Showing posts with label material. Show all posts
Showing posts with label material. Show all posts

Tuesday, 7 March 2017

শক্তিশালী রাষ্ট্রের শক্তিশালী পাট চাই

০৭ মার্চ ২০১৭

https://s3-eu-central-1.amazonaws.com/centaur-wp/theengineer/prod/content/uploads/2012/06/25093400/24-26-Merc-fibre.gif
মার্সিডিস গাড়িতে ব্যবহার করা ন্যাচারাল ফাইবারের কম্পোনেন্টগুলি। ন্যাচারাল ফাইবার হিসেবে পাটের নামকে উপরে তুলে ধরতে জুট-কম্পোজিট ম্যাটেরিয়াল তৈরি এবং ব্যবহার করতে হবে। বাংলাদেশের পাটের উপরে অন্য দেশ উন্নত হবে - এই চিন্তার দিন শেষ।


জাতীয় পাট দিবস পালিত হয়ে গেল মাত্র। অনেক কথা হলো পাট নিয়ে, কিন্তু পাটকে বিশ্বের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ফাইবারে পরিণত করার কোন প্রয়াস দেখা গেলো না, যদিও এটা পাটের প্রাপ্য সন্মান এবং একুশ শতকের অদম্য বাংলাদেশের জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ। পাটের গুরুত্ব বুঝতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে ফাইবারের (বা আঁশের বা তন্তুর) আধুনিক ব্যবহার কোন ক্ষেত্রে। ফাইবার হলো বিল্ডিং তৈরির রডের মতো; কংক্রীটকে একত্রে ধরে রাখে এবং শক্তিশালী করে। অনেকটা কংকালের মতো। এভাবে রড যেমত বিল্ডিং এবং অনান্য অবকাঠামো তৈরিতে ব্যবহৃত হয়, তেমনি ফাইবার ব্যবহৃত হয় বিভিন্ন আকৃতির বস্তু তৈরিতে। কংক্রীট যেমন ভেজা অবস্থায় নরম থাকে এবং শুকিয়ে গেলেই শক্ত হয়ে যায়, তেমনি রেজিন ব্যবহার করা হয় ফাইবারের সাথে, যা শুকিয়ে গেলেই যেকোন মোল্ডের আকৃতি নিয়ে নেয়। এক্ষেত্রে এই আকৃতিকে শক্তিশালী করে ফাইবার। সবচাইতে বেশি ব্যবহৃত ফাইবার গ্লাস-ফাইবার হলেও এটা কৃত্রিম ফাইবার, যা তৈরি করতে হলে বিশেষ কিছু কাঁচামাল লাগে, যা আহরণ করতে হয়। তবে প্রাকৃতিক ফাইবার ফসলের খেতে উৎপাদন করা যায়, যা একটি বিরাট সুবিধা। ন্যাচারাল ফাইবারের আরও একটি ব্যাপার হলো, এটি বিশেষ কিছু এলাকায় ভালো জন্মে। তাই ন্যাচারাল ফাইবার সাধারণতঃ বিশ্বের কিছু দেশের কাছে সম্পদ হিসেবে থাকে। পাট হলো এমনই এক ন্যাচারাল ফাইবার। পৃথিবীর অন্যান্য স্থানে পাট উৎপাদন হলেও বাংলাদেশের পাট বিশ্বের সবচাইতে উন্নতমানের পাট। একারণেই “গোল্ডেন ফাইবার” কথাটি শুধু এই দেশেই প্রচলিত।


https://tibotaratari.files.wordpress.com/2010/10/ambulance.jpg
পাটের কম্পোজিট থেকে কি কি তৈরি হয়, সেটা অনেকেই জানেন না। বাংলাদেশেই পাট থেকে নৌযান তৈরি হচ্ছে।


