Showing posts with label Denmark. Show all posts
Showing posts with label Denmark. Show all posts

Friday, 4 April 2025

ট্রাম্পের গ্রীনল্যান্ড চাই – এটাই নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা

০৫ই এপ্রিল ২০২৫

ডেনমার্ক ন্যাটোর সদস্যদেশ হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ডেনমার্কের অধীন অঞ্চল দখল করে নিতে চাইছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপিত বিশ্বব্যবস্থা এখন যে আর নেই, তার আরেকটা প্রমাণ এটা। অপরদিকে এই ইস্যু যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইইউ, ব্রিটেন এবং ব্রিটিশ কমনওয়েলথের অধীন কানাডার প্রতিদ্বন্দ্বিতা; যা কিনা বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার একটা অংশ। 


মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার হোয়াইট হাউজে এসেই গ্রীনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানায় নেয়ার কথা বলতে থাকেন। এর আগে প্রথম টার্মেও ট্রাম্প গ্রীনল্যান্ড ক্রয় করার কথা বলেছিলেন। অনেকেই প্রশ্ন করেছেন যে, ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা বাস্তবতার সাথে যায় কিনা। তবে মার্চ মাস থেকেই গ্রীনল্যান্ডের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান যথেষ্ট শক্ত হতে শুরু করে। এখন অনেকেই ধরে নিচ্ছেন যে, ট্রাম্প গ্রীনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার ব্যাপারে যথেষ্টই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

ট্রাম্প কেন গ্রীনল্যান্ড চাইছেন?

গত ১২ই ফেব্রুয়ারি মার্কিন সিনেটের এক শুনানিতে 'টেক্সাস মিনারাল রিসোর্সেস'এর এনথনি মারচেজি বলেন যে, গ্রীনল্যান্ডের পুরো উপকূল নিঃসন্দেহে বিশ্বের সবচাইতে বড় খনিজ সম্পদের ভান্ডারগুলির একটা। এই উপকূলের যেকোন স্থানে কেউ ঢিল ছুঁড়লেই একটা বিশ্বমানের খনির সন্ধান পাবে। 'ডয়েচে ভেলে' বলছে যে, এই মুহুর্তে গ্রীনল্যান্ডে মাত্র দু'টা খনিতে কাজ চলছে; যেখানে শ'খানেক মানুষ কাজ করে। সেখানে খনিজ আহরণ খুবই কষ্টকর। অন্য অনেক স্থানের চাইতেও এখানে খনিজ আহরণ অনেক ব্যববহুল। এখানে কোন রাস্তা নেই এবং ভূপ্রকৃতি খুবই বন্ধুর। চীনের বাইরে 'রেয়ার আর্থ' খনিজের সবচাইতে বড় উৎসগুলির একটা ২০২১ সালে গ্রীনল্যান্ড সরকার বন্ধ করে দেয়। কারণ ঐ একই সাথে তেজস্ক্রিয় ইউরেনিয়ামের খনি রয়েছে এবং তা জনবসতির বেশ কাছাকাছি। আর্কটিক অঞ্চলে বরফ গলতে শুরু করার কারণে এই অঞ্চল দিয়ে কৌশলগত সমুদ্রপথ চালুর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে; যার মাঝে একটা গিয়েছে রাশিয়ার উত্তর উপকূল ঘেঁষে; যা 'নর্দার্ন সী রুট' বা 'এনএসআর' নামে পরিচিত। দ্বিতীয়টা গিয়েছে গ্রীনল্যান্ডের পাশ দিয়ে কানাডার মাঝ দিয়ে; যা 'নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ' নামে পরিচিত। তৃতীয়টা গিয়েছে একেবারে উত্তর মেরুর মাঝ দিয়ে; যা 'ট্রান্স পোলার সী রুট' হিসেবে পরিচিত। এই রুটগুলি এশিয়া এবং ইউরোপের মাঝে সমুদ্রপথকে অনেক কমিয়ে ফেলতে পারে। বর্তমানে আর্কটিক অঞ্চল দিয়ে জাহাজ পার করতে হলে আইস ব্রেকার জাহাজ লাগে; যা বেশ ব্যয়বহুল। কাজেই এখনও পর্যন্ত খনিজ আহরণ এবং সমুদ্রপথ ব্যবহার করার ব্যাপারটা ভবিষ্যতের আলোচনা। এই মুহুর্তে গ্রীনল্যান্ডের জনগণের আয় শুধুমাত্র মাছ ধরার উপর নির্ভরশীল। একারণে ডেনমার্ক সরকার বছরে প্রায় ৫'শ মিলিয়ন ইউরো বাজেট সহায়তা দিচ্ছে। তবে গ্রীনল্যান্ড নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় ডেনমার্ক শক্তিশালী দেশগুলির সাথে বড় রকমের দেনদরবার করতে পারে; যা ডেনমার্কের আকারের তুলনায় বেশি শক্তির প্রতীক।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক টিম মার্শাল 'বিবিসি'কে বলছেন যে, এর আগেও ১৯৫০এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র গ্রীনল্যান্ড ক্রয় করতে চেয়েছিল। কাজেই একটা অঞ্চল ক্রয় করার ব্যপারটা নতুন নয়। অর্থনৈতিক দিক থেকে ছাড়াও সামরিক দিক থেকে গ্রীনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর মেরুর উপর দিয়ে রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলি সবচাইতে কম দূরত্ব অতিক্রম করে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে পারে। আবার একইসাথে, রুশ সাবমেরিনের যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি পৌঁছাবার ক্ষেত্রে সবচাইতে স্বল্প দূরতের রুট হলো উত্তর মেরুর বরফের নিচ দিয়ে। গ্রীনল্যান্ডের গুরুত্বপূর্ণ খনিগুলির বেশিরভাগই গ্রীনল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলে কানাডার কাছাকাছি। গ্রীনল্যান্ড যদি স্বাধীন হয়ে যায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রই সবচাইতে বেশি লাভবান হবে। প্রশান্ত মহাসাগরের মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ এবং মাইক্রোনেশিয়ার পররাষ্ট্রনীতি যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। সেইরকমই একটা বোঝাপড়া মার্কিনীরা করতে পারে গ্রীনল্যান্ডের সাথে। নব্যস্বাধীন গ্রীনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র যদি প্রথমে নিজেদের অবস্থানকে সুসংহত করে, তাহলে প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলি থেকে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে যাবে।
 
আর্কটিক অঞ্চলে বরফ গলতে শুরু করার কারণে এই অঞ্চল দিয়ে কৌশলগত সমুদ্রপথ চালুর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে; যার মাঝে একটা গিয়েছে রাশিয়ার উত্তর উপকূল ঘেঁষে; যা 'নর্দার্ন সী রুট' বা 'এনএসআর' নামে পরিচিত। দ্বিতীয়টা গিয়েছে গ্রীনল্যান্ডের পাশ দিয়ে কানাডার মাঝ দিয়ে; যা 'নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ' নামে পরিচিত। তৃতীয়টা গিয়েছে একেবারে উত্তর মেরুর মাঝ দিয়ে; যা 'ট্রান্স পোলার সী রুট' হিসেবে পরিচিত। এই রুটগুলি এশিয়া এবং ইউরোপের মাঝে সমুদ্রপথকে অনেক কমিয়ে ফেলতে পারে।


