Tuesday, 25 August 2015

আলফ্রেড মাহান এবং বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশ

২৫শে অগাস্ট ২০১৫


বিখ্যাত মার্কিন জিওস্ট্র্যাটেজিস্ট এবং জিওপলিটিশিয়ান আলফ্রেড থেয়ার মাহান (Alfred Thayer Mahan, 1840-1914) আজকাল আবার আলোচনার বিষয় হয়ে উঠছেন। উনিশ শতকের শেষের দিকে তার থিওরিগুলি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পরিবর্তন করেছিল। তার কথায় অনুপ্রাণিত হয়েই মার্কিন প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট (Theodore Roosevelt, 1858-1919; president 1901-1909) দেশের স্ট্র্যাটেজি পরিবর্তন করেছিলেন। তখন থেকেই আমেরিকা হয়ে উঠতে থাকে একটা বিশ্বশক্তি বা গ্লোবাল পাওয়ার। ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের সাথে পাল্লা দিয়ে সমুদ্রে টিকে থাকার মাঝেই যে আমেরিকার ভবিষ্যত শক্তি নিহিত, সেটা মাহান-ই প্রথম বলেন। যদিও মাহানের থিওরি সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার জন্ম দিয়েছিল এবং সেজন্য তিনি বেশ সমালোচিত ছিলেন কিছু মহলে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে মাহানের দেখিয়ে দেয়া পথ অনুসরণ করেই আমেরিকা দুনিয়ার রাজা বনেছে; যদিও সেটাতে সময় লেগেছে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো একটা যুদ্ধকে সংগঠিত হতে হয়েছে। যাই হোক, এখনকার দুনিয়াতে অনেক দেশ সমুদ্রের দিকে ঝুঁকছে বলেই এখন ২১শতকে এসে আবারও মাহানের কথাই মনে করতে হচ্ছে।
মাহান ভূরাজনীতির প্রথম দিককার চিন্তাবিদ। শীতল যুদ্ধের সময় সবাই তাকে ভুলে গেলেও নপুন বাস্তবতায় তার নাম আবারো উচ্চারিত হচ্ছে।


মাহানের পূণরুত্থান

মাহান নৌ-শক্তির সাথে অর্থনীতি, সামাজিক অবস্থা, রাজনীতি এবং সর্বোপরি ভৌগোলিক সত্যগুলিকে একত্রিত করেছিলেন। তারই সমসাময়িক ব্রিটিশ জিওপলিটিশিয়ান হ্যালফোর্ড ম্যাকিন্ডার (Halford Mackinder, 1861-1947) এবং এদের কিছু পরের ডাচ বংশোদ্ভূত মার্কিন চিন্তাবিদ নিকোলাস স্পাইকম্যান (Nocholas J. Spykman, 1893-1943) জিওপলিটিক্স নামে নতুন এক ক্ষেত্রের জন্ম দেন। এদেরকে অনুসরণ করে আরও অনেকেই চিন্তায় অগ্রসর হয়েছেন। এসব চিন্তাবিদদের বেশিরভাগই পশ্চিমা দেশের। অপশ্চিমা দেশগুলিতে এরকম জিওপলিটিক্স নিয়ে চিন্তা করতে পারার মতো মানুষ তেমন একটা নেই, তবে ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে। কয়েকশ’ বছর পশ্চিমা শাসনে বিশ্ব শাসিত হবার ফলে চিন্তার ক্ষেত্রেও এরকম মেরুকরণ হয়েছে। তবে গত দুই-তিন দশকে অর্থনৈতিক এবং শিক্ষাগত দিক থেকে অগ্রগতি হবার কারণে অনেক দেশ বিশ্ব রাজনীতিতে এগিয়ে এসেছে। ঠিক যেভাবে মাহান শতবর্ষ আগে মার্কিন নেতৃত্বকে বলেছিলেন যে বিশ্ব-বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণের মাঝেই মার্কিন বিশ্ব-নেতৃত্ব নিহিত, ঠিক একই পরিস্থিতি এখন তৈরি হয়েছে সারা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে। মাহান বলেছিলেন যে বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণের মাঝেই একটা দেশ উঠবে এবং একই সাথে তার নৌ-শক্তির বিকাশ ঘটবে, যা কিনা বিশ্বব্যাপী তার শক্তিকে ধরে রাখতে সাহায্য করবে। মাহানের থিওরির কারণে বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং জাপানের মাঝে ব্যাপক বাণিজ্য এবং নৌ-প্রতিযোগিতা শুরু হয়, যা কিনা দু’টি বিশ্বযুদ্ধকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে কয়েক দশক ঠান্ডা যুদ্ধের সময়ে মাহানের থিওরি সবাই ভুলেই গিয়েছিল। কিন্তু সমাজতন্ত্রের পতনের পরে পুঁজিবাদের ব্যাপক প্রসারের কারণে এখন আবার সেই একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে।

ইউরোপ থেকে এশিয়া

পশ্চিমা বিশ্ব তাদের ঔপনিবেশিকতাকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশকেই করেছে বিশ্ববাণিজ্য-নির্ভর। যেসময় ইউরোপের মানুষ বাণিজ্যের উপরে পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল, সেসময় যুদ্ধের কারণে বাণিজ্যের ক্ষতি হলে না খেয়ে থাকার অবস্থা হতো তাদের, ঠিক যেমনটা ডাচদের ক্ষেত্রে হয়েছিল ইংল্যান্ডের সাথে আঠারো মাস যুদ্ধের পরে (১৬৫৩-৫৪)। ঔপনিবেশিক যুগের আগে এশিয়ার বেশিরভাগ দেশ বহিঃবাণিজ্যের উপরে তেমন একটা নির্ভরশীল ছিল না; অন্তঃত বাণিজ্য বন্ধ হলে না খেয়ে থাকার অবস্থা ছিল না। ইউরোপিয়ানরা এসে এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। আজ এশিয়াতে বিশ্বের বিরাট এক জনগোষ্ঠীর বসবাসের কারণে দুনিয়ার বেশিরভাগ উতপাদন আবারও এশিয়াতে ফেরত এসেছে। তবে এবার এই উতপাদন এসেছে বহিঃবাণিজ্যের উপরে নির্ভরশীল হয়ে। এর ফলশ্রুতিতে ইউরোপে যেমন বাণিজ্য রক্ষার কাজকে জীবন রক্ষার সম-গুরুত্ব দেওয়া হতো, ঠিক একই অবস্থা এখন এশিয়াতে বিরাজ করতে যাচ্ছে। গত দুই-তিন দশকে এশিয়ার অনেক দেশের কাছে এই উতপাদন-রপ্তানি-আমদানি বাণিজ্যের কারণে বিপুল সম্পদ এসে পড়েছে। এই সম্পদ যেমন তাদের অর্থনীতিকে করেছে বেগবান, একইসাথে তাদের সমাজকে করেছে শিক্ষিত। এই অর্থ এবং শিক্ষা জন্ম দিয়েছে এক জাতীয়তাবাদের, যা কিনা তাদের বেঁচে থাকার জন্যে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বহিঃবাণিজ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এই উদ্বিগ্নতা বা অস্থিরতা তাদেরকে জাতীয় নিরাপত্তার দিকে মনোনিবেশ করতে বাধ্য করছে। বাণিজ্যের বাজার, কাঁচামালের উতস এবং বাণিজ্যপথগুলিকে নিরাপদ রাখতে সবাই নৌ-শক্তিবৃদ্ধিতে মনোনিবেশ করছে। পূর্ব চীন সাগর এবং দক্ষিণ চীন সাগর থেকে শুরু করে ভারত মহাসাগর অঞ্চল পার হয়ে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত এই অবস্থাই বিরাজ করছে। ছোট ছোট অনেক দেশের হাতে এখন বেশ ক্ষমতা, তবে তারা সবাই ছোট ছোট দেশে বিভক্ত এবং রাজনৈতিক হিংসার কারণে এদের একত্রে কাজ করার সম্ভাবনা খুবই কম; তাই শক্তিধর দেশগুলি এটা ভেবে চিন্তিত নয়; বরং এক দেশকে অপরের বিরূদ্ধে লাগিয়ে রাখাকেই তারা বেশি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবে। আর এরকম আঞ্চলিক সমস্যা বৃহত শক্তিগুলিকে নাক গলানোর সুযোগ দেবে। তবে এরকম আঞ্চলিক সমস্যার সংখ্যা খুব বেশি হয়ে গেলে আবার সেটা শক্তিধর দেশগুলির পক্ষেও ম্যানেজ করাটা কঠিন হয়ে যাবে, যেমনটি হয়েছে আমেরিকার ক্ষেত্রে ইরাক, আফগানিস্তান-সহ আরও বিভিন্নস্থানে একযোগে জড়িয়ে গিয়ে।

মাহানের থিওরি ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সাথে নৌ-শক্তির সম্পর্ক নিয়ে। ভারত মহাসাগরে নিজেদের বাণিজ্যের নিরাপত্তায় চীনের আবির্ভাব অনেক হিসেবই পালটে দিয়েছে।

চীন – পূর্ব থেকে পশ্চিমে


পূর্ব চীন সাগর, দক্ষিণ চীন সাগর এবং ভারত মহাসাগর অবশ্য অন্য হিসেবে পড়েছে। এখানে চীনকে একপেশে করার জন্যে অনেকেই সাধারণ (কমন) কারণ খুঁজে পেয়েছে। তবে একটি চিন্তা করলেই বোঝা যাবে যে সকলের চিন্তাতেই নিজেদের বহিঃবাণিজ্য সবচাইতে বড় স্থান অধিকার করে রয়েছে। মাহানীয় থিওরিতে চীনের উত্থানকে ব্যাখ্যা করা যায় – চীনের স্থলসীমানা আজ আর বিপদসংকুল নয়, তাই চীন সমুদ্রে পাল তুলতে পারছে সহজেই। চীনের বাণিজ্যিক এবং নৌ-শক্তির উত্থানের কারণে জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া ছাড়াও সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, তাইওয়ান এবং ভিয়েতনাম তাদের নৌশক্তি বৃদ্ধি করছে। এই অবস্থাটাই উপচে পড়ে (ওভারফ্লো) ভারত মহাসাগরে এসে হাজির হয়েছে। পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের বহুদিনের সামরিক সরবরাহকারী চীন; আর পাকিস্তান এবং শ্রীলংকায় ডীপ-সী পোর্ট তৈরি করেছে চীন। এসব ব্যাপার ভারতের চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছে। মালাক্কা প্রণালীকে বাইপাস করতে মিয়ানমারের উপকূলে চীন তেলবাহী জাহাজের জন্যে ডীপ-সী পোর্ট করেছে এবং সেই পোর্টের সাথে চীনের ভূখন্ড পর্যন্ত তেলের পাইপলাইন করেছে গ্যাস পাইপলাইনের পাশাপাশি। ঠিক একইভাবে পাকিস্তানে গোয়াদর পোর্ট থেকে চীনের সীমান্ত পর্যন্ত ইকনমিক করিডোর করা হচ্ছে বিশাল এক প্রজেক্টের মাধ্যমে। মিয়ানমারের পাইপলাইন এবং পাকিস্তানের ইকনমিক করিডোর সাফল্য পাবে যদি বঙ্গোপসাগর এবং আরব সাগরে চীনা বাণিজ্য জাহাজ ভিড়তে পারে কোন সমস্যা ছাড়াই। কিন্তু এই নিষ্কন্টক ভ্রমণের নিশ্চয়তা তো চীনকে কেউ দেয়নি। কাজেই ভারত মহাসাগরে চীনা যুদ্ধজাহাজ দেখা যাবে – এটা ধরেই নেয়া যায়। একইসাথে চীন চাইবে ভারত মহাসাগরে তার বন্ধুরাষ্ট্র তৈরি করতে, যাদের সাথে চীন শুধু বাণিজ্যই করবে না, তার গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক স্থাপনাগুলি দেখভাল করবে। পূর্ব চীন সাগর এবং দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সাথে বেশ কয়েকটি দেশের সমুদ্রসীমা নিয়ে সরাসরি বিরোধ থাকলেও হিমালয় পর্বতের কারণে ভারত মহাসাগরের দেশগুলির সাথে তাদের ততটা বিরোধ নেই, শুধু ভারত ছাড়া। যদিও মিয়ানমারের সাথে সীমান্তে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের একটা বিবাদ রয়েছে, সেটা ভারতের সাথে চীনের বিরোধের কাছে নস্যি। চীনের প্রতিটি পদক্ষেপ ভারত বিরোধিতা করার চেষ্টা করবে সেটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশে্র ডীপ-সী পোর্ট প্রজেক্টে চীনের আগ্রহ ঠিক একইভাবে ভারতের কাছে বিপজ্জনক ঠেকবে। এমনকি ভারতের আশেপাশের দেশে চীনের বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ ভারতের কাছে হুমকিস্বরূপ দেখা যাওয়াটা স্বাভাবিক, কারণ এতে ভারত শুধু তার পণ্যের বাজারই হারাবে না, তাদের রাজনৈতিক প্রতিপত্তি হারাবে, এবং ক্ষেত্রবিশেষে ভারতের অখন্ডতার জন্যেও সেটা হুমকিস্বরূপ হয়ে দেখা দিতে পারে। যেহেতু এটা জানা কথা যে সৃষ্টির পর থেকেই ভারতের অখন্ডতা বজায় রাখার চিন্তা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার চিন্তাকে আগলে রেখেছে, চীনের এরকম ‘এগ্রেসিভ এপ্রোচ’ ভারতের কাছে তাই ভয়ঙ্কর হিসেবে দেখা দেবে। ভারত মহাসাগরের অন্যান্য দেশ নিজেদের সমুদ্র-বাণিজ্যের নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিলে সেটাও ভারতের কাছে সন্দেহের উদ্রেক করবে। একজনের বাণিজ্যের নিরাপত্তা আরেকজনের বাণিজ্যের প্রতি হুমকি।

মধ্যপ্রাচ্য একাধারে চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং অন্যান্য দেশের জন্যে জ্বালানী তেলের প্রধান উতস হওয়াতে ভারত মহাসাগরে চীনের যুদ্ধজাহাজের আনাগোনা বাড়ার সাথেসাথে জাপান এবং কোরিয়ার নৌবাহিনীকেও দেখা যাবে শিগগিরই। আপাতত জাপান বঙ্গোপসাগরে ‘বিগ-বি’ প্রজেক্ট নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও এই প্রজেক্টের পিছনে পিছনে জাপানী নৌবাহিনীও ভারত মহাসাগরে আসবে। মাহানের থিওরি এখানে একেবারে চমতকারভাবে ফলতে যাচ্ছে। আমদানি-রপ্তানি-নির্ভর অর্থনীতি এরকম নৌশক্তির জন্ম দেবে - এটা আলফ্রেড মাহান চিন্তা করতে পেরেছিলেন বলেই তার থিওরি এখন আবার নতুন করে অনেকেই পড়া শুরু করেছেন।

প্রবাহ না দেখলে ভারতীয় উপমহাদেশে আসল শক্তির উতস যেমন নিরূপণ করা যাবে না, ঠিক তেমনি বর্তমান ভারতের কৌশলগত শক্তি বা এর দুর্বলতাও সঠিকভাবে হিসেব করা যাবে না।

 ভারত – দুর্বল রাষ্ট্র?

