Saturday, 9 May 2020

করোনাভাইরাস চীন-মার্কিন দ্বন্দ্বকে আরও উস্কে দিয়েছে

১০ই মে ২০২০
চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমার সাথেসাথে চীনা সরকার অভ্যন্তরীন ভোগ বাড়াবার তাগিদ দিয়েছিল। করোনার প্রভাবে সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দার কারণে চীনাদের এই প্রচেষ্টা আরও বৃদ্ধি পাবে। অর্থাৎ চীন ক্রমেই নিজের অর্থনীতিকে পশ্চিমা দেশগুলিতে রপ্তানির নির্ভরশীলতা থেকে সরিয়ে আনতে চেষ্টা করবে। পশ্চিমাদের সাথে চীনের এই পারস্পরিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নির্ভরশীলতা এতদিন সরাসরি কোন সংঘাতকে দূরে রেখেছিল। কিন্তু করোনা দুর্যোগের পটভূমিতে পারস্পরিক নির্ভরশীলতার বাধ্যবাধকতা কমে আসায় তার স্থলাভিষিক্ত হতে যাচ্ছে অনিশ্চয়তা এবং সংঘাতের অধিকতর সম্ভাবনা। 


৮ই মে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন যে, তিনি চীনের সাথে স্বাক্ষরিত প্রথম দফা বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করে দেবেন কিনা, সেব্যাপারে দোটানায় রয়েছেন। তিনি বলছেন যে, চীন যদি চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানির টার্গেট মেটাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তিনি চুক্তি বাতিল করে দিতে পারেন। উভয় দেশের বাণিজ্য প্রতিনিধিরা কথা বলে ঠিক করেছেন যে, দু’দেশই চুক্তি অনুযায়ী তাদের বাধ্যবাধকতাগুলি সময়মতো পূরণ করবে। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে যে, দুই দেশ চুক্তি বাস্তবায়নের পরিবেশ উন্নয়নের ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। ‘রয়টার্স’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, চুক্তি অনুযায়ী চীনের ধাধ্যবাধকতা রয়েছে দুই বছরের মাঝে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি ২’শ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি করার। এর মাঝে কৃষিজ দ্রব্য, তৈরি পণ্য, জ্বালানি এবং সার্ভিস রয়েছে। এই চুক্তির ফলে দুই দেশের মাঝে বাণিজ্য যুদ্ধে কিছুটা হলেও বিরতি আসে।

বাণিজ্য যুদ্ধ থেকে করোনা যুদ্ধ

মার্কিন মিডিয়া ‘সিএনএন’এর প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের মহামারির মাঝে চীন-মার্কিন দ্বন্দ্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। উভয় দেশ এই সংকট মোকাবিলায় কাছাকাছি না এসে বরং উগ্র জাতীয়বাদের আগুন জ্বালিয়েছে। ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে চীনের চেষ্টাকে বিশ্বব্যাপী সমালোচনা করা হলেও চীন জোর গলায় এই সমালোচনার জবাব দিয়েছে। তারা বলছে তারা মার্কিনীদের মিথ্যা অপবাদের জবাব দিচ্ছে মাত্র। মার্চ মাসে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ঝাও লিজিয়ান সংবাদ সন্মেলনে বলেন যে, মার্কিন সেনাবাহিনীর হাত হয়েই চীনে ভাইরাসের সংক্রমণ হয়ে থাকতে পারে। এর কিছুদিন পরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ভাইরাসকে ‘চীনা ভাইরাস’ বলে ডাকতে থাকেন, যাতে ভাইরাসের উতপত্তিস্থলের জন্যে দায় চীনের উপর বর্তায়। এরপর ট্রাম্প চীনে মৃতের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং সংক্রমণের শুরুর দিকে চীনের ভূমিকার সমালোচনা করেন। সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প এবং পররাষ্ট্র সচিব মাইক পম্পেও কোন প্রমাণ দেখানো ছাড়াই দাবি করতে থাকেন যে, ভাইরাসের উতপত্তিস্থল ছিল উহানের গবেষণাগার। এর জবাবে চীনারা বলে যে, এই কথাগুলি ট্রাম্পের নির্বাচনী কৌশলের অংশ। অপরিকে চীনা সরকারি মিডিয়াতে মাইক পম্পেওকে ‘শয়তান’, ‘উন্মাদ’ এবং ‘মানবজাতির শত্রু’ বলে আখ্যা দেয়া হয়। তবে ‘সিএনএন’ বলছে যে, ট্রাম্প প্রশাসন সম্ভবতঃ করোনা ইস্যুতে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চলেছেন। এই ব্যবস্থার মাঝে অবরোধ, ঋণ ফেরত না দেয়া এবং বাণিজ্য নীতিতে পরিবর্তন আনার কথা থাকতে পারে। চীনের উপর চাপ সৃষ্টি করার কাজে সমর্থন আদায়ে ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু দেশগুলির সাথে কথা বলছে।

তবে চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের এই দ্বন্দ্ব করোনাভাইরাসের কারণে শুরু হয়নি। গত দুই বছর ধরেই দুই দেশের মাঝে চলছে তুমুল বাণিজ্য যুদ্ধ। তবে এবারের এই দ্বন্দ্ব আগের চাইতে আলাদা বলে মনে করছেন ‘হংকং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স এন্ড টেকনলজি’র প্রফেসর ডেভিড জোয়াইগ। তিনি বলছেন যে, ২০১৬ সালে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরুর আগে মূল ইস্যু ছিল মানুষের কর্মসংস্থান; ২০২০ সালে আলোচ্য বিষয়বস্তু হলো মানুষের জীবন। এ পর্যন্ত প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষের মাঝে এই রোগের সংক্রমণ পাওয়া গিয়েছে এবং এত ফলে মৃত্যুবরণ করেছেন কমপক্ষে ২ লক্ষ ৭৬ হাজার মানুষ। মার্কিন লেবার ডিপার্টমেন্ট বলছে যে, এপ্রিল মাসে ২ কোটির বেশি মার্কিন নাগরিক বেকারত্বের মাঝে পতিত হয়েছে। চীনের ‘রেনমিন ইউনিভার্সিটি’র আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রফেসর শি ইয়িনহংএর মতে চীন-মার্কিন সম্পর্ক ১৯৭২ সালের পর থেকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। দুই দেশের মাঝে প্রতিযোগিতা এখন বাণিজ্য, প্রযুক্তি এবং রাজনীতির মাঝে ছড়িয়েছে। আর লকডাউনের কারণে ফ্লাইট বন্ধ হওয়া এবং চীনের কারখানাগুলির উপর নির্ভরশীলতা কমে যাওয়ার কারণে দুই দেশের মাঝে দূরত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন ‘ফক্স নিউজ চ্যানেল’এর সাথে এক সাক্ষাতে বলেন যে, জানুয়ারি মাসে চীনের সাথে বাণিজ্যচুক্তির ব্যাপারে তিনি খুবই আশাবাদী থাকলেও এখন অতটা আশাবাদী নন তিনি। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, চুক্তি অনুযায়ী প্রথম বছরে চীনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে ৭৭ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্য আমদানি করার। কিন্তু করোনাভাইরাসের মহামারি থেকে মাত্র উঠে এসেই চীন এই টার্গেট বাস্তবায়ন করতে পারবে কিনা, তা নিশ্চিত নয়।

অপরদিকে দুই দেশের দ্বন্দ্বের নতুন সেক্টর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে মিডিয়া। ৮ই মে মার্কিন ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি জানায় যে, যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত চীনা সাংবাদিকরা যারা কোন মার্কিন মিডিয়ার জন্যের কাজ করে না, তাদের ভিসার সর্বোচ্চ মেয়াদ ৯০ দিন পর্যন্ত করে দেয়া হয়েছে। এর আগে মেয়াদ নির্দিষ্ট থাকতো না। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ বলছে যে, মার্কিন সরকারের এই সিদ্ধান্ত প্রায় মাসখানেক ধরে দুই দেশের মাঝে মিডিয়া নিয়ে চলা দ্বন্দ্বের ফলাফল। চীনা এবং মার্কিন সাংবাদিকদের একে অপরের দেশে চালানো কর্মকান্ডকে টার্গেট করেই এই দ্বন্দ্ব চলছিল। মার্কিন সরকারের কর্মকর্তারা বলছেন যে, চীনে মিডিয়ার যে স্বাধীনতা নেই, সেটাকে ব্যালান্স করতেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। গত মার্চে মার্কিন সরকার ঘোষণা দেয় যে, যুক্তরাষ্ট্রে চীনা সরকারি পাঁচটা সংবাদ মিডিয়ার জন্যে কাজ করা চীনা সাংবাদিকদের সংখ্যা ১’শর বেশি হতে পারবে না; যা ঐ সময় ছিল ১’শ ৬০। এর জবাবে চীনা সরকার ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’, ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ এবং ‘ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল’এর জন্যে কাজ করা সকল মার্কিন সাংবাদিককে দেশ থেকে বের করে দেয়। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, সংবাদ মাধ্যম নিয়ে দুই দেশের এই দ্বন্দ্ব তাদের মাঝে অর্থনৈতিক, সামরিক, প্রযুক্তিগত এবং সর্বোপরি ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ বই অন্য কিছু নয়।

মার্কিন জনমতে পরিবর্তন

৬ই মে হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন যে, করোনাভাইরাস যুক্তরাষ্ট্রের উপর ‘ইতিহাসের সবচাইতে বড় হামলা’, যার ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পার্ল হারবারে জাপানিদের হামলা বা ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলার চাইতেও বেশি ক্ষতি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। তিনি বলেন যে, এই মহামারি হবারই কথা ছিল না। যেখানে এর সূত্রপাত হয়েছিল, সেখানেই সেটা থামিয়ে দেয়া উচিৎ ছিল; কিন্তু সেটা করা হয়নি। তবে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ এখন মহামারির সাথে; চীনের সাথে নয়।

শুধু প্রেসিডেন্টই নয়; মার্কিন জনমতও সাম্প্রতিক সময়ে চীনের বিপক্ষে চলে যাচ্ছে। ‘পিউ রিসার্চ’এর এপ্রিল মাসের এক জরিপ বলছে যে, ৬৬ শতাংশ মার্কিন জনগণ চীনের ব্যাপারে অপেক্ষাকৃত খারাপ ধারণ পোষণ করছে; যা ২০০৫ সাল থেকে এই জরিপ শুরু হবার পর থেকে সর্বোচ্চ। মাত্র চার ভাগের এক ভাগ মার্কিনী চীনের ব্যাপারে ভালো কথা বলছেন। অপরদিকে চীনারা মনে করছে যে, ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে চীনের উহানের জনগণ এতটা কষ্ট সহ্য করার পর এখন ভাইরাস ঠেকাতে যথেষ্ট চেষ্টা না করার অপবাদ নিতে হচ্ছে তাদের। ডেভিড জোয়াইগ বলছেন যে, ব্যাপারটা পরিষ্কার যে, যখন বাইরে থেকে চীনের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টি করা হয়, তখন চীনের জনগণ জাতীয়তাবাদী হয়ে ওঠে। তারা মনে করতে থাকে যে, চীনা হবার কারণেই তাদেরকে আক্রমণের শিকার হতে হচ্ছে। আর চীনা কমিউনিস্ট পার্টি এই সুযোগটাকেই কাজে লাগায়। অর্থনৈতিক মন্দার মাঝে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে চীনা সরকার জাতীয়তাবাদকে উস্কে দিচ্ছে। চীনের রাষ্ট্রীয় পত্রিকা ‘গ্লোবাল টাইমস’এর প্রধান সম্পাদক হু শিজিন বলছেন যে, উহানে প্রথমদিকে কিছু ভুল হলেও চীনা জনগণ ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে চীনের ভূমিকায় যথেষ্ট খুশি। আর চীনের সফলতার আয়নার মাঝেই তারা যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতাকে দেখছে। পুরো ব্যাপারটাকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে সরকারি মিডিয়া ‘সিসিটিভি’ মন্তব্য করছে যে, চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থাই চীনের সফলতা মূল কারণ। দেশটার কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বের কারণেই ভাইরাস মোকাবিলা করা গিয়েছে।

অন্যদিকে ব্রিটিশ মিডিয়া ‘বিবিসি’ বলছে যে, বহু মার্কিনী চীনের বিরুদ্ধে বৈরী চিন্তা ধারণ করলেও এটাও ঠিক যে ৬৫ শতাংশ মার্কিনী মনে করছে যে, ট্রাম্প প্রশাসন যথেষ্ট দ্রুততার সাথে ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। ‘বিবিসি’ এ-ও মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, এবছরের শেষের দিকে ট্রাম্পের জন্যে একটা কঠিন নির্বাচন অপেক্ষা করছে। মন্দার অর্থনীতির মাঝে তিনি আবারও নির্বাচনে জিততে পারবেন কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তবে ট্রাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনও চীনের বিরুদ্ধে জনমতকে নিজের নির্বাচনী কাজে ব্যবহার করতে চাইছেন।

তদুপরি মার্কিনীদের মাঝেই অনেকেই চীনকে আরও সুযোগ দিতে উচ্ছুক। তারা চীন-মার্কিন দ্বন্দ্বের ফলাফলের ব্যাপারে ভীত। ‘ইউএস-চায়না বিজনেস কাউন্সিল’ বা ‘ইউএসসিবিসি’র প্রেসিডেন্ট ক্রেইগ এলেন বলছেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট যদি চীনাদেরকে বাণিজ্য চুক্তি মোতাবেক শর্তপূরণের সময় না দিয়ে চুক্তি থেকে বেরিয়ে যান, তাহলে সেটা ভীষণ অস্থিরতার জন্ম দেবে। চুক্তিটা চালু হয়েছে মাত্র ১৫ই ফেব্রুয়ারি থেকে, যখন বিশ্বব্যাপী মহামারি শুরু হয়েছে। চীন তার নিজের বাধ্যবাধকতা মেনে চলছে কিনা, সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না। হোয়াইট হাউজের অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ল্যারি কুড্রো ‘ব্লুমবার্গ টেলিভিশন’এর সাথে এক সাক্ষাতে বলছেন যে, চীনের ইচ্ছে রয়েছে তাদের বাধ্যবাধকতাগুলি মেনে চলার।

এই বিভেদ অত সহজে কমার সম্ভাবনা নেই

প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংএর অধীনে চীনাদের জাতীয়তাবাদী চিন্তাগুলিকে আরও এগিয়ে নেয়া হয়েছে। ‘চীনা স্বপ্ন’ এবং ‘জাতীয় পুনরুজ্জীবন’এর চিন্তাগুলি বাস্তবায়নের পথে চীনারা বিশ্বব্যাপী তাদের প্রভাব বৃদ্ধি করছে এবং জাতীয় স্বার্থকে শক্ত হাতে তুলে ধরতে চাইছে। এতে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে চীনের দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে। ইউরোপ থেকে বলা হচ্ছে যে, চীনারা করোনাভাইরাসের ব্যাপারে মিথ্যা তথ্য দিচ্ছে। পশ্চিমা কিছু দেশ ভাইরাস সংক্রমণ রোধে চীনের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করছে। এমনকি চীন বিভিন্ন দেশকে মেডিক্যাল সরঞ্জাম দিয়ে সহায়তা করার পরও অনেকে বেইজিংএর ‘মাস্ক কূটনীতি’র সমালোচনা করেছেন। প্রফেসর শি ইয়িনহংএর মতে, করোনাভাইরাসের মহামারি চলে যাবার পরেও এই প্রতিযোগিতা থেকে যাবে। মহামারির কঠিন স্মৃতি মানুষের হৃদয়ে গভীর দাগ কেটেছে, যা কয়েক প্রজন্ম ধারণ করবে।

অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথেসাথে বিশ্বব্যাপী চীনের প্রভাব বিস্তারের আকাংক্ষা মার্কিন প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করেছে। বৈশ্বিকভাবে মার্কিন নেতৃত্ব যখন হুমকির মাঝে, তখন যুক্তরাষ্ট্র চীনকে কোন বিষয়েই ছাড় দিতে রাজি নয়। মার্কিন সরকার চীনের প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে যে সব চেষ্টাই করবে, তা করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ব্যাপারে মার্কিন-চীন পাল্টাপাল্টি অভিযোগই বলে দিচ্ছে; চীনারা এক্ষেত্রে নিজেদের ভূরাজনৈতিক আকাংক্ষাকে ধরে রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে চীনা অর্থনীতি এখনও পশ্চিমা দেশগুলিতে রপ্তানির উপরই নির্ভরশীল। চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমার সাথেসাথে চীনা সরকার অভ্যন্তরীন ভোগ বাড়াবার তাগিদ দিয়েছিল। করোনার প্রভাবে সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দার কারণে চীনাদের এই প্রচেষ্টা আরও বৃদ্ধি পাবে। অর্থাৎ চীন ক্রমেই নিজের অর্থনীতিকে পশ্চিমা দেশগুলিতে রপ্তানির নির্ভরশীলতা থেকে সরিয়ে আনতে চেষ্টা করবে। পশ্চিমাদের সাথে চীনের এই পারস্পরিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নির্ভরশীলতা এতদিন সরাসরি কোন সংঘাতকে দূরে রেখেছিল। কিন্তু করোনা দুর্যোগের পটভূমিতে পারস্পরিক নির্ভরশীলতার বাধ্যবাধকতা কমে আসায় তার স্থলাভিষিক্ত হতে যাচ্ছে অনিশ্চয়তা এবং সংঘাতের অধিকতর সম্ভাবনা।




Tuesday, 5 May 2020

বাংলাদেশের ‘আন্দামান প্যাট্রোল ফোর্স’ কোথায়?

