০৬ই ডিসেম্বর ২০২১
প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ দেশ সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের প্রধানমন্ত্রী মানাসেহ সোগাভারেএর পদত্যাগ দাবি করে গত ২৪শে নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া প্রতিবাদী সমাবেশ খুব শীঘ্রই সহিংসতায় রূপ নেয়। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা বলছে যে, মালাইতা দ্বীপ থেকে আসা বেশকিছু লোক গুয়াদালকানাল দ্বীপে অবস্থিত রাজধানী হোনিয়ারাতে সহিংসতায় যোগ দেয়। প্রায় হাজার খানেক লোক পার্লামেন্ট ভবন কমপ্লেক্সের একাংশে আগুন ধরিয়ে দেয়। পুলিশ যখন জনগণকে পার্লামেন্ট ভবন থেকে সরাবার চেষ্টা করছে, তখন হোনিয়ারা শহরে শুরু হয় লুটতরাজ। পরদিন হোনিয়ারার চায়না টাউনে চীনা মালিকানার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলিতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। শহর আইন শৃংখলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবার পর সলোমোনের প্রধানমন্ত্রী সোগাভারে অস্ট্রেলিয়ার কাছে সহযোগিতা চান। ২৪ ঘন্টার মাঝেই অস্ট্রেলিয় সরকার হোনিয়ারাতে সেনা মোতায়েন করে। নিউজিল্যান্ডও পরবর্তীতে সেখানে সেনা পাঠায়।
বর্তমান সমস্যার শুরুটা ছিল ২০১৯ সালে; যখন ৮ লক্ষ জনসংখ্যার দ্বীপ দেশ সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের সরকার ৫’শ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে তাইওয়ানের সাথে ৩৬ বছরের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। বিরোধী দলগুলি এবং গুয়াদালকানাল দ্বীপের প্রতিবেশী মালাইতাএর প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রী ড্যানিয়েল সুইদানি এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। ২০২০ সালে মালাইতাএর প্রাদেশিক সরকার সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের সরকারের আদেশ অমান্য করে তাইওয়ানের কাছ থেকে ২৫ মিলিয়ন ডলারের আর্থিক সহায়তা নেয়। ২০১৯ সালে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জ এবং কিরিবাতি দ্বীপ তাইওয়ানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক কর্তনের পর বর্তমানে মাত্র ১৫টা দেশের সাথে তাইওয়ানের কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় থাকলো। এর মাঝে ৪টা দেশ হলো প্রশান্ত মহাসাগরীয় ছোট্ট দ্বীপ দেশ।
চীন এবং তাইওয়ানের মাঝে দ্বন্দ্ব
‘দ্যা অস্ট্রেলিয়ান ফিনানশিয়াল রিভিউ’এর এক লেখায় অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলেক্সান্ডার ডাউনার বলছেন যে, সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে হস্তক্ষেপ করার ব্যাপারটা সবসময়েই চীনের কারণে ছিল। বেইজিং এবং তাইপে এই অঞ্চলে তাদের প্রভাব বিস্তারে যে প্রতিযোগিতা চালাচ্ছে, তাতে এখানে অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘমেয়াদী অবস্থান গ্রহণ করা ছাড়া উপায় নেই। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপগুলিতে স্থিতিশীলতা দেখতে অস্ট্রেলিয়াকে অনেক সময় এবং সম্পদ বিনিয়োগ করতে হবে বলে মন্তব্য করেন ডাউনার। তবে তিনি বলেন যে, অনেকেই ভুল করে মনে করছেন যে, চীন এই অঞ্চলে অস্ট্রেলিয়া এবং তার বন্ধুদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে। প্রকৃতপক্ষে চীনের লক্ষ্য হলো প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ দেশগুলিকে তাইওয়ান থেকে দূরে রাখা। এই লক্ষ্যে তারা সাম্প্রতিক সময়ে বেশ সাফল্যও পেয়েছে। শুধুমাত্র নাউরু, পালাউ, তুভালু এবং মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ এখনও তাইওয়ানের কূটনৈতিক বন্ধু হিসেবে রয়েছে। উভয় পক্ষই দ্বীপগুলিকে নিজেদের পক্ষে রাখতে ঘুস দিচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া এই অঞ্চলে তাদের সাহায্য দেয়ার কর্মসূচি অব্যাহত রাখলেও এই প্রতিদ্বন্দ্বীতা অস্ট্রেলিয়ার চেষ্টাকে সমস্যায় ফেলেছে। অস্ট্রেলিয়ার সহযোগিতা মূলতঃ গণতান্ত্রিক শাসনযন্ত্রকে আরও কর্মক্ষম করার উদ্দেশ্যে।
