Showing posts with label shipbuilding. Show all posts
Showing posts with label shipbuilding. Show all posts

Thursday, 15 September 2016

আফ্রিকা আমাদের জন্যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

১৫ই সেপ্টেম্বর ২০১৬
আফ্রিকার মাটিতে শান্তিরক্ষীরা একটা চমতকার ভাবমূর্তি তৈরি করে এসেছেন, সেটা ঠিকমতো কাজে লাগাতে গেলে আমাদের চিন্তাটাকে আরও বেশকিছুটা প্রসারিত করতে হবে। আফ্রিকা আমাদের জন্যে কততা গুরুতপূর্ণ, তা ভাবার সময় এখনই।


১৯৭০-এর দশকে বাংলাদেশ নামে নতুন জন্ম নেয়া দেশটিকে পরাশক্তিরা যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে। সদ্য স্বাধীন দেশটিতে মারাত্মক খাদ্য ঘাটতি ছিল। এই সুযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত এবং অন্য দেশগুলি বাংলাদেশের জনগণকে জিম্মি করে নিজেদের কাজ হাসিল করেছে। আর এই কাজে যুক্তরাষ্ট্রের আগে আর কেউ এগিয়ে ছিলনা। চার দশক পরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের declassify করা নথিগুলি আমাদের জানান দেয় যে তারা সেসময় খাদ্য নিয়ে কি পরিমাণ রাজনীতি করেছে। খাদ্যশস্য দেবার চুক্তি করার আগে শর্ত পূরণ করিয়েছে। বামপন্থী কিউবার কাছে পাটজাত পণ্য বিক্রি করার ‘অপরাধে’ ১৯৭৪ সালে খাদ্যশস্যবাহী জাহাজ তিন সপ্তাহ দেরি করিয়েছে, যা কিনা ’৭৪-এর দুর্ভিক্ষে বহু মানুষের মৃত্যুর অন্যতম কারণ ছিল। কি দম্ভটাই না তাদের ছিল তখন। ঢাকায় তাদের অফিসের সামনে একটি পোস্টার কেন লাগানো হয়েছিল, তা কৈফিয়ত চাওয়া হয়েছিল। সরকারের সদস্যরা কেন উমুক দেশকে সমর্থন করেছিলেন, তার জন্যে আমাদের কূটনীতিককে ডেকে শাসিয়েছে; খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেবার হুমকি দিয়েছে। সরকারী দলের লোকেরা কেন আমেরিকার বিরুদ্ধে কথা বলে, এ নিয়ে চাপ সৃষ্টি করেছে। এই দম্ভ আজ কোথায়? এখন নিজেদের দূরভিসন্ধিমূলক উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্যে বিভিন্ন দেশের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে তাদের। এক দেশের উপরে চাপ সৃষ্টি করতে আরেক দেশের সাহায্য নিতে হচ্ছে। এজন্যেই প্রশ্ন করেছিলাম আগের এক লেখায় – আমরা হেরে যাওয়া দলের খেলোয়াড় কেন থাকবো?

মানবতার জন্যে আফ্রিকা

যাই হোক, বাংলাদেশ যে বহু দূর এসেছে, তা এখন আর বলে দিতে হবে না। ১৯৭০-এর দশকে কিসিঞ্জার সাহেবের “Basket Case” এখন খাদ্যশস্য রপ্তানি করতে চাইছে। খাবারের কষ্ট কেমন, সেটা এই দেশের মানুষকে মনে করিয়ে দিতে হবে না। এদেশের ভুভুক্ষু মানুষগুলিকে জিম্মি করে খাদ্যশস্যের জাহাজ নিয়ে রাজনীতি চলেছে একসময়। সারা দুনিয়াতে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে শোষণ করেছে তারা। আমরা এই জঘন্য মানসিকতা তাদের কাছ থেকে শিখবো না অবশ্যই। আর এই জঘন্য চিন্তা যেহেতু এখন পুরোপুরি নিম্নমুখী, তাই আঙ্গুরের আশায় তাদের দিকে তাকিয়ে থাকার দিন শেষ। আমরা বিপদের সময়ে নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং মালদ্বীপকে সাহায্য করেছি; সামনের দিনগুলিতেও করবো। ভারতের চোখ রাঙ্গানিতে কাজ হবে না। আমাদের সৈন্যদের পরিশ্রমে আফ্রিকার অনেক দেশের মানুষ শান্তিতে ফিরেছে। জাতিসঙ্ঘের সমস্যাসঙ্কুল মিশনের কাঁটাতারে আটকে না গেলে আমরা হয়তো আরও ভালো কাজ করতে পারতাম। যা-ই হোক; কাজ আমরা করেছি; করছি। কালো মানুষগুলিকে বন্ধুর মতো নিতে আমাদের কষ্ট হয়নি। পশ্চিমা বর্ণবাদ আমাদের সৈনিকদের মাঝে কাজ করেনি। আফ্রিকার অনেক দেশের মানুষ বাংলাদেশের মানুষকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছে। মার্কিনীরা ১৯৭০-এর দশকে থাইল্যান্ডকে যেভাবে রঙ্গিন “বৃন্দাবন” বানিয়েছিল তাদের ভিয়েতনামে যুদ্ধরত সৈন্যদের যৌন-আকাংক্ষা বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে, আমরা সেটা আফ্রিকাতে করতে পারিনি আমাদের ইসলামিক বিশ্বাসের কারণে। মার্কিন ব্যবস্থাতে দুনিয়া চললেও আমাদের বিশ্বাসকে মুছে ফেলতে পারেনি তারা। তাই আফ্রিকার দেশে দেশে রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে বাংলায়। কালো কালো শিশুদের মাঝে সেনারা তাদের দেশে ফেলে আসা সন্তানদের দেখতে পেয়েছেন; পশ্চিমা পাদ্রীদের মতো pedophilia কেইস আমরা হতে পারিনি। মার্কিন মুল্লুকের সাদা-কালো বৈষম্য আমাদের কখনো স্পর্শ করেনি, কারণ ইসলামে সাদা-কালো ব্যাপারটার অস্তিত্বই নেই; তাই এখানে অনেক ফেয়ার-এন্ড-লাভলি মাখিয়েও আমাদের সৈন্যদের হাতে আফ্রিকাকে ধ্বংস করানো যায়নি।
  