০৫ই মে ২০২০

সমুদ্রে টহল দিচ্ছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। সাম্প্রতিক শরণার্থী সমস্যা দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আন্দামান সাগরের মতো কৌশলগত একটা সাগরকে বাংলাদেশ কতটা হাল্কাভাবে নিয়েছে এতকাল। বাংলাদেশের ‘আন্দামান প্যাট্রোল ফোর্স’ বাংলাদেশের কৌশলগত স্বার্থকে রক্ষায় একটা গুরুত্বপূর্ণ ঢাল হিসেবে কাজ করবে।
  
শরণার্থীদের সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়ে রাজনীতি

বাংলাদেশের দক্ষিণের কোন সাগরের মাঝ দিয়ে পূর্ব এশিয়ার সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্যের পুরোটাই যায়? বাংলাদেশের দক্ষিণের কোন সাগর পাড়ি দিয়ে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের শরণার্থীরা মালয়েশিয়া গিয়ে আবার বাংলাদেশে আসে? বাংলাদেশের দক্ষিণের কোন সাগরকে নিয়ে বাংলাদেশের কোন মাথাব্যাথা নেই, যদিও বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্যে এর গুরুত্ব অপরিসীম? উত্তর বঙ্গোপসাগর নয়; আন্দামান সাগর। আন্দামান সাগরের উত্তরে মিয়ানমার; পূর্বে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড; দক্ষিণে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপ; পশ্চিমে ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ। এপ্রিলের ১৬ তারিখে বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের সংক্রমণের মাঝে খবর আসে যে, বঙ্গোপসাগরে একটা ট্রলারে গাদাগাদি করে অমানবিক পরিবেশে সমুদ্রে ভাসছে ৩’শ ৮২ জন শরণার্থী। বাংলাদেশের কোস্ট গার্ড, গোয়েন্দা সংস্থা এবং স্থানীয় প্রশাসনের বরাত দিয়ে ‘বিবিসি’ জানাচ্ছে যে, এই শরণার্থীরা প্রায় দুই মাস ধরে সমুদ্রে ভাসছিল। শুধু তা-ই নয়, এই সময়ের মাঝে নৌকাটা মার্চ থেকে মালয়েশিয়ার উপকূলে পৌঁছাবার উদ্দেশ্যে দু’বার আন্দামান সাগর পারপার করেছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে আসা এই মুসলিম শরণার্থীদেরকে পাচারকারীরা পাঠিয়েছিল মালয়েশিয়া। মালয়েশিয়ার সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা বলছে যে, ঐ একই দিনে মালয়েশিয়ার বিমান বাহিনী মালয়েশিয়ার সমুদ্রসীমায় লাংকাউইএর কাছাকাছি ২’শ মানুষবাহী দ্বিতীয় ট্রলারটা দেখতে পেয়ে নৌবাহিনীকে জানালে নৌবাহিনী সেটাকে ফেরত পাঠায়। মালয়েশিয়ার সরকার বলছে যে, দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। থাইল্যান্ডও মালয়েশিয়ার মতোই শরণার্থীদেরকে দেশে ঢুকতে দেয়নি। এই দুই দেশে প্রত্যাক্ষ্যাত হয়েই ট্রলারগুলি বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা চালাতে থাকে। এই সময় থেকেই শুরু হয় রাজনীতি।

২৪শে এপ্রিল জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল বাশলেতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে লেখা চিঠিতে সমুদ্রে ভাসমান পাঁচ শতাধিক শরণার্থীকে বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়ার অনুরোধ জানান। আরেক বিবৃতিতে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)এর এশিয়া বিষয়ক পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন যে, মিয়ানমারের গণহত্যার কারণে রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশকে অনেক বড় বোঝা কাঁধে নিতে হয়েছে। কিন্তু শরণার্থী বোঝাই ট্রলারকে ফিরিয়ে দিয়ে তাদেরকে সাগরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার কোনো অজুহাত নেই। ২৭শে এপ্রিল ব্রিটিশ ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিসের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী লর্ড আহমেদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেনকে ফোন করে রোহিঙ্গাদের গ্রহণে অনুরোধ জানান। জবাবে ব্রিটিশ মন্ত্রীকে রোহিঙ্গা সঙ্কটের বিস্তারিত তুলে ধরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সীমিত সম্পদ সত্ত্বেও মানবিক কারণে ইতোমধ্যে ১১ লক্ষ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ। তারপরও বাংলাদেশকেই অনুরোধ করা হচ্ছে। অথচ ঐ ভাসমান রোহিঙ্গাদের বর্তমান অবস্থান যে এলাকায় সেই দেশগুলিকে কেউ আশ্রয় দিতে বলছে না, তারা নিজেরাও এগিয়ে আসছে না। মন্ত্রী ভাসমান রোহিঙ্গাদের উদ্ধারে ব্রিটিশ রয়াল নেভিকে এগিয়ে আসতে উপদেশ দেন।

পরিষ্কারভাবেই বোঝা যাচ্ছে যে, ১১ লক্ষ শরণার্থী নিয়ে নতুন রাজনীতি শুরু হয়েছে। একসময় এই শরণার্থীদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়ে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং কৌশলগতভাবে বিপদে ফেলার চেষ্টা শুরু হয়েছিল। এখন সমুদ্রে ভাসমান শরণার্থীদের নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন ভূরাজনৈতিক খেলা। পশ্চিমা শক্তিগুলি এই শরণার্থীদের ব্যবহার করে বাংলাদেশকে এবং বঙ্গোপসাগরকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। চীনের উত্থানের পর থেকে বঙ্গোপসাগর এবং ভারত মহাসাগর ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইনের কিউকপিউতে চীনারা তৈরি করেছে তেলের টার্মিনাল, যেখানে ২৫ মিটার ড্রাফটের তেলের ট্যাঙ্কার ভিড়তে পারে। এখানে নামিয়ে দেয়া তেল এবং বঙ্গোপসাগর থেকে ওঠানো প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে চীনে পৌঁছাচ্ছে। আবার অত্র অঞ্চলে চীনের প্রভাবকে কমাতে ভারত রাখাইনে ‘কালাদান প্রকল্প’র নামে সিতওয়ে বন্দর এবং কালাদান নদীকে ব্যবহার করে ভারতের পূর্বাঞ্চলের স্থলবেষ্টিত রাজ্য মিজোরামের সীমানা পর্যন্ত পরিবহণ করিডোর তৈরি করছে। ভূরাজনৈতিকভাবে এহেন প্রতিযোগিতাপূর্ণ এলাকায় পশ্চিমারা কলকাঠি নাড়ছে; আর শরণার্থীদের চাপিয়ে দিয়ে বিপদে ফেলছে বাংলাদেশকে। ‘ক্যারট এন্ড স্টিক’ খেলার মাধ্যমে তারা বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে।
  
আন্দামান সাগরের মানব পাচারের রুট ম্যাপ। ভূরাজনৈতিকভাবে এহেন প্রতিযোগিতাপূর্ণ এলাকায় পশ্চিমারা কলকাঠি নাড়ছে; আর শরণার্থীদের চাপিয়ে দিয়ে বিপদে ফেলছে বাংলাদেশকে। ‘ক্যারট এন্ড স্টিক’ খেলার মাধ্যমে তারা বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে।

বাংলাদেশ কি ভূরাজনৈতিক খেলার গুটি হয়েই থাকবে?

বিশ্বব্যাপী করোনা দুর্যোগের মাঝেই কিছু দেশ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের খেলায় মেতেছে। বিশেষ করে বিশ্ব ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় এই খেলা আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। এই খেলায় তারা অপেক্ষাকৃত দুর্বল দেশগুলিকে গুটি হিসেবে ব্যবহার করছে। বাংলাদেশকে তারা এমনই এই গুটি হিসেবে দেখছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কি শক্তিশালী দেশগুলির ক্রীড়নক হয়েই থাকবে, নাকি নিজের শক্তির জানান দেবে? নিজের সারভাইভাল নিশ্চিত করতেই বাংলাদেশকে নিজের শক্তির জানান দিতে হবে।

প্রথমতঃ আন্দামান সাগরে শরণার্থীবাহী ট্রলারগুলি ভাসছে দুই মাস ধরে। এতে দু’টা ব্যাপার নিশ্চিত হওয়া যায়। এক, ভারত, চীন, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার এতে কোন মাধাব্যাথা নেই। এবং দুই, এই সাগরে একটা ট্রলার দুই মাস ধরে ঘুরলেও সেটার খবর নেবার কেউ নেই। অর্থাৎ এই সাগরে মানব পাচার ধরার জন্যে দায়িত্ব কেউ নেয়নি। সকলেই নিজের সমুদ্রসীমাটুকু পাহাড়া দিয়েই দায় সাড়ছে। আর শেষ পর্যন্ত সর্বোচ্চ সংখ্যক শরণার্থী আশ্রয় দেয়ার কারণে এদের দায়ভার বাংলাদেশের উপরে চাপাবার কথা বলে কূটনৈতিকভাবে বাংলাদেশের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করে নিতে চাচ্ছে শক্তিশালী দেশগুলি। এই সমস্যার সমাধান হতে পারে বাংলাদেশের উদ্যোগে আন্দামান সাগরে প্যাট্রোলের ব্যবস্থা করা।

দ্বিতীয়তঃ আন্দামান সাগর হয়ে বাংলাদেশের সাথে পূর্ব এশিয়ার সম্পূর্ণ বাণিজ্য হয়ে থাকে। এই বাণিজ্যের পরিমাণ বাৎসরিক প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। পূর্বগামী বাংলাদেশের পরিবহণ জাহাজগুলি আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ এবং মিয়ামনারের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের মাঝ দিয়ে পার হয়। কোলকাতাগামী জাহাজগুলিও এই রুট ব্যবহার করে। শ্রীলংকা এবং মধ্যপ্রাচ্যগামী জাহাজগুলি নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ এবং ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের মাঝ দিয়ে যায়। আর বঙ্গোপসাগরে ভারতের পূর্ব উপকূলের বন্দরগুলিতে জাহাজ যায় আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের মাঝ দিয়ে। এই সাগরে একটা ট্রলার দুই মাস এমনি এমনি ভাসতে পারলে বাণিজ্য জাহাজগুলি কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে প্রশ্ন করা যেতেই পারে। বাংলাদেশের কৌশলগত চিন্তায় এই সমুদ্র রুটের নিরাপত্তার ব্যাপারটা কি কখনো এসেছিল? আন্দামান সাগরে প্যাট্রোল বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা চালু রাখার জন্যে অবশ্য প্রয়োজনীয়।
 

আন্দামান সাগর হয়ে বাংলাদেশের সাথে পূর্ব এশিয়ার সম্পূর্ণ বাণিজ্য হয়ে থাকে। এই বাণিজ্যের পরিমাণ বাৎসরিক প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। এই সাগরে একটা ট্রলার দুই মাস এমনি এমনি ভাসতে পারলে বাণিজ্য জাহাজগুলি কতটা নিরাপদ, তা সন্দেহাতীত নয়। বাংলাদেশের কৌশলগত চিন্তায় এই সমুদ্র রুটের নিরাপত্তার ব্যাপারটা কি কখনো এসেছিল? আন্দামান সাগরে প্যাট্রোল বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা চালু রাখার জন্যে অবশ্য প্রয়োজনীয়।

কিভাবে এই প্যাট্রোল হবে?
প্রতিবেশী দেশগুলির সাথে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক রয়েছে। সেই হিসেবে ভারতের আন্দামান দ্বীপ, মিয়ানমার, থাইল্যান্ডের ফুকেট, মালয়েশিয়ার কেলাং, সিঙ্গাপুর এবং ইন্দোনেশিয়ার বন্দরগুলিতে বাংলাদেশের নৌবাহিনী এবং কোস্ট গার্ডের প্যাট্রোল জাহাজগুলি নিয়মিতই সফর করতে পারে। এই সবগুলি বন্দরই আন্দামান সাগরের চারিদিকে ছড়িয়ে। কাজেই এই সাগরে বাংলাদেশের নিয়মিত প্যাট্রোল একটা স্বাভাবিক ব্যাপার হতে পারতো, যদি রাষ্ট্রের কৌশলগত চিন্তার মাঝে আন্দামান সাগর স্থান পেতো। আন্দামান সাগর থেকে বিতাড়িত শরণার্থীদের যে বাংলাদেশেই পাঠানো হবে, সেটা সম্পর্কে আগেভাগে তথ্য হাতে পাওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। তাই আন্দামান সাগর এবং এর চারিদিকের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে যথেষ্ট তথ্য পাবার ব্যবস্থা থাকবে হবে বাংলাদেশের হাতে। এই তথ্যের সাথে প্যাট্রোলের সমন্বয়ের মাধ্যমে আশেপাশের দেশগুলিকে সাথে দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা করতে হবে। মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং ভারতকে এই ব্যবস্থায় বাংলাদেশকে সহায়তা দেবার জন্যে রাজি করাতে হবে। তারা যদি লাখো শরণার্থীর দায় নিতে না চায়, তাহলে আন্দামান সাগর টহল দিতে বাংলাদেশকে তাদের অবশ্যই লজিস্টিক্যাল এবং ইন্টেলিজেন্স সাপোর্ট দিতে হবে।

বাংলাদেশ যদি করোনা দুর্যোগ থেকে বৈশ্বিক পাওয়ার ব্যালান্সের ‘ভূমিকম্পসম’ পরিবর্তন বুঝতে পারে, তাহলে এটাও পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, শক্তিশালী দেশগুলির খেলার গুটি হওয়াটা বাংলাদেশের জন্যে কোন অপশন নয়। বরং নিজের শক্তিকে জানান দিয়ে এটা বলে দিতে হবে যে, এদেশের সাথে ‘ক্যারট এন্ড স্টিক’ খেলতে গেলে যে কারুরই হাত পুড়বে। সাম্প্রতিক শরণার্থী সমস্যা দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আন্দামান সাগরের মতো কৌশলগত একটা সাগরকে বাংলাদেশ কতটা হাল্কাভাবে নিয়েছিল এতদিন। বাংলাদেশের ‘আন্দামান প্যাট্রোল ফোর্স’ বাংলাদেশের কৌশলগত স্বার্থকে রক্ষায় একটা গুরুত্বপূর্ণ ঢাল হিসেবে কাজ করবে।

Sunday, 3 May 2020

করোনা পরিস্থিতিতেও অস্ট্রেলিয়ার শিপইয়ার্ডগুলি ব্যস্ত কেন?

