Showing posts with label strategy. Show all posts
Showing posts with label strategy. Show all posts

Saturday, 25 November 2023

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ডিটারেন্ট - পাঁচ দশকের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম

২৫শে নভেম্বর ২০২৩

পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষা ডিটারেন্ট

ডিটারেন্ট এমন একটা জিনিস, যার মাধ্যমে একটা রাষ্ট্র তার প্রতিদ্বন্দ্বী বা শত্রু রাষ্ট্রকে হুমকি প্রদান করে - যদি শত্রু রাষ্ট্র তার উপর হামলা করে, তাহলে তাকে চরম মূল্য দিতে হবে। এই হুমকির পিছনে যদি সক্ষমতা এবং সদিচ্ছা থাকে, তাহলে শত্রু হয়তো হামলা করা থেকে বিরত থাকতে পারে। যুদ্ধ না করেই শত্রুকে বিরত রাখার কৌশলই হলো ডিটারেন্ট। একটা রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ডিটারেন্ট নিয়ে কথা বলতে হলে প্রথমেই আসবে রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির কথা।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র হলো ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব; কারুর সাথে শত্রুতা নয়’। নীতি প্রণয়নের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান পরিষ্কার হলেও এই নীতির বাস্তবায়নে বেশকিছু ধোঁয়াশা রয়েই গিয়েছে। যেমন, ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব’ যদি নীতি হয়, তাহলে তো বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। কারণ বাংলাদেশ তো সকলকেই বন্ধু মনে করছে; বন্ধুদের সাথে তো যুদ্ধ করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কেউই তো বাংলাদেশকে মুচলেকা দিয়ে বলেনি যে, তারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোন সংঘাতে যাবে না। বাংলাদেশ হয়তো সকল দেশকে বন্ধু মনে করতে পারে; কিন্তু সেই দেশগুলি নিজেরা কি একে অপরকে বন্ধু মনে করে? উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ ভারত, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে বন্ধু মনে করছে। কিন্তু এই তিনটা দেশ কি একে অপরকে বন্ধু মনে করছে? এরা যদি একে অপরকে বন্ধু মনে না করে, তাহলে তারা কি বাংলদেশের সাথে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের বন্ধুত্বকে স্বাভাবিক চোখে দেখবে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর সহজ নয়। এবং একইসাথে এখানে কোন রাষ্ট্রের শক্তি কতখানি, সেই হিসেবটা চলে আসে। কারণ বর্তমান পশ্চিমা-নিয়ন্ত্রিত বিশ্বে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতিই চলমান। শক্তিশালী দেশের কাছে ছোট কোন দেশের নীত পছন্দ না হলে ছোট দেশকে রাজনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক অবরোধ, এমনকি সামরিক আগ্রাসনের শিকারও হতে হচ্ছে।

একারণে বাংলাদেশ প্রথম দিন থেকেই সামরিক বাহিনী তৈরি করেছে। এখানেই নীতি এবং নীতির বাস্তবায়নের মাঝে ফারাক। সকলকে বন্ধু হিসেবে ঘোষণা দেয়ার পরেও বাংলাদেশ ধরেই নিয়েছে যে, সেই বন্ধুদের মাঝে যে কেউ হঠাৎ করেই শত্রু হয়ে যেতে পারে। অন্য কথায় বলতে গেলে, ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব’ নীতি বাংলাদেশ মুখে বললেও কাজে সেটা কেউই বিশ্বাস করে না। তাহলে এটা কি একটা বিবৃতি মাত্র? নাকি এর পিছনে আরও কিছু রয়েছে?

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর 'এফ-৮৬ স্যাবর' ফাইটার। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ‘এফ-৮৬’ যুদ্ধবিমান ঢাকার আকাশে শত্রু বিমানের প্রতি একটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়; যা খুব বড় কিছু না হলেও গুরুত্বপূর্ণ; যদিও এই বিমানগুলির মেইনটেন্যান্স কতটা নির্ভরযোগ্য ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল তখনও।


ভারতের জন্যে ভূরাজনৈতিক শিক্ষা

১৯৭১ সালে ভারতের সরাসরি সহায়তা এবং সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার স্বাধীনতা পেলেও নতুন রাষ্ট্র থেকে ভারতীয় সেনা প্রত্যাহারের দাবি উঠেছিল পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের পরপরই। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ‘এম-২৪’ ট্যাঙ্ক এবং ‘এফ-৮৬ স্যাবর’ যুদ্ধবিমান রিপেয়ার করে সেগুলিকে বাংলাদেশের নতুন সামরিক বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এগুলি আবার ১৯৭২ সালের সামরিক প্যারেডে প্রদর্শিতও হয়। ভারতীয়রা নতুন তৈরি হওয়া বাংলাদেশের উপর তাদের প্রভাব ধরে রাখতে সকল প্রচেষ্টাই করেছে; যার মাঝে ছিল বাংলাদেশকে সীমিত সংখ্যক সামরিক সরঞ্জাম প্রদান। তবে সেসময় ভারতের সামরিক সক্ষমতারও যথেষ্ট ঘাটতি ছিল। যেকারণে কিছু সেকেন্ড-হ্যান্ড ‘এলিউট-৩’ হেলিকপ্টার, প্যাট্রোল বোট এবং আরও কিছু সরঞ্জাম তারা বাংলাদেশকে আনুদান হিসেবে দেয়। তবে এগুলি বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিশ্চিতে তেমন কোন ভূমিকা রাখেনি।

১৯৭২ সাল থেকেই বাংলাদেশের উপর প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে ভারত ভূরাজনৈতিক চাপ অনুভব করতে থাকে বিভিন্ন দিক থেকে। একটু দেরিতে বুঝলেও দিল্লীর কাছে এটা অন্ততঃ পরিষ্কার হয়ে যায় যে, ভারত বাংলাদেশের জন্মদাতা বলে মনে করলেও প্রকৃতপক্ষে শক্তিশালী দেশগুলির (যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন) ইচ্চা থাকার কারণেই ভারত এই কাজটা সম্পাদন করতে পেরেছে। একদিকে যেমন ব্রিটেন এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন এটা চেয়েছিল, অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র এই রাষ্ট্র গঠনের বিরোধিতা করার যথেষ্ট কারণ খুঁজে পায়নি। বরং পাকিস্তানের সামরিক সরকার প্রধান ইয়াহিয়া খানের মাধ্যমে চীনের সাথে গোপনে যোগাযোগ স্থাপন করাটাই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের আগ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে মৌখিক সমর্থন দিয়ে গেছে; কোন সামরিক সহায়তা দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র শুধু নিশ্চিত করেছে যাতে করে নতুন তৈরি হওয়া বাংলাদেশে কোন বামপন্থী দল ক্ষমতায় না আসতে পারে। একারণে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুজিব বাহিনীকে যুক্তরাষ্ট্র গোপনে ‘এম-১৬’ রাইফেলও দিয়েছে; যেগুলির ৫ দশমিক ৫৬মিঃমিঃ ক্যালিবারের গোলা এই উপমহাদেশের আর কোন রাইফেল বা মেশিনগানে ব্যবহারই হয় না।

ভারত ভূরাজনীতি কম বুঝলেও আশ্চর্য্য ব্যাপার হলো, বাংলাদেশের প্রথম থেকেই ঢাকার কর্তাব্যক্তিরা ভারতের চাইতে ভূরাজনীতি বেশিই বুঝেছিল। একারণেই ১৯৭২ সাল থেকেই বাংলাদেশ পৃথিবীর অনেকগুলি দেশের সাথে সম্পর্কোন্নয়নে মনোযোগী হয়; যা স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশে ভারতের প্রভাবকে কমাতে থাকে। অন্য কথায় বলতে গেলে, ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব’ নীতিটা ভারতের স্বার্থের পরিপন্থী হয়ে যেতে থাকে। কারণ ভারত চেয়েছিল ঢাকার নীতির উপর একচ্ছত্র প্রভাব ধরে রাখতে। প্রকৃতপক্ষে এই নীতির মূল জায়গাটা হলো ব্যালান্সিং; বড় বড় রাষ্ট্রগুলি যাতে বাংলাদেশকে গিলে খেতে না পারে, সেজন্য প্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন দেশের সাথে সম্পর্ক তৈরি করা। এই নীতির ফলাফল ভারত হাঁড়ে হাঁড়ে টের পেতে থাকে ১৯৭২ সাল থেকে।

১৯৭৮ সাল নাগাদ বাংলাদেশ পৃথিবীর ৩৮টা শহরে কূটনৈতিক মিশন খুলে ফেলেছে। ইউরোপের মস্কো, লন্ডন, প্যারিস, রোম, আমেরিকার ওয়াশিংটন, এশিয়ার বেইজিং, ক্যানবেরা ছাড়াও মুসলিম বিশ্বের কায়রো, আবুধাবি, কুয়েত, তেহরান, বাগদাদ, ইসলামাবাদ, রিয়াদ, জাকার্তা, কুয়েত, আঙ্কারাতে বাংলাদেশ কূটনৈতিক মিশন খোলে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, কোন এক দেশের একচ্ছত্র প্রাধান্য সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে বাংলাদেশের উপর ভারতের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে; যা কিনা ভারতকে অসন্তুষ্ট করেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পূর্ব-ব্লকের রাষ্ট্রগুলির সাথে সম্পর্ক রাখার কারণে তা যুক্তরাষ্ট্রের অসন্তুষ্টির কারণও ছিল। তবে রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক কোন একটা দেশকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়নি। সম্পর্ক এক-দেশ-কেন্দ্রিক না থাকার বহু উদাহরণ নিয়ে আসা যায়। তবে এই লেখাতে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টাকেই তুলে ধরা হয়েছে।

১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে ১৪টা 'মিগ-২১' ফাইটার বিমান পায়। ১৯৭৩ সালে ‘মিগ-২১’ ছিল ভারতীয় বিমান বাহিনীর প্রধান যুদ্ধবিমান। অর্থাৎ কোয়ালিটির দিক থেকে ভারতীয় বিমান বাহিনী এবং বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর হার্ডওয়্যার হয়ে গেলো সমমানের। এই ‘মিগ-২১’ যুদ্ধবিমানের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশকে ‘পি-৩৫’ রাডারও দেয়; যার মাধ্যমে বাংলাদেশের আকাশসীমায় শত্রু বিমানের উপস্থিতির একটা আগাম বার্তা দেয়া সম্ভব হয় প্রথমবারের মতো। এক ধাক্কায় ঢাকার আকাশ শত্রুর পরিবহণ বিমানের জন্যে ‘নো-ফ্লাই জোন’ হয়ে দাঁড়ায়।


প্রথম দশক - তিনটা ডিটারেন্ট

পাকিস্তান বিমান বাহিনীর এক স্কোয়াড্রন (১৬টা) ‘এফ-৮৬ স্যাবর’ ফাইটার জেটের ব্যাপারে ভারতীয় বিমান বাহিনী কতটা চিন্তিত ছিল, তার উদাহরণ পাওয়া যায় ১৯৭১ সালে তেজগাঁও বিমান ঘাঁটির উপর ভারতীয় বিমান বাহিনীর বারংবার হামলা। দুই দশকের বেশি পুরোনো প্রযুক্তির হলেও এই বিমানগুলি ভারতীয়দের শান্তিতে ঘুমাতে দেয়নি। রানওয়েতে বহু সংখ্যক গভীর খাদ হয়ে যাবার পরেও ভারতীয়রা এই বিমানগুলির ভয়ে ছিল এবং বোমা ফেলা বন্ধ করেনি। ১৬টা বিমানের মাঝে ১৩টা বিমান তেজগাঁও বিমান বন্দরের কম্পাউন্ডের মাঝেই ছিল। এরপরেও তারা সেগুলি খুঁজে পেতেই ব্যর্থ হয়! এর সাথে কমপক্ষে একটা ‘টি-৩৩’ জেট ট্রেইনার বিমানও ছিল। যুদ্ধের শেষে কমপক্ষে ৮টা ‘স্যাবর’ বিমান বাংলাদেশী ইঞ্জিনিয়াররা মেরামত করে সার্ভিসে নিয়ে আসে; যেগুলি ভারতীয়রা ১৯৭২ সালের ২৬শে মার্চ প্রথমবারের মতো ঢাকার আকাশে উড়তে দেখে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ‘এফ-৮৬’ যুদ্ধবিমান ঢাকার আকাশে শত্রু বিমানের প্রতি একটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়; যা খুব বড় কিছু না হলেও গুরুত্বপূর্ণ; যদিও এই বিমানগুলির মেইনটেন্যান্স কতটা নির্ভরযোগ্য ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল তখনও। ভারত বিভিন্ন সময়ে আশেপাশের ছোট দেশগুলির বিমানবন্দরে সামরিক পরিবহণ বিমান নামিয়ে অতি দ্রুত সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছে। সেসকল দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কলহের সুযোগ নিয়ে ভারত এই কাজগুলি করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই নীতি কিছুটা হলেও চ্যালেঞ্জে পড়ে যায় ‘এফ-৮৬’ বিমানগুলির জন্যে। এই বিমানগুলির ইউনিটের ব্যাপারে হয় আগে থেকেই নিশ্চিত হতে হবে যে তারা আকাশে উড়ে ভারতীয় পরিবহণ বিমানকে বাধা দেবে না। অথবা ভারতীয় ফাইটার বিমানকে তেজগাঁও বিমানবন্দরে বোমা ফেলে এই বিমানগুলিকে আকাশে ওড়া থেকে বিরত রাখতে হবে। এই কাজগুলি সম্পাদন করাটা কূটনৈতিকভাবে বেশ কঠিন।

তবে এই কাজটা আরও অনেক বেশি কঠিন হয়ে যায় যখন ১৯৭৩ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশকে পুরো এক স্কোয়াড্রন ‘মিগ-২১’ যুদ্ধবিমান (১২টা ‘মিগ-২১এমএফ’ এবং ২টা ‘মিগ-২১উইবি’ ট্রেইনার) উপহার দেয়। এই বিমানগুলির সাথে এসেছিল ৭৫টা ‘কে-১৩এ’ আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র। ১৯৭৩ সালে ‘মিগ-২১’ ছিল ভারতীয় বিমান বাহিনীর প্রধান যুদ্ধবিমান। অর্থাৎ কোয়ালিটির দিক থেকে ভারতীয় বিমান বাহিনী এবং বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর হার্ডওয়্যার হয়ে গেলো সমমানের। এই ‘মিগ-২১’ যুদ্ধবিমানের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশকে ‘পি-৩৫’ রাডারও দেয়; যার মাধ্যমে বাংলাদেশের আকাশসীমায় শত্রু বিমানের উপস্থিতির একটা আগাম বার্তা দেয়া সম্ভব হয় প্রথমবারের মতো। এক ধাক্কায় ঢাকার আকাশ শত্রুর পরিবহণ বিমানের জন্যে ‘নো-ফ্লাই জোন’ হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ ‘এফ-৮৬ স্যাবর’, ‘মিগ-২১’ যুদ্ধবিমান এবং ‘পি-৩৫’ রাডার ছিল বাংলাদেশের প্রথম ডিটারেন্ট। অন্য কথায় বলতে গেলে ১৯৭৪ সাল থেকে ভারতকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সামরিক হস্তক্ষেপ করতে হলে স্থলসীমান্ত পেরিয়ে সেনাবাহিনী প্রেরণ করতে হবে; যা খুবই কঠিন একটা কাজ হবে। এখন বাংলাদেশ তার সেনাবাহিনীকে গড়ে তুলতে পারে; যাতে করে স্থলসীমান্ত পেরিয়ে ভারতীয় আগ্রাসন যেন বিভীষিকাময় হয়ে যায়।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তার ১৯৭১ সালের তিনটা ব্রিগেডকে তিন স্থানে মোতায়েন করে নিয়মিত সেনাবাহিনীর অংশ করে নেয় - যশোরে ৫৫ ব্রিগেড, ঢাকায় ৪৬ ব্রিগেড, কুমিল্লাতে ৪৪ ব্রিগেড। কিছুদিনের মাঝে রংপুরেও ৭২তম ব্রিগেড স্থাপন করা হয়। ১৯৭৪ সালের ১১ই জানুয়ারি কুমিল্লাতে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে নতুন ইউনিট তৈরি করার জন্যে বিরাট একটা মাইলফলক ছিলো। আর ১৯৪৮ সাল থেকে চট্টগ্রামে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টার তো ছিলোই। প্রায় ২৪ হাজার ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্য ১৯৭১ সালে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলো। আর যুদ্ধের পর ৩০ হাজারের বেশি বাঙ্গালী সামরিক সদস্যকে পাকিস্তান থেকে ফেরত নিয়ে আসা হয়। ১৯৭৩ সালের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে মিশর ও সিরিয়ার পক্ষ নেয়ায় বাংলাদেশকে উপহারস্বরূপ ৩০টা ‘টি-৫৪’ ট্যাংক দেয় মিশর। এর আগে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর রেখে যাওয়া ‘এম-২৪’ ট্যাঙ্কগুলি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ট্যাংক ইউনিট গঠনের জন্যে যথেষ্ট ছিল না। কিন্তু এই ‘টি-৫৪’ ট্যাঙ্কগুলি সেনাবাহিনীর আর্মার্ড কোরের ভিত গড়ে দেয়। ইতালি থেকে ‘অটো মেলারা মড-৫৬’ ডিজাইনের ১০৫মিঃমিঃ আর্টিলারি হাউইটজার আনা শুরু হয়। ‘সিপরি’র হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মোট ৮৫টা কামান পেয়েছিল। এর মাধ্যমে আর্টিলারি কোর একটা শক্ত ভিতের উপর দাঁড়ায়। এই কর্মকান্ডগুলি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যসংখ্যাকে দ্রুত বৃদ্ধি করে এবং বাংলাদেশের প্রতিরক্ষার জন্যে দ্বিতীয় ডিটারেন্ট তৈরি করে।

তৃতীয় ডিটারেন্ট তৈরি হয় ব্রিটেন ও চীনের হাত ধরে। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮২এর মাঝে ব্রিটিশ রয়াল নেভি তাদের বাহিনী থেকে রিটায়ার করাটা তিনটা ফ্রিগেট (একটা ‘টাইপ-৪১’, দু’টা ‘টাইপ-৬১’) বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করলে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের হাতে সল্প পাল্লার ‘ব্লু-ওয়াটার’ সক্ষমতা হাজির হয়। এই ফ্রিগেটগুলিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ নৌবাহিনী এমন কিছু ইউনিট গঠন করতে পারবে, যা কিনা শত্রুর নৌ-অবরোধকে কিছুটা হলেও চ্যালেঞ্জ করতে পারবে। সেই হিসেবে ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যুক্ত হয় চীনে তৈরি ৪টা ‘টাইপ-০২৪’ মিসাইল বোট; সাথে ডেলিভারি পায় ২০টা ‘এসওয়াই-১এ’ জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র; যেগুলির পাল্লা ছিল ১০০কিঃমিঃএরও বেশি। এখন চট্টগ্রাম বন্দরকে অবরোধ দিতে আসা নৌবহর সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকলো না।

স্বাধীনতার পর এক দশকের মাঝেই বাংলাদেশ তার নিরাপত্তা নিশ্চিতে তিনটা ডিটারেন্ট গঠন করে। প্রথম ডিটারেন্টের মাধ্যমে ঢাকার বিমানবন্দরে পরিবহণ বিমান নামিয়ে সেনা মোতায়েন প্রায় অসম্ভব করে ফেলা হয় এবং এর মাধ্যেম স্থলসীমানা দিয়ে সেনা আক্রমণকেই একমাত্র অপশন করে ফেলা হয়। দ্বিতীয় ডিটারেন্টের মাধ্যমে স্থলসীমানা দিয়ে আক্রমণকে কিছুটা হলেও কঠিন করে ফেলা হতে থাকে। আর তৃতীয় ডিটারেন্টের মাধ্যমে নৌ-অবরোধকে ক্ষতির মাঝে ফেলে দেয়ার সম্ভাবনা তৈরি করা হয়। এই তিনটা ডিটারেন্ট তৈরিতে অনেক দেশের সহায়তা লেগেছে; যারা সকলেই নিজেদের স্বার্থেই বাংলাদেশকে সহায়তা দিয়েছে; যাদের মাঝে রয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়ন, ব্রিটেন, চীন, মিশর, ইতালি, এবং আরও অন্যান্য দেশ। স্বাধীনতার পর প্রথম দশকে বাংলাদেশ বহু রাজনৈতিক কলহের মাঝ দিয়ে গিয়েছে; রক্তাক্ত হয়েছে দেশের বহু অঞ্চল। কিন্ত এতো কিছুর মাঝেও এই ডিটারেন্ট তৈরি করা থেমে থাকেনি।

