Wednesday, 9 June 2021

জিব্রালটার প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বের শুরু?

১০ই জুন ২০২১
১৯৭০এর দশকে স্পেন মরক্কো ছেড়ে আসলেও মরক্কোর উত্তর উপকূলে কয়েকটা বন্দরকে স্পেন ছিটমহল হিসেবে রেখে দেয়। ভবিষ্যতে জিব্রালটার প্রণালীর দক্ষিণ উপকূল নিয়ন্ত্রণে এই ছিটমহলগুলি ইউরোপের জন্যে কাজে দিতে পারে। ইস্রাইলের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের মতো জনবিরোধী সিদ্ধান্তও মরক্কোর সরকার নিয়েছে পশ্চিম সাহারায় মরক্কোর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি পাবার জন্যে। তবে এর ফলশ্রুতিতে ইউরোপের সাথে মরক্কোর সম্পর্ক টানাপোড়েনের মাঝে পড়েছে। যদিও মরক্কোর সাথে ইউরোপের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবার সম্ভাবনা কম, তথাপি মরক্কোর উত্তর উপকূলে স্পেনের ছিটমহলগুলি যখন হাজারো শরণার্থীর জোয়ারে ভেসে যাবার উপক্রম, তখন এই ছিটমহলগুলির সামনের দিনগুলিতে ইউরোপের ‘ব্রিজহেড’ হিসেবে থাকার সম্ভাবনা প্রশ্নের মুখে পড়ে।



মে এবং জুন মাসে হঠাত করেই উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কোর সাথে ইউরোপের, বিশেষ করে স্পেন এবং জার্মানির সম্পর্ক নিম্নমুখী হয়েছে। সংবাদ মাধ্যমগুলি এই দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে বিতর্কিত পশ্চিম সাহারার কথা বললেও এর ভূরাজনৈতিক গভীরতা যথেষ্ট। এই গভীরতার একটা ধারণা পাওয়া যাবে মরক্কোর সাথে ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ইতিহাস এবং বর্তমানে তাদের মাঝে সম্পর্কের দিকে তাকালে। তবে একইসাথে তাকাতে হবে মরক্কোর অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূকৌশলগত অবস্থানের দিকে। মরক্কোর ব্যাপারগুলিকে কোন অবস্থাতেই ভূরাজনৈতিকভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ জিব্রালটার প্রণালীকে বাদ দিয়ে চিন্তা করা যাবে না।

পশ্চিম সাহারার সমস্যা ঔপনিবেশিক সময়ের

সপ্তদশ শতক থেকে স্পেন মরক্কোর উপকূলে কয়েকটা ছিটমহল উপনিবেশ হিসেবে দখল করে নেয়। ঊনিশ শতকের শেষ দিক থেকে পশ্চিম আফ্রিকার পুরোটাই ইউরোপিয় ঔপনিবেশিকদের অধীনে চলে যায়। ১৯০৬ সালে মরক্কোর সরকারের দুর্বলতার কারণ দেখিয়ে মরক্কোর দখল নিয়ে জার্মানি এবং ফ্রান্সের মাঝে দ্বন্দ্ব বাধলে ব্রিটেনের মধ্যস্ততায় মরক্কোর নিয়ন্ত্রণ নেয় ইউরোপিয়রা। ১৯১২ সালে মরক্কোর নিয়ন্ত্রণ চলে যায় স্পেন এবং ফ্রান্সের কাছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আফ্রিকায় নিজেদের উপনিবেশ থাকা অঞ্চলগুলিকে ইউরোপিয়রা নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী বিভক্ত করে অনেকগুলি নতুন রাষ্ট্র তৈরি করে। পশ্চিম আফ্রিকায় একইভাবে তৈরি করা হয় মরক্কো, আলজেরিয়া, মৌরিতানিয়া এবং অন্যান্য দেশ। ফরাসিরা ১৯৫৬ সালে মরক্কো ছেড়ে যায়। মরক্কোর দক্ষিণ অঞ্চল ছিল স্পেনের অধিকারে; অন্যদিকে আলজেরিয়া, মৌরিতানিয়া এবং অন্যান্য অঞ্চলগুলি ছিল ফরাসিদের অধীনে। এই দেশগুলির সীমানাও ঔপনিবেশিকরা তৈরি করে; যা পরবর্তীতে বহু ধরনের সংঘাতের জন্ম দেয়। এরকমই একটা দ্বন্দ্ব হলো পশ্চিম সাহারার দ্বন্দ্ব। মরক্কোর দক্ষিণের পশ্চিম সাহারা অঞ্চলটা ছিল স্পেনের উপনিবেশ; যার নাম ছিল ‘রিও ডে অরো’। আঞ্চলিকভাবে অঞ্চলটা সাহরাউই নামে পরিচিত। ১৯৭৫ সালে স্পেন এই অঞ্চল ছেড়ে যাবার সময় রিও ডে অরো অঞ্চলকে দুই ভাগে ভাগ করে নতুন তৈরি করা দুই দেশ মরক্কো এবং মৌরিতানিয়ার মাঝে বিতরণ করে। এরপরই সাহরাউই অঞ্চলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেয়া পলিসারিও ফ্রন্টের সাথে মৌরিতানিয়া এবং মরক্কোর যুদ্ধ শুরু হয়। চার বছর যুদ্ধ করার পর ১৯৭৯ সালে মৌরিতানিয়া তাদের অংশ ছেড়ে দিয়ে পশ্চিম সাহারা ত্যাগ করে। কিন্তু মরক্কো যুদ্ধ চালিয়ে যায়। এই যুদ্ধে মরক্কোকে সামরিক সহায়তা দেয় যুক্তরাষ্ট্র; আর পলিসারিওকে সোভিয়েত অস্ত্র দিয়ে সহায়তা দেয় আলজেরিয়া এবং লিবিয়া। পলিসারিওর সকল অস্ত্রসস্ত্রই আলজেরিয়া হয়ে আসে এবং আলজেরিয়াকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেই পলিসারিও মরক্কোর সামরিক বাহিনীর উপর হামলা চালিয়ে যায়।। ১৯৮০এর দশকে মরক্কো পশ্চিম সাহারার মাঝ বরাবর উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত ২ হাজার ৭’শ কিঃমিঃ লম্বা বালুর দেয়াল তৈরি করে। এই দেয়ালের ফলে যুদ্ধ মরক্কো সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে; এবং পলিসারিওর সামরিক জয় পাবার আশা স্তিমিত হয়ে যায়। ১৯৯১ সালে ঠান্ডা যুদ্ধ শেষ হলে পশ্চিম সাহারার যুদ্ধও শেষ হয়ে যায়; এবং একটা যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। জাতিসংঘের একটা মিশনের মাধ্যমে এই যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ করা হয়; যেখানে মরক্কো সরকারের অধীনে রয়েছে পশ্চিমের অংশ; আর পলিসারিওর হাতে রয়েছে আলজেরিয়ার সীমানা ঘেঁষে পূর্বের অংশ। এই সমস্যার একটা মূল ভিত্তি হলো কে এই সংঘাতকে কিভাবে দেখছে।

পশ্চিম সাহারার যুদ্ধ মরক্কোর সাথে অনেক দেশের সম্পর্ক নির্ধারণ করেছে। আরব দেশগুলি মরক্কোর পক্ষে থেকেছে; অন্যদিকে আফ্রিকার বেশিরভাগ দেশই পলিসারিওর পক্ষ নিয়েছে। যুদ্ধের ফলে আলজেরিয়ার সাথে মরক্কোর সম্পর্ক বরাবরই খারাপ রয়েছে। আফ্রিকার দেশগুলি সাহরাউই রিপাবলিককে স্বীকৃতি দিলে ১৯৮৪ সালে মরক্কো আফ্রিকান ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যায়। তবে তিন দশক পর ২০১৭ সালে মরক্কো আবারও আফ্রিকান ইউনিয়নে প্রবেশ করে। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, আফ্রিকার দেশগুলি মূলতঃ অর্থনৈতিক কারণেই মরক্কোর আফ্রিকান ইউনিয়নে ঢোকাকে সমর্থন করেছে। মরক্কো সাম্প্রতিক সময়ে আফ্রিকার দেশগুলির সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়ন করেছে; যার উদ্দেশ্যই ছিল আফ্রিকান ইউনিয়নে ঢোকার পথ প্রসারিত করা। ৩৯টা দেশ মরক্কোর পক্ষে ভোট দেয়; তবে ৯টা বিপক্ষে থাকে। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা বলছে যে, বিপক্ষে ভোট দেয়া দেশগুলি মূলতঃ আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলের দেশ। সাহরাউইএর ব্যাপারে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের অবস্থান দেখলে বোঝা যাবে যে, বিপক্ষে ভোট দেয়া দেশগুলির মাঝে খুব সম্ভবতঃ দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে, এঙ্গোলা থাকতে পারে। কারণ এই দেশগুলি মরক্কোর আফ্রিকান ইউনিয়নে যোগ দেয়ার সরাসরি বিরোধিতা করেছিল।
 
পশ্চিম সাহারায় মরক্কোর তৈরি করা বালির দেয়াল। ১৯৮০এর দশকে মরক্কো ২ হাজার ৭’শ কিঃমিঃ লম্বা বালুর দেয়াল তৈরি করে। এই দেয়ালের ফলে যুদ্ধ মরক্কো সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে; এবং পলিসারিওর সামরিক জয় পাবার আশা স্তিমিত হয়ে যায়। ১৯৯১ সালে ঠান্ডা যুদ্ধ শেষ হলে পশ্চিম সাহারার যুদ্ধও শেষ হয়ে যায়; এবং একটা যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। তবে মরক্কোর প্রায় ২ লক্ষ সদস্যের সেনাবাহিনী পশ্চিম সাহারায় ব্যস্ত থেকে জিব্রালটার এবং স্প্যানিশ ছিটমহলগুলি থেকে যে দূরে থাকছে, সেব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র খুব বেশি চিন্তিত হবার কথা নয়। 


স্পেনের সাথে দ্বন্দ্ব

মে মাসের মাঝামাঝি হঠাত করেই মরক্কো থেকে স্পেনের ছিটমহল সেউতাতে ৮ হাজার শরণার্থী ঢুকে পড়ে। স্পেন বলছে যে, মরক্কো তার সীমানা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছে; যার ফলে হাজার হাজার শরণার্থী সেউতায় ঢুকেছে। সাধারণতঃ শরণার্থীদের নিয়ন্ত্রণে মরক্কো স্পেনকে যথেষ্ট সহায়তা করে থাকে। ‘বিবিসি’র এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, এপ্রিল মাসে স্পেন পশ্চিম সাহারার পলিসারিওর নেতা ব্রাহিম ঘালিকে স্পেনের এক হাসপাতালে করনোভাইরাসের চিকিৎসার জন্যে ভর্তি করে। মরক্কো বলছে যে, স্পেন মরক্কোকে না জানিয়ে পশ্চিম সাহারা পলিসারিওর নেতাকে হাসপাতালে ভর্তি করেছে। অনেকেই বলছেন যে, এর প্রতিশোধ হিসেবেই মে মাসে মরক্কোর নিরাপত্তা বাহিনী কিছু সময়ের জন্যে শরণার্থীদের উপর থেকে তাদের নজরদারি সরিয়ে ফেলে; যার ফলশ্রুতিতে হাজারো শরণার্থী সেউতায় ঢুকে পড়ে। একই সময়ে স্পেনের পক্ষ থেকে পশ্চিম সাহারা নিয়ে বিবৃতি আসতে থাকে। স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঞ্চা গোঞ্জালেজ লায়া বলেন যে, স্পেন পশ্চিম সাহার ব্যাপারে জাতিসংঘের সিদ্ধান্তের উপরেই নির্ভর করবে। স্পেন চায় সকল পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সমাধান।

৬ই জুন মরক্কোর সরকার ঘোষণা দেয় যে, মরক্কো স্পেনের সাথে সমুদ্রে যাত্রীবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, ইউরোপে বসবাসকারী প্রায় ৩০ লক্ষ মরক্কোর নাগরিকের বেশিরভাগই স্পেন হয়ে মরক্কো যেতো। তবে মরক্কো সরকার ফরাসি এবং ইতালিয় বন্দরগুলির সাথে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখবে বলে বলেছে। কারণ হিসেবে মরক্কোর সরকার করোনাভাইরাসের কথা বললেও অনেকেই মনে করছেন যে, এর সাথে দুই দেশের মাঝে চলমান উত্তেজনার সম্পর্ক থাকতে পারে।

