Monday, 6 December 2021
সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে কেন অস্ট্রেলিয়ার সৈন্য মোতায়েন?
প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ দেশ সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের প্রধানমন্ত্রী মানাসেহ সোগাভারেএর পদত্যাগ দাবি করে গত ২৪শে নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া প্রতিবাদী সমাবেশ খুব শীঘ্রই সহিংসতায় রূপ নেয়। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা বলছে যে, মালাইতা দ্বীপ থেকে আসা বেশকিছু লোক গুয়াদালকানাল দ্বীপে অবস্থিত রাজধানী হোনিয়ারাতে সহিংসতায় যোগ দেয়। প্রায় হাজার খানেক লোক পার্লামেন্ট ভবন কমপ্লেক্সের একাংশে আগুন ধরিয়ে দেয়। পুলিশ যখন জনগণকে পার্লামেন্ট ভবন থেকে সরাবার চেষ্টা করছে, তখন হোনিয়ারা শহরে শুরু হয় লুটতরাজ। পরদিন হোনিয়ারার চায়না টাউনে চীনা মালিকানার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলিতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। শহর আইন শৃংখলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবার পর সলোমোনের প্রধানমন্ত্রী সোগাভারে অস্ট্রেলিয়ার কাছে সহযোগিতা চান। ২৪ ঘন্টার মাঝেই অস্ট্রেলিয় সরকার হোনিয়ারাতে সেনা মোতায়েন করে। নিউজিল্যান্ডও পরবর্তীতে সেখানে সেনা পাঠায়।
বর্তমান সমস্যার শুরুটা ছিল ২০১৯ সালে; যখন ৮ লক্ষ জনসংখ্যার দ্বীপ দেশ সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের সরকার ৫’শ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে তাইওয়ানের সাথে ৩৬ বছরের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। বিরোধী দলগুলি এবং গুয়াদালকানাল দ্বীপের প্রতিবেশী মালাইতাএর প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রী ড্যানিয়েল সুইদানি এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। ২০২০ সালে মালাইতাএর প্রাদেশিক সরকার সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের সরকারের আদেশ অমান্য করে তাইওয়ানের কাছ থেকে ২৫ মিলিয়ন ডলারের আর্থিক সহায়তা নেয়। ২০১৯ সালে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জ এবং কিরিবাতি দ্বীপ তাইওয়ানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক কর্তনের পর বর্তমানে মাত্র ১৫টা দেশের সাথে তাইওয়ানের কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় থাকলো। এর মাঝে ৪টা দেশ হলো প্রশান্ত মহাসাগরীয় ছোট্ট দ্বীপ দেশ।
চীন এবং তাইওয়ানের মাঝে দ্বন্দ্ব
‘দ্যা অস্ট্রেলিয়ান ফিনানশিয়াল রিভিউ’এর এক লেখায় অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলেক্সান্ডার ডাউনার বলছেন যে, সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে হস্তক্ষেপ করার ব্যাপারটা সবসময়েই চীনের কারণে ছিল। বেইজিং এবং তাইপে এই অঞ্চলে তাদের প্রভাব বিস্তারে যে প্রতিযোগিতা চালাচ্ছে, তাতে এখানে অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘমেয়াদী অবস্থান গ্রহণ করা ছাড়া উপায় নেই। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপগুলিতে স্থিতিশীলতা দেখতে অস্ট্রেলিয়াকে অনেক সময় এবং সম্পদ বিনিয়োগ করতে হবে বলে মন্তব্য করেন ডাউনার। তবে তিনি বলেন যে, অনেকেই ভুল করে মনে করছেন যে, চীন এই অঞ্চলে অস্ট্রেলিয়া এবং তার বন্ধুদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে। প্রকৃতপক্ষে চীনের লক্ষ্য হলো প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ দেশগুলিকে তাইওয়ান থেকে দূরে রাখা। এই লক্ষ্যে তারা সাম্প্রতিক সময়ে বেশ সাফল্যও পেয়েছে। শুধুমাত্র নাউরু, পালাউ, তুভালু এবং মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ এখনও তাইওয়ানের কূটনৈতিক বন্ধু হিসেবে রয়েছে। উভয় পক্ষই দ্বীপগুলিকে নিজেদের পক্ষে রাখতে ঘুস দিচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া এই অঞ্চলে তাদের সাহায্য দেয়ার কর্মসূচি অব্যাহত রাখলেও এই প্রতিদ্বন্দ্বীতা অস্ট্রেলিয়ার চেষ্টাকে সমস্যায় ফেলেছে। অস্ট্রেলিয়ার সহযোগিতা মূলতঃ গণতান্ত্রিক শাসনযন্ত্রকে আরও কর্মক্ষম করার উদ্দেশ্যে।
ডাউনার বলছেন যে, তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকার সময় ২০০৩ সালে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে আইনশৃংখলা বজায় রাখতে তার সরকার সামরিক বাহিনী প্রেরণ করে। সেবার গুয়াদালকানাল দ্বীপের সাথে মালাইতা দ্বীপের দ্বন্দ্ব থেকে বিশৃংখলা সৃষ্টি হয়। ২০১৭ সালে এই বাহিনীকে তুলে নেয়া হয়। ডাউনারের কথায় সেটা ছিল একটা বড় ভুল। কারণ যদি সেখানে খুব ছোট একটা অস্ট্রেলিয় বাহিনী থাকতো, তাহলে হয়তো সেখানকার অবস্থা আজকের মতো হতো না। ডাউনার বলছেন যে, বর্তমানে সমস্যার পিছনে গুয়ালাদালকানাল এবং মালাইতার মাঝে দ্বন্দ্বই দায়ী; আর পিছনে ইন্ধন যোগাচ্ছে দুই পক্ষের চীনের ব্যাপারে নীতি। ডাউনার মনে করছেন যে, ২০১৭ সালে অস্ট্রেলিয়া সলোমোন দ্বীপপুঞ্জ থেকে সেনা সরিয়ে ফেলার কারণে বেইজিং এবং তাইপে উভয়েই হয়তো ধারণা করেছিল যে, অস্ট্রেলিয়া অত্র অঞ্চলকে কম গুরুত্ব দিচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার থিংকট্যাংক ‘লোয়ি ইন্সটিটিউট’এর রিসার্চ ফেলো মিহাই সোরা ব্রিটেনের ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকার এক লেখায় মত দিচ্ছেন যে, সলোমোনে অস্ট্রেলিয়ার দ্রুত সামরিক হস্তক্ষেপ দেশটার দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হওয়া থেকে বাঁচিয়েছে। তিনি বলছেন যে, সমস্যার শুরুটা ছিল আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদী কোন্দলের মাঝে। তবে খুব দ্রতই তা প্রাত্যহিক জীবনের সমস্যাগুলিকে পুঁজি করে জ্বলে ওঠে। করোনাভাইরাসের কারণে দেশের স্বাস্থ্যগত সমস্যা এবং এর ফলফলস্বরূপ অর্থনৈতিক ধ্বস মানুষকে সহিংসতা এবং লুটতরাজের দিকে আগ্রহী করেছে। শিক্ষার অভাব এবং বেকারত্বে জর্জরিত যুবসমাজ যখন হতাশায় ডুবে আছে, তখন চরম দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদদের সিদ্ধান্তের প্রতি মানুষের আনুগত্যের ঘাটতি তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের সমস্যার কেন্দ্রে ছিল দেশটার অসমান অর্থনৈতিক উন্নয়ন। দেশটার রাজধানী হোনিয়ারার অবস্থান হলো গুয়াদালকানাল দ্বীপে; যেকারণে বেশিরভাগ উন্নয়ন কর্মকান্ড হয়েছে এই দ্বীপে। পাশের দ্বীপ মালাইতাএর জনগণ এই উন্নয়নের হিস্যা না পাওয়ায় ছিল ক্ষুব্ধ। মালাইতা দ্বীপ থেকেই প্রতিবাদ শুরু হলেও পরবর্তীতে তা অন্যান্য অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক ইস্যুর মাঝে হারিয়ে যায়।
সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের ভূকৌশলগত অবস্থান
ভূকৌশলগতভাবে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের অবস্থান অস্ট্রেলিয়ার জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূলের প্রধান বন্দরগুলির সাথে সবচাইতে বেশি বাণিজ্য হয় এশিয়ার দেশগুলির। আর এই বাণিজ্য সাধনের জন্যে বাণিজ্যিক জাহাজগুলিকে পপুয়া নিউগিনির পূর্ব উপকূল থেকে শুরু করে পূর্বদিকে প্রায় দুই হাজার কিঃমিঃ পর্যন্ত সমুদ্রে অবস্থিত দ্বীপগুলির ফাঁক দিয়ে প্রবাহিত প্রণালিগুলির মাঝ দিয়ে যেতে হয়। সবচাইতে বেশি জাহাজ চলাচল করে নিউগিনি এবং নিউ ব্রিটেন দ্বীপের মাঝ দিয়ে; এবং নিউ আয়ারল্যান্ড এবং বোগেনভিল দ্বীপের মাঝ দিয়ে। সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের দ্বীপগুলি এই দুই বাণিজ্য রুট ঘেঁষে অবস্থিত। এই দ্বীপগুলিকে জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেবার চেষ্টা করে। এই চেষ্টায় বাধা হয়ে দাঁড়ায় যুক্তরাষ্ট্র। এই দ্বন্দ্বে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের গুয়াদালকানাল দ্বীপ বিখ্যাত হয়ে যায়। উভয় পক্ষই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিয়ে রাজি হয়নি। এর কারণ হলো এই দ্বীপগুলির নিয়ন্ত্রণের উপর অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা নির্ভর করছিল। প্রায় ৮০ বছর পর এখনও সেই বাস্তবতা পাল্টায়নি। একারণে অস্ট্রেলিয়া এই দ্বীপ দেশগুলির নিরাপত্তা নিয়ে সর্বদাই চিন্তিত।
অস্ট্রেলিয়ার জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘অস্টাল’ গত অক্টোবরে বলে যে, তাদের তৈরি করা ১৩তম ‘গার্ডিয়ান ক্লাস’ প্যাট্রোল বোট অস্ট্রেলিয়ার সরকার পপুয়া নিউগিনিকে দান করেছে। ২০১৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার সরকার ২’শ ৩৬ মিলিয়ন ডলার খরচে ২১টা প্যাট্রোল বোট অর্ডার করে। এই বোটগুলি প্রশান্ত মহাসাগরীয় ১২টা দেশের জন্যে তৈরি করা হচ্ছে; যা কিনা এর আগে অস্ট্রেলিয়া সরকারের দান করা প্যাট্রোল বোটগুলিকে প্রতিস্থাপন করবে। পপুয়া নিউগিনি এবং সলোমোন দ্বীপপুঞ্জ ছাড়াও এই ১২টা দেশের মাঝে রয়েছে ফিজি, ফেডারেটেড স্টেটস অব মাইক্রোনেশিয়া, টোঙ্গা, কুক দ্বীপপুঞ্জ, কিরিবাতি, মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ, পালাউ, সামোয়া, তুভালু, ভানুয়াতু; এবং ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপপুঞ্জের মাঝে অবস্থিত তিমর লেস্তে। অতি ছোট এই দেশগুলি প্রত্যেকেই জাতিসংঘে একটা ভোটের মালিক। অথচ এদের নিজেদের নিরাপত্তা নিজেদের হাতে নেই। এই দেশগুলির কূটনৈতিক কর্মকান্ড অস্ট্রেলিয়ার দ্বারা যথেষ্ট প্রভাবিত ছিল সর্বদা। এই দেশগুলির তাইওয়ানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা এর বড় উদাহরণ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে চীনের অর্থনৈতিক আগ্রাসী ভূমিকা এই দ্বীপ দেশগুলির উপর অস্ট্রেলিয়ার নিয়ন্ত্রণকে নড়বড়ে করে ফেলেছে।
অস্ট্রেলিয়ার সমুদ্র বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক অবস্থানে থাকা পপুয়া নিউগিনি এবং সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে চীনা অর্থনৈতিক প্রভাব অস্ট্রেলিয়াকে বিচলিত করেছে। একইসাথে কূটনৈতিক দ্বন্দ্বে এগিয়ে থাকার জন্যে চীনারা যখন তাইওয়ানের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, তখন অপেক্ষাকৃত বড় পুঁজির এই এশিয় প্রতিদ্বন্দ্বীরা প্রশান্ত মহাসাগরীয় ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র দেশগুলির উপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করছে। চীন এবং তাইওয়ানের কাছ থেকে মিলিয়ন ডলারের সহায়তা পেতে রাজনীতিবিদদের মাঝে জন্ম নিয়েছে লালসা; যা একইসাথে উস্কে দিয়েছে গুয়াদালকানাল এবং মালাইতাএর মাঝে আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদের দ্বন্দ্ব। দামি এই অবকাঠামোগত বিনিয়োগের সামনে অস্ট্রেলিয়ার গণতান্ত্রিক কাঠামো শক্ত করার সহায়তাগুলি ম্লান হয়ে গিয়েছে। ২০০৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে অস্ট্রেলিয়ার সেনা মোতায়েন ছিল দেশটার আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদের দ্বন্দ্বকে পুঁজি করেই। এখন নতুন করে শুরু হওয়া দ্বন্দ্ব আবারও সেখানে অস্ট্রেলিয়ার সেনা মোতায়েনের সুযোগ করে দিয়েছে। যদিও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র চীনের সাথে ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, তথাপি ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ চিন্তার অংশ অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড এই অঞ্চলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকতে চায়। সহিংসতায় সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের পুড়ে যাওয়া বাড়িঘরগুলি সেক্ষেত্রে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর জন্যে প্রভাব ধরে রাখার ছুতো মাত্র।
Saturday, 4 December 2021
পুঁজিবাদ কি পৃথিবীর জলবায়ুকে বাঁচাতে পারলো?