ভারত মহাসাগরের ভূরাজনীতিকে আলাদাভাবে দেখলে যে বিষয়গুলি চোখে পড়বে, তার মধ্যে একটি হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার উপকূলের বৈচিত্র্য। এই উপকূলের সবচাইতে বড় স্থান জুড়ে রয়েছে ভারত। তবে উলটা ত্রিভুজ আকৃতির হবার কারণে ভারতের নৌবহরকে প্রধান দু’টি ভাগে ভাগ করতে হচ্ছে। কাজেই বিশাল শক্তিধর নৌবাহিনী হওয়া সত্তেও ভারতের নৌবহর প্রকৃতপক্ষে আলাদা দু’টি ফ্লীট হিসেবে অপারেট করবে; এদের একত্রিত হয়ে কাজ করতে পারার সম্ভাবনা খুবই কম। এই অবস্থান ভারতের নৌবাহিনীর জন্যে বিরাট দুর্বল একটা দিক। আবার তাদের উপকূলের বাণিজ্য কেন্দ্রগুলির দিকে তাকালে দেখা যাবে যে কোলকাতা ছাড়া বাকি বন্দরগুলি নদীপথে দেশের গভীরের সাথে সংযুক্ত নয়। এটা একদিকে যেমন অধিকতর ব্যয়বহুল রেলপথ এবং স্থলপথের উপরে ভারতকে নির্ভরশীল হতে বাধ্য কাছে, তেমনি আবার নদীপথের মুখের নিরাপত্তা দেবার দায়িত্ব থেকে তাদের মুক্ত করেছে। বেশিরভাগ সমুদ্রবন্দরগুলি নদীর মুখে না হবার কারণে ভারত অভ্যন্তরীণ পরিবহণের আসল সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অবশ্য এই ভৌগোলিক নিয়তি ভারতীয় উপমহাদেশে হাজার হাজার বছর ধরে। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র এবং মেঘনা-সহ অন্যান্য নদীগুলির সঙ্গমস্থল বাংলাতে হবার কারণে বাংলা ছিল ভারতের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য। উর্বর ভূমি, খণিজ সম্পদ, বিশাল নদীর অববাহিকা, বৃষ্টির প্রাচুর্য্য এবং নদীগুলির সঙ্গমস্থলে সুমদ্রবন্দর থাকায় বাংলা ছিল বিদেশী শক্তির কাছে সবচাইতে লোভনীয় টার্গেট। মাহান নদী অববাহিকার মুখে বন্দরের গুরুত্ব আলাদাভাবে বর্ণনা করেছেন। মিসিসিপি নদী, হাডসন নদী, পটোম্যাক নদী এবং সেন্ট লরেন্স নদীর স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্বকে তিনি হাইলাইট করেছেন। ঠিক একইভাবে ব্রিটিশরা গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র এবং মেঘনা অববাহিকার সঙ্গমস্থলে সমুদ্রবন্দরের গুরুত্ব ধরতে পেরেছিল। যেকারণেই তারা বাংলাতে এসে কলকাতা বন্দর তৈরি করেছিল, যা কিনা ওই নদীগুলির সঙ্গমস্থল থেকে অনেক পশ্চিমে, অর্থাৎ নদীগুলির প্রাকৃতিক প্রবাহের একেবারে উল্টোদিকে। পরবর্তীতে ব্রিটিশরা যখন বাংলার কর্তিত্ব নিয়ে নেয়, তখন এই কৃত্রিম স্থানেই ভারতের প্রধান সমুদ্রবন্দর এবং প্রধান শহর স্থাপন করে। কোলকাতায় প্রধান সমুদ্রবন্দর স্থাপনের কারণে বাংলার পূর্বাঞ্চল থেকে পণ্য উল্টাদিকে নদীপথে পাঠাতে হতো কলকাতায়। পূর্বাঞ্চলেই চাল, পাট, চা-সহ বেশিরভাগ পণ্য উতপাদিত হতো। ব্রিটিশরা কোলকাতায় প্রধান শহর করার কারণে কোলকাতায় সকল কারখানা গড়ে উঠলো, যেগুলি বাংলার পূর্বাংশের উপরে নির্ভরশীল ছিল। আবার বাংলার পূর্বাংশে সকল নদী থাকার কারণে সেখানে স্বাভাবিকভাবেই জাহাজ-নির্মাণ শিল্প গড়ে উঠেছিল। ব্রিটিশরা এই শিল্পের বারোটা বাজিয়ে কোলকাতায় জাহাজ-নির্মাণ শিল্প করে, যেখানে মানুষের জীবনধারণের জন্যে জাহাজ নির্মাণ করাটা জরুরি নয়। এই ইতিহাসগুলির ফলশ্রুতিতে যা দাঁড়ালো তা হলো, যখন ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা দেশ বিভাগ করলো, তখন ভারত কোলকাতার পশ্চাদভূমির বেশিভাগ হারালো পাকিস্তান (পরবর্তীতে বাংলাদেশ)-এর কাছে। আসামের বিশাল এক ভূমি (বর্তমানে সাতটি রাজ্য) কোলকাতা থেকে আলাদ হয়ে গেলো ব্রহ্মপুত্র নদ এবং গঙ্গা নদীকে কেটে ফেলার জন্যে। বিহার এবং উড়িষ্যাকেও বাংলা থেকে আলাদা করা হলেও সেগুলি অবশ্য ভারতের নিয়ন্ত্রণেই থাকলো। ব্রিটিশদের এই বিভাজন ভারতকে জন্ম থেকে দুর্বল করেছে। পশ্চাদভূমি ছাড়া আধা-গুরুত্বের কোলকাতা বন্দর পায় ভারত এবং তিনটি প্রধান নদীর সঙ্গমস্থল সমুদ্রবন্দর-সহ হারায় ভারত। ব্রিটিশরা বুঝতে পেরেছিল যে ভারতীয় উপমহাদেশের মূল শক্তি হচ্ছে বাংলা। তাই বাংলাকেই তারা প্রায় দু’শ বছর তাদের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক কার্যক্রমের কেন্ত্রভূমি করেছিল। বাকি অঞ্চল ছিল অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাকে একটা অঞ্চল হিসেবে না রাখার ক্ষেত্রে তারা ছিল বদ্ধ পরিকর। ভারত এবং পাকিস্তান গঠনের চাইতে বাংলাকে কয়েক ভাগ করে দুই দেশের মাঝে বিতরণ করাটা বৃটিশদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ১৮৫৭ সালের সিপাই বিপ্লব সহ উপমহাদেশের বেশিরভাগ ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন বাংলাতেই সংগঠিত হয়েছিল। ব্রিটিশরা বঙ্গোপসাগরে একটা শক্তিশালী দেশ রেখে যাবার পক্ষপাতি ছিল না; বরং এমন একটা ভারতের পক্ষপাতি ছিল যার কিনা আকারে বিশাল হলেও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে উঠতে অনেক কষ্ট করতে হতো। বহুজাতিক এক রাষ্ট্র ভারত নিজেকে সামাল দিতেই ব্যস্ত থাকবে চিরকাল। আর এরকম একটা উদ্ভট রাজনৈতিক ম্যাপ ভারতের নেতৃবৃন্দকে সারাজীবন ভারতের অখন্ডতা বজায় রাখার চিন্তায় (যেখানে বাংলা নিয়ে চিন্তা থাকবে সবার উপরে) মশগুল রাখবে এবং তাদেরকে পশ্চিমা শক্তির কথায় চলতে বাধ্য করবে। বহু বছর আগে থেকেই চীনারা ভারতের উপরে পশ্চিমা প্রভাবের এই ব্যাপারটা বুঝতে পেরেই ভারতকে বিশ্বাস করতে ছিল অনিচ্ছুক।

ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া এই বিন্যাসের ষোল কলা পূর্ণ করেছে ভারত নিজেই। অজায়গায় ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া কোলকাতা বন্দর চালু রাখতে ভারত গঙ্গা নদীতে বাঁধ দিয়ে স্রষ্টার দেওয়া সবচাইতে বড় উপহারগুলির একটিকে ধর্ষণ করেছে। প্রাকৃতিক এই নদীকে কেটে ফেলে ভারত ভাটির দেশ বাংলাদেশের যতটা না ক্ষতি করেছে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি তারা ভারতের করেছে। বাংলাদেশে যে পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়, তাতে সঠিক নীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ পানির সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেয়েও যেতে পারে, কিন্তু ভারত সারাজীবন খুঁড়িয়ে চলবে। অন্যান্য নদীর উপরে বাঁধ এবং নদী-সংযোগ প্রকল্পের মতো আত্মহননের চেষ্টা ভারতকে ডোবাবে। এভাবে প্রাকৃতিক সম্পদকে ধ্বংস করে এবং ভাটির দেশের উপরে চরম চাপ সৃষ্টি করে ভারতের পক্ষে বঙ্গোপসাগরের কর্তিত্ব রাখা কতোটা সম্ভব হবে, সেটা প্রশ্নাতীত নয়। বঙ্গোপসাগরে ভারতের বিশাল লম্বা সমুদ্রতট রক্ষা করা ভারতের জন্যে বেশ কঠিনই হবে। এই লম্বা সমুদ্রতট তাদের বঙ্গোপসাগরের সামরিক শক্তিকে কয়েকটা ভাগে ভাগ করে ফেলবে, যেটা তাদের ভবিষ্যতের যে কোন সামরিক পদক্ষেপে তাদের বিপক্ষে কাজ করবে। আলফ্রেড মাহান ১৮০৫ সালের ব্রিটিশদের সাথে নৌ-যুদ্ধে ন্যাপোলিয়নের ফ্রান্সের এই দুর্বলতার কথা বলেছিলেন, যেখানে ফ্রান্সের আকৃতি ভারত থেকে আরও অনেক ছোট। ভারতের সমস্যা ফ্রান্সের কয়েক গুণ হবে –এটাই স্বাভাবিক। নদী কম থাকার কারণে এই লম্বা উপকূল বরাবর কোলকাতা, বিশাখাপত্তম, চেন্নাই-সহ অনেকগুলি বন্দর রক্ষা করার চ্যালেঞ্জের সাথে যোগ হয়েছে মূল ভূখন্ড থেকে আলাদা থাকার কারণে আন্দামান এবং নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের নিরাপত্তা দেওয়া, যা কিনা বঙ্গোপসাগরে ভারতকে আরও বেশি দুর্বল করবে। বঙ্গোপসাগরে ভারত চিরকাল অকর্মণ্য শক্তির মোকাবিলা করবে বলে চিন্তা করে থাকলে সামনের দিনগুলিতে তাদের সামনে চমক অপেক্ষা করছে।
আরব সাগরে পাকিস্তানের সাবমেরিন ভারতের বাণিজ্যপথের জন্য মারাত্মক হুমকি। এই বিপদ ভারতের বিভক্ত নৌবহরকে বেশ ব্যস্ত রাখতে পারবে।


পাকিস্তান – অল্পেই সাফল্য?

পশ্চিম পাকিস্তানের (বর্তমান পাকিস্তান) জন্ম হয়েছিল এমন একটা ভূমি নিয়ে, যেখানে অত্যন্ত শক্তিশালী একটা নদীর (সিন্ধু নদ) মুখে একটা গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর (করাচী) তারা পেয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তান এই নদী এবং বন্দরের পুরো সদ্যবহার করতে পারেনি। এটার কারণ হিসেবে ভারতের সাথে পাকিস্তানের বিশাল ভূমি-সীমান্তের কথা বলা যায়। এতবড় ভূমিকে নিরাপত্তা দিতে পাকিস্তানের নেতৃত্বের দৃষ্টি চলে যায় ভূমির দিকে। মাত্র কিছুদিন আগে, ২০১১ সালে, পাকিস্তান সিন্ধু নদকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ নদীপথ উন্নয়নের চেষ্টা শুরু করে। পাকিস্তানের ৯৬% পণ্য পরিবহণ হয় স্থলপথে; বাকি ৪% রেলপথে। এর অর্থ হচ্ছে, পাকিস্তান নিজেদেরকে ম্যারিটাইম শক্তি হিসেবে তৈরি করার চেষ্টাই করেনি কখনো। মাহান বলেছিলেন যে ইউরোপিয়ান ভূমির অংশ হবার কারণে ফ্রান্স নৌশক্তিতে ঠিকমতো উন্নতি করতে পারেনি; যেটা ব্রিটেন পেরেছিল দ্বীপ দেশ হবার কারণে। পাকিস্তানও ফ্রান্সের মতো তার জাতীয় শক্তির বেশিরভাগটা খরচ করবে স্থলশক্তি তৈরি করতে; অর্থাৎ পাকিস্তানের স্থলসীমানার আশেপাশের এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতে পারার চাইতে খুব বেশি ক্ষমতা থাকছে না। এরপরেও পাকিস্তান তাদের নৌবাহিনী তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে যা কিনা আরব সাগরে পাকিস্তানের সাথে মধ্যপ্রাচ্যের যোগাযোগ অটুট রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে। আর একইসাথে ভারতের নৌবহর দুই সাগরের মাঝে ভাগ হয়ে যাবার কারণে আরব সাগরে পাকিস্তান কিছুটা হলেও স্বস্তিতে থাকবে। স্থলভাগে দৃষ্টি থাকার কারণে পাকিস্তান গভীর সমুদ্রে যাবার ক্ষেত্রে গুরুত্বারোপ না করে আরব সাগরে নিজেদের বাণিজ্য রক্ষা করা এবং দরকারে আক্রমণাত্মক কাজের মাধ্যমে ভারতের আরব সাগরের বাণিজ্য ব্যাহত করবে। এক্ষেত্রে ভারত অত্যন্ত দুর্বল অবস্থানে থাকবে, কারণ মধ্যপ্রাচ্য এবং ভারতের ঠিক মাঝখানে পাকিস্তানের অবস্থান। ম্যারিটাইম শক্তি না হয়েই পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ভারতের যথেষ্ট ক্ষতি করা সম্ভব। আরব সাগরের বাণিজ্য রক্ষা করতে ভারতের নৌবহরের বেশিরভাগটাই লাগবে; অথচ তারা তাদের পূর্বের সমুদ্র উপকূলও খালি রাখতে পারছে না। চীন পুরো ভারত মহাসাগরে নৌশক্তি মোতায়েনের মাধ্যমে ভারতকে যতটা না সমস্যায় ফেলতে পারবে, তার চাইতে পাকিস্তানী নৌবাহিনীর আক্রমণাত্মক শক্তি বৃদ্ধি করে এর চাইতে অনেক সমস্যায় জর্জ্জরিত করতে পারবে – এটা চীনারা ভালোই বুঝেছে।

মিয়ানমার যুদ্ধজাহাজ তৈরিতে বেশ এগুচ্ছে। কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল নীতি তাদেরকে অন্ধকারে পতিত করবে।

মিয়ানমার – উদ্দেশ্যহীন?

