Saturday, 20 November 2021
পোল্যান্ড এবং বেলারুশের সীমানায় তুরস্কের স্বার্থ কি?
পোল্যান্ড এবং বেলারুশের সীমানায় মধ্যপ্রাচ্যের হাজার হাজার শরণার্থীদের উপর যখন পোলিশ সেনারা জলকামান, পেপার স্প্রে এবং অন্যান্য অস্ত্র ব্যবহার করছে, তখন কেউ কেউ প্রশ্ন করছেন যে, এর সমস্যার পিছনে শুধুমাত্র বেলারুশের প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কো এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনই রয়েছেন কিনা। ব্রিটেনের ‘দ্যা স্পেকট্যাটর’ পত্রিকার এক লেখায় ‘বলকান ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টিং নেটওয়ার্ক’এর ফেলো ইয়ানিস বাবুলিয়াস বলছেন যে, এই ভূরাজনৈতিক খেলায় তুরস্ককে বাদ দিয়ে ভুল হবে। কারণ বেলারুশের সীমানায় মধ্যপ্রাচ্যের শরণার্থীরা পৌঁছেছে তুরস্কের ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’এর মাধ্যমে।
তুর্কি কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে ‘হুরিয়েত ডেইলি নিউজ’ জানাচ্ছে যে, ১০ই নভেম্বর তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু পোলিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিবিগনিউ রাউএর সাথে ফোনে কথা বলেন। এই কথোপকথনে কাভুসোগলু বলেন যে, তুরস্ক এই সমস্যার অংশ না হলেও কেউ কেউ তা বোঝাতে চাইছে। তিনি তুরস্ক এবং ‘টারকিশ এয়ারওয়েজ’এর বিরুদ্ধে অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে আখ্যা দেন। একইসাথে তিনি বলেন যে, জনগণকে এই অভিযোগের ব্যাপারে সত্যটা জানাতে হবে। তিনি পোল্যান্ডের টেকনিক্যাল তদন্ত দলকে তুরস্কে আমন্ত্রণ জানান। দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এহেন কথোপকথন মাত্র একমাস আগের বৈঠকের সময়েও অন্যরকম ছিল। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহেই কাভুসোগলু পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশ সফর করেন এবং পোল্যান্ডের সীমান্ত ইস্যুতে তুরস্কের সহায়তা দেয়ার আশ্বাস দেন। দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা যৌথ ঘোষণায় বলেন যে, তাদের ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস একত্রে এধরণের হুমকি মোকাবিলায় এবং ইইউএর ভেতর ঢোকার উদ্দেশ্যে মানব পাচারের রুটগুলি খুঁজে বের করবে। জিবিগনিউ রাউ বলেন যে, তিনি কাভুসোগলুকে শরণার্থীদের বিমানে করে বেলারুশের রাজধানী মিনস্কে যাবার ব্যাপারে আরও মনোযোগ দেয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন যে, শরণার্থীদের নিয়ে আসা ফ্লাইটগুলি অনেক ক্ষেত্রেই ইস্তাম্বুলকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে। কাভুসোগলু বলেন যে, নয় মাসে ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’ মিনস্কে ৬’শ ইরাকি নাগরিককে নিয়ে গিয়েছে; যাদের অর্ধেকই আবার ফিরে এসেছে। এই সফরের সময় পোলিশ মন্ত্রী রাউ বলেন যে, দুই দেশের বাণিজ্য এখন প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার; যা শীঘ্রই ৯ বিলিয়নে যাবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।
তুরস্কের প্রতি ইইউএর হুমকি
৮ই নভেম্বর ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেইয়েন বলেন যে, ইইউ খতিয়ে দেখছে যে, তৃতীয় কোন দেশের এয়ারলাইন্স, যারা কিনা “মানব পাচারে জড়িত” রয়েছে, তাদের উপর অবরোধ দেয়া বা তাদেরকে কালো তালিকাভুক্ত করা যায় কিনা। ‘ইইউ অবজারভার’ বলছে যে, ভন ডার লেইয়েন যে তৃতীয় দেশের এয়ারলাইন্সের কথা বলেছে, তা হলো ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’। আর ‘পলিটিকো ইউরোপ’এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, মিনস্কে যাবার প্রধান বিমান রুটটাই হলো তুরস্ক থেকে। ১০ই নভেম্বর পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ম্যাটিউজ মোরাউইয়েকি পার্লামেন্টের এক জরুরি বৈঠকে অভিযোগ করে বলেন যে, পরিষ্কারভাবেই দেখা যাচ্ছে যে, তুরস্কের কর্মকান্ডগুলি বেলারুশ এবং রাশিয়ার সাথে সমন্বয় করা; যা পোলিশরা পছন্দ করছে না। তিনি আরও বলেন যে, মাত্র এক বা দুইমাস আগেই তুরস্ক পোল্যান্ডের সাথে একসাথে কাজ করতে চায় বলে মনে হয়েছিল। তুরস্কের দাবানল ঠেকাতে সহায়তা এবং তুর্কি পর্যটন শিল্পে সহায়তা দেয়াটা খুব সম্ভবতঃ একমুখী সহায়তা ছিল। এই ব্যাপারটা তুরস্ক সরকারকে জানানো হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
একইদিন ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’এর এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, তারা সকল নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সংবেদনশীলতার সাথে সহযোগিতা করে আসছে। একইসাথে বিবৃতিতে বলা হয় যে, তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন। ‘এএফপি’ জানাচ্ছে যে, বেলারুশের রাজধানীতে যাবার সবচাইতে বেশি ব্যবহৃত আকাশ নেটওয়ার্ক হলো ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’। এছাড়াও তুরস্কে রয়েছে বিভিন্ন দেশের প্রায় ৫০ লক্ষ শরণার্থী এবং অভিবাসী। এবং এখনও দেশটা ইউরোপ অভিমুখী শরণার্থীদের যাতায়াতের একটা গুরুত্বপূর্ণ রুট। ‘মিডলইস্ট আই’এর এক প্রতিবেদনে ফ্লাইটের তথ্য দিয়ে বলা হয় যে, গত ৩১শে অক্টোবর থেকে ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’ ইস্তাম্বুল থেকে মিনস্কে সাপ্তাহিক ফ্লাইটের সংখ্যা ১৪ থেকে ১০এ নামিয়ে আনে। ভিসা ফ্রি ট্রাভেল সুবিধা থাকার কারণে বেলারুশ তুর্কি পর্যটকদের জন্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য।
তুরস্কের ‘ইউ টার্ন’
