Showing posts with label Uighur. Show all posts
Showing posts with label Uighur. Show all posts

Tuesday, 1 June 2021

‘ওয়ান চাইল্ড’ থেকে ‘থ্রি চাইল্ড’ ... কোন পথে চীন?

০২রা জুন ২০২১ 
‘ওয়ান চাইল্ড’ নীতির কারণে চীনে যেমন অবিবাহিত মধ্যবয়সী পুরুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি শহরাঞ্চলে বেশি খরচের ভয়ে মহিলারা একের বেশি সন্তান নিতে না চাওয়ায় ‘টু চাইল্ড’ এবং ‘থ্রি চাইল্ড’ নীতির সফলতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অর্থনীতিকে এতটা প্রাধান্য দেয়ার পরেও চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ব্যাপারে কেউই নিশ্চিত নয়। মানুষের প্রবৃত্তিকে এড়িয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়ার ফলশ্রুতিতে সমাজ, অর্থনীতি এবং রাজনীতি, সবগুলিই এখন ঝুঁকির মাঝে পড়েছে; যা সামনের দিনগুলিতে চীনের ভূরাজনৈতিক আকাংক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করবে।


গত ৩১শে মে চীন ঘোষণা করেছে যে, চীনা দম্পতিরা এখন থেকে সর্বোচ্চ তিনজন সন্তান গ্রহণ করতে পারবেন। চীনা বার্তা সংস্থা ‘শিনহুয়া’ জানাচ্ছে যে, পলিটব্যুরোর বৈঠকে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এব্যাপারে সম্মতি দিয়েছেন। মে মাসের শুরুতে প্রকাশিত আদম শুমারিরতে দেখা যায় যে, ২০২০ সালে চীনে প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ শিশু জন্ম নিয়েছে; যা কিনা ২০১৬ সালে ছিল ১ কোটি ৮০ লক্ষ। ১৯৬০এর দশকের পর থেকে এটা সর্বনিম্ন সংখ্যা। ২০১৬ সালে চীনা সরকার তাদের ‘ওয়ান চাইল্ড’ নীতিতে পরিবর্তন এনে দম্পতিদেরকে দু’টা সন্তান গ্রহণ করতে অনুমতি দেয়। সেই অনুমতির পর থেকে দুই বছরের জন্যে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও তা আবারও অবনতির দিকে যেতে থাকে। চার বছরের মাথায়ই চীনা সরকার সেই নীতিতে দ্বিতীয়বারের মতো পরিবর্তন আনলো। ১৯৭৯ সালে চীনা সরকার নিয়ম করেছিল যে, চীনা দম্পতিরা একটার বেশি সন্তান গ্রহণ করতে পারবে না। যে পরিবার এই নিয়ম মানেনি, তাদেরকে জরিমানা এবং চাকুরিচ্যুত করা ছাড়াও গর্ভপাতে বাধ্য করা হয়েছিল। বারংবার নীতি পরিবর্তনের একদিকে যেমন অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে, তেমনি তা চীনের তথা বিশ্বের ভূরাজনীতিতেও ভূমিকা রাখবে।

‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, চীনের ‘ওয়ান চাইল্ড’ নীতির কারণে দেশটাতে পুরুষ মহিলার অনুপাতে মারাত্মক ধরনের ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। বেশিরভাগ পরিবারই একটা সন্তান নেবার ব্যাপারে ছেলে সন্তানকে গুরুত্ব দিতে থাকে। ‘ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর’এর প্রফেসর মু ঝেং বলছেন যে, চীনা সরকারের এই নীতির ফলে আর্থসামাজিক দিক থেকে অপেক্ষাকৃত নিচের ঘরে জন্ম নেয়া পুরুষরা বিয়ের জন্যে পাত্রী পেতে ব্যর্থ হয়। বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা ‘রয়টার্স’ বলছে যে, পরিবর্তিত নিয়ম চীনের একেক অঞ্চলে একেকভাবে প্রতিফলিত হবে। বড় শহরগুলিতে জীবনযাত্রার খরচ বেশি হওয়ায় অনেক মহিলাই আরেকটা সন্তান গ্রহণ করতে দু’বার চিন্তা করবে; অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলের মানুষ খরচের চাইতে পরিবারের রীতিকেই বেশি গুরুত্ব দেবে। এতে নতুন ধরনের আর্থসামাজিক সমস্যার জন্ম হতে পারে। অনেকেই মনে করছেন যে, যেহেতু কয়েক দশকে চীনের অর্থনীতির আকার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, তাই চীনের জনসংখ্যা কমে যাবার ব্যাপারটা সারা বিশ্বের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে। কারণ চীনের অর্থনীতিকে বড় করতে যথেষ্ট সংখ্যক নবীন জনগণ পাওয়া যাবে না; বৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা বাড়বে প্রতিনিয়ত। ২০১০ সালে যেখানে জনসংখ্যার ৯ শতাংশ ছিল ৬৫ বছরের উপর; সেখানে ২০২০ সালে তা দাঁড়িয়েছে সাড়ে ১৩ শতাংশে। চীনা সরকার জনগণের অবসরে যাবার বয়স বাড়িয়ে এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে পারে।

‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, চীনের বাজারভিত্তিক অর্থনীতি সেদেশে ব্যাপকহারে বেশ্যাবৃত্তির জন্ম দিয়েছে। যদিও চীনে বেশ্যাবৃত্তি বেআইনী, তথাপি জনসংখ্যার মাঝে মহিলার সংখ্যা কম হওয়ায় এবং বহু মানুষ শহরের শিল্পাঞ্চলে কাজের জন্যে চলে আসার কারণে বেশ্যাবৃত্তিকে থামানো যাচ্ছে না। ‘হাফিংটন পোস্ট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ‘হ্যাপি এনডিং’এর নামে সেখানে বেশ্যাবৃত্তি চলছে। কিছু শহরে ম্যাসাজ পার্লারের নামে চলছে বেশ্যাবৃত্তি। ‘ফরেন পলিসি’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, সোশাল মিডিয়া ব্যবহার করে বেশ্যাবৃত্তির ব্যাপক প্রসার হচ্ছে। চীনে এখন মানুষ বিক্রি না হলেও মানুষ ভাড়ায় পাওয়া যাচ্ছে!
 
২০১৬ সালে উইঘুরে প্রতি এক লক্ষ জনগণের মাঝে ৫০ জনকে বন্ধ্যা করে ফেলা হচ্ছিল; ২০১৮ সাল নাগাদ তা পাঁচ গুণ বেড়ে প্রতি লক্ষে ২’শ ৪৩এ গিয়ে দাঁড়ায়! অথচ পুরো চীনের জন্যে এই সংখ্যা হলো এক লক্ষে মাত্র ৩৩ জন! অর্থাৎ পুরো চীনের তুলনায় উইঘুরে বন্ধ্যাত্ব ৭ গুণেরও বেশি! চীনা সরকারের জনহার নিয়ন্ত্রণের নীতি পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দিলে উইঘুরের মত বিদ্রোহী অঞ্চলগুলিতে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সরকারি চেষ্টাকে বৈধতা দেয়া কঠিন হবে।


‘সিএনএন’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, কিছু সমালোচক প্রশ্ন করছেন যে, চীনা সরকার কেন তাদের দম্পতিদের সর্বোচ্চ তিনটা সন্তান নিতে অনুমতি দিচ্ছে? কেন তারা এটা পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দিচ্ছে না? এর উত্তর হয়তো চীনের পশ্চিমের মুসলিম অধ্যুষিত শিনজিয়ান বা উইঘুর প্রদেশের নীতিতে পাওয়া যাবে। সেখানে চীনা সরকার মুসলিমদের জন্ম হার মারাত্মকভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। ২০১৬ সালে উইঘুরে প্রতি এক লক্ষ জনগণের মাঝে ৫০ জনকে বন্ধ্যা করে ফেলা হচ্ছিল; ২০১৮ সাল নাগাদ তা পাঁচ গুণ বেড়ে প্রতি লক্ষে ২’শ ৪৩এ গিয়ে দাঁড়ায়! অথচ পুরো চীনের জন্যে এই সংখ্যা হলো এক লক্ষে মাত্র ৩৩ জন! অর্থাৎ পুরো চীনের তুলনায় উইঘুরে বন্ধ্যাত্ব ৭ গুণেরও বেশি! শিনজিয়াং সরকারের হিসেবে ২০১৭ সালে সেখানে জন্ম হার ছিল প্রতি হাজারে প্রায় ১৬ জন; ২০১৮ সালে তা কমে গিয়ে দাঁড়ায় প্রতি হাজারে প্রায় ১১ জনেরও কম। অর্থাৎ এক বছরের মাঝে জন্মহার প্রায় ৩৩ শতাংশ কমে গেছে! শিনজিয়াং সরকার বলছে যে, এটা তাদের জন্মনিয়ন্ত্রণ নীতি বাস্তবায়নের ফলাফল। অনেকেই বলছেন যে, চীনা সরকারের জনহার নিয়ন্ত্রণের নীতি পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দিলে উইঘুরের মত বিদ্রোহী অঞ্চলগুলিতে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সরকারি চেষ্টাকে বৈধতা দেয়া কঠিন হবে।

‘ওয়ান চাইল্ড’ নীতির কারণে চীনে যেমন অবিবাহিত মধ্যবয়সী পুরুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি শহরাঞ্চলে বেশি খরচের ভয়ে মহিলারা একের বেশি সন্তান নিতে না চাওয়ায় ‘টু চাইল্ড’ এবং ‘থ্রি চাইল্ড’ নীতির সফলতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অধিক সংখ্যক বৃদ্ধ মানুষ এবং কমসংখ্যক নবীন কর্মক্ষম মানুষ চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আগের মতো এগিয়ে নিতে পারবে কিনা, সেব্যাপারে কেউই নিশ্চিত নয়। অর্থনৈতিক ব্যাপারগুলিকে প্রাধান্য দিয়েই ১৯৭৯ সালে ‘ওয়ান চাইল্ড’ নীতিতে যায় চীন; আবার ২০২১ সালে এসে অর্থনৈতিক কারণেই ‘থ্রি চাইল্ড’ নীতির সফলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অর্থনীতিকে এতটা প্রাধান্য দেয়ার পরেও চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ব্যাপারে কেউই নিশ্চিত নয়। সন্তান নেবার ক্ষেত্রে শহর এবং গ্রামাঞ্চলের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য যেমন নতুন সামাজিক অসঙ্গতির জন্ম দেবে, তেমনি উইঘুরের মতো মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে বৈষম্যমূলক নীতি বাস্তবায়নের কারণে রাজনৈতিক সমস্যাও কম হবে না। অর্থনৈতিক কারণেই চীনারা পুরুষ সন্তানকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে; এখন বিয়ের জন্যে কনে পাবার সম্ভাবনা কমে যাওয়ায় এবং প্রবৃত্তিকে পরিতৃপ্ত করার আর কোন আইনী পদ্ধতি না থাকায় সেদেশে বেশ্যাবৃত্তি থামানো যাচ্ছে না। মানুষের প্রবৃত্তিকে এড়িয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়ার ফলশ্রুতিতে সমাজ, অর্থনীতি এবং রাজনীতি, সবগুলিই এখন ঝুঁকির মাঝে পড়েছে; যা সামনের দিনগুলিতে চীনের ভূরাজনৈতিক আকাংক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করবে।

Friday, 16 October 2020

কিরগিজস্তানে রাজনৈতিক অস্থিরতা ... ভূরাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠছে মধ্য এশিয়া

১৭ই অক্টোবর ২০২০ 

কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকের রাস্তায় বিক্ষোভ। মধ্য এশিয়ার একমাত্র কিরগিজস্তানেই কিছুদিন পরপরই বিক্ষোভের মুখে সরকারের পরিবর্তন হয়েছে। আশেপাশের দেশগুলির সবগুলিতেই একনায়ক ক্ষমতাসীন। মধ্য এশিয়ায় ‘সিল্ক রোড’এর উপর অবস্থিত দেশটাতে রাজনৈতিক অস্থিরতা ভূরাজনৈতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ; কারণ চীনের ‘বিআরআই’ চিন্তাই হলো ‘নতুন সিল্ক রোড’, যা পূর্ব এবং পশ্চিমের মাঝে সুপার হাইওয়ে; চীনারা শুরু করলেও সকলেই চাইছে এর নিয়ন্ত্রণ নিতে।

১৫ই অক্টোবর মধ্য এশিয়ার দেশ কিরগিজস্তানের রাজনৈতিক সমস্যার ফলাফল হিসেবে প্রেসিডেন্ট সুরনবাই জিনবেকভ পদত্যাগ করেন এবং নতুন একজন প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতাসীন হন। সাদির জাপারভ মাত্র ক’দিন আগেও কারাগারে ছিলেন; এখন তিনি প্রধানমন্ত্রী। ২০১৩ সালে ‘কুমতর’ স্বর্ণ খনির আন্দোলনে জড়িত থাকার অভিযোগে তার ১১ বছরের জেল হয়। ২০১০ সালে ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট কুরমানবেক বাকিয়েভের সমর্থক ছিলেন তিনি। ‘আল জাজিরা’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, বেশিরভাগ বিশ্লেষকই মনে করছেন যে, প্রায় অচেনা একজন রাজনীতিবিদ এবং সাজাপ্রাপ্ত আসামীর প্রধানমন্ত্রী হবার অর্থই হলো পিছনে কেউ কলকাঠি নাড়ছে। ৪ঠা অক্টোবরের পার্লামেন্ট নির্বাচনের পর থেকেই রাস্তায় ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভকারীরা প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট আলমাজবেক আতামবায়েভকে জেল থেকে বের করে নিয়ে আসলেও পরে তাকে আবারও গ্রেপ্তার করা হয়। বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্ট ভবন আক্রমণ করার পর প্রধানমন্ত্রী এবং স্পিকার পদত্যাগ করেন। কিরগিজস্তানের রাজনৈতিক সমস্যা অত্র এলাকার ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে। এই ঘটনার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব বুঝতে হলে কিরগিজস্তানসহ মধ্য এশিয়ার ভৌকৌশলগত বিষয়গুলি বিশ্লেষণ করতে হবে।

ভূরাজনৈতিকভাবে আকারের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ কিরগিজস্তান

মধ্য এশিয়ার দেশ কিরগিজস্তানের উত্তরে রয়েছে কাজাখস্তান, পশ্চিমে রয়েছে উজবেকিস্তান, দক্ষিণে তাজিকিস্তান এবং পূর্বে রয়েছে চীনের উইঘুর বা শিনজিয়াং। প্রায় ২ লক্ষ বর্গকিঃমিঃ এই দেশের জনসংখ্যা মাত্র ৬৩ লক্ষ। জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ মুসলিম; প্রায় ১৬ শতাংশ রুশ অর্থোডক্স খ্রিস্টান। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবার মাধ্যমে দেশটার জন্ম। প্রায় ১৩’শ ডলার মাথাপিছু আয় নিয়ে মধ্য এশিয়ার সবচাইতে গরীব দেশ কিরগিজস্তান। দেশটার প্রধান রপ্তানি পণ্যের মাঝে রয়েছে স্বর্ণ, কৃষিজ দ্রব্য, বিদ্যুৎ, তৈরি পোষাক, ইত্যাদি। মধ্য এশিয়ার অন্যান্য দেশে মোটামুটিভাবে একনায়কতন্ত্র চললেও কিরগিজস্তানে পার্লামেন্টারি ব্যাবস্থা প্রচলিত হয়েছে। দেশটাতে বেশ কয়েকবার নির্বাচন পরবর্তী আন্দোলন হয়েছে এবং বেশ কয়েকবার ক্ষমতাসীন নেতৃত্বকে চাপের মুখে পদক্ষেপ করতে হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে কিরগিজস্তানের সম্পর্ক পশ্চিমাদের সাথে মোটামুটি ভালো; যদিও নিরাপত্তার দিক থেকে দেশটা রাশিয়ার উপর যথেষ্টই নির্ভরশীল। তদুপরি মধ্য এশিয়াতে যুক্তরাষ্ট্রের আবির্ভাবের পর এবং একইসাথে চীনা বিনিয়োগ বাড়তে থাকায় এখানকার ভূরাজনীতিতে বেশ পরিবর্তন এসেছে। অত্র এলাকায় পশ্চিমা দেশগুলির কূটনৈতিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ; বিশেষ করে কাজাখস্তানের সবচাইতে বড় শহর আলমাতিতে পশ্চিমা দেশগুলির রাজনৈতিক অবস্থান। 


