Showing posts with label Ecuador. Show all posts
Showing posts with label Ecuador. Show all posts

Friday, 28 March 2025

যুদ্ধাস্ত্রের ব্যাপারে অন্য রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীলতা সার্বভৌমত্বকে হুমকিতে ফেলতে পারে

২৮শে মার্চ ২০২৫

পেরু বিমান বাহিনীর ফরাসি নির্মিত 'মিরাজ-২০০০পি' যুদ্ধবিমান। ইকুয়েডরের বিরুদ্ধে ১৯৯৫ সালের সেনেপা যুদ্ধে পেরু এই বিমানগুলিকে এয়ারবোর্ন রাডার হিসেবে ব্যবহার করা ছাড়া তেমন কোন কাজে লাগাতে পারেনি। কারণ ফরাসিরা এই বিমানের সাথে মধ্যম পাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করতে রাজি ছিল না। অস্ত্র নির্মাতা রাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্যের সাথে সমন্বয় না হলে যুদ্ধের দিন সরঞ্জামের রেডিনেসের সমস্যা হতে পারে।


সেনেপা যুদ্ধ – পেরু বনাম ইকুয়েডর

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরু এবং ইকুয়েডর। পেরুর জনসংখ্যা বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি ৩০ লক্ষ এবং ইকুয়েডরের জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৮০ লক্ষ। আয়তনের দিক থেকেও পেরু অনেক বড় দেশ; ১৩ লক্ষ বর্গকিঃমিঃ বনাম ৩ লক্ষ বর্গকিঃমিঃ। বর্তমানে পেরুর জিডিপি (২৭০ বিলিয়ন ডলার) ইকুয়েডরের চাইতে (১২০ বিলিয়ন ডলার) অনেক বড় হলেও ১৯৮০এর দশকে একেবারে সমান ছিল। এই দুই দেশের মাঝে বহু আগে থেকেই সীমানা নিয়ে একটা দ্বন্দ্ব ছিল। সেনেপা নামে গভীর অরণ্যের পাহাড়ি এলাকায় প্রায় ৭০কিঃমিঃএর মতো অঞ্চলে সীমানা নির্ধারণে কিছুটা ধোঁয়াশা ছিল। ১৯৪০এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্ততায় এই দ্বন্দ্ব কিছুটা কাটলেও ১৯৫০এর দশকে ইকুয়েডরের পার্লামেন্টে সেই সীমানাকে স্বীকৃতি না দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এই সমস্যা আবারও জেঁকে বসে ১৯৮১ সালে; যখন ইকুয়েডর সামরিক বাহিনী পাঠিয়ে গোপনে এই দুর্গম অঞ্চলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। তবে সামরিক দিক থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী পেরু খুব সহজেই ইকুয়েডরের সেনাদেরকে সেখান থেকে বিতাড়িত করে সেনেপা অঞ্চলের উপর তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। মূলতঃ এই অঞ্চলের ইকুয়েডর প্রান্তে স্বর্ণ এবং তামার খনির সন্ধান পাবার কারণে ইকুয়েডর এই অঞ্চলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে চাইছিল। ১৯৮১ সালের অপমান ইকুয়েডর ভোলেনি। ১৯৮৮ সাল থেকে দক্ষিণ আমেরিকার অনেকগুলি দেশেই অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়। ইকুয়েডর সুযোগ খোঁজে। অর্থনৈতিক চাপে পেরু তার সামরিক বাজেট কমিয়ে ফেলে। তাদের বিমান বাহিনীতে ১২টা ফরাসি নির্মিত অত্যাধুনিক 'মিরাজ-২০০০পি' বিমান ছাড়াও ছিল ১৫টা সুপারসনিক 'মিরাজ-৫পি' ফাইটার (১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনাকে ১০টা দিয়ে দেয়ার পর), ৩৪টা সোভিয়েত 'সুখোই-২২' সুপারসনিক বোমারু বিমান, ১৫টা ব্রিটিশ 'ক্যানবেরা' মধ্যম পাল্লার বোমারু বিমান, ২৪টা মার্কিন নির্মিত 'এ-৩৭বি' হাল্কা এটাক বিমান এবং ১৫টা সোভিয়েত নির্মিত 'এমআই-২৪' এটাক হেলিকপ্টার। কাগজে কলমে এটা ছিল দক্ষিণ আমেরিকার সবচাইতে শক্তিশালী বিমান বাহিনী। কিন্তু সমস্যা হলো, বাজেট না থাকায় স্পেয়ার পার্টসের অভাবে পেরুর বিমান বাহিনীর মাত্র ৩টা 'মিরাজ-২০০০পি', ৭টা 'সুখোই-২২', ৪টা 'ক্যানবেরা', ৮টা 'এ-৩৭বি' বিমান এবং মাত্র ৫টা সোভিয়েত নির্মিত 'এমআই-২৪' এটাক হেলিকপ্টার অপারেশনাল ছিল। তাদের ২০টা বিমান প্রতিরক্ষা রাডারের মাঝে মাত্র ৮টা অপারেশনাল ছিল। এছাড়াও মধ্যম পাল্লার সোভিয়েত নির্মিত ৬টা 'এসএ-৩' আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (১১৬টা ক্ষেপণাস্ত্র), ১২৫টা 'এসএ-৭' ও ১১০টা 'এসএ-১৬' স্বল্পপাল্লার বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মাঝে মাত্র ২০ শতাংশ অপারেশনাল ছিল। এছাড়াও তাদের বহরে ১২৪টা সোভিয়েত নির্মিত ২৩মিঃমিঃ বিমান প্রতিরক্ষা কামানও ছিল; তবে সেগুলিকে হেলিকপ্টারে করে বহণ করে দুর্গম এলাকায় নিয়ে যাবার মতো সক্ষমতা পেরুর ছিল না। এই অবস্থার ধীরে ধীরে উন্নতি হলেও তা যুদ্ধের এক মাসের মাঝে পুরোপুরিভাবে কাটিয়ে ওঠা যায়নি। একারণে ১৯৯৫ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে সেনেপা যুদ্ধে পেরুর বিমান বাহিনীর অত্যাধুনিক 'মিরাজ-২০০০' এবং 'মিরাজ-৫' বিমানগুলি একবারের জন্যেও ইকুয়েডরের বিমানগুলিকে বাধা দিতে পারেনি। অপরদিকে ইকুয়েডরের 'মিরাজ-এফ১' এবং ইস্রাইলের তৈরি 'কেফির সি২' সুপারসনিক বিমানগুলি পেরুর কয়েকটা বিমান ভূপাতিত করে ফেলে। বাজে অর্থনৈতিক অবস্থা স্বল্প সময়ের জন্যে পেরুর সাথে ইকুয়েডরের সামরিক সক্ষমতার সমতা তৈরি করেছিল। পেরুর প্রায় ১০টার মতো 'মিরাজ-এফ১' এবং ১০টার মতো 'কেফির সি২' বিমান অপারেশনাল ছিল; যা যুদ্ধের ফলাফল তাদের পক্ষে নিয়ে আসতে সহায়তা করেছিল। তাদের বিমান বাহিনীর সবচাইতে আধুনিক ব্রিটিশ 'জাগুয়ার' বোমারু বিমানকে ব্যবহার করারই দরকার হয়নি। এবারে আবারও যখন যুদ্ধবিরতি হয় এবং সকলে আলোচনার টেবিলে বসে, তখন ইকুয়েডর সেনেপা অঞ্চল থেকে তার সেনা সরিয়ে নিয়ে আসতে বাধ্য হয় ঠিকই, কিন্তু খনিজ সম্পদে পরিপূর্ণ অঞ্চলটা তাদের নামে নিশ্চিতভাবে লিখিয়ে নেয়। এই অঞ্চলে কানাডার একটা কোম্পানি স্বর্ণের খনি ডেভেলপ করেছে এবং একটা চীনা কোম্পানি তামার খনি ডেভেলপ করেছে। অর্থাৎ ইকুয়েডর যা চেয়েছিল, সেটাই পেয়েছে।

স্বল্প সময়ের সেনেপা যুদ্ধ যে ব্যাপারটা পরিষ্কার করে দেয় তা হলো, একটা রাষ্ট্র কোন অবস্থাতেই তার প্রতিরক্ষাকে হাল্কাভাবে নিতে পারে না। এটা স্বার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। যুদ্ধ শেষ হবার সাথেসাথেই পেরু রাশিয়া থেকে 'মিগ-২৯' এবং 'সুখোই-২৫' যুদ্ধবিমান কেনে। ২০০১ সালেই পেরু 'মিগ-২৯' যুদ্ধবিমানগুলিকে আপগ্রেড করে মধ্যম পাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য 'আর-৭৭' রাডার গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র বহণের উপযোগী করে নেয়। তাদের অতি দামী 'মিরাজ-২০০০পি' ফাইটারগুলি এয়ারবোর্ন রাডার ছাড়া খুব বেশি একটা কাজে আসেনি। এই বিমানগুলি একবারের জন্যেও ইকুয়েডরের বিমানগুলিকে বাধা দিতে পারেনি। সেগুলিতে বহণ করার জন্যে মধ্যম পাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রও ফরাসিরা পেরুকে দিতে রাজি হয়নি।
 
ইকুয়েডর বিমান বাহিনীর 'মিরাজ-এফ১' যুদ্ধবিমান। পেরুর প্রায় ১০টার মতো 'মিরাজ-এফ১' এবং ১০টার মতো 'কেফির সি২' বিমান অপারেশনাল ছিল; যা যুদ্ধের ফলাফল তাদের পক্ষে নিয়ে আসতে সহায়তা করেছিল। বাজে অর্থনৈতিক অবস্থা স্বল্প সময়ের জন্যে পেরুর সাথে ইকুয়েডরের সামরিক সক্ষমতার সমতা তৈরি করেছিল। কোন একটা সময় একটা রাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহারের উপরে কোন নিয়ন্ত্রণ চলে আসলে প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের ইন্টেলিজেন্স সেটার উপর নজরদারি করবে এবং প্রয়োজন হলে সেই পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে নিজেদের আখের গোছাতে পারে।


সেনেপা যুদ্ধ থেকে শিক্ষা

প্রথমতঃ বিশাল শক্তিশালী সামরিক সরঞ্জামের বহর কোন কাজেই আসবে না যদি সেগুলি সর্বদা ব্যবহারের উপযোগী না থাকে। যুদ্ধের দিনে যুদ্ধক্ষেত্রে কে কতটা সামরিক শক্তি মোতায়েন করতে পারে, সেটার উপরেই জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়। কোন একটা সময় সেই সরঞ্জামগুলি ব্যবহারের উপরে কোন নিয়ন্ত্রণ চলে আসলে প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের ইন্টেলিজেন্স সেটার উপর নজরদারি করবে এবং প্রয়োজন হলে সেই পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে নিজেদের আখের গোছাতে পারে। সামরিক সরঞ্জামের রেডিনেস বা ব্যবহারের উপযোগিতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। এই রেডিনেস একদিকে যেমন নির্ভর করবে সরঞ্জামের কর্মক্ষমতার উপর, তেমনি নির্ভর করবে মানবসম্পদের ট্রেনিংএর উপর। এটা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন।

