Wednesday, 12 October 2022

‘ওপেক প্লাস’এর তেলের উৎপাদন কর্তনের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব

১২ই অক্টোবর ২০২২
 
বারাক ওবামার প্রশাসনের সময় থেকে ইরানের সাথে পারমাণবিক চুক্তি করা এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্তে সৌদি আরব নিরাপত্তাহীনতায় পড়েছে। ওয়াশিংটনের স্বার্থকে উপেক্ষা করেই ‘ওপেক প্লাস’এর তেলের উৎপাদন কর্তন এই ভূরাজনৈতিক ধারাবাহিকতারই অংশ। তবে এটা আবারও প্রমাণ করে যে, মার্কিন নিয়ন্ত্রিত পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থা এখন কতটা দুর্বল হয়ে গেছে।

গত ১১ই অক্টোবর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ‘সিএনএন’এর সাথে এক সাক্ষাতে বলেন যে, রাশিয়ার সাথে আঁতাত করে জ্বালানি তেলের উৎপাদন কমিয়ে দিয়ে মূল্য বৃদ্ধি করার জন্যে সৌদি আরবকে মূল্য দিতে হবে। সৌদি আরবের সাথে সম্পর্ককে নিয়ে নতুন করে ভাববার সময় এসেছে। জ্বালানি বিষয়ক পত্রিকা ‘অয়েল প্রাইস’এর এক প্রতিবেদনে মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, ৫ই অক্টোবর জ্বালানি তেল রপ্তানিকারক দেশগুলির জোট ‘ওপেক’ এবং তার সাথে রাশিয়া মিলে তেলের উৎপাদন দৈনিক ২০ লক্ষ ব্যারেল কমাবার সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২০ সালের মে মাসে করোনা মহামারির লকডাউনের কারণে ৯৭ লক্ষ ব্যারেল উৎপাদন কর্তনের পর থেকে এটা ছিল সর্বোচ্চ কর্তন। বাজারের সকলে ১০ লক্ষ ব্যারেল কমানো আশা করলেও এর দ্বিগুণ কমাবার সিদ্ধান্ত এসেছে। ‘ওপেক’ এবং রাশিয়া মিলে এই জোট ‘ওপেক প্লাস’ নামে পরিচিত। যদিও রাশিয়া এবং ‘ওপেক’ উভয়েই বলছে যে, ‘টেকনিক্যাল’ কারণে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, ওয়াশিংটন মনে করছে যে, এই সিদ্ধান্তটা পুরোপুরিভাবে রাজনৈতিক। মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব এন্টনি ব্লিনকেন রাশিয়ার সাথে একাত্মতা প্রকাশের জন্যে সৌদি আরবের সমালোচনা করেছেন এবং তেলের উৎপাদন বৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে অদূরদর্শীতা বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন যে, সৌদিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তারা কংগ্রেসের সাথে কথা বলছেন।

মার্কিন সিনেটের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির প্রধান বব মেনেনডেজ ১০ই অক্টোবর এক বিবৃতিতে সৌদি আরবের সাথে সকল সহযোগিতা বন্ধ করা সহ দেশটাতে অস্ত্র বিক্রি বন্ধেরও আহ্বান জানান। তবে প্রেসিডেন্ট বাইডেন নির্দিষ্ট করে বলতে রাজি হননি যে, তিনি সৌদি আরবের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেবেন। বাইডেন বলেন যে, কয়েক মাস আগে তিনি যখন সৌদি আরব ঘুরে এসেছেন, তখন তার সফরের উদ্দেশ্য ছিল না সৌদি আরবকে তেল উৎপাদন বৃদ্ধিতে রাজি করানো। বরং তিনি সেখানে গিয়েছিলেন সকলকে নিশ্চয়তা দেয়ার জন্যে যে, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে যাচ্ছে না।

৬ই অক্টোবর মার্কিন কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাটদের নেতা চাক শুমার বলেন যে, কংগ্রেস সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সকল রকমের আইনী ব্যবস্থা নিয়েই ভাবছে; যার মাঝে ‘নোপেক’ বিলও রয়েছে। ‘নোপেক’ হলো একটা আইনের খসরা, যার মাধ্যমে তেলের বাজারে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ‘অপরাধে’ ‘ওপেক’ সদস্য দেশগুলির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া যাবে। এহেন ব্যবস্থা নেয়া হলে সৌদি রাজপরিবারের নিয়ন্ত্রণে থাকা তেল কোম্পানি ‘আরামকো’র শেয়ার কেনাবেচা বাতিল হয়ে যেতে পারে। এতে এই কোম্পানির শেয়ারের মূল্য রাতারাতি শূণ্যের কোঠায় চলে আসবে।

সৌদি আরবের নেতৃত্বে ‘ওপেক’ কেন তেলের উৎপাদন কমালো, তার ব্যাখ্য দিয়েছেন সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রী প্রিন্স আব্দুলআজিজ বিন সালমান। তিনি ‘সৌদি টিভি’র সাথে এক সাক্ষাতে বলেন যে, তার দেশ সর্বপ্রথমে তার নিজের স্বার্থের কথা চিন্তা করবে। পশ্চিমা দেশগুলির কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলি মূদ্রাস্ফীতি রোধে সুদের হার বাড়িয়েই যাচ্ছে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী মন্দার সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে জ্বালানির চাহিদা অনেক কমে যাবে এবং তেলের বাজারে ব্যাপক দরপতন হবে।

 
‘ওপেক’ দেশগুলির অর্থনীতি তেল বিক্রির উপরে পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল। তেলের দরপতন এই দেশগুলির অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। সৌদি আরব তাদের সরকারের বাজেট ঠিক করে তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৭৯ ডলার হিসেবে। এর নিচে মূল্য পড়ে গেলে বাজেটে ঘাটতি তৈরি হবে। সাত মাস আগে ১’শ ৩৯ ডলারে মূল্য উঠে গেলেও গতমাসেই সেটা ৮৫ ডলারে নেমে গিয়েছিল; যা কিনা ‘ওপেক’ দেশগুলির জন্যে একটা সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করেছে।

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘দ্যা আটলান্টিক কাউন্সিল’এর সিনিয়র ফেলো এলেন ওয়াল্ড ‘সিএনএন’কে বলছেন যে, মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডারেল রিজার্ভ’এর সুদের হার বৃদ্ধির সাথে সমন্বয় করেই ‘ওপেক’ হয়তো তেলের উৎপাদন কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে; যাতে চাহিদা পড়ে গেলে হঠাৎ করে উৎপাদন কমাতে না হয়। ‘ওপেক’ দেশগুলির অর্থনীতি তেল বিক্রির উপরে পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল। তেলের দরপতন এই দেশগুলির অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। ২০০৮ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ‘ওপেক’ দেশগুলি মারাত্মক সমস্যায় পড়েছিল। সৌদি আরব তাদের সরকারের বাজেট ঠিক করে তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৭৯ ডলার হিসেবে। এর নিচে মূল্য পড়ে গেলে বাজেটে ঘাটতি তৈরি হবে। সাত মাস আগে ১’শ ৩৯ ডলারে মূল্য উঠে গেলেও গতমাসেই সেটা ৮৫ ডলারে নেমে গিয়েছিল; যা কিনা ‘ওপেক’ দেশগুলির জন্যে একটা সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করেছে।

বাজার বিশ্লেষক সায়মন ওয়াটকিন্স ‘অয়েল প্রাইস’এর এক লেখায় বলছেন যে, মার্কিন অনুরোধ সত্ত্বেও সৌদিরা তেলের উৎপাদন যে কমাবে, সেটা জানাই ছিল। কারণ বেশ অনেকদিন ধরেই রাশিয়ার সাথে তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে সৌদিরা তৎপর রয়েছে এবং চীনও এখন সৌদি তেলের সবচাইতে বড় ক্রেতা। তেলের উৎপাদন কমানো হলে এর তিনটা ফলাফল হবে। প্রথমতঃ ব্যাপক মূল্যস্ফীতি আরও বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলি সুদের হার বাড়াতে থাকবে। দ্বিতীয়তঃ রাশিয়ার এতে রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে; যা তারা ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহার করবে। এবং তৃতীয়তঃ আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে বাইডেনের ডেমোক্র্যাট দল খারাপ ফলফল করবে। এতে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা কমে যাবে। ঐতিহাসিকভাবেই ব্যারেল প্রতি ১০ ডলার মূল্যবৃদ্ধির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যালনপ্রতি জ্বালানি তেলের মূল্য ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির মূল্য গ্যালনপ্রতি ১ সেন্ট বৃদ্ধি পাবার অর্থ হলো কনজিউমারদের পকেট থেকে এক বছরে ১ বিলিয়ন ডলারের খরচ করার সক্ষমতা কমে যাওয়া। আবার ঐতিহাসিকভাবেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দুই বছরের মাঝে অর্থনীতি যদি মন্দায় পতিত হয়, তাহলে প্রেসিডেন্টের পুনরায় নির্বাচিত হবার সম্ভাবনা প্রায় নিঃশেষ হয়ে যায়। এবছরের প্রথম ছয় মাসে মার্কিন অর্থনীতি ক্রমান্বয়ে ছোট হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে সৌদি আরব বহুকাল ধরেই তেলের মূল্যকে নিয়ন্ত্রণ করেছে; যা ওয়াশিংটনের স্বার্থকেই রক্ষা করেছে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য এবং দেশগুলির নেতৃত্বকে নিরাপত্তা দিয়েছে। কিন্তু বারাক ওবামার প্রশাসনের সময় থেকে ইরানের সাথে পারমাণবিক চুক্তি করা এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্তে সৌদি আরব নিরাপত্তাহীনতায় পড়েছে। বিশেষ করে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের আক্রমণ থেকে সৌদি আরবের তেলের স্থাপনাগুলিকে রক্ষার জন্যে যুক্তরাষ্ট্র কোন নিরাপত্তার ব্যবস্থা না করায় সৌদিদের সাথে ওয়াশিংটনের এতকালের সখ্যতায় ভাটা পড়েছে। একই সূত্রে মানবাধিকার বিষয়ে ওয়াশিংটন থেকে সৌদিদের উপরে চাপও বৃদ্ধি পেয়েছে। ওয়াশিংটনের স্বার্থকে উপেক্ষা করেই ‘ওপেক প্লাস’এর তেলের উৎপাদন কর্তন এই ভূরাজনৈতিক ধারাবাহিকতারই অংশ। তবে এটা আবারও প্রমাণ করে যে, মার্কিন নিয়ন্ত্রিত পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থা এখন কতটা দুর্বল হয়ে গেছে।