ডেনমার্কের উপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বাড়ছে

মার্চের শেষ সপ্তাহে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের স্ত্রী উশা ভ্যান্সের গ্রীনল্যান্ডে ঘুরতে যাওয়ার খবর প্রকাশিত হবার পর গ্রীনল্যান্ড এবং ডেনমার্কে ব্যাপক হৈচৈ পড়ে যায়। এই ভিজিট সম্পর্কে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডারিকসেন সাংবাদিকদের বলেন যে, এই ভ্রমণ গ্রীনল্যান্ডের প্রয়োজন নেই এবং এটা গ্রীনল্যান্ড চাচ্ছেও না। গ্রীনল্যান্ড এবং ডেনমার্কের উপর যে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে, তা মেনে নেয়া যায় না। তিনি বলেন যে, এই চাপের মুখে তারা বাধা প্রদান করবেন। হৈচৈ শুরু হবার পর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এক ভিডিও বার্তায় ঘোষণা দেন যে, হৈচৈ শুরু হবার কারণে তিনি নিজেও এখন তার পরিবারের সাথে গ্রীনল্যান্ডে যাবেন। তবে তিনি বলেন যে, তার এই সফর গ্রীনল্যান্ডে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির মাঝে সীমাবদ্ধ থাকবে। এই সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিন স্পেস ফোর্সের গুরুত্বপূর্ণ রাডার রয়েছে; যার মাধ্যমে উত্তর মেরুর দিক থেকে ধেয়ে আসা পারমাণবিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাপারে আগাম সতর্কতা পাবে যুক্তরাষ্ট্র। 'গ্রীনল্যান্ডিক ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন'এর মারকাস ভ্যালেন্টিন 'ডয়েচে ভেলে'কে বলছেন যে, ভ্যান্সের গ্রীনল্যান্ড সফর শুধুমাত্র সামরিক ঘাঁটিতে সীমাবদ্ধ করার ফলে সেখানে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে এবং বিক্ষোভ সমাবেশ বন্ধের ঘোষণাও দেয়া হয়েছে। গ্রীনল্যান্ডের জনগণ ভ্যান্স পরিবারের সাথে অসহযোগিতা করার পথে হেঁটেছে। সরকারিভাবে ভ্যান্সের পরিবারকে গ্রহণ না করার কথাও বলা হয়েছে গ্রীনল্যান্ডের পক্ষ থেকে। গ্রীনল্যান্ড এবং ডেনমার্কের অনেকেই মনে করতে শুরু করেছেন যে, স্বল্প মেয়াদে হলেও তাদের প্রতিবাদ অনেকটাই সফল হয়েছে। গ্রীনল্যান্ডের স্বল্পসংখ্যক কিছু মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুক্ত হতে আগ্রহী। তবে গ্রীনল্যান্ডের অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও গভীর করতে ইচ্ছুক। 'বিবিসি'র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, আপাততঃ গ্রীনল্যান্ডের অধিবাসীরা একটা ছোট জয় পেয়েছে বলে মনে হলেও আসন্ন দিনগুলিতে গ্রীনল্যান্ডের উপর চাপ বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে। গ্রীনল্যান্ডে ৭৪ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র চাইলে এই ঘাঁটিকে যতটা ইচ্ছা বৃদ্ধি করতে পারবে। তাহলে এখানে সমস্যাটা কোথায়, তা স্পষ্ট নয়। গ্রীনল্যান্ডের জনগণও হয়তো ডেনমার্ক থেকে আলাদা হতে চাইবে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন সবকিছু অতি দ্রুত চাইছে।

তবে ২৯শে মার্চ গ্রীনল্যান্ডে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সফরের সময় জেডি ভ্যান্স এক ভাষণে ডেনমার্ক সরকারের ব্যাপক সমালোচনা করেন। তিনি বলেন যে, ডেনমার্কের প্রতি তার বার্তা খুবই পরিষ্কার – গ্রীনল্যান্ডের জনগণের জন্যে ডেনমার্ক যথেষ্ট বিনিয়োগ করেনি এবং গ্রীনল্যান্ডের নিরাপত্তা বৃদ্ধিতেও ডেনমার্ক কিছু করেনি। তিনি বলেন যে, এই পরিস্থিতির পরিবর্তন প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের বিতর্ক গ্রীনল্যান্ডের অধিবাসীদের সাথে নয়; বরং তা হলো ডেনমার্কের নেতৃত্বের সাথে; যারা তাদের দায়িত্ব পালন করেনি। ভ্যান্স এমন এক সময়ে গ্রীনল্যান্ড সফর করেছেন, যখন গ্রীনল্যান্ডের সরকার পরিবর্তন হচ্ছিলো। ভ্যান্সের সফরের পরপরই নবগঠিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী জেন্স ফ্রেডেরিক নিয়েলসেন সাংবাদিকদের বলেন যে, সরকার পরিবর্তনের এমন এক সময়ে ভ্যান্সের গ্রীনল্যান্ড সফর করতে আসাটা একটা বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্রের প্রতি অসন্মান দেখানো। এটা একটা লজ্জাজনক অধ্যায় ছিল।
 
গ্রীনল্যান্ডের গুরুত্বপূর্ণ খনিগুলির বেশিরভাগই গ্রীনল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলে কানাডার কাছাকাছি। গ্রীনল্যান্ড যদি স্বাধীন হয়ে যায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রই সবচাইতে বেশি লাভবান হবে। প্রশান্ত মহাসাগরের মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ এবং মাইক্রোনেশিয়ার পররাষ্ট্রনীতি যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। সেইরকমই একটা বোঝাপড়া মার্কিনীরা করতে পারে গ্রীনল্যান্ডের সাথে। নব্যস্বাধীন গ্রীনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র যদি প্রথমে নিজেদের অবস্থানকে সুসংহত করে, তাহলে প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলি থেকে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে যাবে।


ভ্যান্সের গ্রীনল্যান্ড সফরের একই দিন, ২৯শে মার্চ, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন যে, গ্রীনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অতি প্রয়োজন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যে নয়; সারা দুনিয়ার শান্তি ও নিরাপত্তার জন্যে। গ্রীনল্যান্ডের আশেপাশের সমুদ্রপথগুলি চীনা এবং রুশ জাহাজে ভরে গিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ডেনমার্ক বা অন্য কারুর উপর এই পরিস্থিতি সামাল দেয়ার ভার ছেড়ে দিতে পারে না। এক'শ বছর আগেও গ্রীনল্যান্ডের আশেপাশের সমুদ্রপথগুলি খোলা ছিল না। কিন্তু এখন আইসব্রেকার জাহাজের মাধ্যমে গ্রীনল্যান্ডের আশেপাশে দিয়ে রাশিয়া এবং চীনে যাওয়া যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন যে, তার আশা ডেনমার্ক এটা বুঝতে পারছে এবং ইইউও এটা বুঝতে পারছে। আর না বুঝতে পারলে যুক্তরাষ্ট্র তাদেরকে বোঝাবে। দু'দিন পর ৩১শে মার্চ এক ভিডিও বার্তায় ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লারস লোকি রাসমুসেন বলেন যে, ডেনমার্ক সরকার সমালোচনা পছন্দ করে; তবে যে ভাষায় মার্কিনীরা কথা বলছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। এভাবে কেউ কাছের বন্ধু রাষ্ট্রের সাথে কথা বলে না। তিনি বলেন যে, ব্যক্তিগতভাবে তিনি এখনও ডেনমার্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রকে কাছের বন্ধু হিসেবেই দেখেন। ১৯৫১ সালের চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র গ্রীনল্যান্ডে তার সামরিক শক্তি বহুগুণে বৃদ্ধি করতে পারে। ১৯৪৫ সালে গ্রীনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের ১৭টা সামরিক ঘাঁটি ছিল এবং কয়েক হাজার সেনা সেখানে মোতায়েন ছিল। বর্তমানে একটা ঘাঁটিতে মাত্র ২'শ সেনা রয়েছে। ১৯৫১ সালের চুক্তি অনুযায়ী একত্রে অনেক কিছুই করা সম্ভব। একসময় শুধু ডেনমার্ক নয়, সকলেই মনে করেছিল যে, আর্কটিকে কোন নিরাপত্তা হুমকি নেই। বর্তমানে পরিস্থতি পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে। একারণেই কিছুদিন আগেই ডেনমার্ক আর্কটিকের নিরাপত্তায় বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার ঘোষণা দিয়েছে। আর ভুলে গেলে চলবে না যে, গ্রীনল্যান্ড ন্যাটোর অংশ এবং ন্যাটোর নিরাপত্তার মাঝে গ্রীনল্যান্ডের নিরাপত্তাও রয়েছে।

