Showing posts with label intelligence. Show all posts
Showing posts with label intelligence. Show all posts

Sunday, 5 February 2023

বেলুন কান্ড ও এর সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক ফলাফল

০৬ই ফেব্রুয়ারি ২০২৩

যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে চীনের বিশাল বেলুনকে অতিক্রম করছে মার্কিন বিমান বাহিনীর 'এফ-২২' যুদ্ধবিমান। মার্কিন গোয়েন্দা বিমানগুলি যখন নিয়মিতভাবেই চীনের কাছাকাছি ঘুরে চীনাদের অস্বস্তির মাঝে ফেলছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে চীনের বেলুনের অবাঞ্ছিত প্রবেশকে অতিরঞ্জিত করে দেখানো হচ্ছে বলেই প্রতীয়মান হয়; যা চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমান্বয়ে উত্তেজনা বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যের দিকেই নির্দেশ করে।

মার্কিন আকাশসীমায় চীনের তৈরি বিশাল একটা বেলুনের প্রবেশকে ঘিরে ব্যাপক আলোচনা চলছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন যে, বেলুনটা সর্বপ্রথম ২৮শে জানুয়ারি প্রায় ৬০ হাজার ফুট উঁচু দিয়ে আলাস্কার আকাশে ঢোকে। এর তিনদিন পর কানাডার আকাশসীমায় চলে গেলেও ৩১শে জানুয়ারি তা আবারও যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে প্রবেশ করে। এরপর পুরো যুক্তরাষ্ট্রের উপর দিয়ে ওড়ার পরে ৫ই ফেব্রুয়ারি আটলান্টিক মহাসাগরের উপরে বেলুনটাকে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভূপাতিত করা হয়। মার্কিন কর্মকর্তারা এটাকে গোয়েন্দা বেলুন বলে আখ্যা দিচ্ছেন। আর চীনারা বলছে যে, বেলুনটা ছিল আবহাওয়ার তথ্য সংগ্রহের জন্যে তৈরি; যা কিনা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে চলে গিয়েছে। ‘সিএনএন’এর এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, বেলুনটা ভূপাতিত হবার আগে পুরো যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনার উপর দিয়ে উড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো’র এরোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিংএর প্রফেসর ইয়াইন বয়েড ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, বেলুনটা খুব সম্ভবতঃ আবহাওয়ার ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করছিল না। কারণ আবহাওয়া বেলুনের আকৃতি অনেক ছোট হয়। এটা বিশ্বাস করাটা কঠিন যে, চীনারা আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি বাতাসের তাপমাত্রা বা চাপ মাপার চেষ্টা করবে।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ‘সিআইএ’র প্রাক্তন কর্মকর্তা ট্রেসি ওয়াল্ডার মার্কিন টেলিভিশন চ্যানেল ‘এমএসএনবিসি’কে বলছেন যে, এই বেলুন খুব সম্ভবতঃ ছবি তোলার জন্যে পাঠানো হয়নি। কারণ চীনের বেশকিছু গোয়েন্দা স্যাটেলাইট রয়েছে, যেগুলি হাই রেজোলিউশনের ছবি তুলতে পারে। এই বেলুন হয়তো ইলেকট্রনিক সিগনালস ইন্টেলিজেন্স সংগ্রহ করছিল। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে তেজষ্ক্রিয়তা কতটুকু বা আকাশ প্রতিরক্ষা রাডারের কর্মকান্ড কেমন, এগুলি জানতে হলে স্যাটেলাইটের চাইতে আরও কম উচ্চতায় উড়তে হবে।

মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রাক্তন জেনারেল ব্যারি ম্যাকাফরে ‘এমএসএনবিসি’কে বলছেন যে, এটা নিঃসন্দেহে গত ৫০ বছরের মাঝে চীনা ইন্টেলিজেন্সের সবচাইতে ‘গোঁয়াড়’ কর্মকান্ড ছিল। তার ধারণা, চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরা নিশ্চয়ই এটা সম্পর্কে জানতেন না। এটাও হতে পারে যে, চীনের সামরিক বাহিনীর উপর রাজনৈতিক কর্তাব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণ নেই। জেনারেল ম্যাকাফরে মনে করছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র নিঃসন্দেহে সামরিক দিক থেকে চীনের চেয়ে বহু এগিয়ে রয়েছে। এখানে তাইওয়ানের সামরিক সক্ষমতা ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে রয়েছে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশের সামরিক শক্তি। এবং অতি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ফিলিপাইনে নতুন করে ৯টা সামরিক ঘাঁটি পাবার অবস্থানে পৌঁছেছে; যার মাধ্যমে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের কৃত্রিম দ্বীপভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটা ডিটারেন্ট তৈরি হবে। কাজেই চীনারা মারাত্মক ভুল না করলে যুদ্ধ হবার সম্ভাবনা নেই। ট্রেসি ওয়াল্ডার বলছেন যে, গোয়েন্দা সংস্থাতে তিনি চীনা ইন্টেলিজেন্স ঠেকাতে কাজ করেছেন; কিন্তু কখনোই চীনাদের এহেন খোলামেলা কর্মকান্ড প্রত্যক্ষ করেননি। সাধারণতঃ চীনারা খুব সন্তর্পণে কাজ করে; সহজে তাদেরকে খুঁজে পাওয়া যায় না।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ‘সিআইএ’র প্রাক্তন প্রধান লিয়ন প্যানেট্টা ‘সিএনএন’কে বলছেন যে, বেলুনের ধ্বংসাবশেষ থেকে যদি বুঝতে পারা যায় যে, এটা কি প্রকারের তথ্য সংগ্রহ করছিল এবং আকাশে এটাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল কিনা, তাহলে বোঝা যাবে যে এটা যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে গোয়েন্দাবৃত্তির জন্যেই এসেছিল কিনা। প্যানেট্টা মনে করছেন যে, যদি মার্কিন সামরিক নেতৃত্ব বুঝেই থাকে যে, বেলুনটা একটা গোয়েন্দা বেলুন, তাহলে এটাকে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনার উপর দিয়ে উড়তে দেয়াটা উচিৎ হয়নি; বরং এটাকে আরও আগেই ভূপাতিত করা উচিৎ ছিল। প্যানেট্টা বলছেন যে, চীন কিভাবে কাজটা করেছে, তা নিয়ে অনেক বেশি আলোচনা হলেও চীনে কেন এই কাজটা করেছে, সেটা নিয়ে খুব কমই কথা হচ্ছে। চীনারা নিঃসন্দেহে জানতো যে, মার্কিনীরা এটা খুঁজে পাবে এবং এর প্রত্যুত্তর দেবে। তারা হয়তো বার্তা দিতে চাইছিলো যে, মার্কিনীরা যদি চীনের উপরে গোয়েন্দাবৃত্তি করে, তাহলে চীনও যুক্তরাষ্ট্রের উপরে গোয়েন্দাবৃত্তি করতে সক্ষম। কারণ মার্কিনীরা নিয়মিতভাবেই চীনের সীমানার খুব কাছ দিয়ে গোয়েন্দা বিমান ওড়ায় এবং সেগুলি বেশ নিয়মিতভাবেই চীনারা বাধা দিতে আসে। কারণ চীনারা এই কর্মকান্ডকে মোটেই ভালো চোখে দেখে না।

