Showing posts with label nuclear. Show all posts
Showing posts with label nuclear. Show all posts

Tuesday, 24 June 2025

ট্রাম্পের ১২ দিনের যুদ্ধ কিভাবে শেষ হলো?

২৪শে জুন ২০২৫

'বিবিসি'র এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, এটা ছিল সবচাইতে অমায়িক যুদ্ধের একটা উদাহরণ! কারণ ইরান একদিকে যেমন আগে থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বলে দিয়েছিল, তেমনি ট্রাম্প ইরানকে ধন্যবাদ দিয়েছেন কাউকে হতাহত না করার জন্যে। ট্রাম্প যখন বলেছেন যে, তিনি আশা করছেন না যে, ইরান এরপর আর কোন হামলা করবে, তখন এটা চিন্তা করা কঠিন যে, ইরান যুদ্ধ চালিয়ে নেবে। তবে ট্রাম্প ইস্রাইলকেও বলেছেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত না করতে। অন্ততঃ গত দুই সপ্তাহে মিডিয়া এবং সোশাল মিডিয়াতে সত্য-অসত্য মিলে যা প্রচারিত হয়েছে, তা সাধারণ মানুষকে ঘোরের মাঝে রাখার জন্যে যথেষ্ট ছিল। অনেকে তো মনে করা শুরু করেছিলেন যে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে কিনা? এখানেই ভূরাজনীতির খেলাগুলি; যা খুবই সাধারণ চিন্তার উপর; কিন্তু সাধারণের জন্যে বোঝা খুবই কঠিন। অন্ততঃ পত্রিকা পড়ে কারুর পক্ষে এটা বোঝা সম্ভব নয়।



২৪শে জুন যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোশাল মিডিয়ায় ঘোষণা দেন যে, ইরানের সাথে ১২ দিনের যুদ্ধের অবসান হয়েছে, তখন এটা অনেকের জন্যেই বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে যাচ্ছিলো। ট্রাম্প ইরানকে ধন্যবাদ দেন যে, ইরান কাতারের আল-উদাইদ বিমান ঘাঁটিতে হামলার আগে সতর্ক বার্তা দিয়েছিল। 'বিবিসি'র এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, এটা ছিল সবচাইতে অমায়িক যুদ্ধের একটা উদাহরণ! কারণ ইরান একদিকে যেমন আগে থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বলে দিয়েছিল, তেমনি ট্রাম্প ইরানকে ধন্যবাদ দিয়েছেন কাউকে হতাহত না করার জন্যে। ট্রাম্প যখন বলেছেন যে, তিনি আশা করছেন না যে, ইরান এরপর আর কোন হামলা করবে, তখন এটা চিন্তা করা কঠিন যে, ইরান যুদ্ধ চালিয়ে নেবে। তবে ট্রাম্প ইস্রাইলকেও বলেছেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত না করতে।

অন্ততঃ গত দুই সপ্তাহে মিডিয়া এবং সোশাল মিডিয়াতে সত্য-অসত্য মিলে যা প্রচারিত হয়েছে, তা সাধারণ মানুষকে ঘোরের মাঝে রাখার জন্যে যথেষ্ট ছিল। অনেকে তো মনে করা শুরু করেছিলেন যে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে কিনা? এখানেই ভূরাজনীতির খেলাগুলি; যা খুবই সাধারণ চিন্তার উপর; কিন্তু সাধারণের জন্যে বোঝা খুবই কঠিন। অন্ততঃ পত্রিকা পড়ে কারুর পক্ষে এটা বোঝা সম্ভব নয়।

যুদ্ধ সম্পর্কে পশ্চিমা চিন্তাবিদদের কথাগুলি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সেগুলি বলে দেয় যে, পশ্চিমারা কি চাইছে। আর সেটা একইসাথে বলে দেয় যে, ইরান পশ্চিমাদের ইচ্ছাগুলিকে কতটা গুরুত্বের সাথে দেখেছে বা এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেছে কিনা। কেনই বা ইরান চার দিন আগে খালি করে ফেলা কাতারের আল-উদাইদ বিমান ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করলো? আর ট্রাম্প কেনই বা এর প্রত্যুত্তর না দিয়ে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেন? মোট কথা, পশ্চিমা বিশ্লেষকদের মন্তব্যগুলি শুনে বোঝা যায় যে উভয় পক্ষ একই সুরে নাচার চেষ্টা করছে কিনা। যদি সেটা হয়েই থাকে, তার অর্থ হলো, যুদ্ধবিরতি খুবই সন্নিকটে।
 

যদি ধরে নেয়া হয় যে, ইরান ফোর্দো থেকে এনরিচড ইউরেনিয়াম সরিয়ে নিয়েছে, তথাপি এটা নিশ্চিত নয় যে, কি পরিমাণ এনরিচড ইউরেনিয়াম সেখান থেকে সরানো সম্ভব হয়েছে। এছাড়াও সেগুলি দিয়ে একটা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা খুব সহজ কাজ নয়। এনরিচড ইউরেনিয়াম থেকে পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে গেলে যথেষ্ট যন্ত্রপাতি এবং স্থাপনার প্রয়োজন; যেগুলি ইস্রাইল এবং যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই ধ্বংস করেছে; বা সেগুলির যথেষ্ট ক্ষতিসাধন করেছে। এর ফলে ইরান যদি একটা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে যায়, তাহলে তাকে সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপনাগুলিকে আবারও তৈরি করতে হবে; যা বহু সময়ের ব্যাপার। মোটকথা এই আক্রমণের মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রকল্প অনেক পিছিয়ে গেলো।


ফোর্দো এবং ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতার কি হবে?

‘স্কাই নিউজ'এর সাথে কথা বলতে গিয়ে ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক 'রয়াল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইন্সটিটিউট' বা 'রুসি'র প্রাক্তন প্রধান মাইকেল ক্লার্ক বলছেন যে, যেহেতু খবরে প্রকাশ পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে বোমাবর্ষণের আগে ইরানিদেরকে আগেভাগে সতর্ক করেছিল, তার অর্থ হলো ইরান যথেষ্ট সময় পেয়েছে তাদের ফোর্দো পারমাণবিক স্থাপনা খালি করার। ইরানের খুব ভালো করেই জানার কথা যে, সারা দুনিয়ার স্যাটেলাইটগুলি এখন ফোর্দোর ছবি তুলছে। তাই ইরান যখন ফোর্দোর স্থাপনার পাশের রাস্তায় ২০টার মতো ট্রাক জমা করে রেখেছিল, সেটা হতে পারে যে, ইরান জানান দিচ্ছিলো যে, তারা ফোর্দো থেকে এনরিচড ইউরেনিয়াম সরিয়ে নিচ্ছে; অথবা তারা হয়তো সারা বিশ্বকে জানাতে চাইছিলো যে, তারা ইউরেনিয়াম সরিয়ে নিচ্ছে; যদিও তারা সেটা সেই মুহুর্তে করেনি। যদি ধরে নেয়া হয় যে, ইরান ফোর্দো থেকে এনরিচড ইউরেনিয়াম সরিয়ে নিয়েছে, তথাপি এটা নিশ্চিত নয় যে, কি পরিমাণ এনরিচড ইউরেনিয়াম সেখান থেকে সরানো সম্ভব হয়েছে। এছাড়াও সেগুলি দিয়ে একটা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা খুব সহজ কাজ নয়। এনরিচড ইউরেনিয়াম থেকে পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে গেলে যথেষ্ট যন্ত্রপাতি এবং স্থাপনার প্রয়োজন; যেগুলি ইস্রাইল এবং যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই ধ্বংস করেছে; বা সেগুলির যথেষ্ট ক্ষতিসাধন করেছে। এর ফলে ইরান যদি একটা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে যায়, তাহলে তাকে সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপনাগুলিকে আবারও তৈরি করতে হবে; যা বহু সময়ের ব্যাপার। মোটকথা এই আক্রমণের মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রকল্প অনেক পিছিয়ে গেলো।

মার্কিন ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ইয়ান ব্রেমার 'ইউরেশিয়া গ্রুপ'এর 'জি-জিরো মিডিয়া'র এক পডকাস্টে বলছেন যে, আলোচনার সময় যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছিলো যে, ইরান নিজেই তার স্থাপনা ধ্বংস করে ফেলুক। এটা ইরানের নেতৃত্বের জন্যে অতি অপমানজনক ছিল। তাই ইরানিরা চাইছিলো যে, দরকার হলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের হামলার মুখে তাদের সামরিক দুর্বলতাকেই তুলে ধরবে; যা হয়তো ইরানের জনগণের কাছে নিজেদের স্থাপনা নিজেরা ধ্বংস করার চাইতে অধিকতর গ্রহণযোগ্যতা পাবে। তাই ইরানের নেতৃত্ব চাইছিলো যে, মার্কিনীরাই ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করে ফেলুক। অপরদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিঃসন্দেহে ইরানের সাথে সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করতে চাননি। তিনি জানেন যে, বেশিরভাগ মার্কিন জনগণ সেটা সমর্থন করবে না; এমনকি তার সমর্থকদের মাঝেও অনেকে যুদ্ধ চাইবে না। ট্রাম্প চেয়েছেন একটা ঝটপট যুদ্ধ; অনেকটা 'টিকটক-স্টাইলে'। তার প্রথম টার্মের সময় ২০১৯এর সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের আবকাইক তেল শোধনাগারে ইরানের তৈরি ড্রোন দিয়ে হামলা হলেও আরব দেশগুলি এবং ইস্রাইলের যথেষ্ট চাপ থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেননি। কিন্তু এর প্রায় তিন মাস পর ২০২০এর জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউজ ছাড়ার ঠিক আগ মুহুর্তে ট্রাম্প ইরানের জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার নির্দেশ দেন। ইরানিরা যথেষ্ট রাগ প্রদর্শন করলেও অকার্যকর লোক দেখানো কিছু হামলার মাঝেই ইরান তাদের প্রত্যুত্তরকে সীমিত করেছিল। ট্রাম্প হয়তো আশা করেছেন যে, এবারও ইরান সেরকমই আচরণ করবে। ব্রেমার বলছেন যে, যদি ইরান এবং তার প্রক্সিগুলির হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মাঝে তেমন একটা হতাহত না হয়, তাহলে ট্রাম্প ধরে নিতে পারেন যে, এই যাত্রায় তিনি জিতে গেছেন। একইসাথে ইস্রাইলও ধরে নেবে যে, তারা জিতেছে; যদিও এতে শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়নি।

ইরানে মার্কিন হামলার আন্তর্জাতিক প্রভাব কতটুকু?

যুদ্ধবিরতির আগে মার্কিন ইন্টেলিজেন্স সংস্থা 'সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি' বা 'সিআইএ'র প্রাক্তন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গ্লেন কর্ন নিরাপত্তা বিষয়ক ম্যাগাজিন 'সাইফার ব্রীফ'এর সাথে সাক্ষাতে বলেছেন যে, কেউ কেউ বলছেন যে, রাশিয়া ইরানকে সামরিক সহায়তা দেবে। কিন্তু তিনি মনে করছেন না যে, রাশিয়ার আদৌ সেই বাস্তবতা রয়েছে। কারণ তারা নিজেরাই ইউক্রেনের যুদ্ধ থেকে বের হতে পারেনি। আর কিছুদিন আগেই যখন সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের সরকারের পতন ঘটেছিল, তখনও রাশিয়া কিছুই করতে পারেনি। অপরদিকে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে যদি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পায়, তাহলে ভ্লাদিমির পুতিন হয়তো খুশি হতে পারেন; কিন্তু তার বন্ধু শি জিনপিং মোটেই খুশি হবে না। তবে পুতিন হয়তো দুশ্চিন্তায় থাকবেন যে, তিনি মধ্যপ্রাচ্যে তার আরও একজন গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু হারাতে পারেন। ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা থেকেও পুতিন শিক্ষা নিতে পারেন। সত্য বা মিথ্যা সেটা নিশ্চিত নয়, তবে বাজারে ছড়িয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ইস্রাইলকে সহায়তা দেয়ার জন্যেই ইরানের সাথে আলোচনা চালিয়ে নিয়েছে; যাতে করে ইরানিদের দৃষ্টি ভিন্ন দিকে থাকে। এর মাধ্যমে পুতিনের জন্যে শিক্ষা হলো, ট্রাম্পের অধীনে মার্কিন নীতি কি হবে, তা আগে থেকে বলা কঠিন।
 
ইরানের সক্ষমতা রয়েছে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়ার। তবে সেটা তারা খুব সম্ভবতঃ বেশিদিন ধরে রাখতে পারবে না। কারণ ১৯৮০এর দশকে ইরান যখন প্রথমবারের মতো এই কাজটা করেছিল, সেই সময় থেকে প্রযুক্তি অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছে। এবং যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং আরব দেশগুলির কাছে যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে এগুলিকে মোকাবিলা করার। তবে ইরান যদি কয়েক সপ্তাহের জন্যে হরমুজ বন্ধ করে রাখতে সক্ষম হয়, তাহলে তা তেলের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করার জন্যে যথেষ্ট।



ইরান কি হরমুজ আটকে দিতে পারতো?

