Showing posts with label economics. Show all posts
Showing posts with label economics. Show all posts

Monday, 4 April 2022

শ্রীলংকার ভবিষ্যৎ কি?

০৪ঠা এপ্রিল ২০২২

শ্রীলংকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের জন্যে মানুষের লাইন। শ্রীলংকার অর্থনীতি গড়ে উঠেছে বৈদেশিক বাণিজ্যের উপর ভিত্তি করে। দেশটার অর্থনীতি পর্যটন খাত এবং রেমিট্যান্স থেকে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে থাকার কারণে জনগণের খরচ বাড়তে থাকে। দেশের রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস খাত এবং পর্যটনমুখী হোটেল ব্যবসাও আমদানিনির্ভর থাকে। রপ্তানি বাড়লেও আমদানির সাথে পাল্লা দিয়ে উঠতে পারেনি কখনোই। ২০১৬ সালে দেশটার পর্যটন শিল্প যখন বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছিল, তখনও দেশের আমদানি ব্যয় মেটাতে না পেরে সরকার ‘আইএমএফ’এর কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিল।

 
ভারত মহাসাগরের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র বাণিজ্যপথের উপর অবস্থিত শ্রীলংকার সমস্যা যেন হিমালয়সম হয়ে দাঁড়িয়েছে! দেশটায় মারাত্মক মূল্যস্ফীতি চলছে। তদুপরি অর্থ দিয়েও মানুষ তাদের দরকারি জিনিস কিনতে পারছে না। বিশেষ করে আমদানিকৃত যেকোন জিনিসই দুর্লভ হয়ে গেছে। আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্যে যথেষ্ট বৈদেশিক মুদ্রা দেশটার হাতে নেই। চরম অসন্তোষে মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। জরুরি অবস্থা এবং কারফিউ দিয়েও বিক্ষোভ থামানো যাচ্ছে না। সরকারের সকল মন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন এবং রাষ্ট্রপতি গোতাবায়া রাজাপক্ষে পার্লামেন্টের সকল দলকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন মন্ত্রীসভা তৈরি করার জন্যে, যাতে করে সমস্যার একটা সমাধান পাওয়া যায়। একসময় দক্ষিণ এশিয়াতে শ্রীলংকাকে সকলের জন্যে মডেল হিসেবে দেখানো হতো। দেশটার মাথাপিছু আয় ছিল প্রায় ৪ হাজার ডলার; যা কিনা আশেপাশের দেশগুলির প্রায় দ্বিগুণ! দেশটার শিক্ষার হার প্রায় ১’শ ভাগ। ২ কোটি ২০ লক্ষ জনসংখ্যার দেশটার জিডিপি প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলারের মতো। অথচ বারংবার দেশটাকে দেউলিয়া অবস্থান থেকে উদ্ধার পাবার জন্যে ‘আইএমএফ’এর সরণাপন্ন হতে হয়েছে। শ্রীলংকার সমস্যার গভীরে যেতে হলে দেশটার অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের যথেষ্ট বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

‘দ্যা ইকনমিক টাইমস’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ২০২০ সালে ‘আইএমএফ’ শ্রীলংকাকে প্রতিশ্রুত ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ঋণের মাঝে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার দেয়ার পর ঋণের প্রবাহ বন্ধ করে দেয়। এতে শ্রীলংকা করোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে হিমসিম খেয়ে ওঠে। এর ফলশ্রুতিতে ২০২১এর ফেব্রুয়ারি মাসে শ্রীলংকা সরকার পুঁজি ধরে রাখার উদ্দেশ্যে কিছু নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নেয়; যার মাঝে ছিল ছয় মাসের মাঝে রপ্তানির অর্থ দেশে ফেরত নিয়ে আসা; রপ্তানি আয়ের কিছু অংশকে রুপিতে পরিবর্তন করে নেয়া; বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহকে তাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের কিছু অংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে হস্তান্তর করতে বাধ্য করা। এই পদক্ষেপগুলির উদ্দেশ্য ছিল ‘আইএমএফ’এর ঋণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং করোনার কারণে পর্যটন শিল্পে ভাটা পড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার যে ঘাটতি পড়েছে, সেটাকে কিছুটা পুষিয়ে নেয়া। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছিল যে, এর মাধ্যমে শ্রীলংকা বিদেশী ঋণের উপর নির্ভর না করে নিজস্ব সম্পদের উপর নির্ভরশীলতা বাড়াবে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, এই পদক্ষেপগুলির মাধ্যমে আরও একটা লক্ষ্য অর্জিত হবে, তা হলো ‘আইএমএফ’এর শর্তের বেড়াজাল থেকে মুক্ত থাকা। শ্রীলংকার প্রতিমন্ত্রী অজিত নিভাদ কাব্রাল বলেন যে, সরকার আশা করছে যে, ২০২১ সালে দেশের মোট রপ্তানি আয় এবং রেমিটান্স মিলে আসবে প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলার; আর দেশ থেকে বের হবে মোট ২৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। এর ফলে দেশে ৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত থাকবে। কিন্তু বছর শেষে এই হিসেব পুরোপুরি উল্টে যায়।

 
বিদেশী পর্যটকদের আকর্ষণে ভূস্বর্গ বানিয়েছে শ্রীলংকা। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের চেষ্টা শ্রীলংকাকে উন্মাদ করেছে। রপ্তানি, পর্যটন এবং রেমিট্যান্স থেকে শ্রীলংকা কম উপার্জন করেনি। কিন্তু উন্নততর লাইফস্টাইলও এতে পেয়ে বসেছে দেশটাকে। আমদানি করা জিনিসের প্রতি আগ্রহ দেশটার জনগণের কাছে স্বাবলম্বী হবার চেষ্টা করা থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এর ফলশ্রুতিতে দেশটার উপর ‘আইএমএফ’এর মতো আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

পর্যটন শিল্পে ধ্বস এবং রেমিট্যান্স আয়ে হুন্ডি

দেশটার পর্যটন কর্তৃপক্ষ ফেব্রুয়ারি মাসে জানায় যে, ২০২১ সালে পর্যটন শিল্প প্রায় ৬’শ ৩৪ মিলিয়ন ডলার আয় করে। শ্রীলংকার ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’ বলছে যে, ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে যেখানে দেশটাতে মাত্র ১৭’শ পর্যটক এসেছিল, সেখানে ডিসেম্বর মাসে তা গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৯০ হাজারে। আর পুরো বছরে এসেছিল ২ লক্ষের কিছু কম। গত জানুয়ারিতেও ৮২ হাজারের উপর পর্যটক এসেছিল। কিন্তু এটা খুশি হবার কোন খবর নয়; কারণ পর্যটন খাতে শ্রীলংকার আয় ২০১৮ সালে ছিল ৪ বিলিয়ন ডলারের উপর। সেবছর সেদেশে ২০ লক্ষাধিক পর্যটক এসেছিল। তবে ২০১৯ সালে সন্ত্রাসী হামলার পর আয় ৩ দশমিক ৬ বিলিয়নে নেমে আসে। আর ২০২০ সালে করোনার কারণে তা ৭’শ মিলিয়নের নিচে নেমে যায়! অর্থাৎ ২০১৮ সালের তুলনায় পর্যটন খাতে শ্রীলংকার আয় এখন ছয় ভাগের এক ভাগেরও কম!

শ্রীলংকা সরকার আশা করছিল যে, ২০২২ সালে দেশটায় ১০ লক্ষের বেশি পর্যটক আসবে। কিন্তু সেই আশা এখন ধুলোয় মিশে গেছে! ‘ব্লুমবার্গ’ বলছে যে, গত মার্চ মাসে শ্রীলংকার পর্যটন কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দেয় যে, ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে তাদের পর্যটন শিল্প আরও এক দফা সমস্যায় পড়তে যাচ্ছে। কারণ রাশিয়া এবং ইউক্রেন থেকেই তাদের সবচাইতে বেশি পর্যটক এসে থাকে। ফেব্রুয়ারি মাসে শ্রীলংকায় মোট পর্যটকের মাঝে প্রায় ১৬ শতাংশ এসেছিল রাশিয়া থেকে।

অপরদিকে ২০২১ সালে রেমিট্যান্স আয় একেবারেই পড়ে যায়। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, গত বছর রেমিট্যান্স আয় ছিল প্রায় সাড়ে ৫ বিলিয়ন ডলার; যা ছিল দশ বছরের মাঝে সর্বনিম্ন! শ্রীলংকার থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ভেরিটে রিসার্চ’ বলছে যে, রেমিট্যান্স আয় কমার মূল কারণ হলো সরকার অলিখিতভাবে ডলারের বিপরীতে রুপির মূল্য ২’শ থেকে ২’শ ৩এ নিয়ন্ত্রণ করেছে। অথচ খোলা বাজারে তখন এক ডলারে প্রায় আড়াই’শ রুপি পাওয়া যেতো। এর ফলে বেশিরভাগ প্রবাসী শ্রীলংকান হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠাতে থাকে। তবে সমস্যা হলো যখন দেশটার পর্যটন শিল্প শিখরে ছিল এবং রেমিট্যান্সও ভালো আসছিল, তখনও দেশটাকে বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে দেউলিয়াত্বের মাঝে পড়ে ‘আইএমএফ’এর দ্বারস্থ হতে হয়েছে। এর অর্থ হলো, মূল সমস্যা পর্যটন বা রেমিট্যান্স খাতে নয়; অন্য কোথাও।

