Showing posts with label French Republic. Show all posts
Showing posts with label French Republic. Show all posts

Saturday, 1 July 2023

ফ্রান্সে আবারও বিক্ষোভ… সামাজিক অবিচার, নাকি দুর্বল রাষ্ট্রের উদাহরণ?

০১লা জুলাই ২০২৩

সাম্প্রতিক সময়ে ফ্রান্সে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন এবং পেনশন সংস্কারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের পর এবারের বর্ণবাদ-বিরোধী বিক্ষোভ শুধুমাত্র সামাজিক অবিচারকেই তুলে ধরে না, রাষ্ট্রের দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে আসে।

গত ২৭শে জুন ফ্রান্সের নঁতেরে শহরে ১৭ বছর বয়সী এক যুবককে পুলিশ গুলি করে হত্যা করার পর থেকে পুরো ফ্রান্স জুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ চলছে। ভিডিওতে ধারণ করা এই ঘটনায় দেখা যায় যে, পুলিশ একটা ট্রাফিক সিগনালে খুব কাছে থেকে কাউকে গুলি করছে। সকাল ৯টার দিকে দু’জন পুলিশ গাড়িটা আটকাবার পর চালক গাড়ি চালিয়ে চলে যাবার চেষ্টা করলে পুলিশ তার বুকে গুলি করে। প্রতিবাদের কারণ ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ফ্রান্সের ‘সোশালিস্ট পার্টি’র নেতা অলিভিয়ের ফাউরে ‘বিবিসি’কে বলছেন যে, পুলিশের কথায় কেউ যদি না থামে, এর অর্থ এই নয় যে, তাকে গুলি করা যাবে। প্রত্যেক ব্যক্তিরই সুবিচার পাবার অধিকার রয়েছে।

নিহত যুবকের স্মরণে শোকমিছিল থেকেই শুরু হয় বিক্ষোভ। পহেলা জুলাই পর্যন্ত চার দিনের বিক্ষোভে ফ্রান্সজুড়ে ১৩’শ মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ভবন এবং গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ছাড়াও বিভিন্ন দোকানপাটে লুটপাট হয়েছে। ফ্রান্সজুড়ে সাঁজোয়া গাড়িসহ প্রায় ৪৫ হাজার পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সরকার বলছে যে, কঠোর অবস্থান নেবার কারণে সহিংসতা কিছুটা হলেও কমে আসছে। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ এই বিক্ষোভকে অযৌক্তিক বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং নাগরিকদেরকে তাদের সন্তানদের বিক্ষোভের দায় নিতে বলেন। একইসাথে তিনি ‘টিকটক’ এবং ‘স্ন্যাপচ্যাট’এর মতো সোশাল মিডিয়া ব্যবহার করে সহিংসতা ছড়ানো বন্ধ করার পদক্ষেপ নেবার কথা বলেন। সংবেদনশীল তথ্য সোশাল মিডিয়া থেকে সরিয়ে না দেয়ার জন্যে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলিকে তিনি দোষারোপ করেন।

নঁতেরে শহরের সরকারি উকিল পাসকাল প্রাশ সাংবাদিকদের বলেন যে, প্রাথমিক তদন্তে তার মনে হয়েছে যে, আইনগতভাবে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করার যে শর্তগুলি রয়েছে, সেগুলি উপেক্ষিত হয়েছে। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, ফ্রান্সের আইন অনুযায়ী একজন পুলিশের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করার অর্থ হলো বিচারক অভিযুক্তের বিরুদ্ধে যথেষ্ট শক্ত প্রমাণ পেয়েছেন। তবে বিচারকার্য শুরু করার আগে এতে যথেষ্ট সময় দেয়া হয়।

ফ্রান্সে অ-শ্বেতাঙ্গদের সুবিচার পাওয়া নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। এর আগে ২০০৫ সালে প্যারিসের কাছাকাছি এক স্থানে পুলিশের হাত থেকে বাঁচার জন্যে উত্তর আফ্রিকার বংশোদ্ভূত দু’জন মুসলিম যুবক এক বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে লুকাতে গেলে বিদ্যুৎপিষ্ট হয়ে মৃত্যুবরণ করে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিক্ষোভ তিন সপ্তাহ ধরে চলে এবং শেষ পর্যন্ত ফরাসি সরকার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। সেই ঘটনায় দু’জন পুলিশ কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করা হলেও ১০ বছরের দীর্ঘ আইনী প্রক্রিয়া শেষে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, সেই বিক্ষোভের পিছনে বহুদিনের জমে থাকা ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছিল; যার মাঝে ছিল মুসলিম সংখ্যালঘুদের মাঝে ব্যাপক বেকারত্ব এবং পুলিশের বৈষম্যমূলক জুলুম। যুক্তরাষ্ট্রে ২০০১ সালের ৯/১১এর ঘটনার পর থেকে ফ্রান্সে মুসলিম-বিদ্বেষী চিন্তার প্রসারকেও সেই বিক্ষোভের একটা কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এবারের ঘটনাও মুসলিম সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধেই ঘটেছে। ‘বিবিসি’ বলছে যে, আলজেরিয় বংশোদ্ভূত নাহেল তার মায়ের একমাত্র সন্তান; যে কিনা পণ্য ডেলিভারি দেয়ার কাজ করতো। একইসাথে গত তিন বছর ধরে সে একটা রাগবি ক্লাবেও খেলতো। ইলেকট্রিশিয়ান হবার জন্যে একটা কলেজেও ভর্তি হয়েছিলো সে; যদিও কলেজে খুব বেশি একটা সময় সে দিতে পারেনি। নাহেলের বিরুদ্ধে পুলিশের কোন ক্রিমিনাল রেকর্ড না থাকলেও অপ্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে গাড়ি চালাবার অভিযোগ ছিল। দরিদ্র্য পরিবারদের নিয়ে কাজ করা এনজিও ‘ওভাল সিটোইয়েঁ’র প্রধান জেফ পুয়েশ ‘বিবিসি’কে বলছেন যে, নাহেল সমাজে সকলের সাথে মিশে চলার মতো ছেলে ছিলো। মাদকাসক্তি বা অপরাধের সাথে জড়াবার মতো ব্যক্তি সে ছিলো না। নাহেলকে বহণকারী এম্বুলেন্সের মেডিকেল কর্মী মারুয়ানি বলছেন যে, তিনি নাহেলকে দেখেই চিনতে পেরেছেন এবং তিনি জানতেন যে এই ছেলে কারুর দিকে আঙ্গুল তুলে কথা বলার মতো নয়। নাহেলের মা ‘ফ্রান্স ৫ টিভি’র সাথে সাক্ষাতে বলেন যে, পুলিশ হয়তো তার ‘আরব চেহারা’ দেখেই তাকে হত্যা করতে চেয়েছে।

