Showing posts with label Extremism. Show all posts
Showing posts with label Extremism. Show all posts

Friday, 30 September 2022

ইতালির ডানে মোড়… ইউরোপের জন্যে এটা কেমন বার্তা?

৩০শে সেপ্টেম্বর ২০২২
 
ইতালির নির্বাচনে জেতার পর কট্টর ডানপন্থী কোয়ালিশনের তিন নেতা মাত্তেও সালভিনি, সিলভিও বারলুসকোনি এবং জর্জিয়া মেলোনি। ইতালিতে ফ্যাসিস্ট রাজনীতি কোন না কোন ফর্ম্যাটে চলেছে। নব্য-ফ্যাসিস্টরা তাদের কথাগুলি পরিবর্তন করেছে। কিন্তু তাদের কথার কেন্দ্রে ছিল অভিবাসী নীতি; যেটাকে তারা ইতালির অর্থনৈতিক দৈন্যতার মাঝে সকল সমস্যার উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছে। মেলোনির সরকার কতদিন টিকবে সেটা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও অশ্বেতাঙ্গ অভিবাসীদের উপর এর বিরূপ প্রভাব যে বাড়বে, তা নিশ্চিত।

সেপ্টেম্বরের ইতালির নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থী জাতীয়তাবাদীরা বিশাল বিজয় পেয়েছে। নির্বাচনের সর্বশেষ হিসেবে বলা হচ্ছে যে, জর্জিয়া মেলোনির ‘ব্রাদার্স অব ইতালি’, মাত্তেও সালভিনির ‘লেগা নর্ড’ এবং সিলভিও বারলুসকোনির ‘ফোর্তসা ইতালিয়া’ দলের ডানপন্থী কোয়ালিশন প্রায় ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়েছে। এর মাঝে মেলোনির দল পেয়েছে প্রায় ২৬ শতাংশ ভোট। ইতালির সকল পত্রিকাই মেলোনির দলের বিজয়ের ব্যবধান নিয়ে হেডলাইন করে। কেউ কেউ বলে যে, মেলোনি ইতালির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন। তবে মাত্র ৬৪ শতাংশ ভোটার ভোট দেয়ার কারণে অনেকেই এই ভোটের গুরুত্বকে কিছুটা হলেও কম হিসেবে দেখছেন বলে বলছে ‘ডয়েচে ভেলে’। যারা ডানপন্থী দলের পক্ষে ভোট দেয়নি, তারা আশা করছেন দেশের বাকি জনগণকে সাথে নিয়েই যেন সরকার কাজ করে। তবে এই মুহুর্তে জীবনযাত্রার খরচ মারাত্মক বেড়ে যাওয়ায় এবং ইউক্রেনে যুদ্ধ চলমান থাকায় প্রথম দিন থেকেই মেলোনির সরকার চ্যালেঞ্জের মাঝে পড়বে। নির্বাচিত হবার পর জর্জিয়া মেলোনি তার প্রথম ভাষণে বলেন যে, তিনি ইতালিকে একত্রিত করার চেষ্টা করবেন।

ইতালিতে ডানপন্থী রাজনীতির ইতিহাস

৪৫ বছর বয়স্ক মেলোনির দল ‘ব্রাদার্স অব ইতালি’ ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠা পেলেও আগের কিছু ইতিহাসের সাথে দলটার সম্পর্ক রয়েছে বলে বলছেন অনেকে। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলছে যে, ১৯২২ সালে ইতালিতে বেনিতো মুসোলিনির নেতৃত্বে ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী ‘ন্যাশনাল ফ্যাসিস্ট পার্টি’ ক্ষমতা দখল করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইতালি প্রথমে নাজি জার্মানির পক্ষে থাকলেও মুসোলিনির পতনের পর তারা মিত্রপক্ষে যোগ দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৬ সালে মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট সরকারের চিফ অব স্টাফ গিওরগিও আলমিরান্তের অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয় নব্য-ফ্যাসিস্ট দল ‘ইতালিয়ান সোশাল মুভমেন্ট’ বা ‘এমএসআই’। বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ফ্যাসিস্ট সমর্থকরা এই দলে যোগদান করতে থাকে। প্রায় তিন দশক ধরে চলা এর রাজনীতিতে তারা ১০ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি। তবে ইতিহাসবিদ পল জিনসবর্গ মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, এই দল যে এতকাল টিকে থেকেছিল, সেটাই বড় বিষয়। ইতালির দক্ষিণের জনগণ, শহরাঞ্চলের গরীব মানুষেরা এবং নিম্ন মধ্যবিত্তরা অনেকেই এদের পক্ষে ভোট দিয়েছে। জিয়ানফ্রাঙ্কো ফিনির অধীনে ১৯৯০এর দশকে এই দলে পরিবর্তন আসে। তিনি দলের বক্তব্যগুলিকে পরিবর্তন করেন এবং ১৯৯৩ সালে রোমের মেয়র নির্বাচনে ৪৭ শতাংশ ভোট পেয়ে সকলকে অবাক করে দেন। পরের বছরেই তিনি তার দলের নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘ন্যাশনাল এলায়েন্স’। এই সময়টাতেই রোমের খেটে খাওয়া একজন মহিলার সন্তান জর্জিয়া মেলোনি ‘এমএসআই’তে যোগদান করেন এবং পরে ‘ন্যাশনাল এলায়েন্স’এর যুব দলের নেতা হয়ে যান।

একসময় মুসোলিনিকে বিংশ শতকের সেরা রাজনীতিবিদ বলে আখ্যা দিলেও জিয়ানফ্রাঙ্কো ফিনি তার মতামতকে পরিবর্তন করেন এবং ২০০৩ সালে ইস্রাইল সফর করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে গণহত্যার শিকার ইহুদিদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সেখানে গিয়ে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ইতালির ইহুদী বিদ্বেষী আইনের সমালোচনা করেন। জর্জিয়া মেলোনিও ২০০৯ সালে সিলভিও বারলুসকোনির সরকারের মন্ত্রী থাকার সময় ইস্রাইল সফর করে একই স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ২০১১ সালে ইইউএর প্রভাবে ইতালিতে গঠিত সরকারে মেলোনি যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান। এবং ২০১২ সালে ‘ব্রাদার্স অব ইতালি’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি তার দলকে ‘পুরোনো ঐতিহ্যের জন্যে নতুন দল’ হিসেবে পরিচিত করান। তবে ২০২২ সালের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত তার দল ১০ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি।

মেলোনির ‘ব্রাদার্স অব ইতালি’র লোগো হলো ইতালির জাতীয় পতাকার তিন রঙের আগুন। এর আগের ‘এমএসআই’ এবং ‘ন্যাশনাল এলায়েন্স’এর লোগোও সেটাই ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ‘রুটগার্স ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর কোরি ব্রেনান ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’কে বলছেন যে, রাজনীতিতে লোগোটা ব্র্যান্ডিংএর মতো গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ এটাকে খোঁজে এবং অনুসরণ করে। ইতালিতে মুসোলিনির তৈরি করা অনেক কিছুই এখনও টিকে আছে। বড় বড় স্থাপত্য ছাড়াও রোমের ম্যানহোলের ডাকনার এক-চতুর্থাংশের উপরে লেখা রয়েছে ‘এসপিকিউআর’। যার অর্থ হলো, ‘রোমের সিনেট এবং জনগণ’। মুসোলিনি তার সাম্রাজ্যকে প্রাচীন রোমের সাথে তুলনা দিতে এটা ব্যবহার করতেন। অনেক ম্যানহোলে ফ্যাসিট লোগোটাও রয়েছে। যদিও ইতালিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ফ্যাসিস্ট দল নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তথাপি ডানপন্থীরা এখনও ফ্যাসিস্ট স্যালুট ব্যবহার করে।

বড় বড় স্থাপত্য ছাড়াও রোমের ম্যানহোলের ডাকনার এক-চতুর্থাংশের উপরে লেখা রয়েছে ‘এসপিকিউআর’। যার অর্থ হলো, ‘রোমের সিনেট এবং জনগণ’। মুসোলিনি তার সাম্রাজ্যকে প্রাচীন রোমের সাথে তুলনা দিতে এটা ব্যবহার করতেন। অনেক ম্যানহোলে ফ্যাসিট লোগোটাও রয়েছে। ইউরোপে ডানপন্থী রাজনীতি কখনোই বন্ধ করা হয়নি। উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকেরা লিবারাল রাজনৈতিক ব্যবস্থার মাঝেই তাদের কর্মকান্ড চালিয়ে গেছে। আর সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে অভিবাসী সংকটের পর থেকে ইউরোপজুড়ে ডানপন্থীদের উত্থান হয়েছে। যেকারণে ইতালির এই নির্বাচন পুরো ইউরোপের জন্যেই গুরুত্বপূর্ণ।

 ডানপন্থীরা কিভাবে ইতালির নির্বাচনে জিততে পারলো?

রোমে ‘ইইউ’এর পররাষ্ট্র বিষয়ক কাউন্সিলের প্রকল্প ব্যবস্থাপক টেরেসা কোরাটেলা ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, মেলোনির এই অবস্থানে আসার সবচাইতে বড় কারণ হলো, ২০১৮ সাল থেকে ইতালিতে যতগুলি অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়েছে, তিনি সেগুলির কোনটারই অংশ ছিলেন না। আর দ্বিতীয়তঃ তার কোয়ালিশন সহযোগী মাত্তেও সালভিনি এবং সিলভিও বারলুসকোনি এই মুহুর্তে তাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে সবচাইতে খারাপ সময় পার করছেন। ইতালির আগের সরকার প্রধানদের অনেকেই প্যারিস এবং বার্লিনের নেতৃত্বের সাথে যেমন সমঝোতা করে চলতে বাধ্য হয়েছেন, তিনি হয়তো সেই পথে নাও হাঁটতে পারেন। অন্ততঃ ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত তিনি হাঙ্গেরি এবং পোল্যান্ডের ডানপন্থী নেতৃত্বের সাথে বেশি কাছের সম্পর্ক রেখেছিলেন।

‘এসোসিয়েটেড প্রেস’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে রোমের ‘ইন্সটিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এফেয়ার্স’এর ডিরেক্টর নাথালি টচ্চি ডানপন্থীদের জয়কে ইতালির রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতার সাথে যুক্ত করেন। ডানপন্থীরা জিতেছে, এর অর্থ এই নয় যে, ইতালিয়রা ফ্যাসিস্ট হয়ে গেছে। এদের জয়ের মূল কারণ হলো, জনগণ ইতালির রাজনীতির ব্যাপারে যারপরনাই ক্ষুব্ধ; তারা পরিবর্তন চাইছে। তারা ভিন্ন একটা দলকে ভোট দিতে চাইছিল।

তবে ‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ডানপন্থীরা ভোট পাবার জন্যে এমন কিছু ইস্যুকে বেছে নিয়েছে, তা চিন্তা করার মতো। মাত্তিও সালভিনির নির্বাচনী এলাকা ফেরারা কিভাবে বামপন্থী থেকে ডানপন্থী হয়ে গেলো তার উত্তর খুঁজতে ‘বিবিসি’ বলছে যে, সেখানকার জনগণ মনে করছে যে, অভিবাসীদের কারণে তাদের শহরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছে এবং সাধারণ ইতালিয়রা অর্থনৈতিক সমস্যা পড়েছে। অথচ প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, এই অঞ্চলটা ইতালির অনেক অঞ্চলের চাইতে অধিকতর সমৃদ্বশালী। এখানকার সমস্যা হলো এখানকার স্থবির জনসংখ্যা; যেটার কারণে এখানকার মানুষের অর্থনৈতিক জীবনে পরিবর্তন আসছে না; তাদের ব্যবসা বাণিজ্যের উন্নতি হচ্ছে না। ডানপন্থীরা বলছে যে, এখানকার অর্থনৈতিক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে অভিবাসীদের কারণেই; আর সেটাই অনেক মানুষ সমর্থন করছে। অথচ একসময় এই শহরে ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের অপরাধে অনেক মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে; যাদের মাঝে কেউ কেউ এখনও বেঁচে আছেন। তাদের জীবদ্দশাতেই তারা দেখতে পাচ্ছেন যে, ইতালি আবারও উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির দিকে ধাবিত হচ্ছে।

অনেকেই ডানপন্থীদের জয়ের পিছনে কিছু ষড়যন্ত্র থিউরির কথা বলছেন; যা মানুষ বিশ্বাস করছে। ‘ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলি’র প্রফেসর লরেন্স রোজেনথাল ‘আল জাজিরা’কে বলছেন যে, মেলোনি বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের নীতির বিরুদ্ধে মানুষকে জাগিয়ে তুলেছেন; যার মাঝে রয়েছে নারীবাদী ইস্যুগুলি। তিনি ইতালির পরিবারগুলির স্বার্থ নিয়ে কথা বলেছেন; শরণার্থী থামাতে সীমানা পাহাড়া দেবার কথা বলেছেন। তিনি সেই থিউরির কথা বলে জনগণকে ক্ষেপিয়েছেন, যেখানে বলা হচ্ছে যে, ‘গ্লোবাল এলিট’রা পশ্চিমা দেশগুলির আদিবাসীদেরকে অশ্বেতাঙ্গ অভিবাসী দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে চাইছে। এই থিউরিটাই জনগণের ক্রোধের কেন্দ্রে রয়েছে; যা তিনি ব্যবহার করেছেন। সবগুলি পশ্চিমা দেশেই এই চিন্তাটা ঘনীভূত হচ্ছে এবং এরা সকলেই অশ্বেতাঙ্গদেরকে তাদের সমস্যার কারণ হিসেবে দেখছে।

মেলোনি কিছুদিন আগেই এক বক্তব্যে বলেছেন যে, বামপন্থীরা রক্ষণশীলদের সকল বিশ্বাসের উপরে হামলা করেছে। তিনি সিসিলির উপকূলে আফ্রিকা থেকে আসা অভিবাসীদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ও মেক্সিকোর সীমানার তুলনা করেন। তিনি বলেন যে, হাজারো অভিবাসী শহরের বস্তিগুলি ভরে ফেলছে; এবং তাদের কারণে ইতালির জনগণের পারিশ্রমিক কমে গেছে; এই অভিবাসীরা অনেকেই বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত। মেলোনি ইউরোপের অন্যান্য দেশের জনগণের উদ্দেশ্যে যখন কথা বলছেন, তখন তার কথাগুলি বেশ স্পস্ট। স্পেনের কট্টর ডানপন্থী ‘ভোক্স’ পার্টির এক র‍্যালিতে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন যে, তিনি স্বাভাবিক পরিবারের পক্ষে; সমকামি লবির পক্ষে নন। মানুষের লিঙ্গ পরিচয়ের ব্যাপারে তিনি একাত্মতা প্রকাশ করলেও লিঙ্গ নিয়ে আদর্শের বিরোধী।

 
জর্জিয়া মেলোনির পিছনে 'ব্রাদার্স অব ইতালি'র লোগো; যেখানে রয়েছে ইতালির পতাকার তিন রঙের আগুন। এর আগের নব্য-ফ্যাসিস্ট দল ‘ইতালিয়ান সোশাল মুভমেন্ট’ বা ‘এমএসআই’ এবং ‘ন্যাশনাল এলায়েন্স’এর লোগোও ছিল এটাই। রাজনীতিতে লোগোটা ব্র্যান্ডিংএর মতো গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ এটাকে খোঁজে এবং অনুসরণ করে।

ডানপন্থীদের নীতি কি ইইউএর সাথে সাংঘর্ষিক হবে?