১২ই নভেম্বর তুরস্কের বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা মধ্যপ্রাচ্যের তিনটা দেশ ইরাক, সিরিয়া এবং ইয়েমেনের নাগরিকদের তুরস্ক থেকে বেলারুশে যাওয়া বন্ধ ঘোষণা করে। এই খবর পাবার পর ইউরোপিয়ান কাউন্সিনের প্রেসিডেন্ট চার্লস মিশেল এক টুইটার বার্তায় তুর্কি সরকারকে ধন্যবাদ জানান। পরদিন বার্তাসংস্থা ‘এএফপি’র সাথে এক সাক্ষাতে তুর্কি প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা ইব্রাহিম কালিন বলেন যে, পোল্যান্ডের সীমান্তে মানবিক দুর্যোগের ব্যাপারে তুরস্ক বা ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’কে দোষারোপ করাটা সমীচিন নয়। ভ্রমণকারীরা বেলারুশ গিয়ে সেখান থেকে পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া বা অন্যান্য ইইউ দেশে যাচ্ছে। এর জন্যে তুরস্ক বা ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’কে দোষারোপ করাটা পুরোপুরি অবান্তর। তিনি আরও বলেন যে, তারা নিশ্চিত করতে চান যে, যারা তুরস্ক হয়ে বিভিন্ন দেশে যাতায়াত করে, তারা যেন যাওয়া এবং ফেরত আসার টিকিট সাথে রাখে; অর্থাৎ তারা যেন ফেরত আসে। কিন্তু কেউ যদি বেলারুশে গিয়ে হারিয়ে যায়, তাহলে সেটা তুরস্কের দায় নয়। ‘আল মনিটর’এর সাথে এক সাক্ষাতে ‘পোলিশ ইন্সটিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এফেয়ার্স’এর মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা প্রোগ্রামের প্রধান ক্যারল ওয়াসিলেউস্কি বলেন যে, যদিও তুর্কিরা বলছে যে, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে কোনকিছু করেনি, তথাপি পোলিশ সমাজের কাছে ব্যাপারটা সেভাবে ঠেকেনি। তিনি বলেন যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ। পোল্যান্ডের কৌশলগত সংস্কৃতিতে এর একটা প্রভাব থাকবে। পোলিশরা মনে রাখবে যে, পোল্যান্ডের দুর্যোগের সময় তুরস্ক পাশে থাকেনি। ওয়াসিলেউস্কি মনে করছেন যে, বর্তমানের এই বিরোধ স্বল্প সময়ই স্থায়ী হবে; কূটনীতির মাধ্যমে তা সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু পোল্যান্ডের কর্মকর্তাদের মাঝে যারা একসময় তুরস্কের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের পক্ষপাতি ছিলেন না, তারা এখন এই উদাহরণ টেনে বলতে পারবে যে, তুরস্ক প্রকৃতপক্ষে কোন নির্ভরযোগ্য বন্ধু নয়।
কেউ কেউ বলছেন যে, ইইউ এবং যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের মাঝে সমন্বয় করে তুরস্কের উপর চাপ সৃষ্টি করে বেলারুশে তুর্কি বিমানের ফ্লাইট বন্ধ করেছে। প্রতিরক্ষা ম্যাগাজিন ‘ডিফেন্স নিউজ’এ মতামত দিতে গিয়ে তুর্কি পার্লামেন্টের প্রক্তন সদস্য এবং বর্তমানে ‘ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্র্যাসিস’এর সিনিয়র ডিরেক্টর আইকান এরদেমির বলছেন যে, যদিও ওয়াশিংটন বা ব্রাসেলস কেউই সরাসরি ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’ নিয়ে কথা বলেনি, তথাপি আপাতঃদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে যে, হুমকি দিয়েই ফ্লাইটগুলি বন্ধ করা হয়েছে। কারণ ভন ডার লেইয়েনের হুমকির দু’দিনের মাথায় মেভলুত কাভুসোগলু যেমন দায় স্বীকার করেননি, তেমনি ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’ও বলেছে যে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ অবান্তর। অথচ এর দু’দিনের মাথাতেই ইস্তাম্বুল থেকে মিনস্কে মধ্যপ্রাচ্যের তিন দেশের নাগরিকদের যাওয়া বন্ধ করে দেয়া হয়।
তুরস্ক আসলে কি চাইছে?
কিন্তু প্রশ্ন হলো, গত মে মাসেই যেখানে পোল্যান্ডের সাথে তুরস্কের ২৪টা ‘বায়রাকতার টিবি২’ মনুষ্যবিহীন ড্রোন বিমান কেনার চুক্তি হয়েছে, সেখানে মাত্র কয়েক মাসের মাঝেই তুরস্কের সাথে পোল্যান্ডের সম্পর্ক এই পর্যায়ে কিভাবে আসতে পারে? আর পোল্যান্ডের সীমান্তে তুরস্কের স্বার্থই বা কি? কেনই বা আরেকটা ন্যাটো সদস্য দেশের সাথে তুরস্কের সমন্বয় এত কঠিন হবে? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক ফোকাসের দিকে তাকালেই। পোল্যান্ডের সীমান্ত সমস্যায় তুরস্কের প্রভাব খাটাবার চেষ্টার আলোচনাটা এমন সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের মূল ফোকাস হলো চীন। মার্কিনীরা ইউরোপ সহ দুনিয়ার সকল অঞ্চলে তাদের সামরিক অবস্থান কমিয়ে ইন্দোপ্যাসিফিকে চীনের বিরুদ্ধে মোতায়েন করছে। আর এমন একটা অবস্থায় পূর্ব ইউরোপে উত্তেজনা নিঃসন্দেহে যুক্তরাষ্ট্রকে বিচলিত করবে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র চাইবে যে, ইউরোপিয়রাই তাদের নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিক। তথাপি যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের সীমান্তে একটা দ্বন্দ্বে আটকে থাকলে তা অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নীতিকে প্রভাবিত করবে।
ঠান্ডা যুদ্ধের সময় তুরস্ক যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে ইউরোপের ঢাল হিসেবে কাজ করেছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের কাছে তুরস্কের যে মূল্য ছিল, তা এখন নেই। কারণ বর্তমানে রুশ হুমকিকে ইউরোপের শক্তিধর দেশগুলি ততটা বড় হিসেবে দেখছে না। ইইউ এবং ন্যাটোর সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে জার্মানি এবং তার পার্শ্ববর্তী পোল্যান্ডের মাঝে চিন্তার ব্যাপক ফারাক রয়েছে। ইইউএর প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি জার্মানি তার বেশিরভাগ গ্যাস আমদানি করে থাকে রাশিয়া থেকে। অপরদিকে রাশিয়ার হুমকি মোকাবিলায় পোল্যান্ড চাইছে তাদের দেশে ন্যাটোর সেনা মোতায়েন থাকুক। ইইউএর এই বিভাজনের সময়েই ইউরোপ এবং রাশিয়ার মাঝে যুক্তরাষ্ট্র ব্যালান্স দেখতে চায়। ব্রেক্সিট পরবর্তী ব্রিটেনও সেটাই চায়; তাই তারাও পোল্যান্ডকে সীমান্ত শক্তিশালী করতে সহায়তা দিতে এগিয়ে এসেছে। সেই জায়গাটাতেই তুরস্ক জড়িত থাকতে চাইছে, ঠিক যেখানে যুক্তরাষ্ট্র একটা শূন্যস্থান রেখে যাচ্ছে। ঠান্ডা যুদ্ধ শেষেও একুশ শতকের ধ্বসে পরা বিশ্বব্যবস্থায় তুরস্ক পশ্চিমাদের কাছে তার মূল্য ধরে রাখতে চাইছে। অন্ততঃ ইইউএর সীমান্তে প্রচন্ড শীতের মাঝে শরণার্থীদের উপর জলকামানের ব্যবহার ইইউএর মানবাধিকারের স্তম্ভকে যতক্ষণ নাড়া দেবে, ততক্ষণ তুরস্ক ইইউএর সাথে কূটনৈতিক দরকষাকষির সুযোগ পাবে। আর তুরস্কের সাথে ইইউএর দ্বন্দ্বের তালিকা এখন বেশ বড়। তবে যুদ্ধবিমান বা যুদ্ধজাহাজ বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে নয়, বরং নিজস্ব বেসামরিক এয়ারলাইন্স ব্যবহার করেই তুরস্ক এই কাজটা করেছে। একুশ শতকে যুদ্ধের নতুন সংজ্ঞায় শরণার্থীরা যেমন বেলারুশ এবং রাশিয়ার কাছে অস্ত্র, তেমনি ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’ হয়েছে তুরস্কের অস্ত্র।
Sunday, 31 October 2021
বেলারুশ কি ইইউএর বিরুদ্ধে ‘হাইব্রিড’ যুদ্ধ চালাচ্ছে?