স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে হয়ে গেলো জলবায়ু সন্মেলন ‘কপ২৬’। ২৬তম এই আসরের সাফল্য কতটুকু, তা নিয়ে যেমন প্রশ্ন ছিল, তেমনি উত্তর মেলেনি বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় জলবায়ু সমস্যার সমাধান কিভাবে হবে। গ্লাসগোতে হাজারো পরিবেশবাদীরা বিক্ষোভ করেছে। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, একদল বামপন্থীদের প্লাকার্ডে লেখা ছিল ‘ক্যাপিটালিজম ইজ কিলিং দ্যা প্ল্যানেট’; অর্থাৎ ‘পুঁজিবাদ বিশ্বটাকে মেরে ফেলছে’। আসলেই কি তাই? পুঁজিবাদ কি গ্লাসগোর বৈঠকে এই অভিযোগের জবাব দিতে পেরেছে? ‘কপ২৬’ বৈঠকের শুরুতে ছিল বিজ্ঞানীদের আশংকা এবং বৈঠকের শেষে ছিল প্রতিনিধিদের একগুচ্ছ ঐচ্ছিক প্রতিশ্রুতি, যার আন্তরিকতা নিয়ে রয়েছে বিস্তর প্রশ্ন।
‘ডয়েচে ভেলে’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ‘কপ২৬’ বৈঠকের শুরু হয়েছিল প্রতিশ্রুতির মাঝ দিয়ে; কিন্তু শেষ হয়েছে ক্ষমা চাইবার মাধ্যমে। বৈঠকের শেষে প্রতিনিধিরা একটা সমঝোতায় পৌঁছান ঠিকই। বেশিরভাগ দেশই নতুন করে গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমন কমাবার উচ্চাভিলাসী টার্গেট বাস্তবায়ন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে বিজ্ঞানীরা বলেছিলেন যে, ইউরোপে শিল্প বিপ্লব শুরুর সময়ের তুলনায় বর্তমানের বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধির মাঝে রাখতে না পারলে জলবায়ুগত বিপর্জয় দেখা দেবে। অনেকেই মনে করছেন যে, তাপমাত্রা এই সীমার মাঝে রাখার জন্যে গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমন যতটা কমানো দরকার ছিলো, তা ‘কপ২৬’ বৈঠক থেকে প্রতিশ্রুত হয়নি। বৈঠকের শেষ মুহুর্তে ভারত একটা শব্দ পরিবর্তন করে ‘কয়লার ব্যবহার বন্ধ করা’র স্থানে ‘কয়লার ব্যবহার কমানো’কে অন্তর্ভুক্ত করায়। একইসাথে বৈঠকে খনিজ জ্বালানির উপর থেকে ভর্তুকি পুরোপুরি প্রত্যাহার করার ব্যাপারে সমঝোতা হয়। অনেক দেশ তাদের গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমন পুরোপুরি বন্ধ করার টার্গেট ঘোষণা করে। অপরদিকে ধনী দেশগুলি জলবায়ু পরিবর্তনে সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলিকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যাপারে পিছু হটে। ‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, আগামী বছর ‘কপ২৭’ বৈঠক বসবে মিশরে; যেখানে গ্রীনহাউজ গ্যাসের প্রধান নির্গমনকারী দেশগুলিকে নতুন টার্গেট দিতে বলা হবে। কিন্তু ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি তাপমাত্রার টার্গেটই যখন ‘লাইফ সাপোর্ট’এ রয়েছে, তখন জলবায়ু নিয়ে আন্দোলন করা গ্রুপগুলি বলছে যে, ‘কপ২৭’ এখনই মৃত।
‘কপ২৬’ ... সাফল্য, নাকি হতাশা?
বৈঠকের শেষ দিন ১৩ই নভেম্বর ‘কপ২৬’এর প্রেসিডেন্ট অলোক শর্মা তার বক্তব্যে বলেন যে, যেভাবে এই বৈঠক চলেছে, তার জন্যে তিনি ‘গভীরভাবে দুঃখিত’। তিনি আরও বলেন যে, তিনি বৈঠকের ফলাফল নিয়ে গভীর হতাশার ব্যাপারে তিনি অবগত আছেন। তথাপি তিনি বৈঠক থেকে যা পাওয়া গিয়েছে সেটাকে রক্ষা করার জন্যে সকলকে অনুরোধ করেন। তিনি বলেন যে, কয়লার ব্যাপারে এই প্রথমবারের মতো সমঝোতা হয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেন যে, তারা শেষ পর্যন্ত এমন একটা সমঝোতায় পৌঁছাতে পেরেছেন, যা ‘গেম চেঞ্জিং’ বা খেলা পরিবর্তন করে ফেলার মতো। তিনি মনে করেন যে, এটা ছিল জলবায়ুর ব্যাপারে বৈশ্বিক চিন্তার একটা বিশাল পরিবর্তন। একইসাথে গ্লাসগোতে কয়লার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়ে গেছে বলে তিনি মনে করেন। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, বৈঠকের সাফল্যের মাঝে ছিল কিছু হতাশা। স্বাধীন দেশগুলি যা করতে চায়, তার উপর তারা কোনকিছু চাপিয়ে দিতে পারেন না বলে বলেন তিনি। জনসন একইসাথে বৈঠককে রক্ষা করে বলেন যে, ‘কপ২৬’এর কখনোই জলবায়ু পরিবর্তন বন্ধ করতে পারার কথা নয়। মানুষ বুঝতে পেরেছিল যে, সর্বোচ্চ যেটা করা সম্ভব তা হলো জলবায়ু পরিবর্তনের দ্রুততাকে কমানো এবং ভবিষ্যতে এটা পরিবর্তন করে ফেলার জন্যে নিজেদের প্রস্তুত করা। ‘ইউরোনিউজ’এর সাথে সাক্ষাতে পরিবেশবাদী সংস্থা ‘গ্রীনপিস’এর এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর জেনিফার মরগ্যান বলেন যে, দেড় ডিগ্রির টার্গেট কোনমতে বেঁচে আছে; তথাপি কয়লার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হওয়ায় তারা খুশি। তবে তিনি বলেন যে, জলবায়ুর ব্যাপারে সিদ্ধান্তগুলি প্রকৃতপক্ষে পরের বছরের দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে।
‘কপ২৬’ বৈঠকে যেসব সমঝোতা হয়েছে, তা সরকারগুলি কিভাবে বাস্তবায়ন করবে, সেব্যাপারে অনেকেই দুশ্চিন্তায় আছেন। কারণ এখানে জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে; কোন দেশেরই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা নেই। ‘আল জাজিরা’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, জলবায়ু টার্গেটকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে ২০১০ সালের গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমনের পরিমাণ থেকে ৪৫ শতাংশ নির্গমন কমাতে হবে ২০৩০ সালের মাঝেই। সবচাইতে বড় গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমনকারী দেশ চীন তাদের নির্গমন শূণ্যে নিয়ে আসার টার্গেট দিয়েছে ২০৬০ সালের মাঝে; তবে তারা কয়লার ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করতে রাজি হয়নি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নির্গমনকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্রও ২০৫০ সালের মাঝে নির্গমন শূণ্যে নামানোর টার্গেট দিলেও কলয়ার ব্যবহার শূণ্য করতে নারাজ। তৃতীয় সর্বোচ্চ নির্গমনকারী ভারত ২০৭০ সালের মাঝে নির্গমন শূণ্য করতে চায়। ‘কপ২৬’এ কয়লার ব্যাপারে কেবলমাত্র তাদের শক্ত অবস্থানই মিডিয়াতে এসেছে। চতুর্থ সর্বোচ্চ নির্গমনকারী দেশ রাশিয়া ২০৬০ সালের টার্গেট দিয়েছে; কয়লার ব্যাপারে তারাও একই অবস্থানে। অর্থাৎ সর্বোচ্চ গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমনকারী চারটা দেশ কয়লা ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করতে রাজি হয়নি। আর ‘কপ২৬’ সন্মেলনে চীনা নেতা শি জিনপিং এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যোগদানই করেননি। কাজেই বৈঠকের বাধ্যবাধকতাহীন সমঝোতাগুলির ব্যাপারে দেশগুলির দৃষ্টিভঙ্গি যে খুব বেশি একটা কঠোর নয়, তা বোধগম্য।
জলবায়ু সমস্যার দায় কার?