 
স্বাধীনতার পর থেকে শ্রীলংকাকে মোট ১৬ বার 'আইএমএফ'এর দ্বারস্থ হতে হয়েছে। প্রতিবারই ‘আইএমএফ’ দেশটার সরকারের উপর কঠিন শর্তারোপ করেছে, যা জনগণের জন্যে বয়ে এনেছে ভোগান্তি। কিন্তু এতে দেশটার অর্থনৈতিক সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান আসেনি। বিদেশীদের কাছে ঋণের জন্যে হাত পেতেই চলতে হয়েছে দেশটাকে। বহু বছর তামিল টাইগারদের সাথে গৃহযুদ্ধের মাঝে ‘আইএমএফ’ দেশটার উপর নিয়ন্ত্রণ রেখেছে; যুদ্ধও চলেছে যুগের পর যুগ। অর্থাৎ শ্রীলংকা কখনোই স্বাধীন হতে পারেনি।


আমদানি নির্ভরতা শেষ পর্যন্ত ‘আইএমএফ’এর কাছে নিয়ে গেলো শ্রীলংকাকে

গত জানুয়ারি মাসে শ্রীলংকার রপ্তানি উন্নয়ন সংস্থা জানায় যে, ২০২১ সালে দেশের মোট রপ্তানি আয় ছিল প্রায় সাড়ে ১২ বিলিয়ন ডলার, যা ছিল রপ্তানি টার্গেটের চাইতেও বেশি। কিন্তু ২০২০ সালের ডিসেম্বরে যেখানে শ্রীলংকার মাসিক বাণিজ্য ঘাটতি ছিল প্রায় সাড়ে ৫’শ মিলিয়ন ডলার, তা ২০২১এর ডিসেম্বরে এসে দাঁড়ায় ১ বিলিয়ন ডলারেরও উপর। এর মূল কারণ হলো, রপ্তানি বাড়ার হার যেখানে ছিল প্রায় ২০ শতাংশ, সেখানে আমদানি বেড়েছিল প্রায় ৪৭ শতাংশ হারে। গত ডিসেম্বরে শ্রীলংকা প্রায় ২ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছিল; যা ছিল দেশটার ইতিহাসে এক মাসে সর্বোচ্চ আমদানি।

শ্রীলংকার পত্রিকা ‘ইকনমি নেক্সট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, দেশটার আমদানি ব্যয় আগের বছরের ১৬ বিলিয়নের তুলনায় সাড়ে ২৮ শতাংশ বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ২০ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে। এই আমদানি দেশের জিডিপির প্রায় ২৫ শতাংশ। করোনার আগে ২০১৯ সালেও আমদানি ছিল ২০ বিলিয়নের চাইতে কম। এর ফলশ্রুতিতে দেশটার বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। সরকার গাড়ি আমদানির উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করায় গাড়ি আমদানির ব্যয় ২০১৯ সালে ৮’শ ১৬ মিলিয়ন ডলার থেকে মাত্র ১৩ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। তবে সার্বিকভাবে যেহেতু আমদানি ব্যয় কমানো সম্ভব হচ্ছে না, তাই রপ্তানি বৃদ্ধি করেও বাণিজ্য ঘাটতি কমানো অথবা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। এই মুহুর্তে পর্যটন শিল্পের অবস্থা খারাপ রয়েছে। কিন্তু পর্যটন শিল্প ভালো হলেও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়বে না। কারণ যারা পর্যটন শিল্পের সাথে জড়িত, তারা খরচ বাড়াবে এবং ফলশ্রুতিতে আমদানি বাড়তে থাকবে। হোটেলগুলিও জরুরি মেরামতের কাজগুলি করবে এবং তাদের ঋণ ফেরত দিতে থাকবে। এর ফলে আরও বিনিয়োগ হবে এবং আমদানি বাড়বে। ব্যাংকগুলি যদি সরকারি বন্ড কেনে, সেটাও ব্যবহৃত হবে সরকারি কর্মচারিদের বেতন দিতে; যা কিনা আবারও আমদানি বাড়াবে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, এই সমস্যার মূলে ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রুপি ছাপানো। যখন অর্থনীতে যথেষ্ট বৈদেশিক মুদ্রা আসছিলো না এবং সরকার যথেষ্ট আয় করতে পারছিলো না, তখন তারা সিদ্ধান্ত নেয় রুপি ছাপানো বৃদ্ধি করার। এতে মারত্মক মুদ্রাস্ফীতির সৃষ্টি হয়েছে। ঋণের উপর সুদের হার কম থাকায় বিনিয়োগ বেড়েছে এবং প্রচুর যন্ত্রপাতি আমদানি হয়েছে। ফলশ্রুতি যন্ত্রপাতি আমদানি ২ দশমিক ১ বিলিয়ন থেকে বেড়ে ২ দশমিক ৮ বিলিয়নে উঠে গেছে। শিল্পের জন্যে ক্যাপিটাল গুডসএর আমদানি সাড়ে ৩ বিলিয়ন থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ৪ বিলিয়নে পৌঁছেছে। কন্সট্রাকশন দ্রব্যের আমদানি বেড়ে ১ বিলিয়ন থেকে হয়েছে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। খাদ্যদ্রব্য আমদানিতে খরচ হয়েছে দেড় বিলিয়ন ডলার। মোট ভোগ্যপণ্য আমদানি হয়েছে ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার; যা আগের বছর ছিল ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। বিরাট পরিবর্তন এসেছে জ্বালানি আমদানিতে। আড়াই বিলিয়ন ডলার থেকে জ্বালানি আমদানি ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে উঠে গেছে। এই মুহুর্তে মোট আমদানির ১৮ শতাংশ জ্বালানি; রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস শিল্পের জন্যে আমদানি করা কাপড় ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ; যন্ত্রপাতি ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ; খাদ্য বাদে অন্যান্য ভোগ্যপণ্য সাড়ে ১০ শতাংশ; খাদ্যদ্রব্য ৮ শতাংশ; ঔষধ ও মেডিক্যাল দ্রব্য ৪ শতাংশ।

শ্রীলংকার রাজাপক্ষে সরকার শেষ পর্যন্ত বাস্তবতার কাছে হার মেনেছে। ফলশ্রুতিতে সরকার গত ১৪ই মার্চ ‘আইএমএফ’এর সাথে আলোচনায় বসে। ক্ষমতা নেবার পর থেকে ‘আইএমএফ’এর কঠিন শর্তের বেড়াজাল এড়িয়ে চলার চেষ্টা করলেও শেষ রক্ষা হয়নি। ‘ব্লুমবার্গ’ বলছে যে, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে শ্রীলংকার ঋণদাতা দেশ ভারত এবং চীন অন্যদিকে ব্যস্ত। এর আগেই শ্রীলংকা সরকার রুপির মূল্য কমিয়ে ঋণ নেয়াকে আরও কঠিন করে দেয়। এই পদক্ষেপ ‘আইএমএফ’এর প্রেসক্রিপশনের মাঝে থাকায় অনেকেই ধারণা করে যে, সরকার খুব সম্ভবতঃ আবারও ‘আইএমএফ’এর কাছে যাচ্ছে। মার্চ মাস নাগাদ দেশটার বৈদেশিক রিজার্ভ ২ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসে। অথচ এবছরেই তাদের ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ ফেরত দিতে হবে। এর মাঝে জুলাই মাসে ফেরত দিতে হবে ১ বিলিয়ন ডলারের বন্ড।

 
গোতাবায়া রাজাপক্ষে এবং তার ভাই মাহিন্দা রাজাপক্ষে। মাহিন্দা রাজাপক্ষের জাতীয়তাবাদী সরকার ২০০৯ সালে গৃহযুদ্ধ শেষ করে শ্রীলংকাকে যুদ্ধের শৃংখল থেকে মুক্ত করলেও অর্থনৈতিক শৃংখল থেকে মুক্ত করার ফর্মূলা রাজাপক্ষেদের হাতে ছিল না; এখনও নেই। রাজাপক্ষেদের জাতীয়তাবাদী আবেগের চিন্তাগুলি অনেকের কাছে আকর্ষনীয় মনে হলেও তা পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে এড়িয়ে যায়না। ভেড়ার পালের মতো বাকিদের অনুসরণ করার বাইরে শ্রীলংকার হাতে কিছুই করার নেই। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনই যেন শ্রীলংকার সামনে একমাত্র আশা।

জন্মের পর থেকেই বৈদেশিক মুদ্রার পিছনে ছুটেছে শ্রীলংকা

‘সিএনবিসি’র এক প্রতিবেদনে মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, শ্রীলংকার অর্থনীতির করুণ দশা আজকের নয়। অর্থাৎ এই সমস্যার গভীরতা যথেষ্ট। ২০১৬ সালে দেশটার বৈদেশিক রিজার্ভ মারাত্মক নেমে গেলে সরকার ‘আইএমএফ’এর কাছে ঋণের জন্যে যেতে বাধ্য হয়। ‘আইএমএফ’এর শর্ত মেনে শ্রীলংকার সরকার দেড় বিলিয়ন ডলার ঋণ পায়। সেই বছরের শেষ নাগাদ দেশটার বৈদেশিক ঋণ প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকে। এমনকি সরকার নিজেই বলতে পারছিলো না যে, দেশটার মোট ঋণ আসলে কত। বৈদেশিক ঋণ ফেরত দেয়ার লক্ষ্যে সরকার ‘আইএমএফ’এর ফর্মূলায় মূল্য সংযোজন কর বৃদ্ধি করে। ২০১৮ সালে চীন শ্রীলংকাকে আরও ১ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ দেয়। ভারতের কাছ থেকে ঋণ না পেয়ে শ্রীলংকা বাংলাদেশের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছে।

