Showing posts with label CPEC. Show all posts
Showing posts with label CPEC. Show all posts

Tuesday, 18 March 2025

পাকিস্তানের ট্রেনে হামলা - ভারত কেন সন্ত্রাসী রাষ্ট্র নয়?

১৯শে মার্চ ২০২৫

পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলার এই ঘটনা যে বাস্তবতাকে এড়িয়ে যায় না তা হলো, পাকিস্তান রাষ্ট্র তার জনগণের মৌলিক চাহিদা পুরণে যথেষ্ট যত্নবান হয়নি কখনোই। এছাড়াও পাকিস্তান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় এবং তার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জাতিগত বৈষম্যকেই প্রাধান্য দিয়েছে সর্বদা। একারণেই যুগ যুগ ধরে পুরো পাকিস্তান জুড়ে অস্থিরতা তৈরির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ভারতীয়রা এই অস্থিরতায় ইন্ধন যুগিয়েছে মাত্র।


গত ১১ই মার্চ পাকিস্তানের বালুচিস্তান প্রদেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী 'বালুচ লিবারেশন আর্মি' বা 'বিএলএ'এর একটা সশস্ত্র গ্রুপ দুর্গম অঞ্চলে 'জাফর এক্সপ্রেস' নামের একটা ট্রেন হাইজ্যাক করে ৪'শ মানুষকে জিম্মি করে। প্রায় ৩৬ ঘন্টা পর পাকিস্তানের স্পেশাল ফোর্স 'এসএসজি'র 'আল জারার কোম্পানি' ট্রেনটার নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়। এর ফলাফল হিসেবে ১৮ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, ৩ জন রেলওয়ে কর্মী, ৫ জন সাধারণ যাত্রী এবং ৩৩ জন বিচ্ছিন্নতাবাদীর মৃত্যু হয় এবং ৩'শ ৫৪ জন যাত্রীকে উদ্ধার করা হয় বলে সরকারি সূত্র বলছে। আক্রমণকারীরা ট্রেন লাইনে বোমা ফাটিয়ে ট্রেন থামানোর ব্যবস্থা করেছিল। 'এসোসিয়েটেড প্রেস'এর এক খবরে প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে বলা হয় যে, আক্রমণকারীরা ট্রেনের যাত্রীদের সকলের পরিচয়পত্র চেক করতে থাকে এবং যারা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, তাদেরকে গুলি করে মেরে ফেলতে থাকে। হত্যা করা ব্যক্তিদের মাঝে সেনাসদস্য ছাড়াও সংখ্যালঘু শিয়া এবং পাঞ্জাবিরা ছিল। বালুচ অধিবাসীদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়। একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন যে, হামলাকারীরা কিছু যাত্রীর হাত বেঁধে তাদেরকে কয়েকবার গুলি করে হত্যা করে। একজন মহিলার চোখের সামনে সামরিক বাহিনীতে কাজ করা তার তিন ছেলেকে হত্যা করা হয়। পাকিস্তানী সেনাদের সাথে আক্রমণকারীদের গুলি বিনিময়ের সময় বেশ কিছু যাত্রী পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

একইদিনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লেঃ জেনারেল আহমাদ শরীফ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন যে, এই সন্ত্রাসী হামলা এবং এর আগের আক্রমণগুলির পেছনে ইন্ধন যুগিয়েছে ভারত। তিনি অবশ্য ভারতের জড়িত থাকার ব্যাপারে কোন প্রমাণ উপস্থাপন করেননি। তিনি উল্লেখ করেন যে, ২০১৬ সালে কুলভূষণ যাদব নামে ভারতের নৌবাহিনীর একজন অফিসার পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছিলেন। ভারতের পক্ষে গোয়ান্দাবৃত্তির কাজ করা এবং বালুচিস্তান ও অন্যান্য অঞ্চলের গেরিলা গ্রুপগুলিকে ইন্ধন দেয়ার অপরাধে তাকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হয়েছিল। জেনারেল চৌধুরী বলেন যে, কিছু আক্রমণকারী পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে; যাদেরকে পাকরাও করার চেষ্টা চলছে। হতাহতের মাঝে বেশিরভাগই ছিল ট্রেনের যাত্রীদেরকে রক্ষা করতে যাওয়া নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং নিজেদের গ্রামের বাড়িতে ফেরত যাওয়া সেনা সদস্য। তিনি আরও বলেন যে, ভারতীয় মিডিয়াতে 'বিএলএ'এর প্রকাশ করা ভিডিও প্রচার করা হয়; যেগুলি হয় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআইএর মাধ্যমে তৈরি, নতুবা পুরোনো ছবি। জেনারেল চৌধুরী বলেন যে, হামলাকারীরা মহিলা এবং শিশুদেরকে আলাদা করে ৮ ঘন্টা পরে ছেড়ে দেয়। তারা পুরুষ যাত্রীদেরকে বাইরে নিয়ে আসে এবং যাত্রীদের জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা করে। 'আল জাজিরা' বলছে যে, তারাও যাত্রীদের সাথে কথা বলে সেটাই জানতে পেরেছে। জেনারেল চৌধুরী বলেন যে, আক্রমণকারীদের বড় অংশ পাহাড়ি অঞ্চলে লুকিয়ে পড়ে। আর ছোট একটা গ্রুপ জিম্মিদের সাথে থাকে। থেকে যাওয়া হামলাকারীদের প্রায় সকলেই ছিল সুইসাইড স্কোয়াডের সদস্য। পাকিস্তানি ইন্টেলিজেন্স বুঝতে পেরেছে যে, হামলাকারীরা ওয়াকিটকির মাধ্যমে আফগানিস্তানে তাদের ইন্ধনদাতাদের সাথে কথা বলছিল। দ্বিতীয় দিনে সামরিক স্নাইপারদের গুলিতে জিম্মিদের কাছে দাঁড়ানো কয়েকজন সুইসাইড স্কোয়াড হামলাকারীর মৃত্যু হলে কয়েকজন জিম্মি পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এরপরই জিম্মি উদ্ধারের মূল অপারেশন চালানো হয়। উদ্ধার অভিযানের সময় কোন জিম্মির মৃত্যু হয়নি বলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়। 'আল জাজিরা'র সাথে কথা বলতে গিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিরাপত্তা বাহিনীর অফিসার বলেন যে, গেরিলাদের জীবন্ত ধরার জন্যে সর্বোচ্চ লক্ষ্য থাকলেও এধরণের অপারেশনে জিম্মি উদ্ধারে গেরিলাদেরকে বাঁচিয়ে রাখা কঠিন।
 
২০১৬ সালে কুলভূষণ যাদব নামে ভারতের নৌবাহিনীর একজন অফিসার পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছিলেন। ভারতের পক্ষে গোয়ান্দাবৃত্তির কাজ করা এবং বালুচিস্তান ও অন্যান্য অঞ্চলের গেরিলা গ্রুপগুলিকে ইন্ধন দেয়ার অপরাধে তাকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমা মিডিয়া যখন পাকিস্তানের অভ্যন্তরে হামলায় ভারতের সংশ্লিষ্টতা দেখতে পাচ্ছে না, তখন এটা বলাই বাহুল্য যে, পশ্চিমারা ভারত-ঘেঁষা নীতিতেই অটল থাকবে। কারণ বালুচিস্তানের গেরিলাদেরকে পশ্চিমারা সন্ত্রাসী সংগঠন বলে আখ্যা দিয়েছে। এখন এই সংগঠনগুলির সাথে ভারতের সংশ্লিষ্টতা মেনে নেয়ার অর্থ হলো ভারত সন্ত্রাসবাদের ইন্ধনদাতা। 


হামলার আন্তর্জাতিক চেহারা

দিল্লীতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রানধির জাইসওয়াল সাংবাদিকদের বলেন যে, পাকিস্তানের ট্রেন হামলায় ভারতের যোগসাজসের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। তিনি বলেন যে, পাকিস্তানের নিজস্ব ভূখন্ডই সন্ত্রাসের আখড়া। পাকিস্তানের উচিৎ নিজের অভ্যন্তরীণ সমস্যা ও ব্যর্থতাকে ঢাকতে অন্যের উপর দোষ না চাপিয়ে নিজের দিকে তাকানো। এর আগে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র শাফকাত আলী খান বলেন যে, এই হামলার পরিকল্পনা আফগানিস্তানে বসে করা হয়েছে। এবং সেখানে হামলাকারীদের সাথে ইন্ধনদাতাদের যোগাযোগ হয়েছে। পাকিস্তান বরাবরই আফগানিস্তান সরকারকে বলেছে যে, তারা যেন 'বিএলএ'কে তাদের ভূখন্ড ব্যবহার করতে না দেয়। কাবুলের তালিবান সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আব্দুল ক্বাহার বালখি এক বিবৃতিতে এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন যে, আফগানিস্তানে 'বিএলএ'র কোন উপস্থিতি নেই। তিনি আরও বলেন যে, পাকিস্তানের উচিৎ দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা না বলে নিজস্ব নিরাপত্তা জোড়দার করা এবং অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধান করা।

‘এসোসিয়েটেড প্রেস'এর এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, বালুচিস্তান প্রদেশের অনেকেই পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অভিযোগ করে আসছিল; যদিও পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার তা সর্বদাই অস্বীকার করেছে। এই প্রদেশে প্রচুর খনিজ সম্পদও রয়েছে। 'বিএলএ' পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করতে চাইছে এবং সেই লক্ষ্যে তারা এর আগেও ট্রেনে হামলা করেছে। তবে ট্রেন হাইজ্যাকের ঘটনা এটাই প্রথম। এই আক্রমণ সারা দুনিয়া থেকে নিন্দা কুড়িয়েছে; যার মাঝে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, তুরস্ক, ইরান এবং ব্রিটেন রয়েছে। ১৪ই মার্চ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদেও এই আক্রমনের নিন্দা জানানো হয় এবং এই আক্রমণকে সন্ত্রাসী আক্রমণ আখ্যা দিয়ে দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তির দাবি করা হয়।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ২০২১ সালের অগাস্ট থেকে আফগানিস্তানের তালিবান সরকার পাকিস্তানের 'তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান' বা 'টিটিপি'কে সহায়তা দিয়ে আসছে; যারা পাকিস্তানের অভ্যন্তরে অনেক হামলার সাথে জড়িত ছিল। এছাড়াও সেই প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ‘বিএলএ'র সাথে 'টিটিপি' এবং আইসিসের খোরাসান শাখার যোগাযোগ রয়েছে। যদিও এই গ্রুপগুলির লক্ষ্য ভিন্ন, তথাপি নিজেদের স্বার্থে তারা একে অপরের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলে।
 
বালুচিস্তানে চীনের কৌশলগত প্রকল্পে কাজ করা চীনা নাগরিকদের উপর হামলার ব্যাপারটা ভূরাজনৈতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পাকিস্তানের গোয়াদরে চীনের কৌশলত সমুদ্রবন্দর তৈরিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারত কেউই ভালো চোখে দেখেনি। চীনাদের উপর সন্ত্রাসী হামলা যেন একপ্রকার গ্রীন লাইটই পাচ্ছে পশ্চিমাদের কাছ থেকে। হাজার হলেও চীনকে নিয়ন্ত্রণে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের বড় বন্ধু। 


