Wednesday, 26 January 2022

ইউক্রেন নিয়ে যুদ্ধ কি অবশ্যম্ভাবী?

২৬শে জানুয়ারি ২০২২

জানুয়ারি ২০২২। ২০১৪ সালে দখল করা ক্রিমিয়ায় রুশ সৈন্য। ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনকে পশ্চিমা দেশগুলি থেকে দূরে রাখতেই হুমকি দিচ্ছেন, ইউক্রেনকে দখল করতে নয়; কারণ পশ্চিমা ঘেঁষা ইউক্রেনই রাশিয়ার জন্যে হুমকি।

 
ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর প্রতিমন্ত্রী জেইমস হিপ্পে ২৫শে জানুয়ারি ‘দ্যা সান’ পত্রিকার এক লেখায় বলেন যে, ব্রিটিশ সরকারের কাছে ইন্টেলিজেন্স রয়েছে যে, রুশ সামরিক বাহিনীর সাথে যুক্ত বহু ব্যক্তি এই মুহুর্তে ইউক্রেনের ভেতরে অবস্থান করছে। এর আগে ২২শে জানুয়ারি ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিজ ট্রাস বলেন যে, ক্রেমলিন ইউক্রেনে একটা রুশ সমর্থিত সরকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যেই ইউক্রেনের উপর রুশ হামলার আশংকায় পশ্চিমা দেশগুলি ইউক্রেনকে প্রচুর অস্ত্র সরবরাহ করছে। এই অস্ত্রের মাঝে রয়েছে ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, গ্রেনেড লঞ্চার, মেশিন গান, গোলাবারুদ, ইত্যাদি। এগুলি রুশ সামরিক আগ্রাসন থামাতে না পারলেও রাশিয়ার জন্যে সামরিক অপারেশনকে আরও কঠিন করে ফেলবে। রুশ হুমকির প্রত্যুত্তরে ন্যাটো সদস্যদেশগুলি বল্টিক রাষ্ট্র লিথুয়ানিয়া এবং পূর্ব ইউরোপের দেশ বুলগেরিয়াতে যুদ্ধবিমান মোতায়েন ছাড়াও রোমানিয়াতে সৈন্য বৃদ্ধি এবং কৃষ্ণ সাগরে যুদ্ধজাহাজ প্রেরণ করছে। তবে রাশিয়াও তার সামরিক কর্মকান্ড বৃদ্ধি করে চলেছে। ইউক্রেনের পূর্ব সীমানায় ১ লক্ষ সেনা মোতায়েন ছাড়াও উত্তরের সীমানায় বেলারুশের সাথে যৌথ মহড়ার ঘোষণা দিয়েছে রাশিয়া। ইউক্রেনে সাইবার হামলার জন্যেও রুশদেরকে দায়ী করা হচ্ছে। যুদ্ধের শংকায় ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ থেকে মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের পরিবারবর্গকে সরিয়ে নেবার আদেশ দেয়া হয়েছে।

ইউক্রেন ইস্যুকে যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া কে কিভাবে দেখছে?

মার্কিন মিডিয়া ‘সিবিএস’এর সাথে এক সাক্ষাতে মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব এন্টনি ব্লিংকেন বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র প্রথম থেকেই বলে আসছে যে, যদি রাশিয়া ইউক্রেনে আগ্রাসান চালায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ একত্রে দ্রুত এবং মারাত্মক প্রত্যুত্তর দেবে। তিনি আরও বলেন যে, ইউক্রেন বা অন্য কোন দেশে সেনা না পাঠিয়ে রাশিয়া যদি ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’, সাইবার হামলা বা সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা করে, তাহলেও তিনি আত্মবিশ্বাসী যে ইউরোপিয় মিত্রদেরকে একত্রিত করে দ্রুত প্রত্ত্যুত্তর দেবেন তারা। তবে এই প্রত্যুত্তরের মাঝে মার্কিন সেনা মোতায়েন থাকবে কিনা, সেব্যাপারে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। ব্লিংকেন অর্থনৈতিক অবরোধ ছাড়াও ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেয়া এবং ন্যাটোর পূর্ব সীমান্তে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করার কথা বলেন। তিনি ‘সিএনএন’কে বলেন যে, ন্যাটো বাস্তবসম্মত এবং গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেবে; যার মাঝে সামরিক অপশনও থাকবে।

ইউক্রেনে রাশিয়ার কি স্বার্থ রয়েছে? রাশিয়ার কাছে ইউক্রেনের গুরুত্বই বা কতটুকু? যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ভার্চুয়াল টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘ম্যাককুইস্টিয়ন টিভি’র সাথে এক সাক্ষাতে ভূরাজনৈতিক চিন্তাবিদ জর্জ ফ্রীডম্যান বলছেন যে, সপ্তদশ শতাব্দীর পর থেকে পশ্চিম থেকে রাশিয়া চারবার আক্রমণের শিকার হয়েছে; দক্ষিণ থেকে আক্রমণ হয়েছে দু’বার। রাশিয়ার অস্তিত্ব নির্ভর করছে এই সীমানাগুলির উপর। এই সীমানাগুলিকে শক্তিশালী করতে রাশিয়া পশ্চিমে পোল্যান্ড ও বেলারুশের সমতলভূমি, আর দক্ষিণে ককেশাস এলাকা নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছে। কিন্তু রাশিয়ার নিরাপত্তার একেবারে কেন্দ্রে রয়েছে মূলতঃ ইউক্রেন। ইউক্রেন যদি পশ্চিমা ঘেঁষা না হতো, তাহলে রাশিয়ার কোন সমস্যা ছিল না। ২০১৪ সাল থেকে রাশিয়া এব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছিলোনা বলেই তারা ইউক্রেনে জড়িয়েছে।

 
সপ্তদশ শতাব্দীর পর থেকে পশ্চিম থেকে রাশিয়া চারবার আক্রমণের শিকার হয়েছে; দক্ষিণ থেকে আক্রমণ হয়েছে দু’বার। রাশিয়ার অস্তিত্ব নির্ভর করছে এই সীমানাগুলির উপর। এই সীমানাগুলিকে শক্তিশালী করতে রাশিয়া পশ্চিমে পোল্যান্ড ও বেলারুশের সমতলভূমি, আর দক্ষিণে ককেশাস এলাকা নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছে। কিন্তু রাশিয়ার নিরাপত্তার একেবারে কেন্দ্রে রয়েছে মূলতঃ ইউক্রেন। ইউক্রেন যদি পশ্চিমা ঘেঁষা না হতো, তাহলে রাশিয়ার কোন সমস্যা ছিল না। ২০১৪ সাল থেকে রাশিয়া এব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছিলোনা বলেই তারা ইউক্রেনে জড়িয়েছে।

কে কি করতে পারে?

মার্কিন থিংকট্যাংক ‘ইউরেশিয়া গ্রুপ’এর প্রেসিডেন্ট ইয়ান ব্রেমার বলছেন যে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন খুব সম্ভবতঃ তার কমান্ডারদের কাছ থেকে ইউক্রেনে হামলার পরিকল্পনা চেয়েছেন। তবে এর মানে এই নয় যে, তিনি হামলা করবেন। তিনি তার অপশনগুলি খোলা রাখতে চাইছেন। তবে কূটনৈতিক দিক থেকে সফলতা না আসলে হয়তো উত্তেজনা আরও বাড়বে। তিনি বলছেন যে, তিনি মনে করতে পারেন না যে, সাম্প্রতিক সময়ে কবে কোন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে মার্কিন রাজনীতিবিদেরা এতটা একমত হতে পেরেছিল। রুশ দাবিগুলি মার্কিন রাজনৈতিক মতামতকে একত্রিত করেছে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, মার্কিন নীতি সফল হবে। কারণ ইউক্রেনের ব্যাপারে রাশিয়া যতটা চিন্তিত, মার্কিনীরা ততটা চিন্তিত নয়। ইউরোপের উপর রাশিয়ার অর্থনৈতিক প্রভাব যতটা রয়েছে, তার কিছুই যুক্তরাষ্ট্রের উপর নেই। এর ফলশ্রুতিতে ইউক্রেনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে খুব কম বাধাই রয়েছে। তবে সারা বিশ্বের ‘পুলিশম্যান’ থাকার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র যে অনীহা দেখিয়েছে, তাতে মার্কিনীদের নেতৃত্বে রাশিয়ার বিরুদ্ধে একটা কোয়ালিশন তৈরি করা কঠিন হবে। তিনি পরিষ্কার করে দেন যে, যদিও অনেকেই সোশাল মিডিয়াতে ‘স্ট্যান্ড উইথ ইউক্রেন’ হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করছে, তথাপি এটা মনে করার কোন কারণ নেই যে, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে রক্ষা করতে যুদ্ধ করবে। যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র দেশগুলি ইউক্রেনকে অস্ত্র দিয়ে সহায়তা দিতে পারে, কিন্তু সরাসরি ইউক্রেনকে সহায়তা দেয়ার কোন সম্ভাবনাই নেই। ইউক্রেনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র আর রাশিয়ার যুদ্ধ, বা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হবার কোন সম্ভাবনা নেই বলে তিনি বলেন।

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘জিওপলিটিক্যাল ফিউচার্স’এর এক লেখায় জর্জ ফ্রীডম্যান বলছেন যে, রাশিয়া ইউক্রেনের উপর সামরিক হামলার প্রস্তুতি নিয়েও হামলা না করে বরং আলোচনা করতে চাইছে। রাশিয়া দাবি করছে যে, ন্যাটো ইউক্রেনকে যেন কখনোই সদস্য হিসেবে গ্রহণ না করে; এবং ন্যাটো যেন রাশিয়ার সীমানায় অস্ত্র মোতায়েন নিয়ন্ত্রণ করে। রাশিয়া এমন একটা দাবি করেছে, যা তারা খুব ভালো করেই জানে যে, যুক্তরাষ্ট্র সেব্যাপারে কিছুতেই রাজি হবে না। কারণ এতে করে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরিভাবে তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে। চাপের মুখে রাশিয়ার কাছে নতি স্বীকার করাটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে একেবারেই সমীচিন নয়। ফলাফল হিসেবে এর প্রভাব পড়বে বিশ্বব্যাপী। অভ্যন্তরীণভাবেও তা যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করবে, যা কিনা মার্কিন সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। সামরিক মিশনের প্রস্তুতি নিয়ে বসে থাকার মানে হয় না। কারণ প্রতি মুহুর্তে ন্যাটো ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দিচ্ছে; এবং রাশিয়ার জন্যে মিশনটা প্রতি মুহুর্তে কঠিনতর হচ্ছে। তাহলে রাশিয়া কি পুরো কাজটাই করছে তথ্যযুদ্ধ হিসেবে? কিন্তু সমস্যা হলো, আরেকটা দেশে সামরিক হামলা করলে জনমত নিজের পক্ষে নিয়ে আসাটা বেশ কঠিন। হামলা করার সবচাইতে ভালো সময়টাতে হামলা না করে বসে থেকে হামলার হুমকি দেয়ার অর্থ হলো, রাশিয়া আসলে ইউক্রেনে হামলা করতে চায় না। যুদ্ধ করার নিয়ম হলো, সর্বোচ্চ সুবিধাজনক পর্যায়ে হামলা করা; এবং শত্রুকে কোন সুবিধা না দেয়া। আর কূটনীতির নিয়ম হলো, সমঝোতায় পৌঁছাবার আগে যথেষ্ট হুমকি দেয়া।

