Sunday, 31 October 2021

বেলারুশ কি ইইউএর বিরুদ্ধে ‘হাইব্রিড’ যুদ্ধ চালাচ্ছে?

৩১শে অক্টোবর ২০২১

পশ্চিমা চিন্তার স্তম্ভ মানবাধিকার ইইউএর সদস্য রাষ্ট্রগুলির শরণার্থী বিরোধী জাতীয়তাবাদী চিন্তার কাছে হার মেনেছে। পোল্যান্ডের পার্লামেন্টে গণতান্ত্রিকভাবেই শরণার্থীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। রাশিয়ার সমর্থনে বেলারুশ ইউরোপের দুর্বলতাকেই উস্কে দিচ্ছে; যাকে ইইউ বলছে ‘হাইব্রিড’ যুদ্ধ। ইউরোপের লিবারাল গণতান্ত্রিক আদর্শ দিনে দিনে দুর্বল হচ্ছে; আর এর স্থলাভিষিক্ত হচ্ছে উগ্রবাদী জাতীয়তাবাদী চিন্তা। লিবারাল চিন্তার উৎসস্থলে এই দুর্যোগ ধ্বসে পড়া বিশ্বব্যবস্থারই প্রমাণ মাত্র।

 পূর্ব ইউরোপের দেশ বেলারুশের সাথে ইইউএর যখন উত্তপ্ত সম্পর্ক চলছে, তখন ইইউএর অনেকেই অভিযোগ করছেন যে, বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কো ইইউএর সাথে শরণার্থী ব্যবহার করে ‘হাইব্রিড’ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন। আর এই যুদ্ধে লুকাশেঙ্কোর প্রধান সমর্থনকারী হলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। অপরদিকে ইইউএর পূর্ব সীমানার দেশ লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া এবং পোল্যান্ড শরণার্থীদের আটকাতে তাদের সীমানায় দেয়াল তৈরিতে উদ্যত হয়েছে; এবং এব্যাপারে তারা ইইউএর সহায়তা চাইছে।

‘ফিনানশিয়াল টাইমস’এর সাথে সাক্ষাতে ইইউএর স্বরাষ্ট্র কমিশনার ইয়ালভা জোহানসন বলেন যে, বেলারুশের প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কো মানুষকে আগ্রাসনের জন্যে ব্যবহার করছেন। তিনি দাবি করেন যে, বেলারুশের উপর ইইউএর অবরোধগুলি তাকে আঘাত করছে বলেই তিনি এখন মরিয়া হয়ে দ্বন্দ্বের দিকে ধাবিত হতে বাধ্য হচ্ছেন। ‘ইউরোনিউজ’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ২০২০ সালে বেলারুশের নির্বাচনে জেতার পর থেকেই ইইউএর সাথে লুকাশেঙ্কো সরকারের সম্পর্ক খারাপের দিকে যেতে থাকে। ইইউ থেকে নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং এরপর থেকে বেলারুশের রাস্তায় প্রতিবাদ শুরু হয়। ইইউ লুকাশেঙ্কো সরকারের উপর অবরোধ আরোপ করে এবং দ্বন্দ্ব চলতেই থাকে। বেলারুশ সরকার ‘রায়ান এয়ার’এর একটা বিমানকে মিনস্ক বিমানবন্দরে নামতে বাধ্য করে এবং বিমানের অভ্যন্তর থেকে এক সাংবাদিককে বের করে এনে গ্রেপ্তার করে। গত অগাস্টে টোকিও অলিম্পিক থেকে পালানো বেলারুশ এথলেট ক্রিস্টসিনা সিমানুস্কায়াকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেয় ইইউএর সদস্য দেশ পোল্যান্ড; যা বেলারুশের সাথে দেশটার সম্পর্ক খারাপ করে। তবে এক সংবাদ সন্মেলনে লুকাশেঙ্কো অস্বীকার করেন যে, তিনি শরণার্থীদেরকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন। তিনি বলেন যে, বেলারুশ কাউকে ‘ব্ল্যাকমেইল’ করে না; তবে তারা যদি বেলারুশকে শর্তের মাঝে ফেলে, তাহলে বেলারুশ প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য হবে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন যে, তার দেশের রাশিয়া, চীন বা ইইউএর মতো সম্পদ নেই।

 

তবে বেলারুশ থেকে আসা শরণার্থীর চাপে প্রতিবেশী দেশ লিথুয়ানিয়া এবং লাটভিয়া জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। পোল্যান্ডও তার সীমান্ত অঞ্চলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে এবং প্রায় ৬ হাজার সেনা সীমানায় মোতায়েন করে। লাটভিয়া এবং পোল্যান্ড উভয় দেশই তাদের সীমান্তরক্ষী এবং সামরিক বাহিনীকে শক্তি ব্যবহার করে শরণার্থীদের বেলারুশে ফিরিয়ে দেয়ার ক্ষমতা প্রদান করেছে। পোল্যান্ডের পার্লামেন্টে বিল পাশ করে সাড়ে তিন’শ মিলিয়ন ইউরো ব্যয়ে বেলারুশের সাথে ৪’শ কিঃমিঃ সীমানা বরাবর দেয়াল তোলার প্রকল্প নেয়া হয়েছে। পোলিশ সরকার বলছে যে, এবছরেই তারা বেলারুশ থেকে শরণার্থী ঢোকার চেষ্টার ২৩ হাজার প্রচেষ্টাকে তালিকাভুক্ত করেছে। লিথুয়ানিয়াও বেলারুশের সীমানায় কাঁটাতাদের বেড়া দেয়া শুরু করেছে। ইউরোপিয়ান কমিশনের এক বিবৃতিতে এই বেড়া দেয়াকে ‘ভালো চিন্তা’ বলে আখ্যা দেয়া হয়। তবে ইইউ এই প্রকল্পে কোন অর্থায়ন করবে না বলে বলা হয়। লিথুয়ানিয়া সরকার ইইউএর কাছ থেকে এব্যাপারে সহায়তা চেয়েছে।

‘ডয়েচে ভেলে’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, শরণার্থীদের মূল স্রোত আসছে ইরাকের উত্তরের কুর্দী অধ্যুষিত অঞ্চল থেকে। ইরাক, সিরিয়া এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে শরণার্থীরা ১৪ থেকে ১৭ হাজার ডলার খরচ করে মানব পাচারকারীদের মাধ্যমে সেখানে পৌঁছাচ্ছে। প্রথমে এবছরের অগাস্টে বাগদাদ থেকে সরাসরি শরণার্থীরা বেলারুশে আসতে থাকে। এরপর ইইউএর চাপের মুখে ইরাক সরকার সরাসরি ফ্লাইট বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে ইরাক থেকে শরণার্থীরা দুবাই, লেবানন, সিরিয়া, জর্দান, তুরস্ক, ইত্যাদি দেশ হয়ে বেলারুশে আসতে থাকে। অনেকেই অভিযোগ করছেন যে, বেলারুশ সরকার মিনস্ক বিমানবন্দর থেকেই শরণার্থীদের সরাসরি পোল্যান্ডের সীমানায় পাঠিয়ে দিচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ইইউএর সাথে দ্বন্দ্ব শুরু হবার পর থেকে বেলারুশ সরকার ভিসা ইস্যু করার দায়িত্ব বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সির হাতে দিয়ে দেয়। এই এজেন্সিগুলি বিভিন্ন উপায়ে শরণার্থীদের বেলারুশে পাঠাবার ব্যবস্থা করতে থাকে।

 

বেলারুশের সীমানার সমস্যার এক ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছেন ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘চ্যাটহ্যাম হাউজ’এর এসোসিয়েট ফেলো সামানথা ডে বেনডার্ন। বেলারুশের বিতর্কিত নির্বাচনের এক বছরের মাথায় ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা বেলারুশের প্রধান রপ্তানি দ্রব্য পটাশ, অপরিশোধিত তেল, এবং আরও কিছু পণ্যের উপর অবরোধ দেয়। একইসাথে বেলারুশের উপর ব্রিটেনের অর্থবাজার থেকে অর্থ যোগানের উপরও অবরোধ দেয়া হয়। এর পাল্টা হিসেবে লুকাশেঙ্কো মধ্যপ্রাচ্য থেকে শরণার্থী ঢোকার পথ খুলে দেন। বেনডার্ন বলছেন যে, এটা হলো একধরনের ‘হাইব্রিড’ যুদ্ধ, যা শরণার্থীদেরকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ইইউ এবং ন্যাটোর পূর্ব সীমানায় উত্তেজনা সৃষ্টি করা ছাড়াও মিত্র দেশগুলির মাঝে বিরোধের জন্ম দিতে চাইছে। নতুন শরণার্থী সমস্যার কারণে পূর্ব ইউরোপে শরণার্থী বিরোধী মনোভাবকে আরও বেশি উস্কে দিতে পারে এবং অভিবাসন বিরোধী রাজনৈতিক গ্রুপগুলিকে শক্তিশালী করতে পারে। এই ব্যাপারটা ইতোমধ্যেই জার্মানি এবং সুইডেনে দেখা গেছে; যেখানে সমাজের সমস্যার জন্যে উগ্র ডানপন্থীরা শরণার্থীদের দায়ী করছে। একইসাথে তা উগ্র জাতীয়তাবাদ, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং ইইউ বিরোধী চিন্তার জন্ম দিয়েছে। রাশিয়া বহুদিন ধরেই চাইছে ইউরোপে ডানপন্থীদের উত্থান হোক; যা ইইউ এবং ন্যাটোকে দুর্বল করবে। বেনডার্ন মনে করেন না যে, এই ‘হাইব্রিড’ যুদ্ধ বেলারুশের পক্ষে মস্কোর অনুমতি ছাড়া করা সম্ভব।