পাটের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কম হয়নি। কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় বিশ্বশক্তিরা সর্বদাই খেয়াল রেখেছে যেন এই ফসলটি ব্যবহার করে কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ কোন পণ্য তৈরি করা না হয়। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে বাংলাদেশকে অর্থ দিয়েছে জুটমিল বন্ধ করার জন্যে। একইসাথে ভারতকে অর্থ দিয়েছে নতুন করে জুটমিল খোলার জন্যে, যাতে বাংলাদেশে উৎপন্ন কাঁচাপাট ভারতের কারখানায় ব্যবহৃত হয়। এতে বাংলাদেশে যেমন কৌশলগত কোন পণ্য তৈরি হতে পারবে না, তেমনি ভারতের উপরে বাংলাদেশ নির্ভরশীল থাকবে রপ্তানি আয়ের জন্যে। শুধু তা-ই নয়, যেখানে বিশ্বের সবচাইতে ভালো মানের পাট উৎপাদন হয় বাংলাদেশে, সেখানে বর্তমানে প্রায় সকল পাটের বীজ আসে ভারত থেকে!! এই বাস্তবতা তৈরি করা হয়েছে ভালো মানের পাটের উৎপাদন বন্ধ করার জন্যে। ভারতের পাটের আঁশ হয় মোটা; আর বাংলাদেশের পাটের আঁশ হয় সরু। সরু আঁশ থেকে তৈরি পণ্যের বৈচিত্র্য এবং মান অনেক বেশি ভালো হবে। উন্নত প্রযুক্তির পণ্য উৎপাদন ভারতের মাঝে সীমাবদ্ধ রাখার উদ্দেশ্য থেকেই এটা করা হয়েছে। পশ্চিমারা জানে যে ভারত পাটের সর্বাধিক ব্যবহার কোনদিনই করতে সক্ষম হবে না, কারণ কাঁচা পাটের জন্যে ভারত বাংলাদেশের উপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ যখন নিজ দেশে পাটের বস্তার বাধ্যতামূলক ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছিল, তখন ভারতীয়রা বাধা দিয়েছিল। তারা বলছিল যে এটা বাস্তসম্মত সিদ্ধান্ত হবে না। অথত ভারতে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হচ্ছে প্রায় তিন দশক ধরে!! এরপরেও বাংলাদেশের কিছু তথাকথিত বুদ্ধিজীবি এবং তথাকথিত গবেষণা সংস্থা পাটের উন্নয়নে ভারতের সাথে একত্রিত হয়ে কাজ করার কথা বলে থাকে!!

 
বাংলাদেশেই তৈরি হয়েছে গ্লাস-ফাইবারের জাহাজ। তবে এক্ষেত্রে পাটের মতো ন্যাচারাল ফাইবারের ব্যবহার যেতো কিনা, তা নিয়ে গবেষণা হতে পারে। অন্ততঃ পশ্চিমারা যদি গাড়ির ভেতএর কম্পোনেন্ট পাট দিয়ে তৈরি করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশে জাহাজের অভ্যন্তরে পাটের ব্যবহার হতেই পারে।

