Tuesday, 11 January 2022
ইউরোপজুড়ে ভ্যাকসিন বিরোধী আন্দোলন রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থাকেই তুলে ধরে
নতুন বছরের শুরুতেই পুরো ইউরোপ উত্তপ্ত হয়েছে ভ্যাকসিন বিরোধী আন্দোলনে। ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ইতালি, বেলজিয়াম, চেক রিপাবলিকসহ ইউরোপের দেশগুলিতে করোনার ভ্যাকসিনের বিষয়ে সরকারি বাধ্যবাধতার বিরুদ্ধে চলছে এই বিক্ষোভ। বেশিরভাগ স্থানেই শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ হলেও কিছু শহরে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে এবং কিছু ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। বিক্ষোভকারীরা ভ্যাকসিন নেয়ার ক্ষেত্রে তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতার ব্যাপারটাকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। ‘বিবিসি’ বলছে যে, এর আগে গত ১৮ই ডিসেম্বর ফ্রান্সে যে বিক্ষোভ হয়েছিল, এবারের বিক্ষোভ তার চাইতে চার গুণ বড় ছিল।
‘আল জাজিরা’ বলছে যে, ৮ই জানুয়ারি ভ্যাকসিনের বাধ্যবাধকতার বিরোধিতা করে ফ্রান্সে ১ লক্ষ ৫ হাজার মানুষ রাস্তায় বিক্ষোভ করে। পুলিশ বলছে যে, রাজধানী প্যারিসে প্রচন্ড ঠান্ডা এবং বৃষ্টি উপেক্ষা করে ১৮ হাজার মানুষ ‘সত্য’, ‘স্বাধীনতা’ এবং ‘ভ্যাকসিন পাস মানি না’ লেখা প্লাকার্ড নিয়ে বিক্ষোভ করে। অনেকেই তাদের ক্ষোভের কেন্দ্রে রেখেছিল ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁকে। এক সপ্তাহ আগেই ম্যাক্রঁ ‘লে প্যারিসিয়ান’ পত্রিকার সাথে সাক্ষাতে ভ্যাকসিন বিরোধীদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত খারাপ শব্দ ব্যবহার করে হুমকি দেন যে, যারা ভ্যাকসিন নেবে না তিনি তাদের জীবন এতটাই দুর্বিসহ করে ফেলবেন যে, তারা বাধ্য হবে ভ্যাকসিন নিতে। আন্দোলনকারীরা ম্যাক্রঁর বিরুদ্ধেও একই ধরনের খারাপ শব্দ ব্যবহার করে প্রতিবাদ করে। একজন বিক্ষোভকারী ‘রয়টার্স’কে বলেন যে, এটা ছিল ম্যাক্রঁর ‘শেষ চেষ্টা’। বিক্ষোভকারীরা বলছে যে, সরকার তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতা খর্ব করা ছাড়াও নাগরিকদের মাঝে পার্থক্য করছে।
এই বিক্ষোভ এমন সময়ে এলো, যখন এক সপ্তাহে দ্বিতীয়বারের মতো ফ্রান্সে ‘ওমিক্রন’ ভ্যারিয়্যান্টের কারণে একদিনে ৩ লাখের বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। অথচ ইউরোপের দেশগুলির মাঝে ফ্রান্স সবচাইতে বেশি ভ্যাকসিন দেয়া দেশগুলির একটা। ‘বিবিসি’ বলছে যে, ১২ বছরের বেশি বয়সের জনগণের ৯০ শতাংশকেই পুরোপুরি ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে। আইসিইউগুলি ভর্তি হয়ে যাচ্ছে; হাসপাতালগুলি চাপের মাঝে রয়েছে। আর এর আগের দিন ৬ই জানুয়ারি ফ্রান্সের পার্লামেন্টে আইন পাস করে বলা হয় যে, জনগণকে রেস্টুরেন্টে খেতে, আন্তশহর বাসে চড়তে বা কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে হলে পুরোপুরিভাবে ভ্যাকসিন নিতে হবে। ‘বিবিসি’ বলছে যে, ফরাসি সিনেটে বিরোধী দলের শক্তি বেশি থাকায় সেখানে বিল পাস হতে কিছু সময় লাগতে পারে। এই আইন ১৫ই জানুয়ারি থেকেই বাস্তবায়িত হবার কথা রয়েছে। প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে পুলিশ ৩৪ জনকে গ্রেপ্তার করে। ১০ জন পুলিশ অফিসারও কিছুটা আহত হয়। মঁপেলিয়ে শহরে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়ে।
অস্ট্রিয়ার পুলিশ বলছে যে, রাজধানী ভিয়েনাতে ৪০ হাজার মানুষ রাস্তায় বিক্ষোভ করে। সেখানে আগামী মাস থেকে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন নেয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। জার্মানিতেও অনেকগুলি শহরে বিক্ষোভ চলে। এর মাঝে সবচাইতে বড় বিক্ষোভ হয় হামবুর্গ শহরে; যেখানে ১৩ হাজার মানুষ রাস্তায় ছিল। সেখানে প্লাকার্ডে লেখা ছিল ‘যথেষ্ট হয়েছে; আমাদের সন্তানদেরকে রেহাই দাও’। একজন বিক্ষোভকারী তার গায়ে ইহুদিদের ‘স্টার অব ডেভিড’ বহন করছিলেন; যেখানে লেখা ছিল ‘ভ্যাকসিন নেয়া হয়নি’। এর মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানিতে ইহুদিদের গায়ে বাধ্যতামূলকভাবে ‘স্টার অব ডেভিড’ এঁকে রাখার নির্দেশনার সাথে তুলনা দেয়া হয়। জার্মানিতে ভ্যাকসিন বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা চলছে। সেখানে এক মাস আগে থেকে ৫ থেকে ১১ বছর বয়সী শিশুদেরকে ভ্যাকসিন দেয়া শুরু হয়েছে। ‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, ৯ই জানুয়ারি বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে ৫ হাজার মানুষ বিক্ষোভ করে। পুলিশ ৪১ জনকে গ্রেপ্তার করে। বিক্ষোভকারীদের প্লাকার্ডে লেখা ছিল ‘ভ্যাকসিন একনায়কতন্ত্র’। বেলজিয়ামে রেস্টুরেন্ট, বার এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে কোভিড পাস বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সেখানে এক সপ্তাহে নতুন সংক্রমণ বেড়েছে ৯৬ শতাংশ। চেক রিপাবলিকে ৬০ বছরের উপরে জনগণ, স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ এবং জরুরি সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের ভ্যাকসিন নিতে বাধ্য করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। দেশটার নতুন কোয়ালিশন সরকার ক্ষমতা নেবার আগে এই পরিকল্পনাগুলির বিরোধিতা করেছিল। এখন ক্ষমতায় গিয়ে নীতি পরিবর্তন করে তারা বিভিন্ন প্রফেশনালদের বাধ্যতামূলক ভ্যাকসিনের পরিকল্পনা নিয়ে এগুতে চাইছে।
ইতালির তুরিন শহরেও শতশত মানুষ বিক্ষোভ করে। সেখানে ৫০ বছরের বেশি বয়সী সকল ব্যক্তির ভ্যাকসিন নেয়া বাধ্যমূলক করা হয়েছে। আর ১১ই জানুয়ারি থেকে ইতালিতে ভ্যাকসিন না নিলে কেউ রেস্টুরেন্টে ঢুকতে পারবে না, অথবা গণপরিবহণে চড়তে পারবে না। জার্মানির স্বাস্থ্যমন্ত্রী কার্ল লাউটারবাক ‘ডাই আম সনটাগ’ পত্রিকাকে বলেন যে, স্বল্প সংখ্যক মানুষ সকল বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে উপেক্ষা করে সেচ্ছায় মিথ্যা তথ্যের মাঝে ডুবে থাকতে চাইছে। তিনি বলেন যে, ভ্যাকসিন বিরোধীরা এবং করোনাভাইরাসকে ষড়যন্ত্র আখ্যা দেয়া মানুষেরা সকল মাপকাঠি এবং লক্ষ্য হারিয়ে ফেলেছে।
‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, জার্মানির মিনডেন শহরে আড়াই হাজার এবং ড্রেসডেন শহরে সাড়ে ৩ হাজার মানুষ সরকারের সিদ্ধান্তের পক্ষে মানব বন্ধন করে। তাদের বক্তব্য ছিল, তারা ভ্যাকসিন বিরোধীদের আক্রমণের শিকার। এর মাঝে ৭ই জানুয়ারি অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর কার্ল নেহামার পুরোপুরি ভ্যাকসিন নেবার পর বুস্টার ডোজ নিয়েও করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তিনি ইতোমধ্যেই ভ্যাকসিন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর ভূমিকা নেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। অপরদিকে ফ্রান্সের বিক্ষোভগুলি এমন সময়ে এসেছে, যখন কিছুদিন পরেই সেখানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ ভ্যাকসিন বিরোধীদের বিরুদ্ধে খারাপ শব্দ ব্যবহার করে বেশ বড় একটা ঝুঁকি নিয়েছেন।
ইউরোপের সরকারগুলি করোনার ভ্যাকসিন প্রয়োগের নীতি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তাদের দুই শতকের ব্যক্তিস্বাধীনতা ভিত্তিক চিন্তাকে জ্বলাঞ্জলি দিচ্ছে। রাস্তায় বিক্ষোভকারীরা তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে তুলে ধরতে চাইলেও সরকার তাদের সংখ্যাকে ছোট বলে এড়িয়ে যেতে চাইছে। ডোজের পর ডোজ ভ্যাকসিন দেয়া সত্ত্বেও যখন ‘ওমিক্রণ’এর সংক্রমণ ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না, তখন সংখ্যাগরিষ্ঠতাই রাজনীতিবিদদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের শক্তি; লিবারাল আদর্শ নয়। ফ্রান্স এবং চেক রিপাবলিকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বলে দিচ্ছে যে, রাজনীতিবিদেরা মূলতঃ জনগণের মতামতের ব্যাপারে মোটেও আগ্রহী নন। তবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাঝ দিয়ে নেয়া সিদ্ধান্তগুলির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখিয়ে দেয় যে, জনগণ পশ্চিমা রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারাচ্ছে।
Saturday, 25 December 2021
পশ্চিমা অর্থনীতিকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে করোনার ওমিক্রন ভ্যারিয়্যান্ট
করোনাভাইরাসের ওমিক্রন ভ্যারিয়্যান্টের সংক্রমণের কারণে পশ্চিমা দুনিয়ায় ক্রিসমাসের আগে আগে ৪ হাজারের বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ওয়েবসাইট ‘ফ্লাইটএওয়্যার’এর বরাত দিয়ে ‘বিবিসি’ বলছে যে, ফ্লাইট বাতিলের এক চতুর্থাংশই ছিল যুক্তরাষ্ট্রে। ক্রিসমাসের আগের দিন যুক্তরাষ্ট্রে বাতিল হয়েছে ৬’শ ৮৯টা ফ্লাইট; ক্রিসমাসের দিন আরও ৭’শ বাতিলের অপেক্ষায়। এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে যে, অনেক ফ্লাইট ক্রু এবং অপারেশনসএর সাথে জড়িত লোকজন করোনায় আক্রান্ত হয়েছে; অথবা তাদের নিজেদেরকে কোয়ার্যান্টাইন করতে হয়েছে। যদিও গবেষকেরা বলেছেন যে, ওমিক্রন আগের ভ্যারিয়্যান্টগুলির চাইতে বেশি প্রাণনাশী নয়, তথাপি এর সংক্রমণ করতে পারার সক্ষমতা অনেক বেশি থাকায় অনেকেই চিন্তা পড়েছেন। ‘ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান’এর এসোসিয়েট প্রফেসর হ্যালি প্রেসকট ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’কে বলছেন যে, যখন একইসাথে লক্ষ লক্ষ মানুষ আক্রান্ত হয়ে যায়, তখন এদের মাঝে স্বল্প শতাংশ মানুষও যদি হাসপাতালে যায়, সেটাও মেডিক্যাল ব্যবস্থাকে ব্যতিব্যস্ত করে ফেলার জন্যে যথেষ্ট।
ক্রিসমাসের ঠিক আগে আগে ব্রিটেনের রেস্টুর্যান্টগুলি ওমিক্রন ভ্যারিয়্যান্টের কারণে মারাত্মক সমস্যায় পতিত হয়েছে। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা বলছে যে, গত বসন্তের পর থেকে সবচাইতে খারাপ অবস্থায় পড়েছে তারা। ‘অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিসটিক্স’ বা ‘ওএনএস’ বলছে যে, ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে রেস্টুর্যান্টগুলিতে বসা খদ্দেরের সংখ্যা ১৪ শতাংশ কমেছে। ওমিক্রনের কারণে ব্রিটিশরা এখন বাইরে গিয়ে খাচ্ছে কম; এবং বাসায় বসে কাজ করছে বেশি। লন্ডনে এই অবস্থা সবচাইতে খারাপ; সেখানে খদ্দেরের সংখ্যা কমেছে ১৮ শতাংশ। ‘ওএনএস’ আরও বলছে যে, বাসা থেকে কাজ করতে বলা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দুই সপ্তাহে ২ শতাংশ বেড়ে ১৪ শতাংশে ঠেকেছে। ব্রিটেনের আঞ্চলিক শহরগুলিতে বেচাকেনা ভালো চললেও লন্ডনে বেচাকেনা ২৯ শতাংশ কমে গেছে। কনসালট্যান্সি কোম্পানি ‘অক্সফোর্ড ইকনমিক্স’এর অর্থনীতিবিদ এন্ড্রু গুডউইন বলছেন যে, যদিও সরকার বেশিরভাগ বিধিনিষেধ ক্রিসমাসের আগে চালু না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তথাপি জনগণের মাঝেই সাবধানতা অবলম্বণ করার প্রবণতা বেড়েছে; এর উপর রয়েছে অবাধে চলাচলের উপর নিষেধাজ্ঞা। তিনি মনে করছেন যে, এগুলির কারণে ব্রিটেনের জিডিপি ডিসেম্বর মাসে কমবে।
অপরদিকে আটলান্টিকে ওপাড়ে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডেরাল রিজার্ভ’ বলছে যে, মার্কিন অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি প্রায় চার দশকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। বলা হচ্ছে যে, গত নভেম্বরে ব্যক্তিগত খরচার হিসেবে ব্যয় বেড়েছে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ; যা ১৯৮২ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ। গত অক্টোবরে এটা ছিল ৫ দশমিক ১ শতাংশ। নভেম্বরে জনগণের খরচ বাড়লেও আয় সেই তুলনায় বাড়েনি। খরচ বেড়েছে দশমিক ৬ শতাংশ; আয় বেড়েছে দশমিক ৪ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে কমপক্ষে দুই সপ্তাহ ধরে বেকার ভাতা দাবি করা মানুষের সংখ্যা ডিসেম্বরে দাঁড়িয়েছে ১৮ লক্ষ ৫৯ হাজারে। মহামারির মাঝে এটা সর্বনিম্ন সংখ্যা হলেও সংখ্যাটা যথেষ্টই বড়। কারণ এর বাইরেও অনেকেই রয়েছে যারা বেকারত্বের এই সংজ্ঞার মাঝে না পড়লেও কোনমতে সংসার চালাচ্ছে।
‘বিবিসি’ বলছে যে, ওমিক্রন ঠেকাতে বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন ব্যবস্থা নিচ্ছে। ইতালি, স্পেন এবং গ্রিসে মাস্ক পড়ে বাইরে যাওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। উত্তর স্পেনের কাতালোনিয়াতে রাত্রিকালীন কারফিউ বলবত করা হয়েছে। নেদারল্যান্ডসে চলছে কঠোর লকডাউন। জার্মানিতে ২৮ ডিসেম্বর থেকে প্রাইভেট গণজমায়েত ১০ জনের বেশি করা যাবে না; নাইট ক্লাবগুলিও বন্ধ থাকবে। ফুটবল খেলা হবে দর্শকবিহীন মাঠে। পর্তুগালে ২৬শে ডিসেম্বর থেকে বার এবং নাইট ক্লাবগুলি বন্ধ হচ্ছে; আর ৯ই জানুয়ারি পর্যন্ত বাসা থেকে কাজ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ সংস্থার প্রধান এন্থনি ফাউচি বলছেন যে, ক্রিসমাসের সময় মানুষ বেশি ঘোরাঘুরি করলে পুরোপুরি ভ্যাকসিন নেয়া থাকলেও সংক্রমণ বাড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি’র হিসেবে বিশ্বব্যাপী কমপক্ষে ৫৩ লক্ষ মানুষ করোনাভাইরাসে মৃত্যুবরণ করেছে; আক্রান্ত হয়েছে কমপক্ষে ২৭ কোটি ৯০ লক্ষ। যুক্তরাষ্ট্রে ১৫ই ডিসেম্বর অফিশিয়ালি করোনায় মৃতের সংখ্যা ৮ লক্ষ ছাড়িয়ে যায়। গত ২রা অক্টোবরে তা ৭ লক্ষ ছাড়িয়েছিল। অর্থাৎ ৭৫ দিনে বা প্রায় আড়াই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে করোনায় মারা গেছে ১ লক্ষ মানুষ। প্রতিদিন গড়ে এই সংখ্যা ১ হাজার ৩’শ ৩৩ জন। ২০২০ সালের মার্চের শুরু থেকে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৯ মাসে মৃত্যু হয়েছিল ৭ লক্ষ মানুষের। অর্থাৎ এই সময়ের মাঝে গড়ে প্রতিদিন মৃতের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ২’শ ২৮ জন; যা কিনা গত আড়াই মাসের চাইতে কম! অথচ প্রথম ১৯ মাসের তুলনায় শেষ আড়াই মাসে বেশিরভাগ মানুষই ভ্যাকসিনের আওতায় এসেছে। ‘ব্লুমবার্গ’এর প্রতিবেদনে দেখানো হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৭৩ শতাংশ মানুষ কমপক্ষে একবার ভ্যাকসিন নিয়েছে; ৬২ শতাংশ মানুষকে পুরোপুরিভাবে ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে। এর মাঝে ২০ শতাংশ আবার বুস্টার ডোজও পেয়েছে। ইইউতে ৭০ শতাংশ মানুষকে দেয়া হয়ে পুরোপুরি ভ্যাকসিন; ২৬ শতাংশ বুস্টারও পেয়েছে। মাল্টিবিলিয়ন ডলারের এই ভ্যাকসিন ব্যবস্থাও মৃত্যুর মিছিল কমাতে পারছে না। থামাতে পারছে না অর্থনৈতিক নিম্নগতি।
পশ্চিমা দেশগুলিতে ভ্যাকসিন নেয়ার বাধ্যবাধকতার বিরুদ্ধে যেমন প্রতিবাদ হয়েছে, তেমনি করোনার কারণে বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপের বিরুদ্ধেও হয়েছে বিক্ষোভ। রাষ্ট্রগুলি কোন সমাধান দিতে পারেনি তাদের জনগণকে, যার মাধ্যমে সংক্রমণ বা মৃত্যু কমানো যেতে পারতো। অথচ পরীক্ষামূলক বিধিনিষেধের যাঁতাকলে পরে জনগণের আর্থিক অবস্থা হয়েছে করুণ। ভ্যাকসিনের ডোজ বৃদ্ধি করার পরেও মেলেনি কাংক্ষিত ফলাফল। অথচ এর ফলে কিছু ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি প্রচুর লাভ করেছে; তাদের গুটিকয়েক শেয়ারহোল্ডার লাশের মিছিলের উপর হয়েছে বিলিয়নায়ার। ওমিক্রন মানুষের জীবন নিচ্ছে কম; কিন্তু দুই বছর ধরে থেকে থেকে বিধিনিষেধের পর পশ্চিমা অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়াবার চেষ্টাটুকুকে ধ্বসিয়ে ফেলছে। মানুষের মৃত্যুর মহামারি যতটা, তার চাইতে বেশি সম্পদের মহামারি। অপ্রতুল এবং যথেচ্ছ সমাধানের কারণে পশ্চিমা পুঁজিবাদী ব্যবস্থা মারাত্মক চাপের মাঝে পড়েছে। এই যথেচ্ছ সমাধানগুলিকে জোরপূর্বক বাস্তবায়নের চেষ্টা মানুষকে আরও বিভ্রান্ত করছে এবং জনমনে ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে। রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই পড়েছে প্রশ্নের মুখে। করোনা মহামারি বিশ্বের জনগণকে ধ্বসে পড়া পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প খুঁজতে বাধ্য করছে।
Sunday, 8 August 2021
ব্যাক্তিস্বাধীনতার ফরাসি সংজ্ঞা আসলে কি?
