২৪শে মার্চ ২০২২
ইউক্রেন যুদ্ধের শুরু থেকেই বেশকিছু ভিডিও সোশাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে আকাশ থেকে দেখা যাচ্ছে যে, ভূমিতে বেশকিছু গাড়ির ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এই ভিডিও ফুটেজগুলি ইউক্রেনের বিমান বাহিনীর ড্রোন থেকে তোলা। তুরস্কের সরবরাহ করা ‘বায়রাকতার টিবি-২’ ড্রোনগুলি ইউক্রেনের জন্যে অনলাইন প্রচারণার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তুরস্কে ইউক্রেনের রাষ্ট্রদূত ভাসিল বোদনার সোশাল মিডিয়াতে এরকমই একটা ভিডিও শেয়ার করেন এবং শিরোনামে লেখেন ‘মাশাআল্লাহ’! এছাড়াও ইউক্রেনিয়ানরা ‘বায়রাকতার’ নামে একটা গান রচনা করেছে। এই গানের ভিডিওতে ড্রোনের ফুটেজ ব্যবহার করা হয়েছে। গানটা ইউক্রেন রেডিওতেও প্রচার করা হয়েছে। তবে এই ড্রোনগুলি প্রকৃতপক্ষে কতটুকু কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন করছেন অনেকেই।
ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘রয়াল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইন্সটিটিউট’ বা ‘রুসি’র বিশ্লেষক জ্যাক ওয়াটলিং ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’কে বলছেন যে, তুর্কি ড্রোনগুলির ইউক্রেনে সাফল্য পাবার কোন অর্থই নেই। কারণ এই ড্রোনগুলি মধ্যম উচ্চতায় উড্ডয়ন করে, এদের ইলোকট্রোম্যাগনেটিক সিগনেচার যথেষ্ট বড় এবং এগুলির রাডার ক্রস সেকসেনও যথেষ্ট বড়। রুশদের বেশ শক্তিশালী একটা বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে, যা এই ড্রোনগুলিকে সহজেই ভূপাতিত করার কথা। এছাড়াও ইউক্রেনের ভূমিও বেশ সমতল; যেখানে পাহাড় বা অন্য কোন ভৌগোলিক বাধা না থাকার কারণে রাডারের হাত থেকে বাঁচা সম্ভব নয়। তার ধারণা রুশ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিজেদের প্রস্তুতি শেষ করার আগেই এই ড্রোনগুলি আকাশে উড়ে সাফল্য পেয়েছে। তিনি বলছেন যে, ইউক্রেনের বিমান বাহিনী তুর্কি ড্রোনগুলিকে বেশ নিচু দিয়ে ওড়াচ্ছে; এরপর আক্রমণের ঠিক আগে উপড়ে উঠে সুবিধাজনক টার্গেটে হামলা করছে। তবে সামনের দিনগুলিতে রুশ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিজেদের শৃংখলা খুঁজে পেলে এই ড্রোনগুলির ওড়ার জায়গা সীমিত হয়ে আসবে। ইউক্রেনের বিমান বাহিনীকেও আরও সাবধান হতে হবে যে, তারা কোথায় কখন এই ড্রোনগুলিকে ব্যবহার করবে।
মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ফরেন পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউট’এর ডিরেক্টর আরন স্টাইন বলছেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত এই ড্রোনগুলি উড়তে থাকবে, ততক্ষণ এগুলির একটা প্রচারণা মূল্য থাকবে। হাই ডেফিনিশনে বিমান হামলা দেখা যাবার কারণে এই ড্রোন ফুটেজগুলি আকর্ষণ ক্ষমতা বেশি। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ২০১৯ সালে তুর্কি কোম্পানি ‘বায়কার’ তাদের ড্রোনগুলি ইউক্রেনের কাছে বিক্রি শুরু করে। ২০২১ সালের মাঝামাঝি এগুলির ডেলিভারি শুরু হয়। সেবছর অগাস্ট মাসে রাজধানী কিয়েভের রাস্তায় প্যারেডে ড্রোনগুলি প্রদর্শিত হয়। এর আগে সিরিয়া, লিবিয়া এবং ককেশাসের নাগোর্নো কারাবাখে এই ‘বায়রাকতার টিবি-২’ ড্রোনগুলি ব্যাপক সাফল্য পেয়েছিল। কিন্তু সেসব যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। এবার ইউক্রেনের যুদ্ধে ব্যাপারটা পুরোপুরিভাবে আলাদা। রাশিয়া একটা বড় শক্তি এবং তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যথেষ্ট শক্তিশালী বলেই সকলে মনে করেন। একারণেই পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা ইউক্রেনে ড্রোনগুলির সাফল্য দেখে বুঝে উঠতে পারছেন না যে ব্যাপারটা কি করে সম্ভব হচ্ছে। যুদ্ধ শুরু হবার পর ৩রা মার্চ ইউক্রেন সরকার ঘোষণা দেয় যে, তারা তুরস্ক থেকে ড্রোনের নতুন একটা চালান পেয়েছে। তবে তারা ড্রোনের সংখ্যা বলেননি। তুর্কি কর্মকর্তারা রুশদের রক্তচক্ষু এড়াতে ঘোষণা দেন যে, একটা তুর্কি বেসরকারি কোম্পানি চুক্তি অনুযায়ী ডেলিভারি দিয়েছে। আর এরকম ড্রোন শুধু ইউক্রেন নয়, দুনিয়ার অনেক দেশেই বিক্রি করেছে তুর্কিরা। সঠিক সংখ্যা জানা না থাকলেও অনেকেই বলছেন যে, ২০ থেকে ৫০টার মতো ‘বায়রাকতার’ ড্রোন তুর্কিরা এপর্যন্ত ইউক্রেনকে সরবরাহ করেছে।
মার্কিন মিডিয়া ‘এনবিসি’র সাথে কথা বলতে গিয়ে ব্রিটিশ সাংবাদিক এবং ড্রোন যুদ্ধের উপর বইএর লেখক ডেভিড হ্যাম্বলিং বলছেন যে, এই ড্রোনগুলি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিমানের মতো। মাত্র ১’শ ১০ হর্সপাওয়ারের ইঞ্জিনচালিত এই ড্রোনগুলি অতি সহজেই টার্গেট করতে পারার কথা। সবচাইতে অবাক ব্যাপার হলো ড্রোনের ফুটেজে দেখা যাচ্ছে যে, রুশ বিমানধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এই ড্রোনগুলি ধ্বংস করে ফেলছে! অথচ এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাগুলিই ড্রোন ভূপাতিত করার সবচাইতে ভালো অস্ত্র হবার কথা ছিল। এছাড়াও রুশ ইলেকট্রনিক জ্যামিং ব্যবস্থাও বেশ ভালো। সেগুলিও তো এই ড্রোনগুলিকে অকার্যকর করে ফেলার কথা। তিনি বলছেন যে, পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা খুব সম্ভবতঃ রুশ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতাকে বড় করে দেখেছেন। হ্যাম্বলিং বলছেন যে, আর কিছু না হোক, অন্ততঃ রুশ ফাইটার বিমান দিয়েও তো এই ড্রোনগুলিকে ভূপাতিত করা যেতো। হয় রুশরা নিজেদের কাজে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে; অথবা ইউক্রেনিয়রা নতুন কোন ট্যাকটিকস খুঁজে পেয়েছে কার্যকর হামলার জন্যে।
সুইজারল্যান্ডের ‘ইটিএইচ জুরিখ’ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মাউরো গিলি ‘আল জাজিরা’কে বলছেন যে, যেহেতু এহেন ড্রোনগুলিকে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সহজেই টার্গেট করতে পারে, তাই এগুলিকে রক্ষা করার জন্যে ইলেকট্রনিক জ্যামারের সমন্বয়ে কাজ করাটা জরুরি। লিবিয়াতে অবশ্য রুশরা বেশকিছু তুর্কি ড্রোন ভূপাতিত করেছিল। ইউক্রেনে এদের সাফল্য বলে দিচ্ছে যে, হয়তো রুশরা বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সাথে না নিয়ে এগুচ্ছে। এটা অসম্ভব নয়, কারণ রুশরা বেশ বড় রকমের লজিস্টিক্যাল সমস্যার মাঝে রয়েছে। অথবা এমনও হতে পারে যে, ইউক্রেনিয়ানরা অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক জ্যামার হাতে পেয়েছে।
এই ড্রোনগুলি পুরো যুদ্ধকে কতটা প্রভাবিত করবে, সেটা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে ড্রোনগুলি আন্তর্জাতিক অস্ত্রের বাজারে তুরস্কের অবস্থানকে আরও উপরে উঠিয়েছে। একেকটা তুর্কি ‘বায়রাকতার’ ড্রোনের মূল্য প্রায় ২ মিলিয়ন ডলার; যা আকাশে ওড়া যেকোন বিমানের মূল্যের তুলনায় কিছুই নয়। অন্ততঃ শক্তিশালী রুশ বিমান বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে পশ্চিমারা যখন ইউক্রেনকে কোন বিমান দিচ্ছে না, তখন এই ড্রোনগুলিই রুশদের উপরে বিমান হামলার স্বাদ দিচ্ছে এবং ইউক্রেনিয়ানদের অনলাইন প্রচারণার কেন্দ্রে থাকছে। যে ব্যাপারটা নিশ্চিত তা হলো, পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা এই ড্রোনগুলি যে ইউক্রেনে কোনরূপ সাফল্য পেতে পারে, সেটা বিশ্বাসই করেননি। রুশ অত্যাধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কমদামি ধীরগতির ড্রোনের সফলতা দেখিয়ে দেয় যে, কোনকিছুই অজেয় নয়। তুর্কি ড্রোনের সফলতা নিশ্চিত করলো যে, সামনের দিনগুলিতে ইউক্রেনের আকাশে আরও বিভিন্ন আকারের এবং ধরণের ড্রোন দেখা যাবে; যার মাঝে ক্ষুদ্র এবং মাঝারি সুইসাইড ড্রোনও থাকবে।
Showing posts with label information war. Show all posts
Showing posts with label information war. Show all posts
Thursday, 24 March 2022
ইউক্রেনের আকাশে তুর্কি ড্রোনগুলি কতটুকু সফল?