‘আল জাজিরা’ বলছে যে, যুবকের হত্যার ঘটনাটা ফ্রান্সে পুলিশের সাথে দরিদ্র্য এলাকার মানুষের উত্তেজনাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। ফ্রান্সে অ-শ্বেতাঙ্গ যুবকদের বিরুদ্ধে পুলিশের কৌশল নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। এক যুবক ‘বিবিসি’কে বলছেন যে, প্রায় প্রতিদিনই পুলিশের সহিংসতা চলছে; বিশেষ করে কেউ যদি আরব বা কৃষ্ণাঙ্গ হয়। নাহেলের আইনজীবী ইয়াসিনে বুজরুউ অবশ্য পুলিশের বর্ণবাদের বিষয়টাকে সামনে না এনে বলছেন যে, ফ্রান্সের আইন এবং বিচারব্যবস্থা পুলিশকে বিশেষ রকমের সুরক্ষা দিয়ে থাকে; যেকারণে অনেকেই নিজেকে বিচারের উর্ধ্বে মনে করতে থাকে। বুজরুউএর বর্ণবাদকে পাশ কাটিয়ে যাবার এই চেষ্টাটাকেই অনেকে মারাত্মক বলে আখ্যা দিচ্ছেন। ‘আল জাজিরা’র এক লেখায় নিউ ইয়র্কের ‘স্টোন ব্রুক ইউনিভার্সিটির’ প্রফেসর ক্রিস্টাল ফ্লেমিং বলছেন যে, ফ্রান্সের সমাজে বর্ণবাদের কারণে নাহেলের জীবন গেছে। প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ জানেন যে, নাহেলের মৃত্যু ব্যাখ্যার বাইরে নয়। কিন্তু যতদিন পর্যন্ত না তারা ফ্রান্সের বর্ণবাদকে স্বীকার করে না নেবেন, ততদিন পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না। ৩০শে জুন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক অফিসের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, সময় এসেছে ফ্রান্সের বর্ণবাদ এবং আইন শৃংখলা বাহিনীর বর্ণবাদজনিত বৈষম্যের গভীর সমস্যাকে স্বীকার করা। পাল্টা বিবৃতিতে ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই অভিযোগকে পুরোপুরি ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করে।

‘দ্যা গার্ডিয়ান’এর এক লেখায় ফরাসি সাংবাদিক রোখায়া দিয়াল্লো বলছেন যে, ফ্রান্সের দারিদ্র্যপীড়িত শহরাঞ্চলে পুলিশের দ্বারা অপরাধগুলি দেশটার অনেকগুলি দাঙ্গার মূল কারণ। বহু বছর ধরে মিছিল, প্রতিবাদপত্র, অনুরোধ-আহ্বানে কোন কাজ না হওয়ায় একজন যুবকের সামনে সহিংসতা ছাড়া কোন পথ খোলা থাকে না। প্রশ্ন করতেই হয় যে, এতটা সহিংসতা না হলে নাহেলের হত্যাকান্ডকে নিয়ে কেউ কোন কথা বলতো? রোখায়া দিয়াল্লোর কথাগুলি ফ্রান্সের গভীরের এমন এক সমস্যার কথা তুলে ধরে, যা কিনা ফরাসি রিপাবলিকের সেকুলার স্তম্ভকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। সাম্প্রতিক সময়ে ফ্রান্সে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন এবং পেনশন সংস্কারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের পর এবারের বর্ণবাদ-বিরোধী বিক্ষোভ শুধুমাত্র সামাজিক অবিচারকেই তুলে ধরে না, রাষ্ট্রের দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে আসে।

Saturday, 25 March 2023

ময়লার শহর প্যারিস… রাজনৈতিক ব্যবস্থার উপরেই আস্থার অভাব

২৫শে মার্চ ২০২৩

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের রাস্তায় ময়লার স্তূপ। প্যারিসের আবর্জনার স্তূপের মাঝেই ফ্রান্সের রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি জনগণের অনাস্থা এবং ফ্রেঞ্চ রিপাবলিকের ভিত্তিতে পচনের প্রমাণ পাওয়া গেলেও এর সমাধান কারুর কাছেই নেই।


গত জানুয়ারি মাসে ফরাসি সরকার পেনশন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নেবার পর থেকে প্রতিবাদে দেশজুড়ে চলছে ধর্মঘট ও বিক্ষোভ। শিক্ষক, ট্রেনচালক, তেলের রিফাইনারির কর্মীসহ বিভিন্ন সেক্টরের লক্ষ লক্ষ কর্মীরা কর্মবিরতি পালন করছে এবং নিয়মিতভাবে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। ২৪শে মার্চ নাগাদ ফ্রান্সের পরিচ্ছন্নকর্মীরা ১৯ দিন ধরে ধর্মঘটে রয়েছে। শহরের রাস্তাগুলিতে ময়লা আবর্জনার স্তূপের মাঝে ইঁদুরের প্রকোপ বৃদ্ধি পেতে পারে বলে বলছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা; যার ফলশ্রুতিতে বিভিন্ন রোগজীবাণু ছড়াবার আশংকাও তৈরি হয়েছে। ‘ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর’ বলছে যে, ৯ হাজার ৬’শ টনের বেশি আবর্জনা এখন প্যারিসের রাস্তাগুলিতে স্তূপীকৃত অবস্থায় রয়েছে। আর পরিচ্ছন্ন কর্মীদের শ্রমিক ইউনিয়ন বলছে যে, তারা ২৭শে মার্চের আগে ধর্মঘট প্রত্যাহার করবে না।

ফ্রান্সের জ্বালানি ডিপো এবং তেলের রিফাইনারিগুলিতে দুই সপ্তাহ ধরে চলছে ধর্মঘট। কর্মীরা উৎপাদন কমানো ছাড়াও সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটাতে চেষ্টা করছে। ২১শে মার্চ ফ্রান্সের দক্ষিণের জ্বালানি ডিপোতে ধর্মঘটকারী কর্মীদেরকে জোরপূর্বক কাজে ফেরত আনার চেষ্টা করলে কর্মীরা ডিপো অবরোধ করে। এতে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের উপরে টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। ধর্মঘটে ফ্রান্সের দক্ষিণের প্রায় ৪০ শতাংশ পেট্রোল স্টেশনেই জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে বলে বলছে ‘ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর’। পুরো ফ্রান্সে ৮ শতাংশ পেট্রোল স্টেশনে জ্বালানি ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সংকট মোকাবিলায় অনেক পেট্রোল স্টেশনেই গাড়িপ্রতি সর্বোচ্চ ৩০ লিটার পেট্রোল বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।