পূর্ব ইউরোপের দেশ বেলারুশের সাথে ইইউএর যখন উত্তপ্ত সম্পর্ক চলছে, তখন ইইউএর অনেকেই অভিযোগ করছেন যে, বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কো ইইউএর সাথে শরণার্থী ব্যবহার করে ‘হাইব্রিড’ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন। আর এই যুদ্ধে লুকাশেঙ্কোর প্রধান সমর্থনকারী হলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। অপরদিকে ইইউএর পূর্ব সীমানার দেশ লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া এবং পোল্যান্ড শরণার্থীদের আটকাতে তাদের সীমানায় দেয়াল তৈরিতে উদ্যত হয়েছে; এবং এব্যাপারে তারা ইইউএর সহায়তা চাইছে।
‘ফিনানশিয়াল টাইমস’এর সাথে সাক্ষাতে ইইউএর স্বরাষ্ট্র কমিশনার ইয়ালভা জোহানসন বলেন যে, বেলারুশের প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কো মানুষকে আগ্রাসনের জন্যে ব্যবহার করছেন। তিনি দাবি করেন যে, বেলারুশের উপর ইইউএর অবরোধগুলি তাকে আঘাত করছে বলেই তিনি এখন মরিয়া হয়ে দ্বন্দ্বের দিকে ধাবিত হতে বাধ্য হচ্ছেন। ‘ইউরোনিউজ’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ২০২০ সালে বেলারুশের নির্বাচনে জেতার পর থেকেই ইইউএর সাথে লুকাশেঙ্কো সরকারের সম্পর্ক খারাপের দিকে যেতে থাকে। ইইউ থেকে নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং এরপর থেকে বেলারুশের রাস্তায় প্রতিবাদ শুরু হয়। ইইউ লুকাশেঙ্কো সরকারের উপর অবরোধ আরোপ করে এবং দ্বন্দ্ব চলতেই থাকে। বেলারুশ সরকার ‘রায়ান এয়ার’এর একটা বিমানকে মিনস্ক বিমানবন্দরে নামতে বাধ্য করে এবং বিমানের অভ্যন্তর থেকে এক সাংবাদিককে বের করে এনে গ্রেপ্তার করে। গত অগাস্টে টোকিও অলিম্পিক থেকে পালানো বেলারুশ এথলেট ক্রিস্টসিনা সিমানুস্কায়াকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেয় ইইউএর সদস্য দেশ পোল্যান্ড; যা বেলারুশের সাথে দেশটার সম্পর্ক খারাপ করে। তবে এক সংবাদ সন্মেলনে লুকাশেঙ্কো অস্বীকার করেন যে, তিনি শরণার্থীদেরকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন। তিনি বলেন যে, বেলারুশ কাউকে ‘ব্ল্যাকমেইল’ করে না; তবে তারা যদি বেলারুশকে শর্তের মাঝে ফেলে, তাহলে বেলারুশ প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য হবে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন যে, তার দেশের রাশিয়া, চীন বা ইইউএর মতো সম্পদ নেই।
তবে বেলারুশ থেকে আসা শরণার্থীর চাপে প্রতিবেশী দেশ লিথুয়ানিয়া এবং লাটভিয়া জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। পোল্যান্ডও তার সীমান্ত অঞ্চলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে এবং প্রায় ৬ হাজার সেনা সীমানায় মোতায়েন করে। লাটভিয়া এবং পোল্যান্ড উভয় দেশই তাদের সীমান্তরক্ষী এবং সামরিক বাহিনীকে শক্তি ব্যবহার করে শরণার্থীদের বেলারুশে ফিরিয়ে দেয়ার ক্ষমতা প্রদান করেছে। পোল্যান্ডের পার্লামেন্টে বিল পাশ করে সাড়ে তিন’শ মিলিয়ন ইউরো ব্যয়ে বেলারুশের সাথে ৪’শ কিঃমিঃ সীমানা বরাবর দেয়াল তোলার প্রকল্প নেয়া হয়েছে। পোলিশ সরকার বলছে যে, এবছরেই তারা বেলারুশ থেকে শরণার্থী ঢোকার চেষ্টার ২৩ হাজার প্রচেষ্টাকে তালিকাভুক্ত করেছে। লিথুয়ানিয়াও বেলারুশের সীমানায় কাঁটাতাদের বেড়া দেয়া শুরু করেছে। ইউরোপিয়ান কমিশনের এক বিবৃতিতে এই বেড়া দেয়াকে ‘ভালো চিন্তা’ বলে আখ্যা দেয়া হয়। তবে ইইউ এই প্রকল্পে কোন অর্থায়ন করবে না বলে বলা হয়। লিথুয়ানিয়া সরকার ইইউএর কাছ থেকে এব্যাপারে সহায়তা চেয়েছে।
‘ডয়েচে ভেলে’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, শরণার্থীদের মূল স্রোত আসছে ইরাকের উত্তরের কুর্দী অধ্যুষিত অঞ্চল থেকে। ইরাক, সিরিয়া এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে শরণার্থীরা ১৪ থেকে ১৭ হাজার ডলার খরচ করে মানব পাচারকারীদের মাধ্যমে সেখানে পৌঁছাচ্ছে। প্রথমে এবছরের অগাস্টে বাগদাদ থেকে সরাসরি শরণার্থীরা বেলারুশে আসতে থাকে। এরপর ইইউএর চাপের মুখে ইরাক সরকার সরাসরি ফ্লাইট বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে ইরাক থেকে শরণার্থীরা দুবাই, লেবানন, সিরিয়া, জর্দান, তুরস্ক, ইত্যাদি দেশ হয়ে বেলারুশে আসতে থাকে। অনেকেই অভিযোগ করছেন যে, বেলারুশ সরকার মিনস্ক বিমানবন্দর থেকেই শরণার্থীদের সরাসরি পোল্যান্ডের সীমানায় পাঠিয়ে দিচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ইইউএর সাথে দ্বন্দ্ব শুরু হবার পর থেকে বেলারুশ সরকার ভিসা ইস্যু করার দায়িত্ব বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সির হাতে দিয়ে দেয়। এই এজেন্সিগুলি বিভিন্ন উপায়ে শরণার্থীদের বেলারুশে পাঠাবার ব্যবস্থা করতে থাকে।
বেলারুশের সীমানার সমস্যার এক ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছেন ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘চ্যাটহ্যাম হাউজ’এর এসোসিয়েট ফেলো সামানথা ডে বেনডার্ন। বেলারুশের বিতর্কিত নির্বাচনের এক বছরের মাথায় ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা বেলারুশের প্রধান রপ্তানি দ্রব্য পটাশ, অপরিশোধিত তেল, এবং আরও কিছু পণ্যের উপর অবরোধ দেয়। একইসাথে বেলারুশের উপর ব্রিটেনের অর্থবাজার থেকে অর্থ যোগানের উপরও অবরোধ দেয়া হয়। এর পাল্টা হিসেবে লুকাশেঙ্কো মধ্যপ্রাচ্য থেকে শরণার্থী ঢোকার পথ খুলে দেন। বেনডার্ন বলছেন যে, এটা হলো একধরনের ‘হাইব্রিড’ যুদ্ধ, যা শরণার্থীদেরকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ইইউ এবং ন্যাটোর পূর্ব সীমানায় উত্তেজনা সৃষ্টি করা ছাড়াও মিত্র দেশগুলির মাঝে বিরোধের জন্ম দিতে চাইছে। নতুন শরণার্থী সমস্যার কারণে পূর্ব ইউরোপে শরণার্থী বিরোধী মনোভাবকে আরও বেশি উস্কে দিতে পারে এবং অভিবাসন বিরোধী রাজনৈতিক গ্রুপগুলিকে শক্তিশালী করতে পারে। এই ব্যাপারটা ইতোমধ্যেই জার্মানি এবং সুইডেনে দেখা গেছে; যেখানে সমাজের সমস্যার জন্যে উগ্র ডানপন্থীরা শরণার্থীদের দায়ী করছে। একইসাথে তা উগ্র জাতীয়তাবাদ, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং ইইউ বিরোধী চিন্তার জন্ম দিয়েছে। রাশিয়া বহুদিন ধরেই চাইছে ইউরোপে ডানপন্থীদের উত্থান হোক; যা ইইউ এবং ন্যাটোকে দুর্বল করবে। বেনডার্ন মনে করেন না যে, এই ‘হাইব্রিড’ যুদ্ধ বেলারুশের পক্ষে মস্কোর অনুমতি ছাড়া করা সম্ভব।
