০৫ই জুলাই ২০২০
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ৪টা জুলাই মার্কিন জাতীয় দিবসে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছ থেকে টুইটারে শুভেচ্ছাবার্তা পাবার পর মোদিকে ধন্যবাদ দিয়ে বার্তা দেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে ভালোবাসে। ট্রাম্প তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে কথাগুলি বললেও ভারতীয় মিডিয়াতে তা ব্যাপক গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করার হয়। চীনের সাথে চলমান সীমান্ত দ্বন্দ্বে ভারত তার প্রতিবেশীদেরকে কাছে না পেয়ে যুক্তরাষ্ট্রকেই যেন কাছে টেনে নিতে চাইছে। ‘দ্যা হিন্দু’ পত্রিকা বলছে যে, ট্রাম্পের বার্তা দেয়ার মুহুর্তটা বলে দিচ্ছে যে, তিনি দক্ষিণ এশিয়ার সাথে যোগাযোগ রেখে চলেছেন। যদিও মুহুর্তটা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দিবস। চীনের সাথে দ্বন্দ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে দিল্লী এবং বেইজিংএ চলছে ব্যাপক জল্পনাকল্পনা। দুই পক্ষ যখন সীমান্তে নিজেদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে চাইছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের দিকেই সকলে তাকিয়ে রয়েছে। হিমালয়ের পাদদেশের এই বিবাদে ওয়াশিংটনের প্রভাব আসলে কতটুকু?
চীনারা সবসময়ই বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। ৫ই জুলাই চীনা রাষ্ট্রীয় মিডিয়া ‘গ্লোবাল টাইমস’এর এক লেখায় বলা হয় যে, ওয়াশিংটন চাইছে ভারত এবং চীনের সংঘাত থেকে নিজেরা লাভবান হতে। যতবারই ভারতের সাথে চীনের দ্বন্দ্ব হয়েছে, প্রতিবারই মার্কিনীরা ভারতের পক্ষ নিয়েছে এবং দ্বন্দ্বকে আরও উস্কে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং তার বন্ধু রাষ্ট্রগুলি ভারতের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের বিভিন্ন পদ্ধতি গড়ে তুলেছে, যার মাধ্যমে তারা ভারতকে বোঝাতে সক্ষম হচ্ছে যে, তারা ভারতকে যথেষ্ট সমর্থন দেবে। চীনারা প্রকৃতপক্ষে ভারতের সাথে সংঘাতের বিরোধী। তবে চীনারা যে ভারতের সামরিক পদক্ষেপগুলিকে গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় ‘গ্লোবাল টাইমস’এর এক বিশ্লেষণে। ‘ইন্সটিটিউট অব চাইনিজ বর্ডারল্যান্ড স্টাডিজ’এর রিসার্চ ফেলো ঝাং ইয়ংপ্যান বলছেন যে, গালওয়ান নদীর কাছে শায়ক নদীর স্থানে ভারত একটা বিমানবন্দর তৈরি করেছে; সাথে রাস্তা, সেতু এবং মানুষের বসবাসের জন্যে গ্রাম তৈরি করেছে। অনেক বছর ধরেই ভারত চীনা স্থলভাগের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ার চিন্তা করছিল। ১৯৬২ সালে ভারতের সাথে যুদ্ধের সময় থেকে এই স্থানটা উভয় দেশের জন্যেই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বলেন তিনি। ভারত খুব সম্ভবতঃ লাদাখ এবং কাশ্মিরে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করে ভৌগোলিক সুবিধা আদায় করতে চাইছে।
কেউ কেউ অবশ্য চীনকে ভারতের সাথে সমঝোতা করার উপদেশ দিচ্ছেন। ‘বাকনেল ইউনিভার্সিটি’র রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ঝিকুন ঝু ‘আল-জাজিরা’তে এক লেখায় বলছেন যে, চীনারা তাদের চিন্তাকে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে কেন্দ্রিভূত করার ফলে এশিয়ার দেশগুলিতে চীন বিরোধী চিন্তা দানা বেঁধেছে। চীনের উচিৎ অনেকগুলি শত্রু তৈরি না করে বন্ধু তৈরিতে অগ্রসর হওয়া। ভারতের সাথে সংঘাত বাড়তে থাকলে ভারত আরও শক্তভাবে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে যাবে। সীমানার দেশগুলির সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেইজিংএর চিন্তাবিদদের মাঝে হয়তো পূর্ণ সমঝোতা নেই। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, একটা চীনা প্রবাদ রয়েছে যে, কাছের প্রতিবেশী দূরের আত্মীয় অপেক্ষা বেশি কাছের। তিনি আরও বলছেন যে, এশিয়ার দিকে দৃষ্টি ফেরাবার ক্ষেত্রে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ দেশ হলো ভারত।
ভারতেও কেউ কেউ পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে যাবার ব্যাপারে নিশ্চিত নন। দিল্লীর সাংবাদিক ভারত ভূষণ ‘দ্যা কুইন্ট’এ এক লেখায় বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং তার বন্ধুদের সাথে ভারতের কৌশলগত সম্পর্কোন্নয়ন হলে তা নিঃসন্দেহে চীনকে চিন্তিত করবে। কিন্তু তা পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বড় কোন ভূমিকা রাখতে পারবে না। তিনি আরও বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন কৌশলগত চুক্তির অংশ হলেও তার বন্ধুদের জন্যে যুদ্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্র এখন কতটা প্রস্তুত তা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়েই যখন প্রশ্ন উঠেছে, তখন এশিয়াতে যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্রে রেখে কৌশলগত গ্রুপিং স্বপ্নের মতোই। আর যুক্তরাষ্ট্র চীনকে ভারতের সীমানায় দখলীকৃত ভূমি ছেড়ে দিতে বাধ্য করতে পারবে না। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত চুক্তি হিমালয়ের পাদদেশে ভারতের কোন কাজেই আসবে না।
যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে গত এক দশকে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রযুক্তি সহায়তা দিয়েছে। যেমন সীমানাতে দ্রুত সেনা মোতায়েনের সুবিধার্থে ‘সি-১৩০জে সুপার হারকিউলিস’ এবং ‘সি-১৭ গ্লোবমাস্টার’ পরিবহণ বিমান; অতি উঁচু ভূমিতে যুদ্ধ করার সক্ষমতা সম্বলিত ‘এএইচ-৬৪ এপাচি’ ও ‘সিএইচ-৪৭ শিনুক’ হেলিকপ্টার; এবং পাহাড়ের উপর সহজে পরিবহণযোগ্য ‘এম-৭৭৭’ হাল্কা কামান। এই অস্ত্রগুলি বিক্রি করে একাধারে যুক্তরাষ্ট্র যেমন স্বল্প সময়ের মাঝে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র সরবরাহকারীর তালিকায় নাম লিখিয়েছে, তেমনি হিমালয়ের পাদদেশে ভারতকে স্থলযুদ্ধে অবতীর্ণ হবার একটা সক্ষমতা তৈরি করে দিয়েছে, যা কিনা গত পাঁচ দশকে ভারতের ছিল না।
হিমালয়ের পাদদেশে ভারতের যুদ্ধ করার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ ভারত এবং চীন উভয় দেশেই ভিন্ন মতের জন্ম দিয়েছে। চীনের হুমকি মোকাবিলায় ভারতের হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের সুর ধরেই অনেকে ওয়াশিংটনকে কাছে টেনে নিতে চাইছেন। তবে একইসাথে কেউ কেউ আবার ভারতের চিরাচরিত জোট নিরপেক্ষ চিন্তাকে তুলে আনতে চাইছেন এবং নিরাপত্তার জন্যে যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভর করাকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন। অপরপক্ষে বেইজিংএ অনেকেই ভারতের সাথে যুদ্ধ এড়াতে চাইলেও সীমানাতে ভারতের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিকে বাদ দিয়ে চিন্তা করতে পারছেন না। ভারত যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে চীনের বিরুদ্ধে লড়াই করছে বলেই বেইজিংএ অনেকের মাঝে ধারণা জন্ম নিয়েছে; যা থেকে বের হওয়া কঠিন। আর আঞ্চলিকভাবে এশিয়ার দেশগুলির উপর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই বেইজিংএর পক্ষে এশিয়ার দেশগুলিকে কাছে টেনে নেয়া কঠিন হচ্ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ চীন সাগরের ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে থাকার নীতিটাই বেইজিংএ হালে পানি পাচ্ছে বেশি, যা কিনা বেইজিংএর জন্যে এশিয়ার দেশগুলির সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করাটা কঠিন করে দিচ্ছে। এই বাস্তবতায় দক্ষিণ এবং পূর্ব চীন সাগরে দ্বন্দ্ব জিইয়ে রেখেই বেইজিং ভারতের সাথে স্থলসীমানা নিয়ে সংঘাতে জড়িয়েছে, যা কিনা বেইজিংএর কৌশলগত সক্ষমতাকে বিভাজিত করেছে, এবং যুক্তরাষ্ট্রের চীনকে নিয়ন্ত্রণ করার নীতিতে একটা বড় সাফল্য উপহার দিয়েছে।
Sunday, 5 July 2020
হিমালয়ে ভারত-চীন সংঘর্ষে যুক্তরাষ্ট্র কি পেল?
Labels:
China,
Galwan Valley,
Geopolitics,
India,
Ladakh,
USA
Friday, 26 June 2020
ইথিওপিয়া-মিশর-সুদানের পানি-যুদ্ধ - বিশ্ব-ব্যবস্থার প্রতি আরেকটা আঘাত
২৭শে জুন ২০২০
২৬শে জুন ইথিওপিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী গেদু আন্দারগাচিউ ‘ডিপিএ নিউজ এজেন্সি’র সাথে এক সাক্ষাতে ঘোষণা দেন যে, তার দেশ মিশর এবং সুদানের সাথে সমঝোতায় না পৌঁছাতে পারলেও আগামী মাসে ‘গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁস ড্যাম’ বা ‘জিইআরডি’ নামে নীল নদের শাখা ব্লু নাইলের উপর নির্মিত বাঁধের কাজ শেষ করে ফেলবে। ৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার বাজেটে নির্মিত এই বাঁধের মাধ্যমে ইথিওপিয়া বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চাইছে। প্রায় এক দশক ধরে এই বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে ইথিওপিয়ার সাথে মিশর এবং সুদানের কথা চালাচালি হচ্ছে। নীল নদের শেষাংশের প্রায় ১০ কোটি জনসংখ্যার দেশ মিশর বলছে যে, এই বাঁধ তৈরির কাজ শেষ হয়ে গেলে মিশরে পানির স্বল্পতা ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
২০১১ সালের এপ্রিল মাসে ইথিওপিয়া এই বাঁধের কাজ শুরু করে। এই বাঁধ থেকে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্র নির্ধারণ করা হয়েছে। ইথিওপিয়া মাত্র ৩ থেকে ৫ বছরের মাঝেই এই বাঁধের পিছনের হ্রদ ভরে ফেলে এখান থেকে উৎপাদিত ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আশেপাশের দেশগুলিতে রপ্তানি করতে চাইছে। ১৯২৯ এবং ১৯৫৯ সালের দুই চুক্তি অনুযায়ী মিশর নীল নদের ৮৪ বিলিয়ন কিউবিক মিটার পানির সাড়ে ৫৫ বিলিয়ন কিউবিক মিটার বা ৬৬ শতাংশ পানি পায়; আর সুদান পায় ২২ শতাংশ পানি। মিশর চাইছে যে, ইথিওপিয়া ১০ থেকে ২১ বছরের মাঝে শুধুমাত্র বর্ষার ঋতুতে এই বাঁধের পিছনে হ্রদ ভরুক। অন্যদিকে ইথিওপিয়া বলছে যে, মিশরের পানির চাহিদা পূরণ করতে গেলে ইথিওপিয়ার হ্রদ ভর্তি করা সম্ভব হবে না।
‘আল জাজিরা’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, মিশরের পানির চাহিদার ৯৮ শতাংশ আসে নীল নদ থেকে; আর দেশটার ৯৫ শতাংশ মানুষ এই নদীর আশেপাশে বসবাস করে। ১৯৭১ সালে মিশর আসওয়ান বাঁধ তৈরি করার পর বিদ্যুৎ তৈরি করতে পেরেছে ঠিকই, কিন্তু নীল নদের প্রাকৃতিক ব্যবস্থা নষ্ট যায় এবং বদ্বীপের উর্বরতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। বিজ্ঞানীরা আশংকা করছেন যে, ইথিওপিয়ার বাঁধ তৈরি এই অঞ্চলের আর্থসামাজিক অবস্থাকে আরও খারাপ করবে। ইথিওপিয়ার ব্লু নাইল নীল নদের ৮৫ শতাংশ পানির উৎস। ‘আল জাজিরা’ ইথিওপিয়ার বাঁধ নিয়ে পাঁচটা সম্ভাব্য বিশ্লেষণ করেছে। প্রথমতঃ ইথিওপিয়া যদি ২১ বছরে বাঁধের পিছনের হ্রদ পানি দিয়ে ভর্তি করে, তাহলে মিশর তার বাৎসরিক পানির চাহিদার ৫ শতাংশ হারাবে; আর আড়াই শতাংশ কৃষিজমি হারাবে। দ্বিতীয়তঃ যদি ১০ বছরে হ্রদ ভরা হয়, তাহলে মিশর ১৪ শতাংশ পানি আর ২০ লক্ষ একর বা ১৮ শতাংশ কৃষিজমি হারাবে। তৃতীয়তঃ হ্রদ ৭ বছরে ভর্তি করা হলে মিশর ২২ শতাংশ পানি হারাবে; কৃষিজমি হারাবে ৩০ লক্ষ একর বা ৩০ শতাংশ। চতুর্থতঃ হ্রদ পাঁচ বছরে ভর্তি করা হলে মিশর ৩৬ শতাংশ পানি এবং ৫০ শতাংশ কৃষিজমি হারাবে। আর শেষ হিসেবে, ইথিওপিয়া যদি মাত্র ৩ বছরের মাঝেই হ্রদ ভরে ফেলে, তাহলে মিশর ৫০ শতাংশ পানি এবং ৬৭ শতাংশ বা সাড়ে ৬৭ লক্ষ একর কৃষিজমি হারাবে।
এই দ্বন্দ্বে আরেক পক্ষ সুদান এতদিন বলে এসেছে যে, ইথিওপিয়ার বাঁধ সুদানের বন্যা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা দেয়া ছাড়াও দেশটার পূর্বের পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলিকে পলি থেকে বাঁচাবে। সুদান এই আলোচনায় এতদিন বাঁধের বিরোধিতা করেনি। কিন্তু সবকিছু পাল্টে যায় সুদানে সাম্প্রতিক সরকার পরিবর্তনের পর থেকে। গত ১৩ই মে সুদান ইথিওপিয়ার সাথে ‘আংশিক চুক্তি’ স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানায়। সুদানের প্রধানমন্ত্রী আব্দ আল্লাহ হামদক বলেন যে, চুক্তিতে টেকনিক্যাল এবং আইনগত আর্টিকেল রাখা হয়নি; আর তথ্য আদানপ্রদান এবং সমন্বয়েও ঘাটতি রয়েছে। তিনি আরও বলেন যে, তিন দেশ একত্রে বসে সমঝোতায় আসার আগে জুলাই মাসে ইথিওপিয়ার হ্রদ ভর্তি করা উচিৎ হবে না। গত ২৪শে জুন সুদানের সেচ মন্ত্রী ইয়াসের আব্বাস এক সংবাদ সন্মেলনে বলেন যে, সমঝোতা ছাড়া ইথিওপিয়া বাঁধের কাজ শেষ করে ফেললে সুদানের বাঁধগুলি হুমকির মাঝে পড়ে যাবে। সুদান নিজেদের বাঁধের কোন সমস্যা হবেনা, এই শর্তে ইথিওপিয়ার সাথে সমঝোতায় রাজি ছিল।
আলোচনা থেকে সুদান উঠে আসার পরপরই ইথিওপিয়ার সাথে সুদানের সম্পর্ক উল্টোদিকে মোড় নেয়, যখন ২৯শে মে সুদান বলে যে, দেশটার পূর্বে ইথিওপিয়ার সীমানায় গাদারিফে ইথিওপিয়দের সশস্ত্র হামলায় তিনজন সুদানি সেনা এবং বেসামরিক লোক হতাহত হয়েছে। রাজধানী খার্তুমে ইথিওপিয়ার রাষ্ট্রদূতকে ডেকে প্রতিবাদ জানানো হয়। এরপর ২২শে জুন সুদান ঘোষণা দেয় যে, গাদারিফের আনফাল সেনা ক্যাম্পে ইথিওপিয় সামরিক হামলা প্রতিহত করেছে সুদানিরা। এই ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়ে ‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, সাবেক প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিররের সময় সুদান তার সীমানায় ইথিওপিয় কৃষকদের চাষ করতে দিতো; কিন্তু বশির ক্ষমতাচ্যুত হবার পর নীতির পরিবর্তন হয়েছে এবং ২৫ বছরে প্রথমবারের মতো সুদান ইথিওপিয়ার সীমান্তে সেনা মোতায়েন করেছে। এই সীমান্ত সংঘর্ষকে ভূরাজনীতির অংশ হিসেবেই দেখতে হবে বলে বলছে তারা। এক দশক ধরে চলা এই উত্তেজনা সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাবে কিনা, তা নির্ভর করছে মিশরের উপর। আরব দেশগুলি ২৩শে জুন মিশরকে সমর্থন জানিয়ে ইথিওপিয়াকে বাঁধের কাজে দেরি করতে অনুরোধ করে। তারা বলছে যে, মিশর আর সুদানের সুপেয় পানির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার অর্থ হলো আরবের জাতীয় নিরাপত্তা ক্ষুন্ন হওয়া। অপরদিকে মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সামেহ সুক্রি বলেন যে, বাঁধের ব্যাপারে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ যদি সফল না হয়, তাহলে মিশর তার যা বলার সরাসরি এবং পরিষ্কারভাবে বলবে। মিশর এতদিন কোন সামরিক হুমকি না দিলেও এখন কেউই এব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছেন না। বিশেষ করে হঠাত করেই সুদান সুর পাল্টে ফেলার কারণে ঘটনা নাটকীয় মোড় নিয়েছে। বিবদমান পক্ষরা শক্তির জোরেই এই সমস্যার মিটমাট করবে কিনা, তার দায় জাতিসংঘের সাফল্য-ব্যর্থতার উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে; যা কিনা করোনাভাইরাসে নুয়ে পড়া বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার প্রতি আরেকটা আঘাত হিসেবেই এসেছে।
২৬শে জুন ইথিওপিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী গেদু আন্দারগাচিউ ‘ডিপিএ নিউজ এজেন্সি’র সাথে এক সাক্ষাতে ঘোষণা দেন যে, তার দেশ মিশর এবং সুদানের সাথে সমঝোতায় না পৌঁছাতে পারলেও আগামী মাসে ‘গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁস ড্যাম’ বা ‘জিইআরডি’ নামে নীল নদের শাখা ব্লু নাইলের উপর নির্মিত বাঁধের কাজ শেষ করে ফেলবে। ৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার বাজেটে নির্মিত এই বাঁধের মাধ্যমে ইথিওপিয়া বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চাইছে। প্রায় এক দশক ধরে এই বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে ইথিওপিয়ার সাথে মিশর এবং সুদানের কথা চালাচালি হচ্ছে। নীল নদের শেষাংশের প্রায় ১০ কোটি জনসংখ্যার দেশ মিশর বলছে যে, এই বাঁধ তৈরির কাজ শেষ হয়ে গেলে মিশরে পানির স্বল্পতা ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
২০১১ সালের এপ্রিল মাসে ইথিওপিয়া এই বাঁধের কাজ শুরু করে। এই বাঁধ থেকে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্র নির্ধারণ করা হয়েছে। ইথিওপিয়া মাত্র ৩ থেকে ৫ বছরের মাঝেই এই বাঁধের পিছনের হ্রদ ভরে ফেলে এখান থেকে উৎপাদিত ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আশেপাশের দেশগুলিতে রপ্তানি করতে চাইছে। ১৯২৯ এবং ১৯৫৯ সালের দুই চুক্তি অনুযায়ী মিশর নীল নদের ৮৪ বিলিয়ন কিউবিক মিটার পানির সাড়ে ৫৫ বিলিয়ন কিউবিক মিটার বা ৬৬ শতাংশ পানি পায়; আর সুদান পায় ২২ শতাংশ পানি। মিশর চাইছে যে, ইথিওপিয়া ১০ থেকে ২১ বছরের মাঝে শুধুমাত্র বর্ষার ঋতুতে এই বাঁধের পিছনে হ্রদ ভরুক। অন্যদিকে ইথিওপিয়া বলছে যে, মিশরের পানির চাহিদা পূরণ করতে গেলে ইথিওপিয়ার হ্রদ ভর্তি করা সম্ভব হবে না।
‘আল জাজিরা’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, মিশরের পানির চাহিদার ৯৮ শতাংশ আসে নীল নদ থেকে; আর দেশটার ৯৫ শতাংশ মানুষ এই নদীর আশেপাশে বসবাস করে। ১৯৭১ সালে মিশর আসওয়ান বাঁধ তৈরি করার পর বিদ্যুৎ তৈরি করতে পেরেছে ঠিকই, কিন্তু নীল নদের প্রাকৃতিক ব্যবস্থা নষ্ট যায় এবং বদ্বীপের উর্বরতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। বিজ্ঞানীরা আশংকা করছেন যে, ইথিওপিয়ার বাঁধ তৈরি এই অঞ্চলের আর্থসামাজিক অবস্থাকে আরও খারাপ করবে। ইথিওপিয়ার ব্লু নাইল নীল নদের ৮৫ শতাংশ পানির উৎস। ‘আল জাজিরা’ ইথিওপিয়ার বাঁধ নিয়ে পাঁচটা সম্ভাব্য বিশ্লেষণ করেছে। প্রথমতঃ ইথিওপিয়া যদি ২১ বছরে বাঁধের পিছনের হ্রদ পানি দিয়ে ভর্তি করে, তাহলে মিশর তার বাৎসরিক পানির চাহিদার ৫ শতাংশ হারাবে; আর আড়াই শতাংশ কৃষিজমি হারাবে। দ্বিতীয়তঃ যদি ১০ বছরে হ্রদ ভরা হয়, তাহলে মিশর ১৪ শতাংশ পানি আর ২০ লক্ষ একর বা ১৮ শতাংশ কৃষিজমি হারাবে। তৃতীয়তঃ হ্রদ ৭ বছরে ভর্তি করা হলে মিশর ২২ শতাংশ পানি হারাবে; কৃষিজমি হারাবে ৩০ লক্ষ একর বা ৩০ শতাংশ। চতুর্থতঃ হ্রদ পাঁচ বছরে ভর্তি করা হলে মিশর ৩৬ শতাংশ পানি এবং ৫০ শতাংশ কৃষিজমি হারাবে। আর শেষ হিসেবে, ইথিওপিয়া যদি মাত্র ৩ বছরের মাঝেই হ্রদ ভরে ফেলে, তাহলে মিশর ৫০ শতাংশ পানি এবং ৬৭ শতাংশ বা সাড়ে ৬৭ লক্ষ একর কৃষিজমি হারাবে।
এই দ্বন্দ্বে আরেক পক্ষ সুদান এতদিন বলে এসেছে যে, ইথিওপিয়ার বাঁধ সুদানের বন্যা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা দেয়া ছাড়াও দেশটার পূর্বের পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলিকে পলি থেকে বাঁচাবে। সুদান এই আলোচনায় এতদিন বাঁধের বিরোধিতা করেনি। কিন্তু সবকিছু পাল্টে যায় সুদানে সাম্প্রতিক সরকার পরিবর্তনের পর থেকে। গত ১৩ই মে সুদান ইথিওপিয়ার সাথে ‘আংশিক চুক্তি’ স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানায়। সুদানের প্রধানমন্ত্রী আব্দ আল্লাহ হামদক বলেন যে, চুক্তিতে টেকনিক্যাল এবং আইনগত আর্টিকেল রাখা হয়নি; আর তথ্য আদানপ্রদান এবং সমন্বয়েও ঘাটতি রয়েছে। তিনি আরও বলেন যে, তিন দেশ একত্রে বসে সমঝোতায় আসার আগে জুলাই মাসে ইথিওপিয়ার হ্রদ ভর্তি করা উচিৎ হবে না। গত ২৪শে জুন সুদানের সেচ মন্ত্রী ইয়াসের আব্বাস এক সংবাদ সন্মেলনে বলেন যে, সমঝোতা ছাড়া ইথিওপিয়া বাঁধের কাজ শেষ করে ফেললে সুদানের বাঁধগুলি হুমকির মাঝে পড়ে যাবে। সুদান নিজেদের বাঁধের কোন সমস্যা হবেনা, এই শর্তে ইথিওপিয়ার সাথে সমঝোতায় রাজি ছিল।
