Showing posts with label Falklands War. Show all posts
Showing posts with label Falklands War. Show all posts

Tuesday, 2 November 2021

চীন কি আসলেই তাইওয়ান আক্রমণ করবে?

০২রা নভেম্বর ২০২১

অক্টোবর ২০২১। চীনা বেসামরিক রোরো জাহাজের ভিতরে সামরিক গাড়ির বহর। মার্কিন এডমিরাল ফিলিপ ডেভিডসনের ছয় থেকে দশ বছরের ‘উইন্ডো’ এখন মার্কিনীরা ব্যবহার করছে তাদের নৌবহর নতুন করে তৈরি করার জন্যে জনসমর্থন আদায়ে। তবে চুলচেরা বিশ্লেষণে চীনাদের সক্ষমতা এবং আকাংক্ষার মাঝে একটা ফারাক রয়েই যায়। এই ফারাকটাই এখন মার্কিন ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাবাচ্ছে। তারা যে ব্যাপারটাতে নিশ্চিত নন তা হলো তাইওয়ান আক্রমণ করার মতো একটা সিদ্ধান্ত যে চীনের অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করবে, সেটা জেনেও চীনারা এই মিশন বাস্তবায়ন করবে কিনা।

 
গত মার্চে মার্কিন নৌবাহিনীর ইন্দোপ্যাসিফিকের কমান্ডার এডমিরাল ফিলিপ ডেভিডসন মার্কিন সিনেটের সামরিক সার্ভিস কমিটির সামনে বলেন যে, চীনারা আগামী ছয় থেকে দশ বছরের মাঝেই তাইওয়ান দখলের আকাংক্ষা বাস্তবায়নের দিকে যেতে পারে। তিনি আরও আশংকা করেন যে, ২০৫০ সালের মাঝে চীন যুক্তরাষ্ট্রের আইনের শাসন এবং বৈশ্বিক নেতৃত্বকে প্রতিস্থাপন করতে পারে। তার কথায়, চীনারা সবসময়ই বলেছে যে, ২০৫০ সালের মাঝে তারা এটা করতে চায়। তার আংশকা হলো, চীনারা সেই টার্গেটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মার্কিন এডমিরালের সরাসরি জবাব না দিয়ে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ঝাও লিজিয়ান সাংবাদিকদের বলেন যে, তাইওয়ানের ব্যাপারে চীনের অবস্থান পরিষ্কার। দুনিয়ায় চীন একটাই এবং তাইওয়ান চীনের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। ‘এনবিসি’ ব্যাখ্যা দিয়ে বলছে যে, ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্টরা চীনের ক্ষমতা নিলে হেরে যাওয়া জাতীয়তাবাদীরা তাইওয়ানে গিয়ে একটা বিরোধী সরকার গঠন করে। অফিশিয়াল না হলেও তাইওয়ানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক যথেষ্ট গভীর। যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে নিয়মিত অস্ত্র সরবরাহ করে যাচ্ছে। প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাইওয়ানে মার্কিন ক্যাবিনেট কর্মকর্তাদের পাঠিয়ে চীনের সাথে দ্বন্দ্ব বাড়িয়েছিলেন। জো বাইডেনের প্রশাসনও সেই পথেই রয়েছে। চীনারা তাইওয়ানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের গভীর সম্পর্কের ব্যাপারে সর্বদাই প্রতিবাদ করেছে। তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট সাই ইং ওয়েন সাম্প্রতিক নির্বাচনে জেতার পর চীনকে প্রতিরোধ করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। চীনারাও তাইওয়ানের আশেপাশে তাদের সামরিক কর্মকান্ড বৃদ্ধি করে তাইওয়ানকে প্রতিনিয়ত চাপের মাঝে ফেলছে। একারণেই প্রশ্নের জন্ম হয়েছে যে, চীন কি আসলেই তাইওয়ান আক্রমণ করে বসতে পারে কিনা।

তাইওয়ানের উপকূলে যথেষ্ট সেনা মোতায়েনের সক্ষমতা চীনের রয়েছে কি?

‘ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস, অস্টিন’এর প্রতিরক্ষা বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘ওয়ার অন দ্যা রক্স’এর এক লেখায় প্রাক্তন মার্কিন নৌবাহিনী কর্মকর্তা এবং মার্কিং থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটি’র সিনিয়র ফেলো থমাস শুগার্ট বলছেন যে, যারা মনে করছেন যে, চীনের পক্ষে খুব তাড়াতাড়িই তাইওয়ান আক্রমণ করা সম্ভব নয়, তারা একটা যুক্তি দিচ্ছেন যে, তাইওয়ান প্রণালি পেরিয়ে একটা বড় আকারের উভচর অভিযান চালাবার মতো যথেষ্ট সক্ষমতা চীনের নেই। তবে তারা এই হিসেব কষেছেন চীনা নৌবাহিনীর বিশেষায়িত উভচর জাহাজগুলির সক্ষমতার উপর ভিত্তি করে। এখানে তারা চীনের বেসামরিক জাহাজের বহরের সক্ষমতাকে আমলে নেননি; অন্ততঃ একটা সম্ভাব্য উভচর হামলার প্রাথমিক ধাপে তো নয়ই। শুগার্ট বলছেন যে, যদি চীনাদের বেসামরিক জাহাজগুলিকে এখানে হিসেবে নেয়া হয়, তাহলে এডমিরাল ডেভিডসনের কথাগুলি হালে পানি পায়।

তবে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে পেন্টাগনের করা এক গবেষণায় বলা হচ্ছে যে, আপাতদৃষ্টিতে চীনের উভচর নৌবহরের মূল লক্ষ্য হয়তো চীন থেকে দূরবর্তী অঞ্চলে মিশন পরিচালনা করা। তাইওয়ান প্রণালি পার হয়ে উভচর মিশন পরিচালনা করতে চীনের দরকার বিপুল সংখ্যায় ল্যান্ডিং শিপ এবং মিডিয়াম ল্যান্ডিং ক্রাফট; যেগুলি তাদের নেই এবং সেগুলি তৈরি করার উপর তারা কোন প্রাধান্যও দেয়নি। তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও মনে করছে যে, তাইওয়ান আক্রমণ করার মতো যথেষ্ট ল্যান্ডিং ভেহিকল এবং লজিস্টিক্যাল সক্ষমতা চীনের নেই। মার্কিন সরকারের ‘ইউএস চায়না ইকনমিক এন্ড সিকিউরিটি রিভিউ কমিশন’এর ২০২০ সালের প্রতিবেদনেও তাইওয়ানকে নিয়ন্ত্রণে নেবার জন্যে চীনের যথেষ্ট উভচর সক্ষমতা এবং বিমান পরিবহণ সক্ষমতা নেই বলে বলা হয়। তারা এই শূণ্যস্থান পূরণে বেসামরিক জাহাজ ব্যবহারের প্রশিক্ষণ নেয়া শুরু করেছে; যেগুলির মাধ্যমে তারা দ্বিতীয় ধাপে তাইওয়ানে সেনা পাঠাতে পারবে। প্রথম ধাপে তাইওয়ানের উপকূলে চীনা নৌবাহিনীর উভচর জাহাজগুলিকেই সেনা নামাতে হবে; যারা সমুদ্রবন্দরগুলি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বা অস্থায়ী জেটি তৈরি করে বেসামরিক জাহাজ ভেড়ার ব্যবস্থা করবে। তবে একই কমিশনের সামনে কথা বলতে গিয়ে প্রাক্তন মার্কিন ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তা লনি হেনলি বলেন যে, হয়তো ২০২০ সালের মাঝেই চীনারা তাদের উভচর সক্ষমতার টার্গেট ধরে ফেলেছে। তিনি বলেন যে, এটা তারা হয়তো করতে পেরেছে বেসামরিক জাহাজ ব্যবহারের মাধ্যমে; যেগুলির পরিবহণ সক্ষমতা সামরিক উভচর নৌবহরের চাইতে অনেক বেশি।

 
১৯৮২ সাল। ফকল্যান্ডস যুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে যাত্রীবাহী জাহাজ 'ক্যানবেরা'। জাহাজের ডেকের উপর একটা হেলিকপ্টারও দেখা যাবে। চীনারা বেসামরিক জাহাজ ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্রিটিশদের উদাহরণ বিশেষভাবে বিবেচনা করছে। তারা ব্রিটিশদের ফকল্যান্ডস মিশনকে একটা শিক্ষা হিসেবেই নিয়েছে।

চীনারা ব্রিটিশদের ফকল্যান্ডস অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিচ্ছে

‘ইউনাইটেড স্টেটস নেভাল ওয়ার কলেজ’এর রিসার্চ প্রফেসর লাইল গোল্ডস্টাইন ‘দ্যা ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় বলছেন যে, চীনারা বেসামরিক জাহাজ ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্রিটিশদের উদাহরণ বিশেষভাবে বিবেচনা করছে। ২০১৭ সালে চীনাদের সামরিক জার্নাল ‘মিলিটারি ইকনমিক রিসার্চ’এর এক লেখায় ‘চায়না ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটি’র দু’জন প্রফেসর ১৯৮২ সালে ব্রিটিশদের ফকল্যান্ডস অপারেশনের বিশদ ব্যাখ্যা দেন। সেখানকার বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, ব্রিটিশরা ৬৭টা বেসামরিক জাহাজ ব্যবহার করেছিল সেই মিশনে; যা সংখ্যায় সামরিক জাহাজের প্রায় সমান হলেও পরিবহণ সক্ষমতা ছিল সামরিকের দ্বিগুণ। ব্রিটিশরা যুদ্ধ শুরুর মাত্র দুই দিনের মাথাতেই বেসামরিক জাহাজগুলিকে প্রস্তুত করতে থাকে। জাহাজের উপর হেলিকপ্টার ডেক তৈরি, লম্বা সমুদ্রপথে জাহাজ থেকে জাহাজে জ্বালানি নেবার ব্যবস্থা, উন্নততর যোগাযোগের ব্যবস্থা করা এবং সমুদ্রে উদ্ধার কর্মকান্ড চালনার দক্ষতা বৃদ্ধি করা হয়। তিন’শ বেসামরিক সংস্থাকে দিয়ে গড়ে মাত্র ৭২ ঘন্টার মাঝে এই পরিবর্তনগুলি বাস্তবায়ন করা হয়। সম্ভাব্য সকল সমস্যা মোকাবিলায় ব্রিটিশদের প্রস্তুতির ব্যাপকতাকে এই মিশনের সাফল্যের একটা গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ বলে উল্লেখ করে চীনারা। ব্রিটিশ লজিস্টিক্যাল কর্মকর্তারা, যাদেরকে রিটায়ারমেন্ট থেকে বা ঐচ্ছিক সার্ভিস দেয়ার জন্যে আনা হয়েছিল, তাদের ট্রেনিং এবং প্রেরণার ব্যাপারটা চীনাদের অবাক করে। চীনারা তাদের লেখায় জাহাজে খাবার পরিবেশন থেকে শুরু করে বেসামরিক কর্মকর্তাদেরকে কত ভাতা দেয়া হয়েছিল, তা নিয়েও আলোচনা করে। মোটকথা চীনারা ব্রিটিশদের ফকল্যান্ডস মিশনকে একটা শিক্ষা হিসেবেই নিয়েছে।

থমাস শুগার্ট বলছেন যে, চীনারা ইতোমধ্যেই তাদের সমস্যাগুলিকে এড়াতে বেসামরিক জাহাজ নির্মাণে কিছু নিয়ম বেঁধে দিয়েছে; যার মাধ্যমে সেই জাহাজগুলি জাতীয় প্রয়োজনে সামরিক বাহিনী ব্যবহার করতে পারবে। বেসামরিক নৌবহরকে তারা নৌবাহিনীর অক্সিলারি ইউনিটের অধীনে রাখতে চাইছে। উদাহরণস্বরূপ, ‘বোহাই ফেরি গ্রুপ’এর রোরো ফেরিগুলিকে কৌশলগত সাপোর্ট ফ্লিটের ৮ম ট্রান্সপোর্ট গ্রুপের মাঝে সংগঠিত করা হয়েছে। ‘হাইনান স্ট্রেইট শিপিং’কে দেয়া হয়েছে ৯ম গ্রুপের অধীনে। ‘সিএসসি রোরো লজিস্টিকস’ রয়েছে ৫ম ট্রান্সপোর্ট গ্রুপে। বেসামরিক ফেরি থেকে চীনারা ইতোমধ্যেই উভচর ক্রাফট পানিতে নামিয়ে সরাসরি উপকূলে সেনা নামাবার প্রশিক্ষণ নিয়েছে। অর্থাৎ প্রথম ধাপেই বেসামরিক জাহাজ থেকে সেনারা উপকূলে নামতে পারবে। চীনাদের জাহাজ নির্মাণ সক্ষমতাকে এই হিসেবে নিয়ে আসলে আরেকটা চিত্র পাওয়া যাবে। ২০২০ সালে চীনারা ২ কোটি ৩০ লক্ষ টনের বেসামরিক জাহাজ তৈরি করেছে; যা মার্কিন গড়পড়তা জাহাজ নির্মাণের ১’শ ১৫ গুণ! শুগার্ট তার গবেষণায় বলছেন যে, চীনের বর্তমানের গাড়ির ফেরিগুলি ১১ লক্ষ টন সক্ষমতার; যেখানে চীনা নৌবাহিনীর উভচর এসল্ট জাহাজগুলির সক্ষমতা হলো ৩ লক্ষ ৭০ হাজার টন। এছাড়াও হংকংএর গাড়ির ফেরিগুলি এর সাথে আরও ৩ লক্ষ ৭০ হাজার টন যোগ করতে পারবে। সব মিলিয়ে চীনারা প্রায় ১৫ লক্ষ টনের সক্ষমতা জড়ো করতে পারবে। অপরদিকে মার্কিন নৌবাহিনীর উভচর নৌবহরের সক্ষমতা হলো ৮ লক্ষ ৪০ হাজার টন। আর যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ‘মিলিটারি সীলিফট কমান্ড’এর অধীনে সকল রোরো জাহাজ যোগ করলে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতাও প্রায় একই রকম হবে।

তবে কেউ কেউ মত দিচ্ছেন যে, যথাযথ সমন্বয় না থাকলে বেসামরিক জাহাজ ব্যবহার করে তাইওয়ান আক্রমণ করতে গেলে চীনাদের বিপদ হতে পারে। বেসামরিক জাহাজকে রক্ষা করতে হয় এবং আক্রান্ত হলে সহজেই ডুবে যেতে পারে। তবে শুগার্ট বলছেন যে, বেসামরিক জাহাজ কেন, সামরিক উভচর জাহাজের ক্ষেত্রেও সমস্যার ঘাটতি থাকে না। আর এই সকল জাহাজকে ডেস্ট্রয়ার, ফ্রিগেট এবং যুদ্ধবিমান দিয়ে রক্ষা করতেই হয়। বেসামরিক জাহাজগুলি আক্রান্ত হলে সেগুলির ভেসে থাকার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। চীনারা এক্ষেত্রে তাদের বর্তমান অবস্থাকে আরও উন্নত করতে কাজ করছে।

 

মার্কিনীরা কিভাবে তাইওয়ানকে রক্ষা করার কথা চিন্তা করছে?

