Monday, 4 September 2023

মিয়ানমার নৌবাহিনীর লক্ষ্য কি?

০৪ঠা সেপ্টেম্বর ২০২৩

মিয়ানমার নৌবাহিনীর ফ্ল্যাগশিপ সাড়ে ১২ হাজার টনের ডক ল্যান্ডিং শিপ 'মোয়াত্তামা', যা চুপিসারে তৈরি করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। ভারত এবং দক্ষিণ কোরিয়া মিয়ানমারের নৌবাহিনীকে সক্ষমতার দিক থেকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। চীন মিয়ানমারকে অনেক অস্ত্রই দিয়েছে; কিন্তু সেগুলি বাংলাদেশের থেকে এগিয়ে যাবার জন্যে যথেষ্ট ছিল না। অপরদিকে ভারতের দেয়া সাবমেরিন, রাডার, সোনার, এন্টি-সাবমেরিন টর্পেডো, ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার দেয়া ডক ল্যান্ডিং শিপ মিয়ানমারের নৌবাহিনীকে ‘ব্লু-ওয়াটার নেভি’ হিসেবে গড়ে দিয়েছে। মিয়ানমারের নৌবাহিনীর লক্ষ্য হলো বঙ্গোপসাগরে বড় বড় শক্তিশালী রাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক লক্ষ্যের একপ্রকারের খিচুরি।

বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্ম এবং মিয়ানমারের প্রতি হুমকি

মিয়ামমারের নৌবাহিনীর কথা বলতে গেলে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কথা বলতে হবে। কারণ মিয়ানমার নৌবাহিনীর ডেভেলপমেন্ট মূলতঃ বাংলাদেশের সাথে পাল্লা দিয়েই হয়েছে। কাজেই এই দুই দেশের মাঝে কূটনৈতিক সম্পর্কের সাথে এর ডেভেলপমেন্ট ওঁতোপ্রোতোভাবে জড়িত। বাংলাদেশের নিরাপত্তা চিন্তার সাথে মিয়ানমারের নৌশক্তির ডেভেলপমেন্ট জড়িত। একারণেই বাংলাদেশের নিরাপত্তা চিন্তাটাকে একটু কাছে থেকে দেখতে হবে। ১৯৭০এর দশকে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষার মূল চিন্তা ছিল কিভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের সামরিক হস্তক্ষেপ প্রতিহত করা যায়। এই লক্ষ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আকার দ্রুত বৃদ্ধি করার শুরু হয়; যাতে করে ভারতের পক্ষে বাংলাদেশে সামরিক হস্তক্ষেপ করাটা জটিল সমীকরণে পরিণত হয়। ১৯৮০এর দশকে গিয়ে ঠিক সেটাই হয়েছিল। ভারত তার নিরাপত্তা চিন্তার মাঝ থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সামরিক হস্তক্ষেপকে বাদ দিতে বাধ্য হয়। তবে ঠিক এই সময়ের মাঝেই বাংলাদেশের নিরাপত্তা চিন্তায় নতুন চ্যালেঞ্জ যুক্ত হয়। যদি ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সামরিক হস্তক্ষেপ না করে, তাহলে দিল্লী বাংলাদেশের উপরে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টিতে কি কি পন্থা নেবে? প্রথমতঃ প্রক্সি যুদ্ধ; যার কেন্দ্রে থাকবে সাবভার্সন। যেমন, পার্বত্য চট্টগ্রামে জাতিগত সংঘাতে ইন্ধন যোগানো এবং বাংলাদেশের রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার জন্ম দিয়ে রাজনৈতিক এবং সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করা; যাতে করে ভারতের ‘চিকেন নেক’এর উপর হুমকি কমানো সম্ভব হয়। দ্বিতীয়তঃ অর্থনৈতিক বা নৌ অবরোধ; যার মাধ্যমে বাংলাদেশের মূল সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামকে পঙ্গু করে ফেলা যায়। দ্বিতীয় সম্ভাবনাটার উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ নিজেদের নৌবাহিনীর আক্রমণভাগ গড়তে থাকে; যা কিনা একপ্রকার ডিটারেন্ট। অর্থাৎ আক্রান্ত হলে আক্রমণকারীর এমন ক্ষতিসাধন করা, যাতে করে সে অবরোধ তুলে নিতে বাধ্য হয়। ১৯৮০এর দশকে এই ডিটারেন্টের চেহারা ছিল মিসাইল বোট স্কোয়াড্রন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পিছনে যেসকল যুক্তি ছিল, তার মাঝে একটা ছিল পাকিস্তানের নৌবাহিনীতে পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের অংশগ্রহণ না থাকা। কারণ এদেশের বেশিরভাগ চিন্তাবিদেরাই বাংলাদেশকে ‘ম্যারিটাইম নেশন’ হিসেবে চিন্তা করেছে; যা ইসলামাবাদের নেতৃত্বের চিন্তায় ছিল না। একারণে স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশ তার নৌবাহিনীকে ‘ব্লু-ওয়াটার নেভি’ হিসেবে দেখতে চেয়েছে। ১৯৭৬ সালেই বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যুক্ত হয় প্রাক্তন ব্রিটিশ নৌবাহিনীর ‘টাইপ ৬১ স্যালসবুরি-ক্লাস’এর ফ্রিগেট। ২১ বছরের পুরোনো এই ফ্রিগেট ছিল নবীন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্যে বিরাট একটা পদক্ষেপ। বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরে প্রবেশ করা বাণিজ্য জাহাজগুলির নিরাপত্তা দেয়াই ছিল এই ফ্রিগেটের মূল উদ্দেশ্য। অন্যকথায়, বাংলাদেশের সমুদ্রবাণিজ্যের সাথে ফ্রিগেট ক্রয় জড়িত।

অপরদিকে মিয়ানমার তার জন্মের পর থেকেই নিজেদের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সাথে যুদ্ধরত। তাই তাদের নিরাপত্তা চিন্তার মাঝে অভ্যন্তরীণ শৃংখলাই ছিল সবার উপরে। এক্ষেত্রে নৌবাহিনীর গুরুত্ব ছিল খুবই কম। তবে তাদের ১৪’শ কিঃমিঃএর বিশাল সমুদ্র সৈকতের নিরাপত্তা এবং দূরবর্তী অঞ্চলের (মূলতঃ রাখাইন রাজ্য এবং দক্ষিণের আন্দামান সাগরের তীরবর্তী অঞ্চলের) সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে মিয়ানমার বড় সংখ্যক প্যাট্রোল বোট এবং পরিবহণ বা লজিস্টিকস জাহাজ যোগাড়ে মনোযোগী হয়। অর্থাৎ তাদের চিন্তায় দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি সবচাইতে বড় হুমকি ছিল বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন; পার্শ্ববর্তী দেশের নৌবাহিনী নয়।

সরাসরি না হলেও পরোক্ষভাবে হলেও নৌশক্তির গুরুত্ব সম্পর্কে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকেরা নিশ্চিত হয়েছিলেন ১৯৭৮ সালে। ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ চীন থেকে 'টাইপ ০৫৩এইচ১' ফ্রিগেট 'ওসমান' কেনে। যদিও বাংলাদেশ নৌবাহিনী আরও আগ থেকেই এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি তাদের মিসাইল বোটগুলিতে ব্যবহার করছিলো, তথাপি ফ্রিগেটে এই ক্ষেপণাস্ত্র বহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর হাতে বন্দর থেকে অনেক দূরের টার্গেটে হামলা করার সক্ষমতা চলে আসে। এর বিরুদ্ধে মিয়ানমার নৌবাহিনীর কোন জবাব ছিলো না।

নিজেদের দুর্বলতাকে বুঝতে পারা - ১৯৭৮ থেকে ১৯৯০

তবে বাংলাদেশের জন্মের পরপরই মিয়ানমার সরকারকে বাংলাদেশের নৌবাহিনীর শক্তির সামনে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হলো। প্রথমবারের মতো তারা রাখাইন উপকূলে বাংলাদেশের ফ্রিগেট দেখতে পেলো ১৯৭৬ সালে; যদিও তখন পর্যন্ত সেটার গুরুত্ব অতটা গভীর ছিল না। তবে পরিস্থিতি পাল্টে গেলো যখন রাখাইন প্রদেশে মুসলিম জনগণের উপরে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়ন শুরু হলো। ১৯৭৮ সালের শুরুতেই রাখাইনে সামরিক অভিযানের প্রেক্ষিতে প্রায় ১ লক্ষ মুসলিম জনগণ শরণার্থী হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এপ্রিল-মে নাগাদ বাংলাদেশ মিয়ানমারের উপরে কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করলেও তাতে কাজ হয়নি। অবশেষে ৯ই জুলাই মিয়ানমার বাংলাদেশের শান্তি প্রস্তাব মেনে নিয়ে শরণার্থীদের ফেরত নিতে রাজি হয়। যদিও এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর গুরুত্ব সরাসরি দেখানো যাবে না, তথাপি শান্তি প্রতিষ্ঠার মাত্র তিনদিন আগে ৬ই জুলাই যে বাংলাদেশ নৌবাহিনী তাদের দ্বিতীয় ব্রিটিশ ফ্রিগেট ‘আলী হায়দার’ অন্তর্ভুক্ত করে, তা উল্লেখ করতেই হয়।

সরাসরি না হলেও পরোক্ষভাবে হলেও নৌশক্তির গুরুত্ব সম্পর্কে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকেরা নিশ্চিত হয়েছিলেন ১৯৭৮ সালে। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যুক্ত হয় তৃতীয় ব্রিটিশ ফ্রিগেট ‘আবু বকর’। এই ফ্রিগেটগুলিতে খুব একটা শক্তিশালী অস্ত্র না থাকলেও বিভিন্ন কারণে এগুলি ছিল গুরুত্বপূর্ণ; যেমন - দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অবস্থান করে কমান্ড এন্ড কন্ট্রোলের কাজ করা, শক্তিশালী দূরপাল্লার রাডারের মাধ্যমে শত্রুর বিমান এবং জাহাজের উপরে নজরদারি, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারের মাধ্যমে শত্রুর রাডার এবং ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাপারে আগাম সতর্কবার্তা দেয়া, এবং সর্বোপরি শক্তিশালী ১১৩মিঃমিঃ এবং ৪০মিঃমিঃ কামানের মাধ্যমে গোলাবর্ষণ করা। এই জাহাজগুলির ‘স্ট্রাইকিং পাওয়ার’ হিসেবে ১৯৮৩ সালে যুক্ত হয় চীনা ৪টা ‘টাইপ ০২৪’ মিসাইল বোট; যেগুলির একেকটা বহণ করছিলো ২টা করে ‘এসওয়াই-২’ জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র; যা ‘সিল্কওয়ার্ম’ নামেও পরিচিত ছিল। সোভিয়েত ‘পি-১৫ টারমিট’এর চীনা সংস্করণ এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ইরান পারস্য উপসাগরে ১৯৮৭ সালে ব্যাপক সফলতার সাথে ব্যবহার করেছিল। প্রায় নিয়মিতভাবে এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ১’শ কিঃমিঃএর বেশি দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে সক্ষম হয়েছিল। ইরানের প্রয়োগ চীনা এই ক্ষেপণাস্ত্রের জন্যে বাজার তৈরি করে; যার মাঝে বাংলাদেশও ছিল। ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ‘সিল্কওয়ার্ম’ ক্ষেপণাস্ত্র সজ্জিত ৪টা ‘টাইপ ০২১’ মিসাইল বোট সংগ্রহ করে; এগুলি একেকটা বহণ করছিলো ৪টা করে ‘সিল্কওয়ার্ম’। ১৯৮৮ সাল নাগাদ বাংলাদেশের প্রধান ডিটারেন্ট ফোর্স ছিল নৌবাহিনীর এই মিসাইল বোটগুলি; যা কিনা যেকোন নৌ অবরোধ তুলে নেবার বিরুদ্ধে আক্রমণের দ্বায়িত্ব নেবে। ৩টা ফ্রিগেট এবং ৮টা মিসাইল বোটকে (মোট ২৪টা ‘সিল্কওয়ার্ম’ ক্ষেপণাস্ত্রের লঞ্চার) আরও সহায়তা দেয়ার জন্যে ১৯৮৫ সালে সিঙ্গাপুর থেকে ২টা প্যাট্রোল ক্রাফট তৈরি করে নিয়ে আসা হয়। ‘মেঘনা’ এবং ‘যমুনা’ নামের এই জাহাজগুলিতে ছিল শক্তিশালী ৫৭মিঃমিঃ কামান। একই বছরে চীন থেকে নিয়ে আসা হয় ‘টাইপ ০৩৭’এর দু’টা সাবমেরিন চেজার ‘দুর্জয়’ এবং ‘নির্ভয়’।

১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ সরকার চীন থেকে তাদের প্রথম গাইডেড মিসাইল ফ্রিগেট কেনে। ১৯৮৭ সালে চীনা নৌবাহিনীতে কমিশন পাবার পর ১৯৮৮ সালে ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সফলতার সাথে অংশ নেয় ‘শিয়াংতান’ জাহাজটা; যা বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে ‘ওসমান’ নামে কমিশনপ্রাপ্ত হয়। ‘টাইপ ০৫৩এইচ১’ ক্লাসের এই জাহাজগুলিতে ছিল ৬টা করে ‘সিল্কওয়ার্ম’ ক্ষেপণাস্ত্র। যদিও বাংলাদেশ নৌবাহিনী আরও আগ থেকেই এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি তাদের মিসাইল বোটগুলিতে ব্যবহার করছিলো, তথাপি ফ্রিগেটে এই ক্ষেপণাস্ত্র বহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর হাতে বন্দর থেকে অনেক দূরের টার্গেটে হামলা করার সক্ষমতা চলে আসে।

২০০৪ সালে মিয়ানমারের নিজস্ব শিপইয়ার্ডে তৈরি '৫-সিরিজ'এর মিসাইল বোট '৫৬২'। ১৯৯১ সালে মিয়ানমারের রাখাইনে আবারও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন শুরু হয়। এসময়েই মিয়ানমার সরকার তাদের নৌবাহিনীকে নতুন করে তৈরি করার লক্ষ্য স্থির করে।


মিসাইল যুগে মিয়ানমারের ‘নতুন’ নৌবাহিনী - ১৯৯১-২০০৮

১৯৯১ সালে মিয়ানমারের রাখাইনে আবারও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন শুরু হয় এবং যথারীতি মিয়ানমার সরকার বিচারবুদ্ধিহীনভাবে সাধারণ মুসলিম জনগণের উপরে হামলা করে। এতে রাখাইনের কমপক্ষে আড়াই লক্ষ মুসলিম শরণার্থী বাংলাদেশের কক্সবাজার এলাকায় আশ্রয় নেয়। এই শরণার্থী ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমারের উত্তেজনা তুমুল আকার ধারণ করে। তবে ১৯৭০এর দশকের মতো কূটনৈতিকভাবে এই সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ হয় বাংলাদেশ। কাজেই উত্তেজনার প্রশমন হয় না এবং পুরো ১৯৯০এর দশক জুড়েই রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সাথে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সংঘর্ষ চলতে থাকে। এই বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের পিছনে পশ্চিমা ইন্ধন থাকার সম্ভাবনাকে এড়ানো সম্ভব নয়। ১৯৮৯ সালে বেইজিংএর তিয়ানানমেন স্কয়ারের ঘটনার পর পশ্চিমাদের সাথে চীনের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। সেই হিসেবেই চীনকে বিচলিত করতে মিয়ানমারের রাখাইনে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অস্ত্র সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়ে থাকতে পারে। এসময়েই মিয়ানমার সরকার তাদের নৌবাহিনীকে নতুন করে তৈরি করার লক্ষ্য স্থির করে। আর তাদেরকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসে চীন। মিয়ানমার ১৯৯১-৯২ সালের মাঝে চীন থেকে ৯টা ‘টাইপ ০৩৭’ সাবমেরিন চেজার ডেলিভারি পায়। বাংলাদেশ নৌবাহিনীও ১৯৮৫ সালে এরকম দু’টা জাহাজ কিনেছিল। এই জাহাজগুলি ২টা করে শক্তিশালী টুইন ৫৭মিঃমিঃ কামান দ্বারা সজ্জিত ছিল এবং একইসাথে এদের ৩০ নটিক্যাল মাইল গতি প্রথমবারের মতো মিয়ানমার নৌবাহিনীকে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে কিছুটা হলেও যুদ্ধ সক্ষমতা দেয়।

