Showing posts with label Tigray. Show all posts
Showing posts with label Tigray. Show all posts

Saturday, 14 May 2022

ইথিওপিয়ায় হঠাৎ যুদ্ধবিরতির কারণ কি?

১৫ই মে ২০২২
যুদ্ধবিরতির পর জাতিসংঘের ট্রাকগুলি ত্রাণসামগ্রী নিয়ে তিগ্রে অঞ্চলে পৌঁছাচ্ছে। পশ্চিমা দেশগুলি যখন ইউক্রেন নিয়ে ব্যস্ত, তখন ইথিওপিয়ার সরকারের ‘মানবিক’ যুদ্ধবিরতি অনেকেই পছন্দ করছে।  ড্রোন ব্যবহারে ইথিওপিয়া সরকার যখন যুদ্ধে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, ঠিক তখনই ইউক্রেন যুদ্ধের পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক চাপই ইথিওপিয়ার সরকারকে একতরফাভাবে যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে।

 
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর ঠিক একমাস পর ২৪শে মার্চ ইথিওপিয়ার সরকার দেশটার উত্তরের তিগ্রে অঞ্চলের নেতৃত্বের সাথে চলা ১৭ মাসের গৃহযুদ্ধে সকলকে অবাক করে দিয়ে হঠাৎ করেই একতরফাভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে। সরকার বলে যে, এই যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে তারা যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে মানবিক সহায়তা যাবার একটা সুযোগ করে দেবে। এর চার দিন পর তিগ্রে অঞ্চলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ‘টিপিএলএফ’ এই যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার পক্ষে বিবৃতি দেয়। একইসাথে তারা বলে যে, তারা শান্তিচুক্তির ব্যাপারে আশাবাদী, তবে খুব বেশি একটা নয়। ২৫শে এপ্রিল তিগ্রে বিদ্রোহীরা আফার অঞ্চল থেকে তাদের সেনা প্রত্যাহার করে নেয়; যা কিনা ইথিওপিয়ার সরকার তিগ্রে অঞ্চলে মানবিক সহায়তা যেতে দেবার জন্যে শর্ত হিসেবে দেখছিল।

৫ই মে জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টেফানে দুজাররিক সাংবাদিকদের বলেন যে, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে চার দফায় সড়কপথে ১’শ ৬৯টা ট্রাকে করে মোট ৪ হাজার ৩’শ টন দ্রব্য সেখানে পরিবহণ করা সম্ভব হয়েছে। তথাপি এই ত্রাণ সহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় কিছুই নয়। আর বিশেষ করে ইথিওপিয় সরকার তিগ্রে অঞ্চলে বিদ্যুৎ, টেলিকম এবং ব্যাংকিং সেবা বন্ধ করে দেয়ায় সেখানে যেকোন কিছু করাই কঠিন হয়ে গেছে। জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ‘ডব্লিউএফপি’র হিসেবে তিগ্রে অঞ্চলে দিনে ১’শ ট্রাক মালামাল নেয়া প্রয়োজন; আর পরিবহণ চালিয়ে নেয়ার জন্যে সপ্তাহে ২ লক্ষ লিটার জ্বালানি তেলের প্রয়োজন। জানুয়ারি মাস থেকে মার্চের শেষ পর্যন্ত আকাশপথে তিগ্রে অঞ্চলে মোট ৪’শ ২৮ মেট্রিক টন খাদ্য পাঠানো গেছে; যা কিনা মাত্র ১১ ট্রাকের সমপরিমাণ!

অনেকেই বলছেন যে, তিগ্রে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়েছে ড্রোন। ‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, কেউ স্বীকার না করলেও ইথিওপিয়া সরকারকে তুরস্ক, ইরান, চীন এবং সম্ভবতঃ আরব আমিরাত মনুষ্যবিহীন ড্রোন সরবরাহ করেছে। ব্রাসেলস ভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’ বা ‘আইসিজি’র এক বিশ্লেষণে ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হচ্ছে যে, ২০২১এর জুনে তিগ্রেরা সরকারি বাহিনীকে তাদের অঞ্চল থেকে বিতাড়িত করে। এরপর তারা তিগ্রে অঞ্চল থেকে বের হয়ে ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবার মাত্র ১’শ কিঃমিঃএর মাঝে পৌঁছে যায়। তবে সরকারি বাহিনী বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা ড্রোন ব্যবহার শুরুর পর থেকে তিগ্রে বাহিনী পিছু হঠতে বাধ্য হয়। অপরদিকে তিগ্রে অঞ্চলের পক্ষে শক্তিশালী কোন দেশ দেশ অবস্থান না নেয়ায় এবং তিগ্রেদের সাথে যোগ দেয়া অরোমো অঞ্চলের গেরিলারা খুব একটা শক্তিশালী ভূমিকা না রাখতে পারায় তিগ্রেদের জয়লাভের আশা স্তিমিত হয়ে যায়। ২০২১এর ২২শে ডিসেম্বর ইথিওপিয়ার সরকার ঘোষণা দেয় যে, সরকারি বাহিনী তিগ্রে অঞ্চলের ভেতরে আর ঢুকবে না।

 
তিগ্রের পশ্চিমাঞ্চল এখন এরিত্রিয়া সমর্থিত আমহারাদের দখলে; যার ফলে তিগ্রেরা সুদানের সাথে সরাসরি স্থলযোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন। সরকারের শর্তের বেড়াজালে পড়ে তিগ্রেরা যদি সামনের দিনগুলিতে সুদানের সাথে যোগাযোগ তৈরি করতে পশ্চিমাঞ্চল দখল করতে চায়, তাহলে অবাক হবার কিছু থাকবে না।