মানবাধিকার সংস্থাগুলি পোল্যান্ড এবং বেলারুশ উভয় দেশের বিরুদ্ধেই আশ্রয়প্রার্থীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগে মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গের অভিযোগ করেছে। ইতোমধ্যেই প্রচন্ড শীত এবং অন্যান্য সমস্যায় পড়ে কমপক্ষে আটজন শরণার্থীর মৃত্যু হয়েছে বলে খবর পাওয়া যায়। পশ্চিমা চিন্তার স্তম্ভ মানবাধিকার ইইউএর সদস্য রাষ্ট্রগুলির শরণার্থী বিরোধী জাতীয়তাবাদী চিন্তার কাছে হার মেনেছে। পোল্যান্ডের পার্লামেন্টে গণতান্ত্রিকভাবেই শরণার্থীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। রাশিয়ার সমর্থনে বেলারুশ ইউরোপের দুর্বলতাকেই উস্কে দিচ্ছে; যাকে ইইউ বলছে ‘হাইব্রিড’ যুদ্ধ। লিবারাল গণতান্ত্রিক দেশগুলি যখন শরণার্থীর ঢল ঠেকাতে দেয়াল তুলছে এবং সামরিক বাহিনী ব্যবহার করছে, তখন বেলারুশে লিবারাল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার দাবি তুলে লুকাশেঙ্কো সরকারের উপর অবরোধ আরোপ পরস্পরবিরোধীই বটে। ইউরোপের লিবারাল গণতান্ত্রিক আদর্শ দিনে দিনে দুর্বল হচ্ছে; আর এর স্থলাভিষিক্ত হচ্ছে উগ্রবাদী জাতীয়তাবাদী চিন্তা। লিবারাল চিন্তার উৎসস্থলে এই দুর্যোগ ধ্বসে পড়া বিশ্বব্যবস্থারই প্রমাণ মাত্র।
Tuesday, 18 August 2020
বেলারুশ ... ভূরাজনৈতিক খেলার গুটি
১৯শে অগাস্ট ২০২০
২৬ বছর ধরে ক্ষমতা ধরে রেখেছেন বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কো। বিশ্বব্যাপী মিডিয়াতে যখন বেলারুশের রাস্তায় লুকাশেঙ্কোর বিরোধী বিশাল সমাবেশের ছবি আসছে, তখন অনেকেই প্রশ্ন করছেন বেলারুশের ভবিষ্যৎ নিয়ে। এটা শুধু এক ব্যক্তির ভবিষ্যৎ নয়; বেলারুশ রাষ্ট্র এবং তার প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ।
৬৫ বছর বয়সী লুকাশেঙ্কো ১৯৯৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম রাউন্ডে ৪৫ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। দ্বিতীয় রাউন্ডে ৮০ শতাংশ ভোট পেয়ে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৯৯ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি রাশিয়ার সাথে রাজনৈতিক একত্রীকরণের একটা চেষ্টায় অংশ নিয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত এই পরিকল্পনা ভেস্তে গেলেও দুই দেশের মাঝে ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক এখনও যথেষ্ট গভীর। ২০১১ সালের শুমারি অনুযায়ী প্রায় ৯৫ লক্ষ মানুষের দেশ বেলারুশের ৪৮ শতাংশ মানুষ ইস্টার্ন অর্থোডক্স খ্রিস্টান। একারণেই রুশ অর্থোডক্স চার্চের সাথে তাদের সুসম্পর্ক রয়েছে। দেশটার দু’টা অফিশিয়াল ভাষার একটা বেলারুশিয়ান; আরেকটা রুশ। ‘ন্যাশনাল স্ট্যাটিসটিক্যাল কমিটি অব দ্যা রিপাবলিক অব বেলারুশ’এর হিসেবে দেশটার ৫৩ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা বেলারুশিয়ান; আর সাড়ে ৪১ শতাংশের মাতৃভাষা রুশ। তথাপি দেশটার ৭০ শতাংশ মানুষ নিজেদের বাড়িতে সাধারণতঃ রুশ ভাষাতেই কথা বলে।
২০০১ সালের নির্বাচনে লুকাশেঙ্কো প্রায় ৭৭ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন। ২০০৬ সালের নির্বাচনে তিনি ৮৪ শতাংশ ভোটে জয়ী হন। ২০১০ সালের নির্বাচনে পান ৮০ শতাংশ ভোট। ২০১৫ সালে তিনি আবারও ৮৪ শতাংশ ভোটে জয়ী হন। এবার ২০২০ সালে তিনি পেয়েছেন ৮০ শতাংশ ভোট। প্রতিবারই লুকাশেঙ্কোর বিরুদ্ধে কারচুপির অভিযোগ উঠেছে; প্রতিবাদও হয়েছে। তবে ২০২০ সালের প্রতিবাদ ছিল পুরোপুরি আলাদা। ‘কিয়েভ পোস্ট’ বলছে যে, ২০১০ সালের নির্বাচনের পর প্রতিবাদের অপরাধে প্রায় ৭’শ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, ২০০৬ সালের নির্বাচনের পরেও সাড়ে ৪’শর বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল; পুলিশের সাথে প্রতিবাদকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষও হয়। তবে ২০১৫ সালের নির্বাচনে তেমন কোন প্রতিবাদই হয়নি।
প্রতিবারের নির্বাচনের পরই রাশিয়া লুকাশেঙ্কোকে অভিনন্দনের মাধ্যমে সমর্থন দিয়েছে। ইউরোপিয় সরকারগুলি লুকাশেঙ্কোর সমালোচনা করলেও তার সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক অব্যাহত রেখেছে। আদর্শগতভাবে গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং বাকস্বাধীনতার বিপক্ষে কাজ করলেও লুকাশেঙ্কো ছিল ইউরোপের কাছে গুরুত্বপূর্ণ; কারণ তাকে পশ্চিমারা রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের একজন প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে চেয়েছে। আর অন্যদিকে নিজস্ব নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থেই রাশিয়া বেলারুশের একনায়ককে সাথে রেখেছে, যদিও তার ২৬ বছরের শাসনামলে মস্কোর সাথে সম্পর্ক সকল সময়ে মধুর ছিল না। বেলারুশের ভূরাজনৈতিক এই অবস্থানকে আরও গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেশটাকে ভূরাজনৈতিক খেলার গুটি হিসেবেই মনে হবে। দেশটার গুরুত্ব শুধু একজন ব্যক্তির মাঝে সীমাবদ্ধ নয়।