ইইউ পার্লামেন্টে জার্মানির ক্ষমতাসীন সোশালিস্ট দলের প্রতিনিধি এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট ক্যাটারিনা বারলি ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, মেলোনি ক্ষমতায় যাবার পরে তার পূর্বের নীতির মতোই চলবেন, নাকি পরিবর্তিত হবেন, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে এটা নিশ্চিত যে, অর্থনৈতিক এবং আর্থিক নীতির ক্ষেত্রে তিনি রক্ষণশীল ভূমিকা নেবেন; আর মানবাধিকার, নারীর অধিকার, এবং সংখ্যালঘুদের অধিকারের মতো আদর্শিক বিষয়ের ক্ষেত্রে খুবই কঠোরভাবে জনমতের উপরে চলবেন। ইউরোপের খারাপ সময়ে তার জাতীয়তাবাদী এজেন্ডাগুলি ইউরোপকে একত্রিত করবে না। ক্যাটারিনা বারলি বলছেন যে, তাদের অভিজ্ঞতায় এধরনের সরকারগুলির ইইউএর মাঝে ছাড় দেয়ার প্রবণতা থাকে না। অথচ ইইউএর নীতি তখনই তৈরি করা সম্ভব, যখন সেখানে একেকটা দেশের ছাড় দেয়ার প্রবণতা থাকে। যদি একেকটা দেশ মাঝে মাঝে নিজের স্বার্থ দেখে, তাহলে সেটা মেনে নেয়া যায়। কিন্তু সেটা যদি চলতেই থাকে, তাহলে ইইউ আর ইইউ থাকবে না; তা হয়ে যাবে কিছু স্বার্থপর মানুষের ক্লাব। বারলি বলছেন যে, এখন পর্যন্ত মেলোনি ইউক্রেন যুদ্ধে ইউক্রেনের পক্ষে কথা বললেও তার কোয়ালিশন সহযোগী মাত্তেও সালভিনি এবং সিলভিও বারলুসকোনি ভ্লাদিমির পুতিনের সমর্থক বলে পরিচিত। কাজেই এখনই বলা যাচ্ছে না যে, ইউক্রেন যুদ্ধে ইতালির অবস্থান কি হবে। তবে ইইউএর জ্বালানি সংকটের মাঝে ইতালি খুব সম্ভবতঃ রুশ জ্বালানির উপরে নির্ভরশীল দেশগুলির জন্যে কোন ছাড় দিতে রাজি হবে না।

মেলোনির ‘ব্রাদার্স অব ইতালি’ দলের সংসদ সদস্য ইলেনিয়া লুকাসেলি ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, ইতালির জনগণ রক্ষণশীল; তাদের দলও সেইরকমই। অভিবাসী, সমকামিদের অধিকার, গর্ভপাতের অধিকার ইত্যাদি আদর্শিক বিষয় এই মুহুর্তে তাদের দলের কাছে অর্থনৈতিক সমস্যার চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। ইতালির রক্ষণশীল জনগণ প্রকৃতপক্ষে শরণার্থীদের জন্যে জীবন দিতে প্রস্তুত নয়। লুকাসেলি বলছেন যে, তাদের দলের সাথে মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট দলের কোন সম্পর্ক নেই। এই দলের সাথে সম্পর্কিত কেউ যদি ব্যক্তিগতভাবে সোশাল মিডিয়াতে কোন উগ্রপন্থী কথা বলে থাকে, সেটা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন; কারণ এই দলটা অনেক বড়। প্রতিটা মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তবে দলের কোন নীতির মাঝে উগ্রতা নেই।

ডানপন্থীদের বিজয়কে কে কিভাবে দেখছে?

‘ডয়েচে ভেলে’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, জার্মানির ক্ষমতাসীন বামপন্থী সোশালিস্ট সরকার ইতালির নির্বাচনের ব্যাপারে রয়েসয়ে বক্তব্য দিচ্ছে। তবে উগ্র ডানপন্থী ‘অলটারনেটিভ ফর জার্মানি’ বা ‘এএফডি’ দল ইতালির নির্বাচনে খুশি। তারা বলছে যে, সুইডেন এবং ইতালিতে ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলির বিজয় প্রমাণ করছে যে, বামপন্থী রাজনীতি এখন অতীতের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফ্রান্স এবং স্পেনের ডানপন্থী বিরোধী দলগুলিই মেলোনির বিজয়ে প্রথম অভিনন্দন জানিয়েছে। এছাড়াও ইইউএর মাঝে ‘ইউরোস্কেপটিক’ পোল্যান্ড এবং হাঙ্গেরির সরকারও তাদের উৎফুল্লতা প্রকাশ করেছে। তবে ইইউএর বাকি দেশগুলি মেলোনির ব্যাপারে একেবারেই আশাবাদী নয়; কারণ তিনি এতদিন তার নীতিতে ইতালির স্বার্থকেই প্রাধান্য দেবার কথা বলেছেন। যদিও ইইউএর পক্ষ থেকে নীতিগত কারণে ইতালির নির্বাচন নিয়ে কোন মন্তব্য করা হয়নি, তথাপি ইইউ কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেইয়েন বলেছেন যে, যেসব দেশ ইইউএর আদর্শকে সন্মান করবে না, সেসব দেশকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো পদ্ধতি ইইউএর জানা রয়েছে।

জার্মানির ‘গ্রিন পার্টি’র সংসদ সদস্য টোবিয়াস বাখেরলে ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, এখনও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না যে, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনকে সহায়তা দেয়া এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবরোধ চালিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে ইতালির ডানপন্থী দলের নীতি কি হবে। তবে এটা নিশ্চিত যে, বিভিন্ন ইস্যুতে ইইউএর অন্যান্য দেশের ডানপন্থী সরকারগুলির সাথে ইতালির এই সরকার তাল মেলাবে। বাখেরলে পুরো ইউরোপ জুড়ে ডানপন্থী দলগুলির জয়জয়কারে যথেষ্ট চিন্তিত। তিনি মনে করছেন না যে, ডানপন্থীদের উত্থানের ব্যাপারে শুধুমাত্র তার দলের মতো বামপন্থী দলগুলিরই চিন্তা করতে হবে। তিনি বিশেষ করে উগ্র ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী চিন্তার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়াটা সকলের কর্তব্য বলে মনে করেন; কারণ এই চিন্তাগুলি গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে কাজ করছে।

‘আল জাজিরা’ বলছে যে, পশ্চিমা দেশগুলিতে ডানপন্থী জাতীয়তাবাদীরা কিছু ইস্যুতে একমত হচ্ছে; যার মাঝে রয়েছে অভিবাসী ইস্যু, গর্ভপাতের অধিকার, সমকামিদের অধিকার; এবং এর সাথে কিছু ইস্যু, যেগুলিকে ডানপন্থীরা ‘গ্লোবালিস্ট’ ইস্যু বলে আখ্যা দিচ্ছে; অর্থাৎ তারা বলছে যে, সেগুলি দুনিয়ার সমস্যা হলেও তাদের দেশের সেখানে মাথা ঘামাবার দরকার নেই। এই চিন্তগুলি যুক্তরাষ্ট্রেও অনেকেই সমর্থন করেন; যারা মূলতঃ রিপাবলিকান দলের সমর্থক। রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজ এবং টম কটন; কংগ্রেস সদস্য মারজোরি টেইলর গ্রিন, এবং প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব মাইক পম্পেও সকলেই ইতালির ডানপন্থী নেতাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। কংগ্রেস সদস্য লরেন বুবার্ট এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, বামপন্থীরা শুধু ধ্বংসই করেছে; যা সারা দুনিয়ার মানুষ বুঝতে পারছে। রিপাবলিকানপন্থী মিডিয়া ‘ফক্স নিউজ’এর প্রভাবশালী সাংবাদিক টাকার কার্লসন ইতালিতে ডানপন্থীদের বিজয়কে একটা বিপ্লব হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

 
ফ্যাসিস্ট স্যালুট দিচ্ছে ইতালির ফুটবল ক্লাব 'লাতসিও'র সমর্থকেরা। ইতালিতে মেলোনির জয় বাকি ইউরোপে এবং যুক্তরাষ্ট্রে চরম ডানপন্থীদের শক্তিশালী করবে। বিশেষ করে জার্মানির উগ্র ডানপন্থী গ্রুপগুলি এই নির্বাচনের ফলাফলে আরও অনুপ্রাণিত হবে। এমতাবস্থায় সবচাইতে বড় প্রশ্নের মুখে পড়বে জার্মানির রাজনৈতিক লক্ষ্য; যা কিনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উগ্র ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে মিত্রশক্তিই নির্ধারণ করে দিয়েছিল।

ইউরোপে উগ্রপন্থীদের পুনরুত্থান

ফিলিস্তিন বংশোদ্ভূত ইতালিয় সাংবাদিক এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউনিভার্সিটি অব মায়ামি’র প্রফেসর রুলা জেব্রীল ‘আল জাজিরা’কে বলছেন যে, ইতালিতে মেলোনির জয় বাকি ইউরোপে এবং যুক্তরাষ্ট্রে চরম ডানপন্থীদের শক্তিশালী করবে। ডানপন্থী এই কর্মকান্ডগুলি যথেষ্ট সংগঠিত এবং এদের বিচরণ এখন বিশ্বব্যাপী। একসময় মেলোনিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার ফলে তিনি ডানপন্থীদের ক্রোধের শিকার হন। ইতালিতে নির্বাচনের পর থেকে তার এবং তার মতো ডানপন্থীদের সমালোচকদের বিরুদ্ধে প্রাণনাশের হুমকি আসতে শুরু করেছে।

২০১৯এর এপ্রিলে ইতালির ফুটবল ক্লাব ‘লাতসিও’র কিছু সমর্থক মিলানে একটা খেলা শুরুর আগে রাস্তায় ‘বেনিতো মুসোলিনির প্রতি সন্মান’ লেখা একটা ব্যানার তুলে ধরে। প্রায় ৭০ জনের মতো সমর্থক ফ্যাসিস্ট সঙ্গীত গায় এবং ফ্যাসিস্ট স্যালুট দেখায়। ‘সিএনএন’ বলছে যে, ব্যানারটা যে যায়গায় দেখানো হয়, তার কাছেই ১৯৪৫ সালে মুসোলিনি, তার স্ত্রী এবং উচ্চপদস্থ ফ্যাসিস্ট নেতাদের হত্যা করে তাদের মৃতদেহ উল্টো করে ঝুলিয়া রাখা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, দিনটাও ছিল ‘লিবারেশন ডে’র আগের দিন; যে দিনটা ইতালিতে ফ্যাসিস্টদের হাত থেকে ইতালির মুক্ত হওয়ার দিন হিসেবে পালন করা হয়। অবশ্য ইতালিতে ফুটবল মাঠে ডানপন্থীদের স্যালুট এবং অন্যান্য প্রতীকের দৃশ্যমান হওয়াটা নতুন নয়। বহুবার এ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলেও তা চলছে। তৎকালীন ডানপন্থী উপপ্রধানমন্ত্রী মাত্তেও সালভিনি ফুটবল মাঠে ফ্যাসিস্ট স্যালুটের সমালোচনা করলেও এর বাইরে তিনি তেমন কিছু করেননি।

ডানপন্থীরা কতদিন ক্ষমতায় থাকতে পারবে?

‘রয়টার্স’এর এক প্রতিবেদনে প্রশ্ন করা হচ্ছে যে, ইতালিতে যখন ১৯৪৮ সালের পর থেকে একেকটা সরকারের গড় আয়ু মাত্র ১৪ মাস, সেখানে ডানপন্থী কোয়ালিশনের প্রতিশ্রুত ৫ বছর উচ্চাকাংক্ষাই বটে। আর দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সমস্যা নিরসনে নীতি নিয়ে কোয়ালিশনের সদস্য দলগুলির মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে। মূল্যস্ফীতির প্রভাব কমাতে আগের সরকার ৪০ বিলিয়ন ইউরোর প্রণোদনা দিয়েছে। এখন মেলোনির শরীক দলের প্রধান বারলুসকোনি চাইছেন আরও ৩১ বিলিয়ন ইউরো ঋণ করে প্রতি মাসে ১ হাজার ইউরো পেনসনের ব্যবস্থা করতে। কিন্তু ইতালির বর্তমান রাষ্ট্রীয় ঋণ ২ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ইউরো, যা কিনা দেশটার জিডিপির দেড় গুণ! এমতাবস্থায় উচ্চ সুদে ইতালি কতটা অর্থ ঋণ করতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অপরদিকে মেলোনির উপদেষ্টারা বলছেন যে, তারা হয়তো দারিদ্র্য বিমোচনে অর্থায়ন কমিয়ে দিয়ে কর কমাবার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু মেলোনির শরীক দলগুলি যদি তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বেশি আগ্রহী হয়, তাহলে তার নীতি বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির সমস্যাকে কাটিয়ে উঠতে না পারলে ১ লক্ষ ২০ হাজার কোম্পানি এবং ৩ লক্ষ ৭০ হাজার কর্মসংস্থান ঝুঁকির মাঝে পড়বে।

ইউরোপে ডানপন্থী রাজনীতি কখনোই বন্ধ করা হয়নি। উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকেরা লিবারাল রাজনৈতিক ব্যবস্থার মাঝেই তাদের কর্মকান্ড চালিয়ে গেছে। আর সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে অভিবাসী সংকটের পর থেকে ইউরোপজুড়ে ডানপন্থীদের উত্থান হয়েছে। যেকারণে ইতালির এই নির্বাচন পুরো ইউরোপের জন্যেই গুরুত্বপূর্ণ। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলছে যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে জার্মানিতে নাজি পার্টির সকল স্তম্ভ দূরীকরণের যে প্রচেষ্টা চলেছে, তা ইতালিতে হয়নি। কিন্তু তারা বলছে না যে, জার্মানিতে এতকিছু করার পরেও নব্য-নাজিরা এখনও সক্রিয় এবং উগ্র ডানপন্থী দল ‘এএফডি’ আইনগতভাবেই রাজনীতিতে রয়েছে। অপরদিকে ইতালিতে নব্য-ফ্যাসিস্ট দলের রাজনীতি করার ব্যাপারটা অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলি যতটা মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করেছে, ইতালিতে সেটা তেমন বড় কোন বিষয় ছিল না কখনোই। মোটকথা ইতালিতে ফ্যাসিস্ট রাজনীতি কোন না কোন ফর্ম্যাটে চলেছে। নব্য-ফ্যাসিস্টরা তাদের কথাগুলি পরিবর্তন করেছে। কিন্তু তাদের কথার কেন্দ্রে ছিল অভিবাসী নীতি; যেটাকে তারা ইতালির অর্থনৈতিক দৈন্যতার মাঝে সকল সমস্যার উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছে। মেলোনির সরকার কতদিন টিকবে সেটা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও অশ্বেতাঙ্গ অভিবাসীদের উপর এর বিরূপ প্রভাব যে বাড়বে, তা নিশ্চিত। আর ইউরোপের অন্যান্য দেশ, বিশেষ করে জার্মানির উগ্র ডানপন্থী গ্রুপগুলি এই নির্বাচনের ফলাফলে আরও অনুপ্রাণিত হবে। ইউরোপজুড়ে ডানপন্থীদের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি ইইউএর কর্মসম্পাদনকে আরও চ্যালেঞ্জের মাঝে ফেলে দেবে। একেকটা দেশ যখন জাতীয় স্বার্থকে ইউরোপের উপরে স্থান দিচ্ছে, তখন ইইউএর অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় সবচাইতে বড় প্রশ্নের মুখে পড়বে জার্মানির রাজনৈতিক লক্ষ্য; যা কিনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উগ্র ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে মিত্রশক্তিই নির্ধারণ করে দিয়েছিল।



সূত্রঃ
‘Why Republicans are elated by ‘triumph’ of Italy’s Giorgia Meloni’ in Al-Jazeera, 27 September 2022
‘Italy’s right-wing winners inherit poison chalice’ in Reuters, 26 September 2022
‘How a party of neo-fascist roots won big in Italy’ in Associated Press, 26 September 2022
‘Lazio fans hang pro-Mussolini banner, make fascist salutes ahead of Liberation day’ in CNN, 24 April 2019
‘Why is Italy swinging to the far right?’ in BBC News, (https://www.youtube.com/watch?v=BNRQTSfAR1o)
‘How extremist is Italy's designated far-right government?’ in DW News, 27 September 2022 (https://www.youtube.com/watch?v=4S89Iuz1I7E)

Thursday, 13 January 2022

তুরস্কে ডানপন্থী উগ্র জাতীয়তাবাদীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে কেন?

