Saturday, 13 June 2020

করোনাভাইরাস রাশিয়ার ভূরাজনৈতিক আকাংক্ষাকে কমাবে না বাড়াবে?

১৩ই জুন ২০২০
     
রাশিয়ার জাতীয় দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠান। করোনাভাইরাসের লকডাউন তুলে নেবার পর রাশিয়ায় এটাই প্রথম বড় অনুষ্ঠান।
১২ই জুন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মস্কোতে জাতীয় দিবস উদযাপন উপলক্ষে পতাকা উত্তোলন করেন। ‘বিবিসি’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে গত ৯ই মের পর থেকে পুতিন প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে আসলেন। করোনাভাইরাসের কারণে রাশিয়ার ঐতিহ্যবাহী প্যারেড ২৪শে জুন পর্যন্ত স্থগিত করা হয়। রাশিয়াতে মহামারি ঠেকাতে বলবত করা লকডাউন এখন উঠিয়ে নেয়া হচ্ছে। ১লা জুলাই পুতিন রাশিয়ার সংবিধান পরিবর্তনের জন্যে গণভোট ডেকেছেন। অভিযোগ রয়েছে যে, গণভোটে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করার জন্যে জনগণকে শপিং ভাউচার দেবার পরিকল্পনা করা হয়েছে। করোনা পরিস্থিতির মাঝে রাশিয়া খুব খারাপ সময় পার করছে। ৫ লক্ষ ১১ হাজারেরও বেশি মানুষ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে; যার মাঝে কমপক্ষে ৬ হাজার ৭’শ ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। অনেকেরই অভিযোগ যে, রুশ সরকার মৃতের প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশ করছে না। জনগণের একটা বড় অংশ সরকারি সাহায্যের উপর বেঁচে আছে। বিভিন্ন সেচ্ছাসেবী সংগঠন রাস্তায় মানুষকে খাবার সরবরাহ করছে। ভ্লাদিমির পুতিনের জনপ্রিয়তা গত দুই দশকের মাঝে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। এমন অবস্থাতেই পুতিন গণভোট ডেকেছেন। এই গণভোটে অনুমোদন পেলে ২০২৪ সালে পুতিনের বর্তমান ছয় বছরের ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হলে তিনি আরও দুই বার নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। অর্থাৎ কাগজে কলমে হলেও ৬৭ বছর বয়স্ক পুতিন ২০৩৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতা ধরে রাখার সুযোগ পাবেন।

করোনাভাইরাসের লকডাউনও যেন যথেষ্ট ছিল না। মার্চ মাসে রাশিয়া এবং সৌদি আরব তেলের বাজারে অদ্ভুত এক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়, যার কারণে করোনা দুর্যোগে চাহিদা কমে যাওয়ার পরও ব্যাপকভাবে সরবরাহ বৃদ্ধি পায়। ফলস্বরূপ তেলের বাজারে রেকর্ড দরপতনের পর রুশ অর্থনীতি ব্যাপক ধাক্কা খেয়েছে। তেল বিক্রির উপর রাশিয়ার জিডিপির ৩০ শতাংশ নির্ভরশীল। অথচ তেলের বাজারের নিয়ন্ত্রণে নেই রাশিয়া। এই বাস্তবতাই রাশিয়াকে বিপদে ফেলেছে। ‘সিএনবিসি’র সাথে এক সাক্ষাতে কাতারের জ্বালানি মন্ত্রী সাদ আল-কাবি বলেন যে, রাশিয়া এবং সৌদি আরবের তেলের বাজারের প্রতিযোগিতা একটা বড় ভুল ছিল। আর একারণে এখন কেউ উৎপাদনেই যেতে পারছে না।

তবে এত দুর্যোগের মাঝেও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থেকে ঝরে পড়তে চাইছে না পুতিনের রাশিয়া। লিবিয়া এবং সিরিয়াতে রুশ ভূরাজনৈতিক আকাংক্ষা রয়েছে। ২৯শে মে মার্কিন সামরিক বাহিনীর আফ্রিকা কমান্ডের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল গ্রগরি হ্যাডফিল্ড বলেন যে, তারা তথ্য পেয়েছেন যে রুশরা লিবিয়াতে ১৪টা ফাইটার বিমান মোতায়েন করেছে। মার্কিনীরা বলছে যে, লিবিয়াতে এই বিমানগুলি মোতায়েনের মাধ্যমে রাশিয়া ইউরোপের দক্ষিণ দিক থেকে ইউরোপকে হুমকিতে ফেলতে পারে। বিমানগুলি রাশিয়া থেকে সিরিয়া হয়ে লিবিয়া পৌঁছায়। তবে রাশিয়াকে চাপে রাখার জন্যে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে অনেকগুলি কার্ড রয়েছে। ১১ই জুন মার্কিন কংগ্রেসে ইউক্রেনের জন্যে আড়াই’শ মিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তার ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পনা পাস করা হয়।

‘মিলিটারি টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, রাশিয়ার সীমানার কাছাকাছি বল্টিক সাগরে ন্যাটোর বার্ষিক নৌ মহড়া ‘ব্যালটপস ২০২০’তে নেতৃত্ব দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ১১ই জুন রুশ বল্টিক ফ্লিটের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, কয়েক ডজন রুশ ‘সুখোই ২৪’, ‘সুখোই ২৭’ এবং ‘সুখোই ৩০’ যুদ্ধবিমান একই সময়ে পাল্টা এক মহড়ায় অংশ নিচ্ছে। রাশিয়া বারংবারই তার সীমানার কাছাকাছি ন্যাটোর সামরিক মহড়াকে রাশিয়ার জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হিসেবে দেখছে বলে বলছে। শুধু বল্টিকেই নয়; রাশিয়া চেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মহড়ার জবাব সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সীমানায় দিতে। ১০ই জুন যুক্তরাষ্ট্রের ‘নর্থ আমেরিকান এরোস্পেস ডিফেন্স কমান্ড’ বা ‘নোরাড’এর এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, মার্কিন বিমান বাহিনীর বিমান আলাস্কা থেকে মাত্র ২০ নটিক্যাল মাইল দূরে রুশ বিমান বাহিনীর ৫টা বিমানকে বাধা দেয়। এরপর আরও তিনটা রুশ বিমান আলাস্কার ৩২ নটিক্যাল মাইলের মাঝে চলে আসে। তবে ‘নোরাড’ বলছে যে, রুশ বিমানগুলি আন্তর্জাতিক আকাশ সীমাতেই অবস্থান করছিলো। এছাড়াও বল্টিক সাগরে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি এবং রাশিয়ার ত্রিমুখী উত্তেজনা চলছে গ্যাস পাইপলাইন তৈরি নিয়ে। রাশিয়া আশেপাশের সকল দেশকে বাইপাস করে ‘নর্ড স্ট্রিম ২’ পাইপলাইন তৈরি করছে জার্মানি পর্যন্ত, যা রাশিয়ার অর্থনীতির জন্যে অতি জরুরি। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে না যে, রুশ গ্যাসের উপর জার্মানির নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পাক। এই লক্ষ্যে মার্কিন কংগ্রেস এই প্রকল্পে অংশ নেয়া কোম্পানিগুলির উপর অবরোধ দেয়ার জন্যে আইন পাস করছে। ১২ই জুন জার্মান অর্থ মন্ত্রণলায়রের এই প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জার্মান পত্রিকা ‘ফ্রাঙ্কফুরটার আলেমাইন জাইটুং’ বলে যে, মার্কিন অবরোধ জার্মান কোম্পানি ছাড়াও সরকারি সংস্থাগুলিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

বল্টিক সাগর ছাড়াও গত পহেলা মে মার্কিন এবং ব্রিটিশ নৌবাহিনী নরওয়ের উত্তরে আর্কটিকের কাছাকাছি নৌ মহড়ায় অংশ নেয়। এরও আগে মার্চের শুরুতে ব্রিটিশ নেতৃত্বে নরওয়েতে ১৬ হাজার সৈন্যের বড়সড় সামরিক মহড়া শুরু হয়। ‘দ্যা ব্যারেন্টস অবজারভার’ বলছে যে, শূণ্যের ২০ ডিগ্রি নিচের তাপমাত্রায় অনুষ্ঠিত দুই সপ্তাহের এই মহড়ার নাম ছিল ‘এক্সারসাইজ কোল্ড রেসপঞ্জ ২০২০’। এই মহড়া শেষ হতে না হতেই জবাব হিসেবে রাশিয়া তার সামরিক শক্তিকে ব্রিটেনের আশেপাশে মোতায়েন করে। একসাথে ৭টা রুশ যুদ্ধজাহাজ কয়েকদিন ধরে ইংলিশ চ্যানেলের আশেপাশে দিয়ে ঘোরাঘুরি করে। এর জবাবে ব্রিটিশ রয়াল নেভি একত্রে ৯টা যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করতে বাধ্য হয়। এছাড়াও ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ বলছে যে, রুশ বিমান বাহিনীর বোমারু বিমানগুলি শেটল্যান্ড আইল্যান্ডের উত্তরে এসে হাজির হয়। ব্রিটিশ রয়াল এয়ার ফোর্সের ‘টাইফুন’ ফাইটার বিমান রুশ বিমানগুলিকে বাধা দেয়।

‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় ব্যারেন্টস সাগর, বল্টিক সাগর, কৃষ্ণ সাগরে রাশিয়াকে ব্যাতিব্যস্ত রাখতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন। তবে পুতিনের রাশিয়াও এর জবাব দিতে চাইছে বিভিন্নভাবে। এবং একইসাথে লিবিয়া এবং সিরিয়াতেও সে তার অবস্থান ধরে রাখতে চাইছে। কিন্তু করোনা দুর্যোগ এবং তেলের বাজারে মন্দার মাঝে দুর্বল অর্থনীতি নিয়ে রাশিয়া এই প্রতিযোগিতাকে কতদূর এগিয়ে নিতে পারবে, তা প্রশ্নবিদ্ধ।

Monday, 8 June 2020

ক্যারিবিয়ানে কানাডার কি স্বার্থ রয়েছে?

০৯ই জুন ২০২০
  
ভেনিজুয়েলাতে মাদুরোর বিরুদ্ধে মিশন যে ব্যর্থ হবে, তা যদি সকলেই আগে থেকেই জানে, তাহলে এই মিশন কেন বাস্তবায়িত হলো? এই মিশনের নেতা গুডরোর স্বার্থই বা কি ছিলো? আর এক্ষেত্রে তার যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার নাগরিকত্ত্বের মাঝে কোন দ্বন্দ্ব আছে কিনা?

মে মাসের শুরুতে ভেনিজুয়েলার সরকার বলে যে, তারা প্রেসিডেন্ট মাদুরোর বিরুদ্ধে একটা ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিয়েছে। তারা বলে যে, সমুদ্রপথে কলম্বিয়া থেকে আসা কিছু ভাড়াটে সেনাকে তারা হত্যা করেছে এবং কিছু সেনাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দু’জন মার্কিন নাগরিককে তাদের পাসপোর্ট এবং অন্যান্য পরিচয়পত্রসহ টেলিভিশনে দেখানো হয়। এরা হলেন ৪১ বছর বয়সী এইরান ব্যারি এবং ৩৪ বছর বয়সী লিউক ডেনমান। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলছে যে, এরা উভয়েই মার্কিন সেনাবাহিনীর স্পেশাল ফোর্সের প্রাক্তন সদস্য ছিলেন বলে নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে। এই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় অবস্থিত ‘সিলভার কর্প’ নামের একটা নিরাপত্তা কোম্পানির মালিক জরডান গুডরো দাবি করেন যে, এই মিশন তিনি পরিকল্পনা করেছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে আসা। তিনি আরও দাবি করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত ভেনিজুয়েলার নেতা হুয়ান গুয়াইদোর সাথে চুক্তি মোতাবেক তিনি এই অপারেশনে যান। তবে গুয়াইদো তাকে পারিশ্রমিক দেননি বলেও বলেন তিনি। ভেনিজুয়েলার টেলিভিশনে দেখানো মার্কিন সেনারা দাবি করেন যে, মিশনে যাবার সময় তারা তাদের সাথে গুয়াইদোর স্বাক্ষরিত চুক্তিপত্রও নিয়ে গিয়েছেন। মাদুরো দাবি করেন যে, মিশন চালানো ব্যক্তিরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিরাপত্তা বাহিনীর লোক। গুয়াইদো এবং ট্রাম্প প্রশাসন উভয়েই এই মিশনের সাথে জড়িত থাকার কথা পুরোপুরি অস্বীকার করে। ‘ভোক্স’ ম্যাগাজিনের সাথে কথা বলতে গিয়ে মার্কিন নৌবাহিনীর প্রাক্তন স্পেশাল ফোর্সের সদস্য এফরাহিম মাত্তোস বলেন যে, পুরো বিষয়টা এতটাই হাস্যকর যে, এটা কখনোই কাজ করার কথা নয়। এটাকে তিনি বদ্ধ উন্মাদের কাজ বলে উল্লেখ করেন। ‘আল জাজিরা’র এক আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রশ্ন করা হয় যে, এই মিশন যে ব্যর্থ হবে, তা যদি সকলেই আগে থেকেই জানে, তাহলে এই মিশন কেন বাস্তবায়িত হলো?

কে এই জরডান গুডরো? ১৯৭৬ সালে গুডরো কানাডার ক্যালগারিতে জন্ম নেন। কলেজ শেষ করে তিনি কানাডার সামরিক বাহিনীতে ঢোকেন। তবে পরবর্তীতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান এবং ২০০১ সালে মার্কিন সেনাবাহিনীতে নাম লেখান। তিনি সেখানে স্পেশাল ফোর্সের সদস্যও হয়ে যান। ‘১০ম স্পেশাল ফোর্সেস গ্রুপ’এর সার্জেন্ট ফার্স ক্লাস পদ পান তিনি। তিনি বিভিন্ন সামরিক মিশনে অংশ নেন এবং ২০১৪ সালের অগাস্টে একটা প্যারাসুট দুর্ঘটনার পর ২০১৬ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন। অবসরের পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব নেন। ২০১৮ সালে তিনি ‘সিলভার কর্প’ নামের একটা নিরাপত্তা কোম্পানি চালু করেন। ২০১৮ সালের ২৬শে অক্টোবর নর্থ ক্যারোলিনার শারলোটসভিলে এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের নিরাপত্তার কাজও করেন তিনি, যা ছবিতে দেখাও যায়। মাদুরো এই ব্যাপারটাকেই টার্গেট করেছেন।

এই অদ্ভূত ঘটনার পর প্রশ্ন আসছে যে, এই মিশনের উদ্দেশ্যই কি ছিলো ব্যর্থ হওয়া? গুয়াইদো যদি অর্থায়ন না করে থাকেন, তাহলে কেই বা অর্থায়নই করেছে? এখানে গুডরোর স্বার্থই বা কি ছিলো? কানাডার নাগরিক হওয়াতে ব্যাপারটা আরও ঘনীভূত হয়েছে। আর ভেনিজুয়েলার সাথে কিউবার ভালো সম্পর্ক থাকার কারণে এখানে কিউবার কোন ভূমিকা আছে কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। তবে সবচাইতে বড় প্রশ্ন হলো, গুডরো সরাসরি ব্যাপারটাকে স্বীকার করে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকেই আঘাত করেছেন কিনা? আর এক্ষেত্রে তার যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার নাগরিকত্ত্বের মাঝে কোন দ্বন্দ্ব আছে কিনা? মধ্য আমেরিকা, তথা ক্যারিবিয় অঞ্চলে কানাডার কর্মকান্ডের ইতিহাস দেখলে অনেক কিছুই হিসেব থেকে বাদ দেয়া সম্ভব নয়। ক্যারিবিয়ানে যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার আড়াই’শ বছরের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার ইতিহাসটাই এখন আলোচনায় চলে আসছে।
   
১৯২৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘সারাটোগা’ পানামা খাল পারি দিচ্ছে। এই খাল যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টিক এবং প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলকে যোগ করেছে। এই খাল তৈরি করার পর যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবিয়ানের নিরাপত্তা নিয়ে আরও গভীরভাবে চিন্তা করতে থাকে। ফলশ্রুতিতে ক্যারিবিয়ানে প্রভাব বিস্তার নিয়ে ব্রিটেনের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় তারা।

