Showing posts with label rockets. Show all posts
Showing posts with label rockets. Show all posts

Wednesday, 26 May 2021

গাজা যুদ্ধ ... ইস্রাইলের নিরাপত্তাহীনতা বাড়ালো হামাসের বিজয়

২৬শে মে ২০২১
হামাসের কাছে থাকা মোট রকেটের সংখ্যা নিরূপণ যেমন ইস্রাইলের নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ, তেমনি ‘আয়রন ডোম’এর উপর নির্ভরশীল থাকার সত্ত্বেও এবং রাজনৈতিকভাবে অসমর্থনযোগ্য ব্যাপক বিমান হামলায় শতশত ফিলিস্তিনি হত্যার পরেও ইস্রাইলিদের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক না হওয়া এবং হতাহত পুরোপুরি বন্ধ না করতে পারা ইস্রাইলের দুর্বলতা তুলে ধরে। এবারের গাজার যুদ্ধ বলে দিচ্ছে যে, মান্ধাতার প্রযুক্তির ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইস্রাইলের যুদ্ধ জেতা শুধু কঠিনই নয়, বরং যুদ্ধ প্রতিরোধ করতে ইস্রাইলকে আশেপাশের দেশগুলির সহযোগিতার উপরেই বেশি নির্ভরশীল হতে হবে। অর্থাৎ নিজের নিরাপত্তার স্বার্থেই ইস্রাইল তার আশেপাশের দেশগুলির সাথে সম্পর্কোন্নয়নে এগুবে।


গাজা যুদ্ধের সময় ভিডিও ছড়াতে থাকে, যেখানে দেখা যাচ্ছিল যে, রাতের আকাশে একদিক থেকে উড়ছে ফিলিস্তিনি গ্রুপ হামাসের রকেট; আর অপর দিক থেকে উড়ছে ইস্রাইলের প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র, যা কিনা ‘আয়রন ডোম’ নামের একটা ব্যবস্থার অংশ। যুদ্ধ শেষ হবার আগেই প্রশ্ন উঠেছে যে, এই ‘আয়রন ডোম’এর কর্মক্ষমতা আসলে কতটুকু। এই ব্যবস্থার সক্ষমতার উপর ইস্রাইলের আকাশ প্রতিরক্ষাই ব্যবস্থাই শুধু নির্ভর করছে না, ইস্রাইলের আশেপাশের দেশগুলি ইস্রাইলের বিরুদ্ধে প্রক্সি যুদ্ধ করার ব্যাপারে কতটা আশাবাদী হতে পারে, তাও নির্ভর করবে। সে হিসেবে এর ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব যথেষ্ট।