১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র কাজাখস্তানকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।পরের মাসে, অর্থাৎ ১৯৯২ সালের জানুয়ারিতেই যুক্তরাষ্ট্র আলমাতিতে তার দূতাবাস খোলে। কাজাখস্তানের রাজধানী ১৯৯৮ সালে আস্তানাতে চলে গেলে মার্কিন দূতাবাসও সেখানে চলে যায় ২০০৬ সালে। তবে আলমাতির গুরুত্ব বিচারে সেখানে দূতাবাসের একটা শাখা থেকে যায়। ২০০৯ সালে সেখানে একটা কনসুলেট জেনারেল খোলা হয়; যার কর্মকান্ডের মাঝে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তাও রয়েছে। মার্কিন দূতাবাসের কথায় দেশটার রাজধানী সরে গেলেও আলমাতি দেশটার ‘দক্ষিণের রাজধানী’ রয়ে গেছে; যা বর্তমানে দেশটার সবচাইতে বড় শহর এবং সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক রাজধানী। অত্র অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বৃদ্ধি করার পিছনে এই কূটনৈতিক অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটেনও আলমাতিতে একই বছরের অক্টোবরে তাদের দূতাবাস খোলে। ব্রিটিশরা অবশ্য পরবর্তীতে তাদের দূতাবাস নতুন রাজধানীতে সরিয়ে নেয়। রাজধানী নূর সুলতান, যার আগের নাম ছিল আস্তানা, বর্তমানে ৬৯টা দেশের দূতাবাসের ঠিকানা। তবে আলমাতিতে অবস্থান ধরে রেখেছে ১৯টা দেশ; যার মাঝে মধ্য এশিয়া এবং পূর্ব এশিয়ার দেশগুলি ছাড়াও রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক এবং প্রতিবেশী চীন। অথচ প্রতিবেশী দেশ কিরগিজস্তানের রাজধানীতে রয়েছে মাত্র ১৩টা দেশের দূতাবাস। অনেক দেশই কিরগিজস্তানে তাদের কূটনৈতিক কর্মকান্ড কাজাখস্তান থেকেই চালিয়ে থাকে। একারণেই কিরগিজস্তানের রাজধানীতে রাজনৈতিক কর্মকান্ডের সাথে আলমাতির একটা যোগসূত্র থেকে যায়।

কৌশলগতভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ চীনের ‘বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা ‘বিআরআই’এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মধ্য এশিয়া। আর মধ্য এশিয়া ভৌগোলিক আয়তনে যত বিশালই হোক না কেন, চীন থেকে মধ্য এশিয়ায় ঢোকার পথ কিন্তু খুবই সীমিত। পথগুলি চীনের শিনজিয়াং প্রদেশ বা উইঘুরের মাঝ দিয়ে মধ্য এশিয়ার দেশগুলিতে প্রবেশ করে। এই পথগুলিই হাজার বছরের পুরোনো ‘সিল্ক রোড’। এর মূল পথগুলি ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে দক্ষিণে হিমালয় পর্বত এবং উত্তরে অতি শীতল সাইবেরিয়া এড়িয়ে যেতে বাধ্য হয়। একটা পথ উইঘুরের কাশগর হয়ে হিমালয়ের উত্তরে তিয়েন শান পর্বতমালার মাঝ দিয়ে ফারগানা ভ্যালিতে পৌঁছে। আরেকটা পথ উইঘুরের উরুমচি থেকে তিয়েন শান পর্বতমালার উত্তর দিয়ে ইশিক কুল হ্রদ এবং বলখাশ হ্রদের মাঝ দিয়ে ফারগানা ভ্যালিতে পৌঁছায়। বর্তমানে বলখাশ হ্রদের উত্তরে সাইবেরিয়ার অতি শীতল অঞ্চলের মাঝ দিয়ে আরও কিছু পথ তৈরি করা হলেও তা বেশ ঘুরপথ হওয়ায় প্রাচীন ‘সিল্ক রোড’এর পথগুলিই এখনও প্রধান পথ হয়ে রয়েছে। এই পথগুলি বর্তমানের কাজাখস্তান এবং কিরগিজস্তানের মাঝ দিয়ে যায়। অর্থাৎ উইঘুর, কাজাখস্তান এবং কিরগিজস্তান হলো ‘বিআরআই’এর মধ্য এশিয়া রুটের প্রধান পথ। আর এর মাঝে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলি হলো উইঘুরের কাশগর থেকে কিরগিজস্তানের ওশ; এবং উইঘুরের উরুমচি থেকে খরগোস হয়ে কাজাখস্তানের আলমাতি। আলমাতি বর্তমান কাজাখস্তানের সবচাইতে বড় শহর। আর কিরগিজস্তানের ওশ শহর কিরগিজস্তানের গুরুত্বপূর্ণ শহর হলেও এর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে কিরগিজ রাজধানী বিশকেকএ। বিশকেক আবার অনেক ক্ষেত্রেই আলমাতির সাথে যুক্ত। অর্থাৎ আলমাতি এবং বিশকেক ‘বিআরআই’এর রুটগুলির নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থানে রয়েছে। 

২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি। মার্কিন বিমান বাহিনীর শেষ ‘কেসি ১৩৫’ এয়ার রিফুয়েলিং বিমান ছেড়ে যাচ্ছে কিরগিজস্তানের মানাস বিমান ঘাঁটি। রুশ বাধার মুখে আফগানিস্তানের যুদ্ধের উপর ভর করে প্রায় ১৩ বছর কিরগিজস্তানে সামরিক লজিস্টিকস ঘাঁটি ধরে রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক উপস্থিতি অত্র অঞ্চলে মার্কিন প্রভাবকে যেমন বাড়িয়েছে, তেমনি রাশিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকেও বাড়িয়েছে।

আফগান যুদ্ধ কিরগিজস্তানের গুরুত্বকে বাড়িয়েছে

২০০১ সালে আফগানিস্তানে যুদ্ধে জড়াবার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র মধ্য এশিয়াতে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় ভূমিকা পালনের দিকে অগ্রসর হয়েছে। আফগান যুদ্ধের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্র কিরগিজস্তানের সাথে নিরাপত্তা চুক্তি করে। আফগানিস্তানে যুদ্ধ চালিয়ে নেবার লক্ষ্যে কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকএর মানাস বিমান বন্দরকে লজিস্টিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়া এতে তার নিজের উঠানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তার হিসেবে দেখতে থাকে; যদিও রাশিয়াও যুক্তরাষ্ট্রের মালামালকে কাজাখস্তান পর্যন্ত রেল ট্রানজিট দিয়েছিল; যেখান থেকে তা কাজাখস্তান এবং উজবেকিস্তান হয়ে আফগানিস্তান পৌঁছাতো। এভাবে মূলতঃ খাবারদাবারসহ কিছু সাধারণ পণ্য আফগানিস্তানে যেতো। জ্বালানি, সামরিক গাড়ি এবং ভারি রসদপাতিসহ বেশকিছু পণ্য আফগানিস্তানে পৌঁছাতো পাকিস্তানের মাঝ দিয়ে। আর সৈন্য এবং তাদের ব্যবহৃত অতি সংবেদনশীল জিনিসগুলি যেতো আকাশপথে কিরগিজস্তান হয়ে। দেশটার রুশ লবি সর্বদাই এই সামরিক রুটখানা বন্ধ করে দেবার জন্যে চাপ সৃষ্টি করে। এই চাপের অংশ হিসেবে ২০০৩ সালে রুশ নেতৃত্বের ‘কালেকটিভ সিকিউরিটি ট্রিটি অর্গানাইজেশন’ বা ‘সিএসটিও’এর সদস্যপদের শর্ত হিসেবে রাশিয়া কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকএর অদূরে কান্টএ একটা সামরিক বিমান ঘাঁটি ব্যবহার করার চুক্তি করে। মধ্য এশিয়ার কাজাখস্তান এবং তাজিকিস্তান ছাড়াও আর্মেনিয়া এবং বেলারুশ ‘সিএসটিও’এর সদস্য। চুক্তি মোতাবেক এই দেশগুলি বাইরের শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হলে রাশিয়া সেখানে সামরিক হস্তক্ষেপ করার কথা রয়েছে। রুশ বিমান ঘাঁটি ব্যবহারের চুক্তিটা সর্বশেষ এবছরের জুন মাসে নবায়ন করা হয়েছে। বাৎসরিক সাড়ে ৪ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে এই ঘাঁটি ব্যবহার করছে রাশিয়া। এছাড়াও কিরগিজস্তানে রাশিয়ার আরও কয়েকটা ঘাঁটি রয়েছে; যার মাঝে রয়েছে ইসিক কুল হ্রদে রুশ নৌবাহিনীর সাবমেরিন ধ্বংসী টর্পেডো টেস্টিংএর ঘাঁটি।

২০০৫ সালের জুলাই মাসে ‘সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন’ বা ‘এসসিও’এর আলোচনায় কিরগিজস্তান এবং উজবেকিস্তান থেকে মার্কিন ঘাঁটি সরিয়ে নেবার জন্যে সমসীমা বেঁধে দেবার দাবি জানানো হয়। ‘এসসিও’এর সদস্য হিসেবে কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান এবং তাজিকিস্তানের সাথে রয়েছে রাশিয়া এবং চীন। প্রায় ১৩ বছর ব্যবহার করার পর কিরগিজ সরকারের চাপের মুখে ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র মানাসে তার লজিস্টিকস ঘাঁটিখানা বন্ধ করে দেয়। মার্কিন বিমান বাহিনীর ৩৭৬তম এক্সপিডিশনারি উইংএর কমান্ডার কর্নেল জন মিলার্ড বলেন যে, এই সময়ের মাঝে মানাসের এই ঘাঁটি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র ৫৩ লক্ষ সৈন্য আনা নেয়া করেছে; আর ১ লক্ষ ৩৬ হাজার বিমানকে আকাশ থেকে আকাশে রিফুয়েলিং করা হয়েছে; এবং ৪২ হাজার কার্গো পরিবহণ মিশন সম্পাদন করেছে। প্রায় ২ হাজার মার্কিন সেনা এই ঘাঁটিতে অবস্থান করতো। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, ২০১১ সালে রুশ সমর্থিত আলমাজবেক আতামবায়েভ কিরগিজ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবার পর মানাসের ঘাঁটি বন্ধ করার জন্যে চাপ সৃষ্টি শুরু হয়। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে তিনি মস্কোর সাথে চুক্তি নবায়নের মাধ্যমে কান্ট সামরিক ঘাঁটিকে রাশিয়ার কাছে আরও ১৫ বছরের জন্যে লিজ দেবার ব্যবস্থা করেন। বিনিময়ে মস্কো কিরগিজস্তানের ৫’শ মিলিয়ন ডলারের ঋণ মওকুফ করে। 

বলখাশ হ্রদের দক্ষিণের ‘জেতিসু’ বা ‘সাত নদী’ অঞ্চলের বড় শহর আলমাতি, যা কাজাখস্থানের প্রাক্তন রাজধানী। একই অঞ্চলের মাঝে পড়েছে কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেক এবং চীনের উইঘুরের ইয়িনিং শহর। মূলতঃ মুসলিম অধ্যুষিত এই অঞ্চলকে ঊনিশ শতকে রাশিয়া এবং চীন নিজেদের মাঝে ভাগ বাটোয়ারা করে নেয়। কৃত্রিমভাবে তৈরি করা এই বাউন্ডারিগুলি উভয় পাশের মানুষের বিশ্বাসগত এবং জাতিগত একাত্মতাকে মুছে ফেলতে পারেনি।


কিরগিজস্তান এবং মধ্য এশিয়ার ভৌগোলিক অসঙ্গতি


মধ্য এশিয়ার একেবারে পূর্বে অবস্থিত কিরগিজস্তান। তিয়েন শান পর্বতমালা দেশটাকে দুই ভাগে ভাগ করে ফেলেছে। রাজধানী বিশকেকএর অবস্থান দেশের একেবারে উত্তরে কাজাখস্তানের সীমানার কাছাকাছি। বিশকেকের জনসংখ্যা প্রায় ১১ লক্ষ; যা পুরো দেশের জনসংখ্যার ছয় ভাগের এক ভাগ। সেখান থেকে কাজাখস্তানের সবচাইতে বড় শহর আলমাতি মাত্র ২’শ ৩৬ কিঃমিঃ দূরে; যেতে লাগে মাত্র ৪ ঘন্টা। নিকটবর্তী কাজাখস্তানের প্রায় ১৯ লক্ষ জনসংখ্যার আলমাতি শহরই বিশকেকের মানুষের জন্যে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশকেক এবং আলমাতি তিয়েন শান পর্বতের উত্তরে ইশিক কুল হ্রদ এবং বলখাশ হ্রদের মাঝে অবস্থিত এলাকার অংশ; যা ঐতিহাসিকভাবে ‘জেতিসু’ বা ‘সাত নদী’ নামে পরিচিত। বলখাশ হ্রদে পরা সাতটা নদীর উপর ভিত্তি করেই এই নাম; যদিও বর্তমানে মূল নদী ইলি সহ পাঁচটা নদী অবশিষ্ট রয়েছে। এই অঞ্চলটা রাজনৈতিকভাবে ভাগাভাগি হয়ে বেশিরভাগটা পড়েছে কাজাখস্তানে; বাকিটা চীন এবং কিরগিজস্তানে। বিশকেক থেকে পাহাড়ি পথে কিরগিজস্তানের অপর গুরুত্বপূর্ণ শহর ওশ যেতে লাগে ১১ থেকে ১২ ঘন্টার উপরে। ওশ হলো তিয়েন শানের পশ্চিমে ফারগানা ভ্যালিতে অবস্থিত এক শহর। সেখান থেকে ফারগানা ভ্যালির অন্য শহরগুলি বেশি কাছে; যদিও সেই শহরগুলি উজবেকিস্তান বা তাজিকিস্তানের অংশ। মোটকথা, ফারগানা ভ্যালি এবং ‘জেতিসু’ দু’টা ভৌগোলিকভাবে আলাদা অঞ্চল; এবং এই অঞ্চলগুলিকে কৃত্রিমভাবে কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান এবং চীনের মাঝে ভাগ বাটোয়ারা করা হয়েছে। জারের রাশিয়া এবং সোভিয়েত আমলে করা এই বিভাজনের বর্তমান ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব যথেষ্ট। ১৮৫৪ সালে রুশরা আলমাতি শহরের গোড়াপত্তন করে; বিশকেক শহরের গোড়াপত্তন হয় ১৮৬৮ সালে। এই শহরগুলি তিয়েন শান পর্বতমালার দক্ষিণে কাশগর থেকে ফারগানা ভ্যালিতে যাওয়া সিল্ক রোডের একটা বিকল্প তৈরি করে, যা মূলতঃ রাশিয়ার সাথে চীনের বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা দেয়। একুশ শতকে এসে সেই একই কারণে এই শহরগুলি গুরুত্বপূর্ণ।

