Showing posts with label Donbas. Show all posts
Showing posts with label Donbas. Show all posts

Saturday, 2 July 2022

রাশিয়া কি ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের ডনবাসে যুদ্ধ জিততে চলেছে?

০২রা জুলাই ২০২২

 
ইউক্রেনের পূর্বের শহর সেভেরোডোনেতস্কের উপর রুশ আর্টিলারির হামলা হচ্ছে। আপাততঃ ডনবাসের যুদ্ধ দীর্ঘ করার মার্কিন লক্ষ্যকে মেনে নেয়া ছাড়া ইউক্রেনিয়ানদের সামনে কোন পথ খোলা নেই। তবে সেই পথে সেভেরোডোনেতস্কের মতো শহরের পতন দেখিয়ে দেয় যে, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পরেও রাশিয়া হয়তো ধীরে ধীরে পুরো ডনবাস দখলে নিয়ে নিতে পারে; যার পরবর্তীতে যুদ্ধের ইতি টানার একটা পদক্ষেপ হয়তো ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে দেখা যেতে পারে; যা মার্কিন নীতির বিরুদ্ধ।


গত ২৫শে জুন রাশিয়া ঘোষণা দেয় যে, তাদের সেনারা ইউক্রেনের পূর্বের ডনবাস অঞ্চলের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহর সেভেরোডোনেতস্ক পুরোপুরিভাবে দখল করে নিয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই রুশ বাহিনীর মূল টার্গেট ছিল এই শহর; আর্টিলারি এবং বিমান হামলায় এখন এই শহরের খুব কমই অবশিষ্ট রয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলদিমির জেলেন্সকি এক বার্তায় শহরটা হারাবার কথা স্বীকার করেন এবং বলেন যে, দিনটা ইউক্রেনের মনোবল এবং আবেগের জন্যে খুবই কঠিন একটা দিন। ‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সেভেরোডোনেতস্ক শহর দখলের মাধ্যমে ইউক্রেনের ডনবাস অঞ্চলে রাশিয়ার কৌশলগত লক্ষ্য বাস্তবায়ন আরও এগিয়ে গেলো। ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ এবং উত্তরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শহর ছেড়ে আসতে বাধ্য হবার পর থেকে ডনবাসের নিয়ন্ত্রণ নেয়াই রাশিয়ার মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ডনবাস অঞ্চল ডোনেতস্ক এবং লুহানস্ক নামে দু’টা ভাগে বিভক্ত। এই দু’টার যেকোন একটার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তার একটা বড় বিজয় বলে দেখাতে পারবেন। অন্ততঃ যুদ্ধ শুরুর পর থেকে নানা বিপর্জয়ের মাঝে রুশ বাহিনীর জন্যে সত্যিকারের যেকোন বিজয় অতি গুরুত্বপূর্ণ। সেভেরোডোনেতস্ক শহরের নিয়ন্ত্রণ নেবার পর রাশিয়ার জন্যে পুরো লুহানস্ক এলাকা নিয়ন্ত্রণ নেয়াটা আরও একধাপ এগিয়ে গেলো। তবে পুরো লুহানস্কের নিয়ন্ত্রণ রাশিয়ার জন্যে নিশ্চিত হচ্ছে না অত তাড়াতাড়ি। এই মুহুর্তে তাদের পথে রয়েছে ইউক্রেনের আরেক শহর লিসিচানস্ক। সেভেরোডোনেতস্ক শহর থেকে পিছু হটে ইউক্রেনিয়ান সেনারা খুব সম্ভবতঃ লিসিচানস্কেই গিয়েছে।

‘বিবিসি’র বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, সেভেরোডোনেতস্ক এবং লিসিচানস্ক উভয় শহরই সিভার্স্কি ডোনেতস নদীর তীরে অবস্থিত। একমাস আগে এই নদীটা একবার অতিক্রম করতে গিয়ে রুশরা পুরো একটা ব্যাটালিয়ন হারায়। সেই ব্যর্থ মিশনে ইউক্রেনের আর্টিলারি হামলায় কয়েক’শ রুশ সেনা প্রাণ হারায় এবং কয়েক ডজন সাঁজোয়া যান ধ্বংস হয়। এই নদীর উপর সকল সেতু ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। এখন লিসিচানস্ক শহর দখলে নিতে হলে রুশদেরকে এই নদীই অতিক্রম করতে হবে। কাজেই এই নদী এখন রুশদের সামনে একটা বড় প্রাকৃতিক বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে। শুধু তাই নয়, লিসিচানস্ক শহরটা একটা পাহাড়ের উপর অবস্থিত হওয়ায় এই শহরের নিয়ন্ত্রণ নেয়াটা খুব সহজ কাজ হবে না।

 
পুরো লুহানস্কের নিয়ন্ত্রণ রাশিয়ার জন্যে নিশ্চিত হচ্ছে না অত তাড়াতাড়ি। এই মুহুর্তে তাদের পথে রয়েছে ইউক্রেনের আরেক শহর লিসিচানস্ক। সেভেরোডোনেতস্ক এবং লিসিচানস্ক উভয় শহরই সিভার্স্কি ডোনেতস নদীর তীরে অবস্থিত। একমাস আগে এই নদীটা একবার অতিক্রম করতে গিয়ে রুশরা পুরো একটা ব্যাটালিয়ন হারায়। এখন লিসিচানস্ক শহর দখলে নিতে হলে রুশদেরকে এই নদীই অতিক্রম করতে হবে। এখন রাশিয়ার সামনে করণীয় হলো এই শহরটাকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করা।

‘ইন্সটিটিউট ফর দ্যা স্টাডি অব ওয়ার’ যুদ্ধের প্রথম থেকেই প্রতিদিন ব্রিফিং দিচ্ছে। ২৪শে জুন তাদের বিশ্লেষণে বলা হয় যে, এটা এখন বোধগম্য যে, ইউক্রেনের সেনারা লিসিচানস্কের উঁচু ভূমিতে অবস্থান নেবে; যেখান থেকে তারা হয়তো বেশ কিছু সময় রুশ হামলা প্রতিহত করতে পারবে। এখন রাশিয়ার সামনে করণীয় হলো এই শহরটাকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করা। সেই লক্ষ্যে রুশরা লিসিচানস্ক শহরকে দক্ষিণ দিক থেকে আক্রমণের চেষ্টা চালাচ্ছে। রুশ সমর্থিত ইউক্রেনিয়ানদের মুখপাত্র আন্দ্রেই মরোচকো সাংবাদিকদের বলেন যে, তারা এখন যে গতিতে এগুচ্ছেন, তাতে তারা শিগগিরই পুরো লুহানস্ক অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিতে সক্ষম হবেন। তাদের অবস্থান থেকে তারা এখন লিসিচানস্কে ইউক্রেনিয়ান সেনাদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম বলে বলেন তিনি।