বালুচিস্তানের ভূরাজনীতি

‘বিবিসি'র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, বালুচিস্তান হলো পাকিস্তানের পুরো ভূখন্ডের ৪৪ শতাংশ। তবে জনসংখ্যার দিক থেকে পাকিস্তানের ২৪ কোটি মানুষের মাত্র ৬ শতাংশ হলো বালুচ। তবে খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রে এই প্রদেশ পাকিস্তানের সবচাইতে ধনী। কানাডার 'বারিক গোল্ড' কোম্পানি এখানে 'রেকো ডিক' খনি ডেভেলপ করছে; যা কিনা বর্তমানে ডেভেলপের মাঝে থাকা সর্ববৃহত তামা এবং স্বর্ণ খনিগুলির অন্যতম। এই প্রদেশে চীনারা 'চায়না পাকিস্তান ইকনমিক করিডোর' বা 'সিপেক' নামের কৌশলগত প্রকল্পে বিশাল বিনিয়োগ করেছে। এই প্রকল্পের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো গোয়াদর গভীর সমুদ্রবন্দর; যা কিনা চীনের 'বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ'এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই প্রদেশে চীনারা খনিজ প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে এবং গোয়াদরে একটা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর তৈরি করছে। 'বিএলএ' এই প্রকল্পগুলির ঘোর বিরোধী। ইরান এবং আফগানিস্তানের সাথে বিশাল সীমানা ছাড়াও আরব সাগরে এর রয়েছে বেশ লম্বা সমুদ্রতট। বালুচ জাতির মাঝে বেশ অনেকেই আফগানিস্তান এবং ইরানের বাসিন্দা। ২০২৪এর জানুয়ারিতে ইরান এবং পাকিস্তান একে অপরের ভূমিতে বিমান হামলা করে। তাদের উভয়েরই যুক্তি ছিল যে, অপর দেশের অভ্যন্তরে বিদ্রোহীদের ক্যাম্প রয়েছে। বালুচিস্তানের বাসিন্দারা অভিযোগ করে যে, পাকিস্তান সরকার বালুচিস্তানের খনিজগুলিকে তুলছে ঠিকই, কিন্তু সেখানকার অধিবাসীদের অবস্থার উন্নয়ন করছে না। ১৯৪৮ সালে শুরু হয়ে বালুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ১৯৭০এর দশক পর্যন্ত তাদের কর্মকান্ড চালিয়ে গিয়েছিল। এরপর বেশকিছু সময় পর ২০০৩ সাল থেকে তারা আবারও সক্রিয় হয়। 'বালুচ লিবারেশন আর্মি' বা 'বিএলএ' এবং 'বালুচ লিবারেশন ফ্রন্ট' বা 'বিএলএফ' প্রধান বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ। এর মাঝে 'বিএলএ'র সক্ষমতা সবচাইতে বেশি। যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন 'বিএলএ'কে সন্ত্রাসী সংগঠন বলে আখ্যা দিয়ে থাকে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এক অপারেশনে বালুচ নেতা নওয়াব আকবর খান বুগতিকে হত্যা করে। অভিযোগ রয়েছে যে, পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে বহু বালুচ জনগণ গুম হয়েছে। পাকিস্তান সরকার অবশ্য এগুলি অস্বীকার করে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে 'বিএলএ' পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী ছাড়াও বড় প্রকল্পগুলিতে কাজ করা চীনা নাগরিকদের উপর হামলা করছে। 'বিএলএফ'ও বিদেশী নাগরিকদের উপর হামলা করছে। পাকিস্তান সরকার দাবি করছে যে, ইরান এবং আফগানিস্তানে এই গ্রুপগুলির ঘাঁটি রয়েছে। এবং এদের অনেককেই ভারত অর্থায়ন করছে।

পাকিস্তানের ট্রেনে হামলার ঘটনা পশ্চিমা মিডিয়াতে ততটা গুরুত্বের সাথে প্রচারিত হয়নি; যতটা দেখা গিয়েছে ভারতের উপর বিভিন্ন হামলার সময়। একইসাথে ভারতের উপর হামলার সময় পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতাকে যতটা হাইলাইট করা হয়েছে, ততটা কখনোই দেখা যায়নি পাকিস্তানের অভ্যন্তরে হামলায় ভারতের জড়িত থাকার ব্যাপারে। এমনকি যখন ভারতের সামরিক বাহিনীর একজন অফিসার পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার পরেও পশ্চিমা মিডিয়া পাকিস্তানের অভ্যন্তরে হামলায় ভারতের সংশ্লিষ্টতা দেখতে পাচ্ছে না, তখন এটা বলাই বাহুল্য যে, পশ্চিমারা ভারত-ঘেঁষা নীতিতেই অটল থাকবে। কারণ বালুচিস্তানের গেরিলাদেরকে পশ্চিমারা সন্ত্রাসী সংগঠন বলে আখ্যা দিয়েছে। এখন এই সংগঠনগুলির সাথে ভারতের সংশ্লিষ্টতা মেনে নেয়ার অর্থ হলো ভারত সন্ত্রাসবাদের ইন্ধনদাতা। আর বালুচিস্তানে চীনের কৌশলগত প্রকল্পে কাজ করা চীনা নাগরিকদের উপর হামলার ব্যাপারটা ভূরাজনৈতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পাকিস্তানের গোয়াদরে চীনের কৌশলত সমুদ্রবন্দর তৈরিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারত কেউই ভালো চোখে দেখেনি। চীনাদের উপর সন্ত্রাসী হামলা যেন একপ্রকার গ্রীন লাইটই পাচ্ছে পশ্চিমাদের কাছ থেকে। হাজার হলেও চীনকে নিয়ন্ত্রণে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের বড় বন্ধু। তবে সন্ত্রাসী হামলার এই ঘটনাগুলি যে বাস্তবতাকে এড়িয়ে যায় না তা হলো, পাকিস্তান রাষ্ট্র তার জনগণের মৌলিক চাহিদা পুরণে যথেষ্ট যত্নবান হয়নি কখনোই। এছাড়াও পাকিস্তান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় এবং তার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জাতিগত বৈষম্যকেই প্রাধান্য দিয়েছে সর্বদা। একারণেই যুগ যুগ ধরে পুরো পাকিস্তান জুড়ে অস্থিরতা তৈরির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ভারতীয়রা এই অস্থিরতায় ইন্ধন যুগিয়েছে মাত্র।

Sunday, 2 May 2021

আফগানিস্তান ... যুক্তরাষ্ট্রের পর...

০২রা মে ২০২১


২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনাবলীকে পুঁজি করে প্রায় দুই দশক আগে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে। সেই সামরিক অভিযান শেষ করার বহু চেষ্টার পর অবশেষে গত ১৪ই এপ্রিল আফগানিস্তান থেকে সকল মার্কিন এবং পশ্চিমা সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। ঘোষণা মোতাবেক আগামী ১১ই সেপ্টেম্বরের মাঝে সকল সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন হবে। মার্কিনীদের আফগানিস্তান ত্যাগের সম্ভাব্য ফলাফল কি হতে পারে, তা নিয়ে ব্যাপক জল্পনা কল্পনা চলছে।

শান্তি প্রতিষ্ঠার কোন নিশ্চয়তা না দিয়েই যুক্তরাষ্ট্রকে আফগানিস্তান ছাড়তে হচ্ছে। ‘কাবুল ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর ফাইজ জালান্দ ‘সিজিটিএন’কে বলছেন যে, শান্তি আলোচনা চললেও বাস্তবিকপক্ষে আফগানিস্তানে কোন শান্তি নেই। আলোচনার টেবিলে এগিয়ে থাকার জন্যে সকল পক্ষই আগ্রাসী ভূমিকা নিয়েছে। তিনি মনে করছেন না যে, শান্তি প্রক্রিয়ায় খুব বেশি একটা আশা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্রায়নের নামে দুর্নীতিবাজ এবং অপরাধপ্রবণ লোকদের উপর বিনিয়োগ করেছে। আফগানরা বেশিরভাগই তালিবানের পক্ষে না থাকলেও আফগান সরকারকে সমর্থন দেয় না। আর যুদ্ধের মাঝে গণহত্যা ও মারাত্মক মানবাধিকার লঙ্ঘনের কাজ করার কারণে তারা মার্কনীদেরকেও বিশ্বাস করে না। আফগান রাজনীতিবিদ ইহসানুল্লাহ সেদিকের মতে দেশটাতে বহু রাজনৈতিক নেতৃত্বের মাঝে ক্ষমতা দখলের জের ধরে নতুন করে গৃহযুদ্ধ লাগতে পারে। আর মার্কিনী সেনারা তো আফগানিস্তানের মানুষের বিশ্বাস ও সংস্কৃতিকে সন্মান করার জন্যে প্রশিক্ষিতই হয়নি। তাদের সমর্থিত সরকারও আফগান সাধারণ জনগণ এবং তালিবানের মাঝে কোন পার্থক্য খুঁজে পায়নি। গত ২০ বছরে যুক্তরাষ্ট্র আফগান জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য একটা সরকার দিতে পারেনি। জাতিসংঘের হিসেবে ২০২১ সালের প্রথম তিন মাসে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ২৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ১২ই এপ্রিল মার্কিন কংগ্রেসের তিনজন রিপাবলিকান সদস্য মাইকেল ওয়াল্টজ, লিজ চেনি এবং স্কট ফ্রাঙ্কলিন মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব এন্টনি ব্লিনকেনের কাছে এক চিঠিতে লেখেন যে, মার্কিন ইন্টেলিজেন্স বারংবার সাবধান করেছে যে, মার্কিন সেনারা আফগানিস্তান ছাড়ালে তালিবান এবং অন্যান্য অস্ত্রধারী গ্রুপগুলি নিজেদের অবস্থানকে সুসংহত করবে।

মার্কিন সহায়তা ছাড়া আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর সক্ষমতা কতদূর?

মার্কিনীরা আফগানিস্তান ছেড়ে যাবার পর আফগানিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী কতদিন নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন করছেন অনেকেই। বাইডেন সরকারের কাছে অবশ্য এর উত্তর রয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব এন্টনি ব্লিনকেন ‘এবিসি’ টেলিভিশনকে দেয়া এক সাক্ষাতে বলেন যে, মার্কিন সেনারা আফগানিস্তান ছেড়ে যাবার পর আফগান সামরিক বাহিনী শহরাঞ্চলগুলি ধরে রাখার সক্ষমতা রাখে। এটা যথেষ্ট শক্তিশালী একটা বাহিনী। আর মার্কিনীরা আফগানদের বিভিন্ন সহয়াতা দিতে থাকবে। তবে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, মার্কিন বাহিনী থাকা অবস্থাতেই আফগানিস্তানের বিশাল এলাকা তালিবানদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আফগান সেনাবাহিনীর অনেক সেনাসদস্যই অনেক বছর ধরে নিজেদের গ্রামে ফেরত যেতে পারছে না; কারণ তালিবানরা সেই গ্রামগুলির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আফগান সেনাবাহিনী যথেষ্ট দুর্নীতিপরায়ণ এবং ইতোমধ্যেই প্রচুর অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিরুদ্দেশ হয়েছে। কাগজে কলমে আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসংখ্যা ৩ লাখের বেশি হলেও বাস্তবে তা অনেক কম। কারণ অনেক অফিসার মৃত বা অনুপস্থিত অফিসারদের বেতন ভোগ করছে। এছাড়াও সামরিক অপারেশনে উচ্চ হতাহতের সংখ্যা এবং নতুন রিক্রুট পেতে হিমসিম খাওয়ায় বাহিনীর সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর হিসেবে প্রতি মাসে গড়ে কমপক্ষে ২’শ ৮৭ জন সেনা নিহত এবং ১’শ ৮৫ জন সেনা আহত হচ্ছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৯ থেকে ১০ জন আফগান সেনা প্রাণ হারাচ্ছে। ২০০১ সাল থেকে আফগানিস্তানে যেখানে সাড়ে ৩ হাজার পশ্চিমা সেনা নিহত হয়েছে, সেখানে প্রায় ৬৬ হাজার আফগান সেনা প্রাণ হারিয়েছে। বহু সেনা আহত অবস্থায় বেঁচে আছে। বেসামরিক মানুষ হতাহতের তো হিসেবই নেই। আফগানিস্তানের উত্তরে উজবেক ও তাজিক জাতিগোষ্ঠির লোকদের মাঝ থেকে পুশতুন তালিবানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে বেশি রিক্রুট পাওয়া যেতো। কিন্তু একসময় যেখানে মাসে ৩ হাজার রিক্রুট পাওয়া যেতো, তা এখন মাসে ৫’শতে দাঁড়িয়েছে। অতি কম বেতনে ঝুঁকিপূর্ণ এই কাজে অনেকেই নাম লেখাতে চাইছে না। সরকারি কর্মকর্তারা এবং বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বেতনের একটা বড় অংশ নিজেদের পকেটে পুরে নিচ্ছেন। শুধুমাত্র অতি দরিদ্র লোকেরাই সামরিক বাহিনীতে নাম লেখাচ্ছে। বাইডেনের সিদ্ধান্তের বহু বছর আগ থেকেই মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন যে, এত উচ্চ হতাহতের সংখ্যা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে আফগানিস্তান ধরে রাখা সম্ভব নয়। বিভিন্ন ইউনিটে গোলাবারুদের সরবরাহও যথেষ্ট অপ্রতুল। এদের বিপক্ষে রয়েছে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন তালিবান; যাদের বেশিরভাব অস্ত্রই আফগান সরকারকে মার্কিনীদের সরবরাহ করা। যুদ্ধের মাঝে অনেক সময়েই আফগান সামরিক অফিসাররা নিজেদের অবস্থান তালিবানদের হাতে ছেড়ে দিয়ে পিছু হটেছে। অনেকেই বাহিনী ছেড়ে পালিয়েছে।

