২৯শে মার্চ ২০২২
গত ২৭শে মার্চ মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশ সফরের সময় তার ভাষণে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সম্পর্কে বলেন যে, ‘ঈশ্বরের কসম! এই লোকটা ক্ষমতায় থাকতে পারে না!’ কথাগুলি বলার প্রায় সাথেসাথেই হোয়াইট হাউজ থেকে বলা হয় যে, বাইডেন অবশ্যই পুতিনকে ক্ষমতাচ্যুত করার কথা বলছিলেন না। বাইডেনের অভ্যন্তরীণ সমালোচকেরা বলতে শুরু করেছেন যে, বাইডেন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করতে চাইছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ এই সুযোগে বলেন যে, এটা দায়িত্বশীল বক্তব্য নয়। বরং তিনিই এর চাইতে ভালো কূটনীতি চালাতে পারেন। তবে অনেকেই পুতিনের ক্ষমতায় না থাকার ব্যাপারে বাইডেনের কথাগুলিকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করলেও তারা হয়তো খেয়াল করছে না যে, এর আগে বাইডেন যখন ইউক্রেনের যুদ্ধকে গণতন্ত্র বনাম একনায়কতন্ত্র হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন, সেটার গুরুত্ব ছিল আরও সুদূরপ্রসারী।
মার্কিন থিংকট্যাঙ্ক ‘ইউরেশিয়া গ্রুপ’এর প্রধান ইয়ান ব্রেমার বলছেন যে, বাইডেন হয়তো তার লিখিত ভাষণের বাইরেই আবেগতাড়িত হয়ে বলেছিলেন যে, পুতিনের ক্ষমতায় থাকা উচিৎ নয়। সেটা হয়তো আবেগের কথাই ছিল। এর গুরুত্ব কিছুটা কমই হবে; কারণ পুতিনকে প্রতিস্থাপিত করার মতো সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের নেই। এই একই যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার সাথে সংঘর্ষ এড়াবার জন্যে ইউক্রেনের উপর ‘নো-ফ্লাই জোন’ করতে বা ইউক্রেনকে রক্ষা করতে সামরিক বাহিনী প্রেরণ করতে চাইছে না। কথাগুলি বরং ক্রেমলিনের তথ্যযুদ্ধে সহায়তা দেবে। তবে এর আগে যখন তিনি ইউক্রেনের যুদ্ধকে গণতন্ত্রের জন্যে যুদ্ধ বলেছেন, তখন সেটা আবেগতাড়িত হয়ে বললেও এর ছায়া পড়বে বিশ্বব্যাপী। বাইডেন বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একটা নতুন বিশ্বব্যবস্থা প্রয়োজন। রাশিয়াকে ‘জি২০’ বের করে দেয়া উচিৎ। বাইডেন সম্ভবতঃ ইউক্রেনের যুদ্ধের গুরুত্বকে বাড়াবার জন্যেই গণতন্ত্র বাঁচাবার সংগ্রাম বলেছেন। কিন্তু তার বোঝা উচিৎ ছিল যে, বিশ্বের বেশিরভাগ গণতান্ত্রিক দেশ এখন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নেই। ১’শ ৪১টা দেশ জাতিসংঘে রাশিয়ার নিন্দা করলেও শুধুমাত্র ধনী দেশগুলি রাশিয়ার উপর অবরোধের পক্ষে রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ভারত এবং দক্ষিণ আফ্রিকা নিরপেক্ষ থেকেছে; চীন পুরোপুরিভাবে রাশিয়ার পক্ষ নিয়েছে। বাইডেন অবশ্যই চাইবেন না রাশিয়া এবং চীনের সাথে একটা ঠান্ডা যুদ্ধ শুরু হোক; কারণ এতে সকলেই, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এখন বিশ্বের সামনে গণতন্ত্রের মডেল নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সামনের নির্বাচনে যেই হারবে সেই বলবে যে, নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। বাইডেনের কথাগুলি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রভাব কমাতে ইন্ধ্বন যোগাবে।
ওবামা প্রশাসনের সময়কার মার্কিন ইন্টেলিজেন্স সংস্থা ‘সিআইএ’র প্রাক্তন ভারপ্রাপ্ত প্রধান মাইকেল মোরেল মার্কিন টেলিভিশন চ্যানেল ‘সিবিএস’কে বলেন যে, বাইডেন যখন বলেন যে, পুতিনকে ক্ষমতাচ্যুত হতে হবে, সেটা ছিল একটা মস্তবড় ভুল, যা তার উপরে কেউ চাপিয়ে দেয়নি। এতে নিজ দেশে পুতিনের হাত শক্তিশালী হয়েছে। এতে পুতিনের বিরুদ্ধে যেকোন বিরোধীদের একত্রিত হওয়াটা কঠিন হয়ে যায়। কোন রুশ নাগরিকই চাইবে না যে, রাশিয়া প্রধান শত্রু দেশের প্রেসিডেন্ট বলে দিক যে, তার নেতৃত্ব কেমন হওয়া উচিৎ। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হওয়া উচিৎ আরও ছোট পরিসরে; অর্থাৎ দাবি হওয়া উচিৎ রাশিয়ার ইউক্রেন ছাড়ার; এবং রাশিয়ার উপর চাপ সৃষ্টি করার যাতে করে পুতিন এহেন কাজ আবারও না করেন। গণতন্ত্র বনাম একনায়কতন্ত্রের কথাগুলি চীনাদেরকে রাশিয়ার কাছে নিয়ে যাবে। শুধু তাই নয়, মার্কিনীদের অনেক বন্ধু রয়েছে যারা একনায়ক; এদের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দাঁড়ানোটা তখন কঠিন হয়ে যায়।
ভারতীয় মিডিয়া ‘এনডিটিভি’র এক প্রতিবেদনে প্রশ্ন করা হচ্ছে যে, বাইডেনের গণতন্ত্রের পক্ষে লড়াই করার কথাগুলি কতটা সততার উপরে ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত; এবং কতটা দ্বিমুখী নীতি এখানে রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, রাশিয়ার হাইড্রোকার্বনের উপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর যুক্তরাষ্ট্র এখন সৌদি আরবের দিকে ঝুঁকছে। কারণ নিজের দেশে জ্বালানির মূল্যের স্বল্প বৃদ্ধিও বাইডেন প্রশাসনের জন্যে ভালো সংবাদ বয়ে আনবে না। অথচ এর আগে সৌদি আরবের মানবাধিকার ইস্যুতে, বিশেষ করে ২০১৮ সালে সাংবাদিক জামাল খাশোগির হত্যার ঘটনায়, বাইডেন প্রশাসন সৌদি আরবের উপর চাপ প্রয়োগ করেছে। এরপর রয়েছে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো, যার উপর যুক্তরাষ্ট্র ২০১৯ সালে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে। অথচ এখন জ্বালানির বিকল্প খুঁজতে গিয়ে একটা উচ্চপদস্থ মার্কিন প্রতিনিধিদল ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাস ঘুরে এসেছে। ‘এনডিটিভি’ বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি এবং গণতান্ত্রিক আদর্শের মাঝে সাংঘর্ষিক অবস্থান নতুন নয়; তবে জো বাইডেন ক্ষমতায় আসার পর গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারকে তার পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে রাখার কথা বলেছেন। যদিও অনেকেই বলেছেন যে, এটা মূলতঃ চীনের প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যেই বাইডেন ঘোষণা দিয়েছিলেন।
গত ডিসেম্বরে বাইডেনের ডাকা গণতন্ত্র শীর্ষবৈঠকের মাঝে আমন্ত্রিত দেশগুলির ৩০ শতাংশেরই গণতান্ত্রিক আদর্শ রক্ষা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। এমনকি ভারতীয় সরকারের গণতান্ত্রিক রেটিংও সাম্প্রতিক সময়ে নিম্নগামী ছিল। ‘এনডিটিভি’র প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে এটা হাস্যকর যে এই একই যুক্তরাষ্ট্র মাত্র কয়েক মাস আগেই আফগান জনগণকে তালিবানদের হাতে ছেড়ে দিয়ে এসেছে। বহুকাল যাবতই যুক্তরাষ্ট্র মিশর, সৌদি আরব, বাহরাইন, আরব আমিরাত এবং অন্যান্য দেশের অগণতান্ত্রিক সরকারগুলিকে সমর্থন দিয়ে গেছে। পৃথিবী দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হবার কারণে যুক্তরাষ্ট্র চীনের সাথে সম্পর্ক রেখে চলতে বাধ্য হয়েছে। যখন যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ইউক্রেন হামলার নিন্দা প্রস্তাবে রুশ ভেটো দেয়ার সমালোচনা করছে, তখন তারা ভুলে যাচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র নিজেই একসময় গ্রেনাডা, নিকারাগুয়া এবং পানামার উপর মার্কিন হামলা এবং লেবাননে ইস্রাইলের আগ্রাসনের নিন্দা প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছে। ইয়েমেন, লেবানন, ফিলিস্তিন এবং অন্যান্য দেশের মানুষজন মার্কিন সরবরাহকৃত অস্ত্র দ্বারা সজ্জিত মার্কিন বন্ধুদের দ্বারা হামলার শিকার হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে যে, কোন একটা দেশ মিথ্যা কারণ দেখিয়ে অন্য দেশে আগ্রাসন চালাতে পারে না। অথচ হাস্যকর যে, যুক্তরাষ্ট্র নিজেই প্রচুর মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করে ইরাকে আগ্রাসন চালিয়েছে। ‘এনডিটিভি’ বলছে যে, এটা বাস্তব সত্য যে, পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হয় একটা দেশের জাতীয় স্বার্থ দ্বারা; গণতন্ত্রের আকাশকুসুম চিন্তা দ্বারা নয়, যদিও অনেকে সেটাই চাইতে পারে। ভারতীয় কর্মকর্তারাও বলছেন যে, ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়াকে সমালোচনা করা থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্তটা ভারত পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতোই তার জাতীয় স্বার্থেই নিয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে বাইডেন যখন বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে নতুন বিশ্বব্যবস্থা প্রয়োজন, তখন তিনি বর্তমান বিশ্ব অব্যবস্থায় সুপারপাওয়ার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটা বিকল্প সমাধান তুলে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। ইউক্রেনের যুদ্ধকে বাইডেন গণতন্ত্রের লড়াই তকমা দেয়ায় পশ্চিমা চিন্তাবিদেরা ভুল ধরেছেন। এতে মার্কিন বন্ধুরাও ব্যাপক সমালোচনা করছে। কিন্তু সেটাও তো বর্তমান বিশ্বে পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দৈন্যতাকে আলোচনায় নিয়ে এসে বিকল্পের সন্ধান করার অনুপ্রেরণা যোগায়। সেক্ষেত্রে পুতিনের ক্ষমতায় থাকা উচিৎ বা অনুচিত এই কথাগুলি আলোচনায় এনে মিডিয়া গণতন্ত্রের সমস্যাগুলিকে আড়াল করে আসল আলোচনা এড়িয়ে যাচ্ছে; যা হলো, এই বিশ্ব পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় চলা উচিৎ কি উচিৎ নয়। যদি উচিৎ হয়, তাহলে কার নেতৃত্ব জাতীয় স্বার্থ জ্বলাঞ্জলি দিয়ে ‘প্রকৃত গণতন্ত্র’ বাস্তবায়িত হবে; আর যদি উচিৎ না হয়, তাহলে কোন ব্যবস্থা এর বিকল্প হওয়া উচিৎ?
Tuesday, 29 March 2022
ইউক্রেন যুদ্ধ… রুশ কৌশলে বড় পরিবর্তন?