Sunday, 9 October 2022

ক্রিমিয়ার কার্চ সেতুর উপর হামলার গুরুত্ব কতখানি?

০৯ই অক্টোবর ২০২২
 
কার্চ সেতুর উপর হামলা যা দিয়েই করা হোক না কেন, এটা ছিল একটা দুঃসাহসিক অপারেশন। আর ইউক্রেনিয়রা এই হামলার ফল কতটা ভোগ করতে পারবে, তা নির্ভর করছে যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর দক্ষতার উপর। পশ্চিমা সরঞ্জামের উপরে পুরোপুরি নির্ভরশীল হলেও ইউক্রেনের সেনাদেরকেই প্রমাণ করতে হচ্ছে যে, তারা রুশ সেনাদের চাইতে অধিকতর দক্ষ।

০৮ই অক্টোবর রুশ অধিকৃত ক্রিমিয়া উপদ্বীপকে রাশিয়ার মূল ভূখন্ডের সাথে সংযোগ স্থাপনকারী কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কার্চ সেতুর একাংশ এক হামলায় ধ্বসে পড়ে। সড়কপথের দু’টা লেনের মাঝে একটা লেনের তিনটা স্প্যান দু’জায়গায় পানিতে পড়ে যায়। একইসাথে এই সেতুর সমান্তরালে রেলসেতুর উপর দিয়ে চলা রেলগাড়ির কয়েকটা তেলের ট্যাঙ্কারে আগুন লেগে যায়; যা পরের দিন পর্যন্ত চলে এবং সেতুর বেশ খানিকটা এতে পুড়ে যায়। রুশ কর্তৃপক্ষ বলছে যে, এই ধ্বংসযজ্ঞ খুব সম্ভবতঃ একটা ট্রাক বোমার মাধ্যমে ঘটানো হয়। সকলেই এই আক্রমণের জন্যে ইউক্রেনের সেনাবাহিনীকেই সন্দেহ করলেও ইউক্রেন সরকার এই হামলার জন্যে দায় স্বীকার করেনি। তবে ইউক্রেনের জনগণ এই হামলাকে উৎসব হিসেবে পালন করছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলদিমির জেলেন্সকি সোশাল মিডিয়াতে এক ভিডিও বার্তায় ব্যাঙ্গাত্মকভাবে বলেন যে, ইউক্রেনের আকাশে ঝলমলে সূর্য থাকলেও ক্রিমিয়ার আকাশ মেঘে ঢাকা রয়েছে। আর মেঘে ঢাকা থাকলেও ইউক্রেনিয়রা জানে যে, কি করতে হবে। জেলেন্সকি ক্রিমিয়াকে ইউক্রেনের অংশ বলে ঘোষণা দেন যে, ভবিষ্যতে ক্রিমিয়া এবং অন্যান্য দখলীকৃত অংশ ইউক্রেনের হাতে ফেরত আসবে। ব্রিটেনের পত্রিকা ‘দ্যা সান’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ২০১৮ সালে ৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে তৈরি করা এই সেতু রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্যে খুবই গর্বের একটা বিষয় ছিল। যুদ্ধ শুরুর পর ইউক্রেন সরকার এই সেতুতে হামলার জন্যে হুমকিও দিয়েছে।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায় যে, একটা ২২ চাকার ট্রাক লরির কাছাকাছি বিস্ফোরণের শুরু। রুশ কর্তৃপক্ষের প্রকাশ করা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাচ্ছে যে, এই ট্রাক সেতুর রুশ প্রান্ত থেকে চেকপয়েন্ট অতিক্রম করছে এবং সেখানে সেনারা ট্রাকটা পর্যবেক্ষণ করছে। রুশরা বলছে যে, এই হামলা খুব সম্ভবতঃ ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থা ‘এসবিইউ’এর কাজ। রুশ বিশ্লেষক ইউরি পদোলিয়াকা বলছেন যে, ট্রাকটা খুব সম্ভবতঃ রুশ চালকই চালাচ্ছিলেন। তিনি হয়তো জানতেন না যে, তার ট্রাকে কি ছিল। ইউক্রেনিয়রা হয়তো রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে থাকতে পারে। তবে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর প্রাক্তন বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ টনি স্পামার ‘ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল’কে বলছেন যে, বোমার উৎস ট্রাক নাও হতে পারে। কারণ ট্রাকে বোমা থাকলে রাস্তার উপর গর্ত তৈরি হতো; সেতুর একাংশ পানিতে পড়ে যেতো না। এরকম ধ্বংসযজ্ঞের জন্যে সেতুর পুরো প্রস্থ জুড়ে আঘাত করতে হবে। দেখে মনে হচ্ছে যে, বোমাটা সেতুর নিচ থেকেই ফাটানো হয়েছে। এটা একটা দৈত্যাকৃতির বিস্ফোরণ ছিল। স্পামারের থিউরির সমর্থক কেউ কেউ সিসিটিভি ফুটেজে বিস্ফোরণের সময় সেতুর নিচে রহস্যজনক জলযানের উপস্থিতি খুঁজে পাচ্ছেন। তবে টনি স্পামারএর মতের সাথে অনেকেই এক হতে পারেননি, যখন ধ্বংসপ্রাপ্ত সেতুর নিচ থেকে তোলা ছবি সোশাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়ে। কারণ সেতুর নিচের দিকে কোন বিস্ফোরণের আলামত দেখা যায় না। কংক্রিটের পিলারগুলি শক্তিশালী হলেও অনেকেই সেতুর স্প্যানগুলির নিচে ধাতুর কাঠামোর হাল্কা কনস্ট্রাকশনের সমালোচনা করেন; যা হয়তো স্প্যানগুলি ধ্বসে পড়তে সহায়তা দিয়েছে।

কেউ কেউ অবশ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের ব্যাপারটাও উড়িয়ে দিতে নারাজ। ‘স্কাই নিউজ’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘রয়াল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইন্সটিটিউট’এর প্রাক্তন ডিরেক্টর মাইকেল ক্লার্ক বলছেন যে, এই ঘটনা হয় ইউক্রেনের স্পেশাল ফোর্সের সদস্যরা ঘটিয়েছে, অথবা এটা একটা ক্ষেপণাস্ত্রের কাজ; যা কিনা এই মুহুর্তে ইউক্রেনের হাতে রয়েছে বলে জানা নেই। মোটকথা, বিশ্লেষকেরা কেউই এই মুহুর্তে নিশ্চিত হতে পারছেন না যে, এই ঘটনা কিভাবে ঘটানো হয়েছে। হয়তো প্রকৃত ঘটনা জানতে আরও অপেক্ষা করতে হবে। এই মুহুর্তে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো যুদ্ধের উপরে এই হামলার প্রভাব কতটুকু হতে পারে।

 
কার্চ সেতু কিছুদিনের মাঝেই হয়তো মেরামত করা হয়ে যাবে। এর আগ পর্যন্ত দক্ষিণের খেরসনের যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ রসদ মারিউপোল এবং বেরদিয়ানস্ক সমুদ্রবন্দর হয়ে সেখান থেকে রেলযোগে মেলিটোপোল হয়ে খেরসন পৌঁছাবে। ক্রিমিয়াতে রসদ পৌঁছাতে মেলিটোপোলের রেল জংশনের গুরুত্ব বাড়ার সাথেসাথে মেলিটোপোলের ১’শ ২০ কিঃমিঃ উত্তরে অবস্থিত জাপোরিজজিয়া বরাবর ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর আক্রমণের সম্ভাবনা বেড়ে যাচ্ছে; যদিও ইউক্রেনিয়রা হয়তো আরও আগেই এই পরিকল্পনা করে থাকতে পারে।