আফ্রিকাতে বাংলাদেশের নামে রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে। এটা সম্ভব হতো না যদি আমাদের সৈন্যরা পশ্চিমা সংস্কৃতিতে অনুপ্রাণিত হয়ে অনাচারে লিপ্ত হতো। কালো মানুষগুলির সাথে আত্মার বন্ধন তৈরির একটা সুযোগ সেখানে তৈরি করা হয়েই গেছে। এখন সেটাকে সামনে এগিয়ে নেবার পালা। আমরা আফ্রিকার মানুষগুলির সাথে দায়িত্বপূর্ণ মনোভাব দেখালে আমাদের দরকারগুলিকেও তারা গুরুত্বের সাথে দেখবে। সামনের দিনগুলিতে আমাদের জন্যে আফ্রিকার গুরুত্ব বাড়তেই থাকবে। সেই অনুযায়ী এখন থেকেই তৈরি হতে হবে আমাদের।

উন্নয়নের জন্যে আফ্রিকা

আফ্রিকার এই দেশগুলি অনেক সময়েই অজন্মার কারণে খাদ্যসংকটে পতিত হয়েছে। পশ্চিমা সম্পদশালীদের সম্পদ কুক্ষিগত করার কারণে, আর Consumerism-এর নামে হাজার হাজার টন খাদ্য অপচয় করার কারণে আফ্রিকাতে দুর্ভিক্ষে মারা গেছে বহু মানুষ। আমরা আমাদের উদ্ধৃত্ত খাদ্যশস্য আফ্রিকাতে পাঠালে এটা সবদিক থেকেই সঠিক সিদ্ধান্ত হবে। আমরা তো আর ঘুর্নিঝড় সিডরের পর ভারত আমাদের সাথে চাল নিয়ে যে কূটনীতি করেছিল, সেটা আফ্রিকার সাথে করবো না। বাংলাদেশের অনেক পণ্যই এখন বাজার খুঁজছে পৃথিবীব্যপী। গত দুই দশকে যে পরিমাণ শিল্পায়ন এই দেশে হয়েছে, তাতে অল্প কিছু অদরকারী পণ্য এবং কিছু হাই-টেক পণ্য বাদ দিলে বেশিরভাগ জিনিসই এই দেশে তৈরি হয়ে থাকে। ভারত তার নিজের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যকে ভয় পায় বলেই এখন আফ্রিকাতে এসব পণ্যের বাজার তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশের কর্পোরেট গ্রুপগুলির একটা বড় রপ্তানি আয় আসছে আফ্রিকা থেকে, যা দিনে দিনে বাড়ছে। জাহাজ-ভর্তি পণ্য যাচ্ছে আফ্রিকাতে। আফ্রিকাতে ইলেকট্রনিক্স পণ্য নিয়ে ঢুকেছে ওয়াল্টন। ইথিওপিয়ার মোটসাইকেল বাজারে ঢুকেছে রানার মোটরসাইকেল। কেনিয়া, উগান্ডা, মোজাম্বিক, তাঞ্জানিয়া-সহ পূর্ব-আফ্রিকার দেশগুলি ছাড়াও পশ্চিম আফ্রিকার গাম্বিয়াতে বাংলাদেশ তৈরি জাহাজ রপ্তানি হয়েছে। আফ্রিকার অনেক দেশেই ঔষধের বিরাট ঘাটতি রয়েছে, যা আমরা মেটাতে পারি। আমাদের ঔষধে আফ্রিকার মানুষের জীবন বাঁচলে সেটা আমাদের সাফল্যের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় দিক হবে। আমাদের কৃষি প্রযুক্তি আফ্রিকার খাদ্য-সংকট মেটাতে সহায়তা করতে পারে। নির্মাণ সামগ্রী তৈরিতে আমরা অগ্রগতি করতে পেরেছি; তাই আমরা সেক্ষেত্রে আফ্রিকাকে প্রযুক্তি দিয়ে সাহায্য করতে পারি। আমরা নদীর দেশের মানুষ হওয়ায় পশ্চিম আফ্রিকার নিজের নদী, মধ্য আফ্রিকার কঙ্গো নদী এবং সাব-সাহারান আফ্রিকার নীল নদে আমরা আমাদের নদীব্যবস্থাপনা এবং নৌ-পরিবহণের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারি। বর্তমানে কঙ্গো নদে না থাকলেও নীল নদ (দক্ষিণ সুদান) এবং নিজের নদীতে (মালি) বাংলাদেশ নৌবাহিনীর দু’টি কনটিনজেন্ট কাজ করছে।
    