‘ইয়াহু নিউজ’এর এক প্রতিবেদনে ‘ওয়ার্ল্ড রিসার্চ ইন্সটিটিউট’এর তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হচ্ছে যে, বৈশ্বিক গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমনের ৭৩ শতাংশই আসে জ্বালানি থেকে। এই জ্বালানির বেশিরভাগ যায় শিল্প, বাড়িঘর উষ্ণকরণে এবং পরিবহণে। সেই তুলনায় কৃষিখাতে নির্গমন মাত্র ১৮ শতাংশ। কেবলমাত্র পরিবহণ খাতেই নির্গমন ১৬ শতাংশ। ১৮৫০ সাল থেকে বায়ুমন্ডলে যত গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমন হয়েছে, তার ২০ শতাংশই এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে চীনের নির্গমন সকল বাঁধ ভেঙ্গে ফেলেছে। চীনের অর্থনীতি কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কয়লা পুড়িয়েই চীনারা পশ্চিমা বিশ্বের জন্যে স্বল্প খরচে পণ্যদ্রব্য উৎপাদন করে চলেছে। এখন পশ্চিমারাই চীনাদেরকে বলছে গ্রীনহাউজ গ্যাসের নির্গমন কমাতে। তবে চীনা শহরগুলির ব্যাপক বায়ুদূষণ চীনাদেরকেও বিচলিত করেছে।
অর্থনীতি এবং জলবায়ুকে পুঁজিবাদের পাল্লায় মাপতে গিয়ে জলবায়ু সর্বদাই হেরেছে। ‘কপ২৬’এর আগে আরও ২৫টা সন্মেলন হয়েছে; কিন্তু জলবায়ু কখনোই প্রাধান্য পায়নি। গ্রীনহাউজ গ্যাসের বেশিরভাগটাই যখন পশ্চিমা দেশগুলির শিল্পবিপ্লবের কারণে নির্গমন হয়েছে, তখন সারা বিশ্বের সকল দরিদ্র দেশের মাথার উপর গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমন শূণ্য করার টার্গেট বেঁধে দেয়াটা কপটতারই উদাহরণ। কারণ দরিদ্র এই দেশগুলির বেশিরভাগই পশ্চিমা দেশগুলিতে রপ্তানি করে তাদের বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে। আর এই রপ্তানি তাদের গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমনের পিছনে যথেষ্টই দায়ি। পশ্চিমা দেশগুলির কনজিউমার সংস্কৃতির উপর নির্ভর করে বহু দেশ তাদের রপ্তানিমুখী শিল্পগুলিকে গড়ে তুলেছে। স্থবির জনসংখ্যার পশ্চিমা দেশগুলি কনজিউমার সংস্কৃতির প্রসারের মাধ্যমেই নিজেদের অর্থনীতিকে চালিয়ে নিচ্ছে। আর সেসব অর্থনীতির উপরেই রচিত হয়েছে দরিদ্র দেশগুলির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। মাথাপিছু জিডিপি বৃদ্ধির লক্ষ্য দরিদ্র এই দেশগুলির মানুষের জন্যে জলবায়ু রক্ষার চাইতে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অপরদিকে পশ্চিমা পুঁজিবাদী দেশগুলির জন্যে কনজিউমারিজমের মাধ্যমে নিজেদের লাইফস্টাইল জারি রাখাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ; কারণ তা হলো পশ্চিমা পুঁজিবাদী অর্থনীতির জ্বালানি। জলবায়ুকে বাঁচাবার চেষ্টা এক্ষেত্রে পুঁজিবাদী অর্থনীতির উপর লাগাম। খুব স্বাভাবিকভাবেই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ‘কপ২৬’এর সাফল্য দাবি করেন; অথচ জলবায়ু সমস্যার মূলে থাকা কনজিউমারিজম নিয়ে কথা বলা থেকে বিরত থাকেন। জলবায়ু বাঁচাতে তিনি কিভাবে ব্রিটিশ নাগরিকদেরকে লাইফস্টাইল পরিবর্তন করে খরচ কমাতে বলবেন? আর কিভাবেই বা তিনি পুঁজিবাদকে সারা দুনিয়াতে ছড়িয়ে দেয়া ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হয়ে স্বীকার করে নেবেন যে, ‘ক্যাপিটালিজম ইজ কিলিং দ্যা প্ল্যানেট’?
Friday, 3 December 2021
রাশিয়া কি ইউক্রেন আক্রমণ করবে?
৪ঠা ডিসেম্বর ২০২১
২রা ডিসেম্বর সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে ‘অর্গানাইজেশন ফর সিকিউরিটি এন্ড কোঅপারেশন ইন ইউরোপ’ বা ‘ওএসসিই’র এক অনুষ্ঠানে মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব এন্টনি ব্লিনকেনএর সাথে বৈঠকের আগে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ বলেন যে, ইউরোপ হয়তো সামরিক সংঘাতের দুঃস্বপ্নের দিকে ফেরত যেতে চলেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ল্যাভরভ ইউরোপের সাথে নতুন নিরাপত্তা চুক্তি করার প্রস্তাব দেন; যার মূল স্তম্ভ হলো ন্যাটোর পূর্বদিকে সম্প্রসারণ রোধ করা। তিনি আরও বলেন যে, ন্যাটো দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে রাশিয়ার সীমানার কাছে পোল্যান্ড এবং রোমানিয়াতে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন সামরিক অবকাঠামো তৈরি করেছে। ‘বিবিসি’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, এই বৈঠক এমন সময়ে হলো, যখন ইউক্রেন বলছে যে, রাশিয়া ইউক্রেনের সীমানার কাছে ৯০ হাজার সেনা মোতায়েন করেছে। মস্কো বলছে যে, ইউক্রেনের উপর হামলা করার কোন উদ্দেশ্য তাদের নেই; উল্টো ইউক্রেনেই তাদের পূর্ব সীমানায় সামরিক শক্তি মোতায়েন করছে, যেখানে রুশ সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সাথে ২০১৪ সাল থেকে ডনবাস অঞ্চলে যুদ্ধ চলছে। বৈঠকের পর মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব ব্লিনকেন বলছেন যে, ইউক্রেনের সাথে সংঘাতে জড়ালে রাশিয়াকে মারাত্মক পরিণতি গুণতে হবে।
উভয় পক্ষের উত্তেজক বক্তব্যের মাঝে উত্তেজনা প্রশমণের কথাও আসছে। রুশ উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই রিয়াবকভ রুশ বার্তা সংস্থাকে বলছেন যে, দুই দেশের প্রেসিডেন্টের মাঝে আলোচনা চাইছেন তারা; যদিও এখনও আলোচনার সিডিউল ঠিক হয়নি। তিনি আরও বলেন যে, দুই নেতার এই বৈঠক খুবই জরুরি; কারণ সমস্যাগুলি ঘনীভূত হচ্ছে। ব্লিনকেনও দুই প্রেসিডেন্টের আলোচনার ব্যাপারে আশাবাদী।
