Showing posts with label inflation. Show all posts
Showing posts with label inflation. Show all posts

Wednesday, 22 March 2023

মার্কিন ব্যাংক দেউলিয়া… পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থার উপর আস্থা হারাচ্ছে মানুষ?

২২শে মার্চ ২০২৩

'সিলিকন ভ্যালি ব্যাংক' বা 'এসভিবি'র বাইরে ডিপোজিট তুলে ফেলার জন্যে মানুষের লাইন। তথা পশ্চিমা অর্থ ব্যবস্থা চলছে ‘ট্রায়াল এন্ড এরর’ বা জোড়াতালি দিয়ে। সকল বিশ্লেষকেরাই বলছেন যে, মার্কিন অর্থনীতি ব্যাংকিং ব্যবস্থার উপরে পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল। পরিস্থিতি এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে, পুরো আর্থিক ব্যবস্থার উপর থেকে জনগণের আস্থা উঠে যাচ্ছে। কারণ সরকারি বন্ড বা ব্যাংকে ডিপোজিট রাখাও এখন অনিরাপদ ঠেকছে।


‘সিলিকন ভ্যালি ব্যাংক’এর দেউলিয়া হওয়াটা ছিল ২০০৮ সালের পর থেকে সবচাইতে বড় ব্যাংক দেউলিয়ার ঘটনা। এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকিং ইতিহাসে দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যাংক দেউলিয়ার ঘটনা। ‘সিএনএন’এর এক প্রতিবেদনে ব্যাংকটার দেউলিয়ার হবার ঘটনাগুলির বর্ণনা দিয়ে বলা হয় যে, শেয়ার বাজারে ব্যাংকটার শেয়ারের মূল্য এক সপ্তাহে ৮০ শতাংশ পড়ে যায়; যার ৬০ শতাংশই পড়ে ১০ই মার্চ, বা মাত্র একদিনে! তবে সমস্যা হলো, ‘সিলিকন ভ্যালি ব্যাংক’ বা ‘এসভিবি’ যা করছিল, তা ব্যাংকিং সেক্টরের বহু ব্যাংকই করছিল; আর তা হলো, মানুষের কাছ থেকে ডিপোজিট হিসেবে অর্থ জোগাড় করে তা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করা। এই বিনিয়োগের মাঝে ছিল মার্কিন সরকারের ঋণপত্র না বন্ড এবং বিভিন্ন প্রকারের ঋণ। ব্যাংকটা বিপদে পড়ে যায় যখন মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডেরাল রিজার্ভ’ বা ‘ফেড’ ব্যাপকহারে সুদের হার বাড়াতে শুরু করে। ফলশ্রুতিতে ‘এসভিবি’ ক্ষতির মুখে পড়তে থাকে এবং এই খবরগুলি যখন ছড়াতে থাকে, তখন ব্যাংকের বিপুলসংখ্যক গ্রাহক একসাথে তাদের ডিপোজিট তুলতে থাকেন। এরপরই মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘এসভিবি’র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। মাত্র ৩৬ ঘন্টার মাঝে ‘এসভিবি’ দেউলিয়া হয়ে যায়।

‘এসভিবি’র দেউলিয়া হবার মূল কারণ কি?

সম্পদের হিসেবে ‘এসভিবি’ ছিল মার্কিন ব্যাংকিং সেক্টরের ১৬তম বৃহৎ ব্যাংক। ১৯৮৩ সালে চালু হওয়া ‘সিলিকন ভ্যালি ব্যাংক’ মূলতঃ মার্কিন প্রযুক্তিনির্ভর কোম্পানিগুলিকে সহায়তা দেয়ার জন্যে স্থাপিত হয়েছিল। ‘ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিভিত্তিক কোম্পানিগুলির প্রায় অর্ধেকই ‘এসভিবি’র করা বিনিয়োগের উপর নির্ভরশীল ছিল। ‘এসভিবি’র অনেক বিনিয়োগই ছিল অপেক্ষাকৃত দুর্বল কোম্পানিতে। ২০০৮ সালে অর্থনৈতিক ধ্বসের পর প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ‘ডড-ফ্র্যাঙ্ক এক্ট’ নামের আইনে স্বাক্ষর করেন, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকগুলিকে আরও কঠোর আইন মেনে চলতে বাধ্য করা হয়। তবে ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান সরকারের সময়ে এর কঠোরতা কিছুটা কমিয়ে আনা হয়। তবে মার্কিন কংগ্রেসে এই আইন পাস করতে গিয়ে আইনপ্রণেতাদের মাঝে যথেষ্ট দ্বন্দ্ব হয়। এর মাধ্যমে বড় ব্যাংকগুলির নিয়ম কঠোর থাকলেও অপেক্ষাকৃত ছোট ব্যাংকগুলি, যেগুলির সম্পদের পরিমাণ আড়াই’শ বিলিয়ন ডলারের কম, সেগুলির ক্ষেত্রে নিয়ম কিছুটা শিথিল করা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয় যে, এর মাধ্যমে ছোট আকারের ব্যাংক চালু করতে অনুপ্রেরণা দিয়ে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

২০২০ সালে করোনা লকডাউনের মাঝে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলির ডিপোজিট বেড়ে যায়। ‘এসভিবি’র ডিপোজিট দুই বছরে তিনগুণ হয়ে ১’শ ৮৯ বিলিয়ন ডলার হয়ে যায়। এই অতিরিক্ত অর্থ ব্যাংক বিনিয়োগ করে দীর্ঘমেয়াদী সরকারি ঋণপত্র বা বন্ডে। এই বিনিয়োগগুলিকে সবসময়ই নিরাপদ বিনিয়োগ মনে করা হয়। সরকারি বন্ডে ১’শ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করার পর ২০২২ সালের মার্চ থেকে মুদ্রাস্ফীতি কমাতে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডেরাল রিজার্ভ’ সুদের হার বাড়াতে থাকে। এর ফলে সরকারি বন্ডের মূল্য ক্রয়মূল্যের চাইতে কমে যেতে থাকে। ‘এসভিবি’র কাছে থাকা সরকারি বন্ডের মূল্য ১৭ বিলিয়ন ডলার কমে যায়। ‘এসভিবি’র মতো সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করা অন্যান্য ব্যাংকগুলিও ব্যাপক হারে ক্ষতির সন্মুখীন হতে থাকে। গত ৮ই মার্চ একটা প্রতিবেদনে ‘এসভিবি’ উল্লেখ করে যে, তারা সরকারি বন্ড বিক্রি করতে গিয়ে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার ক্ষতির সন্মুখীন হয়েছে। এই খবরে ‘এসভিবি’র শেয়ারের মূল্য পড়ে যেতে থাকে। একইসাথে বিপুল সংখ্যক বড় আকারের বিনিয়োগকারী ‘এসভিবি’ থেকে তাদের ডিপোজিট তুলে নিতে থাকে। ১০ই মার্চ ‘এসভিবি’র শেয়ারমূল্যে ধ্বস নামে এবং একদিনে ৪২ বিলিয়ন ডলারের ডিপোজিট তুলে ফেলে গ্রাহকরা। সেদিনই সরকার ‘এসভিবি’র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়।

তবে এর বাইরেও কিছু বড় কারণ রয়েছে; বিশেষ করে বড় পরিসরের কারণগুলিকে বাদ দেয়া যাবে না। নিউইয়র্কের ‘ফোর্ডহ্যাম ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর রিচার্ড স্কুয়ির ‘আল জাজিরা’কে বলছেন যে, প্রথম বড় কারণ হলো, গত কয়েক বছরের মাঝে, বিশেষ করে করোনাভাইরাসের লকডাউনের সময় মার্কিন ‘ফেডেরাল রিজার্ভ’ ব্যাপকহারে ডলার ছাপিয়েছে। এই ডলার ছাপাবার উদ্দেশ্য ছিল করোনার খারাপ অবস্থা থেকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং জনগণকে উদ্ধার করা এবং সরকারের বাজেটের ঘাটতি পূরণ করা। এর ফলে একদিকে যেমন ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়, তেমনি মুদ্রাস্ফীতি রোধে ‘ফেডেরাল রিজার্ভ’ সুদের হার বাড়াতে শুরু করে; যার ফলে সরকারি বন্ডের মূল্য পড়ে যায়। বাজারে প্রচুর ডলারের ছড়াছড়ির এই পরিস্থিতিতে কিছু ব্যাংক বেশ ভালো অবস্থানে চলে যায়; আর কিছু বেশ খারাপ পরিস্থিতিতে পড়ে। দেউলিয়া হওয়া ব্যাংকগুলি বিশেষ কিছু সেক্টরের উপর নির্ভরশীল ছিল, যেখানে সরকারি বন্ডের মূল্য পড়ে যাবার প্রভাবটা ছিল অনেক বেশি। 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন যে, মার্কিন ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিরাপদ; তিনি ব্যাংকিং ব্যবস্থার উপর জনগণের আস্থা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। তার সরকার বলছে যে, করদাতাদের অর্থে দেউলিয়া হওয়া ব্যাংকগুলিকে তারা বাঁচাবে না। কিন্তু মাল্টিমিলিয়ন ডলারের কর্পোরেট ডিপোজিটগুলিকে রক্ষা করে সরকার প্রকারান্তরে করদাতাদের অর্থ ব্যয় করে এই কোম্পানিগুলিকে বাঁচাচ্ছে।


ব্যাংক দেউলিয়া হলে মার্কিন সরকার কি সেটাকে বাঁচাবে?

প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকারের জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিলের সদস্য গ্যারি কোহন ‘সিএনএন’কে ব্যাখ্যা দিয়ে বলছেন যে, একটা ব্যাংক মানুষের কাছ থেকে ডিপোজিট আকারে যত অর্থ যোগাড় করে, তার বেশিরভাগটাই বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঋণ হিসেবে বিনিয়োগ করে এবং খুব স্বল্প পরিমাণ অর্থই নিজের কাছে রেখে দেয়। সাধারণতঃ একটা ব্যাংকের মোট ডিপোজিটের খুব কম অংশই একদিনে ব্যাংক থেকে বের হয়। কিন্তু যখন একটা ব্যাংক সাধারণ মানুষের আস্থা হারিয়ে ফেলে, তখন সকলেই একসাথে সেই ব্যাংক থেকে তাদের ডিপোজিট তুলে ফেলতে চায়। কিন্তু একটা ব্যাংক কখনোই এতটা ডিপোজিট ফেরত দেবার অবস্থায় থাকে না। তবে যুক্তরাষ্ট্রের আইনে দেউলিয়া হওয়া ব্যাংকে রাখা ডিপোজিটের আড়াই লক্ষ ডলার পর্যন্ত ইন্সুরেন্সের আওতায় থাকে। অর্থাৎ একজন ডিপোজিটর ব্যাংকে যত অর্থই রাখুন না কেন, আড়াই লক্ষ ডলার তিনি নিশ্চিতভাবে ফেরত পাবেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘ফেডেরাল ডিপোজিটরি ইন্সুরেন্স কর্পোরেশন’ বা ‘এফডিআইসি’ নামের সংস্থা এই ব্যাপারটা নিশ্চিত করে। ‘ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল’এর প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ‘এসভিবি’র মোট ১’শ ৫১ বিলিয়ন ডলারের ডিপোজিট ছিল, যা কিনা ‘এফডিআইসি’র ইন্সুরেন্সের বাইরে ছিল। অর্থাৎ এগুলি ছিল আড়াই লক্ষ ডলারের চাইতে বড় ডিপোজিট।

ট্রাম্প প্রশাসনের প্রাক্তন কর্মকর্তা নিকি হেলি বলছেন যে, মার্কিন করদাতারা একটা দেউলিয়া হওয়া ব্যাংকের দায় নেবে না। অর্থাৎ ‘এসভিবি’কে বাঁচাবার দায়িত্ব সরকারের নেয়া উচিৎ নয়। তবে গ্যারি কোহন বলছেন যে, ব্যাংকিং ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নীতিনির্ধারকেরা সকলেই জনগণকে ব্যাংকে অর্থ রাখার জন্যে আগ্রহী রাখতে চায়। কারণ ব্যাংকের মাধ্যমেই মার্কিন অর্থনীতিতে ডলার আবর্তিত হয়। তবে দেউলিয়া হওয়া ‘এসভিবি’র বেশিরভাগ ডিপোজিটই ইন্সুরেন্সের আওতায় পড়েনি। যারা এই ডিপোজিট রেখেছিল, এর একটা বড় অংশ ছিল বিভিন্ন কোম্পানির কর্মচারীদের বেতনের অর্থ। খেটে খাওয়া মানুষের বেতনের অর্থ এখানে রয়েছে বলেই এক্ষেত্রে সরকারের কিছু দায়বদ্ধতা রয়েছে। তবে একটা ব্যাংক যাতে সহজে দেউলিয়া না হয়, সেই লক্ষ্যে ব্যাংকের পুঁজি কত হতে হবে, তা নিয়ে মার্কিন নীতিনির্ধারকদের মাঝে যথেষ্ট বিরোধ রয়েছে।

গ্যারি কোহন বলছেন যে, ২০১৮ সালে ব্যাংকিং আইন পরিবর্তন করার সময়ে অনেকেই বলেছেন যে, ব্যাংকের পুঁজি অনেক বেশি বা নিয়মনীতি খুব বেশি কঠোর হওয়া উচিৎ নয়। তারা চাইছেন আরও বেশি সংখ্যক ছোট ছোট ব্যাংক গড়ে উঠুক। বেশি কঠোর নীতি থাকলে ব্যাংকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রিত হয়ে যাবে। আর ‘এসভিবি’ ব্যাংকের যথেষ্ট পুঁজি ছিল; এর পরেও তারা দেউলিয়া হয়েছে। এর সাথে ২০১৮ সালের আইন পরিবর্তনের কোন সম্পর্ক নেই। তবে জো বাইডেন প্রশাসনের কেউ কেউ দাবি করছেন যে, ২০১৮ সালে ‘ডড-ফ্র্যাঙ্ক এক্ট’এর আইনগুলিকে পরিবর্তন করার জন্যেই এমনটা ঘটেছে। প্রেসিডেন্ট বাইডেন বলেন যে, তিনি কংগ্রেসকে আনুরোধ করেছেন যাতে করে ব্যাংকিংএর আইনগুলিকে আরও কঠোর করে ফেলা হয়; এর ফলশ্রুতিতে ব্যাংক দেউলিয়া হবার সম্ভাবনা অনেক কমে আসবে।

‘এসভিবি’ এমন কিছু করেনি, যা কিনা মার্কিন ব্যাংকগুলি করছিলো না। অর্থাৎ ‘এসভিবি’র মতো আরও অনেক ব্যাংক রয়েছে, যারা একই সমস্যায় পতিত। ‘এসভিবি’র পতনের মাত্র দুই দিনের মাথায়, ১২ই মার্চ, ‘সিগনেচার ব্যাংক’ নামের আরেকটা ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যায়। এই ব্যাংকের দেউলিয়া হওয়া ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের তৃতীয় বৃহত্তম দেউলিয়া হবার ঘটনা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক চিন্তায় পড়ে যায় এবং সিদ্ধান্ত নেয় যে, দেউলিয়া হওয়া দু’টা ব্যাংকের সকল ডিপোজিটই ইন্সুরেন্সের অধীনে আসবে; অর্থাৎ যাদের একাউন্টে আড়াই লক্ষ ডলারের বেশি অর্থ ছিল, তারাও ইন্সুরেন্সের আওতায় পড়বে। তবে ১৩ই মার্চ মার্কিন সরকারের রাজস্ব সচিব জ্যানেট ইয়েলেন সরাসরিই বলেন যে, সরকার এই ব্যাংকগুলিকে বাঁচাবে না। তবে জ্যানেট ইয়েলেন যাই বলুন না কেন, বাইডেন প্রশাসন যখন আড়াই লক্ষ ডলারের সীমা অতিক্রম করে দেউলিয়া ব্যাংকের ডিপোজিট ফেরত দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তখন অনেকেই বলতে শুরু করেছেন যে, সরকার প্রকৃতপক্ষে সাধারণ করদাতাদের অর্থ ব্যয় করে এই ব্যাংকগুলি বা ব্যাংকের গ্রাহকদেরকে বাঁচাচ্ছে। এই গ্রাহকগুলির মাঝে সিলিকন ভ্যালির বিভিন্ন কোম্পানি ছিল, যারা মাল্টিমিলিয়ন ডলার ডিপোজিট রেখেছিল এই ব্যাংকগুলিতে। অর্থাৎ সরকার প্রকারান্তরে করদাতাদের অর্থ ব্যয় করে এই কোম্পানিগুলিকে বাঁচাচ্ছে।

কেউ কেউ বলছেন যে, প্রযুক্তি সেক্টরের ব্যাংক হবার কারণেই বাইডেন প্রশাসন ‘এসভিবি’কে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখেছে। ‘বিএনই ইন্টেলিনিউজ’এর সম্পাদক বেন আরিস ‘আল জাজিরা’কে বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যখন চীনের সাথে প্রযুক্তি যুদ্ধে মনোনিবেশ করছে, তখন হোয়াইট হাউজ চাইছে না যে, মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলি আর্থিক সমস্যায় পড়ে যাক। একারণেই সরকার এই সেক্টরের ডিপোজিট যাতে নষ্ট না হয়ে যায়, সেদিকে খেয়াল রেখেছে এবং ইন্সুরেন্সের সীমা ছাড়িয়ে ডিপোজিটগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে।