১৫ বছরের মাঝে দেশটার সবচাইতে মারাত্মক আর্থিক সমস্যার মাঝে ২০১৯ সালে গোতাবায়া রাজাপক্ষে এবং তার পরিবারবর্গ ক্ষমতায় আসে। তাদের প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল কর কমানো। মূল্য সংযোজন কর ১৫ শতাংশ থেকে ৮ শতাংশে নামিয়ে আনা ছাড়াও সরকার বহু ক্ষেত্রে বিপুলভাবে কর কর্তন করে। সরকারের যুক্তি ছিল যে, কর কমালে বিনিয়োগ বাড়বে এবং অর্থনীতি চাঙ্গা হবে; জিডিপি বাড়বে। এর মাধ্যমে যেসব ক্ষেত্রে কর পাওয়া যেতো না, তারাও কর দেয়ার সামর্থ্য অর্জন করবে। কিন্তু ২০১৯ সালে সন্ত্রাসী হামলা এবং ২০২০ সালে করোনার লকডাউনের কারণে শ্রীলংকার অর্থনীতিতে ধ্বস নামে। আর রাজাপক্ষে সরকার ‘আইএমএফ’এর শর্ত বাস্তবায়নে গড়িমসি করায় ‘আইএমএফ’ ঋণ দেয়া বন্ধ করে দেয়। বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি পোষাতে না পেরে সরকার রুপি ছাপাতে থাকে। এতে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়।

২০১৯ সাল থেকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে গোতাবায়া রাজাপক্ষে সরকার জনগণের উপর কর কমানো থেকে সরে আসতে চায়নি। এর ফলশ্রুতিতে সরকারের রাজস্ব নিম্নগামী হয় এবং বৈদেশিক ঋণ ফেরত দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। শ্রীলংকার সমস্যা শুধু রাজাপক্ষের পরিবার নয়। কারণ ২০১৯ সালে তারা ক্ষমতায় আসার আগেও দেশটার অর্থনীতি ধুঁকে ধুঁকে চলছিল। শ্রীলংকার অর্থনীতি গড়ে উঠেছে বৈদেশিক বাণিজ্যের উপর ভিত্তি করে। দেশটার অর্থনীতি পর্যটন খাত এবং রেমিট্যান্স থেকে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে থাকার কারণে জনগণের খরচ বাড়তে থাকে। দেশের রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস খাত এবং পর্যটনমুখী হোটেল ব্যবসাও আমদানিনির্ভর থাকে। রপ্তানি বাড়লেও আমদানির সাথে পাল্লা দিয়ে উঠতে পারেনি কখনোই। ২০১৬ সালে দেশটার পর্যটন শিল্প যখন বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছিল, তখনও দেশের আমদানি ব্যয় মেটাতে না পেরে সরকার ‘আইএমএফ’এর কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিল। ‘আইএমএফ’এর শর্ত পূরণে দেশের মানুষের উপর কর বৃদ্ধি করে সরকার। ‘আইএমএফ’ দেশটার রপ্তানি বৃদ্ধি এবং বাণিজ্য উদারীকরণের উপর চাপ দিলেও আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে কখনোই উপদেশ দেয়নি, যা কিনা সর্বদাই দেশটার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাবার মূল কারণ ছিল। স্বাবলম্বী হবার চেষ্টা না করে আমদানিনির্ভর অর্থনীতি হবার কারণে শ্রীলংকার অর্থনীতি আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে ওঠানামা করেছে। করোনার লকডাউন উঠে যাবার পর আন্তর্জাতিক বাজারে যখন জ্বালানি তেলের মূল্য বেড়ে যায়, তখন শ্রীলংকার আমদানি ব্যয়ও বাড়তে থাকে। আমদানি ব্যয় মেটাতে শ্রীলংকার সরকার বৈদেশিক ঋণের দিকে ঝুঁকে যায়। এর মাঝে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানির মূল্য আরেকবার বৃদ্ধি পাওয়া ছাড়াও পর্যটন শিল্প আরেকবার ধ্বসের মুখে পড়েছে।

বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের চেষ্টা শ্রীলংকাকে উন্মাদ করেছে। রপ্তানি, পর্যটন এবং রেমিট্যান্স থেকে শ্রীলংকা কম উপার্জন করেনি। কিন্তু উন্নততর লাইফস্টাইলও এতে পেয়ে বসেছে দেশটাকে। আমদানি করা জিনিসের প্রতি আগ্রহ দেশটার জনগণের কাছে স্বাবলম্বী হবার চেষ্টা করা থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এর ফলশ্রুতিতে দেশটার উপর ‘আইএমএফ’এর মতো আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ‘দ্যা ডিপ্লোম্যাট’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় থামিল ভেনথান আনান্থাভিনায়াগান মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, স্বাধীনতার পর থেকে মোট ১৬ বার ‘আইএমএফ’এর দ্বারস্থ হতে হয়েছে শ্রীলংকাকে। প্রতিবারই ‘আইএমএফ’ দেশটার সরকারের উপর কঠিন শর্তারোপ করেছে, যা জনগণের জন্যে বয়ে এনেছে ভোগান্তি। কিন্তু এতে দেশটার অর্থনৈতিক সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান আসেনি। বিদেশীদের কাছে ঋণের জন্যে হাত পেতেই চলতে হয়েছে দেশটাকে। বহু বছর তামিল টাইগারদের সাথে গৃহযুদ্ধের মাঝে ‘আইএমএফ’ দেশটার উপর নিয়ন্ত্রণ রেখেছে; যুদ্ধও চলেছে যুগের পর যুগ। অর্থাৎ শ্রীলংকা কখনোই স্বাধীন হতে পারেনি। অন্ততঃ পৃথিবীর প্রধান সমুদ্রপথের উপর অবস্থিত এই দ্বীপ দেশের উপর পশ্চিমারা কখনোই নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে রাজি ছিল না। মাহিন্দা রাজাপক্ষের জাতীয়তাবাদী সরকার ২০০৯ সালে গৃহযুদ্ধ শেষ করে শ্রীলংকাকে যুদ্ধের শৃংখল থেকে মুক্ত করলেও অর্থনৈতিক শৃংখল থেকে মুক্ত করার ফর্মূলা রাজাপক্ষেদের হাতে ছিল না; এখনও নেই। রাজাপক্ষেদের জাতীয়তাবাদী আবেগের চিন্তাগুলি অনেকের কাছে আকর্ষনীয় মনে হলেও তা পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে এড়িয়ে যায়না। ভেড়ার পালের মতো বাকিদের অনুসরণ করার বাইরে শ্রীলংকার হাতে কিছুই করার নেই। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনই যেন শ্রীলংকার সামনে একমাত্র আশা।

Sunday, 16 January 2022

‘এরদোগানোমিকস’…… ২০২২ সালে তুরস্কের জন্যে সবচাইতে বড় হুমকি

১৬ই জানুয়ারি ২০২২

 
এরদোগান একটা নরম ‘প্রকৃতির ইসলামিস্ট তুরস্ক’ তৈরি করে নতুন তুরস্কের জনক হতে চাইছেন। আর এরদোগানের সমালোচকেরা তার তথাকথিত ‘ইসলামিস্ট’ নীতির সমালোচনা করে বলছেন যে, একুশ শতকের জটিল অর্থনীতি সপ্তম শতাব্দীর নীতি দ্বারা চালনা করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ তারা সার্টিফিকেট দিচ্ছেন যে, এরদোগানের সুদের হার কমাবার নীতি ইসলাম সমর্থিত।


তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগান সর্বদাই তার অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে সমালোচিত। কারণ তিনি বিদ্যমান পুঁজিবাদী অর্থনীতির সাধারণ চিন্তাগুলির বিরুদ্ধে কথা বলছেন। এরদোগান বলছেন যে, উচ্চ সুদের হারের কারণেই মুদ্রাস্ফীতি হয়; যদিও পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে সাধারণভাবে উল্টোটা মনে করা হয়। তিনি বলছেন যে, ইসলাম সুদ কমাতে বলেছে। যারা তার সাথে দ্বিমত পোষণ করছেন, তাদেরকে তিনি ষড়যন্ত্রকারী আখ্যা দিয়ে বলছেন যে, এই ‘ইন্টারেস্ট রেট লবি’গুলি উচ্চ সুদের উপর ভিত্তি করে মুনাফা বাড়াতে চাইছে। এরদোগানের সমালোচকেরা অনেকেই এহেন নীতিকে ‘এরদোগানোমিকস’ বলে আখ্যা দিয়ে থাকেন। এরদোগানের এই নীতিগুলির প্রভাব বুঝতে হলে তুরস্কের অর্থনীতির সূচকগুলি দেখা ছাড়াও অর্থনীতির বৈশিষ্ট্যগুলিকে বিশ্লেষণ করতে হবে।