আলোচনা থেকে সুদান উঠে আসার পরপরই ইথিওপিয়ার সাথে সুদানের সম্পর্ক উল্টোদিকে মোড় নেয়, যখন ২৯শে মে সুদান বলে যে, দেশটার পূর্বে ইথিওপিয়ার সীমানায় গাদারিফে ইথিওপিয়দের সশস্ত্র হামলায় তিনজন সুদানি সেনা এবং বেসামরিক লোক হতাহত হয়েছে। রাজধানী খার্তুমে ইথিওপিয়ার রাষ্ট্রদূতকে ডেকে প্রতিবাদ জানানো হয়। এরপর ২২শে জুন সুদান ঘোষণা দেয় যে, গাদারিফের আনফাল সেনা ক্যাম্পে ইথিওপিয় সামরিক হামলা প্রতিহত করেছে সুদানিরা। এই ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়ে ‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, সাবেক প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিররের সময় সুদান তার সীমানায় ইথিওপিয় কৃষকদের চাষ করতে দিতো; কিন্তু বশির ক্ষমতাচ্যুত হবার পর নীতির পরিবর্তন হয়েছে এবং ২৫ বছরে প্রথমবারের মতো সুদান ইথিওপিয়ার সীমান্তে সেনা মোতায়েন করেছে। এই সীমান্ত সংঘর্ষকে ভূরাজনীতির অংশ হিসেবেই দেখতে হবে বলে বলছে তারা। এক দশক ধরে চলা এই উত্তেজনা সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাবে কিনা, তা নির্ভর করছে মিশরের উপর। আরব দেশগুলি ২৩শে জুন মিশরকে সমর্থন জানিয়ে ইথিওপিয়াকে বাঁধের কাজে দেরি করতে অনুরোধ করে। তারা বলছে যে, মিশর আর সুদানের সুপেয় পানির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার অর্থ হলো আরবের জাতীয় নিরাপত্তা ক্ষুন্ন হওয়া। অপরদিকে মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সামেহ সুক্রি বলেন যে, বাঁধের ব্যাপারে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ যদি সফল না হয়, তাহলে মিশর তার যা বলার সরাসরি এবং পরিষ্কারভাবে বলবে। মিশর এতদিন কোন সামরিক হুমকি না দিলেও এখন কেউই এব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছেন না। বিশেষ করে হঠাত করেই সুদান সুর পাল্টে ফেলার কারণে ঘটনা নাটকীয় মোড় নিয়েছে। বিবদমান পক্ষরা শক্তির জোরেই এই সমস্যার মিটমাট করবে কিনা, তার দায় জাতিসংঘের সাফল্য-ব্যর্থতার উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে; যা কিনা করোনাভাইরাসে নুয়ে পড়া বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার প্রতি আরেকটা আঘাত হিসেবেই এসেছে।
Labels:
Egypt,
Ethiopia,
Geopolitics,
GERD,
Nile River,
Sudan
Wednesday, 24 June 2020
তিউনিসিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফ্রান্স ও তুরস্কের মাঝে চলছে প্রতিযোগিতা
২৪শে জুন ২০২০
ফ্রান্স লিবিয়ার যুদ্ধে তিউনিসিয়ার সমর্থন চাইছে
গত ২২শে জুন ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ করোনাভাইরাস মোকাবিলায় তিউনিসিয়ার জন্যে সাড়ে ৩’শ মিলিয়ন ইউরো সহায়তার ঘোষণা দেন। ইলাইসি প্যালেসে তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট কাইস সাইয়েদের সাথে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় ম্যাক্রঁ বলেন যে, তিউনিসিয়ার স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেয়া, সেদেশে হাসপাতাল তৈরি এবং অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পুনরায় শুরু করার লক্ষ্যে সহায়তা দেবে ফ্রান্স। তিনি আরও বলেন যে, এই অর্থ ২০২২ সাল পর্যন্ত তিউনিসার স্বাস্থ্যখাত এবং যুব উন্নয়নের জন্যে ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ইউরো বরাদ্দের অংশ। দুই দেশ আঞ্চলিক ইস্যু নিয়েও কথা বলেছে। ম্যাক্রঁ বলেন যে, ফ্রান্স এবং তিউনিসিয়া একত্রে দাবি করছে যে, লিবিয়াতে যুদ্ধরত পক্ষগুলি যেন আলোচনার টেবিলে বসে সকলের জন্যে নিরাপত্তা এবং লিবিয়ার সংস্থাগুলির পুনএকত্রীকরণ নিশ্চিত করে। ফরাসী প্রেসিডেন্ট লিবিয়াতে বিদেশী হস্তক্ষেপ বন্ধের আহ্বান জানান। একইসাথে ম্যাক্রঁ লিবিয়াতে তুরস্কের ভূমিকাকে ‘বিপজ্জনক খেলা’ বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন যে, এটা ঐ অঞ্চল এবং ইউরোপের জন্যে সরাসরি হুমকিস্বরূপ। তিনি বলেন যে, একই কথাগুলি ঐদিনই তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফোন করে বলেছেন। অপরদিকে তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট কাইস সাইয়েদ বলেন যে, তার দেশ ফ্রান্সের সাথে অতীতের ক্ষতচিহ্ন ভুলে গিয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে চাইছে। তিনি তিউনিসিয়ার উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত একটা রেলওয়ে লাইন তৈরির চিন্তায় ফ্রান্সের সহায়তা দেয়াকে স্বাগত জানান। দুই দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের আলোচনা এমন সময়ে এলো, যখন তিউনিসিয়ার প্রতিবেশী দেশ লিবিয়ার যুদ্ধে তুরস্কের হস্তক্ষেপের পর যুদ্ধের মোড় ঘুরে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে তিউনিসিয়ার সাথে ফ্রান্সের সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টার ব্যাপক ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে।
লন্ডন থেকে প্রকাশিত পত্রিকা ‘আল এরাব উইকলি’র এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, লিবিয়াতে কোণঠাসা হয়ে যাবার পর ফ্রান্স লিবিয়ার প্রতিবেশী তিউনিসিয়াতে তার দুর্বল হয়ে যাওয়া অবস্থানকে আরও দৃঢ় করতে চাইছে। কিছুদিন ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মন্তব্য করেন যে, লিবিয়াতে আরেকটা সিরিয়া তৈরি হতে চলেছে; যা খুবই দুশ্চিন্তার ব্যাপার। ২৬শে মে তিউনিসিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইমেদ হাজগুই ফ্রান্সের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফ্লোরেন্স পার্লির সাথে ফোনে লিবিয়া নিয়ে কথা বলেন। তারা লিবিয়ায় বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপের ব্যাপারে একমত পোষণ করেন এবং লিবিয়ার সমস্যা লিবিয়ার মানুষদের মাঝেই সমাধান হওয়া উচিৎ বলে বলেন। দুই দেশের মাঝে সামরিক সহযোগিতা আরও বাড়ানো যায় কিভাবে, তা নিয়েও তারা আলোচনা করেন।

তিউনিসিয়ার সামরিক বাহিনী গড়ে দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক
ঐতিহাসিকভাবে তিউনিসিয়ার সাথে ফ্রান্সের সম্পর্ক বেশি গভীর থাকলেও সামরিক বাহিনীর ক্ষেত্রে বেশকিছু পরিবর্তন এসেছে। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’ তিউনিসিয়া নিয়ে বেশ কয়েকটা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তারা বলছে যে, একনায়ক বেন আলি তিউনিসিয়ার সামরিক বাহিনীকে ছোট করে রেখেছিলেন, যাতে সামরিক বাহিনী দেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে। তিউনিসিয়ার নিয়ন্ত্রণ ছিল মূলতঃ ন্যাশনাল গার্ডের হাতে, যা কিনা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালের অধীন, এবং যার মূল কাজ ছিল দেশের উপর শাসকের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। ব্যাপারটা পরিবর্তন হয়ে যায় ২০১১ সালে বেন আলির পতনের পর। যুক্তরাষ্ট্র তিউনিসিয়া নিয়ে চিন্তিত ছিল যে, ছোট হলেও তিউনিসিয়া থেকেই সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষ ইরাক ও সিরিয়াতে বিভিন্ন জিহাদি গ্রুপে যোগ দিয়েছে। এছাড়াও তিউনিসিয়ায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবার পর থেকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভেদ এবং অস্থিরতা মানুষকে গণতন্ত্রবিমুখ করে ফেলেছে। উদাহরণস্বরূপ, তিউনিসিয়ার বর্তমান সরকারে ৬টা রাজনৈতিক দল থেকে ১৫ জন এমপি এবং আরও ১৭ জন স্বতন্ত্র এমপি মন্ত্রীত্ব পেয়েছেন। কোন দলই প্রতিশ্রুতি দিয়ে কথা রাখেনি; তাই কোন দলই বেশি সংখ্যক আসন পাচ্ছে না। ২০১৪ সালে ‘পিউ রিসার্চ’এর এক জরিপ বলছে যে, মাত্র ৪৮ শতাংশ তিউনিসিয়ান গণতন্ত্রকে সমর্থন করছে। ৫১ শতাংশ মানুষ মনে করছে যে গণতান্ত্রিক সময়ের চাইতে একনায়কের সময়েই দেশের অবস্থা ভালো ছিল। মুসলিম ব্রাদারহুডপন্থী ‘এননাহদা পার্টি’র সমর্থন দুই বছরের মাঝে ৬৫ শতাংশ থেকে ৩১ শতাংশে নেমে আসে। ৮৩ শতাংশ তিউনিসিয়ান মনে করে যে, দেশের রাজনীতিতে ইসলামের আদর্শগুলি বাস্তবায়িত থাকা উচিৎ; যাদের মাঝে ৩০ শতাংশ মনে করে যে, ইসলামকে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা উচিৎ। কিন্তু সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সামরিক বাহিনীর ব্যাপারে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি। ৯৫ শতাংশ মানুষ সামরিক বাহিনীর প্রশংসা করে; যেখানে মিডিয়ার পক্ষে বলে ৬২ শতাংশ মানুষ; আদালতের পক্ষে ৪৪ শতাংশ; আর ধর্মীয় নেতাদের পক্ষে মাত্র ৩৩ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র এই ব্যাপারগুলিকে পুঁজি করেই তিউনিসিয়ার সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দেয়া শুরু করে এবং তাদের সাথে মহড়া এবং অপারেশনে অংশ নিয়ে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে থাকে।
লিবিয়া থেকে আসা জিহাদী গ্রুপগুলির সাথে তিউনিসিয়ার সেনাদের ব্যাপক সংঘর্ষে নিয়মিত প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে থাকে। মার্কিন সেনারাও সেখানে সরাসরি জড়িত থাকলেও তা পত্রিকার খবরে আসতে দেয়া হয়নি। ট্রাম্প প্রশাসন হোয়াইট হাউজে আসার পর থেকে তিউনিসিয়ার জন্যে সামরিক সহায়তা কমে গেলেও তিউনিসিয়া নিজের নিরাপত্তায় বিনিয়োগ করতে থাকে। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে অংশ নিতে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র মার্কিনীরা তিউনিসিয়াকে সরবরাহ করেছে। এর মাঝে রয়েছে ৮০টারও বেশি হেলিকপ্টার; যার মাঝে ২৪টা ‘ওএইচ-৫৮ডি কিওওয়া ওয়ারিয়র’, ৮টা ‘ইউএইচ-৬০এম ব্ল্যাক হক’, ৩৬টা ‘ইউএইচ-১’ রয়েছে। এছাড়াও ৯টা ‘সি-১৩০’ পরিবহণ বিমান দেয়া হয় তিউনিসিয়াকে; যার মাঝে ২০১৪ সালে দেয়া হয় সর্বশেষ মডেলের ‘সি-১৩০জে সুপার হারকিউলিস’। এবছরের এপ্রিল মাসে একটা ‘সি-১৩০জে’ বিমান করোনাভাইরাস মোকাবিলায় ২২ হাজার কিঃমিঃ উড়ে চীন থেকে মেডিক্যাল সাপ্লাই নিয়ে আসে। এই ফ্লাইটের মাঝে বিমানটা দু’বার কাজাখস্তানে রিফুয়েলিং করে। নিরাপত্তা বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘ওয়ার অন দ্যা রকস’এর এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, করোনাভাইরাস মোকাবিলায় তিউনিসিয়ার রাস্তায় সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়; যা কিনা দেশের মানুষ ভালোভাবে দেখেছে। অন্যদিকে মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’ বলছে যে, তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক দলগুলি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নেয়ার জন্যে প্রতিযোগিতা করছে। একদিকে ‘নিদা তিউনেস’ এবং ‘এননাহদা পার্টি’ সামরিক বাহিনীর উপর তাদের প্রভাব বাড়াতে চাইছে; অন্যদিকে বিরোধীরা চাইছে এতে বাধা দিতে।
মার্কিনীরা তিউনিসিয়ার উপকূল সন্ত্রাসীমুক্ত রাখতে তিউনিসিয়ার নৌবাহিনীকে কমপক্ষে ২২টা ছোট বোট দেয়। তবে ২০১৬ সাল থেকে তিউনিসিয়া নিজস্ব নৌবাহিনী গঠন করা শুরু করে। প্রথমবারের মতো নেদারল্যান্ডসের ‘ডামেন’ শিপইয়ার্ড থেকে অত্যাধুনিক চারটা অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল অর্ডার করে তারা। ৭২ মিটার লম্বা এবং প্রায় ১৩’শ টনের হেলিকপ্টার ও ড্রোন বহনে সক্ষম এই জাহাজগুলি তিউনিসিয়াকে ভূমধ্যসাগরে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ২০১৮ সালের মাঝেই ‘ডামেন’ চারটা জাহাজই ডেলিভারি দিয়ে দেয়। এর আগ পর্যন্ত তিউনিসিয়ার ফরাসী ও জার্মান নির্মিত পুরোনো ফাস্ট এটাক ক্রাফটগুলি শুধুমাত্র তিউনিসিয়ার উপকূলের কাছাকাছি অঞ্চল পাহাড়া দিতে সক্ষম ছিল। শুধু তাই নয়, তিউনিসিয়া নিজেরাই ৩টা ছোট আকৃতির ২৬ মিটার লম্বা প্যাট্রোল বোট তৈরি করে নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা জানান দেয়।
সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের আড়ালে যুক্তরাষ্ট্র এবং তুরস্ক তিউনিসিয়ার সাথে সামরিক সম্পর্ক গভীর করেছে। ২০১৪ সালে তিউনিসিয়ার সেনাবাহিনী তুরস্ক থেকে ১’শটা ‘কিরপি’ আর্মার্ড ভেহিকল অর্ডার করে। ২০১৬ সাল থেকে এর ডেলিভারি শুরু হয়। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগানের তিউনিসিয়া সফরের সময়ে দুই দেশের মাঝে কয়েকটা সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর মাঝে আগের ৩’শ মিলিয়ন ডলার সহায়তার সাথে আরও ৩’শ মিলিয়ন ডলার সহায়তার আশ্বাস দেয়া হয়। তুরস্ক তিউনিসিয়ার সেনাবাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। ২০১১ সাল থেকে ২০১৭ সালের মাঝে তুরস্ক তিউনিসিয়াকে ২’শ মিলিয়ন ডলারের নিরাপত্তা সহায়তা দেয়।
গত মার্চেই ‘ডিফেন্স নিউজ’ জানায় যে, তুরস্কের প্রতিরক্ষা কোম্পানি ‘টিএআই’ তিউনিসিয়ার কাছে ২’শ ৪০ মিলিয়ন ডলারে ৬টা ‘আনকা-এস’ সার্ভেইল্যান্স ড্রোন এবং তিনটা কন্ট্রোল স্টেশন বিক্রির ক্রয়াদেশ নিশ্চিত করেছে। তুর্কি কর্মকর্তারা বলছেন যে, তারা এই ক্রয়াদেশের জন্যে এক বছরের বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করছিলেন। আর তারা তিউনিসিয়ার কাছে অস্ত্র বহণকারী ড্রোন বিক্রি করার চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছেন। ‘আনকা-এস’ ড্রোনের বৈশিষ্ট্য হলো এটা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়; যার ফলশ্রুতিতে এই ড্রোন নিয়ন্ত্রক স্টেশন থেকে বেশ দূরে গিয়েও কাজ করতে সক্ষম। অর্থাৎ এই ড্রোনগুলি তিউনিসিয়ার উপকূলের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলির উপর নজরদারি করতে সক্ষম হবে।

লিবিয়ার যুদ্ধে তুরস্কের আবির্ভাব তিউনিসিয়ার রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে
লিবিয়াতে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের ঠিক আগেআগে গত বছরের ডিসেম্বরের শেষে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগান হঠাত করেই তিউনিসিয়ার রাজধানীতে আবির্ভূত হন। এরদোগানের সাথে বৈঠকের পর তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট সাইয়েদ সাংবাদিকদের বলেন যে, লিবিয়ার সাথে তুরস্কের সমুদ্রসীমা নিয়ে যে চুক্তি হয়েছে, তা ঐ দুই দেশের ব্যাপার এবং তাতে তিউসিয়ার কিছু বলার নেই। অপরদিকে এরদোগান বলেন যে, লিবিয়ার ব্যাপারে আলোচনায় আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া এবং কাতারকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিৎ ছিল, কারণ এই দেশগুলি লিবিয়া সমাজ এবং রাজনৈতিক কাঠামোকে ভালোভাবে বোঝে। এরদোগানের এই সফরের পর তুরস্ক শুধু কথায় নয়, কার্যত তিউনিসিয়াকে লিবিয়ার ব্যাপারে জড়িত হতে বাধ্য করেছে। ‘রয়টার্স’ খবর দিচ্ছে যে, গত ৮ই মে তুরস্কের একটা পরিবহণ বিমান ত্রিপোলির বিমানন্দর অনিরাপদ বলে তিউনিসিয়ার দক্ষিণে লিবিয়ার সীমানার কাছাকাছি জিয়েরবা বিমানবন্দরে অবতরণ করার অনুমতি চায়। তিউনিসিয়া বিমানটাকে নামতে দেয়। এই বিমানে লিবিয়ার জন্যে মেডিক্যাল সামগ্রী ছিল বলে বলা হয়; এবং এই সামগ্রীগুলি লিবিয়া পর্যন্ত পৌঁছে দেবার জন্যে তিউনিসিয়াকে অনুরোধ করা হয়। তিউনিসিয়ার বিরোধী দল ‘ফ্রি দেস্তুরিয়ান পার্টি’র নেতারা অভিযোগ করেন যে, তুরস্ক তিউনিসিয়াকে লিবিয়ার যুদ্ধের লজিস্টিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে।
ওয়াশিংটন থেকে প্রকাশিত আরেক পত্রিকা ‘আল মনিটর’ বলছে যে, লিবিয়ার যুদ্ধ তিউনিসিয়ার রাজনীতিকে ঘোলাটে করে ফেলেছে। কারণ তিউনিসিয়াতে সকলেই লিবিয়ার যুদ্ধে কোন না কোন পক্ষ নিয়ে কথা বলা শুরু করেছে। তিউনিসিয়ার পার্লামেন্টে বর্তমানে সবচাইতে বেশি আসন দখন করে আছে ‘এননাহদা পার্ট’, যারা মুসলিম ব্রাদারহুডের চিন্তার সাথে একমত পোষণ করে। ‘এননাহদা’ লিবিয়ার যুদ্ধে ত্রিপোলির ‘গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল একর্ড’ বা ‘জিএনএ’ সরকারকে সমর্থন করছে। একইসাথে তুরস্কের ক্ষমতাসীন ‘একে পার্ট’র সাথেও তাদের বেশ ভালো সম্পর্ক রয়েছে। অপরদিকে তিউনিসিয়ায় ২৪ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা এবং ২০১১ সালে ক্ষমতাচ্যুত প্রাক্তন একনায়ক জিনে এল আবিদিন বেন আলির সমর্থকদের থেকে গঠন করা ‘ফ্রি দেস্তুরিয়ান পার্টি’ বা ‘পিডিএল’ লিবিয়ার জেনারেল হাফতারের পক্ষ সমর্থন করছে। তিউনিসের ‘কলাম্বিয়া গ্লোবাল সেন্টার্স’এর প্রধান ইউসেফ শেরিফ বলছেন যে, সকলেই আসলে তিউনিসিয়াকে লিবিয়াতে যাবার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখে। লিবিয়া থেকে সন্ত্রাসীরা যাতে তিউনিসিয়ায় প্রবেশ করতে না পারে, এই অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র তিউনিসিয়ার সাথে সম্পর্কোন্নয়ন করেছে। তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষক সেইফ এদ্দিন ত্রাবেলসির মতে, লিবিয়াতে ‘জিএনএ’এর সাম্প্রতিক সফলতা তিউনিসিয়ার নিরাপত্তাকে আরও সুসংহত করবে। তিনি বলেন যে, তিউনিসিয়া আর লিবিয়া একই সূত্রে গাঁথা। লিবিয়াতে যা কিছুই ঘটবে, সেটাই তিউনিসিয়াকে প্রভাবিত করবে। লিবিয়ার ঘটনার ব্যাপারে তিউনিসিয়ার জনগণ চিন্তিত থাকবে, এটাই তো স্বাভাবিক। হাফতারের বিরুদ্ধে লিবিয়াতে ‘জিএনএ’র বড় বিজয়ের পরপরই ‘এননাহদা পার্টি’র প্রধান এবং পার্লামেন্টের স্পিকার রাচেদ ঘানুচি ত্রিপোলি সরকারের প্রধান ফায়েজ আল-সারাজকে ফোন করে অভিনন্দন জানান। কিন্তু এই ব্যাপারটা তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট কাইস সাইয়েদ একেবারেই পছন্দ করেননি। তিউনিসিয়ার সংবিধান অনুযায়ী পররাষ্ট্রনীতি প্রেসিডেন্টের হাতে। সাইয়েদ ঈদ উল-ফিতরের এক বার্তায় জোর গলায় বলেন যে, সকলেরই জানা উচিৎ যে তিউনিসিয়া একটাই এবং এর একজনই প্রেসিডেন্ট।
তিউনিসিয়ায় ঔপনিবেশিক শাসক ফ্রান্সের প্রভাব
তিউনিসিয়ার প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শক্তি হওয়ায় সেখানকার রাজনীতিতে ফ্রান্সের প্রভাব ব্যাপক। দেশের এলিট ক্লাসের বেশিরভাগ ব্যক্তিরই কোন না কোনভাবে ফ্রান্সের সাথে যোগসূত্র রয়েছে। ‘পিডিএল’এর প্রতিষ্ঠাতা এবং বেন আলি সরকারের প্রধানমন্ত্রী হামেদ কারুয়ি ফ্রান্সে মেডিসিন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এলিয়েস ফাখফাখ ফ্রান্সের লিয়ঁ এবং প্যারিস থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ব্যবসায় বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইমেদ হাজগুই ফ্রান্সে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। ক্ষমতাসীন কোয়ালিশনের মাঝের দল ‘তাহিয়া তিউনেস’এর নেতা এবং গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইউসেফ চাহেদ ফ্রান্সে কৃষি বিষয়ে পড়াশোনা করেন। বিলিয়নায়ার ব্যবসায়ী, মিডিয়া টাইকুন এবং ২০১৯ সালের প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচনে প্রার্থী নাবিল কারুয়ি ফ্রান্সের বিভিন্ন কোম্পানিতে চাকুরি করে ক্যারিয়ার শুরু করেন।
‘পিডিএল’এর নেতা আবির মুসি ৩রা জুন লিবিয়াতে বিদেশী হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে বিল উত্থাপন করেন। বিলটা শেষ পর্যন্ত পাস না হলেও তর্ক বিতর্কের সময় আবির মুসি ‘এননাহদা’র নেতা রাচেদ ঘানুচিকে তুরস্ক এবং কাতারের অনুগত বলে অভিযোগ করেন। এরপর এই বিলের পাল্টা জবাব হিসেবে পার্লামেন্টে ১৯ আসনের অধিকারী দল ‘কোয়ালিশন আল কারামা’ আরেকটা বিল উত্থাপন করে, যা পাস হলে প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শাসক ফ্রান্সের কাছ থেকে ঔপনিবেশিক সময়ের অপরাধের জন্যে ক্ষমা চাইবার দাবি জানানো হবে। ১৪ ঘন্টা তুমুল বাকযুদ্ধের পর সাংসদরা এই বিল রুখে দেয়। ৭৭ জন সাংসদ এই বিলের পক্ষে ভোট দেয়; মাত্র ৫ জন ভোট দেয় বিপক্ষে। কিন্তু ৪৬ জন ভোটদানে বিরত থাকার কারণে বিল পাসের জন্যে দরকার ১’শ ৯ ভোট পাওয়া যায়নি। তবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল যে, মুসলিম ব্রাদারহুডপন্থী ‘এননাহদা’ এই বিল পাসের বিপক্ষে কথা বলে। তারা বলে যে, এই বিল পাস হলে তা তিউনিসিয়ার অর্থনীতিকে আঘাত করবে এবং দেশটার গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপিয় বন্ধুদের দূরে ঠেলে দেবে। ১৮৮১ সাল থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত ফ্রান্স তিউনিসিয়ার ঔপনিবেশিক শাসক ছিল। এই বিল পাস না হওয়ায় এখনও তিউনিসিয়ার উপর ফ্রান্সের প্রভাব টের পাওয়া যায়।
তিউনিসিয়াতে ফ্রান্সের কি স্বার্থ রয়েছে?
তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুস্তফা আব্দেলকাবির ‘দ্যা এরাব উইকলি’র সাথে কথা বলতে গিয়ে বলেন যে, তিউনিসিয়ার ভৌগোলিক অবস্থান ফ্রান্সের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একইসাথে দেশটার কৌশলগত অবস্থান লিবিয়াতে যুদ্ধরত সকল পক্ষের জন্যেই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন যে, লিবিয়াতে তুরস্কের স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের ব্যাপারে কিছু রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে। আর সাম্প্রতিক সময়ে লিবিয়াতে তুরস্কের অবস্থানকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দেয়ায় তা পশ্চিম লিবিয়া নিয়ে ফ্রান্সের পরিকল্পনাকে হুমকির মাঝে ফেলে দিয়েছে। লিবিয়ার সাথে তুরস্কের সমুদ্রসীমার চুক্তি ফ্রান্সের জন্যে সরাসরি হুমকি তৈরি না করার পরেও ফরাসীরা গ্রীস এবং গ্রীক সাইপ্রাসের সাথে ঐকমত্য প্রকাশ করে তুরস্কের বিরুদ্ধাচরণ করেছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন লিবিয়ার সমুদ্রসীমায় অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা নিশ্চিত করতে গত ফেব্রুয়ারি মাসে ‘অপারেশন ইরিনি’ নামে এক মিশন শুরুর ঘোষণা দেয়। আমিরাতের ‘দ্যা ন্যাশনাল’ পত্রিকা বলছে যে, ইইউ সদস্য দেশগুলির মাঝে অনৈক্যের কারণে এই মিশন শুরু করাটা খুবই কঠিন হয়েছে। ‘ইরিনি’র অধীনে নৌ মিশনের নেতৃত্বে থাকা ইতালি এখনও ঠিক করতে পারেনি যে, তারা এই মিশনে কিভাবে অংশ নেবে। মে মাসে ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী লুইজি ডি মাইও পার্লামেন্টে বলেন যে, ‘ইরিনি’র জন্যে পরিকল্পিত একটা নৌজাহাজ, ৩টা বিমান এবং ৫’শ সামরিক সদস্য মোতায়েনের ব্যাপারটা ইতালি সরকার খতিয়ে দেখছে। আর এই প্রস্তাব পার্লামেন্টের হাউজগুলিতেও অনুমোদন পেতে হবে। বর্তমানে শুধুমাত্র ফ্রান্স এবং গ্রীসই অপারেশন ‘ইরিনি’র অধীনে লিবিয়ার উপকূলে যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে। উভয় দেশই লিবিয়াতে তুরস্কের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছে এবং লিবিয়ার সাথে তুরস্কের সমুদ্রসীমা বিষয়ক চুক্তি স্বাক্ষরের বিরোধিতা করেছে।
গত ১৯শে জুন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু ইতালি ভ্রমণকালে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে ‘অপারেশন ইরিনি’র ব্যাপক সমালোচনা করেন। তিনি বলেন যে, এই মিশনের মাধ্যমে সিরিয়া থেকে লিবিয়ায় যুদ্ধবিমান উড়িয়ে আনাকে বাধা দেয়া হয়নি। আবুধাবি থেকে আকাশপথে অস্ত্র আসার ব্যাপারটাও এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন যে, ‘ইরিনি’ লিবিয়ার সমস্যার কোন সমাধান দেয় না এবং লিবিয়ার উপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞাও নিশ্চিত করেনা। ‘দ্যা এরাব উইকলি’ বলছে যে, ফরাসী এবং গ্রীকদের অবস্থানের কারণেই ন্যাটোকে এই মিশনের অংশ করার মার্কিন এবং তুর্কি চেষ্টা সফল হচ্ছে না। লিবিয়ার জেনারেল হাফতারের অধীন ‘লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি’ বা ‘এলএনএ’কে ফ্রান্স সমর্থন দিয়ে চলেছে বলেই ইইউএর মাঝ থেকে হাফতারের বাহিনীর বিরোধিতা করার চেষ্টাকে ফ্রান্স বারংবার বাধাগ্রস্ত করেছে। আব্দেলকাবির বলছেন যে, ২০১১ সালে লিবিয়ার একনায়ক মুয়াম্মার গাদ্দাফির সরকারকে অপসারণের পিছনে ফ্রান্সের সমর্থনই ছিল সবচাইতে জোরালো। তারা মনে করেছিল যে, গাদ্দাফিকে সরানোর পর লিবিয়াতে ফ্রান্সের একটা শক্ত ভিত প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু লিবিয়ার যুদ্ধে অনেকগুলি রাষ্ট্র যুক্ত হওয়ায় ফ্রান্স তার কাংক্ষিত ফলাফল থেকে বঞ্চিত হয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর আফ্রিকা কমান্ডের অপারেশনস ডিরেক্টর ব্র্যাডফোর্ড গেরিং বলছে যে, লিবিয়াতে রুশ সামরিক অবস্থান শক্তিশালী হবার সাথেসাথে তা ইউরোপের দক্ষিণ সীমানার জন্যে হুমকি সৃষ্টি করছে। তথাপি তুরস্কের জন্যে মার্কিন সমর্থন পরিষ্কার হতে থাকায় ফ্রান্স হয়তো লিবিয়াতে রুশ সামরিক অবস্থানের বিপক্ষে কথা নাও বলতে পারে।

তিউনিসিয়ার ভূকৌশলগত অবস্থান ফ্রান্স ও তুরস্ককে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে
উসমানি খিলাফতের সময় ষোড়শ শতক থেকেই তিউনিসিয়ার সাথে ইস্তাম্বুলের গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়। তুরস্ক সেই সম্পর্ককেই আবার জাগিয়ে তুলতে চাইছে। তবে আঙ্কারার সাথে তিউনিসিয়ার মুসলিম ব্রাদারহুডপন্থী ‘এননাহদা পার্টি’র সম্পর্ক যে বাস্তবতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, তা জুন মাসে পার্লামেন্টে ফ্রান্সের কাছ থেকে ঔপনিবেশিক সময়ের অপরাধের ক্ষমা চাওয়ার বিলে ‘এননাহদা’র সমর্থন না দেয়াই প্রমাণ করে। তথাপি এই বিল তিউনিসিয়ার জনগণের ঔপনিবেশিক সময়ের প্রতি ঘৃণা এবং ঔপনিবেশিক সময় থেকে টেনে আনা সম্পর্কের ইতি টানার ইচ্ছেরই বহিঃপ্রকাশ; যা কিনা ফ্রান্সকে বিচলিত করেছে। তিউনিসিয়ার সামরিক বাহিনীর দ্রুত উন্নয়ন, জনগণের মাঝে তাদের জনপ্রিয়তা এবং তাদের সাথে তুরস্কের সম্পর্কের ব্যাপারটাও ফ্রান্সকে দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। কারণ এতে লিবিয়ায় তুরস্কের সামরিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
তিউনিসিয়ার কৌশলগত অবস্থান ফ্রান্সের জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ। তিউনিসিয়ার উত্তর উপকূল থেকে ইতালির দক্ষিণের সিসিলি দ্বীপের উপকূলের দূরত্ব মাত্র ১’শ ৬০ কিঃমিঃ। সিসিলি প্রণালী নামে পরিচিত এই সরু নৌপথ ভূমধ্যসাগরের পূর্ব এবং পশ্চিম ভাগকে যুক্ত করেছে। আর এর মাঝ দিয়েই ফ্রান্সের সাথে সুয়েজ খাল, তথা ভারত মহাসাগর এবং পূর্ব এশিয়ার যোগাযোগ। একারণেই ফ্রান্স তিউনিসিয়াকে কাছে রাখতে চাইছে। লিবিয়ার যুদ্ধে তুর্কি সমর্থনে ‘জিএনএ’এর সাম্প্রতিক বিজয়ের পর কৌশলগত এই নৌপথের নিয়ন্ত্রণ তুরস্কের কাছে হারাবার ভয় পেয়ে বসেছে ফ্রান্সকে। আর একইসাথে ইতালিকে পাশে না পাওয়ায় ফ্রান্সের হতাশা চরমে পৌঁছেছে। তুরস্কের প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র গ্রীসকে সাথে করেই ফ্রান্স লিবিয়ার উপকূল পাহাড়া দেবার যে মিশনে মনোনিবেশ করেছে, তা ইতোমধ্যেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, যখন গত ১০ই জুন লিবিয়ার উপকূলে ফরাসী এবং তুর্কি যুদ্ধজাহাজের মাঝে অসৌজন্যমূলক পরিস্থিতির সূচনা হয়। তুরস্ক যদি লিবিয়াতে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনে মনোযোগী হয়, আর ফ্রান্স ও গ্রীস যদি তুরস্ককে একাজে বাধা দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকে, তাহলে সামনের দিনগুলিতে দুই পক্ষের মাঝে সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়তে থাকবে।
ফ্রান্স লিবিয়ার যুদ্ধে তিউনিসিয়ার সমর্থন চাইছে
গত ২২শে জুন ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ করোনাভাইরাস মোকাবিলায় তিউনিসিয়ার জন্যে সাড়ে ৩’শ মিলিয়ন ইউরো সহায়তার ঘোষণা দেন। ইলাইসি প্যালেসে তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট কাইস সাইয়েদের সাথে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় ম্যাক্রঁ বলেন যে, তিউনিসিয়ার স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেয়া, সেদেশে হাসপাতাল তৈরি এবং অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পুনরায় শুরু করার লক্ষ্যে সহায়তা দেবে ফ্রান্স। তিনি আরও বলেন যে, এই অর্থ ২০২২ সাল পর্যন্ত তিউনিসার স্বাস্থ্যখাত এবং যুব উন্নয়নের জন্যে ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ইউরো বরাদ্দের অংশ। দুই দেশ আঞ্চলিক ইস্যু নিয়েও কথা বলেছে। ম্যাক্রঁ বলেন যে, ফ্রান্স এবং তিউনিসিয়া একত্রে দাবি করছে যে, লিবিয়াতে যুদ্ধরত পক্ষগুলি যেন আলোচনার টেবিলে বসে সকলের জন্যে নিরাপত্তা এবং লিবিয়ার সংস্থাগুলির পুনএকত্রীকরণ নিশ্চিত করে। ফরাসী প্রেসিডেন্ট লিবিয়াতে বিদেশী হস্তক্ষেপ বন্ধের আহ্বান জানান। একইসাথে ম্যাক্রঁ লিবিয়াতে তুরস্কের ভূমিকাকে ‘বিপজ্জনক খেলা’ বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন যে, এটা ঐ অঞ্চল এবং ইউরোপের জন্যে সরাসরি হুমকিস্বরূপ। তিনি বলেন যে, একই কথাগুলি ঐদিনই তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফোন করে বলেছেন। অপরদিকে তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট কাইস সাইয়েদ বলেন যে, তার দেশ ফ্রান্সের সাথে অতীতের ক্ষতচিহ্ন ভুলে গিয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে চাইছে। তিনি তিউনিসিয়ার উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত একটা রেলওয়ে লাইন তৈরির চিন্তায় ফ্রান্সের সহায়তা দেয়াকে স্বাগত জানান। দুই দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের আলোচনা এমন সময়ে এলো, যখন তিউনিসিয়ার প্রতিবেশী দেশ লিবিয়ার যুদ্ধে তুরস্কের হস্তক্ষেপের পর যুদ্ধের মোড় ঘুরে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে তিউনিসিয়ার সাথে ফ্রান্সের সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টার ব্যাপক ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে।
লন্ডন থেকে প্রকাশিত পত্রিকা ‘আল এরাব উইকলি’র এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, লিবিয়াতে কোণঠাসা হয়ে যাবার পর ফ্রান্স লিবিয়ার প্রতিবেশী তিউনিসিয়াতে তার দুর্বল হয়ে যাওয়া অবস্থানকে আরও দৃঢ় করতে চাইছে। কিছুদিন ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মন্তব্য করেন যে, লিবিয়াতে আরেকটা সিরিয়া তৈরি হতে চলেছে; যা খুবই দুশ্চিন্তার ব্যাপার। ২৬শে মে তিউনিসিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইমেদ হাজগুই ফ্রান্সের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফ্লোরেন্স পার্লির সাথে ফোনে লিবিয়া নিয়ে কথা বলেন। তারা লিবিয়ায় বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপের ব্যাপারে একমত পোষণ করেন এবং লিবিয়ার সমস্যা লিবিয়ার মানুষদের মাঝেই সমাধান হওয়া উচিৎ বলে বলেন। দুই দেশের মাঝে সামরিক সহযোগিতা আরও বাড়ানো যায় কিভাবে, তা নিয়েও তারা আলোচনা করেন।

তিউনিসিয়ার সামরিক বাহিনী গড়ে দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক
ঐতিহাসিকভাবে তিউনিসিয়ার সাথে ফ্রান্সের সম্পর্ক বেশি গভীর থাকলেও সামরিক বাহিনীর ক্ষেত্রে বেশকিছু পরিবর্তন এসেছে। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’ তিউনিসিয়া নিয়ে বেশ কয়েকটা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তারা বলছে যে, একনায়ক বেন আলি তিউনিসিয়ার সামরিক বাহিনীকে ছোট করে রেখেছিলেন, যাতে সামরিক বাহিনী দেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে। তিউনিসিয়ার নিয়ন্ত্রণ ছিল মূলতঃ ন্যাশনাল গার্ডের হাতে, যা কিনা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালের অধীন, এবং যার মূল কাজ ছিল দেশের উপর শাসকের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। ব্যাপারটা পরিবর্তন হয়ে যায় ২০১১ সালে বেন আলির পতনের পর। যুক্তরাষ্ট্র তিউনিসিয়া নিয়ে চিন্তিত ছিল যে, ছোট হলেও তিউনিসিয়া থেকেই সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষ ইরাক ও সিরিয়াতে বিভিন্ন জিহাদি গ্রুপে যোগ দিয়েছে। এছাড়াও তিউনিসিয়ায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবার পর থেকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভেদ এবং অস্থিরতা মানুষকে গণতন্ত্রবিমুখ করে ফেলেছে। উদাহরণস্বরূপ, তিউনিসিয়ার বর্তমান সরকারে ৬টা রাজনৈতিক দল থেকে ১৫ জন এমপি এবং আরও ১৭ জন স্বতন্ত্র এমপি মন্ত্রীত্ব পেয়েছেন। কোন দলই প্রতিশ্রুতি দিয়ে কথা রাখেনি; তাই কোন দলই বেশি সংখ্যক আসন পাচ্ছে না। ২০১৪ সালে ‘পিউ রিসার্চ’এর এক জরিপ বলছে যে, মাত্র ৪৮ শতাংশ তিউনিসিয়ান গণতন্ত্রকে সমর্থন করছে। ৫১ শতাংশ মানুষ মনে করছে যে গণতান্ত্রিক সময়ের চাইতে একনায়কের সময়েই দেশের অবস্থা ভালো ছিল। মুসলিম ব্রাদারহুডপন্থী ‘এননাহদা পার্টি’র সমর্থন দুই বছরের মাঝে ৬৫ শতাংশ থেকে ৩১ শতাংশে নেমে আসে। ৮৩ শতাংশ তিউনিসিয়ান মনে করে যে, দেশের রাজনীতিতে ইসলামের আদর্শগুলি বাস্তবায়িত থাকা উচিৎ; যাদের মাঝে ৩০ শতাংশ মনে করে যে, ইসলামকে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা উচিৎ। কিন্তু সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সামরিক বাহিনীর ব্যাপারে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি। ৯৫ শতাংশ মানুষ সামরিক বাহিনীর প্রশংসা করে; যেখানে মিডিয়ার পক্ষে বলে ৬২ শতাংশ মানুষ; আদালতের পক্ষে ৪৪ শতাংশ; আর ধর্মীয় নেতাদের পক্ষে মাত্র ৩৩ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র এই ব্যাপারগুলিকে পুঁজি করেই তিউনিসিয়ার সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দেয়া শুরু করে এবং তাদের সাথে মহড়া এবং অপারেশনে অংশ নিয়ে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে থাকে।
লিবিয়া থেকে আসা জিহাদী গ্রুপগুলির সাথে তিউনিসিয়ার সেনাদের ব্যাপক সংঘর্ষে নিয়মিত প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে থাকে। মার্কিন সেনারাও সেখানে সরাসরি জড়িত থাকলেও তা পত্রিকার খবরে আসতে দেয়া হয়নি। ট্রাম্প প্রশাসন হোয়াইট হাউজে আসার পর থেকে তিউনিসিয়ার জন্যে সামরিক সহায়তা কমে গেলেও তিউনিসিয়া নিজের নিরাপত্তায় বিনিয়োগ করতে থাকে। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে অংশ নিতে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র মার্কিনীরা তিউনিসিয়াকে সরবরাহ করেছে। এর মাঝে রয়েছে ৮০টারও বেশি হেলিকপ্টার; যার মাঝে ২৪টা ‘ওএইচ-৫৮ডি কিওওয়া ওয়ারিয়র’, ৮টা ‘ইউএইচ-৬০এম ব্ল্যাক হক’, ৩৬টা ‘ইউএইচ-১’ রয়েছে। এছাড়াও ৯টা ‘সি-১৩০’ পরিবহণ বিমান দেয়া হয় তিউনিসিয়াকে; যার মাঝে ২০১৪ সালে দেয়া হয় সর্বশেষ মডেলের ‘সি-১৩০জে সুপার হারকিউলিস’। এবছরের এপ্রিল মাসে একটা ‘সি-১৩০জে’ বিমান করোনাভাইরাস মোকাবিলায় ২২ হাজার কিঃমিঃ উড়ে চীন থেকে মেডিক্যাল সাপ্লাই নিয়ে আসে। এই ফ্লাইটের মাঝে বিমানটা দু’বার কাজাখস্তানে রিফুয়েলিং করে। নিরাপত্তা বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘ওয়ার অন দ্যা রকস’এর এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, করোনাভাইরাস মোকাবিলায় তিউনিসিয়ার রাস্তায় সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়; যা কিনা দেশের মানুষ ভালোভাবে দেখেছে। অন্যদিকে মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’ বলছে যে, তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক দলগুলি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নেয়ার জন্যে প্রতিযোগিতা করছে। একদিকে ‘নিদা তিউনেস’ এবং ‘এননাহদা পার্টি’ সামরিক বাহিনীর উপর তাদের প্রভাব বাড়াতে চাইছে; অন্যদিকে বিরোধীরা চাইছে এতে বাধা দিতে।
মার্কিনীরা তিউনিসিয়ার উপকূল সন্ত্রাসীমুক্ত রাখতে তিউনিসিয়ার নৌবাহিনীকে কমপক্ষে ২২টা ছোট বোট দেয়। তবে ২০১৬ সাল থেকে তিউনিসিয়া নিজস্ব নৌবাহিনী গঠন করা শুরু করে। প্রথমবারের মতো নেদারল্যান্ডসের ‘ডামেন’ শিপইয়ার্ড থেকে অত্যাধুনিক চারটা অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল অর্ডার করে তারা। ৭২ মিটার লম্বা এবং প্রায় ১৩’শ টনের হেলিকপ্টার ও ড্রোন বহনে সক্ষম এই জাহাজগুলি তিউনিসিয়াকে ভূমধ্যসাগরে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ২০১৮ সালের মাঝেই ‘ডামেন’ চারটা জাহাজই ডেলিভারি দিয়ে দেয়। এর আগ পর্যন্ত তিউনিসিয়ার ফরাসী ও জার্মান নির্মিত পুরোনো ফাস্ট এটাক ক্রাফটগুলি শুধুমাত্র তিউনিসিয়ার উপকূলের কাছাকাছি অঞ্চল পাহাড়া দিতে সক্ষম ছিল। শুধু তাই নয়, তিউনিসিয়া নিজেরাই ৩টা ছোট আকৃতির ২৬ মিটার লম্বা প্যাট্রোল বোট তৈরি করে নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা জানান দেয়।
সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের আড়ালে যুক্তরাষ্ট্র এবং তুরস্ক তিউনিসিয়ার সাথে সামরিক সম্পর্ক গভীর করেছে। ২০১৪ সালে তিউনিসিয়ার সেনাবাহিনী তুরস্ক থেকে ১’শটা ‘কিরপি’ আর্মার্ড ভেহিকল অর্ডার করে। ২০১৬ সাল থেকে এর ডেলিভারি শুরু হয়। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগানের তিউনিসিয়া সফরের সময়ে দুই দেশের মাঝে কয়েকটা সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর মাঝে আগের ৩’শ মিলিয়ন ডলার সহায়তার সাথে আরও ৩’শ মিলিয়ন ডলার সহায়তার আশ্বাস দেয়া হয়। তুরস্ক তিউনিসিয়ার সেনাবাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। ২০১১ সাল থেকে ২০১৭ সালের মাঝে তুরস্ক তিউনিসিয়াকে ২’শ মিলিয়ন ডলারের নিরাপত্তা সহায়তা দেয়।
গত মার্চেই ‘ডিফেন্স নিউজ’ জানায় যে, তুরস্কের প্রতিরক্ষা কোম্পানি ‘টিএআই’ তিউনিসিয়ার কাছে ২’শ ৪০ মিলিয়ন ডলারে ৬টা ‘আনকা-এস’ সার্ভেইল্যান্স ড্রোন এবং তিনটা কন্ট্রোল স্টেশন বিক্রির ক্রয়াদেশ নিশ্চিত করেছে। তুর্কি কর্মকর্তারা বলছেন যে, তারা এই ক্রয়াদেশের জন্যে এক বছরের বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করছিলেন। আর তারা তিউনিসিয়ার কাছে অস্ত্র বহণকারী ড্রোন বিক্রি করার চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছেন। ‘আনকা-এস’ ড্রোনের বৈশিষ্ট্য হলো এটা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়; যার ফলশ্রুতিতে এই ড্রোন নিয়ন্ত্রক স্টেশন থেকে বেশ দূরে গিয়েও কাজ করতে সক্ষম। অর্থাৎ এই ড্রোনগুলি তিউনিসিয়ার উপকূলের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলির উপর নজরদারি করতে সক্ষম হবে।

লিবিয়ার যুদ্ধে তুরস্কের আবির্ভাব তিউনিসিয়ার রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে
লিবিয়াতে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের ঠিক আগেআগে গত বছরের ডিসেম্বরের শেষে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগান হঠাত করেই তিউনিসিয়ার রাজধানীতে আবির্ভূত হন। এরদোগানের সাথে বৈঠকের পর তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট সাইয়েদ সাংবাদিকদের বলেন যে, লিবিয়ার সাথে তুরস্কের সমুদ্রসীমা নিয়ে যে চুক্তি হয়েছে, তা ঐ দুই দেশের ব্যাপার এবং তাতে তিউসিয়ার কিছু বলার নেই। অপরদিকে এরদোগান বলেন যে, লিবিয়ার ব্যাপারে আলোচনায় আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া এবং কাতারকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিৎ ছিল, কারণ এই দেশগুলি লিবিয়া সমাজ এবং রাজনৈতিক কাঠামোকে ভালোভাবে বোঝে। এরদোগানের এই সফরের পর তুরস্ক শুধু কথায় নয়, কার্যত তিউনিসিয়াকে লিবিয়ার ব্যাপারে জড়িত হতে বাধ্য করেছে। ‘রয়টার্স’ খবর দিচ্ছে যে, গত ৮ই মে তুরস্কের একটা পরিবহণ বিমান ত্রিপোলির বিমানন্দর অনিরাপদ বলে তিউনিসিয়ার দক্ষিণে লিবিয়ার সীমানার কাছাকাছি জিয়েরবা বিমানবন্দরে অবতরণ করার অনুমতি চায়। তিউনিসিয়া বিমানটাকে নামতে দেয়। এই বিমানে লিবিয়ার জন্যে মেডিক্যাল সামগ্রী ছিল বলে বলা হয়; এবং এই সামগ্রীগুলি লিবিয়া পর্যন্ত পৌঁছে দেবার জন্যে তিউনিসিয়াকে অনুরোধ করা হয়। তিউনিসিয়ার বিরোধী দল ‘ফ্রি দেস্তুরিয়ান পার্টি’র নেতারা অভিযোগ করেন যে, তুরস্ক তিউনিসিয়াকে লিবিয়ার যুদ্ধের লজিস্টিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে।
ওয়াশিংটন থেকে প্রকাশিত আরেক পত্রিকা ‘আল মনিটর’ বলছে যে, লিবিয়ার যুদ্ধ তিউনিসিয়ার রাজনীতিকে ঘোলাটে করে ফেলেছে। কারণ তিউনিসিয়াতে সকলেই লিবিয়ার যুদ্ধে কোন না কোন পক্ষ নিয়ে কথা বলা শুরু করেছে। তিউনিসিয়ার পার্লামেন্টে বর্তমানে সবচাইতে বেশি আসন দখন করে আছে ‘এননাহদা পার্ট’, যারা মুসলিম ব্রাদারহুডের চিন্তার সাথে একমত পোষণ করে। ‘এননাহদা’ লিবিয়ার যুদ্ধে ত্রিপোলির ‘গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল একর্ড’ বা ‘জিএনএ’ সরকারকে সমর্থন করছে। একইসাথে তুরস্কের ক্ষমতাসীন ‘একে পার্ট’র সাথেও তাদের বেশ ভালো সম্পর্ক রয়েছে। অপরদিকে তিউনিসিয়ায় ২৪ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা এবং ২০১১ সালে ক্ষমতাচ্যুত প্রাক্তন একনায়ক জিনে এল আবিদিন বেন আলির সমর্থকদের থেকে গঠন করা ‘ফ্রি দেস্তুরিয়ান পার্টি’ বা ‘পিডিএল’ লিবিয়ার জেনারেল হাফতারের পক্ষ সমর্থন করছে। তিউনিসের ‘কলাম্বিয়া গ্লোবাল সেন্টার্স’এর প্রধান ইউসেফ শেরিফ বলছেন যে, সকলেই আসলে তিউনিসিয়াকে লিবিয়াতে যাবার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখে। লিবিয়া থেকে সন্ত্রাসীরা যাতে তিউনিসিয়ায় প্রবেশ করতে না পারে, এই অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র তিউনিসিয়ার সাথে সম্পর্কোন্নয়ন করেছে। তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষক সেইফ এদ্দিন ত্রাবেলসির মতে, লিবিয়াতে ‘জিএনএ’এর সাম্প্রতিক সফলতা তিউনিসিয়ার নিরাপত্তাকে আরও সুসংহত করবে। তিনি বলেন যে, তিউনিসিয়া আর লিবিয়া একই সূত্রে গাঁথা। লিবিয়াতে যা কিছুই ঘটবে, সেটাই তিউনিসিয়াকে প্রভাবিত করবে। লিবিয়ার ঘটনার ব্যাপারে তিউনিসিয়ার জনগণ চিন্তিত থাকবে, এটাই তো স্বাভাবিক। হাফতারের বিরুদ্ধে লিবিয়াতে ‘জিএনএ’র বড় বিজয়ের পরপরই ‘এননাহদা পার্টি’র প্রধান এবং পার্লামেন্টের স্পিকার রাচেদ ঘানুচি ত্রিপোলি সরকারের প্রধান ফায়েজ আল-সারাজকে ফোন করে অভিনন্দন জানান। কিন্তু এই ব্যাপারটা তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট কাইস সাইয়েদ একেবারেই পছন্দ করেননি। তিউনিসিয়ার সংবিধান অনুযায়ী পররাষ্ট্রনীতি প্রেসিডেন্টের হাতে। সাইয়েদ ঈদ উল-ফিতরের এক বার্তায় জোর গলায় বলেন যে, সকলেরই জানা উচিৎ যে তিউনিসিয়া একটাই এবং এর একজনই প্রেসিডেন্ট।
তিউনিসিয়ায় ঔপনিবেশিক শাসক ফ্রান্সের প্রভাব
তিউনিসিয়ার প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শক্তি হওয়ায় সেখানকার রাজনীতিতে ফ্রান্সের প্রভাব ব্যাপক। দেশের এলিট ক্লাসের বেশিরভাগ ব্যক্তিরই কোন না কোনভাবে ফ্রান্সের সাথে যোগসূত্র রয়েছে। ‘পিডিএল’এর প্রতিষ্ঠাতা এবং বেন আলি সরকারের প্রধানমন্ত্রী হামেদ কারুয়ি ফ্রান্সে মেডিসিন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এলিয়েস ফাখফাখ ফ্রান্সের লিয়ঁ এবং প্যারিস থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ব্যবসায় বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইমেদ হাজগুই ফ্রান্সে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। ক্ষমতাসীন কোয়ালিশনের মাঝের দল ‘তাহিয়া তিউনেস’এর নেতা এবং গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইউসেফ চাহেদ ফ্রান্সে কৃষি বিষয়ে পড়াশোনা করেন। বিলিয়নায়ার ব্যবসায়ী, মিডিয়া টাইকুন এবং ২০১৯ সালের প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচনে প্রার্থী নাবিল কারুয়ি ফ্রান্সের বিভিন্ন কোম্পানিতে চাকুরি করে ক্যারিয়ার শুরু করেন।
‘পিডিএল’এর নেতা আবির মুসি ৩রা জুন লিবিয়াতে বিদেশী হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে বিল উত্থাপন করেন। বিলটা শেষ পর্যন্ত পাস না হলেও তর্ক বিতর্কের সময় আবির মুসি ‘এননাহদা’র নেতা রাচেদ ঘানুচিকে তুরস্ক এবং কাতারের অনুগত বলে অভিযোগ করেন। এরপর এই বিলের পাল্টা জবাব হিসেবে পার্লামেন্টে ১৯ আসনের অধিকারী দল ‘কোয়ালিশন আল কারামা’ আরেকটা বিল উত্থাপন করে, যা পাস হলে প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শাসক ফ্রান্সের কাছ থেকে ঔপনিবেশিক সময়ের অপরাধের জন্যে ক্ষমা চাইবার দাবি জানানো হবে। ১৪ ঘন্টা তুমুল বাকযুদ্ধের পর সাংসদরা এই বিল রুখে দেয়। ৭৭ জন সাংসদ এই বিলের পক্ষে ভোট দেয়; মাত্র ৫ জন ভোট দেয় বিপক্ষে। কিন্তু ৪৬ জন ভোটদানে বিরত থাকার কারণে বিল পাসের জন্যে দরকার ১’শ ৯ ভোট পাওয়া যায়নি। তবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল যে, মুসলিম ব্রাদারহুডপন্থী ‘এননাহদা’ এই বিল পাসের বিপক্ষে কথা বলে। তারা বলে যে, এই বিল পাস হলে তা তিউনিসিয়ার অর্থনীতিকে আঘাত করবে এবং দেশটার গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপিয় বন্ধুদের দূরে ঠেলে দেবে। ১৮৮১ সাল থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত ফ্রান্স তিউনিসিয়ার ঔপনিবেশিক শাসক ছিল। এই বিল পাস না হওয়ায় এখনও তিউনিসিয়ার উপর ফ্রান্সের প্রভাব টের পাওয়া যায়।
তিউনিসিয়াতে ফ্রান্সের কি স্বার্থ রয়েছে?
তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুস্তফা আব্দেলকাবির ‘দ্যা এরাব উইকলি’র সাথে কথা বলতে গিয়ে বলেন যে, তিউনিসিয়ার ভৌগোলিক অবস্থান ফ্রান্সের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একইসাথে দেশটার কৌশলগত অবস্থান লিবিয়াতে যুদ্ধরত সকল পক্ষের জন্যেই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন যে, লিবিয়াতে তুরস্কের স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের ব্যাপারে কিছু রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে। আর সাম্প্রতিক সময়ে লিবিয়াতে তুরস্কের অবস্থানকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দেয়ায় তা পশ্চিম লিবিয়া নিয়ে ফ্রান্সের পরিকল্পনাকে হুমকির মাঝে ফেলে দিয়েছে। লিবিয়ার সাথে তুরস্কের সমুদ্রসীমার চুক্তি ফ্রান্সের জন্যে সরাসরি হুমকি তৈরি না করার পরেও ফরাসীরা গ্রীস এবং গ্রীক সাইপ্রাসের সাথে ঐকমত্য প্রকাশ করে তুরস্কের বিরুদ্ধাচরণ করেছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন লিবিয়ার সমুদ্রসীমায় অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা নিশ্চিত করতে গত ফেব্রুয়ারি মাসে ‘অপারেশন ইরিনি’ নামে এক মিশন শুরুর ঘোষণা দেয়। আমিরাতের ‘দ্যা ন্যাশনাল’ পত্রিকা বলছে যে, ইইউ সদস্য দেশগুলির মাঝে অনৈক্যের কারণে এই মিশন শুরু করাটা খুবই কঠিন হয়েছে। ‘ইরিনি’র অধীনে নৌ মিশনের নেতৃত্বে থাকা ইতালি এখনও ঠিক করতে পারেনি যে, তারা এই মিশনে কিভাবে অংশ নেবে। মে মাসে ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী লুইজি ডি মাইও পার্লামেন্টে বলেন যে, ‘ইরিনি’র জন্যে পরিকল্পিত একটা নৌজাহাজ, ৩টা বিমান এবং ৫’শ সামরিক সদস্য মোতায়েনের ব্যাপারটা ইতালি সরকার খতিয়ে দেখছে। আর এই প্রস্তাব পার্লামেন্টের হাউজগুলিতেও অনুমোদন পেতে হবে। বর্তমানে শুধুমাত্র ফ্রান্স এবং গ্রীসই অপারেশন ‘ইরিনি’র অধীনে লিবিয়ার উপকূলে যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে। উভয় দেশই লিবিয়াতে তুরস্কের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছে এবং লিবিয়ার সাথে তুরস্কের সমুদ্রসীমা বিষয়ক চুক্তি স্বাক্ষরের বিরোধিতা করেছে।
গত ১৯শে জুন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু ইতালি ভ্রমণকালে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে ‘অপারেশন ইরিনি’র ব্যাপক সমালোচনা করেন। তিনি বলেন যে, এই মিশনের মাধ্যমে সিরিয়া থেকে লিবিয়ায় যুদ্ধবিমান উড়িয়ে আনাকে বাধা দেয়া হয়নি। আবুধাবি থেকে আকাশপথে অস্ত্র আসার ব্যাপারটাও এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন যে, ‘ইরিনি’ লিবিয়ার সমস্যার কোন সমাধান দেয় না এবং লিবিয়ার উপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞাও নিশ্চিত করেনা। ‘দ্যা এরাব উইকলি’ বলছে যে, ফরাসী এবং গ্রীকদের অবস্থানের কারণেই ন্যাটোকে এই মিশনের অংশ করার মার্কিন এবং তুর্কি চেষ্টা সফল হচ্ছে না। লিবিয়ার জেনারেল হাফতারের অধীন ‘লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি’ বা ‘এলএনএ’কে ফ্রান্স সমর্থন দিয়ে চলেছে বলেই ইইউএর মাঝ থেকে হাফতারের বাহিনীর বিরোধিতা করার চেষ্টাকে ফ্রান্স বারংবার বাধাগ্রস্ত করেছে। আব্দেলকাবির বলছেন যে, ২০১১ সালে লিবিয়ার একনায়ক মুয়াম্মার গাদ্দাফির সরকারকে অপসারণের পিছনে ফ্রান্সের সমর্থনই ছিল সবচাইতে জোরালো। তারা মনে করেছিল যে, গাদ্দাফিকে সরানোর পর লিবিয়াতে ফ্রান্সের একটা শক্ত ভিত প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু লিবিয়ার যুদ্ধে অনেকগুলি রাষ্ট্র যুক্ত হওয়ায় ফ্রান্স তার কাংক্ষিত ফলাফল থেকে বঞ্চিত হয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর আফ্রিকা কমান্ডের অপারেশনস ডিরেক্টর ব্র্যাডফোর্ড গেরিং বলছে যে, লিবিয়াতে রুশ সামরিক অবস্থান শক্তিশালী হবার সাথেসাথে তা ইউরোপের দক্ষিণ সীমানার জন্যে হুমকি সৃষ্টি করছে। তথাপি তুরস্কের জন্যে মার্কিন সমর্থন পরিষ্কার হতে থাকায় ফ্রান্স হয়তো লিবিয়াতে রুশ সামরিক অবস্থানের বিপক্ষে কথা নাও বলতে পারে।

তিউনিসিয়ার ভূকৌশলগত অবস্থান ফ্রান্স ও তুরস্ককে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে
উসমানি খিলাফতের সময় ষোড়শ শতক থেকেই তিউনিসিয়ার সাথে ইস্তাম্বুলের গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়। তুরস্ক সেই সম্পর্ককেই আবার জাগিয়ে তুলতে চাইছে। তবে আঙ্কারার সাথে তিউনিসিয়ার মুসলিম ব্রাদারহুডপন্থী ‘এননাহদা পার্টি’র সম্পর্ক যে বাস্তবতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, তা জুন মাসে পার্লামেন্টে ফ্রান্সের কাছ থেকে ঔপনিবেশিক সময়ের অপরাধের ক্ষমা চাওয়ার বিলে ‘এননাহদা’র সমর্থন না দেয়াই প্রমাণ করে। তথাপি এই বিল তিউনিসিয়ার জনগণের ঔপনিবেশিক সময়ের প্রতি ঘৃণা এবং ঔপনিবেশিক সময় থেকে টেনে আনা সম্পর্কের ইতি টানার ইচ্ছেরই বহিঃপ্রকাশ; যা কিনা ফ্রান্সকে বিচলিত করেছে। তিউনিসিয়ার সামরিক বাহিনীর দ্রুত উন্নয়ন, জনগণের মাঝে তাদের জনপ্রিয়তা এবং তাদের সাথে তুরস্কের সম্পর্কের ব্যাপারটাও ফ্রান্সকে দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। কারণ এতে লিবিয়ায় তুরস্কের সামরিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
তিউনিসিয়ার কৌশলগত অবস্থান ফ্রান্সের জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ। তিউনিসিয়ার উত্তর উপকূল থেকে ইতালির দক্ষিণের সিসিলি দ্বীপের উপকূলের দূরত্ব মাত্র ১’শ ৬০ কিঃমিঃ। সিসিলি প্রণালী নামে পরিচিত এই সরু নৌপথ ভূমধ্যসাগরের পূর্ব এবং পশ্চিম ভাগকে যুক্ত করেছে। আর এর মাঝ দিয়েই ফ্রান্সের সাথে সুয়েজ খাল, তথা ভারত মহাসাগর এবং পূর্ব এশিয়ার যোগাযোগ। একারণেই ফ্রান্স তিউনিসিয়াকে কাছে রাখতে চাইছে। লিবিয়ার যুদ্ধে তুর্কি সমর্থনে ‘জিএনএ’এর সাম্প্রতিক বিজয়ের পর কৌশলগত এই নৌপথের নিয়ন্ত্রণ তুরস্কের কাছে হারাবার ভয় পেয়ে বসেছে ফ্রান্সকে। আর একইসাথে ইতালিকে পাশে না পাওয়ায় ফ্রান্সের হতাশা চরমে পৌঁছেছে। তুরস্কের প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র গ্রীসকে সাথে করেই ফ্রান্স লিবিয়ার উপকূল পাহাড়া দেবার যে মিশনে মনোনিবেশ করেছে, তা ইতোমধ্যেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, যখন গত ১০ই জুন লিবিয়ার উপকূলে ফরাসী এবং তুর্কি যুদ্ধজাহাজের মাঝে অসৌজন্যমূলক পরিস্থিতির সূচনা হয়। তুরস্ক যদি লিবিয়াতে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনে মনোযোগী হয়, আর ফ্রান্স ও গ্রীস যদি তুরস্ককে একাজে বাধা দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকে, তাহলে সামনের দিনগুলিতে দুই পক্ষের মাঝে সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়তে থাকবে।
Labels:
France,
Geopolitics,
Greece,
Libya,
Mediterranean,
Tunisia,
Turkey,
USA
Saturday, 20 June 2020
জন্মের পর থেকে সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জে ভারত
২০শে জুন ২০২০
১৬ থেকে ১৮ই জুনের মাঝে তিন দফা আলোচনার পর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভারতীয় কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ‘হিন্দুস্তান টাইমস’ জানাচ্ছে যে, আটককৃত দু’জন অফিসারসহ ১০ জন ভারতীয় সেনাকে ফেরত দিয়েছে চীনারা। ১৫ই জুন ভারতীয়রা জানায় যে, চীনাদের সাথে লাদাখ সীমান্তে গালওয়ান উপত্যকায় উভয় পক্ষের প্রায় ৫’শ সেনার ব্যাপক সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হয়েছে, যাদের মাঝে একজন কর্ণেলও রয়েছেন। দুই দেশের মাঝে চার দশকে এটা সবচাইতে মারাত্মক সীমান্ত সংঘর্ষ। ১৮ তারিখ পর্যন্ত ভারতীয়রা বলে আসছিলো যে, চীনাদের হাতে কোন ভারতীয় সেনা আটক নেই। উত্তেজনা প্রশমণে উভয় পক্ষ মে মাসের শুরু থেকে সাত বার আলোচনায় বসেছে। ২০শে জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অফিস থেকে এক বার্তায় বলা হয় যে, ভারতীয় সেনাদের বীরত্বের কারণেই চীনারা ভারতের সীমানার অভ্যন্তরে ঢুকতে পারেনি। আর মোদির সরকার চীনাদেরকে ইচ্ছেমতো দুই দেশের বিরোধপূর্ণ সীমানা পরিবর্তন করতে দেবে না। যদিও এর আগে ১৭ই জুন নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা দেন যে, তার সরকার চীনাদের উচিৎ জবাব দেবে, তথাপি গালওয়ান উপত্যকায় ভারতীয় সেনাদেরকে বীরের মতো সীমানা রক্ষা করার বার্তা দিয়ে মোদি তার কঠোর হুমকি থেকে বেশ খানিকটা সরেই এসেছেন। আঞ্চলিক বাস্তবতা যে ভারতের যথেষ্টই বিপক্ষে যাচ্ছে, তা প্রতিবেশী নেপাল এবং বাংলাদেশের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে।
গত ৯ই জুন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং নেপাল ও চীনের সীমান্তে লিপুলেখ গিরিপথ পর্যন্ত একটা রাস্তা উদ্ভোধন করেন। নেপাল এই অঞ্চলকে তার নিজের সীমানার অভ্যন্তরে বলে মনে করে। ১৯৫০এর দশক থেকেই নেপাল চাইছে উভয় দেশ আলোচনায় বসে যাতে বাউন্ডারির সমস্যাগুলির সুরাহা করে। কিন্তু ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নেপালকে আলোচনায় বসার সময় দেয়নি। ১৯৬২ সালে চীনের সাথে যুদ্ধের সময় ভারতীয় সেনারা এই অঞ্চল দখল করে নেয়। ১১ই মে নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রদীপ গিয়াওয়ালি নিজে কাঠমুন্ডুতে ভারতের রাষ্ট্রদূত ভিনায় মোহন কোয়াত্রাকে ডেকে প্রতিবাদপত্র হস্তান্তর করেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে যে, করোনাভাইরাসের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই কেবল তারা নেপালের সাথে আলোচনায় বসবে। অপরদিকে নেপাল বলছে যে, করোনাভাইরসের সমস্যা শেষ হওয়া পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করতে পারবে না। ১৩ই জুন নেপালের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে সকল রাজনৈতিক দলের সমর্থনে দেশটার নতুন মানচিত্রকে সংবিধানের অংশ করে প্রস্তাব পাস হয়; এই মানচিত্রে কালাপানি, লিপুলেখ গিরিপথ এবং লিম্পিয়াধুরা এলাকাগুলি নেপালের অংশ দেখানো হয়। ১৯শে জুন নেপালের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে এই প্রস্তাব পাশ হলে নেপালের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপাত্র বিষ্ণু রিজাল ঘোষণা দেন যে, নেপাল কালাপানিতে একটা সেনা ক্যাম্প তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছে। ১৭ই মে নেপালের সেনাপ্রধান জেনারেল পুর্ন চন্ত্র থাপা কালাপানি সীমান্ত এলাকা সফর করেন। নেপালের সাথে ভারতের সীমান্ত উত্তেজনা যখন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, ঠিক তখনই বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কোন্নয়নে ব্যাস্ত চীন।
১৬ই জুন বেইজিং সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্য, বা ৫ হাজার ১’শ ৬১টা পণ্যের জন্যে চীনের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেবে। ব্যাপারটা ভারতীয়দেরকে বিচলিত করেছে। ‘দ্যা টাইমস অব ইন্ডিয়া’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ঠিক যেসময় লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় ভারত এবং চীনের মাঝে ব্যাপক সংঘর্ষ চলছে, তখনই চীন হয়তো বাংলাদেশকে তার পক্ষে টানতে চাইছে। অনেক বছর ধরে বাংলাদেশের সাথে গড়ে তোলা সুসম্পর্ক এখন হুমকির মুখে পড়ছে বলে প্রতিবেদনে আশংকা করা হয়। এই সম্পর্ক গত বছরই চাপের মাঝে পড়েছে, যখন ভারতে ‘এনআরসি’ এবং এর পরবর্তীতে ‘সিএএ’ আইন নিয়ে ঢাকায় অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। এছাড়াও গত ১৯শে মে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে ঢাকা নর্থ সিটি কর্পোরেশকে ‘সিসটার সিটি’ নামের এক কনসেপ্টে যুক্ত হবার জন্যে আহ্বান করা হয়। এই প্রস্তাবে বাংলাদেশের বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশনের সমস্যা দূরীকরণে চীনা শহরগুলির উদাহরণকে ব্যবহার করার জন্যে প্রস্তাব দেয়া হয়। এতে দুই দেশের জনগণের মাঝে সম্পর্কোন্নয়ন হবে বলে আশা করা হয়। এই ব্যাপারটাও ভারতীয়রা সহজভাবে নিতে পারেনি। ভারতের শীর্ষস্থানীয় থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’এর এক লেখায় এব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। একইসাথে বাংলাদেশের সাথে চীনের বিরাট বাণিজ্য ঘাটতি কেন দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে টানাপোড়েন সৃষ্টি করছে না, সেব্যাপারেও হতাশা প্রকাশ করা হয়।
গালওয়ান উপত্যকায় সংঘর্ষে ভারতীয় সেনাদের প্রাণহানির পর মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব মাইক পম্পেও এক টুইটার বার্তায় মার্কিন সরকারের সমবেদনা জ্ঞাপণ করেন। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, গত দুই দশকে ভারত ওয়াশিংটনের সাথে নিবিড় রাজনৈতিক এবং সামরিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে; যুক্তরাষ্ট্র এখন ভারতের সবচাইতে বড় অস্ত্র সরবরাহকারীদের একটা। ভারতীয় চিন্তাবিদদের অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক আরও গভীর করার পরামর্শ দিচ্ছেন। প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব নিরুপমা রাও ‘দ্যা হিন্দু’ পত্রিকার সাথে সাক্ষাতে বলেন যে, এসময় ভারতের উচিৎ কৌশলগত সহযোগী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পারস্পরিক স্বার্থের জোরালো সমন্বয় করা। একইসাথে জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং আসিয়ানের সাথেও সম্পর্ক গভীর করা। কিন্তু ভারতের প্রতিবেশীদের ব্যাপারে তিনি কোন কথাই বলেননি। অর্থনৈতিক দৈন্যতা, সামাজিক অস্থিরতা, জাতিগত ও ধর্মীয় অসন্তোষের মাঝে করোনা দুর্যোগে ভারত যখন নাকাল, তখনই শুরু হলো এই সীমান্ত সংঘাত। ভারতের জন্যে ভৌগোলিক সীমানাগুলি অতি গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৪৭এ জন্মের পর থেকেই নিজস্ব ভৌগোলিক অখন্ডতা ভারতকে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগাচ্ছে। একারণেই স্থলসীমানাবেষ্টিত ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির সাথে সম্পর্কের স্থিতাবস্থা ভারতের জন্যে এতটা গুরুত্বপূর্ণ। লাদাখের সীমান্ত বিরোধ ভারতকে এমন এক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মাঝে ফেলেছে, যেখানে বহুদূরের মার্কিন সহায়তা পেলেও নিজস্ব স্থলসীমানায় অবস্থিত চারটা দেশ চীন, পাকিস্তান, নেপাল এবং বাংলাদেশের ব্যাপারে নিশ্চিত নয় ভারত, যা কিনা দেশটার জন্মের পর থেকে সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ।
১৬ থেকে ১৮ই জুনের মাঝে তিন দফা আলোচনার পর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভারতীয় কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ‘হিন্দুস্তান টাইমস’ জানাচ্ছে যে, আটককৃত দু’জন অফিসারসহ ১০ জন ভারতীয় সেনাকে ফেরত দিয়েছে চীনারা। ১৫ই জুন ভারতীয়রা জানায় যে, চীনাদের সাথে লাদাখ সীমান্তে গালওয়ান উপত্যকায় উভয় পক্ষের প্রায় ৫’শ সেনার ব্যাপক সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হয়েছে, যাদের মাঝে একজন কর্ণেলও রয়েছেন। দুই দেশের মাঝে চার দশকে এটা সবচাইতে মারাত্মক সীমান্ত সংঘর্ষ। ১৮ তারিখ পর্যন্ত ভারতীয়রা বলে আসছিলো যে, চীনাদের হাতে কোন ভারতীয় সেনা আটক নেই। উত্তেজনা প্রশমণে উভয় পক্ষ মে মাসের শুরু থেকে সাত বার আলোচনায় বসেছে। ২০শে জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অফিস থেকে এক বার্তায় বলা হয় যে, ভারতীয় সেনাদের বীরত্বের কারণেই চীনারা ভারতের সীমানার অভ্যন্তরে ঢুকতে পারেনি। আর মোদির সরকার চীনাদেরকে ইচ্ছেমতো দুই দেশের বিরোধপূর্ণ সীমানা পরিবর্তন করতে দেবে না। যদিও এর আগে ১৭ই জুন নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা দেন যে, তার সরকার চীনাদের উচিৎ জবাব দেবে, তথাপি গালওয়ান উপত্যকায় ভারতীয় সেনাদেরকে বীরের মতো সীমানা রক্ষা করার বার্তা দিয়ে মোদি তার কঠোর হুমকি থেকে বেশ খানিকটা সরেই এসেছেন। আঞ্চলিক বাস্তবতা যে ভারতের যথেষ্টই বিপক্ষে যাচ্ছে, তা প্রতিবেশী নেপাল এবং বাংলাদেশের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে।
গত ৯ই জুন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং নেপাল ও চীনের সীমান্তে লিপুলেখ গিরিপথ পর্যন্ত একটা রাস্তা উদ্ভোধন করেন। নেপাল এই অঞ্চলকে তার নিজের সীমানার অভ্যন্তরে বলে মনে করে। ১৯৫০এর দশক থেকেই নেপাল চাইছে উভয় দেশ আলোচনায় বসে যাতে বাউন্ডারির সমস্যাগুলির সুরাহা করে। কিন্তু ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নেপালকে আলোচনায় বসার সময় দেয়নি। ১৯৬২ সালে চীনের সাথে যুদ্ধের সময় ভারতীয় সেনারা এই অঞ্চল দখল করে নেয়। ১১ই মে নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রদীপ গিয়াওয়ালি নিজে কাঠমুন্ডুতে ভারতের রাষ্ট্রদূত ভিনায় মোহন কোয়াত্রাকে ডেকে প্রতিবাদপত্র হস্তান্তর করেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে যে, করোনাভাইরাসের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই কেবল তারা নেপালের সাথে আলোচনায় বসবে। অপরদিকে নেপাল বলছে যে, করোনাভাইরসের সমস্যা শেষ হওয়া পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করতে পারবে না। ১৩ই জুন নেপালের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে সকল রাজনৈতিক দলের সমর্থনে দেশটার নতুন মানচিত্রকে সংবিধানের অংশ করে প্রস্তাব পাস হয়; এই মানচিত্রে কালাপানি, লিপুলেখ গিরিপথ এবং লিম্পিয়াধুরা এলাকাগুলি নেপালের অংশ দেখানো হয়। ১৯শে জুন নেপালের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে এই প্রস্তাব পাশ হলে নেপালের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপাত্র বিষ্ণু রিজাল ঘোষণা দেন যে, নেপাল কালাপানিতে একটা সেনা ক্যাম্প তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছে। ১৭ই মে নেপালের সেনাপ্রধান জেনারেল পুর্ন চন্ত্র থাপা কালাপানি সীমান্ত এলাকা সফর করেন। নেপালের সাথে ভারতের সীমান্ত উত্তেজনা যখন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, ঠিক তখনই বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কোন্নয়নে ব্যাস্ত চীন।