৪ঠা মে ২০২০
   
এপ্রিল ২০২০; করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারির মাঝেও অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীর জন্যে ‘আরাফুরা-ক্লাস’এর অফশোর প্যাট্রোল ভেসেলের কীল লেইং। এই জাহাজগুলি অস্ট্রেলিয়ার ৮০ বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধজাহাজ তৈরির পরিকল্পনার অংশ। জাহাজগুলি অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীকে নতুন ধরনের সক্ষমতা দেবে; যা কিনা দেশটার নিরাপত্তা চিন্তাকেই প্রতিফলিত করে। দক্ষিণ চীন সাগর এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনকে মোকাবিলায় এই জাহাজগুলি সমমনা দেশের জাহাজগুলির সাথে সমুদ্র নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করবে।

অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা দপ্তর ২৭শে মার্চ ঘোষণা দেয় যে, রয়াল অস্ট্রেলিয়ান নেভির জন্যে ১২টা অফশোর প্যাট্রোল ভেসেলের তৃতীয়টার কাজ শুরু হয়েছে। দ্বিতীয়টার কাজ শুরু হয় ৯ই এপ্রিল। অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিন্ডা রেইনল্ডস বলেন যে, ২০২২ সালে এই জাহাজগুলির প্রথমটা পাবার সাথে সাথে অস্ট্রেলিয়া নতুন ধরনের এক সক্ষমতা পেতে যাচ্ছে। প্রায় সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পে ৮০ মিটার লম্বা ১৬’শ টনের এই জাহাজগুলি জার্মান কোম্পানি ‘লুরসেন’এর ডিজাইনে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার ‘এএসসি’ শিপইয়ার্ড এবং পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার ‘সিভমেক’ শিপইয়ার্ডে তৈরি হচ্ছে। ‘লুরসেন’ শুধু জাহাজই তৈরি করছে না, পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় শিপইয়ার্ডটাও তারা তৈরি করছে। প্রতিরক্ষা ম্যাগাজিন ‘আইএইচএস জেনস’ বলছে যে, এই জাহাজগুলি বিভিন্ন মিশন প্যাকেজ বহন করার মাধ্যমে কয়েক ধরনের বিশেষায়িত কাজ করতে সক্ষম হবে। অস্ট্রেলিয়ার সরকার দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার ‘এএসসি’ শিপইয়ার্ডকে ব্রিটিশ কোম্পানি ‘ব্রিটিশ এরোস্পেস সিস্টেমস’এর কাছে বিক্রি করে দেয় আরেকটা বড় প্রকল্পের অংশ হিসেবে। এই শিপইয়ার্ডে তৈরি হতে যাচ্ছে ৯টা ‘হান্টার-ক্লাস’ ফ্রিগেট, যা ‘টাইপ-২৬’ নামে ব্রিটিশ রয়াল নেভির জন্যে ৮টা এবং ‘রয়াল কানাডিয়ান নেভি’র জন্যে ১৫টা তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে এই জাহাজের ডিজাইন এবং প্রোটোটাইপ তৈরির কাজ চলছে। প্রথম জাহাজটার কাজ শুরু হবে ২০২২ সালে। ২৬ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পে ৫ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে; যার মাঝে ১ হাজার গ্র্যাজুয়েট কর্মী থাকবে। এই দুই প্রকল্প ছাড়াও ৫০ বিলিয়ন ডলারের আরেক প্রকল্পের অধীনে তৈরি হচ্ছে ১২টা ‘এটাক-ক্লাস’ সাবমেরিন। ফরাসী কোম্পানি ‘নেভাল গ্রুপ’এর ডিজাইনে এই সাবমেরিনগুলিও তৈরি হবে অস্ট্রেলিয়াতে। বর্তমানে এর ডিজাইনের কাজ চলছে ফ্রান্সে। করোনাভাইরাসের লকডাউনের মাঝেও অস্ট্রেলিয়ার শিপইয়ার্ডগুলিতে কাজ চলছে সমানে। বাজেটেরও কোন ঘাটতি নেই। কেন এতগুলি জাহাজ তৈরি করছে তারা? কি ধরনের সক্ষমতার কথাইবা বলছিলেন অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী? একসাথে প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ প্রকল্পগুলির নেপথ্যে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা নীতি।

অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা নীতি

২০১৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার সরকার ‘ডিফেন্স হোয়াইট পেপার’ নামে একটা প্রতিবেদন প্রকাশ করে; যেখানে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সামনের দিনগুলিতে প্রতিরক্ষা বাজেট ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করার কথা বলা হয়। এতে ২০২৫-২৬ সাল নাগাদ অস্ট্রেলিয়ার সামরিক বাজেট দাঁড়াবে প্রায় ৫৯ বিলিয়ন ডলার, যা ২০১৬-১৭ সালে ছিল ৩২ বিলিয়ন। জিডিপির ২ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করার প্রত্যয় ব্যক্ত করার সাথে সাথে নৌবাহিনীর শক্তিকে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করার কথা বলা হয়। অস্ট্রেলিয়ার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুল বলেন যে, যেহেতু অস্ট্রেলিয়া একটা দ্বীপ দেশ, তাই তার একটা শক্তিশালী নৌবাহিনী থাকা বাধ্যতামূলক। বর্তমানে নৌবাহিনীর ‘কলিন্স-ক্লাস’এর ৬টা সাবমেরিনকে প্রতিস্থাপন করে ‘এটাক-ক্লাস’এর ১২টা সাবমেরিন কেনার কথা বলা হয়, যাতে খরচ হবে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে ৮টা ‘এনজাক-ক্লাস’এর ফ্রিগেটকে প্রতিস্থাপন করতে ৯টা নতুন ফ্রিগেট তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়াও ১২টা নতুন অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল, ৭টা ‘পি-৮এ’ ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান, ৭২টা ‘এফ-৩৫এ’ স্টেলথ যুদ্ধবিমান এবং ১২টা ‘ইএ-১৮জি গ্রাউলার’ ইলেকট্রনিক এটাক বিমান ক্রয় করার কথা বলা হয়।

‘হোয়াইট পেপার’এ মূলতঃ যে চ্যালেঞ্জগুলির কথা বলা হয়, সেগুলি হলো, প্রথমতঃ চীন-মার্কিন দ্বন্দ্ব; দ্বিতীয়তঃ জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় বিভিন্ন দেশের মাঝে প্রতিযোগিতার কারণে আন্তর্জাতিক আইনের উপরে ভিত্তি করে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক ব্যবস্থার দুর্বল হওয়া; তৃতীয়তঃ সন্ত্রাসবাদ বৃদ্ধি; চতুর্থতঃ সম্পদের অসম বন্টন, সামাজিক অসঙ্গতি ও জলবায়ুগত কারণে অত্র অঞ্চলের কিছু দেশের স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে; পঞ্চমতঃ অনেকগুলি দেশের সমরশক্তির সক্ষমতার ব্যাপক বৃদ্ধি; আর ষষ্ঠতঃ সাইবারস্পেসে হামলার আশংকা বৃদ্ধি। অস্ট্রেলিয়ার নিজস্ব ভূখন্ডে আরেকটা দেশের সামরিক হামলার আশংকা না থাকলেও অন্য কোন স্থানে অস্ট্রেলিয়ার স্বার্থ হুমকির মাঝে পড়লে সেখানে হস্তক্ষেপের কথা বলা হয়। বৈশ্বিক শক্তি অনেকগুলি দেশের হাতে ছড়িয়ে যাওয়ায় অনিশ্চয়তা বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। সমুদ্রসীমা এবং প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে দক্ষিন-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির মাঝে প্রতিযোগিতা উত্তেজনার কারণ হতে পারে; এবং সকলেই সমান্তরালে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির কারণে অত্র অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ব্যাহত করতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র আর চীনের মাঝে দ্বন্দ্ব সামনের দিনগুলিতে নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হবে বলে প্রতিবেদনটাতে বলা হয়। এতে আরও বলা হয় যে, দুই দশকের মাঝে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সারা দুনিয়ার অর্ধেক সাবমেরিন অপারেট করবে; আর এই অঞ্চলের দেশগুলির হাতে থাকবে দুনিয়ার অর্ধেক আধুনিক যুদ্ধবিমান। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের সরাসরি যুদ্ধের আশঙ্কা না থাকলেও পূর্ব চীন সাগর, দক্ষিণ চীন সাগর, সাইবারস্পেস এবং মহাকাশে এই দেশগুলির দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পাবে বলে বলা হয়।

‘হোয়াইট পেপার’এ লক্ষ্য হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমুদ্রের নিরাপত্তায় অংশ নেয়ার কথা বলা হয়। একইসাথে পপুয়া নিউ গিনি, তিমর-লেস্তে এবং প্রশান্ত মহাসাগরী দ্বীপ দেশগুলির নিজেদের নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে অস্ট্রেলিয়া তাদের প্রধান নিরাপত্তা সহযোগী হতে চায়। আরেকটা লক্ষ্য হিসেবে বলা হয় যে, আন্তর্জাতিক আইনের উপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক ব্যবস্থার প্রতি কোন হুমকি অস্ট্রেলিয়ার স্বার্থবিরুদ্ধ হলে যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য দেশের সাথে অস্ট্রেলিয়া একত্রে হস্তক্ষেপ করবে।

ঠিক এই ব্যাপারটাই দেখা যায় ফিলিপাইনের নৌবাহিনীর জন্যে অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল ক্রয়ের প্রকল্পে। গত অগাস্টে ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষা সচিব ডেলফিন লরেনজানা ঘোষণা দেন যে, অস্ট্রেলিয় সরকারের অর্থায়নে ৬টা প্যাট্রোল ভেসেল ক্রয় করা হবে। অস্ট্রেলিয়ার ‘অস্টাল’ কোম্পানির ফিলিপাইন শিপইয়ার্ডে এই জাহাজগুলি তৈরি হবে বলে বলা হয়। প্রায় ৫’শ ৭১ মিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পে ফিলিপাইনের আপাততঃ কোন অর্থ বিনিয়োগ দরকার নেই। চীনকে মোকাবিলায় এই জাহাজগুলি নিঃসন্দেহে ভূমিকা রাখবে। দক্ষিণ চীন সাগরে অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীর জাহাজগুলি যেসকল দেশের নৌবাহিনীর সাথে কাজ করবে বলে বলা হচ্ছে, তার একটা হলো ফিলিপাইন।
  
এপ্রিল ২০২০; দক্ষিণ চীন সাগরে টহল দিচ্ছে মার্কিন এম্ফিবিয়াস এসল্ট শিপ ‘আমেরিকা’, ক্রুজার ‘বাংকার হিল’ এবং ডেস্ট্রয়ার ‘ব্যারি’; সাথে অস্ট্রেলিয়ার ফ্রিগেট ‘পারামাত্তা’ (সর্ববামে)। প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজগুলিতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হওয়ায় দক্ষিণ চীন সাগরে টহল দেয়ার জন্যে মার্কিন সক্ষমতা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। অস্ট্রেলিয়া যুক্তরাষ্ট্রকে সর্বদাই কাছে পেলেও করোনাভাইরাসের সংক্রমণের মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার ব্যাপারটা অস্ট্রেলিয়াকে ভাবাবে। এমনই একটা পরিস্থিতি পূর্ব এশিয়াতে ব্রিটেনের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে; যা কিনা অস্ট্রেলিয়া স্বাগত জানাবে।

অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে কে কি ভাবছে?

অন্যদিকে চীন অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা চিন্তাকে নিজেদের স্বার্থবিরুদ্ধ মনে করছে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হুয়া চুনয়িং সরাসরিই বলেন যে, দক্ষিণ চীন সাগর এবং চীনের সামরিক শক্তি নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাথা ঘামানোটা চীন ভালো চোখে দেখছে না। তিনি আশা করেন যে, বিভিন্ন দেশ অত্র এলাকায় সামরিক মহড়া এবং প্যাট্রোল দেয়া বন্ধ করবে এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করা বন্ধ করবে। অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা চিন্তার ব্যাপারে চীনের অসন্তোষ প্রকাশের উপর মন্তব্য করতে গিয়ে ‘অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি’র ‘স্ট্র্যাটেজিক এন্ড ডিফেন্স স্টাডিজ সেন্টার’এর জন ব্ল্যাক্সল্যান্ড বলেন যে, চীন যে এধরণের কথাই বলবে, তা জানাই ছিল। বরং অত্র অঞ্চলের সব দেশই চীনের সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে স্বাভাবিকভাবেই চিন্তিত।

যুক্তরাষ্ট্রের থিংকট্যাঙ্ক ‘হাডসন ইন্সটিটিউট’এর সিনিয়র ফেলো জন লী বলছেন যে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অস্ট্রেলিয়ার সাথে নিরাপত্তা সম্পর্কটাই যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। একই ধরনের আদর্শিক লক্ষ্য থাকার কারণে উভয় দেশই একত্রে কাজ করবে। অত্র অঞ্চলে অস্ট্রেলিয়ার নৌশক্তি বেশ গুরুত্বপূর্ণ, যাকে যুক্তরাষ্ট্র নিজের পক্ষে রাখতে চায়। যুক্তরাষ্ট্র চাইবে অস্ট্রেলিয়া এবং জাপানকে মার্কিন নেতৃত্বের অধীনে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়ার হিসেবে দেখতে। তিনি আরও বলছেন যে, যদি চীনের আগ্রাসী ভূমিকার কারণে জাপানের শক্তি বৃদ্ধি হয়, তাহলে চীনাদের এই কৌশলকে অনেকেই ভুল বলে গণ্য করতে পারেন। আর এই শক্তিগুলির সামষ্টিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলেই বেইজিংএর আগ্রাসী ভূমিকাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতে পারে। তবে জন লীর চিন্তায় বেইজিংকে চাপে ফেলে মার্কিন নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার অধীনে নিয়ে আসার জন্যে যে চেষ্টার কথা বলা হয়েছে, সেটা চীন-মার্কিন বাণিজ্য যুদ্ধ, ‘ফাইভ-জি’ প্রযুক্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং সাম্প্রতিককালে করোনাভাইরাসের উৎপত্তি নিয়ে কাদাছোঁড়াছুড়ির ফলে এখনও অসফল।