মধ্য এশিয়ায় কয়েকটা বিশেষ অঞ্চলে প্রাকৃতিক কারণে পানির সহজলভ্যতার উপর ভিত্তি করে মানুষের বসতি স্থাপিত হয়েছে। বৃষ্টি না থাকার কারণে প্রায় মরু এই অঞ্চলে কিছু বরফগলা নদীর উপর নির্ভর করে মানুষ বেঁচে থাকে। এই অঞ্চলের মাঝ দিয়ে যাওয়া সবচাইতে বড় বাউন্ডারি হলো তিয়েন শান পর্বতমালা। এই পর্বতমালার উত্তরে আলতাই পর্বতমালার দক্ষিণ পর্যন্ত রয়েছে ‘জুংগার বেসিন’; যার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ শহর উইঘুরের উরুমচি। এখানে উরুমচি নদী ছাড়াও অনেকগুলি নদী নেমে এসেছে তিয়েন শান পর্বতমালা থেকে। উরুমচি থেকে তিয়েন শান পর্বত পেরিয়ে দক্ষিণে আসলে ‘তারিম বেসিন’; যেখানে তাকলা মাকান মরুভূমির মাঝ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে তারিম, হোতান, ইয়ারকান্দ নদী এবং এগুলির শাখা প্রশাখাগুলি। তারিমের পশ্চিম প্রান্তে গুরুত্বপূর্ণ শহর কাশগর; মধ্যযুগের সিল্ক রোড এই অঞ্চলের উপর দিয়েই গিয়েছে। তিয়েন শানের উত্তর পশ্চিমে রয়েছে ‘জেতিসু’ বা ‘সাত নদী’র অঞ্চল; যেখানে মূল নদী ইলি। আর তিয়েন শানের দক্ষিণ পশ্চিমে রয়েছে উর্ভর ফারগানা ভ্যালি, যার মাঝ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গেছে শির দরিয়া নদী। ‘জুংগার’ এবং ‘তারিম’ মূলতঃ বর্তমানে চীনের উইঘুরের মাঝে পড়েছে। ‘জেতিসু’ ভাগাভাগি হয়েছে কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান এবং চীনের মাঝে। গুরুত্বপূর্ণ এই প্রাকৃতিক ভৌগোলিক অঞ্চলগুলিকে কৃত্রিম রাজনৈতিক সীমানা দিয়ে ভাগাভাগি করা হয়েছে; সৃষ্টি হয়েছে বহু ধরনের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব। এই ভাগাভাগির পিছনে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল ‘সিল্ক রোড’এর নিয়ন্ত্রণ নেয়া। মূলতঃ মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল হলেও রুশ এবং চীনা সাম্রাজ্যগুলি এই অঞ্চলকে ভাগবাটোয়ারা করে নিজেদের উপনিবেশ বানিয়ে নেয়। এই অঞ্চলে রুশ অর্থোডক্স খ্রিস্টান এবং চীনা হান জাতির লোকদের ব্যাপক হারে বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়। এই কর্মকান্ডগুলি আজও এখানকার ভূরাজনীতিকে প্রভাবিত করে যাচ্ছে। কৃত্রিম বাউন্ডারির মাধ্যমে এই অঞ্চলের মানুষকে আলাদা করা হলেও বিশ্বাসগত এবং জাতিগত একাত্মতার প্রভাব খুব সহজেই সীমানা পার হয়ে যাচ্ছে, যার ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম।

ফারগানা ভ্যালি ... মরুর মাঝে ওয়েসিস


তিয়েন শান পর্বতমালা এবং গিসার আলাই পর্বতমালার মাঝে অবস্থিত প্রায় ২২ হাজার বর্গকিঃমিঃএর ফারগানা ভ্যালির সমতলভূমি কতটা শুষ্ক, তার প্রমাণ হলো এই অঞ্চলের বৃষ্টিপাতের পরিমাণ। ‘ক্লাইমেট ডাটা’র হিসেব মতে ফারগানাতে বছরে মাত্র ২’শ ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। মাসের হিসেবে তা বৃষ্টিপাতের আট মাসে গড়ে মাসে ২০ থেকে ৩০ মিঃমিঃ। আর গ্রীষ্মকালের শুষ্ক চার মাসে প্রায় নেই বললেই চলে। তুলনামূলকভাবে, বাংলাদেশে বৃষ্টির মৌসুমে মাসে গড়ে ৩’শ থেকে ৯’শ মিঃমিঃ পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়। তদুপরি এখানে চাষাবাদের কমতি নেই। ফারগানা ভ্যালি পুরো মধ্য এশিয়ার খাদ্যের জোগানের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এখানে তুলা, গম, ধান, সব্জি, ফল ইত্যাদি ফসলের চাষ হয়। চাষাবাদের কারণেই ফারগানা হলো মধ্য এশিয়ার মাঝে সবচাইতে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। পুরো মধ্য এশিয়ার সাড়ে ৬ কোটি মানুষের মাঝে প্রায় দেড় কোটিই বাস করে ফারগানাতে, যা কিনা মধ্য এশিয়ার ভূমির মাত্র ৫ শতাংশ।

সোভিয়েতদের তৈরি করা রাজনৈতিক সীমানা

ইতিহাসের বেশিরভাগ সময়েই পুরো ফারগানা ভ্যালির নিয়ন্ত্রণ ছিল যেকোন একটা রাজনৈতিক শক্তির হাতে। একসময় এর নিয়ন্ত্রণ ছিল পারস্যের হাতে; এরপর তা চলে যায় ইসলামিক সভত্যার অধীনে। ত্রয়োদশ শতকে মোঙ্গল আক্রমণের পর তা আবারো মুসলিম শাসনের অধীনে আসে। মধ্যপ্রাচ্য এবং চীনের মাঝে স্থলবাণিজ্যপথ ‘সিল্ক রোড’এর উপর অবস্থিত হবার কারণে এর কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। ঊনিশ শতকে এই অঞ্চলে রুশদের আগ্রাসন শুরু হয়। ১৮৭৬ সাল নাগাদ তৎকালীন কোকান্দ খানাতের পুরো এলাকা রুশদের উপনিবেশ হয়ে যায় এবং দলে দলে রুশরা এখানে এসে বসতি স্থাপন করতে থাকে। বিংশ শতকে বলশেভিক বিপ্লবের পর এই অঞ্চল রুশদের হাত থেকে সোভিয়েতদের হাতে যায়। সোভিয়েতরা প্রথমবারের মতো মধ্য এশিয়াকে জাতি ভিত্তিতে, অর্থাৎ উজবেক, তাজিক, কাজাখ, তুর্কমেন এবং কিরগিজ পরিচয়ে ভাগ করা শুরু করে। উজবেক এবং তাজিকরা সমতলভূমিতে চাষাবাদের কাজ করলেও কাজাখ, তুর্কমেন এবং করগিজরা বেশিরভাগই ছিল যাযাবর। সোভিয়েতরা নতুন তৈরি করা সীমানা অনুযায়ী এই যাযাবরদেরকে এক জায়গায় থাকতে বাধ্য করে। ‘স্ট্রাটফর’ বলছে যে, সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্তালিনের এই নীতির পিছনে মূল চিন্তাটা ছিল মধ্য এশিয়ায় পুনরায় একক কোন শক্তির উত্থান প্রতিহত করা, যা কিনা অত্র অঞ্চলে মস্কোর শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করতে সক্ষম হতে পারে। তবে নতুন তৈরি করা সীমানাগুলি জাতিগত সীমানা পুরোপুরিভাবে মেনে চলেনি। এক রিপাবলিকে আরেক রিপাবলিকের বড়সড় একটা সংখ্যালঘু জনসংখ্যা থেকেই যায়। সোভিয়েত সময়ে মধ্য এশিয়া মস্কোর একচ্ছত্র অধিকারে থাকার ফলে এই সীমানাগুলির ফলাফল খুব বড় ছিল না। অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং নিরাপত্তার দিক থেকে পুরো অঞ্চল একক সত্ত্বা হিসেবেই কাজ করেছে। তবে এই পুরো হিসেব পরিবর্তিত হয়ে যায় সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সাথেসাথে। 

বৃষ্টিহীন মধ্য এশিয়ায় কিরিগিজস্তানের তক্তোগুল রিজার্ভার। পানিবিদ্যুৎ উৎপাদন করার লক্ষ্যে ১৯৭০এর দশকে নারিন নদীর উপর বাঁধ দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল এই রিজার্ভার। নারিন নদীর পানির উপর উজবেকিস্তানের ফারগানা ভ্যালি ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল; আবার কিরগিজস্তানের অর্থনীতিতে পানিবিদ্যুৎ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ। কৃত্রিম রাজনৈতিক সীমানারা কারণে ফারগানা ভ্যালির বিরাট জনসংখ্যার পানির নিয়ন্ত্রণ ছোট্ট কিরগিজস্তানের হাতে।


কিরগিজস্তানের বিদ্যুৎ ব্যবসা, পশ্চিমা বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক

অর্থনৈতিকভাবে কিরগিজস্তান তার প্রতিবেশী দেশগুলির উপরে যথেষ্টই নির্ভরশীল; বিশেষ করে তেল গ্যাসের জন্যে। দেশটায় খনিজ তেল এবং গ্যাস তেমন একটা না থাকলেও এর পানিবিদ্যুৎ শক্তি উল্লেখযোগ্য। দেশটার জিডিপির প্রায় ৪ শতাংশ বিদ্যুৎ খাত থেকে আসে। আর উৎপাদিত বিদ্যুতের ৯০ শতাংশই হলো পানিবিদ্যুৎ। তবে শীতকালে পানিবিদ্যুতের উৎপাদন কমে গেলে আমদানিকৃত হাইড্রোকার্বনের উপর নির্ভরশীলতা বেড়ে যায়; তাজিকিস্তান এবং কাজাখস্তান থেকে বিদ্যুৎ আমদানিও করতে হয়। ২০১০ সালের পর থেকে দেশে কয়লার উৎপাদন যেখানে ছিল সাড়ে ৪ লক্ষ টন, সেখানে ২০১৮ সাল নাগাদ তা বেড়ে হয় প্রায় ২৪ লক্ষ টন। মাত্র ৬৩ লক্ষ মানুষের দেশের জন্যে সংখ্যাটা বেশ বড়। সরকারের কয়লা উৎপাদন বৃদ্ধির পিছনে কারণ হলো বিদ্যুৎ এবং আমদানিকৃত তেল গ্যাসের উপর নির্ভরশীলতা কমানো। তদুপরি তেল গ্যাস আমদানির নেটওয়ার্ক কিরগিজস্তানের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৩ সালে রক্ষণাবেক্ষণের অর্থের অভাবে কিরগিজস্তানের গ্যাস পাইপলাইন নেটওয়ার্ক রুশ কোম্পানি গ্যাজপ্রমের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়। দেশটা বেশিরভাগ তেল আমদানি করে রাশিয়া এবং কাজাখস্থান থেকে।

কিরগিজস্তানের পানিবিদ্যুতের উৎস হলো দেশটার পাহাড়ি নদীগুলি। মধ্য এশিয়ার পাহাড়গুলির মাঝে একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ পেয়েছে কিরগিজস্তান; বিশেষ করে তিয়েন শান পর্বতমালা। তিয়েন শানের পশ্চিমে অবস্থিত ফারগানা ভ্যালির উর্বরতার মূলে রয়েছে শির দরিয়া নদী এবং এর শাখা প্রশাখা। শির দরিয়া নদীর পানির সবচাইতে বড় উৎস হলো নারিন এবং কারা দরিয়া নদী। উভয় নদীর উৎপত্তিই কিরগিজস্তানের পার্বত্য অঞ্চলে। অর্থাৎ কৌশলগতভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ ফারগানা ভ্যালির পানির উৎসের প্রায় পুরোটাই ছোট্ট দেশ কিরগিজস্তানের হাতে। এই অতি গুরুত্বপূর্ণ পানির উৎসগুলির উপর বাঁধ দিয়েই কিরগিজরা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে থাকে। ফারগানা ভ্যালির নামানগান শহরের কাছে এই নদী দু’টা মিলিত হয়ে শির দরিয়া নদী তৈরি করেছে। নারিন নদীর উপর ১৯৭০এর দশকে সোভিয়েতরা শুরু করে বাঁধ নির্মাণ; উদ্দেশ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন। সবচাইতে বড় পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প হলো ১২’শ মেগাওয়াট সক্ষমতার তক্তোগুল বাঁধ। এই বাঁধের ভাটিতে কুরপসাই, তাশ কুমির, শামালদাইসাই এবং উচ কুরগানস্ক নামে আরও চারটা বাঁধ নির্মাণ করা হয়, যেগুলির বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা যথাক্রমে ৮’শ, সাড়ে ৪’শ, ২’শ ৪০ এবং ১’শ ৮০ মেগাওয়াট। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরেও নারিন নদীর উপর বাঁধ নির্মাণ অব্যাহত থাকে। তক্তোগুল রিজার্ভারের উজানে ২০১০ সালে রুশ অর্থায়নে তৈরি করা হয় ৩’শ ৬০ মেগাওয়াট সক্ষমতার কামবারাতা-২ বিদ্যুৎ প্রকল্প। কিরগিজস্তানের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অনেক হলেও শীতকালে তাপমাত্রা শূণ্যের নিচে নেমে গেলে তা যথেষ্ট থাকে না। যেকারণে উজানে আরও দু’টা প্রকল্প নিয়েছে কিরগিজ সরকার, যেগুলির জন্যে অর্থায়ন নিয়ে সমস্যা ছাড়াও ভাটির দেশ উজবেকিস্তানকে রাজি করাবার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কামবারাতা-১ প্রকল্প হলো সর্ববৃহত, যার সক্ষমতা হবে ১৮’শ ৬০ মেগাওয়াট। এই প্রকল্পের মাধ্যমে কিরগিজস্তান খারাপ মৌসুমে বিদ্যুৎ ঘাটতি কমাবে আর ভালো মৌসুমে বিদ্যুৎ রপ্তানি করবে।

এবছরের ফেব্রুয়ারি মাসে আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি মধ্য এশিয়া থেকে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিতরণ লাইন তৈরির প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০১২ সালে শুরু হওয়া ‘সেন্ট্রাল এশিয়া সাউথ এশিয়া ১০০০’ বা ‘সিএএসএ ১০০০’ নামের এই প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। এর মূল অর্থ যোগানদাতা হলো বিশ্বব্যাংক; যাদের নেতৃত্ব অনুসরণ করে ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকসহ আরও বেশকিছু সংস্থা এতে অর্থায়ন করছে। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো কিরগিস্তানকে গ্রিড লাইনের মাধ্যমে আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানের সাথে যুক্ত করা; মাঝে তাজিকিস্তানও যুক্ত থাকবে। এই লাইনের মাধ্যমে গ্রীষ্মকালে যখন কিরগিজস্তানে বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত থাকবে, তখন তা আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানে রপ্তানি করা হবে। তবে বর্তমানে যেহেতু চীনা বিনিয়োগে পাকিস্তানে অনেকগুলি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করা হচ্ছে, তাই পাকিস্তান বলছে যে, গ্রিড লাইনটাকে এমনভাবে তৈরি করা হোক, যাতে দরকার হলে একই লাইন ব্যবহার করে পাকিস্তান থেকে যেন কিরগিজস্তান এবং তাজিকিস্তানে বিদ্যুৎ রপ্তানি করা যায়।

কিরগিজস্তানের পরিবর্তিত রাজনৈতিক কাঠামোর সুযোগ নিয়ে দেশটার বিদ্যুৎ শিল্পে পশ্চিমা বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করছে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ১৯৭০এর দশকে তৈরি তক্তোগুল হাইড্রোপাওয়ার প্রকল্পের সক্ষমতা কমে গিয়েছিল; যা কিনা কিরগিজস্তানের বিদ্যুৎ রপ্তানি করার সক্ষমতাকেও কমিয়ে দেয়। ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ বা ‘এডিবি’র ২’শ ৭৫ মিলিয়ন ডলার অর্থায়নে ২০১২ সালে এই প্রকল্পের উন্নয়ন কাজে হাত দেয়া হয়। এতে ২০২৩ সালের মাঝে এর স্থাপিত সক্ষমতা ১২’শ মেগাওয়াট থেকে ১৪’শ ৪০ মেগাওয়াটে উন্নীত হবার কথা রয়েছে। এই প্রকল্পে বেঁচে যাওয়া অর্থের মাধ্যমে ভাটির ১’শ ৮০ মেগাওয়াট সক্ষমতার উচ কুরগানস্ক বাঁধেরও উন্নয়ন করার কথা রয়েছে। ১৯৯৪ সালে এডিবির সদস্যপদ পাবার পর থেকে কিরগিজস্তানকে এডিবি প্রায় ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ এবং অনুদান দিয়েছে। বিশ্বব্যাংক দেশটার কৃষি, পানিবিদ্যুৎ এবং পর্যটন খাতকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে। ১৯৯২ সালে বিশ্বব্যাংকের সদস্য হবার পর থেকে কিরগিজস্তান সংস্থাটা থেকে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি আর্থিক সহায়তা পেয়েছে। একইসাথে সকল পশ্চিমা উন্নয়ন সংস্থাগুলির সহায়তাকে সমন্বয় করার দায়িত্বও নিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