ভূগোলের সাথে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে আজকে আফ্রিকার গুরুত্ব সম্পর্কে আমাদের আলাদাভাবে চিন্তা করতে হচ্ছে। অথচ ভূগোল পড়লে খুব সহজেই বোঝা হয়ে যেত যে আফ্রিকাকে ছাড়া আমরা সামনের দিনগুলিতে হোঁচট খাবো।

আর আমাদের যেগুলি নেই, তা আফ্রিকাতে রয়েছে ভুরি ভুরি। বাংলাদেশ আস্তে আস্তে কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুতের দিকে যাচ্ছে। আফ্রিকা এক্ষেত্রে আমাদের সহায়ক হতে পারে কয়লা সরবরাহ করে। দক্ষিণ আফ্রিকা এবং মোজাম্বিক থেকে কয়লা আমদানির বড় পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। আর আমাদের নতুন গঠিত ভারী শিল্পগুলিতে লোহা সরবরাহ করার জন্যে গিনি এবং দক্ষিণ আফ্রিকা হতে পারে ভালো একটি উতস। ছোট্ট দেশ গিনিতে রয়েছে ১৮০ কোটি টন লোহার খনি! উপরন্তু সারা দুনিয়ার ২৫% বক্সাইট (এলুমিনিয়ামের খনি) রয়েছে এই দেশেই! গিনির প্রতিবেশী দেশ সিয়েরা লিওন, লাইবেরিয়া এবং আইভোরি কোস্টে আমাদের সৈন্যরা শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজ করছে বহু বছর ধরে। এছাড়াও আরও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ধাতুর খনি আফ্রিকাতে প্রচুর রয়েছে, যেমন কঙ্গো ও জাম্বিয়ার কপার (তামা), কঙ্গোর জিঙ্ক (দস্তা), দক্ষিণ আফ্রিকার নিকেল ও ক্রোমিয়াম, কঙ্গো, জাম্বিয়া এবং ক্যামেরুনের কোবাল্ট, ইত্যাদি। বাংলাদেশ সামনের দিনগুলিতে যেদিকে এগুতে চাইছে, তাতে আফ্রিকার খনিগুলি আমাদের জন্যে অবশ্য প্রয়োজনীয় হবে। বাংলাদেশের বাইরে কোন এলাকায় যদি বিনিয়োগ করতে হয়, সেক্ষেত্রে আফ্রিকা হওয়া উচিত সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। আফ্রিকায় বিনিয়োগই পারবে বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে কৌশলগত পণ্যগুলির সরবরাহ নিশ্চিত করতে।

এক মহাদেশ; অনেক করণীয়……

১. সামনের দিনগুলিকে চিন্তা করে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আফ্রিকা ডেস্ককে আরও শক্তিশালী করতে হবে। আফ্রিকাতে আমাদের মিশনগুলিকে সকল দিক থেকে শক্তিশালী করতে হবে। ভালো নেগোশিয়েটরদেরকে আফ্রিকায় পোস্টিং দিতে হবে। আফ্রিকায় পূর্ব অভিজ্ঞতাপ্রাপ্ত লোকদের প্রাধান্য দিতে হবে।
   
আফ্রিকায় আমাদের হাজার হাজার সৈন্য মোতায়েন থাকলেও সেই সৈন্যদের নিরাপত্তা এবং সেই দেশগুলিতে বাংলাদেশীদের এবং তাদের কর্মকান্ডের নিরাপত্তা দেবার কথা আমরা চিন্তাই করিনি। আফ্রিকাতে আমাদের কর্মকান্ডের ব্যাপকতাই আমাদের একটা 'আফ্রিকা কমান্ড' তৈরির দিকে দিকনির্দেশনা দিচ্ছে।

২. বহু বছর যাবত আফ্রিকাতে বাংলাদেশের আট থেকে নয় হাজার সৈন্য মোতায়েন রয়েছে, কিন্তু আমাদের সামরিক বাহিনীতে কোন ‘আফ্রিকা কমান্ড’ নেই। আফ্রিকাতে কর্মরত আমাদের সৈন্য এবং সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং লজিস্টিক্যাল ব্যাকআপ দেবার ব্যবস্থা করতে এর কোন বিকল্প নেই।

৩. পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আফ্রিকা ডেস্ক, সামরিক বাহিনী আফ্রিকা কমান্ড এবং শিল্পক্ষেত্রে আফ্রিকাতে বাণিজ্য করতে ইচ্ছুক কর্পোরেটদের কৌশলগতভাবে এক লক্ষ্যের ছত্রছায়ায় বিবেচনা করে ঢালাওভাবে সাজাতে হবে। এই কাজটাকে শক্ত ভিত্তি দিতে ‘আফ্রিকা স্টাডি গ্রুপ’ তৈরি করতে হবে, যেখানে থাকবে আফ্রিকা থেকে সরাসরি অভিজ্ঞতা নেয়া সামরিক সদস্যরা, কূটনীতিকেরা, বাণিজ্য প্রতিনিধিরা, শিক্ষাবিদেরা এবং আরও অনান্য সদস্যরা। এরা আফ্রিকা আফ্রিকার উপরে গবেষণা ছাড়াও আমাদের অভিজ্ঞতাকে আরও তীক্ষ্ণ করবেন এবং সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাকে পরামর্শ দেবেন। আফ্রিকা সম্পর্কে অভিজ্ঞতাকে তারা মানুষের মাঝে ছড়াবেন বই-পুস্তকের মাধ্যমে, পত্র-পত্রিকায় লেখার মাধ্যমে, বিভিন্ন সভা-সেমিনারের মাধ্যমে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নীতিনির্ধারণী সংগঠন এবং ব্যবসায়িক সংগঠনে তারা কথা বলার ক্ষেত্র প্রস্তুত করবেন।