ডাউনার বলছেন যে, তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকার সময় ২০০৩ সালে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে আইনশৃংখলা বজায় রাখতে তার সরকার সামরিক বাহিনী প্রেরণ করে। সেবার গুয়াদালকানাল দ্বীপের সাথে মালাইতা দ্বীপের দ্বন্দ্ব থেকে বিশৃংখলা সৃষ্টি হয়। ২০১৭ সালে এই বাহিনীকে তুলে নেয়া হয়। ডাউনারের কথায় সেটা ছিল একটা বড় ভুল। কারণ যদি সেখানে খুব ছোট একটা অস্ট্রেলিয় বাহিনী থাকতো, তাহলে হয়তো সেখানকার অবস্থা আজকের মতো হতো না। ডাউনার বলছেন যে, বর্তমানে সমস্যার পিছনে গুয়ালাদালকানাল এবং মালাইতার মাঝে দ্বন্দ্বই দায়ী; আর পিছনে ইন্ধন যোগাচ্ছে দুই পক্ষের চীনের ব্যাপারে নীতি। ডাউনার মনে করছেন যে, ২০১৭ সালে অস্ট্রেলিয়া সলোমোন দ্বীপপুঞ্জ থেকে সেনা সরিয়ে ফেলার কারণে বেইজিং এবং তাইপে উভয়েই হয়তো ধারণা করেছিল যে, অস্ট্রেলিয়া অত্র অঞ্চলকে কম গুরুত্ব দিচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার থিংকট্যাংক ‘লোয়ি ইন্সটিটিউট’এর রিসার্চ ফেলো মিহাই সোরা ব্রিটেনের ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকার এক লেখায় মত দিচ্ছেন যে, সলোমোনে অস্ট্রেলিয়ার দ্রুত সামরিক হস্তক্ষেপ দেশটার দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হওয়া থেকে বাঁচিয়েছে। তিনি বলছেন যে, সমস্যার শুরুটা ছিল আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদী কোন্দলের মাঝে। তবে খুব দ্রতই তা প্রাত্যহিক জীবনের সমস্যাগুলিকে পুঁজি করে জ্বলে ওঠে। করোনাভাইরাসের কারণে দেশের স্বাস্থ্যগত সমস্যা এবং এর ফলফলস্বরূপ অর্থনৈতিক ধ্বস মানুষকে সহিংসতা এবং লুটতরাজের দিকে আগ্রহী করেছে। শিক্ষার অভাব এবং বেকারত্বে জর্জরিত যুবসমাজ যখন হতাশায় ডুবে আছে, তখন চরম দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদদের সিদ্ধান্তের প্রতি মানুষের আনুগত্যের ঘাটতি তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের সমস্যার কেন্দ্রে ছিল দেশটার অসমান অর্থনৈতিক উন্নয়ন। দেশটার রাজধানী হোনিয়ারার অবস্থান হলো গুয়াদালকানাল দ্বীপে; যেকারণে বেশিরভাগ উন্নয়ন কর্মকান্ড হয়েছে এই দ্বীপে। পাশের দ্বীপ মালাইতাএর জনগণ এই উন্নয়নের হিস্যা না পাওয়ায় ছিল ক্ষুব্ধ। মালাইতা দ্বীপ থেকেই প্রতিবাদ শুরু হলেও পরবর্তীতে তা অন্যান্য অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক ইস্যুর মাঝে হারিয়ে যায়।
সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের ভূকৌশলগত অবস্থান
ভূকৌশলগতভাবে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের অবস্থান অস্ট্রেলিয়ার জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূলের প্রধান বন্দরগুলির সাথে সবচাইতে বেশি বাণিজ্য হয় এশিয়ার দেশগুলির। আর এই বাণিজ্য সাধনের জন্যে বাণিজ্যিক জাহাজগুলিকে পপুয়া নিউগিনির পূর্ব উপকূল থেকে শুরু করে পূর্বদিকে প্রায় দুই হাজার কিঃমিঃ পর্যন্ত সমুদ্রে অবস্থিত দ্বীপগুলির ফাঁক দিয়ে প্রবাহিত প্রণালিগুলির মাঝ দিয়ে যেতে হয়। সবচাইতে বেশি জাহাজ চলাচল করে নিউগিনি এবং নিউ ব্রিটেন দ্বীপের মাঝ দিয়ে; এবং নিউ আয়ারল্যান্ড এবং বোগেনভিল দ্বীপের মাঝ দিয়ে। সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের দ্বীপগুলি এই দুই বাণিজ্য রুট ঘেঁষে অবস্থিত। এই দ্বীপগুলিকে জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেবার চেষ্টা করে। এই চেষ্টায় বাধা হয়ে দাঁড়ায় যুক্তরাষ্ট্র। এই দ্বন্দ্বে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের গুয়াদালকানাল দ্বীপ বিখ্যাত হয়ে যায়। উভয় পক্ষই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিয়ে রাজি হয়নি। এর কারণ হলো এই দ্বীপগুলির নিয়ন্ত্রণের উপর অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা নির্ভর করছিল। প্রায় ৮০ বছর পর এখনও সেই বাস্তবতা পাল্টায়নি। একারণে অস্ট্রেলিয়া এই দ্বীপ দেশগুলির নিরাপত্তা নিয়ে সর্বদাই চিন্তিত।