১৬ই জুন বেইজিং সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্য, বা ৫ হাজার ১’শ ৬১টা পণ্যের জন্যে চীনের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেবে। ব্যাপারটা ভারতীয়দেরকে বিচলিত করেছে। ‘দ্যা টাইমস অব ইন্ডিয়া’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ঠিক যেসময় লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় ভারত এবং চীনের মাঝে ব্যাপক সংঘর্ষ চলছে, তখনই চীন হয়তো বাংলাদেশকে তার পক্ষে টানতে চাইছে। অনেক বছর ধরে বাংলাদেশের সাথে গড়ে তোলা সুসম্পর্ক এখন হুমকির মুখে পড়ছে বলে প্রতিবেদনে আশংকা করা হয়। এই সম্পর্ক গত বছরই চাপের মাঝে পড়েছে, যখন ভারতে ‘এনআরসি’ এবং এর পরবর্তীতে ‘সিএএ’ আইন নিয়ে ঢাকায় অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। এছাড়াও গত ১৯শে মে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে ঢাকা নর্থ সিটি কর্পোরেশকে ‘সিসটার সিটি’ নামের এক কনসেপ্টে যুক্ত হবার জন্যে আহ্বান করা হয়। এই প্রস্তাবে বাংলাদেশের বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশনের সমস্যা দূরীকরণে চীনা শহরগুলির উদাহরণকে ব্যবহার করার জন্যে প্রস্তাব দেয়া হয়। এতে দুই দেশের জনগণের মাঝে সম্পর্কোন্নয়ন হবে বলে আশা করা হয়। এই ব্যাপারটাও ভারতীয়রা সহজভাবে নিতে পারেনি। ভারতের শীর্ষস্থানীয় থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’এর এক লেখায় এব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। একইসাথে বাংলাদেশের সাথে চীনের বিরাট বাণিজ্য ঘাটতি কেন দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে টানাপোড়েন সৃষ্টি করছে না, সেব্যাপারেও হতাশা প্রকাশ করা হয়।
গালওয়ান উপত্যকায় সংঘর্ষে ভারতীয় সেনাদের প্রাণহানির পর মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব মাইক পম্পেও এক টুইটার বার্তায় মার্কিন সরকারের সমবেদনা জ্ঞাপণ করেন। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, গত দুই দশকে ভারত ওয়াশিংটনের সাথে নিবিড় রাজনৈতিক এবং সামরিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে; যুক্তরাষ্ট্র এখন ভারতের সবচাইতে বড় অস্ত্র সরবরাহকারীদের একটা। ভারতীয় চিন্তাবিদদের অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক আরও গভীর করার পরামর্শ দিচ্ছেন। প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব নিরুপমা রাও ‘দ্যা হিন্দু’ পত্রিকার সাথে সাক্ষাতে বলেন যে, এসময় ভারতের উচিৎ কৌশলগত সহযোগী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পারস্পরিক স্বার্থের জোরালো সমন্বয় করা। একইসাথে জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং আসিয়ানের সাথেও সম্পর্ক গভীর করা। কিন্তু ভারতের প্রতিবেশীদের ব্যাপারে তিনি কোন কথাই বলেননি। অর্থনৈতিক দৈন্যতা, সামাজিক অস্থিরতা, জাতিগত ও ধর্মীয় অসন্তোষের মাঝে করোনা দুর্যোগে ভারত যখন নাকাল, তখনই শুরু হলো এই সীমান্ত সংঘাত। ভারতের জন্যে ভৌগোলিক সীমানাগুলি অতি গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৪৭এ জন্মের পর থেকেই নিজস্ব ভৌগোলিক অখন্ডতা ভারতকে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগাচ্ছে। একারণেই স্থলসীমানাবেষ্টিত ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির সাথে সম্পর্কের স্থিতাবস্থা ভারতের জন্যে এতটা গুরুত্বপূর্ণ। লাদাখের সীমান্ত বিরোধ ভারতকে এমন এক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মাঝে ফেলেছে, যেখানে বহুদূরের মার্কিন সহায়তা পেলেও নিজস্ব স্থলসীমানায় অবস্থিত চারটা দেশ চীন, পাকিস্তান, নেপাল এবং বাংলাদেশের ব্যাপারে নিশ্চিত নয় ভারত, যা কিনা দেশটার জন্মের পর থেকে সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ।
Labels:
Bangladesh,
China,
Galwan Valley,
Geopolitics,
India,
Ladakh,
Nepal,
USA
Thursday, 18 June 2020
ককেশাসে বাড়ছে ভূরাজনৈতিক তাপমাত্রা
১৮ই জুন ২০২০
গত ২রা মে আজেরবাইজানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে একটা ভিডিওতে দেখানো হয় যে, আজেরবাইজানের নাখচিভান ছিটমহলে বেশকিছু অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করা হয়েছে। তুর্কি থিংকট্যাঙ্ক ‘ইডিএএম’এর প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক জান কাসাপোগলু বলছেন যে, এই ভিডিওতে তুরস্কে নির্মিত ‘টিআরজি-৩০০ কাপলান’ ৩০০ মিঃমিঃ রকেট আর্টিলারি বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। এর নির্মাতা কোম্পানি ‘রকেটসান’ বলছে যে, এই রকেটের পাল্লা ১’শ ২০ কিঃমিঃ এবং এর সক্ষমতা রয়েছে এর ১’শ ৫ কেজি ওয়ারহেডকে টার্গেটের ১০ মিটারের মাঝে ফেলার। এই রকেটগুলি সৈন্যদের ব্যারাক, কমান্ড সেন্টার, রাডার, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ টার্গেট ধ্বংসে বিশেষভাবে কার্যকর। কাসাপোগলু মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, গত ফেব্রুয়ারিতে সিরিয়ার ইদলিবের যুদ্ধে তুর্কি সেনাবাহিনী এই রকেটগুলিকে ব্যবহার করেছিল। নাখচিভান ছিটমহলে এই রকেট মোতায়েন করার ফলে অত্র অঞ্চলের সামরিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এসেছে। আজেরবাইজানের প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র আর্মেনিয়ার সাথে বিরোধপূর্ণ নাগোর্নো কারাবাখ অঞ্চলকে কেন্দ্র করে তুমুল বিরোধ রয়েছে। ১৯৯০এর দশক থেকে চলা একরকম যুদ্ধাবস্থাতে বর্তমানে অস্ত্রবিরতি থাকলেও এই স্থিতাবস্থা কতদিন এভাবে থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে। কাসাপোগলু বলছেন যে, নাখচিভান ছিটমহলে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আজেরবাইজান এখন নাগোর্নো কারাবাখে আর্মেনিয় সেনাদের সাপ্লাই লাইনকে হুমকির মুখে ফেলতে পারবে।
সাম্প্রতিক সময়ে আজেরবাইজান সামরিক খাতে ব্যাপক ব্যয় করেছে। একইসাথে তুরস্কের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের মাঝে দুই দেশ যৌথ মহড়ায় অংশ নিয়েছে; যার মাধ্যমে আজেরবাইজানের যুদ্ধ করার সক্ষমতা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। তুর্কি মিডিয়া ‘ইয়েনি সাফাক’ গত বছর মে মাসে আজেরবাইজানের রাজধানী বাকুর কাছকাছি ‘মুস্তফা কেমাল আতাতুর্ক ২০১৯’ নামের এক সামরিক মহড়ার খবর দেয়। এই মহড়ায় ট্যাঙ্ক, আর্মার্ড ভেহিকল এবং আর্টিলারির সমন্বয়ে গঠিত আজেরবাইজানের সেনাবাহিনীর মেকানাইজড ফর্মেশনগুলি বড় আকারের আক্রমণাত্মক কৌশলের মহড়ার দেয়। এই মহড়াগুলি আজেরবাইজানকে নাগোর্নো কারাবাখে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত করছে।
আজেরবাইজান ও আর্মেনিয়ার সংঘাতের ঐতিহাসিক পটভূমি
আর্মেনিয়া ককেশাসের অংশ। খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতকে আর্মেনিয়ার মানুষ খ্রিষ্ঠান হওয়া শুরু করে। সেই সময় থেকে ৭ম শতাব্দী পর্যন্ত বাইজ্যান্টাইন সাম্রাজ্য এবং পারসিক সাম্র্যাজ্যের মাঝে আর্মেনিয়া নামে একটা খ্রিষ্ঠান রাজ্য তার উপস্থিতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। তবে ৮ম শতাব্দীর মাঝামাঝি আর্মেনিয়াসহ পুরো ককেশাস ইসলামের অধীনে চলে যায়। ত্রয়োদশ শতকে মোঙ্গল আক্রমণের পর থেকে এই অঞ্চলের ধরণ পাল্টে যায়। তুর্কিরা এখানকার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি ইস্তাম্বুলে উসমানি খিলাফতের আবির্ভাবের পর থেকে ককেশাস অঞ্চল পারস্য এবং উসমানিদের মাঝে প্রতিযোগিতার বস্তু হয়ে যায়। এরপর অষ্টাদশ শতকে রুশদের আবির্ভাবের পর অত্র অঞ্চলে ত্রিমুখী প্রভাবের প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়। তবে বিংশ শতকে সোভিয়েত ইউনিয়ন তৈরির পর ককেশাস অঞ্চল পুরোটাই সোভিয়েত শক্তির পদানত হয়। সোভিয়েতরাই বর্তমান ককেশাসের বাউন্ডারিগুলি এঁকেছিল। সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্টালিন আর্মেনিয়া এবং আজেরবাইজানের সীমানা এঁকে দেন; যেখানে নাগোর্নো কারাবাখ অঞ্চলকে আজেরবাইজানের মাঝে রাখা হয়। আর্মেনিয়রা এটা পছন্দ করেনি; তারা চেয়েছিল যে, খ্রিষ্টান অধ্যুষিত নাগোর্নো কারাবাখ আর্মেনিয়ার অধীন হোক; মুসলিম অধ্যুষিত আজেরবাইজানের অধীন নয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সময় থেকেই এই সীমানা নিয়ে আর্মেনিয় এবং আজেরিদের মাঝে শুরু হয় জাতিগত সংঘাত। আর ১৯৯০এর শুরুতে তা রূপ নেয় পুরোপুরি যুদ্ধে। সোভিয়েত সেনাবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকার কারণে আর্মেনিয়রা বেশ শক্তিশালী একটা সেনাবাহিনী গঠন করতে পারে; যা কিনা আজেরিরা পারেনি। তুলনামূলকভাবে অনেক ছোট দেশ হওয়া সত্ত্বেও আর্মেনিয়া তার সামরিক দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে নাগোর্নো কারাবাখকে আজেরিদের হাত থেকে ছিনিয়ে নেয়। ১৯৯৪ সালে যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরিত হবার পর থেকে এখানে থেকে থেকে সংঘাত চলছে। আর্মেনিয়ার নেতৃত্বের সাথে ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চের সম্পর্ক খুবই গভীর। তৃতীয় শতাব্দী থেকেই আর্মেনিয়া একটা ইস্টার্ন অর্থোডক্স খ্রিষ্টান রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। তাই ধর্মীয় বিষয়গুলি কখনোই আর্মেনিয়ার রাজনীতির বাইরে ছিল না।
বাকুর তেলের ভূরাজনীতি
ঊনিশ শতকের শেষের দিকে আজেরবাইজানের বাকু তেলখনি থেকে তেল উত্তোলন শুরু করে রুশরা। বিংশ শতকের শুরুতে সারা বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের অর্ধেক আসতো বাকু থেকে। ১৯১৮ সালে উসমানি খিলাফত ধ্বংসের কাছাকাছি সময়ে উসমানি সেনারা আজেরিদেরকে সাথে নিয়ে বাকুর নিয়ন্ত্রণ নেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানি খিলাফত ধ্বংস করে ব্রিটিশরা এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। কিন্তু ১৯২০ সালের এপ্রিলে সোভিয়েত সৈন্যরা বাকুর দখল নেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বাকুর তেলখনিগুলি জার্মানদের বিরুদ্ধে সোভিয়েত বিজয়ে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বাকুর তেল পশ্চিমা দেশগুলিতে রপ্তানি করার পিছনে ব্যাপক অর্থ বিনিয়োগ শুরু হয়। ১৯৯৭ সালে রুশ বিনিয়োগে বাকু থেকে রাশিয়ার কৃষ্ণ সাগরের বন্দর নভোরোসিস্ক পর্যন্ত তেলের পাইপলাইন চালু হয়। ১ লক্ষ ব্যারেল সক্ষমতার এই পাইপলাইনের চাইতে আরও বেশি সক্ষমতার আরেকটা পাইপলাইন তৈরি করা হয় রাশিয়াকে বাইপাস করে বাকু থেকে জর্জিয়ার সুপসা বন্দর পর্যন্ত। ১৯৯৯ সালে চালু হওয়া এই পাইপলাইনের সক্ষমতা হলো ১ লক্ষ ৪৫ হাজার ব্যারেল। তবে এই দুই পাইপলাইনের চাইতে আরও অনেক বড় এক প্রকল্প গ্রহণ করা হয় আরও আগেই। ১৯৯৩ সালে রাশিয়াকে বাইপাস করে আজেরবাইজানের বাকু তেলখনি থেকে তেল তুরস্কের ভূমধ্যসাগরের চেইহান বন্দরে খালাস করার লক্ষ্যে কাজ শুরু হয়। রাশিয়া এবং আর্মেনিয়াকে এক্ষেত্রে বাইপাস করে জর্জিয়াকে বেছে নেয়া হয়। তবে ২০০৩ সালের আগে এই পাইপলাইনের কাজ শুরু হয়নি। ২০০৬ সালের মে মাসে ১২ লক্ষ ব্যারেল সক্ষমতার এই পাইপলাইন পুরোপুরি চালু হয়। মার্কিন ‘এনার্জি ইনফর্মেশন এডমিনিস্ট্রেশন’র হিসেবে ২০০৪ সালে যেখানে আজেরবাইজানের তেলের উৎপাদন ছিল দৈনিক প্রায় ৩ লক্ষ ব্যারেল, তা ২০০৭ সালে গিয়ে দাঁড়ায় ৭ লক্ষ ব্যারেলের বেশি। এই পাইপলাইন চালুর মাধ্যমে বাকুর তেলখনিগুলির উপর রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই কমে যায়। তেল বিক্রির অর্থের উপর ভর করে আজেরবাইজানের জিডিপি বিশ্বব্যাঙ্কের হিসেবে ২০০৪ সালে ৯ বিলিয়ন ডলার থেকে লাফ দিয়ে ২০১৪ সালে ৭৫ বিলিয়ন ডলার হয়ে যায়। অর্থাৎ মাত্র দশ বছরে জিডিপি ৮ গুণ বেড়ে যায়! তবে তেলের বাজারে ব্যাপক দরপতনের পর দেশটার জিডিপি ৪৮ বিলিয়নে নেমে আসে। তেল বিক্রির এই অর্থ আজেরবাইজানের সামরিক সক্ষমতাকে পুরোপুরি পাল্টে দেয়। জর্জিয়ার অর্থনীতিও একই সময়ে ৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার হয়ে যায়। আর আর্মেনিয়ার অর্থনীতি সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলার থেকে হয়ে যায় ১২ বিলিয়ন ডলার।
নাগোর্নো কারাবাখকে ঘিরে আর্মেনিয়ার সাথে আজেরবাইজানের যুদ্ধের কারণে বাকু থেকে তেলের পাইপলাইনগুলি খোলা সমুদ্র পর্যন্ত পৌঁছানোটা হয়ে গিয়েছিল কঠিন। এক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগের কাজ করে জর্জিয়া। ২০০৩ সালে জর্জিয়াতে পশ্চিমাদের সমর্থিত ‘রোজ রেভোলিউশন’এর মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন হয়। নতুন প্রেসিডেন্ট মিখাইল শালিকাশভিলি পশ্চিমাদের সাথে ভালো সম্পর্ক রেখে চলেন। তবে একইসাথে রাশিয়ার সাথে জর্জিয়ার সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে। জর্জিয়ার মাঝ দিয়ে যাবার কারণে বাকু থেকে আসা পাইপলাইনগুলিকে নাগোর্নো কারাবাখের সংঘাত স্পর্শ করতে পারেনি। তবে এই প্রকল্পগুলিকে রাশিয়া নিজ অঞ্চলে পশ্চিমাদের হস্তক্ষেপ হিসেবেই দেখেছে। ২০০৮ সালের অগাস্টে মাত্র ৩৭ লক্ষ জনসংখ্যার জর্জিয়া রাশিয়ার সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে যায়। জর্জিয়ার ভেতরে আবখাজিয়া এবং সাউথ অসেটিয়া অঞ্চলকে রাশিয়া সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে জর্জিয়া থেকে আলাদা করে ফেলে এবং এদেরকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দেয়। সেসময় আজেরবাইজানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলে যে, তারা জর্জিয়ার অখন্ডতায় বিশ্বাসী। ২০০৮ সালে রাশিয়ার জর্জিয়া অভিযান নাগোর্নো কারাবাখ নিয়ে আজেরবাইজানের নিরাপত্তাহীনতাকে জাগিয়ে তুলে। ২০১০ সালের অগাস্টে আজেরবাইজান তুরস্কের সাথে দশ বছর মেয়াদী ‘স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ এন্ড মিউচুয়াল সাপোর্ট’ নামের এক চুক্তি করে; যার অধীনে এক দেশ বাইরের শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হলে অপর দেশ তাকে সকল ধরনের সহায়তা দেবে। ২০২০ সালের অগাস্টে এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হবার কথা রয়েছে।
২০১৬ সালের এপ্রিলের ‘চার দিনের যুদ্ধ’
২০১৬ সালের এপ্রিলে নাগোর্নো কারাবাখের সীমান্তে আজেরিদের সাথে আর্মেনিয়দের ব্যাপক গোলাগুলি শুরু হয়। মোটামুটি ৪ দিনের জন্যে দুই দেশের মাঝে যুদ্ধাবস্তা বিরাজ করে। উভয় পক্ষেই হতাহতের পরষ্পবিরোধী দাবি তোলা হয়। ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’এর এক বিশ্লেষণে বলা হয় যে, আজেরবাইজান এই যুদ্ধে ক্ষুদ্র, কিন্তু কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু এলাকা দখল করে নেয়। ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘চ্যাটহ্যাম হাউজ’এর ফেলো জাউর শিরিইয়েভ বলেন যে, এই যুদ্ধের মাধ্যমে আজেরবাইজান এতদিনের স্থিতাবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে তা বাকি বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছে। এই যুদ্ধের সময় তুরস্ক আজেরবাইজানের সাথে থাকার ঘোষণা দিলে রাশিয়া তুরস্ককে সতর্ক করে বলে যে, তুরস্কের উচিৎ এই সংঘর্ষে শুধু একপক্ষকে সমর্থন না করা। একইসাথে রুশরা বলে যে, তুরস্কের উচিৎ তার আশেপাশের দেশগুলির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক না গলানো এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলিকে সমর্থন না দেয়া। এখানে উল্লেখ্য যে, রাশিয়া সিরিয়াতে বাশার আল-আসাদের সরকারের বিরোধী গ্রুপগুলিকে সন্ত্রাসী বলে আখ্যা দিয়ে থাকে। ঐতিহ্যগতভাবেই রুশরা ককেশাস অঞ্চলকে তাদের প্রভাবের এলাকা হিসেবেই দেখে থাকে। ২০১৬ সালের এপ্রিলের যুদ্ধ তুরস্ক এবং ইস্রাইলকে ককেশাসে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। আজেরবাইজানের জন্যে এই দুই দেশের সমর্থন অত্র এলাকার সামরিক ব্যালান্সকে যে পরিবর্তন করে দিয়েছে, তা এই যুদ্ধের মাঝেই বোঝা গিয়েছে। ভবিষ্যতের যেকোন সংঘাতেও এই দুই দেশের যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে, তা নিশ্চিত। ‘ফরেন পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউট’এর ক্রিস্টিন ফিলিপ ব্লুমায়ের মতামত দেন যে, ২০১৬ সালের যুদ্ধের সময় রুশ কর্মকর্তাদের কথাবর্তা বলে দিয়েছিল যে, রুশরা আর্মেনিয়ার পক্ষে যুদ্ধে সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে না। তবে ব্লুমায়েরের সেই মন্তব্যের পর আরও চার বছর পেরিয়ে গেছে। আর ভূরাজনৈতিকভাবে রাশিয়া এবং তুরস্কের সম্পর্কেও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আবারও যদি আজেরবাইজানের সাথে আর্মেনিয়ার সংঘাত শুরু হয়, তবে সেখানে রাশিয়া চুপচাপ বসে থাকবে কিনা, তা নিশ্চিত নয়। আর যদি আর্মেনিয়রা যুদ্ধে হেরে যাবার অবস্থায় চলে যায়, তাহলেও কি রুশরা বসে থাকবে কিনা?
রুশ নেতৃত্বে ‘কালেকটিভ সিকিউরিটি ট্রিটি অর্গানাইজেশন’ বা ‘সিএসটিও’এর অধীনে থাকা ৬টা দেশের সাথে রাশিয়ার নিরাপত্তা সম্পর্ক অনেক গভীর। ১৯৯৪ সালে ৯টা দেশ এর মাঝে থাকলেও ১৯৯৯ সালে আজেরবাইজান এবং জর্জিয়া এই সংগঠন থেকে বের হয়ে যায়। ২০০৬ সালে ইউক্রেনও বের হয়ে যায় এখান থেকে। বর্তমানে রাশিয়া ছাড়াও আর্মেনিয়া, বেলারুশ, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান এবং তাজিকিস্তান এর সদস্য। আর্মেনিয়ার মিডিয়া ‘আজাতুতইয়ুন’ বলছে যে, ‘সিএসটিও’এর সদস্য হবার কারণে আর্মেনিয়া নামমাত্র মূল্যে বা বিনা পয়সায় রুশ অস্ত্র পায়।
আর্মেনিয়ার সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি কি যথেষ্ট?