এরদোগানের ‘একে পার্টি’র নীতি … ঋণ নিয়ে খরচ করো

‘দ্যা ইকনমিস্ট’ তুরস্কের অর্থনীতির প্রধান কিছু ইস্যুকে তুলে এনেছে। তুরস্ক হলো ইউরোপের সবচাইতে বড় টেলিভিশন এবং হাল্কা বাণিজ্যিক গাড়ি নির্মাতা। বিশ্বের ৮ম বৃহত্তম খাদ্য প্রস্তুতকারক এবং ৬ষ্ঠ বৃহত্তম পর্যটন কেন্দ্র। বিশ্বের সবচাইতে বড় আড়াই’শ কন্সট্রাকশন কোম্পানির মাঝে ৪৩টাই তুরস্কের। ২০০২ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত তুরস্কের জিডিপি ৬ দশমিক ৮ শতাংশ হারে বেড়েছে। তবে এর সাথে তুরস্কের অর্থনীতির বড় কিছু দুর্বলতাও রয়েছে। দেশটার অর্থনীতি খুব বেশি ইউরোপকেন্দ্রিক। তুরস্কের মোট বহিঃবাণিজ্যের ৬০ শতাংশই হয় ইউরোপের সাথে; দেশে মোট বাইরের বিনিয়োগের তিন চতুর্থাংশও আসে ইউরোপ থেকে। একারণেই ইউরোপ অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়লে তা তুরস্ককেও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে। তুরস্ক হয়তো গাড়ি এবং ওয়াশিং মেশিন তৈরি করতে পারে; কিন্তু নিজস্ব গবেষণা, ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং এবং মার্কেটিংএ তুর্কিরা তেমন আগাতে পারেনি। বিশ্বব্যাংকের হিসেবে ২০০২ সালের পর থেকে তুরস্কের মোট তৈরি করা রপ্তানিদ্রব্যের মাঝে মাত্র ২ শতাংশ আসে হাইটেক দ্রব্য থেকে।

এরদোগান তুরস্ককে ২০২৩ সালের মাঝে, অর্থাৎ বর্তমান তুরস্কের জন্মের শততম বার্ষিকীতে, বিশ্বের শীর্ষ ১০ অর্থনীতির একটা হিসেবে তৈরি করতে চান বলে ঘোষণা দিয়েছেন। সেই লক্ষ্যে ‘একে পার্টি’ ক্ষমতায় এসে কিছু মেগা কন্সট্রাকশন প্রকল্পের কাজ হাতে নেয়। তুর্কি সরকারি মিডিয়া ‘টিআরটি’ এই মেগা প্রকল্পগুলির সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। প্রথমেই রয়েছে ইস্তাম্বুলের নতুন বিমানবন্দর। এর প্রথম স্টেজের কাজ ২০১৫এর মে মাসে শুরু হয়ে ২০১৮ সালের অক্টোবরে শেষ হয়; খরচ হয় প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার। তবে এর দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ স্টেজের কাজ ২০২৫ পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে। এরপর রয়েছে বসফরাস প্রণালির সমান্তরালে ৪৫ কিঃমিঃ লম্বা ইস্তাম্বুল ক্যানাল। ২০২১ সালের জুনে এরদোগান এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ছয় বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার খরচ হবে বলে বলছেন তিনি। তার নিজের কথায়, এটা একটা ‘উন্মাদীয় প্রকল্প’। এছাড়াও রয়েছে ৪৫ বিলিয়ন ডলার বাজেটের হাই স্পিড রেলওয়ে প্রকল্প। এর অংশ হিসেবে ইস্তাম্বুলে বসফরাস প্রণালির তলদেশ দিয়ে ‘মারমারায়’ পাতাল রেলের খরচ পড়বে ৫ বিলিয়ন ডলার। তারপর রয়েছে ইস্তাম্বুল ফাইনান্স সেন্টার; যা তৈরির মাধ্যমে এরদোগান ইস্তাম্বুলকে বিশ্বের একটা গুরুত্বপূর্ণ অর্থ বাজারে পরিণত করতে চান। এর বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ বিলিয়ন ডলার। এছাড়াও ১০ বিলিয়ন ডলার খরচে তুরস্কের মাঝ দিয়ে মধ্য এশিয়ার গ্যাস ইউরোপে রপ্তানির পাইপলাইন প্রকল্প চলমান। এই সবগুলি প্রকল্পই তুরস্কের অর্থনীতিতে বিশাল ঋণ যুক্ত করেছে এবং আরও করছে। পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপিতে করার কারণে প্রকল্পগুলির বেশিরভাগ ঋণই হলো বেসরকারি খাতে।

 
তুরস্কের মেগা প্রকল্প ইস্তাম্বুল বিমানবন্দর। মেগা প্রকল্পগুলি তুরস্কের অর্থনীতিতে বিশাল ঋণ যুক্ত করেছে এবং আরও করছে। পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপিতে করার কারণে প্রকল্পগুলির বেশিরভাগ ঋণই হলো বেসরকারি খাতে।

২০০২ সালে যখন ‘একে পার্টি’ ক্ষমতায় আসে, তখন কনজিউমার ঋণ ছিল তুরস্কের প্রতি পরিবারের গড় আয়ের প্রায় ৫ শতাংশ। ২০১৩ সাল নাগাদ এটা হয়ে যায় প্রায় ৫৫ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থনীতির আকার বড় করার উদ্দেশ্যে ‘একে পার্টি’ সাধারণ জনগণকে খরচ বাড়াতে উৎসাহ দিতে ব্যাপকহারে ঋণ দিতে থাকে। এই খরচার কারণে তুর্কি পরিবারগুলি নিজেদেরকে ধনী মনে করতে থাকে; কারণ এক দশকের মাঝে তাদের পারিবারিক সম্পদ বেড়ে তিনগুণ হয়ে যায়। তবে সমস্যা হলো এই সম্পদ তৈরি হয়েছে ঋণের উপর ভর করে। ঋণ ফেরত দিতে গিয়ে সীমিত আয়ের খুব স্বল্প অংশই সঞ্চয় হিসেবে রাখতে পেরেছে তারা। ২০১৪ সালে তুরস্কের জাতীয় সঞ্চয় হার ছিল মাত্র ১২ দশমিক ৬ শতাংশ; যা কিনা বড় উঠতি অর্থনীতিগুলির মাঝে সর্বনিম্ন। ব্যবসায়ীরাও লাভের আশায় কনজিউমার দ্রব্যের উপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছে; বড় শিল্প গড়ার উপর নয়। একারণে বাইরে থেকে আমদানি করা কনজিউমার দ্রব্যের চাহিদাও ব্যাপকহারে বেড়ে যায়। আইএমএফএর হিসেবে ২০১২ থেকে ২০১৪ সালের মাঝে তুরস্কের ব্যংকগুলির দেয়া মোট ঋণের মাঝে কন্সট্রাকশন সেক্টরে দেয়া ঋণের অংশ ৫০ শতাংশ থেকে বেড়ে গিয়ে ৭০ শতাংশে দাঁড়ায়। অর্থাৎ ব্যাংকগুলি কারখানা নয়, বরং এপার্টমেন্ট বিল্ডিং, অফিস বিল্ডিং এবং শপিং কমপ্লেক্সের জন্যে ঋণ দিতেই বেশি আগ্রহী ছিল। একইসাথে ২০১২ সালে রিয়েল এস্টেট সেক্টরে বিদেশী মালিকানার অনুমোদন দেয়ায় রিয়েল এস্টেটের মূল্য দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০১৫ সালে এক বছর আগের তুলনায় তুরস্কের বড় শহর ইস্তাম্বুলে বাড়ির মূল্য ২০ শতাংশ বেড়ে যায়।

বৈদেশিক ঋণের উপর ভর করে প্রবৃদ্ধি

২০০২ সালে যখন ‘একে পার্টি’ ক্ষমতায় আসে, তখন তুরস্কের জিডিপি ছিল আড়াই’শ বিলিয়ন ডলার। ২০১৩ সাল নাগাদ তা পৌঁছে যায় সাড়ে ৯’শ বিলিয়নে। অর্থাৎ মাত্র এক দশকে তুরস্কের অর্থনীতির আকার ৩ দশমিক ৮ গুণ বেড়ে যায়! তবে এই প্রবৃদ্ধির পিছনে ছিল ঋণের বোঝা। জাতীয় সঞ্চয় কমে যাবার কারণে দেশের কন্সট্রাকশন প্রকল্পগুলিতে বিনিয়োগ করার মত অর্থেরও ঘাটতি পড়ে যায়। এই ঘাটতি পূরণ করতে গিয়ে বিদেশ থেকে ঋণ নেয়া শুরু হয়। বৈদেশিক ঋণ তুরস্কের জিডিপির প্রায় ৫০ শতাংশ হয়ে যায়; যার বেশিরভাগই ছিল বেসরকারি ঋণ। তুরস্কের ‘আহভাল নিউজ’ বলছে যে, তুরস্কের বৈদেশিক ঋণ ২০২০ সাল নাগাদ সাড়ে ৪’শ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যায়; যার মাঝে বেসরকারি কর্পোরেট সেক্টরের ঋণই ছিল ৩’শ বিলিয়ন ডলার। এসকল ঋণ তুরস্ককে পরিশোধ করতে হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রায়; যা কিনা তুর্কি লিরার উপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করে। তবে দুর্বল মুদ্রাব্যবস্থা, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং ঘনঘন সরকারি নীতির পরিবর্তনের কারণে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা দেশটাতে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগে আগ্রহী হয়নি। সকলেরই উদ্দেশ্য ছিল স্বল্প সময়ের মাঝে মুনাফা করে নিয়ে দেশ ছেড়ে যাওয়া।