‘আল জাজিরা’ জানাচ্ছে যে, মে মাসের প্রথম সপ্তাহে ইউরোপিয় আদালতে মরক্কোর সাথে ইইউএর বাণিজ্য চুক্তির ব্যাপারে শুনানি হয়। পলিসারিওর পক্ষ থেকে এই চুক্তির বিরোধিতা করে ইইউএর কাছে আবেদন জানানো হয়েছিল। পলিসারিও বলছে যে, মরক্কো পশ্চিম সাহারার সম্পদ লুন্ঠন করছে; যার মাঝে রয়েছে রক ফসফেট, কৃষিদ্রব্য এবং পশ্চিম সাহারার উপকূলের মৎস্যসম্পদ। অনেকেই মনে করছেন যে, এই বছরের শেষের দিকে আদালয়ের যে রায় আসবে, তা পলিসারিওর পক্ষে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। ইইউ আদালতের রায় মরক্কোর বিপক্ষে গেলে মরক্কোর সাথে ইইউএর সম্পর্কে নতুন করে দ্বন্দ্ব দেখা দিতে পারে।

জার্মানির সাথে দ্বন্দ্ব

মরক্কো ইস্রাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার এবং যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম সাহারায় মরক্কোর সার্বভৌমত্ব মেনে নেয়ার ১১ দিনের মাথায় ২০২০এর ২১শে ডিসেম্বর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে জার্মানির রাষ্ট্রদূত ক্রিসটফ হিউসগেন পশ্চিম সাহারা নিয়ে একটা রুদ্ধদ্বার বৈঠকের ডাক দেন। তার উপস্থাপনায় হিউসগেন বলেন যে, পশ্চিম সাহারার সমস্যার মূলে রয়েছে মরক্কো। হিউসগেন পলিসারিওর সামরিক দুর্বলতার অবস্থান উল্লেখ করেন। পলিসারিও যুদ্ধবিরতি ভাঙলেও তিনি এর জন্যে মরক্কোকে দায়ি করেন। আর পলিসারিও যদি আশাহত হয়, তবে তারা উগ্রবাদী হয়ে যেতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। ২০১৯ সালে জাতিসংঘ মহাসচিবের দূত হিসেবে প্রাক্তন জার্মান প্রেসিডেন্ট কোহলারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন যে, কোহলার অসুস্থ হয়ে যাবার পর থেকে কথাবার্তা থেমে গেছে। জার্মানি চাইছে যে, পশ্চিম সাহারা নিয়ে আবারও আলোচনা শুরু হোক এবং রাজনৈতিকভাবে এর সমাধান হোক। জার্মান রাষ্ট্রদূত তার মার্কিন বন্ধুদেরকে শক্ত অবস্থান নেবার কথা বলেন।

পশ্চিম সাহারার বিষয়ে জাতিসংঘে জার্মানির বৈঠক ডাকার কারণ দেখিয়ে চার মাস পর ২০২১এর মে মাসের শুরুতে মরক্কো বার্লিনে তার রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে। ২০২০এর শেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পশ্চিম সাহারাতে মরক্কোর সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দেয়ার পরেও মরক্কোর বিরুদ্ধে জার্মানির অবস্থানের ব্যাপক সমালোচনা করে মরক্কো। মরক্কো ইস্রাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সেই স্বীকৃতি পেয়েছিল। এক বিবৃতিতে মরক্কোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলে যে, জার্মানি গঠনমূলক সমাধানের পথে না হেঁটে ধংসাত্মক মনোভাব দেখাচ্ছে। একইসাথে মরক্কো বলে যে, জার্মানি মরক্কোর প্রভাব নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে সর্বদা; বিশেষ করে লিবিয়া ইস্যুর কথা উল্লেখ করা হয়। ২০২০এর জানুয়ারিতে বার্লিনে লিবিয়া নিয়ে আলোচনায় মরক্কোকে বাদ দেয়ার জন্যে জার্মান সরকারকে অভিযুক্ত করা হয়। ‘ডয়েচে ভেলে’র এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, গত মার্চে মরক্কো সরকার তাদের সরকারি দপ্তরগুলিকে জার্মান দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিতে নির্দেশ দেয়।

‘আল জাজিরা’র সাথে কথা বলতে গিয়ে স্প্যানিশ সাংবাদিক ইগনাসিও সেমব্রেরো বলছেন যে, মরক্কো চাইছে যে, ইইউ এবং প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শক্তি স্পেনের উপর চাপ সৃষ্টি করে পশ্চিম সাহারার উপর মরক্কোর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি আদায় করে নেয়া। তবে আপাততঃ ইইউ এব্যাপারে মরক্কোকে স্বীকৃতি দেবে বলে মনে করছেন না সেমব্রেরো; অন্ততঃ প্রকাশ্যে নয়। মরক্কো এবং জার্মানির অর্থনৈতিক সম্পর্ক কিন্তু বেশ ভালো। মরক্কোর সপ্তম বৃহত্তম বাণিজ্য সহযোগী হলো জার্মানি। এছাড়াও ২০২০ সালেই জার্মানির কাছ থেকে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের ঋণ এবং অনুদান পেয়েছে মরক্কো।
 
২০১৮ সাল। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁর সাথে মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ। মরক্কোর নিরাপত্তা চিন্তায় ইউরোপ সবসময়ই রূঢ় বাস্তবতা; কারণ ইউরোপ মরক্কোকে ভূমধ্যসাগরে ঢোকার পশ্চিম দরজার দক্ষিণ পাল্লা হিসেবে দেখে। একারণেই বিংশ শতকে ইউরোপিয় উপনিবেশ হওয়া থেকে বাঁচতে পারেনি মরক্কো; যার ফলশ্রুতিতে বর্তমান মরক্কো অর্থনৈতিকভাবে ইউরোপের উপর অনেকটাই নির্ভরশীল। তবে নির্ভরশীলতা একমুখী নয় মোটেই; কারণ ইউরোপিয়রাও মরক্কোতে তাদের বিনিয়োগের সুরক্ষা চায়।  


ইউরোপের উপর মরক্কোর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা

মরক্কো হলো পৃথিবীর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ফসফেট উৎপাদক। রক ফসফেট খনিজ থেকে ফসফেট সার তৈরি হয়। পৃথিবীর জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথেসাথে ফসফেট সারের চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টন রক ফসফেট উৎপাদন হয়; যার প্রায় এক তৃতীয়াংশই মরক্কোতে উৎপাদিত হয়। তবে পুরো দুনিয়ার প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টন রক ফসফেট রিজার্ভের মাঝে শুধু মরক্কো এবং পশ্চিম সাহারাতেই পাওয়া গেছে প্রায় ৫ হাজার কোটি টন। মরক্কোর প্রায় সকল রক ফসফেট উৎপাদন করে সরকারি মালিকানার কোম্পানি ‘ওসিপি’। ১৯৭৬ সালে পশ্চিম সাহারা মরক্কো নিজের নিয়ন্ত্রণে নেবার পর থেকে সেখানকার ‘বৌ ক্রা’ এবং ‘লাইউনি’ খনি থেকে ফসফেট উত্তোলন শুরু হয়। বর্তমানে ‘ওসিপি’র প্রায় ৮ শতাংশ উৎপাদন পশ্চিম সাহারার এই খনি থেকে আসে।

‘আইএইচএস মার্কিট’এর হিসেবে বিশ্বের প্রায় অর্থেক রক ফসফেটের ব্যবহারকারী হলো চীন। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, আফ্রিকা এবং পূর্ব ইউরোপ মিলে প্রায় এক চতুর্থাংশ ব্যবহার করে। এছাড়াও মধ্যপ্রাচ্য এবং আমেরিকা মহাদেশের অন্যান্য দেশ ফসফেটের গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা। যদিও অর্থের হিসেবে ফসফেট এবং আনুসাঙ্গিক পণ্য মরক্কোর সবচাইতে বড় রপ্তানি পণ্য নয়, তথাপি বিশ্বব্যাপী শস্য উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হিসেবে ফসফেট মরক্কোকে গুরুত্বপূর্ণ করেছে।

‘ওইসি’র হিসেবে মরক্কোর সবচাইতে বড় রপ্তানি বাজার হলো স্পেন; যেখানে প্রায় ২৩ শতাংশ রপ্তানি হয়। এরপর প্রায় ২০ শতাংশ নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ফ্রান্স; ৪ শতাংশ নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে ইতালি; সাড়ে ৩ শতাংশ নিয়ে চতুর্থ স্থানে জার্মানি। এছাড়াও ইউরোপের দেশগুলির মাঝে ব্রিটেন, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম এবং রাশিয়া মরক্কোর গুরুত্বপূর্ণ বাজার। ইউরোপের বাইরে রয়েছে ভারত, তুরস্ক, চীন এবং জাপান। পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলির সাথে মরক্কোর নির্ভরশীলতা ফসফেট নিয়ে নয়; গাড়ি, ইনসুলেটেড তার এবং গার্মেন্টস পণ্যের মতো তৈরি পণ্য ইউরোপে রপ্তানি করে মরক্কো; যা কিনা ইউরোপের উপর মরক্কোকে নির্ভরশীল করেছে। মরক্কোতে বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও ফ্রান্স এবং স্পেন এগিয়ে আছে। মরক্কোর মাটিতে ফরাসি গাড়ি নির্মাতা কোম্পানি ‘রেনো’ এবং ‘পোঁজো’ বিনিয়োগ করেছে।

মরক্কোর বিশাল সাড়ে তিন হাজার কিঃমিঃ লম্বা উপকূল সামুদ্রিক মাছের একটা বড় উৎস; অথচ মরক্কোর নিজের সক্ষমতা নেই গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ করার। জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ‘এফএও’এর হিসেবে মরক্কোর বাৎসরিক সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ এবং চাষ প্রায় ১৫ লক্ষ টন; যা আফ্রিকার বৃহত্তম এবং বিশ্বে ১৭তম। প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ মৎস্য আহরণ এবং চাষের উপর নির্ভরশীল। প্রায় ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার আয় হয় মৎস্য রপ্তানি করে; যার বেশিরভাগটাই যায় ইউরোপে। ১৯৯৬ সালে ইইউএর সাথে চুক্তি অনুযায়ী মরক্কো তার দেশের উপকূলে ইইউএর, বিশেষ করে স্পেনের জাহাজগুলিকে মাছ ধরার অনুমতি দেয়। এর বিনিময়ে মরক্কো ইইউএর কাছ থেকে বাৎসরিক অর্থ সহায়তা পায়। ২০১৬ সালে মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ পশ্চিম সাহারার দাখলা উদ এদদাহাব উপকূল অঞ্চলে বিভিন্ন মৎস্যজাতীয় চাষের প্রকল্প উদ্ভোধন করেন। এই প্রকল্পগুলিতে ইউরোপিয় দেশগুলি ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। ২০১৯ সালে ইইউ মরক্কোর সাথে এক চুক্তি করে; যার মাধ্যমে পশ্চিম সাহারা উপকূলে ইইউ মাছ ধরার অনুমতি পায়। ‘এএফপি’র হিসেবে চার বছরের এই চুক্তির মাধ্যমে মরক্কো ইইউ থেকে ১’শ ৫৩ মিলিয়ন ইউরো পাবে। ইইউএর পার্লামেন্টে পাস হওয়া এই চুক্তির বিপক্ষে রয়েছে পশ্চিম সাহারার লবিং গ্রুপ। পলিসারিওর উপদেষ্টা নূর বকর ‘আরএফআই’কে বলছেন যে, ইউরোপের আদালতে তারা সকল প্রকারের চেষ্টা চালাবেন মরক্কোর সাথে এই চুক্তি বাতিল করতে। ইউরোপিয়ান কমিশনের হিসেবে ২০১৯ সালে মরক্কো পশ্চিম সাহারা থেকে ৫’শ ২৪ মিলিয়ন ডলার মূল্যের মৎস্য এবং কৃষিজ পণ্য ইউরোপে রপ্তানি করে।