পানামা খাল ও এর নিরাপত্তা

১৭৭৬ সালে নতুন রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্মের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র আমেরিকা মহাদেশে ইউরোপিয় প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করতে থাকে। ঊনিশ শতকের শুরুতে দক্ষিণ আমেরিকায় অনেকগুলি দেশ ব্রিটিশ সহায়তায় স্পেন থেকে আলাদা হয়ে যায়। এই সময়েই ১৮২৩ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো ঘোষণা দেন যে, এখন থেকে ইউরোপিয় শক্তিরা যদি আমেরিকায় কোন স্বাধীন দেশের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র সেই প্রচেষ্টাকে নিজের স্বার্থবিরুদ্ধ মনে করবে। ১৮৫০ সাল নাগাদ জেমস মনরোর এই চিন্তাটা ‘মনরো ডকট্রাইন’ নামে পরিচিতি পায়। যুক্তরাষ্ট্রের জন্মের সময় শুধুমাত্র আটলান্টিক উপকূলের ১৩টা রাজ্য নিয়েই যুক্তরাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল। এরপর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম দিকে তার স্থলভাগ বৃদ্ধি করতে থাকে। ১৮৪৬ সাল নাগাদ ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত মার্কিন নিয়ন্ত্রণ পৌঁছে গেলে প্রথমবারের মতো রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তৃতি পূর্বে আটলান্টিকের উপকূল থেকে পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এর ফলশ্রুতিতে যুক্তরাষ্ট্রের দুই উপকূলকে সমুদ্রপথে যুক্ত করার চিন্তাটা শক্তিশালী হতে থাকে। এর আগেই ১৮২৬ সালে স্পেন থেকে নতুন আলাদা হয়ে যাওয়া ‘গ্র্যান কলম্বিয়া’র নেতৃবৃন্দের সাথে মার্কিন কর্মকর্তারা মধ্য আমেরিকায় একটা খাল তৈরির প্রকল্প নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন। এই খালের মাধ্যমে আটলান্টিক এবং প্রশান্ত মহাসাগরকে যুক্ত করা যাবে। তবে গ্র্যান কলম্বিয়ার নেতা সিমন বলিভার এই প্রস্তাবে রাজি হননি। ১৮৪৬ সালে ‘গ্র্যান কলম্বিয়া’ থেকে আলাদা হয়ে তৈরি হওয়া ‘নিউ গ্রানাডা’র (পরবর্তী কলম্বিয়া) সাথে মার্কিনীরা এক চুক্তি করে। চুক্তি মোতাবেক যুক্তরাষ্ট্র পানামা যোযকের স্থানে আটলান্টিক উপকূল থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল পর্যন্ত ৭৭ কিঃমিল লম্বা একটা রেললাইন তৈরি করে। ১৮৫৫ সালে এই রেললাইন উন্মুক্ত হয়। এই সময় থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টিক উপকূল থেকে জাহাজ পানামা পর্যন্ত যেত। এরপর রেললাইনের মাধ্যমে মানুষ প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল পর্যন্ত গিয়ে আরেকটা জাহাজে উঠে ক্যালিফোর্নিয়া যেত। ফরাসীরা এই রেললাইনের সমান্তরালে একটা খাল তৈরি করার চেষ্টা শুরু করে ১৮৮১ সালে। তবে ১৮৯৪ সাল নাগাদ তারা ব্যর্থ হবার পর যুক্তরাষ্ট্রের সামনে কোন ইউরোপিয় বাধা থাকে না। ১৯০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপে কলম্বিয়া থেকে পানামা আলাদা হয়ে যায় এবং পানামার সাথে খাল খননের জন্যে মার্কিন সরকার একটা চুক্তি করে। এই চুক্তি মোতাবেক ১৯০৪ থেকে ১৯১৪ সালের মাঝে পানামা খাল তৈরি করে। এখানকার নিরাপত্তার দায়িত্ব থাকে পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের উপর। এই খালের নিরাপত্তা দিতে খালের পূর্বদিকে ক্যাবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ভাবতে শুরু করে।

পানামা খাল তৈরি করার আগেই যুক্তরাষ্ট্র মেক্সিকো উপসাগর এবং ক্যারিবিয়ান সাগরে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা উপকূল থেকে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত। পশ্চিমে কিউবা থেকে শুরু করে এই পূর্বে ত্রিনিদাদ টোবাগোর মাধ্যমে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের সমাপ্তি। মেক্সিকো উপসাগর এবং ক্যারিবিয়ান সাগরকে খাঁচার মতো ঘিরে রেখেছে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ। এই ভৌগোলিক বাস্তবতায় পানামা খাল দিয়ে যাতায়াত করা জাহাজগুলিকে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূল পৌঁছাতে হলে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের মাঝ দিয়ে যাওয়া প্রণালিগুলি পার হয়ে যেতে হবে। কিন্তু ঊনিশ শতকের শুরুতে এই দ্বীপগুলির সবগুলিই ছিল ইউরোপিয় শক্তিদের হাতে। ১৮৫৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণের মানুষেরা কিউবাকে কিনে নেবার প্রস্তাব দিলেও সেটা উত্তরের মার্কিনীদের বিরোধের কারণে সফল হয়নি। দ্বীপগুলির মাঝে সবচাইতে বড় দ্বীপ কিউবাতে স্প্যানিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের উস্কে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ১৮৯৪ সাল নাগাদ বাণিজ্যের জন্যে কিউবা স্পেনের চাইতে যুক্তরাষ্ট্রের উপরেই বেশি নির্ভরশীল ছিল। যুক্তরাষ্ট্র তার নিজের স্বার্থ রক্ষায় ১৮৯৮ সালে স্পেনের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। চার মাসের এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র স্পেনের কাছ থেকে ক্যারিবিয়ানের দ্বীপ পুয়ের্তো রিকো দখল করে নেয়। কিউবাকে স্বাধীনতা দিতে বাধ্য হয় স্প্যানিশরা। একইসাথে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ফিলিপাইন এবং গুয়ামকে দখল করে নেয় যুক্তরাষ্ট্র।

এছাড়াও পুয়ের্তো রিকো এবং ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জের মাঝে অবস্থিত ডেনমার্কের অধীনে থাকা ড্যানিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জকে যুক্তরাষ্ট্র নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে চাইছিল। ১৮৫০এর দশকেই মার্কিন কর্মকর্তারা ডেনমার্কের কাছ থেকে এই দ্বীপগুলি কিনে নিতে চাইছিল। তবে মার্কিন সিনেট একমত হতে না পারায় এই ক্রয় সম্ভব হয়নি। এরপর ১৮৯৯ থেকে ১৯০২ সালের মাঝে আরও একবার দীপগুলি কেনার কথা আসলে ড্যানিশ পার্লামেন্টের একমত না হতে পারার কারণে প্রকল্প ভেস্তে যায়। এরপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মাঝে ১৯১৬ সালে ডেনমার্কের যখন জার্মানির হাতে চলে যাবার সম্ভাবনা তৈরি হয়, তখন ২৫ মিলিয়ন ডলারে দ্বীপগুলি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিক্রি করে দেয়ার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়ে যায়। এই চুক্তির অধীনে যুক্তরাষ্ট সেন্ট ক্রই, সেন্ট জন এবং সেন্ট থমাস দ্বীপ পেয়ে যায়। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো পুয়ের্তো রিকো এবং এই দ্বীপগুলির মাঝ দিয়ে প্রায় ৪০ কিঃমিঃ প্রস্থের সমুদ্র প্রণালী পুরোপুরিভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আসে।
  
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ত্রিনিদাদে ‘ওয়ালার’ বিমান ঘাঁটিতে মার্কিন ‘বি-২৪’ এন্টি-সাবমেরিন বোমারু বিমান। অস্ত্র সহায়তা দেয়ার বিনিময়ে মার্কিনীরা ক্যারিবিয়ানে ব্রিটিশ দ্বীপগুলিতে ৯৯ বছরের জন্যে ঘাঁটি লীজ পেয়ে যায়। ব্রিটেনের উপর জার্মানির চাপ যখন সর্বোচ্চ, তখনই যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেনের কাছ থেকে ঘাঁটিগুলি আদায় করে নেয়।

ডেস্ট্রয়ারের বিনিময়ে ব্রিটিশ ঘাঁটি

ক্যারিবিয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আরও দৃঢ় হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝে। ১৯৪০ সালে জার্মান সৈন্যরা যখন ফ্রান্সের মাঝ দিয়ে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তখন মার্কিন সরকার যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত ফিলিপ কারএর মাধ্যমে লন্ডনের কাছে প্রস্তাব পাঠায়, যাতে কানাডার আটলান্টিক উপকূলের নিউফাউন্ডল্যান্ড এবং ক্যারিবিয়ানে ত্রিনিদাদ এবং বার্মুডায় ব্রিটিশ বিমান ঘাঁটিগুলি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে লিজ দেয়ার করা বলা হয়। ২৭শে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সামরিক সহায়তার বিনিময়ে এই ঘাঁটি দিতে রাজি হন। ব্রিটিশরা আটলান্টকে জার্মান সাবমেরিনের হাত থেকে ব্রিটিশ সমুদ্র বাণিজ্য রক্ষা করতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নৌবাহিনীর কিছু পুরোনো ডেস্ট্রয়ার চায়। তবে যুক্তরাষ্ট্র তাতে তৎক্ষণাৎ রাজি হয়নি। অবশেষে অগাস্টের শেষে যখন ব্রিটেন জার্মানির দ্বারা একেবারেই কোণঠাসা হয়ে যায়, তখন দুই দেশ সমঝোতায় পৌঁছায়। চুক্তি অনুযায়ী ব্রিটেন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ৫০টা ডেস্ট্রয়ার লাভ করে। আর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ড উপকূলে ৪টা বিমান ঘাঁটি এবং ক্যারিবিয়ানে বার্মুডা, এন্টিগা, বাহামা, ব্রিটিশ গায়ানা, জামাইকা, সেন্ট লুসিয়া এবং ত্রিনিদাদে বিমান ও নৌঘাঁটি ৯৯ বছরের জন্যে লীজ পায়। আর এই লীজের জন্যে যুক্তরাষ্ট্রকে কোন অর্থ দিতে হবে না! এর মাধ্যমে এক শতকের জন্যে যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবিয়ানে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করে ফেলে।

ক্যারিবিয়ানে ব্রিটিশ উপনিবেশগুলির মাঝে বাহামা, জামাইকা, এন্টিগা, সেন্ট কিটস এন্ড নেভিস, ডমিনিকা, সেন্ট লুসিয়া, ত্রিনিদাদ এন্ড টোবাগো এবং গায়ানাকে ব্রিটিশরা স্বাধীনতা দেয়। ১৯৬০এর দশক থেকে ১৯৮০এর দশকের মাঝে এই উপনিবেশগুলিকে স্বাধীনতা দেয়া হয়। তবে দ্বীপগুলি অনেকক্ষেত্রেই রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড়াতে সক্ষম ছিল না। ব্রিটিশদের অধীনে থাকা এই অঞ্চলগুলিতে ইংরেজি ছিল অফিশিয়াল ভাষা। মূলতঃ এই ইংরেজি ভাষাভাষি অঞ্চলগুলিতে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ব্রিটিশ কমনওয়েলথের প্রতিযোগিতা চলছে। তবে বাকি দ্বীপগুলি নিয়েও চলছে প্রতিযোগিতা; যেমন একসময় স্প্যানিশদের অধীনে থাকা কিউবা ও ডমিনিকান রিপাবলিক; এবং ফরাসীদের অধীনে থাকা হাইতি। এই দ্বীপগুলিতে যথাক্রমে স্প্যানিশ ও ফরাসী ভাষা চলে। প্রভাব বিস্তারের খেলায় কোন দ্বীপই বাদ যাচ্ছে না।
   
অনেকেই মনে করছেন যে, হাইড্রোকার্বন এই অঞ্চলের অর্থনীতিকে আবারও পরিবর্তন করবে। তবে চিনি, মদ, কফি, কলা, বক্সাইট, পর্যটন, ব্যাংকিং, টেক্সটাইল বা হাইড্রোকার্বন কোনটাই ক্যারিবিয়ানের সাথে কানাডার গভীর সম্পর্কের মূল কারণ নয়। ক্যারিবিয়ানে শক্ত অবস্থানে থাকার কারণেই কানাডা এখানকার ব্যবসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পেরেছে। আর এই শক্ত অবস্থানের ভিত্তি রাজনৈতিক। ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার মাঝেই কানাডার প্রভাব বিস্তারের বীজ নিহিত।

ক্যারিবিয়ানের অর্থনীতিতে কানাডা

ষোড়শ শতক থেকেই ক্যারিবিয়ানে ইউরোপিয় ঔপনিবেশিকেরা আখের চাষ শুরু করে চিনি উৎপাদন শুরু করে। সেখানকার বাসিন্দাদের নির্মূল করে ফেলার পর চিনি শিল্পে কাজ করাতে ইউরোপিয়রা আফ্রিকা থেকে লক্ষ লক্ষ ক্রীতদাস নিয়ে আসে। চিনি শিল্পের সাথে মদও উৎপাদিত হতো। কলা, কোকোয়া, কফি এবং তামাকও যুক্ত হয় অর্থকরী ফসল হিসেবে। তবে সকল খাদ্যশস্যই আমেরিকার মূল ভূখন্ড থেকে আসতে হতো। মোটামুটিভাবে ঊনিশ শতকের প্রথমভাগ পর্যন্ত চিনির ব্যবসা ভালোভাবে চললেও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে আখ এবং বীট চাষ শুরু হওয়ায় চিনির মূল্যে ধ্বস নামে এবং ক্যারিবিয়ানের ভাগ্যে ব্যাপক পরিবর্তন আসে।

অষ্টাদশ শতকের শুরুর দিকে উত্তর আমেরিকার ফরাসী উপনিবেশগুলির সাথে ক্যারিবিয়ানের ফরাসী উপনিবেশগুলির বেস বাণিজ্য চলছিল। বর্তমান কানাডার আটলান্টিক উপকূলে নোভা স্কোশিয়ার সাথেই মূলতঃ এই বাণিজ্য চলছিল। ১৭৫৬ থেকে ১৭৬৩ সালের মাঝে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধের মাধ্যমে ব্রিটেন ফ্রান্সের কাছ থেকে পুরো উত্তর আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। এর ফলশ্রুতিতে নোভা স্কোশিয়ার সাথে নয়, বরং বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টিক উপকূলের বন্দরগুলির সাথে ক্যারিবিয়ানের বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়। ১৭৭৬ সালে ব্রিটেন থেকে যুক্তরাষ্ট্র আলাদা হয়ে গেলেও ক্যারিবিয়ানের বাণিজ্য যুক্তরাষ্ট্রের সাথেই হতে থাকে। ১৮৬০এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত কানাডার বণিকেরা ক্যারিবিয়ানের সাথে বাণিজ্য বৃদ্ধির কিছুটা চেষ্টা করেন। তবে উৎপাদন বেশি এবং পণ্যের ভিন্নতার কারণে মার্কিনীরাই ক্যারিবিয়ানে এগিয়ে থাকে। শুল্ক বাধা উঠিয়ে দেবার ফলে যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবিয়ানের দ্বীপগুলিতে তার প্রভাব বাড়াতে থাকে। ক্যারিবিয়ানের বাণিজ্যের উপর নির্ভর করে কানাডায় বিভিন্ন শিল্প গড়ে ওঠে।

১৯৫০এর দশক থেকে জাতিসংঘ এবং বিশ্বব্যাংকের উপদেশে ক্যারিবিয়ানে পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন শুরু হয়। ক্যারিবিয়ানের কিছু দ্বীপ দেশে জিডিপির ৫০ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত পর্যটনের উপর নির্ভরশীল। ‘ক্যারিবিয়ান ট্যুরিজম অর্গানাইজেশন’এর বরাত দিয়ে ‘ক্যারিবিয়ান জার্নাল’ বলছে যে, ২০১৯ সালে ক্যারিবিয় দ্বীপপুঞ্জে ৩ কোটি ১৫ লক্ষ পর্যটক ভ্রমণ করে। এদের মাঝে প্রায় ৩ কোটি পর্যটকই লাক্সারি ক্রুজ লাইনারে চড়ে ক্যারিবিয়ানে আসে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে সর্বোচ্চ ১ কোটি ৫৫ লক্ষ পর্যটক আসলেও প্রায় ৩৪ লক্ষ পর্যটক নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে কানাডা। নিজস্ব জনসংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি কানাডিয় নাগরিক ক্যারিবিয়ানে ভ্রমণ করে থাকে।