‘ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল’ বলছে যে, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর কথায়, এই পরিবর্তন ফ্রান্সের পেনশন ব্যবস্থাকে ধ্বসে পড়া থেকে বাঁচাবে এবং সরকারের খরচ কমাবে। অবসরের সময় দুই বছর বৃদ্ধি করে ৬৪ বছরে উন্নীত করার মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষ অতিরিক্ত দুই বছর কাজ করার পরেই পেনশন পাবার জন্যে যোগ্যতা অর্জন করবে। ম্যাক্রঁ সামরিক বাজেট বৃদ্ধি করতে চাইছেন এবং সরকারের বাজেট ঘাটতিকে কমিয়ে ইইউএর টার্গেটের সাথে সমন্বয় করতে চাইছেন। পুরো ইউরোপের মাঝে ফ্রান্সে অবসরপ্রাপ্তরা অর্থনৈতিকভাবে সবচাইতে বেশি সচ্ছল। তবে এর জন্যে ‘ওইসিডি’র হিসেবে ফ্রান্সের জিডিপির সাড়ে ১৪ শতাংশ পেনশনের পিছনে খরচ করতে হচ্ছে। তুলনামূলকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে তা মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ। পেনশনের খরচ মেটাতে গিয়ে ২০২৩ সালে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ইউরো ঘাটতির মাঝে পড়তে যাচ্ছে সরকার। ২০২৫ সালের মাঝে এটা আরও বেড়ে প্রায় ১১ বিলিয়ন ইউরো এবং ২০৩৫ সাল নাগাদ ২১ বিলিয়ন ইউরোতে ঠেকবে। ফ্রান্সের মানুষের গড় বয়স বাড়ার সাথেসাথে পেনশনের জন্যে অর্থায়ন করা কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে আসছে। খরচ মেটাতে সরকার নতুন করে কর আরোপ বা সরকারি ঋণ বৃদ্ধি করতে চাইছে না। এর আগে ২০১৯ সালে ম্যাক্রঁর সরকার পরিবহণ খাতের পেনশন ব্যবস্থাকে পরিবর্তনের চেষ্টা করলে পুরো ফ্রান্সজুড়ে পরিবহণ শ্রমিকরা রাস্তায় নেমেছিল। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণেই সেবার সরকার বেশিদূর এগুতে পারেনি।

২০১৯ সালেও ফ্রান্সে পেনশন নিয়ে বিক্ষোভ হয়েছিল। বিক্ষোভকারীদের অনেকেই মনে করছেন যে, সরকারের পেনশন ব্যবস্থা পরিবর্তনেও সমস্যার সমাধান হবে না। বরং ফ্রান্সের সামাজিক সুরক্ষা মডেলের দিনই এখন প্রায় শেষের পথে। এর মাধ্যমে ফ্রান্সে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার দ্রুত নিম্নগামী হচ্ছে। একইসাথে আইনপ্রনয়ণের প্রক্রিয়াও অল্প কিছু মানুষের হাতে কুক্ষিগত হয়ে যাচ্ছে। ৭০ শতাংশ জনগণ বিপক্ষে থাকলেও এখন সংবিধানের ‘আর্টিকেল ৪৯’ বলে সরকার পেনশন ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করে আইন তৈরি করতে পারবে।

২২শে মার্চ ম্যাক্রঁ ফরাসি টেলিভিশনে এক সাক্ষাতে বলেন যে, তিনি তার সিদ্ধান্ত থেকে সড়ে আসবেন না; কারণ ফ্রান্সের জাতীয় স্বার্থের জন্যে সেটাই সঠিক সিদ্ধান্ত। একইসাথে তিনি ফ্রান্সের বিক্ষোভকে ২০২১ সালের ৬ই জানুয়ারির যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের ‘ক্যাপিটল হিল’এর অরাজকতার সাথে তুলনা করেন। ‘হ্যারিস ইন্টারএকটিভ’এর ২২শে মার্চের জরিপে বলা হচ্ছে যে, ফ্রান্সের ৭০ শতাংশ জনগণ ম্যাক্রঁর এই বক্তব্যে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। এর আগে ৬ই মার্চ ‘এলাবি’র জরিপে বলা হয় যে, ৬৭ শতাংশ জনগণ সরকারের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে। ম্যাক্রঁর বক্তব্যের পর ২৩শে মার্চ পুরো ফ্রান্স জুড়ে বিক্ষোভ হয়। ‘ব্লুমবার্গ’ বলছে যে, ফরাসি পুলিশের হিসেবে ১১ লক্ষ মানুষ রাস্তায় বিক্ষোভ করেছে; আর ফরাসি শ্রমিক ইউনিয়নগুলির হিসেবে প্রায় ৩৫ লক্ষ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে। প্যারিসে ময়লার স্তূপে অগ্নিসংযোগ ছাড়াও সংঘর্ষে কমপক্ষে ৪’শ ৫৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ৪’শ ৪১ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়। এর আগের ১১ই ও ১৫ই মার্চের বিক্ষোভ অপেক্ষাকৃত ছোট ছিল বলে অনেকেই সেটাকে ফরাসি সরকারের বিজয় বলে ধরে নিচ্ছিলো। কিন্তু নতুন করে সহিংস বিক্ষোভের পরে তার পুনরায় সরকারকে অস্থিরতার মাঝে ফেলেছে। ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসেবে গত ১৯শে জানুয়ারি থেকে ২৩শে মার্চ পর্যন্ত মোট ৯টা বড় আকারের বিক্ষোভ হয়েছে, যেগুলিতে সাড়ে ৩ লক্ষ থেকে শুরু করে ১৩ লক্ষ মানুষ অংশ নিয়েছে।

ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেরাল্ড ডারমানিন ফরাসি টেলিভিশনের এক সাক্ষাৎকারে বলছেন যে, সহিংসতার মাত্রা যথেষ্ট বেড়ে যাওয়ায় পুলিশকে একটা সীমা পর্যন্ত বলপ্রয়োগ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। অপরদিকে ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি জেনারেল ফেবিয়েন রুসেল সাংবাদিকদের বলেন যে, ফরাসি সরকার সহিংসতা নিয়ে জুয়া খেলছে। মাত্র কয়েকদিনের মাঝেই শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ পরিণত হয়েছে পুলিশের লাঠিচার্জে। বিক্ষোভকারীরা বলছে যে, তারা শুধুমাত্র পেনশন ব্যবস্থার পরিবর্তন নিয়েই বিক্ষোভ করছে না; ফরাসি সরকার পার্লামেন্টকে বাইপাস করে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অগ্রসর হওয়াতে জনগণের আক্রোশ আরও বেড়ে গেছে। ‘ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, পার্লামেন্টে পাস করাতে না পেরে গত ১৬ই মার্চ ম্যাক্রঁর সরকার ফরাসি সংবিধানের ‘আর্টিকেল ৪৯’এর উপর ভিত্তি করে পার্লামেন্টকে বাইপাস করে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাবলে পেনশন ব্যবস্থার পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত নেয়।