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর চীনা নির্মিত 'এফ-৭এমবি' ফাইটার। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৩এর মাঝে বিমান বাহিনীতে চীনে নির্মিত ৩৬টা ‘এফ-৬’ ফাইটার বিমান যুক্ত হয়। ১৯৮৯-৯০ সালে পাকিস্তান থেকে আসে আরও ৪০টা সেকেন্ড-হ্যান্ড ‘এফ-৬’ যুদ্ধবিমান। একইসাথে চীন থেকে আসে ২০টা ‘এফ-৭এমবি’ যুদ্ধবিমান এবং ১২টা ‘এ-৫সি’ যুদ্ধবিমান। এই যুদ্ধবিমানগুলি সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে এক লাফে অনেকদূর এগিয়ে নেয়।


দ্বিতীয় দশক - আরও শক্তিশালী ডিটারেন্ট

১৯৮০এর দশকে এই ডিটারেন্টগুলিকে আরও শক্তিশালী করা চলমান থাকে। ‘সিপরি’র হিসেবে ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৩এর মাঝে বিমান বাহিনীতে চীনে নির্মিত ৩৬টা ‘এফ-৬’ ফাইটার বিমান যুক্ত হয়। ১৯৮৯-৯০ সালে পাকিস্তান থেকে আসে আরও ৪০টা সেকেন্ড-হ্যান্ড ‘এফ-৬’ যুদ্ধবিমান। একইসাথে চীন থেকে আসে ২০টা ‘এফ-৭এমবি’ যুদ্ধবিমান এবং ১২টা ‘এ-৫সি’ যুদ্ধবিমান। এই যুদ্ধবিমানগুলি সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে এক লাফে অনেকদূর এগিয়ে নেয়। এ-তো গেলো প্রথম ডিটারেন্ট। দ্বিতীয় ডিটারেন্টের জন্যে সেনাবাহিনীর ইউনিটের সংখ্যা বাড়তেই থাকে। ডিভিশনের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ৬-এ। ১৯৮৪-৮৫ সালে চীন থেকে আসে দুই হাজার ‘রেড এরো ৭৩’ ট্যাংক-বিধ্বংসী গাইডেড মিসাইল। এটা ছিল ট্যাংক ধ্বংস করার জন্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম গাইডেড মিসাইল। সোভিয়েত ‘৯এম১৪ মালইউতকা’ মিসাইলের চীনা কপি ছিল এটা। এই মিসাইল ভিয়েতনাম যুদ্ধের শেষের দিকে ১৯৭২ সালে এবং ১৯৭৩ সালে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছিল। এবার বাংলাদেশের মাটি ভারতের ট্যাঙ্কের জন্যেও অনিরাপদ হয়ে যায়। তৃতীয় ডিটারেন্টের জন্যে ১৯৮৭-৮৮ সালে চীন থেকে আসে ৪টা ‘টাইপ-০২১’ মিসাইল বোট। ১৯৮৮-৮৯ সালে চীন থেকে নৌবাহিনী পায় ‘টাইপ-০৫৩এইচ’-ক্লাসের গাইডেড মিসাইল ফ্রিগেট বিএনএস ওসমান। এটা ছিল বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রথম গাইডেড মিসাইল ফ্রিগেট। এই জাহাজগুলি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সক্ষমতাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।

অর্থাৎ স্বাধীনতার পর প্রথম দশকে যেখানে তিনটা ডিটারেন্ট তৈরি করা হয়েছিল, সেখানে এর পরের দশকে এই ডিটারেন্টগুলিকে আরও অনেক শক্তিশালী করা হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের সামরিক হস্তক্ষেপ প্রায় অসম্ভব করে ফেলা হয়। কাজেই বাংলাদেশের নীতিতে ভারতের প্রভাব বাড়াতে দিল্লীর নীতিতে একটা বড় পরিবর্তন দেখা যেতে থাকে ১৯৮০এর দশকের মাঝে। একারণেই দিল্লীর বাংলাদেশ নীতিতে যুক্ত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম। পার্বত্য চট্টগ্রামে কাপ্তাই হ্রদ তৈরির পর বিশাল এলাকা পানির নিচে চলে যায়। এর ফলে বহু মানুষ তাদের আবাসস্থল হারিয়ে ফেলে। এই মানুষগুলির মাঝে ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে ভারত পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্রোহী গোষ্ঠিগুলিকে সামরিক সহায়তা দিতে থাকে। এর ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং আধা-সামরিক বাহিনীর একটা বড় অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামে আটকে থাকে। একই সময়ে বঙ্গোপসাগরে নৌ-অবরোধের চিন্তাটাও জেঁকে বসে। যেকারণে নৌবাহিনীর গাইডেড মিসাইল ফ্রিগেট এবং মিসাইল বোটগুলি গুরুত্বপূর্ণ ডিটারেন্ট হয়ে যায়।

১৯৯০এর দশকের শুরুটাই হয় ১৯৯১ সালের ২৯শে এপ্রিলের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় দিয়ে। ঘূর্ণিঝড়ে বিমান বাহিনীর ৪০টার মতো যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত অথবা ধ্বংস হয়। শুধুমাত্র দুই সিটের ‘এফটি-৬’ ট্রেইনার বিমানগুলিকে সার্ভিসে রেখে সকল ‘এফ-৬’ বিমানকে মেরামত না করে একযোগে রিটায়ার করিয়ে দেয়া হয়। এই বিমানগুলিকে কখনোই প্রতিস্থাপন করা হয়নি। এর ফলে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর বহর হঠাৎ করেই অর্ধেক হয়ে যায়।


তৃতীয় দশক - ক্রাইসিস

১৯৯০এর দশকের শুরুটাই হয় ১৯৯১ সালের ২৯শে এপ্রিলের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় দিয়ে। ঘূর্ণিঝড়ে বিমান বাহিনীর ৪০টার মতো যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত অথবা ধ্বংস হয়। নৌবাহিনীরও কিছু জাহাজ ডুবে যায় বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোন এক অজানা কারণে ঘূর্ণিঝড়ের আগে জাতীয় নিরাপত্তার জন্যে এই অতি মূল্যবান সম্পদগুলিকে নিরাপদে সরানো হয়নি। বিমান বাহিনী প্রাথমিকভাবে বলে যে, ক্ষতিগ্রস্ত বিমানগুলির মাঝে কয়েকটা ছাড়া বেশিরভাগই মেরামত করা সম্ভব। কিন্তু সেবছরই দেখা গেলো যে, শুধুমাত্র দুই সিটের ‘এফটি-৬’ ট্রেইনার বিমানগুলিকে সার্ভিসে রেখে সকল ‘এফ-৬’ বিমানকে মেরামত না করে একযোগে রিটায়ার করিয়ে দেয়া হয়। এই বিমানগুলিকে কখনোই প্রতিস্থাপন করা হয়নি। এর ফলে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর বহর হঠাৎ করেই অর্ধেক হয়ে যায়। খুব সম্ভবতঃ অর্থনৈতিক কারণ দেখিয়েই এই বিমানগুলির মেরামত নাকচ করে দেয়া হয়। শুধু তা-ই নয়, ১৯৯৩ সালে সার্ভিসে থাকা শেষ ‘মিগ-২১’ যুদ্ধবিমানগুলিকেও রিটায়ারমেন্টে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এর ফলে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার প্রথম ডিটারেন্ট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একারণে ১৯৯১-৯২ সালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী অত্যাচার ও গণহত্যার মাধ্যমে তাদের রাখাইন প্রদেশ থেকে আড়াই লক্ষ মুসলিমকে বাংলাদেশের ভেতরে পাঠিয়ে দেয়। বাংলাদেশ কিছুই করতে পারেনি। ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব’ নীতির একটা মারাত্মক ব্যর্থতা এটা। এই নীতি ভারতকে ব্যালান্স করতে হয়তো সফল হয়েছে; কিন্তু মিয়ানমারের ক্ষেত্রে পুরোপুরিভাবে মার খেয়েছে।

১৯৯০এর দশকে মিয়ানমার ‘এফ-৭’ যুদ্ধবিমান পায়; যেগুলি সংখ্যায় বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে ছাড়িয়ে যায়। এছাড়াও মিয়ানমার চীন থেকে ‘হাউজিন-ক্লাস’এর ৬টা মিসাইল বোট কেনে এবং নিজের দেশেই ‘৫-সিরিজ’এর মিসাইল বোট তৈরি করা শুরু করে। নৌবাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যার দিক থেকেও মিয়ানমার বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে যায় দ্রুতই। মোটকথা, বাংলাদেশ যে মিয়ানমারকে তার জাতীয় নিরাপত্তার জন্যে কখনোই হুমকি মনে করেনি, সেই মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীই এখন সংখ্যার দিক দিয়ে বাংলাদেশের ডিটারেন্টগুলিকে নাকচ করে দেয়ার চেষ্টায় নেমেছে। বাংলাদেশের সামনে তার ডিটারেন্ট ফিরে পাবার একটাই উপায় থাকে - কোয়ালিটি। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে ৮টা ‘মিগ-২৯’ যুদ্ধবিমান কেনে। একইসাথে ২০০১ সালে দক্ষিণ কোরিয়াতে তৈরি করা অত্যাধুনিক ফ্রিগেট বিএনএস বঙ্গবন্ধুর ডেলিভারি পায় বাংলাদেশ নৌবাহিনী। কিন্তু মিয়ানমারও বাংলাদেশের পিছু ছাড়েনি। ২০০১ সালেই মিয়ানমার বেলারুশ থেকে ‘মিগ-২৯’ যুদ্ধবিমান কেনে; এবং সেটাও আবার সংখ্যায় বাংলাদেশের চাইতে বেশি। মাত্র এক দশকের মাঝে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তায় প্রধান হুমকি হয়ে দাঁড়ায় মিয়ানমার। বলাই বাহুল্য যে, দিল্লীতে কেউ এতে অখুশি হবার কথা নয়। মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের এই অস্ত্র প্রতিযোগিতাই পরবর্তীতে দিল্লীর বাংলাদেশ নীতিকে আরও একবার পরিবর্তন করতে সহায়তা করে।

চতুর্থ দশক - হিসেব নিকেশ

প্রায় ২০০১ সাল থেকে চীন এবং ভারতের অর্থনীতি ব্যাপক গতি পেতে থাকে। বাংলাদেশের অর্থনীতিও এই দুই দেশের সাথে গতি পেতে থাকে। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের জিডিপি ৩২ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০০০ সালে তা ৫৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছিল। কিন্তু ২০১০ সাল নাগাদ তা একেবারে দ্বিগুণ হয়ে ১১৫ বিলিয়ন ডলার হয়ে যায়। অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি পাবার সাথে সাথে একদিকে যেমন অর্থনৈতিক অবকাঠামোর নিরাপত্তা দেয়ার গুরুত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে, তেমনি নিরাপত্তার পেছনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করার সক্ষমতাও বৃদ্ধি পেতে থাকে। কিন্তু এরপরেও প্রথম ডিটারেন্ট নিগৃহীতই থেকে যায়। রাশিয়া থেকে দু’টা ‘১এল-১১৭’ রাডার কেনা হয় ২০০১ সালে। ২০০৬ সালে ১৬টা ‘এফ-৭বিজি’ যুদ্ধবিমান কেনা হয় চীন থেকে। তবে এগুলি প্রথম ডিটারেন্টকে বিশেষ কোন সুবিধা দিতে পারেনি।

প্রথম ডিটারেন্ট দুর্বল হবার সাথেসাথে দ্বিতীয় ডিটারেন্টের উপরও চাপ বেড়ে যায়। দ্বিতীয় ডিটারেন্ট হিসেবে শত্রুর সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতি-আক্রমণ চালাতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মেকানাইজড ইউনিট গঠনের কাজ শুরু করে এই সময়ে। রাশিয়া থেকে ১৩০টার মতো ‘বিটিআর-৮০’ এপিসি কেনা হয়। চীন থেকে আড়াই’শ ‘কিউডব্লিউ-২’ অতি-স্বল্প পাল্লার বিমান-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র কেনা হয়। রাজনৈতিক কারণে নৌবাহিনীর ডিকমিশন করা যুদ্ধজাহাজ বিএনএস বঙ্গবন্ধুকে তৃতীয় ডিটারেন্ট হিসেবে সার্ভিসে নিয়ে আসা হয়। একইসাথে বিএনএস ওসমানএর ক্ষেপণাস্ত্রগুলি পরিবর্তন করে ‘সি-৮০২’ ক্ষেপণাস্ত্র যুক্ত করা হয়। ২০০৮ সালের নভেম্বরে সেন্ট মার্টিনস দ্বীপের কাছাকাছি মিয়ানমারের সাথে একটা সংঘাতপূর্ণ অবস্থায় চলে যায় বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের নৌবাহিনী। এই ঘটনায় বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত কিছুটা এগিয়ে থাকলেও এটা বুঝতে বাকি থাকে না যে, বাংলাদেশের ডিটারেন্টগুলিকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। কারণ এখন শুধুমাত্র সার্বভৌমত্ব রক্ষাই নয়, নিজেদের অর্থনৈতিক অবকাঠামোগুলিকে রক্ষা করাটাও একটা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়ে যায়। নিজেদের অর্থনৈতিক অবকাঠামোগুলিকে রক্ষা করতে হলে এমন কিছু ডিটারেন্ট প্রয়োজন, যা কিনা শত্রুর অর্থনৈতিক অবকাঠামোকেও হুমকির মাঝে ফেলে দিতে সক্ষম।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর 'অনুশীলন নবদিগন্ত ২০২১-২২-এ প্যারাড্রপিং এক্সারসাইজ। ২০১৬ সালে তৈরি করা হয় প্যারাকমান্ডো ব্রিগেড। এই কমান্ডোদেরকে শত্রুর এলাকার ভেতর মোতায়েন করতে ‘হাই অল্টিটিউড হাই ওপেনিং’ বা ‘হাহো’ এবং ‘হাই অল্টিটিউড লো ওপেনিং’ বা ‘হালো’ প্যারাশুট ডেলিভারির কৌশলগুলি রপ্ত করা শুরু হয় ২০২০এর পর। ‘হাহো’ পদ্ধতিতে প্যারাট্রুপাররা প্রায় ৫০কিঃকিঃ দূর থেকে জাম্প করে গ্লাইড করে টার্গেট এলাকায় অবতরণ করতে পারে। এই পদ্ধতি শত্রুর এলাকার গভীরে হামলা করার জন্যে সবচাইতে উপযোগী।


পঞ্চম ও ষষ্ঠ দশক - চতুর্থ ডিটারেন্টের খোঁজে

প্রথম ডিটারেন্ট ছিল বাংলাদেশের আকাশসীমানাকে শত্রুর সামরিক পরিবহণ বিমানের জন্যে কঠিন করে ফেলা; যাতে করে বাংলাদেশের বিমানবন্দরে কোন শত্রু সামরিক বিমান সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে না পারে এবং স্থল আক্রমণে যেতে বাধ্য হয়। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতির পর থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বিমান বাহিনীতে যুক্ত হয়েছে ৮টা ‘এল-৩৯জেডএ’ এডভান্সড ট্রেইনার, ৮টা ‘মিগ-২৯’, এবং ১৬টা ‘এফ-৭বিজি’। সবগুলি ‘এফ-৬’ এবং ‘মিগ-২১’ প্রায় একসাথে রিটায়ার করিয়ে দেয়ার পর এগুলি দ্বারা প্রথম ডিটারেন্ট কোনমতে টিকে ছিল। দ্বিতীয় ডিটারেন্ট ছিল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যেকোন স্থল আক্রমণ দুর্বিসহ করে ফেলা। কিন্তু এটাও দুর্বল হতে শুরু করে যখন নিজেদের দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামোগুলিও রক্ষা করার দায়িত্ব পড়ে যায়। নিজের দেশকে ধ্বংস করে শত্রু আটকাবার নীতি এখন প্রশ্নবিদ্ধ।

একইসাথে ২০১৬ সালে ‘হোলি আর্টিসান’ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশ বুঝতে পারে যে, কত পদ্ধতিতে বাংলাদেশের অস্তিত্বকে হুমকির মাঝে ফেলে দেয়া যায়। তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবাদ’এর নাম করে বড় কোন শক্তির সামরিক হস্তক্ষেপ যেন বাস্তবে রূপ না নিতে পারে, সেজন্য বাংলাদেশ সরকারের সকল কর্তাব্যক্তি এক মুহুর্তের জন্যেও ভুল করে হলেও বলেননি যে, বাংলাদেশের তথাকথি ‘সন্ত্রাসবাদ’এর পিছনে আন্তর্জাতিক ‘সন্ত্রাসী’ কোন সংগঠন জড়িত। এবং যুক্তরাষ্ট্রকে খুশি রাখতে ইন্টেলিজেন্স শেয়ারিং, সামরিক বাহিনীর সন্ত্রাসবিরোধী ট্রেনিং, বিভিন্ন সংগঠনের বিরুদ্ধে ধরপাকড়, ইত্যাদি চলতে থাকলো।

২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইনে কে বা কারা মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের হত্যা করে উধাও হয়ে গেলো। আর এই ছুতোতে মিয়ানমারের পাশবিক সেনাবাহিনী গণহত্যায় নেমে যায়। সাড়ে ১১ লক্ষ মুসলিম শরণার্থী দিয়ে কক্সবাজার ছেয়ে যাবার পর বাংলাদেশ আবারও বুঝতে পারলো যে, ডিটারেন্স কাজে দিচ্ছে না।

বাংলাদেশের তৃতীয় ডিটারেন্ট ছিল শত্রুর নৌ-অবরোধকে হুমকির মাঝে ফেলে দেয়া। এটাও দুর্বল হতে শুরু করে মিয়ানমারের নৌশক্তি বৃদ্ধি করার সাথেসাথে। কারণ বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমারের সম্পর্ক যত খারাপ হতে থাকে, মিয়ানমারও ততটাই দ্রুতবেগে তাদের নৌবাহিনী ডেভেলপ করতে থাকে। এবার বাংলাদেশের কর্তাব্যক্তিরা চিন্তা করতে থাকলেন যে, রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায় প্রয়োজন নতুন ডিটারেন্ট; যা হলো - শত্রু রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে হামলা করে তার সামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনার ক্ষতিসাধন। 

শত্রু রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে হামলার একটা পদ্ধতি হলো স্পেশাল ফোর্স। পুরো ১৯৮০এর দশক চলে যায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর স্পেশাল ফোর্সকে সংগঠিত করতে। ১৯৯২ সালের জুনে সেনাবাহিনীর ১ম প্যারাকমান্ডো ব্যাটালিয়ন যাত্রা শুরু করে। ২য় প্যারাকমান্ডো ব্যাটালিয়ন তৈরি হতে চলে যায় ২০১৯। আর ২০১৬ সালে তৈরি করা হয় প্যারাকমান্ডো ব্রিগেড। এই কমান্ডোদেরকে শত্রুর এলাকার ভেতর মোতায়েন করতে ‘হাই অল্টিটিউড হাই ওপেনিং’ বা ‘হাহো’ এবং ‘হাই অল্টিটিউড লো ওপেনিং’ বা ‘হালো’ প্যারাশুট ডেলিভারির কৌশলগুলি রপ্ত করা শুরু হয় ২০২০এর পর। যুক্তরাষ্ট্র হয় এই প্রযুক্তি এবং প্রশিক্ষণের উৎস। ‘হালো’ পদ্ধতিতে সৈন্যরা ৫ হাজার ফুট থেকে ২৫ হাজার ফুট উচ্চতায় বিমান থেকে প্যারা জাম্প দেয়; যেখানে সাধারণ প্যারা জাম্প দেড় হাজার ফুটের মতো হয়ে থাকে। এর ফলে প্যারাট্রুপার বহণকারী বিমান বিমান-বিধ্বংসী অস্ত্রের পাল্লার ভিতরে থাকার সম্ভাবনা কমে যায়। আর ‘হাহো’ পদ্ধতিতে প্যারাট্রুপাররা প্রায় ৫০কিঃকিঃ দূর থেকে জাম্প করে গ্লাইড করে টার্গেট এলাকায় অবতরণ করতে পারে। এই পদ্ধতি শত্রুর এলাকার গভীরে হামলা করার জন্যে সবচাইতে উপযোগী।

