Saturday, 24 August 2019

ভেনিজুয়েলার সরকারকে টিকিয়ে রেখেছে কিউবার ইন্টেলিজেন্স?


২৪শে অগাস্ট ২০১৯
অর্থনৈতিক সমস্যায় পতিত হবার পর ভেনিজুয়েলার অর্থনীতি এখন মধ্য আমেরিকার ছোট দেশগুলির আকারে এসে পৌঁছেছে, যদিও দেশটা বিশ্বে বৃহৎ তেল উৎপাদনকারী দেশগুলির একটা; এবং পৃথিবীর সবচাইতে বড় তেলের রিজার্ভ (প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ব্যারেল) রয়েছে সেখানে। মার্কিন অবরোধ এবং ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে প্রতি মাসে ভেনিজুয়েলার তেল বিক্রির আয় ১৫ শতাংশ করে কমছে। ভেনিজুয়েলা সরকারের ক্ষমতায় টিকে থাকার পিছনে সবচাইতে বড় স্তম্ভ হলো এর সেনাবাহিনী, যা এখনও প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সমর্থন করে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে যে, মাদুরোকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রেখেছে কিউবা।



যুক্তরাষ্ট্র বনাম ভেনিজুয়েলা-কিউবা

গত ২৪শে জুলাই ভেনিজুয়েলায় মার্কিন বিশেষ প্রতিনিধি এলিয়ট এব্রামস এক অনুষ্ঠানে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে টিকিয়ে রাখতে বাইরের দেশের হস্তক্ষেপের ব্যাপারে কথা বলেন। তিনি বলেন যে, ভেনিজুয়েলার অর্থনৈতিক অচলাবস্থার মাঝে মাদুরো সরকার ৩৮ মিলিয়ন ডলার খরচ করে সামরিক ইউনিফর্ম কিনেছে। মে মাসে ২’শ ৯ মিলিয়ন ডলার খরচে ভেনিজুয়েলা সরকার রাশিয়ার সহায়তায় তার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ঠিকঠাক করেছে। একইসাথে ৯টা রুশ ‘সুখোই-৩০’ যুদ্ধবিমান আর ৮টা পরিবহণ হেলিকপ্টার ক্রয়ের কথাও হয়েছে রুশদের সাথে। তবে রাশিয়ার ব্যাপারে এব্রামসের কথাগুলিতে নতুন কিছু না থাকলেও তিনি কিউবা নিয়ে যে কথাগুলি বলেছেন, তা অনেককেই অবাক করেছে। তিনি বলেন যে, ভেনিজুয়েলাতে আড়াই হাজার কিউবান ইন্টেলিজেন্স এজেন্ট কাজ করছে। আর এই সুযোগে কিউবা ভেনিজুয়েলা থেকে বিনা খরচে তেলের সরবরাহ পাচ্ছে। এব্রামসের কথার একদিন পরই আরেকজন উচ্চপদস্থ মার্কিন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের সাথে টেলিকনফারেন্সের সময় একই ধরনের কথা বলেন। তিনি বলেন যে, কিউবার আর্থিক নেটওয়ার্ক, আয়ের উৎস, তেলের বাণিজ্য – এসকল কিছুর বিরুদ্ধেই মার্কিন সরকার ব্যবস্থা নিয়েছে। এই ব্যবস্থা আরও কঠোর হবে যদি কিউবানরা ভেনিজুয়েলার সরকারকে সমর্থন দেয়া বন্ধ না করে। আসলেই কি ভেনিজুয়েলায় কিউবার ততটা প্রভাব রয়েছে? মার্কিন চেষ্টার বিরুদ্ধে ভেনিজুয়েলার সরকারকে টিকিয়ে রাখতে কিউবার ভূমিকাই বা কতটুকু?

মার্কিন কর্মকর্তাদের হুমকির পরদিনই কিউবার ‘হাভানা টাইমস’ পত্রিকার এক খবরে বলা হয় যে, কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-কানেল কিউবা ভেনিজুয়েলাকে তার সমর্থন দেয়া অব্যাহত রাখবে। কিউবান বিপ্লবের ৬৬তম বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে দিয়াজ-কানেল বলেন যে, ওয়াশিংটন কিউবার বিদ্যুৎ, পানি, এমনকি বাতাস আটকে দিতে চাইছে যাতে কিউবা ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে সহায়তা দিতে না পারে। মার্কিনীরা কিউবার বন্দরে তেলের জাহাজ ভিড়তে বাধা দিচ্ছে, জাহাজ কোম্পানিগুলিকে ভীতি প্রদর্শন করছে। ভেনিজুয়েলা থেকে কিউবায় তেল নিয়ে যাওয়া কয়েকটা কোম্পানির উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। মার্কিন অবরোধের কারণে জুলাই মাসে কিউবায় পর্যটকের আগমন প্রায় ২৪ শতাংশ কমে গেছে। তবে একইসাথে কিউবার প্রেসিডেন্ট এ-ও বলেন যে, কিউবা ওয়াশিংটনের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চায়; পারস্পরিক সন্মান প্রদর্শনের ভিত্তিতে নিজেদের বিরোধগুলিকে দেখতে চাচ্ছে কিউবা। তবে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়ে মার্কিনীরা যখন কিউবার সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমে দেশটাকে নিজেদের প্রভাব বলয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই ট্রাম্প প্রশাসন সেখান থেকে পুরোপুরি উল্টো পথে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। কিউবার সাথে মার্কিনীদের বহু বছরের বিরোধের সূত্রে কিউবা তাদের নিরাপত্তাকে সর্বদাই গুরুত্ব দিয়ে দেখেছে; বিশেষতঃ তাদের ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসের সক্ষমতাকে গড়ে তুলেছে।

‘কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’এর ফেলো মইজেস নাইম ১৯৯০-এর দশকে ভেনিজুয়েলার সরকারে ছিলেন। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘জি’-জিরো মিডিয়া’র সাথে এক সাক্ষাতে তিনি বলেন যে, অর্থনৈতিক সমস্যায় পতিত হবার পর ভেনিজুয়েলার অর্থনীতি এখন মধ্য আমেরিকার ছোট দেশগুলির আকারে এসে পৌঁছেছে, যদিও দেশটা বিশ্বে বৃহৎ তেল উৎপাদনকারী দেশগুলির একটা; এবং পৃথিবীর সবচাইতে বড় তেলের রিজার্ভ (প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ব্যারেল) রয়েছে সেখানে। মার্কিন অবরোধ এবং ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে প্রতি মাসে ভেনিজুয়েলার তেল বিক্রির আয় ১৫ শতাংশ করে কমছে। ভেনিজুয়েলা সরকারের ক্ষমতায় টিকে থাকার পিছনে সবচাইতে বড় স্তম্ভ হলো এর সেনাবাহিনী, যা এখনও প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সমর্থন করে যাচ্ছে। এর কারণ হিসেবে মইজেস নাইম বলছেন যে, সেনাবাহিনীর হাতে আর কোন অপশন নেই। এবং একইসাথে মাদুরোকে সমর্থন দিয়ে চলছে কিউবার ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস। ভেনিজুয়েলার অর্থনীতি, রাজনীতি, কূটনীতি – বিভিন্ন ক্ষেত্রে কিউবার ইন্টেলিজেন্সের প্রভাব এখন ব্যাপক।

গত মে মাসে ‘অর্গানাইজেশন অব আমেরিকান স্টেটস’এ এক ভাষণে কিউবা গবেষক মারিয়া সি ওয়েরলাউ বলেন যে, দুর্বল অর্থনীতি এবং ছোট জনসংখ্যা সত্ত্বেও কিউবা বস্তুতঃ ভেনিজুয়েলার দখল নিয়ে নিয়েছে। কোন গুলি খরচ না করেই কিউবা তার চাইতে অনেক বড় এবং অনেক বেশি বিত্তশালী একটা দেশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। ওয়েরলাউ-এর কথাগুলি যে ভিত্তিহীন নয়, তার প্রমাণ পাওয়া যায় ভেনিজুয়েলার ব্যাপারে কানাডার কূটনৈতিক চেষ্টা দেখে। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ড ২২শে অগাস্ট ঘোষণা দেন যে, তিনি কিউবা যাচ্ছেন সেদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদরিগেজের সাথে ভেনিজুয়েলা বিষয়ে কথা বলতে। মে মাস থেকে এটা হবে রদরিগেজের সাথে তার তৃতীয় বৈঠক।

 
ফিদেল ক্যাস্ট্রোর সাথে ভালো বন্ধুত্ব থাকার কারণে ১৯৯৯ সালে হুগো শাভেজ ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হবার পর ‘জি-২’এর জন্যে নতুন করে দুয়ার খুলে যায়। কিউবা থেকে আসা ডাক্তার, ক্রীড়া প্রশিক্ষক, টেকনিশিয়ান, ইঞ্জিনিয়ারদের মাঝ দিয়েই ‘জি-২’ ভেনিজুয়েলায় তাদের উপস্থিতি গড়ে তোলে। ২০০৭ সালে হুগো শাভেজ বলেন যে, ভেনিজুয়েলাতে ২০ হাজারের বেশি কিউবান ডাক্তার, নার্স এবং টেকনিশিয়ান কাজ করছে। ২০০২ সালে হুগো শাভেজকে ক্ষমতাচ্যুত করার ব্যর্থ অভ্যুত্থানচেষ্টাটাই ছিল দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে টার্নিং পয়েন্ট।



হুগো শাভেজ এবং ফিদেল ক্যাস্ট্রো

‘জিওপলিটিক্যাল মনিটর’এর এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, ‘কিউবান ইন্টেলিজেন্স ডিরেকটরেট’ বা ‘জি-২’-এর শক্তির উৎস হচ্ছে ঠান্ডা যুদ্ধের সময় ১৯৬০-৭০-এর দশকে সোভিয়েত এবং পূর্ব-জার্মানির ইন্টেলিজেন্সের দ্বারা প্রশিক্ষণের ভিত। টানা ছয় দশক যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি অবস্থিত হয়েও সমাজতান্ত্রিক সরকারকে রক্ষা করতে পারার সাথে সাথে ‘জি-২’-এর ভিত আরও শক্ত হয়েছে। ফিদেল ক্যাস্ট্রোকে হত্যা করার বেশ কয়েকটা চেষ্টাকেও তারা প্রতিহত করেছে বলে শোনা যায়। মধ্য এবং দক্ষিণ আমেরিকার বেশকিছু সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী গ্রুপকে ‘জি-২’ প্রশিক্ষণ দিয়েছে। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং ভিয়েতনামেও তাদের জড়িত থাকার কথা জানা যায়। ১৯৫৯ সালে কিউবায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর থেকেই ‘জি-২’ ভেনিজুয়েলায় প্রভাব বিস্তারে সচেষ্ট হয়েছিল। কিউবা ভেনিজুয়েলার বামপন্থী বিপ্লবীদের সহায়তা করছিল। অন্যদিকে ভেনিজুয়েলার সরকার ছিল বামপন্থা-বিরোধী। তাই এসময়ে দুই দেশের সম্পর্ক সহজ ছিল না। ঠান্ডা যুদ্ধ শেষের পর থেকে কিউবার জ্বালানি নিরাপত্তা শঙ্কার মাঝে পড়ে গেলে ভেনিজুয়েলা কিউবার কাছে আবারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফিদেল ক্যাস্ট্রোর সাথে ভালো বন্ধুত্ব থাকার কারণে ১৯৯৯ সালে হুগো শাভেজ ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হবার পর ‘জি-২’এর জন্যে নতুন করে দুয়ার খুলে যায়। কিউবা থেকে আসা ডাক্তার, ক্রীড়া প্রশিক্ষক, টেকনিশিয়ান, ইঞ্জিনিয়ারদের মাঝ দিয়েই ‘জি-২’ ভেনিজুয়েলায় তাদের উপস্থিতি গড়ে তোলে। ২০০৭ সালে হুগো শাভেজ বলেন যে, ভেনিজুয়েলাতে ২০ হাজারের বেশি কিউবান ডাক্তার, নার্স এবং টেকনিশিয়ান কাজ করছে। বেসরকারি হিসেবে অনেকে এই সংখ্যাকে ৪০ হাজার বলছেন।

অভিজ্ঞতার দিক থেকে ‘জি-২’ ভেনিজুয়েলার ইন্টেলিজেন্স থেকে অনেক এগিয়ে থাকার কারণেই কিউবা তার নেতৃত্ব ধরে রাখতে পেরেছে। তবে ভেনিজুয়েলার ইন্টেলিজেন্সের মাঝে অনেকেই বামপন্থী-বিরোধী থাকায় তারা ‘জি-২’এর প্রভাবকে পছন্দ করেনি। ২০০২ সালে হুগো শাভেজকে ক্ষমতাচ্যুত করার ব্যর্থ অভ্যুত্থানচেষ্টায় মার্কিনীদের জড়িত থাকার খবর দেয় ব্রিটেনের ‘দ্যা অবজার্ভার’ পত্রিকা। জার্মান মিডিয়া ‘ডিডব্লিউ’ বলছে যে, শাভেজের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানচেষ্টাটাই ছিল দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে টার্নিং পয়েন্ট। ‘রয়টার্স’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ক্যাস্ট্রো এবং শাভেজ ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিতে চুক্তি করেন। চুক্তি মোতাবেক কিউবা ভেনিজুয়েলার সেনাবাহিনী এবং ইন্টেলিজেন্সকে প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু করে। প্রথম উদ্দেশ্যই থাকে ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরে শত্রু দেশের ইন্টেলিজেন্সের কর্মকান্ডকে খুঁজে বের করে দমন করা। এই কাজে ভেনিজুয়েলার ইন্টেলিজেন্স ব্যাপক ধরপাকরড় চালায়।

