Monday, 7 September 2020

ইউরোপে উগ্রপন্থীদের উত্থান প্রকৃতপক্ষে পশ্চিমা আদর্শের সংকট

৭ই সেপ্টেম্বর ২০২০
বার্লিনে করোনা বিরোধী প্রতিবাদের বিশেষত্ব ছিল উগ্র ডানপন্থীদের অংশগ্রহণ এবং জার্মান পার্লামেন্টে হামলার চেষ্টা। যে উগ্রপন্থী চিন্তাকে পুঁজি করে ডানপন্থীরা ইউরোপজুড়ে ক্ষমতায় যাচ্ছে, তার পিছনে জনগণের সমর্থন গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক ধারাতেই উগ্রপন্থীরা ইউরোপে আরও শক্ত অবস্থানে যাচ্ছে। সেই হিসেবে জার্মান পুলিশের উগ্রপন্থীদের টার্গেট করে চাপের মাঝে ফেলার চেষ্টাখানা যথেষ্টই অগণতান্ত্রিক। গণতন্ত্রকে পুঁজি করে পরস্পরবিরোধী এই কার্যকলাপ ইউরোপের আদর্শিক সংকটেরই চিত্র, যা থেকে বের হবার কোন পথ কেউ দেখাতে পারছেন না। 




অগাস্টের শেষে জার্মান রাজধানী বার্লিনে ৩৮ হাজার মানুষের এক বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। করোনাভাইরাস বিষয়ে জার্মান সরকারের নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এই বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়েছিল। পুলিশ এদের মাঝ থেকে প্রায় ৩’শ প্রতিবাদকারীকে গ্রেপ্তারও করে। পরবর্তীতে কয়েক’শ ডানপন্থী প্রতিবাদকারী জার্মান পার্লামেন্ট ‘রাইখস্টাগ’এ হামলা করার চেষ্টা করে। জার্মান রাজনীতিবিদেরা অনেকেই এই হামলাকে ‘লজ্জাজনক’ এবং ‘অগ্রহনীয়’ বলে আখ্যা দেন। ‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, প্রতিবাদকারীদের মাঝে অনেকেই উগ্রপন্থী কথা লেখা টি শার্ট বা পতাকা বহন করছিল। ‘ল্যাটেরাল থিংকিং ৭১১’ নামের একতা সংগঠন বলে যে, সরকারের করোনাভাইরাসের নিয়মকানুন জনগণের ব্যক্তিস্বাধীনতার উপর আঘাতের স্বরূপ। অংশগ্রহণকারীদের মাঝে অনেকেই করোনাভাইরাস বলে কিছু আছে, সেটাই বিশ্বাস করে না। তারা মনে করছে যে, করোনাভাইরাস একটা ষড়যন্ত্র; এবং সরকার করোনাভাইরাসের নামে মানুষের উপর গোয়েন্দাগিরি করছে। একই রকমের চিন্তার মানুষের লন্ডন, প্যারিস, ভিয়েনা এবং জুরিখ শহরেও বিক্ষোভ করে।

‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, জার্মানিতে মোট ২ লক্ষ ৪২ হাজার মানুষের মাঝে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পাওয়া গিয়েছে, যা কিনা অন্যান্য ইউরোপিয় দেশ থেকে কম। ৯ হাজার ৩’শ মানুষের মৃত্যুর সংখ্যাটাও ব্রিটেন, স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি বা রাশিয়ার চাইতে কম বলে বলছে ‘জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি’র গবেষণা। ‘ইসিডিসি’র হিসেবে অগাস্ট মাসে পুরো ইউরোপেই সংক্রমণ আবারও বাড়তে শুরু করেছে। জার্মানিতেও তাই ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে আরও কঠোর হচ্ছে সরকার। ২৭শে অগাস্ট চ্যান্সেলর এঙ্গেলা মার্কেলের সরকার জনসমক্ষে মাস্ক না পড়ার জন্যে ৫০ ইউরো জরিমানা ধার্য্য করে। আগামী বছর পর্যন্ত জনসমাগমের উপরে নিষেধাজ্ঞা বলবত করা হয়েছে। বার্লিনের করোনা বিরোধী প্রতিবাদের বিশেষত্ব ছিল উগ্র ডানপন্থীদের অংশগ্রহণ এবং জার্মান পার্লামেন্টে হামলার চেষ্টা। করোনা ইস্যুকে কেন্দ্র করে ডানপন্থীরা নিজেদের অবস্থান সংহত করতে চাইছে কিনা, তা নিয়েও কথা শুরু হয়েছে। কারণ জার্মানিতে উগ্রবাদী, বিশেষ করে নিও নাজিদের কর্মকান্ড নিয়ে উদার ও মধ্যপন্থীরা যারপরনাই চিন্তিত।

গত মার্চে জার্মানির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা ‘বিএফভি’এর প্রধান থমাস হালডেনওয়াং এক সংবাদ সন্মেলনে বলেন যে, ডানপন্থী উগ্রবাদ এবং সন্ত্রাসবাদ জার্মানির গণতন্ত্রের জন্যে সবচাইতে বড় হুমকি। তিনি বলেন যে, উগ্র ডানপন্থীদের সদস্য সংখ্যা প্রায় ৩২ হাজারের মতো; এর মাঝে ১৩ হাজারের সম্ভাব্য সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়াবার সম্ভাবনা বেশি। তিনি আরও বলেন যে, জার্মানির ডানপন্থী রাজনৈতিক দল ‘অলটারনেটিভ ফুর ডয়েচল্যান্ড’ ‘এএফডি’ বা ‘অলটারনেটিভ ফর জার্মানি’র সবচাইতে উগ্রবাদী অংশের নেতৃবৃন্দকে গোয়েন্দা নজরে রাখা হয়েছে। এই অংশটার নাম ‘ডের ফ্লুগেল’ বা ‘দ্যা উইং’; যার সদস্যসংখ্যা আনুমানিক ৭ হাজারের মতো। ব্রিটেনের ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা বলছে যে, এই গ্রুপের গুরুত্ব তাদের সংখ্যার চাইতেও আরও বেশি; কারণ এরা পুরো দলের নীতি নির্ধারণেও প্রভাবশালী ভূমিকা রাখে। জার্মান পুলিশ এবং তাদের কথাবার্তা শুনতে এবং রেকর্ড করতে পারবে। হালডেনওয়াং বলেন যে, জার্মানিতে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন হামলার ঘটনাই বলে দিচ্ছে যে, উগ্রবাদী গ্রুপগুলিকে নিয়ন্ত্রণে রাখাটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। গত ফেব্রুয়ারিতে হানাউ শহরে একতা শিশা বারে এক উগ্রপন্থী বন্দুকধারী ৯ জনকে গুলি করে হত্যা করে। এর আগে অক্টোবরে হাল শহরে ইহুদিদের উপাসনালয় সিনাগগে হামলায় দুই জন নিহত হয়। তারও আগে জুন মাসে হেস রাজ্যে ইমিগ্রেশনের ব্যাপারে নমনীয় অবস্থানে থাকা এক রাজনীতিবিদ ওয়াল্টার লুবেককে এক উগ্রপন্থী ব্যক্তি গুলি করে হত্যা করে।

  
জার্মানির ‘এএফডি’ দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আলেক্সান্ডার গল্যান্ড ছিলেন একজন সরকারি আমলা এবং পরবর্তীতে পটসড্যামের একটা পত্রিকার সম্পাদক। জার্মানির উগ্রপন্থী রাজনীতিবিদেরা জার্মানির স্বাভাবিক জীবনযাত্রার মাঝ থেকেই উঠে এসেছে। এদের অনেকেই সবচাইতে বড় রাজনৈতিক দল এঙ্গেলা মার্কেলের ‘ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন’এর সদস্য ছিল; কেউ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর; সরকারি কর্মকর্তা; বা গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকার সাংবাদিক বা কলামিস্ট। জার্মান গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মাঝ দিয়েই এই উগ্রপন্থী চিন্তার আবির্ভাব ঘটেছে। 



‘এএফডি’ তৈরি হয় ২০১২ সালে। দল গঠনের পিছনে মূল যুক্তি ছিল জার্মানিকে ইউরো থেকে নিজস্ব মুদ্রা ডয়েচ মার্কে ফিরিয়ে নেয়া। তাদের বক্তব্য ছিল যে, ইউরোর চাপে দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলি দেউলিয়া হয়ে যাবে এবং তারা ক্রমান্বয়ে জার্মানির উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠবে। ২০১০ সালে গ্রীসের দেউলিয়া হবার ঘটনায় জার্মানির অর্থনৈতিক সহায়তা দেবার প্রতিশ্রুতি দল গঠনের গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল। দলের উদ্যোক্তা হিসেবে তিনজনের নাম বলা হয়েছিল। এর মাঝে আলেক্সান্ডার গল্যান্ড ছিলেন একজন সরকারি আমলা এবং পরবর্তীতে পটসড্যামের একটা পত্রিকার সম্পাদক। গল্যান্ড একইসাথে এঙ্গেলা মার্কেলের ‘ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন’ বা ‘সিডিইউ’এর সদস্য ছিলেন। ‘সিডিইউ’ হলো জার্মানির সবচাইতে বড় রাজনৈতিক দল। জার্মান পার্লামেন্ট ‘বুন্দেস্টাগ’এর ৭’শ ৯টা আসনের মাঝে ‘সিডিইউ’এর আসন রয়েছে ২’শ। আরেকজন প্রতিষ্ঠাতা বার্ন্ড লাক ইউনিভার্সিটি অব হামবুর্গের অর্থনীতির প্রফেসর। তিনি বিশ্ব ব্যাঙ্কের একজন উপদেষ্টার পদে থাকা ছাড়াও কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ভিজিটিং স্কলার ছিলেন। আরেকজন প্রতিষ্ঠাতা কোনরাড এডাম মূলতঃ সাংবাদিক হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত। দীর্ঘ ২৮ বছর তিনি জার্মানির গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা ‘ফ্রাঙ্কফুটার আলেমাইন জাইটুং’ এবং ‘ডাই ওয়েল্ট’এর সাথে কাজ করেছে। ২০০৭ সাল থেকে তিনি পত্রিকাতে কলামিস্ট হিসেবে কাজ করছেন। ‘এএফডি’ গঠনের পূর্বে তিনিও ‘সিডিইউ’এর সদস্য ছিলেন। গত সাত বছরে দলটা রও বেশি উগ্রবাদী ধারণা পোষণ শুরু করে এবং নিজেদের নেতৃত্বে বেশ কয়েক দফা পরিবর্তন হয়। ২০১৫ সালে ইউরোপে শরণার্থী আগমণ শুরু হলে ‘এএফডি’ চ্যান্সেলর এঙ্গেলা মার্কেলের সীমান্ত খুলে রাখার নীতির ব্যাপক সমালোচনা করে। বর্তমানে ‘এএফডি’ই হলো ক্ষমতাসীন ‘সিডিইউ’এর সবচাইতে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। পার্লামেন্টে এখন তাদের ৮৮টা আসন রয়েছে; ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টেও এদের ১১টা আসন রয়েছে। কাজেই এই দলকে এড়িয়ে যাওয়া কারুর পক্ষেই সভব নয়। গোয়েন্দা সংস্থার বিবৃতির পর ‘এএফডি’র মুখপাত্র জোর্গ মিউথেন বলেন যে, দলের বিরুদ্ধে এই কর্মকান্ড দলটার কন্ঠরোধ করার একটা চেষ্টা। এই প্রচেষ্টা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত।