প্যারাকমান্ডো ছাড়াও ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় নৌবাহিনীর অধীনে তৈরি করা হয় ‘স্পেশাল ওয়ারফেয়ার এন্ড ডাইভিং স্যালভেজ’ বা ‘সোয়াডস’। কাজেই এই দুই বাহিনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের সক্ষমতা তৈরি হয় জলে-স্থলে শত্রুর অভ্যন্তরে হামলা করার। নৌবাহিনীর ‘সোয়াডস’ সদস্যদেরকে শত্রুর উপকূলে নামানোর প্রধান বাহণ হয়ে দাঁড়ায় ২০১৬ সালে চীন থেকে কেনা দু’টা ‘টাইপ-০৩৫জি’ সাবমেরিন। সাবমেরিন খুব সন্তর্পণে শত্রুর উপকূলের কাছাকাছি স্পেশাল ফোর্সের সেনাদের নামিয়ে দিতে পারে; যাতে তারা শত্রু রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কোন স্থাপনা ধ্বংস করতে পারে, অথবা নিজেদের যুদ্ধবিমান বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের জন্যে টার্গেট খুঁজে দিতে পারে। সাবমেরিন দু’টা কেনার সিদ্ধান্ত প্রকাশ হবার সাথেসাথেই দিল্লীতে হৈ চৈ পড়ে যায়। এবং বাংলাদেশ সাবমেরিন পাবার তিন বছরের মাঝেই ভারত নিজেদের একটা রুশ নির্মিত ‘কিলো-ক্লাস’এর সাবমেরিন রিটায়ার করিয়ে মিয়ানমারকে দিয়ে দেয়।

মিয়ানমারের নৌবাহিনী থেকে এগিয়ে থাকতে বাংলাদেশ নৌবাহিনী সাবমেরিন ছাড়াও ৬টা ফ্রিগেট, ৬টা কর্ভেট, ৪টা এলপিসি জোগাড় করে। কিন্তু মিয়ানমারও বাংলাদেশের সমান্তরালেই নিজেদের নৌবাহিনী ডেভেলপ করতে থাকে; কিছু ক্ষেত্রে এগিয়েও যায়। ভারত মিয়ানমার নৌবাহিনীকে এক্ষেত্রে ব্যাপক সহায়তা দিতে থাকে। আর মিয়ানমারের বিমান বাহিনী পাকিস্তান থেকে ‘জেএফ-১৭’ যুদ্ধবিমান, রাশিয়া থেকে ‘মিগ-২৯’, ‘সুখোই-৩০’ এবং ‘ইয়াক-১৩০’ যুদ্ধবিমান, এবং চীন থেকে ‘এফটিসি-২০০০’ যুদ্ধবিমান কেনে। ‘জেএফ-১৭’ যুদ্ধবিমানগুলিকে জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রেও সজ্জিত করা হয়; যাতে করে সেগুলি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্যে হুমকিরূপে দেখা দেয়। মোটকথা বাংলাদেশের প্রথম ডিটারেন্ট বিমান বাহিনী এবং তৃতীয় ডিটারেন্ট নৌবাহিনী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে মিয়ানমারের কারণে। চতুর্থ ডিটারেন্ট হিসেবে স্পেশাল ফোর্সকে ডেভেলপ করা হলেও এক্ষেত্রে সাবমেরিনের ভূমিকা অনেক বড় আকারে দেখা দেয়। কিন্তু সেটার সক্ষমতাকেও ভারত কমিয়ে ফেলে মিয়ানমারকে সাবমেরিন এবং মিয়ানমার নৌবাহিনীর ফ্রিগেটগুলির জন্যে সাবমেরিন-ধ্বংসী সোনার এবং টর্পেডো সরবরাহ করার মাধ্যমে। এবারে চতুর্থ ডিটারেন্টের জন্যে বাংলাদেশ তার বিমান বাহিনী এবং সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত করতে থাকে।

২০১৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে যুক্ত হয় রুশ লীড-ইন-ট্রেইনার বিমান ‘ইয়াক-১৩০’। এই বিমানটা প্রযুক্তিগত দিক থেকে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সবচাইতে উন্নত বিমান। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ভাষ্যমতে, ‘ইয়াক-১৩০’ বিমানের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো রাতের বেলায় আকাশ থেকে শত্রুর উপর হামলা করার সক্ষমতা অর্জন করে। ‘ইয়াক-১৩০’ বিমান প্রায় ১৫কিঃমিঃ দূর থেকে ৫০০কেজি ওজনের 'কেএবি-৫০০কেআর' টিভি-গাইডেড বোমা শত্রুর টার্গেটের ১৩ফুট থেকে ২৩ফুটের মাঝে ফেলতে সক্ষম।


চতুর্থ ডিটারেন্ট - বিমান বাহিনীর স্ট্র্যাটেজিক স্ট্রাইক মিশন

১৯৭২ সাল থেকে শুরু করে চার দশকে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর শত্রুর উপর আক্রমণ করার সক্ষমতা ছিল। তবে সেই আক্রমণে স্ট্র্যাটেজিক বা কৌশলগত কোন সামরিক বা অর্থনৈতিক অবকাঠামো ধ্বংস করার সক্ষমতা ছিল সীমিত। কারণ শুধু রকেট বা সাধারণ বোমা দিয়ে একটা নির্দিষ্ট টার্গেট ধ্বংস করা খুব সহজ নয়। কারণ একদিকে যেমন নিখুঁতভাবে রকেট বা বোমা নিক্ষেপ কঠিন, তেমনি খুব কাছে থেকে গোলা নিক্ষেপ করা পাইলটের জন্যে খুবই বিপজ্জনক। বিশেষ করে সেই টার্গেটের আশেপাশে যদি শক্তিশালী বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকে। শত্রুর অঞ্চলের ভেতরে ঢুকে বেশ দূর থেকেই এধরণের টার্গেটে হামলা করে ফিরে আসতে পারার জন্যে কোন অস্ত্র বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর কাছে ছিল না। তবে কিছু অস্ত্র বিমান বাহিনীর কাছে ছিলো, যা দিয়ে নির্দিষ্ট ধরণের কিছু শক্তিশালী টার্গেট ধ্বংস করা সম্ভব ছিল। যেমন, ‘এফ-৭’ সিরিজের বিমানগুলি ২০০কেজি ওজনের ‘টাইপ-২০০এ’ এন্টি-রানওয়ে বোমা এবং ক্লাস্টার বোমা বহণ করতে পারতো। আর ‘মিগ-২৯’ বিমানগুলি ১২৩কেজি ওজনের ‘এস-২৪’ ২৪০মিঃমিঃ রকেট বহণ করতে পারতো।

২০১০এর পর বিমান বাহিনীতে ১৬টা ‘এফ-৭বিজি১’ ফাইটার, ১৬টা ‘ইয়াক-১৩০’ লীড-ইন-জেট-ট্রেইনার যুক্ত হয়। এছাড়াও বিমান এবং সেনাবাহিনীতে যুক্ত হয় ‘এমএম-৯০’ স্বল্পপাল্লার বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে। এই সংখ্যাগুলি একদিনে যেমন উল্লেখযোগ্য কিছু নয়; আবার শুধুমাত্র বিমানের সংখ্যা দিয়েও এখন আর নিজেদের ডিটারেন্ট ধরে রাখা সম্ভব নয়। একারণেই ২০১৪-১৫ সালে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ‘এফ-৭বিজি১’ বিমানগুলির জন্যে চীন থেকে ‘এলএস-৬’ জিপিএস-গাইডেড গ্লাইড বোমা কেনে। প্রকৃতপক্ষে এটা কিছু যন্ত্রাংশ, যা কিনা সাধারণ ২৫০কেজি বোমার সাথে জুড়ে দিয়ে সেটাকে প্রায় ৬০কিঃমিঃ দূর থেকে টার্গেটের ৫০ফুটের মাঝে ফেলার জন্যে উপযোগী করে ফেলা হয়। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ বিমান বাহিনী শত্রুর কৌশলগত কোন টার্গেট ধ্বংস করতে সক্ষমতা অর্জন করে। প্রথমদিকে শুধুমাত্র ৩৫তম স্কোয়াড্রনের ‘এফ-৭বিজি১’ বিমানগুলিই ‘এলএস-৬’ গাইডেড বোমা বহণ করতে পারতো। বিমান বাহিনীর ইঞ্জিনিয়াররা নিজেদের প্রচেষ্টায় ৫ম স্কোয়াড্রনের ‘এফ-৭বিজি’ বিমানগুলিকেও ‘এলএস-৬’ বহণের উপযোগী করে ফেলেন। এখন দুই স্কোয়াড্রন বিমান এই বোমা বহণ করতে সক্ষম। এই বোমাগুলি যেকোন আবহাওয়ায়, এমনকি মেঘের কারণে ভূমি না দেখা গেলেও টার্গেট ধ্বংস করতে সক্ষম।

২০১৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে যুক্ত হয় রুশ লীড-ইন-ট্রেইনার বিমান ‘ইয়াক-১৩০’। এই বিমানটা প্রযুক্তিগত দিক থেকে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সবচাইতে উন্নত বিমান। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ভাষ্যমতে, ‘ইয়াক-১৩০’ বিমানের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো রাতের বেলায় আকাশ থেকে শত্রুর উপর হামলা করার সক্ষমতা অর্জন করে। এই বিমানের সাথেই আসে ‘কেএবি-৫০০কেআর’ টিভি-গাইডেড বোমার ট্রেনিং ভার্সন। ‘ইয়াক-১৩০’ বিমান প্রায় ১৫কিঃমিঃ দূর থেকে ৫০০কেজি ওজনের এই বোমা শত্রুর টার্গেটের ১৩ফুট থেকে ২৩ফুটের মাঝে ফেলতে সক্ষম। এই বোমাগুলি ডেলিভারির জন্যে ভালো আবহাওয়া আবশ্যক। তবে অপটিক্যাল গ্যাইড্যান্সের কারণে এটাকে জ্যামিং করা অসম্ভব।

তুর্কি মিডিয়া বলছে যে, ২০১৯ সাল থেকে তুর্কিরা বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ‘এফ-৭’ বিমানে ‘রকেটসান’ কোম্পানির ‘তেবার’ লেজার-গাইডেড বোমা সংযোজনের চেষ্টা করে যাচ্ছিলো। এই বিমানগুলি লেজার-গাইডেড বোমা ডেলিভারির জন্যে তৈরি করা হয়নি। তবে তুর্কি ইঞ্জিনিয়াররা কিছু ইকুইপমেন্ট কিট সংযোজনের মাধ্যমে এই বিমানগুলিকে ‘তেবার’ গাইডেড বোমা বহণে সক্ষম করে ফেলেন। এরপর ২০২২এর জানুয়ারি মাসে তুর্কি মিডিয়া আবারও খবর দেয় যে, তুর্কিরা বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে ‘তেবার’ লেজার-গাইডেড বোমা সরবরাহ করেছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ‘এফ-৭’ যুদ্ধবিমানগুলি চলমান টার্গেট ধ্বংস করতে সক্ষম হলো। এই বোমাগুলি ২ থেকে ২৮কিঃমিঃ দূরত্ব রেখেই ছোঁড়া যায় এবং এগুলি টার্গেটের ১০ফুটের ভেতর আঘাত করতে সক্ষম। অর্থাৎ টার্গেটের বেঁচে যাবার কোন সম্ভাবনাই নেই। বোমাগুলির টার্গেটিংএর জন্যে অন্য কোন বিমান বা ড্রোন অথবা ভূমিতে স্পেশাল ফোর্সের সদস্যদের সহায়তায় টার্গেটের উপর লেজার পয়েন্টার ব্যবহার করতে হয়। উপরে বর্ণিত সেনা ও নৌবাহিনীর স্পেশাল ফোর্সের সদস্যরা একারণে অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

বেলারুশ থেকে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ‘মিগ-২৯’ যুদ্ধবিমানগুলি ওভারহলিং এবং মডার্নাইজ করে নিয়ে আসার পর এই বিমানগুলির সক্ষমতা ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। ২০২২ সালের বিজয় দিবস প্যারেডে বিমান বাহিনী অফিশিয়ালি ঘোষণা দেয় যে, মডার্নাইজ করার পর এই বিমানগুলি এখন ‘কেএবি-৫০০কেআর’ টিভি-গাইডেড বোমা ব্যবহার করে ২৫কিঃমিঃ দূরের টার্গেট ধ্বংস করতে সক্ষম। একইসাথে ‘মিগ-২৯’ বিমানগুলি এখন ‘কেএইচ-২৯’ এবং ‘কেএইচ’৩১’ ক্ষেপণাস্ত্র বহণ করতে সক্ষম। ‘কেএইচ-২৯টি’ বিশাল একটা টিভি-গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র। ৬৮৫কেজি ওজনের এই ক্ষেপণাস্ত্রে রয়েছে ৩২০কেজি ওজনের বিশাল একটা ওয়ারহেড; যা কিনা ভূমির যে কোন টার্গেট অথবা সমুদ্রে সবচাইতে বড় আকৃতির যুদ্ধজাহাজ সুপারসনিক গতিতে উড়ে গিয়ে ১৩কিঃমিঃ দূর থেকে ধ্বংস করতে পারে। বাংলাদেশ বিমান বাহিনী এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলিকে ম্যারিটাইম এলাকার নিরাপত্তায় ব্যবহার করতে চায়। এই ক্ষেপণাস্ত্রের সাথে যুক্ত হয়েছে ‘কেএইচ’৩১এ’ জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। ৬১০কেজি ওজনের এই ক্ষেপণাস্ত্র ৯৪কেজি ওজনের ওয়ারহেড ব্যবহার করে ৭০কিঃমিঃ দূর থেকে সাড়ে ৪ হাজার টন আকৃতির যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস করতে সক্ষম। এর সুপারসনিক গতির কারণে জাহাজের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্যে এটা বড় চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়। ‘মিগ-২৯’ বিমানগুলি বঙ্গোপসাগরের যে কোন প্রান্তে উড়ে যেতে সক্ষম। আর এই বিমানগুলিতে এধরণের ক্ষেপণাস্ত্র যুক্ত করার অর্থ হলো, পুরো বঙ্গোপসাগরের কোথাও কোন জাহাজ বা উপকূলীয় স্থাপনা বাংলাদেশ বিমান বাহিনী থেকে নিরাপদ নয়।

বিমান বাহিনীর এই প্রতিটা স্ট্র্যাটেজিক স্ট্রাইকে শত্রু এলাকার অনেক ভেতরে মিশন পরিচালনা করতে হবে; যার ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর পাইলট ভূপাতিত হতে পারে। এমতাবস্থায় এই পাইলটকে উদ্ধার করাটা জরুরি; কেননা একটা বিমান স্বল্প সময়ে কিনে নিয়ে আসা সম্ভব হলেও একজন অভিজ্ঞ পাইলট তৈরি করতে অনেক বছর সময় লাগে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে জার্মানির প্রচুর ভালো ভালো বিমান ছিল (জেট ফাইটার সহ); কিন্তু অভিজ্ঞ পাইলটের অভাবে তারা আকাশের নিয়ন্ত্রণ হারায়। একারণে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী তাদের চতুর্থ ডিটারেন্ট ডেভেলপ করার সাথে সাথে শত্রুর নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকা থেকে পাইলট উদ্ধার করার মিশন নিয়ে অনুশীলন শুরু করে। ‘কমব্যাট সার্চ এন্ড রেসকিউ’ বা ‘সি-এসএআর’ মিশনের জন্যে ‘আগুস্টা এডব্লিউ-১৩৯’ উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার এবং ‘এমআই-১৭১এসএইচ’ হেলিকপ্টার ক্রয় করার ছাড়াও এই মিশনের কার্যপ্রণালী কেমন হওয়া উচিৎ, তার উপরে নিয়মিত চলছে কনসেপ্ট ডেভেলপমেন্ট এবং প্রশিক্ষণ। বিমান বাহিনী গড়ে তুলতে থাকে নিজস্ব স্পেশাল ফোর্স; যারা ‘সি-এসএআর’ মিশনে পাইলট উদ্ধারে মূল ভূমিকা পালন করবে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তুরস্কে নির্মিত 'টিআরজি-৩০০ টাইগার' ৩০০মিঃমিঃ রকেটের পরীক্ষামূলক ফায়ারিং। পৃথিবীর অনেক স্থানে ১২০কিঃমিঃ তেমন কোন পাল্লা নয়; কিন্তু বাংলাদেশের আশেপাশের এলাকার জন্যে এটা অনেক। কারণ এই এলাকা ঘনবসতিপূর্ণ। এখানে কিছুদূর পরপরই বড় বড় শহর এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অবকাঠামো রয়েছে। তবে এ-ই শেষ নয়। কারণ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ২৮০কিঃমিঃ পাল্লার ‘টাইপ-এ’ ক্ষেপণাস্ত্রও পাবার পথে রয়েছে; যা আরও বহু এলাকা বাংলাদেশের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লার মাঝে নিয়ে আসবে।


চতুর্থ ডিটারেন্ট - সেনাবাহিনীর রকেট আর্টিলারি

২০১৯ সালের মার্চে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তুরস্ক থেকে মধ্যম পাল্লার ‘টাইপ-বি’ রকেট লঞ্চার কেনার চুক্তি করে। তুরস্কের ‘রকেটসান’ কোম্পানির তৈরি ৩০০মিঃমিঃ ক্যালিবারের ‘টিআরজি-৩০০ টাইগার’ মাল্টিপল লঞ্চ রকেট সিস্টেমকে স্বল্প পাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল বলাটাই শ্রেয়। কারণ এই ক্ষেপণাস্ত্রের ১০৫কেজি ওয়ারহেড স্যাটেলাইট এবং ইনারশিয়াল ন্যাভিগেশন ব্যবহার করে ১২০কিঃমিঃ দূরের লক্ষ্যবস্তুর ১০ফুটের মাঝে আঘাত হানতে সক্ষম। ২০২১ সালের ৩০মে এই ক্ষেপণাস্ত্রের চালান পায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী; যা অফিশিয়ালি ‘স্ট্রাটেজিক ওয়েপন সিস্টেম’ বলে আখ্যা দেয়া হয়েছে। পৃথিবীর অনেক স্থানে ১২০কিঃমিঃ তেমন কোন পাল্লা নয়; কিন্তু বাংলাদেশের আশেপাশের এলাকার জন্যে এটা অনেক। কারণ এই এলাকা ঘনবসতিপূর্ণ। এখানে কিছুদূর পরপরই বড় বড় শহর এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অবকাঠামো রয়েছে। তবে এ-ই শেষ নয়। কারণ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ২৮০কিঃমিঃ পাল্লার ‘টাইপ-এ’ ক্ষেপণাস্ত্রও পাবার পথে রয়েছে; যা আরও বহু এলাকা বাংলাদেশের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লার মাঝে নিয়ে আসবে।

তবে এত দূরের টার্গেটে নিখুঁতভাবে গোলা ছুঁড়তে গেলে টার্গেট খুঁজে পাওয়াটা জরুরি। সেনাবাহিনীর স্পেশাল ফোর্স ছাড়াও সেনা ও বিমান বাহিনীর ড্রোনগুলি এই ক্ষেপণাস্ত্রের জন্যে টার্গেট খুঁজে দিতে সক্ষম। বিমান বাহিনীর ইতালিতে তৈরি ‘ফ্যালকো আস্টোর’ ড্রোন এবং সেনাবাহিনীর তুরস্কে তৈরি ‘বায়রাকতার টিবি-২’ ড্রোনের ‘হেনসোল্ড আরগোস-২’ ইলেকট্রো-অপটিক্যাল সেন্সর দ্বারা ২০০কিঃমিঃ থেকে ৩০০কিঃমিঃ দূরত্বে ভূমিতে লুকিয়ে রাখা যেকোন কৌশলগত সামরিক স্থাপনার লোকেশন নিখুঁতভাবে সনাক্তকরণ সম্ভব। এই লোকেশনের তথ্য ‘এফ-৭’ বিমানের ‘এলএস-৬’ গাইডেড বোমা অথবা ‘টিআরজি-৩০০’ ক্ষেপণাস্ত্রের গাইড্যান্স সিস্টেমে ঢুকিয়ে দিলেই সেই টার্গেট ধ্বংস করার মিশন পরিচালনা করা সম্ভব।

যে ব্যাপারটা একমত হতেই হবে তা হলো, পাঁচ দশক ধরে বাংলাদেশের নীতির প্রকৃতপক্ষে কোন পরিবর্তন হয়নি। কারণ এই রাষ্ট্রের চিন্তার ভিত একই আছে; যা ১৯৪৭ সালের ব্রিটিশদের এঁকে দেয়া বাউন্ডারির প্রতিফলন। বহু সরকার আসা-যাওয়া করলেও রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলি একই রয়েছে; যাদের চিন্তায় পরিবর্তন আসেনি। বাংলাদেশে পাঁচ দশকে যা কিছু ঘটেছে, তার কেন্দ্রে সর্বদাই রয়েছে রাষ্ট্রের স্থায়ী সংস্থাগুলি। এটা একটা স্থায়ী রাষ্ট্রীয় কাঠামো; যা ১৯৪৭-কেন্ত্রিক চিন্তাকে ঘিরে আবর্তিত। বাংলাদেশে যেকোন পরিবর্তনও এই স্থায়ী রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে কেন্দ্র করেই হতে হবে; সেটা ১৯৪৭কে মাথায় রেখেই হোক, অথবা ১৯৪৭কে উপেক্ষা করেই হোক।


পাঁচ দশক ধরে কেন বাংলাদেশ শুধু ডিটারেন্সের পিছনেই ছুটছে?

