Showing posts with label Armenia. Show all posts
Showing posts with label Armenia. Show all posts

Thursday, 22 September 2022

ন্যান্সি পেলোসির আর্মেনিয়া সফরের গুরুত্ব কতটুকু?

২২শে সেপ্টেম্বর ২০২২
 
বর্তমান অস্ত্রবিরতির উপরে কেউই আস্থা রাখতে পারছে না। আজেরবাইজান যখন রুশদের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন করছে এবং তুরস্কের সহায়তায় ইইউতে গ্যাস রপ্তানির মাধ্যমে ভূরাজনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চাইছে, তখন আর্মেনিয়রাও অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝোঁকার জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, আর্মেনিয়ার সাথে আজেরবাইজানের দুই দিনের যুদ্ধ এবং পেলোসির আর্মেনিয়া সফর ককেশাসে আরেক দফা উত্তেজনার দ্বার উন্মুক্ত করলো।



মার্কিন কংগ্রেসের স্পীকার ন্যান্সি পেলোসি গত ১৮ই সেপ্টেম্বর আজেরবাইজান ঘুরে এসেছেন। তার এই সফরের সময়টা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য; কারণ মাত্র কিছুদিন আগে ১৩-১৪ সেপ্টেম্বর আজেরবাইজান তার প্রতিবেশী দেশ আর্মেনিয়ার সাথে দুই দিনের একটা সীমান্ত যুদ্ধ শেষ করেছে। সফরকালে তিনি সাম্প্রতিক যুদ্ধকে আর্মেনিয়ার উপর আজেরবাইজানের ‘বেআইনী এবং মারাত্মক হামলা’ বলে উল্লেখ করেন; যদিও উভয় পক্ষই এই যুদ্ধ শুরুর জন্যে অপরপক্ষকে দায়ী করেছে। পেলোসি বলেন যে, আজেরবাইজানের যে ‘হামলা’য় প্রায় ২’শত মানুষের প্রাণ গেছে, তার ব্যাপারে তিনি বলিষ্ঠভাবে নিন্দা জানাচ্ছেন। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, পেলোসি যখন এই কথাগুলি বলছিলেন, তখন তার পাশে ছিলেন আর্মেনিয়ার পার্লামেন্টের স্পীকার আলেন সিমোনিয়ান; যিনি আজেরবাইজানের সাথে সামরিক দ্বন্দ্বে রাশিয়ার সহয়তা না পাওয়ায় নাখোশ হয়েছেন। রুশ বার্তা সংস্থা ‘ইন্টারফ্যাক্স’ বলছে যে, তিনি এর আগের সপ্তাহে রুশদের সাথে সামরিক চুক্তিকে গুলি করতে না পারা পিস্তলের সাথে তুলনা করেছেন; যা কিনা দরকারের সময়ে কাজে লাগে না। উল্লেখ্য যে, অর্থোডক্স খ্রিস্টান আর্মেনিয়া রাশিয়ার অনেক পুরোনো বন্ধু এবং রাশিয়ার সাথে আর্মেনিয়ার সামরিক চুক্তি রয়েছে, যা মোতাবেক আর্মেনিয়ার উপর সামরিক হামলা হলে রাশিয়ার সরাসরি হস্তক্ষেপ করার কথা। এর আগে গত অগাস্টেই ৮২ বছর বয়সী প্রবীন রাজনীতিবিদ পেলোসি তার রাজনৈতিক জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে তাইওয়ান সফর করে চীনাদেরকে ক্ষেপিয়েছেন। এখন তার আর্মেনিয়া সফরকে অনেকেই দেখছেন রাশিয়ার একটা পুরোনো বন্ধুকে ওয়াশিংটনের দিকে নিয়ে আসার প্রচেষ্টা হিসেবে; বিশেষ করে মস্কো যখন ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ভীষণভাবে ব্যস্ত।

ন্যান্সি পেলোসি বলেন যে, আজেরবাইজান যে এই যুদ্ধ শুরু করেছিল, সেব্যাপারে কথা বলাটা প্রয়োজন। তার এই কথায় আজেরবাইনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, আজেরবাইজানের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন এবং অন্যায্য যে অভিযোগ তিনি করেছেন, তা মেনে নেয়া যায় না। এই ঘটনা আর্মেনিয়ার সাথে আজেরবাইজানের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে বড় একটা বাধা। বক্তব্যে আরও বলা হয় যে, পেলোসি সর্বদাই আর্মেনিয়া-ঘেঁষা একজন রাজনীতিবিদ বলে পরিচিত। আর তিনি তার সফরসঙ্গী হিসেবে তেমনই কংগ্রেস সফস্যদেরকে নিয়ে গেছেন। শুধু তাই নয়, বক্তব্যে আরও বলা হয় যে, পেলোসি ন্যায়ের কথা বললেও আজেরি এলাকা আর্মেনিয়রা যে প্রায় ৩০ বছর ধরে দখলে রেখেছিল এবং আজেরিদের বিরুদ্ধে হত্যাযজ্ঞ চালানো ছাড়াও তাদেরকে জোরপূর্বক বাড়িঘরছাড়া করেছিল, সেব্যাপারে তিনি কিছুই বলেননি। পেলোসির বক্তব্যে অত্র এলাকায় শান্তির পরিবর্তে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাবে। ‘রয়টার্স’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, পেলোসি যেভাবে আজেরবাইজানকে যুদ্ধের জন্যে দায়ী করেছেন, তা ওয়াশিংটনের অফিশিয়াল বক্তব্যের বিপরীতে। মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব এন্টনি ব্লিনকেন এক বার্তায় যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করেন এবং পরবর্তীতে ১৮ই সেপ্টেম্বর তিনি আজেরবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিইয়েভকে ফোন করে অস্ত্রবিরতি বাস্তবায়ন করার অনুরোধ করেন এবং আলোচনার মাধ্যমে আর্মেনিয়ার সাথে সমস্যার সমাধান করার কথা বলেন।

বাকুর থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘সেন্টার অব এনালিসিস অব ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স’এর ফরিদ শাফিইয়েভ ‘আল জাজিরা’কে বলছেন যে, পেলোসি আর্মেনিয়ায় এসেছেন মূলতঃ আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে আর্মেনিয়দের সমর্থন পেতে। ক্যালিফোর্নিয়াতে তার নির্বাচনী এলাকায় আর্মেনিয়দের প্রভাব যথেষ্টই বেশি। অপরদিকে ইয়েরেভানের থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘রিজিওনাল স্টাডিজ সেন্টার’এর ডিরেক্টর রিচার্ড জিরোগোসিয়ান ‘পলিটিকো’কে বলছেন যে, ককেশাসে মার্কিনীরদের ফোকাস বৃদ্ধি শুধু ভূরাজনৈতিক কারণে নয়, আদর্শিক কারণেও। এটা শুধু রাশিয়ার কারণে নয়, আর্মেনিয়ার কারণেও। পেলোসির সফর হয়তো মার্কিন নীতিতে পরিবর্তনের একটা শুরু। 

প্রায় তিন দশক আর্মেনিয়ার সাথে সামরিক দিক থেকে পিছিয়ে থাকলেও ২০২০ সালের যুদ্ধের পর থেকে আজেরবাইজান তার নিজস্ব সামরিক সক্ষমতার ব্যাপারে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী। সেপ্টেম্বরের দুই দিনের যুদ্ধ আজেরবাইজানকে একটা ধারণা দিয়েছে যে, ইউক্রেন যুদ্ধের মাঝে রুশরা আর্মেনিয়াকে রক্ষায় কতটুকু ভূমিকা নিতে পারে।

আফগানিস্তানে মার্কিনীদের অবস্থানের সময় আজেরবাইজান যুক্তরাষ্ট্রের খুবই গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু হিসেবে কাজ করেছে। আজেরবাইজানের আকাশসীমা ব্যবহার করে মার্কিনীর আফগানিস্তানে সেনা আনানেয়া করেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আজেরবাইজানের সবচাইতে কাছের বন্ধু হলো তুরস্ক। ২০২০ সালে আর্মেনিয়ার সাথে ৪৪ দিনের যুদ্ধে জয়ের পিছনে আজেরবাইজানকে সবচাইতে বেশি সহায়তা দিয়েছিল তুরস্ক। অপরদিকে রাশিয়া ককেশাস এলাকাকে তার নিজের উঠান মনে করে থাকে। আর্মেনিয়া এবং আজেরবাইজানের সীমানায় যুদ্ধবিরতি পাহাড়া দেয়ার দায়িত্ব হলো রুশ শান্তিরক্ষী বাহিনীর। তবে ২০১৮ সালে ‘ভেলভেট রেভোলিউশন’এর মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা প্রধানমন্ত্রী নিকল পাশিনিয়ানের সরকারকে পশ্চিমারা গণতান্ত্রিক উত্থানের ফলাফল হিসেবেই দেখেছে। পেলোসি তার সফরের সময় আর্মেনিয়ার গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কথা স্মরণ করিয়ে মার্কিন সমর্থনের কথা ব্যক্ত করেন।

পেলোসির সফরের ব্যাপারে আজেরবাইজের বন্ধু তুরস্ক কঠোর বার্তা দিয়েছে। ১৯শে সেপ্টেম্বর তুর্কি ভাইস প্রেসিডেন্ট ফুয়াত ওকতে এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, পেলোসির একপেশে বক্তব্যগুলি আর্মেনিয়ার সাথে আজেরবাইজানের কূটনীতিকে ‘স্যাবোটাজ’ করেছে; যেকারণে এই বক্তব্যগুলি গ্রহণযোগ্য নয়। একইসাথে তিনি ওয়াশিংটনকে আহ্বান জানান তারা যেন পরিষ্কার করে যে, পেলোসির কথাগুলি মার্কিন সরকারের বক্তব্য কিনা। অপরদিকে মস্কোতে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ সাংবাদিকদের বলেন যে, পেলোসি ঢোল পিটিয়ে তার আগমণ জানান দিয়েছেন। এমনটা না করে বরং চুপচাপ কার্যকর পদক্ষেপ নিলে আর্মেনিয়া এবং আজেরবাইজানের সংকটের সমাধান মিলতে পারে।

‘পলিটিকো’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভানে পেলোসির সফরের সময়ে অনেকেই প্রকাশ্যে রাশিয়া বিরোধী বার্তা দেয়। কেউ কেউ পুতিনের ছবি সম্বলিত বিলবোর্ড নামিয়ে ফেলে। রুশ সাংবাদিকদেরকেও হেনস্তা হতে হয়েছে কোন কোন ক্ষেত্রে। আর্মেনিয়দের মাঝে অনেকেই মনে করা শুরু করেছে যে, রাশিয়ার সাথে বন্ধুত্ব আর্মেনিয়াকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। অপরদিকে আজেরবাইজান তুরস্কের সহায়তায় দিনে দিনে শক্তিশালী হচ্ছে। এমতাবস্থায় অনেকেই ওয়াশিংটনের দিকে ঝুঁকতে চাইছে।

প্রায় তিন দশক আর্মেনিয়ার সাথে সামরিক দিক থেকে পিছিয়ে থাকলেও ২০২০ সালের যুদ্ধের পর থেকে আজেরবাইজান তার নিজস্ব সামরিক সক্ষমতার ব্যাপারে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী। সেপ্টেম্বরের দুই দিনের যুদ্ধ আজেরবাইজানকে একটা ধারণা দিয়েছে যে, ইউক্রেন যুদ্ধের মাঝে রুশরা আর্মেনিয়াকে রক্ষায় কতটুকু ভূমিকা নিতে পারে। বর্তমান অস্ত্রবিরতির উপরে কেউই আস্থা রাখতে পারছে না। আজেরবাইজান যখন রুশদের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন করছে এবং তুরস্কের সহায়তায় ইইউতে গ্যাস রপ্তানির মাধ্যমে ভূরাজনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চাইছে, তখন আর্মেনিয়রাও অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝোঁকার জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, আর্মেনিয়ার সাথে আজেরবাইজানের দুই দিনের যুদ্ধ এবং পেলোসির আর্মেনিয়া সফর ককেশাসে আরেক দফা উত্তেজনার দ্বার উন্মুক্ত করলো।

Friday, 1 October 2021

মধ্য এশিয়াতে ইরান এবং তুরস্কের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা জটিল আকার নিচ্ছে

০২রা অক্টোবর ২০২১

আজেরবাইজানের সীমান্তের কাছাকাছি অঞ্চলে ইরানের সামরিক মহড়া সেই হিসেবে ইরানের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। মধ্য এশিয়ার মাঝ দিয়ে তুরস্ক থেকে আজেরবাইজান হয়ে পূর্ব পশ্চিম পরিবহণ করিডোর সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে ইরানের সাথে রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ার উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত পরিবহণ করিডোরকে। পরস্পরবিরোধী এই কৌশলগত করিডোরের মাঝে প্রতিযোগিতা সবে শুরু হয়েছে মাত্র; যার ভূরাজনৈতিক তাপমাত্রা লক্ষ্যণীয় হচ্ছে বিভিন্ন রকমের সামরিক মহড়া এবং কূটনৈতিক শব্দের ব্যবহারের মাঝ দিয়ে।



পহেলা অক্টোবর ইরানের সামরিক বাহিনী মধ্য এশিয়ার ককেশাসের দেশ আজেরবাইজানের সীমানায় বড় আকারের মহড়া শুরু করেছে। ‘আল জাজিরা’ ইরানের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলছে যে, ইরানের এই মহড়া আজেরবাইজান এবং জায়নিস্ট ইস্রাইলের কাছাকাছি সম্পর্কের ফলাফলের জের। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেখানো হয় যে, ইরানের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্ত এলাকায় ট্যাঙ্ক, হেলিকপ্টার, আর্টিলারি এবং বহু সেনাসদস্যদের মহড়া শুরু হয়েছে। ইরানি সেনাবাহিনীর বিবৃতিতে আরও বলা হয় যে, তারা প্রথমবারের মতো নিজস্ব ডেভেলপ করা দূরপাল্লার মনুষ্যবিহীন ড্রোন পরীক্ষা করছে। ইরানের সেনাবাহিনীর কমান্ডার কিউমারস হাইদারি ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন যে, গত বছর নাগোর্নো কারাবাখের যুদ্ধে আজেরবাইজান আর্মেনিয়ার সাথে যুদ্ধ করার জন্যে আইসিস সন্ত্রাসীদেরকে ককেশাসে নিয়ে এসেছিল। তিনি বলেন যে, এই সন্ত্রাসীরা এখনও এই এলাকা ছেড়ে গেছে বলে তারা নিশ্চিত নন; তবে তাদেরকে এই এলাকা ছেড়ে যেতে হবে।

‘আল জাজিরা’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, সেপ্টেম্বর মাসে আজেরবাইজানের বাকুতে তুরস্ক এবং পাকিস্তানের যৌথ সামরিক মহড়ার পরপরই ইরানের ‘ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোর’ বা ‘আইআরজিসি’ আজেরবাইজানের সীমানায় সৈন্য এবং সামরিক যন্ত্রপাতি মোতায়েন করে। ইরান বারংবার ইস্রাইলের সাথে আজেরবাইজানের সম্পর্কের ব্যাপারে দুশ্চিন্তা দেখিয়েছে। ২০২০ সালের শেষের দিকে আর্মেনিয়ার সাথে ৪৪ দিনের যুদ্ধে জয়লাভের পিছনে আজেরিদের একটা বড় সহায়তা এসেছিল ইস্রাইলের কাছ থেকে। ৩০শে সেপ্টেম্বর তেহরানে আজেরবাইজানের নতুন রাষ্ট্রদূতের সাথে দেখা করেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমিরাব্দোল্লাহিয়ান। তিনি আজেরি প্রতিনিধিকে সরাসরিই বলেন যে, ইরান তার জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে জায়নিস্ট ইস্রাইলের অবস্থান এবং কর্মকান্ডকে সহ্য করবে না এবং দরকার বিশেষে যা করা দরকার, সেটাই করবে।

তুরস্কের ‘আনাদোলু এজেন্সি’কে দেয়া এক সাক্ষাতে আজেরবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিইয়েভ বলেন যে, যেকোন দেশই নিজ অঞ্চলে সামরিক মহড়া করতে পারে; এটা তাদের সার্বভৌম ক্ষমতার মাঝে পড়ে। কিন্তু তিনি বুঝতে পারছেন না যে, ইরান কেন আজেরবাইজানের সীমানায় মহড়া শুরু করেছে এবং সেটা এখনই বা কেন? তিনি মনে করিয়ে দেন যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে প্রথমবারের মতো ইরান আজেরিদের সীমানায় শক্তি প্রদর্শন করছে। আজেরিরা তিন দশক পর কারাবাখের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে; আর এখনই ইরান আজেরবাইজানের সীমানায় মহড়া শুরু করেছে।

আর্মেনিয়া এবং আজেরবাইজানে ইরানের ট্রাক

দুই দেশের মাঝে উত্তেজনার কিছুটা পাওয়া যাবে গত মাসে ইরানের পণ্যবাহী ট্রাকের উপর আজেরিদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা শুরুর পর থেকে। ২০২০ সালের নাগোর্নো কারাবাখের যুদ্ধের পর থেকে তিন দশকে প্রথমবারের মতো কারাবাখ অঞ্চলে আজেরিদের কর্তৃত্ব বহাল হয়। আজেরিরা সেটা নিশ্চিত করতে ইরানের ট্রাকের উপর থেকে ‘রোড ট্যাক্স’ আদায় করা শুরু করে। আলিইয়েভ বলেন যে, এই করারোপ শুরু করার পর থেকে ইরান থেকে আর্মেনিয়াতে যাওয়া ট্রাকের সংখ্যা প্রায় শূণ্যের কোঠায় নেমে এসেছে। তিনি আরও বলেন যে, ১১ই অগাস্ট থেকে ১১ই সেপ্টেম্বরের সময়ের মাঝে আজেরিরা মোট ৬০টা ইরানিয়ান ট্রাকের আজেরি রাস্তা ব্যবহারের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছে। কিছু ট্রাক নিজেদের পরিচয় গোপন করে আর্মেনিয়ার লাইলেন্স প্লেট ব্যবহার করছে। আজেরিরা বারংবার ইরানের কর্মকর্তাদের এব্যাপারে তথ্য দিচ্ছে বলে বলেন আলিইয়েভ। 


আজেরবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিইয়েভ বলেন যে, যেকোন দেশই নিজ অঞ্চলে সামরিক মহড়া করতে পারে; এটা তাদের সার্বভৌম ক্ষমতার মাঝে পড়ে। কিন্তু সেটা এখনই বা কেন? তিনি মনে করিয়ে দেন যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে প্রথমবারের মতো ইরান আজেরিদের সীমানায় শক্তি প্রদর্শন করছে। আজেরিরা তিন দশক পর কারাবাখের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে; আর এখনই ইরান আজেরবাইজানের সীমানায় মহড়া শুরু করেছে।