২৯শে মার্চ ২০২২
একমাস যুদ্ধের পর গত ২৫শে মার্চ রুশ নেতৃত্ব বলছে যে, ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে তাদের সামরিক মিশনের প্রথম ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। ঘোষণায় বলা হচ্ছে যে, রুশরা এখন পূর্বের ডনবাস অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি প্রতিষ্ঠার জন্যে কাজ করবে। ‘ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’এর রাফায়েল লস ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, ইউক্রেনের সেনারা রুশ সাপ্লাই লাইনগুলিকে চাপের মাঝে রেখেছে এবং কিছু ক্ষেত্রে তারা রুশ বাহিনীকে ঘিরে ফেলার অবস্থায়ও নিয়ে গেছে। এমতাবস্থায় রুশরা হয়তো তাদের সামরিক অপারেশনকে পুনর্গঠিত করার চেষ্টা করছে; যাতে করে তাদের ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায়। তবে তারা যদি ডনবাসকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারে, তাহলে তারা অবশ্যই কিয়েভের উপর নতুন করে ফোকাস দেবে। কৌশল পরিবর্তনের ঘোষণা হয়তো স্বল্প মেয়াদে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্যে সন্মান বাঁচাবার চেষ্টা হতে পারে। তবে তিনি গত দু’বছরে ইউক্রেন নিয়ে যেধরনের মন্তব্য করেছেন, তাতে এটা নিশ্চিত যে, ইউক্রেন সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়নি। পুতিন বলেছেন যে, ইউক্রেনিয়ানদের পরিচয় রুশ পরিচয় থেকে আলাদা নয়। এমতাবস্থায় পুতিন নিশ্চিতভাবে দীর্ঘমেয়াদে ইউক্রেনের উপর চাপ অব্যাহত রাখবেন।
‘ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন’এর প্রফেসর এগলায়া স্নেতকভ বলছেন যে, গত একমাসের যুদ্ধে মনে হচ্ছে যে, রুশরা প্রায় তিন বা চারটা ভিন্ন স্ট্র্যাটেজি বা বড় পরিসরে কৌশল নিয়ে এগিয়েছে। এই কৌশলগুলি হয়তো এখন সফল হচ্ছে না বলেই পূর্ব ইউক্রেনের সাথে ক্রিমিয়া উপদ্বীপের যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ করাটা এখন তাদের জন্যে মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই যোগাযোগের লজিস্টিক্যাল দিকটা হয়তো রুশদের জন্যে ব্যবস্থাপনা করা অপেক্ষাকৃতভাবে সহজ হতে পারে। এই মুহুর্তে রুশ জনগণও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভ্লাদিমির পুতিনের উপর দোষারোপ না করে পশ্চিমাদের উপর দোষারোপ করছে। কাজেই জনমত হয়তো এখনও পুতিনের সাথেই রয়েছে, যদিও রুশ শীর্ষ নেতৃত্বের মাঝে একটা বোধ এসেছে যে, প্রাথমিকভাবে যে লক্ষ্য নিয়ে তারা এগিয়েছে, সেটা এখন পর্যন্ত সফল হয়নি। রাশিয়ার বিভিন্ন স্থানে হয়তো জনগণ প্রতিবাদ করেছে, কিন্তু সেটা যুদ্ধের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান নয়। আর এই মুহুর্তে পুতিনের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান করার মতো কেউ রয়েছে বলেও মনে হয় না; যদিও পরিস্থিতি পরিবর্তন হতে সময় লাগে না।
মার্কিন ইন্টেলিজেন্স সংস্থা ‘সিআইএ’র প্রাক্তন ডিরেক্টর জেনারেল ডেভিড পেট্রেয়াস কানাডার টেলিভিশন চ্যানেল ‘সিবিসি’কে বলছেন যে, রাশিয়ার সামরিক অপারেশনের মূল লক্ষ্য ছিল রাজধানী কিয়েভ দখল করা, সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা এবং একটা রুশ সমর্থিত সরকারকে তার স্থলাভিষিক্ত করা। তবে এখন পর্যন্ত রুশরা কিয়েভের বাইরে অবস্থান করছে, খারকিভকেও ঘিরে ফেলতে পারেনি, যদিও তারা দক্ষিণে কিছু সফলতা পেয়েছে; যেমন মারুউপোলকে ঘিরে ফেলেছে, ডনবাসের নিয়ন্ত্রণের কাজেও তারা বেশকিছু এগিয়েছে। দক্ষিণের এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেবার পর তারা হয়তো সৈন্য সরিয়ে উত্তর এবং পূর্বের এলাকাগুলিতে মোতায়েন করতে পারে। কমপক্ষে ৭ জন জেনারেল পদের সেনা কর্মকর্তার নিহত হবার খবর পাওয়া যায়; তাদের ৭ হাজার থেকে ১০ হাজার সেনাও হয়তো নিহত হয়েছে। রাশিয়ার নিজস্ব অর্থনীতিও মারাত্মক সমস্যায় পতিত। এমতাবস্থায় তারা ইউক্রেনের সাথে কোন একটা সমঝোতার মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করতে চাইতে পারে। সেক্ষেত্রে তারা হয়তো বলতে পারে যে, ২০১৪ সালে দখলকৃত ক্রিমিয়া উপদ্বীপের সাথে ডনবাস অঞ্চলের সরাসরি স্থলপথ নিশ্চিত হয়ে গেলেই অপারেশনের লক্ষ্য অর্জিত হয়ে যাবে। তারা হয়তো ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর ওডেসা দখলের চেষ্টাটাও বাদ দিতে পারে।
ডাচ অনলাইন সামরিক ম্যাগাজিন ‘ওরিক্স’এর স্টাইন মিতজার এবং তার দল ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করে হিসেব করেছেন যে, যুদ্ধে রাশিয়া এবং ইউক্রেনের সামরিক ক্ষয়ক্ষতি কমপক্ষে কত হতে পারে। রুশরা এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ২ হাজার সামরিক গাড়ি হারিয়েছে; যার মাঝে প্রায় ১ হাজার ধ্বংস হলেও প্রায় ৭’শ ৩৫টা ইউক্রেনিয়ানরা দখল করেছে। এই গাড়ির মাঝে ৩’শ ১৫টা ছিল ট্যাংক; যেগুলির মাঝে ১’শ ৪০টা ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; আর বাকি ১’শ ৭৫টা ইউক্রেনিয়ানরা দখল করেছে, অথবা রুশরা ফেলে চলে গেছে। এছাড়াও রুশরা কমপক্ষে ৬’শ ১৫টা অন্যান্য সাঁজোয়া যান; ৬১টা ইঞ্জিনিয়ারিং যন্ত্রপাতি; ৬৩টা ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র; ৬৪টা বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র; ১’শ ৪৪টা আর্টিলারি ও রকেট; ১৭টা যুদ্ধবিমান; ৩৫টা হেলিকপ্টার; ১৬টা মনুষ্যবিহীন ড্রোন; ৩টা যুদ্ধজাহাজ; আরও ৭’শ ৬টা সামরিক গাড়ি; ইত্যাদি আরও অনেক কিছু হারিয়েছে। অপরদিকে ইউক্রেন হারিয়েছে কমপক্ষে ৫’শ ৭৪টা গাড়ি; যার মাঝে রয়েছে ৭৯টা ট্যাংক; ১’শ ৪৯টা অন্যান্য সাঁজোয়া যান; ৫১টা ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র; ৪৭টা আর্টিলারি ও রকেট; ২১টা বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র; ১২টা যুদ্ধবিমান; ১টা হেলিকপ্টার; ৯টা মনুষ্যবিহীন ড্রোন; ১৩টা যুদ্ধজাহাজ; ২’শ ১৮টা অন্যান্য সামরিক গাড়ি; ইত্যাদি আরও অনেক কিছু।
ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘রয়াল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইন্সটিটিউট’ বা ‘রুসি’র সিনিয়র ফেলো জ্যাক ওয়াটলিং ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকার এক লেখায় বলছেন যে, রাশিয়া এখন বাধ্য হচ্ছে একটা করে টার্গেট নিয়ে এগুতে। বর্তমানে দক্ষিণের মারিউপোল শহর এখন তাদের ফোকাস; এরপর তারা খুব সম্ভবতঃ খারকিভের দিকে মনোযোগ দেবে। এরপর তারা হয়তো নীপার নদী বরাপর উত্তর দিকে ধাবিত হয়ে খারকিভের সাথে মিলিত হতে চেষ্টা করবে, যাতে করে ডনবাসে ইউক্রেনের সকল বাহিনীকে ঘিরে ফেলা যায়। যদি রুশরা খারসন শহর ধরে রাখতে পারে, তাহলে তারা হয়তো একটা যুদ্ধবিরতির দিকে যেতে পারে, যার মাঝে ডনবাস থেকে ক্রিমিয়া পর্যন্ত যোগাযোগের নিয়ন্ত্রণ রুশদের হাতে থাকবে। তবে নীপার নদী বরাবর কোন অপারেশনই সহজ হবে না; ইউক্রেনিয়ানরা এটাকে প্রবলভাবে প্রতিহত করতে চাইবে। আপাততঃ তারা অন্যদিকে গুরুত্ব দিলেও ভবিষ্যতে তারা রাজধানী কিয়েভের দিকে মনোযোগ দেবে। যারা এই মুহুর্তে যুদ্ধ বন্ধ করার পক্ষপাতি, তারা হয়তো কিয়েভের নেতৃত্বকে দীর্ঘমেয়াদে রাশিয়ার কাছে কিছু সুবিধা ছেড়ে দিতে ইচ্ছুক থাকবে। অপরদিকে ইউক্রেনের নেতৃত্ব মনে করবে যে, রুশদের আপাততঃ লক্ষ্য ছোট করে আনার অর্থ হলো নিজেদের বৃহত্তর উচ্চাকাংক্ষাগুলিকে ভবিষ্যতের জন্যে জিইয়ে রাখা। তবে প্রশ্ন হলো যে, পশ্চিমারা এই দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে কতটা একমত হতে পারবে।
একমাস যুদ্ধের পর গত ২৫শে মার্চ রুশ নেতৃত্ব বলছে যে, ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে তাদের সামরিক মিশনের প্রথম ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। ঘোষণায় বলা হচ্ছে যে, রুশরা এখন পূর্বের ডনবাস অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি প্রতিষ্ঠার জন্যে কাজ করবে। ‘ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’এর রাফায়েল লস ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, ইউক্রেনের সেনারা রুশ সাপ্লাই লাইনগুলিকে চাপের মাঝে রেখেছে এবং কিছু ক্ষেত্রে তারা রুশ বাহিনীকে ঘিরে ফেলার অবস্থায়ও নিয়ে গেছে। এমতাবস্থায় রুশরা হয়তো তাদের সামরিক অপারেশনকে পুনর্গঠিত করার চেষ্টা করছে; যাতে করে তাদের ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায়। তবে তারা যদি ডনবাসকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারে, তাহলে তারা অবশ্যই কিয়েভের উপর নতুন করে ফোকাস দেবে। কৌশল পরিবর্তনের ঘোষণা হয়তো স্বল্প মেয়াদে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্যে সন্মান বাঁচাবার চেষ্টা হতে পারে। তবে তিনি গত দু’বছরে ইউক্রেন নিয়ে যেধরনের মন্তব্য করেছেন, তাতে এটা নিশ্চিত যে, ইউক্রেন সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়নি। পুতিন বলেছেন যে, ইউক্রেনিয়ানদের পরিচয় রুশ পরিচয় থেকে আলাদা নয়। এমতাবস্থায় পুতিন নিশ্চিতভাবে দীর্ঘমেয়াদে ইউক্রেনের উপর চাপ অব্যাহত রাখবেন।