১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশ ভেঙ্গে দেয়ার সময় ব্রিটিশরাই ঠিক করেছে এখানে কয়টা রাষ্ট্র হবে, সেগুলির মানচিত্র কেমন হবে এবং এই রাষ্ট্রগুলির গঠনতন্ত্রই বা কেমন হবে। ব্রিটিশরা নিশ্চিত করেছে যে, উপমহাদেশে নতুন তৈরি করা রাষ্ট্রগুলির মাঝে থাকবে দ্বন্দ্ব এবং একে অপরকে দেখবে তার অস্তিত্বের প্রতি হুমকি হিসেবে। কারণ এই রাষ্ট্রগুলির অস্তিত্বের সংজ্ঞাটাও ব্রিটিশরা এমনভাবেই দিয়েছে, যাতে করে তারা সারাক্ষণ একে অপরকে নিজের প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখে। ব্যাপারটা এমন নয় যে, ব্রিটিশরা বোঝেনি যে কোন একসময় পাকিস্তান ভেঙ্গে যাবে। বরং ব্রিটিশদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল ভেঙ্গে যাওয়া পাকিস্তানের অংশগুলি ব্রিটিশ চিন্তার উপর ভর করেই চলবে কিনা। একারণেই ব্রিটিশরা উপমহাদেশ ভেঙ্গে ফেলার প্রায় ২৫ বছর পর বাংলাদেশের জন্ম হলেও বাংলাদেশের চিন্তাটা সেই একই অস্তিত্বের চিন্তার আশেপাশে ঘুরপাক খেয়েছে।

১৯৭২ সাল থেকেই বাংলাদেশের চিন্তার কেন্দ্রে ছিল নিজের অস্বিত্ব রক্ষা করা। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের এঁকে দেয়া বাউন্ডারি ১৯৭২ সালেও বাংলাদেশের জন্যে ছিল সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ। তিন দিক থেকে বাংলাদেশকে ঘিরে রাখা বিশাল রাষ্ট্র ভারত ছিল বাংলাদেশের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে; কারণ ১৯৪৭ সালের মানচিত্র এটাই ঠিক করে দিয়েছিল। প্রথম দিন থেকেই বাংলাদেশ ভারতের প্রভাবকে ব্যালান্স করতে সারা বিশ্বে বন্ধু খুঁজেছে; এমনকি পাকিস্তানের সাথেও সম্পর্কোন্নয়ন করতে তার সময় লাগেনি। যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়ের সাথেই বন্ধুত্ব রেখেছে সে ব্যালান্সিং এক্ট হিসেবেই; যাতে কোন একজনের পকেটে তারা চলে না যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা চেয়েছে শক্তিশালী দেশগুলিকে খুশি রাখতে; যাতে করে তারা নাখোশ হয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কিছু করে না বসে। কিন্তু সকলকে খুশি করাটা একটা অবাস্তব ব্যাপার; যা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কর্তাব্যাক্তিরা প্রথম দিন থেকেই জানতো। তথাপি তারা ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব’র মতো একটা নীতি প্রণয়ন করেছিল। আবার একইসাথে বাস্তবতাকে মাথায় রেখে তারা নাখোশ হওয়া ‘বন্ধু’কে রাজনৈতিক ও সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে বিরত রাখতে মরিয়া থেকেছে। এটাই হলো বাংলাদেশের ডিটারেন্স খোঁজার উৎস। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে বহু সরকার এসেছে। রাজনৈতিক পরিবর্তন ছিল নিয়মিত; এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা ছিল রক্তাক্ত। কিন্তু বাংলাদেশের চিন্তার কেন্দ্রে থাকা ডিটারেন্সের নীতি থেকে বাংলাদেশ কখনোই সরে আসেনি। কারণ এই নীতি বাংলাদেশের মানচিত্র তৈরির সাথে সম্পর্কিত; যেটার উপর বাংলাদেশের কোন নিয়ন্ত্রণই নেই।

স্বাধীনতার পর প্রথম দশকে বাংলাদেশ তার তিনটা ডিটারেন্স তৈরি করেছে। দ্বিতীয় দশকে সেগুলিকে আরও বহু শক্তিশালী করেছে। কিন্তু তৃতীয় দশকে এই ডিটারেন্স ধ্বংস হয়েছে এবং রাষ্ট্র পড়েছে মহা বিপদে। বাংলাদেশের প্রথম দুই দশকের শক্তিশালী অবস্থান ভারতকে তার নীতির পরিবর্তন করতে বাধ্য করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম হয়েছে ভারতের জন্যে নতুন ফোকাস পয়েন্ট। তবে একইসাথে তৃতীয় দশকে মিয়ানমার বাংলাদেশের সাথে সাংঘর্ষিক অবস্থানে চলে যাবার পর থেকে ভারত সেটাকে সুযোগ হিসেবেই দেখেছে; যদিও সেই সুযোগ কাজে লাগাতে ভারতের আরও অনেক সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। চতুর্থ দশক চলেছে দুর্বল অবস্থানকে নিয়েই। তবে এসময়ে চলেছে চিন্তাভাবনা এবং নিজেদের ডিটারেন্সগুলিকে পূনরুজ্জীবিত করার নতুন পরিকল্পনা। সেই অনুযায়ী পঞ্চম দশকে শুরু হয় নতুন কর্মকান্ড। কিন্তু বড্ড বেশি দেরি হয়ে গেছে। বাংলাদেশের দুই দশকের স্থবির নীতিকে উপজীব্য করে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে বাংলাদেশের ব্যালান্সিং এক্ট হিসেবে ডেভেলপ করে গেছে ভারত। একারণে ২০১০ সাল থেকে বহু চেষ্টা করেও বাংলাদেশ তার কৌশলগত ডিটারেন্টগুলিকে শক্তিশালী অবস্থানে আনতে পারেনি।

পাঁচ দশকের কৌশলগত ডিটারেন্ট গঠনের প্রয়াস কতটুকু সফল হয়েছে, সেই প্রশ্নে একেক জনের কাছে একেক উত্তর পাওয়া যাবে। তবে যে ব্যাপারটা একমত হতেই হবে তা হলো, পাঁচ দশক ধরে বাংলাদেশের নীতির প্রকৃতপক্ষে কোন পরিবর্তন হয়নি। কারণ এই রাষ্ট্রের চিন্তার ভিত একই আছে; যা ১৯৪৭ সালের ব্রিটিশদের এঁকে দেয়া বাউন্ডারির প্রতিফলন। বহু সরকার আসা-যাওয়া করলেও রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলি একই রয়েছে; যাদের চিন্তায় পরিবর্তন আসেনি। বাংলাদেশে পাঁচ দশকে যা কিছু ঘটেছে, তার কেন্দ্রে সর্বদাই রয়েছে রাষ্ট্রের স্থায়ী সংস্থাগুলি; যাদের মাঝে রয়েছে সামরিক বাহিনী, সরকারি কর্মকর্তাবৃন্দ এবং তাদের কাঠামো, কূটনীতিক, একাডেমিক ব্যক্তিত্ব, বিভিন্ন চিন্তাবিদ এবং থিঙ্কট্যাঙ্ক, প্রভাবশালী ব্যাবসায়ীবৃন্দ এবং তাদের সংগঠন, এবং এর বাইরেও আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ। রাজনৈতিক কর্মকান্ডের সামনে এই মানুষগুলিকে দেখা যায় না; কিন্তু রাষ্ট্রের অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ তাদেরকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে এবং হবে। এটা একটা স্থায়ী রাষ্ট্রীয় কাঠামো; যা ১৯৪৭-কেন্ত্রিক চিন্তাকে ঘিরে আবর্তিত। ১৯৪৭এর ভূতই বাংলাদেশকে চালিয়ে নিচ্ছে; এটা কারুর পছন্দ হোক বা না হোক। বাংলাদেশে যেকোন পরিবর্তনও এই স্থায়ী রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে কেন্দ্র করেই হতে হবে; সেটা ১৯৪৭কে মাথায় রেখেই হোক, অথবা ১৯৪৭কে উপেক্ষা করেই হোক।





সূত্রঃ


‘SYND 28/03/1972 PRIME MINISTER AND PRESIDENT OF BANGLADESH ATTEND INDEPENDENCE PARADE’ in AP Archive, 21 July 2015 (https://www.youtube.com/watch?v=OaekhWjfCu0)
‘SYND 30/09/72 BANGLADESH AIRFORCE CELEBRATES FIRST ANNIVERSARY’ in AP Archive, 23 July 2015 (https://www.youtube.com/watch?v=aPuGKGznTv0)
‘SYND 13-3-72 INDIAN ARMY CEREMONIAL WITHDRAWAL OF BANGLADESH’ in AP Archive, 21 July 2015 (https://www.youtube.com/watch?v=X4D7y2UWQTE)
‘SYND 27/3/1973 2ND INDEPENDANCE DAY MILITARY PARADE’ in AP Archive, 21 July 2015 (https://www.youtube.com/watch?v=b9fDZECQfwY)
‘TRADE REGISTERS’ in Stockholm International Peace Research Institute (SIPRI), (https://armstrade.sipri.org/armstrade/page/trade_register.php)
‘Blood Telegram: India’s Secret War in East Pakistan’ by Gary J Bass, 2014
‘মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী - ইতিহাসের পুনর্পাঠ’, আলতাফ পারভেজ, ২০১৫
‘Bangladesh Liberation War - Myths and Facts - How India, US, China, and the USSR Shaped the Outcome’ by B. Z. Khasru, 2010
‘RAW: A History of India’s Covert Operations’, by Yatish Yadav, 2020
‘Eagles Over Bangladesh: The Indian Air Force in the 1971 Liberation War’, by P.V.S. Jagan Mohan and Samir Chopra, 2013
‘বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী দিবস ২০২৩ - Bangladesh Army Day 2023’ in ATN News, 20 November 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=fNq432D50uM)
‘A History of Bangladesh, Second Edition’ by Willem van Schendel, 2020
‘Bangladeshi Insurgents Say India Is Supporting Them’ in New York Times, 11 June 1989
‘Bangladesh to probe 50% loss of military aircraft in typhoon’ in Deseret News, 07 May 1991 (https://www.deseret.com/1991/5/7/18919284/bangladesh-to-probe-50-loss-of-military-aircraft-in-typhoon)
‘Bangladesh: Tardy relief work prolongs suffering of populace ravaged by 12-hour cyclone’ in India Today, 31 May 1991 (https://www.indiatoday.in/magazine/special-report/story/19910531-bangladesh-tardy-relief-work-prolongs-suffering-of-populace-ravaged-by-12-hour-cyclone-815365-1991-05-30)
‘Storm Kills 1,000 In Bangladesh’ in The Washington Post, 01 May 1991 (https://www.washingtonpost.com/archive/politics/1991/05/01/storm-kills-1000-in-bangladesh/ca713435-5e43-456d-8759-1fbbfbdcfb85/)
‘GDP (current US$) - Bangladesh’ in The World Bank (https://data.worldbank.org/indicator/NY.GDP.MKTP.CD?locations=BD)
‘Myanmar withdraws warships’ in The Daily Star, 10 November 2008
‘St Martin's Island seen vulnerable’ in The Daily Star, 17 October 2009
‘Bangladesh Attack Is New Evidence That ISIS Has Shifted Its Focus Beyond the Mideast’ in The Ney York Times, 02 July 2016
‘ISIS attack in Bangladesh shows broad reach as ‘caliphate’ feels pressure’ in CNN, 04 July 2016
‘Bangladesh Attack Is New Evidence That ISIS Has Shifted Its Focus Beyond the Mideast’ in The Hindustan Times, 03 July 2016
‘Dozens killed in fighting between Myanmar army and Rohingya militants’ in The Guardian, 25 August 2017
‘Rohingyas in Bangladesh: Myanmar proposes taking them back’ in The Daily Star, 03 October 2017
‘Airborne Systems RA-300 Advanced Ram Air Parachute System’ in Airborne Systems Products (https://airborne-sys.com/products/personnel-parachute-systems/)
‘PM inaugurates Naval Aviation, names SWADS naval command base “Nirvik”’, in Priyo News, 27 December 2011 (http://news.priyo.com/politics/2011/12/27/pm-inaugurates-naval-aviation-44644.html)
‘First 2 submarines commissioned’ in The Daily Star, 12 March 2017
‘Bangladesh can protect itself from any external aggression: PM’ in The Business Standard, 12 December 2021
‘India’s World- Chinese submarines and Sino-Bangladesh defence ties’ in SansadTV, 22 November 2016 (https://www.youtube.com/watch?v=2BOqaLnIZ6s)
‘Why China’s Submarine Deal With Bangladesh Matters’ in The Diplomat, 20 January 2017
‘India set to export torpedoes to Myanmar’ in Times of India, 25 March 2017
‘Why This Indian Neighbour Decided To Buy 2 Submarines From China’ in NDTV, 13 July 2017
‘Defence Make In India: First Batch Of Lightweight Anti-Submarine Shyena Torpedoes Sent To Myanmar’ in Swarajya Magazine, 13 July 2019 (https://swarajyamag.com/insta/defence-make-in-india-first-batch-of-lightweight-anti-submarine-shyena-torpedoes-sent-to-myanmar)
‘India gifts a submarine to Myanmar, gains edge over China’ in The Hindustan Times, 21 October 2020
‘With an eye on China, India gifts submarine to Myanmar’ in Nikkkei Asia, 22 October 2020
‘Roketsan’dan Bangladeş’e TEBER İhracatı ‘ in Savunma Sanayi ST, 18 January 2022 (https://www.savunmasanayist.com/roketsandan-bangladese-teber-ihracati/)
‘জাতীয় প্যারেড স্কয়ার হতে সরাসরি সম্প্রচার’ in BTV, 16 December 2022 (https://www.youtube.com/watch?v=jIcyKqvbp0I)
‘Kh-29ТЕ Air-to-surface missile’ in Rosoboronexport, 25 September 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=fjoJ1tlmkJo)
‘Kh-31A - Air-launched high-speed anti-ship missile’ in Rosobonexport (http://roe.ru/eng/catalog/aerospace-systems/air-to-air-missile/kh-31a/)
‘Combat Search & Rescue_BAF_2015_xHD’ in @xeehad, 25 May 2015 (https://www.youtube.com/watch?v=DkCs0Cgmq7Y&t=33s)
‘দেখুন বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর শীতকালীন মহড়ার দৃশ্য’ in Jamuna TV, 04 May 2020 (https://www.youtube.com/watch?v=XqbqsyFy_9A)
‘সেনাবাহিনীর বহরে যুক্ত হলো তুরস্কের 'টাইগার মিসাইল সিস্টেম' in Somoy TV, 31 January 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=e2NjTcmW8hc&t=9s)

Tuesday, 31 July 2018

একটা বিমান বাহিনী কিভাবে তৈরি হয়?