‘সিআইএ’র আরেক প্রাক্তন প্রধান জন ব্রেনান ‘এমএসএনবিসি’কে বলছেন যে, এটা এখনও পরিষ্কার নয় যে, চীনারা প্রকৃতপক্ষে কি চিন্তা করছিল। একটা বেলুন ৬০ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে কিছু কাজ করতে পারে, যা কিনা একটা গোয়েন্দা স্যাটেলাইট আরও বেশি উচ্চতা থেকে করতে পারে না। তবে এই বেলুন কে উৎক্ষেপণ করেছিল এবং এর প্রযুক্তিগত সক্ষমতাই বা কতটুকু ছিল, তা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে চীনারা জানতো যে, যুক্তরাষ্ট্র এটাকে খুঁজে পাবে এবং ব্যবস্থা নেবে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের আলোচনার অনেকগুলি বিষয় রয়েছে, যেগুলি এখন ব্যাহত হবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কিন্তু সেটাই চীনারা চেয়েছিল কিনা, সেব্যাপারে এখনও কেউই নিশ্চিত নয়।

ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘রয়াল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইন্সটিটিউট’এর প্রাক্তন ডিরেক্টর জেনারেল মাইকেল ক্লার্ক ব্রিটেনের ‘স্কাই নিউজ’কে বলছেন যে, এই বেলুনের মাধ্যমে চীনারা এমন কোন গুরুত্বপূর্ণ ইন্টেলিজেন্স পাবে না, যা কিনা তারা ইতোমধ্যেই পাচ্ছে না। বরং দেখতে হবে যে, এর মাধ্যমে চীনাদের বার্তাটা কি ছিল। ক্লার্ক বলছেন যে, তারা ধারণা কিছুদিন আগেই যুক্তরাষ্ট্র ফিলিপাইনে যে ঘাঁটি তৈরির চুক্তি করেছে, এটা সেই চুক্তিরই প্রত্যুত্তর।

মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব এন্টনি ব্লিনকেন বেলুনের ঘটনাকে একটা ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ কর্মকান্ড বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং ইতোমধ্যেই ৫ই ফেব্রুয়ারি তার বেইজিং সফর বাতিল করেছেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্র বলছে যে, তারা চীনের সাথে সম্পর্ক খারাপ করতে ইচ্ছুক নয়, তথাপি ব্লিনকেনের বেইজিং সফর বাতিল করা দেখিয়ে দেয় যে যুক্তরাষ্ট্র বেলুনের ইস্যুটাকে ব্যবহার করতে চাইছে। অথচ মাত্র কিছুদিন আগেই ফিলিপাইনে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ঘাঁটি তৈরির যে ঘোষণা দিয়েছে, সেটাকে তারা চীনের অসন্তুষ্ট হবার কোন কারণই দেখছে না। আর মার্কিন গোয়েন্দা বিমানগুলি যখন নিয়মিতভাবেই চীনের কাছাকাছি ঘুরে চীনাদের অস্বস্তির মাঝে ফেলছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে চীনের বেলুনের অবাঞ্ছিত প্রবেশকে অতিরঞ্জিত করে দেখানো হচ্ছে বলেই প্রতীয়মান হয়; যা চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমান্বয়ে উত্তেজনা বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যের দিকেই নির্দেশ করে।

Tuesday, 15 March 2022

ইউক্রেন যুদ্ধ … দুই সপ্তাহ ধরে রুশ বিমান বাহিনী নিরুদ্দেশ!

১৫ই মার্চ ২০২২

 

রুশদের অত্যাধুনিক 'সুখোই ৩৪' বোমারু বিমানকে সাধারণ আনগাইডেড বোমা বহণ করতে দেখা যাচ্ছে। অনেকেই মনে করতে শুরু করেছেন যে, রুশদের ‘প্রিসিশন গাইডেড মিউনিশন’ বা ‘পিজিএম’ বা নিখুঁতভাবে আঘাতে সক্ষম গোলাবারুদএর ঘাটতি রয়েছে। 


ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতে অনেকেই মনে করেছিলেন যে, রুশ বিমান বাহিনী খুব দ্রতই ইউক্রেনের আকাশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে। কিন্তু যুদ্ধের দুই সপ্তাহেও রুশ বিমান বাহিনীর আনাগোণা বেশ কমই দেখা গেছে বলে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আসা বিভিন্ন রিপোর্টে বলা হচ্ছে। রুশ প্রতিরক্ষা দপ্তরের পত্রিকা ‘ক্রাসনায়া জুয়েজদা’র এক লেখায় রুশ বিমান বাহিনীর উপপ্রধান লেঃ জেনারেল সের্গেই দ্রোনভ বলেন যে, এবছরের মাঝে রুশ বিমান বাহিনী ‘সুখোই ৩৫’, ‘সুখোই ৩০’, ‘সুখোই ৫৭’ এবং ‘সুখোই ৩৪’সহ ৬০টারও বেশি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান পেতে যাচ্ছে। ২০০৯ সাল থেকে ২০২০এর মাঝে তারা ৪’শ ৪০টা নতুন যুদ্ধবিমান এবং কয়েক হাজার মনুষ্যবিহীন ড্রোন পেয়েছে। কিন্তু দ্রোনভের কথাগুলি ইউক্রেনের আকাশে প্রতিফলিত হতে দেখা যায়নি; যেখানে রুশ দ্রুতগামী ফাইটার বিমানগুলিকে বেশ কমই উড়তে দেখা গেছে; সেটাও মূলতঃ একটা বা দু’টা বিমান হিসেবে, একেবারে কম উচ্চতায় এবং রাতের বেলায়। যুদ্ধের প্রথম মুহুর্তেই রুশ ব্যালিস্টিক এবং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ইউক্রেনের বিমান ঘাঁটি, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার এবং বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রগুলিকে টার্গেট করে ছোঁড়া হয়। ‘দ্যা ইকনমিস্ট’ বলছে যে, মার্কিন ইন্টেলিজেন্স ছাড়াও ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে জানা যাচ্ছে যে, ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখনও কর্মক্ষম রয়েছে। ‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’এর হিসেবে রুশ বিমান বাহিনীতে রয়েছে প্রায় দেড় হাজার যুদ্ধবিমান; ইউক্রেনের রয়েছে ১’শরও কম। রুশরা ইউক্রেনের সীমানার কাছাকাছি প্রায় ৩’শ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করলেও সেগুলির কতটুকু সফল ব্যবহার হয়েছে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়ে গেছে।

খারকিভ শহরের ৬ই মার্চের এক সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাচ্ছে যে, দু’টা বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের মতো বস্তু আকাশের দিকে উড়ে গিয়ে বড় আকারের বিস্ফোরণ তৈরি করেছে। লন্ডনের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক থমাস উইদিংটন এই ভিডিওটা দেখে বলছেন যে, প্রথম ক্ষেপণাস্ত্রটা খুব সম্ভবতঃ টার্গেট মিস করেছে; তবে দ্বিতীয়টা সরাসরি আঘাত করেছে। একই ঘটনার আরেকটা ভিডিও ফুটেজে দেখা যাচ্ছে যে, আকাশ থেকে একটা বিমান জ্বলন্ত অবস্থায় ভূপাতিত হচ্ছে। এই ঘটনাটা খুব সম্ভবতঃ মধ্যম পাল্লার রাডার নিয়ন্ত্রিত ক্ষেপণাস্ত্রের কাজ ছিল; হয়তো ‘বুক’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। এসব ক্ষেপণাস্ত্রের নিয়ন্ত্রক রাডার থেকে বাঁচার জন্যেই রুশ বিমানগুলি খুব সম্ভবতঃ নিচু দিয়ে উড়ছে। তবে এভাবে একটা সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে তারা আরেকটা সমস্যার জন্ম দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা ইউক্রেনকে ‘স্টিংগার’ ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে। ইনফ্রারেড নিয়ন্ত্রিত এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি কাঁধের উপর থেকে ছোঁড়া যায়, যা নিচু দিয়ে ওড়া বিমানের ইঞ্জিনের তাপকে টার্গেট করে। এই একই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ১৯৮০এর দশকে আফগান মুজাহিদরা ৩’শ সোভিয়েত হেলিকপ্টার এবং ১’শ ফাইটার বিমান ধ্বংস করে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা দপ্তরের প্রকাশ করা একটা ভিডিও ফুটেজে দেখা যাচ্ছে যে, একটা ‘স্টিংগার’ ক্ষেপণাস্ত্রের দ্বারা একটা ‘এমআই ৩৫’ এটাক হেলিকপ্টার ধ্বংস হচ্ছে।

 

ইউক্রেনের 'স্টিংগার' ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভূপাতিত হচ্ছে রুশ 'এমএই ৩৫' এটাক হেলিকপ্টার। নিচু দিয়ে উড়ে রুশ বিমানগুলি হয়তো মধ্যম পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের হাত থেকে বাঁচবে, কিন্তু স্বল্প পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের শিকারে পরিণত হবে; যেগুলি এখন মার্কিনীরা ইউক্রেনিয়ানদের সরবরাহ করছে।


রুশদের ‘পিজিএম’এর সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে কি?