 
নভেম্বর ২০২১। ইউক্রেনের বিমানবন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদ। যদিও অনেকেই সোশাল মিডিয়াতে ‘স্ট্যান্ড উইথ ইউক্রেন’ হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করছে, তথাপি এটা মনে করার কোন কারণ নেই যে, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে রক্ষা করতে যুদ্ধ করবে। যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র দেশগুলি ইউক্রেনকে অস্ত্র দিয়ে সহায়তা দিতে পারে, কিন্তু সরাসরি ইউক্রেনকে সহায়তা দেয়ার কোন সম্ভাবনাই নেই। ইউক্রেনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র আর রাশিয়ার যুদ্ধ, বা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হবার কোন সম্ভাবনা নেই। 

ইউক্রেনের ব্যাপারে ইউরোপের অনৈক্য

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন, জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শোলজ এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর সাথে কথা বলার পর ২৫শে জানুয়ারি পার্লামেন্ট সদস্যদেরকে বলেন যে, ইউরোপের কিছু দেশ রাশিয়ার গ্যাসের উপর প্রচন্ডভাবে নির্ভরশীল হবার কারণে রাশিয়ার উপর মারাত্মক কোন অর্থনৈতিক অবরোধের ব্যাপারে চিন্তিত। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, জনসন মূলতঃ জার্মানিকেই বোঝাচ্ছিলেন। তিনি আরও বলেন যে, তাদের এখন কাজ হলো চিন্তিত রাষ্ট্রগুলিকে বুঝিয়ে যতদূর সম্ভব নিয়ে যাওয়া; যাতে করে রাশিয়ার উপর একটা শক্ত অর্থনৈতিক অবরোধ দেয়া যায়। জনসন বলেন যে, রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক আন্ত ব্যাংকিংএর মানি ট্রান্সফার ব্যবস্থা ‘সুইফট’ থেকে বের করে দেয়া যায় কিনা, সেব্যাপারে মিত্র দেশগুলির মাঝে কথা হলেও সেটা যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি ছাড়া সম্ভব নয়। আর এব্যাপারে জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবক ইতোমধ্যেই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। জনসন বলেন যে, কিছু গুরুত্বপূর্ণ রুশ ব্যক্তিত্ব এবং কোম্পানির উপরেই মূলতঃ অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা হবে। একইসাথে তিনি বলেন যে, রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা করলে ব্রিটেন পূর্ব ইউরোপে তার সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতে পারে। ‘নিউজউইক’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, জার্মানি ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দিতে চাইছে না। তাদের কথা বলা হলো, এটা ইউক্রেনের জন্যে সহায়ক হবে না। বার্লিন এর বদলে ইউক্রেনকে মেডিক্যাল সহায়তা দিতে চাইছে। ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিমিত্রো কুলেবা এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, জার্মানির অবস্থান ঐক্যের বিরুদ্ধে এবং এতে পুতিন ইউক্রেনে নতুন করে হামলা করতে আগ্রহী হবেন। কিন্তু ব্লিংকেন ‘এনবিসি’কে বলেন যে, জার্মান চ্যান্সেলর এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে কথা বলে তিনি নিশ্চিত হয়েছেন যে, জার্মানি যুক্তরাষ্ট্রের দুশ্চিন্তার সাথে একমত এবং দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার ব্যাপারেও যে তারা একমত, সেব্যাপারেও তার কোন সন্দেহ নেই।

তবে ফ্রীডম্যান বলছেন যে, ইউরোপ রাশিয়ার ব্যাপারে একমত নয়। ইউরোপিয়রা শত শত বছর ধরে শুধু যুদ্ধই করেছে। এখনও সেই প্রতিদ্বন্দ্বিত বিদ্যমান। জার্মানি চাইছে রাশিয়ার অর্থনৈতিক পশ্চাতগামীতাকে নিজের পক্ষে কাজে লাগাতে। অপরদিকে পোল্যান্ড মনে করছে যে, তারা ১৯৩৯ সালে দেখেছে যে কিভাবে জার্মানি এবং রাশিয়া পোল্যান্ডকে ভাগাভাগি করে নিয়েছিল। ফ্রান্স আবার মনে করছে এই সুযোগে জার্মানিকে সরিয়ে দিয়ে ইউরোপকে নিজেদের প্রভাবে নিয়ে আসা যায় কিনা। ইউরোপ এবং ন্যাটোর দেশগুলির মাঝে দ্বন্দ্বের সুযোগটাই রাশিয়া নিতে চাইছে। তবে এই মুহুর্তে দুনিয়ার অপর প্রান্তে চীন নিজের অভ্যন্তরীণ ইস্যুগুলি নিয়ে ব্যস্ত থাকায় রাশিয়ার দিকে সকলের চোখ যাচ্ছে।

ইউক্রেন ইস্যুতে চীনের অবস্থানের একটা গুরুত্ব রয়েছে। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ফরেন পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউট’এর ডিরেক্টর ক্রিস মিলার এক লেখায় বলছেন যে, বিভিন্ন সময়ে উত্তর কোরিয়া এবং ইরানের উপর অর্থনৈতিক অবরোধ মান্য করা নিয়ে চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব চলেছে। চীন অনেক ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে অবরোধ মান্য করতে বাধ্য হয়েছে; যা কিনা চীনের দুর্বলতাকেই তুলে ধরে। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া ইস্যুতে পশ্চিমারা রাশিয়ার উপর যে অবরোধ দিয়েছিল, তা খুব একটা কঠোর ছিল না। চীন এবং রাশিয়ার বাণিজ্য সম্পর্কের উপর এই অবরোধের প্রভাব ছিল না বললেই চলে। কিন্তু এবারে যে সেটার ব্যতিক্রম হবে, তা নিশ্চিত। এবারে চীন যদি যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ মেনে নেয়, তাহলে সকলের চোখেই চীনের অর্থনৈতিক শক্তি যথেষ্ট দুর্বল মনে হবে; আর যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক শক্তিও বৃদ্ধি পাবে। এছাড়াও ইরান এবং উত্তর কোরিয়ার চাইতে রাশিয়ার অর্থনীতি অনেক বড়। তাই ঐ দুই দেশের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক কর্তনের জন্যে ক্ষতি খুব কম হলেও রাশিয়ার বেলায় সেটা হবে না। রাশিয়ার উপর অবরোধ চীনের অর্থনীতিকে নিঃসন্দেহে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। একারণেই এবারে চীন যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক কর্তনে রাজি নাও হতে পারে। যদি চীন এই সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তাহলে রাশিয়া তার দুর্যোগের মাঝে অনেক বড় একটা বন্ধু পাবে; আর পশ্চিমাদেরকেও একত্রে দুই ফ্রন্টে আর্থিক যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হবে।

ধোঁকা না সত্যিকারের হুমকি?

ইউক্রেন রাশিয়ার জন্যে অস্তিত্বের প্রশ্ন; অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে এটা বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন। যদিও আফগানিস্তান থেকে পলায়নের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখন আর দুনিয়ার ‘পুলিশম্যান’ থাকতে চাইছে না, তথাপি রাশিয়ার দাবির কাছে নতি স্বীকার করে বাকি বিশ্ব, বিশেষ করে চীনের কাছে একটা উদাহরণ তৈরি করতে চাইছে না যুক্তরাষ্ট্র। ইউরোপের অনৈক্যের কারণে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার বিরুদ্ধে একটা কোয়ালিশন তৈরি করতে হিমসিম খাচ্ছে। তবে রাশিয়ার হামলা বাস্তবতায় রূপ নিলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে ঐকমত্য তৈরি করা অপেক্ষাকৃত সহজ হবে। ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনকে পশ্চিমা দেশগুলি থেকে দূরে রাখতেই হুমকি দিচ্ছেন, ইউক্রেনকে দখল করতে নয়; কারণ পশ্চিমা ঘেঁষা ইউক্রেনই রাশিয়ার জন্যে হুমকি। পুতিন হয়তো তার হুমকিকে শক্ত ভিত দিতেই সামরিক পরিকল্পনার ব্যাপারে যত্নবান হয়েছেন; যাতে তার আগ্রাসী ইচ্ছাটাই পশ্চিমাদের চোখে ভেসে ওঠে। কিন্তু তার দাবিকে যুক্তরাষ্ট্র যখন অবাস্তব মনে করছে, তখন পুতিন কি বাধ্য হবেন সামরিক মিশনে যেতে? তাতে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র কিছু না হারালেও রাশিয়া যথেষ্টই ক্ষতির মুখে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্র চীনকেও রাশিয়ার কাছ থেকে দূরে রাখতে চেষ্টা করবে; যদিও এবারে চীন রাশিয়ার উপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ নাও মানতে পারে। প্রকৃতপক্ষে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়াকে সামরিক মিশনে যেতে বাধ্য করতে পারলে তা হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে অনেক বড় কৌশলগত বিজয়; যা কিনা তার আফগানিস্তানে দুই দশকের ব্যর্থতাকে ভুলতে কিছুটা হলেও সহায়তা করবে।

Sunday, 23 January 2022

‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ কি একটা দিবাস্বপ্ন?

