Friday, 13 November 2020
আজেরবাইজানের যুদ্ধজয় এবং অতঃপর...
১২ই নভেম্বর তুরস্কের পত্রিকা ‘ডেইলি সাবাহ’র এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, নাগোর্নো কারাবাখের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর শুশাতে ২৮ বছর পর মসজিদ থেকে আজান দেয়া হয়। সোশাল মিডিয়াতে এক ভিডিওতে দেখা যায় যে, শুশার ঐতিহাসিক ইউখারি গোভহার আগা মসজিদের মিনার থেকে একজন আজেরি সেনাসদস্য আজান দিচ্ছে। ২৭শে সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া আজেরবাইজানের সাথে আর্মেনিয়ার যুদ্ধ ১০ই নভেম্বর রুশ মধ্যস্ততায় থামার পর এখানকার ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনগুলি আলোচনায় আসছে।
শুশা শহর কারাবাখের রাজধানী স্তেপানাকার্ট থেকে মাত্র ১০ কিঃমিঃ দূরে এবং শুশা স্তেপানাকার্টএর প্রায় ২ হাজার ফুট বেশি উচ্চতায়। স্তেপানাকার্টএর সাথে আর্মেনিয়ার যোগাযোগের রাস্তার উপর অবস্থিত শুশা; আর তাই শুশার নিয়ন্ত্রণ নেয়ার অর্থ হলো স্তেপানাকার্টএর নিয়ন্ত্রণ নেয়া। ৮ই নভেম্বর আজেরবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিইয়েভ শুশা পুণর্দখলের ঘোষণা দেন। শহরটা আজেরিদের নিয়ন্ত্রণে যাবার কারণেই আর্মেনিয়া যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরে বাধ্য হয়েছে বলে অনেকের ধারণা। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ঘোষণা দেন যে, উভয় পক্ষ ‘সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতি’তে সম্মত হয়েছে, যা অত্র অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী সমঝোতার দিকে যাবার সম্ভাবনা তৈরি করবে। তিনি আরও বলেন যে, উভয় পক্ষ তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলি ধরে রাখবে এবং রুশ শান্তিরক্ষী সেনারা দুই পক্ষের মাঝে অবস্থান নেবে। রুশ সেনারা নাগোর্নো কারাবাখের সাথে আর্মেনিয়ার যোগাযোগের জন্যে একটা করিডোর নিয়ন্ত্রণে রাখবে। রুশ বার্তা সংস্থাগুলি বলছে যে, মোট ১ হাজার ৯শ ৬০ জন রুশ সেনা এবং ৯০টা সাঁজোয়া যান শান্তিরক্ষায় মোতায়েন হবে।
ফরাসি বার্তাসংস্থা ‘এএফপি’ বলছে যে, যুদ্ধবিরতির পর আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভানে বিক্ষুব্ধ জনতা পার্লামেন্ট ভবনের নিয়ন্ত্রণ নেবার চেষ্টা করে এবং বিভিন্ন অফিস ভাংচুর করে। আর্মেনিয়ার প্রেসিডেন্ট নিকল পাশিনিয়ান এক ঘোষণায় বলেন যে, সার্বিক সামরিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে একটা ‘অকল্পনীয় যন্ত্রণাদায়ক’ চুক্তি স্বাক্ষরে তিনি বাধ্য হয়েছেন। অপরদিকে আজেরবাইজানের প্রেসিডেন্ট আলিইয়েভ বলছেন যে, একটা ‘লৌহ হস্ত’ পাশিনিয়ানকে চুক্তি স্বাক্ষরে বাধ্য করেছে। তিনি এই চুক্তিকে আর্মেনিয়ার ‘আত্মসমর্পণ’ বলে আখ্যা দেন। আলিইয়েভ বলেন যে, একটা নির্দিষ্ট সময়সীমার মাঝে কারাবাখের একটা বড় এলাকা থেকে আর্মেনিয়া সেনা প্রত্যাহার করতে সম্মত হয়েছে। আর আজেরবাইজানের বন্ধুরাষ্ট্র তুরস্ক যুদ্ধবিরতি ধরে রাখতে সহায়তা দেবে।
শুশার মসজিদের ইতিহাসের সাথে অত্র অঞ্চলের সংঘাতের গভীরতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। ‘ইউরেশিয়ানেট’ বলছে যে, এই মসজিদের কাজ শেষ হয় ১৮৮৫ সালে। সোভিয়েত আমলে মসজিদটাকে জাদুঘর হিসেবে আখ্যা দিয়ে নামাজ আদায় বন্ধ করে দেয়া হলেও ১৯৮৮ সালে আবার নামাজ আদায় শুরু হয়। ১৯৯২ সালের ৮ই মে শুশা শহর আর্মেনিয়দের হাতে চলে যাবার পর থেকে এই মসজিদ থেকে আজান প্রচার হয়নি। গত বছরের ডিসেম্বরে আর্মেনিয়রা ইরানিদের সহায়তায় এই মসজিদ মেরামত করে জাদুঘর হিসেবে জনসাধারণের জন্যে খুলে দেয়। তবে এই মসজিদের মেরামত আজেরিরা ভালো চোখে দেখেনি। আর্মেনিয়রা কারাবাখ দখল করে নেবার পর কারাবাখের ৬ লাখের বেশি আজেরি তাদের বাড়িঘর ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। শুশার এক শিক্ষক নুনে হাকোবিয়ান মসজিদখানা মেরামতের পর মন্তব্য করেন যে, তিনি এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটাকে পছন্দ করেন; তবে তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন যে, এই মসজিদখানা তৈরি হয়েছে খ্রিস্টান ভূমিতে। আরটার পোগোসিয়ান নামের আরেক ব্যক্তি মন্তব্য করেন যে, কারাবাখের কর্তাব্যক্তিরা এই মসজিদের মেরামত চাইলেও জনগণ চায় না। তারা মনে করে যে, এখানে একটা মসজিদ থাকলে মুসলিমরা কোন এক সময় মনে করবে যে, এই ভূমি মুসলিমদের। শুশার আর্মেনিয়দের কথায় অত্র অঞ্চলে আর্মেনিয় এবং আজেরিদের মাঝে দ্বন্দ্ব কতটা গভীর, তার প্রমাণ মেলে। উভয় পক্ষের দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে রয়েছে ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলি। মসজিদটা মেরামত করে কারাবাখের আর্মেনিয়রা ঘোষণা দেয় যে, আজেরিরা আর্মেনিয়দের ইতিহাস ধ্বংস করলেও আর্মেনিয়রা তার উল্টোটা করেছে। অপরদিকে আজেরিরা বলছে যে, আর্মেনিয়রা মসজিদখানা মেরামত করে এটাকে ‘পারস্যের মসজিদ’ বলে আখ্যা দিচ্ছে, যা কিনা এখান থেকে আজেরিদের ঐতিহ্য মুছে ফেলার একটা চক্রান্ত। কারাবাখের মন্ত্রী আরতাক গ্রিগোরিয়ান বলছেন যে, ইরানি প্রকৌশলীরা সহায়তা করতে এসে এই মসজিদকে ‘পারস্যের মসজিদ’ বলেই আখ্যা দিয়েছে; তাই তারাও সেটাই বলছেন। দুই পক্ষের কথাগুলি জাতিগত চরম মেরুকরণেরই উদাহরণ, যা অত সহজে পরিবর্তনীয় নয়। আজেরিরা নিজেদেরকে তুর্কি জাতির অংশ বলে মনে করলেও পারসিক আখ্যা দেয়াটা তাদের পছন্দনীয় নয়।
কমপক্ষে ১৩’শ মানুষ এই যুদ্ধে নিহত হয়েছে বলে বলছে বার্তাসংস্থাগুলি; যদিও অনেকেই এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি হবে বলে বলছেন। এই হত্যাযজ্ঞ প্রায় তিন দশক ধরে চলা যুদ্ধাবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। তুর্কি ও ইস্রাইলি মনুষ্যবিহীন ড্রোন এবং বাকুর তেল বিক্রির অর্থে কেনা বিপুল অস্ত্রের সমাহার আজেরবাইজানকে আর্মেনিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে একচ্ছত্র প্রাধান্য দিলেও তুরস্কের সমর্থন ব্যাতীত আজেরিদের পক্ষে এতদিন যুদ্ধ চালিয়ে নেয়া সম্ভব ছিল না। রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের কাছে আর্মেনিয়রা সহায়তা চাইলেও পুতিন সরাসরিই বলে দেন যে, শুধুমাত্র আর্মেনিয়া আক্রান্ত হলেই রুশরা আর্মেনিয়ার পক্ষে যুদ্ধে জড়াবে; কারাবাখ যেহেতু আজেরবাইজানের এলাকা বলে স্বীকৃত, তাই সেখানকার যুদ্ধে রুশরা জড়াবে না। আজেরবাইজানকে তুরস্কের সরাসরি সমর্থনই শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত করে যে, রাশিয়া যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন ব্যতীত অন্য কোন ভূমিকা নেয়নি। এই যুদ্ধ শেষ হলো রাশিয়া এবং তুরস্কের ভূমিকায়; যা কিনা ‘ওএসসিই মিনস্ক গ্রুপ’কে অর্থহীন করে ফেলেছে। সুপারপাওয়ার যুক্তরাষ্ট্র নীরব থেকে তুরস্ককে সমর্থন দিয়ে যাওয়ায় একদিকে মিনস্ক গ্রুপের সদস্য ফ্রান্সের প্রভাব যেমন আরও কমলো, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র যে এই অঞ্চল নিয়ে তেমন মাথা ঘামাবে না, সেব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেলো। প্রধানমন্ত্রী পাশিনিয়ানের পশ্চিমা সমর্থিত সরকারের খুঁটিও দুর্বল হলো; যা রাশিয়াকে খুশিই করবে। তবে ককেশাসে গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু রাষ্ট্র আর্মেনিয়াকে সহায়তা না দেয়ায় মধ্য এশিয়ায় রাশিয়ার অন্যান্য বন্ধু রাষ্ট্রের কাছে কি বার্তা গেলো, তা এখন আলোচ্য বিষয়। শুশার মসজিদ নিয়ে জাতিগত দ্বন্দ্বই বলে দিচ্ছে যে, আজেরবাইজানের জয় এখনও শুধুমাত্র সামরিক। অপরদিকে বৃহত্তর মধ্য এশিয়াতে কৌশলগত জয়ের ফসল গিয়েছে তুরস্কের ঘরে, যা তুরস্ককে আরও আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতির দিকে ঠেলবে।
Sunday, 8 November 2020
ফকল্যান্ডস দাবি করে আর্জেন্টিনা কি আবারও ব্রিটেনকে চাপের মুখে ফেলতে পারবে?