পশ্চিম সাহারার ফসফেট ইউরোপের সাথে বাণিজ্যে বড় কোন ইস্যু না হলেও মরক্কো ইইউএর উপর অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্টই নির্ভরশীল। আর সেই হিসেবে ইউরোপের আদালতে পশ্চিম সাহারার অভিযোগ মরক্কোর জন্যে বিরক্তির ব্যাপার হতে পারে। তবে মরক্কো যেমন ইইউএর উপর নির্ভরশীল, তেমনি মরক্কোতে বড় বিনিয়োগও ইইউএর দেশগুলির কাছে গুরুত্বপূর্ণ। মরক্কোর বিরুদ্ধে ইইউ আদালতের যেকোন সিদ্ধান্ত ইউরোপিয় কোম্পানিগুলিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে। মরক্কোর ৩২ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির বিপরীতে আমদানি হলো প্রায় ৪৯ বিলিয়ন ডলার। আমদানি এবং রপ্তানির মাঝে বড় ব্যবধান দেশটার অর্থনীতিকে ব্যাতিব্যস্ত রেখেছে। এমতাবস্থায় মরক্কোও এমন কোন সিদ্ধান্ত নিতে যাবে না, যা কিনা দেশটার অর্থনীতিকে আরও চাপের মাঝে ফেলবে।

জিব্রালটার প্রণালী উত্তর ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার সাথে ভূমধ্যসাগর, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার সংযোগপথ। একসময় প্রাকৃতিক কারণে মরক্কোর উপকূলে বড় বন্দর নির্মাণ কঠিন হলেও প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথেসাথে মরক্কোর উপকূলে বড় বড় সমুদ্রবন্দর তৈরি হতে থাকে। এর ফলে জিব্রালটার প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ বহুকাল জিব্রালটার এবং স্পেনের উপর নির্ভরশীল হলেও এখন মরক্কোও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। একারণেই মরক্কোর নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী দেশগুলির কাছে গুরুত্বপূর্ণ। 


ভূকৌশলগত দিক থেকে মরক্কোর অতি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান

মরক্কো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা ভৌগোলিক অবস্থান ধরে রেখেছে, যা কিনা ভূকৌশলগত দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মরক্কোর উত্তর উপকূল জিব্রালটার প্রণালির দক্ষিণ কূল নিয়ন্ত্রণ করে। ১৯০৬ সালে মরক্কোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী ইউরোপিয় দেশগুলি ব্রিটেনের একটা শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। ব্রিটেন বলেছিল যে, মরক্কোর নিয়ন্ত্রণ যার কাছেই যাক না কেন, জিব্রালটারের উল্টো পাসে মরক্কোর উত্তর উপকূলে কোন বন্দরে দুর্গ তৈরি করা যাবে না। ব্রিটেন বিশেষ করে খেয়াল রেখেছিল জার্মানি যেন মরক্কোর উপর প্রভাব বিস্তার করে সেখানে একটা নৌঘাঁটি করে ফেলতে না পারে। এটা জিব্রালটারের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্রিটেনের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ১৯৭০এর দশকে স্পেন মরক্কো ছেড়ে আসলেও মরক্কোর উত্তর উপকূলে কয়েকটা বন্দরকে স্পেন ছিটমহল হিসেবে রেখে দেয়। ভবিষ্যতে জিব্রালটার প্রণালীর দক্ষিণ উপকূল নিয়ন্ত্রণে এই ছিটমহলগুলি ইউরোপের জন্যে কাজে দিতে পারে। এগুলির মাঝে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেউতা এবং মেলিলা। সেউতার পাশেই মরক্কোর তাঞ্জিয়ার এবং তাঞ্জিয়ার মেড জিব্রালটারের উল্টো দিকে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর।

জিব্রালটার প্রণালী উত্তর ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার সাথে ভূমধ্যসাগর, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার সংযোগপথ। ব্রিটেন, নেদারল্যান্ডস, জার্মানিসহ পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলি এই প্রণালীর মধ্য দিয়ে যাওয়া বাণিজ্যপথের উপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল। ফ্রান্সের আটলান্টিক উপকূলের সাথে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের সংযোগও জিব্রালটারের মাধ্যমে। তাই এই সংযোগপথের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে ইউরোপিয়দের কাছে মরক্কোর গুরুত্ব সর্বদাই বেশি ছিল। একসময় প্রাকৃতিক কারণে মরক্কোর উপকূলে বড় বন্দর নির্মাণ কঠিন হলেও প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথেসাথে মরক্কোর উপকূলে বড় বড় সমুদ্রবন্দর তৈরি হতে থাকে। এর ফলে জিব্রালটার প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ বহুকাল জিব্রালটার এবং স্পেনের উপর নির্ভরশীল হলেও এখন মরক্কোও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। একারণেই মরক্কোর নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী দেশগুলির কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও মরক্কো হলো যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যের মাঝে অবস্থিত একটা দরজা। এর মাঝ দিয়ে মার্কিন সামরিক বিমানগুলি উড়ে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়া আসা করে। মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলিও এই পথে ভূমধ্যসাগর এবং মধ্যপ্রাচ্যে যায়। কাজেই মার্কিনীরাও মধ্যপ্রাচ্যের নিয়ন্ত্রণ রাখতে মরক্কোর নিয়ন্ত্রণ চায়।

মরক্কো নিজের অবস্থানকে ব্যবহার করে আফ্রিকার গ্যাস ইউরোপে রপ্তানি করতে চাইছে। আলজেরিয়া থেকে একটা পাইপলাইনের মাধ্যমে মরক্কো হয়ে গ্যাস রপ্তানি হচ্ছে ইউরোপে। আরেকটা পাইপলাইনের মাধ্যমে নাইজেরিয়ার গ্যাস ইউরোপে রপ্তানি করতে চাইছে মরক্কো। এই পাইপলাইনগুলি নিয়ে মরক্কোর সাথে আলজেরিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে।

মরক্কোর সাথে পশ্চিম আফ্রিকার অন্যান্য দেশের সড়ক যোগাযোগের একমাত্র পথ হল পশ্চিম সাহারার মাঝ দিয়ে যাওয়া একটা মাত্র রাস্তা। ২০২০এর নভেম্বরে প্রায় দু’শ মালবাহী ট্রাক মৌরিতানিয়ার সীমানায় আটকে থেকে অভিযোগ করে যে, মিলিশিয়ারা রাস্তা অবরোধ করে রেখেছে। এরপরই মরক্কো এই রাস্তার নিরাপত্তা নিশ্চিতে পশ্চিম সাহারার দক্ষিণে মৌরিতানিয়ার সীমানায় গুরগেরাত বাফার জোনে সেনা মোতায়েন করে। ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’এর রিকার্ডো ফাবিয়ানি ‘আল জাজিরা’কে বলেন যে, নতুন করে শুরু হওয়া এই উত্তেজনার ফলাফল সুদূরপ্রসারী হতে পারে। আলজেরিয়ার পররাষ্ট্র দপ্তর মরক্কোর এই সামরিক মিশনের সমালোচনা করে বিবৃতি দেয়।
 
২০১৩ সাল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাথে মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ। মরক্কোর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বহুকালের। যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে ভূমধ্যসাগরে ঢোকার একটা পথ হলো জিব্রালটার। এছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ধরে রাখতে মরক্কো একটা দরজার মতো। আরব দেশগুলিও সেকারণেই যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা পাবার জন্যে মরক্কোর এই ‘দরজা’ খোলা দেখতে চায়। ইউরোপের নিয়ন্ত্রণ থেকে বাঁচতেই মরক্কো যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকিয়েছিল।  

মরক্কোর যুক্তরাষ্ট্র কেন্দ্রিক রাজনীতি

মরক্কো যুক্তরাষ্ট্রের অনেক পুরোনো বন্ধু। যুক্তরাষ্ট্র তৈরি হবার সময়েই মরক্কোর সুলতান মোহাম্মদ বেন আব্দেল্লাহ ১৭৭৭ সালে ব্রিটেনের চোখ রাঙ্গানো উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন দিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ১৭৮৬ সালে মরক্কোর করা বন্ধুত্বের চুক্তি এখনও বলবত রয়েছে। ১৯০৬ সালে ইউরোপিয় শক্তিরা মরক্কোর দখল নেবার সময় যুক্তরাষ্ট্র এর বিরোধিতা করেছিল। ১৯৫৬ সালে ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাবার পরের বছরেই মরক্কোর রাজা পঞ্চম মোহাম্মদ ওয়াশিংটন সফর করেন। পরবর্তী রাজা দ্বিতীয় হাসানও কয়েকবার ওয়াশিংটন সফর করেন। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় মরক্কো যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবেই থাকে। ১৯৯৯ সাল থেকে পরবর্তী রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপারে তার পূর্ববর্তীদের নীতি অনুসরণ করেন। ১৯৮৭ সালে মরক্কোর সরকার যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের দেশের বিমান ঘাঁটিগুলি ব্যবহার করার অনুমতি দেয়। মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকায় মার্কিন সামরিক অপারেশন চালাতে মরক্কোর বিমান ঘাঁটিগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পলিসারিওর বিরুদ্ধে যুদ্ধে মরক্কোকে সামরিক সহায়তা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এই সামরিক সহায়তার পিছনে অর্থায়ন সৌদি আরব করে বলেই মনে করেন বিশ্লেষকেরা। ওয়াশিংটনে মরক্কোর পক্ষে শক্তিশালী লবিং গ্রুপ থাকায় পশ্চিম সাহারা ইস্যুতে মার্কিন সরকার মরক্কোকে সরাসরি সমর্থন না করলেও যুক্তরাষ্ট্র মূলতঃ মরক্কোর পক্ষেই থাকে। মার্কিনীরা পশ্চিম সাহার জন্যে মরক্কোর অধীনে স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে লবিং করতে থাকে।

২০১৯ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্র মরক্কোর কাছে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যে ২৫টা ‘এফ ১৬ ব্লক ৭২’ ফাইটার বিমান বিক্রয়ের অনুমোদন দেয়; এবং আরও প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারে বর্তমানে মরক্কোর বিমান বাহিনীতে থাকা ২৩টা ‘এফ ১৬’ বিমানকে আপগ্রেড করার কথা বলে। একই বছরের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর মরক্কোর কাছে আরও ১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির প্রস্তাবের অনুমোদন দেয়। ‘ডিফেন্স নিউজ’ বলছে যে, এর মাঝে ছিল ‘এফ ১৬’ যুদ্ধবিমানে ব্যবহারের জন্যে ৫ হাজার ৮’শ ‘মার্ক ৮২’ বোমা, ৩’শ ‘মার্ক ৮৪’ বোমা, ১’শ ৫টা ‘জেডিএএম’ বোমার কিট, ১’শ ৮০টা ‘জিবিইউ ১০’ বোমার কিট, ৪ হাজার ১’শ ২৫টা ‘জিবিইউ ১২’ বোমার কিট। এছাড়াও ৪’শ টা লঞ্চার সহ ২ হাজার ৪’শটা ‘টিওডব্লিউ’ ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। এক বছরের মাঝে মরক্কো যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের অস্ত্র কেনার অনুমোদন পায়।

২০২০এর ১০ই ডিসেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন যে, ইস্রাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম সাহারায় মরক্কোর সার্বভোমত্ব স্বীকার করে নিয়েছে। পরদিনই যুক্তরাষ্ট্র মরক্কোর কাছে আরও ১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির ঘোষণা দেয়। ‘রয়টার্স’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, এই অস্ত্রের মাঝে রয়েছে চারটা ‘এমকিউ ৯বি সী গার্ডিয়ান’ ড্রোন এবং ‘হেলফায়ার’ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ‘পেইভওয়ে’ ও ‘জেডিএএম’ বোমা। এই অস্ত্রগুলি পশ্চিম সাহারা নিয়ে পুনরায় সংঘাত শুরু হলে মরক্কোকে নিশ্চিতভাবে এগিয়ে রাখবে।

জিব্রালটার প্রণালী নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র বনাম ইউরোপ

