Showing posts with label Baluchistan. Show all posts
Showing posts with label Baluchistan. Show all posts

Tuesday, 18 March 2025

পাকিস্তানের ট্রেনে হামলা - ভারত কেন সন্ত্রাসী রাষ্ট্র নয়?

১৯শে মার্চ ২০২৫

পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলার এই ঘটনা যে বাস্তবতাকে এড়িয়ে যায় না তা হলো, পাকিস্তান রাষ্ট্র তার জনগণের মৌলিক চাহিদা পুরণে যথেষ্ট যত্নবান হয়নি কখনোই। এছাড়াও পাকিস্তান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় এবং তার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জাতিগত বৈষম্যকেই প্রাধান্য দিয়েছে সর্বদা। একারণেই যুগ যুগ ধরে পুরো পাকিস্তান জুড়ে অস্থিরতা তৈরির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ভারতীয়রা এই অস্থিরতায় ইন্ধন যুগিয়েছে মাত্র।


গত ১১ই মার্চ পাকিস্তানের বালুচিস্তান প্রদেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী 'বালুচ লিবারেশন আর্মি' বা 'বিএলএ'এর একটা সশস্ত্র গ্রুপ দুর্গম অঞ্চলে 'জাফর এক্সপ্রেস' নামের একটা ট্রেন হাইজ্যাক করে ৪'শ মানুষকে জিম্মি করে। প্রায় ৩৬ ঘন্টা পর পাকিস্তানের স্পেশাল ফোর্স 'এসএসজি'র 'আল জারার কোম্পানি' ট্রেনটার নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়। এর ফলাফল হিসেবে ১৮ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, ৩ জন রেলওয়ে কর্মী, ৫ জন সাধারণ যাত্রী এবং ৩৩ জন বিচ্ছিন্নতাবাদীর মৃত্যু হয় এবং ৩'শ ৫৪ জন যাত্রীকে উদ্ধার করা হয় বলে সরকারি সূত্র বলছে। আক্রমণকারীরা ট্রেন লাইনে বোমা ফাটিয়ে ট্রেন থামানোর ব্যবস্থা করেছিল। 'এসোসিয়েটেড প্রেস'এর এক খবরে প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে বলা হয় যে, আক্রমণকারীরা ট্রেনের যাত্রীদের সকলের পরিচয়পত্র চেক করতে থাকে এবং যারা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, তাদেরকে গুলি করে মেরে ফেলতে থাকে। হত্যা করা ব্যক্তিদের মাঝে সেনাসদস্য ছাড়াও সংখ্যালঘু শিয়া এবং পাঞ্জাবিরা ছিল। বালুচ অধিবাসীদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়। একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন যে, হামলাকারীরা কিছু যাত্রীর হাত বেঁধে তাদেরকে কয়েকবার গুলি করে হত্যা করে। একজন মহিলার চোখের সামনে সামরিক বাহিনীতে কাজ করা তার তিন ছেলেকে হত্যা করা হয়। পাকিস্তানী সেনাদের সাথে আক্রমণকারীদের গুলি বিনিময়ের সময় বেশ কিছু যাত্রী পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

একইদিনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লেঃ জেনারেল আহমাদ শরীফ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন যে, এই সন্ত্রাসী হামলা এবং এর আগের আক্রমণগুলির পেছনে ইন্ধন যুগিয়েছে ভারত। তিনি অবশ্য ভারতের জড়িত থাকার ব্যাপারে কোন প্রমাণ উপস্থাপন করেননি। তিনি উল্লেখ করেন যে, ২০১৬ সালে কুলভূষণ যাদব নামে ভারতের নৌবাহিনীর একজন অফিসার পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছিলেন। ভারতের পক্ষে গোয়ান্দাবৃত্তির কাজ করা এবং বালুচিস্তান ও অন্যান্য অঞ্চলের গেরিলা গ্রুপগুলিকে ইন্ধন দেয়ার অপরাধে তাকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হয়েছিল। জেনারেল চৌধুরী বলেন যে, কিছু আক্রমণকারী পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে; যাদেরকে পাকরাও করার চেষ্টা চলছে। হতাহতের মাঝে বেশিরভাগই ছিল ট্রেনের যাত্রীদেরকে রক্ষা করতে যাওয়া নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং নিজেদের গ্রামের বাড়িতে ফেরত যাওয়া সেনা সদস্য। তিনি আরও বলেন যে, ভারতীয় মিডিয়াতে 'বিএলএ'এর প্রকাশ করা ভিডিও প্রচার করা হয়; যেগুলি হয় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআইএর মাধ্যমে তৈরি, নতুবা পুরোনো ছবি। জেনারেল চৌধুরী বলেন যে, হামলাকারীরা মহিলা এবং শিশুদেরকে আলাদা করে ৮ ঘন্টা পরে ছেড়ে দেয়। তারা পুরুষ যাত্রীদেরকে বাইরে নিয়ে আসে এবং যাত্রীদের জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা করে। 'আল জাজিরা' বলছে যে, তারাও যাত্রীদের সাথে কথা বলে সেটাই জানতে পেরেছে। জেনারেল চৌধুরী বলেন যে, আক্রমণকারীদের বড় অংশ পাহাড়ি অঞ্চলে লুকিয়ে পড়ে। আর ছোট একটা গ্রুপ জিম্মিদের সাথে থাকে। থেকে যাওয়া হামলাকারীদের প্রায় সকলেই ছিল সুইসাইড স্কোয়াডের সদস্য। পাকিস্তানি ইন্টেলিজেন্স বুঝতে পেরেছে যে, হামলাকারীরা ওয়াকিটকির মাধ্যমে আফগানিস্তানে তাদের ইন্ধনদাতাদের সাথে কথা বলছিল। দ্বিতীয় দিনে সামরিক স্নাইপারদের গুলিতে জিম্মিদের কাছে দাঁড়ানো কয়েকজন সুইসাইড স্কোয়াড হামলাকারীর মৃত্যু হলে কয়েকজন জিম্মি পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এরপরই জিম্মি উদ্ধারের মূল অপারেশন চালানো হয়। উদ্ধার অভিযানের সময় কোন জিম্মির মৃত্যু হয়নি বলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়। 'আল জাজিরা'র সাথে কথা বলতে গিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিরাপত্তা বাহিনীর অফিসার বলেন যে, গেরিলাদের জীবন্ত ধরার জন্যে সর্বোচ্চ লক্ষ্য থাকলেও এধরণের অপারেশনে জিম্মি উদ্ধারে গেরিলাদেরকে বাঁচিয়ে রাখা কঠিন।
 
২০১৬ সালে কুলভূষণ যাদব নামে ভারতের নৌবাহিনীর একজন অফিসার পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছিলেন। ভারতের পক্ষে গোয়ান্দাবৃত্তির কাজ করা এবং বালুচিস্তান ও অন্যান্য অঞ্চলের গেরিলা গ্রুপগুলিকে ইন্ধন দেয়ার অপরাধে তাকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমা মিডিয়া যখন পাকিস্তানের অভ্যন্তরে হামলায় ভারতের সংশ্লিষ্টতা দেখতে পাচ্ছে না, তখন এটা বলাই বাহুল্য যে, পশ্চিমারা ভারত-ঘেঁষা নীতিতেই অটল থাকবে। কারণ বালুচিস্তানের গেরিলাদেরকে পশ্চিমারা সন্ত্রাসী সংগঠন বলে আখ্যা দিয়েছে। এখন এই সংগঠনগুলির সাথে ভারতের সংশ্লিষ্টতা মেনে নেয়ার অর্থ হলো ভারত সন্ত্রাসবাদের ইন্ধনদাতা। 


হামলার আন্তর্জাতিক চেহারা

দিল্লীতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রানধির জাইসওয়াল সাংবাদিকদের বলেন যে, পাকিস্তানের ট্রেন হামলায় ভারতের যোগসাজসের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। তিনি বলেন যে, পাকিস্তানের নিজস্ব ভূখন্ডই সন্ত্রাসের আখড়া। পাকিস্তানের উচিৎ নিজের অভ্যন্তরীণ সমস্যা ও ব্যর্থতাকে ঢাকতে অন্যের উপর দোষ না চাপিয়ে নিজের দিকে তাকানো। এর আগে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র শাফকাত আলী খান বলেন যে, এই হামলার পরিকল্পনা আফগানিস্তানে বসে করা হয়েছে। এবং সেখানে হামলাকারীদের সাথে ইন্ধনদাতাদের যোগাযোগ হয়েছে। পাকিস্তান বরাবরই আফগানিস্তান সরকারকে বলেছে যে, তারা যেন 'বিএলএ'কে তাদের ভূখন্ড ব্যবহার করতে না দেয়। কাবুলের তালিবান সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আব্দুল ক্বাহার বালখি এক বিবৃতিতে এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন যে, আফগানিস্তানে 'বিএলএ'র কোন উপস্থিতি নেই। তিনি আরও বলেন যে, পাকিস্তানের উচিৎ দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা না বলে নিজস্ব নিরাপত্তা জোড়দার করা এবং অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধান করা।

