সারা বিশ্বে যখন করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা নিয়ে আলোচনা চলছে, তখন শক্তিশালী দেশগুলি ভ্যাকসিনকে ভূরাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির হাতিহার হিসেবে দেখছে। পূর্ব ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকা এবং আফ্রিকাতে যখন পশ্চিমা দেশগুলি ভ্যাকসিন সরবরাহ করতে হিমসিম খাচ্ছে, তখন চীন এবং রাশিয়া এই সুযোগে প্রভাব বাড়িয়ে নিচ্ছে বলে মনে করছেন অনেক পশ্চিমা চিন্তাবিদেরা। তবে ব্রিটেনের ‘দ্যা টেলিগ্রাফ’ পত্রিকার এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, ঠান্ডা যুদ্ধের মতোই রাশিয়া এবং চীনের ভীতিকে জিইয়ে রেখে পশ্চিমারা শক্তিশালী একটা প্রত্যুত্তর দিতে চাইছে। নিজেদের মেডিক্যাল গর্বকে ধরে রাখতে পশ্চিমা দেশগুলিকে দ্রুত কাজ করতে হবে। তবে একইসাথে বলা হচ্ছে যে, ব্রিটেনের উচিৎ তাদের ভ্যাকসিনের সফলতাকে ভূরাজনৈতিক সফলতাতে রূপান্তরিত করা। উদাহরণস্বরূপ বলা হচ্ছে যে, ভারতের সাথে ব্রিটেনের একটা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি দুই দেশের বাণিজ্যকে ১’শ ৪০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যেতে পারে, যা বর্তমানে ৩২ বিলিয়ন ডলারের মতো।
ব্রিটেনের প্রভাবশালী ‘স্পেকট্যাটর’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, ঠান্ডা যুদ্ধ যখন তুঙ্গে ছিল, তখন বিশ্বের প্রায় শ’খানেক উন্নয়নশীল রাষ্ট্র জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনে নাম লেখায়; যারা যুক্তরাষ্ট্র বা সোভিয়েত ইউনিয়ন, কারুর পক্ষেই যাবার পক্ষপাতি ছিল না। তখন উভয় সুপারপাওয়ারই চেষ্টা করেছে এই দেশগুলিকে নিজেদের বলয়ে নিয়ে আসতে; বর্তমানেও সেটাই হচ্ছে। ঠান্ডা যুদ্ধের পর ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় চীন এবং রাশিয়াও চাইছে মাঝামাঝি থাকা এই দেশগুলিকে নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসতে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে আসে। চীন এবং রাশিয়ার ভ্যাকসিন কূটনীতি এরই অংশ। অপরদিকে ব্রিটেন আন্তর্জাতিকভাবে ভ্যাকসিনের প্রসার ঘটাতে ভারতকে ব্যবহার করছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। ভারতের ‘সেরাম ইন্সটিটিউট’ প্রকৃতপক্ষে ব্রিটেনের অক্সফোর্ডের ডেভেলপ করা ভ্যাকসিনই তৈরি করছে। ব্রিটেন যখন নিজের তৈরি ভ্যাকসিন দিয়ে নিজস্ব জনগণকে রক্ষা করছে, তখন ব্রিটিশ ‘আশীর্বাদে’ ভারত দুনিয়াব্যাপী ভ্যাকসিন ছড়িয়ে দিচ্ছে। তবে লেখায় আরও বলা হচ্ছে যে, আসন্ন ‘ডি১০’ শীর্ষ বৈঠকে ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে যে, পশ্চিমাদের বন্ধুত্ব চীনের বন্ধুত্বের চাইতেও বেশি দামি।
‘ডি১০’ হলো অর্থনৈতিকভাবে উন্নত সাতটা দেশ ‘জি৭’এর একটা সম্প্রসারণ। ‘জি৭’এর দেশগুলি হলো যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, কানাডা ও জাপান। এর সাথে ‘ডি১০’এর অধীনে যুক্ত করা হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভারতকে। ব্রিটেন চাইছে ২০২১ সালে ‘জি৭’ শীর্ষ বৈঠককে ‘ডি১০’ বৈঠকে রূপান্তরিত করতে। অনেকেই বলা শুরু করেছেন যে, ‘জি৭’ একটা পুরোনো চিন্তা; তাই এটাকে ‘ডি১০’এর মাধ্যমে প্রতিস্থাপিত করা উচিৎ। ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’এর এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, ‘ডি১০’এর চিন্তাটা নতুন নয়। ২০০৮ সালে মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘আটলান্টিক কাউন্সিল’এর এশ জৈন এবং মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রাক্তন পলিসি প্ল্যানিং ডিরেক্টর ডেভিড গর্ডন ‘ডি১০’এর ব্যাপারে কথা বলা শুরু করেন। তারা বলছিলেন যে, এখন এমন একটা সময়ে এসেছে, যখন পশ্চিমা লিবারাল আদর্শের দেশগুলি নিজেদের নেতৃত্ব ধরে রাখতে পারছে না। এমতাবস্থায় এই দেশগুলির উচিৎ একত্রে বসে কৌশল নির্ধারণ করা। এশ জৈন বর্তমানে ‘আটলান্টিক কাউন্সিল’এ ‘ডি১০ স্ট্র্যাটেজি ফোরাম’ দেখাশুনা করছেন; যার উদ্দেশ্য হলো এই দেশগুলির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং বিশ্লেষকদের একত্রে নিয়ে এসে নীতি বিষয়ক কথাবার্তা চালিয়ে নেয়া।