রেমিট্যান্সের ভূরাজনীতি এবং রাশিয়ার উপর নির্ভরশীলতা

কিরগিজস্তানের অর্থনীতি রেমিট্যান্সের উপর যথেষ্টই নির্ভরশীল। বিশ্ব ব্যাংকের হিসেবে ২০০০ সালে কিরগিজস্তানের রেমিট্যান্স আয় ছিল ২ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার; যা ছিল জিডিপির দশমিক ২ শতাংশেরও কম। ২০০৫ সালে রেমিট্যান্স এক লাফে ৩’শ মিলিয়ন ডলার পার হয়ে যায়; যা ছিল জিডিপির প্রায় ১৩ শতাংশ। ২০০৮ সাল নাগাদ তা পৌঁছে যায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে; যা জিডিপির প্রায় ২৪ শতাংশ। ২০১৩ সালে তা গিয়ে দাঁড়ায় ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে; যা কিনা জিডিপির প্রায় ৩১ শতাংশ। আর ২০১৮ সালে তা পৌঁছে যায় ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে; যা কিনা জিডিপির ৩২ শতাংশ। বুঝতে বাকি থাকে না যে, কিরগিজস্তানের অর্থনৈতিক উন্নয়নে রেমিট্যান্সের গুরুত্ব কতটা বেশি। বিশ্বব্যাংক বলছে যে, দেশটার সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে এর অর্থনীতির একটা খাতের উপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে।

বিশ্বব্যাংকের কথাগুলিকে খতিয়ে দেখতে কিরগিজস্তানের রেমিট্যান্সের উৎসের দিকে তাকাতে হবে। কিরগিজস্তানসহ মধ্য এশিয়ার দেশগুলি তাদের রেমিট্যান্সের জন্যে রাশিয়ার উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। রাশিয়া থেকে যে কয়টা দেশে রেমিট্যান্স যায়, তার মাঝে সর্বোচ্চ যায় উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান এবং কিরগিজস্তানে। ২০১৮ সালে রাশিয়া থেকে যাওয়া মোট রেমিট্যান্সের ৬৮ শতাংশই গেছে এই তিন দেশে। বিশেষ করে কিরগিজস্তান এবং তাজিকিস্তানে কর্মসংস্থানের ব্যাপক স্বল্পতার কারণে দেশের একতা বড় সংখ্যক মানুষ রাশিয়াতে যায় কাজ করতে। তাজিকিস্তানের জিডিপির কমপক্ষে এক তৃতীয়াংশ আসে রেমিট্যান্স থেকে। যা এই দেশগুলিকে পৃথিবীর সবচাইতে বেশি রেমিট্যান্স নির্ভর দেশ হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে। রাশিয়া এই মানুষগুলিকে মূলত কন্সট্রাকশন সেক্টরে কাজে লাগায়; যা মূলতঃ একটা মৌসুমী কর্মকান্ড। কিরগিজস্তানের রেমিট্যান্সের বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, ২০১২ সালের পর থেকে দেশটার রেমিট্যান্স তেমন একটা বাড়েনি। কারণ হিসেবে ২০১৪ সালে রাশিয়ার অর্থনীতিতে ধ্বসের কথা বলতেই হয়। সেবছর তেলের বাজারে মূল্য ধ্বস এবং ইউক্রেন যুদ্ধে জড়াবার কারণে রাশিয়ার উপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ রাশিয়ার অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে। ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত রাশিয়ার অর্থনীতি ছিল নিম্নগামী। এরপর সেখানে কিছুটা আশার আলো দেখা গেলেও অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। যেকারণে মধ্য এশিয়ার দেশগুলিও রাশিয়া থেকে বেশি রেমিট্যান্স পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে। 

কিরগিজস্তানের ‘কুমতর’ স্বর্ণ খনি। কানাডিয়ান একটা কোম্পানি ১৯৯২ সালে কোন টেন্ডার ছাড়াই এই খনির শতভাগ মালিকানা পেয়ে যায়। এরপর মারাত্মক পরিবেশগত দুর্ঘটনার পরেও এই কোম্পানি খনির মালিকানা ধরে রেখেছে। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে যে, খনিটা কিরগিজস্তানের অর্থনীতির জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ। অপরদিকে দেশটাতে চীনা বিনিয়োগ নানা বাধার সম্মুখীন হচ্ছে।

স্বর্ণ খনি এবং চীনা বিনিয়োগ

বিশ্ব ব্যাংকএর হিসেবে কিরগিজস্তানের জিডিপির প্রায় ৮ শতাংশ ‘কুমতর’ নামের স্বর্ণ খনি থেকে আসে। এই খনির শতভাগ মালিকানা কানাডিয় কোম্পানি ‘সেনটেরা গোল্ড’এর হাতে। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে কোন টেন্ডার ডাকা ছাড়াই এই খনি কানাডিয়দের হাতে দিয়ে দেয়া হয়। ১৯৯৭ সালে খনি থেকে স্বর্ণ উত্তোলন শুরু হলে পরের বছরেই সেখানে মারাত্মক এক দুর্ঘটনা পর পুরো এলাকার ৫ হাজারের বেশি মানুষকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে হয়। ব্যাপক পরিবেশগত সমস্যা থাকলেও কানাডিয়ান কোম্পানির কর্মকান্ড বন্ধ হয়নি। ২০০৪ সাল থেকে খনির মালিকানা নিয়ে কিরগিজ সরকারের সাথে কানাডিয়দের দ্বন্দ্ব শুরু হলেও আন্তর্জাতিক আদালত পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ২০১৬ সালে কিরগিজ সরকার কোম্পানির সাথে চুক্তি করে মালিকানা কানাডিয়দের হাতেই রেখে দেয়। বলা হয় যে, ‘কুমতর’ কিরগিজস্তানের অর্থনীতির জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ। কানাডিয়দের পিছন পিছন চীনারাও কিরগিজস্তানে স্বর্ণ খনিতে বিনিয়োগ করে। কিন্তু তারা তাদের সমস্যাগুলিকে সমাধান করতে হিমসিম খেয়েছে।

চীনারা কিরগিজস্তানে তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থগুলিকে এগিয়ে নিতে চায় ‘বিআরআই’ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে। কিন্তু কিরগিজস্তানে চীনারাদের রাজনৈতিক অবস্থান যে, কতটা দুর্বল, তা কয়েকটা প্রকল্পের সমস্যার দিকে তাকালেই বোঝা যাবে। ২০১৯এর অগাস্টে দেশের দক্ষিণে নারিন এলাকায় চীনা বিনিয়োগে চলা সলটন সারি স্বর্ণ খনিতে কর্মীদের সাথে গ্রামবাসীর সংঘর্ষে ২০ জন আহত হবার পর খনির কর্মকান্ড বন্ধ করে দেয় দেশের সরকার। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, গ্রামবাসীরা অভিযোগ করে যে, খনি থেকে বের হওয়া বিষাক্ততা থেকে তাদের গবাদিপশু মারা যাচ্ছিল; যদিও সেখানকার পশু বিশেষজ্ঞরা বলেন যে, পশু মৃত্যুর কারণ ছিল জীবাণুর সংক্রমণ। এরপর এবছরের ফেব্রুয়ারিতে চীনারা কিরগিজস্তানে একটা বড় প্রকল্প থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়। ‘নারিন ফ্রি ইকনমিক জোন’ নামে একটা লজিস্টিক্যাল সেন্টার তৈরি করার প্রকল্প ছিল দেশটার দক্ষিণে আতবাশি অঞ্চলে। এই লজিস্টিক্যাল সেন্টারের মাধ্যমে চীনের কাশগর এর সাথে ফারগানা ভ্যালির ব্যবসা সহজ হতো। কিন্তু প্রকল্প অঞ্চলে শতশত মানুষের প্রতিবাদের মুখে চীনা কোম্পানি তাদের ২’শ ৮০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের কর্মকান্ড বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। প্রতিবাদকারীদের বক্তব্য ছিল যে, চীনারা এই প্রকল্পের মাধ্যমে কিরগিজস্তানের জমি দখল করে নিচ্ছে। 

মধ্যযুগের ‘সিল্ক রোড’। মধ্য এশিয়া বিশাল এলাকা হলেও ভৌগোলিক কারণেই এই পথ মাত্র অল্প কিছু অঞ্চলের মাঝ দিয়ে যেতে বাধ্য হয়। সেই পথের উপরে হবার কারণেই কাজাখস্তান এবং কিরগিজস্তান ভূরাজনৈতিকভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ। একুশ শতকের ‘নিউ সিল্ক রোড’ও এই দেশগুলি হয়েই যাচ্ছে।


নতুন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা

চীনের জন্যে কিরগিজস্তানে থেকে থেকে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সেখানে চীনের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে না পারাটা একটা আঞ্চলিক হুমকি। প্রাকৃতিক ভৌগোলিক অঞ্চলগুলিকে কৃত্রিমভাবে বিভাজনের মাধ্যমে রাশিয়া এবং চীন যে সীমানাগুলি তৈরি করেছে, তা আজ বহু ধরনের ভূরাজনৈতিক জটিলতার জন্ম দিচ্ছে। যেমন উজবেকিস্তানের পানির নিয়ন্ত্রণ কিরগিজস্তানের হাতে। কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেক আবার কাজাখস্তানের বড় শহর আলমাতির প্রভাবমুক্ত নয়। চীনের ‘বিআরআই’ চিন্তাটা কাজাখস্তান এবং কিরগিজস্তানের উপর পুরোপুরি নির্ভর থাকার কারণেই এই এলাকার নিয়ন্ত্রণ চীনের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই অঞ্চলে রাশিয়ার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং নিরাপত্তাগত প্রভাব এখনও সর্বোচ্চ। ১৯৯০এর দশক থেকেই এখানে পশ্চিমা দেশগুলির, বিশেষতঃ যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়ছে। ২০০১ সালে আফগান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মধ্য এশিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে রাশিয়ার দ্বন্দ্ব ঘনীভূত হতে থাকে। আর এই ভূরাজনৈতিক খেলার মাঠ হয়ে দাঁড়ায় কিরগিজস্তান; যেখানে কিছুদিন পরপরই গণবিক্ষোভে নেতৃত্বের পরিবর্তন হয়েছে। কিরগিজস্তানের অর্থনীতিতে, বিশেষ করে পানিবিদ্যুৎ এবং স্বর্ণ খনিতে পশ্চিমারা অনেক বিনিয়োগ করলেও দেশটা এখনও রাশিয়া থেকে আসা রেমিট্যান্সের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে মার্কিন অবরোধে এবং তেলের বাজারে ধ্বসের ফলে রাশিয়ার অর্থনীতি যখন ধুঁকে ধুঁকে চলছে, তখন মধ্য এশিয়ার ছোট্ট দেশ কিরগিজস্তানের আয়ও কমতে শুরু করেছে। অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং বেকারত্ব একটা গণবিক্ষোভ উস্কে দেবার জন্যে যথেষ্ট।

এহেন পরিস্থিতিতে চীন তার অর্থনৈতিক স্বার্থগুলিকে সমুন্নত রাখতেও হিমসিম খাচ্ছে। তদুপরি উইঘুর বা শিনজিয়াং প্রদেশে চীনা সরকারের দমনপীড়নের সাথে বিশ্বাসগত এবং জাতিগতভাবে একাত্মতা প্রকাশ করা সীমানার ওপাড়ের কিরগিজ এবং কাজাখদেরকে চীনারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। ঊনিশ শতক থেকে শুরু করে রাশিয়া এবং চীনের প্রচেষ্টায় মধ্য এশিয়ায় তৈরি করা কৃত্রিম বাউন্ডারিগুলির ব্যবস্থাপনাই আজ চীনের জন্যে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাশিয়া এবং চীনের তৈরি করা এই কৃত্রিম সীমানাগুলিই এখন পশ্চিমারা ব্যবহার করছে অত্র অঞ্চলে তাদের প্রভাব বৃদ্ধিতে। মধ্য এশিয়ার দেশগুলির উপর রাজনৈতিক প্রভাব রাখা রাশিয়ার উপর চীনকে নির্ভর করতে হচ্ছে; যদিও মধ্য এশিয়ায় রাশিয়া এবং চীনের স্বার্থ আলাদা। পূর্ব এবং পশ্চিমের মাঝে স্থলযোগাযোগের এক সুপারহাইওয়ে মধ্য এশিয়া; যা নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে চীনের ‘বিআরআই’ চিন্তার কারণে। চীনাদের হাত দিয়েই এর শুরু হলেও ‘বিআরআই’ নামের এই ‘নতুন সিল্ক রোড’এর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাবে, তা নিয়েই এখন শুরু হয়েছে নতুন প্রতিযোগিতা। কিরিগিজস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতা এই ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতারই ফলাফল।



সূত্রঃ 


‘Who is Kyrgyzstan’s new prime minister, Sadyr Japarov?’, Al Jazeera, 15 October 2020
‘Rayimbek Matraimov: Do protests threaten Kyrgyzstan’s kingmaker?’, Al Jazeera, 13 October 2020
‘Seizure of Kyrgyzstan nears completion as president steps down’, Eurasianet, 15 October 2020
‘Fergana Climate (Uzbekistan)’ in Climate Data (https://en.climate-data.org/asia/uzbekistan/fergana-province/fergana-2780/)
‘Bangladesh Average Precipitation’ in Trading Economics (https://tradingeconomics.com/bangladesh/precipitation)
‘Kyrgyz Republic President, ADB Country Director Inspect Toktogul Hydropower Plant’, ADB News Release, 18 October 2019
‘Kyrgyzstan to hold talks on Kambarata HPP in Tashkent’ in Azer News, 21 February 2019
‘Kyrgyzstan Energy Profile: Country Report April 2020’, International Energy Agency
‘Central Asia: The Complexities Of The Fergana Valley’ by Stratfor in Forbes, 10 October 2013
‘Afghan Leader Inaugurates Construction of Key Regional Energy Project’, VOA News, 06 February 2020
‘Kyrgyz Lawmakers OK Bill On Amendments To Russian Military Base Agreement’, Radio Free Europe Radio Liberty, 12 June 2020
‘"Mission accomplished" for U.S. air base in pro-Moscow Kyrgyzstan’, Reuters, 06 March 2014
‘U.S. vacates base in Central Asia as Russia's clout rises’, Reuters, 03 June 2014
‘Kyrgyzstan Reveals More Russian Military Facilities’ by John C.K. Daly in Jamestown Foundation, Eurasia Daily Monitor Volume: 5 Issue 59, 28 March 2008
‘Personal remittances, received (% of GDP) - Kyrgyz Republic’, The World Bank (https://data.worldbank.org/indicator/BX.TRF.PWKR.DT.GD.ZS?locations=KG)
‘The World Bank in the Kyrgyz Republic’, The World Bank (https://www.worldbank.org/en/country/kyrgyzrepublic/overview)
‘Personal remittances, received (current US$) - Kyrgyz Republic’, The World Bank (https://data.worldbank.org/indicator/BX.TRF.PWKR.CD.DT?locations=KG)
U.S. Embassy & Consulate in Kazakhstan – History (https://kz.usembassy.gov/embassy-consulates/almaty/history/)
‘Kumtor Hostory’ (https://www.kumtor.kg/en/deposit/history/)
‘Mountain of gold’, Reuters, 03 October 2013
‘Conflict continues at Kyrgyzstan’s massive gold mine’, Al Jazeera, 19 February 2016
‘Kyrgyzstan halts work at Chinese gold mine after clashes’, Reuters, 07 August 2019
‘China-led $280 million Kyrgyzstan project abandoned after protests’, Reuters, 18 February 2020

Monday, 31 August 2020

কাশ্মির থেকে উইঘুর... মুসলিমরা জাতীয়তাবাদী রাজনীতির শিকার

৩১শে অগাস্ট ২০২০

 

চীনা সরকারি মিডিয়ায় প্রকাশিত উইঘুরের ডিটেনশন ক্যাম্প।জাতিসংঘের হিসেবে উইঘুরে ১০ লক্ষ মুসলিমকে চীন সরকার আটকে রেখে ‘নতুন করে শিক্ষা’ দিচ্ছে। শুধু কাশ্মির, আসাম বা উইঘুরই নয়; এর সাথে রয়েছে ফিলিস্তিন, সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, ইয়েমেন, লিবিয়া, আরাকান এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলিমদের উপর নির্যাতনের অগুণিত প্রতিবেদন। প্রতিটা ক্ষেত্রেই জাতিরাষ্ট্রগুলি তার নিজস্ব জাতিস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছে। করোনাভাইরাসের মহামারি এবং বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার মাঝে পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত ক্ষয়িষ্ণু বিশ্বব্যবস্থার অন্যতম স্তম্ভ ‘মানবাধিকার’ এখন হাস্যকর এক শব্দে পরিণত হয়েছে। অন্ততঃ মুসলিম বিশ্বের মাঝে জাতীয়তাবাদ প্রসূত স্বার্থের রাজনীতি যে বিভাজন ও অন্যায়ের জন্ম দিচ্ছে, তা মুসলিমদেরকে বিকল্প বিশ্বব্যবস্থা খুঁজতে বেশি অনুপ্রাণিত করবে।