 ‘ইউরেশিয়ানেট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, প্রথমদিকে আজেরি পুলিশ এবং কাস্টমস কর্মকর্তারা ইরানের ট্রাক আটক করা শুরু করলে ইরান চুপই ছিল। আর্মেনিয়ার মিডিয়া বলছে যে, ট্রাকগুলির বেশকিছু আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভান এবং নাগোর্নো কারাবাখের রাজধানী স্তেপানাকার্ট যাচ্ছিলো সিমেন্ট নিয়ে। ইরানের ব্যবহার করা অঞ্চলটা আন্তর্জাতিকভাবে আজেরি অঞ্চল বলে স্বীকৃত; যদিও তিন দশক ধরে তা আর্মেনিয়ানদের হাতে অধিকৃত ছিল। কারাবাখের এই অঞ্চলের মাঝ দিয়ে এতকাল ইরান থেকে আর্মেনিয়ার দক্ষিণের গোরিস এবং কাপান অঞ্চলে পণ্য পরিবহণ হচ্ছিলো। এই হাইওয়ে হলো ইরান এবং আর্মেনিয়ার মাঝে একমাত্র হাইওয়ে।

আজেরবাইজানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এহসান জাহাদভ বলেন যে, ট্রাকগুলি বেআইনীভাবে আর্মেনিয়া থেকে আজেরবাইজানের কারাবাখ অঞ্চলে ঢোকার কারণেই ড্রাইভারদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরপর থেকে ইরানের কর্মকর্তারা আজেরিদের সাথে এই সমস্যা সমাধানে বৈঠক করছেন বলে জানা যায়। আজেরবাইজানে ইরানের রাষ্ট্রদূত আব্বাস মুসাভি এক সপ্তাহে দু’বার আজেরি প্রেসিডেন্ট আলিইয়েভের জেষ্ঠ্য পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা হিকমেত হাযিইয়েভের সাথে দেখা করেন। গত ২৩শে সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বৈঠকের সাইডলাইনে আজেরি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেইহুন বায়রামভ এবং ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমিরআব্দোল্লাহিয়ান বৈঠক করেন। ‘তেহরান টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দুই দেশের মাঝে তৃতীয় কোন পক্ষের হস্তক্ষেপের ব্যাপারে উদ্রেক জ্ঞাপন করেন। এই তৃতীয় পক্ষ বলতে ইরান মূলতঃ ইস্রাইলকেই বোঝাতে চাইছে। ইরানের রাজনীতিবিদেরা কেউ কেউ আজেরিদের সাথে সম্পর্ককে আরও কঠিন পরীক্ষার মাঝেই ফেলতে চাইছেন। ইরানের পার্লামেন্ট সদস্য আহমেদ নাদেরি এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, আজেরিরা নিজেদের অবস্থান বুঝতে পারছে না এবং নিজেদের আকৃতি এবং সক্ষমতার বাইরে কথা বলছে। আরেকজন পার্লামেন্ট সদস্য মোহাম্মদ রেজা আহমাদি সাঙ্গারি বলছেন যে, আর্মেনিয়ার সাথে যুদ্ধ জয়ের পর আজেরিরা অহংকারি হয়ে গেছে এবং তাদেরকে ইন্ধন যোগাচ্ছে তুরস্ক। তিনি কঠোর ভাষায় বলেন যে, আজেরবাইজানের মতো ছোট্ট দেশের বয়স ইরানের সর্বকনিষ্ঠ রাজনীতিবিদের বয়সের চাইতেও কম!

আজেরিদের সাথে ইরানের সম্পর্কের অবনতি কেন?

দুই দেশের মাঝে সন্দেহের সম্পর্ককে তুলে ধরছেন লাটভিয়ার কূটনীতি বিশ্লেষক এলদার মামিদভ। তিনি ‘ইউরেশিয়ানেট’কে বলছেন যে, আজেরিদের মাঝে একটা ধারণা রয়েছে যে, ইরান আর্মেনিয়ার সাথে যুদ্ধে আজেরিদের বিপক্ষে থেকেছে। এর মাঝে ইস্রাইলের সাথে আজেরবাইজানের কথাকাছি সম্পর্ক ইরানের জন্যে হুমকিস্বরূপ। এছাড়াও আজেরিরা কেউ কেউ মনে করে যে, ইরানের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের আজেরি অধ্যুষিত দক্ষিণ আজেরবাইজানকে ইরানের হাত থেকে মুক্ত করতে হবে। ইরানের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের এই আজেরিরা অনেক ক্ষেত্রেই আজেরবাইজানের সাথে সহমর্মিতা প্রদর্শন করে। বিশেষ করে আর্মেনিয়ার সাথে যুদ্ধের সময় ইরানের আজেরিরা চাইছিলো ইরান সরকার যেনো আজেরবাইজানের পক্ষাবলম্বন করে। এমতাবস্থায় মামিদভ বলছেন যে, ইরানের উত্তরাঞ্চলের ককেসাস সীমানায় নতুন করে আজেরিদের সাথে সম্পর্ক খারাপ করার সুযোগ নেই। পারস্য উপসাগর, ইরাক এবং আফগানিস্তানে ইরান ইতোমধ্যেই অনেক চ্যালেঞ্জের মাঝে রয়েছে।

তুর্কি মিডিয়া ‘টিআরটি’ বলছে যে, সাম্প্রতিক কারাবাখ যুদ্ধের আগ পর্যন্ত তিন দশক ধরে এই অঞ্চল আর্মেনিয়দের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তেহরানের সাংবাদিক ফাতিমা কারিমখান বলছেন যে, এই সময়ে ইরানের ট্রাকগুলি কোন কর প্রদান ছাড়াই কারাবাখের অঞ্চল ব্যবহার করে আর্মেনিয়া, রাশিয়া এবং মধ্য এশিয়ার সাথে বাণিজ্য চালিয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের পর কারাবাখের বেশিরভাগটাই আজেরিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় ইরানের এই পরিবহণ করিডোরের উপর আজেরিরা কাস্টমস নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। তিনি আরও বলছেন যে, ইরানের ট্রাকের ব্যাপারে আজেরি প্রেসিডেন্টের কথাগুলি ইরানের জনমতের বিরুদ্ধে যায়। ইরানের ট্রাক আটকে দেয়ার ব্যাপারটা ইরানিরা ভালো চোখে দেখেনি। এই ট্রাক আটকানের মাধ্যমে আজেরিরা মধ্য এশিয়াতে ইরানের বাণিজ্য নিরাপত্তাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। সামরিক মহড়ার মাধ্যমে ইরান দেখিয়ে দিচ্ছে যে, এই বাণিজ্য পরিবহণ করিডোর ইরানের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ।

তবে আজেরিদের মাঝে অনেকেই সন্দেহ পোষণ করেন যে, ইরানের ট্রাকগুলিতে করে হয়তো ইরান থেকে আর্মেনিয়ার কাছে সামরিক সহায়তা যেতে পারে; যা পরবর্তীতে আজেরিদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘দ্যা আটলান্টিক কাউন্সিল’এর সিনিয়র ফেলো মাথিউ ব্রাইজা বলছেন যে, ইরানের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে বিভিন্ন হিসেবে প্রায় দুই কোটি আজেরি বসবাস করে। আজেরিদের মাঝে অনেক জাতিয়তাবাদী এবং শিক্ষাবিদেরা মনে করেন যে, আজেরবাইজান এবং ইরানের অভ্যন্তরের আজেরিরা সাংস্কৃতিক এবং সামাজিকভাবে একইরকম। সেই হিসেবে তাদের একই রাজনৈতিক একাত্মতা প্রকাশ করা উচিৎ। এই ব্যাপারগুলি তেহরানের নেতৃত্বকে বিচলিত করছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে আজেরবাইজানে তুরস্ক এবং পাকিস্তানের যৌথ সামরিক মহড়া হয়তো ইরানের আজেরি জনগণের জন্যে তেহরানের নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে কোন বার্তা বহণ করতে পারে। আর্মেনিয়ার বিরুদ্ধে আজেরবাইজানের ৪৪ দিনের যুদ্ধ ইরানের অভ্যন্তরের আজেরিদের মাঝে যথেষ্ট আগ্রহের সৃষ্টি করেছিল। ইরানের আজেরিরা চাইছিল ইরান সরকার যেন আর্মেনিয়ার পক্ষ না নেয়। সেই হিসেবে ইরানের উত্তর পশ্চিমের তাবরিজ শহরের আজেরি জনগণ আজেরবাইজানের পক্ষে রাস্তায় বিক্ষোভও করেছে। ইরান সরকার তার আজেরি জনগণের জন্যে হয়তো বার্তা দিচ্ছে যে, তুর্কি এবং পাকিস্তানি যৌথ মহড়ার উপর ভিত্তি করে ইরানের আজেরিরা যেন কোন অস্থিরতার সৃষ্টি না করে।

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘হাডসন ইন্সটিটিউট’এর মাইকেল ডোরান বলছেন যে, আর্মেনিয়ার সাথে যুদ্ধের সময় জর্জিয়া তার আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়ার কারণে রাশিয়া কাস্পিয়ান সাগর হয়ে ইরানের অঞ্চল ব্যবহার করে আর্মেনিয়াতে পণ্য পরিবহণ করছিলো। বর্তমানে আজেরবাইজানের প্রেসিডেন্ট আলিইয়েভ প্রকৃতপক্ষে তুরস্কের জনগণের কাছ থেকে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন। এরউপরে এখানে যোগ হয়েছে ‘জাঙ্গেজুর করিডোর’এর ইস্যু। এই করিডোর হলো আজেরবাইজানের মূল ভূখন্ড এবং দেশটার নাখচিভান ছিটমহলের মাঝে যোগাযোগের করিডোর। একইসাথে এই করিডোর নাখচিভান হয়ে তুরস্ক পর্যন্ত যাবে। ইরান এই করিডোরকে মূলতঃ তুর্কি করিডোর হিসেবে দেখছে। এই করিডোর ইরানের উত্তরের অঞ্চলকে একেবারেই ঘিরে ফেলবে বলে ইরানিয়ানরা মনে করছে। অন্যদিক দিয়ে চিন্তা করলে ইরানের উত্তরাঞ্চল তখন তুরস্ক থেকে আজেরবাইজান পর্যন্ত একটা পরিবহণ করিডোর দ্বারা ঘিরে যাবে। আর ইরানের অভ্যন্তরে বড় আজেরি জাতি থাকার কারণে এই করিডোর তখন ইরানের জন্যে হুমকি হিসেবে দেখা দিতে পারে। তদুপরি অনেক বিশ্লেষকই মনে করছেন যে, আজেরবাইজানের সাথে সম্পর্ককে ব্যবহার করে এবং ইরানের অভ্যন্তরে অসন্তুষ্ট আজেরিদের সম্পর্ককে পুঁজি করে ইস্রাইল সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের অভ্যন্তরে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনায় বহু হামলা চালিয়েছে। তেহরানের নেতৃত্ব খুব স্বাভাবিকভাবেই বাকুর সাথে ইস্রাইলের সম্পর্ককে ভালোভাবে দেখবে না।

 


গত এপ্রিলে ‘জাঙ্গেজুর করিডোর’ নিয়ে আজেরি প্রেসিডেন্ট আলিইয়েভের কথাগুলি যথেষ্ট আলোচিত হয়েছে। আজেরবাইজানের সরকারি টেলিভিশনে আলিইয়েভ বলেন যে, ৯ই নভেম্বর ২০২০এর চুক্তি অনুযায়ী আর্মেনিয়া আজেরবাইজানকে দেশটার কারাবাখ অঞ্চল থেকে নাখচিভান ছিটমহল পর্যন্ত পরিবহণ করিডোর দেবে। আজেরবাইজান এই ‘জাঙ্গেজুর করিডোর’ বাস্তবায়ন করবে; সেটা আর্মেনিয়া ইচ্ছা করুক বা না করুক। যদি আর্মেনিয়া এটা করতে চায়, তাহলে সমস্যা সমাধান সহজ হবে। কিন্তু তারা না চাইলে শক্তি দিয়ে এটা বাস্তবায়ন করা হবে। এর জবাবে আর্মেনিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আনা নাখতালিয়ান বলেন যে, আলিইয়েভের এধরনের মন্তব্য আঞ্চলিক শান্তি এবং স্থিলিশীলতাকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করে। একইসাথে তিনি আজেরবাইজানের শান্তি এবং দীর্ঘমেয়াদী সমস্যার সমাধানের প্রতি অঙ্গীকারকে প্রশ্ন করেন। আর্মেনিয়ান প্রধানমন্ত্রী নিকল পাশিনিয়ান আর্মেনিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে গেলে সেখানে জনগণের আক্রোশের মুখে পড়েন। কারণ সেই অঞ্চল দিয়েই ‘জাঙ্গেজুর করিডোর’ বাস্তবায়নের কথা বলছে আজেরবাইজান। আলিইয়েভ বলেন যে, আজেরবাইজানের জনগণ ‘জাঙ্গেজুর করিডোর’এ ফেরত আসবে; যা ১’শ ১ বছর আগে আজেরিদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হয়েছিল। এই করিডোর চালু করাটা আজেরবাইজানের জাতীয় স্বার্থের প্রকল্প। তিনি বলেন যে, এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মূল চ্যালেঞ্জ এখন সময়। কারণ রেলওয়ে এবং রাস্তা তৈরি করা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।

আর্মেনিয়ার সাথে নাগোর্নো কারাবাখের যুদ্ধে জয়ী হওয়াটা আজেরিদেরকে সাহস যুগিয়েছে। বিশেষ করে তুরস্ক এবং ইস্রাইলের সমর্থন আজেরিদের সামরিক সক্ষমতাকে এমন একটা পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে, তারা নিজেদের দাবি আদায়ে আর্মেনিয়ার সাথে নতুন করে শক্ত ভাষায় কথা বলতেও পিছপা হচ্ছে না। আজেরিদের এই চিন্তাগুলি আঞ্চলিকভাবে ইরানকে বিচলিত করেছে। ‘জাঙ্গেজুর করিডোর’এর মতো প্রকল্পগুলি মধ্য এশিয়াতে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক করিডোরকে হুমকির মাঝে ফেলেছে। কারাবাখে ইরানের ট্রাক আটকে দেয়ার ব্যাপারটা তাই মধ্য এশিয়াতে ইরানের কৌশলগত অবস্থানের প্রতি হুমকি। এর সাথে যুক্ত হয়েছে তুরস্ক এবং পাকিস্তানের যৌথ সামরিক মহড়া, যার একটা প্রভাব হয়তো পড়তে পারে ইরানের অভ্যন্তরের আজেরিদের উপর। আজেরবাইজানের সীমান্তের কাছাকাছি অঞ্চলে ইরানের সামরিক মহড়া সেই হিসেবে ইরানের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। মধ্য এশিয়ার মাঝ দিয়ে তুরস্ক থেকে আজেরবাইজান হয়ে পূর্ব পশ্চিম পরিবহণ করিডোর সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে ইরানের সাথে রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ার উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত পরিবহণ করিডোরকে। পরস্পরবিরোধী এই কৌশলগত করিডোরের মাঝে প্রতিযোগিতা সবে শুরু হয়েছে মাত্র; যার ভূরাজনৈতিক তাপমাত্রা লক্ষ্যণীয় হচ্ছে বিভিন্ন রকমের সামরিক মহড়া এবং কূটনৈতিক শব্দের ব্যবহারের মাঝ দিয়ে। আপাততঃ এই প্রতিযোগিতাতে রাশিয়া সরাসরি অংশ নেয়া থেকে বিরত রয়েছে। তুরস্কও চাইছে রাশিয়ার সাথে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলতে। কিন্তু মধ্য এশিয়ার ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের মাঝে তুরস্ক এবং রাশিয়ার সংঘাত এড়িয়ে চলার সমীকরণ দিনে দিনে আরও জটিল হচ্ছে।

Saturday, 1 May 2021

মার্কিন প্রভাব বলয় থেকে বের হবার পথে তুরস্ক?

০১লা মে ২০২১

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ১৯১৫ সালের আর্মেনিয় হত্যাকান্ডকে ‘গণহত্যা’র স্বীকৃতি দেয়ার পর এটা নিশ্চিত যে, বাইডেন প্রশাসনের নীতি শুধু তুর্কি সরকার নয়, রাষ্ট্র হিসেবে তুরস্ককেই কাছের বন্ধু হিসেবে দরকার মনে করছে না। এতে সন্দেহাতীতভাবেই তুরস্কের জনগণের মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি হৃদ্যতাবোধ যতটুকু অবশিষ্ট ছিল, তাও বাতাসে মিলিয়ে যাবে। পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বলয় থেকে বের হয়ে আসা ছাড়া তুরস্কের সামনে কোন পথই খোলা থাকছে না।

গত ২৪শে এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ১৯১৫ সালের আর্মেনিয় হত্যাকান্ডকে ‘গণহত্যা’র স্বীকৃতি দেয়ার পর থেকে তুরস্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ২০১৬ সালে তুরস্কে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক নিম্নগামী রয়েছে। সেই ব্যর্থ অভ্যুত্থানে যুক্তরাষ্ট্রের হাত ছিল বলে তুর্কিরা অভিযোগ করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া থেকে ‘এস ৪০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার ফলশ্রুতিতে যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ককে ‘এফ ৩৫’ স্টেলথ যুদ্ধবিমান প্রকল্প থেকে বাদ দেয়। সিরিয়াতে কুর্দি মিলিশিয়া গ্রুপ ‘ওয়াইপিজি’কে সন্ত্রাসী আখ্যা দেয়ার পরেও যুক্তরাষ্ট্র তাদেরকে অব্যাহত সহায়তা দেয়ায় তুরস্কের সাথে সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পের উপরেও যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এছাড়াও মার্কিন আদালতে তুর্কি সরকারি ব্যাঙ্কের বিরুদ্ধে মামলা চলা নিয়েও চলছে বাকবিতন্ডা। জো বাইডেন নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হবার আগেই নির্বাচনী প্রচারণার সময়েই তুরস্কের সরকার, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগানের কঠোর সমালোচনা করেছেন। ডেমোক্র্যাট সরকারের আমলে দুই দেশের সম্পর্ক যে আরও বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে, এটা প্রায় জানাই ছিল।

বাইডেনের ঘোষণার পর তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, তুরস্কের অতীতের ব্যাপারে অন্য কারুর কাছ থেকে তুর্কিদের শিখতে হবে না। শুধুমাত্র জনসমর্থন আদায়ের জন্যে এধরনের চেষ্টাকে তুরস্ক পুরোপুরিভাবে প্রত্যাখ্যান করছে। তুর্কি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বাইডেনের ‘বিশাল ভুল’কে শুধরে নিতে বলা হয়। একইসাথে বলা হয় যে, এর মাধ্যমে এমন এক ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে, যা সারিয়ে নেয়া কঠিন। ‘জার্মান মার্শাল ফান্ড অব দ্যা ইউনাইটেড স্টেটস’এর আঙ্কারা ডিরেক্টর ওজগুর উনলুহিসারচিকলি ‘এরাব নিউজ’এর সাথে এক সাক্ষাতে বলছেন যে, বাইডেনের ঘোষণা বেশিরভাগ তুর্কির কাছেই দ্বিমুখী নীতি হিসেবে দেখা দিয়েছে; যা কিনা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতে দীর্ঘ মেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একইসাথে বলা যায় যে, তুরস্কে মার্কিন বিরোধী চিন্তা যতটা খারাপ হওয়া সম্ভব ইতোমধ্যেই তা হয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন যে, প্রতিশোধ হিসেবে তুরস্ক আফগানিস্তানের শান্তি আলোচনায় সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে; সিরিয়াতে নতুন করে সামরিক অভিযান চালাতে পারে; অথবা তুরস্কের মাটিতে ন্যাটোর ইনচিরলিক বিমান ঘাঁটিতে মার্কিন বিমান ওঠানামায় নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে। তবে এখনও পর্যন্ত তুরস্কের বড় কোন প্রত্যুত্তর না দেয়া দেখে মনে হচ্ছে যে, হয় তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আরেকটা সংঘাতে জড়াতে চাইছে না; অথবা আরেকটা সংঘাত বহণ করার সক্ষমতা তুরস্কের নেই।