যুদ্ধবিরতির আগে গ্লেন কর্ন বলছিলেন যে, বর্তমান অবস্থা থেকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে যদি ইরান যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক বন্ধুদের উপর, বিশেষ করে তাদের তেলের স্থাপনাগুলির উপর হামলা করে, অথবা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়ার চেষ্টা করে অথবা মধ্যপ্রাচ্য বা এর বাইরে মার্কিন স্বার্থের উপর সামরিক বা বড় আকারের সাইবার হামলা করে। রালফ গফ বলছেন যে, এই মুহুর্তে যে ব্যাপারটা পরিষ্কার তা হলো, ইরানের কিছু না কিছু প্রত্যুত্তর দিতেই হবে। কাশেম সুলাইমানিকে হত্যার পর ইরান প্রতিশোধ নেবে বলেছিল; কিন্তু সেক্ষেত্রে তারা ব্যর্থ হলেছিল। কিন্তু তার মানে এ-ই নয় যে, তারা সকল ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হবে। ইরানের 'আইআরজিসি' ইরানের বাইরে সরকার বিরোধীদেরকে টার্গেট করতে পারে। এছাড়াও ইরানের সাইবার হামলার সক্ষমতাও রয়েছে।

যুদ্ধবিরতির আগে ‘সিআইএ'তে ইরানের জন্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রাক্তন ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স ম্যানেজার নরমান রুল 'সাইফার ব্রীফ'কে দেয়া সাক্ষাতে বলেছেন যে, হরমুজ প্রণালির কথা উঠলেই সকলে তেলের কথা চিন্তা করে। কিন্তু তেল ছাড়াও বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ দ্রব্য মধ্যপ্রাচ্য থেকে রপ্তানি হয়ে থাকে। যেমন, কাতার বর্তমানে চীন, ভারত, জাপান, কোরিয়ার মতো দেশগুলির জন্যে প্রধান এলএনজি সরবরাহকারী। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিশ্ববাজারে পেট্রোকেমিক্যাল সরবরাহের একটা বড় অংশ যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। মিথানল এবং রাসায়নিক সারের বড় সরবরাহকারী এখন মধ্যপ্রাচ্য। মধ্যপ্রাচ্য থেকে গ্যাস এবং এলএনজি সরবরাহের সমস্যা তৈরি হলে রাসায়নিক সারের সরবরাহেও সমস্যা তৈরি হবে। এছাড়াও মধ্যপ্রাচ্য থেকে পাথর, চুনাপাথর ও ক্লিংকার ভারত এবং বাংলাদেশের মতো দেশগুলিতে রপ্তানি হয়। আবার মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিও খাবার, চিনি, সয়াবিন ইত্যাদির জন্যে আমদানির উপর নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালি আটকে গেলে এই সকল পণ্যের সরবরাহেই সমস্যা তৈরি হবে এবং এগুলির বাজারে অস্থিরতা দেখা দেবে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারলে ইরান সাময়িকভাবে এর সুবিধা নিতে পারবে। কারণ ইরানের রয়েছে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫টা তেলের ট্যাঙ্কার জাহাজ; যেগুলি প্রায় ৪০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিয়ে পূর্ব এশিয়ার সমুদ্রে অবস্থান করছে। তেলের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হলেই এই জাহাজগুলি চীনের তেল শোধনাগারগুলিতে তেল সরবরাহ করবে। নরমান রুল বলছেন যে, ইরানের সক্ষমতা রয়েছে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের জন্যে ব্যাপক সমস্যা তৈরি করার। জিপিএস জ্যামিং-এর কারণে কোন একটা জাহাজ তার অবস্থান হারিয়ে ভুলবশতঃ ইরানের জলসীমানায় ঢুকে যেতে পারে। তখন ইরানিরা সেই জাহাজটাকে দখলে নিয়ে নিতে পারে। এছাড়াও বিভিন্ন রকম অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করতে পারে।
 
ইরানিদের দিক থেকে অনেক হুমকি শোনা গেছে; কিন্তু বাস্তবে সেটা করাটা ভিন্ন বিষয়। এরূপ হামলা মুহুর্তের মাঝেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যকে ১'শ ডলারের উপর নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু ইস্রাইলিরা যখন একসাথে ইরানের সকল শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বকে হত্যা করেছে, তখন কতটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, ইরানিরা সুচিন্তিত সিদ্ধান্তই নেবে? এমনও হতে পারে যে, যারা নতুন নেতৃত্ব নেবে, তারা তাদের আবেগকে প্রাধান্য দেবে। আর যখন ইরানের সক্ষমতা দিন দিন নিচের দিকে যাচ্ছে, তখন নেতৃত্বে আসা নতুন লোকেরা আগের মতোই সিদ্ধান্ত নেবে - এটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।


ইরানের অস্ত্রগুলি সম্পর্কে একটা ধারণা দিয়েছেন ব্রিটিশ সামরিক বিশ্লেষক এবং রয়াল নেভির প্রাক্তন কর্মকর্তা এইচ আই সাটন। তিনি তার 'কোভার্ট শোরস' চ্যানেলে এক বিশ্লেষণে বলছেন যে, ইরানের নৌবাহিনী এবং আইআরজিসি-র জাহাজগুলি যত সুন্দর দেখতেই হোক না কেন, সেগুলি পশ্চিমাদের জন্যে কোনরূপ হুমকি হিসেবে দেখা দেবে না। ইরানের সবচাইতে শক্তিশালী অস্ত্র হতে পারে সামুদ্রিক মাইন। মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমাদের মাইন অপসারণের জন্যে জাহাজ রয়েছে ঠিকই, কিন্তু এগুলির কাজ সঠিকভাবে করতে হলে জাহাজগুলিকে ইরানের আক্রমণ থেকে পুরোপুরি সুরক্ষা প্রদান করতে হবে; যা মোটেই সহজ হবে না। ইরানের ছোট ছোট সাবমেরিনগুলি, বিশেষ করে 'ঘাদির-ক্লাস'এর সাবমেরিনগুলি টর্পেডো এবং মাইনের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালির পণ্যবাহী জাহাজগুলি ধ্বংস করতে পারে। ইরানের জাহাজ-ধ্বংসী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যেগুলির কিছু ইয়েমেনের হুথিরা ব্যবহার করেছে। এগুলির সফলতা নির্ভর করছে কোন জাহাজে হামলা করা হচ্ছে এবং জাহাজে কি পণ্য বহণ করা হচ্ছিলো সেটার উপর। এগুলি চীনা ক্ষেপণাস্ত্রের মতো অতটা শক্তিশালী না হলেও জাহাজের যথেষ্ট ক্ষতি করতে পারে। ইরানের জাহাজ-ধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রগুলির মাঝে রয়েছে 'নূর' (চীনা 'সি-৮০২'এর কপি) এবং 'নাসর-১' (চীনা 'সি-৭০৪'এর কপি)। এগুলি জাহাজ ডুবাতে সক্ষম না হলেও যেকোন জাহাজের যথেষ্ট ক্ষতি করতে সক্ষম। তবে একবার ব্যবহার করার পরেই এগুলির লঞ্চারগুলি খুব সম্ভবতঃ পশ্চিমা ইন্টেলিজেন্স খুঁজে পাবে এবং ধ্বংস করে ফেলবে। ইরানের ছোট ছোট স্পীডবোটগুলি যথেষ্ট গুরুত্ব বহণ করবে; বিশেষ করে মনুষ্যবিহীন সুইসাইড বোটগুলি, যেগুলি ওয়ারহেড বহণ করে পণ্যবাহী জাহাজের গায়ে হামলা করতে পারে। ইয়েমেনের হুথিরা এগুলির কার্যকারিতা দেখিয়েছে। যুদ্ধের শুরুতে ইরান নিঃসন্দেহে এরকম অনেক বোট একসাথে পানিতে নামাতে পারবে। এছাড়াও ইরানের রয়েছে বিভিন্ন প্রকারের সুইসাইড ড্রোন বিমান; যেগুলি হয়তো কোন জাহাজ ডোবাতে পারবে না, তবে একসাথে অনেকগুলি ছুঁড়লে একটা শক্ত ডিটারেন্স তৈরি করতে পারে। যদিও এগুলিকে গুলি করে ধ্বংস করাটা খুব কঠিন নয়, তথাপি একটা বেসামরিক জাহাজের জন্যে এটা যথেষ্টই হুমকি। আর এগুলির শক্তিশালী দিক হলো পাল্লা। ভারত মহাসাগরের গভীরে গিয়েও এগুলি একটা জাহাজে হামলা করতে পারবে। ইরানের যেসকল স্বল্প পাল্লার বিমান বিধ্বংসী ব্যবস্থা রয়েছে, সেগুলি হরমুজে বেশ কাজ করবে; বিশেষ করে পশ্চিমা মাইন অপসারণ হেলিকপ্টার এবং সার্ভেইল্যান্স ড্রোনের বিরুদ্ধে এগুলি যথেষ্ট কার্যকর হতে পারে। ইয়েমেনের হুথিরা ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকটা মার্কিন 'রীপার' ড্রোন ধ্বংস করে যথেষ্ট নাম কামিয়েছে।

নরমান রুল বলছেন যে, ইরানের সক্ষমতা রয়েছে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়ার। তবে সেটা তারা খুব সম্ভবতঃ বেশিদিন ধরে রাখতে পারবে না। কারণ ১৯৮০এর দশকে ইরান যখন প্রথমবারের মতো এই কাজটা করেছিল, সেই সময় থেকে প্রযুক্তি অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছে। এবং যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং আরব দেশগুলির কাছে যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে এগুলিকে মোকাবিলা করার। তবে ইরান যদি কয়েক সপ্তাহের জন্যে হরমুজ বন্ধ করে রাখতে সক্ষম হয়, তাহলে তা তেলের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করার জন্যে যথেষ্ট।

যুদ্ধবিরতি ঘোষণার আগে ভূরাজনৈতিক চিন্তাবিদ ইয়ান ব্রেমার বলেছেন যে, যেহেতু ইরানের তেলের স্থাপনাগুলি এখনও হামলার শিকার হয়নি, তাই ইরানও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করা বা আরব দেশগুলির তেলের স্থাপনাগুলির উপর হামলার মতো সিদ্ধান্ত না-ও নিতে পারে। ইরানিদের দিক থেকে অনেক হুমকি শোনা গেছে; কিন্তু বাস্তবে সেটা করাটা ভিন্ন বিষয়। এরূপ হামলা মুহুর্তের মাঝেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যকে ১'শ ডলারের উপর নিয়ে যেতে পারে। অপরদিকে মার্কিনীরা হরমুজে ইরানের যেকোন আক্রমণকে প্রতিহত করার জন্যে যথেষ্টই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। ব্রেমার বলছেন যে, এখনও পর্যন্ত ইরানি নেতৃত্ব সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। কিন্তু ইস্রাইলিরা যখন একসাথে ইরানের সকল শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বকে হত্যা করেছে, তখন কতটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, ইরানিরা সুচিন্তিত সিদ্ধান্তই নেবে? এমনও হতে পারে যে, যারা নতুন নেতৃত্ব নেবে, তারা তাদের আবেগকে প্রাধান্য দেবে। আর যখন ইরানের সক্ষমতা দিন দিন নিচের দিকে যাচ্ছে, তখন নেতৃত্বে আসা নতুন লোকেরা আগের মতোই সিদ্ধান্ত নেবে - এটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

ইয়ান ব্রেমার পরবর্তীতে 'সিএনএন'এর সাথে এক সাক্ষাতে বলছেন যে, ইরানের সরকার ইস্রাইল এবং মার্কিন সামরিক স্থাপনার উপর হামলাগুলিকে বেশ বড় করে দেখিয়েছে এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির দাবি করেছে। এবং একইসাথে তারা বলেছে যে, ফোর্দোতে তেমন কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। এই কথাগুলি তারা বলেছে ইরানের জনগণকে ঠান্ডা করার জন্যে। অথচ সত্যটা হলো, মার্কিন ঘাঁটিগুলিতে হামলার আগে ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়ে দিয়েছে, যাতে করে মার্কিনীদের মাঝে কেউ হতাহত না হয়। ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে বার্তা দিচ্ছিলো যে, যুক্তরাষ্ট্র যেন নতুন করে আর কোন হামলা না করে। ইরান ইচ্ছা করলে এমন সকল টার্গেটে হামলা করতে পারতো, যেখানে মার্কিনীদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ততটা শক্তিশালী নয়। অথবা তারা যদি আগাম বলে না দিতো, সেক্ষেত্রেও মার্কিনীদের জন্যে কিছুটা সমস্যা হতো। তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার দিকেও আগায়নি। ইরানের নেতৃত্ব বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে এগিয়েছে। অপরদিকে ট্রাম্প ইস্রাইলকে যুদ্ধ বন্ধ করতে বলেছেন ঠিকই কিন্তু ইস্রাইল সেটা কতটুকু মানবে, সেটা এখনও নিশ্চিত নয়। আর ইস্রাইল যদি ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালিয়ে যেতে থাকে, তাহলে ইরানেও যে আবেগপ্রবণ হয়ে কেউ কিছু করবে না, সেটা নিশ্চিত করে বলা যায় না।
 
লেবাননের শিয়াদের মাঝে অনেকেই প্রশ্ন করছেন যে, যখন লেবাননের উপর ইস্রাইলি হামলা চলছিলো, তখন কেন ইরান তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ব্যবহার করেনি? ইরান কেন লেবাননে তাদের বন্ধুদের রক্ষায় এগিয়ে এলো না? আর হিযবুল্লাহর সদস্যরা এখন ইরানের সাথে ইস্রাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতে সরাসরি যুক্ত হতে চাইছে না। অন্ততঃ সাম্প্রতিক সময়ে ইস্রাইলি ইন্টেলিজেন্স হিযবুল্লাহর নেতৃত্বকে যেভাবে টার্গেট করেছে, সেটার পুনরাবৃত্তি তারা দেখতে চাইছে না। তবে হিযবুল্লাহর মাঝে হতাশ হয়ে যাওয়া কিছু গ্রুপ ইস্রাইল ও মার্কিন টার্গেটে হামলা করার চেষ্টা করলে অবাক হবার কিছু নেই।


ইরানের প্রক্সিগুলির ভবিষ্যৎ কি?