‘ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন’এর প্রফেসর এগলায়া স্নেতকভ বলছেন যে, গত একমাসের যুদ্ধে মনে হচ্ছে যে, রুশরা প্রায় তিন বা চারটা ভিন্ন স্ট্র্যাটেজি বা বড় পরিসরে কৌশল নিয়ে এগিয়েছে। এই কৌশলগুলি হয়তো এখন সফল হচ্ছে না বলেই পূর্ব ইউক্রেনের সাথে ক্রিমিয়া উপদ্বীপের যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ করাটা এখন তাদের জন্যে মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই যোগাযোগের লজিস্টিক্যাল দিকটা হয়তো রুশদের জন্যে ব্যবস্থাপনা করা অপেক্ষাকৃতভাবে সহজ হতে পারে। এই মুহুর্তে রুশ জনগণও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভ্লাদিমির পুতিনের উপর দোষারোপ না করে পশ্চিমাদের উপর দোষারোপ করছে। কাজেই জনমত হয়তো এখনও পুতিনের সাথেই রয়েছে, যদিও রুশ শীর্ষ নেতৃত্বের মাঝে একটা বোধ এসেছে যে, প্রাথমিকভাবে যে লক্ষ্য নিয়ে তারা এগিয়েছে, সেটা এখন পর্যন্ত সফল হয়নি। রাশিয়ার বিভিন্ন স্থানে হয়তো জনগণ প্রতিবাদ করেছে, কিন্তু সেটা যুদ্ধের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান নয়। আর এই মুহুর্তে পুতিনের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান করার মতো কেউ রয়েছে বলেও মনে হয় না; যদিও পরিস্থিতি পরিবর্তন হতে সময় লাগে না।
মার্কিন ইন্টেলিজেন্স সংস্থা ‘সিআইএ’র প্রাক্তন ডিরেক্টর জেনারেল ডেভিড পেট্রেয়াস কানাডার টেলিভিশন চ্যানেল ‘সিবিসি’কে বলছেন যে, রাশিয়ার সামরিক অপারেশনের মূল লক্ষ্য ছিল রাজধানী কিয়েভ দখল করা, সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা এবং একটা রুশ সমর্থিত সরকারকে তার স্থলাভিষিক্ত করা। তবে এখন পর্যন্ত রুশরা কিয়েভের বাইরে অবস্থান করছে, খারকিভকেও ঘিরে ফেলতে পারেনি, যদিও তারা দক্ষিণে কিছু সফলতা পেয়েছে; যেমন মারুউপোলকে ঘিরে ফেলেছে, ডনবাসের নিয়ন্ত্রণের কাজেও তারা বেশকিছু এগিয়েছে। দক্ষিণের এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেবার পর তারা হয়তো সৈন্য সরিয়ে উত্তর এবং পূর্বের এলাকাগুলিতে মোতায়েন করতে পারে। কমপক্ষে ৭ জন জেনারেল পদের সেনা কর্মকর্তার নিহত হবার খবর পাওয়া যায়; তাদের ৭ হাজার থেকে ১০ হাজার সেনাও হয়তো নিহত হয়েছে। রাশিয়ার নিজস্ব অর্থনীতিও মারাত্মক সমস্যায় পতিত। এমতাবস্থায় তারা ইউক্রেনের সাথে কোন একটা সমঝোতার মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করতে চাইতে পারে। সেক্ষেত্রে তারা হয়তো বলতে পারে যে, ২০১৪ সালে দখলকৃত ক্রিমিয়া উপদ্বীপের সাথে ডনবাস অঞ্চলের সরাসরি স্থলপথ নিশ্চিত হয়ে গেলেই অপারেশনের লক্ষ্য অর্জিত হয়ে যাবে। তারা হয়তো ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর ওডেসা দখলের চেষ্টাটাও বাদ দিতে পারে।
ডাচ অনলাইন সামরিক ম্যাগাজিন ‘ওরিক্স’এর স্টাইন মিতজার এবং তার দল ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করে হিসেব করেছেন যে, যুদ্ধে রাশিয়া এবং ইউক্রেনের সামরিক ক্ষয়ক্ষতি কমপক্ষে কত হতে পারে। রুশরা এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ২ হাজার সামরিক গাড়ি হারিয়েছে; যার মাঝে প্রায় ১ হাজার ধ্বংস হলেও প্রায় ৭’শ ৩৫টা ইউক্রেনিয়ানরা দখল করেছে। এই গাড়ির মাঝে ৩’শ ১৫টা ছিল ট্যাংক; যেগুলির মাঝে ১’শ ৪০টা ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; আর বাকি ১’শ ৭৫টা ইউক্রেনিয়ানরা দখল করেছে, অথবা রুশরা ফেলে চলে গেছে। এছাড়াও রুশরা কমপক্ষে ৬’শ ১৫টা অন্যান্য সাঁজোয়া যান; ৬১টা ইঞ্জিনিয়ারিং যন্ত্রপাতি; ৬৩টা ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র; ৬৪টা বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র; ১’শ ৪৪টা আর্টিলারি ও রকেট; ১৭টা যুদ্ধবিমান; ৩৫টা হেলিকপ্টার; ১৬টা মনুষ্যবিহীন ড্রোন; ৩টা যুদ্ধজাহাজ; আরও ৭’শ ৬টা সামরিক গাড়ি; ইত্যাদি আরও অনেক কিছু হারিয়েছে। অপরদিকে ইউক্রেন হারিয়েছে কমপক্ষে ৫’শ ৭৪টা গাড়ি; যার মাঝে রয়েছে ৭৯টা ট্যাংক; ১’শ ৪৯টা অন্যান্য সাঁজোয়া যান; ৫১টা ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র; ৪৭টা আর্টিলারি ও রকেট; ২১টা বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র; ১২টা যুদ্ধবিমান; ১টা হেলিকপ্টার; ৯টা মনুষ্যবিহীন ড্রোন; ১৩টা যুদ্ধজাহাজ; ২’শ ১৮টা অন্যান্য সামরিক গাড়ি; ইত্যাদি আরও অনেক কিছু।
ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘রয়াল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইন্সটিটিউট’ বা ‘রুসি’র সিনিয়র ফেলো জ্যাক ওয়াটলিং ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকার এক লেখায় বলছেন যে, রাশিয়া এখন বাধ্য হচ্ছে একটা করে টার্গেট নিয়ে এগুতে। বর্তমানে দক্ষিণের মারিউপোল শহর এখন তাদের ফোকাস; এরপর তারা খুব সম্ভবতঃ খারকিভের দিকে মনোযোগ দেবে। এরপর তারা হয়তো নীপার নদী বরাপর উত্তর দিকে ধাবিত হয়ে খারকিভের সাথে মিলিত হতে চেষ্টা করবে, যাতে করে ডনবাসে ইউক্রেনের সকল বাহিনীকে ঘিরে ফেলা যায়। যদি রুশরা খারসন শহর ধরে রাখতে পারে, তাহলে তারা হয়তো একটা যুদ্ধবিরতির দিকে যেতে পারে, যার মাঝে ডনবাস থেকে ক্রিমিয়া পর্যন্ত যোগাযোগের নিয়ন্ত্রণ রুশদের হাতে থাকবে। তবে নীপার নদী বরাবর কোন অপারেশনই সহজ হবে না; ইউক্রেনিয়ানরা এটাকে প্রবলভাবে প্রতিহত করতে চাইবে। আপাততঃ তারা অন্যদিকে গুরুত্ব দিলেও ভবিষ্যতে তারা রাজধানী কিয়েভের দিকে মনোযোগ দেবে। যারা এই মুহুর্তে যুদ্ধ বন্ধ করার পক্ষপাতি, তারা হয়তো কিয়েভের নেতৃত্বকে দীর্ঘমেয়াদে রাশিয়ার কাছে কিছু সুবিধা ছেড়ে দিতে ইচ্ছুক থাকবে। অপরদিকে ইউক্রেনের নেতৃত্ব মনে করবে যে, রুশদের আপাততঃ লক্ষ্য ছোট করে আনার অর্থ হলো নিজেদের বৃহত্তর উচ্চাকাংক্ষাগুলিকে ভবিষ্যতের জন্যে জিইয়ে রাখা। তবে প্রশ্ন হলো যে, পশ্চিমারা এই দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে কতটা একমত হতে পারবে।
Labels:
Donbas,
Geopolitics,
Kyiv. strategy,
Mariupol,
Russia,
Ukraine
Thursday, 24 March 2022
ইউক্রেনের আকাশে তুর্কি ড্রোনগুলি কতটুকু সফল?
২৪শে মার্চ ২০২২
ইউক্রেন যুদ্ধের শুরু থেকেই বেশকিছু ভিডিও সোশাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে আকাশ থেকে দেখা যাচ্ছে যে, ভূমিতে বেশকিছু গাড়ির ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এই ভিডিও ফুটেজগুলি ইউক্রেনের বিমান বাহিনীর ড্রোন থেকে তোলা। তুরস্কের সরবরাহ করা ‘বায়রাকতার টিবি-২’ ড্রোনগুলি ইউক্রেনের জন্যে অনলাইন প্রচারণার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তুরস্কে ইউক্রেনের রাষ্ট্রদূত ভাসিল বোদনার সোশাল মিডিয়াতে এরকমই একটা ভিডিও শেয়ার করেন এবং শিরোনামে লেখেন ‘মাশাআল্লাহ’! এছাড়াও ইউক্রেনিয়ানরা ‘বায়রাকতার’ নামে একটা গান রচনা করেছে। এই গানের ভিডিওতে ড্রোনের ফুটেজ ব্যবহার করা হয়েছে। গানটা ইউক্রেন রেডিওতেও প্রচার করা হয়েছে। তবে এই ড্রোনগুলি প্রকৃতপক্ষে কতটুকু কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন করছেন অনেকেই।
ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘রয়াল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইন্সটিটিউট’ বা ‘রুসি’র বিশ্লেষক জ্যাক ওয়াটলিং ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’কে বলছেন যে, তুর্কি ড্রোনগুলির ইউক্রেনে সাফল্য পাবার কোন অর্থই নেই। কারণ এই ড্রোনগুলি মধ্যম উচ্চতায় উড্ডয়ন করে, এদের ইলোকট্রোম্যাগনেটিক সিগনেচার যথেষ্ট বড় এবং এগুলির রাডার ক্রস সেকসেনও যথেষ্ট বড়। রুশদের বেশ শক্তিশালী একটা বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে, যা এই ড্রোনগুলিকে সহজেই ভূপাতিত করার কথা। এছাড়াও ইউক্রেনের ভূমিও বেশ সমতল; যেখানে পাহাড় বা অন্য কোন ভৌগোলিক বাধা না থাকার কারণে রাডারের হাত থেকে বাঁচা সম্ভব নয়। তার ধারণা রুশ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিজেদের প্রস্তুতি শেষ করার আগেই এই ড্রোনগুলি আকাশে উড়ে সাফল্য পেয়েছে। তিনি বলছেন যে, ইউক্রেনের বিমান বাহিনী তুর্কি ড্রোনগুলিকে বেশ নিচু দিয়ে ওড়াচ্ছে; এরপর আক্রমণের ঠিক আগে উপড়ে উঠে সুবিধাজনক টার্গেটে হামলা করছে। তবে সামনের দিনগুলিতে রুশ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিজেদের শৃংখলা খুঁজে পেলে এই ড্রোনগুলির ওড়ার জায়গা সীমিত হয়ে আসবে। ইউক্রেনের বিমান বাহিনীকেও আরও সাবধান হতে হবে যে, তারা কোথায় কখন এই ড্রোনগুলিকে ব্যবহার করবে।
মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ফরেন পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউট’এর ডিরেক্টর আরন স্টাইন বলছেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত এই ড্রোনগুলি উড়তে থাকবে, ততক্ষণ এগুলির একটা প্রচারণা মূল্য থাকবে। হাই ডেফিনিশনে বিমান হামলা দেখা যাবার কারণে এই ড্রোন ফুটেজগুলি আকর্ষণ ক্ষমতা বেশি। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ২০১৯ সালে তুর্কি কোম্পানি ‘বায়কার’ তাদের ড্রোনগুলি ইউক্রেনের কাছে বিক্রি শুরু করে। ২০২১ সালের মাঝামাঝি এগুলির ডেলিভারি শুরু হয়। সেবছর অগাস্ট মাসে রাজধানী কিয়েভের রাস্তায় প্যারেডে ড্রোনগুলি প্রদর্শিত হয়। এর আগে সিরিয়া, লিবিয়া এবং ককেশাসের নাগোর্নো কারাবাখে এই ‘বায়রাকতার টিবি-২’ ড্রোনগুলি ব্যাপক সাফল্য পেয়েছিল। কিন্তু সেসব যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। এবার ইউক্রেনের যুদ্ধে ব্যাপারটা পুরোপুরিভাবে আলাদা। রাশিয়া একটা বড় শক্তি এবং তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যথেষ্ট শক্তিশালী বলেই সকলে মনে করেন। একারণেই পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা ইউক্রেনে ড্রোনগুলির সাফল্য দেখে বুঝে উঠতে পারছেন না যে ব্যাপারটা কি করে সম্ভব হচ্ছে। যুদ্ধ শুরু হবার পর ৩রা মার্চ ইউক্রেন সরকার ঘোষণা দেয় যে, তারা তুরস্ক থেকে ড্রোনের নতুন একটা চালান পেয়েছে। তবে তারা ড্রোনের সংখ্যা বলেননি। তুর্কি কর্মকর্তারা রুশদের রক্তচক্ষু এড়াতে ঘোষণা দেন যে, একটা তুর্কি বেসরকারি কোম্পানি চুক্তি অনুযায়ী ডেলিভারি দিয়েছে। আর এরকম ড্রোন শুধু ইউক্রেন নয়, দুনিয়ার অনেক দেশেই বিক্রি করেছে তুর্কিরা। সঠিক সংখ্যা জানা না থাকলেও অনেকেই বলছেন যে, ২০ থেকে ৫০টার মতো ‘বায়রাকতার’ ড্রোন তুর্কিরা এপর্যন্ত ইউক্রেনকে সরবরাহ করেছে।
মার্কিন মিডিয়া ‘এনবিসি’র সাথে কথা বলতে গিয়ে ব্রিটিশ সাংবাদিক এবং ড্রোন যুদ্ধের উপর বইএর লেখক ডেভিড হ্যাম্বলিং বলছেন যে, এই ড্রোনগুলি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিমানের মতো। মাত্র ১’শ ১০ হর্সপাওয়ারের ইঞ্জিনচালিত এই ড্রোনগুলি অতি সহজেই টার্গেট করতে পারার কথা। সবচাইতে অবাক ব্যাপার হলো ড্রোনের ফুটেজে দেখা যাচ্ছে যে, রুশ বিমানধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এই ড্রোনগুলি ধ্বংস করে ফেলছে! অথচ এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাগুলিই ড্রোন ভূপাতিত করার সবচাইতে ভালো অস্ত্র হবার কথা ছিল। এছাড়াও রুশ ইলেকট্রনিক জ্যামিং ব্যবস্থাও বেশ ভালো। সেগুলিও তো এই ড্রোনগুলিকে অকার্যকর করে ফেলার কথা। তিনি বলছেন যে, পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা খুব সম্ভবতঃ রুশ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতাকে বড় করে দেখেছেন। হ্যাম্বলিং বলছেন যে, আর কিছু না হোক, অন্ততঃ রুশ ফাইটার বিমান দিয়েও তো এই ড্রোনগুলিকে ভূপাতিত করা যেতো। হয় রুশরা নিজেদের কাজে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে; অথবা ইউক্রেনিয়রা নতুন কোন ট্যাকটিকস খুঁজে পেয়েছে কার্যকর হামলার জন্যে।
সুইজারল্যান্ডের ‘ইটিএইচ জুরিখ’ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মাউরো গিলি ‘আল জাজিরা’কে বলছেন যে, যেহেতু এহেন ড্রোনগুলিকে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সহজেই টার্গেট করতে পারে, তাই এগুলিকে রক্ষা করার জন্যে ইলেকট্রনিক জ্যামারের সমন্বয়ে কাজ করাটা জরুরি। লিবিয়াতে অবশ্য রুশরা বেশকিছু তুর্কি ড্রোন ভূপাতিত করেছিল। ইউক্রেনে এদের সাফল্য বলে দিচ্ছে যে, হয়তো রুশরা বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সাথে না নিয়ে এগুচ্ছে। এটা অসম্ভব নয়, কারণ রুশরা বেশ বড় রকমের লজিস্টিক্যাল সমস্যার মাঝে রয়েছে। অথবা এমনও হতে পারে যে, ইউক্রেনিয়ানরা অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক জ্যামার হাতে পেয়েছে।
এই ড্রোনগুলি পুরো যুদ্ধকে কতটা প্রভাবিত করবে, সেটা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে ড্রোনগুলি আন্তর্জাতিক অস্ত্রের বাজারে তুরস্কের অবস্থানকে আরও উপরে উঠিয়েছে। একেকটা তুর্কি ‘বায়রাকতার’ ড্রোনের মূল্য প্রায় ২ মিলিয়ন ডলার; যা আকাশে ওড়া যেকোন বিমানের মূল্যের তুলনায় কিছুই নয়। অন্ততঃ শক্তিশালী রুশ বিমান বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে পশ্চিমারা যখন ইউক্রেনকে কোন বিমান দিচ্ছে না, তখন এই ড্রোনগুলিই রুশদের উপরে বিমান হামলার স্বাদ দিচ্ছে এবং ইউক্রেনিয়ানদের অনলাইন প্রচারণার কেন্দ্রে থাকছে। যে ব্যাপারটা নিশ্চিত তা হলো, পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা এই ড্রোনগুলি যে ইউক্রেনে কোনরূপ সাফল্য পেতে পারে, সেটা বিশ্বাসই করেননি। রুশ অত্যাধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কমদামি ধীরগতির ড্রোনের সফলতা দেখিয়ে দেয় যে, কোনকিছুই অজেয় নয়। তুর্কি ড্রোনের সফলতা নিশ্চিত করলো যে, সামনের দিনগুলিতে ইউক্রেনের আকাশে আরও বিভিন্ন আকারের এবং ধরণের ড্রোন দেখা যাবে; যার মাঝে ক্ষুদ্র এবং মাঝারি সুইসাইড ড্রোনও থাকবে।
ইউক্রেন যুদ্ধের শুরু থেকেই বেশকিছু ভিডিও সোশাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে আকাশ থেকে দেখা যাচ্ছে যে, ভূমিতে বেশকিছু গাড়ির ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এই ভিডিও ফুটেজগুলি ইউক্রেনের বিমান বাহিনীর ড্রোন থেকে তোলা। তুরস্কের সরবরাহ করা ‘বায়রাকতার টিবি-২’ ড্রোনগুলি ইউক্রেনের জন্যে অনলাইন প্রচারণার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তুরস্কে ইউক্রেনের রাষ্ট্রদূত ভাসিল বোদনার সোশাল মিডিয়াতে এরকমই একটা ভিডিও শেয়ার করেন এবং শিরোনামে লেখেন ‘মাশাআল্লাহ’! এছাড়াও ইউক্রেনিয়ানরা ‘বায়রাকতার’ নামে একটা গান রচনা করেছে। এই গানের ভিডিওতে ড্রোনের ফুটেজ ব্যবহার করা হয়েছে। গানটা ইউক্রেন রেডিওতেও প্রচার করা হয়েছে। তবে এই ড্রোনগুলি প্রকৃতপক্ষে কতটুকু কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন করছেন অনেকেই।
ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘রয়াল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইন্সটিটিউট’ বা ‘রুসি’র বিশ্লেষক জ্যাক ওয়াটলিং ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’কে বলছেন যে, তুর্কি ড্রোনগুলির ইউক্রেনে সাফল্য পাবার কোন অর্থই নেই। কারণ এই ড্রোনগুলি মধ্যম উচ্চতায় উড্ডয়ন করে, এদের ইলোকট্রোম্যাগনেটিক সিগনেচার যথেষ্ট বড় এবং এগুলির রাডার ক্রস সেকসেনও যথেষ্ট বড়। রুশদের বেশ শক্তিশালী একটা বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে, যা এই ড্রোনগুলিকে সহজেই ভূপাতিত করার কথা। এছাড়াও ইউক্রেনের ভূমিও বেশ সমতল; যেখানে পাহাড় বা অন্য কোন ভৌগোলিক বাধা না থাকার কারণে রাডারের হাত থেকে বাঁচা সম্ভব নয়। তার ধারণা রুশ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিজেদের প্রস্তুতি শেষ করার আগেই এই ড্রোনগুলি আকাশে উড়ে সাফল্য পেয়েছে। তিনি বলছেন যে, ইউক্রেনের বিমান বাহিনী তুর্কি ড্রোনগুলিকে বেশ নিচু দিয়ে ওড়াচ্ছে; এরপর আক্রমণের ঠিক আগে উপড়ে উঠে সুবিধাজনক টার্গেটে হামলা করছে। তবে সামনের দিনগুলিতে রুশ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিজেদের শৃংখলা খুঁজে পেলে এই ড্রোনগুলির ওড়ার জায়গা সীমিত হয়ে আসবে। ইউক্রেনের বিমান বাহিনীকেও আরও সাবধান হতে হবে যে, তারা কোথায় কখন এই ড্রোনগুলিকে ব্যবহার করবে।
মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ফরেন পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউট’এর ডিরেক্টর আরন স্টাইন বলছেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত এই ড্রোনগুলি উড়তে থাকবে, ততক্ষণ এগুলির একটা প্রচারণা মূল্য থাকবে। হাই ডেফিনিশনে বিমান হামলা দেখা যাবার কারণে এই ড্রোন ফুটেজগুলি আকর্ষণ ক্ষমতা বেশি। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ২০১৯ সালে তুর্কি কোম্পানি ‘বায়কার’ তাদের ড্রোনগুলি ইউক্রেনের কাছে বিক্রি শুরু করে। ২০২১ সালের মাঝামাঝি এগুলির ডেলিভারি শুরু হয়। সেবছর অগাস্ট মাসে রাজধানী কিয়েভের রাস্তায় প্যারেডে ড্রোনগুলি প্রদর্শিত হয়। এর আগে সিরিয়া, লিবিয়া এবং ককেশাসের নাগোর্নো কারাবাখে এই ‘বায়রাকতার টিবি-২’ ড্রোনগুলি ব্যাপক সাফল্য পেয়েছিল। কিন্তু সেসব যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। এবার ইউক্রেনের যুদ্ধে ব্যাপারটা পুরোপুরিভাবে আলাদা। রাশিয়া একটা বড় শক্তি এবং তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যথেষ্ট শক্তিশালী বলেই সকলে মনে করেন। একারণেই পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা ইউক্রেনে ড্রোনগুলির সাফল্য দেখে বুঝে উঠতে পারছেন না যে ব্যাপারটা কি করে সম্ভব হচ্ছে। যুদ্ধ শুরু হবার পর ৩রা মার্চ ইউক্রেন সরকার ঘোষণা দেয় যে, তারা তুরস্ক থেকে ড্রোনের নতুন একটা চালান পেয়েছে। তবে তারা ড্রোনের সংখ্যা বলেননি। তুর্কি কর্মকর্তারা রুশদের রক্তচক্ষু এড়াতে ঘোষণা দেন যে, একটা তুর্কি বেসরকারি কোম্পানি চুক্তি অনুযায়ী ডেলিভারি দিয়েছে। আর এরকম ড্রোন শুধু ইউক্রেন নয়, দুনিয়ার অনেক দেশেই বিক্রি করেছে তুর্কিরা। সঠিক সংখ্যা জানা না থাকলেও অনেকেই বলছেন যে, ২০ থেকে ৫০টার মতো ‘বায়রাকতার’ ড্রোন তুর্কিরা এপর্যন্ত ইউক্রেনকে সরবরাহ করেছে।