আর্মেনিয়রা বাইডেনের ঘোষণাকে স্বাগত জানালেও কিছুদিন আগেই নাগোর্নো কারাবাখ ছিটমহল নিয়ে আর্মেনিয়দের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ করা আজেরবাইজান ব্যাপারটাকে অন্যভাবে দেখেছে। বাইডেনের ঘোষণার চারদিন পর মার্কিন পররাষ্ট্রসচিব এন্টনি ব্লিনকেনের সাথে এক টেলিফোন আলাপে আজেরি প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিইয়েভ বলেন যে, দেশটার নেতৃত্ব এবং জনগণ বাইডেনের ঘোষণায় ‘উদ্বিগ্ন’। তবে আজেরবাইজানের সরকারি বার্তাসংস্থা ‘আজেরতাগ’ বলছে যে, ফোনালাপে তারা আর্মেনিয়ার সাথে যুদ্ধের পর পুনর্বাসন কর্মকান্ড এবং গ্যাস পাইপলাইনে মার্কিন সরকারের সমর্থন নিয়েই বেশি কথা বলেছেন।

ওয়াশিংটনে তুরস্কের রাষ্ট্রদূত হাসান মুরাত মেরকান ওয়াশিংটনের মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক পত্রিকা ‘আল মনিটর’এর সাথে এক সাক্ষাতে বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তুরস্কের বিরোধের অনেক জায়গা থাকলেও তিনি দুই দেশের মাঝে সহযোগিতার ভবিষ্যৎ দেখতে পান। তিনি সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলির উপরই বেশি গুরুত্ব দিতে ইচ্ছুক। বিশেষ করে আফগানিস্তান এবং সিরিয়ায় শান্তি ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে তিনি দুই দেশের সহযোগিতার সুযোগ দেখছেন। অপরদিকে আঙ্কারাতে প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস জেফরি তুরস্কের ‘আনাদোলু এজেন্সি’কে দেয়া এক সাক্ষাতে বলছেন যে, যদিও দুই দেশের মাঝে সম্পর্ক বর্তমানে ‘খুব একটা কাছাকাছি নয়’, ছয় মাসের মাঝে নিশ্চিত যে, সম্পর্কের উন্নয়ন হবে। সিরিয়ার কুর্দি ‘ওয়াইপিজি’ মিলিশিয়াদেরকে সন্ত্রাসী আক্ষ্যা দেয়ার পরেও যুক্তরাষ্ট্র আইসিসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সহযোগী হিসেবে নিয়েছে তাদেরকে; যা কিনা তুরস্কের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের মতবিরোধের একটা বড় জায়গা। অন্যদিকে ‘এস ৪০০’ এবং ‘এফ ৩৫’ স্টেলথ যুদ্ধবিমান ইস্যুগুলি দুই দেশের সম্পর্ককে আরও কলুষিত করেছে। জেমস জেফরি সম্পর্ককে আগের অবস্থানে ফেরত নিতে পারার কথা বলেননি; তবে সম্পর্ক মেরামত সম্ভব হতে পারে বলে মনে করছেন।

তুরস্কের ‘ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর এবং তুর্কি প্রেসিডেন্টের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা গুলনার আইবেত ব্রিটেনের ‘রয়াল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইন্সটিটিউট’এর এক লেখায় বলছেন যে, পরিবর্তিত বিশ্বে তুরস্ককে সাথে না রেখে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা সম্ভব নয়। তিনি বলছেন যে, আর্মেনিয়া নিয়ে তুরস্কের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান বিরোধ শুধুমাত্র দুই দেশের সরকারের বিরোধ নয়। বিষয়টা তুরস্কের জনগণের কাছেও খুবই সংবেদনশীল। একসময় তুরস্কের বন্ধুত্ব হারাবার ভয়েই ওয়াশিংটনের লবিং গ্রুপগুলির কথা শোনেনি মার্কিন সরকার। এখন পরিবর্তিত এবং অনিশ্চিত বিশ্বে দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিৎ।

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইউরেশিয়া গ্রুপ’এর প্রেসিডেন্ট ইয়ান ব্রেমার বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এখন প্রধান ফোকাস হলো চীন। একারণেই মার্কিনীরা মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অবস্থানকে কমিয়ে আনতে চাচ্ছে। যেহেতু সেখানে এখন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ তেমন নেই, তাই তার হারাবারও খুব বেশি কিছু নেই। একারণেই মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র এখন এমন সব সিদ্ধান্ত নিতে পারছে, যা আগে নেয়া কষ্টকর ছিল। এই নীতির অংশ হিসেবেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তুরস্কের গুরুত্ব কমে গেছে। এখন তুরস্ককে নিজের পক্ষে রাখার তেমন কোন কারণ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নেই। অপরপক্ষে তুর্কি নেতৃত্ব এবং বুদ্ধিজীবিরা জোর দিয়ে বলতে চাইছে যে, তুরস্ককে ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র তার বিশ্ব নেতৃত্বকে ধরে রাখতে পারবে না; তাই দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়ন ছাড়া আর কোন গত্যন্তর নেই। তবে যে ব্যাপারটাতে সকলেই একমত তা হলো, বাইডেন প্রশাসনের নীতি শুধু তুর্কি সরকার নয়, রাষ্ট্র হিসেবে তুরস্ককেই কাছের বন্ধু হিসেবে দরকার মনে করছে না। এতে সন্দেহাতীতভাবেই তুরস্কের জনগণের মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি হৃদ্যতাবোধ যতটুকু অবশিষ্ট ছিল, তাও বাতাসে মিলিয়ে যাবে। পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বলয় থেকে বের হয়ে আসা ছাড়া তুরস্কের সামনে কোন পথই খোলা থাকছে না।

Friday, 13 November 2020

আজেরবাইজানের যুদ্ধজয় এবং অতঃপর...

১৪ই নভেম্বর ২০২০
আজেরবাইজান এবং তুরস্কের পতাকা নিয়ে আজেরবাইজানের রাজধানী বাকুতে উল্লাস করছে মানুষ। ককেশাসে গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু রাষ্ট্র আর্মেনিয়াকে সহায়তা না দেয়ায় মধ্য এশিয়ায় রাশিয়ার অন্যান্য বন্ধু রাষ্ট্রের কাছে কি বার্তা গেলো, তা এখন আলোচ্য বিষয়। শুশার মসজিদ নিয়ে জাতিগত দ্বন্দ্বই বলে দিচ্ছে যে, আজেরবাইজানের জয় এখনও শুধুমাত্র সামরিক। অপরদিকে বৃহত্তর মধ্য এশিয়াতে কৌশলগত জয়ের ফসল গিয়েছে তুরস্কের ঘরে, যা তুরস্ককে আরও আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতির দিকে ঠেলবে।

১২ই নভেম্বর তুরস্কের পত্রিকা ‘ডেইলি সাবাহ’র এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, নাগোর্নো কারাবাখের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর শুশাতে ২৮ বছর পর মসজিদ থেকে আজান দেয়া হয়। সোশাল মিডিয়াতে এক ভিডিওতে দেখা যায় যে, শুশার ঐতিহাসিক ইউখারি গোভহার আগা মসজিদের মিনার থেকে একজন আজেরি সেনাসদস্য আজান দিচ্ছে। ২৭শে সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া আজেরবাইজানের সাথে আর্মেনিয়ার যুদ্ধ ১০ই নভেম্বর রুশ মধ্যস্ততায় থামার পর এখানকার ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনগুলি আলোচনায় আসছে।

শুশা শহর কারাবাখের রাজধানী স্তেপানাকার্ট থেকে মাত্র ১০ কিঃমিঃ দূরে এবং শুশা স্তেপানাকার্টএর প্রায় ২ হাজার ফুট বেশি উচ্চতায়। স্তেপানাকার্টএর সাথে আর্মেনিয়ার যোগাযোগের রাস্তার উপর অবস্থিত শুশা; আর তাই শুশার নিয়ন্ত্রণ নেয়ার অর্থ হলো স্তেপানাকার্টএর নিয়ন্ত্রণ নেয়া। ৮ই নভেম্বর আজেরবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিইয়েভ শুশা পুণর্দখলের ঘোষণা দেন। শহরটা আজেরিদের নিয়ন্ত্রণে যাবার কারণেই আর্মেনিয়া যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরে বাধ্য হয়েছে বলে অনেকের ধারণা। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ঘোষণা দেন যে, উভয় পক্ষ ‘সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতি’তে সম্মত হয়েছে, যা অত্র অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী সমঝোতার দিকে যাবার সম্ভাবনা তৈরি করবে। তিনি আরও বলেন যে, উভয় পক্ষ তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলি ধরে রাখবে এবং রুশ শান্তিরক্ষী সেনারা দুই পক্ষের মাঝে অবস্থান নেবে। রুশ সেনারা নাগোর্নো কারাবাখের সাথে আর্মেনিয়ার যোগাযোগের জন্যে একটা করিডোর নিয়ন্ত্রণে রাখবে। রুশ বার্তা সংস্থাগুলি বলছে যে, মোট ১ হাজার ৯শ ৬০ জন রুশ সেনা এবং ৯০টা সাঁজোয়া যান শান্তিরক্ষায় মোতায়েন হবে।

ফরাসি বার্তাসংস্থা ‘এএফপি’ বলছে যে, যুদ্ধবিরতির পর আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভানে বিক্ষুব্ধ জনতা পার্লামেন্ট ভবনের নিয়ন্ত্রণ নেবার চেষ্টা করে এবং বিভিন্ন অফিস ভাংচুর করে। আর্মেনিয়ার প্রেসিডেন্ট নিকল পাশিনিয়ান এক ঘোষণায় বলেন যে, সার্বিক সামরিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে একটা ‘অকল্পনীয় যন্ত্রণাদায়ক’ চুক্তি স্বাক্ষরে তিনি বাধ্য হয়েছেন। অপরদিকে আজেরবাইজানের প্রেসিডেন্ট আলিইয়েভ বলছেন যে, একটা ‘লৌহ হস্ত’ পাশিনিয়ানকে চুক্তি স্বাক্ষরে বাধ্য করেছে। তিনি এই চুক্তিকে আর্মেনিয়ার ‘আত্মসমর্পণ’ বলে আখ্যা দেন। আলিইয়েভ বলেন যে, একটা নির্দিষ্ট সময়সীমার মাঝে কারাবাখের একটা বড় এলাকা থেকে আর্মেনিয়া সেনা প্রত্যাহার করতে সম্মত হয়েছে। আর আজেরবাইজানের বন্ধুরাষ্ট্র তুরস্ক যুদ্ধবিরতি ধরে রাখতে সহায়তা দেবে।

শুশার মসজিদের ইতিহাসের সাথে অত্র অঞ্চলের সংঘাতের গভীরতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। ‘ইউরেশিয়ানেট’ বলছে যে, এই মসজিদের কাজ শেষ হয় ১৮৮৫ সালে। সোভিয়েত আমলে মসজিদটাকে জাদুঘর হিসেবে আখ্যা দিয়ে নামাজ আদায় বন্ধ করে দেয়া হলেও ১৯৮৮ সালে আবার নামাজ আদায় শুরু হয়। ১৯৯২ সালের ৮ই মে শুশা শহর আর্মেনিয়দের হাতে চলে যাবার পর থেকে এই মসজিদ থেকে আজান প্রচার হয়নি। গত বছরের ডিসেম্বরে আর্মেনিয়রা ইরানিদের সহায়তায় এই মসজিদ মেরামত করে জাদুঘর হিসেবে জনসাধারণের জন্যে খুলে দেয়। তবে এই মসজিদের মেরামত আজেরিরা ভালো চোখে দেখেনি। আর্মেনিয়রা কারাবাখ দখল করে নেবার পর কারাবাখের ৬ লাখের বেশি আজেরি তাদের বাড়িঘর ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। শুশার এক শিক্ষক নুনে হাকোবিয়ান মসজিদখানা মেরামতের পর মন্তব্য করেন যে, তিনি এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটাকে পছন্দ করেন; তবে তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন যে, এই মসজিদখানা তৈরি হয়েছে খ্রিস্টান ভূমিতে। আরটার পোগোসিয়ান নামের আরেক ব্যক্তি মন্তব্য করেন যে, কারাবাখের কর্তাব্যক্তিরা এই মসজিদের মেরামত চাইলেও জনগণ চায় না। তারা মনে করে যে, এখানে একটা মসজিদ থাকলে মুসলিমরা কোন এক সময় মনে করবে যে, এই ভূমি মুসলিমদের। শুশার আর্মেনিয়দের কথায় অত্র অঞ্চলে আর্মেনিয় এবং আজেরিদের মাঝে দ্বন্দ্ব কতটা গভীর, তার প্রমাণ মেলে। উভয় পক্ষের দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে রয়েছে ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলি। মসজিদটা মেরামত করে কারাবাখের আর্মেনিয়রা ঘোষণা দেয় যে, আজেরিরা আর্মেনিয়দের ইতিহাস ধ্বংস করলেও আর্মেনিয়রা তার উল্টোটা করেছে। অপরদিকে আজেরিরা বলছে যে, আর্মেনিয়রা মসজিদখানা মেরামত করে এটাকে ‘পারস্যের মসজিদ’ বলে আখ্যা দিচ্ছে, যা কিনা এখান থেকে আজেরিদের ঐতিহ্য মুছে ফেলার একটা চক্রান্ত। কারাবাখের মন্ত্রী আরতাক গ্রিগোরিয়ান বলছেন যে, ইরানি প্রকৌশলীরা সহায়তা করতে এসে এই মসজিদকে ‘পারস্যের মসজিদ’ বলেই আখ্যা দিয়েছে; তাই তারাও সেটাই বলছেন। দুই পক্ষের কথাগুলি জাতিগত চরম মেরুকরণেরই উদাহরণ, যা অত সহজে পরিবর্তনীয় নয়। আজেরিরা নিজেদেরকে তুর্কি জাতির অংশ বলে মনে করলেও পারসিক আখ্যা দেয়াটা তাদের পছন্দনীয় নয়।

কমপক্ষে ১৩’শ মানুষ এই যুদ্ধে নিহত হয়েছে বলে বলছে বার্তাসংস্থাগুলি; যদিও অনেকেই এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি হবে বলে বলছেন। এই হত্যাযজ্ঞ প্রায় তিন দশক ধরে চলা যুদ্ধাবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। তুর্কি ও ইস্রাইলি মনুষ্যবিহীন ড্রোন এবং বাকুর তেল বিক্রির অর্থে কেনা বিপুল অস্ত্রের সমাহার আজেরবাইজানকে আর্মেনিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে একচ্ছত্র প্রাধান্য দিলেও তুরস্কের সমর্থন ব্যাতীত আজেরিদের পক্ষে এতদিন যুদ্ধ চালিয়ে নেয়া সম্ভব ছিল না। রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের কাছে আর্মেনিয়রা সহায়তা চাইলেও পুতিন সরাসরিই বলে দেন যে, শুধুমাত্র আর্মেনিয়া আক্রান্ত হলেই রুশরা আর্মেনিয়ার পক্ষে যুদ্ধে জড়াবে; কারাবাখ যেহেতু আজেরবাইজানের এলাকা বলে স্বীকৃত, তাই সেখানকার যুদ্ধে রুশরা জড়াবে না। আজেরবাইজানকে তুরস্কের সরাসরি সমর্থনই শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত করে যে, রাশিয়া যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন ব্যতীত অন্য কোন ভূমিকা নেয়নি। এই যুদ্ধ শেষ হলো রাশিয়া এবং তুরস্কের ভূমিকায়; যা কিনা ‘ওএসসিই মিনস্ক গ্রুপ’কে অর্থহীন করে ফেলেছে। সুপারপাওয়ার যুক্তরাষ্ট্র নীরব থেকে তুরস্ককে সমর্থন দিয়ে যাওয়ায় একদিকে মিনস্ক গ্রুপের সদস্য ফ্রান্সের প্রভাব যেমন আরও কমলো, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র যে এই অঞ্চল নিয়ে তেমন মাথা ঘামাবে না, সেব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেলো। প্রধানমন্ত্রী পাশিনিয়ানের পশ্চিমা সমর্থিত সরকারের খুঁটিও দুর্বল হলো; যা রাশিয়াকে খুশিই করবে। তবে ককেশাসে গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু রাষ্ট্র আর্মেনিয়াকে সহায়তা না দেয়ায় মধ্য এশিয়ায় রাশিয়ার অন্যান্য বন্ধু রাষ্ট্রের কাছে কি বার্তা গেলো, তা এখন আলোচ্য বিষয়। শুশার মসজিদ নিয়ে জাতিগত দ্বন্দ্বই বলে দিচ্ছে যে, আজেরবাইজানের জয় এখনও শুধুমাত্র সামরিক। অপরদিকে বৃহত্তর মধ্য এশিয়াতে কৌশলগত জয়ের ফসল গিয়েছে তুরস্কের ঘরে, যা তুরস্ককে আরও আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতির দিকে ঠেলবে।

Sunday, 1 November 2020

ককেশাসের যুদ্ধের এক মাস ...