‘আইসিজি’ বলছে যে, ইথিওপিয়ার অর্থনীতি হয়তো যুদ্ধবিরতির পিছনে ভূমিকা রেখেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের আগেই দেশটার মূল্যস্ফীতি ছিল ৩৩ শতাংশ। দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে খরা, ঋণ পরিশোধ করতে না পারা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পড়ে যাওয়ার সাথে সাথে আইএমএফএর চাপ প্রয়োগ শুরু হয়েছে। অপরদিকে তিগ্রেরা চাইছে তাদের অঞ্চলের পশ্চিমাংশ ফেরত পেতে, যা কিনা যুদ্ধের শুরুতেই পার্শ্ববর্তী দেশ এরিত্রিয়ার সহায়তায় আমহারা অঞ্চলের মিলিশিয়ারা দখল করে নেয় এবং ৭ লক্ষ তিগ্রেকে জোরপূর্বক ঘরছাড়া করে। এর ফলে তিগ্রেরা তাদের প্রতি সদাচরণ করা সুদানের সীমানার সাথে যোগাযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। বিশেষ করে সীমান্ত শহর হুমেরা দখল করে রাখার মাধ্যমে এরিত্রিয়া এবং আমহারা তিগ্রে অঞ্চলকে বাইরের দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে এবং যেকোন ত্রাণের জন্যে তিগ্রেকে ইথিওপিয়া সরকারের মর্জির উপর নির্ভরশীল করে। এখন ইথিওপিয়া সরকার সেই ত্রাণের বিনিময়ে তিগ্রেদের কাছ থেকে অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ চাইছে। তিগ্রের পশ্চিমাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব খুব সহজেই চলে যাচ্ছে না। সরকারের শর্তের বেড়াজালে পড়ে তিগ্রেরা যদি সামনের দিনগুলিতে সুদানের সাথে যোগাযোগ তৈরি করতে পশ্চিমাঞ্চল দখল করতে চায়, তাহলে অবাক হবার কিছু থাকবে না।

ইথিওপিয়া সরকারের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার একমাস পর এবং তিগ্রে বাহিনীর আফার অঞ্চল ত্যাগ করার চার দিন পর ২৯শে এপ্রিল মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব এন্টনি ব্লিনকেন এক বার্তায় ইথিওপিয়ার প্রেসিডেন্ট আবি আহমেদের সরকারের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন যে, ইথিওপিয়া সরকারের অনেকগুলি পদক্ষেপের কারণে যুদ্ধ শেষ হবার একটা আশা তৈরি হয়েছে; যেগুলির মাঝে রয়েছে জরুরি অবস্থা তুলে নেয়া, কিছু রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দেয়া, এবং একটা যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন করা। একইসাথে তিনি তিগ্রেদের প্রশংসা করেন যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার জন্যে এবং আফার অঞ্চল থেকে সেনা সরিয়ে নেয়ার জন্যে। সবশেষে তিনি বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র একটা একত্রিত সার্বভৌম ইথিওপিয়া চায়, যেখানে রাজনৈতিক ব্যবস্থার মাঝে সকলকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, যাতে করে দেশটার বিভাজনগুলি কাটিয়ে ওঠা যায়।

যুদ্ধবিরতি পুরোপুরিভাবে কার্যকর করাটা যে খুব একটা সহজ নয়, তার প্রমাণ মিলে খুব দ্রুতই। ব্লিনকেনের বিবৃতির দিনই ‘ভয়েস অব আমেরিকা’র এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, আমহারা অঞ্চলে অরোমিয়ার সাথে সীমান্তে কিছু সশস্ত্র গ্রুপের মাঝে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয় যে, শেওয়া রাবিত শহরে দুই গ্রুপের মাঝে সংঘর্ষ হয়েছে। তবে এতে কোন গ্রুপগুলি জড়িত ছিল, তা নিয়ে দ্বন্দ্ব রয়েছে; কারণ একপক্ষ অপর পক্ষকে দোষারোপ করছে।

পশ্চিমা দেশগুলি যখন ইউক্রেন নিয়ে ব্যস্ত, তখন ইথিওপিয়ার সরকারের ‘মানবিক’ যুদ্ধবিরতি অনেকেই পছন্দ করছে। অন্ততঃ মার্কিন সরকারের কাছে ইথিওপিয়া সরকারের পক্ষ নেয়াটা অনেক সহজ হয়েছে; যেখানে ওয়াশিংটনের পছন্দের নোবেল বিজয়ী আবি আহমেদের সরকারের ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের খবরগুলি যুক্তরাষ্ট্রকে পীড়াদায়ক অবস্থান নিতে বাধ্য করেছে। ড্রোন ব্যবহারে ইথিওপিয়া সরকার যখন যুদ্ধে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, ঠিক তখনই ইউক্রেন যুদ্ধের পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক চাপই ইথিওপিয়ার সরকারকে একতরফাভাবে যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। তবে বলাই বাহুল্য যে, যুদ্ধবিরতি কোন শান্তি চুক্তি নয়; অস্থির আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির একটা প্রতিফলন মাত্র। দেশটার জাতিগত বিরোধগুলি যুদ্ধের মাঝে দগদগে ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে; যা মুছে ফেলা কঠিন। এই বিভেদগুলিই পূর্ব আফ্রিকার গুরুত্বপূর্ণ ‘হর্ন’ অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার জ্বালানি হয়েছে।

Thursday, 20 January 2022

ইথিওপিয়ার গৃহযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তনের অর্থ কি?

২০শে জানুয়ারি ২০২২

ইথিওপিয়ার হারার মেদা বিমান ঘাঁটিতে চীনে নির্মিত 'উইং লুং ১' ড্রোন। এটা মনে করার কারণ নেই যে, এই যুদ্ধে অস্ত্র সরবরাহ করার অপরাধে যুক্তরাষ্ট্র আমিরাত বা তুরস্কের উপর অবরোধ দেবে। ট্রাম্প প্রশাসন ইথিওপিয়ার সরকারের ভৌগোলিক অখন্ডতা রক্ষার চেষ্টাকে সমর্থন দিলেও বাইডেন প্রশাসন সেখানে ইথিওপিয়া সরকারের মানবাধিকার লংঘনকে হাইলাইট করতে চাইছে। অর্থাৎ ইথিওপিয়ার অখন্ডতা রক্ষা এখন মার্কিন সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়।


২০২১এর ২০শে ডিসেম্বর ইথিওপিয়ার তিগ্রে বিদ্রোহীরা ঘোষণা দেয় যে, তারা সরকারি আক্রমণের মুখে কিছু এলাকা ছেড়ে দিচ্ছে। একইসাথে তারা জাতিসংঘের কাছে তিগ্রে অঞ্চলের উপর যুদ্ধবিমান এবং ড্রোনের জন্যে একটা ‘নো ফ্লাই জোন’ ঘোষণা করার জন্যে আহ্বান জানায়। জাতিসংঘ তিগ্রে অঞ্চলে মানবাধিকার লংঘনের ব্যাপারে তদন্ত করতে একটা কমিশন গঠন করলেও ইথিওপিয়ার সরকার এর বিরোধিতা করেছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে মার্কিন সরকার ঘোষণা দেয় যে, যারা ইথিওপিয়ার যুদ্ধে সামরিক সহায়তা দেবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু বিভিন্ন সূত্র থেকে খবর আসছে যে, ইথিওপিয়াকে বিভিন্ন দেশ অস্ত্র সরবরাহ করছে; যাদের মাঝে সর্বাগ্রে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’এর এক বিশ্লেষণে উইলিয়াম ডেভিডসন বলছেন যে, তিগ্রে সেনাদের পিছু হটার কারণ হয়তো আবি আহমেদের ইথিওপিয় সরকারের জন্যে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত বিদেশী সামরিক সহায়তা; বিশেষ করে অস্ত্রবাহী ড্রোন।