রুশ বিমানগুলির নিচু দিয়ে ওড়ার আরেকটা কারণ থাকতে পারে; তা হলো বিমানগুলির বহণকৃত গোলাবারুদ। সাম্প্রতিক সময়ে রুশ বিমান বাহিনী বেশকিছু ‘প্রিসিশন গাইডেড মিউনিশন’ বা ‘পিজিএম’ বা নিখুঁতভাবে আঘাতে সক্ষম গোলাবারুদ পেলেও এগুলির ব্যবহার এখনও খুব বেশি নয়। ব্রিটিশ থিংকট্যাঙ্ক ‘রয়াল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইন্সটিটিউট’ বা ‘রুসি’র বিশ্লেষক জাস্টিন ব্রঙ্ক এক লেখায় বলছেন যে, সিরিয়াতেও রুশ বিমান বাহিনী ব্যাপক হারে সাধারণ আনগাইডেড বোমা এবং আনগাইডেড রকেট ব্যবহার করেছে। বেশিরভাগ ‘পিজিএম’ ব্যবহার করেছিল রুশ ‘সুখোই ৩৪’ বোমারু বিমানগুলি। কিন্তু সেগুলিও অনেক ক্ষেত্রেই আনগাইডেড গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে। এর মাধ্যমে ধারণা করা যেতে পারে যে, রুশ বিমান বাহিনীর খুব বেশি পাইলট ‘পিজিএম’এর ব্যাপারে জ্ঞান রাখে না। আর হয়তো তাদের ‘পিজিএম’এর সরবরাহ এবং মজুদও খুব একটা বড় নয়। ইউক্রেনের চেরনিহিভ শহরে একটা ‘সুখোই ৩৪’ বোমারু বিমানের ধ্বংসাবশেষের সাথে সাধারণ আনগাইডেড বোমা দেখা যায়। রুশ রাষ্ট্রীয় মিডিয়ার ছবিগুলিতেও ‘সুখোই ৩৪’ বিমানে আনগাইডেড বোমা শোভা পেয়েছে। চেরনিহিভ এবং খারকিভ শহরেও অবিস্ফোরিত আনগাইডেড বোমা পাওয়া গেছে। তবে রুশদের ‘পিজিএম’ কম ব্যবহার করার আরেকটা সম্ভাব্য কারণ দেখাচ্ছেন মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘সিএনএ’এর বিশ্লেষক মাইকেল কফম্যান। তিনি বলছেন যে, হয়তো রুশরা সামনের দিনগুলিতে ব্যবহারের জন্যে অথবা আরও বড় কোন যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে ‘পিজিএম’ জমিয়ে রাখছে। আনগাইডেড বোমা ব্যবহারের ফলে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তার বর্ণনা দিচ্ছেন ‘রয়াল এরোনটিক্যাল সোসাইটি’র টিম রবিনসন। তার মতে এখন রুশ পাইলটদের সামনে দু’টা পথ খোলা রয়েছে। প্রথমতঃ নিচু দিয়ে উড়ে স্বল্প পাল্লার বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের শিকার হওয়া; অথবা দ্বিতীয়তঃ দূর থেকে আনগাইডেড বোমা ছোঁড়া; যাতে টার্গেটে আঘাত করার সম্ভাবনা অনেকটাই কম হবে।

ডাচ প্রতিরক্ষা ওয়েবসাইট ‘ওরিক্স’এর বিশ্লেষক স্টাইন মিতজার এবং অন্যান্যরা সোশাল মিডিয়া খুঁজে প্রথম দুই সপ্তাহ পর্যন্ত ১১টা রুশ যুদ্ধবিমান, ১১টা হেলিকপ্টার এবং ২টা ড্রোন ধ্বংসের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছেন। সে সময় পর্যন্ত ইউক্রেনের সরকার দাবি করেছে যে, তারা মোট ৩৯টা যুদ্ধবিমান এবং ৪০টা হেলিকপ্টার ধ্বংস করেছে। ‘কিংস কলেজ লন্ডন’এর রব লী মনে করছেন যে, যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহে ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস না করতে পারাটা রাশিয়ার জন্যে একটা মস্তবড় ভুল ছিল। এর ফলশ্রুতিতে রুশ বিমানগুলি নির্বিঘ্নে ইউক্রেনের আকাশে টহল দিতে সক্ষম হবে না। রুশ বোমারু বিমানগুলিও সেনাবাহিনীকে সহায়তা দিতে সক্ষম হবে না। সার্ভেইল্যান্স এবং আগাম ওয়ার্নিং দেয়া বিমানগুলিকেও এক্ষেত্রে দূরে অবস্থান করতে হবে; যার ফলশ্রুতিতে ইন্টেলিজেন্স প্রবাহে ঘাটতি পড়বে।

ভূপাতিত একটা রুশ 'সুখোই ৩৪' বোমারু বিমানের ধ্বংসাবশেষ দেখানো হচ্ছে। রুশ বিমান বাহিনীর পাইলটদের ট্রেনিং যথেষ্ট কিনা, তা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। 'পিজিএম' যদি কমও থাকে, তাহলে আকাশ নিয়ন্ত্রণকারী ফাইটার বিমানের তো ওড়ার কথা ছিল। হয়তো রুশ জেনারেলরা রুশ বিমান বাহিনীর এই দুর্বলতাগুলিকে ইউক্রেনের আকাশে দেখাতে চাইছেন না; কারণ এতে করে বাইরের বিশ্বের কাছে রুশদের সক্ষমতার যে ছবিখানা রয়েছে, তার সাথে বাস্তবতার দূরত্ব চোখে পড়বে।


নির্বিচার বোমাবর্ষণ আসছে কি?

কানাডার ‘রয়াল মিলিটারি কলেজ’এর প্রফেসর ওয়াল্টার ডর্ন মার্কিন মিডিয়া ‘সিবিএস’কে বলছেন যে, যদি রুশরা ইউক্রেনের আকাশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতো, তাহলে সেটা ভালোভাবেই বোঝা যেতো। কারণ তখন রুশ সেনাবাহিনী খুব সহজেই বিমানবাহিনীকে তাদের সহায়তায় ডাক দিতে পারতো; এবং তখন বিমান হামলায় ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর প্রতিরোধ ভেঙ্গে পড়তো। ‘রুসি’র জাস্টিন ব্রঙ্ক রুশ বিমান বাহিনীর কম কার্যক্ষমতার কিছু ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। রুশ সেনাবাহিনীর বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সাথে বিমান বাহিনীর বিমানগুলির সমন্বয় খুবই খারাপ বোঝা যাচ্ছে। কারণ সেনাবাহিনীর গাড়িগুলি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পাল্লার বাইরে অপারেট করছে। এমনকি রুশ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রাডারগুলি অনেক ক্ষেত্রেই বেকার বসে ছিল; যেসময় ইউক্রেনের তুর্কি নির্মিত ‘বায়রাকতার টিবি২’ ড্রোনগুলি রুশ সেনাবাহিনীর ক্ষতিসাধন করেছে। সিরিয়ার যুদ্ধে রুশরা হয়তো তাদের একটা বড় অংশ ‘পিজিএম’ ব্যবহার করে ফেলেছে। যার ফলশ্রুতিতে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে মোতায়েন করা বেশিরভাগ বিমানই হয়তো সাধারণ আনগাইডেড বোমা দ্বারা সজ্জিত হয়েছে। ‘পিজিএম’ ব্যবহার করার জন্যে ‘টার্গেটিং পড’ বা একধরণের ইলেকট্রনিক ক্যামেরা সজ্জিত টার্গেটিং সিস্টেম দরকার হয়; যেগুলি রুশদের কতগুলি রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এগুলি ছাড়া সাধারণ বোমা দিয়ে ইউক্রেনের শহরাঞ্চলে আক্রমণ করতে গেলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এবং হত্যাযজ্ঞ হবে নিঃসন্দেহে। সেটা করার আগে রুশ বিমান বাহিনী হয়তো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে। এধরণের বাছবিচার ছাড়া বোমাবর্ষণ রুশরা সিরিয়ার আলেপ্পো এবং হমস শহরে করেছিল। ব্রঙ্ক মনে করছেন যে, ইউক্রেনেও সেরকমই কিছু অপেক্ষা করছে।