দ্বিতীয়তঃ সরঞ্জামের সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি; বিশেষ করে যেদিন প্রয়োজন হবে। যদি সরঞ্জাম অন্য কারুর তৈরি হয়, তাহলে সেখানে নির্ভরশীলতা তৈরি হতে পারে। বাইরে থেকে সরঞ্জাম কিনে আনার সাথে আর্থিক স্বচ্ছলতার প্রশ্ন ছাড়াও ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্য জড়িত। অস্ত্র নির্মাতা রাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্যের সাথে সমন্বয় না হলে যুদ্ধের দিন সরঞ্জামের রেডিনেসের সমস্যা হতে পারে। স্পেয়ার পার্টস ছাড়া এখানে সফটওয়্যার আপগ্রেডের ব্যাপার রয়েছে। আবার যুদ্ধ শুরু হলে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞাও চলে আসতে পারে। অস্ত্র নির্মাতা দেশগুলি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র বহণের সক্ষমতা রেখে তাদের বিমানগুলি রপ্তানি করে না। বরং শর্ত সাপেক্ষে কিছু কিছু করে প্রযুক্তির ছাড় দেয়া হয়। পেরু 'মিরাজ-২০০০' বিমান ঠিকই পেয়েছিল; কিন্তু সেগুলি মধ্যম পাল্লার আকাশ থেকে আকাশে বহণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র এবং 'এক্সোসেট' জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র বহণ করতে পারতো না। ১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনার 'সুপার এটেনডার্ড' যুদ্ধবিমানের ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছিল। ব্রিটেনের চাপে ফরাসিরা আর্জেন্টিনার বেশিরভাগ 'সুপার এটেনডার্ড' যুদ্ধবিমানকে 'এক্সোসেট' ক্ষেপণাস্ত্র বহণের উপযোগী করেনি; কালক্ষেপণ করেও আর্জেন্টিনার ক্ষতি করে তারা। পেরুকে ফ্রান্স 'এক্সোসেট' ক্ষেপণাস্ত্র দেয়নি এই সন্দেহে যে, পেরু সেগুলি আর্জেন্টিনাকে দিয়ে দিতে পারে। মিশরেরও একই অভিজ্ঞতা হয়েছে মার্কিন 'এফ-১৬' (১৯২টা) এবং ফরাসি 'রাফাল' (৫৪টার মাঝে ২৪টা ডেলিভারি পেয়েছে) যুদ্ধবিমানের ক্ষেত্রে। যুক্তরাষ্ট্র যেমন তাদের মধ্যম পাল্লার 'এআইএম-১২০ এমর‍্যাম' আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র মিশরকে দেয়নি; তেমনি ফরাসিরাও তাদের 'রাফাল' বিমানের সাথে 'মাইকা' এবং 'মিটিয়র' ক্ষেপণাস্ত্র দিতে রাজি হয়নি। কারণ উভয় দেশের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ হলো ইস্রাইলকে রক্ষা করা; তাই তারা মিশরের হাতে এই অত্যাধুনিক অস্ত্রগুলি দেয়নি। সুতরাং অতি দামী মার্কিন ও ফরাসি যুদ্ধবিমান কেনার পরেও মিশর সেগুলি নিয়ে কিছুই করতে পারেনি। একারণে তারা শেষ পর্যন্ত চীনের দ্বারস্থ হয়েছে 'জে-১০সি' যুদ্ধবিমানের জন্যে। তারা আশা করছে যে, অবশেষে তারা এই বিমানের সাথে মধ্যম পাল্লার 'পিএল-১৫' আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র পাবে। মার্কিন 'এফ-১৬'এর সাথে তুরস্কের অভিজ্ঞতাও ভালো নয়। তুরস্কের 'এফ-১৬' বিমানগুলির সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার আপগ্রেড করার জন্যে তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের পেছনে পেছনে ঘুরছে। আর যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ককে নাকে দড়ি দিয়ে তার কাজগুলি করিয়ে নিচ্ছে। মার্কিন 'এফ-৩৫' স্টেলথ বিমানের প্রকল্পে যুক্ত হয়েও তুরস্ক ফেঁসে গেছে। রাশিয়া থেকে 'এস-৪০০' বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার 'অপরাধে' যুক্তরাষ্ট্র তুরস্কের উপর নিষেধাজ্ঞা দেয় এবং তুরস্কের পাইলটরা 'এফ-৩৫' বিমানে ট্রেনিং সম্পন্ন করার পর যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ককে বিমানগুলি ডেলিভারি দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এমনকি আগাম দেয়া অর্থও যুক্তরাষ্ট্র ফেরত দেয়নি তুরস্ককে! দেরিতে হলেও তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের ব্ল্যাকমেইল বুঝতে পেরেছে (যদিও কিছু লোক এখনও যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়তে পারছে না); এবং একারণে তারা নিজেদের যুদ্ধ সরঞ্জাম ডেভেলপ করছে।
 
মিশরের বিমান বাহিনীর মার্কিন নির্মিত 'এফ-১৬' যুদ্ধবিমান। যুক্তরাষ্ট্র মিশরকে বিমান দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু এর সাথে 'এআইএম-১২০ এমর‍্যাম' মধ্যম পাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র দেয়নি। ফ্রান্সও 'রাফাল' বিমানের সাথে মধ্যম পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স নিশ্চিত করেছে যে, ইস্রাইলের বিরুদ্ধে কেউ মধ্যম পাল্লার ক্ষেপণস্ত্র মোতায়েন করতে পারবে না। 


তৃতীয়তঃ যেকোন ইন্ডাস্ট্রিয়াল সরঞ্জাম ডেলিভারির ক্ষেত্রে একটা লীডটাইম থাকে। অর্থাৎ প্রস্তুতকারীকে কিছুটা সময় দিতে হয় সরঞ্জাম তৈরি করে ডেলিভারি দেয়ার; বিশেষ করে সরঞ্জাম যদি এমন হয়, যা কিনা আগে থেকে তৈরি করে রেখে দেয়া হয় না। সমরাস্ত্রের ক্ষেত্রে লীডটাইম খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা বেশ দীর্ঘ। হাতে গোণা কয়েকজন এসকল সরঞ্জাম প্রস্তুত করে। একারণে অনেক সময়েই দেখা যায় যে, সমরাস্ত্রের স্পেয়ার পার্টস পেতে সময়ক্ষেপণ হয়। পেরুর ক্ষেত্রেও সম্ভবতঃ সেটা হয়েছিল। কোন কোন সময় অতি প্রয়োজন হলে প্রস্তুতকারী দেশ নিজেদের বাহিনী থেকে সমরাস্ত্র সেকেন্ড-হ্যান্ড ডেলিভারি দিয়ে থাকে। তবে সেটা শুধুমাত্র প্রস্তুতকারী রাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্যের সাথে সমন্বিত হলেই হয়ে থাকে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্র যখন ভিয়েতনাম ছেড়ে গিয়েছিল, তখন তারা দক্ষিণ ভিয়েতনামের বিমান বাহিনীকে প্রায় ১১'শ যুদ্ধবিমান দিয়েছিল। অপরদিকে ১৯৬৫ সালে ভারতের সাথে যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এর ফলে পাকিস্তান কানাডা থেকে 'এফ-৮৬এফ স্যাবর' ফাইটার বিমান যোগাড় করে।

চতুর্থতঃ যে ব্যাপারটা পেরু হয়তো মোকাবিলা করেনি, তবে অন্য অনেক দেশকেই মোকাবিলা করতে হতে পারে। যেমন অস্ত্র ডেলিভারি করা বিমানকে আকাশসীমানা ব্যবহার করতে না দেয়া। অস্ত্র যদি আমদানি করতে হয়, তখন শক্তিশালী কোন দেশ ইচ্ছা করলে বহণকারী বিমানের চলাচলকে বিঘ্নিত করতে পারে। এখানে যুদ্ধে জড়ানো রাষ্ট্রের আকাশসীমানা কোন কোন দেশের সাথে বা তাদের সমুদ্রসীমানা রয়েছে কিনা, সেগুলি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়। ১৯৮০এর দশকের শেষের দিকে বাংলাদেশ চীন থেকে ২০টা 'এফ-৭এমবি' এবং ১২টা 'এ-৫' বিমান ক্রয় করে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ চীন থেকে আরও যুদ্ধবিমান ক্রয় করে। এই বিমানগুলি অনেক ক্ষেত্রেই আকাশপথে উড়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল। অন্ততঃ 'কে-৮ডব্লিউ' বিমানগুলি যে আকাশপথে মিয়ানমার হয়ে এসেছিল, তা পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। জাতীয় নিরাপত্তার কারণে এই আকাশপথের বর্ণনা এখানে না দেয়া গেলেও যে ব্যাপারটা বোঝানো সম্ভব তা হলো, যুদ্ধের সময় সমরাস্ত্র আমদানি করতে গেলে কোন একটা পথে আকাশসীমানা খোলা রাখতেই হবে। এটা সার্বভৌমত্ব রক্ষার সাথে সম্পর্কিত।

পঞ্চমতঃ সকল সমরাস্ত্র নিজেরা ডেভেলপ ও তৈরি করতে পারলে উপরের বেশিরভাগ সমস্যাই এড়ানো সম্ভব। সকল সরঞ্জাম না হলেও অন্ততঃ ক্রিটিক্যাল কম্পোনেন্টগুলি যদি নিজেরা তৈরি করা যায়, তাহলে পেরুর মতো পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব। তবে এর সাথে একটা এয়ার করিডোর খোলা রাখতেই হবে; যাতে করে বাইরে থেকে এমন কিছু সরঞ্জাম নিয়ে আসা যায়, যা কিনা নিজেদের কাছে নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের 'ইউএইচ-৬০ ব্ল্যাক হক' হেলিকপ্টার। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটা বলাই যেতে পারে যে, বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা যদি ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্যে প্রস্তুত রাখা না হয়, তাহলে এই রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী রাখার কোন প্রয়োজনই নেই। আর এই সামরিক বাহিনীর জন্যে বাইরে থেকে কেনা কোন অস্ত্রের উপর যদি শর্ত থাকে যে, তা ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যাবে না, অথবা যুদ্ধের সময়ে অস্ত্র অবরোধের মাঝে পড়তে হবে, বা স্পেয়ার পার্টস বা সফটওয়্যার আপডেট পাওয়া যাবে না, তাহলে সেই অস্ত্রের ব্যাপারে বাংলাদেশের অনীহা থাকাটাই স্বাভাবিক হওয়া উচিৎ।