‘আহভাল নিউজ’ বলছে যে, তুর্কি লিরার দরপতনের পর থেকে তুরস্কের কেন্দ্রীয় ব্যাংক লিরাকে শক্তিশালী করতে ব্যাপক হারে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহার করতে থাকে। এতে লিরার মূল্য স্থিতিশীল না হলেও তুরস্কের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ মারাত্মকভাবে কমে যায়। অপরদিকে এরদোগানের ঋণ গ্রহণ সহজ করে বেসরকারি খরচ বাড়াবার নীতির কারণে মুদ্রাস্ফীতি ব্যাপকহারে বাড়তে থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০১৮ সালের মে মাস থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মাঝে সুদের হার ৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৪ শতাংশে নিয়ে যায়; অর্থাৎ তিনগুণ করে ফেলে! কিন্তু তারপরেও ২০১৯ সালের মাঝামাঝি মুদ্রাস্ফীতি ১৪ বছরের মাঝে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়ে যায়। কিন্তু ঋণের অর্থ অনেক ক্ষেত্রেই আমদানি করা পণ্যের পিছনে খরচ হতে থাকে। যার ফলশ্রুতিতে রপ্তানির চাইতে আমদানি অনেক বেশি বেড়ে যায়। করোনা মহামারির আগ পর্যন্ত বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং পর্যটনের মাধ্যমে তুরস্ক তার বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি পূরণ করতো। ২০১৯ সালে এক পর্যটন শিল্প থেকেই এসেছিল সাড়ে ৩৪ বিলিয়ন ডলার। করোনার কারণে পর্যটন শিল্পে ধ্বস নামায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উপর চাপ পড়তে শুরু করে। আর ২০২০এর জুলাইএ বিদেশী বিনিয়োগকারীরা তুরস্কের বন্ড মার্কেট থেকে ব্যাপকহারে পালাতে থাকলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সংকট শুরু হয়।

 
সরকারি হিসেবে তুরস্কের মুদ্রাস্ফীতি ২১ শতাংশ। বেসরকারি হিসেবে তা ৫৯ শতাংশ পর্যন্ত। ২০২২ সালে মুদ্রাস্ফীতি ৩০ শতাংশ হতে পারে। বাজারে ঘনঘন মূল্য তালিকা পরিবর্তন করতে হচ্ছে। এরদোগান তার লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তুরস্কের জনগণের উপর ঋণের বোঝা চাপিয়েছেন; দ্রব্যমূল্যের চাপে জনগণের জীবন হয়েছে দুর্বিসহ। তার দেশের সবচাইতে বড় হুমকি এখন তার নীতি ‘এরদোগানোমিকস’।

আকশচুম্বি মুদ্রাস্ফীতি এবং তুর্কি লিরার দরপতনের রেকর্ড

২০২১এর ডিসেম্বরে এরদোগান ২০২২ সালে ৬০ লাখের বেশি মানুষের জন্যে সর্বনিম্ন বেতন ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে ৪ হাজার ২’শ ৫৩ লিরা বা প্রায় ২’শ ৭০ ডলারে উন্নীত করেন। এটা ছিল ৫০ বছরে সর্বোচ্চ বেতন বৃদ্ধি। ফলস্বরূপ একদিনে তুর্কি লিরার মূল্য ৫ শতাংশ কমে গিয়ে এক ডলারে সাড়ে ১৫ ছাড়িয়ে যায়; যা সর্বনিম্নের রেকর্ড। অথচ এর আগে ২০২০ সালের অগাস্টে ২০ শতাংশ মূল্য হারাবার পরেও ডলারে পাওয়া যেতো ৭ দশমিক ৪ লিরা। ২০২১ সালের মাঝে লিরার মূল্য আরও ৫০ শতাংশ পড়ে যায়। সরকারি হিসেবে গত নভেম্বরে মুদ্রাস্ফীতি ২১ শতাংশে ঠেকে। কিন্তু তুরস্কের অর্থনীতিবিদদের সংগঠন ‘ইএনএজি’র হিসেবে এই মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ৫৯ শতাংশ! মুদ্রাস্ফীতি কমাতে এবং মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতিতে পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে অনেক দেশেই সুদের হার যখন বাড়ানো হচ্ছে, তখন তুরস্কে সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মাঝে সুদের হার ১৯ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৪ শতাংশ করা হয়। কারণ এরদোগান মনে করছেন যে, সুদের হারের কারণেই মুদ্রাস্ফীতি হচ্ছে। ‘নিকেই এশিয়া’র সাথে সাক্ষাতে ‘ক্যাপিটাল ইকনমিকস’এর জেসন টুভে বলছেন যে, ২০২২ সালের প্রথমার্ধের মাঝে লিরার মূল্য যেমন স্থির হবার সম্ভাবনা কম, তেমনি মুদ্রাস্ফীতিও কমবে না। কাজেই এরদোগান সম্ভবতঃ তার সুদের হার কমাবার নীতি অব্যাহত রাখবেন। বেশিরভাগ অর্থনীতিবিদেরাই বলছেন যে, তুরস্কের মুদ্রাস্ফীতি ২০২২ সালে সরকারি হিসেবে ৩০ শতাংশ হতে পারে; তবে ‘ইএনএজি’র হিসেবে তা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ হতে পারে! কারণ সরকারের বেতন বৃদ্ধির প্রভাবগুলি তখন অর্থনীতিতে পড়তে থাকবে।

এদিকে তুর্কি লিরার দরপতনের কারণে তুরস্কের আমদানি ব্যয় ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ‘নিকেই এশিয়া’ বলছে যে, দেশীয় মুদ্রার মূল্য নিম্নগামী হওয়ায় তুর্কিরা তাদের সঞ্চয় লিরা থেকে পরিবর্তন করে বৈদেশিক মুদ্রা, স্বর্ণ, স্টক, ক্রিপ্টোকারেন্সি এমনকি বাড়িঘরে নিয়ে যাচ্ছে। তুরস্কের ব্যাংকে সঞ্চিত সকল সম্পদের মাঝে ৬২ শতাংশই এখন বৈদেশিক মুদ্রায়। তুরস্কের ব্যাংকিং সেক্টর বিশ্লেষক উগুর গারসেস ‘নিকেই এশিয়া’কে বলছেন যে, লিরার দরপতন ঠেকানো না গেলে অর্থনীতিতে স্থবিরতা আসতে পারে; আবার ব্যাংকগুলি থেকে গ্রাহকরা তাদের গচ্ছিত অর্থ ব্যাপকহারে সরিয়ে নিতে পারে। ‘ডয়েচে ব্যাংক’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, যেভাবে মানুষ লিরা থেকে ডলারের দিকে যাচ্ছে এবং ফলশ্রুতিতে লিরার দরপতন হচ্ছে, এবং একইসাথে মুদ্রাস্ফীতি যেভাবে বাড়ছে, তাতে জরুরি ভিত্তিতে সুদের হার বাড়ানোটাও বেশ কঠিন হয়ে যাবে।

এরদোগান নতুন তুরস্কের জনক হতে চাইছেন?

এরদোগান তার নীতিকে ‘অর্থনৈতিক স্বাধীনতার যুদ্ধ’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। অর্থনৈতিক নীতির সাফল্য দেখাতে এরদোগানের সরকার পরিসংখ্যানও পরিবর্তন করেছে। ‘ব্লুমবার্গ’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ২০১৬ সালে এরদোগান তুরস্কের জিডিপির হিসাবে বিরাট পরিবর্তন আনেন; যার ফলশ্রুতিতে তুরস্কের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আগের চাইতে বেশি বলে প্রতীয়মান হতে থাকে। নতুন হিসাবে ২০০৯ সালের আগ পর্যন্ত ‘একে পার্টি’র সময়ে তুরস্কের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল গড়ে ৭ দশমিক ১ শতাংশ; ২০০৯ সাল থেকে ২০১৫ সালের মাঝে তা ছিল ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। অথচ হিসাব পরিবর্তনের আগে ২০০৯ সালের আগ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৮ শতাংশ; আর ২০০৯ সালের পর ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পরিসংখ্যানও ভালো কোন প্রতিচ্ছবি দেখাতে পারেনি। বিশ্বব্যাংকের হিসেবে ২০১৩ সালে তুরস্কের জিডিপি ছিল ৯’শ ৫৮ বিলিয়ন ডলার; ২০২০ সালে তা দাঁড়ায় ৭’শ ২০ বিলিয়নে। অর্থাৎ ২০১৩ থেকে ২০২০এর মাঝে তুরস্ক তার জিডিপির এক চতুর্থাংশ হারিয়েছে।

 
এরদোগান তার সুদ কমাবার নীতিকে ইসলামের সাথে যুক্ত করতে চাইছেন; যদিও ইসলামে যে সুদ পুরোপুরিভাবে নিষিদ্ধ, তা তার অজানা থাকার কথা নয়। তথাপি তিনি তুর্কি জনগণের ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে ইসলামিক দেখাতে চাইছেন। ২০২৩ সালের নির্বাচনে জেতার জন্যে এরদোগান সকল কিছুই করবেন। যার অংশ হিসেবে মারাত্মক মুদ্রাস্ফীতির মাঝে যখন প্রতিনিয়ত দোকানে পণ্যের মূল্য পরিবর্তন করতে হচ্ছে, তখন তিনি ব্যাপকহারে বেতন বৃদ্ধি করেছেন। দেশের মানুষের জাতীয়বাদ জাগিয়ে তুলতে নতুন কোন রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিতেও তিনি হয়তো পিছপা হবেন না।