মার্কিন মিডিয়া ‘এনবিসি’র সাথে কথা বলতে গিয়ে ব্রিটিশ সাংবাদিক এবং ড্রোন যুদ্ধের উপর বইএর লেখক ডেভিড হ্যাম্বলিং বলছেন যে, এই ড্রোনগুলি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিমানের মতো। মাত্র ১’শ ১০ হর্সপাওয়ারের ইঞ্জিনচালিত এই ড্রোনগুলি অতি সহজেই টার্গেট করতে পারার কথা। সবচাইতে অবাক ব্যাপার হলো ড্রোনের ফুটেজে দেখা যাচ্ছে যে, রুশ বিমানধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এই ড্রোনগুলি ধ্বংস করে ফেলছে! অথচ এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাগুলিই ড্রোন ভূপাতিত করার সবচাইতে ভালো অস্ত্র হবার কথা ছিল। এছাড়াও রুশ ইলেকট্রনিক জ্যামিং ব্যবস্থাও বেশ ভালো। সেগুলিও তো এই ড্রোনগুলিকে অকার্যকর করে ফেলার কথা। তিনি বলছেন যে, পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা খুব সম্ভবতঃ রুশ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতাকে বড় করে দেখেছেন। হ্যাম্বলিং বলছেন যে, আর কিছু না হোক, অন্ততঃ রুশ ফাইটার বিমান দিয়েও তো এই ড্রোনগুলিকে ভূপাতিত করা যেতো। হয় রুশরা নিজেদের কাজে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে; অথবা ইউক্রেনিয়রা নতুন কোন ট্যাকটিকস খুঁজে পেয়েছে কার্যকর হামলার জন্যে।
সুইজারল্যান্ডের ‘ইটিএইচ জুরিখ’ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মাউরো গিলি ‘আল জাজিরা’কে বলছেন যে, যেহেতু এহেন ড্রোনগুলিকে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সহজেই টার্গেট করতে পারে, তাই এগুলিকে রক্ষা করার জন্যে ইলেকট্রনিক জ্যামারের সমন্বয়ে কাজ করাটা জরুরি। লিবিয়াতে অবশ্য রুশরা বেশকিছু তুর্কি ড্রোন ভূপাতিত করেছিল। ইউক্রেনে এদের সাফল্য বলে দিচ্ছে যে, হয়তো রুশরা বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সাথে না নিয়ে এগুচ্ছে। এটা অসম্ভব নয়, কারণ রুশরা বেশ বড় রকমের লজিস্টিক্যাল সমস্যার মাঝে রয়েছে। অথবা এমনও হতে পারে যে, ইউক্রেনিয়ানরা অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক জ্যামার হাতে পেয়েছে।
এই ড্রোনগুলি পুরো যুদ্ধকে কতটা প্রভাবিত করবে, সেটা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে ড্রোনগুলি আন্তর্জাতিক অস্ত্রের বাজারে তুরস্কের অবস্থানকে আরও উপরে উঠিয়েছে। একেকটা তুর্কি ‘বায়রাকতার’ ড্রোনের মূল্য প্রায় ২ মিলিয়ন ডলার; যা আকাশে ওড়া যেকোন বিমানের মূল্যের তুলনায় কিছুই নয়। অন্ততঃ শক্তিশালী রুশ বিমান বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে পশ্চিমারা যখন ইউক্রেনকে কোন বিমান দিচ্ছে না, তখন এই ড্রোনগুলিই রুশদের উপরে বিমান হামলার স্বাদ দিচ্ছে এবং ইউক্রেনিয়ানদের অনলাইন প্রচারণার কেন্দ্রে থাকছে। যে ব্যাপারটা নিশ্চিত তা হলো, পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা এই ড্রোনগুলি যে ইউক্রেনে কোনরূপ সাফল্য পেতে পারে, সেটা বিশ্বাসই করেননি। রুশ অত্যাধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কমদামি ধীরগতির ড্রোনের সফলতা দেখিয়ে দেয় যে, কোনকিছুই অজেয় নয়। তুর্কি ড্রোনের সফলতা নিশ্চিত করলো যে, সামনের দিনগুলিতে ইউক্রেনের আকাশে আরও বিভিন্ন আকারের এবং ধরণের ড্রোন দেখা যাবে; যার মাঝে ক্ষুদ্র এবং মাঝারি সুইসাইড ড্রোনও থাকবে।
Labels:
Drone Warfare,
Geopolitics,
information war,
propaganda,
Russia,
Turkey,
Ukraine
Wednesday, 23 March 2022
ইউক্রেন যুদ্ধ… তুরস্ক আসলে কার পক্ষে?
২৩শে মার্চ ২০২২
২৪শে ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেনে সামরিক হামলা শুরু করার দিনই ইউক্রেন তুরস্ককে বসফরাস এবং দার্দানেলিস প্রণালি রুশ জাহাজের জন্যে বন্ধ করে দেয়ার আহ্বান জানায়। এর চারদিন পর ২৮শে ফেব্রুয়ারি তুরস্ক বসফরাস এবং দার্দানেলিস প্রণালিকে সকল রাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজের জন্যে বন্ধ ঘোষণা করে। তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু সাংবাদিকদের বলেন যে, তুরস্ক ১৯৩৬ সালের মনট্রিউ কনভেনশন মেনে চলছে। সেই অনুযায়ী তুরস্ক যখন কোন যুদ্ধে সরাসরি অংশ না নিচ্ছে, তখন তার অধিকার রয়েছে যুদ্ধে অংশ নেয়া পক্ষগুলির যুদ্ধজাহাজকে বসফরাস এবং দার্দানেলিস প্রণালি পার হতে বাধা দেয়ার। যদি কোন যুদ্ধজাহাজ কৃষ্ণ সাগরে নিজের ঘাঁটিতে ফেরত যায়, তবে সেক্ষেত্রে তুরস্ক কোন বাধা দেবে না। কাভুসোগলু বলেন যে, এর আগে রুশ সরকার তাদের কাছে জিজ্ঞেস করেছিল যে, তুরস্ক মনট্রিউ কনভেনশন মেনে চলবে কিনা। তুরস্কের পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছিল যে, তুরস্ক সেই কনভেনশন কঠোরভাবে মেনে চলবে। ‘নেভাল নিউজ’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, তুর্কি সরকার কনভেনশনের ‘আর্টিকেল ১৯’ অনুযায়ী যুদ্ধরত পক্ষগুলিকে যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে নিষেধ করেছে। তবে সকল দেশের যুদ্ধজাহাজ যাওয়া বন্ধ করার জন্যে তারা খুব সম্ভবতঃ ‘আর্টিকেল ২১’এর সরণাপন্ন হয়েছে; যেখানে বলা হয়েছে যে, তুরস্ক যদি যুদ্ধের হুমকির মাঝে পড়ে, তাহলে তারা বসফরাস বন্ধ করে দিতে পারে। তুরস্কের এই সিদ্ধান্তের পরপরই মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব এন্টনি ব্লিংকেন কাভুসোগলুর সাথে ফোনালাপ করেন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র নেড প্রাইস সাংবাদিকদের বলেন যে, ব্লিংকেন কাভুসোগলুকে মনট্রিউ কনভেনশনকে সমুন্নত রাখার জন্যে এবং এর সপক্ষে বক্তব্য দেয়ার জন্যে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। ইউক্রেনকে সহায়তা দানের জন্যেও ব্লিংকেন তুরস্ককে ধন্যবাদ দেন। ইউক্রেনে রুশ সামরিক হামলা শুরু হওয়ার পর থেকেই তুরস্কের গুরুত্ব বহুগুণে বেড়ে গেছে। যুদ্ধের আগে তুরস্কের সাথে যাদের দ্বন্দ্ব চলছিল, তাদের অনেকেই তুরস্ক সফর করেছেন; যা দেখিয়ে দেয় যে, যুদ্ধ অত্র অঞ্চলের বাস্তবতাকে কতটা পরিবর্তন করেছে।
৪ঠা মার্চ মার্কিন উপপররাষ্ট্র সচিব ওয়েন্ডি শেরমান তুরস্ক সফর করে তুর্কি প্রেসিডেন্টের প্রধান উপদেষ্টা ইব্রাহিম কালিনএর সাথে বৈঠক করেন। ‘আনাদোলু এজেন্সি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, বৈঠকে উভয় পক্ষ যুদ্ধ বন্ধে আলোচনার জন্যে যৌথ প্রচেষ্টা বৃদ্ধি করতে একমত হয়। কালিন বলেন যে, তুরস্ক যুদ্ধরত দুই দেশের মাঝে মধ্যস্ততা করতে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এছাড়াও দু’পক্ষ সিরিয়া, লিবিয়া এবং আফগানিস্তানের শান্তি এবং স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা করে; এবং ইস্রাইলের সাথে তুরস্কের ও তুরস্কের সাথে আর্মেনিয়ার সম্পর্কোন্নয়নের ব্যাপারেও আশা ব্যক্ত করা হয়।
ইউক্রেন ও রাশিয়ার মাঝে আলোচনায় মধ্যস্ততা করার প্রচেষ্টা চালানোর জন্যে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পাবার পর ১০ই মার্চ তুরস্কের আনতালিয়াতে ইউক্রেন এবং রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের প্রথম বৈঠকের পর তুরস্কের গুরুত্ব যেন আরও একধাপ বেড়ে যায়! ১১ই মার্চ ন্যাটোর সেক্রেটারি জেনারেল জেন্স স্টলটেনবার্গ তুরস্ক সফর করে আসেন। ন্যাটোর এক সংবাদ বার্তায় বলা হচ্ছে যে, স্টলটেনবার্গ সফরকালে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগানের সাথে সাক্ষাৎ করে ন্যাটোর মাঝে তুরস্কের বিশেষ ভূমিকার প্রশংসা করেন। একইসাথে তিনি ইউক্রেন এবং রাশিয়ার মাঝে আলোচনায় তুরস্কের মধ্যস্ততাকে এবং ইউক্রেনকে তুরস্কের সহায়তা দেয়াকে স্বাগত জানান।
স্টলটেনবার্গের তুরস্ক সফরের দুই দিনের মাথায় ১৩ই মার্চ আঙ্কারা যান গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিতসোতাকিস। তুর্কি থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর ইকনমিকস এন্ড ফরেন পলিসি স্টাডিজ’এর প্রেসিডেন্ট সিনান উলগেন ‘এএফপি’কে বলছেন যে, উভয় দেশের জন্যেই এই মুহুর্তে নিজেদের মাঝে নতুন করে কোন দ্বন্দ্ব একেবারেই অনভিপ্রেত। ‘ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’এর ফেলো আসলি আয়দিনতাসবাস বলছেন যে, উভয় দেশের নেতৃত্বই বুঝতে পারছে যে, তাদের আশেপাশের বাস্তবতা পরিবর্তন হয়ে গেছে। মাত্র তিন মাস আগেও ইউরোপিয় নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ এরকম ছিল না।
যদি মিতসোতাকিসের আঙ্কারা সফর নতুন কিছু ঠেকে, তাহলে আরও অবাক হবার কথা এর পরদিন ১৪ই মার্চ জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শোলজের তুরস্ক সফরের খবরে। এক যৌথ সংবাদ সন্মেলনে শোলজ বলেন যে, দুই দেশ ইউক্রেনে যুদ্ধ বন্ধ্বের ব্যাপারে একমত এবং উভয় দেশই ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দিয়েছে। তিনি বসফরাস প্রণালি সকল যুদ্ধজাহাজের জন্যে বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্যে তুরস্ককে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। তবে একইসাথে তিনি তুরস্কের সাথে দ্বন্দ্বের দিকগুলি, যেমন, মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং জার্মান নাগরিকদের বিরুদ্ধে তুরস্কের বিভিন্ন পদক্ষেপের ব্যাপারেও কথা বলেন। অপরদিকে এরদোগান মনে করিয়ে দেন যে, রাশিয়ার সাথে তুরস্কের বর্তমানে ৩৮ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য রয়েছে, যা তারা ৫০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যেতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