‘এসোসিয়েটেড প্রেস'এর এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, বালুচিস্তান প্রদেশের অনেকেই পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অভিযোগ করে আসছিল; যদিও পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার তা সর্বদাই অস্বীকার করেছে। এই প্রদেশে প্রচুর খনিজ সম্পদও রয়েছে। 'বিএলএ' পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করতে চাইছে এবং সেই লক্ষ্যে তারা এর আগেও ট্রেনে হামলা করেছে। তবে ট্রেন হাইজ্যাকের ঘটনা এটাই প্রথম। এই আক্রমণ সারা দুনিয়া থেকে নিন্দা কুড়িয়েছে; যার মাঝে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, তুরস্ক, ইরান এবং ব্রিটেন রয়েছে। ১৪ই মার্চ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদেও এই আক্রমনের নিন্দা জানানো হয় এবং এই আক্রমণকে সন্ত্রাসী আক্রমণ আখ্যা দিয়ে দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তির দাবি করা হয়।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ২০২১ সালের অগাস্ট থেকে আফগানিস্তানের তালিবান সরকার পাকিস্তানের 'তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান' বা 'টিটিপি'কে সহায়তা দিয়ে আসছে; যারা পাকিস্তানের অভ্যন্তরে অনেক হামলার সাথে জড়িত ছিল। এছাড়াও সেই প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ‘বিএলএ'র সাথে 'টিটিপি' এবং আইসিসের খোরাসান শাখার যোগাযোগ রয়েছে। যদিও এই গ্রুপগুলির লক্ষ্য ভিন্ন, তথাপি নিজেদের স্বার্থে তারা একে অপরের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলে।
 
বালুচিস্তানে চীনের কৌশলগত প্রকল্পে কাজ করা চীনা নাগরিকদের উপর হামলার ব্যাপারটা ভূরাজনৈতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পাকিস্তানের গোয়াদরে চীনের কৌশলত সমুদ্রবন্দর তৈরিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারত কেউই ভালো চোখে দেখেনি। চীনাদের উপর সন্ত্রাসী হামলা যেন একপ্রকার গ্রীন লাইটই পাচ্ছে পশ্চিমাদের কাছ থেকে। হাজার হলেও চীনকে নিয়ন্ত্রণে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের বড় বন্ধু। 


বালুচিস্তানের ভূরাজনীতি

‘বিবিসি'র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, বালুচিস্তান হলো পাকিস্তানের পুরো ভূখন্ডের ৪৪ শতাংশ। তবে জনসংখ্যার দিক থেকে পাকিস্তানের ২৪ কোটি মানুষের মাত্র ৬ শতাংশ হলো বালুচ। তবে খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রে এই প্রদেশ পাকিস্তানের সবচাইতে ধনী। কানাডার 'বারিক গোল্ড' কোম্পানি এখানে 'রেকো ডিক' খনি ডেভেলপ করছে; যা কিনা বর্তমানে ডেভেলপের মাঝে থাকা সর্ববৃহত তামা এবং স্বর্ণ খনিগুলির অন্যতম। এই প্রদেশে চীনারা 'চায়না পাকিস্তান ইকনমিক করিডোর' বা 'সিপেক' নামের কৌশলগত প্রকল্পে বিশাল বিনিয়োগ করেছে। এই প্রকল্পের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো গোয়াদর গভীর সমুদ্রবন্দর; যা কিনা চীনের 'বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ'এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই প্রদেশে চীনারা খনিজ প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে এবং গোয়াদরে একটা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর তৈরি করছে। 'বিএলএ' এই প্রকল্পগুলির ঘোর বিরোধী। ইরান এবং আফগানিস্তানের সাথে বিশাল সীমানা ছাড়াও আরব সাগরে এর রয়েছে বেশ লম্বা সমুদ্রতট। বালুচ জাতির মাঝে বেশ অনেকেই আফগানিস্তান এবং ইরানের বাসিন্দা। ২০২৪এর জানুয়ারিতে ইরান এবং পাকিস্তান একে অপরের ভূমিতে বিমান হামলা করে। তাদের উভয়েরই যুক্তি ছিল যে, অপর দেশের অভ্যন্তরে বিদ্রোহীদের ক্যাম্প রয়েছে। বালুচিস্তানের বাসিন্দারা অভিযোগ করে যে, পাকিস্তান সরকার বালুচিস্তানের খনিজগুলিকে তুলছে ঠিকই, কিন্তু সেখানকার অধিবাসীদের অবস্থার উন্নয়ন করছে না। ১৯৪৮ সালে শুরু হয়ে বালুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ১৯৭০এর দশক পর্যন্ত তাদের কর্মকান্ড চালিয়ে গিয়েছিল। এরপর বেশকিছু সময় পর ২০০৩ সাল থেকে তারা আবারও সক্রিয় হয়। 'বালুচ লিবারেশন আর্মি' বা 'বিএলএ' এবং 'বালুচ লিবারেশন ফ্রন্ট' বা 'বিএলএফ' প্রধান বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ। এর মাঝে 'বিএলএ'র সক্ষমতা সবচাইতে বেশি। যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন 'বিএলএ'কে সন্ত্রাসী সংগঠন বলে আখ্যা দিয়ে থাকে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এক অপারেশনে বালুচ নেতা নওয়াব আকবর খান বুগতিকে হত্যা করে। অভিযোগ রয়েছে যে, পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে বহু বালুচ জনগণ গুম হয়েছে। পাকিস্তান সরকার অবশ্য এগুলি অস্বীকার করে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে 'বিএলএ' পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী ছাড়াও বড় প্রকল্পগুলিতে কাজ করা চীনা নাগরিকদের উপর হামলা করছে। 'বিএলএফ'ও বিদেশী নাগরিকদের উপর হামলা করছে। পাকিস্তান সরকার দাবি করছে যে, ইরান এবং আফগানিস্তানে এই গ্রুপগুলির ঘাঁটি রয়েছে। এবং এদের অনেককেই ভারত অর্থায়ন করছে।

