৩০শে সেপ্টেম্বর ২০২১
সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্ক এবং পাকিস্তানের কৌশলগত সম্পর্কের গভীরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে আফগানিস্তান থেকে পশ্চিমা সৈন্য চলে যাবার পর থেকে তালিবানদের অধীনে আফগানিস্তানকে বিভিন্নভাবে সমর্থন দেবার ক্ষেত্রে পাকিস্তান এবং তুরস্কের কৌশলগত সহযোগিতা চোখে পড়ছে। তবে এক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটা দেশের নামও উল্লেখ করার মতো; যার নাম কাতার। প্রায় একইসাথে মধ্য এশিয়ার মাঝ দিয়ে পাকিস্তান থেকে তুরস্ক পর্যন্ত ‘লাপিস লাজুলি’ নামের একটা কৌশলগত পরিবহণ নেটওয়ার্ক ডেভেলপ করে ভূমধ্যসাগরকে মধ্য এশিয়ার মাঝ দিয়ে ভারত মহাসগরের সাথে যুক্ত করে তার নিরাপত্তা দেয়ার ক্ষেত্রেও মধ্য এশিয়ার দেশ আজেরবাইজান এবং তুর্কমেনিস্তানের নাম সামনে আসছে।
গত জুন এবং জুলাই মাসে তুরস্কে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো যৌথ সামরিক মহড়া ‘আনাতোলিয়ান ঈগল ২০২১’। তুরস্কের বিমান বাহিনীর অফিশিয়াল বিবৃতি অনুযায়ী এই মহড়ার উদ্দেশ্য ছিল অংশগ্রহণকারী দেশগুলির জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতাকে একে অপরের সাথে সমন্বয় করা। এবং একইসাথে সত্যিকারের যুদ্ধাবস্থায় যৌথ অপারেশনে অভ্যস্ত হওয়া। এটা ছিল মূলতঃ চারটা দেশের বিমান বাহিনীর একটা মহড়া। তুরস্ক এই মহড়া অনেকদিন ধরেই আয়োজন করে চলেছে। তবে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই মহড়ার আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। মহড়ায় পাকিস্তান বিমান বাহিনীর ৫টা ‘জেএফ ১৭’ ফাইটার বিমান অংশ নেয়। এর সাথে মহড়ায় অংশ নেয় আজেরবাইজানের রুশ নির্মিত ২টা ‘মিগ ২৯’ বিমান এবং ২টা ‘সুখোই ২৫’ যুদ্ধবিমান। তুরস্কের পক্ষ থেকে ৩৮টা ‘এফ ১৬’ বিমান, একটা ‘আনকা এস’ ড্রোন এবং একটা ‘কেসি ১৩৫’ রিফুয়েলিং বিমান অংশ নেয়। তবে পুরো মহড়ার সবচাইতে আলাদা অংশগ্রহণকারী ছিল কাতারি বিমান বাহিনীর ৪টা ফরাসি নির্মিত ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমান। এর ফলে তুর্কি এবং পাকিস্তানি ফাইটার পাইলটরা প্রথমবারের মতো ফরাসি ‘রাফাল’ ফাইটার জেটের বিরুদ্ধে একটা সত্যিকারের মহড়ায় অংশ নেয়। পাকিস্তানের মূল আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ফ্রান্স থেকে ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমান কিনেছে। অপরদিকে তুরস্কের ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রিসও ফ্রান্স থেকে ‘রাফাল’ বিমান পাচ্ছে। এই যৌথ মহড়ার ব্যাপারে ভারত এবং গ্রিস উভয় দেশের বিশ্লেষকেরাই দুশ্চিন্তা দেখিয়েছেন। কারণ এর মাধ্যমে তুরস্ক এবং পাকিস্তান উভয়েই ‘রাফাল’ বিমানের সক্ষমতা সম্পর্কে একটা সম্যক ধারণা অর্জন করতে পারবে।
শুধু মহড়াই নয়। জুন মাসে কাতারের সাথে তুরস্কের একটা আলাদা চুক্তি তুর্কি পার্লামেন্টে পেশ করা হয়, যার মাধ্যমে কাতারি বিমান বাহিনীর ৩৬টা বিমান এবং প্রায় আড়াই’শ সদস্য তুরস্কে ট্রেনিং নেবে। ‘মিডলইস্ট আই’ বলছে যে, গত মার্চেই তুর্কি সামরিক বাহিনীর জেনারেল ইয়াসার গুলার কাতারিদের সাথে এই চুক্তি স্বাক্ষর করেন। চুক্তি অনুযায়ী কাতারি বিমান বাহিনী পাঁচ বছরের জন্যে তুরস্কে প্রশিক্ষণ নিতে পারবে। প্রতিবারের প্রশিক্ষণের আগে দুই মাসের একটা আগাম খবর দেবে কাতারিরা। ডকুমেন্টে বলা হয় যে, এর মাধ্যমে দুই দেশের মাঝে সামরিক সহযোগিতা আরও বৃদ্ধি পাবে। তুরস্কের আকাশসীমা এবং বন্দরসমূহ ব্যবহার করে কাতারিরা অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে পারবে। প্রতিবেদনে আরও মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, ২০১৭ সাল থেকে কাতারের উপর সৌদি গ্রুপের অবরোধ আরোপের পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিশেষ করে সেসসম্য় থেকেই কাতারে তুরস্কের একটা সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পেও কাতারিরা বিনিয়োগ করেছে এবং তুরস্কের পর্যটন ও রিয়েল এস্টেট খাত ছাড়াও বিভিন্ন খাতে কাতার ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। তবে তুরস্কের মাটিতে কাতারিদের বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ নতুন কিছু নয়। ১৯৯০এর দশক থেকে শুরু করে এক দশকের বেশি সময় ধরে ইস্রাইলি বিমান বাহিনী তুরস্কের পাহাড়ি অঞ্চলকে আকাশ প্রশিক্ষণের জন্যে ব্যবহার করে। উভয় পক্ষ একে অপরের বিমান এবং কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করে। সেই হিসেবে গ্রিক বিশ্লেষকদের মতে, তুর্কিরা কাতারের ‘রাফাল’ ফাইটার বিমান সম্পর্কে গভীর ধারণা পেতেই কাতারি বিমান বাহিনীর বিমানকে নিজ দেশে প্রশিক্ষণে দেখতে চায়। এতে তুর্কিরা ফরাসি বিমান সম্পর্কে আরও বেশি জানতে পারবে।
অপরদিকে তুরস্কের সাথে পাকিস্তানের কৌশলগত সহযোগিতা আরও এক ধাপ এগিয়ে যায় সেপ্টেম্বর মাসে। ১২ই সেপ্টেম্বর থেকে আজেরবাইজানের রাজধানী বাকুতে শুরু হয় ত্রিদেশীয় আরেকটা যৌথ মহড়া। ‘থ্রি ব্রাদার্স ২০২১’ নামের এই মহড়া আরেকটা দিকনির্দেশনা দেয়। আজেরবাইজানের স্পেশাল ফোর্সের কমান্ডার লেঃ জেনারেল হিকমাত মিরজাইয়েভ তুর্কি এবং পাকিস্তানের স্পেশাল ফোর্সের সদস্যদের নিজ দেশে স্বাগত জানান। তিন দেশের কাছাকাছি সম্পর্ককে সংজ্ঞায়িত করতে জেনারেল মিরজাইয়েভ আর্মেনিয়ার সাথে ৪৪ দিনের যুদ্ধের প্রথম থেকেই তুরস্ক এবং পাকিস্তানের পুরোপুরি সমর্থনের কথা উল্লেখ করেন। প্রায় তিন দশকের আর্মেনিয় দখলদারিত্বের পর আজেরিরারা নাগোর্নো কারাবাখের কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ শহরসহ প্রায় ৩’শ বসতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়; যখন উভয় পক্ষ রুশ মধ্যস্ততায় যুদ্ধবিরতি মেনে নেয়। জেনারেল মিরজাইয়েভ তিন দেশের সম্পর্কোন্নয়নের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক নিরাপত্তার উপর গুরুত্বারোপ করেন। তুর্কি লেঃ কর্নেল কুরসাত কনুক এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর লেঃ কর্নেল আমির শাহজাদ দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে এই সামরিক সম্পর্কের গুরুত্বকে তুলে ধরেন।
তুরস্কের ‘কাদির হাস ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর মিতাত চেলিকপালা তুর্কি মিডিয়া ‘টিআরটি’র সাথে এক সাক্ষাতে বলছেন যে, এই মহড়ার মাধ্যমে তুরস্ক এবং আজেরবাইজানের কৌশলগত অবস্থানকে মধ্য এশিয়ার মাঝ দিয়ে আফগানিস্তান পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তুরস্ক এবং পাকিস্তানের মাঝে সামরিক এবং কৌশলগত সম্পর্ককে আরও শক্ত ভিতের উপর প্রতিষ্ঠিত করতেই আজেরবাইজানের মাধ্যমে দেশদু’টাকে আরও কাছাকাছি আনা হচ্ছে। অপরদিকে আজেরবাইজানের ‘এডিএ ইউনিভার্সিটি’র ফারিজ ইসমাঈলজাদে বলছেন যে, এই মহড়ার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মধ্য এশিয়ার মাঝ দিয়ে পরিবহণ করিডোর, যার মাধ্যমে আঞ্চলিক বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে। যদিও এই মহড়া কোন বিশেষ দেশকে টার্গেট করে হচ্ছে না, তথাপি আর্মেনিয়ার মতো কোন দেশ যদি আবারও অত্র অঞ্চলে শান্তি বিঘ্নিত করার চেষ্টা করে, তবে তার জন্যে এই মহড়া হবে একটা হুমকি। তবে ইরানের কর্মকর্তারা কাস্পিয়ান সাগরীয় অঞ্চলে তুরস্ক এবং পাকিস্তানের সামরিক অবস্থানকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছেন। মধ্য এশিয়ার ‘লাপিস লাজুলি করিডোর’ বরাবর তুরস্কের এবং পাকিস্তানের প্রভাব বৃদ্ধি ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে।