কেউ কেউ সেভেরোডোনেতস্ক নিয়ন্ত্রণে যাওয়াকে একটা প্রতীকী বিজয় হিসেবে দেখছেন; যার কৌশলগত গুরুত্ব অপেক্ষাকৃত কমই। ইউক্রেনের সাবেক জেনারেল ইহর রোমানেঙ্কো ‘আল জাজিরা’কে বলছেন যে, সেভেরোডোনেতস্ক তার দায়িত্ব পালন করেছে। সামরিক দিক থেকে ধ্বংসপ্রাপ্ত একটা শহরের গুরুত্ব খুব কমই। রুশরা অনেক শক্তি ক্ষয় করেছে; যা সামনের দিনের যুদ্ধে তাদের সাফল্যের সম্ভাবনাকে কমিয়ে দেবে। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইন্সটিটিউট ফর ওয়ার’এর হিসেবে এই শহরের পতন যুদ্ধক্ষেত্রে কোন কিছুই নিশ্চিত করেনি। আরেক মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘জেমসটাউন ফাউন্ডেশন’এর বিশ্লেষক পাভেল লুজিন ‘আল জাজিরা’কে বলছেন যে, ইউক্রেনের সেনারা অনেকদিন ধরেই একটা বড় রুশ বাহিনীকে আটকে রেখে পরবর্তীতে পিছু হটেছে। রাশিয়ার কাছে সময় গুরুত্বপূর্ণ; কারণ রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিস্থাপনযোগ্য নয়। এই মুহুর্তে লুহানস্ক অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ রাশিয়ার কাছে চলে যেতে পারে বলে মনে হচ্ছে। লুহানস্কের গুরুত্বপূর্ণ কারখানা এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক স্থাপনাগুলি ২০১৪ সাল থেকে রুশ সমর্থিত মিলিশিয়াদের হাতেই রয়েছে। তবে ডোনেতস্ক অঞ্চল, যা লুহানস্কের চাইতে অনেক বড়, সেটার ৪০ শতাংশ ভূমি এখনও ইউক্রেনের অধীনেই রয়েছে। আর যেহেতু সেই অঞ্চলে ইউক্রেনিয়ানরা ২০১৪ সাল থেকে সামরিক স্থাপনা তৈরি করে আসছে, তাই সেটা দখলে নেয়াটা রুশদের জন্যে আরও অনেক কঠিন হবে। ইউক্রেনের বিশ্লেষক লিস্ট আলেক্সেই কুশ্চএর মতে, মারিউপোল শহর হারানোটা ইউক্রেনের জন্যে অনেক বড় ক্ষতি ছিল; কারণ সেটা ছিল সমুদ্রবন্দর এবং সেখানে ইউক্রেনের বেশিরভাগ লৌহজাত পণ্য তৈরি হতো।

যুদ্ধের শুরুতেই রাশিয়া মারাত্মক ভুল করেছে এই ভেবে যে, ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতাকে রুশরা হয়তো খুব সহজেই ধ্বংস করে ফেলতে পারবে। আর ইউক্রেনকে যে পশ্চিমারা সামরিক সহায়তা দেবে, সেটাও হয়তো পুতিন হিসেবের মাঝে নেননি। হয়তো ইউক্রেনের যুদ্ধ খুব দ্রুত শেষ হয়ে যাবে ধারণা করেই তিনি এমনটা মনে করেছিলেন। মার্কিন নেতৃত্বও ইউক্রেন যুদ্ধের প্রথমে নিশ্চিত ছিল না যে, ইউক্রেনের সেনাবাহিনী টিকতে পারবে কিনা। সেকারণে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে সামরিক সহায়তার ঘোষণা আসতে বেশ সময় লেগেছে। তথাপি ইউক্রেনের হারানো ভূমি পুনরুদ্ধার করার জন্যে যেসব অস্ত্র প্রয়োজন ছিল, সেগুলি মার্কিনীরা সরবরাহ করতে যথেষ্ট গরিমসি করেছে। ডনবাসে রুশদের লক্ষ্য নির্ধারিত হবার পরেই মার্কিনীরা ইউক্রেনকে ট্যাংক এবং আর্টিলারির মতো অস্ত্র দিতে শুরু করে। তবে সেগুলির সংখ্যা যেমন অপ্রতুল, তেমনি পশ্চিমারা ইউক্রেনকে কোন যুদ্ধবিমান সরবরাহ না করায় রুশ শক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে জয়লাভ করা ইউক্রেনিয়ানদের জন্যে প্রায় অসম্ভবই ঠেকছে। আপাততঃ ডনবাসের যুদ্ধ দীর্ঘ করার মার্কিন লক্ষ্যকে মেনে নেয়া ছাড়া ইউক্রেনিয়ানদের সামনে কোন পথ খোলা নেই। তবে সেই পথে সেভেরোডোনেতস্কের মতো শহরের পতন দেখিয়ে দেয় যে, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পরেও রাশিয়া হয়তো ধীরে ধীরে পুরো ডনবাস দখলে নিয়ে নিতে পারে; যার পরবর্তীতে যুদ্ধের ইতি টানার একটা পদক্ষেপ হয়তো ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে দেখা যেতে পারে; যা মার্কিন নীতির বিরুদ্ধ।

Thursday, 28 April 2022

যুক্তরাষ্ট্র কি ইউক্রেন যুদ্ধকে চালিয়ে নিতে পারবে?