তবে ‘পিজিএম’ না থাকলেও আকাশ নিয়ন্ত্রণকারী ফাইটার বিমানগুলি তো অপারেট করার কথা। রুশ বিমান বাহিনীর কাছে বর্তমানে ৮০টার মতো অত্যাধুনিক ‘সুখোই ৩৫এস’ ফাইটার বিমান এবং ১’শ ১০টার মতো ‘সুখোই ৩০এসএম২’ ফাইটার বিমান রয়েছে। ব্রঙ্ক বলছেন যে, এই বিমানগুলির তো ইউক্রেনের আকাশ থেকে ইউক্রেনের বিমান বাহিনীকে মুছে ফেলার কথা। তার ধারণা, হয়তো রুশ বিমান বাহিনীর বিমানগুলি রুশদের নিজস্ব বিমান প্রতিরক্ষার সাথে সমন্বয় করে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসের সাথে অপারেট করতে সক্ষম নয়। কারণ এধরণের অপারেশনে পশ্চিমাদের মাঝেও নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে নিজেদের বিমান ভূপাতিত হবার বহু উদাহরণ রয়েছে। এধরণের অপারেশনে দক্ষ হতে গেলে যথেষ্ট ভালো সমন্বয় ছাড়াও চমৎকার যোগাযোগ এবং নিয়মিত ট্রেনিংএর প্রয়োজন। কিন্তু তারপরেও ইউক্রেনের বিমান বাহিনীর ক্ষুদ্র সম্পদের বিরুদ্ধে এই বিমানগুলিকে ব্যবহার না করাটা সত্যিই আশ্চর্যজনক।

হয়তো রুশ পাইলটরা যথেষ্ট ট্রেনিংএর সুযোগ থেকে বঞ্চিত। খুব একটা নির্দিষ্ট করে বলা না গেলেও বিভিন্ন রুশ প্রতিবেদন থেকে ধারণা করা যায় যে, রুশ পাইলটরা গড়ে এক বছরে ১’শ থেকে ১’শ ২০ ঘন্টা ওড়ার সুযোগ পায়। এর মাঝে পরিবহণ বিমানও রয়েছে, যেগুলি সাধারণতঃ ফাইটার বিমানের চেয়ে বেশি সময় ওড়ে। কাজেই রুশ ফাইটার পাইলটরা হয়তো বছরে ১’শ ঘন্টার কমই পায় ওড়ার জন্যে। অপরদিকে মার্কিন এবং ব্রিটিশ ফাইটার পাইলটরা ১’শ ৮০ থেকে ২’শ ৪০ ঘন্টা ওড়ার পরেও, এবং সিমুলেটরে যথেষ্ট সময় কাটাবার পরেও বলছে যে, তাদের দক্ষতা কমে যাচ্ছে। কাজেই গত এক দশকে কয়েক’শ নতুন যুদ্ধবিমান রুশ বিমান বাহিনীতে যুক্ত হলেও তাদের পাইলটদের সেগুলিকে দক্ষতার সাথে ব্যবহার করতে পারার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে। এমতাবস্থায় ব্রঙ্ক মনে করছেন যে, রুশ জেনারেলরা হয়তো রুশ বিমান বাহিনীর এই দুর্বলতাগুলিকে ইউক্রেনের আকাশে দেখাতে চাইছেন না; কারণ এতে করে বাইরের বিশ্বের কাছে রুশদের সক্ষমতার যে ছবিখানা রয়েছে, তার সাথে বাস্তবতার দূরত্ব চোখে পড়বে।

রুশ বিমান বাহিনীর সক্ষমতা ভ্লাদিমির পুতিনের সময় যথেষ্টই বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই সক্ষমতাকে যাচাই করার একটা পরীক্ষাগার ছিল সিরিয়ার যুদ্ধক্ষেত্র। যদি সক্ষমতাগুলি সেখানে পরীক্ষিত হয়, তাহলে দুর্বলতাগুলিও বেরিয়ে আসবে; সেটাই স্বাভাবিক। রুশ বিমান বাহিনীর পাইলটদের ট্রেনিং নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বিস্তর। বিশেষ করে নিখুঁতভাবে টার্গেটে হামলা করার জন্যে ‘পিজিএম’এর উপর দক্ষতার যেমন ঘাটতি রয়েছে, তেমনি কেউ কেউ বলছেন যে, ‘পিজিএম’এর সরবরাহেও ঘাটতি থাকতে পারে। অন্ততঃ সিরিয়ার শহরগুলিতে নির্বিচার আনগাইডেড বোমা নিক্ষেপ করে রুশরা পশ্চিমা ইন্টেলিজেন্সের এই সন্দেহটাকেই আরও শক্তিশালী করেছে। তথাপি ইউক্রেন যুদ্ধে রুশদের বিমান বাহিনীর যথেষ্ট ব্যবহার না করার কারণ নিয়ে পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা মোটেই একমত নয়। তবে তারা ইউক্রেনের যুদ্ধে সামনের দিনগুলিতে সিরিয়ার মতো নির্বিচার বোমাবর্ষণের ব্যাপারে যে ভবিষ্যৎবাণী করছেন, তা যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তাহলে রুশদের ব্যাপারে তাদের সন্দেহগুলি আরও শক্ত ভিত পাবে। এই মুহুর্তে পশ্চিমাদের ভুল প্রমাণিত করার মতো যথেষ্ট প্রমাণ রুশরা দেখাতে পারেনি; যা কিনা ইউক্রেনের যুদ্ধে রুশদের সাফল্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।

Sunday, 23 January 2022

‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ কি একটা দিবাস্বপ্ন?