ফ্রান্সে বিক্ষোভকারীদের অনেকেই মনে করছেন যে, সরকারের পেনশন ব্যবস্থা পরিবর্তনেও সমস্যার সমাধান হবে না। বরং ফ্রান্সের সামাজিক সুরক্ষা মডেলের দিনই এখন প্রায় শেষের পথে। এর মাধ্যমে ফ্রান্সে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার দ্রুত নিম্নগামী হচ্ছে। একইসাথে আইনপ্রনয়ণের প্রক্রিয়াও অল্প কিছু মানুষের হাতে কুক্ষিগত হয়ে যাচ্ছে। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ বলছে যে, ২১শে মার্চ ফ্রান্সের পার্লামেন্টে ম্যাক্রঁর বিরুদ্ধে পরপর দু’টা অনাস্থা প্রস্তাব ভেস্তে গেলে বিরোধী রাজনীতিবিদদের কাছে প্লাকার্ড তুলে প্রতিবাদ করা ছাড়া কিছুই করার ছিল না। কারণ ৭০ শতাংশ জনগণ বিপক্ষে থাকলেও এখন সংবিধানের ‘আর্টিকেল ৪৯’ বলে সরকার পেনশন ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করে আইন তৈরি করতে পারবে। প্যারিসের আবর্জনার স্তূপের মাঝেই ফ্রান্সের রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি জনগণের অনাস্থা এবং ফ্রেঞ্চ রিপাবলিকের ভিত্তিতে পচনের প্রমাণ পাওয়া গেলেও এর সমাধান কারুর কাছেই নেই।

Sunday, 8 August 2021

ব্যাক্তিস্বাধীনতার ফরাসি সংজ্ঞা আসলে কি?

০৮ই অগাস্ট ২০২১

ব্যক্তিস্বাধীনতার সংজ্ঞা একেকজনের কাছে একেকরকম। নবীকে অপমান করাটা ব্যক্তিস্বাধীনতার মাঝে পড়লেও প্রেসিডেন্টকে অপমান করাটা রাষ্ট্রের কাছে অপরাধ হিসেবে ঠেকেছে। রাষ্ট্রের অঙ্গগুলি, তথা সরকার, আদালত এবং জনগণের মাঝে চিন্তার দৃশ্যমান ফারাক ফ্রান্সের রাষ্ট্রীয় ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ এবং দুর্বল করে ফেলছে।


চার সপ্তাহ ধরে ফ্রান্সের রাস্তায় হাজারো মানুষের বিক্ষোভ। ৭ই অগাস্ট ফ্রান্স জুড়ে প্রায় দুই লক্ষ মানুষ প্রতিবাদ করেছে। তাদের দাবি হলো ফরাসি সরকারের করোনাভাইরাস ‘হেলথ পাস’এর ঘোষণা বাতিল করা। ফরাসি সরকারের প্রজ্ঞাপণ অনুযায়ী জনগণকে বেশিরভাগ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যেতে হলে বা গণপরিবহণে উঠতে হলে করোনাভাইরাস থেকে মুক্ত, এই মর্মে একটা ‘হেলথ পাস’ দেখাতে হবে। এরপর গত ২৯শে জুলাই ফরাসি সরকারের আরেক নির্দেশনায় বলা হয় যে, জনগণকে যেকোন পর্যটন স্থানে বা ৫০ জনের বেশি জমায়েত হয় এমন কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যেতে হলে ‘হেলথ পাস’ দেখাতে হবে। এর আগে থেকেই সিনেমা হল, কনসার্ট হল, থিম পার্কের মতো স্থানে পাস লাগছে। ৯ই অগাস্ট থেকে যেকোন বার, রেস্তোরাঁ বা শপিং মলে যেতে হলে অথবা দূরপাল্লার বিমান, রেলগাড়ি বা বাসে ভ্রমণ করতে হলে এই পাস লাগবে। এই পাসে এমন তথ্য থাকতে হবে, যাতে বহণকারী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত নয়, সেব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়। এতে ভ্যাকসিন নেবার সার্টিফিকেট ছাড়াও মুচলেকা থাকবে যে, গত ৪৮ ঘন্টার মাঝে করোনা পরীক্ষায় তিনি নেগেটিভ ফলাফল পেয়েছেন। শুধু তাই নয়, তিনি গত ৬ মাসের মাঝে করোনায় আক্রান্ত হননি; অথবা আক্রান্ত হয়ে থাকলেও গত ১৫ দিনের আগেই তিনি সুস্থ্য হয়ে উঠেছেন। ফরাসি সরকারের এই সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিযুক্ত, সেব্যাপারে যেমন আলোচনা চলছে, তেমনি এর মাধ্যমে ফ্রান্সের ব্যক্তিস্বাধীনতার সংস্কৃতি কতটা আক্রান্ত হয়েছে, সেটাও আলোচনায় আসছে।

গত ৫ই অগান্সট ফ্রান্সের সর্বোচ্চ আদালতে রায় দেয়া হয় যে, ফরাসি সরকারের ‘হেলথ পাস’এর সিদ্ধান্ত সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। একইসাথে আদালত এই সিদ্ধান্তও দেয় যে, ফ্রান্সের পার্লামেন্টে পাস করা আইনের মাধ্যমে জনগণের উপর যে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে, তা মানুষের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে “ব্যালন্সে রেখেছে”; অর্থাৎ এখানে ব্যক্তিস্বাধীনতা খর্ব হবার বিষয়ে খুব বেশি চিন্তিত হবার কিছু নেই। ‘ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর’ বলছে যে, প্যারিসে আদালতের বাইরে কয়েক’শ মানুষ এই রুলিংএর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। প্রতিবাদকারীরা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ‘হেলথ ডিক্টেটরশিপ’ বা ‘স্বাস্থ্যবিষয়ক একনায়কতন্ত্র’ বলছে। একজন প্রতিবাদকারী জুলিয়েন বেইলি বলছেন যে, তিনি ভ্যাকসিন নিয়েছেন। তবে ভ্যাকসিন নেবার ব্যাপারটা হওয়া উচিৎ ছিল স্বেচ্ছায়; সরকারের চাপে পড়ে নয়। তিনি আশংকা করে বলেন যে, কিছুদিন পর হয়তো সকল কর্মকান্ডের জন্যে ‘কিউআর কোড’ দেখাতে হবে। এটা ব্যক্তিস্বাধীনতার উপর নজিরবিহীন আঘাত।