চার সপ্তাহ ধরে ফ্রান্সের রাস্তায় হাজারো মানুষের বিক্ষোভ। ৭ই অগাস্ট ফ্রান্স জুড়ে প্রায় দুই লক্ষ মানুষ প্রতিবাদ করেছে। তাদের দাবি হলো ফরাসি সরকারের করোনাভাইরাস ‘হেলথ পাস’এর ঘোষণা বাতিল করা। ফরাসি সরকারের প্রজ্ঞাপণ অনুযায়ী জনগণকে বেশিরভাগ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যেতে হলে বা গণপরিবহণে উঠতে হলে করোনাভাইরাস থেকে মুক্ত, এই মর্মে একটা ‘হেলথ পাস’ দেখাতে হবে। এরপর গত ২৯শে জুলাই ফরাসি সরকারের আরেক নির্দেশনায় বলা হয় যে, জনগণকে যেকোন পর্যটন স্থানে বা ৫০ জনের বেশি জমায়েত হয় এমন কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যেতে হলে ‘হেলথ পাস’ দেখাতে হবে। এর আগে থেকেই সিনেমা হল, কনসার্ট হল, থিম পার্কের মতো স্থানে পাস লাগছে। ৯ই অগাস্ট থেকে যেকোন বার, রেস্তোরাঁ বা শপিং মলে যেতে হলে অথবা দূরপাল্লার বিমান, রেলগাড়ি বা বাসে ভ্রমণ করতে হলে এই পাস লাগবে। এই পাসে এমন তথ্য থাকতে হবে, যাতে বহণকারী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত নয়, সেব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়। এতে ভ্যাকসিন নেবার সার্টিফিকেট ছাড়াও মুচলেকা থাকবে যে, গত ৪৮ ঘন্টার মাঝে করোনা পরীক্ষায় তিনি নেগেটিভ ফলাফল পেয়েছেন। শুধু তাই নয়, তিনি গত ৬ মাসের মাঝে করোনায় আক্রান্ত হননি; অথবা আক্রান্ত হয়ে থাকলেও গত ১৫ দিনের আগেই তিনি সুস্থ্য হয়ে উঠেছেন। ফরাসি সরকারের এই সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিযুক্ত, সেব্যাপারে যেমন আলোচনা চলছে, তেমনি এর মাধ্যমে ফ্রান্সের ব্যক্তিস্বাধীনতার সংস্কৃতি কতটা আক্রান্ত হয়েছে, সেটাও আলোচনায় আসছে।
গত ৫ই অগান্সট ফ্রান্সের সর্বোচ্চ আদালতে রায় দেয়া হয় যে, ফরাসি সরকারের ‘হেলথ পাস’এর সিদ্ধান্ত সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। একইসাথে আদালত এই সিদ্ধান্তও দেয় যে, ফ্রান্সের পার্লামেন্টে পাস করা আইনের মাধ্যমে জনগণের উপর যে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে, তা মানুষের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে “ব্যালন্সে রেখেছে”; অর্থাৎ এখানে ব্যক্তিস্বাধীনতা খর্ব হবার বিষয়ে খুব বেশি চিন্তিত হবার কিছু নেই। ‘ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর’ বলছে যে, প্যারিসে আদালতের বাইরে কয়েক’শ মানুষ এই রুলিংএর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। প্রতিবাদকারীরা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ‘হেলথ ডিক্টেটরশিপ’ বা ‘স্বাস্থ্যবিষয়ক একনায়কতন্ত্র’ বলছে। একজন প্রতিবাদকারী জুলিয়েন বেইলি বলছেন যে, তিনি ভ্যাকসিন নিয়েছেন। তবে ভ্যাকসিন নেবার ব্যাপারটা হওয়া উচিৎ ছিল স্বেচ্ছায়; সরকারের চাপে পড়ে নয়। তিনি আশংকা করে বলেন যে, কিছুদিন পর হয়তো সকল কর্মকান্ডের জন্যে ‘কিউআর কোড’ দেখাতে হবে। এটা ব্যক্তিস্বাধীনতার উপর নজিরবিহীন আঘাত।
নতুন আইনে রেস্তোরাঁয় খেতে গেলে ‘হেলথ পাস’ লাগবে। রেস্তোরাঁ মালিকরা বলছেন যে, ক্রেতাদের পাস আছে কিনা, সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তো রেস্তোরাঁর হতে পারে না। হাসপাতালে রুগীকে দেখতে গেলেও পাস লাগবে; অথবা অতি জরুরি নয় এমন কোন মেডিক্যাল সেবা নিতে গেলেও। স্বাস্থ্যকর্মীরা এখন ভ্যাকসিন নিতে বাধ্য। তবে আদালত এই আইনের মাঝে কিছু অংশ বাতিল করেছে; যেমন সরকার চেয়েছিল যে, ‘হেলথ পাস’ না থাকলে চাকুরিদাতা কর্মচারীকে হঠাত করেই বরখাস্ত করতে পারবে; যা আদালত অনুমোদন দেয়নি। তবে অনেক মানুষের সাথে কাজ করতে হয় এমন কোন চাকুরিতে থাকলে চাকুরিদাতা তার কর্মচারিকে বরখাস্ত করতে পারবে। ফরাসি থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইন্সটিটিউট মনটেইন’এর করা এক জনমত জরিপে বলা হচ্ছে যে, ফ্রান্সের ৩৭ শতাংশ জনগণ ‘হেলথ পাস’এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীদের পক্ষে রয়েছে; অন্যদিকে ৪৮ শতাংশ রয়েছে বিপক্ষে। অর্থাৎ একটা বড় সংখ্যক মানুষ এই আইনের বিপক্ষে। আর ৫২ শতাংশ জনগণ প্রতিবাদকারীদের বিপক্ষে নয়। ফরাসি সরকারের হিসেবে দেশের ৫৪ শতাংশ জনগণের এখন পর্যন্ত করোনার টিকা দেয়া সম্পন্ন হয়েছে।
ফ্রান্সে ব্যক্তিস্বাধীনতার সংজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এমন একটা সময়ে, যখন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর ব্যাঙ্গাত্মক ছবি বিলবোর্ডে ছাপাবার কারণে মামলা হয়েছে। গত ২৮শে জুলাই বিলবোর্ডের ব্যবসায় থাকা মিশেল অঙ্গে ফ্লোরি এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, ফরাসি প্রেসিডেন্টের অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে টুলঁ শহরের পুলিশ ডেকে পাঠিয়েছে। তিনি ফ্রান্সকে ‘ম্যাক্রনিয়া’ আখ্যা দিয়ে বলেন যে, এই দেশে নবীকে অপমান করে ছবি আঁকলে সেটাকে ‘স্যাটায়ার’ হিসেবে মেনে নেয়া হয়, কিন্তু প্রেসিডেন্টকে একনায়ক বললে ‘ব্লাসফেমি’ হয়ে যায়। ম্যাক্রঁ যে বিলবোর্ডের ব্যাপারে চিন্তিত, ‘ইউরোনিউজ’ তার বর্ণনা দিয়ে বলছে যে, সেখানে ম্যাক্রঁর একটা ছবিকে পরিবর্তিত করে হিটলারের মতো করে দেখানো হয়েছে এবং ম্যাক্রঁর দলের লোগো পরিবর্তিত করে হিটলারের নাজি পার্টির স্বস্তিকা লোগোর মতো করে আঁকা হয়েছে। এর সাথে লেখা হয়েছে যে, “সকলে আদেশ মান্য কর; ভ্যাকসিন নাও”। টুলঁ শহরে ঢোকার পথে রাস্তার পাশেই দু’টা বিলবোর্ডে ম্যাক্রঁর এই ব্যাঙ্গচিত্র প্রদর্শিত হয়।
ফ্লোরি এমন একটা ইস্যুকে সামনে নিয়ে এসেছেন, যা শুধু ব্যক্তিস্বাধীনতা নয়, ফ্রান্সের রাষ্ট্রীয় চিন্তাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ফ্রান্সের সেকুলার চিন্তাকে রক্ষা করার কথা বলে সেদেশের মুসলিম জনগণকে আইন করে ইসলাম পালনে বাধা দেয়া হচ্ছে। গত জুলাই মাসে ফরাসি সরকারি সংস্থা ‘এসজি সিআইপিডিআর’এর এক টুইটার বার্তায় নতুন করে সেকুলারিজমের উপর একটা মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করার কথা ঘোষণা দেয়া হয়। অনেকেই মনে করছেন যে, এর মাধ্যমে ফ্রান্সের মুসলিম জনগণকে রিপাবলিককে কিভাবে ভালোবাসতে হবে, সেটা শিক্ষা দেয়া হবে। গত ডিসেম্বরে ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেরাল্ড ডারমারিন এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেন যে, ফরাসি রিপাবলিকে মানুষ আল্লাহর ইবাদত করতে পারবে এবং রিপাবলিককে ভালোবাসতে পারবে। কিন্তু এক মুহুর্তের জন্যেও আল্লাহ রিপাবলিকের উপরে নয়।
ফ্রান্সের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা তাদের রাষ্ট্রীয় চিন্তাকে রক্ষা করতে ক্রমাগতভাবেই জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। একারণেই ফ্রান্সের বড় একটা অংশ এখন রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তগুলিকে একনায়কোচিত বলে আখ্যা দিচ্ছে। মুসলিমদের ইসলাম পালনের বিরুদ্ধে সরকারের সিদ্ধান্তগুলির পরপরই এখন ‘হেলথ পাস’এর ইস্যু নিয়ে জনগণের মাঝে ক্ষোভ দানা বাঁধছে। ব্যক্তিস্বাধীনতার সংজ্ঞা একেকজনের কাছে একেকরকম। ফ্লোরি যেভাবে বলেছেন যে, নবীকে অপমান করাটা ব্যক্তিস্বাধীনতার মাঝে পড়লেও প্রেসিডেন্টকে অপমান করাটা রাষ্ট্রের কাছে অপরাধ হিসেবে ঠেকেছে। রাষ্ট্রের অঙ্গগুলি, তথা সরকার, আদালত এবং জনগণের মাঝে চিন্তার দৃশ্যমান ফারাক ফ্রান্সের রাষ্ট্রীয় ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ এবং দুর্বল করে ফেলছে।
Saturday, 17 July 2021
চলমান সহিংসতা দেখিয়ে দিচ্ছে যে, গণতন্ত্র দক্ষিণ আফ্রিকার জনগণকে মুক্তি দিতে পারেনি
মিডিয়াতে দক্ষিণ আফ্রিকায় সহিংসতা এবং লুটতরাজের ছবি দেখে বিশ্ববাসী যখন স্তম্ভিত, তখন অনেকেই এর মূল কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা চালাচ্ছেন। আটককৃত প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমার সমর্থকদের বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ২’শ ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ক্ষমতাসীন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমার রাজনৈতিক দল ‘আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস’ বা ‘এএনসি’তে তার বিরোধী গ্রুপের চাপের মুখে মেয়াদ শেষ হবার এক বছর আগেই তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। জুমার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা করা হলেও তিনি আদালতের সামনে স্বাক্ষ্য দিতে অস্বীকৃতি জানালে আদালত অবমাননার জন্যে গত ২৯শে জুন তাকে ১৫ মাসের কারান্ডাদেশ দেয়া হয়। জুমার আটকের খবরের পরপরই দেশটার জনবহুল এবং অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ গুয়াতেং এবং কোয়াজুলু নাটাল প্রদেশে ব্যাপক সহিংসতা শুরু হয়। একইসাথে সেখানে চলে ভয়াবহ লুটতরাজ। প্রেসিডেন্ট সাইরিল রামাফোসার সরকার সহিংসতা বন্ধে তিন মাসের জন্যে ২৫ হাজার সৈন্য মোতায়েন করেছে; যা কিনা দেশটার বর্ণবাদী সরকারের সময়ের পর থেকে সবচাইতে বড় সামরিক মিশন।
‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, দক্ষিণ আফ্রিকায় অনেকেই মনে করছেন যে, বর্তমান বিক্ষোভ এবং লুটতরাজ দেশটার গণতন্ত্রের জন্যে সবচাইতে কালো অধ্যায়। সরকারি কর্মকর্তারা বিভিন্নভাবে এই সমস্যাকে ‘অর্থনৈতিক নাশকতা’; ‘অভ্যত্থান’ বা ‘বিদ্রোহ’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। প্রেসিডেন্ট রামাফোসা বলছেন যে, এই সহিংসতা আগে থেকেই পরিকল্পিত ছিল। প্রথমে এই সমস্যাকে ‘জাতিগত একত্রিকরণ’ বলে আখ্যা দিলেও পরে তিনি সেই বক্তব্য থেকে সড়ে আসেন। তবে দেশটার রাজনৈতিক এবং সামরিক নেতৃবৃন্দ রাস্তায় সৈন্য মোতায়েনের ব্যাপারে বা জরুরি অবস্থা ঘোষণার ব্যাপারে একেবারেই রাজি ছিল না। নিরাপত্তা সংস্থার এক বৈঠকে সামরিক কর্মকর্তারা সরাসরিই জানিয়ে দেন যে, আইন প্রয়োগ করার জন্যে সৈন্যরা রাস্তায় নামেনি; আইন প্রয়োগের দায়িত্ব হলো পুলিশের।
‘এএনসি’র উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ এবং ইন্টেলিজেন্সের সদস্যদের বরাত দিয়ে ‘ডেইলি ম্যাভেরিক’এর এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, এই সকল সহিংসতাই ছিল একটা সমন্বিত প্রচেষ্টা; যার পিছনে রয়েছে প্রাক্তন প্রেসিডেন্টের ডজনখানেক সমর্থক। সহিংসতা শুরুর প্রথম দিকে কোয়াজুলু নাটাল প্রদেশে গাড়িতে আগুন দেয়া হয়। এরপর গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর ডারবানের সাথে অর্থনৈতিকভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ গুয়াতেং প্রদেশের যোগাযোগের পথ বন্ধ করে দেয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল যে, বর্তমানে ধুঁকে ধুঁকে চলা অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলে রামাফোসা সরকারকে সমস্যায় ফেলা। রাস্তায় সামরিক বাহিনী নামানোর উদ্দেশ্য সহিংসতা বন্ধ করা নয়; বরং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলি, যেমন ডারবান সমুদ্রবন্দর, তেলের রিফাইনারি, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক, গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, খাবার এবং জালানির সাপ্লাই লাইন, ইত্যাদিকে রক্ষা করা।