মার্কিন ইন্টেলিজেন্স সংস্থা 'সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি' বা 'সিআইএ'র প্রাক্তন কর্মকর্তা রালফ গফ নিরাপত্তা বিষয়ক ম্যাগাজিন 'সাইফার ব্রীফ'এর সাথে সাক্ষাতে বলছেন যে, ইস্রাইলের ইন্টেলিজেন্স একদিকে যেমন ৭ই অক্টোবরের হামলায় নিজেদের ব্যার্থতা দেখিয়েছে; ঠিক তেমনি পরবর্তীতে আশ্চর্য্য রকম নিখুঁতভাবে হামাস এবং হিযবুল্লাহর নেতৃত্বকে ধ্বংস করে তাদের সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। এর মাধ্যমে ইস্রাইল ইরানের আঞ্চলিক প্রক্সিগুলিকে একেবারেই দুর্বল করে ফেলেছে। এমতাবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ইরানে হয়তো অনেকেই প্রশ্ন করা শুরু করবে যে, আঞ্চলিক প্রক্সি এবং পারমাণবিক প্রকল্পের পিছনে ইরান যে পরিমাণ বিনিয়োগ করেছিল, তার কোনটাই শেষ পর্যন্ত কাজে আসেনি। আর পর্দার আড়ালে নিশ্চয়ই অনেক বার্তা দেয়া হবে ইরানের প্রক্সিগুলিকে, যাতে করে তারা ভবিষ্যতে ইরানের লেজুড়বৃত্তি করা থেকে দূরে থাকে।

গ্লেন কর্ন বলছেন যে, ইস্রাইল এবং যুক্তরাষ্ট্র এখন চাইছে হিযবুল্লাহকে পুরোপুরিভাবে নিরস্ত্র করতে। কিন্তু লেবাননের সেনাবাহিনীর সেই সক্ষমতা নেই; এবং একইসাথে লেবাননের সরকারের আর্থিক সক্ষমতা নেই ইস্রাইলি হামলায় লেবাননের ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকাগুলিকে পুনর্গঠন করার। অথচ এটা সকলেই জানে যে, লেবাননে হিযবুল্লাহর জনপ্রিয়তার একটা বড় কারণ হলো লেবাননের অর্থনীতিতে ইরানের আর্থিক বিনিয়োগ। তবে গ্লেন কর্ন বলছেন যে, লেবাননে তার পরিচিতদের থেকে তিনি জানতে পারছেন যে, লেবাননের শিয়াদের মাঝে অনেকেই প্রশ্ন করছেন যে, যখন লেবাননের উপর ইস্রাইলি হামলা চলছিলো, তখন কেন ইরান তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ব্যবহার করেনি? ইরান কেন লেবাননে তাদের বন্ধুদের রক্ষায় এগিয়ে এলো না? আর হিযবুল্লাহর সদস্যরা এখন ইরানের সাথে ইস্রাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতে সরাসরি যুক্ত হতে চাইছে না। অন্ততঃ সাম্প্রতিক সময়ে ইস্রাইলি ইন্টেলিজেন্স হিযবুল্লাহর নেতৃত্বকে যেভাবে টার্গেট করেছে, সেটার পুনরাবৃত্তি তারা দেখতে চাইছে না। তবে হিযবুল্লাহর মাঝে হতাশ হয়ে যাওয়া কিছু গ্রুপ ইস্রাইল ও মার্কিন টার্গেটে হামলা করার চেষ্টা করলে অবাক হবার কিছু নেই।
 
আল-উদাইদ বিমান ঘাঁটি আমেরিকানরা খালি করেছিল চার দিন আগেই। এরপরেও ইরানিরা এই ঘাঁটিতেই হামলা করে এবং হামলার আগে আমেরিকানদেরকে আগাম সতর্কবাণীও দেয়। পশ্চিমারা যখন একটা মুসলিম দেশকে ধ্বংস করেছে, তখন বাকিরা সাইডলাইনে বসে ছিল। তারা কি জানতো না যে, তাদের পালা আসছে? হয়তো তারা জানতো। তবে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির সামনে ইরানের আত্মসমর্পণ দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আগে থেকে জানলেও তারা তাদের তথাকথিত বাস্তবতাকে মেনেই নিয়েছে। এবং সেই অনুযায়ীই তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে - একই সুরে নেচেছে। বিনিময়ে তারা আপাততঃ ক্ষমতা ধরে রেখেছে ঠিকই, কিন্তু রাষ্ট্র, বিশেষ করে রাষ্ট্রের সামরিক শক্তি, হয়েছে ধ্বংসপ্রাপ্ত। 


ইরানের সরকার পতনের সম্ভাবনা কতটুকু?

যুদ্ধবিরতি ঘোষণার আগে 'সিআইএ'র রালফ গফ বলেছেন যে, গত কয়েক দশকে ইরানের সরকারের সমর্থনে লেবানন এবং ইরাকের মিলিশিয়ারা বিভিন্ন সময়ে মার্কিন সামরিক সদস্যাদের উপর হামলা চালিয়েছে। তিনি বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র একটা দুর্বল ইরানের সুযোগ নিয়ে সেই হামলাগুলির শোধ নিয়েছে দেখে তিনি খুশি হয়েছেন। তবে যেহেতু ইরানের সরকার পরিবর্তনকে মার্কিন সরকার তাদের প্রকাশ্য লক্ষ্যের মাঝে রাখেনি, তাই ইরানের সরকারকে তার যতটাই অপছন্দ হোক না কেন, তাদেরকে মেনে নিতেই হচ্ছে। ইয়ান ব্রেমার বলছেন যে, ইস্রাইলিদের সক্ষমতা নেই ইরানের সরকার পরিবর্তন করার। এই কাজটা শুধুমাত্র বোমা ফেলে বা মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে করা যাবে না; প্রয়োজন হবে বড় আকারের সেনাবাহিনীর; যেটার ব্যাপারে এই মুহুর্তে পশ্চিমাদের কেউই আগ্রহী নয়। আর আরও বড় কথা হলো, ইরানের ৯ কোটি মানুষকে সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে; যার কোন প্রমাণ এখনও পাওয়া যাচ্ছে না। বলাই বাহুল্য যে, ইরান সিরিয়া নয়। বরং যেটা হবার সম্ভাবনা বেশি তা হলো, ইরানের দুর্বল হয়ে যাওয়া নেতৃত্ব আঞ্চলিকভাবে বিভিন্ন গ্রুপকে সহায়তা দেবে। এই কাজটা করার জন্যে তাদের হারাবার কিছু থাকবে না; কারণ তাদের ডিটারেন্সগুলি সবগুলিই নিঃশেষ হয়ে যাবে। ইরানিরা জানবে যে, ইস্রাইলিরা যেকোন মুহুর্তে হামলা করে তাদের নেতৃত্বকে হত্যা করতে পারে। এরূপ পরিস্থিতিতে ইরানের নেতৃত্বে যারা থাকবে, তারা অনেক ক্ষেত্রেই সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত না নিয়ে আবেগকে প্রাধান্য দিতে পারে।

ট্রাম্পের সমালোচক হয়েও ইয়ান ব্রেমার বলছেন যে, একদিন আগেও যেটা পরিষ্কার ছিল না তা হলো, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ট্রাম্পের জন্যে একটা বিরাট সফলতা। কারণ কয়েক দশক ধরে কয়েকটা মার্কিন প্রশাসন যেটা করতে পারেনি (ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প বন্ধ করা), সেটা ট্রাম্প করে দেখিয়েছেন কয়েক দিনের মাঝে। ইরান সেভাবেই কাজ করেছে, যা ট্রাম্প চেয়েছেন; একারণেই ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছেন। ব্রেমারের কথাগুলি পশ্চিমা চিন্তারই প্রতিফলন – পশ্চিমারা চাইছে মুসলিম বিশ্বের ভিন্ন ভিন্ন জাতিরাষ্ট্রগুলি একে একে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সামনে নিজেদেরকে সঁপে দেয়। ২০০১ সালে আফগানিস্তান, ২০০৩ সালে ইরাক, ২০১১ সালে লিবিয়া এবং সিরিয়া, ২০২৩ সালে গাজা, ২০২৪-২৫ সালে লেবাননের পর ২০২৫ সালে ইরানের বিরুদ্ধে পশ্চিমা হামলার ইতিহাস যেন আগেই লিখা হয়ে গিয়েছিল। এখন শুধু হিসেব করতে হবে যে, পরবর্তী টার্গেট কে? পাকিস্তান? তুরস্ক? মিশর? বাংলাদেশ? ২০০১ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা বিশ্ব মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে আগ্রাসন অব্যাহত রেখেছে এবং লক্ষ লক্ষ মুসলিমকে হত্যা করেছে। তারা যখন একটা দেশকে ধ্বংস করেছে, তখন বাকিরা সাইডলাইনে বসে ছিল। তারা কি জানতো না যে, তাদের পালা আসছে? হয়তো তারা জানতো। তবে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির সামনে ইরানের আত্মসমর্পণ দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আগে থেকে জানলেও তারা তাদের তথাকথিত বাস্তবতাকে মেনেই নিয়েছে। এবং সেই অনুযায়ীই তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে - একই সুরে নেচেছে। বিনিময়ে তারা আপাততঃ ক্ষমতা ধরে রেখেছে ঠিকই, কিন্তু রাষ্ট্র, বিশেষ করে রাষ্ট্রের সামরিক শক্তি, হয়েছে ধ্বংসপ্রাপ্ত। এ যেন স্যামুয়েল হান্টিংটনের 'ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশনস'এর কার্বন কপি। ১৯৯৬ সালে হান্টিংটন কিন্তু ধরেই নিয়েছিলেন যে, মুসলিমরা একসময় একত্রিত হবেই; যা হবে পশ্চিমা সভ্যতার জন্যে মারাত্মক চ্যালেঞ্জ। একারণেই তিনি লিখেছিলেন যে, চীন (যারা খুব সম্ভবতঃ মুসলিমদের সহায়তা করবে) এবং মুসলিম বিশ্বের প্রচলিত ও অপ্রচলিত সামরিক শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ ও ধ্বংস করতে হবে। যারা তখন বোঝেনি, আজকেও কি তারা এটা বুঝতে পারছেন না?

Monday, 17 March 2025

উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সাবমেরিন – ধ্বংসপ্রাপ্ত বিশ্বব্যবস্থার আরও প্রমাণ

১৭ই মার্চ ২০২৫

মার্চ ২০২৫। উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জন উন একটা শিপইয়ার্ডে সে সাবমেরিন তৈরি প্রত্যক্ষ করতে যান। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সাবমেরিন প্রকল্পের সাথেসাথে প্রশান্ত মহাসাগরে দু'টা দেশের নৌবাহিনীতে পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন যুক্ত হতে যাচ্ছে। অপরটা হলো অস্ট্রেলিয়া। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং অস্ট্রেলিয়ার মাঝে 'অকাস' চুক্তির মাধ্যমে প্রশান্ত মহাসাগরে পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনের যুগ শুরু হয়েছিল। তখন যারা 'অকাস' চুক্তির বিরুদ্ধে কথা বলেছিল, তারা সকলেই এখন পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন যোগাড় করতে ছুটবে। প্রশান্ত মহাসাগরের পারমাণবিকীকরণ ধ্বংসপ্রপ্ত বিশ্বব্যবস্থায় আসন্ন সংঘাতের জানান দিচ্ছে মাত্র!