মানবাধিকার সংস্থাগুলি পোল্যান্ড এবং বেলারুশ উভয় দেশের বিরুদ্ধেই আশ্রয়প্রার্থীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগে মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গের অভিযোগ করেছে। ইতোমধ্যেই প্রচন্ড শীত এবং অন্যান্য সমস্যায় পড়ে কমপক্ষে আটজন শরণার্থীর মৃত্যু হয়েছে বলে খবর পাওয়া যায়। পশ্চিমা চিন্তার স্তম্ভ মানবাধিকার ইইউএর সদস্য রাষ্ট্রগুলির শরণার্থী বিরোধী জাতীয়তাবাদী চিন্তার কাছে হার মেনেছে। পোল্যান্ডের পার্লামেন্টে গণতান্ত্রিকভাবেই শরণার্থীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। রাশিয়ার সমর্থনে বেলারুশ ইউরোপের দুর্বলতাকেই উস্কে দিচ্ছে; যাকে ইইউ বলছে ‘হাইব্রিড’ যুদ্ধ। লিবারাল গণতান্ত্রিক দেশগুলি যখন শরণার্থীর ঢল ঠেকাতে দেয়াল তুলছে এবং সামরিক বাহিনী ব্যবহার করছে, তখন বেলারুশে লিবারাল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার দাবি তুলে লুকাশেঙ্কো সরকারের উপর অবরোধ আরোপ পরস্পরবিরোধীই বটে। ইউরোপের লিবারাল গণতান্ত্রিক আদর্শ দিনে দিনে দুর্বল হচ্ছে; আর এর স্থলাভিষিক্ত হচ্ছে উগ্রবাদী জাতীয়তাবাদী চিন্তা। লিবারাল চিন্তার উৎসস্থলে এই দুর্যোগ ধ্বসে পড়া বিশ্বব্যবস্থারই প্রমাণ মাত্র।

Saturday, 30 October 2021

মার্কিন নৌবাহিনী কেন চিংড়ি নিয়ে গবেষণা করছে?

৩১শে অক্টোবর ২০২১

নতুন জেনারেশনের নিঃশব্দে চলা রুশ সাবমেরিনগুলিকে মোকাবিলা করা এখন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের গুরুদায়িত্ব। গত সেপ্টেম্বরে মার্কিন নৌবাহিনী আটলান্টিকে ‘টাস্ক গ্রুপ গ্রেহাউন্ড’ নামে রুশ সাবমেরিন খোঁজার মিশন শুরুর ঘোষণা দেয়। এই একই ধারাবাহিকতায় এখন মার্কিন নৌবাহিনীর গবেষকেরা সমুদ্রের নিচে আড়ি পেতে চিংড়ির ‘কট কট’ শব্দ শুনছেন।

 
সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন নৌবাহিনী সমুদ্রের নিচে চিংড়ির ব্যাপারে বেশ আগ্রহী হয়ে উঠেছে। কিছু চিংড়ি পানির নিচে ‘কট কট’ শব্দ তৈরি করে। একসময় সমুদ্রের নাবিকেরা মনে করতো যে, এই শব্দ হয়তো ঢেউয়ের তৈরি, অথবা পানির নিচের আগ্নেয়গিরির শব্দ, অথবা পানির তোড়ে নুড়ি পাথর নড়ার শব্দ। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন নৌবাহিনী যখন সোনার যন্ত্র দিয়ে জার্মান সাবমেরিন খুঁজতে গিয়ে এই শব্দের ঝড়ের মাঝে পড়ে, তখনই তারা নড়েচড়ে বসে। ‘ঊডস হোল ওশানোগ্রাফিক ইন্সটিটিউশন’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ‘ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া’র ‘ডিভিশন অব ওয়ার রিসার্চ’এর গবেষকেরা এই শব্দের উৎসকে চিংড়ি পর্যন্ত নিতে সক্ষম হয়েছিল। এই গবেষণার ফলাফল হিসেবে নৌবাহিনীর সোনার অপারেটরদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল যাতে করে তারা বুঝতে পারে কোন শব্দটা চিংড়ির। একটা চিংড়ির একটা শব্দ প্রায় ২’শ ২০ ডেসিবল পর্যন্ত হতে পারে; যা একটা বন্দুকের গুলির শব্দের চাইতেও বেশি! মার্কিন সামরিক সদস্যদের ম্যাগাজিন ‘স্যান্ডবক্স’এর এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের একটা প্রকল্প ২০২০ সালে দ্বিতীয় ধাপে পৌঁছেছে; যার মাঝ দিয়ে তারা কিছু সেন্সর ডেভেলপ করা শুরু করছে। এই সেন্সরগুলি চিংড়ির তৈরি করা শব্দ রেকর্ড করে বিশ্লেষণ করবে। বিশ্লেষণে যদি বুঝতে পারা যায় যে, চিংড়িগুলির কাছাকাছি কোন সাবমেরিন রয়েছে, তাহলে উপকূল বা জাহাজে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সতর্কবার্তা পৌঁছে যাবে।

বৈজ্ঞানিক ম্যাগাজিন ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকান’ চিংড়ির বিশেষ বৈশিষ্ট্যের ব্যাখ্যা দিচ্ছে। ‘স্ন্যাপিং শ্রিম্প’ বা ‘পিস্তল শ্রিম্প’ নামের এক প্রকারের ক্ষুদ্র সামুদ্রিক চিংড়ি রয়েছে, যেগুলির একটা থাবা থাকে অনেক বড় আকারের; প্রায় নিজেদের শরীরের অর্ধেক। এই থাবাগুলি যখন তারা বন্ধ করে, তখন বেশ জোরে শব্দ হয়। সমুদ্রে কিছু স্থানে এই চিংড়িগুলি তাদের বড় আকারের কলোনি তৈরি করে। সেসব কলোনিতে অনেক সময়েই চিংড়িগুলি সকলে একত্রে থাবা দিয়ে শব্দ করতে থাকে। এরকম সময় কেউ যদি সেখানে সমুদ্রের নিচে সোনার যন্ত্র ব্যবহার করে, তবে চিংড়ির শব্দ ছাড়া কোনকিছুই সে শুনতে পাবে না এবং তার সকল কাজই ব্যাহত হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অনেক সময়েই আটলান্টিকের তলদেশে চিংড়ির কলোনির বিকট শব্দের কারণে মিত্র বাহিনীর জাহাজগুলিকে জার্মান সাবমেরিন খুঁজে পেতে বেগ পেতে হতো। তবে মাত্র ২০০০ সালের সেপ্টেম্বরে ‘সায়েন্স’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় জার্মানির মিউনিখের ‘টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি’র প্রাণিবিদ্যা বিভাগের গবেষক বারবারা শ্মিতজ এই চিংড়িগুলি কিভাবে শব্দ তৈরি করে, সেটার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেন। চিংড়ির থাবা বন্ধ করার সময় সেখান থেকে অতি দ্রুত বের হওয়া পানির জেটের সাথে বুদবুদ বের হয়ে আসে এবং শব্দ উৎপন্ন করে। এই পানির জেটের গতি ব্যবহার করে চিংড়ি নিজের শিকারকে হত্যা করে। পুরো ব্যাপারটা পানির নিচে গুলি করার মতো কাজ করে! বিজ্ঞানীরা একইসাথে চিংড়ির এই বিচিত্র কর্মের কারণও ব্যাখ্যা করছেন। চিংড়িরা মূলতঃ এই শব্দের মাধ্যমে নিজেদের মাঝে যোগাযোগ করে। একইসাথে আক্রমণকারী কোন প্রাণীকে শব্দ করে ভয় দেখিয়ে তারা নিজেদের এলাকাকে রক্ষা করতে চেষ্টা করে। চিংড়ির এই কর্মকান্ডটাই মার্কিন নৌবাহিনীর গবেষকদের আকৃষ্ট করেছে। গতবছর ‘সেন্টার ফর ক্লাইমেট সিকিউরিটি’র এক লেখায় বলা হয় যে, ২০২০ সালের ‘ওশান সায়েন্স মিটিং’এ প্রকাশ করা একটা গবেষণায় বলা হয় যে, জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে সমুদ্রের পানির তাপমাত্র যখন বাড়ছে, তার সাথে এই চিংড়িগুলির শব্দ করার ঘটনাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে মাছ ধরার জাহাজগুলি যেমন সোনার ব্যবহার করতে সমস্যা পড়বে, তেমনি মার্কিন নৌবাহিনীর সমুদ্রের নিচের মাইন এবং সাবমেরিন খোঁজার মতো কর্মকান্ডও সমস্যায় পড়বে।