তবে চীনকে মোকাবিলায় অস্ট্রেলিয়া শুধু যুক্তরাষ্ট্রের উপরই নির্ভরশীল থাকতে চাইছে না। গত জুলাই মাসে লন্ডনে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ বা ‘আইআইএসএস’এর এক অনুষ্ঠানে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিন্ডা রেইনল্ডস বলেন যে, এশিয়া-প্যাসিফিক এলাকায় ব্রিটেনকে সামরিকভাবে আরও বেশি যুক্ত হতে হবে। তিনি বলেন যে, এটা সন্দেহাতীত যে, বর্তমানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে কৌশলগত পরিস্থিতিতে সবচাইতে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া বর্তমানে চীনের ব্যাপক সামরিকীকরণ এবং চীনের সাথে আশেপাশের দেশগুলির বিরোধ দেখতে পাচ্ছে। চীন এখন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করে চলেছে এবং আন্তর্জাতিক আইনের উপর দাঁড়িয়ে থাকা বিশ্বব্যবস্থাকে দুর্বল করে ফেলছে। এমতাবস্থায় মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরের সাথে ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের ‘ফাইভ পাওয়ার ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট’ বা ‘এফপিডিএ’ ব্যবহার করে চীনের সামরিক উত্থানের হুমকি মোকাবিলা করার কথা বলেন রেইনল্ডস। তিনি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ব্রিটিশ রয়াল নেভির জাহাজ মোতায়েনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান এবং সেখানে ব্রিটিশ সামরিক উপস্থিতিকে আরও বৃদ্ধি করার আহ্বান জানান। একইসাথে এব্যাপারে অস্ট্রেলিয়ার সহায়তা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। দুই দেশের সম্পর্কের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন যে, বিশ্বের খুব কম দু’টা দেশের মাঝেই ব্রিটেন এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো কাছাকাছি সম্পর্ক রয়েছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, ব্রিটেন এবং অস্ট্রেলিয়া একে অপরকে বিশ্বাস করে।

   
অস্ট্রেলিয়ার আশেপাশে প্রায় ১৪টার মতো ছোট দ্বীপ দেশকে অস্ট্রেলিয়া অর্থ এবং নিরাপত্তা সহায়তা দিচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার এই সিদ্ধান্ত পুরোপুরিভাবে কৌশলগত; আর এর মূলে রয়েছে চীনের প্রভাব বিস্তারকে ঠেকানো। কার কতটুকু সহায়তা প্রয়োজন, সেই হিসেব করে কখনোই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি।


প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বৈদেশিক সহায়তার কূটনীতি

সামরিক বাজেটের বাইরে অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রনীতির আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো বৈদেশিক সহায়তা। গত বছরের জুনে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন সলোমোন দ্বীপপুঞ্জ ভ্রমণের সময় আড়াই’শ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দেবার প্রতিশ্রুতি দেন। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, এই প্রতিশ্রুত অর্থ ১০ বছরে খরচ করা হবে। সাড়ে ছয় লক্ষ মানুষের এই দ্বীপপুঞ্জের জিডিপি প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার এবং মাথাপিছু গর আয় প্রায় ২ হাজার ৪’শ ডলার। ১০ বছরে আড়াই’শ মিলিয়ন ডলার দেশটার জন্যে খুব বেশি কিছু নয়। তবে গত ছয় বছরে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল অস্ট্রেলিয়ার মোট বৈদেশিক সহায়তার ২১ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৩৫ শতাংশ পাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার থিংকট্যাঙ্ক ‘লোয়ি ইন্সটিটিউট’এর জনাথন প্রাইক বলছেন যে, অস্ট্রেলিয়ার এই সিদ্ধান্ত পুরোপুরিভাবে কৌশলগত; আর এর মূলে রয়েছে চীনের প্রভাব বিস্তারকে ঠেকানো। কার কতটুকু সহায়তা প্রয়োজন, সেই হিসেব করে কখনোই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। একারণেই দেখা যাবে যে, অস্ট্রেলিয়া তার বেশিরভাগ সহায়তা দিচ্ছে এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায়। এই এলাকাগুলিতেই অস্ট্রেলিয়ার প্রভাব এবং গুরুত্ব সবচাইতে বেশি।

২০১৭ সালে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ৪ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দানের ঘোষণার মাধ্যমে চীন অস্ট্রেলিয়ার নিজের উঠানেই অস্ট্রেলিয়াকে ছাড়িয়ে যেতে চাইছে। ঐ একই বছর অস্ট্রেলিয়া এই অঞ্চলের জন্যে মাত্র ৮’শ ১৫ মিলিয়ন ডলারের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। অর্থাৎ চীন অস্ট্রেলিয়ার চার গুণ সহায়তা দিতে চাইছে। ২০১১ সাল থেকে ২০১৭ পর্যন্ত ছয় বছরে অস্ট্রেলিয়া এই অঞ্চলে সাড়ে ৬ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছে; যেখানে চীন প্রায় সাত বছরে দিয়েছিল সোয়া ১ বিলিয়ন ডলার। ২০১১ থেকে ২০১৬এর মাঝে যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ এবং ফ্রান্স এখানে তাদের সহায়তা যথেষ্ট পরিমাণে কমিয়ে দিয়েছে।

মার্কিন মিডিয়া ‘সিএনএন’ বলছে যে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলিতে অস্ট্রেলিয়ার সহায়তা অর্থনৈতিক উন্নয়ন আনতে পারেনি। কারণ অস্ট্রেলিয়া সহায়তা দিয়েছে এমন সব সেক্টরে, যা অস্ট্রেলিয়রা মনে করছে দেয়া উচিৎ; যেমন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সুশাসন। অন্যদিকে চীনারা এই ছোট দেশগুলিকে জিজ্ঞেস করছে যে, তাদের কোন সেক্টরে বিনিয়োগ প্রয়োজন। এর ফলাফল হিসেবে খুব স্বাভাবিকভাবেই চীনারা এসব দেশে বড় অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়ন করছে। উদাহরণস্বরূপ, অস্ট্রেলিয়ার ঠিক উত্তরেই প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সবচাইতে বড় দ্বীপ পপুয়া নিউ গিনির কথা বলা যেতে পারে। ৮৬ লক্ষ মানুষের এই দেশের জিডিপি ২১ বিলিয়ন ডলার; মাথাপিছু গড় আয় আড়াই হাজার ডলার। তবে দেশটার জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশই দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করে। চীন মূলতঃ পপুয়া নিউ গিনিতেই সবচাইতে বড় বিনিয়োগ করছে। ২০১৭ সালে সেখানে চীনারা ৮৫ মিলিয়ন ডলার খরচে রাস্তা উন্নয়নের কাজ শেষ করেছে। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া এ পর্যন্ত ২’শ ১৯ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে ভ্যাকসিন, স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং এইডসএর সংক্রমণ রোধে। অস্ট্রেলিয়ার বেশিরভাগ সহায়তা হলো অনুদান; চীনাদের বেশিরভাগ ঋণ। আইএমএফএর হিসেবে এই অঞ্চলের ১৪টা দেশের মাঝে ৬টাই ঋণের অর্থ ফেরত দেয়ার যোগ্যতা প্রায় হারিয়েছে; আরও ৩টা দেশ যোগ্যতা হারাবার পথে রয়েছে। সুতরাং এই দেশগুলিকে দেয়া চীনা ঋণের কি হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে শ্রীলংকা ঋণের অর্থ ফেরত দিতে না পারার পর চীনারা বন্দরের নিয়ন্ত্রণ নেয়ায় সেটা উদাহরণ হিসেবেই সামনে আসছে।    
জুন ২০১৭; চীনা নৌবাহিনীর কয়েকটা যুদ্ধজাহাজের প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দ্বীপ দেশ ভানুয়াতু সফর। অস্ট্রেলিয়া তার আশেপাশের দ্বীপ দেশগুলিকে নিজের প্রভাবের অঞ্চল হিসেবে দেখে। একইসাথে অস্ট্রেলিয়ার সমুদ্র বাণিজ্য রুটগুলির কয়েকটা এই দ্বীপগুলির মাঝ দিয়ে যাবার কারণে অস্ট্রেলিয়ার কাছে এগুলির গুরুত্ব অপরিসীম। চীনারা এই দ্বীপগুলিতে প্রভাব বিস্তার শুরু করার অস্ট্রেলিয়ার সাথে চীনের দ্বন্দ্বও বৃদ্ধি পেয়েছে।

দ্বীপগুলির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব কেন?

পপুয়াতে রয়েছে স্বর্ণ, তামা, নিকেল, গ্যাস, ইত্যাদি খণিজ সম্পদ। একারণে সেখানে বিনিয়োগ করার যৌক্তিক কারণ রয়েছে চীনের জন্যে। আবার প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলিতে অনেক চীনারাও বসবাস করে; যারা বিভিন্ন সময়ে ব্যবসা করার জন্যে অথবা কাজের জন্যে সেখানে গিয়েছিল। তবে ‘সিএনএন’ বলছে যে, এই অঞ্চলে চীনের আনাগোণা বৃদ্ধির আরও বড় কারণ হতে পারে কূটনীতি। বিশ্বের মাত্র ১৬টা দেশ তাইওয়ানকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে; এর মাঝে ৬টা দেশই হলো প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের। বহু বছর ধরেই চীনারা তাইওয়ানকে স্বীকৃতি দেয়া দেশগুলিকে নিজের পক্ষে নিয়ে আসার চেষ্টা চালাচ্ছে। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে পপুয়া নিউ গিনি তাদের দেশে তাইওয়ানের প্রতিনিধির বিভিন্ন কূটনৈতিক অধিকার কেড়ে নেবার পর তাইওয়ান অভিযোগ করে যে, চীনা সরকারের চাপের কারণেই পপুয়া এটা করেছে। গত সেপ্টেম্বরে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের সরকার তাইওয়ানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে। চীন সলোমোনের সবচাইতে বড় বাণিজ্য সহযোগী; আর তারা চীনা বিনিয়োগ থেকেও বঞ্চিত হতে চায় না। ডিসেম্বরে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের রাজনীতিবিদদের বরাত দিয়ে ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ বলে যে, চীন এবং তাইওয়ান পাল্টাপাল্টি অবস্থানে থেকে তাদেরকে লক্ষ লক্ষ ডলার ঘুষ সেধেছে তাদের পক্ষে থাকার জন্যে।

তবে এই দ্বীপগুলি নিয়ে বিরোধের পিছনে আরেকটা কারণ হিসেবে ‘সিএনএন’ বলছে যে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় ১৪টা দেশের পুরো জনসংখ্যা একটা চীনা শহরের জনসংখ্যার সমান হলেও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে চীনের ভোট এবং এই দেশগুলির ভোট সমান ওজনের। সেই হিসেবে এই দেশগুলি তাদের আকৃতির তুলনায় চীন এবং অস্ট্রেলিয়ার কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর বাইরেও এই অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়াবার পিছনেও চীনের আকাংক্ষা থাকতে পারে। ২০১৮ সালে ‘সিডনি মর্নিং হেরাল্ড’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্ব উপকূলের কাছে ভানুয়াতু দ্বীপের সাথে চীনের স্থায়ী সামরিক ঘাঁটির ব্যাপারে কথা হচ্ছে; যা উভয় দেশই অস্বীকার করে। ২০১৮ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইকনমিক এন্ড সিকিউরিটি রিভিউ কমিশন’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনারা সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করতে পারলে পুরো এলাকায় চীনাদের নজরদারি করার সুযোগ সৃষ্টি হয়ে যাবে; আর তা অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের জন্যে হুমকি হওয়া ছাড়াও অত্র অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর ঢোকা বা বের হওয়ায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার পাঁচটা গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথের মাঝে তিনটাই প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল দিয়ে গিয়েছে। চীনারা এই বাণিজ্যে বাধা সৃষ্টি না করলেও ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই অস্ট্রেলিয়া হুমকির মাঝে পড়বে।

যা চিন্তা তা-ই কাজ। গত অগাস্টে অস্ট্রেলিয়ার তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিন্ডা রেইনল্ডস আনুষ্ঠানিকভাবে পপুয়া নিউ গিনির প্রায় ৩’শ কিঃমিঃ উত্তরে মানাস দ্বীপের ‘লোমব্রুম’এ নতুন নৌঘাঁটির প্রথম ধাপের উদ্ভোধন করেন। পপুয়ার সরকারের সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী এই ঘাঁটি অস্ট্রেলিয় এবং মার্কিন নৌবাহিনী ব্যবহার করবে। লিন্ডা রেইনল্ডস বলেন যে, কৌশলগতভাবে এই ঘাঁটি সর্বদাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল; এখনও রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই দ্বীপে জাপানের বড় আকারের সামরিক ঘাঁটি ছিল। বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৬ থেকে ১৯৭৪ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া এই ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণে ছিল। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয় সরকার ‘প্যাসিফিক ম্যারিটাইম সিকিউরিটি প্রোগ্রাম’এর আওতায় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১৩টা দেশকে ২১টা ‘গার্ডিয়ান-ক্লাস’ প্যাট্রোল বোট অনুদান দিচ্ছে। এর আগে ১৯৮২ সালে জাতিসংঘের আইনে সকল দেশকে উপকূল থেকে ২’শ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত সমুদ্রে ‘এক্সক্লুসিভ ইকনমিক জোন’এর অধিকার দেয়ার পর ১৯৮৫ এবং ১৯৯৭ সালের মাঝে অস্ট্রেলিয় সরকার ১২টা দেশকে ২২টা ‘প্যাসিফিক-ক্লাস’ প্যাট্রোল বোট তৈরি করে দান করেছিল। সেই বোটগুলিকে প্রতিস্থাপন করার লক্ষ্যেই ৩’শ ৩৫ মিলিয়ন ডলার খরচে ৪০ মিটার লম্বা এই বোটগুলি তৈরি করছে অস্ট্রেলিয়ার ‘অস্টাল’ শিপইয়ার্ড। এই দ্বীপ দেশগুলি থেকে যাতে ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান দিয়ে সমুদ্রে টহল বৃদ্ধি করা যায়, সেই প্রচেষ্টাও রয়েছে এই প্রকল্পের মাঝে।
   
নভেম্বর ২০১৮; পপুয়া নিউগিনির পোর্ট মোর্সবির উপকূলে ‘এপেক’ শীর্ষ বৈঠকের নিরাপত্তা দিচ্ছে রয়াল অস্ট্রেলিয়ান নেভির হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার ‘এডেলেইড’। পপুয়াতে এই বৈঠকের মাঝ দিয়ে অস্ট্রেলিয়া এবং চীনের দড়ি টানাটানির কিছুটা চিত্র পাওয়া যায়; যেখানে চীনারা চাইছিলো পোর্ট মোর্সবির উন্নয়নের চেহাড়া দেখাতে; আর অস্ট্রেলিয়া চাইছিলো দেখাতে যে, অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা সহায়তা ছাড়া অত্র অঞ্চলের দেশগুলি অসহায়।