একুশ শতকের অদম্য বাংলাদেশ গড়তে যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের ষড়যন্ত্রের জাল থেকে বের হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। একুশ শতকের পণ্য উৎপাদনই হবে পাট চাষের উদ্দেশ্য। মোটরগাড়ি, জাহাজ, বিমান, উইন্ডমিল, ঘর-বাড়ি, ফার্নিচার, ইত্যাদি তৈরিতে ন্যাচারাল ফাইবার ব্যবহৃত হচ্ছে। জার্মানিতে ভারতের সহায়তায় পাটের প্রযুক্তিগত ব্যবহারে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা জার্মানিতে গিয়ে তাদের জন্যে উন্নত প্রযুক্তিকে উন্নততর করেছেন, যাতে বাংলাদেশ থেকে শুধুই কাঁচা পাট রপ্তানি হয় এবং কৌশলগত পণ্যের ইন্ডাস্ট্রি কখনোই গড়ে না ওঠে। তবে এই কৌশলগত পণ্য বলতে কিন্তু উন্নত ধরনের কাপড়, ব্যাগ, জুতা, বস্তা এগুলি বোঝায় না। এগুলি তৈরি হবে অবশ্যই। কিন্তু একুশ শতকের একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র এগুলির উপরে নির্ভর করে তৈরি হবে না। পাটের কাপড় গুরুত্বপূর্ণ হবে যদি এটা দিয়ে প্যারাশুট তৈরি করা যায়, কম্পোজিট ম্যাটেরিয়াল তৈরি করা যায়, জাহাজ-গাড়ি-বিমান তৈরি করা যায়। বাংলাদেশের পাটের উপরে পশ্চিমারা এসব উন্নত জিনিসপত্র তৈরি করে সেগুলি আবার বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রণ করতেই ব্যবহার করবে, আর এদেশের মানুষ সেটা নিয়ে “গর্ববোধ” করবো, সেই দিন আর নেই! তাদের দেশে গিয়ে তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের দিনও শেষ। এখন প্রযুক্তি দরকার এখানে, এবং দ্রুত। এখানে দরকার মেধা। মেধা হলো শক্তিশালী হবার জন্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান; এটা রপ্তানিযোগ্য নয়।

পাট তার সন্মান ফিরে পাবে, যখন পাটের তৈরি পণ্য একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র তৈরিতে সাহায্য করবে। রাষ্ট্র সন্মান পেলে পাটও পাবে। রাষ্ট্রের লক্ষ্যের সাথে পাটের লক্ষ্যের সমন্বয় ঘটাতে হবে। রাষ্ট্রের চিন্তাকে পাট প্রতিষ্ঠা করবে; রক্ষা করবে এবং বিশ্বে ছড়িয়ে দেবে। এটাই হবে পাটের উদ্দেশ্য। পাটের পণ্য দেখলে মানুষ যেন বোঝে যে এই পণ্য এসেছে এমন এক রাষ্ট্র থেকে, যার সামর্থ্য নিয়ে কারো মাঝে দ্বিমত নেই। পণ্যই যেন রাষ্ট্রের শক্তিকে তুলে ধরে। একুশ শতকে “শক্তিশালী পাট” চাই।

“Jute is Power!”

Wednesday, 9 November 2016

হুভার ড্যাম এবং পদ্মা সেতু - "Strategic Springboard'

১০ই নভেম্বর ২০১৬

  
হুভার ড্যাম তৈরি করেছিল সেই আমেরিকা, যা কিনা ড্যাম তৈরি করার পাঁচ বছরের মাথায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগ দিয়েছিল, এবং আরও চার বছরের মাথায় পৃথিবীর সবচাইতে শক্তিশালী দেশরূপে আবির্ভূত হয়েছিল। এই স্থাপনা মার্কিনীদের material power-এর সক্ষমতার জানান দিয়েছিল। আর মার্কিনীরাও তাদের ক্ষমতাকে নতুন করে টের পেয়েছিল।


যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো নদীর উপরে ১৯৩০-এর দশকে নির্মিত হয়েছিল হুভার ড্যাম বা হুভার বাঁধ। সেসময়ের চরম অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে ওঠার পেছনে এই বাঁধের গুরুত্ব ছিল বিপুল। হাজার পাঁচেক মানুষ এখানে কাজ করেছিল, যাদের থাকার জায়গা দিতে সেখানে একটা শহর তৈরি করা হয়েছিল। ৩৩ লক্ষ কিউবিক মিটার কনক্রিট ব্যবহার করা হয়েছিল এতে; ব্যবহার করা হয়েছিল অনেক নতুন নতুন প্রযুক্তি, যা কিনা এর আগে কোনদিন ব্যবহার করা হয়নি। ১৯৩৬ সালে বাঁধটি যখন চালু করা হয়, তখন এটি ছিল পৃথিবীর সবচাইতে বড় কনক্রিট স্থাপনা। বাঁধ ১,৩৪৫ মেগাওয়াট বিদ্যুত উতপাদন করে সেই বিদ্যুত বিক্রি করে বাঁধের ঋণ শোধ করা হয়েছিল। বাঁধের মূল সুফল পেয়েছিল ১ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষ। ১০ লক্ষ একর চাষের জমিতে সেচের ব্যবস্থা হয়েছিল। ছয়টি মার্কিন কোম্পানি একত্রিত হয়ে বাঁধটি তৈরি করে এমন সময়, যখন পুরো পশ্চিমা বিশ্বে কাজের হাহাকার চলচিল। হ্যাঁ, এগুলি অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেক সুফল বয়ে এনেছিল। কিন্তু হুভার ড্যাম কি আসলেই শুধুমাত্র একটা অর্থনৈতিক স্থাপনা ছিল? আজ কিন্তু এই ড্যামের চাইতে অনেক বড় বড় ড্যাম তৈরি হয়ে গেছে? এটাকি তাহলে আজ গুরুত্বহীন? এই ব্যাপারটা বুঝতে হলে একটু ভিন্ন দিক থেকে চিন্তা করে দেখতে হবে।
    
যারা ১৯৩০-এর দশকে হুভার ড্যাম বানিয়েছিলেন, তারাই ১৯৪০-এর দশকে হাজার হাজার জাহাজ তৈরি করেছিল বিশ্বযুদ্ধে জয়ের জন্যে। হুভার ড্যাম আমেরিকা এমন কিছু দিয়েছিল, যা তাদের ছিল না - বিশ্ব পরিচালনার আত্মবিশ্বাস।

হুভার ড্যাম থেকে গণতন্ত্রের অস্ত্রাগার

হুভার ড্যাম তৈরি করেছিল সেই আমেরিকা, যা কিনা ড্যাম তৈরি করার পাঁচ বছরের মাথায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগ দিয়েছিল, এবং আরও চার বছরের মাথায় পৃথিবীর সবচাইতে শক্তিশালী দেশরূপে আবির্ভূত হয়েছিল। চীনের ইয়াংজি নদীর উপরে তৈরি Three Gorges Dam দেখে সারা বিশ্বের মানুষ যেমন স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল, হুভার ড্যাম তার চাইতে কয়েক গুণ বেশি প্রভাব ফেলেছিল। এই স্থাপনা মার্কিনীদের material power-এর সক্ষমতার জানান দিয়েছিল। আর মার্কিনীরাও তাদের ক্ষমতাকে নতুন করে টের পেয়েছিল। এই ক্ষমতার আস্বাদন পুরোপুরি পেতে অবশ্য তাদেরকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জেতা অবধি অপেক্ষা করতে হয়েছিল। হুভার ড্যাম ছিল একটা Springboard, যার উপরে পা দিয়ে তারা এক লাফে মহাসাগর পাড়ি দিয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিতে আমেরিকানদের রাজি করানোটা খুবই কঠিন ছিল। তারা মনে করতো যে ওটা ইউরোপিয়ানদের যুদ্ধ, আমেরিকার যুদ্ধ নয়। দুনিয়াটাকে মার্কিনীরা তখনও তাদের করে নিতে শেখেনি। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও একই ঘটনা ঘটেছিল। যখন হিটলার পুরো ইউরোপ দখল করে নিচ্ছিল, তখন মার্কিনীরা চেয়ে চেয়ে দেখছিল। শুধুমাত্র জাপানের আক্রমণই মার্কিনীদের যুদ্ধে নামিয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অনেকেই জানতেন যে মার্কিনীদের যুদ্ধে জড়াতেই হবে। আর কেউ কেউ আবার মনে মনে খুশিই হয়েছিলেন যে জাপানীর মার্কিনীদের আক্রমণ করে বসেছিল – কারণ তারা মনে করতেন যে জাপানীরা আক্রমণ না করলে তো এই অলস মার্কিনীদের দিয়ে মহাসাগর পাড়ি দেয়ানো যাবে না। কিন্তু মহাসাগর পাড়ি দিয়ে যুদ্ধ করতে পারার মতো মানসিক সক্ষমতা তাদেরকে দিয়েছিল সেই হুভার ড্যাম। এই ড্যাম মার্কিনীদের সেই আত্মবিশ্বাস গড়ে দিয়েছিল, যার ফলশ্রুতিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নাম হয়ে যায় গণতন্ত্রের অস্ত্রাগার (Arsenal of Democracy)। হুভার ড্যাম তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রাখা মার্কিন ব্যবসায়ী হেনরি জে. কাইজার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে বিরাট সংখ্যক জাহাজ নির্মান করেন। তার শিপইয়ার্ডে ৮০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হয়েছিল। হুভার ড্যাম কাইজারের মতো আরও অনেক লোক তৈরি করেছিল, যারা পরবর্তীতে বিশ্বযুদ্ধ জয়ে বিরাট অবদান রেখেছিল।
  