অস্ট্রেলিয়ার জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘অস্টাল’ গত অক্টোবরে বলে যে, তাদের তৈরি করা ১৩তম ‘গার্ডিয়ান ক্লাস’ প্যাট্রোল বোট অস্ট্রেলিয়ার সরকার পপুয়া নিউগিনিকে দান করেছে। ২০১৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার সরকার ২’শ ৩৬ মিলিয়ন ডলার খরচে ২১টা প্যাট্রোল বোট অর্ডার করে। এই বোটগুলি প্রশান্ত মহাসাগরীয় ১২টা দেশের জন্যে তৈরি করা হচ্ছে; যা কিনা এর আগে অস্ট্রেলিয়া সরকারের দান করা প্যাট্রোল বোটগুলিকে প্রতিস্থাপন করবে। পপুয়া নিউগিনি এবং সলোমোন দ্বীপপুঞ্জ ছাড়াও এই ১২টা দেশের মাঝে রয়েছে ফিজি, ফেডারেটেড স্টেটস অব মাইক্রোনেশিয়া, টোঙ্গা, কুক দ্বীপপুঞ্জ, কিরিবাতি, মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ, পালাউ, সামোয়া, তুভালু, ভানুয়াতু; এবং ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপপুঞ্জের মাঝে অবস্থিত তিমর লেস্তে। অতি ছোট এই দেশগুলি প্রত্যেকেই জাতিসংঘে একটা ভোটের মালিক। অথচ এদের নিজেদের নিরাপত্তা নিজেদের হাতে নেই। এই দেশগুলির কূটনৈতিক কর্মকান্ড অস্ট্রেলিয়ার দ্বারা যথেষ্ট প্রভাবিত ছিল সর্বদা। এই দেশগুলির তাইওয়ানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা এর বড় উদাহরণ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে চীনের অর্থনৈতিক আগ্রাসী ভূমিকা এই দ্বীপ দেশগুলির উপর অস্ট্রেলিয়ার নিয়ন্ত্রণকে নড়বড়ে করে ফেলেছে।
অস্ট্রেলিয়ার সমুদ্র বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক অবস্থানে থাকা পপুয়া নিউগিনি এবং সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে চীনা অর্থনৈতিক প্রভাব অস্ট্রেলিয়াকে বিচলিত করেছে। একইসাথে কূটনৈতিক দ্বন্দ্বে এগিয়ে থাকার জন্যে চীনারা যখন তাইওয়ানের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, তখন অপেক্ষাকৃত বড় পুঁজির এই এশিয় প্রতিদ্বন্দ্বীরা প্রশান্ত মহাসাগরীয় ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র দেশগুলির উপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করছে। চীন এবং তাইওয়ানের কাছ থেকে মিলিয়ন ডলারের সহায়তা পেতে রাজনীতিবিদদের মাঝে জন্ম নিয়েছে লালসা; যা একইসাথে উস্কে দিয়েছে গুয়াদালকানাল এবং মালাইতাএর মাঝে আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদের দ্বন্দ্ব। দামি এই অবকাঠামোগত বিনিয়োগের সামনে অস্ট্রেলিয়ার গণতান্ত্রিক কাঠামো শক্ত করার সহায়তাগুলি ম্লান হয়ে গিয়েছে। ২০০৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে অস্ট্রেলিয়ার সেনা মোতায়েন ছিল দেশটার আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদের দ্বন্দ্বকে পুঁজি করেই। এখন নতুন করে শুরু হওয়া দ্বন্দ্ব আবারও সেখানে অস্ট্রেলিয়ার সেনা মোতায়েনের সুযোগ করে দিয়েছে। যদিও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র চীনের সাথে ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, তথাপি ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ চিন্তার অংশ অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড এই অঞ্চলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকতে চায়। সহিংসতায় সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের পুড়ে যাওয়া বাড়িঘরগুলি সেক্ষেত্রে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর জন্যে প্রভাব ধরে রাখার ছুতো মাত্র।
Showing posts with label Pacific. Show all posts
Showing posts with label Pacific. Show all posts
Monday, 6 December 2021
সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে কেন অস্ট্রেলিয়ার সৈন্য মোতায়েন?
Labels:
Australia,
China,
Global Britain,
New World Order,
New Zealand,
Pacific,
Solomon Islands,
Taiwan,
USA
Thursday, 25 April 2019
বাংলাদেশের "ইন্দো-প্যাসিফিক" কমান্ড এখন সময়ের দাবি
২৫শে এপ্রিল ২০১৯
বাংলাদেশের জন্যে পূর্ব দিকটা যেন হঠাতই বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেল। ২০১৯-এর মার্চ-এপ্রিল বাংলাদেশের “পূর্ব-যাত্রা”র সময় বলা যেতে পারে। তবে একটু খেয়াল করলেই বোঝা যাবে যে পূর্বের গুরুত্ব বাড়ছিল বহুদিন ধরেই। “লুক ইস্ট” বা “পূর্বমুখী” নীতি এই গুরুত্ব বাড়ার পিছনে থাকলেও সাম্প্রতিককালের তৎপরতা এর আগের অবস্থান থেকে বেশ কিছুটা ভিন্ন।
পূর্বের সাথে অর্থনৈতিক যোগাযোগ…