গত ৮ই মার্চ উত্তর কোরিয়ার সরকারি মিডিয়া 'কোরিয়া সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি' খবর প্রকাশ করে যে, উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন তৈরি করছে; যা কিনা কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র বহণে সক্ষম। উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জন উন একটা শিপইয়ার্ডে সে সাবমেরিন তৈরি প্রত্যক্ষ করতে যান। দক্ষিণ কোরিয়ার 'হানইয়াং ইউনিভার্সিটি'র প্রফেসর এবং সেদেশের নৌবাহিনীর সাবেক সাবমেরিন কর্মকর্তা মুন কিউন-সিক 'সিএনএন'কে বলছেন যে, তার ধারণা এই সাবমেরিনটা ৬ হাজার থেকে ৭ হাজার টনের হতে পারে। কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র বলতে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র বোঝানো হয়েছে। ১০টা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হয়তো এরকম একটা সাবমেরিন বহণ করতে সক্ষম হতে পারে। ২০২১এর শুরুতে অস্টম ওয়ার্কার্স পার্টি কংগ্রেসে কিম জন উন বলেছিলেন যে, তার দেশ পারমাণবিক সাবমেরিন, ‘সলিড ফুয়েল' আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র, হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র, গোয়েন্দা স্যাটেলাইট এবং 'মাল্টি ওয়ারহেড' ক্ষেপণাস্ত্র পাবার জন্যে কাজ করছে। সেই সময় থেকে উত্তর কোরিয়া এই প্রযুক্তির বিভিন্ন রকম পরীক্ষা চালিয়েছে। এসকল প্রযুক্তি উত্তর কোরিয়া কিভাবে পেলো, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। মুন কিউন-সিক মনে করছেন যে, ইউক্রেনের সাথে যুদ্ধে সেনা ও রসদ সরবরাহের বিনিময়ে উত্তর কোরিয়া রাশিয়ার কাছ থেকে এসকল প্রযুক্তি পেয়েছে। উত্তর কোরিয়া হয়তো আগামী এক থেকে দুই বছরের মাঝেই এই সাবমেরিন পানিতে ছাড়বে। ২০১৬ সাল থেকে উত্তর কোরিয়া পানির নিচ থেকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের পরীক্ষা চালিয়ে আসছে। এই পরীক্ষাগুলি করা হচ্ছিলো ২ হাজার টনের একটা পরীক্ষামূলক সাবমেরিন থেকে।

মার্কিন নৌবাহিনীর 'অফিস অব নেভাল ইন্টেলিজেন্স' বা 'ওএনআই'এর প্রাক্তন প্রধান অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার এডমিরাল মাইক স্টুডেম্যান নিরাপত্তা বিষয়ক ম্যাগাজিন 'সাইফার ব্রীফ'কে বলছেন যে, এটা জানাই ছিল যে, উত্তর কোরিয়া পাঁচ বছরের মাঝে পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন পেতে চাইছে, যেটা কৌশলগত অস্ত্র বহণ করতে সক্ষম হবে। সাম্প্রতিক সময়ে উত্তর কোরিয়া পানির নিচ থেকে উৎক্ষেপিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। এর মাঝে কিছু ছিল স্বল্প পাল্লার; যেগুলি সর্বোচ্চ ৫'শ থেকে ৬'শ কিঃমিঃএর বেশি যেতে পারবে না। তবে পরবর্তীতে তারা একটা ভার্সন তৈরি করেছে যেটার পাল্লা ২ থেকে আড়াই হাজার কিঃমিঃ হতে পারে। 'পুকগুকসং-৫' নামের সর্বশেষ প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ৩ হাজার কিঃমিঃ পর্যন্ত হতে পারে। উত্তর কোরিয়ার পশ্চিমে পীত সাগরের গভীরতা দেড়'শ ফুটের বেশি নয়; তবে পূর্বের জাপান সাগরের গভীরতা ৫ হাজার ফুটের বেশি। জাপান সাগর থেকে এরকম একটা সাবমেরিন ৩ হাজার কিঃমিঃ পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গুয়াম সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত হানতে পারবে।
 
২৪শে এপ্রিল ২০১৬। ২০১৬ সাল থেকে উত্তর কোরিয়া পানির নিচ থেকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের পরীক্ষা চালিয়ে আসছে। উত্তর কোরিয়ার জন্যে আপাততঃ সীমিত পরিসরে 'সেকেন্ড স্ট্রাইক ক্যাপাবিলিটি' (নিজ ভূমিতে শত্রুর হামলায় নিজের ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ধ্বংস হয়ে গেলেও শত্রুকে প্রত্যুত্তর দিতে পারা) ডেভেলপ করাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে। পিয়ং ইয়ং যদি সাগরকে ব্যবহার করে ভিন্ন একটা দিক থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার সক্ষমতা পেয়ে যায়, তাহলে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থেকে রক্ষা করাটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে কিছুটা হলেও কঠিন হবে।


মার্কিন ইন্টেলিজেন্স সংস্থা 'সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি' বা 'সিআইএ'র প্রাক্তন ইস্ট-এশিয়া অপারেশন্সএর ডিরেক্টর জোসেফ ডেট্রানি 'সাইফার ব্রীফ'কে বলছেন যে, ২০২১ সাল থেকেই জানা ছিল যে, উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক সাবমেরিন পেতে চাইছে। এরপর ২০২৪ সালে কিম জং উন রাশিয়ার ভ্লাডিভস্টকে রুশ প্রশান্ত মহাসাগরীয় ফ্লিট ভিজিট করেন। তাই তাদের হাতে পারমাণবিক সাবমেরিন দেখে অবাক হবার কিছু নেই। উত্তর কোরিয়া নিয়ে যেকোন খবর এলেই সকলে হাই তোলেন এবং ভিন্ন দিকে মুখ ফিরিয়ে নেন। কিন্তু এখানে যুক্তরাষ্ট্রের চিন্তিত হবার কারণ রয়েছে শুধুমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রের কারণেই নয়, রাশিয়ার সাথে উত্তর কোরিয়ার সম্পর্কের কারণেও।

'ওএনআই'এর এডমিরাল স্টুডেম্যান বলছেন যে, উত্তর কোরিয়া নিশ্চিত করতে চাইছে যে, কোন শক্তিশালী রাষ্ট্র যাতে উত্তর কোরিয়ার উপর হামলা করে না বসতে পারে। এটা নিশ্চিত করতেই তারা হয়তো রাশিয়ার কাছে পারমাণবিক সাবমেরিনের প্রযুক্তি চেয়েছে। বিনিময়ে তারা হয়তো ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে সৈন্য ও রসদ দিয়ে সহায়তা করেছে। ‘সিআইএ'এর জোসেফ ডেট্রানি বলছেন যে, উত্তর কোরিয়া 'হোয়াসং-১৯' ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখন্ডে আঘাত হানতে সক্ষম। এই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র যা পারতো না, তা এখন পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনের মাধ্যমে তারা অর্জন করতে যাচ্ছে। এছাড়াও উত্তর কোরিয়া স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করেছে। এগুলির প্রযুক্তি তারা নিঃসন্দেহে রাশিয়া থেকে পেয়েছে। 'হোয়াসং-১৯' ক্ষেপণাস্ত্রের কিছু প্রযুক্তিও উত্তর কোরিয়া হয়তো রাশিয়া থেকেই পেয়েছে।
 
১৯শে অক্টোবর ২০২১। সাবমেরিন থেকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সাবমেরিন তৈরির খবর মার্কিন নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের বিচলিত করেছে। একদিকে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে সামরিক সহায়তা দেয়ার বিনিময়ে উত্তর কোরিয়া যে রাশিয়ার কাছ থেকে কৌশলগত প্রযুক্তি পেয়েছে, সেব্যাপারে যেমন সকলেই একমত, তেমনি গত এক দশকের মাঝে উত্তর কোরিয়ার উপর যুক্তরাষ্ট্র যে তার সকল প্রভাব হারিয়েছে, এই ঘটনা তার প্রমাণ। আর এটাও এখন নিশ্চিত যে, ইউক্রেন যুদ্ধের ফলাফল যে প্রশান্ত মহাসাগরের ভূরাজনীতিকেও প্রভাবিত করতে পারে, সেটাও যুক্তরাষ্ট্র আগে বুঝতে পারেনি। 


মার্কিন নৌবাহিনীর প্রাক্তন এডমিরাল জেমস স্টাভরাইডিস নিরাপত্তা ম্যাগাজিন 'সাইফার ব্রীফ'কে বলছেন যে, ইউক্রেনের সাথে যুদ্ধে ১২ হাজার সেনা এবং রসদ সরবরাহ করার পুরষ্কার হিসেবে রাশিয়া উত্তর কোরিয়াকে ইন্টেলিজেন্স এবং প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে। এর মাঝে হয়তো পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনের প্রযুক্তি সহ পারমাণবিক অস্ত্রের প্রযুক্তিও থাকতে পারে। এই সাবমেরিনগুলিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকবে কিনা, তা এখনও নিশ্চিত নয়; তবে এগুলি নিঃসন্দেহে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বহণ করবে। আর পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন হলো সমুদ্রের সবচাইতে মারাত্মক শিকারী। এরকম একটা সাবমেরিন যদি কিম জং উনের হাতে পড়ে, তা সকলকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করবে। তাইওয়ানকে ঘিরে চীনের সাথে কোন সংঘাত হলে উত্তর কোরিয়ার এই সাবমেরিনকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চিন্তা করতে হবে। কারণ এই সাবমেরিন হয়তো তখন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তিকে বিভাজিত করে ফেলতে পারবে। এর চাইতেও বড় সমস্যা হলো, যদি এরকম একটা সাবমেরিন প্রশান্ত মহাসাগরে বের হয়ে পার্ল হারবার, বা লস এঞ্জেলেস বা ওয়াশিংটন স্টেটের উপকূলের কাছাকাছি অবস্থান নেয়, আর এতে যদি পারমাণবিক ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র থাকে, তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে ভয়াবহ হুমকি তৈরি করবে। কারণ একটা পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন প্রায় অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত পানির নিচে অবস্থান করতে সক্ষম।

তবে 'ওএনআই'এর এডমিরাল মাইক স্টুডেম্যান বলছেন যে, এরকম একটা সাবমেরিনের প্রশান্ত মহাসাগরে বেরিয়ে আসা এতটা সহজ নয়। কারণ তাকে তখন জাপান এবং রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা দ্বীপগুলির মাঝ দিয়ে মহাসাগরে প্রবেশ করতে হবে। আপাততঃ মনে হচ্ছে যে, উত্তর কোরিয়ার জন্যে মহাসাগরে যাওয়াটা অনেক বড় পদক্ষেপ হবে। উত্তর কোরিয়ার জন্যে আপাততঃ সীমিত পরিসরে 'সেকেন্ড স্ট্রাইক ক্যাপাবিলিটি' (নিজ ভূমিতে শত্রুর হামলায় নিজের ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ধ্বংস হয়ে গেলেও শত্রুকে প্রত্যুত্তর দিতে পারা) ডেভেলপ করাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে। পিয়ং ইয়ং যদি সাগরকে ব্যবহার করে ভিন্ন একটা দিক থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার সক্ষমতা পেয়ে যায়, তাহলে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থেকে রক্ষা করাটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে কিছুটা হলেও কঠিন হবে। তিনি বলছেন যে, এরকম একটা প্রযুক্তি প্রথমবারের মতো হাতে পাবার পর উত্তর কোরিয়া হয়তো দুই-তিন বছর সেটা নিয়ে পরীক্ষা করবে। তারা সেটাকে কতদূর পর্যন্ত নিতে পারবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। যদি উত্তর কোরিয়া সার্বক্ষনিকভাবে 'সেকেন্ড স্ট্রাইক ক্যাপাবিলিটি' রাখতে চায়, তাহলে তাদের ৩ থেকে ৫টা সাবমেরিন প্রয়োজন হবে। কারণ একটাকে সমুদ্রে রাখতে হলে বাকিগুলিকে মেইনটেন্যান্সের কোন না কোন পর্যায়ে থাকতে হবে। এটা সম্ভব করতে হলে হয়তো ১০ বছর লেগে যেতে পারে।
 