নিরাপত্তা-বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সিএনএ’-এর সিনিয়র এনালিস্ট উইলিয়াম রোজনাউ এবং রালফ এসপাচ ‘ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় বলছেন যে, ছোট দেশ হয়েও কিউবা তার ইন্টেলিজেন্সের বদৌলতে নিজের ওজন বাড়িয়ে নিয়েছে। প্রাক্তন মার্কিন ইন্টেলিজেন্স সদস্য এডওয়ার্ড স্নোডেন-কে ল্যাটিন আমেরিকায় রাজনৈতিক আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দেবার জন্যে কিউবার ইন্টেলিজেন্স মধ্যস্ততা করে। সোভিয়েতদের সাথে কিউবানরাও মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর এবং ইন্টেলিজেন্সের ভেতরে ঢুকে পড়ে। স্পেন এবং ল্যাটিন আমেরিকায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলিতেও কিউবানরা কাজ চালিয়ে যায়। ১৯৮০-এর দশকে মধ্য আমেরিকার এল-সালভাদর এবং গুয়াতেমালাতে মার্কিন সমর্থিত সরকারের বিরুদ্ধে গেরিলাদের সহায়তা দেয় ‘জি-২’। ঠান্ডা যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রে ‘জি-২’এর কর্মকান্ড বৃদ্ধি পায়; বিশেষ করে ফ্লোরিডায় ক্যাস্ট্রো-বিরোধী গ্রুপগুলির ব্যাপারে ‘জি-২’ বেশি সক্রিয় ছিল। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ‘এফবিআই’ ১৯৯০ থেকে ২০১০ পর্যন্ত মার্কিন নিরাপত্তা স্থাপনায় বহুদিন ধরে কাজ করা বেশকিছু কিউবার ইন্টেলিজেন্স সদস্যকে গ্রেপ্তার করে এবং আদালতে বিচারও করে। ২০১০ সালে ‘উইকিলিকস’এর ফাঁস করা মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তারবার্তার বরাত দিয়ে ‘রয়টার্স’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজ কিউবান ইন্টেলিজেন্সের উপদেশেই চলছেন। মার্কিন তারবার্তায় বলা হয় যে, ভেনিজুয়েলার ইন্টেলিজেন্স কিউবার ইন্টেলিজেন্সের মতো সক্ষম নয়; তাই কিউবানরা ভেনিজুয়েলার ইন্টেলিজেন্সকে প্রশিক্ষণও দেয়। স্পেনের পত্রিকা ‘এবিসি’ এক প্রতিবেদনে বলে যে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বৈঠকে যোগ দেবার জন্যে মাদুরো যখন নিউ ইয়র্ক যাচ্ছিলেন, তখন তার বিমানে থাকা কিউবানদেরকে মার্কিন সরকার যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি না দেয়ায় মাদুরোর বিমান ভেনিজুয়েলায় ফিরে যায়। ভেনিজুয়েলাকে ব্যবহার করে ‘জি-২’ ল্যাটিন আমেরিকার অন্যান্য দেশ, যেমন ব্রাজিল এবং কলম্বিয়াতে ইন্টেলিজেন্স অপারেশন চালাচ্ছে কিউবা।

তেলের বিনিময়ে নিরাপত্তা

কিউবা ভেনিজুয়েলার কাছ থেকে অর্থনৈতিক সহায়তা পাচ্ছে; আর ভেনিজুয়েলা কিউবা থেকে পাচ্ছে নিরাপত্তা, রাজনৈতিক, কৌশলগত এবং ইন্টেলিজেন্স সহায়তা। ‘ব্রুকিংস ইন্সটিটিউট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ২০১২ সাল নাগাদ দুই দেশের বাণিজ্য কিউবার জিডিপির ২১ শতাংশে দাঁড়ায়। অথচ সেই তুলনায় এই বাণিজ্য ভেনিজুয়েলার অর্থনীতির মাত্র ৪ শতাংশ ছিল। ভেনিজুয়েলা থেকে কিউবা ১ লক্ষ ৪ হাজার ব্যারেল তেল আমদানি করে ঐ বছরে, যা ছিল ভেনিজুয়েলার মোট জ্বালানি তেলের চাহিদার ৬১ শতাংশ। অথচ কিউবায় রপ্তানি করা তেল ছিল ভেনিজুয়েলার মোট তেল রপ্তানির ৫ শতাংশ। এই তেল ভেনিজুয়েলা কিউবাকে দেয় অতি সুলভ মূল্যে। মাত্র ৬০ শতাংশ মূল্য ৯০ দিনের মাঝে পরিশোধ করতে হয়; বাকিটা ২৫ বছরে ১ শতাংশ সুদে পরিশোধযোগ্য। অন্যদিকে কিউবা থেকে আসা ডাক্তার-প্রশিক্ষক-টেকনিশিয়ানরা ভেনিজুয়েলার সামাজিক উন্নয়নের দায়িত্ব নিয়েছে। ভেনিজুয়েলার মানুষ উচ্চতর চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে কিউবাতে। আবার হাজার হাজার ভেনিজুয়েলান ছাত্র মেডিক্যাল বিষয়ে পড়াশোনা করছে কিউবাতে।

এর বিনিময়ে কিউবাকে ভেনিজুয়েলা কতটা আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে, তা সঠিক মূল্যায়ন করা কঠিন। তবে তেলের বিনিময়ে ভেনিজুয়েলাকে নিরাপত্তা সহায়তা দিচ্ছে কিউবা। ভেনিজুয়েলার জনগণের বায়োমেট্রিক ডাটাবেস তৈরি করে দিচ্ছে কিউবান সরকারি কোম্পানি। হুগো শাভেজের ক্যান্সার ধরা পড়ার পর তার চিকিৎসাও হয়েছে কিউবাতে – ব্যাপক নিরাপত্তার মাঝে। ২০১৩ সালে শাভেজ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার মন্ত্রীসভার বৈঠকগুলি কিউবাতেই করতেন। ‘রয়টার্স’এর প্রতিবেদন বলছে যে, কিউবার ইন্টেলিজেন্সের সহায়তার কারণেই মাদুরো ক্ষমতায় টিকে গেছেন। ব্যাপক অর্থনৈতিক ধ্বস এবং ৪০ লক্ষ মানুষের দেশত্যাগের পরেও কিউবানদের প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী মাদুরোর বিরুদ্ধে যায়নি। ভেনিজুয়েলার ইন্টেলিজেন্সের একসময় দায়িত্ব ছিল গণতন্ত্র রক্ষা। কিউবানদের প্রশিক্ষণের পর নতুন দায়িত্ব দাঁড়ায় সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা। এবছরের শুরুতে ভেনিজুয়েলার বিরোধী নেতা হুয়ান গুয়াইদো নিজেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেন এবং সেনাবাহিনীকে মাদুরোর বিরুদ্ধে যাবার জন্যে অনুরোধ করেন। যুক্তরাষ্ট্র গুয়াইদোর কথায় সমর্থন দিলেও ভেনিজুয়েলার সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে কোন সাড়াই মেলেনি।
মধ্য আমেরিকায় ভেনিজুয়েলার তেলের বিনিময়ে কিউবা প্রভাব বিস্তারের একটা সুযোগ পেয়েছে। বিভিন্ন আঞ্চলিক সংস্থার মাঝেও কিউবা তার স্থান করে নিচ্ছে। মার্কিন প্রভাবে থাকা সংস্থাগুলিকে কিউবা অকার্যকর করে দিচ্ছে। ২০০১ সালে বিশ্বব্যাপী তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ কারণে ল্যাটিন আমেরিকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টি সড়ে যাবার পরই যুক্তরাষ্ট্রকে বাইপাস করে বিভিন্ন সংগঠন তৈরি হতে থাকে। কিউবা-ভেনিজুয়েলার একত্রে কাজ করার কারণে পুরো আমেরিকাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমছে প্রতি নিয়ত। বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমার সাথে এটা সাংঘর্ষিক নয়। 



আঞ্চলিক প্রভাব বাড়াচ্ছে কিউবা

‘ব্রুকিংস ইন্সটিটিউট’এর প্রতিবেদন বলছে যে, কিউবা এবং ভেনিজুয়েলার মাঝে ‘বলিভারিয়ান’ সহযোগিতাকে পুরো ল্যাটিন আমেরিকা এবং মধ্য আমেরিকায় ছড়িয়ে দিতে চাইছে কিউবা। ২০০৫ সালের ‘পেট্রোক্যারিব’ প্রকল্পের মাধ্যমে ভেনিজুয়েলার তেল শুধু কিউবা নয়, ক্যারিবিয়ানের দ্বীপ দেশগুলি এবং মধ্য আমেরিকার দেশগুলির বেশিরভাগের কাছেই যাওয়া শুরু করেছিল। মোট ১৫টা দেশ এই চুক্তির অধীনে সাশ্রয়ী মূল্যে ভেনিজুয়েলার তেল পাচ্ছিলো। এভাবে মধ্য আমেরিকায় ভেনিজুয়েলার তেলের বিনিময়ে কিউবা প্রভাব বিস্তারের একটা সুযোগ পেয়েছে। বিভিন্ন আঞ্চলিক সংস্থার মাঝেও কিউবা তার স্থান করে নিচ্ছে। যেমন ‘অর্গানাইজেশন অব আমেরিকান স্টেটস’এর মতো মার্কিন প্রভাবে থাকা সংস্থাগুলিকে কিউবা অকার্যকর করে দিচ্ছে। এধরনের সংস্থাগুলির প্রধান এজেন্ডা হচ্ছে গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার, যেগুলি ল্যাটিন আমেরিকার অনেক দেশই এড়িয়ে যেতে চায়। ২০০১ সালে বিশ্বব্যাপী তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ কারণে ল্যাটিন আমেরিকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টি সড়ে যাবার পরই যুক্তরাষ্ট্রকে বাইপাস করে বিভিন্ন সংগঠন তৈরি হতে থাকে। কিউবা সরাসরি জড়িত থেকে অথবা ভেনিজুয়েলার মাধ্যমে এসব ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। ভেনিজুয়েলার হুগো শাভেজের চেষ্টায় ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা বাদে পুরো আমেরিকার বাকি ৩৩টা দেশকে নিয়ে ‘কমিউনিটি অব ল্যাটিন আমেরিকান এন্ড ক্যারিবিয়ান স্টেটস’ গঠন করা হয়। ২০০৮ সালে গঠন করা হয় ‘ইউনিয়ন অব সাউথ আমেরিকান নেশনস’ (যদিও কিউব এর সদস্য নয়), যেটাকে আবার ‘বামপন্থী’ আখ্যা দিয়ে মার্কিন প্রভাবে থাকা বেশ কয়েকটা দেশ ২০১৮-১৯ সালে সেখান থেকে বের হয়ে যায়।

রোজনাউ এবং এসপাচ তাদের প্রতিবেদনে লিখছেন যে, কিউবা নিশ্চিতভাবেই তার ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্ককে কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ে ব্যবহার করছে। কোন রাষ্ট্রই বিনা কারণে ইন্টেলিজেন্স তথ্য যোগাড় করে না। আর গোপন তথ্য যোগাড় করার খরচও তো যোগাতে হবে। কিউবা মার্কিনীদের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলির সাথে ইন্টেলিজেন্সের তথ্য আদান-প্রদান করে তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন সুবিধা আদায় করতে পারে। কিউবানরা মার্কিন নিরাপত্তা, ইন্ডাস্ট্রি, বাণিজ্য এবং প্রযুক্তি সম্পর্কে তথ্য যোগাড় করে সেগুলি মার্কিনীদের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ, যেমন - রাশিয়া, চীন এবং অন্যান্য দেশের সাথে বাণিজ্য করতে পারে।

ভেনিজুয়েলা বন্ধু খুঁজছে

কিছুদিন আগেই মাদুরো সরকারকে উৎখাত করার জন্যে মার্কিনীরা ভেনিজুয়েলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্তাব্যক্তিদের সাথে কথা চালিয়ে যায়। পরবর্তীতে এই অভ্যুত্থান চেষ্টা ভেস্তে গেলেও মাদুরো অভ্যুত্থান চেষ্টার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের কিছু করেননি অথবা করতে পারেননি। এর স্বপক্ষে যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে যে, অভ্যুত্থানের চেষ্টাকারীরা ভেনিজুয়েলার সমাজে এতটাই প্রভাশালী যে, মাদুরো তাদেরকে আটক করা বা তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেবার চেষ্টাই করতে পারেননি। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলছেন যে, মাদুরোর বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানচেষ্টা ভেস্তে যাবার একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো মোক্ষম সময়ে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ। রাশিয়ার পাঠানো সেনারা ভেনিজুয়েলার ক্ষমতার সমীকরণে অনিশ্চয়তা জুড়ে দিলে অভ্যুত্থান ভেস্তে যায়। রুশ সরকার দরকারমতো সহায়তা দিলেও কিউবানরা মাদুরোর সাথে আঠার মতোই লেগে আছে।

২১শে অগাস্ট ভেনিজুয়েলা উত্তর কোরিয়াতে তার দূতাবাস খুলেছে। উত্তর কোরিয়ার উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সাথে ভেনিজুয়েলা সরকার নিজেদের অবস্থানের অভিন্নতা খুঁজছে; উদ্দেশ্য – বহিঃবিশ্বে সমর্থন খোঁজা। এর কয়েকদিন আগেই ১৫ই অগাস্ট ভেনিজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ মস্কো সফর করেন। রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু ভেনিজুয়েলার সরকারের নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি এবং মার্কিন চাপের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার জন্যে রুশ সমর্থনের কথা মনে করিয়ে দেন। এই বছরেই রুশ প্রতিরক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তারা কমপক্ষে দু’বার ভেনিজুয়েলা সফর করেন। তবে ভেনিজুয়েলাকে সমর্থন দেবার ক্ষেত্রে পুরোনো বন্ধুরাও শক্ত অবস্থানে থাকতে পারছে না। ১৯শে অগাস্ট ‘রয়টার্স’ বলছে যে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপে চীনা তেল কোম্পানি ‘চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন’ বা ‘সিএনপিসি’ অগাস্ট মাসে ভেনিজুয়েলার তেল আমদানি স্থগিত করেছে। ভেনিজুয়েলা তেল সরবরাহের বিনিময়ে চীনাদের কাছ থেকে বড় অংকের ঋণ পেয়েছে। ভেনিজুয়েলার বেশিরভাগ তেলের ক্রেতাই চীন। সাম্প্রতিক সময়ে বেইজিং-এ মার্কিন দূতাবাসের সাথে ‘সিএনপিসি’র আলোচনার পরই এই সিদ্ধান্ত এলো। অথচ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিকোলাস মাদুরোর বন্ধুর প্রয়োজনীয়তা এখন সর্বোচ্চ।