২৩শে জানুয়ারি ২০২২

পশ্চিমা আদর্শের অধঃপতনের ফলস্বরূপ ব্রিটেনের নাগরিকেরা যখন নিজেদের স্বাধীনতাকে ধরে রাখতে সামরিক বাহিনীতে যেতে ইচ্ছুক নয়, তখন সামরিক বাহিনী আকারে ছোট হতে থাকলেও প্রযুক্তির কারণে তার সক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে থাকবে, এহেন বক্তব্য হয়তো সেই চিন্তাটার অবাস্তবতাকে ঢেকে রাখার জন্যেই। ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর বিশ্ব নিয়ন্ত্রণের চিন্তাটাও সেই আঙ্গিকে দিবাস্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয়।

 
ব্রিটেনের বৈশ্বিক ইন্টেলিজেন্স সংস্থা ‘এমএই ৬’এর নতুন প্রধান অনেকটা নিয়ম ভেঙ্গেই জনসন্মুখে এসে কথা বলছেন। ২০২১এর ডিসেম্বরে সংস্থার প্রধান রিচার্ড মুর ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ বা ‘আইআইএসএস’এর এক অনুষ্ঠানে পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্সের ভূমিকা নিয়ে এক বক্তব্য রাখেন। তার বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন যে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এখন ঠিকমতো কাজ করছে না এবং বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বীরা আগের চাইতে বেশি আত্মবিশ্বাসী; তারা কম বাধার সন্মুখীন হচ্ছে; এবং তারা আগের চাইতে বেশি সম্পদ কাজে লাগাতে পারছে। একারণেই তারা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার দুর্বলতাগুলিকে কাজে লাগাচ্ছে। তিনি রাশিয়া, চীন, ইরান এবং সন্ত্রাসবাদকে তাদের বড় ফোকাস বলে উল্লেখ করেন। একইসাথে জলবায়ু পরিবর্তন এবং মহামারির মতো বৈশ্বিক সমস্যাও রয়েছে। তিনি চীনের প্রভাব বিস্তারকে ‘এমআই ৬’এর সবচাইতে বড় প্রাধান্য হিসেবে আখ্যা দিলেও চীনের সাথে বৈশ্বিক ইস্যু এবং বাণিজ্যের ব্যাপারে সহযোগিতার কথা বলেন। কারণ চীনের কর্মকান্ড এবং নীতি অনেক ক্ষেত্রেই ব্রিটেনের নিরাপত্তা এবং অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে। তিনি আন্তর্জাতিক আইন লংঘন করে, রাশিয়ার কর্মকান্ডকে, বিশেষ করে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে আগ্রাসনকে প্রতিহত করার জন্যে সকলকে আহ্বান জানান। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে সিরিয়া, লেবানন এবং ইরাকে ইরানের প্রভাব বিস্তারের কথা উল্লেখ করেন; এবং এর ফলে ব্রিটেন এবং ব্রিটেনের বন্ধু রাষ্ট্রদের প্রতি হুমকিকে মোকাবিলায় সহায়তা দেয়ার কথা বলেন। এছাড়াও আফগানিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকাতে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় ব্রিটেনের কাজ করার কথা বলেন তিনি। প্রতিটা বিষয়েই তিনি নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। মুরের বক্তব্যে এটা পরিষ্কার যে, একুশ শতকে পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় ব্রিটেন একটা বিশ্বশক্তি হিসেবে নিজের নামকে সামনে আনতে চাইছে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্রিটেনের এই ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ চিন্তার বাস্তবায়নে পররাষ্ট্র এবং প্রতিরক্ষা বিষয়ে সমন্বিত নীতিপত্র প্রকাশের পর থেকে ব্রিটেনের লক্ষ্যকে অনেকেই অতি উচ্চাভিলাসী বলে আখ্যা দিচ্ছেন।

‘ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস, অস্টিন’এর প্রতিরক্ষা ম্যাগাজিন ‘ওয়ার অন দ্যা রক্স’এর এক লেখায় ব্রিটেনের ‘ইউনিভার্সিটি অব পোর্টসমাউথ’এর সামরিক বিষয়ের শিক্ষক ক্রিস মরিস বলছেন যে, ব্রিটিশ নেতৃবৃন্দ দেশের সম্পদের অপ্রতুলতাকে বিবেচ্য বিষয় না ধরে বরং বৈশ্বিক বাস্তবতাকে নিজেদের মতো করে উপস্থাপন করছে। ফলশ্রুতিতে ব্রিটেন যা করতে চাইছে, তার জন্যে যথেষ্ট শক্তি সে যোগাড় করতে পারছে না। একারণে ব্রিটেন তার সামরিক শক্তির কিছু অংশকে শক্তিশালী করতে গিয়ে বাকিগুলিকে একেবারেই কমিয়ে ফেলছে। বিশেষ করে বলা হচ্ছে যে, কিছু সামরিক শক্তিকে কমিয়ে ফেলে অর্থ বাঁচিয়ে সেই অর্থ দিয়ে প্রযুক্তিগত দিক থেকে ব্রিটেন সকলের চাইতে এগিয়ে থাকবে। কিন্তু যেটা সকলেই ভুলে যাচ্ছে তা হলো, ব্রিটেনের বন্ধু এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে আরও অনেক বেশি সম্পদ রয়েছে; যেকারণে তারা কেন ব্রিটেনের থেকে প্রযুক্তির দিক দিয়ে পিছিয়ে থাকবে? ব্রিটেনের ছোট করে ফেলা সামরিক বাহিনীকে সামনের দিনগুলিতে আরও ঘনঘন এবং আরও বেশি সময়ের জন্যে বিশ্বব্যাপী মোতায়েন করতে হবে। ব্রিটিশ নৌবাহিনীরও কাগজে কলমে যতটুকু সক্ষমতা রয়েছে, বাজে রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিকল্পনার কারণে সেটাও পুরোপুরিভাবে ব্যবহার করতে পারছে না।

 
ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর রিক্রুটিং বিজ্ঞাপণ, যেখানে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দেয়া হচ্ছে। তবে নাগরিকেরা বলছে যে, অনেক জায়গাতেই আত্মবিশ্বাস পাওয়া যেতে পারে; সেটা সেনাবাহিনীতে নাও হতে পারে। কেউ কেউ বলছেন যে, সেনাবাহিনীতে যোগদানের অর্থ হলো অনেক বড় একটা প্রতিশ্রুতির সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলা; যা অনেকেই করতে ইচ্ছুক নয়। তারা নিজেদের ব্যক্তিস্বাধীনতা ধরে রাখতেই বেশি আগ্রহী।

কাগজে কলমে ব্রিটেনের সামরিক বাজেট বিশ্বের মাঝে চতুর্থ। শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ভারত ব্রিটেনের চাইতে এগিয়ে আছে। করোনা মহামারির আগে ২০১৯ সালেও ৭৮ বিলিয়ন ডলার নিয়ে সৌদি আরব এবং ৬১ বিলিয়ন ডলার নিয়ে রাশিয়া ব্রিটেনের থেকে এগিয়ে ছিল। তখন ব্রিটেনের বাজেট ছিল প্রায় ৫৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু ২০২০ সালে বাজেট বৃদ্ধির ঘোষণা দেয়ার পর ব্রিটেনের সামরিক বাজেট ৬১ বিলিয়ন ডলার পেরিয়ে গেলে এবং রাশিয়ার বাজেট কিছুটা কমানো হলে ব্রিটেন চতুর্থ অবস্থানে চলে আসে। আর সেবছর সৌদি আরব তেলের বাজারে মারাত্মক ধ্বসের কারণে সামরিক বাজেট কমিয়ে ৪৮ বিলিয়ন ডলারে কমিয়ে আনে। ফ্রান্স তার বাজেট ৫২ থেকে ৫৫ বিলিয়নে উন্নীত করলেও তা রাশিয়ার পিছনে ষষ্ঠ অবস্থানে থাকে। ‘আইআইএসএস’এর সিনিয়ন ফেলো অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বেন ব্যারি বলছেন যে, সামরিক বাজেটের র‍্যাংকিংএর কারণে ন্যাটো এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ব্রিটেনের সামরিক শক্তির বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে। তবে এর মাধ্যমে ব্রিটেনের সামরিক শক্তি খুব বেড়ে যাচ্ছে না। এর মাধ্যমে ব্রিটিশ রয়াল এয়ার ফোর্সে নতুন কোন স্কোয়াড্রনও যুক্ত হচ্ছে না। রয়াল নেভির যে আকার পরিকল্পনা করা হতো, সেদিকে নিয়ে যাবার একটা চেষ্টা চলছে। বরিস জনসন যখন বলেছেন যে, ব্রিটিশ রয়াল নেভি হবে ইউরোপের মাঝে সবচাইতে বড়, তখন কথাটা ঠিক। তবে এর মানে এই নয় যে, নৌবাহিনী অনেক বড় হয়ে যাবে। একইসাথে এই বাজেট বৃদ্ধির মানে এই নয় যে, বিশ্বব্যাপী মোতায়েন করার জন্যে ব্রিটেনের সেনা ইউনিটের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।

ব্রিটিশ সামরিক শক্তির সমস্যা বহু প্রকারের। এর মাঝে সবচাইতে বড় সমস্যাগুলির একটা হলো রিক্রুটিং। ব্রিটেনের ‘স্কাই নিউজ’এর প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সর্বশেষ রিক্রুটিং বিজ্ঞাপণে জনগণকে বিজ্ঞাপণ এবং সোশাল মিডিয়াতে হাল্কা লাইফস্টাইল বক্তব্য থেকে সরে আসতে আহ্বান জানানো হচ্ছে; যখন টানা নয় বছর ধরে সেনাবাহিনী ছোট হচ্ছে। রিক্রুটিং সমস্যা বহুদিন ধরেই চলছে। ২০০৬ সালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর একটা গ্রুপ মাউন্ট এভারেস্ট আরোহন করতে গিয়েছিল জনগণকে অনুপ্রাণিত করতে। সেই মিশন সফল হয়নি। যারা সেনাবাহিনীর জন্যে নাম লেখায়, তাদের মাঝে মাত্র ১০ শতাংশ প্রাথমিক প্রশিক্ষণ পর্যন্ত যেতে পারে। এই সমস্যার সমাধান করতে সেনাবাহিনী আগ্রহীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং শারীরিক সক্ষমতাকে সামরিক মাপকাঠিতে নিয়ে আনার জন্যে কাজ করছে। তবে এর চাইতে বড় সমস্যা হলো, গবেষণা বলছে যে, ব্রিটিশ ছেলেমেয়েরা আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগছে। এটাকে মাথায় রেখেই সর্বশেষ রিক্রুটিং ভিডিও তৈরি করা হয়েছে। তবে প্রতিবেদনে বলা হয় যে, এই ভিডিও দেখে অনেকেই অনুপ্রাণিত হয়নি। নাগরিকেরা বলছে যে, অনেক জায়গাতেই আত্মবিশ্বাস পাওয়া যেতে পারে; সেটা সেনাবাহিনীতে নাও হতে পারে। কেউ কেউ বলছেন যে, সেনাবাহিনীতে যোগদানের অর্থ হলো অনেক বড় একটা প্রতিশ্রুতির সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলা; যা অনেকেই করতে ইচ্ছুক নয়। তারা নিজেদের ব্যক্তিস্বাধীনতা ধরে রাখতেই বেশি আগ্রহী।

 
বিশ্বব্যাপী ব্রিটেনের প্রধান প্রধান সামরিক অবস্থান। ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ চিন্তাটাকে বাস্তবায়ন করতেই বিশ্বব্যাপী ব্রিটেনকে সামরিক উপস্থিতি রাখতে হচ্ছে। এই সামরিক অবস্থানগুলিকে ধরে রাখতে বৈশ্বিকভাবে ব্রিটেন অনেক দেশের সরকারকেই নিজেদের প্রভাবের অধীনে রাখতে চাইছে। এটা পরিষ্কার যে, সামরিক শক্তির অপ্রতুলতাকে কাটাতে রাজনৈতিক এবং ইন্টেলিজেন্স প্রভাবকেই ব্রিটেন প্রাধান্য দিতে চাইছে।