২৩শে জানুয়ারি ২০২২

পশ্চিমা আদর্শের অধঃপতনের ফলস্বরূপ ব্রিটেনের নাগরিকেরা যখন নিজেদের স্বাধীনতাকে ধরে রাখতে সামরিক বাহিনীতে যেতে ইচ্ছুক নয়, তখন সামরিক বাহিনী আকারে ছোট হতে থাকলেও প্রযুক্তির কারণে তার সক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে থাকবে, এহেন বক্তব্য হয়তো সেই চিন্তাটার অবাস্তবতাকে ঢেকে রাখার জন্যেই। ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর বিশ্ব নিয়ন্ত্রণের চিন্তাটাও সেই আঙ্গিকে দিবাস্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয়।

 
ব্রিটেনের বৈশ্বিক ইন্টেলিজেন্স সংস্থা ‘এমএই ৬’এর নতুন প্রধান অনেকটা নিয়ম ভেঙ্গেই জনসন্মুখে এসে কথা বলছেন। ২০২১এর ডিসেম্বরে সংস্থার প্রধান রিচার্ড মুর ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ বা ‘আইআইএসএস’এর এক অনুষ্ঠানে পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্সের ভূমিকা নিয়ে এক বক্তব্য রাখেন। তার বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন যে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এখন ঠিকমতো কাজ করছে না এবং বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বীরা আগের চাইতে বেশি আত্মবিশ্বাসী; তারা কম বাধার সন্মুখীন হচ্ছে; এবং তারা আগের চাইতে বেশি সম্পদ কাজে লাগাতে পারছে। একারণেই তারা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার দুর্বলতাগুলিকে কাজে লাগাচ্ছে। তিনি রাশিয়া, চীন, ইরান এবং সন্ত্রাসবাদকে তাদের বড় ফোকাস বলে উল্লেখ করেন। একইসাথে জলবায়ু পরিবর্তন এবং মহামারির মতো বৈশ্বিক সমস্যাও রয়েছে। তিনি চীনের প্রভাব বিস্তারকে ‘এমআই ৬’এর সবচাইতে বড় প্রাধান্য হিসেবে আখ্যা দিলেও চীনের সাথে বৈশ্বিক ইস্যু এবং বাণিজ্যের ব্যাপারে সহযোগিতার কথা বলেন। কারণ চীনের কর্মকান্ড এবং নীতি অনেক ক্ষেত্রেই ব্রিটেনের নিরাপত্তা এবং অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে। তিনি আন্তর্জাতিক আইন লংঘন করে, রাশিয়ার কর্মকান্ডকে, বিশেষ করে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে আগ্রাসনকে প্রতিহত করার জন্যে সকলকে আহ্বান জানান। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে সিরিয়া, লেবানন এবং ইরাকে ইরানের প্রভাব বিস্তারের কথা উল্লেখ করেন; এবং এর ফলে ব্রিটেন এবং ব্রিটেনের বন্ধু রাষ্ট্রদের প্রতি হুমকিকে মোকাবিলায় সহায়তা দেয়ার কথা বলেন। এছাড়াও আফগানিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকাতে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় ব্রিটেনের কাজ করার কথা বলেন তিনি। প্রতিটা বিষয়েই তিনি নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। মুরের বক্তব্যে এটা পরিষ্কার যে, একুশ শতকে পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় ব্রিটেন একটা বিশ্বশক্তি হিসেবে নিজের নামকে সামনে আনতে চাইছে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্রিটেনের এই ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ চিন্তার বাস্তবায়নে পররাষ্ট্র এবং প্রতিরক্ষা বিষয়ে সমন্বিত নীতিপত্র প্রকাশের পর থেকে ব্রিটেনের লক্ষ্যকে অনেকেই অতি উচ্চাভিলাসী বলে আখ্যা দিচ্ছেন।

‘ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস, অস্টিন’এর প্রতিরক্ষা ম্যাগাজিন ‘ওয়ার অন দ্যা রক্স’এর এক লেখায় ব্রিটেনের ‘ইউনিভার্সিটি অব পোর্টসমাউথ’এর সামরিক বিষয়ের শিক্ষক ক্রিস মরিস বলছেন যে, ব্রিটিশ নেতৃবৃন্দ দেশের সম্পদের অপ্রতুলতাকে বিবেচ্য বিষয় না ধরে বরং বৈশ্বিক বাস্তবতাকে নিজেদের মতো করে উপস্থাপন করছে। ফলশ্রুতিতে ব্রিটেন যা করতে চাইছে, তার জন্যে যথেষ্ট শক্তি সে যোগাড় করতে পারছে না। একারণে ব্রিটেন তার সামরিক শক্তির কিছু অংশকে শক্তিশালী করতে গিয়ে বাকিগুলিকে একেবারেই কমিয়ে ফেলছে। বিশেষ করে বলা হচ্ছে যে, কিছু সামরিক শক্তিকে কমিয়ে ফেলে অর্থ বাঁচিয়ে সেই অর্থ দিয়ে প্রযুক্তিগত দিক থেকে ব্রিটেন সকলের চাইতে এগিয়ে থাকবে। কিন্তু যেটা সকলেই ভুলে যাচ্ছে তা হলো, ব্রিটেনের বন্ধু এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে আরও অনেক বেশি সম্পদ রয়েছে; যেকারণে তারা কেন ব্রিটেনের থেকে প্রযুক্তির দিক দিয়ে পিছিয়ে থাকবে? ব্রিটেনের ছোট করে ফেলা সামরিক বাহিনীকে সামনের দিনগুলিতে আরও ঘনঘন এবং আরও বেশি সময়ের জন্যে বিশ্বব্যাপী মোতায়েন করতে হবে। ব্রিটিশ নৌবাহিনীরও কাগজে কলমে যতটুকু সক্ষমতা রয়েছে, বাজে রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিকল্পনার কারণে সেটাও পুরোপুরিভাবে ব্যবহার করতে পারছে না।