ভেনিজুয়েলায় প্রভাব বিস্তার কিউবার জন্যে সবচাইতে বড় ভূকৌশলগত সাফল্য। যুক্তরাষ্ট্রের উঠানে ছয় দশক ধরে সমাজতান্ত্রিক সরকারকে টিকিয়ে রাখার পর ভেনিজুয়েলার সরকারকেও টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব নিয়েছে কিউবা। ছোট্ট কিউবার পক্ষে পশ্চিম গোলার্ধে শক্তিধর দেশগুলিকে ব্যালান্সে রাখাটা নয়া বিশ্ব ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হবার ইঙ্গিত। 


কিউবার সাফল্য যা ইঙ্গিত দিচ্ছে

ভেনিজুয়েলার জনস্যংখ্যা কিউবার প্রায় তিন গুণ; ৩ কোটি ২০ লাখ বনাম ১ কোটি ১৫ লাখ। অর্থনৈতিক দিক থেকেও একইরকম গল্প। ভেনিজুয়েলার জিডিপি ২০১৪ সালে ছিল ৪’শ ৮২ বিলিয়ন ডলার; আর কিউবার ছিল ৮১ বিলিয়ন ডলার; অর্থাৎ প্রায় ৬ গুণ। (এখন অবশ্য ভেনিজুয়েলার অর্থনীতি পঙ্গু।) ‘জিওপলিটিক্যাল মনিটর’এর প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ভেনিজুয়েলায় প্রভাব বিস্তার কিউবার জন্যে সবচাইতে বড় ভূকৌশলগত সাফল্য। যুক্তরাষ্ট্রের উঠানে ছয় দশক ধরে সমাজতান্ত্রিক সরকারকে টিকিয়ে রাখার পর ভেনিজুয়েলার সরকারকেও টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব নিয়েছে কিউবা। কিউবার ‘জি-২’এর সাফল্য বলছে যে, শুধু বড় রাষ্ট্রগুলিই নয়, ছোট রাষ্ট্রও শক্তিশালী ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস তৈরি করতে সক্ষম, যদি তার জনগোষ্ঠির সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অংশটা চিন্তার দিক থেকে অন্যদের তুলনায় এগিয়ে থাকে। ইন্টেলিজেন্সের ব্যবহারের মাধ্যমে যে আন্তর্জাতিক ব্যালান্স অব পাওয়ার পরিবর্তন সম্ভব, তা কিউবার কর্মকান্ডই প্রমাণ দেয়। পশ্চিম গোলার্ধে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, এবং অন্যান্য শক্তিধর দেশগুলিকে ব্যালান্সে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে কিউবা।

কিউবার সাফল্য প্রথমতঃ দেখিয়ে দিচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি অবস্থান করেও ঐতিহ্যগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের মাঝে থাকা দেশগুলিতে কিউবা প্রভাব বিস্তার করছে। ভেনিজুয়েলার মাদুরো সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানোটা যুক্তরাষ্ট্রের অত্র অঞ্চলে প্রভাব ধরে রাখার জন্যে অতি জরুরি। কিউবা-ভেনিজুয়েলার একত্রে কাজ করার কারণে পুরো আমেরিকাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমছে প্রতি নিয়ত। বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমার সাথে এটা সাংঘর্ষিক নয়। 
দ্বিতীয়তঃ চিন্তাগত দিক থেকে এগিয়ে থাকার কারণে শুধু ভেনিজুয়েলা নয়, পুরো এলাকায় কিউবা প্রাধান্য বিস্তার করে চলেছে। আকারে ছোট হলেও একটা আদর্শিক ভিতের উপর দাঁড়িয়ে থাকার কারণে কিউবা এটা করতে পারছে। বাকি বিশ্বের জন্যে এটা একটা উদাহরণ বটে – চিন্তাগত উতকর্ষতা থাকলে ছোট দেশও সুপারপাওয়ারের প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করতে সক্ষম। 
তৃতীয়তঃ কিউবা পশ্চিম গোলার্ধে ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতাকে আরও উস্কে দিচ্ছে। কিউবার ইন্টেলিজেন্স যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগী রাশিয়া, চীন এবং অন্যান্য দেশকে ইন্টেলিজেন্স সহায়তা দিয়ে এই প্রতিযোগিতাকে আরও ঘনীভূত করতে যাচ্ছে। 
চতুর্থতঃ ছোট্ট কিউবার পক্ষে পশ্চিম গোলার্ধে শক্তিধর দেশগুলিকে ব্যালান্সে রাখাটা নয়া বিশ্ব ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হবার ইঙ্গিত।

Tuesday, 20 August 2019

কাশ্মির – আবার অগ্নুৎপাতের অপেক্ষায় ভূরাজনৈতিক অগ্নিগিরি


কাশ্মিরের পরিস্থিতির জন্যে মূলতঃ দায়ী অত্র অঞ্চলের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সময়ের চিন্তাগুলি। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় অবিভক্ত ভারতের ৪০ শতাংশ এলাকা ছিল বিভিন্ন রাজন্যদের হাতে; কাশ্মির ছিল এরকমই একটা রাজ্য। এই রাজ্যগুলির শাসকরা বিভিন্ন চুক্তির বদৌলতে ব্রিটিশ অধীনতা মেনে চলতো। ব্রিটিশ-পরবর্তী জাতীয়তাবাদী ভারতে কাশ্মিরকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের পতাকাতলে আনার চেষ্টা করা হয়েছে, যা কিনা হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের আমলে কঠোর আকার ধারণ করে। তবে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার জন্যে বলপ্রয়োগের পদ্ধতিগুলি ব্রিটিশ সময় থেকে বিজেপির সময় পর্যন্ত খুব একটা পরিবর্তিত হয়নি। 
২১শে অগাস্ট ২০১৯


ভারতের সংবিধানের ‘আর্টিকেল ৩৭০’এর মাধ্যমে কাশ্মিরকে আলাদা কিছু সুবিধা দেয়া হতো; যেমন পররাষ্ট্রনীতি এবং প্রতিরক্ষা ছাড়া বাকি ব্যাপারগুলিতে ভারত সরকার হস্তক্ষেপ করবে না। তবে ভারতের ইতিহাস নিয়ে গবেষক করা লেখক জন উইলসনের মতে, এই আর্টিকেল কাশ্মিরকে ভারতের অন্যান্য রাজ্য থেকে আলাদা কোন সুবিধা দিত কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকারের নির্বাচনী ওয়াদা মোতাবেক এই আর্টিকেল বাতিল ঘোষণার পর থেকে কাশ্মিরে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছে। বন্ধ রাখা হয়েছে ইন্টারনেট এবং মিডিয়া। ‘বিবিসি’র ভিডিও প্রতিবেদনে দেখা যায় যে শ্রীনগরে শুক্রবার জুমআর নামাজের পর ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা বিক্ষোভকারীদের উপর কাঁদানে গ্যাস এবং গুলি ব্যবহার করছে। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, হাসপাতালগুলিতে নেই কোন স্টাফ; আর প্রয়োজনীয় দ্রব্য কিনতে রাস্তায় বের হলেই জনগণের উপর চলছে নিরাপত্তা বাহিনীর মারধর। ‘এনডিটিভি’র প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ১২ই অগাস্ট ঈদ-উল-আজহার দিন শ্রীনগরের মসজিদগুলি বন্ধ করে রাখা হয়েছিল; ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হতে দেয়া হয়নি।

‘ফরেন পলিসি’ ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, কাশ্মিরের এহেন পরিস্থিতির জন্যে মূলতঃ দায়ী অত্র অঞ্চলের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সময়ের চিন্তাগুলি। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় অবিভক্ত ভারতের ৪০ শতাংশ এলাকা ছিল বিভিন্ন রাজন্যদের হাতে; কাশ্মির ছিল এরকমই একটা রাজ্য। এই রাজ্যগুলির শাসকরা বিভিন্ন চুক্তির বদৌলতে ব্রিটিশ অধীনতা মেনে চলতো। যতক্ষণ পর্যন্ত তারা ব্রিটিশদের আনুগত্য করেছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকার তাদের স্বায়ত্বশাসন মেনে নিয়েছে। ব্রিটিশ-পরবর্তী জাতীয়তাবাদী ভারতে কাশ্মিরকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের পতাকাতলে আনার চেষ্টা করা হয়েছে, যা কিনা হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের আমলে কঠোর আকার ধারণ করে। তবে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার জন্যে বলপ্রয়োগের পদ্ধতিগুলি ব্রিটিশ সময় থেকে বিজেপির সময় পর্যন্ত খুব একটা পরিবর্তিত হয়নি।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত বিভাগের সময় কাশ্মিরের হিন্দু রাজা হরি সিং কাশ্মিরকে ভারতের অংশ হিসেবে ঘোষণা দেন, যদিও বর্তমান কাশ্মিরের প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখের মতো জনসংখ্যার প্রায় ৯৭ শতাংশই মুসলিম। কাশ্মিরের হিন্দু রাজাদের শুরু ১৮৪৬ সালে; যখন প্রথম এংলো-শিখ যুদ্ধে শিখদের বিরুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয়ের পর ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হেনরি লরেন্স-এর অনুগত দোগরা রাজপুত বংশীয় গুলাব সিং-কে ৭৫ লক্ষ রুপির বিনিময়ে সিন্ধু নদের পূর্ব এবং রাভি নদীর পশ্চিম পাড়ের মাঝের কাশ্মির উপত্যকা নামের পাহাড়ি এলাকাটার রাজত্ব দিয়ে দেয়া হয়। অমরিতসরের চুক্তির মাধ্যমে কাশ্মির ব্রিটিশদের অধীনে আলাদা রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবের সময় কাশ্মিরের দোগরা রাজারা বিপ্লব দমনে ব্রিটিশদেরকে যথাসাধ্য সহায়তা করেছিলেন।

১৯৪৭ সালে ভারতের অংশ হবার সিদ্ধান্ত নেবার আগে রাজা হরি সিং কাশ্মিরের জনগণের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেননি। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে পাকিস্তান প্রান্তের পুশতুন গোত্রীয় মিলিশিয়ারা কাশ্মির আক্রমণ করলে ভারতের শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন রাজাকে ভারতের কাছে নতি স্বীকার করতে বলেন। সেই হিসেবে ১৯৪৭ সালের ২৬শে অক্টোবর রাজা হরি সিং কাশ্মিরকে ভারতের অংশ হিসেবে মেনে নিয়ে চুক্তি সই করেন। তখন কাশ্মিরের অংশ হিসেবে ছিল জম্মু, কাশ্মির, উত্তরের গিলগিট-বালতিস্তান, লাদাখ, ট্রান্স-কারাকোরাম এবং আকসাই চিন। ব্রিটিশ ভারতের সীমারেখার ভাগবাটোয়ারার উপরেই শুরু হয় ১৯৪৭-৪৮ সালের প্রথম পাক-ভারত যুদ্ধ। ১৯৪৮ সালে ১৩ই অগাস্টের জাতিসংঘ ঘোষণার মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ হয়। কাশ্মিরের দুই-তৃতীয়াংশ দেয়া হয় ভারতকে; আর বাকি এক-তৃতীয়াংশ পাকিস্তানকে দেয়া হয়। এই যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসেবে পাকিস্তান কাশ্মির থেকে তাদের নিয়মিত এবং অনিয়মিত বাহিনী সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। অল্পসংখ্যক সেনা মোতায়েনের বদলে কাশ্মিরের বেশিরভাগটার নিয়ন্ত্রণ দেয়া হয় ভারতকে। তবে এখনও পাকিস্তান পুরো কাশ্মিরকে নিজের বলে মনে করে; ভারতও একই নীতিতে রয়েছে। আর অন্যদিকে আকসাই চিন অংশটার দাবিদার হলো চীন।
কাশ্মিরের কিছু ভৌগোলিক বাস্তবতা পাকিস্তান-ভারতকে আটকে রেখেছে। পাকিস্তান-অধিকৃত আজাদ কাশ্মির থেকে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের দূরত্ব মাত্র ৬৭ কিঃমিঃ। এর মাঝের অংশটা বেশ দুর্গম হলেও তা পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যে হুমকি। কাশ্মিরের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহায়তা দিয়ে পাকিস্তান তার ‘কৌশলগত গভীরতা’ বৃদ্ধি করতে চায়। অন্যদিকে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লী থেকে কাশ্মিরের শ্রীনগরের সড়কপথে দূরত্ব ৯শ’ ১৪ কিঃমিঃ। এই দূরত্ব বেশি মনে হলেও এর মাঝে প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা নেই তেমন। অর্থাৎ কাশ্মিরের নিয়ন্ত্রণ ভারতের হাতে না থাকলে দিল্লীর নিরাপত্তা হুমকির মাঝে পড়বে। একারণেই দিল্লীর চিন্তাবিদেরা কাশ্মিরকে পাকিস্তানের অংশ তো নয়ই, কোন প্রকারের স্বাধীনও দেখতে চান না। 