ইউরোপে মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রাক্তন প্রধান লেঃ জেনারেল বেঞ্জামিন হজেস ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর মিডিয়া ‘ফোর্সেস নিউজ’এর সাথে এক সাক্ষাতে বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের মতোই বিশ্বব্যাপী ব্রিটেনের অনেক দায়িত্ব রয়েছে। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, ইন্দোপ্যাসিফিক, ইউরোপ সকল ক্ষেত্রেই ব্রিটেনের নিরাপত্তা দেবার দায়িত্ব রয়েছে। ২০১০ সালে যখন আফগানিস্তানে সেনাসংখ্যা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছিল, তখন ব্রিটেন মাত্র তিনটা দেশের মাঝে একটা হিসেবে সেটাকে সমর্থন করেছিল। সেই তুলনায় ব্রিটেনের সেনাবাহিনীর আকার মারাত্মক ছোট হয়ে গেছে। পৃথিবীর সকল মানুষই স্থলে বাস করে; কাজেই স্থলভাগে মানুষ এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা দিতে স্থলবাহিনীর প্রয়োজন। তিনি বলেন যে, বাইরের একজন ব্যক্তি হিসেবে তিনি খুবই চিন্তিত হবেন জেনে যে, ব্রিটেনের সেনাবাহিনীর আকার মেঝের নিচে নামিয়ে আনা হচ্ছে।

ক্যারিবিয়ান সাগর, দক্ষিণ আটলান্টিকের ফকল্যান্ডস দ্বীপপুঞ্জ, ভূমধ্যসাগরের জিবরালটার ও সাইপ্রাস, মধ্যপ্রাচ্যে বাহরাইন এবং ওমান ছাড়াও পূর্ব এশিয়ার সিঙ্গাপুর ও ব্রুনাই; এবং আফ্রিকার কেনিয়া ও উত্তর আমেরিকার কানাডাতে ব্রিটেনের সামরিক অবস্থান রয়েছে। এর বাইরেও ইউরোপের নরওয়ে, তিনটা বল্টিক রাষ্ট্র, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলি এবং পশ্চিম আফ্রিকার মালিতে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর মিশন রয়েছে। ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ চিন্তাটাকে বাস্তবায়ন করতেই বিশ্বব্যাপী ব্রিটেনকে সামরিক উপস্থিতি রাখতে হচ্ছে। এই সামরিক অবস্থানগুলিকে ধরে রাখতে বৈশ্বিকভাবে ব্রিটেন অনেক দেশের সরকারকেই নিজেদের প্রভাবের অধীনে রাখতে চাইছে। ‘এমআই ৬’এর প্রধানের বক্তব্যে এটা পরিষ্কার যে, সামরিক শক্তির অপ্রতুলতাকে কাটাতে রাজনৈতিক এবং ইন্টেলিজেন্স প্রভাবকেই ব্রিটেন প্রাধান্য দিতে চাইছে। একটা আদর্শিক শক্তি হিসেবে দুনিয়ার বেশিরভাগ দেশের রাজনৈতিক সীমানা এবং সংবিধানকে ব্রিটেন তৈরি করেছে, অথবা প্রভাবিত করেছে। পশ্চিমা আদর্শিক চিন্তাগুলি ব্রিটেনই একসময় উপনিবেশের মাধ্যমে সারা বিশ্বে ছড়িয়েছে। বর্তমান বিশ্বের বেশিরভাগ আইনকানুনই ব্রিটেনের হাতে তৈরি অথবা সেখানে ব্রিটেনের প্রভাব ছিল। এমনকি বিশ্বের আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ভাষাও ব্রিটেনের মানুষের মাতৃভাষা। ব্রিটেন নিজে সুপারপাওয়ার থাকার সময়েই এই কাজগুলির বেশিরভাগ সম্পাদন করেছিল। সেই ঐতিহাসিক প্রভাবটাকে ব্যবহার করেই ব্রিটেন আবারও শক্তিশালী হতে চাইছে। বৈশ্বিক রাজনীতিকে প্রভাবিত করে নিজেদের সক্ষমতা অনুযায়ী আকৃতি দিতে; অথবা অন্যের সক্ষমতাকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক উদ্দেশ্যগুলিকে বাস্তবায়ন করতে চাইছে তারা। তবে সকলেই বুঝতে পারছেন যে, অতি ক্ষুদ্র একটা সামরিক বাহিনী দিয়ে একটা পরিবর্তনশীল লাগামহীন বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করাটা অবাস্তব চিন্তা। পশ্চিমা আদর্শের অধঃপতনের ফলস্বরূপ ব্রিটেনের নাগরিকেরা যখন নিজেদের স্বাধীনতাকে ধরে রাখতে সামরিক বাহিনীতে যেতে ইচ্ছুক নয়, তখন সামরিক বাহিনী আকারে ছোট হতে থাকলেও প্রযুক্তির কারণে তার সক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে থাকবে, এহেন বক্তব্য হয়তো সেই চিন্তাটার অবাস্তবতাকে ঢেকে রাখার জন্যেই। ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর বিশ্ব নিয়ন্ত্রণের চিন্তাটাও সেই আঙ্গিকে দিবাস্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয়।

Saturday, 22 January 2022

বাইডেন কি ইয়েমেন যুদ্ধের ব্যাপারে তার নীতি পাল্টেছেন?

২২শে জানুয়ারি ২০২২

এক বছর ধরে ইয়েমেনে মানবাধিকার রক্ষার আদর্শিক লক্ষ্য এবং আরব দেশগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মার্কিন জাতীয় স্বার্থরক্ষার লক্ষ্যের মাঝামাঝি যে একটা অস্পষ্ট নীতিকে তিনি লালন করছিলেন, তার মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। আফগানিস্তানের পর এখন ইয়েমেনে পশ্চিমা আদর্শকে জ্বলাঞ্জলি দেয়ার এই নীতিকে বাইডেনের বামপন্থী লিবারাল ও প্রগ্রেসিভ মিত্ররা পছন্দ করছে না; যা কিনা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাইডেনের দুর্বল অবস্থানকে দুর্বলতর করবে।

 
২১শে জানুয়ারি ইয়েমেনের উত্তরে হুথি বিদ্রোহী গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা সাদা শহরের এক অস্থায়ী কারাগারের উপর বিমান হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আন্তর্জাতিক এনজিও ‘মেডিসিনস সাঁস ফ্রন্টিয়ের’ বার্তাসংস্থা ‘এএফপি’কে বলছে যে, হামলায় মহিলা ও শিশুসহ কমপক্ষে ৭০ জন নিহত এবং ১’শ ৩৮ জন আহত হয়েছে। এই অস্থায়ী কারাগারটা শরণার্থী শিবির হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিলো। হুথিরা এই বিমান হামলার জন্যে সৌদি আরবকে দায়ী করলেও সৌদি নেতৃত্বের কোয়ালিশন এই হামলার দায় অস্বীকার করেছে। কোয়ালিশনের একজন মুখপাত্র বলেন যে, জায়গাটা জেনেভা কনভেনশনের অধীনে আক্রমণ থেকে দূরে রাখার স্থানের মাঝে পড়ে না। তারা শীঘ্রই ঘটনার ব্যাপারে সত্যটা ছাড়াও হুথিদের মিডিয়াতে বানোয়াট খবরের ব্যাপারে তথ্য দেবেন। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, গত ১৭ই জানুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবু ধাবি বিমানবন্দর এবং তেলের স্টোরেজ ট্যাঙ্কে ড্রোন হামলার পর থেকে কোয়ালিশনের বোমা হামলা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৮ই জানুয়ায়রি ইয়েমেনের রাজধানী সানাতে এক বিমান হামলায় কমপক্ষে ১৪ জন নিহত হয়। ‘সেভ দ্যা চিলড্রেন’ বলছে যে, দক্ষিণের হোদেইদা শহরে একটা টেলিকম স্থাপনায় সৌদি বিমান হামলার সময় কাছেই খেলতে থাকা ৩ জন শিশু নিহত হয়। বোমা হামলার ঘটনায় মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব এন্টনি ব্লিনকেন এক বার্তায় যুদ্ধের তীব্রতার ব্যাপারে উদ্বেগ জানিয়ে উভয় পক্ষকে সহিংসতা কমাতে আহ্বান জানান। তবে এর আগে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সউদএর সাথে কথা বলতে গিয়ে তিনি পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলির নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা অব্যহত রাখার কথা বলেন। অনেকেই প্রশ্ন করতে শুরু করেছেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইয়েমেনের ব্যাপারে তার নীতি পরিবর্তন করেছেন কিনা।

উত্তর ইয়েমেনের সাদা শহরে বিমান হামলার পরপরই বাইডেনের ডেমোক্র্যাট শিবিরের মিত্র মার্কিন কংগ্রেসের বামপন্থীদের সর্ববামের সংগঠন ‘কংগ্রেশনাল প্রগ্রেসিভ ককাস’এর এক টুইটার বার্তায় বলা হয় যে, বাইডেন প্রশাসনকে অবশ্যই অবৈধভাবে সৌদিদের পক্ষে যুদ্ধে অংশ নেয়া বন্ধ করতে হবে; এবং বোমাবর্ষণ ও অবরোধ শেষ করতে হবে। বিশ্বব্যাপী মার্কিন শক্তির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের পক্ষে কথা বলা থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কুইন্সি ইন্সটিটিউট ফর রেসপন্সিবল স্টেটক্রাফট’এর এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, ক্ষমতা নেবার পর থেকে বাইডেন প্রশাসন ১৩ বার হুথিদের কর্মকান্ডের সমালোচনা করলেও ইয়েমেনে সৌদিদের বোমা হামলার একবারও সমালোচনা করেনি।

২০২১এর ফেব্রুয়ারিতে বাইডেন হোয়াইট হাউজের এক প্রেস ব্রিফিংএ বলেছিলেন যে, ইয়েমেনের যুদ্ধ শেষ হতেই হবে। তিনি বলেছিলেন যে, যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র অংশগ্রহণকারী দেশগুলিকে ‘আক্রমণাত্মক অস্ত্র’ বিক্রি করা বন্ধ করবে। কিন্তু এক বছর পর ২০২১এর ডিসেম্বরে বাইডেন প্রশাসন সাড়ে ৬’শ মিলিয়ন ডলারে সৌদি আরবের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রি করার জন্যে কংগ্রেসের অনুমতি নিলে অনেকেই বাইডেনের নীতির ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেন। বাইডেন প্রশাসন বলছে যে, ক্ষেপণাস্ত্রগুলি আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য; যার অর্থ হলো, সেগুলি সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা ঠেকাতে ব্যবহৃত হবে; ইয়েমেনের ভূমিতে বোমা হামলার জন্যে নয়। ১৯শে জানুয়ারি এক সংবাদ সন্মেলনে জো বাইডেন এক প্রশ্নের জবাবে বলেন যে, ইয়েমেনের যুদ্ধ বন্ধে দুই পক্ষের মাঝে সমঝোতা হতে হবে; যা কিনা যথেষ্টই কঠিন একটা কাজ। একইসাথে তিনি বলেন যে, তিনি হুথিদেরকে পুনরায় ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন হিসেবে ঘোষণা দেয়ার জন্যে চিন্তা করছেন। ২০২১ সালের শুরুতে বাইডেন হুথিদেরকে ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন ঘোষণার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত বাতিল করেছিলেন।