হুভার ড্যাম এখন অনেক পুরোনো কথা। সেই ড্যাম এখন আর আমেরিকানদের সামনে এগিয়ে নিয়ে যায় না। ফেসবুক সেলফি, কিম কার্দাশিয়ান, বা WWE Wrestling এখন তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প-হিলারির প্রেসিডেন্সিয়াল ডিবেট-এ এন্টারটেইনমেন্ট না থাকলে মানুষ সেটা দেখে না।

অধঃপতনের পথে….

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিনীদের চিন্তাগুলিকে material রূপ দিতে বিরাট ভূমিকা রেখেছিল হুভার ড্যাম এবং তার ঠিক পরবর্তী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। তখন ছিল মার্কিন চেতনার উচ্ছ্বাসের সময়। সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে টানা ৪৫ বছর ঠান্ডা যুদ্ধের মাঝ দিয়ে এই চেতনার উল্লম্ফন আমরা দেখেছি। প্রযুক্তিগত উত্তরণের পথে তারা বিরাট সাফল্য দেখিয়েছে। তখন ছিল আদর্শিক যুদ্ধের চরম অবস্থা; জিততে না পারলে জীবনটাই বৃথা। সবকিছু পরিবর্তন হয়ে গেল ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর। আফগানিস্তানে হঠাত যুদ্ধে হেরে যাবার ফলাফল যে এটা হতে পারে, তা ছিল সকলের কল্পনার বাইরে। রাতারাতি মার্কিনীরা সেই শত্রুকে হারালো, যার ভয় দেখিয়ে তারা শিশুদের ঘুম পাড়াতো, ব্যাংকার-স্টক ব্রোকারদের সামরিক ট্রেনিং দিতো, মাল্টিবিলিয়ন ডলার খরচ করে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতো। শত্রু নাই তো অস্ত্রের উদ্দেশ্যও নাই। ২০০১ সাল থেকে অফিশিয়ালি এমন এক শত্রুকে মার্কিনীরা ধরে নিয়ে এলো, যার আসলে কোন শারীরিক অস্তিত্ব নেই। যার অস্তিত্ব নেই তাকে তারা মারবে কি করে? এখানেই হয়ে গেল সমস্যা। এই শত্রুকে মার্কিনীরা খুঁজে পাচ্ছে না; বুঝতে পারছে না। একুশ শতকের আমেরিকা এগুলি বুঝতে পারছে না। হুভার ড্যাম এখন অনেক পুরোনো কথা। সেই ড্যাম এখন আর আমেরিকানদের সামনে এগিয়ে নিয়ে যায় না। ফেসবুক সেলফি, কিম কার্দাশিয়ান, বা WWE Wrestling এখন তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প-হিলারির প্রেসিডেন্সিয়াল ডিবেট-এ এন্টারটেইনমেন্ট না থাকলে মানুষ সেটা দেখে না। অনুষ্ঠানের টিআরপি বেশি গুরুত্বপূর্ণ; ব্যবসা তো করতে হবে তাই না? অর্থনীতির অবস্থা ভালো নয়; কি আর করা? এই আমেরিকা এখন আর কিসিঞ্জার-ব্রেজিনস্কিদের মতো মারদাঙ্গা আদর্শিক চিন্তাবিদদের রাষ্ট্র নয়

