Wednesday, 24 July 2024

দ্যা লংগেস্ট উইক - জুলাই ব্যর্থ অভ্যুত্থান

২৪শে জুলাই ২০২৪
১৮ই জুলাই ২০২৪, ঢাকা। পুড়ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং এর পঞ্চাশেরও বেশি গাড়ি। গণ আন্দোলন বা গণ অভ্যুত্থান রাষ্ট্রে পরিবর্তন আনার মেথড হতে পারে না। কারণ এই মেথডে এগুতে গেলে রাষ্ট্রের ক্ষতি হবার সম্ভাবনা থাকে। একদিকে যেমন রাষ্ট্র ধ্বংস করে রাষ্ট্রকে পরিবর্তন করার চেষ্টাটা নিতান্তই শিশুসুলভ; অন্যদিকে রাষ্ট্র ধ্বংস করার দিকে এগুলে রাষ্ট্র বাধা দেবে এটাই স্বাভাবিক।


মঙ্গলবার (১৬ই জুলাই) থেকেই যখন পরিষ্কার হচ্ছিলো যে ছাত্রদের আন্দোলন ধীরে ধীরে ছাত্রদের হাত থেকে অন্য কারো হাতে চলে যাচ্ছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন এসেছিলো যে, সরকারের ইন্টেলিজেন্স কি এই ব্যাপারগুলি সম্পর্কে অবহিত কিনা। তবে কি সরকার জেনেও না জানার ভান করছে? ঘটনার শেষে অনেক প্রশ্ন যেমন সামনে আসে, তেমনি অনেক উত্তরও পাওয়া যায়; যা দু'দিন আগেও পরিষ্কার ছিল না।

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর একদিন আগেই শেষ হয়ে যাওয়াটা অনেকের চোখেই ছিল দৃষ্টিকটু। কেউ কেউ বলতে থাকে যে, দেশের পরিস্থিতি ভালো নেই বলেই তিনি দ্রুত ফিরে এসেছেন। তবে দেশের পরিস্থতি কেন চীন সফর ছোট করে ফেলার মতো খারাপ হবে, সেই ব্যাখ্যা কেউ তখনও দেবার চেষ্টা করেননি। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা পুরণ হয়নি বলে অনেকেই তর্ক জুড়েছেন। বিশেষ করে মাত্র ১,৬০০ কোটি টাকা সমমূল্যের ইউয়ানের আর্থিক সহায়তা অনেককেই হাসিয়েছে। ২০শে জুলাই পর্যন্ত সন্দেহ হতে পারে যে, প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সাথে কোটা আন্দোলনের কোন সম্পর্ক থাকলেও থাকতে পারে। তাহলে চীনের সাথে দহরম মহরম কি যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত পছন্দ করেনি? নাকি অন্য কিছু? তবে ২১শে জুলাই নাগাদ এটা মনে হতেই পারে যে, চীন সফরের সাথে এই আন্দোলনের অনেক বড় যোগসূত্র ছিল। চীনারাও হয়তো বুঝতে পারছিলো যে, ঢাকায় কিছু একটা ঘটতে চলেছে। তাই বেইজিংও ধরি মাছ না ছুই পানি নীতিতে এগিয়েছিল। হয়তো তারাও বুঝতে চাইছিলো যে, ঢাকায় আসন্ন ঘটনার ফলাফল আসলে কি ঘটতে যাচ্ছে। তারাও হয়তো অপেক্ষা করছিলো রাজনৈতিক খেলার ফলাফল নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত। একারণেই তাদের সহায়তার ঝুলিটা ছিল অনেকটাই 'ওপেন-এনডেড'’; অর্থাৎ এই মুহুর্তে খুব কমই প্রতিশ্রুতি দেয়া হচ্ছে; তবে ভবিষ্যতে এটা অনেক বড় হতে পারে।

পরিকল্পিত অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা
যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের টোল প্লাজা পুড়ছে। ফ্লাইওভার এবং এক্সপ্রেসওয়ের টোল প্লাজাগুলিতে আগুন দেয়া হয়েছিল, কারণ অভ্যুত্থানকারীরা মনে করেছিলো যে, এগুলির র‍্যাম্পগুলি ব্যবহার করে পুলিশ তাদের বনানী-মহাখালী এবং যাত্রাবাড়ীর মূল অবস্থানগুলির পিছনে মোতায়েন হতে পারে। এগুলি বলে দেয় যে, এই পরিকল্পনা কতটা ডিটেলসে তৈরি করা হয়েছিল। এটা সাধারণ কারুর পরিকল্পনা নয়; এখানে নিঃসন্দেহে প্রফেশনাল লোকেরা জড়িত ছিল।

এটা ছিল একটা 'প্রি-প্ল্যানড ক্যু' বা পূর্বপরিকল্পিত অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা। অনেকদিন আগেই এর নীল নকশা আঁকা হয়েছিল। তবে খুব সম্ভবতঃ করোনার পরেই এর ডিটেলসগুলি তৈরি করা হয়। এই পরিকল্পনার কেন্দ্রে ছিল কিছু চিন্তা - ১) সেনাবাহিনী এখন আওয়ামী লীগ; তাই তাদেরকে নিজেদের পক্ষে আনা সম্ভব নয়; তবে ভয় দেখিয়ে তাদেরকে নিরপেক্ষ রাখার চেষ্টা করা সম্ভব; ২) পুলিশ, বিজিবি, আনসার এখন আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন; যদি এদের মাঝে কোন প্রকারের ভয় ঢুকিয়ে দেয়া যায়, তাহলে তারা পিছু হটবে; ৩) যদি সেনাবাহিনীকে নিরপেক্ষ রাখা যায় এবং পুলিশ পিছু হটে, তাহলে সাধারণ জনগণকে একত্রিত করে গণভবনমুখী মার্চের মাধ্যমে সরকারের পতন সম্ভব।

এই কেন্দ্রীয় চিন্তাগুলিকে নিয়েই পরিকল্পনার ডিটেলসগুলি আঁকা হয়েছিলো। গত কয়েক বছরে বিরোধী দলকে দমাতে ঢাকাতে ঢোকার পথগুলি ক্ষমতাসীন দল বিভিন্ন সময়ে আটকে দিয়েছিল; যেকারণে বিরোধী দলের কয়েকটা আন্দোলন ভেস্তে গিয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বিরোধী দল শিক্ষা নিয়েছে। প্রথমতঃ তারা ঠিক করেছিল যে, যেভাবেই হোক, ঢাকায় ঢোকার অন্ততঃ একটা পথ খোলা রাখতেই হবে। এক্ষেত্রে তারা নির্বাচিত করেছিল যাত্রাবাড়ীকে। গাবতলী প্রথমেই বাদ পড়ে যায়; কারণ ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে উঠতে হলে প্রথমে আরিচা এবং পাটুরিয়া ফেরি পার হতে হবে। ফেরির কারণে এই রুট বাস্তবসম্মত নয়। অপরদিকে পশ্চিমের রুট গিয়েছে যমুনা সেতুর উপর দিয়ে; যেখানে সেনাবাহিনীর ক্যানটনমেন্ট রয়েছে। সেনাবাহিনীর সাথে যেহেতু কোন সংঘর্ষে যাওয়া যাবে না, তাই যমুনা সেতু পার হবার চিন্তা রাখা যাবে না। পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একই – ক্যানটনমেন্ট। উত্তর দিক গাজীপুর হয়ে ঢাকায় ঢোকা যায়; তবে খুব সম্ভবতঃ সেক্ষেত্রে বিক্ষোভকারীদের জন্যে কিছু লজিস্টিক্যাল চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কাজেই একমাত্র বাস্তবসম্মত রুট হলো যাত্রাবাড়ী; কারণ এই রুটে কোন সেতুর উপর কোন ক্যানটনমেন্ট নেই এবং লজিস্টিক্যাল সুবিধা রয়েছে যথেষ্ট। যদি যাত্রাবাড়ী ধরে রাখা যায়, তাহলে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট থেকে বহু মানুষকে ঢাকায় নিয়ে আসা সম্ভব। আর বগুড়া, রংপুর, রাজশাহী, খুলনা, বরিশালসহ বিভিন্ন স্থানে গোলযোগ সৃষ্টি করলে সেখানকার নিরাপত্তা বাহিনী সেখানে অবস্থান করতে বাধ্য হবে; তাদেরকে বিক্ষোভ দমনে ঢাকায় নিয়ে আসা যাবে না।

দ্বিতীয়তঃ তারা ঢাকার কয়েকটা স্থান নির্ধারণ করেছিল; যেখান থেকে গণভবন খুব বেশি দূরে নয়। এই স্থানগুলিকে যদি নিয়ন্ত্রণে নেয়া যায়, এবং এসব স্থান থেকে যদি নিরাপত্তা বাহিনীকে পিছু হটানো যায়, তাহলে লাখো মানুষ বিক্ষোভকারীদের সাথে যোগ দেবে। এর মূল পুঁজি হবে একটাই – সরকারের জনপ্রিয়তার ঘাটতি।

তৃতীয়তঃ যদি সরকারি টেলিভিশন বিটিভির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়া যায়, তাহলে একদিকে যেমন দেশের বেশিরভাগ মানুষকে প্রভাবিত করা সম্ভব; তেমনি সামরিক বাহিনীকে বার্তা দেয়া যায় যে, তোমরা ব্যারাকের বাইরে বের হয়ো না; অথবা বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে যেয়ো না। একইসাথে পুলিশ বাহিনীকে প্রভাবিত করে তাদের মনোবল ভেঙ্গে দেয়া সম্ভব।

চতুর্থতঃ যদি মূল ইন্টারনেট সেবা দীর্ঘ সময়ের জন্যে বন্ধ করে দেয়া যায়, তাহলে সরকারি দফতরগুলির মাঝে নিরাপদ যোগাযোগ ব্যাহত হবে এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলির উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে যাবে। একইসাথে বিরোধী দল এটা নিশ্চিত ছিল যে, তারা বিক্ষোভ করলে সরকার কোন একটা সময় থ্রি-জি, ফোর-জি এবং ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেবে। কাজেই যদি বিরোধী দল ইন্টারনেটের উপর নির্ভরশীল থাকে, তাহলে তাদের যোগাযোগ পুরোপুরিভাবে ভেঙ্গে পড়বে। একারণে তারা সম্ভবতঃ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, তারা টু-জি সেবার (কল এবং এসএমএস) উপরেই থাকবেন। ইন্টারনেট যোগাযোগ ব্যাহত হলে সরকার নিজেই টু-জি সেবার উপর নির্ভরশীল থাকবে; কাজেই তখন সরকার নিজের স্বার্থেই টু-জি সেবা চালু রাখতে বাধ্য হবে। তবে টু-জি সেবা তো সরকারি মনিটরিংএর মাঝে রয়েছে; এব্যাপারে কি করা যায়? সেটারও সমাধান রয়েছে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা পিবিআইএর স্থাপনাগুলিকে অকার্যকর করে দিতে পারলেই সরকারের টু-জি মনিটরিং সার্ভিস ধ্বসে পড়বে।

রাষ্ট্রীয় ইন্টেলিজেন্সের কাছে কতটুকু ডিটেলস পৌঁছেছিল সেটা বলা মুশকিল। তারা সম্ভবতঃ প্রথম দুই অংশ সম্পর্কে অনেক আগ থেকেই ওয়াকিবহাল ছিল; যদিও তারা হয়তো স্থানগুলি সম্পর্কে অবহিত ছিল না। তারপরেও এটা বলা যায় যে, এটা ইন্টেলিজেন্সের সাফল্য, যে তারা সময়মতো রাষ্ট্রকে সাবধান করতে পেরেছে। তবে তারা যে পরিকল্পনার তৃতীয় এবং চতুর্থ অংশ সম্পর্কে জানতো না, এটা পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে নিশ্চিত হওয়া যায়। এটা ইন্টেলিজেন্সের একটা বড় ব্যর্থতা। সাম্প্রতিক সময়ে ইন্টেলিজেন্স, পুলিশ, র‍্যাব সকলেই কমিউনিকেশন মনিটরিংএর জন্যে বহু প্রযুক্তি পেয়েছে। এই প্রযুক্তিগুলি তাদেরকে বহু তথ্য দিয়েছে; যার মাধ্যমে তাদের পক্ষে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা কিছুটা হলেও সহজতর হয়েছে।

নিরাপত্তা বাহিনী কতটুকু জানতো?
বাড্ডায় কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির ভবনের উপর থেকে কোণঠাসা হওয়া পুলিশ সদস্যদেরকে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে তুলে নেয়া হচ্ছে। হয়তো ইন্টেলিজেন্সের কাছে তথ্য ছিল যে, বিক্ষোভকারীরা পুলিশের লাশ চাইছে অথবা জীবন্ত পুলিশ সদস্যকে ধরে এনে মিডিয়ার সামনে কথা বলাতে চাইছে তাদের সহকর্মীদেরকে বিক্ষোভে বাধা দেয়া থেকে নিবৃত করতে। সহিংসতার ব্যাপারে ইন্টেলিজেন্স আগেভাগেই সতর্ক করতে পেরেছিলো। কিন্তু কিছু ব্যাপারে তারা একেবারেই অজ্ঞ ছিল বলে প্রতীয়মান হয়েছে। 


ইন্টেলিজেন্সের সাবধানবাণীর উপর ভিত্তি করেই গত কয়েক বছর ধরেই সরকার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। পুলিশ, বিজিবি এবং আনসারের জন্যে বিপুল সংখ্যক অস্ত্র এবং গোলাবারুদ ক্রয় করেছে সরকার; যেগুলি মূলতঃ 'ক্রাউড কনট্রোল'এ ব্যবহৃত হয়।

গত তিন বছরে 'ক্রাউড কনট্রোল' কাজে পুলিশের জন্যে কেনা হয়েছে রীতিমতো একটা অস্ত্রাগার! আশ্চর্য্যজনক এই হিসেব থেকে দেখা যায় যে, ২০২১ থেকে ২০২৩এর মাঝে পুলিশ অস্ত্র এবং গোলাবারুদের পাহাড় গড়েছে! এই তিন বছরে পুলিশ কমপক্ষে ১০,০০০ শটগান (১২-বোর), ৭,০০০ সিঙ্গেল-শট টিয়ারশেল লঞ্চার (৩৮মিঃমিঃ), ১১০টা ভেহিকল-মাউন্টেড মাল্টিব্যারেল টিয়ারশেল লঞ্চার, ১০টা ড্রোন, ১৩,০০০ এন্টি-রায়ট হেলমেট, ৩৫,০০০ বুলেটপ্রুফ ভেস্ট, ১০,০০০ রায়ট শিল্ড, ৬৮,২০,০০০ শটগান কার্তুজ (রাবার এবং লেড), ২০,০০০ সফট কাইনেটিক প্রজেক্টাইল (৩৮মিঃমিঃ), ৬,৪৮,০০০ দূরপাল্লার টিয়ারশেল (৩৮মিঃমিঃ), ৪০,০০০ স্বল্পপাল্লার টিয়ারশেল, ২,৩২,০০০ থ্রি-মিউনিশন টিয়ারশেল, ১৬,৬০০ স্টান গ্রেনেড, ৭৪,০০০ সাউন্ড গ্রেনেড, ১৪,০০০ ফ্ল্যাশ-ব্যাং গ্রেনেড, ১৫,০০০ মাল্টি-ইমপ্যাক্ট টিয়ারগ্যাস গ্রেনেড, ৪০,০০০ টিয়ারগ্যাস হ্যান্ড গ্রেনেড। তবে এই অস্ত্রগুলি কেনা হয়েছে পুরো বাংলাদেশের পুলিশের জন্যে। ঢাকার নিরাপত্তার জন্যে রাষ্ট্রকে নির্ভর করতে হবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উপর। ডিএমপি চাপের মাঝে পড়লে রিজার্ভ ডাকতে বাধ্য হবে। শটগান, টিয়ারশেল এবং স্টান-সাউন্ড গ্রেনেডের বাইরে ডিএমপির ক্রাউড কনট্রোল অস্ত্রগুলির মাঝে গুরুত্বপূর্ণ একটা হলো এপিসি। গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলিকে বিক্ষোভকারীদের দখলমুক্ত করতে এই এপিসিগুলির ছত্রছায়ায় পুলিশ অগ্রগামী হতে পারে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন আন্দলনের সময় এই এপিসির ব্যাপক ব্যবহার দেখা গেছে। ২০২৩এর জুলাই মাসেই বিরোধী দলের সাথে যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের সংঘর্ষ হয়; যেখানে অনেকগুলি এপিসি মোতায়েন হয়েছিল। ২০২৪ সালেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।

ঢাকায় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা দেয়ার জন্যে ১টা মহিলা ব্যাটালিয়ন (১১তম) সহ ঢাকার উত্তরায় রয়েছে মোট ৬টা আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন বা এপিবিএন (১ম, ৫ম, ৮ম, ১২তম, ১৩তম)। এপিবিএনএর মোট ১৭টা ব্যাটালিয়নের মাঝে এই ৬টা রয়েছে উত্তরায় এবং গণভবন ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নিরাপত্তায় আরও দুইটা স্পেশাল প্রোটেকশন ব্যাটালিয়ন বা এসপিবিএন (১ম ও ২য়) রয়েছে মোহাম্মদপুরে। বাকি ৯টা ব্যাটালিয়ন রয়েছে ঢাকার বাইরে। এপিবিএন সংসদ ভবন, সুপ্রীম কোর্ট, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল, ডিপ্লোম্যাটিক জোন, সচিবালয়, বিমান বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা দেয়। এই ইউনিটগুলি খুবই ভালো ট্রেনিংপ্রাপ্ত। তবে এরা প্রায় সকলেই বিভিন্ন স্থাপনার নিরাপত্তায় নিয়োজিত। রাস্তায় নিরাপত্তা দিতে এদের বেশিরভাগকেই পাওয়া যাবে না। অর্থাৎ ঢাকায় সহিংসতা প্রতিরোধে এরা মূল রিজার্ভের ভূমিকায় থাকতে পারবে না। এক্ষেত্রে ঢাকার বাইরের ইউনিটগুলি রিজার্ভের ভূমিকা নিতে পারে। একারণেই ঢাকার বাইরের ইউনিটগুলির সাথে নিরপদ কমিউনিকেশন বিঘ্ন করাটা বিক্ষোভকারীদের জন্যে ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ।

ডিএমপির জন্যে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ রিজার্ভের ভূমিকা নিয়েছে বিজিবি। বিজিবি যাতে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় ঢাকার রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে কাজ করতে পারে, সেজন্য বিজিবিকে আলাদাভাকে কিছু অস্ত্র দেয়া হয়েছে; যেগুলি সীমান্ত প্রতিরক্ষার জন্যে প্রয়োজনীয় নয়। এর মাঝে রয়েছে ২০২০ সালে ইউক্রেন থেকে আনা ১২টা স্পারটান এপিসি এবং তুরস্ক থেকে আনা ১০টা রায়ট কন্ট্রোল ভেহিকল। এগুলির সবগুলি হয়তো ঢাকায় রাখা হয়নি। এগুলিকে ২০২১ সালে নারায়নগঞ্জে হেফাজতে ইসলামের আন্দোলনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে; এবং এবারের ২০২৪এর ব্যার্থ অভ্যুত্থানেও ব্যবহার করা হয়েছে। তবে বিজিবির ঢাকা রক্ষায় সবচাইতে বড় প্রদক্ষেপ ছিল ঢাকার দুই প্রবেশ পথে গাজীপুর এবং নারায়নগঞ্জে দুইটা ব্যাটালিয়ন। এর ফলে ২০২২ সাল নাগাদ বিজিবির ঢাকা সেক্টর শক্তিশালী হয়ে দাঁড়ায় ৪টা ব্যাটালিয়নে – ঢাকায় ৫ম এবং ২৬তম ব্যাটালিয়ন, নারায়নগঞ্জে ৬২তম ব্যাটালিয়ন এবং গাজীপুরে ৬৩তম ব্যাটালিয়ন। নারায়নগঞ্জ এবং গাজীপুরের ইউনিটগুলি হলো বিজিবির ৬৩টা ব্যাটালিয়নের সর্বশেষ সংযোজিত ব্যাটালিয়ন। এই ব্যাটালিয়নগুলি ২০২৪ সালে ঢাকাকে রক্ষায় অনেক বড় ভূমিকা রেখেছে।

ডিএমপির আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ রিজার্ভ হলো আনসার। আনসারের মোট ৬১ লক্ষ সদস্যের মাঝে মূল স্ট্রাইকিং ফোর্স হলো ব্যাটালিয়ন আনসার। ২০২৪এর ফেব্রুয়ারি নাগাদ আনসারের নিয়মিত ব্যাটালিয়ন ছিল ৪২টা (যার মাঝে ২টা মহিলা ব্যাটালিয়ন)। এই ৪২টা ব্যাটালিয়নের মাঝে ১৮টাই রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামে। গত নির্বাচনে মোতায়েন করা মোট ৫ লক্ষ ১৭ হাজার আনসারের মাঝে এই ৪২টা ব্যাটালিয়নের সাড়ে ৮ হাজার সদস্য স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিল। তবে এদের সকলে কিন্তু ঢাকায় মোতায়েন নেই। এছাড়াও আনসারের ৭০ হাজার সদস্য বিভিন্ন স্থাপনার নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছে; যাদেরকে অবশ্য রাস্তায় ক্রাউড কনট্রোলের জন্যে পাওয়া যাবে না। তবে ক্রাউড কনট্রোলের জন্যে স্পেশালিস্ট না হলেও আনসার গার্ড ব্যাটালিয়নের স্পেশাল ফোর্সের সদস্যরা ঢাকার সহিংসতা মোকাবিলায় পুলিশের সাথে মোতায়েন ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে আনসারকে আরও বেশি ক্রাউড কনট্রোল ভূমিকা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সেই হিসেবে ২০১৮ সালে ১০৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ইতালি, তুরস্ক এবং ব্রিটেন থেকে আনসার সদস্যদের জন্যে ৩০ হাজার শটগান এবং প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩০ লক্ষ শটগান কার্তুজ কেনার সিদ্ধান্ত হয়। এর মাধ্যমে আনসার বাহিনী পুলিশের সহযোগী হিসেবে কাজ করে পুলিশের শক্তিকে বৃদ্ধি করেছে। যদিও এটা নিশ্চিত নয় যে, চলমান ঘটনাতে কতজন আনসার সদস্যকে ঢাকায় মোতায়েন করা সম্ভব হয়েছিল, তথাপি বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এবারের অভ্যুত্থান প্রচেষ্টায় পুলিশের শক্তি বৃদ্ধিতে আনসারের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

তবে পুলিশ, বিজিবি এবং আনসার মিলেও ঢাকার সকল গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা যে রক্ষা করা সম্ভব নয়, তা এবারে প্রমাণিত হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীকে শেষ পর্যন্ত সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ রিজার্ভের দিকেই তাকাতে হয়েছে - সেনাবাহিনী।

আন্দোলন থেকে সহিংতা
মিরপুর-১০। মেট্রেরোল চলছে আগুনের উপর দিয়ে। মিরপুর-১০ ছিল অভ্যুত্থানকারীদের গুরুত্বপূর্ণ টার্গেটের একটা। এখান থেকে রোকেয়া সরনী পার হলেই গণভবন। মেট্রোরেলের ফার্মগেট, মিরপুর-১০ এবং কাজিপাড়া স্টেশনে হামলা করে ভাংচুর করা হয়। এই ভাংচুরের কারণ বোঝা না গেলেও এটা ধারণা করা যেতে পারে যে, হয়তো বিক্ষোভকারীরা মনে করেছিল যে, মেট্রোরেল ব্যবহার করে নিরাপত্তা বাহিনী সোয়াট, সিআরটি বা র‍্যাবের স্পেশাল ফোর্সের মতো বাহিনীকে ঝটিকা মোতায়েন করতে পারে। 


প্রধানমন্ত্রী চীন সফরের উপর সংবাদ সন্মেলনে ছাত্রদের আন্দোলনের ব্যাপারে কটাক্ষ করে মন্তব্য করেন। তখন মনে হচ্ছিলো যে, হয় তিনি মারাত্মক ভুল করেছেন; অথবা তিনি জানেন ঠিক কি তিনি বলতে চাচ্ছেন। ঘটনার শেষে বোঝা যাচ্ছে যে, তার এই মন্তব্যের সাথে দুই ব্যাপারই সম্পর্কিত। কারণ তিনি চীন সফরের সময়েই জেনে গেছেন যে, অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ট্রিগার করা হয়ে গেছে। অর্থাৎ সংবাদ সন্মেলনের সময় তিনি তখন জানতেন যে, ছাত্রদের আন্দোলন হাইজ্যাক করার পরিকল্পনা করা হয়ে গিয়েছে। হয়তো তিনি তার আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। প্রধানমন্ত্রীর কথাগুলি ছাত্রদের আন্দোলনকে ব্যাপকভাবে বেগবান করেছিল। তবে পরবর্তীতে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে তিনি যথেষ্ট নমনীয়ভাবে তার বক্তব্য পেশ করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে যা বলেছিলেন, সেটা আন্দোলনকারীদের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, আন্দোলনের পিছনে যারা ছিলো, তাদের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের বিবৃতি। আন্দলোনকারীদের পক্ষে মার্কিন বিবৃতি আপারেশন চালিয়ে নেবার একটা গ্রীন লাইট বলা যেতে পারে।

১৬ই জুলাই মঙ্গলবার দেশজুড়ে বিক্ষোভ দেখা দিলো এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন পুরোপুরিভাবে ব্যাহত হলো। সায়েন্স ল্যাবরেটরি রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। মহাখালী মোড়ও মানুষ পার হয়েছে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। এই দিনই বোঝা যাওয়া শুরু হলো যে, পেছনে কেউ রয়েছে এবং তাদের কোন একটা উদ্দেশ্য রয়েছে - যেটা তখনও পরিষ্কার নয়। তখনও ফোর-জি মোবাইল ফোন সার্ভিস এবং ইন্টারনেট চালু ছিল। তবে মোবাইল ফোনে ফেইসবুক ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রিত করা হয়েছিলো।

১৭ই জুলাই বুধবার ছিলো আশুরার ছুটি। এই দিনে অনেকেই বাসার বাইরে বেরিয়েছিল; অনেক সামাজিক অনুষ্ঠানও ছিল এই দিনে। শুধুমাত্র সরকারের ইন্টেলিজেন্সেরই জানার কথা যে পরের দিন কি হতে পারে। তবে সেদিনও পরিষ্কার হয়নি যে, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের পেছনে যারা রয়েছে, তারা আসলে কি চায়। পরের দিন 'কমপ্লিট শাটডাউন' নামের একটা কর্মসূচীর ডাক এলো। তবে এর অর্থ কি হতে পারে, তা তখনও পরিষ্কার নয়। পূর্বে ক্ষমতাসীন দলের আনঅফিশিয়াল হরতালও দেখেছে বাংলাদেশের মানুষ; আবার বিএনপির 'ঈদের পরের আন্দলন'ও দেখেছে তারা। তখনও পর্যন্ত ফোর-জি সার্ভিস এবং ইন্টারনেট সার্ভিস চালু ছিল। তবে টেলিনরের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয় যে, সরকারের নির্দেশে ১৭ই জুলাই থ্রি-জি এবং ফোর-জি সেবা বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল; শুধুমাত্র টু-জি সেবা চালু ছিল।

অকল্পনীয় ঘটনা - বৃহঃস্পতিবার
সেতু ভবনের সাথে কয়লা হয়ে যাওয়া গাড়ির বহর। ভবনে কয়েক'শ ব্যক্তি হামলা করে ব্যাপক ভাংচুর করে এবং ৫৫টা গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। রাস্তায় রোডব্লকের কারণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আসতে পারেনি। একারণে গাড়িগুলি নিঃশেষ হওয়া পর্যন্ত জ্বলেছিলো। পরিকল্পনাকারীরা আক্রমণে অংশ নেয়া জনতাকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলো যে, এই সাহেবদের সুন্দর অফিস এবং দামী দামী গাড়িগুলিই তাদের নিজেরদের স্থবির জীবনের কারণ। এর ফলে জনগণ তাদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে এই ভবনের উপর ঢেলে দেয়। 