Showing posts with label Lapis Lazuli Corridor. Show all posts
Showing posts with label Lapis Lazuli Corridor. Show all posts
Wednesday, 29 September 2021
Monday, 30 August 2021
ইউরেশিয়া ... আফগানিস্তানের পর
৩০শে অগাস্ট ২০২১
আফগানিস্তানের উত্তরপূর্বের বাদাখশান প্রদেশ একসময় পৃথিবী বিখ্যাত ছিল কিছু দামী পাথরের জন্যে। নীল রঙের এই পাথরগুলির নাম লাপিস লাজুলি। মধ্যযুগে এই পাথর ইউরোপে রপ্তানি হতো; যেখানে এই পাথর গুঁড়ো করে ‘আলট্রাম্যারিন’ নামে একপ্রকারের নীল রঙ তৈরি করা হতো। এই রঙ দামি পেইন্টিংএ ব্যবহার করা হতো। আফগানিস্তান থেকে ইউরোপ পর্যন্ত যাবার প্রাচীন বাণিজ্যপথটাকে উপজীব্য করেই বর্তমানে আফগানিস্তান থেকে তুরস্ক পর্যন্ত ‘লাপিস লাজুলি করিডোর’ নামে একটা যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি করা হচ্ছে। এই করিডোরের মাধ্যমে শুধু আফগানিস্তান নয়, আফগানিস্তানের পূর্বে দক্ষিণ এশিয়াকে স্থলপথে যুক্ত করা হবে ইউরোপের সাথে। একইসাথে এই করিডোর প্রাচীন ‘সিল্ক রোড’এর উপরে তৈরি চীনের ‘বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা ‘বিআরআই’ প্রকল্পের সাথে যুক্ত হবে। এই প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো আফগানিস্তান; যেখানে এখন তালিবানরা ক্ষমতা নিয়েছে। গত ১৫ই অগাস্ট কাবুলে মার্কিন দূতাবাস হেলিকপ্টারের মাধ্যমে খালি করার পর এই বিশাল কৌশলগত করিডোরের ভবিষ্যৎ কি হবে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। একইসাথে আলোচনা হচ্ছে আফগানিস্তানের ঘটনাগুলি এই করিডোরের উপর অবস্থিত দেশগুলিকে কিভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
আফগানিস্তান থেকে তুর্কমেনিস্তান
মার্কিন থিংকট্যাঙ্ক ‘জেমসটাউন ফাউন্ডেশন’এর এক লেখায় মধ্য এশিয়া বিশ্লেষক প্রাক্তন মার্কিন ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তা পল গোবল বলছেন যে, আফগানিস্তানের যুদ্ধে তালিবানের বিজয় এবং সেখান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ফলে রাশিয়া এবং চীনসহ মধ্য এশিয়ার দেশগুলি বিচলিত হয়েছে। মধ্য এশিয়ার দেশগুলির সবগুলিই কঠোর একনায়কোচিত শাসনের অধীনে থাকায় এবং প্রতিটা দেশেই দীর্ঘমেয়াদী ইসলামী আন্দোলন থাকার কারণে রাশিয়া এবং চীন নিজেদের অবস্থানকে নতুন করে সাজাতে চাইছে। চীনের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য রুট গিয়েছে মধ্য এশিয়ার মাঝ দিয়ে। আর মধ্য এশিয়া থেকে চীনের জ্বালানির একটা বড় অংশ আসে। এছাড়াও চীনের আরেকটা বড় চিন্তা হলো শিনজিয়াং বা উইঘুর প্রদেশকে নিয়ে। মুসলিম অধ্যুষিত এই প্রদেশে চীনা সরকারের নিপীড়ন যখন চলমান, তখন চীনারা দুশ্চিন্তায় রয়েছে যে, আফগানিস্তানে তালিবানদের বিজয় চীনের মুসলিমদেরকে অনুপ্রাণিত করবে কিনা। রাশিয়া ইতোমধ্যেই আফগানিস্তানের উত্তরে তাজিকিস্তান এবং কিরগিজস্তানে নিজেদের সামরিক অবস্থানকে সুসংহত করতে শুরু করেছে এবং ‘কালেকটিভ সিকিউরিটি ট্রিটি অর্গানাইজেশন’ বা ‘সিএসটিও’র অধীনে থাকা মধ্য এশিয়ার চারটা দেশের সাথে যৌথ সামরিক মহড়া শুরু করেছে। এই দেশগুলির সীমান্ত নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করতে সহায়তা দিচ্ছে রাশিয়া। রাশিয়ার মূল ফোকাসই হলো সামরিক নিরাপত্তা। তবে এখানে রাশিয়ার সবচাইতে বড় দুর্বলতা হলো মধ্য এশিয়ার একটা গুরুত্বপূর্ণ দেশ তুর্কমেনিস্তান তার জন্মের পর থেকেই ‘নিরপেক্ষতা’র নীতিতে এগুবার কারণে দেশটা রাশিয়ার নেতৃত্বে তৈরি হওয়া ‘সিএসটিও’র সদস্য নয়। তাই রাশিয়া চাইছে যে, তুর্কমেনিস্তান ‘সিএসটিও’র সদস্য হিসেবে নাম লিখিয়ে নিক এবং রুশ সহায়তা নিয়ে আফগানিস্তানের সাথে দেশটার প্রায় ৭’শ কিঃমিঃ সীমানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করুক।
তবে তুর্কমেনিস্তান থেকে পুরোপুরি ভিন্নরকম খবর আসছে। ২০২০এর নভেম্বরেই কাতারের রাজধানী দোহাতে তুর্কমেন কর্মকর্তারা তালিবান প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করেছেন। কাবুলের মার্কিন দূতাবাস খালি করার তিন দিন পর ১৮ই অগাস্ট আফগানিস্তানের উত্তরের শহর মাজার ই-শরীফে তুর্কমেনিস্তানের কনসাল বালখ প্রদেশের তালিবানদের নতুন প্রতিনিধির সাথে সাক্ষাত করেন। তুর্কমেনিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে এই আলোচনাকে অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ এবং গঠনমূলক বলে উল্লেখ করা হয়। এতে দুই দেশের সম্পর্ককে ভ্রাতৃসুলভ বলেও বলা হয়। একই দিনে আফগানিস্তানের পশ্চিমের শহর হেরাতেও তুর্কমেনিস্তানের প্রতিনিধির সাথে তালিবান প্রতিনিধির সাক্ষাত হয়। ১৮ই অগাস্ট তুর্কমেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, আফগানিস্তানের সাথে সীমান্তে রাস্তা এবং রেললাইন খোলা রয়েছে এবং সেখানে স্বাভাবিক কর্মকান্ড চলছে। ‘ইউরেশিয়ানেট’এর এক প্রতিবেদনে তুর্কমেনিস্তানের সাথে আফগানিস্তানের এই ‘হৃদ্যতাপূর্ণ’ সম্পর্ককে উভয় পক্ষের বাস্তববাদী চিন্তার ফলাফল বলা হচ্ছে। এদিকে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কোরেশী মধ্য এশিয়ার চারটা দেশ ঘুরে এসেছেন। তিনি আফগানিস্তানের আশেপাশের সকল দেশকে তালিবানদের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখতে অনুরোধ করেছেন। ১৭ই অগাস্ট তালিবান প্রতিনিধি সুহাইল শাহীন ব্রিটেনের ‘স্কাই নিউজ’এর সাথে এক সাক্ষাতে তুর্কমেনিস্তান থেকে আফগানিস্তান হয়ে পাকিস্তান এবং ভারত পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন নিয়ে কথা বলেন, যা ‘টিএপিআই’ বা ‘টাপি’ পাইপলাইন বলে পরিচিত। একইসাথে তুর্কমেনিস্তানের সাথে রেলযোগাযোগ প্রকল্পকেও তিনি প্রাধান্য দেবার কথা বলেন। এগুলির কর্মযজ্ঞ খুব শীঘ্রই শুরু হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সুহাইল শাহীন আফগানিস্তানকে মধ্য এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার মাঝে সেতু বলে আখ্যা দেন। এছাড়াও এবছরেই তালিবান প্রতিনিধি তুর্কমেনিস্তানের রাজধানী আশগাবাদ ঘুরে আসেন এবং তুর্কমেনিস্তান থেকে আফগানিস্তান হয়ে পাকিস্তান পর্যন্ত বিদ্যুৎ রপ্তানির জন্যে গ্রিডলাইন প্রকল্পের কথাও আলোচনা করেন বলে বলছে জ্বলানি বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘আপস্ট্রিম’।