ডাচ প্রতিরক্ষা ওয়েবসাইট ‘ওরিক্স’এর এক বিশ্লেষণে স্টাইন মিতজার এবং জুউস্ট ওলিমান্স বলছেন যে, ইথিওপিয়ার অস্ত্র বহণকারী ড্রোন ফ্লিটের মাঝে রয়েছে ৯টা চীনে নির্মিত ‘উইং লুং ১’, ২টা ইরানে নির্মিত ‘মোহাজের ৬’; এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে তৈরি কয়েকটা ‘ভার্টিক্যাল টেইক অফ এন্ড ল্যান্ডিং’ বা ‘ভিটিওএল’ ড্রোন। এছাড়াও ইস্রাইলে নির্মিত দুই প্রকারের গোয়েন্দা ড্রোনও রয়েছে এগুলিকে সাপোর্ট দেয়ার জন্যে। ইথিওপিয়া তার প্রথম ৩টা ‘উইং লুং ১’ ড্রোন চীন থেকে পায় ২০২১এর সেপ্টেম্বরে। এরপর নভেম্বর মাসে আমিরাত থেকে একই ধরনের আরও ৬টা ড্রোন আসে। এছাড়াও কেউ কেউ দাবি করেছেন যে, যুদ্ধের শুরু থেকেই এরিত্রিয়ার আসাব বন্দরে অবস্থিত সংযুক্ত আরব আমিরাতের সামরিক ঘাঁটি থেকে ড্রোন হামলা হয়েছে তিগ্রেদের উপর। এব্যাপারে কেউ সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দেখাতে পারেনি। তবে ‘ওরিক্স’ তাদের বিশ্লেষণে বলছে যে, এর মানে এই নয় যে, আমিরাতের ঘাঁটি থেকে কোন হামলা হয়নি। বরং যেসময় ইথিওপিয়ার কাছে কোন ড্রোন ছিল না, সেসময় তিগ্রেদের হাতে থাকা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং বড় ক্যালিবারের রকেটের উপর নিখুঁতভাবে হামলা সেদিকেই ইঙ্গিত দেয়।

তিগ্রে অঞ্চলের মাইচিউ এলাকায় ইথিওপিয়দের হাতে আমিরাতে তৈরি প্রথম ‘ভিটিওএল’ ড্রোনগুলিকে দেখা যায় ২০২১এর মাঝামাঝি। তবে তিগ্রেদের দ্রুত স্থানান্তরযোগ্য বাহিনীর বিরুদ্ধে এহেন ড্রোনের কর্মক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ। ইথিওপিয়ার পক্ষে আমিরাতের সবচাইতে বড় সহায়তার প্রমাণ পাওয়া যায় ২০২১এর নভেম্বরে যখন ইথিওপিয়ার হারার মেদা বিমান ঘাঁটিতে ‘উইং লুং ১’ ড্রোনগুলিকে দেখা যেতে থাকে। ইথিওপিয়ার রাজধানী অভিমুখে বিদ্রোহী বাহিনীর রওয়ানা হবার খবরেই হয়তো আমিরাত জরুরি ভিত্তিতে তাদের নিজেদের বিমান বাহিনী থেকে ড্রোনগুলি ইথিওপিয়াতে পাঠিয়েছে। ড্রোনগুলির অপারেটরও নিঃসন্দেহে আমিরাতেরই ছিল। চীন থেকে আনা ‘উইং লুং ১’ ড্রোনগুলি প্রথম থেকেই ‘টিএল ২’ আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র বহণ করেনি। কিন্তু আমিরাতি ড্রোনগুলি প্রথম থেকেই প্রচুর ক্ষেপণাস্ত্রসহ মোতায়েন হয়েছে।

জানুয়ারির শুরুতে অরোমিয়া অঞ্চলের গিদামি শহরে ইরানে নির্মিত ‘ঘানেম ৫’ আকাশ থেকে নিক্ষেপিত অস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যাবার পর ধারণা করা হচ্ছে যে, ইথিওপিয়া সরকার ইরানে নির্মিত ‘মোহাজের ৬’ ড্রোনগুলিকে অরোমিয়া অঞ্চলের কাছাকাছি মোতায়েন করেছে। স্যাটেলাইট ছবি বলছে যে, খুব সম্ভবতঃ আসোসা বিমানবন্দরেই এগুলিকে মোতায়েন করা হয়েছে। সেখান থেকে অরোমিয়া অঞ্চলের বেশিরভাগটাই ড্রোনগুলির ২’শ কিঃমিঃ পাল্লার মাঝে চলে আসবে। ২০২১এর অগাস্টে অরোমো অঞ্চলের বাহিনী ‘অরোমো লিবারেশন আর্মি’ বা ‘ওএলএ’ ‘তিগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট’ বা ‘টিপিএলএফ’এর সাথে জোট বেঁধে আবি আহমেদের সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। এর আগ পর্যন্ত সেমেরা এবং হারার মেদা বিমান ঘাঁটি থেকে তিগ্রে অঞ্চলে ড্রোন হামলা করা গেলেও অরোমিয়া ছিল ড্রোনের পাল্লার বাইরে। ডাচ এনজিও ‘প্যাক্স’এর এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, তুরস্কে তৈরি ড্রোনও ইথিওপিয়া ব্যবহার করছে। তুর্কি সরকার অবশ্য তা অস্বীকার করেছে। 



 
‘ওরিক্স’ তাদের বিশ্লেষণে বলছে যে, ইথিওপিয়া বিমান বাহিনীর ড্রোন হামলার ফলস্বরূপ এখন তিগ্রেদের হাতে তেমন কোন বড় অস্ত্র নেই। ড্রোন হামলার ব্যাপারটা তিগ্রে সেনাদের মনোবলের উপরেও হয়তো আঘাত হেনেছে। অন্ততঃ ট্যাংক বা আর্টিলারির মতো বড় ক্যালিবারে অস্ত্র না থাকায় তিগ্রেদের সামনে অগ্রসর হবার সক্ষমতা কমে যেতে পারে। একারণেই হয়তো তিগ্রেরা আক্রমণে না গিয়ে নিজেদের অঞ্চলকে রক্ষা করতে বেশি যত্নবান হচ্ছে। তবে ‘উইং লুং ১’ ড্রোনগুলি একইসাথে বেসামরিক টার্গেটে হামলায় ব্যবহৃত হচ্ছে বলে তথ্য মিলছে। কিছুদিন আগেই তিগ্রে অঞ্চলের আলামাতা শহরে ড্রোন হামলায় ৪২ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং দেড়শতাধিক আহত হয়। বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে চীনে নির্মিত ‘ব্লু এরো ৭’ ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের দেখা মেলে; যা কিনা ‘উইং লুং ১’ ড্রোন ব্যবহার করে।