ইউক্রেন এবং রাশিয়ার প্রথম আলোচনার আগের দিন ৯ই মার্চ তুরস্ক সফরে আসেন ইস্রাইলের প্রেসিডেন্ট আইজাক হারজগ। তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান সংবাদ সন্মেলনে এই সফরকে ঐতিহাসিক এবং দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন মাত্র বলে আখ্যা দেন। তিনি বিশেষ করে দুই দেশের মাঝে জ্বালানির ব্যাপারে সমঝোতার উপর গুরুত্ব দেন। সেই লক্ষ্যে সামনের দিনগুলিতে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রী ইস্রাইল সফর করবেন। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনে দুই দেশের গুরুত্ব দেয়ার উপর জোর দেন। এছাড়াও তিনি দুই দেশের মাঝে মতভেদের বিষয়গুলিকে পারস্পরিক সন্মান ও খোলা মনের মাধ্যমে সুরাহা করার আশা ব্যক্ত করেন।
‘আল মনিটর’ বলছে যে, তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগানের এহেন নীতি পরিবর্তনকারী সিদ্ধান্তগুলির পিছনে রয়েছে অর্থনৈতিক দুর্দশা, যা ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আরও মারাত্মক আকার ধারণ করছে। এছাড়াও ২০২৩ সালে রয়েছে তুরস্কের নির্বাচন, যেখানে ক্ষমতাসীন ‘একে পার্টি’ যথেষ্ট শক্তিশালী বিরোধী গ্রুপের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’এর এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, তুরস্ক ইউক্রেন যুদ্ধে এমন একটা অবস্থানে আছে, যা কৌশলগতভাবে সমর্থন করা গেলেও নৈতিক দিক থেকে অসমর্থনযোগ্য। লেখায় আরও বলা হচ্ছে যে, তুরস্ক রাশিয়ার সাথে দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলতে চাইছে, যাতে প্রথমতঃ তুরস্কের গ্যাস সরবরাহ যেন ব্যাহত না হয়, এবং দ্বিতীয়তঃ সিরিয়াকে স্থিতিশীল রাখতে গিয়ে যেন রাশিয়াকে পাশে পাওয়া যায়। আবার ইউক্রেনকেও তুরস্ক সমর্থন দিয়ে গেছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে ‘বায়রাকতার টিবি-২’ ড্রোন সরবরাহ করেছে, যেগুলি রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে কিছু সাফল্যও পেয়েছে। এই কথাগুলিতে এটা পরিষ্কার যে, তুরস্ক কোন নীতি নয়, বরং স্বার্থকে বুঝে বাস্তবতার সাথে খাপ খাওয়াবার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। একারণেই ১৯৩৬ সালের মনট্রিউ কনভেনশন মেনে রুশ যুদ্ধজাহাজের জন্যে বসফরাস বন্ধ করে দেয়া ছাড়াও ইউক্রেন এবং রাশিয়ার মাঝে আলোচনায় মধ্যস্ততা করার আগে মার্কিন সমর্থন এবং উপদেশ নিয়েছে; যদিওবা মাত্র কয়েক মাস আগেই রাশিয়া থেকে ‘এস-৪০০’ ক্রয়ের ‘অপরাধে’ যুক্তরাষ্ট্র তুরস্কের উপর অবরোধ দিয়েছে। এটা পরিষ্কার যে মাত্র কিছুদিন আগেও যখন উসমানি খিলাফতের স্বপ্নে বিভোর তুর্কিদের আবেগের বাস্তবতাকে পুঁজি করে এরদোগান তুরস্ককে আঞ্চলিকভাবে বিভিন্ন সংঘাতে জড়িয়েছিলেন, ঠিক একইভাবে ইউক্রেনের যুদ্ধের বাস্তবতাকে পুঁজি করে তিনি তার অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনাকে লুকাবার চেষ্টা করে ২০২৩ সালের নির্বাচনের আগে নিজের অবস্থানকে কিছুটা হলেও শক্তিশালী করতে চাইছেন। যুক্তরাষ্ট্র, ইস্রাইল, জার্মানি, ন্যাটো এবং গ্রিস সেই পরিবর্তিত বাস্তবতাকে ব্যবহার করেই তুরুস্কের সাথে আলোচনা করছে।
২৪শে ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেনে সামরিক হামলা শুরু করার দিনই ইউক্রেন তুরস্ককে বসফরাস এবং দার্দানেলিস প্রণালি রুশ জাহাজের জন্যে বন্ধ করে দেয়ার আহ্বান জানায়। এর চারদিন পর ২৮শে ফেব্রুয়ারি তুরস্ক বসফরাস এবং দার্দানেলিস প্রণালিকে সকল রাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজের জন্যে বন্ধ ঘোষণা করে। তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু সাংবাদিকদের বলেন যে, তুরস্ক ১৯৩৬ সালের মনট্রিউ কনভেনশন মেনে চলছে। সেই অনুযায়ী তুরস্ক যখন কোন যুদ্ধে সরাসরি অংশ না নিচ্ছে, তখন তার অধিকার রয়েছে যুদ্ধে অংশ নেয়া পক্ষগুলির যুদ্ধজাহাজকে বসফরাস এবং দার্দানেলিস প্রণালি পার হতে বাধা দেয়ার। যদি কোন যুদ্ধজাহাজ কৃষ্ণ সাগরে নিজের ঘাঁটিতে ফেরত যায়, তবে সেক্ষেত্রে তুরস্ক কোন বাধা দেবে না। কাভুসোগলু বলেন যে, এর আগে রুশ সরকার তাদের কাছে জিজ্ঞেস করেছিল যে, তুরস্ক মনট্রিউ কনভেনশন মেনে চলবে কিনা। তুরস্কের পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছিল যে, তুরস্ক সেই কনভেনশন কঠোরভাবে মেনে চলবে। ‘নেভাল নিউজ’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, তুর্কি সরকার কনভেনশনের ‘আর্টিকেল ১৯’ অনুযায়ী যুদ্ধরত পক্ষগুলিকে যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে নিষেধ করেছে। তবে সকল দেশের যুদ্ধজাহাজ যাওয়া বন্ধ করার জন্যে তারা খুব সম্ভবতঃ ‘আর্টিকেল ২১’এর সরণাপন্ন হয়েছে; যেখানে বলা হয়েছে যে, তুরস্ক যদি যুদ্ধের হুমকির মাঝে পড়ে, তাহলে তারা বসফরাস বন্ধ করে দিতে পারে। তুরস্কের এই সিদ্ধান্তের পরপরই মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব এন্টনি ব্লিংকেন কাভুসোগলুর সাথে ফোনালাপ করেন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র নেড প্রাইস সাংবাদিকদের বলেন যে, ব্লিংকেন কাভুসোগলুকে মনট্রিউ কনভেনশনকে সমুন্নত রাখার জন্যে এবং এর সপক্ষে বক্তব্য দেয়ার জন্যে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। ইউক্রেনকে সহায়তা দানের জন্যেও ব্লিংকেন তুরস্ককে ধন্যবাদ দেন। ইউক্রেনে রুশ সামরিক হামলা শুরু হওয়ার পর থেকেই তুরস্কের গুরুত্ব বহুগুণে বেড়ে গেছে। যুদ্ধের আগে তুরস্কের সাথে যাদের দ্বন্দ্ব চলছিল, তাদের অনেকেই তুরস্ক সফর করেছেন; যা দেখিয়ে দেয় যে, যুদ্ধ অত্র অঞ্চলের বাস্তবতাকে কতটা পরিবর্তন করেছে।
৪ঠা মার্চ মার্কিন উপপররাষ্ট্র সচিব ওয়েন্ডি শেরমান তুরস্ক সফর করে তুর্কি প্রেসিডেন্টের প্রধান উপদেষ্টা ইব্রাহিম কালিনএর সাথে বৈঠক করেন। ‘আনাদোলু এজেন্সি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, বৈঠকে উভয় পক্ষ যুদ্ধ বন্ধে আলোচনার জন্যে যৌথ প্রচেষ্টা বৃদ্ধি করতে একমত হয়। কালিন বলেন যে, তুরস্ক যুদ্ধরত দুই দেশের মাঝে মধ্যস্ততা করতে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এছাড়াও দু’পক্ষ সিরিয়া, লিবিয়া এবং আফগানিস্তানের শান্তি এবং স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা করে; এবং ইস্রাইলের সাথে তুরস্কের ও তুরস্কের সাথে আর্মেনিয়ার সম্পর্কোন্নয়নের ব্যাপারেও আশা ব্যক্ত করা হয়।
ইউক্রেন ও রাশিয়ার মাঝে আলোচনায় মধ্যস্ততা করার প্রচেষ্টা চালানোর জন্যে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পাবার পর ১০ই মার্চ তুরস্কের আনতালিয়াতে ইউক্রেন এবং রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের প্রথম বৈঠকের পর তুরস্কের গুরুত্ব যেন আরও একধাপ বেড়ে যায়! ১১ই মার্চ ন্যাটোর সেক্রেটারি জেনারেল জেন্স স্টলটেনবার্গ তুরস্ক সফর করে আসেন। ন্যাটোর এক সংবাদ বার্তায় বলা হচ্ছে যে, স্টলটেনবার্গ সফরকালে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগানের সাথে সাক্ষাৎ করে ন্যাটোর মাঝে তুরস্কের বিশেষ ভূমিকার প্রশংসা করেন। একইসাথে তিনি ইউক্রেন এবং রাশিয়ার মাঝে আলোচনায় তুরস্কের মধ্যস্ততাকে এবং ইউক্রেনকে তুরস্কের সহায়তা দেয়াকে স্বাগত জানান।
স্টলটেনবার্গের তুরস্ক সফরের দুই দিনের মাথায় ১৩ই মার্চ আঙ্কারা যান গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিতসোতাকিস। তুর্কি থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর ইকনমিকস এন্ড ফরেন পলিসি স্টাডিজ’এর প্রেসিডেন্ট সিনান উলগেন ‘এএফপি’কে বলছেন যে, উভয় দেশের জন্যেই এই মুহুর্তে নিজেদের মাঝে নতুন করে কোন দ্বন্দ্ব একেবারেই অনভিপ্রেত। ‘ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’এর ফেলো আসলি আয়দিনতাসবাস বলছেন যে, উভয় দেশের নেতৃত্বই বুঝতে পারছে যে, তাদের আশেপাশের বাস্তবতা পরিবর্তন হয়ে গেছে। মাত্র তিন মাস আগেও ইউরোপিয় নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ এরকম ছিল না।
যদি মিতসোতাকিসের আঙ্কারা সফর নতুন কিছু ঠেকে, তাহলে আরও অবাক হবার কথা এর পরদিন ১৪ই মার্চ জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শোলজের তুরস্ক সফরের খবরে। এক যৌথ সংবাদ সন্মেলনে শোলজ বলেন যে, দুই দেশ ইউক্রেনে যুদ্ধ বন্ধ্বের ব্যাপারে একমত এবং উভয় দেশই ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দিয়েছে। তিনি বসফরাস প্রণালি সকল যুদ্ধজাহাজের জন্যে বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্যে তুরস্ককে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। তবে একইসাথে তিনি তুরস্কের সাথে দ্বন্দ্বের দিকগুলি, যেমন, মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং জার্মান নাগরিকদের বিরুদ্ধে তুরস্কের বিভিন্ন পদক্ষেপের ব্যাপারেও কথা বলেন। অপরদিকে এরদোগান মনে করিয়ে দেন যে, রাশিয়ার সাথে তুরস্কের বর্তমানে ৩৮ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য রয়েছে, যা তারা ৫০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যেতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