৩রা এপ্রিল ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডারিকসেন সাংবাদিকদের বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র গ্রীনল্যান্ডের মালিকানা নেবে না। গ্রীনল্যান্ডের মালিকানা হলো গ্রীনল্যান্ডবাসীর। গ্রীনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব, সীমানা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে সকলকে একত্রিত থাকতে হবে; সেটা ডেনমার্ক এবং গ্রীনল্যান্ডের মাঝে যে আলোচনাই হোক না কেন। তিনি বলেন যে, তার ধারণা এখন পর্যন্ত তারা কাজটা ঠিকমতোই করতে পেরেছেন; তবে এটা পরিষ্কার যে, তাদেরকে খোলা জানালাগুলিকে আরও ভালোভাবে আটকাতে হবে। এটা পরিষ্কার যে, ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী গ্রীনল্যান্ডবাসীদের মতামতকে পুরোপুরিভাবে নিজেদের পক্ষে আনতে পারেননি। আর ৪ঠা এপ্রিল ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লারস লোকি রাসমুসেন মার্কিন পররাষ্ট্রসচিব মার্কো রুবিওর সাথে আলোচনার পর সাংবাদিকদের বলেন যে, তিনি রুবিওকে বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী এবং তা ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বের উপর আক্রমণ।
 
উত্তর মেরুর উপর দিয়ে রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলি সবচাইতে কম দূরত্ব অতিক্রম করে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে পারে। আবার একইসাথে, রুশ সাবমেরিনের যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি পৌঁছাবার ক্ষেত্রে সবচাইতে স্বল্প দূরতের রুট হলো উত্তর মেরুর বরফের নিচ দিয়ে। ১৯৫১ সালের চুক্তি অনুযায়ী ডেনমার্ক যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রীনল্যান্ডে সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করতে দিয়েছিল। এই ঘাঁটি মূলতঃ যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ; গ্রীনল্যান্ডের নিরাপত্তার জন্যে নয়। এটা গ্রীনল্যান্ডের চাইতে যুক্তরাষ্ট্রকে বেশি সুবিধা দেয়। 


যুক্তরাষ্ট্র কি গ্রীনল্যান্ডকে আলাদা করতে চায়, নাকি দখল করতে চায়?

'জার্মান মার্শাল ফান্ড'এর ফেলো সোফি আর্টস 'ডয়েচে ভেলে'কে বলছেন যে, ভ্যান্সের বক্তব্য সঠিক নয়। ডেনমার্ক সরকার গ্রীনল্যান্ডের বাজেটের অর্ধেকের বেশি দিয়ে থাকে। এর বাইরেও রয়েছে প্রতিরক্ষা সহায়তা; যা ডেনমার্ক তার বন্ধুপ্রতীম দেশগুলির সাথে একত্রে দিয়ে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের হুমকির পর গ্রীনল্যান্ড ও আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করার জন্যে ২ বিলিয়ন ডলার খরচের ঘোষণা দিয়েছে ডেনমার্ক। এটা এই অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্যে বর্তমানের ১০ গুণ বেশি খরচ। ১৯৫১ সালের চুক্তি অনুযায়ী ডেনমার্ক যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রীনল্যান্ডে সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করতে দিয়েছিল। এই ঘাঁটি মূলতঃ যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ; গ্রীনল্যান্ডের নিরাপত্তার জন্যে নয়। এটা গ্রীনল্যান্ডের চাইতে যুক্তরাষ্ট্রকে বেশি সুবিধা দেয়। তবে গ্রীনল্যান্ডের নিরাপত্তার সাথে পুরো আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা জড়িত। এখানে ন্যাটো জোটের স্বার্থ জড়িত। জোটকে ছোট করে এখানে গ্রীনল্যান্ডের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা করতে গেলে উদ্দেশ্য প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। ন্যাটোর অংশ হিসেবে ডেনমার্ক মার্কিনীদের সাথে আফগানিস্তানে যুদ্ধ করেছে। এখন যুক্তরাষ্ট্র ডেনমার্কের বিরুদ্ধে কথা বলছে এবং গ্রীনল্যান্ডকে ডেনমার্ক থেকে আলাদা করার কথাও শোনা যাচ্ছে।

‘এএফপি'র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, গ্রীনল্যান্ড ডেনমার্ক থেকে পুরোপুরিভাবে আলাদা হবার চেষ্টা করছে। গ্রীনল্যান্ডবাসীদের একটা প্রধান অভিযোগ হলো, ডেনমার্ক সরকার ঐতিহাসিকভাবেই গ্রীনল্যান্ডের ইনুইট আদিবাসীদের সংস্কৃতিকে দমন করেছে। আদিবাসীদেরকে জোর করে বন্ধাত্ব বরণ করিয়েছে এবং তাদের সন্তানদেরকে পরিবার থেকে আলাদা করে নিয়ে গেছে ডেনমার্ক সরকার। গ্রীনল্যান্ডে অনেকেই মনে করেন যে, ডেনমার্ক গ্রীনল্যান্ডবাসীদেরকে নিচু জাতের নাগরিক হিসেবে দেখে। তবে তারা মনে করে না যে, তাদের ভূমি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিক্রি হবার জন্যে। গ্রীনল্যান্ডের প্রায় সকল জনগণ স্বাধীনতার পক্ষে থাকলেও ট্রাম্পের পরিকল্পনার পক্ষে খুব কমই রয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন যে, খুব দ্রুত ডেনমার্ক থেকে আলাদা হতে গেলে যুক্তরাষ্ট্র গ্রীনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে। 'ডয়েচে ভেলে' মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ১৭২১ সালে ডেনমার্ক গ্রীনল্যান্ডে উপনিবেশ স্থাপন করেছিল। এরপর দু'শ বছর ধরে ইনুইট জাতির উপর খ্রিস্টান ধর্ম এবং ড্যানিস ভাষা চাপানো হয়। শুধুমাত্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরই গ্রীনল্যান্ডে ঔপনিবেশিক প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে বন্ধ করা হতে থাকে। একসময় গ্রীনল্যান্ডকে নিজস্ব পার্লামেন্ট এবং সরকার দেয়া হয়। বর্তমানে গ্রীনল্যান্ড ডেনমার্কের অধীনে একটা স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল। অভ্যন্তরীণ ইস্যুগুলি গ্রীনল্যান্ড নিজে নিয়ন্ত্রণ করলেও নিরাপত্তা এবং পররাষ্ট্রনীতি দেখাশোনা করে ডেনমার্ক। গ্রীনল্যান্ডের সরকার বলছে যে, কোন একটা সময় তারা ডেনমার্ক থেকে আলাদা হবার লক্ষ্যেই এগুচ্ছে। ৮৪ শতাংশ মানুষ স্বাধীনতার পক্ষে। এই মুহুর্তে গ্রীনল্যান্ড তাদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ইইউ, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনে তাদের অফিস খুলেছে। তারা খনিজ সম্পদ আহরণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউএর সাথেও সমঝোতা স্বাক্ষর করেছে। অর্থাৎ গ্রীনল্যান্ডের অর্থনীতিতে অনেকেই অংশীদার হতে চাইছে। একারণেই ডেনমার্ক গ্রীনল্যান্ডের ইস্যুকে ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে রেখেছে।
 