মাত্র ৩০ লক্ষ জনসংখ্যার আর্মেনিয়ার জিডিপি ১৩ বিলিয়ন ডলার। বাইরের সহায়তা ছাড়া নিজের শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে তোলা আর্মেনিয়ার জন্যে যথেষ্টই কষ্টকর। আর্মেনিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী আজেরবাইজানের জনসংখ্যা ১ কোটি এবং এর জিডিপি প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার; যা আর্মেনিয়ার তিন গুণেরও বেশি। দুই দেশের জনসংখ্যা এবং অর্থনীতির আকারের এই পার্থক্য সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করাকে যথেষ্টই প্রভাবিত করেছে। ‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’এর হিসেবে আর্মেনিয়ার সেনাবাহিনীতে রয়েছে প্রায় ৪৬ হাজার সেনা। ইউনিটগুলি বেশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে; ১৬টা রাইফেল রেজিমেন্ট, ১টা আর্টিলারি ব্রিগেড, ১টা বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্রিগেড, ২টা বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র রেজিমেন্ট, ১টা আর্টিলারি রেজিমেন্ট, ১টা এন্টি ট্যাঙ্ক রেজিমেন্ট, ৩টা ট্যাঙ্ক ব্যাটালিয়ন, ৪টা আর্টিলারি ব্যাটালিয়ন, এবং আরও বেশকিছু ইউনিট। আর্মেনিয়ার সেনাবাহিনীর সাথে একত্রে যুদ্ধ করছে নাগোর্নো কারাবাখে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া ‘আর্তসাখ রিপাবলিক’এর সেনাবাহিনী। এই বাহিনীতে রয়েছে আরও প্রায় ২৫ হাজার সেনা এবং প্রায় ৩০ হাজার রিজার্ভিস্ট। নিশ্চিত করা না গেলেও আর্তসাখের বাহিনীতে প্রায় ৩’শ ট্যাঙ্ক, ২’শ আর্মার্ড ভেহিকল এবং ৩’শ আর্টিলারি রয়েছে বলে দাবি করে আর্মেনিয়রা।
রাশিয়া নাগোর্নো কারাবাখের সংঘাতে উভয় পক্ষকেই অস্ত্র সরবরাহ করে আসছে। ‘স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইন্সটিটিউট’ বা ‘সিপরি’র হিসেবে ১৯৯৯ থেকে ২০১৯ সালের মাঝে আর্মেনিয়া বেশকিছু অস্ত্র কিনেছে; যার মাঝে রাশিয়াই সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। এই অস্ত্রগুলির মাঝে রয়েছে,
১) ২০১৬ সালে রাশিয়ার সরবরাহকৃত ৪টা ‘ইস্কান্দার’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের লঞ্চার এবং ২৫টা ক্ষেপণাস্ত্র। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলির পাল্লা প্রায় ৪’শ থেকে ৫’শ কিঃমিঃ পর্যন্ত। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, ‘ইস্কান্দার’ ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে আর্মেনিয়রা আজেরবাইজানের তেলের স্থাপনাগুলির উপর হামলা করতে সক্ষম হবে।
২) ২০১৭ সালের মাঝে রাশিয়ার সরবরাহকৃত ৬টা ‘বিএম-৯ এ৫২ স্মার্চ’ ৩০০মিঃমিঃ রকেট লঞ্চার। এগুলির পাল্লা প্রায় ৯০ কিঃমিঃ পর্যন্ত। ২০০৭ সালে বেলারুশ সরবরাহ করে ১০টা ১২২ মিঃমিঃএর ‘ডি-৩০’ কামান। ২০১০ সালে মন্টিনেগ্রো থেকেও একই মডেলের ১৬টা কামান আসে। ১৯৯৯ সালে চীন থেকে আসে ৪টা ‘ডব্লিউএম-৮০’ ২৭৩ মিঃমিঃ সেলফ প্রপেল্ড রকেট লঞ্চার।
৩) ২০১০ সালের মাঝে সরবরাহকৃত ২টা ‘এস ৩০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ‘সিপরি’ বলছে যে, আর্মেনিয়ার কাছে সরবরাহকৃত ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ‘৫ভি৫৫ইউ’ ভার্সনের, যেগুলির পাল্লা দেড়’শ কিঃমিঃ। এর সাথে কমপক্ষে ১’শ ৪৪টা ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করে রাশিয়া। ২০১৭ সালের মাঝে রাশিয়ার সরবরাহকৃত ‘৯কে৩৩৩ ভার্বা’ বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। কাঁধ থেকে ছোঁড়া স্বল্পপাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা সাড়ে ৬ কিঃমিঃ। ২’শটা ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করা হয়। ২০১৩ সালের মাঝে রাশিয়া সরবরাহ করে ৫ কিঃমিঃ পাল্লার ২’শ ‘ইগলা এস’ বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। ২০১৬ সালে আরও ২’শ ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করা হয়। ২০১৯ সালে রুশরা সরবরাহ করে কমপক্ষে ২টা ‘টর এম১’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যাবস্থা এবং এর সাথে ৫০টা ‘৯এম৩৩৮’ ক্ষেপণাস্ত্র। ১২ কিঃমিঃ পাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ট্যাঙ্ক চ্যাসিসের উপর বসানো। তবে আর্মেনিয়ার মিডিয়া ‘আজাতুতইয়ুন’ বলছে যে, প্রধানমন্ত্রী নিকল পাশিনিয়ান তার ফেইসবুক পেইজে ২০১৭ সালের মে মাসেই এই ক্ষেপণাস্ত্র কেনার ঘোষণা দেন।
৪) ২০১৭ সালে রাশিয়া সরবরাহ করে সাড়ে ৫ কিঃমিঃ পাল্লার ১’শটা ‘৯এম১৩৩ করনেট-ই’ ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। ‘করনেট’ রুশদের ডেভেলপ করা ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রগুলির মাঝে সবচাইতে সক্ষমগুলির একটা।
৫) ২০১৯ সালে রুশরা সরবরাহ করা শুরু করে ‘সুখোই এসইউ-৩০এসএম’ ফাইটার বিমান। এই বিমানগুলি আর্মেনিয়ার বিমান বাহিনীকে আজেরবাইজানের বিমান বাহিনী থেকে অনেক এগিয়ে নিয়ে গেল।
৬) ২০০৪ সালে স্লোভাকিয়ার কাছ থেকে আর্মেনিয়া ১০টা রুশ নির্মিত ‘সুখোই এসইউ-২৫’ গ্রাউন্ড এটাক বিমান কেনে।
৭) ইউক্রেনের কাছ থেকে ২০০৪ সালে ২টা ‘এল-৩৯সি আলবাট্রস’ ট্রেনিং জেট বিমান কেনে। ২০১১ সালের মাঝে আরও ৪টা বিমান পায় আর্মেনিয়া।
৮) ২০১৯ সালে আর্মেনিয়া ১৫ কিঃমিঃ পাল্লার ৪টা ‘অসা’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনে। এর সাথে ছিল ১’শ ২০টা ‘৯এম৩৩’ ক্ষেপণাস্ত্র। এগুলির উৎস নিশ্চিত হওয়া না গেলেও রাশিয়া থেকেই এগুলি এসেছে বলে বলছে ‘সিপরি’।
খেয়াল করলে বোঝা যাবে যে, আর্মেনিয়া তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাঝে বিমান প্রতিরক্ষাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। ‘সুখোই-৩০’ বিমান এবং দূরপাল্লার ‘এস-৩০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে আর্মেনিয়া আকাশকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। একইসাথে ২০১৬ সাল থেকে বিপুল সংখ্যক স্বল্প পাল্লার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয় করে তারা। এছাড়াও দূরপাল্লার আর্টিলারি এবং এন্টি ট্যাঙ্ক ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে ক্রয়কৃত আস্ত্রের মাঝে। এগুলি ছাড়াও আর্মেনিয়া রাশিয়া থেকে ‘ইনফাউনা’ ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার যন্ত্র কিনেছে, যা কিনা তারা ২০১৬ সালের জাতীয় দিবস প্যারেডে দেখায়। এই যন্ত্রের মাধ্যমে শত্রুপক্ষের রেডিও যোগাযোগ জ্যামিং করা সম্ভব। এর বাইরেও আর্মেনিয়রা নিজেরাই ‘থান্ডার’ নামে একটা রেডিও জ্যামার তৈরি করে ২০১৮ সালে ইয়েরেভানে একটা প্রতিরক্ষা মেলায় ডিসপ্লে করে। আর্মেনিয়ার সামরিক কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ‘আরমেন প্রেস’ বলছে যে, এই জ্যামার ২০ কিঃমিঃ দূরত্বে শত্রুর রেডিও জ্যামিং করতে পারবে। সিনিয়র লেফটেন্যান্ট হোভানেস খেলাঘাতিয়ান বলেন যে, ২০১৬ সালে আজেরবাইজানের সাথে সীমান্ত যুদ্ধে এই জ্যামার নাগোর্নো কারাবাখে মোতায়েন করা হয় এবং তা ব্যাপক সফলতাও পায়। ২০১১ সালে আর্মেনিয়া সামরিক প্যারেডে নিজস্ব ডিজাইনের ‘ক্রুংক’ সার্ভেইল্যান্স ড্রোন ডিসপ্লে করে। প্রায় ৫ ঘন্টা আকাশে ওড়ার সক্ষমতা রয়েছে এটির। আর্তসাখ সেনাবাহিনীকেও এই ড্রোন সরবরাহ করা হয়েছে।
আজেরবাইজানে অস্ত্র কেনার হিড়িক
অন্যদিকে ‘সিপরি’র হিসেবে ১৯৯৯ থেকে ২০১৯ সালের মাঝে আজেরবাইজান বিপুল পরিমাণ অস্ত্র কিনেছে। সরবরাহকারীদের মাঝে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাশিয়া, ইস্রাইল, দক্ষিণ আফ্রিকা, তুরস্ক, বেলারুশ এবং ইউক্রেন।
আজেরবাইজান যা কিনেছে, তার মাঝে রয়েছে -
১) ট্যাঙ্ক কেনা হয় ৩’শ ৬০টা...
রাশিয়া - ২০০৭ সালে কেনা ৬২টা ‘টি-৭২এম১’ ট্যাঙ্ক; ২০১৫ সালের মাঝে কেনা ১’শটা ‘টি-৯০এস’ ট্যাঙ্ক;
ইউক্রেন - ২০০৬ সালে কেনা ৪৫টা ‘টি-৭২এম১’ ট্যাঙ্ক;
বেলারুশ - ২০০৬ সালে কেনা ৬০টা ‘টি-৭২এম১’ ট্যাঙ্ক; ২০১৩ সালের মাঝে কেনা হয় আরও ৯৩টা;
২) আর্টিলারি কেনা হয় ৬’শ ৯২টা...
বেলারুশ থেকে ২০০৮ এবং ২০০৯ সালে ১২টা ‘২এস৭ পিয়ন’ ২০৩ মিঃমিঃ সেলফ প্রপেল্ড কামান কেনা হয়; ২০১৯ সালের মাঝে ১০টা ‘বি২০০বিএম পলোনেজ’ ৩০০ মিঃমিঃ সেলফ প্রপেল্ড রকেট; ২০১৭ সালে ২৬টা ‘২এ৩৬’ ১৫২ মিঃমিঃ কামান; ২০১০ সালে ৩০টা ‘ডি-৩০’ ১২২ মিঃমিঃ কামান কেনা হয়।
বুলগেরিয়া থেকে ২০০২ সালে ৩৬টা ১৩০ মিঃমিঃ ‘এম-৪৬’ কামান কেনা হয়।
চেক রিপাবলিক থেকে ২০১৮ সালের মাঝে ৩০টা ১২২ মিঃমিঃ ‘আরএম-৭০’ সেলফ প্রপেল্ড রকেট কেনা হয়।
স্লোভাকিয়া থেকে ২০১৮ সালের মাঝে কেনা হয় ৩৬টা ১৫২ মিঃমিঃ ‘ডানা’ সেলফ প্রপেল্ড কামান।
ইস্রাইল থেকে ২০০৬ সালে ৬টা ‘লিংক্স’ সেলফ প্রপেল্ড আর্টিলারি রকেট লঞ্চার কেনা হয়। এরপর ক্রমান্বয়ে ৫০টা ‘এক্সট্রা’ গাইডেড রকেটও কেনা হয়। ২০১০ সালে কেনা হয় ৫টা ১৫৫ মিঃমিঃ সেলফ প্রপেল্ড আর্টিলারি কামান ‘এটমোস ২০০০’। ২০১১ সালের মাঝে কেনা হয় ১০টা ১২০ মিঃমিঃ ‘কারডম’ সেলফ প্রপেল্ড মর্টার। ২০১৮ সালের মাঝে কেনা হয় ৪টা ‘লোরা’ সেলফ প্রপেল্ড রকেট লঞ্চার; সাথে কেনা হয় ৫০টা রকেট। একই বছর কেনা হয় ১০টা ‘স্যান্ডক্যাট স্পিয়ার’ ১২০ মিঃমিঃ সেলফ প্রপেল্ড মর্টার।
রাশিয়া থেকে ২০১৪ সালের মাঝে কেনা হয় ১৮টা ‘২এস১৯ এমএসটিএ-এস’ ১৫২ মিঃমিঃ সেলফ প্রপেল্ড কামান; ১৮টা ‘২এস৩১ ভেনা’ ১২০ মিঃমিঃ সেলফ প্রপেল্ড কামান; ১৮টা বিএম৯ এ৫২ স্মার্চ’ ৩০০ মিঃমিঃ সেলফ প্রপেল্ড রকেট লঞ্চার। ২০১৭এর মাঝে কেনা হয় ৩৬টা ‘টিওএস-১’ ২২০ মিঃমিঃ সেলফ প্রপেল্ড রকেট লঞ্চার।
তুরস্ক থেকে ২০১৩ সালের মাঝে কেনা হয় ৩০টা ১০৭ মিঃমিঃ রকেট লঞ্চার ‘টি-১০৭’; ২০১৪ সালের মাঝে কেনা হয় ৪০টা ‘টি-১২২’ রকেট লঞ্চার; ২০১৬ সালের মাঝে কেনা হয় ৩০০ মিঃমিঃএর ২০টা ‘টি-৩০০’ রকেট লঞ্চার; এর সাথে সরবরাহ করা ১’শ ৮টা ৩০০ মিঃমিঃ ‘টিআরজি-৩০০’ গাইডেড রকেট। এগুলির পিছনে খরচ হয় প্রায় ২’শ ৪৪ মিলিয়ন ডলার।
ইউক্রেন থেকে ২০০২ সালের মাঝে কেনা হয় ৭২টা ‘টি-১২ ২এ১৯’ ১০০ মিঃমিঃ কামান। ২০০৫ সালে কেনা হয় ১২টা ‘বিএম৯ এ৫২ স্মার্চ’ সেলফ প্রপেল্ড রকেট; ২০০৬ সালে কেনা হয় ৮৫টা ‘এম-৪৩’ ১২০ মিঃমিঃ মর্টার; ২০০৭ সালে কেনা হয় ৫৫টা ‘ডি-৩০’ ১২২ মিঃমিঃ কামান; ২০০৮ সালের মাঝে কেনা হয় ৩টা ‘২এস৭ পিওন’ ২০৩ মিঃমিঃ কামান; ২০১০ সালের মাঝে কেনা হয় ৫৪টা ‘২এস১’ ১২২ মিঃমিঃ সেলফ প্রপেল্ড কামান; একই বছরে কেনা হয় ১৬টা ‘২এস৩’ ১৫২ মিঃমিঃ সেলফ প্রপেল্ড কামান।
৩) আর্মার্ড ভেহিকল কেনা হয় ৬’শ ৪৯টা...
২০১০ সালের মাঝে রাশিয়া থেকে কেনা হয় ৭০টা ‘বিটিআর-৮০এ’ এপিসি; ২০১৫ সালের মাঝে কেনা হয় ১’শ ১৮টা ‘বিএমপি-৩’ ইনফ্যান্ট্রি ফাইটিং ভেহিকল; ২০১৮ সালের মাঝে কেনা হয় ৭৬টা ‘বিটিআর-৮২এ’ ইনফ্যান্ট্রি ফাইটিং ভেহিকল।
২০১১ থেকে ২০১৫এর মাঝে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে কেনা হয় ৮৫টা ‘ম্যারডার’ এবং ৬০টা ‘ম্যাটাডোর’ এপিসি।
২০১১ সালে তুরস্ক থেকে কেনা হয় ৩৫টা ‘কোবরা’ এবং ৩৭টা ‘শোরল্যান্ড’ এপিসি।
ইউক্রেন থেকে ২০০৭ সালে কেনা হয় ১৮টা ‘বিটিআর-৮০’ এপিসি; ২০১০ সালের মাঝে কেনা হয় ১শ ৫০টা ‘বিটিআর-৭০’ এপিসি।
৪) বিমান প্রতিরক্ষা
ইস্রাইলের কাছ থেকে ২০১৬ সালে একটা ‘বারাক এলআর’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনা হয়। এর সাথে ছিল ১’শ কিঃমিঃ পাল্লার ৪০টা ‘বারাক-৮’ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১৫০ কিঃমিঃ পাল্লার ৪০টা ‘বারাক-৮ ইআর’ ক্ষেপণাস্ত্র; ২টা ‘ইএলএম ২২৮৮’ এয়ার সার্চ রাডার। স্পেন থেকেও কেনা হয় ‘লানজা এলটিআর-২৫’ এয়ার সার্চ রাডার। ইউক্রেন থেকে ২০০৮ সালে কেনা হয় ১৮টা ‘স্ট্রেলা-৩’ বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। ২০১৩ সালে কেনা হয় ’৮০কে৬এম’ এয়ার সার্চ রাডার।
রাশিয়া থেকে ২০১১ সালে ৩’শ মিলিয়ন ডলার খরচে কেনা হয় ২টা ‘এস-৩০০পিএমইউ-২’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং তাতে ব্যবহারের জন্যে কেনা হয় ২’শ ‘৪৮এন৬’ ক্ষেপণাস্ত্র। এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা দেড়’শ কিঃমিঃএর বেশি। ২০১৩ সালের মাঝে কেনা হয় স্বল্প পাল্লার ২’শ ‘ইগলা-এস’ বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের লঞ্চার এবং ১ হাজার ক্ষেপণাস্ত্র। ২০১৪ সালের মাঝে কেনা হয় ২টা ‘৯কে৩৭ বুক-১এম’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এর সাথে কেনা হয় ৪৫ কিঃমিঃ পাল্লার ১’শটা ‘৯এম৩১৭’ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৪২ কিঃমিঃ পাল্লার ১’শটা ‘৯এম৩৮’ ক্ষেপণাস্ত্র।
৫) আকাশ সক্ষমতা
২০০৬ সালে ইউক্রেন থেকে ১২টা ‘এল-৩৯সি’ প্রশিক্ষণ বিমান কেনা হয়। ২০০৬ থেকে ২০১১ সালের মাঝে ইউক্রেন থেকে কেনা হয় ১৬টা ‘মিগ-২৯’ ফাইটার বিমান। ২০০৭ সালে মিগগুলিতে ব্যবহারের জন্যে কেনা হয় ৪৩টা ‘আর-২৭’ আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র। ২০১০ সালের মাঝে ইউক্রেন থেকে ১২টা ‘এমআই-৩৫পি’ এটাক হেলিকপ্টার কেনা হয়। এই হেলিকপ্টার থেকে ছোঁড়ার জন্যে ৪’শ ‘স্কিফ’ এবং ‘ব্যারিয়ার’ এন্টি ট্যাঙ্ক ক্ষেপণাস্ত্রও কেনা হয়। বেলারুশ থেকে ২০১২ সালের মাঝে কেনা হয় ১১টা ‘সুখোই এসইউ-২৫’ গ্রাউন্ড এটাক বিমান।
২০১৮ সালে সামরিক প্যারেডে আজেরিরা তুরস্কের তৈরি ‘এসওএম বি-১’ আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপণযোগ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ডিসপ্লে করে। ২’শ ৩০ কেজি ওয়ারহেডের এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলিকে খুব সম্ভবতঃ আজেরবাইজানি ‘মিগ-২৯’ এবং ‘সুখোই-২৫’ যুদ্ধবিমান থেকে ছোঁড়ার জন্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। ২০১৯ সালের মাঝে ১০টা ক্ষেপণাস্ত্র ডেলিভারি করা হয়। এই ক্ষেপণাস্ত্রকে ব্যবহার করে আজেরবাইজানের বিমানগুলি শত্রুর বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে দূরত্ব রেখেই আড়াই’শ কিঃমিঃ দূরের অতি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা অর্জন করলো।
রাশিয়া থেকে ২০১৪ সালের মাঝে ৩’শ ৬০ মিলিয়ন ডলারে কেনা হয় ২৪টা ‘এমআই-২৪/৩৫এম’ এটাক হেলিকপ্টার। ২০১৫ সালের মাঝে কেনা হয় ৬৬টা ‘এমআই-১৭’ এসল্ট হেলিকপ্টার। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ‘ভেক্টর’ টারেট ক্রয় করে সেগুলিকে ইউক্রেনের সহায়তায় ‘এমআই-২৪’ এটাক হেলিকপ্টারগুলিকে আপগ্রেড করা হয়।
ইস্রাইলের কাছ থেকে ২০০৮ সালে ৩০ মিলিয়ন ডলারে কেনা হয় ১২ ঘন্টা ওড়ার সক্ষমতার ৪টা ‘এরোস্টার’ সার্ভেইল্যান্স ড্রোন; ২০১৩ সালের মাঝে কেনা হয় ৫২ ঘন্টা ওড়ার সক্ষমতার ৫টা হেরন সার্ভেইল্যান্স ড্রোন; ২০ ঘন্টা ওড়ার সক্ষমতার ১০টা ‘হার্মিস-৪৫০’ ছোট সার্ভেইল্যান্স ড্রোন; এবং ১৮ ঘন্টা ওড়ার সক্ষমতার ৫টা ‘সার্চার’ ছোট সার্ভেইল্যান্স ড্রোন। ২০১৬ সালের মাঝে ডেলিভারি দেয়া হয় ৫০টা ‘হারপ’ লোইটারিং সুইসাইড ড্রোন। ২০১৭ সালের মাঝে কেনা হয় ৭ ঘন্টা ওড়ার সক্ষমতার ১০টা ছোট ‘অরবিটার-৩’ সার্ভেইল্যান্স ড্রোন। ২০১৮ সালের মাঝে কেনা হয় ১’শটা ‘স্কাই স্ট্রাইকার’ লোইটারিং সুইসাইড ড্রোন। ৩৬ ঘন্টা ওড়ার সক্ষমতার ২টা ‘হার্মিস-৯০০’ সার্ভেইল্যান্স ড্রোনও কেনা হয়। ২০১৯ সালের মাঝে কেনা হয় ১’শ ‘অরবিটার-১কে’ লোইটারিং সুইসাইড ড্রোন। ‘জেরবা’ নামে এই সুইসাইড ড্রোনগুলি ২০১৯ সাল থেকে আজেরবাইজানের ‘আজাদ সিস্টেমস কোম্পানি’র ফ্যাক্টরিতে তৈরি হচ্ছে।
আজেরবাইজানের সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি
প্রায় সাড়ে ৩’শ ট্যাঙ্ক, প্রায় ৭’শ আর্টিলারি এবং প্রায় সাড়ে ৬’শ আর্মার্ড ভেহিকল কেনার মাধ্যমে আজেরবাইজান তার সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি করে। ‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’এর প্রকাশ করা ‘দ্যা মিলিটারি ব্যালান্স ২০০৩-২০০৪’এর হিসেব অনুযায়ী আজেরবাইজানের সেনাবাহিনীতে সদস্যসংখ্যা ছিল ৫৬ হাজার। মোট ২৩টা মোটর রাইফেল ব্রিগেডের মাঝে এই সেনাদেরকে অর্গানাইজ করা হয়েছিল। ২০০৭ সালের হিসেবে সেনাবাহিনীর সদস্যসংখ্যা ছিল প্রায় ৫৭ হাজার। ২০১৭ সালের মিলিটারি ব্যালান্সেও সদস্যসংখ্যা প্রায় একইরকম ছিল। কিন্তু ইউনিটগুলিতে বেশকিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। ৪টা ব্রিগেডকে মেকানাইজড ব্রিগেডে পরিবর্তন করা হয়েছে; আর্টিলারি ব্রিগেডের সংখ্যা ১টা থেকে ২টাতে উন্নীত করা হয়েছে। সাড়ে ৬’শ ট্যাঙ্কের সাথে প্রায় ৪’শ সেলফ প্রপেল্ড কামান কেনা হয়। বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিটগুলির মাঝেও অনেকগুলিই ছিল মেকানাইজড ইউনিটের সাথে ব্যবহারের জন্যে মোবাইল ইউনিট। এই মেকানাইজড ব্রিগেডগুলি আজেরবাইজানের সেনাবাহিনীর আক্রমণে যাবার সক্ষমতাকে অনেকগুণে বাড়িয়েছে।
ইস্রাইলের ‘বারাক-৮’ এবং রাশিয়ার ‘এস-৩০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলি আজেরবাইজানের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলিকে রক্ষার জন্যে মোতায়েন করা হতে পারে। অপরদিকে মধ্যম ও স্বল্প পাল্লার ‘বুক’ ও ‘ইগলা এস’ ক্ষেপণাস্ত্রগুলি শত্রুপক্ষের ড্রোনগুলির বিরুদ্ধে মোতায়েন করা হতে পারে।
বিরাট পরিবর্তন এসেছে আজেরবাইজানের আকাশ সক্ষমতায়। ইস্রাইলের তৈরি সার্ভেইল্যান্স ড্রোনগুলির সাথে সুইসাইড ড্রোনগুলি যুক্ত হওয়ায় তা আজেরবাইজানকে আকাশ নিয়ন্ত্রণের এক ধরণের সক্ষমতা দিয়েছে। ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ২০১৬ সালের এপ্রিলের যুদ্ধে ইস্রাইলের তৈরি ‘হারোপ’ সুইসাইড ড্রোন ব্যবহার করে একটা আর্মেনিয় বাস ধ্বংস করা হয়, যেখানে ৭ জন নিহতের মাঝে ছিল কয়েকজন মধ্যম সাড়ির অফিসার। টার্গেট করে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে হত্যা করার জন্যে ড্রোন ব্যবহৃত হওয়ায় ড্রোন ঠেকাবার জন্যে আজেরবাইজান এবং আর্মেনিয়া উভয়েই উঠেপড়ে লেগেছে। ‘ফ্লাইট গ্লোবাল’ বলছে যে, ২০১৬ সালের যুদ্ধে উভয় পক্ষই খুব সম্ভবতঃ এন্টি ড্রোন ইলেকট্রনিক জ্যামিং সিস্টেম ব্যবহার করেছে। আজেরবাইজান তুরস্ক থেকে ‘এসওএম বি-১’ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার ফলে দেশটার পুরোনো মিগ এবং সুখোই বিমানগুলি নতুন ভূমিকা পেয়েছে। আর্মেনিয়ার কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলি এখন এই ক্ষেপণাস্ত্রের নাগালের মাঝে।
আজেরবাইজানের সাম্প্রতিক সামরিক কর্মকান্ড দেশটার নেতৃত্বকে আর্মেনিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী করে তুলছে। আজেরবাইজানের ‘রিপোর্ট নিউজ এজেন্সি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সক্ষমতার দিক থেকে আজেরবাইজানের সামরিক বাহিনী বর্তমানে বিশ্বের সেরা সামরিক বাহিনীগুলির একটা। রুশ সমর বিশ্লেষক আন্দ্রেই ফ্রোলভের কথায়, ১৫ বছরের আগের আজেরি সেনাবাহিনীর তুলনায় বর্তমানের সেনাবাহিনী বলতে গেলে আলাদা একটা বাহিনী।
আর্মেনিয় ইস্টার্ন অর্থোডক্স খ্রিষ্টানদের সাথে আজেরি মুসলিমদের দ্বন্দ্ব বহু পুরোনো। তবে সোভিয়েতদের রেখে যাওয়া উদ্ভট বাউন্ডারিগুলিই নাগোর্নো কারাবাখ নিয়ে আর্মেনিয়া এবং আজেরবাইজানের বর্তমান দ্বন্দ্বের সূচনা করেছে। আর্মেনিয়ার নেতৃত্বের মাঝে ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চের প্রভাব যথেষ্ট থাকায় এই দ্বন্দ্বকে ধর্মীয় রঙে দেখেছে অনেকেই। সোভিয়েত সামরিক বাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার কারণেই ১৯৯০এর দশকে আর্মেনিয়া সামরিক দিক থেকে আজেরিদের থেকে অনেক এগিয়ে ছিল। কিন্তু ২০০৬ সাল থেকে তুরস্কের মাঝ দিয়ে তেলের পাইপলাইন চালু হবার পর তেল বিক্রির অর্থের উপর নির্ভর করে আজেরবাইজান তার সামরিক শক্তি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করতে থাকে। আজেরবাইজানের এই তেল মূলতঃ যায় ইউরোপে। মার্কিন ‘এনার্জি ইনফরমেশন এডমিনিস্ট্রেশন’এর হিসেবে ২০১৭ সালে আজেরবাইজানের রপ্তানি করা ৭৩ শতাংশ তেলই যায় ইউরোপে। অন্যদিকে ২০০৮ সালে জর্জিয়াতে রুশ হামলার পর আজেরিরা তুরস্ককে কৌশলগত বন্ধুর হিসেবে দেখতে থাকে। আজেরিরা তাদের নতুন কেনা অত্যাধুনিক অস্ত্রগুলিকে তুর্কিদের সাথে মহড়া দিয়ে কার্যক্ষম একটা সামরিক বাহিনী তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। ২০১৬ সালের চার দিনের যুদ্ধে আজেরিরা তাদের নতুন প্রযুক্তি, বিশেষ করে ড্রোন ব্যবহারে বেশ দক্ষতা দেখায়। এখন তুরস্কও সিরিয়ার ইদলিবের অভিজ্ঞতা এবং সেখানে সফলতা পাওয়া প্রযুক্তিগুলি আজেরবাইজানকে সরবরাহ করছে। এতে ককেশাসে সামরিক ব্যালান্সে যথেষ্ট পরিবর্তন এসেছে। আজেরবাইজান যদি সম্ভাব্য যুদ্ধে জয় পাবার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে যায়, তাহলে নাগোর্নো কারাবাখের যুদ্ধক্ষেত্র আবারও ফুঁসে উঠতে পারে। তবে এই যুদ্ধের সম্ভাবনা ওঠানামা করবে তুরস্ক এবং রাশিয়ার ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার উপর।