গত ৬ই নভেম্বর আর্জেন্টিনা দক্ষিণ আটলান্টিকের ফকল্যান্ডস দ্বীপপুঞ্জে আর্জেন্টিনার পতাকা ওড়ানোর দ্বিশতবার্ষিকী পালন করতে যাচ্ছে। আর্জেন্টিনা দাবি করে যে, ফকল্যান্ডস দ্বীপপুঞ্জ স্বাভাবিকভাবেই আর্জেন্টিনার, যা ব্রিটিশরা জোরপূর্বক দখল করে রেখেছে। আর্জেন্টিনা ফকল্যান্ডসকে ‘মালভিয়ান্স’ বলে ডাকে। আর্জেন্টিনার কূটনীতিক হোজে লুইস ফার্নান্দেজ এক বার্তায় বলেন যে, এবারের এই অনুষ্ঠান আলাদা কোনকিছু নয়। আর্জেন্টিনা বহুকাল থেকেই এই দ্বীপগুলির উপর তাদের দাবির কথা জানিয়ে আসছে। ১৮১০ সালে স্পেনের রাজার কাছ থেকে আর্জেন্টিনা এই দ্বীপগুলি পায়, যা ব্রিটিশরা ১৮৩৩ সালে দখল করে নিয়েছিল। আর্জেন্টিনার মালভিয়ান্স সেক্রেটারি ড্যানিয়েল ফিলমাস বলেন যে, এই অনুষ্ঠান আর্জেন্টিনার জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ আমেরিকার মিডিয়া ‘মেরকোপ্রেস’ বলছে যে, ৭ই নভেম্বর আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফেলিপ সোলা জার্মান দূতাবাসে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ২১ সদস্য দেশের প্রতিনিধিদের ডেকে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেখানে আর্জেন্টাইনরা বলে যে, ব্রিটেন যখন ইইউ থেকে বের হয়ে যাচ্ছে, তখন ইউরোপিয় দেশগুলির উচিৎ ফকল্যান্ডসএর উপর আর্জেন্টিনার অধিকারকে সমর্থন করা। ব্রিটেনের সাথে আর্জেন্টিনার ফকল্যান্ডস নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা এমন সময়ে শুরু হয়েছে, যখন দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আর্জেন্টিনার ফাইটার জেট ক্রয়ের পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়েছে ব্রিটিশ সরকার। আর্জেন্টাইন মন্ত্রী আগুস্তিন রসি লন্ডনের এহেন সিদ্ধান্তকে ‘সাম্রাজ্যবাদী দাম্ভিকতা’ বলে আখ্যা দেন। দক্ষিণ আমেরিকা ঘুরে আটলান্টিক মহাসগর থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে যাবার পথের উপর অবস্থিত ফকল্যান্ডস দ্বীপপুঞ্জের কৌশলগত গুরুত্ব যথেষ্ট। ব্রিটিশরা প্রায় দু’শ বছর ধরে কৌশলগত এই দ্বীপ দখলে রেখেছে। পানামা খাল চালুর পর থেকে দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণে ম্যাজেলান প্রণালী এবং ড্রেইক প্যাসেজ দিয়ে বর্তমানে বাণিজ্যিক জাহাজ তেমন যাতায়াত করে না। তবে সামরিক জাহাজের জন্যে এই পথ আখনও গুরুত্বপূর্ণ; বিশেষ করে ভবিষ্যতের কোন সম্ভাব্য যুদ্ধে দুই মহাসাগরের মাঝে যাতায়াতের জন্যে এই পথ ব্যবহৃত হতে পারে। ইউরোপিয় দেশগুলি এই পথকে প্রশান্ত মহাসাগরে যাবার বিকল্প পথ হিসেবে দেখে।
বিরোধপূর্ণ দুই শতক
ব্রিটেনের ‘দ্যা এক্সপ্রেস’ পত্রিকা মনে করিয়ে দিয়ে বলছে যে, দুই দেশের মাঝে ফকল্যান্ডস নিয়ে দ্বন্দ্ব ১৮ শতক থেকেই। ১৯৮২ সালে ব্রিটিশদের অধীনে থাকা এই দ্বীপপুঞ্জকে আর্জেন্টিনা সৈন্য পাঠিয়ে দখল করে নেয়। আর্জেন্টিনার দক্ষিণ উপকূল থেকে এই দ্বীপের দূরত্ব প্রায় সাড়ে ৬’শ কিঃমিঃ। ৩ হাজার ৩’শ ৫৪ জন মানুষের বাস এই দ্বীপে ১৯৮২ সালে যুদ্ধের সময় আর্জেন্টাইনরা বেশ কিছু মানুষকে সেখানে বসতি স্থাপন করতে দিয়েছিল। ব্রিটিশ সেনারা সাড়ে ১২ হাজার কিঃমিঃ পথ পাড়ি দিয়ে এসে দ্বীপ পুনর্দখলের পর তাদেরকে আর্জেন্টিনায় ফেরত দিয়ে আসে।
ফকল্যান্ডসএর ইতিহাস জুড়েই রয়েছে ঔপনিবেশিক প্রতিযোগিতা। ১৭৬৪ সালে ফরাসি ক্যাপ্টেন লুই আঁতোয়া ডে বোগেনভিল ইস্ট ফকল্যান্ডসএ পোর্ট লুই নামে একটা ঘাঁটি স্থাপন করেন। এরপর ১৭৬৬ সালে ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন জন ম্যাকব্রাইড সনডার্স আইল্যান্ডে পোর্ট এগমন্ট নামে একটা ঘাঁটি স্থাপন করে। তবে একই বছরেই ফরাসিরা স্পেনের কাছে তাদের ঘাঁটি হস্তান্তর করে ফেলে। পরের বছর ১৭৬৭ সালে স্প্যানিশরা এই ঘাঁটির নামকরণ করে পুয়ের্তো সলেদাদ। তবে তখনও তারা ফকল্যান্ডসে ব্রিটিশ ঘাঁটি সম্পর্কে অবহিত ছিল না। ১৭৭০ সালে স্প্যানিশরা যখন বুঝতে পারে যে, সেখানে ব্রিটিশ একটা ঘাঁটি রয়েছে, তখন তারা ব্রিটিশ ঘাঁটি পোর্ট এগমন্ট দখল করে নেয়। ১৭৭১ সালে ঘাঁটিটা ব্রিটনের হাতে ছেড়ে দেবার মাধ্যমে স্প্যানিশরা সুপারপাওয়ার ব্রিটেনের সাথে যুদ্ধ এড়ায়। ব্রিটিশরা তাদের সার্বভৌমত্বের একটা সাইনবোর্ড রেখে দিয়ে ১৭৭৪ সালের মাঝে দ্বীপ থেকে নিজেদের ঘাঁটি সরিয়ে নেয়। ফরাসী সম্রাট ন্যাপোলিয়নের সাথে ব্রিটিশদের যুদ্ধ শুরুর পর স্পেন ফ্রান্সের অধীনে চলে গেলে ব্রিটিশরা রিও ডেলা প্লাটা বা আর্জেন্টিনা আক্রমণ করে। ১৮১০ সালে ব্রিটিশ সহায়তায় রিও ডেলা প্লাটাতে বিদ্রোহ শুরু হয়। এর ফলে ১৮১১ সালের মাঝে স্প্যানিশরা ফকল্যান্ডস ছেড়ে যায়। ১৮১৬ সালে আর্জেন্টিনা নামে নতুন দেশের ঘোষণা দেয়া হয়। নতুন দেশ আর্জেন্টিনা দক্ষিণ আটলান্টিকে স্পেনের দখলে থাকা সকল দ্বীপই নিজের বলে দাবি করে। ১৮২৩ সালে আর্জেন্টিনা এক জার্মান নাগরিক লুই ভারনেটকে ফকল্যান্ডসের এলাকায় মৎস্য সম্পদের দেখাশুনার দায়িত্ব দেয়। কিন্তু ঘটনা অন্যদিকে মোড় নেয় যখন নতুন উদ্দমী দেশ যুক্তরাষ্ট্র এখানে হস্তক্ষেপ করে। ১৮৩১ সালে ভারনেট দু’টা মার্কিন মাছ ধরার জাহাজ আটক করলে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করে। মার্কিন নৌবাহিনীর অফিসার সিলান ডানকানের নেতৃত্বে যুদ্ধজাহাজ ‘লেক্সিংটন’ এই দ্বীপের কর্তৃত্বকে ধ্বংস করে