তেল ও গ্যাস ... ইউরোপ এবং রাশিয়ার পারস্পরিক নির্ভরশীলতা
ইউরোপ, বিশেষ করে জার্মানি রাশিয়ার তেল গ্যাসের উপর যথেষ্টই নির্ভরশীল। জার্মান ফেডারেল মিনিস্ট্রি ফর ইকনমিক এফেয়ার্স এন্ড এনার্জির হিসেবে জার্মানি প্রতি বছর প্রায় ৯ কোটি টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করে থাকে। এর মাঝে এক তৃতীয়াংশের বেশি সরবরাহ আসে রাশিয়া থেকে, যা কিনা প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ কোটি টন। রাশিয়া বাদে নরওয়ে এবং ব্রিটেন থেকে আসে প্রায় ১ কোটি টন করে। বাকিটা মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলি থেকে আসে। গবেষণা সংস্থা ‘সিইআইসি ডাটা’ বলছে যে, জার্মানি দৈনিক ১৭ লক্ষ ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত তেল আমদানি করে থাকে। পশ্চিম ইউরোপে জার্মানি ছাড়াও নেদারল্যান্ডস আমদানি করে সাড়ে ১১ লক্ষ ব্যারেল তেল; ফ্রান্স প্রায় ১০ লক্ষ ব্যারেল; বেলজিয়াম ৭ লক্ষ ব্যারেল। আর পূর্ব ইউরোপে পোল্যান্ড আমদানি করে প্রায় ৫ লক্ষ ব্যারেল।
আরেক বড় আমদানিকারক নেদারল্যান্ডস ২০১৯ সালে প্রায় ৪৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের অপরিশোধিত তেল আমদানি করে, যা কিনা বিশ্বে আমদানিকারকদের মাঝে ষষ্ঠ বৃহত্তম। জার্মানি সপ্তম স্থানে রয়েছে প্রায় ৪১ বিলিয়ন ডলারের তেল আমদানি করে।‘স্ট্যাটিসটিকস নেদারল্যান্ডস’ বলছে যে, নেদারল্যান্ডসের প্রায় এক তৃতীয়াংশ বা প্রায় ১ কোটি ৭০ লক্ষ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি হয় রাশিয়া থেকে। ‘স্ট্যাটিসটা’র হিসেবে নেদারল্যান্ডস ২০১৯ সালে প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলারের রুশ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। জার্মানি আমদানি করে ৮ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের তেল; বেলারুশ এবং ইতালি আমদানি করে প্রত্যেকে সাড়ে ৬ বিলিয়ন ডলারের তেল; পোল্যান্ড প্রায় ৬ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার; ফিনল্যান্ড ৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার; স্লোভাকিয়া ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের তেল। একই বছরে রাশিয়া মোট ১’শ বিলিয়ন ডলারের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করে। আর এর মাঝে শুধু ইউরোপেই অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করে রাশিয়া ৫৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি আয় করে। অর্থাৎ ইউরোপই শুধু রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের উপরে নির্ভরশীল নয়, রাশিয়ারও ইউরোপের উপরে নির্ভরশীলতা রয়েছে তার অপরিশোধিত তেল রপ্তানির জন্যে।
‘ওইসিডি’র এক হিসেব বলছে যে, ১৯৬০এর দশক থেকে ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার ২০ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এই গ্যাসের মূল ব্যবহার শীতকালে বাড়িঘর উষ্ণ রাখার জন্যে। অন্য কথায় এই চাহিদাটা ইউরোপের সাধারণ জনগণের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জার্মানিতে গ্যাসের ব্যাবহার প্রায় ৮৫ বিলিয়ন কিউবিক মিটার বা বিসিএম। এর মাঝে প্রায় ৬০ বিসিএমই আসে রাশিয়া থেকে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আমদানিকারক ইতালির প্রায় ৭০ বিসিএম আমদানির মাঝে ২৫ বিসিএম আসে রাশিয়া থেকে। তুরস্ক তার প্রায় ৫০ বিসিএম চাহিদার মাঝে ২৫ বিসিএম পায় রাশিয়া থেকে। পোল্যান্ড তার প্রায় ২০ বিসিএম চাহিদার মাঝে ১০ বিসিএম রাশিয়া থেকে আমদানি করে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের হিসেবে রাশিয়া ইইউএর প্রায় ৪০ শতাংশ গ্যাসের সরবরাহকারী।
রাশিয়ার তেল গ্যাসের উপর ইউরোপের নির্ভরশীলতাকে যুক্তরাষ্ট্র মোটেই স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে ‘নর্ড স্ট্রিম ২’ প্রকল্প নিয়ে জার্মানির সাথে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব সেটাই দেখিয়ে দেয়। ইউক্রেনের যুদ্ধের সময় পাইপলাইনের মাধ্যমে রুশ গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবার পর ইউরোপই সবচাইতে বেশি চিন্তায় পড়েছিল। বেলারুশও ঠিক একই কারণে রাশিয়া এবং ইউরোপের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। বেলারুশের রাজনৈতিক অবস্থান যেন ইউরোপে গ্যাস সরবরাহে সমস্যা তৈরি করতে না পারে, সেকারণে বেলারুশকে বাইপাস করা গ্যাস পাইপলাইনগুলি রাশিয়া এবং ইউরোপের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
পাইপলাইন এবং বাইপাস পাইপলাইনের ভূরাজনীতি