যুদ্ধের শুরুতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার্কিন প্রশাসনের শেষ দিনগুলিতে যুক্তরাষ্ট্র আবি আহমেদের সরকারকে সমর্থন দিলেও জো বাইডেন প্রশাসনের নীতিতে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। সেই নীতির উপর ভিত্তি করেই যুক্তরাষ্ট্র ইথিওপিয়া সরকারের কাছে তুর্কি ড্রোন বিক্রির রিপোর্টের ব্যাপারে চিন্তিত। গত ডিসেম্বরে হর্ন অব আফ্রিকার জন্যে মার্কিন সরকারের প্রতিনিধি জেফরি ফেল্টম্যান তুরস্ক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরের সময়ে ইথিওপিয়াতে সশস্ত্র ড্রোন ব্যবহারের ব্যাপারে মার্কিন সরকারের দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেন বলে বলছে ‘রয়টার্স’ এবং ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’। ‘এক্সপোর্টার্স এসেম্বলি’র হিসেবে ২০২১ সালের ১১ মাসে ইথিওপিয়াতে তুরস্ক ৯৫ মিলিয়ন ডলারের সামরিক পণ্য রপ্তানি করেছে। ‘আল মনিটর’ বলছে যে, ইথিওপিয়া সরকারের ইরানি ড্রোন ব্যবহারের ব্যাপারেও মার্কিন কর্মকর্তারা উদ্বিগ্ন।

বাইডেন প্রশাসন ইথিওপিয়ার যুদ্ধ বন্ধে তেমন কোন পদক্ষেপ না নিলেও ইথিওপিয়ার সরকার যাতে সহজে যুদ্ধজয়ের পথে এগুতে না পারে, সেজন্য ইথিওপিয়ার উপর বিভিন্ন অবরোধের হুমকি দিচ্ছে। তবে এটা মনে করার কারণ নেই যে, এই যুদ্ধে অস্ত্র সরবরাহ করার অপরাধে যুক্তরাষ্ট্র আমিরাত বা তুরস্কের উপর অবরোধ দেবে। ট্রাম্প প্রশাসন ইথিওপিয়ার সরকারের ভৌগোলিক অখন্ডতা রক্ষার চেষ্টাকে সমর্থন দিলেও বাইডেন প্রশাসন সেখানে ইথিওপিয়া সরকারের মানবাধিকার লংঘনকে হাইলাইট করতে চাইছে। অর্থাৎ ইথিওপিয়ার অখন্ডতা রক্ষা এখন মার্কিন সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়।

Tuesday, 14 September 2021

গণতন্ত্রের ‘পোস্টারচাইল্ড’ আবি আহমেদ কি ইথিওপিয়াকে জোড়া লাগাবেন বা ভাংবেন?

১৪ই সেপ্টেম্বর ২০২১

ছবিঃ জাতিগত নিধনের যে নীতি নিয়ে আবি এগিয়েছেন, তাতে ইথিওপিয়া রাষ্ট্রের ভিতটাকেই তিনি নড়বড়ে করে ফেলেছেন। উভয় পক্ষই এখন সামরিক সমাধানের দিকে এগুচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যদি কোন প্রকারে সেখানে যুদ্ধবিরতি হয়ও, ঘটে যাওয়া ভয়াবহ নির্যাতনের স্মৃতিগুলি ভুলে গিয়ে তারা এগুতে পারবে কি?


ইথিওপিয়ার গৃহযুদ্ধ এখন নতুন দিকে মোড় নিয়েছে। ২০২০এর নভেম্বরে শুরু হওয়া এই গৃহযুদ্ধ খুব তাড়াতাড়িই শেষ হবে বলে আশা করেছিলেন ইথিওপিয়ার প্রেসিডেন্ট আবি আহমেদ। কিন্তু সেটা তো হয়ই নি, বরং তিগ্রেরা নিজেদের অঞ্চল পুনরাধিকার করে আশেপাশের আমহারা এবং আফার অঞ্চলেও ঢুকে পড়েছে। এর উপর তিগ্রেরা এখন একা নয়। তাদের সাথে যুক্ত হয়েছে দেশটার সবচাইতে বড় জাতি অরোমো। ‘অরোমো লিবারেশন আর্মি’র প্রধান কুমসা দিরিবা বলছেন যে, তাদের মাঝে একটা ব্যাপারে ঐকমত্য হয়েছে; আর তা হলো তারা একই শত্রুর মোকাবিলা করছে। বার্তা সংস্থা ‘ব্লুমবার্গ’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, আবি আহমেদ ইথিওপিয়ার রাজধানীতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার যে চেষ্টা করছিলেন, তা পুরোপুরিভাবে ব্যর্থ হয়েছে। দেশটার অনেক অঞ্চলই এখন বিকেন্দ্রীকরণ চাইছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পশ্চিমা কূটনীতিবিদ বলছেন যে, এই সংঘাত দেশটার অস্তিত্বকেই বিপন্ন করতে যাচ্ছে।

১০ মাস পরেও যুদ্ধ শেষ হবার লক্ষণ নেই

‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’এর উইলিয়াম ডেভিসন ‘আল জাজিরা’র সাথে এক সাক্ষাতে বলছেন যে, তিগ্রেরা চাইছে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করে নিজেদের শর্তে আলোচনায় বসতে এবং একটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করতে। অরোমোরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হবার কারণে তিগ্রেদের সাথে তাদের যুক্ত হবার গুরুত্ব অনেক। তবে তারা তিগ্রেদের মতো সামরিকভাবে সক্ষম কিনা, সেটা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে একটা ব্যাপার নিশ্চিত, তা হচ্ছে এই যুদ্ধের শেষ কোথায়, তা কেউই বলতে পারছে না।