তবে এখানকার কিছু দেশের অর্থনীতি অন্য সেক্টরের উপর নির্ভরশীল। হাইতির অর্থনীতির বেশিরভাগটাই রেডিমেড গার্মেন্টস রপ্তানির উপর নির্ভরশীল। জামাইকার অর্থনীতিতে আবার এলুমিনিয়ামের কাঁচামাল বক্সাইট খনির গুরুত্ব অনেক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এলুমিনিয়ামের চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবার পর ১৯৫০এর দশক থেকে জামাইকাতে বক্সাইট খনি উত্তোলন শুরু হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রবাহিনীর অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত সকল এলুমিনিয়ামের প্রায় ৪০ ভাগ উৎপাদন করেছিল কানাডা। তাই জামাইকার বক্সাইট খনিতে কানাডার আগ্রহ ছিল সবচাইতে বেশি। কানাডা বর্তমানে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম এলুমিনিয়ান উৎপাদনকারী দেশ। নিজেদের এরোস্পেস ইন্ডাস্ট্রি এবং যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির উপর ভিত্তি করে কানাডা এই অবস্থানে পৌঁছেছে। তবে নিজের দেশে বক্সাইটের খনি না থাকায় কানাডিয়রা একসময় ১৯৭০এর দশক পর্যন্ত জামাইকার উপরেই নির্ভরশীল ছিল। বর্তমানে কানাডা তার বেশিরভাগ বক্সাইট ব্রাজিল এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে আনে। তবে জামাইকা এখনও কানাডার সবচাইতে কাছের বক্সাইট খনি। তাই কানাডার কাছে এখানকার খনির কৌশলগত গুরুত্ব অনেক।

ত্রিনিদাদ এন্ড টোবাগোর অর্থনীতিতে পর্যটনের চাইতে তেল গ্যাস উত্তোলনের গুরুত্ব অনেক। সেখানে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন ছাড়াও পেট্রোকেমিক্যাল ইন্ড্রাস্ট্রিতে ব্যাপক বিনিয়োগ হয়েছে। একসময় এমোনিয়া এবং মিথানল রপ্তানিতে বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় অবস্থানে চলে যায় তারা। তবে ত্রিনিদাদ ছাড়াও ক্যারিবিয়ানের অন্যত্রও শুরু হয়েছে তেল গ্যাস অনুসন্ধানের হিড়িক। পেট্রোলিয়াম জিওসায়েন্স বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘জিওএক্সপ্রো’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, এই মুহুর্তে ক্যারিবিয়ান তেল গ্যাস অনুসন্ধানের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হয়ে উঠছে। কিউবা, ডমিনিকান রিপাবলিক, বাহামা, জামাইকা, নিকারাগুয়া, হন্ডুরাস, ত্রিনিদাদ এন্ড টোবাগো এই অঞ্চলের সমুদ্রে তেল গ্যাস অনুসন্ধানে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। কানাডার সরকারি ওয়েবসাইটে ত্রিনিদাদে যেসব খাতে কানাডিয়দের বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে, সেগুলির তালিকা দেয় হয়েছে; যার মাঝে প্রথমেই রয়েছে নিরাপত্তা; তারপর শিক্ষা, অবকাঠামো, এবং সবশেষে হাইড্রোকার্বন।

অল্প কিছুদিন আগ পর্যন্তও কানাডার ব্যাংকগুলি ক্যারিবিয়ানে খুবই শক্ত অবস্থানে ছিল। ১৮৮২ সালে কানাডার সাথে ক্যারিবিয়ানের বাণিজ্যের উপর ভর করে কানাডার ব্যাংকগুলি ক্যারিবিয়ানে তাদের সাবসিডিয়ারি খুলতে শুরু করে। বিংশ শতকে ব্রিটিশরা ক্যারিবিয়ান ছেড়ে যেতে থাকলে কানাডার কোম্পানিগুলি তাদের স্থান নিতে থাকে। আর কানাডার সরকার এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে ব্যালান্স করতে কানাডার কোম্পানিগুলিকে সহায়তা দিতে থাকে। ‘আইএমএফ’এর এক হিসেবে বলা হচ্ছে যে, ক্যারিবিয়ানের সকল ব্যাংকের সকল সম্পদের ৬০ শতাংশ কানাডার তিনটা ব্যাংকের হাতে। ‘ফিনানশিয়াল পোস্ট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ২০০৯ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে ধ্বসের পর ক্যারিবিয়ানের মূল ব্যবসা পর্যটনে যখন মন্দা দেখা দেয়, তখন ক্যারিবিয়ানের লোকাল ব্যাংকগুলি আর্থিক সমস্যায় পরে যায়। অথচ এর মাঝেও কানাডিয়ান ব্যাংকগুলি বিশাল অংকের মুনাফা করে। আর এই ব্যাংকগুলির বার্ষিক প্রতিবেদনে অঞ্চলভিত্তিক বিভাজন এমনভাবে করা হয়, যাতে ক্যারিবিয়ানে কোথায় কিভাবে এই মুনাফা করা হয়েছে, তা যেন বোঝা না যায়। এই ব্যাংকগুলির মুনাফার উৎস খুব সম্ভবতঃ অফশোর ব্যাংকিং। অর্থাৎ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি, যারা নিজেদের আয়ের উৎস লুকিয়ে রাখতে চান, তারাই ক্যারিবিয়ানে এসব ব্যাংকের অর্থ গচ্ছিত রাখেন। তবে ২০১৮ সাল থেকে কানাডিয়ান ব্যাংকগুলি এই অঞ্চল ছেড়ে যাচ্ছে, যার কারণ এখনও পরিষ্কার নয়।

অনেকেই মনে করছেন যে, হাইড্রোকার্বন এই অঞ্চলের অর্থনীতিকে আবারও পরিবর্তন করবে। তবে চিনি, মদ, কফি, কলা, বক্সাইট, পর্যটন, ব্যাংকিং, টেক্সটাইল বা হাইড্রোকার্বন কোনটাই ক্যারিবিয়ানের সাথে কানাডার গভীর সম্পর্কের মূল কারণ নয়। কানাডার অর্থনীতির তুলনায় ক্যারিবিয়ানের অর্থনীতি খুবই ছোট। কানাডার জিডিপি যেখানে ১ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার বা ১৭’শ বিলিয়ন ডলার; সেখানে পুরো ক্যারিবিয়ানের সকল দেশ মিলে জিডিপি ৩’শ বিলিয়নেরও কম। ক্যারিবিয়ানে শক্ত অবস্থানে থাকার কারণেই কানাডা এখানকার ব্যবসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পেরেছে। আর এই শক্ত অবস্থানের ভিত্তি রাজনৈতিক। ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার মাঝেই কানাডার প্রভাব বিস্তারের বীজ নিহিত।
  
২০১৯ সালে ‘ক্যারিকম’এর সরকার প্রধানদের বৈঠক। ‘ক্যারিকম’এর সাথে সম্পর্ক গভীর করা মাধ্যমে কানাডা ক্যারিবিয়ানে, বিশেষ করে প্রাক্তন ব্রিটিশ উপনিবেশগুলিতে তার রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রেখেছে।




ক্যারিবিয়ানের রাজনীতিতে কানাডা

১৮৬৭ সালে উত্তর আমেরিকায় ব্রিটিশ অঞ্চলগুলিকে কানাডিয়ান কনফেডারেশনের মাঝে নিয়ে আসা হয়। এরপর থেকে বেশকিছু ক্যারিবিয় দ্বীপ কানাডিয়ান কনফেডারেশনের অংশ হবার জন্যে চেষ্টা করেছে। এই প্রচেষ্টাগুলির কিছু বেশিদূর আগায়নি; আবার কিছু ক্ষেত্রে এগুলিকে অনেকে বাস্তবসম্মতই মনে করেছে। ১৮৮২ সালে জামাইকাকে কানাডার অংশ করার একটা প্রচেষ্টা হয়েছিল, যা খুব দ্রুতই ভেস্তে যায়। বারবাডোসও চেয়েছিল কানাডার অংশ হতে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেন তার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপনিবেশগুলিকে অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের অধীনে ছেড়ে দেয়। একইসাথে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জের সরকার চাইছিল যে, নিউ ফাউন্ডল্যান্ড, ক্যারিবিয়ান এবং ফকল্যান্ডস আইল্যান্ডে ব্রিটিশ উপনিবেশগুলিকে কানাডার অধীনে দিয়ে দিতে। কানাডার ব্যবসায়ীরা এই প্রস্তাব বাস্তবায়নে যথেষ্ট চেষ্টা করেছিলেন। ব্যবসায়ী হ্যারি ক্রো কানাডার সরকারে নিজের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে একটা প্রতিবেদন তৈরি করান, যেখানে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জকে কানাডার অংশ করলে কি কি সুবিধা পাওয়া যেতে পারে, তার একটা তালিকা তৈরি করা হয়। এতে বলা হয় যে, প্রায় ৩ লক্ষ বর্গ কিঃমিঃ এলাকার সাথে কানাডা প্রায় ২৩ লক্ষ জনসংখ্যা পাবে; যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবিয় অঞ্চল থেকে যে পণ্য সুবিধা পাচ্ছে, কানাডাও সেটা পেতে পারে; এতে কানাডার নৌশক্তি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে; ঐ অঞ্চলে কানাডায় তৈরি পণ্যের বাজার নিশ্চিত হবে; আর বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেনের পক্ষে যুদ্ধ করার জন্যে একটা পুরষ্কার হতে পারে এই দ্বীপগুলি। কিন্তু কানাডাতে উপনিবেশের পুরো নিয়ন্ত্রণ নেবার জন্যে রাজনৈতিক সমর্থন আদায় করা সম্ভব না হওয়ায় এই প্রকল্প সফল হয়নি।

১৯১১ সালে বাহামা দ্বীপপুঞ্জও কানাডার অংশ হতে চেয়েছিল, যা কানাডিয়রা বাতিল করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৫০এর দশকে ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজ ফেডারেশন’ নামে একটা রাজনৈতিক সংগঠন তৈরির প্রচেষ্টা চালানো হয়। উদ্দেশ্য ছিল যে, দ্বীপগুলিকে একত্রিত করে একটা কাঠামোর অধীনে এনে এরপর ব্রিটেন বা কানাডার সাথে রাজনৈতিকভাবে একত্রীকরণের চেষ্টা করা। ১৯৬২ সালে এই প্রচেষ্টা ভেস্তে যায় যখন সবচাইতে বড় দ্বীপ জামাইকা এবং ত্রিনিদাদ এন্ড টোবাগো ফেডারেশন থেকে বের হয়ে যায়। ১৯৬০ এবং ১৯৭০এর দশকে বেশিরভাগ দ্বীপই আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে ব্রিটেন থেকে আলাদা হয়ে যায়। কানাডার সাথে যুক্ত হবার সর্বশেষ প্রচেষ্টা করে টুর্কস এন্ড কাইকোস দ্বীপপুঞ্জ। ১৯৭০এর দশকে তারা কানাডার সাথে যুক্ত হবার চেষ্টা শুরু করে। তবে ১৯৮৭ সাল নাগাদ তা ভেস্তে যায়। এরপর ২০০৩ সালে কানাডা থেকে নতুন আরেকটা প্রচেষ্টা চালানো শুরু হয়। ২০০৯ সালের মাঝে সেই প্রচেষ্টাও বানচাল হয়ে যায়। তবে যদিও কানাডা ক্যারিবিয়ানের দেশগুলিকে নিজের সাথে একত্রিত করতে চায়নি, তথাপি ক্যারিবিয়ানের সাথে কানাডার গভীর সম্পর্কের কারণে কানাডাকে ক্যারিবিয়ান থেকে আলাদা করা কঠিন। কানাডার জনগণকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক চিন্তা থেকে ‘পরিষ্কার’ রাখার জন্যেই হয়তো কানাডা ক্যারিবিয়ানের দেশগুলির সাথে আইনগত সম্পর্ক গড়েনি। তবে মুখে ক্যারিবিয়ান থেকে দূরে থাকার কথা বললেও কাজে কানাডা ক্যারিবিয়ানের অংশ হিসেবেই চিন্তা করেছে।

১৯৬৬ সালে কানাডায় ক্যারিবিয়ান দেশগুলির নেতাদের নিয়ে এক বৈঠক ডাকে কানাডা। এরপর ১৯৭৩ সালে ক্যারিবিয়ানের ইংরেজি ভাষাভাষি চারটা প্রাক্তন ব্রিটিশ উপনিবেশ ‘ক্যারিবিয়ান কমিউনিটি’ বা ‘ক্যারিকম’ নামের একটা সংস্থা গঠন করে; এরা হলো জামাইকা, ত্রিনিদাদ এন্ড টোবাগো, গায়ানা এবং বার্বাডোস। ১৯৭০ এবং ১৯৮০এর দশকে স্বাধীনতা পাওয়া ক্যারিবিয়ানের সকল ইংরেজি ভাষাভাষি দ্বীপ দেশ এতে যোগ দেয়। ১৯৯৫ সালে ডাচ ভাষার সুরিনাম এবং ২০০২ সালে ফরাসী ভাষাভাষি হাইতিও এতে যোগ দেয়। বর্তমানে ১৫টা দেশ এর সম্পূর্ণ সদস্য; ৫টা ব্রিটিশ উপনিবেশ এসোসিয়েট সদস্য; আর ৮টা অবজারভার দেশের মাঝে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অধীন পুয়রতো রিকো, ৩টা ডাচ উনপিবেশ; আর মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশ মেক্সিকো, কলম্বিয়া ও ভেনিজুয়েলা। ক্যারিবিয়ানের একমাত্র দেশ হিসেবে ডমিনিকান রিপাবলিক এই সংস্থার অবজারভার দেশ। ১৯৭৯ সালে কানাডা এবং ‘ক্যারিকম’এর মাঝে বাণিজ্য এবং সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কানাডা এই অঞ্চলে অর্থনৈতিক সহায়তা বৃদ্ধি করারও প্রতিশ্রুতি দেয়।

কানাডার সহায়তায় ১৯৬৯ সালে ‘ক্যারিবিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এখনও এই ব্যাঙ্কে প্রায় ৯ শতাংশ মালিকানা রয়েছে কানাডিয়দের; ৯ শতাংশ রয়েছে ব্রিটেনের; সাড়ে ৫ শতাংশ করে রয়েছে ইতালি, জার্মানি এবং চীনের; প্রায় ১০ শতাংশ রয়েছে ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলির; আর বাকিটা রয়েছে ক্যারিবিয় দেশগুলির। এছাড়াও ক্যারিবিয়ানে কানাডার বিভিন্ন সংস্থা যথেষ্ট গভীর সম্পর্ক রেখে চলেছে; যার মাঝে রয়েছে ‘ক্যানাডিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি’, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ‘কানাডিয়ান ট্রেড কমিশনার’, ‘আটলান্টিক কানাডা কোঅপারেশন এজেন্সি’, ‘ট্রান্সপোর্ট কানাডা’, ‘কানাডিয়ান রেডিও টেলিভিশন এন্ড টেলিকিউমিকেশন্স কমিশন’, ইত্যাদি। কানাডার ‘ভানটেজ এয়ারপোর্ট গ্রুপ’এর অধীনে ক্যারিবিয়ানে জামাইকা এবং বাহামা দ্বীপপুঞ্জে দু’টা বিমানবন্দর রয়েছে। এছাড়াও ‘অর্গানাইজেশন অব আমেরিকান স্টেটস’, ‘ইন্টার আমেরিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’, ‘প্যান আমেরিকান হেলথ অর্গানাইজেশন’ এবং ‘প্যাসিফিক এলায়েন্স’এর মাধ্যমে কানাডা ক্যারিবিয়ানের সাথে সম্পর্ক রাখে।


  
২০১৬ সালে ‘অপারেশন ক্যারিবে’তে অংশ নেয়া রয়াল কানাডিয়ান নেভির যুদ্ধজাহাজ ‘সাসকাচুয়ান’, ‘এডমন্টন’ এবং মার্কিন কোস্ট গার্ডের জাহাজ ‘হ্যাডক’। এই অপারেশনে মাদক বিরোধী অভিযানে অংশ নেবার মাধ্যমে কানাডা ক্যারিবিয়ানে তার সামরিক অবস্থানকে ধরে রাখছে। একইসাথে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় তারা যুক্তরাষ্ট্রকে একা ছেড়ে দেয়নি।