এডমিরাল ডেভিডসনের কথা ইতোমধ্যেই অনেকের মাঝে প্রতিফলিত হতে শুরু করেছে। তার ছয় থেকে দশ বছরের হিসেবকে অনেকেই ‘ডেভিডসন উইন্ডো’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। মার্কিন কংগ্রেসের রিপাবলিকান সদস্য মাইকেল গ্যালাগার ‘নেভি লীগ’এর এক ভাষণে মত দিচ্ছেন যে, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধপ্রস্তুতি নেবার সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের উচিৎ এখনই চীনকে মোকাবিলা করার মতো নৌশক্তি তৈরি এবং প্রস্তুত করা। তার কথায়, সমুদ্রশক্তির ব্যাপারে যথেষ্ট শক্তভাবে নিজেদের অবস্থানকে তুলে না ধরে শুধু চেয়ে চেয়ে দেখতে থাকলে তা ভূরাজনৈতিক বিপর্জয়ের দিকে ধাবিত করবে এবং একসময় তা যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্বকে অবান্তর করে ফেলবে। একমাত্র মার্কিন সমুদ্রশক্তিই তাইওয়ানকে চীনের দখলমুক্ত রাখতে পারবে। তিনি বলেন যে, চীনকে বাধা না দিলে তারা তাইওয়ানকে দখলে নিয়ে জাপানকে ঘিরে ফেলবে। তারা সারা বিশ্বের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে এবং সারা বিশ্বে বার্তা ছড়িয়ে দেবে যে, যুক্তরাষ্ট্র তার বন্ধুদের পাশে দাঁড়ায় না। গ্যালাগার শত বছর আগের মার্কিন প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্টের নৌশক্তি তৈরির নীতিকে অনুরসরণের পক্ষপাতি। তিনি বলছেন যে, রুজভেল্টের নেতৃত্বই পরবর্তীতে বিংশ শতকে মার্কিন নৌশক্তির স্তম্ভ হয়েছিল।

চীনের একটা বড় সুবিধা হলো তাইওয়ান তাদের মূল ভূখন্ডের অনেক কাছে। শুগার্ট বলছেন যে, উত্তরের পীত সাগর বা দক্ষিণের হাইনান দ্বীপের কাছ থেকে চীনারা তাদের সেনাদের জাহাজে উঠিয়ে সরাসরিই তাইওয়ানের উপকূলে নিয়ে আসতে পারবে। এতে সময় খুবই কম লাগবে এবং মার্কিনীদের কাছে আক্রমণের পূর্বাভাস আসতে আসতে চীনারা সৈন্য পরিবহণের প্রাথমিক কাজ করে ফেলতে পারবে। শুগার্ট ‘ইউএস চায়না কমিশন’এর সামনে তার বক্তব্যে বলেছিলেন যে, তাইওয়ানের উপর সম্ভাব্য চীনা আক্রমণ ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের উচিৎ বিপুল সংখ্যক জাহাজধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে সেগুলি দিয়ে চীনা বেসামরিক ফেরিগুলিকে টার্গেট করা। এটা করতে পারার জন্যে মার্কিন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, সামরিক নেতৃত্বের অধীনে বেসামরিক জাহাজগুলিকে টার্গেটের জন্যে যেন কোন আইনী বাধা না থাকে।

মার্কিন সামরিক বিশ্লেষকেরা যেব্যাপারে চিন্তিত, তা হলো চীনারা হয়তো সকলের চোখের সামনেই তাইওয়ান আক্রমণের পরিকল্পনা করে যাচ্ছে। মার্কিন এডমিরাল ফিলিপ ডেভিডসনের ছয় থেকে দশ বছরের ‘উইন্ডো’ এখন মার্কিনীরা ব্যবহার করছে তাদের নৌবহর নতুন করে তৈরি করার জন্যে জনসমর্থন আদায়ে। তবে চুলচেরা বিশ্লেষণে চীনাদের সক্ষমতা এবং আকাংক্ষার মাঝে একটা ফারাক রয়েই যায়। এই ফারাকটাই এখন মার্কিন ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাবাচ্ছে। তারা যে ব্যাপারটাতে নিশ্চিত নন তা হলো তাইওয়ান আক্রমণ করার মতো একটা সিদ্ধান্ত যে চীনের অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করবে, সেটা জেনেও চীনারা এই মিশন বাস্তবায়ন করবে কিনা। এবছরে এপ্রিলে ‘দ্যা ইকনমিস্ট’ তাইওয়ানের ভূখন্ডকে পৃথিবীর সবচাইতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বলে আখ্যা দেয়। তারা বলে যে, তাইওয়ান নিয়ে যুদ্ধ হলে তাইওয়নের ‘টিএসএমসি’ সেমিকন্ডাক্টর কারখানা বন্ধ হয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি ধ্বসে পড়বে। মার্কিন থিংকট্যাংক ‘ইউরেশিয়া গ্রুপ’এর প্রতিষ্ঠাতা ইয়ান ব্রেমার বলছেন যে, ঠিক এই কারণেই চীনারা তাইওয়ান থেকে দূরে থাকবে। কারণ তারাও ‘টিএসএমসি’র সেমিকন্ডাক্টরের উপর নির্ভরশীল; ঠিক যেমনটা যুক্তরাষ্ট্র। ব্রেমার বেশি চিন্তিত তাইওয়ানের উপর চীনের হুমকির ফলাফলের ব্যাপারে। তিনি প্রশ্ন করছেন যে, চীনাদের হুমকির মুখে তাইওয়ানের জনগণ নিজেদের স্বাধীনতা ধরে রাখার ব্যাপারটাকে কিভাবে দেখবে? আর সেই জনমতের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের পশ্চিমা বন্ধুরাই বা কি করতে পারবে? ব্রেমারের কথায় এটা পরিষ্কার যে, পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় এখন কোন নিয়ম নেই। পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত এই ব্যবস্থায় অবশিষ্ট রয়েছে শুধুই অনিশ্চয়তা। পূর্ব এশিয়ায় স্থিতাবস্থা ব্যাহত হবার ব্যাপারে আলোচনাই বলে দিচ্ছে যে, সারা বিশ্ব এখন এই অনিশ্চয়তা কাটিয়ে বিকল্প বিশ্ব ব্যবস্থার আশাতেই রয়েছে।

Sunday, 8 November 2020

ফকল্যান্ডস দাবি করে আর্জেন্টিনা কি আবারও ব্রিটেনকে চাপের মুখে ফেলতে পারবে?

০৯ই নভেম্বর ২০২০
১৯৮২ সালের ঘটনা থেকে ব্রিটেন শিক্ষা নিয়েছে; কৌশলগত ম্যাজেলান প্রণালী এবং ড্রেইক প্যাসেজের পাহাড়াদার ফকল্যান্ডসের নিয়ন্ত্রণ ব্রিটেন দ্বিতীয়বার ছাড়তে রাজি নয়। তবে এজন্য ব্রিটেন খুব বেশি একটা শক্তি খরচ করতে রাজি নয়।


গত ৬ই নভেম্বর আর্জেন্টিনা দক্ষিণ আটলান্টিকের ফকল্যান্ডস দ্বীপপুঞ্জে আর্জেন্টিনার পতাকা ওড়ানোর দ্বিশতবার্ষিকী পালন করতে যাচ্ছে। আর্জেন্টিনা দাবি করে যে, ফকল্যান্ডস দ্বীপপুঞ্জ স্বাভাবিকভাবেই আর্জেন্টিনার, যা ব্রিটিশরা জোরপূর্বক দখল করে রেখেছে। আর্জেন্টিনা ফকল্যান্ডসকে ‘মালভিয়ান্স’ বলে ডাকে। আর্জেন্টিনার কূটনীতিক হোজে লুইস ফার্নান্দেজ এক বার্তায় বলেন যে, এবারের এই অনুষ্ঠান আলাদা কোনকিছু নয়। আর্জেন্টিনা বহুকাল থেকেই এই দ্বীপগুলির উপর তাদের দাবির কথা জানিয়ে আসছে। ১৮১০ সালে স্পেনের রাজার কাছ থেকে আর্জেন্টিনা এই দ্বীপগুলি পায়, যা ব্রিটিশরা ১৮৩৩ সালে দখল করে নিয়েছিল। আর্জেন্টিনার মালভিয়ান্স সেক্রেটারি ড্যানিয়েল ফিলমাস বলেন যে, এই অনুষ্ঠান আর্জেন্টিনার জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ আমেরিকার মিডিয়া ‘মেরকোপ্রেস’ বলছে যে, ৭ই নভেম্বর আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফেলিপ সোলা জার্মান দূতাবাসে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ২১ সদস্য দেশের প্রতিনিধিদের ডেকে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেখানে আর্জেন্টাইনরা বলে যে, ব্রিটেন যখন ইইউ থেকে বের হয়ে যাচ্ছে, তখন ইউরোপিয় দেশগুলির উচিৎ ফকল্যান্ডসএর উপর আর্জেন্টিনার অধিকারকে সমর্থন করা। ব্রিটেনের সাথে আর্জেন্টিনার ফকল্যান্ডস নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা এমন সময়ে শুরু হয়েছে, যখন দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আর্জেন্টিনার ফাইটার জেট ক্রয়ের পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়েছে ব্রিটিশ সরকার। আর্জেন্টাইন মন্ত্রী আগুস্তিন রসি লন্ডনের এহেন সিদ্ধান্তকে ‘সাম্রাজ্যবাদী দাম্ভিকতা’ বলে আখ্যা দেন। দক্ষিণ আমেরিকা ঘুরে আটলান্টিক মহাসগর থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে যাবার পথের উপর অবস্থিত ফকল্যান্ডস দ্বীপপুঞ্জের কৌশলগত গুরুত্ব যথেষ্ট। ব্রিটিশরা প্রায় দু’শ বছর ধরে কৌশলগত এই দ্বীপ দখলে রেখেছে। পানামা খাল চালুর পর থেকে দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণে ম্যাজেলান প্রণালী এবং ড্রেইক প্যাসেজ দিয়ে বর্তমানে বাণিজ্যিক জাহাজ তেমন যাতায়াত করে না। তবে সামরিক জাহাজের জন্যে এই পথ আখনও গুরুত্বপূর্ণ; বিশেষ করে ভবিষ্যতের কোন সম্ভাব্য যুদ্ধে দুই মহাসাগরের মাঝে যাতায়াতের জন্যে এই পথ ব্যবহৃত হতে পারে। ইউরোপিয় দেশগুলি এই পথকে প্রশান্ত মহাসাগরে যাবার বিকল্প পথ হিসেবে দেখে।

বিরোধপূর্ণ দুই শতক

ব্রিটেনের ‘দ্যা এক্সপ্রেস’ পত্রিকা মনে করিয়ে দিয়ে বলছে যে, দুই দেশের মাঝে ফকল্যান্ডস নিয়ে দ্বন্দ্ব ১৮ শতক থেকেই। ১৯৮২ সালে ব্রিটিশদের অধীনে থাকা এই দ্বীপপুঞ্জকে আর্জেন্টিনা সৈন্য পাঠিয়ে দখল করে নেয়। আর্জেন্টিনার দক্ষিণ উপকূল থেকে এই দ্বীপের দূরত্ব প্রায় সাড়ে ৬’শ কিঃমিঃ। ৩ হাজার ৩’শ ৫৪ জন মানুষের বাস এই দ্বীপে ১৯৮২ সালে যুদ্ধের সময় আর্জেন্টাইনরা বেশ কিছু মানুষকে সেখানে বসতি স্থাপন করতে দিয়েছিল। ব্রিটিশ সেনারা সাড়ে ১২ হাজার কিঃমিঃ পথ পাড়ি দিয়ে এসে দ্বীপ পুনর্দখলের পর তাদেরকে আর্জেন্টিনায় ফেরত দিয়ে আসে।