মার্চ ২০২৫। উত্তর কোরিয়ার সাবমেরিনটা ৬ হাজার থেকে ৭ হাজার টনের হতে পারে।  ডোনাল্ড ট্রাম্প কিম জন উনএর সাথে আলোচনা করেছিলেন ২০১৮ সালে। গত চার বছরে উত্তর কোরিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্র কোন কথা বলেনি। একারণেই কিম জন উন যুক্তরাষ্ট্রের উপর সকল আশা ছেড়ে দিয়ে তার দেশের সংবিধান পরিবর্তন করে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়াকে প্রধান শত্রু হিসেবে লিপিবদ্ধ করেছেন।


এডমিরাল স্টাভরাইডিস মনে করেন যে, চীনের সাথে উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক আস্ট্রেলিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের মতো। কাজেই উত্তর কোরিয়ার হাতে পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন যাওয়াতে চীনের চিন্তার কোন কারণ থাকার কথা নয়। তিনি বলছেন যে, অস্ট্রেলিয়াকে পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন দেয়ার জন্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন যে 'অকাস' চুক্তি করেছে, সেই চুক্তিতে জাপানকে ঢোকানো যেতে পারে। যদিও জাপান পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের ব্যাপারে অনিচ্ছুক, তথাপি উত্তর কোরিয়ার হাতে পারমাণবিক সাবমেরিন জাপানকে তাদের চিন্তা পরিবর্তনে প্রভাবিত করতে পারে। তবে 'ওএনআই'এর এডমিরাল স্টুডেম্যান বলছেন যে, উত্তর কোরিয়ার হাতে পারমাণবিক সাবমেরিন চীনের জন্যে সুখকর বিষয় নয়। এতে পিয়ং ইয়ংএর উপর চীনের প্রভাব নিঃসন্দেহে কমে যাচ্ছে; এবং উত্তর কোরিয়া রাশিয়ার বলয়ে প্রবেশ করছে। উত্তর কোরিয়া এখন চীনের বদলে রাশিয়া থেকেও প্রায় সকল দ্রব্যের সরবরাহ পাচ্ছে। চীনারা হয়তো নিজেদেরকে প্রশ্ন করবে যে, কোন ঘাটতির কারণে তারা উত্তর কোরিয়াকে নিজেদের বলয়ে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি মনে করছেন যে, উত্তর কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনরূপ শান্তিচুক্তির ব্যাপারে হাল ছেড়ে দিয়েছে। ওয়াশিংটন ও পিয়ং ইয়ংএর মাঝে সম্পর্কে এখন কোন বিশ্বাস নেই। উত্তর কোরিয়া চেয়েছিল আলোচনার মাধ্যমে তাদের উপর থেকে অর্থনৈতিক অবরোধ সরিয়ে নিতে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তাদেরকে এমন কিছু দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তার ফলশ্রুতিতে এখন উত্তর কোরিয়া রাশিয়া থেকেই অনেক কিছু পাচ্ছে এবং তাদের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনার গুরুত্ব এখন একেবারেই নেই।

‘সিএইএ'র জোসেফ ডেট্রানি বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে সবচাইতে বড় ভুল ছিল বুঝতে না পারা যে, কিম জং উন পুতিনের দিকে ঘুরে যাচ্ছেন। একইসাথে ডেট্রানি বলছেন যে, তিনি নিজে ইউক্রেন যুদ্ধে ১২ হাজার উত্তর কোরিয় সেনা দেখে মনে করেছিলেন যে, সেটা ছিল প্রতিকী। কিন্তু সেটা তার ভুল বিশ্লেষণ ছিল; বরং সেটা ছিল পুরোপুরিভাবে কৌশলগত ব্যাপার। ডোনাল্ড ট্রাম্প কিম জন উনএর সাথে আলোচনা করেছিলেন ২০১৮ সালে। গত চার বছরে উত্তর কোরিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্র কোন কথা বলেনি। একারণেই কিম জন উন যুক্তরাষ্ট্রের উপর সকল আশা ছেড়ে দিয়ে তার দেশের সংবিধান পরিবর্তন করে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়াকে প্রধান শত্রু হিসেবে লিপিবদ্ধ করেছেন। জোসেফ ডেট্রানি মনে করছেন যে, এখনও উত্তর কোরিয়ার সাথে একটা স্বাভাবিক সম্পর্ক অসম্ভব নয়। উত্তর কোরিয়ার উপরে অবরোধ কমানোর ব্যাপারে কথা বলা যাবে। যদিও এটা দাবি করাটা বোকামি হবে যে, উত্তর কোরিয়া তাদের পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ করলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সাথে কথা বলতে রাজি হবে। তবে এখন উত্তর কোরিয়াকে আলোচনায় বসানো অপেক্ষাকৃত কঠিন হলেও পুতিনের সাথে ট্রাম্পের সম্পর্ক এখানে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। পুতিন হয়তো কিম জং উনকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় বসতে প্রভাবিত করতে পারেন। এতদিন চীন এব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করেনি। কারণ চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক সর্বদাই অবনতির দিকে গিয়েছে। তিনি বলছেন যে, তার বিশ্বাস কিম জন উনের কাছে ট্রাম্পের গ্রহণযোগ্যতা অপেক্ষাকৃত বেশি। তবে আলোচনার দিকে যেতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে কিছুটা হলেও ছাড় দিতে হবে। চীনের সাথে উত্তর কোরিয়ার ৯০ শতাংশ বাণিজ্য থাকলেও এখন উত্তর কোরিয়া তার অনেক কিছুই রাশিয়া থেকে পাচ্ছে; এমনকি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও স্যাটেলাইট তৈরির সহায়তাও আসছে সেখান থেকে। এগুলি চীনের জন্যে যথেষ্টই বিচলিত হবার কারণ। হয়তো চীনারা এখন ভাববে যে, গত চার বছরে তারা উত্তর কোরিয়াকে বাইডেন প্রশাসনের সাথে আলোচনায় বসার জন্যে উপদেশ দিলে সেটা ভালো হতো। হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্টের সাথে উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক কেমন হবে, সেসম্পর্কেও চীন এখন নিশ্চিত হতে পারবে না। চীনারা হয়তো এখন চিন্তা করবে যে, ভূকৌশলগত দিক থেকে উত্তর কোরিয়ার উপর চীনের প্রভাব কমে যাবার ব্যাপারটাকে তারা কিভাবে পুনরুদ্ধার করবে।
 
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী তার প্রভাব কতটা হারিয়েছে তা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। উত্তর কোরিয়াকে বিরত করার একমাত্র কার্ড এখন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এই ঘটনায় চীনের বিচলিত হওয়াটাও স্বাভাবিক। কারণে এতে উত্তর কোরিয়ার উপর চীনের প্রভাব কমে গিয়ে রাশিয়া সেই জায়গা নিয়েছে। অপরদিকে ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতির আলোচনার মাঝে রাশিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের সম্ভাবনা এবং উত্তর কোরিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্টের সম্ভাব্য সম্পর্কের ব্যাপারে অনিশ্চয়তা চীনাদেরকে ধোঁয়াশার মাঝে রাখবে। 


উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সাবমেরিন তৈরির খবর মার্কিন নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের বিচলিত করেছে। একদিকে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে সামরিক সহায়তা দেয়ার বিনিময়ে উত্তর কোরিয়া যে রাশিয়ার কাছ থেকে কৌশলগত প্রযুক্তি পেয়েছে, সেব্যাপারে যেমন সকলেই একমত, তেমনি গত এক দশকের মাঝে উত্তর কোরিয়ার উপর যুক্তরাষ্ট্র যে তার সকল প্রভাব হারিয়েছে, এই ঘটনা তার প্রমাণ। আর এটাও এখন নিশ্চিত যে, ইউক্রেন যুদ্ধের ফলাফল যে প্রশান্ত মহাসাগরের ভূরাজনীতিকেও প্রভাবিত করতে পারে, সেটাও যুক্তরাষ্ট্র আগে বুঝতে পারেনি। এই সময়ের মাঝে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী তার প্রভাব কতটা হারিয়েছে তা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। উত্তর কোরিয়াকে বিরত করার একমাত্র কার্ড এখন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এই ঘটনায় চীনের বিচলিত হওয়াটাও স্বাভাবিক। কারণে এতে উত্তর কোরিয়ার উপর চীনের প্রভাব কমে গিয়ে রাশিয়া সেই জায়গা নিয়েছে। অপরদিকে ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতির আলোচনার মাঝে রাশিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের সম্ভাবনা এবং উত্তর কোরিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্টের সম্ভাব্য সম্পর্কের ব্যাপারে অনিশ্চয়তা চীনাদেরকে ধোঁয়াশার মাঝে রাখবে। একটা ব্যাপার নিশ্চিত, তা হলো, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সাবমেরিন প্রকল্পের সাথেসাথে প্রশান্ত মহাসাগরে দু'টা দেশের নৌবাহিনীতে পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন যুক্ত হতে যাচ্ছে। অপরটা হলো অস্ট্রেলিয়া। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং অস্ট্রেলিয়ার মাঝে 'অকাস' চুক্তির মাধ্যমে প্রশান্ত মহাসাগরে পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনের যুগ শুরু হয়েছিল। তখন যারা 'অকাস' চুক্তির বিরুদ্ধে কথা বলেছিল, তারা সকলেই এখন পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন যোগাড় করতে ছুটবে। প্রশান্ত মহাসাগরের পারমাণবিকীকরণ ধ্বংসপ্রপ্ত বিশ্বব্যবস্থায় আসন্ন সংঘাতের জানান দিচ্ছে মাত্র!

Saturday, 4 March 2023

ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প … ইস্রাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সংঘাত কি আসন্ন?

০৪ঠা মার্চ ২০২৩

ইরানের পারমাণবিক স্থাপনার 'সেন্ট্রিফিউজ' পরিদর্শনে দেশটার প্রেসিডেন্ট। ইস্রাইলের পক্ষ থেকে ইরানে হামলার কথা বলাটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। প্রেসিডেন্ট বাইডেনও বলেন যে, ইস্রাইলের যা করা প্রয়োজন, তাদের তা করা উচিৎ; যুক্তরাষ্ট্র তাদেরকে সমর্থন দেবে। কিন্তু ইস্রাইল এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই হিসেব করে চলছে। কারণ ইরানের উপর যেকোন হামলা পুরো অঞ্চলকে অস্থির করবে এবং বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটাবে। ইউক্রেন যুদ্ধ এবং চীনের সাথে ‘গ্রেট পাওয়ার’ দ্বন্দ্বের মাঝে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটা যুদ্ধ মোটেই কেউই চাইছে না।

বিভিন্ন মিডিয়াতে প্রকাশ যে, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘আইএইএ’র সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তারা জানুয়ারি মাসে ইরানের ‘ফোরদো’ পারমাণবিক স্থাপনায় ইউরেনিয়ামের মাঝে ৮৩ দশমিক ৭ শতাংশ বিশুদ্ধ্বতা পেয়েছেন। কয়েক বছর ধরে ইউরেনিয়াম ‘এনরিচমেন্ট’এর মাধ্যমে ইরান এই অবস্থানে পৌঁছেছে। এর অর্থ হলো, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে যতটা বিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম প্রয়োজন, ইরান তার খুব কাছাকাছি পোঁছে গেছে। ইউরেনিয়াম হলো একপ্রকারের খনিজ, যা বিশুদ্ধ বা ‘এনরিচ’ করলে পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্যে ‘এনরিচড’ ইউরেনিয়াম পাওয়া যায়। ‘সেন্ট্রিফিউজ’ নামের এক যন্ত্রের মাধ্যমে ইউরেনিয়াম থেকে ‘ইউ২৩৫’ অংশগুলি আলাদা করে ফেলার ব্যাপারটাকেই বলা হয় ‘এনরিচমেন্ট’। যে ইউরেনিয়ামের মাঝে ৩ থেকে ৫ শতাংশ ‘ইউ২৩৫’ রয়েছে, সেগুলি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত হয়। পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্যে ৯০ শতাংশের বেশি ‘ইউ২৩৫’ প্রয়োজন।

‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ইরানের ভাষ্য হলো, ‘আইএইএ’র প্রতিবেদনে আসা সংখ্যা মূলতঃ অনিচ্ছাকৃত ওঠানামার কারণেই পাওয়া গেছে। ২০১৫ সালে ইরান পশ্চিমা দেশগুলির সাথে চুক্তি করে পারমাণবিক প্রকল্প স্থগিত করে; বিনিময়ে ইরানের উপরে নিষেধাজ্ঞা অনেকটাই তুলে নেয়া হয়। কিন্তু ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার্কিন সরকার চুক্তি থেকে বের হয়ে যায় এবং ইরানের উপরে পুনরায় অবরোধ আরোপ করে। এর প্রতিবাদে ইরান আবারও ইউরেনিয়াম ‘এনরিচ’ করা শুরু করে। প্রায় দুই বছর ধরে প্রকাশ্যেই তারা ৬০ শতাংশ ইউরেনিয়াম ‘এনরিচ’ করছে। জো বাইডেনের মার্কিন প্রশাসন ইরানের সাথে পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনা পুনরায় শুরু করতে চাইলেও গত এক বছর ধরে তা থেমে রয়েছে।