 
সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে যদি একটা রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে সেই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব প্রশ্নের মুখে পড়বে। সেই রাষ্ট্র নিঃসন্দেহে অন্য রাষ্ট্রের পক্ষে প্রক্সি যুদ্ধে নামতে বাধ্য হবে; ঠিক যেমনটা ইউক্রেনের ক্ষেত্রে হয়েছে। নিজের অর্থ খরচ করে অন্যের কাছ থেকে কেনা অস্ত্রের উপর নির্ভর করে কেউ কখনও বড় হতে পারেনি। সে সর্বদাই আরেকজনের কথায় উঠেছে বসেছে। অন্য কথায় অন্যের দাস হিসেবে কাজ করেছে। অনেকে এই দাস মনোভাবের মাঝেই গর্ব দেখে - সবচাইতে শক্তিশালী রাষ্ট্রের দাসত্ব করাও গর্বের ব্যাপার! তবে বিভিন্ন সময়ের ইতিহাস শিক্ষা দেয় যে, যুদ্ধের সময়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলি নিয়মিতই নিজেদের স্বার্থ দেখতে গিয়ে অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে জ্বলাঞ্জলি দেয়। তাই সেসকল রাষ্ট্রের উপর সামরিক সরঞ্জামের ব্যাপারে নির্ভরশীলতা তৈরি করাটা বিপদ ডেকে নিয়ে আসতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটা বলাই যেতে পারে যে, বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা যদি ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্যে প্রস্তুত রাখা না হয়, তাহলে এই রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী রাখার কোন প্রয়োজনই নেই। আর এই সামরিক বাহিনীর জন্যে বাইরে থেকে কেনা কোন অস্ত্রের উপর যদি শর্ত থাকে যে, তা ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যাবে না, অথবা যুদ্ধের সময়ে অস্ত্র অবরোধের মাঝে পড়তে হবে, বা স্পেয়ার পার্টস বা সফটওয়্যার আপডেট পাওয়া যাবে না, তাহলে সেই অস্ত্রের ব্যাপারে বাংলাদেশের অনীহা থাকাটাই স্বাভাবিক হওয়া উচিৎ। অন্ততঃ এটা নিশ্চিত যে, বিশাল অংক খরচ করে পশ্চিমা দেশ থেকে কেনা অত্যাধুনিক সামরিক বিমান যদি মধ্যম পাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, বা এন্টি রাডার ক্ষেপণাস্ত্র, বা জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র বহণে সক্ষম না হয়, তাহলে সেগুলি শো-কেসে সাজিয়ে রাখা চকচকে খেলনা থেকে আলাদা কিছু হবে না।






সূত্রঃ




‘The Time Ecuador and Peru Fought a 34-Day War Over a Patch of Amazonian Jungle’ in Historynet, 16 June 2023 (https://www.historynet.com/cenepa-war-peru-ecuador/)

‘The Cenepa Conflict at 25: Lessons Learned' by Lt Col Oswal Sigüeñas Alvarado in Journal of the Americas, Third Edition 2021

‘Mirage vs. Sukhoi; February 10, 1995 – The Cenepa War’ in Ed Nash’s Military Matters, 20 March 2020 (https://www.youtube.com/watch?v=fKJcm7E59oU)

‘Exocet missile: how the sinking of HMS Sheffield made it famous’ in The Guardian, 15 October 2017

‘Turkey scales down $23 bln F-16 jet deal with US, minister says’ in Reuters, 27 November 2024

‘Egypt to Replace US F-16s With China’s J-10C Fighter Jets: Report’ in The Defense Post, 10 September 2024

‘Egypt has spent big on diversifying its air force, but to what end?’ in Middle East Eye, 09 September 2022

‘Egypt barred from receiving BVR missiles for F-16 and Rafale’ in Bulgarian Military, 12 September 2024 (https://bulgarianmilitary.com/2024/09/12/egypt-barred-from-receiving-bvr-missiles-for-f-16-and-rafale/)

‘Turkey’s readmission to the F-35 program must come with a cost’ by Jonathan Schanzer and Sinan Ciddi in The Hill, 26 March 2025

‘US formally removes Turkey from F-35 programme’ in TRT World (https://www.trtworld.com/turkey/us-formally-removes-turkey-from-f-35-programme-46112)

‘Canadair Sabre’ in Joe Baugher (http://joebaugher.com/usaf_fighters/p86_22.html)

Monday, 15 August 2022

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মুক্তি কি শুধুই সোনার হরিণ?

১৫ই অগাস্ট ২০২২

 
অগাস্ট ২০২২। সিয়েরা লিওনের রাস্তায় বিক্ষোভ। সিয়েরা লিওন ও ইকুয়েডরের বিক্ষোভের খবরগুলি জনগণের অস্থিরতা প্রকাশের একটা মাধ্যমের কথা বলছে, যার ফলশ্রুতিতে সরকারগুলি আইন শৃংখলা বজায় রাখতে হিমসিম খাচ্ছে। অপরদিকে তা শ্রীলঙ্কাতে সরকারের পতন ডেকে এনেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের একদিকে যেমন কেউ সমাধান দিতে পারছে না, অপরদিকে সমস্যার কারণ হিসেবে করোনাভাইরাস বা ইউক্রেন যুদ্ধের উল্লেখও মানুষকে স্বস্তি দিতে পারছে না। অর্থনৈতিক মুক্তি এখন সোনার হরিণ ছাড়া আর কিছুই নয়।


গত ১০ই অগাস্ট পশ্চিম আফ্রিকার দেশ সিয়েরা লিওনের রাজধানী ফ্রীটাউনের রাস্তায় বিক্ষোভকারীদের সাথে নিরাপত্তারক্ষীদের মারাত্মক সংঘর্ষে ৬ জন পুলিশসহ কমপক্ষে ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন মিডিয়ার খবরে বলা হচ্ছে। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ ছিল ব্যাপক মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি। সংঘর্ষের পর থেকে দেশটায় কারফিউ জারি করা হয়েছে এবং ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। ফ্রীটাউনের একজন ব্যবসায়ী ‘সিএনএন’কে বলছেন যে, সরকারের ভাষ্য হলো, অর্থনৈতিক দৈন্যতার জন্যে করোনা মহামারি এবং ইউক্রেন যুদ্ধই দায়ী। কিন্তু দেশটায় বেকারত্বও তো অত্যধিক। যুবকদের মাঝে অসন্তোষ অনেক বেশি।

সিয়েরা লিওনের এই বিক্ষোভ সেই দেশের বা আফ্রিকার কোন সমস্যাও নয়; একটা বৈশ্বিক সমস্যা। বিশ্বের অনেক দেশেই অর্থনৈতিক দুর্দশার কারণে মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে শ্রীলঙ্কার খবরগুলি দুনিয়াব্যাপী প্রচার হয়েছে। জুন মাস থেকে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ইকুয়েডরে পুলিশের সাথে বিক্ষোভকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। ‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, বিক্ষোভকারীদের মূল দাবি ছিল জ্বালানির মূল্য কমানো এবং কৃষিজ দ্রব্যের মূল্যের উপর লাগাম টানা। বিক্ষোভের মূল আয়োজক ছিল দেশটার আদিবাসীদের সংগঠন ‘কনফেডারেশন অব ইন্ডিজেনাস ন্যাশনালিটিজ অব ইকুয়েডর’। রাজধানী কুইটোতেও হাজারো মানুষ বিক্ষোভ করেছে। বিক্ষোভকারীরা টায়ার জ্বালিয়ে এবং গাছের গুঁড়ি ও মাটি ফেলে রাজধানী শহরে ঢোকার রাস্তা আটকেছে। ২০২০ সাল থেকে দেশটায় ডিজেলের মূল্য প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। করোনা মহামারি থেকে বাঁচতে গিয়ে দেশটা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ‘আইএমএফ’এর কাছ থেকে সাড়ে ৬ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেয়। তদুপরি দেশটায় অস্থিরতা চরমে উঠেছে।

জাতিসংঘের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও জলবায়ুগত উন্নয়ন বিষয়ক অঙ্গসংগঠন ‘ইকোসক’এর প্রেসিডেন্ট কলিন কেলাপাইল ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’এর সাথে এক সাক্ষাতে বলেন যে, করোনা মহামারি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে দুনিয়াব্যাপী জাতিসংঘের দারিদ্র্য দূরীকরণ ও শিশুদের জন্যে শিক্ষা নিশ্চিতের কর্মকান্ড যতটুকু সফলতা পেয়েছিল, তা এখন উল্টো দিকে ধাবিত হচ্ছে; যা এর আগে কখনও ঘটেনি। পশ্চিমা দেশগুলি এখন ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার বিরুদ্ধে অর্থায়ন করছে; একারণে ২০৩০ সালের মাঝে জাতিসংঘ বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য দূরীকরণের যে টার্গেট নির্ধারণ করেছিল, তার জন্যে অর্থায়ন পাওয়া নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন যে, দারিদ্রের মতো চ্যালেঞ্জগুলি আরও আগে থেকেই ছিল। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, একজন ক্ষুধার্ত মানুষ হলো একজন উত্তেজিত মানুষ। শ্রীলঙ্কার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন যে, খাদ্য এবং জ্বালানি না পাওয়ার কারণে জনগণের ক্রোধ সামনে চলে আসতে পারে। তবে কেলাপাইল স্বীকার করেন যে, করোনা মহামারির আগে থেকেই বৈশ্বিক উন্নয়ন কর্মকান্ডে অর্থায়ন কমছিল; এবং উন্নয়নশীল দুনিয়াতে প্রযুক্তি, বিশেষ করে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সংযোগের অপ্রতুলতা বিদ্যমান ছিল। বিশ্বের দরিদ্র্ দেশগুলি আরও বেশি করে ঋণের বোঝার নিচে তলিয়ে যাচ্ছে।

বৈশ্বিক দারিদ্র্যের কথা বললে ভারতকে বাদ দিয়ে আলোচনা সম্ভব নয়। ২০২১ সালে ‘পিউ রিসার্চ সেন্টার’এর এক গবেষণায় বলা হয় যে, করোনা মহামারির ফলশ্রুতিতে ভারতে দৈনিক ২ ডলারের কম আয়ের মানুষের সংখ্যা সাড়ে ৭ কোটি বৃদ্ধি পেয়েছে! এই সংখ্যাটা পুরো বিশ্বের দারিদ্র্য বৃদ্ধির সংখ্যার ৬০ শতাংশ! সেই গবেষণায় আরও বলা হয় যে, ভারতের মধ্যবিত্তের সংখ্যা ৩ কোটি ২০ লক্ষ কমে গেছে। এটাও সারা দুনিয়ার ৬০ শতাংশ। ভারতের ৭৫তম স্বাধীনতা দিবসে ডেনমার্কের ‘রসকিল্ডা ইউনিভার্সিটি’র এসোসিয়েট প্রফেসর সোমদীপ সেন ‘আল জাজিরা’র এক লেখায় মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, স্বাধীনতা দিবসে ভারতের উল্লসিত হবার কিছুই নেই। একদিকে যেমন দেশটার হিন্দুত্ববাদী সরকারের ইসলাম বিদ্বেষী নীতি মানবাধিকার ইস্যুকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তেমনি ভুল নীতি অনুসরণ করার কারণে নতুন নতুন সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। করোনা মহামারির আগেই ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল ১৯৭৫-৭৬ সালের পর থেকে সর্বনিম্ন। জুন মাসে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী যুবকদের মাঝে বেকারত্বের হার ছিল প্রায় ৪৪ শতাংশ। দেশটার মুদ্রা রুপীর মূল্যমানের পতনও আমদানি-নির্ভর সেক্টরগুলি দুর্দশার কারণ হতে যাচ্ছে।