ফকল্যান্ডসএর ইতিহাস জুড়েই রয়েছে ঔপনিবেশিক প্রতিযোগিতা। ১৭৬৪ সালে ফরাসি ক্যাপ্টেন লুই আঁতোয়া ডে বোগেনভিল ইস্ট ফকল্যান্ডসএ পোর্ট লুই নামে একটা ঘাঁটি স্থাপন করেন। এরপর ১৭৬৬ সালে ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন জন ম্যাকব্রাইড সনডার্স আইল্যান্ডে পোর্ট এগমন্ট নামে একটা ঘাঁটি স্থাপন করে। তবে একই বছরেই ফরাসিরা স্পেনের কাছে তাদের ঘাঁটি হস্তান্তর করে ফেলে। পরের বছর ১৭৬৭ সালে স্প্যানিশরা এই ঘাঁটির নামকরণ করে পুয়ের্তো সলেদাদ। তবে তখনও তারা ফকল্যান্ডসে ব্রিটিশ ঘাঁটি সম্পর্কে অবহিত ছিল না। ১৭৭০ সালে স্প্যানিশরা যখন বুঝতে পারে যে, সেখানে ব্রিটিশ একটা ঘাঁটি রয়েছে, তখন তারা ব্রিটিশ ঘাঁটি পোর্ট এগমন্ট দখল করে নেয়। ১৭৭১ সালে ঘাঁটিটা ব্রিটনের হাতে ছেড়ে দেবার মাধ্যমে স্প্যানিশরা সুপারপাওয়ার ব্রিটেনের সাথে যুদ্ধ এড়ায়। ব্রিটিশরা তাদের সার্বভৌমত্বের একটা সাইনবোর্ড রেখে দিয়ে ১৭৭৪ সালের মাঝে দ্বীপ থেকে নিজেদের ঘাঁটি সরিয়ে নেয়। ফরাসী সম্রাট ন্যাপোলিয়নের সাথে ব্রিটিশদের যুদ্ধ শুরুর পর স্পেন ফ্রান্সের অধীনে চলে গেলে ব্রিটিশরা রিও ডেলা প্লাটা বা আর্জেন্টিনা আক্রমণ করে। ১৮১০ সালে ব্রিটিশ সহায়তায় রিও ডেলা প্লাটাতে বিদ্রোহ শুরু হয়। এর ফলে ১৮১১ সালের মাঝে স্প্যানিশরা ফকল্যান্ডস ছেড়ে যায়। ১৮১৬ সালে আর্জেন্টিনা নামে নতুন দেশের ঘোষণা দেয়া হয়। নতুন দেশ আর্জেন্টিনা দক্ষিণ আটলান্টিকে স্পেনের দখলে থাকা সকল দ্বীপই নিজের বলে দাবি করে। ১৮২৩ সালে আর্জেন্টিনা এক জার্মান নাগরিক লুই ভারনেটকে ফকল্যান্ডসের এলাকায় মৎস্য সম্পদের দেখাশুনার দায়িত্ব দেয়। কিন্তু ঘটনা অন্যদিকে মোড় নেয় যখন নতুন উদ্দমী দেশ যুক্তরাষ্ট্র এখানে হস্তক্ষেপ করে। ১৮৩১ সালে ভারনেট দু’টা মার্কিন মাছ ধরার জাহাজ আটক করলে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করে। মার্কিন নৌবাহিনীর অফিসার সিলান ডানকানের নেতৃত্বে যুদ্ধজাহাজ ‘লেক্সিংটন’ এই দ্বীপের কর্তৃত্বকে ধ্বংস করে দ্বীপের উপর কোন রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণকে অবৈধ ঘোষণা করে। এই ঘটনাই ব্রিটিশকে সরকারকে জাগিয়ে তোলে। সেবছরের ডিসেম্বরে ক্যাপ্টেন জেমস অনস্লোর নেতৃত্বে দু’টা ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ ‘ক্লিও’ এবং ‘টাইন’ এসে দ্বীপের উপর নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। ১৮৩৩ সাল থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশরা ফকল্যান্ডসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান নৌবাহিনীর এশিয়া স্কোয়াড্রন দক্ষিণ আমেরিকা ঘুরে দেশে ফেরত যাবার সময় ফকল্যান্ডসএর উপকূলে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর হাতে ধ্বংস হয়। এই যুদ্ধ দক্ষিণ আমেরিকা ঘুরে প্রশান্ত মহাসাগরের সাথে আটলান্টিক মহাসাগরের যোগাযোগ পথ নিয়ন্ত্রণে ফকল্যান্ডসকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
মে ২০১৯। ফ্রান্সের নৌবাহিনী থেকে রিটায়ার করা ‘সুপার এটেনডার্ড’ পৌঁছেছে আর্জেন্টিনায়। যুদ্ধবিমানের জন্যে আর্জেন্টিনা সারা বিশ্বের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে। কিন্তু ব্রিটেনের কূটনৈতিক দক্ষতাকে পাশ কাটাবার মতো সক্ষমতার ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি আর্জেন্টিনা। 


আর্জেন্টিনার পুনর্জাগরণের চেষ্টা?

১৯৮২ সালের এপ্রিলে আর্জেন্টিনার সামরিক বাহিনী ‘অপারেশন রোজারিও’এর মাধ্যমে ফকল্যান্ডস দখল করে নেয়। সেসময় ফকল্যান্ডসের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ছিল ১’শ জনেরও কম সেনা এবং নাবিক। ফকল্যান্ডসএর বেসামরিক নাবিকদের মাঝ থেকে ২৫ জন স্বেচ্ছাসেবক নিয়োজিত ছিল নিরাপত্তার জন্যে। ব্রিটিশরা সাড়ে ১২ হাজার কিঃমিঃ পথ পেরিয়ে ফকল্যান্ডসে এসে যুদ্ধ করে জয়লাভ করে। তবে যুদ্ধে আর্জেন্টাইন বিমান বাহিনীর আক্রমণে ব্রিটিশদের বেশ কয়েকটা জাহাজ ধ্বংস হয়। বিমান আক্রমণকে আটকাবার জন্যে ব্রিটিশ রয়াল নেভি তার বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের ‘হ্যারিয়ার’ ফাইটার বিমানগুলিকে ব্যবহার করেছিল। তবে আর্জেন্টিনার হাতে ফরাসি নির্মিত সুপারসনিক ‘মিরাজ’ যুদ্ধবিমান ছাড়াও ছিল মার্কিন নির্মিত ‘এ৪ স্কাইহক’ এবং ফরাসি নির্মিত ‘সুপার এটেনডার্ড’ যুদ্ধবিমান। ‘সুপার এটেনডার্ড’ যুদ্ধবিমান থেকে নিক্ষেপিত ফরাসি ‘এক্সোসেট’ জাহাজধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে কয়েকটা ব্রিটিশ জাহাজ ধ্বংস হয়। এই যুদ্ধের ফলে একটা ব্যাপার সবসময়ের জন্যে পরিবর্তন হয়ে যায়; আর তা হলো, ব্রিটিশরা আর কখনোই ফকল্যান্ডসের নিরাপত্তাকে হাল্কাভাবে নিতে পারবে না। ফকল্যান্ডসে ব্রিটিশরা একদিকে যেমন বেশি সামরিক শক্তি মোতায়েন রাখছে, তেমনি তারা নিশ্চিত করছে যে, আর্জেন্টিনার হাতে যেন ১৯৮২এর মতো বিমান শক্তি না যায়। আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ব্রিটেনের রয়েছে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা; আর সেই নিষেধাজ্ঞা কতটা সফল, তা পরবর্তী ঘটনাগুলিই বলে দেয়।

তিন দশক আগের আর্জেন্টিনার বিমান বাহিনী আজ মৃতপ্রায়। নতুন যুদ্ধবিমান কেনার জন্যে হন্যে হয়ে ঘুরলেও কেউই আর্জেন্টিনাকে বিমান দিতে চাইছে চাইছে না। ব্রিটেনের ‘দ্যা এক্সপ্রেস’ পত্রিকার এক খবরে বলা হচ্ছে যে, ২০১৩ সালে আর্জেন্টিনা স্পেনের কাছ থেকে ১৬টা পুরোনো ফরাসি নির্মিত ‘মিরাজ এফ১’ সুপারসনিক ফাইটার বিমান কেনার চুক্তি করে। স্পেনের দক্ষিণে ব্রিটিশ অধিকৃত জিব্রালটার নিয়ে স্পেনের যে নীতি রয়েছে, সেই নীতির মতোই আর্জেন্টিনার ফকল্যান্ডস নীতি। তবে এই চুক্তি ব্রিটেনের কূটনৈতিক চাপে বাতিল হয়ে যায়। ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মাঝে আর্জেন্টিনা ইস্রাইল থেকে ১২টা পুরোনো ‘কাফির সি১’ ফাইটার বিমান ক্রয়ের চেষ্টা করে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এই বিমানে ব্যবহৃত ‘জে৭৯’ ইঞ্জিন আর্জেন্টিনার কাছে বিক্রি করতে রাজি না হওয়ায় এটাও ভেস্তে যায়। যুক্তরাষ্ট্র চায়নি ব্রিটেনের সাথে সম্পর্ককে খারাপ করে ফেলতে। তবে তা নিঃসন্দেহে মার্কিনীদের কূটনৈতিক দিক থেকে সুবিধা দিয়েছে। ‘রয়টার্স’এর এক খবরে বলা হচ্ছে যে, ২০১৫ সালে আর্জেন্টিনা সুইডেন থেকে ২৪টা অত্যাধুনিক ‘সাব জেএএস৩৯ গ্রিপেন’ ফাইটার বিমান কেনার চেষ্টা করলেও তা তেমন কোন আলোচনা ছাড়াই বাতিল হয়ে যায়। এই বিমানে রাডারসহ ৩০ শতাংশ যন্ত্রাংশ ব্রিটিশদের হবার কারণে এই বিমান আর্জেন্টিনায় রপ্তানিতে ব্রিটিশ সরকারের বাধা নিশ্চিত ছিল। বিমানের ব্রিটিশ যন্ত্রাংশ অন্য দেশের যন্ত্রাংশ দিয়ে প্রতিস্থাপন করার প্রশ্নও আসেনি। ২০১৭ সালে ফরাসিরা আর্জেন্টিনার কাছে ফরাসি নৌবাহিনী থেকে রিটায়ার করা ৫টা ‘সুপার এটেনডার্ড’ ফাইটার বিক্রি করছে বলে ঘোষণা দেন ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত পিয়েরে হেনরি গুইনার্দ। কিন্তু ২০১৮ সালের মাঝে কয়েকটা বিমান দেবার কথা থাকলেও ২০১৯ সালের মে মাসে প্রায় দুই বছর পরে বিমানগুলি আর্জেন্টিনা পৌঁছে; তাও আবার আধুমিকায়ন ছাড়া।

আর্জেন্টিনার সর্বশেষ চেষ্টাটা ছিল দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ‘এফএ৫০’ সুপারসনিক ফাইটার জেট ক্রয়। প্রতিরক্ষা ম্যাগাজিন ‘আইআইচএস জেন্স’ বলছে যে, ব্রিটিশ সরকার এটাও আটকে দিয়েছে। কোরিয়ান কোম্পানি ‘কেএআই’এর এক চিঠিতে বলা হয় যে, এই বিমানে ব্রিটিশ নির্মিত ছয়টা যন্ত্রাংশ রয়েছে; যেকারণে কোরিয়ার পক্ষে এই বিমান আর্জেন্টিনার কাছে বিক্রি করা সম্ভব নয়। আর্জেন্টিনা ২০১৫ সাল থেকেই চীন থেকে যুদ্ধবিমান কিনতে পারে বলে শোনা যাচ্ছিলো; কিন্তু সেটাও এতদিনে কোন লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি।
ফকল্যান্ডসে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি ‘মাউন্ট প্লীজ্যান্ট’। আর্জেন্টিনার জন্যে এই ঘাঁটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। তবে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ এখন ভূমধ্যসাগর, মধ্যপ্রাচ্য, ভারত মহাসাগর এবং তৎসংলগ্ন পূর্ব এশিয়া নিয়ে অনেক বেশি ব্যস্ত; কারণ চীনের উত্থানের পর থেকেই সেখানেই ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বেশি। বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমার সাথেসাথে ব্রিটেন ফাঁকা স্থানগুলিকে পূর্ণ করতে মরিয়া; দক্ষিণ আটলান্টিকের মতো এলাকায় আটকে থাকার সময় কোথায় ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর? 


সাড়ে ১২ হাজার কিঃমিঃ পেরিয়ে নিরাপত্তা

ব্রিটিশরা ফকল্যান্ডসের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ১৯৮২ সালের যুদ্ধের পর থেকে সেখানে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করেছে। ১ হাজারের বেশি সৈন্য এবং নাবিক এখন সেখানকার নিরাপত্তা দিচ্ছে বলে বলছে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর ম্যাগাজিন ‘ফোর্সেস নেটওয়ার্ক’। ১৯৯০এর দশক থেকে সেখানে ৪টা ‘টর্নেডো এফ৩’ যুদ্ধবিমান মোতায়েন ছিল। ১৭ বছর পর ২০০৯ সালে এই বিমানগুলিকে প্রতিস্থাপন করে ৪টা অত্যাধুনিক ‘টাইফুন’ ফাইটার। দক্ষিণ আমেরিকার মিডিয়া ‘মেরকোপ্রেস’ বলছে যে, এই বিমানগুলিকে ফকল্যান্ডসে পৌঁছাতে সহায়তা দেয় ১০টা বিমান; যার মাঝে ছিল ৬টা রিফুয়েলিং বিমান, ৩টা সার্চ রেসকিউ বিমান এবং ১টা ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান। স্প্যানিশ ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ এবং দক্ষিণ আটলান্টিকে ব্রিটিশ এসেনশন দ্বীপ থেকেও বিমানগুলি সহায়তা নেয়। ১৮ ঘন্টার এই ফ্লাইটে মোট ৭ বার আকাশে জ্বালানি নিতে হয়েছিল বিমানগুলিকে। ব্রিটিশ বিমান বাহিনীর স্কোয়াড্রন লীডার পিট মরগান বলেন যে, ‘টাইফুন’ বিমানগুলি মোতায়েন করার মিশন ‘অপারেশন টাইফুন টেম্পেস্ট ট্রেইল’ ব্রিটেনের সামরিক বাহিনীর বিশাল দূরত্বে কৌশলগত মিশনে যাবার সক্ষমতাকে তুলে ধরে।