০১লা নভেম্বর ২০২০
'লাচিন করিডোর' বা গিরিপথ। কৌশলগত ‘লাচিন করিডোর’ হাতছানি দিচ্ছে আজেরিদের কাছে; এর পর রয়েছে ‘কারাবাখের হৃদয়’ শুশা। এই দুই টার্গেটের কোন একটা আজেরিদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে তুরস্ক আর রাশিয়ার মাঝে বর্তমান স্থিতাবস্থা যে আরও চাপের মাঝে পড়বে, তা নিশ্চিত।


২৭শে সেপ্টেম্বর শুরু হয়ে এক মাসের উপর হয়ে গেলো ককেশাসের যুদ্ধে থামেনি। অক্টোবরের ১০, ১৮ এবং ৩০ তারিখে তিনটা যুদ্ধবিরতির চেষ্টা বিফলে গিয়েছে। আজেরিরা বলছে যে, নাগোর্নো কারাবাখ অঞ্চল মুক্ত করার আগ পর্যন্ত তারা যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। আন্তর্জাতিকভাবে নাগোর্নো কারাবাখ অঞ্চল আজেরবাইজানের ভূখন্ড বলেই স্বীকৃত। ১৯৯০এর দশকে আর্মেনিয়রা সামরিকভাবে কারাবাখ দখল করে সেখানে ‘রিপাবলিক অব আর্তসাখ’ নামের একটা রাষ্ট্র ঘোষণা করে, যাকে বিশ্বের আর কোন দেশই স্বীকৃতি দেয়নি। অন্যদিকে আর্মেনিয়ার সাথে সামরিক চুক্তি থাকলেও রাশিয়া বলছে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত আর্মেনিয়ার মূল ভূখন্ড হামলার শিকার না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা আর্মেনিয়ার পক্ষে যুদ্ধে যোগদান করবে না। অপরদিক তুরস্ক আজেরবাইজানকে সরাসরি রাজনৈতিক সমর্থন দিয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম দিয়েছে, যা যুদ্ধে আজেরিদের এগিয়ে থাকতে ব্যাপক সহায়তা দিয়েছে। তুরস্কের সামরিক বিশেষজ্ঞরাও খুব সম্ভবতঃ আজেরিদেরকে উপদেশ দিয়ে সহায়তা করছেন। তবে অনেক হুমকি সত্ত্বেও তুরস্ক আজেরবাইজানে সরাসরি সেনা পাঠানো থেকে বিরত থেকেছে, যা কিনা ককেশাসে রাশিয়া বা অন্য কোন তৃতীয় দেশের সরাসরি জড়িত হওয়ার পেছনে ‘ডিটারেন্ট’ হিসেবে কাজ করেছে। এই সুযোগটা নিয়েই আজেরিরা বিগত বছরগুলিতে তেল বিক্রির অর্থে কেনা বিপুল সামরিক শক্তিকে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করে কারাবাখের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বেশকিছু অঞ্চল মুক্ত করে নিয়েছে। ‘বিবিসি’র এক বিশ্লেষণে দেখানো হচ্ছে যে, ২৭শে অক্টোবর নাগাদ কারাবাখের দক্ষিণে ইরানের সাথে সীমানার পুরোটাই এখন আজেরিরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে। এক মাস রক্তক্ষরণের পর এই যুদ্ধ কোথায় এসে পৌঁছেছে? এই যুদ্ধের শেষই বা কোথায়?

যুদ্ধে সর্বশেষ পরিস্থিতি অনুযায়ী আজেরবাইজানকে সকল বিশ্লেষকেরাই এগিয়ে রেখেছেন। ‘ফোর্বস’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় সাংবাদিক সেবাস্টিয়ান রোবলিন বলছেন যে, কারাবাখের দক্ষিণের পুরোটার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবার পর আজেরিরা খুব সম্ভবতঃ উত্তর দিকে অগ্রসর হচ্ছে; টার্গেট কৌশলগত ‘লাচিন করিডোর’ গিরিপথ। এই করিডোর হলো কারাবাখের রাজধানী স্তেপানাকার্ট (যাকে আজেরিরা বলে খানকেন্দি) এবং গুরুত্বপূর্ণ শহর শুশার সাথে আর্মেনিয়ার মূল ভূখন্ডের যোগাযোগের মূল রাস্তা। ১৯৯২ সালে কারাবাখের সাথে আর্মেনিয়ার একটা কৌশলগত লাইফলাইন নিশ্চিত করতেই এই করিডোর দখল করে নেয় আর্মেনিয়রা। এবারের যুদ্ধে ২২শে অক্টোবর নাগাদ ইরানের সীমানায় আরাস নদী বরাবর পশ্চিমে এগুনোর পর আজেরিরা হাকারি নদীর সংযোগস্থলে পৌঁছে যায়। এই নদীর অববাহিকাই উত্তরে গিয়ে মিলেছে ‘লাচিন করিডোর’এর সাথে। অত্র অঞ্চলের পাহাড়ি বাস্তবতার কারণেই যোগাযোগের পথগুলি বেশ স্বল্প পরিসরের মাঝে সীমাবদ্ধ। এই করিডোরের উপর চাপ কমাতে আজেরবাইজানের সর্বদক্ষিণে আর্মেনিয়ার সীমানার কাছাকাছি আর্মেনিয়রা প্রতিআক্রমণ শুরু করে। আর এই অঞ্চলটা এমন একটা স্থানে, যেখানে আক্রমণ চালাতে গেলে আর্মেনিয়ার মূল ভূখন্ডের উপর নির্ভর করেই করতে হবে। আজেরিরা যদি এই করিডোরের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে, অথবা করিডোরের উপর সামরিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তাহলে সামনের শীতকালে কারাবাখের আর্মেনিয়রা মারাত্মক সমস্যায় পড়বে। তবে রোবলিন এও বলছেন যে, এই করিডোরের উপর চাপ পড়লে নাগোর্নো কারাবাখে যদি মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়, তাহলে তা রাশিয়া এবং অন্যান্য দেশের জন্যে এই যুদ্ধে সরাসরি হস্তক্ষেপের কারণ তৈরি করতে পারে। রাশিয়া লাচিন করিডোরের পশ্চিমে তেগ শহরের কাছে একটা সামরিক ক্যাম্প বসিয়েছে এই করিডোরের উপর নজরদারির জন্যে। 


তুর্কি মিডিয়া ‘টিআরটি ওয়ার্ল্ড’এর সাথে সাক্ষাতে ওয়াশিংটন ভিত্তিক থিংট্যাঙ্ক ‘মিডলইস্ট ইন্সটিটিউট’এর বিশ্লেষক রাউফ মামাদভ বলেন যে, দুই দেশের যুদ্ধে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ শহর এখন লাচিন এবং শুশা। গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়ি অঞ্চলগুলি দখলে নিয়ে আজেরিরা চাইবে দক্ষিণে কৌশলগত লাচিন এবং উত্তরে কারবাহাল এলাকাকে নিয়ন্ত্রণ করতে। আজেরিদের কাছে শুশা হলো কারাবাখের হৃদয়। এই শহরটা যদি আজেরিরা সময়মত নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে, তাহলে তারা তা আলোচনার টেবিলে ব্যবহার করতে পারে; অবশ্য যদি আর্মেনিয়রা আলোচনায় রাজি থাকে। আজেরিরা ইতোমধ্যেই লাচিন থেকে আর্টিলারি দূরত্বে রয়েছে। বাকুর থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘তোপচুবাশভ সেন্টার’এর ডিরেক্টর রুসিফ হুসেইনভ বলছেন যে, লাচিন হলো কারাবাখ এবং আর্মেনিয়ার মাঝে সেতু; আর শুশা হলো এমন এক উঁচু জায়গা, যা নিয়ন্ত্রণে থাকলে পুরো কারাবাখই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তিনি বলেন যে, লাচিন বা শুশার একটাও যদি আজেরিরা দখলে নিতে পারে, তা হবে এই যুদ্ধের মোড় ঘোড়ানো ঘটনা। আর দু’টাই যদি আজেরিদের কাছে চলে যায়, তবে যুদ্ধও শেষ হয়ে যেতে পারে। হুসেইনভ বলছেন যে, আর্মেনিয়রা এতকাল আলোচনা মেনে না নেয়ায় আজেরিরা এখন পুরো কারাবাখ পুনরুদ্ধারের পথেই হাঁটছে। আর সেটা সম্ভব না হলে তারা হয়তো লাচিন করিডোর এবং শুশার নিয়ন্ত্রণ নিতে চেষ্টা করবে। লাচিন করিডোর হারালে কারাবাখের বেঁচে থাকা কঠিন হবে।

তবে যুদ্ধ শেষের কথা বলতে গেলে শক্তিশালী দেশগুলির কথাও আলোচনায় আনতে হবে। হারভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কেনেডি স্কুলের প্রকাশনা ‘রাশিয়া ম্যাটার্স’এ এক লেখায় জ্যেষ্ঠ গবেষক মাইকেল কফম্যান বলছেন যে, আজেরবাইজানকে তুরস্ক সরাসরি সমর্থন দেয়ায় যে প্রশ্নটা সামনে এসেছে তা হলো, রাশিয়া তার আশেপাশের দেশগুলির সাথে যে নিরাপত্তা চুক্তি করেছে, সেই অনুযায়ী রাশিয়া নিরাপত্তা দিতে সক্ষম কিনা। তিনি আরও বলছেন যে, এই যুদ্ধ দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ‘গ্রেট পাওয়ার’ এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলি অনেক সময়ই অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী দেশগুলির উপর নিজেদের ইচ্ছাকে চাপিয়ে দিতে চাইলেও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় তা সর্বদা সাফল্য পায় না।

তিনটা ব্যর্থ যুদ্ধবিরতির চেষ্টার পরেও জেনেভায় আলোচনায় বসেছেন আর্মেনিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহরাব মেনাতসাকানিয়ান এবং আজেরবাইজানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেইহুন বায়রামভ। তবে এই আলোচনার সফলতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বিস্তর। যখন আজেরিরা যুদ্ধে এগিয়ে রয়েছে এবং বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, তারা যুদ্ধে জয়লাভ করতে পারবে, তখন আলোচনার গুরুত্ব কমে যায় বৈকি। কৌশলগত ‘লাচিন করিডোর’ হাতছানি দিচ্ছে আজেরিদের কাছে; এর পর রয়েছে ‘কারাবাখের হৃদয়’ শুশা। তবে এই দুই টার্গেটের কোন একটা আজেরিদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে তুরস্ক আর রাশিয়ার মাঝে বর্তমান স্থিতাবস্থা যে আরও চাপের মাঝে পড়বে, তা নিশ্চিত।

Saturday, 17 October 2020

ড্রোন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কি?

১৮ই অক্টোবর ২০২০

ড্রোন একা যুদ্ধ জেতাতে পারবে না। এর সাথে ইনফর্মেশন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সমন্বিতভাবে কাজ করবে অন্যান্য সার্ভেইল্যান্স ও কমিউনিকেশন্স ইন্টেলিজেন্স ড্রোন, ইলেকট্রনিক জ্যামার, স্যাটেলাইট, হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স, ভূমি ও আকাশ থেকে নিক্ষেপণযোগ্য দূরপাল্লার আর্টিলারি ও ক্ষেপণাস্ত্র। এটা নিশ্চিত যে, এখন থেকে ককেশাসের যুদ্ধের শিক্ষাগুলিকে মাথায় রেখেই সকলকে কাজ করতে হবে।

ককেশাসে আজেরবাইজান এবং আর্মেনিয়ার মাঝে যুদ্ধের মাঝে সোশাল মিডিয়া বহু ভিডিও দিয়ে ছেয়ে যায়, যেখানে আকাশ থেকে দেখা যাচ্ছে যে, আর্মেনিয়ার ট্যাঙ্ক, আর্টিলারি এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এই ভিডিওগুলি এসেছে আজেরবাইজানের ব্যবহৃত মনুষ্যবিহীন বিমান বা ড্রোন থেকে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘দ্যা মিডলইস্ট সেন্টার ফর রিপোর্টিং এন্ড এনালিসিস’এর প্রতিষ্ঠাতা এবং এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর সেথ জে ফ্রান্তজম্যান ‘নিউজউইক’এর এক লেখায় বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরেই ড্রোনের ব্যবহার করে আসলেও আর্মেনিয়ার সাথে যুদ্ধে আজেরবাইজানের শতশত নতুন ধরনের ড্রোন ব্যবহার ভবিষ্যৎ যুদ্ধের যবনিকা উন্মোচন করেছে।

আজেরবাইজানের ড্রোনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো ইস্রাইল। ২০১৬ সালে আজেরবাইজান এবং আর্মেনিয়ার মাঝে চার দিনব্যাপী এক যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যেখানে ইস্রাইলের তৈরি ড্রোনগুলি, বিশেষ করে ‘হারোপ’ সুইসাইড ড্রোন সেই যুদ্ধে তাদের কার্যকারিতার প্রমাণ দেয়। একটা ড্রোনের হামলায় আর্মেনিয়ার একটা বাস ধ্বংস হয়, যার মাধ্যমে কয়েকজন মধ্যম সাড়ির সামরিক অফিসার মারা যায়। এই সুইসাইড ড্রোনগুলি আকাশে উড়তে থাকে; যখন সেগুলি তাদের টার্গেট পেয়ে যায়, তখন নিজেই বোমার মতো সেই টার্গেটের উপর গিয়ে আঘাত করে। আঘাত করার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত তা ছবি প্রেরণ করতে থাকে। ‘হারোপ’এর ইঞ্জিনের শব্দ ভূমি থেকে শোনা গেলেও পরবর্তীতে তৈরি করা ‘স্কাইস্ট্রাইকার’ এবং ‘অরবিটার ওয়ান-কে’ ড্রোন ইলেকট্রিক মোটর ব্যবহার করে বলে ওড়ার সময় প্রায় শব্দহীন থাকে; শুধু টার্গেটের উপর হামলা করার সময় শব্দ করে। আজেরবাইজানের সরকার একটা ভিডিওতে ৪টা ট্রাকের উপর অনেকগুলি সিলিন্ডার থেকে ইস্রাইলি ড্রোন ছোঁড়ার দৃশ্য দেখায়। ফ্রান্তজম্যান বলছেন যে, ঐ ট্রাকগুলি ৩৬টা সুইসাইড ড্রোন বহণ করতে সক্ষম; যা কিনা একটা বড়সড় সামরিক গ্রুপ সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিতে সক্ষম।

২০২০ সালের যুদ্ধে আজেরবাইজানের ড্রোন ফ্লিটে যুক্ত হয় তুরস্কে তৈরি ‘বায়রাকতার টিবি ২’ এটাক ড্রোন। ছোট আকৃতির এবং অপেক্ষাকৃত সস্তা এই ড্রোন টার্গেটের উপর ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ে আবার ঘাঁটিতে ফেরত আসে এবং জ্বালানি নিয়ে আবারও মিশনে যায়। ‘আল জাজিরা’ তাদের বিশ্লেষণে বলছে যে, আজেরবাইজানের ড্রোনগুলি তাদের টার্গেট ধ্বংসের যে হাই রেজোলিউশন ভিডিও পাঠায়, তা তথ্য যুদ্ধে ব্যবহার করা হয়। অপরদিকে আর্মেনিয়া এমন কোন হামলার ভিডিও প্রকাশ করতে না পারায় জনগণের চোখে শুধু আজেরবাইজানের সাফল্যই ধরা পড়েছে এবং সবাই ধরেই নিয়েছে যে, যুদ্ধে আজারবাইজানই জিততে চলেছে।

আকাশ থেকে হামলা করা ছাড়াও ড্রোনগুলি যে ছবি পাঠায়, তার উপর ভিত্তি করে শত্রুর টার্গেটে দূরপাল্লার আর্টিলারি এবং বিমান দিয়ে নির্ভুলভাবে হামলা করা যায়। তুরস্ক সিরিয়া এবং লিবিয়াতে এই কৌশল অবলম্বন করে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন যে, সেই শিক্ষাগুলিই তুরস্কের সাথে যৌথ মহড়ার সময় আজেরিদের কাছে পৌঁছে গেছে। অনেকেই এর মাঝে আশংকা করতে শুরু করেছেন যে, ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে ট্যাঙ্কের অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ‘ওয়াশিংটন টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ট্যাঙ্কের দিন প্রায় শেষের পথে। ‘দ্যা ট্রিবিউন’ বলছে যে, ট্যাঙ্ককে যুদ্ধক্ষেত্রে বাঁচতে হলে কৌশল পরিবর্তন করতে হবে। সমর বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, জ্যামার ব্যবহার করে ড্রোনের সাথে এর কন্ট্রোলারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা যায়; আর ট্যাঙ্কের সাথে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বৃদ্ধি করে ড্রোন ভূপাতিত করা যায়। তবে ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের ম্যারিন কোর এবং ব্রিটিশ সেনাবাহিনী তাদের ট্যাঙ্কের সংখ্যা কমিয়ে ইনফর্মেশন নেটওয়ার্ক ভিত্তিক সমন্বিত সক্ষমতার দিকে দৃষ্টি দিচ্ছে, যেখানে ইলেকট্রনিক সেন্সর, ড্রোন এবং দূরপাল্লার অস্ত্রের ব্যবহার হবে গুরুত্বপূর্ণ। ‘আল জাজিরা’ আজেরবাইজানের উদাহরণ দিয়ে বলছে যে, বর্তমানে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক সেন্সর এবং ড্রোন ব্যবহারের কারণে আর্মেনিয়ার কোন অস্ত্রই লুকিয়ে থাকতে পারছে না; আর এর সাথে ড্রোন এবং দূরপাল্লার অস্ত্রের ব্যবহারে নির্ভুলভাবে টার্গেট ধ্বংস করে ফেলা যাচ্ছে।

তবে আজেরবাইজানের এই যুদ্ধ দেখিয়ে দেয় যে, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও ড্রোন থেকে নিরাপদ নয়। ১৫ই অক্টোবর পর্যন্ত আজেরবাইজান সরকার দাবি করে যে, তারা ১৫টা বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিট ধ্বংস করেছে; যার মাঝে একটা অত্যাধুনিক ‘এস ৩০০’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা রয়েছে; ৬টা রাডারও রয়েছে। এছাড়াও তারা ৪৯টা ট্যাঙ্ক ও আর্মার্ড ভেহিকল এবং ৫১টা আর্টিলারি ইউনিট ধ্বংস করেছে। অপরপক্ষে ১৭ই অক্টোবর আর্মেনিয়া বলে যে, তারা কমপক্ষে ১’শ ৮৬টা ড্রোন ভূপাতিত করেছে। একইসাথে তারা ৫’শ ৫৪টা ট্যাঙ্ক ও আর্মার্ড ভেহিকল ২২টা বিমান এবং ১৬টা হেলিকপ্টার ধ্বংস করার দাবি করে। দাবির সত্যাসত্য যাচাই করার আগে এটা অন্ততঃ বলা যায় যে, এর আগে কোন যুদ্ধে কেউ এতগুলি ড্রোন ভূপাতিত করার যেমন দাবি করেনি, তেমনি ড্রোন ব্যবহার করে এতগুলি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের দাবিও করেনি। সেথ ফ্রান্তজম্যান বলছেন যে, একটা ড্রোন ভিডিওতে আরেকটা ইস্রাইলি ‘অরবিটার’ ড্রোন দেখা যায়; যা বলে দিচ্ছে যে, আকাশে এতগুলি ড্রোন একত্রে উড়ছে যে, একটা আরেকটার ছবি তুলছে!