‘ডের ফ্লুগেল’ শাখার নেতা বিয়র্ন হোক হলেন জার্মানির পূর্বাংশের থুরিঞ্জিয়া রাজ্যের ‘এএফডি’র রাজনীতিবিদ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানিতে ইহুদি নিধনের স্মৃতি স্তম্ভকে তিনি ‘লজ্জার স্মৃতি’ বলে আখ্যা দিয়ে এই স্মৃতি রোমন্থনের সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসার আহ্বান জানান। ‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, গত অক্টোবরে থুরিঞ্জিয়ার প্রায় ২৩ শতাংশ মানুষ ‘এএফডি’কে ভোট দিয়েছে। সিরিয়া এবং আফ্রিকা থেকে আসা শরণার্থীদেরকে জার্মানিতে ডুকতে দেবার নীতির সমালোচনা থেকেই ‘এএফডি’র জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের কথা হলো, চ্যান্সেলর মার্কেল একনায়কের মতো দেশ চালান এবং তাদের মতামতকে কোন মূল্যই দেন না। বিয়র্ন হোক অভিযোগ করেন যে, আফ্রিকা থেকে আগত মানুষেরা জার্মানির সমাজকে কলুষিত করে ফেলছে। তার কথার ধরণ অনেকেই পছন্দ না করলেও তিনি যা বলছেন, সেগুলিকে যুক্তিযুক্ত বলছেন তারা। অনেকেরই ধারণা রয়েছে যে, জার্মানিতে যথেষ্ট গরীব মানুষ রয়েছে; সরকারের উচিৎ বাইরে থেকে আসা মানুষের পিছনে অর্থ ব্যয় না করা। তবে জার্মান গোয়েন্দারা শুধুমাত্র বিয়র্ন হোককে টার্গেট করার কথা বললেও ‘এএফডি’র অন্যান্য নেতৃবৃন্দও উগ্রপন্থী বক্তব্যে পিছিয়ে নেই। দলের প্রতিষ্ঠাতা রাজনীতিবিদ আলেক্সান্ডার গল্যান্ড মন্তব্য করেন যে, জার্মান ফুটবল দলের কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড় বোয়াটেং খেলার মাঠে জার্মানির জন্যে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হলেও জার্মানির অনেক মানুষই তাকে নিজেদের প্রতিবেশী হিসেবে দেখতে চাইবে না। তিনি আরও বলেছিলেন যে, শিশুদের চেহাড়া দেখে শরণার্থীকে জার্মানিতে ঢুকতে দেয়াটা ব্ল্যাকমেইলের শামিল। ২০১৭ সালে তিনি বলেন যে, তুর্কি বংশোদ্ভূত জার্মান রাজনীতিবিদ আইদান উজুগুজকে তুরস্কে ফেরত পাঠানো উচিৎ। ২০১৬ সালে ‘এএফডি’র রাজনীতিবিদ ফ্রাউকা পেট্রি এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে, শরণার্থীদের থামাতে সীমান্ত পুলিশের দরকার হলে গুলি করা উচিৎ। বিয়াট্রিক্স ভন স্টর্ক আরও একধাপ এগিয়ে গিয়ে শরণার্থীদেরকে আক্রমণকারী হিসেবে আখ্যা দেন। ব্র্যান্ডেনবার্গ রাজ্যের ‘এএফডি’র প্রধান আন্দ্রেয়াস কালবিতজ ২০০৭ সালে গ্রীসে এক নিও নাজি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন, যেখানে স্বস্তিকা সংবলিত পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল।

  
২০১৬ সালে জার্মান ডানপন্থীদের একটা সমাবেশ। উগ্র ডানপন্থী দল ‘এএফডি’ এখন জার্মান পার্লামেন্টে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল; তাদের রয়েছে লাখো সমর্থক। পুলিশি কর্মকান্ডের মাধ্যমে এই উগ্রপন্থী চিন্তা নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টাটা কতটা যুক্তিযুক্ত, তা প্রশ্ন করা যেতেই পারে। স্বাধীনচেতা ইউরোপের কাছে কিছু রাজনীতিবিদদের উপর ধরপাকড়ের বিষয়টা মানুষের বাকস্বাধীনতার উপর হামলা বলে বিবেচিত হবে কিনা, তা এখনও পরিষ্কার নয়। তবে তা সমাজকে যে বিভক্ত করবে, তা নিশ্চিত।



যে ব্যাপারটা পরিষ্কার তা হলো, জার্মানির উগ্রপন্থী রাজনীতিবিদেরা জার্মানির স্বাভাবিক জীবনযাত্রার মাঝ থেকেই উঠে এসেছে। এদের অনেকেই সবচাইতে বড় রাজনৈতিক দল এঙ্গেলা মার্কেলের ‘ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন’এর সদস্য ছিল; কেউ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর; সরকারি কর্মকর্তা; বা গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকার সাংবাদিক বা কলামিস্ট। জার্মান গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মাঝ দিয়েই এই উগ্রপন্থী চিন্তার আবির্ভাব ঘটেছে। ‘ডের ফ্লুগেল’এর নেতাদের নজরদারির মাঝে আনার কথা বলা হলেও পুরো ‘এএফডি’র নেতারাই তো প্রকাশ্যে স্বাধীনভাবে উগ্রপন্থী কথা বলছেন। শুধু তাই নয়, ‘এএফডি’ এখন জার্মান পার্লামেন্টে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল; তাদের রয়েছে লাখো সমর্থক। পুলিশি কর্মকান্ডের মাধ্যমে এই উগ্রপন্থী চিন্তা নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টাটা কতটা যুক্তিযুক্ত, তা প্রশ্ন করা যেতেই পারে। স্বাধীনচেতা ইউরোপের কাছে কিছু রাজনীতিবিদদের উপর ধরপাকড়ের বিষয়টা মানুষের বাকস্বাধীনতার উপর হামলা বলে বিবেচিত হবে কিনা, তা এখনও পরিষ্কার নয়। তবে তা সমাজকে যে বিভক্ত করবে, তা নিশ্চিত।

আর জার্মানি কেন, বাকি ইউরোপেও ডানপন্থী চিন্তার ব্যাপক প্রসার ঘটছে। ‘দ্যা টেলিগ্রাফ’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে ফ্রান্সে সহিংসতার সংখ্যা বেড়ে গেছে। উদাহরণসরূপ, মাস্ক পড়তে বলার কারণে কিছু বাসযাত্রীর হাতে এক বাস ড্রাইভারের প্রাণ গিয়েছে। ফরাসী ফুটবল দল প্যারিস সাঁ জার্মেই জার্মানির বায়ার্ন মিউনিখের কাছে হেরে যাবার পর রাস্তায় কিছু লোক ভাংচুর করে। বিভিন্ন শহরের মেয়ররাও জনগণকে মাস্ক পড়তে বলার কারণে হামলার শিকার হয়েছে। ফ্রান্সের উগ্র ডানপন্থী নেতা ম্যারিন লা পেন ৬ই সেপ্টেম্বর জনসমক্ষে এক ভাষণে বলেন যে, প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর সরকার অপরাধের বিরুদ্ধে যথেষ্ট কঠোর হতে পারছে না। আর ফ্রান্স ধীরে ধীরে আরও ‘হিংস্র’ হয়ে যাচ্ছে। লা পেন ২০১৭ সালের প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচনে ম্যাক্রঁর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। ২০২২ সালের নির্বাচনেও তিনি ম্যাক্রঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হতে চাইছেন। তিনি মনে করছেন যে, ম্যাক্রঁর বিরুদ্ধে দাঁড়াবার মতো আর কেউই এখন ফ্রান্সে নেই। ২০১৭এর নির্বানের দ্বিতীয় ধাপে তিনি ৩৪ শতাংশ মানুষের ভোট পেয়েছিলেন। লা পেনের অভিবাসন নীতি জার্মান ডানপন্থীদের মতোই। তিনি ঘোরতরভাবে মুসলিম বিদ্বেষী এবং শরণার্থীদের ফ্রান্সে ঢোকার যারপরনাই বিরোধী। ফ্রান্সে মুসলিম অভিবাসী আসা থামাতে তিনি ফ্রান্সের সীমানা বন্ধ করে দেবার কথা বলেন। একজন উগ্র ডানপন্থী নেতার জন্যে প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচনে এক তৃতীয়াংশ ভোট অর্জন বলে দেয় যে, পুরো জাতির মাঝেই ডানপন্থী চিন্তা কতটা বাসা বেঁধেছে। জার্মানি এবং ফ্রান্সের চাইতেও ডানপন্থীরা বেশি শক্তিশালী ইতালিতে। সেখানে ডানপন্থী কোয়ালিশন ক্ষমতায়ও গিয়েছে। হাঙ্গেরিতেও ডানপন্থী ভিক্টর অরবান বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী। গতবছর পোল্যান্ডের ক্ষমতাসীন ডানপন্থীরা তাদের ভোট ৩৮ শতাংশ থেকে ৪৪ শতাংশে বাড়িয়ে নিয়েছে।