পাকিস্তানের ট্রেনে হামলার ঘটনা পশ্চিমা মিডিয়াতে ততটা গুরুত্বের সাথে প্রচারিত হয়নি; যতটা দেখা গিয়েছে ভারতের উপর বিভিন্ন হামলার সময়। একইসাথে ভারতের উপর হামলার সময় পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতাকে যতটা হাইলাইট করা হয়েছে, ততটা কখনোই দেখা যায়নি পাকিস্তানের অভ্যন্তরে হামলায় ভারতের জড়িত থাকার ব্যাপারে। এমনকি যখন ভারতের সামরিক বাহিনীর একজন অফিসার পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার পরেও পশ্চিমা মিডিয়া পাকিস্তানের অভ্যন্তরে হামলায় ভারতের সংশ্লিষ্টতা দেখতে পাচ্ছে না, তখন এটা বলাই বাহুল্য যে, পশ্চিমারা ভারত-ঘেঁষা নীতিতেই অটল থাকবে। কারণ বালুচিস্তানের গেরিলাদেরকে পশ্চিমারা সন্ত্রাসী সংগঠন বলে আখ্যা দিয়েছে। এখন এই সংগঠনগুলির সাথে ভারতের সংশ্লিষ্টতা মেনে নেয়ার অর্থ হলো ভারত সন্ত্রাসবাদের ইন্ধনদাতা। আর বালুচিস্তানে চীনের কৌশলগত প্রকল্পে কাজ করা চীনা নাগরিকদের উপর হামলার ব্যাপারটা ভূরাজনৈতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পাকিস্তানের গোয়াদরে চীনের কৌশলত সমুদ্রবন্দর তৈরিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারত কেউই ভালো চোখে দেখেনি। চীনাদের উপর সন্ত্রাসী হামলা যেন একপ্রকার গ্রীন লাইটই পাচ্ছে পশ্চিমাদের কাছ থেকে। হাজার হলেও চীনকে নিয়ন্ত্রণে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের বড় বন্ধু। তবে সন্ত্রাসী হামলার এই ঘটনাগুলি যে বাস্তবতাকে এড়িয়ে যায় না তা হলো, পাকিস্তান রাষ্ট্র তার জনগণের মৌলিক চাহিদা পুরণে যথেষ্ট যত্নবান হয়নি কখনোই। এছাড়াও পাকিস্তান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় এবং তার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জাতিগত বৈষম্যকেই প্রাধান্য দিয়েছে সর্বদা। একারণেই যুগ যুগ ধরে পুরো পাকিস্তান জুড়ে অস্থিরতা তৈরির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ভারতীয়রা এই অস্থিরতায় ইন্ধন যুগিয়েছে মাত্র।