দ্বীপের উপর কোন রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণকে অবৈধ ঘোষণা করে। এই ঘটনাই ব্রিটিশকে সরকারকে জাগিয়ে তোলে। সেবছরের ডিসেম্বরে ক্যাপ্টেন জেমস অনস্লোর নেতৃত্বে দু’টা ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ ‘ক্লিও’ এবং ‘টাইন’ এসে দ্বীপের উপর নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। ১৮৩৩ সাল থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশরা ফকল্যান্ডসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান নৌবাহিনীর এশিয়া স্কোয়াড্রন দক্ষিণ আমেরিকা ঘুরে দেশে ফেরত যাবার সময় ফকল্যান্ডসএর উপকূলে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর হাতে ধ্বংস হয়। এই যুদ্ধ দক্ষিণ আমেরিকা ঘুরে প্রশান্ত মহাসাগরের সাথে আটলান্টিক মহাসাগরের যোগাযোগ পথ নিয়ন্ত্রণে ফকল্যান্ডসকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
আর্জেন্টিনার পুনর্জাগরণের চেষ্টা?
১৯৮২ সালের এপ্রিলে আর্জেন্টিনার সামরিক বাহিনী ‘অপারেশন রোজারিও’এর মাধ্যমে ফকল্যান্ডস দখল করে নেয়। সেসময় ফকল্যান্ডসের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ছিল ১’শ জনেরও কম সেনা এবং নাবিক। ফকল্যান্ডসএর বেসামরিক নাবিকদের মাঝ থেকে ২৫ জন স্বেচ্ছাসেবক নিয়োজিত ছিল নিরাপত্তার জন্যে। ব্রিটিশরা সাড়ে ১২ হাজার কিঃমিঃ পথ পেরিয়ে ফকল্যান্ডসে এসে যুদ্ধ করে জয়লাভ করে। তবে যুদ্ধে আর্জেন্টাইন বিমান বাহিনীর আক্রমণে ব্রিটিশদের বেশ কয়েকটা জাহাজ ধ্বংস হয়। বিমান আক্রমণকে আটকাবার জন্যে ব্রিটিশ রয়াল নেভি তার বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের ‘হ্যারিয়ার’ ফাইটার বিমানগুলিকে ব্যবহার করেছিল। তবে আর্জেন্টিনার হাতে ফরাসি নির্মিত সুপারসনিক ‘মিরাজ’ যুদ্ধবিমান ছাড়াও ছিল মার্কিন নির্মিত ‘এ৪ স্কাইহক’ এবং ফরাসি নির্মিত ‘সুপার এটেনডার্ড’ যুদ্ধবিমান। ‘সুপার এটেনডার্ড’ যুদ্ধবিমান থেকে নিক্ষেপিত ফরাসি ‘এক্সোসেট’ জাহাজধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে কয়েকটা ব্রিটিশ জাহাজ ধ্বংস হয়। এই যুদ্ধের ফলে একটা ব্যাপার সবসময়ের জন্যে পরিবর্তন হয়ে যায়; আর তা হলো, ব্রিটিশরা আর কখনোই ফকল্যান্ডসের নিরাপত্তাকে হাল্কাভাবে নিতে পারবে না। ফকল্যান্ডসে ব্রিটিশরা একদিকে যেমন বেশি সামরিক শক্তি মোতায়েন রাখছে, তেমনি তারা নিশ্চিত করছে যে, আর্জেন্টিনার হাতে যেন ১৯৮২এর মতো বিমান শক্তি না যায়। আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ব্রিটেনের রয়েছে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা; আর সেই নিষেধাজ্ঞা কতটা সফল, তা পরবর্তী ঘটনাগুলিই বলে দেয়।
তিন দশক আগের আর্জেন্টিনার বিমান বাহিনী আজ মৃতপ্রায়। নতুন যুদ্ধবিমান কেনার জন্যে হন্যে হয়ে ঘুরলেও কেউই আর্জেন্টিনাকে বিমান দিতে চাইছে চাইছে না। ব্রিটেনের ‘দ্যা এক্সপ্রেস’ পত্রিকার এক খবরে বলা হচ্ছে যে, ২০১৩ সালে আর্জেন্টিনা স্পেনের কাছ থেকে ১৬টা পুরোনো ফরাসি নির্মিত ‘মিরাজ এফ১’ সুপারসনিক ফাইটার বিমান কেনার চুক্তি করে। স্পেনের দক্ষিণে ব্রিটিশ অধিকৃত জিব্রালটার নিয়ে স্পেনের যে নীতি রয়েছে, সেই নীতির মতোই আর্জেন্টিনার ফকল্যান্ডস নীতি। তবে এই চুক্তি ব্রিটেনের কূটনৈতিক চাপে বাতিল হয়ে যায়। ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মাঝে আর্জেন্টিনা ইস্রাইল থেকে ১২টা পুরোনো ‘কাফির সি১’ ফাইটার বিমান ক্রয়ের চেষ্টা করে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এই বিমানে ব্যবহৃত ‘জে৭৯’ ইঞ্জিন আর্জেন্টিনার কাছে বিক্রি করতে রাজি না হওয়ায় এটাও ভেস্তে যায়। যুক্তরাষ্ট্র চায়নি ব্রিটেনের সাথে সম্পর্ককে খারাপ করে ফেলতে। তবে তা নিঃসন্দেহে মার্কিনীদের কূটনৈতিক দিক থেকে সুবিধা দিয়েছে। ‘রয়টার্স’এর এক খবরে বলা হচ্ছে যে, ২০১৫ সালে আর্জেন্টিনা সুইডেন থেকে ২৪টা অত্যাধুনিক ‘সাব জেএএস৩৯ গ্রিপেন’ ফাইটার বিমান কেনার চেষ্টা করলেও তা তেমন কোন আলোচনা ছাড়াই বাতিল হয়ে যায়। এই বিমানে রাডারসহ ৩০ শতাংশ যন্ত্রাংশ ব্রিটিশদের হবার কারণে এই বিমান আর্জেন্টিনায় রপ্তানিতে ব্রিটিশ সরকারের বাধা নিশ্চিত ছিল। বিমানের ব্রিটিশ যন্ত্রাংশ অন্য দেশের যন্ত্রাংশ দিয়ে প্রতিস্থাপন করার প্রশ্নও আসেনি। ২০১৭ সালে ফরাসিরা আর্জেন্টিনার কাছে ফরাসি নৌবাহিনী থেকে রিটায়ার করা ৫টা ‘সুপার এটেনডার্ড’ ফাইটার বিক্রি করছে বলে ঘোষণা দেন ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত পিয়েরে হেনরি গুইনার্দ। কিন্তু ২০১৮ সালের মাঝে কয়েকটা বিমান দেবার কথা থাকলেও ২০১৯ সালের মে মাসে প্রায় দুই বছর পরে বিমানগুলি আর্জেন্টিনা পৌঁছে; তাও আবার আধুমিকায়ন ছাড়া।
আর্জেন্টিনার সর্বশেষ চেষ্টাটা ছিল দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ‘এফএ৫০’ সুপারসনিক ফাইটার জেট ক্রয়। প্রতিরক্ষা ম্যাগাজিন ‘আইআইচএস জেন্স’ বলছে যে, ব্রিটিশ সরকার এটাও আটকে দিয়েছে। কোরিয়ান কোম্পানি ‘কেএআই’এর এক চিঠিতে বলা হয় যে, এই বিমানে ব্রিটিশ নির্মিত ছয়টা যন্ত্রাংশ রয়েছে; যেকারণে কোরিয়ার পক্ষে এই বিমান আর্জেন্টিনার কাছে বিক্রি করা সম্ভব নয়। আর্জেন্টিনা ২০১৫ সাল থেকেই চীন থেকে যুদ্ধবিমান কিনতে পারে বলে শোনা যাচ্ছিলো; কিন্তু সেটাও এতদিনে কোন লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি।