তবে মিয়ানমার এতেই স্বস্থির নিঃস্বাস ফেলতে পারেনি। কারণ বাংলাদেশ নৌবাহিনীর হাতে তখন ছিল ৮টা মিসাইল বোট; যার মাঝে ‘টাইপ ০২৪’ বোটগুলি (১৯৮৩) ২টা করে এবং ‘টাইপ ০২১’ বোটগুলি (১৯৮৮) ৪টা করে ‘সিল্কওয়ার্ম’ ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতো। শুধু উপকূলীয় অঞ্চলের জন্যে উপযুক্ত হলেও ৩৫ থেকে ৩৮ নটিক্যাল মাইল গতিবেগের দ্রুতগামী বোটগুলি ছিল বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রধান ডিটারেন্ট। এর সাথে ১৯৮৯ সালে যুক্ত হয়েছিল ফ্রিগেট ‘ওসমান’; যা আরও ৬টা ক্ষেপণাস্ত্র বহণ করছিলো। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর হাতে ছিল ৩০টা ‘সিল্কওয়ার্ম’ ক্ষেপণাস্ত্রের লঞ্চার; যার বিপক্ষে মোতায়েন করার মতো কিছুই ছিল না মিয়ানমারের। এই কঠিন বাস্তবতা এড়াতে ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৭ সালের মাঝে চীন থেকে ৬টা ‘হাউশিন-ক্লাস’এর মিসাইল বোটের ডেলিভারি পায় মিয়ানমার। ৬৩ মিটার লম্বা ৪’শ ৭৮ টনের এই জাহাজগুলি প্রকৃতপক্ষে ‘টাইপ ০৩৭’ সাবমেরিন চেজারের এন্টি-শিপ ভার্সন; যা ৪টা করে ১’শ ২০কিঃমিঃ পাল্লার ‘সি-৮০২’ জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র বহণ করতে সক্ষম। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো মিয়ানমার বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজকে বাধা দেয়ার সক্ষমতা অর্জন করে। মাত্র ৬ বছরের মাঝে ‘টাইপ ০৩৭’এর ৯টা জাহাজের সাথে এই ৬টা ‘হাউশিন-ক্লাস’এর জাহাজ মিয়ানমারের নৌবাহিনীকে বেশ খানিকটা শক্তিশালী করে ফেলে। এসময় তাদের হাতে ছিল নতুন যুগের ২৪টা ‘সি-৮০২’ জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের লঞ্চার। অপরদিকে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্যে এসময়ে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ‘মধুমতি’ নামের একটা লার্জ প্যাট্রোল ক্রাফট তৈরি করে আনা হয় এবং ৫টা মাইনসুইপার কেনা হয় ব্রিটেন ও চীন থেকে। ‘মধুমতি’ জাহাজটার পাল্লা প্রায় ৬ হাজার নটিক্যাল মাইল; এতে রয়েছে ৫৭মিঃমিঃ শক্তিশালী কামান। আর ‘রিভার-ক্লাস’এর মাইনসুইপারগুলি ব্রিটিশরা ডিজাইন করেছিল এমনভাবে, যাতে করে এগুলি গভীর সমুদ্রে লম্বা সময় ধরে থাকতে পারে। এতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর গভীর সমুদ্রে অবস্থান করার সক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং একইসাথে শত্রুপক্ষের মাইন অপসারণের সক্ষমতা তৈরি হয় প্রথমবারের মতো। তবে নিজেদের নৌবাহিনীর আক্রমণ সক্ষমতা আগের জায়গায়ই থেকে যায়। ১৯৯১ সালের ঘুর্নিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি এবং কিছু নতুন প্রতিস্থাপনের পর তাদের ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চারের সংখ্যা তখন ৩২; যার সবগুলিই পুরোনো জেনারেশনের ‘সিল্কওয়ার্ম’ ক্ষেপণাস্ত্র।

তবে মিয়ানমার কিন্তু থেকে থাকেনি। তারা নিশ্চিতভাবে বুঝেছিল যে বাংলাদেশের সাথে তাদের সংঘাত আবারও হতে পারে। ২০০০ সালের পর থেকে মিয়ানমার তার উপকূলে হাইড্রোকার্বন খোঁজার বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করেছিল। ২০০৬ সাল নাগাদ ১৩টা বিদেশী কোম্পানি মিয়ানমারে ৩৩টা প্রকল্পে কাজ করছিলো। একইসাথে রাখাইনে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সাথে সংঘর্ষে বিদেশী ইন্ধনের কারণে মিয়ানমার নিরাপত্তা নিয়ে বিচলিত ছিলো। তাই তারা তাদের নৌবাহিনীর জন্যে চাইছিলো ‘ব্লু ওয়াটার’ সক্ষমতা। অর্থাৎ আরও বড় জাহাজ; যা কিনা গভীর সমুদ্রে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ৪টা ফ্রিগেটকে মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে এবং সমুদ্রে আরও বেশি সময় ধরে অবস্থান করতে পারবে। বিদেশী কোম্পানিগুলিও সেটাই চাইছিলো। কারণ তারা চাইছিলো না যে মিয়ানমারের নৌ-দুর্বলতার কারণে তাদের বিপুল বিনিয়োগ ভেস্তে যাক। মিয়ানমারের টার্গেট ছিল কর্ভেট অথবা ফ্রিগেট। এক্ষেত্রে মিয়ানমারের সবচাইতে বড় সুবিধা ছিল তাদের জাহাজ নির্মাণ শিল্পের অভিজ্ঞতা। তারা বহু বছর আগে থেকেই নিজস্ব প্যাট্রোল বোট তৈরি করে আসছিলো; যদিওবা সেগুলি ছিল অভ্যন্তরীণ নদীপথ এবং উপকূলীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা দেয়ার জন্যে; অন্য কোন নৌবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করার জন্যে নয়।

ব্রিটিশ সামরিক ম্যাগাজিন ‘জেনস ইন্টেলিজেন্স রিভিউ’এর ২০০০ সালের এক প্রতিবেদনে একটা ধারণা দেয়া হয় যে, কিভাবে মিয়ানমার তার প্রথম কর্ভেটগুলি তৈরি করতে পেরেছিল। ১৯৯০এর দশকে মিয়ানমারের সরকার চীন থেকে রিটায়ার করা পুরোনো দু’টা বা তিনটা ‘টাইপ ০৬৫’ কামান সজ্জিত এন্টি-সাবমেরিন ফ্রিগেট অথবা অপেক্ষাকৃত নতুন ‘এসওয়াই-১’ জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র সজ্জিত ‘টাইপ ০৫৩’ গাইডেড মিসাইল ফ্রিগেট কিনতে চেয়েছিল। কিন্তু এগুলির জন্য চীন তাদেরকে যে ‘স্পেশাল বন্ধুত্বের’ মূল্য দিতে বলেছিল, তা মিয়ানমার সরকার দিতে প্রস্তুত ছিল না। তাই মিয়ানমার চীনের সহায়তায় ৩টা ৭৭ মিটারের জাহাজ ক্রয় করে; যেগুলির হাল ছাড়া কিছুই তারা কেনেনি। এই হালগুলিকে নিজেদের শিপইয়ার্ড পর্যন্ত নিয়ে এসে হালের উপরের সুপারস্ট্রাকচারের অংশ তারা নিজেরা তৈরি করে। জাহাজের প্রধান অস্ত্র থাকে ইতালিতে তৈরি দু’টা ‘অটো মেলারা’ ৭৬মিঃমিঃ অটোম্যাটিক কামান। অস্ত্র অবরোধকে বাইপাস করে তৃতীয় কোন পক্ষকে ব্যবহার করে তারা ইউরোপ থেকে এই কামানগুলি আমদানি করে। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো মিয়ানমার নৌবাহিনীর হাতে মধ্যম ক্যালিবারের আটোম্যাটিক কামান চলে আসে। যদিও ‘জেনস’ তাদের রিপোর্টে ধারণা করে যে, জাহাজগুলি সম্ভবতঃ ইস্রাইলি ইলেকট্রনিক্সে সজ্জিত করা হবে, তথাপি পরবর্তীতে এর পক্ষে প্রমাণ পাওয়া কঠিন হয়। ২০০১ সালে কোনরূপ ক্ষেপণাস্ত্র ছাড়াই ১১’শ টনের প্রথম জাহাজটা ‘আনাওরাহতা’ নামে কমিশনিং করা হয়। তবে জাহাজের অস্ত্র এবং ইলেকট্রনিক্স নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট চলতে থাকে। কারণ অস্ত্র অবরোধের মাঝে তারা কোনটা কখন পাবে, সেটা নিশ্চিত ছিল না কখনোই। পরবর্তীতে কামানগুলির পেছনেরটা সরিয়ে ফেলা হয় এবং ৪টা চীনা ‘সি-৮০২’ জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র যুক্ত করা হয়। একইসাথে এতে চীনে নির্মিত সার্চ এবং ট্র্যাকিং রাডার যুক্ত করা হয়। স্বল্প পাল্লার বিমান-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবস্থাও এতে রাখা হয় বলে অনেকে অনুমান করেন। দুই বছর পর ২০০৩ সালে দ্বিতীয় কর্ভেট ‘বায়িনং’ কমিশনিং করা হয়। তবে এই জাহাজের অস্ত্র ও ইলেকট্রনিক্স নিয়েও চলতে থাকে এক্সপেরিমেন্ট; এবং শিগগিরই এতে যুক্ত করা হয় ৪টা ‘সি-৮০২’ ক্ষেপণাস্ত্র।

১৯৯০এর দশকের শেষের দিকে বাংলাদেশ নৌবাহিনী একধাপ এগিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৯৮ সালের মার্চে তারা দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সর্বশেষ প্রযুক্তির একটা ফ্রিগেট অর্ডার করে; যা কিনা বঙ্গোপসাগরে ভাসমান যেকোন যুদ্ধজাহাজকে মান্ধাতার আমলের বানিয়ে ফেলার জন্যে যথেষ্ট। ২০০১ সালে এই জাহাজটা বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে ‘বঙ্গবন্ধু’ নামে যুক্ত হলেও ধ্বংসাত্মক রাজনীতির উদাহরণ হিসেবে জাহাজটাকে ডিকমিশন করা হয়। এতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর আক্রমণ করার সক্ষমতা আগের অবস্থানেই থাকে; কিন্তু মিয়ানমারের এগিয়ে যাওয়া অব্যাহত থাকে। ২০০০এর প্রথম দিকে মিয়ানমার নৌবাহিনীর হাতে দু’টা কর্ভেটে যোগ হয় মোট ৮টা ‘সি-৮০২’ জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। ১৯৯০এর দশকে নিজেদের জাহাজ তৈরির সক্ষমতা তারা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করে। তারা ‘৫-সিরিজ’এর ৪৭ মিটার লম্বা ১১টা জাহাজ তৈরি করে ফেলে ২০০৪ সাল নাগাদ। এর মাঝে ৩টা জাহাজকে তারা সজ্জিত করে ৪টা করে ‘সি-৮০২’ জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র দ্বারা। ২০০৮ সাল নাগাদ আরও ৬টা বোট যুক্ত হয়; যার মাঝে ২টা বোটে ২টা করে ‘সি-৮০২’ ক্ষেপণাস্ত্র দেয়া হয়। অর্থাৎ ২০০৮ সাল নাগাদ মিয়ানমারের নৌবাহিনীতে আরও ১৬টা জাহাজ-ধ্বংসী ‘সি-৮০২’ ক্ষেপণাস্ত্রের লঞ্চার যুক্ত হয়; যা তাদের মোতায়েনকৃত মোট ‘সি-৮০২’ লঞ্চারের সংখ্যা ৪৮-এ নিয়ে যায়।

অপরদিকে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ২০০০ সালের পর থেকে কিছু পদক্ষেপ নেয়; যা তাদের গভীর সমুদ্রে অবস্থান করার সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করে। ব্রিটেন থেকে ৫টা পুরোনো ‘আইল্যান্ড-ক্লাস’ অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল যুক্ত হয় ২০০২ থেকে ২০০৪ সালের মাঝে। সাড়ে ১২’শ টনের এই জাহাজগুলি খুব বেশি অস্ত্র বহণ না করলেও এগুলি গভীর সমুদ্রে এক মাসেরও বেশি সময় অনায়াসে সার্ভেইল্যান্স চালাতে সক্ষম; যা কিনা ক্ষেপণাস্ত্রবাহী স্বল্প পাল্লার জাহাজগুলিকে সুযোগ বুঝে মোতায়েন করার সুবিধা করে দেয়। এবং একইসাথে ক্ষেপণাস্ত্রের জন্যে টার্গেট খুঁজে দিতে সহায়তা দেয়। এছাড়াও ২০০৮ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ‘বঙ্গবন্ধু’ জাহাজটাকে পুনরায় কমিশনিং করে এবং ২১ বছরের পুরোনো ‘টাইপ ০৫৩এইচ১’ ফ্রিগেট ‘ওসমান’এর ‘সিল্কওয়ার্ম’ ক্ষেপণাস্ত্রগুলিকে ৮টা ‘সি-৮০২’ ক্ষেপণাস্ত্র দ্বারা প্রতিস্থাপন করে। শুধু তা-ই নয়, নৌবাহিনী বঙ্গোপসাগরে ‘সি-৮০২’ ক্ষেপণাস্ত্রের লাইভ ফায়ারিংএর মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতার জানান দেয়। কাজেই ২০০৮ সাল নাগাদ বাংলাদেশ নৌবাহিনীর হাতে থাকে ৯টা মিসাইল বোট; যেগুলি মোট ২৬টা ‘সিল্কওয়ার্ম’ ক্ষেপণাস্ত্র বহণ করছিলো। ‘ওসমান’এর ৮টা ক্ষেপণাস্ত্রসহ মোট ক্ষেপণাস্ত্রের লঞ্চার ছিল ৩৪টা; যা মিয়ানমারের তুলনায় বেশ খানিকটাই কম। মিয়ানমারের ১১টা মিসাইল বোটে তখন ছিল ৪০টা ‘সি-৮০২’ ক্ষেপণাস্ত্র; কর্ভেট দু’টাতে ছিল আরও ৮টা। প্রায় ১৮ বছরের চেষ্টায় মিয়ানমার নৌবাহিনী কতটুকু এগুলো, তার প্রমাণ পেতে তাদের নৌবাহিনী বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিল ২০০৮ সালের অক্টোবরের শেষে।

মিয়ানমার নৌবাহিনীর আধুনিক ডিজাইনের ফ্রিগেট 'সিন ফায়ু শিন'; ডিজাইনের দিক থেকে যা সকলের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। কারণ জাহাজটাতে সর্বশেষ প্রযুক্তির বিভিন্ন রকমের স্টেলথ বৈশিষ্ট্য বাস্তবায়িত ছিল; যাতে এই জাহাজ শত্রু রাডারে অপেক্ষাকৃত ছোট একটা জাহাজ হিসেবে অবির্ভূত হয়। ভারতের সামরিক চিন্তাবিদদের মাঝে অনেকেই মিয়ানমারকে সামরিক সহায়তা দেয়ার জন্যে উঠেপড়ে লেগে যায়। বিশেষ করে মিয়ানমারের নতুন ফ্রিগেটের জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ এয়ার ডিফেন্স রাডার এবং সাবমেরিন খোঁজার সোনার সরবরাহ করার জন্যে বলতে থাকে তারা।

ফ্রিগেট যুগে প্রবেশ - ২০০৮-২০১৫

২০০৭ সাল নাগাদ মিয়ানমার গ্যাস রপ্তানি করে আড়াই বিলিয়ন ডলার আয় করছিলো। ২০০৮ সালে মিয়ানমারের জিডিপি ছিল ২৩ বিলিয়ন ডলার। আর এর বিপরীতে বাংলাদেশের জিডিপি তখন ছিল প্রায় ৯২ বিলিয়ন ডলার। একদিকে গ্যাস বিক্রির অর্থ মিয়ানমারের সামরিক সরকারকে যেমন অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিচ্ছিলো, তেমনি নৌবাহিনীকে ঢেলে সাজানোর কাজটাও তাদের জন্যে বেশ সহজ হয়ে গিয়েছিল। মিয়ানমারের রাখাইনের উপকূলে ২০০৮এর অক্টোবরের শেষে গ্যাস ড্রিলিং করার জন্যে ৪টা জাহাজ মোতায়েন করে দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানি ‘দাইয়ু’। মিয়ানমারের নৌবাহিনী তাদেরকে কাভার করছিলো। জায়গাটা বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিনস দ্বীপ থেকে ৫০ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে। নভেম্বরের ২ তারিখ থেকে বাংলাদেশ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে বলে যে, জায়গাটা বাংলাদেশের। সমুদ্র সীমানা নির্দিষ্ট না থাকায় কেউই তাদের দাবি ছেড়ে দিতে চায়নি। ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ তিনটা যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে - ৩৩ বছরের পুরোনো ব্রিটিশ ফ্রিগেট ‘আবু বকর’; লার্জ প্যাট্রোল ক্রাফট ‘মধুমতি’ এবং ‘টাইপ ০৩৭’ সাবমেরিন চেজার ‘নির্ভয়’। আরও কিছু জাহাজ কাছাকাছি ছিলো নিশ্চিত। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারকে বলে যে, সংঘাত হলে কোরিয়ার জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হবে; কাজেই তাদের উচিৎ হবে মিয়ানমার সরকারকে পিছু হঠতে রাজি করানো। অবশেষে এই হুমকিতেই কাজ হলো।