ইস্রাইলি পত্রিকা ‘জেরুজালেম পোস্ট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ‘আয়রন ডোম’এর দুর্বলতা সবসময়েই ছিল। এর আগের যুদ্ধগুলিতে ‘আয়র ডোম’ হামাসের ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ রকেট ধ্বংস করতে পেরেছিল। তবে ইস্রাইলি ইন্টেলিজেন্সের কর্মকর্তারা সর্বদাই জানতেন যে, লেবাননের হিযবুল্লাহ মিলিশিয়াদের সক্ষমতা রয়েছে দিনে এক হাজার রকেট ছোঁড়ার। সেটা করতে পারলে নিশ্চিতভাবেই ‘আয়রন ডোম’এর সক্ষমতার সীমা পরিসীমা পরীক্ষা হয়ে যাবে। শুধু তাই নয়, ইস্রাইলি হিসেবে হিযবুল্লাহর হাতে রয়েছে দেড় লক্ষাধিক রকেট; যার মাধ্যমে তারা অনির্দিষ্ট সময়ের জন্যে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে। অপরদিকে ২০১৪ সালের গাজা যুদ্ধে হামাস ৫০ দিনে ৪ হাজার রকেট ছুঁড়েছিল। একদিনে সর্বোচ্চ দু’শ রকেট ছুঁড়েছিল তারা। আর এক’শর বেশি রকেট তারা ছুঁড়তে পেরেছিল খুব বেশি হলে দুই সপ্তাহ। কিন্তু এবারের যুদ্ধে হামাস কয়েক মিনিটের মাঝে শতাধিক রকেট ছুঁড়তে পেরেছে; যা এর আগে শোনা যায়নি। তদুপরি হামাসের কাছে কতগুলি রকেট রয়েছে, সেটার উপরেই নির্ভর করবে যে, যুদ্ধ কতদিন স্থায়ী হতে পারে। কাজেই সবচাইতে বড় প্রশ্ন হলো, হামাসের রকেটের সংখ্যার ব্যাপারে ইস্রাইলের ইন্টেলিজেন্সের ধারণা সঠিক কিনা। আর একারণেই ইস্রাইলের হিসেব কষতে হবে যে, তারা হামাস বা হিযবুল্লাহর বিরুদ্ধে একটা যুদ্ধ কতদিন চালিয়ে নিতে সক্ষম হবে। অথবা কত দ্রুত তাদেরকে সেনাবাহিনী প্রেরণ করতে হবে রকেট হামলা থামাতে। কারণ ইস্রাইলের ব্যাপক বিমান হামলা হামাসের রকেট হামলা থামাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।


 
‘ফোর্বস’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, এই যুদ্ধ হচ্ছে সর্বশেষ প্রযুক্তির বিরুদ্ধে মান্ধাতার প্রযুক্তির। দশ বছর আগে ‘আয়রন ডোম’ ডেভেলপ করেছিল ‘রাফায়েল এডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমস’। এতে রয়েছে বেশকিছু রাডার রয়েছে; যেগুলি প্রতিপক্ষের রকেট দেখা মাত্রই স্বয়ংক্রিয়ভাবে মনুষ্যবিহীন লঞ্চার থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে সেগুলিকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে। এই ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেয় যে, কোন রকেটগুলি ইস্রাইলের জনবসতিতে আঘাত হানতে পারে, এবং সেই হিসেবে সেগুলি ধ্বংসে ‘তামির’ ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া হয়। একটা লঞ্চারে ২০টা করে ‘তামির’ ক্ষেপণাস্ত্র থাকে। একেকটা ক্ষেপনাস্ত্রের পাল্লা ৪০ কিঃমিঃ এবং মূল্য ২০ হাজার ডলার থেকে ১ লক্ষ ডলারের মাঝে। অপরদিকে হামাসের রকেটগুলি স্টিল এবং এলুমিনিয়ামের পাইপের সাথে স্টিলের পাখা জুড়ে দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে। এই রকেটের জ্বালানি হলো রাসায়নিক সার এবং গলানো চিনি। রকেটের ওয়ারহেডগুলিও বাড়িতে তৈরি করা। বেশিরভাগ রকেটই স্বল্পপাল্লার ‘কাসাম’। রকেটগুলি ধাতুর কাঠামো থেকে ছোঁড়া হয় এবং এদের কোন গাইড্যান্স সিস্টেম নেই। এগুলির ওজন ৩৬ কেজি থেকে ৯০ কেজি পর্যন্ত এবং পাল্লা ৩ কিঃমিঃ থেকে ৩২ কিঃমিঃ পর্যন্ত। দু’জন ব্যক্তিই এগুলি ছোঁড়ার জন্যে যথেষ্ট। এগুলির খরচ মাত্র কয়েক’শ ডলারের বেশি নয়। এই রকেটগুলির সক্ষমতা নেই বড় ধরনের কোন ক্ষয়ক্ষতি করার; বরং এগুলির উদ্দেশ্য হলো ইস্রাইলকে অনিরাপদ করা এবং ইস্রাইলিদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করে তাদেরকে লুকাতে বাধ্য করা। তবে এবারে হামাসের উদ্দেশ্য ছিল ‘আয়রন ডোম’এর সর্বোচ্চ সক্ষমতা বের করা এবং পুরো ব্যবস্থাকে ব্যাতিব্যস্ত করে ফেলা। ‘তামির’ ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিটের ক্ষেপণাস্ত্র ফুরিয়ে গেলে হতাহতের সংখ্যা বেরে যাবার সম্ভাবনা দেখা দেবে।