চীন-জাপানের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্কোন্নয়ন ছাড়াও মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং সিঙ্গাপুরের সাথে অর্থনৈতিক যোগাযোগ বেড়েই চলেছিল প্রতিদিন। দক্ষিণ কোরিয়াও বাংলাদেশের গুরুত্বপুর্ণ অর্থনৈতিক সহযোগী। মালয়েশিয়ায় বিরাট সংখ্যক বাংলাদেশী শ্রমিক কর্মরত রয়েছে। মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া থেকে বাংলাদেশের বেশিরভাগ ভোজ্য তেলের সরবরাহ আসছে। মালাক্কা প্রণালীতে অবস্থিত সিঙ্গাপুর এবং মালয়েশিয়ার সমুদ্রবন্দরগুলি হয়ে পূর্বের দেশগুলির সাথে বাংলাদেশের বেশিরভাগ বাণিজ্য সংঘটিত হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার সাথে বাণিজ্য করতে গিয়েও জাহাজগুলি এই অঞ্চলের বন্দর হয়ে যাতায়াত করছে। এমনকি কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূল থেকে আসা জাহাজগুলিও মালাক্কা হয়ে আসছে। চীন বর্তমানে বাংলাদেশের সবচাইতে বড় বাণিজ্য সহযোগী। ভিয়েতনাম এবং থাইল্যান্ড থেকে আসছে বিপুল পরিমাণ সিমেন্ট ক্লিংকার এবং পাথর। পূর্বের সাথে বাণিজ্যে নতুন যুক্ত হয়েছে কয়লা এবং সামনের দিনগুলিতে এলএনজি-ও যুক্ত হতে যাচ্ছে।
পূর্বের দেশগুলির সাথে বাংলাদেশের মূলতঃ আমদানি বাণিজ্য; তবে রপ্তানিও রয়েছে। চীন সাথে বাণিজ্য ১২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের। সিঙ্গাপুরের সাথে বাণিজ্য ৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন; জাপানের সাথে বাণিজ্য ২ দশমিক ৯ বিলিয়ন; হংকং-এর সাথে বাণিজ্য ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন; মালয়েশিয়ার সাথে বাণিজ্য ২ বিলিয়ন; কোরিয়ার সাথে বাণিজ্য ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন; অস্ট্রেলিয়ার সাথে ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন; ইন্দোনেশিয়ার সাথে বাণিজ্য ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন; থাইল্যান্ডের সাথে দশমিক ৯ বিলিয়ন; ভিয়েতনামের সাথে দশমিক ৮ বিলিয়ন। মোটামুটিভাবে বলা যায় যে, বাংলাদেশের ৩১ বিলিয়ন ডলারের বেশি বাণিজ্য হচ্ছে পূর্বের দেশগুলির সাথে, যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বাণিজ্যের বেশিরভাগটাই যাচ্ছে মালাক্কা প্রণালী হয়ে। মালয়েশিয়া থেকে ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের রেমিটান্সও আসছে।
বাংলাদেশের বেশিরভাগ বিনিয়োগ এখন আসছে চীন থেকে। তার সাথে রয়েছে জাপান, সিঙ্গাপুর, কোরিয়া এবং মালয়েশিয়া, যেখান থেকেও বড় অংকের বিনিয়োগ আসছে। বড় বড় জটিল কিছু যন্ত্রাংশ-সহ পদ্মা সেতুর প্রযুক্তিগত সকল সাপোর্ট আসছে চীন থেকে। পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, পায়রা বন্দরের অবকাঠামো, ইত্যাদি প্রকল্পে চীনা সহায়তা রয়েছে। অন্যদিকে মাতারবাড়ি বন্দর ও বিদ্যুতকেন্দ্র, মেট্রো রেল, মেঘনা-গোমতি-শীতলক্ষ্যার উপর সেতু, ইত্যাদি প্রকল্পে সহায়তা দিচ্ছে জাপানিরা। স্পেশাল ইকনমিক জোনগুলিতেও চীন, জাপান, সিঙ্গাপুর, কোরিয়া এবং অন্যান্য দেশ থেকে বিরাট অংকের বিনিয়োগ আসছে। এসব বিনিয়োগের সাথে আসছে বিপুল পরিমাণ যন্ত্র এবং যন্ত্রাংশ, যার বেশিরভাগ আসছে সমুদ্রপথে। চীন-জাপানের বিনিয়োগ বৃদ্ধির সাথে সাথে সেসব দেশ থেকে বিরাট সংখ্যক ইঞ্জিনিয়ার এবং টেকনিশিয়ান বাংলাদেশে আসছে।
নিরাপত্তা সম্পর্ক...
চীন বাংলাদেশের সামরিক অস্ত্রসস্ত্রের সবচাইতে বড় সরবরাহকারী। চীনা সহায়তায় বাংলাদেশের সমরাস্ত্র তৈরির সক্ষমতাও তৈরি হচ্ছে। চীনা সহায়তায় ২১৪ এমআরও ইউনিট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এখন এফ-৭ ফাইটার জেটগুলি বাংলাদেশেই ওভারহলিং করা হচ্ছে। এর আগে ২১০ এমআরও ইউনিটের মাধ্যমে চীনে নির্মিত পিটি-৬ প্রশিক্ষণ বিমান ওভারহোলিং-ও শুরু হয়। শর্ট-রেঞ্জ সার্ফেস-টু-এয়ার মিসাইল তৈরির কারখানাও করা হচ্ছে চীনা সহায়তায়। কক্সবাজারে সাবমেরিন বেস তৈরি হচ্ছে চীনা সহায়তায়। খুলনা শিপইয়ার্ডে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্যে দুর্জয়-ক্লাসের এলপিসি তৈরি হয়েছে চীনা সহায়তায়। স্বাধীনতা-ক্লাসের কর্ভেট চীনে নির্মিত হয়েছে, যেগুলির ফলো-অন ইউনিটগুলি চীনা সহায়তায় দেশে তৈরি হতে পারে। সেনাবাহিনীর পুরোনো ট্যাঙ্কগুলিকে আপগ্রেড করা হচ্ছে চীনা সহায়তায়। ইন্দোনেশিয়ার সহায়তায় নারায়নগঞ্জ ডকইয়ার্ডে তৈরি হচ্ছে কম্পোজিট ম্যাটেরিয়ালের ফাস্ট প্যাটোল বোট। ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষা ইন্ডাস্ট্রিও চাইছে বাংলাদেশে তাদের বাজার বৃদ্ধি করতে।
রাজনৈতিক সম্পর্ক...