মিয়ানমার নৌবাহিনী বুঝতে পারে যে, ৪৮টা ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার থাকাটাই যথেষ্ট নয়। কারণ সকল সংঘাতে ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার সুযোগ না-ও হতে পারে। আবার অনেক ক্ষেত্রে ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়লে নিজেদের ক্ষতিই বেশি হতে পারে। কারণ যুদ্ধ শুরু হলে মিয়ানমার সমুদ্রে তার বিদেশী বিনিয়োগ হারাতো। বাংলাদেশের মূল নৌঘাঁটি চট্টগ্রাম থেকে সংঘাতের স্থান ছিল প্রায় ১’শ ৩০ নটিক্যাল মাইল দূরে। সেই তুলনায় জায়গাটা মিয়ানমারের সিতওয়ে (আকিয়াব) এবং কিউকপিউ থেকে অপেক্ষাকৃত অনেক কাছে ছিল। তথাপি প্রায় এক সপ্তাহ বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজগুলি অনায়াসে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছিলো; যা কিনা মিয়ানমার নৌবাহিনীকে নতুন কিছু শেখায়। বাংলাদেশের ফ্রিগেট ‘আবু বকর’ কমান্ড শিপ হিসেবে কাজ করেছিলো। অপরদিকে মিয়ানমারের হাতে ‘আনাওরাহতা’ এবং ‘বায়িনং’ কর্ভেটগুলির বাইরে ছিল মিসাইল বোটগুলি, ‘টাইপ ০৩৭’ সাবমেরিন চেজার এবং ৪৭ মিটার প্যাট্রোল ক্রাফট। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, দক্ষিণ কোরিয় ড্রিলিং জাহাজের ক্রুদের ভয় দেখাবার জন্যে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজগুলির দিবারাত্র সার্ভেইল্যান্সই যথেষ্ট ছিল; তাদেরকে মিসাইল দেখাতে হয়নি। একবার গোলাগুলি শুরু হলে এই জাহাজগুলিই নিখুঁতভাবে মিসাইলের জন্যে টার্গেট খুঁজে দিতো। তখন কেউ চিন্তা করতো না যে মিসাইলগুলি কোথা থেকে ছোঁড়া হয়েছে। সার্ভেইল্যান্স এবং টার্গেট খোঁজার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে মিয়ানমারের চাইতে অনেক এগিয়ে রয়েছে, তা মিয়ানমার হারে হারে বুঝেছিল। ২০০৮ সালের এই ঘটনা একারণেই গুরুত্বপূর্ণ।

তবে ব্যাপারটা এমন নয় যে, ২০০৮এর আগে মিয়ানমার ফ্রিগেটের গুরুত্ব বোঝেনি। ২০০৮ সালেই মিয়ানমারের শিপইয়ার্ডে পানিতে নামানো নয় তাদের প্রথম নিজস্ব ডিজাইনের ফ্রিগেট। ‘অংজেয়া’ নামে জাহাজটার কমিশনিং হতে লেগে গেছে আরও দুই বছর। তবে এই ফ্রিগেটের ইলেকট্রনিক্স প্রায় কিছুই ছিল না। ২০১২ সালে মিয়ানমার সফরে যান ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। তখন ভারতের সামরিক চিন্তাবিদদের মাঝে অনেকেই মিয়ানমারকে সামরিক সহায়তা দেয়ার জন্যে উঠেপড়ে লেগে যায়। বিশেষ করে মিয়ানমারের নতুন ফ্রিগেটের জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ এয়ার ডিফেন্স রাডার এবং সাবমেরিন খোঁজার সোনার সরবরাহ করার জন্যে বলতে থাকে তারা। কারণ ২০১২ সালের এপ্রিলে চীনারা মিয়ানমারকে দু’টা ‘টাইপ ০৫৩এইচ১’ ফ্রিগেট সরবরাহ করে মিয়ানমার নৌবাহিনীর সাথে তাদের সম্পর্ক আরও গভীর করে। প্রায় সাথেসাথেই এই জাহাজগুলিকে আপগ্রেড করে এতে ‘সি-৮০২’ ক্ষেপণাস্ত্র এবং দূর পাল্লার ‘টাইপ ৫১৭’ ‘এ-ব্যান্ড’এর ভিএইচএফ রাডার সংযুক্ত করা হয়। অপরদিকে ভারত চাইছিলো সেখানে চীনের প্রভাবকে প্রতিস্থাপিত করতে। আর ইতোমধ্যেই প্রচার হয়ে গেছে যে মিয়ানমার নৌবাহিনী আরও দুই খানা ফ্রিগেট পানিতে ভাসিয়েছে; যার মাঝে প্রথমটা, ‘কায়ান সিত্তার’ ২০১৪ সালের মার্চে এবং ‘সিন ফায়ু শিন’ ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে কমিশনিং করা হয়। উভয় জাহাজই ডিজাইনের দিক থেকে সকলের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। কারণ জাহাজগুলিতে সর্বশেষ প্রযুক্তির বিভিন্ন রকমের স্টেলথ বৈশিষ্ট্য বাস্তবায়িত ছিল; যাতে জাহাজগুলি শত্রু রাডারে অপেক্ষাকৃত ছোট একটা জাহাজ হিসেবে অবির্ভূত হয়। ২০১৫ সালের ডিসেম্বর নাগাদ মিয়ানমারের তিনটা ফ্রিগেটই ভারতে তৈরি রাডারে সজ্জিত হিসেবে দেখা যায়। ডাচ কোম্পানি ‘সিগনাল’এর কাছ থেকে লাইসেন্স নিয়ে তৈরি করা ২’শ ৭০কিঃমিঃ পাল্লার ‘এল-ব্যান্ড’এর ‘আরএডব্লিউএল-০২ মার্ক৩’ রাডারগুলি তৈরি করেছে ভারতীয় কোম্পানি ‘ভারত ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড’ বা ‘বিইএল’। এই একই রাডার ১৯৯০এর দশকে তৈরি জার্মান নৌবাহিনীর ‘ব্র্যান্ডেনবার্গ-ক্লাস’ ফ্রিগেটে ব্যবহার করা হয়েছে। অপেক্ষাকৃত পুরোনো প্রযুক্তির হলেও এই রাডার এখনও যথেষ্টই কার্যকর; বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে তাদের প্রতিযোগী ধরলে।

একইসাথে ভারত মিয়ানমারের এই তিন জাহাজের জন্যে সাবমেরিন খোঁজার সোনার বিক্রি করে। জাহাজগুলিতে যুক্ত হয়েছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ইতালিতে তৈরি ‘আটো মেলারা সুপার র‍্যাপিড’ ৭৬মিঃমিঃ কামান; যা মিনিটে ১’শ ২০ রাউন্ড গোলা ছুঁড়তে সক্ষম। এর তুলনায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ‘বঙ্গবন্ধু’ জাহাজের ৭৬মিঃমিঃ ‘অটো মেলারা কমপ্যাক্ট’ কামান মিনিটে ৮৫ রাউন্ড গুলি ছুঁড়তে সক্ষম। প্রতিপক্ষের জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র থেকে নিজেকে রক্ষা করতে এতে যুক্ত হয়েছে ডেকয় সিস্টেম এবং তিনটা করে ৩০মিঃমিঃ গ্যাটলিং গান। তিনটা জাহাজেই চীনা নির্মিত ‘সি-৮০২’ জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র বসানো হয়। বিমান প্রতিরক্ষার জন্যে এগুলিতে বসানো হয়েছে অতি স্বল্প (৬কিঃমিঃ) পাল্লার ‘ইগলা’ ক্ষেপণাস্ত্র। জাহাজগুলির ইঞ্জিন হলো ফ্রান্সে তৈরি ‘এসইএমটি পিয়েলস্টিক ১৬ পিএ৬ এসটিসি’, যা মোট ২২ হাজার ৮’শ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম। বাংলাদেশের ‘বঙ্গবন্ধু’ জাহাজ থেকে যা ৩৬ শতাংশ বেশি শক্তি দেবে। একারণে ৩ হাজার টনের এই জাহাজগুলির সর্বোচ্চ গতিবেগ বলা হচ্ছে ঘন্টায় প্রায় ৩০ নটিক্যাল মাইল এবং এগুলির পাল্লা হবে প্রায় ৩ হাজার ৮’শ নটিক্যাল মাইল। এছাড়াও জাহাজগুলিতে যুক্ত করা হয়েছে ব্রিটেনে তৈরি ‘সেইলর’ স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন সিস্টেম। প্রতিটা জাহাজে রয়েছে হেলিকপ্টার বহণ করার জন্যে হেলিপ্যাড এবং হ্যাঙ্গার।

মিয়ানমার নৌবাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র কম নেই। ফ্রিগেটগুলি তৈরির আগেই তাদের কাছে ছিল ৪৮টা ‘সি-৮০২’ লঞ্চার। পাঁচ বছরের মাঝে পাঁচটা ফ্রিগেট এবং ২০১৫ সালে ৪৯ মিটার লম্বা একটা স্টেলথ ডিজাইনের মিসাইল বোট যুক্ত হওয়ায় আরও ৪৪টা ‘সি-৮০২’ লঞ্চার যুক্ত হয় তাদের নৌবাহিনীতে; যা কিনা ২০১৫ সাল নাগাদ মোট ‘সি-৮০২’ লঞ্চারের সংখ্যা নিয়ে যায় ৯২টাতে। ২০০৯ সাল নাগাদ বাংলাদেশ নৌবাহিনী অবশেষে মিয়ানমারের দৌড়ের ব্যাপারটা আমলে নিয়েছিল। চীন থেকে অর্ডার করা হয় ‘দুর্জয়-ক্লাস’এর ২টা লার্জ প্যাট্রোল ক্রাফট, যেগুলি মিয়ানমারের ছোট মিসাইল বোটগুলিকে টার্গেট করে অপেক্ষাকৃত ছোট (১’শ ৩০ কেজি ওয়ারহেড) ৩৫কিঃমিঃ পাল্লার ‘সি-৭০৪’ ক্ষেপণাস্ত্রে সজ্জিত করা হয়। ‘টাইপ ০২১’ মিসাইল বোটগুলিতে ৪টা করে ‘সি-৭০৪’ দ্বারা ‘সিল্কওয়ার্ম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিস্থাপিত করা হয়। ব্রিটেন থেকে ‘ক্যাসল-ক্লাস’এর দু’টা অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল কিনে এনে সেগুলিকে ৪টা করে ‘সি-৭০৪’ ক্ষেপণাস্ত্র এবং একটা করে ৭৬মিঃমিঃ কামান দ্বারা সজ্জিত করে কর্ভেটে রূপান্তর করা হয়। ২টা ‘টাইপ ০৫৩এইচ২’ ফ্রিগেট কেনা হয় চীন থেকে; যেগুলি ১’শ ২০কিঃমিঃ পাল্লার ‘সি-৮০২’ ক্ষেপণাস্ত্র দ্বারা সজ্জিত। যুক্তরাষ্ট্র থেকে দু’টা ‘হ্যামিল্টন-ক্লাস’ কাটার বা ফ্রিগেট কেনা হলেও সেগুলি মূলতঃ ট্রেনিং জাহাজ হিসেবেই সার্ভিসে যুক্ত করা হয়। তাই এগুলিতে নতুন করে কোন অস্ত্র সজ্জিত করা হয়নি; বরং দ্রুত নাবিকের সংখ্যা বৃদ্ধি করাটাই ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৫ সালের মাঝেই বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যুক্ত হয় চীন থেকে তৈরি করে আনা দু’টা ‘টাইপ ০৫৬’ কর্ভেট; যেগুলি ৪টা করে ১’শ ৮০কিঃমিঃ পাল্লার ‘সি-৮০২এ’ ক্ষেপণাস্ত্র দ্বারা সজ্জিত। ২০১৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে মোট ৮২টা জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের লঞ্চার যুক্ত হয়েছে; যার মাঝে রয়েছে ৮টা ‘অটোম্যাট’, ২৪টা ‘সি-৮০২’, ১০টা ‘সিল্কওয়ার্ম’, ৩২টা ‘সি-৭০৪’ এবং ৮টা ‘সি-৮০২এ’। এছাড়াও চীন থেকে অর্ডার করা হয় আরও দু’টা ‘টাইপ ০৫৬’ কর্ভেট এবং প্রথমবারের মতো খুলনা শিপইয়ার্ড থেকে অর্ডার করা হয় দু’টা ‘দুর্জয়-ক্লাস’ লার্জ প্যাট্রোল ক্রাফট; যেগুলি ক্ষেপণাস্ত্রের স্থলে বহণ করছে ৬টা করে সাবমেরিন ধ্বংসী টর্পেডো টিউব। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো এন্টি-সাবমেরিন জাহাজ তৈরি করলো বাংলাদেশ। এর মূল কারণ হলো, বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই তাদের প্রথম সাবমেরিন অর্ডার করেছিল এবং শোনা যাচ্ছিলো যে, মিয়ানমারও সাবমেরিন পেতে চাইছে। চীনের কাছ থেকে ২টা ‘টাইপ ০৫৩এইচ৩’ পাওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছিল; যেগুলি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সক্ষমতাকে, বিশেষ করে ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সক্ষমতাকে আবারও একধাপ এগিয়ে নেয়। ২০১৯-২০ অবধি এই ফ্রিগেট, কর্ভেট এবং এলপিসিগুলির ডেলিভারি পাওয়ার আগ পর্যন্ত বাংলাদশ নৌবাহিনী মিয়ানমার নৌবাহিনী থেকে কিছুটা পিছিয়েই থাকে।

তবে মিয়ানমারের ফ্রিগেটগুলির রাডার এবং সোনার তাদেরকে এমন কিছু সক্ষমতা দিয়েছে, যা তাদেরকে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রতিদ্বন্দ্বী করে তোলে। এটা ছিল ভারতের তৃতীয় নিরাপত্তা চিন্তা - প্রক্সি হিসেবে মিয়ানমারকে ব্যবহার। বাংলাদেশ সাবমেরিন পেতে চাইছে জানার পর থেকেই ভারত উঠেপড়ে লাগে মিয়ানমারের জাহাজগুলিকে এন্টি-সাবমেরিন সোনার দিয়ে সজ্জিত করতে। এর আগে বাংলাদেশে সামরিক হস্তক্ষেপের নীতি ফেলে দিতে বাধ্য হওয়ায় এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনী ভারতের দ্বিতীয় নিরাপত্তা চিন্তা অর্থনৈতিক অবরোধকে এড়াতে নিজেকে শক্তিশালী করতে থাকায় এই তৃতীয় চিন্তাতে যেতে বাধ্য হয় ভারত।

২০২০ সাল। মিয়ানমারের প্রথম সাবমেরিন; যা তারা পায় ভারত থেকে। মিয়ানমারকে অস্ত্র সরবরাহ করার জন্যে কাউকেই যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের সন্মুখীন হতে হয়নি। অথচ যুক্তরাষ্ট্র জানে যে, মিয়ানমারের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ এখন ভারত। এহেন দ্বিমুখী নীতির মূল উদ্দেশ্য হলো মিয়ানমারে চীনের প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণ করা ও রাখাইনে চীনের গভীর সমুদ্রবন্দরের জন্যে প্রতিবন্ধকতা তৈরি; এবং একইসাথে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের নৌ-উত্থান নিয়ন্ত্রণ করা, যাতে অত্র অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার বন্ধু রাষ্ট্র ভারতের নৌ-আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে না পড়ে।