 
সৌদি বিমান বাহিনীর মার্কিন নির্মিত 'এফ-১৫' যুদ্ধবিমান।  যতক্ষণ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সৌদিদেরকে ইন্টেলিজেন্স, খুচরা যন্ত্রাংশ, রক্ষনাবেক্ষণ, এবং অস্ত্র সরবাহ করছে, সেটা ‘আক্রমণাত্মক’ বা ‘প্রতিরক্ষামূলক’ই হোক, যুদ্ধের ভয়াবহতা আরও বাড়বে। এটা এখন পরিষ্কার যে, বাইডেন ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্পের নীতিতে যেতে চাইছেন। কিন্তু হোয়াইট হাউজে আসার এক বছরেও যখন তিনি সৌদি আরব এবং আমিরাতের যুদ্ধ সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের কোন চেষ্টাই করেননি, তখন তার নীতির কতটুকু পরিবর্তন হলো, তা বলা কঠিন।

২০১৮ সালে সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগির হত্যার পর থেকে মার্কিন কংগ্রেসের অনেক সদস্য সৌদিদের সাথে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করার জন্যে এবং ইয়েমেনের যুদ্ধে সৌদিদের সহায়তা না দেয়ার জন্যে সরকারের উপর চাপ দিতে থাকে। তবে এখনও পর্যন্ত সৌদি কোয়ালিশন মার্কিন অস্ত্র ব্যবহার করেই ইয়েমেনে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। মার্কিন লিবারাল রাজনীতিবিদ এবং শিক্ষক ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান রোহিত ‘রো’ খান্না বাইডেনের বক্তব্যের সমালোচনা করে এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, ট্রাম্পের পুরোনো নীতিতে ফিরে গিয়ে যুদ্ধকে আরও উস্কে দেয়া নয়, বরং ইয়েমেন যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা করতে হবে। হুথিদের ‘সন্ত্রাসী’ ঘোষণা দিয়ে তাদের কর্মকান্ডকে থামানো যাবে না; বরং এতে লাখো মানুষের খাবার ও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পাবে। মার্কিন সাংবাদিক এবং লেখক স্পেনসার একারম্যান এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, বাইডেন এবং তার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা যে যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেই যুদ্ধে সৌদি আর আমিরাতের যেকোন বিমান হামলায় মার্কিন হাত রয়েছে। তিনি আশা করেন যে, ইয়েমেনে নিহত শিশুদেরকে মার্কিন কর্মকর্তারা যেন রাতে স্বপ্নের মাঝে দেখতে পান।

‘ভোক্স’ ম্যাগাজিন বলছে যে, মার্কিনীরা সৌদি বিমান বাহিনীর বিমানগুলির রক্ষণাবেক্ষণ করছে; যেগুলি ইয়েমেনে ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০২১এর ফেব্রুয়ারিতে ৪১ জন কংগ্রেসম্যান সৌদি আরবের জন্যে মার্কিন সামরিক সহায়তার ব্যাপারে জানতে চাইলে বাইডেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা দুই মাস পর ধোঁয়াশা উত্তর দেন। কংগ্রেসম্যান পিটার ডেফাজিও ‘মিডলিস্ট আই’কে বলছেন যে, বাইডেন এক বছরেও তার ইয়েমেন নীতিকে পরিষ্কার করেননি। মার্কিন এনজিও ‘ফ্রেন্ডস কমিটি অন ন্যাশনাল লেজিসলেশন’এর ডিরেক্টর হাসান এল তাইয়াব বলছেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সৌদিদেরকে ইন্টেলিজেন্স, খুচরা যন্ত্রাংশ, রক্ষনাবেক্ষণ, এবং অস্ত্র সরবাহ করছে, সেটা ‘আক্রমণাত্মক’ বা ‘প্রতিরক্ষামূলক’ই হোক, যুদ্ধের ভয়াবহতা আরও বাড়বে। এটা এখন পরিষ্কার যে, বাইডেন ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্পের নীতিতে যেতে চাইছেন। কিন্তু হোয়াইট হাউজে আসার এক বছরেও যখন তিনি সৌদি আরব এবং আমিরাতের যুদ্ধ সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের কোন চেষ্টাই করেননি, তখন তার নীতির কতটুকু পরিবর্তন হলো, তা বলা কঠিন। বরং এক বছর ধরে ইয়েমেনে মানবাধিকার রক্ষার আদর্শিক লক্ষ্য এবং আরব দেশগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মার্কিন জাতীয় স্বার্থরক্ষার লক্ষ্যের মাঝামাঝি যে একটা অস্পষ্ট নীতিকে তিনি লালন করছিলেন, তার মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। আফগানিস্তানের পর এখন ইয়েমেনে পশ্চিমা আদর্শকে জ্বলাঞ্জলি দেয়ার এই নীতিকে বাইডেনের বামপন্থী লিবারাল ও প্রগ্রেসিভ মিত্ররা পছন্দ করছে না; যা কিনা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাইডেনের দুর্বল অবস্থানকে দুর্বলতর করবে।

Thursday, 20 January 2022

ইথিওপিয়ার গৃহযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তনের অর্থ কি?

২০শে জানুয়ারি ২০২২

ইথিওপিয়ার হারার মেদা বিমান ঘাঁটিতে চীনে নির্মিত 'উইং লুং ১' ড্রোন। এটা মনে করার কারণ নেই যে, এই যুদ্ধে অস্ত্র সরবরাহ করার অপরাধে যুক্তরাষ্ট্র আমিরাত বা তুরস্কের উপর অবরোধ দেবে। ট্রাম্প প্রশাসন ইথিওপিয়ার সরকারের ভৌগোলিক অখন্ডতা রক্ষার চেষ্টাকে সমর্থন দিলেও বাইডেন প্রশাসন সেখানে ইথিওপিয়া সরকারের মানবাধিকার লংঘনকে হাইলাইট করতে চাইছে। অর্থাৎ ইথিওপিয়ার অখন্ডতা রক্ষা এখন মার্কিন সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়।


২০২১এর ২০শে ডিসেম্বর ইথিওপিয়ার তিগ্রে বিদ্রোহীরা ঘোষণা দেয় যে, তারা সরকারি আক্রমণের মুখে কিছু এলাকা ছেড়ে দিচ্ছে। একইসাথে তারা জাতিসংঘের কাছে তিগ্রে অঞ্চলের উপর যুদ্ধবিমান এবং ড্রোনের জন্যে একটা ‘নো ফ্লাই জোন’ ঘোষণা করার জন্যে আহ্বান জানায়। জাতিসংঘ তিগ্রে অঞ্চলে মানবাধিকার লংঘনের ব্যাপারে তদন্ত করতে একটা কমিশন গঠন করলেও ইথিওপিয়ার সরকার এর বিরোধিতা করেছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে মার্কিন সরকার ঘোষণা দেয় যে, যারা ইথিওপিয়ার যুদ্ধে সামরিক সহায়তা দেবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু বিভিন্ন সূত্র থেকে খবর আসছে যে, ইথিওপিয়াকে বিভিন্ন দেশ অস্ত্র সরবরাহ করছে; যাদের মাঝে সর্বাগ্রে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’এর এক বিশ্লেষণে উইলিয়াম ডেভিডসন বলছেন যে, তিগ্রে সেনাদের পিছু হটার কারণ হয়তো আবি আহমেদের ইথিওপিয় সরকারের জন্যে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত বিদেশী সামরিক সহায়তা; বিশেষ করে অস্ত্রবাহী ড্রোন।

ডাচ প্রতিরক্ষা ওয়েবসাইট ‘ওরিক্স’এর এক বিশ্লেষণে স্টাইন মিতজার এবং জুউস্ট ওলিমান্স বলছেন যে, ইথিওপিয়ার অস্ত্র বহণকারী ড্রোন ফ্লিটের মাঝে রয়েছে ৯টা চীনে নির্মিত ‘উইং লুং ১’, ২টা ইরানে নির্মিত ‘মোহাজের ৬’; এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে তৈরি কয়েকটা ‘ভার্টিক্যাল টেইক অফ এন্ড ল্যান্ডিং’ বা ‘ভিটিওএল’ ড্রোন। এছাড়াও ইস্রাইলে নির্মিত দুই প্রকারের গোয়েন্দা ড্রোনও রয়েছে এগুলিকে সাপোর্ট দেয়ার জন্যে। ইথিওপিয়া তার প্রথম ৩টা ‘উইং লুং ১’ ড্রোন চীন থেকে পায় ২০২১এর সেপ্টেম্বরে। এরপর নভেম্বর মাসে আমিরাত থেকে একই ধরনের আরও ৬টা ড্রোন আসে। এছাড়াও কেউ কেউ দাবি করেছেন যে, যুদ্ধের শুরু থেকেই এরিত্রিয়ার আসাব বন্দরে অবস্থিত সংযুক্ত আরব আমিরাতের সামরিক ঘাঁটি থেকে ড্রোন হামলা হয়েছে তিগ্রেদের উপর। এব্যাপারে কেউ সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দেখাতে পারেনি। তবে ‘ওরিক্স’ তাদের বিশ্লেষণে বলছে যে, এর মানে এই নয় যে, আমিরাতের ঘাঁটি থেকে কোন হামলা হয়নি। বরং যেসময় ইথিওপিয়ার কাছে কোন ড্রোন ছিল না, সেসময় তিগ্রেদের হাতে থাকা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং বড় ক্যালিবারের রকেটের উপর নিখুঁতভাবে হামলা সেদিকেই ইঙ্গিত দেয়।

তিগ্রে অঞ্চলের মাইচিউ এলাকায় ইথিওপিয়দের হাতে আমিরাতে তৈরি প্রথম ‘ভিটিওএল’ ড্রোনগুলিকে দেখা যায় ২০২১এর মাঝামাঝি। তবে তিগ্রেদের দ্রুত স্থানান্তরযোগ্য বাহিনীর বিরুদ্ধে এহেন ড্রোনের কর্মক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ। ইথিওপিয়ার পক্ষে আমিরাতের সবচাইতে বড় সহায়তার প্রমাণ পাওয়া যায় ২০২১এর নভেম্বরে যখন ইথিওপিয়ার হারার মেদা বিমান ঘাঁটিতে ‘উইং লুং ১’ ড্রোনগুলিকে দেখা যেতে থাকে। ইথিওপিয়ার রাজধানী অভিমুখে বিদ্রোহী বাহিনীর রওয়ানা হবার খবরেই হয়তো আমিরাত জরুরি ভিত্তিতে তাদের নিজেদের বিমান বাহিনী থেকে ড্রোনগুলি ইথিওপিয়াতে পাঠিয়েছে। ড্রোনগুলির অপারেটরও নিঃসন্দেহে আমিরাতেরই ছিল। চীন থেকে আনা ‘উইং লুং ১’ ড্রোনগুলি প্রথম থেকেই ‘টিএল ২’ আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র বহণ করেনি। কিন্তু আমিরাতি ড্রোনগুলি প্রথম থেকেই প্রচুর ক্ষেপণাস্ত্রসহ মোতায়েন হয়েছে।