চিন্তার অধঃপতনের সাথে সাথে material power-এরও অধঃপতন হয়েছে। এই মুহুর্তে পৃথিবীর কোথাও আরেকটা যুদ্ধে জড়িয়ে গিয়ে সেখান থেকে সফলভাবে বের হয়ে আসার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের নেই। তার অর্থনীতি এখন আমদানি-নির্ভর। তারা এখন তেমন কিছুই তৈরি করে না; সব আমদানি করে। এমনকি গণতন্ত্রের অস্ত্রাগারের অবস্থাও এখন খারাপের দিকে। একটা যুদ্ধবিমান (F-35) এবং একটা যুদ্ধজাহাজ (Littoral Combat Ship) ডিজাইন করতে গিয়ে তাদের যা অবস্থা হয়েছে, তাতে এটা অস্ত্রাগার থেকে কোন একসময় ভাগাড়ে রূপ নিতে পারে। অবশ্য মার্কিন নেতৃত্বের ভাগাড়-সদৃশ প্রতিযোগিতাই দেখিয়ে দিয়েছে তারা কোন দিকে যাচ্ছে। একটা ক্ষয়িষ্ণু শক্তির করুণ চেহারা দিনে দিনে ফুটে উঠছে। ক’দিন আগেই ফিলিপাইনকে হারিয়েছে তারা। এর আগে হারিয়েছে থাইল্যান্ডকে। এই দুই দেশই ছিল তাদের বহুকালের স্যাটেলাইট দেশ। বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিনীরা “বন্ধু” দেশের উপরে নির্ভর করছে পুলিশম্যানের কাজ করার জন্যে। এই আমেরিকা হুভার ড্যামের আমেরিকা নয়। এই আমেরিকা ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাতি-ধর্ম বিদ্বেষযুক্ত কটূক্তিতে আসক্ত আমেরিকা। তবে হুভার ড্যামের একটা ব্যাপারের সাথে এখানে মিল পাওয়া যাবে – সেই ড্যাম তৈরিতে মাত্র ৩০ জন কালো চামড়ার মানুষকে নেয়া হয়েছিল। এটাই বলে দেয় যে মার্কিন সভ্যতা কিসের উপরে প্রতিষ্ঠিত। ডোনাল্ড ট্রাম্প একুশ শতকে ওই ক্ষয়িষ্ণু সভ্যতারই হাল ধরতে যাচ্ছেন।
   
পদ্মা সেতুর মাঝে তারা বঙ্গোপসাগরের ফানেলের গোড়ায় একটা Springboard দেখতে পাচ্ছিল; তারা দেখতে পাচ্ছিল হুভার ড্যামের প্রতিচ্ছবি। পদ্মা সেতু ভারত মহাসাগরে একটা ভূমিকম্পের জন্ম দেবে, যার থেকে সৃষ্ট সুনামি পুরো মহাসাগরের উপকূল ছাপিয়ে যাবে। রাষ্ট্র এবং তার নাগরিকদের আত্মবিশ্বাসকে উঠিয়ে ধরতে এই সেতু যে কাজটি করবে, তা পরিমাপ করা দুষ্কর। এই Springboard জন্ম দেবে এমন আরও অনেক Springboard-এর।