সোনার যন্ত্র দিয়ে পানির নিচে ভূপৃষ্ঠের ত্রিমাত্রিক প্রতিচ্ছবি তৈরি করা যায়; আবার পানির নিচে চলমান যেকোন জিনিসকে খুঁজে পাওয়া যায়; যেমন মাছ বা সাবমেরিন বা মাইন বা অন্য যেকোন বস্তু। ‘একটিভ সোনার’ একটা শব্দ তরঙ্গকে পানির নিচে ছুঁড়ে দেয়; যা কোন জিনিস থেকে প্রতিফলিত হয়ে আবার ফিরে আসে। এই ফিরে আসা শব্দ শুনে তরঙ্গের পরিমাপ থেকে পানির নিচে যেকোন বস্তুর দূরত্ব পরিমাপ করা যায়। আরেক প্রকার সোনার হলো ‘প্যাসিভ সোনার’; যা শব্দ তৈরি না করে বরং কান পেতে শব্দ শোনে। পানির নিচে তৈরি হওয়া যেকোন শব্দকে সেই যন্ত্র শুনে বিশ্লেষণ করে বোঝার চেষ্টা করে সেটা কি জিনিস এবং কতটুকু দূরে বা গভীরে রয়েছে। সমুদ্র যুদ্ধে সাবমেরিনের ব্যবহার শুরু হবার পর থেকেই সোনার যন্ত্রের গুরুত্ব অপরিসীম হয়ে গেছে। কারণ একটা সাবমেরিন পানির নিচে ডুব দিলে তাকে পানির উপর থেকে আর দেখা যায় না এবং সোনার যন্ত্র ছাড়া তখন সেটাকে খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।

 
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর ‘পারসিসটেন্ট একুয়াটিক লিভিং সেন্সর’ বা ‘প্যালস’ নামের এক প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এই প্রকল্পে গবেষকেরা বুঝতে চেষ্টা করছেন যে, সমুদ্রের নিচে ড্রোন সাবমেরিনের মতো মানুষের তৈরি কোন বস্তু কাছাকাছি দেখলে প্রাণীকূল সেটাকে কিভাবে দেখে? এছাড়াও বেশিরভাগ রীফ অঞ্চলেই এই চিংড়ি থাকে। শুধুমাত্র গুরুত্বপূর্ণ কিছু স্থানে হাইড্রোফোন বসিয়ে রাখলেই শব্দ রেকর্ড করা যাবে।

‘ডিসকভার’ ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, মার্কিন সামরিক গবেষণা সংস্থা ‘ডিফেন্স এডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্টস এজেন্সি’ বা ‘ডারপা’র গবেষকেরা মনে করছেন যে, এসকল চিংড়ির শব্দ শুনে সমুদ্রের নিচে শত্রুর নৌবাহিনীর মনুষ্যবিহীন ড্রোন সাবমেরিন খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। এধরনের ড্রোনগুলি প্রায় শব্দবিহীন হয় বলে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং চীন সকলেই ড্রোন সাবমেরিন ডেভেলপ করছে, যেগুলির কোন কোনটা আবার পারমাণবিক ওয়ারহেডও বহণ করতে সক্ষম। আর আটলান্টিকে রুশ সাবমেরিনের আনাগোণাও অনেক বেড়েছে। ২০১৮ সালে রুশ নৌবাহিনীর কর্মকর্তা সের্গেই স্টারশিনভ দাবি করেন যে, তাদের সাবমেরিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলের নৌঘাঁটির খুব কাছে গিয়ে ঘুরে এসেছে; কিন্তু কেউ তাদেরকে খুঁজে পায়নি।

মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর ‘পারসিসটেন্ট একুয়াটিক লিভিং সেন্সর’ বা ‘প্যালস’ নামের এক প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এই প্রকল্পে গবেষকেরা বুঝতে চেষ্টা করছেন যে, সমুদ্রের নিচে ড্রোন সাবমেরিনের মতো মানুষের তৈরি কোন বস্তু কাছাকাছি দেখলে প্রাণীকূল সেটাকে কিভাবে দেখে? তারা কি কোন বিশেষ শব্দ করে, অথবা আলোকছটা তৈরি করে কিনা, অথবা ভিন্নভাবে চলাচল করে কিনা। প্রকল্পে কাজ করা মার্কিন প্রতিরক্ষা কোম্পানি ‘রেথিয়ন’এর গবেষক এলিসন লাফারিয়ের বলছেন যে, এই চিংড়িগুলিকে কাছে থেকে শুনলে প্রায় ১’শ ৯০ ডেসিবল শব্দ পাওয়া যাবে। অথচ এসব শব্দ উৎপাদন করতে কোন বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হবে না। এছাড়াও বেশিরভাগ রীফ অঞ্চলেই এই চিংড়ি থাকে। শুধুমাত্র গুরুত্বপূর্ণ কিছু স্থানে হাইড্রোফোন বসিয়ে রাখলেই শব্দ রেকর্ড করা যাবে। লাফারিয়ের বলছেন যে, তারা সমুদ্রের নিচের ‘বায়োলজিক্যাল সাউন্ডস্কেপ’ বা সকল প্রাণীকূলের একত্রে তৈরি করা শব্দ নিয়ে গবেষণা করছেন। তারা দেখছেন যে, সাধারণ সময়ে শব্দ কিরকম হয়; আর পানির নিচে কোন সাবমেরিন জাতীয় জিনিস চলাচল করলে শব্দ কি ধরনের হয়।

 
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে রাশিয়ার ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাওয়ায় আটলান্টিক আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। এটাও অবশ্য মার্কিন নীতিরই ফলাফল। রুশ আন্তমহাদেশীয় পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলি এখন মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্বারা প্রতিহত করা সম্ভব। তাই রাশিয়া তার সাবমেরিন প্রযুক্তিকে আরও এগিয়ে নিয়ে নতুন নতুন অস্ত্র ডেভেলপ করায় মনোনিবেশ করেছে; যেগুলি বর্তমান মার্কিন প্রযুক্তিকে বাইপাস করে যুক্তরাষ্ট্রের উপর পুনরায় হুমকি সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে।

‘প্যালস’ প্রকল্পের ব্যবস্থাপক লোরি এডোরনাটো বলছেন যে, সামুদ্রিক প্রাণীগুলিকে ব্যবহার করতে পারলে সেটা বেশ বিচক্ষণতার কাজ হবে; কারণে এতে খুব কম খরচেই এবং তেমন একটা লজিস্টিক্যাল সমস্যায় না পড়েই সার্বক্ষণিকভাবে পানির নিচে সার্ভেইল্যান্স চালনা করা সম্ভব হবে। ‘ডারপা’ বলছে যে, ‘রেথিয়ন’ কোম্পানি ছাড়াও ‘নর্থরোপ গ্রুমান’ কোম্পানির অধীনে আরেকটা গ্রুপ চিংড়ির শব্দ ব্যবহার করে ত্রিমাত্রিক ইমেজ তৈরি করা নিয়ে কাজ করছে। তৃতীয় আরেকটা গ্রুপ ‘ফ্লোরিডা আটলান্টিক ইউনিভার্সিটি’তে ‘গোলিয়াথ গ্রুপার’ নামে একটা বায়োলজিক্যাল সেন্সর ব্যবহার করছে। ‘স্যান্ডবক্স’এর প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে রুশ এবং চীনা সাবমেরিনগুলি অনেক বেশি শব্দহীন করে তৈরি করা হচ্ছে। আর মহাসমুদ্রে এই সাবমেরিনগুলিকে খুঁজে বের করাও খুব কঠিন হয়ে গেছে। কিছুদিন আগেই পেন্টাগন একটা মানচিত্র প্রকাশ করে। সেখানে দেখানো হয় যে, সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে যাওয়া ফাইবার অপটিক কেবলের লাইনগুলির কাছাকাছি দিয়েই রুশ এবং চীনা যুদ্ধজাহাজগুলির আনাগোণা বেশি। মার্কিন নৌবাহিনীর ‘দ্বিতীয় নৌবহর’এর কমান্ডার ভাইস এডমিরাল এন্ড্রু ঊডি লুইস বলছেন যে, নতুন বাস্তবতা হলো যে, মার্কিন উপকূল ছাড়লেই তাদের নাবিকেরা এখন প্রতিযোগিতাপূর্ণ এলাকায় অপারেট করবে। যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজগুলি এখন আর নিরাপদে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে ঘুরতে পারবে না বা অত সহজেই আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে যেকোন স্থানে যেতে পারবে না।