ক্যারিবিয়ানের সাথে কানাডার সামরিক সম্পর্ক

১৭৪৫ সাল থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত দু’শ বছরের বেশি সময় ধরে ব্রিটিশ রয়াল নেভি উত্তর আমেরিকায় তাদের অবস্থান অব্যাহত রাখে। এই অবস্থানের মূল ঘাঁটি ছিল কানাডার আটলান্টিক উপকূলের নোভা স্কোশিয়ার হ্যালিফ্যাক্স। হ্যালিফ্যাক্সে ঘাঁটি ছিল ১৯০৫ সাল পর্যন্ত। আরেকটা ঘাঁটি ছিল বার্মুডাতে; যা ১৯৫১ সাল পর্যন্ত সেখানে ছিল। তবে ১৮১৯ সালে উত্তর আমেরিকায় মূল ব্রিটিশ ঘাঁটি হ্যালিফ্যাক্স থেকে বার্মুডায় স্থানান্তর করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর হুমকিকে আরও ভালোভাবে মোকাবিলা করার জন্যে প্রস্তুতি নেয়া। ১৯১০ সালে রয়াল কানাডিয়ান নেভির জন্মের পর হ্যালিফ্যাক্সের নৌঘাঁটি কানাডার কাছে হস্তান্তর করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে কানাডার নৌবাহিনীর হাতে ছিল মাত্র ১১টা যুদ্ধজাহাজ এবং ১৮’শ নাবিক। বিশ্বযুদ্ধের মাঝে কানাডার কাছে ব্রিটিশরা পুরো উত্তর পশ্চিম আটলান্টিকের নিরাপত্তার দায়িত্ব দিয়ে দেয়। বিশ্বযুদ্ধ শেষে কানাডার হাতে ছিল ৪’শ ৩৪টা যুদ্ধজাহাজ এবং ৯৫ হাজার নাবিক।

বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই ক্যারিবিয়ানে কানাডার সামরিক উপস্থিতি বাড়তে থাকে। ১৯৫০এর দশক থেকে এখন পর্যন্ত এমন কোন বছর সম্ভবতঃ পাওয়া যাবে না, যখন ক্যারিবিয়ানে কানাডার সামরিক উপস্থিতি ছিল না। কানাডার সরকারি ওয়েবসাইটে ক্যারিবিয়ানে তাদের মিশনগুলির বিশদ বর্ণনা দেয়া হয়েছে।

১৯৫০ থেকে ১৯৭৪

- ১৯৫১ সালে ঘুর্নিঝড়ে আক্রান্ত জামাইকায় ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীকে ত্রাণসামগ্রী দিয়ে সহায়তা দেয় রয়াল কানাডিয়ান এয়ার ফোর্স।

- রয়াল কানাডিয়ান নেভির জাহাজগুলি নিয়মিতই ক্যারিবিয়ান টহল দিচ্ছিল। এমনই এক সময়ে ১৯৫৭ সালের মার্চে কানাডার একটা ডেস্ট্রয়ারকে ব্রিটিশ উপনিবেশ সেন্ট লুসিয়ায় জরুরি ভিত্তিতে পাঠানো হয়। সেন্ট লুসিয়ায় চিনি এবং কলা চাষে ব্যবহৃত শ্রমিকরা ধর্মঘটের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কানাডার ডেস্ট্রয়ার ‘মিকম্যাক’এর ক্রুদেরকে শহরে মোতায়েন করা হয় এবং ফলশ্রুতিতে ধর্মঘট এড়ানো যায়।

- ১৯৬১ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ বেলিজে ঘুর্নিঝড়ের তান্ডবের পর রয়াল কানাডিয়ান এয়ার ফোর্সের বিমানে করে ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হয়।

- ১৯৬৩ সালে হাইতিতে রাজনৈতিক গোলযোগের সময় সেখানে মাত্র ৩ ঘন্টার মাঝে রয়াল কানাডিয়ান নেভির ডেস্ট্রয়ার ‘সাসকাচুয়ান’কে প্রেরণ করে। সেখানে সর্বদা নিজেদের জাহাজ টহলে রাখার কারণেই এটা সম্ভব হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রও সেখানে নিজেদের জাহাজ প্রেরণ করে।

- ১৯৬৬ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ এন্টিগাতে রয়াল কানাডিয়ান এয়ার ফোর্সের বিমানে করে স্কুলের সরঞ্জামাদি পাঠানো হয়।

- ১৯৭২ সালে গায়ানাতে বিমান বাহিনীর বিমানে করে স্কুল বাসও প্রেরণ করা হয়। ১৯৭৪এ টুর্কস এন্ড কাইকোসেও স্কুলের সরঞ্জাম পাঠানো হয়।

- ১৯৭২ সালে কানাডা ভেনিজুয়েলার কাছে ২০টা ‘এফ-৫’ যুদ্ধবিমান বিক্রি করে।

- সেবছর নিকারাগুয়াতে ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলে সেখানে কানাডা বিমান বাহিনীর বিমানে করে ত্রাণ পাঠায়। ১৯৭৩ এবং ১৯৭৪এ হাইতিতেও বিমান এবং যুদ্ধজাহাজে করে ত্রাণ সামগ্রী পাঠানো হয়।
  
হাইতিতে কানাডার সৈন্য। ১৯৯০এর পুরো দশক জুড়েই হাইতির রাজনৈতিক সমস্যাকে কেন্দ্র করে সেখানে মার্কিন এবং জাতিসংঘের সেনা মোতায়েন থাকে। কানাডা সবসময় এই মিশনের সাথে ছিল। এই মিশনের বদৌলতে ক্যারিবিয়ানে কানাডার সামরিক উপস্থিতি স্থায়ী হয়ে গিয়েছিল। এই মিশনকে ব্যবহার করে আশেপাশের দেশগুলিতেও কানাডা প্রভাব বিস্তার করেছে।


১৯৭৪ থেকে ১৯৯৯
- ১৯৭৪ সালের জানুয়ারি মাসে ব্রিটেন গ্রেনাডাকে স্বাধীনতা দেয়ার পর সেখানে বিশৃংখলা শুরু হলে কানাডা সেখানে নৌবাহিনীর দু’টা ডেস্ট্রয়ার প্রেরণ করে। ১৯৭৪ সালে হন্ডুরাসে বিমানে করে ঘুর্নিঝড় পরবর্তী ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হয়।

- ১৯৭৬ সালে গুয়াতেমালায় ভূমিকম্পের পর বিমানে করে ত্রাণসামগ্রী পাঠায় কানাডা।

- ১৯৭৭ সালে গায়ানাতে কানাডার বিমান বাহিনীর বিমানে করে দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়।

- ১৯৭৯ সালে সেন্ট ভিনসেন্টএ আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের পর সেখানে কানাডা সামরিক মেডিক্যাল দল এবং বিমান বাহিনীর বিমান প্রেরণ করে। একই বছর নিকারাগুয়ায় গৃহযুদ্ধের মাঝে বিমানে করে ত্রাণসামগ্রী প্রেরণ করা হয়।

- ১৯৮৩ সালে গ্রেনাডাতে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের সময় কানাডাও সেখানে সামরিক পরিবহণ বিমান প্রেরণ করে।

- ১৯৮৮ সালের জানুয়ারিতে হাইতিতে নির্বাচনের আগে উত্তেজনা শুরু হলে সেখানে নৌ মহড়ার আড়ালে ৭টা হেলিকপ্টার সহ তিনটা যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হয়। বিমান বাহিনীর পরিবহণ বিমানও প্রস্তুত রাখা হয়। একই বছরের সেপ্টেম্বরে জামাইকাতে ঘুর্নিঝড় আঘাত করার পর সেখানে বিমান বাহিনীর বিমানে করে ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হয় এবং সামরিক সদস্যদের মোতায়েন করা হয়।

- ১৯৮৯ সালে হাইতি, জামাইকা, ডমিনিকান রিপাবলিক এবং সেন্ট লুসিয়াতে বছরজুড়ে বিমান বাহিনীর বিমানে করে ত্রাণ সহায়তা পাঠানো হয়। সেবছরের সেপ্টেম্বরে মন্টসেরাতে ঘুর্নিঝড় আঘাত হানার পর কানাডার সামরিক সদস্যদের মোতায়েন করা হয়।

- ১৯৮৯ থেকে ১৯৯২ পর্যন্ত মধ্য আমেরিকার কোস্টারিকা, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস এবং নিকারাগুয়ায় জাতিসংঘের শান্তি মিশনে সেনা মোতায়েন রাখে কানাডা।

- ১৯৯০ সালে কানাডা হাইতির নির্বাচনের সময় সেখানে সেনা সদস্য মোতায়েন করে।

- ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত জাতিসংঘ মিশনে হন্ডুরাসে কানাডার সেনাসদস্যরা মোতায়েন থাকে।

- ১৯৯২ সালের শুরুতে হাইতির রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে সেখানে হস্তক্ষেপ করে মার্কিন এবং ফরাসীদের সহায়তায় সেখানকার বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার উদ্দেশ্যে চারটা যুদ্ধজাহাজ প্রস্তুত করে। পরে অবশ্য এই অপারেশন বাস্তবায়িত করা হয়নি।

- ১৯৯৪এর সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের অধীনে সামরিক হস্তক্ষেপের জন্যে কানাডার তিনটা যুদ্ধজাহাজ হাইতির উপকুলে মোতায়েন করা হয়। ১৯৯৫এর মার্চে সেখানে ৫’শ সেনা মোতায়েন করা হয়। ১৯৯৬এর মার্চে সেখানে সামরিক সদস্যের সংখ্যা সাড়ে ৭’শ করা হয়। ১৯৯৭এর নভেম্বর পর্যন্ত সেখানে কানাডার সামরিক বাহিনীর প্রায় ৭’শ সদস্য মোতায়েন থাকে। ২০০০এর মার্চ পর্যন্ত কানাডার সামরিক উপস্থিতি ছিল সেখানে। ১৯৯৩এর ডিসেম্বর থেকে ১৯৯৪এর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাইতির উপকূলে কানাডার নৌবাহিনী জাহাজ মোতায়েন থাকে। পুরো অপারেশনে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্ব দিলেও কানাডা সেখান থেকে কখনোই সরে আসেনি।

- হাইতিতে কানাডার সেনাদের জন্যে সাপ্লাই দেয়ার সময়ে কানাডার সামরিক বিমানগুলি ১৯৯৫এর জুনে কোস্টা রিকাতেও ত্রাণসামগ্রী নিয়ে যায়। সেবছরের সেপ্টেম্বরে ত্রিনিদাদেও ত্রাণসামগ্রী পাঠায় তারা। সেবছরের সেপ্টেম্বরে এন্টিগা এন্ড বারবুডাতে ঘুর্নিঝড় আঘাত হানার পর সেখানে কানাডার কোস্ট গার্ডের জাহাজে করে সামরিক সহায়তা পাঠানো হয়।

- ১৯৯৪ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত গুয়াতেমালায় জাতিসংঘ মিশনের অধীনে কানাডা সেখানে সামরিক অফিসারদের মোতায়েন রাখে।

- ১৯৯৮ সালের নভেম্বরে হন্ডুরাসে ঘুর্নিঝড় আঘাত হানার পর সেখানে কানাডার সামরিক সদস্যদের মোতায়েন করা হয়।

- ১৯৯৯ সালে হাইতি এবং সেন্ট লুসিয়াতে বিমান বাহিনীর বিমানে করে ত্রাণসামগ্রী এবং এম্বুল্যান্স পাঠানো হয়।

২০০১ থেকে ২০০৮

- ২০০১ সালের জানুয়ারিতে এল সালভাদরে ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পর কানাডার বিমান বাহিনীর বিমানে করে ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হয়।

- বেলিজে ঘুর্নিঝড় আঘান হানার পর ২০০২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিমান বাহিনীর বিমানে করে সেখানে ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হয়।

- ২০০৪এর ফেব্রুয়ারিতে হাইতিতে সহিংসতা বেড়ে গেলে কানাডার বিমানবাহিনীর বিমানে করে সেখান থেকে বিদেশী নাগরিকদের বের করে আনা হয়। এরপর সেখানে জাতিসংঘের অধীনে প্রায় ৫’শ কানাডিয়ান সামরিক সদস্যকে মোতায়েন করা হয়। এর বেশিরভাগ সেনাকেই ফেরত আনা হলেও সেখানে কিছু উচ্চপদস্থ কানাডিয়ান সামরিক কর্মকর্তাকে দীর্ঘ সময়ের জন্যে রেখে দেয়া হয়।

- ২০০৭ সালের অগাস্টে ঘুর্নিঝড় আঘাত হানার পর জামাইকাতে কানাডার সামরিক বিমানে করে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেয়া হয়।

- ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে হাইতিতে ঘুর্নিঝড়ে আঘাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলে ক্যারিবিয়ানে মাদক নির্মূল অভিযানে মোতায়েনকৃত কানাডার নৌবাহিনী ফ্রিগেট ‘সেন্ট জন’কে সেখানে ত্রাণ সহায়তা দেবার জন্যে পাঠানো হয়।

এই মিশনগুলির মাঝে ১৯৫০এর দশক থেকে ১৯৮০এর দশক পর্যন্ত কানাডার সামরিক মিশনগুলি সংখ্যায় ছিল কম এবং বেশিরভাগই ছিল ত্রাণসামগ্রী পাঠাবার বা ব্রিটিশ উপনিবেশে শান্তি রক্ষা করার মিশন। ১৯৯০এর দশকে সামরিক মিশনগুলির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায় হাইতি। দুর্যোগের কারণে ত্রাণসামগ্রী পাঠাবার মিশন এর মাঝেই চলেছে। বিভিন্ন দেশে নিজেদের নাগরিক সরিয়ে নেবার কথা বলে বহুবার সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। তবে প্রতিবারই যুক্তরাষ্ট্রের মিশনের সাথে কানাডা যুক্ত ছিল।

২০০৬ সালের নভেম্বর থেকে ক্যারিবিয়ানে নতুন মিশন শুরু করে কানাডা। ‘অপারেশন ক্যারিবে’ নামের মাদক চোরাকারবারি বন্ধের উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু করা এই মিশনে ২০১০ সাল থেকে যোগ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ২০১২ সাল থেকে মার্কিন ‘অপারেশন মারটিলো’র অধীনে ন্যাস্ত করা হয় কানাডার মিশনকে। চুক্তি অনুযায়ী কানাডার জাহাজে মার্কিন কোস্ট গার্ডের সদস্যারা থাকবে; তারাই সরাসরি মাদক চোরাকারবারিদেরকে ধরবে। কানাডা এক্ষেত্রে শুধু লজিস্টিক্যাল সুবিধা দেবে। এল সালভাদরের কমালাপা বিমান ঘাঁটিতে মার্কিন নেতৃত্বে কানাডা ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান মোতায়েন করে। মিশন শুধু ক্যারিবিয়ানেই সীমাবদ্ধ নয়; মিশনের অনেকটা টহল পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে মেক্সিকো এবং মধ্য আমেরিকার পশ্চিম উপকূলেও চলছে। এই মিশনের অধীনে কানাডা অত্র অঞ্চলে নিয়মিত তাদের যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন রাখছে।
  
‘এক্সারসাইজ ট্রেইড উইন্ডস’ ২০১৯এ কানাডার সাথে অংশ নিচ্ছে ক্যারিবিয়ান সামরিক সদস্যারা। এই মহড়াকে ব্যবহার করে কানাডা জামাইকাতে ‘অপারেশনাল সাপোর্ট হাব’ বা ‘ওএসএইচ’ তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে অতি দ্রুততার সাথে কানাডা থেকে সৈন্য, রসদ, অস্ত্র এবং অন্যান্য সাপ্লাই নিয়ে যাবে; এবং সেখান থেকে পুরো ক্যারিবিয়ানের যেকোন স্থানে নিয়ে যাওয়া যাবে।

জামাইকায় সামরিক সহায়তা

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে প্রতিবছর কানাডা ‘এক্সারসাইজ ট্রেইড উইন্ডস’ নামের মহড়ায় অংশ নেয়। এই মহড়ার লক্ষ্য হিসেবে প্রথমেই বলা হচ্ছে অপরাধ দমন; এরপর রয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা। এই মহড়াকে কেন্দ্র করেই ২০১৬ সাল থেকে কানাডিয়ানরা জামাইকাতে একটা স্থায়ী ‘অপারেশনাল সাপোর্ট হাব’ বা ‘ওএসএইচ’ তৈরি শুরু করে। এই হাবের মাধ্যমে পুরো ক্যারিবিয়ানে কানাডিয়ানরা যেকোন সময় তাদের সামরিক কর্মকান্ড চালাতে পারবে। এর মাধ্যমে তারা অতি দ্রুততার সাথে কানাডা থেকে সৈন্য, রসদ, অস্ত্র এবং অন্যান্য সাপ্লাই নিয়ে আসতে পারবে; এবং সেখান থেকে পুরো ক্যারিবিয়ানের যেকোন স্থানে নিয়ে যেতে পারবে। ২০১৮ সালের অগাস্টে এই হাব অপারেশনে আসে। জামাইকার সাথে কানাডার সামরিক সম্পর্ক সবচাইতে গভীর। ১৯৬৫ সাল থেকে জামাইকার এক হাজার ৬’শ ৬০ জন সামরিক সদস্য কানাডায় প্রশিক্ষণ পেয়েছে। আর জামাইকাতে কানাডা বেশ কয়েকটা সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরি করেছে, যেখানে পুরো ক্যারিবিয়ানের সকল দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা প্রশিক্ষণ নেয়।