ড্রোন নির্মাতা যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন অবশ্যই আজেরবাইজানের যুদ্ধের দিকে লক্ষ্য রাখছে। ১৩ই অক্টোবর ‘ইন্সটিটিউট অব ইলেকট্রনিক সায়েন্স এন্ড টেকনলজি চায়না’ একটা ভিডিও প্রকাশ করে; যেখানে দেখানো হয় যে একটা ট্রাক থেকে ৪৮টা সুইসাইড ড্রোন ছোঁড়া হচ্ছে। অনেকগুলি ড্রোনকে একত্রে ঝাঁক বেঁধে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সমস্যায় ফেলে দেয়া সম্ভব, তা ককেশাসের যুদ্ধে প্রমাণিত। ‘কদিন আগেই ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ জেনারেল মার্ক কার্লেটন স্মিথ সাংবাদিকদের বলেন যে, ভবিষ্যতের বাহিনীতে আর্মার্ড ভেহিকল ব্যবহৃত হবে রোবোটের মাদারশিপ হিসেবে; এর সাথে থাকবে দূরপাল্লার আর্টিলারি, যেগুলির জন্যে টার্গেট খুঁজে দেবে ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন। তবে এসব ড্রোন একা যুদ্ধ জেতাতে পারবে না। এর সাথে ইনফর্মেশন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সমন্বিতভাবে কাজ করবে অন্যান্য সার্ভেইল্যান্স ও কমিউনিকেশন্স ইন্টেলিজেন্স ড্রোন, ইলেকট্রনিক জ্যামার, স্যাটেলাইট, হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স, ভূমি ও আকাশ থেকে নিক্ষেপণযোগ্য দূরপাল্লার আর্টিলারি ও ক্ষেপণাস্ত্র। ফ্রান্তজম্যান বলছেন যে, এটা নিশ্চিত যে, এখন থেকে ককেশাসের যুদ্ধের শিক্ষাগুলিকে মাথায় রেখেই সকলকে কাজ করতে হবে।

Saturday, 10 October 2020

ককেশাসে যুদ্ধ ... শান্তি প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব নিচ্ছে না কেউই

১০ই অক্টোবর ২০২০
জাতিসংঘ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি এই রাষ্ট্রগুলির জাতীয় স্বার্থকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি। আর তাই জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ‘৮২২’, ‘৮৫৩’, ‘৮৭৪’ এবং ‘৮৮৪’ নম্বর রেজোলিউশন অর্থহীনই রয়ে গিয়েছে। দন্তহীন জাতিসংঘের রেজোলিউশনের ব্যাপারে ভীত হবার কোন কারণ কারুর কাছেই ছিল না; বরং সকলেই হিসেব করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিরা কি চায়। গায়ের জোরই যেখানে সমস্যা সমাধানের একমাত্র কৌশল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এতে রাশিয়া ছাড়াও তুরস্ক এবং অন্যান্য দেশের অস্ত্র বিক্রি বেড়েছে; বেড়েছে লাশের মিছিল। বর্তমান বিশ্বব্যাবস্থার কদর্য ফুটিয়ে তোলার জন্যে আর কি প্রয়োজন?

৯ই অক্টোবর রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, পরদিন দুপুর থেকে আজেরবাইজান এবং আর্মেনিয়ার মাঝে সীমিতি আকারে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হতে চলেছে। এতে বলা হয় যে, এই যুদ্ধবিরতি বলবত হবে মূলতঃ মানবিক কারণে, যুদ্ধবন্দী আদানপ্রদান করতে, আটকে পড়া মানুষকে নিরাপদে নিতে এবং লাশ হস্তান্তর করতে। রুশ বিবৃতিতে আরও বলা হয় যে, যুদ্ধবিরতির শর্তসমূহের উপর আলাদাভাবে আলোচনা এবং সমঝোতা হবে। ২৭শে সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে কত হতাহত হয়েছে, তা এখনও নিশ্চিত করে কেউ বলতে না পারলেও উভয় পক্ষই অপর পক্ষের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির দাবি করেছে। কিন্তু এই অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি বলবত করতেই প্রায় দুই সপ্তাহ লেগে গেলো কেনো, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন অনেকেই। সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র হিসেবে দুই দেশের উপর ব্যাপক প্রভাব রাখে রাশিয়া; উভয় দেশের বেশিরভাগ অস্ত্রই সরবরাহ করেছে রাশিয়া। এছাড়াও আর্মেনিয়ার সাথে রাশিয়ার নিরাপত্তা চুক্তিও রয়েছে, যার শর্ত অনুযায়ী আর্মেনিয়া আক্রান্ত হলে রুশরা সামরিক সহায়তা দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ১০ দিন আর্মেনিয়ার সাথে চুক্তির ব্যাপারে চুপ থাকার পর ৭ই অক্টোবর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেন যে, আর্মেনিয়ার সাথে রাশিয়ার চুক্তির মাঝে বিতর্কিত নাগোর্নো কারাবাখ নেই, যেখানে আজেরবাইজানের সাথে আর্মেনিয়দের যুদ্ধ চলছে। তিনি সহিংসতার কারণে অনেক মানুষের প্রাণহানিতে শোক প্রকাশ করেন এবং দুঃখ প্রকাশ করেন যে, যুদ্ধটা যেহেতু আর্মেনিয়ার ভূখন্ডে হচ্ছে না, তাই এব্যাপারে রাশিয়ার তেমন কিছু করার নেই। ২৮ বছর আগে ১৯৯২ সালে আজেরবাইজান এবং আর্মেনিয়ার যুদ্ধের শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজতে ‘অর্গানাইজেশন ফর সিকিউরিটি এন্ড কোঅপারেশন ইন ইউরোপ’ বা ‘ওএসসিই’এর অধীনে ‘মিনস্ক গ্রুপ’ নামে একটা সংস্থা গঠন করা হয়। এই সংস্থার কোচেয়ারম্যান রাশিয়া, ফ্রান্স এবং যুক্তরাষ্ট্র। প্রায় তিন দশকে এই সমস্যার সমাধান না হওয়ায় ‘মিনস্ক গ্রুপ’এর সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অপরদিকে তুরস্ক বর্তমান যুদ্ধের শুরু থেকেই আজেরবাইজানকে সমর্থন করে আসছে; সামরিক সহায়তাও দিচ্ছে। আর গ্রুপের কোচেয়ারম্যান ফ্রান্স ইতোমধ্যেই আর্মেনিয়ার পক্ষে কথা বলেছে এবং এই বিবাদে তুরস্কের জড়ানোটা পছন্দ করেনি। নাগোর্নো কারাবাখের আজেরিদের নেতা তুরাল গাঞ্জালিয়েভ তুরস্কের ‘আনাদোলু এজেন্সি’র সাথে কথা বলতে গিয়ে ‘মিনস্ক গ্রুপ’এর কোচেয়ার থেকে ফ্রান্সের অপসারণ দাবি করেন। তিনি ফ্রান্সের স্থানে তুরস্ককে কোচেয়ারের পদে দেখতে চান বলে বলেন। গ্রুপের অপর সদস্য যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত কথাসর্বস্বই থেকেছে। এমতাবস্থায় এরকম ধ্বংসাত্মক একটা যুদ্ধ থামাবার পিছনে আন্তর্জাতিক উদ্যোগের অভাবটাই সামনে আসছে বারংবার।

‘আল জাজিরা’র সাথে এক সাক্ষাতে আজেরবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিইয়েভ অভিযোগ করেন যে, ‘মিনস্ক গ্রুপ’এর মধ্যস্ততাকারীরা জাতিসংঘের রেজোলিউশন বাস্তবায়নের ব্যাপারে কোন চাপ প্রয়োগ করে না। তিনি বলেন যে, আজেরবাইজান এই দ্বন্দ্ব নিরসনে আরও ৩০ বছর অপেক্ষা করতে পারবে না। ১৯৯০এর দশকে আর্মেনিয়রা আজেরবাইজানের ভূখন্ড হিসেবে স্বীকৃত নাগোর্নো কারাবাখ অঞ্চল সামরিকভাবে দখল করে নেয়। সেই যুদ্ধে পশ্চিমা এবং রুশ হিসেবে প্রায় ৩০ হাজার আজেরি মৃত্যুবরণ করে; প্রায় ৬ হাজার আর্মেনিয়ও মারা যায়। সোভিয়েত আমলে ১৯৮৮ সাল থেকে এই দ্বন্দ্ব শুরু হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আজেরবাইজান এবং আর্মেনিয়া নতুন দেশ হিসেবে আবির্ভূত হওয়ায় দুই দেশের মাঝে ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়। তবে ১৯৯৩ সালের এপ্রিলের আগে এই যুদ্ধ বন্ধে জাতিসংঘের কোন রেজোলিউশন আসেনি। সেই একই বছরে নিরাপত্তা পরিষদের মোট ৪টা রেজোলিউশন আসলেও তা যুদ্ধ বন্ধ করতে পারেনি। অবশেষে ১৯৯৪ সালের ১২ই মে যখন রুশ মধ্যস্ততায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, তখন নাগোর্নো কারাবাখের পুরোটাই আর্মেনিয়দের দখলে। শুধু তা-ই নয়, এর বাইরেও আজেরবাইজানের ৯ শতাংশ এলাকা আর্মেনিয়রা অধিকার করে নেয়।

আজেরবাইজান এবং আর্মেনিয়ার অফিশিয়াল সীমানা সোভিয়েত আমলে তৈরি; যা নিয়ে কেউই খুশি হতে পারেনি। জাতিসংঘ সেই সোভিয়েত সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়েই ১৯৯২ সালের ২রা মার্চ দুই দেশকে জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু গত তিন দশকে জাতিসংঘের এই সদস্যপদ এই দুই দেশের জন্যে দিতে পারেনি শান্তি। এখানে রুশ ইচ্ছাটার বাস্তবায়নকেই মেনে নিয়েছে জাতিসংঘ। একইসাথে ‘মিনস্ক গ্রুপ’এর মতো একটা অন্তসারশূণ্য সংস্থাকেও তাদের মেনে নিতে হয়েছে মধ্যস্ততাকারী হিসেবে। রাশিয়া, ফ্রান্স এবং যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিজেদের স্বার্থ থেকে বের হতে না পারার কারণে এই সমস্যার সমাধানও সোনার হরিণ থেকে গিয়েছে। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে সামরিক হস্তক্ষেপ করলে ইউরোপের সাথে আফগানিস্তানের সামরিক এয়ার করিডোর তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ গুটি হয়ে দাঁড়ায় আজেরবাইজান এবং জর্জিয়া। ২০০৩ সালে গণভ্যুত্থানের মাধ্যমে জর্জিয়া রুশ প্রভাব থেকে দূরে সরে যায়। আজেরবাইজানের বাকুর তেলখনিগুলি থেকে উত্তোলিত তেল ইউরোপের বাজারে বিক্রি করতে রাশিয়া এবং আর্মেনিয়াকে বাইপাস করে ২০০৬ সালে জর্জিয়ার মাঝ দিয়ে পাইপলাইন চালু করা হয়। ২০০৮ সালে রাশিয়া জর্জিয়া আক্রমণ করে বসলে এই পাইপলাইনের ভবিষ্যৎ হুমকির মাঝে পড়ে যায়। ফলস্বরূপ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা আজেরবাইজান তুরস্কের সাথে নিরাপত্তা চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। ককেশাসে পশ্চিমা প্রভাব বিস্তারকে রাশিয়া সন্দেহের চোখেই দেখেছে। তবে এর ফলশ্রুতিতে অত্র অঞ্চলে তুরস্কের প্রভাবও বৃদ্ধি পেয়েছে।

ককেশাসে প্রভাব বিস্তার করার জন্যে অনেক দেশই এগিয়ে এসেছে; কিন্তু সেখানে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় সেই প্রচেষ্টা চোখে পড়েনি। জাতিসংঘ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি এই রাষ্ট্রগুলির জাতীয় স্বার্থকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি। আর তাই জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ‘৮২২’, ‘৮৫৩’, ‘৮৭৪’ এবং ‘৮৮৪’ নম্বর রেজোলিউশন অর্থহীনই রয়ে গিয়েছে। থেকে থেকে সংঘাতে জড়িয়েছে দুই দেশ; শক্তিশালী দেশগুলি তাতে দিয়েছে তাদের ইন্ধন। দন্তহীন জাতিসংঘের রেজোলিউশনের ব্যাপারে ভীত হবার কোন কারণ কারুর কাছেই ছিল না; বরং সকলেই হিসেব করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিরা কি চায়। গায়ের জোরই যেখানে সমস্যা সমাধানের একমাত্র কৌশল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এতে রাশিয়া ছাড়াও তুরস্ক এবং অন্যান্য দেশের অস্ত্র বিক্রি বেড়েছে; বেড়েছে লাশের মিছিল। বর্তমান বিশ্বব্যাবস্থার কদর্য ফুটিয়ে তোলার জন্যে আর কি প্রয়োজন?

Saturday, 3 October 2020

বৃদ্ধি পেলো আজেরবাইজান এবং আর্মেনিয়ার সংঘাতের আঞ্চলিক পরিধি

৩রা সেপ্টেম্বর ২০২০ 

আর্মেনিয়া তাদের সমর্থনে রাশিয়া এবং ফ্রান্সকে পেলেও ইরান সরাসরি পক্ষ নেয়নি। অপদিকে তুরস্ক প্রথম থেকেই আজেরবাইজানের পক্ষ নিয়েছে। উভয় পক্ষে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও তাদের সমর্থক রাষ্ট্রগুলি যখন সরাসরি জড়াতে নারাজ, তখন দুই দেশের যুদ্ধ চালিয়ে নেবার সক্ষমতার উপরেই নির্ভর করছে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ। ককেশাসে রাশিয়ার সাথে তুরস্কের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আগে থেকে থাকলেও এখন তুরস্ক এবং ইরানের পরস্পরবিরোধী অবস্থান এই খেলায় নতুন দিকনির্দেশনা দিচ্ছে।

আজেরবাইজান এবং আর্মেনিয়ার মাঝে যখন আবারও যুদ্ধ শুরু হয়েছে, তখন ককেশাসের এই ছোট্ট দুই দেশের আশেপাশের শক্তিশালী দেশগুলির ভূমিকা সামনে আসছে। ২৯শে সেপ্টেম্বর আর্মেনিয়া দাবি করে যে, তাদের বিমান বাহিনীর একটা ‘সুখোই ২৫’ যুদ্ধবিমান তুর্কি বিমান বাহিনী ভূপাতিত করেছে। রাশিয়ার ‘কালেকটিভ সিকিউরিটি ট্রিটি অর্গানাইজেশন’ বা ‘সিএসটিও’ চুক্তি মোতাবেক আর্মেনিয়া আক্রান্ত হলে রাশিয়ার সামরিক সহায়তা দেবার অঙ্গীকার রয়েছে। কিন্তু এই দাবি নিয়ে রাশিয়া যেমন খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি, তেমনি তুরস্ক প্রায় সাথেসাথেই এই ঘটনা আস্বীকার করার কারণে রাশিয়া এবং তুরস্কের সরাসরি যুদ্ধে জড়াবার ইচ্ছা তেমন নেই বলেই প্রকাশ পায়। অপরদিকে এই দুই দেশ ছাড়াও আলোচনায় এসেছে ইরান। ইরানের সাথে আর্মেনিয়ার সীমান্ত বাণিজ্য হয় শুধুমাত্র ইরানের নরদুজ সীমান্ত শহরের মাঝ দিয়ে। সোশাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিওতে দেখা যায় যে, লরির উপরে করে সামরিক গাড়ি নরদুজ সীমান্ত অতিক্রম করছে। এই অঞ্চলটা মূলত আজেরি অধ্যুষিত, যারা আর্মেনিয়ার সাথে দ্বন্দ্বে আজেরবাইজানের পক্ষ নিচ্ছে। বড় শহর তাবরিজে আজেরিরা বিক্ষোভ করে এবং আর্মেনিয়া যাবার রাস্তা আটকাবার চেষ্টা করে। ইরানি পুলিশ লাঠিচার্জ এবং কাঁদানে গ্যাসের ব্যবহারে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে। একইসাথে ইরান আর্মেনিয়াকে অস্ত্র সরবরাহের ঘটনাকে অসত্য বলে দাবি করে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবার পর থেকেই আর্মেনিয়া এবং আজেরবাইজানের সম্পর্কের মাঝে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ‘ইউএনপিও’এর হিসেবে ইরানের ৮ কোটি ১৮ লক্ষ জনসংখ্যার মাঝে প্রায় ৩ কোটিই তুর্কি আজেরি, যাদের অনেকেই ইরানের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের পূর্ব ও পশ্চিম আজেরবাইজান এবং আরদাবিল প্রদেশে বাস করে। আজেরিরা প্রায় সকলেই শিয়া সম্প্রদায়ের হলেও জাতিগতভাবে তুর্কি হওয়ায় তুরস্কের সাথে তাদের সম্পর্ক যথেষ্ট গভীর। তুরস্ক আজেরবাইজানের সাথে সম্পর্ককে ‘এক জাতি দুই রাষ্ট্র’ বলে আখ্যা দেয়। জন্মের সময়েই আজেরবাইজানের নাম ইরানের আজেরি সংখ্যাগরিষ্ঠদের প্রদেশের নামানুসারে রাখার কারণে তা ইরানের ভৌগোলিক অখন্ডতার প্রতি হুমকি তৈরি করেছিল। অন্যদিকে ভৌগোলিক কারণেই আর্মেনিয়া ইরানের উপর নির্ভরশীল। পুরোপুরি স্থলবেষ্টিত আর্মেনিয়ার সীমানা রয়েছে আজেরবাইজান, জর্জিয়া, তুরস্ক এবং ইরানের সাথে। তবে শুধুমাত্র জর্জিয়া এবং ইরানের মাঝ দিয়েই আর্মেনিয়ার বেশিরভাগ বাণিজ্য সম্পাদিত হয়।

আর্মেনিয়া এবং আজেরবাইজানের সাথে ইরানের সীমানার অনেকখানি নির্ধারণ করছে আরাস নদী। পূর্বে আজেরবাইজানের বাহরামতেপে থেকে পশ্চিমে আজেরবাইজানের সাথে তুরস্ক এবং ইরানের সীমানা পর্যন্ত এই নদী চলে গিয়েছে। এই নদীর উপর ১৯৬০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্মতিতে আজেরবাইজানের নাখচিভান শহরের দক্ষিণে ইরান একটা বাঁধ নির্মাণ করে। আবার ২০১০এর পর থেকে আজেরবাইজানের জাবরাইল জেলার সাথে ইরানের সীমান্তে আরাস নদীর উপর খুদা আফেরিনে আরেকটা বাঁধ নির্মাণের কাজে হাত দেয় ইরান। জাবরাইল জেলা বর্তমানে আর্মেনিয়দের দখলে থাকা নাগোর্নো কারাবাখের অংশ। আজেরবাইজানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিইয়েভের বাবা প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট হায়দার আলিয়েভ এই বাঁধের বিপক্ষে ছিলেন। তার নীতি ছিল যে, আর্মেনিয়া যতদিন নাগোর্নো কারাবাখ ছেড়ে না যাবে, ততদিন আজেরবাইজান এই বাঁধ নির্মাণের অনুমতি দেবে না। তবুও ইরান এই বাঁধ নির্মাণ শুরু করে। ২০১৬ সালে আঞ্চলিক চাপের মুখে ইরানকে বাঁধ নির্মাণ চালু রাখার জন্যে লিখিত অনুমতি দেয় আজেরবাইজান। চুক্তি মোতাবেক বাঁধের উত্তরে নাগোর্নো কারাবাখ আজেরবাইজানের অধীন হবার আগ পর্যন্ত এর উত্তর পাড়ে নাগোর্নো কারাবাখের ভেতর ১০ কিঃমিঃ পর্যন্ত এলাকার নিরাপত্তা ইরান নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়। চুক্তির মাঝে আরাস নদীর উপর দিয়ে তৈরি সেতুর কথাও বলা হয়, যা কিনা অত্র অঞ্চলের ভূরাজনীতিকে আরও জটিল করছে বলে বলছে মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘জেমসটাউন ফাউন্ডেশন’। খুদা আফেরিন এবং খোমারলুতে এই সেতুগুলি ব্যবহার করে নাগোর্নো কারাবাখ ইরান থেকে সামরিক সরঞ্জাম আনার ব্যবস্থা করলে সেটাও অবাস্তব হবে না।