রুশ সাবমেরিনের আনাগোণা প্রতিহত করার লক্ষ্যেই ২০১৮ সালের অগাস্ট মাসে মার্কিন নৌবাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূল এবং উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে তাদের ‘দ্বিতীয় নৌবহর’ কার্যকর করে। ২০১১ সালে রুশ হুমকি কমে যাবার হিসেবে এই নৌবহরের কর্মকান্ড বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে রাশিয়ার ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাওয়ায় আটলান্টিক আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। এটাও অবশ্য মার্কিন নীতিরই ফলাফল। যুক্তরাষ্ট্র চীনকে মূল ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে রাশিয়ার সাথে কৌশলগত আলোচনা বন্ধ করে দেয়। আর ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখলের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে। এসব কারণে দুর্বল অবস্থানে পড়ে যাওয়া রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করতে মরিয়া হয়ে উঠে। রুশ আন্তমহাদেশীয় পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলি এখন মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্বারা প্রতিহত করা সম্ভব। তাই রাশিয়া তার সাবমেরিন প্রযুক্তিকে আরও এগিয়ে নিয়ে নতুন নতুন অস্ত্র ডেভেলপ করায় মনোনিবেশ করেছে; যেগুলি বর্তমান মার্কিন প্রযুক্তিকে বাইপাস করে যুক্তরাষ্ট্রের উপর পুনরায় হুমকি সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে। নতুন জেনারেশনের নিঃশব্দে চলা রুশ সাবমেরিনগুলিকে মোকাবিলা করা এখন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের গুরুদায়িত্ব। গত সেপ্টেম্বরে মার্কিন নৌবাহিনী আটলান্টিকে ‘টাস্ক গ্রুপ গ্রেহাউন্ড’ নামে রুশ সাবমেরিন খোঁজার মিশন শুরুর ঘোষণা দেয়। এই একই ধারাবাহিকতায় এখন মার্কিন নৌবাহিনীর গবেষকেরা সমুদ্রের নিচে আড়ি পেতে চিংড়ির ‘কট কট’ শব্দ শুনছেন।

সুদানে অভ্যুত্থান মূলতঃ পশ্চিমা হস্তক্ষেপেরই ফলাফল

৩০শে অক্টবর ২০২১

ওয়াশিংটন আপাততঃ সুদানের অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধাচরণ করলেও সুদানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট দেখিয়ে দেয় যে, মার্কিনীরা সুদানের সামরিক বাহিনীর সাথে সম্পর্ক কখনোই কর্তন করেনি। ওমর আল বশির ক্ষমতায় থাকার সময়েই যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসবাদের সমর্থনকারী দেশের তালিকা থেকে সুদানের নাম সরিয়ে নেয়। বিনিময়ে সুদান মানবাধিকার বিষয়ে সুদানের কিছু আইন পরিবর্তন করে। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনেই সৌদি আরব সুদানকে তেল সরবরাহসহ আর্থিক সহায়তা দিতে থাকে।

 
গত ২৫শে অক্টোবর আফ্রিকার দেশ সুদানে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলের পর থেকে দেশটার চরমভাবে বিভক্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব অর্থহীন হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সুদানের মারাত্মক অর্থনৈতিক বিপর্জয় ২০১৯ সালে একনায়ক ওমর আল বশিরের সরকারের পতনের পিছনে নেতৃত্ব দেয়া জোট ‘ফোর্সেস অব ফ্রিডম এন্ড চেইঞ্জ’ বা ‘এফএফসি’কে মানুষের কাছে হেয় করেছে। ২০১৯ সালের অগাস্টে দেশ পরিচালনার জন্যে ‘এফএফসি’এর মনোনীত পাঁচজন এবং সেনাবাহিনীর মনোনীত পাঁচজন সদস্য মিলে ‘সভেরেইন কাউন্সিল’ গঠন করেছিল। তবে দুই বছরের মাঝে ‘এফএফসি’র নেতৃবৃন্দ দেশটাকে কোনরূপ দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের সম্ভাবনার কথা বেশ কিছুদিন আগ থেকেই শোনা যাচ্ছিল। ২০২২ সালের নভেম্বরে প্রতিশ্রুত গণতান্ত্রিক নির্বাচনের আগেই এই অভ্যুত্থানকে শুধু সুদানের অভ্যন্তরীণ আঙ্গিক থেকে নয়, বরং দেশটা আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে।

সুদানের দুই রাজনৈতিক দল গত ২রা অক্টোবর একটা নতুন জোট গঠন করে। মিনি মিনাউইএর নেতৃত্বে ‘সুদান লিবারেশন মুভমেন্ট’ এবং জিবরিল ইব্রাহিমের নেতৃত্বে ‘জাস্টিস এন্ড ইকুয়ালিটি মুভমেন্ট’ এই জোট গঠন করে। এই দলগুলি ২০২০এর অক্টোবরে সুদান সরকারের সাথে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। এরপর থেকে উভয় নেতাই এতদিন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন। মিনাউই বলেন যে, তারা চান যে, ‘এফএফসি’র নেতারা তাদের কথা শুনবেন। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, এর ফলে ‘এফএফসি’এর বিভাজন আরও গভীর হয়। এই দুই রাজনৈতিক দল মূলতঃ দারফুর অঞ্চলের সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠন; যারা বশির সরকারের সময় আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের জন্যে যুদ্ধ করেছে। ‘এফএফসি’র মাঝে আরও রয়েছে দক্ষিণ সুদানের সীমানায় অবস্থিত কুরদুফান অঞ্চলের বিদ্রোহী দল ‘সুদান পিপলস লিবারেশন মুভমেন্ট নর্থ’। এছাড়াও রয়েছে দারফুরের ওয়াহিদ আল নূরএর নেতৃত্বে ‘সুদান লিবারেশন মুভমেন্ট’এর আরেক অংশ। অস্ত্র নিয়ে সংগ্রাম করা এই দলগুলি একত্রে ‘সুদান রেভোলিউশনারি ফ্রন্ট’ নামে ‘এফএফসি’র মাঝে ছিল। এই আঞ্চলিক বিদ্রোহী গ্রুপগুলি সুদানের ভৌগোলিক অখন্ডতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এই গ্রুপগুলিকে আঞ্চলিক এবং পশ্চিমা শক্তিরা সরাসরি বা প্রচ্ছন্ন সমর্থন দিয়েছে। সবচাইতে বড় উদাহরণ ছিল দক্ষিণ সুদান, যা সুদান থেকে আলাদা হয়ে যায় পশ্চিমা মদদে।

‘এফএফসি’র আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ‘ন্যাশনাল কনসেনসাস ফোর্সেস’; যাদের মূল নেতৃত্ব ছিল জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক দলগুলির হাতে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী সাদিক আল মাহদির প্রতিষ্ঠা করা ‘ন্যাশনাল উম্মা পার্টি’র সাথে কোয়ালিশনে ছিল বামপন্থী ‘সুদানিজ বাথ পার্টি’, ‘সুদানিজ কমিউনিস্ট পার্টি’ এবং হাসান আল তুরাবির প্রতিষ্ঠা করা ‘পপুলার কংগ্রেস পার্টি’। এই দলগুলি বরাবরই পশ্চিমা, বিশেষ করে ইউরোপের কাছ থেকে সমর্থন পেয়েছে। ১৯৮৯ সালে সাদিক আল মাহদির সরকারকে উৎখাত করেই ওমর আল বশির ক্ষমতা দখল করেছিলেন। এরপর থেকে মাহদি বশির সরকারের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। ‘এফএফসি’তে আরও অংশীদার ছিল বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের সমন্বয়ে গঠিত ‘সুদানিজ প্রফেশনালস এসোসিয়েশন’ এবং আরও কিছু নারীবাদী সংগঠন; যেগুলি গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের মাপকাঠিতে ইউরোপ থেকে সরাসরি সমর্থন পেয়েছে।

সুদানের অর্থনৈতিক দৈন্যতাকে পশ্চিমা নীতি থেকে আলাদা করে দেখা যাবে না। এবছরের ২৯শে জুন ‘ইন্টারন্যাশনাল মনেটারি ফান্ড বা ‘আইএমএফ’এর প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা এবং বিশ্বব্যাংকের প্রধান ডেভিড ম্যালপাসের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, সংস্থাগুলির শর্ত হিসেবে সুদান তার নিজস্ব মুদ্রার মূল্যমান পুনর্নিধারণ করার পর বিশ্বব্যংকের ঋণ শোধ করে। এতে তিন দশক পর বিশ্বব্যংকের সাথে সুদানের সম্পর্ক স্থাপিত হয়। বিশ্বব্যংকের শর্ত মানার পুরষ্কার হিসেবে ‘আইএমএফ’ দেশটার ২৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের ঋণ মওকুফ করে। এই মওকুফ সামনের দিনগুলিতে ৫০ বিলিয়ন ডলার বা দেশটার মোট বৈদেশিক ঋণের ৯০ শতাংশ ছাপিয়ে যাবে। তবে ঋণ মাফের শর্ত হিসেবে মুদ্রামান কমিয়ে ফেলায় সুদানে মুদ্রাস্ফীতি মারাত্মক আকার ধারণ করে। দ্রব্যমূল্যের ব্যাপক ঊর্ধগতির সাথে যুক্ত হয় চরম বেকারত্ব; যা কিনা জনগণকে দেশটার রাস্তায় নামায়। সুদানের বিরোধী রাজনীতিবিদেরা এই অসন্তোষের সুযোগ নিয়ে বশিরের সরকারকে উৎখাতে সফলতা পেলেও সেই একই অসন্তোষ বেসামরিক ও সামরিক যৌথ নেতৃত্বকে অর্থহীন করেছে।