কিন্তু অর্থনৈতিক দুর্দশা শুধুমাত্র দরিদ্র্ দেশগুলিতেই নয়। বিশ্বের উন্নত দেশগুলির জনগণও অর্থনৈতিক দৈন্যতার মাঝে রয়েছে। ব্রিটেনের ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা বলছে যে, ব্রিটেনের ট্রেড ইউনিয়ন, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, ভাড়াটিয়াদের সংগঠন এবং রাজনীতিবিদেরা একত্রিত হয়ে দেশব্যাপী আন্দোলনে নেমেছে। তাদের অভিযোগ হলো সরকার জনগণের জীবনধারণের খরচ কমাতে যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না। তারা ইতোমধ্যেই ৩ লক্ষ স্বাক্ষর যোগাড় করেছে; এবং দেশব্যাপী ৫০টা র‍্যালী করবে তারা। যোগাযোগ শ্রমিকদের সংগঠনের জেনারেল সেক্রেটারি ডেইভ ওয়ার্ড বলছেন যে, রাষ্ট্রের সামনে কোন না কোন একটা সমস্যা থাকবেই; আর সবসময়ই শ্রমিকদেরকেই সর্বোচ্চ মূল্য দিতে হয়। ধনীরা সর্বদাই চেষ্টা করছে যাতে করে শ্রমিকদের কাছ থেকে কম খরচে বেশি কাজ আদায় করে নেয়া যায়। এই ধনীরাই এখন অর্থনৈতিক সমস্যার মাঝ থেকে মুনাফা করে নিতে চাইছে; যখন লাখো মানুষ দারিদ্র্যের মাঝে পতিত হচ্ছে।

 
বৈরুতের ব্যাংকের অভ্যন্তরে বন্দুক হাতে বাসাম আল-শেখ হুসেইন। লেবাননে ব্যাংকারদের জিম্মি করার ঘটনা এবং সেই কাজের পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থন দেখিয়ে দেয় যে, প্রচলিত আইনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা কতটা কমেছে। দারিদ্রের ফলস্বরূপ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষ এবং আইনের শাসনে ধ্বস পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থাকে শুধুমাত্র মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মাঝেই ফেলেনি, অনেক ক্ষেত্রেই অকার্জকর করে ফেলেছে; যা মানুষের মাঝে পরিবর্তনের আকাংক্ষাকে বহুলাংশে বৃদ্ধি করেছে।

গত কয়েক বছর ধরেই বিশ্ব মিডিয়াতে লেবাননের অস্থিরতার খবর এসেছে নিয়মিত। ‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, লেবাননের নিজস্ব মুদ্রা ৯০ শতাংশ মূল্য হারিয়েছে। জাতিসংঘের হিসেবে দেশটার ৮০ শতাংশ মানুষ এখন দারিদ্র্যের মাঝে রয়েছে। এরকমই একটা পরিস্থিতিতে গত ১১ই অগাস্ট লেবাননের রাজধানী বৈরুতের একটা ব্যাংকে বাসাম আল-শেখ হুসেইন নামের এক ব্যক্তি অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করে নিজের একাউন্ট থেকে অর্থ উঠাবার দাবি করে। ‘বিবিসি’ বলছে যে, লেবাননের ব্যাংকগুলির উপর সরকার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে বলে দিয়েছে যে, মানুষ ব্যাংক থেকে কত অর্থ তুলতে পারবে। হুসেইনের ভাই বলেন যে, তার ব্যাংক একাউন্টে ২ লক্ষ ১০ হাজার ডলার রয়েছে। অথচ তার বাবার চিকিৎসার খরচ সে বহণ করতে পারছিল না। কারণ ব্যাংকাররা তাকে অর্থ দিতে গড়িমসি করছিল। তাই হুসেইন এই কাজ করতে বাধ্য হয়েছে। শেষ পর্যন্ত হুসেইনকে ৩৫ হাজার ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। লেবাননের জনগণের মাঝে সেই ব্যক্তি হিরো হিসেবে আখ্যা পেয়েছে। ‘সিএনএন’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, অনেকেই মনে করছে যে, তাদের সংসার চালাতে তাদেরকেও হুসেইনের মতোই কাজ করতে হবে। এখন কোন ঘটনা এটাকে উস্কে দেবে, সেটাই দেখার বিষয়।

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের একদিকে যেমন কেউ সমাধান দিতে পারছে না, অপরদিকে সমস্যার কারণ হিসেবে করোনাভাইরাস বা ইউক্রেন যুদ্ধের উল্লেখও মানুষকে স্বস্তি দিতে পারছে না। অর্থনৈতিক মুক্তি এখন সোনার হরিণ ছাড়া আর কিছুই নয়। মুক্ত বাজার অর্থনীতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে বহুগুণে বৃদ্ধি করলেও বিশ্বের বেশিরভাগ দেশকেই আন্তর্জাতিক বাজারের উপর নির্ভরশীল করেছে। এর ফলশ্রুতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে যেকোন অস্থিরতাই বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক দৈন্যতার জন্ম দিয়েছে। দেশে দেশে বিক্ষোভ এবং সহিংসতা বৃদ্ধির সাথে সাম্প্রতিক দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও জ্বালানি সমস্যার সম্পর্ক থাকলেও শুধুমাত্র এগুলিই যে অর্থনৈতিক দুর্দশার কারণ নয়, তা জাতিসংঘের কর্তাব্যক্তিদের কথায় পরিষ্কার। একদিকে ভারতের দারিদ্রের পরিসংখ্যানগুলি যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ঔপনিবেশিক শাসন-পরবর্তী গত সাত দশকের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তেমনি ব্রিটেনের শ্রমিকদের ধনী শ্রেণীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখিয়ে দেয় যে, আয় বৈষম্য নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। সিয়েরা লিওন ও ইকুয়েডরের বিক্ষোভের খবরগুলি জনগণের অস্থিরতা প্রকাশের একটা মাধ্যমের কথা বলছে, যার ফলশ্রুতিতে সরকারগুলি আইন শৃংখলা বজায় রাখতে হিমসিম খাচ্ছে। অপরদিকে তা শ্রীলঙ্কাতে সরকারের পতন ডেকে এনেছে। তবে লেবাননে ব্যাংকারদের জিম্মি করার ঘটনা এবং সেই কাজের পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থন দেখিয়ে দেয় যে, প্রচলিত আইনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা কতটা কমেছে। দারিদ্রের ফলস্বরূপ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষ এবং আইনের শাসনে ধ্বস পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থাকে শুধুমাত্র মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মাঝেই ফেলেনি, অনেক ক্ষেত্রেই অকার্জকর করে ফেলেছে; যা মানুষের মাঝে পরিবর্তনের আকাংক্ষাকে বহুলাংশে বৃদ্ধি করেছে।

Wednesday, 4 July 2018

ভেনিজুয়েলা-কলম্বিয়া-ইকুয়েডরের পতাকা একইরকম কেন?

ঊনিশ শতকে গ্র্যান কলম্বিয়া তৈরি হয় স্পেন থেকে আলাদা হয়ে। এরপরে গ্র্যান কলম্বিয়া ভেঙ্গে তৈরি হয় ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া এবং ইকুয়েডর। দেশগুলির পতাকায় মিল এতটাই যে, এদের উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন আসাটা স্বাভাবিক। 


 ০৫ জুলাই ২০১৮
 
দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলি একসময় ছিল স্প্যানিস এবং পর্তুগীজ উপনিবেশ। পঞ্চদশ শতকের শেষে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের অভিযানের পর থেকে ঐ এলাকার মানুষগুলিকে প্রায় নির্মূল করে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকেরা সেখানে বসতি গড়ে। জনসংখ্যার পুরোটাই প্রকৃতপক্ষে ইউরোপিয়ান বংশোদ্ভূত। এদের ভাষা এবং সংস্কৃতি একই। তবুও অনেকগুলি দেশে বিভক্ত এই মহাদেশ। অনেকগুলি পতাকা; জাতীয় সঙ্গীত; জাতীয় প্রতীক। এই বিভক্তির কারণ খুঁজতে যেতে হবে অষ্টম শতাব্দীতে, যখন ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলি আলাদা হবার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
  
স্প্যানিস সামরিক অফিসার ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডা ব্রিটিশদের সহায়তায় স্পেনের কাছ থেকে ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলিকে আলাদা করার ব্যবস্থা করেন। তার কর্মকান্ডের মাধ্যমে সবচাইতে বেশি লাভবান হয়েছে তৎকালীন সুপারপাওয়ার ব্রিটেন। স্প্যানিসরা ফ্রাঞ্চিসকোকে ব্রিটিশ গুপ্তচর সন্দেহ করতো।


ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডা – যিনি দক্ষিণ আমেরিকাকে স্পেন থেকে আলাদা করেন

১৭৫০ সালে ভেনিজুয়েলাতে জন্ম নেয়া স্প্যানিস সামরিক অফিসার ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডা বহু দেশের বহু যুদ্ধে অংশ নেন। মার্কিন স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় স্প্যানিসরা সুযোগ কাজে লাগিয়ে ব্রিটিশদের কিছু উপনিবেশ বাগিয়ে নিতে চায়। ১৭৮১ থেকে ১৭৮৪ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র এবং ক্যারিবিয় দ্বীপপুঞ্জে স্প্যানিস বাহিনীর অধীনে যুদ্ধে করেন ফ্রাঞ্চিসকো। ১৭৮১ সালে ফ্রাঞ্চিসকোকে ব্রিটিশ উপনিবেশ জামাইকাতে গোয়েন্দাগিরি করতে পাঠানো হয়। সেখানে তিনি তার কর্মসম্পাদনের মাঝে ব্রিটিশ ব্যবসায়ী ফিলিপ অলউডের সাথে এক চুক্তিও করে ফেলেন। চুক্তি মোতাবেক ব্রিটিশদেরকে তিনি স্পেনের সাথে বাণিজ্যের আড়ালে স্পেনে যাবার একটা চ্যানেল খুলে দেন। স্প্যানিসরা পরবর্তীতে ফ্রাঞ্চিসকোকে গুপ্তচর আখ্যা দেয় এবং অবিশ্বাস করতে থাকে। ফ্রাঞ্চিসকো স্পেন এবং ফ্রান্সের এক যৌথ অপারেশনে অংশ নেন, যার উদ্দেশ্য ছিল ক্যারিবিয়ানে ব্রিটিশদের সবচাইতে শক্ত ঘাঁটি জামাইকাকে দখল করা। পুরো দলের মাঝে ফ্রাঞ্চিসকোরই ব্রিটিশদের সম্পর্কে সবচাইতে ভালো ধারণা ছিল, কারণ তাকে ব্রিটিশদের উপরে গোয়ান্দাগিরিতে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু এই অভিযান চলার মাঝেই কিভাবে যেন ব্রিটশরা আগেভাগে পরিকল্পনা জেনে ফেলে এবং আগেই আক্রমণ করে বসে; ভেস্তে যায় অভিযান। জামাইকা ব্রিটিশদের হাতেই থাকে। আভিযান ব্যর্থ হবার পর ফ্রাঞ্চিসকোর বিরুদ্ধে ব্রিটিশদের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ আবারও গভীর হয়। ফ্রাঞ্চিসকো ১৭৮৩ সালের জুলাই মাসে স্প্যানিস কিউবা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যান, এবং পরের বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি সেখানে অবস্থান করেন। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে তিনি জর্জ ওয়াশিংটন, হেনরি নক্স, থমাস পেইন, আলেক্সান্ডার হ্যামিল্টন, স্যামুয়েল এডামস এবং থমাস জেফারসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন।

ফ্রাঞ্চিসকো কি ব্রিটিশ গুপ্তচর ছিলেন?