৪. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভূগোল না পড়ার দৈন্যদশা নিয়ে এর আগেও লিখেছি। আফ্রিকার ভূগোলকে নখদর্পনে আনতে হবেবিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে আফ্রিকা সম্পর্কে পড়াতে হবে। বিজনেস স্কুলগুলিতে ছাত্রদের Strategic Perspective দিতে হবে; বোঝাতে হবে যে আফ্রিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আফ্রিকা নিয়ে কেইস স্টাডি দিতে হবে ছাত্রদের; শিখতে হবে আফ্রিকায় ব্যবসা এগিয়ে নিতে কি করতে হবে। সোশাল সাইন্সে আফ্রিকা সম্পর্কে পড়াতে হবে। আফ্রিকার ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক বিষয়গুলিকে সামনে নিয়ে আসতে হবে। আফ্রিকায় অভিজ্ঞতাসম্পন্নদেরকে গেস্ট লেকচারার হিসেবে নিয়ে আসতে হবে; সেমিনার-সিম্পোজিয়াম করতে হবে আফ্রিকা নিয়ে।

৫. কর্পোরেটদের মাঝে আফ্রিকার গুরুত্বটা ছড়াতে হবে, যাতে তাদের অফিসেও ‘ম্যানেজার, আফ্রিকা বিজনেস’ নামে কেউ একজন থাকেন, যার কাজই হবে আফ্রিকার পেছনে ছোটা।
    
পূর্ব আফ্রিকার দেশ তাঞ্জানিয়ার জন্যে তৈরি করা ক্যাটামারান জাহাজ পরিবহণ করা হচ্ছে। আফ্রিকাতে বাংলাদেশের ছোটখাটো একটা ব্যবসায়িক ভিত্তি তৈরি হয়ে গেছে কিছু কর্মকান্ডের মাঝ দিয়ে। এর সাথে যোগসূত্র দরকার আফ্রিকা থেকে আমরা কি কি পেতে পারি সেটার। আর সেটার জন্যে আফ্রিকার সাথে যোগসূত্র তৈরি করবে আমাদের বাণিজ্যিক জাহাজের বহর। এটা এই ২০১৬ সালে বুঝতে না পারলে একসময় বুঝতে পারবো যে ২০১৬ সালে আমরা ভুল করেছিলাম। 
৬. আফ্রিকা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে; তাই এই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের সাথে নিরবিচ্ছিন্ন যোগাযোগ স্থাপন হয়ে পড়ছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আফ্রিকার সাথে যোগাযোগ রাখার জন্যে আমাদের কোন জাহাজ নেই। একারণেই এর আগের এক লেখায় আফ্রিকার বন্দরে আমাদের জাহাজের প্রতিযোগিতা নিয়ে লিখেছিলাম। ২০১৬ সালের শেষে এসে যদি আমরা আমাদের জাহাজগুলি অর্ডার করতে না পারি, তাহলে কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুতকেন্দ্রগুলি চালু হবার সময়ে আমাদের হাতে কোন জাহাজ থাকবে না। এই বিদ্যুতকেন্দ্রগুলিতে লক্ষ লক্ষ টন কয়লা লাগবে; যা আনতে লাগবে প্রচুর জাহাজ। কয়লা আনা-নেয়ার জন্যে ২০ থেকে ৫০ হাজার টনের জাহাজ যেমন লাগবে, তেমনি এগুলি থেকে কয়লা খালাশ করে নদীতে পরিবহণ করতেও লাগবে শত শত লাইটার জাহাজ। এগুলির জন্যে কাজ এখনই শুরু করতে হবে, নাহলে অনেক পিছিয়ে পড়তে হবে।

৭. বাংলাদেশে অনেক আফ্রিকান লোকেরা বসবাস করছেন। তারা পড়াশোনা করতেই হোক, আর ফুটবল খেলতেই হোক, তাদের কিছু অভিজ্ঞতা তাদের দেশে নিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের সামরিক একাডেমিগুলিতেও আফ্রিকান সামরিক সদস্যরা ট্রেনিং পাচ্ছেন। এই লোকগুলিকে আফ্রিকার সাথে ব্রিজ হিসেবে ব্যবহার করার একটা সামগ্রিক পরিকল্পনা থাকতে হবে। এদেশের রাস্তায় আফ্রিকার কালো মানুষগুলিকে বাংলাদেশের মানুষ দূরের মহাদেশের মানুষ হিসেবেই দেখে; ভারতীয়দের মতো রাস্তায় বর্ণবাদী আচরণ করে না। মুসলিম হবার কারণে আমরা এব্যাপারে সাংস্কৃতিক দিক থেকে এগিয়ে আছি। আমাদের জন্যে কালোদের সাথে মেশাটা অপেক্ষাকৃত সহজ।

৮. আফ্রিকা সাথে নেটওয়ার্ককে নিরবচ্ছিন্ন রাখতে দরকার হবে শক্তিশালী নৌবাহিনী, এবং দরকার বিশেষে সেনা ও বিমান বাহিনী। নিরাপত্তা দিতে না পারলে যে কেউ আমাদের কৌশলগত এই লাইফলাইন কেটে ফেলতে পিছপা হবে না। আফ্রিকা মিশনগুলিরও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আর বলাই বাহুল্য যে শক্তিশালী ইন্টেলিজেন্সের উপস্থিতি ছাড়া উপরের কোনটিই বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