১৮ই জুলাই বৃহঃস্পতিবার যা ঘটলো, তা সাধারণ জনগণের কল্পনার বাইরে ছিল। মিডিয়ার রিপোর্টে ২০ থেকে ২২ জন মানুষের নিহত হবার খবর এলো। হতাহত যতজনই হোক না কেন, এই দিনটা যে ভয়াবহ ছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই দেশের জনগণ বহুকাল এইরূপ সহিংতা দেখেনি। এবং এই দিনই প্রথম পরিষ্কার হলো যে, আন্দোলন এখন ছাত্রদের হাতে নেই। তবে তখনও পরিষ্কার ছিল না যে, যারা সহিংসতা করছিলো, তাদের উদ্দেশ্য কি ছিল। দিনের শুরুটা হয়েছিলো যাত্রাবাড়িতে ঢাকা শহরের প্রবেশপথে। এখানকার সহিংসতা ছিল সবচাইতে ভয়ংকর। পরবর্তীতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, বিক্ষোভকারীদের অন্যতম টার্গেট ছিল যাত্রাবাড়ীর নিয়ন্ত্রণ নেয়া; যাতে করে এই গেইটওয়ে ব্যবহার করে ঢাকার বাইরে থেকে আরও জনগণকে ঢাকায় নিয়ে আসা সম্ভব হয়। এছাড়াও ভৈরবে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক কেটে ফেলা হয়; এবং ঢাকার অন্যান্য প্রবেশপথের উপর পুলিশ এবং বিক্ষোভকারীদের মাঝে সংঘর্ষ শুরু হয়। তবে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা এবং মোড়গুলির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলে মূল সহিংসতা।

রামপুরায় সরকারি টেলিভিশন চ্যানেল বিটিভি ভবনে কয়েক'শ মানুষ হামলা করে বসে। তারা ভবনের ভেতর ভাংচুর করে এবং আগুন দেয়। একইসাথে তারা প্রায় ১৬টার মতো গাড়ি ভাংচুর করে এবং আগুনে পোড়ায়। এর আগে ভবনের সামনে পুরো রাস্তার নিয়ন্ত্রণ নেয় বিক্ষোভকারীরা। তারা রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টি করে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি যেতে বাধা দেয়। এর ফলে বিটিভি ভবন এবং এর গাড়িগুলি নিঃশেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত জ্বলেছিলো। তবে যে ব্যাপারটা খেয়াল করার মতো তা হলো, হামলাকারীরা বিটিভি ভবনের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার চেষ্টা করেছিলো কিনা, সেব্যাপারে কোন খবর প্রচারিত হয়নি। বিটিভির সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায় সন্ধ্যার দিকে। বিকেলের দিকে এই হামলা হলেও রাত সাড়ে ৮টার আগে বিজিবি এই ভবনের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি। তখন প্রচার করা হয় যে, বিজিবি এই ভবন থেকে আক্রমণকারীদের বের করে দিয়ে নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল। যদি তা-ই হয়, তাহলে বুঝে নিতে হবে যে, বিজিবি পৌঁছার আগ পর্যন্ত বিটিভি ভবনের নিয়ন্ত্রণ ছিল হামলাকারীদের হাতে। ২২শে জুলাই বিটিভির মহাপরিচালক একাত্তর টিভিকে বলেন যে, দুপুর ১২টা থেকেই বিক্ষোভকারীরা ভবনের ভেতরের লোকদের বেরিয়ে আসার নির্দেশ দিতে থাকে; যদিও তারা বের হননি। তার লোকেরা 'হিউম্যান শিল্ড' তৈরি করে ভবনের সম্প্রচার কক্ষগুলিকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছিলেন। তারা কলাপসিবল গেট আটকে দেন, সন্ধ্যা নাগাদ সকল পাওয়ার সিস্টেম শাটডাউন করে দেন এবং টেলিফোনে বিভিন্ন এজেন্সির সহায়তা কামনা করেন। পরে রাত ৮টার দিকে তারা ভবন ত্যাগ করেন। তবে তিনি ভবনের নিরাপত্তায় কোন বাহিনীর কেউ ছিল কিনা, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যান। সাংবাদিকদের মাঝে কেউ প্রশ্ন করেছেন যে, এরকম মুহুর্তে বিটিভি ভবনে কেন কমান্ডো টিম পাঠানো হয়নি? সরকার কি 'কেপিআই-১' ক্যাটাগরির এই স্থাপনার নিরাপত্তাকে তুচ্ছজ্ঞান করেছিল? যদি রাত ৮টার দিকে বিটিভির কর্মকর্তারা ভবন ছেড়ে দেন, তাহলে বিজিবি কি রাত সাড়ে ৮টায় খালি ভবনের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে? যে ব্যাপারটা পরিষ্কার তা হলো, বিটিভি ভবন যে বিক্ষোভকারীদের একটা টার্গেট ছিল, সেটা ইন্টেলিজেন্স এবং নিরাপত্তা বাহিনী একেবারেই জানতো না।

সহিংসতার একটা কেন্দ্র ছিল মহাখালী-বনানী। বনানীর সেতু ভবনে কয়েক'শ ব্যক্তি হামলা করে ব্যাপক ভাংচুর করে এবং ৫৫টা গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। রাস্তায় রোডব্লকের কারণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আসতে পারেনি। একারণে গাড়িগুলি নিঃশেষ হওয়া পর্যন্ত জ্বলেছিলো। এখানে যে ব্যাপারটা পরিষ্কার তা হলো, পরিকল্পনাকারীরা আক্রমণে অংশ নেয়া জনতাকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলো যে, এই সাহেবদের সুন্দর অফিস এবং দামী দামী গাড়িগুলিই তাদের নিজেরদের স্থবির জীবনের কারণ। এর ফলে জনগণ তাদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে এই ভবনের উপর ঢেলে দেয়। প্রায় চার তলা পর্যন্ত ভবনের কাঁচের জানালা ঢিল মেরে ভাঙ্গা হয়েছে। তবে এই ভবনে হামলার উদ্দেশ্য পরিষ্কার নয়।

বিক্ষোভকারীদের আরেকটা কেন্দ্র ছিল মিরপুর-১০। এখান থেকে রোকেয়া সরনী পার হলেই গণভবন। মেট্রোরেলের ফার্মগেট, মিরপুর-১০ এবং কাজিপাড়া স্টেশনে হামলা করে ভাংচুর করা হয়। এই ভাংচুরের কারণ বোঝা না গেলেও এটা ধারণা করা যেতে পারে যে, হয়তো বিক্ষোভকারীরা মনে করেছিল যে, মেট্রোরেল ব্যবহার করে নিরাপত্তা বাহিনী সোয়াট, সিআরটি বা র‍্যাবের স্পেশাল ফোর্সের মতো বাহিনীকে ঝটিকা মোতায়েন করতে পারে। মিরপুর ইনডোর স্টেডিয়ামেও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়।

সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় ছিল যুদ্ধক্ষেত্র। রাস্তার মাঝের লোহার ডিভাইডারের সবগুলি স্কায়ার পাইপ কেটে ফেলা হয়েছিলো; গাছগুলিও কেটে ফেলা হয়েছিলো। তবে লোহার ডিভাইডার কিভাবে কাটা সম্ভব হলো, সেটা সত্যিই চিন্তার উদ্রেক করে। হ্যাক-স' ব্লেড দিয়ে এগুলি কাটা সম্ভব হলেও যে সময় এতে খরচ হবে, তার মাঝে পুলিশের ধাওয়া খেতেই হবে। খুব সম্ভবতঃ গ্যাস কাটার দিয়ে এগুলি কাটা হয়েছিলো। রাস্তার মাঝে ধারালো জিনিস দিয়ে খোঁড়ার চেষ্টাও করা হয়েছিলো; যেকারণে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবার পর এই স্থান দিয়ে যানবাহন চলাচল ছিল কষ্টকর। এছাড়াও বিভিন্ন স্থানে পুলিশ, বিজিবি এবং আনসার বাহিনী বেশ কোণঠাসা অবস্থানে চলে যায়। এক পর্যায়ে বাড্ডায় কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির ভবনের উপর থেকে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ঘিরে ফেলা ৬০ জনের বেশি পুলিশ সদস্যকে উদ্ধার করা হয়। হয়তো ইন্টেলিজেন্সের কাছে তথ্য ছিল যে, বিক্ষোভকারীরা পুলিশের লাশ চাইছে অথবা জীবন্ত পুলিশ সদস্যকে ধরে এনে মিডিয়ার সামনে কথা বলাতে চাইছে তাদের সহকর্মীদেরকে বিক্ষোভে বাধা দেয়া থেকে নিবৃত করতে।

দিনটা ছিল খুবই দীর্ঘ – প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত চলে সহিংসতা। মোহাম্মদপুর বাস স্ট্যান্ড মোড়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সন্ধ্যা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত চলে সহিংসতা। এখান থেকে আসাদ গেট পার হলেই গণভবন। পুলিশ এবং বিক্ষোভকারী - দুই গ্রুপই প্রচন্ড রকমের পরিশ্রান্ত থাকার কথা। দিনের শেষে যে ব্যাপারটা পরিষ্কার ছিল তা হলো, পুলিশের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার মোড়গুলির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাটা খুবই কঠিন হয়ে গিয়েছে। আন্দোলনকারীরা হয়তো বিজয়ের গন্ধ পাচ্ছিলো - তারা হয়তো মনে করতে থাকে যে, আর একটু চাপ দিলেই সরকার মনে হয় ধ্বসে পড়বে! অনেকে মনে করতে থাকে যে, সরকারের পতন খুব সম্ভবতঃ অনিবার্য। তবে ছাত্র আন্দোলনের প্রথম থেকেই এটাই বিরোধী দলগুলির লক্ষ্য ছিলো কিনা, সেটা সাধারণ মানুষের জানা ছিলো না। এই দিনেও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা চালু ছিলো। তবে মোবাইলে ফোর-জি এবং থ্রি-জি সেবা বন্ধ করে দেয়া হয়; শুধুমাত্র টু-জি সেবা বা কল এবং এসএমএস করার সেবা চালু থাকে। ফেইসবুক তো আগে থেকেই বন্ধ ছিলো। কাজেই এই দিন থেকে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায় মোবাইলে কল। তবে বাড়িতে ফিক্সড ব্রডব্যান্ড চালু থাকায় অন্ততঃ বাড়িতে থেকে ব্রডব্যান্ড বা ওয়াই-ফাই-এর মাধ্যমে ইন্টারনেটে ঢোকা যাচ্ছিলো।

এত সহিংসতা মানুষ এর আগে দেখেনি
যাত্রাবাড়ীতে বিজিবি এবং তাদের রায়ট কন্ট্রোল ভেহিকল। বিজিবির ঢাকা রক্ষায় সবচাইতে বড় প্রদক্ষেপ ছিল ঢাকার দুই প্রবেশ পথে গাজীপুর এবং নারায়নগঞ্জে দুইটা ব্যাটালিয়ন। এর ফলে ২০২২ সাল নাগাদ বিজিবির ঢাকা সেক্টর শক্তিশালী হয়ে দাঁড়ায় ৪টা ব্যাটালিয়নে – ঢাকায় ৫ম এবং ২৬তম ব্যাটালিয়ন, নারায়নগঞ্জে ৬২তম ব্যাটালিয়ন এবং গাজীপুরে ৬৩তম ব্যাটালিয়ন। নারায়নগঞ্জ এবং গাজীপুরের ইউনিটগুলি হলো বিজিবির ৬৩টা ব্যাটালিয়নের সর্বশেষ সংযোজিত ব্যাটালিয়ন। এই ব্যাটালিয়নগুলি ২০২৪ সালে ঢাকাকে রক্ষায় অনেক বড় ভূমিকা রেখেছে।

১৯শে জুলাই শুক্রবার ছিল সবচাইতে ভয়াবহতম দিন। বেশিরভাগ মিডিয়াই হতাহতের সংখ্যা প্রচার করতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। তবে যারা সংখ্যা দিচ্ছিলো, তার মাঝে সর্বোচ্চ মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৪৯। পুলিশ এবং সরকারী দলের পান্ডাদের সাথে বিক্ষোভকারীদের মারাত্মক সংঘর্ষ হয় পুরো দেশজুড়ে। আগের দিনই বিরোধী দল বিএনপি ঘোষণা দিয়েছিল যে, তারা বিকেল ৩টায় ঢাকায় সমাবেশ করে সরকার পতনের ডাক দেবে। আওয়ামী লীগও পাল্টা সমাবেশের ডাক দেয়। স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই পুলিশ ঢাকায় সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। সকাল ৯টার আগেই ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশ জুড়ে শুরু হয় সহিংসতা। যাত্রাবাড়ী, মহাখালী-বনানী, রামপুরা, উত্তরা, মোহাম্মদপুর, মিরপুর-১০, ইত্যাদি সকল স্থান যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হতে থাকে। জুম'আর নামাজের মাঝেই চলতে থাকে সহিংসতা। আর নামাজের পর এই সহিংসতা অন্য এক রূপ নেয়। বিকেল নাগাদ পরিষ্কার হতে থাকে যে, পুরো বাংলাদেশে অরাজকতা রাজত্ব করছে।

বনানীর সেতু ভবনে দ্বিতীয় বারের মতো হামলা করে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এই ভবনটা কি কারণে দু'বার হামলা করা হয়েছে, তা পরিষ্কার নয়। পাশের বিআরটিএ ভবনেও হামলা করা হয়। মহাখালীতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ভবনে এবং ভবনের ৫২টা গাড়ি ও ১৬টা মোটরসাইকেলে গানপাউডার ব্যবহার করে অগ্নিসংযোগ করা হয়। তবে এর চাইতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ছিল পাশের খাজা টাওয়ারেও অগ্নিসংযোগ এবং ভাংচুর। খাজা টাওয়ারে আইজিডব্লিউ কোম্পানিগুলির সার্ভার থাকার কারণে রাত ৯টার দিকে সারাদেশে ইন্টারনেট সার্ভিস বন্ধ হয়ে যায়। সাধারণ মানুষের কাছে হয়তো অজানা যে, এই ভবনটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এর আগে আরও একবার এই ভবনে আগুন লেগেছিল; তখনই প্রথম জানা গিয়েছিল যে, এই ভবনে একসাথে সবগুলি আইজিডব্লিউ কোম্পানির সার্ভার এবং ডাটা সেন্টার; এবং এখানে আগুন লাগলে সারা দেশে ইন্টারনেট থাকে না! তবে সেই অগ্নিকান্ডের পরেও এই ভবনের নিরাপত্তার ব্যাপারে রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিদের টনক নড়েনি। হামলাকারীরা নিঃসন্দেহে এই ভবনের উপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছিল। আর এটাও এখন নিশ্চিত যে, ইন্টেলিজেন্সের কাছে এই ভবনে হামলার ব্যাপারে কোন তথ্যই ছিল না। একাত্তর টিভির সাংবাদিকই একমাত্র ভবনের ভেতরের দৃশ্যের খবর দিয়েছিলেন – ফাইবার অপটিক লাইনগুলিকে কেটে টুকরা টুকরা করা হয়েছিলো; যাতে করে এটা মেরামতে অনেক বেশি সময় লাগে। ২১শে জুলাই সরকারিভাবে বলা হয় যে, ৪০টা জায়গায় ফাইবার অপটিক ব্যাকবোন এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের কেবল কেটে ফেলা হয়েছে। এটা নিশ্চিত যে, এর ফলে সরকারি দপ্তরগুলির মাঝে কমিউনিকেশন হার্ডলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। অর্থাৎ সরকারের প্রধানতম সিকিউর কমিউনিকেশন লাইন সেদিন অকার্যকর হয়ে গিয়েছিল। এর ফলে সরকারের পক্ষে ঢাকার বাইরে থেকে রিজার্ভ ফোর্স ডাকা কঠিন হয়ে যাবার কথা। আর বলাই বাহুল্য যে, এর ফলে সরকারের অনেকেই টু-জি মোবাইল সার্ভিসের উপর নির্ভরশীল হয়ে যায়। এতে করে যে ব্যাপারটা নিশ্চিত তা হলো, সরকার কোন অবস্থাতেই টু-জি সেবা বন্ধ করতে সক্ষম হবে না।

বিভিন্ন স্থানে বিজিবির ২৫০ প্লাটুন সদস্য মোতায়েন করা হয়; যার মাঝে ৭৫ প্লাটুন মোতায়েন করা হয় শুধু ঢাকায়। বিজিবির কমপক্ষে ৫২ সদস্য আহত হবার খবর জানা যায়। নারায়নগঞ্জে বিজিবির ৬২তম ব্যাটালিয়নের ব্যারাকে হামলা হয়। যেহেতু নারায়নগঞ্জের এই ব্যাটালিয়ন বিজিবির ঢাকায় রিজার্ভ ফোর্স, তাই অবশ্যই এই হামলার উদ্দেশ্য ছিল বিজিবিকে নারায়নগঞ্জে আটকে রেখে মূল এলাকাগুলি থেকে দূরে রাখা। মেরুল-বাড্ডায় আনসার ক্যাম্পে হামলা করে টাকা ও খাদ্যদ্রব্য লুটপাট করে অগ্নিসংযোগ করা হয়। তবে এখানে কোন অস্ত্র ছিল না। নারায়নগঞ্জে শীতল পরিবহণের ডিপোতে হামলা করে ২৬টা গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না যে, এই অগ্নিসংযোগের উদ্দেশ্য কি ছিল।

নরসিংদীতে জেলা প্রশাসন ভবনে অগ্নিসংযোগ করা হয়। একইসাথে নরসিংদী কারাগারে কয়েক হাজার মানুষ হামলা করে বহু কয়েদীকে বের করে নিয়ে আসে এবং অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট করে। পরে জানা যায় যে, মোট ৮২৬ জন সাজাপ্রাপ্ত কয়েদী সেখান থেকে পালায় এবং ৮৫টা অস্ত্রসহ প্রায় ৭ হাজার রাউন্ড গুলিও লুট হয়। ধানমন্ডিতে বেপজা অফিসে ভাংচুর চালানো হয়। পরবর্তীতে এক রিপোর্টে বলা হয় যে, সেখান থেকে নিরাপত্তার জন্যে রাখা ৩০টা বুলেটপ্রুফ ভেস্টও চুরি হয়। এছাড়াও মহাখালীর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএস ভবনে হামলা করে ভবনে এবং সেখানকার ২৩টা গাড়িতে গানপাউডার ব্যবহার করে অগ্নিসংযোগ করা হয়। মিরপুরে বিআরটিএর টেস্ট সেন্টারে হামলা করে সকল যন্ত্র ভাংচুর করা হয় এবং লুটপাট করা হয়। মিরপুরে সিটি কর্পোরেশনের গাড়ির ডিপোতে হামলা করে ৪০টা ময়লার গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়।

বিভিন্ন জায়গায় রেল লাইন উপড়ে ফেলা এবং কয়েকটা ট্রেন ভাংচুর করার পর রেল সার্ভিস অনির্দিষ্টকালের জন্যে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণাগার বিসিএসআইআর ভবনে অগ্নিসংযোগ করা হয়। বনানী এবং মহাখালীর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের টোল প্লাজা আগুনে ভস্মীভূত করে ফেলা হয়। যাত্রাবাড়ীতে মেয়ন হানিফ ফ্লাইওভারের টোল প্লাজাও আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়। এই অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলির সময় ফায়ার সার্ভিস ছিল প্রায় পুরোপুরিভাবে নিষ্ক্রিয়। কারণ, ফায়ার সার্ভিসের ৪টা গাড়িতে অগ্নিসংযোগসহ ১৩টা গাড়ি ভাংচুর করা হয় এবং ১৮জন ফায়ার ফাইটার আহত হয়। ফায়ার ফাইটিং অকার্যকর হয়ে পড়ার কারণে বিমান বাহিনীর 'এমআই-১৭১' হেলিকপ্টার থেকে বাকেটের মাধ্যমে বুড়িগঙ্গা নদী এবং হাতিরঝিল থেকে পানি তুলে আকাশ থেকে ফেলা হয়। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে র‍্যাবের হেলিকপ্টার থেকে প্রথমবারের মতো বিক্ষোভকারীদের উপরে টিয়ার শেল নিক্ষেপ করতে দেখা যায়। ড্রোনের ব্যবহার কতটুকু হয়েছিল সেটা জানা না গেলেও এবারের ব্যর্থ অভ্যুত্থানে এয়ার সাপোর্ট যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছিল, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। টোল প্লাজাগুলিতে কেন আগুন দেয়া হয়েছিল, সেটা সেসময় পরিষ্কার না হলেও এখন বোঝা যাচ্ছে যে, এগুলিকে ধ্বংস করা হয়েছে, যাতে করে ফ্লাইওভার এবং এক্সপ্রেসওয়েকে পুলিশ যেন ব্যবহার করতে না পারে। কারণ এই ফ্লাইওভারগুলির র‍্যাম্প মহাখালী-বনানী এবং যাত্রাবাড়ীতে বিক্ষোভকারীদের মূল অবস্থানের পিছনে ছিল। এগুলি বলে দেয় যে, এই পরিকল্পনা কতটা ডিটেলসে তৈরি করা হয়েছিল। এটা সাধারণ কারুর পরিকল্পনা নয়; এখানে নিঃসন্দেহে প্রফেশনাল লোকেরা জড়িত ছিল।

এই দিন শেষ হবার আগেই আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বলা হয় যে, তারা সকল সহিংসতার বিরুদ্ধে এবং যারা এই কাজগুলি করছে, তারা শিক্ষার্থীদের অংশ নয়। শিক্ষার্থীদের এই ঘোষণা সরকারের জন্যে একটা বিজয় ছিল। ভয়াবহ এই দিনটার শেষ হয় রাত সাড়ে ১১টার দিকে; যখন মিডিয়াতে প্রচার শুরু হয় যে, রাত ১২টা থেকে কারফিউ ঘোষণা করা হচ্ছে এবং সারা দেশে সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই খবরেই বিক্ষোভকারীরা ধীরে ধীরে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলি ছাড়তে থাকে। শুক্রবার রাত ১২টা থেকে রোববার সকাল ১০টা পর্যন্ত কারফিউ ঘোষণা করা হয়। এর মাঝে ১২ ঘন্টা পর শনিবার দুপুর ১২টায় দুই ঘন্টার জন্যে কারফিউ শিথিলের ঘোষণা দেয়া হয়।

কারফিউ এবং সেনা মোতায়েন – ‘মোস্ট ডিসাইসিভ মোমেন্ট'
ঢাকার রাস্তায় সেনাবাহিনী। শুক্রবার রাতের পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, নিরাপত্তা বাহিনী এবং সরকারি দলের পান্ডারা পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেনি; যদিও তারা পুরোপুরিভাবে হেরেও যায়নি। তবে এটা বলা যায় যে, শুক্রবারের মতো শনিবারও যদি একই দ্রুতি নিয়ে জ্বলতো, তাহলে পুলিশ, বিজিবি, আনসার নিঃসন্দেহে সামাল দিতে পারতো না। কাজেই সেই হিসেবে সেনা মোতায়েন ছিল পুরো ঘটনার 'মোস্ট ডিসাইসিভ মোমেন্ট'। অর্থাৎ এই এক সিদ্ধান্তেই পুরো ঘটনাপ্রবাহের মোড় ঘুরে গেছে; যদিওবা বিক্ষোভ ঠেকাবার মূল কাজটা পুলিশ, বিজিবি, আনসার এবং সরকারি পান্ডারাই করেছে!


২০শে জুলাই শনিবার কারফিউএর প্রথম দিনে সহিংসতা থামেনি। ইন্টারনেট বন্ধ থাকার পরেও মোবাইলে টু-জি সার্ভিস ব্যবহার করেই গুজব ছড়ানো হয় যে, খালেদা জিয়া মারা গেছেন। সহিংস আন্দোলন থেকে ছাত্রদের সড়ে যাবার পর আন্দোলন কতটা এগুবে তা নিয়ে যেমন প্রশ্নের উদ্রেক হয়, তেমনি কারফিউ ভেঙ্গে সহিংস আন্দোলন করার জন্যে যথেষ্ট জ্বালানি পাওয়া যাবে কিনা, সেব্যাপারেও ছিল সন্দেহ। হয়তো নিজেদের কর্মীদের উজ্জীবিত রাখতেই অভ্যুত্থানকারীদের নেতৃত্ব খালেদা জিয়ার মারা যাবার গুজবটা ছড়িয়েছিল। আর এই ব্যাপারটা এতটাই প্রভাব ফেলেছিল যে, ইন্ডেপেন্ডেন্ট টিভিতে খালেদা জিয়ার চিকিৎসকের বরাত দিয়ে নিশ্চিত করা হয় যে, খালেদা জিয়া মারা যাননি।

তবে এই দিনেই মিডিয়াতে প্রশ্ন উঠতে থাকে যে, সরকার যদি ছাত্রদের দাবিদাওয়া মেনে নেয়ার ঘোষণাটা দু'দিন আগে দিতো, তাহলে তো এতগুলি প্রাণহানি হতো না। আবার কেউ কেউ প্রশ্ন করতে থাকে যে, ছাত্রদের আন্দোলন আরেকটা পক্ষ যে হাইজ্যাক করছে, সেটা সরকারের ইন্টেলিজেন্সের অবশ্যই জানার কথা। তাহলে সরকার কেন আগেভাগে কোন ব্যবস্থা নিলো না? কেউ কেউ আবার বলতে থাকেন যে, সরকার এই সমস্যাটাকে 'মিসম্যানেজ' করেছে। ঘটনার শেষে সরকারের ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করার একটা সম্ভাব্য কৌশল সামনে দিয়ে ঘুরপাক খায়। হয়তো সরকার এই ঘটনাগুলি ঘটতে দিয়েছিল বিরোধী পক্ষগুলিকে খোলা ময়দানে আনার জন্যে। এতে করে কে কে এই পরিকল্পনার সাথে জড়িত, তা যথেষ্ট প্রমাণসহ সকলের সামনে হাজির হয়ে যাবে। তবে এই কৌশল অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ একবার বিটিভি ভবনের নিয়ন্ত্রণ পেয়ে গেলে এবং সরকারি টেলিভিশন ব্যবহার করে যদি বিরোধীরা কোন সম্প্রচার করে ফেলতে সক্ষম হয়, তাহলে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় টিকে থাকা অত্যন্ত অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। কাজেই খুব সম্ভবতঃ সরকার এটা হতে দেয়নি; বরং রাষ্ট্রের উপদেষ্টারা বলেছে যে, ১৯শে জুলাইএর ধ্বংসযজ্ঞের আগে যদি পুলিশ বেশি কঠোর হয়, বা কারফিউ বলবত করা হয় বা সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়, তাহলে ছাত্ররা বিএনপি-জামাতের বিক্ষোভের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করতে পারে। একারণেই পুলিশের কঠোর হওয়া বা কারফিউ দেয়া বা সেনা মোতায়েনসহ সকল কিছুই দু'দিন দেরিতে করা হয়েছে বলে মনে হয়েছে। ২২শে জুলাই গণভবনে প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন যে, তিনি সেনাবাহিনীকে ছাত্রদের বিরুদ্ধে মোতায়েন করতে চাননি। এবং সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল নিতান্ত বাধ্য হয়েই।

কারফিউএর প্রথম দিনে নিঃসন্দেহেই পুরো মিডিয়াতে সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়। একে তো বাসার বাইরে যেতে না পারা; তার উপর ইন্টারনেট না থাকা এবং টেলিভিশনে সকল চ্যানেলে জাবর কাটা সংবাদ প্রচারে জনজীবন দুর্বিসহ হয়ে পড়ে। ইন্টারনেটের উপরে নির্ভরশীল সকল সার্ভিস ব্যাহত হয় এবং জনজীবন বিপর্যস্ত হয়। মোবাইল ফোনে টু-জি সার্ভিস চালু থাকলেও মোবাইল রিচার্জ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ইন্টারনেটের উপর নির্ভরশীল বিদ্যুৎ এবং গ্যাসের প্রি-পেইড মিটার সার্ভিসে ধ্বস নামে এবং লাখো মানুষের মাঝে হাহাকার পড়ে যায়।

কারফিউ ছিল অনেকটাই ঢিলেঢালা। কারণ পাড়া-মহল্লায় মানুষ বাইরে বের হচ্ছিলো এবং রিক্সা, গাড়ি এবং মোটরসাইকেলও চলেছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ মোড় এবং প্রধান সড়কে যেকোন চলাচলে বাধা দেয়া হয়। এমনকি যারা হাসপাতালের কর্মী, তাদেরকেও যথেষ্ট প্রশ্নের সন্মুখীন হতে হয়েছে। সেনাসদস্যরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পুলিশ, বিজিবি এবং আনসার সদস্যদের সহায়তায় মোতায়েন হয়। একইসাথে আকাশে সেনাবাহিনীর 'বেল-২০৬/৪০৭' এবং 'এমআই-১৭১এসএইচ' হেলিকপ্টারের আনাগোণা দেখা যায়। দুপুর ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল হলে হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে আসে এবং শুক্রবারের সহিংসতার চিহ্নগুলি অবলোকন করে। তবে দুপুর ২টায় কারফিউ পুনরায় বলবত করার সময় থেকে পুনরায় শুরু হয় সহিংসতা। এই সহিংসতার খবর মিডিয়াতে একেবারেই প্রচার করা হয়নি।

তবে বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের থেকে জানা যায় যে, যথেষ্ট সহিংসতা হয়েছে এই দিনে। শনিবার মোহাম্মদপুর এবং যাত্রাবাড়ী মোড়ে হয়েছে সহিংসতা। দিনের বেলায় সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার আকাশে দেখা গেলেও রাতের বেলায় বিমান বাহিনীর 'বেল-২১২' হেলিকপ্টারের আনাগোণা ছিল উল্লেখযোগ্য। দুপুর ২টা থেকে শুরু সহিংসতা সন্ধ্যা পর্যন্ত লাগামহীনভাবে চলে। বিভিন্ন যানবাহনে আগুন দেয়া হয় এবং রোডব্লক তৈরি করা হয়। বিভিন্ন এলাকায় শতশত বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়; যেগুলি ছিলো শটগান, টিয়ার শেল, স্টান গ্রেনেড বা ককটেলের শব্দ। কারণ ক্রাউড কনট্রোল রোলে নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে এগুলিই ছিল প্রধান অস্ত্র। তবে বিজিবি এবং সেনাবাহিনীর কাছে থাকা রাইফেল এবং মেশিন গানের কোন ব্যবহার হয়েছে কিনা, সেব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

কারফিউএর প্রথম দিনে সহিংসতা হলেও তা শুক্রবারের মতো ছিল না। রাস্তায় সেনাবাহিনী মোতায়েন এবং দেখামাত্র গুলির নির্দেশ বিক্ষোভকে যথেষ্টই দুর্বল করেছে। শুক্রবার রাতের পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, নিরাপত্তা বাহিনী এবং সরকারি দলের পান্ডারা পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেনি; যদিও তারা পুরোপুরিভাবে হেরেও যায়নি। তবে এটা বলা যায় যে, শুক্রবারের মতো শনিবারও যদি একই দ্রুতি নিয়ে জ্বলতো, তাহলে পুলিশ, বিজিবি, আনসার নিঃসন্দেহে সামাল দিতে পারতো না। কাজেই সেই হিসেবে সেনা মোতায়েন ছিল পুরো ঘটনার 'মোস্ট ডিসাইসিভ মোমেন্ট'। অর্থাৎ এই এক সিদ্ধান্তেই পুরো ঘটনাপ্রবাহের মোড় ঘুরে গেছে; যদিওবা বিক্ষোভ ঠেকাবার মূল কাজটা পুলিশ, বিজিবি, আনসার এবং সরকারি পান্ডারাই করেছে!

ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পুলিশের এপিসি থেকে ছোঁড়া হচ্ছে টিয়ার শেল। শটগান, টিয়ারশেল এবং স্টান-সাউন্ড গ্রেনেডের বাইরে ডিএমপির ক্রাউড কনট্রোল অস্ত্রগুলির মাঝে গুরুত্বপূর্ণ একটা হলো এপিসি। গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলিকে বিক্ষোভকারীদের দখলমুক্ত করতে এই এপিসিগুলির ছত্রছায়ায় পুলিশ অগ্রগামী হতে পারে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন আন্দলনের সময় এই এপিসির ব্যাপক ব্যবহার দেখা গেছে। ২০২৩এর জুলাই মাসেই বিরোধী দলের সাথে যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের সংঘর্ষ হয়; যেখানে অনেকগুলি এপিসি মোতায়েন হয়েছিল। ২০২৪ সালেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।


২১শে জুলাই রোববার কারফিউএর দ্বিতীয় দিনে সকাল ১০টার পরিবর্তে বিকেল ৩টায় দুই ঘন্টার জন্যে কারফিউ শিথিল করা হয়। এতে ধারণা করা যায় যে, নিরাপত্তা বাহিনী আন্দোলনকারীদের নেতৃত্বকে পাকড়াও করতে যতটা সময় লাগবে বলে ধারণা করেছিল, তার চাইতে বেশি সময় লাগছে। এছাড়াও কারফিউএর মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্যে থাকবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়। ইন্টারনেট সংযোগ ফিরিয়ে দেয়ার কথাগুলিও আগের মতোই ধোঁয়াশা রেখে ঘোষণা দেয়া হতে থাকে। বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভের সাথে সম্পৃক্ত সন্দেহে গ্রেপ্তার শুরু হয়েছে বলে মিডিয়াতে খবর আসতে থাকে।

কারফিউএর মাঝেই বিদ্যুৎ প্রি-পেইড মিটার এবং মোবাইল রিচার্জের জন্যে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। বাজারে যেকোন পণ্য তোলার সাথেসাথেই বিক্রি হয়ে যায়; যদিওবা মূল্য ছিল আকাশচুম্বী। ব্যাংকের এটিএমগুলি অকার্যকর হয়ে পড়ে; অনেকেই অর্থের কষ্টে পড়ে যান। যে মোড়গুলিতে শনিবার সেনা মোতায়েন করা হয়নি, সেই মোড়গুলিতে রোববার সেনাসদস্যদের দেখা যেতে লাগলো। মোহাম্মদপুর বাস স্ট্যান্ডে সেনাবাহিনীর সদস্যদেরকে পুলিশ, বিজিবি এবং আনসারের সহযোগিতায় দেখা গেছে। মোহাম্মদপুর আসাদ গেটে রেজর ওয়্যার এবং বালুর বস্তা দিয়ে ব্যারিকেড দিয়েছিল নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। মূলতঃ মোহাম্মদপুর বাস স্ট্যান্ড বা ধানমন্ডির দিক থেকে কেউ যাতে গণভবনের দিকে যেতে না পারে, সেজন্যেই এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। এই মোড়ে কোন সহিংসতার চিহ্ন না থাকলেও মোহাম্মদপুর আসাদ এভিনিউএ টাউন হল থেকে বাস স্ট্যান্ডের দিকে যাবার পথে ধ্বংসযজ্ঞ এবং পোড়ানো গাড়ি ছিল লক্ষ্যনীয়। যদিও মোহাম্মদপুর বাস স্ট্যান্ডের মূল সংঘর্ষ ছিল বসিলার দিক থেকে আক্রমণ করা বিক্ষোভকারীদের সাথে, তথাপি আসাদ এভিনিউ এবং আশেপাশের সকল ছোট ছোট রাস্তা এবং গলি থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর উপর হামলা হয়; যা ঠেকাতে বাহিনীর সদস্যদের হিমসিম খেতে হয়েছে।

কারফিউএর দ্বিতীয় দিনে যে ব্যাপারটা সকলের সামনে পরিষ্কার হচ্ছিলো তা হলো, বিক্ষোভকারীরা টার্গেট নিয়েই কিছু অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেবার চেষ্টা করেছে। বাকি এলাকাগুলিতে কাউকে দেখাই যায়নি। একাত্তর টেলিভিশনের একজন সাংবাদিক ২০শে জুলাই রাতে এই ব্যাপারটাকে তুলে ধরে বলেছিলেন যে, তাদের অভিজ্ঞতা বলছে যে, বিক্ষোভকারীরা পরিকল্পনা করেই নেমেছে। তারা যে জায়গাগুলি নিয়ন্ত্রন নেবার চেষ্টা করেছিল, সেই জায়গাগুলি তারা কিছুতেই ছেড়ে যায়নি। তারা পিছু হঠলেও কাছেই অবস্থান করেছে। এমনকি রাতের বেলাতেও তারা সেই স্থান পুরোপুরি ছেড়ে যায়নি। পরের দিন শুরু হলেই মানুষের সংখ্যা বাড়িয়েছে এবং আক্রমণে গিয়েছে।

রোববার সন্ধ্যার পর মিডিয়াতে ধীরে ধীরে কারফিউএর মাঝে চলা সহিংসতার খবর প্রচার করা শুরু হয়। প্রথমে সরাসরি না বললেও এটা বোঝা যায় যে, মিডিয়া রিপোর্টগুলি ছিল শনিবার এবং রবিবারের; অর্থাৎ কারফিউ চলার সময়ের। যাত্রাবাড়ী, রামপুরা, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকার নাম উল্লেখ করা হতে থাকে। রোববার সন্ধ্যায় প্রথমবারের মতো যাত্রাবাড়ীতে ধারণকৃত সেই দিনের দুপুর ১টার রিপোর্ট প্রচার করা হয়। সেখানে দেখা যায় যে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মাঝে কংক্রিটের ডিভাইডারের মতো ভারি বস্তু রাস্তার মাঝে এনে ব্যারিকেড দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়াও বাস এনে ৬০ ডিগ্রি আড়াআড়ি রেখে রাস্তায় ব্যারিকেড দেয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে সেই ব্যারিকেডের নিয়ন্ত্রণ হারাবার সময় বাসটাতে আগুন দিয়ে দেয় তারা। সরাসরি না বললেও বোঝা যায় যে, এই ঘটনাগুলি ঘটেছিল কারফিউএর মাঝে। এবং যেকোন হতাহতের খবর তখন পুরোপুরিভাবে সেন্সর করা হয়।

রোববার কারফিউ চলাকালীন সময়ে সারাদিনে বহু মানুষ রাস্তায় বেরিয়েছে তাদের জরুরি কর্মসম্পাদনের জন্যে। এই মানুষগুলিকে রাস্তায় বের হলেও পুলিশ এদের কাউকে বাধা দেয়নি - যতক্ষণ পর্যন্ত তারা গুরুত্বপূর্ণ মোড় থেকে দূরে থেকেছে। অর্থাৎ এই কারফিউ মূলতঃ ১৪৪ ধারার মতো কাজ করেছে। পাড়া-মহল্লায় কোন পুলিশের টহল দেখা যায়নি। পুলিশ-বিজিবি-সেনাবাহিনীকে শুধুমাত্র গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলিতেই দেখা গিয়েছে। মূলতঃ অভ্যুত্থানকারীরা যে জায়গাগুলিকে টার্গেট করেছিল, নিরাপত্তা বাহিনী ঠিক সেই জায়গাগুলিকেই নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে।

রোববার সন্ধ্যার পর থেকে রিপোর্ট আসতে থাকে বিএনপি, জামাতে ইসলামি এবং তাদের সমমনা দলগুলির নেতাকর্মীদের মাঝে কাকে কাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং কতদিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। এর আগে শনিবারেও বেশকিছু নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তবে কারফিউ তুলে না দেয়ায় বোঝা যাচ্ছিলো যে, মূল বা আঞ্চলিক সমন্বয়কদের অনেকেই তখনও পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে সক্ষম হয়েছে। তাছাড়া কেউ যাতে সহজে ঢাকা ত্যাগ করে সটকে পড়তে না পারে, অথবা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে যেতে না পারে, সেজন্যেই হয়তো কারফিউ বলবত রাখা হয়েছে। তথাপি রোববার রাতে ঘোষণা আসে যে, কারফিউ থাকবে কিনা, সেই সিদ্ধান্ত অনেকটাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হাত থেকে আঞ্চলিক জেলা প্রশাসকের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। শুধুমাত্র ঢাকা, নারায়নগঞ্জ, গাজীপুর এবং নরসিংদীর কারফিউএর সিদ্ধান্ত দেয়া হবে কেন্দ্রীয়ভাবে। আর পরদিন কারফিউ শিথিল হচ্ছে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত তিন ঘন্টার জন্যে। এই সিদ্ধান্তগুলি বলে দেয় যে, পরিস্থিতি নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের মাঝেই চলে এসেছে।

রোববার শেষেও ইন্টারনেট চালুর কোন ঘোষণা আসেনি। কারণ হিসেবে ফাইবার অপটিক কেবলের ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়। আইসিটি মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয় যে, দেশের বিভিন্ন স্থানে ৪০টা পয়েন্টে ফাইবার অপটিক কেবল কেটে ফেলা হয়েছে। এই খবরে প্রশ্ন করতেই হয় যে, যারা এই কাজটা করেছে, তারা ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক সম্পর্কে কতটুকু জ্ঞান রাখে এবং কোন উদ্দেশ্য হাসিলে তারা এই কাজটা সম্পাদনে অগ্রণী হয়েছিল? তবে এই ঘটনায় বাংলাদেশের ইন্টারনেট সার্ভিস এবং ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের মারাত্মক দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে।

আনুগত্যের শপথ অনুষ্ঠান


২২শে জুলাই সোমবার দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল করার কথা বলা হলেও মানুষ সারাদিনভরই রাস্তায় ছিলো। নিরাপত্তা বাহিনী তাদের কাউকেই বাধা দেয়নি। আসলে বিক্ষোভের মূল কেন্দ্রগুলি ব্যাতীত অন্য কোথাও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের দেখাই যায়নি। ইন্টারনেট বন্ধে মানুষের ভোগান্তি বাড়তেই থাকে। সকল রাস্তায় রিক্সা চলেছে এবং সকল বাজার কারফিউএর মাঝেই চলমান ছিল। দিনের বেলায় এবং সন্ধ্যায় বিমান বাহিনী এবং সেনাবাহিনীর 'বেল-২১২' এবং 'বেল-২০৬/৪০৭' হেলিকপ্টারের টহল চলে। সন্ধ্যায় একনাগারে ৫০ মিনিট সেনাবাহিনীর 'বেল-২০৬/৪০৭' হেলিকপ্টারের নিচু দিয়ে টহল ছিল উল্লেখ করার মতো। রাত ৮টার পরেও অবশ্য বিমান বাহিনীর 'বেল-২১২' এবং 'আমআই-১৭১' হেলিকপ্টারের আনাগোণা চলতে থাকে। এতে প্রমাণ হয় যে, পরিস্থিতি এখনও শতভাগ নিয়ন্ত্রণে আসেনি। নরসিংদীর কারাগার থেকে লুট হওয়া ৮৫টা অস্ত্রের মাঝে ৭০টা তখনও পাওয়া যায়নি। এছাড়াও ৮২৬ জন কয়েদির বেশিরভাগেরই তখন পর্যন্ত হদিস পাওয়া যায়নি। বিশেষ করে পালিয়ে যাওয়া ৯জন এবিটি এবং জেএমবি সদস্য তখনও একটা হুমকি হিসেবে রয়ে গেছে। এই দিনের মিডিয়া রিপোর্টে বলা হয় যে, ৬ শতাধিক রাজনৈতিক কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এই দিনে বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবনে ব্যবসায়ীদের বিশাল এক গ্রুপকে ডেকে নিয়ে আসা হয়। প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল সরকারের প্রতি ব্যবসায়ীদের আনুগত্যের শপথ অনুষ্ঠান। ব্যবসায়ীদের মাঝ থেকে কয়েকজনকে কথা বলতে দেয়া হয়; যারা মূলতঃ আনুগত্য প্রকাশের বক্তব্যগুলি দেন। আর সরকারের পক্ষ থেকে প্রথমবারের মতো 'আন্দোলন'এর সাথেসাথে 'ষড়যন্ত্র' শব্দটা ব্যবহার করা হয়। ব্যবসায়ীদের মাঝ থেকে শেষ বক্তা হিসেবে বসুন্ধরা গ্রুপের প্রধানকে আমন্ত্রণ জানানো হয় এই ঘটনায় জড়িতদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের প্রস্তাব দেয়ার জন্যে। প্রধানমন্ত্রী তার কথাগুলিকে প্রতিফলিত করে ঘোষণা দেন যে, এর আগে বারংবার জামাতে ইসলামী এবং তাদের সহযোগীদেরকে লঘু দন্ড দেয়া হলেও এবার সেটা করা হবে না। কাজেই এটা মোটামুটিভাবে ধরেই নেয়া যায় যে, আইনী পদক্ষেপগুলি এবারে রাষ্ট্রদ্রোহীতার দিকেই যাবে। সরকার এই অনুষ্ঠানকে ব্যবহার করেছে কঠোর পদক্ষেপে যাবার এপ্রুভাল হিসেবে। এই অনুষ্ঠানে তথ্য মন্ত্রণালয় ৭ মিনিটের একটা ডকুমেন্টারি দেখায় এবং একইসাথে তথ্য প্রতিমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী সহিংসতার কিছু অজানা তথ্যও তুলে ধরেন। উভয়েই পুলিশের উপর অত্যাচার এবং পুলিশ হত্যার কথা উল্লেখ করেন। একই দিনে পুলিশ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয় যে, সহিংসতায় ৩ জন পুলিশের প্রাণহানি ঘটেছে এবং বর্তমানে আরও ৩ জন পুলিশ হাসপাতালের আইসিইউতে আশংকাজনক অবস্থায় রয়েছেন। সর্বমোট ১,১১৭ জন পুলিশ এই ক'দিনে আহত হয়েছেন। যে ব্যাপারটা নিশ্চিত তা হলো, গত কয়েকদিনে কোন মিডিয়াতে পুলিশ হত্যার কথা প্রচার করা হয়নি। খুব সম্ভবতঃ পুলিশ সদস্যদের মনোবলে যাতে কোন আঘাত না লাগে, সেটা নিশ্চিত করতেই এই খবর সেন্সর করা হয়েছিল।

গ্রেপ্তার এবং গ্রেপ্তার


২৩শে জুলাই মঙ্গলবার ঢাকা, গাজীপুর, নারায়নগঞ্জ এবং নরসিংদীতে কারফিউ শিথিল করা হয় দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। বাকি অঞ্চলগুলিতে মোটামুটিভাবে সকাল বা দুপুর থেকে সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত কারফিউ শিথিল করার সিদ্ধান্ত দেয়া হয়। এটা নিশ্চিত যে, মূলতঃ ধরপাকড়ের জন্যেই কারফিউ রাখা হয়েছে। বিভিন্ন আবাসিক অঞ্চলে, বিশেষ করে বস্তিগুলিতে চিরুনি অভিযান এবং ব্লক রেইড চলছে। চেহারা দেখে দেখে প্রতিটা মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং সন্দেহজনক হলে বা চিনে ফেললে তাদেরকে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। যাদেরকে চেনা সম্ভব হচ্ছে, তারা নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে তৎক্ষণাৎ ভয়াবহ মারধরের শিকার হচ্ছে। গত কয়েক দিনের মাঝে এদের মধ্যেই অনেকে সুযোগ পেয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের এক হাত দেখে নিয়েছে। এখন নিরাপত্তা বাহিনী এদেরকেই খুঁজে বেড়াচ্ছে। বিশেষ করে এই মানুষগুলিকে যারা নির্দেশ দিয়েছে বা অর্থায়ন করেছে, তাদেরকে খোঁজা হচ্ছে। দুপুরে মিডিয়া রিপোর্টে বলা হয় যে, ঢাকায় ১,২০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে; বগুড়ায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৯০০ জনকে। সারা দেশে প্রায় ২,৫০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মোবাইল কমিউনিকেশন খতিয়ে দেখা হচ্ছে যে, কারা তাদেরকে নির্দেশনা দিচ্ছিলো।

সকাল থেকে সেনাবাহিনীর 'বেল-২০৬/৪০৭' হেলিকপ্টার নিচু দিয়ে উড়ে টহল দিয়েছে। এই দিনে সারা দিন শেষে রাতের বেলাতেও আকাশে হেলিকপ্টার টহল দিতে দেখা গেছে। বিশেষ করে 'বেল-২০৬/৪০৭'এর রাতের বেলায় টহল ছিল অস্বাভাবিক। প্রথমবারের মতো ঘোষণা দেয়া হয় যে, ২২শে জুলাই রাত থেকে পরীক্ষামূলকভাবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ দেয়া শুরু করা হবে। তবে সোশাল মিডিয়ার একসেস পেতে জনগণকে আরও অপেক্ষা করতে হবে। আপাততঃ গুরুত্বপূর্ণ সার্ভিস, ব্যাংক, রপ্তানি পণ্য এবং সার্ভিস নিয়ে কাজ করে এমন সেক্টর, মিডিয়া, ইত্যাদি সেক্টর ইন্টারনেট লাইন পেতে প্রাধান্য পাবে। তবে ইতোমধ্যেই ইন্টারনেট না থাকায় সাধারণ জনগণের নাভিশ্বাস উঠেছে। ইন্টারনেট না দিতে পারার ব্যাপারটা জনগণ একেবারেই মেনে নিতে পারেনি; যা ব্যাপক জনরোষের কারণ হতে পারতো। শুধুমাত্র অভ্যুত্থানকারীদের বেশিরভাগ গ্রেপ্তার হবার কারণেই হয়তো পরিস্থিতি আবারও খারাপের দিকে যায়নি।

জুলাই ব্যর্থ অভ্যুত্থান – কার জন্যে কি শিক্ষা


এই পুরো ঘটনাপ্রবাহের মাধ্যমে যে ব্যাপারগুলি পুরো দেশের মানুষের কাছে পরিষ্কার হতে হবে তা হলো -

১) সরকার এবং রাষ্ট্র দু'টার দু'টা আলাদা 'সোউল' বা আত্মা রয়েছে। এর প্রথমটা অস্থায়ী; পরেরটা মোটামুটিভাবে স্থায়ী। একটা পরিবর্তন হলেও অপরটা থেকে যায়। উদাহরণ – ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পরেও রাষ্ট্র আগেরটাই রয়েছে। মিশরের হোসনি মুবারক সরকার পতনের পরেও মিশর রাষ্ট্র রয়ে গেছে।

২) গণ আন্দোলন বা গণ অভ্যুত্থান রাষ্ট্রে পরিবর্তন আনার মেথড হতে পারে না। কারণ এই মেথডে এগুতে গেলে রাষ্ট্রের ক্ষতি হবার সম্ভাবনা থাকে। একদিকে যেমন রাষ্ট্র ধ্বংস করে রাষ্ট্রকে পরিবর্তন করার চেষ্টাটা নিতান্তই শিশুসুলভ; অন্যদিকে রাষ্ট্র ধ্বংস করার দিকে এগুলে রাষ্ট্র বাধা দেবে এটাই স্বাভাবিক।

৩) রাষ্ট্রের 'মোস্ট ডিসাইসিভ' ফ্যাক্টর সবসময়ই সেনাবাহিনী।

৪) যেকোন ইস্যু-ভিত্তিক আন্দোলনের ব্যাপারে সাবধান; আন্দোলনকারীরা অন্য কারুর দ্বারা ব্যবহৃত হতে পারে; এবং জেনে বা না জেনেই অন্য কারুর এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে ফেলবে। আবেগতাড়িত হয়ে কাজ করলে আন্দোলনকারীরা রাষ্ট্র ধ্বংসের কারণও হতে পারে।



রাষ্ট্রের কাছে যে ব্যাপারগুলি পরিষ্কার হতে হবে তা হলো -

১) বুদ্ধিবৃত্তিক স্তম্ভের উপর স্থাপিত না হওয়ায় রাষ্ট্র দুর্বল। তাকে বারংবার ইমার্জেন্সি ফায়ার সার্ভিসের কাজ করতে হচ্ছে। কিছুদিন আগেই কুকি-চিন দমনে শক্তি প্রয়োগ করতে হয়েছে। আবার মিয়ানমার সীমান্তে বিজিবি, কোস্ট গার্ড ছাড়াও সেনাবাহিনী এবং নৌবাহিনী মোতায়েন করতে হয়েছে। আফ্রিকার উপকূলে জলদস্যুদের হাত থেকে নিজেদের জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি।

২) ভূরাজনৈতিক এবং ভূকৌশলগত কারণে বাংলাদেশের উপর অনেকের ঈগল-দৃষ্টি রয়েছে; এবং তারা সুযোগ বুঝে এই দেশের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার চেষ্টা করতেই থাকবে; বারবার আগুন লাগবে; বারবার রাষ্ট্র ফায়ার সার্ভিসের কাজ করতে থাকবে। কুকি-চিনের উত্থানের পর সরকার মাউন্টেন পুলিশ গঠন করেছে। এর আগে সন্ত্রাস দমনে সরকার র‍্যাব, সোয়াট, র‍্যাবের স্পেশাল ফোর্স, আনসার গার্ড ব্যাটালিয়ন, সিআরটি, কিউআরটি, পিবিআই, সেনাবাহিনীর প্যারাকমান্ডো ব্রিগেডের এন্টি-টেররিজম ইউনিট গঠন করেছে। অর্থনৈতিক চাপে পড়ে অর্থনীতিবিদরূপী পশ্চিমা দালালদের প্রভাবে আইএমএফ-এর মতো মাফিয়া সংস্থা থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছে; কারণ তারা বলা শুরু করেছিল যে, বাংলাদেশ বুঝি শ্রীলংকা হয়ে গেল!

৩) ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা যত বাড়তে থাকবে, বাংলাদেশের সামনে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তত বেশি বেশি করে আসতে থাকবে। মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ায় বাংলাদেশের উপর চাপ পড়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ায় বাংলাদেশের অর্থনীতির উপর চাপ পড়েছে। একই যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার সাথে বাংলাদেশের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য হুমকির মাঝে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের উত্তেজনার কারণে বাংলাদেশ এবং চীনের সম্পর্ক চাপের মাঝে পড়ছে।

৪) রাষ্ট্র যেহেতু বুদ্ধিবৃত্তিক স্তম্ভ না তৈরি করে ফায়ার সার্ভিসের কাজ করে যাচ্ছে, তাই পরবর্তী আগুন কোথায় লাগতে পারে, সেটাই হয়ে যাবে আলোচনা। যেমন – এবারে বাংলাদেশের ইন্টারনেট এবং ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক কতটা দুর্বল, তা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। কাজেই সামনে হ্যাকিংএর মতো কিছু আসতেই পারে। হয়তো কোন হ্যাকিং গ্রুপ দেশের বিদ্যুৎ বা ইন্টারনেট সংযোগ আটকে রেখে অর্থ দাবি করবে। এক সপ্তাহ ইন্টারনেট না থাকলে কি হতে পারে, সেটা বাংলাদেশের মানুষ দেখেছে। এটা যদি এক মাস হয়, তাহলে কি হতে পারে ভেবে দেখুন তো! এরকম একটা কাজ দেখে মনে হবে যে, এই হ্যাকিং গ্রুপ কোন প্রাইভেট গ্রুপ; প্রকৃতপক্ষে এরা কোন রাষ্ট্র দ্বারা পুষ্ট। আরও একটা ক্রাইসিস হতে পারে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে। কুকি-চিনকে সবাই দেখেছে; এরা খুবই ক্ষুদ্র। কিন্তু যদি বড় কোন গ্রুপ আবারও সহিংস হয়ে ওঠে, তখন রাষ্ট্র কি করবে? আবার, কারুর উস্কানিতে যদি ধর্মীয় সহিংসতা শুরু হয় (যেমন, কুকি-চিন ছিল খ্রিস্টান গ্রুপ)? যদি পার্শ্ববর্তী ভারতে হিন্দুত্ববাদী নীতির কারণে বাংলাদেশের উপর চাপ সৃষ্টি হয়, তখন বাংলাদেশ কি করবে?

৫) ভারত এবং চীনের মাঝে যদি সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয় তখন বাংলাদেশ কি করবে? যদি ভারত বাংলাদেশের পদ্মা সেতু এবং মাতারবাড়ি বন্দর সামরিক রসদ পরিবহণে ব্যবহার করতে চায়, তখন বাংলাদেশ কি চীনের বিরুদ্ধে যাবে? যদি যুক্তরাষ্ট্র ভারতের পক্ষ নিয়ে বাংলাদেশের উপর চাপ সৃষ্টি করে (যেমন বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গার্মেন্টস রপ্তানি অস্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়া), তাহলে বাংলাদেশ কি চীনের বিপক্ষে গিয়ে বাংলাদেশের মাঝ দিয়ে ভারতকে সামরিক ট্রানজিট দেবে? বাংলাদেশ যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের চোখ রাঙ্গানি উপেক্ষা করে, তাহলে এর ফলাফল হজম করার সক্ষমতা কি বাংলাদেশের রয়েছে? প্রশ্নগুলির উত্তর কঠিন হবে যতক্ষণ পর্যন্ত বুদ্ধিবৃত্তিক স্তম্ভের উপর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত না হবে।

Friday, 31 May 2024

পদ্মা সেতু এবং উত্তরবঙ্গের নিরাপত্তার প্রতি হুমকি

৩১শে মে ২০২৪

বিআইডব্লিউটিসি-র ফেরি দিয়ে নদী পার হচ্ছে সামরিক যানবাহন। শান্তিকালীন সময়েই যদি এই ফেরিগুলির ব্যবহার ফুরিয়ে যায়, তাহলে আপদকালীন সময়ে এগুলিকে কি আর পাওয়া যাবে? বেশিরভাগ ফেরির বয়সই ৪০ বছরের বেশি। পুরোনো ফেরিগুলি যদি কেটে ফেলা হয়; তাহলে তাদের স্থলে নতুন ফেরি কি আদৌ তৈরি হবে? অনেকেই তখন যুক্তি তুলে ধরবেন – এতগুলি সেতু তৈরি করা হয়েছে; ফেরি তৈরির প্রয়োজন কি রয়েছে?