কাশ্মিরকে বলা যায় ভূরাজনৈতিক অগ্নিগিরি। এই অঞ্চলে ১৯৪৭, ১৯৬৫, ১৯৭১ এবং ১৯৯৯ সালে সংঘটিত হয়েছে চারটা পাক-ভারত যুদ্ধ। ১৯৮৯ সাল থেকে পাকিস্তানের সমর্থনে কাশ্মিরে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলছে; আর ভারত বলছে পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদের ইন্ধনদাতা। এবছরের ফেব্রুয়ারিতেও পুলওয়ামায় জঙ্গী হামলার পর আরেকটা ছোটখাটো পাক-ভারত সংঘর্ষ হয়ে গেছে। শুধু ভারত-পাকিস্তানই নয়, আকসাই চিন-এর দাবি করা চীনও পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। ‘ইউরেশিয়া গ্রুপ’এর বিশ্লেষক কেভিন এলিসন বলছেন যে, মোদি সরকারের এই ঘোষণায় কাশ্মির নিয়ে পাক-ভারত উত্তেজনা বৃদ্ধি পাবে। পাকিস্তান বলছে যে, ভারতের এই ঘোষণায় কাশ্মিরের পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলছেন যে, এই ঘোষণা ভারত সরকারের একটা কৌশলগত ভুল। অন্ততঃ কাশ্মিরের নরমপন্থী রাজনীতিবিদদের গ্রেপ্তারি পরওয়ানা পর সেটাই মনে হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে ৬ই অগাস্ট পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মেজর জেনারেল আসিফ ঘাফুর বলেন যে, পাকিস্তান ভারতীয় সংবিধানের ‘আর্টিকেল ৩৭০’কে কখনোই স্বীকৃতি দেয়নি; কারণ এই আর্টিকেল কাশ্মিরকে ভারতের অংশ হিসেবে মনে করিয়ে দেয়। কেভিন এলিসন বলছেন যে, কাশ্মিরের জনগণ স্বভাবগতভাবেই নিজেদের মুক্ত দেখতে যায়, যা ভারত সরকার সহজে এড়িয়ে যেতে পাববে না। আর এই আর্টিকেল-ই এতকাল কাশ্মিরের জনগনের একটা বড় অংশকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে জড়ানো থেকে দূরে রেখেছিল। এখন কাশ্মিরের বাইরের জনগণও কাশ্মিরে জমি কিনতে পারবে, যা কিনা কাশ্মিরের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে চ্যালেঞ্জ করবে, এবং উত্তেজনা বাড়াবে।

কাশ্মিরের কিছু ভৌগোলিক বাস্তবতা পাকিস্তান-ভারতকে আটকে রেখেছে। পাকিস্তান-অধিকৃত আজাদ কাশ্মির থেকে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের দূরত্ব মাত্র ৬৭ কিঃমিঃ। এর মাঝের অংশটা বেশ দুর্গম হলেও তা পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যে হুমকি। ‘দ্যা ডিপ্লোম্যাট’ ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, কাশ্মিরের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহায়তা দিয়ে পাকিস্তান তার ‘কৌশলগত গভীরতা’ বৃদ্ধি করতে চায়। অন্যদিকে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লী থেকে কাশ্মিরের শ্রীনগরের সড়কপথে দূরত্ব ৯শ’ ১৪ কিঃমিঃ। এই দূরত্ব বেশি মনে হলেও এর মাঝে প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা নেই তেমন। অর্থাৎ কাশ্মিরের নিয়ন্ত্রণ ভারতের হাতে না থাকলে দিল্লীর নিরাপত্তা হুমকির মাঝে পড়বে। একারণেই দিল্লীর চিন্তাবিদেরা কাশ্মিরকে পাকিস্তানের অংশ তো নয়ই, কোন প্রকারের স্বাধীনও দেখতে চান না। বিজেপির বিরোধী দল কংগ্রেস ‘আর্টিকেল ৩৭০’ বাদ দেয়ার সমালোচনা করলেও ভারতের বেশিরভাগ মানুষই ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ তকমা পাবার ভয়ে তেমন কিছু বলতে নারাজ।

অন্যদিকে কাশ্মিরে রয়েছে চীনের স্বার্থ। পাকিস্তানের মাঝ দিয়ে তৈরি হচ্ছে ‘চায়না-পাকিস্তান ইকনমিক করিডোর’ বা ‘সিপিইসি’, যা আরব সাগরে গোয়াদর সমুদ্রবন্দর থেকে চীনের পশ্চিমাঞ্চলের উইঘুর বা শিনজিয়াং প্রদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত। এই ‘সিপিইসি’র মাধ্যমে চীন পূর্ব এশিয়ার মালাক্কা প্রণালীকে বাইপাস করে এবং মার্কিন নৌবাহিনীকে এড়িয়ে তার জ্বালানি তেলের সরবরাহ পাওয়া নিশ্চিত করতে চাইছে। ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতাতে এই ‘সিপিইসি’ চীনের জন্যে কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। অন্যদিকে পাকিস্তান এই প্রকল্প চাইছে তার অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে। ‘সিপিইসি’-কে তার নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হিসেবে দেখে বলেই বালুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদীদেরকে ভারত সরকার সমর্থন দিয়েছে। ‘সিপিইসি’ চীনে পৌঁছাবার আগে পাকিস্তান-অধিকৃত আজাদ কাশ্মিরের উপর দিয়ে যাচ্ছে। ভারত-অধিকৃত কাশ্মির থেকে এই ‘সিপিইসি’র এর দূরত্ব ইসলামাবাদের কাছাকাছি ১’শ কিঃমিঃ-এর মতো। চীন শুধু এ-ই দেখতে চায় যে ‘সিপিইসি’র নিরাপত্তা যেন হুমকির মাঝে না পড়ে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কোরেশির আহ্বানে ১৬ই অগাস্ট জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বদ্ধদুয়ার বৈঠকে চীনের রাষ্ট্রদূত ঝ্যাং জুন বলেন যে, ভারতের সংবিধানে পরিবর্তনের ফলে এই অঞ্চলের শান্তি বিঘ্নিত হতে যাচ্ছে। চীন এক্ষেত্রে সকল পক্ষকে রয়েসয়ে চলার উপদেশ দিচ্ছে। কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে ‘ব্লুমবার্গ’ বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ফ্রান্সের বিরোধিতার কারণে নিরাপত্তা পরিষদের পক্ষ থেকে ঐকমত্যে পৌঁছে এই উপদেশ দেয়া সম্ভব হয়নি।

কাশ্মির ইস্যু বিশ্বব্যাপী মুসলিম জনগোষ্ঠীর একাত্মতা প্রকাশের একটা মাধ্যম। তবে মুসলিম দেশগুলির নেতৃত্ব এই ইস্যুতে ততটা সক্রিয় কিনা, তা প্রশ্ন করাই যায়। ৮ই অগাস্ট সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সূত্রের বরাত দিয়ে ‘গালফ নিউজ’ জানায় যে, সৌদি সরকার কাশ্মিরের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন, এবং সেখানে কোন সহিংসতা হোক, তারা তা চাচ্ছেন না। আর এব্যাপারে জাতিসংঘের চুক্তিগুলিকে মেনে চলতেই তারা উপদেশ দিচ্ছেন। ২০১৮ সালে ভারতের সাথে সৌদি আরবের বাণিজ্য ছিল সাড়ে ২৭ বিলিয়ন ডলার; যা হয়তো ভারতের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানে যাওয়া থেকে সৌদি সরকারকে বাধা দিতে পারে। অন্যদিকে ১৭ই অগাস্ট তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, তারা চাইছেন যে জাতিসংঘ কাশ্মির ইস্যুতে আরও অগ্রগামী ভূমিকা নিক। আগের দিন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এব্যাপারে আলোচনা হওয়াকেই তুরস্ক সরকার ভালো দিক বলে দেখছে। মুসলিম বিশ্বের নেতৃস্থানীয় দুই দেশের জাতিসংঘের উপর নির্ভরশীলতাই জানিয়ে দিচ্ছে যে, ১৬ই অগাস্ট নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক থেকে তেমন কিছু না আসাটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অন্যদিকে ১৪ই অগাস্ট পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মিরে যেকোন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ভারতকে সাবধান করেন। তিনি বলেন যে, ভারত যদি আজাদ কাশ্মিরে সামরিক হস্তক্ষেপ করে, তাহলে পাকিস্তান তার উচিৎ জবাব দেবে। ভারতীয় অধিকৃত কাশ্মিরের ব্যাপারে পাকিস্তান অবশ্য জাতিসংঘের দিকেই তাকিয়ে। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, পাকিস্তান সরাসরি ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে না জড়াতে চাইলেও কাশ্মিরের উত্তেজনা পাক-ভারত প্রক্সি যুদ্ধকে আবারও উস্কে দিতে পারে। আর সেটার উপর ভর করে বিশ্বব্যাপী মুসলিম আবেগকে নেতৃত্বস্থানীয়রা জনমত আদায়ে ব্যবহার করতে পারেন।

‘আর্টিকেল ৩৭০’ বাতিল করার পর আপাততঃ নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা বাড়বে বলেই বিশ্লেষকরা মনে করছেন। দীর্ঘ মেয়াদে কাশ্মিরের উপর ভারত সরকারের আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করবে এই ঘোষণা। তবে স্বল্প মেয়াদে কাশ্মিরে ভারত-বিরোধী চিন্তা দানা বাধার সম্ভাবনাই বেশি, যা কিনা দীর্ঘ মেয়াদে মোদির সফলতাকে চ্যালেঞ্জ করবে। আর কাশ্মিরে সহিংসতা বৃদ্ধি মানেই পাক-ভারত উত্তেজনা বৃদ্ধি পাবে। মুসলিম বিশ্বে কাশ্মির ইস্যুতে আবেগ থাকলেও মুসলিম দেশগুলির নেতৃত্ব ভারতের বিরুদ্ধে বিশেষ কিছু করা থেকে বিরত থাকবে। এই আর্টিকেল বাতিলের ঘটনা চীনের ‘সিপিইসি’ বা আকসাই চিন-কে আপাততঃ চ্যালেঞ্জ করবে না; তাই চীনও এব্যাপারে বিশেষ কিছু করা থেকে বিরত থাকবে। পশ্চিমারাও ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া বাস্তবতার উপর প্রতিষ্ঠিত ‘স্থিতাবস্থা’কে পরিবর্তন করতে চায় না বলেই এব্যাপারে খুব বেশি কিছু করবে না। কাশ্মিরের জনগণের কষ্টকে নয়, বরং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা এবং জাতীয় স্বার্থকেই প্রাধান্য দেবে সবাই।

Saturday, 27 July 2019

নেপালের একটা নৌবাহিনী থাকা উচিৎ

২৮শে জুলাই ২০১৯
  
  
নেপালের চ্যালেঞ্জকে বুঝতে হলে নেপালের দিক হতে বিশ্বকে দেখতে হবে। মানচিত্রকে উল্টো করে, অর্থাৎ দক্ষিণ দিককে মানচিত্রের উপরের দিকে রেখে দেখা হয়। দক্ষিণে নেপালের এই দৃষ্টিই বলে দেবে নেপাল আসলে কি দেখতে পাচ্ছে, আর কি চাইছে। নেপালের প্রয়োজন সমুদ্র বাণিজ্যের। নেপালের থাকতে পারে একটা মার্চেন্ট মেরিন ফ্লিট। আর সেই ফ্লিটের নিরাপত্তা দেয়ার জন্যে তাদের একটা নৌবহরও থাকতে পারে।


নেপালের সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের এঁকে দেয়া মানচিত্র। দেশটাকে এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যাতে তা সারাজীবন ভারতের উপর নির্ভরশীল থাকে। মদেশী আন্দোলনকে ব্যবহার করে ভারত নেপালের উপর অঘোষিত অবরোধ দেবার পরেও নেপাল ভারতের উপর থেকে নির্ভরশীলতা কমাতে পারেনি। নেপালের উত্তরে রয়েছে হিমালয় পর্বত; যার উত্তরে চীনের তিব্বত। ভারতের নিষেধাজ্ঞাকে এড়িয়ে চীন নেপালকে সহায়তা করতে উদ্দ্যত হলেও হিমালয়ের বাস্তবতাকে এড়াতে পারেনি চীন। কিছুদিনের জন্যে চীন নেপালের জন্যে আশা জাগালেও শেষ পর্যন্ত ভারতের গ্রাস থেকে বের হতে পারেনি দেশটা। নেপালের এই চ্যালেঞ্জকে বুঝতে হলে নেপালের দিক হতে বিশ্বকে দেখতে হবে। মানচিত্রে দেশগুলিকে সাধারণতঃ যেভাবে দেখানো হয়, তাতে একেকটা দেশের নিজস্ব দৃষ্টিকে বোঝা যায় না। নেপালের ক্ষেত্রে এর কিছুটা উপলব্ধি করা সম্ভব যদি এর মানচিত্রকে উল্টো করে, অর্থাৎ দক্ষিণ দিককে মানচিত্রের উপরের দিকে রেখে দেখা হয়। যেহেতু উত্তরের হিমালয়কে অতিক্রম করাটা অতি দুরূহ কাজ, তাই হিমালয়কে পিছনের দেয়াল মনে করেই নেপাল দৃষ্টি দেয় দক্ষিণে।

দক্ষিণে নেপালের এই দৃষ্টিই বলে দেবে নেপাল আসলে কি দেখতে পাচ্ছে, আর কি চাইছে। নেপালের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দেশটার জনগণকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনতে হলে নেপালকে বাইরের দুনিয়ার সাথে যোগাযোগ করার সুযোগ দিতে হবে। বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্যে স্থলপথে নেপালকে যুক্ত হতে হবে আশেপাশের দেশগুলির সাথে। আর এক্ষেত্রে নেপাল থেকে দক্ষিণে তাকালে ভারত-বাংলাদেশই প্রথমে চোখে পড়বে। এই দুই দেশই যে নেপালের সাথে সকল ধরনের বাণিজ্য করবে, তা যুক্তিযুক্ত হতে পারে না। এর বাইরে অন্য দেশের সাথেও নেপালকে বাণিজ্যের অধিকার দিতে হবে। আর সেক্ষেত্রে নেপালের প্রয়োজন সমুদ্র বাণিজ্যের। স্থলবেষ্টিত একটা দেশের জন্যে সমুদ্র পর্যন্ত পৌঁছানো একটা চ্যালেঞ্জই বটে। এতদিন সমুদ্রে পৌঁছতে গেলে নেপালের জন্যে ভারতের উপর নির্ভর করা ছাড়া কোন গতি ছিল না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করতে পারার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে নেপালের জন্যে।