জার্মানি ও ফ্রান্সসহ ইউরোপে ডানপন্থীদের উত্থান শুধু ইউরোপিয় ইউনিয়নের ঐক্যের জন্যেই যে হুমকি তা নয়; ব্যক্তিস্বাধীনতায় কঠোরভাবে বিশ্বাসী ইউরোপিয়দের আদর্শিক অবস্থানকেও তা আঘাত করেছে। ডানপন্থী রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে পুলিশি গোয়েন্দাগিরি চালনা করাটা সেই আঘাতেরই বহিঃপ্রকাশ। তবে যে চিন্তার স্বাধীনতা থেকে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মাঝে উগ্রপন্থী ধারণা বাসা বাঁধছে, সেই চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে নিজেদের আদর্শকেই খাঁচায় পুরতে হচ্ছে ইউরোপিয়দের। একইসাথে যে উগ্রপন্থী চিন্তাকে পুঁজি করে ডানপন্থীরা ইউরোপজুড়ে ক্ষমতায় যাচ্ছে, তার পিছনে জনগণের সমর্থন গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক ধারাতেই উগ্রপন্থীরা ইউরোপে আরও শক্ত অবস্থানে যাচ্ছে। সেই হিসেবে জার্মান পুলিশের উগ্রপন্থীদের টার্গেট করে চাপের মাঝে ফেলার চেষ্টাখানা যথেষ্টই অগণতান্ত্রিক। গণতন্ত্রকে পুঁজি করে পরস্পরবিরোধী এই কার্যকলাপ ইউরোপের আদর্শিক সংকটেরই চিত্র, যা থেকে বের হবার কোন পথ কেউ দেখাতে পারছেন না।


Saturday, 5 September 2020

সৌদি পাকিস্তান টানাপোড়েন মুসলিম নেতৃত্বের বিভাজনকেই দেখিয়ে দেয়

০৫ই সেপ্টেম্বর ২০২০
   

কাশ্মির ইস্যুতে অনৈক্য মুসলিম দেশগুলির পারস্পরিক সাংঘর্ষিক জাতীয় স্বার্থের বেড়াজালে আটকে রয়েছে। সৌদি নেতৃত্বের দেশগুলির সাথে তুর্কি নেতৃত্বের দেশগুলির দ্বন্দ্ব এতটাই প্রাধান্য পেয়েছে যে, মুসলিম নেতৃত্বের কাছে কাশ্মির, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, ইয়েমেন বা উইঘুরের মতো সমস্যাগুলি ছোট হয়ে গিয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে চীনের কাছ থেকে ব্যাপক সহায়তা পাওয়ায় পাকিস্তানের জন্যে সৌদি আরবের সাথে মনোমালিন্য কাটিয়ে ওঠা সহজতর হবে। তবে কাশ্মির ইস্যুতে চীন, তুরস্ক বা মালয়েশিয়ার সমর্থন পেলেও এখানেও যে স্বার্থের দ্বন্দ্ব থাকবে না, তার নিশ্চয়তা পাকিস্তানের কাছে নেই। আদর্শগত অবস্থান নয়, বরং জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই এগুচ্ছে পাকিস্তানসহ সকলে। অপরদিকে কোন পথে এগুলে কাশ্মির সমস্যার সত্যিকার সমাধান হবে, সেটার উত্তরও পাকিস্তানের কাছে নেই।

 

পাকিস্তানের সাথে সৌদি আরবের সম্পর্ক নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ আলোচনা শুরু হয়েছে। দুই দেশের সম্পর্ক বেশ গভীর বলেই সকলে জানে, কিন্তু তারপরেও হঠাত করেই সম্পর্কে একটা টানাপোড়েন দেখা দেয়ায় অনেকেই অবাক হয়েছেন। ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন পাকিস্তানের পরররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কোরেশী গত ৪ঠা অগাস্ট পাকিস্তানের একটা টেলিভিশন চ্যানেলে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন যে, তিনি আবারও ‘ওআইসি’কে আহ্বান করছেন যাতে তারা কাশ্মির ইস্যুতে কাউন্সিল অব ফরেন মিনিস্টার্সএর একটা আলোচনার ডাক দেয়। যদি ‘ওআইসি’ সেটা করতে ব্যর্থ হয়, তবে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে বলতে বাধ্য হবেন যে, তিনি যেন এমন একটা আলাদা আলোচনার ডাক দেন, যেখানে কাশ্মির ইস্যুতে পাকিস্তানের সাথে দাঁড়াবে এমন মুসলিম দেশগুলি যোগ দেয়। তিনি বলেন যে, পাকিস্তানের নিজস্ব কিছু অবস্থান রয়েছে যেগুলি ‘ওআইসি’ এবং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলিকে বুঝতে হবে। কোরোশীর এই বক্তব্যের পরপরই ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’ বলে যে, সৌদি আরব পাকিস্তানের জন্যে ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তা স্থগিত করেছে। একইসাথে তারা পাকিস্তানকে ১ বিলিয়ন ডলার ঋণ ফেরত দিতে বলে। চীনাদের জরুরি সহায়তায় পাকিস্তান এই ঋণ ফেরত দেয়। এই ঋণ ২০১৮ সালের নভেম্বরে দেয়া হয়েছিল, তখন পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ভয়াবহ রকমের কমে গিয়েছিল। সৌদি আরব থেকে তেল কেনার মূল্য দেরিতে পরিশোধ করার ব্যাপারে দুই দেশের মাঝে যে চুক্তি রয়েছে, সেই চুক্তিও সৌদি আরব নবায়ন করা বন্ধ করে দিয়েছে বলে জানা যায়। ১৭ই অগাস্ট পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া সৌদি আরব সফরে গেলে পাকিস্তানের ‘ডন’ পত্রিকা বলে যে, অনেকেই মনে করছেন যে, পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘ওআইসি’র আরব নেতৃত্বের সমালোচনা এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানের জন্যে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক সহায়তা বন্ধ করে দেয়ার ব্যাপারটার সাথে সেনাপ্রধানের এই সফরের সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এই সফরকে দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মাঝে নিয়মিত সফরের অংশ হিসেবেই আখ্যা দেয়। এর কয়েকদিন পরেই পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এক বিবৃতিতে কাশ্মিরের ব্যাপারে ‘ওআইসি’র ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করা হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী কোরেশীও সাংবাদিকদের বলেন যে, কাশ্মির ইস্যুতে ‘ওআইসি’ বহু রেজোলিউশন পাস করেছে, যার ব্যাপারে কোন সন্দেহই নেই। আর সেই ব্যাপারগুলি পাকিস্তানের অবস্থানের সাথে মিল রেখেই হয়েছিল। তিনি আরও পরিষ্কার করে বলেন যে, পাকিস্তানের সাথে সৌদি আরবের কোন মতপার্থক্য নেই। এতো অল্প সময়ের মাঝে পরস্পরবিরোধী এই খবরগুলির গুরুত্ব আসলে কোথায়?

সৌদি আরব এবং পাকিস্তানের মাঝে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা রয়েছে। গত বছর দুই দশের মাঝে বাণিজ্য ছিল ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার; যার মাঝে ৭৪ শতাংশই ছিল সৌদি আরব থেকে পাকিস্তানের তেল আমদানি। পাকিস্তানের এক চতুর্থাংশ তেল আসে সৌদি আরব থেকে। এছাড়াও প্রায় ২৫ লক্ষ পাকিস্তানি সৌদি আরবে কর্মরত রয়েছে; যাদের কাছ থেকে পাকিস্তানের মোট রেমিট্যান্স আয়ের ৩০ শতাংশ আসে। অপরদিকে সৌদি আরবের সামরিক বাহিনীর গঠন এবং প্রশিক্ষণের পিছনে পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তথাপি কাশ্মির ইস্যুতে সৌদি আরবের পক্ষে সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষ নেয়াটা অতটা সহজ নয়। ‘আল জাজিরা’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ভারতের সাথে সৌদি আরবের বার্ষিক বাণিজ্য এখন প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। সৌদি আরব এতবড় বাণিজ্যকে ছেড়ে দিয়ে কাশ্মির ইস্যুতে ভারতের বিপক্ষে অবস্থান নিতে চাইবে না। ভারতের সাথে সৌদিদের সম্পর্কের ব্যাপারে পাকিস্তানের অসন্তোষ থাকলেও সেক্ষেত্রে পাকিস্তানের দরকষাকষির সুযোগ খুব কমই রয়েছে। অন্ততঃ পরবর্তীতে সৌদিদের ব্যাপারে পাকিস্তানের সুর পাল্টে ফেলার ব্যাপারটা সেটাই দেখিয়ে দিচ্ছে।

মার্কিন থিংকট্যাঙ্ক ‘ব্রুকিংস ইন্সটিটিউট’এর ফেলো মাদিহা আফজাল বলছেন যে, দুই দেশের নির্ভরশীলতার মাঝে পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কথাগুলি বেশ অদ্ভূতই ঠেকেছে। তবে এতে মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বের ক্ষেত্রে সৌদি আরবের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। এটা এর আগেও একবার হয়েছে, যখন গতবছর কুয়ালালামপুরে মালয়েশিয়া, তুরস্ক এবং পাকিস্তান আলাদাভাবে ‘ওআইসি’কে বাইপাস করে মুসলিম দেশগুলির নেতৃত্ব নেবার একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরির দিকে এগিয়ে যায়। পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান সেই বৈঠক থেকে শেষ মুহুর্তে নিজের নাম সড়িয়ে নিয়ে সৌদি আরবের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করেন। সাম্প্রতিক সময়ে যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান বা ‘এমবিএস’এর অধীনে সৌদি আরব তুরস্ক, ইরান এবং কাতারকে প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র হিসেবে দেখছে; পাকিস্তানের সাথে এই দেশগুলির সম্পর্কোন্নয়নও তাই সৌদি আরবের কাছে ভালো ঠেকছে না।