নতুন আইনে রেস্তোরাঁয় খেতে গেলে ‘হেলথ পাস’ লাগবে। রেস্তোরাঁ মালিকরা বলছেন যে, ক্রেতাদের পাস আছে কিনা, সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তো রেস্তোরাঁর হতে পারে না। হাসপাতালে রুগীকে দেখতে গেলেও পাস লাগবে; অথবা অতি জরুরি নয় এমন কোন মেডিক্যাল সেবা নিতে গেলেও। স্বাস্থ্যকর্মীরা এখন ভ্যাকসিন নিতে বাধ্য। তবে আদালত এই আইনের মাঝে কিছু অংশ বাতিল করেছে; যেমন সরকার চেয়েছিল যে, ‘হেলথ পাস’ না থাকলে চাকুরিদাতা কর্মচারীকে হঠাত করেই বরখাস্ত করতে পারবে; যা আদালত অনুমোদন দেয়নি। তবে অনেক মানুষের সাথে কাজ করতে হয় এমন কোন চাকুরিতে থাকলে চাকুরিদাতা তার কর্মচারিকে বরখাস্ত করতে পারবে। ফরাসি থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইন্সটিটিউট মনটেইন’এর করা এক জনমত জরিপে বলা হচ্ছে যে, ফ্রান্সের ৩৭ শতাংশ জনগণ ‘হেলথ পাস’এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীদের পক্ষে রয়েছে; অন্যদিকে ৪৮ শতাংশ রয়েছে বিপক্ষে। অর্থাৎ একটা বড় সংখ্যক মানুষ এই আইনের বিপক্ষে। আর ৫২ শতাংশ জনগণ প্রতিবাদকারীদের বিপক্ষে নয়। ফরাসি সরকারের হিসেবে দেশের ৫৪ শতাংশ জনগণের এখন পর্যন্ত করোনার টিকা দেয়া সম্পন্ন হয়েছে।

ফ্রান্সে ব্যক্তিস্বাধীনতার সংজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এমন একটা সময়ে, যখন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর ব্যাঙ্গাত্মক ছবি বিলবোর্ডে ছাপাবার কারণে মামলা হয়েছে। গত ২৮শে জুলাই বিলবোর্ডের ব্যবসায় থাকা মিশেল অঙ্গে ফ্লোরি এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, ফরাসি প্রেসিডেন্টের অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে টুলঁ শহরের পুলিশ ডেকে পাঠিয়েছে। তিনি ফ্রান্সকে ‘ম্যাক্রনিয়া’ আখ্যা দিয়ে বলেন যে, এই দেশে নবীকে অপমান করে ছবি আঁকলে সেটাকে ‘স্যাটায়ার’ হিসেবে মেনে নেয়া হয়, কিন্তু প্রেসিডেন্টকে একনায়ক বললে ‘ব্লাসফেমি’ হয়ে যায়। ম্যাক্রঁ যে বিলবোর্ডের ব্যাপারে চিন্তিত, ‘ইউরোনিউজ’ তার বর্ণনা দিয়ে বলছে যে, সেখানে ম্যাক্রঁর একটা ছবিকে পরিবর্তিত করে হিটলারের মতো করে দেখানো হয়েছে এবং ম্যাক্রঁর দলের লোগো পরিবর্তিত করে হিটলারের নাজি পার্টির স্বস্তিকা লোগোর মতো করে আঁকা হয়েছে। এর সাথে লেখা হয়েছে যে, “সকলে আদেশ মান্য কর; ভ্যাকসিন নাও”। টুলঁ শহরে ঢোকার পথে রাস্তার পাশেই দু’টা বিলবোর্ডে ম্যাক্রঁর এই ব্যাঙ্গচিত্র প্রদর্শিত হয়।

ফ্লোরি এমন একটা ইস্যুকে সামনে নিয়ে এসেছেন, যা শুধু ব্যক্তিস্বাধীনতা নয়, ফ্রান্সের রাষ্ট্রীয় চিন্তাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ফ্রান্সের সেকুলার চিন্তাকে রক্ষা করার কথা বলে সেদেশের মুসলিম জনগণকে আইন করে ইসলাম পালনে বাধা দেয়া হচ্ছে। গত জুলাই মাসে ফরাসি সরকারি সংস্থা ‘এসজি সিআইপিডিআর’এর এক টুইটার বার্তায় নতুন করে সেকুলারিজমের উপর একটা মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করার কথা ঘোষণা দেয়া হয়। অনেকেই মনে করছেন যে, এর মাধ্যমে ফ্রান্সের মুসলিম জনগণকে রিপাবলিককে কিভাবে ভালোবাসতে হবে, সেটা শিক্ষা দেয়া হবে। গত ডিসেম্বরে ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেরাল্ড ডারমারিন এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেন যে, ফরাসি রিপাবলিকে মানুষ আল্লাহর ইবাদত করতে পারবে এবং রিপাবলিককে ভালোবাসতে পারবে। কিন্তু এক মুহুর্তের জন্যেও আল্লাহ রিপাবলিকের উপরে নয়।

ফ্রান্সের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা তাদের রাষ্ট্রীয় চিন্তাকে রক্ষা করতে ক্রমাগতভাবেই জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। একারণেই ফ্রান্সের বড় একটা অংশ এখন রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তগুলিকে একনায়কোচিত বলে আখ্যা দিচ্ছে। মুসলিমদের ইসলাম পালনের বিরুদ্ধে সরকারের সিদ্ধান্তগুলির পরপরই এখন ‘হেলথ পাস’এর ইস্যু নিয়ে জনগণের মাঝে ক্ষোভ দানা বাঁধছে। ব্যক্তিস্বাধীনতার সংজ্ঞা একেকজনের কাছে একেকরকম। ফ্লোরি যেভাবে বলেছেন যে, নবীকে অপমান করাটা ব্যক্তিস্বাধীনতার মাঝে পড়লেও প্রেসিডেন্টকে অপমান করাটা রাষ্ট্রের কাছে অপরাধ হিসেবে ঠেকেছে। রাষ্ট্রের অঙ্গগুলি, তথা সরকার, আদালত এবং জনগণের মাঝে চিন্তার দৃশ্যমান ফারাক ফ্রান্সের রাষ্ট্রীয় ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ এবং দুর্বল করে ফেলছে।

Saturday, 20 February 2021

ফ্রান্স কি উগ্রপন্থী সেকুলার রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে?