অগাস্টে আবি আহমেদ একদিনের ঝটিকে সফরে তুরস্ক ঘুরে এসেছেন। তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগানের সাথে দেখা করে প্রতিরক্ষা এবং আর্থায়ন বিষয়ে দু’টা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। চুক্তির সকলকিছু প্রকাশ করা না হলেও অনেকেই ধরে নিচ্ছেন যে, আবি হয়তো তুর্কি ড্রোন কেনার জন্যেই আঙ্কারা গিয়েছিলেন। ডাচ সামরিক বিশ্লেষণধর্মী ওয়েবসাইট ‘ওরিক্স’ বলছে যে, ইতোমধ্যেই ইথিওপিয়াতে ইরান এবং ইস্রাইলের অস্ত্র দেখা গিয়েছে। হয়তো সেখানে তুরস্কের ড্রোনের আবির্ভাব সময়ের ব্যাপার মাত্র।

ইথিওপিয়ার স্থিতিশীলতা পার্শ্ববর্তী সোমালিয়ার জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সোমালিয়াও ইথিওপিয়ার মতো ফেডারেল রাষ্ট্র। সোমালিয়াতে রয়েছে তুরস্কের বিরাট সামরিক ঘাঁটি। তুর্কিরা সোমালি সেনাদের ট্রেনিং দিচ্ছে। একারণে ‘হর্ন অব আফ্রিকা’য় স্থিতিশীলতা তুরস্কের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ। তুর্কিরা উভয় দেশেই ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। তুর্কি ড্রোনগুলি এর আগে সিরিয়া, লিবিয়া এবং আজেরবাইজানে যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন সম্ভব করেছিল। হয়তো ইথিওপিয়াতেও সেই প্রচেষ্টাই করবে তারা।

 

যুদ্ধ কিভাবে শেষ হতে পারে?

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ফরেন পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউট’এর এক লেখায় প্রাক্তন মার্কিন কূটনীতিবিদ চার্লস এ রে মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, আবি আহমেদ ১০ই অগাস্ট সাধারণ জনগণকে দলে দলে সামরিক বাহিনীতে যোগ দেয়ার আবেদন জানান। এই ঘোষণা শান্তি প্রতিষ্ঠার পক্ষে কাজ করে না। এর আগে তার সরকার জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত একতরফাভাবে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে। কিন্তু তিগ্রেরা সেটাকে আমলে নেয়নি। আবি আহমেদ তিগ্রে অঞ্চলে কোনরূপ মানবিক সাহায্য যেতে দিচ্ছেন না। এতে যুদ্ধপিড়ীত অঞ্চলে ত্রাণ পৌঁছাবার যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন, তা তিনি নিজেই ভাংছেন। আবিএর সরকার মনে করছে যে, ত্রাণের সাথে তিগ্রে অঞ্চলে অস্ত্রও পৌঁছে যাবে। ইথিওপিয়াতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত অরেলিয়া ব্রাজীল এবং ডেভিড শিনএর সাথে কথা বলে এবং অন্যান্য কূটনীতিবিদদের বক্তব্য শুনে তিনি ইথিওপিয়ার যুদ্ধ বন্ধের একটা ফর্মূলা দেবার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলছেন যে, কেন্দ্রীয় সরকারের উচিৎ হবে তিগ্রে অঞ্চলে ত্রাণ পৌঁছতে দেয়া এবং বাণিজ্যিক কর্মকান্ড পুনরায় শুরু করার ব্যবস্থা নেয়া। যদি সরকার এটা বাস্তবায়ন করে, তাহলে তিগ্রেদের উচিৎ হবে আফার অঞ্চল থেকে সরে আসা এবং সামরিক কর্মকান্ড থামিয়ে দেয়া। অন্যান্য আঞ্চলিক মিলিশিয়াদেরও উচিৎ হবে যুদ্ধ বন্ধ করে আলোচনায় বসা। একইসাথে এরিত্রিয়ারও উচিৎ হবে ইথিওপিয়ার অভ্যন্তর থেকে তাদের সেনাবাহিনী সরিয়ে নেয়া। চার্লস রেএর প্রস্তাবগুলি আপাত দৃষ্টিতে ভালো মনে হলেও দুই পক্ষকে রাজি করানোর কাজটা কে করবে, তা নিশ্চিত নয়। আবি আহমেদ একসময় মার্কিন সরকারি সহায়তা সংস্থা ‘ইউএসএআইডি’এর প্রধান সামানথা পাওয়ারের সাথে দেখা করতে পর্যন্ত রাজি হননি। প্রকৃতপক্ষে এই যুদ্ধের গতিপথ জাতিগত নিধন ছাড়া আর কোনদিকেই যায়নি; যা সেখানকার জনগণের উপর অবর্নণীয় নির্যাতন নিয়ে এসেছে।

‘আল জাজিরা’র সাথে কথা বলতে গিয়ে মানবাধিকার সংস্থা ‘এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল’এর জেষ্ঠ্য উপদেষ্টা ডোনাটেলা রোভেরা তিগ্রে যুদ্ধে মারাত্মক মানবাধিকার লংঘনের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন যে, এই ঘটনা যুদ্ধের প্রথম দিন থেকেই চলছে এবং উভয় পক্ষই যৌন নির্যাতনকে একটা এজেন্ডা নিয়ে লড়ছে। শত্রু জাতির সর্বোচ্চ ক্ষতি এবং অপমান করাই যেন এখানে মূল উদ্দেশ্য হিসেবে দেখা দিয়েছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন যে, নয় মাসের যুদ্ধের পরেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যখন কথাসর্বস্বই থাকছে, তখন তা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মারাত্মক একটা উদাহরণ তৈরি করছে। ‘ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন’এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মার্টিন প্লাউট মন্তব্য করছেন যে, তিগ্রেতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপারগুলি কয়েকজন কমান্ডো বা অবাধ্য ইউনিটের উপর চাপিয়ে দিলে ভুল করা হবে। এই অপরাধগুলি এতটাই ব্যাপক যে, এটা বুঝতে বাকি থাকে না যে, সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছ থেকে অনুমতিক্রমেই এই কর্মকান্ড চালানো হচ্ছে। তিনি গণহত্যার কর্মকান্ডের জন্যে ইথিওপিয়ার প্রেসিডেন্ট আবি আহমেদ এবং এরিত্রিয়ার প্রেসিডেন্ট ইসাইয়াস আফওয়ের্কিকে সরাসরি দায়ী করেন। তিনি বলেন যে, যৌন নিপীড়ণকে একটা কৌশল ধরে নিয়ে এগুচ্ছে ইথিওপিয়া সরকার। গত নভেম্বরে যুদ্ধ শুরু হবার কিছুদিন পরেই ‘ইউএস ইন্সটিটিউট অব পিস’এর ভবিষ্যৎবাণীকে টেনে এনে তিনি বলেন যে, নয় মাস পর মনে হচ্ছে যে, রাষ্ট্র হিসেবে ইথিওপিয়ার স্থায়িত্ব নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। এটা নিশ্চিত না হলেও এটা এখন একটা সম্ভাবনা।