আফ্রিকার কৌশলগত গুরুত্ব বুঝতে ব্যর্থ হলে আমাদের সামনের দিনগুলিতে অনেক বাজে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। একুশ শতকে পৃথিবীর কোন স্থান আর দূরে নেই; আর আমরা বটমলেস বাস্কেট নই যে আমাদের চিন্তা করতে হবে যে আদার ব্যাপারীর জাহাজের খবর নিয়ে লাভ কি? আসলে ব্রিটিশদের ঢুকিয়ে দেয়া সেই চিন্তা আজ আর খাটেনা। আদার ব্যাপারীও খোঁজ রাখে দুনিয়ার কোথায় আদার মূল্য কত।

আফ্রিকার কাছে আমরা অনুকরণীয়, পশ্চিমা বিশ্ব নয়। আফ্রিকানরা জানে পশ্চিমারা কিভাবে যুগের পর যুগ সেই মহাদেশে যুদ্ধ বাধিয়ে রেখে খণিজ সম্পদ শোষণ করেছে। আফ্রিকানরা বরং হেনরি কিসিঞ্জারের তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে উঠে আসা বাংলাদেশ সম্পর্কে জানতেই বেশি আগ্রহী। তারা আমাদেরকেই অনুসরণ করতে চায়। আমাদের সৈন্যরা সেই মহাদেশে আমাদের একটা দিককে প্রতিষ্ঠিত করে দিয়ে এসেছে, যেখান থেকে এগিয়ে নিয়ে যাবার দায়িত্ব আমাদের সকলের। কর্পোরেট হাউজগুলির কাছে আফ্রিকার গুরুত্ব আরও বাড়তে হবে; কৌশলগত দিকটা না ধরতে পারলে ব্যবসা করবেন কি করে তারা? অন্যের বাড়িয়ে বুয়া হিসেবে খাটার সময় আমাদের আর নেই; একুশ শতক আমাদেরকে সেই ভুলকে শোধরানোর সুযোগ দেবে না। আমাদের প্রতিবেশীরা আফ্রিকাতে আমাদের আগে ঢুকে সেখানকার দরজা আমাদের জন্যে বন্ধ করে রাখার চেষ্টা করবে। তাই আমাদের শক্তি দিয়েই ঢুকতে হবে।

Saturday, 20 August 2016

আমাদের শিল্পপতিরা যেভাবে ‘ব্লু ইকোনমি’ গড়বেন

'ব্লু ইকোনমি' বুঝতে হলে আমাদের বুঝতে হবে কিভাবে আমরা এটা পাবো, আর কে কিভাবে বাধা দেবে সেই পথে। লক্ষ্য বাস্তবায়নে কঠোরতাই পারবে বাধা অতিক্রম করতে।
২০শে অগাস্ট ২০১৬


ঘটনা না গল্প?

মাঝ সমুদ্র। সূর্য উঠি উঠি করছে। জাহাজের ক্যাপ্টেন জাহিদুল ইসলাম চোখ রেখেছেন তার গন্তব্যের দিকে। আর মাত্র ঘন্টা কয়েকের পথ; তারপরেই জাহাজ পৌঁছে যাবে আফ্রিকার সেই বন্দরে। অনেকে অপেক্ষা করে আছে সেখানে বাংলাদেশে তৈরি পণ্যের জন্যে। সকাল হলে তো তারা সেই পণ্য পেয়েই যাচ্ছে। কিন্তু জীবনে পণ্য বিক্রি করাই তো সব নয়। ক্যাপ্টেন জাহিদ তাঁর ব্রিজ থেকে সামনে এগিয়ে থাকা জাহাজটির দূরত্বের একটু খোঁজ করে নিলেন। তিনি বুঝে ফেললেন যে তাঁর জাহাজের সাধ্যি হবে না ওই জাহাজের আগে জেটিতে পৌঁছানো। জাহাজের সেকেন্ড অফিসার আশিকুল ইসলামের মুখটা মলিন হয়ে গেল এটা ভেবে। ক্যাপ্টেন জাহিদ তাঁর বহু বছরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তাঁর ব্রাইট জুনিয়র অফিসারকে বললেন, “মন খারাপ করছো কেন আশিক? ওই জাহাজের ফ্ল্যাগটা মনে রেখো – ওই ফ্ল্যাগটাও আমাদেরই! আমাদেরই ভাই ওই জাহাজ চালাচ্ছেন”। আশিকের চেহারায় তেমন একটা পরিবর্তন না দেখে ক্যাপ্টেন তাঁর অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে কিছু বের করলেন, “বছর দশেক আগের কথা। তখনও আমার রক্ত তোমার মতোই গরম ছিল। আফ্রিকার এমনই একটা বন্দরে ঢোকার জন্যে আমাদের জাহাজের সাথে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে গিয়েছিল আরেকটি জাহাজ। কিন্তু সেবার ওই জাহাজটি ছিল আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিবেশী দেশের। তীরে নেমে আমাদের কারুরই মন স্থির ছিল না, যদিও আমাদের মিশনের সবটাই সাফল্যের ছিল। আজ নাহয় আমরা আমাদের ভাইদের কাছেই হারলাম”।