হিটলার ইয়ুথ-এর ছেলেরা বিমানের মডেল বহন করছে। জার্মানিতে দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝে পাইলট ট্রেনিং-এর এক বিরাট প্রকল্প নেয়া হয়, যার নেতৃত্ব দেয় হিটলার ইয়ুথ-এর ফ্লাইং ডিভিশন। এদের ট্রেনিং-এর কারণে পরবর্তীতে খুব তাড়াতাড়ি জার্মান বিমান বাহিনীর ভিত গড়ে ফেলা সম্ভব হয়েছিল। 
০১ অগাস্ট ২০১৮




একটা বিমান বাহিনী তৈরি হয় তিনটা জিনিসের যোগসূত্রে – ম্যান, মেশিন এবং ডকট্রাইন। রাষ্ট্রের বিমান বাহিনী এই তিনের সমন্বয় ঘটাবে সেই রাষ্ট্রের চিন্তার উপরে ভিত্তি করে। এই পুরো ব্যাপারটার সবচাইতে ভালো উদাহরণ হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কয়েকটা বিমান বাহিনীর ভিত কি করে গঠন করা হয়েছিল, তা আলোচনায় আনা যেতে পারে।

পাইলট ট্রেনিং-এর ভিত গড়ে দেয়া হয় যেভাবে

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর অনেক আগ থেকেই জার্মানরা অল্প বয়সের ছেলেদের (১৪ বছর থেকে শুরু) মাঝে আকাশে ওড়ার অভিজ্ঞতা দিতে থাকে। ১৯৩৩ সালে এডলফ হিটলার ক্ষমতায় আসীন হবার পর নাজি পার্টির ‘হিটলার ইয়ুথ’ উইং-কে আরও শক্তিশালী করা হয়। হিটলার ইয়ুথের একটা ফ্লাইং ডিভিশন তৈরি করা হয়, যারা অল্প বয়সের ছেলের রিক্রুট করে গ্লাইডার ডিজাইন ও তৈরি করা এবং গ্লাইডারের মাধ্যমে ফ্লাইং ট্রেনিং দিতো (প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভার্সাই চুক্তি অনুযায়ী জার্মানির কোন বিমান বাহিনী রাখা নিষেধ ছিল, কিন্তু গ্লাইডারের ব্যাপারে কোন নিষেধ ছিল না) এবং বেসিক এরোনটিক্যাল ট্রেনিং-ও দিতো। দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে সারা জার্মানি জুড়ে বহু গ্লাইডার ক্লাব গড়ে ওঠে। ১৯৩২ সালে নাজি পার্টিরও একটা ফ্লাইং কোর (ন্যাশনাল সোশালিস্ট ফ্লাইং কোর বা এনএসএফকে) তৈরি করা হয়। ১৯৩৫ সালে হিটলার অফিশিয়ালি ভার্সাই চুক্তির অবমাননা করে জার্মান বিমান বাহিনী বা লুফতওয়াফে-এর গোড়াপত্তনের ঘোষণা দেবার সময় জার্মানদের কাছে ইতোমধ্যেই অনেক যুবকের একটা পুল রেডি হয়ে ছিল, যাদের বেশ সহজেই ট্রেনিং-এ নিয়ে নেয়া যেতো। পাইলট ট্রেনিং-এর সময় কমে গিয়েছিল তাদের।এনএসএফকেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় অনেক ধরনের ইভেন্টের আয়োজন করে অল্প বয়সের ছেলের মাঝেফ্লাইং-এর একটা সংস্কৃতি তৈরি করার উদ্দেশ্যে, যেমন – বিমানের মডেলের ফ্লাইট প্রতিযোগিতা (যাদের বয়স একটু কম ছিল), গ্লাইডার ফ্লাইটের প্রতিযোগিতা (যাদের বয়স একটু বেশি ছিল), ইত্যাদি। ‘ফ্লাইং ডে’ নামের কিছু ইভেন্টও চলতো। ১৯৩৬ সালের এরকম এক ইভেন্টে ১,৫৫০ জন ছেলে অংশগ্রহণ করেছিল। প্রতিযোগিতাতে দেখা হতো যে কার তৈরি মডেল বিমান কতদূর পর্যন্ত উড়তে পারে। এদের অনেককেই লুফতওয়াফের বিমান তৈরির কারখানায় নিয়ে যাওয়া হয়; অনেককে বিমান বাহিনীর বিমানে চড়ার অভিজ্ঞতা দেয়া হয়।এনএসএফকে-এর কার্যকলাপের কারণে জার্মানি যখন ১৯৪০ সালে ব্রিটেনের সাথে আকাশযুদ্ধে (ব্যাটল অব ব্রিটেন) অবতীর্ণ হয়, তখন জার্মানদের ভালো পাইলটের অভাব হয়নি।
   
  
 
জার্মান বিমান বাহিনীর ডাইভ বম্বার জুঙ্কার্স-৮৭ 'স্টুকা'। এধরনের বিমান শুধু জার্মানরাই তৈরি করেছিল। জার্মান বিমান বাহিনীর ডকট্রাইন ছিল সেনাবাহিনীকে সহায়তা দেয়া, যাতে সেনাবাহিনী ভার্সাই চুক্তির প্রতিশোধ নিয়ে সারা ইউরোপ দখল করতে পারে। একারণে জার্মান বিমানগুলি ছিল স্বল্প পাল্লার এবং অপেক্ষাকৃত হাল্কা।  

বিমান বাহিনীর দাপ্তরিক ভিত (ডকট্রাইন)

১৯৩৩ সালের মার্চে হিটলার ‘এয়ার মিনিস্ট্রি’ গঠন করে হেরমান গোরিং-কে এর দায়িত্বে দেন; তার ডেপুটি করা হয় এরহার্ড মিলচ-কে। গোরিং প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মান বিমান বাহিনীর প্রথিতযশা পাইলট ছিলেন। এয়ার মিনিস্ট্রির মূল কাজ ছিল জার্মান বিমান বাহিনীর প্রতিষ্ঠা এবং এর জন্যে দরকারি সকলকিছু করা। নতুন বিমান ডিজাইন এবং তৈরি করার দায়িত্বও ছিল এই মিনিস্ট্রির। সকল বিমানের ডিজাইন করা হয়েছিল বেসামরিক বিমানের নাম করে।

এখানে ডকট্রাইনাল কিছু ব্যাপার আলোচনা না করলেই নয়।

- জার্মান বিমান বাহিনীর বেশিরভাগ লোক এসেছিল সেনাবাহিনী থেকে। তাই তাদের চিন্তায় সেনাবাহিনীর সহায়তাটা ছিল প্রবল। জার্মান বিমানগুলি ছিল যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর ট্যাঙ্কের সহায়ক মাত্র। জার্মানরা দুই ইঞ্জিনের উপরে বিমান তেমন একটা তৈরি করতো না, যেগুলি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বেশি ভেতরে বোমা ফেলার জন্যে যেতো না। এর পেছনে মূল চিন্তাটা ছিল ভার্সাই চুক্তির প্রতিশোধ নেয়া এবং সেনাবাহিনীর মাধ্যমে পুরো ইউরোপ দখল করে বিশ্বের সবচাইতে শক্তিধর জাতি হিসেবে আবির্ভূত হওয়া। ইউরোপের পুরো স্থলভাগের কর্তৃত্ব নেয়াই ছিল মূল উদ্দেশ্য।

- অপরদিকে ব্রিটিশ-মার্কিনিরা স্ট্রাটেজিক বম্বিং নিয়ে চিন্তা করেছিলো। তারা কয়েক হাজার মাইল দূরে জার্মান অর্থনৈতিক এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল গুরুত্বপূর্ণ টার্গেটে বোমা ফেলার উদ্দেশ্যে বিমান ডিজাইন করেছিল। তাই তাদের ল্যাঙ্কাসটার, স্টার্লিং, বি-১৭, বি-২৪ বোমারু বিমানগুলি ছিল চার ইঞ্জিনের এবং অনেক বড়; তাদের পি-৫১, পি-৪৭ ও পি-৩৮ ফাইটারগুলিকেও বেশি তেল বহণ করে বোমারু বিমানের সাথে বহুদূর যাবার জন্যে ডিজাইন করা হয়েছিল।

- তবে ব্রিটিশ-মার্কিন এই ডকট্রাইন ১৯৪১ সালের পরে কার্যকারিতা পেয়েছিল। অন্যদিকে জার্মানরা যুদ্ধ শুরুর আগেই তাদের ডকট্রাইন তৈরি করে ফেলেছিল এবং তাদের বিমানগুলি সেভাবেই ডিজাইন করেছিল।

- জার্মান বিমান বাহিনীর মেশারস্মিট-১০৯ ও ফকে-উলফ-১৯০ ফাইটার এবং হাইঙ্কেল-১১১, জুঙ্কার্স-৮৮ ও ডর্নিয়ার-১৭ বম্বারগুলি ছিল স্বল্প-পাল্লার। তাদের একটা গুরুত্বপূর্ণ বিমান ছিল জুঙ্কার্স-৮৭ ‘স্টুকা’, যা ডাইভ-বম্বিং-এর জন্যে ব্যবহৃত হতো। মিত্রবাহিনীর এমন কোন বিমানই ছিল না।

- ব্রিটিশ রয়াল এয়ার ফোর্সে আবার ‘ডে হাভিলান্ড মসকিটো’ এবং ‘ব্রিস্টল বিউফাইটার’এর মতো দুই ইঞ্জিনের বিমানকে দ্রুতগামী বোমারু বিমান হিসেবে ব্যবহার করেছিলো, যা কিনা নিচু দিয়ে উড়ে টার্গেটের উপরে হামলা করতো। দ্রুত সকলের চোখকে ফাঁকি দিয়ে বোমা ফেলে দ্রুত প্রস্থান করাই ছিল এগুলির কাজ। কাজটা ছিল চোরাগুপ্তা ধরনের। 
  

মার্কিন বিমান বাহিনীর বি-১৭ স্ট্র্যাটেজিক বম্বার। মার্কিন ডকট্রাইন ছিল দূরপাল্লার ভারী বোমারু বিমানের সাহায্যে জার্মান অর্থনৈতিক এবং শিল্পের কাঠামোকে ধ্বংস করা, যাতে করে যুদ্ধ শেষে দুনিয়ার ক্ষমতায় পশ্চিমাদের হাতেই থেকে যায়। 



- আবার ব্রিটিশ বিমান বাহিনী জার্মানিতে বোমা ফেলতো রাতের বেলা; কোন ফাইটার এসকর্ট ছাড়া। অন্যদিকে আমেরিকানরা দিনের বেলায় বোমা ফেলতো ফাইটার এসকর্ট সহ। দিনের বেলায় বোমা ফেলতে যে শক্তির দরকার, তা রয়াল এয়ার ফোর্স যোগাড় করতে পারেনি। তাই তারা রাতের অন্ধকারের আড়ালেই কাজ করতে চেয়েছে। অন্যদিকে আমেরিকানরা যেহেতু নতুন সুপারপাওয়ার হবার পথে, তাই তারা দিনের বেলায় শক্তি প্রদর্শনের দিকেই বেশি আগ্রহী ছিল।

- সোভিয়েতরা তৈরি করেছিল ৩৬ হাজার ইলিউশিন-২/ইলিউশিন-১০ ‘স্টুরমোভিক’ ট্যাঙ্ক ডেস্ট্রয়ার, যা জার্মান আর্মার্ড ফর্মেশনকে যুদ্ধক্ষেত্রে হারাবার জন্যে তৈরি করা হয়েছিল। বিশাল স্থলবাহিনী ব্যবহার করেই তার পূর্ব ইউরোপসহ জার্মানি নিজেদের দখলে নিয়ে সেখানে কমিউনিজম প্রতিষ্ঠা করেছিল।

- জাপানি মিতসুবিসি এ৪এম, জি৪এম, জি৩এম এবং অন্যান্য বেশিরভাগ বিমান ছিল হাল্কা গড়নের, তবে যেন প্রচুর তেল নিতে পারে। প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলির দূরত্বকে মাথায় রেখে এগুলি ডিজাইন করা হয়েছিল। তাই এগুলি হাল্কা অস্ত্র বহণ করতো এবং তেমন একটা গুলি হজম করতে পারতো না। তবে সিঙ্গাপুরের কাছে রয়াল নেভির দুইটা ব্যাটলশিপকে জাপানি বিমান যখন ডুবিয়ে দেয়, তখন জাপানিদের দূর-পাল্লার বিমান বানাবার ডকট্রাইনের সাফল্যই কিন্তু সামনে আসছিলো। তবে সেটা পরবর্তীতে আরও শক্তিশালী মার্কিন বিমানের সামনে ভস্ম হয়ে যায়।

- জার্মান বিমান বাহিনী এবং সোভিয়েত বিমান বাহিনী তৈরি হয়েছিলো যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাবাহিনীকে জেতানোর জন্যে। জাপানি বিমানগুলিকে ডিজাইন করা হয়েছিল প্রশান্ত মহাসাগরে জাপানের কৌশলগত খনিজগুলিকে আয়ত্বে আনার চিন্তা থেকে। অন্যদিকে ব্রিটিশ-মার্কিন বিমান বাহিনী তৈরি হয়েছিল জার্মানির অর্থনৈতিক এবং সামরিক শক্তিকে পঙ্গু করে দেবার জন্যে, যাতে পরবর্তীতে বিশ্ব-কর্তৃত্ব পশ্চিমাদের হাতেই থাকে। আর ব্রিটিশ-মার্কিনীদের পার্থক্য ছিল দিবা-রাত্রে। আমেরিকানরা দিনের আলোতে শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে জানিয়ে দিল যে ব্রিটিশদের আজ যুদ্ধ জিততে রাতের অন্ধকারের আশ্রয় লাগে; কারণ ব্রিটিশ সামাজ্যে আজ আর সূর্য ওঠেনা! সূর্য এখন আমেরিকানদের!

বিশ্বযুদ্ধের মাঝে বিমান বাহিনীগুলির ভিত গড়তে গিয়ে এই ডকট্রাইন ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রগুলি তাদের চিন্তাকে এই ডকট্রাইনের মাধ্যমে প্রকাশ করে। যার চিন্তা যেমন হবে, তার বিমানের ডিজাইনও তেমনই হবে। আর তার পাইলটদের ট্রেনিং-ও তেমনই হবে।

জার্মান বিমান বাহিনীর ট্রেনিং প্রসেস

যুদ্ধেরপ্রথম কয়েক বছরে (১৯৪২-এর আগ পর্যন্ত) জার্মান পাইলটদের ট্রেনিং ছিল নিম্নরূপ-

- ৬ মাসের জন্যে রিক্রুট ট্রেনিং ডিপো (ফ্লিজার এরসাতজ আবটাইলুং)-এ পাঠানো হতো। অনান্য বিমান বাহিনীর বুট-ক্যাম্পের মতো এটা। এখানে শারীরিকভাবে প্রস্তুত করা ছাড়াও আকাশযুদ্ধের উপরে কিছু লেকচার দেয়া হতো।

- এরপর দুই মাসের জন্যে পাইলটদের ‘ফ্লুগান ওয়ার্টার কোম্পানি’ নামের ইউনিটে পাঠানো হতো, যেখানে সাধারণ এরোনটিক্যাল বিষয়ের উপরে শেখানো হতো।

- এরপর পাইলটদের প্রাথমিক বা এলিমেন্টারি ফ্লাইং স্কুল (এ/বি শুলে)-এ পাঠানো হতো, যেখানে ক্লেম-৩৫, ফকে উলফ-৪৪ এবং বুকার-১৩১ প্রশিক্ষণ বিমানে ওড়া শেখানো হতো। এরোডাইনামিক্স, এরোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, এলিমেন্টারি ন্যাভিগেশন, মিটিওরোলজি, ফ্লাইং প্রসিজার এবং মোর্স রিসিভিং-এর উপরে ট্রেনিং নেবার পরে ‘এ২’ লাইসেন্স দেয়া হতো।

- আর ‘বি’ লাইসেন্স পাবার জন্যে পাইলটদের হাইয়ার পার্ফরমেন্স বিমানে যেমন – আরাদো-৬৬, গোথা-১৪৫, আরাদো-৭৬, জুঙ্কার ডব্লিউ-৩৩ ও ডব্লিউ-৪৪ ভারি বিমান, দুই ইঞ্জিনের ফকে উলফ এফডব্লিউ-৫৮ অথবা পুরোনো বিমান, যেমন হাইঙ্কেল-৫১, আরাদো-৬৫ বা হেনশেল-১২৩ বিমানে ট্রেনিং দেয়ার জন্যে পাঠানো হতো। ১০০ থেকে ১৫০ ঘন্টা উড্ডয়নের অভিজ্ঞতার পর ‘বি-২’ ট্রেনিং শেষে পাইলটদের পাইলটস লাইসেন্স এবং পাইলটস উইং দেয়া হতো।

- ফাইটার এবং ডাইভ বম্বার ট্রেনিং-এর জন্যে এই লাইসেন্স পাবার পর ঐ স্পেশালিস্ট ইউনিটে পাঠানো হতো। দুই ইঞ্জিনের

- ফাইটার, বম্বার এবং রেকনাইসেন্স বিমানে ট্রেনিং-এর জন্যেও আলাদা স্পেশালিস্ট ইউনিটে পাঠানো হতো। এসব স্কুলে ছয় মাসের ট্রেনিং-এ ৫০ থেকে ৬০ ঘন্টা ওড়ার পরে ‘সি’ বা এডভান্সড পাইলটস লাইসেন্স দেয়া হতো। বম্বার পাইলটদের অপারেশনাল বিমানের পুরোনো ভার্সনে (হাইঙ্কেল-১১১, জুঙ্কার্স-৫২, জুঙ্কার্স-৮৬, ডর্নিয়ার-১৭) ট্রেনিং দেয়া হতো। এই ট্রেনিং শেষে পাইলটরা দিনে বা রাতে মোটামুটি দক্ষতার সাথে বিমান চালাতে পারতো, ইন্সট্রুমেন্ট ফ্লাইং-এ অল্প কিছু ট্রেনিং হতো তার এবং ভালো আবহাওয়ায় সিম্পল ক্রস-কান্ট্রি ন্যাভিগেশন ফ্লাইট চালাতে পারতো।

- ‘সি’ স্কুলের পরে দুই ইঞ্জিনের ফাইটার পাইলটদের স্পেশালিস্ট ইউনিটে পাঠানো হতো এবং বাকিরা বম্বার ও রেকনাইস্যান্স ইউনিটে যেতো, যেখানে আরও ৫০ থেক ৬০ ঘন্টা ওড়ার প্রশিক্ষণ পেতো সে। স্পেশালিস্ট ট্রেনিং-এ লেটেস্ট ডিজাইনের বিমানে কম্বাইন্ড ক্রু ট্রেনিং দেয়া হতো এবংরাতের বেলায় ও খারাপ আবহাওয়ায় ন্যাভিগেশন ট্রেনিং-এ বেশি গুরুত্ব নিয়ে শিক্ষা পেতো।

- স্পেশালিস্ট ট্রেনিং-এর পর ক্রুরা একত্রেই থাকতো এবং একত্রে তাদের কোন অপারেশনাল ইউনিটে পাঠানো হতো। কিছু পাইলটকে অবজার্ভার ট্রেনিং-এ আরও নয় মাসের জন্যে পাঠানো হতো, যেখানে তারা ব্লাইন্ড ফ্লাইং এবং ন্যাভিগেশনে আরও স্পেশালিস্ট হয়ে উঠতো। এরা বোমারু বিমান বা রেকনাইস্যান্স বিমানের ক্যাপ্টেন হতো। যুদ্ধের মাঝে ১৯৪২ সালের পর থেকে অবজার্ভার ট্রেনিং-এর গুরুত্ব কমতে কমতে ১৯৪৪ সাল নাগাদ ৫ মাসের ট্রেনিং-এ এসে ঠেকে।

- স্পেশালিস্ট ট্রেনিং শেষে পাইলটদের বিভিন্ন অপারেশনাল গ্রুপের অধীনে অপারেশনাল ট্রেনিং ইউনিটে (এরগেনজুং সাইনহাইটেন) দেয়া হতো। এখানে তারা ঐ ইউনিটের অপারেশনাল ট্যাকটিক্যাল মেথডগুলি শিখতো।



প্রথম দিন থেকে এই অপারেশনাল ট্রেনিং ইউনিটে আসতে একজন ফাইটার বা ডাইভ বম্বার পাইলটের ১৩ মাসের মতো সময় লাগতো, যার মাঝে তার ১০০ থেকে ১৫০ ঘন্টা ওড়ার অভিজ্ঞতা হতো। আর বম্বার ও রেকনাইস্যান্স পাইলটের লাগতো ২০ মাস সময়, যার মাঝে তার ২২০ থেকে ২৭০ ঘন্টা ওড়ার অভিজ্ঞতা লাগতো। ১৯৪২ সালের আগ পর্যন্ত লুফতওয়াফের এই ট্রেনিং প্রসেসই ছিল। ১৯৪২ সাল থেকে সোভিয়েত ফ্রন্টের চাপে পুরো ট্রেনিং প্রসেসই ভেঙ্গে পড়ে।
   
  
জার্মান বিমান বাহিনীর সেরা পাইলটের অভাব ছিল না। বহু পাইলটের নামের পাশে প্রচুর 'কিল' যোগ হয়েছিল। এর মূল কারণ ছিল - যুদ্ধের শুরুতে জার্মান বিমান বাহিনীর ট্রেনিং এবং বিমানের মান অপেক্ষাকৃত ভালো থাকা এবং সুনির্দিষ্ট ডকট্রাইন অনুযায়ী অপারেট করা। জার্মানরা অনেক আগ থেকেই তাদের ট্রেনিং অপারেশন চালাবার ফলে যুদ্ধের শুরুর দিকে ভালো পাইলটের অভাব হয়নি তাদের। 
 