ক্ষমতাসীন ‘এএনসি’র মাঝে এখন দু’টা গ্রুপের সৃষ্টি হয়েছে। এক গ্রুপ বলছে যে, জুমার অধীনে এক দশকের দুর্নীতির রাজত্ব থেকে দেশের কাঠামো এবং জবাবদিহিতাকে উদ্ধার করার চেষ্টা করছেন রামাফোসা। আরেক গ্রুপ জুমার সময়ে বিভিন্নভাবে উপকৃত হয়েছিল; এখন রামাফোসার অধীনে তাদের অবস্থান আবারও হুমকির মাঝে পড়েছে। ‘বিবিসি’ বলছে যে, একসময় ‘এএনসি’র ইন্টেলিজেন্সের দেখাশুনা করা জুমার সাথে দেশটার ইন্টেলিজেন্সে যোগাযোগ ভালো। জুমার বিরুদ্ধে বলা হচ্ছে যে, তিনি একটা সমান্তরাল ইন্টেলিজেন্স সংস্থা তৈরি করেছিলেন। ২০১৮ সালে এক প্রতিবেদনে জুমার এই ইন্টেলিজেন্স সংস্থার উল্লেখ করা হয়। তবে এব্যাপারে রামাফোসার সরকার তেমন কিছু করতে পেরেছে কিনা, সেব্যাপারে অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করছেন। অপরপক্ষে জুমার সমর্থকরা বলছেন যে, সরকার দরিদ্রদের অবস্থার উন্নয়ন করতে না পেরে রাজনৈতিক বিভেদ বা সমান্তরাল ইন্টেলিজেন্সের কথাগুলি বলছে এবং একইসাথে সহিংসতার ব্যাপারে ভবিষ্যতবাণী করছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার রাজনীতিতে জাতিগত বিভেদের ব্যাপারটা খুব বেশি আলোচিত নয়। দেশটার কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার রক্ষার আন্দোলনের নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার সময়েও এই বিভেদ ছিল। দেশটার সবচাইতে বড় জাতিগোষ্ঠি হলো জুলু; যাদের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ১০ লক্ষ। মোঙ্গোসুটু বুথেলেজি ১৯৭০এর দশকে ‘ইনকাথা ফ্রিডম পার্টি’ নামে প্রধানতঃ জুলুদের একটা দল গঠন করেন। ‘ইনকাথা’র সাথে ‘এএনসি’র দ্বন্দ্ব সেই সময় থেকেই। ‘এএনসি’র আন্দোলনে ‘ইনকাথা’ জড়িত ছিল না। ১৯৯০এর দশকে দেশটার রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় ‘ইনকাথা’ নির্বাচনে অংশ নেবার শর্ত হিসেবে জুলুদের রাজাকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে চেয়েছিল। তবে তাদের এই দাবির বাস্তবায়ন ছাড়াই তারা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেয়। ১৯৯৪ সালের নির্বাচনে ‘ইনকাথা’ তাদের মূল ঘাঁটি কোয়াজুলু নাটাল প্রদেশে ৫০ শতাংশ ভোট পায়। অথচ আর কোন প্রদেশে তারা ৪ শতাংশ ভোটও পায়নি। কোয়াজুলু নাটালে ‘এএনসি’ পেয়েছিল ৩২ শতাংশ ভোট। তবে পরবর্তী নির্বাচনগুলিতে কোয়াজুলু নাটালে ‘এএনসি’র ভোট বাড়তে থাকে। ২০০৪ সালে ‘এএনসি’ সেখানে ৪৭ শতাংশ ভোট পায়। আর ২০০৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম জুলু প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমার নির্বাচনের সময় ‘এএনসি’ সেখানে ৬৩ শতাংশ ভোট পায়। জুমা ক্ষমতা হারাবার পর ২০১৯ সালের নির্বাচনে কোয়াজুলু নাটালে ‘এএনসি’র ভোট ৫৪ শতাংশে নেমে আসে। শিল্পভিত্তিক দক্ষিণ আফ্রিকার জুলু অঞ্চলগুলি মূলতঃ কৃষিভিত্তিক। ‘স্ট্যাটস সাউথ আফ্রিকা’র হিসেবে কোয়াজুলু নাটালের মাথাপিছু আয় দক্ষিণ আফ্রিকার নয়টা প্রদেশের মাঝে ৭ম। অথচ জনসংখ্যার দিক থেকে প্রায় ২০ শতাংশ জনগণ নিয়ে কোয়াজুলু নাটাল দ্বিতীয়। ২৫ শতাংশ নিয়ে সর্বোচ্চ হলো গুয়াতেং; যেখানে রয়েছে জোহান্সবার্গ এবং প্রিটোরিয়া। বর্তমানে সহিংসতা হচ্ছে এই দুই প্রদেশেই; যেখানে সৈন্য মোতায়েন করা হয়েছে।
‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সহিংসতা যেসব অঞ্চলে হচ্ছে, সেসব অঞ্চলই করোভাইরাস এবং লকডাউনে অর্থনৈতিকভাবে সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লুটতরাজ চালানো অনেকেই বলছেন যে, তারা তাদের পরিবারকে বাঁচাতে লুটতরাজ চালাচ্ছেন। দেশটার সরকারের বরাত দিয়ে ‘রয়টার্স’ জানাচ্ছে যে, এবছরের প্রথম প্রান্তিকে বেকারত্বের হার রেকর্ড ৩২ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে; ২০০৮ সাল থেকে যা সর্বোচ্চ। রামাফোসার আইনের শাসন বনাম জুমার অর্থনৈতিক মুক্তির ‘জাতিগত’ কৌশল একে অপরের মুখোমুখি। ১৯৯০এর দশকে সফল গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের পরেও প্রায় তিন দশকেও দেশের মানুষ দারিদ্র্য এবং বৈষম্যের শিকার। আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ দেশ দক্ষিণ আফ্রিকার এহেন অবস্থা আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতেও প্রভাব ফেলবে।
Sunday, 23 May 2021
ভারতে করোনা সংক্রমণের ভূরাজনৈতিক ফলাফল
করোনাভাইরাসের সংক্রমণে ভারতের ভয়াবহ অবস্থার চিত্র যখন প্রতিফলিত হচ্ছে বিশ্বমিডিয়াতে, তখন কেউ কেউ এই সংক্রমণের ভূরাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করছেন। ‘ইউরেশিয়া গ্রুপ’এর ‘জি জিরো মিডিয়া’তে মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সরকার ভারতের মহামারির ব্যাপারে যতটা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, ব্রাজিলের ব্যাপারে তার ধারেকাছেও নয়। এর কারণ খুঁজতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভারতের কৌশলগত গুরুত্বের দিকে তাকাতে হবে।
২০২০এর অগাস্টে ভারতের সরকারি পরিসংখ্যানে বলা হয় যে, এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত দ্বিতীয় প্রান্তিকে ভারতের অর্থনীতি প্রায় ২৪ শতাংশ কমে গিয়েছিল; যা কিনা বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলির মাঝে সর্বোচ্চ। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি কমেছিল সাড়ে ৯ শতাংশ; আরা জাপানের কমেছিল ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। ১৯৯৬ সালে ভারত সরকার সর্বপ্রথম জিডিপির পরিসংখ্যান প্রকাশ শুরু করার পর থেকে এটা অর্থনীতিতে সর্বোচ্চ ধ্বস। লকডাউনের কারণে লাখ লাখ দিনমজুর কাজের অভাবে শহরগুলি ছেড়ে পালিয়েছে। এই মানুষগুলি অনেকক্ষেত্রেই ভারতের জিডিপির পরিসংখ্যানের বাইরে রয়েছে। ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সিথারামান গত অগাস্টে ভারতের অর্থনৈতিক দুর্দশার জন্যে করোনাভাইরাসকে দায়ী করে বলেন যে, এটা সৃষ্টিকর্তার কারণে হয়েছে। তবে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ভারতের অর্থনীতি মহামারির আরও আগে থেকেই ধুঁকে ধুঁকে চলছিল। ২০১৯এর অগাস্টে বলা হয়েছিল যে, দেশটাতে গাড়ি বিক্রি ৩২ শতাংশ কমেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০২৪ সাল নাগাদ দেশটার অর্থনীতিকে ৫ ট্রিলিয়ন ডলার বা ৫ হাজার বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার যে ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন, সেই স্বপ্ন এখন বেশ দূরবর্তীই মনে হচ্ছে।
মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’এর এক লেখায় ‘জন্স হপকিন্স স্কুল অব এডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’এর প্রফেসর ড্যানিয়েল মার্কি ভারতে করোনাভাইরাসের ব্যাপক সংক্রমণের কৌশলগত ফলাফল ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। ২০২০ সালের শেষের দিকে এবং ২০২১এর শুরুতে অনেকেই মনে করতে শুরু করেছিলেন যে, ভারত খুব সম্ভবতঃ করোনার সবচাইতে খারাপটা দেখে ফেলেছে। এখন ভাইরাসের নতুন ধরনের সংক্রমণ এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে এই আশা পুরোপুরি ভেঙ্গে গেছে। বাইডেন প্রশাসন তাদের চীনকে নিয়ন্ত্রণ করার কৌশলে ভারতের সাথে সহযোগিতাকে মূল স্তম্ভগুলির একটা হিসেবে দেখছে। যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে দিয়ে চীনকে ব্যালান্স করতে চাইছে, তাই ভারতের স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দুশ্চিন্তার ভিত্তি মানবিক নয়; কৌশলগত। হিমালয়ের পাদদেশে চীনের সাথে উত্তেজনা যখন সমাধানহীন অবস্থায় রয়ে গেছে, তখন ভারতে করোনার মারাত্মক সংক্রমণের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব যথেষ্ট। প্রফেসর মার্কি মনে করছেন যে, ভারতের দুর্বল মুহুর্তেকে চীন যদি ব্যবহার করতে চায়, তাহলে একইসাথে কয়েকটা চ্যালেঞ্জের চাপে পড়ে নতুন দিল্লীতে নীতিগত ভুল হবার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। আর এসময়েই যুক্তরাষ্ট্রের উচিৎ ভারতকে নীতিগত সহায়তা দিয়ে কৌশলগত দিক থেকে শক্তিশালী করা।
বার্তাসংস্থা ‘ব্লুমবার্গ’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, করোনার ভারে নুয়ে পড়ে ভারত যখন তার ভ্যাকসিন সরবরাহের প্রতিশ্রুতি রাখতে হিমসিম খাচ্ছে, তখন সারা বিশ্ব চীনের ভ্যাকসিনের উপর নির্ভরশীল হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চীনের ‘সিনোফার্ম গ্রুপ’এর ভ্যাকসিনকে স্বীকৃতি দেবার পর বিশ্বব্যাপী চীনের ভ্যাকসিনের চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন অনেকেই। এছাড়াও চীনের ‘সিনোভ্যাক বায়োটেক’এর ভ্যাকসিনও খুব শিগগিরই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বীকৃতি পেতে পারে। ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’এর সিনিয়র ফেলো ইয়ানঝং হুয়াং বলছেন যে, চীন শুধুমাত্র ভ্যাকসিনের সবচাইতে বড় রপ্তানিকারকই হতে যাচ্ছে না, কিছু দেশের জন্যে চীনের ভ্যাকসিন ছাড়া কোন পথই খোলা থাকছে না।
এমতাবস্থায় চীনের প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণে বাইডেন প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের নিজের জন্যে ক্রয় করা ‘এসট্রাজেনেকা’র ৬ কোটি ডোজ অন্য দেশগুলিকে দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এবং একইসাথে মার্কিন নিয়ন্ত্রণে থাকা ‘মডার্না’, ‘ফাইজার’ এবং ‘জনসন এন্ড জনসন’এর ভ্যাকসিন উৎপাদন দ্রুত বৃদ্ধির জন্যে জোর দিচ্ছে ওয়াশিংটন। তবে অন্যান্য দেশের ভ্যাকসিন ফ্যাক্টরিগুলিকে কার্যকর করার জন্যে মার্কিন কোম্পানিগুলির ডেভেলপ করা ভ্যাকসিনের উপর থেকে কপিরাইট স্বত্ব উঠিয়ে নেবার ব্যাপারে কথা বললেও এখনও সেব্যাপারে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি বাইডেন সরকার। যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত ২৪ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন তৈরি করলেও বিশ্বের অন্যান্য দেশকে ভ্যাকসিন দেবার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের কৃপণতা দৃষ্টিকটু। রপ্তানি বন্ধ করার আগ পর্যন্ত ভারত পৃথিবীর প্রায় এক’শ দেশে ব্রিটেনের অক্সফোর্ডের ডেভেলপ করা ‘এসট্রাজেনেকা’র ৬ কোটি ৭০ লক্ষ ডোজ ভ্যাকসিন রপ্তানি করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় গড়ে ওঠা ‘কোভ্যাক্স’ চেষ্টার মাধ্যমে এখন পর্যন্ত মাত্র ৫ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন বিশ্বের গরীব দেশগুলিতে পৌঁছেছে, যা কিনা যুক্তরাষ্ট্রের নিজের জন্যে তৈরি ২৪ কোটি ভ্যাকসিনের তুলনায় কিছুই নয়। ‘কোভ্যাক্স’ ভারতের ‘সেরাম ইন্সটিটিউট’এর ফ্যাক্টরির উপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল।
পশ্চিমা গবেষকেরা বলছেন যে, চীনের ভ্যাকসিনের কর্মক্ষমতা তুলনামূলকভাবে বেশ কম। হংকংএর ‘সিটি ইউনিভার্সিটি’র এসোসিয়েট প্রফেসর নিকোলাস থমাসএর মতে, চীনারা মধ্যম মেয়াদে ভ্যাকসিনের মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে পারবে। কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলি যদি উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হয়, তাহলে তারা চীনা ভ্যাকসিনের দুর্বল কর্মক্ষমতাকে ব্যবহার করে ভূরাজনৈতিক প্রভাব পুনরুদ্ধার করতে পারবে। অপরদিকে বর্তমান পরিস্থিতিকে ব্যবহার করতে চীনারা সকল চেষ্টাই করছে। চীনের রাষ্ট্রীয় পত্রিকা ‘গ্লোবাল টাইমস’এর এক লেখায় যুক্তরাষ্ট্রকে কটাক্ষ করে বলা হয় যে, ভারতের সবচাইতে খারাপ সময়ে ওয়াশিংটন ভারতকে সাহায্য করতে ব্যর্থ হচ্ছে। পশ্চিমারা ভারতের কাছাকাছি গিয়েছে ভূরাজনৈতিক স্বার্থের জন্যে; এই সম্পর্ক ঠুনকো এবং অগভীর।
ভারতের করোনা মহামারি একদিকে যেমন দেশটার দুর্বল অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোকে আরও দুর্বল করছে, তেমনি বিশ্বব্যাপী ভ্যাকসিন সরবরাহের অপ্রতুলতা সৃষ্টি করে চীনের ভ্যাকসিন কূটনীতির জন্যে জায়গা করে দিচ্ছে। দুর্বল ভারতকে দিয়ে চীনকে ব্যালান্স করতে যুক্তরাষ্ট্র যে হিমসিম খাবে, তা বলাই বাহুল্য। এতে কৌশলগত দিক থেকে ওয়াশিংটনের উপর দিল্লীর নির্ভরশীলতা তৈরি হলেও পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বন্ধুর সবচাইতে কঠিন সময়ে যথেষ্ট সহায়তা দিতে না পারাটা যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জকে কঠিনতর করবে।
Friday, 12 March 2021
ভারতকে আবারও নিজ ছায়াতলে আনতে চাইছে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’
সারা বিশ্বে যখন করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা নিয়ে আলোচনা চলছে, তখন শক্তিশালী দেশগুলি ভ্যাকসিনকে ভূরাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির হাতিহার হিসেবে দেখছে। পূর্ব ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকা এবং আফ্রিকাতে যখন পশ্চিমা দেশগুলি ভ্যাকসিন সরবরাহ করতে হিমসিম খাচ্ছে, তখন চীন এবং রাশিয়া এই সুযোগে প্রভাব বাড়িয়ে নিচ্ছে বলে মনে করছেন অনেক পশ্চিমা চিন্তাবিদেরা। তবে ব্রিটেনের ‘দ্যা টেলিগ্রাফ’ পত্রিকার এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, ঠান্ডা যুদ্ধের মতোই রাশিয়া এবং চীনের ভীতিকে জিইয়ে রেখে পশ্চিমারা শক্তিশালী একটা প্রত্যুত্তর দিতে চাইছে। নিজেদের মেডিক্যাল গর্বকে ধরে রাখতে পশ্চিমা দেশগুলিকে দ্রুত কাজ করতে হবে। তবে একইসাথে বলা হচ্ছে যে, ব্রিটেনের উচিৎ তাদের ভ্যাকসিনের সফলতাকে ভূরাজনৈতিক সফলতাতে রূপান্তরিত করা। উদাহরণস্বরূপ বলা হচ্ছে যে, ভারতের সাথে ব্রিটেনের একটা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি দুই দেশের বাণিজ্যকে ১’শ ৪০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যেতে পারে, যা বর্তমানে ৩২ বিলিয়ন ডলারের মতো।