ভূরাজনৈতিক গবেষণা সংস্থা ‘জিওপলিটিক্যাল ফিউচার্স’এর এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, রাশিয়ার উপর তেল গ্যাসের জন্যে নির্ভরশীলতা ইউরোপে একটা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। পোল্যান্ড রুশ গ্যাসের উপর নির্ভরশীলতা কমানোর লক্ষ্যে ‘বল্টিক পাইপ’ প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যার মাধ্যমে নরওয়ে থেকে পাইপলাইন ডেনমার্ক হয়ে পোল্যান্ডে আসবে। এর সক্ষমতা প্রায় ১০ বিসিএম। ২০২২ সালে পোল্যান্ডের সাথে রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহের চুক্তির মেয়াদ উত্তীর্ণ হবে। তখন ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের এই পাইপলাইন রাশিয়ার উপর পোল্যান্ডের নির্ভরশীলতা একেবারেই কমিয়ে ফেলবে। পোল্যান্ড রাশিয়ার সীমান্তে থাকায় ন্যাটোর সদস্য হিসেবে রাজনৈতিকভাবে পোল্যান্ডের অবস্থান বেশ সংবেদনশীল। রুশ হুমকি মোকাবিলা করতেই রাশিয়ার গ্যাসের উপর নির্ভরশীলতা কমাতে চাইছে পোল্যান্ড। অপরদিকে জার্মানি রাশিয়া থেকে গ্যাস আমদানি বৃদ্ধি করতে চাইছে। বর্তমানে জার্মানি যে কয়টা গ্যাস পাইপলাইন দিয়ে রাশিয়া থেকে গ্যাস আমদানি করে, তার মাঝে ২০০৭ সালে তৈরি করা ‘নর্ড স্ট্রিম’ সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। এর সক্ষমতা প্রায় ৫৫ বিসিএম। এই পাইপলাইনের সমান্তরালে একই সক্ষমতার আরেকটা ‘নর্ড স্ট্রিম ২’ পাইপলাইন তৈরির প্রকল্প নেয়া হয়েছে, যা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে জার্মানি এবং রাশিয়ার টানাপোড়েন চলছে। পাশাপাশি দেশ পোল্যান্ড এবং জার্মানি রাশিয়ার ব্যাপারে পুরোপুরি বিপরীত অবস্থানে রয়েছে। পোল্যান্ড যেখানে রাশিয়ার উপর নির্ভরশীলতা শূণ্যের কোঠায় নিয়ে আসতে চাইছে, সেখানে জার্মানি তার নির্ভরশীলতাকে দ্বিগুণ করতে চাইছে। এই ইস্যুতেই জার্মানির সাথে যুক্তরাষ্ট্রের দূরত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে; আর অপরদিকে পোল্যান্ডের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন হচ্ছে।
মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘দ্যা জেমসটাউন ফাউন্ডেশন’এর এক প্রতিবেদনে বেলারুশের বিশেষ ভৌগোলিক অবস্থানকে গুরুত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বেলারুশ এমন একটা দেশ, যা নিজে তেল গ্যাস উৎপাদন না করলেও এর রপ্তানি পণ্যের একটা বড় অংশই তেল গ্যাস। স্থলবেষ্টিত এই দেশটা ইউরোপ এবং রাশিয়ার মাঝে সেতুর মতো। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় সোভিয়েতরা বেলারুশে দু’টা তেল রিফাইনারি তৈরি করেছিল। ১৯৫৮ সালে তৈরি করা নাফতান রিফাইনারির বাৎসরিক সক্ষমতা ১ কোটি ২০ লক্ষ টন। আর মজির রিফাইনারির সক্ষমতা ৮০ লক্ষ টন। এই রিফাইনারিগুলিতে দ্রুজবা পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল আসে সাইবেরিয়ার তেলখনিগুলি থেকে; আর সেখান থেকে রিফাইন করা বিভিন্ন জ্বালানি পাইপলাইনের মাধ্যমে যায় ইউরোপের বাজারে। এই পাইপলাইনের মাধ্যমে রাশিয়ার তেল যায় জার্মানি, পোল্যান্ড, বেলারুশে। এই পাইপলাইনের মাধ্যমে বেলারুশ প্রায় ২ কোটি ৪০ লক্ষ টন অপরিশোধিত তেল পায় রাশিয়া থেকে; আর একই পাইপলাইনের মাধ্যমে রাশিয়া থেকে ইউরোপ যাচ্ছে ৪ কোটি টন তেল।
তেল ছাড়াও বেলারুশ পাইপলাইনের মাধ্যমে রাশিয়া থেকে ২০ বিসিএম গ্যাস আমদানি করে; আর একইসাথে প্রায় ৩৯ বিসিএম গ্যাস বেলারুশ হয়ে ইউরোপ যায়। রাশিয়া থেকে ভূমির উপর দিয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে ইউরোপে যতো গ্যাস যায়, তার পুরোটাই যায় বেলারুশ এবং ইউক্রেনের উপর দিয়ে। এর বাইরে গ্যাস যাচ্ছে কৃষ্ণ সাগর এবং বল্টিক সাগরের তলদেশ দিয়ে।
ঠান্ডা যুদ্ধের পর বেলারুশ স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাবার পর থেকেই দেশটার অর্থনীতি তেল গ্যাস বাণিজ্যের উপরে নির্ভরশীল। বেলারুশ পাইপলাইনের ব্যবসা করা ছাড়াও স্বল্প মূল্যে রাশিয়া থেকে গ্যাসের সরবরাহ পায়। তেল গ্যাসের মূল্য নিয়ে রাশিয়ার সাথে বেলারুশের দ্বন্দ্ব হয়েছে বহুবার। দ্বন্দ্বের জের হিসেবে রাশিয়া ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বেলারুশে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এর ফলশ্রুতিতে ইউরোপের জনগণকে গ্যাসের অভাবে প্রচন্ড ঠান্ডায় শীত পোহাতে হয়েছিল। প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে বেলারুশ ইউরোপে রাশিয়ার গ্যাস সরবয়াহ বন্ধ করে দিয়েছে কয়েকবার। আর ২০০৭ সাল থেকে বেলারুশ নতুন কৌশল হিসেবে ইউরোপের উদ্দেশ্যে পাঠানো গ্যাস থেকে নিজেদের জন্যে গ্যাস সরিয়ে রাখার হুমকি দিতে থাকে। আর তেলের বাজারে মূল্যপতনের পর থেকে বেলারুশের পাইপলাইনের আয়ও কমতে থাকে। ২০১৬ সালে রাশিয়া বেলারুশের কাছে বিক্রি করা তেলের মূল্য বৃদ্ধি করতে চাইলে বেলারুশ রাজি হয়নি। কিন্তু রাশিয়া তার দাবি আদায়ে ২০১৭ সালের শুরুতে বেলারুশে তেলের সরবরাহ ৩০ শতাংশ কমিয়ে দেয়। বাধ্য হয়ে বেলারুশ বেশি মূল্য দিয়ে ইউক্রেন এবং পোল্যান্ডের সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। ২০১৯এর অগাস্টে বেলারুশ নিজ দেশের উপর দিয়ে যাওয়া রুশ পাইপলাইনের ট্রানজিট ফি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধি করার ঘোষণা দেয়। আর ২০২০এর জানুয়ারিতে বেলারুশ পাইপলাইনের ট্রানজিটের উপর আরও ৬ শতাংশ ট্যারিফ আরোপ করে।
ইউক্রেনের সাথেও রাশিয়ার পাইপলাইনের বিরোধ বহুদিনের। থেকে থেকে চলা এই দ্বন্দ্ব সবচাইতে মারাত্মক আকার ধারণ করে ২০১৪ সালে, যখন ইউক্রেনে রাজনৈতিক পরিবর্তন আসে। সেবছরের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে গণুভ্যুত্থানে রুশ সমর্থিত ভিক্টর ইয়ানুকোভিচের সরকারের পতনের পরপরই রাশিয়া ইউক্রেনের কাছ থেকে ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখল করে নেয়। এর জের হিসেবে পশ্চিমা অবরোধের কারণে রাশিয়ার অর্থনীতিতে ধ্বস নামে। জুন মাসে ইউক্রেনের মাঝ দিয়ে যাওয়া পাইপলাইনগুলিতেও রাশিয়া গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মধ্যস্ততায় গ্যাস সরবরাহ আবারও শুরু হলেও এই পাইপলাইনের মাধ্যমে ইউরোপে গ্যাস রপ্তানি একেবারেই কমে যায়। রাজনৈতিক সমস্যা এড়াতেই ইউক্রেন এবং বেলারুশকে বাইপাস করে বল্টিক সাগর এবং কৃষ্ণ সাগরের নিচ দিয়ে যথাক্রমে ‘নর্ড স্ট্রিম’ এবং ‘তুর্ক স্ট্রিম’ পাইপলাইন তৈরি করা হয়। বেলারুশও আগে যেভাবে ইউরোপে রাশিয়ার তেল গ্যাস রপ্তানি করার পাইপলাইন বন্ধ করে দেবার হুমকি দিয়ে আলোচনার টেবিলে রাশিয়ার উপর চাপ সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখতো, এই বাইপাস পাইপলাইনগুলির কারণে বেলারুশের সেই ক্ষমতা অনেকাংশেই কমে গিয়েছে।