জার্মান ট্রেনিং-এর অবনতি এবং ধ্বংস

১৯৪১ সালের ২২শে জুন জার্মানরা সোভিয়েত ইউনিয়নে হামলা করে। প্রথম ছয় মাসে তারা ২,২০০ পাইলট হারায়। এর পরে ১৯৪২ সালের প্রথম ছয় মাসেও প্রায় একই সংখ্যক পাইলট হারায় তারা। এর মাঝে আবার সোভিয়েত ফ্রন্টে জার্মান সেনাবাহিনীর কিছু ইউনিট আটকে পড়ার কারণে তাদেরকে আকাশ থেকে সাপ্লাই দিতে দুই ইঞ্জিনের ট্রেনিং প্রোগ্রাম থেকে বিমান এবং প্রশিক্ষকদের রুশ ফ্রন্টে পাঠানো হয়। এরপর থেকে যুদ্ধে চাপে সেই বিমান এবং প্রশিক্ষকদের আর ফেরত আনা সম্ভব হয়নি। আর রুশ ফ্রন্টে যুদ্ধের কারণে যখন জ্বালানি তেলের সরবরাহের উপরে চাপ পড়ে, তখন ট্রেনিং ইউনিটেই জ্বালানি তেলের বরাদ্দ কমানো হয় সবচাইতে বেশি। এসময় আধাআধি ট্রেনিংপ্রাপ্ত ‘এ’ এবং ‘বি’ টাইপের লাইসেন্সধারী পাইলটের একটা আধিক্য তৈরি হয় এবং অপারেশনাল ট্রেনিং ইউনিটে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পাইলটের ক্রাইসিস দেখা দেয়। ১৯৪২ সালের জুলাই-এ পাইলট ট্রেনিং-এর ডিরেক্টর জেনারেল কুয়েল লুফতওয়াফের প্রধান রাইখমার্শাল হেরমান গোরিং-এর কাছে গিয়ে আসছে মহাবিপদের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন যে, ‘সি’ টাইপের ট্রেনিং-এর অবস্থা শোচনীয় অবস্থায় ঠেকেছে। গোরিং শর্টকাট সমাধান খুঁজতে গিয়ে পুরো ‘সি’ টাইপ ট্রেনিং প্রোগ্রাম-ই বাদ দিয়ে দেন এবং এই ট্রেনিং নেবার জন্যে পাইলটদের সরাসরি অপারেশনাল ট্রেনিং ইউনিটে পাঠিয়ে দিতে বলেন। কিন্তু অপারেশনাল ট্রেনিং ইউনিটে ‘সি’ টাইপের ট্রেনিং দেবার জন্যে যথেষ্ট বিমান এবং প্রশিক্ষক না থাকায় তাদের অবস্থাও শোচনীয় হয়ে ওঠে। অপারেশনাল ট্রেনিং ইউনিট এই চাপ নিতে না পেরে অপারেশনাল গ্রুপের কাছে ট্রেনিং-এর জন্যে পাইলট পাঠাতে থাকে। ফলশ্রুতিতে মারাত্মক এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যেখানে বম্বার এবং রেকনাইস্যান্স পাইলটদের পার্ফরমেন্স খুব খারাপ হয়ে যেতে থাকে।

১৯৪৪ সালের শুরুতে জার্মান অপারেশনাল ফাইটার ইউনিটগুলিতে মাত্র ১৬০ ঘন্টা উড্ডয়নের অভিজ্ঞতা নিয়েই পাইলটরা যোগদান করতে থাকে। অথচঃ ঐ একই সময়ে ব্রিটিশ রয়াল এয়ার ফোর্স এবং আমেরিকার আর্মি এয়ার ফোর্সে ফাইটার পাইলট হতে দ্বিগুণেরও বেশি ঘন্টা উড্ডয়নের প্রয়োজন হতো। ১৯৪৪-এর প্রথম ৬ মাসে জার্মান ফাইটারের ইন্টারসেপ্টর ইউনিটিগুলি ২,০০০-এরও বেশি পাইলট হারায়। দিনের বেলায় মার্কিন বোমারু বিমানের সাথে আসা পি-৫১ ফাইটারগুলি জার্মান বিমান বাহিনীর যেকোন ফাইটারের চাইতে ভালো ছিল। এর উপরে মার্কিন পাইলটের মান তখন যথেষ্ট ভালো। অন্যদিকে জার্মান পাইলটদের ট্রেনিং-এর অবস্থা দিনকে দিন আরও খারাপ হচ্ছিল। ১৯৪৪-এর মাঝামাঝি সময়ে ‘বি’ ট্রেনিং ইউনিটগুলি বাদ দিয়ে দেয়া হয় এবং সকল পাইলটকে মাত্র ১১২ ঘন্টা উড্ডয়নের অভিজ্ঞতাসহ অপারেশনাল ইউনিটে পাঠানো হতে থাকে। আর ঐ বছরের সেপ্টেম্বর নাগাদ জ্বালানি স্বল্পতায় এলিমেন্টারি এবং স্পেশালিস্ট ট্রেনিং প্রসেস বাদ দিয়ে সকলকে ফ্রন্টলাইনে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

হিটলার ইয়ুথ ফ্লাইটের শেষ দিনগুলি

হিটলার ইয়ুথের ফ্লাইং ডিভিশনের সদস্যদের ১৯৪৩ সাল থেকে বিমান-ধ্বংসী কামান চালাতে নিয়োগ দেয়া হয়; তাদের সাথে বহু বেসামরিক নাগরিককেও এই ট্রেনিং দেয়া হয়, কারণ সামরিক ট্রেনিংপ্রাপ্ত সকলকেই তখন যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। যেসব ছেলেরা বয়সে একটু বড় ছিল, তারা কামান চালনা করতো, আর কম বয়সের ছেলেরা ফিজিক্যাল কমিউনিকেশন (কুরিয়ার) এবং সার্চলাইট চালনার কাজ করতো। বোমা হামলায় যোগাযোগ ধ্বংস হওয়াটা অস্বাভাবিক ছিল না। তখন এই ছেলেরাই যোগাযোগ সচল রাখতো। আকাশে মার্কিন বিমান বাহিনীর নতুন ডিজাইনের ফাইটারের (পি-৫১, পি-৪৭ এবং পি-৩৮) কাছে জার্মান ফাইটারগুলি হেরে যাচ্ছিল। তখন এই কম বয়সীদের বাহিনীর চালনা করা বিমান-ধ্বংসী কামানগুলি অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। যুদ্ধে একেবারে শেষের দিকে মেশারস্মিট এমই-২৬২ এবং হাইঙ্কেল এইচই-১৬২ নামের জেট ফাইটারগুলি তৈরি করা শুরু হয়েছিল। হাইঙ্কেল-১৬২-এর নাম দেয়া হয়েছি ‘পিপলস ফাইটার’ (ভোকস যাগের), এবং এই বিমান চালনার জন্যে অল্প বয়সের ছেলের ট্রেনিং দেয়া শুরু করা হয়েছিল। হাইঙ্কেলের বিমানটা যথেষ্ট ভালো একটা ফাইটার হলেও মাত্র ৩২০টা ফাইটার যুদ্ধের মোড় ঘোরানোর জন্যে যথেষ্ট ছিল না। আর তখন জার্মান বিমান বাহিনীর পাইলটের মান ছিল একেবারেই নিম্নমানের। তদুপরি, অনেক ক্ষেত্রেই বিমান পাওয়া গেলেও চালানোর পাইলট পাওয়া যায়নি! অর্থাৎ ম্যান এবং মেশিনের মাঝে সমন্বয় ভেঙ্গে পড়েছিল।
    
  
মার্কিন বিমান বাহিনীর পাইলট ক্যাপ্টেন ফ্রেড ক্রিশ্চেনসেন (১৯৪৪)। তার পি-৪৭ বিমানে অঙ্কিত ২২টা স্বস্তিকার মানে হলো তিনি ২২টা জার্মান বিমান ভূপাতিত করেছেন। মার্কিনীরা তাদের সবচাইতে ভালো পাইলটদের দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসতো নতুন পাইলট ট্রেনিং দেবার উদ্দেশ্যে। অন্যদিকে জার্মান পাইলটদের সর্বোত্তমরা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ করে মৃত্যুবরণ করেছিল। তাদের অভিজ্ঞতা নতুনদের মাঝে খুব কমই গিয়েছিল।  
 

জার্মান পাইলটের মান

জার্মান ফাইটার পাইলটদের একটা নাম হয়ে গিয়েছিল ‘কিল’-এর সংখ্যার জন্যে। ২,৫০০ পাইলট কমপক্ষে ৫টা বিমান ভূপাতিত করার দাবি করে। ১০০টার বেশি বিমান ভূপাতিত করার পাইলটের সংখ্যা ছিল ১০৩। ৪০ থেকে ১০০ ‘কিল’-এর দাবি ছিল ৩৬০ জন পাইলটের। ২০ থেকে ৪০ ‘কিল’এর দাবি ছিল ৫০০ জন পাইলটের। ৪৫৩ জন ফাইটার (দিনের বেলার ফাইটার) পাইলটকে ‘নাইটস ক্রস অব দ্যা আয়রন ক্রস’ পুরষ্কার দেয়া হয়েছিল; আরও ৮৫ জন নাইট ফাইটার পাইলট (১৪ জন ক্রু-সহ) একই সন্মান পেয়েছিল। যুদ্ধের শুরুতে এটাই ছিল জার্মানির সর্বোচ্চ সামরিক সন্মান। জার্মান বিমান বাহিনী যুদ্ধে মোট ৭০ হাজার বিমান ভূপাতিত করার দাবি করে; যার মাঝে ৪৫ হাজার ছিল সোভিয়েত, আর ২৫ হাজার ছিল ব্রিটিশ-মার্কিন। ১৮ হাজার ৬০০-এর মতো জার্মান পাইলট যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করে। 

জার্মান বিমান বাহিনীর সাথে রয়াল এয়ার ফোর্স এবং মার্কিন বিমান বাহিনীর ট্রেনিং-এর দৈর্ঘ্যের একটা তুলনাচিত্র। যেখানে যুদ্ধের শুরুতে ১৯৪২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জার্মানরা ব্রিটিশ এবং মার্কিন ট্রেনিং-এর চাইতে বেশি লম্বা ট্রেনিং নিতো, সেখানে পুরো চিত্রই পাল্টে যায় ১৯৪২-৪৩ সালে। যুদ্ধের শেষের দিকে জার্মানরা ভালো বিমান তৈরি করতে পারলেও সেগুলি চালাবার মতো পাইলটই তাদের ছিলনা। 


জার্মান পাইলটদের ‘কিল’এর এই দাবি পশ্চিমা ঐতিহাসিকেরা অনেকেই প্রশ্ন করেছেন। তবে এর স্বপক্ষে যুক্তিও রয়েছে যথেষ্ট। প্রথমতঃ যুদ্ধের প্রথম দিকে জার্মান পাইলটের মান ছিল অন্যদের চাইতে অনেক ভালো, কারণ তারা অনেক আগ থেকেই পাইলট তৈরি করে আসছিল। যেমন যুদ্ধের শুরুতে প্রচন্ড চাপের মুখে ব্রিটেনের রয়াল এয়ার ফোর্সের পাইলটেরা মাত্র ১৬০ ঘন্টা উড্ডয়নের অভিজ্ঞতা নিয়েই জার্মান বিমান বাহিনীকে মোকাবিলা করতে গিয়েছিল। ১৯৪১ সালের পর থেকে এই ট্রেনিং-কে ৩২০ ঘন্টার উপরে নিয়ে যাওয়া হয়। যুদ্ধের প্রথম দিকে রুশ বিমান বাহিনীর ট্রেনিং-এর অবস্থাও ছিল খুবই খারাপ।দ্বিতীয়তঃ পরিকল্পনা অনুযায়ী যুদ্ধপ্রস্তুতির কারণে জার্মান বিমান বাহিনী যুদ্ধের শুরুতে বেশ ভালো মানের ফাইটার তৈরি করতে পেরেছিল। অন্যদিকে অন্য দেশগুলি ছিল একেবারেই প্রস্তুতিহীন; তাই তাদের শুরুর দিকের বিমানগুলি ছিল নিম্নমানের। তৃতীয়তঃ যেখানে ব্রিটিশ-আমেরিকান সেরা পাইলটদেরকে দেশে ফেরত নিয়ে আসা হতো নতুন পাইলটদের ট্রেনিং দেবার জন্যে, সেখানে জার্মান বিমান বাহিনীর শ্রেষ্ঠ পাইলটদেরকে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যস্ত রাখা হয়েছিল তারা মারা যাবার আগ পর্যন্ত। ব্রিটিশ-মার্কিন পাইলটেরা তাদের অভিজ্ঞতা নতুনদের মাঝে বিতরণ করে পাইলট তৈরিতে সহায়তা করেছিল। অন্যদিকে জার্মান পাইলটদের অভিজ্ঞতা নতুনদের মাঝে ততটা যায়নি।

জার্মান বিমান বাহিনীর ডকট্রাইনগত সমস্যা

জার্মান পাইলট ট্রেনিং এবং বিমান নির্মান শিল্প তাদের রাষ্ট্রের চিন্তার সাথে সাংঘর্ষিক ছিল। কারণ তাদের চিন্তায় যেখানে সেনাবাহিনী দ্বারা সারা ইউরোপ দখলের দিকে লক্ষ্যস্থির ছিল, সেখানে অনেকগুলি শক্তিশালী রাষ্ট্রের সাথে একত্রে যুদ্ধ করতে পারার মতো ট্রেনিং কাঠামো তাদের থাকা দরকার ছিল। কিন্তু সেটা ছিল শুধুই স্বপ্ন। রাশিয়া, ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্মিলিত জনবল, খনিজ সম্পদ, ভূমি, শিল্প এবং অর্থনৈতিক শক্তির সাথে পেরে ওঠা জার্মানির একার পক্ষে কখনোই সম্ভব ছিলনা। তাই সকলের সাথে একত্রে লড়তে গিয়ে তাদের ট্রেনিং কাঠামো এবং বিমান নির্মাণ শিল্প ভেঙ্গে পড়েছিল। একইসাথে এতগুলি ফ্রন্টে একত্রে যুদ্ধ করার জন্যে দরকারি খনিজ সম্পদের জোগান তারা দিতে অক্ষম ছিল।
     
 
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেনের মাটিতে পাইলট ট্রেনিং-এর জন্যে যথেষ্ট এয়ারফিল্ড এবং ট্রেনিং বিমান না থাকায় বেশিরভাগ পাইলট ট্রেনিং-এর আয়োজন করা হয় ব্রিটেনের বাইরে। ঐ এলাকাগুলি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অনেক দূরে থাকায় পাইলটরা তেমন কোন চাপ ছাড়াই ট্রেনিং নিতে পেরেছিল। ১৯৪১ থেকে ১৯৪৩ সালের মাঝে পাইলট ট্রেনিং এতটাই সাফল্যজনক ছিল যে, ১৯৪৪ সাল থেকে পাইলট ট্রেনিং কমিয়ে দেয়া হয়েছিল! 
  

ব্রিটিশ অভিজ্ঞতা

যুদ্ধের প্রথম দিকে ব্রিটিশরা জার্মানদের সাথে পেরে উঠছিল না একেবারেই। তারা তাদের পাইলট ট্রেনিং-এর জন্যে ৯টা দেশের উপরে নির্ভর করেছিল। পাইলট ট্রেনিং-এর জন্যে যথেষ্ট সংখ্যক এয়ারফিল্ড ব্রিটেনে ছিল না। এরপরেও ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫-এর মাঝে মোট ১৫৩টা ফ্লাইং স্কুলে ১৪,৪০০ পাইলটকে ট্রেনিং দেয়া হয়েছিল ব্রিটেনে। মোট ট্রেনিংপ্রাপ্ত ১ লক্ষ ১০ হাজার ৬০০ পাইলটের মাঝে এই সংখ্যা মাত্র ১৩%। সর্বোচ্চ সংখ্যক ট্রেনিং দেয়া হয়েছিল কানাডার ৯২টা স্কুলে– ৫৪,১০০, যা কিনা মোট ট্রেনিংপ্রাপ্ত পাইলটের ৪৯%। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রেনিং পেয়েছিল ১১,৮০০ জন (১১%), অস্ট্রেলিয়াতে ট্রেনিং পেয়েছিল ১০,৫০০ জন (৯%), দক্ষিণ আফ্রিকা এবং রোডেশিয়াতে মোট ১৪,৮০০ জন (১৩%), নিউজিল্যান্ডে ৪,২০০ জন (৪%), ভারতে ৭০০ জন এবং মধ্যপ্রাচ্যে ১০০ জন। ব্রিটেনের সাহায্যকারী এই দেশ/অঞ্চলগুলি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে ছিল বিধায় সেখানে পাইলটরা মোটামুটি শান্তিতেই ট্রেনিং নিতে পেরেছে। এভাবে ট্রেনিং নেবার জন্যে যথেষ্ট ভালো ফ্লাইং কন্ডিশনও ব্রিটিশরা পেয়েছিল; কাজেই ট্রেনিং-এ আবহাওয়ার কারণে সময়ক্ষেপণ ছিল কম। অন্যদিকে জার্মান পাইলটরা মিত্রবাহিনীর বোমারু বিমানের হামলার মাঝেই ট্রেনিং নিচ্ছিল।

ব্রিটেনের আকাশে যখন জার্মান বিমান হামলা করছিল (ব্যাটল অব ব্রিটেন), তখন ব্রিটিশদের পাইলটের ব্যাপক ঘাটতি ছিল; চাপের মুখে পাইলটের মানও ছিল অতি সাধারণ। কিন্তু ১৯৪৩ সাল থেকে ট্রেনিংপ্রাপ্ত পাইলটের সারপ্লাস পরিলক্ষিত হচ্ছিল। বিমানের মান ভালো হচ্ছিল, আর ভালো বিমান চালাতে পাইলটের ট্রেনিং-এর মানও ভালো হতে হতো। যুদ্ধের প্রথমে পরিলক্ষিত ক্ষতির চাইতে পরবর্তীতে ক্ষতির পরিমাণ কমতে থাকে; কাজেই বদলি পাইলটের দরকারও আস্তে আস্তে কমতে থাকে। এমতাবস্থায় ১৯৪৪ সালের শুরু থেকে পাইলট ট্রেনিং-এর হার কমিয়েই দেয়া হয়! অর্থাৎ যুদ্ধ জেতার জন্যে যথেষ্ট সংখ্যক ভালো পাইলট ১৯৪১ থেকে ১৯৪৩ সালের মাঝেই তৈরি করে ফেলা সম্ভব হয়েছিল! শেষের দেড় বছর শুধু যুদ্ধ শেষ করতে ব্যবহৃত হচ্ছিল।

ব্রিটেনের কোন হিটলার ইয়ুথ ছিল না; তবে ব্রিটিশরা যুদ্ধ প্রস্তুতিও বন্ধ করেনি একেবারে। রয়াল এয়ার ফোর্সের রেগুলার পাইলটরা দুই বছরের ট্রেনিং পেতো আরএএফ কলেজে। এছাড়াও আরও বেশি সংখ্যক পাইলট তৈরি হতো এক বছরের শর্ট সার্ভিস ট্রেনিং-এর মাধ্যমে। এদের ট্রেনিং হতো ফ্লাইং ট্রেনিং স্কুলে। ১৯২৫ সাল থেকে আরও একট নতুত ধাপে পাইলট ট্রেনিং শুরু হয় – স্পেশাল রিজার্ভ স্কোয়াড্রন এবং অক্সিলারি স্কোয়াড্রন। এদেরকে সপ্তাহান্তে পার্ট টাইম ট্রেনিং দেয়া হতো। তবে ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৯-এর মাঝে এই প্রোগ্রামগুলিকে ত্বরান্বিত করা হয়। ১৯৩৬ সালে ট্রেনিং কমান্ড এবং আরএএফ ভলান্টিয়ার রিজার্ভ গঠন করা হয়। এরা বেসামরিক ফ্লাইং স্কুলগুলিতে ট্রেনিং নিতো। ছুটির দিনে এরা বিমান ওড়াতো এবং সন্ধ্যায় অনান্য ক্লাসে প্রশিক্ষণ নিতো। এদেরকে পরবর্তীতে বিমান বাহিনীতে নেয়া অনেক সহজ হয়ে গিয়েছিল। তারপরেও যুদ্ধ শুরুর সময় (১৯৩৯ সালে) যথেষ্ট এয়ারফিল্ড, ট্রেনিং বিমান এবং প্রশিক্ষকের অভাবে বেশি সংখ্যক পাইলট তৈরি করা যাচ্ছিলো না। তবে এই কাঠামোটাই ১৯৪১ সাল থেকে ব্যবহার করে পাইলট ট্রেনিং-এ ব্যাপক সাফল্য পাওয়া গিয়েছিল।
   