২০১৮ সালের নভেম্বরে পপুয়া নিউ গিনির রাজধানী পোর্ট মোর্সবিতে ‘এশিয়া-প্যাসিফিক ইকনমিক কোঅপারেশন’ বা ‘এপেক’ ফোরামের শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স সহ ২১টা দেশের শীর্ষ নেতারা যোগ দেন। প্রায় ১৫ হাজার গেস্টের থাকার সংকুলান না হওয়ায় বন্দরে ৩টা ক্রুজ লাইনার জাহাজ ভিড়িয়ে রাখা হয়। এই বৈঠকের নিরাপত্তার খাতিরে যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান এবং স্পেশাল ফোর্সসহ প্রায় ৪ হাজার সেনা মোতায়েন করা হয়। ফিলিপাইনের মিডিয়া ‘র‍্যাপলার’ বলছে যে, এই বৈঠকের নিরাপত্তার দায়িত্বের পুরোটাই নেয় অস্ট্রেলিয়া। অস্ট্রেলিয়া দেড় হাজার সেনাসহ রয়াল অস্ট্রেলিয়ান এয়ার ফোর্সের ‘এফএ-১৮ সুপার হর্নেট’ ফাইটার বিমান, ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান এবং নৌবাহিনীর হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার ‘এডেলেইড’কে মোতায়েন করে। অস্ট্রেলিয়ার সাথে নিউজিল্যান্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রও এই নিরাপত্তা মিশনে অংশ নেয়। অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা থিংকট্যাঙ্ক ‘অস্ট্রেলিয়া ডিফেন্স এসোসিয়েশন’এর এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর নেইল জেমস বলেন যে, পপুয়া নিউ গিনির মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি যদি বিদেশী নিরাপত্তা বাহিনীকে নিজ দেশে আসতে দিতে না চায়, তাহলে তারা কখনোই ‘এপেক’এর মতো বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে সক্ষম হবে না। এটা কৌশলগত এবং রাজনৈতিক দিক থেকেও ভালো হবে না। তবে ‘এপেক’ বৈঠকের পিছনে অস্ট্রেলিয়া ছাড়াও চীনের অবদানও ছিল। বৈঠকের আগে চীনাদের অর্থায়নে পোর্ট মোর্সবির চেহাড়ার বেশ পরিবর্তন সাধিত হয়। চীনা অর্থে রাস্তা ও কনভেনশন সেন্টারের উন্নয়ন করা হয়; গেস্টদের আনা নেয়ার জন্যে কেনা হয় বাস। অনেকেই প্রশ্ন করেন যে, দেশের বহু মানুষের যখন মৌলিক চাহিদাই পূর্ণ হচ্ছে না, তখন পপুয়ার মানুষের কাছে এরকম জাঁকজমকের অর্থ কতটুকু? পপুয়াতে এই বৈঠকের মাঝ দিয়ে অস্ট্রেলিয়া এবং চীনের দড়ি টানাটানির কিছুটা চিত্র পাওয়া যায়; যেখানে চীনারা চাইছিলো পোর্ট মোর্সবির উন্নয়নের চেহাড়া দেখাতে; আর অস্ট্রেলিয়া চাইছিলো দেখাতে যে, অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা সহায়তা ছাড়া অত্র অঞ্চলের দেশগুলি অসহায়।

অস্ট্রেলিয়ার সবচাইতে বেশি বাণিজ্য এশিয়ার সাথে। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া থেকে পূর্ব এশিয়ায় যাবার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ দু’টা নৌপথ পপুয়া নিউ গিনি এবং সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের মাঝ দিয়ে যায়। নিউ গিনি দ্বীপ ও নিউ ব্রিটেন দ্বীপের মাঝে দিয়ে দক্ষিণ রুটটা; আর নিউ ব্রিটেন ও সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের অন্তর্গত বোগেনভিল দ্বীপের মাঝ দিয়ে উত্তর রুটটা গিয়েছে। মানাস দ্বীপের নৌঘাঁটিটা এই দুই সমুদ্র বাণিজ্য রুটের ঠিক মাঝখানে হওয়ায় এর গুরুত্ব অপরিসীম। অন্যদিকে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার বন্দরগুলি থেকে জাহাজ মূলতঃ ইন্দোনেশিয়ার সুন্দা ও লম্বক প্রণালী এবং তিমর সাগর ও আরাফুরা সাগরের মাঝ দিয়ে যায়। এই পথগুলির উপর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া।

কিন্তু চীন থেকে অস্ট্রেলিয়া কতটুকু দূরে থাকবে?

অস্ট্রেলিয়ার ‘এসবিএস নিউজ’ জানাচ্ছে যে, চীন হলো অস্ট্রেলিয়ার সবচাইতে বড় বাণিজ্য সহযোগী। দুই দেশের মাঝে বাণিজ্য দেড়’শ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। অস্ট্রেলিয়ার মোট বাণিজ্যের ২৩ শতাংশই চীনের সাথে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র; যার সাথে বাণিজ্য ৬৪ বিলিয়ন ডলার; এরপর জাপানের সাথে ৬১ বিলিয়ন; দক্ষিণ কোরিয়া সাথে ৩২ বিলিয়ন; এবং ব্রিটেনের সাথে ২৯ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য। সিঙ্গাপুরের সাথেও বাণিজ্য যথেষ্ট। অস্ট্রেলিয়ার বেশিরভাগ বাণিজ্য পূর্ব এশিয়ার সাথেই। এখানকার বেশিরভাগ দেশের সাথেই অস্ট্রেলিয়ার রয়েছে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। ২০০৭ সালেই চীনারা অস্ট্রেলিয়ার সবচাইতে বড় বাণিজ্য সহযোগী হিসেবে জাপানকে অতিক্রম করে। অপরদিক থেকে অস্ট্রেলিয়া চীনের জন্যে সপ্তম বৃহত্তম বাণিজ্য সহযোগী। অস্ট্রেলিয়ার ‘মনাশ ইউনিভার্সিটি’র বাণিজ্য বিশ্লেষক জিওভানি ডে লিয়েতো বলছেন যে, অস্ট্রেলিয়ার সকল রপ্তানি পণ্যকে ‘পাথর এবং শস্য’এর মাঝে চিন্তা করা যায়। অর্থাৎ লৌহ আকরিক, কয়লা, স্বর্ণ এবং গ্যাস হলো খণিজ পণ্য; আর গরুর গোশত, পশম, তুলা, ছোলা, ডাল, গম, চিনি এবং মদ হলো কৃষিজ পণ্য। তবে অস্ট্রেলিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রার উৎস হলো শিক্ষা। লাখো শিক্ষার্থী অস্ট্রেলিয়াতে আসছে ইংরেজি শিখতে এবং উচ্চশিক্ষার্থে। পর্যটনেও বড় আয় রয়েছে আস্ট্রেলিয়ার। অন্যদিকে আমদানির কথা চিন্তা করলে অস্ট্রেলিয়রা বিদেশ ভ্রমণেই খরচ করে প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার; গাড়ি আমদানিতে যায় ২১ বিলিয়ন; পেট্রোলিয়াম পণ্যে ১৫ বিলিয়ন; টেলিকম যন্ত্রপাতিতে ১২ বিলিয়ন; আর পণ্য পরিবহণে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার।

গত বছরের জুনে চীনা নৌবাহিনীর তিনটা যুদ্ধজাহাজ অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বন্দর ঘুরে আসে। অস্ট্রেলিয়ার জনগণের কাছে ব্যাপারটা অদ্ভুত ঠেকলেও এটা নিশ্চিত যে চীনের সাথে কোনরূপ সহিংসতা অস্ট্রেলিয়ার বাস্তবতা নয়। তবে এটা পরিষ্কার যে, অস্ট্রেলিয়া অত্র অঞ্চলে তার নিরাপত্তাকে হাল্কাভাবে নিচ্ছে না। চীনকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনসহ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিকে সে পাশে চাইছে। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থানকে পাকাপোক্ত করতেই সে জাহাজ নির্মাণে বিনিয়োগ করছে। এই জাহাজ শুধু নিজের নৌবাহিনীর জন্যেই নয়; দক্ষিণ চীন সাগরের আশেপাশের দেশগুলির জন্যেও তৈরি করতে চাইছে তারা। একইসাথে অস্ট্রেলিয়া তার সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পপুয়া নিউগিনি এবং সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের মতো দেশগুলিকে আর্থিক এবং নিরাপত্তা সহায়তা দিয়ে নিজের সাথে রাখতে চাইছে। চীন অস্ট্রেলিয়ার সাথে সরাসরি সংঘাত না চাইলেও প্রভাব বিস্তারের খেলায় অস্ট্রেলিয়া যেমন তাইওয়ান ইস্যুতে চীনকে শান্তি দেবে না, তেমনি চীনও অস্ট্রেলিয়ার উঠানে ছোট দ্বীপদেশগুলিকে বিশাল বিনিয়োগের মাধ্যমে কিনে ফেলতে চাইবে। অস্ট্রেলিয়া যুক্তরাষ্ট্রকে সর্বদাই কাছে পেলেও করোনাভাইরাসের সংক্রমণের মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার ব্যাপারটা অস্ট্রেলিয়াকে ভাবাবে। এমনই একটা পরিস্থিতি পূর্ব এশিয়াতে ব্রিটেনের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে; যা কিনা ব্রিটিশ কমোনওয়েলথের অন্তর্গত অস্ট্রেলিয়া স্বাগত জানাবে। ব্রিটেনের সাথে অস্ট্রেলিয়ার সম্পর্ক ঐতিহাসিক এবং পারস্পরিক বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত। যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতার কারণে ব্রিটনের সাথে অস্ট্রেলিয়ার এই সম্পর্ক আরও গভীর হবে। এটা ধীরে ধীরে পরিষ্কার হবে যে, রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ অস্ট্রেলিয়ার নামমাত্র রানীই শুধু নন।

Monday, 27 April 2020

করোনাভাইরাসের সুযোগে বিশ্বব্যাপী প্রভাব বাড়াচ্ছে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’

২৮শে এপ্রিল ২০২০

এপ্রিল মাসে দক্ষিণ আমেরিকার কাছে সাউথ জর্জিয়া দ্বীপে ব্রিটিশ রয়াল নেভির জাহাজ ‘ফোর্দ’। ব্রিটেনের সামরিক সক্ষমতা সর্বদাই প্রশ্নের মুখে। কিন্তু এই ছোট্ট সক্ষমতাকে ব্যবহার করেই ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ বিশ্বব্যাপী তার প্রভাবকে বৃদ্ধি করতে চাইছে; যখন করোনা দুর্যোগে সকলেই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত; যখন সকলেই যুক্তরাষ্ট্র আর চীনের সংঘাত নিয়ে চিন্তিত।

ব্রিটেনের ‘স্কাই নিউজ’ এক প্রতিবেদনে বলছে যে, ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর মাঝে ১’শর কম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলেও প্রায় ১৩ হাজার সেনা এই মুহুর্তে কোয়ার‍্যান্টিনে রয়েছেন, অথবা বাড়িতে থেকে কাজ করছেন, যা কিনা ব্রিটেনের পুরো সামরিক বাহিনীর ৯ শতাংশ। এদের মাঝে কারুর হয়তো উপসর্গ দেখা দিয়েছে; কারুর হয়তো পরিবারের সদস্য আক্রান্ত; অথবা পরিবারের দুর্বল কোন সদস্যকে সহায়তা দেয়ার জন্যে বাড়িতে রয়েছেন। দক্ষিণ আটলান্টিকে ব্রিটিশ উপনিবেশ ফকল্যান্ডস দ্বীপপুঞ্জে কমপক্ষে ১১ জন সামরিক সদস্য করোনা আক্রান্ত বলে জানা গিয়েছে। পূর্ব ভূমধ্যসাগরের সাইপ্রাস দ্বীপে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটিতেও কমপক্ষে দুইজন সেনার মাঝে করোনার অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে। তবে ব্রিটেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে যে, তারা ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর কতজন আক্রান্ত হলো, তার হিসেব তারা নিয়মিতভাবে দেবেন না। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের মাঝে নিজ দেশে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেও এটা নিশ্চিত যে বিশ্বব্যাপী ব্রিটেনের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টাগুলি থেমে থাকেনি। করোনাভাইরাসের মাঝে বহু দেশ যখন শুধুমাত্র নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত, তখন সারাবিশ্বে সামরিক, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিকভাবে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ তার প্রভাব বৃদ্ধি করে চলেছে।

মধ্যপ্রাচ্য এবং ভারত মহাসাগর

২৬শে এপ্রিল ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন যে, গত ১০ই এপ্রিল প্রায় সাত মাসে প্রথমবারের মতো ব্রিটিশ যুদ্ধবিমান উত্তর ইরাকের তুক খুর্মা এলাকায় আইসিস টার্গেটের উপর বোমাবর্ষণ করে। রয়াল এয়ার ফোর্সের দু’টা ‘টাইফুন’ বিমান বোমাবর্ষণে কয়েকটা বিল্ডিং ধ্বংস করে। এতে সহায়তা দেয় রয়াল এয়ার ফোর্সেরই আরেকটা মনুষ্যবিহীন ‘রিপার’ ড্রোন। এর আগে গত সেপ্টেম্বর মাসে শেষবার আইসিসের বিরুদ্ধে ব্রিটিশরা বিমান হামলা করেছিল। ব্রিটেনের ‘মর্নিং স্টার’ পত্রিকা জানাচ্ছে যে, ব্রিটিশদের এই হামলার এক সপ্তাহ আগেই গত ৩রা এপ্রিল ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব ডমিনিক রাব জাতিসংঘের ডাকে সাড়া দিয়ে বিশ্বব্যাপী যুদ্ধবিরতিতে সমর্থন দেন। শান্তিবাদী এনজিও ‘পিস প্লেজ ইউনিয়ন’ অভিযোগ করে বলছে যে, ব্রিটিশ সরকার করোনাভাইরাসের আড়ালে চুপিসারে বোমাবর্ষণের কথা ঘোষণা করছে, যখন সকল মিডিয়ার দৃষ্টি মহামারির দিকে। ব্রিটিশ এই হামলার মাত্র চার দিন আগেই প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি হয়েছিলেন। হামলার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা সচিব বেন ওয়ালেস বলছেন যে, ব্রিটিশদের প্রতিরক্ষা কখনও ঘুমায় না। এবং তারা নিজেদের মানুষকে রক্ষা করতে যা করা দরকার তা-ই করবে।

ইরাকে হামলার দিনই ব্রিটিশ রয়াল নেভির ফ্রিগেট ‘আরগিল’ প্লাইমাউথের নৌঘাঁটি ছেড়ে যায়; উদ্দেশ্য মধ্যপ্রাচ্য এবং ভারত মহাসাগর। জাহাজটার নেতৃত্বে থাকা কমান্ডার এন্ড্রু আইন্সলি ব্রিটিশ পত্রিকা ‘দ্যা নিউজ’কে বলেন যে, এক বছরের কম সময় আগেই ‘আরগিল’ নয় মাসের মিশন শেষ করে দেশে ফিরেছিল। এবারে সাত মাসের মিশনে জাহাজটা মধ্যপ্রাচ্যে যাচ্ছে। ২০০২ সাল থেকে জাহাজটা পঞ্চম বারের মতো মধ্যপ্রাচ্যে যাচ্ছে; আর গত এক বছরের মাঝে এটা দ্বিতীয়বার। মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে ব্রিটেনের ফ্রিগেট ‘মনট্রোজ’ ছাড়াও চারটা মাইনহান্টার এবং একটা সাপ্লাই জাহাজ মোতায়েন রয়েছে। মার্চ মাসেই ডেস্ট্রয়ার ‘ডিফেন্ডার’ মধ্যপ্রাচ্যে মিশন শেষে দেশে ফিরে আসে। ‘আরগিল’ এই ‘ডিফেন্ডার’এর স্থান নিতে যাচ্ছে। ২৩শে এপ্রিল রয়াল নেভির এক বিবৃতিতে বলা হচ্ছে যে, সারাবিশ্ব লকডাউনে থাকলেও পারস্য উপসাগরে ব্রিটিশ মাইনহান্টারগুলি সমুদ্রপথ নিরাপদ রাখতে সর্বদা সমুদ্রে টহল দিয়ে যাচ্ছে। উপসাগরে নিজেদের অবস্থানকে সুসংহত করতে দু’টা মাইনহান্টার কুয়েতের নৌবাহিনীর সাথে একটা মহড়ায় অংশ নেয়। এর আগে ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং ওমানের সাথে যৌথ মহাড়ায় অংশ নেয় ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জাহাজগুলি।