পুরো ব্যাপারটাই দৃষ্টিভঙ্গির উপর

ডলারের হিসেবে নেপালের ৬৬% বাণিজ্য সংঘটিত হয় ভারতের সাথে। বাকি ৩৪%-এর বেশিরভাগটাই সমুদ্র পার হয়ে আসতে হয়। এখানেই বাংলাদেশ পারে নেপালকে নতুন আশা জাগাতে। নেপাল থেকে সমুদ্রে পৌঁছাবার সবচাইতে সহজ পথ হলো বাংলাদেশের মাঝ দিয়ে। এই ব্যাপারটা দক্ষিণ দিককে মানচিত্রের উপরের দিকে দিয়ে দেখলেই কেবলমাত্র বোঝা সম্ভব। শুধু সমুদ্র পর্যন্ত পৌঁছানোই নয়, নেপালের থাকতে পারে একটা মার্চেন্ট মেরিন ফ্লিট। আর সেই ফ্লিটের নিরাপত্তা দেয়ার জন্যে তাদের একটা নৌবহরও থাকতে পারে। ব্যাপারটা অবাস্তব মনে হলেও একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই বোঝা যাবে যে, এটা কতটা বাস্তবসম্মত। পুরোটাই আটকে আছে দৃষ্টিভঙ্গির উপর।

প্রথমতঃ সুইজারল্যান্ডের মতো একটা স্থলবেষ্টিত দেশ হলো বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কনটেইনার পরিবহন কোম্পানি ‘এমএসসি’এর কেন্দ্র। অন্যদিকে ইথিওপিয়া এখন স্থলবেষ্টিত হলেও একসময় তার সমুদ্রতট ছিল। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় সুপারপাওয়ারদের দ্বন্দ্বে বলি হয়ে এরিত্রিয়া যুদ্ধ করে ইথিওপিয়া থেকে আলাদা হয়ে যায়। আর তাতে ইথিওপিয়ার পুরো সমুদ্রতট এরিত্রিয়ার হয়ে যায়। ইথিওপিয়া তার নৌবহর এবং মার্চেন্ট মেরিন হারায়। কারণ এরিত্রিয়ার সাথে ইথিওপিয়ার সম্পর্ক ভালো ছিল না। বর্তমানে ইথিওপিয়া জিবুতির মাধ্যমে তাদের সমুদ্র বাণিজ্য চালাচ্ছে। এবং তারা তাদের মার্চেন্ট মেরিন আবারও তৈরি করতে যাচ্ছে। এই ইতিহাসগুলি বলে যে, ইথিওপিয়ার সমুদ্রে যাওয়াটা অবাস্তব কিছু নয়। আরও একটা উদাহরণ দেয়া যায় বলিভিয়ার। একসময় বলিভিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রতট ছিল। সুপারপাওয়ারদের দ্বন্দ্বে পেরু এবং চিলি বলিভিয়ার কাছ থেকে সেই সমুদ্রতট সামরিকভাবে দখল করে নেয়। বলিভিয়া এখনও একটা নৌবাহিনী রেখেছে; এবং প্রতি বছর একটা দিনে সেই নৌবাহিনীর সদস্যরা রাস্তায় প্যারেড করে। তারা এখনও তাদের সমুদ্রে যাবার ন্যায্য হিস্যা চায়।

দ্বিতীয়তঃ কে সমুদ্রে যেতে পারবে, আর কে যেতে পারবে না, সেটা সৃষ্টিকর্তা ঠিক করে দেননি; মানুষ ঠিক করেছে। মানুষ নিজেদের মাঝে হিংসাত্মক কাজের অংশ হিসেবে অন্য আরেক জাতিকে সমুদ্রে পৌঁছানো থেকে বাধা দিয়েছে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরাই সৃষ্টিকর্তার স্থানে নিজেদেরকে বসিয়ে অত্র এলাকার বাউন্ডারিগুলি এঁকে দেয়। সেই আঁকা মানচিত্রে নেপালকে সমুদ্রে পৌঁছানো থেকে বাধা দেয়া হয়। অথচ বাংলা যখন সুলতান এবং নবাবদের অধীনে ছিল, তখন যে কেউই সমুদ্র পর্যন্ত পৌঁছাতে পারতো; কারুরই ভিসা লাগতো না এতে! নেপালের মানুষগুলির দিনাজপুরের মানুষগুলির মতোই সমুদ্রে যাবার অধিকার ছিল।

তৃতীয়তঃ পুরো ব্যাপারটা আসলে একটা নির্দিষ্ট আয়তনের ভূখন্ডের মানুষের সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত রাস্তার উপরে নির্ভরশীল। যেমন – যদি ঢাকা একটা আলাদা দেশ হতো, তাহলে ঢাকার মানুষকে রাস্তা, রেল বা নদীপথে চট্টগ্রাম, মংলা বা পায়রা সমুদ্রবন্দরে পৌঁছাতে হতো। ব্রিটিশরা ঢাকা আর চট্টগ্রামকে এক দেশের অধীনে রাখার ফলে ঢাকার মানুষের চট্টগ্রাম বন্দরে যেতে ভিসা লাগেনা। কিন্তু কাঠমুন্ডুর মানুষের লাগে!

নেপালের ফ্লিট এবং এর ভবিষ্যৎ ফলাফল

নেপালকে বাংলাদেশ তার সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করতে দিলে নেপালকে শুধু বাংলাদেশের বন্দর পর্যন্ত একটা পথ বের করতে হবে; সেটা রাস্তা, রেল বা নদীপথই হোক। দিনাজপুর থেকে চট্টগ্রাম পৌঁছাতে যেমন রাস্তা তৈরি করতে হয়েছে, তেমনি কাঠমুন্ডু থেকে চট্টগ্রাম বা মংলা পৌঁছাতেও সেই ব্যবস্থাই করতে হবে। নেপালকে শুধু সমুদ্র পর্যন্ত পৌঁছানো নয়, তাদেরকে একটা মার্চেন্ট ফ্লিট গঠন করতেও বাংলাদেশের সহায়তা করা উচিৎ। আর সেই মার্চেন্ট ফ্লিটের নিরাপত্তা দিতে নেপালকে একটা নৌবাহিনী তৈরি করার জন্যেও সব ধরনের সহায়তা করা দরকার। এর ফলশ্রুতিতে যে ব্যাপারগুলি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হিসেবে দেখা দেবে তা হলো –

১। সমুদ্র বাণিজ্যের প্রসারে নেপালের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে; দারিদ্র্য থেকে বের হয়ে আসবে নেপালের জনগণ। নেপাল অত্র এলাকার ব্যবসায়ীদের জন্যে আরও আকর্ষণীয় বাজার হিসেবে আবির্ভূত হবে।

২। বাংলাদেশের সাথে নেপালের বাণিজ্য ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে, যা এখন নেই বললেই চলে।

৩। নেপালের জনগণের সাথে বাংলাদেশের জনগণের যোগাযোগ বৃদ্ধি পাবে এবং দীর্ঘমেয়াদী বন্ধুত্ব তৈরি হবে, যা কিনা বঙ্গোপসাগরে একটা শক্তিশালী রাষ্ট্র তৈরি হবার শর্ত।

৪। সমুদ্রবন্দরগুলির উন্নয়ন হবে; বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে। নেপালও বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে অংশ নেবে। যেমন, এই মুহুর্তে নেপাল বাংলাদেশের সাথে হাইড্রোইলেকট্রিক প্রকল্প করতে চাইছে।

৫। সমুদ্র বাণিজ্য বৃদ্ধির সাথে সাথে বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে। নেপাল নিজের স্বার্থের জন্যেই চাইবে বঙ্গোপসাগরকে নিরাপদ রাখতে। বাংলাদেশের নৌবাহিনীর সাথে তারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে।


৬। এই বন্ধুত্বের নিদর্শন নেপালের জনগণ কখনও ভুলবে না। এর ফলে হিমালয়ের পাদদেশে যে অকৃত্রিম বন্ধুর আবির্ভাব হবে, তা আর কোন ভাবেই পাওয়া সম্ভব নয়।


-------------------------------------------------------------------------------



নেপাল – একটা পরিচিতি

জনসংখ্যা – প্রায় ৩ কোটি (২০১৮)

জিডিপি –২৭ বিলিয়ন ডলার (২০১৮)

মাথাপিছু জিডিপি – ৯২০ ডলার (২০১৮)

আমদানি – ৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার (২০১৭)

রপ্তানি – ৮০৩ মিলিয়ন ডলার (২০১৭)

প্রধান আমদানি পণ্য – পরিশোধিত জ্বালানি তেল (১ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার), সেমি-ফিনিশড আয়রন (৪৪৭ মিলিয়ন ডলার), বিমান, হেলিকপ্টার (৩৩০ মিলিয়ন), স্বর্ণ (২৪৬ মিলিয়ন), কন্সট্রাকশন ভেহিকল (২৩৩ মিলিয়ন)।

মূলতঃ (৬৬%) ভারত থেকেই আমদানি করা হয় (৬ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার) – কনজিউমার গুডস ২ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার, ইন্টারমিডিয়ারি গুডস ২ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলার, জ্বালানি তেল (১ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার), ক্যাপিটাল গুডস (১ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলার), মেটাল (১ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার), মেশিনারি (৭০০ মিলিয়ন), শাকসবজি (৬৮২ মিলিয়ন), ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইনপুট (৬৭৪ মিলিয়ন), ট্রান্সপোর্ট (৬৫৮ মিলিয়ন), কেমিক্যাল (৪৪৭ মিলিয়ন), মিনারাল (৩৬২ মিলিয়ন), ফুড প্রডাক্টস (৩০৫ মিলিয়ন), প্লাস্টিক এন্ড রাবার (২৬০ মিলিয়ন), টেক্সটাইল (১৯০ মিলিয়ন), কাঠ (১২৫ মিলিয়ন), স্টোন এন্ড গ্লাস (১০৮ মিলিয়ন), পশু (৫৫ মিলিয়ন), ফুটওয়্যার (১২ মিলিয়ন)।

চীন থেকে আমদানি হয় ১৩% পণ্য বা ১ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলার; আরব আমিরাত থেকে ১৭৫ মিলিয়ন; ফ্রান্স থেকে ১৫৫ মিলিয়ন; আর্জেন্টিনা থেকে ১৩৪ মিলিয়ন; ইন্দোনেশিয়া থেকে ১২১ মিলিয়ন; থাইল্যান্ড থেকে ১০৮ মিলিয়ন; কোরিয়া থেকে ৯৩ মিলিয়ন; ভিয়েতনাম থেকে ৯১ মিলিয়ন; সৌদি আরব থেকে ৮৯ মিলিয়ন; মালয়েশিয়া থেকে ৮৬ মিলিয়ন; কানাডা থেকে ৮৬ মিলিয়ন; যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৮২ মিলিয়ন; ইউক্রেন থেকে ৬১ মিলিয়ন; দক্ষিণ আফ্রিকা ৫৭ মিলিয়ন; জাপান ৫৬ মিলিয়ন; জার্মানি ৫২ মিলিয়ন; অস্ট্রেলিয়া ৫১ মিলিয়ন; সিঙ্গাপুর ৪৫ মিলিয়ন; সুইজারল্যান্ড ৪০ মিলিয়ন; বাংলাদেশ থেকে ৩৯ মিলিয়ন; মিয়ানমার ৩২ মিলিয়ন; তুরস্ক ৩২ মিলিয়ন; মিশর ২৬ মিলিয়ন; ব্রিটেন ২৫ মিলিয়ন।

প্রধান রপ্তানি পণ্য – সিন্থেটিক স্টেপল ফাইবার ইয়ার্ন (৮০ মিলিয়ন ডলার), নটেড কার্পেট (৭১ মিলিয়ন), ফ্লেভার্ড ড্রিঙ্ক (৪৬ মিলিয়ন), ফ্রুট জুস (৪৫ মিলিয়ন), জয়ফল (৪৩ মিলিয়ন)।

৬৬% রপ্তানি হয় ভারতে (৪২০ মিলিয়ন ডলার); যুক্তরাষ্ট্রে যায় ৮৩ মিলিয়ন; তুরস্কে ৪৭ মিলিয়ন; জার্মানিতে ২৯ মিলিয়ন; ব্রিটেনে ২৫ মিলিয়ন; চীনে ২২ মিলিয়ন; ইতালিতে ১২ মিলিয়ন; ফ্রান্সে ১১ মিলিয়ন; বাংলাদেশে ১০ মিলিয়ন; জাপানে ১০ মিলিয়ন।

রেমিট্যান্স – ৮ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার (২০১৮), যা জিডিপি-এর ২৮%

ট্যুরিজম – ৬৪৩ মিলিয়ন ডলার (২০১৮); এটা বেশিরভাগ সময় ৩৪০ মিলিয়ন থেকে ৫৫০ মিলিয়নের মাঝে ওঠানামা করে।

স্বর্ণ রিজার্ভ – ৬ দশমিক ৪ থেকে ৬ দশমিক ৫ টন;

কৃষি – ৬৬% মানুষ কৃষিতে জড়িত; জিডিপির ৩৩% কৃষি থেকে আসে; কৃষিযোগ্য জমি ১৫% বা ২১ লক্ষ হেক্টর; ১৩ লক্ষ হেক্টর সেচের আওতায়; বনভূমি ২৫%; খাদ্যশস্য উৎপাদন ৮৬ থেকে ৯৬ লক্ষ টন;

প্রধান শস্য – ধান ৫২ থেকে ৫৬ লক্ষ টন (৮৬% থেকে ৯৭% জমিতে ধান চাষ হয়);

জ্বালানি – কাঠ, গোবর, কয়লা – ৮২%; পেট্রোলিয়াম – ৮% (মূলতঃ ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল);

গ্রামাঞ্চলে রান্নার জ্বালানি - কাঠ (৮১%), গোবর (৯%), এলপিজি (৪%), বায়োগ্যাস (৩ শতাংশ)। শহরাঞ্চলে রান্নার জ্বালানি – এলপিজি (৪০%), কাঠ (৩৬%), কেরোসিন (১৬%), বায়োগ্যাস (৩%), গোবর (৩%)।