১৩ই জানুয়ারি ২০২২

তুর্কি উগ্রপন্থী জাতীয়তাবাদী ‘উলকুচু’ বা ‘গ্রে উল্ভস’ গ্রুপের ‘উলফ স্যালুট’। তুরস্কে সিরিয় শরণার্থীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনাগুলি ঘটনাগুলি একটা ধারাবাহিকতাকেই দেখিয়ে দিচ্ছে। আঙ্কারায় সিরিয় শরণার্থীদের সাথে তুর্কিদের দাঙ্গার পর ‘আমরা সিরিয়দেরকে চাই না’, ‘আমরা কোন আফগান চাইনা’ এবং ‘তুরস্ক হলো শুধুমাত্র তুর্কিদের জন্যে’ হ্যাশট্যাগ দিয়ে সোশাল মিডিয়া ভরে যায়।

 
গত ১১ই জানুয়ারি তুরস্কের দক্ষিণের দিয়ারবাকির শহরে ১৮ বছর বয়সী একজন সিরিয় শরণার্থীকে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবার সময় ছুরিকাঘাত করা হয়। এর আগের দিন তুরস্কের বড় শহর ইস্তাম্বুলের বায়রামপাশা এলাকায় নাঈল আল নাঈফ নামের ১৯ বছর বয়সী আরেকজন সিরিয় শরণার্থীকে গভীর রাতে তার ঘরে ঢুকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। এর আগে ৯ই জানুয়ারি একজন তুর্কি নাগরিককে একজন সিরিয় শরণার্থী সিগারেট দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় ইস্তাম্বুলের এসেনইয়ুর্ত এলাকায় সিরিয়দের ব্যবহৃত একটা শপিং মলে অনেকজন দুর্বৃত্ত একত্রে হামলা চালিয়ে ক্ষতিসাধন করে। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, সোশাল মিডিয়াতে ভাইরাল হওয়া একটা ভিডিওতে দেখা যায় যে, কয়েক’শ মানুষ মিছিল করতে করতে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে এবং স্লোগান দিচ্ছে ‘এটা তুরস্ক; সিরিয়া নয়’। তারা একসময় রাস্তার পার্শ্ববর্তী শপিং মলে হামলা চালিয়ে ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে এবং মলের ভেতরে থাকা সিরিয়দের উপর হামলা করে। তবে সবচাইতে ভয়ংকর ঘটনাটা ঘটে তুরস্কের পশ্চিমের শহর ইজমিরে। ১৬ই নভেম্বর কনস্ট্রাকশন সেক্টরে কাজ করা তিনজন সিরিয় কর্মীকে ঘুমের মাঝে পুড়িয়ে মারা হয়। প্রথমে ঘটনাটা দুর্ঘটনা বলে বলা হলেও পরে এর পিছনে হত্যার লক্ষণগুলি প্রকাশ পেতে থাকে। পুলিশ প্রায় একমাস পর ২১শে ডিসেম্বর কেমাল কোরুকমাজ নামের ৪০ বছর বয়সী একজন তুর্কি নাগরিকের স্বীকারোক্তির উপর ভিত্তি করে হত্যাকান্ডের তদন্ত শুরু করে। ২৩ বছর বয়সী মামুন আল নাবহান, ২১ বছর বয়সী আহমেদ আল আলী, এবং ১৭ বছর বয়সী মোহাম্মদ আল বিশ রাতের বেলায় তাদের ঘরে আগুন লাগলে আর বের হতে পারেননি। গ্রেপ্তারকৃত কেমাল কোরুকমাজ নিজেই ঘটনার দিন আরেক ব্যক্তিকে বলেছিল যে, সে সিরিয়দেরকে খুন করতে চায়। এই সূত্রে পুলিশ তার উপর নজরে রাখার পরেও ঘটনা ঘটে এবং ঘটনার দশ দিন পর পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, এই ঘটনাগুলি তুরস্কে শরণার্থীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার মারাত্মক ধারাবাহিকতাকেই দেখিয়ে দিচ্ছে। তবে এই সহিংসতা যে কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, তা একটু গভীরে গেলেই বোঝা যাবে।

রাজনীতিবিদেরাই যখন উগ্র জাতীয়তাবাদী

তুরস্কে বর্তমানে ৬০ লাখের মতো অভিবাসী এবং শরণার্থী রয়েছে; যাদের মাঝে প্রায় ৩৬ লাখ হলো সিরিয়। তুরস্কের রাজনৈতিক মহলে অনেকেই বলতে শুরু করেছে যে, তুরস্কের অর্থনৈতিক সমস্যার জন্যে সিরিয় শরণার্থীরাই দায়ী। ২০২১ সালে তুরস্কের একটা আদালত ইস্তাম্বুলের পূর্বের শহর বোলুর মেয়রের শরণার্থী বিরোধী কিছু সিদ্ধান্তকে খোলাখুলিভাবে বর্ণবাদী আখ্যা দিয়ে বাতিল ঘোষণা করে। তুরস্কের প্রধান বিরোধী দল ‘রিপাবলিকান পিপলস পার্টি’ বা ‘সিএইচপি’র সদস্য মেয়র তানজু ওজকান সিরিয় শরণার্থীদের জন্যে ১১ গুণ বেশি মূল্যে পানি সরবরাহ করার পরিকল্পনা করেন; একইসাথে সিরিয়দের বিয়ের লাইসেন্স ১ লক্ষ লিরা ধার্য করেন। তিনি বলেন যে, এই সিদ্ধান্তের পিছনে তার উদ্দেশ্য হলো সিরিয় শরণার্থীদেরকে তার শহর থেকে তাড়ানো। ‘সিএইচপি’র নেতৃত্ব ওজকানের এহেন বর্ণবাদী সিদ্ধান্তের সমর্থন না করলেও তুর্কি রাজনীতিবিদেরা অনেকেই তাদের শরণার্থী বিরোধী কথা চালিয়ে যাচ্ছেন।

জানুয়ারির শুরুতেই তুরস্কের পুলিশ ডানপন্থী দল ‘জাফের পার্টি’র প্রধান উমিত ওজদাগএর বিরুদ্ধে ‘মানুষের মাঝে ঘৃণা ছড়ানো’র অভিযোগ আনে। অথচ অভিযোগ দায়ের কথার তিন বছরেরও বেশি সময় আগে ২০১৭ সালের নভেম্বরে ওজদাগ দাবি করেছিলেন যে, সিরিয় শরণার্থীরা স্থূলকায় হয়ে যাচ্ছে; যেখানে তুর্কিরা দারিদ্র্যের মাঝে পতিত হচ্ছে। ওজদাগ একদিন একটা সিরিয় মালিকানার দোকানে ঢুকে ট্যাক্সের কাগজ এবং পরিচয়পত্র দেখতে চান এবং পুরো ব্যাপারটাকে ভিডিও করে অনলাইনে প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি দোকান মালিককে তুর্কি ভাষা না বলতে পারার জন্যে তিরস্কার করেন। তিনি টুইটারে লেখেন যে, এই দোকান মালিকের মতো আরও ৯ লক্ষ লোক তুরস্কে রয়েছে; যারা তুরস্কের জন্যে হুমকি। আরেকটা ঘটনায় গত নভেম্বরে তুরস্কের বিরোধী দল ‘আইওয়াইআই পার্টি’র সদস্য ইলায় আসকোয় ৪৫ জন সিরিয়কে তুরস্কের অর্থনীতিকে নিয়ে ব্যাঙ্গাত্মক ভিডিও তৈরির অভিযোগে দেশ থেকে বের করে দেয়ার ব্যাপারে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেন। তুর্কি মিডিয়া ‘আহভাল’ বলে যে, গত অক্টোবরে তুরস্কের রাস্তায় এক ব্যক্তি মিডিয়াকে বলে যে, তুর্কিরা অর্থনৈতিকভাবে খুব খারাপ রয়েছে; অথচ তুরস্কে থাকা সিরিয়রা বেশ রয়েছে। তিনি বলেন যে, তিনি কলা কিনতে পারছেন না; অথচ সিরিয়রা কেজি কেজি কলা কিনতে পারছে। এই সাক্ষাতের পর তুরস্কে বসবাসরত কয়েকজন সিরিয় অনলাইনে ব্যাঙ্গাত্মকভাবে কলা খাওয়ার ভিডিও প্রকাশ করে।

‘ডয়েচে ভেলে’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ২০২১এর অগাস্টে আঙ্কারার আলতিনদাগ এলাকায় সিরিয় শরণার্থী এবং তুর্কিদের মাঝে দ্বন্দ্ব হানাহানিতে পরিণত হয়। এর মাঝে দু’জন তুর্কি ছুরিকাহত হয়; যাদের একজন পরবর্তীতে মৃত্যুবরণ করে। ঘটনার পর শতশত তুর্কি শহরের সিরিয় বাড়িঘর, দোকানপাট এবং গাড়ি ভাংচুর করে। এই ভাংচুরের দৃশ্য অনেকেই টুইটারে লাইভ প্রকাশ করে। ভিডিওগুলিতে অনেককেই দেখা যায় উগ্র জাতীয়তাবাদী স্লোগান ব্যবহার করতে। কেউ কেউ তাদের হাত দিয়ে ‘উলফ স্যালুট’ দিচ্ছিলো; যা হলো তুর্কি উগ্রপন্থী জাতীয়তাবাদী ‘উলকুচু’ বা ‘গ্রে উল্ভস’ গ্রুপের চিহ্ন। দাঙ্গার পর ‘আমরা সিরিয়দেরকে চাই না’, ‘আমরা কোন আফগান চাইনা’ এবং ‘তুরস্ক হলো শুধুমাত্র তুর্কিদের জন্যে’ হ্যাশট্যাগ দিয়ে সোশাল মিডিয়া ভরে যায়।

তুরস্কের শরণার্থী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থা ‘হেপিমিজ গোচমেনিজ’এর একজন সদস্য য়িলদিজ ওনেন ‘আল জাজিরা’কে বলেন যে, ‘আইওয়াইআই পার্টি’ বা ‘সিএইচপি’র সদস্য বোলুর মেয়র বা উমিত ওজদাগএর মতো লোকেরা যখন বারংবার বলতে থাকে যে শরণার্থীরা তুরস্কের প্রধান সমস্যা, তখন কিছু উগ্রপন্থী লোক শরণার্থীদের উপর হামলা করার কারণ পেয়ে যায়। এটা শুধু কয়েক ব্যক্তির কর্মকান্ড নয়, বরং পুরো দেশে কয়েক মাস ধরে চলা রাজনৈতিক পরিবেশই এসকল ঘটনার জন্যে দায়ী। ওনেন বলছেন যে, সবচাইতে মারাত্মক ব্যাপার হলো, এই ঘটনাগুলি তুরস্কের সরকার বা মিডিয়ার কাছে তেমন কোন গুরুত্বই পায়নি; অথচ লক্ষ লক্ষ তুর্কি, যারা জার্মানিতে বসবাস করে জাতিগত বৈষম্যের শিকার হচ্ছে, তাদের ব্যাপারগুলি পুরোপুরি আলাদাভাবে দেখা হচ্ছে। যখন জার্মানিতে তুর্কিদের উপর হামলা হয়, তখন রাজনীতিবিদেরা এবং সরকার কঠোর বিবৃতি দেয়; অনেকেই রাস্তায় প্রতিবাদ সমাবেশ করে। অথচ ইস্তাম্বুলের এসেনইয়ুর্ত এলাকার ভিডিওতে যখন শতশত মানুষকে সিরিয় দোকানে হামলা করতে দেখা গেলো, তখন মাত্র সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হলো!

 
আঙ্কারার রাস্তায় 'উলফ স্যালুট' দিচ্ছে তুর্কি যুবারা। সিরিয় শরণার্থীর বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনাগুলি তুরস্কের সরকার বা মিডিয়ার কাছে তেমন কোন গুরুত্বই পায়নি; অথচ লক্ষ লক্ষ তুর্কি, যারা জার্মানিতে বসবাস করে জাতিগত বৈষম্যের শিকার হচ্ছে, তাদের ব্যাপারগুলি পুরোপুরি আলাদাভাবে দেখা হচ্ছে। যখন জার্মানিতে তুর্কিদের উপর হামলা হয়, তখন রাজনীতিবিদেরা এবং সরকার কঠোর বিবৃতি দেয়; অনেকেই রাস্তায় প্রতিবাদ সমাবেশ করে। অথচ ইস্তাম্বুলের এসেনইয়ুর্ত এলাকার ভিডিওতে যখন শতশত মানুষকে সিরিয় দোকানে হামলা করতে দেখা গেলো, তখন মাত্র সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হলো!