মরক্কোর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বহুকালের। যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে ভূমধ্যসাগরে ঢোকার একটা পথ হলো জিব্রালটার। এছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ধরে রাখতে মরক্কো একটা দরজার মতো। আরব দেশগুলিও সেকারণেই যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা পাবার জন্যে মরক্কোর এই ‘দরজা’ খোলা দেখতে চায়। ইউরোপের নিয়ন্ত্রণ থেকে বাঁচতেই মরক্কো যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকিয়েছিল। মরক্কোর নিরাপত্তা চিন্তায় ইউরোপ সবসময়ই রূঢ় বাস্তবতা; কারণ ইউরোপ মরক্কোকে ভূমধ্যসাগরে ঢোকার পশ্চিম দরজার দক্ষিণ পাল্লা হিসেবে দেখে। একারণেই বিংশ শতকে ইউরোপিয় উপনিবেশ হওয়া থেকে বাঁচতে পারেনি মরক্কো; যার ফলশ্রুতিতে বর্তমান মরক্কো অর্থনৈতিকভাবে ইউরোপের উপর অনেকটাই নির্ভরশীল। তবে নির্ভরশীলতা একমুখী নয় মোটেই; কারণ ইউরোপিয়রাও মরক্কোতে তাদের বিনিয়োগের সুরক্ষা চায়।

অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্ব ইউরোপের সাথে দরকষাকষিতে মরক্কোকে শক্ত ভিত্তি দেয়। একারণেই ১৯৭০এর দশক থেকে সামরিক শক্তি দিয়ে পশ্চিম সাহারাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করলেও মরক্কোর উপর কোন অবরোধ কেউ দিতে পারেনি। উল্টো পলিসারিওর সাথে যুদ্ধে মরক্কো যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা অস্ত্র পেয়েছে। তবে মরক্কোর প্রায় ২ লক্ষ সদস্যের সেনাবাহিনী পশ্চিম সাহারায় ব্যস্ত থেকে জিব্রালটার এবং স্প্যানিশ ছিটমহলগুলি থেকে যে দূরে থাকছে, সেব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র খুব বেশি চিন্তিত হবার কথা নয়। পশ্চিম সাহারার ফ্রন্টলাইন অনেকদিন ঠান্ডা থাকার পর আবারও উত্তপ্ত হচ্ছে; যা মূলতঃ পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থারই ফলাফল। সুপারপাওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতা মরক্কোর উপর ইউরোপের চাপ বৃদ্ধির পিছনে বড় কারণ। ইস্রাইলের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের মতো জনবিরোধী সিদ্ধান্তও মরক্কোর সরকার নিয়েছে পশ্চিম সাহারায় মরক্কোর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি পাবার জন্যে। তবে এর ফলশ্রুতিতে ইউরোপের সাথে মরক্কোর সম্পর্ক টানাপোড়েনের মাঝে পড়েছে। যদিও মরক্কোর সাথে ইউরোপের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবার সম্ভাবনা কম, তথাপি মরক্কোর উত্তর উপকূলে স্পেনের ছিটমহলগুলি যখন হাজারো শরণার্থীর জোয়ারে ভেসে যাবার উপক্রম, তখন এই ছিটমহলগুলির সামনের দিনগুলিতে ইউরোপের ‘ব্রিজহেড’ হিসেবে থাকার সম্ভাবনা প্রশ্নের মুখে পড়ে। জিব্রালটার প্রণালীর উভয় উপকূল নিয়ন্ত্রণে রাখা ইউরোপের জন্যে ততক্ষণই কঠিন, যতক্ষণ যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী হাতে মরক্কোর নিরাপত্তার দায়ভার নিতে পারবে। সাম্প্রতিক সময়ে মরক্কোর জন্যে বিপুল সামরিক সহায়তা ইউরোপের জন্যে সেই বার্তা বহণ করে।

Friday, 4 June 2021

জার্মানি কেন নিজস্ব ভূরাজনৈতিক কৌশল প্রণয়ন করছে?

০৪ঠা জুন ২০২১

জার্মানরা বুঝতে পারছে যে, ঠান্ডা যুদ্ধের পর তৈরি করা বিশ্বব্যবস্থা এখন পুরোপুরিভাবে ভেঙ্গে পড়ছে। তাই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে অনুসরণ করা ছাড়া তাদের সামনে আর কোন গত্যন্তর নেই। তবে ২০৪০ সালের কৌশল বলে দিচ্ছে যে, ন্যাটো, ইইউ এবং যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে জার্মানি এখনও এককভাবে নিজের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে এগুবার ব্যাপারে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী নয়।


জার্মান সরকার সাম্প্রতিক সময়ে ঘোষণা দিয়েছে যে, তারা ২০২১ সালে ইন্দোপ্যাসিফিকে তাদের নৌবাহিনীর একটা ফ্রিগেট মোতায়েন করবে। ২০০২ সালের পর থেকে এশিয়ার সমুদ্রে জার্মান নৌবাহিনী প্রথমবারের মতো আনাগোণা করবে। কিন্তু জার্মানির ইন্দোপ্যাসিফিকে যুদ্ধজাহাজ প্রেরণের উদ্দেশ্য কি? অনেকেই বলছেন যে, এটা চীনের প্রতি একটা বার্তা। আবার কেউ কেউ বলছেন যে, এটা জার্মানির বন্ধুদের প্রতিই একটা বার্তা। তবে এখানে প্রথম প্রশ্ন হলো, এটা কি জার্মান কৌশলগত চিন্তায় কোন পরিবর্তনের প্রতিফলন কিনা।

জার্মানির কৌশলগত চিন্তায় পরিবর্তন কেন?

জার্মানির রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তারা কিভাবে চিন্তা করছেন, তার একটা সম্যক ধারণ পাওয়া যাবে ২০১৭ সালে ফাঁস হওয়া একটা গোপন দলিল থেকে। জার্মান পত্রিকা ‘ডের স্পাইজেল’ জার্মান সেনাবাহিনীর প্ল্যানিং অফিসের ১’শ ২ পৃষ্ঠার ২০৪০ সাল পর্যন্ত কৌশলগত ভবিষ্যৎবাণীর এই দলিল ফাঁস করে দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি প্রথমবারের মতো এরকম একটা দলিল তৈরি করেছে। পত্রিকাটা বলছে যে, এই দলিল লেখা হয়েছিল ২০১৫ সালের দিকে। ২০৪০ সাল পর্যন্ত ভূরাজনৈতিক ঘটনাবলীকে মোটামুটি ছয়টা সম্ভাবনার মাঝে আলোচনা করা হয়। প্রথম দু’টা সম্ভাবনাই মূলতঃ ইইউএর সমস্যা নিয়ে; যেখানে বলা হচ্ছে যে, ইইউ ব্যাপক সমস্যার মাঝে থাকলেও আটলান্টিকের ওপাড়ের সাথে দৃঢ় সম্পর্ক রাখার মাধ্যমে কোনমতে টিকে থাকবে। এর মাঝে জার্মানির নিরাপত্তার ফোকাস থাকবে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির সহায়তায় শান্তি রক্ষার কাজ করা।

তৃতীয় সম্ভাবনাটা হলো পশ্চিমা দুনিয়ায় উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়া; যার কেন্দ্রে থাকবে জাতীয়তাবাদের উত্থান এবং সন্ত্রাসবাদ। চতুর্থ সম্ভাবনা হলো ইউরোপ এবং চীনে অর্থনৈতিক মন্দা। জার্মানির প্রধান দুই বাজার হলো এগুলি। সুতরাং এদের মন্দা মানেই জার্মানিও অর্থনৈতিকভাবে মারাত্মক হুমকিতে পড়বে।

পঞ্চম সম্ভাবনা হলো পশ্চিমের সাথে পূর্বের প্রতিযোগিতার বৃদ্ধি। এখানে পশ্চিম বলতে ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝানো হয়েছে; ইইউকে বাদ দিয়ে চিন্তা করা হয়েছে। অপরদিকে পূর্বকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে চীন এবং রাশিয়া হিসেবে। তবে এই উত্তেজনা বড় কোন সংঘাতে রূপ নিতে পারে বলে তারা মনে করছেন না। তাদের ধারণা, বাণিজ্যকে টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রগুলি যুদ্ধ এড়িয়ে যাবে। এই দ্বন্দ্বে পূর্ব ইউরোপের কিছু দেশ হয়তো রাশিয়ার পক্ষ নিতে পারে।

ষষ্ঠ সম্ভাবনাটা হলো সবচাইতে মারাত্মক। তারা বলছেন যে, এটার মানে হলো ইইউ পুরোপুরি ভেঙ্গে যাবে; এবং একইসাথে যুক্তরাষ্ট্র তার বৈশ্বিক নেতৃত্বকে ধরে রাখতে পারবে না। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সমস্যা মারাত্মক আকার ধারণ করবে এবং তা থামাবার ক্ষমতা পশ্চিমা দুনিয়ার কারুরই থাকবে না।

এই বিশ্লেষণের অর্থ হলো, জার্মানরা মনে করছে যে, সামনের দিনগুলি আরও অনেক বেশি অনিশ্চিত হবে। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘জিওপলিটিক্যাল ফিউচার্স’ বা ‘জিপিএফ’এর বিশ্লেষণে জার্মানির সমস্যাগুলিকে সহজভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দা ইইউএর মাঝে ফাঁটল ধরায়। অর্থনৈতিক চাপে পড়ে একেক দেশ একেকভাবে চিন্তা করতে থাকে। এই ফাঁটল আরও ব্যাপক আকার ধারণ করে যখন সিরিয়া যুদ্ধের কারণে হাজার হাজার শরণার্থী ইউরোপে প্রবেশ করতে থাকে। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলি শরণার্থীদেরকে তাদের দেশের উপর দিয়ে যেতে দেয়; কারণ শরণার্থীরা পশ্চিম ইউরোপেই যেতে চাইছিল। এরপর ২০১৪ সালে রাশিয়া ইউক্রেনের কাছ থেকে ক্রিমিয়া দখল করে নিলে ন্যাটোর মাঝে ফাঁটল দেখা দেয়। জার্মানি রাশিয়ার গ্যাসের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল; অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে জার্মানি যাতে রাশিয়ার উপর নির্ভরশীলতা না রাখে। জার্মানির উল্টো পথে হাঁটছে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলই; যারা রাশিয়ার হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের উপর বেশি নির্ভরশীল হতে থাকে।

‘জিপিএফ’ বলছে যে, ইউরোপে জাতীয়তাবাদ বাণিজ্যকে বাধাগ্রস্ত করবে; যা জার্মানির রপ্তানিভিত্তিক অর্থনীতিকে আঘাত করবে। অর্থাৎ এতে ইইউএর কাঠামো ক্রমেই প্রশ্নবিদ্ধ হতে থাকবে। জার্মানি ইইউএর মাঝে ছিল শুধু অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণে নয়। জার্মানরা মনে করেছে যে, ইইউএর ভেতরে থাকার মাধ্যমে জার্মানি ইউরোপের মাটিতে তার অপর প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথে সংঘাত এড়াতে পারবে। অপর এই প্রতিদ্বন্দ্বী হলো ফ্রান্স। অপরদিকে ২০১৪ সালের পর থেকে জার্মানি বুঝতে শুরু করে যে, ইইউ এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে নিজের স্বার্থ হিসেবে আর চিন্তা করা যাবে না। কাজেই নিজের স্বার্থ অনুযায়ী কৌশল ঠিক করার সময় এসেছে। তবে ‘জিপিএফ’ বলছে যে, জার্মানরা নিজেদেরকে অনিরাপদ ভাবা শুরু করলে তারা নিজেদের সামরিক বাজেট বৃদ্ধি করবে; যা কিনা যুক্তরাষ্ট্র অনেকদিন থেকেই চাইছে।

 
যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের দ্বন্দ্বে নিশ্চিতভাবে কোন পক্ষ নিতে জার্মানি বাধ্যবাধকতার মাঝে পড়তে চাইছে না; বরং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো জার্মানি নিজস্ব স্বকীয়তা পেতে চাইছে। তথাপি অদূর ভবিষ্যতে জার্মানি হয়তো ইন্দোপ্যাসিফিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দ্বন্দ্বে জড়াবে না; বরং জার্মানি নিজের অর্থনৈতিক শক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষেই মোতায়েন করছে।



জার্মানরা কিভাবে তাদের সামনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে চাইছে?