বিদ্যুৎ – ৪৪% মানুষ বিদ্যুত পাচ্ছে; শীতকালে (শুষ্ক মৌসুমে) বিদ্যুৎ চাহিদা – ১,২০০ মেগাওয়াট; ৫০% নিজ উৎপাদন এবং বাকিটা ভারত থেকে আমদানিকৃত।

১,০১৬ মেগাওয়াট হাইড্রোপাওয়ার; ৩,৯০০ গিগাওয়াট-আওয়ার বিদ্যুৎ উৎপাদন; হাইড্রোপাওয়ারের সম্ভাবনা ৪২ হাজার মেগাওয়াট (৬০০ খরস্রোতা নদী)



তথ্যসূত্র -

বিশ্ব ব্যাংক; অবজারভেটরি অব ইকনমিক কমপ্লেক্সিটি (ওইসি); ফুড এন্ড আগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন (এফএও); ওয়ার্ল্ড ইন্টিগ্রেটেড ট্রেড সলিউশন; জাতিসংঘ কমট্রেড ডাটাবেস; সিইআইসি ডাটা; ইন্টারন্যাশনাল হাইড্রোপাওয়ার এসোসিয়েশন; এনার্জিপিডিয়া।


Thursday, 4 July 2019

ভারত মহাসগরে একা হয়ে যাচ্ছে চীন


চীনের ৮০ শতাংশ জ্বালানি তেলের সরবরাহ ভারত মহসাগর দিয়ে আশা-যাওয়া করে। চীনের ‘বেল্ট-এন্ড-রোড’ পরিকল্পনাকে হুমকি ভেবেই ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং সমমনা অন্যান্য রাষ্ট্রগুলি ভারত মহাসাগরে তাদের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করছে।
৪ঠা জুলাই ২০১৯

ভারত মহাসাগরে বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনীর মহড়া বেড়েই চলেছে। গত ১৭ থেকে ২৫শে মে বঙ্গোপসাগরে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল নৌ-মহড়া ‘লা পেরৌজি’; যাতে অংশ নেয় ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া এবং জাপানের মোট ৬টা যুদ্ধজাহাজ। মহড়ার বিষয়বস্তুর মাঝে সাবমেরিন-ধ্বংসী এবং বিমান-ধ্বংসী সক্ষমতার পরীক্ষা অন্তর্ভুক্ত ছিল। মহড়ার নেতৃত্ব ছিল ফ্রান্সের বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘শার্ল দ্য গল’এর কাছে। জাপানের শক্তিশালী ফ্লোটিলার অংশ ছিল হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার ‘ইজুমো’ এবং ডেস্ট্রয়ার ‘মুরাসামে’। অস্ট্রেলিয়া থেকে ফ্রিগেট ‘টুঊম্বা’ এবং সাবমেরিন ‘কলিন্স’ অংশ নেয়। যুক্তরাষ্ট্র থেকে অংশ নেয় ডেস্ট্রয়ার ‘উইলিয়াম পি লরেন্স’। ‘ফ্রি এন্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করতেই এই মহড়ার আয়োজন করা হয়েছিল। ‘ফ্রি’ এবং ‘ওপেন’ বলতে যে চীনের প্রভাবমুক্ততাকেই বোঝানো হয়েছে, সেব্যাপারে বিশ্লেষকেরা মোটামুটি একমত। মার্কিন সপ্তম নৌবহরের কমান্ডার ভাইস এডমিরাল ফিল সইয়ার বলেন যে, এই মহড়ার মাধ্যমে বোঝা যায় যে, তারা ইন্দো-প্যাসিফিকের যেকোন স্থানেই অপারেট করতে সক্ষম। একইসাথে তিনি এ-ও বলেন যে, এর মাধ্যমে অংশগ্রহণকারী দেশগুলির চিন্তার একাত্মতা প্রকাশ পায়। এই মহড়া শুরুর আগেই ১৪ই মে ফরাসী নৌবহরের সাথে মার্কিন নৌবাহিনী যৌথ মহড়ায় অংশ নেয়। সেখানে ফরাসী নৌবাহিনীর বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ’ শার্ল দ্য গল’এর সাথে ছিল এয়ার-ডিফেন্স ডেস্ট্রয়ার ‘ফোরবিন’, ‘ডুর‍্যান্স’-ক্লাসের জ্বালানি সরবরাহকারী জাহাজ ‘মার্ন’, এন্টি-সাবমেরিন ফ্রিগেট ‘লা-টুশে-ট্রেভিল’ এবং ‘প্রোভেন্স’। এই মহড়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল সাবমেরিন-ধ্বংসী সক্ষমতাগুলিকে ঝালাই করে নেয়া।

এখানেই শেষ নয়। ফরাসীদের এই ফ্লোটিলাই পহেলা মে থেকে ১০ই মে পর্যন্ত আরব সাগরে ভারতের পশ্চিম উপকূলে ভারতীয় নৌবাহিনীর সাথে ‘ভারুনা’ নামে আরেক নৌমহড়ায় অংশ নেয়। উভয় দেশের মোট ১১টা যুদ্ধজাহাজ সেই মহড়ায় অংশ নেয়। এই একই মহড়ার দ্বিতীয় অংশটা অনুষ্ঠিত হয় পূর্ব আফ্রিকার জিবুতির কাছে একই মাসের ২২ থেকে ২৫ তারিখ। সেখানে ফরাসী নৌবাহিনীর একটা পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনের সাথে অংশ নেয় আরেকটা ভারতীয় সাবমেরিন। জিবুতিতে অন্যান্য দেশ ছাড়াও চীনের প্রথম ওভারসিজ নৌঘাঁটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর ভারতীয় নৌবাহিনী এর বাইরেও এপ্রিলের ১৫ তারিখে ভারত মহাসাগরে মার্কিন নৌঘাঁটি দিয়েগো গার্সিয়ার কাছে মার্কিন নৌবাহিনীর সাথে সাবমেরিন-ধ্বংসী মহড়ায় অংশ নেয়। এখানে মার্কিন নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার ‘স্প্রুয়্যান্স’এর সাথে যোগ দেয় মার্কিন এবং ভারতীয় নৌবাহিনীর দু’টি অত্যাধুনিক ‘পি-৮’ সাবমেরিন-ধ্বংসী বিমান। এছাড়াও অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীর সাথে ভিশাখাপত্তম-এর কাছাকাছি বঙ্গোপসাগরে ‘অসইনডেক্স-১৯’ নামের আরেক মহড়ায় অংশ নেয় ভারতীয় নৌবাহিনী। ৩রা এপ্রিলে শুরু হওয়া সাবমেরিন-বিধ্বংসী এই মহড়ায় অংশ নেয় অস্ট্রেলিয়ার হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার ‘ক্যানবেরা’, ফ্রিগেট ‘নিউকাসল’ ও ‘পারামাত্তা’ এবং জ্বালানীবাহী জাহাজ ‘সাকসেস’।

২০১৫ সাল থেকে বঙ্গোপসাগরে নৌমহড়া ‘মালাবার’এর মাঝে যুক্ত হয়েছে জাপান। ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯২ সাল থেকে এই মহড়ার আয়োজন করে আসছে। গত বছরের জুনেও এর আয়োজক ছিল ভারত। বঙ্গোপসাগরে নিয়মিত আয়োজনের পাশাপাশি এক বছর এই মহড়া প্রশান্ত মহাসাগরের ফিলিপাইন সাগরেও হয়েছে। অস্ট্রেলিয়াকে এই মহড়ায় নেবার জন্যে বিভিন্ন মহলের চাপ থাকলেও ভারত সরকার অস্ট্রেলিয়াকে এই মহড়ার অংশ করেনি। অন্ততঃ লোক দেখানো হলেও এই মহড়া থেকে অস্ট্রেলিয়াকে বাইরে রেখে ভারত বোঝাতে চাইছে যে, তারা চীনকে রাগাতে চায় না। অথচ এটা অনেকেই ভুলে যাচ্ছেন যে, ‘মালাবার’ মহড়া এখন পুরোপুরিভাবেই চীনকে নিয়ন্ত্রণের চিন্তা দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। তদুপরি অস্ট্রেলিয়ার সাথে ভারতের আলাদাভাবে মহড়া তো হচ্ছেই। 

অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীর সাথে ভিশাখাপত্তম-এর কাছাকাছি বঙ্গোপসাগরে ‘অসইনডেক্স-১৯’ নামের আরেক মহড়ায় অংশ নেয় ভারতীয় নৌবাহিনী। অন্ততঃ লোক দেখানো হলেও 'মালাবার' মহড়া থেকে অস্ট্রেলিয়াকে বাইরে রেখে ভারত বোঝাতে চাইছে যে, তারা চীনকে রাগাতে চায় না। অথচ এটা অনেকেই ভুলে যাচ্ছেন যে, ‘মালাবার’ মহড়া এখন পুরোপুরিভাবেই চীনকে নিয়ন্ত্রণের চিন্তা দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। তদুপরি অস্ট্রেলিয়ার সাথে ভারতের আলাদাভাবে মহড়া তো হচ্ছেই।


দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হবার পরপরই জুন মাসে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মালদ্বীপ এবং শ্রীলংকা সফর করে আসেন। মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোহামেদ সলিহ-এর সাথে বৈঠক ছাড়াও মোট ৬টা চুক্তি সই করেন মোদি; যার মাঝে ছিল ‘হোয়াইট শিপিং ইনফরমেশন’এর উপর চুক্তি। এর মাধ্যমে মালদ্বীপ সরকার মালদ্বীপের সীমানায় আসা যেকোন জাহাজের সম্পর্কে তথ্য ভারতীয় নৌবাহিনীর কাছে সরবরাহ করবে। উভয় নেতা একত্রে মালদ্বীপ ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্স ট্রেনিং সেন্টার এবং উপকূলীয় রাডার সিস্টেম-এর উদ্ভোধন করেন। এই রাডারগুলির মাধ্যমে মালদ্বীপ ও এর আশেপাশের এলাকায় যেকোন জাহাজের উপস্থিতি সম্পর্কে মালদ্বীপ সরকার ওয়াকিবহাল থাকবে এবং এসব তথ্য ভারতীয় নৌবাহিনীকে সরবরাহ করবে। শ্রীলঙ্কা সফরের সময়েও নরেন্দ্র মোদি সামরিক প্রশিক্ষণ সহায়তার চুক্তি সই করেন। শ্রীলংকার নৌবাহিনীর জন্যে যুদ্ধজাহাজ সরবরাহ করছে ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে চীন তার স্থান করে নিতে চাইলেও তা তাদের জন্যে মোটেই সহজ ঠেকছে না।

‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ পত্রিকার এক লেখায় ভারতীয় চিন্তাবিদ রাজা মোহন বলেন যে, মালে এবং কলম্বো সফরের মাধ্যমে ভারত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্রগুলিকে ভারত তার আঞ্চলিক ভূগোলের মাঝে শক্তভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে চাইছে। একেবারে ছোট দ্বীপগুলিও এখন ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গিয়েছে। ভারত চাইছে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় আফ্রিকার উপকূল থেকে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ করতে। চীনের ৮০ শতাংশ জ্বালানি তেলের সরবরাহ এই পথেই আশা-যাওয়া করে। চীনের ‘বেল্ট-এন্ড-রোড’ পরিকল্পনাকে হুমকি ভেবেই ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং সমমনা অন্যান্য রাষ্ট্রগুলি ভারত মহাসাগরে তাদের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করছে।

আফ্রিকার উপকূলেও ভারত তার সামরিক অবস্থান দৃঢ় করেছে। দক্ষিণ-পূর্ব আফ্রিকার দেশ মোজাম্বিকে গত মার্চ মাসে সাইক্লোন ‘ইদাই’ আঘাত হানার পর সেখানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ভারতীয় নৌবাহিনীর চারটি জাহাজ সবার আগে সেখানে ত্রানসামগ্রী নিয়ে পৌঁছায়। জুনের প্রথম সপ্তাহে মোজাম্বিকের প্রেসিডেন্ট ফিলিপ নাইয়ুসি নরেন্দ্র মোদিকে ফোন করে ভারতের এই সহায়তার জন্যে তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তাঞ্জানিয়ার সাথে ভারতীয় নৌবাহিনীর সহযোগিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে দিনদিন। ২০১৭ সালে ভারতীয় নৌবাহিনীর জাহাজ তাঞ্জানিয়ার উপকূলে হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভের কাজও করে। গত জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলিকে সাথে নিয়ে হয়ে গেল ‘কাটল্যাস এক্সপ্রেস-২০১৯’ নামের নৌ-মহড়া, যাতে নেতৃত্ব দেয় যুক্তরাষ্ট্রের আফ্রিকা কমান্ড। পূর্ব আফ্রিকার ৯টা দেশের পাশাপাশি এই মহড়ায় অংশ নেয় ফ্রান্স, পর্তুগাল, নেদারল্যান্ডস, কানাডা এবং ভারত। ভারতীয় নৌবাহিনীর ফ্রিগেট ‘ত্রিকান্দ’ জিবুতির কাছে এই মহড়ায় অংশ নেয়। ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপ দেশ মরিশাসের সাথে ভারতের সামরিক সহযোগিতার সম্পর্ক আরও গভীর হচ্ছে। মরিশাসের কোস্ট গার্ডের জন্যে যুদ্ধজাহাজ সরবরাহ করেছে ভারত। আবার পূর্ব আফ্রিকার উপকূলে মোজাম্বিক চ্যানেলে সেইশেল দ্বীপের অধীনে থাকা এসাম্পশন দ্বীপেও ভারত নৌঘাঁটি করতে চাইছে। 