Tuesday, 5 January 2021

বালুচিস্তানে ভারতের প্রক্সি যুদ্ধ পাকিস্তানের জাতীয়তাবাদী নীতিরই ফলাফল

৫ই জানুয়ারি ২০২১
বালুচিস্তানের বিচ্ছন্নতাবাদী নেত্রী করিমা বালোচের মৃত্যুর পর করাচির রাস্তায় প্রতিবাদ। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের এনজিও ‘ইইউ ডিজইনফোল্যাব’ তাদের এক বিশ্লেষণে বলে যে, ভারতীয় ইন্ধনে চলা ‘আফ্রিকান রুরাল এন্ড এগ্রিকালচারাল ক্রেডিট অর্গানাইজেশন’এর পক্ষে বালুচিস্তানের নেত্রী কারিমা বালোচ বক্তৃতা দিয়েছেন। 



গত ২২শে ডিসেম্বর কানাডার টরোন্টো শহরে করিমা মেহরাব নামে এক মহিলার মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। করিমা বালোচ নামে পরিচিত এই মহিলা পাকিস্তানের দক্ষিণের বালুচিস্তান প্রদেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন। ২০ তারিখ থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন বলে বলছে তার আত্মীয়রা। টরোন্টো পুলিশ এক বিবৃতিতে বলে যে, মৃতের সকলকিছু বিশ্লেষণের পর পুলিশ অফিসাররা নিশ্চিত হয়েছেন যে, এই মৃত্যু কোন হত্যাকান্ড নয়। মৃতের পরিবারকে এব্যাপারে জানানো হয়েছে। এক টুইটার বার্তায় টরোন্টো পুলিশ জানায় যে, পুলিশ এই মৃত্যুর ব্যাপারে মিডিয়ার যথেষ্ট আগ্রহের কথা জানে। ‘ভয়েস অব আমেরিকা’ বলছে যে, করিমা বালোচ ২০১৫ সালে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে টরোন্টোতে বসবাস করছিলেন। পাকিস্তান সরকার তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ এনেছিল। তার মৃত্যুর সাথেসাথেই মিডিয়াতে অনেকেই সন্দেহ করা শুরু করে যে, বালোচের মৃত্যু হয়তো পাকিস্তানি ইন্টেলিজেন্স অপারেটিভদের হাতেই হয়েছে। পাকিস্তান সরকার ইতোমধ্যেই পাকিস্তানি ইন্টেলিজেন্সকে জড়িত করার চেষ্টাকে ‘অবাস্তব’ বলে আখ্যা দিয়েছে। এবং বলেছে যে, এই কথাগুলি বলা হচ্ছে পাকিস্তানের ইমেজ নষ্ট করার লক্ষ্যে।

করিমা বালোচের স্বামী হাম্মাল হায়দার ব্যাপারটাকে একদমই মেনে নিতে পারছেন না। ব্রিটেনের ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকার সাথে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন যে, বালোচ ‘টরোন্টো সেন্টার আইল্যান্ড’এ গিয়েছিলেন; যেখান থেকে তিনি আর ফেরেননি। যাবার সময় তিনি যথেষ্ট শক্তসমর্থ মানুষ হিসেবেই গিয়েছিলেন। এখানে কোন সন্দেহভাজন কর্মকান্ডকে উড়িয়ে দেয়া যায় না; কারণ তিনি হুমকির মাঝেই ছিলেন। তার বাড়িতে দু’বার অভিযানের পর তিনি পাকিস্তান ছেড়েছিলেন। ‘বিবিসি’র সাথে কথা বলতে গিয়ে করিমা বালোচের সহকর্মী লতিফ জোহার বালোচ বলেন যে, কিছুদিন আগেই করিমা হুমকি পান যে, তাকে নাকি ‘ক্রিসমাস গিফট’ দেয়া হবে এবং ‘শিক্ষা দেয়া হবে’।