২০শে মার্চ বিশ্বের বৃহৎ ব্যাংকগুলির একটা, সুইজারল্যান্ডের ‘ক্রেডিট সুইস’ ব্যাংককে ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে জোরপূর্বক কিনে নেয় ‘ইউবিএস’ ব্যাংক। সুইজারল্যান্ডের সরকার বলছে যে, একটা অর্থনৈতিক দুর্যোগ এড়ানোর এটাই ছিল একমাত্র পথ। সকলেই এখন যা কিছু বলছেন, তার সাথে বলছেন যে, ‘তার বিশ্বাস’ এটা বা ওটা হবে। এর অর্থ হলো পুরো ব্যবস্থাটাই বিশ্বাসের সমস্যা পড়েছে। বিশ্বাস যেমন অর্জন করা সম্ভব, তেমনি খুব স্বল্প সময়ের মাঝে হারানোও সম্ভব।


মার্কিন এবং ইউরোপের ব্যাংকিং সেক্টরের উপর প্রভাব

যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাংক দেউলিয়া হবার প্রভাব সারা দুনিয়াতেই পড়েছে। অনেকেই এতে বিচলিত হয়েছেন; আর একারণেই রাজনীতিবিদেরা মানুষকে আস্বস্ত করতে চাইছেন। ফরাসি অর্থমন্ত্রী ব্রুনো লে মেয়ার পার্লামেন্টে বলেন যে, ফ্রান্স ২০০৮ সালের আর্থিক দুর্যোগ থেকে শিক্ষা নিয়েছে। ইউরোপের ব্যাংক এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা হয়েছে; বিশেষ করে ফরাসি ব্যাংকগুলির এখন যেধরনের রক্ষাব্যবস্থা রয়েছে, তা যথেষ্ট শক্তিশালী। তিনি শক্তভাবে বলেন যে, ফরাসি ব্যাংকের এপ্রকারের কোন ঝুঁকি নেই। কিন্তু রাজনীতিবিদদের কথায় সকলে আস্বস্ত নয়। জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট স্টক এক্সচেঞ্জের ‘বাডের ব্যাংক’এর পুঁজি বাজার বিশ্লেষণ প্রধান রবার্ট হালভার ‘আল জাজিরা’কে বলছেন যে, অনেকেই ভয় পাচ্ছেন যে, ২০০৮ সালের মতো কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলিকে আবারও হস্তক্ষেপ করতে হতে পারে; যাতে করে একটা ছোট্ট মাছি বড় হতে হতে হাতি না হয়ে যায়। সেবার ‘লিহমান ব্রাদার্স’এর দেউলিয়া হওয়াটা প্রায় পুরো আর্থিক বাজারকেই ধ্বসিয়ে দিয়েছিল। একারণেই বাজারে যথেষ্ট ভয় বিদ্যমান রয়েছে।

রাজনীতিবিদেরা যাই বলুক না কেন, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক দেউলিয়া হবার ঘটনা যে বিশ্বব্যাপী প্রভাব ফেলেছে, তা এখন পরিষ্কার। ২০শে মার্চ বিশ্বের বৃহৎ ব্যাংকগুলির একটা, সুইজারল্যান্ডের ‘ক্রেডিট সুইস’ ব্যাংককে ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে জোরপূর্বক কিনে নেয় ‘ইউবিএস’ ব্যাংক। ‘ইউবিএস’ হলো সুইজারল্যান্ডের সবচাইতে বড় ব্যাংক; আর ‘ক্রেডিট সুইস’ হলো দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যাংক। এই ঘটনায় আর্থিক বাজারের বিনিয়োগকারীরা ভয় পেয়ে গেলেও সরকার এবং নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলি বলছে যে, মূল উদ্দেশ্য হলো ডিপোজিটগুলিকে রক্ষা করা এবং পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে নিরাপদ রাখা। সুইজারল্যান্ডের সরকার বলছে যে, একটা অর্থনৈতিক দুর্যোগ এড়ানোর এটাই ছিল একমাত্র পথ। সুইজারল্যান্ডের অর্থমন্ত্রী ক্যারিন কেলার সাটার সংবাদ সন্মেলনে বলেন যে, শুধু সুইজারল্যান্ড নয়, বিশ্বব্যাপী আর্থিক সমস্যা এড়ানোর জন্যেই এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই কাজে ১’শ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেবে। আর এই একত্রীরণের ফলে ‘ইউবিএস’এর ক্ষতি বেশি হলে সরকার ৯ বিলিয়ন ডলারের ঋণের নিশ্চয়তা দেবে।

‘ডয়েচে ভেলে’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ২০০৮ সালে দেউলিয়া হওয়া মার্কিন ব্যাংক ‘লিহমান ব্রাদার্স’এর তুলনায় ‘ক্রেডিট সুইস’এর আকার দ্বিগুণ। শুধু তাই নয়, সুইজারল্যান্ডের এই ব্যাংকের আন্তর্জাতিক ব্যবসা অনেক বেশি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। সুইজারল্যান্ডের ব্যাংক ‘জে সাফরা সারাসিন’এর প্রধান অর্থনীতিবিদ কার্সটেন ইউনিস ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, সকলেই এখন যা কিছু বলছেন, তার সাথে বলছেন যে, ‘তার বিশ্বাস’ এটা বা ওটা হবে। এর অর্থ হলো পুরো ব্যবস্থাটাই বিশ্বাসের সমস্যা পড়েছে। বিশ্বাস যেমন অর্জন করা সম্ভব, তেমনি খুব স্বল্প সময়ের মাঝে হারানোও সম্ভব। সরকারের হস্তক্ষেপে আর্থিক বাজারে স্বস্তি ফিরবে বলে তিনি আশা করছেন এবং তারও বিশ্বাস মানুষের আস্থা ফিরে আসবে এবং সমস্যা বহুদূর পর্যন্ত গড়াবে না। কিন্তু এটা কখনোই শতভাগ নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় যে, এটা হবেই।

মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডেরাল রিজার্ভ’ ব্যাপকহারে ডলার ছাপিয়ে মুদ্রাস্ফীতি তৈরি করেছে; আবার মুদ্রাস্ফীতি কমাতে সুদের হার বাড়াতে মনোনিবেশ করেছে; যা কিনা ব্যাংকিং সেক্টরকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এটা এখন পরিষ্কার যে, মার্কিন, তথা পশ্চিমা অর্থ ব্যবস্থা চলছে ‘ট্রায়াল এন্ড এরর’ বা জোড়াতালি দিয়ে। পরিস্থিতি এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে, পুরো আর্থিক ব্যবস্থার উপর থেকে জনগণের আস্থা উঠে যাচ্ছে। কারণ সরকারি বন্ড বা ব্যাংকে ডিপোজিট রাখাও এখন অনিরাপদ ঠেকছে। সাধারণ জনগণের এই ভীতি ছোট্ট একটা সমস্যাকে পুরো আর্থিক ব্যবস্থা ধ্বসে রূপ দিতে পারে।


মার্কিন সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন কি করবে?

বেন আরিস বলছেন যে, মুদ্রাস্ফীতি কমাতে গিয়ে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন সুদের হার বাড়াতে থাকলো, তখন তারা চিন্তা করেনি যে, এর প্রভাব ব্যাংকিং সেক্টরের উপর কিভাবে পড়বে। ‘ফেডেরাল রিজার্ভ’ এখন দোটানায় পড়েছে যে, তারা কি সুদের হার কমিয়ে ব্যাংকিং সেক্টরকে বাঁচাবে, নাকি মুদ্রাস্ফীতি কমাতে সুদের হার বাড়াতেই থাকবে? এই পরিস্থিতিটা তাদের জন্যে সত্যিই মারাত্মক। কারণ ব্যাংকিং সেক্টরে বিপর্জয় মুদ্রাস্ফীতির চাইতে আরও মারাত্মক সমস্যা ডেকে আনতে পারে। একইসাথে সুদের হার বাড়াতে থাকলে বাজারে একটা আলোচনা তৈরি হয় যে, সুদের হার বুঝি বাড়তেই থাকবে। সেই হিসেবে বাকি সকলকিছুও পরিবর্তিত হতে থাকে। শেষপর্যন্ত দেখা যায় যে, মুদ্রাস্ফীতিও খুব একটা কমে না।

অর্থনীতিবিদ নুরিয়েল রুবিনি ‘ব্লুমবার্গ’কে বলছেন যে, ‘ফেডেরাল রিজার্ভ’এর সামনে সুদের হার বাড়ানো ছাড়া কিছু করার নেই। কিন্তু সমস্যা হলো, পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় এখন বিপুল পরিমাণ ঋণ; ব্যক্তিগত ঋণ, গৃহ ঋণ, কর্পোরেট ঋণ, ব্যাংকের ঋণ, অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ, সরকারি ঋণ। একারণেই যদি পরিস্থিতি কঠিন হয়, তবে সেটা অনেক বেশি কঠিনই হবে; এবং সেটা হবে দীর্ঘমেয়াদী। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার বাড়ার সাথেসাথে সরকারি বন্ডের মূল্য প্রায় ২০ শতাংশ পড়ে গেছে। এর ফলে শুধুমাত্র মার্কিন ব্যাংকগুলিকেই ৬’শ ২০ বিলিয়ন ডলারের লোকসান গুণতে হবে। এই ব্যাংকগুলির পুঁজি প্রায় ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার, বা ২২’শ বিলিয়ন ডলার। কাজেই এই লোকসান তাদের পুঁজির প্রায় ২৮ শতাংশকে নিঃশেষ করে ফেলবে; যা এখনও বাস্তবে রূপ নেয়নি। অনেক ছোট ব্যাংকের পুঁজির প্রায় অর্ধেকই ঝুঁকির মাঝে রয়েছে। এছাড়াও পুরো অর্থ ব্যবস্থায় ২০ ট্রিলিয়ন ডলারের দীর্ঘমেয়াদী বন্ড রয়েছে; যেগুলি ডলারের সাথে সম্পর্কিত। ‘ফেডেরাল রিজার্ভ’এর সুদের হার বাড়ানোর কারণে এই সবগুলিই মূল্য পড়ে যাবার ঝুঁকিতে রয়েছে। অর্থাৎ এর ফলস্বরূপ শুধুমাত্র মার্কিন অর্থনীতিতেই ৩ থেকে ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের লোকসান গুণতে হবে। এগুলির অনেক লোকসানই এখনও বাস্তবে রূপ নেয়নি। এতকাল মানুষ মনে করতো যে, সরকারি বন্ড একটা নিরাপদ বিনিয়োগ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সকলেই বুঝতে পারছে যে, সরকারি বন্ড নিরাপদ নয়। কারণ যদিও এটার মূল্য ফেরত না পাবার সম্ভাবনা নেই, তথাপি বাজারে এর মূল্য বেশ দ্রুতই কমে যেতে পারে; যা থেকে বাঁচা যাচ্ছে না। গত এক বছরের মাঝে ১০ বছর মেয়াদী বন্ডের মূল্যে ২০ শতাংশ পড়ে গেছে। কাজেই যারা রিটায়ার করার পর তাদের পেনশনের অর্থ বন্ডে বিনিয়োগ করেছে, তাদেরকে এখন ভিন্ন পথ দেখতে হবে।

এটা এখন পরিষ্কার যে, মার্কিন, তথা পশ্চিমা অর্থ ব্যবস্থা চলছে ‘ট্রায়াল এন্ড এরর’ বা জোড়াতালি দিয়ে। সকল বিশ্লেষকেরাই বলছেন যে, মার্কিন অর্থনীতি ব্যাংকিং ব্যবস্থার উপরে পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল। যেকারণেই এই সেক্টরের ব্যাপারে সকলেই সংবেদনশীল। কিন্তু এই সেক্টরের নীতি নিয়ে মার্কিন রাজনীতিবিদদের মাঝে মেরুকরণ চলছে; যা আরও বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক মেরুকরণের একটা অংশ। পরিস্থিতি এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে, পুরো আর্থিক ব্যবস্থার উপর থেকে জনগণের আস্থা উঠে যাচ্ছে। কারণ সরকারি বন্ড বা ব্যাংকে ডিপোজিট রাখাও এখন অনিরাপদ ঠেকছে। সাধারণ জনগণের এই ভীতি ছোট্ট একটা সমস্যাকে পুরো আর্থিক ব্যবস্থা ধ্বসে রূপ দিতে পারে। রিচার্ড স্কুয়ির বেশ পরিষ্কারভাবেই বলেছেন যে, করোনাভাইরাসের সময় ব্যাপকভাবে ডলার ছাপানোটাই শেষ পর্যন্ত ব্যাপক মূদ্রাস্ফীতির জন্ম দিয়েছে। আর মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডেরাল রিজার্ভ’ মুদ্রাস্ফীতি ঠেকাতে আর কোন পদ্ধতি না পেয়ে সুদের হার বাড়াতে মনোনিবেশ করেছে; যা কিনা ব্যাংকিং সেক্টরকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বেন আরিস বলছেন যে, ব্যাংকিং সেক্টরে বিপর্যয় মুদ্রাস্ফীতির চাইতে আরও মারাত্মক সমস্যা ডেকে আনতে পারে। অপরদিকে নুরিয়েল রুবিনি বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের ছোট একটা ব্যাংক দেউলিয়া হলে একইরকম আরও বেশকিছু ব্যাংক দেউলিয়া হতে শুরু করবে; যা পুরো আর্থিক ব্যবস্থাকে ধ্বসিয়ে ফেলবে এবং অর্থনীতিকে মন্দার মাঝে পতিত করবে। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির মাঝে এই মন্দা পুরো অর্থনীতিকে একটা ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ফেলবে। পরিস্থিতি এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে, একটা শক্ত ধাক্কা খাওয়া থেকে বাঁচা আর সম্ভব নয়।

Saturday, 19 November 2022

যুক্তরাষ্ট্র কি ইউক্রেন যুদ্ধের ব্যাপারে তার নীতির পরিবর্তন করতে যাচ্ছে?

১৯শে নভেম্বর ২০২২

ইন্দোনেশিয়ার বালিতে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। ইউক্রেনের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র যে চীনের সাথে একটা সমঝোতায় পোঁছার চেষ্টায় রয়েছে, তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। বাইডেন বলেন যে, ইউক্রেনে রুশ পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকির ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন একমত হয়েছে; এবং দুই দেশ এব্যাপারে যোগাযোগ রেখে চলবে। তার কথাগুলি যুদ্ধের কারণে ব্যাপক মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক মন্দার ব্যাপারে মার্কিন জনগণের মতামতকেই প্রতিফলিত করছে। তদুপরি মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর কংগ্রেসে বিরোধী রিপাবলিকান শিবিরের শক্তিশালী অবস্থান হোয়াইট হাউজকে চাপে রাখবে।

 গত ১৭ই নভেম্বর মার্কিন সর্বোচ্চ সামরিক কর্মকর্তা জয়েন্ট চীফ অব স্টাফএর চেয়ারম্যান জেনারেল মার্ক মিলি সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে বলেন যে, ইউক্রেন এই মুহুর্তে যুদ্ধক্ষেত্রে শক্তিশালী অবস্থানে আছে। আর এই অবস্থাতেই তারা যদি আলোচনার টেবিলে বসে, তাহলে রুশরা হয়তো কোন একটা রাজনৈতিক সমাধানের দিকে এগুতেও পারে। জেনারেল মিলির কথাগুলি ওয়াশিংটনের ইউক্রেন নীতিতে নতুন সুর যোগ করেছে বলে মনে করছেন অনেকেই।

জেনারেল মিলি বলেন যে, রুশরা প্রায় ১ লক্ষ ৭০ হাজারেরও বেশি সেনা নিয়ে ইউক্রেন হামলা করে বহু হতাহতের শিকার হয়েছে। কিন্তু তারপরেও যে বাহিনী তারা ইউক্রেনে রেখেছে, তা বেশ শক্তিশালী। আর এর সাথে নতুন করে মোবিলাইজ করা সেনারা যুক্ত হচ্ছে। ইউক্রেনিয়রা রুশদের আক্রমণ সফলভাবে ঠেকাতে পেরেছে; এবং এরপর তারা আক্রমণে গিয়ে খারকিভ এবং খেরসনের বেশকিছু এলাকা পুনরুদ্ধার করেছে। তবে এই পুনরুদ্ধার করা ভূমি রুশদের দখলীকৃত ভূমির খুব বড় কোন অংশ নয়। রুশদেরকে সামরিকভাবে ইউক্রেনের দখলীকৃত ভূমি থেকে উৎখাত করাটা অত্যন্ত কঠিন একটা কাজ। কাজেই ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর ক্রিমিয়া সহ ইউক্রেনের পুরো ভূমি থেকে রুশদেরকে বিতাড়িত করতে পারার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে রাজনৈতিকভাবে রাশিয়ার ইউক্রেন ছেড়ে যাবার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। এখন পর্যন্ত রুশ সামরিক বাহিনী যতটা ক্ষয়ক্ষতির সন্মুখীন হয়েছে, তাতে তারা আলোচনার মাধ্যমে একটা রাজনৈতিক সমাধানের দিকে এগুলে অবাক হবার কিছু থাকবে না।

‘সিএনএন’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, এক সপ্তাহ আগেও জেনারেল মিলি বলেছেন যে, শান্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেলে ইউক্রেনিয়দের তা হাতছাড়া করা উচিৎ হবে না। অপদিকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেইক সুলিভান বলছেন যে, ওয়াশিংটন ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেয়া অব্যাহত রাখবে। শান্তিচুক্তির জন্যে টেবিলে বসা হবে কিনা, সেটা ইউক্রেনের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। যুক্তরাষ্ট্র এক্ষেত্রে কোন প্রভাব রাখবে না। জেনারেল মিলি এবং জেইক সুলিভানের এহেন ধোঁয়াশা বক্তব্যে ইউক্রেনে অনেকেই প্রশ্ন করতে শুরু করেছে যে, তারা কার কথা শুনবে?