ব্রিটিশ ‘রয়াল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইন্সটিটিউট’এর এক লেখায় জার্মানির পটসড্যাম ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর ম্যাক্সিমিলিয়ান টেরহাল বলছেন যে, ১৯৪৯ সালে যে চিন্তা নিয়ে ন্যাটো গঠিত হয়েছিল, সেটারই একটা পরিবর্তিত ধরন নিয়ে একুশ শতকের কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। ১৯৪৯ সালে যেখানে বলা হয়েছিল যে, ন্যাটো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রকে ভেতরে রাখার জন্যে এবং একইসাথে রাশিয়াকে বাইরে রাখা এবং জার্মানিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যে। এখন ২০২০এর দশকে এসে কথাগুলির প্রথম দুই অংশ এক রেখে শুধু জার্মানির স্থানে চীনকে বসাতে করতে হবে। তিনি বলছেন যে, চীনারা তাদের প্রভাব বিস্তার করতে গিয়ে ইউরোপিয় ইউনিয়নের দুর্বল দেশগুলিকে টার্গেট করছে। বিশেষ করে করোনাভাইরাসের মহামারির মাঝে ইতালি এবং গ্রিসের চীনা বিনিয়োগের লোভের মাঝে পড়ে যাবার কথা বলছেন তিনি। তার মতে জার্মানির উচিত হবে ইইউএর এহেন দুর্বল সময়ে ইউরোপের নেতৃত্ব দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝানো যে, চীনকে নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে ইউরোপের দরকার রয়েছে। টেহহাল রাশিয়াকে ইউরোপের প্রতি হুমকি হিসেবে দেখছেন; এবং মনে করছেন যে, যদি যুক্তরাষ্ট্র চীনের সাথে কোন সংঘাতে জড়িয়ে পরে, তাহলে রাশিয়া ইউরোপের সিমানায় নিজের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ নেবে। তখন যারা রাশিয়ার শক্তি কমে গেছে বলে বলছেন, তারা দু’বার চিন্তা করতে বাধ্য হবেন। তিনি ইউরোপের সকল দেশের সামরিক বাজেট বৃদ্ধি করার পক্ষপাতি। এভাবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ইউরোপের ব্যাপারে আগ্রহী করে রাখতে চাইছেন এবং একইসাথে রুশ হুমকিকে মোকাবিলা করার কথা বলছেন। দুনিয়ার উপর পশ্চিমাদের অর্থনৈতিক এবং সামরিক নেতৃত্ব ধরে রাখতে ইউরোপকে একত্রিত হতে হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রকেও সাথে রাখতে হবে বলে বলছেন তিনি। আর সেই আঙ্গিকে বিশ্বব্যাপী চলমান ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে বাস্তবতা ধরে এঙ্গেলা মার্কেলের পর জার্মানির নতুন চ্যান্সেলরকে ইউরোপের নেতৃত্ব দেবার চেষ্টা করতে হবে।

জার্মান সামরিক বাহিনীর ক্রয় পরিদপ্তরের কর্মকর্তা ডমিনিক ঊল্লার্স অবশ্য ইউরোপের একমত হবার ব্যাপারে অতটা আশাবাদী নন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র যখন তার শক্তিকে চীনের বিরুদ্ধে মোতায়েন করছে, তখন ইউরোপকে যেমনি আলাদাভাবে চিন্তা করতে হবে, তেমনি ইউরোপের প্রধান দেশগুলিকেও আলাদাভাবে চিন্তা করতে হবে। 'ওয়ার অন দ্যা রকস' ম্যাগাজিনের এক লেখায় তিনি উদাহরণস্বরূপ গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত জার্মান সরকারের ইন্দোপ্যাসিফিক কৌশলকে টেনে নিয়ে আসেন। তিনি বলছেন যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে জার্মানিতে যুদ্ধবিরোধী মনোভাব এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে তুলে ধরে সেই আলোকে নিজস্ব স্বার্থের উপর ভিত্তি করে কৌশল প্রণয়ন করাটা কারুর কাছেই গ্রহণযোগ্য ছিল না। কিন্তু জার্মানি এখন সেই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকেই তার কৌশল প্রণয়নের কেন্দ্রে রেখেছে। ইউরোপে চীনাদের অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তার জার্মানির অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রতি হুমকি হওয়ায় জার্মানি ইউরোপে চীনাদের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবে। অপরদিকে ইন্দোপ্যাসিফিকের ৪’শ কোটি মানুষের বিশাল বাজার এবং সেখানকার বিশাল জনশক্তির উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা শিল্প অবকাঠামো জার্মানির অর্থনৈতিক স্বার্থকে ধরে রাখার জন্যে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অত্র অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলির নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জ জার্মানির নিরাপত্তার জন্যে হুমকি। একারণেই জার্মানি তার অর্থনৈতিক স্বার্থকে রক্ষা করতে ইন্দোপ্যাসিফিকে নৌবাহিনীর একটা জাহাজ পাঠাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে জার্মানি একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক আইনকে রক্ষা করার ব্রত নিয়ে অন্যান্য ইউরোপিয় দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একই লক্ষ্যে কাজ করবে, তেমনি একইসাথে নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থকে রক্ষা করতে নিজস্ব কৌশল বাস্তবায়ন করবে। যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের দ্বন্দ্বে নিশ্চিতভাবে কোন পক্ষ নিতে জার্মানি বাধ্যবাধকতার মাঝে পড়তে চাইছে না; বরং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো জার্মানি নিজস্ব স্বকীয়তা পেতে চাইছে। তথাপি অদূর ভবিষ্যতে জার্মানি হয়তো ইন্দোপ্যাসিফিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দ্বন্দ্বে জড়াবে না; বরং জার্মানি নিজের অর্থনৈতিক শক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষেই মোতায়েন করছে।

 
আফগানিস্তানে কৌশলগত ব্যর্থতা জার্মান নেতৃত্বের প্রতি জার্মান সেনাদের বিশ্বস্ততাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। একারণেই জার্মান সেনাদের মাঝে উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক দল ‘অলটারনেটিভ ফর জার্মানি’ বা ‘এএফডি’র জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আফগানিস্তান মিশনের কারণেই জার্মানরা এখন প্রশ্ন করছে যে, প্রতি বছর ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ করে একটা সামরিক বাহিনী পোষার অর্থ কি? জার্মান সরকারের কাছে এই প্রশ্নের কোন উত্তর নেই।


জার্মান সামরিক বাহিনী … ন্যাটোর অধীনে কতদিন?

‘ডয়েচে ভেলে’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, আফগানিস্তানে জার্মান সেনাদের থাকার মেয়াদ আরও ১০ মাস বাড়িয়ে ২০২২ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত করা হয়েছে। জার্মানরা প্রশ্ন করছে যে, এই মিশন আসলে কতটা সফল হয়েছে? এই মিশনের পিছনে ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। প্রায় ১৩’শ জার্মান সেনা আফগানিস্তানে মোতায়েন রয়েছে। এ পর্যন্ত ৫৯ জন সেনা সেখানকার সংঘাতে প্রাণ হারিয়েছে। ‘ইউনিভার্সিটি অব পটসড্যাম’এর প্রফেসর সোনকা নাইতজেল বলছেন যে, আফগানিস্তানে যাবার পিছনে জার্মানদের কোন কৌশলগত চিন্তাই ছিল না। তারা অন্ধভাবে যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটোকে অনুসরণ করেছে। তৎকালীন জার্মান চ্যান্সেলর গেরহার্ড শ্রোডার সেপ্টেম্বর ১১এর ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সহমর্মিতা দেখাতে আফগানিস্তানে সৈন্য প্রেরণ করেছিল। চিন্তাটা ছিল এমন যে, ছয় মাসের মাঝেই সেই সেনাদেরকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। পরবর্তীতে চ্যান্সেলর এঙ্গেলা মার্কেল মনে করেছেন যে, আফগানিস্তানে সৈন্য রাখার মাধ্যমে জার্মানি ন্যাটো, জাতিসংঘ এবং ইইউএর মাঝে নিজের প্রভাব ধরে রাখছে। তাই সেখান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত পিছাতে পিছাতে দুই দশকে ঠেকেছে। আফগানিস্তানে মোতায়েনকৃত জার্মান সেনাদেরকে বলা হয়েছে যে, তালিবানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাটা তাদের দায়িত্ব নয়। অন্যদিকে বহুজাতিক বাহিনীর কমান্ডাররা যুদ্ধ করতে গিয়ে জার্মান সেনাদেরকে পাশে না পেয়ে তাদেরকে ভিতু বলে আখ্যা দিয়েছে।

জার্মানরা তাদের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি মুছে ফেলার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে পারছে না। তাই সৈন্যদেরকে যুদ্ধ করতে বলার মতো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত জার্মান নেতৃবৃন্দ নিতে পারছে না। জার্মানরা ন্যাটো মিশনে গিয়েছে; কিন্তু তাদের ইতিহাসের ভয়ে তারা ন্যাটোর লক্ষ্য বাস্তবায়নে অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলির সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেনি। তারা ন্যাটোর মাঝে সর্বদাই ‘কিছুটা জড়িত’ থেকেছে। একারণেই আফগানিস্তানের কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলিতেও জার্মানরা অংশগ্রহণ করতে পারেনি; তাদেরকে দ্বিতীয় সাড়ির গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। নাইতজেল বলছেন যে, আফগানিস্তানে কৌশলগত ব্যর্থতা জার্মান নেতৃত্বের প্রতি জার্মান সেনাদের বিশ্বস্ততাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। একারণেই জার্মান সেনাদের মাঝে উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক দল ‘অলটারনেটিভ ফর জার্মানি’ বা ‘এএফডি’র জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। নাইতজেল বলছেন যে, আফগানিস্তান মিশনের কারণেই জার্মানরা এখন প্রশ্ন করছে যে, প্রতি বছর ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ করে একটা সামরিক বাহিনী পোষার অর্থ কি? জার্মান সরকারের কাছে এই প্রশ্নের কোন উত্তর নেই।

জার্মান সামরিক বাহিনীর ওয়েবসাইট বলছে যে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ৭’শ জার্মান সেনা মোতায়েন রয়েছে। এদের সকলেরই মিশন হলো শান্তিরক্ষা করা। আফগানিস্তানে ন্যাটোর অধীনে মিশন ছাড়াও পশ্চিম আফ্রিকার মালিতে ফরাসিদের সহায়তা করার জন্যে জাতিসংঘের অধীনে ৯’শ জার্মান সেনা মোতায়েন রয়েছে সেখানে। মোটকথা এই সবগুলির কোনটাই জার্মানির নিজস্ব মিশন নয়। কিন্তু জার্মান নেতৃত্ব মনে করছে যে, ন্যাটো এবং জাতিসংঘের অধীনে এই মিশনগুলি আন্তর্জাতিকভাবে জার্মানির প্রভাব ধরে রাখার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন জার্মান প্রতিরক্ষানীতি … কতটুকু বাস্তব?