 
শ্রীলঙ্কা বিমান বাহিনীর এফ-৭ যুদ্ধবিমান। দেশটির গৃহযুদ্ধের শুরুতে বিমান বাহিনীতে পাইলট ছিল ৪০ জনেরও কম। এমতাবস্থায় নতুন বিমান কিনলেও তা চালাবার জন্যে পাইলট ছিল না তাদের। তাই অনেক ক্ষেত্রেই বিদেশী ভাড়া করা পাইলট দিয়ে চালাতে হয়েছিল তাদের। 
 

আরও কিছু উদাহরণ

১৯৮০-এর দিকে মধ্য আফ্রিকার দেশ শাদ (কেউ কেউ বলে চাদ) ব্রিটেন-ফ্রান্স-যুক্তরাষ্ট্রের ধস্তাধস্তির মাঝে পড়ে গৃহযুদ্ধে পতিত হয়। তখন শাদের একনায়ক ইদ্রিস দেবি, যিনি ফরাসীদের কাছে পাইলট ট্রেনিং নেবার কারণে বিমান বাহিনীর গুরুত্ব বুঝতেন। তিনি শাদের বিমান বাহিনী তৈরি করার লক্ষ্যে আগানো শুরু করেন। কিন্তু যেহেতু নিজের দেশের কোন পাইলটই নেই, তাই ভাড়াটে পাইলট দিয়েই তিনি শাদের বিমান বাহিনী তৈরি করেন। আজও শাদের বিমান বাহিনী বিদেশী পাইলটের উপরে বেশ নির্ভরশীল।

শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধ শুরুর সময়ে শ্রীলঙ্কার বিমান বাহিনীতে তেমন কোন সংখ্যক পাইলটই ছিল না। তাই বিদেশী ভাড়া করা পাইলটের উপরেই নির্ভর করতে হয়েছে তাদের। ১৯৮৫ সালে যখন শ্রীলঙ্কা ইতালি থেকে Siai Marchetti বিমান কেনে, তখনও তাদের মোট পাইলটের সংখ্যা ছিল ৪০-এরও কম। এই সংখ্যক পাইলট দিয়েই তাদের এটাক এয়ারক্রাফট, পরিবহণ বিমান এবং হেলিকপ্টার অপারেট করতে হয়েছিল।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ‘কিলো ফ্লাইট’ তৈরি করতে বাংলাদেশের হাতে ছিল ৩ জন বিমান বাহিনীর পাইলট এবং ৬ জন বেসামরিক পাইলট। এই সবগুলি উদাহরণেই একটা ব্যাপার নিশ্চিত, আর তা হলো – পাইলটের স্বল্পতা এতটাই ছিল যে, আরও বেশি সংখ্যক বিমান পেলেও সেগুলি ব্যবহার করা সম্ভব ছিল না।

আর এই তিন উদাহরণের প্রত্যেকটাই অন্য দেশে তৈরি বিমানের উপরে নির্ভরশীল ছিল বিধায় ঐ দেশগুলি দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়েছে।

এই দীর্ঘ আলোচনাকে সংক্ষেপে বলতে গেলে –

- একটা বিমান বাহিনীকে গড়তে গেলে প্রথমেই তার ডকট্রাইন স্থির করতে হবে, যা কিনা সেই রাষ্ট্রের চিন্তার উপরে নির্ভরশীল। সেই চিন্তাটা যেমন, তার বিমানের ডিজাইন, ফর্মেশন এবং ট্রেনিং হবে তেমনি।

- ট্রেনিং এমন একটা ব্যাপার, যার একটা দফারফা না করে কোন যুদ্ধ করাটা বোকামি। পাইলট তৈরি করতে সময় লাগে। সেটা হিসেবে না এনে যুদ্ধে গেলে আধাআধি প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের উপরে নির্ভর করতে হতে পারে। এদের হাতে ভালো অস্ত্র দিলেও এর উপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত হবে না।

- যথেষ্ট সংখ্যক ও নিরাপদ এয়ারফিল্ড এবং এয়ারস্পেস ছাড়া ভালো ট্রেনিং-এর আশা করা যায় না।

- অভিজ্ঞদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে হবে নতুনদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে। অভিজ্ঞদের ভালো যোদ্ধা হিসেবে ব্যবহার করে কিছু সাফল্য পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে যুদ্ধ হারতে হতে পারে।

- ট্রেনিং অনেক অল্প বয়সে শুরু করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। অল্প বয়সের ছেলেদের মানসপটে পাইলট হবার আকাংক্ষা যে ভালোমতো তৈরি করতে পারবে, তার বিমান বাহিনী ততো শক্তিশালী হবে।

- বেসামরিক জনগণের পাইলট ট্রেনিং-এ ভূমিকা থাকলেও রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতাই হবে মূল বিষয়। রাষ্ট্রের চিন্তা বিমান বাহিনীর ডকট্রাইন এবং ট্রেনিং প্রসেসে প্রতিফলিত হবে।

- অন্য দেশের তৈরি বিমানের উপরে নির্ভরশীল হতে হলে ঐ দেশের ডকট্রাইনই মেনে চলতে হবে; এভাবে নিজেদের ডকট্রাইন হবে স্বল্প মেয়াদী, যাকে ডকট্রাইন বলাটাই ভুল হবে

Saturday, 28 July 2018

যুদ্ধ এক – অস্ত্র অনেক, কেন?

২৮শে জুলাই ২০১৮


  
ডিঙ্গো নামের এই কুকুর-পরিবারের প্রাণীটি অস্ট্রেলিয়ার স্থলভাগে সবচাইতে ভয়ংকর স্তন্যপায়ী প্রাণী। অস্ট্রেলিয়াতে বনের রাজা হতে হলে ডিঙ্গো হলেই চলবে, যদিও সুন্দরবনে হতে হবে টাইগার বা আফ্রিকায় হতে হবে লায়ন।


বনের রাজা কে?


অস্ট্রেলিয়া একটা মহাদেশ হলেও তা মূলতঃ একতা বিশাল দ্বীপ; এবং বাকি দুনিয়া থেকে সমুদ্র দ্বারা আলাদা। অস্ট্রেলিয়ার সবচাইতে মারাত্মক প্রাণী কোনটা – এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কুমীর, হাঙ্গর, সাপ, জেলিফিশ, আক্টোপাস, মৌমাছি, মাকড়ষা, পিঁপড়া, ইত্যাদির নাম আসবে। এখানে স্থলভাগের বড় কোন জন্তুর নাম আসবে না সহজে, কারণ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সবচাইতে ভয়ঙ্কর স্তন্যপায়ী প্রাণী হলো ডিঙ্গো নামের কুকুর-পরিবারের একটা জন্তু। ফেরাল ক্যাট নামের একটা বিড়াল আছে, যা পাখি ধরে খায়। কিন্তু সেখানে বড় কোন বিড়াল নেই – যেমন বাঘ বা সিংহ বা চিতা বা লেপার্ড। সেখানে বনে রাজা বড় কোন পশু নয়। ডিঙ্গোর মতো প্রাণী আফ্রিকা বা আমাজন বা সুন্দরবনে হয়তো টিকতে পারবে না; তবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাকে হারাবার কেউ নেই। একেকটা জঙ্গলের বাস্তবতা একেক রকম। মূলকথা, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বনের রাজা হতে টাইগার বা লায়ন হবার দরকার নেই। এই হিসেবটা জঙ্গলের বাইরের জঙ্গলেও প্রচলিত। কারণ সবগুলি একই সৃষ্টির অংশ।
 
   
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ইউরোপের আকাশে ব্রিটিশ হকার হারিকেন বিমানগুলি খুব একটা সুবিধা করতে না পারলেও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ঠিকই চালিয়ে নিয়েছিল। এই বিমানের গতি (ঘন্টায় ৫৩১ কিঃমিঃ) জাপানি জেরো ফাইটারের কাছাকাছি ছিলো (৫৩৩ কিঃমিঃ থেকে ৫৬৫ কিঃমিঃ)।


বিশ্বযুদ্ধে আকাশের রাজত্ব কে করেছে?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে একেক যুদ্ধক্ষেত্রে একেক ধরনের যুদ্ধবিমান ব্যবহৃত হয়েছিল। ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্রে জার্মান বিমান বাহিনীর বিরুদ্ধে যেসব ব্রিটিশ-মার্কিন যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়েছিল, জাপানের সাথে যুদ্ধে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সেগুলি মোতায়েন করা হয়নি। জার্মান বিমান বাহিনীর মূল ফাইটার বিমান ছিল মেশারস্মিট বিএফ-১০৯, যে বিমানের সর্বোচ্চ গতি একসময় ঘন্টায় ৪৭০ কিঃমিঃ থাকলেও খুব দ্রুতই পরের ভার্সনের বিমানগুলির গতি ৫৬০ কিঃমিঃ পার হয়ে ৬২৪ কিঃমিঃ, এমনকি ৭২৯ কিঃমিঃ পর্যন্ত যায়। বিএফ-১০৯-এর সাথে আরেকটা ফাইটার বিমান ফকে-উলফ এফডব্লিউ-১৯০ প্রচুর তৈরি করা হয়েছিল, যার গতি ৬৫০ কিঃমিঃ থেকে ৬৮৫ কিঃমিঃ পর্যন্ত ছিল। এই বিমানগুলিকে মোকাবিলা করার জন্যে ব্রিটিশদেশ হকার হারিকেন বিমানগুলির গতি ছিল ৫১৯ কিঃমিঃ থেকে ৫৩১ কিঃমিঃ পর্যন্ত; অর্থাৎ জার্মান বিমানগুলির বিরুদ্ধে যুদ্ধ হেরে যাবার সম্ভাবনা এর ছিল বেশি। ব্রিটিশরা তাই দ্রুত সুপারম্যারিন স্পিটফায়ার বিমানের উৎপাদন বাড়িয়েছিল, যার গতি ছিল ঘন্টায় ৬০২ কিঃমিঃ থেকে ৭২১ কিঃমিঃ পর্যন্ত। কিন্তু স্পিটফায়ারগুলি যথেষ্ট সংখ্যায় তৈরি করতে সময় লেগেছিল। স্পিটফায়ারের কারখানাগুলির সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে করতে যে সময় লেগেছিল, সেসময়ে হারিকেনগুলিই ঠেকনা দিয়েছিল। যখন স্পিটফায়ারগুলি যথেষ্ট সংখ্যায় পাওয়া যেতে থাকলো, তখন হারিকেনগুলিকে অন্য যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠাবার ব্যবস্থা করা হয় – যেমন আফ্রিকা এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে।

প্রশান্ত মহাসাগরে জাপানের মূল যুদ্ধবিমান ছিল মিতসুবিসি এ-৬এম ‘জেরো’। এর গতি ৫৩৩ কিঃমিঃ থেকে ৫৬৫ কিঃমিঃ-এর মতো ছিল; অর্থাৎ ৬০০ কিঃমিঃ-এর নিচে। ব্রিটিশরা এই যুদ্ধক্ষেত্রে হারিকেনগুলিকে পাঠিয়েছিল আর মার্কিনীরা পাঠিয়েছিল কার্টিস পি-৪০ (৫২০ কিঃমিঃ থেকে ৫৬৩ কিঃমিঃ), বেল পি-৩৯ এয়ারাকোবরা (৬১২ কিঃমিঃ), গ্রুম্মান এফ-৪এফ ওয়াইল্ডক্যাট (৫৩৩ কিঃমিঃ) এবং গ্রুম্মান এফ-৬এফ হেলক্যাট (৬১২ কিঃমিঃ)। পরবর্তীতে ভট এফ-৪ইউ কর্সেয়ার বিমানগুলি (৬৭১ কিঃমিঃ থেকে ৭১৮ কিঃমিঃ) গতিকে আরও এগিয়ে নেয়। কর্সেয়ার ছাড়া বাকি বিমানগুলির গতি ছিল ৬৫০ কিঃমিঃ-এর নিচে; তবে তারপরেও বিমানগুলি জাপানি জেরো ফাইটারের সাথে যুদ্ধ করে জিততে পারতো। অন্যদিকে ৬৫০ কিঃমিঃ ইউরোপের যুদ্ধ জেতার জন্যে যথেষ্ট ছিল না। মার্কিনীরা ইউরোপে তিনটা ফাইটার বিমান ব্যবহার করেছিল – নর্থ আমেরিকান পি-৫১ মাসট্যাং (৬২৪ কিঃমিঃ থেকে ৭০৩ কিঃমিঃ), রিপাবলিক পি-৪৭ থান্ডারবোল্ট (৬৯০ কিঃমিঃ থেকে ৬৯৭ কিঃমিঃ) এবং লকহিড পি-৩৮ লাইটনিং (৬৩৬ কিঃমিঃ থেকে ৬৭৬ কিঃমিঃ)। এই বিমানগুলির গতি ছিল মোটামুটিভাবে ৬৫০ কিঃমিঃ থেকে ৭০০ কিঃমিঃ-এর মতো। আর তাই এই বিমানগুলি জার্মান বিমান বাহিনীর বারোটা বাজাতে যথেষ্ট সহায়ক হয়েছিল।
   
  
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত কার্টিস পি-৪০ বিমান। এই বিমানে ইঞ্জিন ব্যবহৃত হয়েছিল ১,২০০ হর্সপাওয়ারের রাইট, অথবা ১,০৫০ থেকে ১,২০০ হর্সপাওয়াররের প্র্যাট এন্ড হুইটনি, অথবা ১,১৫০ হর্সপাওয়ারের এলিসন, অথবা ১,৩০০ থেকে ১,৩২৫ হর্সপাওয়ারের প্যাকার্ড। অর্থাৎ যে ইঞ্জিন পাওয়া গিয়েছিল, সেটাই ব্যবহৃত হয়েছিল এতে। বেশি শক্তিশালী (১,৫০০ থেকে ২,০০০ হর্সপাওয়ার) ইঞ্জিনগুলি ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্রের বিমানগুলির জন্যে দেয়া হচ্ছিলো।  


ইঞ্জিনের উৎপাদন বনাম বিমানের উৎপাদন

পি-৫১-এ ব্যবহৃত হয়েছিল ১,৫২০ থেকে ১,৬৫০ হর্সপাওয়ারের এলিসন ইঞ্জিন; পি-৪৭-এ ব্যবহৃত হয়েছিল ২,০০০ থেকে ২,৫৩৫ হর্সপাওয়ারের প্র্যাট এন্ড হুইটনি ইঞ্জিন; আর পি-৩৮-এ ব্যবহৃত হয়েছিল ১,২২৫ থেকে ১,৬০০ হর্সপাওয়ারের দুইটা এলিসন ইঞ্জিন। বাকি বিমানগুলিতে ব্যবহৃত হয়েছিল – পি-৪০ (১,২০০ হর্সপাওয়ারের রাইট, অথবা ১,০৫০ থেকে ১,২০০ হর্সপাওয়াররের প্র্যাট এন্ড হুইটনি, অথবা ১,১৫০ হর্সপাওয়ারের এলিসন, অথবা ১,৩০০ থেকে ১,৩২৫ হর্সপাওয়ারের প্যাকার্ড), পি-৩৯ (১,১৫০ থেকে ১,৩২৫ হর্সপাওয়ারের এলিসন), এফ-৬এফ (২,০০০ থেকে ২,২০০ হর্সপাওয়ারের প্র্যাট এন্ড হুইটনি), এফ-৪ইউ (২,০০০ থেকে ২,৩০০ হর্সপাওয়াররের প্র্যাট এন্ড হুইটনি)। এখান থেকে যা পরিষ্কার হয় তা হলো, বিমানের ইঞ্জিনের উৎপাদনের সাথে বিমানের উৎপাদনের একতা সমন্বয় ঘটানো হয়েছিল। সবগুলি মডেলের ইঞ্জিন একই সংখ্যায় তৈরি করা যায়নি। কর্মক্ষমতা বাড়ানোটা যুদ্ধের সময়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হয়ে যায়। সেটা ধরে রাখতেই এক প্রকারের ইঞ্জিন বা এক প্রকারের বিমান তৈরি করা হয়নি। আর একারণেই ইউরোপে মার খাওয়া বিমান এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভালোই চালিয়ে নেয়া গিয়েছিল। পুরো ব্যাপারটা অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সবচাইতে মারাত্মক প্রাণীর মতোই। ইউরোপে বনের রাজা হতে গতি দরকার ছিল ৬৫০ কিঃমিঃ থেকে ৭০০ কিঃমিঃ; অন্যদিকে প্রশান্ত মহাসাগরে ৫৫০ কিঃমিঃ থেকে ৬০০ কিঃমিঃ-ই ছিল যথেষ্ট। একই যুদ্ধ; বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্র!

http://www.airliners.net/photo/Mali-Air-Force/Embraer-A-29B-Super-Tucano-EMB-314/4115817
এমব্রায়ার-৩১৪ সুপার টুকানো বিমানগুলি আফ্রিকার বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে টিকে যেতে পারে, যদিও এশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে সুপারসনিক জেট বিমানের কাছে তা কিছুই নয়। মোটকথা যুদ্ধের সময় সকল যুদ্ধক্ষেত্রে সমহারে শক্তি মোতায়েন করা সম্ভব হবে না। তাই যেসব যুদ্ধাস্ত্র একেবারে বাতিল মনে হবে, সেটারও ব্যবহার দেখা যাবে অনেক যুদ্ধক্ষেত্রে।
   

হিসেব পুরোনো হলেও সর্বদাই কার্যকর

যুদ্ধ যে সময়েই হউক না কেন, এই হিসেবগুলি থাকবেই। পুরোনো ইঞ্জিনগুলির উৎপাদন হঠাতই পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়ে নতুন ইঞ্জিন তৈরি করা যাবে না। তাই পুরোনো ইঞ্জিন উৎপাদন চলবে; সেকারণে পুরোনো বিমানের উতপাদনও চলবে। যারা যুদ্ধ করবে, তারাও এই ব্যাপারটাকে খেয়ালে রাখবে। যে যুদ্ধক্ষেত্র বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে বেশি শক্তিশালী এবং অপেক্ষাকৃত দামি বিমানগুলি দেয়া হবে। বাকিগুলিতে কম শক্তিশালী বিমান দিয়েই চালিয়ে নেয়া হবে।

আজকের এশিয়া যুদ্ধক্ষেত্রে হয়তো মিনিমাম স্ট্যান্ডার্ড হবে এফ-১৮ বা এফ-১৬ বা এফ-১৫। অন্যদিকে আফ্রিকায় এফ-৭, এফ-৫, মিরেজ-৩ বিমানগুলিও খারাপ করবে না। এমনকি এমব্রায়ার-৩১৪ সুপার টুকানো বা এয়ার ট্রাক্টর এটি-৮০২ বা আইওম্যাক্স আর্কেঞ্জেলের মতো প্রপেলার বিমানও চালিয়ে নেবে স্থানবিশেষে। শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধে যতদিন পর্যন্ত এলটিটিই-এর হাতে বিমান-ধ্বংসী মিসাইল পড়েনি, ততোদিন শ্রীলঙ্কার বিমান বাহিনী ইতালির সিয়াই মার্চেট্টি এসএফ-২৬০ এবং আর্জেন্টিনার আইএ-৫৮ পুকারার মতো বিমান দিয়েই চালাচ্ছিল। প্রথম মিসাইল হামলার পর থেকে শ্রীলংকার বিমান বাহিনী ইস্রাইলের আইএআই কাফির, রাশিয়ার মিগ-২৭ এবং চীনের এফ-৭ জেট বিমান কেনে।  


 
ক্যামেরুন নৌবাহিনীর চীনা নির্মিত প্যাট্রোল বোট CNS Le Ntem (P-108)। এই জাহাজের সামনে রয়েছে ৭৬ মিঃমিঃ কামান, যা কিনা ৪৭ মিটার একটা বোটের জন্যে বেশ শক্তিশালী কামান। আফ্রিকার গিনি উপকূলে ৭৬ মিঃমিঃ কামান একটা শক্তিশালী যুদ্ধাস্ত্র। মিসাইল থাকলে তো আরও বেশি। এই কামানের কারণে একটা প্যাট্রোল বোটও গুরুত্বপূর্ণ একটা যুদ্ধজাহাজ। সকল যুদ্ধক্ষেত্রে রাজা হতে সমান শক্তির দরকার হয় না। তাই এক যুদ্ধ; অনেক যুদ্ধক্ষেত্র। এক যুদ্ধ; অনেক অস্ত্র।