২০০৫ সাল থেকে করিমা বালোচ বালুচিস্তানে নিখোঁজ ব্যক্তিদের ব্যাপারে প্রতিবাদ শুরু করেন। প্রতিবাদকারীরা বলছেন যে, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে হাজারো মানুষের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। করিমা বালোচের পরিবারের দুইজন সদস্য নিখোঁজ হন এবং এর কিছুদিন পর তাদের মৃতদেহ পাওয়া যায়। ২০০৬ সাল থেকে ‘বালোচ স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশন’এ নাম লেখান করিমা। ২০১৩ সালে সংস্থাটাকে পাকিস্তান সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তবে এর কার্যক্রম চলমান থাকে; এবং ২০১৫ সালে করিমা বালোচ সংস্থার চেয়ারপার্সন হন। তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ এলে তিনি পাকিস্তান ছাড়েন। টরোন্টোতে তিনি তার সহকর্মী হাম্মাল হায়দারকে বিয়ে করেন। গত পাঁচ বছর ধরে সোশাল মিডিয়া ছাড়াও কানাডা এবং ইউরোপে তিনি বালুচিস্তানের ব্যাপারে যথেষ্ট সরব ছিলেন। ২০১৬ সালে ‘বিবিসি’ করিমা বালোচকে ১০০ জন প্রভাবশালী মহিলার তালিকায় রাখে। বালুচিস্তানের আন্দোলনকারীর এরকম রহস্যজনক মৃত্যু এবারই প্রথম নয়। ২০২০ সালের মে মাসে সুইডেনে বসবাসকারী বালুচিস্তানের স্বাধীনতার জন্যে কাজ করা সাংবাদিক সাজিদ হুসাইনের মরদেহ পাওয়া যায়। পুলিশ বলে যে, তিনি পানিতে ডুবে মারা গিয়েছেন এবং তা হত্যাকান্ড ছিল বলে কোন প্রমাণ নেই। ২০১২ সালে সাজিদ পাকিস্তান ছেড়ে পালিয়ে সুইডেনে আশ্রয় পান।
বালুচিস্তানে ‘সিপেক’ প্রকল্পের অধীন গোয়াদর বন্দর। ‘সিপেক’ প্রকল্পকে টার্গেট করে ভারত শুধু পাকিস্তানকেই দুর্বল করতে চাইছে না, চীনের জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পকে হুমকির মাঝে রাখছে। এতে রক্তপাত হচ্ছে পাকিস্তানিদের; ভারতের কেউ মরছে না। এহেন প্রক্সিযুদ্ধে ভারতের লজ্জিত হবার কোন কারণও থাকার কথা নয়। বরং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হবার পরেও পাকিস্তানকে কেন কষ্ট করে একত্রে রাখতে হচ্ছে, সেই প্রশ্নটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।



ভারতের ভূমিকা

পাকিস্তান সরকারের অভিযোগ হলো, বালুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের পিছনে রয়েছে ভারতের মদদ। ২০১৬ সালে ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রাক্তন অফিসার কুলভুষন যাদব পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে গোয়েন্দাবৃত্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। পাকিস্তান সরকার একটা ভিডিও ছাড়ে, যেখানে দেখা যায় যে, কুলভুষন যাদব বালুচিস্তানে বিভিন্ন হামলার পিছনে সহায়তা দিয়েছেন বলে স্বীকার করছেন। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, ২০১৭ সালের এপ্রিলে একটা সামরিক আদালতে বিচারের পর কুলভুষনের মৃত্যুদন্ডাদেশ দেয়া হয়। ভারত এব্যাপারে আন্তর্জাতিক আদালতে গেলেও আদালত পাকিস্তানের সামরিক আদালতের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। তবে দোষী ভারতীয় নাগরিককে ভারতীয় কূটনীতিবিদদের সাথে দেখা করার আদেশ দেয়। ২০১৯এর সেপ্টেম্বরে ভারতীয় কর্মকর্তারা কুলভুষনের সাথে দেখা করেন।

গত ৯ই ডিসেম্বর ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের এনজিও ‘ইইউ ডিজইনফোল্যাব’ তাদের এক বিশ্লেষণে বলে যে, ২০০৫ সাল থেকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে কেন্দ্র করে ভারত সরকার গোপনে মিথ্যা তথ্য ছড়াবার অপারেশন চালিয়ে আসছে। সাড়ে ৭’শর বেশি মিডিয়া আউটলেট এবং ১০টার বেশি এনজিওর নাম ব্যবহার করে প্রায় ১’শ ১৯টা দেশে এই অপারেশন চালাচ্ছে ভারত। এর অধীনে সাড়ে ৫’শ ইন্টারনেট ডোমেইন রয়েছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া মিডিয়া, এনজিও এবং থিঙ্কট্যাঙ্ক আবারও জীবন্ত করে চালিয়ে নেয়া হয় এই অপারেশন। এমনকি মৃত ব্যক্তিদেরও এক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। আফ্রিকা বিষয়ক এনজিওর নাম ব্যবহার করে পাকিস্তানের মানবাধিকার বিষয়ক খবরাখবর প্রচার করা হয়। উদাহরণস্বরূপ ‘আফ্রিকান রুরাল এন্ড এগ্রিকালচারাল ক্রেডিট অর্গানাইজেশন’এর পক্ষে বালুচিস্তানের নেত্রী করিমা বালোচ বক্তৃতা দিয়েছেন। ব্রাসেলস এবং জেনেভাতে অপারেট করা এই নেটওয়ার্কের মূল টার্গেট হলো পাকিস্তান; যদিও চীনও এই টার্গেটিংএর অংশ। ‘শ্রীভাস্তাভা গ্রুপ’এর নেতৃত্বে পরিচালিত এই অপারেশনের মূল লক্ষ্য হলো ভারতীয়দের মাঝে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ জাগিয়ে তোলা ও পাকিস্তান বিরোধী আবেগ উস্কে দেয়া; এবং একইসাথে ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলির বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের অবস্থানকে সুসংহত করা। ‘ইইউ ডিজইনফোল্যাব’ ভারতের এই অপারেশনের নাম দেয় ‘ইন্ডিয়ান ক্রনিকলস’। এই প্রতিবেদন পাকিস্তানের জন্যে বড় সুখবর হিসেবে আসে। এর মাধ্যমে পাকিস্তান সরকার মিডিয়াতে ভারতের বিরুদ্ধে আক্রমণে যেতে পারে। পাকিস্তান সরকার ভারতের বিরুদ্ধে ‘পঞ্চম জেনারেশনের যুদ্ধ’ বা তথ্য যুদ্ধ চালনা করার অভিযোগ করে।