ভারতীয় নৌবাহিনীর ফ্রিগেট 'ত্রিকান্দ' তাঞ্জানিয়ার রাজধানী দার-এস-সালাম-এ। ভারত চাইছে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় আফ্রিকার উপকূল থেকে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ করতে। ভারত মহাসাগরের মাঝ দিয়ে যাওয়া চীনের সমুদ্র বাণিজ্য রুটগুলিকে নিজস্ব নৌবহরের মাধ্যমে রক্ষা করার সক্ষমতা থেকে চীনা এখনও বহুদূরে রয়েছে। ভারত মহাসাগরে চীনা যুদ্ধজাহাজের ব্যবহার করতে পারার মতো বন্দর খুব বেশি একটা নেই। মার্কিন বলয়ে থাকা দেশগুলি ভারত মহাসাগর জুড়ে নৌ-মহড়া চালিয়ে চীনকে সেই বার্তাই দিচ্ছে।  


গত বছরের মে মাসে ভারত মহাসাগরের অপর প্রান্তে ইন্দোনেশিয়া সফরের সময় নরেন্দ্র মোদি ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদোর সাথে সামরিক সহযোগিতার ব্যাপারে একমত হন। সে অনুযায়ী ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের উত্তর প্রান্তে সাবাং-এ একটা নৌঘাঁটি করার প্রকল্প হাতে নেয়া হচ্ছে। এই নৌঘাঁটির মাধ্যমে মালাক্কা প্রণালী হয়ে ভারত মহাসাগরে ঢোকার সময় যেকোন সামরিক জাহাজের উপর নজরদারি করা সম্ভব হবে। মিয়ানমারের সাথেও ভারতীয় নৌবাহিনী গত বছরের মার্চ এবং সেপ্টেম্বরে যৌথ মহড়া করে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সাথে করা চুক্তি অনুযায়ী মিয়ানমার ভারতীয় নৌবাহিনীকে তার নিজস্ব সীমানায় আসা সকল জাহাজের তথ্য সরবরাহ করছে। মিয়ানমারে ভারতীয় নৌবাহিনীর জাহাজের সফর বৃদ্ধি পেয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে। আরব সাগরেও ওমানের দুকম বন্দর ভারতীয় নৌবাহিনী ব্যবহারের অনুমতি পেয়েছে। ব্রিটিশ নৌবাহিনীও দুকমে বড় আকারের নৌঘাঁটি তৈরি করছে; যেখানে ‘কুইন এলিজাবেথ-ক্লাস’এর বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজগুলি ঢুকতে পারবে।

চীন তার ‘বেল্ট-এন্ড-রোড’ পরিকল্পনার অধীনে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। মিয়ানমার, পাকিস্তান, তাঞ্জানিয়া এবং শ্রীলংকায় সমুদ্রবন্দর উন্নয়নের কাজও করছে চীন। কিন্তু ভারত মহাসাগরের মাঝ দিয়ে যাওয়া চীনের সমুদ্র বাণিজ্য রুটগুলিকে নিজস্ব নৌবহরের মাধ্যমে রক্ষা করার সক্ষমতা থেকে চীনা এখনও বহুদূরে রয়েছে। ভারত মহাসাগরে চীনা যুদ্ধজাহাজের ব্যবহার করতে পারার মতো বন্দর খুব বেশি একটা নেই। মার্কিন বলয়ে থাকা দেশগুলি ভারত মহাসাগর জুড়ে নৌ-মহড়া চালিয়ে চীনকে সেই বার্তাই দিচ্ছে। মিয়ানমার, পাকিস্তান এবং শ্রীলংকা – এই সবগুলি দেশেই চীনের সমুদ্রবন্দরগুলি রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে পরার আশংকা থেকে মুক্ত নয়। পাকিস্তানে বালুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের জন্যে ভারতীয় সমর্থন রয়েছে। অন্যদিকে মিয়ানমারের রাখাইনে মুসলিম-বিরোধী গণহত্যা এবং ফলশ্রুতিতে প্রতিবেশী বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ১০ লাখ মানুষের শরণার্থী হিসেবে পালিয়ে যাবার পর থেকে রাখাইন অস্থিতিশীল রয়েছে। শ্রীলংকার গৃহযুদ্ধ শেষ হলেও নতুন করে উগ্রবাদী হামলা হবার পর থেকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

এমতাবস্থায় চীনের কাছে দু’টা পথ খোলা রয়েছে। প্রথমতঃ নিজেদের সামরিক শক্তির উন্নয়নের মাধ্যমে ভারত মহাসাগরের কর্তৃত্ব নিয়ে নেয়া। এবং দ্বিতীয়তঃ ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শক্তিশালী বন্ধু খোঁজা, যার কিনা শক্তিশালী নৌবহর থাকবে। ভারত মহাসাগরে যথেষ্ট সংখ্যক সামরিক ঘাঁটি না থাকায় প্রথম অপশনটা চীনের জন্যে বর্তমানে প্রায় অসম্ভব। ভারত মহাসাগর চীনের সমুদ্রবন্দর থেকে যথেষ্ট দূরে থাকায় চীনের কাছে দ্বিতীয় অপশন ছাড়া আর গতি নেই। যুক্তরাষ্ট্রও ভারত মহাসাগরে এভাবেই চলছে। সুদূর যুক্তরাষ্ট্র থেকে যুদ্ধজাহাজ ভাসিয়ে এনে ভারত মহাসাগর পাড়ি দেয়াটা অত্যন্ত কঠিন কাজ। এক্ষেত্রে ভারত মহাসাগরীয় দেশগুলি যুক্তরাষ্ট্রকে লজিস্টিক সহায়তা না দিলে এটা মার্কিনীদের পক্ষে একেবারেই সম্ভব ছিল না। আর দ্বিতীয় অপশনটা এখন যুক্তরাষ্ট্রই ব্যবহার করছে; কারণ যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এখন একা সারা দুনিয়ার সমদ্রপথ টহল দেয়া সম্ভব নয়। তাই যুক্তরাষ্ট্র এখন তার কাজ অন্যদের মাঝে ভাগ করে দিচ্ছেভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলি যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্বের বেশিরভাগটাই নিয়ে নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং ব্রিটেন এতে সহায়তা দিচ্ছে মাত্র। নৌ-মহড়া ‘লা পেরৌজি’তে ৬টা যুদ্ধজাহাজের মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের ছিল মাত্র একটা। ‘কাটল্যাস এক্সপ্রেস-২০১৯’এও মার্কিন জাহাজ ছিল মাত্র একটা। আর মহড়ার মাধ্যমে এই সহযোগিতার মূল লক্ষ্যই হলো অত্র অঞ্চলে চীনা প্রভাব বিস্তারকে নিয়ন্ত্রণ করা। মার্কিন-ব্রিটিশ-ফরাসী প্রভাব বলয়ে ভারত মহাসাগরে যে নৌশক্তির নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, চীনের হাতে এর ধারেকাছেও কিছু নেই। ভারত মহাসাগরে শক্তিশালী নৌশক্তি-সম্পন্ন বন্ধু তৈরি নিয়ে চীনকে নতুন করে ভাবতে হবে। অন্ততঃ ২০১৯ সালের প্রথম ছয় মাসে ভারত মহাসাগরে চীন-বিরোধী নৌ-মহড়ার জমজমাট আসর সেদিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। এক্ষেত্রে পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোন দেশের মাধ্যমে ভারত মহাসাগরে নতুন কোন নৌশক্তির আবির্ভাব ঘটানো দুষ্কর। যদিও উভয় দেশই শুধুমাত্র চীনের প্রভাবে থাকতে চাইছে না; যদিও তারা চীনের বিনিয়োগকে স্বাগত জানাচ্ছে।

Wednesday, 29 May 2019

“বেঙ্গল গেইট” এবং আওরঙ্গজেবের “স্বর্গ”

২৯শে মে ২০১৯


বৃষ্টিপাত, ভৌগোলিক অবস্থান এবং ভূ-প্রকৃতি

পৃথিবীর বহু স্থান রয়েছে যেখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়; কিন্তু মানুষ বসবাসের উপযোগী নয়। বিষুবীয় অঞ্চলে অবস্থিত দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন জঙ্গল, আফ্রিকার কঙ্গো এবং ইন্দোনেশিয়ার বোর্নিও, সুমাত্রা এবং পপুয়া নিউ গিনির মত এলাকাগুলি এই প্রকারের মাঝে পড়বে। ঘন বনাঞ্চল হবার কারণে এই এলাকাগুলিতে মানুষ বসবাস কঠিন। সারাবছর বৃষ্টিপাত হওয়া সত্ত্বেও এই অঞ্চলগুলি অনেক মানুষ বাঁচিয়ে রাখার জন্যে উপযোগী নয়। আবার রয়েছে পাহাড়ি অঞ্চল। বৃষ্টিপাত হলেও পাহাড়ি অঞ্চল বসবাসের জন্যে কম উপযোগী। প্রথম সমস্যা হলো, ঢালু অঞ্চলে হবার কারণে প্রাকৃতিকভাবে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা কঠিন। আর দ্বিতীয় সমস্যা হলো যাতায়াতের সমস্যা। পাহাড়ি নদীতে নৌকা চালিয়ে উজানের দিকে যাওয়া কঠিন। আর পাহাড়ের গা বেয়ে রাস্তা তৈরি করা তো আরও কষ্টকর। জঙ্গল এবং পাহাড়ি অঞ্চলে চাষাবাদ অপেক্ষাকৃত কঠিন। আর চাষাবাদ ছাড়া বহু মানুষের জন্যে অন্নের সংস্থান করাটাও কঠিন। প্রচুর বৃষ্টি হলেও তা যথেষ্ট নয়; বৃষ্টির পানি যদি প্রাকৃতিকভাবে ধরে রাখার ব্যবস্থা থাকে, তাহলেই কেবল তা চাষাবাদের জন্যে উপযোগী এলাকা হবে। আর সেখানে অনেক মানুষের থাকার ব্যবস্থাও সম্ভব।

এরপরও কথা থেকে যায়। বৃষ্টির মেঘ সমুদ্র থেকে ভূমির দিকে এগুলে যেকোন স্থানেই বৃষ্টি হয়ে ঝড়তে পারে। এই বৃষ্টি যত কম স্থানের উপরে পড়বে, সেখানে স্বাদু পানির সংস্থান সবচাইতে বেশি হবে। যদি বৃষ্টি অনেক বেশি এলাকা নিয়ে পড়ে, তবে সেই পানি ব্যবহার করতে একটা নির্দিষ্ট স্থানে বাস করলেই হবে না; ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে হবে। তবে বৃষ্টির পরিমাণ যদি অনেক বেশি হয়, সেক্ষেত্রে তা অনেক বেশি মানুষের সংস্থান করতে পারবে। বৃষ্টির নির্দিষ্ট স্থানে পড়ার একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হলো পাহাড়-পর্বত। বৃষ্টির মেঘ উঁচু পাহাড়ে আটকে গিয়ে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পারে। যদি সেই পাহাড়ের পাদদেশে মানুষ বসবাস করে, তাহলে তারা সেই বৃষ্টির পানি যথেষ্ট পরিমাণে পাবে। তবে পাহাড়ের পাদদেশের আয়তন এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক স্থানেই পাহাড় প্রায় সমুদ্রের উপকূলে অবস্থিত। তাই পাহাড়ে মেঘের ধাক্কায় যে বৃষ্টিপাত হয়, তা সরাসরিই সমুদ্রে চলে যায়। তাহলে বৃষ্টির পানি ব্যবহার করতে হলে পাহাড়ের পাদদেশের প্রাকৃতিক পরিস্থিতি দেখতে হবে।

একটা সমতল এলাকায় বৃষ্টির পানি পড়লে সেটা সমুদ্রে যেতে অনেক সময় নেবে। ভূমির ঢাল যত কম হবে, পানি তত ধীরে ধীরে সমুদ্রে পৌঁছাবে। আর এই ধীরে সমুদ্রে পৌঁছার মাঝে সমতলে বসবাসরত মানুষেরা সেই পানিকে ব্যবহার করতে পারবে। সেই অঞ্চলের নদী-নালা-খাল-বিল পানি ধরে রাখতে পারবে অনেক সময়; যদিও তা একসময় না একসময় সমুদ্রে পৌঁছাবে। এখানে সময়টা গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড়ি অঞ্চলের বৃষ্টির পানি খুব দ্রুত সমুদ্রে চলে যায়; সমতলের পানি অনেক ধীরে যায় সমুদ্রে। আরও ব্যাপার রয়েছে সমতলের আয়তন নিয়ে। সমতলের আয়তন বেশি হলে সেই পানির সমুদ্রে পৌঁছাতে অনেক বেশি সময় লাগবে; আয়তন ছোট হলে দ্রুত পৌঁছাবে সমুদ্রে। আর এই সমতলের পাশে পাহাড় থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড় যদি সমতল আর সমুদ্রের মাঝে থাকে, তাহলে পাহাড় বৃষ্টির মেঘকে সমতলে পৌঁছাতে দেবে না; অর্থাৎ সমতলে বৃষ্টি হবে না এবং তা মানুষ বসবাসের জন্যে কম উপযোগী হবে। অন্যদিকে সমতল যদি পাহাড় এবং সমুদ্রের মাঝে থাকে, তাহলে বৃষ্টির মেঘ পাহাড়ে বাধা পেয়ে যে বৃষ্টি হবে, তার পানি ঐ সমতলের মাঝ দিয়েই ধীরে ধীরে প্রবাহিত হয়ে সমুদ্রে পৌঁছাবে। এক্ষেত্রে ঐ সমতলে থাকা মানুষ বহু সময় ধরে বহমান পানি ব্যবহার করতে পারবে।

আর এই সবকিছুর উপরে রয়েছে বাতাসের দিক। সমুদ্র থেকে বৃষ্টির মেঘ সকল দিকে ধাবিত হয় না; সকল সময়েও ধাবিত হয় না। বাতাসের দিকও সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়, যা কিনা ঋতুর পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত। অর্থাৎ বৃষ্টির পানির পুরোপুরি ব্যবহার হতে হলে সমুদ্র থেকে বাতাসের দিক হতে হবে নির্দিষ্ট ভূখন্ডের দিকে, যেখানে রয়েছে বিরাট সমতল, এবং সমতলের পর রয়েছে উঁচু পাহাড়, যেখানে বৃষ্টির মেঘ ধাক্কা খেয়ে বৃষ্টি ঘটায়। সেই সমতল আর সমুদ্রের মাঝে থাকবে না কোন পাহাড়, যা বৃষ্টির মেঘ সমতলে ঢোকার আগেই আটকে দিতে পারে। জঙ্গলের মাঝে মানুষ বসবাস কঠিন হবে, তাই এই পুরো এলাকা আবার জংলা অঞ্চলে হলেও সমস্যা। প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ধ্বংস করেও অবশ্য কৃষির ব্যবস্থা করা সম্ভব।

এই দরজাটাই হলো বাংলা অঞ্চলে বৃষ্টির মেঘ ঢোকার রাস্তা। এই দরজার পূর্বে রয়েছে আরাকান পর্বত, আর পশ্চিমে পূর্ব-ঘাট পর্বত। এই “বেঙ্গল গেইট” দিয়েই ঢোকে ভারত মহাসাগর থেকে উড়ে আসা দক্ষিণ-পশ্চিমের মেঘ। একবার “বেঙ্গল গেইট” দিয়ে বৃষ্টির মেঘ ঢুকে গেলে তা তিনদিকে মেঘের মাঝে আটকা পড়ে যায়, এবং এর পুরোটাই বৃষ্টি হয়ে এই সমতলে ঝরে পড়ে; পালাবার পথ নেই! 