পদ্মা সেতু বনাম যাত্রীবাহী নৌযান

পদ্মা সেতু তৈরি করতে পারাটা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল বটে। তবে সেতু চালু করার সাথেসাথে নৌপরিবহণ (প্রকৃতপক্ষে নৌপথে যাত্রী ও যানবাহণ পরিবহণ) ব্যাপকহারে কমে যাওয়াটা রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার উপর একটা বড় আঘাত হিসেবে এসেছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথের মাঝে সবচাইতে বড় জাহাজগুলি চলে ঢাকা-বরিশাল রুটে। পদ্মা সেতু চালুর ভার মাথায় নিয়েই ২০২২ সালের নভেম্বরে সার্ভিসে আসে 'এমভি সুন্দরবন-১৬'। ১১০মিঃ লম্বা এবং ১৮মিঃ প্রস্থের এই জাহাজটাকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলরত সবচাইতে বড় জাহাজ বলে আখ্যা দেয়া হয়। অফিশিয়ালি জাহাজটা ১,৩৫০ জন যাত্রী বহণ করতে পারে বলে বলা হয়েছে। এর আগে ২০১৬ সালে সার্ভিসে আসে 'এমভি সুন্দরবন-১০' জাহাজ। ১০১মিঃ লম্বা ও ১৬মিঃ প্রস্থের এই জাহাজের যাত্রী ধারণক্ষমতা প্রায় ১,৪০০। ২০১৮ সালে সার্ভিসে আসে 'এমভি কীর্তনখোলা-১০'। ৯৬মিঃ লম্বা এবং ১৮মিঃ প্রস্থের এই জাহাজের ধারণক্ষমতা প্রায় ২,০০০। ২০১৭ সালে সার্ভিসে আসে 'এমভি সুন্দরবন-১১'। 'এমভি সুন্দরবন-৭' জাহাজকে রূপান্তরিত করে তৈরি করা এই জাহাজ ৯০মিঃ লম্বা এবং ১৩মিঃ প্রস্থের। প্রায় ১,২০০ যাত্রী পরিবহণে সক্ষম এই জাহাজ। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা থেকে পটুয়াখালী রুটে চলাচল শুরু করে 'এমভি সুন্দরবন-১৪'। ৭৩মিঃ লম্বা ও ১১মিঃ প্রস্থের এই জাহাজের অনুমোদিত যাত্রী ধারণক্ষমতা ৭৬০জন।

এই জাহাজগুলির সমসাময়িক আরেকটা জাহাজ ছিল 'এমভি কীর্তনখোলা-২'; ২০১২ সালে যা সার্ভিসে আসে। ৯৩মিঃ লম্বা এবং ১৭মিঃ প্রস্থের এই জাহাজের যাত্রী ধারণক্ষমতা ছিল প্রায় ২,০০০। এই জাহাজটা ২০২৪ সালের শুরুতে কেটে ফেলা (স্ক্র্যাপ) হয়। ২০২২ থেকে ২০২৪এর মাঝে বেশকিছু জাহাজ কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত হয়। যদিও জাহাজের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যাবার কারণে প্রতি বছরই অনেক জাহাজ কেটে ফেলা হয়, লঞ্চ মালিক সমিতির হিসেবে, মেয়াদ থাকার পরেও বেশকিছু জাহাজ কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। পদ্মা সেতু চালুর পর থেকে প্রায় ৩ ঘন্টায় যেখানে বরিশাল পৌঁছানো যাচ্ছে, সেখানে নৌপথে বরিশাল যেতে লাগে প্রায় ৫ থেকে ৭ ঘন্টা। সময় বাঁচাতে অনেক মানুষই সড়কপথে রওয়ানা হয়েছে। এমনকি ঈদের ছুটিতে অনেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মোটরসাইকেলে করে দেশের বাড়ি রওয়ানা হয়েছে। এর পিছনে জাহাজ মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতাও কম ছিলনা। ঈদের ছুটিতে নৌপথে যাতায়াত খুবই কঠিন হয়ে যেতো অতিরিক্ত এবং অযাচিত ভাড়া আদায়ের কারণে। অবশ্য এই মালিকদেরকেই বা কিভাবে দোষ দেয়া যায়? পুঁজিবাদী সমাজে জীবনের লক্ষ্যই যেখানে অর্থ উপার্জন করা, সেখানে জাহাজ মালিকদেরকে কেন আলাদা করে দোষারোপ করা হবে?

নদীকেন্দ্রিক সামরিক পরিবহণ – কিছু উদাহরণ

আপদকালীন সময়ে এই জাহাজগুলির জরুরি ব্যবহার রয়েছে বিধায় এগুলির শান্তিকালীন সময়ে সার্ভিসে থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর অনেক রাষ্ট্রই আলাদাভাবে সামরিক পরিবহণ জাহাজ সার্ভিসে রাখে। তারা বেসামরিক সার্ভিস থেকে জাহাজগুলি কিনে নিয়ে সামরিক সার্ভিসে নিয়োজিত করে। এর মাঝে কিছু জাহাজ মালামাল বহণ করে; আর কিছু বহণ করে সৈন্য। মিয়ানমারের নৌবাহিনীর কমপক্ষে ৮টা সৈন্য পরিবহণ জাহাজ রয়েছে। এছাড়াও তাদের রয়েছে ৩০টারও বেশি ল্যান্ডিং ক্রাফট এবং আরও ৩টা কার্গো জাহাজ এবং ২টা তেল পরিবহণ করার ট্যাঙ্কার জাহাজ। এই জাহাজগুলির মাঝে রাজা হলো ল্যান্ডিং প্ল্যাটফর্ড ডক বা এলপিডি 'মোয়াত্তামা'; যা ১২৫মিঃ লম্বা, ১২,৫০০টন ওজনের এবং ৫২০জন সেনার সাথে আরও ২৫টা ট্যাংক বহণে সক্ষম। মিয়ানমার নৌবাহিনীর ২টা হাসপাতাল জাহাজও রয়েছে। মিয়ানমারে প্রচুর নদী এবং বিশাল সমুদ্রতটের নিরাপত্তায় তারা এই জাহাজগুলিকে সামরিক সার্ভিসে রেখেছে। মিয়ানমারের মতো ব্রাজিলেও অনেক বড় বড় নদী রয়েছে। ব্রাজিলের নৌবাহিনীতে নদীতে সার্ভিস দেয়ার জন্যে কমপক্ষে ১১টা প্যাট্রোল বোট, ৩টা সৈন্য বহণকারী জাহাজ, ১টা তেলবাহী জাহাজ, ৩টা হাসতাপাল জাহাজ এবং এছাড়াও আরও বেশকিছু টাগবোট ও অন্যান্য জাহাজ রয়েছে। তবে সবচাইতে অদ্ভুত জাহাজ হলো ৮৬ বছরের পুরোনো মনিটর জাহাজ 'পারনাইবা'। ৫৫মিঃ লম্বা এবং ৭২০টনের এই জাহাজটা বিশ্বের যেকোন দেশে নদীতে অপারেশনে থাকা সবচাইতে শক্তিশালী জাহাজ। এতে রয়েছে একটা ৭৬মিঃমিঃ কামান, ২টা ৪০মিঃমিঃ কামান, ৬টা ২০মিঃমিঃ কামান, ২টা ৮১মিঃমিঃ মর্টার এবং হেলিকপ্টার ল্যান্ডিংএর সুবিধা। একসময় ব্রাজিলের নৌবাহিনীতে নদীর জাহাজ অনেক বেশি ছিল; সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ আমেরিকার ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে নদীতে অপারেশনের জাহাজ কমিয়ে ফেলা হয়েছে। ব্রাজিলের প্রতিবেশী কলম্বিয়ার নৌবাহিনীতে রয়েছে নদীতে সার্ভিসের জন্যে বেশকিছু জাহাজ। একসময় গৃহযুদ্ধ সামাল দিতে তাদের নৌবাহিনীতে রাখা হয়েছে ১৮টা নদীতে যুদ্ধ করা কম্ব্যাট জাহাজ (যেগুলি সেনাও বহণ করে), ৩০টার মতো ছোট প্যাট্রোল বোট, এবং বহু ধরণের সাপোর্ট ভেসেল। এগুলির মাঝে ৮টা জাহাজ সত্যিই আলাদা ছিল। ৩৭মিঃ থেকে ৪০মিঃ লম্বা এই বর্মাবৃত জাহাজগুলির প্রথম ৩টা ৮টা করে ১২ দশমিক ৭মিঃমিঃএর মেশিন গান এবং ৮২ জন করে সেনা বহণ করতে পারে; আর পরের ৫টা জাহাজ ৭টা করে মেশিন গান, ১টা করে গ্রেনেড লঞ্চার এবং সাথে ৩৯ জন সেনা বহণে সক্ষম।

ব্রাজিলের নৌবাহিনীর নদীর হাসপাতাল জাহাজ 'ডক্টর মনটেনেগ্রো'। ব্রাজিলের নদীগুলি দেশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলি থেকে বহুদূরে। একারণে তাদের জন্যে বাণিজ্যিকভাবে চালু থাকা জাহাজগুলিকে সেই এলাকাগুলিতে নিয়ে কাজে লাগানোটা ছিল বেশ কষ্টসাধ্য। তাই জাহাজগুলিকে সামরিক বাহিনীর অধীনেই সার্ভিসে রাখতে হয়েছে; যা কিনা শান্তিকালীন সময়ের জন্যে বেশ ব্যয়বহুল। ব্রাজিলের নদীভিত্তিক বাহিনী তৈরি করা হয়েছে এমনভাবে, যাতে করে তা কেন্দ্রের সরাসরি সমর্থন ছাড়াই লম্বা সময় যুদ্ধ করতে পারে।

 
একেকটা দেশকে একেক ধরণের সামরিক হুমকি মোকাবিলা করতে হয়েছে। তাই এই দেশগুলি নিজেদের অভ্যন্তরীণ নদীপথের নিরাপত্তাকে নিয়ে সেভাবেই চিন্তা করেছে। ব্রাজিলের নদীগুলি মূল রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলি থেকে অনেক দূরে এবং আশেপাশের দেশগুলির (ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া, পেরু, বলিভিয়া, প্যারাগুয়ে, আর্জেন্টিনা) সাথে সীমান্ত নির্ধারক। কিছু ক্ষেত্রে এই নদীগুলিতে জাহাজ পাঠাতে গেলে পাশের দেশের অনুমতি নিতে হয়। আমাজন, পারানা, প্যারাগুয়ে, রিও নেগ্রো এবং অন্যান্য নদীগুলির দূরবর্তী অঞ্চলগুলিতে নিজেদের সার্বভৌমত্ব ধরে রাখতে ব্রাজিল নদীকেন্দ্রিক বিশাল বাহিনী ধরে রেখেছে। একারণে ব্রাজিলের নদীভিত্তিক বাহিনী তৈরি করা হয়েছে এমনভাবে, যাতে করে তা কেন্দ্রের সরাসরি সমর্থন ছাড়াই লম্বা সময় যুদ্ধ করতে পারে। কলম্বিয়ার ব্যাপারটা আবার আলাদা। তারা তাদের দেশের অভ্যন্তরে গৃহযুদ্ধে নদীকেন্দ্রিক অঞ্চলগুলির নিয়ন্ত্রণ নিতে বর্মাবৃত প্যাট্রোল বোট এবং সৈন্য পরিবহণ জাহাজ তৈরি করেছে। মিয়ানমারের ব্যাপারটা আবার এদের দুইজন থেকে আলাদা। মিয়ানমারের দূরবর্তী উপকূলের অঞ্চলগুলিতে (মূলতঃ রাখাইন প্রদেশ) বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাত থেকে রাষ্ট্রকে বাঁচাতে তারা কার্গো এবং সেনা পরিবহণের জাহাজগুলিকে ব্যবহার করেছে। এক্ষেত্রে এই জাহাজগুলিকে উপকূলীয় অঞ্চল এবং নদী - উভয়ই পার হতে হয়েছে; ব্রাজিল এবং কলম্বিয়া থেকে যা ভিন্ন প্রকারের চ্যালেঞ্জ। তবে মিয়ানমার এবং ব্রাজিল, উভয়কেই আবার একটা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে - তাদের নদী বা উপকূলের অঞ্চলগুলি দেশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলি থেকে বহুদূরে। একারণে তাদের জন্যে বাণিজ্যিকভাবে চালু থাকা জাহাজগুলিকে সেই এলাকাগুলিতে নিয়ে কাজে লাগানোটা ছিল বেশ কষ্টসাধ্য। তাই জাহাজগুলিকে সামরিক বাহিনীর অধীনেই সার্ভিসে রাখতে হয়েছে; যা কিনা শান্তিকালীন সময়ের জন্যে বেশ ব্যয়বহুল।

বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গ – নাব্যতার বাস্তবতা

বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীতে সেনা পরিবহণের জন্যে আলাদা কোন জাহাজ নেই। তবে সরকারি এবং বেসরকারি পরিবহণ জাহাজগুলিকে দরকারে কাজে লাগানো হবে। এই দরকারটা হবে মূলতঃ যমুনা এবং পদ্মা নদী দ্বারা বিভাজিত স্থলভাগগুলিকে জোড়া দেয়ার কাজে। শুধুমাত্র বৃষ্টির সময় ছাড়া এই নদীগুলিতে নাব্যতা জঘন্য খারাপ হলেও এটাই বাংলাদেশের বাস্তবতা। আর জাতীয় নিরাপত্তার জন্যে এই নাব্যতাহীন নৌপথগুলির উপরেই নির্ভর করতে হবে। কেউ প্রশ্ন করতে পারেন যে, যমুনা সেতু, পদ্মা সেতু, লালন শাহ সেতু - এগুলির ভীড়ে এখনও জাহাজে ভ্রমণ নিয়ে কথা বলাটা প্রস্তর যুগের চিন্তা হয়ে গেলো কিনা। এর উত্তরে বলা যায় যে, ব্যালিস্টিক মিসাইল, ক্রুজ মিসাইল, গাইডেড বম্বএর যুগে দুই-তিনটা সেতুর উপর নির্ভর করে থাকাটা কি বোকার স্বর্গে বাস করা নয়? একটু চিন্তা করে দেখুন তো, যদি যমুনা নদীর উপর সেতু ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যায়, তাহলে শীতকালে, যখন যমুনা নদীতে একটা নৌকাও চালানো যায় না এবং উত্তরবঙ্গের মাটিতে সামরিক অপারেশনের জন্য সারা বছরের মাঝে সবচাইতে ভালো সময় উপস্থিত হয়, তখন দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে উত্তরবঙ্গে থাকা সেনারা দেশের বাকি অঞ্চল থেকে রসদ পাবেন কিভাবে? শুধুমাত্র বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর 'সি-১৩০' বিমান এবং 'এমআই-১৭১' হেলিকপ্টারের মাধ্যমে? এই বিমানগুলি কত হাজার সেনার রসদের সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারবে?
 

পাবনার নগরবাড়িতে সরকারি সংস্থা বিআইডব্লিউটিএ বড়সড় একটা নদীবন্দর তৈরি করছে। রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প এবং যমুনা রেলসেতুর সকল ভারি যন্ত্রপাতি মংলা বন্দর থেকে নদীপথে পরিবহণ করা হয়েছে। এটা সম্ভব করতে জায়গামতো ড্রেজিংও করা হয়েছে। কিন্তু উত্তরবঙ্গের নৌরুটগুলিকে সারাবছর চালু রাখার কোন সত্যিকারের প্রচেষ্টা আজও চোখে পড়েনি; যা উত্তরবঙ্গের, তথা বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। কাজেই চিলমারি থেকে শুরু করে পাবনার খয়েরচর পর্যন্ত সারা বছরব্যাপী নাব্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নৌরুটের জাহাজগুলিকে রক্ষা করাটা এখন অতি গুরুত্বপূর্ণ।


রাষ্ট্র চেষ্টা করছে উত্তরবঙ্গকে দেশের বাকি অংশের সাথে নৌপথে যুক্ত করতে। বর্তমানে মালামাল সরবরাহের জন্যে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর হলো সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ি। এখানে চট্টগ্রাম, মংলা এবং পায়রা বন্দর থেকে আমদানি করা জ্বালানি তেল, রাসায়নিক সার, কয়লা এবং কিছু কন্সট্রাকশন ম্যাটেরিয়াল নামানো হয়। শীতকালে এই পণ্যগুলির চাহিদা বহুগুণে বেড়ে গেলেও এই সেসময় নাব্যতা ইস্যুতে মারাত্মক সমস্যা তৈরি হয়। তখন আরিচার কাছাকাছি স্থানে পদ্মা-যমুনা নদীর মিলনস্থলে অনেক জাহাজ থেকেই মালামাল নামিয়ে দেয়া হয় ছোট বোটে। এই বোটগুলি হয় বাঘাবাড়ি অথবা পাবনা জেলার নগরবাড়ি অথবা কাজিরহাটে মালামাল নামিয়ে দেয়। অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহণ দেখাশোনা করার সংস্থা বিআইডব্লিউটিএ নগরবাড়িতে একটা বড় নদীবন্দরের কাজে হাত দিয়েছে। আবার কাজিরহাটকেও ফেরির মাধ্যমে আরিচার সাথে সংযুক্ত করেছে। নাব্যতার ইস্যুতে এই ফেরি পরিচালনা পথও মারাত্মক সমস্যায় পতিত হচ্ছে নিয়মিত। ড্রেজিং কাজ শেষ হচ্ছে না। একারণে কাজিরহাটের আরেকটা বিকল্প ঘাট করার পরিকল্পনা করছে রাষ্ট্র। তারা পাবনার একেবারে দক্ষিণ-পূর্ব কোণে রাখালগাছি পর্যন্ত একটা রাস্তা তৈরি করছে; যাতে করে এই রাস্তাকে একেবারে যমুনার পাড়ে খয়েরচরে নিয়ে গিয়ে সেখানে একটা ফেরিঘাট করা যায়। এতে করে আরিচা থেকে মাত্র আধা ঘন্টায় ফেরিতে যমুনা নদী পার হওয়া যাবে। এছাড়াও পাবনার দক্ষিণে নাজিরগঞ্জে আরেকটা ফেরিঘাট তৈরি করা হয়েছে রাজবাড়ী জেলার ধাওয়াপাড়া-জৌকুড়া-এর সাথে সংযুক্ত করার জন্যে। এখানেও নাব্যতা মারাত্মক একটা ইস্যু। বাঘাবাড়ি, নগরবাড়ি, কাজিরহাট, খয়েরচর, এবং নাজিরগঞ্জ – এই সবগুলিই উত্তরবঙ্গকে নৌপথে যুক্ত করার রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টার অংশ; আর এগুলি সবগুলিই যমুনা সেতুর দক্ষিণে।

যমুনা সেতুর উত্তরে নাব্যতা আরও ভয়াবহ। ১) ২০২১ সালের অগাস্টে বগুড়ার সারিয়াকান্দি থেকে জামালপুরের মাদারগঞ্জের জামথল পর্যন্ত লঞ্চ সার্ভিস চালু করে সরকারি কোম্পানি বিআইডব্লিউটিসি। এই রুট চালু করতে সরকারি সংস্থা বিআইডব্লিউটিএ ড্রেজিং চালালেও তারা শেষ পর্যন্ত এই সার্ভিসটাকে বছরের কয়েক মাসের জন্যে ছেড়ে দেয়। অর্থাৎ যখন যথেষ্ট নাব্যতা থাকবে, তখন নৌযান চলবে; বাকি সময় চলবে না। ২) এরও উত্তরে গাইবান্ধার বালাসি ঘাটের সাথে যুক্ত করা হয়েছে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের বাহাদুরাবাদ ঘাটকে। নাব্যতার মারাত্মক ইস্যুর মাঝেও ব্রিটিশ আমল থেকে এখানে রেল ফেরি চালু ছিল ২০০১ সাল পর্যন্ত। ২০০৫ সালে যমুনা সেতুতে রেললাইন বসানো শেষ হলে এই রেল ফেরি নতুন করে চালু হবার সম্ভাবনাটুকুও শেষ হয়ে যায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি সংস্থা বিআইডব্লিউটিএ বিশাল অংকের অর্থ ব্যয় করে বালাসি এবং বাহাদুরাবাদে নৌ-টার্মিনাল তৈরি করে। ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে এই রুটে নতুন করে নৌযান চলাচল শুরু করা হয়। কিন্তু কিছুদিনের মাঝেই বোঝা যায় যে, এই রুটটাও নাব্যতা থাকলে সরকার তা ব্যবহার করবে; অন্য সময় ব্যবহার করবে না। তবে আশার কথা হলো, পানি কমলেও এই রুট ব্যবহৃত হচ্ছে। মানুষ পারাপারে ছোট মোটর নৌকা এবং স্পীডবোট ব্যবহৃত হচ্ছে; আর মালামাল বহণে বড় কার্গো বোট ব্যবহৃত হচ্ছে। বিআইডব্লিউটিএ-এর ড্রেজারগুলি এখানে ঘাঁটি গেড়েছে; যদিও তাদের সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ৩) বালাসিরও উত্তরে রয়েছে কুড়িগ্রামের পুরোনো বিখ্যাত নদীবন্দর চিলমারি। বর্ষাকালে এখানে পানি থাকে; কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে যেকোন নৌযানের জন্যেই এই বন্দর ব্যবহার খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রায় পাঁচ দশক পর এই নদীবন্দরের সীমিত কর্মকান্ড শুরু হয়। আর ২০২৩এর অক্টোবরে এই বন্দরের রমনায় একটা ফেরিঘাট চালু করা হয়; যা যমুনার পূর্ব তীরে রৌমারির সাথে সংযুক্ত হয়। কিছুদিন সেখানে সরকারি কোম্পানি বিআইডব্লিউটিসি-এর ফেরিও চলেছে। তবে সকলেই বুঝে গেছে যে, সেটাও নাব্যতাকে জয় করে নয়। ২০১৬ সালে নেওয়া চিলমারী নৌবন্দর প্রকল্প ২০২৪ সালেও জমি অধিগ্রহণের মাঝে আটকে রয়েছে।

সরকারি নৌযানের দৈন্যতা

সরকারি কোম্পানি বিআইডব্লিউটিসি-র অধীনে অভ্যন্তরীণ রুটের বেশকিছু যাত্রীবাহী জাহাজ রয়েছে, যেগুলি প্রয়োজনের সময়ে সামরিক কাজে ব্যবহার করা যাবে। এর মাঝে রয়েছে ২০১৪-১৫এর দিকে তৈরি করা অত্যাধুনিক জাহাজ 'মধুমতি' এবং 'বাঙ্গালী'। এই জাহাজগুলি প্রায় ৭৬মিঃ লম্বা, সাড়ে ১২মিঃ প্রস্থের এবং ১,৭৩৪টন ওজনের। এই জাহাজগুলিতে ৭৫০ জনের মতো যাত্রী বহণ করা যায়। নতুন এই দু'টা জাহাজ ছাড়াও বিআইডব্লিউটিসি-র অধীনে রয়েছে অতি পুরাতন (তবে এখনও কর্মক্ষম) কয়েকটা প্যাডেল স্টিমার। এই জাহাজগুলি বহুকাল ধরে ঢাকা থেকে বরিশাল হয়ে মোরেলগঞ্জ পর্যন্ত রকেট-স্টীমার হিসেবে সার্ভিস দিয়েছে। এছাড়াও ১৯৮২ সালে রেলওয়ের জন্যে তৈরি 'এমভি সোনারগাঁও'কে খুলনা শিপইয়ার্ডে ব্যাপকভাবে পরিবর্তন করে ২০০৯ সালে রকেট-স্টীমার সার্ভিসে যুক্ত করা হয়। ৭০মিঃ লম্বা এই জাহাজটার ধারণক্ষমতা ৮০০। ২০১২ সাল পর্যন্ত কাগজে-কলমে হলেও ৬টা জাহাজ মিলে ৪,১২২ জন যাত্রী বহণ করতে পারতো। 'এমভি শ্যালা' বহণ করতে পারতো ৩৯৫ জন। ১৯২৮ সালে কোলকাতায় নির্মিত 'এমভি অসট্রিচ' এবং 'এমভি মাসউদ' এই জাহাজগুলির মাঝে সবচাইতে বড়; একেকটার ধারণক্ষমতা ৯৬০ জন। 'এমভি অসট্রিচ', ‘এমভি মাসউদ', ‘এমভি লেপচা' এবং 'এমভি টার্ন' একত্রে বহণ করতে পারতো ২,৮১০ জন যাত্রী। এই জাহাজগুলিকে ১৯৭৮, ১৯৮২, ১৯৯৫ এবং ২০০২ সালে ডিজেল ইঞ্জিন সংযোজনসহ ব্যাপকভাবে আধুনিকায়ন করা হয়। আশ্চর্য্য ব্যাপার হলো বহু পুরোনো হলেও এই জাহাজগুলির জ্বালানি খরচ ঘন্টায় মাত্র ৮৫ থেকে ৯৫ লিটার; যেখানে নতুন তৈরি করা অত্যাধুনিক 'মধুমতি' এবং 'বাঙ্গালী' ঘন্টায় প্রায় ২০০ লিটার জ্বালানি খরচ করে। এই জাহাজদু'টার মতোই আরও দু'টা জাহাজ তৈরি হচ্ছিলো ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডে। কোম্পানিটা দেউলিয়া হয়ে যাওয়ায় দু'টা জাহাজই অর্ধ-সমাপ্ত হয়ে পড়ে আছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্যে নির্মীয়মান দু'টা ৬৪মিঃ লম্বা ট্যাংক ল্যান্ডিং ক্রাফটও (একেকটা ৮টা ট্যাংক এবং ২৪০ জন সেনা বহণে সক্ষম) সেখানে অর্ধ-সমাপ্ত আকারে আটকে গেছে। অর্থাৎ এক শিপইয়ার্ডেই রাষ্ট্রের চারটা গুরুত্বপূর্ণ পরিবহণ জাহাজ অসমাপ্ত আকারে আটকে গেছে।

পদ্মা সেতু চালুর পর ঢাকা থেকে বরিশাল রুটে যাত্রী একেবারেই কমে যায়। লোকসান সামলাতে না পেরে ২০২২এর ১৭ই সেপ্টেম্বর বিআইডব্লিউটিসি তাদের ১৫০ বছরের রকেট-স্টীমার সার্ভিসের ইতি টানে। শেষ ট্রিপে ঢাকা থেকে বরিশাল গিয়েছিল ১০৪ জন; আর বরিশাল থেকে ঢাকা এসেছিল মাত্র ২৮ জন। বিআইডব্লিউটিসি এই জাহাজগুলিকে নিয়ে কি করবে, সেটা বুঝতে পারছে না। বেসরকারি মালিকরা তাদের জাহাজ কেটে ফেললেও সরকারি কোম্পানি হিসেবে বিআইডব্লিউটিসি এটা করতে পারবে না। বিআইডব্লিউটিসি-র বেশিরভাগ জাহাজই এখন নামমাত্র মূল্যে বেসরকারি খাতে লীজ দিয়ে দেয়া হচ্ছে। এগুলি এখন হয় বিভিন্ন রুটে (যেমন সেন্ট মার্টিনস) পর্যটক বহণ করছে; নতুবা ভাসমান রেস্তোঁরা হিসেবে নাম নিয়েছে।

আবার, পদ্মা সেতু চালু হবার পরই মিডিয়াতে আসা শুরু করে যে, বিআইডব্লিউটিসি সড়কপথে চলা গাড়ি পদ্মা নদী পার করেই তাদের বেশিরভাগ আয় করতো। পদ্মা সেতু চালুর সাথেসাথেই কোম্পানির ফেরিগুলির ব্যবহার ব্যাপকভাবে কমে যায় এবং আয়ও একেবারেই পড়ে যায়। আশ্চর্য্য ব্যাপার হলো বাংলাদেশের ম্যারিটাইম সেক্টরের সরকারি কোম্পানি সড়কপথের উপরে নির্ভরশীল! সড়কপথে গাড়ি বাড়লে তাদের আয় বাড়ে; আবার নদীর উপরে সেতু তৈরি হয়ে গেলে তাদের আয় পড়ে যায়! ৪০ থেকে ৫০টার মতো ফেরি রয়েছে এই কোম্পানির; যেগুলি তাদের আয়ের মূল উৎস। তবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, এই ফেরিগুলি সামরিক গাড়ি পরিবহণের একটা বড় মাধ্যম। বিভিন্ন সামরিক মহড়ার সময় এই ফেরিগুলি সামরিক গাড়ি পারাপার করে তাদের গুরুত্ব দেখিয়ে দেয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শান্তিকালীন সময়েই যদি এই ফেরিগুলির ব্যবহার ফুরিয়ে যায়, তাহলে আপদকালীন সময়ে এগুলিকে কি আর পাওয়া যাবে? বেশিরভাগ ফেরির বয়সই ৪০ বছরের বেশি। পুরোনো ফেরিগুলি যদি কেটে ফেলা হয়; তাহলে তাদের স্থলে নতুন ফেরি কি আদৌ তৈরি হবে? অনেকেই তখন যুক্তি তুলে ধরবেন – এতগুলি সেতু তৈরি করা হয়েছে; ফেরি তৈরির প্রয়োজন কি রয়েছে?