প্রায় একই সময়ে ঘটে যাওয়া আরেকটা ঘটনা দেখিয়ে দেয় যে, ওয়াশিংটন প্রকৃতপক্ষে ইউক্রেনের যুদ্ধকে আরও বড় কোন যুদ্ধের দিকে নিতে ইচ্ছুক নয়। মার্কিন ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলে যে, ইউক্রেনের আকাশ থেকে একটা ক্ষেপণাস্ত্র এসে ইউক্রেনের প্রতিবেশী ন্যাটো দেশ পোল্যান্ডে আছড়ে পড়েছে এবং সেখানে দুই ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। ‘সিএনএন’ বলছে যে, এই খবরটা মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কাছে পৌঁছায় যখন তিনি ‘জি-২০’ শীর্ষ বৈঠকের জন্যে ইন্দোনেশিয়ার বালিতে অবস্থান করছিলেন। খবরটা দিতে ভোর রাতে প্রেসিডেন্টকে ডেকে তোলা হয় এবং তিনি তার কর্মকর্তাদের ছাড়াও পোলিশ প্রেসিডেন্ট এবং ইউক্রেনের নেতৃত্বের সাথে কথা বলে তাদেরকে শান্ত থাকার জন্যে উপদেশ দেন।

‘ডিফেন্স নিউজ’এর এক খবরে বলা হচ্ছে যে, ন্যাটো সদস্য দেশ হিসেবে পোল্যান্ডের উপরে ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়ার এই ঘটনা যদি রুশদের হামলা হিসেবে প্রমাণ হয়, তাহলে প্রশ্ন আসবে যে, জোটের ‘আর্টিকেল-৫’ অনুসারে ন্যাটোভুক্ত বাকি দেশগুলি পোল্যান্ডকে সামরিক সহায়তা দিতে এগিয়ে আসবে কিনা। এই আর্টিকেল অনুসারে জোটের একটা দেশের উপরে হামলা হলে বাকিরাও তাদের উপরে হামলা হয়েছে বলে ধরে নেবে। তবে ঘটনার ২৪ ঘন্টার মাঝেই ন্যাটো সেক্রেটারি জেনারেল জ্যান্স স্টলটেনবার্গ সাংবাদিকদের বলেন যে, ক্ষেপণাস্ত্রটা খুব সম্ভবতঃ ইউক্রেনিয় বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ছিল, যা রুশ ক্ষেপণাস্ত্রকে ঘায়েল করতে গিয়ে টার্গেট মিস করে পোল্যান্ডে আছড়ে পড়ে। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের পক্ষ থেকেও বলা হয় যে, পোল্যান্ডের উপরে রুশ সামরিক হামলার কোন প্রমাণ মেলেনি।

ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর মিডিয়া ‘ফোর্সেস নিউজ’এর সাথে এক সাক্ষাতে ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স সংস্থা ‘বেলিংক্যাট’এর লেখক ব্রিটিশ সাংবাদিক এলিয়ট হিগিন্স বলছেন যে, ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ দেখে যে ব্যাপারটা নিশ্চিত হওয়া গেছে তা হলো, এটা ‘এস-৩০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র, যা এই মুহুর্তে ইউক্রেন এবং রাশিয়া উভয়েই ব্যবহার করছে। তবে প্রমাণাদি দেখে মনে হচ্ছে যে, মিডিয়াতে প্রচারিত খবরটা সত্য নয়। অর্থাৎ এই ক্ষেপণাস্ত্র রাশিয়া ছোঁড়েনি। লন্ডনের ‘কিংস কলেজ’এর প্রফেসর মাইকেল ক্লার্ক বলেন যে, পোল্যান্ডের ঘটনাটা ঘটার সাথেসাথেই ইউক্রেন ঘোষণা দেয় যে, ক্ষেপণাস্ত্রটা রুশরা ছুঁড়েছে। কিন্তু বাকি সকলেই বলে যে, তদন্ত সম্পূর্ণ হওয়ার আগ পর্যন্ত কিছু বলা যাচ্ছে না। ইউক্রেনের চারিদিকে ন্যাটোর গোয়েন্দা বিমানগুলি দিনরাত উড়ছে। কাজেই ইউক্রেনের আকাশে কতগুলি ক্ষেপণাস্ত্র উড়ছে, তা ন্যাটোর অজানা থাকার কথা নয়।

পোল্যান্ডের ঘটনাটা দেখিয়ে দেয় যে, যুক্তরাষ্ট্র, তথা পশ্চিমা দেশগুলি রাশিয়ার সাথে সরাসরি সংঘর্ষে জড়াতে মোটেই আগ্রহী নয়। পশ্চিমাদের সামরিক সক্ষমতাও প্রশ্নাতীত নয়। ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রতিরক্ষা শিল্পের কাছ থেকে সময়মতো খুচরা যন্ত্রাংশ পাচ্ছে না। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে অস্ত্রের অর্ডার বেড়েছে। কিন্তু সরবরাহ ২০২৪এর মাঝেও সমস্যায় থাকবে। অপরদিকে জেইক সুলিভান ইউক্রেনকে সহায়তা দেয়া অব্যাহত রাখার কথা বললেও ইউক্রেনের শান্তি আলোচনায় যাবার ব্যাপারে জেনারেল মিলির বক্তব্যকে বাতিল করেননি। প্রকৃতপক্ষে তিনি শান্তি আলোচনার ব্যাপারটা একপ্রকার এড়িয়েই গেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইউক্রেন এই মুহুর্তে পশ্চিমা, বিশেষ করে মার্কিন সামরিক সহায়তার উপরে পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল। অর্থাৎ ইউক্রেনের যুদ্ধ চালিয়ে নিতে পারার সক্ষমতা পশ্চিমা সহায়তার উপরেই নির্ভর করবে। ইউক্রেনের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র যে চীনের সাথে একটা সমঝোতায় পোঁছার চেষ্টায় রয়েছে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় ‘জি-২০’ বৈঠক থেকে। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংএর সাথে বৈঠকের পর প্রেসিডেন্ট বাইডেন সাংবাদিকদের বলেন যে, ইউক্রেনে রুশ পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকির ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন একমত হয়েছে; এবং দুই দেশ এব্যাপারে যোগাযোগ রেখে চলবে। একইসাথে তিনি বলেন যে, তিনি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেইক সুলিভানকে আলোচনা এগিয়ে নিতে বেইজিং যেতে বলেছেন। বাইডেনের কথাগুলি যুদ্ধের কারণে ব্যাপক মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক মন্দার ব্যাপারে মার্কিন জনগণের মতামতকেই প্রতিফলিত করছে। তদুপরি মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর কংগ্রেসে বিরোধী রিপাবলিকান শিবিরের শক্তিশালী অবস্থান হোয়াইট হাউজকে চাপে রাখবে।

Wednesday, 12 October 2022

‘ওপেক প্লাস’এর তেলের উৎপাদন কর্তনের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব

১২ই অক্টোবর ২০২২
 
বারাক ওবামার প্রশাসনের সময় থেকে ইরানের সাথে পারমাণবিক চুক্তি করা এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্তে সৌদি আরব নিরাপত্তাহীনতায় পড়েছে। ওয়াশিংটনের স্বার্থকে উপেক্ষা করেই ‘ওপেক প্লাস’এর তেলের উৎপাদন কর্তন এই ভূরাজনৈতিক ধারাবাহিকতারই অংশ। তবে এটা আবারও প্রমাণ করে যে, মার্কিন নিয়ন্ত্রিত পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থা এখন কতটা দুর্বল হয়ে গেছে।

গত ১১ই অক্টোবর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ‘সিএনএন’এর সাথে এক সাক্ষাতে বলেন যে, রাশিয়ার সাথে আঁতাত করে জ্বালানি তেলের উৎপাদন কমিয়ে দিয়ে মূল্য বৃদ্ধি করার জন্যে সৌদি আরবকে মূল্য দিতে হবে। সৌদি আরবের সাথে সম্পর্ককে নিয়ে নতুন করে ভাববার সময় এসেছে। জ্বালানি বিষয়ক পত্রিকা ‘অয়েল প্রাইস’এর এক প্রতিবেদনে মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, ৫ই অক্টোবর জ্বালানি তেল রপ্তানিকারক দেশগুলির জোট ‘ওপেক’ এবং তার সাথে রাশিয়া মিলে তেলের উৎপাদন দৈনিক ২০ লক্ষ ব্যারেল কমাবার সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২০ সালের মে মাসে করোনা মহামারির লকডাউনের কারণে ৯৭ লক্ষ ব্যারেল উৎপাদন কর্তনের পর থেকে এটা ছিল সর্বোচ্চ কর্তন। বাজারের সকলে ১০ লক্ষ ব্যারেল কমানো আশা করলেও এর দ্বিগুণ কমাবার সিদ্ধান্ত এসেছে। ‘ওপেক’ এবং রাশিয়া মিলে এই জোট ‘ওপেক প্লাস’ নামে পরিচিত। যদিও রাশিয়া এবং ‘ওপেক’ উভয়েই বলছে যে, ‘টেকনিক্যাল’ কারণে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, ওয়াশিংটন মনে করছে যে, এই সিদ্ধান্তটা পুরোপুরিভাবে রাজনৈতিক। মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব এন্টনি ব্লিনকেন রাশিয়ার সাথে একাত্মতা প্রকাশের জন্যে সৌদি আরবের সমালোচনা করেছেন এবং তেলের উৎপাদন বৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে অদূরদর্শীতা বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন যে, সৌদিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তারা কংগ্রেসের সাথে কথা বলছেন।

মার্কিন সিনেটের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির প্রধান বব মেনেনডেজ ১০ই অক্টোবর এক বিবৃতিতে সৌদি আরবের সাথে সকল সহযোগিতা বন্ধ করা সহ দেশটাতে অস্ত্র বিক্রি বন্ধেরও আহ্বান জানান। তবে প্রেসিডেন্ট বাইডেন নির্দিষ্ট করে বলতে রাজি হননি যে, তিনি সৌদি আরবের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেবেন। বাইডেন বলেন যে, কয়েক মাস আগে তিনি যখন সৌদি আরব ঘুরে এসেছেন, তখন তার সফরের উদ্দেশ্য ছিল না সৌদি আরবকে তেল উৎপাদন বৃদ্ধিতে রাজি করানো। বরং তিনি সেখানে গিয়েছিলেন সকলকে নিশ্চয়তা দেয়ার জন্যে যে, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে যাচ্ছে না।

৬ই অক্টোবর মার্কিন কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাটদের নেতা চাক শুমার বলেন যে, কংগ্রেস সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সকল রকমের আইনী ব্যবস্থা নিয়েই ভাবছে; যার মাঝে ‘নোপেক’ বিলও রয়েছে। ‘নোপেক’ হলো একটা আইনের খসরা, যার মাধ্যমে তেলের বাজারে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ‘অপরাধে’ ‘ওপেক’ সদস্য দেশগুলির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া যাবে। এহেন ব্যবস্থা নেয়া হলে সৌদি রাজপরিবারের নিয়ন্ত্রণে থাকা তেল কোম্পানি ‘আরামকো’র শেয়ার কেনাবেচা বাতিল হয়ে যেতে পারে। এতে এই কোম্পানির শেয়ারের মূল্য রাতারাতি শূণ্যের কোঠায় চলে আসবে।

সৌদি আরবের নেতৃত্বে ‘ওপেক’ কেন তেলের উৎপাদন কমালো, তার ব্যাখ্য দিয়েছেন সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রী প্রিন্স আব্দুলআজিজ বিন সালমান। তিনি ‘সৌদি টিভি’র সাথে এক সাক্ষাতে বলেন যে, তার দেশ সর্বপ্রথমে তার নিজের স্বার্থের কথা চিন্তা করবে। পশ্চিমা দেশগুলির কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলি মূদ্রাস্ফীতি রোধে সুদের হার বাড়িয়েই যাচ্ছে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী মন্দার সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে জ্বালানির চাহিদা অনেক কমে যাবে এবং তেলের বাজারে ব্যাপক দরপতন হবে।

 
‘ওপেক’ দেশগুলির অর্থনীতি তেল বিক্রির উপরে পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল। তেলের দরপতন এই দেশগুলির অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। সৌদি আরব তাদের সরকারের বাজেট ঠিক করে তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৭৯ ডলার হিসেবে। এর নিচে মূল্য পড়ে গেলে বাজেটে ঘাটতি তৈরি হবে। সাত মাস আগে ১’শ ৩৯ ডলারে মূল্য উঠে গেলেও গতমাসেই সেটা ৮৫ ডলারে নেমে গিয়েছিল; যা কিনা ‘ওপেক’ দেশগুলির জন্যে একটা সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করেছে।

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘দ্যা আটলান্টিক কাউন্সিল’এর সিনিয়র ফেলো এলেন ওয়াল্ড ‘সিএনএন’কে বলছেন যে, মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডারেল রিজার্ভ’এর সুদের হার বৃদ্ধির সাথে সমন্বয় করেই ‘ওপেক’ হয়তো তেলের উৎপাদন কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে; যাতে চাহিদা পড়ে গেলে হঠাৎ করে উৎপাদন কমাতে না হয়। ‘ওপেক’ দেশগুলির অর্থনীতি তেল বিক্রির উপরে পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল। তেলের দরপতন এই দেশগুলির অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। ২০০৮ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ‘ওপেক’ দেশগুলি মারাত্মক সমস্যায় পড়েছিল। সৌদি আরব তাদের সরকারের বাজেট ঠিক করে তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৭৯ ডলার হিসেবে। এর নিচে মূল্য পড়ে গেলে বাজেটে ঘাটতি তৈরি হবে। সাত মাস আগে ১’শ ৩৯ ডলারে মূল্য উঠে গেলেও গতমাসেই সেটা ৮৫ ডলারে নেমে গিয়েছিল; যা কিনা ‘ওপেক’ দেশগুলির জন্যে একটা সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করেছে।

বাজার বিশ্লেষক সায়মন ওয়াটকিন্স ‘অয়েল প্রাইস’এর এক লেখায় বলছেন যে, মার্কিন অনুরোধ সত্ত্বেও সৌদিরা তেলের উৎপাদন যে কমাবে, সেটা জানাই ছিল। কারণ বেশ অনেকদিন ধরেই রাশিয়ার সাথে তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে সৌদিরা তৎপর রয়েছে এবং চীনও এখন সৌদি তেলের সবচাইতে বড় ক্রেতা। তেলের উৎপাদন কমানো হলে এর তিনটা ফলাফল হবে। প্রথমতঃ ব্যাপক মূল্যস্ফীতি আরও বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলি সুদের হার বাড়াতে থাকবে। দ্বিতীয়তঃ রাশিয়ার এতে রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে; যা তারা ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহার করবে। এবং তৃতীয়তঃ আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে বাইডেনের ডেমোক্র্যাট দল খারাপ ফলফল করবে। এতে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা কমে যাবে। ঐতিহাসিকভাবেই ব্যারেল প্রতি ১০ ডলার মূল্যবৃদ্ধির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যালনপ্রতি জ্বালানি তেলের মূল্য ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির মূল্য গ্যালনপ্রতি ১ সেন্ট বৃদ্ধি পাবার অর্থ হলো কনজিউমারদের পকেট থেকে এক বছরে ১ বিলিয়ন ডলারের খরচ করার সক্ষমতা কমে যাওয়া। আবার ঐতিহাসিকভাবেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দুই বছরের মাঝে অর্থনীতি যদি মন্দায় পতিত হয়, তাহলে প্রেসিডেন্টের পুনরায় নির্বাচিত হবার সম্ভাবনা প্রায় নিঃশেষ হয়ে যায়। এবছরের প্রথম ছয় মাসে মার্কিন অর্থনীতি ক্রমান্বয়ে ছোট হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে সৌদি আরব বহুকাল ধরেই তেলের মূল্যকে নিয়ন্ত্রণ করেছে; যা ওয়াশিংটনের স্বার্থকেই রক্ষা করেছে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য এবং দেশগুলির নেতৃত্বকে নিরাপত্তা দিয়েছে। কিন্তু বারাক ওবামার প্রশাসনের সময় থেকে ইরানের সাথে পারমাণবিক চুক্তি করা এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্তে সৌদি আরব নিরাপত্তাহীনতায় পড়েছে। বিশেষ করে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের আক্রমণ থেকে সৌদি আরবের তেলের স্থাপনাগুলিকে রক্ষার জন্যে যুক্তরাষ্ট্র কোন নিরাপত্তার ব্যবস্থা না করায় সৌদিদের সাথে ওয়াশিংটনের এতকালের সখ্যতায় ভাটা পড়েছে। একই সূত্রে মানবাধিকার বিষয়ে ওয়াশিংটন থেকে সৌদিদের উপরে চাপও বৃদ্ধি পেয়েছে। ওয়াশিংটনের স্বার্থকে উপেক্ষা করেই ‘ওপেক প্লাস’এর তেলের উৎপাদন কর্তন এই ভূরাজনৈতিক ধারাবাহিকতারই অংশ। তবে এটা আবারও প্রমাণ করে যে, মার্কিন নিয়ন্ত্রিত পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থা এখন কতটা দুর্বল হয়ে গেছে।