 
ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর রিক্রুটিং বিজ্ঞাপণ, যেখানে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দেয়া হচ্ছে। তবে নাগরিকেরা বলছে যে, অনেক জায়গাতেই আত্মবিশ্বাস পাওয়া যেতে পারে; সেটা সেনাবাহিনীতে নাও হতে পারে। কেউ কেউ বলছেন যে, সেনাবাহিনীতে যোগদানের অর্থ হলো অনেক বড় একটা প্রতিশ্রুতির সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলা; যা অনেকেই করতে ইচ্ছুক নয়। তারা নিজেদের ব্যক্তিস্বাধীনতা ধরে রাখতেই বেশি আগ্রহী।

কাগজে কলমে ব্রিটেনের সামরিক বাজেট বিশ্বের মাঝে চতুর্থ। শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ভারত ব্রিটেনের চাইতে এগিয়ে আছে। করোনা মহামারির আগে ২০১৯ সালেও ৭৮ বিলিয়ন ডলার নিয়ে সৌদি আরব এবং ৬১ বিলিয়ন ডলার নিয়ে রাশিয়া ব্রিটেনের থেকে এগিয়ে ছিল। তখন ব্রিটেনের বাজেট ছিল প্রায় ৫৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু ২০২০ সালে বাজেট বৃদ্ধির ঘোষণা দেয়ার পর ব্রিটেনের সামরিক বাজেট ৬১ বিলিয়ন ডলার পেরিয়ে গেলে এবং রাশিয়ার বাজেট কিছুটা কমানো হলে ব্রিটেন চতুর্থ অবস্থানে চলে আসে। আর সেবছর সৌদি আরব তেলের বাজারে মারাত্মক ধ্বসের কারণে সামরিক বাজেট কমিয়ে ৪৮ বিলিয়ন ডলারে কমিয়ে আনে। ফ্রান্স তার বাজেট ৫২ থেকে ৫৫ বিলিয়নে উন্নীত করলেও তা রাশিয়ার পিছনে ষষ্ঠ অবস্থানে থাকে। ‘আইআইএসএস’এর সিনিয়ন ফেলো অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বেন ব্যারি বলছেন যে, সামরিক বাজেটের র‍্যাংকিংএর কারণে ন্যাটো এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ব্রিটেনের সামরিক শক্তির বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে। তবে এর মাধ্যমে ব্রিটেনের সামরিক শক্তি খুব বেড়ে যাচ্ছে না। এর মাধ্যমে ব্রিটিশ রয়াল এয়ার ফোর্সে নতুন কোন স্কোয়াড্রনও যুক্ত হচ্ছে না। রয়াল নেভির যে আকার পরিকল্পনা করা হতো, সেদিকে নিয়ে যাবার একটা চেষ্টা চলছে। বরিস জনসন যখন বলেছেন যে, ব্রিটিশ রয়াল নেভি হবে ইউরোপের মাঝে সবচাইতে বড়, তখন কথাটা ঠিক। তবে এর মানে এই নয় যে, নৌবাহিনী অনেক বড় হয়ে যাবে। একইসাথে এই বাজেট বৃদ্ধির মানে এই নয় যে, বিশ্বব্যাপী মোতায়েন করার জন্যে ব্রিটেনের সেনা ইউনিটের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।

ব্রিটিশ সামরিক শক্তির সমস্যা বহু প্রকারের। এর মাঝে সবচাইতে বড় সমস্যাগুলির একটা হলো রিক্রুটিং। ব্রিটেনের ‘স্কাই নিউজ’এর প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সর্বশেষ রিক্রুটিং বিজ্ঞাপণে জনগণকে বিজ্ঞাপণ এবং সোশাল মিডিয়াতে হাল্কা লাইফস্টাইল বক্তব্য থেকে সরে আসতে আহ্বান জানানো হচ্ছে; যখন টানা নয় বছর ধরে সেনাবাহিনী ছোট হচ্ছে। রিক্রুটিং সমস্যা বহুদিন ধরেই চলছে। ২০০৬ সালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর একটা গ্রুপ মাউন্ট এভারেস্ট আরোহন করতে গিয়েছিল জনগণকে অনুপ্রাণিত করতে। সেই মিশন সফল হয়নি। যারা সেনাবাহিনীর জন্যে নাম লেখায়, তাদের মাঝে মাত্র ১০ শতাংশ প্রাথমিক প্রশিক্ষণ পর্যন্ত যেতে পারে। এই সমস্যার সমাধান করতে সেনাবাহিনী আগ্রহীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং শারীরিক সক্ষমতাকে সামরিক মাপকাঠিতে নিয়ে আনার জন্যে কাজ করছে। তবে এর চাইতে বড় সমস্যা হলো, গবেষণা বলছে যে, ব্রিটিশ ছেলেমেয়েরা আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগছে। এটাকে মাথায় রেখেই সর্বশেষ রিক্রুটিং ভিডিও তৈরি করা হয়েছে। তবে প্রতিবেদনে বলা হয় যে, এই ভিডিও দেখে অনেকেই অনুপ্রাণিত হয়নি। নাগরিকেরা বলছে যে, অনেক জায়গাতেই আত্মবিশ্বাস পাওয়া যেতে পারে; সেটা সেনাবাহিনীতে নাও হতে পারে। কেউ কেউ বলছেন যে, সেনাবাহিনীতে যোগদানের অর্থ হলো অনেক বড় একটা প্রতিশ্রুতির সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলা; যা অনেকেই করতে ইচ্ছুক নয়। তারা নিজেদের ব্যক্তিস্বাধীনতা ধরে রাখতেই বেশি আগ্রহী।