ত্রিমাত্রিক মিয়ানমার নৌবাহিনী - ২০০৬-২০২০

২০১৬ সালে আবারও মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে সংঘাত শুরু হয়; যেখানে পশ্চিমা ইন্টেলিজেন্সের ইন্ধন থাকার কথা বলেছেন অনেকেই। মিয়ানমারে অনেকেই বিশ্বাস করতে থাকে যে, বাংলাদেশ পশ্চিমা প্রক্সি হয়ে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সদস্যের উপরে হামলার কাজ করেছে। তবে মিয়ানমারের সরকার এই সুযোগে ১০ লক্ষের বেশি মুসলিমকে রাখাইন প্রদেশ থেকে বিতাড়িত করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়। একইসাথে হাজারো মানুষকে হত্যা করে গণহত্যার উদাহরণ তৈরি করে তারা। পরবর্তীতে মিয়ানমারের নোবেল প্রাইজ জয়ী গণতান্ত্রিক নেতা অং সান সু কি আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর পক্ষে সাফাই গেয়েছিলেন। রাখাইনের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলি জানতো যে, মিয়ানমার সরকারি বাহিনীর উপর হামলা এই পরিস্থতির জন্ম দেবে। যাদেরকে হত্যা করা হবে এবং শরণার্থী বানানো হবে, তারা তো তাদেরই ভাই-বোন-সন্তান। কাজেই এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, মিয়ানমার বাহিনীর উপর হামলা পশ্চিমা ইন্ধনেই হয়েছে। এই ঘটনা মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের মাঝে সম্পর্ককে স্বায়ীভাবে নষ্ট করে এবং বঙ্গোপসাগরে অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে ইন্ধন যোগায়; যদিও মিয়ানমার ২০১৬ সালের আগে থেকেই নিজেকে অস্ত্রসজ্জিত করছিলো।

২০০৬ সালে মিয়ানমারকে ভারত ২টা ‘ব্রিটেন-নরমান বিএন-২ আইল্যান্ডার’ ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান দেয়। ব্রিটেনে তৈরি এই বিমানগুলি ভারতীয় নৌবাহিনী ব্যবহার করছিলো অনেক বছর ধরে। পুরোনো এই বিমানগুলি মিয়ানমারের নৌবাহিনীকে দিয়ে বঙ্গোপসাগরে তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করছে ভারত। পরের বছর তারা আরও দু’টা বিমান সরবরাহ করে। এই বিমানগুলির মাধ্যমে মিয়ানমারের নৌবাহিনী প্রথমবারের মতো আকাশ থেকে সার্ভেইল্যান্স করা এবং তাদের জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রগুলির জন্যে টার্গেট খোঁজার সক্ষমতা পায়। অপরদিকে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে প্রথমবারের মতো দু’টা ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান (ডর্নিয়ার ডিও-২২৮এনজি) যুক্ত হয় ২০১৩ সালে। এর আগে দু’টা ‘আগুস্টা এডব্লিউ ১০৯’ হেলিকপ্টার যুক্ত হয় ২০১১ সালে। ২০২০ সালে মিয়ানমার নৌবাহিনীতে যুক্ত হয় অস্ট্রিয়ায় নির্মিত ‘শাইবেল এস-১০০ ক্যামকপ্টার’ ম্যারিটাইম সার্ভেইল্যান্স ড্রোন। এই ড্রোনগুলি মিয়ানমারের ফ্রিগেট এবং কর্ভেটগুলির টার্গেট খুঁজে পাবার সক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। এছাড়াও ২০১৭ সালে মিয়ানমার বিমান বাহিনীতে যুক্ত হয় ‘এটিআর-৪২’ ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান। এগুলিও মিয়ানমার নৌবাহিনীকে সার্ভেইল্যান্সের মাধ্যমে সহায়তা দিতে পারবে। বিমান সংযোজন ছিল নৌবাহিনীর দ্বিতীয় মাত্র। তবে তৃতীয় মাত্রাটা ছিল কৌশলগত দিক থেকে সবচাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে সাবমেরিন যুক্ত হয় ২০১৬ সালে। ভারতের নীতিনির্ধারকদের মাঝে অনেকেই এটা মেনে নিতে পারেনি। বিশেষ করে বাংলাদেশ চীন থেকে সাবমেরিন কেনায় দিল্লীর মাথাব্যাথা শুরু হয়ে যায়। বাংলাদেশের নৌবাহিনী থেকে ভারতের নৌবাহিনী কমপক্ষে ৫০ গুণ শক্তিশালী হবার পরেও বাংলাদেশের সাবমেরিনকে নিয়ন্ত্রণ করতে মিয়ানমারকে সাবমেরিন খোঁজার সোনার এবং এন্টি-সাবমেরিন টর্পেডো সরবরাহ করতে উঠেপড়ে লাগে ভারত। একইসাথে নিজেদের বাহিনী থেকে রিটায়ার করা রুশ নির্মিত ‘কিলো-ক্লাস’এর সাবমেরিন মিয়ানমারকে দেয়ার জন্যে অগ্রগামী হয় ভারত। ২০২০ সালে মিয়ানমার নৌবাহিনীতে ‘কিলো-ক্লাস’এর সাবমেরিন যুক্ত হবার মাধ্যমে মিয়ানমার নৌবাহিনী ত্রিমাত্রিক বাহিনীতে পরিণত হয়। শুধু তা-ই নয়, মিয়ানমারে ভারতের প্রভাবকে ব্যালান্স করতে চীনও মিয়ানমারকে ‘টাইপ ০৩৫জি’ সাবমেরিন সরবরাহ করে ২০২১ সালে।

 


এর আগে ২০১৯ সালে মিয়ানমার নৌবাহিনীতে যুক্ত হয় সাড়ে ১২ হাজার টনের উভচর মিশনের জাহাজ ডক ল্যান্ডিং শিপ বা এলপিডি ‘মোয়াত্তামা’। জাহাজটা তৈরি করে দক্ষিণ কোরিয়া; যে কিনা যুক্তরাষ্ট্রের খুবই কাছের বন্ধু দেশ। মিয়ানমার নৌবাহিনীর সবচাইতে বড় এই জাহাজ ২৫টা ট্যাংক এবং ৫’শ ২০ জন সেনা বহণ করতে পারে এবং একাধিক হেলিকপ্টার ল্যান্ডিং এবং বহণের সুবিধা রয়েছে এতে। ‘মোয়াত্তামা’ জাহাজটাকে প্রথমবারের মতো মিশনে পাঠানো হয় ২০২২ সালের জুন মাসে। জাহাজটা রাখাইন প্রদেশের কিউকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দরে নোঙ্গর করে। পরে জাহাজটা সিতওয়ের উত্তরে মায়ু নদীর মোহনায় আহ নগু মাও জেটিতে সামরিক সরঞ্জাম পৌঁছে দেয়। সুউচ্চ এবং দুর্গম আরাকান পর্বতের কারণে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশ বাকি মিয়ানমার থেকে প্রায় আলাদা। তাই মিয়ানমারের বাকি এলাকা থেকে রাখাইনে সামরিক সরঞ্জাম পাঠানোর মূল পদ্ধতিই হলো সমুদ্রপথ। ‘মোয়াত্তামা’ জাহাজ এখন মিয়ানমার নৌবাহিনীর ফ্ল্যাগশিপ। এতে রয়েছে অত্যাধুনিক কমিউনিকেশন সরঞ্জাম। পশ্চিমারা যা-ই বলুক না কেন, তাদের তৈরি করা সামরিক কমিউনিকেশন যন্ত্রপাতি মিয়ানমারের হাতে পোঁছানোটা তাদের গোপন ইচ্ছারই প্রতিফলন। এই জাহাজে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ায় তৈরি ‘ব্যারেট ৪০৫০’ এইচএফ ট্রানসিভার, ইতালিতে তৈরি ‘এলমান আরএক্সএইচ-৮১৬১আর’ এমএফ-এইচএফ রিসিভার, চীনা কোম্পানি ‘হাইটেরা’র তৈরি ‘এমআর-৯৫৬০’ ভিএইচএফ ট্রানসিভার এবং জাপানে তৈরি ‘আইকম আইসিএম-৭১০’ এমএফ-এইচএফ ট্রানসিভার।

‘মোয়াত্তামা’ জাহাজটাকে সমর্থন দিচ্ছে পুরোনো ১২টা ল্যান্ডিং ক্রাফট এবং মিয়ানমারের নিজস্ব তৈরি ৬টা এলসিএম (৫৬ মিটার লম্বা; ৪টা ট্যাংক বহণ করে) এবং ২০টা এলসিটি (২৯ মিটার লম্বা; ২টা ট্যাংক বহণ করে)। এলসিএম-গুলি তৈরি করা হয় ২০০৫ থেকে ২০২০ সালের মাঝে। আর এলসিটি-গুলি তৈরি করা হয় ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মাঝে। এই জাহাজগুলি মূলতঃ মার্কিন ল্যান্ডিং ক্রাফটের অনুসারে ডিজাইন করা হয়েছে। এই ডিজাইনের বিশেষত্ব হলো, এই বোটগুলি বড় উভচর জাহাজের পিছনের ডকের ভিতরে ঢুকে যায় এবং জাহাজের ভেতর থেকে সামরিক গাড়িগুলি সরাসরি এই বোটগুলিতে উঠে যায়। যেকারণে এগুলির সুপারস্ট্রাকচার থাকে ছোট এবং নিচু; গাড়ি ওঠাবার সুবিধা থাকে বেশি। মোটকথা উভচর সক্ষমতা তৈরিতে মিয়ানমার যুক্তরাষ্ট্রকেই অনুসরণ করেছে। ‘মোয়াত্তামা’ জাহাজ থেকে সেনা, গাড়ি এবং রসদ দ্রুত উপকূলে নামাবার জন্যে এই ল্যান্ডিং ক্রাফটগুলি সহায়তা করবে। অপরদিকে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ল্যান্ডিং ক্রাফটগুলি চওড়া এবং সুপারস্ট্রাকচার বেশ বড় এবং উঁচু। এগুলিকে ডিজাইন করা হয়েছে উপকূলের একস্থান থেকে অন্যস্থানে সৈন্য নিয়ে যাওয়ার জন্যে।

ইস্রাইলের কাছ থেকে কিছু ‘সুপার ভোরা’ প্যাট্রোল ক্রাফটও কিনেছে মিয়ানমার। ২০১৬ সালে যুক্ত হয়েছে কর্ভেট ‘তাবিনশোয়েতি’; যেটাতে ৪টা ‘সি-৮০২’ ক্ষেপণাস্ত্রের সাথে যুক্ত হয়েছে ভারতীয় রাডার, সোনার এবং এন্টি-সাবমেরিন টর্পেডো। ২০২০ সালে তারা যুক্ত করেছে ২টা সাবমেরিন চেজার; যেগুলির একেকটা ৬টা করে ভারতীয় ‘শায়েনা’ এন্টি-সাবমেরিন টর্পেডো দ্বারা সজ্জিত; বাংলাদেশের সাবমেরিন যেগুলির টার্গেট। ২০২০ সালে যুক্ত হয়েছে স্টেলথ ডিজাইনের ২য় ৪৯ মিটার লম্বা মিসাইল বোট; যেগুলিতে বহণ করা হচ্ছে ৪টা করে ‘সি-৮০২’ ক্ষেপণাস্ত্র। ২০১৭ এবং ২০২১ সালে যুক্ত হয়েছে দু’টা ওপিভি।


মিয়ানমার নৌবাহিনী - একটা বিশ্লেষণ

এখনও মিয়ানমার নৌবাহিনীর একটা বড় অংশ হলো প্যাট্রোল বোট এবং লজিস্টিকস জাহাজ। ১৩টা মিসাইল বোটের সাথে রয়েছে মোটামুটিভাবে বড় আকারের ৪০টা প্যাট্রোল ক্রাফট। ছোট আকারের বোট রয়েছে বহু। এগুলি দেখিয়ে দেয় মিয়ানমারের ১৪’শ কিঃমিঃ উপকূল এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের বাস্তবতা। কিন্তু ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান, ম্যারিটাইম ড্রোন, সাবমেরিন, ডক ল্যান্ডিং শিপ, ফ্রিগেট, কর্ভেট, মিসাইল বোট, ইত্যাদি সকল কিছুই গত তিন দশকের মাঝে যুক্ত হয়েছে মিয়ানমার নৌবাহিনীতে। ১৯৮০এর দশকের সেই মিয়ানমার নৌবাহিনী এখন আর নেই; যখন বাংলাদেশের নৌবাহিনীর ধারেকাছেও ছিল না তাদের সক্ষমতা। তখন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং বিশাল উপকূলে আইন শৃংখলা বজায় রাখাই ছিল মিয়ানমার নৌবাহিনীর মূল কাজ। অপরদিকে বাংলাদেশ নৌবাহিনী প্রথম থেকেই ফ্রিগেট, কর্ভেট, ওপিভি এবং অন্যান্য দূর পাল্লার জাহাজের উপরে নির্ভর করেছে। কারণ বাংলাদেশের নৌ-চিন্তাতে সমুদ্র বাণিজ্যের নিরাপত্তা সবসময় প্রাধান্য পেয়েছে।

কিন্তু ১৯৯০এর দশক থেকেই মিয়ানমার নৌবাহিনী বাংলাদেশকে টার্গেট করে নিজেদের ডেভেলপ করতে থাকে। রাখাইন প্রদেশে ১৯৯১ সাল থেকে শুরু হওয়া বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে বাংলাদেশ পশ্চিমাদের প্রক্সি হয়ে ইন্ধন যোগাচ্ছে - এটা মিয়ানমারের অনেকেই বিশ্বাস করে। এছাড়াও ২০০৮ সালের নৌ-উত্তেজনা দেখিয়ে দেয় যে, মিয়ানমার তার সমুদ্র সম্পদ আহরণের নিরাপত্তা দিতেও সমধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। কারণ এটা তাদের অর্থনীতিতে বিরাট অংকের বৈদেশিক মুদ্রা যোগাচ্ছে। বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও চাইছে মিয়ানমারের নৌবাহিনী শক্তিশালী হোক। একারণে ভারত এবং দক্ষিণ কোরিয়া মিয়ানমারের নৌবাহিনীকে সক্ষমতার দিক থেকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। চীন মিয়ানমারকে অনেক অস্ত্রই দিয়েছে; কিন্তু সেগুলি বাংলাদেশের থেকে এগিয়ে যাবার জন্যে যথেষ্ট ছিল না। অপরদিকে ভারতের দেয়া সাবমেরিন, রাডার, সোনার, এন্টি-সাবমেরিন টর্পেডো, ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার দেয়া ডক ল্যান্ডিং শিপ মিয়ানমারের নৌবাহিনীকে ‘ব্লু-ওয়াটার নেভি’ হিসেবে গড়ে দিয়েছে। মিয়ানমারের নৌবাহিনীর লক্ষ্য হলো বঙ্গোপসাগরে বড় বড় শক্তিশালী রাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক লক্ষ্যের একপ্রকারের খিচুরি।