রাষ্ট্রীয় অত্যাচারের পর মিয়ানমারের আরাকান থেকে ১০ লাখ মুসলিম উদ্বাস্তু বাংলাদেশে চলে আসার সময় থেকে বাংলাদেশের সাথে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সম্পর্ক নতুন মোড় নিয়েছে। চীন এবং জাপানকে বাংলাদেশ নিজেদের দলে ভেড়াতে পারেনি; থাইল্যান্ডের অবস্থানও একই। তবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং ব্রুনাই থেকে বাংলাদেশ সাড়া পেয়েছে। বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলি যখন কোন সমর্থন দিতে অপারগ ছিলো, তখন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলি থেকে কূটনৈতিক তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। এর কারণ ছিল সেসব দেশের মানুষের ইসলামের প্রতি দুর্বলতা। দেশগুলির সরকার মূলতঃ সেকুলার হলেও মুসলিম জনমতের চাপে তারা মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করতে বাধ্য হয়। মিয়ানমারে গণহত্যার প্রতিবাদে ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় লাখো মানুষ মিছিল করেছিল। ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়ার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা নিয়মিত বাংলাদেশের কক্সবাজারের উদ্বাস্তু শিবিরগুলি পরিদর্শন করেছেন। ২০১৮-এর জানুয়ারিতে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো বাংলাদেশে আসেন। বাংলাদেশ চাইছে মিয়ানমার ইস্যুতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলি শক্ত অবস্থানে আসুক। আর সেই লক্ষ্যে এই দেশগুলির সাথে সম্পর্ক আরও গভীর করতে আগ্রহী বাংলাদেশ।
যোগাযোগের ব্যবস্থার উন্নয়ন...
বাংলাদেশ থেকে পূর্বের দেশগুলিতে যাতায়াতের মূল উপায় বিমান এবং সমুদ্রপথ; সড়কপথ বা রেলপথ তৈরির পরিস্থিতি এখনও তৈরি হয়নি মূলতঃ মিয়ানমারের কারণে। তদুপরি, পূর্বের সাথে বাণিজ্যের প্রসার হয়েছে বেশ দ্রুতই। ঢাকা থেকে কুয়ালালামপুরে এখন প্রতিদিন ৮টা থেকে ১০টা ফ্লাইট চলে; ব্যাঙ্ককে যায় প্রতিদিন ৭টা ফ্লাইট; সিঙ্গাপুরে প্রতিদিন ৩টা ফ্লাইট। সরাসরি গুয়াংঝু যাচ্ছে প্রতিদিন ২টা ফ্লাইট; কুনমিং-এ ১টা ফ্লাইট। আর এসব শহর থেকে জাকার্তা, বেইজিং, সাংহাই, হংকং অথবা টোকিওতে রয়েছে বহু ফ্লাইট। এই ফ্লাইটগুলি এখন বাংলাদেশের সাথে পূর্বের দেশগুলিকে অনেক কাছে নিয়ে এসেছে। সহজ যাতায়াত সেসব দেশের সাথে বাণিজ্যের প্রসারে বিরাট অবদান রেখেছে। তবে বেশিরভাগ পণ্য বাণিজ্য হচ্ছে সমুদ্রপথে; মালাক্কা প্রণালীর সমুদ্রবন্দরগুলি হয়ে।
মার্চ-এপ্রিলের ইস্টার্ন টাইম-লাইন......
২০১৯-এর মার্চ-এপ্রিলে বাংলাদেশের পূর্ব-নীতি যথেষ্ট গতি লাভ করে। নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে এগুলে এই গতিবেগ যে বৃদ্ধি পেতে পারে, তা পরিষ্কার হয়ে গেল।
১৮ই মার্চ ২০১৯ - মালয়েশিয়ায় লংকাউই ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অ্যান্ড অ্যারোস্পেস এক্সিবিশনে অংশ নিতে মালয়েশিয়ায় গেল বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড জাহাজ সিজিএস সৈয়দ নজরুল। জাহাজের অধিনায়ক ক্যাপ্টেন শেখ মোহাম্মদ জসিমুজ্জামানের নেতৃত্বে ১২ জন কর্মকর্তা, ১০৬ জন নাবিক ও ১১ জন বেসামরিক লোক শুভেচ্ছা সফরে যাচ্ছেন। জাহাজটি ভারতের পোর্ট ব্লেয়ার ও থাইল্যান্ডের ফুকেট বন্দর হয়ে মালয়েশিয়ায় পৌঁছাবে।
২০শে মার্চ ২০১৯ – চারদিনের শুভেচ্ছা সফরে ভারতের আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের পোর্ট ব্লেয়ার গেল বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড জাহাজ সিজিএস সৈয়দ নজরুল।
২১শে মার্চ ২০১৯ - মালয়েশিয়ায় লংকাউই ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অ্যান্ড অ্যারোস্পেস এক্সিবিশনে অংশ নিতে চট্টগ্রাম নৌ-জেটি ত্যাগ করে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ 'সমুদ্র জয়'।
২৬শে মার্চ ২০১৯ – ছয় দিনের সফরে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল মাসিহুজ্জামান সেরনিয়াবাত। সফরকালে তিনি লাংকাউই-তে ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অ্যান্ড এরোস্পেস এক্সিবিশন (এলআইএমএ)-২০১৯ ও এয়ার চিফ কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করেন। রুশ এয়ারক্রাফট করপোরেশন, ইউনাইটেড এয়ারক্রাফট করপোরেশন ও ইরকুট করপোরেশনের প্রতিনিধির সঙ্গেও তিনি সাক্ষাৎ করেন। ৩১শে মার্চ বাংলাদেশ বিমান বাহিনী প্রধান মালয়েশিয়ান আর্মড ফোর্সেস স্টাফ কলেজ পরিদর্শন করেন। সেখানে আর্মড ফোর্সেস স্টাফ কলেজ আয়োজিত একটি অভিষেক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কলেজের ‘হল অব ফেম’ এ ১৩তম ব্যক্তি হিসেবে বিমান বাহিনী প্রধানের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরে বিমান বাহিনী প্রধান ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেন।