ইজমিরের নৃশংসতা

তুর্কি পত্রিকা ‘ইয়েনি সাফাক’ বলছে যে, ইজমিরের হত্যাকান্ডের স্বীকারোক্তি দেয়া কেমাল কোরুকমাজ ঘটনার ১০ দিন পর গত ২৬শে নভেম্বর দু’জন ব্যক্তিকে আলাদাভাবে ছুরিকাঘাত করে। পুলিশের সামনে সে গর্ব করে স্বীকার করে যে, এর আগে তিনজন সিরিয় নাগরিককে সে নিজেই আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেছে। তুর্কি মিডিয়া ‘এভরেনসেল’ বলছে যে, কোরুকমাজ পুলিশকে বলে যে, সে দুই দশক আগে তুরস্কের সামরিক ইন্টেলিজেন্স সংস্থা ‘জেআইটিইএম’এর অধীনে গোপন মিশনে কাজ করতো। সে বলে যে, সে তার গাড়ির উইন্ডশিল্ডের উপর সিরিয়দেরকে হত্যা করার ব্যাপারে পরপর তিনটা নির্দেশনা পাবার পরেই কাজটার পরিকল্পনা শুরু করে। সে অভিযোগ করে যে, সিরিয়রা আসার পর থেকে সে চাকুরি পাচ্ছিলো না। সে মৃত ব্যক্তিদের সাথে একই বাড়িতে থাকা শুরু করে, যা কংক্রিট কোম্পানি ‘বিরলিক বেটন’এর মালিকানায় ছিলো। ঘটনার রাতে সে বের হয়ে গিয়ে পাঁচ লিটার পেট্রোল কিনে এনে বাড়িতে আগুন লাগায়।

ইজমিরে পুড়ে মারা যাওয়া সিরিয়দের একজনের ভাই আহমেদ আল বিশ তুরস্কের কুর্দি মিডিয়া ‘রুদাউ’কে বলেন যে, ভবিষ্যতে যাতে এধরনের ঘটনা না ঘটে, সেজন্য তিনি ক্ষমতাসীন ‘একে পার্টি’, তুরস্কের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, মানবাধিকার সংস্থা এবং জাতিসংঘকে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানাচ্ছেন। এধরনের হামলা জাতীয়তাবাদীরা করছে বলে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। মৃত আরেকজনের ভাই আহমেদ আল নাবহান তুর্কি মিডিয়া ‘দুভার’কে বলেন যে, পুলিশ তাকে বলেছিল যাতে সে ঘটনার ব্যাপারে চুপ থাকে। পুলিশ এক ব্যক্তিকে সন্দেহ করছে; এবং সেই ব্যক্তি গ্রেপ্তার হবার আগ পর্যন্ত যেন সে কাউকে কিছু না বলে। আল নাবহান আরও বলেন যে, তিনি চান সরকার যাতে সুষ্ঠু বিচার করে এবং বর্ণবাদ রোধে দায়ী ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ সাজা দেয়। তিনি বলেন যে, তুর্কি, সিরিয়, ইরাকি, জর্ডানিয়ানরা সকলেই মুসলিম। তুরস্কের ১৩টা মানবাধিকার সংস্থা এক যৌথ বিবৃতিতে বলে যে, ইজমিরের ঘটনাটা ছিল পুরোপুরিভাবে বর্ণবাদী চিন্তা প্রসূত। তারা ঘটনা তুরস্কের জনগণ এবং মৃতদের আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখার জন্যে তুর্কি সরকারকে দায়ী করেন। তুরস্কের মানবাধিকার এসোসিয়েশন ‘আইএইচডি’র প্রধান জাফের ইনসে বলেন যে, তারা জানেন যে, আইন শৃংখলা বাহিনী এবং অগ্নি নির্বাপক বাহিনীর সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। তবে দায়ী ব্যক্তি নিজেই স্বীকার করেছে যে, সে এক মারাত্মক পরিকল্পনার মাধ্যমে এই কাজটা করেছে। যদিও এখনও তদন্ত শুরুর দিকে রয়েছে, তথাপি এটা বোঝা যাচ্ছে যে, অনেক লোক এই ঘটনায় জড়িত।

 
তুরস্কের জাতীয়তাবাদীরা সিরিয় শরণার্থীদেরকে তাদের অর্থনৈতিক সমস্যার জন্যে দায়ী করছে। কিন্তু যে ব্যাপারটা অনেকেই এড়িয়ে যাচ্ছেন তা হলো, শরণার্থী সমস্যার মাঝেই তুরস্কের জিডিপি ২০০৯ সালে সাড়ে ৬’শ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০১৩ সাল নাগাদ সাড়ে ৯’শ বিলিয়নে পৌঁছায়। তুরস্কের অর্থনীতি যখন ভালো ছিল, তখন কেউ শরণার্থী নিয়ে কথা বলেনি; অর্থনীতি খারাপ হবার সাথেসাথেই অনেকেই এর জন্যে শরণার্থীদের দায়ী করতে থাকে।

তুরস্কের শরণার্থী রাজনীতি

২০২১এর জুলাইএ তুরস্কের প্রধান বিরোধী দল ‘সিএইচপি’র প্রধান কেমাল কিলিশদারোগলু বলেন যে, তার দলের পাঁচটা মূল লক্ষ্যের একটা হলো সিরিয় শরণার্থীদেরকে দেশে ফেরত পাঠানো। তারা ক্ষমতায় যাবার দুই বছরের মাঝেই সকল শরণার্থীকে ফেরত পাঠাবেন; এবং এব্যাপারে তাদের সকল পরিকল্পনা করাই আছে। এর জবাবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগান বলেন যে, তিনি তুরস্কে আশ্রয় খোঁজা ‘আল্লাহতে বিশ্বাসী’ মানুষদেরকে খুনিদের হাতে তুলে দেবেন না। তবে এরদোগানের এই কথাগুলির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন করেন অনেকেই। ‘মাইগ্রেশন পলিসি ইন্সটিটিউট’এর লেখায় বলা হচ্ছে যে, ২০১৬ সালে তুরস্ক ইইউএর সাথে সিরিয় শরণার্থীদের ব্যাপারে একটা চুক্তি করে। চুক্তি মোতাবেক তুরস্ক ইইউএর সীমানা থেকে শরণার্থীদেরকে দূরে রাখবে। ইইউ শরণার্থীদের জন্যে ডেবিট কার্ড ইস্যু করে তাদেরকে অর্থ সহায়তা দিতে থাকে; যা ব্যবহার করে শরণার্থীরা বাজার থেকে কেনাকাটা করতে থাকে। চুক্তির ফলে ইইউতে শরণার্থী আসা অনেক কমে যায়। চুক্তিতে পরিবর্তন আনার ব্যাপারে ইইউএর উপর চাপ সৃষ্টি করতে তুরস্ক ২০২০এর প্রথমাংশে কয়েক লক্ষ শরণার্থীকে গ্রিসে পাঠানোর হুমকি দেয়। এই ঘটনা বলে দিচ্ছে যে, ইইউ এবং তুরস্কের মাঝে শরণার্থী চুক্তি একটা অস্বস্তিকর চুক্তি, যা রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত।

তুরস্কের চাপের মুখে ২০২১এর জুনে ইইউ সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, তারা শরণার্থীদের জন্যে তুরস্ককে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আরও ৩ বিলিয়ন ইউরো সহায়তা দেবে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইইউ গত ডিসেম্বরে ঘোষণা দেয় যে, ১৫ লক্ষ শরণার্থীর ডেবিট কার্ডে ৩’শ ২৫ মিলিয়ন ইউরো দেয়া হবে; যা ব্যবহার করে তারা তাদের দরকারি খাদ্য, বাড়িভাড়া, পরিবহণ এবং ঔষধ কেনাকাটা করতে পারবে। ইইউএর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক কমিশনার জানেজ লেনারসিচ বলেন যে, এই অর্থ সহায়তার ফলে শরণার্থীরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিতে পারবে যে, তাদের কোন জিনিসটা সবচাইতে বেশি দরকার; এবং একইসাথে তারা তুরস্কের অর্থনীতিকে সহায়তা দিতে পারবে।

‘ডেইলি সাবাহ’ বলছে যে, ইইউএর শরণার্থী দূরে রাখার প্রবণতা এবং তুরস্কে শরণার্থীদের অর্থায়নে ইইউএর আমলাতান্ত্রিক জটিলতার ব্যাপারে তুর্কি রাজনীতিবিদেরা সর্বদাই সমালোচনার ঝড় তুলেন। এরদোগানের তুর্কি সরকারের অভিযোগ যে, ইইউ তুরস্ককে যে পরিমাণ অর্থের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা না দিয়ে গ্রিসকে অর্থায়ন করে যাচ্ছে। চুক্তির পাঁচ বছর পর শরণার্থী নীতির ব্যাপারে ইইউ আগের চাইতে অনেক বেশি বিভাজিত; এবং চুক্তির শর্তগুলি এখন ভেঙ্গে পড়ছে।

 
তুরস্কের প্রধান বিরোধী দল উগ্র জাতীয়তাবাদী 'সিএইচপি'র প্রধান কেমাল কিলিশদারোগলু। তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান এবং তার ‘একে পার্টি’ শরণার্থীদেরকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার কোন সুযোগই হাতছাড়া করেনি। অপরদিকে তুরস্কের বিরোধী উগ্র জাতীয়তাবাদী দলগুলিও অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান না পেয়ে দায়ভার চাপিয়েছে শরণার্থীদের উপর; যা কিনা তাদেরকে ডানপন্থীদের ভোট পেতে সহায়তা করবে। মোটকথা সিরিয় শরণার্থীরা এবং ডানপন্থী উগ্রবাদীরা এখন তুরস্কের রাজনৈতিক ময়দানে খেলার গুটি ছাড়া আর কিছুই নয়।

তুরস্কের উগ্র জাতীয়তাবাদী চিন্তার নেপথ্যে

‘ডেইলি সাবাহ’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ২০১১ সালে সিরিয়াতে গৃহযুদ্ধ শুরুর আগ পর্যন্ত তুরস্কে ৬০ হাজার অভিবাসী প্রত্যাশী ছিল। এখন তুরস্কে প্রায় ৬০ লক্ষ অভিবাসী বসবাস করছে; যার মাঝে প্রায় ৪০ লক্ষই এসেছে সিরিয়া থেকে। আর ২০১৬ সালে ইইউএর সাথে শরণার্থী চুক্তি করার পর তুরস্কে আরও ২০ লক্ষ শরণার্থী আশ্রয় নেয়। রেড ক্রিসেন্ট বলছে যে, তুরস্কে শরণার্থীদের অর্ধেকই প্রয়োজনীয় খাদ্য যোগাড় করতে পারছে না। আর করোনা মহামারি শুরুর পর থেকে শরণার্থীদের উপর ঋণের বোঝা আগের চাইতে দ্বিগুণ হয়েছে। আর গত অগাস্টে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পলায়নের পর তুরস্কে আবারও নতুন করে শরণার্থী আসার শংকা শুরু হয়। এই শংকাকে কেন্দ্র করে তুরস্কে উগ্র জাতীয়তাবাদীদের আরেক দফা শরণার্থী বিরোধী কর্মকান্ড দানা বাঁধে। তুরস্কের ‘রিসার্চ সেন্টার ফর এসাইলাম এন্ড ইমিগ্রেশন’ বা ‘আইজিএএম’এর প্রধান মেতিন কোরাবাতির ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, তুরস্কের উগ্র জাতীয়তাবাদের পিছনে রাজনীতিবিদদের একটা বড় অবদান রয়েছে। তারা অনেকেই ২০২৩ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখেই শরণার্থীদেরকে দেশে ফেরত পাঠাবার কথা বলছেন। সমাজ গবেষক উলাস সুনাতাও বলছেন যে, রাজনীতিবিদেরা যখন বারংবার বলছেন যে, শরণার্থীরা দেশে ফেরত পাঠানো হবে, তখন সামনের দিনগুলিতে আরও মারাত্মক সহিংসতা অপেক্ষা করবে।

তুরস্কের জাতীয়তাবাদীরা সিরিয় শরণার্থীদেরকে তাদের অর্থনৈতিক সমস্যার জন্যে দায়ী করছে। কিন্তু যে ব্যাপারটা অনেকেই এড়িয়ে যাচ্ছেন তা হলো, শরণার্থী সমস্যার মাঝেই তুরস্কের জিডিপি ২০০৯ সালে সাড়ে ৬’শ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০১৩ সাল নাগাদ সাড়ে ৯’শ বিলিয়নে পৌঁছায়। তবে অর্থনৈতিক অবব্যস্থাপনার কারণে তুরস্কের জিডিপি কমে এখন ৭’শ বিলিয়নে নেমে এসেছে। বিশেষ করে ২০১৮ সাল থেকে তুর্কি লিরার ব্যাপক দরপতন ঠেকাতে না পারার ফলশ্রুতিতে মারাত্মক মূল্যস্ফীতি গ্রাস করেছে তুরস্কের অর্থনীতিকে। ‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, তুরস্কের অর্থনীতি যখন ভালো ছিল, তখন কেউ শরণার্থী নিয়ে কথা বলেনি; অর্থনীতি খারাপ হবার সাথেসাথেই অনেকেই এর জন্যে শরণার্থীদের দায়ী করতে থাকে।

তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান এবং তার ‘একে পার্টি’ শরণার্থীদেরকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার কোন সুযোগই হাতছাড়া করেনি। এরদোগান একদিকে যেমন সিরিয় শরণার্থীদেরকে সীমানা অতিক্রম করে ইউরোপে যাবার ট্রানজিট দিয়ে ইইউকে ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ আদায় করেছেন, তেমনি সিরিয় শরণার্থীদেরকে তিনি ‘আল্লাহতে বিশ্বাসী’ শরণার্থী বলেই থাকতে দিয়েছেন বলে তুর্কি জনগণের ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়েছেন। একইসাথে বিরোধী জাতীয়তাবাদী দলগুলিকে তিনি আক্রমণ করেছেন ‘বিশ্বাসী জনগণ’কে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা করার জন্যে। এগুলি তিনি করেছেন তার ভোট ব্যাংক বাড়াবার উদ্দেশ্যেই। এরদোগানের সরকার শরণার্থীদের নিরাপত্তার ব্যাপারে কতটা আন্তরিক, তা ইজমিরে তিনজন সিরিয় কর্মীকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনাকে তার সরকারের প্রায় একমাস গোপন রাখার মাঝেই বোঝা যায়। অপরদিকে তুরস্কের বিরোধী উগ্র জাতীয়তাবাদী দলগুলিও অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান না পেয়ে দায়ভার চাপিয়েছে শরণার্থীদের উপর; যা কিনা তাদেরকে ডানপন্থীদের ভোট পেতে সহায়তা করবে। মোটকথা সিরিয় শরণার্থীরা এবং ডানপন্থী উগ্রবাদীরা এখন তুরস্কের রাজনৈতিক ময়দানে খেলার গুটি ছাড়া আর কিছুই নয়।

Tuesday, 5 October 2021

আলজেরিয়ার ইতিহাস নিয়ে কথা বলে ম্যাক্রঁ কত বড় ভুল করলেন?