পশ্চিমা দেশগুলি মিয়ানমারকে নামে বেনামে বিভিন্নভাবে অস্ত্র, ইলেকট্রনিক্স এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে। অনেক ক্ষেত্রে পশ্চিমাদের তৈরি করা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সুবিধা নিয়েই মিয়ানমার এগুলি করেছে। মিয়ানমারকে অস্ত্র সরবরাহ করার জন্যে কাউকেই যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের সন্মুখীন হতে হয়নি। অথচ যুক্তরাষ্ট্র জানে যে, মিয়ানমারের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ এখন ভারত। এহেন দ্বিমুখী নীতির মূল উদ্দেশ্য হলো মিয়ানমারে চীনের প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণ করা ও রাখাইনে চীনের গভীর সমুদ্রবন্দরের জন্যে প্রতিবন্ধকতা তৈরি; এবং একইসাথে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের নৌ-উত্থান নিয়ন্ত্রণ করা, যাতে অত্র অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার বন্ধু রাষ্ট্র ভারতের নৌ-আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে না পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের সবচাইতে কাছের বন্ধু দক্ষিণ কোরিয়া চুপিসারে মিয়ানমারের জন্যে সাড়ে ১২ হাজার টনের বিশাল ডক ল্যান্ডিং শিপ তৈরি করে দিয়েছে; যা এখন রাখাইনে গণহত্যায় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর রসদ সরবরাহ করছে। এবং একইসাথে এই জাহাজের মাধ্যমে মিয়ানমার প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিনস দ্বীপের উপর সত্যিকারের হুমকি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এই জাহাজের কমিউনিকেশন যন্ত্রপাতি এসেছে অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, জাপান এবং চীন থেকে। মিয়ানমার নৌবাহিনীর বড় যুদ্ধজাহাজগুলির বেশিরভাগই এখন ইতালিতে তৈরি ৭৬মিঃমিঃ কামান, ভারতে তৈরি রাডার, সোনার ও টর্পেডো এবং ব্রিটেনে তৈরি স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন যন্ত্রপাতি দ্বারা সজ্জিত। ভারত আবার এই রাডার তৈরি করেছে ডাচ কোম্পানি ‘সিগনাল’ (বর্তমানে থালেস)এর লাইসেন্স নিয়ে। অথচ বাংলাদেশ চীন থেকে সাবমেরিন কেনার পর সারা দুনিয়ার মিডিয়ায় যেন ভূমিকম্প হয়ে গিয়েছিল! চীনের সহায়তায় কক্সবাজারের পেকুয়াতে বাংলাদেশের ‘সাবমেরিন ফ্লীট হেডকোয়ার্টার্স’ তৈরিও ভারত ও পশ্চিমারা পছন্দ করেনি। কারণ বাংলাদেশের হাতে ‘সাবমেরিন ফ্লীট’ বা শক্তিশালী নৌবাহিনী পশ্চিমাদের বঙ্গোপসাগর নিয়ন্ত্রণ-চেষ্টার বিরুদ্ধে। এখন তারা চাইছে মিয়ানমারকে প্রক্সি হিসেবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে; যাতে করে কোন একটা সময় মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের যুদ্ধ লাগিয়ে বাংলাদেশের সামরিক শক্তিকে নিঃশেষ করে ফেলা যায়। একারণেই তারা রাখাইনের মুসলিম শরণার্থীদের নিজেদের ভূমিতে ফেরত যাবার বিরোধী। তারা চাইছে এই মানুষগুলিকে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে অমানুষিক পরিবেশে রেখে দিয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সাবভার্সনে ব্যবহার করতে এবং মিয়ানমারের সাথে সংঘর্ষে জ্বালানি হিসেবে পোড়াতে। চিন্তাহীন মিয়ানমারও না বুঝেই সেই পথেই হাঁটছে। ১৯৯১ সাল থেকে মিয়ানমার নৌবাহিনীর একটাই কাজ - বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে চ্যালেঞ্জ করা; যা কিনা বঙ্গোপসাগরে পশ্চিমা আদর্শিক শক্তিদের লক্ষ্যের বাস্তবায়নে একটা অধ্যায়।



সূত্রঃ


‘BNS Abu Bakar - Ex RN Frigates (BNS UF,AB,AH)’ in Global Security (https://www.globalsecurity.org/military/world/bangladesh/bns-abu-bakr.htm)

‘Rohingya exodus in 1978: A history of systematic eviction’ by Probir Kumar Sarker, Dhaka Tribune, 31 August 2021

‘Myanmar and Israel develop military pact’ by William Ashton in Jane's Intelligence Review, 01 March 2000

‘Myanmar Navy Latest Corvette UMS Tabinshwehti Likely Operational’ in Navy Recognition, 15 November 2016

‘Daewoo to explore more gas in Myanmar’ in Mint, 06 April 2007

‘Bangladesh and Burma send warships into Bay of Bengal’ in The Guardian, 04 November 2008

‘Myanmar stops disputed gas exploration -Bangladesh officials’ in Reuters, 06 November 2008

‘Navy decommissions first two frigates’ in Dhaka Tribune, 22 January 2014

‘Upsurge in Indo-Myanmar Naval Cooperation’ by Rear Admiral (ret) Sushil Ramsay in SP’s Naval Forces, Issue 4, 2013

‘Tự đóng chiến hạm tàng hình cỡ lớn, CNQP Myanmar đã vượt mặt VN’ in SOHA, 11 December 2015 (in Vietnamese) (https://soha.vn/quan-su/tu-dong-chien-ham-tang-hinh-co-lon-cnqp-myanmar-da-vuot-mat-vn-20151211001902439.htm)

‘RAWL-02’ in Radar Tutorial (https://www.radartutorial.eu/19.kartei/07.naval2/karte038.en.html)

‘LW 08 “Jupiter”’ in Radar Tutorial (https://www.radartutorial.eu/19.kartei/07.naval/karte005.en.html)

‘Update: Myanmar Navy commissions its first LPD amphibious assault ship’ in Janes, 27 December 2019

‘Myanmar Navy has commissioned seven new warships and one submarine’ in Navy Recognition, 26 December 2020

‘Myanmar Navy commissions Type 35B Ming-class submarine’, in Naval Technology, 27 December 2021

‘Myanmar Navy commissions Type 035 Ming-class submarine’ in Naval Today, 27 December 2021

‘75th Anniversary Tatmadaw (Navy): Commissioning Ceremony of Navy Vessels’ in MITV, 24 December 2022

‘Myanmar gets India's maritime aircraft’ in Hindustan Times, 12 May 2007

‘Bangladesh Navy Do228NG emerges from its stable’ in Scramble, 20 October 2021

‘S-100 Camcopter Operating Onboard of Myanmar Navy's Ships’ in Defense Studies, 27 July 2020 (http://defense-studies.blogspot.com/2020/07/s-100-camcopter-operating-onboard-of.html)

‘Myanmar: Fact-finding mission identifies businesses linked to the military that is accused of serious rights violations; some companies respond’ in Business and Human Right Resource Centre, 13 February 2020 (https://www.business-humanrights.org/en/latest-news/myanmar-fact-finding-mission-identifies-businesses-linked-to-the-military-that-is-accused-of-serious-rights-violations-some-companies-respond/)

‘Chinese Supply Submarines to Bangladesh (Gravitas)’ in WION, 19 November 2016 (https://www.youtube.com/watch?v=hc-J96QmJ_o)

‘India’s World- Chinese submarines and Sino-Bangladesh defence ties’ in SansadTV, 22 November 2016 (https://www.youtube.com/watch?v=2BOqaLnIZ6s)

‘Bangladesh in Submarine Era : Amb. Muhammad Zamir and Maj. Gen. Abdur Rashid’ in EkattorTV, 29 March 2017 (https://www.youtube.com/watch?v=FpFPcYOUaOw&t=14s)

‘The Myanmar military are using Australian radios to commit atrocities’ in Justice for Myanmar, 18 October 2021 (https://www.justiceformyanmar.org/stories/the-myanmar-military-are-using-australian-radios-to-commit-atrocities)

‘What Myanmar’s New Amphibious Ship Says About Its Naval Ambitions’ by Mohammad Rubaiyat Rahman in The Diplomat, 09 November 2019

‘India gifts a submarine to Myanmar, gains edge over China’ in The Hindustan Times, 21 October 2020

‘With an eye on China, India gifts submarine to Myanmar’ in Nikkei Asia, 22 October 2020

‘Myanmar Navy boosts amphibious capability, adds UAV’ in Janes, 03 January 2019

‘Myanmar Navy flagship supports troop buildup in western Rakhine’ in Janes, 06 June 2022

‘Landing Craft, Mechanized and Utility - LCM/LCU’ in America’s Navy, updated 17 Jan 2019 (https://www.navy.mil/Resources/Fact-Files/Display-FactFiles/Article/2171588/landing-craft-mechanized-and-utility-lcmlcu/)

‘Myanmar Navy commissions seven new vessels’ in Mizzima, 29 December 2017

‘Myanmar Navy Commissions Some Asset’ in Defense Studies, 27 December 2016 (http://defense-studies.blogspot.com/2016/12/myanmar-navy-commissions-some-asset.html)

‘Myanmar Strengthens Navy’ in TurDef, 23 January 2023

‘Australian, Italian Chinese & Japanese biz provided comms systems for Myanmar Navy’s UMS Mottama warship’ by Justive for Myanmar, 24 May 2023 (https://twitter.com/JusticeMyanmar/status/1661314128991092737)

Saturday, 8 July 2023

পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালি থেকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী সরিয়ে নেবার ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

০৮ই জুলাই ২০২৩

মালি, সেপ্টেম্বর ২০১৭। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা মিশনে নিহত তিনজন বাংলাদেশী সেনার মৃতদেহ বহণ করছে। শক্তিশালী দেশগুলির ভূরাজনৈতিক স্বার্থ এবং তাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বলি হয়েছে তৃতীয় বিশ্বের ৩ শতাধিক সেনা; যারা অর্থের বিনিময়ে মালির মরুভূমিতে শক্তিশালী দেশগুলির স্বার্থরক্ষা করেছে।

পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালিতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর মিশন ২০২৩এর ৩০ জুন পর্যন্ত থাকার কথা ছিল, যদি সেই মিশনের সময় বৃদ্ধি করা না হতো। কিন্তু জাতিসংঘের অনুরোধ সত্ত্বেও জাতিসংঘে মালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুলায়ে দিওপ মিশনের ইতি টানার কথা বলেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, মালিতে নিরাপত্তার যেই চ্যালঞ্জগুলি রয়েছে, সেগুলির সমাধান দিতে ব্যার্থ হয়েছে এই মিশন। এছাড়াও মালি সরকার অভিযোগ করে যে, জাতিসংঘ মিশন সেদেশে জাতিগত বিদ্বেষ তৈরি করছে, যেকারণে মালির শান্তি নষ্ট হচ্ছে, এবং দেশের মানুষকে সহিংসতা ভুলে গিয়ে শান্তির পথে এগুতে বাধা সৃষ্টি করছে। অপরদিকে জাতিসংঘ অভিযোগ করছে যে, ২০২২ সালের মার্চে মালির সেনাবাহিনী এবং রুশ ভাড়াটে সেনারা দেশের মধ্যাঞ্চলে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে ৫’শরও বেশি বেসামরিক লোককে হত্যা করেছে। এছাড়াও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী অভিযোগ করেছে যে, মালির সরকার শান্তিরক্ষী মিশনের কর্মকান্ডে নিয়মিতভাবে বাধা সৃষ্টি করেছে। এহেন অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ৩০শে জুন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ফ্রান্সের প্রস্তাবিত এক রেজোলিউশনে ভোটাভুটির পর সর্বসম্মতিক্রমে ২০২৩এর ৩১শে ডিসেম্বরের মাঝে মালি থেকে শান্তিরক্ষী বাহিনী সরিয়ে নেবার সিদ্ধান্ত হয়। একইদিনে জাতিসংঘের প্রশাসনিক এবং আর্থিক ৫ম কমিটির সভায় আগামী ছয় মাসের জন্যে মালির মিশনের জন্যে ৫’শ ৯০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়; যা স্বাভাবিক বার্ষিক বাজেটের অর্ধেক।

২০১৩ সালে মালির উত্তরাঞ্চলে ‘আল-কায়েদা’ সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীদের কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সেখানে ইতোমধ্যেই মোতায়েন করা ফরাসি বাহিনীর সমর্থনে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনের ওয়েবসাইট অনুযায়ী গত ফেব্রুয়ারি মাসে মালিতে মোট ১৭ হাজার ৪’শ ৩০ জন বিদেশী শান্তিরক্ষী মোতায়েন ছিল। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, দশ বছর পরেও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন থাকা অঞ্চলে শান্তি ফিরে আসেনি। বছরে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার খরচে এই মিশনের সাফল্য নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন রয়েছে। তবে এই মিশনের সাফল্য পাবার ক্ষেত্রে একটা বড় বাধা ছিল ২০২০ সালের অগাস্টের সামরিক অভ্যুত্থান; যার প্রধান কারণ ছিল বিদ্রোহী গোষ্ঠিগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করায় ব্যার্থতা। এরপর ২০২১এর মে মাসে দ্বিতীয়বার সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। সেসময় থেকেই মালির সরকার অভিযোগ করতে থাকে মালির পরিস্থতিকে অশান্ত করছে প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্স।

মালিতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশন পরিচালনা সত্ত্বেও সহিংতার কমতি হয়নি। মালিতে জাতিসংঘ বাহিনী মোতায়েনের তিন বছর পর ২০১৬ সালের জুন মাসে জাতিসংঘের নিজস্ব মিডিয়া ‘ইউএন ডিসপ্যাচ’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের পর শান্তিরক্ষীরাই সেখানে জঙ্গি গোষ্ঠিগুলির প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছে। মার্কিন গবেষণা সংস্থা ‘আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন এন্ড ইভেন্ট ডাটা’ বা ‘এসিএলইডি’ পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলিতে সহিংসহতার নিয়মিত হিসেব রাখছে। তাদের হিসেবে মালিতে সহিংস ঘটনার সংখ্যা কমেনি; বরং বেড়েছে। ২০২০ সালে প্রায় ৩ হাজার সহিংস ঘটনা থেকে ২০২১ সালে কমে গিয়ে ২ হাজারের নিচে নেমে গেলেও ২০২২ সালে তা সাড়ে ৪ হাজার পেরিয়েছে। একইসাথে জঙ্গি সংগঠনগুলিতে মালির জনগণ রিক্রুটিংও বেড়েছে। গত এক দশকে সেখানে ৩’শরও বেশি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী সদস্য নিহত হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, মালি থেকে এই সংঘাত আশেপাশের দেশ বুরকিনা ফাসো এবং নিজেরএ ছড়িয়ে পড়েছে।

‘বিবিসি’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, রাশিয়া এবং চীন মালির এই মিশনের সমালোচনা করেছে ও ব্রিটেন এবং সুইডেন সেখানে সেনা মোতায়েনে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ২০২২ সালে মালি সরকারের বিরুদ্ধাচরণের ফলস্বরূপ ফ্রান্স মালি থেকে তাদের সেনা সরিয়ে নেবার সিদ্ধান্ত নেয়। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর হতাশা ছিল, মালির সামরিক সরকার দেশটাতে নির্বাচন দিতে দেরি করছে এবং তারা নিরাপত্তার জন্যে রুশ ভাড়াটে সেনাবাহিনী ‘ওয়াগনার গ্রুপ’এর হাজারখানেক সদস্যকে সেখানে মোতায়েন করেছে।

প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন সীমিত করতে চেয়েছিলেন। জো বাইডেন প্রশাসন ট্রাম্পের নীতি পরিবর্তন করলেও অর্থায়নের ক্ষেত্রে তা অনেক ক্ষেত্রেই মার্কিন কংগ্রেসের উপর নির্ভরশীল। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’ বা ‘সিএফআর’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনের বাজেটের ২৭ শতাংশ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সমস্যা হলো, ২০০১ সাল থেকে মার্কিন কংগ্রেস জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাজেটের ২৫ শতাংশ পর্যন্ত দিতে রাজি হয়েছে; এর বেশি অংশ যুক্তরাষ্ট্র দেবে না। একারণেই প্রতিবছরের শান্তিরক্ষী বাজেটে যুক্তরাষ্ট্র বড় একটা অংক বাকি রেখে দিচ্ছে। তবে ৮ বছরের মাঝে তিনগুণ বাড়িয়ে ২০২১ সাল নাগাদ চীন শান্তিরক্ষী বাজেটের ১৫ শতাংশ অর্থায়ন করে। তথাপি শান্তিরক্ষী মিশনে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য দেশগুলি তেমন কোন সেনা মোতায়েন করে না। এই শূণ্যস্থান পূরণ করছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ; যারা অর্থের বিনিময়ে মিশনে সেনা পাঠায়।

ব্রিটিশ থিংকট্যাংক ‘চ্যাটহ্যাম হাউজ’এর গবেষক পল মেলি ‘আল জাজিরা’কে বলছেন যে, শান্তিরক্ষীরা চলে যাবার ফলে মালির কিছু অঞ্চলে সরকার বিভিন্ন সার্ভিস দিতে ব্যর্থ হবে এবং বিদ্রোহীদের সাথে সরকারের নতুন করে সংঘাত হতে পারে। কিন্তু পল মেলি এড়িয়ে গেছেন যে, এক দশকেও জাতিসংঘ মালিতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়নি। মালি থেকে শান্তিরক্ষী বাহিনী সরিয়ে ফেলার ক্ষেত্রে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয়েছে। অর্থাৎ ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, রাশিয়া এবং চীন সেই প্রস্তাবে সমর্থন দিয়েছে। যা প্রমাণ করে যে, শক্তিশালী দেশগুলির স্বার্থ ছিল মালি থেকে সেনা প্রত্যাহারের পিছনে; যার ঠিক উল্টোটা ছিল মালিতে সেনা মোতায়েনের সময়। শান্তিরক্ষী মিশন যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না, সেই বাস্তবতাটা এক দশক ধরেই ছিল; কিন্তু ২০২৩ সালে শক্তিশালী দেশগুলির স্বার্থ একত্রিত হওয়ায় মিশনের সমাপ্তি ঘটছে। শান্তিরক্ষী মিশনের অর্থায়ন অনেক ক্ষেত্রেই মার্কিন কংগ্রেসের মর্জির উপরে নির্ভরশীল; যা আবার যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সাথে জড়িত। অর্থাৎ শক্তিশালী দেশগুলির ভূরাজনৈতিক স্বার্থ এবং তাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বলি হয়েছে তৃতীয় বিশ্বের ৩ শতাধিক সেনা; যারা অর্থের বিনিময়ে মালির মরুভূমিতে শক্তিশালী দেশগুলির স্বার্থরক্ষা করেছে।