ব্রিটেনের প্রভাবশালী ‘স্পেকট্যাটর’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, ঠান্ডা যুদ্ধ যখন তুঙ্গে ছিল, তখন বিশ্বের প্রায় শ’খানেক উন্নয়নশীল রাষ্ট্র জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনে নাম লেখায়; যারা যুক্তরাষ্ট্র বা সোভিয়েত ইউনিয়ন, কারুর পক্ষেই যাবার পক্ষপাতি ছিল না। তখন উভয় সুপারপাওয়ারই চেষ্টা করেছে এই দেশগুলিকে নিজেদের বলয়ে নিয়ে আসতে; বর্তমানেও সেটাই হচ্ছে। ঠান্ডা যুদ্ধের পর ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় চীন এবং রাশিয়াও চাইছে মাঝামাঝি থাকা এই দেশগুলিকে নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসতে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে আসে। চীন এবং রাশিয়ার ভ্যাকসিন কূটনীতি এরই অংশ। অপরদিকে ব্রিটেন আন্তর্জাতিকভাবে ভ্যাকসিনের প্রসার ঘটাতে ভারতকে ব্যবহার করছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। ভারতের ‘সেরাম ইন্সটিটিউট’ প্রকৃতপক্ষে ব্রিটেনের অক্সফোর্ডের ডেভেলপ করা ভ্যাকসিনই তৈরি করছে। ব্রিটেন যখন নিজের তৈরি ভ্যাকসিন দিয়ে নিজস্ব জনগণকে রক্ষা করছে, তখন ব্রিটিশ ‘আশীর্বাদে’ ভারত দুনিয়াব্যাপী ভ্যাকসিন ছড়িয়ে দিচ্ছে। তবে লেখায় আরও বলা হচ্ছে যে, আসন্ন ‘ডি১০’ শীর্ষ বৈঠকে ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে যে, পশ্চিমাদের বন্ধুত্ব চীনের বন্ধুত্বের চাইতেও বেশি দামি।
‘ডি১০’ হলো অর্থনৈতিকভাবে উন্নত সাতটা দেশ ‘জি৭’এর একটা সম্প্রসারণ। ‘জি৭’এর দেশগুলি হলো যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, কানাডা ও জাপান। এর সাথে ‘ডি১০’এর অধীনে যুক্ত করা হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভারতকে। ব্রিটেন চাইছে ২০২১ সালে ‘জি৭’ শীর্ষ বৈঠককে ‘ডি১০’ বৈঠকে রূপান্তরিত করতে। অনেকেই বলা শুরু করেছেন যে, ‘জি৭’ একটা পুরোনো চিন্তা; তাই এটাকে ‘ডি১০’এর মাধ্যমে প্রতিস্থাপিত করা উচিৎ। ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’এর এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, ‘ডি১০’এর চিন্তাটা নতুন নয়। ২০০৮ সালে মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘আটলান্টিক কাউন্সিল’এর এশ জৈন এবং মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রাক্তন পলিসি প্ল্যানিং ডিরেক্টর ডেভিড গর্ডন ‘ডি১০’এর ব্যাপারে কথা বলা শুরু করেন। তারা বলছিলেন যে, এখন এমন একটা সময়ে এসেছে, যখন পশ্চিমা লিবারাল আদর্শের দেশগুলি নিজেদের নেতৃত্ব ধরে রাখতে পারছে না। এমতাবস্থায় এই দেশগুলির উচিৎ একত্রে বসে কৌশল নির্ধারণ করা। এশ জৈন বর্তমানে ‘আটলান্টিক কাউন্সিল’এ ‘ডি১০ স্ট্র্যাটেজি ফোরাম’ দেখাশুনা করছেন; যার উদ্দেশ্য হলো এই দেশগুলির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং বিশ্লেষকদের একত্রে নিয়ে এসে নীতি বিষয়ক কথাবার্তা চালিয়ে নেয়া।
‘ফরেন পলিসি’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’এর ফেলো এরিক ব্র্যাটেনবার্গ এবং ব্রিটিশ সাংবাদিক বেন জুডাহ বলছেন যে, এখন সময় এসেছে ‘জি৭’কে পিছনে ফেলে ‘ডি১০’কে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। তারা বলছেন যে, ‘ডি১০’ কোন চীন বিরোধী সংস্থা নয়। বরং এটা হলো পশ্চিমা গণতান্ত্রিক শাসনের প্রতি হুমকিস্বরূপ দু’টা বিশেষ সমস্যাকে সমাধানের একটা উপায়। এর মাঝে একটা হলো ‘ফাইভ জি’ বা পঞ্চম জেনারেশনের প্রযুক্তি; আরেকটা হলো অতি গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সাপ্লাই চেইন। এই উভয় সমস্যাই পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলির কেউ একা সমাধান করতে পারবে না। অপরপক্ষে ‘ডি১০’এর মাধ্যমে এই সমস্যাগুলিকে সমাধানে বেশ দ্রুত কাজ করা সম্ভব। এর মাধ্যমে ট্রান্স আটলান্টিক এবং ট্রান্স প্যাসিফিকের গণতান্ত্রিক দেশগুলিকে একটা কাঠামোর মাঝে এনে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলিকে কেন্দ্র করে দ্রুত কর্মমুখী একটা সমাধানে দিকে এগুনোর মাধ্যমে একাধারে যেমন সংস্থাটাকে একটা আলোচনা সভা বানিয়ে ফেলা থেকে বাঁচা যাবে, তেমনি চীনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র ব্যবস্থা নেয়াকেও কঠিন করে ফেলা যাবে। তারা বলছেন যে, গণতান্ত্রিক দেশগুলির মাঝে সেতু তৈরি করার ক্ষেত্রে ব্রিটেনের গুরুত্ব যথেষ্ট। তারা মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, ১৯৪৯ সালে ন্যাটো তৈরির সময় ব্রিটিশ সামরিক অফিসার হেস্টিংস ইসমে বলেছিলেন যে, ন্যাটোর দরকার রয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়নকে বাইরে রাখতে, যুক্তরাষ্ট্রকে ভিতরে রাখতে, এবং জার্মানিকে দমিয়ে রাখতে। তেমনি ব্র্যাটেনবার্গ এবং জুডাহ বলছেন যে, ‘ডি১০’এর দরকার রয়েছে চীনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে, ভারতে কাছে রাখতে, এবং যুক্তরাষ্ট্রকে দৃঢ় রাখতে। তাদের কথায়, ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ চিন্তাটা এখনও একটা কঙ্কাল; লন্ডনের জন্যে ‘ডি১০’ হলো এই কংকালের উপর পেশী যুক্ত করার একটা সোনালী সুযোগ।
চীন এবং রাশিয়ার ভ্যাকসিনের ‘ভীতি’কে ব্যবহার করেই ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে চাইছে। ঔপনিবেশিক সময় থেকেই ভারত এবং চীনের অর্থনৈতিক গুরুত্ব ব্রিটেনের কাছে কখনোই কমেনি। একারণেই ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ চীন এবং ভারত উভয়কেই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছে। বিশেষ করে ব্রেক্সিটের পর ভারত এবং চীনের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্কের ব্যাপারে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে ব্রিটেন। ‘ফাইভ জি’ প্রযুক্তি এবং সাপ্লাই চেইনকে আলোচনায় এনে ব্রিটেন চীনের বিকল্প তৈরি নয়, বরং চীনকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। অপরপক্ষে অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনের উৎপাদনে ভারতকে অংশীদার করে এবং ‘ডি১০’ গঠনের মাধ্যমে ভারতকে একটা বড় আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মের অংশ করে নিয়ে ব্রিটেন ভারতকে আবারও নিজের ছায়াতলে আনতে চাইছে। একইসাথে ব্রিটেন চাইছে চীনকে নিয়ন্ত্রণের খেলায় যুক্তরাষ্ট্র যেন একচ্ছত্রভাবে সিদ্ধান্ত না নিতে পারে। ইইউ থেকে বের হয়ে যাবার সাথেসাথেই করোনাভাইরাসের সংক্রমণে ব্রিটেনের অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতি হলেও ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ চিন্তার বাস্তবায়ন অন্বেষণ করা থেকে তারা যে এক চুলও নড়েনি, তা পরিষ্কার।
Thursday, 18 February 2021
ডলার ছাপিয়ে চলছে যুক্তরাষ্ট্র ..... কিন্তু এভাবে কতদিন?
নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন করোনাভাইরাসের মহামারি এবং এর ফলশ্রুতিতে সৃষ্ট মহামন্দা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে বাঁচাতে ১ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার বা ১৯’শ বিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা প্যাকেজ প্রস্তাব করেছেন। এর মাঝে ১ ট্রিলিয়ন বা ১ হাজার বিলিয়ন ডলার নগদ অর্থ সহায়তা হিসেবে খেটে খাওয়া মানুষকে দেয়া হবে। ৪’শ বিলিয়ন খরচ করা হবে ভ্যাকসিন এবং মেডিক্যাল ব্যবস্থার উন্নয়নের পিছনে। আরও ৪’শ ৪০ বিলিয়ন ডলার দেয়া হবে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য এবং ছোট ব্যবসাগুলিকে, যারা পুঁজি বাজার থেকে ঋণ পাবে না। ‘কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস’ বা ‘সিবিও’এর হিসেবে এই প্রণোদনা প্যাকেজ ২০২১ সালের পুরো মার্কিন জিডিপির প্রায় ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে সমস্যা সেখানে নয়, ‘সিবিও’ হিসেব করে বলছে যে, ২০২১ সালে সরকারের পুরো রাজস্ব হবে খুব বেশি হলে সাড়ে ৩ ট্রিলিয়ন বা ৩৫’শ বিলিয়ন ডলার হবে। অর্থাৎ ১৯’শ বিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা প্যাকেজ মার্কিন সরকারের বাৎসরিক রাজস্বের ৫৪ শতাংশ। অথচ এই ‘রেসকিউ প্যাকেজ’ আসলে করোনাভাইরাসের কারণে বেড়ে যাওয়া খরচের উপরে যোগ হওয়া খরচ। ২০২১ সালে সরকারের বাজেট ঘাটতি হবে ২৩’শ বিলিয়ন ডলার; যা জিডিপির ১০ দশমিক ৩ শতাংশ। আর রাষ্ট্রীয় ঋণ দাঁড়াচ্ছে জিডিপির ১’শ শতাংশ বা জিডিপির সমান। এটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বোচ্চ।
‘সিএনএন’এর এক লেখায় ‘কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর জেফরি সাক্স বলছেন যে, বাইডেন তার করোনা প্রণোদনার ব্যাপারে বেশ শক্ত যুক্তি রেখেছেন; এবং একইসাথে দীর্ঘমেয়াদী উত্তোরণের পিছনেও কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই অর্থ আসবে কোত্থেকে? বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী অবকাঠামো উন্নয়নে আরও ২ ট্রিলিয়ন বা ২ হাজার বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সাক্স বলছেন যে, তিন পদ্ধতিতে এই কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের ঘাটতি পূরণ করা যেতে পারে। প্রথমতঃ মার্কিন সরকার আরও ঋণ করতে পারে। দ্বিতীয়তঃ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডেরাল রিজার্ভ’ বা ‘ফেড’ আরও ডলার ছাপাতে পারে। আর তৃতীয়তঃ সরকার ট্যাক্স বাড়াতে পারে। সরকার ঋণ করতেই পারে। কিন্তু যখন রাষ্ট্রীয় ঋণ জিডিপির সমান, তখন ঋণ করার সীমা নিয়ে প্রশ্ন আসতেই পারে। আর ‘ফেড’ ফেব্রুয়ারি ২০২০ থেকে জানুয়ারি ২০২১ সালের মাঝে প্রায় ১৮’শ বিলিয়ন ডলার ছাপিয়েছে! বর্তমানে বাজারে থাকা মোট ডলার হলো ৫ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন বা ৫২’শ বিলিয়ন। অর্থাৎ ২০২০ সালের এক বছরে যুক্তরাষ্ট্র বাজারের মোট ডলারের ৩৪ শতাংশ ছাপিয়েছে! ২০০৮ সালে ‘ফেড’এর মোট ছাপানো ডলারের পরিমাণ ছিল মাত্র ৮’শ ৪৭ বিলিয়ন ডলার। সাক্স বলছেন যে, ঋণ করার যেমন সীমা রয়েছে, তেমনি ডলার ছাপানোরও সীমা রয়েছে। কারণ ডলার বেশি ছাপালে মুদ্রাস্ফীতি হবে। তিনি বলছেন যে, ইতোমধ্যেই বিভিন্ন পণ্যের মূল্য বেড়েছে, যা কিনা সামনের দিনগুলিতে আরও বেশি মুদ্রাস্ফীতির দিকেই ইঙ্গিত দেয়। এটা নিশ্চিত যে, ঋণ করে আর ডলার ছাপিয়ে সরকারের বাজেট ঘাটতি দূর করা যাবে না। তাই জনগণের উপর করের বোঝাও বাড়াতে হবে।
জেফরি সাক্সের কথার কিছু প্রমাণ পাওয়া যায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ দ্রব্যের মূল্যের দিকে তাকালে। ‘গোল্ড হাব’এর হিসেবে, ২০২০এর অগাস্টে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের মূল্য আউন্স প্রতি সর্বোচ্চ ২ হাজার ডলার পেরিয়ে যায়। ২০১৯এর ডিসেম্বরে তা ছিল প্রায় ১৪’শ ৭৯ ডলার। অর্থাৎ ২০২০ সালের আট মাসে স্বর্ণের মূল্য ৩৭ শতাংশ বেড়ে যায়! তবে এরপর কিছুটা কমে এসে স্বর্ণের মূল্য ২০২১এর ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ১৭’শ ৮০ ডলার হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যশস্যের মূল্যও বেড়েছে। ‘ট্রেডিং ইকনমিকস’এর হিসেবে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে গমের মূল্য যেখানে ছিল সর্বোচ্চ ৫’শ ৮০ ডলার, সেখানে ২০২১এর জানুয়ারিতে তা ৬’শ ৭৮ ডলারে উঠে যায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে গমের মূল্য বেড়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে গমের মূল্য ৬’শ ৪৮ ডলারের কাছাকাছি রয়েছে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা সর্বোচ্চ ৫’শ ৬৩ ডলার ছিল। ফেব্রুয়ারি মাসেও মূল্য ১৫ শতাংশ বেশি রয়েছে।
‘ইউএসএ টুডে’র এক প্রতিবেদনে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেড’এর ডলার ছাপানোকে ‘জাদু’র সাথে তুলনা করা হয়। যখনই ডলারের দরকার পরবে, তখনই ‘ফেড’ কম্পিউটারের কিছু বাটন চাপ দিয়ে একেবারে শূণ্য থেকে ডলার তৈরি করে নেয়। ইলেকট্রনিক ডিপোজিটের মতো ‘ফেড’ ‘ভার্চুয়াল প্রিন্টিং’এর মাধ্যমে ডলার তৈরি করে বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কের কাছে পাঠিয়ে দেয়। ‘অক্সফোর্ড ইকনমিক্স’ বলছে যে, এটা করোনা মহামারি এবং এর ফলশ্রুতিতে মহামন্দা থেকে উত্তোরণের জন্যে একটা উপায়। নিউ ইয়র্কের ‘বার্ড কলেজ’এর অর্থনীতিবিদ পাভলিনা চেরনেভা বুঝিয়ে বলেন যে, একজন ব্যক্তি অর্থ দরকার হলে যেভাবে চেক লিখে একাউন্ট থেকে অর্থ তুলতে পারে, তেমনি বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলিও ‘ফেড’ থেকে ঋণ নিতে পারে। মার্কিন কংগ্রেস বিশাল রাষ্ট্রীয় ঋণের অনুমোদন দিচ্ছে; আর সেটা পূরণ করে দিচ্ছে ‘ফেড’। ‘ফেড’এর ডলার ছাপানোর এই পদ্ধতির সমালোচক প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেনশনিয়াল প্রার্থী রন পল ‘ইউএসএ টুডে’কে বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র মিথ্যা অর্থ দিয়ে কাজ করছে। এখানে মাপকাঠিটাও বানোয়াট; যা কিনা সত্যিকার অর্থেই অবিশ্বাস্য! ব্যক্তি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তাদের ক্রেডিট কার্ডের বিল একটা বাটন চেপেই দিয়ে দিয়ে পারছেন না; নিজেদের কষ্ট করে আয় করে সেখান থেকে দিতে হচ্ছে। অথচ মার্কিন সরকার একটা বাটন চেপেই তার ঋণ পরিশোধ করে ফেলতে পারছে; কারণ সরকারের নিজস্ব ব্যাংক ডলার ছাপাচ্ছে!