১৯৯৩ সাল থেকে জামাইকাতে চালু রয়েছে ‘ক্যারিবিয়ান জুনিয়র কমান্ড এন্ড স্টাফ কোর্স ফ্যাসিলিটি’। ২০০৬ সালে তৈরি করা হয় ‘ক্যারিবিয়ান মিলিতারই এভিয়েশন স্কুল’। ২০০৮ সালে তৈরি করা হয় টেকনিক্যাল ট্রেনিং স্কুল। ২০০৯ সালে তৈরি হয় ‘ক্যারিবিয়ান কাউন্টার টেররিজম ট্রেনিং সেন্টার’। ২০১২ সালে শুরু হয় ‘ক্যারিবিয়ান মিলিটারি ম্যারিটাইম ট্রেনিং সেন্টার’। ২০১৭ সালে তৈরি হয় ‘ডিরেক্টোরেট অব ট্রেনিং এন্ড ডকট্রাইন’। ২০১৮ সালে চালু হয় ‘ক্যারিবিয়ান স্পেশাল ট্যাকটিকস সেন্টার’।
  
২০১৬ সালে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর কিউবা ভ্রমণ। কিউবার ব্যাপারে কানাডার নীতি সর্বদাই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নীতির উল্টো। ক্যারিবিয়ানে প্রভাব বিস্তারের খেলায় ব্রিটিশ সময় থেকেই কানাডা যুক্তরাষ্ট্রকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখেছে। সমাজতান্ত্রিক কিউবার সাথে সম্পর্ক ধরে রাখার ব্যাপারটাও সেই একই চিন্তার অংশ।


কিউবার সাথে সম্পর্ক

কিউবার সাথে কানাডার বাণিজ্য চলছে অষ্টাদশ শতক থেকেই। তবে রাষ্ট্র হিসেবে কানাডা এবং কিউবার মাঝে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় ১৯৪৫ সালে। পুরো ক্যারিবিয়ানে কিউবাতেই কানাডিয়ানরা প্রথম দূতাবাস খোলে। ১৯৫৯ সালে কিউবাতে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর মাত্র দু’টা দেশ কিউবার সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখে; এর একটা মেক্সিকো; অন্যটা কানাডা। কানাডার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জন ডিফেনবেকার ঘোষণা দেন যে, আদর্শগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তিনি কিউবার সাথে সম্পর্ক রাখবেন। একই বছরের এপ্রিলে কিউবার নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো কানাডা সফরও করেন। ডিফেনবেকারের সরকার সকলকে বার্তা দেয় যে, কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি হুবহু নকল করে চলবে না। ১৯৬৩ সালে ডিফেনবেকার নির্বাচনে হেরে যাবার পর নতুন প্রধানমন্ত্রী পিয়েরে ট্রুডোও কানাডার পররাষ্ট্রনীতিকে মার্কিন প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার কথা বলেন। পিয়েরে ট্রুডো বর্তমান প্রধানন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর বাবা। ১৯৬০ এবং ১৯৭০এর দশকে কিউবার সাথে বাণিজ্যের ব্যাপারে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সাংঘর্ষিক নীতি অনুসরণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধে থাকা কিউবার অর্থনীতিতে কানাডার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। কিউবার ট্যুরিস্ট বোর্ডের বরাত দিয়ে ‘ট্রাভেল পালস কানাডা’ বলছে যে, ২০১৯ সালে কিউবাতে ১১ লক্ষের বেশি কানাডিয়ান ভ্রমণ করেছে। এই সংখ্যা কিউবায় ভ্রমণ করা সকল পর্যটকের প্রায় এক চতুর্থাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ১৯৯৬ সালে পাস করা ‘হেলমস বারটন এক্ট’ বাস্তবায়নের জন্যে যুক্তরাষ্ট্র কানাডার উপর চাপ সৃষ্টি করে। এই আইনের ‘টাইটেল ৩’এ বলা হয় যে, কিউবাতে মার্কিন নাগরিকদের সম্পদ কিউবার সরকার বাজেয়াপ্ত করে থাকলে মার্কিন নাগরিকেরা কিউবায় সেই সম্পদের বর্তমান ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে। এই আইনের প্রতিবাদে কানাডার হাইজ অব কমন্সে ‘গডফ্রে মিলিকেন বিল’ নিয়ে আসা হয়, যার মাধ্যমে বলা হয় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্মের সময় যেসকল ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার বিরোধী ছিলেন এবং কানাডায় পালিয়ে এসেছিলেন, তাদের বাজেয়াপ্ত সম্পদ তাদের উত্তরসুরীরা পাবার জন্যে চেষ্টা করতে পারবে। কানাডার প্রতিবাদের কারণে ‘হেলমস বারটন এক্ট’এর ‘টাইটেল ৩’ ২০১৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত স্থগিত করে দেয়া হয়। ২০১৯এর ২৭শে এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দেয় যে, ‘টাইটেল ৩’ এখন কার্যকর করা হবে। কানাডার প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে ৩রা মে বলা হয় যে, প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো কিউবার প্রধানমন্ত্রী মিগেল দিয়াজ কানেলের সাথে ফোনে কথা বলে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফাভাবে ‘টাইটেল ৩’ কার্যকর করার ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ট্রুডো কিউবাতে কানাডার জনগণের স্বার্থ রক্ষা করবেন বলে বলেন।

ব্রিটিশ কমনওয়েলথের কানাডা যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করেই যাবে

জরডান গুডরোর ব্যাপারটা যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের বছরে ট্রাম্পের জন্যে সুখকর কোন খবর নয়। এর মাত্র ক’দিন আগেই যুক্তরাষ্ট্র কিউবার ব্যাপারে ১৯৯৬ সালে কংগ্রেসে পাস করা আইন বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দেয়। এর কিছুদিন পরেই ২৫শে মে ইরান থেকে তেল নিয়ে আসা ট্যাঙ্কার ভেনিজুয়েলায় প্রবেশ করে। এই ঘটনাগুলি ট্রাম্প প্রশাসনকে নির্বাচনের বছরে হিস্প্যানিক ভোটারদের সামনে দুর্বল করতে পারে। গুডরোর কানাডার নাগরিকত্ব ক্যারিবিয়ানে প্রায় আড়াই’শ বছরের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সময় থেকেই কানাডা ক্যারিবিয়ানে প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। ব্রিটিশরা তাদের উপনিবেশগুলিকে ছেড়ে দেবার পর কানাডা ব্রিটিশ কমনওয়েলথের নীতিই ধরে রেখেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখেছে। প্রথমে অর্থনৈতিক দিক থেকে সম্পর্কের সূচনা হলেও বর্তমান কানাডা ক্যারিবিয়ানের উপর নির্ভরশীল নয়। বরং ক্যারিবিয়ানের ছোট দ্বীপ দেশগুলিই কানাডার উপর নির্ভরশীল। ব্রিটিশদের প্রাক্তন উপনিবেশে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলকভাবেই দেখেছে। একারণেই কানাডা ক্যারিবিয়ানে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামরিক দিক থেকে সর্বদা ব্যস্ত থেকেছে। ঔপনিবেশিক শক্তি হবার তকমা নিতে না চাইলেও ক্যারিবিয়ানকে কানাডা নিজের মনে করেই দেখেছে। কানাডা আলাদা কোন জাতীয়তাবাদী শক্তি নয়। বিশ্বব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রবাহে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর কৌশলের মাঝে ব্রিটিশ কমনওয়েলথের কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডকেই ব্রিটেনের আত্মার অংশ হিসেবে চিন্তা করা হচ্ছে। আদর্শিক দিক থেকে একই সূত্রে গাঁথা এই দেশগুলি তো এক সুরেই কথা বলবে। প্রশান্ত মহাসাগরে যেমন অস্ট্রেলিয়াকে ব্রিটেনের হাত হিসেবে দেখতে চাইছেন তারা, তেমনি আমেরিকা মহাদেশে কানাডাকে তারা দেখতে চাইছেন অগ্রগামী অবস্থানে। ভেনিজুয়েলা এবং কিউবার সাম্প্রতিক ইতিহাস ক্যারিবিয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে দুর্বল করে। আর এই সুযোগটা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বীরা নিলে অবাক হবার কিছু নেই। ক্যারিবিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রকে নিজের উঠানেই চ্যালেঞ্জ নিতে হচ্ছে।

Saturday, 6 June 2020

কালাপানি সীমান্ত বিরোধ - নেপাল কোন পথে যাচ্ছে?

৭ই জুন ২০২০



গত ৩১শে মে নেপালের আইনমন্ত্রী শিভামায়া তুম্বাহাংপে দেশটার পার্লামেন্টে সংবিধান সংশোধনের একটা প্রস্তাব পেশ করেন। প্রস্তাব মোতাবেক নেপালের নতুন মানচিত্র প্রকাশ করা হবে, যার মাঝে থাকবে কালাপানি, লিপুলেখ গিরিপথ এবং লিম্পিয়াধুরা, যা নিয়ে ভারতের সাথে সাম্প্রতিক সময়ে বিরোধ চলছে। এতকাল পর্যন্ত নেপালের মানচিত্রের ব্যাপারে দুই দেশের বিরোধ চললেও মানচিত্রকে নেপাল আইনের মাধ্যমে লিপিবদ্ধ করেনি। পার্লামেন্টে এই প্রস্তাব পাস হলে নেপাল এই মানচিত্রকে আইনগত বৈধতা দেবে। গত ২০শে মে নেপাল সরকার এই নতুন মানচিত্র প্রকাশ করে। ভারতের মিডিয়া ‘টাইম নাউ’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, সংবিধান সংশোধন করতে হলে ক্ষমতাসীন নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি একা এই প্রস্তাব পাস করতে পারবে না; কারণ দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাদের নেই। এক্ষেত্রে অন্য দলগুলির সমর্থনও দরকার হবে। অপরদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অনুরাগ শিভাস্তাভা বলেন যে, নেপালের এধরনের কর্মকান্ড পুরোপুরিভাবে একতরফা, এবং তা ঐতিহাসিক সত্যের উপর ভিত্তি করে নয়। নেপাল ভালো করেই জানতো যে এব্যাপারে ভারতের অবস্থান কি। এর আগে গত ৮ই মে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং লিপুলেখ গিরিপথ এবং চীনের কৈলাস মানসসরোবরের মাঝে ৮০ কিঃমিঃ লম্বা একটা রাস্তা উদ্ভোধন করার পর নেপাল এব্যাপারে প্রতিবাদ করা শুরু করে। এর আগে ২০১৯এর নভেম্বরে ভারত সরকার নতুন মানচিত্র প্রকাশ করে, যার মাঝে বিরোধপূর্ণ অঞ্চলটা ভারতের অভ্যন্তরে দেখানো হয়েছিল। 

২১শে মে নেপালের সেনাবাহিনী ঘোষণা দেয় যে, তারা নেপাল এবং ভারতের পশ্চিম সীমান্তের সমান্তরালে ধারচুলা থেকে টিঙ্কার গিরিপথের মাঝে রাস্তা তৈরি করা শুরু করেছে। ২০০৮ সালে এই রাস্তা তৈরির কাজ স্থগিত করা হয়েছিল। নেপালের সেনাবাহিনী বলছে যে, তারা রাস্তার সাড়ে ৪’শ মিটার একটা অংশের কাজ করছে। এর মাধ্যমে ১’শ ৮২টা পরিবারের ১২’শ মানুষকে ভারতের অভ্যন্তরে গিয়ে রাস্তা ব্যবহার করতে হবে না। গত ২৬শে এপ্রিল নেপালের মন্ত্রীসভায় এই রাস্তা তৈরির সিদ্ধান্ত হয় বলে বলা হয়। এই রাস্তা নেপালের নিজস্ব অঞ্চলের ভিতরে হওয়া সত্ত্বেও ভারতীয় মিডিয়া এই রাস্তার ব্যাপারে খবরাখবর প্রকাশ করছে। কারণ, এই রাস্তার অবস্থান বিরোধপূর্ণ অঞ্চলের খুবই কাছে। এই রাস্তার মাধ্যমে নেপালের পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের চীনের সাথে বাণিজ্য করার একটা সম্ভবনা তৈরি হতে পারে।   
     
কূটনৈতিক কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ‘সানডে এক্সপ্রেস’ পত্রিকা বলছে যে, পার্লামেন্টে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব পেশ করার পর নেপালের পররাষ্ট্র দপ্তর এক কূটনৈতিক নোট দিয়ে ভারতকে জানায় যে, উভয় দেশের পররাষ্ট্র সচিবরা ‘ভার্চুয়াল’ আলোচনায় বসতে পারেন। এর আগে গত ৯ই মে ভারত বলেছিল যে, করোনাভাইরাসের মহামারি সফলতার সাথে মোকাবিলা করার পরই কেবল ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা এবং নেপালের পররাষ্ট্র সচিব শংকর দাশ বৈরাগী আলোচনায় বসতে পারেন। আলোচনার ব্যাপারে ভারতের অনাগ্রহ এবং নেপালের সদিচ্ছা যথেষ্টই দৃশ্যমান। আর ভারতকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করতে নেপালি সরকার পার্লামেন্টে সংবিধান সংশোধন প্রস্তাব এবং সীমান্তে রাস্তা নির্মাণকে পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করবে। 

ভারতীয়রা বলছে যে, নেপালের বর্তমান সরকার নেপালকে চীনের কাছে নিয়ে যাচ্ছে। ভারতীয় মিডিয়াতে নেপালের সরকারকে চীনা প্রক্সি বলতেও কার্পণ্য করছেন না কেউ কেউ। ‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, বিরোধপূর্ণ অঞ্চলের উপর নেপালের দাবি থাকা সত্ত্বেও ভারত একতরফাভাবে ৮০ কিঃমিঃ লম্বা রাস্তা তৈরি করে। নেপালের ভাষ্য হচ্ছে, ভারত তার ছোট প্রতিবেশীকে চাপে রাখতেই এধরণের কর্মকান্ড করছে। নেপাল দাবি করছে যে, ১৮১৬ সালে ব্রিটিশ ভারত সরকারের সাথে গুর্খা যুদ্ধের পর সুগাউলি চুক্তির মাধ্যমে নেপালের সীমানা নির্ধারণ করে দেয়া হয়। সেই চুক্তি মোতাবেক কালি নদীকে নেপাল এবং ভারতের মাঝে সীমানা হিসেবে সম্মতি দেয় উভয় পক্ষ। ১৯৫৯ সালের নেপালের নির্বাচনে কালাপানি, লিপুলেখ গিরিপথ এবং লিম্পিয়াধুরার জনগণ ভোট দিয়ে অংশ নেয়; এবং তারা নেপাল সরকারকে করও দিয়ে যাচ্ছিল। ১৯৬২ সালে চীনের সাথে সীমান্ত যুদ্ধের পর থেকে ভারতীয় সেনারা এই অঞ্চলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে দেয়। তবে এই বিরোধপূর্ণ অঞ্চল নিয়ে চীনের অবস্থানটা এখনও পরিষ্কার নয়। ২০১৫ সালের মে মাসে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংএর আলোচনায় স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলির মাঝে ছিল চিয়াংলা এবং লিপুলেখ গিরিপথের মাধ্যমে বাণিজ্য বৃদ্ধি। সেসময় নেপাল এই চুক্তির বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ জানায়। তারা উভয় দেশকেই সীমানার ব্যাপারটা সঠিকভাবে দেখতে উপদেশ দেয়।  

ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ১৯৫০এর দশক থেকেই নেপাল বারংবার সীমান্ত বিরোধ কাটাতে ভারতকে আলোচনায় বসার অনুরোধ করতে থাকে। কিন্তু ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তর নেপালকে আলোচনায় বসার জন্যে সময় দেয়নি। আর নেপালের বর্তমান প্রতিবাদ এমন সময়ে এলো, যখন লাদাখে ভারতের সাথে চীনের উত্তেজনা চলছে। ভারত মনে করছে যে, নেপালের নতুন কমিউনিস্ট পার্টি চীনের ইন্ধনে তৈরি হয়েছে। ২০১৮ সালের মে মাসে অফিশিয়ালি ‘নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি’র জন্ম হয়। পূর্ববর্তী মার্কস ও লেনিনের অনুসারী গ্রুপ এবং মাওপন্থী গ্রুপ একত্রিত হয়েই এই দল গঠিত হয়। ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ বলছে যে, কালাপানি সীমান্ত বিরোধ নেপালের রাজনৈতিক দলগুলিকে একত্রিত করেছে, যা ইতিহাসে বিরল। ২০১৫ সালে নেপালের সংবিধান বিষয়ে মদেশীদের অন্দোলনে ভারত মদেশীদের পক্ষে হস্তক্ষেপ করে এবং নেপালের উপর অঘোষিত অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে। এতে নেপালের জনগণের সাথে ভারতের দূরত্ব যথেষ্ট বৃদ্ধি পায়। আর অবরোধের কারণে নেপাল চীন থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করতে বাধ্য হয়, যা নেপালকে চীনের কাছে নেয় এবং ভারতীয় চিন্তাবিদদের নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি করে। স্থলবেষ্টিত দেশ হিসেবে নেপালের বাণিজ্য ভারতের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। তদুপরি নেপালকে ভারত নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। অপরদিকে চীনের সাথে নেপালের সম্পর্ক গভীর হবার সাথেসাথে ভারত নেপালের উপর চাপ সৃষ্টি করছে, যা কিনা নেপালকে আরও কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলে দিচ্ছে। এহেন পরিস্থিতি নেপালকে শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক ব্যালান্স নিশ্চিত করতে ভারত এবং চীনের বিকল্প খুঁজতে আগ্রহী করবে।       

Wednesday, 3 June 2020

চীন ও ভারতের সীমান্ত উত্তেজনার ভবিষ্যৎ কি?