সরকারি কোম্পানি বিআইডব্লিউটিসি-র যাত্রীবাহী জাহাজ 'এমভি বাঙ্গালী' সেন্ট মার্টিনস দ্বীপে যাচ্ছে পর্যটক নিয়ে। পদ্মা সেতু চালুর পর ঢাকা থেকে বরিশাল রুটে যাত্রী একেবারেই কমে যায়। বেসরকারি মালিকরা তাদের জাহাজ কেটে ফেললেও সরকারি কোম্পানি হিসেবে বিআইডব্লিউটিসি এটা করতে পারবে না। বিআইডব্লিউটিসি-র বেশিরভাগ জাহাজই এখন নামমাত্র মূল্যে বেসরকারি খাতে লীজ দিয়ে দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীতে সেনা পরিবহণের জন্যে আলাদা কোন জাহাজ নেই। তবে সরকারি এবং বেসরকারি পরিবহণ জাহাজগুলিকে দরকারে কাজে লাগানো হবে। এই দরকারটা হবে মূলতঃ যমুনা এবং পদ্মা নদী দ্বারা বিভাজিত স্থলভাগগুলিকে জোড়া দেয়ার কাজে।


বাংলাদেশ প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তানের পথেই হাঁটছে। এই পথটা হলো, সড়কপথের উপর অতি-নির্ভরশীলতা। বাংলাদেশের মানুষের মাঝে একটা চিন্তা বহুদিন ধরেই ঢোকানো হয়েছে – একটা এলাকা খুবই দুর্গম বলে ধরে নেয়া হয়, যদি সেখানে গাড়ি যাবার রাস্তা না থাকে। মানুষকে বলতে শোনা গিয়েছে, “এলাকাটা এতই ব্যাকওয়ার্ড যে নৌকা দিয়ে যেতে হয়"। অথচ তারা একবার চিন্তাও করে দেখেনি যে নৌপথে যাতায়ত হলো সবচাইতে সাশ্রয়ী; আর সড়কপথ হলো সবচাইতে ব্যয়বহুল। একারণেই বাংলাদেশের সকল ভারি শিল্প গড়ে উঠেছে এমন সকল নদীর পাড়ে, যেখানে সারাবছর ড্রেজিং ছাড়াই যথেষ্ট নাব্যতা থাকে। পদ্মা এবং যমুনা নদীতে যথেষ্ট নাব্যতা না থাকার কারণেই উত্তরবঙ্গে গড়ে ওঠেনি ভারি শিল্প। এবং আজও ভারি জিনিসপত্র উত্তরবঙ্গে নিয়ে যাওয়া একটা চ্যালেঞ্জ। তবে রাষ্ট্রের সদিচ্ছা একটা বড় ব্যাপার; কারণ সেটা নির্ধারণ করে দেয় যে, কোন ব্যাপারটা বেশি গুরুত্ব পাবে। একারণেই রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প এবং যমুনা রেলসেতুর সকল ভারি যন্ত্রপাতি মংলা বন্দর থেকে নদীপথে পরিবহণ করা হয়েছে। এটা সম্ভব করতে জায়গামতো ড্রেজিংও করা হয়েছে। কিন্তু উত্তরবঙ্গের নৌরুটগুলিকে সারাবছর চালু রাখার কোন সত্যিকারের প্রচেষ্টা আজও চোখে পড়েনি; যা উত্তরবঙ্গের, তথা বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। কাজেই চিলমারি থেকে শুরু করে পাবনার খয়েরচর পর্যন্ত সারা বছরব্যাপী নাব্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নৌরুটের জাহাজগুলিকে রক্ষা করাটা এখন অতি গুরুত্বপূর্ণ। একবার স্ক্র্যাপ হয়ে গেলে এই জাহাজগুলিকে নতুন করে তৈরি করতে কয়েক বছর লেগে যাবে। ভূরাজনীতি বাংলাদেশের জন্যে থেমে থাকবে না! বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে বাংলাদেশের ঘুমিয়ে থাকার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ সর্বদাই নিরাপদে থাকবে - এই চিন্তাখানা যে ভিত্তিহীন, তা আজকে প্রমাণিত। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মাঝে 'গ্রেট পাওয়ার' প্রতিযোগিতায় এটা পরিষ্কার যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্ররোচনাতেই চীন-ভারত সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়বে। আর সেক্ষেত্রে ভারতের 'চিকেন নেক'এর উপর যেমন হুমকি তৈরি হবে, তেমনি দিল্লী এবং ওয়াশিংটনের দিকে থেকে হুমকি সৃষ্টি হবে বাংলাদেশের উপর; যদি বাংলাদেশ ভারতের সামরিক বাহিনীকে পদ্মা সেতু, যমুনা সেতু এবং মাতারবাড়ি বন্দর ব্যবহার করার অনুমতি না দেয়।




সূত্রঃ

‘২৫ কোটি টাকা দামের লঞ্চ বিক্রি হচ্ছে কেজি দরে!’, ইত্তেফাক, ০২ অক্টোবর ২০২২

‘বরিশাল-ঢাকা নৌপথে যুক্ত হলো বড় লঞ্চ সুন্দরবন-১৬' প্রথম আলো, ১৮ নভেম্বর ২০২২

‘মিস করব সবসময় বরিশালের জনপ্রিয় কীর্তনখোলা ২ লঞ্চকে' ২৫ এপ্রিল ২০২৪ (https://www.youtube.com/watch?v=fJnrOibH1lk)

‘লিফট-সিসিইউ সুবিধাসহ সুন্দরবন-১১ এর যাত্রা', ঢাকা টাইমস, ১৯ অগাস্ট ২০১৭

‘পটুয়াখালী-ঢাকা নৌরুটে চারতলা নতুন লঞ্চ ‘সুন্দরবন-১৪’, BanglaNews24, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০

‘লিফট ও সিসিইউ সুবিধা নিয়ে আসছে সুন্দরবন-১০', BanglaNews24, ২০ জুন ২০১৬

‘কীর্তনখোলা-১০ লঞ্চের উদ্বোধন', BanglaNews24, ২১ মার্চ ২০১৮

‘ঢাকা-পটুয়াখালী নৌপথে চালু হচ্ছে বিলাসবহুল চার তলা লঞ্চ', JagoNews24, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০

‘New vessels now albatross around BIWTC's neck’ in The Financial Express, 19 May 2018

‘BIWTC MV Bangali and Modhumoti’ in Western Marine (https://www.wms.com.bd/biwtc-mv-bangali-and-modhumoti/)

‘Rocket-steamer service: 150-year-old tradition abandoned due to loss’ in Dhaka Tribune, 14 January 2023

‘State-run steamer service in bad shape’ in The Daily Star, 16 August 2012

‘২৫ বছর পর নাজিরগঞ্জ-ধাওয়াপাড়া রুটে বড় ফেরি', ডেইলি স্টার বাংলা, ০২ জানুয়ারি ২০২৩

‘যমুনা সেতুর বিকল্প হবে আরিচা-কাজিরহাট ফেরি রুট: নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী', বাংলা ট্রিবিউন, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১

‘বগুড়া-জামালপুর নৌ পথে বৃহস্পতিবার থেকে ফেরি চলাচল শুরু', বাংলা ট্রিবিউন, ১১ অগাস্ট ২০২১

‘বাহাদুরাবাদ ঘাটে ফেরিতে ট্রেন পারাপার', BanglaVision, 08 September 2022

‘২২ বছর পর বালাসী-বাহাদুরাবাদ নৌপথে লঞ্চ চলাচল শুরু', BDNews24, ০৯ এপ্রিল ২০২২

‘নতুন সরকারি জাহাজ 'এমভি সোনারগাঁর' যাত্রা শুরু', BDNews24, ১৭ নভেম্বর ২০০৯

‘অস্ট্রিচও সোনারগাঁওয়ের পথে', দৈনিক ইনকিলাব, ১৯ জুলাই ২০১৮

‘৬৪ কোটি টাকা খরচেও মেলেনি নৌযান', যুগান্তর, ১০ মার্চ ২০২২

‘সেনাবাহিনীর জন্য দুটি ট্যাংক ক্যারিয়ার বানাচ্ছে ওয়েস্টার্ন মেরিন', কালের কন্ঠ, ০৫ জুলাই ২০১৭

‘পদ্মা সেতু চালুর পর বিআইডব্লিউটিসি’র আয় ২৭ শতাংশ কমেছে', সমকাল, ২০ ডিসেম্বর ২০২২

‘আশঙ্কাজনক হারে কমেছে বিআইডব্লিউটিসির আয়', সাম্প্রতিক দেশকাল, ২০ ডিসেম্বর ২০২২

‘আয়ের উৎস ধরে রাখতে মরিয়া বিআইডব্লিউটিসি', প্রতিদিনের সংবাদ, ২৫ এপ্রিল ২০২৪

Monday, 12 February 2024

মিয়ানমারে রাষ্ট্রীয় দুর্যোগ – প্রতিবেশী বাংলাদেশের সামনে অপশন

১২ই ফেব্রুয়ারি ২০২৪

বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের হাতে আটক হওয়া অকটেন এবং সয়াবিন তেলের বিশাল চালান। চোরাচালানের ধরণ দেখিয়ে দিচ্ছে যে, রাখাইনের এই বিদ্রোহী গ্রুপগুলি লজিস্টিক্যাল সমস্যায় ভুগছে। বিশেষ করে সরকারের কাছ থেকে দখল করা যানবাহণ চালাবার জন্যে পেট্রোল বা অকটেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নৌযান চালানোর জন্যে ব্যবহৃত ডিজেল এবং বিদ্রোহী সেনাদের খাবার রান্নার জন্যে খাবার তেল এবং মসলা-জাতীয় পণ্যের সরবরাহের ব্যাপক ঘাটতি দৃশ্যমান।


তেল, পিঁয়াজ, আদা, রসুন!

সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক শিরোনাম হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সীমান্তে গোলাগুলি, গুলিতে হতাহত মানুষ, সীমান্ত ছাড়িয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মর্টার ও রকেট, শতশত মিয়ানমার সামরিক সদস্যের বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড বা বিজিবির কাছে অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ, বিজিবির হাতে মিয়ানমারের সশস্ত্র বেসামরিক ব্যাক্তির গ্রেপ্তার, ইত্যাদি সংবাদ হেডলাইন হয়েছে। তবে অপেক্ষাকৃত কম জানাজানি হয়েছে মিয়ানমার সীমান্তে চোরাচালানের ধরণ পরিবর্তনের গল্প। যে ব্যাপারটা এতকাল জানাই ছিলো তা হলো, মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে ইয়াবা, গাঁজা, ক্রিস্টাল মেথ ইত্যাদি মাদক। আর এর পেমেন্ট হয় ভারতের সাথে কুষ্টিয়া ও যশোর সীমান্ত দিয়ে স্বর্ণের মাধ্যমে। তবে এবার মিয়ানমারের মাদকের পেমেন্ট দেয়া হচ্ছে মিয়ানমার সীমান্ত দিয়েই – বিভিন্ন পণ্যের মাধ্যমে। এই পণ্যের মাঝে প্রথমেই রয়েছে জ্বালানি তেল (অকটেন এবং ডিজেল), খাবার তেল (সয়াবিন), এবং আরও কিছু মসলা-জাতীয় খাবার; যেমন পিঁয়াজ, আদা, রসুন। ডিসেম্বর-জানুয়ারির মাঝে একমাসে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছে সাড়ে ৭ টনের বেশি অকটেন এবং প্রায় ৪ টনের মতো সয়াবিন তেল। গত ২৫শে ডিসেম্বর একদিনে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের হাতে ধরা পড়েছে ১৮'শ লিটার অকটেন, ৩৭'শ লিটার সয়াবিন তেল এবং ১'শ ৩৬ লিটার ডিজেল।

এই মালামালগুলি মিয়ানমারে কাদের হাতে যাচ্ছে? মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বিজিপির ৩'শ ৩০ জন সদস্যের বাংলাদেশে পালিয়ে আসার কাহিনীই বলে দিচ্ছে যে, বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমারের সীমান্ত এখন কাদের দখলে। মিয়ানমারের সরকারি এই সেনারা মিয়ানমারের অভ্যন্তরে পালাতে পারেনি; তাই বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। আর তাদের সংখ্যা বলে দিচ্ছে যে, বিদ্রোহী গ্রুপের সামরিক শক্তি কতটুকু। তবে একইসাথে চোরাচালানের ধরণ দেখিয়ে দিচ্ছে যে, রাখাইনের এই বিদ্রোহী গ্রুপগুলি লজিস্টিক্যাল সমস্যায় ভুগছে। বিশেষ করে সরকারের কাছ থেকে দখল করা যানবাহণ চালাবার জন্যে পেট্রোল বা অকটেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নৌযান চালানোর জন্যে ব্যবহৃত ডিজেল এবং বিদ্রোহী সেনাদের খাবার রান্নার জন্যে খাবার তেল এবং মসলা-জাতীয় পণ্যের সরবরাহের ব্যাপক ঘাটতি দৃশ্যমান। ব্যাপারটা এমন নয় যে, রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এই ঘাটতিগুলি ছিল না। বরং মিয়ানমার সরকার নিজস্ব লজিস্টিকস ব্যবস্থায় এই ঘাটতিগুলি পূরণ করতে পারতো। বিদ্রোহীরা রাখাইনের বড় অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিলেও লজিস্টিকসের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে নেই; যা কিনা যুদ্ধের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে।

রাখাইনে বিদ্রোহী গ্রুপের হাতে দখল হওয়া সেনাবাহিনীর বিপুল পরিমাণ অস্ত্র। যেকোন সশস্ত্র বিদ্রোহ বা ইনসার্জেন্সিকে এগিয়ে নিতে হলে যে শর্তগুলি পূরণ আবশ্যকীয়, তার মাঝে একটা হলো বাইরের কোন শক্তির সমর্থন। এই সমর্থন হতে হবে রাজনৈতিক, সামরিক, আর্থিক এবং লজিস্টিক্যাল। বাইরের সমর্থন ছাড়া যেকোন সশস্ত্র সংগ্রাম বেশিদূর এগুতে পারে না।




সশস্ত্র বিদ্রোহ বা ইনসার্জেন্সির স্বরূপ

যেকোন সশস্ত্র বিদ্রোহ বা ইনসার্জেন্সিকে এগিয়ে নিতে হলে যে শর্তগুলি পূরণ আবশ্যকীয়, তার মাঝে একটা হলো বাইরের কোন শক্তির সমর্থন। এই সমর্থন হতে হবে রাজনৈতিক, সামরিক, আর্থিক এবং লজিস্টিক্যাল। বাইরের সমর্থন ছাড়া যেকোন সশস্ত্র সংগ্রাম বেশিদূর এগুতে পারে না। একারণেই বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলি হয় বাইরের সমর্থনে সংগ্রাম শুরু করে অথবা কোন এক সময় বাইরের সমর্থন খোঁজে। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় বাহিনী যখন বিদ্রোহীদেরকে কোণঠাসা করে ফেলতে উদ্যত হয়, তখন বিদ্রোহীরা বাইরের, বিশেষ করে রাষ্ট্রের সীমান্তের সাথে লাগোয়া অন্য রাষ্ট্রগুলির সমর্থন চায়। সেই রাষ্ট্র হয় জাতিরাষ্ট্রের সীমানার কনসেপ্টকে মেনে চলে অথবা সেটাকে ভেঙ্গে ফেলে। ১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফালিয়ান চুক্তির আওতায় লিপিবদ্ধ করা জাতিরাষ্ট্রের কনসেপ্টগুলির একটা হলো, একটা রাষ্ট্র অপর রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সীমানাকে মেনে চলবে এবং সেই রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না।

এই কনসেপ্টগুলি অনুযায়ী জাতিরাষ্ট্রের বাউন্ডারিগুলি আজও পরিচালিত হলেও নিয়মগুলিকে নিয়মিতই বাঁকানো হয়েছে। তবে সেটা মূলতঃ সম্ভব হয়েছে জাতিরাষ্ট্রের কনসেপ্টগুলিকে লালন-পালন করা শক্তিশালী দেশগুলির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদে। শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলির মদদ ছাড়া বাকি রাষ্ট্রগুলি জাতিরাষ্ট্রের কনসেপ্টগুলিকে বাঁকানোর সাহস করেনি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় উসমানি খিলাফত থেকে আলাদা হবার জন্যে আরবদেরকে সামরিক সহায়তা দিয়েছিল ব্রিটেন। 'লরেন্স অব এরাবিয়া' নামে মুভি তৈরি করে এই ব্যাপারটাকে পরবর্তীতে জনপ্রিয়তা দেয়া হয়েছিলো। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্মের সময় ভারতের পিছনে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রত্যক্ষ এবং ব্রিটেনের পরোক্ষ মদদ ছিলো। ১৯৮০এর দশকে আফগান মুজাহিদদের সহায়তা দেয়া পাকিস্তানের পিছনে যুক্তরাষ্ট্রের মদদ ছিলো। শ্রীলংকার তামিল বিদ্রোহীদের ভারতীয় সমর্থনের পিছনে ইউরোপিয়দের মদদ ছিলো। ভিয়েতনাম যুদ্ধে দক্ষিণ ভিয়েতনামের বিদ্রোহীদের পিছনে উত্তর ভিয়েতনামের সরাসরি সমর্থন সম্ভব হয়েছিলো সোভিয়েত ইউনিয়নের কারণে। ১৯৬০এর দশকে নাইজেরিয়ার বায়াফ্রা বিদ্রোহীদেরকে বড় কোন রাষ্ট্র সরাসরি মদদ না দিলেও ক্যাথোলিক সংগঠনগুলির মাধ্যমে পরোক্ষ মদদ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, আয়ারল্যান্ড এবং আরও কিছু দেশ।

তবে এক্ষেত্রে সীমান্তবর্তী দেশগুলির অবস্থান হয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সীমান্ত হলো লজিস্টিক্যাল সহায়তা পাবার একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। এছাড়াও রাষ্ট্রের যদি সমুদ্রসীমা থাকে, তাহলে বিদ্রোহীরা সেই সমুদ্রসীমা ব্যবহার করেও লজিস্টিক্যাল সহায়তা পেতে পারে। যেমন, শ্রীলংকার তামিল বিদ্রোহীরা গভীর সমুদ্রে অবস্থান করা জাহাজ থেকে ছোট ছোট বোটে করে সাপ্লাই আনার ব্যবস্থা করতো। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে বিমান পথেও এটা সম্ভব। যেমন, বায়াফ্রা যুদ্ধের সময় নাইজেরিয়ার সামরিক বাহিনী বায়াফ্রা অঞ্চলের সমুদ্রসীমা দখলে নিয়ে নিলে বিমানের মাধ্যমে সহায়তা দেয়া হতো। এতে সাপ্লাই নিয়ে অবতরণের সময় নাইজেরিয় বাহিনীর গুলিতে বহু পরিবহণ বিমান ভূপাতিত হয়েছিল।



মিয়ানমারের ভৌগোলিক এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

মিয়ানমারের সশস্ত্র বিদ্রোহগুলির বেশিরভাগই অনেক পুরোনো। এই লেখার উদ্দেশ্য নয় এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলির ইতিহাসের চুলচেরা বিশ্লেষণ। বরং এখানে যে ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, বিদ্রোহী গ্রুপগুলির কে কার কাছ থেকে রাজনৈতিক এবং লজিস্টিক্যাল সহায়তা পাচ্ছে, সেটা খুঁজে দেখা। কারণ এই সহায়তা দেয়ার পিছনে একটা রাষ্ট্রের কিছু রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল হয়। মিয়ানমার একটা কৃত্রিম রাষ্ট্র; যা ব্রিটিশরা তৈরি করেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। এই রাষ্ট্রের বাউন্ডারিগুলি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে করে আশেপাশের রাষ্ট্রগুলির সাথে এই রাষ্ট্রের বিভিন্ন দ্বন্দ্ব লেগে থাকে। মিয়ানমারের আয়তন বিশাল; কিন্তু সীমান্তবর্তী এলাকার সাথে রাজধানী এবং এর আশেপাশের এলাকাগুলির যোগাযোগ দুর্গম। দেশের একটা বড় অঞ্চল বনভূমি এবং পাহাড়ি; যার মাঝ দিয়ে গিয়েছে প্রচুর নদনদী। প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে মিয়ানমারে সারাবছর ধরে স্থল পরিবহণ বেশ কঠিন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিয়ানমার ছিল জাপানি বাহিনীর সাথে ব্রিটিশ এবং তার মিত্রদের একটা ফ্রন্ট। প্রায় চার বছর ধরে মিয়ানমারে যুদ্ধ চলেছে। যুদ্ধে শত্রুর গুলির চাইতে বেশি সেনা হতাহত হয়েছে মিয়ানমারের বৈরী পরিবেশের কারণে। এটা সবচাইতে খারাপ যুদ্ধক্ষেত্রগুলির মাঝে একটা বলে ইতিহাতে পরিচিত। উভয় পক্ষই দুই লক্ষাধিক সেনা হারিয়েছে। আর বার্মিজরা হারিয়েছে প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ।


রাখাইন প্রদেশের লজিস্টিক্যাল বাস্তবতা

মিয়ানমারের বাকি অংশ থেকে আরাকান বা রাখাইন ভৌগোলিকভাবে আলাদা। এর কারণ হলো আরাকান পর্বত; যা কিনা হিমালয়ের একটা শাখা। প্রায় সাড়ে ৯'শ কিঃমিঃ লম্বা এই পর্বতের সর্বোচ্চ উচ্চতা ১০ হাজার ফুট। এই পর্বতের মাঝ দিয়ে যাবার রাস্তা মাত্র দু'টা। মূলতঃ এই দু'টা রাস্তার মাধ্যমেই রাখাইন রাজ্য বাকি মিয়ানমারের সাথে যুক্ত। রাজধানী নে-পি-দো থেকে সড়কপথে রাখাইনের মূল শহর সিতওয়ে (প্রাক্তন আকিয়াব) যাওয়া যায় এই দুই পথের একটা দিয়ে। সাধারণ হিসেবে সাড়ে ৬'শ কিঃমিঃ এই রাস্তা পাড়ি দিতে ১৪ ঘন্টারও বেশি সময় লাগে। প্রাক্তন রাজধানী রেঙ্গুন (যা ১ হাজার কিঃমিঃ দূরে) থেকে সড়কপথে সিতওয়ে আসতে লাগে কমপক্ষে সাড়ে ১৮ ঘন্টা। এর মাঝে আবার রাখাইন রাজ্যে রয়েছে বড় কয়েকটা নদী; যেগুলির উপর দিয়ে সেতুর সংখ্যা সীমিত। এই দুর্গম পরিবহণ ব্যবস্থার কারণে রাখাইনের সাথে বাকি মিয়ানমারের মূল যোগাযোগ হয় সমুদ্রপথে। রাখাইনের রয়েছে ৪'শ কিঃমিঃএর বেশি লম্বা সমুদ্রতট; যেখানে রয়েছে কয়েকটা সুমুদ্রবন্দর। রাখাইনের সিতওয়ে এবং কিউকপিউ বন্দরে জাহাজ আসে রেঙ্গুন থেকে। মাঝে মাঝে জাহাজগুলি নাফ নদী দিয়ে মংডু পর্যন্তও যায়। এসব কারণেই ১৯৯০এর দশক থেকে মিয়ানমার তার নৌবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করতে সক্রিয় হয়েছে। আন্তর্জাতিক অবরোধ এবং নিজস্ব সামরিক ইন্ডাস্ট্রির সক্ষমতার কারণে মিয়ানমার তার নৌবাহিনীর বেশিরভাগ জাহাজ নিজেরাই তৈরি করেছে। রাখাইন রাজ্যকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই নৌসক্ষমতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সেনা এবং রসদ পরিবহণ করার জন্যে মিয়ানমার নৌবাহিনীর ৮টার মতো পুরোনো সেনা পরিবহণ এবং ৫টা মালামাল পরিবহন জাহাজ রয়েছে। এই জাহাজগুলি রাখাইনের বন্দরগুলিতে ভিড়তে পারে। তবে বন্দরের বাইরে সমুদ্রতট ব্যবহার করে রসদ নামাবার জন্যে মিয়ানমার নৌবাহিনীর হাতে রয়েছে পুরোনো ১০টা ল্যান্ডিং ক্রাফট; এবং ২০০৫ থেকে ২০২০ সালের মাঝে নিজেদের দেশে তৈরি করা ২৬টা ল্যান্ডিং ক্রাফট। নতুন ২৬টা ল্যান্ডিং ক্রাফট একত্রে ৬৪টা সাঁজোয়া যান বহণে সক্ষম। তবে রাখাইনকে নিয়ন্ত্রণে মিয়ানমারের সবচাইতে বড় পদক্ষেপ ছিল প্রায় ১৫ হাজার টনের বিশাল উভচর যুদ্ধজাহাজ 'মোয়াত্তামা'। ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক অবরোধকে হাসিঠাট্টার খোরাক বানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু রাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়া এই জাহাজটা মিয়ানমারকে হস্তান্তর করে। এই জাহাজ একসাথে ৩৫টার মতো সামরিক গাড়ি, সাড়ে ৩'শ সেনা এবং ২টা ল্যান্ডিং ক্রাফট বহণ করে। তবে স্বল্প দূরত্বের জন্যে এই জাহাজ আরও অনেক বেশি সেনা বহণ করতে পারে। সেনা এবং রসদ বহণের সক্ষমতা ছাড়াও মিয়ানমারের নৌবাহিনীর হাতে রয়েছে ৫টা ফ্রিগেট, ৩টা কর্ভেট, ৪টা ওপিভি; যেগুলি দীর্ঘ সময় ধরে সমুদ্রে টহল দিতে সক্ষম। এর বাইরেও তাদের রয়েছে উপকূলের কাছাকাছি টহল দেয়ার মতো বহু ছোট ছোট প্যাট্রোল বোট। এই জাহাজগুলি অন্ততঃ কাগজে কলমে হলেও রাখাইনের উপকূলকে অবরোধ দেয়ার সক্ষমতা রাখে। রাখাইনের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলির সমুদ্রপথে বাইরে থেকে সহায়তা পেতে হলে মিয়ানমার নৌবাহিনীর চোখকে ফাঁকি দিতে হবে। আর সেটা কষ্টকর হলে রাখাইনের সাথে যে দেশগুলির স্থল সীমান্ত রয়েছে, সেই দেশগুলির সরাসরি বা পরোক্ষ সহায়তা চাইবে। কারণ আরাকান পর্বত পারি দিয়ে মিয়ানমারের অন্যান্য অঞ্চল ঘুরে রাখাইনে খুব কমই রসদ আসা সম্ভব। আর বাস্তবতা হলো, রাখাইনের সাথে স্থলসীমান্ত রয়েছে শুধুমাত্র বাংলাদেশের। উত্তরে বাংলাদেশ, পূর্বে আরাকান পর্বত, পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর – এর মাঝেই হলো রাখাইন।

রাখাইনের কিউকপিউ-তে চীন একটা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছে; যেখানে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা তেলের জাহাজগুলি তেল খালাস করবে এবং এই তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে চীনে পৌঁছাবে। এর ফলে মার্কিন-নিয়ন্ত্রিত মালাক্কা প্রণালিকে বাইপাস করে চীন মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল আমদানি করতে পারবে। যদিওবা এর পরিমাণ চীনের চাহিদার তুলনায় তেমন কিছুই নয়; তথাপি 'গ্রেট পাওয়ার' প্রতিযোগিতার মাঝে এর গুরুত্ব যথেষ্ট। চীন এই প্রকল্পগুলি হাতে নেবার পর থেকেই রাখাইনে গণহত্যা শুরু হয়েছে এবং এর স্বাভাবিক ফলাফল হলো সশস্ত্র বিদ্রোহ; যা এখন চীনা প্রকল্পগুলিকে হুমকির মাঝে ফেলেছে। 'গ্রেট পাওয়ার' প্রতিযোগিতাতে চীনকে 'ব্যাকফুটে' রাখতে যুক্তরাষ্ট্র চাইবে যাতে করে বাংলাদেশ তার নীতি পরিবর্তন করে রাখাইনের বিদ্রোহীদের লজিস্টিক্যাল সাপোর্ট নিশ্চিত করে; অথবা অন্ততঃ নিরপেক্ষ ভূমিকা নিয়ে সীমানার কিছু অংশ ইয়াবার বিনিময়ে জ্বালানি তেলের বাণিজ্যকে চলতে দেয়। বলাই বাহুল্য যে, এতে বাংলাদেশের সাথে চীনের সম্পর্ক খারাপ হতে বাধ্য।