Saturday, 1 October 2022

অর্থনৈতিক দৈন্যতা জার্মানদেরকে ইউক্রেনের শরণার্থীদের ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করাচ্ছে

০২রা অক্টোবর ২০২২
 
২০১৬ সাল। জার্মানিতে ডানপন্থীদের মুসলিম শরণার্থী বিরোধী বিক্ষোভ। ইউরোপে মুসলিম এবং ইউক্রেনিয় খ্রিস্টান শরণার্থীদের ব্যাপারে জনমতে ব্যাপক পার্থক্য থাকলেও জ্বালানির ব্যাপক মূল্যস্ফীতির মাঝে এখন যেকোন শরণার্থীই বোঝা হয়ে যাচ্ছে। এমনকি মধ্যপন্থায় থাকা রাজনীতিবিদেরাও শরণার্থীদের আটকাতে বলছেন।

গত ২৭শে সেপ্টেম্বর জার্মান ‘ফেডেরাল স্ট্যাটিসটিক্যাল অফিস’ বলে যে, জার্মানির জনসংখ্যা ২০২২ সালে রেকর্ড সংখ্যক বেড়েছে। এর কারণ ছিল ইউক্রেন থেকে শরণার্থীর ঢল। বর্তমানে দেশটার জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ কোটি ৪০ লক্ষের বেশি। শরণার্থীদের কারণে জার্মানির জনসংখ্যা ২০২২ সালের প্রথম ছয় মাসে ৮ লক্ষ ৪৩ হাজার বা ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২১ সালের পুরো বছরে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল মাত্র ৮২ হাজার। যুদ্ধের আগে সরকারি হিসেবে জার্মানিতে ইউক্রেনিয়দের সংখ্যা ছিল প্রায় দেড় লক্ষ। যুদ্ধ শুরুর পর প্রায় ৯ লক্ষ ৭১ হাজার নতুন শরণার্থীকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, এর আগে ১৯৯২ সালে সাবেক যুগোশ্লাভিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় শরণার্থীদের চাপে জার্মানির জনসংখ্যা ৭ লক্ষ বৃদ্ধি পেয়েছিল। আবার ২০১৫ সালে সিরিয় শরণার্থীর ঢলে দেশটার জনসংখ্যা আরও প্রায় ১০ লক্ষ বৃদ্ধি পায়। আর ইউক্রেন যুদ্ধের মাঝে ইউক্রেন সরকার বেশিরভাগ পুরুষ মানুষকে দেশ ছাড়তে অনুমতি না দেয়ায় জার্মানিতে বেশিরভাগ ইউক্রেনিয় শরণার্থীই হলো নারী ও শিশু। তবে শরণার্থীদের ঢল আসার আগেই জার্মানি শুধু ইউরোপের সবচাইতে ধনীর দেশই ছিল না; সেখানে জন্মহার ছিল অত্যধিক কম এবং অল্প বয়সের মানুষের সংখ্যাও ছিল অপেক্ষাকৃত অনেক কম। তাই জার্মানির অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যে কর্মঠ অপেক্ষাকৃত অল্প বয়সের মানুষের চাহিদা তৈরি হয়েছিল।

জার্মানিতে শরণার্থীদের নিয়ে সমস্যা বাড়ছে

জার্মানির পশ্চিমের আখেন শহরের ২০ কিঃমিঃ দূরে ছোট একটা এলাকার চিত্র তুলে ধরে ‘ডয়েচে ভেলে’। ৫০ হাজার জনসংখ্যার এই ছোট্ট শহরে প্রতি বছর ৫০ থেকে ৬০ জন করে শরণার্থী গ্রহণ করা হয়। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কয়েক মাসের মাঝেই সেখানে ৫’শ ৩০ জন শরণার্থী হাজির হয়েছে। এর বাইরেও আরও ২০টা দেশের ৮’শ ৫০ জন শরণার্থীকে সেখানে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। শহরের খেলাধূলার জিমনেসিয়াম এবং হল রুমে পার্টিশনের ব্যবস্থা করে শরণার্থীদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। একসময় অনেকেই নিজেদের বাড়িতে শরণার্থীদের থাকতে দিলেও এখন কেউ অগ্রগামী হচ্ছে না। কারণ জ্বালানির মূল্য এতটাই বেড়ে গেছে যে, তারা মনে করছে যে, শরণার্থীদের নিলে তাদের দৈনন্দিন খরচ সক্ষমতার বাইরে চলে যাবে। শরণার্থীদের মাঝে কেউ কেউ কাজ যোগাড় করতে পারলেও অনেকেই এখনও পারেনি। সাহায্যকারীরা খুবই ব্যস্ত সময় পার করছে। তারা শরণার্থীদের জন্যে ফর্ম পূরণের কাজ ছাড়াও তাদের জন্যে ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা করছে; তাদের থাকার জন্যে জায়গা খুঁজে দিচ্ছে; এমনকি তাদের সন্তানদের দেখাশুনা এবং তাদেরকে রান্না করার শিক্ষাও দিচ্ছে।

আখেন শহরের মেয়রও ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন যে, তার শহরে এখন আর কোন শরণার্থী রাখার ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। সেখানে ৪ হাজার ইউক্রেনিয় শরণার্থী রাখার পর সকল যায়গা ফুরিয়ে গেছে; যার মাঝে ৮টা জিমনেসিয়াম হলও রয়েছে। আখেন শহরে যুদ্ধের আগেই ইউক্রেনিয়দের একটা বড়সড় গ্রুপ বসবাস করতো; এরা অনেকেই শরণার্থীদেরকে তাদের বাড়িতে থাকতে দিয়েছে। ২০১৬ সালে সিরিয়া এবং আফ্রিকা থেকে আসা ১’শ ২০ জন শরণার্থীর জন্যে শহরের খেলার মাঠে অস্থায়ী বাড়ি তৈরি করা হয়। এই বাড়িগুলি পুরোনো হলেও সেখানে একান্তভাবে বসবাসের সুযোগ থাকায় সকলেই তেমন বাড়ি চায়। শহরের খালি বাণিজ্যিক জায়গাগুলিকে ব্যবহার করে শরণার্থীদেরকে জিমনেসিয়াম থেকে সরিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। কারণ সকলেই এখন বুঝতে পারছে যে, যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হবে। শরণার্থীদের সন্তানদের জন্যে শিক্ষা এবং অন্যান্য সেবার ব্যবস্থাও করতে হবে। কিন্তু এই সেবা পেতে এখন শরণার্থীরা সাধারণ জার্মান নাগরিকদের সাথে প্রতিযোগিতা করছে। ভিন্ন ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর জন্যে আলাদা বাসস্থানের ব্যবস্থা করা ছাড়া কোন গতি নেই; নাহলে শান্তিশৃংখলা ব্যাহত হতে পারে। সাহায্যকারীরা বলছেন যে, বেশিরভাগ বাড়িওয়ালাই শরণার্থীদের কাছে বাড়ি দেয়ার কথা শুনলে ফোন রেখে দিচ্ছে। মোটকথা শরণার্থীদের বাসস্থান যোগাড় করতে এখন অনেক বেশি কষ্ট করতে হচ্ছে।

‘ইউরোনিউজ’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, জার্মানিতে ইউক্রেনিয় এবং রুশদের মাঝে চলছে সংঘর্ষ; যা জার্মানির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করছে। একদিকে ইউক্রেনিয়রা বার্লিনের রাস্তায় জার্মানির রুশ গ্যাস আমদানি করার নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে। অপরদিকে রুশরা ইউক্রেনিয়দেরকে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে। এখানেই শেষ নয়, জার্মানিতে রুশদের মালিকানায় থাকা ব্যবসা বাণিজ্যেও ভূতুড়ে ফোন আসছে হুমকিসহ। জার্মানিতে রুশদের একটা স্কুলে আগ্নিসন্ত্রাসও হয়েছে বলে বলছে ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’। জার্মান পুলিশ বলছে যে, এপ্রিল মাসে জার্মানিতে ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রুশ, ইউক্রেনিয় এবং বেলারুশদের মাঝে ১৭’শ অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে ইউক্রেনিয়দের সংখ্যা ১১ লক্ষ ছাড়িয়ে গেলেও জার্মানিতে ১৯৯০এর দশক থেকেই প্রায় ৩০ লক্ষ রুশ ভাষাভাষী মানুষ বাস করে।

 
২৮শে সেপ্টেম্বর ২০২২। চেক রিপাবলিকের রাজধানী প্রাগে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ইস্যুতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ। ইউরোপজুড়ে ডানপন্থী রাজনীতির জয়জয়কার দৃশ্যমান হওয়ায় জার্মানির ডানপন্থীরাও এতে আনুপ্রাণিত হয়েছে। নিজেদের দলের কর্মকান্ডের সফলতার চাইতে লিবারাল রাজনৈতিক ব্যবস্থার ব্যর্থতাই ডানপন্থীদের বেশি সহায়তা দিয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে যে, আসন্ন শীতকাল ইউরোপে, তথা জার্মানিতে, পশ্চিমা লিবারাল আদর্শের জন্যে অতি শীতল পরীক্ষা নিয়ে আসতে যাচ্ছে।

শরণার্থীদের ব্যাপারে রাজনীতিবিদেরা তাদের মতামত পাল্টাচ্ছেন

জার্মানির বৃহত্তম বিরোধী দল এঙ্গেলা মার্কেলের মধ্য-ডানপন্থী ‘ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাট’ বা ‘সিডিইউ’ দলের প্রধান ফ্রেডরিক মার্জ জার্মান টেলিভিশন ‘বিল্ড টিভি’র সাথে এক সাক্ষাতে বলেন যে, ইউক্রেন থেকে আসা শরণার্থীরা জার্মান সরকারের সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থা থেকে সুবিধা ভোগ করতে পর্যটকের মতো আচরণ করছে। ১১ লক্ষের বেশি ইউক্রেনিয় শরণার্থীদের জন্যে শীতকালে ঘর উষ্ণ করার সুবিধা দিলে সেটা জার্মান নাগরিকদের জন্যে অন্যায্য হয়ে যাচ্ছে। কারণ অনেক খেটে খাওয়া জার্মান তাদের জ্বালানি খরচ বহণ করতে পারছে না। ‘পলিটিকো’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, জার্মানির অর্ধেক বাড়িঘরই শীতকালে উষ্ণ রাখার জন্যে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করে থাকে। এই বাড়িগুলির জন্যে জ্বালানি খরচ কমপক্ষে দ্বিগুণ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। ফ্রেডরিক মার্জের কথাগুলির পর দেশজুড়ে সমালোচনা শুরু হলে তিনি এক টুইটার বার্তায় তার মন্তব্যের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। মার্জ ক্ষমতাসীন সোশালিস্ট সরকারের শরণার্থী নীতির সমালোচনা করে বলছেন যে, সরকারের কোন সুনির্দিষ্ট নীতি নেই। যে-ই জার্মানিতে আসতে চাইছে, তাকেই সরকার দেশে ঢুকতে দিচ্ছে। সরকারের উচিৎ কঠোরভাবে নির্দিষ্ট করে দেয়া যে, কত শরণার্থী দেশে ঢুকতে পারবে। ‘পলিটিকো’ বলছে যে, মার্জের কথাগুলি বেশ খানিকটা পপুলিস্ট ঘরানার, যা কিনা ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী ‘অলটারনেটিভ ফর জার্মানি’ বা ‘এএফডি’ দলের কথার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে যে, ‘সিডিইউ’এর চিন্তায় বেশ খানিকটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এতদিন ‘সিডিইউ’ ইউক্রেনিয় শরণার্থীদের ব্যাপারে জার্মান সরকারের নীতিকে সমর্থন করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় সরকারের ব্যর্থতাকে কাজে লাগাতে ‘সিডিইউ’ হয়তো এই সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাইছে না।

‘ইউরোনিউজ’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, জার্মানির পূর্ব দিকের ছোট দেশগুলিতেও শরণার্থীদের চাপ অনুভূত হচ্ছে। চেক রিপাবলিক ৪ লক্ষ ৩৯ হাজারের বেশি ইউক্রেনিয় শরণার্থী নিয়েছে; পাশের স্লোভাকিয়া নিয়েছে আরও প্রায় ১ লক্ষ। কিন্তু সেপ্টেম্বর মাসে সিরিয়া থেকে শরণার্থী আসা বেড়ে যাওয়ায় তারা তাদের সীমান্তে পাহাড়া বসিয়েছে; যদিও ইইউএর নিয়ম অনুসারে একদেশ থেকে অন্যদেশে যাতায়াতে কোন বাধা থাকার কথা নয়। সমস্যা হলো, যেখানে চেক রিপাবলিকের ৭৫ শতাংশ জনগণ ইউক্রেনের শরণার্থীদের দেশে ঢোকার পক্ষে, সেখানে ২০১৫ সালে সিরিয়া এবং আফ্রিকার মুসলিম শরণার্থীদের দেশে ঢোকার বিরুদ্ধে ছিল ৭০ শতাংশ মানুষ। অর্থাৎ ইউক্রেনের শরণার্থীদেরকে তারা ভাইয়ের মতো দেখলেও মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার মুসলিমদেরকে তারা ভিন্ন চোখে দেখেছে। কিন্তু এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে চলেছে। কারণ জীবনযাত্রার খরচ মারাত্মকভাবে বেড়ে যাওয়ায় চেক রিপাবলিকের কট্টর বামপন্থী এবং কট্টর ডানপন্থী দলগুলি রাজধানী প্রাগের রাস্তায় সরকার বিরোধী বিক্ষোভ করেছে। অনেকেই বলা শুরু করেছে যে, সরকার শরণার্থীদেরকে চেক নাগরিকদের তুলনায় বেশি সুবিধা দিচ্ছে। স্লোভাকিয়াতেও অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধিতে চেক রিপাবলিকে মূদ্রাস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ১৭ শতাংশ; আর স্লোভাকিয়াতে ১৪ শতাংশ; যা কিনা ইউরোপের সর্বোচ্চগুলির মাঝে।

জার্মানিতে ডানপন্থীদের জনসমর্থন বাড়ছে

জার্মানির ‘ডের স্পাইগেল’ পত্রিকা বলছে যে, জার্মানির ১৬টা রাজ্যের মাঝে ১২টা রাজ্য ইতোমধ্যেই বলে দিয়েছে যে তারা ইউক্রেন থেকে আর কোন শরণার্থী নিতে পারবে না। জার্মান স্বারাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলছেন যে, খুব শীঘ্রই সবগুলি রাজ্যই তাদের সক্ষমতার সীমানা অতিক্রম করবে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিদিন গড়ে ৮শ’ ৭৫ জন শরণার্থী জার্মানিতে প্রবেশ করেছে। অর্থনৈতিক চাপের মাঝে শরণার্থীদের ভার নিতে হিমসিম খাচ্ছে ইউরোপ; বিশেষ করে জার্মানি। এই সুযোগটাই নিচ্ছে জার্মানির কট্টর ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী দল ‘অলটারনেটিভ ফর জার্মানি’ বা ‘এএফডি’। তবে জার্মানির প্রাক্তন চ্যালেন্সর গেরহার্ড শ্রোডার মনে করছেন যে, ‘এএফডি’র নিজেদের মাঝেই বিভেদ রয়েছে। তিনি ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, দেশের পূর্বাঞ্চলে এই দলের সমর্থকেরা রাশিয়াকে সমর্থন করলেও পশ্চিমাঞ্চলের সমর্থকেরা রাশিয়ার পক্ষে নয়। এমতাবস্থায় তারা সরকারের বিরুদ্ধে শক্ত কোন আন্দোলন করতে পারবে না। তথাপি জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধির ইস্যুতে ‘এএফডি’র সরকার বিরোধী বিক্ষোভে হাজারো মানুষ যোগ দিচ্ছে। গবেষণা সংস্থা ‘আইএনএসএ’র এক জরিপে বলা হচ্ছে যে, ক্ষমতাসীন চ্যান্সেলর ওলাফ শোলজএর বামপন্থী সোশালিস্ট দলের পক্ষে জনমত ২৬ শতাংশ থেকে কমে ১৮ শতাংশে নেমে এসেছে; শরীক দল ‘এফডিপি’র অর্ধেক কমে গিয়ে হয়েছে মাত্র ৭ শতাংশ। অপর শরীক দল ‘গ্রিন পার্টি’ও জনপ্রিয়তা হারিয়েছে। অপরদিকে ‘এএফডি’র সমর্থন ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫ শতাংশে উঠে গেছে; যা কিনা ইতিহাসের সর্বোচ্চ। অক্টোবর থেকে রাস্তায় বিক্ষোভে ‘এএফডি’র এজেন্ডা হবে ‘আমাদের দেশ আগে’; যা প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’এর সাথে মিলে যায়।