গত ৩১শে জুলাই যুক্তরাষ্ট্র বৃহৎ চীনা কোম্পানি ‘শিনজিয়াং প্রোডাকশন এন্ড কন্সট্রাকশন কর্পোরেশন’ এবং এর দুইজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা প্রাক্তন পার্টি সেক্রেটারি সুন জিলং এবং ডেপুটি সেক্রেটারি পেং জিয়ারুইএর উপর চীনের পশ্চিমের উইঘুর অঞ্চলে মুসলিমদের উপর নির্যাতনের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে অবরোধ আরোপ করে। ‘ভয়েস অব আমেরিকা’ এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলছে যে, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র এই কোম্পানি এবং ব্যাক্তিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা ছাড়াও ব্যাক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেবে এবং মার্কিনীদের এদের সাথে ব্যবসা করার উপর নিষেধাজ্ঞা দেবে। এর আগে গত ১৭ই জুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উইঘুর মুসলিমদের উপর নির্যাতনের কারণ দেখিয়ে তৈরি করা নতুন মার্কিন আইনে স্বাক্ষর করেন। গত ডিসেম্বরে এই আইন মার্কিন কংগ্রেসে প্রায় সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়; যেখানে বিপক্ষে পড়েছিল মাত্র এক ভোট। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল চীনকে মানবাধিকার বিষয়ে একটা বার্তা দেয়া। এই আইনের অধীনে চীনের উইঘুর বা শিনজিয়াং রাজ্যের কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি চেন কুয়াংগুয়োর উপর অবরোধের কথা বলা হয়েছে এবং মার্কিন কোম্পানিগুলিকে উইঘুরের জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি যে কোন পণ্য বর্জন করতে বলা হয়েছে। জাতিসংঘের হিসেবে উইঘুরে ১০ লক্ষ মুসলিমকে চীন সরকার আটকে রেখে ‘নতুন করে শিক্ষা’ দিচ্ছে। মার্কিন নেতৃবৃন্দ বলছেন যে, চীনারা উইঘুরের মুসলিমদের সংস্কৃতি এবং বিশ্বাসকে মুছে ফেলতে চাইছে। অপরদিকে চীনারা বলছে যে, এই ক্যাম্পগুলিতে বিভিন্ন বিষয়ে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে এবং এটা উগ্রবাদী চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণের জন্যে দরকার রয়েছে। চীনারা মার্কিন কংগ্রেসে পাস করা আইনের কড়া সমালোচনা করে বলে যে, এর মাধ্যমে চীনকে খারাপ প্রমাণ করার ষড়যন্ত্র চলছে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে তার ভুল শুধরে নিতে বলা হয়। চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার ব্যাপারেও হুঁশিয়ার করে দেয়া হয়। এতে আরও বলা হয় যে, যুক্তরাষ্ট্র এর থেকে বিরত না হলে চীন এর বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেবে এবং যুক্তরাষ্ট্র এই দ্বন্দ্বের জন্যে পুরোপুরি দায়ী থাকবে। উইঘুর মুসলিমদের সংগঠন ‘ওয়ার্ল্ড উইঘুর কংগ্রেস’ ট্রাম্পকে ধন্যবাদ দিয়ে বলে যে, এটা উইঘুরের জনগণকে আশা দেবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, উইঘুরের মুসলিমদের রক্ষায় তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে? এতে কার স্বার্থই বা কি?

‘বিজনেস ইনসাইডার’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, শুধু উইঘুরই সমস্যা নয়। ভারত তার অধিকৃত কাশ্মির অঞ্চলের বিশেষ অধিকার বাতিল করেছে এবং তার পূর্বের আসাম রাজ্যে বাঙ্গালী মুসলিমদের আটক করার ব্যবস্থা করছে। চীন এবং ভারত উভয়েই বলছে যে, এই ব্যবস্থাগুলি তারা নিচ্ছে সহিংসতা বন্ধ করতে; এবং একইসাথে অন্যান্য দেশগুলিকে তারা এব্যাপারে নাক না গলাতে হুঁশিয়ার করে দিচ্ছে। প্রতিবেদনে বিশেষভাবে বলা হচ্ছে যে, উভয় দেশই মূলতঃ মুসলিমদেরকে টার্গেট করেছে ‘সহিংসতা বন্ধের’ কথা বলে। আর বাকি বিশ্ব এই দুই দেশের বিরুদ্ধে প্রকৃতপক্ষে কোন ব্যবস্থাই নেয়নি। হয় চীনের সাথে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক ধরে রাখতে বা চীনের হুমকির ভয়ে একটা মুসলিম দেশও চীনের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নও চীনকে শুধরে নিতে বলেছে, কিন্তু চীনকে বাধ্য করতে কোন পদক্ষেপই নেয়নি। উইনিভার্সিটি অব কলোরাডোর গবেষক ড্যারেন বায়লার বলছেন যে, অনেককেই চীনের বিরুদ্ধে অনেক কথা বলতে শোনা যাচ্ছে; কিন্তু যখন এর ফলশ্রুতিতে মানবসম্পদ বা অর্থসম্পদহানির কোন সম্ভাবনা দেখা দেয়, তখনই তারা নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে। তারা একইসাথে মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলির নেতৃবৃন্দের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলছে যে, মুসলিম দেশগুলিই তো কিছু করছে না, তাহলে তাদের উপর কেন দায় থাকবে? তারা নিজেদের অবস্থানের সমর্থনে বলছেন যে, অন্ততঃপক্ষে এর বিরুদ্ধে কিছু কথা তো তারা বলছেন।
    

ভারতীয় বাহিনীর পেলেট গানের শিকার কাশ্মিরের জনগণ। মুসলিম হওয়াটাই যেন ছিল তাদের অপরাধ। উইঘুরের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র পদক্ষেপ নিলেও কাশ্মির এবং আসামের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি চুপ থেকেছে। অন্যদিকে কাশ্মির ইস্যুতে সবচাইতে সরব রয়েছে পাকিস্তান; আর ঠিক একইভাবে উইঘুর ইস্যুতে একইরূপ নিস্তব্ধ রয়েছে তারা। পরিষ্কারভাবেই বোঝা যাচ্ছে যে, বিভিন্ন রাষ্ট্রের ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় স্বার্থ এক্ষেত্রে কাশ্মির, উইঘুর এবং আসামের মুসলিমদের উপর নির্যাতন চলমান থাকার পিছনে বড় রকমের ইন্ধন যুগিয়েছে।
 

উইঘুরের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র পদক্ষেপ নিলেও কাশ্মির এবং আসামের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি চুপ থেকেছে। গত অক্টোবরের মার্কিন কংগ্রেসের ‘হাউজ এশিয়া’ সাবকমিটির মানবাধিকার বিষয়ক শুনানিতে এবং এর পরবর্তীতে ‘ইউএস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম’ রিপোর্টে ভারতের মুসলিমদের উপর নাগরিকত্বের শর্ত দিয়ে মানবাধিকার ভূলুন্ঠিত করার কথা এসেছিল। কাশ্মির ইস্যুতে সবচাইতে সরব রয়েছে পাকিস্তান; আর ঠিক একইভাবে উইঘুর ইস্যুতে একইরূপ নিস্তব্ধ রয়েছে তারা। এবছরের জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ‘ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরাম’এর এক আলোচনায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান প্রথমে বলেন যে, তিনি উইঘুরে চীনা সরকারের কর্মকান্ডের ব্যাপারে পুরোপুরি অবগত নন। পরে সাংবাদিকদের চাপের মুখে সরাসরিই বলেন যে, পাকিস্তানের সবচাইতে খারাপ সময়ে চীন পাকিস্তানকে সহায়তায় এগিয়ে এসেছে; তাই তারা চীনা সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ। কাশ্মির ইস্যুতে পাকিস্তানী মিডিয়া যতটা সরব, ততটাই সরব দেখা যাচ্ছে ভারতীয় মিডিয়াকে উইঘুর ইস্যুতে। বিশেষ করে লাদাখ সীমান্তে চীনের সাথে সংঘর্ষ শুরুর পর থেকেই ভারতীয় মিডিয়া উইঘুর ইস্যুতে পাকিস্তানের সমালোচনায় মুখর রয়েছে। পরিষ্কারভাবেই বোঝা যাচ্ছে যে, বিভিন্ন রাষ্ট্রের ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় স্বার্থ এক্ষেত্রে কাশ্মির, উইঘুর এবং আসামের মুসলিমদের উপর নির্যাতন চলমান থাকার পিছনে বড় রকমের ইন্ধন যুগিয়েছে।

ব্রিটেনের ‘ইন্ডেপেন্ডেন্ট’ পত্রিকার প্রবীন কলামিস্ট প্যাট্রিক ককবার্ন বলছেন যে, দুনিয়াব্যাপী জাতীয়তাবাদের এক উত্থান দেখা যাচ্ছে। তিনি বলছেন যে, তুরস্ক তার তুর্কি জাতীয়তাবাদের সাথে ইসলামকে ব্যবহার করে তার প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে; অন্যদিকে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি হিন্দুত্ববাদী চিন্তার উপর ভর করে ভারতের পরিচয় পূননির্ধারণ করতে চাইছে। চীনারাও তাদের হান ভিত্তিক চৈনিক জাতীয়তাবাদকে রাষ্ট্রীয় শক্তির ভিত্তি হিসেবে দেখতে চাইছে। এই জাতীয়তাবাদী চিন্তার ফলে একেকটা দেশের অভ্যন্তরে জাতি এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর বয়ে আসছে অমানুষিক অত্যাচার। অধিকৃত কাশ্মির ছাড়াও ভারতের প্রায় ২০ কোটি মুসলিম সংখ্যালঘুদের উপর যেমন অত্যাচার হচ্ছে, তেমনি চীনের পশ্চিমাঞ্চলের উইঘুর রাজ্যেও কয়েক বছর ধরেই মুসলিমদের উপর চলছে ‘শুদ্ধাভিযান’। তুরস্কের অভ্যন্তরে কুর্দিদেরকে আলাদাভাবে দেখা হচ্ছে তুরস্কের ভৌগোলিক অখন্ডতার প্রতি চ্যালেঞ্জ হিসেবে। ককবার্নের কথাগুলিকে সাম্প্রতিক বিশ্ব মিডিয়ার খবরের সাথে সমন্বয় করলে দেখা যায় যে, প্রতি ক্ষেত্রেই বাইরের দেশগুলি সেই দেশের অভ্যন্তরের সংখ্যালঘুদেরকে সমর্থন দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে চাইছে। কারণ ককবার্ন মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, এই সংখ্যালঘুরা কতটুকু শক্তিশালী, তা নির্ভর করছে বিশ্বব্যাপী তারা কতটা রাজনৈতিক সমর্থন আদায় করতে পারে সেটার উপর। সেই হিসেবেই কাশ্মিরের মুসলিমদের পক্ষে দাঁড়িয়েছে পাকিস্তান; কুর্দিদের আলাদা রাষ্ট্র গড়ার পিছনে মদদ যোগাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র; আর গত এক বছরের মাঝে উইঘুর মুসলিমদের পক্ষে কথা বলে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলি ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে চীনকে চাপের মুখে রাখতে চাইছে।
    

উইঘুরের সন্দেহভাজন ক্যাম্পগুলির মানচিত্র। অনেককেই চীনের বিরুদ্ধে অনেক কথা বলতে শোনা যাচ্ছে; কিন্তু যখন এর ফলশ্রুতিতে মানবসম্পদ বা অর্থসম্পদহানির কোন সম্ভাবনা দেখা দেয়, তখনই তারা নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে। তারা একইসাথে মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলির নেতৃবৃন্দের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলছে যে, মুসলিম দেশগুলিই তো কিছু করছে না, তাহলে তাদের উপর কেন দায় থাকবে? তারা নিজেদের অবস্থানের সমর্থনে বলছেন যে, অন্ততঃপক্ষে এর বিরুদ্ধে কিছু কথা তো তারা বলছেন।

 

তবে ককবার্ন এক্ষেত্রে বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছেন উইঘুর এবং কাশ্মির ইস্যুতে। কাশ্মিরের জনগণের উপর ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর লকডাউন এবং বিচারবহির্ভূত অত্যাচার ভাইরাসের লকডাউনের চাইতেও বহুগুণে বেশি ক্ষতি করেছে। তবে কাশ্মির ছাড়াও ভারতের প্রায় ২০ কোটি মুসলিমের প্রতি বিজেপি সরকারের শত্রুভাবাপন্ন আচরণ এড়ানো যাবে না। রাম মন্দিরের ভিত্তি স্থাপন করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সেধরণের মনোভাবই দেখিয়েছেন। ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে ফেলার পর ফলাফলস্বরূপ দাঙ্গায় প্রায় ২ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। মোদি সরকার মনে করছে যে, তারা কাশ্মির সমস্যার ‘সমাধান’ করে ফেলবেন। তারা ভারতের বাকি মুসলিমদের ‘সমস্যা’ও সমাধান করে ফেলবেন বলে বলছেন। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারিতে দিল্লীর দাঙ্গাই দেখিয়ে দেয় যে, ২০ কোটি মানুষের সংখ্যালঘু জনসংখ্যাকে এতো হাল্কাভাবে নিলে মারাত্মক ভুল হবে। ভারতের চিন্তাবিদদের চিন্তার দৈন্যতা বোঝাতে ককবার্ন এক্ষেত্রে বৈরুতের কর্মকর্তাদের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, যারা বছরের পর বছর নিশ্চিন্তে বিশাল বোমার উপর বসে ছিলেন। ভারতের সরকারকে পশ্চিমারা নিঃশর্ত সমর্থন দিচ্ছে; কারণ তারা মনে করছে যে, ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় ভারত চীনকে নিয়ন্ত্রণের একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। একই সুত্রে তারা উইঘুর ইস্যুতে মুসলিমদের পক্ষাবলম্বন করছে নিজেদের স্বার্থে।

ঊইঘুর ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান মুসলিমদের ব্যাপারে ট্রাম্পের দীর্ঘমেয়াদী চিন্তার পুরোপুরি বিরুদ্ধে। ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’এর এক প্রতিবেদনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইসলাম এবং মুসলিমবিদ্বেষী মন্তব্যের একটা তালিকা দেয়া হয়। এতে ২০১১ সাল থেকে ট্রাম্পের মুসলিমবিদ্বষী মনোভাবের প্রকাশ পায়। ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে বলেন যে, মুসলিমরা যুক্তরাষ্ট্রকে পছন্দ করে না। আবার বিভিন্ন সময়ে এ-ও বলেন যে, মুসলিমরা যুক্তরাষ্ট্রে টাইম বোমার মতো; এবং তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মসজিদগুলিকে বন্ধ করে দেবার পক্ষেও যুক্তি দেন।

শুধু কাশ্মির, আসাম বা উইঘুরই নয়; এর সাথে রয়েছে ফিলিস্তিন, সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, ইয়েমেন, লিবিয়া, আরাকান এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলিমদের উপর নির্যাতনের অগুণিত প্রতিবেদন। প্রতিটা ক্ষেত্রেই জাতিরাষ্ট্রগুলি তার নিজস্ব জাতিস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছে। রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ফায়দা লুঠতে একে অপরের দুর্বলতা ব্যবহার করতে চেয়েছে; মুসলিমদের বাঁচাবার উদ্দেশ্যে নয়। নিজের ভৌগোলিক অখন্ডতা অটুট রাখতে প্রতিটা জাতিরাষ্ট্র আবার চেয়েছে জাতীয় পরিচয় নির্ধারণ করতে। আর সেক্ষেত্রে জাতিগত এবং বিশ্বাসগত দিক থেকে সংখ্যালঘুরা হয়েছে অমানবিক নির্যাতনের শিকার। জাতীয়তাবাদের নামে চলেছে ‘শুদ্ধিকরণ’, যা উইঘুরই হোক, বা আসামই হোক। অভিভাবকহীন সন্তানের মতো কাশ্মির, আসাম, উইঘুর, আরাকান, ফিলিস্তিনের মুসলিমরা দ্বারে দ্বারে ঘুরছে রাজনৈতিক সমর্থনের জন্যে। প্রত্যেকেই তাদের এই অসহায়ত্বকে ব্যবহার করেছে নিজেদের জাতীয় স্বার্থে। করোনাভাইরাসের মহামারি এবং বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার মাঝে পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত ক্ষয়িষ্ণু বিশ্বব্যবস্থার অন্যতম স্তম্ভ ‘মানবাধিকার’ এখন হাস্যকর এক শব্দে পরিণত হয়েছে। অন্ততঃ মুসলিম বিশ্বের মাঝে জাতীয়তাবাদ প্রসূত স্বার্থের রাজনীতি যে বিভাজন ও অন্যায়ের জন্ম দিচ্ছে, তা মুসলিমদেরকে বিকল্প বিশ্বব্যবস্থা খুঁজতে বেশি অনুপ্রাণিত করবে।

Wednesday, 3 June 2020

চীন ও ভারতের সীমান্ত উত্তেজনার ভবিষ্যৎ কি?