০৬ই অক্টোবর ২০২১

ম্যাক্রঁর চিন্তার উপর উসমানি খিলাফতের সময়ের ছায়া কতটা প্রভাব বিস্তার করে আছে, তা আলজেরিয়ার উসমানি সময়ের ইতিহাস নিয়ে তার মন্তব্যেই বোঝা যাচ্ছে। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ফ্রান্সের প্রতিদ্বন্দ্বী তুরস্ককে আলজেরিয়া থেকে দূরে রাখতেই ম্যাক্রঁ হয়তো তার মন্তব্যগুলি সাজিয়েছিলেন। তবে বর্তমান তুরস্ককে উসমানি খিলাফতের সাথে তুলনা করার মতো ভুল করে ম্যাক্রঁ মুসলিম ইতিহাসের এমন এক স্থানে হস্তক্ষেপ করেছেন, যার ফলাফল বহণ করতে পারার মতো সক্ষমতা ক্রমেই দুর্বল হওয়া ফরাসি রিপাবলিকের রয়েছে কিনা, তা প্রশ্ন করাই যায়।

 

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফ্রান্সের সময়টা খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। মাত্র কিছুদিন আগেই ফ্রান্সকে বাইপাস করে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং অস্ট্রেলিয়া ‘অকাস’ প্রতিরক্ষা চুক্তির ঘোষণা দেয়; যার ফলশ্রুতিতে ফ্রান্স বড় আকারের সামরিক বাণিজ্যিক কাজ হারানো ছাড়াও তার বন্ধু দেশগুলির কাছে অপমাণিত হয়েছে। প্রায় একইসাথে আফ্রিকাতে ফ্রান্সের প্রাক্তন উপনিবেশ মালির সরকার ফ্রান্সকে বাইপাস করে রাশিয়ার সাথে নিরাপত্তা সম্পর্ক করছে। এখন ফ্রান্সের উত্তর আফ্রিকার প্রাক্তন উপনিবেশ আলজেরিয়ার সাথে নতুন করে বিরোধ দেখা দিয়েছে; যার ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব যথেষ্ট।

ফ্রান্সের অভিবাসী নীতি এবং উগ্র ডানপন্থী চিন্তার প্রসার

সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে ফরাসি সরকার ঘোষণা দেয় যে, উত্তর আফ্রিকার দেশগুলি থেকে জনগণকে ফ্রান্সে প্রবেশ করতে দেয়ার ক্ষেত্রে তারা ব্যাপকভাবে ভিসার সংখ্যা কমাবে। এর মাঝে আলজেরিয়া এবং মরক্কোর ক্ষেত্রে অর্ধেক এবং তিউনিসিয়ার ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ ভিসা কর্তনের ঘোষণা দেয়া হয়। এই তিন দেশই একসময় ফ্রান্সের উপনিবেশ ছিল। সেই হিসেবে এই দেশগুলির অনেক মানুষেরই ফ্রান্সের সাথে পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে। ফরাসি সরকারের মুখপাত্র গ্যাব্রিয়েল আত্তাল ‘ইউরোপ ওয়ান’ রেডিওকে বলেন যে, ভিসা কর্তনের সিদ্ধান্তটা ফরাসি সরকার নিতে বাধ্য হয়েছে। কারণ ঐ দেশগুলি ফ্রান্স থেকে বের করে দেয়া অভিবাসীদেরকে ফেরত নেবার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সহযোগিতা করেনি। তিনি আরও বলেন যে, ২০১৮ সালে নতুন অভিবাসী আইন পাস করার পর থেকে ফ্রান্স এই দেশগুলির সাথে কথা চালিয়ে যাচ্ছে। আলোচনায় কাজ না হওয়ায় ফ্রান্স এখন হুমকি ব্যবহার করছে। ফ্রান্স আশা করছে এর ফলশ্রুতিতে তারা এই দেশগুলির কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আরও সহযোগিতা পাবে। মরক্কোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী নাসের বুরিতা বলেন যে, তার সরকার ফ্রান্সের সাথে যথেষ্ট সহযোগিতা করে চলেছে। তবে সেখানে ফ্রান্সেরও সমস্যা রয়েছে; কারণ অনেকেই ভাইরাস টেস্ট না করেই ফ্রান্স থেকে মরক্কোতে চলে আসতে চাইছে। শুধুমাত্র তিউনিসায়ার প্রেসিডেন্টের অফিস থেকেই সবচাইতে বন্ধুত্বপূর্ণ কথা বলা হয়। সেখান থেকে বলা হয় যে, তিউনিসিয়া সেই দেশগুলির মাঝে রয়েছে, যারা ফ্রান্সের সাথে সহযোগিতা করে এবং দুই দেশের মাঝে খুবই ভালো সম্পর্ক বিদ্যমান।

ভিসা কর্তনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন ফ্রান্সের উগ্র ডানপন্থী নেতা মারিন লা পেন। ২০১৭ সালের নির্বাচনে লা পেন ছিলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী। খুব সম্ভবতঃ ২০২২ সালের এপ্রিলের নির্বাচনেও তিনি ম্যাক্রঁর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী থাকবেন। তিনি বলেন যে, তিনি এই আইন বাস্তবায়নের জন্যে বহুদিন থেকেই বলে আসছিলেন। তিনি খুশি হয়েছেন যে, প্রেসিডেন্ট তার কথা শুনেছেন। তবে প্রেসিডেন্ট এক্ষেত্রে অনেক বেশি সময় নিয়েছেন। লা পেন এক সংবাদ সন্মেলনে বলছিলেন যে, তিনি ক্ষমতায় আসলে ফ্রান্সের অভিবাসী নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনবেন। ম্যাক্রঁ সরকারের ভিসা কর্তনের সিদ্ধান্ত এবং তাতে লা পেনের সমর্থন দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ম্যাক্রঁর সরকার আসন্ন নির্বাচনে উগ্রবাদী ডানপন্থীদের ভোট হারাতে চাইছে না। অর্থাৎ উগ্রবাদী ডানপন্থী চিন্তা ফ্রান্সে এখন এতটাই শক্ত ভিতের উপর আছে যে, কেউই এদের বিরুদ্ধে গিয়ে নির্বাচনে জেতার আশা করতে পারছেন না।

 
১৯৫৬ সাল; আলজেরিয়াতে ফরাসি সেনা। ফ্রান্সের এমন একটা কালো অধ্যায় নিয়ে ম্যাক্রঁ কথা বলে আলজেরিয়ার সাথে সম্পর্ককে চাপের মাঝে ফেলতে চাইছেন কেন? তাও আবার এমন একটা সময়ে, যখন আন্তর্জাতিকভাবে ফ্রান্স চাপের মাঝে রয়েছে?

আলজেরিয়ার ইতিহাস নিয়ে ম্যাক্রঁর মন্তব্য

০২রা অক্টোবর আলজেরিয়ার সরকার প্যারিস থেকে তাদের রাষ্ট্রদূতকে আলোচনার জন্যে ডেকে পাঠায়। আলজেরিয়ার সরকার বলে যে, তারা এটা করেছে আলজেরিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ফ্রান্সের ‘অগ্রহণযোগ্য হস্তক্ষেপ’এর কারণে। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ বলছে যে, মাত্র দ্বিতীয়বারের মতো আলজেরিয়ার সরকার তার রাষ্ট্রদূতকে ফ্রান্স থেকে ডেকে পাঠিয়েছে। ফ্রান্সের প্রভাবশালী ‘লে মন্ড’ পত্রিকাতে ০২রা অক্টোবর ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর কিছু মন্তব্য ছাপা হবার পর থেকে আলজেরিয়া কূটনৈতিকভাবে পাল্টা পদক্ষেপ নেয়া শুরু করে। ম্যাক্রঁ ৩০শে সেপ্টেম্বর কিছু আলজেরিয় বংশোদ্ভূত ফরাসি তরুনের সাথে একটা অনুষ্ঠানে আলজেরিয়ার ইতিহাস নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন যে, ১৯৫৪ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত আলজেরিয়ার স্বাধীনতার আন্দোলনের পর থেকে আলজেরিয়া একটা ‘রাজনৈতিক সামরিক ব্যবস্থা’য় পরিচালিত হচ্ছে; যারা কিনা আলজেরিয়ার ইতিহাসকে ‘পুরোপুরিভাবে নতুন করে লিখেছেন’। এই ইতিহাস সত্যের উপর নয়, বরং ফ্রান্সের প্রতি ঘৃণা উপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে। তিনি প্রশ্ন করেন যে, ফরাসিরা আলজেরিয়াতে উপনিবেশ তৈরি করার আগে আলজেরিয়ার নিজস্ব কোন জাতিগত পরিচয়ই ছিল কিনা। তিনি আলজেরিয়ার ইতিহাস লেখার জন্যে ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রণে থাকা আরবী এবং বারবার ভাষায় লেখা ডকুমেন্ট সামনে নিয়ে আসার কথাও বলেন। ম্যাক্রঁ আরও বলেন যে, বর্তমানে আলজেরিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থাটা দুর্বল হয়ে গেছে; বিশেষ করে সরকারবিরোধী ‘হিরাক’ আন্দোলনের পর থেকে।

পরের দিন আলজেরিয়া ফ্রান্সের সামরিক বিমানগুলিকে তার নিজস্ব আকাশসীমা ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। ফরাসি বিমানগুলি নিয়মিতভাবেই আলজেরিয়ার আকাশসীমা ব্যবহার করে পশ্চিম আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে যাওয়া আসা করতো। পশ্চিম আফ্রিকার সাহেলে ফরাসি সামরিক বাহিনী ‘অপারেশন বারখেইন’এর অধীনে তথাকথিত সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকান্ডে জড়িত রয়েছে। ফরাসি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল পাসকাল ইয়ানি ‘এএফপি’কে বলেন যে, তারা আলজেরিয়ার কর্তৃপক্ষের কাছে দু’টা বিমানের আলজেরিয়ার আকাশসীমা ব্যবহারের জন্যে অনুমতি চাইতে গিয়ে আবিষ্কার করেন যে, আলজেরিয়ার সরকার ফরাসি বিমানগুলিকে তাদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে দিচ্ছে না। তিনি বলেন যে, এতে তাদের সাহেলের সাপ্লাই ফ্লাইটে স্বল্প প্রভাব পড়লেও মূল অপারেশনে কোন প্রভাব পড়বে না।

ম্যাক্রঁর চিন্তার উপর উসমানি খিলাফতের ছায়া

আলজেরিয় বংশোদ্ভূত ফরাসিদের সাথে কথোপকথনের মাঝ দিয়ে ম্যাক্রঁ কিছু বার্তা দিতে চেয়েছেন। একদিকে তিনি যেমন আলজেরিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে কথা বলেছেন, তেমনি তিনি আলজেরিয়াতে ফরাসি উপনিবেশের আগের সময় নিয়েও কথা বলেছেন। প্রায় ৩’শ বছর উসমানি খিলাফতের অধীনে এবং প্রভাবের মাঝে থাকার পর ১৮৩০ সালে ফরাসিরা বর্তমান আলজেরিয়ার উপকূলের আলজিয়ার্স অঞ্চল জোরপূর্বক দখল করে নেয়। আলজেরিয়রা এই দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রায় পাঁচ দশক ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যায়; যাতে ফরাসি যাঁতাকলে পড়ে কয়েক লক্ষ মানুষ প্রাণ হারায়। আলজেরিয়াকে ফ্রান্সের অধীনে শক্তভাবে নিয়ে আসার জন্যে ফ্রান্স হাজার হাজার ফরাসিকে আলজেরিয়াতে বসতি স্থাপন করায়। শেষ পর্যন্ত জনসংখ্যার প্রায় এক পঞ্চমাংশই হয়ে যায় ফরাসি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আলজেরিয়রা স্বাধীনতা চাইলে সেখানে বসতি স্থাপন করা ফরাসিরা স্বাধীনতাকামীদের ব্যাপকভাবে বাধা দেয়। ১৯৫৪ থেকে ১৯৬২ পর্যন্ত স্বাধীনতা যুদ্ধ চলে; যাতে কমপক্ষে ১০ লক্ষ আলজেরিয় বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু হয়। যুদ্ধের ফলাফল হিসেবে ফ্রান্সে সামরিক অভুত্থানের মাধ্যমে জেনারেল দ্য গল ক্ষমতা নেন এবং চতুর্থ রিপাবলিক বাতিল ঘোষণা করেন। প্রায় দশ লক্ষ ফরাসি বংশোদ্ভূত জনগণ ফ্রান্সে পালিয়ে যায়। ফরাসিদের পক্ষে যুদ্ধ করা প্রায় দুই লক্ষ আলজেরিয় ‘হারকিস’রাও বিদ্বেষের শিকার হয়। হাজার হাজার ‘হারকিস’কে আলজেরিয়ার স্বাধীনতাকামীরা হত্যা করে। গত ২০শে সেপ্টেম্বর ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ ‘হারকিস’দের আলজেরিয়াতে ফেলে যাবার জন্যে ফ্রান্সের পক্ষ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। কিন্তু ফ্রান্সের এমন একটা কালো অধ্যায় নিয়ে ম্যাক্রঁ কথা বলে আলজেরিয়ার সাথে সম্পর্ককে চাপের মাঝে ফেলতে চাইছেন কেন? তাও আবার এমন একটা সময়ে, যখন আন্তর্জাতিকভাবে ফ্রান্স চাপের মাঝে রয়েছে?

 

প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ আলজেরিয় বংশোদ্ভূতদের সাথে তার মন্তব্যে প্রশ্ন করেন যে, ফরাসিরা আলজেরিয়াতে উপনিবেশ করার আগে আলজেরিয় জাতির কোন অস্তিত্ব ছিল কি? তিনি বলেন যে, তিনি অবাক হচ্ছেন যে, তুরস্ক কত সহজে সকলকে আলজেরিয়ার ইতিহাস ভুলিয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন যে, ফরাসিরা আলজেরিয়াতে যাবার আগে তুরস্ক সেই দেশটাকে দখল করে রেখেছিল। অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘পোডাল’এর এক প্রতিবেদনে ফরাসি ইতিহাসবিদ জাইলস মানসিরন প্রশ্ন করছেন যে, ফরাসি প্রেসিডেন্ট আলজেরিয়ার ইতিহাস সম্পর্কে এমন মন্তব্য করতে পারেন কি? ম্যাক্রঁ যখন বলছেন যে, ফরাসিরা আসার আগে আলজেরিয়া ছিল না; এই ব্যাপারটা সেই চিন্তাটাকেই তুলে ধরে যে, ফরাসিদের আগে সেখানে কিছুই ছিল না। প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে আলজেরিয়ার জাতীয়তাবোধ সাধারণভাবে সামনে আসেনি সেটা সত্যি। কিন্তু ফ্রান্সের ক্ষেত্রেও তো ব্যাপারটা সত্যি। ফরাসি বিপ্লবের আগ পর্যন্ত ফরাসি জাতির অংশ হিসেবে নিজেদের চিন্তা করার ব্যাপারটা ফরাসিদের মাঝেও আসেনি।

আলজেরিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক সীমানা নিয়ে যে দেশ, সেটা না থাকলেও কয়েক শতক ধরে সেখানে একটা অঞ্চল ছিল। এই অঞ্চল ১৫১২ সাল থেকে উসমানি খিলাফতের অধীনে ছিল। ১৮৩০ সালে সেটা ফরাসিরা দখল করে নেয়। জাইলস মানসিরন বলছেন যে, উসমানিদের অধীনে আলজিয়ার্স পরিচালিত হতো ‘বেইলিক’ হিসেবে। আলজেরিয়ার অঞ্চল ইস্তাম্বুলের অধীনে থাকলেও সেখানকার জনগণের যথেষ্ট স্বাধীনতা ছিল। উসমানি সরকার জনগণের কাছ থেকে কর আদায় করতো। তবে উসমানিদের অধীনে আলজেরিয়া আর ফ্রান্সের অধীনে আলজেরিয়ার তুলনা দেয়া সম্ভব নয়। কারণ ফ্রান্সের অধীনে আলজেরিয়া ছিল মারাত্মক সহিংসতায় পরিপূর্ণ। ফরাসি উপনিবেশিকরা আলজেরিয়ার সামাজিক এবং ধর্মীয় কাঠামোকে পুরোপুরিভাবে ধ্বংস করেছে।