ইউরোপে মুসলিম এবং ইউক্রেনিয় খ্রিস্টান শরণার্থীদের ব্যাপারে জনমতে ব্যাপক পার্থক্য থাকলেও জ্বালানির ব্যাপক মূল্যস্ফীতির মাঝে এখন যেকোন শরণার্থীই বোঝা হয়ে যাচ্ছে। এমনকি মধ্যপন্থায় থাকা রাজনীতিবিদেরাও শরণার্থীদের আটকাতে বলছেন। জার্মানির বামপন্থী সোশালিস্ট কোয়ালিশন সরকার জনগণকে আশ্বাস দিতে ব্যার্থ হয়েছে যে জার্মানির নীতি সঠিক পথে রয়েছে। অন্ততঃ সিদ্ধান্তগত দিক থেকে অনিশ্চয়তা এবং নীতিগত দিক থেকে স্বাধীনভাবে চলতে না পারাটা জার্মানির জাতীয় গর্বকে আঘাত করছে। এই সুযোগটাই নিতে চাইছে ডানপন্থী গ্রুপগুলি। মধ্যপন্থী বিরোধী দলগুলিও ডানপন্থীদের শ্লোগানকে পুঁজি করাটাকেই সঠিক বলে মনে করছে। ইউরোপজুড়ে ডানপন্থী রাজনীতির জয়জয়কার দৃশ্যমান হওয়ায় জার্মানির ডানপন্থীরাও এতে আনুপ্রাণিত হয়েছে। নিজেদের দলের কর্মকান্ডের সফলতার চাইতে লিবারাল রাজনৈতিক ব্যবস্থার ব্যর্থতাই ডানপন্থীদের বেশি সহায়তা দিয়েছে। ২০২০ সালে কট্টর ডানপন্থী দল ‘এএফডি’র মুখপাত্র ক্রিশ্চিয়ান লুথ বলেছিলেন যে, জার্মানির অবস্থা যত খারাপ হবে, ‘এএফডি’র অবস্থান তত শক্ত হবে। বোঝাই যাচ্ছে যে, আসন্ন শীতকাল ইউরোপে, তথা জার্মানিতে, পশ্চিমা লিবারাল আদর্শের জন্যে অতি শীতল পরীক্ষা নিয়ে আসতে যাচ্ছে।

Wednesday, 31 August 2022

ইউক্রেন যুদ্ধের ছয় মাস… বৈশ্বিক প্রভাব, যুদ্ধের বর্তমান অবস্থা ও সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ

০১লা সেপ্টেম্বর ২০২২
 
জুন ২০২২। ডনবাসে ইউক্রেনিয় সেনারা ফরাসি নির্মিত 'সীজার' আর্টিলারি থেকে গোলাবর্ষণ করছে। যুদ্ধ শুরুর ছয় মাসের মাঝে যুদ্ধটা একে অপরের ক্ষতি বাড়ানোর যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। উভয় পক্ষেরই ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ব্যাপক; কিন্তু কেউই বড় রকমের কোন বিজয় ছিনিয়ে নেবার মতো অবস্থানে নেই।

২৪শে ফেব্রুয়ারি ২০২২ রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করে। যুদ্ধ শুরুর ছয় মাস পর এই যুদ্ধের প্রভাব এখন বিশ্বব্যাপী প্রতিফলিত হচ্ছে। ‘দ্যা ইকনমিস্ট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, যুদ্ধ শুরুর ছয় মাসের মাঝে যুদ্ধটা একে অপরের ক্ষতি বাড়ানোর যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। উভয় পক্ষেরই ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ব্যাপক; কিন্তু কেউই বড় রকমের কোন বিজয় ছিনিয়ে নেবার মতো অবস্থানে নেই। ইউক্রেনিয়ান জেনারেল দিমিত্রো মারচেঙ্কোর মতে, বছর শেষ হবার আগেই ইউক্রেনের দক্ষিণের খেরসন শহর তাদের দখলে চলে আসবে। কিন্তু এহেন উচ্চাকাংক্ষা বাস্তবায়ন যে কঠিন হবে, তা সহজেই অনুমেয়। অপরদিকে যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানির মূল্য ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে; যদিও ইউক্রেনের গম রপ্তানি শুরু হবার কারণে যুদ্ধের শুরুতে ইউরোপে খাবারের মূল্য যতটা বেড়ে গিয়েছিল, সেই অবস্থা থেকে তা ধীরে ধীরে কমে আসছে। তথাপি যুদ্ধ দীর্ঘ হবার সম্ভাবনাটাই বেশি।

সামরিক পরিস্থিতির ছয় মাস

ছয় মাসের যুদ্ধ থেকে পাঁচটা সামরিক শিক্ষা নিয়েছে ‘আল জাজিরা’। প্রথমতঃ যুদ্ধের আগে পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা রুশ সামরিক বাহিনীকে যেভাবে দেখতেন, এখন বোঝা যাচ্ছে যে, তাদের সেই বিশ্লেষণ সম্পূর্ণ ভুল ছিল। যুদ্ধের প্রথম দিকে রুশ বিমান বাহিনী আকাশের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি। এর ফলশ্রুতিতে রুশ সেনাবাহিনীর গাড়ির সাড়িগুলি ইউক্রেনের বিমান ও ড্রোনের আক্রমণের শিকার হয়েছে। বাহিনীগুলির মাঝে সমন্বয়হীনতা ছিল চোখে পড়ার মতো। সেনাদের রসদ এবং খাবার ফুরিয়ে যাবার পর দীর্ঘ গাড়ির সাড়িগুলির উপর ইউক্রেনিয়দের হামলা মনে করিয়ে দেয় যে, প্রথম দিনেই ইউক্রেনিয়দের যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে যাবার যে আশা রুশরা করেছিল, তা কতটা ভুল ছিল। বাহিনীগুলির কর্মকান্ডকে বশে আনতে গিয়ে উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসাররা ফ্রন্টলাইনের একেবারে কাছে গিয়ে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছিলেন। আর একইসাথে রুশ যোগাযোগ ব্যবস্থার অত্যন্ত খারাপ অবস্থার কারণে ইউক্রেনের ইন্টেলিজেন্স খুব সহজেই রুশ জেনারেলদের অবস্থানের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে যায়। ফলশ্রুতিতে বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ অফিসারকে ইউক্রেনিয়রা টার্গেট করে হত্যা করতে সক্ষম হয়। কয়েক মাস যুদ্ধের পর রুশরা তেমন সফলতা না পেয়ে কৌশল পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। নতুন টার্গেট হয় ইউক্রেনের পূর্বের ডোনেতস্ক অঞ্চল; যেখানে পরিকল্পনামাফিক যুদ্ধ করে তারা যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতির বিনিময়ে সেভেরোডোনেতস্ক শহরের নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয়। তবে দক্ষিণের বন্দর শহর ওডেসার দিকে রুশ আক্রমণ ইউক্রেনিয়দের প্রতিরোধের মুখে সফল হয়নি। তারা ধীরে ধীরে পিছু হটে গিয়ে নীপার নদীর উপরে খেরসন শহরে অবস্থান নিতে বাধ্য হয়।

দ্বিতীয়তঃ যুদ্ধের প্রথম দিকে ইউক্রেনিয়রা বিরাট সুবিধা পায় পশ্চিমাদের সরবরাহ করা বড় সংখ্যক শক্তিশালী ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহে। একইসাথে তুর্কি ‘বায়রাকতার টিবি২’ ড্রোনগুলি ইউক্রেনের আর্টিলারির জন্যে নিখুঁতভাবে টার্গেট খুজে দেয়। এর ফলে রুশ সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ রাডার, কমান্ড ও কন্ট্রোল ইউনিটগুলিকে ধ্বংস করে ফেলা সম্ভব হয়। এতে রুশ সেনাবাহিনীর সমস্যা আরও ঘনীভূত হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবক যুদ্ধ করতে ইউক্রেনে আবির্ভূত হয়। এরা ইউক্রেনের বাহিনীকে যথেষ্ট সহায়তা দিলেও ভাষার ভিন্নতা এদের সফলতা কিছুটা হলেও কমিয়ে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ থেকে বিপুল পরিমাণে অস্ত্র আসতে থাকে, যা ইউক্রেনকে যুদ্ধ চালিয়ে নিতে সহায়তা দেয়। এগুলির মাঝে ছিল বিপুল পরিমাণে গোলাবারুদ, নিখুঁতভাবে আঘাত করার মতো আর্টিলারি, আর্টিলারি রকেট, এবং রুশ নির্মিত ট্যাংক ও যুদ্ধবিমান, যেগুলি ইউক্রেনিয়রা খুব স্বল্প ট্রেনিংএর মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়। তবে পশ্চিমারা ইউক্রেনকে সেই অস্ত্রগুলিই দিয়েছে, যেগুলি দিয়ে ইউক্রেনিয়রা তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ভূমিগুলিকে রক্ষা করতে পারবে; দূরপাল্লার রকেট সরবরাহ করা থেকে তারা বিরত থাকে। পশ্চিমারা যুক্তি দেয় যে, তারা রুশদের সহ্যের সীমাকে অতিক্রম করতে চায় না; যে পরিস্থিতিতে তারা হয়তো পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারে আগ্রহী হতে পারে। আর ছয় মাসে যদিও ইউক্রেনিয়রা রুশ আক্রমণের দ্রুতিকে একেবারেই থামিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়েছে, তথাপি নিজেদের সামরিক ক্ষতিকে ইউক্রেনের পক্ষে পুষিয়ে নেয়া দুষ্কর। বিশেষ করে হারানো মানবসম্পদ ইউক্রেনের পক্ষে প্রতিস্থাপন করা একেবারেই সম্ভব নয়। নিজেদের রসদ যখন একেবারেই শেষের পথে, তখন ইউক্রেন পশ্চিমা সহায়তার উপরে পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল।

যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত 'হিমারস' আর্টিলারি রকেট। ব্যবহার করে ইউক্রেনিয়রা নিখুঁতভাবে দূরবর্তী টার্গেটগুলিকে ধ্বংস করতে পারছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কে কার কতো বেশি ক্ষতিসাধন করতে পারছে সেটার উপরেই যখন এগিয়ে থাকা নির্ভর করতে শুরু করেছে, তখন ‘হিমারস’ প্রতিপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ সাপ্লাই ব্যবস্থার উপর দূর থেকে হামলা করতে পারছে। এর ফলশ্রুতিতে রুশরা বড় কোন আক্রমণে যাবার উদ্দেশ্যে কোন একটা স্থানে যথেষ্ট পরিমাণে রসদ জমা করতে সক্ষম হচ্ছে না। একারণেই রসদের অভাবে রুশদের একটার পর একটা আক্রমণ বারংবার থেমে যাচ্ছে।


তৃতীয়তঃ বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা ‘হিমারস’ আর্টিলারি রকেট যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনিয়দেরকে এগিয়ে দিয়েছে। ‘এম-১৪২’ ‘হাই মোবিলিটি আর্টিলারি রকেট সিস্টেম’ বা ‘হিমারস’ নামে পরিচিত অস্ত্রটা হলো ট্রাকের উপর বহণ করা ছয়টা রকেট আর্টিলারি লঞ্চার। একেকটা রকেটের পাল্লা প্রায় ১৫ থেকে ৯২ কিঃমিঃ পর্যন্ত; যেখানে বেশিরভাগ আর্টিলারির পাল্লা সাধারণতঃ ৪০ কিঃমিঃএর ভেতর থাকে। তবে বিশেষ ধরণের রকেট ব্যবহার করে ‘হিমারস’এর পাল্লা প্রায় ১’শ ৫০ কিঃমিঃ পর্যন্ত নেয়া যায়। ‘হিমারস’ ব্যবহার করে ইউক্রেনিয়রা নিখুঁতভাবে দূরবর্তী টার্গেটগুলিকে ধ্বংস করতে পারছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কে কার কতো বেশি ক্ষতিসাধন করতে পারছে সেটার উপরেই যখন এগিয়ে থাকা নির্ভর করতে শুরু করেছে, তখন ‘হিমারস’ প্রতিপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ সাপ্লাই ব্যবস্থার উপর দূর থেকে হামলা করতে পারছে। এর ফলশ্রুতিতে রুশরা বড় কোন আক্রমণে যাবার উদ্দেশ্যে কোন একটা স্থানে যথেষ্ট পরিমাণে রসদ জমা করতে সক্ষম হচ্ছে না। একারণেই রসদের অভাবে রুশদের একটার পর একটা আক্রমণ বারংবার থেমে যাচ্ছে। ‘হিমারস’এর লঞ্চার গাড়ি ব্যবহার করে বড় আকারের একটা ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া যায়, যেটাকে বলা হয় ‘এডভান্সড ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেম’ বা ‘এটাকমস’। এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ৩’শ কিঃমিঃ পর্যন্ত। যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত এই ক্ষেপণাস্ত্র ইউক্রেনকে সরবরাহ করতে রাজি হয়নি।

চতুর্থতঃ উভয় পক্ষই গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ও গোলাবারুদের ক্ষেত্রে সরবরাহ ঘাটতিতে রয়েছে। রুশরা পুরোনো আর্টিলারি ব্যবহার করছে, যেগুলির নিখুঁতভাবে টার্গেটে আঘাত করার সক্ষমতা বেশ খানিকটা কম। আবার এমন কিছু ক্ষেপণাস্ত্র তারা ভূমির টার্গেটের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে, যেগুলি সেই কাজের জন্যে ডিজাইন করা হয়নি। এগুলি বলে দিচ্ছে যে, রুশরা গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহ ঘাটতির মাঝে পড়েছে। অপরদিকে সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেনিয়রা বাণিজ্যিক ড্রোন ব্যবহার করে আকাশ থেকে গোলাবারুদ ফেলেছে। এটা ইউক্রেনিয়দের উদ্ভাবনী শক্তিকে দেখালেও বলে দিচ্ছে যে, যুদ্ধবিমান ও অস্ত্রসজ্জিত ড্রোনের ঘাটতিতে রয়েছে তারা। তবে পশ্চিমারা চিন্তায় রয়েছে যে, ইউক্রেনকে সরবরাহ করতে গিয়ে তাদের নিজেদের কিছু বিশেষ অস্ত্রের স্টকে টান পড়ে যাচ্ছে। কারণ উৎপাদন ও সরবরাহের মাঝে দেখা দিয়েছে ঘাটতি। সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমারা কোন যুদ্ধে জড়ালে সেই অস্ত্রগুলির ঘাটতি তাদেরকে মারাত্মকভাবে ভোগাবে। একইসাথে যুক্তরাষ্ট্রে মারাত্মক মুদ্রাস্ফীতি ও আসন্ন অর্থনৈতিক মন্দার মাঝে অনেকেই বলা শুরু করেছেন যে, বাইডেন প্রশাসনের উচিৎ বিদেশে যুদ্ধের দিকে মনোযোগ না দিয়ে দেশের মানুষের সেবায় মনোনিবেশ করা। অপরদিকে রুশরা প্রশিক্ষিত সেনার অভাবের মাঝে থাকলেও ইউক্রেনের যুদ্ধকে ‘যুদ্ধ’ বা বলে ‘বিশেষ সামরিক অপারেশন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে যাচ্ছে। ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা দিলে হয়তো আরও মানুষকে সামরিক বাহিনীতে যোগদান করানো সম্ভব হবে; কিন্তু তা হবে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্যে রাজনৈতিক আত্মহননের শামিল। এমতাবস্থায় হাঁপিয়ে ওঠা উভয় পক্ষই তাদের ফোকাসকে ইউক্রেনের দক্ষিণে খেরসন শহরের দিকে নিয়ে এসেছে।

 
খেরসন শহর এখন যুদ্ধের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে। ইউক্রেনিয়রা নীপার নদী থেকে যে খালের মাধ্যমে রুশ অধিকৃত ক্রিমিয়া উপদ্বীপে পানি সরবরাহ করা হয়, সেই খালের নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছে। ২০১৪ সালে রুশরা ক্রিমিয়া দখল করে নিলে ইউক্রেনিয়রা এই খালের পানি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল; যা কিনা ক্রিমিয়ার কৃষি ও শিল্পের মোট পানির ৮৫ শতাংশের যোগান দিতো। এখন এই খালের উভয় পাড় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেবার পর রুশরা আবারও ক্রিমিয়ায় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছে। এই খালের নিয়ন্ত্রণ রাশিয়ার জন্যে যুদ্ধের একটা গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।