৪ঠা জুন ২০২০

ভারতীয় কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ২৬শে মে ‘রয়টার্স’ বলছে যে, হিমালয়ের পাদদেশে বিমানবন্দর এবং রাস্তা নির্মাণকে কেন্দ্র করে ভারত এবং চীনের মাঝে উত্তেজনা শুরু হয়েছে। লাদাখ এলাকার গালওয়ান উপত্যকায় উভয় পক্ষ সামরিক ক্যাম্প স্থাপনের মাধ্যমে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে; আর একে অপরকে এই উত্তেজনার ব্যাপারে দোষারোপ করছে। ভারতীয় কর্মকর্তারা বলছেন যে, চীনাদের প্রান্তে ৮০ থেকে ১০০টা তাঁবু গড়ে তোলা হয়েছে। উভয় পক্ষই নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যুহ গড়ে তুলছে। চীনারা ট্রাকে করে সরঞ্জাম নিয়ে আসছে সেখানে। ভারতের লাদাখের অপর প্রান্তে চীনাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে আকসাই চিন অঞ্চল, যা ভারত নিজের বলে দাবি করে।

১৯৬২ সালে চীনের সাথে যুদ্ধে ভারত বেশ বড় আকারের পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। এরপর ১৯৮৮ সালে ভারতের উত্তরপূর্বের অরুনাচল প্রদেশে দুই দেশের মাঝে আরেক দফা সংঘাতের পর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী চীনা নেতা দেং জিয়াওপিংএর সাথে আলোচনা বসেন। ১৯৯৩, ১৯৯৬ এবং ২০০৫ সালে কয়েক দফা বৈঠকের পর দুই দেশ সীমানা ঠান্ডা রাখতে সম্মত হয়েছিল। এর ফলশ্রুতিতে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দুই দেশের মাঝে সীমান্তে কোন সংঘাত হয়নি। তবে ২০১৭ সালে দোকলাম সীমান্তে উত্তেজনা বৃদ্ধির মাঝ দিয়ে এই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সমাপ্তি হয়। আর এবারের উত্তেজনার শুরু হয় ৫ই মে, যখন দুই পক্ষের প্রায় শ’খানেক সেনা হাতাহাতি সংঘাতে লিপ্ত হয়। তবে কোন আগ্নেয়াস্ত্র কোন পক্ষই ব্যবহার করেনি।

চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হচ্ছে যে, চীন তার নিজস্ব অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ; তবে ভারতের সাথে সীমানায় তারা শান্তি ও শৃংখলা বজায় রাখতেও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। বিবৃতিতে আরও বলা হয় যে, বর্তমানে দুই দেশের সীমানা স্থিতিশীল এবং নিয়ন্ত্রণের মাঝেই রয়েছে। উভয় পক্ষই আলোচনায় মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সক্ষম। ভারতের প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব নিরুপমা রাও বলছেন যে, সীমানার কাছাকাছি ভারতের অবকাঠামো উন্নয়নের পর থেকেই চীনারা সেটাকে হুমকি হিসেবে দেখা শুরু করেছে। শি জিনপিংএর চীন তার নিজস্ব ভূমির নিরাপত্তা নিশ্চিতে যেমন কঠোর অবস্থানে রয়েছে, তেমনি ভারতও সেব্যাপারে ছাড় দিতে নারাজ।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার ২০২২ সালের মাঝে চীনের সীমানার কাছাকাছি অনেকগুলি রাস্তা তৈরির প্রকল্প গ্রহণ করেছে। লাদাখে ভারতের সামরিক রাস্তা তৈরির ইতিহাসটা বর্তমান প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ।

মার্কিন নির্মিত ‘সি-১৩০জে’ পরিবহণ বিমান চীনের সীমানার কাছাকাছি লাদাখের ‘দৌলত বেগ ওল্ডি’ নামের বিমানবন্দরে অবতরণ করছে। এই বিমানবন্দর পর্যন্ত রাস্তা তৈরির ফলেই চীনারা ধারণা করা শুরু করে যে, ভারতীয়রা হয়তোবা চীনা নিয়ন্ত্রণে থাকা আকসাই চিন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেবার পরিকল্পনা করছে।


পাঁচ কিঃমিঃ উচ্চতায় বিমানবন্দর

২০১৩ সালের অগাস্টে ভারতীয় মিডিয়ায় ঘোষণা দেয়া হয় যে, ভারতীয় বিমান বাহিনী তাদের মার্কিন নির্মিত ‘সি-১৩০জে’ পরিবহণ বিমান চীনের সীমানার কাছাকাছি লাদাখের ‘দৌলত বেগ ওল্ডি’ নামের বিমানবন্দরে অবতরণ করিয়েছে। সমুদ্র সমতল থেকে ১৬ হাজার ৬’শ ফুট বা ৫ কিঃমিঃএর বেশি উচ্চতায় অবস্থিত এই বিমাববন্দরকে পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিমানবন্দর বলেও দাবি করা হয়। পুরো লাদাখের গড় উচ্চতা ৩ কিঃমিঃ থেকে সাড়ে ৪ কিঃমিঃএর মতো। ষোড়শ শতকে সুলতান সৈয়দ খান লাদাখ অপারেশনে সময় এখানে মৃত্যুবরণ করেন; সেই থেকে এই জায়গার নাম ‘দৌলত বেগ ওল্ডি’। এর ২০ কিঃমিঃ উত্তরেই রয়েছে প্রায় ১৯ হাজার ফুট উচ্চতার কারাকোরাম গিরিপথ, যা লাদাখের সাথে চীনের শিনজিয়াং বা উইঘুর প্রদেশের যোগাযোগের পথ। ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত এই পথে উইঘুরের কাশগড়ের সাথে হোশিয়ারপুরের পাঞ্জাবি বণিকরা বাণিজ্য করতো। ব্রিটিশ সামরিক অফিসাররা একসময় মনে করতেন যে, কারাকোরাম গিরিপথের মাধ্যমে রুশ সামরিক হামলা হবার সম্ভাবনা রয়েছে। এই ভীতি বাস্তবতা পায়নি। পরে অবশ্য ভারত এবং চীন কারাকোরাম গিরিপথকে কোন দ্বন্দ্ব ছাড়াই নিজেদের সীমানা হিসেবে মেনে নেয়। এর পূর্বে চীন নিয়ন্ত্রিত আকসাই চিন, আর পশ্চিমে রয়েছে সিয়াচেন হিমবাহ। ভারতীয় মিডিয়া ‘ফার্স্ট পোস্ট’ বলছে যে, ঐ বছর এপ্রিল মে মাসে সেই এলাকায় উত্তেজনার পর এই বিমান অবতরণের অপারেশন চালানো হয়। ১৯৬২ সালের চীন ভারত যুদ্ধের সময় ‘দৌলত বেগ ওল্ডি’র সামরিক স্থাপনা তৈরি করা হয়েছিল। ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত সেখানে মার্কিন নির্মিত ‘সি-৮২ প্যাকেট’ পরিবহণ বিমান অবতরণ করতো সৈন্যদের রসদপাতি আনানেয়ার কাজে। একটা ভূমিকম্পের পর সেই বিমানবন্দরের মাটি দুর্বল হয়ে পড়ার পর থেকে সেখানে বিমান অবতরণ বন্ধ করে দেয়া হয়। টানা ৪৩ বছর এই বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত থাকার পর ২০০৮ সালের মে মাসে ভারতীয় বিমান বাহিনীর রুশ নির্মিত ‘এন-৩২’ পরিবহণ বিমান সেখানে অবতরণ করে। অত উচ্চতায় পণ্য পরিবহণ সক্ষমতা বৃদ্ধিতেই ২০১৩ সাল থেকে ‘সি-১৩০’ বিমান ব্যবহার করা শুরু হয়।

তবে ঘটনা পরিবর্তিত হয়ে যায় ২০১৯ সালে। এবছরের এপ্রিল মাসে ভারতীয়রা লাদাখের লেহ থেকে উত্তরে ‘দৌলত বেগ ওল্ডি’ পর্যন্ত আড়াইশ’ কিঃমিঃ লম্বা রাস্তা তৈরির কাজ শেষ করে। ভারতীয় পত্রিকা ‘দ্যা ট্রিবিউন’ বলছে যে, কৌশলগতভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ এই রাস্তা সারা বছর চালু থাকবে। এই পথে মোট ৩৭টা সেতু তৈরি করা হয়েছে। দারবুক থেকে দৌলত বেগ ওল্ডি পর্যন্ত রাস্তার কোন অংশই ১৪ হাজার ফুট উচ্চতার নিচে নয়। এই পুরো পথের কোথাও বেসামরিক নাগরিকদের বসবাসের অনুমতি নেই। ২০০০ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত এই রাস্তা তৈরির প্রথম চেষ্টাটা করা হয়। কিন্তু শায়ক নদীর পানির তোড়ে রাস্তা ভেসে গেলে ২০১৪ সাল থেকে নতুনভাবে প্রায় ১’শ ৬০ কিঃমিঃ রাস্তা তৈরির পরকল্পনা হাতে নেয়া হয়। এই কাজ শেষ হয় ২০১৯ সালে। এই রাস্তা তৈরির ফলেই চীনারা ধারণা করা শুরু করে যে, ভারতীয়রা হয়তোবা চীনা নিয়ন্ত্রণে থাকা আকসাই চিন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেবার পরিকল্পনা করছে।

সাম্প্রতিক সময়ে লাদাখে বিমানবন্দরের উন্নয়ন, রাস্তা তৈরি, নতুন ধরণের অস্ত্র ক্রয় এবং সেনা পরিবহণের জন্যে নতুন পরিবহণ বিমান ক্রয়, ইত্যাদি পদক্ষেপের মাধ্যমে চীন সীমান্তে ভারতীয় সেনাবাহিনী সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে। এই সক্ষমতা বৃদ্ধির পিছনে ইন্ধন যুগিয়েছে ভারতীয় চিন্তাবিদদের নিরাপত্তাহীনতার চিন্তা। ভারতীয় পত্রিকা ‘দ্যা প্রিন্ট’ বলছে যে, ১৯৯৯ সালে ভারতের ‘ক্যাবিনেট কমিটি অন সিকিউরিটি’ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘বর্ডার রোডস অর্গানাইজেশন’কে ২০০৩ সালের মাঝে চীন সীমান্তে রাস্তা তৈরির প্রকল্প বাস্তবায়ন করার কাজ দেয়। এই প্রকল্পের সময় ২০১২ সাল পর্যন্ত বৃদ্ধি করলেও তা শেষ করতে ২০১৯ হয়ে যায়। এই প্রকল্পের অধীনে চীনের সীমানার কাছাকাছি ৩ হাজার ৩’শ ৪৬ কিঃমিঃ লম্বা ৬১টা রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। এর মাঝে ১ হাজার ২’শ ৬০ কিঃমিঃ লম্বা ৩৫টা রাস্তার কাজ শেষ হয়েছে। ২ হাজার ৩৫ কিঃমিঃএর ২০টা রাস্তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। আর বাকি ৫১ কিঃমিঃএর ৫টা রাস্তার কাজ এখনও চলছে। ভারতীয় কর্মকর্তারা মনে করছেন যে, এই রাস্তা তৈরির ফলে দুর্গম সীমান্ত অঞ্চলে সরকারের যোগাযোগ সহজীকরণ এবং প্যাট্রল বৃদ্ধি করার লক্ষ্য বাস্তবায়িত হবে। ভারতীয় কর্মকর্তারা বলছেন যে, ১৯৯৭ সালে চীনারা তাদের সীমান্ত এলাকায় রাস্তা তৈরির কাজ আরম্ভ করার পর ভারতীয়রা ‘চায়না স্টাডি গ্রুপ’ তৈরি করে; যা গবেষণা করে ৭৩টা পয়েন্টে রাস্তা নির্মাণ করার উপদেশ দেয়।

ভারতীয় বিমান বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এপাচি হেলিকপ্টার বুঝে নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা পরিবহণ বিমান, হেলিকপ্টার ও কামান সীমান্ত অঞ্চলে ভারতের যুদ্ধ করার সক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি করেছে ঠিকই, তবে সেটা চীনের সাথে সম্ভাব্য সংঘাতে বিজয়ের জন্যে যথেষ্ট কিনা, সেব্যাপারে প্রশ্ন করছেন অনেকেই।


লাদাখে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সক্ষমতা কতটুকু? 

লাদাখের নিরাপত্তায় রয়েছে ভারতীয় সেনাবাহিনীর চতুর্দশ কোর, যা ১৯৯৯ সালে কারগিল যুদ্ধের সময় গঠিত হয়। তবে এখানকার ইউনিটগুলি ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলের নাগাল্যান্ড থেকে নিয়ে আসা ইউনিট থেকেই ডেভেলপ করা হয়েছিল। নাগাল্যান্ডের পাহাড়ি এলাকায় বিদ্রোহী দমনে নিয়োজিত ইউনিটের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েই ১৯৬২ সাল থেকে এর অধীন ৩য় পদাতিক ডিভিশন তৈরি করা হয়। ১৯৯০ সালের পর নাগাল্যান্ড থেকে বিদ্রোহী দমনে নিয়োজিত ৮ম পদাতিক ডিভিশনকে লাদাখে নিয়ে আসা হয়। এরপর থেকে এই ইউনিট নাগাল্যান্ডে আর ফেরত যায়নি। ২০১৯এর সেপ্টেম্বরে লাদাখের দক্ষিণপূর্ব প্রান্তে চীনা সীমানার কাছাকাছি চুশুল অঞ্চলের অত্যন্ত উঁচু এলাকায় ভারত বড় আকারের একটা সামরিক মহড়ার আয়োজন করে। ‘চাংথাং প্রাহার’ নামের এই মহড়ায় ভারতের ট্যাঙ্ক, আর্টিলারি, হেলিকপ্টার, ড্রোন, এবং বিমান বাহিনীর বিমান অংশ নেয়। বিমান থেকে প্যারাশুট দিয়ে সেনা অবতরণও করা হয়। ভারতীয় সেনাবাহিনীর নর্দার্ন কমান্ডের কমান্ডার লেঃ জেনারেল রনবীর সিং মহড়ার সময় বলেন যে, যুদ্ধ করতে বাধ্য হলে নর্দার্ন কমান্ড তার শ্রেষ্ঠ সক্ষমতা প্রদর্শন করবে। নতুন প্রযুক্তির অস্ত্র ব্যবহারের সাথেসাথে এই সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু কাশ্মির এবং লাদাখের নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে ভারতীয় সেনবাহিনীর নর্দার্ন কমান্ড। এর অধীনেই রয়েছে লাদাখের চতুর্দশ কোর, শ্রীনগরের পঞ্চদশ কোর এবং নাগ্রতার ষোড়শ কোর। সেনাবাহিনীর এই ইউনিটগুলি অতি উঁচু ভূমিতে যুদ্ধ করতে সক্ষম। ভারতের ইস্টার্ন কমান্ডের অধীনে থাকা ৯টা মাউন্টেন ডিভিশনই উঁচু স্থানে যুদ্ধ করতে অভ্যস্ত। তাই লাদাখ বা কাশ্মিরে উত্তেজনার উপর ভিত্তি করে অনেক সময়েই ইস্টার্ন কমান্ড থেকে সেনা এনে নর্দার্ন কমান্ডে মোতায়েন করা হয়েছে। তবে ইস্টার্ন কমান্ডের ইউনিটগুলির একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো চীনের উপর খেয়াল রাখা। চীনা সীমানা ঠান্ডা থাকলেই কেবল ইস্টার্ন কমান্ডের ইউনিট নর্দার্ন কমান্ডে মোতায়েন করা সম্ভব। চীনের সাথে ভারতের সম্ভাব্য উত্তেজনার মাঝে সেটা কতটুকু সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে।