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মার্ক চ্যাম্পিয়ন ‘ব্লুমবার্গ’এর এক লেখায় বলছেন যে, এরদোগান চাইছেন নতুন করে একটা ‘নরম প্রকৃতির ইসলামিস্ট তুরস্ক’ তৈরি করতে; যার ভিত্তি হিসেবে তিনি কম সুদের হার এবং দ্রুত বর্ধমান কন্সট্রাকশন ইন্ডাস্ট্রিকে রাখতে চাইছেন। ২০২৩ সালের মাঝে এরদোগান কিছু মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে তুরস্কের আকৃতিই পরিবর্তন করে ফেলতে চাইছেন। অপরদিকে এরদোগান এবং তার ‘একে পার্টি’র সাথে সমমনা ‘ইসলামিস্ট’ ব্যবসায়ীরাই এর মাঝে সরকারি নীতির সুবিধা ভোগ করবে; আর তার বিরোধী কট্টর সেকুলাররা বঞ্চিত হবে। তুরস্কের কর কাঠামোগুলিকে এমনভাবে সাজানো হচ্ছে, যাতে করে সমাজের পুরোনো এলিটদের হাত থেকে সম্পদ নতুন এলিটদের হাতে চলে আসে। মার্ক চ্যাম্পিয়ন মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, তুরস্কে এহেন নীতি নতুন নয়। এরদোগানের আগে যারা ক্ষমতায় ছিল, তারা সামরিক বাহিনী এবং কট্টর সেকুলারদেরকে সুবিধা দিতো; মুদ্রানীতিও সেই আঙ্গিকেই হতো। প্রকৃতপক্ষে এরদোগান নতুন একজন ‘আতাতুর্ক’ বা নতুন এক তুরস্কের জনক হতে চাইছেন।

‘নিকেই এশিয়া’ বলছে যে, এরদোগান যেভাবে তুরস্কের অর্থনীতির কর্তৃত্ব নিয়েছেন, তাতে নিজের সিদ্ধান্ত উল্টে ফেলে নির্বাচনের আগে সুদের হার বৃদ্ধি করা রাজনৈতিকভাবে খুবই কঠিন হবে। এরদোগান তার সুদ কমাবার নীতিকে ইসলামের সাথে যুক্ত করতে চাইছেন; যদিও ইসলামে যে সুদ পুরোপুরিভাবে নিষিদ্ধ, তা তার অজানা থাকার কথা নয়। তথাপি তিনি তুর্কি জনগণের ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে ইসলামিক দেখাতে চাইছেন। মার্ক চ্যাম্পিয়ন বলছেন যে, এরদোগান একটা নরম ‘প্রকৃতির ইসলামিস্ট তুরস্ক’ তৈরি করে নতুন তুরস্কের জনক হতে চাইছেন। আর এরদোগানের সমালোচকেরাই তার নীতিকে ইসলামিক বলে সার্টিফিকেট দিচ্ছেন। ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’এর এক লেখায় ‘ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’এর সিনিয়র ফেলো আসলি আয়দিনতাসবাস এরদোগানের তথাকথিত ‘ইসলামিস্ট’ নীতির সমালোচনা করে বলছেন যে, একুশ শতকের জটিল অর্থনীতি সপ্তম শতাব্দীর নীতি দ্বারা চালনা করা সম্ভব নয়। তার কথায় অর্থনীতি চালাবার জন্যে বিজ্ঞজনদের নিয়ে এসে তাদের কথা শুনতে হবে। অর্থাৎ তিনি সার্টিফিকেট দিচ্ছেন যে, এরদোগানের সুদের হার কমাবার নীতি ইসলাম সমর্থিত।

২০২৩ সালের নির্বাচনে জেতার জন্যে এরদোগান সকল কিছুই করবেন। যার অংশ হিসেবে মারাত্মক মুদ্রাস্ফীতির মাঝে যখন প্রতিনিয়ত দোকানে পণ্যের মূল্য পরিবর্তন করতে হচ্ছে, তখন তিনি ব্যাপকহারে বেতন বৃদ্ধি করেছেন। দেশের মানুষের জাতীয়বাদ জাগিয়ে তুলতে নতুন কোন রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিতেও তিনি হয়তো পিছপা হবেন না। কিন্তু তার ২০২৩ সালের মাঝে তুরস্ককে বিশ্বের ১০ম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য বাস্তবায়িত হওয়া থেকে বহুদূরে। আইএমএফএর হিসেবে তুরস্কের অর্থনীতি ২০২১ সালে ছিল বিশ্বের ২০তম। বরং সেই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তিনি তুরস্কের জনগণের উপর ঋণের বোঝা চাপিয়েছেন; দ্রব্যমূল্যের চাপে জনগণের জীবন হয়েছে দুর্বিসহ। তার দেশের সবচাইতে বড় হুমকি এখন তার নীতি ‘এরদোগানোমিকস’। তুর্কি জনগণ তাদের উসমানি খিলাফতের স্বপ্নে বিভোর; যেই স্বপ্নকে দেখিয়েই এরদোগান তার জনমতের ভিত তৈরি করেছেন। কিন্তু ২০২২ সালে ‘এরদোগানোমিকস’এর অব্যবস্থাপনার কারণে সেই স্বপ্নে ভাটা পড়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

Monday, 5 October 2020

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ধ্বস কি আসন্ন?

০৫ই অক্টোবর ২০২০

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা পশ্চিমা চিন্তার একটা গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ মুক্ত বাজারের সাইনবোর্ড। সারা বিশ্বকে একটা মুক্ত বাজারের অধীনে আনার যে লক্ষ্য নিয়ে ‘ডব্লিউটিও’র যাত্রা শুরু, ২৫ বছর পর সেই লক্ষ্য অবাস্তব ঠেকছে। জাতিরাষ্ট্রগুলির নিজস্ব স্বার্থকে পেরিয়ে সংস্থার আইনগুলিকে প্রাধান্য দেবার জন্যে কেউই প্রস্তুত নয়; এমনকি সুপারপাওয়ার যুক্তরাষ্ট্রও। আর করোনাভাইরাসের মহামারি এবং মহামন্দার মাঝে জাতিরাষ্ট্রগুলিও ক্রমেই আরও রক্ষণশীল হচ্ছে; দূরে চলে যাচ্ছে সংস্থার প্রাথমিক লক্ষ্য মুক্ত বাজার।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বা ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন’ বা ‘ডব্লিউটিও’এর নতুন ডিরেক্টর জেনারেল নির্বাচন চলছে। বিদায়ী ডিরেক্টর জেনারেল ব্রাজিলের নাগরিক রবার্তো আজেভেদো তার মেয়াদ শেষের এক বছর আগেই পদত্যাগ করার কারণে নির্বাচনী কর্মকান্ড আগেভাগেই শুরু করতে হয়েছে। ১৮ই সেপ্টেম্বর পাঁচজন প্রার্থী প্রাথমিক নির্বাচনে সামনে এসেছেন; এরা হলেন কেনিয়ার মন্ত্রী আমিনা মোহামেদ, নাইজেরিয়ার প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী নগোজি ওকোঞ্জো ইওয়েআলা, দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী ইয়ু মিউংহি, সৌদি আরবের মোহাম্মদ আল তুওয়াইজরি এবং ব্রিটেনের প্রাক্তন মন্ত্রী লায়াম ফক্স। ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’ বলছে যে, সৌদি আরব আর ব্রিটেনের প্রার্থীরা প্রথম রাউন্ডের পরেও টিকে যাবেন, এটা অনেকেই ভাবেনি। তিনজন প্রার্থী বাদ পড়েছেন; যারা হলেন মেক্সিকোর জিসাস সীদ, মিশরের হামাদ মামদুহ এবং মলদোভার তুদর উলিয়ানভশি। ২৪শে সেপ্টেম্বর থেকে ৬ই অক্টোবর পর্যন্ত দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে সংস্থার ১’শ ৬৪টা সদস্য দেশ ভোট দিয়ে প্রার্থীর সংখ্যা দুইয়ে নামিয়ে নিয়ে আসবে। সংস্থা বলছে যে, নভেম্বরের শুরুতেই তারা নতুন ডিরেক্টর জেনারেল নির্বাচিত করে ফেলতে চাইছেন। সংস্থাটা ভূরাজনীতিতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝার জন্যে এটাই যথেষ্ট যে, কেউ কেউ মনে করছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের ৩রা নভেম্বরের নির্বাচনের কারণে সংস্থার ডিরেক্টর জেনারেল নিয়োগের সময়সীমা বৃদ্ধি পেতে পারে। ‘রয়টার্স’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, যে-ই ডিরেক্টর জেনারেল হোন না কেন, তার জন্যে বেশ কঠিন সময় অপেক্ষা করছে; বিশেষ করে করনাভাইরাসের মহামারি এবং বিশ্বব্যাপী মহামন্দার মাঝে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সকলেই রক্ষণশীল আচরণ করছে। আর বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মাঝে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা চরম আকার নিয়েছে, যেখানে বাণিজ্য যুদ্ধ একটা গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সংস্কারের দাবি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে জেঁকে ধরেছে। অনেকেই ডিরেক্টর জেনারেল নির্বাচন নিয়ে কথা বললেও এটা সংস্থার মূল চ্যালেঞ্জ নয়। বরং চ্যালেঞ্জগুলি এতটাই জটিল যে, তা সংস্থার ভবিষ্যৎকেই হুমকির মাঝে ফেলে দিয়েছে। এই হুমকিকে বুঝতে সংস্থার ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিশ্বব্যাপী মুক্ত বাজার তৈরি করতে ১৯৪৭ সালে ‘জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফস এন্ড ট্রেড’ বা ‘জিএটিটি’ বা ‘গ্যাট’ প্রতিষ্ঠিত হয়। ২৩টা দেশ এর সদস্য ছিল। আর এই সংস্থা কার্যক্রম চালিয়ে যায় ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত; ১৯৯৫ সালে ‘উরুগুয়ে রাউন্ড’ আলোচনা শেষে ১’শ ২৩টা দেশের সমন্বয়ে ‘ডব্লিউটিও’ গঠন করা হয়। ‘গ্যাট’এর সদস্যরাষ্ট্রগুলি যে আইনের মাঝে ছিল, সেই আইন ‘ডব্লিউটিও’র মাঝেও চালিয়ে নেয়া হয়েছে। কিন্তু সদস্যরাষ্ট্রগুলির মাঝে বাণিজ্যের দ্বন্দ্ব থামানো যায়নি। ১৯৯৫ সালের পর থেকে দ্বন্দ্বের কারণে সংস্থার আইনে কোন পরিবর্তনই আনা সম্ভব হয়নি। যেকারণে সদস্যদের মাঝে দ্বন্দ্ব নিরসনে আপিল বডি অনেক বেশি হারে আইনের ‘ব্যাখ্যা’র আশ্রয় নিয়েছে। বড় অর্থনীতির দেশগুলি নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্যেই সংস্থাকে ব্যবহার করতে চেয়েছে; যেকারণে সংস্থার ২৫ বছরের ইতিহাস শুধুই সংঘাতে পরিপূর্ণ। বিশেষ করে ২০০১ সালে চীনকে সংস্থার সদস্য করে নেবার পর থেকে এই দ্বন্দ্ব নতুন গতি পেয়েছে। সংস্থার সদস্য হবার জন্যে চীনকে অন্যদের তৈরি আইন মেনে নিতে হয়েছে; মেনে নিতে হয়েছিল বেশকিছু শর্তও, যেগুলি পশ্চিমা আদর্শের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে বাকস্বাধীনতা এবং মানবাধিকার বিষয়ে ছাড়া দেবার বিষয়ে বলা হয়। তবে আইনের ফাঁকফোঁকড়ে আটকে যায় সেসব বিষয়; ‘যুক্তিসঙ্গত সময়’এর সংজ্ঞার ব্যাপারে কেউই একমত হতে পারেনি। এই শর্তগুলি চীন কতদিনে এবং কিভাবে পূরণ করবে, তা এখনও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের বিভেদের কারণ।