ফকল্যান্ডসের বর্তমান নিরাপত্তায় রয়েছে রয়াল নেভির একটা অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল। বছরের ছয় মাস ব্রিটিশ এন্টার্কটিক প্যাট্রোল জাহাজ ‘প্রোটেক্টর’ এই অঞ্চলে থাকে। একটা ফ্রিগেট বা ডেস্ট্রয়ার এবং একটা সাপ্লাই জাহাজ মাঝে মাঝে দক্ষিণ আটলান্টিকে প্যাট্রোল দিতে আসে। ১৯৮২এর যুদ্ধের পর দ্বীপে ‘মাউন্ট প্লিজ্যান্ট’ নামে একটা নতুন বিমান ঘাঁটি তৈরি করা হয়। সেখানে ১৬টা ফাইটার বিমান রাখার জন্যে দুর্ভেদ্য বাঙ্কার নির্মাণ করা হয়েছে। এই ঘাঁটিতে একটা ‘এ৪০০এম’ পরিবহণ বিমান সর্বদা থাকছে, যা দ্বীপের আশেপাশে আকাশ প্যাট্রোল দেয়। আর প্রতি সপ্তাহে দুইবার একটা ‘ভয়েজার’ ট্যাঙ্কার পরিবহণ বিমান ফকল্যান্ডস এবং ব্রিটেনের মাঝে যাতায়াত করে। এই বিমান পথিমধ্যে পশ্চিম আফ্রিকার সেনেগালের দাকারে জ্বালানি নিলেও বিরতি না নিয়েই ফকল্যান্ডসে অবতরণ করার রেকর্ডও রয়েছে। সামরিক ঘাঁটির দক্ষিণেই নতুন একটা বন্দরও নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে বড় বাণিজ্যিক জাহাজও ভিড়তে পারে। দ্বীপের বিমান প্রতিরক্ষা নিশ্চিতে একটা বিমান ধ্বংসী ‘র‍্যাপিয়ার’ ক্ষেপণাস্ত্রের ইউনিটও রয়েছে। অনেকেই মনে করেন যে, ব্রিটিশ ‘এসটিউট ক্লাস’এর পারমাণবিক সাবমেরিনগুলি দক্ষিণ আটলান্টিকে টহল দেয়; যদিওবা সেই তথ্য নিশ্চিতভাবে জানা দুষ্কর। ১৯৮২ সালে ব্রিটিশ সাবমেরিনের টর্পেডোর আঘাতে আর্জেন্টিনার যুদ্ধজাহাজ ‘জেনারেল বেলগ্রানো’ ডুবে গেলে ৩’শ ২৩ জন নাবিক প্রাণ হারায়। এরপর আর্জেন্টিনার নৌবাহিনী আর ব্রিটিশদের চ্যালেঞ্জ দিতে বন্দর থেকে বের হয়নি। সেই ইতিহাস এখনও ব্রিটিশদের শক্তি যোগায়।

ফকল্যান্ডসে অবস্থিত ব্রিটিশ বিমান বাহিনীর ‘টাইফুন’ ফাইটার বিমানগুলিকে এড়িয়ে দ্বীপের উপর হামলা করার সামরিক ক্ষমতা থেকে আর্জেন্টিনা এখন বহুদূরে। থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘গ্লোবাল রিস্ক ইনসাইট’ বলছে যে, আর্জেন্টিনা ফকল্যান্ডস দাবি করে তার জনগণকে অর্থনৈতিক দৈন্যদশা থেকে দৃষ্টি সড়াবার চেষ্টা করছে মাত্র। অপরদিকে ১৯৮২ সালের ঘটনা থেকে ব্রিটেন শিক্ষা নিয়েছে; কৌশলগত ম্যাজেলান প্রণালী এবং ড্রেইক প্যাসেজের পাহাড়াদার ফকল্যান্ডসের নিয়ন্ত্রণ ব্রিটেন দ্বিতীয়বার ছাড়তে রাজি নয়। তবে এজন্য ব্রিটেন খুব বেশি একটা শক্তি খরচ করতে রাজি নয়। যুদ্ধবিমানের জন্যে আর্জেন্টিনা সারা বিশ্বের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে। কিন্তু ব্রিটেনের কূটনৈতিক দক্ষতাকে পাশ কাটাবার মতো সক্ষমতার ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি আর্জেন্টিনা। আর্জেন্টিনার কাছে সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি না করার শর্ত যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, ইস্রাইল বা ফ্রান্সের মতো দেশগুলিকে ব্রিটেনের সাথে কূটনৈতিক দরকষাকষির সুযোগ দিয়েছে। তথাপি এই ঘটনাগুলি বিশ্বব্যাপী ব্রিটেনের রাজনৈতিক প্রভাবের একটা উদাহরণ হিসেবে কাজ করে। এই মুহুর্তে দক্ষিণ আটলান্টিকে দৃষ্টি দেবার মতো সময় ব্রিটেনের নেই। ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ এখন ভূমধ্যসাগর, মধ্যপ্রাচ্য, ভারত মহাসাগর এবং তৎসংলগ্ন পূর্ব এশিয়া নিয়ে অনেক বেশি ব্যস্ত; কারণ চীনের উত্থানের পর থেকেই সেখানেই ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বেশি। বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমার সাথেসাথে ব্রিটেন ফাঁকা স্থানগুলিকে পূর্ণ করতে মরিয়া; দক্ষিণ আটলান্টিকের মতো এলাকায় আটকে থাকার সময় কোথায় ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর? 

Friday, 17 August 2018

সামরিক কাজে বেসামরিক জাহাজ? - ফকল্যান্ডস থেকে শিক্ষা

১৮ই অগাস্ট ২০১৮
 
১৯৮২ঃ যাত্রীবাহী ক্রুজ লাইনার 'এসএস ক্যানবেরা' ফকল্যান্ড যুদ্ধ শেষ করে দেশে ফেরত এসেছে। জাহাজের উপরে হেলিপ্যাডের উপরে একটা হেলিকপ্টার দেখা যাচ্ছে। বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী জাহাজকে রিকুইজিশন করে ব্রিটিশরা সৈন্য পরিবহণ করেছিল। এই জাহাজগুলি ছাড়া ব্রিটিশদের পক্ষে ফকল্যান্ড যুদ্ধে জেতা সম্ভব ছিল না।


লাক্সারি লাইনারে সৈন্য পরিবহণ

১৯৮২ সালের ২রা এপ্রিল আর্জেন্টিনা ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ফকল্যান্ডস দ্বীপপুঞ্জ দখল করে নেয়। ব্রিটিশ সরকার প্রায় সাথে সাথেই ফকল্যান্ডস পুনর্দখল করতে পরিকল্পনা শুরু করে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ৯ই এপ্রিল এবং ২৭শে এপ্রিল ব্রিটিশ সেনাবাহিনী এবং নৌবাহিনী ফকল্যান্ড যুদ্ধের জন্যে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ৫ম ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেডকে পাঠানোর অনুরোধ করে। ব্রিটিশ সরকার এই ব্রিগেডকে পাঠাবার অনুমতি দেয় ২রা মে। এই ইউনিটকে সেখানে পাঠাবার সবচাইতে ভালো পদ্ধতি হিসেবে নতুন কোন পরিবহণ জাহাজ রিকুইজিশন করার সিদ্ধান্ত হয়। সে অনুযায়ী ৩রা মে ব্রিটিশ সরকার শিপিং কোম্পানি কুনার্ড লাইন-এর মালিকানায় থাকা লাইনার জাহাজ ‘এসএস কুইন এলিজাবেথ ২’-কে রিকুইজিশন করে। মাত্র ১৯ ঘন্টা পরেই জাহাজটার ভূমধ্যসাগর ভ্রমণে যাবার কথা ছিল। ২৯৩ মিটার লম্বা ৬৭ হাজার টনের বিশাল এই জাহাজটা ছিল সমুদ্রের বিলাসবহুল মার্সিডিস গাড়ির মতো! ম্যান কোম্পানির তৈরি ১০,৬২৫ কিলোওয়াটের ৯টা ইঞ্জিন জাহাজটাকে সর্বোচ্চ ৩৪ নটিক্যাল মাইল গতিতে চলার সক্ষমতা দেয়। তবে এর স্বাভাবিক গতি ছিল ২৮ দশমিক ৫ নটিক্যাল মাইল, যা বেশিরভাগ যুদ্ধজাহাজের চাইতে বেশি বা কমপক্ষে সমতুল্য। ৫ই মে জাহাজটাকে ভসপার থর্নিক্রফট শিপইয়ার্ডে পাঠানো হয় কিছু মডিফিকেশনের জন্যে। জাহাজের উপরে পেছনের সুইমিং পুল এবং সামনের ডেকের উপরে দুইটা হেলিডেক তৈরি করা হয়। জাহাজের মাঝ দিয়ে জ্বালানি পরিবহণের জন্য লম্বা পাইপলাইন বসানো হয়। পাইপলাইনের মাধ্যমে অন্য জাহাজ থেকে তেল নিয়ে ইঞ্জিনরুম পর্যন্ত নেবার ব্যবস্থা করা হয়। জাহাজের পাবলিক লাউঞ্জগুলিকে সেনাদের থাকার ডরমিটরিতে রূপান্তর করা হয়। জাহাজের পুরো দৈর্ঘ্যের প্রায় চার ভাগের এক ভাগকে স্টিল প্লেটিং-এর মাধ্যমে শক্তিশালী করা হয়। এন্টি-ম্যাগনেটিক কয়েল স্থাপনের মাধ্যমে ম্যাগনেটিক মাইন থেকে জাহাজকে রক্ষা করার ব্যবস্থা করা হয়। জাহাজের সাথে জাহাজের ৬৫০ জন ক্রু ফকল্যান্ডে যাবার জন্যে স্বেচ্ছায় নাম লেখায়। মাত্র এক সপ্তাহের মডিফিকেশনের কাজ করার পর ১২ই মে ৫ম ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেডের ৩,২০০ সৈন্যকে নিয়ে এই জাহাজ রওয়ানা হয়। যখন জাহাজ রওয়ানা হয়, তখন জাহাজের তিনটা বয়লারের মাঝে মাত্র একটা কাজ করছিল। বাকি দুইটাকে যাত্রাপথে মেরামত করে নেয়া হয়। যাত্রাপথে জাহাজটার রাডার বন্ধ করে রাখা হয়েছিল এবং জাহাজের কোন বাতি যেন বাইরে থেকে দেখা না যায়, তার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যাতে কেউ জাহাজটাকে খুঁজে না পায়। মডার্ন কোন ন্যাভিগেশন এইড ছাড়াই জাহাজটা দক্ষিণ আটলান্টিকে পৌঁছায়।
 
 
লাক্সারি ক্রুজ লাইনার 'কুইন এলিজাবেথ-২'-এর ডেকের উপরে সৈন্যরা ব্যায়াম করছে। পিছনে হেলিপ্যাডের উপরে দুইটা হেলিকপ্টার দেখা যাচ্ছে। ব্রিটিশ সেনারা কল্পনায়ও ভাবেনি যে এরকম লাক্সারি জাহাজে চেপে তারা কখনও যুদ্ধ করতে যাবে। জাহাজের ক্রুরাও ভাবেনি যে তারা কখনও সেনা পরিবহণ করবে।


সামরিক কাজে বেসামরিক জাহাজ

যে নিয়মের মাধ্যমে এই বেসামরিক জাহাজগুলি ব্রিটিশ সরকার রিকুইজিশন বা চার্টার করেছিল, তা পরিচিত ছিল ‘শিপ টেকেন আপ ফ্রম ট্রেড’ বা স্টাফট নামে, যা ১৯৮২ সালের ৪ঠা মে (ফকল্যান্ড দখলের দুই দিন পর) ইস্যু করা হয়। ‘স্টাফট’এর বদৌলতে ব্রিটিশ সরকার যেকোন জাহাজ রিকুইজিশন করতে পারবে। এর আগে ১৯৫৬ সালে সুয়েজ যুদ্ধের সময় ব্রিটিশরা বেসরকারি জাহাজ কাজে লাগিয়েছিল। ব্রিটিশ সরকার নিয়ম করেছিল যে, শুধুমাত্র ব্রিটিশ ফ্ল্যাগের জাহাজই রিকুইজিশন করা হবে এবং ব্রিটিশ ক্রুরাই এসব জাহাজ চালাবে। ‘কুনার্ড কাউন্টেস’-কে রিকুইজিশন করা হয়েছিল ফকল্যান্ড যুদ্ধের পরে – ১৯৮২ সালের অক্টোবরে – ৬ মাসের জন্যে। ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ থেকে আসেনশন দ্বীপ পর্যন্ত সৈন্যদের নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হয় এই জাহাজে। কারণ ফকল্যন্ডের পোর্ট স্ট্যানলি বিমান বন্দরকে তখনও কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। কয়েক মাসের ব্যবধানে ব্রিটিশ সরকার ৩৩ জন মালিকের কাছ থেকে ৫৪টা জাহাজ রিকুইজিশন করেছিল। এই জাহাজগুলিকে এমন হতে হয়েছিল, যাতে করে তারা বহুদূরের সমুদ্রপথ পাড়ি দিতে পারে এবং খারাপ আবহাওয়ায় সমস্যা না হয়। দক্ষিণ আটলান্টিকের খারাপ আবহাওয়ার আবার বেশ খ্যাতি রয়েছে। এই ৫৪টা জাহাজে ১ লক্ষ টন মালামাল, ৪ লক্ষ ১০ হাজার টন জ্বালানি তেল, ৯ হাজার সৈন্য এবং ৯৫টা বিমান বহন করা হয়েছিল। ব্রিটিশ রয়াল নেভির জাহাজগুলিতে যা বহণ করা সম্ভব ছিল, তা ফকল্যন্ড মিশনের জন্যে যথেষ্ট ছিল না। লম্বা মিশনে খারাপ আবহাওয়ায় সৈন্য এবং রসদ পরিবহণের জন্যে যাত্রীবাহী ওশান লাইনার জাহাজগুলিকেই বেশি উপযুক্ত মনে হয়েছিল ব্রিটিশদের। ‘কুইন এলজাবেথ-২’ জাহাজটা যতক্ষণে দক্ষিন আটলান্টিকে পৌঁছেছিল, ততদিনে যুদ্ধ বেশ কিছুদূর এগিয়ে গিয়েছে। ব্রিটিশ সেনারা ইতোমধ্যেই ফকল্যান্ডে নেমেছে। ‘কুইন এলিজাবেথ-২’ ফকল্যান্ডের উপকূলে সৈন্য নামায়নি; নামিয়েছিল ফকল্যান্ডের কাছাকাছি সাউথ জর্জিয়া দ্বীপে, যা কিনা সেবছরের ২৫শে এপ্রিল ব্রিটিশরা দখল করে নিয়েছিল। সেখান থেকে অন্য জাহাজে করে ফকল্যান্ডে নামানো হয় সৈন্যদের। ‘কুইন এলিজাবেথ’এর মতো আরও কিছু জাহাজ রিকুইজিশন করা হয়েছিল।