তুর্কমেনিস্তান চাইছে তার বিশাল প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদকে পুরোপুরি ব্যবহার করতে। এই লক্ষ্যে দেশটার নেতৃত্ব শুধু চীনের বাজারের উপর নির্ভরশীল থাকতে চাইছে না। ‘টাপি’ পাইপলাইনের মাধ্যমে তুর্কমেনিস্তানের দক্ষিণপূর্বাঞ্চলের ‘গালকাইনিশ’ খনি থেকে পাকিস্তান এবং ভারত পর্যন্ত বছরে ৩৩ বিলিয়ন কিউবিক মিটার বা বিসিএম গ্যাস রপ্তানির চিন্তা করা হচ্ছে। এই গ্যাসের ৫ বিসিএম পাবে আফগানিস্তান; বাকি ২৮ বিসিএম সমভাবে বন্টিত হবে পাকিস্তান এবং ভারতের মাঝে। এই প্রকল্পে ১৮’শ ৪০ কিঃমিঃ পাইপলাইনের মাঝে প্রায় ১৬’শ কিঃমিঃ থাকবে আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানে। এর শেষ প্রান্ত থাকবে পাকিস্তানের সাথে ভারতের সীমান্ত শহর ফাজিলকাতে। তুর্কমেনিস্তানের আরেকটা প্রকল্প হলো কাস্পিয়ান সাগর, ককেশাস এবং তুরস্ক হয়ে ইউরোপে গ্যাস রপ্তানি। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে রাশিয়া এবং ইরানের যথেষ্ট আপত্তি রয়েছে। তবে এতে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন রয়েছে। কারণ এর মাধ্যমে রাশিয়া এবং ইরানকে বাইপাস করে তুর্কমেন গ্যাস ইউরোপে রপ্তানি হবে।
কাসপিয়ান সাগর পাড়ি দিয়ে তুরস্ক এবং ইউরোপে
তুর্কমেনিস্তানের পশ্চিমে রয়েছে কাসপিয়ান সাগর। স্থলবেষ্টিত একটা হ্রদ হলেও এটাকে সাগর বলেই আখ্যা দেয়া হয়। তবে এটাকে আইনগতভাবে হ্রদ বলা হবে, নাকি সাগর বলা হবে, সেব্যাপারে এর উপকূলবর্তী পাঁচটা দেশের মাঝে বিরোধ ছিল। রাশিয়া এবং প্রাক্তন সোভিয়েত রিপাবলিক কাজাখস্তান, তুর্কমেনিস্তান এবং আজেরবাইজান কাসপিয়ানকে সাগর বলতে চাইছিল; ইরান বলতে চাইছিল এটা একটা হ্রদ। ইরান চাইছিল এই ‘হ্রদ’এর পুরোটা আই পাঁচ দেশের মাঝে সমভাবে বন্টন করে দেয়া হোক। এতে এক দেশ আরেক দেশের অংশে প্রবেশ করতে পারবে না। কিন্তু রাশিয়া এতে রাজি ছিল না। কারণ এতে রাশিয়ার কাসপিয়ান সাগরের নৌবহর পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে যেতো। শেষ পর্যন্ত দুই দশক আলোচনার পর ইরান রাশিয়ার সিদ্ধান্তই মেনে নিতে বাধ্য হয়। ‘বিবিসি’র এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, ‘হ্রদ’ ঘোষণা না দেয়ায় ইরানই হয়তো এই চুক্তিতে কিছু হারিয়েছে। তবে চুক্তিতে যেহেতু বলা হয়েছে যে, স্বাক্ষরকারী পাঁচ দেশ ব্যতীত কাসপিয়ানে আর কোন দেশের সামরিক অবস্থান থাকবে না, সেদিক থেকে ইরান হয়তো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে। অপরদিকে তুর্কমেনিস্তান এবং আজেরবাইজান ‘সাগর’ ঘোষণায় খুশি হয়েছে। কারণ এতে তারা পশ্চিমা তেল কোম্পানিগুলিকে কাসপিয়ানের তলদেশ দিয়ে গ্যাস পাইপলাইন তৈরি করতে ডাক দিতে পারবে। অর্থাৎ তুর্কমেনিস্তান তার বিশাল গ্যাস সম্পদ আজেরবাইজান, জর্জিয়া এবং তুরস্ক হয়ে ইউরোপে রপ্তানি করতে পারবে।
স্থলবেষ্টিত তুর্কমেনিস্তান সমুদ্র নিয়ে চিন্তা শুরু করেছে অনেক আগে থেকেই। তাদের উদ্দেশ্য হলো মধ্য এশিয়ার অন্যান্য স্থলবেষ্টিত দেশগুলিকে তুর্কমেনিস্তানের মাধ্যমে তুরস্ক, ইউরোপ এবং ভূমধ্যসাগরের সাথে সংযুক্ত করা। এই লক্ষ্যে ২০১৩ সালের অগাস্টে তুর্কি সহায়তায় তুর্কমেনিস্তান কাসপিয়ান সাগরের তীরে তুর্কমেনবাশি সমুদ্রবন্দর তৈরি শুরু করে। ২০১৮ সালের মে মাসে তুর্কমেন প্রেসিডেন্ট গুরবাঙ্গুলি বারদিমুহামেদভ প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার খরচে নির্মিত এই সমুদ্রবন্দর উদ্ভোধন করেন। প্রায় সমান্তরালে আরেকটা প্রকল্পে হাত দেয় তুর্কমেনিস্তান। দেশটার পূর্বে আফগানিস্তানের সীমান্ত পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১৩ সালে। তিন বছরের মাঝে তুর্কমেনিস্তান নিজেদের অংশের লাইনের নির্মাণ শেষ করে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরের ৩০ কিঃমিঃ লাইন নির্মাণ শুরু করে। এই লাইন উদ্ভোধন করা হয় ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে। এর মাধ্যমে আফগানিস্তান যুক্ত হয়ে যায় কাসপিয়ান সাগরে তুর্কমেনবাশি সমুদ্রবন্দরের সাথে। এছাড়াও কাজাখস্তানও কাসপিয়ানের উপকূলে আকটাউ বন্দরের ১’শ কিঃমিঃ দক্ষিণে কুরিক রেল ফেরি টার্মিনাল চালু করে ২০১৬ সালে। ‘কাসপিয়ান নিউজ’ বলছে যে, এই বন্দর তৈরি করার সময় নির্মাতারা খেয়াল রাখছিলেন কাসপিয়ানের ওপাড়ে আজেরবাইজানের আলাত বন্দরের দিকে; যাতে করে কুরিকের রেলগাড়িগুলি আলাতে ওঠানামা করা যায়।
কাসপিয়ানের পূর্বে তুর্কমেনিস্তান এবং কাজাখস্তানের সাথে যুক্ত হবার জন্যে কাসপিয়ানের পশ্চিমে আজেরবাইজান নতুন সমুদ্রবন্দর তৈরিতে হাত দেয় ২০১০ সালে। রাজধানী বাকুর ৭০ কিঃমিঃ দক্ষিণে আলাতে এই বন্দরে রেল ফেরি টার্মিনাল তৈরি হয় ২০১৪ সালে; গাড়ির টার্মিনাল তৈরি হয় ২০১৬ সালে। ২০১৮ সালের মে মাসে আজেরি প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিইয়েভ এই সমুদ্রবন্দর উদ্ভোধন করেন। এই বন্দরের মাধ্যমে তুর্কমেনবাশি বন্দর থেকে আসা রেলের বগি, ট্রাক এবং কনটেইনার আজেরবাইজানে প্রবেশ করবে। তুর্কমেনিস্তানের গ্যাস ব্যবহার করে তৈরি করা রাসায়নিক সারের অর্ধেক আজেরবাইজানের মাধ্যমে রপ্তানি হচ্ছে। তাই আজেরবাইজান আলাত সমুদ্রবন্দরে ২৫ লক্ষ টন প্রসেসিং সক্ষমতার একটা ফার্টিলাইজার টার্মিনাল তৈরি করছে।
মধ্য এশিয়ার সাথে তুরস্ক এবং ইউরোপের যোগাযোগের সর্ব পশ্চিমের প্রকল্প হলো আজেরবাইজানের বাকু থেকে জর্জিয়ার তিবলিসি হয়ে তুরস্কের কার্স পর্যন্ত রেললাইন। ‘বিটিকে’ নামে পরিচিত এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। তুরস্কের সমর্থনে নেয়া এই প্রকল্পে আর্মেনিয়াকে বাইপাস করা হয়। ২০০৮ সালে রাশিয়া জর্জিয়া আক্রমণ করে বসলে প্রকল্প পিছিয়ে যায়। অবশেষে ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে ৮’শ ২৬ কিঃমিঃ লম্বা এই রেললাইন চালু হয়। ২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো একটা মালবাহী রেলগাড়ি চীন থেকে ইউরোপের চেক রিপাবলিকের প্রাগ স্টেশনে পৌঁছায়। এই রেলগাড়ি চীনের শিয়ান প্রদেশ থেকে কাজাখস্তান হয়ে কাসপিয়ান সাগর পাড়ি দিয়ে আজেরবাইজান পৌঁছে। এরপর ‘বিটিকে’ রেললাইন ব্যবহার করে তুরস্কের রেললাইনে পৌঁছায়; সেখান থেকে সহজেই ইউরোপে পৌঁছে যায়। ‘ডেইলি সাবাহ’ বলছে যে, প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কিঃমিঃ এই পথ রেলগাড়িটা পাড়ি দেয় ১২ দিনে। পুরো রুটে রেলগাড়িটা রাশিয়াকে বাইপাস করে।
কাসপিয়ান সাগরের এই সমুদ্রপথকে নিরাপত্তা দিতে আজেরবাইজান এবং তুর্কমেনিস্তান উভয়েই নৌবাহিনী তৈরিতে মনোনিবেশ করেছে। রাতারাতি তৈরি হওয়া তুর্কমেন নৌবাহিনীতে ক’দিন আগেই যুক্ত হয়েছে ৯১ মিটার লম্বা একটা কর্ভেট বা ছোট আকারের ফ্রিগেট ‘দেনিজ খান’; যা কিনা কাসপিয়ান সাগরের সর্বাধুনিক যুদ্ধজাহাজ। এর আগে তুর্কমেনিস্তানের জন্যে শিপইয়ার্ড তৈরি করে দেয় তুরস্কের ‘দিয়ারসান’ কোম্পানি। তাদের সহায়তায় তুর্কমেন নৌবাহিনী ২০১২ সাল থেকে মিসাইল সজ্জিত ১০টা ৫৬ মিটার লম্বা প্যাট্রোল বোট এবং ৬টা মিসাইল বোট তৈরি করে। কাসপিয়ানের অপর পাড়ে আজেরবাইজান ইস্রাইলের সহায়তায় তৈরি করেছে মিসাইল সজ্জিত ৬টা ৬২ মিটার লম্বা ‘তুফান ক্লাস’ প্যাট্রোল ভেসেল এবং ৬টা ‘শালদাগ’ ছোট প্যাট্রোল বোট। মাত্র এক দশকের মাঝেই এই দুই দেশ শক্তিশালী নৌবহর গড়ে তুলে; যার ফলশ্রুতিতে কাসপিয়ানে চলছে একটা অস্ত্র প্রতিযোগিতা; যেখানে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হলো তুরস্ক এবং ইস্রাইল।