২৯শে এপ্রিল ২০২২

২৫শে এপ্রিল ২০২২। রাশিয়ার ব্রিয়ান্সক শহরের দু'টা জ্বালানি তেলের ডিপোতে প্রায় একই সময়ে বিস্ফোরণ ঘটে। ডনবাসের যুদ্ধের ধরণের কারণেই উভয় পক্ষ একে অপরের লজিস্টিকসের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিগুলির উপর হামলা করতে থাকবে। উভয় পক্ষই অপরের ক্ষয়ক্ষতি বৃদ্ধি করতে চাইছে। এর অর্থ হলো, উভয় পক্ষের জন্যেই যুদ্ধের খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রতিদিন।


২৫শে এপ্রিল ইউক্রেন রেলওয়েজের প্রধান ওলেক্সান্দর কামিশিন এক ‘টেলিগ্রাম’ বার্তায় বলেন যে, রুশরা এক ঘন্টার ব্যবধানে ইউক্রেনের পাঁচটা রেলস্টেশনে হামলা করেছে। এই হামলার মাধ্যমে এটা পরিষ্কার যে, রুশরা ইউক্রেনের রেল নেটওয়ার্ককে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করছে। ‘পলিটিকো’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, এই আক্রমণের মাত্র দু’দিন আগেই ইউক্রেন পোল্যান্ডের সাথে সীমান্ত রেলওয়ে ব্যবহার সহজীকরণের ব্যাপারে একটা সমঝোতা স্বাক্ষর করেছে। ইউক্রেনের সমুদ্রবন্দরগুলি যখন রুশ অবরোধের মাঝে রয়েছে, তখন এই চুক্তি ইউক্রেনে মালামাল আনানেয়ার পিছনে অনেক বড় সহায়তা দেবে। ইউক্রেন তার পুরো পরিবহণ ব্যবস্থাকে সমুদ্রবন্দর থেকে সরিয়ে রাস্তা, রেলওয়ে এবং অভ্যন্তরীণ নৌপথের দিকে নিয়ে আসতে হিমসিম খাচ্ছে। ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী ডেনিস শামিহাল বলছেন যে, পোল্যান্ডের সাথে সমঝোতা রেলের মাধ্যমে ইউক্রেনের বহির্বাণিজ্যকে বহুগুণে বাড়াতে সহায়তা দেবে। তবে পোল্যান্ডের সীমানা দিয়ে রেলযোগাযোগ যে ইউক্রেনের পূর্বে ডনবাসে যুদ্ধের জন্যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা ইউক্রেনের রেল ব্যবস্থার উপর রুশ হামলাই বলে দিচ্ছে।

লজিস্টিকসের উপর পাল্টাপাল্টি হামলা

তবে উভয় পক্ষই ডনবাসের যুদ্ধে লজিস্টিকসের গুরুত্ব বুঝতে পেরে একে অপরের গুরুত্বপুর্ণ সাপ্লাই ব্যবস্থার উপর হামলা করছে। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, ২৭শে এপ্রিল ইউক্রেনের সীমানায় অবস্থিত তিনটা রুশ অঞ্চলে ভোর বেলায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। ইউক্রেনের সীমানা থেকে ৪০ কিঃমিঃএর কম দূরত্বে থাকা বেলগোরদ শহরের একটা গোলাবারুদের স্টোরে আগুন লেগেছে বলে বলেন বেলগোরদের গভর্নর ভিয়াচিস্লাভ গ্লাদকভ। এই একই শহরে কিছুদিন আগেই দু’টা হেলিকপ্টার একটা জ্বালানি তেলের ডিপোতে হামলা করে বলে সোশাল মিডিয়াতে প্রকাশ করা ভিডিওতে দেখা যায়। রুশরা ইউক্রেনকে সেই হামলার জন্যে দায়ী করলেও ইউক্রেন তা স্বীকার করেনি। বেলগোরদ ছাড়াও ইউক্রেন সীমানা থেকে প্রায় ১’শ ৬০ কিঃমিঃ দূরে কুর্স্ক অঞ্চলের গভর্নর রোমান স্টারোভোইত বলছেন যে, সেখানেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গিয়েছে। তিনি বলেন যে, খুব সম্ভবতঃ ইউক্রেনের ড্রোন হামলা ঠেকাতে রুশ বিমান বিধ্বংসী অস্ত্রের গোলাবর্ষণের শব্দ ছিলো সেগুলি। কোন ক্ষয়ক্ষতি সেখানে হয়নি। তবে পার্শ্ববর্তী ভরোনেজ অঞ্চলের দুই জায়গায় বিস্ফোরণ হয়েছে বলে বলেছে রুশ বার্তা সংস্থা ‘তাস’। এর আগে ইউক্রেনের রেলওয়ের উপর রুশ হামলার দিন, অর্থাৎ ২৫শে এপ্রিল ইউক্রেনের সীমানা থেকে ১’শ ৫০ কিঃমিঃ দূরে রুশ শহর ব্রিয়ান্সক হামলার শিকার হয়। শহরের দু’টা বেসামরিক ও সামরিক জ্বালানি তেলের ডিপোতে প্রায় একইসাথে বিশাল বিস্ফোরণ হয়। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে সাবেক মার্কিন ম্যারিন কোর সদস্য এবং থিংকট্যাঙ্ক ‘ফরেন পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউট’এর ফেলো রব লী বলেন যে, ভিডিও ফুটেজগুলি দেখে মনে হচ্ছে যে, এই বিস্ফোরণগুলি খুব সম্ভবতঃ ইউক্রেনের হামলা। ইউক্রেনের সীমানা থেকে দূরত্ব দেখে বলা যায় যে, এই হামলায় ইউক্রেনিয়ানরা হয় ‘টচকা-ইউ’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অথবা তুর্কি নির্মিত ‘বায়রাকতার টিবি-২’ ড্রোন ব্যবহার করে করেছে। ইউক্রেনিয়ানরা যদি এটা করে থাকে, তাহলে তারা রুশ সাপ্লাই লাইনকে সমস্যায় ফেলার জন্যেই এটা করেছে। এর আগে ১২ই এপ্রিল ‘দ্যা গার্ডিয়ান’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, বেলগোরদের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা রেলসেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ছবি দেখে অনেকেই ধারণা করছেন যে, সেটা কোন বিস্ফোরণের কারণে হতে পারে; যার পিছনে কোন স্যাবোটাজ জাতীয় কর্মকান্ড থাকতে পারে। রুশরা ডনবাসে তাদের সামরিক কর্মকান্ড চালিয়ে নিতে রেলওয়ের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। রাশিয়ার ভেতরে পূর্ববর্তী কোন হামলার দায় ইউক্রেনিয়ানরা স্বীকার না করলেও ২৭শে এপ্রিল ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা মিখাইলো পদোলিয়াক এক বার্তায় বলেন যে, যদি রুশরা ইউক্রেনের মানুষ হত্যা করে যেতে থাকে, তাহলে রুশ কর্মকান্ডে সহায়তাকারী ডিপোগুলি যেসব অঞ্চলে রয়েছে, সেই অঞ্চলগুলিকেও হিসেব দিতে হবে। তিনি সরাসরিই বলেন যে, বেলগোরদ এবং ভরোনেজ অঞ্চলের ডিপোগুলিকে ধ্বংস করাটা একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তারা তাদের কর্মফল ভোগ করছে। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, এই ঘটনাগুলি রুশ সামরিক লজিস্টিকসের দুর্বলতাগুলিকে তুলে ধরেছে।