ওমর আল বশির ক্ষমতায় থাকার সময়েই যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসবাদের সমর্থনকারী দেশের তালিকা থেকে সুদানের নাম সরিয়ে নেয়। বিনিময়ে সুদান মানবাধিকার বিষয়ে সুদানের কিছু আইন পরিবর্তন করে। দক্ষিণ সুদানের তেলখনিগুলি সুদান থেকে আলাদা হয়ে যাবার পর থেকেই সুদানের অর্থনীতি বিপদে পড়ে। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনেই সৌদি আরব সুদানকে তেল সরবরাহসহ আর্থিক সহায়তা দিতে থাকে। ইয়েমেনের যুদ্ধে সুদান সৌদিদের পক্ষে সৈন্যও প্রেরণ করে। গত এপ্রিলে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ঘোষণা দেয় যে, কৃষিখাতে তারা এবছর সুদানকে ৪’শ মিলিয়ন ডলার দেবে। এই সহায়তা মূলতঃ ৩ বিলিয়ন ডলারের মূল সহায়তার অংশ। সুদান সরকারের বরাত দিয়ে ‘ভয়েস অব আমেরিকা’ বলে যে, এর মাঝে সাড়ে ৭’শ মিলিয়ন ডলার ইতোমধ্যেই সুদান পেয়ে গেছে; যার মাঝে ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্যে ৫’শ মিলিয়ন ডলারের পুঁজি। দুই বছর আগের আরও দেড় বিলিয়ন ডলারের অনুদানও নিশ্চিত করা হয়। ‘আরব নিউজ’ বলছে যে, অভ্যুত্থানে সৌদিরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং তারা সকল পক্ষকে আলোচনার টেবিলে দেখতে চায়।

ওয়াশিংটন আপাততঃ সুদানের অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধাচরণ করলেও সুদানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট দেখিয়ে দেয় যে, মার্কিনীরা সুদানের সামরিক বাহিনীর সাথে সম্পর্ক কখনোই কর্তন করেনি। মার্কিন থিংকট্যাঙ্ক ‘দ্যা আটলান্টিক কাউন্সিল’এর সিনিয়র ফেলো ক্যামেরন হাডসন এক লেখায় সুদানের সমস্যার জন্যে সামরিক বাহিনীকে পুরোপুরি দায়ী করেন। তার কথায়, সুদানের সেনাবাহিনী যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বোকা বানিয়েছে’; যা বারংবার হতে দেয়া যায় না। তিনি অবশ্য সুদানের অর্থনীতিতে ‘আইএমএফ’ এবং বিশ্বব্যাংকের চাপিয়ে দেয়া শর্তের ফলাফলগুলি ঠিকই এড়িয়ে যান। তবে আরবের মার্কিন বন্ধু দেশগুলির সুদানের সাথে গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন যে, সুদানের অভ্যুত্থানে মিশর, সৌদি বা আমিরাত যেন সরাসরি সমর্থন না দেয়, সেজন্য ওয়াশিংটন যথেষ্ট কূটনৈতিক তৎপরতা চালায়। সুদানের রাজনীতিতে ইউরোপের প্রভাবের কথাও তিনি আলোচনায় আনেননি; যা বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে পরিপূর্ণতা দেয় না।



Friday, 29 October 2021

চীনা হাইপারসনিক অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে কতটুকু হুমকি?

২৯শে অক্টোবর ২০২১

চীন এবং রাশিয়ার হাইপারসনিক অস্ত্র ডেভেলপের কারণ যুক্তরাষ্ট্রের নীতি। মার্কিনীরাই আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। এর ফলশ্রুতিতে রাশিয়ার সাথে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের চুক্তি অর্থহীন হয়ে যায় এবং রাশিয়া নিরাপত্তাহীনতার মাঝে পড়ে যায়। একারণেই রাশিয়া হাইপারসনিক অস্ত্র ডেভেলপ করায় মনোযোগী হয়। চীনারাও সেই একই পথে এগুচ্ছে। হাইপারসনিক অস্ত্র নিয়ে চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের এই লাগামহীন প্রতিযোগিতা ধ্বসে পড়া বিশ্বব্যবস্থারই একটা প্রমাণ মাত্র।

 
মার্কিন টেলিভিশন চ্যানেল ‘এনবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ২০ লক্ষ সেনার পৃথিবীর সবচাইতে বড় সামরিক বাহিনী থাকলেও চীনের যে ব্যাপারটা নিয়ে এখন মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তারা চিন্তিত, তা হলো চীনের ডেভেলপ করা অস্ত্রসমূহ, যা কিনা মার্কিন সামরিক প্রতিরক্ষ্যা ব্যুহকে ভেদ করতে পারে। পেন্টাগনের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয় যে, চীনারা এই গ্রীষ্মে দু’টা হাইপারসনিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। তবে চীনারা এখন পর্যন্ত একটা পরীক্ষার কথা স্বীকার করেছে; তাও আবার তারা বলছে যে, সেটা ছিল চীনাদের বেসামরিক মহাকাশ গবেষণার অংশ। মার্কিনীরা ভীত যে, এই অস্ত্র সামনের দিনগুলিতে হয়তো পারমাণবিক ওয়ারহেড বহণ করতে সক্ষম হবে। শব্দের গতির চাইতে কমপক্ষে ৫ গুণ বেশি গতিসম্পন্ন এই অস্ত্র বর্তমানের মার্কিন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভেদ করতে সক্ষম হতে পারে। গত ২৭শে অক্টোবর বার্তা সংস্থা ‘ব্লুমবার্গ’এর সাথে এক সাক্ষাতে সর্বোচ্চ মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল মার্ক মিলি বলেন যে, চীনারা হাইপারসনিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে, যা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। তিনি বলেন যে, এই পরীক্ষা ঠান্ডা যুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের মহাকাশে ‘স্পুতনিক’ স্যাটেলাইট প্রেরণের মতো অত গুরুত্ববহ না হলেও এর খুব কাছাকাছি; তাই মার্কিনীরা এর উপর কড়া নজর রাখছে। ১৯৫৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ‘স্পুতনিক’ স্যাটেলাইট মহাকাশে প্রেরণের পর মার্কিনীরা প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে উঠে পড়ে লেগেছিল। ‘এনবিসি’র বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, মার্কিন কর্মকর্তাদের কথায় এটা বোঝা যাচ্ছে যে, মার্কিনীরা চীনাদের এই অগ্রগামিতার ব্যাপারে প্রস্তুত ছিল না। মার্কিনীরা নিজেরাও হাইপারসনিক অস্ত্র ডেভেলপ করছে। কিন্তু মার্কিন প্রতিরক্ষা কোম্পানি ‘রেথিয়ন’এর প্রধান নির্বাহী বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র হাইপারসনিক অস্ত্রের দিক থেকে চীনের থেকে কয়েক বছর পিছিয়ে আছে।

ওয়াশিংটন এবং বেইজিং থেকে হাইপারসনিক অস্ত্রের ব্যাপারে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য আসছে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওয়াং ওয়েনবিন বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র হলো প্রথম রাষ্ট্র, যারা হাইপারসনিক অস্ত্র নিয়ে গবেষণা চালিয়েছে। তারা এখনও সেগুলি ডেভেলপ করছে, এমনকি হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে চাইছে। একইসাথে তারা ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করে তাদের পারমাণবিক ‘ট্রায়াড’ উন্নততর করছে। পারমাণবিক ‘ট্রায়াড’ হলো ভুমি থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য, সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য এবং আকাশ থেকে ছোঁড়া তিন প্রকারের পারমাণবিক অস্ত্রের ডিটারেন্ট। ওয়াং ওয়েনবিন বলেন যে, চীনের সাধারণ মহাকাশ গবেষণা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বারংবার নিজেদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা এটা করেছে ‘চীনা হুমকি’র চিন্তাটাকে সামনে নিয়ে আসার জন্যেই। ২৭শে অক্টোবর পেন্টাগনের মুখপাত্র জন কারবি সাংবাদিকদের বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র তার বাজেটের ভেতরেই বাস্তবসম্মতভাবে নিজেদের হাইপারসনিক অস্ত্রের সক্ষমতা নিয়ে কাজ করছে এবং এই সক্ষমতা ডেভেলপ করার পথে তারা এগিয়ে যাচ্ছে।

 
হাইপারসনিক অস্ত্র একটা গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা হলেও এটা একেবারে নতুন কিছু নয়। এবং যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখন্ডের বিরুদ্ধে পারমাণবিক হামলার সক্ষমতা চীনের বর্তমানেই রয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা চীনাদের হুমকিকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে উপস্থাপন করছে। এর মূল উদ্দেশ্য আসলে মার্কিন হাইপারসনিক অস্ত্রের প্রকল্পের জন্যে বাজেট জোগাড় করা। তথাকথিত ‘সন্ত্রাস’এর হুমকি কমে যাওয়ায় মার্কিন প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলি এখন নতুন বাজেট চাইছে।