মার্কিন সরকার ঋণ নেবার জন্যে ট্রেজারি বন্ড ইস্যু করে। সেটা কিনে নেয় বিনিয়োগকারীরা। এর বিনিময়ে তারা সরকার থেকে সুদ আয় করে। মার্কিন সরকারের ‘গভর্নমেন্টে একাউন্টাবিলিটি অফিস’ বা ‘জিএও’এর ২০১৯ সালের হিসেবে সরকারের ইস্যু করা মোট ট্রেজারি বন্ডের প্রায় ১৪ শতাংশ ‘ফেড’ কিনেছে; বাকিটা কিনেছে মার্কিন এবং অন্য দেশের বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু গত মার্চ মাস থেকে মার্কিন সরকারের ইস্যু করা বেশিরভাগ ট্রেজারি বন্ড কিনেছে মার্কিন সরকারের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডেরাল রিজার্ভ’। অর্থাৎ মার্কিন সরকারের একটা প্রতিষ্ঠান আরেকটা সরকারি প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিচ্ছে! আর সেই ঋণের অর্থ এসেছে শূণ্য থেকে! রন পল বলছেন যে, এভাবে ডলার ছাপানোর অর্থ হলো অর্থনীতি ফুলে ফেঁপে বেলুনের মতো হয়ে যাবে। বাজারে পণ্য যা রয়েছে, তার চাইতে ডলার বেশি হয়ে যাবে। ফলশ্রুতিতে মুদ্রাস্ফীতি হবে। এক ডলারে আগে যত পণ্য কেনা যেত, এখন তার চাইতে অনেক কম কেনা যাবে। রন পলের উল্টো কথা বলছেন ‘মডার্ন মনেটারি থিওরি’র অনুসারীরা। তারা বলছেন যে, বর্তমান ব্যবস্থায় ডলার ছাপিয়ে সরকার সর্বদাই তার ঋণগুলি শোধ করতে পারবে। কাজেই বাজেট ঘাটতি বা অনেক বেশি ঋণ কোন সমস্যা নয়। কিন্তু বিশ্বের সকল দেশ দরকার হলেই নিজের অর্থ নিজে ছাপিয়ে নিতে পারে না। আর বিশ্বের সবচাইতে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এবং সুপারপাওয়ার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ঋণ পেতে পারে, তা দুনিয়ার আর কেউ পেতে পারে না। সকলেই মার্কিন সরকারের ট্রেজারি বন্ড কিনতে চায়। কিন্তু এভাবে কতদিন চলবে?
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি চলছে ঋণের উপর। বিশ্বব্যাংকের হিসেবে ২০১৯ সালের শেষে যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি ঋণ ছিল জিডিপির প্রায় ১’শ ৯২ শতাংশ! মার্কিন ‘ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট’এর হিসেব বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় ঋণ প্রায় ২৭ ট্রিলিয়ন বা ২৭ হাজার বিলিয়ন ডলার! ‘ফ্রেড ইকনমিক ডাটা’ বলছে যে, এই ঋণ যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির ১’শ ২৭ শতাংশ! অর্থাৎ সরকারি ও বেসরকারি মিলে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ঋণ দেশটার জিডিপির ৩’শ ১৯ শতাংশ বা তিন গুণেরও বেশি! এই ঋণের বেশিরভাগটাই স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ড থেকে আসেনি। যখনই দরকার হয়েছে, তখনই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডেরাল রিজার্ভ’ বা ‘ফেড’ শূণ্য থেকে ডলার তৈরি করে দিয়েছে! এই ডলারই ১৯৭১ সাল থেকে সারা বিশ্বের রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে চলছে। সেবছরের অগাস্ট মাসে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে ১৯৪৪ সালে করা ‘ব্রেটন উডস’ চুক্তি থেকে বের হয়ে যায়। সেই চুক্তি মোতাবেক মার্কিন ডলারের মূল্য স্বর্ণের সাথে যুক্ত করা ছিল। স্বর্ণকে মুদ্রা ব্যবস্থার মাপকাঠি হিসেবে রাখাকে বলা হতো ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’। কিন্তু চুক্তি থেকে বের হয়ে যাবার পর মার্কিন ডলারের মূল্যের কোন হদিসই থাকলো না। বরং অন্যান্য মুদ্রার মূল্য নির্ধারিত হতে থাকলো মার্কিন ডলারের বিপরীতে। ডলারই হয়ে গেল বৈশ্বিক মুদ্রাব্যবস্থার মাপকাঠি। ‘ম্যাক্রোট্রেন্ডস’এর এক হিসেবে দেখানো হচ্ছে যে, ১৯৪৪ সালে এক আউন্স স্বর্ণ কিনতে লাগতো প্রায় ৫’শ ডলারের মতো। সেটা ২০২১ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি ছিল ১৭’শ ৭২ ডলার ৮০ সেন্ট। এর মাঝে স্বর্ণের মূল্য বহুবার কমেছে বা বেড়েছে। আসলে স্বর্ণ আগের জায়গাতেই আছে; ডলারের মূল্য কমেছে বা বেড়েছে। ‘ফেড’ যখন ইচ্ছে ডলার ছাপিয়ে বা বাজার থেকে ডলার কিনে বাজারে ডলারের মূল্য ঠিক রাখার চেষ্টা করেছে। মার্কিন সরকারের নিজের ব্যাংক থেকে ইচ্ছেমতো ঋণ নেয়া এবং শূণ্য থেকে ডলার তৈরি করে ঘাটতি পূরণ করার এহেন কাহিনী গায়ের জোরে এক মুদ্রাব্যবস্থাকে ধরে রাখাকেই দেখিয়ে দিচ্ছে। কেউ কেউ এই ব্যবস্থাকে সমর্থনও করে যাচ্ছেন এই ভেবে যে, এটা কখনোই ভেঙ্গে পড়বে না। কিন্তু করোনা মহামারি দেখিয়ে দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের গায়ের জোর কেন, কোনকিছুই আসলে স্থায়ী নয়। পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় ডলারের স্থায়িত্ব কতদিন, তা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও ডলারের উপর বিশ্ব অর্থনীতির নির্ভরশীলতা কতদিন যুক্তরাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখবে, সেব্যাপারে আলোচনা হতে পারে।
Friday, 29 January 2021
‘ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ’ পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থার বাস্তবতার দিকেই ইঙ্গিত দেয়
করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন সরবরাহ নিয়ে ব্রিটেন এবং ইউরোপিয় ইউনিয়নের দ্বন্দ্ব এখন বেশ পরিষ্কার। ব্রিটিশ সুইডিশ কোম্পানি ‘এসট্রাজেনেকা’ বলছে যে, তারা ইইউএর কাছে যে পরিমাণ ভ্যাকসিন ২০২১ সালের মার্চের মধ্যে সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা তারা বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হচ্ছে না। ২৬শে জানুয়ারি ইতালিয় পত্রিকা ‘লা রিপাবলিকা’র সাথে এক সাক্ষাতে কোম্পানির প্রধান নির্বাহী পাসকাল সোরিঅট বলেন যে, চুক্তি অনুযায়ী ‘সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা’ দেয়ার জন্যে কোম্পানির বাধ্যবাধকতা রয়েছে; তবে নির্দিষ্ট তারিখের মাঝে সকল ভ্যাকসিন সরবরাহ করার কোন বাধ্যবাধকতা নেই। তবে ইইউ ‘এসট্রাজেনেকা’র এই বক্তব্য মানতে নারাজ। ইইউএর স্বাস্থ্য কমিশনার স্টেলা কিরিয়াকিদেস ২৭শে জানুয়ারি সাংবাদিকদের বলেন যে, কোম্পানির ব্রিটিশ কারখানাগুলি ইইউএর সাথে করা চুক্তির অংশ। যেহেতু ব্রিটিশ কারখানাগুলির সরবরাহ ভালোমতো চলছে, তাই কোম্পানি তার প্রতিশ্রুতি রাখতে বাধ্য। পরদিন এক টুইটার বার্তায় তিনি বলেন যে, ইইউ ‘এসট্রাজেনেকা’র চলমান অস্বচ্ছ সরবরাহ শিডিউলে ব্যাথিত। কিরিয়াকিদেস সাংবাদিকদের বলেন যে, কোম্পানি চুক্তিকে যেভাবে ব্যাখ্যা করছে, তা ভুল এবং অগ্রহণযোগ্য। এর সপ্তাখানেক আগে কোম্পানি বলে যে, মার্চের মাঝে তারা তাদের প্রতিশ্রুত ৮ কোটি ভ্যাকসিনের মাঝে মাত্র ৩ কোটি ১০ লক্ষ সরবরাহ করতে পারবে। কারণ হিসেবে কোম্পানিটা বলছে যে, তাদের ইইউএর ভূমিতে বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসের কারখানাগুলি সরবরাহ দিতে হিমসিম খাচ্ছে। এছাড়াও কোম্পানির দু’টা কারখানা রয়েছে ব্রিটেনে। ইইউএর সাথে ‘এসট্রাজেনেকা’র দ্বন্দ্বের মাঝে ব্রিটিশ ক্যাবিনেট অফিসের মন্ত্রী মাইকেল গোভ বলেন যে, ইইউএর সাথে ‘এসট্রাজেনেকা’র যে দ্বন্দ্বই থাকুক না কেন, ব্রিটিশ জনগণের ভ্যাকসিন পেতে কোন সমস্যাই হবে না। তিনি সাংবাদিকদের বলেন যে, ব্রিটেনের কাছে ‘পূর্ণ নিশ্চয়তা’ রয়েছে যে, ব্রিটেন তার ভ্যাকসিন ঠিকমতোই পাবে। আর ব্রিটেনের ভ্যাকসিন প্রকল্প সম্পূর্ণ সফলতা পাবার পরই ইইউএর দেশগুলিকে সহায়তা দেবার কথা আসবে। তিনি আরও বলেন যে, ইউরোপিয়ান কমিশনের চাপ সত্ত্বেও ‘এসট্রাজেনেকা’ ব্রিটেনকে নিশ্চিত করেছে যে, তারা তাদের প্রতিশ্রুতি রাখবে। ভ্যাকসিন নিয়ে ইইউ এবং ব্রিটিশ সরকারের পরস্পরবিরোধী কথাগুলি ‘ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ’এর আলোচনাকে সামনে নিয়ে আসছে, যার ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব যথেষ্ট।
ইইউ করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে এবং ভ্যাকসিন প্রকল্প বাস্তবায়নে হিমসিম খাচ্ছে। ‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ইইউ তার প্রায় ৪৫ কোটি জনসংখ্যার জন্যে এখন পর্যন্ত মোট ২’শ ৩০ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন অর্ডার করেছে। এর মাঝে ‘এসট্রাজেনেকা’র কাছ থেকে অর্ডার করেছে ৪০ কোটি। ইইউ কর্মকর্তারা বলছেন যে, ইইউএর কাছ থেকে কোম্পানি যে অর্থ পেয়েছে, তা দিয়েই কোম্পানির ব্রিটিশ কারখানার উন্নয়ন করা হয়েছে। ইইউএর সাথে চুক্তিতে বলা হয়েছে যে, কোম্পানির মূল কারখানা ব্রিটেনে; বেলজিয়াম আর নেদারল্যান্ডসের কারখানাগুলি দ্বিতীয় সারির। ‘এসট্রাজেনেকা’ ছাড়াও মার্কিন কোম্পানি ‘ফাইজার’ ও জার্মান কোম্পানি ‘বায়োএনটেক’এর জয়েন্ট ভেঞ্চার থেকে ইইউ অর্ডার করেছে ৬০ কোটি ডোজ; আর মার্কিন কোম্পানি ‘মডার্না’র কাছ থেকে অর্ডার করেছে ১৬ কোটি ডোজ। ‘ফাইজার’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, ২০২০এর ডিসেম্বরের মাঝে তারা ১ কোটি ২৫ লক্ষ ডোজ সরবরাহ করবে। কোম্পানির বেলজিয়ান কারখানা সম্প্রসারণের কাজ চলায় তারা সিডিউলে কয়েক সপ্তাহ পিছিয়ে রয়েছে বলে বলছে। এর ফলাফলস্বরূপ স্পেন সরকার ২৭শে জানুয়ারি ঘোষণা দেয় যে, ভ্যাকসিনের অভাবে মাদ্রিদ এলাকায় ভ্যাকসিন দেয়ার কর্মকান্ড দুই সপ্তাহের জন্যে স্থগিত করা হয়েছে। কাতালোনিয়াতেও ভ্যাকসিন কর্মকান্ড বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ইতালি সরকার ইতোমধ্যেই ‘এসট্রাজেনেকা’র বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দিয়েছে। অপরদিকে জার্মান স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেন্স স্পাহন ইউরোপিয়ান কমিশনের উপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছেন যাতে ভ্যাকসিন কারখানাগুলি ইইউএর যে সদস্য রাষ্ট্রের সীমানার মাঝে অবস্থিত, তাদের সরকারের অনুমতি ব্যাতীত যেন ভ্যাকসিন রপ্তানি করতে না পারে।
‘এসট্রাজেনেকা’ এবং ইইউএর দ্বন্দ্ব বলে দিচ্ছে যে, ভ্যাকসিনের কারখানা কোন দেশের জাতীয় সীমানার মাঝে রয়েছে, তা এখন যথেষ্টই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সব দেশের মাটিতে তো কারখানা নেই; বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে। ২৬শে জানুয়ারি ‘প্যান আফ্রিকানিস্ট’ সাংবাদিক সন্মেলনে ধনকুবের বিল গেটস বলেন যে, মহামারি থেকে উদ্ধার পেতে আরও অনেক ভ্যাকসিন কারখানা চালু করতে হবে এবং সব দেশের মানুষকে ভ্যাকসিন দিতে হবে। গেটস বলেন যে, তিনি বিশ্বের ভ্যাকসিন কারখানাগুলিকে অর্থায়ন করছেন, যাতে করে ভ্যাকসিন ডেভেলপ করা বায়োটেকনলজি কোম্পানিগুলির ভ্যাকসিন অনেকগুলি কারখানায় তৈরি করা সম্ভব হয়। উদাহরণস্বরূপ, ব্রিটেনের ‘অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি’র ডেভেলপ করা ভ্যাকসিন তৈরি করছে ‘এসট্রাজেনেকা’; আর ‘এসট্রাজেনেকা’র সহায়তা নিয়ে ভ্যাকসিন উৎপাদন করছে ভারতের ‘সিরাম ইন্সটিটিউট’। তবে গেটস বিশ্বের সকল স্থানে কারখানা তৈরিকেও আবার সমর্থন করছেন না। এক প্রশ্নের জবাবে গেটস বলেন যে, আফ্রিকায় একটা ভ্যাকসিন কারখানা করতে কমপক্ষে পাঁচ বছর সময় লাগবে; কাজেই এটা বরং ভবিষ্যতের কোন মহামারির প্রস্তুতি হিসেবে দেখা যেতে পারে। বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশেগুলির বড় কারখানাগুলির উপর নির্ভর করা ছাড়া গতি নেই। তিনি উন্নয়নশীল দেশগুলিতে ভ্যাকসিন কারখানার জন্যে ধনী দেশগুলির বিনিয়োগ প্রত্যাশা করেন।
‘ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স’এর গবেষণায় বলা হচ্ছে যে, বিশ্বব্যাপী সব দেশে ভ্যাকসিন প্রকল্প চালু করা না গেলে বিশ্ব অর্থনীতি ৯ হাজার ২’শ বিলিয়ন বা ৯ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার হারাবে। বিল গেটস বলছেন যে, করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্ব যেখানে ২৮ হাজার বিলিয়ন বা ২৮ ট্রিলিয়ন ডলার হারিয়েছে, সেই তুলনায় ভ্যাকসিনের জন্যে নতুন কারখানার পিছনে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ কিছুই নয়। কিন্তু গেটসএর কথায় এটা পরিষ্কার যে, কেউই আসলে এই মুহুর্তে আফ্রিকার মতো উন্নয়নশীল অঞ্চলে ভ্যাকসিন কারখানার কথা চিন্তা করছেন না। আর ‘এসট্রাজেনেকা’র কোন কারখানা কোন দেশের সীমানার মাঝে অবস্থিত, তা যখন ব্রিটেন এবং ইইউএর মাঝে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করছে, তখন আফ্রিকাসহ উন্নয়নশীল দেশগুলিতে ভ্যাকসিন কারখানা তৈরি করাটা অবাস্তবই শোনাবে। ‘ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ’এর এই পরিস্থিতি কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যাবস্থায় আদর্শ নয়, বরং জাতীয় স্বার্থই সকল সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে। একইসাথে মানুষের জীবন নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির উপর প্রভাবই জাতীয় সিদ্ধান্তের পিছনে মূল প্রেরণা।
Sunday, 17 January 2021
ভূরাজনীতিতে করোনা মহামারির প্রভাব কতটুকু?