Labels:
Drone Warfare,
Geopolitics,
information war,
propaganda,
Russia,
Turkey,
Ukraine
Tuesday, 5 January 2021
বালুচিস্তানে ভারতের প্রক্সি যুদ্ধ পাকিস্তানের জাতীয়তাবাদী নীতিরই ফলাফল
৫ই জানুয়ারি ২০২১
গত ২২শে ডিসেম্বর কানাডার টরোন্টো শহরে করিমা মেহরাব নামে এক মহিলার মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। করিমা বালোচ নামে পরিচিত এই মহিলা পাকিস্তানের দক্ষিণের বালুচিস্তান প্রদেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন। ২০ তারিখ থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন বলে বলছে তার আত্মীয়রা। টরোন্টো পুলিশ এক বিবৃতিতে বলে যে, মৃতের সকলকিছু বিশ্লেষণের পর পুলিশ অফিসাররা নিশ্চিত হয়েছেন যে, এই মৃত্যু কোন হত্যাকান্ড নয়। মৃতের পরিবারকে এব্যাপারে জানানো হয়েছে। এক টুইটার বার্তায় টরোন্টো পুলিশ জানায় যে, পুলিশ এই মৃত্যুর ব্যাপারে মিডিয়ার যথেষ্ট আগ্রহের কথা জানে। ‘ভয়েস অব আমেরিকা’ বলছে যে, করিমা বালোচ ২০১৫ সালে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে টরোন্টোতে বসবাস করছিলেন। পাকিস্তান সরকার তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ এনেছিল। তার মৃত্যুর সাথেসাথেই মিডিয়াতে অনেকেই সন্দেহ করা শুরু করে যে, বালোচের মৃত্যু হয়তো পাকিস্তানি ইন্টেলিজেন্স অপারেটিভদের হাতেই হয়েছে। পাকিস্তান সরকার ইতোমধ্যেই পাকিস্তানি ইন্টেলিজেন্সকে জড়িত করার চেষ্টাকে ‘অবাস্তব’ বলে আখ্যা দিয়েছে। এবং বলেছে যে, এই কথাগুলি বলা হচ্ছে পাকিস্তানের ইমেজ নষ্ট করার লক্ষ্যে।
করিমা বালোচের স্বামী হাম্মাল হায়দার ব্যাপারটাকে একদমই মেনে নিতে পারছেন না। ব্রিটেনের ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকার সাথে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন যে, বালোচ ‘টরোন্টো সেন্টার আইল্যান্ড’এ গিয়েছিলেন; যেখান থেকে তিনি আর ফেরেননি। যাবার সময় তিনি যথেষ্ট শক্তসমর্থ মানুষ হিসেবেই গিয়েছিলেন। এখানে কোন সন্দেহভাজন কর্মকান্ডকে উড়িয়ে দেয়া যায় না; কারণ তিনি হুমকির মাঝেই ছিলেন। তার বাড়িতে দু’বার অভিযানের পর তিনি পাকিস্তান ছেড়েছিলেন। ‘বিবিসি’র সাথে কথা বলতে গিয়ে করিমা বালোচের সহকর্মী লতিফ জোহার বালোচ বলেন যে, কিছুদিন আগেই করিমা হুমকি পান যে, তাকে নাকি ‘ক্রিসমাস গিফট’ দেয়া হবে এবং ‘শিক্ষা দেয়া হবে’।
২০০৫ সাল থেকে করিমা বালোচ বালুচিস্তানে নিখোঁজ ব্যক্তিদের ব্যাপারে প্রতিবাদ শুরু করেন। প্রতিবাদকারীরা বলছেন যে, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে হাজারো মানুষের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। করিমা বালোচের পরিবারের দুইজন সদস্য নিখোঁজ হন এবং এর কিছুদিন পর তাদের মৃতদেহ পাওয়া যায়। ২০০৬ সাল থেকে ‘বালোচ স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশন’এ নাম লেখান করিমা। ২০১৩ সালে সংস্থাটাকে পাকিস্তান সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তবে এর কার্যক্রম চলমান থাকে; এবং ২০১৫ সালে করিমা বালোচ সংস্থার চেয়ারপার্সন হন। তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ এলে তিনি পাকিস্তান ছাড়েন। টরোন্টোতে তিনি তার সহকর্মী হাম্মাল হায়দারকে বিয়ে করেন। গত পাঁচ বছর ধরে সোশাল মিডিয়া ছাড়াও কানাডা এবং ইউরোপে তিনি বালুচিস্তানের ব্যাপারে যথেষ্ট সরব ছিলেন। ২০১৬ সালে ‘বিবিসি’ করিমা বালোচকে ১০০ জন প্রভাবশালী মহিলার তালিকায় রাখে। বালুচিস্তানের আন্দোলনকারীর এরকম রহস্যজনক মৃত্যু এবারই প্রথম নয়। ২০২০ সালের মে মাসে সুইডেনে বসবাসকারী বালুচিস্তানের স্বাধীনতার জন্যে কাজ করা সাংবাদিক সাজিদ হুসাইনের মরদেহ পাওয়া যায়। পুলিশ বলে যে, তিনি পানিতে ডুবে মারা গিয়েছেন এবং তা হত্যাকান্ড ছিল বলে কোন প্রমাণ নেই। ২০১২ সালে সাজিদ পাকিস্তান ছেড়ে পালিয়ে সুইডেনে আশ্রয় পান।
ভারতের ভূমিকা
পাকিস্তান সরকারের অভিযোগ হলো, বালুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের পিছনে রয়েছে ভারতের মদদ। ২০১৬ সালে ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রাক্তন অফিসার কুলভুষন যাদব পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে গোয়েন্দাবৃত্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। পাকিস্তান সরকার একটা ভিডিও ছাড়ে, যেখানে দেখা যায় যে, কুলভুষন যাদব বালুচিস্তানে বিভিন্ন হামলার পিছনে সহায়তা দিয়েছেন বলে স্বীকার করছেন। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, ২০১৭ সালের এপ্রিলে একটা সামরিক আদালতে বিচারের পর কুলভুষনের মৃত্যুদন্ডাদেশ দেয়া হয়। ভারত এব্যাপারে আন্তর্জাতিক আদালতে গেলেও আদালত পাকিস্তানের সামরিক আদালতের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। তবে দোষী ভারতীয় নাগরিককে ভারতীয় কূটনীতিবিদদের সাথে দেখা করার আদেশ দেয়। ২০১৯এর সেপ্টেম্বরে ভারতীয় কর্মকর্তারা কুলভুষনের সাথে দেখা করেন।
গত ৯ই ডিসেম্বর ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের এনজিও ‘ইইউ ডিজইনফোল্যাব’ তাদের এক বিশ্লেষণে বলে যে, ২০০৫ সাল থেকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে কেন্দ্র করে ভারত সরকার গোপনে মিথ্যা তথ্য ছড়াবার অপারেশন চালিয়ে আসছে। সাড়ে ৭’শর বেশি মিডিয়া আউটলেট এবং ১০টার বেশি এনজিওর নাম ব্যবহার করে প্রায় ১’শ ১৯টা দেশে এই অপারেশন চালাচ্ছে ভারত। এর অধীনে সাড়ে ৫’শ ইন্টারনেট ডোমেইন রয়েছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া মিডিয়া, এনজিও এবং থিঙ্কট্যাঙ্ক আবারও জীবন্ত করে চালিয়ে নেয়া হয় এই অপারেশন। এমনকি মৃত ব্যক্তিদেরও এক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। আফ্রিকা বিষয়ক এনজিওর নাম ব্যবহার করে পাকিস্তানের মানবাধিকার বিষয়ক খবরাখবর প্রচার করা হয়। উদাহরণস্বরূপ ‘আফ্রিকান রুরাল এন্ড এগ্রিকালচারাল ক্রেডিট অর্গানাইজেশন’এর পক্ষে বালুচিস্তানের নেত্রী করিমা বালোচ বক্তৃতা দিয়েছেন। ব্রাসেলস এবং জেনেভাতে অপারেট করা এই নেটওয়ার্কের মূল টার্গেট হলো পাকিস্তান; যদিও চীনও এই টার্গেটিংএর অংশ। ‘শ্রীভাস্তাভা গ্রুপ’এর নেতৃত্বে পরিচালিত এই অপারেশনের মূল লক্ষ্য হলো ভারতীয়দের মাঝে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ জাগিয়ে তোলা ও পাকিস্তান বিরোধী আবেগ উস্কে দেয়া; এবং একইসাথে ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলির বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের অবস্থানকে সুসংহত করা। ‘ইইউ ডিজইনফোল্যাব’ ভারতের এই অপারেশনের নাম দেয় ‘ইন্ডিয়ান ক্রনিকলস’। এই প্রতিবেদন পাকিস্তানের জন্যে বড় সুখবর হিসেবে আসে। এর মাধ্যমে পাকিস্তান সরকার মিডিয়াতে ভারতের বিরুদ্ধে আক্রমণে যেতে পারে। পাকিস্তান সরকার ভারতের বিরুদ্ধে ‘পঞ্চম জেনারেশনের যুদ্ধ’ বা তথ্য যুদ্ধ চালনা করার অভিযোগ করে।