ইউক্রেন যুদ্ধে উভয় পক্ষের টার্গেট করা লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক। উভয় পক্ষই ডনবাসের যুদ্ধের গুরুত্ব বুঝতে পারছে। যুদ্ধ দীর্ঘ হতে থাকলে লজিস্টিকসের উপর হামলার ক্ষেত্রে রুশরা অবশ্যই এগিয়ে থাকবে, যদি ইউক্রেন তাদের সাপ্লাই লাইনগুলির সংখ্যা বৃদ্ধি করতে না পারে এবং আরও উন্নয়ন করতে সক্ষম না হয়। ডনবাসে যেপক্ষ ভালোভাবে সাপ্লাই পাবে, তাদেরই জয়ের সম্ভাবনা বেশি থাকবে।

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘দি আটলান্টিক কাউন্সিল’এর এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, ডনবাসের যুদ্ধের ধরণের কারণেই উভয় পক্ষ একে অপরের লজিস্টিকসের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিগুলির উপর হামলা করতে থাকবে। ইউক্রেনের রেলস্টেশনগুলির উপর হামলায় রুশরা নিখুঁত নিশানায় হামলা করেছে, যেখানে হয়তো আকাশ থেকে ছোঁড়া অস্ত্র অথবা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘ হতে থাকলে লজিস্টিকসের উপর হামলার ক্ষেত্রে রুশরা অবশ্যই এগিয়ে থাকবে, যদি ইউক্রেন তাদের সাপ্লাই লাইনগুলির সংখ্যা বৃদ্ধি করতে না পারে এবং আরও উন্নয়ন করতে সক্ষম না হয়। ডনবাসে যেপক্ষ ভালোভাবে সাপ্লাই পাবে, তাদেরই জয়ের সম্ভাবনা বেশি থাকবে। বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, অবশেষে মার্কিন সরকার তাদের নীতিতে পরিবর্তন এনে ইউক্রেনকে আক্রমণে যাবার মতো অস্ত্র দিতে শুরু করেছে। এর আগে ট্রেনিং দেয়ার সমস্যার কথা বলে জো বাইডেনের প্রশাসন ইউক্রেনকে অনেক অস্ত্রই দিতে চায়নি। এখন তারা সেটাই করছে। প্রতিবেদনে ইউক্রেনের জন্যে শুধুমাত্র সোভিয়েত আমলের অস্ত্র যোগাড় করতে নিষেধ করা হয়; কারণ সেই অস্ত্রগুলি একসময় গোলাবারুদের অভাবের মাঝে পড়ে যাবে। কাজেই ইউক্রেনকে পশ্চিমা নির্মিত অস্ত্র, বিশেষ করে ‘এফ-১৬’ যুদ্ধবিমান, ইস্রাইলের ‘আয়রন ডোম’এর মতো বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, নিখুঁতভাবে টার্গেট করতে পারা ‘হিমার্স’ রকেট সিস্টেম, এবং ‘এনএসএম’ ও ‘হারপুন’এর মতো জাহাজ ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করা উচিৎ।

 
যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের যুদ্ধে সরাসরি না জড়িয়েও এর ফলাফলের অনেকটাই ভোগ করছে। করোনা মহামারির পর ব্যাপক মূল্যস্ফীতির মাঝে যখন মার্কিন জনগণই তাদের সংসার চালাতে হিমসিম খাচ্ছে, তখন ইউক্রেনের জন্যে কত বিলিয়ন ডলারের সহায়তা যুক্তরাষ্ট্র বরাদ্দ দিতে সক্ষম হবে, তা প্রশ্নাতীত নয়। এই ব্যাপারগুলি পৃথিবীর অন্য আরেক প্রান্তে আরেকটা যুদ্ধে জড়াবার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতাকে যথেষ্টই খর্ব করেছে।

যুদ্ধের অর্থায়ন আসবে কোত্থেকে?

কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে এই যুদ্ধের অর্থায়নের ক্ষেত্রে। ২১শে এপ্রিল এবং ২৫শে এপ্রিলের নিরাপত্তা সহায়তা যোগ করার পর ইউক্রেনের জন্যে মার্কিন সহায়তার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। অথচ যুদ্ধ এখন পর্যন্ত মাত্র দু’মাস চলেছে। অনেকেই মনে করছেন যে, এই যুদ্ধ কয়েক বছর স্থায়ী হতে পারে; কারণ কোন পক্ষই হারতে চাইছে না। ২৮শে এপ্রিল ওয়াশিংটনে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের বলেন যে, ইউক্রেনকে সহায়তা করার জন্যে এর আগে কংগ্রেসের কাছ থেকে চাওয়া ১৪ বিলিয়ন ডলারের প্যাকেজকে বৃদ্ধি করে ৩৩ বিলিয়ন ডলার করার চেষ্টা চলছে; যার মাঝে ২০ বিলিয়ন ডলারই থাকবে সামরিক সহায়তা; আর বাকিটা অর্থনৈতিক এবং মানবিক সহায়তা। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন যে, তারা তাদের ‘জি-৭’ সহযোগী দেশগুলির কাছ থেকে একই রকমের সহায়তা আশা করছেন। এই সহায়তা দেয়ার জন্যে মার্কিনীরাই আসলে কতটা প্রস্তুত, তা নিয়েই প্রশ্ন থাকছে।

২৭শে এপ্রিল ‘ডিফেন্স নিউজ’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ব্যাপক মূল্যস্ফীতির ফলাফলস্বরূপ ২০২২ সালে জ্বালানি তেলের জন্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্যে বরাদ্দকৃত বাজেটের চাইতে ৩ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত খরচ হতে চলেছে; যার জন্যে কংগ্রেসের কাছে অর্থ চাওয়া হয়েছে। মার্কিন সরকার পেন্টাগনের ২০২৩ সালের বাজেট ৪ শতাংশ বা ৩০ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি করে ৮’শ ১৩ বিলিয়ন ডলার করতে চাইছে। তবে অনেকেই অভিযোগ করছেন যে, বাজেটে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে মূল্যস্ফীতির ব্যাপারটা ঠিকমতো সমন্বয় করা হয়নি। অপরদিকে ‘সিএনবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে বছরে ১ লক্ষ ডলার আয় করা ব্যক্তিরাও মূল্যস্ফীতির কারণে দৈনন্দিন খরচ, বিশেষ করে মুদিপণ্য এবং জ্বালানি তেলের খরচ বহণে হিমসিম খাচ্ছে। তাদের আয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ চলে যায় বাড়িভাড়া দিতে; এরপর রয়েছে গাড়ির দেনা শোধ; জ্বালানি তেল; ক্রেডিট কার্ডের বিল। সকল কিছুরই মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে বলে বলছেন অনেকে। ‘এক্সপেরিয়ান’এর এক জরিপের উল্লেখ করে বলা হচ্ছে যে, ৭১ শতাংশ মার্কিন জনগণ মনে করছে না যে, তাদের ‘পে-চেক’ মূল্যস্ফীতির সাথে খাপ খাওয়াতে পারছে। অপরদিকে ২৯ শতাংশ বলছে যে, তারা বর্তমান মাসে কোনমতে তাদের খরচ মেটাতে পারবে; আর আরও প্রায় একই সংখ্যক মানুষ বলছে যে, পরের মাসে তাদের বাজেটের চাইতে খরচ বেশি হবে। ‘লেনডিং ক্লাব’এর আরেক জরিপ বলছে যে, প্রায় ৬২ শতাংশ মানুষ ‘পে-চেক’এর উপর ভর করে চলছে।