উপরের পুরো কাহিনিটাই কাল্পনিক। কিন্তু কল্পনা না থাকলে তার বাস্তবায়নের প্রশ্নও ওঠেনা। আজকের ‘ব্লু ইকোনমি’র কল্পনাটা আগামীকালের বাস্তব ঘটনা। ক্যাপ্টেন জাহিদ যে মিশনের কথা বলছিলেন – সময়মত পণ্য পৌঁছে দেয়া – এটাই কি আসল মিশন? যদি তা-ই হবে, তাহলে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের সাথে ছোট্ট একটা প্রতিযোগিতায় হেরে গিয়ে তার মন খারাপ হবে কেন? আসলে মিশন হচ্ছে সেটাই, যা তার পেট ঠান্ডা রাখার সাথে সাথে তার আত্মাকেও তৃপ্তি দেয়। ক্যাপ্টেন জাহিদের দশ বছর আগের মিশনে তার আত্মা পরিতৃপ্ত হয়নি, কিন্তু আজকের এই মিশনে হেরে যাবার পরেও আত্মা বিচলিত হয়নি, কারণ সেই হেরে যাওয়াটা তার “আসল মিশন”এর সাথে সাংঘর্ষিক ছিল না। আফ্রিকার একটি বন্দরে নিজ ভাইয়ের সাথে ধাক্কাধাক্কি করে ঢোকাতেও তার সমস্যা নেই, কিন্তু তিনি তার প্রতিদ্বন্দ্বী জাহাজের চেহাড়াও দেখতে চান না। কারণ তাঁর মনে আছে যে, যে জাহাজটিতে তিনি প্রথম তাঁর দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরেছেলিন, সেই জাহাজখানা তৈরিতে সেই পার্শ্ববর্তী দেশ subversion-এর মাধ্যমে বাধা দিয়েছিল। তিনি জানতেন যে আফ্রিকার বৈচিত্র্যময় উপকূলের মানুষের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার তাঁর যে সাধ ছিল, নতুন দেশ, নতুন এলাকা দেখার তাঁর যে স্বপ্ন ছিল, সেটা বাস্তবায়নের পেছনে সবচাইতে বড় বাধা ছিল সেই ‘শক্তিশালী’ দেশের subversive activity. তাঁর রাষ্ট্রকে উন্নত একটা অবস্থানে দেখার তাঁর যে খায়েস ছিল, সেখানে বাগড়া বাধিয়েছিল ওরা – এটা ভুলে যাবার মতো কোন ব্যাপার নয়।

এভাবে আমরা গল্পটির বাকি অংশটুকু এগিয়ে নিতে পারি…… তাই ক্যাপ্টেন জাহিদ তীরে নেমেই দেশে তাঁর অফিসে ফোন করলেন। জিজ্ঞেস করলেন ওই ভদ্রলোকের ফোন নম্বর দেয়া যাবে কিনা, যাঁর শিপইয়ার্ডে তাঁর দশ বছর আগের জাহাজটি তৈরি হয়েছিল! নম্বর পেলেন এবং ফোন করলেন ইঞ্জিনিয়ার সাইফুল আলমকে, যিনি তখন অসুস্থ্য এবং প্রায় মৃত্যুশয্যায়। এরপরেও সাইফুল আলম সাহেব ফোনটা ধরলেন। ক্যাপ্টেন জাহিদ বললেন, “সেদিন আপনি যদি আমাদের শত্রুর subversion-এ ভয় পেয়ে যেতেন, তাহলে আজ আফ্রিকার এই বন্দর আমাদের সন্মানে অপেক্ষা করতো না”। সাইফুল আলম সাহেব কিছু বলতে পারলেন না, কিন্তু তাঁর অজান্তেই তাঁর চোখ দিয়ে দু’ফোটা পানি বেরিয়ে এলো। দশ বছর আগের সেই দুর্বল রাষ্ট্র আজ আর নেই। তাঁর চিন্তা এবং অধ্যবসায়ের ফসল আজ বাস্তব সত্য। তিনি এই দিনটিরই স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেদিন পুরো ভারত মহাসাগর দাপিয়ে বেড়াবে আমাদের জাহাজ! এটাই সেই ‘ব্লু ইকোনমি’র স্বপ্ন।
'ব্লু ইকোনমি'র মূলে রয়েছে জাহাজ নির্মাণ। আমাদের শিল্পপতিরা এখানেই তাদের নাম প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। ভারত মহাসাগরের বিশাল জলরাশির হাতছানিতে সাড়া দিতে আমাদের অনেক জাহাজ লাগবে। শিল্পপতিরা জাহাজ তৈরিতে এগিয়ে এসে বঙ্গোপসাগরে দাঁড়াবার জন্যে স্তম্ভ তৈরি করে দিতে পারেন।
 