বার্মার (বর্তমান মিয়ানমার) জন্ম হয়েছে ইরাবতী নদী এবং এর দক্ষিণ প্রান্তে রেঙ্গুন (বর্তমান ইয়াংগন) সমুদ্রবন্দর নিয়ে। একইসাথে মিয়ানমার বিশাল এক উপকূল পেয়েছে। প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এই দেশ প্রকৃতই নদীমাতৃক; নদীভিত্তিক পরিবহণ ব্যবস্থা খুবই চমতকার। তবে মিয়ানমারের বিশাল উপকূলের নিরাপত্তা দেওয়া এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘদিন সামরিক জান্তার অধীনে থাকার কারণে মিয়ানমার বহিঃবাণিজ্যের উপরে নির্ভরশীল হয়নি একেবারেই। কিন্তু একইসাথে শক্তিশালী একটা দেশ হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারেনি সুযোগ থাকা সত্ত্বেও। সামরিক জান্তা মিয়ানমারের ভৌগোলিক অখন্ডতা ঠিক রাখতে নিজেদের নাগরিকদের মেরে শেষ করেছে; দেশকে করেছে দুর্বল। মিয়ানমারের সাম্প্রদায়িক এই সমস্যাকে কাজে লাগিয়েছে তার প্রতিবেশী চীন, ভারত ও থাইল্যান্ড। মিয়ানমার ১৯৯০ সাল থেকে তার নৌবাহিনী তৈরির কাজে হাত দিয়েছে; নিজেরাই যুদ্ধজাহাজ বানাচ্ছে তারা। আপাতঃদৃষ্টিতে এই নৌবহর তৈরির উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশের বিরূদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা, কারণ তাদের সাথে রোহিঙ্গা মুসলিমদের নিয়ে একটা দীর্ঘমেয়াদী সাম্প্রদায়িক সমস্যা রয়েছে। মিয়ানমারে উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়বাদীরা খুবই শক্তিশালী, যা কিনা মিয়ানমারকে ভেতর থেকে দুর্বল রাখবে। কিন্তু যেহেতু মিয়ানমার সরকার দেশকে ম্যারিটাইম দেশ হিসেবে তৈরির কোন চেষ্টাই কখনো করেনি, তাই তাদের এই জাহাজ নির্মাণ অন্তসারশূণ্যই মনে হয় আপাতঃদৃষ্টিতে। বাংলাদেশের বাস্তবতা বুঝতে না পারার কারণেই মিয়ানমার হয়তো এই প্রতিযোগিতায় নেমেছে। যেহেতু এই নীতি প্রতিক্রিয়াশীল, তাই এটা বেশিদূর এগুবে বলে মনে করাটা সমীচীন হবে না। চীনের কাছ থেকে সাহায্য নিলেও এখন তারা ভারতের দিকে হাত বাড়িয়েছে, যা কিনা চীনের ভালো চোখে দেখার কথা নয়। মিয়ানমারে চীনের প্রচুর স্ট্র্যাটেজিক বিনিয়োগ রয়েছে যেটা চীন রক্ষা করতে চাইবে যেকোন মূল্যে; বিশেষ করে যদি কোন কারণে চীন মালাক্কা প্রণালী ব্যবহারে বাধাপ্রাপ্ত হয়, তাহলে মিয়ানমারে তৈরি ডীপ-সী পোর্ট হয়ে উঠবে চীনের রক্ষাকবচ। চীনের কাছে মিয়ানমারের এই ধরনের স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্বের কারণেই চীন মিয়ানমারকে তার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সচেষ্ট হবে। কিন্তু চীনের ক্ষেত্রেও এই বাণিজ্যপথ রক্ষা করাটা কঠিন। কারণ এতে করে বঙ্গোপসাগরে চীনের একটা নৌবহর রাখতে হবে, যা কিনা বর্তমান বাস্তবতায় খাটে না। এমতাবস্থায় চীন বঙ্গোপসাগরে সবসময়ই যুদ্ধ এড়িয়ে চলবে।


নদীমাতৃক বাংলাদেশে জাহাজ তৈরি একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। তারপরেও ম্যারিটাইম দেশ হতে এখনও কিছু পথ পেরুতে হবে


বাংলাদেশ – ফিনিক্স ফ্রম দ্যা এশেজ?

পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) জন্ম বাংলা প্রদেশকে ভাগ করে। উপরেই বলেছি যে ব্রিটিশরা গঙ্গা এবং ব্রহ্মপুত্র-কে ভাগ করতেই বেশি সচেষ্ট ছিল। বহুকাল রাজনৈতিক সমস্যায় জর্জ্জরিত থাকলেও গত ১৫-২০ বছরে এদেশ অর্থনৈতিকভাবে যা অর্জন করেছে, সেটা অনেক জিওপলিটিশিয়ানকে অবাক করেছে। মাত্র এক দশক আগেও বাংলাদেশ কোন হিসাবেই ছিল না; অথচ আজ সব হিসাবেই বাংলাদেশ বিদ্যমান। ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া অভাব অনটন এদেশের মানুষকে আর্থিক উন্নতির জন্যে ভুভুক্ষু করেছিল। দেশ বিভাগের সময় বেশিরভাগ কারখানা রয়ে যায় কোলকাতায়, অথচ কারখানার বেশিরভাগ কাঁচামাল আসতো বাংলাদেশ থেকে। এদেশের অর্থনীতি ধুঁকে ধুঁকে চলে পাকিস্তান আমলে এবং ১৯৭১-এ বাংলাদেশ হবার পরেও। শীতলযুদ্ধের প্রভাবে বৃহত শক্তিদের ততপরতায় বাংলাদেশের রাজনীতি ছিল রক্তাক্ত; সামরিক শাসনও ছিল বহুকাল। এদেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক অগ্রগতি শুরু হয় ১৯৮০-এর শেষের দিকে, যখন থেকে এদেশে তৈরি পোষাকের কারখানা স্থাপন শুরু হয়। কমদামী দর্জিগিরির কাজ হলেও এখানেই প্রকৃত বৈদেশিক বাণিজ্যের উদ্ভব হয় এদেশের। এই শিল্প জন্ম দেয় ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজের এবং সেগুলি জন্ম দেয় আরও শিল্পের। বৈদেশিক বাণিজ্যের অভিজ্ঞতা নিয়ে বহু পণ্যের রপ্তানি শুরু হয় পরবর্তী দশকগুলিতে। শিক্ষাক্ষেত্রে অগ্রগতির কারণে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আবির্ভাব হয়, যারা বিভিন্ন বাণিজ্য এবং কলকারখানার হাল ধরে। ’৯০-এর দশকে কৃষিতে শুরু হয় বিপ্লব; এদেশের মাটি, আবহাওয়া এবং ব্যাপক বৃষ্টিপাত সাহায্য না করলে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কাজ হতো না, কারণ উজানে ভারত প্রায় সব নদীতে বাঁধ দিয়েছে; ব্রিটিশরা হয়তো এটা চিন্তা করেই সীমান্ত ঠিক করেছিল। ২৪,০০০ কিলোমিটার নদীপথ শুকিয়ে কমতে কমতে চার হাজার কিলোমিটারে নেমে এসেছে আজ, কিন্তু তারপরেও এদেশের মানুষ এখনো পানির উপরে নির্ভরশীল। গুগল আর্থের ম্যাপে গেলে বোঝা যায় যে এদেশের বিরাট একটা অংশ আসলে পানিতে ভর্তি। শুধু মানুষের চিন্তা থেকে পানিকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে (কিভাবে করা হয়েছে সেটা নাহয় আরেকদিন লিখবো)। ম্যারিটাইম দেশ তৈরিতে এটা একটা বড় বাধা।

কিছুদিন আগে মিয়ানমার এবং ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা মিটমাট করার পর থেকে ম্যারিটাইম সেক্টর বেশ গুরুত্ব পেতে শুরু করে। আলফ্রেড মাহান বলেছিলেন যে একটা দেশ ম্যারিটাইম দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে হলে তার দরকার একটা বড় জনসংখ্যা (যেটা বাংলাদেশের আছে) এবং দেশের মানুষের পানির সাথে সম্পৃক্ততা (যেটা অনেকটাই কমে গেছে গত কয়েক দশকে)। একসময় দেশের জনস্ংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বিদেশ থেকে প্রচুর অর্থ পাওয়া গেলেও এখন এটা পরিষ্কার যে এই বিশাল জনগোষ্ঠীই এদেশের সবচাইতে বড় সম্পদ। বিশ্ব অর্থনীতি এখন দ্রুত জনবহুল দেশগুলির দিকেই ঝুঁকে যাচ্ছে। গত এক দশকে দেশে জাহাজ নির্মাণ শিল্প উঠে দাঁড়াতে শুরু করেছে। ব্রিটিশরা ১৭৭৮ সাল থেকে বাংলায় জাহাজ নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ শুরু করে; তারা জানতো যে এদেশের মানুষ জাহাজ তৈরিতে মনোনিবেশ করলে কি হতে পারে। এদেশে জাহাজ-নির্মাণ শিল্পের পিছনে সবচাইতে বড় ভূমিকা পালন করেছে জাহাজ-ভাঙ্গা শিল্প, যেকারণে এই শিল্পের বিরূদ্ধে Subversive Activity ছিল সবচাইতে বেশি। এই শিল্প থেকে আসা স্ক্র্যাপ লোহা দিয়েই গড়ে উঠেছে দেশের কৃষি-যন্ত্র শিল্প, মেশিন শিল্প, রড তৈরি শিল্প (যা কিনা রিয়েল এস্টেটের বিকাশে বিশাল ভূমিকা রেখেছে)। রিয়েল এস্টেট জন্ম দিয়েছে সিমেন্ট শিল্পের, জন্ম দিয়েছে ইট তৈরি শিল্পের, কাঁচ শিল্পের, এলুমিনিয়াম শিল্পের, ইলেক্ট্রিক পণ্যের, পেইন্ট শিল্পের, স্যানিটারি ওয়্যার শিল্পের, কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি ইত্যাদির। এসব ইন্ডাস্ট্রির জন্যে লেগেছে জাহাজ – বালুবাহী জাহাজ, ড্রেজার, কার্গো জাহাজ, তেলবাহী জাহাজ, ইত্যাদি। কন্টেইনার জাহাজও তৈরি শুরু হয়েছে কিছুদিন হলো। এই জাহাজগুলির অনেকগুলিই ব্যবহৃত হলো চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে মালামাল দেশের অন্যান্য স্থানে পরিবহণে। দেশের ৯০% তেল নদীপথে পরিবাহিত হয়। কাজের জন্যে মানুষ বিভিন্ন শহরে বসবাসের কারণে নদীপথে বহু যাত্রী পরিবাহিত হয়; যাত্রীবাহী জাহাজ তৈরিও চলছে ব্যাপক হারে। এদেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথে প্রায় ৩৫ হাজার নৌযান চলছে। এতকিছুর পরেও কেন ম্যারিটাইম দেশ নয়? কারণ এখন পর্যন্ত চিন্তায় সমুদ্র খুব অল্প স্থান জুড়ে রয়েছে; দেশের মানুষ পানিকে বন্ধু ভাবে না (সেটা অবশ্য তৈরি করা হয়েছে); ড্রেজিং-এর মাধ্যমে দেশের নদীপথ উন্নয়নে বাজেট থাকে না (যদিও সড়ক ও রেলপথ উন্নয়নে প্রচুর বিদেশী ডলার আসে); সমুদ্রগামী জাহাজ তৈরিতে দেশীয় উদ্যোগতাদের তেমন আগ্রহ নেই (যদিও এদেশের জাহাজ ইউরোপে রপ্তানি হয়); সমুদ্রবন্দর উন্নয়নে অথর্বের নীতি অনুসরণ (যদিও বন্দর বাণিজ্য বিরাট সাফল্য পেয়েছে); বঙ্গোপসাগরে খণিজ সম্পদ আহরণের কোন কিনারাই হলো না (যদিও ভারত ও মিয়ানমার এগিয়ে গেছে); গভীর সমুদ্রবন্দর প্রজেক্ট শম্ভুক গতিতে চলছে (জিওপলিটিক্সে আটকে গেছে); ইত্যাদি। উপরের লম্বা বর্ণনাতে ইন্ডাস্ট্রির সাথে সাথে জাহাজ-নির্মাণ এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের উল্লেখ করেছি, যা কিনা বাংলাদেশকে বঙ্গোপসাগরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। নদী এবং সমুদ্র বিষয়ে পড়াশোনা শুরু হয়েছে সবে; বঙ্গোপসাগরের জন্যে ফিশিং ট্রলার তৈরি শুরু হয়েছে দেশে; শিপিং লাইনারও চালু হতে চলেছে (যা কিনা মানুষকে সমুদ্রের ব্যাপারে আগ্রহী করবে); ইউরোপে মন্দার পরেও জাহাজ রপ্তানি শুরু হয়েছে আবার; যুদ্ধজাহাজ তৈরি শুরু হয়েছে; তিনটা নদীর পলিত উপরে নির্ভরশীল বদ্বীপ অঞ্চল হওয়ায় বঙ্গোপসাগরে দ্বীপ উন্নয়ন নিয়ে চিন্তাভাবনা হচ্ছে; নৌবাহিনীর মূল্যায়ন শুরু হয়েছে অবশেষে – এগুলি সামনের দিন দেখায়। তবে দেশের সরকারের সঠিক নীতি এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

বেঁচে থাকার তাগিদেই বাংলাদেশের মানুষ বঙ্গোপসাগরের দিকে ছুটবে। সমুদ্র বাণিজ্য এবং সমুদ্র সম্পদের নিরাপত্তার প্রশ্ন এই জাতিকে যতো বেশি ভাবাবে, তারা ততো বেশি বঙ্গোপসাগর থেকে ছুটে বের হতে চাইবে।

বঙ্গোপসাগর – বাংলাদেশের বেসিন?