ভারত অবশ্য পাকিস্তানের সকল অভিযোগ অস্বীকার করে এবং ‘ইইউ ডিজইনফোল্যাব’কেই মিথ্যা খবরের উৎস বলে আখ্যা দেয়। ১১ই ডিসেম্বর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অনুরাগ শ্রীভাস্তাভা সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে বলেন যে, ভারত নয়, বরং পাকিস্তানই মিথ্যা এবং বানোয়াট খবর প্রচার করে। ‘ইইউ ডিজইনফোল্যাব’ এর প্রতিবাদ করে ভারত সরকারের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থার হুমকি দেয়।
পাকিস্তান যেকারণে শান্তিতে নেই
করিমা বালোচ, সাজিদ হুসাইন, ‘ইন্ডিয়ান ক্রনিকলস’, কুলভুষনের ঘটনা পাকিস্তানকে স্বস্তি দেয়না। কারণ এতে পাকিস্তানের বালুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বন্ধ হয়ে যায়নি। বালুচিস্তানের গুরুত্ব আরও বেড়ে গিয়েছে গোয়াদরে চীনা বিনিয়োগে গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প শুরুর পর থেকে। গোয়াদর হলো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘চায়না পাকিস্তান ইকনমিক করিডোর’ বা ‘সিপেক’এর দক্ষিণ প্রান্ত। ‘সিপেক’এর মাধ্যমে বালুচিস্তানের গোয়াদর চীনের মূল ভূখন্ডের সাথে যুক্ত হয়েছে। বালুচিস্তানে চীনা কর্মীদের উপর বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হামলা বেশ নিয়মিত। গত জুলাই মাসে বালুচ এবং সিন্ধি বিচ্ছন্নতাবাদীরা একত্রিত হয়ে একটা জোট করে। এক যৌথ বিবৃতিতে তারা বলে যে, চীনের আগ্রাসী কর্মকান্ডে সিন্ধি এবং বালুচ উভয়েই সমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ২০২০এর জুনে করাচি স্টক এক্সচেঞ্জে হামলার জন্যে বালুচরা দায় স্বীকার করলেও তারা সিন্ধিদের কাছ থেকে সহায়তা পেয়েছে বলে বলা হয়। ওয়াশিংটন ভিত্তিক বিশ্লেষক মালিক সিরাজ আকবর ‘নিকেই এশিয়া’র সাথে কথা বলতে গিয়ে বলেন যে, দুই বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ একত্রিত হয়ে ‘সিপেক’এর জন্যে বড় সমস্যা তৈরি করতে পারলেও চীন এবং পাকিস্তানকে এই প্রকল্প বন্ধ করাতে সক্ষম হবে না। তবে তারা পাকিস্তান সরকারকে নিরাপত্তা বৃদ্ধি করতে বাধ্য করবে; যার ফলে বিচ্ছন্নতাবাদীরা সাধারণ মানুষকে চীনাদের বিরুদ্ধে আরও খেপিয়ে তুলতে পারবে। অন্যদিকে পাকিস্তান সরকার হয়তো বালুচিস্তানের জনগণকে এই প্রকল্পের সাথে আরও বেশি যুক্ত করতে চাইবে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ’এর প্রফেসর মোহন মালিকের মতে, বিচ্ছিন্নতাবাদীরা চীনের জন্যে ‘সিপেক’ প্রকল্পের খরচ বাড়িয়ে দিতে চাইবে। তিনি আরও মনে করছেন যে, এর ফলশ্রুতিতে দক্ষিণ এশিয়াতে প্রক্সি যুদ্ধ আরও বাড়বে। অত্র এলাকার রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রবিরোধী গ্রুপগুলিকে ভারত বা চীনের পক্ষে টানার একটা প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যাবে। লন্ডনের ‘ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টমিন্সটার’এর ‘স্কুল অব সোশাল সাইয়েন্সেস’এর প্রধান দিবিয়েশ আনন্দ বলছেন যে, পাকিস্তান সরকারের জন্যে বালুচিস্তানের জনগণকে ‘সিপেক’ প্রকল্পে জড়িত করার মাধ্যমে এর উন্নয়নকে পুরো অঞ্চলের জন্যে উন্নয়নের ইঞ্জিন বানানো যায়; আর উল্টোটা হলে তা হতে পারে চীনাদের গর্ব করার মতো একটা নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রকল্প, যেটাকে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ঔপনিবেশিক কর্মকান্ড বলে আখ্যা দিতে পারবে।
১৯৭১ সালে ভারতের সহায়তায় পাকিস্তানকে ভেঙ্গে বাংলাদেশ তৈরি হয় এবং পাকিস্তান তার অর্ধেক জনসংখ্যা হারায়। পাকিস্তান সরকারের উগ্র জাতীয়তাবাদী নীতিকে ভারত ব্যবহার করেছিল মাত্র। পাকিস্তানের সেই জাতীয়তাবাদ মূলতঃ পাঞ্জাবিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় পাকিস্তানকে জন্মের পর থেকেই বিচ্ছিন্নতাবাদের মোকাবিলা করতে হয়েছে; যদিও ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের জন্মই হয়েছিল মুসলিম সংখ্যাধিক্য এলাকাগুলি নিয়ে। মুসলিম পরিচয়ের চাইতে জাতিগত পরিচয়কে প্রাধান্য দেয়ায় পাকিস্তান তার বাঙ্গালী, পুশতুন, বালুচ এবং সিন্ধি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। ভারত পাকিস্তানের সেই ঐতিহাসিক ভীতিকেই কাজে লাগিয়েছে। বালুচিস্তানে ‘সিপেক’ প্রকল্পকে টার্গেট করে ভারত শুধু পাকিস্তানকেই দুর্বল করতে চাইছে না, চীনের জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পকে হুমকির মাঝে রাখছে। এতে রক্তপাত হচ্ছে পাকিস্তানিদের; ভারতের কেউ মরছে না। এহেন প্রক্সিযুদ্ধে ভারতের লজ্জিত হবার কোন কারণও থাকার কথা নয়। বরং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হবার পরেও পাকিস্তানকে কেন কষ্ট করে একত্রে রাখতে হচ্ছে, সেই প্রশ্নটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অপরদিকে পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে চীনের প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণ করাটাই যখন সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে, তখন ভারতও বালুচিস্তানে প্রক্সিযুদ্ধ চালিয়ে নিয়ে চীনা কৌশলগত প্রকল্পে বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করলে তা যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সমান্তরালেই থাকবে। পারমাণবিক যুদ্ধ নয়, বরং প্রক্সিযুদ্ধই হতে চলেছে দক্ষিণ এশিয়ায় ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের নতুন চেহারা।