সাড়ে ১২ হাজার কিঃমিঃ পেরিয়ে নিরাপত্তা
ব্রিটিশরা ফকল্যান্ডসের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ১৯৮২ সালের যুদ্ধের পর থেকে সেখানে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করেছে। ১ হাজারের বেশি সৈন্য এবং নাবিক এখন সেখানকার নিরাপত্তা দিচ্ছে বলে বলছে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর ম্যাগাজিন ‘ফোর্সেস নেটওয়ার্ক’। ১৯৯০এর দশক থেকে সেখানে ৪টা ‘টর্নেডো এফ৩’ যুদ্ধবিমান মোতায়েন ছিল। ১৭ বছর পর ২০০৯ সালে এই বিমানগুলিকে প্রতিস্থাপন করে ৪টা অত্যাধুনিক ‘টাইফুন’ ফাইটার। দক্ষিণ আমেরিকার মিডিয়া ‘মেরকোপ্রেস’ বলছে যে, এই বিমানগুলিকে ফকল্যান্ডসে পৌঁছাতে সহায়তা দেয় ১০টা বিমান; যার মাঝে ছিল ৬টা রিফুয়েলিং বিমান, ৩টা সার্চ রেসকিউ বিমান এবং ১টা ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান। স্প্যানিশ ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ এবং দক্ষিণ আটলান্টিকে ব্রিটিশ এসেনশন দ্বীপ থেকেও বিমানগুলি সহায়তা নেয়। ১৮ ঘন্টার এই ফ্লাইটে মোট ৭ বার আকাশে জ্বালানি নিতে হয়েছিল বিমানগুলিকে। ব্রিটিশ বিমান বাহিনীর স্কোয়াড্রন লীডার পিট মরগান বলেন যে, ‘টাইফুন’ বিমানগুলি মোতায়েন করার মিশন ‘অপারেশন টাইফুন টেম্পেস্ট ট্রেইল’ ব্রিটেনের সামরিক বাহিনীর বিশাল দূরত্বে কৌশলগত মিশনে যাবার সক্ষমতাকে তুলে ধরে।
ফকল্যান্ডসের বর্তমান নিরাপত্তায় রয়েছে রয়াল নেভির একটা অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল। বছরের ছয় মাস ব্রিটিশ এন্টার্কটিক প্যাট্রোল জাহাজ ‘প্রোটেক্টর’ এই অঞ্চলে থাকে। একটা ফ্রিগেট বা ডেস্ট্রয়ার এবং একটা সাপ্লাই জাহাজ মাঝে মাঝে দক্ষিণ আটলান্টিকে প্যাট্রোল দিতে আসে। ১৯৮২এর যুদ্ধের পর দ্বীপে ‘মাউন্ট প্লিজ্যান্ট’ নামে একটা নতুন বিমান ঘাঁটি তৈরি করা হয়। সেখানে ১৬টা ফাইটার বিমান রাখার জন্যে দুর্ভেদ্য বাঙ্কার নির্মাণ করা হয়েছে। এই ঘাঁটিতে একটা ‘এ৪০০এম’ পরিবহণ বিমান সর্বদা থাকছে, যা দ্বীপের আশেপাশে আকাশ প্যাট্রোল দেয়। আর প্রতি সপ্তাহে দুইবার একটা ‘ভয়েজার’ ট্যাঙ্কার পরিবহণ বিমান ফকল্যান্ডস এবং ব্রিটেনের মাঝে যাতায়াত করে। এই বিমান পথিমধ্যে পশ্চিম আফ্রিকার সেনেগালের দাকারে জ্বালানি নিলেও বিরতি না নিয়েই ফকল্যান্ডসে অবতরণ করার রেকর্ডও রয়েছে। সামরিক ঘাঁটির দক্ষিণেই নতুন একটা বন্দরও নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে বড় বাণিজ্যিক জাহাজও ভিড়তে পারে। দ্বীপের বিমান প্রতিরক্ষা নিশ্চিতে একটা বিমান ধ্বংসী ‘র্যাপিয়ার’ ক্ষেপণাস্ত্রের ইউনিটও রয়েছে। অনেকেই মনে করেন যে, ব্রিটিশ ‘এসটিউট ক্লাস’এর পারমাণবিক সাবমেরিনগুলি দক্ষিণ আটলান্টিকে টহল দেয়; যদিওবা সেই তথ্য নিশ্চিতভাবে জানা দুষ্কর। ১৯৮২ সালে ব্রিটিশ সাবমেরিনের টর্পেডোর আঘাতে আর্জেন্টিনার যুদ্ধজাহাজ ‘জেনারেল বেলগ্রানো’ ডুবে গেলে ৩’শ ২৩ জন নাবিক প্রাণ হারায়। এরপর আর্জেন্টিনার নৌবাহিনী আর ব্রিটিশদের চ্যালেঞ্জ দিতে বন্দর থেকে বের হয়নি। সেই ইতিহাস এখনও ব্রিটিশদের শক্তি যোগায়।
ফকল্যান্ডসে অবস্থিত ব্রিটিশ বিমান বাহিনীর ‘টাইফুন’ ফাইটার বিমানগুলিকে এড়িয়ে দ্বীপের উপর হামলা করার সামরিক ক্ষমতা থেকে আর্জেন্টিনা এখন বহুদূরে। থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘গ্লোবাল রিস্ক ইনসাইট’ বলছে যে, আর্জেন্টিনা ফকল্যান্ডস দাবি করে তার জনগণকে অর্থনৈতিক দৈন্যদশা থেকে দৃষ্টি সড়াবার চেষ্টা করছে মাত্র। অপরদিকে ১৯৮২ সালের ঘটনা থেকে ব্রিটেন শিক্ষা নিয়েছে; কৌশলগত ম্যাজেলান প্রণালী এবং ড্রেইক প্যাসেজের পাহাড়াদার ফকল্যান্ডসের নিয়ন্ত্রণ ব্রিটেন দ্বিতীয়বার ছাড়তে রাজি নয়। তবে এজন্য ব্রিটেন খুব বেশি একটা শক্তি খরচ করতে রাজি নয়। যুদ্ধবিমানের জন্যে আর্জেন্টিনা সারা বিশ্বের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে। কিন্তু ব্রিটেনের কূটনৈতিক দক্ষতাকে পাশ কাটাবার মতো সক্ষমতার ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি আর্জেন্টিনা। আর্জেন্টিনার কাছে সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি না করার শর্ত যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, ইস্রাইল বা ফ্রান্সের মতো দেশগুলিকে ব্রিটেনের সাথে কূটনৈতিক দরকষাকষির সুযোগ দিয়েছে। তথাপি এই ঘটনাগুলি বিশ্বব্যাপী ব্রিটেনের রাজনৈতিক প্রভাবের একটা উদাহরণ হিসেবে কাজ করে। এই মুহুর্তে দক্ষিণ আটলান্টিকে দৃষ্টি দেবার মতো সময় ব্রিটেনের নেই। ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ এখন ভূমধ্যসাগর, মধ্যপ্রাচ্য, ভারত মহাসাগর এবং তৎসংলগ্ন পূর্ব এশিয়া নিয়ে অনেক বেশি ব্যস্ত; কারণ চীনের উত্থানের পর থেকেই সেখানেই ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বেশি। বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমার সাথেসাথে ব্রিটেন ফাঁকা স্থানগুলিকে পূর্ণ করতে মরিয়া; দক্ষিণ আটলান্টিকের মতো এলাকায় আটকে থাকার সময় কোথায় ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর?
Friday, 6 November 2020
‘কোয়াড’ এবং ‘এক্সারসাইজ মালাবার ২০২০’ ... কার জন্যে কি বার্তা?