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘র‍্যান্ড কর্পোরেশন’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ‘আয়রন ডোম’এর প্রধান দুর্বলতা হলো, অতি কম সক্ষমতার রকেট ধ্বংস করতে অতি উচ্চ সক্ষমতার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, হামাসের একটা রকেট খুব বড় কোন ক্ষতি করার সক্ষমতা না রাখলেও ইস্রাইলিরা এর প্রত্যুত্তরে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে; যেটাকে তাদের এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ন্যায়সংগত প্রমাণ করতে হচ্ছে। ১৩ জন ইস্রাইলিকে হত্যার বিপরীতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে ২’শ ৪৮ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করাকে রাজনৈতিকভাবে সমর্থন করা কঠিন। এছাড়াও রকেট উৎক্ষেপণ বন্ধ করতেও ইস্রাইলকে ফিলিস্তিনিদের উপর ব্যাপক বিমান হামলা, এমনকি সেনাবাহিনীর হামলা করতে হচ্ছে। আবার ‘আয়রন ডোম’এর ফাঁকফোঁকড় দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া রকেট যদি ইস্রাইলিদের হতাহতের কারণ হয়, তাহলে সেটাও ইস্রাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যে চ্যালেঞ্জ।

‘আল জাজিরা’র এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, যুদ্ধের এক পর্যায়ে হামাস মাত্র ৩০ মিনিটের মাঝে ৭০টা রকেট নিক্ষেপ করেছিল। একসময় হামাস পাঁচ মিনিটে ১’শ ৩৭টা রকেট ছোঁড়ার দাবিও করে। বেশিরভাগ রকেট স্বল্পপাল্লার হলেও কিছু রকেট ৭৫ কিঃমিঃ দূরে তেল আভিভেও পৌঁছেছে; যা ইস্রাইলিদের বিচলিত করেছে। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলছে যে, পুরো যুদ্ধে হামাস ৩ হাজার ৭’শর বেশি রকেট ছুঁড়েছে। তবে রকেটের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় ৯০ শতাংশ রকেট ধ্বংস করা গেলেও বাকি ১০ শতাংশও কিন্তু সংখ্যার দিক থেকে একেবারে কম নয়। ইস্রাইলের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা এবারের যুদ্ধের দিকে যে কড়া নজর রেখেছে, তা নিশ্চিত। হামাসের কাছে থাকা মোট রকেটের সংখ্যা নিরূপণ যেমন ইস্রাইলের নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ, তেমনি ‘আয়রন ডোম’এর উপর নির্ভরশীল থাকার সত্ত্বেও এবং রাজনৈতিকভাবে অসমর্থনযোগ্য ব্যাপক বিমান হামলায় শতশত ফিলিস্তিনি হত্যার পরেও ইস্রাইলিদের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক না হওয়া এবং হতাহত পুরোপুরি বন্ধ না করতে পারা ইস্রাইলের দুর্বলতা তুলে ধরে। এবারের গাজার যুদ্ধ বলে দিচ্ছে যে, মান্ধাতার প্রযুক্তির ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইস্রাইলের যুদ্ধ জেতা শুধু কঠিনই নয়, বরং যুদ্ধ প্রতিরোধ করতে ইস্রাইলকে আশেপাশের দেশগুলির সহযোগিতার উপরেই বেশি নির্ভরশীল হতে হবে। অর্থাৎ নিজের নিরাপত্তার স্বার্থেই ইস্রাইল তার আশেপাশের দেশগুলির সাথে সম্পর্কোন্নয়নে এগুবে।