৪ঠা জুন ২০২০

ভারতীয় কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ২৬শে মে ‘রয়টার্স’ বলছে যে, হিমালয়ের পাদদেশে বিমানবন্দর এবং রাস্তা নির্মাণকে কেন্দ্র করে ভারত এবং চীনের মাঝে উত্তেজনা শুরু হয়েছে। লাদাখ এলাকার গালওয়ান উপত্যকায় উভয় পক্ষ সামরিক ক্যাম্প স্থাপনের মাধ্যমে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে; আর একে অপরকে এই উত্তেজনার ব্যাপারে দোষারোপ করছে। ভারতীয় কর্মকর্তারা বলছেন যে, চীনাদের প্রান্তে ৮০ থেকে ১০০টা তাঁবু গড়ে তোলা হয়েছে। উভয় পক্ষই নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যুহ গড়ে তুলছে। চীনারা ট্রাকে করে সরঞ্জাম নিয়ে আসছে সেখানে। ভারতের লাদাখের অপর প্রান্তে চীনাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে আকসাই চিন অঞ্চল, যা ভারত নিজের বলে দাবি করে।

১৯৬২ সালে চীনের সাথে যুদ্ধে ভারত বেশ বড় আকারের পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। এরপর ১৯৮৮ সালে ভারতের উত্তরপূর্বের অরুনাচল প্রদেশে দুই দেশের মাঝে আরেক দফা সংঘাতের পর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী চীনা নেতা দেং জিয়াওপিংএর সাথে আলোচনা বসেন। ১৯৯৩, ১৯৯৬ এবং ২০০৫ সালে কয়েক দফা বৈঠকের পর দুই দেশ সীমানা ঠান্ডা রাখতে সম্মত হয়েছিল। এর ফলশ্রুতিতে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দুই দেশের মাঝে সীমান্তে কোন সংঘাত হয়নি। তবে ২০১৭ সালে দোকলাম সীমান্তে উত্তেজনা বৃদ্ধির মাঝ দিয়ে এই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সমাপ্তি হয়। আর এবারের উত্তেজনার শুরু হয় ৫ই মে, যখন দুই পক্ষের প্রায় শ’খানেক সেনা হাতাহাতি সংঘাতে লিপ্ত হয়। তবে কোন আগ্নেয়াস্ত্র কোন পক্ষই ব্যবহার করেনি।

চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হচ্ছে যে, চীন তার নিজস্ব অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ; তবে ভারতের সাথে সীমানায় তারা শান্তি ও শৃংখলা বজায় রাখতেও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। বিবৃতিতে আরও বলা হয় যে, বর্তমানে দুই দেশের সীমানা স্থিতিশীল এবং নিয়ন্ত্রণের মাঝেই রয়েছে। উভয় পক্ষই আলোচনায় মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সক্ষম। ভারতের প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব নিরুপমা রাও বলছেন যে, সীমানার কাছাকাছি ভারতের অবকাঠামো উন্নয়নের পর থেকেই চীনারা সেটাকে হুমকি হিসেবে দেখা শুরু করেছে। শি জিনপিংএর চীন তার নিজস্ব ভূমির নিরাপত্তা নিশ্চিতে যেমন কঠোর অবস্থানে রয়েছে, তেমনি ভারতও সেব্যাপারে ছাড় দিতে নারাজ।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার ২০২২ সালের মাঝে চীনের সীমানার কাছাকাছি অনেকগুলি রাস্তা তৈরির প্রকল্প গ্রহণ করেছে। লাদাখে ভারতের সামরিক রাস্তা তৈরির ইতিহাসটা বর্তমান প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ।

মার্কিন নির্মিত ‘সি-১৩০জে’ পরিবহণ বিমান চীনের সীমানার কাছাকাছি লাদাখের ‘দৌলত বেগ ওল্ডি’ নামের বিমানবন্দরে অবতরণ করছে। এই বিমানবন্দর পর্যন্ত রাস্তা তৈরির ফলেই চীনারা ধারণা করা শুরু করে যে, ভারতীয়রা হয়তোবা চীনা নিয়ন্ত্রণে থাকা আকসাই চিন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেবার পরিকল্পনা করছে।


পাঁচ কিঃমিঃ উচ্চতায় বিমানবন্দর

২০১৩ সালের অগাস্টে ভারতীয় মিডিয়ায় ঘোষণা দেয়া হয় যে, ভারতীয় বিমান বাহিনী তাদের মার্কিন নির্মিত ‘সি-১৩০জে’ পরিবহণ বিমান চীনের সীমানার কাছাকাছি লাদাখের ‘দৌলত বেগ ওল্ডি’ নামের বিমানবন্দরে অবতরণ করিয়েছে। সমুদ্র সমতল থেকে ১৬ হাজার ৬’শ ফুট বা ৫ কিঃমিঃএর বেশি উচ্চতায় অবস্থিত এই বিমাববন্দরকে পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিমানবন্দর বলেও দাবি করা হয়। পুরো লাদাখের গড় উচ্চতা ৩ কিঃমিঃ থেকে সাড়ে ৪ কিঃমিঃএর মতো। ষোড়শ শতকে সুলতান সৈয়দ খান লাদাখ অপারেশনে সময় এখানে মৃত্যুবরণ করেন; সেই থেকে এই জায়গার নাম ‘দৌলত বেগ ওল্ডি’। এর ২০ কিঃমিঃ উত্তরেই রয়েছে প্রায় ১৯ হাজার ফুট উচ্চতার কারাকোরাম গিরিপথ, যা লাদাখের সাথে চীনের শিনজিয়াং বা উইঘুর প্রদেশের যোগাযোগের পথ। ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত এই পথে উইঘুরের কাশগড়ের সাথে হোশিয়ারপুরের পাঞ্জাবি বণিকরা বাণিজ্য করতো। ব্রিটিশ সামরিক অফিসাররা একসময় মনে করতেন যে, কারাকোরাম গিরিপথের মাধ্যমে রুশ সামরিক হামলা হবার সম্ভাবনা রয়েছে। এই ভীতি বাস্তবতা পায়নি। পরে অবশ্য ভারত এবং চীন কারাকোরাম গিরিপথকে কোন দ্বন্দ্ব ছাড়াই নিজেদের সীমানা হিসেবে মেনে নেয়। এর পূর্বে চীন নিয়ন্ত্রিত আকসাই চিন, আর পশ্চিমে রয়েছে সিয়াচেন হিমবাহ। ভারতীয় মিডিয়া ‘ফার্স্ট পোস্ট’ বলছে যে, ঐ বছর এপ্রিল মে মাসে সেই এলাকায় উত্তেজনার পর এই বিমান অবতরণের অপারেশন চালানো হয়। ১৯৬২ সালের চীন ভারত যুদ্ধের সময় ‘দৌলত বেগ ওল্ডি’র সামরিক স্থাপনা তৈরি করা হয়েছিল। ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত সেখানে মার্কিন নির্মিত ‘সি-৮২ প্যাকেট’ পরিবহণ বিমান অবতরণ করতো সৈন্যদের রসদপাতি আনানেয়ার কাজে। একটা ভূমিকম্পের পর সেই বিমানবন্দরের মাটি দুর্বল হয়ে পড়ার পর থেকে সেখানে বিমান অবতরণ বন্ধ করে দেয়া হয়। টানা ৪৩ বছর এই বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত থাকার পর ২০০৮ সালের মে মাসে ভারতীয় বিমান বাহিনীর রুশ নির্মিত ‘এন-৩২’ পরিবহণ বিমান সেখানে অবতরণ করে। অত উচ্চতায় পণ্য পরিবহণ সক্ষমতা বৃদ্ধিতেই ২০১৩ সাল থেকে ‘সি-১৩০’ বিমান ব্যবহার করা শুরু হয়।

তবে ঘটনা পরিবর্তিত হয়ে যায় ২০১৯ সালে। এবছরের এপ্রিল মাসে ভারতীয়রা লাদাখের লেহ থেকে উত্তরে ‘দৌলত বেগ ওল্ডি’ পর্যন্ত আড়াইশ’ কিঃমিঃ লম্বা রাস্তা তৈরির কাজ শেষ করে। ভারতীয় পত্রিকা ‘দ্যা ট্রিবিউন’ বলছে যে, কৌশলগতভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ এই রাস্তা সারা বছর চালু থাকবে। এই পথে মোট ৩৭টা সেতু তৈরি করা হয়েছে। দারবুক থেকে দৌলত বেগ ওল্ডি পর্যন্ত রাস্তার কোন অংশই ১৪ হাজার ফুট উচ্চতার নিচে নয়। এই পুরো পথের কোথাও বেসামরিক নাগরিকদের বসবাসের অনুমতি নেই। ২০০০ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত এই রাস্তা তৈরির প্রথম চেষ্টাটা করা হয়। কিন্তু শায়ক নদীর পানির তোড়ে রাস্তা ভেসে গেলে ২০১৪ সাল থেকে নতুনভাবে প্রায় ১’শ ৬০ কিঃমিঃ রাস্তা তৈরির পরকল্পনা হাতে নেয়া হয়। এই কাজ শেষ হয় ২০১৯ সালে। এই রাস্তা তৈরির ফলেই চীনারা ধারণা করা শুরু করে যে, ভারতীয়রা হয়তোবা চীনা নিয়ন্ত্রণে থাকা আকসাই চিন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেবার পরিকল্পনা করছে।

সাম্প্রতিক সময়ে লাদাখে বিমানবন্দরের উন্নয়ন, রাস্তা তৈরি, নতুন ধরণের অস্ত্র ক্রয় এবং সেনা পরিবহণের জন্যে নতুন পরিবহণ বিমান ক্রয়, ইত্যাদি পদক্ষেপের মাধ্যমে চীন সীমান্তে ভারতীয় সেনাবাহিনী সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে। এই সক্ষমতা বৃদ্ধির পিছনে ইন্ধন যুগিয়েছে ভারতীয় চিন্তাবিদদের নিরাপত্তাহীনতার চিন্তা। ভারতীয় পত্রিকা ‘দ্যা প্রিন্ট’ বলছে যে, ১৯৯৯ সালে ভারতের ‘ক্যাবিনেট কমিটি অন সিকিউরিটি’ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘বর্ডার রোডস অর্গানাইজেশন’কে ২০০৩ সালের মাঝে চীন সীমান্তে রাস্তা তৈরির প্রকল্প বাস্তবায়ন করার কাজ দেয়। এই প্রকল্পের সময় ২০১২ সাল পর্যন্ত বৃদ্ধি করলেও তা শেষ করতে ২০১৯ হয়ে যায়। এই প্রকল্পের অধীনে চীনের সীমানার কাছাকাছি ৩ হাজার ৩’শ ৪৬ কিঃমিঃ লম্বা ৬১টা রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। এর মাঝে ১ হাজার ২’শ ৬০ কিঃমিঃ লম্বা ৩৫টা রাস্তার কাজ শেষ হয়েছে। ২ হাজার ৩৫ কিঃমিঃএর ২০টা রাস্তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। আর বাকি ৫১ কিঃমিঃএর ৫টা রাস্তার কাজ এখনও চলছে। ভারতীয় কর্মকর্তারা মনে করছেন যে, এই রাস্তা তৈরির ফলে দুর্গম সীমান্ত অঞ্চলে সরকারের যোগাযোগ সহজীকরণ এবং প্যাট্রল বৃদ্ধি করার লক্ষ্য বাস্তবায়িত হবে। ভারতীয় কর্মকর্তারা বলছেন যে, ১৯৯৭ সালে চীনারা তাদের সীমান্ত এলাকায় রাস্তা তৈরির কাজ আরম্ভ করার পর ভারতীয়রা ‘চায়না স্টাডি গ্রুপ’ তৈরি করে; যা গবেষণা করে ৭৩টা পয়েন্টে রাস্তা নির্মাণ করার উপদেশ দেয়।

ভারতীয় বিমান বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এপাচি হেলিকপ্টার বুঝে নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা পরিবহণ বিমান, হেলিকপ্টার ও কামান সীমান্ত অঞ্চলে ভারতের যুদ্ধ করার সক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি করেছে ঠিকই, তবে সেটা চীনের সাথে সম্ভাব্য সংঘাতে বিজয়ের জন্যে যথেষ্ট কিনা, সেব্যাপারে প্রশ্ন করছেন অনেকেই।


লাদাখে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সক্ষমতা কতটুকু? 

লাদাখের নিরাপত্তায় রয়েছে ভারতীয় সেনাবাহিনীর চতুর্দশ কোর, যা ১৯৯৯ সালে কারগিল যুদ্ধের সময় গঠিত হয়। তবে এখানকার ইউনিটগুলি ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলের নাগাল্যান্ড থেকে নিয়ে আসা ইউনিট থেকেই ডেভেলপ করা হয়েছিল। নাগাল্যান্ডের পাহাড়ি এলাকায় বিদ্রোহী দমনে নিয়োজিত ইউনিটের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েই ১৯৬২ সাল থেকে এর অধীন ৩য় পদাতিক ডিভিশন তৈরি করা হয়। ১৯৯০ সালের পর নাগাল্যান্ড থেকে বিদ্রোহী দমনে নিয়োজিত ৮ম পদাতিক ডিভিশনকে লাদাখে নিয়ে আসা হয়। এরপর থেকে এই ইউনিট নাগাল্যান্ডে আর ফেরত যায়নি। ২০১৯এর সেপ্টেম্বরে লাদাখের দক্ষিণপূর্ব প্রান্তে চীনা সীমানার কাছাকাছি চুশুল অঞ্চলের অত্যন্ত উঁচু এলাকায় ভারত বড় আকারের একটা সামরিক মহড়ার আয়োজন করে। ‘চাংথাং প্রাহার’ নামের এই মহড়ায় ভারতের ট্যাঙ্ক, আর্টিলারি, হেলিকপ্টার, ড্রোন, এবং বিমান বাহিনীর বিমান অংশ নেয়। বিমান থেকে প্যারাশুট দিয়ে সেনা অবতরণও করা হয়। ভারতীয় সেনাবাহিনীর নর্দার্ন কমান্ডের কমান্ডার লেঃ জেনারেল রনবীর সিং মহড়ার সময় বলেন যে, যুদ্ধ করতে বাধ্য হলে নর্দার্ন কমান্ড তার শ্রেষ্ঠ সক্ষমতা প্রদর্শন করবে। নতুন প্রযুক্তির অস্ত্র ব্যবহারের সাথেসাথে এই সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু কাশ্মির এবং লাদাখের নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে ভারতীয় সেনবাহিনীর নর্দার্ন কমান্ড। এর অধীনেই রয়েছে লাদাখের চতুর্দশ কোর, শ্রীনগরের পঞ্চদশ কোর এবং নাগ্রতার ষোড়শ কোর। সেনাবাহিনীর এই ইউনিটগুলি অতি উঁচু ভূমিতে যুদ্ধ করতে সক্ষম। ভারতের ইস্টার্ন কমান্ডের অধীনে থাকা ৯টা মাউন্টেন ডিভিশনই উঁচু স্থানে যুদ্ধ করতে অভ্যস্ত। তাই লাদাখ বা কাশ্মিরে উত্তেজনার উপর ভিত্তি করে অনেক সময়েই ইস্টার্ন কমান্ড থেকে সেনা এনে নর্দার্ন কমান্ডে মোতায়েন করা হয়েছে। তবে ইস্টার্ন কমান্ডের ইউনিটগুলির একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো চীনের উপর খেয়াল রাখা। চীনা সীমানা ঠান্ডা থাকলেই কেবল ইস্টার্ন কমান্ডের ইউনিট নর্দার্ন কমান্ডে মোতায়েন করা সম্ভব। চীনের সাথে ভারতের সম্ভাব্য উত্তেজনার মাঝে সেটা কতটুকু সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে।