তুর্কমেনিস্তানের গ্যাস এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূকৌশলগত পরিকল্পনা
ভারত মহাসাগরের সমুদ্রপথ এবং উত্তরের বিশাল দেশ রাশিয়াকে পুরোপুরি বাইপাস করে চীন থেকে ইউরোপ পর্যন্ত রেল করিডোর তৈরি করা ছিল একটা বিরাট পরিকল্পনা। এর পিছনে তুরস্ক এবং চীনের বড় সহায়তা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনাটাই ছিল মূখ্য। যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করেছে যে, চীনের সাথে ইউরোপের যোগাযোগ যেন রাশিয়ার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হয়। এর সমান্তরালে তুর্কমেনিস্তানের মাঝ দিয়ে একটা রেল করিডোর তৈরি করা হয়েছে আফগানিস্তানের সীমানা পর্যন্ত। এর মাধ্যমে তুরস্কের সাথে আফগানিস্তান রেলপথে যুক্ত হয়েছে। পাকিস্তান চাইছে এই রেল করিডোরের সাথে যুক্ত হতে।
রেল করিডোর ছাড়াও আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তুর্কমেনিস্তানের বিশাল গ্যাসের ভান্ডার। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে এই গ্যাস ‘টাপি’ পাইপলাইনের মাধ্যমে পাকিস্তান এবং ভারতে রপ্তানি হোক, যাতে মধ্য এশিয়ায় চীনের প্রভাব কমে আসে। আবার যুক্তরাষ্ট্র চাইছে তুর্কমেনিস্তানের গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে ইউরোপে পৌঁছাক। এতে রাশিয়ার গ্যাসের উপর ইউরোপের নির্ভরশীলতা কমে আসবে। যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে যে, গ্যাস বিক্রি করার মাধ্যমে একদিকে রাশিয়া ইউরোপের উপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাচ্ছে; অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার উপর যেসকল অর্থনৈতিক অবরোধ দিচ্ছে, তা এই গ্যাস রপ্তানির মাধ্যমে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।
পল গোবল বলছেন যে, মধ্য এশিয়াতে রাশিয়া এবং চীন উভয়েই স্থিতিশীলতা চাইলেও তাদের লক্ষ্য আলাদা। চীন মধ্য এশিয়া থেকে তার গ্যাস সরবরাহের যেমন নিরাপত্তা চায়, তেমনি মধ্য এশিয়া হয়ে ইউরোপ যাবার রেলপথেরও নিরাপত্তা চায়। মধ্য এশিয়াতে স্থিতিশীলতা চাওয়াটা চীনের একটা অর্থনৈতিক লক্ষ্য। অপরদিকে রাশিয়া তার দক্ষিণের মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলগুলি নিয়ে চিন্তায় রয়েছে সর্বদা। তাই মধ্য এশিয়ার দেশগুলির নিরাপত্তাজনিত দিকটাই রাশিয়ার জন্যে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তালিবানরা আফগানিস্তানে ক্ষমতা নেবার সাথেসাথেই মস্কো এবং বেইজিংএ তাদের প্রতিনিধি পাঠিয়ে আস্তত্ব করেছে। তথাপি রাশিয়া এবং চীনের দুশ্চিন্তা পুরোপুরি চলে যায়নি। অপরিকে তুর্কমেনিস্তানকে নিয়ে রাশিয়া চিন্তিত হলেও তুর্কমেনিস্তান কিন্তু আফগানিস্তানের মাঝে তার সুযোগই দেখতে পারছে। কারণ তালিবানরা প্রথম থেকেই বলছে যে, তারা আফগানিস্তানের মাঝ দিয়ে গ্যাস পাইপলাইন, রেললাইন এবং বিদ্যুৎ গ্রিডলাইন প্রকল্প বাস্তবায়নে ইচ্ছুক। মধ্য এশিয়াকে দক্ষিণ এশিয়ার সাথে অর্থনৈতিকভাবে যুক্ত করাটাই এখন তালিবানরা লক্ষ্য হিসেবে বলছে; যা কিনা তাদের বাস্তবতা মেনে নেবার চিন্তাতাকেই তুলে ধরে। একই লক্ষ্য তুরস্ক, আজেরবাইজান, তুর্কমেনিস্তান এবং পাকিস্তানের; আর তা হলো 'লাপিস লাজুলি করিডোর'এর সাথে যুক্ত হওয়া। যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ছেড়ে চলে গেলেও যুক্তরাষ্ট্রের রেখে যাওয়া পরিকল্পনাগুলিই মধ্য এশিয়া তথা ইউরেশিয়াতে বাস্তবায়িত হতে চলেছে। এই প্রকল্পগুলির ভূরাজনৈতিক ফলাফল হিসেবে ইউরেশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল অনেক কাছাকাছি চলে এসেছে। আফগানিস্তানের ঘটনাগুলি একারণেই চীন থেকে রাশিয়া এমনকি তুরস্ক এবং ইউরোপ পর্যন্ত পুরো ইউরেশিয়াতে প্রতিফলিত হচ্ছে।
আফগানিস্তানের উত্তরপূর্বের বাদাখশান প্রদেশ একসময় পৃথিবী বিখ্যাত ছিল কিছু দামী পাথরের জন্যে। নীল রঙের এই পাথরগুলির নাম লাপিস লাজুলি। মধ্যযুগে এই পাথর ইউরোপে রপ্তানি হতো; যেখানে এই পাথর গুঁড়ো করে ‘আলট্রাম্যারিন’ নামে একপ্রকারের নীল রঙ তৈরি করা হতো। এই রঙ দামি পেইন্টিংএ ব্যবহার করা হতো। আফগানিস্তান থেকে ইউরোপ পর্যন্ত যাবার প্রাচীন বাণিজ্যপথটাকে উপজীব্য করেই বর্তমানে আফগানিস্তান থেকে তুরস্ক পর্যন্ত ‘লাপিস লাজুলি করিডোর’ নামে একটা যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি করা হচ্ছে। এই করিডোরের মাধ্যমে শুধু আফগানিস্তান নয়, আফগানিস্তানের পূর্বে দক্ষিণ এশিয়াকে স্থলপথে যুক্ত করা হবে ইউরোপের সাথে। একইসাথে এই করিডোর প্রাচীন ‘সিল্ক রোড’এর উপরে তৈরি চীনের ‘বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা ‘বিআরআই’ প্রকল্পের সাথে যুক্ত হবে। এই প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো আফগানিস্তান; যেখানে এখন তালিবানরা ক্ষমতা নিয়েছে। গত ১৫ই অগাস্ট কাবুলে মার্কিন দূতাবাস হেলিকপ্টারের মাধ্যমে খালি করার পর এই বিশাল কৌশলগত করিডোরের ভবিষ্যৎ কি হবে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। একইসাথে আলোচনা হচ্ছে আফগানিস্তানের ঘটনাগুলি এই করিডোরের উপর অবস্থিত দেশগুলিকে কিভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
আফগানিস্তান থেকে তুর্কমেনিস্তান
মার্কিন থিংকট্যাঙ্ক ‘জেমসটাউন ফাউন্ডেশন’এর এক লেখায় মধ্য এশিয়া বিশ্লেষক প্রাক্তন মার্কিন ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তা পল গোবল বলছেন যে, আফগানিস্তানের যুদ্ধে তালিবানের বিজয় এবং সেখান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ফলে রাশিয়া এবং চীনসহ মধ্য এশিয়ার দেশগুলি বিচলিত হয়েছে। মধ্য এশিয়ার দেশগুলির সবগুলিই কঠোর একনায়কোচিত শাসনের অধীনে থাকায় এবং প্রতিটা দেশেই দীর্ঘমেয়াদী ইসলামী আন্দোলন থাকার কারণে রাশিয়া এবং চীন নিজেদের অবস্থানকে নতুন করে সাজাতে চাইছে। চীনের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য রুট গিয়েছে মধ্য এশিয়ার মাঝ দিয়ে। আর মধ্য এশিয়া থেকে চীনের জ্বালানির একটা বড় অংশ আসে। এছাড়াও চীনের আরেকটা বড় চিন্তা হলো শিনজিয়াং বা উইঘুর প্রদেশকে নিয়ে। মুসলিম অধ্যুষিত এই প্রদেশে চীনা সরকারের নিপীড়ন যখন চলমান, তখন চীনারা দুশ্চিন্তায় রয়েছে যে, আফগানিস্তানে তালিবানদের বিজয় চীনের মুসলিমদেরকে অনুপ্রাণিত করবে কিনা। রাশিয়া ইতোমধ্যেই আফগানিস্তানের উত্তরে তাজিকিস্তান এবং কিরগিজস্তানে নিজেদের সামরিক অবস্থানকে সুসংহত করতে শুরু করেছে এবং ‘কালেকটিভ সিকিউরিটি ট্রিটি অর্গানাইজেশন’ বা ‘সিএসটিও’র অধীনে থাকা মধ্য এশিয়ার চারটা দেশের সাথে যৌথ সামরিক মহড়া শুরু করেছে। এই দেশগুলির সীমান্ত নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করতে সহায়তা দিচ্ছে রাশিয়া। রাশিয়ার মূল ফোকাসই হলো সামরিক নিরাপত্তা। তবে এখানে রাশিয়ার সবচাইতে বড় দুর্বলতা হলো মধ্য এশিয়ার একটা গুরুত্বপূর্ণ দেশ তুর্কমেনিস্তান তার জন্মের পর থেকেই ‘নিরপেক্ষতা’র নীতিতে এগুবার কারণে দেশটা রাশিয়ার নেতৃত্বে তৈরি হওয়া ‘সিএসটিও’র সদস্য নয়। তাই রাশিয়া চাইছে যে, তুর্কমেনিস্তান ‘সিএসটিও’র সদস্য হিসেবে নাম লিখিয়ে নিক এবং রুশ সহায়তা নিয়ে আফগানিস্তানের সাথে দেশটার প্রায় ৭’শ কিঃমিঃ সীমানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করুক।