গত ২২শে ডিসেম্বর কানাডার টরোন্টো শহরে করিমা মেহরাব নামে এক মহিলার মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। করিমা বালোচ নামে পরিচিত এই মহিলা পাকিস্তানের দক্ষিণের বালুচিস্তান প্রদেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন। ২০ তারিখ থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন বলে বলছে তার আত্মীয়রা। টরোন্টো পুলিশ এক বিবৃতিতে বলে যে, মৃতের সকলকিছু বিশ্লেষণের পর পুলিশ অফিসাররা নিশ্চিত হয়েছেন যে, এই মৃত্যু কোন হত্যাকান্ড নয়। মৃতের পরিবারকে এব্যাপারে জানানো হয়েছে। এক টুইটার বার্তায় টরোন্টো পুলিশ জানায় যে, পুলিশ এই মৃত্যুর ব্যাপারে মিডিয়ার যথেষ্ট আগ্রহের কথা জানে। ‘ভয়েস অব আমেরিকা’ বলছে যে, করিমা বালোচ ২০১৫ সালে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে টরোন্টোতে বসবাস করছিলেন। পাকিস্তান সরকার তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ এনেছিল। তার মৃত্যুর সাথেসাথেই মিডিয়াতে অনেকেই সন্দেহ করা শুরু করে যে, বালোচের মৃত্যু হয়তো পাকিস্তানি ইন্টেলিজেন্স অপারেটিভদের হাতেই হয়েছে। পাকিস্তান সরকার ইতোমধ্যেই পাকিস্তানি ইন্টেলিজেন্সকে জড়িত করার চেষ্টাকে ‘অবাস্তব’ বলে আখ্যা দিয়েছে। এবং বলেছে যে, এই কথাগুলি বলা হচ্ছে পাকিস্তানের ইমেজ নষ্ট করার লক্ষ্যে।
করিমা বালোচের স্বামী হাম্মাল হায়দার ব্যাপারটাকে একদমই মেনে নিতে পারছেন না। ব্রিটেনের ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকার সাথে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন যে, বালোচ ‘টরোন্টো সেন্টার আইল্যান্ড’এ গিয়েছিলেন; যেখান থেকে তিনি আর ফেরেননি। যাবার সময় তিনি যথেষ্ট শক্তসমর্থ মানুষ হিসেবেই গিয়েছিলেন। এখানে কোন সন্দেহভাজন কর্মকান্ডকে উড়িয়ে দেয়া যায় না; কারণ তিনি হুমকির মাঝেই ছিলেন। তার বাড়িতে দু’বার অভিযানের পর তিনি পাকিস্তান ছেড়েছিলেন। ‘বিবিসি’র সাথে কথা বলতে গিয়ে করিমা বালোচের সহকর্মী লতিফ জোহার বালোচ বলেন যে, কিছুদিন আগেই করিমা হুমকি পান যে, তাকে নাকি ‘ক্রিসমাস গিফট’ দেয়া হবে এবং ‘শিক্ষা দেয়া হবে’।
২০০৫ সাল থেকে করিমা বালোচ বালুচিস্তানে নিখোঁজ ব্যক্তিদের ব্যাপারে প্রতিবাদ শুরু করেন। প্রতিবাদকারীরা বলছেন যে, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে হাজারো মানুষের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। করিমা বালোচের পরিবারের দুইজন সদস্য নিখোঁজ হন এবং এর কিছুদিন পর তাদের মৃতদেহ পাওয়া যায়। ২০০৬ সাল থেকে ‘বালোচ স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশন’এ নাম লেখান করিমা। ২০১৩ সালে সংস্থাটাকে পাকিস্তান সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তবে এর কার্যক্রম চলমান থাকে; এবং ২০১৫ সালে করিমা বালোচ সংস্থার চেয়ারপার্সন হন। তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ এলে তিনি পাকিস্তান ছাড়েন। টরোন্টোতে তিনি তার সহকর্মী হাম্মাল হায়দারকে বিয়ে করেন। গত পাঁচ বছর ধরে সোশাল মিডিয়া ছাড়াও কানাডা এবং ইউরোপে তিনি বালুচিস্তানের ব্যাপারে যথেষ্ট সরব ছিলেন। ২০১৬ সালে ‘বিবিসি’ করিমা বালোচকে ১০০ জন প্রভাবশালী মহিলার তালিকায় রাখে। বালুচিস্তানের আন্দোলনকারীর এরকম রহস্যজনক মৃত্যু এবারই প্রথম নয়। ২০২০ সালের মে মাসে সুইডেনে বসবাসকারী বালুচিস্তানের স্বাধীনতার জন্যে কাজ করা সাংবাদিক সাজিদ হুসাইনের মরদেহ পাওয়া যায়। পুলিশ বলে যে, তিনি পানিতে ডুবে মারা গিয়েছেন এবং তা হত্যাকান্ড ছিল বলে কোন প্রমাণ নেই। ২০১২ সালে সাজিদ পাকিস্তান ছেড়ে পালিয়ে সুইডেনে আশ্রয় পান।
ভারতের ভূমিকা
পাকিস্তান সরকারের অভিযোগ হলো, বালুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের পিছনে রয়েছে ভারতের মদদ। ২০১৬ সালে ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রাক্তন অফিসার কুলভুষন যাদব পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে গোয়েন্দাবৃত্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। পাকিস্তান সরকার একটা ভিডিও ছাড়ে, যেখানে দেখা যায় যে, কুলভুষন যাদব বালুচিস্তানে বিভিন্ন হামলার পিছনে সহায়তা দিয়েছেন বলে স্বীকার করছেন। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, ২০১৭ সালের এপ্রিলে একটা সামরিক আদালতে বিচারের পর কুলভুষনের মৃত্যুদন্ডাদেশ দেয়া হয়। ভারত এব্যাপারে আন্তর্জাতিক আদালতে গেলেও আদালত পাকিস্তানের সামরিক আদালতের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। তবে দোষী ভারতীয় নাগরিককে ভারতীয় কূটনীতিবিদদের সাথে দেখা করার আদেশ দেয়। ২০১৯এর সেপ্টেম্বরে ভারতীয় কর্মকর্তারা কুলভুষনের সাথে দেখা করেন।
গত ৯ই ডিসেম্বর ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের এনজিও ‘ইইউ ডিজইনফোল্যাব’ তাদের এক বিশ্লেষণে বলে যে, ২০০৫ সাল থেকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে কেন্দ্র করে ভারত সরকার গোপনে মিথ্যা তথ্য ছড়াবার অপারেশন চালিয়ে আসছে। সাড়ে ৭’শর বেশি মিডিয়া আউটলেট এবং ১০টার বেশি এনজিওর নাম ব্যবহার করে প্রায় ১’শ ১৯টা দেশে এই অপারেশন চালাচ্ছে ভারত। এর অধীনে সাড়ে ৫’শ ইন্টারনেট ডোমেইন রয়েছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া মিডিয়া, এনজিও এবং থিঙ্কট্যাঙ্ক আবারও জীবন্ত করে চালিয়ে নেয়া হয় এই অপারেশন। এমনকি মৃত ব্যক্তিদেরও এক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। আফ্রিকা বিষয়ক এনজিওর নাম ব্যবহার করে পাকিস্তানের মানবাধিকার বিষয়ক খবরাখবর প্রচার করা হয়। উদাহরণস্বরূপ ‘আফ্রিকান রুরাল এন্ড এগ্রিকালচারাল ক্রেডিট অর্গানাইজেশন’এর পক্ষে বালুচিস্তানের নেত্রী করিমা বালোচ বক্তৃতা দিয়েছেন। ব্রাসেলস এবং জেনেভাতে অপারেট করা এই নেটওয়ার্কের মূল টার্গেট হলো পাকিস্তান; যদিও চীনও এই টার্গেটিংএর অংশ। ‘শ্রীভাস্তাভা গ্রুপ’এর নেতৃত্বে পরিচালিত এই অপারেশনের মূল লক্ষ্য হলো ভারতীয়দের মাঝে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ জাগিয়ে তোলা ও পাকিস্তান বিরোধী আবেগ উস্কে দেয়া; এবং একইসাথে ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলির বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের অবস্থানকে সুসংহত করা। ‘ইইউ ডিজইনফোল্যাব’ ভারতের এই অপারেশনের নাম দেয় ‘ইন্ডিয়ান ক্রনিকলস’। এই প্রতিবেদন পাকিস্তানের জন্যে বড় সুখবর হিসেবে আসে। এর মাধ্যমে পাকিস্তান সরকার মিডিয়াতে ভারতের বিরুদ্ধে আক্রমণে যেতে পারে। পাকিস্তান সরকার ভারতের বিরুদ্ধে ‘পঞ্চম জেনারেশনের যুদ্ধ’ বা তথ্য যুদ্ধ চালনা করার অভিযোগ করে।