২০শে ফেব্রুয়ারি ২০২১


 
ফ্রান্সের পার্লামেন্টে নতুন একটা আইন পাস করা নিয়ে আলোচনার সূচনা হয়েছে। গত ১৬ই ফেব্রুয়ারি পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে ৩’শ ৪৭ ভোট বনাম ১’শ ৫১ ভোটে ‘প্রজাতন্ত্রের ভিত্তিগুলির উপর সন্মানের সমর্থনে’ এই নতুন বিল পাস হয়। ৬৫ জন ভোট দানে বিরত থাকে। এই আইনের মাধ্যমে ফ্রান্সের মসজিদ, স্কুল এবং স্পোর্টস ক্লাবগুলির উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো হবে। এটা প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রকল্পের অংশ, যার উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে উগ্রবাদী ইসলাম থেকে ফ্রান্সকে এবং ফ্রান্সের সেকুলার আদর্শকে রক্ষা করা। বার্তা সংস্থা ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলছে যে, নিম্নকক্ষের পর এই বিল উচ্চকক্ষে যাবে ৩০শে মার্চ; যেখানে এই বিল প্রায় নিশ্চিতভাবেই পাস হবে। তবে ফ্রান্সের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় স্বাধীনতার উপর এই আইন ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করবে বলে মনে করছেন অনেকেই। একইসাথে ইসলামের প্রতি ফরাসিদের উগ্রপন্থী দৃষ্টিভঙ্গিরও বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে এতে।

এই আইনের বিপক্ষে থাকা রাজনীতিবিদেরা বলছেন যে, আইনে যা প্রস্তাব করা হয়েছে, তা মূলতঃ অন্যান্য আইনে ইতোমধ্যেই রয়েছে। এখানে অন্য কোন রাজনৈতিক এজেন্ডা থাকতে পারে। বিল উত্থাপন করা ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেরাল্ড ডারমানিন পার্লামেন্টে ভোটাভুটির কিছুদিন আগেই বিরোধী দলীয় উগ্র ডানপন্থী নেতা মারিন লা পেনএর দিকে আঙ্গুল তাক করে বলেন যে, লা পেন উগ্রবাদী ইসলামের প্রতি বেশ ‘নরম’ অবস্থান নিয়েছেন। তার ‘ভিটামিন দরকার’। এই মন্তব্যের উদ্দেশ্য ছিল এটা প্রমাণ করা যে, ম্যাক্রঁর সরকার উগ্রবাদী ইসলামের ব্যাপারে উগ্র ডানপন্থীদের চাইতে বেশি শক্ত অবস্থান নিয়েছে। ২০২২ সালের নির্বাচনের আগে ডানপন্থী ভোটারদেরকে ম্যাক্রঁর দিকে টেনে আনা এর লক্ষ্য হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। অপরদিকে মারিন লা পেন নতুন আইনকে দুর্বল বলছেন। ‘বিএফএম’ টেলিভিশনে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে লা পেনের উগ্র ডানপন্থী ‘ন্যাশনাল র‍্যালি পার্টি’র ভাইস প্রেসিডেন্ট জরডান বারডেলা বলছেন যে, নতুন আইন ‘টার্গেট মিস’ করেছে; কারণ এটা উগ্রবাদী ইসলামী আদর্শকে সরাসরি আক্রমণ করেনি। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলছে যে, নতুন বিলে মুসলিম বা ইসলামের নাম উচ্চারিত হয়নি। সমর্থকেরা বলছেন যে, এই বিলে ফ্রান্সের সেকুলার আদর্শ এবং লিঙ্গ সমতাকেই রক্ষা করার চেষ্টা করা হয়েছে। ম্যাক্রঁ এই বিলকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ আইন বলছেন; কারণ উগ্রবাদীদেরকে তিনি ফ্রান্সের সমাজের বিরোধিতাকারী হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।

নতুন আইনে তিন বছর বয়স থেকে বাচ্চাদের স্কুলে পাঠিয়ে সেকুলার আদর্শ শেখাতে বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে; যাতে করে শিশুর পরিবার নিজ বাড়িতে আলাদা করে কোন আদর্শিক শিক্ষা দিতে না পারে। বাড়িতে শিক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে সরকারের অনুমতি নিতে হবে। এতে বাড়িতে শিক্ষা নেয়া ৬২ হাজার শিশুর শিক্ষা সরকারের নিয়ন্ত্রণে আসবে। সরকারি অর্থে চলা মসজিদ এবং মসজিদের ব্যবস্থাপনায় থাকা বিভিন্ন এসোসিয়েশনকে সেকুলারিজম মেনে চলার জন্যে ফরাসি সরকারের সাথে চুক্তিবদ্ধ হতে হবে। নিয়মের বাইরে গেলে সরকারি অর্থ ফেরত দিতে হবে। আর দেশের বাইরে থেকে অর্থায়ন হলেও ১২ হাজার ডলারের বেশি অর্থ পেলে সরকারকে জানাতে হবে; এবং বছরওয়ারি খরচের হিসেব দিতে হবে সরকারকে। পুলিশ অফিসার এবং কারাগারের কর্মচারীদের ফ্রান্সের সেকুলার সংবিধান এবং আদর্শের প্রতি নতুন করে আনুগত্য প্রকাশ করে শপথ নিতে হবে। সরকারি অফিসে কাজ করা বা সরকারের জন্যে কাজ করা কোন ব্যক্তি তার বিশ্বাস বোঝা যায়, এমন কোন কাপড় পরতে পারবে না। এর মাধ্যমে মূলতঃ মুসলিম মহিলাদের হিজাব পরাকেই বারন করা হয়েছে। একইসাথে সকল সরকারি কর্মচারীদেরকেও সেকুলারিজমের প্রশিক্ষণ দেবার কথা বলা হয়েছে। যেসকল খেলাধূলার এসোসিয়েশনকে উগ্রপন্থী বলে মনে হবে, সেগুলিকেও রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে আনা হবে। কোন ডাক্তার যদি কোন নারীর কুমারিত্বের সার্টিফিকেট দেয়, তবে তাকে ১৮ হাজার ডলার জরিমানা এবং ১ বছরের কারাদন্ড দেয়া হবে। কোন ব্যক্তির একসাথে দুই স্ত্রী থাকবে পারবে না; যদি কোন অভিবাসী এটা করে, তবে তাকে থাকার অনুমতি দেয়া হবে না। কোন বিবাহকে যদি জোরপূর্বক বলে মনে হয়, তাহলে আইনশৃংখলা বাহিনীকে অবহিত করা যাবে। নতুন এই আইনকে বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে ১৯০৫ সালের সেকুলারিজম আইনেও পরিবর্তন আনা হয়েছে; যার মাধ্যমে চার্চ এবং রাষ্ট্রকে আলাদা করা হয়েছিল।

বিল পাস হবার আগেই শ’দেড়েক মানুষ প্যারিসের রাস্তায় বিলের বিপক্ষে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করে। ‘ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে গত অক্টোবরে নিহত হওয়া ফরাসি শিক্ষক স্যামুয়েল প্যাটির এলাকার বাসিন্দা জেইনেব বুয়াবিবি বলছেন যে, এক ব্যাক্তির কর্মকান্ডের জন্যে পুরো মুসলিম সমাজকে আক্রমণ করাটা একেবারেই অনুচিত। তিনি বলছেন যে, মুসলিম নাম হবার কারণে ইউনিভার্সিটিতে এবং কর্মক্ষেত্রে তাকে বিদ্বেষের শিকার হতে হয়েছে। অনেকেই তাকে বলেছেন যে, ‘তুমি তোমার দেশে ফেরত যাও’; যদিও বুয়াবিবির জন্ম ফ্রান্সে। আর এরকম আইন পাস হলে মুসলিমবিদ্বষ আরও বেড়ে যেতে পারে। গত ১০ই ফেব্রুয়ারি এই বিলের বিপক্ষে এক খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেন ১’শ জন ইমাম, ৫০ জন মুসলিম শিক্ষক এবং ৫০ জন এসোসিয়েশন প্রেসিডেন্ট।

