Friday, 18 March 2022

ইউক্রেনের কাদায় আটকে গেছে রুশ সেনাবাহিনী?

১৯শে মার্চ ২০২২

ইউক্রেনের কাদায় আটকে যাওয়া রুশ ট্যাংক ফেলে দিয়ে গেছে রুশ সেনারা। যেহেতু পুতিন এই আবহাওয়ার সমস্যাগুলিকে একেবারেই আগ্রাহ্য করেছেন, তার অর্থ হলো তিনি নিশ্চয়ই ইউক্রেনের প্রতিরোধ করার সক্ষমতাকে একেবারেই নিচু করে দেখেছেন; আর রুশ সেনাবাহিনীর যুদ্ধ সক্ষমতাকেও যথেষ্ট বড় করে দেখেছেন। রুশ সেনাবাহিনী হয়তো সামনের দিনগুলিতে সিরিয়ার অভিজ্ঞতাগুলিকেই কাজে লাগাতে চাইবেন। সেটা বাস্তবায়িত হলে শহরের ভিতরে হাতাহাতি লড়াই অত্যন্ত ভয়ঙ্কর রূপ নিতে পারে।

 
ইউক্রেন যুদ্ধের তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও যুদ্ধের শেষ পরিণতি কি হবে, সেব্যাপারে কেউই নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারছে না। দেশটার পূর্বের শহর খারকিভের যুদ্ধ পরিস্থিতির বর্ণনা কঠিন সংঘাতের কথা বলছে। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, রুশ সেনারা সেখানে আর্টিলারি শেল এবং রকেট নিক্ষেপ করছে; আর ইউক্রেনের সেনারা পশ্চিমাদের সরবরাহ করা ট্যাংক বিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহার করে সেগুলির খালি বাক্স দিয়ে উঁচু স্তূপ তৈরি করছে। যুদ্ধের প্রথম ক’দিনে ইউক্রেনের সেনারা হতবিহ্বল ছিল; তারা ঠিক বুঝতে পারছিলো না যে, তারা কি করবে। তবে তিন সপ্তাহ যুদ্ধের পর তারা মোটামুটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, তারা যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। ইউক্রেনের সরকারি হিসেবে ১৬ই মার্চ পর্যন্ত খারকিভে মোট ২’শ ৩৪ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে। তবে যে ব্যাপারটা কারুরই দৃষ্টি এড়িয়ে যায় না, তা হলো গভীর পুরু কাদার স্তর। হাঁটতে গেলেই কাদার মাঝে ডুবে যায় জুতা। শীতের শেষে বরফ গলতে শুরু করলেই এই কাদার ব্যাপারটা সামরিক অপারেশনের ক্ষেত্রে মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে জানা যাচ্ছে যে, রুশ বাহিনীর অনেক গাড়ি, এমনকি ট্যাংক এবং সাঁজোয়া যানও অত্যন্ত গভীর কাদার মাঝে আটকে যাচ্ছে। ইউক্রেনের সেনাদের প্রতিরোধ সক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে সাথে এই কাদার ব্যাপারটা রুশদেরকে যুদ্ধের ফলাফল নিশ্চিত করতে বাধা দিচ্ছে।

‘এএফপি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, বরফ গলার পর ইউক্রেনের পাকা রাস্তা ছাড়া বাকি সকল রাস্তাই চলাচলের অনুপযোগী হয়ে গিয়েছে। গত দু’শ বছরে ন্যাপোলিয়ন এবং হিটলারের অধীনে সেনাবাহিনীকে কাদার সমস্যা মোকাবিলা করতে হয়েছিল। বছরে দু’বার এই এলাকার রাস্তাগুলি কাদায় ভরে যায়। সাধারণ মানুষ এই কাদাকে বলে ‘রাসপুতিতসা’। পশ্চিমারা অনেকেই এই কাদাকে সন্মান করে ‘জেনারেল মাড’ বলে থাকে। যুদ্ধের আগে পশ্চিমা বিশ্লেষকদের অনেকেই ধারণা করছিলেন যে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন হয়তো আবহাওয়ার কথা চিন্তা করে ইউক্রেনে অপারেশনের সময় পিছিয়ে দেবেন। ২০২১এর নভেম্বরেই ‘ব্লুমবার্গ’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল যে, বসন্তের কাদা রুশ অপারেশনের সময় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্লেষকেরা পুতিনের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে নিশ্চিত হতে না পারলেও আবহাওয়ার ব্যাপারে তাদের আগাম সতর্কবার্তা পুরোপুরি সঠিক ছিল। ফেব্রুয়ারি মাসে যুদ্ধের আগে ‘ইউএস ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর স্পেনসার মেরেডিথ এক লেখায় বলেন যে, ইউক্রেনের সেনারা যদি পাকা রাস্তাগুলি ধ্বংস করে ফেলে, তাহলে বসন্তের শুরুতে রুশ সেনাদের চলাচল খুবই কঠিন হবে। ইউক্রেনের সামরিক বিশ্লেষক মাইকোলা বেলেস্কভ বলছেন যে, অনেক ক্ষেত্রেই রুশ সেনারা মাঠের মাঝে তাদের ট্যাংক এবং অন্যান্য গাড়ি আটকে যাবার পর পায়ে হেঁটে রওয়া দিতে বাধ্য হয়েছে। এই অবস্থাটা আরও খারাপ হবে যখন আবহাওয়া আরও একটু উষ্ণ হবে এবং এর সাথে বৃষ্টি যুক্ত হবে। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, মার্চের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে শুরু হয়ে তিন থেকে চার সপ্তাহ পর্যন্ত এই কাদার অবস্থা চলে। সাবেক ফরাসি সামরিক অফিসার মিশেল গোইয়া বলছেন যে, কাদার কারণে রুশ জেনারেলরা হয়তো বাধ্য হবে তাদের বাহিনীকে মূল রাস্তাগুলির উপর সীমাবদ্ধ রাখতে। এর ফলশ্রুতিতে রুশ গাড়িগুলির ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর হামলার শিকার হবার সম্ভাবনা আরও বেড়ে যাবে।

 

মার্কিন মিডিয়া ‘এনবিসি’ বলছে যে, ইউক্রেনের দক্ষিণের শহর মারিউপোলে একটা ভবনের উপর বড় করে লেখা ছিল ‘চিলড্রেন’, যা স্যাটেলাইট ছবিতে পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছিলো। কিন্তু গত ১৬ই মার্চ এই ভবনটা রুশরা বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়। শহরের নেতৃস্থানীয়রা বলছে যে, ভবনে অনেক নারী এবং শিশু ছিল। বিশ্লেষকেরা কেউ কেউ বলতে শুরু করেছেন যে, হয়তো তার সেনাবাহিনী যখন কাদায় আটকে গেছে, খাদ্য ও জ্বালানি স্বল্পতার মাঝে পতিত হচ্ছে, এবং সেনাদের মাঝে হতাহতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে, তখন ইউক্রেনের জনগণের মনোবল ভেঙ্গে দেয়ার জন্যে পুতিন চেচনিয়া এবং সিরিয়ার অমানবিক কৌশলের দিকেই দৃষ্টি দেবেন।