ক্রুজ লাইনার 'এসএস ক্যানবেরা'র ডেকের উপর থেকে সেনাবাহিনীর মর্টার উড়িয়ে নিচ্ছে ব্রিটিশ বিমান বাহিনীর সী-কিং হেলিকপ্টার। ডেকের উপরে কনটেইনারে অনেক অস্ত্র এবং রসদ বহণ করা হয়েছিল। ব্রিটিশদের নৌ, বিমান, সেনা, ম্যারিন ও বেসামরিক সকলে একত্রে কাজ করেছিল ফকল্যান্ড যুদ্ধের সময়।
  

জাহাজ থেকে জাহাজে সৈন্য ট্রান্সফার

ভূমধ্যসাগর থেকে ফেরা যাত্রীবাহী জাহাজ এসএস ক্যানবেরা (৪৫ হাজার টন) ৬ই এপ্রিল ব্রিটেনে এসে পৌঁছায়। এই জাহাজের ৪০০ ক্রু ছিল এশিয়ান, যাদেরকে জাহাজ থেকে নামিয়ে দেয়া হয়েছিল। তবে জাহাজের ক্যাপ্টেন ছিলেন একজন রয়াল নেভাল রিজার্ভের অফিসার। জাহাজের উপরে হেলিকপ্টার ওঠা-নামার জন্যে হেলিডেক বসানো হয়। ৯ই এপ্রিল ৪০তম ও ৪২তম কমান্ডো, রয়াল মেরিন এবং ৩য় প্যারা ব্যাটালিয়নকে নিয়ে জাহাজটা দক্ষিণ আটলান্টিকের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। সেখানে ব্রিটিশ অধীনে থাকা এসেনশন দ্বীপে দুই সপ্তাহ মহড়া দেয়া হয় এবং ফকল্যান্ডে সৈন্য নামাবার জন্যে জাহাজটাকে রেডি করা হয়। ২১শে মে ফকল্যান্ডের উপকূলে গিয়ে ২ হাজার সৈন্যকে নামিয়ে দেয় জাহাজটা। এরপর জাহাজটা আড়াই হাজার মাইল দূরের সাউথ জর্জিয়া দ্বীপে গিয়ে ‘কুইন এলিজাবেথ-২’ জাহাজ থেকে নামিয়ে দেয়া সৈন্যদের তুলে নেয়। ক্যানবেরার সাথে ‘নরল্যান্ড’ এবং ‘আরএফএ স্ট্রমনেস’ বাকি সেনাদের পরিবহণ করে। এই সেনাদেরকে ক্যানবেরা এবং বাকি জাহাজগুলি আবারও ফকল্যান্ডে নামিয়ে দেয় ২রা জুন। ল্যান্ডিং ক্রাফট, জাহাজের নিজস্ব বোট এবং ১০০টা হেলিকপ্টার লিফটের মাধ্যমে এই সেনাদের সেখানে নামানো হয়। সৈন্য নামাবার সময় ক্যানবেরার আশেপাশের রয়াল নেভির যুদ্ধজাহাজগুলিকে আর্জেন্টাইন যুদ্ধবিমানগুলি হামলা করেছে, কিন্তু ক্যানবেরায় বোমা পড়েনি একটাও। আর্জেন্টাইনরা ব্রিটিশ ডেস্ট্রয়ার-ফ্রিগেটগুলিকে হামলা করতেই বেশি আগ্রহী ছিল; সাপ্লাই বা ট্রুপ-ক্যারিয়ারগুলিকে নয়। ব্রিটিশরা নিশ্চিত ছিল যে, ক্যানবেরায় বোমা পড়লেও সাড়ে ৩৫ ফুট ড্রাফটের এই জাহাজ ফকল্যান্ডের উপকূলের অগভীর পানিতে ডুববে না। যুদ্ধের শেষে ১৫ই জুন ৪,০০০-এরও বেশি আর্জেন্টাইন যুদ্ধবন্দীদের পরিবহণ করে জাহাজটা। এই কাজ শেষে রয়াল মেরিন সেনাদের ১১ই জুন আবারও দেশে ফেরত নিয়ে আসে।
  

রো-রো ফেরি 'এমভি নরল্যান্ড'-এর পেছনের ভেহিকল র‍্যাম্প দেখা যাচ্ছে। এই র‍্যাম্প ব্রিটিশদের ল্যান্ডিং ক্রাফট থেকে অনেক উঁচু থাকায় জাহাজ থেকে গাড়িগুলি ল্যান্ডিং ক্রাফটে নামানো যাচ্ছিলো না। ব্রিটিশরা একসময় সব বাণিজ্যিক জাহাজ তৈরির সময় ভবিষ্যতে সামরিক ব্যবহারের কথা চিন্তা করতো। কিন্তু আদর্শিক চিন্তার ক্ষয়ের কারণে ব্রিটিশরা ফকল্যান্ড যুদ্ধের সময় ব্যাপক সমস্যার মুখে পড়েছিল।

সৈন্যের সাথে অস্ত্র এবং রসদ

৫ম ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেডের ৩,৯৬১ জনের সেনাদলের ৩৫ দিনের অপারেশনের জন্যে দরকার ছিল ১,০৮৪ টন গোলাবারুদ, ১,১৪৭ টন রসদপাতি, ২০১৫টা গাড়ি এবং ১৯টা হেলিকপ্টার। এত্তসব জিনিস নেবার জন্যে তো আরও জাহাজ দরকার। ২৬ হাজার টনের ‘এমভি নরল্যান্ড’ রিকুইজিশন করা হয় ১৭ই এপ্রিল। এটা ছিল একটা রো-রো ফেরি। এতে দ্বিতীয় প্যারা ব্যাটালিয়ন এবং নেভাল এভিয়েশনের ৮০০ জন সেনাকে পরিবহণ করা হয়। জাহাজের ডিজাইন অবশ্য ব্রিটিশদের জন্যে সুবিধার ছিল না। ব্রিটিশরা তাদের লজিস্টিক ল্যান্ডিং শিপ-গুলির সাথে মেক্সিফ্লোট নামের পন্টুনের মতো কিছু ল্যান্ডিং ক্রাফট বহন করেছিল। এগুলির উপর ট্যাঙ্ক, আর্মার্ড ভেহিকল এবং অন্যান্য গাড়ি তুলে দিয়ে উপকূলে নামানো হতো। নরল্যান্ড একটা রো-রো ফেরি হলেও এই জাহাজের ভেহিকল র‍্যাম্প মেক্সিফ্লোটগুলির উচ্চতা পর্যন্ত নামতোই না। অর্থাৎ এই জাহাজে গাড়ি বহন করলে মেক্সিফ্লোটে সেই গাড়ি নামাবার কোন উপায় নেই। কিন্তু ব্রিটিশদের উপায় ছিল না, কারণ সুবিধামত জাহাজ পাওয়া যাচ্ছিল না। প্রতি চারটা জাহাজ ইন্সপেকশনের পর একটা মাত্র জাহাজ রিকুইজিশনের যোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছিল।
  

'আটলান্টিক কনভেয়র' জাহাজের উপরে উড়ছে ব্রিটিশ রয়াল নেভির সী-হ্যারিয়ার বিমান। এই বিমানগুলি খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল যুদ্ধে। এই জাহাজটা ১৪টা হ্যারিয়ার বিমান বহন করে মূলতঃ অক্সিলারি বিমানবাহী জাহাজের কাজ করেছিল।


বাণিজ্যিক জাহাজে যুদ্ধবিমান পরিবহণ

‘পিএন্ডও লাইন’এর সাড়ে ৫ হাজার টনের ‘এমএস এল্ক’ রো-রো ফেরি বহন করেছিল ১০০টা গাড়ি, ২ হাজার টন এমুনিশন এবং আরও কয়েক’শ টন রসদপাতি। ৮টা লাইট ট্যাঙ্কও নেয়া হয় এতে। হেলিপ্যাড বসানো হয় যাতে ৩টা সী-কিং হেলিকপ্টার বহন করা যায়। ৪,২০০ টনের ‘এমএস ইউরোপিক ফেরি’ রিকুইজিশন করা হয় ১৯শে এপ্রিল। এতে হেলিপ্যাড যুক্ত করা হয় সেনাবাহিনীর ৪টা হেলিকপ্টার বহন করার জন্যে; সৈন্য, গাড়ি এবং রসদও নেয়া হয় এতে। ১৯,০০০ টনের রো-রো ফেরি ‘এমএস বল্টিক ফেরি’ ৫ম ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেডের ১০৫ জন সৈন্যের সাথে ১,৮৭৪ টন রসদপাতি নিয়েছিল। এছাড়াও জাহাজটার উপর হেলিপ্যাড বসানো হয় এবং সেনাবাহিনীর তিনটা হেলিকপ্টার বহন করা হয় এতে। এই জাহাজের সিস্টার শিপ ‘এমএস নরডিক ফেরি’কেও রিকুইজিশন করা হয়। ‘কুনার্ড’এর ১৫ হাজার টনের কনটেইনার জাহাজ ‘এসএস আটলান্টিক কনভেয়র’ এবং ‘এসএস আটলান্টিক কজওয়ে’-কে রিকুইজিশন করা হয় ১৪ই এপ্রিল। জাহাজদু’টিতে বেশকিছু পরিবর্তন করে বিমান পরিবহণের জন্যে উপযুক্ত ক্রয়া হয়েছিল। বিমান ছাড়াও অনেক জ্বালানি এবং গোলাবারুদ নেয় জাহাজদু’টি। ‘আটলান্টিক কনভেয়র’ বহণ করছিল নৌবাহিনীর ৬টা ওয়েসেক্স হেলিকপ্টার এবং রয়াল এয়ার ফোর্সের ৫টা চিনুক হেলিকপ্টার। এসেনশন দ্বীপে এসে জাহাজটা নৌবাহিনীর ৮টা এবং বিমান বাহিনীর ৬টা হ্যারিয়ার বিমান নেয়। ফকল্যান্ডের কাছাকাছি এসে হ্যারিয়ার বিমানগুলিকে বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজে পাঠিয়ে দেয়া হয়। আর একটা চিনুক হেলিকপ্টার ইতোমধ্যেই এসেনশন দ্বীপে নেমে গিয়েছিল। ২৫শে মে আর্জেন্টাইন নৌবাহিনীর সুপার এটেনডার্ড বিমানের ছোঁড়া এক্সোসেট ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে জাহাজটা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। আগুনে ৬টা ওয়েসেক্স, ৩টা চিনুক এবং একটা লিঙ্কস (অন্য জাহাজ থেকে আসা) হেলিকপ্টার পুরো অঙ্গার হয়। অপরদিকে আটলান্টিক কনভেয়রের সিস্টার শিপ আটলান্টিক কজওয়ে ১৪ই মে রওয়ানা দিয়ে নৌবাহিনীর ৮টা সী-কিং এবং ২০টা ওয়েসেক্স হেলিকপ্টার বহন করে ২৭শে মে ফকল্যান্ডের কাছাকাছি পৌঁছায়। যুদ্ধের মাঝে এই জাহাজের উপরে ৪,০০০ বার হেলিকপ্টার অবতরণ করে এবং ৫০০ বিমানে জ্বালানি সরবরাহ করা হয়। এছাড়াও মিসাইল হামলার শিকার রয়াল ফ্লিট অক্সিলারির লজিস্টিক ল্যান্ডিং শিপ ‘স্যার গালাহ্যাড’ এবং ‘স্যার ট্রিসট্রাম’-এর ১৭০ জন ক্রুকে এই জাহাজ আশ্রয় দেয়। সাড়ে ১১ হাজার টনের কন্টেইনার জাহাজ ‘এমভি কন্টেন্ডার বেজান্ট’ ৯টা ওয়াস্প, ৩টা চিনুক হেলিকপ্টার এবং ৪টা হ্যারিয়ার বিমান নিয়ে যখন ফকল্যান্ড পৌঁছায়, তখন যুদ্ধ শেষ। এই জাহাজটা রয়াল নেভি পরবর্তীতে রেখে দেয় ‘আরএফএ আরগাস’ নামে। ২৮ হাজার টনের কনটেইনার জাহাজ ‘এমভি এস্ট্রোনমার’-এ বেশকিছু পরিবর্তন করা হয় ১৩টা হেলিকপ্টার বহণ করার জন্যে। এই জাহাজটাও যুদ্ধ শেষে পৌঁছায়, এবং এটাকেও রয়াল নেভি সার্ভিসে নিয়ে নেয় ‘আরএফএ রিলায়ান্ট’ নামে। এই জাহাজটাই ১৯৮৪ সালে বৈরুত থেকে ৫,০০০ ব্রিটিশ নাগরিক এবং সৈন্যকে উদ্ধার করে।
 





অয়েল রিগ সাপোর্ট শিপ 'স্টেনা ইন্সপেক্টর'কে রয়াল নেভি ফকল্যান্ড নিয়ে গিয়েছিল রিপেয়ার শিপ হিসেবে। জাহাজটার এতটাই কাজে লেগেছিল যে, ব্রিটিশরা পরবর্তীতে জাহাজটাকে সার্ভিসে নিয়ে নেয় 'আরএফএ ডিলিজেন্স' নামে।