ফ্রান্সে কত মুসলিম রয়েছে, তার সঠিক হিসেব কেউ দিতে না পারলেও তা ৩০ থেকে ৬৫ লক্ষের মাঝে হতে পারে। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, ফ্রান্সের সেকুলার আইনে জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাসের কথা জিজ্ঞেস করা যায় না। ফরাসি থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইন্সটিটুট মনটেইন’এর করা এক জনমত জরিপে বলা হচ্ছে যে, ফ্রান্সের মুসলিমদের ২৯ শতাংশ ইসলামের শরীয়া আইনকে ফরাসি রিপাবলিকের আইনের চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। ৬৫ শতাংশ মুসলিম হিজাব পরার পক্ষে। উল্টোদিকে ‘লে মন্ড’ পত্রিকার জন্যে করা এক জরিপে বলা হচ্ছে যে, ৬০ শতাংশ ফরাসি মনে করে যে, ফ্রান্সের সেকুলার আদর্শের সাথে ইসলাম সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এমতাবস্থায় ফ্রান্সের নতুন আইন নিশ্চিতভাবেই মুসলিমদের বিশ্বাসগত বাধ্যবাধকতার সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে যাচ্ছে, যা কিনা পশ্চিমা সেকুলার আদর্শের স্তম্ভ ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিপন্থী। অপরপক্ষে ম্যাক্রঁর সরকার যখন নির্বাচনে জিততে উগ্র ডানপন্থীদের দলে টানার চেষ্টা করছেন, তখন গণতান্ত্রিকভাবেই এক উগ্রপন্থী সেকুলার রাষ্ট্রের দিকে ধাবিত হচ্ছে ফ্রান্স।

Saturday, 24 October 2020

ফ্রান্সে ইসলাম ... কে কার বাস্তবতা?

২৫শে অক্টোবর ২০২০
ফ্রান্স এখন দ্বিধাবিভক্ত; মুসলিমরা কি ফ্রান্সের সেকুলার বাস্তবতার শিকার? নাকি ফরাসিরা ইসলামিক বাস্তবতার শিকার? তারা কি ইসলামোফোবিয়া কাটাতে ইসলামকে পরিবর্তন করতে উদ্যত হবে? নাকি সেকুলার আইনের চাপে সহিংসতাকে আরও বৃদ্ধি করবে? যেদিকেই তারা পা বাড়াক না কেন, ফরাসি রিপাবলিক যে আরও দুর্বল হচ্ছে, তা এখন নিশ্চিত। 


ফ্রান্সে এক শিক্ষককে হত্যার পর ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ তথাকথিত ‘উগ্রবাদী ইসলাম’এর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছেন বলে ঘোষণা দেন। অভিযানের শুরুতেই এক মসজিদের ইমামের তথাকথিত ‘উগ্রবাদী’ চিন্তা ধারণ করার জন্যে মসজিদটাকেই বন্ধ ঘোষণা করা হয়; এবং আরও কঠোর পদক্ষেপ আসছে বলে বলা হয়। কিছুদিন আগেই প্যারিস থেকে ৩০ কিঃমিঃ দূরে এক শহরে ৪৭ বছর বয়সী স্কুল শিক্ষক স্যামুয়েল প্যাটি ফরাসী কারিকুলাম অনুযায়ী বাকস্বাধীনতা বিষয়ে পড়াতে গিয়ে ২০১৫ সালে ‘শার্লি ইব্দো’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত রাসূল (সাঃ)এর ব্যাঙ্গচিত্র প্রদর্শন করেন। এরপর এক মুসলিম ছাত্রীর বাবা স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে ছাত্রদের সামনে অশ্লীল ছবি প্রদর্শনের অভিযোগ করেন। অনলাইন ভিডিওতে প্যাটির বিরুদ্ধে অভিযোগ করা ছাড়াও তিনি প্যাটির পদচ্যুতি দাবি করেন। এরপর গত ১৬ই অক্টোবর ১৮ বছর বয়সী চেচেন বংশোদ্ভূত উদ্বাস্তু আব্দুল্লাখ আবুইয়েদোভিচ আনজোরভ প্যাটিকে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে হত্যা করে। আনজোরভ এক অডিও বার্তায় বলে যে, সে রাসূল (সঃ)এর অপমানের প্রতিশোধ নিয়েছে। এরপর পুলিশের গুলিতে তার মৃত্যু হয়। ‘ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে এক ছাত্র বলেন যে, প্যাটি প্রতিবছরই বাকস্বাধীনতা পড়াতে গিয়ে মুহাম্মদ (সাঃ)এর ব্যাঙ্গচিত্র ছাত্রদের দেখাতেন। এই হত্যাকান্ডের দু’দিন পর আইফেল টাওয়ারের কাছে দু’জন মহিলা হিজাব পরিহিত দু’জন মুসলিম মহিলাকে ছুরিকাঘাত করে। আক্রমণের সময় তারা মুসলিম মহিলাদেরকে ‘নোংড়া আরব’ বলে গালি দেয়। এই ঘটনাগুলি ফরাসী সমাজে ইসলামোফোবিয়াকেই শুধু সামনে টেনে আনছে না, ফ্রান্সের সেকুলার সংস্কৃতির ভিতের মাঝে পরস্পরবিরোধী চিন্তাগুলিকেও আলোচনায় নিয়ে আসছে।

ফরাসীরা প্যাটির হত্যাকান্ডকে ফরাসী রিপাবলিকের উপর হামলা হিসেবে দেখছে। ফরাসী প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ বলেছেন যে, প্যাটি হলো ফরাসি রিপাবলিকের প্রতিচ্ছবি। ফ্রান্সের পার্লামেন্টে জাতীয় সঙ্গীতের পরপরই এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয় প্যাটির জন্যে। পার্লামেন্টের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড ফেরান্ড বলেন যে, প্যাটির হত্যাকান্ডে ফ্রান্স ঐক্যবদ্ধ; কারণ প্যাটির পিছনেই রয়েছে ‘হিউম্যানিস্ট’ ফরাসি রিপাবলিক। ফরাসী স্বরাষ্ট্র দপ্তর বলছে যে, বন্ধ করে দেয়া মসজিদ থেকে প্যাটিকে ভীতি প্রদর্শন করার জন্যে আহ্বান করা হয়েছিল। তারা দাবি করছেন যে, মসজিদ থেকেই প্যাটির হত্যার ‘ফতওয়া’ আসে। ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেরাল্ড ডারমানিন আরও একধাপ এগিয়ে টেলিভিশনে এসে বলেন যে, ফ্রান্সের সুপারমার্কেটে বিভিন্ন জাতির জন্যে আলাদা খাবার পাওয়া যায়; এর ফলে ফ্রান্সের ঐক্য প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে এবং বিচ্ছিন্নতা দানা বাঁধছে।