মার্চ ২০২৫। মার্কিন সেনাদের সাথে গ্রীনল্যান্ডের সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। নতুন বিশ্বব্যবস্থায় ট্রাম্প প্রশাসনের গ্রীনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার সিদ্ধান্ত অনেকের কাছেই অদ্ভুত ঠেকলেও বাস্তবিক ক্ষেত্রে অঞ্চল কেনাবেচা নতুন নয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪০ শতাংশ অঞ্চল ক্রয় করা; যার মাঝে রয়েছে লুইজিয়ানা, ক্যালিফোর্নিয়া এবং আলাস্কা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেনের কাছ থেকে অস্ত্রের বিনিময়ে ক্যারিবিয়ানের কিছু দ্বীপ পেয়ে যায়। তাই আর্কটিক অঞ্চলে বরফ গলে যেতে থাকায় গ্রীনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনায় অবাক হবার কিছু নেই। 


প্রাক্তন ব্রিটিশ সামরিক কর্মকর্তা ফিলিপ ইনগ্রাম ব্রিটিশ মিডিয়া 'দ্যা সান'কে বলছেন যে, গ্রীনল্যান্ডের কোন সামরিক বাহিনী নেই। যুক্তরাষ্ট্র চাইলেই যেকোন দিন সেখানে হেঁটে ঢুকে যেতে পারে। তবে এর ভূরাজনৈতিক ফলাফল হবে খুবই মারাত্মক। তার ধারণা, গ্রীনল্যান্ডের ব্যাপারটা অনেক ক্ষেত্রেই কানাডার সাথে যুক্ত। ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে গ্রীনল্যান্ড, কানাডা এবং পানামা নিয়ে যখন কথা বলেছেন, তখন সর্বদাই তিনি সমুদ্রপথের প্রসঙ্গ এনেছেন। অর্থাৎ তিনি এই অঞ্চলগুলিকে সমুদ্রবাণিজ্য এবং লজিস্টিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখেছেন। ন্যাটোর সদস্য দেশ কানাডা এখনও পর্যন্ত তাদের জিডিপির ২ শতাংশ প্রতিরক্ষার পিছনে খরচ করছে না। এবং 'ফাইভ আইজ' ইন্টেলিজেন্স সমঝোতার মাঝে কানাডাকে দুর্বল সদস্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। খুব সম্ভবতঃ ট্রাম্প গ্রীনল্যান্ডকে হুমকির মাঝে রেখে কানাডার উপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছেন। কানাডার উপর বাণিজ্যিক শুল্ক আরোপের ব্যাপারটাও খুব সম্ভবতঃ একই সূত্রে গাঁথা।

ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর মিডিয়া 'বিএফবিএস ফোর্সেস নিউজ'এর এক আলোচনায় ব্রিটিশ সামরিক চিন্তাবিদ ক্যারোলাইন কেনেডি-পাইপ বলছেন যে, মূলতঃ ২০১৭-১৮ সালের দিকে চীনারা যখন গ্রীনল্যান্ডে বিমানবন্দরের রানওয়ে তৈরি করতে ইচ্ছুক হয়, তখনই মার্কিনীরা এবং ড্যানিশরা নড়েচড়ে বসে। দুই দেশের প্রতিরোধের মুখে চীনা প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়াও 'নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ' নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কানাডার একটা দ্বন্দ্ব রয়েছে। এটাও গ্রীনল্যান্ডের হিসেবে মাঝে নিতে হবে। কানাডা এখনও পর্যন্ত আর্কটিকে তাদের সক্ষমতার অনেক নিচে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে তারাও তড়িঘড়ি করে আর্কটিক নিয়ে কাজ করা শুরু করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা উভয়েই আর্কটিককে রাশিয়ার চোখ দিয়ে দেখা শুরু করেছে। নরওয়ের ডিফেন্স কমান্ড এন্ড স্টাফ কলেজের প্রফেসর টরমড হাইয়ার বলছেন যে, আর্কটিকে নরওয়ের অধীনে থাকা সুয়ালবার্ড দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে; যা কিনা গ্রীনল্যান্ডের সমান্তরালে দরকষাকষির অংশ হতে পারে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯২০ সালের চুক্তি অনুযায়ী এই দ্বীপপুঞ্জকে বাণিজ্যিকভাবে সকলের জন্যে খোলা রাখা হলেও এর সার্বভৌমত্বকে নরওয়ের অধীনে দেয়া হয়; যা এখন রুশরা প্রশ্ন করছে। এই দ্বীপপুঞ্জ থেকে ন্যাটো রুশ সাবমেরিনের উপর নজরদারি করে। ইতোমধ্যেই সেখানে রুশ এবং চীনারা গবেষণা কাজ চালাবার জন্যে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করছে।

নতুন বিশ্বব্যবস্থায় ট্রাম্প প্রশাসনের গ্রীনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার সিদ্ধান্ত অনেকের কাছেই অদ্ভুত ঠেকলেও বাস্তবিক ক্ষেত্রে অঞ্চল কেনাবেচা নতুন নয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪০ শতাংশ অঞ্চল ক্রয় করা; যার মাঝে রয়েছে লুইজিয়ানা, ক্যালিফোর্নিয়া এবং আলাস্কা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেনের কাছ থেকে অস্ত্রের বিনিময়ে ক্যারিবিয়ানের কিছু দ্বীপ পেয়ে যায়। তাই আর্কটিক অঞ্চলে বরফ গলে যেতে থাকায় গ্রীনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনায় অবাক হবার কিছু নেই। ডেনমার্ক ন্যাটোর সদস্যদেশ হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ডেনমার্কের অধীন অঞ্চল দখল করে নিতে চাইছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপিত বিশ্বব্যবস্থা এখন যে আর নেই, তার আরেকটা প্রমাণ এটা। অপরদিকে এই ইস্যু যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইইউ, ব্রিটেন এবং ব্রিটিশ কমনওয়েলথের অধীন কানাডার প্রতিদ্বন্দ্বিতা; যা কিনা বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার একটা অংশ।

Thursday, 18 November 2021

পোল্যান্ড এবং বেলারুশের সীমান্তে ব্রিটেন কি চাইছে?