‘ব্লুমবার্গ’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সাম্প্রতিক ইতিহাসে কোন একটা দেশের জন্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক ট্যাংক ধ্বংসী অস্ত্র পেয়েছে ইউক্রেন। এর মাঝে রয়েছে ব্রিটিশদের সরবরাহ করা ৩ হাজার ৬’শ ১৫টা ‘এনএলএডব্লিউ’ বা ‘এন’ল’ স্বল্প পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র; জার্মানি দিচ্ছে ১ হাজার ক্ষেপণাস্ত্র; নরওয়ে ২ হাজার; সুইডেন ৫ হাজার; আর যুক্তরাষ্ট্র দিয়েছে অজানা সংখ্যক জ্যাভেলিন দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র। এর বাইরেও আরও দেশ ট্যাংক বিধ্বংসী অস্ত্র দিয়েছে। ব্রিটেনের ‘এন্ড্রুজ ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর ফিলিপস ওব্রায়েন বলছেন যে, অনেক দেশই নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত খালি করে ইউক্রেনকে সরবরাহ করেছে। এগুলি যোগ হয়েছে ইউক্রেনের নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্রের সাথে। ‘এন’ল’ এবং ‘জ্যাভেলিন’ উভয় ক্ষেপণাস্ত্রই ট্যাঙ্কের উপর থেকে হামলা করে, যেখানে বর্ম সবচাইতে কম থাকে। ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্সের উপর ভর করে প্রতিরক্ষা ওয়েবসাইট ‘ওরিক্স’ বলছে যে, রুশরা কমপক্ষে ২’শ ১৪টা ট্যাংক হারিয়েছে; সব ধরনের মিলিয়ে গাড়ি হারিয়েছে ১২’শ ৯২টা। ইউক্রেন হারিয়েছে কমপক্ষে ৬৫টা ট্যাংক এবং মোট ৩’শ ৪৩টা গাড়ি।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডার্টমাউথ কলেজ’এর প্রফেসর জেসন লাইল এক টুইটার বার্তায় বলছেন যে, যুদ্ধে ইউক্রেন সেনাবাহিনীর চারটা ঘোড়সওয়ার যোদ্ধা রয়েছে – ‘জ্যাভেলিন’ ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, ‘স্টিংগার’ বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, কাদার প্রতিরোধ ‘রাসপুতিতসা’ এবং সোশাল মিডিয়া দিয়ে প্রচারণা চালনার জন্যে ‘টিকটক’। ‘জেমসটাউন ফাউন্ডেশন’এর পাভেল ফেলগেনহাউয়ার বলছেন যে, ইউক্রেনে কেউ কেউ ‘জ্যাভেলিন’ ক্ষেপণাস্ত্রকে ‘সেইন্ট জ্যাভেলিন’ ডাকতে শুরু করেছে! আর অনেকেই মনে করছেন যে, যেহেতু পুতিন এই আবহাওয়ার সমস্যাগুলিকে একেবারেই আগ্রাহ্য করেছেন, তার অর্থ হলো তিনি নিশ্চয়ই ইউক্রেনের প্রতিরোধ করার সক্ষমতাকে একেবারেই নিচু করে দেখেছেন; আর রুশ সেনাবাহিনীর যুদ্ধ সক্ষমতাকেও যথেষ্ট বড় করে দেখেছেন। ফেলগেনহাউয়ার বলছেন যে, রুশ সেনাবাহিনীর বেশিরভাগ জেনারেল সিরিয়াতে যুদ্ধ করেছেন। সেখানে আলোপ্পো এবং হমস শহরে মারাত্মক বোমা হামলার পাশাপাশি শহরের ভিতরে যুদ্ধ করার জন্যে সেনাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল। তারা হয়তো সামনের দিনগুলিতে সেই অভিজ্ঞতাগুলিকেই কাজে লাগাতে চাইবেন। সেটা বাস্তবায়িত হলে শহরের ভিতরে হাতাহাতি লড়াই অত্যন্ত ভয়ঙ্কর রূপ নিতে পারে।

Tuesday, 15 March 2022

ইউক্রেন যুদ্ধ … দুই সপ্তাহ ধরে রুশ বিমান বাহিনী নিরুদ্দেশ!

১৫ই মার্চ ২০২২

 

রুশদের অত্যাধুনিক 'সুখোই ৩৪' বোমারু বিমানকে সাধারণ আনগাইডেড বোমা বহণ করতে দেখা যাচ্ছে। অনেকেই মনে করতে শুরু করেছেন যে, রুশদের ‘প্রিসিশন গাইডেড মিউনিশন’ বা ‘পিজিএম’ বা নিখুঁতভাবে আঘাতে সক্ষম গোলাবারুদএর ঘাটতি রয়েছে। 


ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতে অনেকেই মনে করেছিলেন যে, রুশ বিমান বাহিনী খুব দ্রতই ইউক্রেনের আকাশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে। কিন্তু যুদ্ধের দুই সপ্তাহেও রুশ বিমান বাহিনীর আনাগোণা বেশ কমই দেখা গেছে বলে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আসা বিভিন্ন রিপোর্টে বলা হচ্ছে। রুশ প্রতিরক্ষা দপ্তরের পত্রিকা ‘ক্রাসনায়া জুয়েজদা’র এক লেখায় রুশ বিমান বাহিনীর উপপ্রধান লেঃ জেনারেল সের্গেই দ্রোনভ বলেন যে, এবছরের মাঝে রুশ বিমান বাহিনী ‘সুখোই ৩৫’, ‘সুখোই ৩০’, ‘সুখোই ৫৭’ এবং ‘সুখোই ৩৪’সহ ৬০টারও বেশি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান পেতে যাচ্ছে। ২০০৯ সাল থেকে ২০২০এর মাঝে তারা ৪’শ ৪০টা নতুন যুদ্ধবিমান এবং কয়েক হাজার মনুষ্যবিহীন ড্রোন পেয়েছে। কিন্তু দ্রোনভের কথাগুলি ইউক্রেনের আকাশে প্রতিফলিত হতে দেখা যায়নি; যেখানে রুশ দ্রুতগামী ফাইটার বিমানগুলিকে বেশ কমই উড়তে দেখা গেছে; সেটাও মূলতঃ একটা বা দু’টা বিমান হিসেবে, একেবারে কম উচ্চতায় এবং রাতের বেলায়। যুদ্ধের প্রথম মুহুর্তেই রুশ ব্যালিস্টিক এবং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ইউক্রেনের বিমান ঘাঁটি, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার এবং বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রগুলিকে টার্গেট করে ছোঁড়া হয়। ‘দ্যা ইকনমিস্ট’ বলছে যে, মার্কিন ইন্টেলিজেন্স ছাড়াও ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে জানা যাচ্ছে যে, ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখনও কর্মক্ষম রয়েছে। ‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’এর হিসেবে রুশ বিমান বাহিনীতে রয়েছে প্রায় দেড় হাজার যুদ্ধবিমান; ইউক্রেনের রয়েছে ১’শরও কম। রুশরা ইউক্রেনের সীমানার কাছাকাছি প্রায় ৩’শ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করলেও সেগুলির কতটুকু সফল ব্যবহার হয়েছে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়ে গেছে।