জানুয়ারির শুরুতে অরোমিয়া অঞ্চলের গিদামি শহরে ইরানে নির্মিত ‘ঘানেম ৫’ আকাশ থেকে নিক্ষেপিত অস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যাবার পর ধারণা করা হচ্ছে যে, ইথিওপিয়া সরকার ইরানে নির্মিত ‘মোহাজের ৬’ ড্রোনগুলিকে অরোমিয়া অঞ্চলের কাছাকাছি মোতায়েন করেছে। স্যাটেলাইট ছবি বলছে যে, খুব সম্ভবতঃ আসোসা বিমানবন্দরেই এগুলিকে মোতায়েন করা হয়েছে। সেখান থেকে অরোমিয়া অঞ্চলের বেশিরভাগটাই ড্রোনগুলির ২’শ কিঃমিঃ পাল্লার মাঝে চলে আসবে। ২০২১এর অগাস্টে অরোমো অঞ্চলের বাহিনী ‘অরোমো লিবারেশন আর্মি’ বা ‘ওএলএ’ ‘তিগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট’ বা ‘টিপিএলএফ’এর সাথে জোট বেঁধে আবি আহমেদের সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। এর আগ পর্যন্ত সেমেরা এবং হারার মেদা বিমান ঘাঁটি থেকে তিগ্রে অঞ্চলে ড্রোন হামলা করা গেলেও অরোমিয়া ছিল ড্রোনের পাল্লার বাইরে। ডাচ এনজিও ‘প্যাক্স’এর এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, তুরস্কে তৈরি ড্রোনও ইথিওপিয়া ব্যবহার করছে। তুর্কি সরকার অবশ্য তা অস্বীকার করেছে। 



 
‘ওরিক্স’ তাদের বিশ্লেষণে বলছে যে, ইথিওপিয়া বিমান বাহিনীর ড্রোন হামলার ফলস্বরূপ এখন তিগ্রেদের হাতে তেমন কোন বড় অস্ত্র নেই। ড্রোন হামলার ব্যাপারটা তিগ্রে সেনাদের মনোবলের উপরেও হয়তো আঘাত হেনেছে। অন্ততঃ ট্যাংক বা আর্টিলারির মতো বড় ক্যালিবারে অস্ত্র না থাকায় তিগ্রেদের সামনে অগ্রসর হবার সক্ষমতা কমে যেতে পারে। একারণেই হয়তো তিগ্রেরা আক্রমণে না গিয়ে নিজেদের অঞ্চলকে রক্ষা করতে বেশি যত্নবান হচ্ছে। তবে ‘উইং লুং ১’ ড্রোনগুলি একইসাথে বেসামরিক টার্গেটে হামলায় ব্যবহৃত হচ্ছে বলে তথ্য মিলছে। কিছুদিন আগেই তিগ্রে অঞ্চলের আলামাতা শহরে ড্রোন হামলায় ৪২ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং দেড়শতাধিক আহত হয়। বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে চীনে নির্মিত ‘ব্লু এরো ৭’ ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের দেখা মেলে; যা কিনা ‘উইং লুং ১’ ড্রোন ব্যবহার করে।

যুদ্ধের শুরুতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার্কিন প্রশাসনের শেষ দিনগুলিতে যুক্তরাষ্ট্র আবি আহমেদের সরকারকে সমর্থন দিলেও জো বাইডেন প্রশাসনের নীতিতে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। সেই নীতির উপর ভিত্তি করেই যুক্তরাষ্ট্র ইথিওপিয়া সরকারের কাছে তুর্কি ড্রোন বিক্রির রিপোর্টের ব্যাপারে চিন্তিত। গত ডিসেম্বরে হর্ন অব আফ্রিকার জন্যে মার্কিন সরকারের প্রতিনিধি জেফরি ফেল্টম্যান তুরস্ক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরের সময়ে ইথিওপিয়াতে সশস্ত্র ড্রোন ব্যবহারের ব্যাপারে মার্কিন সরকারের দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেন বলে বলছে ‘রয়টার্স’ এবং ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’। ‘এক্সপোর্টার্স এসেম্বলি’র হিসেবে ২০২১ সালের ১১ মাসে ইথিওপিয়াতে তুরস্ক ৯৫ মিলিয়ন ডলারের সামরিক পণ্য রপ্তানি করেছে। ‘আল মনিটর’ বলছে যে, ইথিওপিয়া সরকারের ইরানি ড্রোন ব্যবহারের ব্যাপারেও মার্কিন কর্মকর্তারা উদ্বিগ্ন।

বাইডেন প্রশাসন ইথিওপিয়ার যুদ্ধ বন্ধে তেমন কোন পদক্ষেপ না নিলেও ইথিওপিয়ার সরকার যাতে সহজে যুদ্ধজয়ের পথে এগুতে না পারে, সেজন্য ইথিওপিয়ার উপর বিভিন্ন অবরোধের হুমকি দিচ্ছে। তবে এটা মনে করার কারণ নেই যে, এই যুদ্ধে অস্ত্র সরবরাহ করার অপরাধে যুক্তরাষ্ট্র আমিরাত বা তুরস্কের উপর অবরোধ দেবে। ট্রাম্প প্রশাসন ইথিওপিয়ার সরকারের ভৌগোলিক অখন্ডতা রক্ষার চেষ্টাকে সমর্থন দিলেও বাইডেন প্রশাসন সেখানে ইথিওপিয়া সরকারের মানবাধিকার লংঘনকে হাইলাইট করতে চাইছে। অর্থাৎ ইথিওপিয়ার অখন্ডতা রক্ষা এখন মার্কিন সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়।

Sunday, 16 January 2022

‘এরদোগানোমিকস’…… ২০২২ সালে তুরস্কের জন্যে সবচাইতে বড় হুমকি

১৬ই জানুয়ারি ২০২২

 
এরদোগান একটা নরম ‘প্রকৃতির ইসলামিস্ট তুরস্ক’ তৈরি করে নতুন তুরস্কের জনক হতে চাইছেন। আর এরদোগানের সমালোচকেরা তার তথাকথিত ‘ইসলামিস্ট’ নীতির সমালোচনা করে বলছেন যে, একুশ শতকের জটিল অর্থনীতি সপ্তম শতাব্দীর নীতি দ্বারা চালনা করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ তারা সার্টিফিকেট দিচ্ছেন যে, এরদোগানের সুদের হার কমাবার নীতি ইসলাম সমর্থিত।


তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগান সর্বদাই তার অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে সমালোচিত। কারণ তিনি বিদ্যমান পুঁজিবাদী অর্থনীতির সাধারণ চিন্তাগুলির বিরুদ্ধে কথা বলছেন। এরদোগান বলছেন যে, উচ্চ সুদের হারের কারণেই মুদ্রাস্ফীতি হয়; যদিও পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে সাধারণভাবে উল্টোটা মনে করা হয়। তিনি বলছেন যে, ইসলাম সুদ কমাতে বলেছে। যারা তার সাথে দ্বিমত পোষণ করছেন, তাদেরকে তিনি ষড়যন্ত্রকারী আখ্যা দিয়ে বলছেন যে, এই ‘ইন্টারেস্ট রেট লবি’গুলি উচ্চ সুদের উপর ভিত্তি করে মুনাফা বাড়াতে চাইছে। এরদোগানের সমালোচকেরা অনেকেই এহেন নীতিকে ‘এরদোগানোমিকস’ বলে আখ্যা দিয়ে থাকেন। এরদোগানের এই নীতিগুলির প্রভাব বুঝতে হলে তুরস্কের অর্থনীতির সূচকগুলি দেখা ছাড়াও অর্থনীতির বৈশিষ্ট্যগুলিকে বিশ্লেষণ করতে হবে।

এরদোগানের ‘একে পার্টি’র নীতি … ঋণ নিয়ে খরচ করো

‘দ্যা ইকনমিস্ট’ তুরস্কের অর্থনীতির প্রধান কিছু ইস্যুকে তুলে এনেছে। তুরস্ক হলো ইউরোপের সবচাইতে বড় টেলিভিশন এবং হাল্কা বাণিজ্যিক গাড়ি নির্মাতা। বিশ্বের ৮ম বৃহত্তম খাদ্য প্রস্তুতকারক এবং ৬ষ্ঠ বৃহত্তম পর্যটন কেন্দ্র। বিশ্বের সবচাইতে বড় আড়াই’শ কন্সট্রাকশন কোম্পানির মাঝে ৪৩টাই তুরস্কের। ২০০২ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত তুরস্কের জিডিপি ৬ দশমিক ৮ শতাংশ হারে বেড়েছে। তবে এর সাথে তুরস্কের অর্থনীতির বড় কিছু দুর্বলতাও রয়েছে। দেশটার অর্থনীতি খুব বেশি ইউরোপকেন্দ্রিক। তুরস্কের মোট বহিঃবাণিজ্যের ৬০ শতাংশই হয় ইউরোপের সাথে; দেশে মোট বাইরের বিনিয়োগের তিন চতুর্থাংশও আসে ইউরোপ থেকে। একারণেই ইউরোপ অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়লে তা তুরস্ককেও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে। তুরস্ক হয়তো গাড়ি এবং ওয়াশিং মেশিন তৈরি করতে পারে; কিন্তু নিজস্ব গবেষণা, ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং এবং মার্কেটিংএ তুর্কিরা তেমন আগাতে পারেনি। বিশ্বব্যাংকের হিসেবে ২০০২ সালের পর থেকে তুরস্কের মোট তৈরি করা রপ্তানিদ্রব্যের মাঝে মাত্র ২ শতাংশ আসে হাইটেক দ্রব্য থেকে।