রুশ সস্তা গ্যাসের কবল থেকে বের হবার পথ খুঁজে পাচ্ছে না বেলারুশ
বেলারুশের অর্থনীতি পুরোপুরিভাবে গ্যাস নির্ভর। দেশটার ৯০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় গ্যাস থেকে। শীতকালে বাড়ি উষ্ণ রাখার জন্যেও গ্যাসই ব্যবহার করা হয়। বেলারুশ নিজ দেশে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে আনার চেষ্টা করেও সফলতা পায়নি।‘ওয়ার্ল্ড ও মিটারস’এর হিসেবে বেলারুশে মাথাপিছু গ্যাস ব্যবহার প্রায় ১’শ ৮১ কিউবিক ফিট। অপরদিকে ব্রিটেনে মাথাপিছু গ্যাস ব্যবহার প্রায় ১’শ ১৫ কিউবিক ফিট; জার্মানিতে প্রায় ১’শ ৯ কিউবিক ফিট। ফ্রান্সে এটা মাত্র ৬২ কিউবিক ফিট; পোল্যান্ডে মাত্র ৫১ কিউবিক ফিট। সবচাইতে বেশি নেদারল্যান্ডসে ২’শ ৪৭ কিউবিক ফিট; বেলজিয়ামে ১’শ ৪৯ কিউবিক ফিট।
প্রতি হাজার কিউবিক মিটারে বেলারুশ রাশিয়াকে যা দিচ্ছে, তা বাকি দুনিয়ার চাইতে অনেক কম। উদাহরণস্বরূপ, ‘রয়টার্স’ বলছে যে, রাশিয়া ২০১৬ সালে কিরগিজস্তানে রপ্তানি করা গ্যাসের মূল্য প্রতি হাজার কিউবিক মিটারে ১’শ ৬৫ ডলার থেকে কমিয়ে ১’শ ৫০ ডলারে নামিয়ে নিয়ে আসে। রুশ বার্তা সংস্থা ‘তাস’কে রুশ কোম্পানি ‘গ্যাজপ্রম’এর ডিরেক্টর জেনারেল এলেনা বুরমিসত্রোভা বলেন যে, ২০১৯ সালে ইউরোপে রপ্তানির জন্যে রাশিয়ার গ্যাসের মূল্য ২’শ ৩০ ডলার থেকে ২’শ ৫০ ডলারের মাঝে ছিল। ২০১৮ সালে এই মূল্য প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়ে গিয়ে ২’শ ৪৫ ডলার হয়। অপরদিকে ‘আনাদোলু এজেন্সি’ বলছে যে, ২০১৯ সালে বেলারুশ রাশিয়াকে গ্যাসের জন্যে ১’শ ২৭ ডলার দিয়েছে, যা কিনা পুরো ইউরেশিয়ার মাঝে সর্বনিম্ন। তদুপরি এবছরের এপ্রিলে রুশ কোম্পানি ‘নেফতেগ্যাজ’ বলে যে, বেলারুশের জ্বালানি মন্ত্রী ভিক্টর কারানকেভিচ বিশ্ব বাজারের সাথে সমন্বয় করে রুশ গ্যাসের মূল্য কমাতে অনুরোধ করেছেন।
রুশ অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ থেকেই তাদের সোভিয়েত আমলের দু’টা রিফাইনারি দিয়ে বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম পণ্য তৈরি করে তা ইউরোপে বিক্রি করে নিজেদের অর্থনীতিকে সচল রাখছে বেলারুশ। আবার রাশিয়া থেকে তেল গ্যাসের পাইপলাইন ইউরোপ পর্যন্ত যাবার পথে তা বেলারুশের উপর দিয়ে যাবার কারণে বেলারুশ সেই পাইপলাইনের উপর ট্রানজিট ফি পায়। রুশ তেল গ্যাসের উপর বেলারুশের নির্ভরশীলতা শুধু অর্থনৈতিক কারণেই নয়; রাজনৈতিক কারণেও গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া বেলারুশকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সর্বদাই অর্থনৈতিক চাপকে ব্যবহার করেছে। রাশিয়ার সাথে ইউক্রেনের বিরোধের মাঝেই বেলারুশের সাথেও বিরোধ চলছিল। রাশিয়া বহুবার বেলারুশে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করেছে; কিন্তু ইউক্রেন যেভাবে ফুঁসে উঠেছে রুশ নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে, বেলারুশ তা কখনোই করেনি। তাই বেলারুশকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে রাশিয়াকে অপেক্ষাকৃত কম বেগ পেতে হয়েছে।
রাশিয়া এবং বেলারুশের ভৌগোলিক বাস্তবতা
ইউক্রেন এবং বেলারুশকে বাইপাস করে বিকল্প পাইপলাইনের মাধ্যমে ইউরোপে রুশ তেল গ্যাস রপ্তানির ব্যবস্থা করা হলেও বেলারুশ এবং ইউক্রেনের গুরুত্ব কমে যায়নি। ভৌগোলিক কারণেই এই দুই দেশ রাশিয়ার কাছে গুরুত্বপূর্ণ; সেখানে তেল গ্যাসের ইস্যু থাকুক আর না থাকুক। রাশিয়া এই দুই দেশকে নিজের এবং ইউরোপের মাঝে বাফার রাষ্ট্র হিসেবে দেখে। এই দেশগুলিতে ইউরোপিয় প্রভাব মানেই রাশিয়ার কাছে তা ভূরাজনৈতিক হুমকি। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরপরই ইউক্রেনের সাথে ন্যাটো সম্পর্কোন্নয়ন করে। তবে ২০১০ সালে ইউক্রেনে রুশ সমর্থিত ভিক্টর ইয়ানুকোভিচের সরকার ক্ষমতায় আসার পর ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগ দেবার সম্ভাবনা উড়ে যায়। ২০১৪ সালে ইউক্রেনে গণভ্যুত্থান এবং তার পরবর্তীতে সেখানে পশ্চিমা সমর্থিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্যরাষ্ট্র হবার জন্যে জোর প্রচেষ্টা শুরু করে। সেবছরই রাশিয়া ইউক্রেনের কাছ থেকে ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখল করে নেবার পর থেকে ইউক্রেনের জনগণের মাঝে ন্যাটোর সদস্যপদ নেয়ার পক্ষে যুক্তি তৈরি হয়েছে। ‘রয়টার্স’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ২০১২ সালে যেখানে মাত্র ২৮ শতাংশ ইউক্রেনিয়ান ন্যাটোর সদস্যপদের পক্ষে ছিল, ২০১৭ সালের জুনে তা বেড়ে গিয়ে ৬৯ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০১৪ সালে পূর্ব ইউক্রেনের ডনবাসে রুশ সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সাথে ইউক্রেন সরকারের যুদ্ধ শুরু হলে ন্যাটো ইউক্রেনের পক্ষ নেয়। রাশিয়া সরাসরিই জানিয়ে দেয় যে ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগ দেয়াটা রাশিয়ার জন্যে গ্রহণযোগ্য নয়। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বরাত দিয়ে ‘বিবিসি’ বলছে যে, ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্য হলে রাশিয়া তার ক্ষেপণাস্ত্রগুলিকে ইউক্রেনের দিকেও তাক করবে।
