Showing posts with label Pandemic. Show all posts
Showing posts with label Pandemic. Show all posts

Sunday, 23 May 2021

ভারতে করোনা সংক্রমণের ভূরাজনৈতিক ফলাফল

২৪শে মে ২০২১

ভারতের করোনা মহামারি একদিকে যেমন দেশটার দুর্বল অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোকে আরও দুর্বল করছে, তেমনি বিশ্বব্যাপী ভ্যাকসিন সরবরাহের অপ্রতুলতা সৃষ্টি করে চীনের ভ্যাকসিন কূটনীতির জন্যে জায়গা করে দিচ্ছে। দুর্বল ভারতকে দিয়ে চীনকে ব্যালান্স করতে যুক্তরাষ্ট্র যে হিমসিম খাবে, তা বলাই বাহুল্য। এতে কৌশলগত দিক থেকে ওয়াশিংটনের উপর দিল্লীর নির্ভরশীলতা তৈরি হলেও পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বন্ধুর সবচাইতে কঠিন সময়ে যথেষ্ট সহায়তা দিতে না পারাটা যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জকে কঠিনতর করবে।


করোনাভাইরাসের সংক্রমণে ভারতের ভয়াবহ অবস্থার চিত্র যখন প্রতিফলিত হচ্ছে বিশ্বমিডিয়াতে, তখন কেউ কেউ এই সংক্রমণের ভূরাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করছেন। ‘ইউরেশিয়া গ্রুপ’এর ‘জি জিরো মিডিয়া’তে মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সরকার ভারতের মহামারির ব্যাপারে যতটা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, ব্রাজিলের ব্যাপারে তার ধারেকাছেও নয়। এর কারণ খুঁজতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভারতের কৌশলগত গুরুত্বের দিকে তাকাতে হবে।

২০২০এর অগাস্টে ভারতের সরকারি পরিসংখ্যানে বলা হয় যে, এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত দ্বিতীয় প্রান্তিকে ভারতের অর্থনীতি প্রায় ২৪ শতাংশ কমে গিয়েছিল; যা কিনা বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলির মাঝে সর্বোচ্চ। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি কমেছিল সাড়ে ৯ শতাংশ; আরা জাপানের কমেছিল ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। ১৯৯৬ সালে ভারত সরকার সর্বপ্রথম জিডিপির পরিসংখ্যান প্রকাশ শুরু করার পর থেকে এটা অর্থনীতিতে সর্বোচ্চ ধ্বস। লকডাউনের কারণে লাখ লাখ দিনমজুর কাজের অভাবে শহরগুলি ছেড়ে পালিয়েছে। এই মানুষগুলি অনেকক্ষেত্রেই ভারতের জিডিপির পরিসংখ্যানের বাইরে রয়েছে। ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সিথারামান গত অগাস্টে ভারতের অর্থনৈতিক দুর্দশার জন্যে করোনাভাইরাসকে দায়ী করে বলেন যে, এটা সৃষ্টিকর্তার কারণে হয়েছে। তবে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ভারতের অর্থনীতি মহামারির আরও আগে থেকেই ধুঁকে ধুঁকে চলছিল। ২০১৯এর অগাস্টে বলা হয়েছিল যে, দেশটাতে গাড়ি বিক্রি ৩২ শতাংশ কমেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০২৪ সাল নাগাদ দেশটার অর্থনীতিকে ৫ ট্রিলিয়ন ডলার বা ৫ হাজার বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার যে ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন, সেই স্বপ্ন এখন বেশ দূরবর্তীই মনে হচ্ছে।

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’এর এক লেখায় ‘জন্স হপকিন্স স্কুল অব এডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’এর প্রফেসর ড্যানিয়েল মার্কি ভারতে করোনাভাইরাসের ব্যাপক সংক্রমণের কৌশলগত ফলাফল ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। ২০২০ সালের শেষের দিকে এবং ২০২১এর শুরুতে অনেকেই মনে করতে শুরু করেছিলেন যে, ভারত খুব সম্ভবতঃ করোনার সবচাইতে খারাপটা দেখে ফেলেছে। এখন ভাইরাসের নতুন ধরনের সংক্রমণ এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে এই আশা পুরোপুরি ভেঙ্গে গেছে। বাইডেন প্রশাসন তাদের চীনকে নিয়ন্ত্রণ করার কৌশলে ভারতের সাথে সহযোগিতাকে মূল স্তম্ভগুলির একটা হিসেবে দেখছে। যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে দিয়ে চীনকে ব্যালান্স করতে চাইছে, তাই ভারতের স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দুশ্চিন্তার ভিত্তি মানবিক নয়; কৌশলগত। হিমালয়ের পাদদেশে চীনের সাথে উত্তেজনা যখন সমাধানহীন অবস্থায় রয়ে গেছে, তখন ভারতে করোনার মারাত্মক সংক্রমণের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব যথেষ্ট। প্রফেসর মার্কি মনে করছেন যে, ভারতের দুর্বল মুহুর্তেকে চীন যদি ব্যবহার করতে চায়, তাহলে একইসাথে কয়েকটা চ্যালেঞ্জের চাপে পড়ে নতুন দিল্লীতে নীতিগত ভুল হবার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। আর এসময়েই যুক্তরাষ্ট্রের উচিৎ ভারতকে নীতিগত সহায়তা দিয়ে কৌশলগত দিক থেকে শক্তিশালী করা।