বঙ্গোপসাগরের ভবিষ্যত নির্ভর করছে বাংলাদেশের মানুষের নিজেদেরকে মূল্যায়নের উপরে। ভৌগোলিক অখন্ডতার কোন প্রশ্ন এদেশের নেই; এদেশের ভূ-প্রকৃতি এবং বিশাল জনসংখ্যা যেকোন আগ্রাসী শক্তির জন্যে দুঃস্বপ্ন; ভারতের মতো সামরিক শক্তির বিভক্ত হবার সম্ভাবনাও নেই একেবারেই – এসব ব্যাপার বাংলাদশের স্থলভাগকে করবে শক্তিশালী এবং বঙ্গোপসাগর নিয়ে চিন্তায় করবে আগ্রহী। অপরদিকে ভারত তার যে অবস্থানে রয়েছে (যা উপরে বর্ণনা করা হয়েছে), সেখান থেকে খুব বেশি দূরে যাবার সম্ভাবনা কম। মিয়ানমার তাকিয়ে রয়েছে বাংলাদেশের দিকে। আরব সাগরে পাকিস্তানের অবস্থান বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরের অবস্থানকে প্রভাবিত করলেও সেটা হবে পরোক্ষভাবে। বিশাল সম্পদশালী বাংলাকে চিরে ব্রিটিশদের স্বজত্নে তৈরি করা বাংলাদেশের হাতে এখনও রয়েছে বিশাল তিনটা নদী (যা ১৯৪৭ সালে সীমানা দিয়ে কেটে ফেলার পরেও এবং পরে উজানে বাঁধ দিয়ে আটকালেও বৃষ্টির পানিতে ভরা সম্ভব) এবং এর সঙ্গমস্থলে রয়েছে একাধিক সমুদ্রবন্দর। এদেশ এখন বহিঃবানিজ্যের উপরে এতটাই নির্ভরশীল যে বহিঃবাণিজ্যকে রক্ষা করাটা দেশের বাঁচা-মরার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাহান ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন যে ব্রিটেন এবং হল্যান্ড কিভাবে তাদের দেশের অভাবের কারণে বৈদেশিক বাণিজ্যের উপরে নির্ভরশীল হয় এবং অবশেষে ঔপনিবেশিক শক্তিতে পরিণত হয়। দু’টা দেশই পানির দেশ হবার কারণে এদের সাথে বাংলার সবচাইতে বেশি মিল ছিল। পার্থক্য ছিল একটাই – বাংলা ছিল সমৃদ্ধশালী এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ; অপরদিকে ইউরোপিয়ানরা ছিল দরিদ্র এবং বহিঃবাণিজ্যের উপরে নির্ভরশীল। কিন্তু এ-তো ১৭৬৪ সালের আগের কথা বলছি; আজকের বাস্তবতা তো ভিন্ন। ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া ভুভুক্ষু বাংলাদেশ গত ১৫-২০ বছরে বৈদেশিক বাণিজ্যের উপরে নির্ভরশীল এক দেশে পরিণত হয়েছে। বেঁচে থাকার তাগিদেই সারভাইভাল ইন্সটিংক্ট নিয়ে এই দেশের মানুষ বঙ্গোপসাগর আবিষ্কারে বের হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত এদেশের বাণিজ্যিক স্বাধীনতা পূর্ণতা না পায়, ততদিন এদেশের মানুষ বঙ্গোপসাগরে পাড়ি জমাবে এবং এই সাগর থেকে ভারত মহাসাগরে পাড়ি জমাবে। মাহানের থিওরি এখানে পুরোপুরি সফলতা পেতে চলেছে। ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণমূলক সীমারেখা এদেশে প্রায় অর্ধশত বছর সাফল্য দেখিয়েছে; কিন্তু এখন এই নিয়ন্ত্রণই একটা এগ্রেসিভ ম্যারিটাইম দেশের জন্ম দিতে চলেছে। বিশাল এক জনগোষ্ঠী যখন ছোট্ট একটা দেশে বেঁচে থাকার চাপে থাকবে, তখন তার অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসার ইচ্ছে থাকবে প্রবল। একটা জনগোষ্ঠীকে পরিকল্পিতভাবে শিক্ষিত করে Subversion-এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও এই শিক্ষাই একসময় মানুষকে তার ঘোর থেকে জাগিয়ে তুলে – এটা মানুষের সৃষ্টিতত্বেই নিহিত, যা কিনা অনেকেই বোঝেন না।

Thursday, 13 August 2015

যুদ্ধক্ষেত্রের রাজা আসলে কে?

১৩ অগাস্ট ২০১৫

এই নশ্বর পৃথিবীতে এটা চিন্তা করার উপায় নেই যে কোন একটা ধারণা সারাজীবন টিকে রইবে। ইউনিভার্সাল ট্রুথ ছাড়া এই কথাটা সবক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। বিশেষভাবে প্রযোজ্য ওইসব ক্ষেত্রে যেখানে পরিবর্তন আসে বেশ দ্রুততার সাথে। আর দ্রুত পরিবর্তন সেখানেই আসে, যেখানে ধারণাটা কোন জাতির অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত থাকবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় চীনের প্রাচীরের কথা। হল্যান্ডের সমুদ্র উপকূলের বাঁধের কথাও উল্লেখ করা যেতে পারে। কিন্তু এই ব্যাপারগুলি তেমন একটা দ্রুত পরিবর্তনশীল নয়। হল্যান্ডের বাঁধ তৈরির পরে সমুদ্রের ঢেউ হঠাত দু’শ ফুট উপর দিয়ে আসতে শুরু করেনি। চীনের প্রাচীরের উপর দিয়েও মোঙ্গলরা উড়ে উড়ে আসেনি (যদিও তারা প্রাচীরের দরজা পার হয়েই চীন জয় করেছিল)। আসলে কথাটা যেখানে নিতে চাচ্ছি, তা হচ্ছে যুদ্ধ। যুগে যুগে মানুষ বহিঃশত্রুকে মোকাবিলায় নতুন নতুন ধারণার আবির্ভাব ঘটাতে বাধ্য হয়েছে। যুদ্ধ-প্রযুক্তি এবং কৌশলে এনেছে ব্যাপক পরিবর্তন। অস্তিত্ব রক্ষার খাতিরেই এই পরিবর্তন হতে হয়েছে দ্রুত। যারাই এব্যাপারে শম্ভুক গতিতে এগিয়েছে, তারাই অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে, অথবা অস্তিত্ব পুরোপুরিই হারিয়েছে। এরই মাঝে কিছু ধারণা রয়েছে যেগুলি সময়ে সময়ে পুণরুজ্জীবিত হয়েছে; ইতিহাসের হয়েছে পূণর্লিখন। এমনই কিছু ধারণা নিয়ে আজ কথা বলতে চাইছি।
সুইডিশ আর্মি বাকি দুনিয়ার বাহিনীগুলি থেকে পুরোপুরি আলাদা, কারণ তারা বরফকে মাথায় রেখেই তাদের বাহিনী তৈরি করেছে
 
পরিবর্তন আসলে কি?

একটা সেনাবাহিনীর গঠনতান্ত্রিক চিন্তাধারার মাঝে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির মাঝে একটা হচ্ছে কোন ধরনের বাহিনী বা অস্ত্র দিয়ে সেনাবাহিনী সাজাবে। এক্ষেত্রে সেই দেশের ভৌগোলিক গঠন, রাজনীতি, অর্থনীতি, জনসংখ্যা ইত্যাদি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুতপূর্ণ সে দেশের সামরিক চিন্তাবিদেরা কোন ঐতিহাসিক চিন্তাকে প্রাধাণ্য দিচ্ছেন। যেমন বিংশ শতকের যুদ্ধগুলির কথা চিন্তা করে সামর্থ্য থাকা সেনাবাহিনীগুলি হেলিকপ্টারকে স্থলযুদ্ধের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে চিন্তা করতে শিখেছে। এক্ষেত্রে কেউ যদি এই হেলিকপ্টারের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করতে যায়, তাহলে সে হয়তো শুধু হেলিকপ্টারের টাইপ পরিবর্তন বা যুদ্ধক্ষেত্রে হেলিকপ্টারের অবস্থানগত পরিবর্তন করেই ক্ষান্ত হবে; অর্থাৎ এই পরিবর্তন যুদ্ধক্ষেত্রের ব্যাকরণে আমূল পরিবর্তন আনবে না। অন্যভাবে বললে, আমূল পরিবর্তন আনার জন্যে যতটা সাহসী চিন্তার প্রয়োজন, সেটা সবাই প্রদর্শন করবে না। তবে এখানে আরেকটি ব্যপারও গুরুত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে – সেই পরিবর্তন কতটা প্রয়োজনীয়, সেটার সঠিক অনুধাবন করতে পারা। ব্যাপক পরিবর্তনের ফলশ্রুতিতে মনে হতে পারে যে নিজেদের সেনাবাহিনী আশেপাশের দেশের সেনাবাহিনীর তুলনায় প্রায় অন্য গ্রহে অবস্থান করছে। কিন্তু নিজেদের ধারণা যদি শক্ত ভিতের উপরে প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে এরকম চিন্তার আবির্ভাব নাও আসতে পারে। উদাহরণস্বরূপ সুইডেনের সেনাবাহিনীর কথা বলা যেতে পারে। তাদের পুরো সেনাবাহিনীই বরফের উপরে চলাচলের উপযোগী। এটা করতে গিয়ে সুইডেনের সমরবিদদের কঠিন পক্ষেপ নিতে হয়েছে - অন্যান্য দেশের সেনাসদস্যরা শক্তিশালী অস্ত্র বলতে যা বোঝায়, সেগুলি পুরোপুরি উপেক্ষা করতে হয়েছে। ফলশ্রুতিতে সুইডেন এমন একটা বাহিনী তৈরি করেছে, যা কিনা বরফের উপরে যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে দুনিয়ার সেরা। তবে বরফ ছাড়া অন্য কোথাও যুদ্ধ করার তেমন একটা চিন্তা তারা করেনি, কারণ দেশের বাইরে যুদ্ধ করাটা তাদের সরকারের রাষ্ট্রনীতির মাঝে পড়ে না। অবশ্য আজকের এই আলোচনায় সুইডেনের ভৌগোলিক-চিন্তার সেনাবাহিনীকে প্রাধান্য দেয়াটা উদ্দেশ্য নয়। বরং উদ্দেশ্য হচ্ছে ভৌগোলিকতাকে সাধারণ ধরে বিশ্বের স্থলযুদ্ধ-কৌশল নিয়ে কথা বলা, যেখানে ঐতিহাসিক পরিবর্তনগুলি অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আর এই ঐতিহাসিক চিন্তার কারণেই ভৌগোলিক চিন্তা বাদ দিয়েই বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের ক্ষেত্রেই স্থলযুদ্ধের ধারণাগুলি হয়েছে বৈশ্বিক ইতিহাস-নির্ভর, যেটার উদাহরণ হিসেবেই উপরের হেলিকপ্টারের কথা টেনেছি। 

পরিবর্তনের ঐতিহাসিক চেইন

হেলিকপ্টারের কথাই যদি টেনে নিয়ে যাই, তাহলে দেখবো যে গত পঁচিশ বছরের ইতিহাসে স্থলযুদ্ধে ট্যাঙ্ক-ধ্বংসী হিসেবে হেলিকপ্টারের সুনাম তৈরি হয়েছে। অথচ এই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েই এই দায়িত্ব পালন করেছে রাশিয়ার ইল-২ এবং ইল-১০ বিমান, কারণ তখন হেলিকপ্টার তেমন কোন গুরুত্বপূর্ন যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়নি। আর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে দেখলে দেখবো তেমন কোন শক্তিশালী বিমানই ছিল না; ট্যাঙ্কের আবির্ভাবই তো তেমন ভয়ঙ্করভাবে হয়নি। এসবের অর্থ হচ্ছে, মাত্র এক’শ বছরের মাঝেই যুদ্ধক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। আগামীতেও যে এরকম দ্রুত পরিবর্তন অব্যহত থাকবে না, সেটা কি করে বলি? যাই হোক, যে কারণে ট্যাঙ্ক-ধ্বংসী হেলিকপ্টারের কথা আনা – ট্যাঙ্ক না থাকলে এমন হেলিকপ্টারের তো দরকারই হতো না, ঠিক কিনা? আর ট্যাঙ্ক-ধংসী হেলিকপ্টার না বানালে হেলিকপ্টার-ধ্বংসী হেলিকপ্টার বানানোর দরকারও যে হতো না! তাহলে শুরু কোথায়? ট্যাঙ্ক, ঠিক কিনা? কিন্তু ট্যাঙ্ক তৈরি হয়েছিল কেন? কারণ পরিখা থেকে কেউ বের হতে পারিছিলো না। সেটা কেন? কারণ পরিখা থেকে মেশিন গান চালালে কোন সৈন্যের পক্ষেই শত্রুর পরিখা দখল করা সম্ভব ছিল না। তাহলে তো সমস্যা মেশিন গান; ঠিক কিনা? কিন্তু মেশিন গানের আবির্ভাব হয়েছিল তো পদাতিক সৈন্যদের ফর্মেশন ভাঙ্গার জন্যে। তাহলে পদাতিকের এই ফর্মেশনই বা কেন দরকার হলো? ঘোড়সওয়ার-বাহিনী বা ক্যাভালরি – এদেরকে ঠেকানোর জন্যেই পদাতিকের ফর্মেশন দরকার হয়েছিল। ক্যাভালরি-কে ঠেকানোর জন্যে কামান বা আর্টিলারির আবির্ভাবও হয় গেল। তবে আর্টিলারি কিন্তু পদাতিকের ফর্মেশন ভাঙ্গার জন্যেও ব্যবহৃত হতো। একই কাজে হাতি, উট এবং ঘোড়াচালিত চ্যারিয়টও ব্যাবহৃতও হয়েছে। ক্যাভালরির আবির্ভাব হওয়ার আগে তীরন্দাজ এবং অন্যান্য ছুঁড়ে মারা অস্ত্র (মিসাইল) ব্যবহার করা হয়েছে পদাতিকের ফর্মেশন ভাঙ্গার জন্যে। আমরা তাহলে সেই একেবারে শুরুতে এমন একটা সময়ে পৌঁছে যাচ্ছি যখন একজন একক সৈন্যের অস্ত্র ধরার মাঝ দিয়েই পদাতিকের আবির্ভাব। আর ডিসিপ্লিনের মাধ্যমে পদাতিকের ফর্মেশন গঠন করে শত্রুর বিরূদ্ধে একধাপ এগিয়ে যাওয়া। ঠিক এসময়েই পদাতিকের ফর্মেশন ভাঙ্গার জন্যে একে একে আবির্ভাব হতে থাকলো ঘোড়া, তীরন্দাজ, হাতি, উট, চ্যারিয়ট, আর্টিলারি, মেশিন গান এবং অবশেষে ট্যাঙ্ক। 

https://medium.com/war-is-boring/battle-of-the-dumbos-elephant-warfare-from-ancient-greece-to-the-vietnam-war-ca62af225917
জামা-র যুদ্ধ (খ্রীষ্টপূর্ব ২০২)। হস্তিবাহিনী পদাতিকের সামনে আবির্ভূত হতো ভয়ঙ্কর এক শক্তি-রূপে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পদাতিকের ডিসিপ্লিনের সামনে হস্তিবাহিনী টেকেনি।


যুদ্ধক্ষেত্রের রাজা আসলে কে?