রাখাইনের জাতীয়তাবাদ এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা

রাখাইন রাজ্যে রয়েছে বহু উগ্র জাতীয়তাবাদী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় শুধু ১৯৪২ সালেই রাখাইনের জাতীয়তাবাদী বৌদ্ধদের হাতে প্রায় ৪০ হাজার মুসলিম নিহত হয়। ১৯৭০-এর দশকে একবার; ১৯৯০এর দশকে আরেকবার; এবং ২০১৬এর পর থেকে রাখাইনে মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপর মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর পাশবিক হামলার সময় এই জাতীয়তাবাদীরা সরাসরি অংশ নেয় এবং মুসলিমদের ধনসম্পদ দখলে যথেষ্ট পারদর্শীতা দেখায়। সেসময় অবশ্য বিশ্বব্যাপী রাখাইনের মুসলিমদের পক্ষে খুব কমই সহমর্মীতা দেখা গিয়েছিল। জাপান, সিঙ্গাপুর, কোরিয়া, থাইল্যান্ডের মতো যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু দেশগুলি মিয়ানমারকে পৃথিবীর সবচাইতে আকর্ষণীয় বিনিয়োগ-কেন্দ্র বানিয়ে ফেলেছিলো। কথাসর্বস্ব সহমর্মীতাকে ছাপিয়ে মিয়ানমারে মার্কিন-সমর্থিত গণতন্ত্রকামীদের ক্ষমতায় নিয়ে আসাটা বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল। চীনের সীমান্ত রাষ্ট্র মিয়ানমারে একটা মার্কিন-সমর্থিত রাষ্ট্রের অবস্থান ভূরাজনৈতিক দিক থেকে হয়ে যায় গুরুত্বপূর্ণ। সেসময় কেউই রাখাইনের মুসলিমদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হয়নি; কারণ এতে মিয়ানমারে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টাটা পিছিয়ে যেতে পারে। ১৯৯১ সালে মার্কিন-সমর্থিত গণতন্ত্রী নেতা অং সান সু-কি-কে নোবেল পুরষ্কার দেয়ার পর সু-কি তার পুরষ্কারকে পুরোপুরিভাবে কাজে লাগান ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক আদালতে। রাখাইনের মুসলিমদের উপর গণহত্যার ব্যাপারটাকে তিনি কতটা সুন্দরভাবে সমর্থন দিয়েছেন, তা ইতিহাস হয়ে রয়েছে। কিন্তু ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী আবারও ক্ষমতা দখল করলে যে গণতান্ত্রিক বিদ্রোহ শুরু হয়, সেই বিদ্রোহের পক্ষে পশ্চিমা দেশগুলিকে বেশ সোচ্চার দেখা গেছে। অর্থাৎ মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর পাশবিকতা নয়, বরং পশ্চিমা দেশগুলির স্বার্থই ঠিক করেছে যে মিয়ানমারের কোন ব্যাপারটা সকলে গুরুত্ব দেবে।

জন্মের পর থেকে সাত দশক ধরে মিয়ানমারের বহু রাজ্যে সশস্ত্র বিদ্রোহ চলছে। এই বিদ্রোহগুলিকে সমর্থ দিচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশগুলি। মিয়ানমারের ইতিহাসের বেশিরভাগ সময় ধরেই দেশটার স্থলসীমানার বিশাল অংশ মিয়ানমার সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিল না; এখনও নেই। এই অঞ্চলগুলি শাসন করে বিদ্রোহী গ্রুপগুলি। এদের রয়েছে নিজস্ব অর্থনীতি, সামরিক বাহিনী এবং আইন ব্যবস্থা। অর্থাৎ মানচিত্রের মিয়ানমার, আর বাস্তবিক মিয়ানমার এক নয়। শক্তিশালী দেশগুলি, বিশেষ করে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন মিয়ানমারের অঞ্চলটাতে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতেই প্রচুর সম্পদশালী এই দেশটার এমন অবস্থা করে রেখেছে। রাখাইনে বরং এরূপ সশস্ত্র বিদ্রোহ নতুন; কারণ রাখাইন চীনের সীমানায় নয়। রাখাইনের গুরুত্ব বাড়তে থাকে যখন রাখাইনের উপকূলে গ্যাসের খনি আবিষ্কৃত হয়। ২০১৩ সালে এই খনি থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে চীনের কুনমিং প্রদেশে গ্যাস রপ্তানি শুরু হয়। একইসাথে রাখাইনের কিউকপিউ-তে চীন একটা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছে; যেখানে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা তেলের জাহাজগুলি তেল খালাস করবে এবং এই তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে চীনে পৌঁছাবে। এর ফলে মার্কিন-নিয়ন্ত্রিত মালাক্কা প্রণালিকে বাইপাস করে চীন মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল আমদানি করতে পারবে। যদিওবা এর পরিমাণ চীনের চাহিদার তুলনায় তেমন কিছুই নয়; তথাপি 'গ্রেট পাওয়ার' প্রতিযোগিতার মাঝে এর গুরুত্ব যথেষ্ট। চীন এই প্রকল্পগুলি হাতে নেবার পর থেকেই রাখাইনে গণহত্যা শুরু হয়েছে এবং এর স্বাভাবিক ফলাফল হলো সশস্ত্র বিদ্রোহ; যা এখন চীনা প্রকল্পগুলিকে হুমকির মাঝে ফেলেছে।

রাখাইনে সশস্ত্র বিদ্রোহ সেখানে ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ চীনা প্রকল্পগুলির প্রতি সরাসরি হুমকি। সেখানে যেকোন প্রকারের অরাজকতা এবং নাশকতা চীনকে বিচলিত করবে এবং 'গ্রেট পাওয়ার' প্রতিযোগিতায় চীনকে চাপের মাঝে ফেলবে। রাখাইনের ভৌগোলিক বাস্তবতায় সেখানকার বিদ্রোহীদের বাংলাদেশের স্থলসীমানার উপর নির্ভর করা ছাড়া খুব বেশি অপশন নেই। কারণ সমুদ্রপথ মিয়ানমার নৌবাহিনীর দখলে। বাংলাদেশ হলো রাখাইনের সবচাইতে কাছের ভূমি যেখানে যেকোন লজিস্টিক্যাল সাপোর্ট পাওয়া সম্ভব; অন্ততঃ কাগজে-কলমে হলেও। এই কাগজে-কলমের ব্যাপারটা বাস্তবে রূপ পাবে কিনা, সেটা নির্ভর করবে বাংলাদেশের রাষ্ট্র-নীতির উপর। 'গ্রেট পাওয়ার' প্রতিযোগিতাতে চীনকে 'ব্যাকফুটে' রাখতে যুক্তরাষ্ট্র চাইবে যাতে করে বাংলাদেশ তার নীতি পরিবর্তন করে রাখাইনের বিদ্রোহীদের লজিস্টিক্যাল সাপোর্ট নিশ্চিত করে; অথবা অন্ততঃ নিরপেক্ষ ভূমিকা নিয়ে সীমানার কিছু অংশ ইয়াবার বিনিময়ে জ্বালানি তেলের বাণিজ্যকে চলতে দেয়। বলাই বাহুল্য যে, এতে বাংলাদেশের সাথে চীনের সম্পর্ক খারাপ হতে বাধ্য। আবার পশ্চিমারা এটাও চাইছে যে, রাখাইনের উগ্র জাতীয়তাবাদীরা যে সেখানকার সকল মুসলিমকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিতে চাইছে, সেই ব্যাপারটাও বাংলাদেশ যেন 'নরম' দৃষ্টিতে দেখে; অর্থাৎ এই উগ্র জাতীয়তাবাদীদেরকে বাংলাদেশ যেন 'মুসলিম-বিদ্বেষী' বলে আখা না দেয়। কাজেই রাখাইনের অস্থিরতা মূলতঃ চীন এবং বাংলাদেশকে কেন্দ্র করেই।



................................................


সূত্রঃ 



'মাদকের বিনিময়ে মিয়ানমারে পাচার হচ্ছে তেল, চাল, ডাল!’, সময় টিভি, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪,

‘Rise in fuel, edible oil smuggling to Myanmar prompts urgent action in Cox's Bazar’, The Business Standard, 17 January 2024

‘One held with 1,500 litres of oil while smuggling to Myanmar’, Dhaka Tribune, 13 December 2023

‘Waging Insurgent Warfare: Lessons from the Vietcong to the Islamic State’ by Seth G. Jones, 2017

‘War of the Flea: The Classic Study of Guerilla Warfare’ by Robert Taber, 2002

‘The Evolution of a Revolt’ by T E Lawrence, Army Quarterly and Defence Journal, October 1920

‘Out of the Mountain: The Coming Age of the Urban Guerilla’ by David Kilcullen, 2013

‘Afghanistan the Bear Trap: The Defeat of a Superpower’ by Mohammad Yousaf and Mark Adkin, 2001

‘The World was Going Our Way: The KGB and the Battle for the Third World’ by Christopher Andrew and Vasili Mitrokhin, 2005

‘Biafra: The Nigerian Civil War 1967-1970’ by Peter Baxter, 2019

‘Defeat into Victory’ by Field Marshal Sir William Slim, 1956

‘BGB takes 100 fleeing Myanmar border guards to Teknaf’ in BDNews24, 08 February 2024

‘Myanmar rebel group claims control of India border town’ in BBC, 15 January 2024

‘Myanmar Gives China Green Light to Proceed with Strategic Seaport’ in The Maritime Executive, 31 December 2023

‘Why is Myanmar’s new deep-sea port such hot property?’ in The Interpreter, Lowy Institute, 22 November 2023

Saturday, 25 November 2023

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ডিটারেন্ট - পাঁচ দশকের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম

২৫শে নভেম্বর ২০২৩

পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষা ডিটারেন্ট

ডিটারেন্ট এমন একটা জিনিস, যার মাধ্যমে একটা রাষ্ট্র তার প্রতিদ্বন্দ্বী বা শত্রু রাষ্ট্রকে হুমকি প্রদান করে - যদি শত্রু রাষ্ট্র তার উপর হামলা করে, তাহলে তাকে চরম মূল্য দিতে হবে। এই হুমকির পিছনে যদি সক্ষমতা এবং সদিচ্ছা থাকে, তাহলে শত্রু হয়তো হামলা করা থেকে বিরত থাকতে পারে। যুদ্ধ না করেই শত্রুকে বিরত রাখার কৌশলই হলো ডিটারেন্ট। একটা রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ডিটারেন্ট নিয়ে কথা বলতে হলে প্রথমেই আসবে রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির কথা।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র হলো ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব; কারুর সাথে শত্রুতা নয়’। নীতি প্রণয়নের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান পরিষ্কার হলেও এই নীতির বাস্তবায়নে বেশকিছু ধোঁয়াশা রয়েই গিয়েছে। যেমন, ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব’ যদি নীতি হয়, তাহলে তো বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। কারণ বাংলাদেশ তো সকলকেই বন্ধু মনে করছে; বন্ধুদের সাথে তো যুদ্ধ করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কেউই তো বাংলাদেশকে মুচলেকা দিয়ে বলেনি যে, তারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোন সংঘাতে যাবে না। বাংলাদেশ হয়তো সকল দেশকে বন্ধু মনে করতে পারে; কিন্তু সেই দেশগুলি নিজেরা কি একে অপরকে বন্ধু মনে করে? উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ ভারত, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে বন্ধু মনে করছে। কিন্তু এই তিনটা দেশ কি একে অপরকে বন্ধু মনে করছে? এরা যদি একে অপরকে বন্ধু মনে না করে, তাহলে তারা কি বাংলদেশের সাথে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের বন্ধুত্বকে স্বাভাবিক চোখে দেখবে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর সহজ নয়। এবং একইসাথে এখানে কোন রাষ্ট্রের শক্তি কতখানি, সেই হিসেবটা চলে আসে। কারণ বর্তমান পশ্চিমা-নিয়ন্ত্রিত বিশ্বে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতিই চলমান। শক্তিশালী দেশের কাছে ছোট কোন দেশের নীত পছন্দ না হলে ছোট দেশকে রাজনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক অবরোধ, এমনকি সামরিক আগ্রাসনের শিকারও হতে হচ্ছে।

একারণে বাংলাদেশ প্রথম দিন থেকেই সামরিক বাহিনী তৈরি করেছে। এখানেই নীতি এবং নীতির বাস্তবায়নের মাঝে ফারাক। সকলকে বন্ধু হিসেবে ঘোষণা দেয়ার পরেও বাংলাদেশ ধরেই নিয়েছে যে, সেই বন্ধুদের মাঝে যে কেউ হঠাৎ করেই শত্রু হয়ে যেতে পারে। অন্য কথায় বলতে গেলে, ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব’ নীতি বাংলাদেশ মুখে বললেও কাজে সেটা কেউই বিশ্বাস করে না। তাহলে এটা কি একটা বিবৃতি মাত্র? নাকি এর পিছনে আরও কিছু রয়েছে?

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর 'এফ-৮৬ স্যাবর' ফাইটার। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ‘এফ-৮৬’ যুদ্ধবিমান ঢাকার আকাশে শত্রু বিমানের প্রতি একটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়; যা খুব বড় কিছু না হলেও গুরুত্বপূর্ণ; যদিও এই বিমানগুলির মেইনটেন্যান্স কতটা নির্ভরযোগ্য ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল তখনও।


ভারতের জন্যে ভূরাজনৈতিক শিক্ষা

১৯৭১ সালে ভারতের সরাসরি সহায়তা এবং সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার স্বাধীনতা পেলেও নতুন রাষ্ট্র থেকে ভারতীয় সেনা প্রত্যাহারের দাবি উঠেছিল পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের পরপরই। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ‘এম-২৪’ ট্যাঙ্ক এবং ‘এফ-৮৬ স্যাবর’ যুদ্ধবিমান রিপেয়ার করে সেগুলিকে বাংলাদেশের নতুন সামরিক বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এগুলি আবার ১৯৭২ সালের সামরিক প্যারেডে প্রদর্শিতও হয়। ভারতীয়রা নতুন তৈরি হওয়া বাংলাদেশের উপর তাদের প্রভাব ধরে রাখতে সকল প্রচেষ্টাই করেছে; যার মাঝে ছিল বাংলাদেশকে সীমিত সংখ্যক সামরিক সরঞ্জাম প্রদান। তবে সেসময় ভারতের সামরিক সক্ষমতারও যথেষ্ট ঘাটতি ছিল। যেকারণে কিছু সেকেন্ড-হ্যান্ড ‘এলিউট-৩’ হেলিকপ্টার, প্যাট্রোল বোট এবং আরও কিছু সরঞ্জাম তারা বাংলাদেশকে আনুদান হিসেবে দেয়। তবে এগুলি বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিশ্চিতে তেমন কোন ভূমিকা রাখেনি।

১৯৭২ সাল থেকেই বাংলাদেশের উপর প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে ভারত ভূরাজনৈতিক চাপ অনুভব করতে থাকে বিভিন্ন দিক থেকে। একটু দেরিতে বুঝলেও দিল্লীর কাছে এটা অন্ততঃ পরিষ্কার হয়ে যায় যে, ভারত বাংলাদেশের জন্মদাতা বলে মনে করলেও প্রকৃতপক্ষে শক্তিশালী দেশগুলির (যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন) ইচ্চা থাকার কারণেই ভারত এই কাজটা সম্পাদন করতে পেরেছে। একদিকে যেমন ব্রিটেন এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন এটা চেয়েছিল, অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র এই রাষ্ট্র গঠনের বিরোধিতা করার যথেষ্ট কারণ খুঁজে পায়নি। বরং পাকিস্তানের সামরিক সরকার প্রধান ইয়াহিয়া খানের মাধ্যমে চীনের সাথে গোপনে যোগাযোগ স্থাপন করাটাই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের আগ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে মৌখিক সমর্থন দিয়ে গেছে; কোন সামরিক সহায়তা দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র শুধু নিশ্চিত করেছে যাতে করে নতুন তৈরি হওয়া বাংলাদেশে কোন বামপন্থী দল ক্ষমতায় না আসতে পারে। একারণে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুজিব বাহিনীকে যুক্তরাষ্ট্র গোপনে ‘এম-১৬’ রাইফেলও দিয়েছে; যেগুলির ৫ দশমিক ৫৬মিঃমিঃ ক্যালিবারের গোলা এই উপমহাদেশের আর কোন রাইফেল বা মেশিনগানে ব্যবহারই হয় না।

ভারত ভূরাজনীতি কম বুঝলেও আশ্চর্য্য ব্যাপার হলো, বাংলাদেশের প্রথম থেকেই ঢাকার কর্তাব্যক্তিরা ভারতের চাইতে ভূরাজনীতি বেশিই বুঝেছিল। একারণেই ১৯৭২ সাল থেকেই বাংলাদেশ পৃথিবীর অনেকগুলি দেশের সাথে সম্পর্কোন্নয়নে মনোযোগী হয়; যা স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশে ভারতের প্রভাবকে কমাতে থাকে। অন্য কথায় বলতে গেলে, ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব’ নীতিটা ভারতের স্বার্থের পরিপন্থী হয়ে যেতে থাকে। কারণ ভারত চেয়েছিল ঢাকার নীতির উপর একচ্ছত্র প্রভাব ধরে রাখতে। প্রকৃতপক্ষে এই নীতির মূল জায়গাটা হলো ব্যালান্সিং; বড় বড় রাষ্ট্রগুলি যাতে বাংলাদেশকে গিলে খেতে না পারে, সেজন্য প্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন দেশের সাথে সম্পর্ক তৈরি করা। এই নীতির ফলাফল ভারত হাঁড়ে হাঁড়ে টের পেতে থাকে ১৯৭২ সাল থেকে।

১৯৭৮ সাল নাগাদ বাংলাদেশ পৃথিবীর ৩৮টা শহরে কূটনৈতিক মিশন খুলে ফেলেছে। ইউরোপের মস্কো, লন্ডন, প্যারিস, রোম, আমেরিকার ওয়াশিংটন, এশিয়ার বেইজিং, ক্যানবেরা ছাড়াও মুসলিম বিশ্বের কায়রো, আবুধাবি, কুয়েত, তেহরান, বাগদাদ, ইসলামাবাদ, রিয়াদ, জাকার্তা, কুয়েত, আঙ্কারাতে বাংলাদেশ কূটনৈতিক মিশন খোলে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, কোন এক দেশের একচ্ছত্র প্রাধান্য সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে বাংলাদেশের উপর ভারতের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে; যা কিনা ভারতকে অসন্তুষ্ট করেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পূর্ব-ব্লকের রাষ্ট্রগুলির সাথে সম্পর্ক রাখার কারণে তা যুক্তরাষ্ট্রের অসন্তুষ্টির কারণও ছিল। তবে রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক কোন একটা দেশকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়নি। সম্পর্ক এক-দেশ-কেন্দ্রিক না থাকার বহু উদাহরণ নিয়ে আসা যায়। তবে এই লেখাতে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টাকেই তুলে ধরা হয়েছে।

১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে ১৪টা 'মিগ-২১' ফাইটার বিমান পায়। ১৯৭৩ সালে ‘মিগ-২১’ ছিল ভারতীয় বিমান বাহিনীর প্রধান যুদ্ধবিমান। অর্থাৎ কোয়ালিটির দিক থেকে ভারতীয় বিমান বাহিনী এবং বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর হার্ডওয়্যার হয়ে গেলো সমমানের। এই ‘মিগ-২১’ যুদ্ধবিমানের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশকে ‘পি-৩৫’ রাডারও দেয়; যার মাধ্যমে বাংলাদেশের আকাশসীমায় শত্রু বিমানের উপস্থিতির একটা আগাম বার্তা দেয়া সম্ভব হয় প্রথমবারের মতো। এক ধাক্কায় ঢাকার আকাশ শত্রুর পরিবহণ বিমানের জন্যে ‘নো-ফ্লাই জোন’ হয়ে দাঁড়ায়।


প্রথম দশক - তিনটা ডিটারেন্ট

পাকিস্তান বিমান বাহিনীর এক স্কোয়াড্রন (১৬টা) ‘এফ-৮৬ স্যাবর’ ফাইটার জেটের ব্যাপারে ভারতীয় বিমান বাহিনী কতটা চিন্তিত ছিল, তার উদাহরণ পাওয়া যায় ১৯৭১ সালে তেজগাঁও বিমান ঘাঁটির উপর ভারতীয় বিমান বাহিনীর বারংবার হামলা। দুই দশকের বেশি পুরোনো প্রযুক্তির হলেও এই বিমানগুলি ভারতীয়দের শান্তিতে ঘুমাতে দেয়নি। রানওয়েতে বহু সংখ্যক গভীর খাদ হয়ে যাবার পরেও ভারতীয়রা এই বিমানগুলির ভয়ে ছিল এবং বোমা ফেলা বন্ধ করেনি। ১৬টা বিমানের মাঝে ১৩টা বিমান তেজগাঁও বিমান বন্দরের কম্পাউন্ডের মাঝেই ছিল। এরপরেও তারা সেগুলি খুঁজে পেতেই ব্যর্থ হয়! এর সাথে কমপক্ষে একটা ‘টি-৩৩’ জেট ট্রেইনার বিমানও ছিল। যুদ্ধের শেষে কমপক্ষে ৮টা ‘স্যাবর’ বিমান বাংলাদেশী ইঞ্জিনিয়াররা মেরামত করে সার্ভিসে নিয়ে আসে; যেগুলি ভারতীয়রা ১৯৭২ সালের ২৬শে মার্চ প্রথমবারের মতো ঢাকার আকাশে উড়তে দেখে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ‘এফ-৮৬’ যুদ্ধবিমান ঢাকার আকাশে শত্রু বিমানের প্রতি একটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়; যা খুব বড় কিছু না হলেও গুরুত্বপূর্ণ; যদিও এই বিমানগুলির মেইনটেন্যান্স কতটা নির্ভরযোগ্য ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল তখনও। ভারত বিভিন্ন সময়ে আশেপাশের ছোট দেশগুলির বিমানবন্দরে সামরিক পরিবহণ বিমান নামিয়ে অতি দ্রুত সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছে। সেসকল দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কলহের সুযোগ নিয়ে ভারত এই কাজগুলি করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই নীতি কিছুটা হলেও চ্যালেঞ্জে পড়ে যায় ‘এফ-৮৬’ বিমানগুলির জন্যে। এই বিমানগুলির ইউনিটের ব্যাপারে হয় আগে থেকেই নিশ্চিত হতে হবে যে তারা আকাশে উড়ে ভারতীয় পরিবহণ বিমানকে বাধা দেবে না। অথবা ভারতীয় ফাইটার বিমানকে তেজগাঁও বিমানবন্দরে বোমা ফেলে এই বিমানগুলিকে আকাশে ওড়া থেকে বিরত রাখতে হবে। এই কাজগুলি সম্পাদন করাটা কূটনৈতিকভাবে বেশ কঠিন।

তবে এই কাজটা আরও অনেক বেশি কঠিন হয়ে যায় যখন ১৯৭৩ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশকে পুরো এক স্কোয়াড্রন ‘মিগ-২১’ যুদ্ধবিমান (১২টা ‘মিগ-২১এমএফ’ এবং ২টা ‘মিগ-২১উইবি’ ট্রেইনার) উপহার দেয়। এই বিমানগুলির সাথে এসেছিল ৭৫টা ‘কে-১৩এ’ আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র। ১৯৭৩ সালে ‘মিগ-২১’ ছিল ভারতীয় বিমান বাহিনীর প্রধান যুদ্ধবিমান। অর্থাৎ কোয়ালিটির দিক থেকে ভারতীয় বিমান বাহিনী এবং বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর হার্ডওয়্যার হয়ে গেলো সমমানের। এই ‘মিগ-২১’ যুদ্ধবিমানের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশকে ‘পি-৩৫’ রাডারও দেয়; যার মাধ্যমে বাংলাদেশের আকাশসীমায় শত্রু বিমানের উপস্থিতির একটা আগাম বার্তা দেয়া সম্ভব হয় প্রথমবারের মতো। এক ধাক্কায় ঢাকার আকাশ শত্রুর পরিবহণ বিমানের জন্যে ‘নো-ফ্লাই জোন’ হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ ‘এফ-৮৬ স্যাবর’, ‘মিগ-২১’ যুদ্ধবিমান এবং ‘পি-৩৫’ রাডার ছিল বাংলাদেশের প্রথম ডিটারেন্ট। অন্য কথায় বলতে গেলে ১৯৭৪ সাল থেকে ভারতকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সামরিক হস্তক্ষেপ করতে হলে স্থলসীমান্ত পেরিয়ে সেনাবাহিনী প্রেরণ করতে হবে; যা খুবই কঠিন একটা কাজ হবে। এখন বাংলাদেশ তার সেনাবাহিনীকে গড়ে তুলতে পারে; যাতে করে স্থলসীমান্ত পেরিয়ে ভারতীয় আগ্রাসন যেন বিভীষিকাময় হয়ে যায়।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তার ১৯৭১ সালের তিনটা ব্রিগেডকে তিন স্থানে মোতায়েন করে নিয়মিত সেনাবাহিনীর অংশ করে নেয় - যশোরে ৫৫ ব্রিগেড, ঢাকায় ৪৬ ব্রিগেড, কুমিল্লাতে ৪৪ ব্রিগেড। কিছুদিনের মাঝে রংপুরেও ৭২তম ব্রিগেড স্থাপন করা হয়। ১৯৭৪ সালের ১১ই জানুয়ারি কুমিল্লাতে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে নতুন ইউনিট তৈরি করার জন্যে বিরাট একটা মাইলফলক ছিলো। আর ১৯৪৮ সাল থেকে চট্টগ্রামে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টার তো ছিলোই। প্রায় ২৪ হাজার ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্য ১৯৭১ সালে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলো। আর যুদ্ধের পর ৩০ হাজারের বেশি বাঙ্গালী সামরিক সদস্যকে পাকিস্তান থেকে ফেরত নিয়ে আসা হয়। ১৯৭৩ সালের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে মিশর ও সিরিয়ার পক্ষ নেয়ায় বাংলাদেশকে উপহারস্বরূপ ৩০টা ‘টি-৫৪’ ট্যাংক দেয় মিশর। এর আগে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর রেখে যাওয়া ‘এম-২৪’ ট্যাঙ্কগুলি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ট্যাংক ইউনিট গঠনের জন্যে যথেষ্ট ছিল না। কিন্তু এই ‘টি-৫৪’ ট্যাঙ্কগুলি সেনাবাহিনীর আর্মার্ড কোরের ভিত গড়ে দেয়। ইতালি থেকে ‘অটো মেলারা মড-৫৬’ ডিজাইনের ১০৫মিঃমিঃ আর্টিলারি হাউইটজার আনা শুরু হয়। ‘সিপরি’র হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মোট ৮৫টা কামান পেয়েছিল। এর মাধ্যমে আর্টিলারি কোর একটা শক্ত ভিতের উপর দাঁড়ায়। এই কর্মকান্ডগুলি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যসংখ্যাকে দ্রুত বৃদ্ধি করে এবং বাংলাদেশের প্রতিরক্ষার জন্যে দ্বিতীয় ডিটারেন্ট তৈরি করে।

তৃতীয় ডিটারেন্ট তৈরি হয় ব্রিটেন ও চীনের হাত ধরে। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮২এর মাঝে ব্রিটিশ রয়াল নেভি তাদের বাহিনী থেকে রিটায়ার করাটা তিনটা ফ্রিগেট (একটা ‘টাইপ-৪১’, দু’টা ‘টাইপ-৬১’) বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করলে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের হাতে সল্প পাল্লার ‘ব্লু-ওয়াটার’ সক্ষমতা হাজির হয়। এই ফ্রিগেটগুলিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ নৌবাহিনী এমন কিছু ইউনিট গঠন করতে পারবে, যা কিনা শত্রুর নৌ-অবরোধকে কিছুটা হলেও চ্যালেঞ্জ করতে পারবে। সেই হিসেবে ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যুক্ত হয় চীনে তৈরি ৪টা ‘টাইপ-০২৪’ মিসাইল বোট; সাথে ডেলিভারি পায় ২০টা ‘এসওয়াই-১এ’ জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র; যেগুলির পাল্লা ছিল ১০০কিঃমিঃএরও বেশি। এখন চট্টগ্রাম বন্দরকে অবরোধ দিতে আসা নৌবহর সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকলো না।