আফগান সামরিক বাহিনীতর জন্যে রিক্রুট পাওয়া কঠিন হওয়ায় বিভিন্ন আঞ্চলিক জাতিগত ও রাজনৈতিক গ্রুপের অধীন মিলিশিয়াগুলির গুরুত্ব বেড়ে যাচ্ছে। এই মিলিশিয়াগুলি সামরিক বাহিনীর সদস্যদেরকেও রিক্রুট করছে। ক্ষয়ক্ষতি এবং মেইনটেন্যান্স সাইকেলের মাঝে পড়ে আফগান বিমান বাহিনীর অনেক বিমানই কর্মক্ষম অবস্থায় নেই। কম বিমান সার্ভিসে থাকায় শুধুমাত্র স্পেশাল ফোর্সের সেনাদেরকে আকাশ থেকে সহায়তা দেয়া হচ্ছে। আফগান বাহিনীর হাতে কিছু ড্রোন থাকলেও তা কিছু গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ব্যাতীত বাকি স্থানে মোতায়েন করা সম্ভব হচ্ছে না। আফগান বিমান বাহিনীর বিমানগুলি ডাক দেবার পর যতক্ষণে সাড়া দিচ্ছে, ততক্ষণে তালিবানরা এলাকা ছেড়ে গেছে। আর তখন বিমান হামলা নয়; বরং দরকার এয়ার এম্বুল্যান্স।

এছাড়াও আফগানরা এবং মার্কিনীরা একে অপরকে কখনোই বিশ্বাস করতে পারেনি। মার্কিন সেনারা নিয়মিতভাবেই আফগান সেনাদের হাতে হতাহত হয়েছে। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ বলছে যে, আফগান সেনাদের মার্কিনীরা সর্বদাই দ্বিতীয় সাড়ির বাহিনী হিসেবে দেখেছে। এই সেনারা এতটাই কম বেতন পায় যে, তাদের রাইফেলের মূল্য তাদের কয়েক মাসের বেতনের সমান। এমনকি একই মিশনে আহত হবার পর মার্কিন সেনারা বিশ্বমানের মেডিক্যাল সুবিধা পেলেও আফগান সেনাদের দেয়া হয়েছে নিম্নমানের সেবা। আফগানিস্তানের সামরিক বাহিনীর পিছনে মার্কিনীরা ৭০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্রসস্ত্র এবং ট্রেনিং খরচ করেছে বলে বলা হচ্ছে। কিন্তু বাহিনীর করুন দশা দেখে বোঝা যাচ্ছে না যে, সেই অর্থ আসলে কোথায় ব্যয় হলো। আফগান বাহিনীকে প্রতিশ্রুত সামরিক গাড়ির বেশিরভাগই সরবরাহ করা হয়নি। সেনা কমান্ডাররা কালোবাজার থেকে স্নাইপার রাইফেল কিনছে। সেনারা দরকারের বেশি বুলেট ছুঁড়ছে; যাতে করে বুলেটের খোসাগুলি বিক্রি করে কিছু আয় করা যায়। বিভিন্ন ইউনিটে সোভিয়েত আমলের সাঁজোয়া যান দিয়েই কাজ সাড়ছে আফগান সেনারা। সেনারা অনেকেই তাদের নাইট ভিশন গিয়ার বিক্রি করে দিয়েছে অর্থের জন্যে। আর অপরদিকে সেই নাইট ভিশন গিয়ার কাজে লাগিয়েই তালিবানরা রাতের বেলায় হামলা করছে আফগান বাহিনীর উপর। এত করুন দশাতেও আফগান সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ জেনারেল ইয়াসিন জিয়া বলছেন যে, তারা বেঁচে থাকার কোন না কোন পদ্ধতি বের করবেন।

মার্কিনীদের আফগান বন্ধুদের কি হবে?

মার্কিন থিংকট্যাঙ্ক ‘ব্রুকিংস ইন্সটিটিউশন’এর এক লেখায় সিনিয়র ফেলো কেমাল কিরিশচি এবং ‘ইস্তাম্বুল য়িলদিজ টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি’র ফুলিয়া মেমিসোগলু বলছেন যে, মার্কিনীরা আফগানিস্তান ছেড়ে গেলে একটা বড় ধরনের উদ্বাস্তু পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। তারা বলছেন যে, ২০১৫ সালে সিরিয়া যুদ্ধের কারণে লাখো উদ্বাস্তু যখন ইউরোপমুখে যাত্রা করে, তখন ইইউএর ভিতই নড়ে গিয়েছিল। সেটা মূলতঃ হয়েছিল ২০১১ সালে ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর। মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর ইরাক এবং সিরায়াতে ব্যাপক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে এবং তাতে বিশাল এক জনগোষ্ঠীকে বাস্তুহারা হতে হয়। আফগানিস্তান থেকে মার্কিনীরা সড়ে আসার পর যদি এমনই কোন উদ্বাস্তু পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তাহলে বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আরও দুর্বল হবে।

‘দি আটলান্টিক’এর এক প্রতিবেদনে প্রশ্ন করা হচ্ছে যে, যে আফগানরা যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করেছে, তাদেরকে ভুলে যাওয়া উচিৎ হবে কি? উত্তরে বলা হচ্ছে যে, বিভিন্ন দেশে জনবিরোধী যুদ্ধে অংশ নেয়ার এক লম্বা ইতিহাস রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। ১৯৭৫ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধের শেষে মার্কিনীদের সমর্থন দেয়া লাখো মানুষ নিজেদের নিরাপত্তার জন্যে মার্কিনীদের কাছে সাহায্য চায়। জেরাল্ড ফোর্ডের রিপাবলিকান সরকার যখন ১ লক্ষ ৭৫ হাজার ভিয়েতানামীকে উদ্ধ্বার করে নিয়ে আসার জন্যে কংগ্রেসের কাছে ৩’শ মিলিয়ন ডলার চায়, তখন কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাটদের বিরোধিতার কারণে তা সম্ভব হয়নি। সেসময় বিরোধিতাকারী ডেমোক্র্যাটদের মাঝে ছিলেন ডেলাওয়্যার রাজ্যের ৩২ বছর বয়সী সিনেটর জো বাইডেন। তিনি বলেছিলেন যে, মার্কিন সেনাদের সরিয়ে আনার জন্যে তিনি যেকোন আকারের বাজেটের পক্ষপাতি ছিলেন; কিন্তু ভিয়েতনামীদের সরিয়ে আনার জন্যে নয়। প্রেসিডেন্ট ফোর্ড তার জবাবে বলেছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র একসময় হাঙ্গেরিয়ান, কিউবান, এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের ইহুদীদের যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে দিয়েছিল। এখানে ভিয়েতনামীদেরকে কেন অন্য চোখে দেখা হবে? ডেমোক্র্যাটরা এতেও তাদের অবস্থান থেকে নড়েনি। বাইডেন সিনেটে তার বক্তৃতায় বলেছিলেন যে, দক্ষিণ ভিয়েতনামের এক লক্ষ কেন, একটা মানুষকেও বের করে নিয়ে আসার দায়বদ্ধতা যুক্তরাষ্ট্রের নেই। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ঠিক ভিয়েতনামের মতোই ১৭ হাজার আফগান যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় পাবার জন্যে লাইন ধরে আছে। এই ব্যক্তিরা বাইডেন প্রশাসনের কাছ থেকে কতটা সহায়তা পাবে, তা এখন কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারছে না।

গত ১৬ই এপ্রিল প্রেসিডেন্ট বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকার জন্যে আশ্রয়প্রার্থীদের সংখ্যা ১৫ হাজারের মাঝে নিয়ন্ত্রিত রেখে নির্দেশ স্বাক্ষর করেন। আবার এই ১৫ হাজারের মাঝে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কতজন আসতে পারবে, তা নির্দিষ্ট করা আছে। মূলতঃ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মার্কিন ইতিহাসের সর্বনিম্ন এই সংখ্যা নির্ধারণ করেছিলেন। বাইডেন এর মাধ্যমে সাড়ে ৬২ হাজার মানুষকে আশ্রয় দেবার পরিকল্পনা বাতিল করলো। তবে হোয়াইট হাউজ বলছে যে, ১৫ই মেএর মাঝে আরও বড় একটা সংখ্যার অনুমোদন দিতে পারেন বাইডেন। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, গত ফেব্রুয়ারি মাসেই বাইডেন পরবর্তী অর্থ বছরের জন্যে আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা বাড়িয়ে ১ লক্ষ ২৫ হাজার করতে চেয়েছিলেন। ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য আলেক্সান্দ্রিয়া অকাসিও কর্তেজ এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, এটা কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। বাইডেন অভিবাসীদের আসতে দেবেন, সেই আশাতেই জনগণ তাকে ভোট দিয়েছিল। আরেক ডেমোক্র্যাট প্রমিলা জয়পাল বাইডেনের এই সিদ্ধান্তকে বিবেকহীন বলে আখ্যা দিয়েছেন। রিপাবলিকানরা বলছেন যে, ২০২২ সালে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভালো করার উদ্দেশ্য নিয়েই বাইডেন অভিবাসী আসা কমাতে চাইছেন।

মধ্য এশিয়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনাটা আসলে কি?

মধ্য এশিয়াকে বাদ দিয়ে আফগানিস্তানের চিন্তা করাটা ঠিক নয়। বিশেষ করে মধ্য এশিয়ার স্থলবেষ্টিত দেশগুলির সমুদ্রে পৌঁছাবার করিডোর হিসেবে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের এক গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা রয়েছে; যা কিনা যুদ্ধের কারণে কখনোই বাস্তবায়িত করা যায়নি। পাকিস্তানের গোয়াদর সমুদ্রবন্দর থেকে চীনের সীমানা পর্যন্ত নির্মাণাধীন ‘চায়না পাকিস্তান ইকনমিক করিডোর’ বা ‘সিপেক’এর সাথে আফগানিস্তানকে যুক্ত করে মধ্য এশিয়ার দেশগুলির সম্পদকে সমুদ্র পর্যন্ত নিয়ে আসার চিন্তা করছেন পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দ। এছাড়াও মধ্য এশিয়ার খনিজ সম্পদের একটা গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা হলো চীন। ‘ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম’এর হিসেবে চীনের মোট গ্যাস আমদানির প্রায় ৩৮ শতাংশই আসে মধ্য এশিয়ার দেশ তুর্কমেনিস্তান এবং উজবেকিস্তান থেকে। একইসাথে মধ্য এশিয়ার রেল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে চীনারা ইউরোপের সাথে বাণিজ্য করছে। একারণে মধ্য এশিয়ায় চীনা বিনিয়োগ বেড়েই চলেছে। আর বিনিয়োগের মাধ্যমে মধ্য এশিয়াতে রুশ প্রভাবকে চীন অনেকটাই প্রতিস্থাপিত করছে। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘নিউলাইন্স ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজি এন্ড পলিসি’র ডিরেক্টর কামরান বোখারি ‘ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল’এর এক লেখায় বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের চীনকে নিয়ন্ত্রণের কৌশলের মাঝে মধ্য এশিয়া একটা অন্ধকার কূপের মতো; যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি খুবই কম। তিনি মনে করছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের উচিৎ মধ্য এশিয়ার দেশগুলির সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। মধ্য এশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে বৈশ্বিক নেতৃত্ব পুনরুদ্ধারের চাবি হতে পারে। মার্কিনীদের ছেড়ে আসার পর আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতাকে ধরে রাখতে বিশেষ করে কাজাকস্তানের কথা বলছেন তিনি। তার মতে, ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে কাজাকস্তান একইসাথে তুরস্ক এবং ইরানের উচ্চাকাংক্ষাকে ব্যালান্স করতে কাজ করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের পর...