Monday, 3 July 2023

‘ব্রিকস’এর সম্প্রসারণের সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক ফলাফল

০৩রা জুলাই ২০২৩

কেপ টাউন। ০২রা জুন ২০২৩। 'ব্রিকস' পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক। নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থে অনেক দেশ ‘ব্রিকস’এর সদস্য হতে চাইলেও পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প হয়ে ওঠার মতো অবস্থান ‘ব্রিকস’ তৈরি করতে পারেনি। ভারত এবং চীনের মতো কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী দু’টা দেশ ‘ব্রিকস’এর সদস্য হওয়ায় সংস্থার লক্ষ্যের দৃঢ়তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সংস্থার রাজনৈতিক কর্মকান্ড এখনও কিছু বিবৃতির মাঝেই সীমাবদ্ধ।

গত ২রা জুন সাউথ আফ্রিকার কেপ টাউনে ‘ব্রিকস’ জোটের উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলির পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক হয়ে গেলো। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, পশ্চিমা বৈশ্বিক নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার উদ্দেশ্য নিয়ে হয়ে যাওয়া এই বৈঠকে প্রতিষ্ঠাতা দেশ ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং সাউথ আফ্রিকা সংস্থাটার সম্প্রসারণ নিয়ে কথা বলেছে। একসময় বিশ্বের বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে থাকা পাঁচটা রাষ্ট্রের হাল্কা বন্ধনের উপরে গঠিত সংস্থা বলে মনে করা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে চীনের প্রচেষ্টায় এর কর্মকান্ড নির্দিষ্ট রূপ ধারণ করতে থাকে। আর ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়াও সংস্থাটাকে শক্তিশালী করতে আগ্রহী হয়েছে। গত বছর ‘ব্রিকস’এর এক অনলাইন বৈঠকে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়া ইয়ি বলেন যে, চীন চাইছে ‘ব্রিকস’এর সম্প্রসারণের প্রক্রিয়া শুরু করতে এবং ধীরে ধীরে এব্যাপারে সদস্য দেশগুলির মাঝে একটা সমঝোতায় পৌঁছতে। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, চীনের এই প্রস্তাবের পর থেকে সদস্য দেশগুলি সম্প্রসারণের জন্যে নিজেদের মনোনীত দেশগুলির নামের তালিকা দিতে শুরু করেছে।

ইরান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কিউবা, ডি আর কঙ্গো, কমোরুজ, গ্যাবন এবং কাজাখস্তান এবারের বৈঠকে ‘ফ্রেন্ডস অব ব্রিকস’ আলোচনার জন্যে তাদের প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল। এছাড়াও মিশর, আর্জেন্টিনা, বাংলাদেশ, গিনি বিসাউ এবং ইন্দোনেশিয়া এবারের বৈঠকে ভার্চুয়ালি অংশ নেয়। ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর সাংবাদিকদের বলেন যে, ‘ব্রিকস’এর বৈঠকে আলোচনা হয়েছে যে, সংস্থার সদস্যপদ পেতে কি রকমের নীতি, মানদন্ড বা শর্ত থাকবে, এবং কোন পদ্ধতিতে সম্প্রসারণ হবে। আগামী অগাস্টে জোহান্সবার্গে ‘ব্রিকস’এর শীর্ষ বৈঠকের আগে এই ব্যাপারগুলি নিয়ে আলোচনা চলবে।

‘ব্রিকস’এ যোগ দেয়ার জন্যে বিভিন্ন দেশের ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ রয়েছে; যার মাঝে আর্থিক বিনিয়োগই প্রধানতম। ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সৌদি আরব ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ বা ‘এনডিবি’র সদস্য হিসেবে যুক্ত হবে কিনা, সেব্যাপারে আলোচনা চলছে বলে ব্যাংকের এক বিবৃতিতে বলা হয়। ‘এনডিবি’ হলো ‘ব্রিকস’এর আর্থিক সংস্থা; যাকে কিনা বিশ্বব্যাংক এবং ‘আইএমএফ’এর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রতিষ্ঠাতা দেশ রাশিয়ার অর্থনৈতিক সমস্যা ‘এনডিবি’র অর্থের উৎসকে চাপের মাঝে ফেলেছে; কারণ এই ব্যাংকে রাশিয়ার ১৯ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। ইতোমধ্যেই ‘এনডিবি’ ‘ব্রিকস’এর বাইরে সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিশর, বাংলাদেশ এবং উরুগুয়েকে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং ৩৩ বিলিয়ন ডলার এই দেশগুলিতে বিনিয়োগ করেছে। ব্যাংকের ডিরেক্টর জেনারেল আশওয়ানি মুথু এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে, এই মুহুর্তে অর্থের যোগান সংস্থার জন্যে বড় চ্যালেঞ্জ। একারণে চীনা মুদ্রা ইউয়ান এবং সাউথ আফ্রিকার মুদ্রা র‍্যান্ডে ব্যাংক অর্থ যোগাড় করছে।

‘ব্রিকস’এর সম্প্রসারণ একবার ইতোমধ্যেই হয়ে গিয়েছে। ফ্রান্সের ‘লে মন্ড’ পত্রিকার এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ এবং ‘গোল্ডমান সাকস’এর অর্থনীতিবিদ জিম ওনীল ২০০১ সালে যখন সর্বপ্রথম ভবিষ্যতের চারটা বড় অর্থনীতি নিয়ে কথা বলেন, তখন তার মাঝে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত এবং চীন থাকলেও সাউথ আফ্রিকা ছিল না। অর্থাৎ চারটা দেশকে একত্রে ওনীল ‘ব্রিক’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে সাউথ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমার দীর্ঘ সময়ের কূটনীতির ফলাফলস্বরূপ দেশটা নতুন এই সংস্থার অন্তর্ভুক্ত হয় এবং এর নাম পরিবর্তিত হয়ে দাঁড়ায় ‘ব্রিকস’। ওনীল বলেছিলেন যে, সাউথ আফ্রিকার এই সংস্থায় যুক্ত হওয়াটা অর্থহীন। তবে যদি দেশটাকে পুরো আফ্রিকার প্রতিনিধি হিসেবে দেখা হয়, তাহলে ব্যাপারটা অন্যরকম। ওনীলএর এই চিন্তাটা সাউথ আফ্রিকার চিন্তাবিদেরা কিভাবে দেখছে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। ‘প্রিটোরিয়া ইউনিভার্সিটি’র লায়াল হোয়াইট বলছেন যে, সাউথ আফ্রিকার ভবিষ্যৎ হলো আফ্রিকার বাজার ধরা; এখানে বাইরের কাউকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নিয়ে আসাটা বিপজ্জনক।

ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতির বিশ্লেষক ইন্দ্রানি বাগচি ‘দ্যা টাইমস অব ইন্ডিয়া’র এক লেখায় বলছেন যে, ‘ব্রিকস’এর সম্প্রসারণ উভয় সংকট তৈরি করতে পারে। যেহেতু ‘ব্রিকস’এর সদস্য রাষ্ট্রগুলি পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণকে পাশ কাটিয়ে একটা অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্বব্যবস্থা চাইছে, সেহেতু রাশিয়া এবং চীন উভয়কেই সাবধান হতে হবে যে, ‘ব্রিকস’এর নতুন সদস্য দেশগুলির মাঝে কোন একটাকে যুক্তরাষ্ট্র তার নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারে কিনা। যুক্তরাষ্ট্র তার পুরোনো বন্ধু দেশগুলির সাথে সম্পর্কে টানাপোড়েন হলে সেখান থেকে পরিস্থতি ঘুরিয়ে ফেলতে পরিপক্ক। তিনি বিশেষ করে সৌদি আরবের কথা উল্লেখ করেন।

অনেক প্রশ্ন থাকলেও ‘ব্রিকস’কে অনেকেই পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে দেখার চেষ্টা করছে। সাউথ আফ্রিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী নালেদি পান্ডর কেপ টাউনের বৈঠকে বলেন যে, করোনা মহামারির সময়ে ধনী দেশগুলি এবং বৈশ্বিক সংস্থাগুলি যখন উন্নয়নশীল দেশগুলিকে উপেক্ষা করেছিল, তখন ‘ব্রিকস’ এই দেশগুলির পাশে দাঁড়িয়েছে। উন্নত দেশগুলি কথা দিয়ে কথা রাখেনি এবং তারা সকল দায় উন্নয়নশীল দেশগুলির উপরে চাপিয়ে দিয়েছে। ডি আর কঙ্গোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফে লুতুনদুলা আপালা বলেন যে, তার দেশ নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থা তৈরি করে পরিবর্তন আনার জন্যে ‘ব্রিকস’কে উৎসাহ যোগাবে; কারণ সামষ্টিক শান্তি এবং উন্নয়নে উন্নত দেশগুলির কোন রাজনৈতিক সদিচ্ছা নেই। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা ‘দ্যা গ্লোবাল টাইমস’ বলছে যে, নতুন সদস্য যুক্ত হলে ‘ব্রিকস’ আরও শক্তিশালী হবে।

নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থে অনেক দেশ ‘ব্রিকস’এর সদস্য হতে চাইলেও পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প হয়ে ওঠার মতো অবস্থান ‘ব্রিকস’ তৈরি করতে পারেনি। ভারত এবং চীনের মতো কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী দু’টা দেশ ‘ব্রিকস’এর সদস্য হওয়ায় সংস্থার লক্ষ্যের দৃঢ়তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সংস্থার রাজনৈতিক কর্মকান্ড এখনও কিছু বিবৃতির মাঝেই সীমাবদ্ধ। তথাপি অর্থায়নের জন্যে চীনের উপর নির্ভরশীলতা এবং মার্কিন ডলার-কেন্দ্রিক পশ্চিমা পুঁজিবাদী আর্থিক ব্যবস্থাকে বাইপাস করতে না পারাটাও সংস্থার বড় দুর্বলতা। ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’ বলছে যে, ‘ব্রিকস’এর ব্যাংক ‘এনডিবি’ এবং চীনা নেতৃত্বের ‘এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক’ বা ‘এআইআইবি’ ইতোমধ্যেই পশ্চিমা ক্রেডিট রেটিং এজেন্সির চাপে পড়ে অর্থায়নের খরচ কমাতে রাশিয়াতে তাদের বিনিয়োগ কার্যক্রমকে স্থগিত করেছে। ডলার-ভিত্তিক ঋণ নেয়াকে সহজ করতেই ‘এনডিবি’র নীতিতে পরিবর্তন আনতে হয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় যে, পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে আবির্ভাবের কথা বললেও মার্কিন ডলারের উপরে নির্ভরশীলতাকে এড়াতে পারেনি ‘ব্রিকস’।

Saturday, 1 July 2023

ফ্রান্সে আবারও বিক্ষোভ… সামাজিক অবিচার, নাকি দুর্বল রাষ্ট্রের উদাহরণ?

০১লা জুলাই ২০২৩

সাম্প্রতিক সময়ে ফ্রান্সে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন এবং পেনশন সংস্কারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের পর এবারের বর্ণবাদ-বিরোধী বিক্ষোভ শুধুমাত্র সামাজিক অবিচারকেই তুলে ধরে না, রাষ্ট্রের দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে আসে।

গত ২৭শে জুন ফ্রান্সের নঁতেরে শহরে ১৭ বছর বয়সী এক যুবককে পুলিশ গুলি করে হত্যা করার পর থেকে পুরো ফ্রান্স জুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ চলছে। ভিডিওতে ধারণ করা এই ঘটনায় দেখা যায় যে, পুলিশ একটা ট্রাফিক সিগনালে খুব কাছে থেকে কাউকে গুলি করছে। সকাল ৯টার দিকে দু’জন পুলিশ গাড়িটা আটকাবার পর চালক গাড়ি চালিয়ে চলে যাবার চেষ্টা করলে পুলিশ তার বুকে গুলি করে। প্রতিবাদের কারণ ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ফ্রান্সের ‘সোশালিস্ট পার্টি’র নেতা অলিভিয়ের ফাউরে ‘বিবিসি’কে বলছেন যে, পুলিশের কথায় কেউ যদি না থামে, এর অর্থ এই নয় যে, তাকে গুলি করা যাবে। প্রত্যেক ব্যক্তিরই সুবিচার পাবার অধিকার রয়েছে।

নিহত যুবকের স্মরণে শোকমিছিল থেকেই শুরু হয় বিক্ষোভ। পহেলা জুলাই পর্যন্ত চার দিনের বিক্ষোভে ফ্রান্সজুড়ে ১৩’শ মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ভবন এবং গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ছাড়াও বিভিন্ন দোকানপাটে লুটপাট হয়েছে। ফ্রান্সজুড়ে সাঁজোয়া গাড়িসহ প্রায় ৪৫ হাজার পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সরকার বলছে যে, কঠোর অবস্থান নেবার কারণে সহিংসতা কিছুটা হলেও কমে আসছে। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ এই বিক্ষোভকে অযৌক্তিক বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং নাগরিকদেরকে তাদের সন্তানদের বিক্ষোভের দায় নিতে বলেন। একইসাথে তিনি ‘টিকটক’ এবং ‘স্ন্যাপচ্যাট’এর মতো সোশাল মিডিয়া ব্যবহার করে সহিংসতা ছড়ানো বন্ধ করার পদক্ষেপ নেবার কথা বলেন। সংবেদনশীল তথ্য সোশাল মিডিয়া থেকে সরিয়ে না দেয়ার জন্যে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলিকে তিনি দোষারোপ করেন।

নঁতেরে শহরের সরকারি উকিল পাসকাল প্রাশ সাংবাদিকদের বলেন যে, প্রাথমিক তদন্তে তার মনে হয়েছে যে, আইনগতভাবে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করার যে শর্তগুলি রয়েছে, সেগুলি উপেক্ষিত হয়েছে। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, ফ্রান্সের আইন অনুযায়ী একজন পুলিশের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করার অর্থ হলো বিচারক অভিযুক্তের বিরুদ্ধে যথেষ্ট শক্ত প্রমাণ পেয়েছেন। তবে বিচারকার্য শুরু করার আগে এতে যথেষ্ট সময় দেয়া হয়।

ফ্রান্সে অ-শ্বেতাঙ্গদের সুবিচার পাওয়া নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। এর আগে ২০০৫ সালে প্যারিসের কাছাকাছি এক স্থানে পুলিশের হাত থেকে বাঁচার জন্যে উত্তর আফ্রিকার বংশোদ্ভূত দু’জন মুসলিম যুবক এক বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে লুকাতে গেলে বিদ্যুৎপিষ্ট হয়ে মৃত্যুবরণ করে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিক্ষোভ তিন সপ্তাহ ধরে চলে এবং শেষ পর্যন্ত ফরাসি সরকার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। সেই ঘটনায় দু’জন পুলিশ কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করা হলেও ১০ বছরের দীর্ঘ আইনী প্রক্রিয়া শেষে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, সেই বিক্ষোভের পিছনে বহুদিনের জমে থাকা ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছিল; যার মাঝে ছিল মুসলিম সংখ্যালঘুদের মাঝে ব্যাপক বেকারত্ব এবং পুলিশের বৈষম্যমূলক জুলুম। যুক্তরাষ্ট্রে ২০০১ সালের ৯/১১এর ঘটনার পর থেকে ফ্রান্সে মুসলিম-বিদ্বেষী চিন্তার প্রসারকেও সেই বিক্ষোভের একটা কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এবারের ঘটনাও মুসলিম সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধেই ঘটেছে। ‘বিবিসি’ বলছে যে, আলজেরিয় বংশোদ্ভূত নাহেল তার মায়ের একমাত্র সন্তান; যে কিনা পণ্য ডেলিভারি দেয়ার কাজ করতো। একইসাথে গত তিন বছর ধরে সে একটা রাগবি ক্লাবেও খেলতো। ইলেকট্রিশিয়ান হবার জন্যে একটা কলেজেও ভর্তি হয়েছিলো সে; যদিও কলেজে খুব বেশি একটা সময় সে দিতে পারেনি। নাহেলের বিরুদ্ধে পুলিশের কোন ক্রিমিনাল রেকর্ড না থাকলেও অপ্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে গাড়ি চালাবার অভিযোগ ছিল। দরিদ্র্য পরিবারদের নিয়ে কাজ করা এনজিও ‘ওভাল সিটোইয়েঁ’র প্রধান জেফ পুয়েশ ‘বিবিসি’কে বলছেন যে, নাহেল সমাজে সকলের সাথে মিশে চলার মতো ছেলে ছিলো। মাদকাসক্তি বা অপরাধের সাথে জড়াবার মতো ব্যক্তি সে ছিলো না। নাহেলকে বহণকারী এম্বুলেন্সের মেডিকেল কর্মী মারুয়ানি বলছেন যে, তিনি নাহেলকে দেখেই চিনতে পেরেছেন এবং তিনি জানতেন যে এই ছেলে কারুর দিকে আঙ্গুল তুলে কথা বলার মতো নয়। নাহেলের মা ‘ফ্রান্স ৫ টিভি’র সাথে সাক্ষাতে বলেন যে, পুলিশ হয়তো তার ‘আরব চেহারা’ দেখেই তাকে হত্যা করতে চেয়েছে।