“বেঙ্গল গেইট”

ভারতীয় উপমহাদেশে বৃষ্টিপাতের সেই অবস্থাটাই বিরাজ করছে, যা কিনা বহু মানুষের বসবাসের জন্যে উপযোগী। এর মাঝে আবার গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রা-মেঘনা অববাহিকার গুরুত্ব সবচাইতে বেশি।

প্রথমতঃ ভারত মহাসাগরের বৃষ্টির মেঘগুলি ঠিক দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে প্রবাহিত হয়ে এই নদী অববাহিকা পর্যন্ত পৌঁছে; মাঝে কোন বাধা নেই। এটা সম্ভব হচ্ছে বঙ্গোপসাগরের ফানেল আকৃতির কারণে।

দ্বিতীয়তঃ উপকূলে কোন পাহাড় নেই; তাই বৃষ্টির মেঘ ভূমির অনেক ভেতর ঢুকতে পারে।

তৃতীয়তঃ ভারতের দক্ষিণ অঞ্চলটা উপদ্বীপ আকৃতির; যার পূর্ব উপকূলে রয়েছে পূর্ব-ঘাট পর্বত। এই পর্বতের কারণে বৃষ্টির মেঘগুলি উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক বৃষ্টিপাত ঘটায়। কিন্তু পাহাড়ের উত্তরের দিকে বৃষ্টি খুব হয়। পূর্ব-ঘাট পর্বত যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানেই বৃষ্টি মেঘের সামনে সমতলে ঢোকার একটা দরজা খুলে যায়। এই দরজাটাই হলো বাংলা অঞ্চলে বৃষ্টির মেঘ ঢোকার রাস্তা। এই দরজার পূর্বে রয়েছে আরাকান পর্বত, আর পশ্চিমে পূর্ব-ঘাট পর্বত। এই “বেঙ্গল গেইট” দিয়েই ঢোকে ভারত মহাসাগর থেকে উড়ে আসা দক্ষিণ-পশ্চিমের মেঘ।

চতুর্থতঃ এই মেঘ ঢুকে যায় সমতল অববাহিকায়, এবং এর উত্তরের উঁচু হিমালয় পর্বত এবং এর শাখা প্রশাখায় মেঘ ধাক্কা খেয়ে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে। পঞ্চমতঃ একবার “বেঙ্গল গেইট” দিয়ে বৃষ্টির মেঘ ঢুকে গেলে তা তিনদিকে মেঘের মাঝে আটকা পড়ে যায়, এবং এর পুরোটাই বৃষ্টি হয়ে এই সমতলে ঝরে পড়ে; পালাবার পথ নেই! উত্তর ভারতে গঙ্গা নদীর অববাহিকা জুড়ে বেশ কিছু এলাকায় এই মেঘ পৌঁছে। তবে যত উত্তর-পশ্চিমে যাওয়া যায়, বৃষ্টি কমতে থাকে। ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় হিমালয়ের পাদদেশে ব্যাপক বৃষ্টি হয়, যা ব্রহ্মপুত্র নদের মাধ্যমে সমতলে প্রবাহিত হয়। এরও পূর্বে হিমালয়, মেঘালয় এবং আরাকান পর্বতের মাঝে আটকা পড়ে মেঘ। এইসব পাহাড়ে বৃষ্টির পানি ব্রহ্মপুত্র, বরাক এবং অন্যান্য নদী বেয়ে সমতলে পৌঁছায়। মোটকথা “বেঙ্গল গেইট”এর ভেতর দিয়ে ঢোকার পরে এই মেঘগুলি একটা বৃষ্টির রাজ্য তৈরি করে, যা কিনা দুনিয়ার আর কোথাও দেখা যায় না।

গঙ্গা অববাহিকায় বাস করে ভারতের ৪০ কোটি মানুষ। আর গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-বরাকের মিলিত স্রোতের নদী-বিধৌত অঞ্চলে বাস করে আরও ২১ কোটির মতো মানুষ। অর্থাৎ এই “বেঙ্গল গেইট”এর মাঝ দিয়ে ঢোকা বৃষ্টির মেঘের উপর বেঁচে থাকছে ৬০ কোটিরও বেশি মানুষ। দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে বৃষ্টি এই অঞ্চলে চাষাবাদের এক বিরাট সুযোগ করে দিয়েছে; যা কিনা এত বিশাল এক জনসংখ্যাকে বাঁচিয়ে রাখছে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের এই মৌসুমী বায়ু প্রতিবছর প্রায় একই সময়ে একই দিক থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে ছোটে। আর বঙ্গোপসাগরের ফানেলের কারণে তা বাধা না পেয়ে উত্তরের দিকে যেতে থাকে। এরপর সে পেয়ে যায় “বেঙ্গল গেইট”! পুরো মেঘমালা ঢুকে যায় এই গেইট দিয়ে; আর আটকা পড়ে যায় তিন দিকের উঁচু পাহাড়ের মাঝে; বৃষ্টি হয়ে ঝড়ে পরে; তৈরি করে বিশাল বিশাল প্রবাহমান জলাধার, যেগুলিকে আমরা নদী বলে জানি। তিন নদীর মিলিত স্রোতেই এই অঞ্চলই পৃথিবীর সবচাইতে সম্পদশালী অঞ্চলগুলির একটা। এই সম্পদ হলো এর মৌসুমী বায়ু, ভৌগোলিক অবস্থান এবং ভূ-প্রকৃতি; যার সবগুলিই সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত! এবং এগুলি কখনোই ফুরাবার নয়, যদি না সৃষ্টিকর্তা অন্য কিছু চান! অর্থাৎ এই অঞ্চল যে সবচাইতে সম্পদশালী হবে, তা সৃষ্টিকর্তা নিজেই ঠিক করে দিয়েছেন!
হিন্দুস্তান আর চীন – এই দুই অর্থনৈতিক দৈত্যের মাঝে বাণিজ্যের সম্পর্ক গভীর করার পিছরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল আরবদের। আর আরবরা ইসলাম নেবার পর থেকে এই বাণিজ্যের প্রসার আরও বহুগুণে বেড়ে যায়। ইসলামের দাওয়া পৌঁছে দেবার স্পৃহা মুসলিম বণিকদের বহুদূর নিয়ে গেছে। পুরো ভারত মহাসাগর জুড়ে তারা বসতি স্থাপন করেছিল; এনেছিল ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নয়ন। হিন্দুস্তান-চীন-ইন্দোচীন-মালয়ের অর্থনীতি ছিল একই সূত্রে গাঁথা।



ঔপনিবেশিকরাও বুঝেছিল “বেঙ্গল গেইট”এর গুরুত্ব

ষোড়শ শতকে ঔপনিবেশিক শক্তিরা এখানে এসেছিল এই সম্পদের খোঁজেই। তারা জানতো এই সম্পদ ফুরাবার নয়। তাই তারা চীরজীবন এই সম্পদকে নিজেদের উন্নয়নে ব্যবহার করার লক্ষ্যে রাজনৈতিকভাবে এখানকার গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলির দখল নিতে মনোযোগী হয়। পর্তুগীজরা যখন এই “বেঙ্গল গেইট”এ পৌঁছায়, তখনও তারা এখানকার সম্পদের মাপ করতে সক্ষম হয়নি। আসলে এত সম্পদ তারা জীবনে কখনও দেখেনি বলেই এই মাপ তারা করতে পারেনি। এখানকার ভাব বুঝতেই তাদের বেশকিছু সময় চলে যায়। তবে ভাব বোঝার সাথেসাথেই তারা কাজে নেমে পড়ে – এই অঞ্চলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতেই হবে। সপ্তদশ শতকে এখানে হাজির হয় ডাচ, ব্রিটিশ, ফরাসীরা। এরাও এই অঞ্চলের অশেষ সম্পদের লোভে পড়ে যায়। শুরু হয় এদের মাঝে দ্বন্দ্ব। শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশরাই টিকে যায়। এবং তারা বেঙ্গলকে পুরো ভারতের মাঝে সবচাইতে বেশি গুরুত্ব দিতো। তাদের আগে পর্তুগীজরাও তা-ই দিয়েছিল। মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব ছিলেন একজন যোদ্ধা; জীবনের বেশিরভাগ সময়ই তিনি যুদ্ধের ময়দানে কাটিয়েছেন। তার সেনাবাহিনীকে টিকিয়ে রাখার আর্থিক শক্তিটুকুর বেশিরভাগটাই তিনি বাংলা থেকে পেয়েছিলেন। কাজেই অবাক হবার কি আছে, যখন তিনি বাংলাকে বলেছেন “হিন্দুস্তানের স্বর্গ”? ব্রিটিশরা এই “স্বর্গ” নিয়ে এতটাই প্রেমে পড়েছিল যে, ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে বাকি দুনিয়ার সবকিছু ফেলে তারা তাদের সকল চিন্তাকে ভারত-কেন্দ্রিক করে ফেলেছিল। ভারতের, তথা বাংলার সম্পদকে ব্যবহার করে ব্রিটিশরা দেড়’শ বছর দুনিয়া শাসন করেছিল। দুনিয়ার ইতিহাসের সবচাইতে শক্তিশালী নৌবহর তারা তৈরি করতে পেরেছিল ভারতের সম্পদকে কাজে লাগিয়েই।

এখানেই শেষ নয়। এশিয়ার অন্য প্রান্তে রয়েছে আরেক জনবহুল অঞ্চল – চীন। আরও রয়েছে এর আশেপাশের মালয় দ্বীপপুঞ্জ এবং ইন্দোচীন উপদ্বীপ। হিন্দুস্তানের সাথে চীন এবং আশেপাশের অঞ্চলের চলেছে হাজার বছরের বাণিজ্য। এই বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ ছিল আরব বণিকদের হাতে। আরবরা বাণিজ্য করতো; কারণ তাদের অঞ্চল ছিল মরুভূমি; ফসল ফলে না একেবারেই। তার রিযিক অন্বেষণে তারা হয়েছিল বণিক। হিন্দুস্তান আর চীন – এই দুই অর্থনৈতিক দৈত্যের মাঝে বাণিজ্যের সম্পর্ক গভীর করার পিছরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল আরবদের। আর আরবরা ইসলাম নেবার পর থেকে এই বাণিজ্যের প্রসার আরও বহুগুণে বেড়ে যায়। ইসলামের দাওয়া পৌঁছে দেবার স্পৃহা মুসলিম বণিকদের বহুদূর নিয়ে গেছে। পুরো ভারত মহাসাগর জুড়ে তারা বসতি স্থাপন করেছিল; এনেছিল ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নয়ন। হিন্দুস্তান-চীন-ইন্দোচীন-মালয়ের অর্থনীতি ছিল একই সূত্রে গাঁথা। মুসলিমরা এই সম্পদশালী অঞ্চলের সম্পদকে বাণিজ্যের মাধ্যমে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছিল। মুসলিমদের এই বাণিজ্য সাফল্যই ইউরোপিয়দের অনুপ্রাণিত করেছিল পূর্বের সাথে বাণিজ্য করার। এটা তারা করতে পেরেছিল ভাস্কো দা গামার ভারত মহাসাগর অভিযানের পর থেকে।

ইতিহাসে হিন্দুস্তান এবং চীনের অর্থনীতি একত্রেই ওঠা-নামা করেছে। দুনিয়ার প্রায় অর্ধেক মানুষের বসবাস সবসময় এখানেই ছিল। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই এখানকার অর্থনীতি ছিল দুনিয়ার অর্থনীতিরও অর্ধেক। এই ব্যাপারটা পরিবর্তন করে ফেলে ঔপনিবেশিকেরা। তারা পুঁজিবাদী চিন্তার মাধ্যমে সম্পদের অসুস্থ্য বন্টন করে ইউরোপকে সম্পদশালী করে, যেখানে ইউরোপের জনসংখ্যা সারা দুনিয়ার তুলনায় কিছুই নয়। একটা মানুষের বেঁচে থাকার জন্যে যা প্রয়োজন, তার চাইতে বহুগুণ সম্পদ তারা কুক্ষিগত করে সারা দুনিয়ার অর্থনীতিকে ধ্বংস করে। প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য্যের কারণেই হিন্দুস্তান-চীনের বিশাল জনসংখ্যা। এটা সৃষ্টিকর্তা স্বয়ং ঠিক করে দিয়েছেন। তাঁর তৈরি করে দেয়া এই নিয়মের হেরফের করার ফলে বিশ্বব্যাপী মানুষের মাঝে তৈরি হয়েছে সংঘাত এবং অশান্তি।



“আর তারা কি আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন সব সত্ত্বার পূজা করে যাদের না আকাশ থেকে তাদের কিছু রিযিক দেবার ক্ষমতা ও অধিকার আছে, না পৃথিবী থেকে?” [সূরা আন-নাহল – আয়াত ৭৩]