ইউক্রেন যুদ্ধে উভয় পক্ষের লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক টার্গেটের অর্থ হচ্ছে উভয় পক্ষই অপরের ক্ষয়ক্ষতি বৃদ্ধি করতে চাইছে। এর অর্থ হলো, উভয় পক্ষের জন্যেই যুদ্ধের খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রতিদিন। ‘দি আটলান্টিক কাউন্সিল’এর প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ইউক্রেনকে শুধুমাত্র কোনমতে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে বাইডেন প্রশাসন এতদিন যেসব অস্ত্র দিয়েছে, সেগুলি দীর্ঘ যুদ্ধের জন্যে মোটেই যথেষ্ট নয়; বিশেষ করে ডনবাসের সমতলভূমিতে যুদ্ধ করতে গেলে যার কাছে গোলাবর্ষণের সক্ষমতা বেশি থাকবে, জেতার সম্ভাবনা তারই বেশি থাকবে। ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত ১৫৫ মিঃমিঃ আর্টিলারি, ওয়েপন লোকেটিং রাডার, ‘সুইচব্লেইড’ এবং ‘ফিনিক্স ঘোস্ট’ সুইসাইড ড্রোন ইত্যাদি অস্ত্র ইউক্রেনকে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে প্রশ্ন হলো, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও মার্কিন অর্থনীতির উপর চাপ সামলে নিয়ে ইউক্রেনকে যুক্তরাষ্ট্র কতটুকু সহায়তা দিতে সক্ষম? ইউক্রেনের প্রতিদ্বন্দ্বী তালিবানের মতো কোন সংগঠন নয়, বরং রাশিয়ার মতো পারমাণবিক শক্তিধর একটা ‘গ্রেট পাওয়ার’। রাশিয়াকে ইউক্রেনে হারাতে যে অর্থায়নের প্রয়োজন, তা মাত্র দুই মাসেই পাহাড়সম হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডনবাসের যুদ্ধে যেসব অস্ত্রের দরকার পড়ছে, সেগুলি হবে আরও বেশি দামী। এছাড়াও রয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর অস্ত্রের স্টকের প্রশ্ন। মার্কিনীরা ডনবাসের যুদ্ধ শুরুর আগেই তাদের নিজেদের সামরিক বাহিনীর এক তৃতীয়াংশ ‘জ্যাভেলিন’ ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং এক চতুর্থাংশ ‘স্টিংগার’ বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ইউক্রেনকে সরবরাহ করেছে; যেগুলির স্টক তৈরি করতে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বছর লেগেছিল। মোটকথা, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের যুদ্ধে সরাসরি না জড়িয়েও এর ফলাফলের অনেকটাই ভোগ করছে। করোনা মহামারির পর ব্যাপক মূল্যস্ফীতির মাঝে যখন মার্কিন জনগণই তাদের সংসার চালাতে হিমসিম খাচ্ছে, তখন ইউক্রেনের জন্যে কত বিলিয়ন ডলারের সহায়তা যুক্তরাষ্ট্র বরাদ্দ দিতে সক্ষম হবে, তা প্রশ্নাতীত নয়। এই ব্যাপারগুলি পৃথিবীর অন্য আরেক প্রান্তে আরেকটা যুদ্ধে জড়াবার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতাকে যথেষ্টই খর্ব করেছে।

Tuesday, 29 March 2022

ইউক্রেন যুদ্ধ… রুশ কৌশলে বড় পরিবর্তন?

২৯শে মার্চ ২০২২

কিয়েভের বাইরে বুচায় রুশ সামরিক গাড়ির ধ্বংসস্তূপ। রাশিয়া এখন বাধ্য হচ্ছে একটা করে টার্গেট নিয়ে এগুতে। বর্তমানে দক্ষিণের মারিউপোল শহর এখন তাদের ফোকাস; এরপর তারা খুব সম্ভবতঃ খারকিভের দিকে মনোযোগ দেবে। এরপর তারা হয়তো নীপার নদী বরাপর উত্তর দিকে ধাবিত হয়ে খারকিভের সাথে মিলিত হতে চেষ্টা করবে, যাতে করে ডনবাসে ইউক্রেনের সকল বাহিনীকে ঘিরে ফেলা যায়। যদি রুশরা খারসন শহর ধরে রাখতে পারে, তাহলে তারা হয়তো একটা যুদ্ধবিরতির দিকে যেতে পারে, যার মাঝে ডনবাস থেকে ক্রিমিয়া পর্যন্ত যোগাযোগের নিয়ন্ত্রণ রুশদের হাতে থাকবে।

একমাস যুদ্ধের পর গত ২৫শে মার্চ রুশ নেতৃত্ব বলছে যে, ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে তাদের সামরিক মিশনের প্রথম ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। ঘোষণায় বলা হচ্ছে যে, রুশরা এখন পূর্বের ডনবাস অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি প্রতিষ্ঠার জন্যে কাজ করবে। ‘ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’এর রাফায়েল লস ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, ইউক্রেনের সেনারা রুশ সাপ্লাই লাইনগুলিকে চাপের মাঝে রেখেছে এবং কিছু ক্ষেত্রে তারা রুশ বাহিনীকে ঘিরে ফেলার অবস্থায়ও নিয়ে গেছে। এমতাবস্থায় রুশরা হয়তো তাদের সামরিক অপারেশনকে পুনর্গঠিত করার চেষ্টা করছে; যাতে করে তাদের ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায়। তবে তারা যদি ডনবাসকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারে, তাহলে তারা অবশ্যই কিয়েভের উপর নতুন করে ফোকাস দেবে। কৌশল পরিবর্তনের ঘোষণা হয়তো স্বল্প মেয়াদে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্যে সন্মান বাঁচাবার চেষ্টা হতে পারে। তবে তিনি গত দু’বছরে ইউক্রেন নিয়ে যেধরনের মন্তব্য করেছেন, তাতে এটা নিশ্চিত যে, ইউক্রেন সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়নি। পুতিন বলেছেন যে, ইউক্রেনিয়ানদের পরিচয় রুশ পরিচয় থেকে আলাদা নয়। এমতাবস্থায় পুতিন নিশ্চিতভাবে দীর্ঘমেয়াদে ইউক্রেনের উপর চাপ অব্যাহত রাখবেন।