স্বাধীনতার পর এক দশকের মাঝেই বাংলাদেশ তার নিরাপত্তা নিশ্চিতে তিনটা ডিটারেন্ট গঠন করে। প্রথম ডিটারেন্টের মাধ্যমে ঢাকার বিমানবন্দরে পরিবহণ বিমান নামিয়ে সেনা মোতায়েন প্রায় অসম্ভব করে ফেলা হয় এবং এর মাধ্যেম স্থলসীমানা দিয়ে সেনা আক্রমণকেই একমাত্র অপশন করে ফেলা হয়। দ্বিতীয় ডিটারেন্টের মাধ্যমে স্থলসীমানা দিয়ে আক্রমণকে কিছুটা হলেও কঠিন করে ফেলা হতে থাকে। আর তৃতীয় ডিটারেন্টের মাধ্যমে নৌ-অবরোধকে ক্ষতির মাঝে ফেলে দেয়ার সম্ভাবনা তৈরি করা হয়। এই তিনটা ডিটারেন্ট তৈরিতে অনেক দেশের সহায়তা লেগেছে; যারা সকলেই নিজেদের স্বার্থেই বাংলাদেশকে সহায়তা দিয়েছে; যাদের মাঝে রয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়ন, ব্রিটেন, চীন, মিশর, ইতালি, এবং আরও অন্যান্য দেশ। স্বাধীনতার পর প্রথম দশকে বাংলাদেশ বহু রাজনৈতিক কলহের মাঝ দিয়ে গিয়েছে; রক্তাক্ত হয়েছে দেশের বহু অঞ্চল। কিন্ত এতো কিছুর মাঝেও এই ডিটারেন্ট তৈরি করা থেমে থাকেনি।

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর চীনা নির্মিত 'এফ-৭এমবি' ফাইটার। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৩এর মাঝে বিমান বাহিনীতে চীনে নির্মিত ৩৬টা ‘এফ-৬’ ফাইটার বিমান যুক্ত হয়। ১৯৮৯-৯০ সালে পাকিস্তান থেকে আসে আরও ৪০টা সেকেন্ড-হ্যান্ড ‘এফ-৬’ যুদ্ধবিমান। একইসাথে চীন থেকে আসে ২০টা ‘এফ-৭এমবি’ যুদ্ধবিমান এবং ১২টা ‘এ-৫সি’ যুদ্ধবিমান। এই যুদ্ধবিমানগুলি সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে এক লাফে অনেকদূর এগিয়ে নেয়।


দ্বিতীয় দশক - আরও শক্তিশালী ডিটারেন্ট

১৯৮০এর দশকে এই ডিটারেন্টগুলিকে আরও শক্তিশালী করা চলমান থাকে। ‘সিপরি’র হিসেবে ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৩এর মাঝে বিমান বাহিনীতে চীনে নির্মিত ৩৬টা ‘এফ-৬’ ফাইটার বিমান যুক্ত হয়। ১৯৮৯-৯০ সালে পাকিস্তান থেকে আসে আরও ৪০টা সেকেন্ড-হ্যান্ড ‘এফ-৬’ যুদ্ধবিমান। একইসাথে চীন থেকে আসে ২০টা ‘এফ-৭এমবি’ যুদ্ধবিমান এবং ১২টা ‘এ-৫সি’ যুদ্ধবিমান। এই যুদ্ধবিমানগুলি সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে এক লাফে অনেকদূর এগিয়ে নেয়। এ-তো গেলো প্রথম ডিটারেন্ট। দ্বিতীয় ডিটারেন্টের জন্যে সেনাবাহিনীর ইউনিটের সংখ্যা বাড়তেই থাকে। ডিভিশনের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ৬-এ। ১৯৮৪-৮৫ সালে চীন থেকে আসে দুই হাজার ‘রেড এরো ৭৩’ ট্যাংক-বিধ্বংসী গাইডেড মিসাইল। এটা ছিল ট্যাংক ধ্বংস করার জন্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম গাইডেড মিসাইল। সোভিয়েত ‘৯এম১৪ মালইউতকা’ মিসাইলের চীনা কপি ছিল এটা। এই মিসাইল ভিয়েতনাম যুদ্ধের শেষের দিকে ১৯৭২ সালে এবং ১৯৭৩ সালে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছিল। এবার বাংলাদেশের মাটি ভারতের ট্যাঙ্কের জন্যেও অনিরাপদ হয়ে যায়। তৃতীয় ডিটারেন্টের জন্যে ১৯৮৭-৮৮ সালে চীন থেকে আসে ৪টা ‘টাইপ-০২১’ মিসাইল বোট। ১৯৮৮-৮৯ সালে চীন থেকে নৌবাহিনী পায় ‘টাইপ-০৫৩এইচ’-ক্লাসের গাইডেড মিসাইল ফ্রিগেট বিএনএস ওসমান। এটা ছিল বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রথম গাইডেড মিসাইল ফ্রিগেট। এই জাহাজগুলি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সক্ষমতাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।

অর্থাৎ স্বাধীনতার পর প্রথম দশকে যেখানে তিনটা ডিটারেন্ট তৈরি করা হয়েছিল, সেখানে এর পরের দশকে এই ডিটারেন্টগুলিকে আরও অনেক শক্তিশালী করা হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের সামরিক হস্তক্ষেপ প্রায় অসম্ভব করে ফেলা হয়। কাজেই বাংলাদেশের নীতিতে ভারতের প্রভাব বাড়াতে দিল্লীর নীতিতে একটা বড় পরিবর্তন দেখা যেতে থাকে ১৯৮০এর দশকের মাঝে। একারণেই দিল্লীর বাংলাদেশ নীতিতে যুক্ত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম। পার্বত্য চট্টগ্রামে কাপ্তাই হ্রদ তৈরির পর বিশাল এলাকা পানির নিচে চলে যায়। এর ফলে বহু মানুষ তাদের আবাসস্থল হারিয়ে ফেলে। এই মানুষগুলির মাঝে ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে ভারত পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্রোহী গোষ্ঠিগুলিকে সামরিক সহায়তা দিতে থাকে। এর ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং আধা-সামরিক বাহিনীর একটা বড় অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামে আটকে থাকে। একই সময়ে বঙ্গোপসাগরে নৌ-অবরোধের চিন্তাটাও জেঁকে বসে। যেকারণে নৌবাহিনীর গাইডেড মিসাইল ফ্রিগেট এবং মিসাইল বোটগুলি গুরুত্বপূর্ণ ডিটারেন্ট হয়ে যায়।

১৯৯০এর দশকের শুরুটাই হয় ১৯৯১ সালের ২৯শে এপ্রিলের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় দিয়ে। ঘূর্ণিঝড়ে বিমান বাহিনীর ৪০টার মতো যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত অথবা ধ্বংস হয়। শুধুমাত্র দুই সিটের ‘এফটি-৬’ ট্রেইনার বিমানগুলিকে সার্ভিসে রেখে সকল ‘এফ-৬’ বিমানকে মেরামত না করে একযোগে রিটায়ার করিয়ে দেয়া হয়। এই বিমানগুলিকে কখনোই প্রতিস্থাপন করা হয়নি। এর ফলে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর বহর হঠাৎ করেই অর্ধেক হয়ে যায়।


তৃতীয় দশক - ক্রাইসিস

১৯৯০এর দশকের শুরুটাই হয় ১৯৯১ সালের ২৯শে এপ্রিলের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় দিয়ে। ঘূর্ণিঝড়ে বিমান বাহিনীর ৪০টার মতো যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত অথবা ধ্বংস হয়। নৌবাহিনীরও কিছু জাহাজ ডুবে যায় বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোন এক অজানা কারণে ঘূর্ণিঝড়ের আগে জাতীয় নিরাপত্তার জন্যে এই অতি মূল্যবান সম্পদগুলিকে নিরাপদে সরানো হয়নি। বিমান বাহিনী প্রাথমিকভাবে বলে যে, ক্ষতিগ্রস্ত বিমানগুলির মাঝে কয়েকটা ছাড়া বেশিরভাগই মেরামত করা সম্ভব। কিন্তু সেবছরই দেখা গেলো যে, শুধুমাত্র দুই সিটের ‘এফটি-৬’ ট্রেইনার বিমানগুলিকে সার্ভিসে রেখে সকল ‘এফ-৬’ বিমানকে মেরামত না করে একযোগে রিটায়ার করিয়ে দেয়া হয়। এই বিমানগুলিকে কখনোই প্রতিস্থাপন করা হয়নি। এর ফলে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর বহর হঠাৎ করেই অর্ধেক হয়ে যায়। খুব সম্ভবতঃ অর্থনৈতিক কারণ দেখিয়েই এই বিমানগুলির মেরামত নাকচ করে দেয়া হয়। শুধু তা-ই নয়, ১৯৯৩ সালে সার্ভিসে থাকা শেষ ‘মিগ-২১’ যুদ্ধবিমানগুলিকেও রিটায়ারমেন্টে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এর ফলে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার প্রথম ডিটারেন্ট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একারণে ১৯৯১-৯২ সালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী অত্যাচার ও গণহত্যার মাধ্যমে তাদের রাখাইন প্রদেশ থেকে আড়াই লক্ষ মুসলিমকে বাংলাদেশের ভেতরে পাঠিয়ে দেয়। বাংলাদেশ কিছুই করতে পারেনি। ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব’ নীতির একটা মারাত্মক ব্যর্থতা এটা। এই নীতি ভারতকে ব্যালান্স করতে হয়তো সফল হয়েছে; কিন্তু মিয়ানমারের ক্ষেত্রে পুরোপুরিভাবে মার খেয়েছে।

১৯৯০এর দশকে মিয়ানমার ‘এফ-৭’ যুদ্ধবিমান পায়; যেগুলি সংখ্যায় বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে ছাড়িয়ে যায়। এছাড়াও মিয়ানমার চীন থেকে ‘হাউজিন-ক্লাস’এর ৬টা মিসাইল বোট কেনে এবং নিজের দেশেই ‘৫-সিরিজ’এর মিসাইল বোট তৈরি করা শুরু করে। নৌবাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যার দিক থেকেও মিয়ানমার বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে যায় দ্রুতই। মোটকথা, বাংলাদেশ যে মিয়ানমারকে তার জাতীয় নিরাপত্তার জন্যে কখনোই হুমকি মনে করেনি, সেই মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীই এখন সংখ্যার দিক দিয়ে বাংলাদেশের ডিটারেন্টগুলিকে নাকচ করে দেয়ার চেষ্টায় নেমেছে। বাংলাদেশের সামনে তার ডিটারেন্ট ফিরে পাবার একটাই উপায় থাকে - কোয়ালিটি। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে ৮টা ‘মিগ-২৯’ যুদ্ধবিমান কেনে। একইসাথে ২০০১ সালে দক্ষিণ কোরিয়াতে তৈরি করা অত্যাধুনিক ফ্রিগেট বিএনএস বঙ্গবন্ধুর ডেলিভারি পায় বাংলাদেশ নৌবাহিনী। কিন্তু মিয়ানমারও বাংলাদেশের পিছু ছাড়েনি। ২০০১ সালেই মিয়ানমার বেলারুশ থেকে ‘মিগ-২৯’ যুদ্ধবিমান কেনে; এবং সেটাও আবার সংখ্যায় বাংলাদেশের চাইতে বেশি। মাত্র এক দশকের মাঝে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তায় প্রধান হুমকি হয়ে দাঁড়ায় মিয়ানমার। বলাই বাহুল্য যে, দিল্লীতে কেউ এতে অখুশি হবার কথা নয়। মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের এই অস্ত্র প্রতিযোগিতাই পরবর্তীতে দিল্লীর বাংলাদেশ নীতিকে আরও একবার পরিবর্তন করতে সহায়তা করে।

চতুর্থ দশক - হিসেব নিকেশ

প্রায় ২০০১ সাল থেকে চীন এবং ভারতের অর্থনীতি ব্যাপক গতি পেতে থাকে। বাংলাদেশের অর্থনীতিও এই দুই দেশের সাথে গতি পেতে থাকে। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের জিডিপি ৩২ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০০০ সালে তা ৫৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছিল। কিন্তু ২০১০ সাল নাগাদ তা একেবারে দ্বিগুণ হয়ে ১১৫ বিলিয়ন ডলার হয়ে যায়। অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি পাবার সাথে সাথে একদিকে যেমন অর্থনৈতিক অবকাঠামোর নিরাপত্তা দেয়ার গুরুত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে, তেমনি নিরাপত্তার পেছনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করার সক্ষমতাও বৃদ্ধি পেতে থাকে। কিন্তু এরপরেও প্রথম ডিটারেন্ট নিগৃহীতই থেকে যায়। রাশিয়া থেকে দু’টা ‘১এল-১১৭’ রাডার কেনা হয় ২০০১ সালে। ২০০৬ সালে ১৬টা ‘এফ-৭বিজি’ যুদ্ধবিমান কেনা হয় চীন থেকে। তবে এগুলি প্রথম ডিটারেন্টকে বিশেষ কোন সুবিধা দিতে পারেনি।

প্রথম ডিটারেন্ট দুর্বল হবার সাথেসাথে দ্বিতীয় ডিটারেন্টের উপরও চাপ বেড়ে যায়। দ্বিতীয় ডিটারেন্ট হিসেবে শত্রুর সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতি-আক্রমণ চালাতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মেকানাইজড ইউনিট গঠনের কাজ শুরু করে এই সময়ে। রাশিয়া থেকে ১৩০টার মতো ‘বিটিআর-৮০’ এপিসি কেনা হয়। চীন থেকে আড়াই’শ ‘কিউডব্লিউ-২’ অতি-স্বল্প পাল্লার বিমান-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র কেনা হয়। রাজনৈতিক কারণে নৌবাহিনীর ডিকমিশন করা যুদ্ধজাহাজ বিএনএস বঙ্গবন্ধুকে তৃতীয় ডিটারেন্ট হিসেবে সার্ভিসে নিয়ে আসা হয়। একইসাথে বিএনএস ওসমানএর ক্ষেপণাস্ত্রগুলি পরিবর্তন করে ‘সি-৮০২’ ক্ষেপণাস্ত্র যুক্ত করা হয়। ২০০৮ সালের নভেম্বরে সেন্ট মার্টিনস দ্বীপের কাছাকাছি মিয়ানমারের সাথে একটা সংঘাতপূর্ণ অবস্থায় চলে যায় বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের নৌবাহিনী। এই ঘটনায় বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত কিছুটা এগিয়ে থাকলেও এটা বুঝতে বাকি থাকে না যে, বাংলাদেশের ডিটারেন্টগুলিকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। কারণ এখন শুধুমাত্র সার্বভৌমত্ব রক্ষাই নয়, নিজেদের অর্থনৈতিক অবকাঠামোগুলিকে রক্ষা করাটাও একটা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়ে যায়। নিজেদের অর্থনৈতিক অবকাঠামোগুলিকে রক্ষা করতে হলে এমন কিছু ডিটারেন্ট প্রয়োজন, যা কিনা শত্রুর অর্থনৈতিক অবকাঠামোকেও হুমকির মাঝে ফেলে দিতে সক্ষম।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর 'অনুশীলন নবদিগন্ত ২০২১-২২-এ প্যারাড্রপিং এক্সারসাইজ। ২০১৬ সালে তৈরি করা হয় প্যারাকমান্ডো ব্রিগেড। এই কমান্ডোদেরকে শত্রুর এলাকার ভেতর মোতায়েন করতে ‘হাই অল্টিটিউড হাই ওপেনিং’ বা ‘হাহো’ এবং ‘হাই অল্টিটিউড লো ওপেনিং’ বা ‘হালো’ প্যারাশুট ডেলিভারির কৌশলগুলি রপ্ত করা শুরু হয় ২০২০এর পর। ‘হাহো’ পদ্ধতিতে প্যারাট্রুপাররা প্রায় ৫০কিঃকিঃ দূর থেকে জাম্প করে গ্লাইড করে টার্গেট এলাকায় অবতরণ করতে পারে। এই পদ্ধতি শত্রুর এলাকার গভীরে হামলা করার জন্যে সবচাইতে উপযোগী।


পঞ্চম ও ষষ্ঠ দশক - চতুর্থ ডিটারেন্টের খোঁজে

প্রথম ডিটারেন্ট ছিল বাংলাদেশের আকাশসীমানাকে শত্রুর সামরিক পরিবহণ বিমানের জন্যে কঠিন করে ফেলা; যাতে করে বাংলাদেশের বিমানবন্দরে কোন শত্রু সামরিক বিমান সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে না পারে এবং স্থল আক্রমণে যেতে বাধ্য হয়। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতির পর থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বিমান বাহিনীতে যুক্ত হয়েছে ৮টা ‘এল-৩৯জেডএ’ এডভান্সড ট্রেইনার, ৮টা ‘মিগ-২৯’, এবং ১৬টা ‘এফ-৭বিজি’। সবগুলি ‘এফ-৬’ এবং ‘মিগ-২১’ প্রায় একসাথে রিটায়ার করিয়ে দেয়ার পর এগুলি দ্বারা প্রথম ডিটারেন্ট কোনমতে টিকে ছিল। দ্বিতীয় ডিটারেন্ট ছিল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যেকোন স্থল আক্রমণ দুর্বিসহ করে ফেলা। কিন্তু এটাও দুর্বল হতে শুরু করে যখন নিজেদের দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামোগুলিও রক্ষা করার দায়িত্ব পড়ে যায়। নিজের দেশকে ধ্বংস করে শত্রু আটকাবার নীতি এখন প্রশ্নবিদ্ধ।

একইসাথে ২০১৬ সালে ‘হোলি আর্টিসান’ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশ বুঝতে পারে যে, কত পদ্ধতিতে বাংলাদেশের অস্তিত্বকে হুমকির মাঝে ফেলে দেয়া যায়। তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবাদ’এর নাম করে বড় কোন শক্তির সামরিক হস্তক্ষেপ যেন বাস্তবে রূপ না নিতে পারে, সেজন্য বাংলাদেশ সরকারের সকল কর্তাব্যক্তি এক মুহুর্তের জন্যেও ভুল করে হলেও বলেননি যে, বাংলাদেশের তথাকথি ‘সন্ত্রাসবাদ’এর পিছনে আন্তর্জাতিক ‘সন্ত্রাসী’ কোন সংগঠন জড়িত। এবং যুক্তরাষ্ট্রকে খুশি রাখতে ইন্টেলিজেন্স শেয়ারিং, সামরিক বাহিনীর সন্ত্রাসবিরোধী ট্রেনিং, বিভিন্ন সংগঠনের বিরুদ্ধে ধরপাকড়, ইত্যাদি চলতে থাকলো।

২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইনে কে বা কারা মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের হত্যা করে উধাও হয়ে গেলো। আর এই ছুতোতে মিয়ানমারের পাশবিক সেনাবাহিনী গণহত্যায় নেমে যায়। সাড়ে ১১ লক্ষ মুসলিম শরণার্থী দিয়ে কক্সবাজার ছেয়ে যাবার পর বাংলাদেশ আবারও বুঝতে পারলো যে, ডিটারেন্স কাজে দিচ্ছে না।

বাংলাদেশের তৃতীয় ডিটারেন্ট ছিল শত্রুর নৌ-অবরোধকে হুমকির মাঝে ফেলে দেয়া। এটাও দুর্বল হতে শুরু করে মিয়ানমারের নৌশক্তি বৃদ্ধি করার সাথেসাথে। কারণ বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমারের সম্পর্ক যত খারাপ হতে থাকে, মিয়ানমারও ততটাই দ্রুতবেগে তাদের নৌবাহিনী ডেভেলপ করতে থাকে। এবার বাংলাদেশের কর্তাব্যক্তিরা চিন্তা করতে থাকলেন যে, রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায় প্রয়োজন নতুন ডিটারেন্ট; যা হলো - শত্রু রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে হামলা করে তার সামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনার ক্ষতিসাধন। 

শত্রু রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে হামলার একটা পদ্ধতি হলো স্পেশাল ফোর্স। পুরো ১৯৮০এর দশক চলে যায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর স্পেশাল ফোর্সকে সংগঠিত করতে। ১৯৯২ সালের জুনে সেনাবাহিনীর ১ম প্যারাকমান্ডো ব্যাটালিয়ন যাত্রা শুরু করে। ২য় প্যারাকমান্ডো ব্যাটালিয়ন তৈরি হতে চলে যায় ২০১৯। আর ২০১৬ সালে তৈরি করা হয় প্যারাকমান্ডো ব্রিগেড। এই কমান্ডোদেরকে শত্রুর এলাকার ভেতর মোতায়েন করতে ‘হাই অল্টিটিউড হাই ওপেনিং’ বা ‘হাহো’ এবং ‘হাই অল্টিটিউড লো ওপেনিং’ বা ‘হালো’ প্যারাশুট ডেলিভারির কৌশলগুলি রপ্ত করা শুরু হয় ২০২০এর পর। যুক্তরাষ্ট্র হয় এই প্রযুক্তি এবং প্রশিক্ষণের উৎস। ‘হালো’ পদ্ধতিতে সৈন্যরা ৫ হাজার ফুট থেকে ২৫ হাজার ফুট উচ্চতায় বিমান থেকে প্যারা জাম্প দেয়; যেখানে সাধারণ প্যারা জাম্প দেড় হাজার ফুটের মতো হয়ে থাকে। এর ফলে প্যারাট্রুপার বহণকারী বিমান বিমান-বিধ্বংসী অস্ত্রের পাল্লার ভিতরে থাকার সম্ভাবনা কমে যায়। আর ‘হাহো’ পদ্ধতিতে প্যারাট্রুপাররা প্রায় ৫০কিঃকিঃ দূর থেকে জাম্প করে গ্লাইড করে টার্গেট এলাকায় অবতরণ করতে পারে। এই পদ্ধতি শত্রুর এলাকার গভীরে হামলা করার জন্যে সবচাইতে উপযোগী।

প্যারাকমান্ডো ছাড়াও ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় নৌবাহিনীর অধীনে তৈরি করা হয় ‘স্পেশাল ওয়ারফেয়ার এন্ড ডাইভিং স্যালভেজ’ বা ‘সোয়াডস’। কাজেই এই দুই বাহিনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের সক্ষমতা তৈরি হয় জলে-স্থলে শত্রুর অভ্যন্তরে হামলা করার। নৌবাহিনীর ‘সোয়াডস’ সদস্যদেরকে শত্রুর উপকূলে নামানোর প্রধান বাহণ হয়ে দাঁড়ায় ২০১৬ সালে চীন থেকে কেনা দু’টা ‘টাইপ-০৩৫জি’ সাবমেরিন। সাবমেরিন খুব সন্তর্পণে শত্রুর উপকূলের কাছাকাছি স্পেশাল ফোর্সের সেনাদের নামিয়ে দিতে পারে; যাতে তারা শত্রু রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কোন স্থাপনা ধ্বংস করতে পারে, অথবা নিজেদের যুদ্ধবিমান বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের জন্যে টার্গেট খুঁজে দিতে পারে। সাবমেরিন দু’টা কেনার সিদ্ধান্ত প্রকাশ হবার সাথেসাথেই দিল্লীতে হৈ চৈ পড়ে যায়। এবং বাংলাদেশ সাবমেরিন পাবার তিন বছরের মাঝেই ভারত নিজেদের একটা রুশ নির্মিত ‘কিলো-ক্লাস’এর সাবমেরিন রিটায়ার করিয়ে মিয়ানমারকে দিয়ে দেয়।

মিয়ানমারের নৌবাহিনী থেকে এগিয়ে থাকতে বাংলাদেশ নৌবাহিনী সাবমেরিন ছাড়াও ৬টা ফ্রিগেট, ৬টা কর্ভেট, ৪টা এলপিসি জোগাড় করে। কিন্তু মিয়ানমারও বাংলাদেশের সমান্তরালেই নিজেদের নৌবাহিনী ডেভেলপ করতে থাকে; কিছু ক্ষেত্রে এগিয়েও যায়। ভারত মিয়ানমার নৌবাহিনীকে এক্ষেত্রে ব্যাপক সহায়তা দিতে থাকে। আর মিয়ানমারের বিমান বাহিনী পাকিস্তান থেকে ‘জেএফ-১৭’ যুদ্ধবিমান, রাশিয়া থেকে ‘মিগ-২৯’, ‘সুখোই-৩০’ এবং ‘ইয়াক-১৩০’ যুদ্ধবিমান, এবং চীন থেকে ‘এফটিসি-২০০০’ যুদ্ধবিমান কেনে। ‘জেএফ-১৭’ যুদ্ধবিমানগুলিকে জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রেও সজ্জিত করা হয়; যাতে করে সেগুলি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্যে হুমকিরূপে দেখা দেয়। মোটকথা বাংলাদেশের প্রথম ডিটারেন্ট বিমান বাহিনী এবং তৃতীয় ডিটারেন্ট নৌবাহিনী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে মিয়ানমারের কারণে। চতুর্থ ডিটারেন্ট হিসেবে স্পেশাল ফোর্সকে ডেভেলপ করা হলেও এক্ষেত্রে সাবমেরিনের ভূমিকা অনেক বড় আকারে দেখা দেয়। কিন্তু সেটার সক্ষমতাকেও ভারত কমিয়ে ফেলে মিয়ানমারকে সাবমেরিন এবং মিয়ানমার নৌবাহিনীর ফ্রিগেটগুলির জন্যে সাবমেরিন-ধ্বংসী সোনার এবং টর্পেডো সরবরাহ করার মাধ্যমে। এবারে চতুর্থ ডিটারেন্টের জন্যে বাংলাদেশ তার বিমান বাহিনী এবং সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত করতে থাকে।

২০১৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে যুক্ত হয় রুশ লীড-ইন-ট্রেইনার বিমান ‘ইয়াক-১৩০’। এই বিমানটা প্রযুক্তিগত দিক থেকে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সবচাইতে উন্নত বিমান। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ভাষ্যমতে, ‘ইয়াক-১৩০’ বিমানের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো রাতের বেলায় আকাশ থেকে শত্রুর উপর হামলা করার সক্ষমতা অর্জন করে। ‘ইয়াক-১৩০’ বিমান প্রায় ১৫কিঃমিঃ দূর থেকে ৫০০কেজি ওজনের 'কেএবি-৫০০কেআর' টিভি-গাইডেড বোমা শত্রুর টার্গেটের ১৩ফুট থেকে ২৩ফুটের মাঝে ফেলতে সক্ষম।


চতুর্থ ডিটারেন্ট - বিমান বাহিনীর স্ট্র্যাটেজিক স্ট্রাইক মিশন

১৯৭২ সাল থেকে শুরু করে চার দশকে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর শত্রুর উপর আক্রমণ করার সক্ষমতা ছিল। তবে সেই আক্রমণে স্ট্র্যাটেজিক বা কৌশলগত কোন সামরিক বা অর্থনৈতিক অবকাঠামো ধ্বংস করার সক্ষমতা ছিল সীমিত। কারণ শুধু রকেট বা সাধারণ বোমা দিয়ে একটা নির্দিষ্ট টার্গেট ধ্বংস করা খুব সহজ নয়। কারণ একদিকে যেমন নিখুঁতভাবে রকেট বা বোমা নিক্ষেপ কঠিন, তেমনি খুব কাছে থেকে গোলা নিক্ষেপ করা পাইলটের জন্যে খুবই বিপজ্জনক। বিশেষ করে সেই টার্গেটের আশেপাশে যদি শক্তিশালী বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকে। শত্রুর অঞ্চলের ভেতরে ঢুকে বেশ দূর থেকেই এধরণের টার্গেটে হামলা করে ফিরে আসতে পারার জন্যে কোন অস্ত্র বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর কাছে ছিল না। তবে কিছু অস্ত্র বিমান বাহিনীর কাছে ছিলো, যা দিয়ে নির্দিষ্ট ধরণের কিছু শক্তিশালী টার্গেট ধ্বংস করা সম্ভব ছিল। যেমন, ‘এফ-৭’ সিরিজের বিমানগুলি ২০০কেজি ওজনের ‘টাইপ-২০০এ’ এন্টি-রানওয়ে বোমা এবং ক্লাস্টার বোমা বহণ করতে পারতো। আর ‘মিগ-২৯’ বিমানগুলি ১২৩কেজি ওজনের ‘এস-২৪’ ২৪০মিঃমিঃ রকেট বহণ করতে পারতো।