মাইকেল ক্লার্ক বলছেন যে, এই সেতু কিছুদিনের মাঝেই হয়তো মেরামত করা হয়ে যাবে। এর আগ পর্যন্ত দক্ষিণের খেরসনের যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ রসদ মারিউপোল এবং বেরদিয়ানস্ক সমুদ্রবন্দর হয়ে সেখান থেকে রেলযোগে মেলিটোপোল হয়ে খেরসন পৌঁছাবে। এই রেললাইনের একাংশ ইউক্রেনের দূরপাল্লার আর্টিলারি দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। তখন খেরসনে ইউক্রেনের আক্রমণ আরও শক্তিশালী হবে। রুশরা সামরিক রসদ পরিবহণে সড়কের চাইতে রেলের উপরে বেশি নির্ভরশীল। তবে যেহেতু কার্চ সেতুর রেল অংশটা ধ্বসে পড়েনি; শুধু ক্ষতি হয়েছে কিছুটা, তাই ইউক্রেন খুব বেশি হলে দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় পাবে এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগানোর জন্যে।

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক এন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিস’ বা ‘সিএসআইএস’এর ফেলো এবং অস্ট্রেলিয়ার সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর জেনারেল মিক রায়ান এক টুইটার বার্তায় বলছেন যে, কার্চ সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মেলিটোপোল হয়ে স্থলভাগের উপর দিয়ে রেললাইনটা এখন বেশি ব্যবহৃত হবে। আর এর বাইরেও কার্চ প্রণালি পার হবার জন্যে ফেরিও রয়েছে। তবে এই ঘটনার ফলে মেলিটোপোল অধিকারে রাখাটা রুশদের জন্যে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেলো। আর রুশরাও হয়তো একারণে দক্ষিণের দিকে তাদের সেনা মোতায়েন বাড়াতে পারে। এর ফলে যুদ্ধের অন্যান্য ফ্রন্টে ইউক্রেন সেনাবাহিনীর জন্যে সুযোগ তৈরি হবে। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট’এর সিনিয়র ফেলো এবং প্রাক্তন মার্কিন ম্যারিন কোর সদস্য রব লী টুইটারে জেনারেল মিক রায়ানএর মতামত সমর্থন করে বলছেন যে, ক্রিমিয়াতে রসদ পৌঁছাতে মেলিটোপোলের রেল জংশনের গুরুত্ব বাড়ার সাথেসাথে মেলিটোপোলের ১’শ ২০ কিঃমিঃ উত্তরে অবস্থিত জাপোরিজজিয়া বরাবর ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর আক্রমণের সম্ভাবনা বেড়ে যাচ্ছে; যদিও ইউক্রেনিয়রা হয়তো আরও আগেই এই পরিকল্পনা করে থাকতে পারে।

২৭শে জুলাই খেরসন এবং ৬ই সেপ্টেম্বর খারকিভের অপারেশন শুরুর পর থেকে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী যুদ্ধের গতিপথের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। খেরসনে ইউক্রেনের অপারেশন শুরুর আগ থেকেই রুশরা পূর্বাঞ্চলের অন্যান্য ফ্রন্ট থেকে সেনা সড়িয়ে খেরসনে মোতায়েন করে। এর ফলে ইউক্রেনিয়রা যখন খারকিভে অপারেশন শুরু করে, তখন কয়েক দিনের মাঝেই রুশরা কয়েক হাজার বর্গ কিঃমিঃ এলাকা ছেড়ে দিয়ে পিছু হঠতে বাধ্য হয়। এখন ইউক্রেনিয়রা আবারও খেরসন অভিমুখে অপারেশনের দিক পাল্টাবার ফলে রুশরাও সেদিকে গুরুত্ব দিতে বাধ্য হচ্ছে। এমনই একটা সময়ে কার্চ সেতুর উপর হামলার ঘটনাটা ঘটলো। এতে রুশদের দীর্ঘমেয়াদে কোন ক্ষতি না হলেও রুশ গর্ব এতে যথেষ্টই আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। ২০১৮ সালের ১৫ই মে ভ্লাদিমির পুতিন নিজে ট্রাক চালিয়ে ১৭ কিঃমিঃ লম্বা রাশিয়ার দীর্ঘতম সেতুটা উদ্ভোধন করেছিলেন। সেতুর উপর আক্রমণে রুশদের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা দেয়ার সক্ষমতা আবারও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। কার্চ সেতুর উপর হামলা যা দিয়েই করা হোক না কেন, এটা ছিল একটা দুঃসাহসিক অপারেশন। আর ইউক্রেনিয়রা এই হামলার ফল কতটা ভোগ করতে পারবে, তা নির্ভর করছে যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর দক্ষতার উপর। পশ্চিমা সরঞ্জামের উপরে পুরোপুরি নির্ভরশীল হলেও ইউক্রেনের সেনাদেরকেই প্রমাণ করতে হচ্ছে যে, তারা রুশ সেনাদের চাইতে অধিকতর দক্ষ।

Thursday, 6 October 2022

দক্ষিণ এশিয়াতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির পরিবর্তন কেন?

০৬ই অক্টোবর ২০২২
 
অক্টোবর ২০২২। ওয়াশিংটনে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল বাজওয়াকে স্বাগত জানাচ্ছেন মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব লয়েড অস্টিন। এতকাল যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার জন্যে। এখন আবার ভারতকে শাসনে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা দিতেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিজেকে ব্যবহৃত হতে দিচ্ছে।

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যখন রাশিয়ার সাথে সুসম্পর্ক রাখার কারণে দিল্লীকে মার্কিন কর্তাব্যক্তিদের কাছ থেকে অনেক কথা শুনতে হচ্ছে, ঠিক তখনই খবর এলো যে, যুক্তরাষ্ট্র অনেকদিন পর হঠাৎ করেই পাকিস্তানের কাছে প্রায় সাড়ে ৪’শ মিলিয়ন ডলার সমপরিমাণের সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করতে সম্মত হয়েছে। ইসলামাবাদের সাথে ওয়াশিংটনের সম্পর্কের টানাপোড়েনের মাঝে দুই দেশের সম্পর্ক সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল যখন ইমরান খান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীত্ব থেকে ক্ষমতাচ্যুত হবার সময় বলেন যে, ওয়াশিংটনের ইচ্ছানুযায়ী তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে। ইমরান ক্ষমতাচ্যুত হবার এক সপ্তাহ আগে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া গত ৩রা এপ্রিল এক সেমিনারে বলেন যে, ঐতিহাসিকভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পাকিস্তানের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে যুক্তরাষ্ট্রই তৈরি করেছে এবং ট্রেনিং দিয়েছে। পাকিস্তানের সেরা সামরিক সরঞ্জামও যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি। কথাগুলির প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘দ্যা র‍্যান্ড কর্পোরেশন’এর প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ডেরেক গ্রসম্যান এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী যুক্তরাষ্ট্রকে চাইছে; তাদের সাথে চীনের অত ভালো চলছে না। কিন্তু এটা ঘটলে ভারত তা পছন্দ করবে না। গ্রসম্যানের এই কথাগুলিই ছয় মাস পর আলোচিত হচ্ছে।

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘দ্যা উইলসন সেন্টার’এর দক্ষিণ এশিয়া বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান ‘ফরেন পলিসি’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় বলছেন যে, ক’দিন আগেই মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র নেড প্রাইস সাংবাদিকদের বলেন যে, ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী; যারা ভিন্ন ভিন্ন কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। প্রাইসের এই কথাগুলি জর্জ বুশ হোয়াইট হাউজে থাকার সময় থেকে দক্ষিণ এশিয়াতে মার্কিন নীতিকে প্রতিফলিত করছে। এই নীতির অধীনে ওয়াশিংটন যখন পাকিস্তানের সাথে কথা বলছে, তখন ভারতের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ককে আলাদা রাখছে; আবার ভারতের সাথে যখন কথা বলছে, তখনও পাকিস্তানের সাথে ভারতের সম্পর্কের বিষয়টাকে সেখানে যুক্ত করছে না। এই নীতির ফলে যুক্তরাষ্ট্র কাশ্মির ইস্যুকে পাশ কাটিয়ে ভারতের সাথে সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পেরেছে। ইসলামাবাদ এখন বুঝতে পারছে যে, তারা ওয়াশিংটনের কাছ থেকে আশা করতে পারে না যে, যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকেও একইভাবে দেখবে। ২০১৮ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে নিরাপত্তা সহায়তা দেয়া বন্ধ রেখেছে। এমতাবস্থায় নিরাপত্তা সহায়তা স্থগিত রেখে পাকিস্তানের পুরোনো ‘এফ-১৬’ যুদ্ধবিমানের উন্নয়নের জন্যে সরঞ্জামাদি বিক্রয় করাটা নতুন নীতির দিকেই ইঙ্গিত দেয়। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর পাকিস্তানের কাছে সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করার জন্যে ওয়াশিংটনের সমালোচনা করেন। কুগেলম্যান বলছেন যে, এস জয়শঙ্করের প্রতিক্রিয়াটা অবাক করার মতো; যখন এটা পরিষ্কার যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের সম্পর্ক এখন পাকিস্তানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের চাইতে অনেক বেশি উচ্চতায়। সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটনের সাথে ইসলামাবাদের সখ্যতা দেখা গেলেও দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ যথেষ্টই অনিশ্চিত। অপরদিকে চীনকে মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে ভারত ওয়াশিংটনের জন্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী। যদি দিল্লী থেকে বলা হয় যে, পাকিস্তানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কোন্নয়ন ভারতের স্বার্থের পরিপন্থী, তাহলে ওয়াশিংটনও বলতে পারে যে, মস্কোর সাথে দিল্লীর সম্পর্ক ওয়াশিংটনে স্বার্থের পরিপন্থী। এই ঘটনাগুলি দেখিয়ে দেয় যে, দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্ব করতে করতে গেলে ওয়াশিংটনকে আরও সাবধানে এগুতে হবে।