১৮ই নভেম্বর ২০২১

পোল্যান্ড বেলারুশ সীমান্তে শরণার্থী সমস্যা মোকাবিলায় ব্রিটেন পোল্যান্ডের সাথে থাকবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। অমানবিকতার উদাহরণ সৃষ্টি করে ঠান্ডায় জমে যাওয়া শরণার্থীদেরকে শক্তি প্রয়োগে ঠেকিয়ে রাখতে পোল্যান্ডকে সমর্থন এবং টেকনিক্যাল সহায়তা দিয়ে ব্রিটেন প্রমাণ করছে যে, তার ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ কৌশল বিশ্বব্যাপী আদর্শকে পূনপ্রতিষ্ঠা করার জন্যে নয়; নিছক ইংরেজি ভাষাভাষী দেশগুলিকে বিশ্বের সবচাইতে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্যে।

 
পোল্যান্ড বেলারুশ সীমান্তে শরণার্থী সমস্যা মোকাবিলায় ব্রিটেন পোল্যান্ডের সাথে থাকবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। ১৩ই নভেম্বর ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব লিজ ট্রাস ‘সানডে টেলিগ্রাফ’ পত্রিকার এক লেখায় বলেন যে, বেলারুশের প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কো অসহায় শরণার্থীদেরকে খুব সুচতুরভাবে ব্যবহার করে একটা সমস্যার জন্ম দিয়েছেন। তিনি সমস্যা সমাধানে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে হস্তক্ষেপ করার আহ্বান জানান। ‘ইভিনিং স্ট্যান্ডার্ড’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ইইউ এই সমস্যাকে বেলারুশ সরকারের ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ বলে আখ্যা দিচ্ছে। তারা বলছে যে, বেলারুশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে শরণার্থীদের পোল্যান্ডের সীমানায় জড়ো করে চাপ সৃষ্টি করছে। লিজ ট্রাসের জবাবে পরদিন রুশ পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা বলেন যে, এই সমস্যার ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট পুতিনের কোন দায়বদ্ধতা নেই। তিনি উল্টো বলেন যে, বরং ইরাকে ব্রিটিশ হামলাই ছিল সুচতুরভাবে করা। ইরাকের জনগণের মৃত্যু, রাষ্ট্রের পতন, অগুণিত শরণার্থী, আইসিসের উত্থান, মানবাধিকার দুর্যোগের জন্যে ব্রিটেন পুরোপুরিভাবে দায়ী। যতক্ষণ পর্যন্ত লন্ডন এই অপরাধগুলির জন্যে দায়বদ্ধতা নিচ্ছে না, ততক্ষণ তাদের প্রতিনিধিদের অন্য কারুর দিকে আঙ্গুল তাক করার অধিকার নেই। ভ্লাদিমির পুতিন একই দিনে রুশ টেলিভিশনের এক স্বাক্ষাতে জাখারোভার কথাগুলিকেই সমর্থন দেন। তিনি বলেন যে, পোলিশ সেনারা শরণার্থীদের পেটাচ্ছে, তাদের মাথার উপর দিয়ে গুলি ছুঁড়ছে এবং রাতের বেলায় বাতি এবং সাইরেন দিয়ে তাদের দূরে রাখছে। এই কর্মকান্ডগুলি পশ্চিমা দেশগুলির মানবাধিকারের কথাগুলির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

পোল্যান্ডই কেন?


এই সমস্যার মাঝে পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মাটিউজ মোরাউইয়েকি ন্যাটোকে জড়িত হবার অনুরোধ করেছেন। তিনি বলেন যে, পোল্যান্ড নিজেদের সমস্যাগুলি জনসন্মুখে বলেছে সেটাই যথেষ্ট। এখন পোল্যান্ড ন্যাটোর সদস্য দেশগুলির কাছ থেকে বাস্তব সহায়তা আশা করছে। ১২ই নভেম্বর ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা দপ্তরের বরাত দিয়ে ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ জানায় যে, ব্রিটিশ সরকার পোল্যান্ডের সীমানা রক্ষায় ১০ জন ব্রিটিশ সেনা পাঠিয়েছে। এই সেনারা সীমানা প্রাচীর আরও শক্তিশালী করতে ইঞ্জিনিয়ারিং সহায়তা দেবে। তবে এরপর আর কোন সৈন্য পাঠাবার উদ্দেশ্য ব্রিটেনের নেই বলে জানায় তারা। ইতোমধ্যেই পোলিশ সরকার বেলারুশের সীমানায় ২০ হাজার সেনা মোতায়েন করেছে। পোলিশ সরকার ব্রিটেনের কাছে সহায়তা চাইলেও ইইউএর সীমানা ব্যবস্থাপনা সংস্থা ‘ফ্রনটেক্স’এর সহায়তা চায়নি। পত্রিকাটা বলছে যে, কি কারণে পোল্যান্ড ব্রিটেনের সহায়তা চেয়েছে তা পরিষ্কার না হলেও ইইউএর সাথে উভয় দেশই দ্বন্দ্বে জড়াবার পর থেকে তাদের মাঝে সখ্যতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থা ‘এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল’ বলছে যে, যখন শরণার্থীরা মারা যাচ্ছে, তখন তাদের সহায়তা না দিয়ে ব্রিটিশ সেনা পাঠিয়ে সীমানা প্রাচীর শক্তিশালী করাটা মানুষের জীবনের প্রতি মারাত্মক অবহেলা এবং অভিবাসী প্রত্যাশী মানুষের অধিকারের প্রতি চরম অবহেলাকে দেখিয়ে দেয়।

 
সমতলভূমি হওয়ায় দেশটা পশ্চিম ইউরোপ এবং রাশিয়ার মাঝে একটা খোলা জায়গা। এই অবস্থানটাই পোল্যান্ডকে অষ্টাদশ শতকের পর থেকে চ্যালেঞ্জে ফেলেছে। অষ্টাদশ শতকে রাশিয়া এবং প্রুশিয়া এবং ঊনিশ শতকে জার্মানির আবির্ভাবের পর থেকে জার্মানি, রাশিয়া এবং অস্ট্রিয়া মিলে পোল্যান্ডের ভূখন্ড ভাগাভাগি করে ফেলে। এর ফলশ্রুতিতে ষোড়শ শতকের শক্তিশালী পোলিশ লিথুয়ানিয়ান সাম্রাজ্য প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পোল্যান্ড ইউরোপের অন্যান্য শক্তিদের যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়।