সেনাবাহিনী ছাড়াও ভারতীয় বিমান বাহিনীর রসদ পরিবহণ সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে বিমান বাহিনীর ওয়েস্টার্ন কমান্ডের একটা মহড়া অনুষ্ঠিত হয়, যার মাঝে লাদাখ থেকে ৪’শ কিঃমিঃ দূরের চন্ডিগড় বিমান ঘাঁটি থেকে ৬ ঘন্টায় ৪’শ ৬৩ টন রসদ লাদাখে প্রেরণ করা হয়। বিমান বাহিনীর মোট ১৬টা পরিবহণ বিমান এতে ব্যবহৃত হয়, যার মাঝে ছিল মার্কিন নির্মিত ‘সি-১৭ গ্লোবমাস্টার’ এবং রুশ নির্মিত ‘ইলিউশিন-৭৬’ ও ‘এন্টোনভ-৩২’। ‘ফিনানশিয়াল এক্সপ্রেস’ বলছে যে, সাধারণ সময়ে ওয়েস্টার্ন এয়ার কমান্ড মাসে ৩ হাজার টনের মতো রসদ পরিবহণ করে থাকে। এয়ার ভাইস মার্শাল ধিলন বলছেন যে, লাদাখে স্বল্প সময়ের যুদ্ধাবস্থার মাঝে লজিস্টিক সাপোর্ট দেয়ার সক্ষমতার প্রমাণ রেখেছে ভারতীয় বিমান বাহিনী। 

২০১১ সালের জুনে ভারতীয় বিমান বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ১০টা ‘সি-১৭ গ্লোবমাস্টার’ পরিবহণ বিমান ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। বিমানের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং এই বিমানের উৎপাদন শেষ করে দেবার সময় ভারত আরও ৩টা বিমান কিনতে চায়। তবে ভারতের আমতান্ত্রিক জটিলতার কারণে শেষ পর্যন্ত ২০১৯ সালের অগাস্টে ভারত তার ১১তম এবং শেষ ‘সি-১৭’এর ডেলিভারি পায়। এই বিমানটা ডেলিভারির মাধ্যমে বোয়িংএর ‘সি-১৭’ কারখানা বন্ধ করে দেয়া হয়। ১’শ ৮৮ জন সেনা বা ৭৩ টন রসদ বহণে সক্ষম এই বিমানগুলিকে ভারত কিনেছিল কৌশলগত পরিবহণের জন্যে। ‘সি-১৭’ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র থেকে ‘সি-১৩০জে সুপার হারকিউলিস’ পরিবহণ বিমান কিনেছে ভারত। ২০০৮ সালে প্রথম ৬টা ‘সি-১৩০জে’ অর্ডার করে ভারত। ২০১১ সাল থেকে এগুলির ডেলিভারি শুরু হয়। এরপর ২০১৩ সালে আরও ৬টা বিমান অর্ডার করে ভারত। এই বিমানগুলি প্রায় ১’শ সেনা বা ১৯ টন রসদ বহণ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনা বিমানগুলি ভারতীয় বাহিনীর সোভিয়েত আমলের ‘ইলিউশিন ইল-৭৬এমডি’ এবং ‘এন্টোনভ এএন-৩২’ বিমানের সাথে যুক্ত হয়েছে। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৮ সালের মাঝে ৪৮ টন রসদ বহণে সক্ষম ১৪টা ‘ইল-৭৬’ বিমান কেনে ভারত। ২০১৭ সালে ভারতের কম্পট্রোলার এন্ড অডিটর জেনারেল এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, বিমানগুলির মাঝে মাত্র ৪১ শতাংশ যেকোন সময় কর্মক্ষম থাকে। ভারতীয় বিমান বাহিনীর ১’শটার মতো পুরোনো ‘এন-৩২’ বিমান রয়েছে; যেগুলি মডার্নাইজেশনে প্রক্রিয়া চলছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনা ‘সি-১৭’ এবং ‘সি-১৩০জে’ বিমানগুলি চীনের সীমানায় ভারতীয় বিমান বাহিনীর রসদ সরবরাহ বৃদ্ধির সক্ষমতাকে বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে। বিমানগুলির সক্ষমতার অনেকটাই হিসেব করা হয়েছে চীন সীমান্তে কত দ্রুততার সাথে কত পরিমাণ রসদ মোতায়েন করা যাবে তার উপর। এই সক্ষমতার একটা পরীক্ষাই ভারতীয় বিমান বাহিনী করেছিল ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে।

শুধু পরিবহণ বিমান ক্রয়ই নয়; ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্যে উঁচু পার্বত্য অঞ্চলে ব্যবহারের উপযোগী ‘এম-৭৭৭’ হাউইটজার কামান সরবরাহ করছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৬ সালে নরেন্দ্র মোদির সরকার ব্রিটিশ কোম্পানি ‘বিএই সিস্টেমস’এর ডিজাইন করা মোট ১’শ ৪৫টা কামান ৭’শ ৩৭ মিলিয়ন ডলার খরচে কেনার অনুমোদন দেয়। প্রথম ২৫টা যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরাসরি আসলেও বাকি ১’শ ২০টা ভারতের মাহিন্দ্রা কোম্পানি এসেম্বলি করবে। ২০১৮এর নভেম্বর থেকে কামানগুলির ডেলিভারি পাওয়া শুরু করে ভারত। সাধারণ ১৫৫মিঃমিঃ হাউইটজার কামানের চাইতে প্রায় ৪০ শতাংশ কম ওজনের হবার কারণে এই কামানগুলি খুব সহজেই আকাশপথে উঁচু ভূমিতে মোতায়েন করা সম্ভব হবে, যা কিনা চীন এবং পাকিস্তানের সীমান্তে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। 
‘ডেকান হেরাল্ড’ বলছে যে, ১৯৯৯ সালে কারগিল যুদ্ধের সময় ভারতীয় বিমান বাহিনী বুঝতে পারে যে, হিমালয়ের উঁচু ভূমিতে অপারেট করার মতো কোন এটাক হেলিকপ্টার ভারতের নেই। রুশ নির্মিত ‘এমআই-৩৫’ হেলিকপ্টারগুলি ৫ কিঃমিঃ উচ্চতা পর্যন্ত যেতে পারে না। অথচ কাশ্মির এবং লাদাখ সীমানায় অনেক স্থানের উচ্চতাই ৪ থেকে ৫ কিঃমিঃ বা তারও বেশি। এই অক্ষমতা কাটিয়ে উঠতে ভারত ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার খরচে ২২টা ‘এএইচ-৬৪ই এপাচি’ এটাক হেলিকপ্টার এবং ১৫টা ‘সিএইচ-৪৭ শিনুক’ পরিবহণ হেলিকপ্টার কেনার চুক্তি করে। দু’টা হেলিকপ্টারই প্রায় ৬ কিঃমিঃ উচ্চতায় উড়তে পারে এবং সফলতার সাথে আফগানিস্তানের উঁচু জায়গাগুলিতে অপারেট করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা পরিবহণ বিমান, হেলিকপ্টার ও কামান সীমান্ত অঞ্চলে ভারতের যুদ্ধ করার সক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি করেছে ঠিকই, তবে সেটা চীনের সাথে সম্ভাব্য সংঘাতে বিজয়ের জন্যে যথেষ্ট কিনা, সেব্যাপারে প্রশ্ন করছেন অনেকেই। 

গত এক বছর ধরেই ভারতের লাদাখের সীমানা থেকে প্রায় ২’শ কিঃমিঃ দক্ষিণে ‘নেগারি গুনসা’ বিমানবন্দরে চীনারা উন্নয়ন কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে কাশ্মির এবং লাদাখের কাছাকাছি চীনারা গোটা পঞ্চাশেকের বেশি যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেনি। সংখ্যার দিক থেকে এই বিমানশক্তি খুব বড় কিছু নয়। তদুপরি তা ভারতের নিরাপত্তাহীনতাকে উস্কে দিয়েছে।  


চীনের অবকাঠামো চ্যালেঞ্জ

বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, চীন ভারতের সীমানার কাছাকাছি এলাকায় অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে। প্রতিরক্ষা এবং ইন্টেলিজেন্স বিশ্লেষক ক্রিস বিগার্স বলছেন যে, গত এক বছর ধরেই লাদাখের সীমানা থেকে প্রায় ২’শ কিঃমিঃ দক্ষিণে ‘নেগারি গুনসা’ বিমানবন্দরে চীনারা উন্নয়ন কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবিতে দেখা যাচ্ছে যে, সেখানে চীনারা নতুন ট্যাক্সিওয়ে, পার্কিং র‍্যাম্প এবং ‘কুইক রিয়্যাকশন এলার্ট র‍্যাম্প’ তৈরি করেছে। তবে একসাথে বেশি বিমান ওড়াবার সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে দ্বিতীয় রানওয়ে তৈরি করেনি। সেখানে চীনারা ৪টা সুখোই ফাইটার বিমান এবং বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেছে। প্রায় ১৪ হাজার ফুট বা ৪ দশমিক ৩ কিঃমিঃ উচ্চতায় অবস্থিত এই বিমানবন্দরকে বিশ্বের চতুর্থ সর্বোচ্চ বিমানবন্দর দাবি করা হয়। ভারতীয় সামরিক বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, অতি উচ্চতায় অবস্থিত হওয়ায় এই বিমানবন্দর থেকে ওড়া ফাইটার বিমানগুলি তাদের সক্ষমতার চাইতে অনেক কম অস্ত্র বহণ করতে পারবে। সক্ষমতা অনুযায়ী ইঞ্জিন না চলতে পারার কারণে জ্বালানিও বেশি বহণ করতে হতে পারে। ভারতীয় বিমান বাইনীর সাবেক অফিসার স্কোয়াড্রন লীডার সামীর জোশি বলছেন যে, এত উঁচু থেকে ওড়ার ফলে সুখোই বিমানগুলি এক ঘন্টার বেশি উড়তে পারবে না। অপরদিকে লাদাখের কাছাকাছি ভারতের অনেকগুলি বিমান ঘাঁটি রয়েছে; যেগুলি থেকে ওড়া বিমান আকাশ থেকে আকাশে রিফুয়েলিংএর মাধ্যমে তিন থেকে চার ঘন্টা আকাশে উড়তে পারবে।

তবে ভারতের সীমানায় চীনের উদ্দেশ্য বুঝতে হলে চীনের অবকাঠামো উন্নয়নকে আরও বড় পরিসরে দেখতে হবে। তিব্বতে ভারতের সীমানার কাছাকাছি চীনের খুব বেশি একটা বিমানবন্দর নেই। পূর্ব তিব্বতে অরুণাচল প্রদেশের উত্তরে রয়েছে নিংচি বিমানবন্দর এবং চামদো বিমানবন্দর। এর মাঝে চামদো বিমানবন্দরকে আরও বড় করা হচ্ছে। ভূটানের উত্তরে রয়েছে লাসা গঙ্গার এবং শিগাটসে বিমানবন্দর। দু’টাই বেশ বড়সড় বিমানবন্দর, যেগুলির একাধিক রানওয়ে রয়েছে। ভূটানের সীমানায় দোকলাম উত্তেজনার সময় এই বিমানবন্দর দু’টা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। শিগাটসে থেকে পশ্চিমে নেপালের উত্তরে প্রায় ১২’শ কিঃমিঃ কোন বিমানবন্দর নেই। শিগাটসের পর ভারতের হিমাচল প্রদেশের পূর্বে রয়েছে ‘নেগারি গুনশা’ বিমানবন্দর, যেটা বর্তমান লাদাখ ইস্যুতে খবরে এসেছে। এখানে সামরিক বিমান অপারেট করার সুযোগসুবিধা এখনও খুব বেশি একটা নেই; তবে এর উন্নয়ন চলমান। এখানে আপাততঃ ৪টা যুদ্ধবিমান দেখা গেছে। নেগারি থেকে ১৩’শ কিঃমিঃ সড়কপথে যুক্ত হয়েছে উইঘুরের ‘খোটান’। এই রাস্তা আকসাই চিনের মাঝ দিয়ে গিয়েছে। আকসাই চিন থেকে প্রায় ২’শ কিঃমিঃ উত্তরে খোটানে রয়েছে বেশ বড় একটা বিমানবন্দর। এখানে প্রায় ত্রিশ চল্লিশটার মতো ফাইটার মোতায়েন রয়েছে। খোটানের সাথে প্রায় ৫’শ কিঃমিঃ সরকপথে যুক্ত হয়েছে কাশগড়, যেখানে রয়েছে আরেকটা বড় বিমানবন্দর। এখানেও প্রায় ডজনখানেক যুদ্ধবিমান মোতায়েন রয়েছে। তবে কাশ্মির এবং লাদাখের কাছাকাছি চীনারা গোটা পঞ্চাশেকের বেশি যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেনি। সংখ্যার দিক থেকে এই বিমানশক্তি খুব বড় কিছু নয়। তদুপরি তা ভারতের নিরাপত্তাহীনতাকে উস্কে দিয়েছে।
চীন তার পশ্চিমের রাজ্যগুলিকে পূর্বের হান অধ্যুষিত অঞ্চলগুলির সাথে সরাসরি যুক্ত করার চেষ্টা করছে। এই বিশাল অঞ্চলে অবকাঠামো তৈরির পিছনে রয়েছে বিশাল সব প্রকৃতিগত চ্যালেঞ্জ। কিন্তু চীন তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের উপর ভর করে তিব্বত এবং শিনজিয়াং বা উইঘুরে অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। এর মাঝে রয়েছে নতুন রাস্তা, রেললাইন এবং বিমানবন্দর নির্মাণ। সর্বপশ্চিমের মুসলিম অধ্যুষিত উইঘুর রাজ্যে চীনের প্রকল্পগুলির কৌশলগত গুরুত্ব সবচাইতে বেশি। উইঘুরের মাধ্যমেই চীন মধ্য এশিয়ার সাথে যুক্ত হয়েছে। একইসাথে পাকিস্তানের মাঝ দিয়ে ভারত মহাসগরের তীরে গোয়াদর বন্দরের সাথে যুক্ত হবার প্রকল্প উইঘুরের মাঝ দিয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মির থেকে বের হয়ে ‘চায়না পাকিস্তান ইকনমিক করিডোর’ বা ‘সিপিইসি’ বা ‘সিপেক’এর রাস্তা উইঘুরের হাইওয়ে ‘জি৩১৪’এর মিলেছে এবং এরপর তা কাশগরএর জংশনের সাথে যুক্ত হয়েছে। এখান থেকে হাইওয়ে ‘জি৩০১২’ উত্তরপূর্ব দিকে উইঘুরের রাজধানী উরুমচি এবং বাকি চীনের সাথে যুক্ত হয়েছে। কাশগর থেকে  হাইওয়ে ‘জি২১৯’ বের হয়ে তিব্বতের রাজধানী লাসা গিয়েছে। এই হাইওয়ে ‘জি২১৯’ পুরো ভারতের উত্তর সীমার প্রায় সমান্তরাল গিয়েছে। এটাই হলো সেই হাইওয়ে, যা ভারতকে বিচলিত করেছে। এই হাইওয়ে চীন নিয়ন্ত্রিত আকসাই চিন অঞ্চলের মাঝ দিয়ে যায়, যা ভারত নিজের অঞ্চল বলে দাবি করে আসছে। চীনের রাষ্ট্রীয় পত্রিকা ‘গ্লোবাল টাইমস’ জানাচ্ছে যে, ‘জি২১৯’ রাস্তা ১৯৫১ থেকে ১৯৫৭ সালের মাঝে তৈরি করা হয়। এর মাঝে বেশকিছু অংশ ছিল কাঁচা রাস্তা, যা ২০১৩ সালে পাকা করা হয়। ‘শিনহুয়া’ বলছে যে, এই রাস্তার লাদাখের কাছাকাছি জিয়েশান দাবান অংশ সমুদ্র সমতল থেকে ৫ দশমিক ২৫ কিঃমিঃ উঁচু। এই অঞ্চলে গাড়ি চালাতে গেলে অনেকেই অক্সিজেন মাস্ক পড়ে থাকেন। 