‘ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন’এর প্রফেসর এগলায়া স্নেতকভ বলছেন যে, গত একমাসের যুদ্ধে মনে হচ্ছে যে, রুশরা প্রায় তিন বা চারটা ভিন্ন স্ট্র্যাটেজি বা বড় পরিসরে কৌশল নিয়ে এগিয়েছে। এই কৌশলগুলি হয়তো এখন সফল হচ্ছে না বলেই পূর্ব ইউক্রেনের সাথে ক্রিমিয়া উপদ্বীপের যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ করাটা এখন তাদের জন্যে মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই যোগাযোগের লজিস্টিক্যাল দিকটা হয়তো রুশদের জন্যে ব্যবস্থাপনা করা অপেক্ষাকৃতভাবে সহজ হতে পারে। এই মুহুর্তে রুশ জনগণও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভ্লাদিমির পুতিনের উপর দোষারোপ না করে পশ্চিমাদের উপর দোষারোপ করছে। কাজেই জনমত হয়তো এখনও পুতিনের সাথেই রয়েছে, যদিও রুশ শীর্ষ নেতৃত্বের মাঝে একটা বোধ এসেছে যে, প্রাথমিকভাবে যে লক্ষ্য নিয়ে তারা এগিয়েছে, সেটা এখন পর্যন্ত সফল হয়নি। রাশিয়ার বিভিন্ন স্থানে হয়তো জনগণ প্রতিবাদ করেছে, কিন্তু সেটা যুদ্ধের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান নয়। আর এই মুহুর্তে পুতিনের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান করার মতো কেউ রয়েছে বলেও মনে হয় না; যদিও পরিস্থিতি পরিবর্তন হতে সময় লাগে না।

মার্কিন ইন্টেলিজেন্স সংস্থা ‘সিআইএ’র প্রাক্তন ডিরেক্টর জেনারেল ডেভিড পেট্রেয়াস কানাডার টেলিভিশন চ্যানেল ‘সিবিসি’কে বলছেন যে, রাশিয়ার সামরিক অপারেশনের মূল লক্ষ্য ছিল রাজধানী কিয়েভ দখল করা, সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা এবং একটা রুশ সমর্থিত সরকারকে তার স্থলাভিষিক্ত করা। তবে এখন পর্যন্ত রুশরা কিয়েভের বাইরে অবস্থান করছে, খারকিভকেও ঘিরে ফেলতে পারেনি, যদিও তারা দক্ষিণে কিছু সফলতা পেয়েছে; যেমন মারুউপোলকে ঘিরে ফেলেছে, ডনবাসের নিয়ন্ত্রণের কাজেও তারা বেশকিছু এগিয়েছে। দক্ষিণের এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেবার পর তারা হয়তো সৈন্য সরিয়ে উত্তর এবং পূর্বের এলাকাগুলিতে মোতায়েন করতে পারে। কমপক্ষে ৭ জন জেনারেল পদের সেনা কর্মকর্তার নিহত হবার খবর পাওয়া যায়; তাদের ৭ হাজার থেকে ১০ হাজার সেনাও হয়তো নিহত হয়েছে। রাশিয়ার নিজস্ব অর্থনীতিও মারাত্মক সমস্যায় পতিত। এমতাবস্থায় তারা ইউক্রেনের সাথে কোন একটা সমঝোতার মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করতে চাইতে পারে। সেক্ষেত্রে তারা হয়তো বলতে পারে যে, ২০১৪ সালে দখলকৃত ক্রিমিয়া উপদ্বীপের সাথে ডনবাস অঞ্চলের সরাসরি স্থলপথ নিশ্চিত হয়ে গেলেই অপারেশনের লক্ষ্য অর্জিত হয়ে যাবে। তারা হয়তো ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর ওডেসা দখলের চেষ্টাটাও বাদ দিতে পারে।

 

ডাচ অনলাইন সামরিক ম্যাগাজিন ‘ওরিক্স’এর স্টাইন মিতজার এবং তার দল ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করে হিসেব করেছেন যে, যুদ্ধে রাশিয়া এবং ইউক্রেনের সামরিক ক্ষয়ক্ষতি কমপক্ষে কত হতে পারে। রুশরা এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ২ হাজার সামরিক গাড়ি হারিয়েছে; যার মাঝে প্রায় ১ হাজার ধ্বংস হলেও প্রায় ৭’শ ৩৫টা ইউক্রেনিয়ানরা দখল করেছে। এই গাড়ির মাঝে ৩’শ ১৫টা ছিল ট্যাংক; যেগুলির মাঝে ১’শ ৪০টা ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; আর বাকি ১’শ ৭৫টা ইউক্রেনিয়ানরা দখল করেছে, অথবা রুশরা ফেলে চলে গেছে। এছাড়াও রুশরা কমপক্ষে ৬’শ ১৫টা অন্যান্য সাঁজোয়া যান; ৬১টা ইঞ্জিনিয়ারিং যন্ত্রপাতি; ৬৩টা ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র; ৬৪টা বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র; ১’শ ৪৪টা আর্টিলারি ও রকেট; ১৭টা যুদ্ধবিমান; ৩৫টা হেলিকপ্টার; ১৬টা মনুষ্যবিহীন ড্রোন; ৩টা যুদ্ধজাহাজ; আরও ৭’শ ৬টা সামরিক গাড়ি; ইত্যাদি আরও অনেক কিছু হারিয়েছে। অপরদিকে ইউক্রেন হারিয়েছে কমপক্ষে ৫’শ ৭৪টা গাড়ি; যার মাঝে রয়েছে ৭৯টা ট্যাংক; ১’শ ৪৯টা অন্যান্য সাঁজোয়া যান; ৫১টা ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র; ৪৭টা আর্টিলারি ও রকেট; ২১টা বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র; ১২টা যুদ্ধবিমান; ১টা হেলিকপ্টার; ৯টা মনুষ্যবিহীন ড্রোন; ১৩টা যুদ্ধজাহাজ; ২’শ ১৮টা অন্যান্য সামরিক গাড়ি; ইত্যাদি আরও অনেক কিছু।

ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘রয়াল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইন্সটিটিউট’ বা ‘রুসি’র সিনিয়র ফেলো জ্যাক ওয়াটলিং ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকার এক লেখায় বলছেন যে, রাশিয়া এখন বাধ্য হচ্ছে একটা করে টার্গেট নিয়ে এগুতে। বর্তমানে দক্ষিণের মারিউপোল শহর এখন তাদের ফোকাস; এরপর তারা খুব সম্ভবতঃ খারকিভের দিকে মনোযোগ দেবে। এরপর তারা হয়তো নীপার নদী বরাপর উত্তর দিকে ধাবিত হয়ে খারকিভের সাথে মিলিত হতে চেষ্টা করবে, যাতে করে ডনবাসে ইউক্রেনের সকল বাহিনীকে ঘিরে ফেলা যায়। যদি রুশরা খারসন শহর ধরে রাখতে পারে, তাহলে তারা হয়তো একটা যুদ্ধবিরতির দিকে যেতে পারে, যার মাঝে ডনবাস থেকে ক্রিমিয়া পর্যন্ত যোগাযোগের নিয়ন্ত্রণ রুশদের হাতে থাকবে। তবে নীপার নদী বরাবর কোন অপারেশনই সহজ হবে না; ইউক্রেনিয়ানরা এটাকে প্রবলভাবে প্রতিহত করতে চাইবে। আপাততঃ তারা অন্যদিকে গুরুত্ব দিলেও ভবিষ্যতে তারা রাজধানী কিয়েভের দিকে মনোযোগ দেবে। যারা এই মুহুর্তে যুদ্ধ বন্ধ করার পক্ষপাতি, তারা হয়তো কিয়েভের নেতৃত্বকে দীর্ঘমেয়াদে রাশিয়ার কাছে কিছু সুবিধা ছেড়ে দিতে ইচ্ছুক থাকবে। অপরদিকে ইউক্রেনের নেতৃত্ব মনে করবে যে, রুশদের আপাততঃ লক্ষ্য ছোট করে আনার অর্থ হলো নিজেদের বৃহত্তর উচ্চাকাংক্ষাগুলিকে ভবিষ্যতের জন্যে জিইয়ে রাখা। তবে প্রশ্ন হলো যে, পশ্চিমারা এই দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে কতটা একমত হতে পারবে।

Sunday, 18 April 2021

পূর্ব ইউক্রেনে কি চাইছেন পুতিন?

১৮ই এপ্রিল ২০২১

সাত বছর আগে রাশিয়া পূর্ব ইউক্রেনে তার সামরিক শক্তি প্রেরণ করে তা অস্বীকার করেছিল; এখনও করছে। সেটা ছিল রাশিয়া গোপন অপারেশন। কিন্তু এবারে রুশরা বড়সর আয়োজন করে সামরিক বাহিনী মোতায়েন করছে। রাশিয়া পশ্চিমা বিশ্বের সামনে ভালবাসার বস্তু হিসেবে আবির্ভূত হবার আশা ছেড়ে দিয়েছে; বরং তারা চাইছে যে, পশ্চিমারা রাশিয়াকে ভয় করুক। রাশিয়া এবারে সৈন্য পাঠায়নি; বার্তা পাঠিয়েছে।


এপ্রিলের শুরু থেকেই ইউক্রেনের সীমান্তে রাশিয়ার সামরিক বাহিনী মোতায়েনের খবর আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হচ্ছে। অনেকেই একে নতুন করে সহিংসতা শুরুর আভাস হিসেবে দেখছেন। ‘নিউ ইয়র্ক টাইম’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, কয়েক বছর ধরে এই সুপ্ত অবস্থায় থাকার পর গত মার্চ মাস থেকেই পূর্ব ইউক্রেনের ডনবাসে ইউক্রেনের সরকারি বাহিনীর সাথে রুশ সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সংঘাত হঠাত করেই বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সাথে যোগ হয়েছে রুশ সৈন্য সমাবেশ। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই সৈন্য সমাবেশের উদ্দেশ্য কি? রাশিয়া বলছে যে, ইউক্রেনের সীমান্তে রুশ সামরিক বাহিনী মোতায়েনের পিছনে মূল কারণ হলো ইউক্রেনের মাটিতে ন্যাটোর সামরিক মহড়া এবং হুমকি। রুশ সরকারি টেলিভিশনে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের বিষয় নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। বক্তারা বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটোর শত্রুতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে রাশিয়া। এই উত্তেজনার মাঝেই ১৩ই এপ্রিল হোয়াইট হাউজ বলে যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ফোন করে কয়েক মাসের মাঝে তৃতীয় কোন দেশে দু’জনের এক শীর্ষ বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছেন। অনেক ইস্যুর মাঝে বাইডেন ইউক্রেনের বিষয়েও কথা বলেন। তিনি বলেন যে, ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব এবং ভৌগোলিক অখন্ডতা রক্ষার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র বদ্ধ পরিকর। একই দিনে ক্রেমলিন থেকেও এই ফোনালাপের কথা স্বীকার করা হয়। ‘ডয়েচে ভেলে’র সাংবাদিক এবং রাশিয়া বিশ্লেষক কনস্টানটিন এগার্ট ‘বিবিসি’র সাথে এক সাক্ষাতে বলেন যে, বাইডেন ও পুতিনের এই খেলায় বাইডেনই প্রথম চোখের পলক ফেলেছেন। বাইডেন কিছুদিন আগেও পুতিনকে ‘খুনি’ আখ্যা দিয়েছিলেন। তিনি প্রশ্ন করেন যে, এখন ফোন করে তিনি কি দুর্যোগ আটকালেন, নাকি বড় কোন ছাড় দিলেন? তবে শীর্ষ বৈঠকের সম্ভাবনা রুশ সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনাকে কমিয়ে দেয়। কারণ তা পুতিনের জন্যে রাষ্ট্রনায়কোচিত হবে না। তবে যেহেতু বাইডেন প্রথমে এই বৈঠকের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, তাই পুতিন সেক্ষেত্রে কিছুটা এগিয়ে থাকবেন।