১৯শে অক্টোবর ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলেছিল যে, গত অগাস্টে চীন হাইপারসনিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। এতে বলা হয় যে, ক্ষেপণাস্ত্রটা প্রথমে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে, এরপর সেটা গ্লাইড করে ভূমির দিকে নেমে আসে। ব্যাপারটা এমন কিছু উন্নততর সক্ষমতাকে দেখায়, যা মার্কিন কর্মকর্তাদেরকে অবাক করেছে। ‘আর্মস কনট্রোল এসোসিয়েশন'এর এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ড্যারিল কিম্বাল ‘সিএনএন’কে বলছেন যে, এই অস্ত্র যেহেতু খুবই দ্রুতগতি সম্পন্ন এবং এটাকে আগে থেকে খুঁজে পাওয়াও যেহেতু কঠিন হতে পারে, তাই এগুলি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্যে পূর্বাভাষের সময় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময়কে কমিয়ে দেবে। তবে যেহেতু প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, এই অস্ত্র মহাকাশের কক্ষপথ ঘুরে এসেছে, তাই এটা আরও একটা নতুন উত্তেজনার জন্ম দিতে পারে। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘দ্যা হেরিটেজ ফাউন্ডেশন’এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ডীন চেং বলছেন যে, এই প্রতিবেদন যদি সঠিক হয়, তাহলে প্রশ্ন করতে হবে যে, মহাকাশে প্রেরিত যেকোন চীনা স্যাটেলাইটই গোপনে পারমাণবিক ওয়ারহেড বহণ করছে কিনা। এই গ্রীষ্মে প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হচ্ছে যে, চীনারা তাদের পশ্চিমের মরু অঞ্চলে এক’শরও বেশি আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের লঞ্চার বা ‘সাইলো’ তৈরি করা শুরু করেছে। ডীন চেং বলছেন যে, চীনারা সাম্প্রতিক সময়ে গত চার বা পাঁচ দশকের তুলনায় নিজেদের আন্তমহাদেশীয় কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্রের সক্ষমতাকে অনেকদূর এগিয়ে নিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র নেড প্রাইস সাংবাদিকদের বলেন যে, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত এক বছরের কম সময়েই চীনারা কমপক্ষে আড়াই’শ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। ড্যারিল কিম্বাল মনে করছেন যে, বেশি দুশ্চিন্তার ব্যাপার হতে পারে যদি হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করতে গিয়ে পূর্ব এশিয়াতে লাগামহীন অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়। কারণ সেখানে চীন এবং জাপানের মাঝে সামরিক উত্তেজনা রয়েছে; কোরিয় উপদ্বীপেও রয়েছে; আবার চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাঝেও উত্তেজনা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে উত্তর কোরিয়াও হাইপারসনিক অস্ত্র ডেভেলপ করছে বলে খবর আসছে। কেউ কেউ উত্তর কোরিয়ার এই প্রযুক্তির উৎসের সাথে চীনের সম্পর্ক খুঁজলেও খুব সম্ভবতঃ এই প্রযুক্তি কোরিয়রা নিজেরাই ডেভেলপ করেছে।

তবে কেউ কেউ মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, চীনের হাইপারসনিক অস্ত্রের ডেভেলপমেন্টকে আরও বড় পরিসরে দেখতে হবে। ‘ডয়েচে ভেলে’র সাথে সাক্ষাতে ‘ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্র্যাসি’র সিনিয়র ডিরেক্টর ব্র্যাডলি বাউম্যান বলছেন যে, প্রথমতঃ এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা হলেও এটা একেবারে নতুন কিছু নয়। এবং দ্বিতীয়তঃ যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখন্ডের বিরুদ্ধে পারমাণবিক হামলার সক্ষমতা চীনের বর্তমানেই রয়েছে। তবে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র মহাকাশে প্রেরিত রকেটে বহণ করা স্পেস শাটলের মতো, যা গ্লাইড করে ভূমিতে নেমে আসতে পারবে। বেশিরভাগ মার্কিন রাডার যখন উত্তর মেরুর উপর নজর রাখছে, তখন চীনারা দক্ষিণ মেরুতে রকেট পাঠিয়ে সেখান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র গ্লাইড করতে পারবে; এতে তা রাডারে খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে বাউম্যান মনে করছেন যে, চীনের হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের সাথে সরাসরি প্রতিযোগিতায় না নেমে যুক্তরাষ্ট্রের উচিৎ নিজেদের পারমাণবিক ‘ট্রায়াড’কে আরও উন্নত করা; মহাকাশে ক্ষেপণাস্ত্র খোঁজার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করা; এবং ‘বুস্ট ফেইজ’এ বা উৎক্ষেপণের সময় ক্ষেপণাস্ত্রকে বাধা দেয়ার প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করা। তিনি মনে করছেন যে, সবচাইতে বড় দুশ্চিন্তার ব্যাপার হলো, চীনাদের সাথে কোন অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের চুক্তি না থাকায় তারা লাগামহীনভাবেই নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে; যা মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদেরকে বিচলিত করছে। তবে বাউম্যান বলছেন যে, প্রতিদ্বন্দ্বীরা যতক্ষণ পর্যন্ত কোন রাষ্ট্রকে চাপের মাঝে না ফেলে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে আলোচনায় বসতে চায় না। কাজেই এক্ষেত্রে নিজেদের পারমাণবিক সক্ষমতাকে উন্নত করার মাধ্যমেই মস্কো এবং বেইজিংএর অস্ত্র প্রকল্পগুলিকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিনীদের মাঝে অনেকেই বুঝতে পারছেন যে, মার্কিন কর্মকর্তারা চীনাদের হুমকিকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে উপস্থাপন করছে। বিদায়ী মার্কিন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল জন হাইটেন সাংবাদিকদের বলেন যে, গত পাঁচ বছরে যুক্তরাষ্ট্র মাত্র নয়বার হাইপারসনিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে; অপরপক্ষে চীনারা একই সময়ে শতশত হাইপারসনিক পরীক্ষা চালিয়েছে। মার্কিন সংস্থা ‘ইউনিয়ন অব কনসার্নড সায়েন্টিস্টস’এর ক্যামেরন ট্রেসি এক লেখায় ব্যাখ্যা দিয়ে বলছেন যে, পারমাণবিক অস্ত্র ডেভেলপ করলেও সেগুলি ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক। নিজেদের স্বার্থেই একে অপরকে কেউ ধ্বংস করতে চায়না বলেই চার দশকের ঠান্ডা যুদ্ধের সময় সোভিয়েত এবং মার্কিনীরা একে অপরকে ধ্বংস করতে উদ্যত হয়নি। এই একই চিন্তা এখনও বিদ্যমান। প্রকৃতপক্ষে জেনারেল মিলি নিজেই তার কথায় বলেছেন যে, মার্কিনীরা চীনাদের প্রত্যুত্তরে নিজেদের সামরিক অবস্থানকে পরিবর্তন করবে। এর অর্থ হলো প্রতিরক্ষায় ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ। মার্কিন সামরিক বিশ্লেষক টাইলার রোগোওয়ে এক টুইটার বার্তায় বলছেন যে, মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা যেভাবে চীনের হাইপারসনিক অস্ত্র নিয়ে চিৎকার করছেন, তা থেকে পরিষ্কার যে, তারা আসলে চীনের ব্যাপারে একটা ভীতির জন্ম দিতে চাইছেন। এর মূল উদ্দেশ্য আসলে মার্কিন হাইপারসনিক অস্ত্রের প্রকল্পের জন্যে বাজেট জোগাড় করা। ট্রেসি বলছেন যে, তথাকথিত ‘সন্ত্রাস’এর হুমকি কমে যাওয়ায় মার্কিন প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলি এখন নতুন বাজেট চাইছে।

মার্কিন প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলির স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টার ব্যাপারে ক্যামেরন ট্রেসি এবং টাইলার রোগোওয়ের কথাগুলি প্রতিরক্ষা কোম্পানি ‘রেথিয়ন’এর প্রধানের কথাতেও প্রতিফলিত হয়েছে, যিনি মার্কিন হাইপারসনিক প্রকল্পকে চীনাদের থেকে কয়েক বছর পিছিয়ে রয়েছে বলে মন্তব্য করেন। চীনারা বলছে যে, মার্কিনীদের উচিৎ অন্য রাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা ডেভেলপ করার ব্যাপারে সহনশীল আচরণ করতে। প্রকৃতপক্ষে চীন এবং রাশিয়ার হাইপারসনিক অস্ত্র ডেভেলপের কারণ যুক্তরাষ্ট্রের নীতি। ২০০১ সালের পর থেকে মার্কিনীরাই আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। মার্কিনীরা বলছে যে, উত্তর কোরিয়ার মতো কোন ‘অবাধ্য রাষ্ট্র’ যদি যুক্তরাষ্ট্রের দিকে পারমাণবিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের নিজেই নিজেকে রক্ষা করতে হবে। এর ফলশ্রুতিতে রাশিয়ার সাথে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের চুক্তি অর্থহীন হয়ে যায় এবং রাশিয়া নিরাপত্তাহীনতার মাঝে পড়ে যায়। একারণেই রাশিয়া হাইপারসনিক অস্ত্র ডেভেলপ করায় মনোযোগী হয়। চীনারা জানে যে, মার্কিনীদের পারমাণবিক ‘ট্রায়াড’কে চীনারা প্রতিহত করতে না পারলেও চীনা ‘ট্রায়াড’কে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিহত করতে পারবে; একারণেই চীনারাও সেই একই পথে এগুচ্ছে। হাইপারসনিক অস্ত্র নিয়ে চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের এই লাগামহীন প্রতিযোগিতা ধ্বসে পড়া বিশ্বব্যবস্থারই একটা প্রমাণ মাত্র।

Thursday, 28 October 2021

মার্কিন ম্যারিন কোর কেন তাদের ট্যাংকগুলি ফেলে দিচ্ছে?