খারকিভ শহরের ৬ই মার্চের এক সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাচ্ছে যে, দু’টা বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের মতো বস্তু আকাশের দিকে উড়ে গিয়ে বড় আকারের বিস্ফোরণ তৈরি করেছে। লন্ডনের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক থমাস উইদিংটন এই ভিডিওটা দেখে বলছেন যে, প্রথম ক্ষেপণাস্ত্রটা খুব সম্ভবতঃ টার্গেট মিস করেছে; তবে দ্বিতীয়টা সরাসরি আঘাত করেছে। একই ঘটনার আরেকটা ভিডিও ফুটেজে দেখা যাচ্ছে যে, আকাশ থেকে একটা বিমান জ্বলন্ত অবস্থায় ভূপাতিত হচ্ছে। এই ঘটনাটা খুব সম্ভবতঃ মধ্যম পাল্লার রাডার নিয়ন্ত্রিত ক্ষেপণাস্ত্রের কাজ ছিল; হয়তো ‘বুক’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। এসব ক্ষেপণাস্ত্রের নিয়ন্ত্রক রাডার থেকে বাঁচার জন্যেই রুশ বিমানগুলি খুব সম্ভবতঃ নিচু দিয়ে উড়ছে। তবে এভাবে একটা সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে তারা আরেকটা সমস্যার জন্ম দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা ইউক্রেনকে ‘স্টিংগার’ ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে। ইনফ্রারেড নিয়ন্ত্রিত এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি কাঁধের উপর থেকে ছোঁড়া যায়, যা নিচু দিয়ে ওড়া বিমানের ইঞ্জিনের তাপকে টার্গেট করে। এই একই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ১৯৮০এর দশকে আফগান মুজাহিদরা ৩’শ সোভিয়েত হেলিকপ্টার এবং ১’শ ফাইটার বিমান ধ্বংস করে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা দপ্তরের প্রকাশ করা একটা ভিডিও ফুটেজে দেখা যাচ্ছে যে, একটা ‘স্টিংগার’ ক্ষেপণাস্ত্রের দ্বারা একটা ‘এমআই ৩৫’ এটাক হেলিকপ্টার ধ্বংস হচ্ছে।

 

ইউক্রেনের 'স্টিংগার' ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভূপাতিত হচ্ছে রুশ 'এমএই ৩৫' এটাক হেলিকপ্টার। নিচু দিয়ে উড়ে রুশ বিমানগুলি হয়তো মধ্যম পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের হাত থেকে বাঁচবে, কিন্তু স্বল্প পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের শিকারে পরিণত হবে; যেগুলি এখন মার্কিনীরা ইউক্রেনিয়ানদের সরবরাহ করছে।


রুশদের ‘পিজিএম’এর সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে কি?

রুশ বিমানগুলির নিচু দিয়ে ওড়ার আরেকটা কারণ থাকতে পারে; তা হলো বিমানগুলির বহণকৃত গোলাবারুদ। সাম্প্রতিক সময়ে রুশ বিমান বাহিনী বেশকিছু ‘প্রিসিশন গাইডেড মিউনিশন’ বা ‘পিজিএম’ বা নিখুঁতভাবে আঘাতে সক্ষম গোলাবারুদ পেলেও এগুলির ব্যবহার এখনও খুব বেশি নয়। ব্রিটিশ থিংকট্যাঙ্ক ‘রয়াল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইন্সটিটিউট’ বা ‘রুসি’র বিশ্লেষক জাস্টিন ব্রঙ্ক এক লেখায় বলছেন যে, সিরিয়াতেও রুশ বিমান বাহিনী ব্যাপক হারে সাধারণ আনগাইডেড বোমা এবং আনগাইডেড রকেট ব্যবহার করেছে। বেশিরভাগ ‘পিজিএম’ ব্যবহার করেছিল রুশ ‘সুখোই ৩৪’ বোমারু বিমানগুলি। কিন্তু সেগুলিও অনেক ক্ষেত্রেই আনগাইডেড গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে। এর মাধ্যমে ধারণা করা যেতে পারে যে, রুশ বিমান বাহিনীর খুব বেশি পাইলট ‘পিজিএম’এর ব্যাপারে জ্ঞান রাখে না। আর হয়তো তাদের ‘পিজিএম’এর সরবরাহ এবং মজুদও খুব একটা বড় নয়। ইউক্রেনের চেরনিহিভ শহরে একটা ‘সুখোই ৩৪’ বোমারু বিমানের ধ্বংসাবশেষের সাথে সাধারণ আনগাইডেড বোমা দেখা যায়। রুশ রাষ্ট্রীয় মিডিয়ার ছবিগুলিতেও ‘সুখোই ৩৪’ বিমানে আনগাইডেড বোমা শোভা পেয়েছে। চেরনিহিভ এবং খারকিভ শহরেও অবিস্ফোরিত আনগাইডেড বোমা পাওয়া গেছে। তবে রুশদের ‘পিজিএম’ কম ব্যবহার করার আরেকটা সম্ভাব্য কারণ দেখাচ্ছেন মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘সিএনএ’এর বিশ্লেষক মাইকেল কফম্যান। তিনি বলছেন যে, হয়তো রুশরা সামনের দিনগুলিতে ব্যবহারের জন্যে অথবা আরও বড় কোন যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে ‘পিজিএম’ জমিয়ে রাখছে। আনগাইডেড বোমা ব্যবহারের ফলে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তার বর্ণনা দিচ্ছেন ‘রয়াল এরোনটিক্যাল সোসাইটি’র টিম রবিনসন। তার মতে এখন রুশ পাইলটদের সামনে দু’টা পথ খোলা রয়েছে। প্রথমতঃ নিচু দিয়ে উড়ে স্বল্প পাল্লার বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের শিকার হওয়া; অথবা দ্বিতীয়তঃ দূর থেকে আনগাইডেড বোমা ছোঁড়া; যাতে টার্গেটে আঘাত করার সম্ভাবনা অনেকটাই কম হবে।

ডাচ প্রতিরক্ষা ওয়েবসাইট ‘ওরিক্স’এর বিশ্লেষক স্টাইন মিতজার এবং অন্যান্যরা সোশাল মিডিয়া খুঁজে প্রথম দুই সপ্তাহ পর্যন্ত ১১টা রুশ যুদ্ধবিমান, ১১টা হেলিকপ্টার এবং ২টা ড্রোন ধ্বংসের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছেন। সে সময় পর্যন্ত ইউক্রেনের সরকার দাবি করেছে যে, তারা মোট ৩৯টা যুদ্ধবিমান এবং ৪০টা হেলিকপ্টার ধ্বংস করেছে। ‘কিংস কলেজ লন্ডন’এর রব লী মনে করছেন যে, যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহে ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস না করতে পারাটা রাশিয়ার জন্যে একটা মস্তবড় ভুল ছিল। এর ফলশ্রুতিতে রুশ বিমানগুলি নির্বিঘ্নে ইউক্রেনের আকাশে টহল দিতে সক্ষম হবে না। রুশ বোমারু বিমানগুলিও সেনাবাহিনীকে সহায়তা দিতে সক্ষম হবে না। সার্ভেইল্যান্স এবং আগাম ওয়ার্নিং দেয়া বিমানগুলিকেও এক্ষেত্রে দূরে অবস্থান করতে হবে; যার ফলশ্রুতিতে ইন্টেলিজেন্স প্রবাহে ঘাটতি পড়বে।

ভূপাতিত একটা রুশ 'সুখোই ৩৪' বোমারু বিমানের ধ্বংসাবশেষ দেখানো হচ্ছে। রুশ বিমান বাহিনীর পাইলটদের ট্রেনিং যথেষ্ট কিনা, তা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। 'পিজিএম' যদি কমও থাকে, তাহলে আকাশ নিয়ন্ত্রণকারী ফাইটার বিমানের তো ওড়ার কথা ছিল। হয়তো রুশ জেনারেলরা রুশ বিমান বাহিনীর এই দুর্বলতাগুলিকে ইউক্রেনের আকাশে দেখাতে চাইছেন না; কারণ এতে করে বাইরের বিশ্বের কাছে রুশদের সক্ষমতার যে ছবিখানা রয়েছে, তার সাথে বাস্তবতার দূরত্ব চোখে পড়বে।


নির্বিচার বোমাবর্ষণ আসছে কি?