এরদোগান তুরস্ককে ২০২৩ সালের মাঝে, অর্থাৎ বর্তমান তুরস্কের জন্মের শততম বার্ষিকীতে, বিশ্বের শীর্ষ ১০ অর্থনীতির একটা হিসেবে তৈরি করতে চান বলে ঘোষণা দিয়েছেন। সেই লক্ষ্যে ‘একে পার্টি’ ক্ষমতায় এসে কিছু মেগা কন্সট্রাকশন প্রকল্পের কাজ হাতে নেয়। তুর্কি সরকারি মিডিয়া ‘টিআরটি’ এই মেগা প্রকল্পগুলির সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। প্রথমেই রয়েছে ইস্তাম্বুলের নতুন বিমানবন্দর। এর প্রথম স্টেজের কাজ ২০১৫এর মে মাসে শুরু হয়ে ২০১৮ সালের অক্টোবরে শেষ হয়; খরচ হয় প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার। তবে এর দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ স্টেজের কাজ ২০২৫ পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে। এরপর রয়েছে বসফরাস প্রণালির সমান্তরালে ৪৫ কিঃমিঃ লম্বা ইস্তাম্বুল ক্যানাল। ২০২১ সালের জুনে এরদোগান এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ছয় বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার খরচ হবে বলে বলছেন তিনি। তার নিজের কথায়, এটা একটা ‘উন্মাদীয় প্রকল্প’। এছাড়াও রয়েছে ৪৫ বিলিয়ন ডলার বাজেটের হাই স্পিড রেলওয়ে প্রকল্প। এর অংশ হিসেবে ইস্তাম্বুলে বসফরাস প্রণালির তলদেশ দিয়ে ‘মারমারায়’ পাতাল রেলের খরচ পড়বে ৫ বিলিয়ন ডলার। তারপর রয়েছে ইস্তাম্বুল ফাইনান্স সেন্টার; যা তৈরির মাধ্যমে এরদোগান ইস্তাম্বুলকে বিশ্বের একটা গুরুত্বপূর্ণ অর্থ বাজারে পরিণত করতে চান। এর বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ বিলিয়ন ডলার। এছাড়াও ১০ বিলিয়ন ডলার খরচে তুরস্কের মাঝ দিয়ে মধ্য এশিয়ার গ্যাস ইউরোপে রপ্তানির পাইপলাইন প্রকল্প চলমান। এই সবগুলি প্রকল্পই তুরস্কের অর্থনীতিতে বিশাল ঋণ যুক্ত করেছে এবং আরও করছে। পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপিতে করার কারণে প্রকল্পগুলির বেশিরভাগ ঋণই হলো বেসরকারি খাতে।

 
তুরস্কের মেগা প্রকল্প ইস্তাম্বুল বিমানবন্দর। মেগা প্রকল্পগুলি তুরস্কের অর্থনীতিতে বিশাল ঋণ যুক্ত করেছে এবং আরও করছে। পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপিতে করার কারণে প্রকল্পগুলির বেশিরভাগ ঋণই হলো বেসরকারি খাতে।

২০০২ সালে যখন ‘একে পার্টি’ ক্ষমতায় আসে, তখন কনজিউমার ঋণ ছিল তুরস্কের প্রতি পরিবারের গড় আয়ের প্রায় ৫ শতাংশ। ২০১৩ সাল নাগাদ এটা হয়ে যায় প্রায় ৫৫ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থনীতির আকার বড় করার উদ্দেশ্যে ‘একে পার্টি’ সাধারণ জনগণকে খরচ বাড়াতে উৎসাহ দিতে ব্যাপকহারে ঋণ দিতে থাকে। এই খরচার কারণে তুর্কি পরিবারগুলি নিজেদেরকে ধনী মনে করতে থাকে; কারণ এক দশকের মাঝে তাদের পারিবারিক সম্পদ বেড়ে তিনগুণ হয়ে যায়। তবে সমস্যা হলো এই সম্পদ তৈরি হয়েছে ঋণের উপর ভর করে। ঋণ ফেরত দিতে গিয়ে সীমিত আয়ের খুব স্বল্প অংশই সঞ্চয় হিসেবে রাখতে পেরেছে তারা। ২০১৪ সালে তুরস্কের জাতীয় সঞ্চয় হার ছিল মাত্র ১২ দশমিক ৬ শতাংশ; যা কিনা বড় উঠতি অর্থনীতিগুলির মাঝে সর্বনিম্ন। ব্যবসায়ীরাও লাভের আশায় কনজিউমার দ্রব্যের উপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছে; বড় শিল্প গড়ার উপর নয়। একারণে বাইরে থেকে আমদানি করা কনজিউমার দ্রব্যের চাহিদাও ব্যাপকহারে বেড়ে যায়। আইএমএফএর হিসেবে ২০১২ থেকে ২০১৪ সালের মাঝে তুরস্কের ব্যংকগুলির দেয়া মোট ঋণের মাঝে কন্সট্রাকশন সেক্টরে দেয়া ঋণের অংশ ৫০ শতাংশ থেকে বেড়ে গিয়ে ৭০ শতাংশে দাঁড়ায়। অর্থাৎ ব্যাংকগুলি কারখানা নয়, বরং এপার্টমেন্ট বিল্ডিং, অফিস বিল্ডিং এবং শপিং কমপ্লেক্সের জন্যে ঋণ দিতেই বেশি আগ্রহী ছিল। একইসাথে ২০১২ সালে রিয়েল এস্টেট সেক্টরে বিদেশী মালিকানার অনুমোদন দেয়ায় রিয়েল এস্টেটের মূল্য দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০১৫ সালে এক বছর আগের তুলনায় তুরস্কের বড় শহর ইস্তাম্বুলে বাড়ির মূল্য ২০ শতাংশ বেড়ে যায়।

বৈদেশিক ঋণের উপর ভর করে প্রবৃদ্ধি

২০০২ সালে যখন ‘একে পার্টি’ ক্ষমতায় আসে, তখন তুরস্কের জিডিপি ছিল আড়াই’শ বিলিয়ন ডলার। ২০১৩ সাল নাগাদ তা পৌঁছে যায় সাড়ে ৯’শ বিলিয়নে। অর্থাৎ মাত্র এক দশকে তুরস্কের অর্থনীতির আকার ৩ দশমিক ৮ গুণ বেড়ে যায়! তবে এই প্রবৃদ্ধির পিছনে ছিল ঋণের বোঝা। জাতীয় সঞ্চয় কমে যাবার কারণে দেশের কন্সট্রাকশন প্রকল্পগুলিতে বিনিয়োগ করার মত অর্থেরও ঘাটতি পড়ে যায়। এই ঘাটতি পূরণ করতে গিয়ে বিদেশ থেকে ঋণ নেয়া শুরু হয়। বৈদেশিক ঋণ তুরস্কের জিডিপির প্রায় ৫০ শতাংশ হয়ে যায়; যার বেশিরভাগই ছিল বেসরকারি ঋণ। তুরস্কের ‘আহভাল নিউজ’ বলছে যে, তুরস্কের বৈদেশিক ঋণ ২০২০ সাল নাগাদ সাড়ে ৪’শ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যায়; যার মাঝে বেসরকারি কর্পোরেট সেক্টরের ঋণই ছিল ৩’শ বিলিয়ন ডলার। এসকল ঋণ তুরস্ককে পরিশোধ করতে হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রায়; যা কিনা তুর্কি লিরার উপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করে। তবে দুর্বল মুদ্রাব্যবস্থা, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং ঘনঘন সরকারি নীতির পরিবর্তনের কারণে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা দেশটাতে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগে আগ্রহী হয়নি। সকলেরই উদ্দেশ্য ছিল স্বল্প সময়ের মাঝে মুনাফা করে নিয়ে দেশ ছেড়ে যাওয়া।

‘আহভাল নিউজ’ বলছে যে, তুর্কি লিরার দরপতনের পর থেকে তুরস্কের কেন্দ্রীয় ব্যাংক লিরাকে শক্তিশালী করতে ব্যাপক হারে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহার করতে থাকে। এতে লিরার মূল্য স্থিতিশীল না হলেও তুরস্কের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ মারাত্মকভাবে কমে যায়। অপরদিকে এরদোগানের ঋণ গ্রহণ সহজ করে বেসরকারি খরচ বাড়াবার নীতির কারণে মুদ্রাস্ফীতি ব্যাপকহারে বাড়তে থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০১৮ সালের মে মাস থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মাঝে সুদের হার ৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৪ শতাংশে নিয়ে যায়; অর্থাৎ তিনগুণ করে ফেলে! কিন্তু তারপরেও ২০১৯ সালের মাঝামাঝি মুদ্রাস্ফীতি ১৪ বছরের মাঝে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়ে যায়। কিন্তু ঋণের অর্থ অনেক ক্ষেত্রেই আমদানি করা পণ্যের পিছনে খরচ হতে থাকে। যার ফলশ্রুতিতে রপ্তানির চাইতে আমদানি অনেক বেশি বেড়ে যায়। করোনা মহামারির আগ পর্যন্ত বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং পর্যটনের মাধ্যমে তুরস্ক তার বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি পূরণ করতো। ২০১৯ সালে এক পর্যটন শিল্প থেকেই এসেছিল সাড়ে ৩৪ বিলিয়ন ডলার। করোনার কারণে পর্যটন শিল্পে ধ্বস নামায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উপর চাপ পড়তে শুরু করে। আর ২০২০এর জুলাইএ বিদেশী বিনিয়োগকারীরা তুরস্কের বন্ড মার্কেট থেকে ব্যাপকহারে পালাতে থাকলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সংকট শুরু হয়।

 
সরকারি হিসেবে তুরস্কের মুদ্রাস্ফীতি ২১ শতাংশ। বেসরকারি হিসেবে তা ৫৯ শতাংশ পর্যন্ত। ২০২২ সালে মুদ্রাস্ফীতি ৩০ শতাংশ হতে পারে। বাজারে ঘনঘন মূল্য তালিকা পরিবর্তন করতে হচ্ছে। এরদোগান তার লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তুরস্কের জনগণের উপর ঋণের বোঝা চাপিয়েছেন; দ্রব্যমূল্যের চাপে জনগণের জীবন হয়েছে দুর্বিসহ। তার দেশের সবচাইতে বড় হুমকি এখন তার নীতি ‘এরদোগানোমিকস’।