আরেক ফরাসি ইতিহাসবিদ ‘সিএনআরএস’এর রিসার্চ ডিরেক্টর ইসাবেল গ্রানগাউদ বলছেন যে, উসমানি কর্তৃপক্ষের অল্প কিছু লোক আলজিয়ার্স শাসন করতো। তারা শুধু রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতো এবং সেনাবাহিনী পরিচালনার মাধ্যমে নিরাপত্তা দিতো। সেখানে উসমানিদের শাসন ছিল খুবই সহনীয় ধরনের। অপরদিকে ফরাসিরা আলজেরিয়াতে ব্যাপক হারে বসতি স্থাপন করেছিল। তিনি বলছেন যে, ম্যাক্রঁ যখন আলজেরিয়াতে ফরাসি শাসনের সাথে উসমানি শাসনের তুলনা দিচ্ছেন, তখন নতুন আরেকটা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। কারণ ম্যাক্রঁ এখানে একেবারেই দুই ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বকে এক মাপকাঠি দিয়ে মাপছেন। ইসাবেল গ্রানগাউদ আরও বলছেন যে, ম্যাক্রঁ যখন উসমানি খিলাফত না বলে তার স্থলে তুরস্ক বলছেন, তখন তিনি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগানের স্বপ্নের সাথেই একাত্মতা প্রকাশ করলেন। কারণ এরদোগান বর্তমান তুরস্ককে উসমানিদের মতোই বৈশ্বিকভাবে শক্তিশালী একটা রাষ্ট্র হিসেবে দেখার স্বপ্নে বিভোর আছেন।

ফরাসিরা কঠোর অভিবাসী আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে ফরাসি সমাজে ডানপন্থী চিন্তার শক্ত ভিতের ব্যাপারেই জানান দিচ্ছে। ম্যাক্রঁ বুঝতে পারছেন যে, ২০২২এর এপ্রিলের নির্বাচন জিততে হলে তাকে ডানপন্থী কথাই বলতে হবে। এতে উত্তর আফ্রিকার দেশ আলজেরিয়ার সাথে ফ্রান্সের সম্পর্কের অবনতি ম্যাক্রঁর কাছে অনিবার্য ফলাফল; যদিও আলজেরিয়ার সরকার তার দেশের আকাশসীমা ফ্রান্সের সামরিক বিমানের জন্যে বন্ধ করে দিয়ে পুরো পশ্চিম আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে সমস্যায় জর্জরিত ফ্রান্সকে আরও চাপের মাঝে ফেলেছে। কিন্তু একইসাথে ম্যাক্রঁর চিন্তার উপর উসমানি খিলাফতের সময়ের ছায়া কতটা প্রভাব বিস্তার করে আছে, তা আলজেরিয়ার উসমানি সময়ের ইতিহাস নিয়ে তার মন্তব্যেই বোঝা যাচ্ছে। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ফ্রান্সের প্রতিদ্বন্দ্বী তুরস্ককে আলজেরিয়া থেকে দূরে রাখতেই ম্যাক্রঁ হয়তো তার মন্তব্যগুলি সাজিয়েছিলেন। তবে বর্তমান তুরস্ককে উসমানি খিলাফতের সাথে তুলনা করার মতো ভুল করে ম্যাক্রঁ মুসলিম ইতিহাসের এমন এক স্থানে হস্তক্ষেপ করেছেন, যার ফলাফল বহণ করতে পারার মতো সক্ষমতা ক্রমেই দুর্বল হওয়া ফরাসি রিপাবলিকের রয়েছে কিনা, তা প্রশ্ন করাই যায়।

Sunday, 5 April 2020

পশ্চিমা দেশগুলিতে বর্ণবাদী চিন্তাকে উস্কে দিয়েছে করোনাভাইরাস!

৫ই এপ্রিল ২০২০

     
ফ্রান্সের নঁতে শহরে গ্রাফিতি বলছে, ‘করোনাভাইরাস যত মানুষকে অসুস্থ্য করেছে, তার চাইতে বেশি মানুষকে বর্ণবাদী করেছে’



গত পহেলা এপ্রিল দু’জন ডাক্তার ফরাসী টিভিতে এসে মতামত দেন যে, নভেল করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন আফ্রিকার জনগণের উপর টেস্ট করে দেখা যেতে পারে। এই মন্তব্যের পর থেকে এই ডাক্তারদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদের অভিযোগ উঠেছে। টিভি চ্যানেল ‘এলসিআই’এর সাথে সাক্ষাতে প্যারিসের কোচিন হসপিটালের আইসিইউএর প্রধান জঁ-পল মিরা বলেন যে, এইডসএর ভ্যাকসিন টেস্ট করার জন্যে যেমন পতিতাদের বেছে নেয়া হয়েছিল, তেমনি করোনাভাইরাসের প্রতিরোধক হিসেবে যক্ষ্মার প্রতিরোধক ‘বিসিজি’ ভ্যাকসিন টেস্ট করার জন্যে আফ্রিকার মানুষগুলিকে বেছে নেয়া যেতে পারে; কারণ পতিতাদের যেমন এইডসএর বিরুদ্ধে আলাদা কোন প্রতিরোধ নেই, তেমনি আফ্রিকার মানুষগুলিরও করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে কোন প্রতিরোধ নেই। তিনি যুক্তি দেন যে, ইউরোপ বা অস্ট্রেলিয়ার মেডিক্যাল কর্মীরা যথেষ্ট সুরক্ষা নিয়ে কাজ করেন, যার ফলে এমনিতেই তাদের করোনভাইরাসে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা কম থাকবে; তাদেরকে ভ্যাকসিন দেয়া হোক আর না হোক। ফ্রান্সের ন্যাশনাল হেলথ ইন্সটিটিউটের রিসার্চ ডিরেক্টর ক্যামিল লক্ট তার সাথে সহমত পোষণ করে বলেন যে, তারা ইতোমধ্যেই ইউরোপের সমান্তরালে আফ্রিকাতেও এই টেস্ট চালাবার চিন্তা করছেন। এই টেলিভিশন অনুষ্ঠানের পর থেকে প্রায় সাথেসাথেই শুরু হয় সমালোচনার ঝড়। আইভোরি কোস্টের বিখ্যাত ফুটবলার দিদিয়ের দ্রগবা এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, এটা আশ্চর্য্য একটা ব্যাপার যে এধরণের কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে বারংবার সাবধান করতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন যে, আফ্রিকা কোন টেস্টিং ল্যাবরেটরি নয়। তিনি তাদের কথাগুলিকে বর্ণবাদী কথা বলে আখ্যা দেন। দ্রগবার মতো ফ্রান্সের সোশালিস্ট পার্টি এবং বর্ণবাদ বিরোধী গ্রুপগুলিও বিবৃতি দিয়েছে।

‘আল জাজিরা’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, আফ্রিকা এই মুহুর্তে সবচাইতে কম আক্রান্ত মহাদেশ, যেখানে সাড়ে ৭ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছে এবং মারা গিয়েছে মোট ৩’শ ২০ জন। জঁ-পল মিরা পরবর্তীতে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং ‘হাফিংটন পোস্ট’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে তার বক্তব্যের ব্যাখ্যা হিসেবে বলেন যে, ফ্রান্স এবং আস্ট্রেলিয়ার সাথে আফ্রিকার একটা দেশ এই গবেষণার অংশ হতে পারে, এধরনের কথা আগে কখনোই শোনা যায়নি। ‘বিবিসি’ এক সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফল টেনে নিয়ে এসে বলে যে, যক্ষ্মার প্রতিরোধে ‘বিসিজি’ ভ্যাকসিন বা টিকা যেসব দেশে জনগণের মাঝে দেয়া হয়েছে, সেসব দেশে করোনাভাইরাসে মৃত্যুর সংখ্যা কম হয়ে থাকতে পারে। তারা বলছেন যে, যেসব দেশে যক্ষ্মার প্রকোপ বেশি, সেসব দেশেই শিশুদের মাঝে ‘বিসিজি’ ভ্যাকসিন দেবার প্রচলন রয়েছে। এই চিন্তার উপর নির্ভর করেই কিছু গবেষক ‘বিসিজি’ ভ্যাকসিনকে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ব্যবহার করা যায় কিনা, তা নিয়ে চিন্তা করছেন। তবে এই টিভি সাক্ষাতের পর থেকে ভ্যাকসিনের চাইতে পশ্চিমা সমাজের বর্ণবাদ নিয়েই কথা হচ্ছে বেশি।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হবার পর থেকে পশ্চিমা বিশ্বে বর্ণবাদী এবং উগ্র জাতীয়তাবাদী আচরণের খবর আবারও সংবাদপত্রে আসা শুরু হয়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে লন্ডনের অক্সফোর্ড স্ট্রীটে এক সিঙ্গাপুর বংশোদ্ভূত ব্যক্তির উপর চার ব্যক্তি হামলা করে ব্যাপক মারধর করে। হামলাকারীরা বলে যে, ‘আমরা তোমার করোনাভাইরাস আমাদের দেশে চাই না’। ফেব্রুয়ারির শুরুতে নিউ ইয়র্কের সাবওয়ে স্টেশনে মাস্ক পড়া এক চীনা বংশোদ্ভূত মহিলার উপর হামলা করা হয় এবং তাকে ‘রোগের বাহক’ বলে আখ্যা দেয়া হয়। ক্যালিফোর্নিয়ায় এক এশিয় পরিবারের গাড়ির উপর করোনাভাইরাসকে কেন্দ্র করে গালাগালি লেখা হয়। ক্যালিফোর্নিয়াতে এক স্কুলে চীনা বংশোদ্ভূত এক ছাত্রকে কাশি দেবার কারণে শিক্ষক নার্সের কাছে যেতে বলেন, যদিও অন্যদের জন্যে তিনি তা বলেননি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১৬ই মার্চ এক টুইটার বার্তায় করোনাভাইরাসকে ‘চীনা ভাইরাস’ বলে আখ্যা দেবার সাথেসাথেই চীনা বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিকদের মাঝে নতুন করে শংকা দেখা দিয়েছে। নিউ ইয়র্কের জনপ্রতিনিধি গ্রেইস মেং একজন চীনা বংশোদ্ভূত মার্কিনী। তিনি ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর সাথে সাক্ষাতে বলেন যে, বিভিন্ন দেশে চীনাদের বিরুদ্ধে হয়রানি এবং আক্রমণের ঘটনার খবর শুনে মনে হয় যে, চীনা বংশোদ্ভূত জনগণকে এখনও বিদেশী বলেই আখ্যা দেয়া হয়। পত্রিকাটা বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে যুগের পর যুগ বর্ণবাদ এবং বৈষম্য পেরিয়ে এশিয় বংশোদ্ভূতরা অনেক আশা নিয়ে একুশ শতক শুরু করেছিল। তিনজন এশিয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও দাঁড়িয়েছেন, যা কিনা এশিয়দের মাঝে আশার সঞ্চার করেছিল। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু পর থেকে মার্কিন শ্বেতাঙ্গ উগ্রবাদীরা এশিয় বংশোদ্ভূতদেরকে ভাইরাসের সংক্রমণের জন্যে দায়ি করতে থাকে এবং একইসাথে এশিয়দের উপর বিপুল সংখ্যায় আক্রমণ আসতে থাকে। শতশত মানুষ হামলার কথা রিপোর্ট করলেও বহু মানুষ এব্যাপারে কোন রিপোর্টই করেনি।
   
 
বহু আগ থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে চীনাদেরকে অপেক্ষাকৃত নিচু স্তরের, নোংড়া এবং রুগ্ন মানুষ হিসেবে দেখা হতো। ১৮৭০ সাল থেকে চীন থেকে আসা শ্রমিকদেরকে শ্বেতাঙ্গরা তাদের চাকুরি হারাবার কারণ হিসেবে দেখতে থাকে। ১৮৮২ সালে এক আইনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে চীনা শ্রমিকের আসা বন্ধ করা হয়েছিল। এরপর ১৯৪০এর দশকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রে থাকা জাপানিদের ভাগ্যে জোটে ব্যাপক অত্যাচার। যুক্তরাষ্ট্রে বরাবরই এশিয় এবং অন্যান্য অশ্বেতাঙ্গ দেশ থেকে আগত জনগণকে অপেক্ষাকৃত নিম্ন স্তরের মানুষ এবং রোগের বাহক হিসেবে দেখা হয়েছে।




জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানের প্রফেসর রসালিন্ড চৌ বলছেন যে, তিনি এখন জনসন্মুখে কাশি দিতেও ভয় পান। কারণ তিনি মনে করছেন যে, এশিয় বংশোদ্ভূত হওয়ায় তাকে কাশি দিতে দেখে অন্যরা সেটাকে কিভাবে দেখবে। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রফেসর ক্লেয়ার জীন কিম বলেন যে, বহু আগ থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে চীনাদেরকে অপেক্ষাকৃত নিচু স্তরের, নোংড়া এবং রুগ্ন মানুষ হিসেবে দেখা হতো। ১৮৭০ সাল থেকে চীন থেকে আসা শ্রমিকদেরকে শ্বেতাঙ্গরা তাদের চাকুরি হারাবার কারণ হিসেবে দেখতে থাকে। ১৮৮২ সালে এক আইনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে চীনা শ্রমিকের আসা বন্ধ করা হয়েছিল। এরপর ১৯৪০এর দশকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রে থাকা জাপানিদের ভাগ্যে জোটে ব্যাপক অত্যাচার। যুক্তরাষ্ট্রে বরাবরই এশিয় এবং অন্যান্য অশ্বেতাঙ্গ দেশ থেকে আগত জনগণকে অপেক্ষাকৃত নিম্ন স্তরের মানুষ এবং রোগের বাহক হিসেবে দেখা হয়েছে। ১৯৮২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডেট্রয়েট শহরে গাড়ির ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করা কিছু লোক ভিনসেন্ট চিন নামে এক চীনা আমেরিকানকে পিটিয়ে হত্যা করে। সেসময় তারা তাদের অর্থনৈতিক দুর্দশার জন্যে এশিয়দেরকে দায়ি করেছিল। এরপর ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরের পর থেকে বাদামি বর্ণের যেকোন মানুষ দেখলেই তাকে সন্ত্রাসী বলে আখ্যা দেয়া হতো। এখন করোনাভাইরাসের প্রভাব কবে কমবে, তা যেহেতু কেউই বলতে পারছে না, তাই এশিয়দের বিরুদ্ধে মার্কিন উগ্রবাদী শ্বেতাঙ্গদের আক্রমণাত্মক এই অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী হবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