৩রা নভেম্বর থেকে বঙ্গোপসাগরে শুরু হয়েছে যৌথ নৌমহড়া ‘এক্সারসাইজ মালাবার ২০২০’; যেখানে অংশ নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান এবং ভারতের নৌবাহিনী। ‘মালাবার’এর ২৪তম এই আয়োজনে এবার যোগ দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। আর করোনাভাইরাসের বাস্তবতাকে সামনে রেখে মহড়ার নিয়মকানুনে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। ২০২০এর এই মহড়ার এটা হলো প্রথম ধাপ। দ্বিতীয় ধাপ অনুষ্ঠিত হবে নভেম্বরের শেষে। এই মহড়ায় অংশ নিচ্ছে মার্কিন নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার ‘জন এস ম্যাককেইন’, অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীর ফ্রিগেট ‘বালারাট’, জাপানের নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার ‘ওনামি’, ভারতীয় নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার ‘রণবিজয়’, ফ্রিগেট ‘শিভালিক’, সাপ্লাই জাহাজ ‘শক্তি’, সাবমেরিন ‘সিন্ধুরাজ’ এবং একটা ‘পি৮আই’ এন্টিসাবমেরিন বিমান। মার্কিন সামরিক বাহিনীর পত্রিকা ‘নেভি টাইমস’ কোন রাখঢাক না রেখেই বলছে যে, এই মহড়ার আয়োজন করা হয়েছে চীনকে টার্গেট করে। চীনকে টার্গেট করা হয়েছে ইন্দোপ্যাসিফিকে চীনা প্রভাব মোকাবিলার উদ্দেশ্যে। বিশেষ করে ভারত মহাসাগরে চীনের প্রভাব বিস্তারে ভারত যখন বিচলিত, তখন এই চার দেশের মাঝে তৈরি হয়েছে ‘কোয়াড’ নামের এক কৌশলগত জোট।
‘জাপান টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে ‘এক্সারসাইজ মালাবার ২০২০’কে সরাসরি ‘কোয়াড’এর সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, কিছুদিন আগেই টোকিওতে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান এবং ভারতের শীর্ষ কূটনীতিকেরা মিলিত হয়েছিলেন ‘কোয়াড’এর অংশ হিসেবে। যদিও সেই বৈঠক থেকে বিশেষ কোন ঘোষণা আসেনি, তথাপি এটা চীনের প্রতি একটা বার্তা হিসেবেই সকলে দেখেছেন। যদিও এই মহড়াকে অফিশিয়ালি ‘কোয়াড’এর অংশ বলে ঘোষণা দেয়া হয়নি, তবুও বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, এই মহড়া মূলতঃ ইন্দোপ্যাসিফিকে চীনের সামরিক এবং কূটনৈতিক প্রভাবকে মোকাবিলা করার উদ্দেশ্যেই আয়োজন করা হয়েছে। ধীরে ধীরে এই মহড়াকে হয়তো ‘কোয়াড’এর অংশ বলেই বলা হবে। এই মহড়ায় ১৩ বছরের মাঝে প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়া অংশ নিচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিন্ডা রেইনল্ডস এক বার্তায় বলেন যে, এই মহড়ার মাধ্যমে ভারতের সামরিক বাহিনীর সাথে অস্ট্রেলিয়ার আস্থা বৃদ্ধি পাবে। ভারতীয় পত্রিকা ‘ইকনমিক টাইমস’ও এই মহড়াকে ‘কোয়াড মালাবার’ বলে আখ্যা দিচ্ছে। ভারতের জন্যে এই মহড়া এমন এক সময়ে এলো, যখন চীনের সাথে হিমালয়ের পাদদেশে সংঘাতের পর ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলির একটাও ভারতকে সমর্থন দেয়া থেকে বিরত থেকেছে। উল্টো এই সময়ের মাঝে চীনের সাথে পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং নেপালের সম্পর্কোন্নয়ন হয়েছে।
ভারতীয় চিন্তাবিদেরা এহেন পরিস্থিতিতে ভারতের অসহায়ত্বকে আলোচনায় নিয়ে এসেছেন। ভারতের ‘দ্যা প্রিন্ট’ পত্রিকার প্রধান সম্পাদক প্রবীণ সাংবাদিক শেখর গুপ্ত বলছেন যে, বহুদিন ধরেই ভারত তার প্রতিবেশী দেশগুলির সাথে সম্পর্কোন্নয়নে মনোযোগী হয়নি; আর সেই সুযোগেই চীন দক্ষিণ এশিয়াতে তার অবস্থান শক্ত করে নিয়েছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন যে, বাংলাদেশের ঐকান্তিক সহায়তায় ভারত তার উত্তরপূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহীদের দমনে বিরাট সাফল্য পেয়েছে; অথচ প্রতিদানে ভারত তার নাগরিকত্ব আইন পাস করার পর বিরাট এক মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ‘বাংলাদেশী’ আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেবার কথা বলেছে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্কোন্নয়ন কঠিন হয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। একই সময়ে চীন বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্যের জন্যে শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা দিয়েছে। এছাড়াও চীনারা বাংলাদেশ, শ্রীলংকা এবং নেপালেও বিনিয়োগ করে তাদের প্রভাব বিস্তার করেছে। এরই মাঝে ‘আইএমএফ’এর হিসেবে ২০২০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয়কে ভারতের চাইতে বেশি হবে বলে ঘোষণা করা হলে ভারতীয়দের মাঝে অনেকেই ব্যাপারটা স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেননি। যদিও শ্রীলংকা এবং মালদ্বীপের মাথাপিছু আয় ভারতের কয়েক গুণ, তথাপি সেটা ভারতীয়দের চিন্তার কারণ ছিলোনা কখনোই। কিন্তু বাংলাদেশের মাথাপিছু আয়ের খবরটা পত্রপত্রিকায় আসার সাথেসাথেই ভারতীয়রা চিন্তিত হয়ে গিয়েছেন। শেখর গুপ্তের কথায় বোঝা যায় যে, ভারত সরকার বাংলাদেশকে তাদের অতি কাছের বন্ধু বললেও বাস্তবতা অতটা সহজ নয়। বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ ছাড়াও চীন থেকে বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের ব্যাপারটাও ভারত ভালো চোখে দেখে না। বিশেষ করে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্যে সাবমেরিন কেনার ব্যাপারটা ভারতীয় চিন্তাবিদেরা একেবারেই মেনে নিতে পারেননি। এর উপরে আবার বাংলাদেশের কক্সবাজারে চীনা সহায়তায় তৈরি হচ্ছে স্থায়ী সাবমেরিন ঘাঁটি, যা ‘এশিয়া টাইমস’ বলছে যে, ভারতের সাথে চীনের উত্তেজনাকে আরও উস্কে দেবে।
ভারতের ‘দ্যা হিন্দু’ পত্রিকা বলছে যে, গত অগাস্টে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে নীতিগতভাবে অস্ট্রেলিয়াকে ‘মালাবার’ মহড়ায় আমন্ত্রণ জানাবার ব্যাপারে ঐকমত্য হয়। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, হিমালয়ের পাদদেশে লাদাখে চীনের সাথে ভারতের সংঘাত এই সিদ্ধান্তের পিছনে ভূমিকা রাখতে পারে বলে অনেকেই ধারণা করছেন। ‘মালাবার’ এবং ‘কোয়াড’এর যোগসূত্র এখানেই। থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর সিকিউরিটি স্টাডিজ’ বা ‘আইআইএসএস’এর সিঙ্গাপুর অফিসের সিনিয়র ফেলো আলেক্সান্ডার নেইল ‘বিবিসি’কে বলছেন যে, ‘কোয়াড’এর কর্মকান্ড আটকে থাকার মূল কারণ ছিল ভারত; যারা ঐতিহাসিকভাবেই জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের অংশ ছিল। আর এখন এই জোটের সামনে চলে আসাটাও হয়েছে ভারতের জন্যেই, যারা এখন চীনের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত রয়েছে।
অক্টোবর মাসেই মার্কিন উপপররাষ্ট্র সচিব স্টিফেন বিগান এবং পররাষ্ট্র সচিব মাইক পম্পেও দক্ষিণ এশিয়া ঘুরে যান। সফরকালে তারা মার্কিন ‘ইন্দোপ্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’তে যোগ দেয়ার জন্যে দক্ষিণ এশিয়ার নেতৃবৃন্দকে আহ্বান জানান। বাংলাদেশ থেকে সরাসরিই বলে দেয়া হয় যে, বাংলাদেশ কোন নিরাপত্তা জোটে যুক্ত হবে না। আর মার্কিনীদের এই কৌশলের অধীনে বাংলাদেশ কোন অস্ত্র কিনতেও অগ্রহী নয় বলে জানিয়ে দেয়া হয়। এর প্রায় দু’সপ্তাহ পরেই ‘এক্সারসাইজ মালাবার’এর তৃতীয় দিনে ৫ই নভেম্বর বাংলাদেশ নৌবাহিনীর পাঁচটা জাহাজ কমিশনিং করা হয়; যার মাঝে তিনটা ছিল চীনা নির্মিত। এর আগেও ১৮ই জুন হিমালয়ে ভারতের সাথে চীনের সংঘাতের চরম অবস্থায় বাংলাদেশ একটা চীনা নির্মিত কর্ভেট কমিশনিং করে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইন্দোপ্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’ এবং ‘কোয়াড’এর মূল লক্ষ্য হলো ইন্দোপ্যাসিফিককে চীনা প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা। এই লক্ষ্যে বঙ্গোপসাগরে নৌমহড়া শুধু চীনের জন্যেই নয়, চীনকে বন্ধু ভাবা যেকোন রাষ্ট্রের জন্যেই বার্তা। ঘটনাপ্রবাহই বলে দিচ্ছে যে, বঙ্গোপসাগরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এখন আরও এক ধাপ এগুলো, যেখানে সামনের দিনগুলিতে অস্ত্রের ঝনঝনানি আরও বৃদ্ধি পাবে।
Monday, 2 November 2020
‘সাইবার যুদ্ধ’ ... এটাই কি যুদ্ধের ভবিষ্যৎ?