২৪শে এপ্রিল ‘নেভাল টেকনলজি’ ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, রয়াল নেভি তাদের বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘কুইন এলিজাবেথ’কে সমুদ্রে ট্রেনিংএর জন্যে পাঠাতে চাইছে। সেই উদ্দেশ্যে সকল ক্রুকেই করোনাভাইরাস টেস্টিং এবং ১৪ দিনের কোয়ার‍্যান্টিনের মাঝ দিয়ে যেতে হবে। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন যে, মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘থিওডোর রুজভেল্ট’ এবং ফরাসী বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘শার্ল দ্য গল’এ করোনাভাইরাসের সংক্রমণের পর এমন একটা সময়ে ব্রিটেনের জন্যে তার বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের ট্রেনিং কতটা জরুরি। রয়াল নেভির কর্মকর্তারা বলছেন যে, সকল ধরনের প্রস্তুতিই তাদের থাকবে, যাতে সেই ধরনের কোন সমস্যা না হয়। মূলতঃ রয়াল নেভি ডিসেম্বর ২০২০এ নতুন এই জাহাজটার অপারেশনাল হবার সময় নির্ধারণ করেছে। সেই টাইমলাইন নিশ্চিত করতে গেলে মে মাসের শুরু থেকে প্রথম দফা ট্রেনিং শুরু করতে হবে। এরপর এবছরেই শেষবারের মতো ট্রেনিং সম্পন্ন করে মার্কিন ম্যারিন কোরের সাথে ‘এক্সারসাইজ জয়েন্ট ওয়ারিয়র’এ অংশ নেয়ার মাধ্যমে জাহাজটা অপারেশনাল হবার সার্টিফিকেট পাবে। তবে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে এই টাইমলাইন পিছিয়ে ২০২১ সালে চলে যেতে পারে। গত বছরের নভেম্বরে দিল্লীতে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত ডমিনিক এসকুইথ ঘোষণা দেন যে, ৭০টা বিমান বহণে সক্ষম যুদ্ধজাহাজ ‘কুইন এলিজাবেথ’এর প্রথম অপারেশনাল এলাকা হবে ভারত মহাসাগর। কাজেই এটা পরিষ্কার যে, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ব্রিটেন তার প্রভাব বাড়াবার কথা ভেবেই করোনাভাইরাসের লকডাউনের মাঝেই এই যুদ্ধজাহাজকে কর্মক্ষম করতে ট্রেনিং মিশনের আয়োজন করছে।
  
ফেব্রুয়ারি মাসে ভিয়েতনাম সফরে ব্রিটিশ রয়াল নেভির সার্ভে জাহাজ ‘এন্টারপ্রাইজ’। ‘এন্টারপ্রাইজ’ জাহাজটাকে যুদ্ধজাহাজের পর্যায়ে রাখবেন না অনেকেই। কিন্তু এই জাহাজটার মাধ্যমে ব্রিটেন পূর্ব এশিয়াতে তার প্রভাব ধরে রাখার কাজ করছে; বিশেষ করে করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারির সময়।

ইন্দো-প্যাসিফিক

গত জানুয়ারিতে ব্রিটেন ‘আসিয়ান’এর (এসোসিয়েশন অব সাউথ-ইস্ট এশিয়ান নেশনস) সাথে যোগাযোগ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে জাকার্তায় একটা অফিস খুলেছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হচ্ছে যে, বর্তমান সম্পর্ককে পুঁজি করে আসিয়ান এবং এর সদস্য রাষ্ট্রগুলির সাথে সহযোগিতার নতুন পথ বের করাই এই মিশনের কাজ। ব্রিটেনের সাথে আসিয়ানের বাৎসরিক বাণিজ্যের পরিমাণ এখন প্রায় ৪৬ বিলিয়ন ডলার। আসিয়ান দেশগুলি থেকে ৪০ হাজার শিক্ষার্থী ব্রিটেনে পড়াশুনা করছে। আর এখানকার ব্রিটিশ কাউন্সিল ৩৬ হাজার ইংরেজি শিক্ষক তৈরি করেছে। ‘নিকেই এশিয়ান রিভিউ’এর এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, ব্রিটেনের সাথে সম্পর্কোন্নয়ের মাধ্যমে আসিয়ান কৌশলগতভাবে লাভবান হতে পারে। ‘এশিয়া টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, চীন-মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝে ‘আসিয়ান’ সদস্য রাষ্ট্রগুলি নিজেদের নিরপেক্ষতা ধরে রাখতে হিমসিম খাবে। তাদেরকে বাধ্য করা হবে যেকোন একদিকে হেলে যেতে। এমতাবস্থায় অত্র অঞ্চলে ব্রিটেনের উপস্থিতিকে অনেকেই স্বাগত জানাতে পারেন।

গত ফেব্রুয়ারিতে পূর্ব এশিয়া সফর শুরু করার সময় ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব ডমিনিক রাব বলেন যে, ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’কে কর্মে পরিণত করার এটাই সময়। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রচুর সুযোগ রয়েছে; আর ব্রিটেনের বার্তা হলো, ব্রিটেন বাণিজ্যের জন্যে উন্মুক্ত। এই সফরে রাব অস্ট্রেলিয়া থেকে জাপানে যান; আর এরপর সিঙ্গাপুর এবং মালয়েশিয়া হয়ে সফর শেষ করেন। এই অঞ্চলে অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড ব্রিটিশ কমনওয়েলথের অংশ; আর সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং ব্রুনাইএর সাথে ব্রিটেনের নিরাপত্তা সম্পর্ক রয়েছে। ‘ফাইভ পাওয়ার ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট’এর সূত্র ধরে সিঙ্গাপুরে ব্রিটিশ সামরিক অবস্থান রয়েছে, যেটাকে ব্যবহার করে এই অঞ্চলে ব্রিটেন তার কৌশলগত স্বার্থ দেখাশুনা করে।

রয়াল নেভির সার্ভে জাহাজ ‘এন্টারপ্রাইজ’ অনেকদিন ধরেই পূর্ব এশিয়ার সমুদ্রে টহল দিচ্ছে; কিন্তু তা মিডিয়াতে খুব বেশি একটা আসেনি। গত নভেম্বরে জাহাজটা সিঙ্গাপুরে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ সেরে সেখান থেকে ডিসেম্বরে জাপান আর দক্ষিণ কোরিয়া সফর করে। তবে পথে ৭ই ডিসেম্বর জাহাজটা চীন এবং তাইওয়ানের মাঝের তাইওয়ান প্রণালী দিয়ে গিয়ে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রনীতিকে হাইলাইট করে; যা মিডিয়াতে প্রচারিত হয়। এই জাহাজটা ডিজাইন করা হয়েছে সারা বিশ্বের সমুদ্রে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করার জন্যে। এই তথ্য ব্রিটেনের সামরিক এবং বেসামরিক কাজে ব্যবহৃত হয়। জাহাজটা প্রায় সারা বছরই ব্রিটেন থেকে দূরে থাকতে পারে। জাহাজের কনসেপ্টের সাথেই ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’কে যুক্ত করা হয়েছে। জানুয়ারিতে আবারও সিঙ্গাপুরে ভ্রমণ শেষ করে ১৯শে ফেব্রুয়ারি ‘এন্টারপ্রাইজ’ ভিয়েতনামের হাই ফং বন্দরে এক সপ্তাহের শুভেচ্ছা সফর করে। চীনা সার্ভে জাহাজের সাথে যখন ভিয়েতনামের নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষ নিয়মিত সেখানে ব্রিটিশ সার্ভে জাহাজের জন্যে ভিয়েতনামের বন্দর উন্মুক্ত। ৯ই মার্চ জাহাজটা পুনরায় সিঙ্গাপুরে আসে রক্ষণাবেক্ষণের জন্যে। রক্ষণাবেক্ষণের কাজ শেষে প্রায় দেড় মাস পর ২১শে এপ্রিল জাহাজটা সিঙ্গাপুর ছেড়ে যায়। ‘এন্টারপ্রাইজ’ জাহাজটাকে যুদ্ধজাহাজের পর্যায়ে রাখবেন না অনেকেই। কিন্তু এই জাহাজটার মাধ্যমে ব্রিটেন পূর্ব এশিয়াতে তার প্রভাব ধরে রাখার কাজ করছে; বিশেষ করে করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারির সময়।
  
ইংলিশ চ্যানেলে ব্রিটিশ অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল ‘টাইন’ রুশ ‘স্টেরাগুশি-ক্লাস’ ফ্রিগেটের উপর নজর রাখছে। মার্চের শেষে রাশিয়ার ৭টা যুদ্ধজাহাজ ইংলিশ চ্যানেলের মাঝ দিয়ে যাওয়া শুরু করে। ইউরোপের নরওয়েতে ‘কোল্ড রেসপন্স’ মহড়া দেয়ার মাধ্যমে ব্রিটেন করোনাভাইরাসের দুর্যোগের মাঝেও রাশিয়াকে জবাব দিতে বাধ্য করেছে।

ইউরোপ


মার্চ মাসে নরওয়ের অতিশীতল উত্তরাঞ্চলে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনী ‘কোল্ড রেসপন্স ২০২০’ নামের মহড়ায় অংশ নেয়। অনেকগুলি দেশের প্রায় ১৫ হাজার সেনা এই মহড়ায় অংশ নেয়। তবে করোনাভাইরাসের লকডাউনের কারণে মহড়াটা সংক্ষিপ্ত করে ১১ই মার্চে শেষ করে দেয়া হয়। ব্রিটেনের সামরিক মিডিয়া ‘ফোর্সেস নেটওয়ার্ক’ জানাচ্ছে যে, প্রায় ২ হাজার ব্রিটিশ সেনা এই মহড়ায় অংশ নেয়। সরাসরি রাশিয়ার কথা বলা না হলেও নরওয়েকে নিরাপত্তা দেয়ার এই মহড়া যে রাশিয়াকে কেন্দ্র করেই তা বুঝতে বাকি থাকে না।

মার্চের শেষে রাশিয়ার ৭টা যুদ্ধজাহাজ ইংলিশ চ্যানেলের মাঝ দিয়ে যাওয়া শুরু করে। রুশ জাহাজগুলির মাঝে ছিল ৫টা ফ্রিগেট, ২টা ল্যান্ডিং শিপ; এবং এগুলির সহায়ক অক্সিলারি জাহাজ। ব্রিটিশ নৌবাহিনী জরুরি ভিত্তিতে তাদের ৯টা জাহাজকে সমুদ্রে প্রেরণ করে রুশ জাহাজগুলির উপর নজরদারি করার জন্যে। ব্রিটিশ জাহাজগুলির মাঝে ছিল ৪টা ফ্রিগেট, ২টা অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল, একটা সার্ভে জাহাজ এবং দু’টা সাপ্লাই জাহাজ। অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল ‘টাইন’এর এক্সিকিউটিভ অফিসার লেফটেন্যান্ট নিক ওয়ার্ড বলেন যে, বাকি সামরিক বাহিনী যেহেতু মহামারি ঠেকাতে ব্যস্ত, এখন এটা তাদের দায়িত্ব যে, ব্রিটেনের নিরাপত্তাকে তুলে ধরা। সামরিক বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা বলছে যে, রাশিয়া খুব সম্ভবতঃ ‘কোল্ড রেসপন্স’ মহড়ার জবাব হিসেবেই এতগুলি জাহাজ ইংলিশ চ্যানেল দিয়ে পার করিয়েছে।

পশ্চিম আফ্রিকা
সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিম আফ্রিকায় সংঘাত ভীষণভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। মালি থেকে এই সংঘাত এখন পার্শ্ববর্তী নিজের এবং বুরকিনা ফাসোকে ধরে বসেছে। আর সাত বছর আগে মালিতে ফরাসীরা সামরিক হস্তক্ষেপের পর থেকে সেখান থেকে বের হতে পারছে না তারা। মালিতে ফ্রান্সের রয়েছে ৫ হাজার সৈন্য। আর ইতোমধ্যেই সেখানে প্রায় ২’শ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীর মৃত্যু হয়েছে। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ বলছে যে, পশ্চিম আফ্রিকায় ফ্রান্সের এই যুদ্ধের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান যুদ্ধের মতো চিরতরে আটকে যাবার মতো দশা হয়েছে। এই অবস্থাটাই ব্রিটেনকে সুযোগ করে দিয়েছে আফ্রিকায় ফ্রান্সের প্রাক্তন ঔপনিবেশিক এলাকায় হস্তক্ষেপ করার। ‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, পশ্চিম আফ্রিকায় ব্রিটেন তার সামরিক উপস্থিতিকে অনেকটা বৃদ্ধি করতে চাইছে। মালিতে এবছরেই আড়াই’শ ব্রিটিশ সেনা মোতায়েন করার কথা রয়েছে। পশ্চিম আফ্রিকার ‘সাহেল’ অঞ্চলে ব্রিটিশ সেনারা পুরো ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে আফ্রিকান সেনাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। সেনেগালে ৩০ জন ব্রিটিশ সেনা ক্যামেরুন, মরক্কো, নাইজেরিয়াসহ কয়েকটা পশ্চিম আফ্রিকার দেশের স্পেশাল ফোর্সের সেনাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। সেনাগালে ব্রিটিশ সেনা অফিসার মেজর জন হাউজ বলছেন যে, ব্রিটেনের নিজস্ব স্বার্থেই তারা এই অঞ্চলে বেশি করে জড়িত হচ্ছেন। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ‘স্পেশালাইজড ইনফ্যান্ট্রি গ্রুপ’এর ব্রিগেডিয়ার গাস ফেয়ার মনে করছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে দীর্ঘ সময়ের জন্যে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, সেটা ব্রিটেনের ক্ষেত্রে হবে না। কারণ ব্রিটেন তার সার্বভৌম শক্তিকে সরাসরি এখানে জড়াতে চাইছে না। ব্রিটেন চাইছে অত্র এলাকার দেশগুলিই তাদের সমস্যার সমাধান করুক।

ব্রিগেডিয়ার ফেয়ারের কথায় এটা পরিষ্কার যে, ব্রিটেন সাহেলে তার অবস্থানকে দৃঢ়তর করলেও সেই দেশগুলির দায়িত্ব সে নিতে চাইছে না। তবে তার প্রভাব বৃদ্ধির চেষ্টাটাও সে অব্যহত রাখতে চাইছে। ৭ই এপ্রিল জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে মালির পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় জাতিসংঘে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত জেমস রসকো মালিতে গত তিন মাসের ঘটনাবলির ব্যাপারে ব্রিটিশ সরকারের অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন যে, মালিতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সকল পক্ষ তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে না। তবে পশ্চিম আফ্রিকার খারাপ পরিস্থিতির মাঝে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে সেখানে এক কোটি ৩৮ লক্ষ মানুষ খাদ্যাভাবে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই লক্ষ্যে ব্রিটেন তার পার্টনারদের মাধ্যমে পশ্চিম আফ্রিকাতে তার সহায়তা বৃদ্ধি করছে। ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতের কথাতেও বোঝা যাচ্ছে যে, সাহেলে ব্রিটেন সামরিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাব বৃদ্ধি করতে চাইলেও ব্যর্থতার দায় অন্যের উপরে চাপাতে চাইছে। অর্থাৎ পশ্চিম আফ্রিকার, বিশেষ করে ফরাসী ভাষাভাষী প্রাক্তন ফরাসী ঔপনবেশিক এলাকার দায়িত্ব সে নিজের কাঁধে নিতে ইচ্ছুক নয়।
  