সেনাবাহিনী ছাড়াও ভারতীয় বিমান বাহিনীর রসদ পরিবহণ সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে বিমান বাহিনীর ওয়েস্টার্ন কমান্ডের একটা মহড়া অনুষ্ঠিত হয়, যার মাঝে লাদাখ থেকে ৪’শ কিঃমিঃ দূরের চন্ডিগড় বিমান ঘাঁটি থেকে ৬ ঘন্টায় ৪’শ ৬৩ টন রসদ লাদাখে প্রেরণ করা হয়। বিমান বাহিনীর মোট ১৬টা পরিবহণ বিমান এতে ব্যবহৃত হয়, যার মাঝে ছিল মার্কিন নির্মিত ‘সি-১৭ গ্লোবমাস্টার’ এবং রুশ নির্মিত ‘ইলিউশিন-৭৬’ ও ‘এন্টোনভ-৩২’। ‘ফিনানশিয়াল এক্সপ্রেস’ বলছে যে, সাধারণ সময়ে ওয়েস্টার্ন এয়ার কমান্ড মাসে ৩ হাজার টনের মতো রসদ পরিবহণ করে থাকে। এয়ার ভাইস মার্শাল ধিলন বলছেন যে, লাদাখে স্বল্প সময়ের যুদ্ধাবস্থার মাঝে লজিস্টিক সাপোর্ট দেয়ার সক্ষমতার প্রমাণ রেখেছে ভারতীয় বিমান বাহিনী। 

২০১১ সালের জুনে ভারতীয় বিমান বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ১০টা ‘সি-১৭ গ্লোবমাস্টার’ পরিবহণ বিমান ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। বিমানের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং এই বিমানের উৎপাদন শেষ করে দেবার সময় ভারত আরও ৩টা বিমান কিনতে চায়। তবে ভারতের আমতান্ত্রিক জটিলতার কারণে শেষ পর্যন্ত ২০১৯ সালের অগাস্টে ভারত তার ১১তম এবং শেষ ‘সি-১৭’এর ডেলিভারি পায়। এই বিমানটা ডেলিভারির মাধ্যমে বোয়িংএর ‘সি-১৭’ কারখানা বন্ধ করে দেয়া হয়। ১’শ ৮৮ জন সেনা বা ৭৩ টন রসদ বহণে সক্ষম এই বিমানগুলিকে ভারত কিনেছিল কৌশলগত পরিবহণের জন্যে। ‘সি-১৭’ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র থেকে ‘সি-১৩০জে সুপার হারকিউলিস’ পরিবহণ বিমান কিনেছে ভারত। ২০০৮ সালে প্রথম ৬টা ‘সি-১৩০জে’ অর্ডার করে ভারত। ২০১১ সাল থেকে এগুলির ডেলিভারি শুরু হয়। এরপর ২০১৩ সালে আরও ৬টা বিমান অর্ডার করে ভারত। এই বিমানগুলি প্রায় ১’শ সেনা বা ১৯ টন রসদ বহণ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনা বিমানগুলি ভারতীয় বাহিনীর সোভিয়েত আমলের ‘ইলিউশিন ইল-৭৬এমডি’ এবং ‘এন্টোনভ এএন-৩২’ বিমানের সাথে যুক্ত হয়েছে। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৮ সালের মাঝে ৪৮ টন রসদ বহণে সক্ষম ১৪টা ‘ইল-৭৬’ বিমান কেনে ভারত। ২০১৭ সালে ভারতের কম্পট্রোলার এন্ড অডিটর জেনারেল এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, বিমানগুলির মাঝে মাত্র ৪১ শতাংশ যেকোন সময় কর্মক্ষম থাকে। ভারতীয় বিমান বাহিনীর ১’শটার মতো পুরোনো ‘এন-৩২’ বিমান রয়েছে; যেগুলি মডার্নাইজেশনে প্রক্রিয়া চলছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনা ‘সি-১৭’ এবং ‘সি-১৩০জে’ বিমানগুলি চীনের সীমানায় ভারতীয় বিমান বাহিনীর রসদ সরবরাহ বৃদ্ধির সক্ষমতাকে বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে। বিমানগুলির সক্ষমতার অনেকটাই হিসেব করা হয়েছে চীন সীমান্তে কত দ্রুততার সাথে কত পরিমাণ রসদ মোতায়েন করা যাবে তার উপর। এই সক্ষমতার একটা পরীক্ষাই ভারতীয় বিমান বাহিনী করেছিল ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে।

শুধু পরিবহণ বিমান ক্রয়ই নয়; ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্যে উঁচু পার্বত্য অঞ্চলে ব্যবহারের উপযোগী ‘এম-৭৭৭’ হাউইটজার কামান সরবরাহ করছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৬ সালে নরেন্দ্র মোদির সরকার ব্রিটিশ কোম্পানি ‘বিএই সিস্টেমস’এর ডিজাইন করা মোট ১’শ ৪৫টা কামান ৭’শ ৩৭ মিলিয়ন ডলার খরচে কেনার অনুমোদন দেয়। প্রথম ২৫টা যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরাসরি আসলেও বাকি ১’শ ২০টা ভারতের মাহিন্দ্রা কোম্পানি এসেম্বলি করবে। ২০১৮এর নভেম্বর থেকে কামানগুলির ডেলিভারি পাওয়া শুরু করে ভারত। সাধারণ ১৫৫মিঃমিঃ হাউইটজার কামানের চাইতে প্রায় ৪০ শতাংশ কম ওজনের হবার কারণে এই কামানগুলি খুব সহজেই আকাশপথে উঁচু ভূমিতে মোতায়েন করা সম্ভব হবে, যা কিনা চীন এবং পাকিস্তানের সীমান্তে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। 
‘ডেকান হেরাল্ড’ বলছে যে, ১৯৯৯ সালে কারগিল যুদ্ধের সময় ভারতীয় বিমান বাহিনী বুঝতে পারে যে, হিমালয়ের উঁচু ভূমিতে অপারেট করার মতো কোন এটাক হেলিকপ্টার ভারতের নেই। রুশ নির্মিত ‘এমআই-৩৫’ হেলিকপ্টারগুলি ৫ কিঃমিঃ উচ্চতা পর্যন্ত যেতে পারে না। অথচ কাশ্মির এবং লাদাখ সীমানায় অনেক স্থানের উচ্চতাই ৪ থেকে ৫ কিঃমিঃ বা তারও বেশি। এই অক্ষমতা কাটিয়ে উঠতে ভারত ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার খরচে ২২টা ‘এএইচ-৬৪ই এপাচি’ এটাক হেলিকপ্টার এবং ১৫টা ‘সিএইচ-৪৭ শিনুক’ পরিবহণ হেলিকপ্টার কেনার চুক্তি করে। দু’টা হেলিকপ্টারই প্রায় ৬ কিঃমিঃ উচ্চতায় উড়তে পারে এবং সফলতার সাথে আফগানিস্তানের উঁচু জায়গাগুলিতে অপারেট করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা পরিবহণ বিমান, হেলিকপ্টার ও কামান সীমান্ত অঞ্চলে ভারতের যুদ্ধ করার সক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি করেছে ঠিকই, তবে সেটা চীনের সাথে সম্ভাব্য সংঘাতে বিজয়ের জন্যে যথেষ্ট কিনা, সেব্যাপারে প্রশ্ন করছেন অনেকেই। 

গত এক বছর ধরেই ভারতের লাদাখের সীমানা থেকে প্রায় ২’শ কিঃমিঃ দক্ষিণে ‘নেগারি গুনসা’ বিমানবন্দরে চীনারা উন্নয়ন কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে কাশ্মির এবং লাদাখের কাছাকাছি চীনারা গোটা পঞ্চাশেকের বেশি যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেনি। সংখ্যার দিক থেকে এই বিমানশক্তি খুব বড় কিছু নয়। তদুপরি তা ভারতের নিরাপত্তাহীনতাকে উস্কে দিয়েছে।  


চীনের অবকাঠামো চ্যালেঞ্জ

বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, চীন ভারতের সীমানার কাছাকাছি এলাকায় অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে। প্রতিরক্ষা এবং ইন্টেলিজেন্স বিশ্লেষক ক্রিস বিগার্স বলছেন যে, গত এক বছর ধরেই লাদাখের সীমানা থেকে প্রায় ২’শ কিঃমিঃ দক্ষিণে ‘নেগারি গুনসা’ বিমানবন্দরে চীনারা উন্নয়ন কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবিতে দেখা যাচ্ছে যে, সেখানে চীনারা নতুন ট্যাক্সিওয়ে, পার্কিং র‍্যাম্প এবং ‘কুইক রিয়্যাকশন এলার্ট র‍্যাম্প’ তৈরি করেছে। তবে একসাথে বেশি বিমান ওড়াবার সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে দ্বিতীয় রানওয়ে তৈরি করেনি। সেখানে চীনারা ৪টা সুখোই ফাইটার বিমান এবং বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেছে। প্রায় ১৪ হাজার ফুট বা ৪ দশমিক ৩ কিঃমিঃ উচ্চতায় অবস্থিত এই বিমানবন্দরকে বিশ্বের চতুর্থ সর্বোচ্চ বিমানবন্দর দাবি করা হয়। ভারতীয় সামরিক বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, অতি উচ্চতায় অবস্থিত হওয়ায় এই বিমানবন্দর থেকে ওড়া ফাইটার বিমানগুলি তাদের সক্ষমতার চাইতে অনেক কম অস্ত্র বহণ করতে পারবে। সক্ষমতা অনুযায়ী ইঞ্জিন না চলতে পারার কারণে জ্বালানিও বেশি বহণ করতে হতে পারে। ভারতীয় বিমান বাইনীর সাবেক অফিসার স্কোয়াড্রন লীডার সামীর জোশি বলছেন যে, এত উঁচু থেকে ওড়ার ফলে সুখোই বিমানগুলি এক ঘন্টার বেশি উড়তে পারবে না। অপরদিকে লাদাখের কাছাকাছি ভারতের অনেকগুলি বিমান ঘাঁটি রয়েছে; যেগুলি থেকে ওড়া বিমান আকাশ থেকে আকাশে রিফুয়েলিংএর মাধ্যমে তিন থেকে চার ঘন্টা আকাশে উড়তে পারবে।

তবে ভারতের সীমানায় চীনের উদ্দেশ্য বুঝতে হলে চীনের অবকাঠামো উন্নয়নকে আরও বড় পরিসরে দেখতে হবে। তিব্বতে ভারতের সীমানার কাছাকাছি চীনের খুব বেশি একটা বিমানবন্দর নেই। পূর্ব তিব্বতে অরুণাচল প্রদেশের উত্তরে রয়েছে নিংচি বিমানবন্দর এবং চামদো বিমানবন্দর। এর মাঝে চামদো বিমানবন্দরকে আরও বড় করা হচ্ছে। ভূটানের উত্তরে রয়েছে লাসা গঙ্গার এবং শিগাটসে বিমানবন্দর। দু’টাই বেশ বড়সড় বিমানবন্দর, যেগুলির একাধিক রানওয়ে রয়েছে। ভূটানের সীমানায় দোকলাম উত্তেজনার সময় এই বিমানবন্দর দু’টা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। শিগাটসে থেকে পশ্চিমে নেপালের উত্তরে প্রায় ১২’শ কিঃমিঃ কোন বিমানবন্দর নেই। শিগাটসের পর ভারতের হিমাচল প্রদেশের পূর্বে রয়েছে ‘নেগারি গুনশা’ বিমানবন্দর, যেটা বর্তমান লাদাখ ইস্যুতে খবরে এসেছে। এখানে সামরিক বিমান অপারেট করার সুযোগসুবিধা এখনও খুব বেশি একটা নেই; তবে এর উন্নয়ন চলমান। এখানে আপাততঃ ৪টা যুদ্ধবিমান দেখা গেছে। নেগারি থেকে ১৩’শ কিঃমিঃ সড়কপথে যুক্ত হয়েছে উইঘুরের ‘খোটান’। এই রাস্তা আকসাই চিনের মাঝ দিয়ে গিয়েছে। আকসাই চিন থেকে প্রায় ২’শ কিঃমিঃ উত্তরে খোটানে রয়েছে বেশ বড় একটা বিমানবন্দর। এখানে প্রায় ত্রিশ চল্লিশটার মতো ফাইটার মোতায়েন রয়েছে। খোটানের সাথে প্রায় ৫’শ কিঃমিঃ সরকপথে যুক্ত হয়েছে কাশগড়, যেখানে রয়েছে আরেকটা বড় বিমানবন্দর। এখানেও প্রায় ডজনখানেক যুদ্ধবিমান মোতায়েন রয়েছে। তবে কাশ্মির এবং লাদাখের কাছাকাছি চীনারা গোটা পঞ্চাশেকের বেশি যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেনি। সংখ্যার দিক থেকে এই বিমানশক্তি খুব বড় কিছু নয়। তদুপরি তা ভারতের নিরাপত্তাহীনতাকে উস্কে দিয়েছে।
চীন তার পশ্চিমের রাজ্যগুলিকে পূর্বের হান অধ্যুষিত অঞ্চলগুলির সাথে সরাসরি যুক্ত করার চেষ্টা করছে। এই বিশাল অঞ্চলে অবকাঠামো তৈরির পিছনে রয়েছে বিশাল সব প্রকৃতিগত চ্যালেঞ্জ। কিন্তু চীন তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের উপর ভর করে তিব্বত এবং শিনজিয়াং বা উইঘুরে অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। এর মাঝে রয়েছে নতুন রাস্তা, রেললাইন এবং বিমানবন্দর নির্মাণ। সর্বপশ্চিমের মুসলিম অধ্যুষিত উইঘুর রাজ্যে চীনের প্রকল্পগুলির কৌশলগত গুরুত্ব সবচাইতে বেশি। উইঘুরের মাধ্যমেই চীন মধ্য এশিয়ার সাথে যুক্ত হয়েছে। একইসাথে পাকিস্তানের মাঝ দিয়ে ভারত মহাসগরের তীরে গোয়াদর বন্দরের সাথে যুক্ত হবার প্রকল্প উইঘুরের মাঝ দিয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মির থেকে বের হয়ে ‘চায়না পাকিস্তান ইকনমিক করিডোর’ বা ‘সিপিইসি’ বা ‘সিপেক’এর রাস্তা উইঘুরের হাইওয়ে ‘জি৩১৪’এর মিলেছে এবং এরপর তা কাশগরএর জংশনের সাথে যুক্ত হয়েছে। এখান থেকে হাইওয়ে ‘জি৩০১২’ উত্তরপূর্ব দিকে উইঘুরের রাজধানী উরুমচি এবং বাকি চীনের সাথে যুক্ত হয়েছে। কাশগর থেকে  হাইওয়ে ‘জি২১৯’ বের হয়ে তিব্বতের রাজধানী লাসা গিয়েছে। এই হাইওয়ে ‘জি২১৯’ পুরো ভারতের উত্তর সীমার প্রায় সমান্তরাল গিয়েছে। এটাই হলো সেই হাইওয়ে, যা ভারতকে বিচলিত করেছে। এই হাইওয়ে চীন নিয়ন্ত্রিত আকসাই চিন অঞ্চলের মাঝ দিয়ে যায়, যা ভারত নিজের অঞ্চল বলে দাবি করে আসছে। চীনের রাষ্ট্রীয় পত্রিকা ‘গ্লোবাল টাইমস’ জানাচ্ছে যে, ‘জি২১৯’ রাস্তা ১৯৫১ থেকে ১৯৫৭ সালের মাঝে তৈরি করা হয়। এর মাঝে বেশকিছু অংশ ছিল কাঁচা রাস্তা, যা ২০১৩ সালে পাকা করা হয়। ‘শিনহুয়া’ বলছে যে, এই রাস্তার লাদাখের কাছাকাছি জিয়েশান দাবান অংশ সমুদ্র সমতল থেকে ৫ দশমিক ২৫ কিঃমিঃ উঁচু। এই অঞ্চলে গাড়ি চালাতে গেলে অনেকেই অক্সিজেন মাস্ক পড়ে থাকেন। 