 স্বপ্ন এবং সেই স্বপ্নের লক্ষ্যে দৃঢ় সংকল্প

ইঞ্জিনিয়ার সাইফুল আলম জাহাজ তৈরির সময়ে কি ভেবেছিলেন? কি স্বপ্ন ছিল তাঁর? সেই স্বপ্ন কি আমাদের শিল্পপতিদের রয়েছে? ‘ব্লু ইকোনমি’ কি জিনিস সেটা কি তারা বোঝেন? অনেকে বলতে চাইবেন যে এই দূর্নীতিগ্রস্ত মানুষগুলিকে আমি কি বলছি? কিন্তু যারা এটা বলছেন, তারা বলতে চাইছেন না যে এই দূর্নীতিগ্রস্ত সমাজই যে তাদের দূর্নীতিগ্রস্ত করেছে; তারা জন্মের সময় দূর্নীতিগ্রস্ত ছিল না। তাই এই যুক্তি খাটে না। বরং যেটা চিন্তা করতে হবে তা হলো, এই মানুষগুলি সমাজ পরিবর্তন করতে কতটুকু কাজ করেছে। আজ একজন শিল্পপতি ঝালমুড়ির প্যাকেট বানিয়েই খুশি থাকতে পারেন, আবার এটাও মনে করতে পারেন যে দেশের প্রাইভেট সেক্টরের তৈরি প্রথম যুদ্ধজাহাজখানা তিনিই তৈরি করবেন। গার্মেন্টস ব্যবসায়ে থাকা কেউ কি ভেবেছেন যে কোন জামা তৈরিতে তারা বেশি গর্ববোধ করবেন – মিস ইউনিভার্সে অংশ নেয়া প্রতিযোগীদের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র স্বল্পবাস তৈরিতে, নাকি দেশের সেনাবাহিনীর ইউনিফর্ম তৈরিতে (দ্বিতীয়টি সবচাইতে খারাপ কাপড় দিয়ে তৈরি হলেও)? বিল গেটস-এর সন্তানের জন্যে ল্যাপটপ তৈরিতে তিনি বেশি সন্মানিত বোধ করবেন, নাকি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর বিমান প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক তৈরিতে? পশ্চিমা দেশের ধনীর ঘরের ফার্নিচার তৈরিতে তাঁর শান্তি হবে বেশি, নাকি আফ্রিকার একটি দেশের সাথে শক্ত বন্ধন রচনা করে দেশের স্বার্থকে তুলে ধরতে বেশি শান্তি হবে তাঁর? আর এই ধরনের অধিক গর্বের লক্ষ্যে পৌঁছাতে তাঁরা যে শত্রুদের বাধায় পড়বেন, সেটা বলাই বাহুল্য। কারণ এসবের মাঝেই সাম্রাজ্যবাদীরা বঙ্গোপসাগরে একটি শক্তির আবির্ভাব দেখে। তারা এই দেশে গত কয়েক যুগ ধরে তৈরি করা তাদের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে subversive activity-তে মনোনিবেশ করবে। মামলা করবে, মিডিয়াতে বাজে রিপোর্ট করবে, মানুষকে ক্ষেপিয়ে তুলবে তাদের বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রযন্ত্রের সাথে তাদের সমস্যা তৈরি করে রাখার চেষ্টা করবে, প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ থেকে কোম্পানি নিয়ে আসবে দেশের ইন্ডাস্ট্রি ধ্বংস করতে। তবে যাঁরা বুঝতে পারবেন যে – দুনিয়াতে তাঁরা আসেন খুব অল্প সময়ের জন্যে; আর এর মাঝেই গর্বের কিছু করে যেতে হবে – তাঁরাই শত্রুর বাধাকে identify করতে পারবেন এবং লক্ষ্যে সুস্থির থাকতে পারবেন। সেখানেই সাফল্য। সেটা না করতে পারলে সারাজীবন পরিশ্রম করার পরে দেখতে পাবেন যে তার পরিশ্রমের ফসল টাটা, আদানি, আম্বানি, বা রিলায়েন্সের মতো কোন প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের কোম্পানির ঘরে চলে গেছে!  

মিতসুবিশি "জেরো" ফাইটারের সাথে অমর হয়ে রয়েছে মিতসুবিশির নাম। বাংলাদেশের শিল্পপতিদেরও আজ সিদ্ধান্ত নেবার সময় চলে এসেছে - তারা যখন দুনিয়াতে থাকবেন না, তখন মানুষ তাদের কোন নামে চিনবে - মিস ইউনিভার্স প্রতিযোগিতায় আন্ডারওয়্যার সাপ্লাই দেয়াব্র জন্যে, নাকি দেশের প্রথম যুদ্ধবিমান তৈরি করার জন্যে?
     
কারো নাম প্রতিষ্ঠা পায় কিভাবে?

১৯৪১ সালের ডিসেম্বরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান যখন যুদ্ধে যোগ দেয়, তখন মার্কিনীরা এবং তাদের সহযোগী পশ্চিমা শক্তিরা আবিষ্কার করলো দু’টি জাপানি বিমান, যা কিনা রীতিমতো কাঁপিয়ে দিল তাদের। প্রথমটি ছিল Mitsubishi A-6M “Zero” ফাইটার এবং Mitsubishi G-3M দূরপাল্লার বোমারু বিমান। Zero ফাইটার বেশ কিছুদিন প্রশান্ত মহাসাগর দাপিয়ে বেড়িয়েছিল। আর G-3M সিঙ্গাপুরের অদূরে ডুবিয়ে দিয়েছিল ব্রিটিশ নৌবাহিনীর গর্ব ব্যাটলশিপ ‘প্রিন্স অব ওয়েলস’ এবং ব্যাটলক্রুজার ‘রিপালস’। খেয়াল করে দেখবেন যে দু’টি বিমানই জাপানের মিতসুবিসি কোম্পানির তৈরি। এই কোম্পানি পেন্সিল থেকে শুরু করে জাহাজ অবধি বানায়। কিন্তু তাদের নাম হয় কিন্তু পেন্সিলের কারণে নয়।