১৭৮৫ সালে ফ্রাঞ্চিসকো লন্ডনে আসেন। সেখান থেকে মার্কিন দূতাবাসের এক সামরিক কূটনীতিবিদ কর্নেল উইলিয়াম স্টিফেন স্মিথের সাথে তিনি প্রুশিয়া যান সামরিক মহড়া দেখতে। পুরো ইউরোপ ঘুরে তিনি অনেকের সাথে বন্ধুত্ব করেন।স্প্যানিয়ার্ডরা সবসময়েই তার উপরে নজর রাখছিল। তারা ফ্রাঞ্চিসকোকে গ্রপ্তার করার চেষ্টাও করেছিল, কিন্তু শক্তিশালী বন্ধুরা ফ্রাঞ্চিসকোকে রক্ষা করে। ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডা অনেকদিন থেকেই দক্ষিণ আমেরিকায় স্পেনের উপনিবেশের একটা বড় অংশের দায়িত্বে থাকা ‘ক্যাপ্টেন্সি জেনারেল অব ভেনেজুয়েলা’র কর্তৃত্ব নিতে এক পরিকল্পনা করেন। এই ক্যাপ্টেন্সির অধীনে বর্তমান ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া, পানামা, ইকুয়েডর এবং পেরুর বিরাট অঞ্চল ছিল। তিনি ১৭৯০ সালে প্রথম ব্রিটিশ রাজনীতিবিদের সাথে দক্ষিণ আমেরিকায় আলাদা রাষ্ট্র গঠনের চিন্তাটা আলোচনা করেন। তখন ব্রিটিশদের সাথে স্প্যানিয়ার্ডদের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিলো না। তবে দু’দেশের সম্পর্কে বসন্ত এসে গেলে এই প্রকল্পে ব্রিটিশরা আগ্রহ হারায়।

১৭৯১ থেকে ১৭৯৭ পর্যন্ত সময় ফ্রাঞ্চিসকো ফ্রান্সে কাটান এবং সেখানকার ফরাসী বিপ্লবে সরাসরি অংশ নেন। তিনি ফরাসি বিপ্লবের বিপক্ষে রাজতন্ত্রকামীদের সাথে থাকেন। একাধিকবার বিপ্লবীদের হাতে গ্রেপ্তার হবার পরেও তাকে নিয়ে কি করা হবে, সেটা ঠিক করতে না পেরে তাকে বারংবার ছেড়ে দেয়া হয়। ছাড়া পাবার পরেও তিনি তার কর্মকান্ড অব্যহত রাখেন এবং ১৭৯৬-৯৭ সালের মাঝে দু’দু’বার রাজতন্ত্রপন্থীদের পক্ষে অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেন। অবশেষে সকল চেষ্টা ভেস্তে গেলে ১৭৯৮ সালে গোপনে ব্রিটেনে পালিয়ে যান, যেখানে সবসময়ই তার নিরাপদ আশ্রয় আপেক্ষা করছিল। ব্রিটেন সবসময়েই ফরাসী বিপ্লবের বিরুদ্ধে রাজতন্ত্রীদের সহায়তা দিয়েছিল। আর ১৭৯৯ সাল থেকে ফরাসী বিপ্লব থেকে উত্থিত ন্যাপোলিয়ন আবির্ভূত হন ব্রিটেনের বিশাল শত্রু হিসেবে।

ল্যাটিন আমেরিকায় ফ্রাঞ্চিসকোর প্রথম অভিযান - যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা


তার দক্ষিণ আমেরিকার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ১৮০১ সালে ব্রিটিশদের সহায়তা চান ফ্রাঞ্চিসকো। স্পেন তখন ব্রিটেনের শত্রু দেশ, কেননা ১৭৯৬ থেকে ফ্রান্সের সাথে স্পেন হাত মিলিয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইলিয়াম পিট দ্যা ইয়াংগার ১৮০৫ সালে রিয়ার এডমিরাল হোম রিগস পপহ্যামকে দায়িত্ব দেন ফ্রাঞ্চিসকোর পরিকল্পনাটি খতিয়ে দেখার জন্যে। পপহ্যাম ব্রিটিশ নেতৃত্বকে বোঝান যে, দক্ষিণ আমেরিকায় স্প্যানিস উপনিবেশকে স্পেন থেকে আলাদা করতে গেলে ভেনিজুয়েলা নয়, বরং বর্তমান আর্জেন্টিনার বুয়েনস আয়ার্সের ফলাফল বয়ে আনার সম্ভাবনা বেশি। সেখানে ব্রিটিশ হামলা হলে স্প্যানিস নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ উস্কে দেয়া যাবে অপেক্ষাকৃত সহজে।

ফ্রাঞ্চিসকো এতে মনোক্ষুন্ন হলেন। তিনি তার পরিকল্পনা পাল্টে ১৮০৫-এর নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের সরণাপন্ন হলেন। ফ্রাঞ্চিসকো মার্কিন প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন এবং পররাষ্ট্র সচিব জেমস ম্যাডিসনের সাথেও একান্ত বৈঠক করেন। যুক্তরাষ্ট্র ফ্রাঞ্চিসকোকে সরাসরি সহায়তা করতে অস্বীকৃতি জানান, কারণ ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তখনও পক্ষ নেয়নি। ফ্রাঞ্চিসকো থেমে যাননি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অর্থ এবং জনবল যোগাড় করায় মনোনিবেশ করেন, যা ব্যবহার করে তিনি ভেনিজুয়েলাতে সামরিক অপারেশনে যাবেন। দু’শ-এর মতো ভাড়াটে সৈন্য এ অভিযানে যেতে রাজি হয়। তার সাথে থাকে ফ্রাঞ্চিসকোর পুরোনো বন্ধু মার্কিন কর্নেল উইলিয়াম স্টিফেন স্মিথ। মার্কিন ব্যবসায়ী স্যামুয়েল ওগডেনের কাছ থেকে তিনি ২০টি কামানের একটা জাহাজ ভাড়া নেন; নাম দেন ‘লিয়্যান্ডার’। ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ থেকে ফ্রাঞ্চিসকো আরও দু’টা জাহাজ সাথে নেন। এই সময়েই তিনি ভেনিজুয়েলার পতাকার ডিজাইন করে ১২ই মার্চ উত্তোলন করেন। পতাকাটা ছিল তিনটি রঙের সমান্তরাল দাগ – হলুদ, নীল এবং লাল। তবে ফ্রাঞ্চিসকোর মিশন সফল হলো না। ১৮০৬ সালের ২৮শে এপ্রিল ভেনিজুয়েলার উপকূলে অবতরণ করতে গিয়ে ফ্রাঞ্চিসকো স্প্যানিশ নৌবাহিনীর কাছে তার ক্যারিবিয়ান থেকে সংগৃহীত দু’টি জাহাজই হারান। ৬০ জন নাবিক বন্দী হয়, যাদের বিচারের পরে ১০ জনের মৃত্যুদন্ড দিয়ে মরদেহ কয়েক খন্ড করে ঝুলিয়ে রাখা হয়। ফ্রাঞ্চিসকো অবশ্য লিয়্যান্ডার-এ চড়ে প্রাণ নিয়ে পালান। তাকে পলায়নে সহায়তা দেয় ব্রিটিশ রয়াল নেভির যুদ্ধজাহাজ ‘লিলি’। ব্রিটিশরা ফ্রাঞ্চিসকোকে ব্রিটিশ উপনিবেশ বার্বাডোসে নিয়ে যায়, এবং ফাঞ্চিসকোকে আরেকবার সামরিক অভিযানে সহায়তা দিতে আগ্রহী হয়।

ফ্রাঞ্চিসকোর দ্বিতীয় অভিযান - যুক্তরাষ্ট্রের স্থানে ব্রিটেন

১৮০৬ সালের ২৪শে জুলাই ত্রিনিদাদের পোর্ট অব স্পেন থেকে ফ্রাঞ্চিসকোর নতুন অভিযানের শুরু হয়। তার যুদ্ধজাহাজ লিয়্যান্ডার-এর সাথে রয়েছে রয়াল নেভির ৪টা যুদ্ধজাহাজ। ফ্রাঞ্চিসকোর ভাড়াটে সেনারা এবং ব্রিটিশ নৌবাহিনীর নাবিকেরা উপকূলে নেমে কিছুদিন তাদের দখলের চেষ্টা চালিয়ে যান। কিন্তু স্প্যানিশ সৈন্যদের সংখ্যাধিক্যের কারণে অগাস্টের মাঝেই তিনি তার অভিযান গুটিয়ে নিতে বাধ্য হন। এই ব্যর্থ অভিযানের পর যুক্তরাষ্ট্র সরকার ফ্রাঞ্চিসকোকে সহায়তা করার জন্যে কর্নেল উইলিয়াম স্মিথ এবং ব্যবসায়ী স্যামুয়েল ওগডেনের বিরুদ্ধে মামলা করে। অভিযোগ ছিল যে, তারা দস্যুতা করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরপেক্ষতাকে নষ্ট করেছেন। আদালতে হাজির হয়ে কর্নেল স্মিথ বীরদর্পে বলেন যে, তিনি এই অপারেশনে গিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন এবং পররাষ্ট্র সচিব জেমস ম্যাডিসনের নির্দেশে। এই রাজনীতিবিদেরা উভয়েই আদালতে যেতে অস্বীকৃতি জানান এবং ফলশ্রুতিতে স্মিথ এবং ওগডেন উভয়কেই নির্দোষ ঘোষণা করা হয়। আসলে এই অপারেশনটা প্রথমে ছিল মার্কিন। এরপর প্রথম ব্যর্থতার পর ব্রিটিশরা সেটার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেলাতেই যতো বিপত্তির সৃষ্টি হয়। ভেনিজুয়েলাকে স্পেন থেকে আলাদা করে যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন উভয়েই সেটার নিয়ন্ত্রণ চাইছিল।


  
আর্জেন্টিনার প্রতিষ্ঠাতা হোজে ডে স্যান মার্টিন এবং চিলির প্রতিষ্ঠাতা বার্নার্ডো ও'হিগিন্স আন্দিজ পর্বত পাড়ি দিচ্ছেন চিলির উদ্দেশ্যে। ব্রিটিশরা আর্জেন্টিনায় অভিযান চালানোর পর পুরো ল্যাটিন আমেরিকা স্প্যানিস শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসে। আপাতদৃষ্টিতে ব্রিটিশ অপারেশনকে ব্যর্থ মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে ল্যাটিন আমেরিকাকে স্পেন থেকে আলাদা করাই ছিল ব্রিটিশ পরিকল্পনা। আর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে স্বাধীনতাকামী নেতারা বিরাট ভূমিকা পালন করে। 


ব্রিটিশরা কি দক্ষিণ আমেরিকায় ব্যার্থ হয়েছিল?