২৬শে মার্চ ২০১৯ – পাঁচ দিনের সফরে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল আওরঙ্গজেব চৌধুরী। মালয়েশিয়া অবস্থানকালে নৌপ্রধান যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক ফ্লিট কমান্ডার এবং মালয়েশিয়া ও শ্রীলংকান নৌবাহিনী প্রধানের সাথে সৌজন্য সাক্ষাত করেন। তিনি লাংকাউই-তে ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অ্যান্ড এরোস্পেস এক্সিবিশন (এলআইএমএ)-২০১৯-এর ফ্লিট রিভিউ-এ অংশ নেন।
২৭শে মার্চ ২০১৯ - লংকাউই ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অ্যান্ড অ্যারোস্পেস এক্সিবিশনের ফ্লীট রিভিউ-এ অংশ নেয় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ 'সমুদ্র জয়' এবং বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড জাহাজ সিজিএস সৈয়দ নজরুল।
২৮শে মার্চ ২০১৯ - মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ডা. মাহাথির বিন মোহাম্মদের সঙ্গে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বৈঠক করেন দেশটিতে সফররত বাংলাদেশের উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল। দেশটির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারেক আহমেদ সিদ্দিকী কর্মী নিয়োগ, অবৈধদের বৈধতা দেয়া, নির্বিঘ্নে প্রত্যাবাসন, নিরাপদ কর্ম, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা, রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশ সফর নিয়ে আলোচনা করেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল মাসিহুজ্জামান সেরনিয়াবাত, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল আওরঙ্গজেব চৌধুরী, বাংলাদেশের হাইকমিশনার শহীদুল ইসলাম ও দূতাবাসের ডিফেন্স অ্যাডভাইজার এয়ার কমোডর হুমায়ুন কবীর।
২৯শে মার্চ ২০১৯ - চীনে অনুষ্ঠেয় ইন্টারন্যাশনাল ফ্লিট রিভিউতে অংশ নিতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ‘প্রত্যয়’ চট্টগ্রাম নৌজেটি ত্যাগ করে। ২২-২৫ এপ্রিল চার দিনব্যাপী এ মহড়ায় বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনীর জাহাজ, যুদ্ধবিমান এবং সামরিক ব্যক্তিবর্গ অংশ নেবার কথা রয়েছে। ‘বানৌজা প্রত্যয়’ জাহাজের অধিনায়ক ক্যাপ্টেন এমএম মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে ২৪ জন কর্মকর্তাসহ ১১৭জন নৌসদস্য এ মহড়ায় অংশ নেবেন।
২রা এপ্রিল ২০১৯ - বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কর্ভেট বিএনএস প্রত্যয় ২৩ জন কর্মকর্তা এবং ১১৬ জন নাবিকসহ মালয়েশিয়ার রাজকীয় নৌবাহিনীর লুমুট ঘাঁটিতে নোঙর করে।
৩রা এপ্রিল ২০১৯ - নৌবাহিনীর কর্ভেট বিএনএস প্রত্যয়-এ অনবোর্ড অভ্যর্থনা ও নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। অভর্থনা ও নৈশভোজ অনুষ্ঠানে মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার শহীদুল ইসলাম সস্ত্রীক প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে 'গেস্ট অব অনার' হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মালয়েশিয়ার নেভাল স্পেশাল ফোর্সের কমান্ডার ফার্স্ট অ্যাডমিরাল দাতু আনুর বিন হাজি ইলিয়াস।
৩রা এপ্রিল ২০১৯ - সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ ৭ দিনের সরকারী সফরে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন। সফরকালে সেনাবাহিনী প্রধান সিঙ্গাপুরে যৌথ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অনুশীলনের চূড়ান্ত দিনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। বাংলাদেশের সেনা, নৌ, বিমানবাহিনীসহ বেসামরিক কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ৪১ জন সদস্য এ যৌথ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অনুশীলনে অংশগ্রহণ করে। দেশের বাইরে এবারই প্রথম বাংলাদেশ এ ধরনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অনুশীলনে সহযোগী আয়োজকের ভূমিকা পালন করেছে। সিঙ্গাপুরের চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস লেফটেন্যান্ট জেনারেল মেলভিন অংয়ের সঙ্গেও তিনি সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এছাড়াও তিনি চাংগি কমান্ড এন্ড কন্ট্রোল সেন্টার এবং সিঙ্গাপুরের স্বনামধন্য এসটি কাইনেটিকস ডিফেন্স ফ্যাক্টরিসহ বেশকিছু সামরিক ও অসামরিক স্থাপনা পরিদর্শন করেন।
৩রা এপ্রিল ২০১৯ - বাংলাদেশ নৌবাহিনীর দুটি জাহাজ বিএনএস সংগ্রাম (এফ১১৩) ও বিএনএস প্রত্যাশা (এফ১১৪) তৈরির পর অফিশিয়ালি হস্তান্তর করেছে চীনা জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান সিএসআইসি। চীনের পূর্বের জিয়াংশু প্রদেশের চিডং বন্দরে এই অনুষ্ঠান হয়।
৮ই এপ্রিল ২০১৯ - বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কর্ভেট বিএনএস প্রত্যয় ভিয়েতনামের হো চি মিন সিটির সায়গন বন্দরে প্রবেশ করে। জাহাজটা সেখানে চার দিনের শুভেচ্ছা সফর শুরু করেছে। এটা বাংলাদেশের কোন যুদ্ধজাহাজের প্রথম ভিয়েতনাম সফর।