ভারত অবশ্য পাকিস্তানের সকল অভিযোগ অস্বীকার করে এবং ‘ইইউ ডিজইনফোল্যাব’কেই মিথ্যা খবরের উৎস বলে আখ্যা দেয়। ১১ই ডিসেম্বর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অনুরাগ শ্রীভাস্তাভা সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে বলেন যে, ভারত নয়, বরং পাকিস্তানই মিথ্যা এবং বানোয়াট খবর প্রচার করে। ‘ইইউ ডিজইনফোল্যাব’ এর প্রতিবাদ করে ভারত সরকারের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থার হুমকি দেয়।
পাকিস্তান যেকারণে শান্তিতে নেই
করিমা বালোচ, সাজিদ হুসাইন, ‘ইন্ডিয়ান ক্রনিকলস’, কুলভুষনের ঘটনা পাকিস্তানকে স্বস্তি দেয়না। কারণ এতে পাকিস্তানের বালুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বন্ধ হয়ে যায়নি। বালুচিস্তানের গুরুত্ব আরও বেড়ে গিয়েছে গোয়াদরে চীনা বিনিয়োগে গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প শুরুর পর থেকে। গোয়াদর হলো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘চায়না পাকিস্তান ইকনমিক করিডোর’ বা ‘সিপেক’এর দক্ষিণ প্রান্ত। ‘সিপেক’এর মাধ্যমে বালুচিস্তানের গোয়াদর চীনের মূল ভূখন্ডের সাথে যুক্ত হয়েছে। বালুচিস্তানে চীনা কর্মীদের উপর বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হামলা বেশ নিয়মিত। গত জুলাই মাসে বালুচ এবং সিন্ধি বিচ্ছন্নতাবাদীরা একত্রিত হয়ে একটা জোট করে। এক যৌথ বিবৃতিতে তারা বলে যে, চীনের আগ্রাসী কর্মকান্ডে সিন্ধি এবং বালুচ উভয়েই সমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ২০২০এর জুনে করাচি স্টক এক্সচেঞ্জে হামলার জন্যে বালুচরা দায় স্বীকার করলেও তারা সিন্ধিদের কাছ থেকে সহায়তা পেয়েছে বলে বলা হয়। ওয়াশিংটন ভিত্তিক বিশ্লেষক মালিক সিরাজ আকবর ‘নিকেই এশিয়া’র সাথে কথা বলতে গিয়ে বলেন যে, দুই বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ একত্রিত হয়ে ‘সিপেক’এর জন্যে বড় সমস্যা তৈরি করতে পারলেও চীন এবং পাকিস্তানকে এই প্রকল্প বন্ধ করাতে সক্ষম হবে না। তবে তারা পাকিস্তান সরকারকে নিরাপত্তা বৃদ্ধি করতে বাধ্য করবে; যার ফলে বিচ্ছন্নতাবাদীরা সাধারণ মানুষকে চীনাদের বিরুদ্ধে আরও খেপিয়ে তুলতে পারবে। অন্যদিকে পাকিস্তান সরকার হয়তো বালুচিস্তানের জনগণকে এই প্রকল্পের সাথে আরও বেশি যুক্ত করতে চাইবে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ’এর প্রফেসর মোহন মালিকের মতে, বিচ্ছিন্নতাবাদীরা চীনের জন্যে ‘সিপেক’ প্রকল্পের খরচ বাড়িয়ে দিতে চাইবে। তিনি আরও মনে করছেন যে, এর ফলশ্রুতিতে দক্ষিণ এশিয়াতে প্রক্সি যুদ্ধ আরও বাড়বে। অত্র এলাকার রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রবিরোধী গ্রুপগুলিকে ভারত বা চীনের পক্ষে টানার একটা প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যাবে। লন্ডনের ‘ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টমিন্সটার’এর ‘স্কুল অব সোশাল সাইয়েন্সেস’এর প্রধান দিবিয়েশ আনন্দ বলছেন যে, পাকিস্তান সরকারের জন্যে বালুচিস্তানের জনগণকে ‘সিপেক’ প্রকল্পে জড়িত করার মাধ্যমে এর উন্নয়নকে পুরো অঞ্চলের জন্যে উন্নয়নের ইঞ্জিন বানানো যায়; আর উল্টোটা হলে তা হতে পারে চীনাদের গর্ব করার মতো একটা নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রকল্প, যেটাকে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ঔপনিবেশিক কর্মকান্ড বলে আখ্যা দিতে পারবে।
১৯৭১ সালে ভারতের সহায়তায় পাকিস্তানকে ভেঙ্গে বাংলাদেশ তৈরি হয় এবং পাকিস্তান তার অর্ধেক জনসংখ্যা হারায়। পাকিস্তান সরকারের উগ্র জাতীয়তাবাদী নীতিকে ভারত ব্যবহার করেছিল মাত্র। পাকিস্তানের সেই জাতীয়তাবাদ মূলতঃ পাঞ্জাবিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় পাকিস্তানকে জন্মের পর থেকেই বিচ্ছিন্নতাবাদের মোকাবিলা করতে হয়েছে; যদিও ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের জন্মই হয়েছিল মুসলিম সংখ্যাধিক্য এলাকাগুলি নিয়ে। মুসলিম পরিচয়ের চাইতে জাতিগত পরিচয়কে প্রাধান্য দেয়ায় পাকিস্তান তার বাঙ্গালী, পুশতুন, বালুচ এবং সিন্ধি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। ভারত পাকিস্তানের সেই ঐতিহাসিক ভীতিকেই কাজে লাগিয়েছে। বালুচিস্তানে ‘সিপেক’ প্রকল্পকে টার্গেট করে ভারত শুধু পাকিস্তানকেই দুর্বল করতে চাইছে না, চীনের জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পকে হুমকির মাঝে রাখছে। এতে রক্তপাত হচ্ছে পাকিস্তানিদের; ভারতের কেউ মরছে না। এহেন প্রক্সিযুদ্ধে ভারতের লজ্জিত হবার কোন কারণও থাকার কথা নয়। বরং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হবার পরেও পাকিস্তানকে কেন কষ্ট করে একত্রে রাখতে হচ্ছে, সেই প্রশ্নটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অপরদিকে পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে চীনের প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণ করাটাই যখন সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে, তখন ভারতও বালুচিস্তানে প্রক্সিযুদ্ধ চালিয়ে নিয়ে চীনা কৌশলগত প্রকল্পে বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করলে তা যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সমান্তরালেই থাকবে। পারমাণবিক যুদ্ধ নয়, বরং প্রক্সিযুদ্ধই হতে চলেছে দক্ষিণ এশিয়ায় ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের নতুন চেহারা।
Labels:
Baluchistan,
Geopolitics,
India,
information war,
insurgency,
New World Order,
Pakistan,
Proxy War,
USA
Monday, 2 November 2020
‘সাইবার যুদ্ধ’ ... এটাই কি যুদ্ধের ভবিষ্যৎ?