পোল্যান্ডের ভৌগোলিক অবস্থান দেশটার এধরনের সমস্যার একটা প্রধান কারণ। পোল্যান্ডের ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জের একটা বর্ণনা দিয়েছে মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘স্ট্রাটফর’। দেশটা উত্তর ইউরোপের সমতলভূমির উপর অবস্থিত; যার পূর্ব এবং পশ্চিমে তেমন কোন বড় ভৌগোলিক বাধা নেই। তবে এর উত্তরে বল্টিক সাগর এবং দক্ষিণে কার্পেথিয়ান পর্বতমালা দেশটাকে উত্তর-দক্ষিণে সংকুচিত করে রেখেছে। সমতলভূমি হওয়ায় দেশটা পশ্চিম ইউরোপ এবং রাশিয়ার মাঝে একটা খোলা জায়গা। এই অবস্থানটাই পোল্যান্ডকে অষ্টাদশ শতকের পর থেকে চ্যালেঞ্জে ফেলেছে। অষ্টাদশ শতকে রাশিয়া এবং প্রুশিয়া এবং ঊনিশ শতকে জার্মানির আবির্ভাবের পর থেকে জার্মানি, রাশিয়া এবং অস্ট্রিয়া মিলে পোল্যান্ডের ভূখন্ড ভাগাভাগি করে ফেলে। এর ফলশ্রুতিতে ষোড়শ শতকের শক্তিশালী পোলিশ লিথুয়ানিয়ান সাম্রাজ্য প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পোল্যান্ড ইউরোপের অন্যান্য শক্তিদের যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাবের অধীন হয়ে যায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পোল্যান্ড ১৯৯৯ সালে ন্যাটোতে যুক্ত হয় এবং ২০০৪ সালে ইইউতে যুক্ত হয়। বিপুল পশ্চিমা বিনিয়োগে পোল্যান্ডের অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত উন্নতি হতে থাকে। রাশিয়ার ভীতি পোল্যান্ডকে ন্যাটোর সামরিক বাহিনীর উপর নির্ভরশীল করেছে এবং দেশটাতে ইউরোপের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়। একইসাথে ইউক্রেনকে পশ্চিমা ধাঁচে নিয়ে এসে পোল্যান্ড তার পূর্ব সীমানাকে নিরাপত্তা দেয়ার চেষ্টা করেছে।

জার্মান রুশ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বল্টিক সাগরে ব্রিটেনের অবস্থান


পোল্যান্ড একদিকে যেমন উত্তর ইউরোপের সমতলভূমির উপর বড় একটা দেশ, তেমনি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বল্টিক সাগরে পোল্যান্ডের রয়েছে উপকূল এবং বড় সমুদ্রবন্দর। বল্টিক সাগরে ব্রিটেনের রয়েছে ঐতিহাসিক উপস্থিতি। ২০১৮ সালে ব্রিটেন এস্তোনিয়ার স্বাধীনতার শতবর্ষ উদযাপন করে। সেই অনুষ্ঠানে এস্তোনিয়ানরা মনে করে যে, ১৯১৮-১৯ সালের সেই যুদ্ধে ব্রিটিশ নৌ এবং বিমান শক্তি এস্তোনিয়ার স্বাধীনতা অর্জনে বড় ভূমিকা রেখেছিল। এস্তোনিয়ার স্বাধীনতা ছিল রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লবের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশের সামরিক মিশনের ফলাফলস্বরূপ যুদ্ধ। ব্রিটিশরা তখন রাশিয়ার উত্তরে মুরমানস্ক এবং আর্কেঞ্জেলস্ক এবং দক্ষিণে ইউক্রেনে বলশেভিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ছিল। প্রায় একইসাথে চলেছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে সদ্য গঠিত দ্বিতীয় পোলিশ রিপাবলিকের সাথে লেনিনের বলশেভিক রাশিয়ার যুদ্ধ। পোল্যান্ডের সরকারি ওয়েবসাইটে বলা হচ্ছে যে, ১৯২০ সালের অগাস্টে সোভিয়েত বাহিনীর হাত থেকে পোলিশরা যখন তাদের রাজধানী ওয়ারশ মুক্ত করার চেষ্টা করছিল, তখন ব্রিটিশরা পোল্যান্ডকে ১’শটা যুদ্ধবিমান এবং বেশকিছু কামান এবং বন্দুক সরবরাহ করেছিল। এভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে ব্রিটেন বল্টিকে তার প্রভাবকে আরও বাড়াতে চেষ্টা করে। তবে জার্মানি এবং রাশিয়ার কারণে এই প্রভাব সবসময়ই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।

‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ব্রিটেনের সাথে পোল্যান্ডের সম্পর্কটা দৃঢ় হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে। ১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বরে জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করলে ব্রিটেন যুদ্ধে যোগ দেয়। ব্রিটেন পোল্যান্ডকে নিরাপত্তা দিতে না পারলেও হাজার হাজার পোলিশ নাগরিক ব্রিটেনের নিরাপত্তার জন্যে জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং জীবন দেয়। ‘দ্যা ফার্স্ট নিউজ’এর এক প্রতিবেদনে মনে করিয়ে দেয়া হয় যে, বিশ্বযুদ্ধের সময় পোলিশ ইন্টেলিজেন্স ছিল ইউরোপের সবচাইতে সফল ইন্টেলিজেন্স সংস্থা। কর্নেল স্টানিসলাউ গানোর নেতৃত্বে এই ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্ক ছিল ব্রিটিশ তথা মিত্রবাহিনীর ইন্টেলিজেন্সের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর মূল অফিস ছিল পশ্চিম লন্ডনের হ্যামারস্মিথের সেন্ট পলস স্কুল। বিশ্বযুদ্ধের শেষে ১৯৫১ সালে ব্রিটেনে পোলিশ নাগরিক ছিল প্রায় ১ লক্ষ ৬০ হাজার; যা পোল্যান্ডের ইইউতে যোগদানের পর ২০১১ সাল নাগাদ ৫ লক্ষ ছাড়িয়ে যায়। ২০০৪ সালে পোলিশরা ব্রিটেনের ১৩তম বিদেশী নাগরিকের গ্রুপ ছিল; ২০০৮ সাল নাগাদ তারা হয়ে যায় বৃহত্তম।

 

ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘রয়াল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইন্সটিটিউট’ বা ‘রুসি’র এক লেখায় এসোসিয়েট ফেলো ডানকান ডিপ্লেজ বলছেন যে, ২০০৮ সালে রাশিয়া জর্জিয়া আক্রমণ করার পর ছোট বল্টিক রাষ্ট্রগুলি দুশ্চিন্তায় পরে যায়। বিশেষ করে রাশিয়া ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখল করে নেবার পর এই দুশ্চিন্তা জেঁকে বসে। উত্তর এস্তোনিয়ার শহরগুলিতে রুশ নাগরিকের অধিক্য সবসময়ই এস্তোনিয়ানদের ভয়ের মাঝে রাখছে। ন্যাটোর সদস্য হওয়ায় এই দেশগুলি রুশ আক্রমণের শিকার হলে ন্যাটোর অন্যান্য দেশ এখানে হস্তক্ষেপ করবে। আর বল্টিকে সম্ভাব্য যেকোন হস্তক্ষেপে ব্রিটেন নেতৃত্ব দেবে। ২০১৭ সাল থেকে ব্রিটেন ন্যাটোর ‘ফ্রেমওয়ার্ক নেশনস কনসেপ্ট’ বা ‘এফএনসি’এর অধীনে বল্টিকে সামরিক মিশন প্রেরণ করছে। ২০১৯ সালে ‘অপারেশন কাবরিট’এর অধীনে ব্রিটেন এস্তোনিয়াতে ৯’শ সেনা প্রেরণ করে। ১৬তম এয়ার এসল্ট ব্রিগেডের প্রায় ২’শ সেনা আকাশ থেকে প্যারাশুট জাম্প করে। সেবছরের এপ্রিল মাস থেকে রয়াল এয়ার ফোর্সের ৪টা ‘ইউরোফাইটার টাইফুন’ যুদ্ধবিমান এস্তোনিয়াতে মোতায়েন করা হয়। তবে ব্রিটিশ বিমান শক্তি মোতায়েনের এরকম কার্যক্রম নিয়মিত চলছে ২০০৪ সাল থেকেই। ২০২০এর জুলাই মাসে রয়াল এয়ার ফোর্স বলে যে, তাদের ‘টাইফুন’ বিমানগুলি তিনটা রুশ যুদ্ধবিমানকে লিথুয়ানিয়ার কাছাকাছি আকাশে বাধা দেয়। এরকম ঘটনা প্রায় নিয়মিতই ঘটছে। বিশেষ করে বল্টিক সাগরে ন্যাটোর সামরিক মহড়া সর্বদাই মস্কোর জন্যে বিরক্তির কারণ। আবার প্রত্যুত্তর হিসেবে রাশিয়াও অত্র অঞ্চলে নিয়মিত সামরিক মহড়া চালায়। বল্টিকে ব্রিটিশ বিমানগুলির সাথে জার্মান, ফরাসি, স্প্যানিশ এবং অন্যান্য মোট ১৪টা দেশের যুদ্ধবিমানও আকাশ পাহাড়া দেয়। তিনটা বল্টিক রাষ্ট্র লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া এবং এস্তোনিয়ার জনসংখ্যা যথাক্রমে ২৮ লক্ষ, ১৯ লক্ষ এবং ১৩ লক্ষ। ছোট্ট এই দেশগুলির বিমান বাহিনীতে কোন ফাইটার বিমান নেই। তাই দেশগুলি নিরাপত্তার জন্যে ন্যাটোর উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতাই ব্রিটেনকে বল্টিক সাগরে গুরুত্বপূর্ণ করে রেখেছে।