ভারত অবশ্য পাকিস্তানের সকল অভিযোগ অস্বীকার করে এবং ‘ইইউ ডিজইনফোল্যাব’কেই মিথ্যা খবরের উৎস বলে আখ্যা দেয়। ১১ই ডিসেম্বর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অনুরাগ শ্রীভাস্তাভা সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে বলেন যে, ভারত নয়, বরং পাকিস্তানই মিথ্যা এবং বানোয়াট খবর প্রচার করে। ‘ইইউ ডিজইনফোল্যাব’ এর প্রতিবাদ করে ভারত সরকারের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থার হুমকি দেয়।
করাচি স্টক এক্সচেঞ্জে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হামলার পর কড়া নিরাপত্তা। ১৯৭১ সালে ভারতের সহায়তায় পাকিস্তানকে ভেঙ্গে বাংলাদেশ তৈরি হয় এবং পাকিস্তান তার অর্ধেক জনসংখ্যা হারায়। পাকিস্তান সরকারের উগ্র জাতীয়তাবাদী নীতিকে ভারত ব্যবহার করেছিল মাত্র। পাকিস্তানের সেই জাতীয়তাবাদ মূলতঃ পাঞ্জাবিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় পাকিস্তানকে জন্মের পর থেকেই বিচ্ছিন্নতাবাদের মোকাবিলা করতে হয়েছে; যদিও ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের জন্মই হয়েছিল মুসলিম সংখ্যাধিক্য এলাকাগুলি নিয়ে। জাতিগত চিন্তাকে প্রাধান্য দেয়ায় পাকিস্তান তার বাঙ্গালী, পুশতুন, বালুচ এবং সিন্ধি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। ভারত পাকিস্তানের সেই ঐতিহাসিক ভীতিকেই কাজে লাগিয়েছে। 