তিন মাস আগে আজেরবাইজান এবং আর্মেনিয়ার মাঝে আরেক দফা সংঘাতের পর আজেরি মিডিয়া ফ্লাইট তথ্য দিয়ে বলে যে, রুশ সামরিক বাহিনীর ‘ইলুইশিন ৭৬’ পরিবহণ বিমান ২৫শে অগাস্ট থেকে শুরু করে প্রতিদিন রাশিয়া থেকে জর্জিয়া এবং আজেরবাইজানের আকাশসীমা বাইপাস করে কাস্পিয়ান সাগর এবং ইরানের আকাশসীমা ঘুরে আর্মেনিয়া যাচ্ছে। তারা বলে যে, এই বিমানে নিঃসন্দেহে অস্ত্র সরবরাহ করা হয়েছে। রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু এর জবাবে বলেন যে, বিমানগুলি আর্মেনিয়ার গাইউমরিতে রুশ সামরিক ঘাঁটিতে কন্সট্রাকশন দ্রব্যাদি সরবরাহ করছিল। যদিও স্থলবেষ্টিত আর্মেনিয়ার ৭০ শতাংশ বাণিজ্য হয় জর্জিয়া হয়ে, তারপরেও রুশ সামরিক বিমানের ইরান হয়ে আর্মেনিয়া পৌঁছানোটা অত্র অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক জটিলতাকে দেখিয়ে দেয়।

তুরস্কের সরকারি মিডিয়া ‘টিআরটি’র সাথে কথা বলতে গিয়ে তুর্কি ইউরেশিয়া বিশ্লেষক এসরেফ ইয়ালিনকিলিচলি বলেন যে, আজেরবাইজান এবং ইরানের অভ্যন্তরের আজেরিদের নিয়ে একটা ‘গ্রেটার আজেরবাইজান’ তৈরি করার চিন্তা বহুদিন ধরেই ইরানের ভৌগোলিক অখন্ডতার প্রতি হুমকি হিসেবে রয়েছে। ইরান এই চিন্তাটাকে নিয়ন্ত্রণ করতেই আর্মেনিয়াকে সমর্থন দিয়ে আসছে। ইরানের আর্মেনিয়া নীতি অনেকক্ষেত্রেই আবার আজেরবাইজান এবং তুরস্ককে ব্যালান্স করার জন্যে ব্যবহৃত হয়েছে। অরপদিকে বিশ্বায়নের কারণে ইরানের অভ্যন্তরের তুর্কি আজেরিরা আজেরবাইজান, তুরস্ক এবং অন্যান্য দেশের তুর্কিদের সাথে নিজেদের স্বার্থকে এক করে দেখতে শুরু করেছে।

ছয়দিন যুদ্ধ চলার পর ‘বিবিসি’ বলছে যে, আর্মেনিয়া ‘ওএসসিই মিনস্ক’এর মধ্যস্ততায় আলোচনায় বসতে ইচ্ছুক। অথচ এর দু’দিন আগেই আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকল পেশিনিয়ান বলেছিলেন যে, প্রচন্ড যুদ্ধ চলাকালীন আলোচনার কথা বলাটা একেবারেই ঠিক নয়। অন্যদিকে আজেরবাইজান এখনও বলছে যে, আর্মেনিয়রা তাদের দখলে থাকা এলাকা ছেড়ে না দিলে তারা আলোচনায় বসবে না। আর্মেনিয়া তাদের সমর্থনে রাশিয়া এবং ফ্রান্সকে পেলেও ইরান সরাসরি পক্ষ নেয়নি। অপদিকে তুরস্ক প্রথম থেকেই আজেরবাইজানের পক্ষ নিয়েছে। উভয় পক্ষে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও তাদের সমর্থক রাষ্ট্রগুলি যখন সরাসরি জড়াতে নারাজ, তখন দুই দেশের যুদ্ধ চালিয়ে নেবার সক্ষমতার উপরেই নির্ভর করছে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ। ককেশাসে রাশিয়ার সাথে তুরস্কের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আগে থেকে থাকলেও এখন তুরস্ক এবং ইরানের পরস্পরবিরোধী অবস্থান এই খেলায় নতুন দিকনির্দেশনা দিচ্ছে।

Thursday, 18 June 2020

ককেশাসে বাড়ছে ভূরাজনৈতিক তাপমাত্রা

১৮ই জুন ২০২০

২০১৭ সালে তুরস্ক এবং আজেরবাইজানের সেনাবাহিনীর মাঝে যৌথ মহড়া। ২০১০ সালে দুই দেশের মাঝে কৌশলগত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার অধীনে এক দেশ বাইরের শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হলে অপর দেশ তাকে সকল ধরনের সহায়তা দেবে। নিয়মিত বিরতিতে দুই দেশের মাঝে চলছে সামরিক মহড়া। এই মহড়াগুলি আজেরবাইজানকে নাগোর্নো কারাবাখে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত করছে।


গত ২রা মে আজেরবাইজানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে একটা ভিডিওতে দেখানো হয় যে, আজেরবাইজানের নাখচিভান ছিটমহলে বেশকিছু অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করা হয়েছে। তুর্কি থিংকট্যাঙ্ক ‘ইডিএএম’এর প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক জান কাসাপোগলু বলছেন যে, এই ভিডিওতে তুরস্কে নির্মিত ‘টিআরজি-৩০০ কাপলান’ ৩০০ মিঃমিঃ রকেট আর্টিলারি বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। এর নির্মাতা কোম্পানি ‘রকেটসান’ বলছে যে, এই রকেটের পাল্লা ১’শ ২০ কিঃমিঃ এবং এর সক্ষমতা রয়েছে এর ১’শ ৫ কেজি ওয়ারহেডকে টার্গেটের ১০ মিটারের মাঝে ফেলার। এই রকেটগুলি সৈন্যদের ব্যারাক, কমান্ড সেন্টার, রাডার, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ টার্গেট ধ্বংসে বিশেষভাবে কার্যকর। কাসাপোগলু মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, গত ফেব্রুয়ারিতে সিরিয়ার ইদলিবের যুদ্ধে তুর্কি সেনাবাহিনী এই রকেটগুলিকে ব্যবহার করেছিল। নাখচিভান ছিটমহলে এই রকেট মোতায়েন করার ফলে অত্র অঞ্চলের সামরিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এসেছে। আজেরবাইজানের প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র আর্মেনিয়ার সাথে বিরোধপূর্ণ নাগোর্নো কারাবাখ অঞ্চলকে কেন্দ্র করে তুমুল বিরোধ রয়েছে। ১৯৯০এর দশক থেকে চলা একরকম যুদ্ধাবস্থাতে বর্তমানে অস্ত্রবিরতি থাকলেও এই স্থিতাবস্থা কতদিন এভাবে থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে। কাসাপোগলু বলছেন যে, নাখচিভান ছিটমহলে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আজেরবাইজান এখন নাগোর্নো কারাবাখে আর্মেনিয় সেনাদের সাপ্লাই লাইনকে হুমকির মুখে ফেলতে পারবে।

সাম্প্রতিক সময়ে আজেরবাইজান সামরিক খাতে ব্যাপক ব্যয় করেছে। একইসাথে তুরস্কের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের মাঝে দুই দেশ যৌথ মহড়ায় অংশ নিয়েছে; যার মাধ্যমে আজেরবাইজানের যুদ্ধ করার সক্ষমতা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। তুর্কি মিডিয়া ‘ইয়েনি সাফাক’ গত বছর মে মাসে আজেরবাইজানের রাজধানী বাকুর কাছকাছি ‘মুস্তফা কেমাল আতাতুর্ক ২০১৯’ নামের এক সামরিক মহড়ার খবর দেয়। এই মহড়ায় ট্যাঙ্ক, আর্মার্ড ভেহিকল এবং আর্টিলারির সমন্বয়ে গঠিত আজেরবাইজানের সেনাবাহিনীর মেকানাইজড ফর্মেশনগুলি বড় আকারের আক্রমণাত্মক কৌশলের মহড়ার দেয়। এই মহড়াগুলি আজেরবাইজানকে নাগোর্নো কারাবাখে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত করছে।

আজেরবাইজান এবং আর্মেনিয়ার উদ্ভট বাউন্ডারি। সোভিয়েতরাই বর্তমান ককেশাসের বাউন্ডারিগুলি এঁকেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সময় থেকেই এই সীমানা নিয়ে আর্মেনিয় এবং আজেরিদের মাঝে শুরু হয় জাতিগত সংঘাত। আর্মেনিয়ার নেতৃত্বের সাথে ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চের সম্পর্ক খুবই গভীর। তৃতীয় শতাব্দী থেকেই আর্মেনিয়া একটা ইস্টার্ন অর্থোডক্স খ্রিষ্টান রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। তাই ধর্মীয় বিষয়গুলি কখনোই আর্মেনিয়ার রাজনীতির বাইরে ছিল না।




আজেরবাইজান ও আর্মেনিয়ার সংঘাতের ঐতিহাসিক পটভূমি

আর্মেনিয়া ককেশাসের অংশ। খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতকে আর্মেনিয়ার মানুষ খ্রিষ্ঠান হওয়া শুরু করে। সেই সময় থেকে ৭ম শতাব্দী পর্যন্ত বাইজ্যান্টাইন সাম্রাজ্য এবং পারসিক সাম্র্যাজ্যের মাঝে আর্মেনিয়া নামে একটা খ্রিষ্ঠান রাজ্য তার উপস্থিতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। তবে ৮ম শতাব্দীর মাঝামাঝি আর্মেনিয়াসহ পুরো ককেশাস ইসলামের অধীনে চলে যায়। ত্রয়োদশ শতকে মোঙ্গল আক্রমণের পর থেকে এই অঞ্চলের ধরণ পাল্টে যায়। তুর্কিরা এখানকার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি ইস্তাম্বুলে উসমানি খিলাফতের আবির্ভাবের পর থেকে ককেশাস অঞ্চল পারস্য এবং উসমানিদের মাঝে প্রতিযোগিতার বস্তু হয়ে যায়। এরপর অষ্টাদশ শতকে রুশদের আবির্ভাবের পর অত্র অঞ্চলে ত্রিমুখী প্রভাবের প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়। তবে বিংশ শতকে সোভিয়েত ইউনিয়ন তৈরির পর ককেশাস অঞ্চল পুরোটাই সোভিয়েত শক্তির পদানত হয়। সোভিয়েতরাই বর্তমান ককেশাসের বাউন্ডারিগুলি এঁকেছিল। সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্টালিন আর্মেনিয়া এবং আজেরবাইজানের সীমানা এঁকে দেন; যেখানে নাগোর্নো কারাবাখ অঞ্চলকে আজেরবাইজানের মাঝে রাখা হয়। আর্মেনিয়রা এটা পছন্দ করেনি; তারা চেয়েছিল যে, খ্রিষ্টান অধ্যুষিত নাগোর্নো কারাবাখ আর্মেনিয়ার অধীন হোক; মুসলিম অধ্যুষিত আজেরবাইজানের অধীন নয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সময় থেকেই এই সীমানা নিয়ে আর্মেনিয় এবং আজেরিদের মাঝে শুরু হয় জাতিগত সংঘাত। আর ১৯৯০এর শুরুতে তা রূপ নেয় পুরোপুরি যুদ্ধে। সোভিয়েত সেনাবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকার কারণে আর্মেনিয়রা বেশ শক্তিশালী একটা সেনাবাহিনী গঠন করতে পারে; যা কিনা আজেরিরা পারেনি। তুলনামূলকভাবে অনেক ছোট দেশ হওয়া সত্ত্বেও আর্মেনিয়া তার সামরিক দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে নাগোর্নো কারাবাখকে আজেরিদের হাত থেকে ছিনিয়ে নেয়। ১৯৯৪ সালে যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরিত হবার পর থেকে এখানে থেকে থেকে সংঘাত চলছে। আর্মেনিয়ার নেতৃত্বের সাথে ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চের সম্পর্ক খুবই গভীর। তৃতীয় শতাব্দী থেকেই আর্মেনিয়া একটা ইস্টার্ন অর্থোডক্স খ্রিষ্টান রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। তাই ধর্মীয় বিষয়গুলি কখনোই আর্মেনিয়ার রাজনীতির বাইরে ছিল না।

আজেরবাইজানের বাকুর তেলখনিগুলি থেকে কয়েকটা তেলের পাইপলাইন বের হলেও সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হলো তুরস্কের মাঝ দিয়ে ভূমধ্যসাগরের চেইহান বন্দর পর্যন্ত যাওয়া পাইপলাইন। এই পাইলাইনের মাধ্যমে তেল বিক্রির অর্থ ব্যবহার করেই আজেরিরা তাদের সামরিক সক্ষমতা গড়ে তুলতে থাকে। রাশিয়া আর আর্মেনিয়াকে বাইপাস করে জর্জিয়ার মাঝ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে এই পাইপলাইন। ২০০৮ সালে জর্জিয়াতে রুশ সামরিক হস্তক্ষেপের পর এই পাইপলাইন করিডোর হুমকির মাঝে পড়েছে।



বাকুর তেলের ভূরাজনীতি

ঊনিশ শতকের শেষের দিকে আজেরবাইজানের বাকু তেলখনি থেকে তেল উত্তোলন শুরু করে রুশরা। বিংশ শতকের শুরুতে সারা বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের অর্ধেক আসতো বাকু থেকে। ১৯১৮ সালে উসমানি খিলাফত ধ্বংসের কাছাকাছি সময়ে উসমানি সেনারা আজেরিদেরকে সাথে নিয়ে বাকুর নিয়ন্ত্রণ নেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানি খিলাফত ধ্বংস করে ব্রিটিশরা এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। কিন্তু ১৯২০ সালের এপ্রিলে সোভিয়েত সৈন্যরা বাকুর দখল নেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বাকুর তেলখনিগুলি জার্মানদের বিরুদ্ধে সোভিয়েত বিজয়ে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বাকুর তেল পশ্চিমা দেশগুলিতে রপ্তানি করার পিছনে ব্যাপক অর্থ বিনিয়োগ শুরু হয়। ১৯৯৭ সালে রুশ বিনিয়োগে বাকু থেকে রাশিয়ার কৃষ্ণ সাগরের বন্দর নভোরোসিস্ক পর্যন্ত তেলের পাইপলাইন চালু হয়। ১ লক্ষ ব্যারেল সক্ষমতার এই পাইপলাইনের চাইতে আরও বেশি সক্ষমতার আরেকটা পাইপলাইন তৈরি করা হয় রাশিয়াকে বাইপাস করে বাকু থেকে জর্জিয়ার সুপসা বন্দর পর্যন্ত। ১৯৯৯ সালে চালু হওয়া এই পাইপলাইনের সক্ষমতা হলো ১ লক্ষ ৪৫ হাজার ব্যারেল। তবে এই দুই পাইপলাইনের চাইতে আরও অনেক বড় এক প্রকল্প গ্রহণ করা হয় আরও আগেই। ১৯৯৩ সালে রাশিয়াকে বাইপাস করে আজেরবাইজানের বাকু তেলখনি থেকে তেল তুরস্কের ভূমধ্যসাগরের চেইহান বন্দরে খালাস করার লক্ষ্যে কাজ শুরু হয়। রাশিয়া এবং আর্মেনিয়াকে এক্ষেত্রে বাইপাস করে জর্জিয়াকে বেছে নেয়া হয়। তবে ২০০৩ সালের আগে এই পাইপলাইনের কাজ শুরু হয়নি। ২০০৬ সালের মে মাসে ১২ লক্ষ ব্যারেল সক্ষমতার এই পাইপলাইন পুরোপুরি চালু হয়। মার্কিন ‘এনার্জি ইনফর্মেশন এডমিনিস্ট্রেশন’র হিসেবে ২০০৪ সালে যেখানে আজেরবাইজানের তেলের উৎপাদন ছিল দৈনিক প্রায় ৩ লক্ষ ব্যারেল, তা ২০০৭ সালে গিয়ে দাঁড়ায় ৭ লক্ষ ব্যারেলের বেশি। এই পাইপলাইন চালুর মাধ্যমে বাকুর তেলখনিগুলির উপর রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই কমে যায়। তেল বিক্রির অর্থের উপর ভর করে আজেরবাইজানের জিডিপি বিশ্বব্যাঙ্কের হিসেবে ২০০৪ সালে ৯ বিলিয়ন ডলার থেকে লাফ দিয়ে ২০১৪ সালে ৭৫ বিলিয়ন ডলার হয়ে যায়। অর্থাৎ মাত্র দশ বছরে জিডিপি ৮ গুণ বেড়ে যায়! তবে তেলের বাজারে ব্যাপক দরপতনের পর দেশটার জিডিপি ৪৮ বিলিয়নে নেমে আসে। তেল বিক্রির এই অর্থ আজেরবাইজানের সামরিক সক্ষমতাকে পুরোপুরি পাল্টে দেয়। জর্জিয়ার অর্থনীতিও একই সময়ে ৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার হয়ে যায়। আর আর্মেনিয়ার অর্থনীতি সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলার থেকে হয়ে যায় ১২ বিলিয়ন ডলার।

নাগোর্নো কারাবাখকে ঘিরে আর্মেনিয়ার সাথে আজেরবাইজানের যুদ্ধের কারণে বাকু থেকে তেলের পাইপলাইনগুলি খোলা সমুদ্র পর্যন্ত পৌঁছানোটা হয়ে গিয়েছিল কঠিন। এক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগের কাজ করে জর্জিয়া। ২০০৩ সালে জর্জিয়াতে পশ্চিমাদের সমর্থিত ‘রোজ রেভোলিউশন’এর মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন হয়। নতুন প্রেসিডেন্ট মিখাইল শালিকাশভিলি পশ্চিমাদের সাথে ভালো সম্পর্ক রেখে চলেন। তবে একইসাথে রাশিয়ার সাথে জর্জিয়ার সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে। জর্জিয়ার মাঝ দিয়ে যাবার কারণে বাকু থেকে আসা পাইপলাইনগুলিকে নাগোর্নো কারাবাখের সংঘাত স্পর্শ করতে পারেনি। তবে এই প্রকল্পগুলিকে রাশিয়া নিজ অঞ্চলে পশ্চিমাদের হস্তক্ষেপ হিসেবেই দেখেছে। ২০০৮ সালের অগাস্টে মাত্র ৩৭ লক্ষ জনসংখ্যার জর্জিয়া রাশিয়ার সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে যায়। জর্জিয়ার ভেতরে আবখাজিয়া এবং সাউথ অসেটিয়া অঞ্চলকে রাশিয়া সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে জর্জিয়া থেকে আলাদা করে ফেলে এবং এদেরকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দেয়। সেসময় আজেরবাইজানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলে যে, তারা জর্জিয়ার অখন্ডতায় বিশ্বাসী। ২০০৮ সালে রাশিয়ার জর্জিয়া অভিযান নাগোর্নো কারাবাখ নিয়ে আজেরবাইজানের নিরাপত্তাহীনতাকে জাগিয়ে তুলে। ২০১০ সালের অগাস্টে আজেরবাইজান তুরস্কের সাথে দশ বছর মেয়াদী ‘স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ এন্ড মিউচুয়াল সাপোর্ট’ নামের এক চুক্তি করে; যার অধীনে এক দেশ বাইরের শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হলে অপর দেশ তাকে সকল ধরনের সহায়তা দেবে। ২০২০ সালের অগাস্টে এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হবার কথা রয়েছে।