এন্টনি ব্লিনকেন বলছেন যে, ইউক্রেন রাশিয়ার জন্যে কোন হুমকি নয়; বরং একমাত্র হুমকি হলো ইউক্রেনের প্রতি রাশিয়ার হুমকি। কিন্তু ৩০শে নভেম্বর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এক বিনিয়োগ সন্মেলনে ভাষণ দিতে গিয়ে বলেন যে, ইউক্রেনে দূরপাল্লার অস্ত্র মোতায়েন রাশিয়ার জন্যে ‘লাল দাগ’ অতিক্রম করার মতোই ঠেকবে। তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে, ইউক্রেনের মাটিতে কোন আক্রমণাত্মক অস্ত্র মোতায়েন করা হলে তা ৭ থেকে ১০ মিনিটের মাঝে মস্কোতে হামলা করতে পারবে। আর হাইপারসনিক অস্ত্র ব্যবহার করলে তা মাত্র ৫ মিনিটের মাঝেই মস্কো পৌঁছাবে। তিনি পোল্যান্ড এবং রোমানিয়াতে ‘ঈজিস এশোর’ ব্যলিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের কথা উল্লেখ করে বলেন যে, এই ব্যবস্থার মাঝে ‘মার্ক ৪১’ ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার ব্যবস্থা রয়েছে; যার মাধ্যমে শুধুমাত্র বিমান বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রই নয়, একই ব্যবস্থা ব্যবহার করে ‘টোমাহক’ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও ছোঁড়া সম্ভব। ‘ঈজিস’ হলো মার্কিন নৌবাহিনীর ‘আরলেই বুর্ক-ক্লাস’ ডেস্ট্রয়ারগুলিতে ব্যবহৃত অত্যাধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা ‘মার্ক ৪১’ ক্ষেপণাস্ত্র উড্ডয়ন ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে। মাল্টিপারপাস এই ব্যবস্থার মাধ্যমে একইসাথে বিমান ধ্বংসী, সাবমেরিন ধ্বংসী এবং জাহাজ ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ছাড়াও ভূমির টার্গেট ধ্বংস করার জন্যে তৈরি করা ‘টোমাহক’ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও বহণ করা যায়; যার পাল্লা ১৩’শ থেকে আড়াই হাজার কিঃমিঃ পর্যন্ত। পুতিন ন্যাটোকে পোল্যান্ড বা রোমানিয়ার মতো ইউক্রেনেও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করার ব্যাপারে সাবধান করেন। তিনি বলেন যে, এমতাবস্থায় মস্কোর সামনে একটাই পথ খোলা থাকবে; আর তা হলো, শত্রুর বিরুদ্ধে একই ধরনের একটা হুমকি তৈরি করা। আর সেটা করার সক্ষমতা বর্তমানে রাশিয়ার রয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী বর্তমানে ব্যবহৃত অস্ত্রকে নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও শক্তিশালী করতে চাইছে; যার মাধ্যমে সাধারণ একটা অস্ত্র কৌশলগত অস্ত্রে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। গত অক্টোবরে মার্কিন প্রতিরক্ষা কোম্পানি ‘লকহিড মার্টিন’ নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ‘প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল’ বা ‘পিআরএসএম’এর পঞ্চম পরীক্ষা চালিয়েছে। সামরিক ম্যাগাজিন ‘আর্মি টেকনলজি’ বলছে যে, এবারে তারা সেনাবাহিনী এবং ম্যারিন কোরের ব্যবহৃত হাল্কা রকেট আর্টিলারির ব্যবস্থাটাকে ব্যবহার করেছে ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার জন্যে। ‘হাই মোবিলিটি রকেট আর্টিলারি সিস্টেম’ বা ‘হিমারস’ নামে পরিচিত ১৬ টন ওজনের এই রকেট আর্টিলারি ব্যবস্থাকে ‘সি ১৩০’ সামরিক পরিবহণ বিমানে করে পরিবহণ করা সম্ভব। ‘পিআরএসএম’ হলো এমন একটা ক্ষেপণাস্ত্র, যা বর্তমানে মার্কিন সেনাবাহিনীর ব্যবহৃত সর্বোচ্চ ৩’শ কিঃমিঃ পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ‘এমজিএম ১৪০ এটাকমস’এর পাল্লাকে দ্বিগুণ করার জন্যে ডেভেলপ করা হচ্ছে। একটা ‘সি ১৩০’ বিমান ব্যবহার করে এরকম একটা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাকে যেকোন স্থানে খুব দ্রুত মোতায়েন করা সম্ভব; যেখান থেকে তা ৫’শ কিঃমিঃএর অধিক পাল্লার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে পারবে। গত ফেব্রুয়ারিতে রোমানিয়ার সেনাবাহিনী ‘হিমারস’ রকেট আর্টিলারির প্রথম চালানটি পায় বলে বলছে রোমানিয়ার মিডিয়া ‘এগারপ্রেস’। ২০১৮ সালে পোল্যান্ডও ৫৬টা ‘হিমারস’ অর্ডার করে। এই রকেট ব্যবস্থাগুলি একাধারে যেমন বিমানে করে যেকোন স্থানে মোতায়েন করা সম্ভব, তেমনি এগুলি থেকে ৩’শ কিঃমিঃ পাল্লার ‘এটাকমস’ ক্ষেপণাস্ত্র ছাড়াও ভবিষ্যতে ৫’শ কিঃমিঃএর বেশি পাল্লার ‘পিআরএসএম’ও ছোঁড়া সম্ভব। মার্কিন সেনাবাহিনীর অফিসার মেজর ব্রেনান ডেভেরাউ ‘ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস, অস্টিন’এর প্রতিরক্ষা ম্যাগাজিন ‘ওয়ার অন দ্যা রক্স’এর এক লেখায় রাশিয়ার হুমকি মোকাবিলায় পূর্ব ইউরোপে ‘হিমারস’ মোতায়েনের কথা বলেন। তার মতে, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলি এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা কেনার সাথে সাথে খুব স্বল্প বিনিয়োগেই যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার বিরুদ্ধে ডিটারেন্ট তৈরি করতে পারবে।
রুশ এবং মার্কিন কর্মকর্তারা উত্তেজক মন্তব্য করলেও উভয় পক্ষই দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের আলোচনা দেখতে চাইছে। একে অপরকে সামরিক শক্তি মোতায়েনের জন্যে অভিযুক্ত করলেও কেউই যুদ্ধ চাইছে না। তথাপি রাশিয়া যেমন গত এপ্রিলে সামরিক শক্তি মোতায়েন করে হুমকি তৈরি করার মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে আলোচনায় আনতে পেরেছিল, ঠিক সেটাই তারা আবারও করতে চাইছে। রাশিয়া চাইছে ইউরোপ তাকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিক। কিন্তু রাশিয়াকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়ার অর্থ হলো ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অবান্তর হয়ে যাওয়া। চীনকে নিয়ন্ত্রণ করাই যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান উদ্দেশ্য, তখন ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় রাশিয়ার সাথে পিছিয়ে পরাটাও যুক্তরাষ্ট্র মেনে নিতে পারছে না। পূর্ব ইউরোপে অত্যাধুনিক অস্ত্র মোতায়েন করাটা যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি নয়, বরং সামরিক দুর্বলতাকেই তুলে ধরে। কারণ এই অস্ত্রের সাথে রিজার্ভ এবং ন্যাশনাল গার্ডের সেনাদের মোতায়েন করে ইউরোপ থেকে শক্তিশালী ইউনিটগুলি সরিয়ে চীনের বিরুদ্ধে মোতায়েন করা হচ্ছে।
Thursday, 25 November 2021
জাপান কি তার প্রতিরক্ষানীতিকে পরিবর্তন করছে?