এর মাঝেই ১৮০৬-০৭ সালের মাঝে ব্রিটিশ সরকার বর্তমান আর্জেন্টিনার বুয়েনস আয়ার্সে একটা সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। স্প্যানিসদের বেশিরভাগ সামরিক শক্তি কেন্দ্রীভূত ছিল ভেনিজুয়েলাতে; আর্জেন্টিনার আশেপাশে শক্তি ছিল খুবই কম; যেকারণেই ব্রিটিশরা সেখানে অপারেশনে যায়। এরপরেও সরাসরি সাফল্য না পেয়ে ব্রিটিশরা সেখান থেকে চলে আসে। ফ্রাঞ্চিসকো এবার লন্ডন যান এবং নতুন করে ভেনিজুয়েলা আভিযানের জন্যে ব্রিটিশ সহায়তা চাইতে থাকেন। কিন্তু ঠিক সেসময় বিরাট এক রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়ে যায়। ১৮০৫ সালে ফরাসী-স্প্যানিস নৌবহর ব্রিটিশদের হাতে ত্রাফালগার-এর যুদ্ধে পরাজিত হলে পর্তুগীজরা আত্মায় শক্তি পায় এবং ব্রিটিশদের পক্ষে চলে যায়। এতে ন্যাপোলিয়ন ক্ষেপে গিয়ে স্পেন এবং পর্তুগালে সৈন্য পাঠান। এভাবে স্পেন হয়ে যায় ব্রিটিশ বন্ধু; এবং দক্ষিণ আমেরিকায় স্প্যানিস উপনিবেশকে স্পেন থেকে আলাদা করার পরিকল্পনা মুলতুবি করা হয়। কিন্তু ততদিনে যা হবার, তা হয়ে গেছে। ব্রিটিশ আক্রমণের ফলশ্রুতিতে ভেনিজুয়েলা এবং আর্জেন্টিনায় বিদ্রোহ শুরু হয়ে গেছে। ১৮১০ সালের মে মাসে আর্জেন্টিনায় বিদ্রোহীরা স্প্যানিস নেতৃত্বের কাছ থেকে ক্ষমতা দখল করে নেয়। আর্জেন্টিনার বিদ্রোহীরা হোজে ডে স্যান মার্টিনের নেতৃত্বে এরপর চিলি এবং পেরুকে স্পেন থেকে আলাদা করে ফেলে।

প্রায় তিন’শ বছর ধরে ব্রিটিশরা দক্ষিণ আমেরিকায় বড় কোন অপারেশনে যায়নি। ন্যাপোলিয়নের অভিযানকে উপজীব্য করে ব্রিটিশরা স্পেনের উপনিবেশগুলিকে স্পেন থেকে আলাদা করার প্রক্রিয়া শুরু করে। সেই প্রক্রিয়াতে ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডা সহায়তা করেছিলেন শুধু। মিরান্ডার আঁকা পতাকাকেই পরবর্তীতে ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া এবং ইকুয়েডর নিজেদের জাতীয়তার কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দেয়। ১৮১০ সালের ১৯শে এপ্রিল ভেনিজুয়েলার কারাকাসে বিদ্রোহীরা স্প্যানিস নেতৃত্বকে বন্দী করে ফেলে। সিমন বলিভার এবং আন্দ্রেস বেলোর নেতৃত্বে তারা লন্ডনে প্রতিনিধিদল পাঠিয়ে ব্রিটিশদের কাছ থেকে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি চায় এবং সরাসরি ব্রিটিশদের হস্তক্ষেপ কামনা করে। তারা ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডাকেও তাদের সাথে ভেনিজুয়েলাতে নিয়ে আসে। ১৮১১ সালের জুলাই মাসে স্বাধীন ভেনিজুয়েলার ঘোষণা দেয়া এবং ফ্রাঞ্চিসকোর ব্যবহার করা তিন রঙের ভেনিজুয়েলার পতাকাকে অনুমোদন দেয়া হয়। কিন্তু ১৮১২ সালে এক প্রতিবিপ্লবের মাঝ দিয়ে স্পেনপন্থীরা আবারও ক্ষমতা দখল করে নেয়। ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডা স্প্যানিসদের সাথে চুক্তি করতে গেলে সিমন বলিভার এতে নাখোশ হন। বলিভারের হিসবে সেটা ছিল রাষ্ট্রদ্রোহিতার সামিল। ফ্রাঞ্চিসকোকে তারা স্প্যানিস নেতৃত্বের হাতে তুলে দেয়, আর এর বিনিয়মে চুক্তি মোতাবেক সিমন বলিভারকে নিরাপদে স্পেনে ভ্রমণ করার অনুমতি দেয় স্প্যানিয়ার্ডরা। ১৮১৬ সালের ১৪ই জুলাই ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডা বিচারাধীন অবস্থায়ই স্পেনে মৃত্যুবরণ করেন এবং তার লাশ গণকবরে দাফন করা হয়, যাতে কোনটা তার কবর, সেটা যেন খুঁজে পাওয়া না যায়।
  

জার্মান দার্শনিক উলফগ্যাং ফন গোথে ভেনিজুয়েলার পতাকার রংগুলি বেছে নিতে সহায়তা করেছিলেন। পতাকার ডিজাইন করেছিলেন ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডা। পরবর্তীতে এই তিন রঙের পতাকাই ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া এবং ইকুয়েডরের পতাকায় স্থান পায়। উৎস একই বলে ল্যাটিন আমেরিকার এই দেশগুলির মাঝে পার্থক্য করা কঠিন।

যেভাবে তিন দেশের পতাকা আঁকা হলো

ফ্রাঞ্চিসকো ভেনিজুয়েলার পতাকার ধারণাকে আকারে রূপ দিতে কথা বলেছিলেন জার্মান দার্শনিক জোহান উলফগ্যাং ফন গোথে এবং রুশ কূটনীতিবিদ সাইমন রোমানোভিচ ভরনজফের সাথে। গোথের সাথে ফ্রাঞ্চিসকোর পতাকা নিয়ে কথা হয় ১৭৮৫ সালে। গোথে তাকে বলেন যে, তিনটা মূল রঙ থেকেই আলোর সৃষ্টি হয় – হলুদ, নীল এবং লাল। এই তিনটা রঙ আলাদাভাবে শুরু হলেও শেষ হয় এক লক্ষ্যে। ফ্রাঞ্চিসকোরও তাই এরকমই এক লক্ষ্যে এক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা উচিৎ। ফ্রাঞ্চিসকো চাইছিলেন আমেরিকাতে পুরো স্প্যানিস উপনিবেশ মিলিয়ে বিশাল এক রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করা। একেবারে বর্তমানের যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম এবং মধ্যাংশ থেকে শুরু করে মেক্সিকো, মধ্য আমেরিকা, কিউবা সহ, দক্ষিণ আমেরিকার বর্তমান ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর মিলে সেই রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন ফ্রাঞ্চিসকো। ব্রিটিশদের কাছে উপস্থাপিত তার পরিকল্পনা তেমনই ছিল। মূলতঃ স্পেন থেকে আলাদা হবার কাজটাই তিনি করেছিলেন। বিশেষ বিশেষ সময়ে বিশেষ বিশেষ স্থানে উপস্থিত থাকায় স্পেন তাকে ব্রিটিশ গুপ্তচর হিসেবে মনে করতো। ফরাসী বিপ্লবের সময়ে বিপ্লবের বিপক্ষের রাজতন্ত্রকামীদের (যাদেরকে ব্রিটিশরা সহায়তা করতো) পক্ষে একাধিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা তার স্প্যানিস দোষারোপকে মুছে ফেলতে সহায়তা করে না। স্পেন ন্যাপোলিয়নের পক্ষে থাকার সময় তিনি ব্রিটিশদের সহায়তায় ল্যাটিন আমেরিকার বিদ্রোহ উস্কে দেন। এরপর স্পেন ব্রিটিশদের পক্ষে গেলেও তার কর্মকান্ড চালিয়ে যান, এবং স্পেন থেকে তার সকল ল্যাটিন আমেরিকার উপনিবেশ আলাদা করে ফেলেন। তিনি স্থিতিশীল কোন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে যেতে পারেননি; যে কাজটা পরে সিমন বলিভার করেছিলেন।
 

ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো সিমন বলিভারের ছবির সামনে কথা বলছেন। সিমন বলিভার ল্যাটিন আমেরিকার জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে স্বীকৃত হলেও তিনি আসলে কয়েকটা দেশের জন্মদাতা। ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডা যেখানে ল্যাটিন আমেরিকাকে স্পেন থেকে আলাদা করেছিলেন, বলিভার সেই আলাদা হওয়া ল্যাটিন আমেরিকাকে টুকরো টুকরো করায় অংশ নিয়েছেন।

 
সিমন বলিভার এবং ল্যাটিন আমেরিকার বিভক্তি

সিমন বলিভার ল্যাটিন আমেরিকার স্প্যানিস অঞ্চলগুলিকে টুকরো টুকরো করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি ১৮১৯ সালে রিপাবলিক অব কলম্বিয়া তৈরি করে নিজে প্রেসিডেন্ট হন, এবং দুই জন ভাইস প্রেসিডেন্টের অধীনে দেশটাকে দুই ভাগ করেন। একটার নাম দেয়া হয় ভেনিজুয়েলা, আর আরেকটা নিউ গ্রানাডা (পরবর্তীতে কলম্বিয়া)। তবে দেশগুলি যে একই উৎস থেকে এসেছিল, তা ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া এবং ইকুয়েডরের পতাকা দেখলেই বোঝা যায়। তিন দেশের পতাকাতেই একই রঙ ব্যবহার করা হয়েছে, যা কিনা ফ্রাঞ্চিসকোর আঁকা। বলিভার এবং ফ্রাঞ্চিসকোর চিন্তাধারায় কিছুটা দ্বিমত ছিল। যেখানে ফ্রাঞ্চিসকো ছিলেন ব্রিটিশপন্থী, বলিভার ছিলেন সমাজতন্ত্রী। বলিভারের সমাজন্তন্ত্রী চিন্তাধারা তার শিক্ষক ডন সিমন রদ্রিগেজ দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত ছিল। তারা দু’জনে মিলে ইউরোপ ভ্রমণে বের হয়েছিলেন এবং ১৮০৫ সালে মিলানে ইতালির রাজা হিসেবে ন্যাপোলিয়নের রাজকীয় অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। রদ্রিগেজ ১৭৯৭ সালেই স্প্যানিস শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে জড়িত থাকার অপরাধে ভেনিজুয়েলা ছেড়েছিলেন। বলিভার ১৮২১ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের নামানুসারে ‘গ্র্যান কলম্বিয়া’ নামে আরেকটা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন, যার মাঝে ছিল বর্তমানের ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া, পানামা, ইকুয়েডর। আর্জেন্টিনার জেনারেল হোজে ডে স্যান মার্টিন-এর সাথে একত্রিত হয়ে বলিভার পেরু এবং ইকুয়েডরকে আলাদা করেন। সকলের কাছে এই কাজটি ছিল স্পেন থেকে মুক্ত করার কাজ। প্রকৃতপক্ষে তারা আলাদা কয়েকটা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন, যাদের মাঝে আলাদা হবার কোন কারণই ছিল না। আলাদা আলাদা নেতৃত্ব দেয়া হয় এসব স্থানে, যারা খুব শিগগিরই নিজেদের আখের গোছাতে আলাদা রাষ্ট্র চাইতে থাকেন। ১৮২৫ সালের ৬ই অগাস্ট নতুন আরেকটি দেশের জন্ম দেয়া হয়; যার নামকরণ করা হয় সিমন বলিভারের নামে – বলিভিয়া। এই সবগুলিই তখন ছিল গ্র্যান কলম্বিয়ার অধীনে, যার একচ্ছত্র অধিপতি ছিলেন বলিভার। কিন্তু ১৮৩০ সালের মাঝেই গ্র্যান কলম্বিয়া ভেঙ্গে ভেনিজুয়েলা, নিউ গ্রানাডা (কলম্বিয়া) এবং ইকুয়েডর তৈরি হয়; প্রত্যেকটির একচ্ছত্র অধিপতি হন বলিভারেরই সমালোচকেরা, যারা একসময় বলিভারের একনায়কোচিত কার্যকলাপের বিরোধী ছিলেন।
  
খুব অল্প সময়ের মাঝেই ল্যাটিন আমেরিকার পুরো এলাকা স্প্যানিসদের হাতছাড়া তো হয়ই, তদুপরি অনেকগুলি দেশে বিভক্ত হয়ে যায়। সুপারপাওয়ার ব্রিটেন ল্যাটিন আমেরিকাকে একত্রিত দেখতে চায়নি।