পাকিস্তান বিষয়ে ওয়াশিংটনের নীতি নিয়ে গবেষণার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন থিঙ্কট্যাঙ্কের সমন্বয়ে গঠিত ‘পাকিস্তান স্টাডি গ্রুপ’এর ৪ঠা অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে পাকিস্তানকে ছেড়ে যাওয়া সম্ভব নয়। কারণ পাকিস্তানের অবস্থান হলো দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মাঝখানে এবং পাকিস্তানের সাথে চীন এবং ইরানের সীমানা ছাড়াও দেশটার সাথে রাশিয়ারও সুসম্পর্ক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব স্বার্থের কারণেই তারা পাকিস্তানকে একঘরে করা অথবা সম্পর্ককে পুরোপুরিভাবে কর্তন করতে পারবে না। পাকিস্তান যাতে স্বাভাবিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সহযোগিতা করে যেতে থাকে, সেটা নিশ্চিত করাটা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের অংশ। সেখানে বলা হচ্ছে যে, যদিও আফগানিস্তানকে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান ভিন্ন চশমা দিয়ে দেখতে থাকবে, তদুপরি উভয়ের স্বার্থেই আফগানিস্তানে শান্তি-শৃংখলা বজায় রাখা এবং সেদেশের মানুষের সমস্যা লাঘবের জন্যে ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদের মাঝে সহযোগিতা চলতে পারে। বিশেষ করে আফগানিস্তানে মার্কিন ইন্টেলিজেন্স অনেক এজেন্ট হারাবার পর পাকিস্তানের মাধ্যমেই যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে তার প্রভাব ধরে রাখতে পারে। তবে দুই দেশের জনমত সম্পর্কোন্নয়ের ক্ষেত্রে বেশ বড় বাধা। পাকিস্তানের কৌশলগত চিন্তাকে পরিবর্তন করাবার চেষ্টা করার উপর প্রতিবেদনে জোর দেয়া হয়। এই মুহুর্তে চীনের ব্যাপারে পাকিস্তান এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভিন্ন নীতি থাকার কারণে প্রতিবেদনে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কৌসুলী হবার জন্যে ওয়াশিংটনকে উপদেশ দেয়া হয়। কারণ সুবিধা প্রদান করা বা হুমকি দেয়ার মাধ্যমে পাকিস্তানের কৌশলগত দিক পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে প্রতিবেদনে চীনের কাছ থেকে নেয়া ঋণের ব্যাপারে পাকিস্তান সরকার যেন জনগণের সামনে আরও তথ্য উপস্থাপন করে এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলে সেক্ষেত্রে গুরুত্বারোপ করা হয়।

পাকিস্তানের পত্রিকা ‘দ্যা এক্সপ্রেস ট্রিবিউন’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, এই প্রতিবেদন এমন সময়ে প্রকাশ করা হলো, যখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল বাজওয়া ওয়াশিংটন সফর করছেন। আর এর মাত্র এক সপ্তাহ আগেই পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি ওয়াশিংটন ঘুরে এসেছেন।

কুগেলম্যান বলছেন যে, ওয়াশিংটন যেমন পাকিস্তানকে ছাড়তে পারছে না, তেমনি ভারতও রাশিয়াকে ছাড়তে পারছে না। এগুলি ওয়াশিংটন এবং দিল্লীর বাস্তবতার অংশ। এই বাস্তবতা অপছন্দের হলেও মেনে নেয়া ছাড়া গতি নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তিত নীতির কারণে দিল্লী-মস্কো এবং ওয়াশিংটন-ইসলামাবাদ সম্পর্ক দিল্লী-ওয়াশিংটন সম্পর্কের চাইতে অপেক্ষাকৃত বেশি অনিশ্চয়তার মাঝে পড়বে। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইউরেশিয়া গ্রুপ’এর ‘জি-জিরো মিডিয়া’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে বার্তা দিয়েছে যে, রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক রেখে চলার একটা মূল্য রয়েছে; যদিও নিশ্চিতভাবেই, যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে বড় কোন শাস্তি দেবে না। এই কথাগুলির মাঝ দিয়ে যে ব্যাপারটা পরিষ্কার তা হলো, এতকাল যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার জন্যে। এখন আবার ভারতকে শাসনে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা দিতেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিজেকে ব্যবহৃত হতে দিচ্ছে।

Monday, 3 October 2022

ষষ্ঠ জেনারেশনের ফাইটার বিমান … প্রতিযোগিতার মাঝেই প্রতিযোগিতা

০৪ঠা অক্টোবর ২০২২
 
মার্কিনীরা মনে করছে না যে তারা প্রযুক্তিতে চীনাদের চাইতে পিছিয়ে যাচ্ছে। নিজেদের প্রযুক্তিগুলি কে কার আগে কাজে লাগাতে পারে, সেই সক্ষমতা নিয়েই প্রতিযোগিতা হচ্ছে। মার্কিনীরা প্রযুক্তির দিক থেকে এগিয়ে থাকতে যেই ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত, চীনারা ততটা নয়। এটা দুই দেশের চিন্তাগত পার্থক্যের কারণেই।

‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সামরিক সক্ষমতা বিষয়ে যে জায়গাগুলিতে প্রযুক্তিগত উতকর্ষতা নিয়ে বেশি কথা হচ্ছে, তার মাঝে একটা হলো আকাশ প্রযুক্তি। বর্তমানে আকাশ প্রযুক্তির সর্বশেষ হলো পঞ্চম জেনারেশনের ফাইটার বিমান। যুক্তরাষ্ট্র তাদের ‘এফ-২২’ এবং ‘এফ-৩৫’ যুদ্ধবিমানকে ইতোমধ্যেই বিশ্বের সেরা ফাইটার বিমান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। এর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চীন উৎপাদন করছে ‘জে-২০’ এবং রাশিয়া উৎপাদন করছে ‘সুখোই-৫৭’। এর বাইরে চীনাদের একাধিক প্রকল্প রয়েছে; তুরস্কও তাদের নিজস্ব পঞ্চম জেনারেশনের ফাইটার বিমান ডেভেলপ করছে। এখন ইতোমধ্যেই এর পরের জেনারেশন, বা ষষ্ঠ জেনারেশনের ফাইটার জেট নিয়ে কথা শুরু হয়ে গেছে।

গত সেপ্টেম্বর মাসে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে মার্কিন বিমান বাহিনীর ‘এয়ার কমব্যাট কমান্ড’এর প্রধান জেনারেল মার্ক কেলি বলেন যে, তিনি জানেন না যে, চীনে এই মুহুর্তে কমিউনিস্ট পার্টির ২০তম কংগ্রেসের প্রস্তুতি ছাড়া আর কি হচ্ছে। তবে নিশ্চিত করে বলতে পারেন যে, কোন বিষয়টা নিয়ে চীনে কোন কথাই হচ্ছে না। চীনে এই মুহুর্তে ষষ্ঠ জেনারেশনের ফাইটার বিমানের প্রয়োজন নিয়ে কোন আলোচনাই নেই। তবে তিনি বলেন যে, তিনি নিশ্চিত যে, চীনারা এই বিষয়ে সঠিক পথেই রয়েছে। একারণে তিনি মনে করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিৎ প্রতিযোগিদের চাইতে কমপক্ষে এক মাস আগে হলেও ষষ্ঠ জেনারেশনের ফাইটার তৈরি করা।

ফাইটার বিমানের ‘জেনারেশন’এর অর্থ কি?