‘উড্রো উইলসন সেন্টার ফর স্কলার্স’এর দক্ষিণ এশিয়া বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলমান ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, পাকিস্তানের পক্ষে প্রমাণ করা কঠিন হচ্ছে যে, পাকিস্তানের কাশ্মির নীতি কাজ করছে। এই প্রচেষ্টা যদি ফলাফল না নিয়ে আসে, তাহলে তারা কি করবে? ইসলামাবাদের ‘কায়েদ এ আজম ইউনিভার্সিটি’র এসিসট্যান্ট প্রফেসর রাজা কায়সার আহমেদ বলছেন যে, এখন পর্যন্ত কাশ্মির ইস্যুতে পাকিস্তান শুধুমাত্র চীন, তুরস্ক এবং মালয়েশিয়াকে পাশে পেয়েছে। এর থেকে বের হতে পাকিস্তানের আরও আক্রমণাত্মক কূটনীতিতে যেতে হবে। কুগেলমান বলছেন যে, সৌদিদের সাথে সমস্যা খুব সহজেই মুছে যাবে না; তবে চীন এবং আরবের বাইরে অন্যান্য মুসলিম দেশের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান।

কাশ্মির ইস্যুতে অনৈক্য মুসলিম দেশগুলির পারস্পরিক সাংঘর্ষিক জাতীয় স্বার্থের বেড়াজালে আটকে রয়েছে। সৌদি নেতৃত্বের দেশগুলির সাথে তুর্কি নেতৃত্বের দেশগুলির দ্বন্দ্ব এতটাই প্রাধান্য পেয়েছে যে, মুসলিম নেতৃত্বের কাছে কাশ্মির, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, ইয়েমেন বা উইঘুরের মতো সমস্যাগুলি ছোট হয়ে গিয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে চীনের কাছ থেকে ব্যাপক সহায়তা পাওয়ায় পাকিস্তানের জন্যে সৌদি আরবের সাথে মনোমালিন্য কাটিয়ে ওঠা সহজতর হবে। তবে কাশ্মির ইস্যুতে চীন, তুরস্ক বা মালয়েশিয়ার সমর্থন পেলেও এখানেও যে স্বার্থের দ্বন্দ্ব থাকবে না, তার নিশ্চয়তা পাকিস্তানের কাছে নেই। আদর্শগত অবস্থান নয়, বরং জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই এগুচ্ছে পাকিস্তানসহ সকলে। অপরদিকে কোন পথে এগুলে কাশ্মির সমস্যার সত্যিকার সমাধান হবে, সেটার উত্তরও পাকিস্তানের কাছে নেই।

Tuesday, 1 September 2020

করোনা মন্দায় পুঁজিবাদের নিম্নগামীতাকে থামানো যাচ্ছে না কিছুতেই!

২রা সেপ্টেম্বর ২০২০

দুনিয়ার সবচাইতে ধনী ব্যক্তি ‘আমাজন’এর প্রতিষ্ঠাতা বেফ বেজস করোনাভাইরাসের মন্দার মাঝে রেকর্ড পরিমাণ আয় করে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। রাষ্ট্রীয় প্রণোদনার বেশিরভাগ অর্থ ব্যাংক এবং কর্পোরেটদের হাত ঘুরে গুটি কয়েক ধনীদের পকেটেই গিয়েছে। প্রণোদনার অর্থে শেয়ার বাজার চাঙ্গা হয়েছে ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির জন্যেই। অপরদিকে প্রণোদনার অর্থে উঠে দাঁড়ানো ধনীদের অফশোর ব্যাংক একাউন্টও ফুলে ফেঁপে উঠছে। পুঁজিবাদের করুণ অবস্থা করোনাভাইরাসের আগে থেকেই দৃশ্যমান ছিল; বিশেষ করে ব্যাপক আয় বৈষম্যের প্রতিবেদনে পত্রিকার পাতা ভরেছে সাম্প্রতিক সময়ে। করোনাভাইরাসের মাঝে এই করুণ দৃশ্য ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যবস্থায় আয় বৈষম্যের চিত্রটা এখন আর সমাধানের পর্যায়ে নেই। পুঁজিবাদের নিম্নগামীতাকে থামাতে পারছেন না কেউই।

‘বস্টন কনসাল্টিং গ্রুপ’এর এক গবেষণা বলছে যে, ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দার সময় যেখানে মানুষের পকেট থেকে ১০ ট্রিলিয়ন ডলার উধাও হয়ে গিয়েছিল, এবছর করোনাভাইরাসের কারণে সেটা ১৬ ট্রিলিয়ন ডলার ছুঁয়ে যেতে পারে। তবে এই সম্পদহানি সকলের জন্যে সমানভাবে আসেনি। ‘বিজনেস ইনসাইডার’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, করোনাভাইরাসের লকডাউনের কারণে যেখন প্রায় ৪ কোটি মানুষ তাদের চাকুরি হারাবার পর সরকারের কাছে বেকার ভাতা চেয়েছে, সেখানে সেদেশের বিলিয়নায়াররা আরও বেশি করে অর্থ কামিয়ে নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিলিয়নায়াররা একত্রে প্রায় ৬’শ ৩৭ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত সম্পদ আয় করে নিয়েছেন। মার্চ থেকে জুনের মাঝে ‘আমাজন’এর প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজস তার সম্পদকে ৪৮ বিলিয়ন ডলার বাড়িয়ে নিয়েছেন। ভিডিও কনফারেন্সিং সফটওয়্যার ‘জুম’এর মালিকের সম্পদ বেড়েছে আড়াই বিলিয়ন ডলার। ‘মাইক্রোসফট’এর প্রধান নির্বাহী স্টিভ বলমারএর সম্পদ বেড়েছে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার। কেউ কেউ মনে করতে পারেন যে, অর্থনৈতিক মন্দার সময়ে এই মানুষগুলি ঠিক সময়ে ঠিক ব্যবসায়ে থাকার ফলেই লাভবান হয়েছে। কিন্তু এর বাইরেও কিছু ঘটনা রয়েছে, যা এই যুক্তির বিরুদ্ধে যাবে। ক্যাসিনো মালিক শেলডন এডেলসন তার সম্পদ বাড়িয়ে নিয়েছেন ৫ বিলিয়ন ডলার। এলন মাস্কও তার সম্পদ বাড়িয়েছে ১৭ বিলিয়ন ডলার। প্রতিবেদনে মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, এর আগে ২০০৭ সালে হাউজিং কেন্দ্রিক অর্থনৈতিক মন্দার মাঝেও এমনটাই ঘটেছিল। বাড়িঘরের মূল্য পড়ে গিয়েছিল ২১ শতাংশ; শেয়ার বাজারের মূল্য হয়ে গিয়েছিল অর্ধেক; ৮৮ লক্ষ আমেরিকান হয়েছিল বেকার। সেই মন্দার পরপর ২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মাঝে নিচের ৯৯ শতাংশ মানুষের সম্পদ বেড়েছিল শূণ্য দশমিক ৪ শতাংশ; অপরদিকে উপরের ১ শতাংশ মানুষের সম্পদ বেড়েছিল ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ।

‘ফোর্বস’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় করোনাভাইরাস পরবর্তী বিশ্বে আয় বৈষম্য আরও বাড়ার ব্যাপারে সতর্ক করা হয়। বিভিন্ন গবেষণা বলছে যে, ধনীরা গত মার্চের পর থেকে অর্থ জমাতে সক্ষম হয়েছে; আর অন্যদিকে গরীব লোকেরা আয় না থাকার কারণে বাধ্য হয়েছে নিজেদের শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে দিতে এবং নতুন করে ধারকর্য করতে। ব্রিটেনের ‘রেজোলিউশন ফাউন্ডেশন’এর এক গবেষণা বলছে যে, ব্রিটেনের নিম্ন আয়ের মানুষের বেশিরভাগই জুন মাসে ক্রেডিট কার্ডের উপর বেঁচে ছিল। লাক্সারি জিনিসপত্রের দোকান বন্ধ থাকায় এবং ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা থাকায় ধনী ব্যক্তিদের খরচ কমে গেছে। ‘নিউ পলিসি ইন্সটিটিউট’এর গবেষণা বলছে যে, ব্রিটেনের সমাজের উপরের ২০ শতাংশ মানুষের ব্যাংক একাউন্টে লকডাউনের মাঝে প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার জমে গেছে। হারভার্ডের একদল গবেষক বলছে যে, মার্কিন সমাজের উপরের ২৫ শতাংশ মানুষের খরচ ২০ শতাংশ কমেছে; অথচ নিচের ২৫ শতাংশের খরচ কমেছে মাত্র ৫ শতাংশ। ধনীদেরকে টার্গেট করা লাক্সারি গাড়ি তৈরির কারখানা, দামী জামাকাপড় বিক্রেতা, রেস্টুরেন্ট, হোটেলগুলি বিপদে পড়েছে; আর ব্যবসা মালিকরা খরচ কমাতে গিয়ে কম মজুরির কর্মচারীদেরকে ছাঁটাই করেছে। ধনীদের সম্পদ যারা দেখাশোনা করছেন, তারা আবার উপদেশ দিচ্ছে যে, আপাততঃ বিনিয়োগ এবং খরচ কম করাই ভালো হবে। প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হচ্ছে যে, একজন ধনী ব্যবসায়ী যদি বাড়ি থেকেই কাজ করেন, তাহলে নতুন স্যুট কিনে তিনি কি করবেন? আর তার স্ত্রী যেহেতু কোন পার্টিতে যাচ্ছেন না, তাই নতুন লাক্সারি জিনিসপত্র কিনে তিনি কাকে দেখাবেন? সাধারণ সময়ে বোঝা না গেলেও মহামারি এবং অর্থনৈতিক মন্দার মাঝেই বোঝা যাচ্ছে যে, শুধুমাত্র কিছু ধনী ব্যক্তির ইচ্ছেমত খরচের উপর পুরো অর্থনীতিটা কিভাবে চলছে।