ব্রিটেন – সুপারপাওয়ারের রাজনীতিই সবকিছু

ন্যাপোলিয়নের আবির্ভাবের আগ পর্যন্ত ব্রিটিশরা দক্ষিণ আমেরিকায় উপনিবেশ স্থাপন করেনি। গায়ানা উপকূলের অল্প কিছু অঞ্চল ডাচ এবং ফ্রেঞ্চদের অধীনে ছাড়া এর প্রায় পুরোটাই ছিল পর্তুগাল এবং স্পেনের অধীনে। ১৮৩০ সাল নাগাদ পর্তুগীজদের অধীনে ব্রাজিল ছাড়াও সৃষ্টি হয় রিও ডে লা প্লাটা (আর্জেন্টিনা), উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে, চিলি, বলিভিয়া, পেরু, ইকুয়েডর, কলম্বিয়া এবং ভেনিজুয়েলা। ব্রিটিশরাও গায়ানা উপকূলে একটা উপনিবেশ করে ফেলে। স্প্যানিস উপনিবেশিক এলাকাটা কেটে টুকরা টুকরা করে ৯টা দেশ তৈরি হলেও ব্রাজিল একত্রেই থাকে; কেউ একে ভাঙ্গেনি। কারণ ব্রাজিল ছিল ব্রিটিশদের বন্ধু পর্তুগালের উপনিবেশ। ব্রিটিশরা চায়নি ব্রাজিল ভেঙ্গে যাক।

ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলি স্বপ্নে পাওয়া জাতীয়তার উপরে প্রতিষ্ঠিত। নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা নিজেদের মাঝে ক্ষমতার ভাগাভাগি করতে গিয়ে দেশগুলিকে টুকরো টুকরো করেছে। আলাদা করে জাতীয় পতাকা ডিজাইন করার সময় রয়েছে কার? ফ্রাঞ্চিসকো তো কষ্ট করে ডিজাইন করেই দিয়ে গেছেন; তাই ওটার উপরেই কেটে-চিরে দাঁড়িয়ে আছে আজকের পতাকাগুলি। এই পতাকাকে ঘিরেই কতনা আবেগ; উচ্ছ্বাস! কেউ চিন্তাও করেনি যে ৯টা পতাকা মানে ৯টা আলাদা জাতিরাষ্ট্রে বিভক্ত তারা; যদিও তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, আকৃতি, সকলকিছুই এক! এদের সকলেই একবাক্যে ফ্রাঞ্চিসকো, বলিভার, স্যান মার্টিন-এর মতো কয়েক ব্যক্তিকেই স্মরণ করে; কারণ তাদের সকলেরই জন্ম এদের হাতে। আর এরা আবার কাজটা সম্পাদন করেছে তৎকালীন সুপারপাওয়ার ব্রিটিশদের হাত ধরে। ব্রিটিশরা স্পেন থেকে ল্যাটিন আমেরিকার অঞ্চলকে আলাদা করলেও এদেরকে একত্রে বিরাট এক দেশ হিসেবে দেখতে চায়নি। ছোট ছোট দেশে বিভক্ত হয়ে তারা একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করে নিজেদের মাঝে ব্যাস্ত থেকেছে। জাতীয় পতাকা, সঙ্গীত এবং প্রতীকগুলি তাদের সেই ইন্ধন যুগিয়েছে। হাল্কা বিষয়গুলি তাদের আবেগকে নাড়া দিয়েছে এবং আবেগ হয়েছে তাদের চালিকাশক্তি। ফ্রাঞ্চিসকো, বলিভার, স্যান মার্টিন-এর সৃষ্ট দেশগুলি ভূরাজনীতিতে তাই শিশুই রয়ে গিয়েছে।

আরও পড়ুনঃ
আর্জেন্টিনা কি পারবে?

Sunday, 30 October 2016

আর্জেন্টিনার মেসির মুখে বাংলার বাঘ?

৩০শে অক্টোবর ২০১৬
তারা জানবে একুশ শতকের বাঘের নাম, যে কিনা শুধু গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার ত্রাসই নয়, মহাসমুদ্র সাঁতড়ে দুনিয়ার অপর প্রান্তে গিয়ে তার অবস্থান জানান দিতে পারে!



চিন্তার নিয়ন্ত্রণ


বাংলাদেশকে এদেশের মানুষ কেমন দেশ হিসেবে তুলে ধরবে, সেটা নির্ভর করবে দেশের মানুষ দেশ সম্পর্কে সত্যিকার অর্থে কি বিশ্বাস করে। অর্থাৎ নিজেকে কিভাবে মূল্যায়ন করে। এই মূল্যায়ন কিভাবে হবে, সেটা নির্ভর করবে দেশের সমাজ দেশের মানুষকে কি ধরনের চিন্তা দিচ্ছে। চিন্তাকে মানুষের মস্তিষ্ক পর্যন্ত পৌঁছে দেয়াটা অনেকভাবেই করা সম্ভব। তবে এক্ষেত্রে মিডিয়া যেন সবসময় এগিয়েই থাকে। ঊনিশ শতকে ছাপা মিডিয়া আসার পর, আর বিংশ শতকের শুরুতে ইলেকট্রনিক মিডিয়া আসার পর মিডিয়ার গুরুত্ব শুধুই বেড়েছে। আর মানুষের চিন্তাকে প্রভাবিত করতে পারার ক্ষমতা মিডিয়াকে শুধু শক্তিশালীই করেনি, তৈরি করেছে শক্তিশালী জাতি-গোত্র-ব্যক্তির যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে। মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলে দিনরাত যুদ্ধ। যারা ক্ষমতায় থাকে, তারা চায় না মিডিয়া তাদের চিন্তা ছাড়া অন্য কোন চিন্তা প্রচার করুক, আর যারা ক্ষমতা থেকে দূরে, তারা চায় মিডিয়ার দখল নিতে। বাংলাদেশ পৃথিবীর বাইরে নয়; তাই বাকি পৃথিবীর নিয়মকানুন (সে যতই অপ্রীতিকর হোক না কেন) বাংলাদেশেও দৃশ্যমান। এলাকাভিত্তিক এবং দেশভিত্তিক পার্থক্য থাকলেও মূলতঃ পার্থক্য সামান্যই। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে আমরা একই ধরনের চিন্তার প্রসার দেখি। খুব কম মানুষই প্রশ্ন করে যে একই চিন্তা মানুষের মাঝে এলো কোত্থেকে? একটা সুন্দর ব্যাখ্যা অবশ্য দাঁড় করানো হয়ে থাকে, যাকে আদর করে নাম দেয়া হয়েছে গ্লোবালাইজেশন। অবশ্য যারা এর সৃষ্টি করেছেন, আজ তারাই প্রশ্ন তুলছেন যে এটা কার নিয়ন্ত্রণে। নিয়ন্ত্রণ – সেটাই কি আসল উদ্দেশ্য ছিল না? সেটা নিয়েই আজকের এই কথা।

কিছু শক্তিশালী মিডিয়া আমাদের দেশে এই নিয়ন্ত্রণমূলক কর্মকান্ডই করে যাচ্ছে। মানুষকে নিয়ন্ত্রণমূলক চিন্তা দিলে মানুষ নিয়ন্ত্রণে থাকবে – এটাই হলো মূল কথা। মানুষের চিন্তার একটা লিমিট ঠিক করে দেয়া। যারা সৃজনশীল কাজ করেন, তারা হয়তো মনে করতে পারেন যে অনেক ক্রিয়েটিভ কাজ করার সুযোগ তারা পাচ্ছেন। তবে ব্যাপারটা আসলে কি তাই? একজন সৃজনশীল মানুষকে যখন বলা হচ্ছে কিছু একটা ডিজাইন করে দিতে, তিনি তার সবটুকু সৃজনশীলতা নিংড়ে সেটা ডিজাইন করে দিচ্ছেন। খুব ভালো কথা; ক্রিয়েটিভ আউটপুট। কিন্তু তিনি একবারও প্রশ্ন করেননি যে, যেটা নিয়ে ডিজাইন করতে বলা হলো, সেটাকে কেন নির্বাচন করা হয়েছে। এই প্রশ্নটা যাতে তিনি না করেন, সেই ব্যবস্থাটার নামই হচ্ছে নিয়ন্ত্রণ। আমাদের দেশের বেশ কিছু শক্তিশালী মিডিয়া সেই কাজটাই করে।

প্রতিদিনের সকালটা নষ্ট করে দেয়া…

প্রায় প্রতিদিনই একটা করে খবর আসে, যা কিনা মানুষের প্রতিদিনের সকালটা নষ্ট করে। একটা মানুষ যখন সকালে একটা বাজে চিন্তা দিয়ে দিন শুরু করে, তার সারাদিন কেমন যাবে, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। একটা মানুষের সকালটায় তার চিন্তার ভিত্তিটাকে দুর্বল করে দেয়া গেলে সে সারাদিন আর শক্তিশালী কোনকিছু দিতে পারবে না – এটাই হলো সেই চিন্তার ভিত, যদি না সে দিনের মাঝে অন্য কোন উতস থেকে শক্তিশালী কিছু পেয়ে যায়। উদাহরনস্বরূপ, প্রতিদিনই খবর ছাপা হচ্ছে বিভিন্ন সূচক বা ইনডেক্স নিয়ে, যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান হয় ১১০ নম্বরে, নতুবা ১৪০, অথবা একেবারে ১৭৬। যে মানুষটা এই সূচকে বিশ্বাস স্থাপন করবে, সে সারাদিনে দেশের সম্পর্কে পজিটিভ চিন্তা করতে পারবে না। তার মাথায় শুধু থাকবে আজকের দিনের কাজটা শেষ করে বাড়ি ফিরতে পারলেই হলো। আগামীকাল বা পড়শু আরও উপরে থাকবো, বা এক মাস পর আজকের অবস্থান থেকে উপরে থাকতেই হবে – এধরনের কোন চিন্তা থাকবে তার জন্যে সেকেন্ডারি। নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার পদ্ধতি এটা, যার মাধ্যমে আমাদের অবস্থান সবসময় ১১০ বা ১৪০ বা ১৭৬ই থাকবে, কোনদিনই এগুবে না। যদি কখনো এগিয়েই যাই, তাহলে নিয়মগুলি পরিবর্তন করা হবে সূচকে আবারো আগের অবস্থানে ফেরত আনতে। এটাই নিয়ন্ত্রণ।

যা সবার কাছ থেকে আড়াল করে রাখা হয়…

এসব সূচক যাদের তৈরি, তাদের নিজেদের তৈরি করা কিছু সূচকই আবার গোপন রাখা হয়; বাকিগুলি সামনে আনা হয়। যেমন কয়জন জানেন যে বাংলাদেশের অর্থনীতি কাজাকস্তান, গ্রীস, পর্তুগাল, রোমানিয়া, চেক রিপাবলিক, হাঙ্গেরী, পেরুর মতো আরও অনেক দেশের অর্থনীতি থেকে বড়? কয়জন জানেন যে ভারত মহাসাগরে সমুদ্রসীমা থাকা দেশগুলির মাঝে কয়টি দেশের অর্থনীতি ২২০ বিলিয়ন ডলার বা তার চাইতে বেশি? আর কয়টি দেশ আছে, যাদের অর্থনীতি ২০০ বিলিয়ন ডলারের উপরে এবং একইসাথে যাদের জনসংখ্যা ১০০ মিলিয়নের বেশি? কয়টি দেশে বৃষ্টিপাতের আধিক্য আছে এবং একইসাথে তিন-তিনটি প্রধান নদীর সংগমস্থলে তিন-তিনটি সমুদ্রবন্দর রয়েছে, যা কিনা নদীপথে (সবচাইতে সস্তা যোগাযোগ ব্যবস্থা) দেশের অভ্যন্তরের সাথে সরাসরি সংযুক্ত? কয়টি দেশ আছে পুরো দুনিয়াতে, যেখানে প্রাকৃতিকভাবে দেশের স্থলভাগ প্রতি বছর বড় হচ্ছে? কয়টি দেশ আছে, যেখানে প্রায় পুরো দেশই চাষযোগ্য? কয়টি দেশের জনগোষ্ঠীকে ভৌগোলিকভাবে ভাগ করা সম্ভব নয় (অর্থাৎ জনগণ কতটা homogenous)? এগুলির সাথে এখন ২২০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি যোগ করুন তো? এটাই কি প্রতিদিনের সংবাদ হওয়া উচিত ছিল না?