সব জাহাজই কাজে লাগে

ব্রিটিশরা ৩টা যাত্রীবাহী লাইনার, ৮টা রো-রো ফেরি, ৫টা কনটেইনার জাহাজ, ৭টা কার্গো জাহাজ, ১৫টা ট্যাংকার এবং আরও ৮টা সাপোর্ট জাহাজ রিকুইজিশন ও চার্টার করেছিল। এই ৪৬টা বাণিজ্যিক জাহাজের মাঝে অনেকগুলিতেই হেলিপ্যাড বসানো হয়েছিল – সবগুলি যাত্রীবাহী লাইনার, রো-রো ফেরি, কনটেইনার জাহাজ; ৭টা কার্গো জাহাজের মাঝে ৩টা, এবং ৮টা সাপোর্ট শিপের মাঝে ৩টা। ১৫টা বাণিজ্যিক ট্যাঙ্কারের মাঝে ২টাকে সমুদ্রে রিফুয়েলিং-এর জন্যে যন্ত্র বসানো হয়েছিল। আবার অনান্য সকল জাহাজকেও মাঝ সমুদ্রে জ্বালানি গ্রহণ করতে পারার জন্যে প্রস্তুত করা হয়েছিল। অনেক জাহাজে যাত্রাপথেও মডিফিকেশনের কাজ চলছিল। অন্যদিকে রয়াল নেভির অধীনে মোট ৬৮টা জাহাজ ফকল্যান্ড মিশনে গিয়েছিল - ২টা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ, ২টা ডক ল্যান্ডিং শিপ, ৮টা ডেস্ট্রয়ার, ১৫টা ফ্রিগেট, ৩টা প্যাট্রোল ভেসেল, ৬টা সাবমেরিন, ৩টা সার্ভে জাহাজ (ব্যবহৃত হয়েছিল হসপিটাল জাহাজ হিসেবে), ৫টা ফিশিং ট্রলার (ব্যবহৃত হয়েছিল মাইনসুইপার হিসেবে), ১০টা রিফুয়েলিং ট্যাঙ্কার, ৬টা লজিস্টিক ল্যান্ডিং শিপ, ৫টা সাপ্লাই শিপ, ১টা হেলিকপ্টার সাপোর্ট শিপ, ২টা ওশান টাগবোট। ২টা ডেস্ট্রয়ার, ২টা ফ্রিগেট, ১টা লজিস্টিক ল্যান্ডিং জাহাজ, ১টা কনটেইনার জাহাজ, ১টা ইউটিলিটি ল্যান্ডিং ক্রাফট, ২৪টা হেলিকপ্টার ও ১০টা ফাইটার বিমান হারায় ব্রিটিশরা। প্রতিটা জাহাজই সেখানে কাজে লেগেছিল। ডুবে যাওয়া বা আঘাতপ্রাপ্ত জাহাজকে আশেপাশের জাহাজগুলি সহায়তা দিয়েছে; আগুন নিভাতে সহায়তা দিয়েছে; তাদের ক্রুদের পানি থেকে তুলে নিয়েছে। এছাড়াও জাহাজগুলি হেলিকপ্টারগুলিকে রিফুয়েলিং করেছে; ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ ও বিমানগুলিকে রিপেয়ার করতে সহায়তা দিয়েছে; খাবার-দাবার ও রসদ সরবরাহ করেছে; মেডিক্যাল সাপোর্ট দিয়েছে; সৈন্যদের রেস্টহাউজ হিসেবে কাজ করেছে; কুরিয়ার বা ডেসপ্যাচ ভেসেল হিসেবেও কাজ করেছে।

ফকল্যান্ড যুদ্ধ থেকে এই আলোচনা সাপেক্ষে কিছু শিক্ষনীয় রয়েছে।

- ব্রিটিশ নৌবহরের দুর্বলতা - বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ নিয়ন্ত্রণ করার মতো শক্তিশালী নৌবহর ব্রিটেন ততদিনে হারিয়েছে। ব্রিটিশ রয়াল নেভির জাহাজগুলিতে যতো সৈন্য পরিবহণ করা সম্ভব ছিল, তা দিয়ে ফফল্যান্ডস-এর মতো ছোট দ্বীপও পূনর্দখল করা ছিল কঠিন। তাই বেসামরিক বাণিজ্যিক জাহাজের উপরেই নির্ভর করছে হয়েছিল ব্রিটেনকে।

- ব্রিটিশদের আদর্শিক চিন্তার দুর্বলতা - ব্রিটিশদের আদর্শিক চিন্তার দুর্বলতা আরও বহু আগে থেকেই প্রকাশ পেয়েছিল। ফকল্যান্ড যুদ্ধের সময় সেটা আরও কঠিনভাবে সামনে আসলো। ব্রিটিশ এডমিরালটি সকল জাহাজের ডিজাইন নিয়ন্ত্রণ করতো। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ব্রিটেন শত-শত বাণিজ্যিক জাহাজকে রিকুইজিশন করে নৌবাহিনীতে নিয়েছিল। সেটা তারা পেরেছিল, কারণ প্রতিটা জাহাজের ডিজাইন করা হতো ভবিষ্যতের যেকোন সামরিক দরকারের কথা চিন্তা করে। কিন্তু ১৯৮২ সালে ব্রিটেন বেসামরিক জাহাজ রিকুইজিশন করতে গিয়ে দেখলো যে, বেশিরভাগ জাহাজই সামরিক ব্যবহারের অনুপযোগী। যেগুলিকে সামরিক কাজের জন্যে নির্বাচিত করা হয়েছিল, সেগুলিরও ছিল ব্যাপক সমস্যা। ফকল্যান্ডে বাণিজ্যিক পরিবহণ জাহাজ থেকে সৈন্য নামাতে গিয়ে তাদের এই সমস্যাগুলি মোকাবিলা করতে হিমসিম খেতে হয়েছিল।
 
রয়াল নেভির সার্ভে শিপ 'এইচএমএস হেরাল্ড' ও এর ২টা সিস্টার শিপ ফকল্যান্ড গিয়েছিল হসপিটাল শিপ হিসেবে। যুদ্ধে যেকোন জাহাজই কাজে লাগানো সম্ভব - এটার ভালো উদাহরণ এটি।


- যুদ্ধের সময়ে যেকোন জাহাজই কাজে লাগে। কিছু জাহাজ ফকল্যান্ডের আশেপাশে প্যাট্রোল এবং ইন্টেলিজেন্স যোগাড়ের জন্যে ব্যবহৃত হয়েছিল। ৪টা সার্ভে জাহাজকে মডিফাই করে হসপিটাল শিপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। অয়েল প্ল্যাটফর্মের সাপোর্ট জাহাজগুলি অত্যন্ত ভালো ফ্লোটিং ওয়ার্কশপ বা রিপেয়ার শিপ হিসেবে পরিগণিত হয়েছিল। ৫টা বাণিজ্যিক ফিশিং ট্রলারকে রিকুইজিশন করে সোনার বসিয়ে নেয়া হয়েছিল মাইনসুইপিং-এর কাজে।

- বেসামরিক জাহাজ যে সহজেই সামরিক কাজে লাগানো সম্ভব, তা আবারও প্রমাণ হলো ফকল্যান্ডের যুদ্ধের সময়। যাত্রীবাহী লাইনারগুলিকে সহজেই ট্রুপ ক্যারিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা গেছে। কনটেইনার জাহাজগুলিকে কিছুটা পরিবর্তন করে বিমান পরিবহণ করানো হয়েছে। এমনকি কোন ধরনের মডিফিকেশন ছাড়াও একটা জাহাজ সামরিক কাজে ব্যবহার হতে পারে। যেমন – ফকল্যান্ডের কাছাকাছি ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজগুলিকে জ্বালানি ও রসদ সরবরাহ করা; আক্রান্ত বা ডুবন্ত যুদ্ধজাহাজকে অগ্নি নির্বাপণে সহায়তা দেয়া ও সেসব জাহাজের ক্রুদের আশ্রয় দেয়া, ইত্যাদি।

- হেলিকপ্টার অপারেশনের গুরুত্ব - বিমান/হেলিকপ্টার নৌ-অপারেশনের জন্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হলো আবারও। বাণিজ্যিক প্রায় সকল জাহাজকেই মডিফাই করা হয়েছিল ফকল্যান্ডের জন্যে। প্রধান মডিফিকেশন ছিল হেলিপ্যাড বসানো। জাহাজে বহণ করা সৈন্য এবং রসদ জাহাজ থেকে ওঠা-নামানো জন্যে হেলিকপ্টার ছিল একটা গুরুত্বপূর্ণ বাহন। আর ফকল্যান্ডের উপকূলে হেলিকপ্টার অপারেশনের সময় এই জাহাজগুলি ক্রমাগত হেলিকপ্টারগুলিকে জ্বালানি সরবরাহ করেছিল এবং দরকারে মেইনটেন্যান্স/রিপেয়ারের ব্যবস্থা করেছিল।
 


কনটেইনার জাহাজ 'এমভি কন্টেন্ডার বেজান্ট' ১২টা হেলিকপ্টার ও ৪টা হ্যারিয়ার বিমান নিয়ে ফকল্যান্ডে গিয়েছিল। এই জাহাজটা পরবর্তীতে রয়াল নেভি সার্ভিসে নিয়ে নেয় এভিয়েশন সাপোর্ট শিপ হিসেবে, যা এখন 'আরএফএ আরগাস' নামে চলছে।


- অক্সিলারি বিমানবাহী জাহাজ - বাণিজ্যিক কনটেইনার জাহাজগুলিতে বহণ করা হ্যারিয়ার বিমানগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। এই জাহাজগুলি অক্সিলারি বিমানবাহী জাহাজের কাজ করেছিল। এই বিমানগুলি জাহাজের হেলিপ্যাড থেকে উড়ে গিয়ে বিমানবাহী জাহাজগুলিতে যোগ দিয়েছিল। যুদ্ধে হারানো হ্যারিয়ারগুলির প্রতিস্থাপক ছিল এগুলি। বিমানবাহী জাহাজ ‘হার্মিস’ সর্বোচ্চ বহন করেছিল রয়াল নেভির ১৬টা সী-হ্যারিয়ার, বিমান বাহিনীর ১০টা হ্যারিয়ার জিআর-৩, আর ১০টা সী-কিং হেলিকপ্টার। ‘ইনভিনসিবল’ বহন করেছিল ১২টা সী-হ্যারিয়ার এবং ১০টা সী-কিং হেলিকপ্টার। ডুবে যাওয়া কনটেইনার জাহাজ ‘আটলান্টিক কনভেয়র’ নিয়ে এসেছিল নৌবাহিনীর ৮টা, আর বিমান বাহিনীর ৬টা হ্যারিয়ার। ডুবে যাবার আগেই বিমানগুলি বিমানবাহী জাহাজে ট্রান্সফার করা হয়েছিল। আর্জেন্টিনার ১২০-এর উপর ফাইটার বিমানের বিরুদ্ধে এগুলিই ছিল ব্রিটিশদের ভরসা। হ্যারিয়ারগুলি ২১টা আর্জেন্টাইন বিমান ভূপাতিত করেছিল।

আরও পড়ুনঃ
আর্জেন্টিনা কি পারবে?

Tuesday, 26 June 2018

আর্জেন্টিনা কি পারবে?

২৬শে জুন ২০১৮
আর্জেন্টিনা কি পারবে? কি পারবে? বাংলাদেশের মানুষকে এই প্রশ্ন করলে তাদের বেশিরভাগের চিন্তায় থাকবে – আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হতে পারবে কি না। যারা এধরনের চিন্তা করছেন, তারা হয়তো ভুলে যাচ্ছেন যে আর্জেন্টিনা একটা দেশের নাম; ফুটবল টিমের নাম নয়।


কি পারবে আর্জেন্টিনা?


আর্জেন্টিনা কি পারবে? কি পারবে? বাংলাদেশের মানুষকে এই প্রশ্ন করলে তাদের বেশিরভাগের চিন্তায় থাকবে – আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হতে পারবে কি না। যারা এধরনের চিন্তা করছেন, তারা হয়তো ভুলে যাচ্ছেন যে আর্জেন্টিনা একটা দেশের নাম; ফুটবল টিমের নাম নয়। আর্জেন্টিনার ভূমি রয়েছে প্রায় ২৮ লক্ষ বর্গকিঃমিঃ-এর মতো, যা বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ১৯ গুণ বড়। তবে জনসংখ্যা ৪ কোটি ৪০ লাখের মতো, যা বাংলাদেশের প্রায় ৪ ভাগের ১ ভাগ। এর অর্থনীতি আকার প্রায় ৬২৬ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির দ্বিগুণেরও বেশি। ১৪,০০০ ডলারের মাথাপিছু আয় থাকার পরেও দেশের অর্থনীতি এতটা খারাপ অবস্থায় রয়েছে যে, তাদের সামরিক বাহিনী টিকিয়ে রাখাই দায় হয়ে গিয়েছে। ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ দারিদ্রের শিকার, এবং ৬ দশমিক ২ শতাংশ সবচাইতে খারাপ দারিদ্রের মাঝে রয়েছে। ২০১০ সালে ৫৩০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি থেকে ২০১৬-তে মাত্র ৫৪৬ বিলিয়নে পৌঁছায়। এর মাঝে দুই বছর অর্থনৈতি প্রবৃদ্ধি ছিল ঋণাত্মক।

তাহলে আর্জেন্টিনার এই ক্ষয়িষ্ণু অর্থনীতি নিয়ে কি পারার কথা হচ্ছে? আর্জেন্টিনার উপকূলের অদূরে রয়েছে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ, যা আর্জেন্টিনার নয়; ব্রিটেনের। ব্যাপারটা বোঝানোর জন্যে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যদি বলা হয় যে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ ভারতের অধীনে, তাহলে সেটা বাংলাদেশের মানুষের কাছে কেমন লাগতে পারে? ঠিক তেমনটাই আবেগ রয়েছে আর্জেন্টিনার। কিন্তু আর্জেন্টিনা কি পারবে ব্রিটেনের কাছ থেকে এই দ্বীপকে বাগিয়ে নিতে?
  