কানাডার ‘রয়াল মিলিটারি কলেজ’এর প্রফেসর ওয়াল্টার ডর্ন মার্কিন মিডিয়া ‘সিবিএস’কে বলছেন যে, যদি রুশরা ইউক্রেনের আকাশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতো, তাহলে সেটা ভালোভাবেই বোঝা যেতো। কারণ তখন রুশ সেনাবাহিনী খুব সহজেই বিমানবাহিনীকে তাদের সহায়তায় ডাক দিতে পারতো; এবং তখন বিমান হামলায় ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর প্রতিরোধ ভেঙ্গে পড়তো। ‘রুসি’র জাস্টিন ব্রঙ্ক রুশ বিমান বাহিনীর কম কার্যক্ষমতার কিছু ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। রুশ সেনাবাহিনীর বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সাথে বিমান বাহিনীর বিমানগুলির সমন্বয় খুবই খারাপ বোঝা যাচ্ছে। কারণ সেনাবাহিনীর গাড়িগুলি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পাল্লার বাইরে অপারেট করছে। এমনকি রুশ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রাডারগুলি অনেক ক্ষেত্রেই বেকার বসে ছিল; যেসময় ইউক্রেনের তুর্কি নির্মিত ‘বায়রাকতার টিবি২’ ড্রোনগুলি রুশ সেনাবাহিনীর ক্ষতিসাধন করেছে। সিরিয়ার যুদ্ধে রুশরা হয়তো তাদের একটা বড় অংশ ‘পিজিএম’ ব্যবহার করে ফেলেছে। যার ফলশ্রুতিতে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে মোতায়েন করা বেশিরভাগ বিমানই হয়তো সাধারণ আনগাইডেড বোমা দ্বারা সজ্জিত হয়েছে। ‘পিজিএম’ ব্যবহার করার জন্যে ‘টার্গেটিং পড’ বা একধরণের ইলেকট্রনিক ক্যামেরা সজ্জিত টার্গেটিং সিস্টেম দরকার হয়; যেগুলি রুশদের কতগুলি রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এগুলি ছাড়া সাধারণ বোমা দিয়ে ইউক্রেনের শহরাঞ্চলে আক্রমণ করতে গেলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এবং হত্যাযজ্ঞ হবে নিঃসন্দেহে। সেটা করার আগে রুশ বিমান বাহিনী হয়তো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে। এধরণের বাছবিচার ছাড়া বোমাবর্ষণ রুশরা সিরিয়ার আলেপ্পো এবং হমস শহরে করেছিল। ব্রঙ্ক মনে করছেন যে, ইউক্রেনেও সেরকমই কিছু অপেক্ষা করছে।

তবে ‘পিজিএম’ না থাকলেও আকাশ নিয়ন্ত্রণকারী ফাইটার বিমানগুলি তো অপারেট করার কথা। রুশ বিমান বাহিনীর কাছে বর্তমানে ৮০টার মতো অত্যাধুনিক ‘সুখোই ৩৫এস’ ফাইটার বিমান এবং ১’শ ১০টার মতো ‘সুখোই ৩০এসএম২’ ফাইটার বিমান রয়েছে। ব্রঙ্ক বলছেন যে, এই বিমানগুলির তো ইউক্রেনের আকাশ থেকে ইউক্রেনের বিমান বাহিনীকে মুছে ফেলার কথা। তার ধারণা, হয়তো রুশ বিমান বাহিনীর বিমানগুলি রুশদের নিজস্ব বিমান প্রতিরক্ষার সাথে সমন্বয় করে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসের সাথে অপারেট করতে সক্ষম নয়। কারণ এধরণের অপারেশনে পশ্চিমাদের মাঝেও নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে নিজেদের বিমান ভূপাতিত হবার বহু উদাহরণ রয়েছে। এধরণের অপারেশনে দক্ষ হতে গেলে যথেষ্ট ভালো সমন্বয় ছাড়াও চমৎকার যোগাযোগ এবং নিয়মিত ট্রেনিংএর প্রয়োজন। কিন্তু তারপরেও ইউক্রেনের বিমান বাহিনীর ক্ষুদ্র সম্পদের বিরুদ্ধে এই বিমানগুলিকে ব্যবহার না করাটা সত্যিই আশ্চর্যজনক।

হয়তো রুশ পাইলটরা যথেষ্ট ট্রেনিংএর সুযোগ থেকে বঞ্চিত। খুব একটা নির্দিষ্ট করে বলা না গেলেও বিভিন্ন রুশ প্রতিবেদন থেকে ধারণা করা যায় যে, রুশ পাইলটরা গড়ে এক বছরে ১’শ থেকে ১’শ ২০ ঘন্টা ওড়ার সুযোগ পায়। এর মাঝে পরিবহণ বিমানও রয়েছে, যেগুলি সাধারণতঃ ফাইটার বিমানের চেয়ে বেশি সময় ওড়ে। কাজেই রুশ ফাইটার পাইলটরা হয়তো বছরে ১’শ ঘন্টার কমই পায় ওড়ার জন্যে। অপরদিকে মার্কিন এবং ব্রিটিশ ফাইটার পাইলটরা ১’শ ৮০ থেকে ২’শ ৪০ ঘন্টা ওড়ার পরেও, এবং সিমুলেটরে যথেষ্ট সময় কাটাবার পরেও বলছে যে, তাদের দক্ষতা কমে যাচ্ছে। কাজেই গত এক দশকে কয়েক’শ নতুন যুদ্ধবিমান রুশ বিমান বাহিনীতে যুক্ত হলেও তাদের পাইলটদের সেগুলিকে দক্ষতার সাথে ব্যবহার করতে পারার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে। এমতাবস্থায় ব্রঙ্ক মনে করছেন যে, রুশ জেনারেলরা হয়তো রুশ বিমান বাহিনীর এই দুর্বলতাগুলিকে ইউক্রেনের আকাশে দেখাতে চাইছেন না; কারণ এতে করে বাইরের বিশ্বের কাছে রুশদের সক্ষমতার যে ছবিখানা রয়েছে, তার সাথে বাস্তবতার দূরত্ব চোখে পড়বে।