পুতিনের সাথে বাইডেনের ফোনালাপের পরদিন তুর্কি কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে ‘রয়টার্স’ জানায় যে, যুক্তরাষ্ট্র বসফরাস প্রণালী অতিক্রমের জন্যে দু’টা মার্কিন যুদ্ধজাহাজের জন্যে যে অনুমতি চেয়েছিল, তা তারা বাতিল করেছে। এর পাঁচদিন আগে যুক্তরাষ্ট্র এই অনুমতি চেয়েছিল। অর্থাৎ কৃষ্ণ সাগরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন আপাততঃ বাতিল করা হয়েছে। তুরস্কের ‘আনাদোলু এজেন্সি’ বলছে যে, সামনের দিনে নতুন করে কোন যুদ্ধজাহাজের বসফরাস অতিক্রমের অনুমতিও চাওয়া হয়নি। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন যে, তুরস্কের কর্মকর্তারা হয়তো বুঝতে পারেননি যে, জাহাজগুলি মোতায়েন করার সিদ্ধান্তটা কখনোই নিশ্চিত করা হয়নি। অপরদিকে তুরস্ক বলছে যে, মার্কিনীরা ১৫ দিন আগেই ‘মনট্রিউ কনভেনশন’ অনুযায়ী তুর্কি সরকারকে জানিয়েছিল যে, জাহাজগুলি ১৪ বা ১৫ই এপ্রিল বসফরাস অতিক্রম করবে এবং ৪ঠা মে পর্যন্ত কৃষ্ণ সাগরে থাকবে। ১৯৩৬ সালের এই কনভেনশন অনুযায়ী কৃষ্ণ সাগরের দেশ নয় এমন কোন দেশ কৃষ্ণ সাগরে যুদ্ধজাহাজ প্রেরণ করতে গেলে কমপক্ষে ৮ দিন আগে তুরস্ককে জানাতে হবে। আর একসাথে ৯টার বেশি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা যাবে না; যেগুলি সর্বমোট ১৫ হাজার টনও অতিক্রম করতে পারবে না। আর একটা জাহাজ ১০ হাজার টনের চাইতে বেশি বড় হতে পারবে না। বিদেশী যুদ্ধজাহাজ কৃষ্ণ সাগরে ২১ দিনের বেশি থাকতে পারবে না। তবে রাশিয়া নিজেই সাম্প্রতিককালে এই কনভেশনের ব্যত্যয় ঘটিয়েছে।

‘মস্কো স্টেট ইন্সটিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স’এর প্রফেসর মিখাইল ট্রইটস্কির মতে, রাশিয়া পশ্চিমাদের সাথে পুরো ভূরাজনৈতিক খেলাটাকে আরেক ধাপ এগিয়ে নিতে চাইছে। বিভিন্ন ইস্যুতে রাশিয়ার উপর পশ্চিমা অবরোধের জবাব দিতে চাইছে রাশিয়া। পশ্চিমারা যেমন বলছে যে, রাশিয়ার কর্মকান্ডের জন্যে তাদেরকে মূল্য দিতে হচ্ছে, তেমনি রাশিয়াও বলতে চাইছে যে, তারাও পশ্চিমাদের কর্মকান্ডের উপর মূল্য নির্ধারণ করতে পারে; যদিও এতে রাশিয়ার উপর অবরোধ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ‘রাশান ইন্টারন্যাশনাল এফেয়ার্স কাউন্সিল’এর প্রধান আন্দ্রেই করতুনোভের কথায় রাশিয়ার জনগণ এখন তাদের নিজেদের সমস্যা নিয়েই জর্জরিত। করোনাভাইরাস, অর্থনৈতিক অবরোধ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দরপতন রাশিয়ার অর্থনীতিকে ব্যাপক ক্ষতির মাঝে ফেলেছে। এমতাবস্থায় একটা বড় সামরিক মিশন রাশিয়ার জন্যে বাহুল্যই বটে।

করতুনোভ বলছেন যে, ইউক্রেন সরকার পূর্বের সীমান্ত অঞ্চলে নিজেদের সামরিক অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। রুশরা সীমান্তে সামরিক শক্তি মোতায়েন করে ডনবাসে ইউক্রেনের সরকারি বাহিনীর নতুন করে যুদ্ধ শুরুর চিন্তাকে প্রতিহত করতে চাইছে। মার্কিন এবং ইউরোপিয়রা সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ব্যাপক সহায়তা দিয়েছে। পূর্ব ইউক্রেনের রুশ ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করাটা রাশিয়ার জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে করতুনোভ মনে করছেন যে, রাশিয়া খুব সম্ভবতঃ ইউক্রেন আক্রমণ করবে না। কারণ রুশ কৌশল হলো পূর্ব ইউক্রেনে স্থিতাবস্থা বজায় রাখা এবং ইউক্রেনের অভ্যন্তরের ব্যাপক সমস্যার ফলশ্রুতিতে কিয়েভে রাজনৈতিক গোলযোগের অপেক্ষা করা। ইউক্রেনে সরাসরি সামরিক হামলা রাশিয়াকে কিছুই দেবে না।

রুশ সিনেটর কনস্টানটিন কসাচেভ বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পারছে যে, সামরিক দিক থেকে রাশিয়াকে অতিক্রম করা সম্ভব নয়; এবং দুই দেশের আলোচনায় ফেরত আসা ছাড়া গতি নেই। কসাচেভের কথায় বোঝা যাচ্ছে যে, রাশিয়া মূলতঃ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা চাইছে; যার প্রস্তাব বাইডেন ইতোমধ্যেই ফোনালাপের মাধ্যমে দিয়েছেন। মার্কিন থিকট্যাঙ্ক ‘সিএনএ কর্পোরেশন’এর ডিরেক্টর মাইকেল কফম্যান ‘দ্যা মস্কো টাইমস’এর এক লেখায় বলছেন যে, রাশিয়ার সমরশক্তি মোতায়েন মূলতঃ ভীতি প্রদর্শনের জন্যে; দেখানোর জন্যে। কারণ ইউক্রেনে সামরিক হামলা করে রাশিয়ার কোন রাজনৈতিক লক্ষ্য বাস্তবায়িত হবে না। ‘বিবিসি’ এক বিশ্লেষণে বলছে যে, সাত বছর আগে রাশিয়া পূর্ব ইউক্রেনে তার সামরিক শক্তি প্রেরণ করে তা অস্বীকার করেছিল; এখনও করছে। সেটা ছিল রাশিয়া গোপন অপারেশন। কিন্তু এবারে রুশরা বড়সর আয়োজন করে সামরিক বাহিনী মোতায়েন করছে। রাশিয়া পশ্চিমা বিশ্বের সামনে ভালবাসার বস্তু হিসেবে আবির্ভূত হবার আশা ছেড়ে দিয়েছে; বরং তারা চাইছে যে, পশ্চিমারা রাশিয়াকে ভয় করুক। বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, রাশিয়া এবারে সৈন্য পাঠায়নি; বার্তা পাঠিয়েছে।