২৮শে অক্টোবর ২০২১

২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর থেকে দুই দশক ধরে তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে’ যুক্তরাষ্ট্র সারা মুসলিম বিশ্বে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি ম্যারিন সেনাদেরও মোতায়েন করেছিল। ম্যারিনদের বিশেষ সক্ষমতা সর্বদাই ছিল উভচর অপারেশন; যা থেকে তারা বহুকাল দূরে থেকেছিল। এখন তারা সমুদ্রে ফেরত আসছে ঠিকই, কিন্তু ব্যাপক পরিবর্তনের মাঝ দিয়ে। দুই দশক ধরে তথাকথিত ‘সন্ত্রাসী’ দমন অভিযানে বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ করার পর মার্কিনীরা হঠাত করেই চীনাদেরকে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।


চীনকে মোকাবিলায় মার্কিন ম্যারিন কোর নিজেদের কাঠামোকে ব্যাপকভাবে পরিবর্তন করছে। গত বছরের মার্চ মাসে ম্যারিন কোর ঘোষণা দেয় যে, তারা তাদের সংস্থাকে আগের মতো সমুদ্রকেন্দ্রিক বাহিনী হিসেবে দেখতে চাইছে। ২০২১এর ২৩শে ফেব্রুয়ারি ম্যারিন কোরের প্রধান জেনারেল ডেভিড বারজার মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব লয়েড অস্টিনের নিকট একটা মেমো লেখেন। সেখানে তিনি বলেন যে, ইন্দোপ্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের হুমকি মোকাবিলা করতে গেলে অত্র অঞ্চলে অবস্থিত ২৭ হাজার ম্যারিন সদস্যদেরকে বড় ধরনের উন্নয়ন এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের মাঝ দিয়ে যেতে হবে। জেনারেল বারজারের মেমোর বরাত দিয়ে ‘ডিফেন্স নিউজ’ জানাচ্ছে যে, ম্যারিন কোর নতুন করে ‘ম্যারিন লিটোরাল রেজিমেন্ট’ গঠন করতে চাইছে; যেগুলি গুয়াম দ্বীপ, জাপান এবং হাওয়াই দ্বীপে অবস্থান করবে। সেখান থেকে এই ইউনিটগুলি নৌবাহিনীর ছোট আকারের উভচর জাহাজে চেপে বিভিন্ন দ্বীপাঞ্চলে মোতায়েন করা হবে। এই মিশনে এই রেজিমেন্টগুলির সাথে জাহাজে থাকবে নিজস্ব সার্ভেইল্যান্স ড্রোন, নিজস্ব যোগাযোগ ব্যবস্থা, এবং তারা একইসাথে বহণ করবে জাহাজ ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, যা কিনা চীনা নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজগুলিকে দূরে রাখবে। ম্যারিন কোরের এই ইউনিটগুলি চীনা ক্ষেপণাস্ত্র এবং বিমান বাহিনীর পাল্লার মাঝে থেকেই অপারেট করবে। এরকম একেকটা ‘লিটোরাল রেজিমেন্টে’ ১৮’শ থেকে ২ হাজার ম্যারিন সেনা থাকবে।

এর আগে ২০২০এর সেপ্টেম্বরে জেনারেল বার্জার এক কনফারেন্সে তার পরিকল্পনার পিছনে চিন্তার স্তম্ভগুলি উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, নতুন হুমকি মোকাবিলায় ইন্দোপ্যাসিফিকে ম্যারিন সেনারা গত ৭০ বছর ধরে যেভাবে অপারেট করেছে, সেভাবে অপারেট করলে চলবে না। কারণ ম্যারিন সেনাদের এখন একইসাথে বহু স্থানে অবস্থান নিতে হবে, এবং সেটাও অনেক বড় এলাকা জুড়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং কোরিয়ান যুদ্ধের পর থেকে মার্কিন নৌবাহিনী এবং ম্যারিন সেনাদের লক্ষ্য কোরিয় উপদ্বীপে অবস্থান নিয়ে সম্ভব দ্বন্দ্ব মোকাবিলা করা। কিন্তু চীনের উত্থানের সাথেসাথে সেই হিসেব পরিবর্তিত হয়ে গেছে এবং আগামী ১০ বছর বা ২০ বছরের জন্যে সেই কৌশল মোটেই সমীচিন নয়। ‘ডিফেন্স নিউজ’এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হচ্ছে যে, ইন্দোপ্যাসিফিকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী এবং ম্যারিন কোরের বেশিরভাগ শক্তিই রয়েছে জাপানে। জাপানের ইয়োকোসুকা থেকে অপারেট করে মার্কিন নৌবানীর একটা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ এবং তার সাথের ক্রুজার ও ডেস্ট্রয়ারগুলি। এছাড়াও নৌবাহিনীর উভচর জাহাজের বাহিনী অপারেট করে সাসেবো বন্দর থেকে। ‘থার্ড ম্যারিন এক্সপিডিশনারি ফোর্স’এর ১৮ হাজার ম্যারিন সেনা অবস্থান করছে জাপানের দক্ষিণের ওকিনাওয়া দ্বীপে। অনেকেই সমালোচনা করছেন যে, নৌবাহিনী এবং ম্যারিন সেনাদের এতবড় বাহিনীকে চীনের এত কাছাকাছি এলাকায় অল্প কিছু স্থানের মাঝে জড়ো করে রাখা হয়েছে। এধরনের স্থায়ী ঘাঁটিগুলি খুব সহজেই চীনা ক্ষেপণাস্ত্র এবং বোমারু বিমানের দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। ২০২০ সালে মার্কিন সরকারের প্রকাশিত ‘চায়না মিলিটারি পাওয়ার’এ বলা হচ্ছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে জাপান এবং গুয়াম দ্বীপে চীনাদের আক্রমণ করার সক্ষমতা অনেক বেড়ে গেছে। জাপানে মার্কিন ঘাঁটিগুলি এখন চীনা মধ্যম পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লার মাঝে। চীনাদের ‘এইচ ৬কে’ বোমারু বিমানগুলি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে গুয়াম দ্বীপ আক্রমণ করতে পারবে। এছাড়াও ‘ডিএফ ২৬’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেও চীনারা গুয়ামে হামলা করতে সক্ষম। জেনারেল বারজার বলছেন যে, চীনাদের এই সক্ষমতাগুলি মোকাবিলা করতেই মার্কিন সেনাদের ছড়িয়ে ছিটিয়ে মোতায়েন করতে হবে, যাতে চীনারা নির্দিষ্ট করে কোথাও টার্গেট করতে সক্ষম না হয়। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পুরো ইন্দোপ্যাসিফিক অঞ্চলে মার্কিন বন্ধু দেশগুলিকে তাদের সাথে রাখতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র। জেনারেল বারজার ২০২০এর জুলাই মাসে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির সদস্যদের সামনে তার পরিকল্পনাগুলির প্রাথমিক ধারণা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, নতুন পরিকল্পনায় ট্যাংকের দরকার নেই; দরকার দূরপাল্লার নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র। 

ম্যারিনরা মনে করছে না যে, ছোট্ট দ্বীপগুলিকে দখলে নিতে ট্যাঙ্ক ব্যবহার করতে হবে। আর চীনারাও হয়তো এই দ্বীপগুলি দখলে রাখতে ট্যাংক ব্যবহার করবে না। আর আর্টিলারি কামান ব্যবহার করার জন্যেও এই দ্বীপগুলি অতি ক্ষুদ্র। তবে ম্যারিনরা তাদের ‘হাই মোবিলিটি আর্টিলারি রকেট সিস্টেম’ বা ‘হিমারস’কে অতি গুরুত্বের সাথে ব্যবহার করবে। ‘প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল’ বা ‘পিআরএসএম’ প্রকল্পের অধীনে এই রকেট সিস্টেমের রকেটগুলিকে আরও উন্নত করে এগুলির পাল্লা এবং নিখুঁতভাবে আঘাত করার সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি করা হচ্ছে।