একটা রাষ্ট্রের চিন্তাই আসল শক্তি। সেই চিন্তাই ঠিক করে তার material power-কে কিভাবে ব্যবহার করা হবে। উপরে যে কথাগুলি লিখেছি, এগুলি সবই এরকম material power-এর উদাহরণ। শিল্পপতিরা নিজেরাই ঠিক করুন যে মৃত্যুর আগে তাঁদের নামের আগে মানুষ কি টাইটেল যোগ করবে। তাঁদের নাম কি হওয়া উচিত ‘চিনি’ হাসেম? অথবা ‘জাঙ্গিয়া’ আনোয়ার? ‘ঝালমুড়ি’ সেলিম? নাকি এমন কিছু হলে ভালো হতো – ‘ডেস্ট্রয়ার’ হাসেম, আনোয়ার দ্যা ‘ট্যাঙ্ক’, বা ‘হাই টেক’ সেলিম? তারা নিজেদের নাম নিজেরা তৈরি করতে চান, নাকি আদানি-রিলায়েন্স-আম্বানি-টাটা-দের নামের ভারে নিজেদের কবর খুড়তে চান? আমাদের শিল্পপতিরা যখন এই লক্ষ্যগুলি রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনুভব করবেন, তখন এই লক্ষ্যে পৌঁছানোর বিরোধী কর্মকান্ডগুলিও তাঁদের অন্তরের কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে – এর বিরুদ্ধে জয়ী হবার আগ পর্যন্ত তিনি শান্তি পাবেন না। কোন একটা দিন এই সমাজ পরিবর্তিত হবেই। বঙ্গোপসাগরে একটা নতুন শক্তির আবির্ভাব এখন শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র। ‘ব্লু ইকোনমি’র চিন্তাটা এজন্যেই বাস্তব। এই শক্তির material স্তম্ভগুলির কে কোনটা গড়ে দিয়েছেন, সেটা একসময় হিসেব কষবে মানুষ। আর অন্যদিকে যারা আজ বিদেশী শক্তির স্বার্থ বাস্তবায়নে এসব স্তম্ভ তৈরির বিপক্ষে দাঁড়াবে, তারাই আগামীতে তীব্র জনরোষের শিকার হবে।

'ব্লু ইকোনমি'তে অনেক শিল্পের প্রয়োজন হবে, যেমন স্টিল ইন্ডাস্ট্রি। শিল্পপতিদেরকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে তারা তাদের সারাজীবনের পরিশ্রমকে নামফলকে বাঁঢিয়ে রেখে যেতে চান, নাকি তাদের পরিশ্রমের ফসল টাটা-আম্বানি-আদানি-রিলায়েন্সের ঘরে উঠুক, সেটা চান?
 
 লক্ষ্য কোনটা?

প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত চিনি বা ভোজ্য তেলের ব্যবসা করে কে কতো বেশি টাকা কামাবে সেখানে নয়। বরং দেশের প্রথম হাই-টেক পেট্রোকেমিক্যাল প্ল্যান্ট কে তৈরি করলো, বা প্রথম ইঞ্জিন ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট কে করলো, বা প্রথম সিনথেটিক রাবার প্ল্যান্ট কে করলো, বা দেশের প্রথম কমপ্লিট হাই-টেক ইলেকট্রনিক্স প্ল্যান্ট কে করলো – এগুলি হওয়া উচিত প্রতিযোগিতার বিষয়। এর আগের লেখায় লিখেছি যে বাংলাদেশের পুরো সমুদ্রতীরই একটা গভীর সমুদ্রবন্দর। তাই এই দেশের লাইটার জাহাজগুলি হলো এই দেশের বিশাল সম্পদ। এগুলি আমাদের ‘ব্লু ইকোনমি’র স্তম্ভগুলির একটি। আজকের হাজারখানেক লাইটার জাহাজ সামনের দিনগুলিতে প্রতিস্থাপিত (replace) করতে হবে। আর সামনে পাথর, কয়লা, কনটেইনার, জ্বালানি তেল এবং আরও অনেক নব্য পণ্য নদীপথে পরিবহণ করতে হবে – লাগবে আরও কয়েক হাজার জাহাজ। আশেপাশের দেশগুলির সাথে যোগাযোগ রক্ষায় তৈরি করতে হবে মার্চেন্ট ফ্লীট – ঠিক যেরকম একটি জাহাজের মিশনের বর্ণনা দিয়ে এই লেখার শুরু করেছি। বঙ্গোপসাগর এবং ভারত মহাসাগরের সম্পদের সফল আহরণের জন্যে লাগবে বহু ফিশিং ট্রলার। এই পুরো বাণিজ্যিক বহরের নিরাপত্তা দিতে লাগবে শক্তিশালী নৌবহর। আর এই জাহাজের বহরের জন্যে দরকার হবে স্টিল মিল, ইলেকট্রনিক্স কারখানা, ফার্নিচার কারখানা, পেইন্ট কারখানা, যন্ত্রাংশ কারখানা, মেশিন ম্যানুফ্যাকচারিং কারখানা, কম্পোজিট ম্যাটেরিয়াল কারখানা, ইত্যাদি। মিতিসুবিসির মতো আমাদের শিল্পপতিদেরও ‘ব্লু ইকোনমি’র একেকটি স্তম্ভ তৈরি করে অমর হবার সুযোগ রয়েছে, আবার মানুষের বিদ্রুপের বিষয় হবার সুযোগও রয়েছে। সঠিক স্বপ্ন আজ যারা দেখতে পারবেন, আর এসব কাজে বিদেশী শক্তি এবং তাদের এজেন্টদের বাধাকে যারা সামনে এগুবার শক্তিরূপে নেবেন, তারাই হবেন সফল; মানুষের কাছে তারাই হবেন অমর।