 

নিজের স্বার্থের বিপক্ষে গেলেই যুক্তরাষ্ট্র সংস্থার আপিল বডির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আর সংস্থার আইনগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা যুক্তির অভাব হয়নি। চীনের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে ‘ডব্লিউটিও’ অনেক ক্ষেত্রেই অর্থহীন হয়ে পড়েছে।


যুক্তরাষ্ট্র বনাম ‘ডব্লিউটিও’

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ কর্মকান্ডগুলির মাঝে একটা হলো সদস্যরাষ্ট্রগুলির মাঝে বাণিজ্যিক বিরোধের নিষ্পত্তি করা। দ্বন্দ্ব নিরসণের পদ্ধতির মাঝে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘এপেলেইট বডি’ বা আপিল বডি। এতে সাতজন সদস্য থাকার কথা রয়েছে, যারা মূলতঃ বিচারক। চার বছর মেয়াদে নিয়োগ পাওয়া এই সদস্যারা সর্বোচ্চ দুইবার সদস্যপদ পেতে পারেন। সংস্থার নিয়মানুসারে সদস্যদের ‘স্বাধীনভাবে’ সিদ্ধান্ত দিতে পারার শর্ত রয়েছে। তাদের রিপোর্টের উপর ভিত্তি করেই সংস্থার দ্বন্দ্বগুলি নিরসন হয়ে আসছে। তবে আপিল বডির ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ রয়েছে। ২০১১ সালে বারাক ওবামা হোয়াইট হাউজে থাকার সময় আপিল বডির সদস্য জেনিফার হিলম্যানের পুনরায় নিয়োগ পাওয়া বন্ধ করে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। নিয়মানুসারে সদস্য যদি তার পদে বহাল থাকতে ইচ্ছুক থাকেন, তবে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনরায় নিযুক্ত হয়ে যাবেন। তবে হিলম্যানের ক্ষেত্রে কোন কারণ উল্লেখ না করেই ভেটো দেয় যুক্তরাষ্ট্র। মজার ব্যাপার হলো, হিলম্যান একজন মার্কিন নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অনাস্থা এসেছিল। আর একইসাথে কোন কারণ না দেখাবার ফলে ‘ডব্লিউটিও’র ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকে অনেকেই স্বেচ্ছাচারিতা হিসেবে দেখতে শুরু করে। আবার আপিল বডির ‘স্বাধীনতা’র ব্যাপারেও সন্দেহ দেখা দেয়। হিলম্যানের এই ঘটনার পর একই রকম ব্যাপার ঘটে কোরিয়ার নাগরিক সিউং হোয়া চ্যাংএর ক্ষেত্রেও। ২০১৬ সালে তার দ্বিতীয় দফা নিয়োগের ক্ষেত্রে ভেটো দেয় যুক্তরাষ্ট্র। তবে এবার জানা যায় যে, তিনটা রুলিং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়েছে, যেখানে চ্যাং ছিলেন তিন সদস্যের আপিল কমিটির চেয়ারম্যান। মার্কিন প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত মাইকেল পাঙ্কএর কথায়, এই রুলিংগুলির প্রথমটা ছিল চীনের ১৭টা পণ্যের উপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশোধমূলক শুল্কারোপ; চীন এক্ষেত্রে আপিল জিতেছিল। দ্বিতীয়টা ছিল চীনা পণ্যের উপর যুক্তরাষ্ট্রের এন্টি ডাম্পিং শুল্কারোপ। আর তৃতীয়টা ছিল আর্জেন্টিনা এবং পানামার মাঝে পণ্য এবং সার্ভিসের উপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ছিল তৃতীয় পক্ষ। যুক্তরাষ্ট্র বলে যে, আর্জেন্টিনা যেভাবে পানামার বিপক্ষে মামলা জিতেছে, তা সংস্থার আইনের সাথে যায় না। মাইকেল পাঙ্ক আরও বলেন যে, সংস্থার আইনকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ‘আইন তৈরি’ করার এখতিয়ার নেই আপিল বডির। তিনি আরও ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে, প্যানেল জুরি যদি আইনী জটিলতার কারণে কোন ইস্যুর সমাধান দিতে না পারে, তাহলে আপিল বডির উচিৎ নয় সেটার সমাধান করতে যাওয়া। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যখন কোন বাণিজ্য দ্বন্দ্ব নিয়ে দুই পক্ষের লড়াই শুরু হয়, তখন প্রথমেই প্যানেল জুরির সামনে শুনানি হয়। এই প্যানেল হলো এড হক প্রকৃতির; একেকটা বিশেষ সমস্যার জন্যে একেকটা বিশেষজ্ঞ প্যানেল তৈরি করা হয় এবং রিপোর্ট দেয়া শেষে প্যানেল ভেঙ্গে দেয়া হয়। এই রিপোর্ট পাঠানো হয় আপিল বডির কাছে। লিখিত বক্তব্যে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি টিম রাইফ বলেন যে, ওবামা প্রশাসন সংস্থার আইনকে সমুন্নত রাখা ছাড়াও মার্কিন কর্মী, কৃষক এবং ব্যবসায়ীদের স্বার্থকে তুলে ধরবে। আরও বলা হয় যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রের মাঝে আলোচনার মাধ্যমে যে আইনগুলি তৈরি করা হয়েছে, সেগুলি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার অধীন আপিল বডি নিজেদের মতো করে পরিবর্তন করে নিতে পারে না।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় পশ্চিমা এক দেশের প্রতিনিধি অভিযোগ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা সিদ্ধান্তের ফলে আপিল বডির সদস্যদের কাছে এই বার্তা গেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে রুলিং না গেলে চাকুরি খোয়াতে হবে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা দ্বন্দ্ব নিরসনে কি সিদ্ধান্ত দেবে, তা নির্ধারণ করবে যুক্তরাষ্ট্র। ওবামা প্রশাসনের পদক্ষেপ ট্রাম্প প্রশাসন আরও একধাপ এগিয়ে নেয়। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র মরিশাসের নাগরিক শ্রী বাবু চেকিতান সেরভাসিংএর পুনরায় নিয়োগে ভেটো দিলে মাত্র তিনজন সদস্য অবশিষ্ট থাকে। আপিল বডিতে যেকোন শুনানি হতে হলে কমপক্ষে তিনজন সদস্য থাকতে হবে। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, সংস্থার ৬৭টা সদস্য রাষ্ট্র ওয়াশিংটনের কাছে পিটিশন দেয়, যাতে যুক্তরাষ্ট্র তার ভেটো তুলে নেয়। আপিল বডির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যে অভিযোগগুলি রয়েছে, তার মাঝে প্রধান হলো বিশেষজ্ঞ প্যানেলের দেয়া রিপোর্ট আপিল বডি অনেক ক্ষেত্রেই পরিবর্তন করে অথবা পুরোপুরি উল্টিয়ে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র বলছে যে, এই কাজ করার ক্ষমতা আপিল বডির নেই। মার্কিনীরা আরও বলছে যে, সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী ৯০ দিনের মাঝে আপিল বডির কাজ শেষ হবার কথা থাকলেও সকল ক্ষেত্রেই আপিল বডির হস্তক্ষেপে রুলিংএ দেরি হয়। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র বলছে যে, সংস্থার আইনে ফাঁকফোঁকড় থাকার কারণে আপিল বডির সদস্যরা নিজেদের মতো করে রুলিং দিচ্ছেন, যা কিনা নতুন আইন হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাচ্ছে। তারা সদস্য রাষ্ট্রগুলির নিজস্ব আইনের ব্যাখ্যাও দিচ্ছেন নিজেদের মতো করে। আপিল বডির সদস্যরা সংস্থার আইন নতুন করে তৈরি করে দিতে পারেন না। আইনের যে জায়গাটাতে যুক্তরাষ্ট্র বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে তা হলো ‘যুক্তিসংগত সময়’। রুলিংএর সময় কোন সদস্য রাষ্ট্রকে সংস্থার আইন মানার জন্যে ‘যুক্তিসংগত সময়’ বেধে দেয়ার কথা থাকলেও এই ‘যুক্তিসংগত সময়’ আসলে কত, তা নিয়ে একেকজনের ভাবনা একেক রকম। এই বেধে দেয়া সময়ের মাঝে কেউ যদি আইন বাস্তবায়ন না করে, তাহলেও তার বিরুদ্ধে তেমন কোন কিছুই করার নেই সংস্থার। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র বলছে যে, সংস্থার আইন যদি যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কোন অবস্থাতেই সেই আইন বাস্তবায়ন করবে না। আগের প্রশাসনগুলির মতো চাপা না থেকে ট্রাম্প প্রশাসন এক্ষেত্রে একেবারে রাখঢাক না রেখেই বলছে যে, আপিল বডির সদস্যরা অন্য দেশের হবার কারণে তারা অন্য দেশের স্বার্থ দেখে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ নয়। সংস্থায় একটা অলিখিত নিয়ম ছিল যে, আপিল বডির সাতজন সদস্যের মাঝে একজন করে আসবেন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং জাপান থেকে। বাকি সকল রাষ্ট্রের জন্যে থাকবে বাকি চারটা আসন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যখন আমেরিকান নাগরিককেই সদস্য পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছে, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে, সংস্থার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে হিমসিম খাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।