 
ছবিঃ ডিসেম্বর ২০১৯। গণতন্ত্রের ‘পোস্টারচাইল্ড’ আবি আহমেদ নোবেল পুরষ্কার নিচ্ছেন। অনেক আগে থেকেই আবি আহমেদের কলঙ্কগুলি বোঝা যাচ্ছিলো, কিন্তু পশ্চিমারা হয় সেগুলি দেখেনি অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে গেছে। পশ্চিমারা তাকে খোলা চেক দিয়েছে এবং এরপর চুপ করে থেকেছে। কারণ তাকে দিয়ে বিভিন্ন আদর্শিক প্রকল্প তারা বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিল পুরো আফ্রিকার জন্যে পশ্চিমা গণতন্ত্রের একটা উদাহরণ তৈরি করার জন্যে।


গণতন্ত্রের ‘পোস্টারচাইল্ড’

‘সিএনএন’এর এক প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে যে, পশ্চিমারা কিভাবে আবি আহমেদকে ভুল বুঝে নোবেল পুরষ্কার দিয়েছে এবং সারা বিশ্বের কাছে উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে লস এঞ্জেলেসএর ‘ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া’র বাস্কেটবল স্টেডিয়ামে আবি আহমেদকে বিশাল সংবর্ধনা দেয়া হয়েছিল। সেই সংবর্ধনার আয়োজনের দায়িত্ব পড়েছিল ইথিওপিয়ার কূটনীতিক বেরহানে কিদানেমারিয়ামএর উপর। তিনি দুই দশক আগে থেকে আবি আহমেদকে চেনেন, যখন আবি ইথিওপিয়ার সামরিক ইন্টেলিজেন্সে কাজ করতেন। তবে কিদানেমারিয়ামের আরেকটা পরিচয় হলো তিনি একজন তিগ্রে। তিনি লস এঞ্জেলেসএর অনুষ্ঠানের শুরুতে স্টেজে উঠেছিলেন আবিএর ওঠার আগে। তখন গ্যালারি থেকে চিৎকার করে বলা হয় ‘তিগ্রেয়ান তুমি পোডিয়াম থেকে নেমে যাও’। তাকে আরও কিছু গালাগাল শুনতে হয়। কিন্তু আবি আহমেদ পোডিয়ামে উঠে এই গালাগালের ব্যাপারে কোন কিছুই বলেননি। কিদানেমারিয়াম মধ্যাহ্ন ভোজের সময় যখন আবিকে জিজ্ঞেস করেন যে, আবি কেন এই গালাগালের প্রতিবাদ করলেন না, তখন আবি বলেন যে, ‘এখানে তো শুদ্ধ করার কোনকিছু ছিল না’।

‘সিএনএন’ বলছে যে, অনেক আগে থেকেই আবি আহমেদের সমস্যাগুলি বোঝা যাচ্ছিলো, কিন্তু পশ্চিমারা হয় সেগুলি দেখেনি অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে গেছে। পশ্চিমারা তাকে খোলা চেক দিয়েছে এবং এরপর চুপ করে থেকেছে। ‘আদ্দিস স্ট্যান্ডার্ড’এর প্রধান সম্পাদক সেদালে লেমা বলছেন যে, নোবেল পুরষ্কার পাবার পর আবি মনে করেছিলেন যে, তিনি যা ইচ্ছা তাই করতে পারবেন। আবিকে নোবেল পুরষ্কার দেবার ক’দিন পরে লেমা এক লেখায় বলেন যে, যে কাজটার জন্যে তাকে নোবেল পুরষ্কার দেয়া হয়েছে, অর্থাৎ এরিত্রিয়ার সাথে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করা, সেই কাজটা তিগ্রেয়ানদেরকে কোণঠাসা করে ফেলেছে। ‘তিগ্রেয়ান পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট’ বা ‘টিপিএলএফ’ তিন দশক কঠোর হস্তে ইথিওপিয়া শাসন করেছিল; যাদের পরে আবিএর উত্থান হয়। ‘টিপিএলএফ’এর নেতৃত্বে ইথিওপিয়া এরিত্রিয়ার সাথে বহুবছর যুদ্ধ করেছে। আবি ক্ষমতায় এসেই ‘টিপিএলএফ’এর ক্ষমতা কর্তন করা শুরু করেন। বিভিন্ন অঞ্চলের জনগণ সায়ত্বশাসন চাইতে শুরু করলে আবি কঠোর ভূমিকা নিতে থাকেন। যুদ্ধের মাঝেই আবি আহমেদ নির্বাচন ডেকে বিরাট জয় পান; গুরুত্বপূর্ণ বিরোধী দলগুলি নির্বাচনে অংশ নেয়া থেকে বিরত থাকে। অনেকেই বলছেন যে, আবি এমন একটা পরিস্থিতি পেয়েছেন, যা তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তিনি সেই পরিস্থিতিকে পাশ কাটিয়ে কোনকিছুই করতে পারবেন না। তাই যেসকল সংস্কারের কথা তিনি বলেছেন, সেগুলির বাস্তবায়ন কতটা বাস্তব, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

কেন আবি?

আবি আহমেদের আগে অনেকেই ইথিওপিয়াতে যুদ্ধ করেছেন। কিন্তু তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি নিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। পশ্চিমাদের খুশি করার জন্যে সকল কিছুই তিনি বলেছেন। বিনিময়ে সেই সন্মানও তাকে পশ্চিমারা দিয়েছে। গণতন্ত্রের ‘পোস্টারচাইল্ড’ আবি আহমেদের কলঙ্কগুলি পশ্চিমারা খুব সন্তর্পণে এড়িয়ে গেছে। কারণ তাকে দিয়ে বিভিন্ন আদর্শিক প্রকল্প তারা বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিল পুরো আফ্রিকার জন্যে পশ্চিমা গণতন্ত্রের একটা উদাহরণ তৈরি করার জন্যে। কিন্তু জাতিগত সংঘাতের পটভূমিকে তারা পুরোপুরিভাবে ভুলে গিয়েছে; যা কিনা আদর্শিক সংস্কার বাস্তবায়নকে প্রথম দিন থেকেই অবাস্তব করে ফেলেছিল। তথাপি কৌশলগতভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ ‘হর্ন অফ আফ্রিকা’ অঞ্চলের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে ইথিওপিয়ার নিয়ন্ত্রণ পশ্চিমা দেশগুলির জন্যে অপরিহার্য। গ্রেট পাওয়ার প্রতিযোগিতার মাঝে আবিএর অধীনে একটা পশ্চিমা ধাঁচের সরকার সর্বদা পশ্চিমাদের স্বার্থই দেখবে; এটাই ছিল কৌশলগত চিন্তা। আর তাই দশ মাস ধরে যুদ্ধের কৌশল হিসেবে গণহত্যা এবং যৌন নির্যাতন করার পরেও পশ্চিমারা কথাসর্বস্বই থেকেছে। আবিএর দেয়া অবরোধে তিগ্রেতে চলছে দুর্ভিক্ষ। গণতন্ত্রের ‘পোস্টারচাইল্ড’ আবি আহমেদের জন্যে পশ্চিমাদের এই নিরবতাই যেন সর্বোচ্চ সন্মান!