তবে তুর্কমেনিস্তান থেকে পুরোপুরি ভিন্নরকম খবর আসছে। ২০২০এর নভেম্বরেই কাতারের রাজধানী দোহাতে তুর্কমেন কর্মকর্তারা তালিবান প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করেছেন। কাবুলের মার্কিন দূতাবাস খালি করার তিন দিন পর ১৮ই অগাস্ট আফগানিস্তানের উত্তরের শহর মাজার ই-শরীফে তুর্কমেনিস্তানের কনসাল বালখ প্রদেশের তালিবানদের নতুন প্রতিনিধির সাথে সাক্ষাত করেন। তুর্কমেনিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে এই আলোচনাকে অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ এবং গঠনমূলক বলে উল্লেখ করা হয়। এতে দুই দেশের সম্পর্ককে ভ্রাতৃসুলভ বলেও বলা হয়। একই দিনে আফগানিস্তানের পশ্চিমের শহর হেরাতেও তুর্কমেনিস্তানের প্রতিনিধির সাথে তালিবান প্রতিনিধির সাক্ষাত হয়। ১৮ই অগাস্ট তুর্কমেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, আফগানিস্তানের সাথে সীমান্তে রাস্তা এবং রেললাইন খোলা রয়েছে এবং সেখানে স্বাভাবিক কর্মকান্ড চলছে। ‘ইউরেশিয়ানেট’এর এক প্রতিবেদনে তুর্কমেনিস্তানের সাথে আফগানিস্তানের এই ‘হৃদ্যতাপূর্ণ’ সম্পর্ককে উভয় পক্ষের বাস্তববাদী চিন্তার ফলাফল বলা হচ্ছে। এদিকে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কোরেশী মধ্য এশিয়ার চারটা দেশ ঘুরে এসেছেন। তিনি আফগানিস্তানের আশেপাশের সকল দেশকে তালিবানদের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখতে অনুরোধ করেছেন। ১৭ই অগাস্ট তালিবান প্রতিনিধি সুহাইল শাহীন ব্রিটেনের ‘স্কাই নিউজ’এর সাথে এক সাক্ষাতে তুর্কমেনিস্তান থেকে আফগানিস্তান হয়ে পাকিস্তান এবং ভারত পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন নিয়ে কথা বলেন, যা ‘টিএপিআই’ বা ‘টাপি’ পাইপলাইন বলে পরিচিত। একইসাথে তুর্কমেনিস্তানের সাথে রেলযোগাযোগ প্রকল্পকেও তিনি প্রাধান্য দেবার কথা বলেন। এগুলির কর্মযজ্ঞ খুব শীঘ্রই শুরু হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সুহাইল শাহীন আফগানিস্তানকে মধ্য এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার মাঝে সেতু বলে আখ্যা দেন। এছাড়াও এবছরেই তালিবান প্রতিনিধি তুর্কমেনিস্তানের রাজধানী আশগাবাদ ঘুরে আসেন এবং তুর্কমেনিস্তান থেকে আফগানিস্তান হয়ে পাকিস্তান পর্যন্ত বিদ্যুৎ রপ্তানির জন্যে গ্রিডলাইন প্রকল্পের কথাও আলোচনা করেন বলে বলছে জ্বলানি বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘আপস্ট্রিম’।
তুর্কমেনিস্তান চাইছে তার বিশাল প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদকে পুরোপুরি ব্যবহার করতে। এই লক্ষ্যে দেশটার নেতৃত্ব শুধু চীনের বাজারের উপর নির্ভরশীল থাকতে চাইছে না। ‘টাপি’ পাইপলাইনের মাধ্যমে তুর্কমেনিস্তানের দক্ষিণপূর্বাঞ্চলের ‘গালকাইনিশ’ খনি থেকে পাকিস্তান এবং ভারত পর্যন্ত বছরে ৩৩ বিলিয়ন কিউবিক মিটার বা বিসিএম গ্যাস রপ্তানির চিন্তা করা হচ্ছে। এই গ্যাসের ৫ বিসিএম পাবে আফগানিস্তান; বাকি ২৮ বিসিএম সমভাবে বন্টিত হবে পাকিস্তান এবং ভারতের মাঝে। এই প্রকল্পে ১৮’শ ৪০ কিঃমিঃ পাইপলাইনের মাঝে প্রায় ১৬’শ কিঃমিঃ থাকবে আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানে। এর শেষ প্রান্ত থাকবে পাকিস্তানের সাথে ভারতের সীমান্ত শহর ফাজিলকাতে। তুর্কমেনিস্তানের আরেকটা প্রকল্প হলো কাস্পিয়ান সাগর, ককেশাস এবং তুরস্ক হয়ে ইউরোপে গ্যাস রপ্তানি। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে রাশিয়া এবং ইরানের যথেষ্ট আপত্তি রয়েছে। তবে এতে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন রয়েছে। কারণ এর মাধ্যমে রাশিয়া এবং ইরানকে বাইপাস করে তুর্কমেন গ্যাস ইউরোপে রপ্তানি হবে।
কাসপিয়ান সাগর পাড়ি দিয়ে তুরস্ক এবং ইউরোপে
তুর্কমেনিস্তানের পশ্চিমে রয়েছে কাসপিয়ান সাগর। স্থলবেষ্টিত একটা হ্রদ হলেও এটাকে সাগর বলেই আখ্যা দেয়া হয়। তবে এটাকে আইনগতভাবে হ্রদ বলা হবে, নাকি সাগর বলা হবে, সেব্যাপারে এর উপকূলবর্তী পাঁচটা দেশের মাঝে বিরোধ ছিল। রাশিয়া এবং প্রাক্তন সোভিয়েত রিপাবলিক কাজাখস্তান, তুর্কমেনিস্তান এবং আজেরবাইজান কাসপিয়ানকে সাগর বলতে চাইছিল; ইরান বলতে চাইছিল এটা একটা হ্রদ। ইরান চাইছিল এই ‘হ্রদ’এর পুরোটা আই পাঁচ দেশের মাঝে সমভাবে বন্টন করে দেয়া হোক। এতে এক দেশ আরেক দেশের অংশে প্রবেশ করতে পারবে না। কিন্তু রাশিয়া এতে রাজি ছিল না। কারণ এতে রাশিয়ার কাসপিয়ান সাগরের নৌবহর পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে যেতো। শেষ পর্যন্ত দুই দশক আলোচনার পর ইরান রাশিয়ার সিদ্ধান্তই মেনে নিতে বাধ্য হয়। ‘বিবিসি’র এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, ‘হ্রদ’ ঘোষণা না দেয়ায় ইরানই হয়তো এই চুক্তিতে কিছু হারিয়েছে। তবে চুক্তিতে যেহেতু বলা হয়েছে যে, স্বাক্ষরকারী পাঁচ দেশ ব্যতীত কাসপিয়ানে আর কোন দেশের সামরিক অবস্থান থাকবে না, সেদিক থেকে ইরান হয়তো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে। অপরদিকে তুর্কমেনিস্তান এবং আজেরবাইজান ‘সাগর’ ঘোষণায় খুশি হয়েছে। কারণ এতে তারা পশ্চিমা তেল কোম্পানিগুলিকে কাসপিয়ানের তলদেশ দিয়ে গ্যাস পাইপলাইন তৈরি করতে ডাক দিতে পারবে। অর্থাৎ তুর্কমেনিস্তান তার বিশাল গ্যাস সম্পদ আজেরবাইজান, জর্জিয়া এবং তুরস্ক হয়ে ইউরোপে রপ্তানি করতে পারবে।
স্থলবেষ্টিত তুর্কমেনিস্তান সমুদ্র নিয়ে চিন্তা শুরু করেছে অনেক আগে থেকেই। তাদের উদ্দেশ্য হলো মধ্য এশিয়ার অন্যান্য স্থলবেষ্টিত দেশগুলিকে তুর্কমেনিস্তানের মাধ্যমে তুরস্ক, ইউরোপ এবং ভূমধ্যসাগরের সাথে সংযুক্ত করা। এই লক্ষ্যে ২০১৩ সালের অগাস্টে তুর্কি সহায়তায় তুর্কমেনিস্তান কাসপিয়ান সাগরের তীরে তুর্কমেনবাশি সমুদ্রবন্দর তৈরি শুরু করে। ২০১৮ সালের মে মাসে তুর্কমেন প্রেসিডেন্ট গুরবাঙ্গুলি বারদিমুহামেদভ প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার খরচে নির্মিত এই সমুদ্রবন্দর উদ্ভোধন করেন। প্রায় সমান্তরালে আরেকটা প্রকল্পে হাত দেয় তুর্কমেনিস্তান। দেশটার পূর্বে আফগানিস্তানের সীমান্ত পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১৩ সালে। তিন বছরের মাঝে তুর্কমেনিস্তান নিজেদের অংশের লাইনের নির্মাণ শেষ করে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরের ৩০ কিঃমিঃ লাইন নির্মাণ শুরু করে। এই লাইন উদ্ভোধন করা হয় ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে। এর মাধ্যমে আফগানিস্তান যুক্ত হয়ে যায় কাসপিয়ান সাগরে তুর্কমেনবাশি সমুদ্রবন্দরের সাথে। এছাড়াও কাজাখস্তানও কাসপিয়ানের উপকূলে আকটাউ বন্দরের ১’শ কিঃমিঃ দক্ষিণে কুরিক রেল ফেরি টার্মিনাল চালু করে ২০১৬ সালে। ‘কাসপিয়ান নিউজ’ বলছে যে, এই বন্দর তৈরি করার সময় নির্মাতারা খেয়াল রাখছিলেন কাসপিয়ানের ওপাড়ে আজেরবাইজানের আলাত বন্দরের দিকে; যাতে করে কুরিকের রেলগাড়িগুলি আলাতে ওঠানামা করা যায়।