উপরে যে কয়টি দেশের নাম উল্লেখ করেছি, তার মধ্যে কাজাকস্তান একটি স্থলবেষ্টিত দেশ, যার সমুদ্র পর্যন্ত যেতে রাশিয়ার সহায়তা লাগে। হাঙ্গেরী এবং চেক রিপাবলিকেরও একই অবস্থা। রোমানিয়ার খোলা সমুদ্রে যেতে তুরস্কের অনুমতি লাগে। এই দেশগুলির বেশ কতগুলির সামনের দিনের অর্থনীতি আশাব্যাঞ্জক নয়; জনসংখ্যা কমে যাচ্ছে; অগ্রগতি ঋণাত্মক। আর বাংলাদেশ গত দুই দশকে পিছনে তাকায়নি। সারা দুনিয়ার অর্থনীতি দুইবার উঠেছে, দুইবার নেমেছে; অথচ বাংলাদেশের এতে যেন কিছুই হয়নি। বাংলাদেশের অর্থনীতি খুব শীঘ্রই ফিনল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড এবং চিলির অর্থনীতিকে অতিক্রম করতে যাচ্ছে। আইএমএফ-এর হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনীতি পৃথিবীর ৪৬তম। কিন্তু এখানে আঞ্চলিক ব্যাপারগুলিকে জুড়ে দিলে হিসেব পালটে যাবে। যেমন বাংলাদেশ একইসাথে পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার সাথে সমুদ্রপথে সবাসরি যুক্ত এবং এদের সকলের একেবারে মধ্যিখানে। এই অঞ্চলগুলিতে যেতে বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রেই আঞ্চলিক bottleneck বাইপাস করতে পারে। আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পেলে এই সক্ষমতা আরও বাড়বে। বর্তমান দুনিয়াতে ভূরাজনৈতিক কেন্দ্র হচ্ছে ইউরেশিয়া+আফ্রিকা। বাংলাদেশ এই কেন্দ্রের যতটা কাছে অবস্থিত, ইউরোপ এবং আমেরিকার দেশগুলি সেই তুলনায় দূরে; সরাসরি সমুদ্র যোগাযোগ নেই বা তেমন ভালো নয়। অনেকগুলি আঞ্চলিক bottleneck তাদের অতিক্রম করতে হয়। ভারত মহাসাগর এখন সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মহাসাগর। এই মহাসাগরের সাথে সরাসরি যুক্ত কয়টি দেশের অর্থনীতি ২২০ বিলিয়ন ডলারের উপরে এবং জনসংখ্যা ১৬০ মিলিয়নের উপরে? উপরে যে শক্তিশালী ফ্যাক্টরগুলি উল্লেখ করেছি সেগুলি যোগ করে দিই এর সাথে? এখন এই দেশকে কতটা দুর্বল মনে হচ্ছে?
 
বাংলাদেশে এসে মেসি হয়তোবা তার জনপ্রিয়তাটা কিছুটা বুঝতে পেরেছিলেন। তবে সেটা বাংলাদেশের প্রমোশনের জন্যে যথেষ্ট কিনা সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ। মেসিই হতে পারে বাংলাদেশের সেই brand ambassador যাকে আর্জেন্টিনার মানুষ এবং বাংলাদেশের মানুষ উভয়েই পছন্দ করে।

বাংলাদেশের লিওনেল মেসি…

এর আগে আফ্রিকা নিয়ে লিখেছিলাম। আফ্রিকা আমাদের থেকে অনেক দূরে – এটাই হচ্ছে সেই নিয়ন্ত্রণমূলক subversion. প্রকৃতপক্ষে যা আমাদের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ, তার কোন দূরত্ব নেই, বিশেষতঃ যখন আমাদের ভূকৌশলগত অবস্থান এতটা শক্তিশালী। এই অবস্থানকে অস্বীকার করা মানেই সেই নিয়ন্ত্রকের ফাঁদে পা দেয়া। তারা এটাই চায় – সারাজীবন তাদের পা ধরে বসে থাকতে হবে আমাদের; অথর্ব দেশ; ব্যর্থ রাষ্ট্র। এগুলি গীত শোনার সময় এখন আর আমাদের নাই। এখন সময় চিন্তা করার লিওনেল মেসিকে নিয়ে। মেসির আর্জেন্টিনা থেকে বাংলাদেশের সয়াবিন আসে। ব্রাজিল থেকে আমাদের ৮৬% চিনি আমদানি হয়। চিলি থেকে আসে কপারের একটা অংশ, যা দিয়ে এদেশের সকল প্রকার ইলেকট্রিক্যাল তার এবং যন্ত্রপাতি তৈরি হয়। বাংলাদেশের ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড ইকুয়েডরে জাহাজ রপ্তানি করেছে। আরও অনেক সুযোগ অপেক্ষা করছে সেখানে আমাদের জন্যে। মেসি আমাদের কাছে ল্যাটিন আমেরিকার প্রতিনিধি, যাকে পরিচয় করানোর কিছু নেই। কিন্তু আর্জেন্টিনার মানুষ কি জানে এখানে মেসির জনপ্রিয়তা কতটুকু? ব্রাজিলের মানুষ কি জানে এখানে মানুষ বিশ্বকাপের সময় তাদের দেশের পতাকা তৈরি করে (যদিও বানাতে গিয়ে ভুল হয়)? আমরা আর্জেন্টিনার মানুষের জন্যে মেসিকে নিয়ে একটা ডকুমেন্টারি তৈরি করি না কেন, যা আর্জেন্টিনার মানুষের সাথে বাংলাদেশকে পরিচয় করিয়ে দেবে? তাদের দেশের মানুষের কাছে বাংলাদেশকে নতুন করে চেনাবার চেষ্টা করি না কেন আমরা? মেসিই হতে পারে বাংলাদেশের সেই brand ambassador যাকে আর্জেন্টিনার মানুষ এবং বাংলাদেশের মানুষ উভয়েই পছন্দ করে।
 
ব্রাজিলের নৌবাহিনীর সাথে আমাদের নৌবাহিনী বেশ কয়েক বছর ধরে লেবাননের উপকূলে কাজ করছে। এতদিনে ব্রাজিলের নৌবাহিনীর প্রায় সবাই বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নাম জেনে গেছে। কাজেই যেদিন ব্রাজিলের কোন বন্দরে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজের ফ্লোটিলা শুভেচ্ছা সফরে যাবে, সেদিন সেখানে তারা পুরোনো অনেক বন্ধুকেই খুঁজে পাবে। কোটি কোটি টাকা ভারতীয় নর্তক-নর্তকীদের পেছনে না ঢেলে মেসির আর্জেন্টিনাতে আর ল্যাটিন আমেরিকায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর শুভেচ্ছা সফরের পেছনে ঢাললে একটা গুরুত্বপূর্ণ মহাদেশে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-কৌশলগত দুয়ার খুলে যাবে।

আমরা কেন ব্রাজিলিয়ানদের বলি না যে বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশে ফুটবল খেলা নিয়ে যে পাগলামি হয়, সেটা তাদের মিডিয়াতে নিয়ে আসতে? এই দেশগুলির মানুষের কাছে বাংলাদেশকে কিভাবে তুলে ধরা হয়েছে সেটা আমরা না জানলেও অনুমান করতে পারি – খুব একটা ভালো কিছু না। ব্রাজিলের নৌবাহিনীর সাথে আমাদের নৌবাহিনী বেশ কয়েক বছর ধরে লেবাননের উপকূলে কাজ করছে। এতদিনে ব্রাজিলের নৌবাহিনীর প্রায় সবাই বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নাম জেনে গেছে। কাজেই যেদিন ব্রাজিলের কোন বন্দরে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজের ফ্লোটিলা শুভেচ্ছা সফরে যাবে, সেদিন সেখানে তারা পুরোনো অনেক বন্ধুকেই খুঁজে পাবে। ব্রাজিলের নৌবাহিনী অনেক পুরোনো; তাদের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা ওই এলাকা সম্পর্কে শিখতে পারবো। আর একইসাথে আমাদের দেশের নাম সেখানে জানিয়ে আসা ছাড়াও আমাদের দেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্প সম্পর্কে ল্যাটিন আমেরিকায় একটা জানান দিয়ে আসতে পারবো আমরা। কোটি কোটি টাকা ভারতীয় নর্তক-নর্তকীদের পেছনে না ঢেলে মেসির আর্জেন্টিনাতে আর ল্যাটিন আমেরিকায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর শুভেচ্ছা সফরের পেছনে ঢাললে একটা গুরুত্বপূর্ণ মহাদেশে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-কৌশলগত দুয়ার খুলে যাবে। তারা জানবে একুশ শতকের বাঘের নাম, যে কিনা শুধু গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার ত্রাসই নয়, মহাসমুদ্র সাঁতড়ে দুনিয়ার অপর প্রান্তে গিয়ে তার অবস্থান জানান দিতে পারে!

কূপমুন্ডুক চিন্তা থেকে বের হয়ে আসার সময় হয়েছে আমাদের। মেসির মাঝে শুধু আবেগ না খুঁজে বাংলাদেশকে খুঁজতে হবে। দেশকে এবং দেশের মানুষকে প্রতিনিধিত্ব করতে হলে “দুর্বল দেশ” চিন্তা পরিত্যাগ করতে হবে। দূরত্ব কোন বাধা নয়; রবার্ট ক্লাইভের কাছে অষ্টাদশ শতকে দূরত্ব বাধা হয়নি। অথচ আমাদের মাথায় ঠিকই সেটা গুঁজিয়ে দিয়েছে তারা। বাংলাদেশের মানুষকে তারা বারংবার মনে করিয়ে দেয় যে দেশটা গরীব; অথচ ২০ কোটি অভুক্ত মানুষের দেশকে বলে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী ভারত। পশ্চিমা প্রেসক্রিপশনে দেশ চালাবার সময় বহু আগেই গেছে। এখন এগুলি নিয়ে পত্রিকায় হাহুতাশ দেখলে হাসিই পায়। ভারত মহাসাগরে শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক অবস্থানে থেকে মিউ মিউ করার সময় এখন নয়। শক্তিশালী দেশের মানুষ হাহুতাশ করে না; বাঘের গর্জন দেয়।