ইউক্রেন এবং রাশিয়ার প্রথম আলোচনার আগের দিন ৯ই মার্চ তুরস্ক সফরে আসেন ইস্রাইলের প্রেসিডেন্ট আইজাক হারজগ। তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান সংবাদ সন্মেলনে এই সফরকে ঐতিহাসিক এবং দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন মাত্র বলে আখ্যা দেন। তিনি বিশেষ করে দুই দেশের মাঝে জ্বালানির ব্যাপারে সমঝোতার উপর গুরুত্ব দেন। সেই লক্ষ্যে সামনের দিনগুলিতে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রী ইস্রাইল সফর করবেন। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনে দুই দেশের গুরুত্ব দেয়ার উপর জোর দেন। এছাড়াও তিনি দুই দেশের মাঝে মতভেদের বিষয়গুলিকে পারস্পরিক সন্মান ও খোলা মনের মাধ্যমে সুরাহা করার আশা ব্যক্ত করেন।
‘আল মনিটর’ বলছে যে, তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগানের এহেন নীতি পরিবর্তনকারী সিদ্ধান্তগুলির পিছনে রয়েছে অর্থনৈতিক দুর্দশা, যা ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আরও মারাত্মক আকার ধারণ করছে। এছাড়াও ২০২৩ সালে রয়েছে তুরস্কের নির্বাচন, যেখানে ক্ষমতাসীন ‘একে পার্টি’ যথেষ্ট শক্তিশালী বিরোধী গ্রুপের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’এর এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, তুরস্ক ইউক্রেন যুদ্ধে এমন একটা অবস্থানে আছে, যা কৌশলগতভাবে সমর্থন করা গেলেও নৈতিক দিক থেকে অসমর্থনযোগ্য। লেখায় আরও বলা হচ্ছে যে, তুরস্ক রাশিয়ার সাথে দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলতে চাইছে, যাতে প্রথমতঃ তুরস্কের গ্যাস সরবরাহ যেন ব্যাহত না হয়, এবং দ্বিতীয়তঃ সিরিয়াকে স্থিতিশীল রাখতে গিয়ে যেন রাশিয়াকে পাশে পাওয়া যায়। আবার ইউক্রেনকেও তুরস্ক সমর্থন দিয়ে গেছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে ‘বায়রাকতার টিবি-২’ ড্রোন সরবরাহ করেছে, যেগুলি রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে কিছু সাফল্যও পেয়েছে। এই কথাগুলিতে এটা পরিষ্কার যে, তুরস্ক কোন নীতি নয়, বরং স্বার্থকে বুঝে বাস্তবতার সাথে খাপ খাওয়াবার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। একারণেই ১৯৩৬ সালের মনট্রিউ কনভেনশন মেনে রুশ যুদ্ধজাহাজের জন্যে বসফরাস বন্ধ করে দেয়া ছাড়াও ইউক্রেন এবং রাশিয়ার মাঝে আলোচনায় মধ্যস্ততা করার আগে মার্কিন সমর্থন এবং উপদেশ নিয়েছে; যদিওবা মাত্র কয়েক মাস আগেই রাশিয়া থেকে ‘এস-৪০০’ ক্রয়ের ‘অপরাধে’ যুক্তরাষ্ট্র তুরস্কের উপর অবরোধ দিয়েছে। এটা পরিষ্কার যে মাত্র কিছুদিন আগেও যখন উসমানি খিলাফতের স্বপ্নে বিভোর তুর্কিদের আবেগের বাস্তবতাকে পুঁজি করে এরদোগান তুরস্ককে আঞ্চলিকভাবে বিভিন্ন সংঘাতে জড়িয়েছিলেন, ঠিক একইভাবে ইউক্রেনের যুদ্ধের বাস্তবতাকে পুঁজি করে তিনি তার অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনাকে লুকাবার চেষ্টা করে ২০২৩ সালের নির্বাচনের আগে নিজের অবস্থানকে কিছুটা হলেও শক্তিশালী করতে চাইছেন। যুক্তরাষ্ট্র, ইস্রাইল, জার্মানি, ন্যাটো এবং গ্রিস সেই পরিবর্তিত বাস্তবতাকে ব্যবহার করেই তুরুস্কের সাথে আলোচনা করছে।
Labels:
Black Sea,
Bosphorus,
Geopolitics,
Germany,
Greece,
Israel,
Montreux Convention,
NATO,
Russia,
Turkey,
Ukraine,
USA
Tuesday, 22 March 2022
ইউক্রেন যুদ্ধ কি জার্মানির নীতির পরিবর্তন করিয়েছে?
২২শে মার্চ ২০২২
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর তিন দিন পর গত ২৭শে ফেব্রুয়ারি জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শোলজ জার্মান পার্লামেন্ট বুন্দেস্টাগএ নতুন প্রতিরক্ষা নীতির ঘোষণা দেন। তিনি বলেন যে, ইউক্রেনে আগ্রাসনের কারণে জার্মানি নতুন এক যুগে প্রবেশ করলো। ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, জার্মান সরকারের এই অবস্থান অনেককেই অবাক করেছিল; কারণ বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরেই জার্মান সরকারকে সরাসরি ইউক্রেনের পক্ষ না নেবার এবং আরও কঠোরভাবে রাশিয়ার বিরুদ্ধাচরণ না করার ব্যাপারে ব্যাপক সমালোচনার শিকার হতে হয়েছে। শোলজ বলেন যে, সাম্প্রতিক ঘটনা এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে তার সর্বশেষ আলোচনার পর তিনি নিশ্চিত হয়েছেন যে, রুশ প্রেসিডেন্ট একটা নতুন সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে চাইছেন; এবং এই মুহুর্তে গণতন্ত্র এবং শান্তি রক্ষার জন্যে ইউরোপের প্রয়োজন নিজেদের প্রতিরক্ষাকে শক্তিশালী করা।
শোলজ এবছরেই জার্মান সামরিক বাহিনীকে আধুনিকীকরণ করার জন্যে ১’শ বিলিয়ন ইউরো বা ১’শ ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার ঘোষণা দেন। একইসাথে তিনি সামনের বছরগুলিতে জার্মান প্রতিরক্ষা বাজেটকে জিডিপির ২ শতাংশের উপরে তোলারও আশ্বাস দেন। ন্যাটো সদস্য হিসেবে জার্মানি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, তারা তাদের জিডিপির ২ শতাংশ প্রতিরক্ষায় খরচ করবে। কিন্তু ইউরোপের অনেক দেশের মতো জার্মানি সেই টার্গেটের ধারেকাছেও যায়নি। ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’এর প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, আগের চ্যান্সেলর এঙ্গেলা মার্কেলের ১৬ বছরের শাসনামলে জার্মানি রাশিয়ার সাথে সাবধানে সম্পর্ক রেখে চলেছে। বিশেষ করে রাশিয়া থেকে জার্মানি পর্যন্ত বল্টিক সাগরের তলদেশ দিয়ে ‘নর্ড স্ট্রিম ২’ গ্যাস পাইপলাইনের ব্যাপারেও দুই দেশের মাঝে সমঝোতা মার্কেলের আমলেই হয়েছিল। প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় মার্কেল প্রতিরক্ষা খরচ বাড়াবার ব্যাপারে মার্কিন চাপকে উপেক্ষা করেছিলেন। মাত্র কিছুদিন আগ পর্যন্তও জার্মানি ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দানে বিরত ছিল। জার্মানি বলছিল যে, তারা যেকোন যুদ্ধে অস্ত্র সরবরাহ না করার নীতিতে অটল থাকবে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে জার্মানি তার সেই নীতি থেকে সরে এসে ইউক্রেনকে অস্ত্র দেবার ঘোষণা দিয়েছে।
মার্কিন মিডিয়া ‘এনবিসি’ বলছে যে, মার্কেল রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক ভালো রেখে জার্মানির সামরিক বাজেট কমিয়ে রেখেছিলেন। এখন অনেকেই তার ভূমিকাকে ভিন্ন চোখে দেখছে। থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশন্স’এর এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ড্যানিয়েলা শোয়ার্জার বলছেন যে, ২০১৪ সালে রাশিয়া ইউক্রেনের ক্রিমিয়া দখল করে নেবার পরে মার্কেল রাশিয়ার উপর হাইড্রোকার্বনের জন্যে নির্ভরতা কমাননি, বরং তিনি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউক্রেনের প্রতিবাদ সত্ত্বেও ‘নর্ড স্ট্রিম ২’ পাইপলাইনকে সমর্থন দিয়েছেন। ‘ইউরোস্ট্যাট’এর হিসেবে ২০১০ সালে জার্মানির ৩৬ শতাংশ গ্যাস আসতো রাশিয়া থেকে; ২০২০ সালে তা দাঁড়ায় ৬৫ শতাংশে।
নতুন প্রতিরক্ষা নীতির মাঝে কিছু ব্যাপারকে ওলাফ শোলজ পরিষ্কার করেছেন। জার্মানি সামনের দিনগুলিতে পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোর সদস্য দেশগুলিতে জার্মান সামরিক অবস্থানকে আরও সুসংহত করবে। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যৌথভাবে জার্মানির যে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের চুক্তি রয়েছে, সেটার আঙ্গিকে তাদের পারমাণবিক আক্রমণের জন্যে ব্যবহৃত ফাইটার বিমানের বহরকে আরও উন্নত করবে। ড্রোন ক্রয় করা ছাড়াও তার সরকার ফ্রান্সের সাথে যৌথভাবে ৬ষ্ঠ জেনারেশনের ফাইটার বিমান এবং ট্যাংক ডেভেলপ করবে বলে বলেন তিনি। শোলজ বলেন যে, পুতিনকে অতীতে ফিরে যেতে না দিয়ে তার মতো ‘যুদ্ধবাজ’কে সীমানার মাঝে আটকে ফেলার প্রশ্ন এখন ইউরোপের সামনে। রুশ হাইড্রোকার্বনের উপর নির্ভরশীলতাকে দ্রুত কমিয়ে ফেলার জন্যে চেষ্টা করার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। বৈশ্বিক বাজার থেকে আরও গ্যাস কিনে, যত দ্রুত সম্ভব দু’টা নতুন এলএনজি টার্মিনাল তৈরি করে এবং নিজেদের কয়লা এবং গ্যাসের মজুত বাড়িয়ে এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ইচ্ছা পোষণ করেন তিনি। তবে এর পরেও ২০৪৫ সালের মাঝে জার্মানিকে ‘কার্বন নিউট্রাল’ করার জলবায়ুগত প্রতিশ্রুতিতে বহাল থাকতে চান তিনি।
জার্মান অর্থমন্ত্রী রবার্ট হাবেক ‘ডয়েশল্যান্ডফুঙ্ক’ রেডিওকে বলেন যে, আগামী শীতের আগে জার্মানি গ্যাসের নতুন সরবরাহকারী না পেলে এবং রুশ গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে জার্মানিতে বাড়ি গরম করার জন্যে এবং কারখানা চালু রাখার জন্যে যথেষ্ট গ্যাস থাকবে না। এই লক্ষ্যেই তিনি গ্যাসের নতুন সরবরাহকারী খুঁজতে কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত হয়ে এসেছেন। তরলীকৃত গ্যাস এবং ‘গ্রিন হাইড্রোজেন’ নিয়ে এই দুই দেশের সাথে আলোচনায় বড় বড় জার্মান কোম্পনিগুলিও অংশ নেয়। জার্মান কোম্পানি ‘থাইসেন ক্রুপ’এর প্রধান নির্বাহী মার্টিনা মার্জ এই সফরে জার্মান মন্ত্রীর প্রচেষ্টার ভূয়সী প্রশংসা করেন। ‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, কাতার বর্তমানে ইইউএর ৩০ শতাংশ তরলীকৃত গ্যাসের সরবরাহ দিলেও জার্মানি আমদানিকারক নয়। কারণ রুশ গ্যাসের উপর নির্ভর করে জার্মানি এলএনজি টার্মিনাল তৈরি করেনি। হাবেক আশা করছেন যে, পাঁচ বছরের মাঝে জার্মানি দু’টা টার্মিনাল তৈরি করতে পারবে।