০২রা নভেম্বর ২০২০
গত ১৩ই অক্টোবর নরওয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এরিকসেন সোরেইডে ঘোষণা দেন যে অগাস্ট মাসে নরওয়ের পার্লামেন্টে সাইবার হামলার পিছনে দায়ী হলো রাশিয়া। তিনি কোন প্রমাণ দেখানো ছাড়াই বলেন যে, প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী নরওয়ের সরকার ধারণা করতে পারছে যে, এই হামলা রাশিয়াই করেছে। মস্কো অবশ্য এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করে এবং বলে যে, এটা একটা মারাত্মক এবং ইচ্ছাকৃত উস্কানি। অসলোতে রুশ দূতাবাস থেকে বলা হয় যে, রাশিয়ার ইন্টারনেটের বিরুদ্ধে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ হামলা হয়; কিন্তু তা রাশিয়াকে কখনোই অধিকার দেয়না হামলার উৎস যেই দেশে, সেই দেশের নেতৃত্বকে কোন বাছবিচার ছাড়াই অভিযুক্ত করার। সেপ্টেম্বরে নরওয়ের সরকার বলে যে, কয়েকজন কর্মকর্তার ইমেইল একাউন্ট হ্যাকিং হয়েছে এবং কিছু তথ্য ডাউনলোড করা হয়েছে। তবে সমস্যার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা তারা জনসম্মুখে আনেননি। ‘বিবিসি’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, নরওয়ের সাথে রাশিয়ার সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে ভালো যাচ্ছে না। গত অগাস্টে নরওয়ে রুশ এক কূটনীতিবিদকে গোয়েন্দাবৃত্তির অভিযোগে বহিষ্কার করে। রাশিয়াও এর প্রতিবাদে নরওয়ের এক কূটনীতিককে বহিষ্কার করে। ২০১৮ সালে নরওয়ে সরকার এক রুশ নাগরিককে গোয়েন্দাবৃত্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার করলেও পরে উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে ছেড়ে দেয়। এবছরের শুরুতেই নরওয়ের সামরিক ইন্টেলিজেন্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, রাশিয়া নরওয়েতে প্রভাব বিস্তারের অপারেশন চালাচ্ছে; যার মাধ্যমে সরকার, নির্বাচন পদ্ধতি এবং মিডিয়ার উপর জনগণের আস্থা কমিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। শুধু নরওয়েই নয়, অন্যান্য দেশও সাইবার হামলার জন্যে অন্য রাষ্ট্রকে, বিশেষ করে রাশিয়া এবং চীনকে অভিযুক্ত করছে। গত জানুয়ারি মাসে জার্মানিতে চ্যান্সেলর এঙ্গেলা মার্কেল সহ কয়েক’শ রাজনীতিবিদের ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করে অনলাইনে প্রকাশ করে দেয়া হয়। আর গত বছর অস্ট্রেলিয়ার সাইবার ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি অভিযোগ করে যে, চীন অস্ট্রেলিয়ার পার্লামেন্টে হ্যাকিং করে ঢোকার চেষ্টা করেছে। চীন অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছিল। ঘটনাগুলি বর্তমান বিশ্বে চলা এই ‘সাইবার যুদ্ধ’কেই হাইলাইট করছে। এর বর্তমানে এবং ভবিষ্যৎ এখন আলোচনার বিষয়বস্তু।
গত ১৯শে অক্টোবর মার্কিন এবং ব্রিটিশ সরকার একটা রুশ হ্যাকিং দলের বিরুদ্ধে লম্বা অভিযোগ দায়ের করে। ‘স্যান্ডওয়ার্ম’ নামে পরিচিত ছয় সদস্যের এই হ্যাকিং গ্রুপের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়, তা মাঝে রয়েছে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ গ্রিডে হামলা, ২০১৭ সালে ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর নির্বাচনে জেতার সময় অনলাইনে প্রভাব বিস্তার, ২০১৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় অলিম্পিকের সময় সাইবার হামলা, এবং ২০১৮ সালে ব্রিটেনের সলসবুরিতে নার্ভ গ্যাস আক্রমণের সময় তদন্তের উপর নজরদারি। এছাড়াও ২০১৬ সালে ‘ফ্যান্সি বেয়ার’ নামে একই গ্রুপ মার্কিন প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনের আগে হিলারি ক্লিন্টন এবং ডেমোক্র্যাটিক জাতীয় কমিটির ইমেইল হ্যাকিং করেছিল বলে বলা হয়। অভিযোগে রুশ ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস ‘জিআরইউ’এর অংশ এই গ্রুপের অফিস মস্কোর বাইরে খিমিকিতে ২২ কিরোভা স্ট্রীটের এক নীল রঙের কাঁচের সুউচ্চ ভবনে রয়েছে বলে বলা হয়। “দ্যা টাওয়ার” নামে পরিচিত সেই ভবনে কাজ করা এই গ্রুপ ‘ইউনিট ৭৪৪৫৫’ নামে পরিচিত। লম্বা সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের সমন্বয়ে গঠিত ‘ফাইভ আইজ’ ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ এবং গুগল, ফেইসবুক, সিসকো এবং টুইটারের সাথে যৌথভাবে তদন্ত করে মার্কিন অভ্যন্তরীণ কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই অভিযোগ পেশ করে। ব্রিটেনের ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকার সাথে সাক্ষাতে ‘জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি’র স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের প্রফেসর থমাস রিড বলেন যে, অভিযোগপত্রের বিষদ বিবরণ দেখে মনে হচ্ছে যে, ‘ফাইভ আইজ’ ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ রুশ ইন্টেলিজেন্সের ভেতরকার বহু ব্যাপার সম্পর্কে যথেষ্টই ওয়াকিবহাল; বিশেষ করে যেসকল তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, সেই তথ্যগুলি এখন আর গোপনীয় মনে করা হচ্ছে না বলেই প্রকাশ করা হয়েছে। নিজেদের কর্মকান্ড গোপন রাখার জন্যে ‘ইউনিট ৭৪৪৫৫’ হয়তো অনেক চেষ্টাই করেছে; তথাপি কিছু ক্ষেত্রে তারা যথেষ্টই অদূরদর্শিতা দেখিয়েছে। ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স ‘বেলিংক্যাট’এর আরিক টোলার বলছেন যে, ছয়জনের মাঝে তিনজনই তাদের গাড়ি রেজিস্ট্রেশন করিয়েছেন একই ঠিকানা থেকে। এই ঠিকানাই সেই ইউনিটকে নির্দেশ করে। এই একই ঠিকানায় মোট ৪৭ জন লোক তাদের গাড়ি রেজিস্ট্রেশন করিয়েছে। হয়তো এরা সকলেই ‘জিআরইউ’এর হ্যাকার দলের সদস্য।
পশ্চিমা নেতৃবৃন্দ ইতোমধ্যেই এই সাইবার হামলাকে ‘সাইবার যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন এবং সেই লক্ষ্যে নিজেদের প্রস্তুতি বৃদ্ধি করার কথা বলছেন। গত ৩০শে সেপ্টেম্বর ব্রিটেনের সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ কর্মকর্তা জেনারেল নিক কার্টার ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘পলিসি এক্সচেঞ্জ’এর এক আলোচনায় দাবি করেন যে, রাশিয়া এবং চীন সাইবার আক্রমণ, মিথ্যা তথ্য ছড়ানো এবং ব্যাপক গোয়েন্দাবৃত্তির মাধ্যমে পশ্চিমা দেশগুলির উপর “রাজনৈতিক যুদ্ধ” চালাচ্ছে। এর লক্ষ্য হলো, অফিশিয়ালি কোন সংঘাতে না জড়িয়েই পশ্চিমা দেশগুলির ইচ্ছাশক্তিকে ভেঙ্গে ফেলা। তিনি আরও বলেন যে, ব্রিটেনের প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলি যুদ্ধে যাবার জন্যে প্রস্তুত নয়; তথাপি তারা সামরিক সংঘাতের সংজ্ঞার ঠিক বাইরে থেকে অপারেশন চালিয়ে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করছে। তিনি উদাহরণ হিসেবে ২০১৭ সালে ইউক্রেনের ব্যাংক এবং জ্বালানি কোম্পানির উপর রুশ হামলার অভিযোগকে টেনে আনেন। একইসাথে তিনি স্যাটেলাইট সিস্টেমকে সমস্যা ফেলার জন্যে বেইজিংএর প্রকল্পগুলির উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন যে, তাদের শত্রুদের যুদ্ধ ছাড়া জয়লাভের এই কৌশলকে হারানো খুবই কঠিন; কারণ তা পশ্চিমা চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ ‘স্বাধীনতা’কে খর্ব না করে মোকাবিলা করা যাবে না। জেনারেল কার্টার রাশিয়া এবং চীনকে এক কাতারে ফেললেও কেউ কেউ এই দুই দেশের কর্মকান্ডকে আলাদা করে দেখছেন। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর প্রবীন সাংবাদিক ডেভিড স্যাঙ্গার মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’এর সাথে এক সাক্ষাতে রাশিয়া এবং চীনের সাইবার কর্মকান্ডের মাঝে পার্থক্য করতে গিয়ে বলেন যে, রুশরা হলো ‘টর্নেডোর মতো’, আর চীনারা হলো ‘জলবায়ু পরিবর্তন’এর মতো। তিনি আরও বলেন যে, চীনারা বিশ্বব্যাপী নিজেদের একটা ভালো প্রতিচ্ছবি তুলে ধরতে চায়; যেকারণে তারা সাইবার যুদ্ধের মাঝে শুধু গোয়েন্দাবৃত্তিকেই প্রধান্য দিচ্ছে। তারা এই যুদ্ধের ‘লাল দাগ’ অতিক্রম করতে চায় না। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড্যানিয়েল ওয়াগনার ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’এর এক লেখায় বলছেন যে, চীন ইতোমধ্যেই সাইবার যুদ্ধের দিক দিয়ে পশ্চিমাদের চাইতে অনেক এগিয়ে গেছে। এখন যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য দেশের করার মতো তেমন কিছুই নেই। তারা সর্বোচ্চ চীনাদের মতো করেই নিজেদের কর্মপদ্ধতিকে গোছাতে পারে যাতে চীনের সমকক্ষ হওয়া যায়। এর অর্থ হলো খবরের পিছনে গোপনে সাইবার যুদ্ধ চালিয়ে নেয়া, যা ইতোমধ্যেই ভবিষ্যতের যুদ্ধকে সংজ্ঞায়িত করছে।