যুদ্ধক্ষত্রে এতকিছুর আবির্ভাব আসলে কি লক্ষ্যে? যুদ্ধ জয় অবশ্যই। কিন্তু সেটা কখন আসবে? যখন বিপক্ষের সৈন্যরা পালাবে বা হাত তুলে আত্মসমর্পণ করবে। সেটা কখন হবে? যখন শত্রুসৈন্যরা যুদ্ধ করার মনোবল হারিয়ে ফেলবে বা মনে করবে যে এখন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার আর মানে হয় না। এই শত্রুসৈন্য বলতে আমরা কাদের বোঝাচ্ছি? অবশ্যই পদাতিক, কারণ পদাতিকেরাই যুদ্ধক্ষেত্রে ‘অবস্থান’ করে দখল অব্যহত রাখে। পালিয়ে যাওয়া মানেই যুদ্ধক্ষেত্রের দখল ছুটে যাওয়া। অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্রের দখল নেবার জন্যেই শত্রুপক্ষের পদাতিকের মনোবল ভাঙ্গাটা জরুরি। যখন হাজার হাজার তীর আকাশ কালো করে পদাতিকের উপরে আবির্ভূত হয়; যখন ভূমিকম্পের মতো শব্দ করে ক্যাভালরি, চ্যারিয়ট বা হস্তিবাহিনীর অবির্ভাব হয়; যখন বিকট শব্দে আর্টিলারি হামলা শুরু হয়; যখন ট্যাঙ্কের ইঞ্জিনের ধোঁয়া এবং শব্দে মাথা ভারি হয়ে ওঠে; যখন ডাইভ বোম্বার বিমানের সাইরেন-মার্কা শব্দ মৃত্যুর কথা মনে করায় – ঠিক তখনই, ঠিক তখনই – পদাতিকের মনোবলের উপরে আসে আঘাত। এতসকল অস্ত্রের মনস্তাত্বিক একটা চাপ প্রবলভাবে ঘিরে ধরে পদাতিক সৈন্যদের। হাজার হাজার বছর ধরে এই চাপ সহ্য করে আসছে পদাতিক। আর চাপ সহ্য করতে হবেই বা না কেন, তীরন্দাজ, ক্যাভালরি, হাতি, উট, চ্যারিয়ট, আর্টিলারি, ট্যাঙ্ক, বিমান – এরা কেউই তো যুদ্ধক্ষেত্রে দখল কায়েম করে না, বরং নিজেদের পদাতিকের জন্যে দখল কায়েম সহজ করে দেয়। এসকল কারণেই পদাতিকের ডিসিপ্লিন শিক্ষা সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ; পদাতিক বেঁকে বসলেই যুদ্ধ শেষ! এটা মনে করিয়ে দেয় প্রাচীন যুগের যুদ্ধে রাজা বা জেনারেলের মৃত্যুর ব্যাপারটা। রাজা শেষ তো যুদ্ধ শেষ; অনেক যুদ্ধেই রাজাকে টার্গেট করা হয়েছে তাড়াতাড়ি যুদ্ধ শেষ করার জন্যে। পদাতিকের ব্যাপারটাও ঠিক তা-ই। অন্য যতো বাহিনীর পরাজয় হোক না কেন, পদাতিকেরা যুদ্ধক্ষেত্র ছাড়ার আগ পর্যন্ত যুদ্ধ চলে। অর্থাৎ গত কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস ঘাটলে আমরা দেখবো যে পদাতিকই যুদ্ধক্ষেত্রের রাজা। এমনকি সাম্প্রতিক ইরাক যুদ্ধের দিকে তাকালেও আমরা দেখবো যে মার্কিন আর্মার্ড ফর্মেশনগুলি ইরাকের উপর দিয়ে প্রায় হেঁটেই পার হয়ে গেছে; কিন্তু এরপরে দেশের দখলের দায়িত্ব পড়েছে পদাতিকের হাতে। সেই পদাতিকদের শেষ পর্যন্ত রাস্তার পাশে রাখা বোমা আর চোরাগুপ্তা হামলায় নাভিস্বাস উঠেছিল। মার্কিন ট্যাঙ্ক, বিমান, আর্টিলারি – এগুলি কোনকিছুই ইরাক যুদ্ধের যবনিকা টানতে পারেনি। যতক্ষন পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্রের রাজা, মানে পদাতিকের একটা গতি না হয়েছে, ততক্ষণ যুদ্ধ চলেছে। 

https://en.wikipedia.org/wiki/Horses_in_World_War_II
রাশিয়ার কাদায় আটকে গেছে জার্মান পদাতিকের ট্রান্সপোর্ট। কিছু বাহিনী সামনে পৌঁছে গেলেই যুদ্ধ শেষ হয় না; সবাই যখন পৌঁছায় তখনই যুদ্ধ শেষ হয়। আর সবার সামনে পৌঁছাতে অনেক সমস্যা উতড়াতে হবেই।


যুদ্ধক্ষেত্রের গতি আসলে কি?

দখল মানেই অবস্থান; আর অবস্থান মানেই গতিবিহীন অবস্থা। তাহলে যুদ্ধক্ষেত্র দখল মাধ্যমে পদাতিকেরা কি গতির পথ রূদ্ধ করছে? সেটা নয়; কারণ পদাতিকেরা পয়েন্ট-এ থেকে পয়েন্ট-বি পর্যন্ত গিয়ে দখল কায়েম করছে – এটা কিন্তু গতি; স্ট্র্যাটেজিক গতি। যুদ্ধক্ষেত্রে তার গতি কম, মানে ট্যাকটিক্যাল গতি কম, কিন্তু স্ট্র্যাটেজিক গতি যে একেবারেই কম, সেটা কিন্তু বলা যাবে না। পদাতিকেরা পায়ে হেঁটে যুদ্ধ করলেও পায়ে হেঁটেই যে যুদ্ধক্ষেত্র পর্যন্ত পৌঁছাবে, তা কিন্তু নয়। একসময় ঘোড়া, ঘোড়ার গাড়ি, খচ্চর, উট ব্যাবহার করা হয়েছে পদাতিকদের পরিবহণের জন্যে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানরা ঘোড়ার গাড়ি, রেল এবং মোটর গাড়ি ব্যাবহার করতো পদাতিকদের পরিবহণ করার জন্যে। মার্কিন ম্যারিন সৈন্যরা নৌবাহিনীর জাহাজে করে লিফট নেয়। আজকাল মার্কিনরা সামরিক পরিবহণ বিমান ব্যবহার করে পদাতিক পরিবহণের জন্যে। বাংলাদেশের সৈন্যরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শান্তিরক্ষী মিশনে গিয়েছে সিভিলিয়ান যাত্রীবাহী বিমানে। ব্রাজিলের নৌবাহিনীতে বেশকিছু জাহাজ আছে আমাজন নদীর ভেতরে সৈন্য পরিবহণ করার জন্যে। ব্রিটিশ সৈন্যরা সর্বদাই ইউরোপের মেইনল্যান্ডে যুদ্ধ করতে গিয়েছে জাহাজে করে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেবার পরে। ব্রিটিশ মার্চেন্ট মেরিনের জাহাজগুলি রাজার নির্দেশে এই সৈন্যদের পরিবহণ করতো। ১৯৮২ সালে ফকল্যান্ড যুদ্ধের সময়ে ব্রিটিশ নৌবাহিনী সিভিলিয়ান প্যাসেঞ্জার লাইনার জাহাজ রিজুইজিশন করেছিল সৈন্য পরিবহণের জন্যে। মালয়ের গৃহযুদ্ধে ব্রিটিশরা এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিনরা হেলিকপ্টার ব্যবহার করেছে জঙ্গলের ভেতরে পদাতিকদের নিয়ে যাবার জন্যে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে আকাশ থেকে প্যারাশুটের মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রের উপরে পদাতিক সৈন্য ফেলে দেবার চলও শুরু হয়েছে। এই সবই হচ্ছে স্ট্র্যটেজিক গতি। 

যখন যুদ্ধক্ষেত্র ছিল ক্যাভালরি-নির্ভর, তখন কিন্তু ক্যাভালরি একা একা যুদ্ধক্ষেত্রে যায়নি; অপেক্ষা করেছে নিজেদের পদাতিক সৈন্যদের আসার আগ পর্যন্ত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অপারেশন বার্বারোসার (১৯৪১) সময় জার্মান আর্মার্ড ফর্মেশনগুলি বিশাল এক সোভিয়েত বাহিনীকে ইউক্রেনে ঘিরে ফেলেছিল গতির মাধ্যমে। কিন্তু এই এনভেলপ বা পকেট চারিদিক দিয়ে বন্ধ করে দিতে তাদেরকে পদাতিকের আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। এই অপেক্ষাটা না করলে অগ্রগামী জার্মান আর্মার্ড ফর্মেশনকে পিছন থেকে সোভিয়েত বাহিনী কেটে ফেলতে পারতো। মোটকথা ট্যাঙ্কের গতি দিয়ে একটা বাহিনীর স্ট্র্যাটেজিক গতি মাপা সম্ভব নয়। ট্যাঙ্ক কিছুদূর গিয়েই অপেক্ষা করবে নতুন করে তেল নেবার জন্যে। তেলের ট্রাক যুদ্ধক্ষেত্রের শেষমাথায় পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত ট্যাঙ্কগুলি বসে থাকবে। তার মানে যে গতিতে তেলের ট্রাক এগুবে, যুদ্ধ তার চেয়ে বেশি গতিতে এগুবে না। রাস্তায় কোন কারণে তেলের ট্রাকের এগুতে সমস্যা হলে শত শত ট্যাঙ্ক থাকার পরেও যুদ্ধক্ষেত্রে গতি থাকবে না। সকল খাড়াই-উতড়াই পার হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের শেষমাথা পর্যন্ত তেলের ট্রাকের গতিই হলো আর্মার্ড ফর্মেশনের জন্যে স্ট্র্যাটেজিক গতি। যাই হোক, এই গতি আসলে দরকার হচ্ছে কেন? গতির দরকার বিপক্ষের সৈন্যদের ঘিরে ফেলার জন্যে; আর ঘিরে ফেলার দরকার বিপক্ষের সৈন্যদের সাপ্লাই লাইন কেটে ফেলতে এবং পালানোর পথ বন্ধ করতে, যাতে তাদের মনোবল ভেঙ্গে যায়। এই পুরো গতিটাকেই ব্যবহার করা হয়েছে শত্রুর মনোবল ভাংতে। যখনই পদাতিক সেই গতি দিতে পারেনি, তখনই আবির্ভাব হয়েছে নতুন নতুন বাহিনীর; এরা যুদ্ধক্ষেত্রে দিয়েছে গতি; ফলাফল নির্ধারনে রেখেছে বিরাট ভূমিকা। আর বিপক্ষের মনোবল ভাঙ্গার মাধ্যমে কম হতাহতের বিনিময়ে জয় তুলে নেবার চেষ্টা করেছে; হাতাহাতি পদাতিকের যুদ্ধে যেখানে হতাহতের সংখ্যা বেশি হতো বলে মনে হয়েছে। যদিও ব্যাপক ধ্বংসাত্মক অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে হাতাহাতির চাইতে অনেক কম সময়েই বেশি সৈন্যকে মেরে ফেলার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

http://www.figuren.miniatures.de/dba-armee-154-mongolen-1206.html
ত্রয়োদশ শতকে মোঙ্গোল ক্যাভালরি সকলের কাছে ভীতির বস্তু ছিল। তাদের গতি ছিল অপ্রতিরোধ্য। কিন্তু তাদের গতিকে কাজে লাগিয়েই মুসলিমরা তাদের এমবুশ করে হারিয়েছিল আইল জালুতের যুদ্ধে।


পদাতিক থেকে ক্যাভালরি

যুদ্ধক্ষেত্রে দুই পক্ষই আক্রমণে থাকে না। একজন আক্রমণে গেলে আরেকজন রক্ষাব্যুহ গড়ে তোলে। আক্রমণে যেতে গেলেই দরকার হয় গতির – স্ট্র্যাটেজিক এবং ট্যাকটিক্যাল উভয়েরই। ডিফেন্সে যারা থাকবে তারা চাইবে সেই গতিকে রোধ করতে। ক্যাভালরিকে আটকাতে একসময় পদাতিক ফর্মেশন ব্যবহৃত হয়েছে। খ্রীষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে আলেক্সান্ডার দি গ্রেটের বাবা মেসিডোনিয়ার ফিলিপ ‘ফ্যালাংস’ ফর্মেশনকে চমতকারভাবে তৈরি করেছিলেন, যেটা তার ছেলে পরবর্তীতে বিশাল এলাকা বিজয়ে ব্যবহার করেছিলেন। অস্ত্র এবং ডিসিপ্লিনের অভূতপূর্ব এক সমন্বয় ছিল এই ফ্যালাংস। শত্রুর ক্যাভালরি, চ্যারিয়ট এবং হাতির আক্রমণকে বহুবার হারিয়েছে এই ফর্মেশন। তবে এই ফর্মেশনের জন্যে খোলা জায়গা ছিল জরুরী। চিপা বা বন্ধুর পথে ফ্যালাংস সমস্যার পড়েছে। এই কারণে রোমানরা তৈরি করেছিল তাদের ‘লিজিয়ন’, যা কিনা ফ্যালাংস-এর চাইতে আরও বেশি স্থিতিস্থাপক (ফ্লেক্সিবল) ছিল। পাহাড়ি এলাকায় এবং বনে-বাঁদাড়ে লিজিয়ন রোমানদের জয় এনে দিয়েছে। কিন্তু লিজিয়নের আসল শক্তি ছিল এর ডিসিপ্লিন, যা কিনা রোমান সাম্রাজ্যের শেষের দিকে একেবারেই নিচে নেমে যেতে থাকে; ঠিক সেসময়েই পঞ্চম এবং ষষ্ঠ শতকে রোমান সাম্রাজ্য গল, ভিসিগোথ, ভ্যান্ডাল এবং অস্ট্রোগোথ-দের দ্বারা আক্রান্ত হয়। অপেক্ষাকৃত কম ডিসিপ্লিনের সেনাবাহিনীর আক্রমণ ঠেকাতে ব্যর্থ হয় রোমান লিজিয়ন। ডিসিপ্লিনের অধঃপতনের কারণে মধ্যযুগে অপেক্ষাকৃত এগ্রেসিভ জাতিগুলি যুদ্ধক্ষেত্রে এগিয়ে যায়; আর সেখানে মূখ্য ভূমিকা নেয় ক্যাভালরি। সপ্তম শতাব্দী থেকে দশম শতাব্দী পর্যন্ত ইসলামের নিয়ন্ত্রণে আরবরা এবং এর কিছু পরে দ্বাদশ এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীতে পূর্ব-মধ্য এশিয়ার মোঙ্গলরা এসময়ে বিশাল এলাকা নিজেদের অধীনে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। এসব যুদ্ধে ক্যাভালরি বিরাট ভূমিকা রেখেছিল। 

http://www.moddb.com/groups/infantry-fans-group/images/french-napoleonic-infantry
ন্যাপোলিয়নের সময়ে যুদ্ধক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ বন্দুকধারী এবং কামানসজ্জিত পদাতিকের হাতে ফিরে আসে।