পঞ্চমতঃ খেরসন শহর এখন যুদ্ধের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে। শহরটা একইসাথে সমুদ্র ও নদীবন্দর; যা রুশরা গত মার্চ মাসে দখলে নেয়। নীপার নদীর পশ্চিমে অবস্থিত শহরটা ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের সাথে দু’টা সেতু দিয়ে সংযুক্ত। সাম্প্রতিক সময়ে এই নদীর উপর দিয়ে নোভা কাখোভকা শহরে অবস্থিত সেতু ইউক্রেনিয়রা ধ্বংস করে ফেলার পর খেরসন শহরের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে রুশদেরকে এই দু’টা সেতুর উপরেই নির্ভর করতে হচ্ছে। ইউক্রেনিয়রা খেরসনের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নীপার নদী দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৌরুট চালু করতে চাইছে। আর একইসাথে ইউক্রেনিয়রা নীপার নদী থেকে যে খালের মাধ্যমে রুশ অধিকৃত ক্রিমিয়া উপদ্বীপে পানি সরবরাহ করা হয়, সেই খালের নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছে। ২০১৪ সালে রুশরা ক্রিমিয়া দখল করে নিলে ইউক্রেনিয়রা এই খালের পানি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল; যা কিনা ক্রিমিয়ার কৃষি ও শিল্পের মোট পানির ৮৫ শতাংশের যোগান দিতো। এখন এই খালের উভয় পাড় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেবার পর রুশরা আবারও ক্রিমিয়ায় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছে। এই খালের নিয়ন্ত্রণ রাশিয়ার জন্যে যুদ্ধের একটা গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। এছাড়াও খেরসনের নিয়ন্ত্রণের উপর নির্ভর করছে রুশরা ইউক্রেনের ওডেসা বন্দরের দিকে এগুতে পারবে কিনা। ওডেসা বন্দরের উপর সমুদ্রের দিক থেকে একটা উভচর হামলার পরিকল্পনা রুশরা আপাততঃ স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে। কারণ এই বন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিতে হলে স্থলের দিক থেকে ঘিরে ফেলা ছাড়া গতি নেই। কিন্তু রুশরা স্থলের দিক থেকে ওডেসা থেকে বেশ কিছুটা দূরে রয়েছে।

‘আল জাজিরা’র বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, এই মুহুর্তে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের ডোনেতস্ক এবং লুহানস্ক অঞ্চল ছাড়াও দক্ষিণের বেশকিছু অঞ্চল রুশদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এমতাবস্থায় রুশদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, কতটুকু পেলে তারা এই যুদ্ধে ‘বিজয়’ হয়েছে বলে ঘোষণা দেবে। পশ্চিমাদের এক হিসেবে বলা হচ্ছে যে, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এক দশকে আফগানিস্তানে যত সেনা হারিয়েছিল, রুশরা তার চাইতে বেশি সেনা ইউক্রেনে হারিয়েছে মাত্র ছয় মাসে! রুশদের রেলওয়ে লাইন এবং গাড়ির বহরের উপর চোরাগুপ্তা হামলা হচ্ছে; যা কিনা সময়ের সাথে সাথে আরও বাড়বে। ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে এখন সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সামনের ছয় মাস…

অস্ট্রেলিয়ার সেনাবাহিনীর প্রাক্তন মেজর জেনারেল মিক রায়ান ‘এবিসি নিউজ’এর এক লেখায় আগামী ছয় মাসে ইউক্রেনের যুদ্ধ কোন দিকে যেতে পারে, সেব্যাপারে কয়েকটা সম্ভাবনাকে তুলে ধরেছেন। প্রথম সম্ভাবনা হলো, যুদ্ধক্ষেত্রে এবং রাজনৈতিক দিক থেকে উভয় পক্ষই থমকে থাকতে পারে; যেখানে কোন পক্ষই হয়তো বড় কোন বিজয় পাবে না। একে অপরকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে দুর্বল করার চেষ্টা চালাতে থাকবে এবং বিশ্বব্যাপী জনমত তৈরির চেষ্টা করবে। তবে এই স্থিতাবস্থা রুশদের পক্ষে যাবে; কারণ তুলনামূলকভাবে ইউক্রেনের চাইতে রাশিয়ার মানবসম্পদ বেশি ও অর্থনীতির আকার বড়। অর্থনৈতিক অবরোধ সত্ত্বেও রুশরা তাদের জ্বালানি বিভিন্ন দেশের কাছে বিক্রি করে আয় করতে পারছে। কিন্তু ইউক্রেনের অর্থনীতি ছোট হয়ে আসছে এবং এই অর্থনীতি নিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া কঠিন। অপরদিকে রুশরা মনে করছে যে, ইউরোপের সরকারগুলি জনগণের চাপের মাঝে পড়বে। এর মাঝে তারা হয়তো ইউক্রেনকে চাপের মাঝে ফেলে যুদ্ধের একটা উপসংহার টানতে চাইবে। তবে রুশদের সাথে ছাড় দিয়ে শান্তিচুক্তি করাটা ইউক্রেনের সরকারের জন্যে যথেষ্ট কঠিন হবে।

দ্বিতীয় সম্ভাবনা হলো, দুই পক্ষের মাঝে কোন একজন এগিয়ে যেতে পারে। আপাতদৃষ্টে মনে হচ্ছে যে, রুশরা তাদের আক্রমণে যাবার শক্তি অনেকটাই হারিয়েছে। আর গত কয়েক সপ্তাহের মাঝে ‘হিমারস’ রকেট ব্যবহার করে ইউক্রেন কিছুটা এগিয়ে রয়েছে। যদি ইউক্রেন সামনের দিনগুলিতে বড় কোন এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয়, তাহলে পশ্চিমাদের মাঝে ইউক্রেনকে সমর্থনের প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে। কারণ এতে পশ্চিমারা মনে করতে পারবে যে, ইউক্রেনকে সহায়তা দেয়ায় ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে। তবে এমতাবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া বর্তমানের অস্ত্রের ঘাটতি পূরণে সামরিক উৎপাদন বৃদ্ধি করতে বাধ্য হবে; যদিও সেটা পুরোপুরিভাবে নির্ভর করবে যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী কতটা এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিতে পারছে বা কত বড় রুশ বাহিনীকে ধ্বংস করতে পারছে তার উপর।

তৃতীয় সম্ভাবনা হলো, কোন একটা পক্ষ হঠাৎ করেই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সামরিক দিক দিয়ে বড় কোন বিজয় পেয়ে যেতে পারে; যেটার উপর ভর করে সে এরপর থেকে শুধু এগিয়েই যাবে। উদাহরণ হিসেবে, যুদ্ধরত দেশগুলির মাঝে কোন দেশের জাতীয় নেতার যদি মৃত্যু হয় অথবা তাকে ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়; অথবা হঠাৎ করেই যদি তাদের সেনাদের মনোবল পুরোপুরিভাবে ভেঙ্গে পড়ে; অথবা অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেক বড় কোন ঘটনা সংঘটিত হলো। যদি এহেন কোন ঘটনা ইউক্রেনের ভাগ্যে ঘটে, তাহলে ইউক্রেনের মাটিতে পশ্চিমা সেনা মোতায়েন না করে রুশদের অগ্রযাত্রা থামানো যাবে না। এতে ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যাহত হবে এবং চীনের নিজস্ব বিশ্বাসকে শক্তিশালী করবে যে, পশ্চিমারা নিম্নগামী। এরকম পরিস্থিতিতে অনেক পশ্চিমা সরকার মারাত্মক চাপের মাঝে পড়বে।

জেনারেল মিক রায়ান বলছেন যে, যদি এমন কোন ঘটনা রাশিয়ার ভাগ্যে ঘটে, তাহলে এতে শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনের বিজয়ই হবে না, রুশরা মনে করতে শুরু করবে যে, এতদিন পশ্চিমাদের হুমকির যে ব্যাপারটা রুশ সরকার তাদের জনগণকে বলেছে, তা প্রকৃতপক্ষে সত্যি। এতে রুশদের মাঝে বিরক্তির উদ্রেক হতে পারে এবং আরও ভয়ংকর একটা রাশিয়া সামনে আসতে পারে।

 
রাশিয়া এখন ইউক্রেনের ১০ থেকে ২০ শতাংশ ভূমি দখলে রেখেছে। কিন্তু সমস্যা হলো, এখানেই রয়েছে ইউক্রেনের ৯০ শতাংশ জ্বালানি এবং বেশিরভাগ সমুদ্রবন্দর। কাজেই ইউক্রেনের জন্যে কোন ভূমি হারানোটাই সমীচিন নয়। এই অঞ্চলগুলি হারালে ইউক্রেন পশ্চিমাদের উপর পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়বে এবং স্বাধীন দেশ হিসেবে ইউক্রেনের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন থাকবে।

যুদ্ধ কতটা দীর্ঘ হতে পারে?

‘দ্যা গার্ডিয়ান’এর প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সম্পাদক ডন সাবাগ মনে করছেন যে, যুদ্ধ আরও কমপক্ষে এক বছর স্থায়ী হতে পারে; কারণ কোন পক্ষই বড় কোন বিজয় ছিনিয়ে নেবার সক্ষমতা দেখাতে পারছে না। ইউক্রেন চাইছে খেরসনের নিয়ন্ত্রণ নিতে, কিন্তু একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গোপনে স্বীকার করে নিয়েছেন যে, ইউক্রেনিয়দের প্রকৃতপক্ষে সেই সক্ষমতা নেই। ইউক্রেনিয়রা আপাততঃ দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং শত্রুর ফ্রন্টলাইনের পিছনে স্পেশাল ফোর্সের সদস্যদের ব্যবহার করে হামলার উপর নির্ভর করতে চাইছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা মিখাইলো পডোলিয়াক বলছেন যে, এতে রুশদের মাঝে সমন্বয়হীনতার সৃষ্টি হবে। কিন্তু সমস্যা হলো, এর ফলে রুশরা তো খেরসন ছেড়ে চলে যাবে না। আর বর্তমানে রুশরা তাদের দখল করা এলাকার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাতেই বেশি ব্যস্ত থাকছে। সামনের শীতকাল নিয়ে সকলেই চিন্তা করছে। ইউক্রেনিয়রা মনে করছে যে, শীতকালে রুশরা ইউক্রেনের উপর চাপ বাড়াতে দেশটার জ্বালানি নেটওয়ার্কের উপর হামলা করতে পারে। তবে এর পরের বসন্তকালটাকে উভয় পক্ষই আক্রমণে যাবার সময় হিসেবে দেখবে। তাই সেসময়ের আগে উভয় পক্ষই তাদের রসদের সরবরাহ বৃদ্ধি করতে চাইবে। অপরদিকে পশ্চিমাদেরকে নিশ্চিত হতে হবে যে, তারা ইউক্রেন যুদ্ধে কি দেখতে চায়। তারা কি ইউক্রেনকে বিজয়ী দেখতে চায়, নাকি শুধু রুশদেরকে ঠেকিয়ে রাখা দেখতে চায়? তারা এতকাল ইউক্রেনকে অনেক সমরাস্ত্র দিলেও রুশদেরকে ঠেলে দেশ থেকে বের করে দিতে পারার মতো অস্ত্র কখনোই দেয়নি।

‘ভোক্স’ ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, যুদ্ধের দীর্ঘতা মাসের সংখ্যায় মাপা সম্ভব নাও হতে পারে; অর্থাৎ তা হতে পারে কয়েক বছরব্যাপী। উভয় পক্ষই এখনও মনে করছে যে, তারা যুদ্ধের ফলাফল নিজেদের অনুকূলে নিয়ে আসতে সক্ষম। একারণে কেউই এখনও শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ছাড় দিতে ইচ্ছুক নয়। যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয় কারুর লক্ষ্য থাকে না; যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয় হলো রাজনৈতিক লক্ষ্য বাস্তবায়নের একটা পদ্ধতি। ‘দ্যা আটলান্টিক কাউন্সিল’এর সিনিয়র ফেলো এনা এশফোর্ড বলছেন যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যেমন দেখা গেছে যে, এক পক্ষ যুদ্ধক্ষেত্রে পুরোপুরিভাবে জিতে গেছে এবং সেই অনুযায়ী রাজনৈতিক লক্ষ্য বাস্তবায়িত হয়েছে – এমন ঘটনা ইতিহাসে খুব বেশি নেই। ইউক্রেন যুদ্ধও ইতিহাসের বেশিরভাগ সময়ের ব্যতিক্রম হবে না। ইউক্রেনকে যুদ্ধক্ষেত্রে পুরোপুরিভাবে হারিয়ে দেয়াটা এখন রাশিয়ার সক্ষমতার বাইরে। কাজেই এটা মোটামুটিভাবে ধরেই নেয়া যায় যে, যুদ্ধের শেষটা হবে আলোচনার টেবিলে; যেখানে কোন পক্ষই প্রথমে যা চেয়েছিল তা পুরোপুরিভাবে পাবে না। তবে কিছু ব্যাপার নির্ধারণ করবে এই যুদ্ধের স্থায়িত্ব; যেমন – ইউক্রেন এবং রাশিয়াতে জনমত; উভয় দেশের অর্থনীতির উপরে চাপ; এবং ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দিয়ে যাবার পিছনে পশ্চিমা দেশগুলির সক্ষমতা। এটা পরিষ্কার যে, রাশিয়া প্রথমে যে লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছিল, তা অর্জনে সে পুরোপুরিভাবে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, ইউক্রেন জিতে গেছে। ইউক্রেনের শহরগুলির ধ্বংস হওয়া, তার শিল্পগুলিতে ধ্বস, কৃষিজমি ভস্ম হয়ে যাওয়া, বিরাট জনসংখ্যার মৃত্যু ও বাস্তুচ্যুতি – এগুলি ইউক্রেনকে মারাত্মক ক্ষতির মাঝে ফেলেছে। ইউক্রেনকে আবারও নিজের পায়ে দাঁড়াতে গেলে একদিকে যেমন রাশিয়াকে ব্যাপক ছাড় দিতে হবে, তেমনি পশ্চিমা দেশগুলিকেও ইউক্রেনের পূনর্গঠনের জন্যে বড় রকমের দায়িত্ব নিতে হবে।

যুদ্ধের বৈশ্বিক প্রভাব

‘ডয়েচে ভেলে’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, যুদ্ধের আগে ইউক্রেনের জনগণের অনেকেই পশ্চিমা-ঘেঁষা হবার পক্ষেই ছিল। কিন্তু পশ্চিমারা এব্যাপারে খুব একটা নিশ্চিত ছিল না। যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিমারা ইউক্রেনের ব্যাপারে তাদের চিন্তাধারা পরিবর্তন করতে যাচ্ছে। যেমন ইউক্রেনকে ইইউএর অংশ করে নেবার পদ্ধতি শুরু হয়েছে; যা কিনা ইউক্রেন অনেকদিন ধরে অনুরোধ করলেও ইইউ মানতে চায়নি। যুদ্ধ ইউক্রেনকে পশ্চিমাদের আরও নিকটে নিয়ে গেছে। অপরদিকে রাশিয়ার সাথে পশ্চিমাদের দূরত্ব বহু বছরের জন্যে বেড়ে গেছে। এর ফলশ্রুতিতে রাশিয়া বাকি বিশ্বে নতুন বন্ধু খুঁজছে; যেমন চীনের কাছে জ্বালানি বিক্রি করা, অথবা ইরানের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা। ইরান যেহেতু কয়েক দশক ধরেই পশ্চিমা অবরোধের মাঝে রয়েছে এবং অবরোধকে কিভাবে বাইপাস করা যায়, সেটা শিখেছে; তাই রাশিয়া ইরানের কাছ থেকে সেটা শিখতে চাইছে।

খাদ্যসংকট - প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাপী, বিশেষ করে আফ্রিকায় খাদ্যসংকটের ইস্যুটাকে নিয়ে আসা হয়েছে। আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়ায় মোট খাদ্যের অর্ধেক গম থেকে উৎপন্ন হয়। অথচ দেশটা তার চাহিদার ৮০ শতাংশ গম আমদানি করে। খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি পুরো নাইজেরিয়াতে মানুষের নিরাপত্তাহীনতাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০২৩ সালে নাইজেরিয়াতে সাধারণ নির্বাচনের আগে সরকার যদি অবস্থার উন্নয়ন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে প্রেসিডেন্টকে মারাত্মক সমস্যায় পড়তে হতে পারে। আর আফ্রিকার সবচাইতে জনবহুল দেশে রাজনৈতিক কলহ সৃষ্টি হলে সেটার প্রভাব পুরো পশ্চিম আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ভারত, রাশিয়া ও চীন - ভারতের সাথে রাশিয়ার গভীর সম্পর্ক বহুকাল ধরেই। আর যুক্তরাষ্ট্রও ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে দেখতে চায় বলে ভারতের উপর চাপ সৃষ্টি করেনি। এতে ভারতের আত্মবিশ্বাস আরও বেড়েছে। এর মাঝে অনেকেই ভারতের নিজস্ব স্বার্থকে সমুন্নত রাখার কথা বলতে থাকে এবং পশ্চিমা দ্বিমুখী নীতিকেও আলোচনায় নিয়ে আসে। তারা রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানির ফলশ্রুতিতে পশ্চিমাদের সমালোচনাকে ভালো চোখে দেখেনি। কিন্তু সমস্যা হলো, রাশিয়া যদি চীনের আরও কাছে যেতে শুরু করে, সেটা ভারতের স্বার্থের বিপক্ষে চলে যেতে পারে। এবং এতে ভারত কূটনৈতিক দিক থেকে সমস্যার মাঝে পড়ে যেতে পারে। তবে ভারত যেহেতু বহু স্বার্থের যোগফল, তাই ইউক্রেন যুদ্ধ ভারতের সামনে নতুন সুযোগও তৈরি করেছে। উল্টোদিকে মার্কিন কংগ্রেসের স্পীকার ন্যান্সি পেলোসির তাইওয়ান সফরের পর উত্তেজনা শুরু হলে তাইওয়ানও চীনের সাথে সম্ভাব্য যুদ্ধের ব্যাপারে কিভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে, সেটা নিয়ে চিন্তা শুরু করেছে।