১৪ই এপ্রিল ২০১৯ - বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজ 'বিএনএস প্রত্যয়' চীনের গুয়াংঝু পৌঁছায়। জাহাজটা চীনে ইন্টারন্যাশনাল ফ্লীট রিভিউ-এ অংশ নেবে।
২১শে এপ্রিল ২০১৯ - গণচীনের নৌবাহিনীর ৭০তম বার্ষিকীতে যোগদানের উদ্দেশ্যে নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল আওরঙ্গজেব চৌধুরী আট দিনের সফরে গণচীনের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন। তিনি সেখানে ইন্টারন্যাশনাল ফ্লিট রিভিউ এ অংশগ্রহণ করবেন। সফরকালে নৌপ্রধান চীনের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ছাড়াও, গণচীনের যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন একাডেমিসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ঘাঁটি পরিদর্শন করবেন।
২১শে এপ্রিল ২০১৯ - প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্রুনাই দারুসসালামের সুলতান হাজী হাসানাল বলকিয়ার আমন্ত্রণে ৩ দিনের সরকারি সফরে ২১শে এপ্রিল ব্রুনাই যান। প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে বাংলাদেশ ও ব্রুনাই কৃষি, মৎস্য, পশুসম্পদ, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া এবং এলএনজি সরবরাহের ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদার করার জন্য সাতটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় অঞ্চলে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সদস্য পাঁচটি দেশের সমন্বয়ে এক আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ফোরাম গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। ব্রুনাইয়ের সুলতান হাজি হাসানাল বলকিয়ার সঙ্গে তার সরকারি বাসভবন ইস্তানা নুরুল ইমানে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ প্রস্তাব করেন। প্রস্তাবিত আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ফোরাম সাউথ-ইস্ট এশিয়া কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (সিয়াকো) সদস্য হবে দক্ষিণ এশিয়া থেকে বাংলাদেশ ও মালদ্বীপ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও ব্রুনাই। প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে ব্রুনাইয়ের সুলতান বিষয়টি ‘ইতিবাচকভাবে বিবেচনা’ করবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন। প্রধানমন্ত্রী ও সুলতান উভয়ই বাংলাদেশ ও ব্রুনাইয়ের মধ্যে সরাসরি উড়োজাহাজ চলাচল শুরুর কথা বলেছেন। এ সময় মানবিক কর্মসূচি ও জ্ঞান বিনিময়ের ক্ষেত্রে সামরিক সহযোগিতার প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী। এ প্রসঙ্গে আসিয়ানের বড় ধরনের অংশগ্রহণ কামনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে তিনি ব্রুনাই সুলতানের সহযোগিতাও কামনা করেন। এর বিপরীতে হাজি হাসানাল বলকিয়া আশ্বাস দেন, বাংলাদেশ এবং আঞ্চলিক ফোরামের সহযোগিতাকে শক্তিশালী করতে ব্রুনাই সহায়তা করবে। আলোচনাকালে প্রধানমন্ত্রী ব্রুনাইয়ের সুলতানকে সস্ত্রীক বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।
২২শে এপ্রিল ২০১৯ - চীন থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশে যাত্রাপথে মালয়েশিয়ার রাজকীয় নৌঘাঁটি ন্যাশনাল হাইডোগ্রাফি জেটি পোর্ট ক্লাংয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর দুটি জাহাজ বিএনএস সংগ্রাম (এফ১১৩) ও বিএনএস প্রত্যাশা (এফ১১৪) নোঙর করে। জাহাজ দুটিতে অন বোর্ড অভ্যর্থনা এবং নৈশভোজের আয়োজন করা হয়, যেখানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম প্রধান অতিথি ও মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে 'গেস্ট অব অনার' হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রয়েল মালয়েশিয়ার নৌবাহিনী সদর দফতরের অ্যাসিস্ট্যান্ট চিফ অব স্টাফ (প্ল্যানস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট), ফার্স্ট অ্যাডমিরাল আহমদ শাফিরুদ্দীন বিন আবু বকর।
২৩শে এপ্রিল ২০১৯ - মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইফুদ্দীন আব্দুল্লাহর সঙ্গে বৈঠক করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কো-অপারেশনে (সিয়াকো) মালয়েশিয়ার সমর্থন অর্জনের জন্য কুয়ালালামপুরে চার সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন শাহরিয়ার আলম। বৈঠকে অর্থনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে উন্নয়নের বিভিন্ন বিষয়ে ঐক্যমত পোষণ করেছেন উভয় দেশের মন্ত্রী। ওয়ার্ল্ড ইসলামিক ইকনোমিক ফোরামের (ডব্লিউআইইএফ) চেয়ারম্যান এবং মালয়েশিয়ার সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী মুসা হাতিমের সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পৃথক বৈঠক হয়। বাংলাদেশের উদ্যোগে তাদের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন পাওয়া যায়।
যা হতে যাচ্ছে...