কিন্তু যুদ্ধের বাস্তবতা আবিকে সামরিক সহায়তার জন্যে দ্বারে দ্বারে নিচ্ছে; কারণ যত সহজে তিনি এই যুদ্ধের সমাপ্তি টানবেন বলে মনে করেছিলেন, তা তার ধারেকাছেও ছিল না। সামরিক সহায়তা দেবার ক্ষেত্রে ইরান, ইস্রাইল এবং তুরস্কের নাম আসছে এক্ষেত্রে। কিন্তু সেই সহায়তাগুলি কি যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন করার জন্যে যথেষ্ট হবে? তবে জাতিগত নিধনের যে নীতি নিয়ে আবি এগিয়েছেন, তাতে ইথিওপিয়া রাষ্ট্রের ভিতটাকেই তিনি নড়বড়ে করে ফেলেছেন। উভয় পক্ষই এখন সামরিক সমাধানের দিকে এগুচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যদি কোন প্রকারে সেখানে যুদ্ধবিরতি হয়ও, ঘটে যাওয়া ভয়াবহ নির্যাতনের স্মৃতিগুলি ভুলে গিয়ে তারা এগুতে পারবে কি?

Sunday, 22 November 2020

ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বলি হতে চলেছে ইথিওপিয়া?

২২শে নভেম্বর ২০২০
সুদান এবং এরিত্রিয়া ইতোমধ্যেই অংশ নিচ্ছে বলে বলেন তিনি। ইথিওপিয়াসহ হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের জন্যেই কিছুদিনের মাঝেই এখানে আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক শক্তিরা জড়াবে।



ব্রিটেনের ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা জাতিসংঘের এক গোপন ইন্টেলিজেন্স রিপোর্টের বরাত দিয়ে বলছে যে, ইথিওপিয়ার সেনারা দেশটার উত্তরের তিগ্রে অঞ্চলে সামরিক অভিযানে ব্যাপক বাধার সন্মুখীন হচ্ছে, যদিও সরকারি বাহিনী বলছে যে, তারা হুমেরা, দানশা, শিরারো, আলামাতা এবং শিরে সহ বেশ কয়েকটা শহর নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। ইথিওপিয়ার সরকারি মুখপাত্র রেদওয়ান হুসেইন বলেন যে, সরকারি বাহিনী তিগ্রের মূল শহর মেকেল্লের অভিমুখে রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সুদান ও এরিত্রিয়ার সীমান্তে পশ্চিমের শহর হুমেরাতে এবং দক্ষিণের শহর আলামাতাতে ব্যাপক সংঘাত হচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছে। ইথিওপিয়ার বিমান বাহিনী বিভিন্ন অঞ্চলে হামলা চালাচ্ছে। তিগ্রেতে টেলিযোগাযোগ বন্ধ করে দেয়ায় এবং সাংবাদিকদের যেতে বাধা দেয়ায় তথ্য সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। সংঘাতে কয়েক’শ মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ৪ঠা নভেম্বর যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কমপক্ষে ৩৬ হাজার মানুষ পার্শ্ববর্তী সুদানে আশ্রয় নিয়েছে। এছাড়াও তিগ্রে অঞ্চলের মাঝেই অনেকে ঘরছাড়া হয়েছে। এক সপ্তাহ আগে ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ ঘোষণা দেন যে, ইথিওপিয়ার সেনাবাহিনী তিগ্রের রাজধানী মেকেল্লের দিকে রওয়ানা হয়েছে এবং তারা বিদ্রোহী ‘তিগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট’ বা ‘টিপিএলএফ’এর নেতৃবৃন্দকে ক্ষমতাচ্যুত করবে। ‘টিপিএলএফ’ ১১ কোটি মানুষের ইথিওপিয়ার একটা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল হলেও এর মূল ভিত্তি তিগ্রে অঞ্চলের ৬০ লক্ষ তিগ্রেদের মাঝে। ১৯৯১ সালে বামপন্থী মেনজিসটু হাইলেমারিয়ামএর সরকারকে উৎখাত করে ‘টিপিএলএফ’এর গেরিলারা ক্ষমতা নেয়। ২০১৮ সাল পর্যন্ত তারা ছিল ক্ষমতাসীন দল, যাদেরকে সরিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ অরোমো এবং আমহারাদের নেতৃত্বে আবি আহমেদ ২০১৮ সালে ক্ষমতায় আরোহণ করেন।

‘বিবিসি’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ‘টিপিএলএফ’ এর আগেও কয়েকবার ইথিওপিয়া থেকে আলাদা হয়ে যাবার হুমকি দিয়েছিল। অগাস্ট মাসে ‘টিপিএলএফ’এর নেতা দেব্রেতসিওন গেব্রেমাইকেল বলেন যে, তারা কখনোই তাদের কষ্টার্জিত স্বশাসনের অধিকার ছেড়ে দেবেন না। সেপ্টেম্বর মাসে করোনা মহামারির কারণ দেখিয়ে ইথিওপিয়া সরকার জাতীয় নির্বাচন পিছিয়ে দেবার পর ‘টিপিএলএফ’এর তত্বাবধানে তিগ্রে অঞ্চলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর থেকেই আদ্দিস আবাবা সরকারের সাথে ‘টিপিএলএফ’এর সম্পর্কের ব্যাপক অবণতি হয়। অক্টোবর মাসে ইথিওপিয়ার সরকার তিগ্রে অঞ্চলের সাথে সম্পর্ক স্থগিত করে এবং সংসদে তিগ্রের বাজেট স্থগিত করা হয়। ইথিওপিয়ার সরকার বলে যে, মেকেল্লের এক সেনা ঘাঁটিতে হামলা করে ‘টিপিএলএফ’এর সদস্যরা অস্ত্র ছিনিয়ে নেবার চেষ্টা করার পর থেকেই এই সামরিক মিশন শুরু করা হয়েছে।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, দ্রুত যুদ্ধজয়ের সম্ভাবনা নেই; কারণ তিগ্রের সেনারা খুব শীঘ্রই মেকেল্লে শহরের পূর্বের পাহাড়ি অঞ্চলে আশ্রয় নেবে। এই পাহাড়ি অঞ্চল রক্ষা করা অপেক্ষাকৃত সহজ বলেই সেখানে ইথিওপিয়ার সরকারি বাহিনীর দ্রুত সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন থাকবে। সেনাবাহিনীর শক্তিশালী ইউনিটগুলি শহরগুলিকে বাইপাস করে মেকেল্লে রওয়ানা হচ্ছে। আর মিলিশিয়া এবং আধাসামরিক বাহিনীর অপেক্ষাকৃত দুর্বল ইউনিটগুলি পরবর্তীতে এই শহরগুলির নিয়ন্ত্রণ নেবার চেষ্টা করছে; এবং এরাই তিগ্রেদের আক্রমণের শিকার হচ্ছে। ইথিওপিয়ার সরকারি বাহিনী যত এগুবে, তাদের সাপ্লাই লাইন গেরিলা আক্রমণের শিকার হবার সম্ভাবনা তৈরি হবে। অর্থাৎ ইথিওপিয়ার সেনাবাহিনী ‘টিপিএলএফ’কে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারলেও সংঘাত নাও থামতে পারে। 