পাকিস্তান যেকারণে শান্তিতে নেই

করিমা বালোচ, সাজিদ হুসাইন, ‘ইন্ডিয়ান ক্রনিকলস’, কুলভুষনের ঘটনা পাকিস্তানকে স্বস্তি দেয়না। কারণ এতে পাকিস্তানের বালুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বন্ধ হয়ে যায়নি। বালুচিস্তানের গুরুত্ব আরও বেড়ে গিয়েছে গোয়াদরে চীনা বিনিয়োগে গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প শুরুর পর থেকে। গোয়াদর হলো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘চায়না পাকিস্তান ইকনমিক করিডোর’ বা ‘সিপেক’এর দক্ষিণ প্রান্ত। ‘সিপেক’এর মাধ্যমে বালুচিস্তানের গোয়াদর চীনের মূল ভূখন্ডের সাথে যুক্ত হয়েছে। বালুচিস্তানে চীনা কর্মীদের উপর বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হামলা বেশ নিয়মিত। গত জুলাই মাসে বালুচ এবং সিন্ধি বিচ্ছন্নতাবাদীরা একত্রিত হয়ে একটা জোট করে। এক যৌথ বিবৃতিতে তারা বলে যে, চীনের আগ্রাসী কর্মকান্ডে সিন্ধি এবং বালুচ উভয়েই সমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ২০২০এর জুনে করাচি স্টক এক্সচেঞ্জে হামলার জন্যে বালুচরা দায় স্বীকার করলেও তারা সিন্ধিদের কাছ থেকে সহায়তা পেয়েছে বলে বলা হয়। ওয়াশিংটন ভিত্তিক বিশ্লেষক মালিক সিরাজ আকবর ‘নিকেই এশিয়া’র সাথে কথা বলতে গিয়ে বলেন যে, দুই বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ একত্রিত হয়ে ‘সিপেক’এর জন্যে বড় সমস্যা তৈরি করতে পারলেও চীন এবং পাকিস্তানকে এই প্রকল্প বন্ধ করাতে সক্ষম হবে না। তবে তারা পাকিস্তান সরকারকে নিরাপত্তা বৃদ্ধি করতে বাধ্য করবে; যার ফলে বিচ্ছন্নতাবাদীরা সাধারণ মানুষকে চীনাদের বিরুদ্ধে আরও খেপিয়ে তুলতে পারবে। অন্যদিকে পাকিস্তান সরকার হয়তো বালুচিস্তানের জনগণকে এই প্রকল্পের সাথে আরও বেশি যুক্ত করতে চাইবে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ’এর প্রফেসর মোহন মালিকের মতে, বিচ্ছিন্নতাবাদীরা চীনের জন্যে ‘সিপেক’ প্রকল্পের খরচ বাড়িয়ে দিতে চাইবে। তিনি আরও মনে করছেন যে, এর ফলশ্রুতিতে দক্ষিণ এশিয়াতে প্রক্সি যুদ্ধ আরও বাড়বে। অত্র এলাকার রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রবিরোধী গ্রুপগুলিকে ভারত বা চীনের পক্ষে টানার একটা প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যাবে। লন্ডনের ‘ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টমিন্সটার’এর ‘স্কুল অব সোশাল সাইয়েন্সেস’এর প্রধান দিবিয়েশ আনন্দ বলছেন যে, পাকিস্তান সরকারের জন্যে বালুচিস্তানের জনগণকে ‘সিপেক’ প্রকল্পে জড়িত করার মাধ্যমে এর উন্নয়নকে পুরো অঞ্চলের জন্যে উন্নয়নের ইঞ্জিন বানানো যায়; আর উল্টোটা হলে তা হতে পারে চীনাদের গর্ব করার মতো একটা নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রকল্প, যেটাকে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ঔপনিবেশিক কর্মকান্ড বলে আখ্যা দিতে পারবে।

১৯৭১ সালে ভারতের সহায়তায় পাকিস্তানকে ভেঙ্গে বাংলাদেশ তৈরি হয় এবং পাকিস্তান তার অর্ধেক জনসংখ্যা হারায়। পাকিস্তান সরকারের উগ্র জাতীয়তাবাদী নীতিকে ভারত ব্যবহার করেছিল মাত্র। পাকিস্তানের সেই জাতীয়তাবাদ মূলতঃ পাঞ্জাবিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় পাকিস্তানকে জন্মের পর থেকেই বিচ্ছিন্নতাবাদের মোকাবিলা করতে হয়েছে; যদিও ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের জন্মই হয়েছিল মুসলিম সংখ্যাধিক্য এলাকাগুলি নিয়ে। মুসলিম পরিচয়ের চাইতে জাতিগত পরিচয়কে প্রাধান্য দেয়ায় পাকিস্তান তার বাঙ্গালী, পুশতুন, বালুচ এবং সিন্ধি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। ভারত পাকিস্তানের সেই ঐতিহাসিক ভীতিকেই কাজে লাগিয়েছে। বালুচিস্তানে ‘সিপেক’ প্রকল্পকে টার্গেট করে ভারত শুধু পাকিস্তানকেই দুর্বল করতে চাইছে না, চীনের জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পকে হুমকির মাঝে রাখছে। এতে রক্তপাত হচ্ছে পাকিস্তানিদের; ভারতের কেউ মরছে না। এহেন প্রক্সিযুদ্ধে ভারতের লজ্জিত হবার কোন কারণও থাকার কথা নয়। বরং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হবার পরেও পাকিস্তানকে কেন কষ্ট করে একত্রে রাখতে হচ্ছে, সেই প্রশ্নটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অপরদিকে পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে চীনের প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণ করাটাই যখন সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে, তখন ভারতও বালুচিস্তানে প্রক্সিযুদ্ধ চালিয়ে নিয়ে চীনা কৌশলগত প্রকল্পে বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করলে তা যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সমান্তরালেই থাকবে। পারমাণবিক যুদ্ধ নয়, বরং প্রক্সিযুদ্ধই হতে চলেছে দক্ষিণ এশিয়ায় ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের নতুন চেহারা।