আকশচুম্বি মুদ্রাস্ফীতি এবং তুর্কি লিরার দরপতনের রেকর্ড

২০২১এর ডিসেম্বরে এরদোগান ২০২২ সালে ৬০ লাখের বেশি মানুষের জন্যে সর্বনিম্ন বেতন ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে ৪ হাজার ২’শ ৫৩ লিরা বা প্রায় ২’শ ৭০ ডলারে উন্নীত করেন। এটা ছিল ৫০ বছরে সর্বোচ্চ বেতন বৃদ্ধি। ফলস্বরূপ একদিনে তুর্কি লিরার মূল্য ৫ শতাংশ কমে গিয়ে এক ডলারে সাড়ে ১৫ ছাড়িয়ে যায়; যা সর্বনিম্নের রেকর্ড। অথচ এর আগে ২০২০ সালের অগাস্টে ২০ শতাংশ মূল্য হারাবার পরেও ডলারে পাওয়া যেতো ৭ দশমিক ৪ লিরা। ২০২১ সালের মাঝে লিরার মূল্য আরও ৫০ শতাংশ পড়ে যায়। সরকারি হিসেবে গত নভেম্বরে মুদ্রাস্ফীতি ২১ শতাংশে ঠেকে। কিন্তু তুরস্কের অর্থনীতিবিদদের সংগঠন ‘ইএনএজি’র হিসেবে এই মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ৫৯ শতাংশ! মুদ্রাস্ফীতি কমাতে এবং মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতিতে পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে অনেক দেশেই সুদের হার যখন বাড়ানো হচ্ছে, তখন তুরস্কে সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মাঝে সুদের হার ১৯ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৪ শতাংশ করা হয়। কারণ এরদোগান মনে করছেন যে, সুদের হারের কারণেই মুদ্রাস্ফীতি হচ্ছে। ‘নিকেই এশিয়া’র সাথে সাক্ষাতে ‘ক্যাপিটাল ইকনমিকস’এর জেসন টুভে বলছেন যে, ২০২২ সালের প্রথমার্ধের মাঝে লিরার মূল্য যেমন স্থির হবার সম্ভাবনা কম, তেমনি মুদ্রাস্ফীতিও কমবে না। কাজেই এরদোগান সম্ভবতঃ তার সুদের হার কমাবার নীতি অব্যাহত রাখবেন। বেশিরভাগ অর্থনীতিবিদেরাই বলছেন যে, তুরস্কের মুদ্রাস্ফীতি ২০২২ সালে সরকারি হিসেবে ৩০ শতাংশ হতে পারে; তবে ‘ইএনএজি’র হিসেবে তা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ হতে পারে! কারণ সরকারের বেতন বৃদ্ধির প্রভাবগুলি তখন অর্থনীতিতে পড়তে থাকবে।

এদিকে তুর্কি লিরার দরপতনের কারণে তুরস্কের আমদানি ব্যয় ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ‘নিকেই এশিয়া’ বলছে যে, দেশীয় মুদ্রার মূল্য নিম্নগামী হওয়ায় তুর্কিরা তাদের সঞ্চয় লিরা থেকে পরিবর্তন করে বৈদেশিক মুদ্রা, স্বর্ণ, স্টক, ক্রিপ্টোকারেন্সি এমনকি বাড়িঘরে নিয়ে যাচ্ছে। তুরস্কের ব্যাংকে সঞ্চিত সকল সম্পদের মাঝে ৬২ শতাংশই এখন বৈদেশিক মুদ্রায়। তুরস্কের ব্যাংকিং সেক্টর বিশ্লেষক উগুর গারসেস ‘নিকেই এশিয়া’কে বলছেন যে, লিরার দরপতন ঠেকানো না গেলে অর্থনীতিতে স্থবিরতা আসতে পারে; আবার ব্যাংকগুলি থেকে গ্রাহকরা তাদের গচ্ছিত অর্থ ব্যাপকহারে সরিয়ে নিতে পারে। ‘ডয়েচে ব্যাংক’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, যেভাবে মানুষ লিরা থেকে ডলারের দিকে যাচ্ছে এবং ফলশ্রুতিতে লিরার দরপতন হচ্ছে, এবং একইসাথে মুদ্রাস্ফীতি যেভাবে বাড়ছে, তাতে জরুরি ভিত্তিতে সুদের হার বাড়ানোটাও বেশ কঠিন হয়ে যাবে।

এরদোগান নতুন তুরস্কের জনক হতে চাইছেন?

এরদোগান তার নীতিকে ‘অর্থনৈতিক স্বাধীনতার যুদ্ধ’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। অর্থনৈতিক নীতির সাফল্য দেখাতে এরদোগানের সরকার পরিসংখ্যানও পরিবর্তন করেছে। ‘ব্লুমবার্গ’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ২০১৬ সালে এরদোগান তুরস্কের জিডিপির হিসাবে বিরাট পরিবর্তন আনেন; যার ফলশ্রুতিতে তুরস্কের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আগের চাইতে বেশি বলে প্রতীয়মান হতে থাকে। নতুন হিসাবে ২০০৯ সালের আগ পর্যন্ত ‘একে পার্টি’র সময়ে তুরস্কের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল গড়ে ৭ দশমিক ১ শতাংশ; ২০০৯ সাল থেকে ২০১৫ সালের মাঝে তা ছিল ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। অথচ হিসাব পরিবর্তনের আগে ২০০৯ সালের আগ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৮ শতাংশ; আর ২০০৯ সালের পর ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পরিসংখ্যানও ভালো কোন প্রতিচ্ছবি দেখাতে পারেনি। বিশ্বব্যাংকের হিসেবে ২০১৩ সালে তুরস্কের জিডিপি ছিল ৯’শ ৫৮ বিলিয়ন ডলার; ২০২০ সালে তা দাঁড়ায় ৭’শ ২০ বিলিয়নে। অর্থাৎ ২০১৩ থেকে ২০২০এর মাঝে তুরস্ক তার জিডিপির এক চতুর্থাংশ হারিয়েছে।

 
এরদোগান তার সুদ কমাবার নীতিকে ইসলামের সাথে যুক্ত করতে চাইছেন; যদিও ইসলামে যে সুদ পুরোপুরিভাবে নিষিদ্ধ, তা তার অজানা থাকার কথা নয়। তথাপি তিনি তুর্কি জনগণের ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে ইসলামিক দেখাতে চাইছেন। ২০২৩ সালের নির্বাচনে জেতার জন্যে এরদোগান সকল কিছুই করবেন। যার অংশ হিসেবে মারাত্মক মুদ্রাস্ফীতির মাঝে যখন প্রতিনিয়ত দোকানে পণ্যের মূল্য পরিবর্তন করতে হচ্ছে, তখন তিনি ব্যাপকহারে বেতন বৃদ্ধি করেছেন। দেশের মানুষের জাতীয়বাদ জাগিয়ে তুলতে নতুন কোন রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিতেও তিনি হয়তো পিছপা হবেন না।

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মার্ক চ্যাম্পিয়ন ‘ব্লুমবার্গ’এর এক লেখায় বলছেন যে, এরদোগান চাইছেন নতুন করে একটা ‘নরম প্রকৃতির ইসলামিস্ট তুরস্ক’ তৈরি করতে; যার ভিত্তি হিসেবে তিনি কম সুদের হার এবং দ্রুত বর্ধমান কন্সট্রাকশন ইন্ডাস্ট্রিকে রাখতে চাইছেন। ২০২৩ সালের মাঝে এরদোগান কিছু মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে তুরস্কের আকৃতিই পরিবর্তন করে ফেলতে চাইছেন। অপরদিকে এরদোগান এবং তার ‘একে পার্টি’র সাথে সমমনা ‘ইসলামিস্ট’ ব্যবসায়ীরাই এর মাঝে সরকারি নীতির সুবিধা ভোগ করবে; আর তার বিরোধী কট্টর সেকুলাররা বঞ্চিত হবে। তুরস্কের কর কাঠামোগুলিকে এমনভাবে সাজানো হচ্ছে, যাতে করে সমাজের পুরোনো এলিটদের হাত থেকে সম্পদ নতুন এলিটদের হাতে চলে আসে। মার্ক চ্যাম্পিয়ন মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, তুরস্কে এহেন নীতি নতুন নয়। এরদোগানের আগে যারা ক্ষমতায় ছিল, তারা সামরিক বাহিনী এবং কট্টর সেকুলারদেরকে সুবিধা দিতো; মুদ্রানীতিও সেই আঙ্গিকেই হতো। প্রকৃতপক্ষে এরদোগান নতুন একজন ‘আতাতুর্ক’ বা নতুন এক তুরস্কের জনক হতে চাইছেন।

‘নিকেই এশিয়া’ বলছে যে, এরদোগান যেভাবে তুরস্কের অর্থনীতির কর্তৃত্ব নিয়েছেন, তাতে নিজের সিদ্ধান্ত উল্টে ফেলে নির্বাচনের আগে সুদের হার বৃদ্ধি করা রাজনৈতিকভাবে খুবই কঠিন হবে। এরদোগান তার সুদ কমাবার নীতিকে ইসলামের সাথে যুক্ত করতে চাইছেন; যদিও ইসলামে যে সুদ পুরোপুরিভাবে নিষিদ্ধ, তা তার অজানা থাকার কথা নয়। তথাপি তিনি তুর্কি জনগণের ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে ইসলামিক দেখাতে চাইছেন। মার্ক চ্যাম্পিয়ন বলছেন যে, এরদোগান একটা নরম ‘প্রকৃতির ইসলামিস্ট তুরস্ক’ তৈরি করে নতুন তুরস্কের জনক হতে চাইছেন। আর এরদোগানের সমালোচকেরাই তার নীতিকে ইসলামিক বলে সার্টিফিকেট দিচ্ছেন। ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’এর এক লেখায় ‘ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’এর সিনিয়র ফেলো আসলি আয়দিনতাসবাস এরদোগানের তথাকথিত ‘ইসলামিস্ট’ নীতির সমালোচনা করে বলছেন যে, একুশ শতকের জটিল অর্থনীতি সপ্তম শতাব্দীর নীতি দ্বারা চালনা করা সম্ভব নয়। তার কথায় অর্থনীতি চালাবার জন্যে বিজ্ঞজনদের নিয়ে এসে তাদের কথা শুনতে হবে। অর্থাৎ তিনি সার্টিফিকেট দিচ্ছেন যে, এরদোগানের সুদের হার কমাবার নীতি ইসলাম সমর্থিত।

২০২৩ সালের নির্বাচনে জেতার জন্যে এরদোগান সকল কিছুই করবেন। যার অংশ হিসেবে মারাত্মক মুদ্রাস্ফীতির মাঝে যখন প্রতিনিয়ত দোকানে পণ্যের মূল্য পরিবর্তন করতে হচ্ছে, তখন তিনি ব্যাপকহারে বেতন বৃদ্ধি করেছেন। দেশের মানুষের জাতীয়বাদ জাগিয়ে তুলতে নতুন কোন রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিতেও তিনি হয়তো পিছপা হবেন না। কিন্তু তার ২০২৩ সালের মাঝে তুরস্ককে বিশ্বের ১০ম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য বাস্তবায়িত হওয়া থেকে বহুদূরে। আইএমএফএর হিসেবে তুরস্কের অর্থনীতি ২০২১ সালে ছিল বিশ্বের ২০তম। বরং সেই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তিনি তুরস্কের জনগণের উপর ঋণের বোঝা চাপিয়েছেন; দ্রব্যমূল্যের চাপে জনগণের জীবন হয়েছে দুর্বিসহ। তার দেশের সবচাইতে বড় হুমকি এখন তার নীতি ‘এরদোগানোমিকস’। তুর্কি জনগণ তাদের উসমানি খিলাফতের স্বপ্নে বিভোর; যেই স্বপ্নকে দেখিয়েই এরদোগান তার জনমতের ভিত তৈরি করেছেন। কিন্তু ২০২২ সালে ‘এরদোগানোমিকস’এর অব্যবস্থাপনার কারণে সেই স্বপ্নে ভাটা পড়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।