রয়াল নেভির একমাত্র হসপিটাল জাহাজ ‘আরগাস’। ২রা এপ্রিল জাহাজটা ক্যারিবিয়ানে ব্রিটিশ উপনিবেশগুলির উদ্দেশ্যে প্লাইমাউথ ছেড়ে যায়। মধ্য আমেরিকার কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে প্রভাব ধরে রাখতেই ব্রিটেন করোনা দুর্যোগের মাঝেও জাহাজটাকে ক্যারিবিয়ানে পাঠিয়েছে।

মধ্য আমেরিকা

২রা এপ্রিল ব্রিটিশ নৌবাহিনীর অক্সিলারি জাহাজ ‘আরগাস’ ক্যারিবিয়ানে ব্রিটিশ উপনিবেশগুলির উদ্দেশ্যে প্লাইমাউথ ছেড়ে যায়। ক্যারিবিয়ানে হারিকেন সিজন মোকাবিলা এবং করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সহায়তা দেবার জন্যে জাহাজটা সেখানে যাচ্ছে বলে ব্রিটিশ কর্মকর্তারা বলছেন। ব্রিটিশ মিডিয়া ‘কর্নওয়াল লাইভ’ বলছে যে, এই জাহাজটা ব্রিটেনের একমাত্র হসপিটাল জাহাজ। প্লাইমাউথের লেবার এমপি লিউক পলার্ড বলছেন যে, যদিও এই জাহাজটাকে ক্যারিবিয়ানে পাঠানোটা সঠিক সিদ্ধান্ত, তদুপরি জনগণ জিজ্ঞেস করবে যে, দেশের একমাত্র হসপিটাল জাহাজটা লন্ডনের পাশে না থেকে কেন দূর দেশে যাচ্ছে। পলার্ড বলছেন যে, এটা দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ব্রিটেনের কাছে যথেষ্ট সংখ্যক জাহাজ নেই। তবে তার মতে, ব্রিটেনের পক্ষে জিব্রালটার, ফকল্যান্ডস এবং ক্যারিবিয়ানের মতো উপনিবেশগুলিকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। ‘দ্যা ম্যারিটাইম এক্সিকিউটিভ’এর এক প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে যে, এই জাহাজটায় ৭০ বেডের একটা হাসপাতাল থাকা সত্তেও এটা সশস্ত্র জাহাজ হবার কারণে এটাকে অফিশিয়ালি হসপিটাল জাহাজ বলা হয় না। ২০১৪ সালে পশ্চিম আফ্রিকার সিয়েরা লিওনে ইবোলা ভাইরাসের সংক্রমণের সময় এই জাহাজটাকে সেখানে পাঠানো হয়েছিল। মধ্য আমেরিকার কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে প্রভাব ধরে রাখতেই ব্রিটেন করোনা দুর্যোগের মাঝেও জাহাজটাকে ক্যারিবিয়ানে পাঠিয়েছে।

দক্ষিণ আমেরিকা

ব্রিটেনের ‘এক্সপ্রেস’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, এবছরের শুরুতেই ব্রিটিশ রয়াল নেভির প্যাট্রোল জাহাজ ‘ফোর্দ’ দক্ষিণ আমেরিকায় ব্রিটিশ উপনিবেশ ফকল্যান্ডস দ্বীপপুঞ্জে তার স্থায়ী মিশন শুরু করে। এপ্রিলের শুরুতেই জাহাজটা ফকল্যান্ডসের ১৩’শ কিঃমিঃ দক্ষিণ-পূর্বে সাউথ জর্জিয়া দ্বীপে টহল দিয়ে আসে। ২০শে এপ্রিল আর্জেন্টিনার সর্বদক্ষিণাঞ্চলের সচিব আন্দ্রেস দাখারি এক বিবৃতিতে ফকল্যান্ডসকে আলোচনায় নিয়ে আসেন। তিনি বলেন যে, সারা বিশ্ব যখন স্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থায় রয়েছে, তখন ব্রিটেন দক্ষিণ আটলান্টিকে তার সামরিক শক্তি প্রদর্শন করছে। দক্ষিণ আটলান্টিকের সামরিকীকরণের দিকেই ঝুঁকছে ব্রিটেন। রয়াল নেভির এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, জাহাজটা দক্ষিণ আটলান্টিকে ব্রিটিশ কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার নিক সইয়ারকে সহ দুই ডজন সৈন্য, বিমান বাহিনীর সদস্য এবং সরকারি কর্মকর্তাদের বহণ করে সাউথ জর্জিয়াতে নিয়ে যায়। আর্জেন্টিনার সচিবের কথার জবাব দিতে গিয়ে অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ এডমিরাল এলান ওয়েস্ট বলেন যে, ঐ সচিবের উচিৎ ‘মুখ ঘুরিয়ে লুকানো’ এবং ‘চুপ থাকা’। ‘দ্যা নিউজ’এর সাথে সাক্ষাতে ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ডস যুদ্ধে অংশ নেয়া এই এডমিরাল বলেন যে, আর্জেন্টিনার সচিব অস্ত্রের ভাষায় কথা বলছেন। আর যদি আর্জেন্টিনা দক্ষিণ আটলান্টিকে শান্তিই চায়, তাহলে অস্ত্রের ভাষায় কথা বলার কথা নয়।

করোনা দুর্যোগের মাঝেও ব্যস্ত রয়েছে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’

ইউরোপের নরওয়েতে ‘কোল্ড রেসপন্স’ মহড়া দেয়ার মাধ্যমে ব্রিটেন করোনাভাইরাসের দুর্যোগের মাঝেও রাশিয়াকে জবাব দিতে বাধ্য করেছে। দক্ষিণ আমেরিকাতে আর্জেন্টিনাকেও কথা বলাচ্ছে ব্রিটেন। সেনাবাহিনীর ১৩ হাজার সেনা কর্মক্ষেত্রে যোগ না দিতে পারলেও পশ্চিম আফ্রিকার প্রাক্তন ফরাসি উপনিবেশে সেনা মোতায়েনে অটল ব্রিটেন। লন্ডনে যখন করোনাভাইরাসে হাজারো মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে, তখন রয়াল নেভির একমাত্র হসপিটাল জাহাজ যাচ্ছে ক্যারিবিয়ানে। মহামারির কারণে জাতিসংঘের ডাকা বিশ্বব্যাপী যুদ্ধবিরতিতে সমর্থন দিয়েও ইরাকে বিমান হামলা করেছে ব্রিটেন। ভারত মহাসাগরে নতুন করে যুদ্ধজাহাজ প্রেরণ করাটাও থেমে থাকেনি। করোনা সংক্রমণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ফ্রান্সের তিক্ত অভিজ্ঞতাকে তুচ্ছ করেই ব্রিটেন তার বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজকে প্রস্তুত করছে ট্রেনিংএর জন্যে, যাতে সময়তো সেটাকে ভারত মহাসাগরে প্রেরণ করা যায়। পূর্ব এশিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে রয়াল নেভির সার্ভে জাহাজ; আর ব্রিটেনের কূটনীতিকে জাগিয়ে রাখছে সেখানে, যখন সকলেই লকডাউনে ঘরের ভেতর। ব্রিটেনের সামরিক সক্ষমতা সর্বদাই প্রশ্নের মুখে। কিন্তু এই ছোট্ট সক্ষমতাকে ব্যবহার করেই ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ বিশ্বব্যাপী তার প্রভাবকে বৃদ্ধি করতে চাইছে; যখন করোনা দুর্যোগে সকলেই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত; যখন সকলেই যুক্তরাষ্ট্র আর চীনের সংঘাত নিয়ে চিন্তিত। গত ফেব্রুয়ারি মাসে করোনাভাইরাসে বিশ্বব্যাপী মহামারি দেখা দেয়ার ঠিক আগে আগেই ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব ডমিনিক রাব পূর্ব এশিয়া সফর করে এই বার্তাই দিয়ে গেছেন।


Saturday, 25 April 2020

করোনা দুর্যোগের মাঝে চীনের সামনে এখন উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক

২৫শে এপ্রিল ২০২০   

ভারত মহাসাগরে রয়েছে মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘আইজেনহাওয়ার’। এই জাহাজগুলি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে ভাসমান সার্বভৌমত্ব। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে করোনাভাইরাসের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির অবক্ষয় অত্র অঞ্চলের ব্যালান্সকে সমস্যায় ফেলবে। এতে মার্কিন ‘বিশ্ব ব্যবস্থা’ যেমন হুমকির মাঝে পড়বে, তেমনি ভারত মহাসাগরে ব্যালান্সিং শক্তি হিসেবে অন্য দেশের আসার পথ উন্মুক্ত হবে।

উন্মুক্ত মহাসাগরে চীনা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ

১৪ই এপ্রিল ভারতীয় নৌবাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমনের মাঝেও তাদের ‘ইস্টার্ন নেভাল কমান্ড’এর অধীনে থাকা অন্ধ্র প্রদেশের ভিশাখাপত্নমে অবস্থিত ‘আইএনএস দেগা’ বিমান ঘাঁটি দিন রাত ২৪ ঘন্টা চালু রয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয় যে, তাদের ‘৩১১ নেভাল এয়ার স্কোয়াড্রন’এর ‘ডরনিয়ার ২২৮’ ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমানগুলি সর্বদা সমুদ্রের উপর দিয়ে টহল দিচ্ছে। আর একইসাথে নৌবাহিনীর অন্যান্য বিমানগুলিকেও যেকোন মিশনের জন্যে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এই বিবৃতি এমন সময়ে এলো, যখন ৮ই এপ্রিল থেকে চীনা নৌবাহিনীর বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘লিয়াওনিং’ পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অজানা মিশনে বের হয়েছে। করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারীর মাঝে যেখানে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় আর কোন দেশের বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজই অপারেট করছে না, তখন চীনা নৌবাহিনীর এই মিশন অনেককেই চিন্তিত করেছে। মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘থিওডোর রুজভেল্ট’এ ৮’শর বেশি নাবিক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হবার পর জাহাজখানা এখন মার্কিন ঘাঁটি গুয়ামে বসে রয়েছে। আরেকটা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘রোনাল্ড রেগ্যান’ও করোনা সংক্রমণের কারণে জাপানের ইয়োকোসুকা নৌঘাঁটিতে বসে রয়েছে। এপ্রিলের শুরুতে পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন রাজ্যে অবস্থিত ব্রেমারটন নৌঘাঁটিতে বসে থাকা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘নিমিতজ’এও করোনা সংক্রমণ পাওয়া গেছে বলে মিডিয়াতে রিপোর্ট এসেছে।

১৩ই এপ্রিল ‘লিয়াওনিং’ জাপানের ওকিনাওয়া দ্বীপ এবং তাইওয়ানের মাঝে অবস্থিত ‘মিয়াকো প্রণালী’ অতিক্রম করে তাইওয়ানের পূর্ব উপকূল ঘেঁষে দক্ষিণ চীন সাগরের দিকে যাত্রা করে। কিন্তু ২২শে এপ্রিল জাহাজখানা দিক পরিবর্তন করে তাইওয়ান এবং ফিলিপাইনের মাঝে অবস্থিত বাশি চ্যানেল পার হয়ে পূর্বদিকে প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে যাত্রা করে বলে বলছে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। জাহাজটার মিশন সম্পর্কে কেউই কিছু বলতে পারছেন না। জাহাজটা প্রশান্ত মহাসাগরেই থাকবে, নাকি ইন্দোনেশিয়ার প্রণালীগুলি পার হয়ে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আসবে তা পরিষ্কার নয়। জাহাজটার সাথে রয়েছে দু’টা ডেস্ট্রয়ার, দু’টা ফ্রিগেট এবং একটা সাপ্লাই জাহাজ। ক’দিন আগেই দক্ষিণ চীন সাগরে মালয়েশিয়ার সাথে চীনের উত্তেজনার ঘটনা ঘটেছে। বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজগুলির অবর্তমানে অত্র এলাকায় মার্কিন শক্তিশালী ইউনিট হলো এম্ফিবিয়াস এসল্ট জাহাজ ‘আমেরিকা’, যা কিনা অত্যাধুনিক ‘এফ-৩৫বি লাইটনিং’ স্টেলথ যুদ্ধবিমান বহণ করছে। মালয়েশিয়ার সাথে উত্তেজনার সময় ‘আমেরিকা’ এবং এর সাথে মার্কিন ও অস্ট্রেলিয় মোট তিনটা যুদ্ধজাহাজ দক্ষিণ চীন সাগরে ছুটে যায়। এরপর ২৪শে এপ্রিল এই গ্রুপে থাকা ডেস্ট্রয়ার ‘ব্যারি’ একমাসে দ্বিতীয়বারের মতো চীন এবং তাইওয়ানের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত তাইওয়ান প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করে। চীনকে উত্তক্ত্য করার এই পদ্ধতি এর আগে বহুবার অনুসরণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এবারে মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজগুলির অনুপস্থিতিতে চীনা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের সমুদ্রে মিশন শুরু করাটা অন্য ধরনের উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে, যা এর আগে কখনোই ঘটেনি।
 
ড্রাইডকে বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘নিমিতজ’। মার্কিন নৌবাহিনীর ১১টা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ থাকলেও এই মুহুর্তে মাত্র ২টা পুরোপুরি কর্মক্ষম রয়েছে। ভারত মহাসাগরে রয়েছে ‘আইজেনহাওয়ার’ এবং পাঁচ মাসের মিশন থেকে ফিরে বন্দরে না ভিড়ে আটলান্টিকে ঘুরছে ‘হ্যারি ট্রুম্যান’।

চাপের মুখে মার্কিন নৌশক্তি


মধ্যপ্রাচ্য এবং ভূমধ্যসাগরে প্রায় পাঁচ মাসের মিশন শেষ করে দেশে ফেরত গেলেও বন্দরে না ভিড়ে বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘হ্যারি ট্রুম্যান’কে আপাততঃ আটলান্টিক মহাসাগরে থাকতে বলা হয়েছে। মার্কিন নৌবাহিনীর দ্বিতীয় নৌবহরের প্রধান ভাইস এডমিরাল উডি লুইস বলেন যে, তারা এখনও জানেন না যে এই জাহাজের মিশন কি হতে পারে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের একজন প্রাক্তন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ‘ফরেন পলিসি’ ম্যাগাজিন বলছে যে, এই জাহাজটাকে প্রশান্ত মহাসাগরে পাঠানো হতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের এশিয়া-কেন্দ্রিক চিন্তার অংশ হিসেবে চীনা অধিপত্যবাদকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার কারণে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দু’টা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছিল। ‘হ্যারি ট্রুম্যান’ জাহাজটাকে সেখান থেকেই সরিয়ে আনা হয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান জেনারেল কেনেথ ম্যাকেঞ্জি মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজগুলির গুরুত্ব তুলে ধরে সাংবাদিকদের বলেন যে, বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের রয়েছে বিশাল আক্রমণ এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা; এটাকে যেকোন স্থানে নিয়ে যাওয়া যায়। তিনি বলেন যে, এই জাহাজগুলি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে ভাসমান সার্বভৌমত্ব।