গত ১৩ই অক্টোবর নরওয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এরিকসেন সোরেইডে ঘোষণা দেন যে অগাস্ট মাসে নরওয়ের পার্লামেন্টে সাইবার হামলার পিছনে দায়ী হলো রাশিয়া। তিনি কোন প্রমাণ দেখানো ছাড়াই বলেন যে, প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী নরওয়ের সরকার ধারণা করতে পারছে যে, এই হামলা রাশিয়াই করেছে। মস্কো অবশ্য এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করে এবং বলে যে, এটা একটা মারাত্মক এবং ইচ্ছাকৃত উস্কানি। অসলোতে রুশ দূতাবাস থেকে বলা হয় যে, রাশিয়ার ইন্টারনেটের বিরুদ্ধে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ হামলা হয়; কিন্তু তা রাশিয়াকে কখনোই অধিকার দেয়না হামলার উৎস যেই দেশে, সেই দেশের নেতৃত্বকে কোন বাছবিচার ছাড়াই অভিযুক্ত করার। সেপ্টেম্বরে নরওয়ের সরকার বলে যে, কয়েকজন কর্মকর্তার ইমেইল একাউন্ট হ্যাকিং হয়েছে এবং কিছু তথ্য ডাউনলোড করা হয়েছে। তবে সমস্যার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা তারা জনসম্মুখে আনেননি। ‘বিবিসি’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, নরওয়ের সাথে রাশিয়ার সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে ভালো যাচ্ছে না। গত অগাস্টে নরওয়ে রুশ এক কূটনীতিবিদকে গোয়েন্দাবৃত্তির অভিযোগে বহিষ্কার করে। রাশিয়াও এর প্রতিবাদে নরওয়ের এক কূটনীতিককে বহিষ্কার করে। ২০১৮ সালে নরওয়ে সরকার এক রুশ নাগরিককে গোয়েন্দাবৃত্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার করলেও পরে উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে ছেড়ে দেয়। এবছরের শুরুতেই নরওয়ের সামরিক ইন্টেলিজেন্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, রাশিয়া নরওয়েতে প্রভাব বিস্তারের অপারেশন চালাচ্ছে; যার মাধ্যমে সরকার, নির্বাচন পদ্ধতি এবং মিডিয়ার উপর জনগণের আস্থা কমিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। শুধু নরওয়েই নয়, অন্যান্য দেশও সাইবার হামলার জন্যে অন্য রাষ্ট্রকে, বিশেষ করে রাশিয়া এবং চীনকে অভিযুক্ত করছে। গত জানুয়ারি মাসে জার্মানিতে চ্যান্সেলর এঙ্গেলা মার্কেল সহ কয়েক’শ রাজনীতিবিদের ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করে অনলাইনে প্রকাশ করে দেয়া হয়। আর গত বছর অস্ট্রেলিয়ার সাইবার ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি অভিযোগ করে যে, চীন অস্ট্রেলিয়ার পার্লামেন্টে হ্যাকিং করে ঢোকার চেষ্টা করেছে। চীন অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছিল। ঘটনাগুলি বর্তমান বিশ্বে চলা এই ‘সাইবার যুদ্ধ’কেই হাইলাইট করছে। এর বর্তমানে এবং ভবিষ্যৎ এখন আলোচনার বিষয়বস্তু।
গত ১৯শে অক্টোবর মার্কিন এবং ব্রিটিশ সরকার একটা রুশ হ্যাকিং দলের বিরুদ্ধে লম্বা অভিযোগ দায়ের করে। ‘স্যান্ডওয়ার্ম’ নামে পরিচিত ছয় সদস্যের এই হ্যাকিং গ্রুপের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়, তা মাঝে রয়েছে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ গ্রিডে হামলা, ২০১৭ সালে ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর নির্বাচনে জেতার সময় অনলাইনে প্রভাব বিস্তার, ২০১৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় অলিম্পিকের সময় সাইবার হামলা, এবং ২০১৮ সালে ব্রিটেনের সলসবুরিতে নার্ভ গ্যাস আক্রমণের সময় তদন্তের উপর নজরদারি। এছাড়াও ২০১৬ সালে ‘ফ্যান্সি বেয়ার’ নামে একই গ্রুপ মার্কিন প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনের আগে হিলারি ক্লিন্টন এবং ডেমোক্র্যাটিক জাতীয় কমিটির ইমেইল হ্যাকিং করেছিল বলে বলা হয়। অভিযোগে রুশ ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস ‘জিআরইউ’এর অংশ এই গ্রুপের অফিস মস্কোর বাইরে খিমিকিতে ২২ কিরোভা স্ট্রীটের এক নীল রঙের কাঁচের সুউচ্চ ভবনে রয়েছে বলে বলা হয়। “দ্যা টাওয়ার” নামে পরিচিত সেই ভবনে কাজ করা এই গ্রুপ ‘ইউনিট ৭৪৪৫৫’ নামে পরিচিত। লম্বা সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের সমন্বয়ে গঠিত ‘ফাইভ আইজ’ ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ এবং গুগল, ফেইসবুক, সিসকো এবং টুইটারের সাথে যৌথভাবে তদন্ত করে মার্কিন অভ্যন্তরীণ কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই অভিযোগ পেশ করে। ব্রিটেনের ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকার সাথে সাক্ষাতে ‘জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি’র স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের প্রফেসর থমাস রিড বলেন যে, অভিযোগপত্রের বিষদ বিবরণ দেখে মনে হচ্ছে যে, ‘ফাইভ আইজ’ ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ রুশ ইন্টেলিজেন্সের ভেতরকার বহু ব্যাপার সম্পর্কে যথেষ্টই ওয়াকিবহাল; বিশেষ করে যেসকল তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, সেই তথ্যগুলি এখন আর গোপনীয় মনে করা হচ্ছে না বলেই প্রকাশ করা হয়েছে। নিজেদের কর্মকান্ড গোপন রাখার জন্যে ‘ইউনিট ৭৪৪৫৫’ হয়তো অনেক চেষ্টাই করেছে; তথাপি কিছু ক্ষেত্রে তারা যথেষ্টই অদূরদর্শিতা দেখিয়েছে। ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স ‘বেলিংক্যাট’এর আরিক টোলার বলছেন যে, ছয়জনের মাঝে তিনজনই তাদের গাড়ি রেজিস্ট্রেশন করিয়েছেন একই ঠিকানা থেকে। এই ঠিকানাই সেই ইউনিটকে নির্দেশ করে। এই একই ঠিকানায় মোট ৪৭ জন লোক তাদের গাড়ি রেজিস্ট্রেশন করিয়েছে। হয়তো এরা সকলেই ‘জিআরইউ’এর হ্যাকার দলের সদস্য।
পশ্চিমা নেতৃবৃন্দ ইতোমধ্যেই এই সাইবার হামলাকে ‘সাইবার যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন এবং সেই লক্ষ্যে নিজেদের প্রস্তুতি বৃদ্ধি করার কথা বলছেন। গত ৩০শে সেপ্টেম্বর ব্রিটেনের সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ কর্মকর্তা জেনারেল নিক কার্টার ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘পলিসি এক্সচেঞ্জ’এর এক আলোচনায় দাবি করেন যে, রাশিয়া এবং চীন সাইবার আক্রমণ, মিথ্যা তথ্য ছড়ানো এবং ব্যাপক গোয়েন্দাবৃত্তির মাধ্যমে পশ্চিমা দেশগুলির উপর “রাজনৈতিক যুদ্ধ” চালাচ্ছে। এর লক্ষ্য হলো, অফিশিয়ালি কোন সংঘাতে না জড়িয়েই পশ্চিমা দেশগুলির ইচ্ছাশক্তিকে ভেঙ্গে ফেলা। তিনি আরও বলেন যে, ব্রিটেনের প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলি যুদ্ধে যাবার জন্যে প্রস্তুত নয়; তথাপি তারা সামরিক সংঘাতের সংজ্ঞার ঠিক বাইরে থেকে অপারেশন চালিয়ে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করছে। তিনি উদাহরণ হিসেবে ২০১৭ সালে ইউক্রেনের ব্যাংক এবং জ্বালানি কোম্পানির উপর রুশ হামলার অভিযোগকে টেনে আনেন। একইসাথে তিনি স্যাটেলাইট সিস্টেমকে সমস্যা ফেলার জন্যে বেইজিংএর প্রকল্পগুলির উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন যে, তাদের শত্রুদের যুদ্ধ ছাড়া জয়লাভের এই কৌশলকে হারানো খুবই কঠিন; কারণ তা পশ্চিমা চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ ‘স্বাধীনতা’কে খর্ব না করে মোকাবিলা করা যাবে না। জেনারেল কার্টার রাশিয়া এবং চীনকে এক কাতারে ফেললেও কেউ কেউ এই দুই দেশের কর্মকান্ডকে আলাদা করে দেখছেন। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর প্রবীন সাংবাদিক ডেভিড স্যাঙ্গার মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’এর সাথে এক সাক্ষাতে রাশিয়া এবং চীনের সাইবার কর্মকান্ডের মাঝে পার্থক্য করতে গিয়ে বলেন যে, রুশরা হলো ‘টর্নেডোর মতো’, আর চীনারা হলো ‘জলবায়ু পরিবর্তন’এর মতো। তিনি আরও বলেন যে, চীনারা বিশ্বব্যাপী নিজেদের একটা ভালো প্রতিচ্ছবি তুলে ধরতে চায়; যেকারণে তারা সাইবার যুদ্ধের মাঝে শুধু গোয়েন্দাবৃত্তিকেই প্রধান্য দিচ্ছে। তারা এই যুদ্ধের ‘লাল দাগ’ অতিক্রম করতে চায় না। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড্যানিয়েল ওয়াগনার ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’এর এক লেখায় বলছেন যে, চীন ইতোমধ্যেই সাইবার যুদ্ধের দিক দিয়ে পশ্চিমাদের চাইতে অনেক এগিয়ে গেছে। এখন যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য দেশের করার মতো তেমন কিছুই নেই। তারা সর্বোচ্চ চীনাদের মতো করেই নিজেদের কর্মপদ্ধতিকে গোছাতে পারে যাতে চীনের সমকক্ষ হওয়া যায়। এর অর্থ হলো খবরের পিছনে গোপনে সাইবার যুদ্ধ চালিয়ে নেয়া, যা ইতোমধ্যেই ভবিষ্যতের যুদ্ধকে সংজ্ঞায়িত করছে।
সাইবার যুদ্ধের পরিধি অনেক দূর পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছে এবং প্রতিদিনই নতুন নতুন জায়গা এর মাঝে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই অভিযোগ করেছে যে, রাশিয়া এবং চীন পশ্চিমা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি এবং মেডিক্যাল গবেষণা সংস্থার ভেতর হ্যাকিং করে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনের ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়েছে। ভারতীয় থিংকট্যাঙ্ক ‘অবজার্ভার রিচার্চ ফাউন্ডেশন’এর এক প্রতিবেদনে সাইবার নিরাপত্তাকে ভারতের পারমাণবিক স্থাপনাগুলির নিরাপত্তার একটা প্রধান স্তম্ভ বলে উল্লেখ করা হয়। পারমাণবিক স্থাপনার অন্যান্য নিরাপত্তার সাথে সাথে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ হুমকি মাথায় রেখেই সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করতে বলা হয়। সাইবার হামলাকে একটা প্রতিবাদ বা প্রতিআক্রমণের পদ্ধতি হিসেবেও দেখা শুরু হয়েছে। কিছুদিন আগেই ফ্রান্সে রাসূল (সাঃ)কে বিদ্রুপ করা নিয়ে ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর বক্তব্যের পর মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে ফ্রান্সের বিভিন্ন ওয়েবসাইটে সাইবার হামলা শুরু হয়। কোন রাষ্ট্র এই হ্যাকিংএ সরাসরি সমর্থন না দিলেও তা মুসলিম বিশ্বের আবেগের একটা বহিঃপ্রকাশ বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
পুঁজিবাদী বিশ্বে অর্থসম্পদের গুরুত্ব যেহেতু সর্বোচ্চ, তাই অর্থসম্পদ আহরণ এবং তার দখল নিয়ে প্রতিযোগিতাই হয়ে গিয়েছে দুনিয়ার মানুষের মূল কর্মকান্ড। এই প্রতিযোগিতায় অপরের আর্থিক ক্ষতি করা এবং একইভাবে বিপক্ষের হামলা থেকে নিজের অর্থসম্পদ রক্ষা করাও হয়ে গিয়েছে একটা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার মূল উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্য অর্জনে সাইবার যুদ্ধ সবচাইতে কম খরচের যুদ্ধ; কারণ এতে কোন বিশাল সৈন্যবাহিনী পুষতে হয়না; আর নিজের সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনাও কম থাকে। আর করোনাভাইরাসের মহামারি এবং বৈশ্বিক মন্দার মাঝে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি সামরিক হামলার চাইতে কম নয়। তবে অর্থসম্পদ বাঁচাতে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে পশ্চিমারা তাদের আদর্শের পবিত্র স্তম্ভ ‘স্বাধীনতা’কেই বিসর্জন দিচ্ছে। ‘স্বাধীনতা’ নিশ্চিত করতে গিয়ে স্বাধীনতা খর্বের পরিকল্পনাগুলি পশ্চিমা আদর্শের ভিতে আঘাত করছে। আর অপরদিকে সারা বিশ্ব এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে যুক্ত থাকার কারণে তথ্য চুরি করা, ব্যবসায়িক ক্ষতি করা, জননিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটানো, নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, ইত্যাদি কর্মকান্ড এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এর সাথে রাজনৈতিক লক্ষ্য যুক্ত হওয়াতেই ‘সাইবার যুদ্ধ’ শব্দগুচ্ছের অবতারণা, তা সে নির্বাচনে হস্তক্ষেপ হোক, বা মহানবী (সাঃ)এর অপমানের প্রতিশোধই হোক। ‘যুদ্ধ’ না করেও এই ‘যুদ্ধ’ পরিচালনা এমন এক যুদ্ধাবস্থার জন্ম দিচ্ছে যে, তা ‘যুদ্ধ’এর সংজ্ঞাকেই চ্যালেঞ্জ করছে।
Sunday, 1 November 2020
ককেশাসের যুদ্ধের এক মাস ...
২৭শে সেপ্টেম্বর শুরু হয়ে এক মাসের উপর হয়ে গেলো ককেশাসের যুদ্ধে থামেনি। অক্টোবরের ১০, ১৮ এবং ৩০ তারিখে তিনটা যুদ্ধবিরতির চেষ্টা বিফলে গিয়েছে। আজেরিরা বলছে যে, নাগোর্নো কারাবাখ অঞ্চল মুক্ত করার আগ পর্যন্ত তারা যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। আন্তর্জাতিকভাবে নাগোর্নো কারাবাখ অঞ্চল আজেরবাইজানের ভূখন্ড বলেই স্বীকৃত। ১৯৯০এর দশকে আর্মেনিয়রা সামরিকভাবে কারাবাখ দখল করে সেখানে ‘রিপাবলিক অব আর্তসাখ’ নামের একটা রাষ্ট্র ঘোষণা করে, যাকে বিশ্বের আর কোন দেশই স্বীকৃতি দেয়নি। অন্যদিকে আর্মেনিয়ার সাথে সামরিক চুক্তি থাকলেও রাশিয়া বলছে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত আর্মেনিয়ার মূল ভূখন্ড হামলার শিকার না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা আর্মেনিয়ার পক্ষে যুদ্ধে যোগদান করবে না। অপরদিক তুরস্ক আজেরবাইজানকে সরাসরি রাজনৈতিক সমর্থন দিয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম দিয়েছে, যা যুদ্ধে আজেরিদের এগিয়ে থাকতে ব্যাপক সহায়তা দিয়েছে। তুরস্কের সামরিক বিশেষজ্ঞরাও খুব সম্ভবতঃ আজেরিদেরকে উপদেশ দিয়ে সহায়তা করছেন। তবে অনেক হুমকি সত্ত্বেও তুরস্ক আজেরবাইজানে সরাসরি সেনা পাঠানো থেকে বিরত থেকেছে, যা কিনা ককেশাসে রাশিয়া বা অন্য কোন তৃতীয় দেশের সরাসরি জড়িত হওয়ার পেছনে ‘ডিটারেন্ট’ হিসেবে কাজ করেছে। এই সুযোগটা নিয়েই আজেরিরা বিগত বছরগুলিতে তেল বিক্রির অর্থে কেনা বিপুল সামরিক শক্তিকে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করে কারাবাখের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বেশকিছু অঞ্চল মুক্ত করে নিয়েছে। ‘বিবিসি’র এক বিশ্লেষণে দেখানো হচ্ছে যে, ২৭শে অক্টোবর নাগাদ কারাবাখের দক্ষিণে ইরানের সাথে সীমানার পুরোটাই এখন আজেরিরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে। এক মাস রক্তক্ষরণের পর এই যুদ্ধ কোথায় এসে পৌঁছেছে? এই যুদ্ধের শেষই বা কোথায়?