ষষ্ঠ জেনারেশনের বিমান বলতে আসলে কি বোঝায়? আগে বুঝতে হবে যে, এই ‘জেনারেশন’ ব্যাপারটা আসলে কি। মার্কিন বিমান বাহিনীর এক ডকুমেন্টে লেঃ জেনারেল হক কারলাইল একটা ধারণা দেয়ার চেষ্টা করেছেন যে, এককটা জেনারেশনের ফাইটার বিমান বলতে কি বোঝানো হচ্ছে। ১৯৪৫ সাল থেকে ১৯৫৫ সালের মাঝে ডেভেলপ করা প্রথম জেট ফাইটারগুলিকে (এফ-৮৬, মিগ-১৫) বলা হচ্ছে প্রথম জেনারেশনের ফাইটার। ১৯৫৫ থেকে ১৯৬০ সালের মাঝে ডেভেলপ করা দ্বিতীয় জেনারেশনের ফাইটারগুলিতে (মিগ-২১, এফ-১০৬) নতুন তিনটা প্রযুক্তি বা সক্ষমতা অন্তর্ভুক্ত হয়; এগুলি হলো, সুপারসনিক গতি, বা শব্দের চাইতে বেশি দ্রুততায় ওড়ার সক্ষমতা; বিমানের নিজস্ব রাডার; এবং প্রথম গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র। তৃতীয় জেনারেশনের ফাইটারগুলি (এফ-৪ই, মিগ-২৩, মিরাজ এফ-১) মোটামুটিভাবে ১৯৬০ থেকে ১৯৭০এর মাঝে ডেভেলপ করা। এগুলিতে প্রথম মাল্টি-রোল কনসেপ্ট অন্তর্ভুক্ত হয়; অর্থাৎ একটা ডিজাইনের বিমানই অনেকগুলি মিশন সফলভাবে সম্পাদন করতে পারবে। একইসাথে বিমানগুলিতে নতুন ধরণের অনেক ইলেকট্রনিক্স অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং প্রথমবারের মতো নিখুঁতভাবে টার্গেটে আঘাত হানার মতো অস্ত্র বহণের ব্যবস্থা করা হয়।

১৯৭০ থেকে ২০০০ সালের মাঝে ডেভেলপ করা বিমানগুলিকে বলা হচ্ছে চতুর্থ জেনারেশনের ফাইটার বিমান। ‘এফ-১৫’, ‘এফ-১৬’, ‘এফ-১৪’, ‘এফ/এ-১৮’, ‘মিগ-২৯’, ‘সুখোই-২৭’, ‘মিরাজ-২০০০’, ‘টর্নেডো’, ‘রাফাল’, ‘গ্রিপেন’, ’ইউরোফাইটার টাইফুন’সহ আরও অনেক বিমান এই ক্যাটাগরিতে পড়েছে। এগুলিতে ইলেকট্রনিক্সের আরও উন্নয়ন করা হয় এবং নিখুঁতভাবে টার্গেটে আঘাত হানার ব্যাপারটাকে আরও পাকাপোক্ত করা হয়। একইসাথে আকাশে শত্রুপক্ষের বিমানের সাথে ডগফাইটে সফলতা আনার জন্যে ডিজাইনে অনেক পরিবর্তন আসে। রাডারের সক্ষমতা অনেক বৃদ্ধি করা হয় এবং প্রথমবারের মতো রাডারে ধরা না পড়া ‘স্টেলথ’ যুদ্ধবিমান (এফ-১১৭) তৈরি করা হয়। ২০০০ সালের পরে ডেভেলপ করা পঞ্চম জেনারেশনের যুদ্ধবিমানের মাঝে ইলেকট্রনিক্স এবং সেন্সরের পুরোপুরিভাবে সমন্বয় করা হয়। অর্থাৎ বিমান যেসব তথ্য সংগ্রহ করবে, সেগুলি সমন্বয় করে একত্রে ডিসপ্লে করা হয়। স্টেলথ প্রযুক্তির আরও অনেক উন্নয়ন করা হয়; যাতে করে শত্রুপক্ষের বিমানের চোখে পড়ার আগেই টার্গেটে হামলা করা সম্ভব হচ্ছে। এছাড়াও এর মাঝে নেটওয়ার্কভিত্তিক যুদ্ধ করার সক্ষমতা দেয়া হয়; যার অর্থ হলো, এই বিমানগুলি নিজ পক্ষের বিভিন্ন ইউনিট, তা বিমান হোক, বা ভূমি বা পানিতেই হোক, সেগুলির সংগ্রহ করা তথ্যকে নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সংগ্রহ করবে এবং তা প্রসেস করে যুদ্ধে ব্যবহার করতে পারবে; এমনকি অন্যান্য বিমান বা অন্যান্য ইউনিটকে কমান্ড দিতে বা নিয়ন্ত্রণও করতে পারবে। মোটকথা এই বিমানগুলি অন্যান্য বিমান বা যেকোন ইউনিটের সক্ষমতাকে ব্যবহার করার ক্ষমতা রাখে। তবে এক্ষেত্রে সক্ষমতা অনেকটাই নির্ভর করবে নেটওয়ার্কের সক্ষমতা এবং বিভিন্ন বাহিনীর মাঝে তথ্য আদানপ্রদানের সংস্কৃতির উপরে।

 
ষষ্ঠ জেনারেশনের ফাইটার বিমানের আদৌ প্রয়োজন রয়েছে কিনা, তা নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন করছেন। ‘এফ-৩৫’ বিমানের যে সক্ষমতা রয়েছে, সেটাকে পেরিয়ে আরও সক্ষমতার কতটুকু প্রয়োজন রয়েছে? ষষ্ঠ জেনারেশনের ফাইটার বিমানের জন্যে যেসকল প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলি পঞ্চম জেনারেশনের উপরে সক্ষমতাকে আসলে কতটুকু বৃদ্ধি করবে? অথচ এগুলি ডেভেলপ করতে এবং তৈরি করতে বিশাল অর্থ গুণতে হবে। 

ষষ্ঠ জেনারেশন বলতে আসলে কি বোঝানো হচ্ছে?

‘ব্রেকিং ডিফেন্স’ বলছে যে, যেসব দেশ ষষ্ঠ জেনারেশনের ফাইটার নিয়ে কাজ করছে, তারা তাদের প্রকল্পকে গোপন রেখেছে। আর এর মাঝে চীনারা তাদের এই প্রকল্পকে সবচাইতে বেশি গোপন রেখেছে। ২০১৯ সালে এক সাক্ষাৎকারে চীনের ‘চেংডু এরোস্পেস কর্পোরেশন’এর প্রধান ডিজাইনার ওয়াং হাইফেং বলেন যে, চীনারা পরবর্তী জেনারেশনের যুদ্ধবিমানের জন্যে চিন্তাভাবনা করছে; যাতে করে নতুন ধরণের এই বিমান ২০৩৫ নাগাদ চীনা বিমান বাহিনীতে সার্ভিসে আসতে পারে। তিনি চীনাদের ষষ্ঠ জেনারেশন প্রকল্প নিয়ে কিছু না বললেও মার্কিনীদের প্রকল্পে কি কি থাকতে পারে, তার একটা ধারণা দিয়েছেন; এর মাঝে থাকবে ড্রোনের সাথে একটা গ্রুপে কাজ করতে পারা; আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করা; স্টেলথ সক্ষমতাকে আরও বৃদ্ধি করা; এবং বিমানের সেন্সরগুলি এমন হবে, যা কিনা কোন নির্দিষ্ট দিক নয়, বরং সকল দিক থেকেই তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে। এছাড়াও লেজার অস্ত্রের সংযোজন, এবং ‘এডাপটিভ ইঞ্জিন’এর ব্যবহার হতে পারে সেই বিমানে।

মার্কিন বিমান বাহিনীর এই প্রকল্পের নাম হলো ‘নেক্সট জেনারেশন এয়ার ডমিন্যান্স’ বা ‘এনজিএডি’ বা ‘এনগ্যাড’। এটা অত্যন্ত জটিল একটা প্রকল্প; কারণ এর মাঝে রয়েছে একটা পাইলট চালিত বিমানের নকশা করা; নতুন ধরণের অস্ত্র ডেভেলপ করা; এমনকি নতুন ধরণের কয়েক প্রকারের ড্রোনেরও ডিজাইন করা। বিমান বাহিনীর সচিব ফ্রাঙ্ক কেনডাল বলছেন যে, এরকম একেকটা বিমানের খরচ কয়েক’শ মিলিয়ন ডলার হয়ে যেতে পারে। যদিও কেনডাল বলছেন যে, মার্কিনীরা এই দশকের মাঝেই এই বিমানের ডেভেলপমেন্ট শেষ করতে পারবে, তথাপি যুক্তরাষ্ট্রের সকল প্রকল্পই দেরিতে শেষ হওয়ায় কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারছে না যে, এত জটিল একটা প্রকল্প ঠিক সময়মতো শেষ হবে। কাজেই অনেকেই ধারণা করছেন যে, এই দেরির সুবাদেই চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত দূরত্ব কমে আসবে।

জাতীয় নিরাপত্তা ম্যাগাজিন ‘নাইনটিন ফোরটিফাইভ’এর এক লেখায় ব্রেন্ট ইস্টউড প্রশ্ন করছেন যে, ষষ্ঠ জেনারেশনের ফাইটার বিমানের আদৌ প্রয়োজন রয়েছে কিনা। ‘এফ-৩৫’ বিমানের যে সক্ষমতা রয়েছে, সেটাকে পেরিয়ে আরও সক্ষমতার কতটুকু প্রয়োজন রয়েছে? চীনের সর্বোচ্চ প্রযুক্তির বিমানগুলি আসলে কতটুকু সক্ষম, সেটা সম্পর্কে তো কেউ এখনও তেমন জানেই না। তাহলে কেন বলা হচ্ছে যে, আরও সক্ষম নতুন প্রজন্মের বিমানের প্রয়োজন? আর ষষ্ঠ জেনারেশনের ফাইটার বিমানের জন্যে যেসকল প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলি পঞ্চম জেনারেশনের উপরে সক্ষমতাকে আসলে কতটুকু বৃদ্ধি করবে? অথচ এগুলি ডেভেলপ করতে এবং তৈরি করতে বিশাল অর্থ গুণতে হবে। যদি ‘এফ-৩৫’ বিমান দিয়েই আকাশের নিয়ন্ত্রণ নেয়া সম্ভব হয়, তাহলে ষষ্ঠ জেনারেশনের বিমান ডেভেলপ না করে সেই অর্থ দিয়ে আরও বেশি ‘এফ-৩৫’ কেনা প্রয়োজন।