মার্কিন নৌবাহিনীর ১১টা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ রয়েছে। এর মাঝে ৩টা জাহাজ দীর্ঘ সময়ের জন্যে ড্রাইডকে থাকবে। ‘জর্জ ওয়াশিংটন’ এবং ‘জন সি স্টেনিস’ বর্তমানে ‘রিফুয়েলিং এন্ড কমপ্লেক্স ওভারহল’এর মাঝে রয়েছে, যা শেষ হতে কয়েক বছর লেগে যাবে। ‘জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ’ গত ফেব্রুয়ারিতে ২৮ মাসের জন্যে ‘ড্রাইডকিং প্ল্যান্ড ইনক্রিমেন্টাল এভেইল্যাবিলিটি’ নামের রক্ষণাবেক্ষণ কাজে ঢুকেছে। সম্পূর্ণ নতুন ডিজাইনের ‘জেরাল্ড আর ফোর্ড’ এখনও টেস্টিং পর্যায়ে রয়েছে; এর অপারেশনে আসতে আরও কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। পশ্চিম উপকূলে ‘কার্ল ভিনসন’ ১৪ মাসের রক্ষণাবেক্ষণের পর মাত্র পানিতে নেমেছে; পুরোপুরিভাবে সার্ভিসে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে এখন। ‘আব্রাহাম লিংকন’ গত জানুয়ারিতেই সান ডিয়েগোতে ফেরত এসেছে। অন্য বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের অভাব থাকায় ‘লিংকন’ জাহাজের ক্রুদের ১০ মাস মিশনে থাকতে হয়েছিল। করোনা ইস্যুতে জাপানে বসে রয়েছে ‘রোনাল্ড রেগ্যান’ এবং গুয়ামে বসে আছে ‘থিওডোর রুজভেল্ট’। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে মিশনের জন্যে প্রস্তুতি নিতে থাকা ‘নিমিতজ’এও করোনা সংক্রমণ পাওয়া গিয়েছে বলে মিডিয়ায় খবর আসে। তাই এখন ‘নিমিতজ’ এবং এর নিরাপত্তায় থাকা জাহাজগুলির মোট ৮ হাজার নাবিককে করোনাভাইরাসের টেস্ট এবং কোয়ার‍্যান্টিনের মাঝ দিয়ে যেতে হচ্ছে। সুতরাং এই মুহুর্তে ১১টা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের মাঝে মাত্র ২টা পুরোপুরি কর্মক্ষম রয়েছে। ভারত মহাসাগরে রয়েছে ‘আইজেনহাওয়ার’ এবং পাঁচ মাসের মিশন থেকে ফিরে বন্দরে না ভিড়ে আটলান্টিকে ঘুরছে ‘হ্যারি ট্রুম্যান’।
 
চীনা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ 'লিয়াওনিং'। ভারত এটা বুঝতে পারছে যে, চীন তার সমুদ্রপথের নিরাপত্তা দিতে ভারত মহাসাগরে পদার্পণ করবেই। আর একারণেই চীনা বিমানবাহী জাহাজ প্রশান্ত মহাসাগরে ঘুরে বেড়াচ্ছে খবর পাওয়া মাত্রই ভারতীয় বিমান বঙ্গোপসাগরের উপর মহড়া দেয়া শুরু করেছে। অন্যদিকে চীনও মেনে নিচ্ছে যে, ভারত মহাসাগরে ভারতের প্রভাব থাকবেই; তাই ভারতের সাথে তার প্রতিযোগিতা অনিবার্য।

চিন্তিত ভারত

জানুয়ারি মাসে ভারতের নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল কারামবির সিং বলেছিলেন যে, ভারত মহাসাগরে যেকোন সময়ে সাত থেকে আটটা চীনা যুদ্ধজাহাজ অপারেট করে। ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ আয়োজিত ভূরাজনীতি বিষয়ক কনফারেন্স ‘রাইসিনা ডায়ালগ’এ কথা বলতে গিয়ে এডমিরাল সিং আরও বলেন যে, কেউ যদি ভারতের এলাকায় অপারেট করতে চায়, তাহলে তাকে আগে ভারতকে জানাতে হবে। এডমিরাং সিংএর চিন্তার কারণ শুধু চীনা নৌবাহিনীর আনাগোণা নয়। ভারত মহাসাগরে চীনারা সবচাইতে বেশি সহায়তা পাচ্ছে পাকিস্তানের কাছ থেকে। ‘ফোর্বস’ ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে স্যাটেলাইট ইমেজের মাধ্যমে দেখানো হচ্ছে যে, গত জানুয়ারিতে পাকিস্তানের উপকূলে চীনাদের সাথে যৌথ সামরিক মহড়া ‘সী গার্ডিয়ান ২০২০’এর সময় চীনা যুদ্ধজাহাজগুলি পাকিস্তানের করাচি বন্দরেই অবস্থান নিয়েছিল। একটা ডেস্ট্রয়ার, একটা ফ্রিগেট, একটা সাপ্লাই জাহাজ এবং একটা সাবমেরিন রেসকিউ জাহাজসহ ৫টা চীনা জাহাজ এই মহড়ায় অংশ নেয়। আর এই মহড়াকে কাছে থেকে উপলব্ধি করার জন্যে ভারতীয় নৌবাহিনী তাদের বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘বিক্রমাদিত্য’কে আরব সাগরে মোতায়েন করে। চীনা নৌবাহিনীর এই জাহাজগুলি হলো ৩৪তম এসকর্ট টাস্ক ফোর্সের অংশ। জানুয়ারির ২০ তারিখের দিকে জাহাজগুলি কৌশলগত বাব-এল মান্ডেব প্রণালীর পাশে জিবুতিতে তাদের নৌঘাঁটিতে পৌঁছায়।

করোনাভাইরাস মোকাবিলায় এশিয়া এবং আফ্রিকার দেশগুলিতে চীনারা মেডিক্যাল সহায়তা দেবার কারণে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজের প্রভাব ধরে রাখতে ব্যাপক চাপের মাঝে পড়েছে ভারত। এপ্রিলের ১৫ তারিখ থেকে ভারতের দক্ষিণের তামিলনাড়ুর থাঞ্জাভুর বিমান ঘাঁটি থেকে বঙ্গোপসাগরে মাসব্যাপী মহড়া শুরু করেছে ভারতীয় বিমান বাহিনী। বিমান থেকে বিমানে রিফুয়েলিং বা জ্বালানি সরবরাহে সক্ষম ‘ইলিউশিন ৭৮এমকেআই’ বিমান এই ঘাঁটিতে মোতায়েন করা হয়েছে বলে বলছে অনলাইন প্লেন স্পটাররা। নিরাপত্তা বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘আইএইচএস জেনস’ বলছে যে, ২০শে জানুয়ারি ভারতীয় বিমান বাহিনী এই ‘থাঞ্জাভুর’ ঘাঁটিতে ‘সুখোই-৩০এমকেআই’ বিমানের ‘২২২তম স্কোয়াড্রন’ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্ভোধন করে। দক্ষিণ ভারতে সুখোই বিমানের একমাত্র এই স্কোয়াড্রন সুপারসনিক জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ‘ব্রাহমোস’ বহণে সক্ষম। রুশ নির্মিত ২৮ফুট লম্বা এবং আড়াই টন ওজনের প্রায় ৩’শ কিঃমিঃ পাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্রকে যেকোন জাহাজের জন্যেই ধ্বংস করাটা কঠিন। আর এর ২’শ কেজি ওয়ারহেডের পক্ষে বিশাল জাহাজও ঘায়েল করা সম্ভব। ২০২১ সালের মাঝে এই স্কোয়াড্রনে ১৮টা সুখোই মোতায়েন করার কথা রয়েছে; যার মাঝে ৮টা বিমান ব্রাহমোস বহণ করতে পারবে। করোনা পরিস্থিতিতে চীনা নৌবাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধিই খুব সম্ভবতঃ থাঞ্জাভুরে মহড়ার কারণ। বিমান থেকে বিমানে রিফুয়েলিং করতে পারলে থাঞ্জাভুরের সুখোই বিমানগুলি ভারত মহাসাগরের একটা বড় এলাকা টহল দিতে পারবে। ভারতীয় নৌবাহিনীর মার্কিন নির্মিত ম্যারিটাইম দূরপাল্লার প্যাট্রোল বিমান ‘পি-৮আই নেপচুন’ বিমানও নিয়মিত টহল দিচ্ছে বঙ্গোপসাগরের উপর দিয়ে। ১৪ই এপ্রিল ইন্দো-প্যাসিফিকে চীনের প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় ভারতের অনুরোধে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুততার সাথে এই বিমানগুলিতে ব্যবহারের জন্যে ভারতের কাছে ১০টা ‘হারপুন’ জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১৬টা সাবমেরিন-ধ্বংসী ‘মার্ক ৫৪’ লাইটওয়েট টর্পেডো বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে। ২৪শে এপ্রিল ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং ভারতের সামরিক নেতৃবৃন্দের সাথে জরুরি বৈঠক করেন। তিনি হুঁশিয়ারি দেন যে, করোনাভাইরাস ঠেকাতে ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যস্ততার মাঝে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিরা যেন নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি না করতে পারে। বৈঠকে জম্মু-কাশ্মিরের বর্তমান অবস্থা আলোচনা করা ছাড়াও চীনের সাথে ভারতের সীমানা এবং ভারত মহাসাগরে চীনা নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিনের আনাগোণা বৃদ্ধি নিয়ে কথা হয় বলে বলছে ভারতের গণমাধ্যম ‘পিটিআই’। বৈঠকে অভিযোগ করে বলা হয় যে, পাকিস্তান গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ‘লাইন অব কন্ট্রোল’ বরাবর যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে এবং ভারতী অধিকৃত কাশ্মিরে জঙ্গীদের ঢুকিয়ে দিচ্ছে। এর ক’দিন আগেই জম্মু-কাশ্মিরের পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেল দিলবাগ সিং অভিযোগ করেন যে, পাকিস্তান করোনা আক্রান্ত জঙ্গীদের ভারত অধিকৃত কাশ্মিরে ঢুকিয়ে দিচ্ছে যাতে এখানকার মানুষও করোনা আক্রান্ত হয়। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে দিলবাগ সিংকে সমর্থন করে একটা বিবৃতিও দেয়া হয়।
 
ভারতীয় নৌবাহিনীর মার্কিন নির্মিত ‘পি-৮আই’ ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান। ইন্দো-প্যাসিফিকে চীনের প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় ভারতের অনুরোধে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুততার সাথে এই বিমানগুলিতে ব্যবহারের জন্যে ভারতের কাছে ‘হারপুন’ জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং সাবমেরিন-ধ্বংসী ‘মার্ক ৫৪’ লাইটওয়েট টর্পেডো বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে।

গত বছরের মে মাসেই ভারতীয় নৌবাহিনী ফ্রান্সের বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘শার্ল দ্য গল’এর সাথে যৌথ মহড়ায় অংশ নেয়। প্রায় একইসাথে ভারতীয়রা জাপানের বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘ইজুমো’ এবং অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজের সাথে যৌথ মহড়ায় অংশ নেয়। কিন্তু সেই সময়গুলি ছিল ভারতের জন্যে অপেক্ষাকৃত ভালো সময়; শক্তিশালী বন্ধুরা ছিল ভারতকে সহায়তা দেবার জন্যে। এখন করোনা দুর্যোগের কারণে ১১টা মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের মাঝে মাত্র ২টা সমুদ্রে অপারেশনে রয়েছে; আর তন্মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণভাবে ভারত মহাসাগরে রয়েছে একটা। আরব সাগরের কাছাকাছি রয়েছে মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘আইজেনহাওয়ার’। এছাড়াও জানুয়ারি থেকে এই অঞ্চলে মোতায়েন রয়েছে এম্ফিবিয়াস এসল্ট জাহাজ ‘বাটান’। চীনা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ভারত মহাসাগরে ঢুকুক বা না ঢুকুক, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে ইতোমধ্যেই তা রাজত্ব করে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। বিশাল মার্কিন নৌবহরের এই অসহায়ত্ব ভারতকেও বিচলিত করেছে। একারণেই ভারত চাইছে চীনের পথ অনুসরণ করে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় নিজের আঞ্চলিক প্রভাবকে দ্রুত ঝালাই করে নিতে।

চীনের ‘ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটি’র এসোসিয়েট প্রফেসর ঝাও ইয়ি বেইজিংএ ভারতীয় সাংবাদিকদেরকে সরাসরিই বলেন যে, চীন ভারত মহাসাগরকে নিরাপদ রাখতে ভারতের বিশেষ ভূমিকাকে মেনে নেয়। তবে ভারত মহাসাগরের মতো উন্মুক্ত এক মহাসাগরকে ভারতের ‘উঠান’ বলাটা একেবারেই সমীচিন নয়। সুইডিশ সাংবাদিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক বার্টিল লিন্টনার ‘এশিয়া টাইমস’এর এক লেখায় বলছেন যে, চীন চাইছে না যে কোন একটা শক্তি ভারত মহাসাগরকে নিয়ন্ত্রণ করুক। চীনের জ্বালানি, খনিজ এবং রপ্তানি পণ্যের মূল সমুদ্রপথ এখন ভারত মহাসাগর। আর তাই এই সমুদ্রপথের নিরাপত্তা দেয়ার চেষ্টা না করাটাই বরং বেইজিংএর জন্যে হ্রস্বদৃষ্টির পরিচায়ক হবে। করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারির মাঝে চীনের এই প্রচেষ্টা শুধু চলছেই না, বাড়তেও পারে। লিন্টনারের কথা ধরেই বলা যায় যে, ভারত এটা বুঝতে পারছে যে, চীন তার সমুদ্রপথের নিরাপত্তা দিতে ভারত মহাসাগরে পদার্পণ করবেই। আর একারণেই চীনা বিমানবাহী জাহাজ প্রশান্ত মহাসাগরে ঘুরে বেড়াচ্ছে খবর পাওয়া মাত্রই ভারতীয় বিমান বঙ্গোপসাগরের উপর মহড়া দেয়া শুরু করেছে। অন্যদিকে চীনও মেনে নিচ্ছে যে, ভারত মহাসাগরে ভারতের প্রভাব থাকবেই; তাই ভারতের সাথে তার প্রতিযোগিতা অনিবার্য। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আলাদা। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী সামরিক অবস্থান মানেই হলো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ‘ব্যবস্থা’ বজায় থাকা। ভারত-চীনের প্রতিযোগিতার মাঝে অত্র অঞ্চলের ছোট দেশগুলি ব্যালান্সিং পাওয়ার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের দিকেই চেয়ে থাকবে। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির অবক্ষয় এই ব্যালান্সকে সমস্যায় ফেলবে। এতে মার্কিন ‘বিশ্ব ব্যবস্থা’ যেমন হুমকির মাঝে পড়বে, তেমনি ভারত মহাসাগরে ব্যালান্সিং শক্তি হিসেবে অন্য দেশের আসার পথ উন্মুক্ত হবে। তবে এই অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পেতেই অত্র অঞ্চলের দেশগুলি নিজেদের শক্তি বৃদ্ধিতে মনোনিবেশ করতে পারে। এতে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির সাথেসাথে সরাসরি সংঘাতের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পাবে।