জাপানের সামরিক বাজেট দেশটার জিডিপির ১ শতাংশের বেশি হবে না বলে একটা অলিখিত সিদ্ধান্ত জাপান সরকার মেনে চলেছে। তবে গত মে মাসে প্রতিরক্ষামন্ত্রী নোবুও কিশি ‘নিকেই এশিয়া’র সাথে এক সাক্ষাতে বলেন যে, জাপান জিডিপির সাথে অনুপাত রেখে কখনোই তার সামরিক বাজেটের পরিকল্পনা করে না। প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই কথাই বলে দিচ্ছে যে, জাপান তার প্রতিরক্ষা বাজেটকে জিডিপির ১ শতাংশের মাঝে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে না। নোবুও কিশি চীনা হুমকি মোকাবিলায় সম্পূর্ণ নতুনভাবে সামরিক বাজেট তৈরির কথা বলেন। শুধু সামরিক বাজেট বৃদ্ধিই নয়, প্রতিরক্ষা ম্যাগাজিন ‘আইএইচএস জেনস’ বলছে যে, নতুন প্রতিরক্ষানীতি তৈরির কাজে হাত দিয়েছে জাপান; যা ২০২২ সালে গতি পাবে।
২০১৪এর জুলাই মাসে তৎকালীন জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সরকার দেশটার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের রচনা করে দেয়া যুদ্ধবিরোধী সংবিধানের একটা নতুন ব্যাখ্যার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১৬ সালের মার্চে প্রবল বাধার মুখে নতুন আইন হিসেবে জাপানের পার্লামেন্টে এই সিদ্ধান্তগুলিকে পাস করানো হয়। জাপানে অনেকেই এই আইনকে ‘যুদ্ধ আইন’ বলে আখ্যা দেয়। তারা বলছিলেন যে, এর ফলশ্রুতিতে অন্যের শুরু করা যুদ্ধে জাপানকে জোর করে জড়ানো হতে পারে। ‘জাপান টাইমস’ বলছে যে, এই আইনের ফলস্বরূপ কোরিয় উপদ্বীপে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে জড়ালে জাপানের সামরিক বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে যুদ্ধে জড়াতে পারে। এছাড়াও এতদিন পর্যন্ত জাপানের আশেপাশে জাপানিরা যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা দিতে পারতো; এখন নতুন আইনে তৃতীয় কোন দেশেও পারবে।
২০২০এর নভেম্বরে জাপান এবং অস্ট্রেলিয়া তাদের একে অপরের সামরিক সদস্য এবং যন্ত্রপাতিকে রক্ষা করার ব্যাপারে চুক্তি করে। ‘দ্যা জাপান নিউজ’ বলছে যে, চুক্তি মোতাবেক, শান্তিকালীন সময়ে জাপানের সাথে যৌথ সামরিক মহড়ার সময় এবং জাপানের আশেপাশের সমুদ্রে অস্ট্রেলিয়ার সার্ভেইল্যান্স অপারেশন চালনার সময় জাপান তার সামরিক শক্তিকে অস্ট্রেলিয়ার সম্পদ রক্ষায় ব্যবহার করবে। জাপানের আশেপাশের সমুদ্রের মাঝে পূর্ব চীন সাগরও রয়েছে, যেখানে জাপানের সাথে চীনের রয়েছে সমুদ্রসীমা এবং আকাশসীমা নিয়ে বিরোধ। অস্ট্রেলিয়ার থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইস্টএশিয়া ফোরাম’এর লেখায় ‘ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলস’এর প্রফেসর অরেলিয়া জর্জ মুলগান বলছেন যে, এভাবেই একটু একটু করে জাপান আঞ্চলিকভাবে তার সামরিক ভূমিকাকে বৃদ্ধি করেছে; আর এই কাজ করার জন্যে তাদের যুদ্ধবিরোধী সংবিধানকেও পরিবর্তন করতে হয়নি। চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের পরই অস্ট্রেলিয়া জাপানের সবচাইতে কাছের সহযোগী হিসেবে নাম লেখালো। এর ফলশ্রুতিতে অস্ট্রেলিয়ার সামরিক বাহিনীর সদস্যরা যথেষ্ট ঘন ঘন জাপানের মাটিতে এবং এর আশেপাশের সমুদ্রাঞ্চলে সামরিক মহড়ায় অংশ নেবে। এছাড়াও আরও যে ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, এতকাল জাপান তার নিরাপত্তার জন্যে শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রকেই কাছের বন্ধু মনে করলেও এখন অন্যান্য দেশকেও তার নিজের নিরাপত্তার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে শুরু করেছে। জাপান ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র, ভারত এবং অস্ট্রেলিয়ার সাথে ‘কোয়াড’ জোটের অংশ হয়েছে, যা কিনা একটা চীন বিরোধী জোট হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছে।
গত জুনে জাপানের উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াসুহিদে নাকাইয়ামা মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘হাডসন ইন্সটিটিউট’এর সাথে এক সাক্ষাতে বলেন যে, গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে তাইওয়ানকে রক্ষা করার প্রয়োজন রয়েছে। তিনি জাপান এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ‘ওয়ান চায়না’ নীতি নিয়ে প্রশ্ন করেন। তিনি নিজেও এতকাল তাইওয়ানকে ‘লাল দাগ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। নাকাইয়ামা প্রশ্ন বলেন যে, ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারকেরা হয়তো তাইওয়ানের ব্যাপারে নীতি কতটা সঠিক ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন করতে পারে। ভৌগোলিকভাবে তাইওয়ান জাপানের খুবই কাছে; তাইওয়ানে কিছু ঘটলে তা জাপানের ওকিনাওয়ার উপর প্রভাব ফেলবে। মহাকাশ, ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি, পারমাণবিক এবং প্রচলিত অস্ত্রের দিক থেকে চীনের আগ্রসী চিন্তা এবং ইচ্ছার ব্যাপারে তিনি সকলকে ‘জেগে উঠতে’ বলেন। এছাড়াও তিনি সাম্প্রতিক সময়ে জাপানের আশেপাশে চীন এবং রাশিয়ার যৌথ সামরিক মহড়ার ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন যে, রাশিয়া এবং চীনের সহযোগিতা এক নতুন হুমকির সৃষ্টি করেছে। এজন্যে তিনি আরও শক্তিশালী যুক্তরাষ্ট্রকে দেখতে চান।
মার্কিন বিমান বাহিনীর ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তা রায়ান এশলি ‘ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস, অস্টিন’এর প্রতিরক্ষা ম্যাগাজিন ‘ওয়ার অন দ্যা রক্স’এর এক লেখায় বলছেন যে, সাম্প্রতিককালে জাপানের রাজনীতিবিদদের মাঝে অর্থনীতিকেন্দ্রিক চিন্তার বদলে বাস্তবতাকেন্দ্রিক চিন্তাকে শক্তিশালী দেখা যাচ্ছে। এতকাল ক্ষমতাসীন এলডিপি দলের বেশিরভাগ সদস্যই চাইতেন বেইজিংএর সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দিতে; তবে বর্তমানে লিবারাল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাতে অংশ নেয়াতেই তারা এখন বেশি আগ্রহী। এই হিসেবেই জাপান এখন তাইওয়ানের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন করতে চাইছে। জাপানিরা মনে করছে না যে, তাইওয়ানের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন করলে জাপানের জন্যে নতুন কোন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ ডেকে আনবে। কারণ চীনারা আগে থেকেই জাপানের আশেপাশে ব্যাপক সামরিক অপারেশন চালিয়ে যাচ্ছে। আপাততঃ হয়তো তাইওয়ানের ব্যাপারে কূটনীতি বা নিরাপত্তা বিষয়ে জাপানের নীতির কোন পরিবর্তন হবে না। তবে জাপানি নেতৃত্বের তাইওয়ানের সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দেয়া এবং চীনের হাত থেকে তাইওয়ানের রক্ষা করার ব্যাপারে জাপানি সরকারের ইচ্ছা প্রকাশ চীনা কমিউনিস্ট পার্টি এবং চীনা সামরিক নেতৃত্বের জন্যে স্বল্পমেয়াদে মাথাব্যাপার কারণ হবে; এমনকি সাম্প্রতিককালে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং অস্ট্রেলিয়ার মাঝে পারমাণবিক সাবমেরিনের প্রযুক্তি দেয়ানেয়ার চুক্তির চাইতেও তা বড় হুমকি হয়ে দেখা দিতে পারে।
‘নিকেই এশিয়া’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, চীন তার সামরিক শক্তি ব্যাপক বৃদ্ধি করলেও ভৌগোলিকভাবে চীনের দুর্বলতা রয়েছে। তাইওয়ান এবং জাপানের দ্বীপগুলি চীনের প্রশান্ত মহাসাগরে বের হবার পথগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করে। মার্কিন সামরিক চিন্তাবিদেরা জাপানের নৌবাহিনীর সাবমেরিনগুলিকে ব্যবহার করে এই দ্বীপগুলির মাঝের প্রণালিগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছেন। আর সাম্প্রতিককালে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর অংশ অস্ট্রেলিয়ার সাথে জাপানের চুক্তিও দেখিয়ে দেয় যে, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও অন্যান্য শক্তিরাও চীনকে নিয়ন্ত্রণে জাপানকে ব্যবহার করতে চাইছে। ব্রিটেনও জাপানের সাথে আরও গভীর সামরিক সম্পর্কের ব্যাপারে কথা বলছে। চুক্তিগুলির ফলস্বরূপ জাপানের উঠানে পশ্চিমাদের সাথে চীনাদের দ্বন্দ্ব জাপানকেও জড়াতে বাধ্য করবে। এমনই এক পরিস্থিতিতে তাইওয়ানের ব্যাপারে জাপানের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জাপান এবং চীনের মাঝে উত্তেজনাকে যেমন বাড়াবে, তেমনি পূর্ব এশিয়াতে পশ্চিমাদের অবস্থানও সুসংহত করবে।
Saturday, 20 November 2021
পোল্যান্ড এবং বেলারুশের সীমানায় তুরস্কের স্বার্থ কি?