কাসপিয়ানের পূর্বে তুর্কমেনিস্তান এবং কাজাখস্তানের সাথে যুক্ত হবার জন্যে কাসপিয়ানের পশ্চিমে আজেরবাইজান নতুন সমুদ্রবন্দর তৈরিতে হাত দেয় ২০১০ সালে। রাজধানী বাকুর ৭০ কিঃমিঃ দক্ষিণে আলাতে এই বন্দরে রেল ফেরি টার্মিনাল তৈরি হয় ২০১৪ সালে; গাড়ির টার্মিনাল তৈরি হয় ২০১৬ সালে। ২০১৮ সালের মে মাসে আজেরি প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিইয়েভ এই সমুদ্রবন্দর উদ্ভোধন করেন। এই বন্দরের মাধ্যমে তুর্কমেনবাশি বন্দর থেকে আসা রেলের বগি, ট্রাক এবং কনটেইনার আজেরবাইজানে প্রবেশ করবে। তুর্কমেনিস্তানের গ্যাস ব্যবহার করে তৈরি করা রাসায়নিক সারের অর্ধেক আজেরবাইজানের মাধ্যমে রপ্তানি হচ্ছে। তাই আজেরবাইজান আলাত সমুদ্রবন্দরে ২৫ লক্ষ টন প্রসেসিং সক্ষমতার একটা ফার্টিলাইজার টার্মিনাল তৈরি করছে।
মধ্য এশিয়ার সাথে তুরস্ক এবং ইউরোপের যোগাযোগের সর্ব পশ্চিমের প্রকল্প হলো আজেরবাইজানের বাকু থেকে জর্জিয়ার তিবলিসি হয়ে তুরস্কের কার্স পর্যন্ত রেললাইন। ‘বিটিকে’ নামে পরিচিত এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। তুরস্কের সমর্থনে নেয়া এই প্রকল্পে আর্মেনিয়াকে বাইপাস করা হয়। ২০০৮ সালে রাশিয়া জর্জিয়া আক্রমণ করে বসলে প্রকল্প পিছিয়ে যায়। অবশেষে ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে ৮’শ ২৬ কিঃমিঃ লম্বা এই রেললাইন চালু হয়। ২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো একটা মালবাহী রেলগাড়ি চীন থেকে ইউরোপের চেক রিপাবলিকের প্রাগ স্টেশনে পৌঁছায়। এই রেলগাড়ি চীনের শিয়ান প্রদেশ থেকে কাজাখস্তান হয়ে কাসপিয়ান সাগর পাড়ি দিয়ে আজেরবাইজান পৌঁছে। এরপর ‘বিটিকে’ রেললাইন ব্যবহার করে তুরস্কের রেললাইনে পৌঁছায়; সেখান থেকে সহজেই ইউরোপে পৌঁছে যায়। ‘ডেইলি সাবাহ’ বলছে যে, প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কিঃমিঃ এই পথ রেলগাড়িটা পাড়ি দেয় ১২ দিনে। পুরো রুটে রেলগাড়িটা রাশিয়াকে বাইপাস করে।
কাসপিয়ান সাগরের এই সমুদ্রপথকে নিরাপত্তা দিতে আজেরবাইজান এবং তুর্কমেনিস্তান উভয়েই নৌবাহিনী তৈরিতে মনোনিবেশ করেছে। রাতারাতি তৈরি হওয়া তুর্কমেন নৌবাহিনীতে ক’দিন আগেই যুক্ত হয়েছে ৯১ মিটার লম্বা একটা কর্ভেট বা ছোট আকারের ফ্রিগেট ‘দেনিজ খান’; যা কিনা কাসপিয়ান সাগরের সর্বাধুনিক যুদ্ধজাহাজ। এর আগে তুর্কমেনিস্তানের জন্যে শিপইয়ার্ড তৈরি করে দেয় তুরস্কের ‘দিয়ারসান’ কোম্পানি। তাদের সহায়তায় তুর্কমেন নৌবাহিনী ২০১২ সাল থেকে মিসাইল সজ্জিত ১০টা ৫৬ মিটার লম্বা প্যাট্রোল বোট এবং ৬টা মিসাইল বোট তৈরি করে। কাসপিয়ানের অপর পাড়ে আজেরবাইজান ইস্রাইলের সহায়তায় তৈরি করেছে মিসাইল সজ্জিত ৬টা ৬২ মিটার লম্বা ‘তুফান ক্লাস’ প্যাট্রোল ভেসেল এবং ৬টা ‘শালদাগ’ ছোট প্যাট্রোল বোট। মাত্র এক দশকের মাঝেই এই দুই দেশ শক্তিশালী নৌবহর গড়ে তুলে; যার ফলশ্রুতিতে কাসপিয়ানে চলছে একটা অস্ত্র প্রতিযোগিতা; যেখানে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হলো তুরস্ক এবং ইস্রাইল।
তুর্কমেনিস্তানের গ্যাস এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূকৌশলগত পরিকল্পনা
ভারত মহাসাগরের সমুদ্রপথ এবং উত্তরের বিশাল দেশ রাশিয়াকে পুরোপুরি বাইপাস করে চীন থেকে ইউরোপ পর্যন্ত রেল করিডোর তৈরি করা ছিল একটা বিরাট পরিকল্পনা। এর পিছনে তুরস্ক এবং চীনের বড় সহায়তা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনাটাই ছিল মূখ্য। যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করেছে যে, চীনের সাথে ইউরোপের যোগাযোগ যেন রাশিয়ার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হয়। এর সমান্তরালে তুর্কমেনিস্তানের মাঝ দিয়ে একটা রেল করিডোর তৈরি করা হয়েছে আফগানিস্তানের সীমানা পর্যন্ত। এর মাধ্যমে তুরস্কের সাথে আফগানিস্তান রেলপথে যুক্ত হয়েছে। পাকিস্তান চাইছে এই রেল করিডোরের সাথে যুক্ত হতে।
রেল করিডোর ছাড়াও আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তুর্কমেনিস্তানের বিশাল গ্যাসের ভান্ডার। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে এই গ্যাস ‘টাপি’ পাইপলাইনের মাধ্যমে পাকিস্তান এবং ভারতে রপ্তানি হোক, যাতে মধ্য এশিয়ায় চীনের প্রভাব কমে আসে। আবার যুক্তরাষ্ট্র চাইছে তুর্কমেনিস্তানের গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে ইউরোপে পৌঁছাক। এতে রাশিয়ার গ্যাসের উপর ইউরোপের নির্ভরশীলতা কমে আসবে। যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে যে, গ্যাস বিক্রি করার মাধ্যমে একদিকে রাশিয়া ইউরোপের উপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাচ্ছে; অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার উপর যেসকল অর্থনৈতিক অবরোধ দিচ্ছে, তা এই গ্যাস রপ্তানির মাধ্যমে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।
পল গোবল বলছেন যে, মধ্য এশিয়াতে রাশিয়া এবং চীন উভয়েই স্থিতিশীলতা চাইলেও তাদের লক্ষ্য আলাদা। চীন মধ্য এশিয়া থেকে তার গ্যাস সরবরাহের যেমন নিরাপত্তা চায়, তেমনি মধ্য এশিয়া হয়ে ইউরোপ যাবার রেলপথেরও নিরাপত্তা চায়। মধ্য এশিয়াতে স্থিতিশীলতা চাওয়াটা চীনের একটা অর্থনৈতিক লক্ষ্য। অপরদিকে রাশিয়া তার দক্ষিণের মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলগুলি নিয়ে চিন্তায় রয়েছে সর্বদা। তাই মধ্য এশিয়ার দেশগুলির নিরাপত্তাজনিত দিকটাই রাশিয়ার জন্যে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তালিবানরা আফগানিস্তানে ক্ষমতা নেবার সাথেসাথেই মস্কো এবং বেইজিংএ তাদের প্রতিনিধি পাঠিয়ে আস্তত্ব করেছে। তথাপি রাশিয়া এবং চীনের দুশ্চিন্তা পুরোপুরি চলে যায়নি। অপরিকে তুর্কমেনিস্তানকে নিয়ে রাশিয়া চিন্তিত হলেও তুর্কমেনিস্তান কিন্তু আফগানিস্তানের মাঝে তার সুযোগই দেখতে পারছে। কারণ তালিবানরা প্রথম থেকেই বলছে যে, তারা আফগানিস্তানের মাঝ দিয়ে গ্যাস পাইপলাইন, রেললাইন এবং বিদ্যুৎ গ্রিডলাইন প্রকল্প বাস্তবায়নে ইচ্ছুক। মধ্য এশিয়াকে দক্ষিণ এশিয়ার সাথে অর্থনৈতিকভাবে যুক্ত করাটাই এখন তালিবানরা লক্ষ্য হিসেবে বলছে; যা কিনা তাদের বাস্তবতা মেনে নেবার চিন্তাতাকেই তুলে ধরে। একই লক্ষ্য তুরস্ক, আজেরবাইজান, তুর্কমেনিস্তান এবং পাকিস্তানের; আর তা হলো 'লাপিস লাজুলি করিডোর'এর সাথে যুক্ত হওয়া। যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ছেড়ে চলে গেলেও যুক্তরাষ্ট্রের রেখে যাওয়া পরিকল্পনাগুলিই মধ্য এশিয়া তথা ইউরেশিয়াতে বাস্তবায়িত হতে চলেছে। এই প্রকল্পগুলির ভূরাজনৈতিক ফলাফল হিসেবে ইউরেশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল অনেক কাছাকাছি চলে এসেছে। আফগানিস্তানের ঘটনাগুলি একারণেই চীন থেকে রাশিয়া এমনকি তুরস্ক এবং ইউরোপ পর্যন্ত পুরো ইউরেশিয়াতে প্রতিফলিত হচ্ছে।
Labels:
Afghanistan,
Azerbaijan,
Belt and Road Initiative,
Central Asia,
China,
Eurasia,
Geopolitics,
Lapis Lazuli Corridor,
New World Order,
Pakistan,
Russia,
Silk Road,
Turkey,
Turkmenistan,
USA
Tuesday, 16 March 2021
মধ্য এশিয়াতে কি চাইছে তুরস্ক?