সমাজের উপরের স্তরের মানুষের সাথে নিচের স্তরের মানুষের এই ক্রমবর্ধমান বিভেদ, যা কিনা অর্থনৈতিক মন্দার মাঝে বেড়েছে, এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ‘বিজনেস ইনসাইডার’ বলছে যে, এখানে দু’টা সমস্যার দিকে তাকাতে হবে। প্রথমতঃ সরকার বেশিরভাগ প্রণোদনা দেয় ব্যাংক এবং কর্পোরেটদেরকে। ২০০৮ সালের ‘ইমার্জেন্সি ইকনমিক স্ট্যাবিলাইজেশন এক্ট’এর অধীনে ৭’শ বিলিয়ন ডলার খরচে ব্যাংকগুলির কাছ থেকে মূল্য পড়ে যাওয়া সম্পদ কিনে নেয়া হয়। পরবর্তীতে বারাক ওবামা প্রশাসন ‘ট্রাবল্ড এসেট রিলিফ প্রোগ্রাম’ প্রকল্পের অধীনে বাড়ির মালিকদেরকে ৭৫ বিলিয়ন ডলার প্রণোদনা দিয়ে তাদের সুদ পরিশোধে সহায়তা দেয়। অর্থাৎ ৭’শ বিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা থেকে ৭৫ বিলিয়ন বা ১০ শতাংশ গিয়েছে বাড়ির মালিকদের কাছে; বাকিটা গিয়েছে ব্যাংক এবং কর্পোরেটদের কাছে। দ্বিতীয়তঃ কর্পোরেটদের হাতে প্রণোদনার অর্থ যাওয়ায় তারা শেয়ার বাজারে নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করে নিতে পেরেছে। আর সাধারণ বিনিয়োগকারীরা যারা প্রণোদনার অর্থ পায়নি, তারা ঝরে পড়েছে। মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডেরাল রিজার্ভ ২০০৮ সালে স্বল্পমেয়াদী সুদের হার প্রায় শূণ্যের কোঠায় নামিয়ে নিয়ে আসে। আর এই সুযোগে ব্যবসায়ীয়া পরবর্তী এক দশকে শেয়ার বাজার গরম করে রাখে। ‘স্ট্যান্ডার্ড এন্ড পুওর্স ৫০০’ ইন্ডেক্স মূল্যসূচক ৪’শ ৬২ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। এর অর্থ হলো, মন্দার সবচাইতে খারাপ সময়ে যে ব্যবসায়ী শেয়ার বাজারে ১’শ ডলার বিনিয়োগ করেছে, সে ৪’শ ৬২ ডলার পর্যন্ত কামিয়ে নিতে পেরেছে। আর ১ মিলিয়ন ডলার যে বিনিয়োগ করেছে, সে তুলে নিয়েছে ৪ দশমিক ৬২ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বিনিয়োগের সাড়ে চার গুণেরও বেশি সে তুলে নিতে পেরেছে। ২০০৯ সালের মাঝেই অতিধনী ব্যক্তিরা তাদের সম্পদ ১৯ শতাংশ বাড়িয়ে ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলারে নিয়ে যায়; মন্দার কারণে তারা যা হারিয়েছিল, তার পুরোটাই তারা এক বছরের মাঝেই পুষিয়ে নেয়। ২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মাঝে সকল মানুষের আয় মোট যত বৃদ্ধি পেয়েছে, তার ৯৫ ভাগই গিয়েছে ১ শতাংশ মানুষের হাতে; আর ৯৯ শতাংশ মানুষ পেয়েছে মাত্র ৫ ভাগ। আর যুক্তরাষ্ট্রে ২০২০ সালের মাঝে বিলিয়নায়ারদের সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছে ৮০ শতাংশ।   
 

সারা দুনিয়ায় আয় বৈষম্য এখন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ২০০৮ সালের মতোই ২০২০ সালে করোনাভাইরাসের সময় যখন প্রণোদনা দেয়া হয়, তখনও বেশিরভাগ অর্থ চলে যায় কর্পোরেটদের হাতে। ধনীরা গত মার্চের পর থেকে অর্থ জমাতে সক্ষম হয়েছে; আর অন্যদিকে গরীব লোকেরা আয় না থাকার কারণে বাধ্য হয়েছে নিজেদের শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে দিতে এবং নতুন করে ধারকর্য করতে।
 

২০০৮ সালের মতোই ২০২০ সালে করোনাভাইরাসের সময় যখন প্রণোদনা দেয়া হয়, তখনও বেশিরভাগ অর্থ চলে যায় কর্পোরেটদের হাতে। ‘স্মল বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন’এর মাধ্যমে ৩’শ ৪৯ বিলিয়ন ডলার বিতরণ করা হয়, যার মাঝে ২’শ ৪৩ বিলিয়ন ডলার পায় বড় কর্পোরেটরা; যাদের কোন কোনটা ১’শ মিলিয়ন ডলারের চাইতে বড় কোম্পানি। ১৬ই মার্চ ‘ডাউ জোন্স’ ইন্ডেক্স ইতিহাসে একদিনের সবচাইতে মারাত্মক ধ্বসের মাঝে পড়ে। অথচ ৪ঠা জুনের মাঝেই বিশ্বের সবচাইতে ধনী সাত ব্যক্তির সম্পদ ৫০ শতাংশ বেড়ে যায়! সরকারের প্রণোদনা ঘোষণার পরপরই শেয়ার বাজার চাঙ্গা হয়ে ওঠে এবং স্বাভাবিকভাবেই বড় শেয়ারহোল্ডার ব্যক্তিরা তাদের সম্পদ বাড়িয়ে ফেলে।

২০১০ সালে হাইতিতে ভূমিকম্পের পর ১’শ ৯৫ মিলিয়ন ডলারের যে সহায়তা দেয়া হয়, তার বেশিরভাগই চলে যায় মার্কিন কন্সট্রাকশন কোম্পানির কাছে; হাইতির কোম্পানিগুলি পায় মাত্র আড়াই শতাংশ ফান্ড। ২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অরলিয়ান্সএ হারিকেন ‘ক্যাটরিনা’ আঘাত করার পর মার্কিন কন্সট্রাকশন কোম্পানি ‘কেবিআর’ ৩১ বিলিয়ন ডলারের কাজ পায়। এই কোম্পানির মালিক ‘হ্যালিবারটন’এর প্রধান নির্বাহী ছিলেন প্রাক্তন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি। নিজেদের বিশাল সম্পদের উপরে সরকার থেকে আরও প্রণোদনা পাওয়ায় এই বিলিয়নায়াররা দুর্যোগের মুহুর্তগুলিকে কাজে লাগিয়ে আরও ধনী হয়েছে। আবার একইসাথে বিনিযোগের সুযোগ বাড়াবার নামে এই বিলিয়নায়ারদেরকে দেয়া হয়েছে কর সুবিধা এবং তাদের অতিরিক্ত মুনাফা করতে পারার জন্যে রেখে দেয়া হয়েছে নানা ফাঁকফোঁকড়। উদাহরণস্বরূপ, লিমিটেড কোম্পানিগুলির ক্ষেত্রে কোম্পানি মালিকেরা নির্দিষ্ট আকারের ঋণের বেশি কোন ঋণ ফেরত দেবার জন্যে দায়বদ্ধ থাকে না। বিভিন্ন ছুতো ধরে ‘আমাজন’ কোম্পানি দুই বছরে এক ডলারও কর দেয়নি; আর ২০১৯ সালে তারা আয়ের উপর মাত্র ১ দশমিক ২ শতাংশ কর দেয়! ১৯৮০এর দশক থেকে বিলিয়নায়ারদের কর ৭৯ শতাংশ কমে গেছে! শুধু তাই নয়, এই অতিধনীদের বেশিরভাগ অর্থই অফশোর ব্যাংক একাউন্টে জমা হয়েছে। ২০১৭ সালে কিছু গবেষক বের করেন যে, পুরো দুনিয়ার জিডিপির ১০ শতাংশই এসব অফশোর ব্যাংক একাউন্টে চলে গেছে! ২০১২ সালে আরেক গবেষণায় উঠে আসে যে, প্রায় ৩২ ট্রিলিয়ন ডলার বা ৩২ হাজার বিলিয়ন ডলার অফশোর একাউন্টে জমা রয়েছে! এটা চীনের জিডিপির প্রায় তিন গুণ!