খুব সম্ভবতঃ ২০১৯-এর জুনেই ‘সিয়াকো’ প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে ভারত মহাসাগর আর প্রশান্ত মহাসাগরের দেশগুলির মাঝে একটা সাংগঠনিক সম্পর্ক তৈরি হবে। আরও নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে মালাক্কা প্রণালীর দুই পাশের দেশগুলিকে এই সংস্থা একত্র করবে। আর এর সদস্য দেশগুলির প্রধান পরিচয় হবে এদের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা। ভূরাজনৈতিক দিক থেকে ভারত মহাসাগরের একটা দেশের প্রশান্ত মহাসাগরে যাওয়া, অথবা প্রশান্ত মহাসাগরের একটা দেশের ভারত মহাসাগরে আসাটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এই যাতায়াত এখন পর্যন্ত সামগ্রিক কোন পরিকল্পনার অংশ মনে না হলেও সেদিকেই এগুচ্ছে সকলকিছু। এই সংস্থা আরও নতুন সমঝোতার জন্ম দেবে, যা কিনা সামগ্রিকভাবে “ইন্দো-প্যাসিফিক” চিন্তার প্রসার ঘটাবে। ভারত মহাসাগরে চীনের আনাগোনা ভারতকে তুষ্ট করেনি। একইসাথে ভারত মহাসাগরে বাংলাদেশের নেতৃত্বে পাঁচটা মুসলিম দেশের আনাগোনাও ভারতকে তুষ্ট করবে না; বিশেষ করে এই দেশগুলিকে একত্রিত করার মূলে রয়েছে যেখানে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা। আবার অন্যদিকে দক্ষিণ চীন সাগরে বাংলাদেশের আনাগোনা চীন মেনে নিতে বাধ্য হবে ভালো সম্পর্ক রক্ষার খাতিরেই।
মালাক্কা প্রণালী হয়ে বাংলাদেশের ৩১ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য যদি “ইন্দো-প্যাসিফিক” চিন্তার ভিত গড়তে যথেষ্ট শক্তিশালী ধাক্কা না দিতে পারে, তাহলে মিয়ানমারের শরণার্থী সমস্যা তা পারবে। নিজের অবস্থানকে শক্তিশালী না করতে পারলে অন্যদের কাছ থেকে সঠিক মূল্যায়ন পাবার চিন্তাটা অবান্তর। পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সাথে বাংলাদেশের যথেষ্ট ‘বারগেইন পাওয়ার’ থাকলে মিয়ানমারের পক্ষে আরাকানের মুসলিমদের গায়ে হাত তোলা সম্ভব হতো না। বাংলাদেশ তার সম্পর্কোন্নয়ন করেছিল মূলতঃ বৌদ্ধ-অধ্যুষিত চীন-জাপান-কোরিয়া-সিঙ্গাপুর-থাইল্যান্ডের সাথে, যারা মুসলিম উদ্বাস্তু সমস্যাকে তাদের বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের অন্তরায় হিসেবে দেখেছে। ভারতও সেই পথেই চিন্তা করেছে। মিয়ানমারের উদ্বাস্তুদের ব্যাপারে আসিয়ানের অবস্থানকে বাংলাদেশের পক্ষে আনার চেষ্টাটাও ব্যর্থ হয়েছে বৌদ্ধ-অধ্যুষিত দেশগুলির অনাগ্রহের কারণে। দেরিতে হলেও বাংলাদেশ বুঝতে পারছে যে, পূর্ব এশিয়ার মুসলিম জনগণের সাথে কৌশলগত সম্পর্কোন্নয়নের বিকল্প আর কিছু নেই। এই সম্পর্কের গভীরতাই সেই দেশগুলির সরকারগুলিকে বাংলাদেশের পক্ষে থাকতে অনুপ্রেরণা যোগাবে। পূর্বের মুসলিম দেশগুলির সাথে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কর্মকান্ড বৃদ্ধি, বিশেষ করে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সম্পর্কোন্নয়ন এখন অত্যাবশ্যক। সেই লক্ষ্যে নিজেদের ইচ্ছা বা ‘ইনটেন্ট’ জানান দিতে পূর্বের সকল রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ডকে একটা আমব্রেলার নিচে এনে “ইন্দো-প্যাসিফিক” কমান্ড তৈরি করার এখনই সময়।
Labels:
Bangladesh,
Brunei,
China,
Geopolitics,
Indian Ocean,
Indo-Pacific,
Indonesia,
Malaysia,
Pacific,
SEACO
Subscribe to:
Posts (Atom)