 
চীনারা খুব সম্ভবতঃ তাদের পঞ্চম জেনারেশনের 'জে-২০' বিমানের অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করেই ষষ্ঠ জেনারেশনের বিমান তৈরি করতে চাইছে। প্রযুক্তির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বকে মেনে নিয়ে তারা কম ঝুঁকিপূর্ণ পথে এগুচ্ছে; যেপথে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ধীরে ধীরে সক্ষমতার ব্যবধান কমাতে পারবে। তাড়াহুড়া নয়, বরং চীনের ধীরে চলার চিন্তাটাই মার্কিনীদের সাথে চীনাদের মূল পার্থক্য। মার্কিনীরা এখন ভবিষ্যতের বিভিন্ন মাইলস্টোনের কথা বলছে। এই মাইলস্টোনগুলিই বলে দিচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র চীনের সাথে মাইলস্টোনগুলির আগেই সংঘাতের ছুতো খুঁজছে।

মার্কিনীদের সাথে চীনাদের চিন্তাগত পার্থক্য

জেনারেল মার্ক কেলি বলছেন যে, চীনারা মূলতঃ মার্কিনীদেরকেই অনুসরণ করছে। কারণ স্টেলথ সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি করা, কম্পিউটারের প্রসেসিং সক্ষমতা ও তথ্য সংগ্রহ করার সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি করা, এবং নতুন নতুন সিস্টেমকে দ্রুত বিমানের সাথে যুক্ত করে ‘রিপ্রোগ্রাম’ করে নিতে পারার সক্ষমতা – এগুলি মূলতঃ মার্কিনী চিন্তা। যদি এখানে কোন ভিন্নতা থাকে, তা খুবই সূক্ষ্ম। যেমন, চীনারা খুব ধীরে ধীরে একটা ফাইটার বিমান থেকে অন্য ফাইটার বিমান ডেভেলপ করে; যেমনটা তারা করেছিল রুশ ‘সুখোই-২৭’ ও ‘সুখোই-৩০’ বিমান থেকে চীনাদের নিজস্ব ‘জে-১৬’ বিমান ডেভেলপ করার ক্ষেত্রে। অপরদিকে জাতি হিসেবে মার্কিনীরা নতুন কিছু ডেভেলপ করতে গিয়ে বড় আকারের লাফ দেয়। সিঁড়ির বর্তমান ধাপ ছেড়ে দিয়ে পরের ধাপ পুরোপুরি এড়িয়ে সামনের ধাপ ধরার জন্যে সেই লাফ দেয় মার্কিনীরা। চীনারা এধরণের কাজ করে না; তারা ধীরে ধীরে এগিয়ে বারংবার চেষ্টা করতে থাকে। এর মাঝে দূরের ধাপটা ধরতে গিয়ে কোন সমস্যায় পড়লে তারা কাছাকাছি ধাপটা ধরে ফেলতে পারে।

চীনারা প্রযুক্তির দিক থেকে কখনোই তাড়াহুড়া করেনি। জেনারেল কেলি বলছেন যে, চীনারা সর্বদাই সহজ পথটাকেই বেছে নিয়েছে। প্রতিরক্ষা ম্যাগাজিন ‘দ্যা ওয়ার জোন’এর এক লেখায় থমাস নেডউইক বলছেন যে, চীনারা শুধু রুশ ‘সুখোই-২৭’ থেকেই শেখেনি। তারা রুশ ‘সুখোই-৩৫’ বিমান কিনে সেটা নিয়ে গবেষণা করেছে। এর ফলে পঞ্চম জেনারেশনের বিমানের ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম, ‘থ্রাস্ট ভেকটরিং ইঞ্জিন’ এবং অস্ত্রগুলি ডেভেলপ করতে পেরেছে। এভাবেই তারা হয়তো ‘জে-২০’ বিমানের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ষষ্ঠ জেনারেশনের বিমান ডেভেলপ করবে।

যুক্তরাষ্ট্র কি আসলেই প্রযুক্তিগত দিক থেকে পিছিয়ে পড়ছে?

যে ব্যাপারটা পরিষ্কার তা হলো, মার্কিনীরা মনে করছে না যে তারা প্রযুক্তিতে চীনাদের চাইতে পিছিয়ে যাচ্ছে। নিজেদের প্রযুক্তিগুলি কে কার আগে কাজে লাগাতে পারে, সেই সক্ষমতা নিয়েই প্রতিযোগিতা হচ্ছে। মার্কিনীরা প্রযুক্তির দিক থেকে এগিয়ে থাকতে যেই ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত, চীনারা ততটা নয়। এটা দুই দেশের চিন্তাগত পার্থক্যের কারণেই। মার্কিন বিমান বাহিনীর প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান জেনারেল কেনেথ উইলসবাক গত সেপ্টেম্বরে সাংবাদিকদের সামনে চীনাদের পঞ্চম জেনারেশনের যুদ্ধবিমান ‘জে-২০’ নিয়ে তার মতামত ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন যে, এটা চীনাদের সবচাইতে শক্তিশালী ফাইটার বিমান। এটা নিয়ে মার্কিনীরা খুব বেশি একটা গবেষণার সুযোগ পায়নি। এটা ভালো একটা বিমান। কিন্তু এটা নিয়ে চিন্তা করে রাতের ঘুম নষ্ট করার কোন কারণ নেই। তার ধারণা, মার্কিন পঞ্চম জেনারেশনের বিমানগুলি চীনাদের বিমানের চাইতে অনেক বেশি সক্ষমতার। এর আগে মার্কিন বিমান বাহিনীর চীফ অব স্টাফ জেনারেল চার্লস ব্রাউন চীনা ‘জে-২০’ বিমানের পক্ষে ভালো কিছু মন্তব্য করলেও তিনি বলেন যে, এই বিমান নিয়ে তিনি চিন্তিত নন মোটেই।

জেনারেল মার্ক কেলি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, চীনারা প্রযুক্তির দিক থেকে মার্কিনীদেরকেই অনুসরণ করবে। কিন্তু চিন্তাগত দিক থেকে তারা মার্কিনীদের থেকে ভিন্ন। মার্কিনীরা প্রযুক্তির উপরেই তাদের সকল চিন্তাকে সীমাবদ্ধ করলেও চীনারা তা করছে না। বরং প্রযুক্তির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বকে মেনে নিয়ে তারা কম ঝুঁকিপূর্ণ পথে এগুচ্ছে; যেপথে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ধীরে ধীরে সক্ষমতার ব্যবধান কমাতে পারবে। তাড়াহুড়া নয়, বরং চীনের ধীরে চলার চিন্তাটাই মার্কিনীদের সাথে চীনাদের মূল পার্থক্য। আর এই চিন্তাটা এখন মার্কিনীদের সিদ্ধান্তকে যথেষ্টই প্রভাবিত করছে। মার্কিনীরা এখন ভবিষ্যতের বিভিন্ন মাইলস্টোনের কথা বলছে, যেই মাইলস্টোনগুলি প্রযুক্তি ও সামরিক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের সমতা এনে দিতে পারে। মার্কিনীরা হয়তো চীনাদের সেই মাইলস্টোনগুলি ধীরে সুস্থে ধরে ফেলা দেখতে চাইছে না। মোটকথা, এই মাইলস্টোনগুলিই বলে দিচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র চীনের সাথে মাইলস্টোনগুলির আগেই সংঘাতের ছুতো খুঁজছে।



সূত্রঃ

‘China ‘on track’ for 6th-gen fighter, US Air Force needs to get there first: ACC chief’ in Breaking Defense, 26 September 2022

‘5th Generation Fighters’ by Lt. Gen. Hawk Carlisle, USAF (unclassified)

‘China racing for 6th-gen fighter edge over US’ in Asia Times, 01 October 2022

‘China Is Working On Its Own Sixth-Generation Fighter Program: Official’ by Thomas Nedwick, in The Warzone, The Drive, 28 September 2022 (https://www.thedrive.com/the-war-zone/china-is-working-on-its-own-sixth-generation-fighter-program-official )

‘China should ‘worry’ about Taiwan 2027 timeline, J-20 is just ‘OK’ fighter: PACAF chief’ in Breaking Defense, 19 September 2022

‘Do We Really Need 6th-Generation Stealth Fighters?’ by Brent M. Eastwood, in 1945, 22 July 2022 (https://www.19fortyfive.com/2022/07/do-we-really-need-6th-generation-stealth-fighters/)

‘Beyond the F-22 or F-35: What Will the Sixth-Generation Jet Fighter Look Like?’ by Sebastian Roblin, in The National Interest, 21 July 2018

Saturday, 1 October 2022

অর্থনৈতিক দৈন্যতা জার্মানদেরকে ইউক্রেনের শরণার্থীদের ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করাচ্ছে

০২রা অক্টোবর ২০২২
 
২০১৬ সাল। জার্মানিতে ডানপন্থীদের মুসলিম শরণার্থী বিরোধী বিক্ষোভ। ইউরোপে মুসলিম এবং ইউক্রেনিয় খ্রিস্টান শরণার্থীদের ব্যাপারে জনমতে ব্যাপক পার্থক্য থাকলেও জ্বালানির ব্যাপক মূল্যস্ফীতির মাঝে এখন যেকোন শরণার্থীই বোঝা হয়ে যাচ্ছে। এমনকি মধ্যপন্থায় থাকা রাজনীতিবিদেরাও শরণার্থীদের আটকাতে বলছেন।