মন্দা থেকে উঠে দাঁড়াতে অনেকেই অনেক ফর্মূলা দিচ্ছেন। ট্রাম্প প্রশাসন জনগণকে নগদ অর্থ প্রদান করতে চাইলে অনেকেই বাধা দিয়েছেন। তবে এরপরেও প্রণোদনার বেশিরভাগ অর্থ ব্যাংক এবং কর্পোরেটদের হাত ঘুরে গুটি কয়েক ধনীদের পকেটেই গিয়েছে। প্রণোদনার অর্থে শেয়ার বাজার চাঙ্গা হয়েছে ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির জন্যেই। আবার ধনীদের খরচের খাতা থমকে যাওয়াতেও চাকুরি হারাতে হয়েছে খেটে খাওয়া মানুষগুলিকেই। ধনীরা কবে আবার খরচ শুরু করবে, সেদিনের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে গরীব মানুষগুলিকে। ধনীদের মতো অর্থ জমানো দূরে থাক, শেষ সম্বলটুকুও বিক্রি করে দিয়ে ক্রেডিট কার্ডের উপর বেঁচে থাকার পথ বেছে নিতে হয়েছে তাদের। অপরদিকে প্রণোদনার অর্থে উঠে দাঁড়ানো ধনীদের অফশোর ব্যাংক একাউন্টও ফুলে ফেঁপে উঠছে। পুঁজিবাদের করুণ অবস্থা করোনাভাইরাসের আগে থেকেই দৃশ্যমান ছিল; বিশেষ করে ব্যাপক আয় বৈষম্যের প্রতিবেদনে পত্রিকার পাতা ভরেছে সাম্প্রতিক সময়ে। করোনাভাইরাসের মাঝে এই করুণ দৃশ্য ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যবস্থায় আয় বৈষম্যের চিত্রটা এখন আর সমাধানের পর্যায়ে নেই। পুঁজিবাদের নিম্নগামীতাকে থামাতে পারছেন না কেউই।

Monday, 31 August 2020

কাশ্মির থেকে উইঘুর... মুসলিমরা জাতীয়তাবাদী রাজনীতির শিকার

৩১শে অগাস্ট ২০২০

 

চীনা সরকারি মিডিয়ায় প্রকাশিত উইঘুরের ডিটেনশন ক্যাম্প।জাতিসংঘের হিসেবে উইঘুরে ১০ লক্ষ মুসলিমকে চীন সরকার আটকে রেখে ‘নতুন করে শিক্ষা’ দিচ্ছে। শুধু কাশ্মির, আসাম বা উইঘুরই নয়; এর সাথে রয়েছে ফিলিস্তিন, সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, ইয়েমেন, লিবিয়া, আরাকান এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলিমদের উপর নির্যাতনের অগুণিত প্রতিবেদন। প্রতিটা ক্ষেত্রেই জাতিরাষ্ট্রগুলি তার নিজস্ব জাতিস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছে। করোনাভাইরাসের মহামারি এবং বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার মাঝে পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত ক্ষয়িষ্ণু বিশ্বব্যবস্থার অন্যতম স্তম্ভ ‘মানবাধিকার’ এখন হাস্যকর এক শব্দে পরিণত হয়েছে। অন্ততঃ মুসলিম বিশ্বের মাঝে জাতীয়তাবাদ প্রসূত স্বার্থের রাজনীতি যে বিভাজন ও অন্যায়ের জন্ম দিচ্ছে, তা মুসলিমদেরকে বিকল্প বিশ্বব্যবস্থা খুঁজতে বেশি অনুপ্রাণিত করবে।

গত ৩১শে জুলাই যুক্তরাষ্ট্র বৃহৎ চীনা কোম্পানি ‘শিনজিয়াং প্রোডাকশন এন্ড কন্সট্রাকশন কর্পোরেশন’ এবং এর দুইজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা প্রাক্তন পার্টি সেক্রেটারি সুন জিলং এবং ডেপুটি সেক্রেটারি পেং জিয়ারুইএর উপর চীনের পশ্চিমের উইঘুর অঞ্চলে মুসলিমদের উপর নির্যাতনের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে অবরোধ আরোপ করে। ‘ভয়েস অব আমেরিকা’ এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলছে যে, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র এই কোম্পানি এবং ব্যাক্তিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা ছাড়াও ব্যাক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেবে এবং মার্কিনীদের এদের সাথে ব্যবসা করার উপর নিষেধাজ্ঞা দেবে। এর আগে গত ১৭ই জুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উইঘুর মুসলিমদের উপর নির্যাতনের কারণ দেখিয়ে তৈরি করা নতুন মার্কিন আইনে স্বাক্ষর করেন। গত ডিসেম্বরে এই আইন মার্কিন কংগ্রেসে প্রায় সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়; যেখানে বিপক্ষে পড়েছিল মাত্র এক ভোট। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল চীনকে মানবাধিকার বিষয়ে একটা বার্তা দেয়া। এই আইনের অধীনে চীনের উইঘুর বা শিনজিয়াং রাজ্যের কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি চেন কুয়াংগুয়োর উপর অবরোধের কথা বলা হয়েছে এবং মার্কিন কোম্পানিগুলিকে উইঘুরের জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি যে কোন পণ্য বর্জন করতে বলা হয়েছে। জাতিসংঘের হিসেবে উইঘুরে ১০ লক্ষ মুসলিমকে চীন সরকার আটকে রেখে ‘নতুন করে শিক্ষা’ দিচ্ছে। মার্কিন নেতৃবৃন্দ বলছেন যে, চীনারা উইঘুরের মুসলিমদের সংস্কৃতি এবং বিশ্বাসকে মুছে ফেলতে চাইছে। অপরদিকে চীনারা বলছে যে, এই ক্যাম্পগুলিতে বিভিন্ন বিষয়ে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে এবং এটা উগ্রবাদী চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণের জন্যে দরকার রয়েছে। চীনারা মার্কিন কংগ্রেসে পাস করা আইনের কড়া সমালোচনা করে বলে যে, এর মাধ্যমে চীনকে খারাপ প্রমাণ করার ষড়যন্ত্র চলছে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে তার ভুল শুধরে নিতে বলা হয়। চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার ব্যাপারেও হুঁশিয়ার করে দেয়া হয়। এতে আরও বলা হয় যে, যুক্তরাষ্ট্র এর থেকে বিরত না হলে চীন এর বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেবে এবং যুক্তরাষ্ট্র এই দ্বন্দ্বের জন্যে পুরোপুরি দায়ী থাকবে। উইঘুর মুসলিমদের সংগঠন ‘ওয়ার্ল্ড উইঘুর কংগ্রেস’ ট্রাম্পকে ধন্যবাদ দিয়ে বলে যে, এটা উইঘুরের জনগণকে আশা দেবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, উইঘুরের মুসলিমদের রক্ষায় তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে? এতে কার স্বার্থই বা কি?

‘বিজনেস ইনসাইডার’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, শুধু উইঘুরই সমস্যা নয়। ভারত তার অধিকৃত কাশ্মির অঞ্চলের বিশেষ অধিকার বাতিল করেছে এবং তার পূর্বের আসাম রাজ্যে বাঙ্গালী মুসলিমদের আটক করার ব্যবস্থা করছে। চীন এবং ভারত উভয়েই বলছে যে, এই ব্যবস্থাগুলি তারা নিচ্ছে সহিংসতা বন্ধ করতে; এবং একইসাথে অন্যান্য দেশগুলিকে তারা এব্যাপারে নাক না গলাতে হুঁশিয়ার করে দিচ্ছে। প্রতিবেদনে বিশেষভাবে বলা হচ্ছে যে, উভয় দেশই মূলতঃ মুসলিমদেরকে টার্গেট করেছে ‘সহিংসতা বন্ধের’ কথা বলে। আর বাকি বিশ্ব এই দুই দেশের বিরুদ্ধে প্রকৃতপক্ষে কোন ব্যবস্থাই নেয়নি। হয় চীনের সাথে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক ধরে রাখতে বা চীনের হুমকির ভয়ে একটা মুসলিম দেশও চীনের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নও চীনকে শুধরে নিতে বলেছে, কিন্তু চীনকে বাধ্য করতে কোন পদক্ষেপই নেয়নি। উইনিভার্সিটি অব কলোরাডোর গবেষক ড্যারেন বায়লার বলছেন যে, অনেককেই চীনের বিরুদ্ধে অনেক কথা বলতে শোনা যাচ্ছে; কিন্তু যখন এর ফলশ্রুতিতে মানবসম্পদ বা অর্থসম্পদহানির কোন সম্ভাবনা দেখা দেয়, তখনই তারা নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে। তারা একইসাথে মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলির নেতৃবৃন্দের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলছে যে, মুসলিম দেশগুলিই তো কিছু করছে না, তাহলে তাদের উপর কেন দায় থাকবে? তারা নিজেদের অবস্থানের সমর্থনে বলছেন যে, অন্ততঃপক্ষে এর বিরুদ্ধে কিছু কথা তো তারা বলছেন।
    

ভারতীয় বাহিনীর পেলেট গানের শিকার কাশ্মিরের জনগণ। মুসলিম হওয়াটাই যেন ছিল তাদের অপরাধ। উইঘুরের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র পদক্ষেপ নিলেও কাশ্মির এবং আসামের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি চুপ থেকেছে। অন্যদিকে কাশ্মির ইস্যুতে সবচাইতে সরব রয়েছে পাকিস্তান; আর ঠিক একইভাবে উইঘুর ইস্যুতে একইরূপ নিস্তব্ধ রয়েছে তারা। পরিষ্কারভাবেই বোঝা যাচ্ছে যে, বিভিন্ন রাষ্ট্রের ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় স্বার্থ এক্ষেত্রে কাশ্মির, উইঘুর এবং আসামের মুসলিমদের উপর নির্যাতন চলমান থাকার পিছনে বড় রকমের ইন্ধন যুগিয়েছে।
 

উইঘুরের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র পদক্ষেপ নিলেও কাশ্মির এবং আসামের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি চুপ থেকেছে। গত অক্টোবরের মার্কিন কংগ্রেসের ‘হাউজ এশিয়া’ সাবকমিটির মানবাধিকার বিষয়ক শুনানিতে এবং এর পরবর্তীতে ‘ইউএস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম’ রিপোর্টে ভারতের মুসলিমদের উপর নাগরিকত্বের শর্ত দিয়ে মানবাধিকার ভূলুন্ঠিত করার কথা এসেছিল। কাশ্মির ইস্যুতে সবচাইতে সরব রয়েছে পাকিস্তান; আর ঠিক একইভাবে উইঘুর ইস্যুতে একইরূপ নিস্তব্ধ রয়েছে তারা। এবছরের জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ‘ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরাম’এর এক আলোচনায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান প্রথমে বলেন যে, তিনি উইঘুরে চীনা সরকারের কর্মকান্ডের ব্যাপারে পুরোপুরি অবগত নন। পরে সাংবাদিকদের চাপের মুখে সরাসরিই বলেন যে, পাকিস্তানের সবচাইতে খারাপ সময়ে চীন পাকিস্তানকে সহায়তায় এগিয়ে এসেছে; তাই তারা চীনা সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ। কাশ্মির ইস্যুতে পাকিস্তানী মিডিয়া যতটা সরব, ততটাই সরব দেখা যাচ্ছে ভারতীয় মিডিয়াকে উইঘুর ইস্যুতে। বিশেষ করে লাদাখ সীমান্তে চীনের সাথে সংঘর্ষ শুরুর পর থেকেই ভারতীয় মিডিয়া উইঘুর ইস্যুতে পাকিস্তানের সমালোচনায় মুখর রয়েছে। পরিষ্কারভাবেই বোঝা যাচ্ছে যে, বিভিন্ন রাষ্ট্রের ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় স্বার্থ এক্ষেত্রে কাশ্মির, উইঘুর এবং আসামের মুসলিমদের উপর নির্যাতন চলমান থাকার পিছনে বড় রকমের ইন্ধন যুগিয়েছে।