২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে চার দিনের যুদ্ধের মাঝে নাগোর্নো কারাবাখের আকাশে ইস্রাইল নির্মিত ‘হারোপ’ লোইটারিং সুইসাইড ড্রোন। এই যুদ্ধ তুরস্ক এবং ইস্রাইলকে ককেশাসে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। আজেরবাইজানের জন্যে এই দুই দেশের সমর্থন অত্র এলাকার সামরিক ব্যালান্সকে যে পরিবর্তন করে দিয়েছে, তা এই যুদ্ধের মাঝেই বোঝা গিয়েছে। ভবিষ্যতের যেকোন সংঘাতেও এই দুই দেশের যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে, তা নিশ্চিত।



২০১৬ সালের এপ্রিলের ‘চার দিনের যুদ্ধ’

২০১৬ সালের এপ্রিলে নাগোর্নো কারাবাখের সীমান্তে আজেরিদের সাথে আর্মেনিয়দের ব্যাপক গোলাগুলি শুরু হয়। মোটামুটি ৪ দিনের জন্যে দুই দেশের মাঝে যুদ্ধাবস্তা বিরাজ করে। উভয় পক্ষেই হতাহতের পরষ্পবিরোধী দাবি তোলা হয়। ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’এর এক বিশ্লেষণে বলা হয় যে, আজেরবাইজান এই যুদ্ধে ক্ষুদ্র, কিন্তু কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু এলাকা দখল করে নেয়। ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘চ্যাটহ্যাম হাউজ’এর ফেলো জাউর শিরিইয়েভ বলেন যে, এই যুদ্ধের মাধ্যমে আজেরবাইজান এতদিনের স্থিতাবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে তা বাকি বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছে। এই যুদ্ধের সময় তুরস্ক আজেরবাইজানের সাথে থাকার ঘোষণা দিলে রাশিয়া তুরস্ককে সতর্ক করে বলে যে, তুরস্কের উচিৎ এই সংঘর্ষে শুধু একপক্ষকে সমর্থন না করা। একইসাথে রুশরা বলে যে, তুরস্কের উচিৎ তার আশেপাশের দেশগুলির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক না গলানো এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলিকে সমর্থন না দেয়া। এখানে উল্লেখ্য যে, রাশিয়া সিরিয়াতে বাশার আল-আসাদের সরকারের বিরোধী গ্রুপগুলিকে সন্ত্রাসী বলে আখ্যা দিয়ে থাকে। ঐতিহ্যগতভাবেই রুশরা ককেশাস অঞ্চলকে তাদের প্রভাবের এলাকা হিসেবেই দেখে থাকে। ২০১৬ সালের এপ্রিলের যুদ্ধ তুরস্ক এবং ইস্রাইলকে ককেশাসে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। আজেরবাইজানের জন্যে এই দুই দেশের সমর্থন অত্র এলাকার সামরিক ব্যালান্সকে যে পরিবর্তন করে দিয়েছে, তা এই যুদ্ধের মাঝেই বোঝা গিয়েছে। ভবিষ্যতের যেকোন সংঘাতেও এই দুই দেশের যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে, তা নিশ্চিত। ‘ফরেন পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউট’এর ক্রিস্টিন ফিলিপ ব্লুমায়ের মতামত দেন যে, ২০১৬ সালের যুদ্ধের সময় রুশ কর্মকর্তাদের কথাবর্তা বলে দিয়েছিল যে, রুশরা আর্মেনিয়ার পক্ষে যুদ্ধে সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে না। তবে ব্লুমায়েরের সেই মন্তব্যের পর আরও চার বছর পেরিয়ে গেছে। আর ভূরাজনৈতিকভাবে রাশিয়া এবং তুরস্কের সম্পর্কেও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আবারও যদি আজেরবাইজানের সাথে আর্মেনিয়ার সংঘাত শুরু হয়, তবে সেখানে রাশিয়া চুপচাপ বসে থাকবে কিনা, তা নিশ্চিত নয়। আর যদি আর্মেনিয়রা যুদ্ধে হেরে যাবার অবস্থায় চলে যায়, তাহলেও কি রুশরা বসে থাকবে কিনা?

রুশ নেতৃত্বে ‘কালেকটিভ সিকিউরিটি ট্রিটি অর্গানাইজেশন’ বা ‘সিএসটিও’এর অধীনে থাকা ৬টা দেশের সাথে রাশিয়ার নিরাপত্তা সম্পর্ক অনেক গভীর। ১৯৯৪ সালে ৯টা দেশ এর মাঝে থাকলেও ১৯৯৯ সালে আজেরবাইজান এবং জর্জিয়া এই সংগঠন থেকে বের হয়ে যায়। ২০০৬ সালে ইউক্রেনও বের হয়ে যায় এখান থেকে। বর্তমানে রাশিয়া ছাড়াও আর্মেনিয়া, বেলারুশ, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান এবং তাজিকিস্তান এর সদস্য। আর্মেনিয়ার মিডিয়া ‘আজাতুতইয়ুন’ বলছে যে, ‘সিএসটিও’এর সদস্য হবার কারণে আর্মেনিয়া নামমাত্র মূল্যে বা বিনা পয়সায় রুশ অস্ত্র পায়।

২০১৬ সালে আর্মেনিয়ার সামরিক প্যারেডে রুশ নির্মিত ‘ইস্কান্দার’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। এই ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে আর্মেনিয়রা আজেরবাইজানের তেলের স্থাপনাগুলির উপর হামলা করতে সক্ষম হবে।



আর্মেনিয়ার সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি কি যথেষ্ট?

মাত্র ৩০ লক্ষ জনসংখ্যার আর্মেনিয়ার জিডিপি ১৩ বিলিয়ন ডলার। বাইরের সহায়তা ছাড়া নিজের শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে তোলা আর্মেনিয়ার জন্যে যথেষ্টই কষ্টকর। আর্মেনিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী আজেরবাইজানের জনসংখ্যা ১ কোটি এবং এর জিডিপি প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার; যা আর্মেনিয়ার তিন গুণেরও বেশি। দুই দেশের জনসংখ্যা এবং অর্থনীতির আকারের এই পার্থক্য সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করাকে যথেষ্টই প্রভাবিত করেছে। ‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’এর হিসেবে আর্মেনিয়ার সেনাবাহিনীতে রয়েছে প্রায় ৪৬ হাজার সেনা। ইউনিটগুলি বেশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে; ১৬টা রাইফেল রেজিমেন্ট, ১টা আর্টিলারি ব্রিগেড, ১টা বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্রিগেড, ২টা বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র রেজিমেন্ট, ১টা আর্টিলারি রেজিমেন্ট, ১টা এন্টি ট্যাঙ্ক রেজিমেন্ট, ৩টা ট্যাঙ্ক ব্যাটালিয়ন, ৪টা আর্টিলারি ব্যাটালিয়ন, এবং আরও বেশকিছু ইউনিট। আর্মেনিয়ার সেনাবাহিনীর সাথে একত্রে যুদ্ধ করছে নাগোর্নো কারাবাখে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া ‘আর্তসাখ রিপাবলিক’এর সেনাবাহিনী। এই বাহিনীতে রয়েছে আরও প্রায় ২৫ হাজার সেনা এবং প্রায় ৩০ হাজার রিজার্ভিস্ট। নিশ্চিত করা না গেলেও আর্তসাখের বাহিনীতে প্রায় ৩’শ ট্যাঙ্ক, ২’শ আর্মার্ড ভেহিকল এবং ৩’শ আর্টিলারি রয়েছে বলে দাবি করে আর্মেনিয়রা।

রাশিয়া নাগোর্নো কারাবাখের সংঘাতে উভয় পক্ষকেই অস্ত্র সরবরাহ করে আসছে। ‘স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইন্সটিটিউট’ বা ‘সিপরি’র হিসেবে ১৯৯৯ থেকে ২০১৯ সালের মাঝে আর্মেনিয়া বেশকিছু অস্ত্র কিনেছে; যার মাঝে রাশিয়াই সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। এই অস্ত্রগুলির মাঝে রয়েছে,

১) ২০১৬ সালে রাশিয়ার সরবরাহকৃত ৪টা ‘ইস্কান্দার’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের লঞ্চার এবং ২৫টা ক্ষেপণাস্ত্র। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলির পাল্লা প্রায় ৪’শ থেকে ৫’শ কিঃমিঃ পর্যন্ত। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, ‘ইস্কান্দার’ ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে আর্মেনিয়রা আজেরবাইজানের তেলের স্থাপনাগুলির উপর হামলা করতে সক্ষম হবে।

২) ২০১৭ সালের মাঝে রাশিয়ার সরবরাহকৃত ৬টা ‘বিএম-৯ এ৫২ স্মার্চ’ ৩০০মিঃমিঃ রকেট লঞ্চার। এগুলির পাল্লা প্রায় ৯০ কিঃমিঃ পর্যন্ত। ২০০৭ সালে বেলারুশ সরবরাহ করে ১০টা ১২২ মিঃমিঃএর ‘ডি-৩০’ কামান। ২০১০ সালে মন্টিনেগ্রো থেকেও একই মডেলের ১৬টা কামান আসে। ১৯৯৯ সালে চীন থেকে আসে ৪টা ‘ডব্লিউএম-৮০’ ২৭৩ মিঃমিঃ সেলফ প্রপেল্ড রকেট লঞ্চার।

৩) ২০১০ সালের মাঝে সরবরাহকৃত ২টা ‘এস ৩০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ‘সিপরি’ বলছে যে, আর্মেনিয়ার কাছে সরবরাহকৃত ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ‘৫ভি৫৫ইউ’ ভার্সনের, যেগুলির পাল্লা দেড়’শ কিঃমিঃ। এর সাথে কমপক্ষে ১’শ ৪৪টা ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করে রাশিয়া। ২০১৭ সালের মাঝে রাশিয়ার সরবরাহকৃত ‘৯কে৩৩৩ ভার্বা’ বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। কাঁধ থেকে ছোঁড়া স্বল্পপাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা সাড়ে ৬ কিঃমিঃ। ২’শটা ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করা হয়। ২০১৩ সালের মাঝে রাশিয়া সরবরাহ করে ৫ কিঃমিঃ পাল্লার ২’শ ‘ইগলা এস’ বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। ২০১৬ সালে আরও ২’শ ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করা হয়। ২০১৯ সালে রুশরা সরবরাহ করে কমপক্ষে ২টা ‘টর এম১’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যাবস্থা এবং এর সাথে ৫০টা ‘৯এম৩৩৮’ ক্ষেপণাস্ত্র। ১২ কিঃমিঃ পাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ট্যাঙ্ক চ্যাসিসের উপর বসানো। তবে আর্মেনিয়ার মিডিয়া ‘আজাতুতইয়ুন’ বলছে যে, প্রধানমন্ত্রী নিকল পাশিনিয়ান তার ফেইসবুক পেইজে ২০১৭ সালের মে মাসেই এই ক্ষেপণাস্ত্র কেনার ঘোষণা দেন।

৪) ২০১৭ সালে রাশিয়া সরবরাহ করে সাড়ে ৫ কিঃমিঃ পাল্লার ১’শটা ‘৯এম১৩৩ করনেট-ই’ ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। ‘করনেট’ রুশদের ডেভেলপ করা ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রগুলির মাঝে সবচাইতে সক্ষমগুলির একটা।

৫) ২০১৯ সালে রুশরা সরবরাহ করা শুরু করে ‘সুখোই এসইউ-৩০এসএম’ ফাইটার বিমান। এই বিমানগুলি আর্মেনিয়ার বিমান বাহিনীকে আজেরবাইজানের বিমান বাহিনী থেকে অনেক এগিয়ে নিয়ে গেল।

৬) ২০০৪ সালে স্লোভাকিয়ার কাছ থেকে আর্মেনিয়া ১০টা রুশ নির্মিত ‘সুখোই এসইউ-২৫’ গ্রাউন্ড এটাক বিমান কেনে।

৭) ইউক্রেনের কাছ থেকে ২০০৪ সালে ২টা ‘এল-৩৯সি আলবাট্রস’ ট্রেনিং জেট বিমান কেনে। ২০১১ সালের মাঝে আরও ৪টা বিমান পায় আর্মেনিয়া।

৮) ২০১৯ সালে আর্মেনিয়া ১৫ কিঃমিঃ পাল্লার ৪টা ‘অসা’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনে। এর সাথে ছিল ১’শ ২০টা ‘৯এম৩৩’ ক্ষেপণাস্ত্র। এগুলির উৎস নিশ্চিত হওয়া না গেলেও রাশিয়া থেকেই এগুলি এসেছে বলে বলছে ‘সিপরি’।

খেয়াল করলে বোঝা যাবে যে, আর্মেনিয়া তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাঝে বিমান প্রতিরক্ষাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। ‘সুখোই-৩০’ বিমান এবং দূরপাল্লার ‘এস-৩০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে আর্মেনিয়া আকাশকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। একইসাথে ২০১৬ সাল থেকে বিপুল সংখ্যক স্বল্প পাল্লার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয় করে তারা। এছাড়াও দূরপাল্লার আর্টিলারি এবং এন্টি ট্যাঙ্ক ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে ক্রয়কৃত আস্ত্রের মাঝে। এগুলি ছাড়াও আর্মেনিয়া রাশিয়া থেকে ‘ইনফাউনা’ ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার যন্ত্র কিনেছে, যা কিনা তারা ২০১৬ সালের জাতীয় দিবস প্যারেডে দেখায়। এই যন্ত্রের মাধ্যমে শত্রুপক্ষের রেডিও যোগাযোগ জ্যামিং করা সম্ভব। এর বাইরেও আর্মেনিয়রা নিজেরাই ‘থান্ডার’ নামে একটা রেডিও জ্যামার তৈরি করে ২০১৮ সালে ইয়েরেভানে একটা প্রতিরক্ষা মেলায় ডিসপ্লে করে। আর্মেনিয়ার সামরিক কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ‘আরমেন প্রেস’ বলছে যে, এই জ্যামার ২০ কিঃমিঃ দূরত্বে শত্রুর রেডিও জ্যামিং করতে পারবে। সিনিয়র লেফটেন্যান্ট হোভানেস খেলাঘাতিয়ান বলেন যে, ২০১৬ সালে আজেরবাইজানের সাথে সীমান্ত যুদ্ধে এই জ্যামার নাগোর্নো কারাবাখে মোতায়েন করা হয় এবং তা ব্যাপক সফলতাও পায়। ২০১১ সালে আর্মেনিয়া সামরিক প্যারেডে নিজস্ব ডিজাইনের ‘ক্রুংক’ সার্ভেইল্যান্স ড্রোন ডিসপ্লে করে। প্রায় ৫ ঘন্টা আকাশে ওড়ার সক্ষমতা রয়েছে এটির। আর্তসাখ সেনাবাহিনীকেও এই ড্রোন সরবরাহ করা হয়েছে।

২০১৮ সালে আজেরবাইজানের রাস্তায় প্যারেডে তুর্কি ‘এসওএম বি-১’ আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপণযোগ্য ক্রুজ মিসাইল। এই ক্ষেপণাস্ত্রকে ব্যবহার করে আজেরবাইজানের বিমানগুলি শত্রুর বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে দূরত্ব রেখেই আড়াই’শ কিঃমিঃ দূরের অতি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা অর্জন করলো।



আজেরবাইজানে অস্ত্র কেনার হিড়িক

অন্যদিকে ‘সিপরি’র হিসেবে ১৯৯৯ থেকে ২০১৯ সালের মাঝে আজেরবাইজান বিপুল পরিমাণ অস্ত্র কিনেছে। সরবরাহকারীদের মাঝে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাশিয়া, ইস্রাইল, দক্ষিণ আফ্রিকা, তুরস্ক, বেলারুশ এবং ইউক্রেন।

আজেরবাইজান যা কিনেছে, তার মাঝে রয়েছে -

১) ট্যাঙ্ক কেনা হয় ৩’শ ৬০টা...

রাশিয়া - ২০০৭ সালে কেনা ৬২টা ‘টি-৭২এম১’ ট্যাঙ্ক; ২০১৫ সালের মাঝে কেনা ১’শটা ‘টি-৯০এস’ ট্যাঙ্ক;

ইউক্রেন - ২০০৬ সালে কেনা ৪৫টা ‘টি-৭২এম১’ ট্যাঙ্ক;

বেলারুশ - ২০০৬ সালে কেনা ৬০টা ‘টি-৭২এম১’ ট্যাঙ্ক; ২০১৩ সালের মাঝে কেনা হয় আরও ৯৩টা;

২) আর্টিলারি কেনা হয় ৬’শ ৯২টা...