সাইবার যুদ্ধের পরিধি অনেক দূর পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছে এবং প্রতিদিনই নতুন নতুন জায়গা এর মাঝে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই অভিযোগ করেছে যে, রাশিয়া এবং চীন পশ্চিমা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি এবং মেডিক্যাল গবেষণা সংস্থার ভেতর হ্যাকিং করে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনের ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়েছে। ভারতীয় থিংকট্যাঙ্ক ‘অবজার্ভার রিচার্চ ফাউন্ডেশন’এর এক প্রতিবেদনে সাইবার নিরাপত্তাকে ভারতের পারমাণবিক স্থাপনাগুলির নিরাপত্তার একটা প্রধান স্তম্ভ বলে উল্লেখ করা হয়। পারমাণবিক স্থাপনার অন্যান্য নিরাপত্তার সাথে সাথে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ হুমকি মাথায় রেখেই সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করতে বলা হয়। সাইবার হামলাকে একটা প্রতিবাদ বা প্রতিআক্রমণের পদ্ধতি হিসেবেও দেখা শুরু হয়েছে। কিছুদিন আগেই ফ্রান্সে রাসূল (সাঃ)কে বিদ্রুপ করা নিয়ে ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর বক্তব্যের পর মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে ফ্রান্সের বিভিন্ন ওয়েবসাইটে সাইবার হামলা শুরু হয়। কোন রাষ্ট্র এই হ্যাকিংএ সরাসরি সমর্থন না দিলেও তা মুসলিম বিশ্বের আবেগের একটা বহিঃপ্রকাশ বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
পুঁজিবাদী বিশ্বে অর্থসম্পদের গুরুত্ব যেহেতু সর্বোচ্চ, তাই অর্থসম্পদ আহরণ এবং তার দখল নিয়ে প্রতিযোগিতাই হয়ে গিয়েছে দুনিয়ার মানুষের মূল কর্মকান্ড। এই প্রতিযোগিতায় অপরের আর্থিক ক্ষতি করা এবং একইভাবে বিপক্ষের হামলা থেকে নিজের অর্থসম্পদ রক্ষা করাও হয়ে গিয়েছে একটা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার মূল উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্য অর্জনে সাইবার যুদ্ধ সবচাইতে কম খরচের যুদ্ধ; কারণ এতে কোন বিশাল সৈন্যবাহিনী পুষতে হয়না; আর নিজের সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনাও কম থাকে। আর করোনাভাইরাসের মহামারি এবং বৈশ্বিক মন্দার মাঝে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি সামরিক হামলার চাইতে কম নয়। তবে অর্থসম্পদ বাঁচাতে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে পশ্চিমারা তাদের আদর্শের পবিত্র স্তম্ভ ‘স্বাধীনতা’কেই বিসর্জন দিচ্ছে। ‘স্বাধীনতা’ নিশ্চিত করতে গিয়ে স্বাধীনতা খর্বের পরিকল্পনাগুলি পশ্চিমা আদর্শের ভিতে আঘাত করছে। আর অপরদিকে সারা বিশ্ব এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে যুক্ত থাকার কারণে তথ্য চুরি করা, ব্যবসায়িক ক্ষতি করা, জননিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটানো, নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, ইত্যাদি কর্মকান্ড এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এর সাথে রাজনৈতিক লক্ষ্য যুক্ত হওয়াতেই ‘সাইবার যুদ্ধ’ শব্দগুচ্ছের অবতারণা, তা সে নির্বাচনে হস্তক্ষেপ হোক, বা মহানবী (সাঃ)এর অপমানের প্রতিশোধই হোক। ‘যুদ্ধ’ না করেও এই ‘যুদ্ধ’ পরিচালনা এমন এক যুদ্ধাবস্থার জন্ম দিচ্ছে যে, তা ‘যুদ্ধ’এর সংজ্ঞাকেই চ্যালেঞ্জ করছে।
গত ১৩ই অক্টোবর নরওয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এরিকসেন সোরেইডে ঘোষণা দেন যে অগাস্ট মাসে নরওয়ের পার্লামেন্টে সাইবার হামলার পিছনে দায়ী হলো রাশিয়া। তিনি কোন প্রমাণ দেখানো ছাড়াই বলেন যে, প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী নরওয়ের সরকার ধারণা করতে পারছে যে, এই হামলা রাশিয়াই করেছে। মস্কো অবশ্য এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করে এবং বলে যে, এটা একটা মারাত্মক এবং ইচ্ছাকৃত উস্কানি। অসলোতে রুশ দূতাবাস থেকে বলা হয় যে, রাশিয়ার ইন্টারনেটের বিরুদ্ধে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ হামলা হয়; কিন্তু তা রাশিয়াকে কখনোই অধিকার দেয়না হামলার উৎস যেই দেশে, সেই দেশের নেতৃত্বকে কোন বাছবিচার ছাড়াই অভিযুক্ত করার। সেপ্টেম্বরে নরওয়ের সরকার বলে যে, কয়েকজন কর্মকর্তার ইমেইল একাউন্ট হ্যাকিং হয়েছে এবং কিছু তথ্য ডাউনলোড করা হয়েছে। তবে সমস্যার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা তারা জনসম্মুখে আনেননি। ‘বিবিসি’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, নরওয়ের সাথে রাশিয়ার সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে ভালো যাচ্ছে না। গত অগাস্টে নরওয়ে রুশ এক কূটনীতিবিদকে গোয়েন্দাবৃত্তির অভিযোগে বহিষ্কার করে। রাশিয়াও এর প্রতিবাদে নরওয়ের এক কূটনীতিককে বহিষ্কার করে। ২০১৮ সালে নরওয়ে সরকার এক রুশ নাগরিককে গোয়েন্দাবৃত্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার করলেও পরে উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে ছেড়ে দেয়। এবছরের শুরুতেই নরওয়ের সামরিক ইন্টেলিজেন্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, রাশিয়া নরওয়েতে প্রভাব বিস্তারের অপারেশন চালাচ্ছে; যার মাধ্যমে সরকার, নির্বাচন পদ্ধতি এবং মিডিয়ার উপর জনগণের আস্থা কমিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। শুধু নরওয়েই নয়, অন্যান্য দেশও সাইবার হামলার জন্যে অন্য রাষ্ট্রকে, বিশেষ করে রাশিয়া এবং চীনকে অভিযুক্ত করছে। গত জানুয়ারি মাসে জার্মানিতে চ্যান্সেলর এঙ্গেলা মার্কেল সহ কয়েক’শ রাজনীতিবিদের ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করে অনলাইনে প্রকাশ করে দেয়া হয়। আর গত বছর অস্ট্রেলিয়ার সাইবার ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি অভিযোগ করে যে, চীন অস্ট্রেলিয়ার পার্লামেন্টে হ্যাকিং করে ঢোকার চেষ্টা করেছে। চীন অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছিল। ঘটনাগুলি বর্তমান বিশ্বে চলা এই ‘সাইবার যুদ্ধ’কেই হাইলাইট করছে। এর বর্তমানে এবং ভবিষ্যৎ এখন আলোচনার বিষয়বস্তু।
গত ১৯শে অক্টোবর মার্কিন এবং ব্রিটিশ সরকার একটা রুশ হ্যাকিং দলের বিরুদ্ধে লম্বা অভিযোগ দায়ের করে। ‘স্যান্ডওয়ার্ম’ নামে পরিচিত ছয় সদস্যের এই হ্যাকিং গ্রুপের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়, তা মাঝে রয়েছে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ গ্রিডে হামলা, ২০১৭ সালে ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর নির্বাচনে জেতার সময় অনলাইনে প্রভাব বিস্তার, ২০১৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় অলিম্পিকের সময় সাইবার হামলা, এবং ২০১৮ সালে ব্রিটেনের সলসবুরিতে নার্ভ গ্যাস আক্রমণের সময় তদন্তের উপর নজরদারি। এছাড়াও ২০১৬ সালে ‘ফ্যান্সি বেয়ার’ নামে একই গ্রুপ মার্কিন প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনের আগে হিলারি ক্লিন্টন এবং ডেমোক্র্যাটিক জাতীয় কমিটির ইমেইল হ্যাকিং করেছিল বলে বলা হয়। অভিযোগে রুশ ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস ‘জিআরইউ’এর অংশ এই গ্রুপের অফিস মস্কোর বাইরে খিমিকিতে ২২ কিরোভা স্ট্রীটের এক নীল রঙের কাঁচের সুউচ্চ ভবনে রয়েছে বলে বলা হয়। “দ্যা টাওয়ার” নামে পরিচিত সেই ভবনে কাজ করা এই গ্রুপ ‘ইউনিট ৭৪৪৫৫’ নামে পরিচিত। লম্বা সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের সমন্বয়ে গঠিত ‘ফাইভ আইজ’ ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ এবং গুগল, ফেইসবুক, সিসকো এবং টুইটারের সাথে যৌথভাবে তদন্ত করে মার্কিন অভ্যন্তরীণ কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই অভিযোগ পেশ করে। ব্রিটেনের ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকার সাথে সাক্ষাতে ‘জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি’র স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের প্রফেসর থমাস রিড বলেন যে, অভিযোগপত্রের বিষদ বিবরণ দেখে মনে হচ্ছে যে, ‘ফাইভ আইজ’ ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ রুশ ইন্টেলিজেন্সের ভেতরকার বহু ব্যাপার সম্পর্কে যথেষ্টই ওয়াকিবহাল; বিশেষ করে যেসকল তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, সেই তথ্যগুলি এখন আর গোপনীয় মনে করা হচ্ছে না বলেই প্রকাশ করা হয়েছে। নিজেদের কর্মকান্ড গোপন রাখার জন্যে ‘ইউনিট ৭৪৪৫৫’ হয়তো অনেক চেষ্টাই করেছে; তথাপি কিছু ক্ষেত্রে তারা যথেষ্টই অদূরদর্শিতা দেখিয়েছে। ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স ‘বেলিংক্যাট’এর আরিক টোলার বলছেন যে, ছয়জনের মাঝে তিনজনই তাদের গাড়ি রেজিস্ট্রেশন করিয়েছেন একই ঠিকানা থেকে। এই ঠিকানাই সেই ইউনিটকে নির্দেশ করে। এই একই ঠিকানায় মোট ৪৭ জন লোক তাদের গাড়ি রেজিস্ট্রেশন করিয়েছে। হয়তো এরা সকলেই ‘জিআরইউ’এর হ্যাকার দলের সদস্য।
পশ্চিমা নেতৃবৃন্দ ইতোমধ্যেই এই সাইবার হামলাকে ‘সাইবার যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন এবং সেই লক্ষ্যে নিজেদের প্রস্তুতি বৃদ্ধি করার কথা বলছেন। গত ৩০শে সেপ্টেম্বর ব্রিটেনের সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ কর্মকর্তা জেনারেল নিক কার্টার ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘পলিসি এক্সচেঞ্জ’এর এক আলোচনায় দাবি করেন যে, রাশিয়া এবং চীন সাইবার আক্রমণ, মিথ্যা তথ্য ছড়ানো এবং ব্যাপক গোয়েন্দাবৃত্তির মাধ্যমে পশ্চিমা দেশগুলির উপর “রাজনৈতিক যুদ্ধ” চালাচ্ছে। এর লক্ষ্য হলো, অফিশিয়ালি কোন সংঘাতে না জড়িয়েই পশ্চিমা দেশগুলির ইচ্ছাশক্তিকে ভেঙ্গে ফেলা। তিনি আরও বলেন যে, ব্রিটেনের প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলি যুদ্ধে যাবার জন্যে প্রস্তুত নয়; তথাপি তারা সামরিক সংঘাতের সংজ্ঞার ঠিক বাইরে থেকে অপারেশন চালিয়ে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করছে। তিনি উদাহরণ হিসেবে ২০১৭ সালে ইউক্রেনের ব্যাংক এবং জ্বালানি কোম্পানির উপর রুশ হামলার অভিযোগকে টেনে আনেন। একইসাথে তিনি স্যাটেলাইট সিস্টেমকে সমস্যা ফেলার জন্যে বেইজিংএর প্রকল্পগুলির উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন যে, তাদের শত্রুদের যুদ্ধ ছাড়া জয়লাভের এই কৌশলকে হারানো খুবই কঠিন; কারণ তা পশ্চিমা চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ ‘স্বাধীনতা’কে খর্ব না করে মোকাবিলা করা যাবে না। জেনারেল কার্টার রাশিয়া এবং চীনকে এক কাতারে ফেললেও কেউ কেউ এই দুই দেশের কর্মকান্ডকে আলাদা করে দেখছেন। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর প্রবীন সাংবাদিক ডেভিড স্যাঙ্গার মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’এর সাথে এক সাক্ষাতে রাশিয়া এবং চীনের সাইবার কর্মকান্ডের মাঝে পার্থক্য করতে গিয়ে বলেন যে, রুশরা হলো ‘টর্নেডোর মতো’, আর চীনারা হলো ‘জলবায়ু পরিবর্তন’এর মতো। তিনি আরও বলেন যে, চীনারা বিশ্বব্যাপী নিজেদের একটা ভালো প্রতিচ্ছবি তুলে ধরতে চায়; যেকারণে তারা সাইবার যুদ্ধের মাঝে শুধু গোয়েন্দাবৃত্তিকেই প্রধান্য দিচ্ছে। তারা এই যুদ্ধের ‘লাল দাগ’ অতিক্রম করতে চায় না। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড্যানিয়েল ওয়াগনার ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’এর এক লেখায় বলছেন যে, চীন ইতোমধ্যেই সাইবার যুদ্ধের দিক দিয়ে পশ্চিমাদের চাইতে অনেক এগিয়ে গেছে। এখন যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য দেশের করার মতো তেমন কিছুই নেই। তারা সর্বোচ্চ চীনাদের মতো করেই নিজেদের কর্মপদ্ধতিকে গোছাতে পারে যাতে চীনের সমকক্ষ হওয়া যায়। এর অর্থ হলো খবরের পিছনে গোপনে সাইবার যুদ্ধ চালিয়ে নেয়া, যা ইতোমধ্যেই ভবিষ্যতের যুদ্ধকে সংজ্ঞায়িত করছে।
সাইবার যুদ্ধের পরিধি অনেক দূর পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছে এবং প্রতিদিনই নতুন নতুন জায়গা এর মাঝে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই অভিযোগ করেছে যে, রাশিয়া এবং চীন পশ্চিমা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি এবং মেডিক্যাল গবেষণা সংস্থার ভেতর হ্যাকিং করে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনের ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়েছে। ভারতীয় থিংকট্যাঙ্ক ‘অবজার্ভার রিচার্চ ফাউন্ডেশন’এর এক প্রতিবেদনে সাইবার নিরাপত্তাকে ভারতের পারমাণবিক স্থাপনাগুলির নিরাপত্তার একটা প্রধান স্তম্ভ বলে উল্লেখ করা হয়। পারমাণবিক স্থাপনার অন্যান্য নিরাপত্তার সাথে সাথে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ হুমকি মাথায় রেখেই সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করতে বলা হয়। সাইবার হামলাকে একটা প্রতিবাদ বা প্রতিআক্রমণের পদ্ধতি হিসেবেও দেখা শুরু হয়েছে। কিছুদিন আগেই ফ্রান্সে রাসূল (সাঃ)কে বিদ্রুপ করা নিয়ে ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর বক্তব্যের পর মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে ফ্রান্সের বিভিন্ন ওয়েবসাইটে সাইবার হামলা শুরু হয়। কোন রাষ্ট্র এই হ্যাকিংএ সরাসরি সমর্থন না দিলেও তা মুসলিম বিশ্বের আবেগের একটা বহিঃপ্রকাশ বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
পুঁজিবাদী বিশ্বে অর্থসম্পদের গুরুত্ব যেহেতু সর্বোচ্চ, তাই অর্থসম্পদ আহরণ এবং তার দখল নিয়ে প্রতিযোগিতাই হয়ে গিয়েছে দুনিয়ার মানুষের মূল কর্মকান্ড। এই প্রতিযোগিতায় অপরের আর্থিক ক্ষতি করা এবং একইভাবে বিপক্ষের হামলা থেকে নিজের অর্থসম্পদ রক্ষা করাও হয়ে গিয়েছে একটা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার মূল উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্য অর্জনে সাইবার যুদ্ধ সবচাইতে কম খরচের যুদ্ধ; কারণ এতে কোন বিশাল সৈন্যবাহিনী পুষতে হয়না; আর নিজের সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনাও কম থাকে। আর করোনাভাইরাসের মহামারি এবং বৈশ্বিক মন্দার মাঝে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি সামরিক হামলার চাইতে কম নয়। তবে অর্থসম্পদ বাঁচাতে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে পশ্চিমারা তাদের আদর্শের পবিত্র স্তম্ভ ‘স্বাধীনতা’কেই বিসর্জন দিচ্ছে। ‘স্বাধীনতা’ নিশ্চিত করতে গিয়ে স্বাধীনতা খর্বের পরিকল্পনাগুলি পশ্চিমা আদর্শের ভিতে আঘাত করছে। আর অপরদিকে সারা বিশ্ব এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে যুক্ত থাকার কারণে তথ্য চুরি করা, ব্যবসায়িক ক্ষতি করা, জননিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটানো, নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, ইত্যাদি কর্মকান্ড এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এর সাথে রাজনৈতিক লক্ষ্য যুক্ত হওয়াতেই ‘সাইবার যুদ্ধ’ শব্দগুচ্ছের অবতারণা, তা সে নির্বাচনে হস্তক্ষেপ হোক, বা মহানবী (সাঃ)এর অপমানের প্রতিশোধই হোক। ‘যুদ্ধ’ না করেও এই ‘যুদ্ধ’ পরিচালনা এমন এক যুদ্ধাবস্থার জন্ম দিচ্ছে যে, তা ‘যুদ্ধ’এর সংজ্ঞাকেই চ্যালেঞ্জ করছে।
Labels:
Britain,
China,
Cyber Warfare,
Five Eyes,
Geopolitics,
hacking,
information war,
misinformation,
Russia,
USA
Subscribe to:
Posts (Atom)