বিশ্বের সবচাইতে বড় সামরিক শক্তি নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র দুই দশকে আফগানদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। উল্টো এই দুই দশকে তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে’ যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি ক্রমান্বয়ে ক্ষয় হয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষতি ছাড়াও মার্কিন সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা হ্রাসে অনেক বড় ভূমিকা রেখেছে আফগানিস্তান। দুই দশক পাহাড়ের পাদদেশে তালিবানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার পর তারা হঠাত করেই আবিষ্কার করেছে যে, চীন ও রাশিয়ার সাথে ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতার জন্যে তারা প্রস্তুত নয়। প্রফেসর ফাইজ জালান্দ বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের দীর্ঘতম যুদ্ধে তারা পরাজিত হয়েছে; কিন্তু কেউ তো আর পরাজয় স্বীকার করে না। মার্কিন ভূরাজনৈতিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘জিওপলিটিক্যাল ফিউচার্স’ বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থানের পর আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতা রাখার স্বার্থ থাকবে পাকিস্তান, তুরস্ক এবং রাশিয়ার। পাকিস্তান চাইছে আফগানিস্তানের মাধ্যমে মধ্য এশিয়ার সাথে যুক্ত হতে। এতে পাকিস্তানকে সমর্থন দিচ্ছে তুরস্ক। মধ্য এশিয়ার দেশগুলিও আফগানিস্তানের মাঝ দিয়ে ভারত মহাসাগরে পৌঁছাতে চাইছে। ফলশ্রুতিতে মধ্য এশিয়ায় রাশিয়ার সাথে তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা বাড়বে। তবে আফগানিস্তানকে স্থিতিশীল দেখাটা রাশিয়ার জন্যেও নিরাপত্তার প্রশ্ন; যা এই দেশগুলিকে একটা সমঝোতার দিকে হাঁটাবে। যুক্তরাষ্ট্র নিজে না জড়িয়ে মধ্য এশিয়াতে এই শক্তিগুলির মাঝে একটা ব্যালান্স দেখতে চাইবে।

Tuesday, 16 March 2021

মধ্য এশিয়াতে কি চাইছে তুরস্ক?

১৬ই মার্চ ২০২১
মধ্য এশিয়ার ‘লাপিস লাজুলি’ করিডোর। উসমানি খিলাফতের সময়ের ইতিহাসের উপর ভর করে গড়ে ওঠা ভূরাজনৈতিক আকাংক্ষা থেকে তুর্কি জনগণকে যখন আলাদা করা কঠিন, তখন মধ্য এশিয়াতে রাশিয়া, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সমন্বয় ঘটিয়ে প্রভাব বিস্তার করা হবে আরও বেশি কঠিন। কারণ মধ্য এশিয়ায় তুরস্কের প্রভাব বিস্তার মানেই রাশিয়া এবং চীনের দুশ্চিন্তা। আর একইসাথে তা যুক্তরাষ্ট্রের রাশিয়া এবং চীনকে নিয়ন্ত্রণের কৌশলের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কাজেই মধ্য এশিয়ায় তুরস্কের প্রভাব বিস্তারে যুক্তরাষ্ট্র স্বাভাবিকভাবেই লাভবান হবে। 


তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু গত ৬ই মার্চ থেকে ৯ই মার্চ মধ্য এশিয়ার তিনটা দেশ তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান এবং কিরগিজস্তান ঘুরে এসেছেন। তিনি মধ্য এশিয়ার সবচাইতে জনবহুল দেশ উজবেকিস্তানের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেবার আশা করেন। মধ্য এশিয়া সফরের ব্যাপারে তুর্কি মিডিয়ার সাথে কথা বলতে গিয়ে কাভুসোগলু বলেন যে, তার সফর শুধু ব্যাপক সফলই ছিল না, তা ছিল আন্তরিক ও ফলপ্রসু। তিনি বলেন যে, উজবেকিস্তানের সাথে অগ্রাধিকার বাণিজ্য চুক্তি করার কথাবার্তা চলছে। এটা সফল হবার সাথে সাথেই তারা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ব্যাপারে কথা শুরু করতে চান। দুই দেশের বাণিজ্য বর্তমানের ২ বিলিয়ন ডলার থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে চান তারা। এছাড়াও গত বছরের অক্টোবরে তুর্কি প্রতিরক্ষামন্ত্রী হুলুসি আকারের উজবেকিস্তান সফরের সময় দুই দেশের মাঝে সামরিক সহযোগিতার ব্যাপারে একটা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তুর্কমেনিস্তান তুরস্ককে রাজধানী তুর্কমেনাবাদ থেকে টারকিশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট অপারেট করতে দিচ্ছে, যদিও সেখান থেকে অন্য দেশের ফ্লাইট অপারেট করে না। এছাড়াও কাস্পিয়ান সাগরে আজেরবাইজান এবং তুর্কমেনিস্তানের সাথে তুরস্ক যৌথভাবে ‘দোস্তলুগ’ তেলখনি নিয়ে কাজ করছে।

সফরকালে কিরগিজস্তানের তুর্কি কিরগিজ মানাস ইউনিভার্সিটিতে আয়োজিত ‘আনতালিয়া ডিপ্লোম্যাসি ফোরাম’এ কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন যে, ২১ শতক হবে এশিয়ার শতক। সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অর্ধেক এখন এশিয়ার। একারণেই তুরস্ক চাইছে এশিয়ার সাথে যুক্ত হতে। তিনি বলেন যে, বহু বছর ধরে ‘তুর্কি দুনিয়া’ আলাদা হয়ে ছিল ‘কৃত্রিম দেয়াল’এর কারণে। এই দেয়াল ভেঙ্গে যাবার পর তুরস্ক এবং ‘তুর্কি দুনিয়া’ একে অপরকে আলিঙ্গন করেছে। তিনি এপ্রসঙ্গে ২০০৯ সালে গঠিত ‘তুরকিক কাউন্সিল’এর সাফল্যের কথা উল্লেখ করেন। একইসাথে তিনি নাগোর্নো কারাবাখে আজেরবাইজানের যুদ্ধজয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘জেমসটাউন ফাউন্ডেশন’এর এক লেখায় সাবেক মার্কিন ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তা পল গোবল বলেন যে, আজেরবাইজানের যুদ্ধজয়ের পর বেশ কয়েক বছর ধরে আলোচনায় থাকা ‘লাপিস লাজুলি’ করিডোর নতুন জীবন পেয়েছে। এই করিডোর আজেরবাইজান এবং তুর্কমেনিস্তান হয়ে আফগানিস্তানকে তুরস্কের সাথে যুক্ত করবে। একই সূত্রে বাঁধা আফগানিস্তান। ১২ই মার্চ কাভুসোগলু নিশ্চিত করেন যে, এপ্রিল মাসে ইস্তাম্বুলে আফগানিস্তানের শান্তি আলোচনা হতে চলেছে। এর আগে ৭ই মার্চ আফগানিস্তানের টেলিভিশন নেটওয়ার্ক ‘টিওএলও নিউজ’ বলে যে, মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব এন্থনি ব্লিংকেন আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনির কাছে এক চিঠি দিয়ে জানান যে, যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ককে আফগান শান্তি আলোচনার ভেন্যু হতে অনুরোধ করেছে। ব্লিংকেনের এই চিঠিই বলে দিচ্ছে যে, আফগানিস্তানে তুরস্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলের সমন্বয় রয়েছে।

গত ১৬ই ফেব্রুয়ারি এক আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে তুরস্কের ‘সেন্টার ফর ডিপ্লোম্যাটিক এফেয়ার্স এন্ড পলিটিক্যাল স্টাডিজ’এর উপদেষ্টা মেসুত হাক্কি কাসিন বলেন যে, তুরস্ক, পাকিস্তান এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলি অর্থনীতির ভিন্ন ভিন্ন স্তরে রয়েছে। এদের মাঝে কৌশলের সমন্বয় জরুরি। তিনি উদাহরণস্বরূপ বলেন যে, তুরস্কের চিন্তার কেন্দ্র এখনও ইইউ। এক্ষেত্রে পাকিস্তান এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলি তুরস্কের মাধ্যমে ইইউ পৌঁছাতে পারে। অপরদিকে পাকিস্তানি অর্থনীতিবিদ এবং প্রাক্তন তত্বাবধায়ক অর্থমন্ত্রী সালমান শাহ বলেন যে, তুরস্ক যেমনি ইউরোপে ঢোকার পথ, পাকিস্তানও তেমনি চীন এবং মধ্য এশিয়াতে ঢোকার পথ। তিন আরও বলেন যে, এটা সময়ের ব্যাপার মাত্র, যখন ‘চায়না পাকিস্তান ইকনমিক করিডোর’ বা ‘সিপেক’ আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়া হয়ে তুরস্ক এবং অন্যান্য দেশের সাথে যুক্ত হবে। একইসাথে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার দায়িত্বও আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলির হাতেই থাকা উচিৎ বলে তিনি মনে করেন। এপ্রসঙ্গে তিনি তুরস্ক ও পাকিস্তানের মাঝে অনুষ্ঠিত ‘আতাতুর্ক ২০২১’ যৌথ সামরিক মহড়ার কথা মনে করিয়ে দেন।

তুর্কি পররাষ্ট্রনীতির বিশ্লেষক ইউসুফ এরিম মধ্য এশিয়াতে তুরস্কের প্রভাব বিস্তারকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে একটা সুযোগ হিসেবে দেখছেন। ‘ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় তিনি বলছেন যে, তুরস্ককে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে আলাদা হওয়া মধ্য এশিয়ার দেশগুলিতে বেশ হিসেব করেই রুশ প্রভাবকে ব্যালান্স করতে হচ্ছে। রাশিয়া এবং চীনের সাথে বেশ কিছু বিষয়ে তুরস্কের সহযোগিতা থাকার কারণেই মধ্য এশিয়ায় তুরস্কের প্রভাব বৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে সুযোগ। তিনি মনে করছেন যে, দুই দেশের উচিৎ ‘এস ৪০০’ ক্ষেপণাস্ত্র এবং সিরিয়ার কুর্দি ‘ওয়াইপিজি’ মিলিশিয়ার ইস্যুকে প্রাধান্য না দিয়ে মধ্য এশিয়া বিষয়ে একটা সমন্বিত কৌশলের ব্যাপারে একমত হওয়া। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘দ্যা হেরিটেজ ফাউন্ডেশন’এর ডিরেক্টর লিউক কোফি তুর্কি মিডিয়া ‘টিআরটি ওয়ার্ল্ড’এর লেখায় ন্যাটো, মধ্য এশিয়া এবং ইউক্রেনে তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতার রাস্তা খোলা রয়েছে বলে বলেন। ব্রিটিশ রাজনৈতিক বিশ্লেষক তারাস কুজিও তুরস্কের সরকারি মিডিয়া ‘আনাদোলু এজেন্সি’র এক লেখায় তুরস্কের সাথে আজেরবাইজানের কৌশলগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন থাকা উচিৎ বলে মত দেন।

মধ্য এশিয়াতে তুরস্কের জন্যে সবচাইতে বড় সুযোগ তৈরি হয় ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে; যখন ২৬ বছর ক্ষমতায় থাকার পর উজবেকিস্তানের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ইসলাম কারিমভের মৃত্যু হয়। নতুন প্রেসিডেন্ট শাভকাত মিরজিইয়োয়েভ ২০১৭ সালের অক্টোবরে তুরস্ক সফরে যান। সাথেসাথে মধ্য এশিয়ায় তুরস্কের দুয়ার খুলে যায়। তবে আদর্শিক দিকনির্দেশনা না থাকার কারণে তুরস্ক, পাকিস্তান এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলি কৌশলগত দিক থেকে এখনও জাতীয় স্বার্থের উর্ধ্বে উঠতে পারছে না। একারণেই দেশগুলি একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রকে সাথে চাইছে, অন্যদিকে উইঘুর ইস্যুতে কথা বলে চীনের সাথে সম্পর্ক খারাপ করতে চাইছে না। উসমানি খিলাফতের সময়ের ইতিহাসের উপর ভর করে গড়ে ওঠা ভূরাজনৈতিক আকাংক্ষা থেকে তুর্কি জনগণকে যখন আলাদা করা কঠিন, তখন মধ্য এশিয়াতে রাশিয়া, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সমন্বয় ঘটিয়ে প্রভাব বিস্তার করা হবে আরও বেশি কঠিন। কারণ মধ্য এশিয়ায় তুরস্কের প্রভাব বিস্তার মানেই রাশিয়া এবং চীনের দুশ্চিন্তা। আর একইসাথে তা যুক্তরাষ্ট্রের রাশিয়া এবং চীনকে নিয়ন্ত্রণের কৌশলের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কাজেই মধ্য এশিয়ায় তুরস্কের প্রভাব বিস্তারে যুক্তরাষ্ট্র স্বাভাবিকভাবেই লাভবান হবে।

Wednesday, 3 June 2020

চীন ও ভারতের সীমান্ত উত্তেজনার ভবিষ্যৎ কি?