 

সংস্থার আপিল বিভাগের কর্মকান্ড পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় ২০১৯এর ডিসেম্বরে; যখন শেষ তিনজন সদস্যের মাঝে দুইজনের মেয়াদ শেষ হয়ে যায় এবং যুক্তরাষ্ট্র তাদের পুনরায় নিয়োগের ব্যাপারে ভেটো দেয়। খুব সম্ভবতঃ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মৃত্যুর শুরু এখানেই। আম্পায়ার ছাড়া খেলা চলতেই পারে; কিন্তু অভিজ্ঞতা থেকে মানুষ জানে যে, আম্পায়ার ছাড়া খেলায় সমস্যা হবেই।


বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার উপসংহার?

আসলে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আইনের তোয়াক্কা করেনি কোনদিনই। জেনেভার ‘থার্ড ওয়ার্ল্ড নেটওয়ার্ক’এর চক্রবর্তী রাঘাবন মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার দ্বন্দ্ব নিরসনের বেশিরভাগ রুলিং বাস্তবায়ন না করার বিশেষ রেকর্ড রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। এর মাঝে বেশিরভাগই হলো যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এন্টি ডাম্পিং শুল্ক এবং পাল্টা শুল্ক আরোপের ব্যাপারে রুলিং। অনেক আমদানির ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্র রপ্তানিকারকের খরচকে কম হিসেব করে এন্টি ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে যে, আপিল বডির রুলিং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আইনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলেই তারা এগুলির বাস্তবায়ন করেনি।

সংস্থার আপিল বিভাগের কর্মকান্ড পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় ২০১৯এর ডিসেম্বরে; যখন শেষ তিনজন সদস্যের মাঝে দুইজনের মেয়াদ শেষ হয়ে যায় এবং যুক্তরাষ্ট্র তাদের পুনরায় নিয়োগের ব্যাপারে ভেটো দেয়। ‘ডয়েচে ভেলে’র সাথে কথা বলতে গিয়ে লন্ডনের ‘বেরেনবার্গ ব্যাঙ্ক’এর প্রধান অর্থনীতিবিদ হোলগার শ্মাইডিং বলেন যে, খুব সম্ভবতঃ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মৃত্যুর শুরু এখানেই। আম্পায়ার ছাড়া খেলা চলতেই পারে; কিন্তু অভিজ্ঞতা থেকে মানুষ জানে যে, আম্পায়ার ছাড়া খেলায় সমস্যা হবেই। ‘দ্যা ইকনমিস্ট’ বলছে যে, সংস্থার রেফারি চলে যাবার সাথে সাথে এর আলোও নিভে যাচ্ছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র সংস্থাকে দুর্বল করতে চাইলেও আরেক পক্ষ চাইছে এটাকে টিকিয়ে রাখতে। ২০১৮ সালের অক্টোবরে সংস্থার সংস্কারের লক্ষ্যে একটা আলোচনার আয়োজন করে কানাডা, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনকে আমন্ত্রণই জানানো হয়নি। গত বছরের নভেম্বরে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় নিউজিল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত ডেভিড ওয়াকার আপিল বডিকে নিয়ে কিছু প্রস্তাব দেন। তার লক্ষ্য ছিল আপিল বডির কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং যুক্তরাষ্ট্র যা যা চেয়েছে, সেগুলি মেনে নেয়া। তার প্রস্তাবগুলির মাঝে ছিল, আপিল বডির সিদ্ধান্ত ৯০ দিনের মাঝে দেবার ব্যাপারটা নিশ্চিত করা; আপিল বডির সদস্যরা যেন নিজেদের উপর অর্পিত ক্ষমতার বাইরে গিয়ে কোন ধরনের উপদেশ দিতে না যান; পূর্বের দেয়া আপিল বডির রুলিংকে যেন তারা আইনের উদাহরণ হিসেবে না নেন; আর তারা যেন খেয়াল রাখেন যে সদস্য দেশগুলির উপর তারা যেন সংস্থার ১৯৯৫ সালের আইনের বাইরে নতুন কোন বাধ্যবাধকতা আরোপ না করেন। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ওয়াকারের প্রস্তাবের সমর্থন রয়েছে। মার্কিন থিঙ্কট্যাংক ‘কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশন্স’এর এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের উচিৎ ওয়াকারের চিন্তাগুলিকেই পুঁজি করে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আপিল বডিকে টিকিয়ে রাখা; নাহলে তা শুধু আপিল বডিকেই না, পুরো বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা এবং বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য ব্যবস্থাকেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে। শিকাগোভিত্তিক আইন বিষয়ক কোম্পানি ‘বেকার ম্যাকেঞ্জি’ বলছে যে, ইতোমধ্যেই ইউরোপ এবং কানাডা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আপিল বডির বিকল্প খুঁজতে শুরু করেছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন দ্বিপাক্ষিক দিকটাকে প্রাধান্য দিয়ে কানাডা এবং নরওয়ের সাথে আলোচনায় আপিল বডির মতোই একটা ব্যবস্থা নিজেরা তৈরি করে নিতে চাইছে। ওয়াকারের প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্রের দুশ্চিন্তাগুলি সমাধানের চেষ্টা করা হলেও তা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যথেষ্ট মনে হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ছোটখাটো কোন পরিবর্তন চাইছে না; বরং পুরো সংস্থাটার আমূল পরিবর্তন করতে চাইছে।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা পশ্চিমা চিন্তার একটা গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ মুক্ত বাজারের সাইনবোর্ড। সারা বিশ্বকে একটা মুক্ত বাজারের অধীনে আনার যে লক্ষ্য নিয়ে ‘ডব্লিউটিও’র যাত্রা শুরু, ২৫ বছর পরেও সেই লক্ষ্য অবাস্তব ঠেকছে। জাতিরাষ্ট্রগুলির নিজস্ব স্বার্থকে পেরিয়ে সংস্থার আইনগুলিকে প্রাধান্য দেবার জন্যে কেউই প্রস্তুত নয়; এমনকি সুপারপাওয়ার যুক্তরাষ্ট্রও। নিজের স্বার্থের বিপক্ষে গেলেই যুক্তরাষ্ট্র সংস্থার আপিল বডির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আর সংস্থার আইনগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা যুক্তির অভাব হয়নি। চীনের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে ‘ডব্লিউটিও’ অনেক ক্ষেত্রেই অর্থহীন হয়ে পড়েছে। আর করোনাভাইরাসের মহামারি এবং মহামন্দার মাঝে জাতিরাষ্ট্রগুলিও ক্রমেই আরও রক্ষণশীল হচ্ছে; দূরে চলে যাচ্ছে সংস্থার প্রাথমিক লক্ষ্য মুক্ত বাজার। শুধু তা-ই নয়, এর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকেই সন্দিহান হয়ে পড়েছেন। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার এহেন করুণ অবস্থা পুঁজিবাদী আদর্শের উপর একটা কঠিন আঘাত হিসেবেই এসেছে।