‘ফরেন পলিসি’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’এর ফেলো এরিক ব্র্যাটেনবার্গ এবং ব্রিটিশ সাংবাদিক বেন জুডাহ বলছেন যে, এখন সময় এসেছে ‘জি৭’কে পিছনে ফেলে ‘ডি১০’কে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। তারা বলছেন যে, ‘ডি১০’ কোন চীন বিরোধী সংস্থা নয়। বরং এটা হলো পশ্চিমা গণতান্ত্রিক শাসনের প্রতি হুমকিস্বরূপ দু’টা বিশেষ সমস্যাকে সমাধানের একটা উপায়। এর মাঝে একটা হলো ‘ফাইভ জি’ বা পঞ্চম জেনারেশনের প্রযুক্তি; আরেকটা হলো অতি গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সাপ্লাই চেইন। এই উভয় সমস্যাই পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলির কেউ একা সমাধান করতে পারবে না। অপরপক্ষে ‘ডি১০’এর মাধ্যমে এই সমস্যাগুলিকে সমাধানে বেশ দ্রুত কাজ করা সম্ভব। এর মাধ্যমে ট্রান্স আটলান্টিক এবং ট্রান্স প্যাসিফিকের গণতান্ত্রিক দেশগুলিকে একটা কাঠামোর মাঝে এনে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলিকে কেন্দ্র করে দ্রুত কর্মমুখী একটা সমাধানে দিকে এগুনোর মাধ্যমে একাধারে যেমন সংস্থাটাকে একটা আলোচনা সভা বানিয়ে ফেলা থেকে বাঁচা যাবে, তেমনি চীনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র ব্যবস্থা নেয়াকেও কঠিন করে ফেলা যাবে। তারা বলছেন যে, গণতান্ত্রিক দেশগুলির মাঝে সেতু তৈরি করার ক্ষেত্রে ব্রিটেনের গুরুত্ব যথেষ্ট। তারা মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, ১৯৪৯ সালে ন্যাটো তৈরির সময় ব্রিটিশ সামরিক অফিসার হেস্টিংস ইসমে বলেছিলেন যে, ন্যাটোর দরকার রয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়নকে বাইরে রাখতে, যুক্তরাষ্ট্রকে ভিতরে রাখতে, এবং জার্মানিকে দমিয়ে রাখতে। তেমনি ব্র্যাটেনবার্গ এবং জুডাহ বলছেন যে, ‘ডি১০’এর দরকার রয়েছে চীনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে, ভারতে কাছে রাখতে, এবং যুক্তরাষ্ট্রকে দৃঢ় রাখতে। তাদের কথায়, ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ চিন্তাটা এখনও একটা কঙ্কাল; লন্ডনের জন্যে ‘ডি১০’ হলো এই কংকালের উপর পেশী যুক্ত করার একটা সোনালী সুযোগ।
চীন এবং রাশিয়ার ভ্যাকসিনের ‘ভীতি’কে ব্যবহার করেই ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে চাইছে। ঔপনিবেশিক সময় থেকেই ভারত এবং চীনের অর্থনৈতিক গুরুত্ব ব্রিটেনের কাছে কখনোই কমেনি। একারণেই ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ চীন এবং ভারত উভয়কেই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছে। বিশেষ করে ব্রেক্সিটের পর ভারত এবং চীনের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্কের ব্যাপারে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে ব্রিটেন। ‘ফাইভ জি’ প্রযুক্তি এবং সাপ্লাই চেইনকে আলোচনায় এনে ব্রিটেন চীনের বিকল্প তৈরি নয়, বরং চীনকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। অপরপক্ষে অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনের উৎপাদনে ভারতকে অংশীদার করে এবং ‘ডি১০’ গঠনের মাধ্যমে ভারতকে একটা বড় আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মের অংশ করে নিয়ে ব্রিটেন ভারতকে আবারও নিজের ছায়াতলে আনতে চাইছে। একইসাথে ব্রিটেন চাইছে চীনকে নিয়ন্ত্রণের খেলায় যুক্তরাষ্ট্র যেন একচ্ছত্রভাবে সিদ্ধান্ত না নিতে পারে। ইইউ থেকে বের হয়ে যাবার সাথেসাথেই করোনাভাইরাসের সংক্রমণে ব্রিটেনের অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতি হলেও ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ চিন্তার বাস্তবায়ন অন্বেষণ করা থেকে তারা যে এক চুলও নড়েনি, তা পরিষ্কার।