৪ঠা জুন ২০২০

ভারতীয় কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ২৬শে মে ‘রয়টার্স’ বলছে যে, হিমালয়ের পাদদেশে বিমানবন্দর এবং রাস্তা নির্মাণকে কেন্দ্র করে ভারত এবং চীনের মাঝে উত্তেজনা শুরু হয়েছে। লাদাখ এলাকার গালওয়ান উপত্যকায় উভয় পক্ষ সামরিক ক্যাম্প স্থাপনের মাধ্যমে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে; আর একে অপরকে এই উত্তেজনার ব্যাপারে দোষারোপ করছে। ভারতীয় কর্মকর্তারা বলছেন যে, চীনাদের প্রান্তে ৮০ থেকে ১০০টা তাঁবু গড়ে তোলা হয়েছে। উভয় পক্ষই নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যুহ গড়ে তুলছে। চীনারা ট্রাকে করে সরঞ্জাম নিয়ে আসছে সেখানে। ভারতের লাদাখের অপর প্রান্তে চীনাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে আকসাই চিন অঞ্চল, যা ভারত নিজের বলে দাবি করে।

১৯৬২ সালে চীনের সাথে যুদ্ধে ভারত বেশ বড় আকারের পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। এরপর ১৯৮৮ সালে ভারতের উত্তরপূর্বের অরুনাচল প্রদেশে দুই দেশের মাঝে আরেক দফা সংঘাতের পর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী চীনা নেতা দেং জিয়াওপিংএর সাথে আলোচনা বসেন। ১৯৯৩, ১৯৯৬ এবং ২০০৫ সালে কয়েক দফা বৈঠকের পর দুই দেশ সীমানা ঠান্ডা রাখতে সম্মত হয়েছিল। এর ফলশ্রুতিতে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দুই দেশের মাঝে সীমান্তে কোন সংঘাত হয়নি। তবে ২০১৭ সালে দোকলাম সীমান্তে উত্তেজনা বৃদ্ধির মাঝ দিয়ে এই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সমাপ্তি হয়। আর এবারের উত্তেজনার শুরু হয় ৫ই মে, যখন দুই পক্ষের প্রায় শ’খানেক সেনা হাতাহাতি সংঘাতে লিপ্ত হয়। তবে কোন আগ্নেয়াস্ত্র কোন পক্ষই ব্যবহার করেনি।

চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হচ্ছে যে, চীন তার নিজস্ব অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ; তবে ভারতের সাথে সীমানায় তারা শান্তি ও শৃংখলা বজায় রাখতেও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। বিবৃতিতে আরও বলা হয় যে, বর্তমানে দুই দেশের সীমানা স্থিতিশীল এবং নিয়ন্ত্রণের মাঝেই রয়েছে। উভয় পক্ষই আলোচনায় মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সক্ষম। ভারতের প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব নিরুপমা রাও বলছেন যে, সীমানার কাছাকাছি ভারতের অবকাঠামো উন্নয়নের পর থেকেই চীনারা সেটাকে হুমকি হিসেবে দেখা শুরু করেছে। শি জিনপিংএর চীন তার নিজস্ব ভূমির নিরাপত্তা নিশ্চিতে যেমন কঠোর অবস্থানে রয়েছে, তেমনি ভারতও সেব্যাপারে ছাড় দিতে নারাজ।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার ২০২২ সালের মাঝে চীনের সীমানার কাছাকাছি অনেকগুলি রাস্তা তৈরির প্রকল্প গ্রহণ করেছে। লাদাখে ভারতের সামরিক রাস্তা তৈরির ইতিহাসটা বর্তমান প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ।

মার্কিন নির্মিত ‘সি-১৩০জে’ পরিবহণ বিমান চীনের সীমানার কাছাকাছি লাদাখের ‘দৌলত বেগ ওল্ডি’ নামের বিমানবন্দরে অবতরণ করছে। এই বিমানবন্দর পর্যন্ত রাস্তা তৈরির ফলেই চীনারা ধারণা করা শুরু করে যে, ভারতীয়রা হয়তোবা চীনা নিয়ন্ত্রণে থাকা আকসাই চিন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেবার পরিকল্পনা করছে।


পাঁচ কিঃমিঃ উচ্চতায় বিমানবন্দর

২০১৩ সালের অগাস্টে ভারতীয় মিডিয়ায় ঘোষণা দেয়া হয় যে, ভারতীয় বিমান বাহিনী তাদের মার্কিন নির্মিত ‘সি-১৩০জে’ পরিবহণ বিমান চীনের সীমানার কাছাকাছি লাদাখের ‘দৌলত বেগ ওল্ডি’ নামের বিমানবন্দরে অবতরণ করিয়েছে। সমুদ্র সমতল থেকে ১৬ হাজার ৬’শ ফুট বা ৫ কিঃমিঃএর বেশি উচ্চতায় অবস্থিত এই বিমাববন্দরকে পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিমানবন্দর বলেও দাবি করা হয়। পুরো লাদাখের গড় উচ্চতা ৩ কিঃমিঃ থেকে সাড়ে ৪ কিঃমিঃএর মতো। ষোড়শ শতকে সুলতান সৈয়দ খান লাদাখ অপারেশনে সময় এখানে মৃত্যুবরণ করেন; সেই থেকে এই জায়গার নাম ‘দৌলত বেগ ওল্ডি’। এর ২০ কিঃমিঃ উত্তরেই রয়েছে প্রায় ১৯ হাজার ফুট উচ্চতার কারাকোরাম গিরিপথ, যা লাদাখের সাথে চীনের শিনজিয়াং বা উইঘুর প্রদেশের যোগাযোগের পথ। ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত এই পথে উইঘুরের কাশগড়ের সাথে হোশিয়ারপুরের পাঞ্জাবি বণিকরা বাণিজ্য করতো। ব্রিটিশ সামরিক অফিসাররা একসময় মনে করতেন যে, কারাকোরাম গিরিপথের মাধ্যমে রুশ সামরিক হামলা হবার সম্ভাবনা রয়েছে। এই ভীতি বাস্তবতা পায়নি। পরে অবশ্য ভারত এবং চীন কারাকোরাম গিরিপথকে কোন দ্বন্দ্ব ছাড়াই নিজেদের সীমানা হিসেবে মেনে নেয়। এর পূর্বে চীন নিয়ন্ত্রিত আকসাই চিন, আর পশ্চিমে রয়েছে সিয়াচেন হিমবাহ। ভারতীয় মিডিয়া ‘ফার্স্ট পোস্ট’ বলছে যে, ঐ বছর এপ্রিল মে মাসে সেই এলাকায় উত্তেজনার পর এই বিমান অবতরণের অপারেশন চালানো হয়। ১৯৬২ সালের চীন ভারত যুদ্ধের সময় ‘দৌলত বেগ ওল্ডি’র সামরিক স্থাপনা তৈরি করা হয়েছিল। ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত সেখানে মার্কিন নির্মিত ‘সি-৮২ প্যাকেট’ পরিবহণ বিমান অবতরণ করতো সৈন্যদের রসদপাতি আনানেয়ার কাজে। একটা ভূমিকম্পের পর সেই বিমানবন্দরের মাটি দুর্বল হয়ে পড়ার পর থেকে সেখানে বিমান অবতরণ বন্ধ করে দেয়া হয়। টানা ৪৩ বছর এই বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত থাকার পর ২০০৮ সালের মে মাসে ভারতীয় বিমান বাহিনীর রুশ নির্মিত ‘এন-৩২’ পরিবহণ বিমান সেখানে অবতরণ করে। অত উচ্চতায় পণ্য পরিবহণ সক্ষমতা বৃদ্ধিতেই ২০১৩ সাল থেকে ‘সি-১৩০’ বিমান ব্যবহার করা শুরু হয়।

তবে ঘটনা পরিবর্তিত হয়ে যায় ২০১৯ সালে। এবছরের এপ্রিল মাসে ভারতীয়রা লাদাখের লেহ থেকে উত্তরে ‘দৌলত বেগ ওল্ডি’ পর্যন্ত আড়াইশ’ কিঃমিঃ লম্বা রাস্তা তৈরির কাজ শেষ করে। ভারতীয় পত্রিকা ‘দ্যা ট্রিবিউন’ বলছে যে, কৌশলগতভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ এই রাস্তা সারা বছর চালু থাকবে। এই পথে মোট ৩৭টা সেতু তৈরি করা হয়েছে। দারবুক থেকে দৌলত বেগ ওল্ডি পর্যন্ত রাস্তার কোন অংশই ১৪ হাজার ফুট উচ্চতার নিচে নয়। এই পুরো পথের কোথাও বেসামরিক নাগরিকদের বসবাসের অনুমতি নেই। ২০০০ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত এই রাস্তা তৈরির প্রথম চেষ্টাটা করা হয়। কিন্তু শায়ক নদীর পানির তোড়ে রাস্তা ভেসে গেলে ২০১৪ সাল থেকে নতুনভাবে প্রায় ১’শ ৬০ কিঃমিঃ রাস্তা তৈরির পরকল্পনা হাতে নেয়া হয়। এই কাজ শেষ হয় ২০১৯ সালে। এই রাস্তা তৈরির ফলেই চীনারা ধারণা করা শুরু করে যে, ভারতীয়রা হয়তোবা চীনা নিয়ন্ত্রণে থাকা আকসাই চিন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেবার পরিকল্পনা করছে।

সাম্প্রতিক সময়ে লাদাখে বিমানবন্দরের উন্নয়ন, রাস্তা তৈরি, নতুন ধরণের অস্ত্র ক্রয় এবং সেনা পরিবহণের জন্যে নতুন পরিবহণ বিমান ক্রয়, ইত্যাদি পদক্ষেপের মাধ্যমে চীন সীমান্তে ভারতীয় সেনাবাহিনী সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে। এই সক্ষমতা বৃদ্ধির পিছনে ইন্ধন যুগিয়েছে ভারতীয় চিন্তাবিদদের নিরাপত্তাহীনতার চিন্তা। ভারতীয় পত্রিকা ‘দ্যা প্রিন্ট’ বলছে যে, ১৯৯৯ সালে ভারতের ‘ক্যাবিনেট কমিটি অন সিকিউরিটি’ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘বর্ডার রোডস অর্গানাইজেশন’কে ২০০৩ সালের মাঝে চীন সীমান্তে রাস্তা তৈরির প্রকল্প বাস্তবায়ন করার কাজ দেয়। এই প্রকল্পের সময় ২০১২ সাল পর্যন্ত বৃদ্ধি করলেও তা শেষ করতে ২০১৯ হয়ে যায়। এই প্রকল্পের অধীনে চীনের সীমানার কাছাকাছি ৩ হাজার ৩’শ ৪৬ কিঃমিঃ লম্বা ৬১টা রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। এর মাঝে ১ হাজার ২’শ ৬০ কিঃমিঃ লম্বা ৩৫টা রাস্তার কাজ শেষ হয়েছে। ২ হাজার ৩৫ কিঃমিঃএর ২০টা রাস্তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। আর বাকি ৫১ কিঃমিঃএর ৫টা রাস্তার কাজ এখনও চলছে। ভারতীয় কর্মকর্তারা মনে করছেন যে, এই রাস্তা তৈরির ফলে দুর্গম সীমান্ত অঞ্চলে সরকারের যোগাযোগ সহজীকরণ এবং প্যাট্রল বৃদ্ধি করার লক্ষ্য বাস্তবায়িত হবে। ভারতীয় কর্মকর্তারা বলছেন যে, ১৯৯৭ সালে চীনারা তাদের সীমান্ত এলাকায় রাস্তা তৈরির কাজ আরম্ভ করার পর ভারতীয়রা ‘চায়না স্টাডি গ্রুপ’ তৈরি করে; যা গবেষণা করে ৭৩টা পয়েন্টে রাস্তা নির্মাণ করার উপদেশ দেয়।

ভারতীয় বিমান বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এপাচি হেলিকপ্টার বুঝে নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা পরিবহণ বিমান, হেলিকপ্টার ও কামান সীমান্ত অঞ্চলে ভারতের যুদ্ধ করার সক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি করেছে ঠিকই, তবে সেটা চীনের সাথে সম্ভাব্য সংঘাতে বিজয়ের জন্যে যথেষ্ট কিনা, সেব্যাপারে প্রশ্ন করছেন অনেকেই।


লাদাখে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সক্ষমতা কতটুকু? 