পোল্যান্ড এবং বেলারুশের সীমানায় মধ্যপ্রাচ্যের হাজার হাজার শরণার্থীদের উপর যখন পোলিশ সেনারা জলকামান, পেপার স্প্রে এবং অন্যান্য অস্ত্র ব্যবহার করছে, তখন কেউ কেউ প্রশ্ন করছেন যে, এর সমস্যার পিছনে শুধুমাত্র বেলারুশের প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কো এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনই রয়েছেন কিনা। ব্রিটেনের ‘দ্যা স্পেকট্যাটর’ পত্রিকার এক লেখায় ‘বলকান ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টিং নেটওয়ার্ক’এর ফেলো ইয়ানিস বাবুলিয়াস বলছেন যে, এই ভূরাজনৈতিক খেলায় তুরস্ককে বাদ দিয়ে ভুল হবে। কারণ বেলারুশের সীমানায় মধ্যপ্রাচ্যের শরণার্থীরা পৌঁছেছে তুরস্কের ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’এর মাধ্যমে।
তুর্কি কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে ‘হুরিয়েত ডেইলি নিউজ’ জানাচ্ছে যে, ১০ই নভেম্বর তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু পোলিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিবিগনিউ রাউএর সাথে ফোনে কথা বলেন। এই কথোপকথনে কাভুসোগলু বলেন যে, তুরস্ক এই সমস্যার অংশ না হলেও কেউ কেউ তা বোঝাতে চাইছে। তিনি তুরস্ক এবং ‘টারকিশ এয়ারওয়েজ’এর বিরুদ্ধে অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে আখ্যা দেন। একইসাথে তিনি বলেন যে, জনগণকে এই অভিযোগের ব্যাপারে সত্যটা জানাতে হবে। তিনি পোল্যান্ডের টেকনিক্যাল তদন্ত দলকে তুরস্কে আমন্ত্রণ জানান। দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এহেন কথোপকথন মাত্র একমাস আগের বৈঠকের সময়েও অন্যরকম ছিল। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহেই কাভুসোগলু পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশ সফর করেন এবং পোল্যান্ডের সীমান্ত ইস্যুতে তুরস্কের সহায়তা দেয়ার আশ্বাস দেন। দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা যৌথ ঘোষণায় বলেন যে, তাদের ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস একত্রে এধরণের হুমকি মোকাবিলায় এবং ইইউএর ভেতর ঢোকার উদ্দেশ্যে মানব পাচারের রুটগুলি খুঁজে বের করবে। জিবিগনিউ রাউ বলেন যে, তিনি কাভুসোগলুকে শরণার্থীদের বিমানে করে বেলারুশের রাজধানী মিনস্কে যাবার ব্যাপারে আরও মনোযোগ দেয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন যে, শরণার্থীদের নিয়ে আসা ফ্লাইটগুলি অনেক ক্ষেত্রেই ইস্তাম্বুলকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে। কাভুসোগলু বলেন যে, নয় মাসে ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’ মিনস্কে ৬’শ ইরাকি নাগরিককে নিয়ে গিয়েছে; যাদের অর্ধেকই আবার ফিরে এসেছে। এই সফরের সময় পোলিশ মন্ত্রী রাউ বলেন যে, দুই দেশের বাণিজ্য এখন প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার; যা শীঘ্রই ৯ বিলিয়নে যাবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।
তুরস্কের প্রতি ইইউএর হুমকি
৮ই নভেম্বর ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেইয়েন বলেন যে, ইইউ খতিয়ে দেখছে যে, তৃতীয় কোন দেশের এয়ারলাইন্স, যারা কিনা “মানব পাচারে জড়িত” রয়েছে, তাদের উপর অবরোধ দেয়া বা তাদেরকে কালো তালিকাভুক্ত করা যায় কিনা। ‘ইইউ অবজারভার’ বলছে যে, ভন ডার লেইয়েন যে তৃতীয় দেশের এয়ারলাইন্সের কথা বলেছে, তা হলো ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’। আর ‘পলিটিকো ইউরোপ’এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, মিনস্কে যাবার প্রধান বিমান রুটটাই হলো তুরস্ক থেকে। ১০ই নভেম্বর পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ম্যাটিউজ মোরাউইয়েকি পার্লামেন্টের এক জরুরি বৈঠকে অভিযোগ করে বলেন যে, পরিষ্কারভাবেই দেখা যাচ্ছে যে, তুরস্কের কর্মকান্ডগুলি বেলারুশ এবং রাশিয়ার সাথে সমন্বয় করা; যা পোলিশরা পছন্দ করছে না। তিনি আরও বলেন যে, মাত্র এক বা দুইমাস আগেই তুরস্ক পোল্যান্ডের সাথে একসাথে কাজ করতে চায় বলে মনে হয়েছিল। তুরস্কের দাবানল ঠেকাতে সহায়তা এবং তুর্কি পর্যটন শিল্পে সহায়তা দেয়াটা খুব সম্ভবতঃ একমুখী সহায়তা ছিল। এই ব্যাপারটা তুরস্ক সরকারকে জানানো হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
একইদিন ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’এর এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, তারা সকল নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সংবেদনশীলতার সাথে সহযোগিতা করে আসছে। একইসাথে বিবৃতিতে বলা হয় যে, তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন। ‘এএফপি’ জানাচ্ছে যে, বেলারুশের রাজধানীতে যাবার সবচাইতে বেশি ব্যবহৃত আকাশ নেটওয়ার্ক হলো ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’। এছাড়াও তুরস্কে রয়েছে বিভিন্ন দেশের প্রায় ৫০ লক্ষ শরণার্থী এবং অভিবাসী। এবং এখনও দেশটা ইউরোপ অভিমুখী শরণার্থীদের যাতায়াতের একটা গুরুত্বপূর্ণ রুট। ‘মিডলইস্ট আই’এর এক প্রতিবেদনে ফ্লাইটের তথ্য দিয়ে বলা হয় যে, গত ৩১শে অক্টোবর থেকে ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’ ইস্তাম্বুল থেকে মিনস্কে সাপ্তাহিক ফ্লাইটের সংখ্যা ১৪ থেকে ১০এ নামিয়ে আনে। ভিসা ফ্রি ট্রাভেল সুবিধা থাকার কারণে বেলারুশ তুর্কি পর্যটকদের জন্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য।
তুরস্কের ‘ইউ টার্ন’