গত ২রা মে আজেরবাইজানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে একটা ভিডিওতে দেখানো হয় যে, আজেরবাইজানের নাখচিভান ছিটমহলে বেশকিছু অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করা হয়েছে। তুর্কি থিংকট্যাঙ্ক ‘ইডিএএম’এর প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক জান কাসাপোগলু বলছেন যে, এই ভিডিওতে তুরস্কে নির্মিত ‘টিআরজি-৩০০ কাপলান’ ৩০০ মিঃমিঃ রকেট আর্টিলারি বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। এর নির্মাতা কোম্পানি ‘রকেটসান’ বলছে যে, এই রকেটের পাল্লা ১’শ ২০ কিঃমিঃ এবং এর সক্ষমতা রয়েছে এর ১’শ ৫ কেজি ওয়ারহেডকে টার্গেটের ১০ মিটারের মাঝে ফেলার। এই রকেটগুলি সৈন্যদের ব্যারাক, কমান্ড সেন্টার, রাডার, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ টার্গেট ধ্বংসে বিশেষভাবে কার্যকর। কাসাপোগলু মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, গত ফেব্রুয়ারিতে সিরিয়ার ইদলিবের যুদ্ধে তুর্কি সেনাবাহিনী এই রকেটগুলিকে ব্যবহার করেছিল। নাখচিভান ছিটমহলে এই রকেট মোতায়েন করার ফলে অত্র অঞ্চলের সামরিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এসেছে। আজেরবাইজানের প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র আর্মেনিয়ার সাথে বিরোধপূর্ণ নাগোর্নো কারাবাখ অঞ্চলকে কেন্দ্র করে তুমুল বিরোধ রয়েছে। ১৯৯০এর দশক থেকে চলা একরকম যুদ্ধাবস্থাতে বর্তমানে অস্ত্রবিরতি থাকলেও এই স্থিতাবস্থা কতদিন এভাবে থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে। কাসাপোগলু বলছেন যে, নাখচিভান ছিটমহলে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আজেরবাইজান এখন নাগোর্নো কারাবাখে আর্মেনিয় সেনাদের সাপ্লাই লাইনকে হুমকির মুখে ফেলতে পারবে।
সাম্প্রতিক সময়ে আজেরবাইজান সামরিক খাতে ব্যাপক ব্যয় করেছে। একইসাথে তুরস্কের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের মাঝে দুই দেশ যৌথ মহড়ায় অংশ নিয়েছে; যার মাধ্যমে আজেরবাইজানের যুদ্ধ করার সক্ষমতা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। তুর্কি মিডিয়া ‘ইয়েনি সাফাক’ গত বছর মে মাসে আজেরবাইজানের রাজধানী বাকুর কাছকাছি ‘মুস্তফা কেমাল আতাতুর্ক ২০১৯’ নামের এক সামরিক মহড়ার খবর দেয়। এই মহড়ায় ট্যাঙ্ক, আর্মার্ড ভেহিকল এবং আর্টিলারির সমন্বয়ে গঠিত আজেরবাইজানের সেনাবাহিনীর মেকানাইজড ফর্মেশনগুলি বড় আকারের আক্রমণাত্মক কৌশলের মহড়ার দেয়। এই মহড়াগুলি আজেরবাইজানকে নাগোর্নো কারাবাখে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত করছে।
আজেরবাইজান ও আর্মেনিয়ার সংঘাতের ঐতিহাসিক পটভূমি
আর্মেনিয়া ককেশাসের অংশ। খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতকে আর্মেনিয়ার মানুষ খ্রিষ্ঠান হওয়া শুরু করে। সেই সময় থেকে ৭ম শতাব্দী পর্যন্ত বাইজ্যান্টাইন সাম্রাজ্য এবং পারসিক সাম্র্যাজ্যের মাঝে আর্মেনিয়া নামে একটা খ্রিষ্ঠান রাজ্য তার উপস্থিতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। তবে ৮ম শতাব্দীর মাঝামাঝি আর্মেনিয়াসহ পুরো ককেশাস ইসলামের অধীনে চলে যায়। ত্রয়োদশ শতকে মোঙ্গল আক্রমণের পর থেকে এই অঞ্চলের ধরণ পাল্টে যায়। তুর্কিরা এখানকার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি ইস্তাম্বুলে উসমানি খিলাফতের আবির্ভাবের পর থেকে ককেশাস অঞ্চল পারস্য এবং উসমানিদের মাঝে প্রতিযোগিতার বস্তু হয়ে যায়। এরপর অষ্টাদশ শতকে রুশদের আবির্ভাবের পর অত্র অঞ্চলে ত্রিমুখী প্রভাবের প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়। তবে বিংশ শতকে সোভিয়েত ইউনিয়ন তৈরির পর ককেশাস অঞ্চল পুরোটাই সোভিয়েত শক্তির পদানত হয়। সোভিয়েতরাই বর্তমান ককেশাসের বাউন্ডারিগুলি এঁকেছিল। সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্টালিন আর্মেনিয়া এবং আজেরবাইজানের সীমানা এঁকে দেন; যেখানে নাগোর্নো কারাবাখ অঞ্চলকে আজেরবাইজানের মাঝে রাখা হয়। আর্মেনিয়রা এটা পছন্দ করেনি; তারা চেয়েছিল যে, খ্রিষ্টান অধ্যুষিত নাগোর্নো কারাবাখ আর্মেনিয়ার অধীন হোক; মুসলিম অধ্যুষিত আজেরবাইজানের অধীন নয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সময় থেকেই এই সীমানা নিয়ে আর্মেনিয় এবং আজেরিদের মাঝে শুরু হয় জাতিগত সংঘাত। আর ১৯৯০এর শুরুতে তা রূপ নেয় পুরোপুরি যুদ্ধে। সোভিয়েত সেনাবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকার কারণে আর্মেনিয়রা বেশ শক্তিশালী একটা সেনাবাহিনী গঠন করতে পারে; যা কিনা আজেরিরা পারেনি। তুলনামূলকভাবে অনেক ছোট দেশ হওয়া সত্ত্বেও আর্মেনিয়া তার সামরিক দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে নাগোর্নো কারাবাখকে আজেরিদের হাত থেকে ছিনিয়ে নেয়। ১৯৯৪ সালে যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরিত হবার পর থেকে এখানে থেকে থেকে সংঘাত চলছে। আর্মেনিয়ার নেতৃত্বের সাথে ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চের সম্পর্ক খুবই গভীর। তৃতীয় শতাব্দী থেকেই আর্মেনিয়া একটা ইস্টার্ন অর্থোডক্স খ্রিষ্টান রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। তাই ধর্মীয় বিষয়গুলি কখনোই আর্মেনিয়ার রাজনীতির বাইরে ছিল না।
বাকুর তেলের ভূরাজনীতি
ঊনিশ শতকের শেষের দিকে আজেরবাইজানের বাকু তেলখনি থেকে তেল উত্তোলন শুরু করে রুশরা। বিংশ শতকের শুরুতে সারা বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের অর্ধেক আসতো বাকু থেকে। ১৯১৮ সালে উসমানি খিলাফত ধ্বংসের কাছাকাছি সময়ে উসমানি সেনারা আজেরিদেরকে সাথে নিয়ে বাকুর নিয়ন্ত্রণ নেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানি খিলাফত ধ্বংস করে ব্রিটিশরা এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। কিন্তু ১৯২০ সালের এপ্রিলে সোভিয়েত সৈন্যরা বাকুর দখল নেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বাকুর তেলখনিগুলি জার্মানদের বিরুদ্ধে সোভিয়েত বিজয়ে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বাকুর তেল পশ্চিমা দেশগুলিতে রপ্তানি করার পিছনে ব্যাপক অর্থ বিনিয়োগ শুরু হয়। ১৯৯৭ সালে রুশ বিনিয়োগে বাকু থেকে রাশিয়ার কৃষ্ণ সাগরের বন্দর নভোরোসিস্ক পর্যন্ত তেলের পাইপলাইন চালু হয়। ১ লক্ষ ব্যারেল সক্ষমতার এই পাইপলাইনের চাইতে আরও বেশি সক্ষমতার আরেকটা পাইপলাইন তৈরি করা হয় রাশিয়াকে বাইপাস করে বাকু থেকে জর্জিয়ার সুপসা বন্দর পর্যন্ত। ১৯৯৯ সালে চালু হওয়া এই পাইপলাইনের সক্ষমতা হলো ১ লক্ষ ৪৫ হাজার ব্যারেল। তবে এই দুই পাইপলাইনের চাইতে আরও অনেক বড় এক প্রকল্প গ্রহণ করা হয় আরও আগেই। ১৯৯৩ সালে রাশিয়াকে বাইপাস করে আজেরবাইজানের বাকু তেলখনি থেকে তেল তুরস্কের ভূমধ্যসাগরের চেইহান বন্দরে খালাস করার লক্ষ্যে কাজ শুরু হয়। রাশিয়া এবং আর্মেনিয়াকে এক্ষেত্রে বাইপাস করে জর্জিয়াকে বেছে নেয়া হয়। তবে ২০০৩ সালের আগে এই পাইপলাইনের কাজ শুরু হয়নি। ২০০৬ সালের মে মাসে ১২ লক্ষ ব্যারেল সক্ষমতার এই পাইপলাইন পুরোপুরি চালু হয়। মার্কিন ‘এনার্জি ইনফর্মেশন এডমিনিস্ট্রেশন’র হিসেবে ২০০৪ সালে যেখানে আজেরবাইজানের তেলের উৎপাদন ছিল দৈনিক প্রায় ৩ লক্ষ ব্যারেল, তা ২০০৭ সালে গিয়ে দাঁড়ায় ৭ লক্ষ ব্যারেলের বেশি। এই পাইপলাইন চালুর মাধ্যমে বাকুর তেলখনিগুলির উপর রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই কমে যায়। তেল বিক্রির অর্থের উপর ভর করে আজেরবাইজানের জিডিপি বিশ্বব্যাঙ্কের হিসেবে ২০০৪ সালে ৯ বিলিয়ন ডলার থেকে লাফ দিয়ে ২০১৪ সালে ৭৫ বিলিয়ন ডলার হয়ে যায়। অর্থাৎ মাত্র দশ বছরে জিডিপি ৮ গুণ বেড়ে যায়! তবে তেলের বাজারে ব্যাপক দরপতনের পর দেশটার জিডিপি ৪৮ বিলিয়নে নেমে আসে। তেল বিক্রির এই অর্থ আজেরবাইজানের সামরিক সক্ষমতাকে পুরোপুরি পাল্টে দেয়। জর্জিয়ার অর্থনীতিও একই সময়ে ৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার হয়ে যায়। আর আর্মেনিয়ার অর্থনীতি সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলার থেকে হয়ে যায় ১২ বিলিয়ন ডলার।
নাগোর্নো কারাবাখকে ঘিরে আর্মেনিয়ার সাথে আজেরবাইজানের যুদ্ধের কারণে বাকু থেকে তেলের পাইপলাইনগুলি খোলা সমুদ্র পর্যন্ত পৌঁছানোটা হয়ে গিয়েছিল কঠিন। এক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগের কাজ করে জর্জিয়া। ২০০৩ সালে জর্জিয়াতে পশ্চিমাদের সমর্থিত ‘রোজ রেভোলিউশন’এর মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন হয়। নতুন প্রেসিডেন্ট মিখাইল শালিকাশভিলি পশ্চিমাদের সাথে ভালো সম্পর্ক রেখে চলেন। তবে একইসাথে রাশিয়ার সাথে জর্জিয়ার সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে। জর্জিয়ার মাঝ দিয়ে যাবার কারণে বাকু থেকে আসা পাইপলাইনগুলিকে নাগোর্নো কারাবাখের সংঘাত স্পর্শ করতে পারেনি। তবে এই প্রকল্পগুলিকে রাশিয়া নিজ অঞ্চলে পশ্চিমাদের হস্তক্ষেপ হিসেবেই দেখেছে। ২০০৮ সালের অগাস্টে মাত্র ৩৭ লক্ষ জনসংখ্যার জর্জিয়া রাশিয়ার সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে যায়। জর্জিয়ার ভেতরে আবখাজিয়া এবং সাউথ অসেটিয়া অঞ্চলকে রাশিয়া সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে জর্জিয়া থেকে আলাদা করে ফেলে এবং এদেরকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দেয়। সেসময় আজেরবাইজানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলে যে, তারা জর্জিয়ার অখন্ডতায় বিশ্বাসী। ২০০৮ সালে রাশিয়ার জর্জিয়া অভিযান নাগোর্নো কারাবাখ নিয়ে আজেরবাইজানের নিরাপত্তাহীনতাকে জাগিয়ে তুলে। ২০১০ সালের অগাস্টে আজেরবাইজান তুরস্কের সাথে দশ বছর মেয়াদী ‘স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ এন্ড মিউচুয়াল সাপোর্ট’ নামের এক চুক্তি করে; যার অধীনে এক দেশ বাইরের শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হলে অপর দেশ তাকে সকল ধরনের সহায়তা দেবে। ২০২০ সালের অগাস্টে এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হবার কথা রয়েছে।
২০১৬ সালের এপ্রিলের ‘চার দিনের যুদ্ধ’
২০১৬ সালের এপ্রিলে নাগোর্নো কারাবাখের সীমান্তে আজেরিদের সাথে আর্মেনিয়দের ব্যাপক গোলাগুলি শুরু হয়। মোটামুটি ৪ দিনের জন্যে দুই দেশের মাঝে যুদ্ধাবস্তা বিরাজ করে। উভয় পক্ষেই হতাহতের পরষ্পবিরোধী দাবি তোলা হয়। ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’এর এক বিশ্লেষণে বলা হয় যে, আজেরবাইজান এই যুদ্ধে ক্ষুদ্র, কিন্তু কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু এলাকা দখল করে নেয়। ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘চ্যাটহ্যাম হাউজ’এর ফেলো জাউর শিরিইয়েভ বলেন যে, এই যুদ্ধের মাধ্যমে আজেরবাইজান এতদিনের স্থিতাবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে তা বাকি বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছে। এই যুদ্ধের সময় তুরস্ক আজেরবাইজানের সাথে থাকার ঘোষণা দিলে রাশিয়া তুরস্ককে সতর্ক করে বলে যে, তুরস্কের উচিৎ এই সংঘর্ষে শুধু একপক্ষকে সমর্থন না করা। একইসাথে রুশরা বলে যে, তুরস্কের উচিৎ তার আশেপাশের দেশগুলির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক না গলানো এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলিকে সমর্থন না দেয়া। এখানে উল্লেখ্য যে, রাশিয়া সিরিয়াতে বাশার আল-আসাদের সরকারের বিরোধী গ্রুপগুলিকে সন্ত্রাসী বলে আখ্যা দিয়ে থাকে। ঐতিহ্যগতভাবেই রুশরা ককেশাস অঞ্চলকে তাদের প্রভাবের এলাকা হিসেবেই দেখে থাকে। ২০১৬ সালের এপ্রিলের যুদ্ধ তুরস্ক এবং ইস্রাইলকে ককেশাসে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। আজেরবাইজানের জন্যে এই দুই দেশের সমর্থন অত্র এলাকার সামরিক ব্যালান্সকে যে পরিবর্তন করে দিয়েছে, তা এই যুদ্ধের মাঝেই বোঝা গিয়েছে। ভবিষ্যতের যেকোন সংঘাতেও এই দুই দেশের যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে, তা নিশ্চিত। ‘ফরেন পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউট’এর ক্রিস্টিন ফিলিপ ব্লুমায়ের মতামত দেন যে, ২০১৬ সালের যুদ্ধের সময় রুশ কর্মকর্তাদের কথাবর্তা বলে দিয়েছিল যে, রুশরা আর্মেনিয়ার পক্ষে যুদ্ধে সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে না। তবে ব্লুমায়েরের সেই মন্তব্যের পর আরও চার বছর পেরিয়ে গেছে। আর ভূরাজনৈতিকভাবে রাশিয়া এবং তুরস্কের সম্পর্কেও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আবারও যদি আজেরবাইজানের সাথে আর্মেনিয়ার সংঘাত শুরু হয়, তবে সেখানে রাশিয়া চুপচাপ বসে থাকবে কিনা, তা নিশ্চিত নয়। আর যদি আর্মেনিয়রা যুদ্ধে হেরে যাবার অবস্থায় চলে যায়, তাহলেও কি রুশরা বসে থাকবে কিনা?
রুশ নেতৃত্বে ‘কালেকটিভ সিকিউরিটি ট্রিটি অর্গানাইজেশন’ বা ‘সিএসটিও’এর অধীনে থাকা ৬টা দেশের সাথে রাশিয়ার নিরাপত্তা সম্পর্ক অনেক গভীর। ১৯৯৪ সালে ৯টা দেশ এর মাঝে থাকলেও ১৯৯৯ সালে আজেরবাইজান এবং জর্জিয়া এই সংগঠন থেকে বের হয়ে যায়। ২০০৬ সালে ইউক্রেনও বের হয়ে যায় এখান থেকে। বর্তমানে রাশিয়া ছাড়াও আর্মেনিয়া, বেলারুশ, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান এবং তাজিকিস্তান এর সদস্য। আর্মেনিয়ার মিডিয়া ‘আজাতুতইয়ুন’ বলছে যে, ‘সিএসটিও’এর সদস্য হবার কারণে আর্মেনিয়া নামমাত্র মূল্যে বা বিনা পয়সায় রুশ অস্ত্র পায়।
![]() |
| ২০১৬ সালে আর্মেনিয়ার সামরিক প্যারেডে রুশ নির্মিত ‘ইস্কান্দার’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। এই ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে আর্মেনিয়রা আজেরবাইজানের তেলের স্থাপনাগুলির উপর হামলা করতে সক্ষম হবে। |
আর্মেনিয়ার সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি কি যথেষ্ট?
মাত্র ৩০ লক্ষ জনসংখ্যার আর্মেনিয়ার জিডিপি ১৩ বিলিয়ন ডলার। বাইরের সহায়তা ছাড়া নিজের শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে তোলা আর্মেনিয়ার জন্যে যথেষ্টই কষ্টকর। আর্মেনিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী আজেরবাইজানের জনসংখ্যা ১ কোটি এবং এর জিডিপি প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার; যা আর্মেনিয়ার তিন গুণেরও বেশি। দুই দেশের জনসংখ্যা এবং অর্থনীতির আকারের এই পার্থক্য সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করাকে যথেষ্টই প্রভাবিত করেছে। ‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’এর হিসেবে আর্মেনিয়ার সেনাবাহিনীতে রয়েছে প্রায় ৪৬ হাজার সেনা। ইউনিটগুলি বেশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে; ১৬টা রাইফেল রেজিমেন্ট, ১টা আর্টিলারি ব্রিগেড, ১টা বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্রিগেড, ২টা বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র রেজিমেন্ট, ১টা আর্টিলারি রেজিমেন্ট, ১টা এন্টি ট্যাঙ্ক রেজিমেন্ট, ৩টা ট্যাঙ্ক ব্যাটালিয়ন, ৪টা আর্টিলারি ব্যাটালিয়ন, এবং আরও বেশকিছু ইউনিট। আর্মেনিয়ার সেনাবাহিনীর সাথে একত্রে যুদ্ধ করছে নাগোর্নো কারাবাখে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া ‘আর্তসাখ রিপাবলিক’এর সেনাবাহিনী। এই বাহিনীতে রয়েছে আরও প্রায় ২৫ হাজার সেনা এবং প্রায় ৩০ হাজার রিজার্ভিস্ট। নিশ্চিত করা না গেলেও আর্তসাখের বাহিনীতে প্রায় ৩’শ ট্যাঙ্ক, ২’শ আর্মার্ড ভেহিকল এবং ৩’শ আর্টিলারি রয়েছে বলে দাবি করে আর্মেনিয়রা।
রাশিয়া নাগোর্নো কারাবাখের সংঘাতে উভয় পক্ষকেই অস্ত্র সরবরাহ করে আসছে। ‘স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইন্সটিটিউট’ বা ‘সিপরি’র হিসেবে ১৯৯৯ থেকে ২০১৯ সালের মাঝে আর্মেনিয়া বেশকিছু অস্ত্র কিনেছে; যার মাঝে রাশিয়াই সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। এই অস্ত্রগুলির মাঝে রয়েছে,
১) ২০১৬ সালে রাশিয়ার সরবরাহকৃত ৪টা ‘ইস্কান্দার’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের লঞ্চার এবং ২৫টা ক্ষেপণাস্ত্র। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলির পাল্লা প্রায় ৪’শ থেকে ৫’শ কিঃমিঃ পর্যন্ত। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, ‘ইস্কান্দার’ ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে আর্মেনিয়রা আজেরবাইজানের তেলের স্থাপনাগুলির উপর হামলা করতে সক্ষম হবে।
২) ২০১৭ সালের মাঝে রাশিয়ার সরবরাহকৃত ৬টা ‘বিএম-৯ এ৫২ স্মার্চ’ ৩০০মিঃমিঃ রকেট লঞ্চার। এগুলির পাল্লা প্রায় ৯০ কিঃমিঃ পর্যন্ত। ২০০৭ সালে বেলারুশ সরবরাহ করে ১০টা ১২২ মিঃমিঃএর ‘ডি-৩০’ কামান। ২০১০ সালে মন্টিনেগ্রো থেকেও একই মডেলের ১৬টা কামান আসে। ১৯৯৯ সালে চীন থেকে আসে ৪টা ‘ডব্লিউএম-৮০’ ২৭৩ মিঃমিঃ সেলফ প্রপেল্ড রকেট লঞ্চার।
৩) ২০১০ সালের মাঝে সরবরাহকৃত ২টা ‘এস ৩০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ‘সিপরি’ বলছে যে, আর্মেনিয়ার কাছে সরবরাহকৃত ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ‘৫ভি৫৫ইউ’ ভার্সনের, যেগুলির পাল্লা দেড়’শ কিঃমিঃ। এর সাথে কমপক্ষে ১’শ ৪৪টা ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করে রাশিয়া। ২০১৭ সালের মাঝে রাশিয়ার সরবরাহকৃত ‘৯কে৩৩৩ ভার্বা’ বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। কাঁধ থেকে ছোঁড়া স্বল্পপাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা সাড়ে ৬ কিঃমিঃ। ২’শটা ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করা হয়। ২০১৩ সালের মাঝে রাশিয়া সরবরাহ করে ৫ কিঃমিঃ পাল্লার ২’শ ‘ইগলা এস’ বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। ২০১৬ সালে আরও ২’শ ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করা হয়। ২০১৯ সালে রুশরা সরবরাহ করে কমপক্ষে ২টা ‘টর এম১’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যাবস্থা এবং এর সাথে ৫০টা ‘৯এম৩৩৮’ ক্ষেপণাস্ত্র। ১২ কিঃমিঃ পাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ট্যাঙ্ক চ্যাসিসের উপর বসানো। তবে আর্মেনিয়ার মিডিয়া ‘আজাতুতইয়ুন’ বলছে যে, প্রধানমন্ত্রী নিকল পাশিনিয়ান তার ফেইসবুক পেইজে ২০১৭ সালের মে মাসেই এই ক্ষেপণাস্ত্র কেনার ঘোষণা দেন।
৪) ২০১৭ সালে রাশিয়া সরবরাহ করে সাড়ে ৫ কিঃমিঃ পাল্লার ১’শটা ‘৯এম১৩৩ করনেট-ই’ ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। ‘করনেট’ রুশদের ডেভেলপ করা ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রগুলির মাঝে সবচাইতে সক্ষমগুলির একটা।
৫) ২০১৯ সালে রুশরা সরবরাহ করা শুরু করে ‘সুখোই এসইউ-৩০এসএম’ ফাইটার বিমান। এই বিমানগুলি আর্মেনিয়ার বিমান বাহিনীকে আজেরবাইজানের বিমান বাহিনী থেকে অনেক এগিয়ে নিয়ে গেল।
৬) ২০০৪ সালে স্লোভাকিয়ার কাছ থেকে আর্মেনিয়া ১০টা রুশ নির্মিত ‘সুখোই এসইউ-২৫’ গ্রাউন্ড এটাক বিমান কেনে।
৭) ইউক্রেনের কাছ থেকে ২০০৪ সালে ২টা ‘এল-৩৯সি আলবাট্রস’ ট্রেনিং জেট বিমান কেনে। ২০১১ সালের মাঝে আরও ৪টা বিমান পায় আর্মেনিয়া।
৮) ২০১৯ সালে আর্মেনিয়া ১৫ কিঃমিঃ পাল্লার ৪টা ‘অসা’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনে। এর সাথে ছিল ১’শ ২০টা ‘৯এম৩৩’ ক্ষেপণাস্ত্র। এগুলির উৎস নিশ্চিত হওয়া না গেলেও রাশিয়া থেকেই এগুলি এসেছে বলে বলছে ‘সিপরি’।
খেয়াল করলে বোঝা যাবে যে, আর্মেনিয়া তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাঝে বিমান প্রতিরক্ষাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। ‘সুখোই-৩০’ বিমান এবং দূরপাল্লার ‘এস-৩০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে আর্মেনিয়া আকাশকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। একইসাথে ২০১৬ সাল থেকে বিপুল সংখ্যক স্বল্প পাল্লার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয় করে তারা। এছাড়াও দূরপাল্লার আর্টিলারি এবং এন্টি ট্যাঙ্ক ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে ক্রয়কৃত আস্ত্রের মাঝে। এগুলি ছাড়াও আর্মেনিয়া রাশিয়া থেকে ‘ইনফাউনা’ ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার যন্ত্র কিনেছে, যা কিনা তারা ২০১৬ সালের জাতীয় দিবস প্যারেডে দেখায়। এই যন্ত্রের মাধ্যমে শত্রুপক্ষের রেডিও যোগাযোগ জ্যামিং করা সম্ভব। এর বাইরেও আর্মেনিয়রা নিজেরাই ‘থান্ডার’ নামে একটা রেডিও জ্যামার তৈরি করে ২০১৮ সালে ইয়েরেভানে একটা প্রতিরক্ষা মেলায় ডিসপ্লে করে। আর্মেনিয়ার সামরিক কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ‘আরমেন প্রেস’ বলছে যে, এই জ্যামার ২০ কিঃমিঃ দূরত্বে শত্রুর রেডিও জ্যামিং করতে পারবে। সিনিয়র লেফটেন্যান্ট হোভানেস খেলাঘাতিয়ান বলেন যে, ২০১৬ সালে আজেরবাইজানের সাথে সীমান্ত যুদ্ধে এই জ্যামার নাগোর্নো কারাবাখে মোতায়েন করা হয় এবং তা ব্যাপক সফলতাও পায়। ২০১১ সালে আর্মেনিয়া সামরিক প্যারেডে নিজস্ব ডিজাইনের ‘ক্রুংক’ সার্ভেইল্যান্স ড্রোন ডিসপ্লে করে। প্রায় ৫ ঘন্টা আকাশে ওড়ার সক্ষমতা রয়েছে এটির। আর্তসাখ সেনাবাহিনীকেও এই ড্রোন সরবরাহ করা হয়েছে।
আজেরবাইজানে অস্ত্র কেনার হিড়িক
অন্যদিকে ‘সিপরি’র হিসেবে ১৯৯৯ থেকে ২০১৯ সালের মাঝে আজেরবাইজান বিপুল পরিমাণ অস্ত্র কিনেছে। সরবরাহকারীদের মাঝে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাশিয়া, ইস্রাইল, দক্ষিণ আফ্রিকা, তুরস্ক, বেলারুশ এবং ইউক্রেন।
আজেরবাইজান যা কিনেছে, তার মাঝে রয়েছে -
১) ট্যাঙ্ক কেনা হয় ৩’শ ৬০টা...