লাদাখের নিরাপত্তায় রয়েছে ভারতীয় সেনাবাহিনীর চতুর্দশ কোর, যা ১৯৯৯ সালে কারগিল যুদ্ধের সময় গঠিত হয়। তবে এখানকার ইউনিটগুলি ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলের নাগাল্যান্ড থেকে নিয়ে আসা ইউনিট থেকেই ডেভেলপ করা হয়েছিল। নাগাল্যান্ডের পাহাড়ি এলাকায় বিদ্রোহী দমনে নিয়োজিত ইউনিটের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েই ১৯৬২ সাল থেকে এর অধীন ৩য় পদাতিক ডিভিশন তৈরি করা হয়। ১৯৯০ সালের পর নাগাল্যান্ড থেকে বিদ্রোহী দমনে নিয়োজিত ৮ম পদাতিক ডিভিশনকে লাদাখে নিয়ে আসা হয়। এরপর থেকে এই ইউনিট নাগাল্যান্ডে আর ফেরত যায়নি। ২০১৯এর সেপ্টেম্বরে লাদাখের দক্ষিণপূর্ব প্রান্তে চীনা সীমানার কাছাকাছি চুশুল অঞ্চলের অত্যন্ত উঁচু এলাকায় ভারত বড় আকারের একটা সামরিক মহড়ার আয়োজন করে। ‘চাংথাং প্রাহার’ নামের এই মহড়ায় ভারতের ট্যাঙ্ক, আর্টিলারি, হেলিকপ্টার, ড্রোন, এবং বিমান বাহিনীর বিমান অংশ নেয়। বিমান থেকে প্যারাশুট দিয়ে সেনা অবতরণও করা হয়। ভারতীয় সেনাবাহিনীর নর্দার্ন কমান্ডের কমান্ডার লেঃ জেনারেল রনবীর সিং মহড়ার সময় বলেন যে, যুদ্ধ করতে বাধ্য হলে নর্দার্ন কমান্ড তার শ্রেষ্ঠ সক্ষমতা প্রদর্শন করবে। নতুন প্রযুক্তির অস্ত্র ব্যবহারের সাথেসাথে এই সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু কাশ্মির এবং লাদাখের নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে ভারতীয় সেনবাহিনীর নর্দার্ন কমান্ড। এর অধীনেই রয়েছে লাদাখের চতুর্দশ কোর, শ্রীনগরের পঞ্চদশ কোর এবং নাগ্রতার ষোড়শ কোর। সেনাবাহিনীর এই ইউনিটগুলি অতি উঁচু ভূমিতে যুদ্ধ করতে সক্ষম। ভারতের ইস্টার্ন কমান্ডের অধীনে থাকা ৯টা মাউন্টেন ডিভিশনই উঁচু স্থানে যুদ্ধ করতে অভ্যস্ত। তাই লাদাখ বা কাশ্মিরে উত্তেজনার উপর ভিত্তি করে অনেক সময়েই ইস্টার্ন কমান্ড থেকে সেনা এনে নর্দার্ন কমান্ডে মোতায়েন করা হয়েছে। তবে ইস্টার্ন কমান্ডের ইউনিটগুলির একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো চীনের উপর খেয়াল রাখা। চীনা সীমানা ঠান্ডা থাকলেই কেবল ইস্টার্ন কমান্ডের ইউনিট নর্দার্ন কমান্ডে মোতায়েন করা সম্ভব। চীনের সাথে ভারতের সম্ভাব্য উত্তেজনার মাঝে সেটা কতটুকু সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে।

সেনাবাহিনী ছাড়াও ভারতীয় বিমান বাহিনীর রসদ পরিবহণ সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে বিমান বাহিনীর ওয়েস্টার্ন কমান্ডের একটা মহড়া অনুষ্ঠিত হয়, যার মাঝে লাদাখ থেকে ৪’শ কিঃমিঃ দূরের চন্ডিগড় বিমান ঘাঁটি থেকে ৬ ঘন্টায় ৪’শ ৬৩ টন রসদ লাদাখে প্রেরণ করা হয়। বিমান বাহিনীর মোট ১৬টা পরিবহণ বিমান এতে ব্যবহৃত হয়, যার মাঝে ছিল মার্কিন নির্মিত ‘সি-১৭ গ্লোবমাস্টার’ এবং রুশ নির্মিত ‘ইলিউশিন-৭৬’ ও ‘এন্টোনভ-৩২’। ‘ফিনানশিয়াল এক্সপ্রেস’ বলছে যে, সাধারণ সময়ে ওয়েস্টার্ন এয়ার কমান্ড মাসে ৩ হাজার টনের মতো রসদ পরিবহণ করে থাকে। এয়ার ভাইস মার্শাল ধিলন বলছেন যে, লাদাখে স্বল্প সময়ের যুদ্ধাবস্থার মাঝে লজিস্টিক সাপোর্ট দেয়ার সক্ষমতার প্রমাণ রেখেছে ভারতীয় বিমান বাহিনী। 

২০১১ সালের জুনে ভারতীয় বিমান বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ১০টা ‘সি-১৭ গ্লোবমাস্টার’ পরিবহণ বিমান ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। বিমানের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং এই বিমানের উৎপাদন শেষ করে দেবার সময় ভারত আরও ৩টা বিমান কিনতে চায়। তবে ভারতের আমতান্ত্রিক জটিলতার কারণে শেষ পর্যন্ত ২০১৯ সালের অগাস্টে ভারত তার ১১তম এবং শেষ ‘সি-১৭’এর ডেলিভারি পায়। এই বিমানটা ডেলিভারির মাধ্যমে বোয়িংএর ‘সি-১৭’ কারখানা বন্ধ করে দেয়া হয়। ১’শ ৮৮ জন সেনা বা ৭৩ টন রসদ বহণে সক্ষম এই বিমানগুলিকে ভারত কিনেছিল কৌশলগত পরিবহণের জন্যে। ‘সি-১৭’ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র থেকে ‘সি-১৩০জে সুপার হারকিউলিস’ পরিবহণ বিমান কিনেছে ভারত। ২০০৮ সালে প্রথম ৬টা ‘সি-১৩০জে’ অর্ডার করে ভারত। ২০১১ সাল থেকে এগুলির ডেলিভারি শুরু হয়। এরপর ২০১৩ সালে আরও ৬টা বিমান অর্ডার করে ভারত। এই বিমানগুলি প্রায় ১’শ সেনা বা ১৯ টন রসদ বহণ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনা বিমানগুলি ভারতীয় বাহিনীর সোভিয়েত আমলের ‘ইলিউশিন ইল-৭৬এমডি’ এবং ‘এন্টোনভ এএন-৩২’ বিমানের সাথে যুক্ত হয়েছে। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৮ সালের মাঝে ৪৮ টন রসদ বহণে সক্ষম ১৪টা ‘ইল-৭৬’ বিমান কেনে ভারত। ২০১৭ সালে ভারতের কম্পট্রোলার এন্ড অডিটর জেনারেল এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, বিমানগুলির মাঝে মাত্র ৪১ শতাংশ যেকোন সময় কর্মক্ষম থাকে। ভারতীয় বিমান বাহিনীর ১’শটার মতো পুরোনো ‘এন-৩২’ বিমান রয়েছে; যেগুলি মডার্নাইজেশনে প্রক্রিয়া চলছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনা ‘সি-১৭’ এবং ‘সি-১৩০জে’ বিমানগুলি চীনের সীমানায় ভারতীয় বিমান বাহিনীর রসদ সরবরাহ বৃদ্ধির সক্ষমতাকে বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে। বিমানগুলির সক্ষমতার অনেকটাই হিসেব করা হয়েছে চীন সীমান্তে কত দ্রুততার সাথে কত পরিমাণ রসদ মোতায়েন করা যাবে তার উপর। এই সক্ষমতার একটা পরীক্ষাই ভারতীয় বিমান বাহিনী করেছিল ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে।

শুধু পরিবহণ বিমান ক্রয়ই নয়; ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্যে উঁচু পার্বত্য অঞ্চলে ব্যবহারের উপযোগী ‘এম-৭৭৭’ হাউইটজার কামান সরবরাহ করছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৬ সালে নরেন্দ্র মোদির সরকার ব্রিটিশ কোম্পানি ‘বিএই সিস্টেমস’এর ডিজাইন করা মোট ১’শ ৪৫টা কামান ৭’শ ৩৭ মিলিয়ন ডলার খরচে কেনার অনুমোদন দেয়। প্রথম ২৫টা যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরাসরি আসলেও বাকি ১’শ ২০টা ভারতের মাহিন্দ্রা কোম্পানি এসেম্বলি করবে। ২০১৮এর নভেম্বর থেকে কামানগুলির ডেলিভারি পাওয়া শুরু করে ভারত। সাধারণ ১৫৫মিঃমিঃ হাউইটজার কামানের চাইতে প্রায় ৪০ শতাংশ কম ওজনের হবার কারণে এই কামানগুলি খুব সহজেই আকাশপথে উঁচু ভূমিতে মোতায়েন করা সম্ভব হবে, যা কিনা চীন এবং পাকিস্তানের সীমান্তে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। 
‘ডেকান হেরাল্ড’ বলছে যে, ১৯৯৯ সালে কারগিল যুদ্ধের সময় ভারতীয় বিমান বাহিনী বুঝতে পারে যে, হিমালয়ের উঁচু ভূমিতে অপারেট করার মতো কোন এটাক হেলিকপ্টার ভারতের নেই। রুশ নির্মিত ‘এমআই-৩৫’ হেলিকপ্টারগুলি ৫ কিঃমিঃ উচ্চতা পর্যন্ত যেতে পারে না। অথচ কাশ্মির এবং লাদাখ সীমানায় অনেক স্থানের উচ্চতাই ৪ থেকে ৫ কিঃমিঃ বা তারও বেশি। এই অক্ষমতা কাটিয়ে উঠতে ভারত ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার খরচে ২২টা ‘এএইচ-৬৪ই এপাচি’ এটাক হেলিকপ্টার এবং ১৫টা ‘সিএইচ-৪৭ শিনুক’ পরিবহণ হেলিকপ্টার কেনার চুক্তি করে। দু’টা হেলিকপ্টারই প্রায় ৬ কিঃমিঃ উচ্চতায় উড়তে পারে এবং সফলতার সাথে আফগানিস্তানের উঁচু জায়গাগুলিতে অপারেট করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা পরিবহণ বিমান, হেলিকপ্টার ও কামান সীমান্ত অঞ্চলে ভারতের যুদ্ধ করার সক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি করেছে ঠিকই, তবে সেটা চীনের সাথে সম্ভাব্য সংঘাতে বিজয়ের জন্যে যথেষ্ট কিনা, সেব্যাপারে প্রশ্ন করছেন অনেকেই। 

গত এক বছর ধরেই ভারতের লাদাখের সীমানা থেকে প্রায় ২’শ কিঃমিঃ দক্ষিণে ‘নেগারি গুনসা’ বিমানবন্দরে চীনারা উন্নয়ন কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে কাশ্মির এবং লাদাখের কাছাকাছি চীনারা গোটা পঞ্চাশেকের বেশি যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেনি। সংখ্যার দিক থেকে এই বিমানশক্তি খুব বড় কিছু নয়। তদুপরি তা ভারতের নিরাপত্তাহীনতাকে উস্কে দিয়েছে।  