গত ২৭শে সেপ্টেম্বর জার্মান ‘ফেডেরাল স্ট্যাটিসটিক্যাল অফিস’ বলে যে, জার্মানির জনসংখ্যা ২০২২ সালে রেকর্ড সংখ্যক বেড়েছে। এর কারণ ছিল ইউক্রেন থেকে শরণার্থীর ঢল। বর্তমানে দেশটার জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ কোটি ৪০ লক্ষের বেশি। শরণার্থীদের কারণে জার্মানির জনসংখ্যা ২০২২ সালের প্রথম ছয় মাসে ৮ লক্ষ ৪৩ হাজার বা ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২১ সালের পুরো বছরে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল মাত্র ৮২ হাজার। যুদ্ধের আগে সরকারি হিসেবে জার্মানিতে ইউক্রেনিয়দের সংখ্যা ছিল প্রায় দেড় লক্ষ। যুদ্ধ শুরুর পর প্রায় ৯ লক্ষ ৭১ হাজার নতুন শরণার্থীকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, এর আগে ১৯৯২ সালে সাবেক যুগোশ্লাভিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় শরণার্থীদের চাপে জার্মানির জনসংখ্যা ৭ লক্ষ বৃদ্ধি পেয়েছিল। আবার ২০১৫ সালে সিরিয় শরণার্থীর ঢলে দেশটার জনসংখ্যা আরও প্রায় ১০ লক্ষ বৃদ্ধি পায়। আর ইউক্রেন যুদ্ধের মাঝে ইউক্রেন সরকার বেশিরভাগ পুরুষ মানুষকে দেশ ছাড়তে অনুমতি না দেয়ায় জার্মানিতে বেশিরভাগ ইউক্রেনিয় শরণার্থীই হলো নারী ও শিশু। তবে শরণার্থীদের ঢল আসার আগেই জার্মানি শুধু ইউরোপের সবচাইতে ধনীর দেশই ছিল না; সেখানে জন্মহার ছিল অত্যধিক কম এবং অল্প বয়সের মানুষের সংখ্যাও ছিল অপেক্ষাকৃত অনেক কম। তাই জার্মানির অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যে কর্মঠ অপেক্ষাকৃত অল্প বয়সের মানুষের চাহিদা তৈরি হয়েছিল।

জার্মানিতে শরণার্থীদের নিয়ে সমস্যা বাড়ছে

জার্মানির পশ্চিমের আখেন শহরের ২০ কিঃমিঃ দূরে ছোট একটা এলাকার চিত্র তুলে ধরে ‘ডয়েচে ভেলে’। ৫০ হাজার জনসংখ্যার এই ছোট্ট শহরে প্রতি বছর ৫০ থেকে ৬০ জন করে শরণার্থী গ্রহণ করা হয়। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কয়েক মাসের মাঝেই সেখানে ৫’শ ৩০ জন শরণার্থী হাজির হয়েছে। এর বাইরেও আরও ২০টা দেশের ৮’শ ৫০ জন শরণার্থীকে সেখানে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। শহরের খেলাধূলার জিমনেসিয়াম এবং হল রুমে পার্টিশনের ব্যবস্থা করে শরণার্থীদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। একসময় অনেকেই নিজেদের বাড়িতে শরণার্থীদের থাকতে দিলেও এখন কেউ অগ্রগামী হচ্ছে না। কারণ জ্বালানির মূল্য এতটাই বেড়ে গেছে যে, তারা মনে করছে যে, শরণার্থীদের নিলে তাদের দৈনন্দিন খরচ সক্ষমতার বাইরে চলে যাবে। শরণার্থীদের মাঝে কেউ কেউ কাজ যোগাড় করতে পারলেও অনেকেই এখনও পারেনি। সাহায্যকারীরা খুবই ব্যস্ত সময় পার করছে। তারা শরণার্থীদের জন্যে ফর্ম পূরণের কাজ ছাড়াও তাদের জন্যে ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা করছে; তাদের থাকার জন্যে জায়গা খুঁজে দিচ্ছে; এমনকি তাদের সন্তানদের দেখাশুনা এবং তাদেরকে রান্না করার শিক্ষাও দিচ্ছে।

আখেন শহরের মেয়রও ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন যে, তার শহরে এখন আর কোন শরণার্থী রাখার ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। সেখানে ৪ হাজার ইউক্রেনিয় শরণার্থী রাখার পর সকল যায়গা ফুরিয়ে গেছে; যার মাঝে ৮টা জিমনেসিয়াম হলও রয়েছে। আখেন শহরে যুদ্ধের আগেই ইউক্রেনিয়দের একটা বড়সড় গ্রুপ বসবাস করতো; এরা অনেকেই শরণার্থীদেরকে তাদের বাড়িতে থাকতে দিয়েছে। ২০১৬ সালে সিরিয়া এবং আফ্রিকা থেকে আসা ১’শ ২০ জন শরণার্থীর জন্যে শহরের খেলার মাঠে অস্থায়ী বাড়ি তৈরি করা হয়। এই বাড়িগুলি পুরোনো হলেও সেখানে একান্তভাবে বসবাসের সুযোগ থাকায় সকলেই তেমন বাড়ি চায়। শহরের খালি বাণিজ্যিক জায়গাগুলিকে ব্যবহার করে শরণার্থীদেরকে জিমনেসিয়াম থেকে সরিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। কারণ সকলেই এখন বুঝতে পারছে যে, যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হবে। শরণার্থীদের সন্তানদের জন্যে শিক্ষা এবং অন্যান্য সেবার ব্যবস্থাও করতে হবে। কিন্তু এই সেবা পেতে এখন শরণার্থীরা সাধারণ জার্মান নাগরিকদের সাথে প্রতিযোগিতা করছে। ভিন্ন ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর জন্যে আলাদা বাসস্থানের ব্যবস্থা করা ছাড়া কোন গতি নেই; নাহলে শান্তিশৃংখলা ব্যাহত হতে পারে। সাহায্যকারীরা বলছেন যে, বেশিরভাগ বাড়িওয়ালাই শরণার্থীদের কাছে বাড়ি দেয়ার কথা শুনলে ফোন রেখে দিচ্ছে। মোটকথা শরণার্থীদের বাসস্থান যোগাড় করতে এখন অনেক বেশি কষ্ট করতে হচ্ছে।

‘ইউরোনিউজ’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, জার্মানিতে ইউক্রেনিয় এবং রুশদের মাঝে চলছে সংঘর্ষ; যা জার্মানির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করছে। একদিকে ইউক্রেনিয়রা বার্লিনের রাস্তায় জার্মানির রুশ গ্যাস আমদানি করার নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে। অপরদিকে রুশরা ইউক্রেনিয়দেরকে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে। এখানেই শেষ নয়, জার্মানিতে রুশদের মালিকানায় থাকা ব্যবসা বাণিজ্যেও ভূতুড়ে ফোন আসছে হুমকিসহ। জার্মানিতে রুশদের একটা স্কুলে আগ্নিসন্ত্রাসও হয়েছে বলে বলছে ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’। জার্মান পুলিশ বলছে যে, এপ্রিল মাসে জার্মানিতে ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রুশ, ইউক্রেনিয় এবং বেলারুশদের মাঝে ১৭’শ অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে ইউক্রেনিয়দের সংখ্যা ১১ লক্ষ ছাড়িয়ে গেলেও জার্মানিতে ১৯৯০এর দশক থেকেই প্রায় ৩০ লক্ষ রুশ ভাষাভাষী মানুষ বাস করে।

 
২৮শে সেপ্টেম্বর ২০২২। চেক রিপাবলিকের রাজধানী প্রাগে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ইস্যুতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ। ইউরোপজুড়ে ডানপন্থী রাজনীতির জয়জয়কার দৃশ্যমান হওয়ায় জার্মানির ডানপন্থীরাও এতে আনুপ্রাণিত হয়েছে। নিজেদের দলের কর্মকান্ডের সফলতার চাইতে লিবারাল রাজনৈতিক ব্যবস্থার ব্যর্থতাই ডানপন্থীদের বেশি সহায়তা দিয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে যে, আসন্ন শীতকাল ইউরোপে, তথা জার্মানিতে, পশ্চিমা লিবারাল আদর্শের জন্যে অতি শীতল পরীক্ষা নিয়ে আসতে যাচ্ছে।