ব্রিটেনের ‘ইন্ডেপেন্ডেন্ট’ পত্রিকার প্রবীন কলামিস্ট প্যাট্রিক ককবার্ন বলছেন যে, দুনিয়াব্যাপী জাতীয়তাবাদের এক উত্থান দেখা যাচ্ছে। তিনি বলছেন যে, তুরস্ক তার তুর্কি জাতীয়তাবাদের সাথে ইসলামকে ব্যবহার করে তার প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে; অন্যদিকে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি হিন্দুত্ববাদী চিন্তার উপর ভর করে ভারতের পরিচয় পূননির্ধারণ করতে চাইছে। চীনারাও তাদের হান ভিত্তিক চৈনিক জাতীয়তাবাদকে রাষ্ট্রীয় শক্তির ভিত্তি হিসেবে দেখতে চাইছে। এই জাতীয়তাবাদী চিন্তার ফলে একেকটা দেশের অভ্যন্তরে জাতি এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর বয়ে আসছে অমানুষিক অত্যাচার। অধিকৃত কাশ্মির ছাড়াও ভারতের প্রায় ২০ কোটি মুসলিম সংখ্যালঘুদের উপর যেমন অত্যাচার হচ্ছে, তেমনি চীনের পশ্চিমাঞ্চলের উইঘুর রাজ্যেও কয়েক বছর ধরেই মুসলিমদের উপর চলছে ‘শুদ্ধাভিযান’। তুরস্কের অভ্যন্তরে কুর্দিদেরকে আলাদাভাবে দেখা হচ্ছে তুরস্কের ভৌগোলিক অখন্ডতার প্রতি চ্যালেঞ্জ হিসেবে। ককবার্নের কথাগুলিকে সাম্প্রতিক বিশ্ব মিডিয়ার খবরের সাথে সমন্বয় করলে দেখা যায় যে, প্রতি ক্ষেত্রেই বাইরের দেশগুলি সেই দেশের অভ্যন্তরের সংখ্যালঘুদেরকে সমর্থন দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে চাইছে। কারণ ককবার্ন মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, এই সংখ্যালঘুরা কতটুকু শক্তিশালী, তা নির্ভর করছে বিশ্বব্যাপী তারা কতটা রাজনৈতিক সমর্থন আদায় করতে পারে সেটার উপর। সেই হিসেবেই কাশ্মিরের মুসলিমদের পক্ষে দাঁড়িয়েছে পাকিস্তান; কুর্দিদের আলাদা রাষ্ট্র গড়ার পিছনে মদদ যোগাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র; আর গত এক বছরের মাঝে উইঘুর মুসলিমদের পক্ষে কথা বলে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলি ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে চীনকে চাপের মুখে রাখতে চাইছে।
    

উইঘুরের সন্দেহভাজন ক্যাম্পগুলির মানচিত্র। অনেককেই চীনের বিরুদ্ধে অনেক কথা বলতে শোনা যাচ্ছে; কিন্তু যখন এর ফলশ্রুতিতে মানবসম্পদ বা অর্থসম্পদহানির কোন সম্ভাবনা দেখা দেয়, তখনই তারা নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে। তারা একইসাথে মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলির নেতৃবৃন্দের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলছে যে, মুসলিম দেশগুলিই তো কিছু করছে না, তাহলে তাদের উপর কেন দায় থাকবে? তারা নিজেদের অবস্থানের সমর্থনে বলছেন যে, অন্ততঃপক্ষে এর বিরুদ্ধে কিছু কথা তো তারা বলছেন।

 

তবে ককবার্ন এক্ষেত্রে বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছেন উইঘুর এবং কাশ্মির ইস্যুতে। কাশ্মিরের জনগণের উপর ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর লকডাউন এবং বিচারবহির্ভূত অত্যাচার ভাইরাসের লকডাউনের চাইতেও বহুগুণে বেশি ক্ষতি করেছে। তবে কাশ্মির ছাড়াও ভারতের প্রায় ২০ কোটি মুসলিমের প্রতি বিজেপি সরকারের শত্রুভাবাপন্ন আচরণ এড়ানো যাবে না। রাম মন্দিরের ভিত্তি স্থাপন করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সেধরণের মনোভাবই দেখিয়েছেন। ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে ফেলার পর ফলাফলস্বরূপ দাঙ্গায় প্রায় ২ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। মোদি সরকার মনে করছে যে, তারা কাশ্মির সমস্যার ‘সমাধান’ করে ফেলবেন। তারা ভারতের বাকি মুসলিমদের ‘সমস্যা’ও সমাধান করে ফেলবেন বলে বলছেন। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারিতে দিল্লীর দাঙ্গাই দেখিয়ে দেয় যে, ২০ কোটি মানুষের সংখ্যালঘু জনসংখ্যাকে এতো হাল্কাভাবে নিলে মারাত্মক ভুল হবে। ভারতের চিন্তাবিদদের চিন্তার দৈন্যতা বোঝাতে ককবার্ন এক্ষেত্রে বৈরুতের কর্মকর্তাদের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, যারা বছরের পর বছর নিশ্চিন্তে বিশাল বোমার উপর বসে ছিলেন। ভারতের সরকারকে পশ্চিমারা নিঃশর্ত সমর্থন দিচ্ছে; কারণ তারা মনে করছে যে, ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় ভারত চীনকে নিয়ন্ত্রণের একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। একই সুত্রে তারা উইঘুর ইস্যুতে মুসলিমদের পক্ষাবলম্বন করছে নিজেদের স্বার্থে।

ঊইঘুর ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান মুসলিমদের ব্যাপারে ট্রাম্পের দীর্ঘমেয়াদী চিন্তার পুরোপুরি বিরুদ্ধে। ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’এর এক প্রতিবেদনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইসলাম এবং মুসলিমবিদ্বেষী মন্তব্যের একটা তালিকা দেয়া হয়। এতে ২০১১ সাল থেকে ট্রাম্পের মুসলিমবিদ্বষী মনোভাবের প্রকাশ পায়। ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে বলেন যে, মুসলিমরা যুক্তরাষ্ট্রকে পছন্দ করে না। আবার বিভিন্ন সময়ে এ-ও বলেন যে, মুসলিমরা যুক্তরাষ্ট্রে টাইম বোমার মতো; এবং তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মসজিদগুলিকে বন্ধ করে দেবার পক্ষেও যুক্তি দেন।

শুধু কাশ্মির, আসাম বা উইঘুরই নয়; এর সাথে রয়েছে ফিলিস্তিন, সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, ইয়েমেন, লিবিয়া, আরাকান এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলিমদের উপর নির্যাতনের অগুণিত প্রতিবেদন। প্রতিটা ক্ষেত্রেই জাতিরাষ্ট্রগুলি তার নিজস্ব জাতিস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছে। রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ফায়দা লুঠতে একে অপরের দুর্বলতা ব্যবহার করতে চেয়েছে; মুসলিমদের বাঁচাবার উদ্দেশ্যে নয়। নিজের ভৌগোলিক অখন্ডতা অটুট রাখতে প্রতিটা জাতিরাষ্ট্র আবার চেয়েছে জাতীয় পরিচয় নির্ধারণ করতে। আর সেক্ষেত্রে জাতিগত এবং বিশ্বাসগত দিক থেকে সংখ্যালঘুরা হয়েছে অমানবিক নির্যাতনের শিকার। জাতীয়তাবাদের নামে চলেছে ‘শুদ্ধিকরণ’, যা উইঘুরই হোক, বা আসামই হোক। অভিভাবকহীন সন্তানের মতো কাশ্মির, আসাম, উইঘুর, আরাকান, ফিলিস্তিনের মুসলিমরা দ্বারে দ্বারে ঘুরছে রাজনৈতিক সমর্থনের জন্যে। প্রত্যেকেই তাদের এই অসহায়ত্বকে ব্যবহার করেছে নিজেদের জাতীয় স্বার্থে। করোনাভাইরাসের মহামারি এবং বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার মাঝে পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত ক্ষয়িষ্ণু বিশ্বব্যবস্থার অন্যতম স্তম্ভ ‘মানবাধিকার’ এখন হাস্যকর এক শব্দে পরিণত হয়েছে। অন্ততঃ মুসলিম বিশ্বের মাঝে জাতীয়তাবাদ প্রসূত স্বার্থের রাজনীতি যে বিভাজন ও অন্যায়ের জন্ম দিচ্ছে, তা মুসলিমদেরকে বিকল্প বিশ্বব্যবস্থা খুঁজতে বেশি অনুপ্রাণিত করবে।

Thursday, 27 August 2020

যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার মাঝে নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা কেন?