মার্কিন সামরিক ম্যাগাজিন ‘মিলিটারি ডট কম’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, জেনারেল বারজারের পরিকল্পনা অনুসারে ম্যারিন কোরের খরচ কমানো হচ্ছে; যা বিনিয়োগ করা হবে নতুন সক্ষমতা অর্জনে। ট্যাংক ব্যাটালিয়নগুলি বাতিল করে দেয়ায় শতশত ম্যারিন সেনা হয় ইন্টেলিজেন্স, সাইবার বা লজিস্টিকসে নাম লেখাচ্ছে, অথবা সেনাবাহিনীতে চলে যাচ্ছে, অথবা চাকুরি থেকে অবসরে যাচ্ছে। প্রায় ১৩’শ ম্যারিনকে তাদের ক্যারিয়ার নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। ২০৩০ সাল নাগাদ ম্যারিন কোরের সদস্যসংখ্যা ১২ হাজার কমিয়ে ১ লক্ষ ৭৪ হাজারে নামিয়ে আনা হবে। ‘নেভি লীগ অব দ্যা ইউনাইটেড স্টেটস’এর পত্রিকা ‘সী পাওয়ার’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ম্যারিন কোর তাদের পদাতিক ব্যাটালিয়নের সংখ্যা ২৪ থেকে ২১ নামিয়ে আনা ছাড়াও আর্টিলারি কামানের ব্যাটারির সংখ্যা ২১ থেকে মাত্র ৫টায় নামিয়ে আনবে। উভচর যানের কোম্পানির সংখ্যা ৬ থেকে ৪এ নামিয়ে আনা ছাড়াও হেলিকপ্টার স্কোয়াড্রনের সংখ্যাও কমিয়ে আনা হবে। এছাড়াও ম্যারিন কোরের প্রতিটা ‘এফ ৩৫বি’ এবং ‘এফ ৩৫সি’ স্টেলথ ফাইটার স্কোয়াড্রনে ১৬টা বিমানের পরিবর্তে থাকবে মাত্র ১০টা বিমান।

বেঁচে যাওয়া অর্থ থেকে ম্যারিন কোর দূরপাল্লার নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র, উন্নততর গোয়েন্দা সক্ষমতা, মনুষ্যবিহীর ড্রোন এবং শক্তিশালী যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করবে। চীনাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বা দক্ষিণ চীন সাগর এবং পূর্ব চীন সাগরে ‘ফার্স্ট আইল্যান্ড চেইন’এর দ্বীপগুলি বেশ ছোট। ম্যারিনরা মনে করছে না যে, এই ছোট্ট দ্বীপগুলিকে দখলে নিতে ট্যাঙ্ক ব্যবহার করতে হবে। আর চীনারাও হয়তো এই দ্বীপগুলি দখলে রাখতে ট্যাংক ব্যবহার করবে না। আর আর্টিলারি কামান ব্যবহার করার জন্যেও এই দ্বীপগুলি অতি ক্ষুদ্র। তবে ম্যারিনরা তাদের ‘হাই মোবিলিটি আর্টিলারি রকেট সিস্টেম’ বা ‘হিমারস’কে অতি গুরুত্বের সাথে ব্যবহার করবে। ‘প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল’ বা ‘পিআরএসএম’ প্রকল্পের অধীনে এই রকেট সিস্টেমের রকেটগুলিকে আরও উন্নত করে এগুলির পাল্লা এবং নিখুঁতভাবে আঘাত করার সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এছাড়াও ম্যারিন কোরের জন্যে নৌবাহিনীর ‘এনএসএম’ জাহাজ ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং ‘টোমাহক’ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের ভূমি থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ভার্সন ডেভেলপ করা হচ্ছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ব্যবহার করে ম্যারিনরা চীনের আশেপাশে সকল গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ করার পরিকল্পনা করছে।

 

নিজস্ব চিন্তার জোরে নয়, বরং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার চাপেই যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য হচ্ছে নিজেদের সামরিক বাহিনীতে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে। প্রথমবারের মতো ছোট ছোট দ্বীপ এবং তৎসংলগ্ন দ্বীপাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিতে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ‘অতি শক্তিশালী’ নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনী নয়, বরং ম্যারিন কোরের সেনাদের উপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে। কোরিয়া, জাপান, গুয়ামের ঘাঁটি এবং বিশাল বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ও উভচর জাহাজগুলি এখন চীনা ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র থেকে নিরাপদ নয়; তাই তারা এখন ম্যারিন কোরের সেনাদের ছোট ছোট দ্বীপে নামিয়ে দিয়ে পিছনে গিয়ে অবস্থান নিতে চাইছে।


জেনারেল বারজারের পরিকল্পনার সমালোচনাও হচ্ছে। মার্কিন নৌবাহিনীর প্রাক্তন সচিব জিম ওয়েব মত দিচ্ছেন যে, এই পুনর্গঠনের মাধ্যমে ম্যারিন কোরের কর্মকান্ডকে একেবারেই চীন কেন্দ্রিক করে ফেলা হচ্ছে; যেন তারা দক্ষিণ চীন সাগর ছাড়া আর কোথাও যুদ্ধ করবেই না। ওয়েব নিশ্চিত নন যে, এই যুদ্ধটাই একমাত্র যুদ্ধ হিসেবে মার্কিনীদের নেয়া উচিৎ কিনা। তিনি মনে করেন না যে, চীনারা ম্যারিন কোরের সক্ষমতাকে পেরিয়ে গেছে।

মার্কিন থিংকট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক এন্ড ইন্টানন্যাশনাল স্টাডিজ’ বা ‘সিএসআইএস’এর এক লেখায় জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মার্ক কানসিয়ান বলছেন যে, ম্যারিন কোরের এই পরিকল্পনায় ঝুঁকি কম নয়। ভবিষ্যৎটা কেমন হবে, সেটা এখন যেমন মনে হচ্ছে, তা যদি সামনের দিনগুলিতে অন্যরকম মনে হয়? অথবা এখন যেসব কনসেপ্ট ম্যারিন কোন ডেভেলপ করছে বিভিন্ন মহড়ার মাধ্যমে, তা যদি ভবিষ্যতে বাস্তবে রূপ দিতে গিয়ে যতটা সহজ মনে হয়েছিল, ততটা না হয়? অর্থাৎ ম্যারিন কোর তাদের ভবিষ্যৎবাণী সঠিক হবার উপর পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল। এছাড়াও বৈশ্বিকভাবে জরুরি প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক মিশনে জড়াতে হয়, যেখানে বিভিন্ন বাহিনী প্রেরণ করতে হয়। ম্যারিন কোরকে এভাবে পরিবর্তন করে ফেললে মার্কিনীদের বৈশ্বিক অবস্থান ধরে রাখতে বাকি বাহিনীগুলিকে চাপের মাঝে পড়তে হবে।

২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর থেকে দুই দশক ধরে তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে’ যুক্তরাষ্ট্র সারা মুসলিম বিশ্বে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি ম্যারিন সেনাদেরও মোতায়েন করেছিল। ম্যারিনদের বিশেষ সক্ষমতা সর্বদাই ছিল উভচর অপারেশন; যা থেকে তারা বহুকাল দূরে থেকেছিল। এখন তারা সমুদ্রে ফেরত আসছে ঠিকই, কিন্তু ব্যাপক পরিবর্তনের মাঝ দিয়ে। দুই দশক ধরে তথাকথিত ‘সন্ত্রাসী’ দমন অভিযানে বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ করার পর মার্কিনীরা হঠাত করেই চীনাদেরকে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। অর্থনৈতিক এবং সামরিক দিক থেকে উত্থানে থাকা চীন এশিয়াতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করেছে বলে মনে করছে মার্কিনীরা; যদিও এশিয়ার মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রই বাইরের শক্তি। এতকাল কোরিয়া উপদ্বীপে নিজেদের স্বার্থ ধরে রাখার ছুতোয় মার্কিনীরা জাপান এবং কোরিয়াতে ব্যাপক সামরিক শক্তি মোতায়েন রেখেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে চীনের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং বিমান সক্ষমতা মার্কিনীদের এই অবস্থানকে হুমকির মাঝে ফেলে দিয়েছে। নিজস্ব চিন্তার জোরে নয়, বরং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার চাপেই যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য হচ্ছে নিজেদের সামরিক বাহিনীতে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে। প্রথমবারের মতো ছোট ছোট দ্বীপ এবং তৎসংলগ্ন সমুদ্রাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিতে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ‘অতি শক্তিশালী’ নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনী নয়, বরং ম্যারিন কোরের সেনাদের উপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে। কোরিয়া, জাপান, গুয়ামের ঘাঁটি এবং বিশাল বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ও উভচর জাহাজগুলি এখন চীনা ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র থেকে নিরাপদ নয়; তাই তারা এখন ম্যারিন কোরের সেনাদের ছোট ছোট দ্বীপে নামিয়ে দিয়ে পিছনে গিয়ে অবস্থান নিতে চাইছে।