‘দ্যা আটলান্টিক’এর এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, পশ্চিমা সমাজে মহামারী সবসময়েই ভীতির সঞ্চার করেছে। আর এই ভীতি শেষ পর্যন্ত বৈষম্যের মাঝ দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। ২০০৩ সালে সার্স ভাইরাসের সংক্রমণের সময় পূর্ব এশিয়দের টার্গেট করা হয়েছিল। ২০১৪ সালে ইবোলা ভাইরাসের কারণে টার্গেট করা হয়েছিল আফ্রিকানদের। ইবোলা ভাইরাসের নাম দেয়া হয়েছে আফ্রিকার একটা নদীর নামে; যেকারণে এই ভাইরাসটা স্বাভাবিকভাবেই আফ্রিকান ভাইরাস হিসেবে পরিচিতি পায়। ২০১২ সালে সংক্রমিত হওয়া ‘মিডল ইস্ট রেস্পিরেটরি সিনড্রোম’ বা ‘মার্স’ ভাইরাসের নামের সাথেই মধ্যপ্রাচ্যকে জুড়ে দেয়া হয়। এবারে করোনাভাইরাসকে একইভাবে অনেক মার্কিন নেতারা ‘উহান ভাইরাস’ বলে আখ্যা দিতে কার্পণ্য করেননি। ইউরোপের উগ্রবাদী ডানপন্থী নেতারা ভাইরাসের সংক্রমণকে যুক্ত করতে চাইছেন সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের সাথে। ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স এবং স্পেনে ডানপন্থী নেতারা ভাইরাস সংক্রমণের কারণ হিসেবে এশিয় এবং আফ্রিকান অভিবাসীদের দুষতে ভুল করেননি। ইউনিভার্সিটি অব কেন্টের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর মিরি সং ‘টাইম’ ম্যাগাজিনের সাথে এক সাক্ষাতে বলেন যে, মানুষ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ছুতোয় বাহ্যিকভাবে আলাদা করা যায় এমন গ্রুপগুলিকে টার্গেট করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের মতো দেশে এটা বাকিদের চাইতে অনেক বেশি হয়েছে। ‘নাইন ইলেভেন’এর পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা, বা আরব, মুসলিম এবং শিখদের উপর হামলা বেড়ে যায়। ব্রিটেনেও ২০১৬ সালে ব্রেক্সিট গণভোটের পর থেকে জাতিগত এবং ধর্মীয় বিদ্বেষপ্রসূত হামলার সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে।
  
  
চতুর্দশ শতাব্দীতে ইউরোপে প্লেগের আবির্ভাব হয়, যা ‘ব্ল্যাক ডেথ’ বলে পরিচিত। সেসময় ইউরোপিয়রা মনে করেছিল যে, ইহুদী বণিকরা সিল্ক রুটের মাধ্যমে ইউরোপে প্লেগ এনেছিল। এই বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে সারা ইউরোপে ইহুদীদের উপর ভয়াবহ অত্যাচার চলেছিল। ১৩৪৯ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’ গণহত্যা ছিল সবচাইতে ভয়াবহ; যখন ২ হাজার ইহুদীকে স্ট্রাসবুর্গ শহরে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। মানুষকে রোগের বাহক বা তেলাপোকার সাথে তুলনা দিলে হত্যা করাটা সহজতর হয়েছে। এই কথাগুলি পশ্চিমা সমাজের গোঁড়ার সমস্যাকেই তুলে ধরে। করোনাভাইরাস এই সমস্যাকে শুধু আরেকবার সামনে নিয়ে এলো মাত্র।



ইউনিভার্সিটি অব বাথএর প্রফেসর ব্র্যাড ইভান্স ব্রিটেনের ‘দ্যা ইন্ডেপেন্ডেন্ট’এর এক লেখায় পশ্চিমা সমাজের বর্ণবাদের ইতিহাসকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন। চতুর্দশ শতাব্দীতে ইউরোপে প্লেগের আবির্ভাব হয়, যা ‘ব্ল্যাক ডেথ’ বলে পরিচিত। সেসময় ইউরোপিয়রা মনে করেছিল যে, ইহুদী বণিকরা সিল্ক রুটের মাধ্যমে ইউরোপে প্লেগ এনেছিল। এই বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে সারা ইউরোপে ইহুদীদের উপর ভয়াবহ অত্যাচার চলেছিল। ১৩৪৯ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’ গণহত্যা ছিল সবচাইতে ভয়াবহ; যখন ২ হাজার ইহুদীকে স্ট্রাসবুর্গ শহরে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। ইভান্স বলছেন যে, বর্ণবাদ ও জাতিগত বিদ্বেষ পশ্চিমাদের জীবনব্যবস্থার মাঝে গেঁথেই ছিল। ব্যক্তিস্বাধীনতার মতো পশ্চিমা চিন্তাগুলি এই বিদ্বেষকে নিয়ন্ত্রণ তো করেইনি, বরং লালনপালন করেছে। প্রতিটা গণহত্যার সময়ই সমাজের কিছু মানুষকে ইঁদুরের সাথে তুলনা দেয়া হয়েছে; বলা হয়েছে যে, এরা হলো রোগের বাহক। মানুষকে রোগের বাহক বা তেলাপোকার সাথে তুলনা দিলে হত্যা করাটা সহজতর হয়েছে। ইভান্সএর কথাগুলি পশ্চিমা সমাজের গোঁড়ার সমস্যাকেই তুলে ধরে। করোনাভাইরাস এই সমস্যাকে শুধু আরেকবার সামনে নিয়ে এলো মাত্র।


Saturday, 9 July 2016

আমদানি করা “Trojan Horse” থেকেই জঙ্গীবাদ

০৯ জুলাই ২০১৬
 

যে লাইফস্টাইলের মাঝ থেকে আজ জঙ্গী রিক্রুট হচ্ছে, তা আসলে কতটা স্বাভাবিক? অস্বাভাবিকতাকে স্বাভাবিকতা দান করলো কে? কিভাবে?

কল্পকাহিনী নাকি বাস্তবতা?

হলিউডে সাম্প্রতিককালের নামকরা ডিরেক্টর এম নাইট শায়ামালান। ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই ডিরেক্টর Sixth Sense মুভি তৈরি করে রাতারাতিই সাড়া ফেলে দেন। তবে তার এরেকটা মুভি সম্পর্কে সবাই হয়তো অবগত নন, যার নাম Unbreakable. এই মুভিতেও এই তরুণ ডিরেক্টর রোমাঞ্চের মূলটা রেখে দেন মুভির শেষের জন্যে। যারা মুভিটা দেখেননি, তাদের জন্যে একটু spoiler হলেও আজকের আলোচনার খাতিরে কিছু কথা বলতে হচ্ছে। মুভিটাতে সুপারহিরো খুঁজে বের করার উদ্দেশ্যে এক লোক নিজেই ভিলেন সেজে ফেলেন। অর্থাৎ এখানে দেখানো হয় যে ভিলেন না থাকলে হিরো কি করবে? Batman Trilogy মুভিগুলিতেও মোটামুটি সেই চিন্তাটাকেই উপস্থাপন করা হয়। আরও বেশকিছু মুভিতে দেখানো হয় যে ভাইরাস তৈরি করা হয় এন্টিভাইরাস বিক্রির উদ্দেশ্যে। এই মুভিগুলো যে মূল চিন্তাটার উপরে ভিত্তি করে গড়া তা হলো – একটা খেলা খেলতে দুইটা পক্ষ লাগে।

হলিউডের মুভিগুলি কল্পকাহিনী হলেও চিন্তাটা কিন্তু কল্পকাহিনী নয়। এই চিন্তা বহু প্রাচীনকালের; যখন থেকে মানুষ নিজের স্বার্থকে সবকিছুর উপরে স্থান দিতে শুরু করে। নিজের শত্রুদেরকে দুই ভাগে ভাগ করে তাদের মাঝে মারামারি লাগিয়ে দিয়ে গোপনে উভয় পক্ষকেই ইন্ধন যোগানো – চিন্তাটা বোঝা গেলেও যখন কেউ এটা কাজে লাগায়, তখন বেশিরভাগ মানুষের পক্ষেই সেটা ধরা সম্ভব হয় না। বুঝতে পারার সুবিধার্থে একটা সত্যিকারের উদাহরণ দেয়া যাক, যা বেশিদিনের পুরোনো নয়। শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের সময়ে শ্রীলংকার সেনাবাহিনী এবং তামিল টাইগারদের একই ট্রেনিং ক্যাম্পের দুই প্রান্তে ট্রেনিং দেবার ব্যবস্থা করেছিল ইস্রাইল। উভয় পক্ষের উপরেই অস্ত্র এবং নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে ইস্রাইলের ব্যাপক সুবিধা হয়েছিল। দুই পক্ষকে একে অপরের মাঝে লাগিয়ে দিয়ে খেলা উপভোগ করাটা একটা কৌশল, যা ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ থিওরির নামান্তর মাত্র। এতে একজন আম্পায়ার সেজে বসে থাকেন এবং দুই পক্ষ খেলতেই থাকে, খেলতেই থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের শেষ রক্তবিন্দু অবশিষ্ট থাকে। এটা একটা আদর্শিক খেলা (Ideological Game), যার মূলটা গুলশান ৭৯ নম্বরের ঘটনা নিয়ে লিখতে গিয়ে ব্যাখ্যা করেছিলাম। আজকে বাংলাদেশে এই খেলাটার ‘রুলবুক’ নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই, যা কিনা খেলার আম্পায়ার ঠিক করেছেন, কিন্তু খেলোয়াড়েরা জানেন না!

ইস্রাইলের একই ক্যাম্পে দুই পক্ষকে ট্রেনিং দেয়ার মতোই একই বাড়ির দুই ঘরে ভিলেন এবং হিরোর জন্ম দেয়া হয়েছে। একজনকে দেখিয়ে আরেকজনকে তৈরি করা হয়েছে, যদিও দুজনেই একই বাড়ির, হয়তো একই মায়ের সন্তান! এতে সংসার হয়েছে ধ্বংস; সমাজ হয়েছে নষ্ট; দেশ হয়েছে দুর্বল। এটা ultimate subversion. দুঃখজনক হলেও আমাদের অজান্তেই আমরা এই subversion-এর শিকার হয়েছি; হচ্ছি। আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা ধূলায় মিশতে বসেছে আজ! আমাদেরকে চিন্তার দিক থেকে যে অথর্ব করে ফেলা হয়েছে, তা এর আগেই লিখেছি। দুর্বল করে তারপরেই এই কাজে হাত দেয়া হয়েছে। কাজেই আমরা এটা ধরতে তো পারিই নাই, বরং এখন ধরতে পারলেও এর থেকে বের হবার কোন পথ খুঁজে পাচ্ছি না। Subversion-এর মূল চিন্তাটাই হলো একটা জাতিকে দুর্বল করে তারপরে সাহায্যের হাত বাড়ানো এবং হাত ধরতে বাধ্য করা। আর হাত ধরার পরে তারা এই জাতিকে পুরোপুরি ধ্বংসের দোড়গোড়ায় নিয়ে যাবে। এই ক্রাইসিসের সমাধান কি করে হবে, সেটা বোঝার আগে সমস্যাটা কিভাবে পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়েছে, সেটা খতিয়ে দেখতে হবে।
 
সম্ভ্রান্ত ঘরের সন্তানদের সেলেব্রিটি বানাবার পরে হঠাত হাওয়া হয়ে যাওয়া এবং আটলান্টিকের ওপাড় থেকে তাদের ছবি প্রকাশ হওয়া কি একেবারেই কাকতালীয় ব্যাপার?

খেলার মাঠ তৈরি

শিক্ষিত মেধাবী মধ্য বা উচ্চ-মধ্যবিত্ত ঘরের একটা ছেলেকে জঙ্গী হিসেবে তৈরি করতে হলে তার জন্যে একটা playing field আগে তৈরি করতে হবে। সেটা তৈরির উদ্দেশ্যে সে সহ তার আশেপাশের মানুষের উপরে কিছু ব্যাপার চাপানো হয়েছে, যা কিনা ওই ছেলেটির সামনে জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ হিসেবে কাজ করেছে। যে ছেলেটি নিজেই সেই culture বা lifestyle-এ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন, তার সামনে culture-টাকে ‘ভিলেন’ হিসেবে দেখানোটা বেশ সহজই হয়েছে। তার বন্ধুবান্ধব বা ভাই-বোন এমনকি নিজের মাঝেই সেই অন্ধকার উদাহরণ সে দেখতে পায়। যতদিন মাদ্রাসার ছাত্রদের কাছে এই উদাহরণ আনা হয়েছে, ততদিন ব্যাপারটা ক্রাইসিসে রূপ নেয়নি। মাদ্রাসার একটা ছেলে কয়টা মানুষকে চেনে? আর শহুরে মধ্য বা উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের একটা ছেলে বা একটা মেয়ের ফেইসবুক প্রোফাইলে কতজন ফ্রেন্ড থাকে? এভাবে মাদ্রাসার ছেলেটাকে ব্যবহার করে সমাজের যতটা না ক্ষতি করা সম্ভব, তার চাইতে বহুগুণ বেশি ক্ষতি করা সম্ভব মধ্যবিত্ত পরিবারের একটা ছেলেকে বা মেয়েকে টার্গেট করে, কারণ এই দ্বিতীয় ধরণের ছেলে-মেয়েদেরই সমাজে নেতৃত্ব দিতে পারার সম্ভাবনাটা বেশি থাকে। এরা নিঃসন্দেহে বড় টার্গেট।

যে ছেলেমেয়েগুলিকে টার্গেট করা হয়েছে, তারা তো রাস্তার পাশের টং দোকানের কাস্টমার নয়। বরং নামীদামী ব্র্যান্ডেড কফিশপ, ভাজা মুরগি বা বার্গার-পিতজার দোকানেই এদের আনাগোণা। পড়াশোনা করেছে নামী এবং expensive প্রাইভেট স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে। স্কলারশিপ পেয়ে বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয়েছে তাদের। স্পন্সর করে দেশের এম্বাস্যাডর হিসেবে দেখানো হয়েছে এদের। বিদেশী সেলেব্রিটিদের হাত ধরে স্টেজে উঠে নাচার লোক এরা। হেভিলি স্পন্সরড কালচারাল পার্ফরমেন্স-এর টিভি রিয়েলিটি শো-তে এনে পুরো জাতির সন্মুখে সেলেব্রিটি হিসেবে তৈরি করা হয়েছে এদের। এরাই সেই সেলফি জেনারেশন, যারা কিনা ভাজা মুরগির posh দোকান থেকে গার্লফ্রেন্ডকে সাথে নিয়ে সেলফি তুলেছে ফেসবুকে আপলোড করে অনেক অনেক লাইক পাবার জন্যে। ঘন্টার পর ঘন্টা পার করেছে ফেসবুকে; সময়ের দিকে খেয়াল রাখেনি। বিদেশী সেলেব্রিটিদের লাইভ প্রোগামে যাবার জন্যে উন্মুখ হয়ে থেকেছে; টিকেটের মূল্যের কথা চিন্তাও করেনি। তাদের এই lifestyle-এর কারণে এদেরকে তো মাদ্রাসার কেউ এসে ব্রেনওয়াশ করার প্রশ্নই ওঠে না। এদেরকে তো মসজিদে রিক্রুট করা হয়নি; কারণ এদের lifestyle ছিল পুরোপুরি সেকুলার। যারা টার্গেট করেছে, তারা এদের প্রথমবার ধরেছে এদের interaction point-গুলিতেই। ব্রেনওয়াশ শুরুর সর্বপ্রথম ধাপ এটি। অর্থাৎ শস্যের মধ্যেই যে ভূত ছিল!
 