‘আল জাজিরা’ বলছে যে, যুবকের হত্যার ঘটনাটা ফ্রান্সে পুলিশের সাথে দরিদ্র্য এলাকার মানুষের উত্তেজনাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। ফ্রান্সে অ-শ্বেতাঙ্গ যুবকদের বিরুদ্ধে পুলিশের কৌশল নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। এক যুবক ‘বিবিসি’কে বলছেন যে, প্রায় প্রতিদিনই পুলিশের সহিংসতা চলছে; বিশেষ করে কেউ যদি আরব বা কৃষ্ণাঙ্গ হয়। নাহেলের আইনজীবী ইয়াসিনে বুজরুউ অবশ্য পুলিশের বর্ণবাদের বিষয়টাকে সামনে না এনে বলছেন যে, ফ্রান্সের আইন এবং বিচারব্যবস্থা পুলিশকে বিশেষ রকমের সুরক্ষা দিয়ে থাকে; যেকারণে অনেকেই নিজেকে বিচারের উর্ধ্বে মনে করতে থাকে। বুজরুউএর বর্ণবাদকে পাশ কাটিয়ে যাবার এই চেষ্টাটাকেই অনেকে মারাত্মক বলে আখ্যা দিচ্ছেন। ‘আল জাজিরা’র এক লেখায় নিউ ইয়র্কের ‘স্টোন ব্রুক ইউনিভার্সিটির’ প্রফেসর ক্রিস্টাল ফ্লেমিং বলছেন যে, ফ্রান্সের সমাজে বর্ণবাদের কারণে নাহেলের জীবন গেছে। প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ জানেন যে, নাহেলের মৃত্যু ব্যাখ্যার বাইরে নয়। কিন্তু যতদিন পর্যন্ত না তারা ফ্রান্সের বর্ণবাদকে স্বীকার করে না নেবেন, ততদিন পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না। ৩০শে জুন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক অফিসের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, সময় এসেছে ফ্রান্সের বর্ণবাদ এবং আইন শৃংখলা বাহিনীর বর্ণবাদজনিত বৈষম্যের গভীর সমস্যাকে স্বীকার করা। পাল্টা বিবৃতিতে ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই অভিযোগকে পুরোপুরি ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করে।

‘দ্যা গার্ডিয়ান’এর এক লেখায় ফরাসি সাংবাদিক রোখায়া দিয়াল্লো বলছেন যে, ফ্রান্সের দারিদ্র্যপীড়িত শহরাঞ্চলে পুলিশের দ্বারা অপরাধগুলি দেশটার অনেকগুলি দাঙ্গার মূল কারণ। বহু বছর ধরে মিছিল, প্রতিবাদপত্র, অনুরোধ-আহ্বানে কোন কাজ না হওয়ায় একজন যুবকের সামনে সহিংসতা ছাড়া কোন পথ খোলা থাকে না। প্রশ্ন করতেই হয় যে, এতটা সহিংসতা না হলে নাহেলের হত্যাকান্ডকে নিয়ে কেউ কোন কথা বলতো? রোখায়া দিয়াল্লোর কথাগুলি ফ্রান্সের গভীরের এমন এক সমস্যার কথা তুলে ধরে, যা কিনা ফরাসি রিপাবলিকের সেকুলার স্তম্ভকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। সাম্প্রতিক সময়ে ফ্রান্সে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন এবং পেনশন সংস্কারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের পর এবারের বর্ণবাদ-বিরোধী বিক্ষোভ শুধুমাত্র সামাজিক অবিচারকেই তুলে ধরে না, রাষ্ট্রের দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে আসে।

Monday, 26 June 2023

‘ওয়াগনার’-কান্ডের ভূরাজনৈতিক ফলাফল কি হতে পারে?

২৭শে জুন ২০২৩

রুশ শহর রস্টোভের রাস্তায় প্রিগোজিনের 'ওয়াগনার' বাহিনীর ট্যাংক। ভ্লাদিমির পুতিন ‘ওয়াগনার’এর বিদ্রোহকে ১৯১৭ সালের গৃহযুদ্ধের সাথে তুলনা করেছেন। ১৯১৭ সালের সেই গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল যুদ্ধক্ষেত্র থেকেই; এবং তা গৃহযুদ্ধে রূপ নিতে বেশ কয়েক মাস লেগেছিলো। যেটা এখন দেখতে হবে তা হলো, আগামী কয়েক মাসের মাঝে ‘ওয়াগনার’কে উদাহরণ ধরে রুশ বাহিনীর অন্যান্য অংশ থেকে কি কি দাবি উত্থাপিত হয়।

গত ২৩শে জুন রাশিয়ার ভাড়াটে সামরিক বাহিনী ‘ওয়াগনার গ্রুপ’এর নেতা ইয়েভগেনি প্রিগোজিন ঘোষণা দেন যে, তার সেনারা সুবিচার আদায়ের লক্ষ্যে মার্চ শুরু করেছে। ইউক্রেনের ফ্রন্টলাইন থেকে সরে গিয়ে তারা রুশ শহর রস্টোভের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং মস্কো অভিমুখে রওয়ানা দেয়। এর মাঝে রুশ বিমান বাহিনী তাদেরকে টার্গেট করে বোমাবর্ষণ করে। মাত্র ২৪ ঘন্টার মাথায় প্রিগোজিন ঘোষণা দেন যে, তিনি তার বাহিনীকে ইউক্রেনে ফিরিয়ে নিচ্ছেন এবং বেলারুশের প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কোর মধ্যস্ততায় রাজি হয়ে তিনি রাশিয়া ছেড়ে বেলারুশে চলে যাচ্ছেন। ‘ওয়াগনার গ্রুপ’এর এক দিনের এই নাটক কেনই বা ঘটলো এবং এর ফলাফলগুলিই বা কেমন হবে, সেব্যাপারে নিশ্চিত হতে যে আরও অনেকদিন লাগবে, তাতে সকলেই একমত। তথাপি ঘটনার ব্যাপারে অনেকেরই কিছু বিশ্লেষণ এবং মতামত রয়েছে, যা আলোচনায় আসছে।

‘ওয়াগনার গ্রুপ’ আলোচনায় আসলো কিভাবে?

মার্কিন ভূরাজনৈতিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘জিওপলিটিক্যাল ফিউচার্স’এর এক লেখায় জর্জ ফ্রীডম্যান প্রশ্ন করেছেন যে, ‘ওয়াগনার গ্রুপ’ ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে কি করছিলো? একটা ভাড়াটে বাহিনী হিসেবে যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের কর্মকান্ড একেবারেই আলাদা। সেখানে তারা নিয়মিত সেনাবাহিনীর সমান্তরালে যুদ্ধ করেছে। প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনকে পরাজিত করতে না পারার কারণেই ‘ওয়াগনার’এর মতো ভাড়াটে যোদ্ধাদেরকে যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন করতে হয়েছিল; যা কিনা পরবর্তীতে দ্বন্দ্ব এবং বিদ্রোহের জন্ম দিয়েছে। ‘ওয়াগনার’কে কাজে লাগানোটাই ছিল বড় সমস্যা।

ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘রয়াল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইন্সটিটিউট’ বা ‘রুসি’র এক লেখায় সামরিক বিশ্লেষক জ্যাক ওয়াটলিং বলছেন যে, ‘ওয়াগনার’কে রুশ নেতৃত্ব বিশ্বব্যাপী প্রভাব বিস্তারে ব্যবহার করেছে; যেখানে তারা রুশ রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীর স্থলাভিষিক্ত হয়ে কাজ করেছে। তবে এই বাহিনীতে রুশ সামরিক বাহিনী এবং সামরিক ইন্টেলিজেন্স ‘জিআরইউ’এর সদস্যরা কাজ করেছে। আর ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে তারা এমন একটা বাহিনী মোতায়েন করতে পেরেছিল, যা কিনা অনেক ক্ষেত্রেই রুশ সেনাবাহিনীর চাইতে বেশি কার্যকর ছিল। রুশ বিচার বিভাগের সহায়তাতেই ‘ওয়াগনার’ সাজাপ্রাপ্ত আসামীদেরকে এই বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছিল। মোটকথা রাশিয়ার রাষ্ট্রযন্ত্র ‘ওয়াগনার’কে সকল ধরণের সহায়তা দিয়েছে। আর এই সহায়তার ক্ষেত্রে প্রথমেই ছিলেন ‘জিআরইউ’এর জেনারেল ভ্লাদিমির স্তেপানোভিচ আলেক্সেইয়েভ। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছের লোক ইউরি কোভালচুক এবং সের্গেই কিরিয়েঙ্কো ‘ওয়াগনার’ তৈরির সপক্ষের চিন্তাগুলিকে সাজিয়েছিলেন। তবে রাশিয়ার ইন্টেলিজেন্স সংস্থা ‘এফএসবি’ এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এই বাহিনীকে ব্যবহারের বিপক্ষে ছিল। এই দুই গ্রুপকে ঠান্ডা করতে গিয়ে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে ‘ওয়াগনার’ সেনাদের মোতায়েন করার পর দু’টা ভিন্ন কমান্ড কাঠামো গঠন করতে হয়েছিল।

‘ওয়াগনার গ্রুপ’এর প্রতিষ্ঠাতা ইয়েভগেনি প্রিগোজিন কেন এই কাজটা করলেন, সেটার একটা সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন ‘কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টার’এর সিনিয়র ফেলো তাতিয়ানা স্তানোভায়া। টুইটারে এক বিশ্লেষণে তিনি বলছেন যে, প্রিগোজিনের বিদ্রোহ রাশিয়ার সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেবার চেষ্টা ছিল না। ক্রেমলিনের শক্তিধর ব্যাক্তিদের চাপের মুখে তিনি ইউক্রেনে একঘরে হয়ে পড়েছিলেন এবং ‘ওয়াগনার’কে টিকিয়ে রাখা তার জন্যে কঠিন হয়ে যাচ্ছিলো। তিনি প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছিলেন; যাতে করে ‘ওয়াগনার’এর কাজ, নিরাপত্তা এবং অর্থায়নের ব্যাপারে কিছুটা নিশ্চয়তা তিনি পেতে পারেন। তিনি ইউক্রেনে তার সেনাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের ব্যাপারটাকে তুলে ধরে তার দাবি আদায় করতে চেয়েছিলেন। তবে আপাতদৃষ্টে মনে হচ্ছে যে, তার অবদানগুলির কারণে তিনি এই সমস্যা থেকে বেঁচে বের হয়ে আসতে পেরেছেন; কিন্তু রাশিয়াতে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের বিনিময়ে।

প্রিগোজিনের বিদ্রোহ রাশিয়ার সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেবার চেষ্টা ছিল না। ক্রেমলিনের শক্তিধর ব্যাক্তিদের চাপের মুখে তিনি ইউক্রেনে একঘরে হয়ে পড়েছিলেন এবং ‘ওয়াগনার’কে টিকিয়ে রাখা তার জন্যে কঠিন হয়ে যাচ্ছিলো। তিনি ইউক্রেনে তার সেনাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের ব্যাপারটাকে তুলে ধরে তার দাবি আদায় করতে চেয়েছিলেন। তবে আপাতদৃষ্টে মনে হচ্ছে যে, তার অবদানগুলির কারণে তিনি এই সমস্যা থেকে বেঁচে বের হয়ে আসতে পেরেছেন; কিন্তু রাশিয়াতে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের বিনিময়ে।

ইউক্রেন যুদ্ধের উপরে কি প্রভাব পড়বে?

‘পলিটিকো’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ইউক্রেন যুদ্ধে গত শীতে যখন ইউক্রেনিয়রা পাল্টা আক্রমণ করে খারকিভ এবং খেরসন পুনর্দখল করে নেয়, তখন ক্রেমলিন যুদ্ধক্ষেত্রে দুর্বল অবস্থানগুলিকে শক্তিশালী করতে ‘ওয়াগনার গ্রুপ’এর সদস্যদের মোতায়েন করে। শীতের মাঝে ‘ওয়াগনার’ সদস্যরা যখন ফ্রন্টলাইন ধরে রেখেছিল, তখন রুশরা নতুন সেনা এবং রসদ যোগাড় করতে পেরেছিল। এছাড়াও বাখমুতের যুদ্ধে ‘ওয়াগনার’ সেনারা বড় ভূমিকা রেখেছিল।

২৪শে জুন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলদিমির জেলেন্সকি এক বার্তায় বলেন যে, এই ঘটনা দেখিয়ে দেয় যে, রুশ নেতৃত্ব কোনকিছুরই নিয়ন্ত্রণে নেই। একদিনের মাঝে তারা অনেকগুলি শহরের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে এবং দেখিয়ে দিয়েছে যে, রাশিয়ার শহর এবং অস্ত্রের ভান্ডার দখল করে নেয়াটা কত সহজ।

তবে জেলেন্সকি ‘ওয়াগনার’এর ঘটনা থেকে কতটা সুবিধা নিতে পারবেন, তা প্রশ্নবিদ্ধ। ‘রুসি’র রাজনৈতিক বিশ্লেষক মার্ক গ্যালিয়টি ‘ইন মস্কোস শ্যাডো ১০৫’ নামের এক নিয়মিত পডকাস্ট বিশ্লেষণে বলছেন যে, এই ঘটনায় ইউক্রেনের ফ্রন্টলাইনে বড় কোন পরিবর্তন আসবে বলে মনে হয়না; কারণ অন্ততঃ এখন পর্যন্ত ইউক্রেনে রুশ সেনাদের মাঝে অস্ত্র ছেড়ে দেবার বা যুদ্ধ থেকে সরে আসার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এছাড়াও ‘ওয়াগনার’কে থামাবার জন্যে যেহেতু কোন রুশ ইউনিটকে ইউক্রেন থেকে সরাবার প্রয়োজন হয়নি, তাই এই ঘটনার সরাসরি সুবিধা ইউক্রেন খুব কমই পাবে। বরং প্রিগোজিনের কারণে ইউক্রেনের ফ্রন্টলাইনে নেতৃত্বের কোন সমস্যা যদি হয়ে থাকে, সেটা এখন নেই; যা ইউক্রেনকে খুশি করার কথা নয়।

ক্রেমলিনের নিয়ন্ত্রণ কি দুর্বল হলো?