বার্তাসংস্থা ‘ব্লুমবার্গ’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, করোনার ভারে নুয়ে পড়ে ভারত যখন তার ভ্যাকসিন সরবরাহের প্রতিশ্রুতি রাখতে হিমসিম খাচ্ছে, তখন সারা বিশ্ব চীনের ভ্যাকসিনের উপর নির্ভরশীল হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চীনের ‘সিনোফার্ম গ্রুপ’এর ভ্যাকসিনকে স্বীকৃতি দেবার পর বিশ্বব্যাপী চীনের ভ্যাকসিনের চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন অনেকেই। এছাড়াও চীনের ‘সিনোভ্যাক বায়োটেক’এর ভ্যাকসিনও খুব শিগগিরই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বীকৃতি পেতে পারে। ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’এর সিনিয়র ফেলো ইয়ানঝং হুয়াং বলছেন যে, চীন শুধুমাত্র ভ্যাকসিনের সবচাইতে বড় রপ্তানিকারকই হতে যাচ্ছে না, কিছু দেশের জন্যে চীনের ভ্যাকসিন ছাড়া কোন পথই খোলা থাকছে না।

এমতাবস্থায় চীনের প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণে বাইডেন প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের নিজের জন্যে ক্রয় করা ‘এসট্রাজেনেকা’র ৬ কোটি ডোজ অন্য দেশগুলিকে দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এবং একইসাথে মার্কিন নিয়ন্ত্রণে থাকা ‘মডার্না’, ‘ফাইজার’ এবং ‘জনসন এন্ড জনসন’এর ভ্যাকসিন উৎপাদন দ্রুত বৃদ্ধির জন্যে জোর দিচ্ছে ওয়াশিংটন। তবে অন্যান্য দেশের ভ্যাকসিন ফ্যাক্টরিগুলিকে কার্যকর করার জন্যে মার্কিন কোম্পানিগুলির ডেভেলপ করা ভ্যাকসিনের উপর থেকে কপিরাইট স্বত্ব উঠিয়ে নেবার ব্যাপারে কথা বললেও এখনও সেব্যাপারে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি বাইডেন সরকার। যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত ২৪ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন তৈরি করলেও বিশ্বের অন্যান্য দেশকে ভ্যাকসিন দেবার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের কৃপণতা দৃষ্টিকটু। রপ্তানি বন্ধ করার আগ পর্যন্ত ভারত পৃথিবীর প্রায় এক’শ দেশে ব্রিটেনের অক্সফোর্ডের ডেভেলপ করা ‘এসট্রাজেনেকা’র ৬ কোটি ৭০ লক্ষ ডোজ ভ্যাকসিন রপ্তানি করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় গড়ে ওঠা ‘কোভ্যাক্স’ চেষ্টার মাধ্যমে এখন পর্যন্ত মাত্র ৫ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন বিশ্বের গরীব দেশগুলিতে পৌঁছেছে, যা কিনা যুক্তরাষ্ট্রের নিজের জন্যে তৈরি ২৪ কোটি ভ্যাকসিনের তুলনায় কিছুই নয়। ‘কোভ্যাক্স’ ভারতের ‘সেরাম ইন্সটিটিউট’এর ফ্যাক্টরির উপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল।

পশ্চিমা গবেষকেরা বলছেন যে, চীনের ভ্যাকসিনের কর্মক্ষমতা তুলনামূলকভাবে বেশ কম। হংকংএর ‘সিটি ইউনিভার্সিটি’র এসোসিয়েট প্রফেসর নিকোলাস থমাসএর মতে, চীনারা মধ্যম মেয়াদে ভ্যাকসিনের মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে পারবে। কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলি যদি উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হয়, তাহলে তারা চীনা ভ্যাকসিনের দুর্বল কর্মক্ষমতাকে ব্যবহার করে ভূরাজনৈতিক প্রভাব পুনরুদ্ধার করতে পারবে। অপরদিকে বর্তমান পরিস্থিতিকে ব্যবহার করতে চীনারা সকল চেষ্টাই করছে। চীনের রাষ্ট্রীয় পত্রিকা ‘গ্লোবাল টাইমস’এর এক লেখায় যুক্তরাষ্ট্রকে কটাক্ষ করে বলা হয় যে, ভারতের সবচাইতে খারাপ সময়ে ওয়াশিংটন ভারতকে সাহায্য করতে ব্যর্থ হচ্ছে। পশ্চিমারা ভারতের কাছাকাছি গিয়েছে ভূরাজনৈতিক স্বার্থের জন্যে; এই সম্পর্ক ঠুনকো এবং অগভীর।

ভারতের করোনা মহামারি একদিকে যেমন দেশটার দুর্বল অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোকে আরও দুর্বল করছে, তেমনি বিশ্বব্যাপী ভ্যাকসিন সরবরাহের অপ্রতুলতা সৃষ্টি করে চীনের ভ্যাকসিন কূটনীতির জন্যে জায়গা করে দিচ্ছে। দুর্বল ভারতকে দিয়ে চীনকে ব্যালান্স করতে যুক্তরাষ্ট্র যে হিমসিম খাবে, তা বলাই বাহুল্য। এতে কৌশলগত দিক থেকে ওয়াশিংটনের উপর দিল্লীর নির্ভরশীলতা তৈরি হলেও পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বন্ধুর সবচাইতে কঠিন সময়ে যথেষ্ট সহায়তা দিতে না পারাটা যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জকে কঠিনতর করবে।