 
অক্টোবর ২০১৬। আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনোস আয়ার্সে উগ্রপন্থী জাতীয়তাবাদীরা ব্রিটিশ পতাকা পোড়াচ্ছে। ব্রিটিশরা ফকল্যান্ডে সামরিক মহড়া দেবে - এই ঘোষণার প্রতিবাদ এটি। ১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনা ঠিকই ফকল্যন্ড দখল করে নিয়েছিল। কিন্তু সেটা যে তারা ধরে রাখতে পারবে না, তা শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলি আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিল।


ফুটবল বিশ্বকাপ নয়, ফকল্যান্ড নিজের দখলে নিতে পারবে আর্জেন্টিনা?

১৯৮২ সাল। আর্জেন্টিনা তার উপকূলে ব্রিটিশ উপনিবেশ ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ দখল করে নিয়েছে। ব্রিটিশরা তাদের উপনিবেশিক রাজত্বের বেশিরভাগটাই ততদিনে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হারিয়েছে। তবুও ব্রিটিশ ইজ্জত বলে কথা। ব্রিটিশরা স্বল্প সময়ের মাঝে তাদের যতটুকু সামরিক সক্ষমতা রয়েছে, ততটাই কাজে লাগিয়ে দ্বীপগুলি পুনর্দখল করতে সচেষ্ট হয়। কিন্তু প্রায় ১৪ হাজার কিঃমিঃ দূরে পুরো আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আসা ব্রিটিশদের সক্ষমতা ছিল সীমিত। তাই তারা তাদের সকল ধরনের ক্ষমতার প্রয়োগে উদ্যোগী হয়। এর মাঝে একটা ছিল ল্যাটিন আমেরিকায় ব্রিটিশদের জন্যে একটা বন্ধু খোঁজা, যে কিনা গুরুত্বপূর্ণ কিছু সহায়তা দিয়ে ব্রিটিশদের সক্ষমতায় ফাঁকফোকড়গুলিকে বন্ধ করতে পারবে। আরেকটি উদ্যোগ ছিল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে নিজের পক্ষে কাজ করানো।

বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা মূলতঃ মার্কিনীদের তৈরি। তারা ব্রিটিশদের ব্যবস্থাগুলিকে নিজেদের মতো করে তৈরি করিয়ে নিয়েছে। দুর্বল দেশগুলি অস্ত্রের জন্যে অন্যের উপরে নির্ভরশীল থাকবে– এটা অবশ্য ব্রিটিশ সময়ের চিন্তা হলেও মার্কিনীরা এটা অব্যহত রেখেছে। ফকল্যান্ড যুদ্ধের সময় আর্জেন্টিনার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ছিল ফ্রান্সের তৈরি ‘এক্সোসেট’ জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। এই ক্ষেপণাস্ত্রের বিমান থেকে লঞ্চ করা ভার্সনেরই আর্জেন্টিনা সবচাইতে বড় ব্যবহার করেছিল। আর্জেন্টিনার বিমান বাহিনীর ছোঁড়া দু’টি এক্সোসেট ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে দু’টি ব্রিটিশ জাহাজ ধ্বংস হয়। এমতাবস্থায় ব্রিটিশ রাষ্ট্রের কিছু লোক চাইছিলো আর্জেন্টিনা পর্যন্ত এই এক্সোসেট ক্ষেপণাস্ত্রের চালান বন্ধ করে দিতে। এই চালানগুলি আসতো বিমানে। চার্লস হিউসডন নামের এক ব্রিটিশ এয়ার ফ্রেইটের ব্যবসা করতেন, যিনি ছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ এটর্নি জেনারেল মাইকেল হাভার্স-এর বন্ধু। হিউসডন এয়ার ফ্রেইটের আদি-নক্ষত্র জানতেন। তিনি এক্সোসেট ক্ষেপণাস্ত্রের চালান বন্ধ করার একটা পরিকল্পনা এটর্নি জেনারেলকে বলার পরে সেটা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার পর্যন্ত যায়।
 
 
আর্জেন্টিনার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ছিল ফ্রান্সে নির্মিত 'এক্সোসেট' ক্ষেপণস্ত্র। ফ্রান্সের সরবরাহকৃত 'সুপার এটেনডার্ড' বিমান থেকে এই ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া হয়। মাত্র ৫টা ক্ষেপণাস্ত্র ব্রিটিশদের মাঝে যে ত্রাসের সৃষ্টি করেছিল, দুই ডজন কি করতে পারতো, তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু ফ্রান্স ৫টার বাইরে একটাও সরবরাহ করেনি। এমনকি ৫টার মাঝে প্রথমে কাজ করেছে মাত্র ২টা; বাকি ৩টা কাজ করাতে অনেক কষ্ট করতে (সময় ক্ষেপণ) হয়েছে ফরাসিদের। 


ফ্রান্স কি ব্রিটেনের পক্ষে ছিল, নাকি আর্জেন্টিনার?

পরিকল্পনাটা ছিল এরকম। নিজেদের অনুগত একটা কোম্পানি এক্সোসেট ক্ষেপণাস্ত্র শিপমেন্ট করার জন্যে টেন্ডারে অংশগ্রহণ করবে। এটা এমন একটা সময় যখন নিজেদের “নিরপেক্ষ” দেখাতে ফরাসিরা নিজেদের বিমানে আর্জেন্টিনায় এই ক্ষেপণাস্ত্র পাঠাবে না। লোডমাস্টারের যোগসাজসে বিমানটার কোর্স পরিবর্তন করে ট্রানজিটে বার্মুদা বা অন্য কোন স্থানে নামানো হবে। থ্যাচার ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাসোঁয়া মিতেরাঁর কাছে এক গোপন চিঠি লিখে দক্ষিণ আমেরিকায় এক্সোসেট ক্ষেপণাস্ত্রের চালান দেরি করানোর অনুরোধ করেন। ফ্রান্স যাতে পেরুর কাছে এই অস্ত্র বিক্রি না করে, সেটার অনুরোধ করেন থ্যাচার। কারণ পেরু থেকে এই ক্ষেপণাস্ত্র নিশ্চিতভাবেই আর্জেন্টিনায় যাবে। যুদ্ধের আগে ফ্রান্স আর্জেন্টিনার কাছে ৫টি এক্সোসেট ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রি করেছিল, যা কেউ তেমন গুরুত্ব সহকারে নেয়নি। যখন ১৯৮২-এর মে মাসে এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে আর্জেন্টিনা ২টি ব্রিটিশ জাহাজ ধ্বংস করে ফেলে, তখন সকলে নড়েচড়ে বসে। ফ্রান্স ঘোষণা দেয় যে তারা আর্জেন্টিনার কাছে কোন অস্ত্র বিক্রি করবে না। একইসাথে ফ্রান্স ব্রিটেনের কাছে তথ্য দেয় যে তারা আর্জেন্টিনার কাছে কি কি ধরনের অস্ত্র বিক্রি করেছিল। পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলে ফরাসি সামরিক স্থাপনাগুলিকেও ফ্রান্স ব্রিটেনের ব্যবহার জন্যে উন্মুক্ত করে দেয়। তবে ফ্রান্সের রাষ্ট্রীয় কিছু লোকজন মনেপ্রাণে ব্রিটেনের বিপক্ষে ছিলেন।

ফরাসি সরকারের অজানা ছিল না যে একটা ফরাসি সরকারি কোম্পানির (৫১ শতাংশ শেয়ার) একটা টেকনিক্যাল দল আর্জেন্টিনাকে সহায়তা দেবার উদ্দেশ্যে যুদ্ধের পুরো সময় আর্জেন্টিনাতে অবস্থান করে। দলটি এক্সোসেট ক্ষেপণাস্ত্রের কিছু সমস্যা দূর করে অস্ত্রটিকে বিমান থেকে লঞ্চ করার জন্যে কর্মক্ষম করে তোলে। ফরাসি সরকারি কর্মকর্তারা অবশ্য এগুলি জানতো না বলে দাবি করে। তবে মাত্র ৫টি ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আর্জেন্টিনা যে কিছু করতে পারবে না, তা ব্রিটিশরা জানতো। তাই তাদের মূল ফোকাস ছিল কিভাবে আর্জেন্টিনাকে নতুন করে এক্সোসেট ক্ষেপণাস্ত্র পাওয়া থেকে দূরে রাখা যায়। ফরাসিরা যে দুই পক্ষকে খুশি রাখছে, সেটা ব্রিটিশরা জানতো; তারপরেও ফরাসিদের সাথে তাদের নতুন করে কোন শত্রুতা হয়নি। ফরাসিরা থ্যাচারের সাথে দরকষাকষিতে এগিয়ে ছিল। তারা আর্জেন্টিনার কাছে নতুন করে আর এক্সোসেট বিক্রি করেনি। আবার পুরোনো এক্সোসেটগুলিকে কর্মক্ষম করার মাধ্যমে তারা আর্জেন্টিনারও পক্ষেও থাকার ভান করেছে। তারা আর্জেন্টিনাকে এমন কোন সহায়তা দেয়া থেকে বিরত থাকে, যা কিনা যুদ্ধের মোড় পুরোপুরি ঘুরিয়ে ফেলতে পারতো। আরও দুই ডজন এক্সোসেট ক্ষেপণাস্ত্র হয়তো রয়াল নেভির বারোটা বাজাতে পারতো। কিন্তু সেটা মিতেরাঁ-থ্যাচারের দরকষাকষিতেই ব্যবহৃত হয়েছিল কেবল।
 
  
ব্রিটিশ বিমান বাহিনীর 'নিমরড' গোয়েন্দা বিমান। ফকল্যান্ড যুদ্ধের সময় এরকম একটা বিমান আর্জেন্টিনার প্রতিবেশী দেশ চিলির প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ স্যান ফেলিক্সে মোতায়েন করা হয়। চিলির সহায়তায় ব্রিটিশরা আগে থেকেই আর্জেন্টিনার বিমান হামলার ওয়ার্নিং পেয়ে যেতো। চিলির এই সহায়তা ছাড়া ব্রিটিশদের পক্ষে যুদ্ধ জেতা কঠিন হয়ে যেতো। 


দক্ষিণ আমেরিকায় ব্রিটেনের শক্ত ঘাঁটি – চিলি

পুরো যুদ্ধের সময় চিলি ছিল ব্রিটেনের খুব কাছে বন্ধু। তবে সন্মুখে চিলি ল্যাটিন আমেরিকার সাথে একাত্মতা প্রকাশ করার কথা বলে ব্রিটেন-আর্জেন্টিনার যুদ্ধে নিরপেক্ষ থাকে। যুদ্ধের শুরুতেই সিডনি এডওয়ার্ডস নামের ব্রিটিশ রয়াল এয়ার ফোর্সের এক অফিসারকে গোপনে চিলিতে প্রেরণ করা হয়। তিনি চিলির বিমান বাহিনীর প্রধান জেনারেল ফার্নান্দো মাত্থেই-এর সাথে সাক্ষাৎ করে সহায়তা চান। চিলির প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের কাছাকাছি স্যান ফেলিক্স দ্বীপে ব্রিটিশ রয়াল এয়ার ফোর্সের একটা ‘নিমরড’ গোয়েন্দা বিমান মোতায়েন করা হয়। সিডনি এডওয়ার্ডস-এর গোয়েন্দা রিপোর্টগুলি ছিল অত্যন্ত গোপনীয় এবং খুব কম লোকই জানতো এর ব্যাপারে। এই রিপোর্টগুলি পরিচিত ছিল “সিডগ্রামস” নামে। এই বার্তাগুলিতে আর্জেন্টিনার দক্ষিণের উশুয়াইয়া, রিও গালেগোস, রিও গ্রান্দে এবং কমোডোরো রিভাদাভিয়া বিমান ঘাঁটিগুলিতে আর্জেন্টিনার বিমান বাহিনীর কর্মকান্ড রিপোর্ট করা হতো। বিশেষতঃ এই ঘাঁটিগুলি থেকে যুদ্ধবিমান উড়লেই সেই ওয়ার্নিং চলে যেতো ফকল্যান্ডস-এর অদূরে অবস্থান নেয়া রয়াল নেভির কাছে। রয়াল নেভির বিমান প্রতিরক্ষার দায়িত্ব ছিল হাতে গোনা ২৮টি সী হ্যারিয়ার বিমানের হাতে। বিপক্ষে ছিল আর্জেন্টিনার বিমান এবং নৌবাহিনীর মোটামুটি ১১৫টির মতো ফাইটার বিমান। সংখ্যায় অল্প হওয়ায় রয়াল নেভির পক্ষে সম্ভব ছিল না যে সারাক্ষণ এই বিমানগুলি আকাশে টহল দেবে। কারণ আকাশে উড়লে সেগুলি নামার পরে মেইনটান্সের কারণে কয়েকটা বিমান রেডি থাকবে না। ঐ সময়ে আর্জেন্টিনার বিমান হামলা হলে সবগুলি বিমান ইন্টারসেপ্ট করার লক্ষ্যে উড়তে পারবে না। অর্থাৎ তাদের ফ্লিটকে রক্ষা করা সক্ষমতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে। তাই ব্রিটিশরা পরিকল্পনা করে কি করে আগেভাগে আর্জেন্টিনার বিমান হামলার খবর পাওয়া যায়। তখন সে অনুযায়ী হ্যারিয়ার বিমান জাহাজ থেকে ওড়ানো যাবে। আর্জেন্টিনার উপকূল থেকে ফকল্যান্ডের দূরত্ব কমপক্ষে ৩৫০ কিঃমিঃ। অর্থাৎ একটা ফাইটার বিমানের ফকল্যান্ডের কাছাকাছি ব্রিটিশ নৌবাহিনীকে হামলা করতে কমপক্ষে ২০ মিনিট সময় লাগবে। আগেভাগে জানতে পারলে এটা বিমান প্রতিরক্ষাকে প্রস্তুত করার জন্যে মোটামুটি যথেষ্ট। চিলি ব্রিটিশদেরকে এই সহায়তাটাই করেছিল। শুধু তা-ই নয়, ব্রিটিশ স্পেশাল এয়ার সার্ভিস (এসএএস) কমান্ডোদের অবতরণ করিয়ে আর্জেন্টিনার দক্ষিণের রিও গ্রান্দে বিমান ঘাঁটিতে অবস্থিত এক্সোসেট ক্ষেপণাস্ত্র বহণকারীসুপার এটেনডার্ড ফাইটার বিমান ধ্বংস করার জন্যে অত্যন্ত সাহসী একটা মিশন পরিকল্পনা করে ব্রিটিশরা। মিশনটির আগে তথ্য সংগ্রহ করার একটা অপারেশন চালানো হয়, যা সফল হয়নি। কমান্ডোরাসীমান্ত অতিক্রম করে চিলিতে ঢুকে যায় এবং তখন চিলি সরকার তা আলাদা কিছু নয় বলে ব্যাপারটিকে ধামাচাপা দিয়ে দেয়। চিলির নৌবাহিনীর জন্যে ব্রিটিশ নৌবাহিনী থেকে কেনা রিফুয়েলিং ট্যাঙ্কার ‘টাইডপুল’ চিলি সরকার – কিছুদিন পরে ডেলিভারি দিলেও চলবে, এই হিসেবে – ব্রিটিশদের আরও কিছুদিন ব্যবহার করার অনুমতি দেয়। জাহাজটি ফকল্যান্ড যুদ্ধে ব্যবহার করে ব্রিটিশ রয়াল নেভি।