চীনের অবকাঠামো চ্যালেঞ্জ

বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, চীন ভারতের সীমানার কাছাকাছি এলাকায় অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে। প্রতিরক্ষা এবং ইন্টেলিজেন্স বিশ্লেষক ক্রিস বিগার্স বলছেন যে, গত এক বছর ধরেই লাদাখের সীমানা থেকে প্রায় ২’শ কিঃমিঃ দক্ষিণে ‘নেগারি গুনসা’ বিমানবন্দরে চীনারা উন্নয়ন কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবিতে দেখা যাচ্ছে যে, সেখানে চীনারা নতুন ট্যাক্সিওয়ে, পার্কিং র‍্যাম্প এবং ‘কুইক রিয়্যাকশন এলার্ট র‍্যাম্প’ তৈরি করেছে। তবে একসাথে বেশি বিমান ওড়াবার সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে দ্বিতীয় রানওয়ে তৈরি করেনি। সেখানে চীনারা ৪টা সুখোই ফাইটার বিমান এবং বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেছে। প্রায় ১৪ হাজার ফুট বা ৪ দশমিক ৩ কিঃমিঃ উচ্চতায় অবস্থিত এই বিমানবন্দরকে বিশ্বের চতুর্থ সর্বোচ্চ বিমানবন্দর দাবি করা হয়। ভারতীয় সামরিক বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, অতি উচ্চতায় অবস্থিত হওয়ায় এই বিমানবন্দর থেকে ওড়া ফাইটার বিমানগুলি তাদের সক্ষমতার চাইতে অনেক কম অস্ত্র বহণ করতে পারবে। সক্ষমতা অনুযায়ী ইঞ্জিন না চলতে পারার কারণে জ্বালানিও বেশি বহণ করতে হতে পারে। ভারতীয় বিমান বাইনীর সাবেক অফিসার স্কোয়াড্রন লীডার সামীর জোশি বলছেন যে, এত উঁচু থেকে ওড়ার ফলে সুখোই বিমানগুলি এক ঘন্টার বেশি উড়তে পারবে না। অপরদিকে লাদাখের কাছাকাছি ভারতের অনেকগুলি বিমান ঘাঁটি রয়েছে; যেগুলি থেকে ওড়া বিমান আকাশ থেকে আকাশে রিফুয়েলিংএর মাধ্যমে তিন থেকে চার ঘন্টা আকাশে উড়তে পারবে।

তবে ভারতের সীমানায় চীনের উদ্দেশ্য বুঝতে হলে চীনের অবকাঠামো উন্নয়নকে আরও বড় পরিসরে দেখতে হবে। তিব্বতে ভারতের সীমানার কাছাকাছি চীনের খুব বেশি একটা বিমানবন্দর নেই। পূর্ব তিব্বতে অরুণাচল প্রদেশের উত্তরে রয়েছে নিংচি বিমানবন্দর এবং চামদো বিমানবন্দর। এর মাঝে চামদো বিমানবন্দরকে আরও বড় করা হচ্ছে। ভূটানের উত্তরে রয়েছে লাসা গঙ্গার এবং শিগাটসে বিমানবন্দর। দু’টাই বেশ বড়সড় বিমানবন্দর, যেগুলির একাধিক রানওয়ে রয়েছে। ভূটানের সীমানায় দোকলাম উত্তেজনার সময় এই বিমানবন্দর দু’টা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। শিগাটসে থেকে পশ্চিমে নেপালের উত্তরে প্রায় ১২’শ কিঃমিঃ কোন বিমানবন্দর নেই। শিগাটসের পর ভারতের হিমাচল প্রদেশের পূর্বে রয়েছে ‘নেগারি গুনশা’ বিমানবন্দর, যেটা বর্তমান লাদাখ ইস্যুতে খবরে এসেছে। এখানে সামরিক বিমান অপারেট করার সুযোগসুবিধা এখনও খুব বেশি একটা নেই; তবে এর উন্নয়ন চলমান। এখানে আপাততঃ ৪টা যুদ্ধবিমান দেখা গেছে। নেগারি থেকে ১৩’শ কিঃমিঃ সড়কপথে যুক্ত হয়েছে উইঘুরের ‘খোটান’। এই রাস্তা আকসাই চিনের মাঝ দিয়ে গিয়েছে। আকসাই চিন থেকে প্রায় ২’শ কিঃমিঃ উত্তরে খোটানে রয়েছে বেশ বড় একটা বিমানবন্দর। এখানে প্রায় ত্রিশ চল্লিশটার মতো ফাইটার মোতায়েন রয়েছে। খোটানের সাথে প্রায় ৫’শ কিঃমিঃ সরকপথে যুক্ত হয়েছে কাশগড়, যেখানে রয়েছে আরেকটা বড় বিমানবন্দর। এখানেও প্রায় ডজনখানেক যুদ্ধবিমান মোতায়েন রয়েছে। তবে কাশ্মির এবং লাদাখের কাছাকাছি চীনারা গোটা পঞ্চাশেকের বেশি যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেনি। সংখ্যার দিক থেকে এই বিমানশক্তি খুব বড় কিছু নয়। তদুপরি তা ভারতের নিরাপত্তাহীনতাকে উস্কে দিয়েছে।
চীন তার পশ্চিমের রাজ্যগুলিকে পূর্বের হান অধ্যুষিত অঞ্চলগুলির সাথে সরাসরি যুক্ত করার চেষ্টা করছে। এই বিশাল অঞ্চলে অবকাঠামো তৈরির পিছনে রয়েছে বিশাল সব প্রকৃতিগত চ্যালেঞ্জ। কিন্তু চীন তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের উপর ভর করে তিব্বত এবং শিনজিয়াং বা উইঘুরে অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। এর মাঝে রয়েছে নতুন রাস্তা, রেললাইন এবং বিমানবন্দর নির্মাণ। সর্বপশ্চিমের মুসলিম অধ্যুষিত উইঘুর রাজ্যে চীনের প্রকল্পগুলির কৌশলগত গুরুত্ব সবচাইতে বেশি। উইঘুরের মাধ্যমেই চীন মধ্য এশিয়ার সাথে যুক্ত হয়েছে। একইসাথে পাকিস্তানের মাঝ দিয়ে ভারত মহাসগরের তীরে গোয়াদর বন্দরের সাথে যুক্ত হবার প্রকল্প উইঘুরের মাঝ দিয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মির থেকে বের হয়ে ‘চায়না পাকিস্তান ইকনমিক করিডোর’ বা ‘সিপিইসি’ বা ‘সিপেক’এর রাস্তা উইঘুরের হাইওয়ে ‘জি৩১৪’এর মিলেছে এবং এরপর তা কাশগরএর জংশনের সাথে যুক্ত হয়েছে। এখান থেকে হাইওয়ে ‘জি৩০১২’ উত্তরপূর্ব দিকে উইঘুরের রাজধানী উরুমচি এবং বাকি চীনের সাথে যুক্ত হয়েছে। কাশগর থেকে  হাইওয়ে ‘জি২১৯’ বের হয়ে তিব্বতের রাজধানী লাসা গিয়েছে। এই হাইওয়ে ‘জি২১৯’ পুরো ভারতের উত্তর সীমার প্রায় সমান্তরাল গিয়েছে। এটাই হলো সেই হাইওয়ে, যা ভারতকে বিচলিত করেছে। এই হাইওয়ে চীন নিয়ন্ত্রিত আকসাই চিন অঞ্চলের মাঝ দিয়ে যায়, যা ভারত নিজের অঞ্চল বলে দাবি করে আসছে। চীনের রাষ্ট্রীয় পত্রিকা ‘গ্লোবাল টাইমস’ জানাচ্ছে যে, ‘জি২১৯’ রাস্তা ১৯৫১ থেকে ১৯৫৭ সালের মাঝে তৈরি করা হয়। এর মাঝে বেশকিছু অংশ ছিল কাঁচা রাস্তা, যা ২০১৩ সালে পাকা করা হয়। ‘শিনহুয়া’ বলছে যে, এই রাস্তার লাদাখের কাছাকাছি জিয়েশান দাবান অংশ সমুদ্র সমতল থেকে ৫ দশমিক ২৫ কিঃমিঃ উঁচু। এই অঞ্চলে গাড়ি চালাতে গেলে অনেকেই অক্সিজেন মাস্ক পড়ে থাকেন। 

তিব্বতের রাজধানী লাসার পশ্চিমে শিগাটসে পর্যন্ত রেললাইন তৈরি করে বাকি চীনের সাথে সংযুক্ত করা হয় ২০১৪ সালে। এর আগে লাসা পর্যন্ত রেললাইন তৈরির কাজ শেষ হয় ২০০৬ সালে। আবার উইঘুর রাজ্যে পশ্চিমের কাশগর থেকে আকসাই চিনের উত্তরে হোতান পর্যন্ত রেললাইন তৈরি করা হয় ২০১০ সালে। এই রেললাইনের সাথেই ‘সিপেক’কে যুক্ত করার পরিকল্পনা চলছে। কাশগর পর্যন্ত রেললাইন তৈরি করা শেষ হয় ১৯৯৯ সালে। প্রত্যেকটা প্রকল্পই ছিল চীন সরকারের মেগা প্রকল্প। এই রেললাইনগুলি ব্যবহার করে চীন পক্ষে ভারতের সাথে সীমানায় সামরিক স্থাপনা গড়ে তোলা সহজ হয়েছে। বহুকাল যাবত চীনের জন্যে এই সীমানাগুলি পাহাড়া দেয়া কঠিন ছিল। এখন মাল্টিবিলিয়ন ডলারের প্রকল্পগুলি চীনের জন্যে নিজের অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি তা ভারতকে করেছে বিচলিত।

ভারতের ২৮টা ফাইটার স্কোয়াড্রনের মাঝে ১৭টাই কাশ্মির এবং লাদাখের কাছাকাছি মোতায়েন রয়েছে। এই ১৭টা স্কোয়াড্রনে রয়েছে প্রায় ২’শ ৭২টা ফাইটার বিমান; যার মাঝে প্রথম সাড়ির বিমান ১’শ ৭৬টা এবং দ্বিতীয় সাড়ির বিমান ৯৬টা। এগুলির বিপরীতে চীনারা বর্তমানে মোতায়েন করেছে গোটা পঞ্চাশেক বিমান। সীমান্তের কাছাকাছি নিজেদের পাঁচ গুণ বেশি যুদ্ধবিমান মোতায়েন রাখা সত্ত্বেও ভারত চীনাদের ব্যাপারে উতকন্ঠায় রয়েছে। ১৯৪৭ পরবর্তী ভারতের সার্বক্ষণিক চিন্তায় নিরাপত্তাহীনতাই ছিল সর্বাগ্রে। 


তবুও ভারত এবং চীনের অসমান সক্ষমতা

‘ফরেন পলিসি’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় সুমিত গাঙ্গুলি এবং মানজিত পারদেসি বলছেন যে, ১৯৮৮ সালে যখন রাজীব গান্ধী চীনের সাথে আলোচনায় বসেছিলেন, তখন দুই দেশ কৌশলগত দিক থেকে মোটামুটিভাবে তুলনীয় ছিল। ভারতের জিডিপি তখন ছিল ২’শ ৯৭ বিলিয়ন ডলার; চীনের ছিল ৩’শ ১২ বিলিয়ন। ভারতের সামরিক বাজেট ছিল প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার; চীনের ছিল ১১ বিলিয়ন। কিন্তু বর্তমানে চীনের জিডিপি ১৩ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার; যা কিনা ভারতের ২ দশমিক ৭ ট্রিলিয়নের প্রায় ৫ গুণ! আর ২০১৯ সালে চীনের সামরিক বাজেট ছিল ২’শ ৬১ বিলিয়ন ডলার; যা ভারতের ৭১ বিলিয়ন ডলারের চার গুণ! দুই দেশেরই অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলেও চীনারা ভারতের সাথে বড় রকমের পার্থক্য তৈরি করে ফেলেছে, যা কিনা দুই দেশের কৌশলগত ব্যালান্সকে সমস্যায় ফেলে দিয়েছে। চীন তিব্বতে তার অবকাঠামোর অনেক উন্নয়ন করেছে; উঁচু পাহড়ি অঞ্চলে ব্যবহারের জন্যে ‘টাইপ ১৫’ ট্যাঙ্ক ডেভেলপ করেছে। ৩৩ টন ওজনের এই হাল্কা ট্যাঙ্ক চীনারা ২০১৮ সাল থেকে সার্ভিসে এনেছে।