২০১৬ সালে জার্মান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক শ্বেতপত্রেও প্রায় একই ধরনের চিন্তার উল্লেখ রয়েছে। জার্মান চ্যান্সেলর এঙ্গেলা মার্কেল এই শ্বেতপত্রের ভূমিকায় লেখেন যে, সাম্প্রতিক বছরগুলি দেখিয়ে দেয় যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে গঠন করা ইউরোপিয় ব্যবস্থা যত সফলই হোক না কেন, এই সফলতা চিরস্থায়ী নয়। একুশ শতকে ইউরোপে সামরিক শক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রের সীমানা পরিবর্তন হবে; এটা কেউ চিন্তাই করেনি। প্রতিরক্ষা ম্যাগাজিন ‘আর্মি টেকনলজি’র এক প্রতিবেদনে শ্বেতপত্রের বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, এতকাল জার্মানি তার সামরিক শক্তিকে ন্যাটোর অধীনেই মোতায়েন করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের পরিস্থিতি জার্মানদেরকে সক্রিয় প্রতিরক্ষানীতি গ্রহণ করতে বাধ্য করেছে। একসময় জার্মানি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের রেজোলিউশন ছাড়া, অথবা ন্যাটোর কাঠামোর বাইরে সামরিক বাহিনী পাঠানো থেকে দূরে থেকেছে। এখন ন্যাটোর বাইরে অন্য কোন স্থানে সামরিক শক্তি মোতায়েনকে জার্মানরা স্বাভাবিক হিসেবে চিন্তা করতে শুরু করেছে।

শ্বেতপত্রে জার্মানির সামরিক বাজেট বৃদ্ধি করার কথা বলা হয়। ২০২৩ সালের মাঝে সেনাবাহিনীর সদস্যসংখ্যা ১৪ হাজার ৩’শ বৃদ্ধি করতে চাইছে জার্মানি। তবে জার্মানির সামরিক বাহিনী বহুদিন ধরে কম বাজেটের উপর চলার কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০১৪ সালে ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, নৌবাহিনীর বেশিরভাগ সাবমেরিন সার্ভসের বাইরে রয়েছে; সেনাবাহিনীর ‘বক্সার’ আর্মার্ড ভেহিকলগুলির ৪০ শতাংশেরও কম কর্মক্ষম রয়েছে; নৌবাহিনীর ৪২টা ‘এনএইচ ৯০’ হেলিকপ্টারের মাঝে মাত্র ৭টা ওড়ার মতো অবস্থায় রয়েছে। এই হেলিকপ্টার ক্রয়ের প্রকল্প এতটাই সমস্যার মাঝে পতিত হয়েছে যে, ২’শ হেলিকপ্টার ক্রয়ের লক্ষ্য থাকলেও এখন কেনা হচ্ছে মাত্র ৮২টা। সামরিক বাজেট যতটা বৃদ্ধির কথা বলা হচ্ছে, তা প্রকৃতপক্ষে প্রয়োজনের তুলনায় নগন্য। আর নতুন ভূরাজনৈতিক কৌশল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তা কতটুকু বাস্তবমুখী হবে, তা প্রশ্ন করাই যায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে জার্মানরা যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটোর কৌশলগত উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কাজ করছে। ইইউএর মাঝে জার্মানির অবস্থান মূলতঃ অর্থনৈতিক কারণে মনে হলেও সেটাও আসলে ফ্রান্সের সাথে সংঘাত এড়াবার জন্যে। কিন্তু একুশ শতকে পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থা জার্মানিকে বাস্তবতা শেখাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে চীন যখন ইউরোপের চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে, তখন ইউরোপের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হিমসিম খাচ্ছে জার্মানি। উল্টো রাশিয়ার গ্যাসের উপর জার্মান নির্ভরশীলতা বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের তোপের মুখে পড়তে হচ্ছে বার্লিনের নেতৃত্বকে। ঠান্ডা যুদ্ধ শেষ হবার পর থেকে বড় কোন যুদ্ধের আশংকামুক্ত থাকায় জার্মান সামরিক বাজেটে কৃপণতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে মরচে পড়া জার্মান অস্ত্রসস্ত্রের উপর। আর ন্যাটোকে অন্ধভাবে অনুসরণ করে আফগানিস্তানের যুদ্ধে অর্থহীনভাবে জড়িয়ে পড়াকে রাজনৈতিকভাবে বৈধতা দিতে গিয়ে জার্মানিতে উগ্র জাতিয়তাবাদের উত্থান হচ্ছে। জার্মানরা বুঝতে পারছে যে, ঠান্ডা যুদ্ধের পর তৈরি করা বিশ্বব্যবস্থা এখন পুরোপুরিভাবে ভেঙ্গে পড়ছে। তাই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে অনুসরণ করা ছাড়া তাদের সামনে আর কোন গত্যন্তর নেই। তবে ২০৪০ সালের কৌশল বলে দিচ্ছে যে, ন্যাটো, ইইউ এবং যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে জার্মানি এখনও এককভাবে নিজের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে এগুবার ব্যাপারে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী নয়।

Tuesday, 1 June 2021

‘ওয়ান চাইল্ড’ থেকে ‘থ্রি চাইল্ড’ ... কোন পথে চীন?

০২রা জুন ২০২১ 
‘ওয়ান চাইল্ড’ নীতির কারণে চীনে যেমন অবিবাহিত মধ্যবয়সী পুরুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি শহরাঞ্চলে বেশি খরচের ভয়ে মহিলারা একের বেশি সন্তান নিতে না চাওয়ায় ‘টু চাইল্ড’ এবং ‘থ্রি চাইল্ড’ নীতির সফলতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অর্থনীতিকে এতটা প্রাধান্য দেয়ার পরেও চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ব্যাপারে কেউই নিশ্চিত নয়। মানুষের প্রবৃত্তিকে এড়িয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়ার ফলশ্রুতিতে সমাজ, অর্থনীতি এবং রাজনীতি, সবগুলিই এখন ঝুঁকির মাঝে পড়েছে; যা সামনের দিনগুলিতে চীনের ভূরাজনৈতিক আকাংক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করবে।


গত ৩১শে মে চীন ঘোষণা করেছে যে, চীনা দম্পতিরা এখন থেকে সর্বোচ্চ তিনজন সন্তান গ্রহণ করতে পারবেন। চীনা বার্তা সংস্থা ‘শিনহুয়া’ জানাচ্ছে যে, পলিটব্যুরোর বৈঠকে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এব্যাপারে সম্মতি দিয়েছেন। মে মাসের শুরুতে প্রকাশিত আদম শুমারিরতে দেখা যায় যে, ২০২০ সালে চীনে প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ শিশু জন্ম নিয়েছে; যা কিনা ২০১৬ সালে ছিল ১ কোটি ৮০ লক্ষ। ১৯৬০এর দশকের পর থেকে এটা সর্বনিম্ন সংখ্যা। ২০১৬ সালে চীনা সরকার তাদের ‘ওয়ান চাইল্ড’ নীতিতে পরিবর্তন এনে দম্পতিদেরকে দু’টা সন্তান গ্রহণ করতে অনুমতি দেয়। সেই অনুমতির পর থেকে দুই বছরের জন্যে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও তা আবারও অবনতির দিকে যেতে থাকে। চার বছরের মাথায়ই চীনা সরকার সেই নীতিতে দ্বিতীয়বারের মতো পরিবর্তন আনলো। ১৯৭৯ সালে চীনা সরকার নিয়ম করেছিল যে, চীনা দম্পতিরা একটার বেশি সন্তান গ্রহণ করতে পারবে না। যে পরিবার এই নিয়ম মানেনি, তাদেরকে জরিমানা এবং চাকুরিচ্যুত করা ছাড়াও গর্ভপাতে বাধ্য করা হয়েছিল। বারংবার নীতি পরিবর্তনের একদিকে যেমন অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে, তেমনি তা চীনের তথা বিশ্বের ভূরাজনীতিতেও ভূমিকা রাখবে।

‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, চীনের ‘ওয়ান চাইল্ড’ নীতির কারণে দেশটাতে পুরুষ মহিলার অনুপাতে মারাত্মক ধরনের ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। বেশিরভাগ পরিবারই একটা সন্তান নেবার ব্যাপারে ছেলে সন্তানকে গুরুত্ব দিতে থাকে। ‘ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর’এর প্রফেসর মু ঝেং বলছেন যে, চীনা সরকারের এই নীতির ফলে আর্থসামাজিক দিক থেকে অপেক্ষাকৃত নিচের ঘরে জন্ম নেয়া পুরুষরা বিয়ের জন্যে পাত্রী পেতে ব্যর্থ হয়। বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা ‘রয়টার্স’ বলছে যে, পরিবর্তিত নিয়ম চীনের একেক অঞ্চলে একেকভাবে প্রতিফলিত হবে। বড় শহরগুলিতে জীবনযাত্রার খরচ বেশি হওয়ায় অনেক মহিলাই আরেকটা সন্তান গ্রহণ করতে দু’বার চিন্তা করবে; অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলের মানুষ খরচের চাইতে পরিবারের রীতিকেই বেশি গুরুত্ব দেবে। এতে নতুন ধরনের আর্থসামাজিক সমস্যার জন্ম হতে পারে। অনেকেই মনে করছেন যে, যেহেতু কয়েক দশকে চীনের অর্থনীতির আকার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, তাই চীনের জনসংখ্যা কমে যাবার ব্যাপারটা সারা বিশ্বের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে। কারণ চীনের অর্থনীতিকে বড় করতে যথেষ্ট সংখ্যক নবীন জনগণ পাওয়া যাবে না; বৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা বাড়বে প্রতিনিয়ত। ২০১০ সালে যেখানে জনসংখ্যার ৯ শতাংশ ছিল ৬৫ বছরের উপর; সেখানে ২০২০ সালে তা দাঁড়িয়েছে সাড়ে ১৩ শতাংশে। চীনা সরকার জনগণের অবসরে যাবার বয়স বাড়িয়ে এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে পারে।

‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, চীনের বাজারভিত্তিক অর্থনীতি সেদেশে ব্যাপকহারে বেশ্যাবৃত্তির জন্ম দিয়েছে। যদিও চীনে বেশ্যাবৃত্তি বেআইনী, তথাপি জনসংখ্যার মাঝে মহিলার সংখ্যা কম হওয়ায় এবং বহু মানুষ শহরের শিল্পাঞ্চলে কাজের জন্যে চলে আসার কারণে বেশ্যাবৃত্তিকে থামানো যাচ্ছে না। ‘হাফিংটন পোস্ট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ‘হ্যাপি এনডিং’এর নামে সেখানে বেশ্যাবৃত্তি চলছে। কিছু শহরে ম্যাসাজ পার্লারের নামে চলছে বেশ্যাবৃত্তি। ‘ফরেন পলিসি’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, সোশাল মিডিয়া ব্যবহার করে বেশ্যাবৃত্তির ব্যাপক প্রসার হচ্ছে। চীনে এখন মানুষ বিক্রি না হলেও মানুষ ভাড়ায় পাওয়া যাচ্ছে!
 
২০১৬ সালে উইঘুরে প্রতি এক লক্ষ জনগণের মাঝে ৫০ জনকে বন্ধ্যা করে ফেলা হচ্ছিল; ২০১৮ সাল নাগাদ তা পাঁচ গুণ বেড়ে প্রতি লক্ষে ২’শ ৪৩এ গিয়ে দাঁড়ায়! অথচ পুরো চীনের জন্যে এই সংখ্যা হলো এক লক্ষে মাত্র ৩৩ জন! অর্থাৎ পুরো চীনের তুলনায় উইঘুরে বন্ধ্যাত্ব ৭ গুণেরও বেশি! চীনা সরকারের জনহার নিয়ন্ত্রণের নীতি পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দিলে উইঘুরের মত বিদ্রোহী অঞ্চলগুলিতে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সরকারি চেষ্টাকে বৈধতা দেয়া কঠিন হবে।


‘সিএনএন’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, কিছু সমালোচক প্রশ্ন করছেন যে, চীনা সরকার কেন তাদের দম্পতিদের সর্বোচ্চ তিনটা সন্তান নিতে অনুমতি দিচ্ছে? কেন তারা এটা পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দিচ্ছে না? এর উত্তর হয়তো চীনের পশ্চিমের মুসলিম অধ্যুষিত শিনজিয়ান বা উইঘুর প্রদেশের নীতিতে পাওয়া যাবে। সেখানে চীনা সরকার মুসলিমদের জন্ম হার মারাত্মকভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। ২০১৬ সালে উইঘুরে প্রতি এক লক্ষ জনগণের মাঝে ৫০ জনকে বন্ধ্যা করে ফেলা হচ্ছিল; ২০১৮ সাল নাগাদ তা পাঁচ গুণ বেড়ে প্রতি লক্ষে ২’শ ৪৩এ গিয়ে দাঁড়ায়! অথচ পুরো চীনের জন্যে এই সংখ্যা হলো এক লক্ষে মাত্র ৩৩ জন! অর্থাৎ পুরো চীনের তুলনায় উইঘুরে বন্ধ্যাত্ব ৭ গুণেরও বেশি! শিনজিয়াং সরকারের হিসেবে ২০১৭ সালে সেখানে জন্ম হার ছিল প্রতি হাজারে প্রায় ১৬ জন; ২০১৮ সালে তা কমে গিয়ে দাঁড়ায় প্রতি হাজারে প্রায় ১১ জনেরও কম। অর্থাৎ এক বছরের মাঝে জন্মহার প্রায় ৩৩ শতাংশ কমে গেছে! শিনজিয়াং সরকার বলছে যে, এটা তাদের জন্মনিয়ন্ত্রণ নীতি বাস্তবায়নের ফলাফল। অনেকেই বলছেন যে, চীনা সরকারের জনহার নিয়ন্ত্রণের নীতি পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দিলে উইঘুরের মত বিদ্রোহী অঞ্চলগুলিতে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সরকারি চেষ্টাকে বৈধতা দেয়া কঠিন হবে।