বেলারুশ থেকে ২০০৮ এবং ২০০৯ সালে ১২টা ‘২এস৭ পিয়ন’ ২০৩ মিঃমিঃ সেলফ প্রপেল্ড কামান কেনা হয়; ২০১৯ সালের মাঝে ১০টা ‘বি২০০বিএম পলোনেজ’ ৩০০ মিঃমিঃ সেলফ প্রপেল্ড রকেট; ২০১৭ সালে ২৬টা ‘২এ৩৬’ ১৫২ মিঃমিঃ কামান; ২০১০ সালে ৩০টা ‘ডি-৩০’ ১২২ মিঃমিঃ কামান কেনা হয়।

বুলগেরিয়া থেকে ২০০২ সালে ৩৬টা ১৩০ মিঃমিঃ ‘এম-৪৬’ কামান কেনা হয়।

চেক রিপাবলিক থেকে ২০১৮ সালের মাঝে ৩০টা ১২২ মিঃমিঃ ‘আরএম-৭০’ সেলফ প্রপেল্ড রকেট কেনা হয়।

স্লোভাকিয়া থেকে ২০১৮ সালের মাঝে কেনা হয় ৩৬টা ১৫২ মিঃমিঃ ‘ডানা’ সেলফ প্রপেল্ড কামান।

ইস্রাইল থেকে ২০০৬ সালে ৬টা ‘লিংক্স’ সেলফ প্রপেল্ড আর্টিলারি রকেট লঞ্চার কেনা হয়। এরপর ক্রমান্বয়ে ৫০টা ‘এক্সট্রা’ গাইডেড রকেটও কেনা হয়। ২০১০ সালে কেনা হয় ৫টা ১৫৫ মিঃমিঃ সেলফ প্রপেল্ড আর্টিলারি কামান ‘এটমোস ২০০০’। ২০১১ সালের মাঝে কেনা হয় ১০টা ১২০ মিঃমিঃ ‘কারডম’ সেলফ প্রপেল্ড মর্টার। ২০১৮ সালের মাঝে কেনা হয় ৪টা ‘লোরা’ সেলফ প্রপেল্ড রকেট লঞ্চার; সাথে কেনা হয় ৫০টা রকেট। একই বছর কেনা হয় ১০টা ‘স্যান্ডক্যাট স্পিয়ার’ ১২০ মিঃমিঃ সেলফ প্রপেল্ড মর্টার।

রাশিয়া থেকে ২০১৪ সালের মাঝে কেনা হয় ১৮টা ‘২এস১৯ এমএসটিএ-এস’ ১৫২ মিঃমিঃ সেলফ প্রপেল্ড কামান; ১৮টা ‘২এস৩১ ভেনা’ ১২০ মিঃমিঃ সেলফ প্রপেল্ড কামান; ১৮টা বিএম৯ এ৫২ স্মার্চ’ ৩০০ মিঃমিঃ সেলফ প্রপেল্ড রকেট লঞ্চার। ২০১৭এর মাঝে কেনা হয় ৩৬টা ‘টিওএস-১’ ২২০ মিঃমিঃ সেলফ প্রপেল্ড রকেট লঞ্চার।

তুরস্ক থেকে ২০১৩ সালের মাঝে কেনা হয় ৩০টা ১০৭ মিঃমিঃ রকেট লঞ্চার ‘টি-১০৭’; ২০১৪ সালের মাঝে কেনা হয় ৪০টা ‘টি-১২২’ রকেট লঞ্চার; ২০১৬ সালের মাঝে কেনা হয় ৩০০ মিঃমিঃএর ২০টা ‘টি-৩০০’ রকেট লঞ্চার; এর সাথে সরবরাহ করা ১’শ ৮টা ৩০০ মিঃমিঃ ‘টিআরজি-৩০০’ গাইডেড রকেট। এগুলির পিছনে খরচ হয় প্রায় ২’শ ৪৪ মিলিয়ন ডলার।

ইউক্রেন থেকে ২০০২ সালের মাঝে কেনা হয় ৭২টা ‘টি-১২ ২এ১৯’ ১০০ মিঃমিঃ কামান। ২০০৫ সালে কেনা হয় ১২টা ‘বিএম৯ এ৫২ স্মার্চ’ সেলফ প্রপেল্ড রকেট; ২০০৬ সালে কেনা হয় ৮৫টা ‘এম-৪৩’ ১২০ মিঃমিঃ মর্টার; ২০০৭ সালে কেনা হয় ৫৫টা ‘ডি-৩০’ ১২২ মিঃমিঃ কামান; ২০০৮ সালের মাঝে কেনা হয় ৩টা ‘২এস৭ পিওন’ ২০৩ মিঃমিঃ কামান; ২০১০ সালের মাঝে কেনা হয় ৫৪টা ‘২এস১’ ১২২ মিঃমিঃ সেলফ প্রপেল্ড কামান; একই বছরে কেনা হয় ১৬টা ‘২এস৩’ ১৫২ মিঃমিঃ সেলফ প্রপেল্ড কামান।

৩) আর্মার্ড ভেহিকল কেনা হয় ৬’শ ৪৯টা...

২০১০ সালের মাঝে রাশিয়া থেকে কেনা হয় ৭০টা ‘বিটিআর-৮০এ’ এপিসি; ২০১৫ সালের মাঝে কেনা হয় ১’শ ১৮টা ‘বিএমপি-৩’ ইনফ্যান্ট্রি ফাইটিং ভেহিকল; ২০১৮ সালের মাঝে কেনা হয় ৭৬টা ‘বিটিআর-৮২এ’ ইনফ্যান্ট্রি ফাইটিং ভেহিকল।

২০১১ থেকে ২০১৫এর মাঝে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে কেনা হয় ৮৫টা ‘ম্যারডার’ এবং ৬০টা ‘ম্যাটাডোর’ এপিসি।

২০১১ সালে তুরস্ক থেকে কেনা হয় ৩৫টা ‘কোবরা’ এবং ৩৭টা ‘শোরল্যান্ড’ এপিসি।

ইউক্রেন থেকে ২০০৭ সালে কেনা হয় ১৮টা ‘বিটিআর-৮০’ এপিসি; ২০১০ সালের মাঝে কেনা হয় ১শ ৫০টা ‘বিটিআর-৭০’ এপিসি।

৪) বিমান প্রতিরক্ষা

ইস্রাইলের কাছ থেকে ২০১৬ সালে একটা ‘বারাক এলআর’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনা হয়। এর সাথে ছিল ১’শ কিঃমিঃ পাল্লার ৪০টা ‘বারাক-৮’ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১৫০ কিঃমিঃ পাল্লার ৪০টা ‘বারাক-৮ ইআর’ ক্ষেপণাস্ত্র; ২টা ‘ইএলএম ২২৮৮’ এয়ার সার্চ রাডার। স্পেন থেকেও কেনা হয় ‘লানজা এলটিআর-২৫’ এয়ার সার্চ রাডার। ইউক্রেন থেকে ২০০৮ সালে কেনা হয় ১৮টা ‘স্ট্রেলা-৩’ বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। ২০১৩ সালে কেনা হয় ’৮০কে৬এম’ এয়ার সার্চ রাডার।

রাশিয়া থেকে ২০১১ সালে ৩’শ মিলিয়ন ডলার খরচে কেনা হয় ২টা ‘এস-৩০০পিএমইউ-২’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং তাতে ব্যবহারের জন্যে কেনা হয় ২’শ ‘৪৮এন৬’ ক্ষেপণাস্ত্র। এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা দেড়’শ কিঃমিঃএর বেশি। ২০১৩ সালের মাঝে কেনা হয় স্বল্প পাল্লার ২’শ ‘ইগলা-এস’ বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের লঞ্চার এবং ১ হাজার ক্ষেপণাস্ত্র। ২০১৪ সালের মাঝে কেনা হয় ২টা ‘৯কে৩৭ বুক-১এম’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এর সাথে কেনা হয় ৪৫ কিঃমিঃ পাল্লার ১’শটা ‘৯এম৩১৭’ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৪২ কিঃমিঃ পাল্লার ১’শটা ‘৯এম৩৮’ ক্ষেপণাস্ত্র।

২০১৬ সালে আজেরবাইজানের ‘আজাদ সিস্টেমস কোম্পানি’তে ইস্রাইলি প্রযুক্তি সহায়তায় ‘জারবা’ লোইটারিং সুইসাইড ড্রোন তৈরির উদ্ভোধন করেন আজেরবাইজানের প্রেসিডেন্ট আলিইয়েভ। ড্রোনের ব্যবহার আজেরবাইজানের সামরিক সক্ষমতাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।



৫) আকাশ সক্ষমতা

২০০৬ সালে ইউক্রেন থেকে ১২টা ‘এল-৩৯সি’ প্রশিক্ষণ বিমান কেনা হয়। ২০০৬ থেকে ২০১১ সালের মাঝে ইউক্রেন থেকে কেনা হয় ১৬টা ‘মিগ-২৯’ ফাইটার বিমান। ২০০৭ সালে মিগগুলিতে ব্যবহারের জন্যে কেনা হয় ৪৩টা ‘আর-২৭’ আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র। ২০১০ সালের মাঝে ইউক্রেন থেকে ১২টা ‘এমআই-৩৫পি’ এটাক হেলিকপ্টার কেনা হয়। এই হেলিকপ্টার থেকে ছোঁড়ার জন্যে ৪’শ ‘স্কিফ’ এবং ‘ব্যারিয়ার’ এন্টি ট্যাঙ্ক ক্ষেপণাস্ত্রও কেনা হয়। বেলারুশ থেকে ২০১২ সালের মাঝে কেনা হয় ১১টা ‘সুখোই এসইউ-২৫’ গ্রাউন্ড এটাক বিমান।

২০১৮ সালে সামরিক প্যারেডে আজেরিরা তুরস্কের তৈরি ‘এসওএম বি-১’ আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপণযোগ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ডিসপ্লে করে। ২’শ ৩০ কেজি ওয়ারহেডের এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলিকে খুব সম্ভবতঃ আজেরবাইজানি ‘মিগ-২৯’ এবং ‘সুখোই-২৫’ যুদ্ধবিমান থেকে ছোঁড়ার জন্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। ২০১৯ সালের মাঝে ১০টা ক্ষেপণাস্ত্র ডেলিভারি করা হয়। এই ক্ষেপণাস্ত্রকে ব্যবহার করে আজেরবাইজানের বিমানগুলি শত্রুর বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে দূরত্ব রেখেই আড়াই’শ কিঃমিঃ দূরের অতি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা অর্জন করলো।

রাশিয়া থেকে ২০১৪ সালের মাঝে ৩’শ ৬০ মিলিয়ন ডলারে কেনা হয় ২৪টা ‘এমআই-২৪/৩৫এম’ এটাক হেলিকপ্টার। ২০১৫ সালের মাঝে কেনা হয় ৬৬টা ‘এমআই-১৭’ এসল্ট হেলিকপ্টার। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ‘ভেক্টর’ টারেট ক্রয় করে সেগুলিকে ইউক্রেনের সহায়তায় ‘এমআই-২৪’ এটাক হেলিকপ্টারগুলিকে আপগ্রেড করা হয়।

ইস্রাইলের কাছ থেকে ২০০৮ সালে ৩০ মিলিয়ন ডলারে কেনা হয় ১২ ঘন্টা ওড়ার সক্ষমতার ৪টা ‘এরোস্টার’ সার্ভেইল্যান্স ড্রোন; ২০১৩ সালের মাঝে কেনা হয় ৫২ ঘন্টা ওড়ার সক্ষমতার ৫টা হেরন সার্ভেইল্যান্স ড্রোন; ২০ ঘন্টা ওড়ার সক্ষমতার ১০টা ‘হার্মিস-৪৫০’ ছোট সার্ভেইল্যান্স ড্রোন; এবং ১৮ ঘন্টা ওড়ার সক্ষমতার ৫টা ‘সার্চার’ ছোট সার্ভেইল্যান্স ড্রোন। ২০১৬ সালের মাঝে ডেলিভারি দেয়া হয় ৫০টা ‘হারপ’ লোইটারিং সুইসাইড ড্রোন। ২০১৭ সালের মাঝে কেনা হয় ৭ ঘন্টা ওড়ার সক্ষমতার ১০টা ছোট ‘অরবিটার-৩’ সার্ভেইল্যান্স ড্রোন। ২০১৮ সালের মাঝে কেনা হয় ১’শটা ‘স্কাই স্ট্রাইকার’ লোইটারিং সুইসাইড ড্রোন। ৩৬ ঘন্টা ওড়ার সক্ষমতার ২টা ‘হার্মিস-৯০০’ সার্ভেইল্যান্স ড্রোনও কেনা হয়। ২০১৯ সালের মাঝে কেনা হয় ১’শ ‘অরবিটার-১কে’ লোইটারিং সুইসাইড ড্রোন। ‘জেরবা’ নামে এই সুইসাইড ড্রোনগুলি ২০১৯ সাল থেকে আজেরবাইজানের ‘আজাদ সিস্টেমস কোম্পানি’র ফ্যাক্টরিতে তৈরি হচ্ছে।

২০১৭ সালের জানুয়ারিতে আজেরবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিইয়েভ নাখচিভান ছিটমহলে সামরিক সরঞ্জাম পরিদর্শন করছেন। আজেরবাইজানের সাম্প্রতিক সামরিক কর্মকান্ড দেশটা নেতৃত্বকে আর্মেনিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী করে তুলছে। এই আন্মবিশ্বাস নাগোর্নো কারাবাখের যুদ্ধক্ষেত্রকে আবারও ফুঁস তুলতে পারে। তবে এই যুদ্ধের সম্ভাবনা ওঠানামা করবে তুরস্ক এবং রাশিয়ার ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার উপর।



আজেরবাইজানের সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি

প্রায় সাড়ে ৩’শ ট্যাঙ্ক, প্রায় ৭’শ আর্টিলারি এবং প্রায় সাড়ে ৬’শ আর্মার্ড ভেহিকল কেনার মাধ্যমে আজেরবাইজান তার সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি করে। ‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’এর প্রকাশ করা ‘দ্যা মিলিটারি ব্যালান্স ২০০৩-২০০৪’এর হিসেব অনুযায়ী আজেরবাইজানের সেনাবাহিনীতে সদস্যসংখ্যা ছিল ৫৬ হাজার। মোট ২৩টা মোটর রাইফেল ব্রিগেডের মাঝে এই সেনাদেরকে অর্গানাইজ করা হয়েছিল। ২০০৭ সালের হিসেবে সেনাবাহিনীর সদস্যসংখ্যা ছিল প্রায় ৫৭ হাজার। ২০১৭ সালের মিলিটারি ব্যালান্সেও সদস্যসংখ্যা প্রায় একইরকম ছিল। কিন্তু ইউনিটগুলিতে বেশকিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। ৪টা ব্রিগেডকে মেকানাইজড ব্রিগেডে পরিবর্তন করা হয়েছে; আর্টিলারি ব্রিগেডের সংখ্যা ১টা থেকে ২টাতে উন্নীত করা হয়েছে। সাড়ে ৬’শ ট্যাঙ্কের সাথে প্রায় ৪’শ সেলফ প্রপেল্ড কামান কেনা হয়। বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিটগুলির মাঝেও অনেকগুলিই ছিল মেকানাইজড ইউনিটের সাথে ব্যবহারের জন্যে মোবাইল ইউনিট। এই মেকানাইজড ব্রিগেডগুলি আজেরবাইজানের সেনাবাহিনীর আক্রমণে যাবার সক্ষমতাকে অনেকগুণে বাড়িয়েছে।

ইস্রাইলের ‘বারাক-৮’ এবং রাশিয়ার ‘এস-৩০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলি আজেরবাইজানের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলিকে রক্ষার জন্যে মোতায়েন করা হতে পারে। অপরদিকে মধ্যম ও স্বল্প পাল্লার ‘বুক’ ও ‘ইগলা এস’ ক্ষেপণাস্ত্রগুলি শত্রুপক্ষের ড্রোনগুলির বিরুদ্ধে মোতায়েন করা হতে পারে।

বিরাট পরিবর্তন এসেছে আজেরবাইজানের আকাশ সক্ষমতায়। ইস্রাইলের তৈরি সার্ভেইল্যান্স ড্রোনগুলির সাথে সুইসাইড ড্রোনগুলি যুক্ত হওয়ায় তা আজেরবাইজানকে আকাশ নিয়ন্ত্রণের এক ধরণের সক্ষমতা দিয়েছে। ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ২০১৬ সালের এপ্রিলের যুদ্ধে ইস্রাইলের তৈরি ‘হারোপ’ সুইসাইড ড্রোন ব্যবহার করে একটা আর্মেনিয় বাস ধ্বংস করা হয়, যেখানে ৭ জন নিহতের মাঝে ছিল কয়েকজন মধ্যম সাড়ির অফিসার। টার্গেট করে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে হত্যা করার জন্যে ড্রোন ব্যবহৃত হওয়ায় ড্রোন ঠেকাবার জন্যে আজেরবাইজান এবং আর্মেনিয়া উভয়েই উঠেপড়ে লেগেছে। ‘ফ্লাইট গ্লোবাল’ বলছে যে, ২০১৬ সালের যুদ্ধে উভয় পক্ষই খুব সম্ভবতঃ এন্টি ড্রোন ইলেকট্রনিক জ্যামিং সিস্টেম ব্যবহার করেছে। আজেরবাইজান তুরস্ক থেকে ‘এসওএম বি-১’ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার ফলে দেশটার পুরোনো মিগ এবং সুখোই বিমানগুলি নতুন ভূমিকা পেয়েছে। আর্মেনিয়ার কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলি এখন এই ক্ষেপণাস্ত্রের নাগালের মাঝে।

আজেরবাইজানের সাম্প্রতিক সামরিক কর্মকান্ড দেশটার নেতৃত্বকে আর্মেনিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী করে তুলছে। আজেরবাইজানের ‘রিপোর্ট নিউজ এজেন্সি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সক্ষমতার দিক থেকে আজেরবাইজানের সামরিক বাহিনী বর্তমানে বিশ্বের সেরা সামরিক বাহিনীগুলির একটা। রুশ সমর বিশ্লেষক আন্দ্রেই ফ্রোলভের কথায়, ১৫ বছরের আগের আজেরি সেনাবাহিনীর তুলনায় বর্তমানের সেনাবাহিনী বলতে গেলে আলাদা একটা বাহিনী।

আর্মেনিয় ইস্টার্ন অর্থোডক্স খ্রিষ্টানদের সাথে আজেরি মুসলিমদের দ্বন্দ্ব বহু পুরোনো। তবে সোভিয়েতদের রেখে যাওয়া উদ্ভট বাউন্ডারিগুলিই নাগোর্নো কারাবাখ নিয়ে আর্মেনিয়া এবং আজেরবাইজানের বর্তমান দ্বন্দ্বের সূচনা করেছে। আর্মেনিয়ার নেতৃত্বের মাঝে ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চের প্রভাব যথেষ্ট থাকায় এই দ্বন্দ্বকে ধর্মীয় রঙে দেখেছে অনেকেই। সোভিয়েত সামরিক বাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার কারণেই ১৯৯০এর দশকে আর্মেনিয়া সামরিক দিক থেকে আজেরিদের থেকে অনেক এগিয়ে ছিল। কিন্তু ২০০৬ সাল থেকে তুরস্কের মাঝ দিয়ে তেলের পাইপলাইন চালু হবার পর তেল বিক্রির অর্থের উপর নির্ভর করে আজেরবাইজান তার সামরিক শক্তি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করতে থাকে। আজেরবাইজানের এই তেল মূলতঃ যায় ইউরোপে। মার্কিন ‘এনার্জি ইনফরমেশন এডমিনিস্ট্রেশন’এর হিসেবে ২০১৭ সালে আজেরবাইজানের রপ্তানি করা ৭৩ শতাংশ তেলই যায় ইউরোপে। অন্যদিকে ২০০৮ সালে জর্জিয়াতে রুশ হামলার পর আজেরিরা তুরস্ককে কৌশলগত বন্ধুর হিসেবে দেখতে থাকে। আজেরিরা তাদের নতুন কেনা অত্যাধুনিক অস্ত্রগুলিকে তুর্কিদের সাথে মহড়া দিয়ে কার্যক্ষম একটা সামরিক বাহিনী তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। ২০১৬ সালের চার দিনের যুদ্ধে আজেরিরা তাদের নতুন প্রযুক্তি, বিশেষ করে ড্রোন ব্যবহারে বেশ দক্ষতা দেখায়। এখন তুরস্কও সিরিয়ার ইদলিবের অভিজ্ঞতা এবং সেখানে সফলতা পাওয়া প্রযুক্তিগুলি আজেরবাইজানকে সরবরাহ করছে। এতে ককেশাসে সামরিক ব্যালান্সে যথেষ্ট পরিবর্তন এসেছে। আজেরবাইজান যদি সম্ভাব্য যুদ্ধে জয় পাবার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে যায়, তাহলে নাগোর্নো কারাবাখের যুদ্ধক্ষেত্র আবারও ফুঁসে উঠতে পারে। তবে এই যুদ্ধের সম্ভাবনা ওঠানামা করবে তুরস্ক এবং রাশিয়ার ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার উপর।