১৬ই মার্চ ২০২১
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু গত ৬ই মার্চ থেকে ৯ই মার্চ মধ্য এশিয়ার তিনটা দেশ তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান এবং কিরগিজস্তান ঘুরে এসেছেন। তিনি মধ্য এশিয়ার সবচাইতে জনবহুল দেশ উজবেকিস্তানের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেবার আশা করেন। মধ্য এশিয়া সফরের ব্যাপারে তুর্কি মিডিয়ার সাথে কথা বলতে গিয়ে কাভুসোগলু বলেন যে, তার সফর শুধু ব্যাপক সফলই ছিল না, তা ছিল আন্তরিক ও ফলপ্রসু। তিনি বলেন যে, উজবেকিস্তানের সাথে অগ্রাধিকার বাণিজ্য চুক্তি করার কথাবার্তা চলছে। এটা সফল হবার সাথে সাথেই তারা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ব্যাপারে কথা শুরু করতে চান। দুই দেশের বাণিজ্য বর্তমানের ২ বিলিয়ন ডলার থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে চান তারা। এছাড়াও গত বছরের অক্টোবরে তুর্কি প্রতিরক্ষামন্ত্রী হুলুসি আকারের উজবেকিস্তান সফরের সময় দুই দেশের মাঝে সামরিক সহযোগিতার ব্যাপারে একটা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তুর্কমেনিস্তান তুরস্ককে রাজধানী তুর্কমেনাবাদ থেকে টারকিশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট অপারেট করতে দিচ্ছে, যদিও সেখান থেকে অন্য দেশের ফ্লাইট অপারেট করে না। এছাড়াও কাস্পিয়ান সাগরে আজেরবাইজান এবং তুর্কমেনিস্তানের সাথে তুরস্ক যৌথভাবে ‘দোস্তলুগ’ তেলখনি নিয়ে কাজ করছে।
সফরকালে কিরগিজস্তানের তুর্কি কিরগিজ মানাস ইউনিভার্সিটিতে আয়োজিত ‘আনতালিয়া ডিপ্লোম্যাসি ফোরাম’এ কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন যে, ২১ শতক হবে এশিয়ার শতক। সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অর্ধেক এখন এশিয়ার। একারণেই তুরস্ক চাইছে এশিয়ার সাথে যুক্ত হতে। তিনি বলেন যে, বহু বছর ধরে ‘তুর্কি দুনিয়া’ আলাদা হয়ে ছিল ‘কৃত্রিম দেয়াল’এর কারণে। এই দেয়াল ভেঙ্গে যাবার পর তুরস্ক এবং ‘তুর্কি দুনিয়া’ একে অপরকে আলিঙ্গন করেছে। তিনি এপ্রসঙ্গে ২০০৯ সালে গঠিত ‘তুরকিক কাউন্সিল’এর সাফল্যের কথা উল্লেখ করেন। একইসাথে তিনি নাগোর্নো কারাবাখে আজেরবাইজানের যুদ্ধজয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘জেমসটাউন ফাউন্ডেশন’এর এক লেখায় সাবেক মার্কিন ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তা পল গোবল বলেন যে, আজেরবাইজানের যুদ্ধজয়ের পর বেশ কয়েক বছর ধরে আলোচনায় থাকা ‘লাপিস লাজুলি’ করিডোর নতুন জীবন পেয়েছে। এই করিডোর আজেরবাইজান এবং তুর্কমেনিস্তান হয়ে আফগানিস্তানকে তুরস্কের সাথে যুক্ত করবে। একই সূত্রে বাঁধা আফগানিস্তান। ১২ই মার্চ কাভুসোগলু নিশ্চিত করেন যে, এপ্রিল মাসে ইস্তাম্বুলে আফগানিস্তানের শান্তি আলোচনা হতে চলেছে। এর আগে ৭ই মার্চ আফগানিস্তানের টেলিভিশন নেটওয়ার্ক ‘টিওএলও নিউজ’ বলে যে, মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব এন্থনি ব্লিংকেন আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনির কাছে এক চিঠি দিয়ে জানান যে, যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ককে আফগান শান্তি আলোচনার ভেন্যু হতে অনুরোধ করেছে। ব্লিংকেনের এই চিঠিই বলে দিচ্ছে যে, আফগানিস্তানে তুরস্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলের সমন্বয় রয়েছে।
গত ১৬ই ফেব্রুয়ারি এক আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে তুরস্কের ‘সেন্টার ফর ডিপ্লোম্যাটিক এফেয়ার্স এন্ড পলিটিক্যাল স্টাডিজ’এর উপদেষ্টা মেসুত হাক্কি কাসিন বলেন যে, তুরস্ক, পাকিস্তান এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলি অর্থনীতির ভিন্ন ভিন্ন স্তরে রয়েছে। এদের মাঝে কৌশলের সমন্বয় জরুরি। তিনি উদাহরণস্বরূপ বলেন যে, তুরস্কের চিন্তার কেন্দ্র এখনও ইইউ। এক্ষেত্রে পাকিস্তান এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলি তুরস্কের মাধ্যমে ইইউ পৌঁছাতে পারে। অপরদিকে পাকিস্তানি অর্থনীতিবিদ এবং প্রাক্তন তত্বাবধায়ক অর্থমন্ত্রী সালমান শাহ বলেন যে, তুরস্ক যেমনি ইউরোপে ঢোকার পথ, পাকিস্তানও তেমনি চীন এবং মধ্য এশিয়াতে ঢোকার পথ। তিন আরও বলেন যে, এটা সময়ের ব্যাপার মাত্র, যখন ‘চায়না পাকিস্তান ইকনমিক করিডোর’ বা ‘সিপেক’ আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়া হয়ে তুরস্ক এবং অন্যান্য দেশের সাথে যুক্ত হবে। একইসাথে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার দায়িত্বও আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলির হাতেই থাকা উচিৎ বলে তিনি মনে করেন। এপ্রসঙ্গে তিনি তুরস্ক ও পাকিস্তানের মাঝে অনুষ্ঠিত ‘আতাতুর্ক ২০২১’ যৌথ সামরিক মহড়ার কথা মনে করিয়ে দেন।
তুর্কি পররাষ্ট্রনীতির বিশ্লেষক ইউসুফ এরিম মধ্য এশিয়াতে তুরস্কের প্রভাব বিস্তারকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে একটা সুযোগ হিসেবে দেখছেন। ‘ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় তিনি বলছেন যে, তুরস্ককে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে আলাদা হওয়া মধ্য এশিয়ার দেশগুলিতে বেশ হিসেব করেই রুশ প্রভাবকে ব্যালান্স করতে হচ্ছে। রাশিয়া এবং চীনের সাথে বেশ কিছু বিষয়ে তুরস্কের সহযোগিতা থাকার কারণেই মধ্য এশিয়ায় তুরস্কের প্রভাব বৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে সুযোগ। তিনি মনে করছেন যে, দুই দেশের উচিৎ ‘এস ৪০০’ ক্ষেপণাস্ত্র এবং সিরিয়ার কুর্দি ‘ওয়াইপিজি’ মিলিশিয়ার ইস্যুকে প্রাধান্য না দিয়ে মধ্য এশিয়া বিষয়ে একটা সমন্বিত কৌশলের ব্যাপারে একমত হওয়া। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘দ্যা হেরিটেজ ফাউন্ডেশন’এর ডিরেক্টর লিউক কোফি তুর্কি মিডিয়া ‘টিআরটি ওয়ার্ল্ড’এর লেখায় ন্যাটো, মধ্য এশিয়া এবং ইউক্রেনে তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতার রাস্তা খোলা রয়েছে বলে বলেন। ব্রিটিশ রাজনৈতিক বিশ্লেষক তারাস কুজিও তুরস্কের সরকারি মিডিয়া ‘আনাদোলু এজেন্সি’র এক লেখায় তুরস্কের সাথে আজেরবাইজানের কৌশলগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন থাকা উচিৎ বলে মত দেন।
মধ্য এশিয়াতে তুরস্কের জন্যে সবচাইতে বড় সুযোগ তৈরি হয় ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে; যখন ২৬ বছর ক্ষমতায় থাকার পর উজবেকিস্তানের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ইসলাম কারিমভের মৃত্যু হয়। নতুন প্রেসিডেন্ট শাভকাত মিরজিইয়োয়েভ ২০১৭ সালের অক্টোবরে তুরস্ক সফরে যান। সাথেসাথে মধ্য এশিয়ায় তুরস্কের দুয়ার খুলে যায়। তবে আদর্শিক দিকনির্দেশনা না থাকার কারণে তুরস্ক, পাকিস্তান এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলি কৌশলগত দিক থেকে এখনও জাতীয় স্বার্থের উর্ধ্বে উঠতে পারছে না। একারণেই দেশগুলি একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রকে সাথে চাইছে, অন্যদিকে উইঘুর ইস্যুতে কথা বলে চীনের সাথে সম্পর্ক খারাপ করতে চাইছে না। উসমানি খিলাফতের সময়ের ইতিহাসের উপর ভর করে গড়ে ওঠা ভূরাজনৈতিক আকাংক্ষা থেকে তুর্কি জনগণকে যখন আলাদা করা কঠিন, তখন মধ্য এশিয়াতে রাশিয়া, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সমন্বয় ঘটিয়ে প্রভাব বিস্তার করা হবে আরও বেশি কঠিন। কারণ মধ্য এশিয়ায় তুরস্কের প্রভাব বিস্তার মানেই রাশিয়া এবং চীনের দুশ্চিন্তা। আর একইসাথে তা যুক্তরাষ্ট্রের রাশিয়া এবং চীনকে নিয়ন্ত্রণের কৌশলের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কাজেই মধ্য এশিয়ায় তুরস্কের প্রভাব বিস্তারে যুক্তরাষ্ট্র স্বাভাবিকভাবেই লাভবান হবে।