করোনা মহামারির সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী ৯ কোটি ৫০ লক্ষ ৪০ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছে; যার মাঝে ২০ লক্ষ ৩২ হাজার ৭’শ ৫০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। শুধুমাত্র ১৫ই জানুয়ারি এক দিনেই মৃত্যুবরণ করেছে ১৪ হাজার ৯’শ ১৩ জন। এর তুলনায় গত এপ্রিলের ১৭ তারিখে মৃতের সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ ৮ হাজার ৫’শ ২৭ জন। অর্থাৎ প্রথম ঢেউএর তুলনায় দ্বিতীয় ঢেউএ মৃতের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। গত জুলাই মাসে এই সংখ্যা বেশ বাড়লেও তা ২২শে জুলাইএর ৭ হাজার ৩’শ ২৬ জনের বেশি ছিল না। সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে; ৪ লক্ষ ৫ হাজার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্রাজিলে; ২ লক্ষ ৯ হাজার। তৃতীয় সর্বোচ্চ ভারতে; ১ লক্ষ ৫২ হাজার। চতুর্থ সর্বোচ্চ মেক্সিকোতে; ১ লক্ষ ৪০ হাজার। এরপর রয়েছে ব্রিটেন ৮৮ হাজার; ইতালি ৮২ হাজার; ফ্রান্স ৭০ হাজার; রাশিয়া ৬৫ হাজার; ইরান ৫৭ হাজার; স্পেন ৫৩ হাজার; কলম্বিয়া ৪৮ হাজার; জার্মানি ৪৭ হাজার; আর্জেন্টিনা ৪৫ হাজার; পেরু ৩৯ হাজার; দক্ষিণ আফ্রিকা ৩৭ হাজার; পোল্যান্ড ৩৩ হাজার। প্রতি ১ লক্ষ জনসংখ্যার মাঝে সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে বেলজিয়ামে; ১’শ ৭৫ জন মানুষের। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্লোভেনিয়া ১’শ ৫৩ জন; ইতালি ১’শ ৩৫ জন। জনসংখ্যার বিচারে মৃত্যুর সংখ্যা ইউরোপে সবচাইতে বেশি। প্রথম ১০টা দেশের সবগুলিই ইউরোপের। ১১তম স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়াও ১৫তম স্থানে পেরু, ১৮তম স্থানে পানামা এবং ১৯তম স্থানে মেক্সিকো ছাড়া প্রথম ২০টা দেশের ১৬টাই ইউরোপের। বলাই বাহুল্য যে, ইউরোপ এবং আমেরিকা করোনা মহামারিতে সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।
করোনা মহামারির প্রভাব সারা বিশ্বের উপর পরলেও সকল ক্ষেত্রে এর প্রভাব এক নয়। ভূরাজনীতিতে মহামারির প্রভাব হিসেব করতে গেলে ইউরোপ এবং আমেরিকার কথাই আসবে শুরুতে। একইসাথে সেই অঞ্চলগুলিতে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক বিপর্যয়ের কথাগুলি আসবে, যার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। তবে করোনার সরাসরি প্রভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ধ্বস নামায় বিশ্বের অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলির কথাও চলে আসবে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীনকে নিয়ে থাকবে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা। এছাড়াও আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে সবচাইতে বড় সরবরাহকারী মধ্যপ্রাচ্যকে নিয়েও কথা হবে। পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার নিম্নগামিতাকে করোনাভাইরাস আরও দ্রুতগামী করেছে। পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক দুর্বলতার সময়ে আঞ্চলিক শক্তিগুলি ভূরাজনৈতিক শূণ্যস্থানগুলি পূরণ করতে এগিয়ে এসেছে। এতে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আরও প্রবল হয়েছে। এই প্রতিযোগিতার অনেকটাই মহামারির আগে থেকেই চললেও এর উপর মহামারির প্রভাব উল্লেখ করার মতো।
মহামারির মাঝেও চলেছে লিবিয়ার যুদ্ধ; যেখানে তুরস্ক হস্তক্ষেপ করে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়েছে। নাগোর্নো কারাবাখ নিয়ে আজেরবাইজান এবং আর্মেনিয়ার মাঝে চলেছে যুদ্ধ; সেখানেও তুরস্ক হস্তক্ষেপ করেছে। হিমালয়ের পাদদেশে ভারত এবং চীনের মাঝে হয়েছে সংঘর্ষ; যদিও তা পুরোদস্তর সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়নি। ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হর্ন অব আফ্রিকা’র ইথিওপিয়াতে শুরু হয়েছে গৃহযুদ্ধ। পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালিতে হয়েছে সামরিক অভ্যুত্থান। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি ইস্রাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে। সৌদি গ্রুপের দেশগুলিও তুরস্কের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে যাচ্ছে। এই ঘটনাগুলির উপর মহামারির সরাসরি প্রভাব না থাকলেও পরোক্ষ প্রভাব কিছুটা হলেও ছিল।
পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ
মার্কিন ভূরাজনৈতিক চিন্তাবিদ জর্জ ফ্রীডম্যান ‘সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স এন্ড সাসটেইনেবাল ডেভেলপমেন্ট’এর এক লেখায় বলছেন যে, মহামারির সমাধান স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কাছে চাওয়া হলেও তারা সেই মুহুর্তে কোন প্রতিষেধক বা ঔষধ দিতে সক্ষম হয়নি। তদুপরি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যখন ভেন্টিলেটর, মাস্ক এবং টেস্টিং কিটের মতো জিনিসগুলি চাওয়া শুরু করলো, তখন তা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং সামাজিক ব্যবস্থাকেও চাপের মাঝে ফেলে দিলো। আর পুরো ব্যাপারটার দায় রাজনৈতিক ব্যবস্থার উপর থাকার কারণে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও চাপের মাঝে পড়ে গেলো। মহামারি মারাত্মক আকার ধারণ করায় তখন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা থেকে আসা সামাজিক সমাধানকেই বেছে নেয়া হলো; যেটাকে বলা হলো লকডাউন। কিন্তু এর ফলে অর্থনীতির চাকা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলো। অর্থাৎ এই মুহুর্তে সহজলভ্য মেডিক্যাল সমাধান অর্থনৈতিক ধ্বস ডেকে আনছে। তবে জর্জ ফ্রীডম্যান বলছেন যে, অর্থনীতি স্থবির করে ফেলার ফলাফল হলো দীর্ঘমেয়াদে পুরো অর্থনীতিকেই ধ্বংস করে ফেলা। কাজেই মেডিক্যাল সমাধানের চাপ সহ্য করার জন্যে স্বল্প মেয়াদে রাজনৈতিক ব্যবস্থা থেকে দেয়া হলো অর্থনৈতিক প্রণোদনা। ফ্রীডম্যান বলছেন যে, অর্থনীতি স্থবির করে দিয়ে লকডাউনের সমাধান কোন টেকসই সমাধান নয়। জনগণকে ঘরের মাঝে আটকে থাকতে বাধ্য করলে অর্থনৈতিক, পারিবারিক, মনস্তাত্বিক এবং সামাজিক চাপে পড়ে একসময় তারা নিয়ম ভেঙ্গে বের হয়ে আসবেই। জোরপূর্বক লকডাউন বাস্তবায়নের ফলাফল হবে ভয়াবহ সামাজিক অসন্তোষ। এর ফলে রাজনৈতিক অস্থিরতার সৃষ্টি ছাড়াও সামাজিক সংস্থাগুলির উপর মানুষের আস্থা বিলুপ্ত হবে। মানুষের কাছে মনে হতে থাকবে যে, এর কোন সমাধান কেউ দিতে পারেনি।
‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ বা ‘আইআইএসএস’এর এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, করোনাভাইরাসের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রভাব শুধু ব্যাপকই ছিল না, এটা হবে সুদূরপ্রসারী। আর চীনে যখন রোগের প্রদুর্ভাব শুরু হয়, তখন অনেকেই মনে করেছিলেন যে, ‘লকডাউন’এর মতো একটা সমাধানের পথে এগুলে রোগের সংক্রমণ এড়ানো সম্ভব হবে। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেলো যে, লকডাউন পূর্ব এশিয়ার বেশ কিছু দেশে মোটামুটি কাজ করলেও ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা এবং দক্ষিণ এশিয়াতে তেমন সফল হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত এবং ব্রাজিল মিলেই গোটা বিশ্বের মোট সংক্রমণের এক তৃতীয়াংশ হয়ে গিয়েছে।
মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘আটলান্টিক কাউন্সিল’এর এক বিশ্লেষণে করোনা পরবর্তী বিশ্বের একটা মলিন ছবি আঁকা হয়। সেখানে লেখা হয় যে, মার্কিন নেতৃত্বে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তৈরি করা বিশ্বব্যবস্থা এখন হুমকির মুখে। এই বিশ্বব্যবস্থার মাঝে রয়েছে লিবারাল গণতান্ত্রিক ভাবধারার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা আইনের শাসন, মুক্ত বাজার অর্থনীতি, এবং শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দেশগুলির মদদে গড়ে ওঠা কতগুলি আন্তর্জাতিক সংস্থা। পশ্চিমা দেশগুলির অর্থনীতি সমস্যায় পতিত হবার সাথেসাথে চীনের উত্থান হচ্ছে। এবং একইসাথে বৈশ্বিক মহামন্দার মাঝে একেকটা দেশ নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে। বৈশ্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিতে তৈরি করা সংস্থাগুলি নিজেদের ব্যর্থতাকে লুকাতে সক্ষম হয়নি। আটলান্টিকের দুই পাড়ের দেশগুলি নিজেকে বাঁচাতে তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দিচ্ছে। বিশ্বে আইনের শাসন, চিন্তার স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে শক্ত পদক্ষেপ নেয়া ছাড়া আর কোন গতি নেই বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র কি আসলেই সেরকম পদক্ষেপ নেবার সক্ষমতা রাখে? অন্ততঃ ২০২০এর নভেম্বরে চরম বিরোধপূর্ণ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর এক বিভক্ত রাষ্ট্রকে মাথায় রেখে যুক্তরাষ্ট্র সেই সক্ষমতা কতটুকু দেখাতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
অর্থনৈতিক মহামন্দা এবং সামাজিক অসন্তোষ
অস্ট্রেলিয়ার থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘লোয়ি ইন্সটিটিউট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, করোনাভাইরাসের সংক্রমণের আগেই বিশ্ব অর্থনীতি ধুঁকে ধুঁকে চলছিল। ২০১৯ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২ দশমিক ৯ শতাংশ। বেকারত্বের হার বৃদ্ধি, জিডিপির নিম্নগামিতা, ধনী দরিদ্রের বৈষম্যের ব্যাপক বৃদ্ধি, এক রাষ্ট্রের সাথে আরেক রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ব্যাপক পার্থক্য, ইত্যাদি সমস্যা বিশ্বে সামাজিক অসন্তোষ তৈরি করার ক্ষেত্র তৈরি করেই রেখেছিল। যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গ পুলিশের হাতে কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তির মৃত্যুর পর যে ব্যাপক বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল, তার ভিতও ছিল মূলতঃ অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং মহামারির মাঝে ব্যাপক বেকারত্বের করাল গ্রাসের বহিঃপ্রকাশ। বিশ্বব্যাপী অনেক দেশেই বিক্ষোভ এবং সহিংসতার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, যেগুলির ফলাফল অঞ্চলভেদে ভিন্ন হতে পারে। গণতান্ত্রিক দেশগুলিতে সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকছে; আর একনায়কোচিত দেশগুলিতে সরকারগুলি হয়তো ক্ষমতায় টিকে থাকতে প্রতিবাদী জনগণের উপর আরও বেশি করে চড়াও হবে।
তুরস্কের আনতালিয়া বিলিম ইউনিভার্সিটির প্রফেসর তারিক ওগুজলু ‘ডেইলি সাবাহ’ পত্রিকার এক লেখায় বলছেন যে, বর্তমান বিশ্বে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বহুগুণে বেড়ে যাবার কারণেই মূলতঃ করোনাভাইরাস সারা দুনিয়াতে এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। ভাইরাসের সংক্রমণে চীনের অর্থনীতি স্থবির হবার সাথে সাথেই চীনের সাপ্লাই চেইনের উপর নির্ভরশীল দেশগুলিও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মাঝে ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতা
‘লোয়ি ইন্সটিটিউট’ বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মাঝে বাণিজ্য যুদ্ধ এবং বিশ্বায়নের বিরুদ্ধাচরণ করে জাতীয়তাবাদের উত্থান মহামারির আগে থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের একে অপরকে দোষারোপ করে দ্বন্দ্বে জড়ানোটা করোনার কারণে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে গেছে। তবে প্রতিবেদনে আরও বলা হচ্ছে যে, ২০০৮ সালে বৈশ্বিক মন্দার পরপর যুক্তরাষ্ট্র যখন নিজের অর্থনীতিকে পুনরায় দাঁড় করাতে এবং বিশ্বব্যাপী তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে’ জড়িয়ে ব্যস্ত ছিল, সেই সুযোগে চীন শূণ্যস্থান পূরণে মনোযোগী হয়েছিল। ঠিক একইভাবে করোনা মহামারির মাঝে পশ্চিমা শক্তিরা যখন নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত, সেসময় চীনারা দক্ষিণ চীন সাগর এবং পূর্ব চীন সাগরে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করে নিতে চাইছে। এর সমান্তরালে হংকংএর আন্দোলনকারীদের যখন চীনা সরকার জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে, তখন পশ্চিমা দেশগুলি আন্দোলনকারীদের পক্ষাবলম্বণ করে চীনের সাথে দ্বন্দ্বকে আরও গভীর করছে। এর ফলশ্রুতিতে মার্কিন কোম্পানিগুলি চীন ছাড়তে শুরু করেছে এবং ফলশ্রুতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পারস্পরিক অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা কমছে। তবে হংকংএর আন্দোলন চীনের উইঘুর এবং তিব্বতের মতো অঞ্চলগুলিতে যেনো ছড়িয়ে না পড়ে, সেব্যাপারে চীনা সরকার যথেষ্ট সাবধান থাকতে চাইবে।
মার্কিন থিংকট্যাঙ্ক ‘হাডসন ইন্সটিটিউট’এর এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, করোনার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের প্রযুক্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব আরও বাড়বে। চীনারা করোনা নিয়ন্ত্রণে ‘বিগ ডাটা’, ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’, ‘ফেশিয়াল রেকগনিশন’ এবং ড্রোনের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে চীনকে প্রযুক্তিতেই শুধু এগিয়ে নেবে না, নিজ জনগণের উপর নিয়ন্ত্রণ আরও বৃদ্ধি করবে। চীনারা ‘মেইড ইন চায়না ২০২৫’ প্রকল্পের অধীনে অতি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকার উদ্দেশ্যে আরও বিনিয়োগ করবে। আর উল্টোদিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা দেশগুলি চীনের উপর প্রযুক্তিগত নির্ভরশীলতা কমাতে অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে চীনের সাথে দূরত্ব তৈরি করতে থাকবে। তবে মার্কিনীরা চীন থেকে তাদের শিল্পগুলিকে সরিয়ে নেবার যে ইচ্ছা ব্যক্ত করছে, তা বাস্তবায়ন করাটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে খুব সহজ হবে না। আর চীনের বড় বাজার হারিয়ে কোন কোম্পানিই নিজেদের আয় কমাতে চাইবে না।
