২৪শে মার্চ ২০২২
ইউক্রেন যুদ্ধের শুরু থেকেই বেশকিছু ভিডিও সোশাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে আকাশ থেকে দেখা যাচ্ছে যে, ভূমিতে বেশকিছু গাড়ির ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এই ভিডিও ফুটেজগুলি ইউক্রেনের বিমান বাহিনীর ড্রোন থেকে তোলা। তুরস্কের সরবরাহ করা ‘বায়রাকতার টিবি-২’ ড্রোনগুলি ইউক্রেনের জন্যে অনলাইন প্রচারণার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তুরস্কে ইউক্রেনের রাষ্ট্রদূত ভাসিল বোদনার সোশাল মিডিয়াতে এরকমই একটা ভিডিও শেয়ার করেন এবং শিরোনামে লেখেন ‘মাশাআল্লাহ’! এছাড়াও ইউক্রেনিয়ানরা ‘বায়রাকতার’ নামে একটা গান রচনা করেছে। এই গানের ভিডিওতে ড্রোনের ফুটেজ ব্যবহার করা হয়েছে। গানটা ইউক্রেন রেডিওতেও প্রচার করা হয়েছে। তবে এই ড্রোনগুলি প্রকৃতপক্ষে কতটুকু কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন করছেন অনেকেই।
ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘রয়াল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইন্সটিটিউট’ বা ‘রুসি’র বিশ্লেষক জ্যাক ওয়াটলিং ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’কে বলছেন যে, তুর্কি ড্রোনগুলির ইউক্রেনে সাফল্য পাবার কোন অর্থই নেই। কারণ এই ড্রোনগুলি মধ্যম উচ্চতায় উড্ডয়ন করে, এদের ইলোকট্রোম্যাগনেটিক সিগনেচার যথেষ্ট বড় এবং এগুলির রাডার ক্রস সেকসেনও যথেষ্ট বড়। রুশদের বেশ শক্তিশালী একটা বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে, যা এই ড্রোনগুলিকে সহজেই ভূপাতিত করার কথা। এছাড়াও ইউক্রেনের ভূমিও বেশ সমতল; যেখানে পাহাড় বা অন্য কোন ভৌগোলিক বাধা না থাকার কারণে রাডারের হাত থেকে বাঁচা সম্ভব নয়। তার ধারণা রুশ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিজেদের প্রস্তুতি শেষ করার আগেই এই ড্রোনগুলি আকাশে উড়ে সাফল্য পেয়েছে। তিনি বলছেন যে, ইউক্রেনের বিমান বাহিনী তুর্কি ড্রোনগুলিকে বেশ নিচু দিয়ে ওড়াচ্ছে; এরপর আক্রমণের ঠিক আগে উপড়ে উঠে সুবিধাজনক টার্গেটে হামলা করছে। তবে সামনের দিনগুলিতে রুশ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিজেদের শৃংখলা খুঁজে পেলে এই ড্রোনগুলির ওড়ার জায়গা সীমিত হয়ে আসবে। ইউক্রেনের বিমান বাহিনীকেও আরও সাবধান হতে হবে যে, তারা কোথায় কখন এই ড্রোনগুলিকে ব্যবহার করবে।
মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ফরেন পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউট’এর ডিরেক্টর আরন স্টাইন বলছেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত এই ড্রোনগুলি উড়তে থাকবে, ততক্ষণ এগুলির একটা প্রচারণা মূল্য থাকবে। হাই ডেফিনিশনে বিমান হামলা দেখা যাবার কারণে এই ড্রোন ফুটেজগুলি আকর্ষণ ক্ষমতা বেশি। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ২০১৯ সালে তুর্কি কোম্পানি ‘বায়কার’ তাদের ড্রোনগুলি ইউক্রেনের কাছে বিক্রি শুরু করে। ২০২১ সালের মাঝামাঝি এগুলির ডেলিভারি শুরু হয়। সেবছর অগাস্ট মাসে রাজধানী কিয়েভের রাস্তায় প্যারেডে ড্রোনগুলি প্রদর্শিত হয়। এর আগে সিরিয়া, লিবিয়া এবং ককেশাসের নাগোর্নো কারাবাখে এই ‘বায়রাকতার টিবি-২’ ড্রোনগুলি ব্যাপক সাফল্য পেয়েছিল। কিন্তু সেসব যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। এবার ইউক্রেনের যুদ্ধে ব্যাপারটা পুরোপুরিভাবে আলাদা। রাশিয়া একটা বড় শক্তি এবং তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যথেষ্ট শক্তিশালী বলেই সকলে মনে করেন। একারণেই পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা ইউক্রেনে ড্রোনগুলির সাফল্য দেখে বুঝে উঠতে পারছেন না যে ব্যাপারটা কি করে সম্ভব হচ্ছে। যুদ্ধ শুরু হবার পর ৩রা মার্চ ইউক্রেন সরকার ঘোষণা দেয় যে, তারা তুরস্ক থেকে ড্রোনের নতুন একটা চালান পেয়েছে। তবে তারা ড্রোনের সংখ্যা বলেননি। তুর্কি কর্মকর্তারা রুশদের রক্তচক্ষু এড়াতে ঘোষণা দেন যে, একটা তুর্কি বেসরকারি কোম্পানি চুক্তি অনুযায়ী ডেলিভারি দিয়েছে। আর এরকম ড্রোন শুধু ইউক্রেন নয়, দুনিয়ার অনেক দেশেই বিক্রি করেছে তুর্কিরা। সঠিক সংখ্যা জানা না থাকলেও অনেকেই বলছেন যে, ২০ থেকে ৫০টার মতো ‘বায়রাকতার’ ড্রোন তুর্কিরা এপর্যন্ত ইউক্রেনকে সরবরাহ করেছে।