রুশ বিমান বাহিনীর সক্ষমতা ভ্লাদিমির পুতিনের সময় যথেষ্টই বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই সক্ষমতাকে যাচাই করার একটা পরীক্ষাগার ছিল সিরিয়ার যুদ্ধক্ষেত্র। যদি সক্ষমতাগুলি সেখানে পরীক্ষিত হয়, তাহলে দুর্বলতাগুলিও বেরিয়ে আসবে; সেটাই স্বাভাবিক। রুশ বিমান বাহিনীর পাইলটদের ট্রেনিং নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বিস্তর। বিশেষ করে নিখুঁতভাবে টার্গেটে হামলা করার জন্যে ‘পিজিএম’এর উপর দক্ষতার যেমন ঘাটতি রয়েছে, তেমনি কেউ কেউ বলছেন যে, ‘পিজিএম’এর সরবরাহেও ঘাটতি থাকতে পারে। অন্ততঃ সিরিয়ার শহরগুলিতে নির্বিচার আনগাইডেড বোমা নিক্ষেপ করে রুশরা পশ্চিমা ইন্টেলিজেন্সের এই সন্দেহটাকেই আরও শক্তিশালী করেছে। তথাপি ইউক্রেন যুদ্ধে রুশদের বিমান বাহিনীর যথেষ্ট ব্যবহার না করার কারণ নিয়ে পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা মোটেই একমত নয়। তবে তারা ইউক্রেনের যুদ্ধে সামনের দিনগুলিতে সিরিয়ার মতো নির্বিচার বোমাবর্ষণের ব্যাপারে যে ভবিষ্যৎবাণী করছেন, তা যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তাহলে রুশদের ব্যাপারে তাদের সন্দেহগুলি আরও শক্ত ভিত পাবে। এই মুহুর্তে পশ্চিমাদের ভুল প্রমাণিত করার মতো যথেষ্ট প্রমাণ রুশরা দেখাতে পারেনি; যা কিনা ইউক্রেনের যুদ্ধে রুশদের সাফল্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।

Sunday, 13 March 2022

ইউক্রেন যুদ্ধ … বৈশ্বিক খাদ্যসংকট ধেয়ে আসছে!

১৩ই মার্চ ২০২২

কেউ কেউ মনে করছেন যে, পশ্চিমা দেশগুলি মিশরকে এই অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পারে। কিন্তু তারা একইসাথে মিশরের নিজস্ব কৃষিজ উৎপাদন বৃদ্ধির কথা বলছেন। অর্থাৎ পশ্চিমা বিশ্বই যখন করোনা মহামারি এবং সাম্প্রতিক জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ভয়াবহ সমস্যার মাঝ দিয়ে যাচ্ছে, তখন তাদের মিশরসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যের রক্ষাকর্তা হবার ধারণাটা অবাস্তবই বটে। বাম্পার ফলনের বছরেও কোটি কোটি মানুষ যখন না খেয়ে থাকছে, তখন তা পুঁজিবাদী অর্থনীতির বৈশ্বিক বন্টন ব্যবস্থার অসারতাকেই তুলে ধরে।

ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বে খাদ্যদ্রব্যের মূল্য ২০১১ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ অবস্থানে উঠেছে। যুদ্ধ শুরুর এক সপ্তাহ আগের তুলনায় ১০ই মার্চ নাগাদ আন্তর্জাতিক বাজারে গমের মূল্য ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্কিন কৃষি দপ্তরের হিসেবে রাশিয়া বিশ্বের সবচাইতে বড় গম রপ্তানিকারক দেশ; ইউক্রেন হলো এক্ষেত্রে চতুর্থ। ‘ওইসি’র হিসেবে ২০১৯ সালে রাশিয়া এবং ইউক্রেন মিলে বিশ্বের মোট রপ্তানিকৃত গমের সাড়ে ২৫ শতাংশ সরবরাহ করেছিল। আর এই দুই দেশ গোটা বিশ্বের গম এবং বার্লি রপ্তানি বাজারের এক-তৃতীয়াংশ সরবরাহ করে থাকে। ইউক্রেন ভুট্টা এবং সূর্যমুখী তেলেরও বড় জোগানদাতা। এছাড়াও এই দুই দেশ বিশ্বের রাসায়নিক সারের একটা বড় উৎস। যুদ্ধটা যেভাবেই শেষ হোক না কেন, করোনা মহামারির ঠিক পরেই এই যুদ্ধের ফলে বিশ্বের বহু দেশে খাদ্যের অভাব দেখা দিতে পারে বলে মনে করছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের ‘কমিটি অন ওয়ার্ল্ড ফুড সিকিউরিটি’র প্রধান গ্যাব্রিয়েল ফেরেরো ডে লোমা ওসোরিও ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’কে বলছেন যে, করোনা আসার আগেই বিশ্বে ৬৬ কোটির বেশি মানুষ খাদ্যাভাবের মাঝে ছিল। করোনার পর এটা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৮২ কোটিতে।

ইউক্রেনের অনেক বন্দরেই অপারেশন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে; আজভ সাগর অঞ্চলে জাহাজ চলাচলই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ওলেগ উসতেনকো ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’এর এক লেখায় বলছেন যে, ইউক্রেনে গম চাষ শুরুর সময় হলো মার্চের প্রথম ১০ দিনের মাঝে; আর গমের চারা রোপণ শেষ করতে হবে এপ্রিলের শেষ সপ্তাহের আগেই। যুদ্ধের জন্যে যেহেতু মার্চের অর্ধেক শেষ হয়ে গেছে, তাই স্বাভাবিক হিসেবে গমের চাষ এবছরে আর সম্ভব হবে না। গম চাষে সবচাইতে উপযোগী অঞ্চলগুলিতেই এখন যুদ্ধ চলছে। আর অদূর ভবিষ্যতে মাইন এবং অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ না সরিয়ে এই অঞ্চলে চাষাবাদ করা যাবে না।

জাতিসংঘের ডে লোমা ওসোরিও বলছেন যে, বাংলাদেশ তাদের মোট গম আমদানির অর্ধেকই রাশিয়া এবং ইউক্রেন থেকে আনতো। তবে ‘এরাব নিউজ’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, এর চাইতেও বড় হুমকির মাঝে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকার দেশগুলি এবং আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলি, যারা মূলত কৃষ্ণ সাগরের অপেক্ষাকৃত কমদামি খাদ্যশস্যের উপরেই নির্ভর করেছে এতোদিন। অত্র অঞ্চলের লেবানন, মিশর, তিউনিসিয়া, ইয়েমেন এবং সুদানের মতো দেশগুলিতে গম থেকে তৈরি খাদ্যই প্রধান খাদ্য। এই দেশগুলি আরও আগ থেকেই মূল্যস্ফীতি, অর্থসংকট এবং সংঘাতের কারণে খাদ্যঘাটতির মাঝে ছিল। লেবাননের কর্মকর্তারা ধারণা করছেন যে, তাদের গমের মজুত খুব বেশি হলে একমাস টিকবে। দেশটার ৬০ শতাংশ গম আসে ইউক্রেন ও রাশিয়া থেকে। বৈরুতের রাস্তায় অনেকেই রুটির জন্যে আটা মজুত করার উদ্দেশ্যে অন্যান্য খাবার তৈরি ও বিক্রি করা বন্ধ করে দিয়েছে। বৈরুতের এক গবেষণা সংস্থার প্রধান রিয়াদ সাদে মনে করছেন যে, এমন একটা সময় চলে এসেছে, যখন মানুষ রুটির জন্যে বিদ্রোহ করতে পারে। অপরদিকে ইয়েমেন তাদের চাহিদার ৯০ শতাংশ গমই আমদানি করে; তাই সেখানে মারাত্মক দুশ্চিন্তার সৃষ্টি হয়েছে। যুদ্ধ এবং খরার কারণে দেশটায় দুর্ভিক্ষের অবস্থা চলছে কয়েক বছর ধরে। সিরিয়তে গৃহযুদ্ধের পর থেকে জাতিসংঘের হিসেবে ৯০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করছে। জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম’এর এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ডেভিড বীসলি বলছেন যে, অর্থাভাবে তারা সিরিয়াতে ৮০ লক্ষ মানুষের জন্যে খাবার রেশন অর্ধেক করেছেন; আরও কমানো হবে। ঠিক ঐ মুহুর্তেই ইউক্রেনের যুদ্ধ শুরু হলো। ইউক্রেন এবং রাশিয়া থেকে তারা তাদের অর্ধেক গমের সরবরাহ আসতো।