তারিক ওগুজলু বলছেন যে, মহামারির কারণে ‘গ্লোবালাইজেশন’ বা বিশ্বায়ন হয়তো কিছুটা স্থবির হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মাঝে ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতার কারণে চীন আঞ্চলিকভাবে নিজস্ব একটা ‘বিশ্বায়ন’এর দিকে এগুবে। সাপ্লাই চেইনের মাঝে নিজেদের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ না হলে কঠিন সময়ে তা কতটা মারাত্মক হতে পারে, তা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ দেখেছে। সেই হিসেবেই তারা চাইবে পারস্পরিক একটা নির্ভরশীলতা তৈরি করতে, যাতে ভবিষ্যতে আবারও বিপদে পড়তে না হয়। চীনের আশেপাশের দেশগুলি চীনের আগ্রাসী তৎপরতাতে ভীত হলেও এটা তারা বুঝতে পারছে যে, মহামারির পর অর্থনৈতিকে পুনরায় জাগাতে চীনের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইইউএর উপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি করাটা মোটেই সমীচিন নয়। বৈশ্বিকভাবে চীনা এবং মার্কিনী মডেলের প্রতিযোগিতা হবে। স্বাস্থ্য, টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশ রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য বিমোচন, ইত্যাদি বিষয়ে এই প্রতিযোগিতা হবে। উভয় দেশই নিজেদের উন্নয়নের মডেল অন্যান্য দেশের কাছে বিক্রি করতে চাইবে। চীনের ‘বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা ‘বিআরআই’ আলোচনায় আসতেই থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি ‘মার্শাল প্ল্যান’এর মতো কোন পরিকল্পনা নিয়ে আসতে না পারে, তাহলে চীনকে সরিয়ে দিয়ে বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধরে রাখাটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে কষ্টকরই হবে।
এশিয়ায় ব্রিটেনের প্রত্যাবর্তন
করোনা মহামারির মাঝে ইইউ থেকে ব্রিটেনের বের হয়ে যাবার প্রক্রিয়া বন্ধ থাকেনি। ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতার সুযোগ নিতে এবং একইসাথে ব্যাপক অর্থনৈতিক মন্দা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে ব্রিটেন ইইউএর গন্ডি থেকে বের হয়ে বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে চাইছে। ব্রিটেনের থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘চ্যাটহ্যাম হাউজ’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ব্রেক্সিট পরবর্তী ব্রিটেন ইন্দোপ্যাসিফিককে আরও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর ইন্দোপ্যাসিফিকের জন্যে নতুন একজন ডিরেক্টর জেনারেল নিয়োগ দিচ্ছে। একইসাথে ব্রিটেন তার ইন্দোপ্যাসিফিক কৌশলকে একটা ‘ফ্রেমওয়ার্ক’এর মাঝে সাজাচ্ছে। এশিয়াতে সামরিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করার জন্যে ব্রিটিশ সরকার সামরিক বাজেট বৃদ্ধি করেছে। এই সামরিক অবস্থানের মূল কেন্দ্রবিন্দু ভারত মহাসাগর ও মধ্যপ্রাচ্য হলেও তা দক্ষিণ চীন সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে দ্বন্দ্ব এবং তেলের বাজারে অস্থিরতা
‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ বা ‘আইআইএসএস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মহামারি ঘোষণা করার ঠিক আগে আগেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কুদস ফোর্সের জেনারেল কাসেম সুলাইমানিকে ড্রোন হামলায় হত্যা করে। এছাড়াও লেবানন এবং ইরাকের রাস্তায় হাজারো মানুষের বিক্ষোভ গোটা অঞ্চলকে অস্থির করে রেখেছিলো আরও আগ থেকেই। শাসন ব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং নিম্নগামী অর্থনীতি মানুষকে রাস্তায় নামতে বাধ্য করেছিলো। এছাড়াও সিরিয়া, ইয়েমেন এবং লিবিয়ার যুদ্ধও চলমান ছিলো। আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় ইরানের সাথে সৌদি আরব এবং তুরস্কের সাথে আমিরাতের দ্বন্দ্ব বেড়েই চলছিল। ইরান এবং তুরস্ক উভয়েই আঞ্চলিকভাবে তাদের প্রভাব বিস্তারে ব্যাপকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। তবে একইসাথে তেলের বাজারে দরপতনের কারণে তেল রপ্তানির উপর নির্ভরশীল ধনী দেশগুলির অর্থনীতি যেমন ধাক্কা খেয়েছে, তেমনি এই দেশগুলিতে মানবসম্পদ রপ্তানির উপর নির্ভরশীল দেশগুলিও সমস্যায় পতিত হয়েছে। আর অর্থনৈতিক দৈন্যতা ও অব্যাবস্থাপনার ফলশ্রুতিতে শাসকশ্রেণীর উপর জনগণের আক্রোশ বেড়েই চলেছে। এরকম একটা পরিস্থিতিতে করোনাভাইরাসের আবির্ভাব পুরো অঞ্চলের ভূরাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
‘লোয়ি ইন্সটিটিউট’ বলছে যে, করোনা মহামারি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধ এবং ভাইরাসের চাপে পড়ে ইরান হয়তো আঞ্চলিকভাবে আরও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। এতে সৌদি গ্রুপের দেশগুলির সাথে যেমন ইরানের সংঘাত বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হবে, একইসাথে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইস্রাইলও এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে।
‘ইউনিভার্সিটি অব ডেনভার’এর এর প্রফেসর হায়দার খান ‘আল জাজিরা’তে এক লেখায় বলছেন যে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের ব্যাপক দরপতনের সময় রাশিয়া নিজেকে বেশ ভালোই মানিয়ে নিয়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে রাশিয়া নিজের অর্থনীতিকে বেশ কিছুটা বহুমুখীকরণ করে নিয়েছে। তেলের মূল্য কমে যাবার কারণে আমদানিকারক হিসেবে চীন বেশ লাভবান হয়েছে। অপরদিকে করোনার কারণে স্বাস্থ্য এবং অর্থনীতিতে ব্যাপক বিপর্যয়ের কারণে তেলের বাজার নিয়ে প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলশ্রুতিতে অর্থনৈতিক এবং ভূরাজনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নিম্নগামিতা গতিশীল হতে পারে এবং চাপের মুখে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা ঢুকে পড়তে পারে। চীনকে নিয়ন্ত্রণ করতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি প্রদর্শনের সিদ্ধান্তগুলি সংঘাতের সম্ভাবনাকে বাড়িতে দিতে পারে।
উদ্দেশ্যবিহীন ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং জাতীয়তাবাদের উত্থান
‘হাডসন ইন্সটিটিউট’ বলছে যে, করোনাভাইরাস ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অস্তিত্বকেই হুমকির মাঝে ফেলে দিচ্ছে। ইইউ তৈরি হয়েছিল এমন একটা সমঝোতার মাঝ দিয়ে, যার মাধ্যমে ইউরোপের এক দেশ থেকে অন্য দেশে যেতে কোন ঝামেলা থাকবে না। সদস্য দেশগুলি এটা মেনে নেবে কারণ এর বিনিময়ে তারা ইইউএর অন্য দেশগুলির বাজারে কোন বাধা ছাড়াই ঢুকতে পারবে। কিন্তু বর্তমান ইইউএর মূল সমস্যা হলো জনগণের আনুগত্য ইইউএর প্রতি নয়, বরং তাদের নিজ দেশের প্রতি। যতদিন ইইউ তার সদস্য দেশগুলিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেখাতে পেরেছে, ততদিন তারা ইইউএর সদস্য থাকার পিছনে শক্তিশালী কারণ পেয়েছে। তবে সিরিয়া, লিবিয়া ও মালির যুদ্ধের ফলে ইউরোপে শরণার্থীর ঢল এবং অর্থনৈতিক মহামন্দায় ইইউএর অস্তিত্ব প্রশ্নের মাঝে পড়েছে। উত্তর এবং দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলির মাঝে বৈষম্য সকলের সামনে উপস্থাপিত হয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে ইউরোপ জুড়ে ডানপন্থী জাতীয়তাবাদীদের উত্থান পরিলক্ষিত হচ্ছে, যারা বর্তমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলছে। ইউরোপের দেশগুলিতে রাজনৈতিক দলগুলি জনগণের ভোট পেতে জাতীয়তাবাদকেই ব্যবহার করবে। তারা সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে ইউরোপিয় সমাধান নয়; জাতীয় সমাধানের পথ খুঁজবে। মহামারি ব্যবস্থাপনায় ইইউএর দুর্বল পদক্ষেপগুলি জনগণের কাছে ইইউএর চিন্তাটাকে অবান্তর করে তুলবে। আর করোনাভাইরাসের কারণে মার্কিন অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হলে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির উপর নির্ভরশীল ইউরোপের অর্থনীতি, বিশেষ করে জার্মানির অর্থনীতি, চাপের মুখে পড়বে।
জর্জ ফ্রীডম্যান আরও ব্যাখ্যা দিয়ে বলছেন যে, মহামারির সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে ইউরোপের জনগণ তাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের দিকেই তাকাবে; কারণ সেই নেতৃবৃন্দের তাদের জনগণের প্রতি একটা দায়বদ্ধতা রয়েছে। ব্রাসেলসের ইইউ নেতৃবৃন্দের কাছ থেকে জনগণ এই সমস্যার সমাধান আশা করে না। জাতীয় দুর্যোগের সময় জনগণের কাছে জাতীয় পরিচয় এবং স্বশাসনই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর সেকারণেই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলি জাতীয় নেতৃবৃন্দই নিচ্ছে; ইইউ নিচ্ছে না। যদিও ইইউএর সব দেশেই মহামারি ছড়িয়ে পড়েছে, তথাপি তারা নিজেদের জান মালের নিরাপত্তা দিতে অন্য দেশের সাথে সীমানা আটকে রাখার পথেই এগিয়েছে। এক্ষেত্রে ইইউএর সীমানাবিহীন চিন্তা কাজ করেনি। একটা জোট কতটা ভালোভাবে কাজ করছে, তা বুঝতে হলে দেখতে হবে তারা খারাপ সময়ে কিভাবে কাজ করে। কঠিন সময়ে ইউরোপের দেশগুলি নিজেদের স্বার্থকেই প্রথমে দেখেছে; তারপর অন্যের স্বার্থ দেখেছে। নিজ ভাষা, ইতিহাস এবং বিশ্বাসের মাঝেই ইউরোপিয় দেশগুলি নিজেদের গন্ডিকে সীমাবদ্ধ করেছে। বাকিরা সবসময়ই কম প্রাধান্য পেয়েছে। ইইউ তৈরি হয়েছিল এই দেয়ালগুলি ভেঙ্গে ফেলার জন্যে; তা সফল হয়নি। ইউরোপিয়ান পরিচয় তৈরি করার চেষ্টাটা যতটা সফল হবে বলে ভাবা হয়েছিল, তা হয়নি।
ফ্রীডম্যান শুধু ইইউএর মাঝেই দেয়াল তোলার কথা বলেননি। তিনি বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের একটা রাজ্য আরেকটা রাজ্যের সাথে প্রায় একই ধরণের ব্যবহার করেছে। যেমন টেক্সাসের গভর্নর পার্শ্ববর্তী লুইজিয়ানা রাজ্যের সাথে যাতায়াত বন্ধ করে দিয়েছিল, কারণ টেক্সাসের চাইতে লুইজিয়ানায় সংক্রমণ বেশি ছিল তখন। কিন্তু লুইজিয়ানার সাথে সীমানা বন্ধ করেও টেক্সাস তার সংক্রমণ থামাতে পারেনি। ফ্রীডম্যান বলছেন যে, দেয়াল তুলে দেয়ার ব্যাপারটা ইউরোপের একার নয়। তবে ইউরোপের ক্ষেত্রে এর পিছনে একটা লম্বা ইতিহাস রয়েছে। এক দেশ আরেক দেশের সাথে যুদ্ধ করেছে; সর্বদা সংঘাতের ভয় তাদের গ্রাস করেছে। টেক্সাস এবং লুইজিয়ানার মাঝে মনোমালিন্য খুব বেশিদূর হয়তো যাবে না; তবে ইইউএর সদস্য দেশগুলির জন্যে এই বিভেদ মারাত্মক। একইসাথে মার্কিনীদের চোখে বাকি বিশ্বের প্রতি অবিশ্বাসও হবে মারাত্মক। বৈশ্বিক সংস্থাগুলির উপর মানুষের আস্থাটাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
Saturday, 26 December 2020
২০২০ সালের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহ এবং ২০২১ সালের সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক উত্তাপের স্থানসমূহ
![]() |
| রাসায়নিক দ্রব্য ছড়িয়ে রাস্তা থেকে করোনভাইরাস দূরীকরণের চেষ্টা করা হলেও ২০২০ সালে পশ্চিমা পুঁজিবাদের গভীর সমস্যাগুলি আরও নোংড়াভাবে উঠে এসেছে। বছরের সবচাইতে বড় ঘটনা ছিল পশ্চিমা আদর্শের অধোগতি। |
করোনা মহামারি, অর্থনৈতিক ধ্বস এবং আদর্শিক অধোগতি
নিঃসন্দেহে ২০২০ সালের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এবং ফলাফলস্বরূপ বিশ্বব্যাপী মহামারি। সমাধানহীন অবস্থায় বিচলিত বিশ্ব নেতৃত্ব বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে ‘সামাজিক দূরত্ব’ নিশ্চিত করতে ‘লকডাউন’ নামে এক পদ্ধতির আবিষ্কার করে। জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ‘ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন’এর ঘনঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন পুরো বিশ্বব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। ‘লকডাউন’এর ফলে বিশ্বব্যাপী অর্থনীতি স্থবির হয়ে যায় এবং সকল অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে ধ্বস নামে। তেলের বাজার এবং শেয়ার বাজারে ঐতিহাসিক দরপতন ঘটে। ‘লকডাউন’ উঠিয়ে নেয়ার জন্যে পশ্চিমা বিশ্বের স্বাধীনচেতা মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করলে পশ্চিমা আদর্শের ভিত আরও দুর্বল হতে থাকে। কোটি কোটি মানুষ কর্মসংস্থান হারালেও গুটিকয়েক বিলিয়নায়াররা এই সুযোগে তাদের সম্পদ আরও বাড়িয়ে নেয়; যা কিনা সম্পদের অসম বন্টনকে আরও বাজেভাবে উপস্থান করেছে। করোনাভাইরাসের সবচাইতে বড় প্রভাব হলো, তা পশ্চিমা পুঁজিবাদী আদর্শের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলাফল ২০২১ সাল জুড়ে দেখা যাবে।
বিশ্ব অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবার চেষ্টা করার আগেই করোনার দ্বিতীয় ডেউ আঘাত হানে ইউরোপে। ২০২১ সালের প্রথম অংশেও বিশ্ব দ্বিতীয় ঢেউকেই মোকাবিলা করবে। এরই মাঝে ভাইরাসের নতুন জাতের আবির্ভাব হবার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এই মুহুর্তে এর গতিপ্রকৃতি নির্দিষ্ট করা না গেলেও তা যে অর্থনীতির উপর সবচাইতে বড় আঘাত হানবে, তা নিশ্চিত।
মহামারির কারণে মেডিক্যাল সুরক্ষা সামগ্রী এবং টেস্টিং কিট নিয়ে শুরু হয় আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা; চীন এবং তুরস্ক এক্ষেত্রে এগিয়ে থাকে। ভাইরাসের সংক্রমণ চীনের উহান প্রদেশ থেকে শুরু হওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প করোনাভাইরাসকে ‘চীনা ভাইরাস’ বলে আখ্যা দিয়ে চীনের বিরুদ্ধে জনমত তৈরির চেষ্টা চালান। চীনারাও এই ভাইরাসের উৎপত্তি যুক্তরাষ্ট্রের ল্যাবরেটরিতে হয়েছে বলে দাবি করতে থাকে। দুই দেশের মাঝে চলমান বাণিজ্য যুদ্ধের মাঝে এই দ্বন্দ্ব আরও অস্থিরতার জন্ম দেয়।
মহামারিতে লাখো মানুষের মৃত্যুর মাঝে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলির মাঝে শুরু হয় মুনাফাবৃত্তির প্রতিযোগিতা। ভ্যাকসিন ডেভেলপ করার ক্ষেত্রে এই প্রতিযোগিতা আরও গতিশীল হয়; বিশেষ করে রাশিয়া এবং চীন ভ্যাকসিন তৈরিতে মনোনিবেশ করার পর থেকে। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, কানাডা এবং আরও কয়েকটা দেশ নিজেদের জনসংখ্যার বহুগুণ ভ্যাকসিন অর্ডার করার ফলে ভ্যাকসিন নিয়ে আসন্ন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার আভাস পাওয়া যায়। তদুপরি আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহণে ভ্যাকসিন নেয়া বাধ্যমূলক করার প্রচেষ্টা শুরু হওয়ায় এই প্রতিযোগিতা ২০২১ সালে একটা বাজে দিকে মোড় নিতে যাচ্ছে।