বন্দুক, কামান – আবারো পদাতিক

ক্যাভালরির জয়জয়কার এই সময়ে পদাতিকেরা যুদ্ধে জিতেছে অনেকবার; জিতেছে একটা অভিনব ডিফেন্সিভ পন্থায় – এমবুশ। ক্যাভালরির ট্যাকটিক্যাল গতিকে ব্যবহার করেই ক্যাভালরিকে ফাঁদে ফেলেছে পদাতিকেরা। ৬২৭ সালে খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খনন করে মুসলিমরা কুরাইশ বাহিনীকে আটকে দেয়। ১২৬০ সালে আইন জালুতের যুদ্ধে অপ্রতিদ্বন্দী বলে খ্যাত মোঙ্গোল ক্যাভালরিকে হারিয়েছিল কুতুয-এর অধীন মুসলিম সেনাবাহিনী। ১২৯৭ সালে উইলিয়াম ওয়ালেসের অধীন স্কটিশরা ইংলিশ হেভি ক্যাভালরিকে আগে থেকে তৈরি করে রাখা যুদ্ধক্ষেত্রে পরাভূত করেছিল। ক্রেসি-এর যুদ্ধে (১৩৪৬) এবং এজিনকোর্ট-এর যুদ্ধে (১৪১৫) ইংলিশরা তীরন্দাজ ব্যাবহার করে দেখিয়েছিল কিভাবে সঠিকভাবে এর ব্যবহারের মাধ্যমে দ্রুতগামী আক্রমণকারী বাহিনীকে পরাভূত করা যায়। ষোড়শ শতকের ইউরোপে ম্যাকিয়াভেলি তার লেখার মাধ্যমে ইউরোপিয়ান জেনারেলদের বোঝাতে সক্ষম হন যে পদাতিকের ডিসিপ্লিন ফিরিয়ে না আনলে ক্যাভালরির বিরূদ্ধে নিয়মিত বিজয় পাওয়া কঠিন হবে। তিনি কামানের ব্যবহার বাড়ানোর জন্যেও বলেন, যদিও কামানকে যুদ্ধক্ষেত্রে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ একটা অস্ত্র হিসেবে তৈরি হতে সময় লেগেছিল। প্রথম দিকের বন্দুকের মতো কামানের নিশানা ভালো ছিল না। তাই একত্রে ফর্মেশন আকারে ব্যবহার না করতে পারলে বন্দুক এবং কামানের কার্যকারিতা ছিল কম। তবে এখানে সবচাইতে বড় লক্ষ্যনীয় ব্যাপার হচ্ছে বন্দুক এবং কামান ব্যবহার করা হয়েছে ডিফেন্সিভ অস্ত্র হিসেবে। যখন একত্রে অনেক বন্দুক ফায়ার করা হচ্ছে, তখন সেটা ক্যাভালরির বিরূদ্ধে একটা সীসার দেয়াল-রূপে দেখা দিল। এর সাথে কামান যোগ হওয়ায় ক্যাভালরির প্রতিপত্তি কমতেই থাকে। অষ্টাদশ শতকে প্রুশিয়ার রাজা ফ্রেডরিক দ্যা গ্রেট পদাতিকের ডিসিপ্লিনকে লৌহ-কঠিন অবস্থানে নিয়ে যান। এর পরে ন্যাপোলিয়ন কামানের ব্যবহারকে শৈল্পিক পর্যায়ে নিয়ে যান উনিশ শতকের শুরুতে এবং পদাতিককে সেনাবাহিনীর প্রধান ফর্মেশন রূপে সামনে নিয়ে আসেন। ১৮৫৪ সালের বালাক্লাভার (রাশিয়ার ক্রিমিয়ায়) যুদ্ধে মোটামুটি বোঝা হয়ে যায় যে ক্যাভালরির দিন শেষ। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের (১৮৬১-১৮৬৫) সময় ক্যাভালরির যায়গা হয় সেনাবাহিনীর স্কাউট হিসেবে; মূল যুদ্ধক্ষেত্র পুরোপুরি চলে যায় বন্দুকধারী পদাতিক আর আর্টিলারির হাতে। যুদ্ধের গতি হয়ে আসে মন্থর। এখানে উল্লেখ্য যে বন্দুক এবং কামানের ব্যবহারে এমবুশ ছাড়াই পদাতিক বাহিনী হয়ে ওঠে প্রবল শক্তিশালী। সবাই তখন পদাতিকের ধারণা নিয়ে বসে আছে। দুপক্ষয়ই যখন ডিফেন্সিভ ট্যাকটিকস নিয়ে এগোয়, তখন যুদ্ধ যে স্থবির হবে, সেটা বলাই বাহুল্য। পদাতিক আবার সেই গ্রীক ফ্যালাংস এবং রোমান লিজিয়নের মতো ক্ষমতাধর হয়ে ওঠে।

http://fire2.net/military-history-of-italy-during-world-war-ii-wikipedia-
দ্বিতীয় বিশযুদ্ধে ট্যাঙ্কের ব্যবহারে আসে বিরাট পরিবর্তন। গুডেরিয়ান, রমেল, মানস্টেইন প্রমুখ জার্মান জেনারেলরা ট্যাঙ্ক ব্যবহার করে যুদ্ধক্ষেত্রে গতির সংজ্ঞাই পালটে দেন।


স্থবিরতা থেকে গতি

এরই মাঝে উনিশ শতকের শেষের দিকে আবিষ্কার হয় মেশিন গান, যা কিনা দুই পক্ষকেই পরিখা খুড়তে বাধ্য করে। ফর্মেশনে থাকা মানেই মৃত্যু! কাজেই প্রথমে ছড়িয়ে পড়া এবং পরবর্তীতে পরিখা খুড়ে লুকানো। বুর (বোয়ার) যুদ্ধ (১৮৯৯-১৯০২) এই মেশিন গান এবং পরিখার স্থবির যুদ্ধের অগ্রবার্তা দেয়, যা কিনা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৮) সময়ে সবাইকে হতাশার মধ্যে ফেলে দেয়। আর এই হতাশা থেকেই গতি আনতে আবির্ভাব হয় ট্যাঙ্কের। যদিও টেকনিক্যাল কিছু সমস্যার কারণে ট্যাঙ্ক যুদ্ধের মোড় ঘোরাতে ব্যর্থ হয়, পরিখা থেকে পদাতিক সৈন্যদের বের করে নিয়ে আসার একটা পদ্ধতি কিন্তু আবিষ্কার হয়ে গেল। বিশ্বযুদ্ধের শেষে ব্রিটিশরা ট্যাঙ্কের ব্যবহার করতে থাকে পদাতিকের সহযোগী হিসেবে। তবে ব্যাসিল লিডেল হার্ট, হেইঞ্জ গুডেরিয়ানের মতো অল্প কিছু স্ট্র্যাটেজিস্টের চিন্তার কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ট্যাঙ্ক আবির্ভাব হয় যুদ্ধক্ষেত্রের মূল পরিচালক হিসেবে। ফর্মেশন হিসেবে ট্যাঙ্কের আবির্ভাব হবার পরে এই ফর্মেশনকে ঠেকাতে তৈরি হতে থাকে বহু প্রকারের অস্ত্র। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিমান ততটা শক্তিশালী না হলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিমান হয়ে ওঠে সর্বেসর্বা। আর বিমান আক্রমণের একটা অংশ কেন্দীভূত হয় শত্রুর ট্যাঙ্ক বা আর্মার্ড ফর্মেশনের উপর। এই সময় থেকে আকাশে বিমান ছত্রছায়া ছাড়া ট্যাঙ্ক খোলা জায়গায় দাঁড়াতে পারেনি। মেশিনগানের আবির্ভাবের পরে পদাতিকেরা ছড়িয়ে পড়েছিল জীবন বাঁচাতে; তখন থেকেই বিমান থেকে একেকটি পদাতিক সৈন্যকে টার্গেট করা বেশ ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু ট্যাঙ্কের অপেক্ষাকৃত বৃহত আকার এবং কম সংখ্যার কারণে ট্যাঙ্ক হয়ে দাঁড়ায় বিমানের প্রধান টার্গেট। আর মিসাইলের ব্যাপক প্রচলনের পর থেকে একজন পদাতিক সৈন্যও একটা ট্যাঙ্ককে উড়িয়ে দেবার ক্ষমতা রাখছে অনায়াসে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ট্যাঙ্ক যতটা না সহজ টার্গেট ছিল, আজ সেটা আরও অনেক সহজ টার্গেট। ট্যাঙ্ককে নিরাপত্তা দেবার জন্যে আর্মার্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ার (এপিসি) দিয়ে পদাতিক সৈন্য সাথে নিতে হচ্ছে। এর ফলশ্রুতিতে এপিসি-গুলি বিপক্ষের পদাতিকের হাতে থাকা মিসাইলের সহজ শিকার হচ্ছে। এর উপরে রয়েছে বিমান এবং হেলিকপ্টার। ফলশ্রুতিতে যা দাঁড়াচ্ছে তা হলো – যুদ্ধক্ষেত্রে ডিফেন্সিভ পদাতিকের বিরূদ্ধে গতি আনতে যে যন্ত্রগুলি তৈরি করা হয়েছিল, সেগুলি আজ পদাতিকের সহায়তা ছাড়া এগুতে পারেনা এবং এগুলিকে নিরাপত্তা দিতে গিয়ে পদাতিকের শুধু কষ্টই করতে হচ্ছে না, নিজেরাও একটা লোভনীয় টার্গেটে পরিণত হয়েছে। 

আধুনিক মিসাইল বর্তমানের পদাতিক সৈন্যের হাতে এনে দিয়েছে ব্যাপক ক্ষমতা। সামনে দিনে এই সৈন্যরাই পরিবর্তন করবে যুদ্ধক্ষেতে গতির সংজ্ঞা।


নতুন ভবিষ্যত?

গতি থেকে আবারও স্থিতির দিকেই হয়তো এগুচ্ছি আমরা। ইরাক এবং আফগানিস্তানে মার্কিন বিমান শক্তি দানবীয় এবং ভারী গাড়িগুলিতে (যেগুলিকে বলা হয়েছে এমআরএপি) চলা তাদের নিজস্ব পদাতিক বাহিনীকে আকাশ থেকে পুরো নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। যুদ্ধ সবসময় খোলা মাঠে লক্ষ লক্ষ সৈন্যের মধ্যে সংগঠিত হবে – এটা কেউ বলতে পারে না। শহরে-শহরে এবং গ্রামে গ্রামে যুদ্ধ এখন স্বাভাবিক ব্যাপার। গত এক’শ বছরে উল্লেখযোগ্য পরিমান মানুষ শহরে চলে এসেছে; ভবিষ্যতে আরও আসবে। সামনের দিনগুলিতে শহুরে যুদ্ধই আমরা বেশি দেখবো। স্ট্যালিনগ্রাদের মতো শহুরে যুদ্ধ (১৯৪২-৪৩) এখন দেখা যাবে দেশে দেশে। বিশাল ফর্মেশনের চাইতে ছোট ছোট ফর্মেশন হয়ে উঠবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর এরই মাঝে দশজন সৈন্যকে আলাদাভাবে আক্রমণ করার চাইতে তাদের পরিবহণকারী দামী এপিসি-টাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ টার্গেট হয়ে উঠবে। শহরের ভিতরে শত্রুর পদাতিক সৈন্যদের চোরাগুপ্তা হামলা ঠেকাতে নিজেদের পদাতিক সৈন্যদের গড়তে হবে অত্যাধুনিক সৈন্য হিসেবে। এর ফলশ্রুতিতে শহরের ভিতরে যুদ্ধ করার জন্যে পঞ্চাশ পদের যন্ত্রে সজ্জিত অত্যন্ত উচ্চশিক্ষিত পদাতিক সৈন্যও টার্গেটে পরিণত হবে। এরকম একজন সৈন্য তার যুদ্ধের উদ্দেশ্য সম্পর্কে যতটা না দীক্ষিত হবে, তার চাইতে বেশি সময় তাকে দিতে হবে যন্ত্র এবং অস্ত্র পরিচালনা শিক্ষায়। অত্যন্ত ‘দামী’ এই সৈন্য যাতে সহজে জীবন না হারায়, সেজন্য তাকে দিতে হবে বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। অর্থ দিয়ে যে সৈন্যকে মূল্যায়ন করা হবে, যুদ্ধ সম্পর্কে তার মতামত অন্য দিকে ঘুরে যেতে বাধ্য; যুদ্ধে উদ্দেশ্যগত দিক থেকে তার থাকবে বিভ্রান্তিকর চিন্তা। 

ত্রিশ লক্ষ ভিয়েতনামীদের বিপক্ষে মার্কিনী নিহত হয়েছিল আটান্ন হাজার; যুদ্ধে কিন্তু জিতেছিল ভিয়েতনাম। উইলিয়াম ওয়ালেসের অধীনে স্কটিশরা ইংলিশদের গর্ব হেভি ক্যাভালরির উপরে আরোহিত নাইটদেরকে পরাজিত করেছিল স্বাধীনতার স্বাদ নিতে। একইভাবে আরবের মরুভূমির প্রথম দিকের মুসলিমরা খুব অল্প সময়ের মাঝেই মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর এক বিরাট অংশ নিজদের অধীনে নিয়ে নিয়েছিল ইসলামের দীক্ষায় দীক্ষিত হয়ে। সামনের দিনগুলিতে অপেক্ষাকৃত উন্নত দেশে যুদ্ধ করার জন্যে সৈন্যের অভাব হবে; তাই অল্প সৈন্যে বেশি কাজ করিয়ে নেবার একটা প্রবণতা থাকবে, যার ফলশ্রুতিতে তাদের পদাতিকেরা উপরে উল্লিখিত দামী হাই-টেক টার্গেটে পরিণত হবে। এসময়ে শক্তভাবে দীক্ষিত কিন্তু অপেক্ষাকৃত কম খরচে সজ্জিত পদাতিক সৈন্য যুদ্ধের মোড় ঘোরাতে বেশি সক্ষম হবে। পদাতিক সৈন্যের বহন করা অস্ত্র শত্রুর  ট্যাঙ্ক, বিমান, হেলিকপ্টার ধ্বংস করার সক্ষমতা রাখবে। অন্যদিকে এই একেকজন সৈন্যকে শহুরে যুদ্ধে খুঁজে ফিরে হতাশ হবে বিমান বাহিনী। বরং ছোট ছোট পাইলটবিহীন বিমান বা ড্রোন পদাতিকের সাপোর্টে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। শহরের বিল্ডিংগুলি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরিখার মতো (বা এর চাইতে ভালো) কাজ করবে। যেসব বাহিনী এরকম যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা ধরতে না পেরে ট্যাঙ্ক এবং অনান্য হেভি অস্ত্রের উপরে নির্ভরশীলতা কমাতে অক্ষম হবে, তারা খুব দ্রুত যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বিতাড়িত হবে; কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা তাদের বিশাল এলাকা হারিয়ে বসবে। যুদ্ধক্ষেত্রের ধারনার দিক থেকে স্বল্প পরিবর্তন যে কোন পরিবর্তনই নয়, সেটা তারা বুঝতে পারবে; কিন্তু ততক্ষণে দেরী হয়ে যাবে। পদাতিকের গতি তখনই সবাই উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে, যতক্ষন না সে তারই মতো আরেকটি পদাতিকের সন্মুখে না পরে। তখন শুরু হবে নতুন পরিবর্তনের খেলা।