মার্কিন মিডিয়া ‘এনবিসি’র সাথে কথা বলতে গিয়ে ব্রিটিশ সাংবাদিক এবং ড্রোন যুদ্ধের উপর বইএর লেখক ডেভিড হ্যাম্বলিং বলছেন যে, এই ড্রোনগুলি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিমানের মতো। মাত্র ১’শ ১০ হর্সপাওয়ারের ইঞ্জিনচালিত এই ড্রোনগুলি অতি সহজেই টার্গেট করতে পারার কথা। সবচাইতে অবাক ব্যাপার হলো ড্রোনের ফুটেজে দেখা যাচ্ছে যে, রুশ বিমানধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এই ড্রোনগুলি ধ্বংস করে ফেলছে! অথচ এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাগুলিই ড্রোন ভূপাতিত করার সবচাইতে ভালো অস্ত্র হবার কথা ছিল। এছাড়াও রুশ ইলেকট্রনিক জ্যামিং ব্যবস্থাও বেশ ভালো। সেগুলিও তো এই ড্রোনগুলিকে অকার্যকর করে ফেলার কথা। তিনি বলছেন যে, পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা খুব সম্ভবতঃ রুশ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতাকে বড় করে দেখেছেন। হ্যাম্বলিং বলছেন যে, আর কিছু না হোক, অন্ততঃ রুশ ফাইটার বিমান দিয়েও তো এই ড্রোনগুলিকে ভূপাতিত করা যেতো। হয় রুশরা নিজেদের কাজে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে; অথবা ইউক্রেনিয়রা নতুন কোন ট্যাকটিকস খুঁজে পেয়েছে কার্যকর হামলার জন্যে।
সুইজারল্যান্ডের ‘ইটিএইচ জুরিখ’ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মাউরো গিলি ‘আল জাজিরা’কে বলছেন যে, যেহেতু এহেন ড্রোনগুলিকে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সহজেই টার্গেট করতে পারে, তাই এগুলিকে রক্ষা করার জন্যে ইলেকট্রনিক জ্যামারের সমন্বয়ে কাজ করাটা জরুরি। লিবিয়াতে অবশ্য রুশরা বেশকিছু তুর্কি ড্রোন ভূপাতিত করেছিল। ইউক্রেনে এদের সাফল্য বলে দিচ্ছে যে, হয়তো রুশরা বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সাথে না নিয়ে এগুচ্ছে। এটা অসম্ভব নয়, কারণ রুশরা বেশ বড় রকমের লজিস্টিক্যাল সমস্যার মাঝে রয়েছে। অথবা এমনও হতে পারে যে, ইউক্রেনিয়ানরা অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক জ্যামার হাতে পেয়েছে।
এই ড্রোনগুলি পুরো যুদ্ধকে কতটা প্রভাবিত করবে, সেটা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে ড্রোনগুলি আন্তর্জাতিক অস্ত্রের বাজারে তুরস্কের অবস্থানকে আরও উপরে উঠিয়েছে। একেকটা তুর্কি ‘বায়রাকতার’ ড্রোনের মূল্য প্রায় ২ মিলিয়ন ডলার; যা আকাশে ওড়া যেকোন বিমানের মূল্যের তুলনায় কিছুই নয়। অন্ততঃ শক্তিশালী রুশ বিমান বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে পশ্চিমারা যখন ইউক্রেনকে কোন বিমান দিচ্ছে না, তখন এই ড্রোনগুলিই রুশদের উপরে বিমান হামলার স্বাদ দিচ্ছে এবং ইউক্রেনিয়ানদের অনলাইন প্রচারণার কেন্দ্রে থাকছে। যে ব্যাপারটা নিশ্চিত তা হলো, পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা এই ড্রোনগুলি যে ইউক্রেনে কোনরূপ সাফল্য পেতে পারে, সেটা বিশ্বাসই করেননি। রুশ অত্যাধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কমদামি ধীরগতির ড্রোনের সফলতা দেখিয়ে দেয় যে, কোনকিছুই অজেয় নয়। তুর্কি ড্রোনের সফলতা নিশ্চিত করলো যে, সামনের দিনগুলিতে ইউক্রেনের আকাশে আরও বিভিন্ন আকারের এবং ধরণের ড্রোন দেখা যাবে; যার মাঝে ক্ষুদ্র এবং মাঝারি সুইসাইড ড্রোনও থাকবে।