বল্টিকের নিরাপত্তায় ন্যাটোর মাঝে নেতৃত্ব ব্রিটেনের হাতে

বল্টিক সাগরের উপকূলে ব্রিটেনের বর্তমান সামরিক অবস্থানকে বুঝতে হলে ন্যাটোর ‘এফএনসি’এর দিকে তাকাতে হবে। সুজারল্যান্ডের থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর সিকিউরিটি স্টাডিজ’ বা ‘সিএসএস’এর এক প্রতিবেদনে ‘জার্মান ইন্সটিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল এন্ড সিকিউরিটি এফেয়ার্স’ বা ‘এসডব্লিউপি’এর রেইনার গ্লাটজ এবং ‘সিএসএস’এর মার্টন জাপফে ন্যাটোর ‘এফএনসি’এর একটা ধারণা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। ‘এফএনসি’এর অধীনে ২০১৩ সাল থেকে ন্যাটোর তিন সীমানা অঞ্চলের নিরাপত্তা দিতে তিনটা দেশের নেতৃত্বে তিনটা নিরাপত্তা কাঠামো পরিকল্পনা করা হয়। এই তিনটা কাঠামোর নেতৃত্বে রয়েছে জার্মানি, ব্রিটেন এবং ইতালি। জার্মানির নেতৃত্বে গ্রুপটা মোট ১৬টা সামরিক সক্ষমতার কথা উল্লেখ করেছে; এর মাঝে ন্যাটোর যে দেশ এই সক্ষমতাগুলির যেটা দিতে পারবে, তারা সেটাতে অংশ নেবে। জার্মানির নেতৃত্বে এই গ্রুপের একটা গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো ন্যাটোর পূর্ব সীমান্তে একটা সমন্বিত সেনাবাহিনী তৈরি করা। ইতালির নেতৃত্বে গ্রুপটা কাজ করবে ইউরোপের দক্ষিণ সীমান্তে; মূলতঃ উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যে। তবে এই গ্রুপটা খুব বড় কোন লক্ষ্য রেখে এগুচ্ছে না। উত্তর ইউরোপে যে গ্রুপটা বড় লক্ষ্য নিয়ে এগুচ্ছে, সেটা হলো ব্রিটেনের নেতৃত্বে থাকা ‘জয়েন্ট এক্সপিডিশনারি ফোর্স’ বা ‘জেইএফ’। ২০১২ সালে পরিকল্পিত হওয়া ‘জেইএফ’এর মাঝে ২০১৪ সালে যুক্ত হয় নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক, স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশ নরওয়ে এবং তিনটা বল্টিক রাষ্ট্র লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া ও এস্তোনিয়া। ২০১৭ সালে ন্যাটোর বাইরের স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশ সুইডেন এবং ফিনল্যান্ডও যুক্ত হয়। এদের একটা লক্ষ্য ছিল ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়া ব্রিটেনের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন। তবে এই দেশগুলির সবগুলিরই মূল লক্ষ্য ছিল উত্তর ইউরোপে রাশিয়ার আগ্রাসী অবস্থানকে মোকাবিলা করা। ব্রিটেন ‘জেইএফ’ নামের এই গ্রুপের কাঠামোটাকে এমনভাবে ডিজাইন করেছে যে, যেকোন দেশ যেকোন সময়ে এই মাঝে যুক্ত হতে পারবে। ‘জেইএফ’এর মূল কর্মক্ষেত্র হলো নরওয়ের উপকূল এবং বল্টিক সাগর। নিয়মিতভাবেই ‘জেইএফ’এর মহড়া অনুষ্ঠিত হচ্ছে বল্টিকে এবং নরওয়ের উপকূলে। ব্রিটেন এর মাধ্যমে পোল্যান্ডের সাথে সামরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করতে চাইবে।

 
এপ্রিল ১৮০১ সাল। কোপেনহাগেনের যুদ্ধে ব্রিটিশরা ড্যানিশ নৌবাহিনীকে পরাজিত করে বল্টিকের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে। বল্টিক সাগরে ব্রিটেনের স্বার্থ কয়েক শতক ধরে। সপ্তদশ শতক থেকে ঊনিশ শতকের শুরু পর্যন্ত কাঠের পালতোলা জাহাজের যুগে ব্রিটেনের একটা বড় বাণিজ্য ছিল বল্টিকের সাথে। ব্রিটিশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ তৈরির উপকরণের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অংশ আসতো সুইডেন, রাশিয়া, প্রুশিয়া, পোল্যান্ড, নরওয়ে থেকে। এই বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে ব্রিটেন স্প্যানিশ, ডাচ এবং ড্যানিশদের সাথে যুদ্ধও করেছে।