গত ২০শে ফেব্রুয়ারি ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র নাসের কানানি সাংবাদিকদের বলেন যে, ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পের ইস্যুগুলি ‘টেকনিক্যাল’ আলাপ এবং দ্বিপাক্ষিক আলোচনাতে না তুলে মিডিয়ার সামনে তুলে নিয়ে আসার অর্থ হলো ‘আইএইএ’ তাদের পেশাদারিত্ব হারিয়েছে। একইসাথে ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলছে যে, ইরানের আণবিক শক্তি সংস্থার মুখপাত্র বেহরুজ কামালভান্দি সরাসরিই বলেছেন যে, ইরান কখনোই ৬০ শতাংশের বেশি ইউরেনিয়াম ‘এনরিচ’ করেনি। পহেলা মার্চ ইরানের বার্তা সংস্থা ‘ইরনা’কে ইরানের আণবিক শক্তি সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ এসলামি বলেন যে, ‘আইএইএ’র নমুনা এতটাই নগন্য যে, তা খালি চোখে দেখাই সম্ভব নয়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কি পরিমাণ ইউরেনিয়াম ‘এনরিচ’ করার পর মজুত করা হয়েছে।

তবে ২৬শে ফেব্রুয়ারি মার্কিন মিডিয়া ‘সিবিএস’এর সাথে এক সাক্ষাতে মার্কিন ইন্টেলিজেন্স ‘সিআইএ’র প্রধান উইলিয়াম বার্নস বলেন যে, তাদের বিশ্বাস ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এখনও পুনরায় পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সিদ্ধান্ত নেননি; যা কিনা ২০০৩ সালের পর থেকে ইরান স্থগিত করেছে। তবে এর বাইরে আরও দু’টা যায়গায় তারা অনেকদূর এগিয়ে গেছে। প্রথমতঃ ইরান যদি ইচ্ছা করে, তাহলে কয়েক সপ্তাহের মাঝেই ৯০ শতাংশ ইউরেনিয়াম ‘এনরিচমেন্ট’ পেরিয়ে যেতে পারবে। আর দ্বিতীয়তঃ তারা পারমাণবিক ওয়ারহেড বহণে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির দিকেও যথেষ্ট অগ্রগামী হয়েছে। কাজেই যদিও ইরান এখনও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়নি, তথাপি অন্যান্য ব্যাপারগুলি পুরো পরিস্থিতিকে চ্যালেঞ্জিং করে ফেলেছে। ২৮শে ফেব্রুয়ারি মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তা কলিন কাহল মার্কিন কংগ্রেসের কমিটির সামনে বলেন যে, ইরানের ক্ষেত্রে শান্তিপূর্ণ অবস্থান থেকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করার সক্ষমতার মাঝে যে দূরত্ব, তা ১২ মাস থেকে কমে গিয়ে ১২ দিনে নেমে এসেছে।

পহেলা মার্চ মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র নেড প্রাইস সাংবাদিকদের বলেন যে, বাইডেন প্রশাসনের নীতি হলো, ইরানকে কোন অবস্থাতেই পারমাণবিক অস্ত্র পেতে না দেয়া। এই লক্ষ্যে তাদের বিশ্বাস কূটনীতিই সবচাইতে ভালো পদ্ধতি। কারণ এই সমস্যার একটা স্থায়ী সমাধান হওয়া প্রয়োজন; যাতে করে ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র পাবার মতো অবস্থানে যেতে না পারে। তবে তারা অন্য কোন পদ্ধতিই হিসেব থেকে বাদ দেননি। তবে প্রাইস বলেন যে, ২৮শে ফেব্রুয়ারির ‘আইএইএ’র প্রতিবেদনে কি ছিল, সেটা নিয়ে তিনি কথা বলতে পারবেন না; কারণ সেই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। তবে তারা ইরানের প্রায় ৮৪ শতাংশ ইউরেনিয়াম ‘এনরিচমেন্ট’এর ব্যাপারে মিডিয়ার প্রতিবেদনগুলি দেখেছেন। এই মুহুর্তে যুক্তরাষ্ট্র তার ইউরোপিয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলির সাথে কথা বলেই এগুবে।

তবে ইস্রাইলি ও মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা ‘ব্লুমবার্গ’ বলছে যে, ২০২৩ সালের শেষ নাগাদ ইরানের হাতে ১০টা পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্যে যথেষ্ট ‘এনরিচড’ ইউরেনিয়াম থাকবে। ইরান যদি রাশিয়ার কাছ থেকে ‘এস-৪০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয় করে তাহলে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনার উপর ইস্রাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার সিদ্ধান্ত এগিয়ে আসবে। যদিও রাশিয়া ইরানের কাছে ‘এস-৪০০’ বিক্রি করার কথা প্রকাশ করেনি, তথাপি ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়া এবং ইরান কাছাকাছি চলে এসেছে। এরকম একটা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ইরানে কার্যকর হতে দুই বছরের কম সময় লাগতে পারে। ইরানি পার্লামেন্টের একজন সদস্য বলেছেন যে, মার্চ মাসেই ইরান রাশিয়ার কাছ থেকে অত্যাধুনিক ‘সুখোই-৩৫’ যুদ্ধবিমান পেতে যাচ্ছে। ইরান ইতোমধ্যেই রাশিয়ার কাছ থেকে ‘এস-৩০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পেয়েছে। ইস্রাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এক সপ্তাহ আগেই তেল আভিভের এক নিরাপত্তা আলোচনায় বলেন যে, যত বেশি সময় অপেক্ষা করা হবে, ইরানের উপর হামলার ব্যাপারটা ততটাই কঠিন হয়ে যাবে। ব্রিটিশ সামরিক থিংকট্যাঙ্ক ‘জেনস’এর জেরেমি বিনি বলছেন যে, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ইস্রাইল আকাশ থেকে আকাশে জ্বালানি সরবরাহ করার বিমান পেতে চলেছে, যা ইরানের অভ্যন্তরে ইস্রাইলের হামলা করার সক্ষমতাকে অনেকটাই এগিয়ে নেবে।

‘ব্লুমবার্গ’ বলছে যে, ইস্রাইলের পক্ষ থেকে ইরানে হামলার কথা বলাটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। প্রেসিডেন্ট বাইডেনও ১৯শে ফেব্রুয়ারি বলেন যে, ইস্রাইলের যা করা প্রয়োজন, তাদের তা করা উচিৎ; যুক্তরাষ্ট্র তাদেরকে সমর্থন দেবে। কিন্তু ইস্রাইল এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই হিসেব করে চলছে। কারণ ইরানের উপর যেকোন হামলা পুরো অঞ্চলকে অস্থির করবে এবং বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটাবে। ইউক্রেন যুদ্ধ এবং চীনের সাথে ‘গ্রেট পাওয়ার’ দ্বন্দ্বের মাঝে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটা যুদ্ধ মোটেই কেউই চাইছে না।

Sunday, 18 December 2022

চীনকে নিয়ে ভারতের দুশ্চিন্তা পুরো দক্ষিণ এশিয়াকে অস্থির করছে

১৮ই ডিসেম্বর ২০২২
 
অরুণাচল প্রদেশে চীনের সাথে দ্বন্দ্বের কয়েকদিনের মাঝেই ভারত 'অগ্নি-৫' ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। ভারতীয়রা বলছে যে, এর পাল্লা বেইজিং পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া সম্ভব। এতকাল দিল্লীর চিন্তাবিদেরা চীনের সাথে স্থিতাবস্থায় থাকার নীতি অনুসরণ করলেও ডানপন্থী হিন্দুত্ববাদী সরকারের অধীনে ভারত দ্রুতই আধুনিক অস্ত্রের জন্যে ওয়াশিংটনের দিখে ঝুঁকছে। পশ্চিমা অস্ত্রের উপরে ভারতের নির্ভরশীলতা এবং দক্ষিণ এশিয়াতে চীনকে মোকাবিলায় ভারতের সামরিক শক্তি প্রদর্শন অত্র অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে; যা প্রতিবেশী দেশগুলির প্রতিরক্ষা নীতিকেও প্রভাবিত করবে।

গত ১৩ই ডিসেম্বর ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, গত ৯ই ডিসেম্বর ভারত এবং চীনের সেনাবাহিনীর সদস্যরা অরুণাচল প্রদেশের ‘তাওয়াং সেক্টর’ নামের সীমান্ত এলাকায় সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল। এতে উভয় পক্ষের সেনারা স্বল্প আহত হয়েছে। ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং পার্লামেন্টে বলেন যে, চীনা সৈন্যদের আগ্রাসী মনোভাবকে ভারতীয় সেনারা রুখে দিয়েছে। দুই পক্ষের মাঝে হাতাহাতি লড়াইয়ে ভারতীয় সেনাদের প্রতিরোধের মুখে চীনারা নিজেদের ব্যারাকে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। একই দিনে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওয়াং ওয়েনবিন সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এব্যাপারে সরাসরি কোন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন।

অরুণাচল প্রদেশে দুই দেশের মাঝে দ্বন্দ্বের পরপরই ভারত পারমাণবিক ওয়ারহেড বহণে সক্ষম ‘অগ্নি-৫’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। ‘দ্যা টাইমস অব ইন্ডিয়া’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ৫ হাজার কিঃমিঃ। ভারতের সামরিক কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা ‘এএনআই’ বলছে যে, ভারতীয় গবেষকেরা এই ক্ষেপণাস্ত্রের মাঝে কিছু ধাতুর পরিবর্তে কম্পোজিট ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করে এর ওজন প্রায় ২০ শতাংশ কমিয়ে এনেছেন। এর ফলশ্রুতিতে এর পাল্লা ৭ হাজার কিঃমিঃ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা সম্ভব; যা কিনা চীনের রাজধানী বেইজিংকেও এর টার্গেটের মাঝে যোগ করবে। তবে এই পাল্লা পর্যন্ত ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালানো হবে কিনা, তা নির্ভর করছে রাজনৈতিক সদিচ্ছার উপর। চীন এবং পাকিস্তানের দুই ফ্রন্টের হুমকি মোকাবিলায় ভারত আক্রান্ত হলে প্রত্যুত্তর দেয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে চাইছে। এর অংশ হিসেবে তারা ভূমি থেকে ছোঁড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছাড়াও সাবমেরিন থেকে ছোঁড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও ডেভেলপ করছে।

ভারতের ডানপন্থী হিন্দুত্ববাদীরা অরুণাচল প্রদেশে চীনাদের সাথে দ্বন্দ্বে বিজয় দাবি করছে। ‘দ্যা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ পত্রিকার এক লেখায় ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ‘বিজেপি’র জন্মদাতা সংস্থা ‘আরএসএস’এর সদস্য এবং ‘ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন’এর বোর্ড অব গভর্নরের সদস্য রাম মাধব বলছেন যে, লাদাখের সমস্যা যেখানে দুই বছর ধরে ঝুলে আছে, সেখানে অরুণাচল প্রদেশের দ্বন্দ্ব মাত্র দুই ঘন্টার মাঝে সমাধান হয়েছে। লাদাখের চাইতে অরুণাচল প্রদেশে ভারতের সামরিক অবস্থান অনেক বেশি শক্তিশালী; যা এখন চীনকে মেনে নিতে হবে। কয়েক দশক ধরে ভারত চীনের সাথে দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চললেও ২০১৭ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভারতের চীন নীতিতে পরিবর্তন এনেছেন। ১৯৯৩, ১৯৯৫, ২০০৫ এবং ২০১২ সালের সীমানা সমঝোতায় শান্তির কথা বলা হলেও শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়নি। মোদির নীতি হলো ‘সশস্ত্র সহাবস্থান’, যা একসময় মাও সে তুংএর নীতি ছিল। এই নীতির হিসেবে ভারত কূটনীতিকে এগিয়ে নেবার সাথেসাথে সামরিক অবস্থানকেও শক্তিশালী করছে।