মিশরে ২০২০এর এপ্রিল থেকে ২০২১এর ডিসেম্বরের মাঝে সেখানে ৮০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। আর সাম্প্রতিক সময়ে গমের মূল্য ৫০ শতাংশ বেড়েছে। মিশর হলো বিশ্বের সবচাইতে বড় গম আমদানিকারক দেশ। ‘এসএন্ডপি গ্লোবাল’এর হিসেবে গত জানুয়ারিতে মিশর ৩৫ লক্ষ টন গম কিনেছে। তাদের ৮০ শতাংশ গমই ইউক্রেন ও রাশিয়া থেকে এসেছে। দেশটার হাতে এই মুহুর্তে ৪ মাসের গম মজুত রয়েছে। প্রেসিডেন্ট সিসির সরকার ইতোমধ্যেই বলে দিয়েছে যে, তারা রুটির উপর ভর্তুকি কমিয়ে মূল্য বৃদ্ধি করতে যাচ্ছে। অবস্থাটা মিশরের অর্থনীতির জন্যে অস্তিত্বের সংকট সৃষ্টি করেছে বলে বলছেন ‘মিডলইস্ট ইন্সটিটিউট’এর অর্থনীতিবিদ মাইকেল টানচুম। রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তুরস্কে খাবার তেলের মূল্য ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে; আর জনগণ সূর্যমুখী তেল মজুত করতে শুরু করেছে। যুদ্ধরত রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে তুরস্কের ৭০ শতাংশ খাবার তেল আসে।

‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা বলছে যে, তিউনিসিয়ার প্রায় অর্ধেক আমদানিকৃত গম আসে ইউক্রেন থেকে। গমের মূল্য সেখানে ১৪ বছরের মাঝে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে। সেদেশে সরকার রুটির মূল্য নির্ধারণ করলেও সকলেই মনে করছেন যে, তাদের জীবনের উপর মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব পড়বেই। মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, ঋণের বোঝার কারণে তিউনিসিয়ার অর্থনীতি আরও আগ থেকেই ধুঁকে চলছিল। ‘ডব্লিউএফপি’র মুখপাত্র আবীর এতেফা বলছেন যে, এবছরে বিশ্বে চাহিদার চাইতে বেশি গম উৎপাদন হয়েছে। কিন্তু রাশিয়া ও ইউক্রেনকে বাদ দিয়ে যেখান থেকে গম আসতে হবে, তাতে সময় এবং পরিবহণ খরচ উভয়ের উপরেই চাপ পড়বে। মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকা অঞ্চল বহুদিন ধরেই রাজনৈতিক এবং সামাজিক অস্থিরতার মাঝ দিয়ে যাচ্ছে; যার মূলেই রয়েছে ধ্বসে পড়া অর্থনীতি; বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্যের মূল্য নাগালের বাইরে চলে যাওয়া। এতেফা বলছেন যে, খাদ্যনিরাপত্তা ব্যাহত হলে জনগণের মাঝে অস্থিরতা এবং সহিংসতার আশংকা বৃদ্ধি পাবে। ইউক্রেন যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটা সংঘাতের সৃষ্টি করছে। মাইকেল টানচুম মনে করছেন যে, পশ্চিমা দেশগুলি মিশরকে এই অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পারে। কিন্তু তিনি একইসাথে মিশরের নিজস্ব কৃষিজ উৎপাদন বৃদ্ধির কথা বলছেন। অর্থাৎ পশ্চিমা বিশ্বই যখন করোনা মহামারি এবং সাম্প্রতিক জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ভয়াবহ সমস্যার মাঝ দিয়ে যাচ্ছে, তখন তাদের মিশরসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যের রক্ষাকর্তা হবার ধারণাটা অবাস্তবই বটে। বাম্পার ফলনের বছরেও কোটি কোটি মানুষ যখন না খেয়ে থাকছে, তখন তা পুঁজিবাদী অর্থনীতির বৈশ্বিক বন্টন ব্যবস্থার অসারতাকেই তুলে ধরে।

Saturday, 12 March 2022

'আফগানিস্তানের পর...'

 ১২ই মার্চ ২০২২

আলহামদুলিল্লাহ!
আমার ষষ্ঠ বই প্রকাশিত হলো।

'আফগানিস্তানের পর... - কাবুল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পলায়ন এবং এর ভূরাজনৈতিক ফলাফল' 



বই-এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে কিছুটা ধারণা এই বর্ণনা থেকে পাওয়া যাবে -


-----------------------------------------------------------------------------------------------


"২০২১এর শেষ ছয় মাসে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলির মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান থেকে পলায়ন ছিল সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে ইউরেশিয়াতে শুরু হয়েছে শূণ্যস্থান পূরণের প্রতিযোগিতা; পূর্ব ইউরোপের দেশগুলি রাশিয়ার হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রকে পাশে পাবে কিনা, তা নিয়ে নিশ্চিত নয়; মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি নিজেদের নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে ইস্রাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের মতো জনবিরোধী কাজে নিমজ্জিত হয়েছে; মার্কিন বন্ধুরা যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভর করতে পারছে না। আফগানিস্তান থেকে পলায়নের ঘটনা অভ্যন্তরীণভাবে বিভক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক শক্তির যতটুকু অবশিষ্ট ছিল, তার অনেকটুকুই নিঃশেষ করে ফেলেছে।

করোনা মহামারিতে পরীক্ষামূলক সমাধানকে জোরপূর্বক বাস্তবায়ন করতে গিয়ে মানুষের অর্থনৈতিক দৈন্যতা পশ্চিমা জীবনব্যবস্থার অধীন বিশ্বকে করেছে দিশেহারা। ধনী হয়েছে আরও ধনী; দরিদ্র হয়েছে আরও বেশি দরিদ্র। পুঁজিবাদের বিদায় ঘন্টা বাজলো বলে! এর সাথে পশ্চিমা রাজনৈতিক ব্যবস্থাও হচ্ছে প্রশ্নবিদ্ধ। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারেরাই মানুষের ধর্মীয় অধিকার, বাকস্বাধীনতা, মানবাধিকার কেড়ে নিচ্ছে। গণতন্ত্র মানুষের জীবনের সমাধান তো দিতেই পারেনি, বরং গণতান্ত্রিকভাবেই নতুন সমস্যাগুলির সৃষ্টি হয়েছে। ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধি নিয়োগই যে গণতন্ত্র নয়, সেটা এখন যেন কেউই জানেন না। প্রতিনিধি নিয়োগ নয়, বরং প্রতিনিধিদের তৈরি করা আইন নিয়েই যে সমস্যা, সেটাই এখন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা"।