তিব্বতের রাজধানী লাসার পশ্চিমে শিগাটসে পর্যন্ত রেললাইন তৈরি করে বাকি চীনের সাথে সংযুক্ত করা হয় ২০১৪ সালে। এর আগে লাসা পর্যন্ত রেললাইন তৈরির কাজ শেষ হয় ২০০৬ সালে। আবার উইঘুর রাজ্যে পশ্চিমের কাশগর থেকে আকসাই চিনের উত্তরে হোতান পর্যন্ত রেললাইন তৈরি করা হয় ২০১০ সালে। এই রেললাইনের সাথেই ‘সিপেক’কে যুক্ত করার পরিকল্পনা চলছে। কাশগর পর্যন্ত রেললাইন তৈরি করা শেষ হয় ১৯৯৯ সালে। প্রত্যেকটা প্রকল্পই ছিল চীন সরকারের মেগা প্রকল্প। এই রেললাইনগুলি ব্যবহার করে চীন পক্ষে ভারতের সাথে সীমানায় সামরিক স্থাপনা গড়ে তোলা সহজ হয়েছে। বহুকাল যাবত চীনের জন্যে এই সীমানাগুলি পাহাড়া দেয়া কঠিন ছিল। এখন মাল্টিবিলিয়ন ডলারের প্রকল্পগুলি চীনের জন্যে নিজের অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি তা ভারতকে করেছে বিচলিত।

ভারতের ২৮টা ফাইটার স্কোয়াড্রনের মাঝে ১৭টাই কাশ্মির এবং লাদাখের কাছাকাছি মোতায়েন রয়েছে। এই ১৭টা স্কোয়াড্রনে রয়েছে প্রায় ২’শ ৭২টা ফাইটার বিমান; যার মাঝে প্রথম সাড়ির বিমান ১’শ ৭৬টা এবং দ্বিতীয় সাড়ির বিমান ৯৬টা। এগুলির বিপরীতে চীনারা বর্তমানে মোতায়েন করেছে গোটা পঞ্চাশেক বিমান। সীমান্তের কাছাকাছি নিজেদের পাঁচ গুণ বেশি যুদ্ধবিমান মোতায়েন রাখা সত্ত্বেও ভারত চীনাদের ব্যাপারে উতকন্ঠায় রয়েছে। ১৯৪৭ পরবর্তী ভারতের সার্বক্ষণিক চিন্তায় নিরাপত্তাহীনতাই ছিল সর্বাগ্রে। 


তবুও ভারত এবং চীনের অসমান সক্ষমতা

‘ফরেন পলিসি’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় সুমিত গাঙ্গুলি এবং মানজিত পারদেসি বলছেন যে, ১৯৮৮ সালে যখন রাজীব গান্ধী চীনের সাথে আলোচনায় বসেছিলেন, তখন দুই দেশ কৌশলগত দিক থেকে মোটামুটিভাবে তুলনীয় ছিল। ভারতের জিডিপি তখন ছিল ২’শ ৯৭ বিলিয়ন ডলার; চীনের ছিল ৩’শ ১২ বিলিয়ন। ভারতের সামরিক বাজেট ছিল প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার; চীনের ছিল ১১ বিলিয়ন। কিন্তু বর্তমানে চীনের জিডিপি ১৩ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার; যা কিনা ভারতের ২ দশমিক ৭ ট্রিলিয়নের প্রায় ৫ গুণ! আর ২০১৯ সালে চীনের সামরিক বাজেট ছিল ২’শ ৬১ বিলিয়ন ডলার; যা ভারতের ৭১ বিলিয়ন ডলারের চার গুণ! দুই দেশেরই অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলেও চীনারা ভারতের সাথে বড় রকমের পার্থক্য তৈরি করে ফেলেছে, যা কিনা দুই দেশের কৌশলগত ব্যালান্সকে সমস্যায় ফেলে দিয়েছে। চীন তিব্বতে তার অবকাঠামোর অনেক উন্নয়ন করেছে; উঁচু পাহড়ি অঞ্চলে ব্যবহারের জন্যে ‘টাইপ ১৫’ ট্যাঙ্ক ডেভেলপ করেছে। ৩৩ টন ওজনের এই হাল্কা ট্যাঙ্ক চীনারা ২০১৮ সাল থেকে সার্ভিসে এনেছে।

চীনের সীমানায় ভারতীয় সেনাবাহিনী যেসব ইউনিট মোতায়েন করেছে, সেগুলির পক্ষে পাহাড়ি অঞ্চলের রাস্তা বেয়ে চীনের বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালনা করা খুবই কঠিন। এখানে উঁচু পাহাড়ের কারণে রাস্তাগুলি সরু এবং রাস্তার উপর সামরিক বহরের বিমান আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়াটা সহজ নয়। চীনা বিমান বাহিনী এক্ষেত্রে খুব সহজেই ভারতীয় সাপ্লাই রাস্তাগুলি আটকে দিতে পারবে, যদি না ভারতীয় বিমান বাহিনী চীনা বিমান বাহিনীকে আকাশযুদ্ধে পরাস্ত করতে সক্ষম হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় বিমান বাহিনী তার প্রয়োজনীয় ৪২ স্কোয়াড্রন ফাইটার বিমান রাখতে পারছে না। অনেকেই বলছেন যে, পুরোনো বিমান অবসরে পাঠানো এবং নতুন বিমান ক্রয়ে দীর্ঘসূত্রিতার জেরে ভারতীয় বিমান বাহিনীকে ২০২০এর পর থেকে ২৬ স্কোয়াড্রন ফাইটার বিমান নিয়েই খুশি থাকতে হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে হিমালয়ের পাদদেশে চীনাদের সাথে যুদ্ধে ভারতীয়রা আকাশ নিজেদের দখতে নিতে পারবে কিনা, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। 
তবে কাশ্মির ও লাদাখের কাছাকাছি ভারতের বিমান বাহিনীর শক্তি অন্ততঃ কাগজে কলমে হলেও গুরুত্ব রাখে। ডাচ ম্যাগাজিন ‘স্ক্র্যাম্বল’ ভারতীয় বিমান বাহিনীর ঘাঁটিগুলিতে মোতায়েনকৃত স্কোয়াড্রনগুলিকে দেখাবার চেষ্টা করেছে। এর মাঝে আকাশ নিয়ন্ত্রণের জন্যে নিযুক্ত ইউনিটগুলি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আদমপুরে রয়েছে ‘মিগ-২৯’ বিমানের ৪৭তম এবং ২২৩তম স্কোয়াড্রন। হালওয়ারাতে রয়েছে ‘সুখোই-৩০’এর ২২০তম এবং ২২১তম স্কোয়ড্রন। বারেইলিতে রয়েছে ‘সুখোই-৩০’এর ৮ম এবং ২৪তম স্কোয়াড্রন। লেহতে রয়েছে ২৮তম স্কোয়াড্রনের ‘মিগ-২৯’। গোয়ালিয়রে রয়েছে ‘মিরেজ-২০০০’এর ১ম, ৭ম এবং ৯ম স্কোয়াড্রন। সিরসাতে রয়েছে ‘সুখোই-৩০’এর ১৫তম স্কোয়াড্রন। অর্থাৎ প্রথম সাড়ির ফাইটার বিমানের ১১টা স্কোয়াড্রন ছড়িয়ে আছে ৬টা বিমান ঘাঁটিতে। এছাড়াও দ্বিতীয় সাড়ির ফাইটার হিসেবে ‘মিগ-২১’ বিমানের ৫১তম, ২৬তম, ২১তম, ২৩তম স্কোয়াড্রন এবং ‘জাগুয়ার’ বিমানের ৫ম এবং ১৪তম স্কোয়াড্রনও কাছাকাছি মোতায়েন রয়েছে। অর্থাৎ দ্বিতীয় সাড়ির আরও ৬টা ফাইটার স্কোয়াড্রনও মোতায়েন রয়েছে কাছাকাছি। আম্বালাতে ফরাসী নির্মিত ‘রাফাল’ জেটগুলি ১৭তম স্কোয়াড্রনে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এবছরের জানুয়ারিতে ভারতীয় বিমান বাহিনী বলে যে, এই মুহুর্তে তাদের ২৮ স্কোয়াড্রন ফাইটার অপারেশনাল রয়েছে। এর মাঝে ১২টা ‘সুখোই-৩০’, ৩টা ‘মিগ-২৯’, ৬টা ‘জাগুয়ার’, ৩টা ‘মিরেজ-২০০০’, একটা ‘তেজাস’ এবং ৩টা ‘মিগ-২১’ স্কোয়াড্রন। আর উপরের সংক্ষ্যাগুলি বলছে যে, ২৮টা স্কোয়াড্রনের মাঝে ১৭টাই কাশ্মির এবং লাদাখের কাছাকাছি মোতায়েন রয়েছে। এই ১৭টা স্কোয়াড্রনে রয়েছে প্রায় ২’শ ৭২টা ফাইটার বিমান; যার মাঝে প্রথম সাড়ির বিমান ১’শ ৭৬টা এবং দ্বিতীয় সাড়ির বিমান ৯৬টা। এগুলির বিপরীতে চীনারা বর্তমানে মোতায়েন করেছে গোটা পঞ্চাশেক বিমান।

পাকিস্তানের সাথে কয়েক দফা যুদ্ধের পর ভারতের বিমান ঘাঁটিগুলি সর্বদাই যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত রাখা হয়। সেখানে বিমানের জন্যে বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। বেশিরভাগ বিমানই শেলটারের ভিতর রাখা হয়ে থাকে। প্রতিটা ঘাঁটিতেই একাধিক রানওয়ে রয়েছে দ্রুত বিমান ওঠানামা করার জন্যে। অপরদিকে চীনের ঘাঁটিগুলিতে ফাইটার বিমান টারমাকের উপরেই রাখা হচ্ছে। ঘাঁটির সংখ্যাও কম; ঘাঁটিতে রানওয়ের সংখ্যাও কম। প্রকৃতপক্ষে চীনারা যুদ্ধের সম্ভাবনাকে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়নি। তবে সীমান্তকে একেবারে অরক্ষতিও রাখতে চায়নি। সীমান্তের দু’পাশে উভয় পক্ষই অবকাঠামো উন্নয়ন করেছে। তবে ভারতের এই উন্নয়ন সীমান্তের নিরাপত্তা দেবার জন্যে হলেও চীনের ক্ষেত্রে তার পশ্চিমের প্রদেশগুলিকে আরও শক্তভাবে ধরে রাখার উদ্দেশ্য কাজ করেছে। ভারত চীনা সীমান্তে তার যুদ্ধ করার সক্ষমতা বৃদ্ধি করলেও চীনারা ভারতের সকল চেষ্টার জবাব দেয়ার চেষ্টা করেনি।

লাদাখে দুই পক্ষের প্রায় শ’খানেক সেনা হাতাহাতি সংঘাতে লিপ্ত হয়। তবে কোন আগ্নেয়াস্ত্র কোন পক্ষই ব্যবহার করেনি। গত দুই দশকে ভারত এবং চীনের সীমান্ত পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন হয়েছে এবং তা অব্যহত থাকবে। এতে উভয় পক্ষই নিরাপত্তাহীনতার মাঝে পড়বে, যা উত্তেজনা এবং সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়াবে। তবে লাদাখের সীনামায় দুই দেশের সেনাদের আগ্নেয়াস্ত্রবিহীন সংঘর্ষ বলে দিচ্ছে যে, কেউই সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চাইছে না। ভারত যেমন তার সীমানাকে যুদ্ধ ছাড়াই রক্ষা করতে চাইছে, তেমনি চীনারাও বুঝতে পারছে যে, যুদ্ধ চীনের জাতীয় নিরাপত্তাকে আরও বড় হুমকিতে ফেলবে।


যুদ্ধের সম্ভাবনা আসলে কতটুকু? 

‘বিবিসি’ তাদের বিশ্লেষণে বলছে যে, চীনারা ভারতের বিজেপি নেতৃবৃন্দের পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মির দখল করে নেবার হুমকিকে চীনারা হয়তো হাল্কাভাবে নেয়নি। কারণ আজাদ কাশ্মিরের মাঝ দিয়েই ‘সিপেক’ চীনের উইঘুরের হাইওয়ে ‘জি৩১৪’এর সাথে মিলিত হয়েছে। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ তাদের বিশ্লেষণে বলছে যে, দুই দেশের মাঝে বাণিজ্যও কিন্তু থেমে থাকেনি। চীনের এক’শর বেশি কোম্পানি ভারতে বিনিয়োগ করেছে। চীনা কোম্পানিগুলি ভারতের মোবাইল ফোন বাজারের ৬০ শতাংশ দখল করে রেখেছে। ২০১৮ সালে দুই দেশের মাঝে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৯৫ বিলিয়ন ডলার। ২০১৯এর প্রথমার্ধে এই বাণিজ্য ছিল ৫৩ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য যুদ্ধের মাঝে ভারত চাইছে চীন থেকে বের হয়ে যাওয়া কোম্পানিগুলিকে ভারতে নিয়ে আসতে। মোটকথা দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক এমন একটা অবস্থানে রয়েছে যে, কেউই সেটাকে সমস্যায় ফেলতে চাইবে না।

সীমান্তের কাছাকাছি নিজেদের পাঁচ গুণ বেশি যুদ্ধবিমান মোতায়েন রাখা সত্ত্বেও ভারত কেন চীনাদের ব্যাপারে উতকন্ঠায় রয়েছে? চীনাদের অবকাঠামো উন্নয়ন কেন ভারতকে চিন্তিত করেছে, যেখানে চীনারা সামরিক দিক থেকে খুব কমই শক্তি মোতায়েন করেছে? নিজস্ব সীমান্ত অবকাঠামো উন্নয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে অত্যাধুনিক অস্ত্র কেনাকেই বা ভারত কেন মনে করেনি যে তা চীনাদের উস্কে দিতে পারে? বিজেপি সরকারের আজাদ কাশ্মির দখলের চিন্তাকে চীনারা যদি তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ ‘সিপেক’এর প্রতি হুমকি হিসেবে নেয়, তাহলে সেব্যাপারে ভারত কি অবস্থান নেবে, সেটা ভেবে দেখেছে কি? ১৯৪৭ পরবর্তী ভারতের সার্বক্ষণিক চিন্তায় নিরাপত্তাহীনতাই ছিল সর্বাগ্রে। বিশেষ করে নিজের ভৌগোলিক অখন্ডতা প্রশ্নে ভারত প্রয়োজনে আগ্রাসী ভূমিকাও নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের এই নিরাপত্তাহীনতাকে ব্যবহার করে অস্ত্র সরবরাহ করেছে; যা চীনকে তার স্থলসীমানার দিকে কিছুটা হলেও তাকাতে বাধ্য করেছে। তবে চীনারা আপাততঃ যদিও যুদ্ধ প্রস্তুতির দিকে দ্রুত অগ্রসর হয়নি, তথাপি ভারতের সামরিক সক্ষমতার পিছনে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ধন চীনের জন্যে কিছুটা হলেও হুমকি তৈরি করেছে। ‘সিপেক’এর প্রতি হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রকে এগিয়ে রাখবে। আর চীনারা যেহেতু উইঘুর এবং তিব্বতের অবকাঠামো উন্নয়ন বন্ধ করতে পারবে না, সেহেতু নিরাপত্তাহীনতা ভারতকে সামনের দিনে আরও বেশি গ্রাস করবে। বিশেষ করে ভবিষ্যতে কাশ্মির ইস্যুতে পাকিস্তান এবং চীনের একত্রে থাকার সম্ভাবনা বেড়ে যাওয়ায় তা ভারতকে বিচলিত করবে এবং তাকে আরও প্রবলভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বলয়ের মাঝে নিয়ে যাবে। উপসংহারে বলা যায় যে, গত দুই দশকে ভারত এবং চীনের সীমান্ত পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন হয়েছে এবং তা অব্যহত থাকবে। এতে উভয় পক্ষই নিরাপত্তাহীনতার মাঝে পড়বে, যা উত্তেজনা এবং সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়াবে। তবে লাদাখের সীনামায় দুই দেশের সেনাদের আগ্নেয়াস্ত্রবিহীন সংঘর্ষ বলে দিচ্ছে যে, কেউই সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চাইছে না। ভারত যেমন তার সীমানাকে যুদ্ধ ছাড়াই রক্ষা করতে চাইছে, তেমনি চীনারাও বুঝতে পারছে যে, যুদ্ধ চীনের জাতীয় নিরাপত্তাকে আরও বড় হুমকিতে ফেলবে।