‘ওয়ান চাইল্ড’ নীতির কারণে চীনে যেমন অবিবাহিত মধ্যবয়সী পুরুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি শহরাঞ্চলে বেশি খরচের ভয়ে মহিলারা একের বেশি সন্তান নিতে না চাওয়ায় ‘টু চাইল্ড’ এবং ‘থ্রি চাইল্ড’ নীতির সফলতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অধিক সংখ্যক বৃদ্ধ মানুষ এবং কমসংখ্যক নবীন কর্মক্ষম মানুষ চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আগের মতো এগিয়ে নিতে পারবে কিনা, সেব্যাপারে কেউই নিশ্চিত নয়। অর্থনৈতিক ব্যাপারগুলিকে প্রাধান্য দিয়েই ১৯৭৯ সালে ‘ওয়ান চাইল্ড’ নীতিতে যায় চীন; আবার ২০২১ সালে এসে অর্থনৈতিক কারণেই ‘থ্রি চাইল্ড’ নীতির সফলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অর্থনীতিকে এতটা প্রাধান্য দেয়ার পরেও চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ব্যাপারে কেউই নিশ্চিত নয়। সন্তান নেবার ক্ষেত্রে শহর এবং গ্রামাঞ্চলের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য যেমন নতুন সামাজিক অসঙ্গতির জন্ম দেবে, তেমনি উইঘুরের মতো মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে বৈষম্যমূলক নীতি বাস্তবায়নের কারণে রাজনৈতিক সমস্যাও কম হবে না। অর্থনৈতিক কারণেই চীনারা পুরুষ সন্তানকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে; এখন বিয়ের জন্যে কনে পাবার সম্ভাবনা কমে যাওয়ায় এবং প্রবৃত্তিকে পরিতৃপ্ত করার আর কোন আইনী পদ্ধতি না থাকায় সেদেশে বেশ্যাবৃত্তি থামানো যাচ্ছে না। মানুষের প্রবৃত্তিকে এড়িয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়ার ফলশ্রুতিতে সমাজ, অর্থনীতি এবং রাজনীতি, সবগুলিই এখন ঝুঁকির মাঝে পড়েছে; যা সামনের দিনগুলিতে চীনের ভূরাজনৈতিক আকাংক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করবে।

Wednesday, 26 May 2021

গাজা যুদ্ধ ... ইস্রাইলের নিরাপত্তাহীনতা বাড়ালো হামাসের বিজয়

২৬শে মে ২০২১
হামাসের কাছে থাকা মোট রকেটের সংখ্যা নিরূপণ যেমন ইস্রাইলের নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ, তেমনি ‘আয়রন ডোম’এর উপর নির্ভরশীল থাকার সত্ত্বেও এবং রাজনৈতিকভাবে অসমর্থনযোগ্য ব্যাপক বিমান হামলায় শতশত ফিলিস্তিনি হত্যার পরেও ইস্রাইলিদের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক না হওয়া এবং হতাহত পুরোপুরি বন্ধ না করতে পারা ইস্রাইলের দুর্বলতা তুলে ধরে। এবারের গাজার যুদ্ধ বলে দিচ্ছে যে, মান্ধাতার প্রযুক্তির ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইস্রাইলের যুদ্ধ জেতা শুধু কঠিনই নয়, বরং যুদ্ধ প্রতিরোধ করতে ইস্রাইলকে আশেপাশের দেশগুলির সহযোগিতার উপরেই বেশি নির্ভরশীল হতে হবে। অর্থাৎ নিজের নিরাপত্তার স্বার্থেই ইস্রাইল তার আশেপাশের দেশগুলির সাথে সম্পর্কোন্নয়নে এগুবে।


গাজা যুদ্ধের সময় ভিডিও ছড়াতে থাকে, যেখানে দেখা যাচ্ছিল যে, রাতের আকাশে একদিক থেকে উড়ছে ফিলিস্তিনি গ্রুপ হামাসের রকেট; আর অপর দিক থেকে উড়ছে ইস্রাইলের প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র, যা কিনা ‘আয়রন ডোম’ নামের একটা ব্যবস্থার অংশ। যুদ্ধ শেষ হবার আগেই প্রশ্ন উঠেছে যে, এই ‘আয়রন ডোম’এর কর্মক্ষমতা আসলে কতটুকু। এই ব্যবস্থার সক্ষমতার উপর ইস্রাইলের আকাশ প্রতিরক্ষাই ব্যবস্থাই শুধু নির্ভর করছে না, ইস্রাইলের আশেপাশের দেশগুলি ইস্রাইলের বিরুদ্ধে প্রক্সি যুদ্ধ করার ব্যাপারে কতটা আশাবাদী হতে পারে, তাও নির্ভর করবে। সে হিসেবে এর ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব যথেষ্ট।

ইস্রাইলি পত্রিকা ‘জেরুজালেম পোস্ট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ‘আয়রন ডোম’এর দুর্বলতা সবসময়েই ছিল। এর আগের যুদ্ধগুলিতে ‘আয়র ডোম’ হামাসের ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ রকেট ধ্বংস করতে পেরেছিল। তবে ইস্রাইলি ইন্টেলিজেন্সের কর্মকর্তারা সর্বদাই জানতেন যে, লেবাননের হিযবুল্লাহ মিলিশিয়াদের সক্ষমতা রয়েছে দিনে এক হাজার রকেট ছোঁড়ার। সেটা করতে পারলে নিশ্চিতভাবেই ‘আয়রন ডোম’এর সক্ষমতার সীমা পরিসীমা পরীক্ষা হয়ে যাবে। শুধু তাই নয়, ইস্রাইলি হিসেবে হিযবুল্লাহর হাতে রয়েছে দেড় লক্ষাধিক রকেট; যার মাধ্যমে তারা অনির্দিষ্ট সময়ের জন্যে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে। অপরদিকে ২০১৪ সালের গাজা যুদ্ধে হামাস ৫০ দিনে ৪ হাজার রকেট ছুঁড়েছিল। একদিনে সর্বোচ্চ দু’শ রকেট ছুঁড়েছিল তারা। আর এক’শর বেশি রকেট তারা ছুঁড়তে পেরেছিল খুব বেশি হলে দুই সপ্তাহ। কিন্তু এবারের যুদ্ধে হামাস কয়েক মিনিটের মাঝে শতাধিক রকেট ছুঁড়তে পেরেছে; যা এর আগে শোনা যায়নি। তদুপরি হামাসের কাছে কতগুলি রকেট রয়েছে, সেটার উপরেই নির্ভর করবে যে, যুদ্ধ কতদিন স্থায়ী হতে পারে। কাজেই সবচাইতে বড় প্রশ্ন হলো, হামাসের রকেটের সংখ্যার ব্যাপারে ইস্রাইলের ইন্টেলিজেন্সের ধারণা সঠিক কিনা। আর একারণেই ইস্রাইলের হিসেব কষতে হবে যে, তারা হামাস বা হিযবুল্লাহর বিরুদ্ধে একটা যুদ্ধ কতদিন চালিয়ে নিতে সক্ষম হবে। অথবা কত দ্রুত তাদেরকে সেনাবাহিনী প্রেরণ করতে হবে রকেট হামলা থামাতে। কারণ ইস্রাইলের ব্যাপক বিমান হামলা হামাসের রকেট হামলা থামাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।


 
‘ফোর্বস’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, এই যুদ্ধ হচ্ছে সর্বশেষ প্রযুক্তির বিরুদ্ধে মান্ধাতার প্রযুক্তির। দশ বছর আগে ‘আয়রন ডোম’ ডেভেলপ করেছিল ‘রাফায়েল এডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমস’। এতে রয়েছে বেশকিছু রাডার রয়েছে; যেগুলি প্রতিপক্ষের রকেট দেখা মাত্রই স্বয়ংক্রিয়ভাবে মনুষ্যবিহীন লঞ্চার থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে সেগুলিকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে। এই ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেয় যে, কোন রকেটগুলি ইস্রাইলের জনবসতিতে আঘাত হানতে পারে, এবং সেই হিসেবে সেগুলি ধ্বংসে ‘তামির’ ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া হয়। একটা লঞ্চারে ২০টা করে ‘তামির’ ক্ষেপণাস্ত্র থাকে। একেকটা ক্ষেপনাস্ত্রের পাল্লা ৪০ কিঃমিঃ এবং মূল্য ২০ হাজার ডলার থেকে ১ লক্ষ ডলারের মাঝে। অপরদিকে হামাসের রকেটগুলি স্টিল এবং এলুমিনিয়ামের পাইপের সাথে স্টিলের পাখা জুড়ে দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে। এই রকেটের জ্বালানি হলো রাসায়নিক সার এবং গলানো চিনি। রকেটের ওয়ারহেডগুলিও বাড়িতে তৈরি করা। বেশিরভাগ রকেটই স্বল্পপাল্লার ‘কাসাম’। রকেটগুলি ধাতুর কাঠামো থেকে ছোঁড়া হয় এবং এদের কোন গাইড্যান্স সিস্টেম নেই। এগুলির ওজন ৩৬ কেজি থেকে ৯০ কেজি পর্যন্ত এবং পাল্লা ৩ কিঃমিঃ থেকে ৩২ কিঃমিঃ পর্যন্ত। দু’জন ব্যক্তিই এগুলি ছোঁড়ার জন্যে যথেষ্ট। এগুলির খরচ মাত্র কয়েক’শ ডলারের বেশি নয়। এই রকেটগুলির সক্ষমতা নেই বড় ধরনের কোন ক্ষয়ক্ষতি করার; বরং এগুলির উদ্দেশ্য হলো ইস্রাইলকে অনিরাপদ করা এবং ইস্রাইলিদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করে তাদেরকে লুকাতে বাধ্য করা। তবে এবারে হামাসের উদ্দেশ্য ছিল ‘আয়রন ডোম’এর সর্বোচ্চ সক্ষমতা বের করা এবং পুরো ব্যবস্থাকে ব্যাতিব্যস্ত করে ফেলা। ‘তামির’ ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিটের ক্ষেপণাস্ত্র ফুরিয়ে গেলে হতাহতের সংখ্যা বেরে যাবার সম্ভাবনা দেখা দেবে।

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘র‍্যান্ড কর্পোরেশন’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ‘আয়রন ডোম’এর প্রধান দুর্বলতা হলো, অতি কম সক্ষমতার রকেট ধ্বংস করতে অতি উচ্চ সক্ষমতার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, হামাসের একটা রকেট খুব বড় কোন ক্ষতি করার সক্ষমতা না রাখলেও ইস্রাইলিরা এর প্রত্যুত্তরে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে; যেটাকে তাদের এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ন্যায়সংগত প্রমাণ করতে হচ্ছে। ১৩ জন ইস্রাইলিকে হত্যার বিপরীতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে ২’শ ৪৮ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করাকে রাজনৈতিকভাবে সমর্থন করা কঠিন। এছাড়াও রকেট উৎক্ষেপণ বন্ধ করতেও ইস্রাইলকে ফিলিস্তিনিদের উপর ব্যাপক বিমান হামলা, এমনকি সেনাবাহিনীর হামলা করতে হচ্ছে। আবার ‘আয়রন ডোম’এর ফাঁকফোঁকড় দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া রকেট যদি ইস্রাইলিদের হতাহতের কারণ হয়, তাহলে সেটাও ইস্রাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যে চ্যালেঞ্জ।