-----------------------------------------------------------------------------------------------

 




আপডেটঃ ১৬ই মার্চ ২০২২

বইটি এখন  রকমারি ডট কমে পাওয়া যাচ্ছে।

 https://www.rokomari.com/book/231858/afghanistaner-por---

 

এছাড়াও বইটি কুরিয়ারের মাধ্যমে ডেলিভারির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যারা অর্ডার করতে ইচ্ছুক, তারা নিচের ফেসবুক পেইজে পুরো ঠিকানা এবং ফোন নম্বরসহ 'ইনবক্স' করুন। পেমেন্ট করতে হবে বিকাশে। ডেলিভারি চার্জ ফ্রি। অর্থাৎ বইএর মূল্যের বাইরে কোন চার্জ দিতে হবে না।  


https://www.facebook.com/k360bd/ 

-----------------------------------------------------------------------------------------------
 
লেখক - আহমেদ শরীফ

প্রকাশক - মুহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম, ড্রিমস পাবলিকেশনস, টাঙ্গাইল

প্রথম প্রকাশ - ফেব্রুয়ারি ২০২২ 

প্রচ্ছদ - তৌহিদুল ইসলাম

বিন্যাস ও অলংকরণ - মোঃ আবদুর রহিম

মুদ্রণ - প্রিন্টটেক প্রিন্টিং প্রেস

পৃষ্ঠা সংখ্যা - ৩৪০; হার্ড কভার 

মূল্য - ৯০০/- (নয়শত টাকা মাত্র) 

ISBN : 978-984-35-2023-4
 -------------------------------------------------------------------------------
 











 
 
লেখকের প্রথম পাঁচটা বই না পেয়ে থাকলে এই লিঙ্কগুলি থেকে ঘুরে আসুন - 
 

'বঙ্গোপসাগর আসলে কার? বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের ভূরাজনীতিতিতে বাংলাদেশের অবস্থান'
 
'যুক্তরাষ্ট্রের পর... সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নতুন বিশ্বব্যবস্থার হাতছানি' 

Sunday, 6 March 2022

ইউক্রেন যুদ্ধে শরণার্থী চ্যালেঞ্জ ইউরোপের জাতিগত বিদ্বেষকে সামনে নিয়ে আসছে

০৬ই মার্চ ২০২২

 
‘ইউরোপিয়ান’ শব্দটা একটা কোড হয়ে গিয়েছে। জনগণ কোন সংঘাত নিয়ে মাথা ঘামাবে, সেটার মাপকাঠিও হয়ে গেছে সেটা। সিরিয়া, সোমালিয়া বা অন্যান্য স্থানের ভয়াবহ সংঘাতগুলি পশ্চিমা মিডিয়াতে সেভাবে উঠে আসেনি; যেভাবে ইউক্রেনের যুদ্ধ উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রে আফ্রিকানদের ক্রীতদাস হিসেবে রাখা এবং ইউরোপিয়দের হাতে আফ্রিকার উপনিবেশ তৈরির সেই ইতিহাসগুলিই যেন ইউক্রেনের যুদ্ধের মাঝে নতুন করে দেখা দিচ্ছে। একুশ শতকেও ইউরোপের চিন্তায় জাতিগত বিদ্বেষ শক্তভাবে প্রোথিত রয়েছে।


গত ২৪শে ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেনে সামরিক হামলা শুরু করার পর থেকে বিদেশীরা ছাড়াও বহু ইউক্রেনিয়ান দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। ২৬শে ফেব্রুয়ারি থেকে প্রতিদিন দেড় লাখের বেশি মানুষ দেশ ছেড়েছে। জাতিসংঘের হিসেবে ৬ই মার্চ পর্যন্ত আনুমানিক ১৪ লক্ষাধিক মানুষ ইউরোপের দেশগুলিতে আশ্রয় নিয়েছে। এর মাঝে সর্বোচ্চ প্রায় সাড়ে ৭ লক্ষ গিয়েছে পোল্যান্ডে; হাঙ্গেরিতে দেড় লক্ষ; মলদোভায় ১ লাখের বেশি; স্লোভাকিয়ায় ১ লাখ; রোমানিয়ায় ৬৩ হাজার; রাশিয়ায় ৫৩ হাজার। এছাড়াও আরও অন্যান্য দেশে গিয়েছে প্রায় ১ লক্ষ ৩৪ হাজারের মতো। যুদ্ধের ভয়াবহতার মাঝে এই শরণার্থী চ্যালেঞ্জ ইউরোপের গভীর কিছু সমস্যাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

‘আল জাজিরা’ বলছে যে, পোল্যান্ডে বহু স্বেচ্ছাসেবক সীমান্ত অঞ্চলে আসতে শুরু করেছে ইউক্রেনিয় শরণার্থীদের জন্যে পরিবহণ ও থাকার ব্যবস্থা করার জন্যে। স্বেচ্ছাসেবীরা খাবার, চা এবং পানি নিয়ে শরণার্থীদের জন্যে অপেক্ষা করছে। সোশাল মিডিয়াতে হাজারো মানুষ শরণার্থীদের সহায়তা দেবার জন্যে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। শরণার্থীদের জন্যে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টারও কমতি নেই। শরণার্থীদের ব্যাপারে পোলিশ আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের মহানুভবতায় অনেকেই অবাক হয়েছেন। কারণ গত বছর সেপ্টেম্বর থেকে পোলিশ আইনশৃংখলা বাহিনী বেলারুশের সীমানায় মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকা থেকে আসা শরণার্থীদেরকে জোরপূর্বক দেশে ঢুকতে বাধা দিয়েছিল। সীমান্ত অঞ্চলে মানবিক সহায়তা এবং সাংবাদিকদের পৌঁছাতে বাধা দেয়া হয়েছিল। ফলশ্রুতিতে শতশত মানুষ খোলা আকাশের নিচে থাকতে বাধ্য হয়। প্রচন্ড ঠান্ডায় বেশ ক’জন মৃত্যুবরণও করেছিল। এনজিও ‘গ্রুপা গ্রানিকা’র আনা আলবোথ বলছেন যে, সীমান্ত এলাকায় তারা এতো বেশি খাবার এনে রেখেছিলেন যে, খাবার নষ্ট হচ্ছে। কারণ তাদের আশানুরূপ সংখ্যক শরণার্থী আসেনি। শরণার্থীদের জন্যে চাকুরি, ইউক্রেনিয় ভাষার শিক্ষক এবং ক্লাসরুপে কমপিউটারের ব্যবস্থা করা কষ্টসাধ্য হতে পারে। মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব এন্টনি ব্লিনকেন ৫ই মার্চ পোল্যান্ড সফরকালে বলেন যে, ইউক্রেন যুদ্ধের মানবিক সহায়তা হিসেবে ২ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন সহায়তার জন্যে চেষ্টা করছে হোয়াইট হাউজ।