Tuesday, 7 July 2015

ট্রেইন দ্যা টাইগার টু কাম আউট অব দ্যা মাউন্টেন

০৭ জুলাই ২০১৫

দূরপ্রাচ্যের সামরিক কৌশলের প্রাচীন থিউরিগুলির মধ্যে একটি হচ্ছে - Train the tiger to come out of the mountains. যার অর্থ হচ্ছে শত্রুকে তার শক্ত অবস্থান থেকে বের করে নিয়ে আসা, যাতে সে অপেক্ষাকৃত দুর্বল অবস্থানে থেকে লড়াই করতে বাধ্য হয়। প্রাচীন জাপানের "৩৬টি কৌশল"-এর মধ্যে এটি থাকলেও এর উতস চীন হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়, কারণ সেখান থেকেই জাপানী সংস্কৃতির অনেক কিছুই এসেছে। যাই হোক, আজকে এই প্রবাদসম কৌশল দিয়ে কথা শুরু করলেও উদ্দেশ্য হচ্ছে এই একই ধরনের কৌশলের ব্যবহারিক প্রয়োগ দেখানো। উদাহরণটা আসলে দূরপ্রাচ্যের নয়; আমাদের এখানেই - বাংলাদেশে। এই প্রবাদগুলি আসলে এমন নয় যে অন্য সভ্যতার কেউ সেগুলি জানে না। কাজেই অন্য কেউ সেগুলি প্রয়োগ করলে অবাক হবার কিছু নেই। অন্য সভ্যতাতে সেই একই প্রবাদ হয়তো অন্য কোন বাক্যের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়; আসলে অর্থ হয়তো একই।

স্ট্র্যাটেজিক দিক থেকে বাংলাদেশের সবচাইতে গুরুত্বপূরর দিক হচ্ছে এদেশের ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, যার প্রধান দিক হচ্ছে এর নদনদী। শতশত নদনদী থাকার কারণে শত্রু সেনাবাহিনীর পক্ষে এদেশে সামরিক অভিযান পরিচালনা করা খুবই কষ্টকর। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান এবং ভারতের সেনাবাহিনী এটা টের পেয়েছিল। তবে এরও অনেক আগেই সেটা বাংলার প্রতিবেশী রাজ্যের অধিকর্তারা টের পেয়েছিল; টের পেয়েছিল দিল্লীর মুঘলরা; ব্রিটিশরাও বুঝেছিল। কিন্তু একটা জিনিস অনেক গবেষকই এড়িয়ে গেছেন অথবা বুঝে উঠতে পারেননি, সেটি হচ্ছে এই দেশের অর্থনীতিতে নদনদীর গুরুত্ব। প্রবাদসম একটি কথা আছে যে, যে দেশ সমুদ্রের কাছাকাছি থাকবে, তার অর্থনীতি স্থলভাগের ভেতরে অবস্থিত একটি দেশের চাইতে অপেক্ষাকৃত ভালো হবে। কারণ সমুদ্রের কাছাকাছি দেশ অপেক্ষাকৃত সহজে এবং কম খরচে পণ্য পরিবহণ করতে পারবে; অন্যদিকে স্থলভাগের ভেতরে থাকা দেশটিকে কষ্ট করে অনেক খরচ করে রাস্তা বানাতে হবে। আর সমুদ্রের কাছাকাছি থাকা দেশটিতে যদি নদনদীর আধিক্য থাকে, তাহলে তাদের সারা দেশে তৈরি মালামাল খুব সহজেই নদীপথে পৌঁছে যাবে সমুদ্রবন্দরে। মোদ্দাকথা, নদীমাতৃক একটি দেশ যার অবস্থান সমুদ্রের কাছে, সেটি স্থলবেষ্টিত একটি দেশ থেকে অধিক সম্পদশালী হবে। আর সম্পদের আধিক্য থাকা মানেই দেশটি একটি শক্তিশালী দেশ রূপে পৃথিবীতে নিজের অবস্থান সুসংহত করতে চাইবে। এখন বুঝতে বাকি থাকার কথা নয় যে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর নদনদী কতটা গুরুত্বপূর্ণ।





এই ধরনের চিন্তাগুলি আমরা নিজেরা করতে পারিনি (অথবা করতে দেওয়া হয়নি) বলেই বাইরের শক্তিরা আমাদের নিয়ন্ত্রণ করেছে সবসময়। ১৭৫৭ সাল ছিল এর শুরু; তবে এর যে শেষ কখনোই হয়নি, তা মোটামুটিভাবে বলা চলে। আমাদের নদীগুলিকে আড়াআড়ি কেটে বাঁধ দেওয়া হয়েছে যাতে নদী শুকিয়ে যায়। আমাদের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে যে বাঁচতে হলে রাস্তা বানাতে হবে নদীর উপর দিয়ে; ড্রেজিং করে নদীতে পানি ধরে রেখে নয়। আমাদের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে যে বাঁচতে হলে সীমান্তে দেওয়া বাঁধ থেকে কয়েক চিমটি পরিমাণ পানি আনলেই হবে; অথচ বাংলাদেশে যে বছরে সম্পূর্ণ ভারতের চাইতে দ্বিগুণেরও বেশি বৃষ্টিপাত হয়, সেকথা কেউই জানে না। পানি দিয়ে নদী ভরতে হলে নাকি ওই টেস্টটিউব ভরে আনা ছিঁটেফোঁটা পানিই যথেষ্ট হবে; অথচ গত চার দশকে কোন নদীই খনন করা হয়নি; ভরে গেছে পলি দিয়ে - পানি সবসময় নিচু জায়গাতেই থাকে, ভরাট হওয়া উঁচু জায়গাতে নয়। উঁচু জায়গাতে পানি ঢাললেও সেখানে পানি থাকবে না।

গত কয়েক বছরে পরিবহণ সেক্টরে যত বিনিয়োগ হয়েছে, তার ৭৯% হয়েছে সড়কপথে, ১৯% হয়েছে রেলপথে, অথচ নৌপথে হয়েছে মাত্র ১.৬% । দেশের জ্বালানী তেলের ৯০% পরিবহণ হয় নৌপথে; একতৃতীয়াংশ যাত্রী এবং মালামালও পরিবহণ হয় নৌপথে। রেলপথের অর্ধেক খরচ হয়ে নদীপথে; আর সড়কে তারও কয়েক গুণ বেশি খরচ হয়। আমাদের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়ছে যে উন্নতি মানেই সড়ক এবং রেলপথ; নৌকায় যাতায়াত করে তো গরীব দেশের মানুষেরা!! প্রচুর বিদেশী বিনিয়োগ আসছে সড়ক এবং রেলপথের জন্যে, কিন্তু নৌপথের যোগাড় কিন্তু নিজেদেরই করতে হচ্ছে। বিদেশীরা তাদের নিজেদের স্বার্থ দেখবেই। তাদের দরকার কি ভারত মহাসাগরে একটা টাইগারের জন্ম দেওয়ার? বরং টাইগারকে জঙ্গল থেকে বের করে খোলা মাঠে নিয়ে আসলেই তাকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে সহজ। প্রাচীন প্রবাদ পুরোনো হয় না কখনোই।

Saturday, 7 February 2015

"সী-বেইসিং" - সমুদ্রেই ঘাঁটি!

০৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৫



অনেকেরই একটা ধারণা রয়েছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটা শক্তিশালী নৌবহরের মালিক বলেই উমুক-তমুক কাজ করে বেড়াতে সক্ষম; অন্যরা পারে না। কিন্তু যেটা তারা বুঝতে পারেন না তা হলো, মার্কিনীদের বিশ্বরাজনীতিতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্যে একটা শক্তিশালী নৌবহরের দরকার হয় বলেই তারা শক্তিশালী নৌবহরের মালিক। অর্থাৎ এখানে তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য না বুঝতে পারলে তাদের সামরিক শক্তির পাঠোদ্ধার সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রের নৌশক্তি তাদের বিরূদ্ধাচরণ করা জনগোষ্ঠীর জন্যে যেমন ভয়ঙ্কর, তাদের এই বাহিনীর সরমশক্তির বিশ্লেষণও তেমনই রোমাঞ্চকর। তারা বর্তমানে আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের সংজ্ঞা পরিবর্তন করছে প্রতিদিন। তাই যারা স্ট্র্যাটেজিক বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেন, তাদের জন্যে মার্কিন সামরিক দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণ একপ্রকার ফরয কাজই হয়ে গেছে। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি সামরিক শক্তিধর দেশই শুধু নয়, সামরিক দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত থাকছে মার্কিন বাহিনী। তাই তাদের সমরশক্তির ব্যবহার সমরবিদদের জন্যে পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করছে প্রতিনিয়ত।

সমুদ্র থেকেই যুদ্ধ পরিচালনা করা এবং সেখান থেকেই স্থলভাগে হামলা চালানো "সী-বেইসিং" কনসেপ্টের মূল


“সী-বেইসিং” কি?

স্নায়ূযুদ্ধের সময়ে মার্কিন স্ট্র্যাটেজি যা ছিল, তা এখন অনেক পরিবর্তন হয়েছে। তবে সেটা বোঝার জন্যে কিছু সামরিক চিন্তাধারা সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে “সী-বেইসিং” (Seabasing), যার অর্থ হচ্ছে – সমুদ্র থেকে যুদ্ধ চালনা। এখানে সমুদ্রই হবে তাদের জন্যে ঘাঁটি। বহুযুগ ধরে মার্কিনীরা সমুদ্রের উপরে নির্ভর করে ভূরাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। স্থলভাগে যেমন কিছুদূর পরপরেই একেক দেশের সীমানা থাকে, যা কিনা গতিরোধ করে বসে, সমুদ্রপথে কিন্তু তা নেই। পৃথিবীর বেশিরভাগ ‘গোলযোগপূর্ণ’ স্থানেই কিন্তু সমুদ্র থেকে পৌঁছানো সম্ভব। আর রাজনৈতিক যোগসাজসে সমুদ্র থেকে অনেক দূরে থাকা দেশেও সমুদ্র থেকে পৌঁছানো সম্ভব – উদাহরণ, আফগানিস্তান। চারিদিকে স্থলসীমানা-বেষ্টিত হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানের সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্র ২০০১ সালে আরব সাগর থেকে আফগানিস্তানে পৌঁছেছিল (অন্য দিক দিয়েও বিমানপথে পৌঁছেছিল); মানে সমুদ্রকে একটা ঘাঁটি বা বেইস হিসেবে ব্যবহার করেছিল। স্নায়ূযুদ্ধের সময়ে এই “সী-বেইসিং” ছিল বড়সড় স্থলযুদ্ধের একটা ‘সাইড-শো’। অর্থাৎ সর্বদাই প্রধান যুদ্ধের পরিকল্পনা ছিল  স্থলভাগের একেবারে অভ্যন্তরে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জার্মানী আর স্নায়ূযুদ্ধের সোভিয়েত স্থলশক্তিকে প্রতিহত করার জন্যে স্ট্র্যাটেজি ছিল স্থলমূখী। এই স্ট্র্যাটেজির একটা প্রধান দিক ছিল সারা বিশ্বে বড় বড় সামরিক স্থাপনা। যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র দেশগুলির সহায়তায় পৃথিবীর অনেক দেশে তৈরি হয়েছিল এইসব ঘাঁটি। যেকোন যুদ্ধের সময়ে এই ঘাঁটিগুলি ব্যবহার করে তারা সৈন্য সমাবেশ করেছিল, অথবা করার পরিকল্পনা করেছিল। মানে আসল যুদ্ধটা তারা চিন্তা করেছিল ঘাঁটিতে সৈন্য সমাবেশ করার পরে। ১৯৯০-৯১ সালের প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে ব্যবহার করেছিল ঘাঁটি হিসেবে। সেক্ষেত্রে পারস্য উপসাগরে থাকা মার্কিন নৌশক্তির গুরুত্ব কম না হলেও সৌদি আরবে জমায়েত করা স্থলশক্তির চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। স্থলভাগে ঘাঁটির উপরে এই নির্ভরতায় আজ অনেক পরিবর্তন এসেছে, তাই মার্কিন স্ট্র্যাটেজিতেও এসেছে অনেক পরিবর্তন। ‘সাইড-শো’-তে থাকা “সী-বেইসিং” এখন প্রধান ভূমিকায় চলে এসেছে। 

https://c1.staticflickr.com/6/5497/11347590944_0ef3c55841_b.jpg
USNS Spearhead (JHSV-1) নতুন কনসেপ্টের নতুন ডিজাইনের জাহাজ। সমুদ্রের উপর দিয়ে দ্রুত সৈন্য আনানেওয়াতে এক্সপার্ট। সামনের দিনগুলিতে যুদ্ধের প্রকৃতির ধারণা দিচ্ছে এই ধরনের জাহাজগুলি।