মার্কিন ভূরাজনৈতিক চিন্তাবিদ জর্জ ফ্রীডম্যান‘ বিজনেস ইনসাইডার’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে রাশিয়ার ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জের ব্যাখ্যা দেন। গত কয়েক শতাব্দী ধরেই রাশিয়া তার নিরাপত্তার জন্যে বল্টিক রাষ্ট্র লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া, এস্তোনিয়া এবং বেলারুস ও ইউক্রেনের উপর নির্ভরশীল। এই বাফার রাষ্ট্রগুলি রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকার কারণেই ১৮১২ সালে নেপোলিয়ন এবং প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির হামলা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছে রাশিয়া। এই বাফার অঞ্চলগুলির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুদ্ধ হতে হতেই আক্রমণকারীরা দুর্বল হয়ে গিয়েছে। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকেই এই রাষ্ট্রগুলির নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে রাশিয়া। বল্টিক রাষ্ট্রগুলি এবং ইউক্রেন ইতোমধ্যে পশ্চিমাদের নিরাপত্তা বলয়ের মাঝে চলে গিয়েছে।বেলারুশের অবস্থানের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলছেন যে, সোভিয়েত সময়ে রুশ শহর স্মোলেনস্ক ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের অনেক অভ্যন্তরের একটা শহর। কিন্তু বর্তমানে তা হয়ে গিয়েছে বেলারুশের সাথে রাশিয়ার একটা সীমান্ত শহর।
বেলারুশের সীমান্ত থেকে মস্কোর দূরত্ব মাত্র সাড়ে ৪’শ কিঃমিঃ। আর ইউক্রেনের সীমানা থেকে মস্কোর দূরত্ব মাত্র ৫’শ ৩৩ কিঃমিঃ। অথচ বেলারুশ যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ছিল, তখন পোল্যান্ডের সীমানা থেকে মস্কোর দূরত্ব ছিল ১ হাজার কিঃমিঃ। আবার সোভিয়েত আমলে যখন পোল্যান্ড সোভিয়েত নিয়ন্ত্রণে ছিল, তখন পূর্ব জার্মানির সীমানা থেকে মস্কোর দূরত্ব ছিল ২ হাজার কিঃমিঃ। এর অর্থ হলো, সোভিয়েত আমলে যেখানে পশ্চিম ইউরোপের প্রভাবে থাকা অঞ্চল মস্কো থেকে ২ হাজার কিঃমিঃ দূরে ছিল, এখন পূর্ব জার্মানি এবং পোল্যান্ডের পর ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণ পশ্চিম ইউরোপের কাছে চলে যাওয়ায় তা মাত্র ৪’শ থেকে ৫’শ কিঃমিঃ দূরে। এটা রাশিয়ার জন্যে বিরাট একটা ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ, যা মোকাবিলা করতে রাশিয়া এখন অনেক কিছুই করবে। বিশেষ করে ইউক্রেন রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ থেকে বের হয়ে যাওয়ায় রাশিয়া এখন বেলারুশ নিয়ে চিন্তিত।
বেলারুশ রাশিয়ারই থাকবে
মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ইউরেশিয়া গ্রুপের প্রধান ইয়ান ব্রেমার মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, বেলারুশ হলো সেই দেশ যা কিনা সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়া থেকে আলাদা হয়ে যাবার জন্যে খুব বেশি আগ্রহী ছিল না। জাতিগত, ভাষাগত বা সংস্কৃতিগতভাবে বেলারুশের সাথে রাশিয়ার পার্থক্য খুব কম। তাই রাশিয়ার উপর নির্ভরশীলতাকে বেলারুশের জনগণ খুব বেশি সমস্যা বলে মনে করেনি। রাশিয়ার বিরুদ্ধে তারা রাস্তায় নামেনি; বরং বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কোর কুশাসনের কারণেই বেলারুশিয়ানরা রাস্তায় নেমেছে। একারণেই মস্কো খুব সম্ভবতঃ লুকাশেঙ্কোর পক্ষে শক্তি খরচ না-ও করতে পারে। ব্রেমার আর্মেনিয়ার উদাহরণ টেনে বলেন যে, আর্মেনিয়াতেও সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাশিয়া কোন হস্তক্ষেপের চেষ্টা করেনি। কারণ আর্মেনিয়ার জনগণ রাশিয়াকে বরাবরই আর্মেনিয়ার বন্ধু মনে করে।
পাইপলাইনকে কেন্দ্র করে বেলারুশের সাথে রাশিয়ার বিভিন্ন সময়ের বিরোধ ইউরোপকে আরও নিরাপদ তেল গ্যাসের উৎস খুঁজতে অনুপ্রাণিত করেছে। তবে রাশিয়া চায়নি সেই সরবরাহ নেটওয়ার্ক থেকে বাদ পড়ে যেতে; কারণ রাশিয়ার অর্থনীতি ইউরোপের দেশগুলিতে তেল গ্যাস রপ্তানির উপর যথেষ্টই নির্ভরশীল। তাই রাশিয়াও উদ্যোগী হয়েছে ইউক্রেন এবং বেলারুশকে বাইপাস করে ইউরোপে তেল গ্যাস সরবরাহ করতে; ইউরোপও এতে সহায়তা দিয়েছে। ইউরোপ এবং রাশিয়ার এহেন পারস্পরিক অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্যের বিপক্ষে গিয়েছে বলেই যুক্তরাষ্ট্র বল্টিক সাগরের তলদেশ দিয়ে রাশিয়া থেকে জার্মানি পর্যন্ত ‘নর্ড স্ট্রিম ২’ গ্যাস পাইপলাইনের বিরোধিতা করছে। ইউরোপে নিজের প্রভাব ধরে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র সর্বদাই ইউরোপ এবং রাশিয়ার মাঝে মধ্যস্ততাকারী হিসেবে নিজেকে দেখতে চায়।
তেল গ্যাসের উপর নির্ভরশীল অর্থনীতির কারণেই বেলারুশ রাশিয়ার সাথে অর্থনৈতিকভাবে আবদ্ধ থাকবে; রাশিয়া এবং ইউরোপের মাঝে তেল গ্যাস রপ্তানির পাইপলাইনের কারণে নয়। বেলারুশের ভবিষ্যৎ কোন সরকার দেশটার অর্থনীতিকে রাশিয়ার প্রভাব থেকে মুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করবে কিনা, তা নিশ্চিত নয়। কারণ বেলারুশের জনগণের মাঝে রাশিয়া বিরোধী ভাবধারা গত তিন দশকে তৈরি হয়নি; আর খুব তাড়াতাড়িই এটা পরিবর্তিত নাও হতে পারে। ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র চাইবে বেলারুশের সাথে রাশিয়ার দূরত্ব বৃদ্ধি করতে। আপাততঃ বেলারুশে একটা পশ্চিমা ধাঁচের সরকার থাকাটা ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে একটা আদর্শিক জয়।