রাম মাধব ভারতের সামরিক অবস্থানকে শক্তিশালী বললেও সকলে তার সাথে একমত নন। অনেকেই বলছেন যে, ভারতের সামরিক সক্ষমতাকে একটা ভালো অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বেশ বড়সড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ভারতীয় থিঙ্কট্যাংক ‘অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’এর সিনিয়র ফেলো মিহির শর্মা ‘ব্লুমবার্গ’এর এক লেখায় বলছেন যে, বহু বছর ধরে ভারতের সামরিক শক্তিতে কম বিনিয়োগ করা হয়েছে; যার ফলশ্রুতিতে ভারতের সামরিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে গিয়েছে। বিশেষ করে প্রতিদ্বন্দ্বী যদি চীন হয়, তাহলে ভারতের অবস্থান আরও দুর্বল। কিন্তু সমস্যা হলো, পাকিস্তানকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে ভারতে জনসমর্থন আদায় করা গেলেও চীনের কথা বলে সেটা এখনও ততটা সম্ভব নয়। কাজেই চীনকে মাথায় রেখে সামরিক বাজেট বৃদ্ধি করাটা খুব একটা সহজ নয়। অপরদিকে সমরাস্ত্রের জন্যে পশ্চিমাদের উপরে পুরোপুরিভাবে নির্ভর করাটাও ভারতের জন্যে মোটেই সমীচিন নয়। কারণ এতে ভারতকে পশ্চিমা প্রক্সি মনে করে চীনারা আরও বেশি আগ্রাসী হয়ে উঠতে পারে। আর যেখানে ভারত সামরিক দ্বন্দ্বের জন্যে মোটেই প্রস্তুত নয়, সেখানে চীনকে উস্কে দেয়াটা আত্মহত্যার সামিল। একারণেই ভারতীয় নেতারা একদিকে যেমন চীনের বিরুদ্ধে কথা বলছেন, অপরদিকে পশ্চিমাদের দ্বিমুখী নীতির সমালোচনা করছেন; যদিও দিল্লীর সকল নীতি নির্ধারকেরাই জানেন যে, পশ্চিমা সামরিক সহায়তা ছাড়া ভারতের চলবে না। কিন্তু নিজেদের সমরাস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াবার কথাগুলি যত ভালোই মনে হোক না কেন, চীনের আগ্রাসনকে মোকাবিলায় কয়েক দশক সময় নিয়ে নিজেদের প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়ন করার অবস্থানে নেই ভারত। এই মুহুর্তে চ্যালেঞ্জ হলো, জনগণকে বোঝানো যে, কেন ভারত তার সামরিক বাজেট বৃদ্ধি করে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ে পশ্চিমাদের কাছ থেকে অস্ত্র কিনবে।

ভারতের সাথে দ্বন্দ্বকে চীনারা পুরোপুরি ভিন্নভাবে দেখছে। প্যারিসে চীনা রাষ্ট্রদূত লু শে সাংবাদিকদের সাথে মত বিনিময়কালে বলেন যে, ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ বলে প্রকৃতপক্ষে কোন কনসেপ্ট নেই। এটা যুক্তরাষ্ট্র তৈরি করেছে ভারতসহ বিভিন্ন দেশকে ব্যবহার করে চীনকে নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে। একসময় সবাই ‘প্যাসিফিক’ বা ‘এশিয়া-প্যাসিফিক’ অঞ্চল নিয়ে কথা বলতো; ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’কে নিয়ে কেউ কথা বলেনি। এখন এখানে ভারত মহাসাগরকে এর মাঝে অন্তর্ভুক্ত করার অর্থ হলো, যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে যে, চীনকে নিয়ন্ত্রণে তার ‘এশিয়া-প্যাসিফিক’ অঞ্চলের বন্ধুরা যথেষ্ট নয়। ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ বলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ভারত এবং ফ্রান্সকে তাদের কৌশলের মাঝে যুক্ত করেছে। ভারতের ‘দ্যা হিন্দু’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, চীনারা ভারতের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সখ্যতাকে ন্যাটোর সাথে তুলনা দিলেও ভারতীয়রা তা অস্বীকার করছে। দিল্লী বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়ার সমন্বয়ে গঠিত ‘কোয়াড’ কোন সামরিক সংস্থা নয়; যদিও কোয়াডের ছত্রছায়ায় বঙ্গোপসাগরে নিয়মিতই বড় আকারের নৌমহড়া চলছে। বেশিরভাগ চীনা বিশ্লেষকেরাই ভারতের সাথে চীনের সম্পর্কের অবনতিকে ভারতের যুক্তরাষ্ট্রের আরও কাছাকাছি যাবার কারণ হিসেবে দেখছেন।

ভারতের ডানপন্থী সরকার চীনের সাথে সীমান্ত সংঘাতকে চীনের আগ্রাসী মনোভাব হিসেবে দেখছে। অপরদিকে চীনারা ভারতের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহযোগিতাকে চীন বিরোধী জোট হিসেবে দেখছে। এতকাল দিল্লীর চিন্তাবিদেরা চীনের সাথে স্থিতাবস্থায় থাকার নীতি অনুসরণ করলেও ডানপন্থী হিন্দুত্ববাদী সরকারের অধীনে ভারত দ্রুতই আধুনিক অস্ত্রের জন্যে ওয়াশিংটনের দিখে ঝুঁকছে। পশ্চিমা অস্ত্রের উপরে ভারতের নির্ভরশীলতা এবং দক্ষিণ এশিয়াতে চীনকে মোকাবিলায় ভারতের সামরিক শক্তি প্রদর্শন অত্র অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে; যা প্রতিবেশী দেশগুলির প্রতিরক্ষা নীতিকেও প্রভাবিত করবে।

Monday, 26 September 2022

ইউক্রেনকে ঘিরে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা কতটুকু?

২৬শে সেপ্টেম্বর ২০২২
 
পুতিন হয়তো মনে করছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপিয় বন্ধুরা, বিশেষ করে জার্মানরা হয়তো পুতিনের হুমকিকে ভিন্ন চোখে দেখতে পারে; যদিও জার্মানরা আপাততঃ কোন দুর্বলতা দেখায়নি। তবে যে ব্যাপারটা নিশ্চিত তা হলো, মার্কিনীরা পুতিনের পারমাণবিক হুমকিকে সত্যিকারের বুঝেও উপেক্ষা করতে প্রস্তুত; যা কিনা ইউরোপে প্রথমবারের মতো পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।

গর ২১শে সেপ্টেম্বর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এক টেলিভিশন ভাষণে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন। তিনি ইউক্রেন যুদ্ধের জন্যে আংশিক ‘মোবিলাইজেশন’এর ঘোষণা দেন; যার অর্থ হলো, কিছু ব্যাতিক্রম ছাড়া সাধারণ নাগরিকদের মাঝ থেকে সামরিক বাহিনীতে কাজ করার মতো উপযুক্ত ব্যক্তিদের বাধ্যতামূলক রিক্রুটিংএর ব্যবস্থা করা। তার দ্বিতীয় ঘোষণাটা ছিল ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে রুশদের দখল করা এলাকায় গণভোটের আয়োজন করা। আর তৃতীয় ঘোষণাটা ছিল, রাশিয়া তার নিজস্ব ভূমি রক্ষায় পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে। ভ্লাদিমির পুতিনের এই ঘোষণাগুলিকে সকলেই যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সবচাইতে মারাত্মক অবস্থা বলে আখ্যা দিচ্ছেন।

‘দ্যা ইকনমিস্ট’এর এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, যদিও পুতিন বলেছেন যে, ‘মোবিলাইজেশন’এর মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে পূর্বে সামরিক ট্রেনিংপ্রাপ্ত প্রায় ৩ লক্ষ নাগরিককে ডাকা হবে, তথাপি সংখ্যাটা এর চাইতেও অনেক বাড়তে পারে। এই ঘোষণার পর রাশিয়ার ৩০টা শহরে বিক্ষোভ হয়েছে; যেখানে শতশত মানুষকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। দ্বিতীয় ঘোষণায় দখলকৃত এলাকায় গণভোটের কথা বলা হলেও মূলতঃ সেই অঞ্চলগুলিকে রাশিয়ার অন্তর্ভুক্তিকরণের সিদ্ধান্ত এটা। তৃতীয় ঘোষণায় পুতিন বলেছেন যে, দখলকৃত এলাকাগুলি যদি রাশিয়ার অংশ হয়ে যায়, তাহলে রাশিয়া সেই অঞ্চলগুলিকে রক্ষায় তার পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারে প্রস্তুত থাকবে। রাশিয়ার কাছে বহু কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র থাকলেও পশ্চিমাদের মূল ভয় হলো রাশিয়া ছোট আকারের ‘ট্যাকটিক্যাল’ পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করে ইউক্রেন এবং তাদের পশ্চিমা বন্ধুদেরকে মনস্তাত্বিকভাবে দুর্বল করে ফেলে তাদেরকে যুদ্ধ বন্ধের জন্যে আলোচনায় বসতে বাধ্য করতে পারে। পুতিনের এই হুমকি কোন ফাঁকা হুমকি নয়। ‘দ্যা ইকনমিস্ট’ যুক্তরাষ্ট্র এবং তার বন্ধুদের আহ্বান করে যে, তারা যেন রাশিয়াকে বার্তা দেয় যে, পশ্চিমারা রাশিয়ার পারমাণবিক ‘ব্ল্যাকমেইল’এ পিছু হটবে না এবং পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করলে পশ্চিমারা মারাত্মক জবাব দেবে।

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পীস’এর সিনিয়র ফেলো আলেক্সান্ডার বাউনভ এক বিশ্লেষণে বলছেন যে, রুশ কর্মকর্তারা সবসময়েই বলেছেন যে, তারা ইউক্রেনে তাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবেন। এটা তারা বলতে পারেন, কারণ ইউক্রেনে তাদের লক্ষ্য কি, তা তারা কখনোই পরিষ্কার করে বলেননি। ফলে তারা প্রথমে পুরো ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণ নিতে ব্যর্থ হওয়ার পর লক্ষ্যকে শুধুমাত্র ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চল এবং দক্ষিণাঞ্চলের মাঝে সীমাবদ্ধ করতে পারতেন। সেটাও না হলে ডোনেতস্ক ও লুহানস্ক এলাকার নিয়ন্ত্রণের মাঝে সীমাবদ্ধ করতে পারতেন। সেটাও না হলে যতটুকু পাওয়া গেছে, সেগুলিকে রুশ অঞ্চল ঘোষণা দিয়ে এর গুরুত্ব বৃদ্ধি করতে পারতেন। মূলতঃ কত ভূমি রাশিয়া নেবে সেটা গুরুত্বপূর্ন নয়; বরং রাশিয়া যা বলেছে, সেটা করবে, সেটা প্রমাণ করা। যেহেতু সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেনে রাশিয়ার অর্জনগুলি প্রায় শূণ্য হয়ে গিয়েছে, তাই পুতিন আবারও হিসেবটা পরিবর্তন করেছেন; যাতে করে তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা যেখানে রয়েছে, সেখানেই থেমে যায়। যদি সেই হুমকিতেও কাজ না হয়, তাহলে পুতিনকে আবারও প্রমাণ করতে হবে যে, তিনি মিথ্যা বলছেন না। আর তখন তার হুমকিগুলিকে বিশ্বাস করাতে আরও মারাত্মক কাজ করতে হবে।

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘দ্যা আটলান্টিক কাউন্সিল’এর ১০ জন বিশ্লেষক আলাদাভাবে তাদের বিশ্লেষণে বলেছেন যে, ভ্লাদিমির পুতিন এখন ইউক্রেনে যথেষ্ট খারাপ পরিস্থিতিতে পড়েছেন বলেই তিনি আংশিক ‘মোবিলাইজেশন’এর ঘোষণা দিয়েছেন এবং একইসাথে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলকে রুশ এলাকা বলে ঘোষণা দিয়ে সেই এলাকাকে পারমাণবিক অস্ত্রের ছত্রছায়ায় আনার কথা বলেছেন। পুতিন যদি যুদ্ধে হেরে যাবার মতো অবস্থায় পড়ে যান, তাহলে তিনি ইউক্রেনে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারেন। কাউন্সিলের বিশ্লেষকেরা সর্বসম্মতিক্রমে বলেছেন যে, রুশদের এই হুমকির মুখে যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমারা যেন কোন অবস্থাতেই ছাড় না দেয়। পুতিন হয়তো মনে করছেন যে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ এড়াবার জন্যে পশ্চিমারা নিশ্চয়ই রাশিয়ার সাথে সরাসরি সংঘাতে যাবে না। কিন্তু পশ্চিমাদেরকে বুঝতে হবে যে, রাশিয়ার দাবির সামনে মাথা নত করার অর্থ হলো অন্য রাষ্ট্রের জন্যে একটা উদাহরণ তৈরি করে দেয়া, যে জোর করে একটা রাষ্ট্রের সীমানা পরিবর্তন করা যায়। কাজেই পশ্চিমাদের উচিৎ হবে পুতিনের পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকিকে আমলে না নিয়ে ইউক্রেনকে সহায়তা দেয়া অব্যাহত রাখা। তারা আরও বলছেন যে, যদি রাশিয়া পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের উচিৎ পরিস্থিতি বিবেচনা করে রুশদের পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারকারী বাহিনীর উপরে প্রচলিত অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে মারাত্মক হামলা করা অথবা রুশদের আক্রমণের একইরূপ জবাব প্রদান করা। মোটকথা, কাউন্সিলের সকলেই রুশদের পারমাণবিক অস্ত্রের হুমকিকে এড়িয়ে ইউক্রেনকে সহায়তা দানের কথা বলেছেন; এবং সেটা তারা বলেছেন এই কারণে নয় যে, পুতিন পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবেন না; বরং তারা পুতিনের পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার সত্ত্বেও যুদ্ধ চালিয়ে যাবার কথা বলেছেন!