 
বিশ্বব্যাপী ব্রিটেনের প্রধান প্রধান সামরিক অবস্থান। ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ চিন্তাটাকে বাস্তবায়ন করতেই বিশ্বব্যাপী ব্রিটেনকে সামরিক উপস্থিতি রাখতে হচ্ছে। এই সামরিক অবস্থানগুলিকে ধরে রাখতে বৈশ্বিকভাবে ব্রিটেন অনেক দেশের সরকারকেই নিজেদের প্রভাবের অধীনে রাখতে চাইছে। এটা পরিষ্কার যে, সামরিক শক্তির অপ্রতুলতাকে কাটাতে রাজনৈতিক এবং ইন্টেলিজেন্স প্রভাবকেই ব্রিটেন প্রাধান্য দিতে চাইছে।

ইউরোপে মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রাক্তন প্রধান লেঃ জেনারেল বেঞ্জামিন হজেস ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর মিডিয়া ‘ফোর্সেস নিউজ’এর সাথে এক সাক্ষাতে বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের মতোই বিশ্বব্যাপী ব্রিটেনের অনেক দায়িত্ব রয়েছে। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, ইন্দোপ্যাসিফিক, ইউরোপ সকল ক্ষেত্রেই ব্রিটেনের নিরাপত্তা দেবার দায়িত্ব রয়েছে। ২০১০ সালে যখন আফগানিস্তানে সেনাসংখ্যা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছিল, তখন ব্রিটেন মাত্র তিনটা দেশের মাঝে একটা হিসেবে সেটাকে সমর্থন করেছিল। সেই তুলনায় ব্রিটেনের সেনাবাহিনীর আকার মারাত্মক ছোট হয়ে গেছে। পৃথিবীর সকল মানুষই স্থলে বাস করে; কাজেই স্থলভাগে মানুষ এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা দিতে স্থলবাহিনীর প্রয়োজন। তিনি বলেন যে, বাইরের একজন ব্যক্তি হিসেবে তিনি খুবই চিন্তিত হবেন জেনে যে, ব্রিটেনের সেনাবাহিনীর আকার মেঝের নিচে নামিয়ে আনা হচ্ছে।

ক্যারিবিয়ান সাগর, দক্ষিণ আটলান্টিকের ফকল্যান্ডস দ্বীপপুঞ্জ, ভূমধ্যসাগরের জিবরালটার ও সাইপ্রাস, মধ্যপ্রাচ্যে বাহরাইন এবং ওমান ছাড়াও পূর্ব এশিয়ার সিঙ্গাপুর ও ব্রুনাই; এবং আফ্রিকার কেনিয়া ও উত্তর আমেরিকার কানাডাতে ব্রিটেনের সামরিক অবস্থান রয়েছে। এর বাইরেও ইউরোপের নরওয়ে, তিনটা বল্টিক রাষ্ট্র, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলি এবং পশ্চিম আফ্রিকার মালিতে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর মিশন রয়েছে। ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ চিন্তাটাকে বাস্তবায়ন করতেই বিশ্বব্যাপী ব্রিটেনকে সামরিক উপস্থিতি রাখতে হচ্ছে। এই সামরিক অবস্থানগুলিকে ধরে রাখতে বৈশ্বিকভাবে ব্রিটেন অনেক দেশের সরকারকেই নিজেদের প্রভাবের অধীনে রাখতে চাইছে। ‘এমআই ৬’এর প্রধানের বক্তব্যে এটা পরিষ্কার যে, সামরিক শক্তির অপ্রতুলতাকে কাটাতে রাজনৈতিক এবং ইন্টেলিজেন্স প্রভাবকেই ব্রিটেন প্রাধান্য দিতে চাইছে। একটা আদর্শিক শক্তি হিসেবে দুনিয়ার বেশিরভাগ দেশের রাজনৈতিক সীমানা এবং সংবিধানকে ব্রিটেন তৈরি করেছে, অথবা প্রভাবিত করেছে। পশ্চিমা আদর্শিক চিন্তাগুলি ব্রিটেনই একসময় উপনিবেশের মাধ্যমে সারা বিশ্বে ছড়িয়েছে। বর্তমান বিশ্বের বেশিরভাগ আইনকানুনই ব্রিটেনের হাতে তৈরি অথবা সেখানে ব্রিটেনের প্রভাব ছিল। এমনকি বিশ্বের আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ভাষাও ব্রিটেনের মানুষের মাতৃভাষা। ব্রিটেন নিজে সুপারপাওয়ার থাকার সময়েই এই কাজগুলির বেশিরভাগ সম্পাদন করেছিল। সেই ঐতিহাসিক প্রভাবটাকে ব্যবহার করেই ব্রিটেন আবারও শক্তিশালী হতে চাইছে। বৈশ্বিক রাজনীতিকে প্রভাবিত করে নিজেদের সক্ষমতা অনুযায়ী আকৃতি দিতে; অথবা অন্যের সক্ষমতাকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক উদ্দেশ্যগুলিকে বাস্তবায়ন করতে চাইছে তারা। তবে সকলেই বুঝতে পারছেন যে, অতি ক্ষুদ্র একটা সামরিক বাহিনী দিয়ে একটা পরিবর্তনশীল লাগামহীন বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করাটা অবাস্তব চিন্তা। পশ্চিমা আদর্শের অধঃপতনের ফলস্বরূপ ব্রিটেনের নাগরিকেরা যখন নিজেদের স্বাধীনতাকে ধরে রাখতে সামরিক বাহিনীতে যেতে ইচ্ছুক নয়, তখন সামরিক বাহিনী আকারে ছোট হতে থাকলেও প্রযুক্তির কারণে তার সক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে থাকবে, এহেন বক্তব্য হয়তো সেই চিন্তাটার অবাস্তবতাকে ঢেকে রাখার জন্যেই। ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর বিশ্ব নিয়ন্ত্রণের চিন্তাটাও সেই আঙ্গিকে দিবাস্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয়।