‘আল জাজিরা’র সাথে কথা বলতে গিয়ে ফরাসি মানবাধিকারকর্মী ইয়াসির লুয়াতি বলেন যে, ফ্রান্সে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার নামে সর্বত্র ক্যামেরা বসানো হয়েছে, অনেকগুলি আইন পাস হয়েছে এবং ইন্টারনেটে গোয়ান্দাগিরি করা হচ্ছে; কিন্তু তারপরেও এরূপ ঘটনা ঘটা রাষ্ট্রের ব্যর্থতারই প্রকাশ। নির্বাচনের ১৮ মাস আগে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ মহামারি এবং অর্থনৈতিক দৈন্যতাকে ঢাকতে এক ব্যাক্তির কর্মকান্ডকে ব্যবহার করে পুরো মুসলিম সমাজকে টার্গেট করছেন। ম্যাক্রঁ বলছেন যে, ফ্রান্স ঐক্যবদ্ধ; কিন্তু সেই ঐক্যের মাঝে মুসলিমরা নেই। একইসাথে তিনি ডানপন্থীদের মাঝেও তার সমর্থন বৃদ্ধি করতে চাইছেন। ইসলামোফোবিয়া কমাতে কাজ করা মুসলিম এনজিওগুলিকেও টার্গেট করা হচ্ছে। তবে ফ্রান্সের বুদ্ধিজীবিরা ফ্রান্সে ইসলামোফোবিয়া রয়েছে, সেটা স্বীকার করতে নারাজ। ‘দ্যা গ্লোবাল পলিসি রিসার্চ’এর সিনিয়র ফেলো জাক রোঁলা বলছেন যে, ফ্রান্স নিজেকে সেকুলার ধারণার ঝান্ডাবাহী মনে করে; যেখানে মানুষের আইনকে স্রষ্টার আইন থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। আর ফরাসীরা এই চিন্তাকে রক্ষা করতে সবকিছু করবে। তিনি বলেন যে, ‘উগ্রবাদী ইসলাম’এর বিরুদ্ধে যথেষ্ট শক্ত ভূমিকা না নেয়ার সমালোচনা রয়েছে ম্যাক্রঁর বিরুদ্ধে। ফ্রান্সের সমস্যা ইসলামোফোবিয়া নয়, বরং ইসলামের রাজনৈতিক চিন্তাটাই আসল সমস্যা। ফরাসি পত্রিকা ‘লে ফিগারো’র প্রবীণ সাংবাদিক রনোঁ জিরাঁদ আরও কঠোর ধারণা পোষণ করেন। তিনি বলেন যে, মুসলিমরা ফ্রান্সে এসে বিনামূল্যে শিক্ষা, চিকিৎসা এবং অন্যান্য সুবিধা পাবার পর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করে বরং ফরাসি সেকুলার স্কুল, যা তাদের সমাজের একটা স্তম্ভ, সেটাকে আক্রমণ করেছে। তিনি বলেন যে, ফ্রান্সের সামরিক বাহিনীতে মুসলিমরা রয়েছে; অনেক মসজিদও রয়েছে ফ্রান্সে। তবে ফ্রান্সের সেকুলার চিন্তা বলছে যে, ধর্ম এবং রাজনীতি থাকবে আলাদা। নিজের বাড়িতে ধর্মকর্ম করায় কোন বাধা থাকবে না; তবে প্রকাশ্যে ধর্মের কোন ভূমিকাই থাকবে না। যারা ফ্রান্সের এই চিন্তাধারাকে ভালোবাসতে পারে না, তাদের ফ্রান্স ছেড়ে চলে যাওয়া উচিৎ।

‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ১৯০৫ সালে ফ্রান্সে যে সেকুলার আইন তৈরি হয়েছিল, তা ছিল মূলতঃ ক্যাথোলিক চার্চের প্রভাবকে কমাবার জন্যে। সেসময় ফ্রান্সের বেশিরভাগ জনগণই ছিল ক্যাথোলিক। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্স তার উপনিবেশগুলিকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হলে বহু মুসলিম ফ্রান্সে এসে হাজির হয়; এভাবেই ফ্রান্সে ইসলামের আবির্ভাব হয়। বর্তমানে ফ্রান্সে মুসলিম জনসংখ্যা একেবারে কম নয়; যা ফ্রান্সের বাস্তবতাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। ১৯৬২ সালে আলজেরিয়া থেকে ফ্রান্সের লজ্জাজনক বিদায়ের পর ফরাসিদের কাছে ইসলামের একবিন্দু উপস্থিতিও অসহ্য হয়ে দাঁড়ায়। যদিও ফ্রান্সে ক্যাথোলিক অনুষ্ঠানের দিনগুলিতে এখনও রাষ্ট্রীয় ছুটি থাকে, তথাপি ইসলামের যেকোন দৃশ্যমান ব্যাপারকে ফরাসিরা তাদের সেকুলার চিন্তার বিরোধী হিসেবে দেখতে থাকে। যেমন হিজাব বর্তমানে ফ্রান্সে সবচাইতে আলোচ্য বিষয়গুলির একটা।

ফ্রান্স তার সেকুলার আদর্শের মাঝেই পরস্পরবিরোধী অবস্থানে রয়েছে। বাকস্বাধীনতা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতাকে সেকুলার চিন্তার ভিত্তি হিসেবে ধরলেও ধর্মীয় আবেগকে আঘাত করেই তারা বাকস্বাধীনতাকে উপরে স্থান দিয়েছে। আবার সংখ্যাগরিষ্ঠ ক্যাথোলিকদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়া থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করলেও সংখ্যালঘু মুসলিমদের অনুভূতি তাদের কাছে গুরুত্ব পায়নি; উল্টা মুসলিমদের ধর্মকর্ম পালনকে ফরাসীরা দেখেছে ফ্রান্সের সেকুলার ব্যবস্থার প্রতি হুমকি হিসেবে। ফ্রান্স এখন দ্বিধাবিভক্ত; মুসলিমরা কি ফ্রান্সের সেকুলার বাস্তবতার শিকার? নাকি ফরাসিরা ইসলামিক বাস্তবতার শিকার? তারা কি ইসলামোফোবিয়া কাটাতে ইসলামকে পরিবর্তন করতে উদ্যত হবে? নাকি সেকুলার আইনের চাপে সহিংসতাকে আরও বৃদ্ধি করবে? যেদিকেই তারা পা বাড়াক না কেন, ফরাসি রিপাবলিক যে আরও দুর্বল হচ্ছে, তা এখন নিশ্চিত।