আলেক্সান্ডার বাউনভ বলছেন যে, যুদ্ধের সাত মাসের মাথায় খারকিভ থেকে রুশ সেনাদের পিছু হটার কারণে রাশিয়াতে ডানপন্থী গ্রুপগুলি, যারা ‘মোবিলাইজেশন’সহ আরও কঠোর পদক্ষেপের পক্ষে ছিল, তাদের কথাই পুতিন শুনতে বাধ্য হয়েছেন। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ বলছে যে, কোণঠাসা হয়ে যাবার কারণে পুতিন আগের চাইতে আরও মারাত্মক হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করলে কঠিন পরিণতি হবে বলে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে। পুতিনের পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকির মুখে মার্কিনীরা কেউই পিছু হটার পক্ষপাতি না থাকলেও তাদের ইউরোপিয় বন্ধুরা কি একই কথাই বলবে? জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শোলজ পুতিনের ভাষণকে চাপের মুখে পড়ে বক্তব্য বলে আখ্যা দিলেও মার্কিন সেনাবাহিনীর ‘ওয়ার কলেজ’এর প্রফেসর জন ডেনি ‘পলিটিকো’র এক লেখায় ইউক্রেনকে যথেষ্ট সহায়তা না দেয়ার জন্যে জার্মানি ও ফ্রান্সের সমালোচনা করেন; এবং এই দেশগুলির নীতি সহজে পরিবর্তিত হবে না বলেও মন্তব্য করেন। পুতিন হয়তো মনে করছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপিয় বন্ধুরা, বিশেষ করে জার্মানরা হয়তো পুতিনের হুমকিকে ভিন্ন চোখে দেখতে পারে; যদিও জার্মানরা আপাততঃ কোন দুর্বলতা দেখায়নি। তবে যে ব্যাপারটা নিশ্চিত তা হলো, মার্কিনীরা পুতিনের পারমাণবিক হুমকিকে সত্যিকারের বুঝেও উপেক্ষা করতে প্রস্তুত; যা কিনা ইউরোপে প্রথমবারের মতো পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।

Thursday, 27 August 2020

যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার মাঝে নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা কেন?

২৮শে অগাস্ট ২০২০ 

রাশিয়া সোভিয়েত আমলের ৫০ মেগাটনের বোমা পরীক্ষার ডকুমেন্টারি প্রকাশ করলো এমন সময়ে, যখন কথা উঠছে যে, রাশিয়া এমন এক ধরনের অস্ত্র ডেভেলপ করছে, যা কিনা সাবমেরিন থেকে ছোঁড়া যাবে এবং যা প্রায় ১’শ মেগাটনের পারমাণবিক ওয়ারহেড বহণ করবে। এরকম বোমা যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলের কাছে সমুদ্রের নিচে বিস্ফোরণ ঘটালে ভয়াবহ তেজস্ক্রিয় সুনামিতে নিউ ইয়র্কসহ উপকূলের বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ শহরই ধ্বংস হয়ে যাবে। আর তা মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে পুরোপুরিভাবে বাইপাস করবে। রাশিয়াকে চাপে রাখার যুক্তরাষ্ট্রের নীতিই রাশিয়াকে দুনিয়া বিধ্বংসী অস্ত্র ডেভেলপের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। রাশিয়ার ভৌগোলিক অখন্ডতার চ্যালেঞ্জ রাশিয়াকে প্রতিযোগিতামূলক অস্ত্র তৈরিতে আরও বেশি আক্রমণাত্মক করে তুলতে পারে।



গত ২০শে অগাস্ট রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় আণবিক শক্তি কোম্পানি ‘রসাটম’ একটা ডকুমেন্টারি প্রকাশ করে। এতে ১৯৬১ সালের অক্টোবর মাসে বিশ্বের সবচাইতে শক্তিশালী পারমাণবিক বোমা পরীক্ষা করার কার্যক্রম দেখানো হয়। ২৭ টন ওজনের এবং ২৬ ফুট লম্বা এই বিশাল বোমাটা রাশিয়ার উত্তরের অতিশীতল আর্কটিক সাগরের নোভায়া জেম্বলিয়া দ্বীপের উপর একটা ‘তুপোলেভ ৯৫’ বোমারু বিমান থেকে নিক্ষেপ করা হয়। বিস্ফোরণের ‘মাশরুম ক্লাউড’ ৬৫ কিঃমিঃ উচ্চতা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ৫০ মেগাটন বা ৫০ হাজার কিলোটন শক্তির এই হাইড্রোজেন বোমার অফিশিয়াল নাম ‘আরডিএস ২২০’ হলেও একে এখন ‘জার বম্বা’ বলেই ডাকা হচ্ছে। বোমাটা এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, বোমারু বিমানের পাইলটরা কয়েক ঘন্টা পর ল্যান্ডিং করার সময় ৮’শ কিঃমিঃ দূর থেকেও এই বিস্ফোরণের ‘মাশরুম ক্লাউড’ দেখেছিলেন। বোমার প্রচণ্ডতায় কয়েক’শ কিঃমি দূরের বাড়িঘর ধ্বসে পড়েছিল অথবা জানালা ভেঙ্গে গিয়েছিল। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমা শহরের উপর যে পারমাণবিক বোমা ফেলেছিল, তার শক্তি ছিল ১৫ কিলোটন। ১৯৫৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সবচাইতে শক্তিশালী ‘ক্যাসল ব্রাভো’ পারমাণবিক পরীক্ষার শক্তি ছিল ১৫ মেগাটন। ‘পপুলার মেকানিকস’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ১৯৬৩ সালে বাতাসে পারমাণবিক বোমা পরীক্ষা করা বন্ধের পর থেকে এরকম বোমা পরীক্ষা বিশ্ব আর দেখেনি। এরপর কয়েক দশকে ছোট আকারের পারমাণবিক বোমা ডিজাইন করার প্রতিযোগিতা শুরু হয়; উদ্দেশ্য ছিল বোমার সংখ্যা বাড়িয়ে দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে অনেকগুলি শহরের উপর একসাথে পুংখানুপুখভাবে হামলা করা। আণবিক বিষয়ের ইতিহাস নিয়ে কাজ করা গবেষক রবার্ট নরিস ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’কে বলছেন যে, রুশরাই বারংবার মনে করিয়ে দিয়েছে যে, হাইড্রোজেন বোমা ব্যবহার করারটা কেন চিন্তাও করা উচিৎ নয়। তারা তাদের বিরাট আকারের বোমা পরীক্ষার মাধ্যমে বোমা ব্যবহারের ব্যাপারে ভীতির সঞ্চার করতে চেয়েছে। তবে নরিসের এই বক্তব্য থেকে যে প্রশ্নটা সামনে এসে যায় তা হলো, প্রায় ছয় দশক পর রাশিয়া এই বিশাল বোমা পরীক্ষার ডকুমেন্টারি কেন প্রকাশ করলো?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সরকারের পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার প্রধান ফিলিপ কোইল ‘বিবিসি’র সাথে এক সাক্ষাতে বলেন যে, ১৯৬০এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক প্রযুক্তিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বহু এগিয়ে ছিল। সোভিয়েতরা চাইছিল মানুষ সোভিয়েত ইউনিয়নকে যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ হিসেবে চিন্তা করুক। একারণেই তারা ‘জার বম্বা’র মতো এতো বড় বোমা পরীক্ষা করেছিল। এমনকি এই বোমা এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, সোভিয়েতরাও চাইছিল না যে, পূর্ণ শক্তি নিয়ে এটা পরীক্ষা করা হোক; যেকারণে তারা বোমার ডিজাইন করার সময়েই সীসা ব্যবহার করে এর শক্তিকে কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ করেছিল। পারমাণবিক অস্ত্রের মতো ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের ক্ষেত্রেও আকার নিয়ে কথা বলাটা অদ্ভূত শোনাতে পারে, যেখানে ছোট বোমাগুলিই এককেকটা শহর ধ্বংস করে দিতে সক্ষম। এত বড় বোমার ব্যবহারিক দিকের চাইতে মনস্তাত্বিক দিকটাই বেশি গুরত্বপূর্ণ ছিল।

প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির পাবলিক এন্ড ইন্টারন্যাশনাল এফেয়ার্সএর প্রফেসর ফ্রাঙ্ক ভন হিপেল বলছেন যে, সোভিয়েত আণবিক গবেষক আন্দ্রেই সাখারভ ঠান্ডা যুদ্ধের সময় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ার ঘোর বিরোধিতা করেছিলেন। ১৯৬৭ সালে এক গোপন চিঠিতে তিনি সোভিয়েত নেতৃবৃন্দের কাছে লিখেন যে, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পারমাণবিক যুদ্ধের সম্ভাবনা অনেক বাড়িয়ে দেবে। সাখারভের কথায় বেশ যুক্তি ছিল। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে পারমাণবিক অস্ত্র ছোঁড়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলি অকার্যকর হয়ে গেলে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে এড়াতে সক্ষম নতুন ধরনের অস্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতা শুরু হবে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ১৯৯০এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র চিন্তা করা শুরু করে যে, কোন ‘অবাধ্য’ রাষ্ট্র যদি পারমাণবিক বোমা এবং দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করে ফেলে, তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে মারাত্মক হুমকির সৃষ্টি করবে। কারণ সেরকম ‘আবাধ্য’ রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের যেমন কৌশলগত চুক্তি ছিল, তেমন কোন চুক্তি দ্বারা আবদ্ধ থাকবে না। তবে এতে মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তরসুরী রাশিয়ার। কারণ এতে রাশিয়ার পারমাণবিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলিও তাদের কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে; এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে অনেক পিছিয়ে পড়ার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়।

২০১৯এর অগাস্টে যুক্তরাষ্ট্র ‘ইন্টারমিডিয়েট রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস’ ‘আইএনএফ’ বা মধ্যম পাল্লার পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ন্ত্রণের চুক্তি থেকে নিজেকে বের করে নেবার ঘোষণা দেবার পর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সাবধান করে দিয়ে বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যম পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করার ব্যাপারে যথেষ্ট তথ্য পেলে রাশিয়াও তেমন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করতে বাধ্য হবে। পুতিনের কথাগুলিতে সেই পিছিয়ে পড়ার ভয়ই চলে আসে, যা কিনা সোভিয়েতদের ১৯৬০এর পারমাণবিক কর্মকান্ডে প্রকাশ পেয়েছিল।

ইউক্রেনকে নিজ নিয়ন্ত্রণ থেকে হারাবার পরই রাশিয়া নিজের ভৌগোলিক অখন্ডতা রক্ষার ব্যাপারে সাবধান হতে শুরু করে। ২০১৪ সালে রাশিয়া ইউক্রেনের কাছ থেকে ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখল করে নেবার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করে চলেছে। এমতাবস্থায় ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ভয়ই রাশিয়াকে নতুন অস্ত্র প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে বাধ্য করছে, যার মাধ্যমে স্বল্প সামরিক বাজেটে রাশিয়া নিজের জাতীয় স্বার্থকে রক্ষা করতে পারবে। রাশিয়া সোভিয়েত আমলের ৫০ মেগাটনের বোমা পরীক্ষার ডকুমেন্টারি প্রকাশ করলো এমন সময়ে, যখন কথা উঠছে যে, রাশিয়া এমন এক ধরনের অস্ত্র ডেভেলপ করছে, যা কিনা সাবমেরিন থেকে ছোঁড়া যাবে এবং যা প্রায় ১’শ মেগাটনের পারমাণবিক ওয়ারহেড বহণ করবে। মার্কিন বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, এরকম বোমা যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলের কাছে সমুদ্রের নিচে বিস্ফোরণ ঘটালে ভয়াবহ তেজস্ক্রিয় সুনামিতে নিউ ইয়র্কসহ উপকূলের বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ শহরই ধ্বংস হয়ে যাবে। আর ‘ফরেন পলিসি’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, তা মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে পুরোপুরিভাবে বাইপাস করবে। রাশিয়াকে চাপে রাখার যুক্তরাষ্ট্রের নীতিই রাশিয়াকে দুনিয়া বিধ্বংসী অস্ত্র ডেভেলপের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। রাশিয়ার ভৌগোলিক অখন্ডতার চ্যালেঞ্জ রাশিয়াকে প্রতিযোগিতামূলক অস্ত্র তৈরিতে আরও বেশি আক্রমণাত্মক করে তুলতে পারে।