চীনের সীমানায় ভারতীয় সেনাবাহিনী যেসব ইউনিট মোতায়েন করেছে, সেগুলির পক্ষে পাহাড়ি অঞ্চলের রাস্তা বেয়ে চীনের বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালনা করা খুবই কঠিন। এখানে উঁচু পাহাড়ের কারণে রাস্তাগুলি সরু এবং রাস্তার উপর সামরিক বহরের বিমান আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়াটা সহজ নয়। চীনা বিমান বাহিনী এক্ষেত্রে খুব সহজেই ভারতীয় সাপ্লাই রাস্তাগুলি আটকে দিতে পারবে, যদি না ভারতীয় বিমান বাহিনী চীনা বিমান বাহিনীকে আকাশযুদ্ধে পরাস্ত করতে সক্ষম হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় বিমান বাহিনী তার প্রয়োজনীয় ৪২ স্কোয়াড্রন ফাইটার বিমান রাখতে পারছে না। অনেকেই বলছেন যে, পুরোনো বিমান অবসরে পাঠানো এবং নতুন বিমান ক্রয়ে দীর্ঘসূত্রিতার জেরে ভারতীয় বিমান বাহিনীকে ২০২০এর পর থেকে ২৬ স্কোয়াড্রন ফাইটার বিমান নিয়েই খুশি থাকতে হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে হিমালয়ের পাদদেশে চীনাদের সাথে যুদ্ধে ভারতীয়রা আকাশ নিজেদের দখতে নিতে পারবে কিনা, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। 
তবে কাশ্মির ও লাদাখের কাছাকাছি ভারতের বিমান বাহিনীর শক্তি অন্ততঃ কাগজে কলমে হলেও গুরুত্ব রাখে। ডাচ ম্যাগাজিন ‘স্ক্র্যাম্বল’ ভারতীয় বিমান বাহিনীর ঘাঁটিগুলিতে মোতায়েনকৃত স্কোয়াড্রনগুলিকে দেখাবার চেষ্টা করেছে। এর মাঝে আকাশ নিয়ন্ত্রণের জন্যে নিযুক্ত ইউনিটগুলি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আদমপুরে রয়েছে ‘মিগ-২৯’ বিমানের ৪৭তম এবং ২২৩তম স্কোয়াড্রন। হালওয়ারাতে রয়েছে ‘সুখোই-৩০’এর ২২০তম এবং ২২১তম স্কোয়ড্রন। বারেইলিতে রয়েছে ‘সুখোই-৩০’এর ৮ম এবং ২৪তম স্কোয়াড্রন। লেহতে রয়েছে ২৮তম স্কোয়াড্রনের ‘মিগ-২৯’। গোয়ালিয়রে রয়েছে ‘মিরেজ-২০০০’এর ১ম, ৭ম এবং ৯ম স্কোয়াড্রন। সিরসাতে রয়েছে ‘সুখোই-৩০’এর ১৫তম স্কোয়াড্রন। অর্থাৎ প্রথম সাড়ির ফাইটার বিমানের ১১টা স্কোয়াড্রন ছড়িয়ে আছে ৬টা বিমান ঘাঁটিতে। এছাড়াও দ্বিতীয় সাড়ির ফাইটার হিসেবে ‘মিগ-২১’ বিমানের ৫১তম, ২৬তম, ২১তম, ২৩তম স্কোয়াড্রন এবং ‘জাগুয়ার’ বিমানের ৫ম এবং ১৪তম স্কোয়াড্রনও কাছাকাছি মোতায়েন রয়েছে। অর্থাৎ দ্বিতীয় সাড়ির আরও ৬টা ফাইটার স্কোয়াড্রনও মোতায়েন রয়েছে কাছাকাছি। আম্বালাতে ফরাসী নির্মিত ‘রাফাল’ জেটগুলি ১৭তম স্কোয়াড্রনে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এবছরের জানুয়ারিতে ভারতীয় বিমান বাহিনী বলে যে, এই মুহুর্তে তাদের ২৮ স্কোয়াড্রন ফাইটার অপারেশনাল রয়েছে। এর মাঝে ১২টা ‘সুখোই-৩০’, ৩টা ‘মিগ-২৯’, ৬টা ‘জাগুয়ার’, ৩টা ‘মিরেজ-২০০০’, একটা ‘তেজাস’ এবং ৩টা ‘মিগ-২১’ স্কোয়াড্রন। আর উপরের সংক্ষ্যাগুলি বলছে যে, ২৮টা স্কোয়াড্রনের মাঝে ১৭টাই কাশ্মির এবং লাদাখের কাছাকাছি মোতায়েন রয়েছে। এই ১৭টা স্কোয়াড্রনে রয়েছে প্রায় ২’শ ৭২টা ফাইটার বিমান; যার মাঝে প্রথম সাড়ির বিমান ১’শ ৭৬টা এবং দ্বিতীয় সাড়ির বিমান ৯৬টা। এগুলির বিপরীতে চীনারা বর্তমানে মোতায়েন করেছে গোটা পঞ্চাশেক বিমান।

পাকিস্তানের সাথে কয়েক দফা যুদ্ধের পর ভারতের বিমান ঘাঁটিগুলি সর্বদাই যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত রাখা হয়। সেখানে বিমানের জন্যে বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। বেশিরভাগ বিমানই শেলটারের ভিতর রাখা হয়ে থাকে। প্রতিটা ঘাঁটিতেই একাধিক রানওয়ে রয়েছে দ্রুত বিমান ওঠানামা করার জন্যে। অপরদিকে চীনের ঘাঁটিগুলিতে ফাইটার বিমান টারমাকের উপরেই রাখা হচ্ছে। ঘাঁটির সংখ্যাও কম; ঘাঁটিতে রানওয়ের সংখ্যাও কম। প্রকৃতপক্ষে চীনারা যুদ্ধের সম্ভাবনাকে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়নি। তবে সীমান্তকে একেবারে অরক্ষতিও রাখতে চায়নি। সীমান্তের দু’পাশে উভয় পক্ষই অবকাঠামো উন্নয়ন করেছে। তবে ভারতের এই উন্নয়ন সীমান্তের নিরাপত্তা দেবার জন্যে হলেও চীনের ক্ষেত্রে তার পশ্চিমের প্রদেশগুলিকে আরও শক্তভাবে ধরে রাখার উদ্দেশ্য কাজ করেছে। ভারত চীনা সীমান্তে তার যুদ্ধ করার সক্ষমতা বৃদ্ধি করলেও চীনারা ভারতের সকল চেষ্টার জবাব দেয়ার চেষ্টা করেনি।

লাদাখে দুই পক্ষের প্রায় শ’খানেক সেনা হাতাহাতি সংঘাতে লিপ্ত হয়। তবে কোন আগ্নেয়াস্ত্র কোন পক্ষই ব্যবহার করেনি। গত দুই দশকে ভারত এবং চীনের সীমান্ত পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন হয়েছে এবং তা অব্যহত থাকবে। এতে উভয় পক্ষই নিরাপত্তাহীনতার মাঝে পড়বে, যা উত্তেজনা এবং সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়াবে। তবে লাদাখের সীনামায় দুই দেশের সেনাদের আগ্নেয়াস্ত্রবিহীন সংঘর্ষ বলে দিচ্ছে যে, কেউই সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চাইছে না। ভারত যেমন তার সীমানাকে যুদ্ধ ছাড়াই রক্ষা করতে চাইছে, তেমনি চীনারাও বুঝতে পারছে যে, যুদ্ধ চীনের জাতীয় নিরাপত্তাকে আরও বড় হুমকিতে ফেলবে।


যুদ্ধের সম্ভাবনা আসলে কতটুকু? 

‘বিবিসি’ তাদের বিশ্লেষণে বলছে যে, চীনারা ভারতের বিজেপি নেতৃবৃন্দের পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মির দখল করে নেবার হুমকিকে চীনারা হয়তো হাল্কাভাবে নেয়নি। কারণ আজাদ কাশ্মিরের মাঝ দিয়েই ‘সিপেক’ চীনের উইঘুরের হাইওয়ে ‘জি৩১৪’এর সাথে মিলিত হয়েছে। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ তাদের বিশ্লেষণে বলছে যে, দুই দেশের মাঝে বাণিজ্যও কিন্তু থেমে থাকেনি। চীনের এক’শর বেশি কোম্পানি ভারতে বিনিয়োগ করেছে। চীনা কোম্পানিগুলি ভারতের মোবাইল ফোন বাজারের ৬০ শতাংশ দখল করে রেখেছে। ২০১৮ সালে দুই দেশের মাঝে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৯৫ বিলিয়ন ডলার। ২০১৯এর প্রথমার্ধে এই বাণিজ্য ছিল ৫৩ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য যুদ্ধের মাঝে ভারত চাইছে চীন থেকে বের হয়ে যাওয়া কোম্পানিগুলিকে ভারতে নিয়ে আসতে। মোটকথা দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক এমন একটা অবস্থানে রয়েছে যে, কেউই সেটাকে সমস্যায় ফেলতে চাইবে না।

সীমান্তের কাছাকাছি নিজেদের পাঁচ গুণ বেশি যুদ্ধবিমান মোতায়েন রাখা সত্ত্বেও ভারত কেন চীনাদের ব্যাপারে উতকন্ঠায় রয়েছে? চীনাদের অবকাঠামো উন্নয়ন কেন ভারতকে চিন্তিত করেছে, যেখানে চীনারা সামরিক দিক থেকে খুব কমই শক্তি মোতায়েন করেছে? নিজস্ব সীমান্ত অবকাঠামো উন্নয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে অত্যাধুনিক অস্ত্র কেনাকেই বা ভারত কেন মনে করেনি যে তা চীনাদের উস্কে দিতে পারে? বিজেপি সরকারের আজাদ কাশ্মির দখলের চিন্তাকে চীনারা যদি তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ ‘সিপেক’এর প্রতি হুমকি হিসেবে নেয়, তাহলে সেব্যাপারে ভারত কি অবস্থান নেবে, সেটা ভেবে দেখেছে কি? ১৯৪৭ পরবর্তী ভারতের সার্বক্ষণিক চিন্তায় নিরাপত্তাহীনতাই ছিল সর্বাগ্রে। বিশেষ করে নিজের ভৌগোলিক অখন্ডতা প্রশ্নে ভারত প্রয়োজনে আগ্রাসী ভূমিকাও নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের এই নিরাপত্তাহীনতাকে ব্যবহার করে অস্ত্র সরবরাহ করেছে; যা চীনকে তার স্থলসীমানার দিকে কিছুটা হলেও তাকাতে বাধ্য করেছে। তবে চীনারা আপাততঃ যদিও যুদ্ধ প্রস্তুতির দিকে দ্রুত অগ্রসর হয়নি, তথাপি ভারতের সামরিক সক্ষমতার পিছনে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ধন চীনের জন্যে কিছুটা হলেও হুমকি তৈরি করেছে। ‘সিপেক’এর প্রতি হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রকে এগিয়ে রাখবে। আর চীনারা যেহেতু উইঘুর এবং তিব্বতের অবকাঠামো উন্নয়ন বন্ধ করতে পারবে না, সেহেতু নিরাপত্তাহীনতা ভারতকে সামনের দিনে আরও বেশি গ্রাস করবে। বিশেষ করে ভবিষ্যতে কাশ্মির ইস্যুতে পাকিস্তান এবং চীনের একত্রে থাকার সম্ভাবনা বেড়ে যাওয়ায় তা ভারতকে বিচলিত করবে এবং তাকে আরও প্রবলভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বলয়ের মাঝে নিয়ে যাবে। উপসংহারে বলা যায় যে, গত দুই দশকে ভারত এবং চীনের সীমান্ত পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন হয়েছে এবং তা অব্যহত থাকবে। এতে উভয় পক্ষই নিরাপত্তাহীনতার মাঝে পড়বে, যা উত্তেজনা এবং সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়াবে। তবে লাদাখের সীনামায় দুই দেশের সেনাদের আগ্নেয়াস্ত্রবিহীন সংঘর্ষ বলে দিচ্ছে যে, কেউই সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চাইছে না। ভারত যেমন তার সীমানাকে যুদ্ধ ছাড়াই রক্ষা করতে চাইছে, তেমনি চীনারাও বুঝতে পারছে যে, যুদ্ধ চীনের জাতীয় নিরাপত্তাকে আরও বড় হুমকিতে ফেলবে।