রাশিয়া - ২০০৭ সালে কেনা ৬২টা ‘টি-৭২এম১’ ট্যাঙ্ক; ২০১৫ সালের মাঝে কেনা ১’শটা ‘টি-৯০এস’ ট্যাঙ্ক;
ইউক্রেন - ২০০৬ সালে কেনা ৪৫টা ‘টি-৭২এম১’ ট্যাঙ্ক;
বেলারুশ - ২০০৬ সালে কেনা ৬০টা ‘টি-৭২এম১’ ট্যাঙ্ক; ২০১৩ সালের মাঝে কেনা হয় আরও ৯৩টা;
২) আর্টিলারি কেনা হয় ৬’শ ৯২টা...
বেলারুশ থেকে ২০০৮ এবং ২০০৯ সালে ১২টা ‘২এস৭ পিয়ন’ ২০৩ মিঃমিঃ সেলফ প্রপেল্ড কামান কেনা হয়; ২০১৯ সালের মাঝে ১০টা ‘বি২০০বিএম পলোনেজ’ ৩০০ মিঃমিঃ সেলফ প্রপেল্ড রকেট; ২০১৭ সালে ২৬টা ‘২এ৩৬’ ১৫২ মিঃমিঃ কামান; ২০১০ সালে ৩০টা ‘ডি-৩০’ ১২২ মিঃমিঃ কামান কেনা হয়।
বুলগেরিয়া থেকে ২০০২ সালে ৩৬টা ১৩০ মিঃমিঃ ‘এম-৪৬’ কামান কেনা হয়।
চেক রিপাবলিক থেকে ২০১৮ সালের মাঝে ৩০টা ১২২ মিঃমিঃ ‘আরএম-৭০’ সেলফ প্রপেল্ড রকেট কেনা হয়।
স্লোভাকিয়া থেকে ২০১৮ সালের মাঝে কেনা হয় ৩৬টা ১৫২ মিঃমিঃ ‘ডানা’ সেলফ প্রপেল্ড কামান।
ইস্রাইল থেকে ২০০৬ সালে ৬টা ‘লিংক্স’ সেলফ প্রপেল্ড আর্টিলারি রকেট লঞ্চার কেনা হয়। এরপর ক্রমান্বয়ে ৫০টা ‘এক্সট্রা’ গাইডেড রকেটও কেনা হয়। ২০১০ সালে কেনা হয় ৫টা ১৫৫ মিঃমিঃ সেলফ প্রপেল্ড আর্টিলারি কামান ‘এটমোস ২০০০’। ২০১১ সালের মাঝে কেনা হয় ১০টা ১২০ মিঃমিঃ ‘কারডম’ সেলফ প্রপেল্ড মর্টার। ২০১৮ সালের মাঝে কেনা হয় ৪টা ‘লোরা’ সেলফ প্রপেল্ড রকেট লঞ্চার; সাথে কেনা হয় ৫০টা রকেট। একই বছর কেনা হয় ১০টা ‘স্যান্ডক্যাট স্পিয়ার’ ১২০ মিঃমিঃ সেলফ প্রপেল্ড মর্টার।
রাশিয়া থেকে ২০১৪ সালের মাঝে কেনা হয় ১৮টা ‘২এস১৯ এমএসটিএ-এস’ ১৫২ মিঃমিঃ সেলফ প্রপেল্ড কামান; ১৮টা ‘২এস৩১ ভেনা’ ১২০ মিঃমিঃ সেলফ প্রপেল্ড কামান; ১৮টা বিএম৯ এ৫২ স্মার্চ’ ৩০০ মিঃমিঃ সেলফ প্রপেল্ড রকেট লঞ্চার। ২০১৭এর মাঝে কেনা হয় ৩৬টা ‘টিওএস-১’ ২২০ মিঃমিঃ সেলফ প্রপেল্ড রকেট লঞ্চার।
তুরস্ক থেকে ২০১৩ সালের মাঝে কেনা হয় ৩০টা ১০৭ মিঃমিঃ রকেট লঞ্চার ‘টি-১০৭’; ২০১৪ সালের মাঝে কেনা হয় ৪০টা ‘টি-১২২’ রকেট লঞ্চার; ২০১৬ সালের মাঝে কেনা হয় ৩০০ মিঃমিঃএর ২০টা ‘টি-৩০০’ রকেট লঞ্চার; এর সাথে সরবরাহ করা ১’শ ৮টা ৩০০ মিঃমিঃ ‘টিআরজি-৩০০’ গাইডেড রকেট। এগুলির পিছনে খরচ হয় প্রায় ২’শ ৪৪ মিলিয়ন ডলার।
ইউক্রেন থেকে ২০০২ সালের মাঝে কেনা হয় ৭২টা ‘টি-১২ ২এ১৯’ ১০০ মিঃমিঃ কামান। ২০০৫ সালে কেনা হয় ১২টা ‘বিএম৯ এ৫২ স্মার্চ’ সেলফ প্রপেল্ড রকেট; ২০০৬ সালে কেনা হয় ৮৫টা ‘এম-৪৩’ ১২০ মিঃমিঃ মর্টার; ২০০৭ সালে কেনা হয় ৫৫টা ‘ডি-৩০’ ১২২ মিঃমিঃ কামান; ২০০৮ সালের মাঝে কেনা হয় ৩টা ‘২এস৭ পিওন’ ২০৩ মিঃমিঃ কামান; ২০১০ সালের মাঝে কেনা হয় ৫৪টা ‘২এস১’ ১২২ মিঃমিঃ সেলফ প্রপেল্ড কামান; একই বছরে কেনা হয় ১৬টা ‘২এস৩’ ১৫২ মিঃমিঃ সেলফ প্রপেল্ড কামান।
৩) আর্মার্ড ভেহিকল কেনা হয় ৬’শ ৪৯টা...
২০১০ সালের মাঝে রাশিয়া থেকে কেনা হয় ৭০টা ‘বিটিআর-৮০এ’ এপিসি; ২০১৫ সালের মাঝে কেনা হয় ১’শ ১৮টা ‘বিএমপি-৩’ ইনফ্যান্ট্রি ফাইটিং ভেহিকল; ২০১৮ সালের মাঝে কেনা হয় ৭৬টা ‘বিটিআর-৮২এ’ ইনফ্যান্ট্রি ফাইটিং ভেহিকল।
২০১১ থেকে ২০১৫এর মাঝে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে কেনা হয় ৮৫টা ‘ম্যারডার’ এবং ৬০টা ‘ম্যাটাডোর’ এপিসি।
২০১১ সালে তুরস্ক থেকে কেনা হয় ৩৫টা ‘কোবরা’ এবং ৩৭টা ‘শোরল্যান্ড’ এপিসি।
ইউক্রেন থেকে ২০০৭ সালে কেনা হয় ১৮টা ‘বিটিআর-৮০’ এপিসি; ২০১০ সালের মাঝে কেনা হয় ১শ ৫০টা ‘বিটিআর-৭০’ এপিসি।
৪) বিমান প্রতিরক্ষা
ইস্রাইলের কাছ থেকে ২০১৬ সালে একটা ‘বারাক এলআর’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনা হয়। এর সাথে ছিল ১’শ কিঃমিঃ পাল্লার ৪০টা ‘বারাক-৮’ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১৫০ কিঃমিঃ পাল্লার ৪০টা ‘বারাক-৮ ইআর’ ক্ষেপণাস্ত্র; ২টা ‘ইএলএম ২২৮৮’ এয়ার সার্চ রাডার। স্পেন থেকেও কেনা হয় ‘লানজা এলটিআর-২৫’ এয়ার সার্চ রাডার। ইউক্রেন থেকে ২০০৮ সালে কেনা হয় ১৮টা ‘স্ট্রেলা-৩’ বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। ২০১৩ সালে কেনা হয় ’৮০কে৬এম’ এয়ার সার্চ রাডার।
রাশিয়া থেকে ২০১১ সালে ৩’শ মিলিয়ন ডলার খরচে কেনা হয় ২টা ‘এস-৩০০পিএমইউ-২’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং তাতে ব্যবহারের জন্যে কেনা হয় ২’শ ‘৪৮এন৬’ ক্ষেপণাস্ত্র। এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা দেড়’শ কিঃমিঃএর বেশি। ২০১৩ সালের মাঝে কেনা হয় স্বল্প পাল্লার ২’শ ‘ইগলা-এস’ বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের লঞ্চার এবং ১ হাজার ক্ষেপণাস্ত্র। ২০১৪ সালের মাঝে কেনা হয় ২টা ‘৯কে৩৭ বুক-১এম’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এর সাথে কেনা হয় ৪৫ কিঃমিঃ পাল্লার ১’শটা ‘৯এম৩১৭’ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৪২ কিঃমিঃ পাল্লার ১’শটা ‘৯এম৩৮’ ক্ষেপণাস্ত্র।
৫) আকাশ সক্ষমতা
২০০৬ সালে ইউক্রেন থেকে ১২টা ‘এল-৩৯সি’ প্রশিক্ষণ বিমান কেনা হয়। ২০০৬ থেকে ২০১১ সালের মাঝে ইউক্রেন থেকে কেনা হয় ১৬টা ‘মিগ-২৯’ ফাইটার বিমান। ২০০৭ সালে মিগগুলিতে ব্যবহারের জন্যে কেনা হয় ৪৩টা ‘আর-২৭’ আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র। ২০১০ সালের মাঝে ইউক্রেন থেকে ১২টা ‘এমআই-৩৫পি’ এটাক হেলিকপ্টার কেনা হয়। এই হেলিকপ্টার থেকে ছোঁড়ার জন্যে ৪’শ ‘স্কিফ’ এবং ‘ব্যারিয়ার’ এন্টি ট্যাঙ্ক ক্ষেপণাস্ত্রও কেনা হয়। বেলারুশ থেকে ২০১২ সালের মাঝে কেনা হয় ১১টা ‘সুখোই এসইউ-২৫’ গ্রাউন্ড এটাক বিমান।
২০১৮ সালে সামরিক প্যারেডে আজেরিরা তুরস্কের তৈরি ‘এসওএম বি-১’ আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপণযোগ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ডিসপ্লে করে। ২’শ ৩০ কেজি ওয়ারহেডের এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলিকে খুব সম্ভবতঃ আজেরবাইজানি ‘মিগ-২৯’ এবং ‘সুখোই-২৫’ যুদ্ধবিমান থেকে ছোঁড়ার জন্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। ২০১৯ সালের মাঝে ১০টা ক্ষেপণাস্ত্র ডেলিভারি করা হয়। এই ক্ষেপণাস্ত্রকে ব্যবহার করে আজেরবাইজানের বিমানগুলি শত্রুর বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে দূরত্ব রেখেই আড়াই’শ কিঃমিঃ দূরের অতি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা অর্জন করলো।
রাশিয়া থেকে ২০১৪ সালের মাঝে ৩’শ ৬০ মিলিয়ন ডলারে কেনা হয় ২৪টা ‘এমআই-২৪/৩৫এম’ এটাক হেলিকপ্টার। ২০১৫ সালের মাঝে কেনা হয় ৬৬টা ‘এমআই-১৭’ এসল্ট হেলিকপ্টার। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ‘ভেক্টর’ টারেট ক্রয় করে সেগুলিকে ইউক্রেনের সহায়তায় ‘এমআই-২৪’ এটাক হেলিকপ্টারগুলিকে আপগ্রেড করা হয়।
ইস্রাইলের কাছ থেকে ২০০৮ সালে ৩০ মিলিয়ন ডলারে কেনা হয় ১২ ঘন্টা ওড়ার সক্ষমতার ৪টা ‘এরোস্টার’ সার্ভেইল্যান্স ড্রোন; ২০১৩ সালের মাঝে কেনা হয় ৫২ ঘন্টা ওড়ার সক্ষমতার ৫টা হেরন সার্ভেইল্যান্স ড্রোন; ২০ ঘন্টা ওড়ার সক্ষমতার ১০টা ‘হার্মিস-৪৫০’ ছোট সার্ভেইল্যান্স ড্রোন; এবং ১৮ ঘন্টা ওড়ার সক্ষমতার ৫টা ‘সার্চার’ ছোট সার্ভেইল্যান্স ড্রোন। ২০১৬ সালের মাঝে ডেলিভারি দেয়া হয় ৫০টা ‘হারপ’ লোইটারিং সুইসাইড ড্রোন। ২০১৭ সালের মাঝে কেনা হয় ৭ ঘন্টা ওড়ার সক্ষমতার ১০টা ছোট ‘অরবিটার-৩’ সার্ভেইল্যান্স ড্রোন। ২০১৮ সালের মাঝে কেনা হয় ১’শটা ‘স্কাই স্ট্রাইকার’ লোইটারিং সুইসাইড ড্রোন। ৩৬ ঘন্টা ওড়ার সক্ষমতার ২টা ‘হার্মিস-৯০০’ সার্ভেইল্যান্স ড্রোনও কেনা হয়। ২০১৯ সালের মাঝে কেনা হয় ১’শ ‘অরবিটার-১কে’ লোইটারিং সুইসাইড ড্রোন। ‘জেরবা’ নামে এই সুইসাইড ড্রোনগুলি ২০১৯ সাল থেকে আজেরবাইজানের ‘আজাদ সিস্টেমস কোম্পানি’র ফ্যাক্টরিতে তৈরি হচ্ছে।
আজেরবাইজানের সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি
প্রায় সাড়ে ৩’শ ট্যাঙ্ক, প্রায় ৭’শ আর্টিলারি এবং প্রায় সাড়ে ৬’শ আর্মার্ড ভেহিকল কেনার মাধ্যমে আজেরবাইজান তার সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি করে। ‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’এর প্রকাশ করা ‘দ্যা মিলিটারি ব্যালান্স ২০০৩-২০০৪’এর হিসেব অনুযায়ী আজেরবাইজানের সেনাবাহিনীতে সদস্যসংখ্যা ছিল ৫৬ হাজার। মোট ২৩টা মোটর রাইফেল ব্রিগেডের মাঝে এই সেনাদেরকে অর্গানাইজ করা হয়েছিল। ২০০৭ সালের হিসেবে সেনাবাহিনীর সদস্যসংখ্যা ছিল প্রায় ৫৭ হাজার। ২০১৭ সালের মিলিটারি ব্যালান্সেও সদস্যসংখ্যা প্রায় একইরকম ছিল। কিন্তু ইউনিটগুলিতে বেশকিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। ৪টা ব্রিগেডকে মেকানাইজড ব্রিগেডে পরিবর্তন করা হয়েছে; আর্টিলারি ব্রিগেডের সংখ্যা ১টা থেকে ২টাতে উন্নীত করা হয়েছে। সাড়ে ৬’শ ট্যাঙ্কের সাথে প্রায় ৪’শ সেলফ প্রপেল্ড কামান কেনা হয়। বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিটগুলির মাঝেও অনেকগুলিই ছিল মেকানাইজড ইউনিটের সাথে ব্যবহারের জন্যে মোবাইল ইউনিট। এই মেকানাইজড ব্রিগেডগুলি আজেরবাইজানের সেনাবাহিনীর আক্রমণে যাবার সক্ষমতাকে অনেকগুণে বাড়িয়েছে।
ইস্রাইলের ‘বারাক-৮’ এবং রাশিয়ার ‘এস-৩০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলি আজেরবাইজানের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলিকে রক্ষার জন্যে মোতায়েন করা হতে পারে। অপরদিকে মধ্যম ও স্বল্প পাল্লার ‘বুক’ ও ‘ইগলা এস’ ক্ষেপণাস্ত্রগুলি শত্রুপক্ষের ড্রোনগুলির বিরুদ্ধে মোতায়েন করা হতে পারে।
বিরাট পরিবর্তন এসেছে আজেরবাইজানের আকাশ সক্ষমতায়। ইস্রাইলের তৈরি সার্ভেইল্যান্স ড্রোনগুলির সাথে সুইসাইড ড্রোনগুলি যুক্ত হওয়ায় তা আজেরবাইজানকে আকাশ নিয়ন্ত্রণের এক ধরণের সক্ষমতা দিয়েছে। ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ২০১৬ সালের এপ্রিলের যুদ্ধে ইস্রাইলের তৈরি ‘হারোপ’ সুইসাইড ড্রোন ব্যবহার করে একটা আর্মেনিয় বাস ধ্বংস করা হয়, যেখানে ৭ জন নিহতের মাঝে ছিল কয়েকজন মধ্যম সাড়ির অফিসার। টার্গেট করে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে হত্যা করার জন্যে ড্রোন ব্যবহৃত হওয়ায় ড্রোন ঠেকাবার জন্যে আজেরবাইজান এবং আর্মেনিয়া উভয়েই উঠেপড়ে লেগেছে। ‘ফ্লাইট গ্লোবাল’ বলছে যে, ২০১৬ সালের যুদ্ধে উভয় পক্ষই খুব সম্ভবতঃ এন্টি ড্রোন ইলেকট্রনিক জ্যামিং সিস্টেম ব্যবহার করেছে। আজেরবাইজান তুরস্ক থেকে ‘এসওএম বি-১’ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার ফলে দেশটার পুরোনো মিগ এবং সুখোই বিমানগুলি নতুন ভূমিকা পেয়েছে। আর্মেনিয়ার কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলি এখন এই ক্ষেপণাস্ত্রের নাগালের মাঝে।
আজেরবাইজানের সাম্প্রতিক সামরিক কর্মকান্ড দেশটার নেতৃত্বকে আর্মেনিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী করে তুলছে। আজেরবাইজানের ‘রিপোর্ট নিউজ এজেন্সি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সক্ষমতার দিক থেকে আজেরবাইজানের সামরিক বাহিনী বর্তমানে বিশ্বের সেরা সামরিক বাহিনীগুলির একটা। রুশ সমর বিশ্লেষক আন্দ্রেই ফ্রোলভের কথায়, ১৫ বছরের আগের আজেরি সেনাবাহিনীর তুলনায় বর্তমানের সেনাবাহিনী বলতে গেলে আলাদা একটা বাহিনী।
আর্মেনিয় ইস্টার্ন অর্থোডক্স খ্রিষ্টানদের সাথে আজেরি মুসলিমদের দ্বন্দ্ব বহু পুরোনো। তবে সোভিয়েতদের রেখে যাওয়া উদ্ভট বাউন্ডারিগুলিই নাগোর্নো কারাবাখ নিয়ে আর্মেনিয়া এবং আজেরবাইজানের বর্তমান দ্বন্দ্বের সূচনা করেছে। আর্মেনিয়ার নেতৃত্বের মাঝে ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চের প্রভাব যথেষ্ট থাকায় এই দ্বন্দ্বকে ধর্মীয় রঙে দেখেছে অনেকেই। সোভিয়েত সামরিক বাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার কারণেই ১৯৯০এর দশকে আর্মেনিয়া সামরিক দিক থেকে আজেরিদের থেকে অনেক এগিয়ে ছিল। কিন্তু ২০০৬ সাল থেকে তুরস্কের মাঝ দিয়ে তেলের পাইপলাইন চালু হবার পর তেল বিক্রির অর্থের উপর নির্ভর করে আজেরবাইজান তার সামরিক শক্তি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করতে থাকে। আজেরবাইজানের এই তেল মূলতঃ যায় ইউরোপে। মার্কিন ‘এনার্জি ইনফরমেশন এডমিনিস্ট্রেশন’এর হিসেবে ২০১৭ সালে আজেরবাইজানের রপ্তানি করা ৭৩ শতাংশ তেলই যায় ইউরোপে। অন্যদিকে ২০০৮ সালে জর্জিয়াতে রুশ হামলার পর আজেরিরা তুরস্ককে কৌশলগত বন্ধুর হিসেবে দেখতে থাকে। আজেরিরা তাদের নতুন কেনা অত্যাধুনিক অস্ত্রগুলিকে তুর্কিদের সাথে মহড়া দিয়ে কার্যক্ষম একটা সামরিক বাহিনী তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। ২০১৬ সালের চার দিনের যুদ্ধে আজেরিরা তাদের নতুন প্রযুক্তি, বিশেষ করে ড্রোন ব্যবহারে বেশ দক্ষতা দেখায়। এখন তুরস্কও সিরিয়ার ইদলিবের অভিজ্ঞতা এবং সেখানে সফলতা পাওয়া প্রযুক্তিগুলি আজেরবাইজানকে সরবরাহ করছে। এতে ককেশাসে সামরিক ব্যালান্সে যথেষ্ট পরিবর্তন এসেছে। আজেরবাইজান যদি সম্ভাব্য যুদ্ধে জয় পাবার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে যায়, তাহলে নাগোর্নো কারাবাখের যুদ্ধক্ষেত্র আবারও ফুঁসে উঠতে পারে। তবে এই যুদ্ধের সম্ভাবনা ওঠানামা করবে তুরস্ক এবং রাশিয়ার ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার উপর।
Labels:
Armenia,
Azerbaijan,
Baku,
Geopolitics,
Georgia,
Nagorno-Karabakh,
Nakhchivan,
Oil,
Russia,
Turkey
Subscribe to:
Posts (Atom)