নতুন নতুন ডিজাইন

তাহলে “সী-বেইসিং”-এর এই গুরুত্ব বেড়ে যাওয়া কি খুব নতুন কিছু? না, সেটা নয়। গুরুত্ব বাড়ছে স্নায়ূযুদ্ধ শেষ হবার পর থেকেই। কারণ তখন থেকেই ঘাঁটির সংখ্যা কমছে। কিন্তু তারপরেও মার্কিন নৌবাহিনী এমন কিছু জাহাজের ডিজাইন করেছে, বা জাহাজের ডিজাইন টেস্ট করেছে, যেগুলি স্থলভাগের ঘাঁটির উপরে নির্ভরশীল। “হাই-স্পীড ভেসেল” (HSV) নাম দিয়ে এক ধরনের জাহাজ তারা অস্ট্রেলিয়া থেকে নিয়ে আসলো টেস্ট করার জন্যে। ক্যাটামারান (দুইটা খোল) ধরনের এই জাহাজের মূল দিক ছিল গতি। অত্যন্ত দ্রুত অল্প সংখ্যক সৈন্য মোতায়েনের উদ্দেশ্যে এই জাহাজ টেস্ট করা শুরু হলো। কিন্তু এই জাহাজগুলি মার্কিন নৌবাহিনীর উভচর জাহাজের (এম্ফিবিয়াস জাহাজ) মতো পানিতে ল্যান্ডিং ক্রাফট বা হোভারক্রাফট ছাড়তে পারে না। উভচর জাহাজগুলি যেমন কোন বন্দর ছাড়াই শত্রুপক্ষের সমুদ্রতটে সৈন্য নামাতে পারে, এই নতুন ধরনের ক্যাটামারান জাহাজগুলি কিন্তু সেটা পারে না। হেলিকপ্টারের মাধ্যমে কিছু সংখ্যক সৈন্য তারা উপকূলে অবতরণ করাতে পারলেও, তাদের ভারী যুদ্ধসরঞ্জামগুলি কিন্তু জাহাজেই রয়ে যাবে। সেগুলি মাটিতে নামাতে তাদের খুব কম করে হলেও একটা শক্তসমর্থ জেটি দরকার হবে। অস্ট্রেলিয়া থেকে আনা HSV নামের এই জাহাজগুলি মার্কিন নৌবাহিনী ফেরত দিয়ে দিয়েছে। তবে নিজেদের জন্যে বেশ কয়েকটি বানাচ্ছে তারা। এগুলির নাম এখন পরিবর্তিত হয়ে হয়েছে JHSV, মানে জয়েন্ট-HSV, যা কিনা ম্যারিন, আর্মি, নেভি সকলের দ্বারা পরিচালিত হবে। এই জাহাজগুলি তৈরি করার আপাত অর্থ দাঁড়াচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র এখনো তাদের সী-বেইসিং স্ট্র্যাটেজির জন্যে স্থলভাগে কিছু বন্দর বা ঘাঁটির উপরে নির্ভরশীল থাকবে। কিন্তু এই অবস্থানের বিরাট পরিবর্তন হয়েছে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই – আরেকটি জাহাজের ডিজাইনের মাধ্যমে। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যত নতুন ধরনের যুদ্ধজাহাজের ডিজাইন করা হয়েছে, তার মধ্যে এই "মোবাইল ল্যান্ডিং প্ল্যাটফর্ম" বা এমএলপি (MLP) একেবারে সন্মুখে থাকবে। এগুলি সমুদ্রে মাঝে একেকটা ঘাঁটি।


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যত নতুন ধরনের জাহাজের ডিজাইন করা হয়েছে, তার মধ্যে উপরের দিকে থাকবে “মোবাইল ল্যান্ডিং প্ল্যাটফর্ম” (MLP)। এই জাহাজগুলি সমুদ্রের মাঝে একটা বন্দর। মানে স্থলভাগের সেই ঘাঁটিটি যেখানে নেই, সেখানেও সী-বেইসিং স্ট্র্যাটেজি এপ্লাই করা সম্ভব হবে। কিন্তু সম্ভব হবে বলেই কি এই জাহাজ বানানো? না! ওই যে প্রথমেই বলেছি – তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই তাদেরকে বলে দিচ্ছে যে কি ধরনের নৌবহর লাগবে। তারা বুঝতে পারছে যে কিছুদিন আগ পর্যন্তও স্থলভাগে যে রাজনৈতিক সহায়তা তারা পেয়েছে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহারের জন্যে, সেই সহায়তায় সামনের দিনগুলিতে খরা আসছে। আর সামনের দিনগুলি যখন বলবো, তখন কমপক্ষে ২০ থেকে ৩০ বছরের কথা বলছি। কারণ একটা জাহাজ তৈরি করা হয় খুব কম করে হলেও ওই সময় বিবেচনায়, যদি না সেটা কোন বিশ্বযুদ্ধের কথা বিবেচনায় রেখে করা হয় (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়েছিল ছয় বছর; এই ছয় বছরেই হাজার হাজার নৌজাহাজের নবীন অবস্থায় সলীল সমাধি হয়েছিল)। এমএলপি নামের এই জাহাজগুলি তৈরি করা হয়েছে অয়েল ট্যাঙ্কারের ডিজানের উপরে। জাহাজের মাঝখানে বিরাট একটা খালি জায়গা রেখে দেয়া হয়েছে পাশে নোঙ্গর করা ট্র্যান্সপোর্ট জাহাজ থেকে সৈন্য ও রসদ নামানোর জন্যে। র‌্যাম্পের মাধ্যমে পাশের জাহাজ থেকে গাড়ি, ট্যাঙ্ক, কামান, রসদ নামানো যায়, যেই জাহাজ কিনা আনলোড করার জন্যে একটা বন্দরের উপরে নির্ভরশীল ছিল। কাজেই একটু আগেই যে জেএইএসভি নামের ক্যাটামারান জাহাজের কথা বলেছিলাম, সেটি কিন্তু এখন ঘাঁটি ছাড়াই সৈন্য নামাতে পারছে। এই এমএলপি জাহাজের ডিজাইন এমনভাবে করা যে তার এক পাশে অন্য জাহাজ থেকে রসদপাতি নামবে, আর অন্য পাশ থেকে হোভারক্রাফট বা অন্য কোন কানেক্টরের (ল্যান্ডিং ক্রাফট, এম্ফিবিয়াস গাড়ি, ইত্যাদি) সাহায্যে রসদপাতি দ্রুত পৌঁছে যাবে উপকূলে। এখন প্রশ্ন হলো, মার্কিন নৌবাহিনীর এম্ফিবিয়াস জাহাজগুলি তো এই কাজটা করতেই পারতো। তাহলে এরকম উদ্ভট পদ্ধতির দরকার কেন হচ্ছে? কারণ এম্ফিবিয়াস জাহাজগুলি অনেক বেশি দামী; একই সাথে সেগুলি এই কাজে অনেক বেশি এক্সপার্টও বটে। যেখানে বেশি শক্তিশালী শত্রু থাকবে, সেখানে দামী এম্ফিবিয়াস জাহাজগুলি যাবে; আর যেখানে প্রতিপক্ষ অপেক্ষাকৃত দুর্বল, সেখানে এই এমএলপি-জেএইচএসভি এবং অনান্য ট্রান্সপোর্ট জাহাজের কম্বিনেশন কাজ করবে। 

জাহাজটাকে খুব একটা আলাদা কিছু মনে হবে না, কারণ এটা একটা ট্র্যান্সপোর্ট জাহাজ। কিন্তু এটার বহণকৃত অস্ত্র এবং রসদের উপরে নির্ভর করেই বড় ধরনের যুদ্ধগুলি হচ্ছে এবং হবে। এধরনের বেশ কিছু জাহাজ (Maritime Pre-positioning Force) স্ট্র্যাটেজিক লোকেশনে অপেক্ষা করছে সেই সময়ের জন্যে।


সামনের দিনগুলি

যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক এসেসমেন্ট বলছে যে সামনের দিনগুলিতে তাদেরকে সমুদ্রের উপরে নির্ভর করে অনেক বেশি সামরিক মিশনে অংশগ্রহণ করতে হবে। সেক্ষেত্রে তাদের বর্তমান শক্তিশালী এম্ফিবিয়াস ফোর্সও টানা-হ্যাঁচড়ার মাঝে পড়ে যাবে। এই সমস্যা মোকাবিলায় তারা তাদের বর্তমান কিছু ট্র্যান্সপোর্ট জাহাজ ব্যবহার করতে চাইছে যেগুলি এম্ফিবিয়াস ফোর্সের সাপোর্টে ব্যবহৃত হয়। “ম্যারিটাইম প্রিপোজিশনিং ফোর্স” (MPF) নামে পরিচিত এই জাহাজগুলি পৃথিবীর হাতে গোণা কয়েকটা স্থানে বসে থাকে। যখনই কোন যুদ্ধ আসন্ন হয়, তখন এই জাহাজগুলি সেই অঞ্চলের দিকে ধাবিত হয়। এই জাহাজগুলি সারা বছর নির্দিষ্ট কিছু সামরিক সরঞ্জাম এবং রসদ নিয়ে বসে থাকে। “প্রি-পোজিশনিং”, মানে আগে থেকেই “পজিশনিং” বা প্রস্তুত করে রাখার এই কনসেপ্টকেই আরও কিছুটা টেনে নিয়ে এমএলপি-জেএইচএসভি এবং অন্যান্য জাহাজের সাথে যুক্ত করে আলাদা ধরনের একটা এম্ফিবিয়াস ফোর্স তৈরি করা হচ্ছে। এতে মার্কিন নৌবাহিনী উভচর অপারেশনের দিক থেকে বর্তমানের চাইতে সামনের দিনগুলিতে প্রায় ৫০% বেশি সৈন্য ও রসদ শত্রুর উপকূলে নামাতে পারবে। আর এটা তারা করতে পারছে এম্ফিবিয়াস জাহাজের সংখ্যা ৫০% না বাড়িয়েই। এখানে তাদের এই সক্ষমতা কিন্তু ৫০% বাড়ছে বললেও কমই বলা হবে। কারণ এমএলপি-এর মতো একটা প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তারা যেকোন বেসামরিক ট্র্যান্সপোর্ট জাহাজকেও বন্দর ছাড়া আনলোড করতে পারবে। আর অনেকেই হয়তো জানেন না যে মার্কিনীরা বহুকাল ধরেই তাদের রিটায়ার করা বহু সামরিক এবং বেসামরিক জাহাজ রিজার্ভে রেখে দেয় বছরের পর বছর। “নেভি রিজার্ভ ফ্লীট”-এ থাকে সামরিক জাহাজ, আর “ন্যাশনাল ডিফেন্স রিজার্ভ ফোর্স” (NDRF)-এ থাকে বেসামরিক ট্র্যান্সপোর্ট জাহাজ। ন্যাশনাল ইমার্জেন্সির সময়ে এই জাহাজগুলি ব্যবহার করা হয়। সাধারণ সময়ে রিকুইজিশন করে বেসামরিক জাহাজ ব্যবহার করা হলেও কিছু ক্ষেত্রে সেটা করা সমীচিন হয় না। আর তাই যুক্তরাষ্ট্র কিছু কিছু জাহাজ ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে রিজার্ভে রেখে দিয়েছে – কোন একদিন ব্যবহার হতে পারে বলে। রিজার্ভে থাকা শতশত এইসব জাহাজ এমএলপি জাহাজের পাশে নোঙ্গর করতে পারবে তাদের রসদ নিয়ে। “সী-বেইসিং” কনসেপ্টের পুরোপুরি সদ্যবহার আমরা সামনের দিনগুলিতে দেখতে যাচ্ছি। যদিও যুক্তরাষ্ট্র তাদের রিজার্ভে রাখা জাহাজের সংখ্যা স্নায়ূযুদ্ধের সময়ের চাইতে অনেক কমিয়ে দিয়েছে, তারপরেও এই ধরনের সক্ষমতা থাকাটা ন্যাশনাল ইমার্জেন্সির সময়ে অনেক বড় ব্যাপার হবে। 

USS Independence (LCS-2)... "লিটোরাল কমব্যাট শিপ"... এই ধরনের জাহাজগুলি যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ফ্রিগেটগুলিকে সরিয়ে দিচ্ছে। আর আমরা এখনো ফ্রিগেট/কর্ভেট/ডেস্ট্রয়ারের ক্লাসিফিকেশন নিয়ে ব্যাস্ত

USS Zumwalt (DDG-1000)... "সী-বেইসিং" কনসেপ্ট-এর সবচাইতে শক্তিশালী অংশগুলির মধ্যে একটি হবে এটি। নিজেদের জাহাজের নিরাপত্তা দেবার চাইতে শত্রুর উপকূল ধ্বংসস্তূপে পরিণত করাই এর প্রধান দায়িত্ব!


ক্যাটেগরির যুদ্ধ!

এমএলপি-এর পরের দিকের জাহাজগুলির উপরে আবার হেলিকপ্টার ডেকও দেওয়া হয়েছে। কমান্ড এন্ড কন্ট্রোলের জন্যে কিছু ফ্যাসিলিটিও দেওয়া হয়েছে। এখন এই জাহাজগুলি সমুদ্রে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হবে। এই ভাসমান ঘাঁটিগুলি শত্রুর উপকূল থেকে খুব একটা দূরে থাকবে না। কাজেই এই জাহাজগুলিকে উপকূল থেকে আক্রমণ করা বিমান, জাহাজ এবং মিসাইল থেকে বাঁচানোর প্রশ্ন আসবে। এয়ার ডিফেন্সের কাজ বিমানবাহী জাহাজ, ডেস্ট্রয়ার এবং এম্ফিবিয়াস এসল্ট শিপ করবে। তবে স্বল্প গভীরতার পানিতে শত্রুর দ্রুতগামী জাহজগুলিকে মোকাবিলার জন্যে তৈরি হচ্ছে “লিটোরাল কমব্যাট শিপ” (LCS)। এই জাহাজগুলি তৈরি করাই হয়েছে অল্প গভীরতার পানিতে ছোট সাইজের জাহাজের সাথে যুদ্ধ করার জন্যে। জুমওয়াল্ট-ক্লাসের “ডেস্ট্রয়ার”গুলি তৈরি করা হয়েছে সমুদ্রে দাঁড়িয়ে থেকেই স্থলভাগ ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার জন্যে। স্নায়ূযুদ্ধের ডীপ-সী ফাইটিং স্ট্র্যাটেজি এখন আর নেই। 

যারা যুদ্ধজাহাজের ক্যাটেগরি নিয়ে মারামারি করছেন, তারা কতটা ছেলেখেলায় মেতেছেন, এই আলোচনার পরে আশা করি বুঝতে পারবেন। MLP, JHSV, LCS এরকম আরও কত্ত কতো ব্র্যান্ড নিউ ক্যাটেগরি তারা এখন তৈরি করছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্যে যখন দুর্জয়-ক্লাস জাহাজগুলি তৈরি করা হচ্ছিলো, তখন অনেকে অনেকভাবে এই জাহাজগুলিকে কোন একটা ক্যাটেগরিতে ফেলতে চাচ্ছিলেন, যেই ক্যাটেগরিগুলি আমেরিকান এবং ব্রিটিশরা তৈরি করেছিল। ব্রিটিশরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কর্ভেট, স্লুপ, ফ্রিগেট এবং আরও অনেক ধরনের জাহাজ তৈরি করেছিল ট্র্যান্সপোর্ট কনভয়গুলিকে এসকর্ট করার জন্যে। আমেরিকানরা প্রথম তৈরি করেছিল ল্যান্ডিং শিপ, যেটা তৈরি করতে মার্কিন নৌবাহিনীর সংবিধান পরিবর্তন করতে হয়েছিল (জাহাজ মাটিতে উঠালে কোর্ট মার্শাল হবার কথা; কিন্তু ল্যান্ডিং শিপ তো বানানোই হয়েছিল মাটিতে উঠানো জন্যে)। কিন্তু যখন এই বৃহত শক্তিরা নিজেরাই এই ক্যাটেগরিগুলি ফেলে দিয়ে নতুন ক্যাটেগরি বানাচ্ছে, তখন আমাদের কি বোঝা উচিত নয় যে – নিজেদের দরকারে আসলে অন্যের ক্যাটেগরি দিয়ে কাজ হয় না? নিজের ক্যাটেগরি নিজেরা তৈরি করার মাঝেই নিজেদের স্বাধীন চিন্তার বহিঃপ্রকাশ।