‘আল জাজিরা’র এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, যুদ্ধের এক পর্যায়ে হামাস মাত্র ৩০ মিনিটের মাঝে ৭০টা রকেট নিক্ষেপ করেছিল। একসময় হামাস পাঁচ মিনিটে ১’শ ৩৭টা রকেট ছোঁড়ার দাবিও করে। বেশিরভাগ রকেট স্বল্পপাল্লার হলেও কিছু রকেট ৭৫ কিঃমিঃ দূরে তেল আভিভেও পৌঁছেছে; যা ইস্রাইলিদের বিচলিত করেছে। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলছে যে, পুরো যুদ্ধে হামাস ৩ হাজার ৭’শর বেশি রকেট ছুঁড়েছে। তবে রকেটের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় ৯০ শতাংশ রকেট ধ্বংস করা গেলেও বাকি ১০ শতাংশও কিন্তু সংখ্যার দিক থেকে একেবারে কম নয়। ইস্রাইলের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা এবারের যুদ্ধের দিকে যে কড়া নজর রেখেছে, তা নিশ্চিত। হামাসের কাছে থাকা মোট রকেটের সংখ্যা নিরূপণ যেমন ইস্রাইলের নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ, তেমনি ‘আয়রন ডোম’এর উপর নির্ভরশীল থাকার সত্ত্বেও এবং রাজনৈতিকভাবে অসমর্থনযোগ্য ব্যাপক বিমান হামলায় শতশত ফিলিস্তিনি হত্যার পরেও ইস্রাইলিদের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক না হওয়া এবং হতাহত পুরোপুরি বন্ধ না করতে পারা ইস্রাইলের দুর্বলতা তুলে ধরে। এবারের গাজার যুদ্ধ বলে দিচ্ছে যে, মান্ধাতার প্রযুক্তির ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইস্রাইলের যুদ্ধ জেতা শুধু কঠিনই নয়, বরং যুদ্ধ প্রতিরোধ করতে ইস্রাইলকে আশেপাশের দেশগুলির সহযোগিতার উপরেই বেশি নির্ভরশীল হতে হবে। অর্থাৎ নিজের নিরাপত্তার স্বার্থেই ইস্রাইল তার আশেপাশের দেশগুলির সাথে সম্পর্কোন্নয়নে এগুবে।

Sunday, 23 May 2021

ভারতে করোনা সংক্রমণের ভূরাজনৈতিক ফলাফল

২৪শে মে ২০২১

ভারতের করোনা মহামারি একদিকে যেমন দেশটার দুর্বল অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোকে আরও দুর্বল করছে, তেমনি বিশ্বব্যাপী ভ্যাকসিন সরবরাহের অপ্রতুলতা সৃষ্টি করে চীনের ভ্যাকসিন কূটনীতির জন্যে জায়গা করে দিচ্ছে। দুর্বল ভারতকে দিয়ে চীনকে ব্যালান্স করতে যুক্তরাষ্ট্র যে হিমসিম খাবে, তা বলাই বাহুল্য। এতে কৌশলগত দিক থেকে ওয়াশিংটনের উপর দিল্লীর নির্ভরশীলতা তৈরি হলেও পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বন্ধুর সবচাইতে কঠিন সময়ে যথেষ্ট সহায়তা দিতে না পারাটা যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জকে কঠিনতর করবে।


করোনাভাইরাসের সংক্রমণে ভারতের ভয়াবহ অবস্থার চিত্র যখন প্রতিফলিত হচ্ছে বিশ্বমিডিয়াতে, তখন কেউ কেউ এই সংক্রমণের ভূরাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করছেন। ‘ইউরেশিয়া গ্রুপ’এর ‘জি জিরো মিডিয়া’তে মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সরকার ভারতের মহামারির ব্যাপারে যতটা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, ব্রাজিলের ব্যাপারে তার ধারেকাছেও নয়। এর কারণ খুঁজতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভারতের কৌশলগত গুরুত্বের দিকে তাকাতে হবে।

২০২০এর অগাস্টে ভারতের সরকারি পরিসংখ্যানে বলা হয় যে, এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত দ্বিতীয় প্রান্তিকে ভারতের অর্থনীতি প্রায় ২৪ শতাংশ কমে গিয়েছিল; যা কিনা বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলির মাঝে সর্বোচ্চ। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি কমেছিল সাড়ে ৯ শতাংশ; আরা জাপানের কমেছিল ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। ১৯৯৬ সালে ভারত সরকার সর্বপ্রথম জিডিপির পরিসংখ্যান প্রকাশ শুরু করার পর থেকে এটা অর্থনীতিতে সর্বোচ্চ ধ্বস। লকডাউনের কারণে লাখ লাখ দিনমজুর কাজের অভাবে শহরগুলি ছেড়ে পালিয়েছে। এই মানুষগুলি অনেকক্ষেত্রেই ভারতের জিডিপির পরিসংখ্যানের বাইরে রয়েছে। ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সিথারামান গত অগাস্টে ভারতের অর্থনৈতিক দুর্দশার জন্যে করোনাভাইরাসকে দায়ী করে বলেন যে, এটা সৃষ্টিকর্তার কারণে হয়েছে। তবে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ভারতের অর্থনীতি মহামারির আরও আগে থেকেই ধুঁকে ধুঁকে চলছিল। ২০১৯এর অগাস্টে বলা হয়েছিল যে, দেশটাতে গাড়ি বিক্রি ৩২ শতাংশ কমেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০২৪ সাল নাগাদ দেশটার অর্থনীতিকে ৫ ট্রিলিয়ন ডলার বা ৫ হাজার বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার যে ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন, সেই স্বপ্ন এখন বেশ দূরবর্তীই মনে হচ্ছে।

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’এর এক লেখায় ‘জন্স হপকিন্স স্কুল অব এডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’এর প্রফেসর ড্যানিয়েল মার্কি ভারতে করোনাভাইরাসের ব্যাপক সংক্রমণের কৌশলগত ফলাফল ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। ২০২০ সালের শেষের দিকে এবং ২০২১এর শুরুতে অনেকেই মনে করতে শুরু করেছিলেন যে, ভারত খুব সম্ভবতঃ করোনার সবচাইতে খারাপটা দেখে ফেলেছে। এখন ভাইরাসের নতুন ধরনের সংক্রমণ এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে এই আশা পুরোপুরি ভেঙ্গে গেছে। বাইডেন প্রশাসন তাদের চীনকে নিয়ন্ত্রণ করার কৌশলে ভারতের সাথে সহযোগিতাকে মূল স্তম্ভগুলির একটা হিসেবে দেখছে। যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে দিয়ে চীনকে ব্যালান্স করতে চাইছে, তাই ভারতের স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দুশ্চিন্তার ভিত্তি মানবিক নয়; কৌশলগত। হিমালয়ের পাদদেশে চীনের সাথে উত্তেজনা যখন সমাধানহীন অবস্থায় রয়ে গেছে, তখন ভারতে করোনার মারাত্মক সংক্রমণের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব যথেষ্ট। প্রফেসর মার্কি মনে করছেন যে, ভারতের দুর্বল মুহুর্তেকে চীন যদি ব্যবহার করতে চায়, তাহলে একইসাথে কয়েকটা চ্যালেঞ্জের চাপে পড়ে নতুন দিল্লীতে নীতিগত ভুল হবার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। আর এসময়েই যুক্তরাষ্ট্রের উচিৎ ভারতকে নীতিগত সহায়তা দিয়ে কৌশলগত দিক থেকে শক্তিশালী করা।

বার্তাসংস্থা ‘ব্লুমবার্গ’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, করোনার ভারে নুয়ে পড়ে ভারত যখন তার ভ্যাকসিন সরবরাহের প্রতিশ্রুতি রাখতে হিমসিম খাচ্ছে, তখন সারা বিশ্ব চীনের ভ্যাকসিনের উপর নির্ভরশীল হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চীনের ‘সিনোফার্ম গ্রুপ’এর ভ্যাকসিনকে স্বীকৃতি দেবার পর বিশ্বব্যাপী চীনের ভ্যাকসিনের চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন অনেকেই। এছাড়াও চীনের ‘সিনোভ্যাক বায়োটেক’এর ভ্যাকসিনও খুব শিগগিরই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বীকৃতি পেতে পারে। ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’এর সিনিয়র ফেলো ইয়ানঝং হুয়াং বলছেন যে, চীন শুধুমাত্র ভ্যাকসিনের সবচাইতে বড় রপ্তানিকারকই হতে যাচ্ছে না, কিছু দেশের জন্যে চীনের ভ্যাকসিন ছাড়া কোন পথই খোলা থাকছে না।

এমতাবস্থায় চীনের প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণে বাইডেন প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের নিজের জন্যে ক্রয় করা ‘এসট্রাজেনেকা’র ৬ কোটি ডোজ অন্য দেশগুলিকে দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এবং একইসাথে মার্কিন নিয়ন্ত্রণে থাকা ‘মডার্না’, ‘ফাইজার’ এবং ‘জনসন এন্ড জনসন’এর ভ্যাকসিন উৎপাদন দ্রুত বৃদ্ধির জন্যে জোর দিচ্ছে ওয়াশিংটন। তবে অন্যান্য দেশের ভ্যাকসিন ফ্যাক্টরিগুলিকে কার্যকর করার জন্যে মার্কিন কোম্পানিগুলির ডেভেলপ করা ভ্যাকসিনের উপর থেকে কপিরাইট স্বত্ব উঠিয়ে নেবার ব্যাপারে কথা বললেও এখনও সেব্যাপারে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি বাইডেন সরকার। যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত ২৪ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন তৈরি করলেও বিশ্বের অন্যান্য দেশকে ভ্যাকসিন দেবার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের কৃপণতা দৃষ্টিকটু। রপ্তানি বন্ধ করার আগ পর্যন্ত ভারত পৃথিবীর প্রায় এক’শ দেশে ব্রিটেনের অক্সফোর্ডের ডেভেলপ করা ‘এসট্রাজেনেকা’র ৬ কোটি ৭০ লক্ষ ডোজ ভ্যাকসিন রপ্তানি করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় গড়ে ওঠা ‘কোভ্যাক্স’ চেষ্টার মাধ্যমে এখন পর্যন্ত মাত্র ৫ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন বিশ্বের গরীব দেশগুলিতে পৌঁছেছে, যা কিনা যুক্তরাষ্ট্রের নিজের জন্যে তৈরি ২৪ কোটি ভ্যাকসিনের তুলনায় কিছুই নয়। ‘কোভ্যাক্স’ ভারতের ‘সেরাম ইন্সটিটিউট’এর ফ্যাক্টরির উপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল।

পশ্চিমা গবেষকেরা বলছেন যে, চীনের ভ্যাকসিনের কর্মক্ষমতা তুলনামূলকভাবে বেশ কম। হংকংএর ‘সিটি ইউনিভার্সিটি’র এসোসিয়েট প্রফেসর নিকোলাস থমাসএর মতে, চীনারা মধ্যম মেয়াদে ভ্যাকসিনের মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে পারবে। কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলি যদি উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হয়, তাহলে তারা চীনা ভ্যাকসিনের দুর্বল কর্মক্ষমতাকে ব্যবহার করে ভূরাজনৈতিক প্রভাব পুনরুদ্ধার করতে পারবে। অপরদিকে বর্তমান পরিস্থিতিকে ব্যবহার করতে চীনারা সকল চেষ্টাই করছে। চীনের রাষ্ট্রীয় পত্রিকা ‘গ্লোবাল টাইমস’এর এক লেখায় যুক্তরাষ্ট্রকে কটাক্ষ করে বলা হয় যে, ভারতের সবচাইতে খারাপ সময়ে ওয়াশিংটন ভারতকে সাহায্য করতে ব্যর্থ হচ্ছে। পশ্চিমারা ভারতের কাছাকাছি গিয়েছে ভূরাজনৈতিক স্বার্থের জন্যে; এই সম্পর্ক ঠুনকো এবং অগভীর।

ভারতের করোনা মহামারি একদিকে যেমন দেশটার দুর্বল অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোকে আরও দুর্বল করছে, তেমনি বিশ্বব্যাপী ভ্যাকসিন সরবরাহের অপ্রতুলতা সৃষ্টি করে চীনের ভ্যাকসিন কূটনীতির জন্যে জায়গা করে দিচ্ছে। দুর্বল ভারতকে দিয়ে চীনকে ব্যালান্স করতে যুক্তরাষ্ট্র যে হিমসিম খাবে, তা বলাই বাহুল্য। এতে কৌশলগত দিক থেকে ওয়াশিংটনের উপর দিল্লীর নির্ভরশীলতা তৈরি হলেও পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বন্ধুর সবচাইতে কঠিন সময়ে যথেষ্ট সহায়তা দিতে না পারাটা যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জকে কঠিনতর করবে।