২৮শে অগাস্ট ২০২০ 

রাশিয়া সোভিয়েত আমলের ৫০ মেগাটনের বোমা পরীক্ষার ডকুমেন্টারি প্রকাশ করলো এমন সময়ে, যখন কথা উঠছে যে, রাশিয়া এমন এক ধরনের অস্ত্র ডেভেলপ করছে, যা কিনা সাবমেরিন থেকে ছোঁড়া যাবে এবং যা প্রায় ১’শ মেগাটনের পারমাণবিক ওয়ারহেড বহণ করবে। এরকম বোমা যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলের কাছে সমুদ্রের নিচে বিস্ফোরণ ঘটালে ভয়াবহ তেজস্ক্রিয় সুনামিতে নিউ ইয়র্কসহ উপকূলের বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ শহরই ধ্বংস হয়ে যাবে। আর তা মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে পুরোপুরিভাবে বাইপাস করবে। রাশিয়াকে চাপে রাখার যুক্তরাষ্ট্রের নীতিই রাশিয়াকে দুনিয়া বিধ্বংসী অস্ত্র ডেভেলপের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। রাশিয়ার ভৌগোলিক অখন্ডতার চ্যালেঞ্জ রাশিয়াকে প্রতিযোগিতামূলক অস্ত্র তৈরিতে আরও বেশি আক্রমণাত্মক করে তুলতে পারে।



গত ২০শে অগাস্ট রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় আণবিক শক্তি কোম্পানি ‘রসাটম’ একটা ডকুমেন্টারি প্রকাশ করে। এতে ১৯৬১ সালের অক্টোবর মাসে বিশ্বের সবচাইতে শক্তিশালী পারমাণবিক বোমা পরীক্ষা করার কার্যক্রম দেখানো হয়। ২৭ টন ওজনের এবং ২৬ ফুট লম্বা এই বিশাল বোমাটা রাশিয়ার উত্তরের অতিশীতল আর্কটিক সাগরের নোভায়া জেম্বলিয়া দ্বীপের উপর একটা ‘তুপোলেভ ৯৫’ বোমারু বিমান থেকে নিক্ষেপ করা হয়। বিস্ফোরণের ‘মাশরুম ক্লাউড’ ৬৫ কিঃমিঃ উচ্চতা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ৫০ মেগাটন বা ৫০ হাজার কিলোটন শক্তির এই হাইড্রোজেন বোমার অফিশিয়াল নাম ‘আরডিএস ২২০’ হলেও একে এখন ‘জার বম্বা’ বলেই ডাকা হচ্ছে। বোমাটা এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, বোমারু বিমানের পাইলটরা কয়েক ঘন্টা পর ল্যান্ডিং করার সময় ৮’শ কিঃমিঃ দূর থেকেও এই বিস্ফোরণের ‘মাশরুম ক্লাউড’ দেখেছিলেন। বোমার প্রচণ্ডতায় কয়েক’শ কিঃমি দূরের বাড়িঘর ধ্বসে পড়েছিল অথবা জানালা ভেঙ্গে গিয়েছিল। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমা শহরের উপর যে পারমাণবিক বোমা ফেলেছিল, তার শক্তি ছিল ১৫ কিলোটন। ১৯৫৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সবচাইতে শক্তিশালী ‘ক্যাসল ব্রাভো’ পারমাণবিক পরীক্ষার শক্তি ছিল ১৫ মেগাটন। ‘পপুলার মেকানিকস’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ১৯৬৩ সালে বাতাসে পারমাণবিক বোমা পরীক্ষা করা বন্ধের পর থেকে এরকম বোমা পরীক্ষা বিশ্ব আর দেখেনি। এরপর কয়েক দশকে ছোট আকারের পারমাণবিক বোমা ডিজাইন করার প্রতিযোগিতা শুরু হয়; উদ্দেশ্য ছিল বোমার সংখ্যা বাড়িয়ে দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে অনেকগুলি শহরের উপর একসাথে পুংখানুপুখভাবে হামলা করা। আণবিক বিষয়ের ইতিহাস নিয়ে কাজ করা গবেষক রবার্ট নরিস ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’কে বলছেন যে, রুশরাই বারংবার মনে করিয়ে দিয়েছে যে, হাইড্রোজেন বোমা ব্যবহার করারটা কেন চিন্তাও করা উচিৎ নয়। তারা তাদের বিরাট আকারের বোমা পরীক্ষার মাধ্যমে বোমা ব্যবহারের ব্যাপারে ভীতির সঞ্চার করতে চেয়েছে। তবে নরিসের এই বক্তব্য থেকে যে প্রশ্নটা সামনে এসে যায় তা হলো, প্রায় ছয় দশক পর রাশিয়া এই বিশাল বোমা পরীক্ষার ডকুমেন্টারি কেন প্রকাশ করলো?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সরকারের পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার প্রধান ফিলিপ কোইল ‘বিবিসি’র সাথে এক সাক্ষাতে বলেন যে, ১৯৬০এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক প্রযুক্তিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বহু এগিয়ে ছিল। সোভিয়েতরা চাইছিল মানুষ সোভিয়েত ইউনিয়নকে যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ হিসেবে চিন্তা করুক। একারণেই তারা ‘জার বম্বা’র মতো এতো বড় বোমা পরীক্ষা করেছিল। এমনকি এই বোমা এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, সোভিয়েতরাও চাইছিল না যে, পূর্ণ শক্তি নিয়ে এটা পরীক্ষা করা হোক; যেকারণে তারা বোমার ডিজাইন করার সময়েই সীসা ব্যবহার করে এর শক্তিকে কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ করেছিল। পারমাণবিক অস্ত্রের মতো ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের ক্ষেত্রেও আকার নিয়ে কথা বলাটা অদ্ভূত শোনাতে পারে, যেখানে ছোট বোমাগুলিই এককেকটা শহর ধ্বংস করে দিতে সক্ষম। এত বড় বোমার ব্যবহারিক দিকের চাইতে মনস্তাত্বিক দিকটাই বেশি গুরত্বপূর্ণ ছিল।

প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির পাবলিক এন্ড ইন্টারন্যাশনাল এফেয়ার্সএর প্রফেসর ফ্রাঙ্ক ভন হিপেল বলছেন যে, সোভিয়েত আণবিক গবেষক আন্দ্রেই সাখারভ ঠান্ডা যুদ্ধের সময় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ার ঘোর বিরোধিতা করেছিলেন। ১৯৬৭ সালে এক গোপন চিঠিতে তিনি সোভিয়েত নেতৃবৃন্দের কাছে লিখেন যে, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পারমাণবিক যুদ্ধের সম্ভাবনা অনেক বাড়িয়ে দেবে। সাখারভের কথায় বেশ যুক্তি ছিল। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে পারমাণবিক অস্ত্র ছোঁড়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলি অকার্যকর হয়ে গেলে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে এড়াতে সক্ষম নতুন ধরনের অস্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতা শুরু হবে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ১৯৯০এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র চিন্তা করা শুরু করে যে, কোন ‘অবাধ্য’ রাষ্ট্র যদি পারমাণবিক বোমা এবং দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করে ফেলে, তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে মারাত্মক হুমকির সৃষ্টি করবে। কারণ সেরকম ‘আবাধ্য’ রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের যেমন কৌশলগত চুক্তি ছিল, তেমন কোন চুক্তি দ্বারা আবদ্ধ থাকবে না। তবে এতে মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তরসুরী রাশিয়ার। কারণ এতে রাশিয়ার পারমাণবিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলিও তাদের কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে; এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে অনেক পিছিয়ে পড়ার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়।

২০১৯এর অগাস্টে যুক্তরাষ্ট্র ‘ইন্টারমিডিয়েট রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস’ ‘আইএনএফ’ বা মধ্যম পাল্লার পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ন্ত্রণের চুক্তি থেকে নিজেকে বের করে নেবার ঘোষণা দেবার পর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সাবধান করে দিয়ে বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যম পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করার ব্যাপারে যথেষ্ট তথ্য পেলে রাশিয়াও তেমন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করতে বাধ্য হবে। পুতিনের কথাগুলিতে সেই পিছিয়ে পড়ার ভয়ই চলে আসে, যা কিনা সোভিয়েতদের ১৯৬০এর পারমাণবিক কর্মকান্ডে প্রকাশ পেয়েছিল।

ইউক্রেনকে নিজ নিয়ন্ত্রণ থেকে হারাবার পরই রাশিয়া নিজের ভৌগোলিক অখন্ডতা রক্ষার ব্যাপারে সাবধান হতে শুরু করে। ২০১৪ সালে রাশিয়া ইউক্রেনের কাছ থেকে ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখল করে নেবার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করে চলেছে। এমতাবস্থায় ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ভয়ই রাশিয়াকে নতুন অস্ত্র প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে বাধ্য করছে, যার মাধ্যমে স্বল্প সামরিক বাজেটে রাশিয়া নিজের জাতীয় স্বার্থকে রক্ষা করতে পারবে। রাশিয়া সোভিয়েত আমলের ৫০ মেগাটনের বোমা পরীক্ষার ডকুমেন্টারি প্রকাশ করলো এমন সময়ে, যখন কথা উঠছে যে, রাশিয়া এমন এক ধরনের অস্ত্র ডেভেলপ করছে, যা কিনা সাবমেরিন থেকে ছোঁড়া যাবে এবং যা প্রায় ১’শ মেগাটনের পারমাণবিক ওয়ারহেড বহণ করবে। মার্কিন বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, এরকম বোমা যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলের কাছে সমুদ্রের নিচে বিস্ফোরণ ঘটালে ভয়াবহ তেজস্ক্রিয় সুনামিতে নিউ ইয়র্কসহ উপকূলের বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ শহরই ধ্বংস হয়ে যাবে। আর ‘ফরেন পলিসি’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, তা মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে পুরোপুরিভাবে বাইপাস করবে। রাশিয়াকে চাপে রাখার যুক্তরাষ্ট্রের নীতিই রাশিয়াকে দুনিয়া বিধ্বংসী অস্ত্র ডেভেলপের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। রাশিয়ার ভৌগোলিক অখন্ডতার চ্যালেঞ্জ রাশিয়াকে প্রতিযোগিতামূলক অস্ত্র তৈরিতে আরও বেশি আক্রমণাত্মক করে তুলতে পারে।