তুরস্ক, ইউক্রেন ও রাশিয়া - ‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, অদ্ভুত একটা পরিস্থিতিতে রয়েছে তুরস্ক। ন্যাটোর সদস্য তুরস্ক একদিকে যেমন ইউক্রেনকে সমর্থন দিচ্ছে, তেমনি তারা চেষ্টা করছে রাশিয়াকে না ক্ষেপাতে। তারা কিয়েভের কাছে ড্রোন বিক্রি করেছে; কিন্তু রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবরোধে যোগ দেয়নি। উভয় পক্ষের সাথে সম্পর্ক রাখার এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রেসিডেন্ট এরদোগান ইউক্রেনের গম রপ্তানির জন্যে কাজ করেছেন এবং তার এই অবস্থানকে বিরাট কূটনৈতিক সাফল্য বলে জাহির করেছেন। তবে ২০২৩ সালের নির্বাচন যখন কাছে চলে এসেছে, তখন অনেকেই প্রশ্ন করছেন যে, তিনি তার এই অবস্থানকে কতটা ধরে রাখতে পারবেন।

 
চীনা কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা 'গ্লোবাল টাইমস'এ প্রকাশিত মার্কিনীদের সমালোচনামূলক কার্টুন। যে ব্যাপারটা মার্কিনীদেরকে ভাবাচ্ছে তা হলো, তাদের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়া এবং চীন এখন আরও কাছাকাছি চলে এসেছে। এমতাবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইউরোপের সাথে আরও শক্তিশালী বন্ধুত্ব তৈরি করতে।

যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন - আটলান্টিকের ওপাড়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বৈরিতা যখন চীনের দিকে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ায় অনেকেই মার্কিনীদের ফোকাস রাশিয়ার দিকে নিয়ে গিয়েছে; যদিও চীনকে কেউই হিসেব থেকে বাদ দেয়নি। যে ব্যাপারটাতে সকলেই নিশ্চিত হয়েছেন তা হলো, যুক্তরাষ্ট্র এখনোও ইউরোপের নিরাপত্তার কেন্দ্রে রয়েছে। ইউরোপের কৌশলগত স্বাতন্ত্রের যে কথাগুলি শুরু হয়েছিল, তা বর্তমান বাস্তবতায় যৌক্তিকতা পাচ্ছে না। তবে যে ব্যাপারটা মার্কিনীদেরকে ভাবাচ্ছে তা হলো, তাদের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়া এবং চীন এখন আরও কাছাকাছি চলে এসেছে। এমতাবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইউরোপের সাথে আরও শক্তিশালী বন্ধুত্ব তৈরি করতে।

ইউরোপ ও জ্বালানি সংকট - যুদ্ধের কারণে ইউরোপ সবচাইতে চাপের মাঝে পড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, যুদ্ধের আগে যেখানে রাশিয়া ছিল ইউরোপের সবচাইতে বড় জ্বালানি সরবরাহকারী, এখন তারা হঠাত করেই রুশ জ্বালানির উপর নির্ভরশীলতা কমাতে উঠেপড়ে লেগেছে। ইউক্রেনের যুদ্ধ ইউরোপের একাত্মতাকে প্রশ্নের মাঝে ফেলেছে। ইইউএর মাঝে যখন সকলকেই জ্বালানি খরচ কমাতে বলা হচ্ছে, তখন সদস্যদেশগুলির মাঝেই কেউ কেউ বলছে যে, এটা তাদের উপর জুলুম হচ্ছে। কারণ সকলে রুশ গ্যাসের উপর সমানভাবে নির্ভরশীল নয়। যুদ্ধের কারণে সুইডেন ও ফিনল্যান্ড ন্যাটোতে যোগ দিতে যাচ্ছে। আর ন্যাটো তার পূর্ব সীমানায় সৈন্যের সংখ্যাও বৃদ্ধি করছে।

মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক মন্দা - ‘ডয়েচে ভেলে’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি ইউক্রেন যুদ্ধের আগেই সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছিল। করোনা লকডাউনের পর আন্তর্জাতিক সরবরাহে জটলা সৃষ্টি হওয়ায় যেমন মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে, তেমনি করোনা লকডাউনের মাঝে জ্বালানির ব্যবহার শূণ্যের কোঠায় চলে যাবার পর হঠাত করেই চাহিদা আকাশচুম্বী হয়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি দেখা দেয়। আর যেহেতু ইউক্রেন ও রাশিয়া মিলে আন্তর্জাতিক বাজারে এক চতুর্থাংশ গমের সরবরাহ করতো, তাই যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলি মূল্যস্ফীতি কমাতে সুদের হার বাড়াতে শুরু করেছে। মূল চিন্তাটা হলো, যদি অর্থ ঋণ নেয়া কঠিন হয়ে যায়, তাহলে মানুষ কম খরচ করবে। এতে করে চাহিদা কমবে এবং পণ্যের মূল্যও কমে আসবে। তবে এর আরেকটা অর্থ হলো ধীরে চলা অর্থনীতিকে মন্দার দিকে ঠেলে দেয়া। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলি যুদ্ধ বন্ধ করতে পারবে না; তারা গম বা জ্বালানি উৎপাদনও করতে পারবে না। তাই তারা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে মন্দা থেকেও বাঁচাতে পারবে না।

পশ্চিমাদের বিভক্তি - ‘ডয়েচে ভেলে’র প্রতিবেদনে যে ব্যাপারটা পরিষ্কার তা হলো, রাশিয়ার উপর পশ্চিমা অবরোধকে অনেকেই পশ্চিমাদের একাত্মতা হিসেবে দেখলেও বিশ্লেষণে সেখানে বিভেদ ফুটে ওঠে। রাশিয়ার উপর সকল অবরোধেই পশ্চিমারা একত্রে ছিল; শুধুমাত্র জ্বালানির ক্ষেত্রে অবরোধ আরোপ করতে গিয়েই পশ্চিমাদের মাঝে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। কারণ জার্মানিসহ ইউরোপের কিছু দেশ রুশ গ্যাসের উপর বেশি নির্ভরশীল ছিল। যুদ্ধের প্রথম ছয় মাসে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির কারণে রাশিয়ার গ্যাস রপ্তানির আয় কমেনি; বরং বেড়েছে। জার্মানি এবং ফ্রান্স যুদ্ধের আগ থেকেই রাশিয়ার উপর অবরোধ আরোপে আগ্রহী ছিল না। বিশেষ করে শীতকালে রুশ গ্যাসের উপর নির্ভরশীলতা জার্মানির নীতিকে বাকি ইউরোপের সাথে সাংঘর্ষিক অবস্থানে রেখেছিল।

অবরোধ অকার্যকর - রাশিয়ার উপর অবরোধ অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকারিতা হারিয়েছে; কারণ চীন এবং ভারতের মতো কিছু বড় দেশ রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানি বৃদ্ধি করেছে। একইসাথে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত তেলের উৎপাদন বৃদ্ধি করে পশ্চিমা দেশগুলির মূল্যস্ফীতি কমাবার ব্যাপারে আগ্রহী হয়নি। ফলশ্রুতিতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানির মূল্য মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কাজেই রাশিয়ার উপর অবরোধ রাশিয়াকে যতটা না বিপদে ফেলেছে, তার চাইতে সামনের শীতকালে রুশ গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় ইউরোপকে, বিশেষ করে জার্মানিকে বেশি ত্রাসের মাঝে ফেলেছে।

 
মার্চ ২০২২। মার্কিন কংগ্রেসের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিচ্ছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলদিমির জেলেন্সকি। ইউক্রেনের সামনে এখন অস্ত্র, অর্থ এবং অন্যান্য সহায়তার জন্যে পশ্চিমাদের উপর নির্ভরশীল হওয়া ছাড়া কোন পথই খোলা নেই। এখন উভয় পক্ষই আলোচনায় বসার আগে নিজেদের অবস্থানকে আরও সুসংহত করতে চাইছে। তবে আলোচনা অনেক ক্ষেত্রেই নির্ভর করছে যুদ্ধের ব্যাপারে পশ্চিমারা কি ভাবছে সেটার উপর। যদি পশ্চিমা দেশগুলিতে জনমত যুদ্ধের বিপক্ষে চলে যায়, তাহলে পশ্চিমা নেতারা আলোচনায় বসার জন্যে ইউক্রেনের উপর চাপ সৃষ্টি করবে।

যুদ্ধ শেষ হতে পারে কিভাবে?

ইউক্রেন যুদ্ধের প্রথম মাসে রাশিয়ার লক্ষ্য ছিল পুরো ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণ নেয়া এবং কিয়েভে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটানো। রুশরা ভেবেছিল তারা কয়েক দিনের মাঝেই যুদ্ধ শেষ করে ফেলবে; মাসের পর মাস যুদ্ধ করার কথা তারা চিন্তাও করেনি। সৈন্যদের মাঝে অনেকেই যুদ্ধের বিজয়ের পরে প্যারেড করার জন্যে পোষাকও সাথে নিয়েছিল! কিন্তু রাশিয়ার দ্রুত বিজয় পাবার চিন্তাটা প্রথম মাসেই ধূলায় মিশে যায়।

ইউক্রেনের কাছে বিজয় বলতে কি বোঝায়? ইউক্রেনিয়রা কি মনে করছে যে, তারা পূর্বাঞ্চলের ডনবাস এবং দক্ষিণের ক্রিমিয়া উপদ্বীপ পূনর্দখল করতে পারবে? রাশিয়া এখন ইউক্রেনের ১০ থেকে ২০ শতাংশ ভূমি দখলে রেখেছে। কিন্তু সমস্যা হলো, এখানেই রয়েছে ইউক্রেনের ৯০ শতাংশ জ্বালানি এবং বেশিরভাগ সমুদ্রবন্দর। কাজেই ইউক্রেনের জন্যে কোন ভূমি হারানোটাই সমীচিন নয়। এই অঞ্চলগুলি হারালে ইউক্রেন পশ্চিমাদের উপর পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়বে এবং স্বাধীন দেশ হিসেবে ইউক্রেনের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন থাকবে। ইউক্রেন এখনও বলছে যে তারা রাশিয়ার সাথে আলোচনায় আগ্রহী নয়। কিন্তু ইউক্রেনের সমস্যা বাড়ছেই। যুদ্ধের শুরুতে ইউরোপের দেশগুলি ইউক্রেনের শরণার্থী নিতে যতটা আগ্রহী ছিল, এখন ব্যাপক মূল্যস্ফীতির পর তারা আর ততটা আগ্রহী নয়।

ইউক্রেনের সামনে এখন অস্ত্র, অর্থ এবং অন্যান্য সহায়তার জন্যে পশ্চিমাদের উপর নির্ভরশীল হওয়া ছাড়া কোন পথই খোলা নেই। এবং সেই আঙ্গিকেই তারা শুধুমাত্র রাশিয়ার ক্ষতি বৃদ্ধি করাতেই মনোনিবেশ করেছে। তারা হয়তো আশা করছে যে, রাশিয়ার জন্যে যুদ্ধের ব্যয় বহণ করা খুব কঠিন হয়ে গেলে একসময় রাশিয়া নিজেই যুদ্ধ বন্ধ করতে চাইবে। এখন উভয় পক্ষই আলোচনায় বসার আগে নিজেদের অবস্থানকে আরও সুসংহত করতে চাইছে। তবে আলোচনা অনেক ক্ষেত্রেই নির্ভর করছে যুদ্ধের ব্যাপারে পশ্চিমারা কি ভাবছে সেটার উপর। যদি পশ্চিমা দেশগুলিতে জনমত যুদ্ধের বিপক্ষে চলে যায়, তাহলে পশ্চিমা নেতারা আলোচনায় বসার জন্যে ইউক্রেনের উপর চাপ সৃষ্টি করবে। অপরদিকে রাশিয়া হয়তো নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থার উপর নির্ভর করে আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মাঝে যুদ্ধ শেষ করার ব্যাপারে আগ্রহী হতে পারে। এর মাঝে তারা তাদের দখলীকৃত এলাকার পরিধি বৃদ্ধি করতে এবং নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলির উপর নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করতে চাইবে।

Saturday, 27 August 2022

ব্রিটেনের অর্থনীতিতে ধ্বস আসন্ন?

২৭শে অগাস্ট ২০২২
 
ফেব্রুয়ারি ২০২২। লন্ডনে জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যাবার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ব্রিটিশ নাগরিকদের অর্থনৈতিক অবস্থা হয়েছে শোচনীয়। ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ নামের ভূরাজনৈতিক উচ্চাকাংক্ষা বাস্তবায়নে ব্রিটেন যেভাবে ব্রেক্সিটের দিকে এগিয়েছে, করোনার দুর্যোগের পর বৈশ্বিক জ্বালানি সমস্যার কারণে সেই চিন্তাগুলি খুব দ্রুতই ম্লান হয়ে যাচ্ছে।


ব্রিটেনের ‘অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিসটিকস’এর এক হিসেবে বলা হচ্ছে যে, ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে জুন মাসের মাঝে দেশটার অর্থনীতি শূণ্য দশমিক ১ সঙ্কুচিত হয়েছে। অথচ এবছরের প্রথম তিন মাসে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল শূণ্য দশমিক ৮ শতাংশ। বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে ‘বিবিসি’ বলছে যে, সামনের দিনগুলিতে অর্থনীতিতে ধ্বস নামার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। এর কারণ হিসেবে করোনার প্রণোদনা শেষ হয়ে যাবার সাথে সাথে খুচরা বাজারে ক্রেতাদের চাহিদা কমে যাওয়া দায়ী। ‘ব্যাংক অব ইংল্যান্ড’এর পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে যে, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির কারণে ২০২২ সাল শেষ হবার আগেই ব্রিটেনের অর্থনীতি মন্দার মাঝে পড়তে যাচ্ছে। টানা ছয় মাস অর্থনীতির নিম্নগতিকেই অর্থনৈতিক মন্দা হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ব্রিটেনের বার ও রেস্তোঁরার মালিকরা বলছেন যে, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির কারণে তাদের এখনই মন্দার অনুভূতি হচ্ছে। মানুষ বাড়ি থেকে কম বের হচ্ছে; জীবনযাত্রার খরচ ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। এছাড়াও পোলট্রি থেকে শুরু করে ভোজ্যতেল, সকল কিছুরই মূল্য বেড়ে গেছে; উল্টোদিকে তাদের ক্রেতারা খরচ কমাতে চাইছে। এমতাবস্থায় ব্যবসাগুলি এখন কোনমতে বেঁচে থাকার চেষ্টা চালাচ্ছে।

‘এসোসিয়েটেড প্রেস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ব্রিটেনে জ্বালানির মূল্য এতটাই বেড়েছে যে, নাগরিকেরা তাদের খরচের হিসেব রাখতে হিমসিম খাচ্ছেন। তাদের জ্বালানির মিটারের ব্যালান্স দেখতে দেখতেই শূণ্যের কোঠায় চলে যাচ্ছে। রান্না করার মাঝেই কারো কারো জ্বালানি চলে যাচ্ছে। আর যারা রাষ্ট্রীয় সহায়তা নিয়ে বেঁচে আছে, তাদের হাতে এখন বিদ্যুতের বিল পরিশোধের পর বাড়িভাড়া দেয়ার অর্থও থাকছে না। ২৬শে অগাস্ট ব্রিটেনের জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বলে যে, নাগরিকদের বাৎসরিক জ্বালানি খরচ ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে। অথচ গত এপ্রিল মাসেই জ্বালানি খরচ বেড়েছে ৫৪ শতাংশ! এর ফলশ্রুতিতে গড়পড়তা একেকটা বাড়ির জ্বালানি খরচ ২ হাজার ৩’শ ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ৪ হাজার ২’শ ডলার হতে চলেছে। সর্বশেষ এই মূল্যবৃদ্ধি অক্টোবরের প্রথম দিন থেকে কার্যকর হতে চলেছে। আর ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে এই খরচ আরও বেড়ে ৪ হাজার ৭’শ ডলার অতিক্রম করবে! ‘জি-৭’ বা বিশ্বের সবচাইতে ধনী ৭টা দেশের গ্রুপের মাঝে ব্রিটেনের মূল্যস্ফীতি সবচাইতে বেশি। আর ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সাথে সমন্বয় করে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে কয়েক মাস ধরেই দেশজুড়ে রেল শ্রমিক, ডাকবিভাগের শ্রমিক, বন্দরের শ্রমিক, আইনজীবী, এমনকি পরিচ্ছন্ন কর্মীরাও ধর্মঘটে নেমেছে। জুলাই মাসে খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ব্রিটেনের মূল্যস্ফীতি গিয়ে দাঁড়ায় ১০ দশমিক ১ শতাংশে; যা কিনা ৪০ বছরের মাঝে সর্বোচ্চ!