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু গত ৬ই মার্চ থেকে ৯ই মার্চ মধ্য এশিয়ার তিনটা দেশ তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান এবং কিরগিজস্তান ঘুরে এসেছেন। তিনি মধ্য এশিয়ার সবচাইতে জনবহুল দেশ উজবেকিস্তানের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেবার আশা করেন। মধ্য এশিয়া সফরের ব্যাপারে তুর্কি মিডিয়ার সাথে কথা বলতে গিয়ে কাভুসোগলু বলেন যে, তার সফর শুধু ব্যাপক সফলই ছিল না, তা ছিল আন্তরিক ও ফলপ্রসু। তিনি বলেন যে, উজবেকিস্তানের সাথে অগ্রাধিকার বাণিজ্য চুক্তি করার কথাবার্তা চলছে। এটা সফল হবার সাথে সাথেই তারা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ব্যাপারে কথা শুরু করতে চান। দুই দেশের বাণিজ্য বর্তমানের ২ বিলিয়ন ডলার থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে চান তারা। এছাড়াও গত বছরের অক্টোবরে তুর্কি প্রতিরক্ষামন্ত্রী হুলুসি আকারের উজবেকিস্তান সফরের সময় দুই দেশের মাঝে সামরিক সহযোগিতার ব্যাপারে একটা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তুর্কমেনিস্তান তুরস্ককে রাজধানী তুর্কমেনাবাদ থেকে টারকিশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট অপারেট করতে দিচ্ছে, যদিও সেখান থেকে অন্য দেশের ফ্লাইট অপারেট করে না। এছাড়াও কাস্পিয়ান সাগরে আজেরবাইজান এবং তুর্কমেনিস্তানের সাথে তুরস্ক যৌথভাবে ‘দোস্তলুগ’ তেলখনি নিয়ে কাজ করছে।
সফরকালে কিরগিজস্তানের তুর্কি কিরগিজ মানাস ইউনিভার্সিটিতে আয়োজিত ‘আনতালিয়া ডিপ্লোম্যাসি ফোরাম’এ কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন যে, ২১ শতক হবে এশিয়ার শতক। সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অর্ধেক এখন এশিয়ার। একারণেই তুরস্ক চাইছে এশিয়ার সাথে যুক্ত হতে। তিনি বলেন যে, বহু বছর ধরে ‘তুর্কি দুনিয়া’ আলাদা হয়ে ছিল ‘কৃত্রিম দেয়াল’এর কারণে। এই দেয়াল ভেঙ্গে যাবার পর তুরস্ক এবং ‘তুর্কি দুনিয়া’ একে অপরকে আলিঙ্গন করেছে। তিনি এপ্রসঙ্গে ২০০৯ সালে গঠিত ‘তুরকিক কাউন্সিল’এর সাফল্যের কথা উল্লেখ করেন। একইসাথে তিনি নাগোর্নো কারাবাখে আজেরবাইজানের যুদ্ধজয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘জেমসটাউন ফাউন্ডেশন’এর এক লেখায় সাবেক মার্কিন ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তা পল গোবল বলেন যে, আজেরবাইজানের যুদ্ধজয়ের পর বেশ কয়েক বছর ধরে আলোচনায় থাকা ‘লাপিস লাজুলি’ করিডোর নতুন জীবন পেয়েছে। এই করিডোর আজেরবাইজান এবং তুর্কমেনিস্তান হয়ে আফগানিস্তানকে তুরস্কের সাথে যুক্ত করবে। একই সূত্রে বাঁধা আফগানিস্তান। ১২ই মার্চ কাভুসোগলু নিশ্চিত করেন যে, এপ্রিল মাসে ইস্তাম্বুলে আফগানিস্তানের শান্তি আলোচনা হতে চলেছে। এর আগে ৭ই মার্চ আফগানিস্তানের টেলিভিশন নেটওয়ার্ক ‘টিওএলও নিউজ’ বলে যে, মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব এন্থনি ব্লিংকেন আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনির কাছে এক চিঠি দিয়ে জানান যে, যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ককে আফগান শান্তি আলোচনার ভেন্যু হতে অনুরোধ করেছে। ব্লিংকেনের এই চিঠিই বলে দিচ্ছে যে, আফগানিস্তানে তুরস্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলের সমন্বয় রয়েছে।
গত ১৬ই ফেব্রুয়ারি এক আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে তুরস্কের ‘সেন্টার ফর ডিপ্লোম্যাটিক এফেয়ার্স এন্ড পলিটিক্যাল স্টাডিজ’এর উপদেষ্টা মেসুত হাক্কি কাসিন বলেন যে, তুরস্ক, পাকিস্তান এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলি অর্থনীতির ভিন্ন ভিন্ন স্তরে রয়েছে। এদের মাঝে কৌশলের সমন্বয় জরুরি। তিনি উদাহরণস্বরূপ বলেন যে, তুরস্কের চিন্তার কেন্দ্র এখনও ইইউ। এক্ষেত্রে পাকিস্তান এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলি তুরস্কের মাধ্যমে ইইউ পৌঁছাতে পারে। অপরদিকে পাকিস্তানি অর্থনীতিবিদ এবং প্রাক্তন তত্বাবধায়ক অর্থমন্ত্রী সালমান শাহ বলেন যে, তুরস্ক যেমনি ইউরোপে ঢোকার পথ, পাকিস্তানও তেমনি চীন এবং মধ্য এশিয়াতে ঢোকার পথ। তিন আরও বলেন যে, এটা সময়ের ব্যাপার মাত্র, যখন ‘চায়না পাকিস্তান ইকনমিক করিডোর’ বা ‘সিপেক’ আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়া হয়ে তুরস্ক এবং অন্যান্য দেশের সাথে যুক্ত হবে। একইসাথে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার দায়িত্বও আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলির হাতেই থাকা উচিৎ বলে তিনি মনে করেন। এপ্রসঙ্গে তিনি তুরস্ক ও পাকিস্তানের মাঝে অনুষ্ঠিত ‘আতাতুর্ক ২০২১’ যৌথ সামরিক মহড়ার কথা মনে করিয়ে দেন।
তুর্কি পররাষ্ট্রনীতির বিশ্লেষক ইউসুফ এরিম মধ্য এশিয়াতে তুরস্কের প্রভাব বিস্তারকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে একটা সুযোগ হিসেবে দেখছেন। ‘ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় তিনি বলছেন যে, তুরস্ককে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে আলাদা হওয়া মধ্য এশিয়ার দেশগুলিতে বেশ হিসেব করেই রুশ প্রভাবকে ব্যালান্স করতে হচ্ছে। রাশিয়া এবং চীনের সাথে বেশ কিছু বিষয়ে তুরস্কের সহযোগিতা থাকার কারণেই মধ্য এশিয়ায় তুরস্কের প্রভাব বৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে সুযোগ। তিনি মনে করছেন যে, দুই দেশের উচিৎ ‘এস ৪০০’ ক্ষেপণাস্ত্র এবং সিরিয়ার কুর্দি ‘ওয়াইপিজি’ মিলিশিয়ার ইস্যুকে প্রাধান্য না দিয়ে মধ্য এশিয়া বিষয়ে একটা সমন্বিত কৌশলের ব্যাপারে একমত হওয়া। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘দ্যা হেরিটেজ ফাউন্ডেশন’এর ডিরেক্টর লিউক কোফি তুর্কি মিডিয়া ‘টিআরটি ওয়ার্ল্ড’এর লেখায় ন্যাটো, মধ্য এশিয়া এবং ইউক্রেনে তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতার রাস্তা খোলা রয়েছে বলে বলেন। ব্রিটিশ রাজনৈতিক বিশ্লেষক তারাস কুজিও তুরস্কের সরকারি মিডিয়া ‘আনাদোলু এজেন্সি’র এক লেখায় তুরস্কের সাথে আজেরবাইজানের কৌশলগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন থাকা উচিৎ বলে মত দেন।
মধ্য এশিয়াতে তুরস্কের জন্যে সবচাইতে বড় সুযোগ তৈরি হয় ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে; যখন ২৬ বছর ক্ষমতায় থাকার পর উজবেকিস্তানের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ইসলাম কারিমভের মৃত্যু হয়। নতুন প্রেসিডেন্ট শাভকাত মিরজিইয়োয়েভ ২০১৭ সালের অক্টোবরে তুরস্ক সফরে যান। সাথেসাথে মধ্য এশিয়ায় তুরস্কের দুয়ার খুলে যায়। তবে আদর্শিক দিকনির্দেশনা না থাকার কারণে তুরস্ক, পাকিস্তান এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলি কৌশলগত দিক থেকে এখনও জাতীয় স্বার্থের উর্ধ্বে উঠতে পারছে না। একারণেই দেশগুলি একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রকে সাথে চাইছে, অন্যদিকে উইঘুর ইস্যুতে কথা বলে চীনের সাথে সম্পর্ক খারাপ করতে চাইছে না। উসমানি খিলাফতের সময়ের ইতিহাসের উপর ভর করে গড়ে ওঠা ভূরাজনৈতিক আকাংক্ষা থেকে তুর্কি জনগণকে যখন আলাদা করা কঠিন, তখন মধ্য এশিয়াতে রাশিয়া, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সমন্বয় ঘটিয়ে প্রভাব বিস্তার করা হবে আরও বেশি কঠিন। কারণ মধ্য এশিয়ায় তুরস্কের প্রভাব বিস্তার মানেই রাশিয়া এবং চীনের দুশ্চিন্তা। আর একইসাথে তা যুক্তরাষ্ট্রের রাশিয়া এবং চীনকে নিয়ন্ত্রণের কৌশলের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কাজেই মধ্য এশিয়ায় তুরস্কের প্রভাব বিস্তারে যুক্তরাষ্ট্র স্বাভাবিকভাবেই লাভবান হবে।
Labels:
Azerbaijan,
Central Asia,
China,
CPEC,
Geopolitics,
Lapis Lazuli Corridor,
Pakistan,
Russia,
Turkey,
Turkmenistan,
USA,
Uzbekistan
Subscribe to:
Posts (Atom)