অপরদিকে ২৬ লক্ষ জনগণের ছোট্ট দেশ মলদোভার প্রধানমন্ত্রী নাতালিয়া গাভরিলিতা জাতিসংঘকে আরও সহায়তা দিতে অনুরোধ করেছেন। তিনি বলছেন যে, ৬ই মার্চ পর্যন্ত মোট ২ লক্ষ ৩০ হাজার মানুষ ইউক্রেন থেকে মলদোভায় ঢুকেছে। এর মাঝে ১ লক্ষ ২০ হাজার এখানে রয়েছে গেছে; যাদের মাঝে ৯৬ হাজার ইউক্রেনিয়। তিনি বলেন যে, মলদোভার মতো ছোট দেশের জন্যে এটা অনেক বড় সংখ্যা।

এদিকে গত ৩রা মার্চ দেশটার উগ্র ডানপন্থী প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান সীমান্ত শহর বেরেগসুরানিতে সাংবাদিকদেরকে বলেন যে, তার দেশ জানে কারা অভিবাসী, আর কারা শরণার্থী। অভিবাসীদেরকে থামিয়ে দেয়া হবে; তবে শরণার্থীদের ঢুকতে দেয়া হবে। অরবান এতদিন যাবত শরণার্থীদের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর নীতিতে ছিলেন। ২০১৫ সালে শরণার্থী ঠেকাতে হাঙ্গেরি সরকার সার্বিয়ার সীমানায় কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছিল। ২০১৬ সালের জুলাইয়ে অরবানের সরকার শরণার্থীদেরকে দেশে ঢুকতে বাধা দিতে নতুন আইন করেছিল। এখন সরকারি সমর্থনে পুরো হাঙ্গেরি থেকে মানবিক সহায়তা দিতে জনগণ সীমান্ত অঞ্চলে আসছে। 


‘ডয়েচে ভেলে’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, মাত্র ছয় সপ্তাহ আগেই পোল্যান্ডের বেলারুশ সীমানায় সিরিয়া, ইরাক এবং আফগানিস্তান থেকে আসা শরণার্থীদের ঠেকাতে দেয়াল তৈরি করা হচ্ছিলো। অথচ এখন হঠাত করেই ইউরোপ তার সীমানা খুলে দিয়েছে। ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন বলছেন যে, শরণার্থীদের আসতে কোন সমস্যা নেই। ইইউ মনে করছে যে, প্রায় ৪০ লক্ষ শরণার্থী ইউক্রেন থেকে আসতে পারে; যা হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইউরোপের সবচাইতে বড় শরণার্থী সমস্যা। ‘ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন রেফেউজিস এন্ড এক্সাইলস’এর ডিরেক্টর ক্যাথারিন উলার্ড বলছেন যে, কতবড় পরিবর্তনই না হয়েছে! তিনি বলছেন যে, ২০১৫ সালে ১০ লক্ষ সিরিয় শরণার্থীর মাঝে কোন দেশকে কতজন রাখতে দেয়া হবে, তা নিয়ে ইইউএর সদস্য দেশগুলির মাঝে মারাত্মক রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হয়েছিল। ইইউএর দেশগুলি এবারে ইউক্রেনিয় শরণার্থীদের কমপক্ষে ১২ মাসের থাকার ব্যাপারে সমঝোতায় পৌঁছেছে। এর মাঝে শরণার্থীদের বাসস্থান, স্বাস্থ্য সুবিধা, শিক্ষা এবং চাকুরির ব্যাপারেও ঐকমত্য হয়েছে। উলার্ড বলছেন যে, ইইউএর দেশগুলির পরিষ্কার দু’মুখো নীতি দৃশ্যমান। ২০১৫ সালে পোল্যান্ড এবং হাঙ্গেরি সিরিয় শরণার্থীদের ঠেকাতে তাদের দক্ষিণের সীমানায় দেয়াল তুলেছিল। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, দেশগুলির অভিবাসন নীতি নির্ভর করেছে ধর্ম, জাতি এবং শরণার্থীদের উৎস দেশের উপর। এই ব্যবস্থা যথেষ্টই পক্ষপাতদুষ্ট।

‘আল জাজিরা’ বলছে যে, পোল্যান্ডের সীমানায় আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং ভারত থেকে আসা শরণার্থীদেরকে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড় করিয়ে রাখা হচ্ছে; কারণ তারা ইউক্রেনের নাগরিক নন। শরণার্থীদের কেউ কেউ বলছেন যে, তাদের সাথে পশুর মতো আচরণ করা হয়েছে। ইউক্রেনের লেভিভ রেলস্টেশনে এক আফ্রিকান মহিলাকে ট্রেন থেকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়া হয় এই বলে যে, শুধু মহিলারাই ট্রেনে উঠতে পারবে! পোলিশ সাহায্য সংস্থা ‘গ্রুপা জাগরানিকা’র স্বেচ্ছাসেবক জ্যান মস বলছেন যে, মেদিকা শহরে শরণার্থীদের ঢোকার সময় তাদেরকে জাতি ভিত্তিতে আলাদা করা হচ্ছিলো। পোলিশ এবং ইউক্রেনিয়দেরকে গাড়ির লাইনে অতি দ্রুততার সাথে যাবার ব্যবস্থা করা হচ্ছিলো। অথচ অন্যদেরকে পায়ে হেঁটে তিন ধাপ পেরিয়ে ঢোকানো হচ্ছিলো, যা ১৪ থেকে ৫০ ঘন্টা পর্যন্ত লাগছিলো।

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ব্রুকিংস ইন্সটিটিউশন’এর এক লেখায় সিনিয়র ফেলো রাশাওন রে বলছেন যে, শ্বেতাঙ্গদের জন্যে ‘ইউরোপিয়ান’ শব্দটা একটা কোড হয়ে গিয়েছে। জনগণ কোন সংঘাত নিয়ে মাথা ঘামাবে, সেটার মাপকাঠিও হয়ে গেছে সেটা। সিরিয়া, সোমালিয়া বা অন্যান্য স্থানের ভয়াবহ সংঘাতগুলি পশ্চিমা মিডিয়াতে সেভাবে উঠে আসেনি; যেভাবে ইউক্রেনের যুদ্ধ উঠে এসেছে। করোনাভাইরাসের টেস্ট, চিকিৎসা এবং ভ্যাকসিন পাবার ক্ষেত্রেও কোন জাতি বা দেশের মানুষদের প্রাধান্য দেয়া হয়েছে, তা সকলেই দেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রে আফ্রিকানদের ক্রীতদাস হিসেবে রাখা এবং ইউরোপিয়দের হাতে আফ্রিকার উপনিবেশ তৈরির সেই ইতিহাসগুলিই যেন ইউক্রেনের যুদ্ধের মাঝে নতুন করে দেখা দিচ্ছে। রাশাওন রেএর কথায় পরিষ্কার যে, একুশ শতকেও ইউরোপের চিন্তায় জাতিগত বিদ্বেষ শক্তভাবে প্রোথিত রয়েছে।