তিব্বতের রাজধানী লাসার পশ্চিমে শিগাটসে পর্যন্ত রেললাইন তৈরি করে বাকি চীনের সাথে সংযুক্ত করা হয় ২০১৪ সালে। এর আগে লাসা পর্যন্ত রেললাইন তৈরির কাজ শেষ হয় ২০০৬ সালে। আবার উইঘুর রাজ্যে পশ্চিমের কাশগর থেকে আকসাই চিনের উত্তরে হোতান পর্যন্ত রেললাইন তৈরি করা হয় ২০১০ সালে। এই রেললাইনের সাথেই ‘সিপেক’কে যুক্ত করার পরিকল্পনা চলছে। কাশগর পর্যন্ত রেললাইন তৈরি করা শেষ হয় ১৯৯৯ সালে। প্রত্যেকটা প্রকল্পই ছিল চীন সরকারের মেগা প্রকল্প। এই রেললাইনগুলি ব্যবহার করে চীন পক্ষে ভারতের সাথে সীমানায় সামরিক স্থাপনা গড়ে তোলা সহজ হয়েছে। বহুকাল যাবত চীনের জন্যে এই সীমানাগুলি পাহাড়া দেয়া কঠিন ছিল। এখন মাল্টিবিলিয়ন ডলারের প্রকল্পগুলি চীনের জন্যে নিজের অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি তা ভারতকে করেছে বিচলিত।

ভারতের ২৮টা ফাইটার স্কোয়াড্রনের মাঝে ১৭টাই কাশ্মির এবং লাদাখের কাছাকাছি মোতায়েন রয়েছে। এই ১৭টা স্কোয়াড্রনে রয়েছে প্রায় ২’শ ৭২টা ফাইটার বিমান; যার মাঝে প্রথম সাড়ির বিমান ১’শ ৭৬টা এবং দ্বিতীয় সাড়ির বিমান ৯৬টা। এগুলির বিপরীতে চীনারা বর্তমানে মোতায়েন করেছে গোটা পঞ্চাশেক বিমান। সীমান্তের কাছাকাছি নিজেদের পাঁচ গুণ বেশি যুদ্ধবিমান মোতায়েন রাখা সত্ত্বেও ভারত চীনাদের ব্যাপারে উতকন্ঠায় রয়েছে। ১৯৪৭ পরবর্তী ভারতের সার্বক্ষণিক চিন্তায় নিরাপত্তাহীনতাই ছিল সর্বাগ্রে। 


তবুও ভারত এবং চীনের অসমান সক্ষমতা

‘ফরেন পলিসি’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় সুমিত গাঙ্গুলি এবং মানজিত পারদেসি বলছেন যে, ১৯৮৮ সালে যখন রাজীব গান্ধী চীনের সাথে আলোচনায় বসেছিলেন, তখন দুই দেশ কৌশলগত দিক থেকে মোটামুটিভাবে তুলনীয় ছিল। ভারতের জিডিপি তখন ছিল ২’শ ৯৭ বিলিয়ন ডলার; চীনের ছিল ৩’শ ১২ বিলিয়ন। ভারতের সামরিক বাজেট ছিল প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার; চীনের ছিল ১১ বিলিয়ন। কিন্তু বর্তমানে চীনের জিডিপি ১৩ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার; যা কিনা ভারতের ২ দশমিক ৭ ট্রিলিয়নের প্রায় ৫ গুণ! আর ২০১৯ সালে চীনের সামরিক বাজেট ছিল ২’শ ৬১ বিলিয়ন ডলার; যা ভারতের ৭১ বিলিয়ন ডলারের চার গুণ! দুই দেশেরই অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলেও চীনারা ভারতের সাথে বড় রকমের পার্থক্য তৈরি করে ফেলেছে, যা কিনা দুই দেশের কৌশলগত ব্যালান্সকে সমস্যায় ফেলে দিয়েছে। চীন তিব্বতে তার অবকাঠামোর অনেক উন্নয়ন করেছে; উঁচু পাহড়ি অঞ্চলে ব্যবহারের জন্যে ‘টাইপ ১৫’ ট্যাঙ্ক ডেভেলপ করেছে। ৩৩ টন ওজনের এই হাল্কা ট্যাঙ্ক চীনারা ২০১৮ সাল থেকে সার্ভিসে এনেছে।

চীনের সীমানায় ভারতীয় সেনাবাহিনী যেসব ইউনিট মোতায়েন করেছে, সেগুলির পক্ষে পাহাড়ি অঞ্চলের রাস্তা বেয়ে চীনের বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালনা করা খুবই কঠিন। এখানে উঁচু পাহাড়ের কারণে রাস্তাগুলি সরু এবং রাস্তার উপর সামরিক বহরের বিমান আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়াটা সহজ নয়। চীনা বিমান বাহিনী এক্ষেত্রে খুব সহজেই ভারতীয় সাপ্লাই রাস্তাগুলি আটকে দিতে পারবে, যদি না ভারতীয় বিমান বাহিনী চীনা বিমান বাহিনীকে আকাশযুদ্ধে পরাস্ত করতে সক্ষম হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় বিমান বাহিনী তার প্রয়োজনীয় ৪২ স্কোয়াড্রন ফাইটার বিমান রাখতে পারছে না। অনেকেই বলছেন যে, পুরোনো বিমান অবসরে পাঠানো এবং নতুন বিমান ক্রয়ে দীর্ঘসূত্রিতার জেরে ভারতীয় বিমান বাহিনীকে ২০২০এর পর থেকে ২৬ স্কোয়াড্রন ফাইটার বিমান নিয়েই খুশি থাকতে হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে হিমালয়ের পাদদেশে চীনাদের সাথে যুদ্ধে ভারতীয়রা আকাশ নিজেদের দখতে নিতে পারবে কিনা, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। 
তবে কাশ্মির ও লাদাখের কাছাকাছি ভারতের বিমান বাহিনীর শক্তি অন্ততঃ কাগজে কলমে হলেও গুরুত্ব রাখে। ডাচ ম্যাগাজিন ‘স্ক্র্যাম্বল’ ভারতীয় বিমান বাহিনীর ঘাঁটিগুলিতে মোতায়েনকৃত স্কোয়াড্রনগুলিকে দেখাবার চেষ্টা করেছে। এর মাঝে আকাশ নিয়ন্ত্রণের জন্যে নিযুক্ত ইউনিটগুলি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আদমপুরে রয়েছে ‘মিগ-২৯’ বিমানের ৪৭তম এবং ২২৩তম স্কোয়াড্রন। হালওয়ারাতে রয়েছে ‘সুখোই-৩০’এর ২২০তম এবং ২২১তম স্কোয়ড্রন। বারেইলিতে রয়েছে ‘সুখোই-৩০’এর ৮ম এবং ২৪তম স্কোয়াড্রন। লেহতে রয়েছে ২৮তম স্কোয়াড্রনের ‘মিগ-২৯’। গোয়ালিয়রে রয়েছে ‘মিরেজ-২০০০’এর ১ম, ৭ম এবং ৯ম স্কোয়াড্রন। সিরসাতে রয়েছে ‘সুখোই-৩০’এর ১৫তম স্কোয়াড্রন। অর্থাৎ প্রথম সাড়ির ফাইটার বিমানের ১১টা স্কোয়াড্রন ছড়িয়ে আছে ৬টা বিমান ঘাঁটিতে। এছাড়াও দ্বিতীয় সাড়ির ফাইটার হিসেবে ‘মিগ-২১’ বিমানের ৫১তম, ২৬তম, ২১তম, ২৩তম স্কোয়াড্রন এবং ‘জাগুয়ার’ বিমানের ৫ম এবং ১৪তম স্কোয়াড্রনও কাছাকাছি মোতায়েন রয়েছে। অর্থাৎ দ্বিতীয় সাড়ির আরও ৬টা ফাইটার স্কোয়াড্রনও মোতায়েন রয়েছে কাছাকাছি। আম্বালাতে ফরাসী নির্মিত ‘রাফাল’ জেটগুলি ১৭তম স্কোয়াড্রনে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এবছরের জানুয়ারিতে ভারতীয় বিমান বাহিনী বলে যে, এই মুহুর্তে তাদের ২৮ স্কোয়াড্রন ফাইটার অপারেশনাল রয়েছে। এর মাঝে ১২টা ‘সুখোই-৩০’, ৩টা ‘মিগ-২৯’, ৬টা ‘জাগুয়ার’, ৩টা ‘মিরেজ-২০০০’, একটা ‘তেজাস’ এবং ৩টা ‘মিগ-২১’ স্কোয়াড্রন। আর উপরের সংক্ষ্যাগুলি বলছে যে, ২৮টা স্কোয়াড্রনের মাঝে ১৭টাই কাশ্মির এবং লাদাখের কাছাকাছি মোতায়েন রয়েছে। এই ১৭টা স্কোয়াড্রনে রয়েছে প্রায় ২’শ ৭২টা ফাইটার বিমান; যার মাঝে প্রথম সাড়ির বিমান ১’শ ৭৬টা এবং দ্বিতীয় সাড়ির বিমান ৯৬টা। এগুলির বিপরীতে চীনারা বর্তমানে মোতায়েন করেছে গোটা পঞ্চাশেক বিমান।

পাকিস্তানের সাথে কয়েক দফা যুদ্ধের পর ভারতের বিমান ঘাঁটিগুলি সর্বদাই যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত রাখা হয়। সেখানে বিমানের জন্যে বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। বেশিরভাগ বিমানই শেলটারের ভিতর রাখা হয়ে থাকে। প্রতিটা ঘাঁটিতেই একাধিক রানওয়ে রয়েছে দ্রুত বিমান ওঠানামা করার জন্যে। অপরদিকে চীনের ঘাঁটিগুলিতে ফাইটার বিমান টারমাকের উপরেই রাখা হচ্ছে। ঘাঁটির সংখ্যাও কম; ঘাঁটিতে রানওয়ের সংখ্যাও কম। প্রকৃতপক্ষে চীনারা যুদ্ধের সম্ভাবনাকে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়নি। তবে সীমান্তকে একেবারে অরক্ষতিও রাখতে চায়নি। সীমান্তের দু’পাশে উভয় পক্ষই অবকাঠামো উন্নয়ন করেছে। তবে ভারতের এই উন্নয়ন সীমান্তের নিরাপত্তা দেবার জন্যে হলেও চীনের ক্ষেত্রে তার পশ্চিমের প্রদেশগুলিকে আরও শক্তভাবে ধরে রাখার উদ্দেশ্য কাজ করেছে। ভারত চীনা সীমান্তে তার যুদ্ধ করার সক্ষমতা বৃদ্ধি করলেও চীনারা ভারতের সকল চেষ্টার জবাব দেয়ার চেষ্টা করেনি।

লাদাখে দুই পক্ষের প্রায় শ’খানেক সেনা হাতাহাতি সংঘাতে লিপ্ত হয়। তবে কোন আগ্নেয়াস্ত্র কোন পক্ষই ব্যবহার করেনি। গত দুই দশকে ভারত এবং চীনের সীমান্ত পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন হয়েছে এবং তা অব্যহত থাকবে। এতে উভয় পক্ষই নিরাপত্তাহীনতার মাঝে পড়বে, যা উত্তেজনা এবং সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়াবে। তবে লাদাখের সীনামায় দুই দেশের সেনাদের আগ্নেয়াস্ত্রবিহীন সংঘর্ষ বলে দিচ্ছে যে, কেউই সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চাইছে না। ভারত যেমন তার সীমানাকে যুদ্ধ ছাড়াই রক্ষা করতে চাইছে, তেমনি চীনারাও বুঝতে পারছে যে, যুদ্ধ চীনের জাতীয় নিরাপত্তাকে আরও বড় হুমকিতে ফেলবে।


যুদ্ধের সম্ভাবনা আসলে কতটুকু? 

‘বিবিসি’ তাদের বিশ্লেষণে বলছে যে, চীনারা ভারতের বিজেপি নেতৃবৃন্দের পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মির দখল করে নেবার হুমকিকে চীনারা হয়তো হাল্কাভাবে নেয়নি। কারণ আজাদ কাশ্মিরের মাঝ দিয়েই ‘সিপেক’ চীনের উইঘুরের হাইওয়ে ‘জি৩১৪’এর সাথে মিলিত হয়েছে। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ তাদের বিশ্লেষণে বলছে যে, দুই দেশের মাঝে বাণিজ্যও কিন্তু থেমে থাকেনি। চীনের এক’শর বেশি কোম্পানি ভারতে বিনিয়োগ করেছে। চীনা কোম্পানিগুলি ভারতের মোবাইল ফোন বাজারের ৬০ শতাংশ দখল করে রেখেছে। ২০১৮ সালে দুই দেশের মাঝে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৯৫ বিলিয়ন ডলার। ২০১৯এর প্রথমার্ধে এই বাণিজ্য ছিল ৫৩ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য যুদ্ধের মাঝে ভারত চাইছে চীন থেকে বের হয়ে যাওয়া কোম্পানিগুলিকে ভারতে নিয়ে আসতে। মোটকথা দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক এমন একটা অবস্থানে রয়েছে যে, কেউই সেটাকে সমস্যায় ফেলতে চাইবে না।

সীমান্তের কাছাকাছি নিজেদের পাঁচ গুণ বেশি যুদ্ধবিমান মোতায়েন রাখা সত্ত্বেও ভারত কেন চীনাদের ব্যাপারে উতকন্ঠায় রয়েছে? চীনাদের অবকাঠামো উন্নয়ন কেন ভারতকে চিন্তিত করেছে, যেখানে চীনারা সামরিক দিক থেকে খুব কমই শক্তি মোতায়েন করেছে? নিজস্ব সীমান্ত অবকাঠামো উন্নয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে অত্যাধুনিক অস্ত্র কেনাকেই বা ভারত কেন মনে করেনি যে তা চীনাদের উস্কে দিতে পারে? বিজেপি সরকারের আজাদ কাশ্মির দখলের চিন্তাকে চীনারা যদি তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ ‘সিপেক’এর প্রতি হুমকি হিসেবে নেয়, তাহলে সেব্যাপারে ভারত কি অবস্থান নেবে, সেটা ভেবে দেখেছে কি? ১৯৪৭ পরবর্তী ভারতের সার্বক্ষণিক চিন্তায় নিরাপত্তাহীনতাই ছিল সর্বাগ্রে। বিশেষ করে নিজের ভৌগোলিক অখন্ডতা প্রশ্নে ভারত প্রয়োজনে আগ্রাসী ভূমিকাও নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের এই নিরাপত্তাহীনতাকে ব্যবহার করে অস্ত্র সরবরাহ করেছে; যা চীনকে তার স্থলসীমানার দিকে কিছুটা হলেও তাকাতে বাধ্য করেছে। তবে চীনারা আপাততঃ যদিও যুদ্ধ প্রস্তুতির দিকে দ্রুত অগ্রসর হয়নি, তথাপি ভারতের সামরিক সক্ষমতার পিছনে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ধন চীনের জন্যে কিছুটা হলেও হুমকি তৈরি করেছে। ‘সিপেক’এর প্রতি হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রকে এগিয়ে রাখবে। আর চীনারা যেহেতু উইঘুর এবং তিব্বতের অবকাঠামো উন্নয়ন বন্ধ করতে পারবে না, সেহেতু নিরাপত্তাহীনতা ভারতকে সামনের দিনে আরও বেশি গ্রাস করবে। বিশেষ করে ভবিষ্যতে কাশ্মির ইস্যুতে পাকিস্তান এবং চীনের একত্রে থাকার সম্ভাবনা বেড়ে যাওয়ায় তা ভারতকে বিচলিত করবে এবং তাকে আরও প্রবলভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বলয়ের মাঝে নিয়ে যাবে। উপসংহারে বলা যায় যে, গত দুই দশকে ভারত এবং চীনের সীমান্ত পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন হয়েছে এবং তা অব্যহত থাকবে। এতে উভয় পক্ষই নিরাপত্তাহীনতার মাঝে পড়বে, যা উত্তেজনা এবং সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়াবে। তবে লাদাখের সীনামায় দুই দেশের সেনাদের আগ্নেয়াস্ত্রবিহীন সংঘর্ষ বলে দিচ্ছে যে, কেউই সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চাইছে না। ভারত যেমন তার সীমানাকে যুদ্ধ ছাড়াই রক্ষা করতে চাইছে, তেমনি চীনারাও বুঝতে পারছে যে, যুদ্ধ চীনের জাতীয় নিরাপত্তাকে আরও বড় হুমকিতে ফেলবে।