নৌ অস্ত্রের ক্ষেত্রেও একই হিসাব চলবে। একস্থানে যেখানে বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের মাঝে প্রতিযোগিতা হবে, সেখানে অন্যখানে প্যাট্রোল বোটই বনে যাবে রাজা। সেখানে কোন প্যাট্রোল বোটে কতো মিঃমিঃ ক্যালিবারের কামান রয়েছে, সেখানে প্রতিযোগিতা হবে। ৭৬ মিঃমিঃ কামান থাকলে উপরে থাকা যাবে; ১০০ মিঃমিঃ কামান আরও উপরে তুলবে; ১২৭ মিঃমিঃ কামান রাজা বানাবে! আর কারো কাছে মিসাইল থাকলেও সে হবে সেই বনের রাজা! সাপ্লাই কম থাকায় সে মিসাইল গুণে গুণে ব্যবহার করবে। ৩০ মিটার-৫০ মিটার জাহাজের মাঝে ১০০ মিটারের জাহাজ হবে কমান্ডশিপ। জাহাজে হেলিকপ্টার থাকলে তা হবে ট্রাম্পকার্ড।

মোটকথা যুদ্ধের সময় সকল যুদ্ধক্ষেত্রে সমহারে শক্তি মোতায়েন করা সম্ভব হবে না। তাই যেসব যুদ্ধাস্ত্র একেবারে বাতিল মনে হবে, সেটারও ব্যবহার দেখা যাবে অনেক যুদ্ধক্ষেত্রে। এবং যেহেতু কৌশলগত কারণে সেই যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করা যাবে না, তাই যুদ্ধ চালিয়ে নিতে অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী অস্ত্রই সেখানে চলবে।

এক যুদ্ধ; অনেক যুদ্ধক্ষেত্র। এক যুদ্ধ; অনেক অস্ত্র। সময় ভিন্ন; হিসেব এক।

Thursday, 21 June 2018

‘এয়ারক্রাফট ফেরি’ আসলে কি জিনিস?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিশ্বব্যাপী এক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছিল, যার মাধ্যমে ফ্যাক্টরি থেকে যুদ্ধবিমান উড়িয়ে যুদ্ধক্ষেত্র পর্যন্ত নেয়া হয়। এই নেটওয়ার্ক সমুদ্রপথের বিপদগুলিকে এড়িয়ে চলে এবং একইসাথে দ্রুততম সময়ের মাঝে যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক সরঞ্জাম পৌঁছে দেয়।

২১শে জুন ২০১৮


বিশ্বযুদ্ধে বিশ্বব্যাপী যুদ্ধবিমান পরিবহন


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। উত্তর আমেরিকার বিমান কারখানাগুলি থেকে ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা এবং এশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রগুলি পর্যন্ত বিমানগুলি কিভাবে নেয়া হবে? জার্মান সাবমেরিন, যুদ্ধজাহাজ এবং লং-রেঞ্জ ম্যারিটাইম বোমারু বিমানগুলি ব্রিটেনকে অবরোধ দিয়ে রেখেছে। যেকোন জাহাজ ব্রিটেনের কাছে ঘেঁষতে গেলেই ডুবিয়ে দিচ্ছে জার্মানরা। এমতাবস্থায় যুদ্ধবিমানের মতো সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ পণ্য কি জাহাজে পরিবহণ ঠিক হবে? এই চিন্তা থেকেই যুদ্ধবিমানগুলিকে উত্তর আমেরিকা থেকে উড়িয়ে ইউরোপ, আফ্রিকা এবং এশিয়া পর্যন্ত আনার ব্যবস্থা করা হয়। একটি রুট ছিল কানাডা-গ্রিনল্যান্ড-আইসল্যান্ড-স্কটল্যান্ড, যার মাধ্যমে বিমানগুলিকে ব্রিটেনে পাঠানো হতো। আরেকটা ছিল মার্কিন পশ্চিম উপকূল থেকে হাওয়াই দ্বীপ হয়ে প্যাসিফিকের আরও কিছু দ্বীপ হয়ে নিউজিল্যান্ড-আস্ট্রেলিয়া, যা কিনা সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের যুদ্ধে ব্যবহার হয়েছে। আরও দু’টা রুট ছিল আফ্রিকা হয়ে, যা কিনা উত্তর আফ্রিকা এবং এশিয়ার যুদ্ধের জন্যে। আরও দু’টা রুট ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্যে। এর একটা ছিল আলাস্কা থেকে বেরিং প্রণালি পার হয়ে সাইবেরিয়া হয়ে মস্কো। আরেকটা ছিল মধ্যপ্রাচ্য-ইরান হয়ে ককেশাস দিয়ে বাকু-স্টালিনগ্রাদ। আফ্রিকা পর্যন্ত যেতে আটলান্টিক পাড়ি দেয়া হতো দু’টা রুটে, যার একটা ১৯৪১ থেকেই চালু হয়েছিল। এই রুটটা যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ হয়ে ব্রাজিল হয়ে দক্ষিণ আটলান্টিক পাড়ি দেয়। আটলান্টিক পাড়ি দিতে এসেনশন দ্বীপ হয়ে লাইবেরিয়ায় নামতো বিমানগুলি। সেখান থেকে আফ্রিকার মাঝ দিয়ে অনেকগুলি বিমান ঘাঁটি হয়ে উত্তর আফ্রিকা, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ভারত এবং চীনে যেত বিমানগুলি।
    

দক্ষিণ আটলান্টিকের এয়ার রুটখানা ব্রাজিল এবং পশ্চিম আফ্রিকার মাঝে যোগাযোগ স্থাপন করে। ব্রাজিল যুদ্ধে প্রথমদিকে নিরপেক্ষা থাকলেও যুদ্ধে যোগদানের আগেই যুক্তরাষ্ট্রের চাপে পড়ে নিজ দেশের মাটিতে মার্কিন সামরিক বিমান ঘাঁটি মেনে নেয়। যুদ্ধের শুরুতে মার্কিন সেনাবাহিনীর দক্ষ লোকের ব্যাপক অভাব থাকায় প্রাইভেট কোম্পানি 'প্যান আমেরিকান' ব্রাজিল এবং আফ্রিকায় বিমানবন্দর তৈরি করা ছাড়াও বিমান 'ফেরি' করার এই নেটওয়ার্ক ম্যানেজ করে।



ফ্লোরিডা থেকে ব্রাজিল

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে বিমানগুলির আসল যাত্রা শুরু হতো। ফ্লোরিডা থেকে ব্রাজিল পর্যন্ত দূরত্ব বিশাল। সেসময়ের বেশিরভাগ বিমানের পক্ষে অতদূর উড়ে যাওয়া কঠিন ছিল। অতটা দূর কভার করার লক্ষ্যে মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবিয় দ্বীপপুঞ্জে বেশকিছু বিমান ঘাঁটি তৈরি করা হয়। পুয়ের্তো রিকো, এন্টিগা, ত্রিনিদাদ এবং ব্রিটিশ গায়ানাতে (বর্তমানে গায়ানা) চারটা বিমান ঘাঁটি তৈরি করে মার্কিনীরা। এর মধ্যে প্রথমটি ছাড়া বাকি তিনটি ১৯৪০ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে ১৯১৭-১৯২২ সালের মাঝে তৈরি ৫০টি পুরোনো ডেস্ট্রয়ার দেবার বদলে পায় আমেরিকানরা। ফ্লোরিডা থেকে পুয়ের্তো রিকোর দূরত্ব ১,৫৭১ কিঃমিঃ; পুয়ের্তো রিকো এন্টিগা থেকে ৫৮৪ কিঃমিঃ দূরে। ত্রিনিদাদ পুয়ের্তো রিকো থেকে ১,০৮৫ কিঃমিঃ দূরে; আর ব্রিটিশ গায়ানা ১,৬৪৩ কিঃমিঃ দূরে। অর্থাৎ মোটামুটিভাবে ১ হাজার থেকে ১,৬০০ কিঃমিঃ দূরত্বের ভেতরে একটি করে বিমান ঘাঁটি তৈরি করা হয়েছিল। বিমানগুলি একটা ঘাঁটি থেকে অন্য ঘাঁটিতে ব্যাঙএর মতো লাফিয়ে লাফিয়ে চলতো; তেল ফুড়িয়ে গেলে তেল নিতো; পাইলট বদল করতো; কোন মেইনটেন্যান্স ইস্যু তৈরি হলে সেগুলি সমাধান করে নিতো।

ব্রাজিল যেকারণে যুদ্ধে যেতে বাধ্য হলো

উপরে উল্লিখিত ঘাঁটিগুলি মার্কিন এবং ব্রিটিশ উপনিবেশে অবস্থিত ছিল। কিন্তু ব্রাজিল তো সেসময় স্বাধীন দেশ। ব্রাজিল যুদ্ধে কোন পক্ষে থাকবে, তা নিয়ে প্রচুর বাদানুবাদ হয়েছিল খোদ ব্রাজিলেই। শেষ পর্যন্ত ১৯৪২ সালের ২২শে অগাস্ট মার্কিন-ব্রিটিশ চাপের মুখে ব্রাজিল জার্মানি-ইতালির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু যুদ্ধ ঘোষণা করার আগেই ১৯৪১ সালের মাঝে উত্তর ব্রাজিলে মার্কিনীরা ৫টি সামরিক বিমান ঘাঁটি তৈরি করে ফেলে। এই কাজটা মূলতঃ সম্পাদন করে মার্কিন প্রাইভেট বিমান কোম্পানি ‘প্যান আমেরিকান’ বা ‘প্যাম-এম’। প্যান-এম-এর ব্রাজিলিয়ান সাবসিডিয়ারি কোম্পানি ‘প্যানএয়ার দো ব্রাজিল’ মার্কিন সরকারের ১৯৪০ সালের ‘এয়ারপোর্ট ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম বা এডিপি’-এর অধীনে এই ঘাঁটিগুলি তৈরি করে অপারেট করে। সেসময় যুদ্ধে মার্কিন সেনাবাহিনী জনবল দিতে হিমশিম খাচ্ছিলো; তাই তাদের পক্ষে এই প্রোগ্রামে জনবল দেয়া একেবারেই সম্ভব ছিল না। তাই প্রাইভেট কোম্পানি এই কাজগুলি সম্পাদন করে রাষ্ট্রীয় সংস্থার কাজ করে। আমাপা, বেলেম, সাও লুইস, ফোর্তালেজা, নাতাল, রেসিফ এবং ফার্নান্দো দে নোরোনিয়া দ্বীপে ১৯৪১ থেকে ১৯৪৪-এর ভেতরে মোট ৭টি ঘাঁটি তৈরি করা হয় এয়ারক্রাফট ফেরি করার লক্ষ্যে।
 
 

১৯৪৩ সাল। ব্রাজিলের বেলেম-এ Val de Cans বিমান ঘাঁটিতে রিফুয়েলিং করার জন্যে সাজিয়ে রাখা হয়েছে বি-২৫ এবং বি-২৪ বোমারু বিমান। বিমানগুলি ফুয়েল নিয়ে আরও দক্ষিণে ব্রাজিলের অন্য ঘাঁটিগুলিতে যাবে; তারপর এসেনশন দ্বীপ হয়ে এগুলি আফ্রিকার পথে পাড়ি জমাবে। ব্রাজিলের এই সহায়তা না পেলে ব্রিটিশদের উত্তর আফ্রিকায় জেনারেল রমেলকে হারানো আরও কঠিন হতো।


আফ্রিকা মহাদেশ পাড়ি

আফ্রিকার ফরাসি উপনিবেশগুলি ব্রিটেনের পক্ষে যাবে কিনা, তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আফ্রিকার বিটিশ উপনিবেশগুলিকেই মূলত ব্যবহার করা হয়েছিল বিমান পরিবহণের জন্যে। লাইবেরিয়া, সিয়েরা লিওন, ঘানা, নাইজেরিয়া, সুদান হয়ে বিমানগুলি মিশরে পৌঁছাতো। ব্রাজিলের উপকূল থেকে লাইবেরিয়ার দূরত্ব ৩,০৭৯ কিঃমিঃ। এ-দুয়ের মাঝে ছিল এসেনশন দ্বীপ, যা ব্রাজিলের উপকূল থেকে ২,২৬১ কিঃমিঃ দূরত্বে। সিঙ্গেল ইঞ্জিন ফাইটার এবং দুই ইঞ্জিনের বিমানগুলি এসেনশন দ্বীপ হয়ে আটলান্টিক পাড়ি দিত। লাইবেরিয়া থেকে ঘানা আক্রা ১,১৩০ কিঃমিঃ; ঘানার আক্রা থেকে নাইজেরিয়ার কানো ১,২৪২ কিঃমিঃ এবং মাইদুগুরি ১,৬১৩ কিঃমিঃ। সুদানের তিনটি ঘাঁটি নাইজেরিয়ার কানো থেকে ১,৫০০-২,৬০০ কিঃমিঃ দূরত্বে। সুদান থেকে ইথিওপিয়া, মিশর, জেদ্দা, ইয়েমেন যেতো বিমানগুলি। এসব ঘাঁটি থেকে প্যালেস্টাইন, ইরাক, ইরান, বাহরাইন, ওমান, করাচি হয়ে ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চীন যেতো বিমান। করাচি থেকে দিল্লী, আগ্রা, কোলকাতা হয়ে আসাম, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম যেতো বার্মা ফ্রন্টের যুদ্ধে যোগদানের জন্যে। আর আসাম থেকে অরুণাচল হয়ে চীনের কুনমিং যেতো চীন ফ্রন্টে যুদ্ধ করার জন্যে।
 

তাকোরাদি এয়ার রুট বলে পরিচিত এই রুটটা আফ্রিকার মাঝ দিয়ে কয়েক হাজার মাইল গিয়েছিল। এই নেটওয়ার্ক জিইয়ে রাখা বেশ কষ্টসাধ্য কাজ ছিল। সবগুলি ঘাঁটিতে রিফুয়েলিং, মেইনটেন্যান্স ছাড়াও পাইলটদের থাকার ব্যবস্থা করতে হয়েছিল।
 

আকাশে বিমান পরিবহনই আসলে বিমান ফেরি

এভাবে একস্থান থেকে অন্যস্থানে বিমান পাঠানোর পদ্ধতিকেই ‘ফেরি’ বলা হয়। প্রতিটা যুদ্ধবিমানের স্পেসিফিকেশনের মাঝে একটা প্যারামিটার থাকে ‘ফেরি রেঞ্জ’। এর অর্থ হলো অবতরণ না করে একটা বিমান কতদূর যেতে পারে। ফেরি করার সময় বিমানগুলিকে সর্বোচ্চ পরিমাণ তেল ভর্তি করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যবহার করা ফাইটার বিমানগুলির চাইতে এখনকার ফাইটার বিমানগুলির ফেরি রেঞ্জ অনেক বেশি। রেঞ্জ বাড়ানোর লক্ষ্যে অতিরিক্ত ফুয়েল ট্যাঙ্ক ব্যবহার করা হতো বিশ্বযুদ্ধের সময়; যা এখনও করা হয়। আর এখন রেঞ্জ বাড়াতে এয়ার-টু-এয়ার রিফুয়েলিং করা হয়। তবে মূল ব্যাপারটা একই রয়েছে; আর তা হলো – ফ্যাক্টরি থেকে বিমানগুলি যুদ্ধক্ষেত্র পর্যন্ত কিভাবে পৌঁছাবে। যেসব স্থান দিয়ে উড়বে বিমানগুলি, সেসব স্থান নিজেদের অনুকূলে হতে হবে, অর্থাৎ সেসব স্থানে নিজেদের বন্ধু থাকতে হবে। বিভিন্ন স্থানে বিমানবন্দরগুলিতে নিজেদের বিমান ওঠা-নামার ব্যবস্থা থাকতে হবে। বিশ্বযুদ্ধের সময়ে হাজার হাজার বিমান ফেরি করতে হয়েছিল। আর তাই ফেরি রুটগুলিতে স্থাপিত ঘাঁটিগুলিতে পাইলটের স্কোয়াড্রন রাখা হতো। বিমান ল্যান্ডিং-এর পরে পাইলট পরিবর্তন হয়ে আরেক স্কোয়াড্রন বুঝে নিতো বিমান। তারাই পরের ঘাঁটি পর্যন্ত উড়িয়ে নিয়ে যেত; আর সেখান থেকে পরিবহণ বিমানে করে পাইলটরা নিজেদের ঘাঁটিতে ফেরত আসতো। এভাবে প্রতি ঘাঁটিতে পাইলটদের থাকার ব্যবস্থা ছাড়াও তেল ভরা এবং অন্যান্য সার্ভিসিং-এর ব্যবস্থা রাখা হতো। এই ঘাঁটিগুলিতে তেল সরবরাহ করাটা আবার আরেক লজিস্টিক্যাল চ্যালেঞ্জ। সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বপূর্বে সাইবেরিয়ার ঘাঁটিগুলিতে তেল সরবরাহ ছিল বিরাট চ্যালেঞ্জ; বিশেষ করে শীতকালে, যখন সমুদ্র বরফে ছেয়ে যেতো। পুরো রুটে এয়ার ট্রাফিল কন্ট্রোল এবং কমিউনিকেশন স্থাপনও ছিল জরুরি।



ব্রাজিলের মাটিতে বিমান ঘাঁটি তৈরি করা হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। ব্রাজিল ছিল মিত্রবাহিনীর যুদ্ধবিমানের সাপ্লাই চেইন-এর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটা শক্তিশালী রাষ্ট্র তার কৌশলগত সরঞ্জামের সাপ্লাই চেইন ম্যানেজ করা জানে। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাটেরিয়ালের সাপ্লাই নিশ্চিত করতে এই পুরো সাপ্লাই চেইন-এরই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ফ্যাক্টরি থেকে শুরু করে ওভারফ্লাইট, বেইসিং রাইটস, রিফুয়েলিং ফ্যাসিলিটি, মেইনটেন্যান্সসহ এই পুরো নেটওয়ার্ক নিজেদের পক্ষে থাকতে হবে। নাহলে দামি দামি খেলনাগুলি শোকেসে স্থান পাবে; কাজে লাগবে না।


যুদ্ধবিমানের সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট

বিমান ফেরি করাটা এক ধরনের সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট। একটা শক্তিশালী রাষ্ট্র তার কৌশলগত সরঞ্জামের সাপ্লাই চেইন ম্যানেজ করা জানে। তার সাপ্লাই চেইন অন্য শক্তির হাতে জিম্মি থাকলে সে কখনোই শক্তিশালী হতে পারে না। রাষ্ট্রের জনগণকে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাটেরিয়াল আনা-নেওয়ার সাপ্লাই চেইন ম্যানেজ করা শিখতে হবে। জানতে হবে কোথা থেকে ম্যাটেরিয়াল আসছে; কে পৌঁছে দিচ্ছে; কিভাবে পৌঁছে দিচ্ছে; কোন রুটে সেগুলি আসছে; কোন এলাকার উপর দিয়ে উড়ে আসছে সেগুলি; কোথায় অবতরণ করছে; কোথায় রিফুয়েলিং করছে; কোথায় সার্ভিসিং করছে। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাটেরিয়ালের সাপ্লাই নিশ্চিত করতে এই পুরো সাপ্লাই চেইন-এরই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ফ্যাক্টরি থেকে শুরু করে ওভারফ্লাইট, বেইসিং রাইটস, রিফুয়েলিং ফ্যাসিলিটি, মেইনটেন্যান্সসহ এই পুরো নেটওয়ার্ক নিজেদের পক্ষে থাকতে হবে। নাহলে দামি দামি খেলনাগুলি শোকেসে স্থান পাবে; কাজে লাগবে না।