শরণার্থীদের ব্যাপারে রাজনীতিবিদেরা তাদের মতামত পাল্টাচ্ছেন

জার্মানির বৃহত্তম বিরোধী দল এঙ্গেলা মার্কেলের মধ্য-ডানপন্থী ‘ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাট’ বা ‘সিডিইউ’ দলের প্রধান ফ্রেডরিক মার্জ জার্মান টেলিভিশন ‘বিল্ড টিভি’র সাথে এক সাক্ষাতে বলেন যে, ইউক্রেন থেকে আসা শরণার্থীরা জার্মান সরকারের সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থা থেকে সুবিধা ভোগ করতে পর্যটকের মতো আচরণ করছে। ১১ লক্ষের বেশি ইউক্রেনিয় শরণার্থীদের জন্যে শীতকালে ঘর উষ্ণ করার সুবিধা দিলে সেটা জার্মান নাগরিকদের জন্যে অন্যায্য হয়ে যাচ্ছে। কারণ অনেক খেটে খাওয়া জার্মান তাদের জ্বালানি খরচ বহণ করতে পারছে না। ‘পলিটিকো’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, জার্মানির অর্ধেক বাড়িঘরই শীতকালে উষ্ণ রাখার জন্যে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করে থাকে। এই বাড়িগুলির জন্যে জ্বালানি খরচ কমপক্ষে দ্বিগুণ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। ফ্রেডরিক মার্জের কথাগুলির পর দেশজুড়ে সমালোচনা শুরু হলে তিনি এক টুইটার বার্তায় তার মন্তব্যের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। মার্জ ক্ষমতাসীন সোশালিস্ট সরকারের শরণার্থী নীতির সমালোচনা করে বলছেন যে, সরকারের কোন সুনির্দিষ্ট নীতি নেই। যে-ই জার্মানিতে আসতে চাইছে, তাকেই সরকার দেশে ঢুকতে দিচ্ছে। সরকারের উচিৎ কঠোরভাবে নির্দিষ্ট করে দেয়া যে, কত শরণার্থী দেশে ঢুকতে পারবে। ‘পলিটিকো’ বলছে যে, মার্জের কথাগুলি বেশ খানিকটা পপুলিস্ট ঘরানার, যা কিনা ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী ‘অলটারনেটিভ ফর জার্মানি’ বা ‘এএফডি’ দলের কথার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে যে, ‘সিডিইউ’এর চিন্তায় বেশ খানিকটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এতদিন ‘সিডিইউ’ ইউক্রেনিয় শরণার্থীদের ব্যাপারে জার্মান সরকারের নীতিকে সমর্থন করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় সরকারের ব্যর্থতাকে কাজে লাগাতে ‘সিডিইউ’ হয়তো এই সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাইছে না।

‘ইউরোনিউজ’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, জার্মানির পূর্ব দিকের ছোট দেশগুলিতেও শরণার্থীদের চাপ অনুভূত হচ্ছে। চেক রিপাবলিক ৪ লক্ষ ৩৯ হাজারের বেশি ইউক্রেনিয় শরণার্থী নিয়েছে; পাশের স্লোভাকিয়া নিয়েছে আরও প্রায় ১ লক্ষ। কিন্তু সেপ্টেম্বর মাসে সিরিয়া থেকে শরণার্থী আসা বেড়ে যাওয়ায় তারা তাদের সীমান্তে পাহাড়া বসিয়েছে; যদিও ইইউএর নিয়ম অনুসারে একদেশ থেকে অন্যদেশে যাতায়াতে কোন বাধা থাকার কথা নয়। সমস্যা হলো, যেখানে চেক রিপাবলিকের ৭৫ শতাংশ জনগণ ইউক্রেনের শরণার্থীদের দেশে ঢোকার পক্ষে, সেখানে ২০১৫ সালে সিরিয়া এবং আফ্রিকার মুসলিম শরণার্থীদের দেশে ঢোকার বিরুদ্ধে ছিল ৭০ শতাংশ মানুষ। অর্থাৎ ইউক্রেনের শরণার্থীদেরকে তারা ভাইয়ের মতো দেখলেও মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার মুসলিমদেরকে তারা ভিন্ন চোখে দেখেছে। কিন্তু এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে চলেছে। কারণ জীবনযাত্রার খরচ মারাত্মকভাবে বেড়ে যাওয়ায় চেক রিপাবলিকের কট্টর বামপন্থী এবং কট্টর ডানপন্থী দলগুলি রাজধানী প্রাগের রাস্তায় সরকার বিরোধী বিক্ষোভ করেছে। অনেকেই বলা শুরু করেছে যে, সরকার শরণার্থীদেরকে চেক নাগরিকদের তুলনায় বেশি সুবিধা দিচ্ছে। স্লোভাকিয়াতেও অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধিতে চেক রিপাবলিকে মূদ্রাস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ১৭ শতাংশ; আর স্লোভাকিয়াতে ১৪ শতাংশ; যা কিনা ইউরোপের সর্বোচ্চগুলির মাঝে।

জার্মানিতে ডানপন্থীদের জনসমর্থন বাড়ছে

জার্মানির ‘ডের স্পাইগেল’ পত্রিকা বলছে যে, জার্মানির ১৬টা রাজ্যের মাঝে ১২টা রাজ্য ইতোমধ্যেই বলে দিয়েছে যে তারা ইউক্রেন থেকে আর কোন শরণার্থী নিতে পারবে না। জার্মান স্বারাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলছেন যে, খুব শীঘ্রই সবগুলি রাজ্যই তাদের সক্ষমতার সীমানা অতিক্রম করবে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিদিন গড়ে ৮শ’ ৭৫ জন শরণার্থী জার্মানিতে প্রবেশ করেছে। অর্থনৈতিক চাপের মাঝে শরণার্থীদের ভার নিতে হিমসিম খাচ্ছে ইউরোপ; বিশেষ করে জার্মানি। এই সুযোগটাই নিচ্ছে জার্মানির কট্টর ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী দল ‘অলটারনেটিভ ফর জার্মানি’ বা ‘এএফডি’। তবে জার্মানির প্রাক্তন চ্যালেন্সর গেরহার্ড শ্রোডার মনে করছেন যে, ‘এএফডি’র নিজেদের মাঝেই বিভেদ রয়েছে। তিনি ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, দেশের পূর্বাঞ্চলে এই দলের সমর্থকেরা রাশিয়াকে সমর্থন করলেও পশ্চিমাঞ্চলের সমর্থকেরা রাশিয়ার পক্ষে নয়। এমতাবস্থায় তারা সরকারের বিরুদ্ধে শক্ত কোন আন্দোলন করতে পারবে না। তথাপি জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধির ইস্যুতে ‘এএফডি’র সরকার বিরোধী বিক্ষোভে হাজারো মানুষ যোগ দিচ্ছে। গবেষণা সংস্থা ‘আইএনএসএ’র এক জরিপে বলা হচ্ছে যে, ক্ষমতাসীন চ্যান্সেলর ওলাফ শোলজএর বামপন্থী সোশালিস্ট দলের পক্ষে জনমত ২৬ শতাংশ থেকে কমে ১৮ শতাংশে নেমে এসেছে; শরীক দল ‘এফডিপি’র অর্ধেক কমে গিয়ে হয়েছে মাত্র ৭ শতাংশ। অপর শরীক দল ‘গ্রিন পার্টি’ও জনপ্রিয়তা হারিয়েছে। অপরদিকে ‘এএফডি’র সমর্থন ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫ শতাংশে উঠে গেছে; যা কিনা ইতিহাসের সর্বোচ্চ। অক্টোবর থেকে রাস্তায় বিক্ষোভে ‘এএফডি’র এজেন্ডা হবে ‘আমাদের দেশ আগে’; যা প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’এর সাথে মিলে যায়।

ইউরোপে মুসলিম এবং ইউক্রেনিয় খ্রিস্টান শরণার্থীদের ব্যাপারে জনমতে ব্যাপক পার্থক্য থাকলেও জ্বালানির ব্যাপক মূল্যস্ফীতির মাঝে এখন যেকোন শরণার্থীই বোঝা হয়ে যাচ্ছে। এমনকি মধ্যপন্থায় থাকা রাজনীতিবিদেরাও শরণার্থীদের আটকাতে বলছেন। জার্মানির বামপন্থী সোশালিস্ট কোয়ালিশন সরকার জনগণকে আশ্বাস দিতে ব্যার্থ হয়েছে যে জার্মানির নীতি সঠিক পথে রয়েছে। অন্ততঃ সিদ্ধান্তগত দিক থেকে অনিশ্চয়তা এবং নীতিগত দিক থেকে স্বাধীনভাবে চলতে না পারাটা জার্মানির জাতীয় গর্বকে আঘাত করছে। এই সুযোগটাই নিতে চাইছে ডানপন্থী গ্রুপগুলি। মধ্যপন্থী বিরোধী দলগুলিও ডানপন্থীদের শ্লোগানকে পুঁজি করাটাকেই সঠিক বলে মনে করছে। ইউরোপজুড়ে ডানপন্থী রাজনীতির জয়জয়কার দৃশ্যমান হওয়ায় জার্মানির ডানপন্থীরাও এতে আনুপ্রাণিত হয়েছে। নিজেদের দলের কর্মকান্ডের সফলতার চাইতে লিবারাল রাজনৈতিক ব্যবস্থার ব্যর্থতাই ডানপন্থীদের বেশি সহায়তা দিয়েছে। ২০২০ সালে কট্টর ডানপন্থী দল ‘এএফডি’র মুখপাত্র ক্রিশ্চিয়ান লুথ বলেছিলেন যে, জার্মানির অবস্থা যত খারাপ হবে, ‘এএফডি’র অবস্থান তত শক্ত হবে। বোঝাই যাচ্ছে যে, আসন্ন শীতকাল ইউরোপে, তথা জার্মানিতে, পশ্চিমা লিবারাল আদর্শের জন্যে অতি শীতল পরীক্ষা নিয়ে আসতে যাচ্ছে।