মহামারির মাঝেই ফ্রান্সে ইসলাম বিদ্বেষী ভূমিকা নেয়া এক শিক্ষককে হত্যা করাকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের মাঝে ফ্রান্স বিরোধী আবেগ দৃশ্যমান হয়। এতে বেশিরভাগ মুসলিম দেশের সরকার ফ্রান্সের বিরুদ্ধে কথা না বললেও তা মুসলিম বিশ্বের অতি সংবেদনশীল জায়গাটাকে দেখিয়ে দেয়। ইউরোপের লিবারাল আদর্শিক অবস্থানের বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বের জনগণের এই অবস্থান ২০২১ সালের আদর্শিক সংঘাতের দিকেই ইঙ্গিত দেয়।
দক্ষিণ চীন সাগর
করোনা মহামারির মাঝে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আরও গতিশীল হয়েছে। ভাইরাসের সংক্রমণে ইন্দোপ্যাসিফিক অঞ্চলে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলি অকার্যকর হয়ে যাওয়ার সময় দক্ষিণ চীন সাগরে চীনারা শক্তি প্রদর্শন করে। এতে পূর্ব এশিয়াতে স্বল্প সময়ের জন্যে মার্কিন অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হয়। হংকংএ চীনা সরকারের কঠোর নীতির ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের হস্তক্ষেপের কারণেও থেকে থেকে উত্তেজনা চলে।
বছরের শেষের দিকে ‘আরসেপ’ নাম নিয়ে আবির্ভাব হয় নতুন অর্থনৈতিক জোটের, যেখানে আসিয়ানের সাথে যোগ দেয় চীন, জাপান, কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড। তবে যুক্তরাষ্ট্রকে এই জোটের বাইরে রাখা হয়। এই জোট রাজনৈতিক কোন পরিবর্তন না আনলেও যুক্তরাষ্ট্রকে বাইরে রেখেই বিশ্বের সবচাইতে বড় অর্থনৈতিক জোট হিসেবে আবির্ভূত হওয়ায় এর ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে।
ভারত মহাসাগর
হিমালয়ের পাদদেশে লাদাখ অঞ্চলে সীমান্ত বিরোধ নিয়ে ভারত এবং চীনের মাঝে চলে ব্যাপক উত্তেজনা। যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহকৃত অস্ত্র এবং ভারতের তৈরি করা সীমান্ত অবকাঠামো আকসাই চিন অঞ্চলে চীনা অবস্থানের উপর হুমকি তৈরি করলে বহু দশকে প্রথমবারের মতো চীনারা তাদের স্থল সীমানা নিয়ে ব্যস্ত হতে বাধ্য হয়। এই উত্তেজনার ফলে চীনারা তাদের সীমান্তে নতুন করে অবকাঠামো তৈরি করা শুরু করেছে, যা এখানকার সামরিক ব্যালান্সকে চ্যালেঞ্জ করবে এবং উত্তেজনাকে ২০২১ সালে টেনে নিয়ে যাবে। হিমালয়ের ইস্যুতে ভারত তার প্রতিবেশী কোন দেশ থেকেই সমর্থন না পাওয়ায় ভারতের জন্যে এমন এক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, যা ভারতের ভৌগোলিক অখন্ডতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
বঙ্গোপসাগরে ‘এক্সারসাইজ মালাবার ২০২০’এ অস্ট্রেলিয়ার যোগদানের মাধ্যমে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়ার মাঝে ‘কোয়াড’ জোট পূর্ণতা পায়। ভারত মহাসাগরে চীনের প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে তৈরি করা এই জোট ভারত মহাসাগরে অস্ট্রেলিয়া তথা ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর হাতকে শক্তিশালী করবে। ২০২১ সালে ভারত মহাসাগরে ব্রিটেন তার দৈত্যাকৃতির নতুন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘কুইন এলিজাবেথ’ মোতায়েন করতে যাচ্ছে, যা অত্র অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে নতুন অস্থিরতার জন্ম দেবে।
হিমালয়ের উত্তেজনা এবং বঙ্গোপসাগরে ‘কোয়াড’ জোটের অস্ত্রের ঝনঝনানি দক্ষিণ এশিয়াতে তুরস্ককে একটা শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করার ভিত তৈরি করে দিয়েছে। কাশ্মির ইস্যু এবং রোহিঙ্গা শরণার্থী ইস্যুকেও তুরস্ক এক্ষেত্রে ব্যবহার করবে।
![]() |
| জানুয়ারি ২০২০। ত্রিপোলির উপকূলে তুর্কি যুদ্ধজাহাজ। লিবিয়ার যুদ্ধ তুরস্ককে লিবিয়ার উপকূলে একটা স্থায়ী সামরিক উপস্থিতির সুযোগ করে দিয়েছে; যা ফ্রান্স হুমকি হিসেবে দেখেছে। |
ভূমধ্যসাগর এবং লোহিত সাগর
২০২০ সালে ভূমধ্যসাগর এবং লোহিত সাগর অঞ্চলে এশিয়া ও ইউরোপের মাঝে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের উপর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ছিল সবচাইতে বেশি। ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টার কারণে ফ্রান্স, গ্রীস, মিশর এবং অন্যান্য দেশের সাথে থেকে থেকে বিবাদে জড়িয়েছে তুরস্ক। লিবিয়ার গৃহযুদ্ধে তুরস্কের হস্তক্ষেপের পর যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায় এবং হাফতার বাহিনী জয়ের দ্বারপ্রান্ত থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়। এতে ত্রিপোলিতে তুরস্কের একটা সামরিক অবস্থান নিশ্চিত হয়; যা ফ্রান্স হুমকিস্বরূপ দেখতে থাকে। এরপর থেকে লিবিয়ার উপকূলে নিয়মিত বিরতিতে গ্রিক এবং ফরাসি যুদ্ধজাহাজের সাথে তুর্কি জাহাজের বিবাদ চলতে থাকে। ২০২১ সালেও এই বিবাদ চলবে। লিবিয়ায় তুরস্কের উপস্থিতি তৈরি হওয়ায় তিউনিসিয়া এবং আলজেরিয়াকে নিয়ে ফ্রান্স এবং তুরস্কের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।
হাফতার বাহিনীর পক্ষে মিশরীয়রা সরাসরি হস্তক্ষপের হুমকি দিলেও শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষের আলোচনায় যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরিত হয়। উল্টো মিশর নীল নদের উপর ইথিওপিয়ার তৈরি করা বাঁধ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যায়। ইথিওপিয়ার সরকার বাঁধের কাজ শেষ পর্যায়ে নিয়ে আসলে মিশর এবং সুদানের সাথে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। তবে সেই উত্তেজনাও অন্যদিকে ধাবিত হয় যখন ইথিওপিয়ার সরকার জাতিগত তিগ্রে অঞ্চলে সামরিক অভিযান শুরু করে। গৃহযুদ্ধের আশংকায় ইথিওপিয়াতে আঞ্চলিক শক্তিগুলির হস্তক্ষেপ ছাড়াও কৌশলগত বাব এল মান্ডেব প্রণালী সংলগ্ন লোহিত সাগর এবং পুরো ‘হর্ন অব অফ্রিকা’ অঞ্চলে অস্থিরতার সম্ভাবনা দেখা দেয়। বছরের শেষের দিকে সোমালিয়া থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার শুরু হলে অত্র অঞ্চলের অস্থিরতা আরও বেড়ে যায়। সোমালিয়াতে তুরস্কের সামরিক অবস্থান এক্ষেত্রে অধিক গুরুত্ব পেতে যাচ্ছে; আর একইসাথে সৌদি আরব এবং আমিরাতের জোট তুরস্কের প্রভাব নিয়ন্ত্রণে আরও জোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। এভাবে ২০২১ সালে ভারত মহাসাগরে তুরস্কের একটা অবস্থান তৈরি হবার পদ্ধতি তৈরি হয়ে গেলো।
পূর্ব ভূমধ্যসাগরে নিয়মিত হাইড্রোকার্বন অনুসন্ধানের তুর্কি চেষ্টা ইউরোপের সাথে তুরস্কের উত্তেজনা জিইয়ে রাখে। এর মাঝেই বিশাল এক বিস্ফোরণে লেবাননের বৈরুত বন্দরের উল্লেখযোগ্য অংশ ধ্বংস হয়ে গেলে বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে ফ্রান্স, পূর্ব ভূমধ্যসাগরে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পায়। তুরস্ক এবং গ্রীসের পাল্টাপাল্টি সামরিক মহড়ায় উত্তপ্ত থাকে সমুদ্র। ইস্তাম্বুলের হায়া সোফিয়াতে নামাজ পড়া শুরু হলেও ইউরোপের সাথে তুর্কিদের একটা চাপা উত্তেজনা শুরু হয়।
![]() |
| আর্মেনিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়ের পর আজেরিদের উল্লাস। আজেরিদের পক্ষে তুর্কিদের সমর্থন ককেশাসে তুরস্কের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। |
ইউরেশিয়া
ককেশাসে আজেরবাইজান এবং আর্মেনিয়ার মাঝে নাগোর্নো কারাবাখ নিয়ে শুরু হয় যুদ্ধ। তুর্কি সহায়তায় এবং রুশ নিরপেক্ষতায় আজেরিরা বড় একটা জয় ঘরে তুলে নেয়। এই যুদ্ধ ককেশাসে তুর্কি অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে এবং মধ্য এশিয়াতে তুরস্কের নতুন করে অবস্থান তৈরির ভিত তৈরি করেছে। এই যুদ্ধ ড্রোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে নতুন এক উদাহরণ সৃষ্টি করেছে, যা ২০২১ সালের সম্ভাব্য সংঘাতগুলিকে প্রভাবিত করবে। অপরদিকে মধ্য এশিয়ার দেশ কিরগিজস্তানে রাজনৈতিক পরিবর্তন চীনের উইঘুর সীমান্তে নতুন এক ভূরাজনৈতিক খেলার জন্ম দিতে যাচ্ছে। বেলারুশে ব্যাপক অস্থিরতা চললেও সেখানে রাজনৈতিক পরিবর্তন সংগঠিত হয়নি। আর ইউক্রেনের সাথে তুরস্কের সখ্যতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ডনবাসে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর একটা সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
রাশিয়া এবং তুরস্ক অর্থনৈতিকভাবে হাইড্রোকার্বন পাইপলাইনের জন্যে একে অপরের উপর নির্ভরশীল। আর যদিও রাশিয়া থেকে তুরস্ক ‘এস ৪০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয় করার কারণে যুক্তরাষ্ট্র বছর শেষে তুরস্কের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তথাপি তুরস্ক এবং রাশিয়ার সম্পর্ক খুব শক্ত ভিতের উপর নয়। ভূকৌশলগত কারণে তুরস্কের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টাগুলি রাশিয়ার স্বার্থের পরিপন্থী। লিবিয়া এবং সিরিয়াতে রাশিয়া এবং তুরস্ক বিপরীত পক্ষে রয়েছে। একারণেই ২০২১ সালে সিরিয়ায় ইদলিবের যুদ্ধ নতুন করে শুরু হবার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে লিবিয়া এবং আজেরবাইজানে তুরস্কের সমর্থন যুদ্ধের মোড় ঘোরার কারণে তা তুরস্ককে সিরিয়াতে অভিযান শুরু করতে আত্মবিশ্বাসী করবে।
পশ্চিম আফ্রিকা
পশ্চিম আফ্রিকায় দেশ মালিতে সামরিক অভ্যুত্থান গৃহযুদ্ধে জর্জরিত দেশটাতে ফ্রান্সের অবস্থানকে দুর্বল করেছে। একইসাথে তা প্রতিদ্বন্দ্বী ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। আলজেরিয়া তার সংবিধান পরিবর্তন করে নিজ সীমানার বাইরে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের ব্যবস্থা করতে যাচ্ছে; যা সাহারা অঞ্চলে আলজেরিয়াকে নতুন শক্তি হিসেবে অবির্ভূত করছে। তুরস্কও পশ্চিম আফ্রিকাতে তার রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করার জন্যে কূটনৈতিক কর্মকান্ড বাড়িয়েছে।
পশ্চিম আফ্রিকার ফরাসি ভাষাভাষী দেশগুলিতে রাশিয়াও তার প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। বিশেষ করে সেসব দেশের গৃহযুদ্ধে সমরাস্ত্র বিক্রয় এবং ভাড়াটে সেনা মোতায়েন করে ফ্রান্সের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমেছে রাশিয়া। অত্র অঞ্চলে সোশাল মিডিয়া ব্যবহার করে ব্যাপক তথ্যযুদ্ধও চলমান। শক্তিশালী দেশগুলির মাঝে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় সোশাল মিডিয়ার ব্যবহার নতুন এক প্রতিযোগিতার দ্বারকে জনসন্মুখে আনলো।
আটলান্টিকের ওপাড়ে
নির্বাচনের বছরে যুক্তরাষ্ট্র অনেকটাই ছিল নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। করোনাভাইরাসের ব্যাপক সংক্রমণ নিয়ে হোয়াইট হাউজের সাথে লিবারালদের বছরব্যাপী দ্বন্দ্ব ছিল চোখে পড়ার মতো। এর উপর রাস্তায় শেতাঙ্গ পুলিশের হাতে একজন কৃষ্ণাঙ্গের বিচার বহির্ভূত হত্যার পর থেকে পুরো যুক্তরাষ্ট্র কেঁপে ওঠে। মহামারির ভয়াবহতাকে উপেক্ষা করেই রাস্তায় লাখো মানুষের সমাবেশ ছাড়াও বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা হয়। সারা বিশ্ব টেলিভিশনে সুপারপাওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জাতিগত কলহকে প্রত্যক্ষ করে; যা ছিল ঐতিহাসিক।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কলহের সর্বশেষ রূপ ছিল হাড্ডাহাড্ডি নির্বাচন এবং ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ। নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন নির্বাচনে জিতলেও একটা বিভক্ত রাষ্ট্রকে নেতৃত্ব দেবার কঠিন দায়িত্ব পান তিনি। একইসাথে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির আবির্ভাবে ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতা যখন চরমে উঠেছে, তখন বাইডেন প্রশাসনের জন্যে ২০২১ সাল যে বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে, তা বলাই বাহুল্য।
মধ্যপ্রাচ্য
মধ্যপ্রাচ্যের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল আরব দেশগুলির সাথে ইস্রাইলের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ। মার্কিন ট্রাম্প প্রশাসন এর সাফল্য দাবি করলেও তা প্রকৃতপক্ষে নতুন বৈশ্বিক বাস্তবতার ফলাফল। মার্কিন দুর্বলতার কারণে ইস্রাইল তার নিরাপত্তার জন্যে এখন আরব দেশগুলি এবং তুরস্কের উপর নির্ভরশীল হতে যাচ্ছে। এতে মুসলিম দেশগুলির সরকারগুলিকে জনগণের অসন্তোষকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ২০২১ সালেও এই প্রবাহ চলবে।
বছরটা শুরু হয়েছিল ইরাকের রাজধানী বাগদাদে ইরানের প্রভাবশালী সামরিক অফিসার কাশেম সুলাইমানিকে মার্কিন ড্রোন হামলায় হত্যার মাধ্যমে। আর বছর শেষ হয়েছে ইরানের অভ্যন্তরে দেশটার পারমাণবিক প্রকল্পের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি মোহসেন ফাখরিজাদেহএর হত্যার মাধ্যমে; যা কিনা ইস্রাইলের কাজ ছিল বলেই সকলে ধারণা করেন। এছাড়াও সাইবার হামলায় ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ সেন্টিফিউজের স্থাপনা ধ্বংস হয়। করোনাভাইরাসের সংক্রমণে নির্বাচন চালিয়ে নেবার প্রচেষ্টা, মহামারির ভয়াবহতা গোপনের চেষ্টা, অর্থনৈতিক দৈন্যদশায় রাস্তায় বিক্ষোভ, ভুলবশতঃ ইউক্রেনের বেসামরিক বিমান ভূপাতিত করে অস্বীকার করা এবং পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত পাল্টে ক্ষতিপূরণ প্রদান, ইত্যাদি ঘটনা ২০২০ সালে ইরানকে আরও দুর্বল করেছে। ইরান তার উপর অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নেবার লক্ষ্যেই ফাখরিজাদেহ হত্যার প্রতিশোধ নেয়া থেকে এখনও বিরত থেকেছে। তারা হয়তো আশা করছে যে, নতুন মার্কিন প্রশাসন ইরানের উপর অবরোধ তুলে নিতে সচেষ্টা হবে। তবে বাইডেন প্রশাসনকে ট্রাম্প প্রশাসনের রেখে যাওয়া বাস্তবতাগুলি নিয়েই কাজ করতে হবে।
বাইডেন প্রশাসনের নীতি পরিবর্তনকে মাথায় রেখে ইতোমধ্যেই তুরস্ক এবং সৌদি আরব সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ শুরু করেছে। এতে সবচাইতে বড় হুমকিতে পড়বে ইরান। সিরিয়ার ইদলিবে বছরের শুরুতে তুর্কি সমর্থিত বাহিনীর সাথে রুশ এবং ইরান সমর্থিত বাহিনীর ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। তবে উপসংহারে না পৌঁছানো এই সংঘাত আবারও শুরু হবার সম্ভাবনা রয়ে গেছে। ইরান বাইডেন প্রশাসনের মাঝে অবরোধ উঠিয়ে নেয়ায় আশার আলো দেখলেও ইরাক এবং সিরিয়াতে ইরানের অবস্থানকে তুর্কি এবং সৌদি গ্রুপের প্রভাব বিস্তার থেকে রক্ষা করার জন্যে ইরানের পক্ষে রাশিয়া ছাড়া আর কেউই থাকবে না। বিশেষ করে ইস্রাইলের সাথে আরব দেশগুলির সখ্যতা তৈরি হওয়ায় ২০২১ সালে ইরানের জন্যে আঞ্চলিক প্রভাব ধরে রাখা কঠিন হবে।


