ড্যানিয়েলা শোয়ার্জার বলছেন যে, শোলজের নতুন প্রতিরক্ষা বিনিয়োগের একটা বড় অংশ নতুন কোন নীতির জন্যে নয়, বরং এতকাল মার্কেলের সময়ে জার্মানির প্রতিরক্ষা বাজেট কম রাখার ব্যাপারটাকে ব্যালান্স করতে। এই অর্থের মাধ্যমে অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় থাকা জার্মানির সামরিক বাহিনীর উন্নয়ন করা হবে। অপরদিকে এলএনজি টার্মিনালের অভাবে রুশ গ্যাসের বিকল্প হিসেবে কাতার এবং আমিরাত থেকে গ্যাস এবং হাইড্রোজেন আমদানি করাও রাতারাতি সম্ভব হচ্ছে না। সেই সময় পর্যন্ত জার্মানিকে ভ্লাদিমির পুতিনের দিকেই হয়তো চেয়ে থাকতে হবে। ‘ডয়েচে ভেলে’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, জলবায়ুর উপর জোর দেয়া ‘গ্রিন পার্টি’র নেতা জার্মান মন্ত্রী হাবেক এখন জলবায়ুকে ভুলে গিয়ে হাইড্রোকার্বন আমদানি করতে এলএনজি টার্মিনাল তৈরি করছেন; আর রাশিয়ার অগণতান্ত্রিক সরকারকে রুখতে কাতার ও আমিরাতের গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের প্রশ্ন ভুলে গিয়ে সেখান থেকে জ্বালানি আমদানি করতে উঠেপড়ে লেগেছেন। চ্যান্সেলর শোলজের নতুন প্রতিরক্ষা নীতি প্রকৃতপক্ষে আলাদা কোন নীতি নয়। কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জার্মানি শিশুমাত্র! ইউক্রেনের যুদ্ধ শোলজ এবং হাবেকের জন্যে বাস্তবতা পরিবর্তন করে দিয়েছে; যেখানে যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া বড় ভূমিকা নিয়েছিল এবং জার্মানি ছিল নিছক দর্শক। জার্মানি সেই পরিবর্তিত বাস্তবতার সাথে খাপ খাওয়াবার চেষ্টা করছে মাত্র।
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর তিন দিন পর গত ২৭শে ফেব্রুয়ারি জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শোলজ জার্মান পার্লামেন্ট বুন্দেস্টাগএ নতুন প্রতিরক্ষা নীতির ঘোষণা দেন। তিনি বলেন যে, ইউক্রেনে আগ্রাসনের কারণে জার্মানি নতুন এক যুগে প্রবেশ করলো। ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, জার্মান সরকারের এই অবস্থান অনেককেই অবাক করেছিল; কারণ বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরেই জার্মান সরকারকে সরাসরি ইউক্রেনের পক্ষ না নেবার এবং আরও কঠোরভাবে রাশিয়ার বিরুদ্ধাচরণ না করার ব্যাপারে ব্যাপক সমালোচনার শিকার হতে হয়েছে। শোলজ বলেন যে, সাম্প্রতিক ঘটনা এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে তার সর্বশেষ আলোচনার পর তিনি নিশ্চিত হয়েছেন যে, রুশ প্রেসিডেন্ট একটা নতুন সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে চাইছেন; এবং এই মুহুর্তে গণতন্ত্র এবং শান্তি রক্ষার জন্যে ইউরোপের প্রয়োজন নিজেদের প্রতিরক্ষাকে শক্তিশালী করা।
শোলজ এবছরেই জার্মান সামরিক বাহিনীকে আধুনিকীকরণ করার জন্যে ১’শ বিলিয়ন ইউরো বা ১’শ ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার ঘোষণা দেন। একইসাথে তিনি সামনের বছরগুলিতে জার্মান প্রতিরক্ষা বাজেটকে জিডিপির ২ শতাংশের উপরে তোলারও আশ্বাস দেন। ন্যাটো সদস্য হিসেবে জার্মানি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, তারা তাদের জিডিপির ২ শতাংশ প্রতিরক্ষায় খরচ করবে। কিন্তু ইউরোপের অনেক দেশের মতো জার্মানি সেই টার্গেটের ধারেকাছেও যায়নি। ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’এর প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, আগের চ্যান্সেলর এঙ্গেলা মার্কেলের ১৬ বছরের শাসনামলে জার্মানি রাশিয়ার সাথে সাবধানে সম্পর্ক রেখে চলেছে। বিশেষ করে রাশিয়া থেকে জার্মানি পর্যন্ত বল্টিক সাগরের তলদেশ দিয়ে ‘নর্ড স্ট্রিম ২’ গ্যাস পাইপলাইনের ব্যাপারেও দুই দেশের মাঝে সমঝোতা মার্কেলের আমলেই হয়েছিল। প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় মার্কেল প্রতিরক্ষা খরচ বাড়াবার ব্যাপারে মার্কিন চাপকে উপেক্ষা করেছিলেন। মাত্র কিছুদিন আগ পর্যন্তও জার্মানি ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দানে বিরত ছিল। জার্মানি বলছিল যে, তারা যেকোন যুদ্ধে অস্ত্র সরবরাহ না করার নীতিতে অটল থাকবে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে জার্মানি তার সেই নীতি থেকে সরে এসে ইউক্রেনকে অস্ত্র দেবার ঘোষণা দিয়েছে।
মার্কিন মিডিয়া ‘এনবিসি’ বলছে যে, মার্কেল রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক ভালো রেখে জার্মানির সামরিক বাজেট কমিয়ে রেখেছিলেন। এখন অনেকেই তার ভূমিকাকে ভিন্ন চোখে দেখছে। থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশন্স’এর এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ড্যানিয়েলা শোয়ার্জার বলছেন যে, ২০১৪ সালে রাশিয়া ইউক্রেনের ক্রিমিয়া দখল করে নেবার পরে মার্কেল রাশিয়ার উপর হাইড্রোকার্বনের জন্যে নির্ভরতা কমাননি, বরং তিনি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউক্রেনের প্রতিবাদ সত্ত্বেও ‘নর্ড স্ট্রিম ২’ পাইপলাইনকে সমর্থন দিয়েছেন। ‘ইউরোস্ট্যাট’এর হিসেবে ২০১০ সালে জার্মানির ৩৬ শতাংশ গ্যাস আসতো রাশিয়া থেকে; ২০২০ সালে তা দাঁড়ায় ৬৫ শতাংশে।
নতুন প্রতিরক্ষা নীতির মাঝে কিছু ব্যাপারকে ওলাফ শোলজ পরিষ্কার করেছেন। জার্মানি সামনের দিনগুলিতে পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোর সদস্য দেশগুলিতে জার্মান সামরিক অবস্থানকে আরও সুসংহত করবে। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যৌথভাবে জার্মানির যে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের চুক্তি রয়েছে, সেটার আঙ্গিকে তাদের পারমাণবিক আক্রমণের জন্যে ব্যবহৃত ফাইটার বিমানের বহরকে আরও উন্নত করবে। ড্রোন ক্রয় করা ছাড়াও তার সরকার ফ্রান্সের সাথে যৌথভাবে ৬ষ্ঠ জেনারেশনের ফাইটার বিমান এবং ট্যাংক ডেভেলপ করবে বলে বলেন তিনি। শোলজ বলেন যে, পুতিনকে অতীতে ফিরে যেতে না দিয়ে তার মতো ‘যুদ্ধবাজ’কে সীমানার মাঝে আটকে ফেলার প্রশ্ন এখন ইউরোপের সামনে। রুশ হাইড্রোকার্বনের উপর নির্ভরশীলতাকে দ্রুত কমিয়ে ফেলার জন্যে চেষ্টা করার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। বৈশ্বিক বাজার থেকে আরও গ্যাস কিনে, যত দ্রুত সম্ভব দু’টা নতুন এলএনজি টার্মিনাল তৈরি করে এবং নিজেদের কয়লা এবং গ্যাসের মজুত বাড়িয়ে এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ইচ্ছা পোষণ করেন তিনি। তবে এর পরেও ২০৪৫ সালের মাঝে জার্মানিকে ‘কার্বন নিউট্রাল’ করার জলবায়ুগত প্রতিশ্রুতিতে বহাল থাকতে চান তিনি।
জার্মান অর্থমন্ত্রী রবার্ট হাবেক ‘ডয়েশল্যান্ডফুঙ্ক’ রেডিওকে বলেন যে, আগামী শীতের আগে জার্মানি গ্যাসের নতুন সরবরাহকারী না পেলে এবং রুশ গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে জার্মানিতে বাড়ি গরম করার জন্যে এবং কারখানা চালু রাখার জন্যে যথেষ্ট গ্যাস থাকবে না। এই লক্ষ্যেই তিনি গ্যাসের নতুন সরবরাহকারী খুঁজতে কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত হয়ে এসেছেন। তরলীকৃত গ্যাস এবং ‘গ্রিন হাইড্রোজেন’ নিয়ে এই দুই দেশের সাথে আলোচনায় বড় বড় জার্মান কোম্পনিগুলিও অংশ নেয়। জার্মান কোম্পানি ‘থাইসেন ক্রুপ’এর প্রধান নির্বাহী মার্টিনা মার্জ এই সফরে জার্মান মন্ত্রীর প্রচেষ্টার ভূয়সী প্রশংসা করেন। ‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, কাতার বর্তমানে ইইউএর ৩০ শতাংশ তরলীকৃত গ্যাসের সরবরাহ দিলেও জার্মানি আমদানিকারক নয়। কারণ রুশ গ্যাসের উপর নির্ভর করে জার্মানি এলএনজি টার্মিনাল তৈরি করেনি। হাবেক আশা করছেন যে, পাঁচ বছরের মাঝে জার্মানি দু’টা টার্মিনাল তৈরি করতে পারবে।
ড্যানিয়েলা শোয়ার্জার বলছেন যে, শোলজের নতুন প্রতিরক্ষা বিনিয়োগের একটা বড় অংশ নতুন কোন নীতির জন্যে নয়, বরং এতকাল মার্কেলের সময়ে জার্মানির প্রতিরক্ষা বাজেট কম রাখার ব্যাপারটাকে ব্যালান্স করতে। এই অর্থের মাধ্যমে অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় থাকা জার্মানির সামরিক বাহিনীর উন্নয়ন করা হবে। অপরদিকে এলএনজি টার্মিনালের অভাবে রুশ গ্যাসের বিকল্প হিসেবে কাতার এবং আমিরাত থেকে গ্যাস এবং হাইড্রোজেন আমদানি করাও রাতারাতি সম্ভব হচ্ছে না। সেই সময় পর্যন্ত জার্মানিকে ভ্লাদিমির পুতিনের দিকেই হয়তো চেয়ে থাকতে হবে। ‘ডয়েচে ভেলে’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, জলবায়ুর উপর জোর দেয়া ‘গ্রিন পার্টি’র নেতা জার্মান মন্ত্রী হাবেক এখন জলবায়ুকে ভুলে গিয়ে হাইড্রোকার্বন আমদানি করতে এলএনজি টার্মিনাল তৈরি করছেন; আর রাশিয়ার অগণতান্ত্রিক সরকারকে রুখতে কাতার ও আমিরাতের গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের প্রশ্ন ভুলে গিয়ে সেখান থেকে জ্বালানি আমদানি করতে উঠেপড়ে লেগেছেন। চ্যান্সেলর শোলজের নতুন প্রতিরক্ষা নীতি প্রকৃতপক্ষে আলাদা কোন নীতি নয়। কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জার্মানি শিশুমাত্র! ইউক্রেনের যুদ্ধ শোলজ এবং হাবেকের জন্যে বাস্তবতা পরিবর্তন করে দিয়েছে; যেখানে যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া বড় ভূমিকা নিয়েছিল এবং জার্মানি ছিল নিছক দর্শক। জার্মানি সেই পরিবর্তিত বাস্তবতার সাথে খাপ খাওয়াবার চেষ্টা করছে মাত্র।
Labels:
Geopolitics,
Germany,
LNG,
Nord Stream 2 pipeline,
Qatar,
Russia,
UAE,
Ukraine,
USA
Subscribe to:
Posts (Atom)