ট্রয় নগরীর মানুষেরা স্পার্টানদের রেখে যাওয়া কাঠের ঘোড়াখানা না বুঝেই যত্ন করে শহরের ভেতরে টেনে নিয়েছিল। তারা জানতো না যে এর মাঝে ট্রয় নগরী ধ্বংসের লক্ষ্যে লুকিয়ে ছিল স্পার্টার সৈন্যরা।

আমদানি করা “Trojan Horse”

ফেসবুক, কফিশপ, ভাজা মুরগির দোকান, বিভিন্ন লাইভ ইভেন্ট, ইত্যাদি একই সাথে যেমন তাদের রিক্রুট করার জন্যে মূল স্থান হিসেবে কাজ করেছে, ঠিক তেমনিভাবে এই একই culture এবং lifestyle-কে ভিলেন হিসেবে তার সামনে হাজির করে জঙ্গী বানানোর ভিত্তি গড়া হয়েছে। এদের রিক্রুটিং এজেন্টরা এই culture এবং lifestyle-এর সাথেই এসেছে। এরাই সেই এজেন্ট, আদর্শিক শক্তিদের প্রজেক্ট বাস্তবায়নই যাদের উদ্দেশ্য। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে যে এই culture এবং lifestyle খুব অল্প সময়ের মাঝে গড়ে তোলা হয়েছে। কল্পনা করেছিলাম কি যে এই আমদানি করা secular lifestyle-এ আসক্ত করে আবার সেটার বিরুদ্ধেই তাদের ক্ষেপিয়ে তুলে জঙ্গী বানিয়ে উদ্দেশ্য হাসিল করা হতে পারে? একবারও কি চিন্তা করে দেখেছি যে ফেইসবুক কালচারকে ব্যবহার করে আমাদের উতকৃষ্ট যুবক-যুবতীদের ধ্বংস করার ব্যবস্থা করা হবে? বিদেশী posh ব্র্যান্ডেড রেস্টুরেন্টের কোন টেবিলে expensive recipe-এর আড়ালে তাদের এজেন্টরা লুকিয়ে থাকতে পারে, সেটা কি আমরা ভেবে দেখেছি একবারও? মেধাবী ছেলে-মেয়েদের স্কলারশিপ দিয়ে দেশের বাইরে পাঠানোর ব্যবস্থা করে বা স্পন্সর করে দেশের এম্বাস্যাডর করে বাইরে পাঠাবার কয়েক মাস পরে বা টিভি রিয়্যালিটি শো-তে সেলেব্রিটি বানানোর কিছুদিন পরে কি করে ছেলে-মেয়ারা গায়েব হয়ে যায় এবং এরপর হঠাত করেই কোন সুইসাইড মিশনের আগে ছবি বা ভিডিওতে তাদেরকে মাথায় পাগড়ি বেধে অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়, যা কিনা আবার আটলান্টিকের ওপাড় থেকে টুইটারের মাধ্যমে প্রচার করা হয়? এটা কি শুধুই coincidence? ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ পলিসি বাস্তবায়নের জন্যে এই culture এবং lifestyle যে “Trojan Horse” হয়ে দেখা দিতে পারে, সেটা কি আমারা স্বপ্নেও ভেবেছিলাম? এখনো ভাবছেন যে কেন এখানে তরুণদের সাথে তরুণীদের কথা বলছি? ইউরোপ থেকে সিরিয়াতে চলে গিয়ে সুইসাইড মিশনে অংশ নেয়া তরুণীদের কথা কি কেউ মনে করতে পারেন? আপনার চেনাজানা সেই Western lifestyle-এ চলা মেয়েটি যে কয়েক মাসের মধ্যেই জঙ্গী হয়ে সুইসাইড মিশনে চলে যাবে না সেটা কি আমরা এখন গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি? অন্তত সারা মুসলিম বিশ্ব থেকে যেসব উদাহরণ আমাদের সামনে আসছে, তাতে আমরা কি করে উদাস থাকতে পারি? মাদ্রাসার ছেলেরা নয়, বরং Secular lifestyle-এ অভ্যস্ত হওয়া উঁচু ঘরের উচ্চশক্ষিত এবং মেধাবী ছেলে-মেয়েরাই আজকে সবচাইতে বড় টার্গেট! এদের জন্যেই খুব যত্ন করে playground তৈরি করা হয়েছে।
 

পত্রিকায় লাইফস্টাইলের নামে কি কি আসবে সেটা কে নিয়ন্ত্রণ করে?

এই “Trojan Horse”-কে যেভাবে আমাদের মাঝে স্থাপন করা হলো…

বিভিন্ন মিডিয়া হাউজের মাধ্যমে প্রডাক্ট ডিজাইন করা হয়েছে এই lifestyle-কে উপরে তুলে ধরার লক্ষ্যে; বিজ্ঞাপন এবং প্রমোশন ক্যাম্পেইন ডিজাইন করা হয়েছে। বেশি টাকা আয়ের লোভে মানুষ ভুলেই গেছে যে নিজের সন্তান এবং ছোট ভাই-বোনদের কোথায় তারা ঠেলে দিচ্ছে। এই subversion পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কৌশলগত স্থানগুলিতে এজেন্ট বসানো হয়েছে এবং ব্যবস্থা করা হয়েছে যাতে বাকিরা এই এজেন্টদের গুরু মেনে অনুসরণ করে যায়। এই lifestyle কতটা সস্তা প্রকৃতির, সেটা সকলেরই জানা; তারপরেও কোন যুক্তিতে সেগুলি শত শত কোটি টাকা খরচ করে promote করা হলো? কে মাথায় ঢুকালো যে এই lifestyle-কে promote না করলে কোন প্রডাক্ট বিক্রি হবে না? কে যুক্তি দিল যে এই lifestyle না নিলে একটা ছেলে বা একটা মেয়ের জীবন বৃথা হয়ে যাবে? একবারও কি প্রশ্ন করে দেখেছি যে বিজ্ঞাপণে যা দেখানো হচ্ছে, তা দেশের বর্তমান অবস্থাকে প্রতিফলিত করে কিনা? আমরা রাস্তায় যা দেখি একই জিনিস কি বিজ্ঞাপণে দেখি? মোট কথা আমরা কি বিজ্ঞাপণে দেশের বর্তমান বাস্তব চিত্র দেখতে পাই? যদি না পাই, তার অর্থ কি এ-ই দাঁড়াচ্ছে না যে বাস্তবতাকে পরিবর্তন করার উদ্দেশ্যেই এই পণ্য এবং বিজ্ঞাপণগুলিকে ডিজাইন করা হচ্ছে? একটা alien culture and lifestyle-কে দেশের যুবসমাজের উপরে জোর করে চাপিয়ে দেয়ার জন্যে দেশের মিডিয়া হাউজগুলি কি যারপরনাই চেষ্টা চালাচ্ছে। ফ্যাশন ডিজাইনার, মেকআপ আর্টিস্ট, হাই-এন্ড পার্লার, ইভেন্ট অর্গানাইজার, ফ্যাশন ম্যাগাজিন, দৈনিক পত্রিকার lifestyle supplement-গুলি এবং আরও অনেকে হাতে-হাত ধরে একই লক্ষ্যে কাজ করেছে। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আয় করা টাকা দিয়েই আবার এই ক্যাম্পেইন চালানো হচ্ছে। অর্থাৎ কই-এর তেলেই কই ভাজা! সেটাও আবার অন্যের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্যে?? কি অবাস্তব রকমের অবস্থা, অথচ কেউ একটা টুঁ শব্দটি করে না এই ব্যাপারে? কেন করে না? যাতে এই ব্যাপারে শুধুমাত্র posh কফিশপ ও branded ভাজা মুরগির দোকানের কোণার টেবিলে বসা ওই জঙ্গী রিক্রুটিং এজেন্টই কথা বলার সুযোগ পায় সেই জন্যে? জঙ্গী রিক্রুটিং এজেন্টদের জন্যে এটা কত বড় ব্যাকআপ! সেটাও তৈরি করা হয়েছে এদেশের মানুষেরই কষ্টার্জিত অর্থে??
 
প্রডাক্টের সাথে সাথে আর কি কি মার্কেটিং করা হয়েছে সেটা কি আমরা জানি? এই বিষয়ে প্রশ্ন তোলার দায়িত্ব আমরা দিয়েছি জঙ্গী রিক্রুটকারীদের হাতে?

প্রত্যেকটা বিজ্ঞাপণে এধরনের lifestyle-এর অন্তত কিছু ছোঁয়া থাকতেই হবে। এই rule কে বা কারা ঠিক করে দেয়? একটা বড় সংখ্যক নাটকেরও এখন একই অবস্থা। আগে সিনেমা তৈরি করা হতো সমাজের নিম্নবিত্তদের জন্যে। অশ্লীলতার নাম করে সেগুলি উতপাটন করা হলো কেন? এখন মধ্যবিত্ত যুবক-যুবতীদের সেই একই সস্তা টনিক যাতে আরও sophisticated-ভাবে দেয়া যায় সেজন্যে? কারণ টার্গেটের priority এখন মধ্য এবং উচ্চমধ্যবিত্ত শিক্ষিত ও মেধাবী তরুণ-তরুণীরা; সেটাই তো? উপরে এই lifestyle-এর সাথে যায় এরকম যতগুলি interaction point-এর কথা বলেছি, তার সবগুলিই মিডিয়াতে heavily promoted. অর্থাৎ জঙ্গী রিক্রুটিং এজেন্টদের জন্যে যুবক-যুবতীদের constant supply তৈরি করে রাখা হচ্ছে! এই অথর্ব সমাজের একটা প্রশ্ন করার ক্ষমতা নেই যে এই unnecessary and cheap lifestyle কি করে সকলের চোখের সামনে অবাঞ্ছিত ঘোষিত না হয়ে বরং জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে promoted হলো? আমরা কি মনে করতে পারি, এগুলি ঘটার সময়ে আমরা আসলে ঠিক কি করছিলাম? না পারি না। কারণ আমরাও সেই একই lifestyle-এ ডুবে আছি, যার প্রতিদিনের ঘটনার মাঝে কোন ঘটনাই মনে রাখার মতো নয়, যদি না সেটা ফেইসবুকে আপলোড করে রাখা হয়! এরকমই একটা অবস্তব দুনিয়ার ঘোরের মাঝে আমরা আছি যে উপরে বর্ণিত সকল কর্মকান্ড আমাদের নাকের ডগার সামনে দিয়ে বাস্তবায়িত হবার পরেও আমরা paralyzed হয়ে দেখেছি! শুধু তা-ই নয়, আরও আশ্চর্য ব্যাপার হলো সেই অবাস্তব কর্মকান্ডকে আমরা ভালোবাসতেও শিখেছি! কেউ কেউ যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করতে পারেন যে বোকার কোন শত্রু নেই। হ্যাঁ, সেটা ছাড়া আর কোন ভাষা দিয়ে নিজেদেরকে মূল্যায়ন করার intellectual ability আমাদের আজ নেই!
 
একটা সমাজ ধ্বংস সবচাইতে বড় অস্ত্র হলো এর নারীদেরকে ধ্বংস করা।

এই “Trojan Horse”-এর খপ্পর থেকে বের হতে হবে

ইংরেজীতে একটা কথা আছে – ‘হুক, লাইন এন্ড সিঙ্কার’ (Hook, line and sinker)। যার আভিধানিক অর্থ হলো একটা কাজ সম্পূর্ণভাবে করা। আসলে বরশির আগায় টোপ দিয়ে মাছ শিকারের প্রসেস এটি। এর জন্যে আগে টোপ গেলাতে হয়। মাদ্রাসা থেকে জঙ্গী রিক্রুটের খবর যখন জানা গেল, তখন জঙ্গীবাদ রুখতে আমরা মাদ্রাসা কেন্দ্রিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলাম। যদিও আমদানি করা অবাস্তব lifestyle-কে টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল, তথাপি আমরা সেটিকে আগের স্থানেই রেখে দিয়েছিলাম। টোপ রেখে দিয়ে মাছকে নিয়ে ব্যস্ত হবার ফল আমরা এখন টের পাচ্ছি। এবার সেই একই অবাস্তব lifestyle-কে টোপ হিসেবেই শুধু নয়, বরং রিক্রুটিং গ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে! এখন আমরা কি করবো? টিভির টক শো-তে hand-picked কিছু এজেন্ট এবং অথর্ব লোকদের অর্থহীন কিন্তু উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বকবক শুনে ঘন্টার পর ঘন্টা জীবন থেকে চলে যেতে দেব? নাকি রাষ্ট্রদ্রোহী এই subversion কর্মকান্ড বন্ধ করার চেষ্টা করবো?
 
অবাস্তবকে বাস্তবে রূপ দেয়ার চেষ্টার কমতি নেই আজ।

আমাদের কে কি এই আমদানি করা অবাস্তব lifestyle-এ এতটাই addicted করে ফেলা হয়েছে, যাতে নিজেদের সন্তান, ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধবকে হারিয়েও সেখানেই নিজেদের শান্তিকে খুঁজে ফিরবো? কি অবস্থা তৈরি হলে বাবা তার যুবক ছেলের লাশটাও ফেরত নিতে চায় না একবার ভেবে দেখতে পারেন? সমাজে সন্মানিত এবং ‘জীবনে সফল’ সেই বাবার কষ্টটা আমাদের পক্ষে কল্পনা করাও সম্ভব নয়। এতটাই কি সস্তা হয়ে গেছি আমরা যে মনুষ্যত্ব ভুলে গিয়ে culture এবং lifestyle-এর পুজায় মনোনিবেশ করবো? এটাই সেই “Trojan Horse”, যার মোহে আমরা শুধু intellectually bankrupt-ই হইনি, মনুষ্যত্বকেও হারাতে বসেছি। চিন্তাশূণ্য থাকার কারণে রাষ্ট্রবিরোধী ওইসব কর্মকান্ডকে ভালোবেসে বছরের পর বছর চলতে দিয়েছি! উপরে বর্ণিত এজেন্টদের আদর করে মোটা টাকার পারিশ্রমিক দিয়েছি তাদের subversion সফলভাবে করার জন্যে!! তাদেরকে আইকন বানিয়েছি নিজেদের জন্যে; নিজেদের সন্তানদের জন্যে!! ফলাফল আমরা ভোগ করবো না তো কে করবে?? অধঃপতন অনেক দূর পর্যন্ত হতে পারে, কিন্তু নিজেদের অবস্থানে থেকে অনেক সময়েই অধঃপতনের গভীরতা পরিমাপ করা কষ্টকর। আজ সেই অধঃপতন আমাদের সামনে প্রিয়জনের রক্তাক্ত লাশের আকারে তার গভীরতা দেখাচ্ছে। অদর্শিক শক্তির অশুভ এই প্রজেক্ট থেকে দেশ এবং দেশের তরুণ-তরুণীদের বাঁচাতে হলে আগে আমদেরকে আমদানি করা অবাস্তব সেই lifestyle-রূপী “Trojan Horse”-এর খপ্পর থেকে বের হতে হবে।