‘পলিটিকো’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ইয়েভগেনি প্রিগোজিনের অধীন ‘ওয়াগনার গ্রুপ’এর সদস্যরা যেভাবে রুশ জমি দখল করে ফেলতে পারলো, মস্কোর ২’শ কিঃমিঃএর মাঝে পৌঁছে গেলো, এবং জনগণের সমর্থন পেলো, তা নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে দিচ্ছে যে, প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সরকার খুব শক্ত ভিতের উপরে প্রতিষ্ঠিত নয়। রস্টোভ শহরে ‘ওয়াগনার’এর পক্ষে মানুষের সমর্থন দেখিয়ে দেয় যে, ক্রেমলিনের ক্ষমতাধর প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু এবং ইউক্রেন যুদ্ধের কমান্ডার জেনারেল ভ্যালেরি গেরাসিমভএর উপর জনগণের আস্থা কমে গেছে। অপরদিকে মার্ক গ্যালিয়টি বলছেন যে, যদিও বেশিরভাগ বিশ্লেষকেরাই বলবেন যে, এই ঘটনার মাধ্যমে পুতিনের নেতৃত্ব দুর্বল হয়েছে, তথাপি ভ্লাদিমির পুতিনের পক্ষে খুব সম্ভবতঃ এর চাইতে ভালো কিছু করার ছিলো না; কারণ একদিকে তিনি সমস্যাটার সমাপ্তি টেনেছেন এবং একইসাথে প্রিগোজিনকে কিনে নিয়েছেন। কারণ ‘ওয়াগনার’ বনাম রুশ সেনাবাহিনীর যুদ্ধ পুরো রাষ্ট্রের জন্যে মারাত্মক হতো। বিশেষ করে ক্রেমলিন নির্দেশ দিলে সেনাবাহিনীর সদস্যরা রুশ ভাড়াটে বাহিনীর উপর গুলি করতে কতটা প্রস্তুত ছিলো, সেটা বরং পুতিনের নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করতো।

ভ্লাদিমির পুতিনের পক্ষে খুব সম্ভবতঃ এর চাইতে ভালো কিছু করার ছিলো না; কারণ একদিকে তিনি সমস্যাটার সমাপ্তি টেনেছেন এবং একইসাথে প্রিগোজিনকে কিনে নিয়েছেন। কারণ ‘ওয়াগনার’ বনাম রুশ সেনাবাহিনীর যুদ্ধ পুরো রাষ্ট্রের জন্যে মারাত্মক হতো। বিশেষ করে ক্রেমলিন নির্দেশ দিলে সেনাবাহিনীর সদস্যরা রুশ ভাড়াটে বাহিনীর উপর গুলি করতে কতটা প্রস্তুত ছিলো, সেটা বরং পুতিনের নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করতো।

তাতিয়ানা স্তানোভায়া বলছেন যে, প্রিগোজিন খুব সম্ভবতঃ পুতিনের কঠোর বক্তব্য আশা করেননি। কারণ তিনি সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারীর ভূমিকা নিতে প্রস্তুত ছিলেন না। মার্ক গ্যালিয়টি বলছেন যে, শেষ পর্যন্ত এটা মনে হয়নি যে, রুশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা ব্যাপক হারে ‘ওয়াগনার’এ যোগ দিয়েছিলো। হয়তো সেটা প্রিগোজিনের সরে দাঁড়ানোর পিছনে একটা কারণ হতে পারে। মস্কোর নিরাপত্তায় নিয়োজিত বাহিনীগুলিকে ‘ওয়াগনার’ পরাজিত করতে পারতো কিনা, সেখানেও সন্দেহ রয়েছে। কারণ যদিও রুশ সেনাবাহিনী ‘ওয়াগনার’এর মতো দ্রুতগামী কোন বাহিনী নয়; তথাপি সেনাবাহিনীর ভারি অস্ত্রের বিরুদ্ধে ‘ওয়াগনার’এর হাল্কা বাহিনী কতটুকু সফল হতো, তা প্রশ্নবিদ্ধ। আর মস্কোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রিগোজিন কি করতেন, সেটা কি নিশ্চিত? তবে জনগণের একটা বড় অংশ ‘ওয়াগনার’কে থামাবার চেষ্টা করেনি; যা কিনা রাষ্ট্রের নেতৃত্বের দুর্বলতা তুলে ধরে। তথাপি প্রশ্ন থেকেই যায়, রুশ ইন্টেলিজেন্স ‘এফএসবি’ কি করছিলো? নিঃসন্দেহে এখানে ‘এফএসবি’র কাজে ঘাটতি ছিলো কিনা, তা খতিয়ে দেখার ব্যাপার হবে। তবে পুতিনের নেতৃত্বের অধীনে ‘এফএসবি’কে ব্যার্থতার জন্যে খুব বড় কোন খেসারত না-ও দিতে হতে পারে। কারণ এর আগেও ‘এফএসবি’ অনেক ভুল করলেও পুতিন তাদের কিছু করেননি।

গ্যালিয়টি বলছেন যে, প্রিগোজিন ১৯৯০এর দশক থেকেই ক্রেমলিনের সমর্থন পেয়ে ধাপে ধাপে উঠে এসেছেন। তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রিগোজিন ব্যাক্তিগতভাবে লাভবান হলেও তিনি প্রকৃতপক্ষে ক্রেমলিনেরই ইচ্ছার ফলাফল। এটা অসম্ভব নয় যে, প্রিগোজিন বেলারুশে বসে আফ্রিকায় ‘ওয়াগনার’এর কর্মকান্ড পরিচালনা করবেন। কারণ আফ্রিকাতে রুশ প্রভাব ধরে রাখার পিছনে ‘ওয়াগনার’এর কর্মকান্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আর রুশ সরকারের সমর্থন রয়েছে বলেই অনেক ক্ষেত্রে ‘ওয়াগনার’ সফলতা পেয়েছে। সমস্যা পুতিনের নিজেরই সৃষ্টি। কারণ তিনি প্রিগোজিনের সাথে রুশ প্রতিরক্ষা দপ্তরের দ্বন্দ্বকে চলতে দিয়েছেন। আর এই দ্বন্দ্ব বাজে আকারে পরিণত হবার আগেই তিনি হস্তক্ষেপ করতে ব্যার্থ হয়েছেন।

জর্জ ফ্রীডম্যান প্রশ্ন করছেন যে, ‘ওয়াগনার’এর কারণে যদি ধরে নেয়া হয় যে, পুতিন দুর্বল হয়েছেন, তাহলে এই দুর্বল হওয়ার অর্থ প্রকৃতপক্ষে কি, সেটা দেখতে হবে। যদি তার রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়, তার অর্থ হলো, তিনি খুব সহজেই কোন কর্মকর্তাকে সরিয়ে দিতে পারবেন না। আর যদি তার নির্দেশনা দেয়ার সক্ষমতা কমে যায়, তাহলে রুশ সামরিক বাহিনীর কমান্ড ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু এর অর্থ দাঁড়াবে অন্য কেউ পুতিনকে তার স্থান থেকে সরিয়ে দেবে। অথচ এখন পর্যন্ত এমন কোন ব্যক্তিকে দেখা যাচ্ছে না যে কিনা পুতিনকে সরাবার মতো অবস্থানে এসেছে। আর এরকম কেউ না আসার আগ পর্যন্ত বলা যাচ্ছে না যে মাত্র একদিনের ব্যার্থ অভ্যুত্থানে পুতিন দুর্বল হয়েছেন। জ্যাক ওয়াটলিং বলছেন যে, একদিক দিয়ে চিন্তা করলে রুশ উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের উপরে পুতিনের নিয়ন্ত্রণ আরও বেড়ে গেলো। কারণ ক্রেমলিনের কোন দলই বেঁচে থাকার জন্যে পুতিনকে ছাড়া শক্তিশালী নয়।

রাশিয়া এবং ইউক্রেনে ‘ওয়াগনার’এর কর্মকান্ড শেষ হয়ে গেছে; যদিও বাকি বিশ্বে হয়তো তা এখনও বিদ্যমান। এমনও হতে পারে যে, প্রিগোজিনের সাথে ক্রেমলিনের শেষ পর্যন্ত সেই চুক্তিই হয়েছে। তবে শোইগু নিঃসন্দেহে ‘ওয়াগনার’কে রাশিয়াতে থাকতে দেবেন না। সংস্থাটার ইউনিটগুলি হয়তো রুশ সামরিক বাহিনীর মাঝে বিলীন হয়ে যাবে।

বিশ্বব্যাপী রাশিয়ার অবস্থান দুর্বল হবে কি?

তাতিয়ানা স্তানোভায়া মনে করছেন যে, প্রিগোজিনকে হয়তো পুতিন ছেড়ে দিয়েছেন এই শর্তে যে, তিনি বেলারুশে চুপচাপ থাকবেন। তবে মার্ক গ্যালিয়টি বলছেন যে, আপাতদৃষ্টে মনে হচ্ছে যে, রাশিয়া এবং ইউক্রেনে ‘ওয়াগনার’এর কর্মকান্ড শেষ হয়ে গেছে; যদিও বাকি বিশ্বে হয়তো তা এখনও বিদ্যমান। এমনও হতে পারে যে, প্রিগোজিনের সাথে ক্রেমলিনের শেষ পর্যন্ত সেই চুক্তিই হয়েছে। তবে শোইগু নিঃসন্দেহে ‘ওয়াগনার’কে রাশিয়াতে থাকতে দেবেন না। সংস্থাটার ইউনিটগুলি হয়তো রুশ সামরিক বাহিনীর মাঝে বিলীন হয়ে যাবে।

বিশ্বব্যাপী কোন কোন দেশে ‘ওয়াগনার গ্রুপ’এর কর্মকান্ড রয়েছে, তার একটা তালিকা তুলে ধরেছে ‘ডয়েচে ভেলে’। ইউক্রেনে ২০১৪ সালে সর্বপ্রথম ‘ওয়াগনার’এর সদস্যদের দেখা যায় রুশ-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন দিতে। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা দপ্তরের হিসেবে প্রিগোজিনের নেতৃত্বে প্রায় ৫০ হাজার সদস্য ছিল। বিদ্রোহের সময় তিনি নিজেই বলেছিলেন যে, তার সাথে ২৫ হাজার সদস্য রয়েছে। বাখমুতের যুদ্ধে এই গ্রুপের সদস্যরা বড় ভূমিকা রেখেছিল; যেখানে অনেকেই ছিল সাজাপ্রাপ্ত আসামি অথবা সামরিক বাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া সেনাসদস্য। ২০১৫ সাল থেকে ‘ওয়াগনার’এর সদস্যরা সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে অংশ নিচ্ছে বলে নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে; কারণ গ্রুপের কিছু সদস্য একনায়ক বাশার আল-আসাদের বিরোধীদের হাতে নিহত হয়েছে। গৃহযুদ্ধের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ মুহুর্তে সেখানে ৫ হাজারের বেশি ‘ওয়াগনার’ সদস্য ছিল বলে ধারণা করা হয়; যাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে।

তবে ‘ওয়াগনার’এর কর্মকান্ড সবচাইতে বেশি ছড়িয়ে রয়েছে আফ্রিকাতে; যেখানে গ্রুপের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও রয়েছে ব্যাপক। উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়ার গৃহযুদ্ধে ‘ওয়াগনার’ জড়িয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে ত্রিপোলি সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত জেনারেল খলিফা হাফতারের অধীনে ‘লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি’র পক্ষে ‘ওয়াগনার’ সদস্যরা নিরাপত্তা ও প্রশিক্ষণ দেয়ার কাজ করছে বলে জানা যায়। একসময় প্রায় ২ হাজারের মতো ‘ওয়াগনার’ সদস্য লিবিয়াতে ছিল। এখান থেকেই সুদানসহ আফ্রিকার অন্যান্য দেশে ‘ওয়াগনার’এর কর্মকান্ড ছড়িয়ে পড়ে। মার্কিন কর্মকর্তারা অনেকেই অভিযোগ করেছেন যে, সুদানে ‘ওয়াগনার’এর সদস্যরা সেদেশের সামরিক শাসকদের সহায়তায় খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।

২০২১ সালে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালির ক্ষমতা নেয়া সামরিক শাসকেরাও ‘ওয়াগনার’কে সেদেশে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছে। জাতিসংঘ অভিযোগ করছে যে, মালির সামরিক বাহিনীর সাথে সহযোগী হিসেবে ‘ওয়াগনার’ সেখানে মানবতাবিরোধী কর্মকান্ডে জড়িত। এছাড়াও মধ্য আফ্রিকার দেশ সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকেও রয়েছে ‘ওয়াগনার’এর শক্ত অবস্থান। এবছরের ফেব্রুয়ারিতে সেদেশে রুশ রাষ্ট্রদূত এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে, ১ হাজার ৮’শ ৯০ জন রুশ সামরিক উপদেষ্টা সেখানে কাজ করছে। ‘ওয়াগনার’এর সদস্যরা সেখানে প্রশিক্ষণ দেয়ার কাজের পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ফস্টিন আরসাঞ্জএর নিরাপত্তায় কাজ করছে। এর বিনিময়ে ‘ওয়াগনার’ সেদেশের খনিজ সম্পদের ভাগ পেয়েছে বলে বলছেন কেউ কেউ। এছাড়াও ‘রয়টার্স’ বলছে যে, ২০১৯ সাল থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার দেশ ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে ‘ওয়াগনার’ কাজ করছে। সেদেশের স্পেশাল ফোর্সের সদস্যদেরকেও প্রশিক্ষণ দিয়েছে ‘ওয়াগনার’।

‘ওয়াগনার’এর পর কি?

জর্জ ফ্রীডম্যান বলছেন যে, কাউকে কাউকে বলতে শোনা যাচ্ছে যে, পুরো ব্যাপারটাই ছিল একটা বানানো ষড়যন্ত্র। যদি তা-ই হয়, তাহলে বেলারুশের প্রেসিডেন্ট, রুশ জেনারেল স্টাফ, পুতিনের অফিসের স্টাফ, এবং ‘ওয়াগনার’এর কিছু লোককেও এই প্রকল্পে যুক্ত করতে হবে। এতগুলি ব্যক্তি যদি এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে জানে, তাহলে সেটা গোপন থাকার প্রশ্নই আসে না। অপরদিকে মার্ক গ্যালিয়টি বলছেন যে, মার্কিন ইন্টেলিজেন্স জুনের মাঝামাঝি থেকেই ‘ওয়াগনার’এর ব্যাপারে বিদ্রোহের মতোই কিছু একটা আশা করছিলো বলে শোনা যাচ্ছে; যা প্রকৃতপক্ষে অবাস্তব নয়। কারণ ইন্টেলিজেন্স সংস্থাগুলি সর্বদাই ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটা ধারণা রাখার চেষ্টা করে। এটাকে আলাদাভাবে দেখার কিছু নেই।

‘রুসি’র জ্যাক ওয়াটলিং বলছেন যে, ‘ওয়াগনার গ্রুপ’এর উৎপত্তি একটা চিন্তা থেকে; যার মাঝে রয়েছে বাণিজ্যিক সংস্থার নিজস্ব বাহিনী তৈরি করা; যেমন ‘গ্যাজপ্রম’ এবং ‘রসকসমস’ তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী তৈরি করছে। এগুলির বিশেষত্ব হলো, সংস্থাগুলি বিশ্বব্যাপী তাদের আয় থেকেই এই বাহিনীগুলিকে চালাবে। সমস্যা হলো, অর্থায়নের জন্যে এই বাহিনীগুলি রুশ সরকারের উপরে সরাসরি নির্ভরশীল না থাকায় এগুলির উপরে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার জন্যে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সমরাস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে; যা কিনা প্রিগোজিনের ‘ওয়াগনার’এর সাথে দ্বন্দ্বের কারণ হয়েছে।

‘পলিটিকো’ বলছে যে, পুতিন তার ভাষণে ‘ওয়াগনার’এর বিদ্রোহকে ১৯১৭ সালের রুশ গৃহযুদ্ধের সাথে তুলনা দিয়েছেন, যখন বিশ্বযুদ্ধের মাঝে ছিল রাশিয়া। তবে এখানে আরও ভালো উদাহরণ ছিল ১৯৯১ সালের অগাস্টে সোভিয়েত নেতা মিখাইল গরবাচেভের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা; যখন কট্টরপন্থীরা গরবাচেভের সংস্কারের বিরোধিতা করেছিল। তবে সেই অভ্যুত্থান প্রচেষ্টায় সমাজতান্ত্রিক সরকারের উপর জনগণের আস্থা নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল; যার ফলশ্রুতিতে কয়েক মাসের মাঝে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যায়। জ্যাক ওয়াটলিং বলছেন যে, ‘ওয়াগনার’এর একদিনের বিদ্রোহ হয়তো রুশ নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের উপর ভ্লাদিমির পুতিনের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে দিয়েছে; কিন্তু তা ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রের সমস্যার সমাধান দেয়নি। সেখানে যথেষ্ট সক্ষম একটা বাহিনীর অভাব থেকেই যাচ্ছে; যা কিনা যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার জয়লাভ করাকে চ্যালেঞ্জের মাঝে ফেলছে। পুতিন ‘ওয়াগনার’এর বিদ্রোহকে ১৯১৭ সালের গৃহযুদ্ধের সাথে তুলনা করেছেন। ১৯১৭ সালের সেই গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল যুদ্ধক্ষেত্র থেকেই; এবং তা গৃহযুদ্ধে রূপ নিতে বেশ কয়েক মাস লেগেছিলো। যেটা এখন দেখতে হবে তা হলো, আগামী কয়েক মাসের মাঝে ‘ওয়াগনার’কে উদাহরণ ধরে রুশ বাহিনীর অন্যান্য অংশ থেকে কি কি দাবি উত্থাপিত হয়।