হুভার ড্যাম এবং পদ্মা সেতু

এখন আসি আমাদের কথায়। পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির কেলেংকারির কথা যখন তুঙ্গে, তখন না বুঝলেও এখন মানুষ বুঝতে পারছে যে আলোচনার বিষবস্তু আসলে ছিল এই সেতু তৈরিতে দুর্নীতি হয়ছিল কিনা সেটা নয়, বরং এই সেতু আদৌ তৈরি হবে কি হবে না, সেটা। তারা এই প্রশ্নটি তুলেছিল, কারণ তারা বঙ্গোপসাগরের ফানেলের গোড়ায় একটা Springboard দেখতে পাচ্ছিল; তারা দেখতে পাচ্ছিল হুভার ড্যামের প্রতিচ্ছবি। পদ্মা সেতু ভারত মহাসাগরে একটা ভূমিকম্পের জন্ম দেবে, যার থেকে সৃষ্ট সুনামি পুরো মহাসাগরের উপকূল ছাপিয়ে যাবে। রাষ্ট্র এবং তার নাগরিকদের আত্মবিশ্বাসকে উঠিয়ে ধরতে এই সেতু যে কাজটি করবে, তা পরিমাপ করা দুষ্কর। এই Springboard জন্ম দেবে এমন আরও অনেক Springboard-এর। এর আগের লেখায় একটা Springboard নিয়ে আলোচনা করেছি, যা কিনা বহুদূর নিয়ে যেতে পারে খুব অল্প সময়ের মাঝেই।

চিন্তার উত্তরণ নিয়ে অনেক লিখেছি। এখন চিন্তাকে material রূপ দেয়ার সময়। Material Progress-এর পথে যতো বাধা আসবে সব সাফ করতে হবে কঠোরভাবে। যারা গুলশানের রক্তাক্ত ঘটনা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নির্লজ্জ হস্তক্ষেপের পরেও বুঝে উঠতে ব্যর্থ হচ্ছেন যে আসল টার্গেট কারা, তারা হয়তো কখনোই বুঝবেন না। বুঝতে বাকি থাকা উচিত নয় যে এই জঘন্য ব্যাপারগুলি ঘটানো হচ্ছে ভারত মহাসাগরে একটা শক্তিশালী রাষ্ট্রের উত্থান ঠেকাতে। আমাদের দেশের মিডিয়াগুলি যখন মার্কিন নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে চোখের পানি ফেলছে, তখন প্রশ্ন করতেই হয় যে “তাদের নেতা” কি আসলেই “আমাদের নেতা” কিনা? তারা এমন চিন্তা করে কারণ স্ট্যাচু অব লিবার্টি তাদের তীর্থ। প্রভূর সুখ-দুঃখের ভাগীদার হতে তাধিং তাধিং করে নাচতে নাচতে সাত-সমুদ্র তারা পাড়ি দিয়ে দেয়; বাংলাদেশের জন্যে তারা একটা নদী বা খালও পাড়ি দেবে না। তাদের জন্যে পদ্মা সেতু Springboard নয়, বরং হুভার ড্যামের প্রতিযোগী। পদ্মা সেতুতে তারা ভারত মহাসাগরে মার্কিন কর্তৃত্বের ধ্বংসের ছায়া দেখতে পায়। আর ভারত মহাসাগরে কর্তৃত্ব হারানোর চিন্তায় মার্কিনীদের সারা দুনিয়ার উপরে কর্তৃত্ব ছুটে যায়; ঘুম হারাম হয়। আটলান্টিকের ওপারের ক্ষয়িষ্ণু রাষ্ট্রের নেতৃত্ব আমাদের জন্যে কাঁসার পাতে কয় দানা বাশি ভাত রেখেছে, সেটা আজ আমাদের চিন্তা নয়। বরং চিন্তা হচ্ছে আর কি কি Springboard আমরা নিয়ে আসবো, যা কিনা আমাদের material শক্তিকে অপ্রতিরোধ্য গতি দেবে।