বল্টিকে ব্রিটেনের ঐতিহাসিক স্বার্থ

বল্টিক সাগরে ব্রিটেনের স্বার্থ কয়েক শতক ধরে। সপ্তদশ শতক থেকে ঊনিশ শতকের শুরু পর্যন্ত কাঠের পালতোলা জাহাজের যুগে ব্রিটেনের একটা বড় বাণিজ্য ছিল বল্টিকের সাথে। ব্রিটিশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ তৈরির উপকরণের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অংশ আসতো সুইডেন, রাশিয়া, প্রুশিয়া, পোল্যান্ড, নরওয়ে থেকে। এই বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে ব্রিটেন স্প্যানিশ, ডাচ এবং ড্যানিশদের সাথে যুদ্ধও করেছে। ১৭১৮ থেকে ১৭২৬ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশরা বল্টিকে টহল দিয়েছে রুশ হামলা থেকে সুইডিশ উপকুলকে রক্ষা করতে। স্থলভাগে রুশদের আগ্রাসী কর্মকান্ড ব্রিটিশরা থামাতে না পারলেও ১৭৫০এর দশকে প্রুশিয়াকে নিজেদের পক্ষে নিয়ে বল্টিকে প্রভাব ধরে রাখে। বল্টিক সাগরে ঢোকার পথের নিয়ন্ত্রণ মুলতঃ ডেনমার্ক এবং সুইডেনের হাতে; কারণ কোপেনহাগেন শহর এবং সুইডেনের মালমো শহরের পাশ দিয়েই জাহাজগুলিকে বল্টিক সাগরে ঢুকতে বা সেখান থেকে বের হতে হয়। মাত্র ৩ থেকে ৫ কিঃমিঃ চওড়া এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ যাতে অন্য কারুর হাতে চলে না যায়, সেজন্য ব্রিটেন দু’বার কোপেনহাগেন আক্রমণ করে। ১৮০১ সালে প্রথমবার রুশ প্রভাব থেকে মুক্ত করার জন্যে ড্যানিশ নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ব্রিটেন। রুশ রাজা জার পল হত্যার পর বল্টিকের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরিভাবে ব্রিটেনের হাতে যায়। অনেকেই মনে করে থাকেন যে, জার পলের হত্যার পিছনে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত চার্লস হুইটওয়ার্থ জড়িত ছিলেন। এর ছয় বছর পর ১৮০৭ সালে ব্রিটেন আবারও কোপেনহাগেন আক্রমণ করে যাতে ন্যাপোলিয়নের ফ্রান্স ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ড্যানিশ যুদ্ধজাহাজগুলিকে বল্টিকের নিয়ন্ত্রণ নিতে ব্যবহার করতে না পারে।

ঊনিশ শতকে জার্মানির আবির্ভাবের পর ব্রিটিশ নৌবাহিনী বল্টিকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চ্যালেঞ্জের মাঝে পড়ে। তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ‘অপারেশন রেড ট্রেক’ নামে বল্টিকে বলশেভিক বিরোধী মিশন শুরু করে; যার ফলশ্রুতিতে এস্তোনিয়া এবং লাটভিয়ার জন্ম দেয় ব্রিটেন। ১৯১৮ সালের ডিসেম্বরে ব্রিটিশ নৌবাহিনী এস্তোনিয়ার স্বাধীনতাকামীদেরকে বলশেভিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সাড়ে ছয় হাজার রাইফেল, ২’শ মেশিন গান এবং দু’টা কামান সরবরাহ করে। এস্তোনিয়া এবং লাটভিয়া ব্রিটিশদের দ্বারা এতটাই প্রভাবিত ছিল যে, তাদের নতুন তৈরি করা নৌবাহিনীর পতাকাগুলিও ছিল ব্রিটিশ ইউনিয়ন জ্যাক পতাকার আদলে তৈরি। ব্রিটিশ সহায়তা ছাড়া এই দেশগুলির স্বাধীনতা অর্জন যেমন সম্ভব ছিল না, তেমনি তাদের স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখাও ছিল পুরোপুরিভাবে অবাস্তব।

‘রুসি’র ডানকান ডিপ্লেজ বলছেন যে, ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্র তিনটা বল্টিক রাষ্ট্রকে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে ছেড়ে দিলে অনেকেই তা মানতে পারেননি। তবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবার পর এই দেশগুলিকে ন্যাটোর মাঝে এনে নিরাপত্তা দেয়ার ব্যাপারটা কিছুটা হলেও পুরোনো ক্ষতগুলিকে সাড়াতে সহায়তা করবে। 

মার্চ ২০২১। ব্রিটেনের নেতৃত্বে থাকা ‘জয়েন্ট এক্সপিডিশনারি ফোর্স’ বা ‘জেইএফ’ মহড়া দিচ্ছে বল্টিক সাগরে। ব্রিটেন শুধু বল্টিক সাগরে নিজের অবস্থানই ধরে রাখতে চাইছে না; ইউরোপের সাথে রাশিয়ার সম্পর্ককেও নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। ব্রিটেন এখন ওয়ারশতে নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে চাইছে। বেলারুশের সাথে পোল্যান্ড এবং বল্টিক রাষ্ট্রগুলির সীমান্ত সমস্যায় ব্রিটেন অগ্রগামী ভূমিকা নিতে চাইছে এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্র চাইছে বাকি বিশ্ব থেকে তার বাহিনী সরিয়ে ইন্দোপ্যাসিফিকে চীনের বিরুদ্ধে মোতায়েন করতে। পূর্ব ইউরোপের উত্তেজনার উপর ব্রিটেনের প্রভাব যত বেশি থাকবে, যুক্তরাষ্ট্র তার ইউরোপ নীতির জন্যে ব্রিটেনের উপর ততটাই নির্ভর করতে বাধ্য হবে।

ব্রিটেন আসলে কি চাইছে?

ব্রিটেন শুধু বল্টিক সাগরে নিজের অবস্থানই ধরে রাখতে চাইছে না; ইউরোপের সাথে রাশিয়ার সম্পর্ককেও নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। রাশিয়ার ব্যাপারে জার্মানি এবং পোল্যান্ডের নীতির পার্থক্য রয়েছে। জার্মানরা যখন রুশ গ্যাসের উপর তাদের নির্ভরশীলতা বাড়িয়েছে, তখন পোলিশরা রুশ হুমকি মোকাবিলায় নিজ দেশে ন্যাটোর সেনা মোতায়েন চেয়েছে। আর ছোট্ট বল্টিক রাষ্ট্রগুলি নিজেদের কোন নিরাপত্তা কাঠামো না থাকায় ন্যাটোর উপর সম্পূর্ণই নির্ভরশীল থাকতে বাধ্য। ঠান্ডা যুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পোল্যান্ডের সম্পর্ক গভীর হয়েছে। ব্রিটেন এখন ওয়ারশতে নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে চাইছে। বেলারুশের সাথে পোল্যান্ড এবং বল্টিক রাষ্ট্রগুলির সীমান্ত সমস্যায় ব্রিটেন অগ্রগামী ভূমিকা নিতে চাইছে এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্র চাইছে বাকি বিশ্ব থেকে তার বাহিনী সরিয়ে ইন্দোপ্যাসিফিকে চীনের বিরুদ্ধে মোতায়েন করতে। পূর্ব ইউরোপের উত্তেজনার উপর ব্রিটেনের প্রভাব যত বেশি থাকবে, যুক্তরাষ্ট্র তার ইউরোপ নীতির জন্যে ব্রিটেনের উপর ততটাই নির্ভর করতে বাধ্য হবে। আর ইউরোপ নীতি নিঃসন্দেহে যুক্তরাষ্ট্রের সীমিত সম্পদের বিশ্বব্যাপী বন্টনকে প্রভাবিত করবে বলেই যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেনকে গুরুত্ব দিতে বাধ্য হবে। ব্রেক্সিটের পর যে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ নীতি নিয়ে ব্রিটেন এগুচ্ছে, তার ফলাফলই এখন দেখছে মানুষ বেলারুশের সীমানায়। অমানবিকতার উদাহরণ সৃষ্টি করে ঠান্ডায় জমে যাওয়া শরণার্থীদেরকে শক্তি প্রয়োগে ঠেকিয়ে রাখতে পোল্যান্ডকে সমর্থন এবং টেকনিক্যাল সহায়তা দিয়ে ব্রিটেন প্রমাণ করছে যে, তার ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ কৌশল বিশ্বব্যাপী আদর্শকে পূনপ্রতিষ্ঠা করার জন্যে নয়; নিছক ইংরেজি ভাষাভাষী দেশগুলিকে বিশ্বের সবচাইতে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্যে।