 

কৌশলগত ম্যাজেলান প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আর্জেন্টিনার সাথে চিলির রয়েছে দ্বন্দ্ব। ব্রিটেন চিলির পক্ষে থাকায় চিলি এই দ্বন্দ্বে শক্তি পায়। ম্যাজেলান প্রণালী থেকে পূর্বেই রয়েছে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ, যা ব্রিটিশদের হাতে রয়েছে। ম্যাজেলানের আরও দক্ষিণের ড্রেইক প্যাসেজ দিয়েও জাহাজ যেতে পারে। তবে সেখানে আবহাওয়া আরও খারাপ থাকে।


ফকল্যান্ড আর্জেন্টিনার হাতে গেলে কি হতো?

চিলি এবং ফ্রান্সের সাথে ফকল্যন্ড যুদ্ধের সময়ে ব্রিটেনের সম্পর্ক কিছু আলোচনাকে সামনে নিয়ে আসে। প্রথমতঃ দক্ষিণ আমেরিকাতে ব্রিটিশ প্রভাব ধরে রাখতে চিলি ব্রিটেনকে সহায়তা করছে। চিলি ১৮৭৯-৮৩ সালে সংঘটিত ‘ওয়ার অব দ্যা প্যাসিফিক’এ পেরু এবং বলিভিয়ার সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। যুদ্ধে চিলি তার ব্রিটেনে নির্মিত অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজগুলি ব্যবহার করে পেরুর পুরো নৌবাহিনীকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দেয়। উভয় দেশ একত্রে চিলির কাছে সামরিক পরাজয় বরণ করে এবং এর ফলশ্রুতিতে চিলি বলিভিয়া এবং পেরুর কাছ থেকে আতাকামা মরুভূমির বিশাল অঞ্চল দখল করে নেয়। ঐ অঞ্চল ছিল বলিভিয়ার জন্যে সমুদ্রে পৌঁছানোর একমাত্র উপায়। একইসাথে সেখানে গুরুত্বপূর্ণ খণিজ সম্পদ ছিল, যা পুরোটাই চিলির হস্তগত হয়। বলিভিয়া এবং পেরুর পক্ষ নেয় যুক্তরাষ্ট্র। সেসময় থেকেই পেরুকে ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্র তার বলয়ে নিয়ে আসতে থাকে। পেরুকে অস্ত্রসস্ত্র সরবরাহ করে ব্রিটিশদের বন্ধু চিলির বিরুদ্ধে ব্যালান্স তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্র।
 

বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপথগুলির মাঝে দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণের সমুদ্রপথের বাণিজ্যিক গুরুত্ব তেমন একটা নেই। কিন্তু এর কারণ কিন্তু মধ্য আমেরিকার পানামা খাল, যা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে। ইউরোপিয়রা সর্বদাই আটলান্টিক হয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের যাবার জন্যে পানামা খালের একটা বিকল্প রাখতে চাইবে।


চিলির সাথে ইউরোপের যোগাযোগ ছিল দক্ষিণ আমেরিকার সর্বদক্ষিণের ম্যাজেলান প্রণালী এবং এরও দক্ষিণের ড্রেইক প্যাসেজ হয়ে, যার নিয়ন্ত্রণ ছিল মুলতঃ চিলি এবং কিছুটা আর্জেন্টিনার হাতে। আর ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ হলো সেই সমুদ্রপথের পূর্ব প্রান্তে। অন্যদিকে পেরুর সাথে ইউরোপের যোগাযোগ বর্তমানে পানামা খাল-এর মাধ্যমে, যা ১৯১৪ সালের আগ পর্যন্ত ছিল না। ১৮৭৯-৮৩-এর যুদ্ধে পেরুর জন্যে অস্ত্র পানামা যোজকের ভূমি পার হয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলে এসে জাহাজে উঠতো। পানামা খাল তৈরি হবার আগ পর্যন্ত পেরুকে অনেক ক্ষেত্রেই চিলির নিয়ন্ত্রণে থাকা ম্যাজেলান প্রণালি ব্যবহার করতে হতো। ইউরোপ থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের সাথে সরাসরি যোগাযোগের পথ হলো পানামা খাল হয়ে, যা যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করে। তবে ম্যাজেলান প্রণালি যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করে না। বরং সেখানে চিলির সহায়তায় ফকল্যান্ড থেকে ব্রিটিশরা ম্যাজেলানকে নিয়ন্ত্রণ করে। ১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনা ফকল্যান্ড নিজেদের দখলে রাখতে পারলে ব্রিটশরাও প্রশান্ত মহাসাগরে পৌঁছাতে মার্কিন-নিয়ন্ত্রিত পানামা খালের উপরে নির্ভরশীল হয়ে যেতো। আর পানামা খালে কোন ধরনের সমস্যা হলে সকল জাহাজকে ম্যাজেলান প্রণালি হয়ে যাতায়াত করতে হবে। সেই ঘটনা ঘটার আগে বেশিরভাগ মানুষের কাছেই ম্যাজেলানের গুরুত্ব থাকবে না; এটাই স্বাভাবিক।

ম্যাজেলান প্রণালির সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আর্জেন্টিনার সাথে চিলির বিবাদ রয়েছে। আর্জেন্টিনা যদি ফকল্যান্ড দখলে রাখতে পারতো, তাহলে চিলিও পরবর্তীতে টার্গেট হতো আর্জেন্টিনার; যার সুবাদে ম্যাজেলান প্রণালির নিয়ন্ত্রণ চিলির কাছ থেকে আর্জেন্টিনার কাছে চলে যেতো। আবার ফকল্যান্ড আর্জেন্টিনার হওয়া মানে মানচিত্রের পরিবর্তন, যা কিনা বলিভিয়া এবং পেরুকে ১৮৭৯-৮৩-এর প্যাসিফিক যুদ্ধের কথা মনে করিয়ে দিতো এবং চিলিকে চাপের মুখে ফেলতো। প্যাসিফিকের যুদ্ধে আর্জেন্টিনাও গোপনে বলিভিয়া এবং পেরুর সাথে কথা বলেছিলো। তবে চিলি ব্যাপক সামরিক সাফল্য পাওয়ায় আর্জেন্টিনা পিছু হটে যায়। ফকল্যান্ড যুদ্ধে আর্জেন্টিনার পক্ষে গেলে আতাকামা নিয়ে বিবাদে আর্জেন্টিনা নিশ্চিতভাবেই পেরু এবং বলিভিয়ার পক্ষ নিতো। আবার এসব সংঘাত চলার সময় আর্জেন্টিনাকে অনেক শক্তিশালী এবং আগ্রাসী হতে দেখে এই এলাকার সবচাইতে বড় দেশ ব্রাজিলও বসে থাকতো না। ব্রিটেন কোনভাবেই এভাবে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটা সমুদ্রপথকে ছেড়ে দিতো না।
  
নভেম্বর ২০১৫। কৌশলগত ম্যাজেলান প্রণালী অতিক্রম করছে মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ 'জর্জ ওয়াশিংটন। ফকল্যান্ড এবং চিলির মাধ্যমে এই প্রণালীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ব্রিটেন। আর ফ্রান্স আর্জেন্টিনাকে 'কোনরকম' সহায়তার মাধ্যমে বুঝিয়ে দিয়েছে যে ফকল্যান্ড ব্রিটেনের হাতে থাকলে ফ্রান্স এর বিরোধিতা করবে না। 

 

অন্যদিকে ফ্রান্সের প্রশান্ত মহাসাগরে বেশকিছু উপনিবেশ রয়েছে। ফরাসীরাও ফকল্যন্ড ব্রিটিশদের হাতে থাকায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে যে পানামা খাল ছাড়াও ফ্রান্স থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে পৌঁছার আরেকটা পথ ইউরোপীয়দের হাতেই রইলো। যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু ম্যাজেলান প্রণালিকে ভুলে যায়নি। মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজগুলি তেমন কোন কারণ ছাড়াই এই প্রণালি দিয়ে আটলান্টিক এবং প্যাসিফিকের মাঝে যাতায়াত করে; যদিও পানামা খাল দিয়ে যাওয়াটা তাদের জন্যে হাজার গুণ সহজ হতো। ২০১৭-এর ডিসেম্বরেও মার্কিন উভচর যুদ্ধজাহাজ ‘ওয়াসপ’ ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ থেকে প্যাসিফিকে যেতে পানামা খাল ব্যবহার না করে ম্যাজেলান প্রণালি ব্যবহার করে। ২০১৫-এর অক্টোবর-নভেম্বরে মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘জর্জ ওয়াশিংটন’ (CVN 73) তার পুরো ব্যাটলগ্রুপ-সহ ম্যাজেলান প্রণালি পার হয়। ২০০৪ সালে আরেক বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘রোনাল্ড রেগ্যান’ (CVN 76) এই প্রণালি পার হয়। ২০১৪-এর অগাস্টে উভচর যুদ্ধজাহাজ ‘আমেরিকা’ (LHA 6) ম্যাজেলান প্রণালি পারি দেয়। যুক্তরাষ্ট্র একা নয়, ২০১৩ সালের অক্টোবরে চীনা নৌবাহিনীর তিনটি যুদ্ধজাহাজের একটা গ্রুপ ম্যাজেলান প্রণালি পারি দেয়। ম্যাজেলানের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বোঝাটা খুব কঠিন নয়।



১৯৮৬ বিশ্বকাপ ফূটবল। আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড। ম্যারাডোনার 'হ্যান্ড অব গড' গোল। আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ডের সাথে জিতেছিল ফুটবলে; কিন্তু ফকল্যান্ড যুদ্ধে নয়! আর্জেন্টিনা বাকি বিশ্বের কাছে একটা ফুটবল দল। ভূরাজনীতিতে আর্জেন্টিনার অংশগ্রহণ ততটুকুই, যতটুকু সুপারপাওয়ার তাকে করতে দেবে। ফুটবলের কাপ আর্জেন্টিনার হাতে দেয়া যেতে পারে; কিন্তু ভূরাজনীতির কাপ দেয়া যাবে না! আর্জেন্টিনা আসলে কি পারবে, এই প্রশ্নটা একটা ভূরাজনৈতিক প্রশ্ন। আর্জেন্টিনাকে দিয়ে সেটাই পারানো হবে, যেটা সুপারপাওয়ার চায়। বিশ্বের আমজনতার কাছে তাই আর্জেন্টিনা একটা ফুটবল দলই থাকবে। একটা শক্তিশালী রাষ্ট্র ভূরাজনীতি বুঝবে – এটাই স্বাভাবিক। ফুটবল খেলা নয়, বরং ভূরাজনীতির খেলায় কাকে কি ধরনের চরিত্র দেয়া হয়েছে, সেটা বোঝাটা ভূরাজনীতি বোঝার অংশ।


আর্জেন্টিনা পশ্চিমা আদর্শিক শক্তিগুলির হাতে বন্দী। যে তাকে অস্ত্র সরবরাহ করবে, সে-ও তাকে এমনভাবে সরবরাহ করবে, যেন সে যুদ্ধে জিততে না পারে। যে সুপারপাওয়ার তাকে সহায়তা করবে, সে তাকে ততটাই সহায়তা করবে, যতটা করলে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ শক্তির কাছ থেকে যথেষ্ট দরকষাকষির সুযোগ পাওয়া যায়। আর্জেন্টিনাকে কেউ জেতাবে না; ব্যবহার করবে। ভূরাজনীতিতে আর্জেন্টিনার অংশগ্রহণ ততটুকুই, যতটুকু সুপারপাওয়ার তাকে করতে দেবে। ফুটবলের কাপ আর্জেন্টিনার হাতে দেয়া যেতে পারে; কিন্তু ভূরাজনীতির কাপ দেয়া যাবে না! আর্জেন্টিনা আসলে কি পারবে, এই প্রশ্নটা একটা ভূরাজনৈতিক প্রশ্ন। আর্জেন্টিনাকে দিয়ে সেটাই পারানো হবে, যেটা সুপারপাওয়ার চায়। বিশ্বের আমজনতার কাছে তাই আর্জেন্টিনা একটা ফুটবল দলই থাকবে। একটা শক্তিশালী রাষ্ট্র ভূরাজনীতি বুঝবে – এটাই স্বাভাবিক। ফুটবল খেলা নয়, বরং ভূরাজনীতির খেলায় কাকে কি ধরনের চরিত্র দেয়া হয়েছে, সেটা বোঝাটা ভূরাজনীতি বোঝার অংশ।