১২ই নভেম্বর তুরস্কের বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা মধ্যপ্রাচ্যের তিনটা দেশ ইরাক, সিরিয়া এবং ইয়েমেনের নাগরিকদের তুরস্ক থেকে বেলারুশে যাওয়া বন্ধ ঘোষণা করে। এই খবর পাবার পর ইউরোপিয়ান কাউন্সিনের প্রেসিডেন্ট চার্লস মিশেল এক টুইটার বার্তায় তুর্কি সরকারকে ধন্যবাদ জানান। পরদিন বার্তাসংস্থা ‘এএফপি’র সাথে এক সাক্ষাতে তুর্কি প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা ইব্রাহিম কালিন বলেন যে, পোল্যান্ডের সীমান্তে মানবিক দুর্যোগের ব্যাপারে তুরস্ক বা ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’কে দোষারোপ করাটা সমীচিন নয়। ভ্রমণকারীরা বেলারুশ গিয়ে সেখান থেকে পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া বা অন্যান্য ইইউ দেশে যাচ্ছে। এর জন্যে তুরস্ক বা ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’কে দোষারোপ করাটা পুরোপুরি অবান্তর। তিনি আরও বলেন যে, তারা নিশ্চিত করতে চান যে, যারা তুরস্ক হয়ে বিভিন্ন দেশে যাতায়াত করে, তারা যেন যাওয়া এবং ফেরত আসার টিকিট সাথে রাখে; অর্থাৎ তারা যেন ফেরত আসে। কিন্তু কেউ যদি বেলারুশে গিয়ে হারিয়ে যায়, তাহলে সেটা তুরস্কের দায় নয়। ‘আল মনিটর’এর সাথে এক সাক্ষাতে ‘পোলিশ ইন্সটিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এফেয়ার্স’এর মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা প্রোগ্রামের প্রধান ক্যারল ওয়াসিলেউস্কি বলেন যে, যদিও তুর্কিরা বলছে যে, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে কোনকিছু করেনি, তথাপি পোলিশ সমাজের কাছে ব্যাপারটা সেভাবে ঠেকেনি। তিনি বলেন যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ। পোল্যান্ডের কৌশলগত সংস্কৃতিতে এর একটা প্রভাব থাকবে। পোলিশরা মনে রাখবে যে, পোল্যান্ডের দুর্যোগের সময় তুরস্ক পাশে থাকেনি। ওয়াসিলেউস্কি মনে করছেন যে, বর্তমানের এই বিরোধ স্বল্প সময়ই স্থায়ী হবে; কূটনীতির মাধ্যমে তা সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু পোল্যান্ডের কর্মকর্তাদের মাঝে যারা একসময় তুরস্কের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের পক্ষপাতি ছিলেন না, তারা এখন এই উদাহরণ টেনে বলতে পারবে যে, তুরস্ক প্রকৃতপক্ষে কোন নির্ভরযোগ্য বন্ধু নয়।
কেউ কেউ বলছেন যে, ইইউ এবং যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের মাঝে সমন্বয় করে তুরস্কের উপর চাপ সৃষ্টি করে বেলারুশে তুর্কি বিমানের ফ্লাইট বন্ধ করেছে। প্রতিরক্ষা ম্যাগাজিন ‘ডিফেন্স নিউজ’এ মতামত দিতে গিয়ে তুর্কি পার্লামেন্টের প্রক্তন সদস্য এবং বর্তমানে ‘ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্র্যাসিস’এর সিনিয়র ডিরেক্টর আইকান এরদেমির বলছেন যে, যদিও ওয়াশিংটন বা ব্রাসেলস কেউই সরাসরি ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’ নিয়ে কথা বলেনি, তথাপি আপাতঃদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে যে, হুমকি দিয়েই ফ্লাইটগুলি বন্ধ করা হয়েছে। কারণ ভন ডার লেইয়েনের হুমকির দু’দিনের মাথায় মেভলুত কাভুসোগলু যেমন দায় স্বীকার করেননি, তেমনি ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’ও বলেছে যে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ অবান্তর। অথচ এর দু’দিনের মাথাতেই ইস্তাম্বুল থেকে মিনস্কে মধ্যপ্রাচ্যের তিন দেশের নাগরিকদের যাওয়া বন্ধ করে দেয়া হয়।
তুরস্ক আসলে কি চাইছে?
কিন্তু প্রশ্ন হলো, গত মে মাসেই যেখানে পোল্যান্ডের সাথে তুরস্কের ২৪টা ‘বায়রাকতার টিবি২’ মনুষ্যবিহীন ড্রোন বিমান কেনার চুক্তি হয়েছে, সেখানে মাত্র কয়েক মাসের মাঝেই তুরস্কের সাথে পোল্যান্ডের সম্পর্ক এই পর্যায়ে কিভাবে আসতে পারে? আর পোল্যান্ডের সীমান্তে তুরস্কের স্বার্থই বা কি? কেনই বা আরেকটা ন্যাটো সদস্য দেশের সাথে তুরস্কের সমন্বয় এত কঠিন হবে? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক ফোকাসের দিকে তাকালেই। পোল্যান্ডের সীমান্ত সমস্যায় তুরস্কের প্রভাব খাটাবার চেষ্টার আলোচনাটা এমন সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের মূল ফোকাস হলো চীন। মার্কিনীরা ইউরোপ সহ দুনিয়ার সকল অঞ্চলে তাদের সামরিক অবস্থান কমিয়ে ইন্দোপ্যাসিফিকে চীনের বিরুদ্ধে মোতায়েন করছে। আর এমন একটা অবস্থায় পূর্ব ইউরোপে উত্তেজনা নিঃসন্দেহে যুক্তরাষ্ট্রকে বিচলিত করবে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র চাইবে যে, ইউরোপিয়রাই তাদের নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিক। তথাপি যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের সীমান্তে একটা দ্বন্দ্বে আটকে থাকলে তা অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নীতিকে প্রভাবিত করবে।
ঠান্ডা যুদ্ধের সময় তুরস্ক যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে ইউরোপের ঢাল হিসেবে কাজ করেছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের কাছে তুরস্কের যে মূল্য ছিল, তা এখন নেই। কারণ বর্তমানে রুশ হুমকিকে ইউরোপের শক্তিধর দেশগুলি ততটা বড় হিসেবে দেখছে না। ইইউ এবং ন্যাটোর সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে জার্মানি এবং তার পার্শ্ববর্তী পোল্যান্ডের মাঝে চিন্তার ব্যাপক ফারাক রয়েছে। ইইউএর প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি জার্মানি তার বেশিরভাগ গ্যাস আমদানি করে থাকে রাশিয়া থেকে। অপরদিকে রাশিয়ার হুমকি মোকাবিলায় পোল্যান্ড চাইছে তাদের দেশে ন্যাটোর সেনা মোতায়েন থাকুক। ইইউএর এই বিভাজনের সময়েই ইউরোপ এবং রাশিয়ার মাঝে যুক্তরাষ্ট্র ব্যালান্স দেখতে চায়। ব্রেক্সিট পরবর্তী ব্রিটেনও সেটাই চায়; তাই তারাও পোল্যান্ডকে সীমান্ত শক্তিশালী করতে সহায়তা দিতে এগিয়ে এসেছে। সেই জায়গাটাতেই তুরস্ক জড়িত থাকতে চাইছে, ঠিক যেখানে যুক্তরাষ্ট্র একটা শূন্যস্থান রেখে যাচ্ছে। ঠান্ডা যুদ্ধ শেষেও একুশ শতকের ধ্বসে পরা বিশ্বব্যবস্থায় তুরস্ক পশ্চিমাদের কাছে তার মূল্য ধরে রাখতে চাইছে। অন্ততঃ ইইউএর সীমান্তে প্রচন্ড শীতের মাঝে শরণার্থীদের উপর জলকামানের ব্যবহার ইইউএর মানবাধিকারের স্তম্ভকে যতক্ষণ নাড়া দেবে, ততক্ষণ তুরস্ক ইইউএর সাথে কূটনৈতিক দরকষাকষির সুযোগ পাবে। আর তুরস্কের সাথে ইইউএর দ্বন্দ্বের তালিকা এখন বেশ বড়। তবে যুদ্ধবিমান বা যুদ্ধজাহাজ বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে নয়, বরং নিজস্ব বেসামরিক এয়ারলাইন্স ব্যবহার করেই তুরস্ক এই কাজটা করেছে। একুশ শতকে যুদ্ধের নতুন সংজ্ঞায় শরণার্থীরা যেমন বেলারুশ এবং রাশিয়ার কাছে অস্ত্র, তেমনি ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’ হয়েছে তুরস্কের অস্ত্র।