যুদ্ধে সর্বশেষ পরিস্থিতি অনুযায়ী আজেরবাইজানকে সকল বিশ্লেষকেরাই এগিয়ে রেখেছেন। ‘ফোর্বস’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় সাংবাদিক সেবাস্টিয়ান রোবলিন বলছেন যে, কারাবাখের দক্ষিণের পুরোটার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবার পর আজেরিরা খুব সম্ভবতঃ উত্তর দিকে অগ্রসর হচ্ছে; টার্গেট কৌশলগত ‘লাচিন করিডোর’ গিরিপথ। এই করিডোর হলো কারাবাখের রাজধানী স্তেপানাকার্ট (যাকে আজেরিরা বলে খানকেন্দি) এবং গুরুত্বপূর্ণ শহর শুশার সাথে আর্মেনিয়ার মূল ভূখন্ডের যোগাযোগের মূল রাস্তা। ১৯৯২ সালে কারাবাখের সাথে আর্মেনিয়ার একটা কৌশলগত লাইফলাইন নিশ্চিত করতেই এই করিডোর দখল করে নেয় আর্মেনিয়রা। এবারের যুদ্ধে ২২শে অক্টোবর নাগাদ ইরানের সীমানায় আরাস নদী বরাবর পশ্চিমে এগুনোর পর আজেরিরা হাকারি নদীর সংযোগস্থলে পৌঁছে যায়। এই নদীর অববাহিকাই উত্তরে গিয়ে মিলেছে ‘লাচিন করিডোর’এর সাথে। অত্র অঞ্চলের পাহাড়ি বাস্তবতার কারণেই যোগাযোগের পথগুলি বেশ স্বল্প পরিসরের মাঝে সীমাবদ্ধ। এই করিডোরের উপর চাপ কমাতে আজেরবাইজানের সর্বদক্ষিণে আর্মেনিয়ার সীমানার কাছাকাছি আর্মেনিয়রা প্রতিআক্রমণ শুরু করে। আর এই অঞ্চলটা এমন একটা স্থানে, যেখানে আক্রমণ চালাতে গেলে আর্মেনিয়ার মূল ভূখন্ডের উপর নির্ভর করেই করতে হবে। আজেরিরা যদি এই করিডোরের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে, অথবা করিডোরের উপর সামরিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তাহলে সামনের শীতকালে কারাবাখের আর্মেনিয়রা মারাত্মক সমস্যায় পড়বে। তবে রোবলিন এও বলছেন যে, এই করিডোরের উপর চাপ পড়লে নাগোর্নো কারাবাখে যদি মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়, তাহলে তা রাশিয়া এবং অন্যান্য দেশের জন্যে এই যুদ্ধে সরাসরি হস্তক্ষেপের কারণ তৈরি করতে পারে। রাশিয়া লাচিন করিডোরের পশ্চিমে তেগ শহরের কাছে একটা সামরিক ক্যাম্প বসিয়েছে এই করিডোরের উপর নজরদারির জন্যে।
![]() |
তুর্কি মিডিয়া ‘টিআরটি ওয়ার্ল্ড’এর সাথে সাক্ষাতে ওয়াশিংটন ভিত্তিক থিংট্যাঙ্ক ‘মিডলইস্ট ইন্সটিটিউট’এর বিশ্লেষক রাউফ মামাদভ বলেন যে, দুই দেশের যুদ্ধে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ শহর এখন লাচিন এবং শুশা। গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়ি অঞ্চলগুলি দখলে নিয়ে আজেরিরা চাইবে দক্ষিণে কৌশলগত লাচিন এবং উত্তরে কারবাহাল এলাকাকে নিয়ন্ত্রণ করতে। আজেরিদের কাছে শুশা হলো কারাবাখের হৃদয়। এই শহরটা যদি আজেরিরা সময়মত নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে, তাহলে তারা তা আলোচনার টেবিলে ব্যবহার করতে পারে; অবশ্য যদি আর্মেনিয়রা আলোচনায় রাজি থাকে। আজেরিরা ইতোমধ্যেই লাচিন থেকে আর্টিলারি দূরত্বে রয়েছে। বাকুর থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘তোপচুবাশভ সেন্টার’এর ডিরেক্টর রুসিফ হুসেইনভ বলছেন যে, লাচিন হলো কারাবাখ এবং আর্মেনিয়ার মাঝে সেতু; আর শুশা হলো এমন এক উঁচু জায়গা, যা নিয়ন্ত্রণে থাকলে পুরো কারাবাখই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তিনি বলেন যে, লাচিন বা শুশার একটাও যদি আজেরিরা দখলে নিতে পারে, তা হবে এই যুদ্ধের মোড় ঘোড়ানো ঘটনা। আর দু’টাই যদি আজেরিদের কাছে চলে যায়, তবে যুদ্ধও শেষ হয়ে যেতে পারে। হুসেইনভ বলছেন যে, আর্মেনিয়রা এতকাল আলোচনা মেনে না নেয়ায় আজেরিরা এখন পুরো কারাবাখ পুনরুদ্ধারের পথেই হাঁটছে। আর সেটা সম্ভব না হলে তারা হয়তো লাচিন করিডোর এবং শুশার নিয়ন্ত্রণ নিতে চেষ্টা করবে। লাচিন করিডোর হারালে কারাবাখের বেঁচে থাকা কঠিন হবে।
তবে যুদ্ধ শেষের কথা বলতে গেলে শক্তিশালী দেশগুলির কথাও আলোচনায় আনতে হবে। হারভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কেনেডি স্কুলের প্রকাশনা ‘রাশিয়া ম্যাটার্স’এ এক লেখায় জ্যেষ্ঠ গবেষক মাইকেল কফম্যান বলছেন যে, আজেরবাইজানকে তুরস্ক সরাসরি সমর্থন দেয়ায় যে প্রশ্নটা সামনে এসেছে তা হলো, রাশিয়া তার আশেপাশের দেশগুলির সাথে যে নিরাপত্তা চুক্তি করেছে, সেই অনুযায়ী রাশিয়া নিরাপত্তা দিতে সক্ষম কিনা। তিনি আরও বলছেন যে, এই যুদ্ধ দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ‘গ্রেট পাওয়ার’ এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলি অনেক সময়ই অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী দেশগুলির উপর নিজেদের ইচ্ছাকে চাপিয়ে দিতে চাইলেও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় তা সর্বদা সাফল্য পায় না।
তিনটা ব্যর্থ যুদ্ধবিরতির চেষ্টার পরেও জেনেভায় আলোচনায় বসেছেন আর্মেনিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহরাব মেনাতসাকানিয়ান এবং আজেরবাইজানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেইহুন বায়রামভ। তবে এই আলোচনার সফলতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বিস্তর। যখন আজেরিরা যুদ্ধে এগিয়ে রয়েছে এবং বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, তারা যুদ্ধে জয়লাভ করতে পারবে, তখন আলোচনার গুরুত্ব কমে যায় বৈকি। কৌশলগত ‘লাচিন করিডোর’ হাতছানি দিচ্ছে আজেরিদের কাছে; এর পর রয়েছে ‘কারাবাখের হৃদয়’ শুশা। তবে এই দুই টার্গেটের কোন একটা আজেরিদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে তুরস্ক আর রাশিয়ার মাঝে বর্তমান স্থিতাবস্থা যে আরও চাপের মাঝে পড়বে, তা নিশ্চিত।