২০১০এর পর বিমান বাহিনীতে ১৬টা ‘এফ-৭বিজি১’ ফাইটার, ১৬টা ‘ইয়াক-১৩০’ লীড-ইন-জেট-ট্রেইনার যুক্ত হয়। এছাড়াও বিমান এবং সেনাবাহিনীতে যুক্ত হয় ‘এমএম-৯০’ স্বল্পপাল্লার বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে। এই সংখ্যাগুলি একদিনে যেমন উল্লেখযোগ্য কিছু নয়; আবার শুধুমাত্র বিমানের সংখ্যা দিয়েও এখন আর নিজেদের ডিটারেন্ট ধরে রাখা সম্ভব নয়। একারণেই ২০১৪-১৫ সালে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ‘এফ-৭বিজি১’ বিমানগুলির জন্যে চীন থেকে ‘এলএস-৬’ জিপিএস-গাইডেড গ্লাইড বোমা কেনে। প্রকৃতপক্ষে এটা কিছু যন্ত্রাংশ, যা কিনা সাধারণ ২৫০কেজি বোমার সাথে জুড়ে দিয়ে সেটাকে প্রায় ৬০কিঃমিঃ দূর থেকে টার্গেটের ৫০ফুটের মাঝে ফেলার জন্যে উপযোগী করে ফেলা হয়। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ বিমান বাহিনী শত্রুর কৌশলগত কোন টার্গেট ধ্বংস করতে সক্ষমতা অর্জন করে। প্রথমদিকে শুধুমাত্র ৩৫তম স্কোয়াড্রনের ‘এফ-৭বিজি১’ বিমানগুলিই ‘এলএস-৬’ গাইডেড বোমা বহণ করতে পারতো। বিমান বাহিনীর ইঞ্জিনিয়াররা নিজেদের প্রচেষ্টায় ৫ম স্কোয়াড্রনের ‘এফ-৭বিজি’ বিমানগুলিকেও ‘এলএস-৬’ বহণের উপযোগী করে ফেলেন। এখন দুই স্কোয়াড্রন বিমান এই বোমা বহণ করতে সক্ষম। এই বোমাগুলি যেকোন আবহাওয়ায়, এমনকি মেঘের কারণে ভূমি না দেখা গেলেও টার্গেট ধ্বংস করতে সক্ষম।

২০১৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে যুক্ত হয় রুশ লীড-ইন-ট্রেইনার বিমান ‘ইয়াক-১৩০’। এই বিমানটা প্রযুক্তিগত দিক থেকে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সবচাইতে উন্নত বিমান। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ভাষ্যমতে, ‘ইয়াক-১৩০’ বিমানের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো রাতের বেলায় আকাশ থেকে শত্রুর উপর হামলা করার সক্ষমতা অর্জন করে। এই বিমানের সাথেই আসে ‘কেএবি-৫০০কেআর’ টিভি-গাইডেড বোমার ট্রেনিং ভার্সন। ‘ইয়াক-১৩০’ বিমান প্রায় ১৫কিঃমিঃ দূর থেকে ৫০০কেজি ওজনের এই বোমা শত্রুর টার্গেটের ১৩ফুট থেকে ২৩ফুটের মাঝে ফেলতে সক্ষম। এই বোমাগুলি ডেলিভারির জন্যে ভালো আবহাওয়া আবশ্যক। তবে অপটিক্যাল গ্যাইড্যান্সের কারণে এটাকে জ্যামিং করা অসম্ভব।

তুর্কি মিডিয়া বলছে যে, ২০১৯ সাল থেকে তুর্কিরা বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ‘এফ-৭’ বিমানে ‘রকেটসান’ কোম্পানির ‘তেবার’ লেজার-গাইডেড বোমা সংযোজনের চেষ্টা করে যাচ্ছিলো। এই বিমানগুলি লেজার-গাইডেড বোমা ডেলিভারির জন্যে তৈরি করা হয়নি। তবে তুর্কি ইঞ্জিনিয়াররা কিছু ইকুইপমেন্ট কিট সংযোজনের মাধ্যমে এই বিমানগুলিকে ‘তেবার’ গাইডেড বোমা বহণে সক্ষম করে ফেলেন। এরপর ২০২২এর জানুয়ারি মাসে তুর্কি মিডিয়া আবারও খবর দেয় যে, তুর্কিরা বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে ‘তেবার’ লেজার-গাইডেড বোমা সরবরাহ করেছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ‘এফ-৭’ যুদ্ধবিমানগুলি চলমান টার্গেট ধ্বংস করতে সক্ষম হলো। এই বোমাগুলি ২ থেকে ২৮কিঃমিঃ দূরত্ব রেখেই ছোঁড়া যায় এবং এগুলি টার্গেটের ১০ফুটের ভেতর আঘাত করতে সক্ষম। অর্থাৎ টার্গেটের বেঁচে যাবার কোন সম্ভাবনাই নেই। বোমাগুলির টার্গেটিংএর জন্যে অন্য কোন বিমান বা ড্রোন অথবা ভূমিতে স্পেশাল ফোর্সের সদস্যদের সহায়তায় টার্গেটের উপর লেজার পয়েন্টার ব্যবহার করতে হয়। উপরে বর্ণিত সেনা ও নৌবাহিনীর স্পেশাল ফোর্সের সদস্যরা একারণে অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

বেলারুশ থেকে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ‘মিগ-২৯’ যুদ্ধবিমানগুলি ওভারহলিং এবং মডার্নাইজ করে নিয়ে আসার পর এই বিমানগুলির সক্ষমতা ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। ২০২২ সালের বিজয় দিবস প্যারেডে বিমান বাহিনী অফিশিয়ালি ঘোষণা দেয় যে, মডার্নাইজ করার পর এই বিমানগুলি এখন ‘কেএবি-৫০০কেআর’ টিভি-গাইডেড বোমা ব্যবহার করে ২৫কিঃমিঃ দূরের টার্গেট ধ্বংস করতে সক্ষম। একইসাথে ‘মিগ-২৯’ বিমানগুলি এখন ‘কেএইচ-২৯’ এবং ‘কেএইচ’৩১’ ক্ষেপণাস্ত্র বহণ করতে সক্ষম। ‘কেএইচ-২৯টি’ বিশাল একটা টিভি-গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র। ৬৮৫কেজি ওজনের এই ক্ষেপণাস্ত্রে রয়েছে ৩২০কেজি ওজনের বিশাল একটা ওয়ারহেড; যা কিনা ভূমির যে কোন টার্গেট অথবা সমুদ্রে সবচাইতে বড় আকৃতির যুদ্ধজাহাজ সুপারসনিক গতিতে উড়ে গিয়ে ১৩কিঃমিঃ দূর থেকে ধ্বংস করতে পারে। বাংলাদেশ বিমান বাহিনী এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলিকে ম্যারিটাইম এলাকার নিরাপত্তায় ব্যবহার করতে চায়। এই ক্ষেপণাস্ত্রের সাথে যুক্ত হয়েছে ‘কেএইচ’৩১এ’ জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। ৬১০কেজি ওজনের এই ক্ষেপণাস্ত্র ৯৪কেজি ওজনের ওয়ারহেড ব্যবহার করে ৭০কিঃমিঃ দূর থেকে সাড়ে ৪ হাজার টন আকৃতির যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস করতে সক্ষম। এর সুপারসনিক গতির কারণে জাহাজের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্যে এটা বড় চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়। ‘মিগ-২৯’ বিমানগুলি বঙ্গোপসাগরের যে কোন প্রান্তে উড়ে যেতে সক্ষম। আর এই বিমানগুলিতে এধরণের ক্ষেপণাস্ত্র যুক্ত করার অর্থ হলো, পুরো বঙ্গোপসাগরের কোথাও কোন জাহাজ বা উপকূলীয় স্থাপনা বাংলাদেশ বিমান বাহিনী থেকে নিরাপদ নয়।

বিমান বাহিনীর এই প্রতিটা স্ট্র্যাটেজিক স্ট্রাইকে শত্রু এলাকার অনেক ভেতরে মিশন পরিচালনা করতে হবে; যার ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর পাইলট ভূপাতিত হতে পারে। এমতাবস্থায় এই পাইলটকে উদ্ধার করাটা জরুরি; কেননা একটা বিমান স্বল্প সময়ে কিনে নিয়ে আসা সম্ভব হলেও একজন অভিজ্ঞ পাইলট তৈরি করতে অনেক বছর সময় লাগে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে জার্মানির প্রচুর ভালো ভালো বিমান ছিল (জেট ফাইটার সহ); কিন্তু অভিজ্ঞ পাইলটের অভাবে তারা আকাশের নিয়ন্ত্রণ হারায়। একারণে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী তাদের চতুর্থ ডিটারেন্ট ডেভেলপ করার সাথে সাথে শত্রুর নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকা থেকে পাইলট উদ্ধার করার মিশন নিয়ে অনুশীলন শুরু করে। ‘কমব্যাট সার্চ এন্ড রেসকিউ’ বা ‘সি-এসএআর’ মিশনের জন্যে ‘আগুস্টা এডব্লিউ-১৩৯’ উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার এবং ‘এমআই-১৭১এসএইচ’ হেলিকপ্টার ক্রয় করার ছাড়াও এই মিশনের কার্যপ্রণালী কেমন হওয়া উচিৎ, তার উপরে নিয়মিত চলছে কনসেপ্ট ডেভেলপমেন্ট এবং প্রশিক্ষণ। বিমান বাহিনী গড়ে তুলতে থাকে নিজস্ব স্পেশাল ফোর্স; যারা ‘সি-এসএআর’ মিশনে পাইলট উদ্ধারে মূল ভূমিকা পালন করবে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তুরস্কে নির্মিত 'টিআরজি-৩০০ টাইগার' ৩০০মিঃমিঃ রকেটের পরীক্ষামূলক ফায়ারিং। পৃথিবীর অনেক স্থানে ১২০কিঃমিঃ তেমন কোন পাল্লা নয়; কিন্তু বাংলাদেশের আশেপাশের এলাকার জন্যে এটা অনেক। কারণ এই এলাকা ঘনবসতিপূর্ণ। এখানে কিছুদূর পরপরই বড় বড় শহর এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অবকাঠামো রয়েছে। তবে এ-ই শেষ নয়। কারণ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ২৮০কিঃমিঃ পাল্লার ‘টাইপ-এ’ ক্ষেপণাস্ত্রও পাবার পথে রয়েছে; যা আরও বহু এলাকা বাংলাদেশের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লার মাঝে নিয়ে আসবে।


চতুর্থ ডিটারেন্ট - সেনাবাহিনীর রকেট আর্টিলারি

২০১৯ সালের মার্চে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তুরস্ক থেকে মধ্যম পাল্লার ‘টাইপ-বি’ রকেট লঞ্চার কেনার চুক্তি করে। তুরস্কের ‘রকেটসান’ কোম্পানির তৈরি ৩০০মিঃমিঃ ক্যালিবারের ‘টিআরজি-৩০০ টাইগার’ মাল্টিপল লঞ্চ রকেট সিস্টেমকে স্বল্প পাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল বলাটাই শ্রেয়। কারণ এই ক্ষেপণাস্ত্রের ১০৫কেজি ওয়ারহেড স্যাটেলাইট এবং ইনারশিয়াল ন্যাভিগেশন ব্যবহার করে ১২০কিঃমিঃ দূরের লক্ষ্যবস্তুর ১০ফুটের মাঝে আঘাত হানতে সক্ষম। ২০২১ সালের ৩০মে এই ক্ষেপণাস্ত্রের চালান পায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী; যা অফিশিয়ালি ‘স্ট্রাটেজিক ওয়েপন সিস্টেম’ বলে আখ্যা দেয়া হয়েছে। পৃথিবীর অনেক স্থানে ১২০কিঃমিঃ তেমন কোন পাল্লা নয়; কিন্তু বাংলাদেশের আশেপাশের এলাকার জন্যে এটা অনেক। কারণ এই এলাকা ঘনবসতিপূর্ণ। এখানে কিছুদূর পরপরই বড় বড় শহর এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অবকাঠামো রয়েছে। তবে এ-ই শেষ নয়। কারণ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ২৮০কিঃমিঃ পাল্লার ‘টাইপ-এ’ ক্ষেপণাস্ত্রও পাবার পথে রয়েছে; যা আরও বহু এলাকা বাংলাদেশের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লার মাঝে নিয়ে আসবে।

তবে এত দূরের টার্গেটে নিখুঁতভাবে গোলা ছুঁড়তে গেলে টার্গেট খুঁজে পাওয়াটা জরুরি। সেনাবাহিনীর স্পেশাল ফোর্স ছাড়াও সেনা ও বিমান বাহিনীর ড্রোনগুলি এই ক্ষেপণাস্ত্রের জন্যে টার্গেট খুঁজে দিতে সক্ষম। বিমান বাহিনীর ইতালিতে তৈরি ‘ফ্যালকো আস্টোর’ ড্রোন এবং সেনাবাহিনীর তুরস্কে তৈরি ‘বায়রাকতার টিবি-২’ ড্রোনের ‘হেনসোল্ড আরগোস-২’ ইলেকট্রো-অপটিক্যাল সেন্সর দ্বারা ২০০কিঃমিঃ থেকে ৩০০কিঃমিঃ দূরত্বে ভূমিতে লুকিয়ে রাখা যেকোন কৌশলগত সামরিক স্থাপনার লোকেশন নিখুঁতভাবে সনাক্তকরণ সম্ভব। এই লোকেশনের তথ্য ‘এফ-৭’ বিমানের ‘এলএস-৬’ গাইডেড বোমা অথবা ‘টিআরজি-৩০০’ ক্ষেপণাস্ত্রের গাইড্যান্স সিস্টেমে ঢুকিয়ে দিলেই সেই টার্গেট ধ্বংস করার মিশন পরিচালনা করা সম্ভব।

যে ব্যাপারটা একমত হতেই হবে তা হলো, পাঁচ দশক ধরে বাংলাদেশের নীতির প্রকৃতপক্ষে কোন পরিবর্তন হয়নি। কারণ এই রাষ্ট্রের চিন্তার ভিত একই আছে; যা ১৯৪৭ সালের ব্রিটিশদের এঁকে দেয়া বাউন্ডারির প্রতিফলন। বহু সরকার আসা-যাওয়া করলেও রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলি একই রয়েছে; যাদের চিন্তায় পরিবর্তন আসেনি। বাংলাদেশে পাঁচ দশকে যা কিছু ঘটেছে, তার কেন্দ্রে সর্বদাই রয়েছে রাষ্ট্রের স্থায়ী সংস্থাগুলি। এটা একটা স্থায়ী রাষ্ট্রীয় কাঠামো; যা ১৯৪৭-কেন্ত্রিক চিন্তাকে ঘিরে আবর্তিত। বাংলাদেশে যেকোন পরিবর্তনও এই স্থায়ী রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে কেন্দ্র করেই হতে হবে; সেটা ১৯৪৭কে মাথায় রেখেই হোক, অথবা ১৯৪৭কে উপেক্ষা করেই হোক।


পাঁচ দশক ধরে কেন বাংলাদেশ শুধু ডিটারেন্সের পিছনেই ছুটছে?

১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশ ভেঙ্গে দেয়ার সময় ব্রিটিশরাই ঠিক করেছে এখানে কয়টা রাষ্ট্র হবে, সেগুলির মানচিত্র কেমন হবে এবং এই রাষ্ট্রগুলির গঠনতন্ত্রই বা কেমন হবে। ব্রিটিশরা নিশ্চিত করেছে যে, উপমহাদেশে নতুন তৈরি করা রাষ্ট্রগুলির মাঝে থাকবে দ্বন্দ্ব এবং একে অপরকে দেখবে তার অস্তিত্বের প্রতি হুমকি হিসেবে। কারণ এই রাষ্ট্রগুলির অস্তিত্বের সংজ্ঞাটাও ব্রিটিশরা এমনভাবেই দিয়েছে, যাতে করে তারা সারাক্ষণ একে অপরকে নিজের প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখে। ব্যাপারটা এমন নয় যে, ব্রিটিশরা বোঝেনি যে কোন একসময় পাকিস্তান ভেঙ্গে যাবে। বরং ব্রিটিশদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল ভেঙ্গে যাওয়া পাকিস্তানের অংশগুলি ব্রিটিশ চিন্তার উপর ভর করেই চলবে কিনা। একারণেই ব্রিটিশরা উপমহাদেশ ভেঙ্গে ফেলার প্রায় ২৫ বছর পর বাংলাদেশের জন্ম হলেও বাংলাদেশের চিন্তাটা সেই একই অস্তিত্বের চিন্তার আশেপাশে ঘুরপাক খেয়েছে।

১৯৭২ সাল থেকেই বাংলাদেশের চিন্তার কেন্দ্রে ছিল নিজের অস্বিত্ব রক্ষা করা। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের এঁকে দেয়া বাউন্ডারি ১৯৭২ সালেও বাংলাদেশের জন্যে ছিল সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ। তিন দিক থেকে বাংলাদেশকে ঘিরে রাখা বিশাল রাষ্ট্র ভারত ছিল বাংলাদেশের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে; কারণ ১৯৪৭ সালের মানচিত্র এটাই ঠিক করে দিয়েছিল। প্রথম দিন থেকেই বাংলাদেশ ভারতের প্রভাবকে ব্যালান্স করতে সারা বিশ্বে বন্ধু খুঁজেছে; এমনকি পাকিস্তানের সাথেও সম্পর্কোন্নয়ন করতে তার সময় লাগেনি। যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়ের সাথেই বন্ধুত্ব রেখেছে সে ব্যালান্সিং এক্ট হিসেবেই; যাতে কোন একজনের পকেটে তারা চলে না যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা চেয়েছে শক্তিশালী দেশগুলিকে খুশি রাখতে; যাতে করে তারা নাখোশ হয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কিছু করে না বসে। কিন্তু সকলকে খুশি করাটা একটা অবাস্তব ব্যাপার; যা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কর্তাব্যাক্তিরা প্রথম দিন থেকেই জানতো। তথাপি তারা ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব’র মতো একটা নীতি প্রণয়ন করেছিল। আবার একইসাথে বাস্তবতাকে মাথায় রেখে তারা নাখোশ হওয়া ‘বন্ধু’কে রাজনৈতিক ও সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে বিরত রাখতে মরিয়া থেকেছে। এটাই হলো বাংলাদেশের ডিটারেন্স খোঁজার উৎস। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে বহু সরকার এসেছে। রাজনৈতিক পরিবর্তন ছিল নিয়মিত; এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা ছিল রক্তাক্ত। কিন্তু বাংলাদেশের চিন্তার কেন্দ্রে থাকা ডিটারেন্সের নীতি থেকে বাংলাদেশ কখনোই সরে আসেনি। কারণ এই নীতি বাংলাদেশের মানচিত্র তৈরির সাথে সম্পর্কিত; যেটার উপর বাংলাদেশের কোন নিয়ন্ত্রণই নেই।

স্বাধীনতার পর প্রথম দশকে বাংলাদেশ তার তিনটা ডিটারেন্স তৈরি করেছে। দ্বিতীয় দশকে সেগুলিকে আরও বহু শক্তিশালী করেছে। কিন্তু তৃতীয় দশকে এই ডিটারেন্স ধ্বংস হয়েছে এবং রাষ্ট্র পড়েছে মহা বিপদে। বাংলাদেশের প্রথম দুই দশকের শক্তিশালী অবস্থান ভারতকে তার নীতির পরিবর্তন করতে বাধ্য করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম হয়েছে ভারতের জন্যে নতুন ফোকাস পয়েন্ট। তবে একইসাথে তৃতীয় দশকে মিয়ানমার বাংলাদেশের সাথে সাংঘর্ষিক অবস্থানে চলে যাবার পর থেকে ভারত সেটাকে সুযোগ হিসেবেই দেখেছে; যদিও সেই সুযোগ কাজে লাগাতে ভারতের আরও অনেক সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। চতুর্থ দশক চলেছে দুর্বল অবস্থানকে নিয়েই। তবে এসময়ে চলেছে চিন্তাভাবনা এবং নিজেদের ডিটারেন্সগুলিকে পূনরুজ্জীবিত করার নতুন পরিকল্পনা। সেই অনুযায়ী পঞ্চম দশকে শুরু হয় নতুন কর্মকান্ড। কিন্তু বড্ড বেশি দেরি হয়ে গেছে। বাংলাদেশের দুই দশকের স্থবির নীতিকে উপজীব্য করে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে বাংলাদেশের ব্যালান্সিং এক্ট হিসেবে ডেভেলপ করে গেছে ভারত। একারণে ২০১০ সাল থেকে বহু চেষ্টা করেও বাংলাদেশ তার কৌশলগত ডিটারেন্টগুলিকে শক্তিশালী অবস্থানে আনতে পারেনি।

পাঁচ দশকের কৌশলগত ডিটারেন্ট গঠনের প্রয়াস কতটুকু সফল হয়েছে, সেই প্রশ্নে একেক জনের কাছে একেক উত্তর পাওয়া যাবে। তবে যে ব্যাপারটা একমত হতেই হবে তা হলো, পাঁচ দশক ধরে বাংলাদেশের নীতির প্রকৃতপক্ষে কোন পরিবর্তন হয়নি। কারণ এই রাষ্ট্রের চিন্তার ভিত একই আছে; যা ১৯৪৭ সালের ব্রিটিশদের এঁকে দেয়া বাউন্ডারির প্রতিফলন। বহু সরকার আসা-যাওয়া করলেও রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলি একই রয়েছে; যাদের চিন্তায় পরিবর্তন আসেনি। বাংলাদেশে পাঁচ দশকে যা কিছু ঘটেছে, তার কেন্দ্রে সর্বদাই রয়েছে রাষ্ট্রের স্থায়ী সংস্থাগুলি; যাদের মাঝে রয়েছে সামরিক বাহিনী, সরকারি কর্মকর্তাবৃন্দ এবং তাদের কাঠামো, কূটনীতিক, একাডেমিক ব্যক্তিত্ব, বিভিন্ন চিন্তাবিদ এবং থিঙ্কট্যাঙ্ক, প্রভাবশালী ব্যাবসায়ীবৃন্দ এবং তাদের সংগঠন, এবং এর বাইরেও আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ। রাজনৈতিক কর্মকান্ডের সামনে এই মানুষগুলিকে দেখা যায় না; কিন্তু রাষ্ট্রের অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ তাদেরকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে এবং হবে। এটা একটা স্থায়ী রাষ্ট্রীয় কাঠামো; যা ১৯৪৭-কেন্ত্রিক চিন্তাকে ঘিরে আবর্তিত। ১৯৪৭এর ভূতই বাংলাদেশকে চালিয়ে নিচ্ছে; এটা কারুর পছন্দ হোক বা না হোক। বাংলাদেশে যেকোন পরিবর্তনও এই স্থায়ী রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে কেন্দ্র করেই হতে হবে; সেটা ১৯৪৭কে মাথায় রেখেই হোক, অথবা ১৯৪৭কে উপেক্ষা করেই হোক।





সূত্রঃ


‘SYND 28/03/1972 PRIME MINISTER AND PRESIDENT OF BANGLADESH ATTEND INDEPENDENCE PARADE’ in AP Archive, 21 July 2015 (https://www.youtube.com/watch?v=OaekhWjfCu0)
‘SYND 30/09/72 BANGLADESH AIRFORCE CELEBRATES FIRST ANNIVERSARY’ in AP Archive, 23 July 2015 (https://www.youtube.com/watch?v=aPuGKGznTv0)
‘SYND 13-3-72 INDIAN ARMY CEREMONIAL WITHDRAWAL OF BANGLADESH’ in AP Archive, 21 July 2015 (https://www.youtube.com/watch?v=X4D7y2UWQTE)
‘SYND 27/3/1973 2ND INDEPENDANCE DAY MILITARY PARADE’ in AP Archive, 21 July 2015 (https://www.youtube.com/watch?v=b9fDZECQfwY)
‘TRADE REGISTERS’ in Stockholm International Peace Research Institute (SIPRI), (https://armstrade.sipri.org/armstrade/page/trade_register.php)
‘Blood Telegram: India’s Secret War in East Pakistan’ by Gary J Bass, 2014
‘মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী - ইতিহাসের পুনর্পাঠ’, আলতাফ পারভেজ, ২০১৫
‘Bangladesh Liberation War - Myths and Facts - How India, US, China, and the USSR Shaped the Outcome’ by B. Z. Khasru, 2010
‘RAW: A History of India’s Covert Operations’, by Yatish Yadav, 2020
‘Eagles Over Bangladesh: The Indian Air Force in the 1971 Liberation War’, by P.V.S. Jagan Mohan and Samir Chopra, 2013
‘বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী দিবস ২০২৩ - Bangladesh Army Day 2023’ in ATN News, 20 November 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=fNq432D50uM)
‘A History of Bangladesh, Second Edition’ by Willem van Schendel, 2020
‘Bangladeshi Insurgents Say India Is Supporting Them’ in New York Times, 11 June 1989
‘Bangladesh to probe 50% loss of military aircraft in typhoon’ in Deseret News, 07 May 1991 (https://www.deseret.com/1991/5/7/18919284/bangladesh-to-probe-50-loss-of-military-aircraft-in-typhoon)
‘Bangladesh: Tardy relief work prolongs suffering of populace ravaged by 12-hour cyclone’ in India Today, 31 May 1991 (https://www.indiatoday.in/magazine/special-report/story/19910531-bangladesh-tardy-relief-work-prolongs-suffering-of-populace-ravaged-by-12-hour-cyclone-815365-1991-05-30)
‘Storm Kills 1,000 In Bangladesh’ in The Washington Post, 01 May 1991 (https://www.washingtonpost.com/archive/politics/1991/05/01/storm-kills-1000-in-bangladesh/ca713435-5e43-456d-8759-1fbbfbdcfb85/)
‘GDP (current US$) - Bangladesh’ in The World Bank (https://data.worldbank.org/indicator/NY.GDP.MKTP.CD?locations=BD)
‘Myanmar withdraws warships’ in The Daily Star, 10 November 2008
‘St Martin's Island seen vulnerable’ in The Daily Star, 17 October 2009
‘Bangladesh Attack Is New Evidence That ISIS Has Shifted Its Focus Beyond the Mideast’ in The Ney York Times, 02 July 2016
‘ISIS attack in Bangladesh shows broad reach as ‘caliphate’ feels pressure’ in CNN, 04 July 2016
‘Bangladesh Attack Is New Evidence That ISIS Has Shifted Its Focus Beyond the Mideast’ in The Hindustan Times, 03 July 2016
‘Dozens killed in fighting between Myanmar army and Rohingya militants’ in The Guardian, 25 August 2017
‘Rohingyas in Bangladesh: Myanmar proposes taking them back’ in The Daily Star, 03 October 2017
‘Airborne Systems RA-300 Advanced Ram Air Parachute System’ in Airborne Systems Products (https://airborne-sys.com/products/personnel-parachute-systems/)
‘PM inaugurates Naval Aviation, names SWADS naval command base “Nirvik”’, in Priyo News, 27 December 2011 (http://news.priyo.com/politics/2011/12/27/pm-inaugurates-naval-aviation-44644.html)
‘First 2 submarines commissioned’ in The Daily Star, 12 March 2017
‘Bangladesh can protect itself from any external aggression: PM’ in The Business Standard, 12 December 2021
‘India’s World- Chinese submarines and Sino-Bangladesh defence ties’ in SansadTV, 22 November 2016 (https://www.youtube.com/watch?v=2BOqaLnIZ6s)
‘Why China’s Submarine Deal With Bangladesh Matters’ in The Diplomat, 20 January 2017
‘India set to export torpedoes to Myanmar’ in Times of India, 25 March 2017
‘Why This Indian Neighbour Decided To Buy 2 Submarines From China’ in NDTV, 13 July 2017
‘Defence Make In India: First Batch Of Lightweight Anti-Submarine Shyena Torpedoes Sent To Myanmar’ in Swarajya Magazine, 13 July 2019 (https://swarajyamag.com/insta/defence-make-in-india-first-batch-of-lightweight-anti-submarine-shyena-torpedoes-sent-to-myanmar)
‘India gifts a submarine to Myanmar, gains edge over China’ in The Hindustan Times, 21 October 2020
‘With an eye on China, India gifts submarine to Myanmar’ in Nikkkei Asia, 22 October 2020
‘Roketsan’dan Bangladeş’e TEBER İhracatı ‘ in Savunma Sanayi ST, 18 January 2022 (https://www.savunmasanayist.com/roketsandan-bangladese-teber-ihracati/)
‘জাতীয় প্যারেড স্কয়ার হতে সরাসরি সম্প্রচার’ in BTV, 16 December 2022 (https://www.youtube.com/watch?v=jIcyKqvbp0I)
‘Kh-29ТЕ Air-to-surface missile’ in Rosoboronexport, 25 September 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=fjoJ1tlmkJo)
‘Kh-31A - Air-launched high-speed anti-ship missile’ in Rosobonexport (http://roe.ru/eng/catalog/aerospace-systems/air-to-air-missile/kh-31a/)
‘Combat Search & Rescue_BAF_2015_xHD’ in @xeehad, 25 May 2015 (https://www.youtube.com/watch?v=DkCs0Cgmq7Y&t=33s)
‘দেখুন বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর শীতকালীন মহড়ার দৃশ্য’ in Jamuna TV, 04 May 2020 (https://www.youtube.com/watch?v=XqbqsyFy_9A)
‘সেনাবাহিনীর বহরে যুক্ত হলো তুরস্কের 'টাইগার মিসাইল সিস্টেম' in Somoy TV, 31 January 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=e2NjTcmW8hc&t=9s)