সরকারি বাহিনী তিগ্রের মূল শহর মেকেল্লের অভিমুখে রয়েছে।  তারা হুমেরা, দানশা, শিরারো, আলামাতা এবং শিরে সহ বেশ কয়েকটা শহর নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। সুদান ও এরিত্রিয়ার সীমান্তে পশ্চিমের শহর হুমেরাতে এবং দক্ষিণের শহর আলামাতাতে ব্যাপক সংঘাত হচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছে। ইথিওপিয়ার বিমান বাহিনী বিভিন্ন অঞ্চলে হামলা চালাচ্ছে।


‘বিবিসি’ বলছে যে, ইথিওপিয়ার প্রতিবেশী এরিত্রিয়া মূলতঃ তিগ্রেদের পছন্দ করে না। তিগ্রেরা বলছে যে, এরিত্রিয়ার বাহিনী ইথিওপিয়ার সেনাবাহিনীকে সরাসরি সহায়তা দিচ্ছে। ১৯৯৮ সালে এরিত্রিয়ার সাথে ইথিওপিয়ার সীমান্ত যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, যা যুদ্ধ মূলতঃ তিগ্রের সাথে সীমানা নিয়েই। তিগ্রের আঞ্চলিক সরকারের অসহযোগিতার কারণে সীমান্তবর্তী শহর বাদমে নিয়ে দুই দেশের দ্বন্দ্বের সুরাহা হয়নি।

মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল রেইনর প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ এবং ‘টিপিএলএফ’এর নেতা দেব্রেতসিওন গেব্রেমাইকেলএর সাথে কথা বলার পর উভয় পক্ষেরই সামরিক ফলাফল পাবার দিকে আশাবাদী হবার আশংকা রয়েছে বলে মতামত দেন। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ বলছে যে, পূর্ব আফ্রিকায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের মাঝে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হলো ইথিওপিয়া। এবং এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র আবি আহমেদের সরকারকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। ১৯শে নভেম্বর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের আফ্রিকা বিষয়ক সহকারি সচিব তিবর নাগি সাংবাদিকদের বলেন যে, ইথিওপিয়ার এই সংঘাত দুই দেশের মাঝে সংঘাত নয়; বরং একটা দেশের একটা অংশ কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে সহিংসতার আশ্রয় নিয়েছে। তাই এর ফলাফল হিসেবে যা তারা আশা করেছিল, সেটাই হচ্ছে।

তিগ্রেদের নেতা গেব্রেমাইকেল বলছেন যে, তারা যুদ্ধ চান না। তবে তাদের সেনাবাহিনী, মিলিশিয়া এবং স্পেশাল ফোর্স যুদ্ধ জয়ের জন্যে প্রস্তুত রয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এখানে বাইরের শক্তিদের জড়িত হবার সম্ভাবনা বাড়বে। বিশেষ করে নীল নদের উপর ইথিওপিয়ার ‘গ্র্যান্ড রেনেসাঁস ড্যাম’ প্রকল্প এবং নদীর পানির হিস্যা নিয়ে ইথিওপিয়ার সাথে মিশর এবং সুদানের যখন দ্বন্দ্ব চলছে, তখন ইথিওপিয়ার অভ্যন্তরীণ কলহ আঞ্চলিক অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে। ‘দ্যা ইস্ট আফ্রিকান’ বলছে যে, ২০শে নভেম্বর আফ্রিকান ইউনিয়নের চেয়ারম্যান দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সাইরিল রামাফোসা মোজাম্বিক, লাইবেরিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকার তিনজন প্রাক্তন প্রেসিডেন্টকে সদস্য করে একটা মিশন ইথিওপিয়াতে পাঠাবার ঘোষণা দেবার পরদিন ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রীর অফিশিয়াল টুইটার একাউন্ট থেকে বলা হয় যে, ইথিওপিয়ার অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে মধ্যস্ততা করতে আফ্রিকান ইউনিয়নের মিশনের ইথিওপিয়া আসার খবরটা বানোয়াট। হর্ন অব আফ্রিকা বিশ্লেষক রশিদ আবদি 'বিবিসি’কে বলছেন যে, এই যুদ্ধ ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক। সুদান এবং এরিত্রিয়া ইতোমধ্যেই অংশ নিচ্ছে বলে বলেন তিনি। ইথিওপিয়াসহ হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের জন্যেই কিছুদিনের মাঝেই এখানে আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক শক্তিরা জড়াবে। আবদি আরও বলেন যে, ইথিওপিয়া যদি তিগ্রের কারণে সোমালিয়ার যুদ্ধ থেকে সৈন্য সরিয়ে নেয়, তাহলে সোমালিয়াতেও এর প্রভাব পড়বে। এছাড়াও জাতিগত কারণে ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ কমতে থাকলে জাতিরাষ্ট্র ইথিওপিয়ার অস্তিত্বই হুমকির মাঝে পড়ে যাবে। অপরদিকে জাতিসংঘ বলছে যে, ইথিওপিয়ার ৭০ লক্ষ মানুষ খাদ্য সহায়তার উপর নির্ভরশীল, যার মাঝে তিগ্রের ৬ লক্ষ। এই অঞ্চল পঙ্গপালের আক্রমণেও জর্জরিত। ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বে দুর্বল মানুষগুলিই সবচাইতে ঝুঁকিতে পড়ছে।