‘এসএন্ডপি গ্লোবাল মার্কেট ইন্টেলিজেন্স’ এবং ‘সিবিআই’এর যৌথ এক গবেষণায় বলা হচ্ছে যে, জুলাই থেকে অগাস্ট মাসের মাঝে ব্রিটেনের ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টর যতটা দ্রুত উৎপাদন হারিয়েছে, তা ২০০৯ সালের পর থেকে দেখা যায়নি। ‘এসএন্ডপি’এর এসোসিয়েট ডিরেক্টর ‘দ্যা গার্ডিয়ান’কে বলছেন যে, ২০২০ সালের মে মাসে করোনার লকডাউনের পর থেকে উৎপাদন সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। অগাস্ট মাসে ব্রিটেনের বেসরকারি খাত অর্থনৈতিক স্থবিরতার আরও কাছাকাছি গিয়েছে। দেশটার সেবা খাত সামান্য ভালো করায় পুরো অর্থনীতি এখনও ধ্বসে যায়নি। ‘সিবিআই’এর অর্থনীতিবিদ আলপেশ পালেহা বলছেন যে, কারখানাগুলি যখন কাঁচামালের উচ্চমূল্য, সরবরাহ পেতে দেরি হওয়া ইত্যাদি সমস্যার মাঝে রয়েছে, তখন অর্থনৈতিক মন্দা হাজির হয়েছে; কাজেই বছরের বাকি মাসগুলিতে উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়াটাই স্বাভাবিক হবে। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি এখন ব্যাংকের উচ্চ সুদের মাঝেও পড়তে হচ্ছে কারখানাগুলিকে। সুদের হার বর্তমানে ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালের বসন্তে ৪ শতাংশ হবার পূর্বাভাস দিচ্ছে কেউ কেউ।

ব্রিটিশ এনজিও ‘ক্রিশ্চিয়ান্স এগেইনস্ট পভার্টি’র জন টেইলর ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’কে বলছেন যে, যে মানুষগুলি কখনোই ঋণদায়গ্রস্ত ছিল না, এখন তারা ঋণের মাঝে পড়ে যাচ্ছে। অনেকেই তাদের কাছের মানুষকে হারিয়েছে; মানসিক বিপর্যয়ের মাঝে রয়েছে; তারা জানে না যে কিভাবে তারা তাদের পরবর্তী বিল পরিশোধ করবে, অথবা কিভাবে তারা বেঁচে থাকার জন্যে যথেষ্ট পরিমাণ খাদ্য ক্রয় করতে পারবে। ‘জোসেফ রাউনট্রি ফাউন্ডেশন’এর গত মে মাসের গবেষণায় বলা হচ্ছে যে, ১০ লক্ষ ব্রিটিশ পরিবার জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে নতুন করে অতিরিক্ত ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছে। ফাউন্ডেশনের প্রধান অর্থনীতিবিদ রেবেকা ম্যাকডোনাল্ড বলছেন যে, এরকম দারিদ্র্য পরিস্থিতি তারা গত কয়েক দশকে দেখেননি। ব্রিটিশ সরকার বলছে যে, তারা আসছে শীতে সকল পরিবারকে ৪’শ ৭০ ডলার করে দেবে; কিন্তু অনেকেই বলছেন যে, এটা অন্ততঃ এর দ্বিগুণ পরিমাণ হওয়া উচিৎ।

‘দ্যা টেলিগ্রাফ’ বলছে যে, কয়েক শতকের জনসংখ্যা বৃদ্ধির পর এখন জন্মহার কমে যাওয়ায় ব্রিটেনের অর্থনীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে যাচ্ছে। সামনের দিনগুলিতে করদাতার সংখ্যাও কমতে যাচ্ছে। এর সাথে যোগ হয়েছে নতুন সমস্যাগুলি। জ্বালানি কোম্পানি ‘ইডিএফ’এর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ফিলিপ কোমারেট ‘বিবিসি’কে বলছেন যে, ব্রিটিশ সরকার যদি জনগণকে জ্বালানি খরচ পোষাতে আরও সহায়তা না দেয়, তাহলে ব্রিটেনের অর্ধেক মানুষ শীতকালে ‘জ্বালানি দারিদ্র্য’র মাঝে পড়বে। এর অর্থ হলো, জ্বালানির খরচ পরিবারের ব্যয়ের ১০ শতাংশের বেশি হয়ে যাবে। নতুন হিসেব বলছে যে, করোনার লকডাউনের কারণে ২০২০ সালে ব্রিটেনের অর্থনীতিতে ৩’শ বছরের মাঝে সবচাইতে বড় ধ্বস নেমেছিল। এখন ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ৪০ বছরের মাঝে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে। এমতাবস্থায় প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের পদত্যাগের পর পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব অনেক কঠিন হয়ে যাচ্ছে। ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ নামের ভূরাজনৈতিক উচ্চাকাংক্ষা বাস্তবায়নে ব্রিটেন যেভাবে ব্রেক্সিটের দিকে এগিয়েছে, করোনার দুর্যোগের পর বৈশ্বিক জ্বালানি সমস্যার কারণে সেই চিন্তাগুলি খুব দ্রুতই ম্লান হয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেনকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে নিতে বিপুল সামরিক সহায়তা দিচ্ছে ব্রিটেন। তবে আসন্ন অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ২০২৩ সালে আফ্রিকায় আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্য ও ইন্দোপ্যাসিফিকে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি, উত্তর ও পূর্ব ইউরোপের নিরাপত্তায় নেতৃত্ব দেয়া, ইত্যাদির মতো ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর ভূরাজনৈতিক চিন্তাগুলি বাস্তবায়নের উপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, সেটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

Saturday, 13 August 2022

ইউক্রেনের খাদ্যশস্য রপ্তানির সমঝোতা কি দুনিয়ার জন্যে স্বস্তি বয়ে নিয়ে আসবে?

১৩ই অগাস্ট ২০২২
 
ইউক্রেনের বন্দরে অপেক্ষা করছে খাদ্যশস্যবাহী জাহাজ। যেহেতু কৃষ্ণ সাগরের খাদ্যশস্য রপ্তানির সমঝোতার কারণে খাদ্যশস্যের আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা এখনই দূরীভূত হয়ে যাচ্ছে না এবং রাশিয়া যেহেতু এই সমঝোতার দীর্ঘমেয়াদী নিশ্চয়তা দেয়নি, তাই যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা বিশ্বের জন্যে এখনই উল্লসিত হবার মতো কিছু ঘটেনি। অপরদিকে দরিদ্র দেশগুলির জনগণের সামনে ব্যাপক মূল্যস্ফীতির চাপ ও ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের মাঝে কৃষ্ণ সাগরের শস্য রপ্তানির সমঝোতা খুব কমই অর্থ বয়ে আনবে।


গত ২২শে জুলাই ইস্তাম্বুলে তুরস্ক এবং জাতিসংঘের মধ্যস্ততায় ইউক্রেনের আটকে পড়া খাদ্যশস্য বিশ্বের বাজারে রপ্তানি করার জন্যে রাশিয়ার সাথে সমঝোতা হয়। এই সমঝোতা অনুযায়ী চার মাসের জন্যে ইউক্রেনের খাদ্যশস্য রপ্তানি করা সম্ভব হবে। ইউক্রেনের বন্দরগুলিতে অনেকগুলি জাহাজ প্রায় ৫ লক্ষ টন শস্য এবং ভোজ্যতেল নিয়ে অপেক্ষা করছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, প্রথমতঃ এই সমঝোতার ফলে ইউক্রেন শস্য বিক্রি করে অতি দরকারী অর্থ পাবে; দ্বিতীয়তঃ এই শস্য দুনিয়ার সবচাইতে দারিদ্রপীড়িত অঞ্চলগুলিতে সরবরাহ করা যাবে; তৃতীয়তঃ এটা ইউক্রেন যুদ্ধের মাঝে প্রথম কূটনৈতিক পদক্ষেপ। অনেকেই এই চুক্তিকে বিশাল একটা বিজয় হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন। বিশেষ করে তুরস্কের ক্ষমতাসীন দল ‘একে পার্টি’ এবং ওয়াশিংটনে জো বাইডেনের মার্কিন প্রশাসন এই পদক্ষেপকে বৈশ্বিক মানবতার জন্যে একটা বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখতে চাইছে। তবে অনেকেই এই সমঝোতাকে দ্রুত সফল হিসেবে দেখানোর ব্যাপারে প্রশ্ন তুলছেন।

সমঝোতার ঠিক আগে আগেই যুক্তরাষ্ট্র এবং ইইউ রাশিয়ার উপর অবরোধের ব্যাপ্তিকে পরিবর্তন করেছে। ১৪ই জুলাই মার্কিন বাণিজ্য দপ্তর খাদ্যশস্য, কৃষি যন্ত্রপাতি, ঔষধ ও মেডিক্যাল যন্ত্রপাতির উপর থেকে অবরোধ তুলে নেয়। এর পাঁচদিন পর ইইউ কিছু ব্যাংকের উপর থেকে অবরোধ সরিয়ে নেয়, যারা রাশিয়ার সাথে খাদ্যশস্য, সার ও অন্যান্য কৃষিজ দ্রব্যের বাণিজ্যের সাথে জড়িত।

ব্রাসেলস ভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’ বা ‘আইসিজি’র এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, ২৩শে জুলাই ইউক্রেনের ওডেসা বন্দরে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা দেখিয়ে দিচ্ছে যে, এই শস্য রপ্তানির সমঝোতাকে রাশিয়া তার যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে দেখতে চায় না। আর এই সমঝোতায় রাজি হবার পুরষ্কার হিসেবে জাতিসংঘ রাশিয়ার সাথে আলাদাভাবে আরেকটা চুক্তি করেছে, যা মোতাবেক রাশিয়াও তার শস্য এবং রাসায়নিক সার পশ্চিমা অর্থনৈতিক অবরোধ এড়িয়ে বিশ্ব বাজারে বিক্রি করতে পারবে। ক্রেমলিন এই চুক্তিকে রাশিয়ার জন্যে একটা বড় বিজয় হিসেবেই দেখছে।

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘দ্যা আটলান্টিক কাউন্সিল’এর এক লেখায় ইউক্রেনের পার্লামেন্ট সদস্য ওলেকসি গোঞ্চারেঙ্কো বলছেন যে, এই সমঝোতার পরেও সকলকে রুশ ‘ব্ল্যাকমেইল’ মোকাবিলা করতেই হবে। তার মতে, যদি পশ্চিমারা হুমকি দেয় যে, শস্য রপ্তানি বন্ধ করে দিতে চাইলে পশ্চিমারা কৃষ্ণ সাগরের রুশ নৌবহরকে ধ্বংস করে দেবে, শুধুমাত্র তাহলেই রাশিয়া হয়তো এই সমঝোতাকে বাস্তবায়িত হতে দেবে। তিনি ইউক্রেনের জন্যে পশ্চিমাদের আরও অস্ত্র সরবরাহের মাঝেই শস্য রপ্তানির সমুদ্রপথ খোলা রাখার সমাধান দেখছেন। ‘কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পীস’এর এক লেখায় রুশ বিশ্লেষক আলেক্সান্দ্রা প্রোকোপেঙ্কো বলছেন যে, এই সমঝোতা রাশিয়ার জন্যে অনেক সুবিধা বয়ে আনলেও রাশিয়া বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, একটা বিষয়ে ছাড় দেয়ার অর্থ এই নয় যে, তারা পুরো ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থানকে নরম করেছে। মস্কো যেকোন সময়েই এই সমঝোতা থেকে বের হয়ে যেতে পারে। তবে অবরোধকে বাইপাস করার মাধ্যমে রাশিয়া তার নিজস্ব কৃষিখাতের জন্যে যন্ত্রপাতি আমদানির চেষ্টা করতে পারে। ২০২১ সাল পর্যন্ত রাশিয়ার ৭৫ শতাংশ কৃষি যন্ত্রপাতি জার্মানি ও নেদারল্যান্ডস থেকে আসতো।

গবেষণা সংস্থা ‘গ্রো ইন্টেলিজেন্স’এর জ্যেষ্ঠ গবেষক জনাথন হাইন্স ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’কে বলছেন যে, প্রথম জাহাজে করে লেবাননে যে ২৬ হাজার টন ভুট্টা রপ্তানি করা হয়েছে, তা প্রকৃতপক্ষে ২ কোটি টন শস্যের তুলনায় নিতান্তই তুচ্ছ। তুচ্ছ পরিমাণ সরবরাহের অর্থ হলো এর ফলশ্রুতিতে বিশ্বের বাজারে খাদ্যশস্যের মূল্য কমে যাচ্ছে না; অথবা বৈশ্বিক খাদ্য সমস্যার সমাধানও দ্রুতই হয়ে যাচ্ছে না। আর ইউক্রেনে আটকে পড়া বেশিরভাগ শস্যই হলো জীবজন্তুর খাবার; মানুষের খাবার নয়। এই পরিস্থিতি আফগানিস্তান এবং সোমালিয়ার মতো অঞ্চলের মানুষের ক্ষুধাকে দুর্ভিক্ষের দিকে ঠেলে দেবে। ঐসব দেশে মূল্যস্ফীতির কারণে খাদ্য এবং জ্বালানি মানুষের সামর্থের বাইরে চলে গেছে। লেবাননের ‘বেকা ফারমার্স এসোসিয়েশন’এর প্রধান ইব্রাহিম তারচিচি বলছেন যে, ইউক্রেনের শস্য হয়তো এখানকার বাজারে শস্যের সরবরাহ বৃদ্ধি করবে। কিন্তু ২০১৯ সালের পর থেকে লেবাননের অর্থনীতি কমপক্ষে ৫৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে! দেশের নিজস্ব মুদ্রার মান এতটাই কমে গেছে যে, এখানকার তিন চতুর্থাংশ মানুষই এখন দারিদ্র সীমার নিচে অবস্থান করছে। আর এর মূলে রয়েছে দেশটার রাজনৈতিক কোন্দল এবং মারাত্মক দুর্নীতি। এমতাবস্থায় ইউক্রেনের শস্য আমদানি এখানকার অর্থনীতিতে তেমন কোন প্রভাব ফেলবে না। তারচিচি মনে করছেন যে, ব্যবসার খরচ যতদিন বৃদ্ধি পাবে, আর মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কমতে থাকবে, ততদিন এই সমস্যার সমাধান হবে না। মানবাধিকার সংস্থা ‘মার্সি কোর’ বলছে যে, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আটার মূল্য ২’শ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে! বিশ্বব্যাংকের ১’শ ৫০ মিলিয়ন ডলারের ঋণের উপর ভর করে দেশটা ৬ থেকে ৯ মাসের জন্যে শস্য কিনছে। ইউক্রেনের শস্য রপ্তানি কোন চ্যারিটি নয়। কাজেই মানবিক চাহিদা নয়, বরং যেখানে ভালো মূল্য পাওয়া যাবে, সেখানেই এই শস্য বিক্রি হবে। একারণেই প্রথমে শস্য পাওয়াটা নির্ভর করবে মানবিকতার উপর নয়, বরং ব্যবসায়িক স্বার্থের উপর।

ইউক্রেন এবং রাশিয়া উভয়েই শস্য রপ্তানির সমঝোতা থেকে অর্থনৈতিক অবরোধ এড়াবার সুবিধা নিতে চাইছে; কেউই এখানে চ্যারিটি করছে না। অপরদিকে ‘আইসিজি’র বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, তুরস্কের ক্ষমতাসীন ‘একে পার্টি’ আশা করছে যে, ২০২৩ সালের নির্বাচনের আগে ইউক্রেনের শস্য রপ্তানির সমঝোতা তাদের জন্যে ভালো কিছু বয়ে আনতে পারে। তবে অন্যরা মনে করছে যে, প্রেসিডেন্ট এরদোগান পররাষ্ট্রনীতির সফলতা দেখিয়ে অর্থনৈতিক দৈন্যদশা থেকে মানুষের দৃষ্টি সড়াতে চাইছেন। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইইউ তাদের নিজ অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে রাশিয়াকে ছাড় দিয়েছে। কিন্তু যেহেতু এই সমঝোতার কারণে খাদ্যশস্যের আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা এখনই দূরীভূত হয়ে যাচ্ছে না এবং রাশিয়া যেহেতু এই সমঝোতার দীর্ঘমেয়াদী নিশ্চয়তা দেয়নি, তাই যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা বিশ্বের জন্যে এখনই উল্লসিত হবার মতো কিছু ঘটেনি। অপরদিকে দরিদ্র দেশগুলির জনগণের সামনে ব্যাপক মূল্যস্ফীতির চাপ ও ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের মাঝে কৃষ্ণ সাগরের শস্য রপ্তানির সমঝোতা খুব কমই অর্থ বয়ে আনবে।