Sunday, 15 August 2021

তালিবান... আবার?

১৬ই অগাস্ট ২০২১ 
১৫ই অগাস্ট হেলিকপ্টার দিয়ে মার্কিন দূতাবাস খালি করার ভিডিও চিত্র দেখা যাচ্ছিল সকল টেলিভিশন চ্যানেলে। ছবিগুলি বিশ্বব্যাপী মার্কিন প্রভাব কমার উদাহরণ হিসেবেই প্রতিফলিত হবে। তবে আলোচনার টেবিলে বসে যুক্তরাষ্ট্র যে ব্যাপারগুলি নিশ্চিত করেছে তার মাঝে রয়েছে আইনের ব্যাপারে তালিবানকে কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দিতে রাজি করানো এবং আন্তর্জাতিক সীমানা অমান্য করে খিলাফত ঘোষণা করা থেকে বিরত থাকা। হেরে গিয়েও যুক্তরাষ্ট্র তালিবানদেরকে দিয়ে তাদের উদ্দেশ্য কিছুটা হলেও বাস্তবায়িত করিয়ে নিয়েছে। তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধরে রাক্ষার জন্যে যথেষ্ট নাও হতে পারে। 


১৫ই অগাস্ট মার্কিনীদের জন্যে যেমন ভুলে যাবার মতো দিন হিসেবে থাকবে, আফগানিস্তানের তালিবানদের জন্যেও ঠিক একইভাবে মনে রাখার মতো দিন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। হেলিকপ্টার দিয়ে মার্কিন দূতাবাস খালি করার ভিডিও চিত্র দেখা যাচ্ছিল সকল টেলিভিশন চ্যানেলে। অনেকেই এর সমান্তরাল টানছিলেন ১৯৭৫ সালের ২৯শে এপ্রিল দক্ষিণ ভিয়েতনামের রাজধানী সায়গন থেকে মার্কিন দূতাবাস খালি করার ঘটনার সাথে। ছবিগুলি বিশ্বব্যাপী মার্কিন প্রভাব কমার উদাহরণ হিসেবেই প্রতিফলিত হবে। অনেকেই অবাক হচ্ছেন এই ভেবে যে, আফগান সেনাবাহিনী প্রায় কোন যুদ্ধ ছাড়াই কিভাবে তালিবানদের হাতে পুরো দেশ ছেড়ে দিল। আর একইসাথে অনেকেই আলোচনা করছেন তালিবানদের চিন্তাধারা, নীতি এবং কর্মকান্ড নিয়ে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, তালিবানদের হাতে আফগান সেনাবাহিনীর পরাজয় প্রায় জানাই ছিল; তবে এটা কতটা দ্রুত হতে পারে, সেব্যাপারে কেউই নিশ্চিত ছিলেন না। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, আফগান সেনাবাহিনীর সদস্যসংখ্যা কাগজেকলমে ৩ লক্ষের মতো হলেও প্রকৃতপক্ষে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা তাদের আয় বৃদ্ধি করার জন্যে সেনাসদস্যের সংখ্যা বেশি দেখাতো। আফগান সেনারা এতটাই কম বেতন পেত যে, তারা তাদের অস্ত্র এবং যন্ত্রপাতি বিক্রি করে দিয়ে সংসার চালাতো। কোন দরকার ছাড়াই বেশি বুলেট ব্যবহার করতো এবং বুলেটের খোসাগুলি ব্জারে বিক্রি করে দিতো। আফগান সেনাবাহিনীর অস্ত্র এবং যন্ত্রপাতি তালিবানরা আফগান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধেই ব্যবহার করেছে। এমতাবস্থায় আফগান সেনাবাহিনীর অস্ত্রসস্ত্র নয়, বরং তাদের যুদ্ধ করার ইচ্ছাশক্তিটাই ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অন্ততঃ গত কয়েকদিনের খবরে এটা পরিষ্কার যে, এই ইচ্ছাশক্তি পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল আফগানিস্তানের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতির উপর।

মার্কিন কূটনীতিবিদ জালমেই খলিলজাদ আফগানিস্তানের একাধিক টেলিভিশনের সাথে সাক্ষাতে বলেছেন যে, এই তালিবান আগের তালিবান নয়; তারা অনেক পরিবর্তিত হয়েছে; বিশেষ করে নারী শিক্ষা, বাকি বিশ্বের সাথে সম্পর্ক এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলিকে থাকতে দেবার ক্ষেত্রে তারা তাদের আগের ভুলগুলি বুঝতে পেরেছে। তবে পশ্চিমা দুনিয়ার অনেকেই খলিলজাদের সাথে একমত নন। তারা মনে করছেন যে, তালিবানরা পশ্চিমা আদর্শ বাস্তবায়ন থেকে বহুদূরে রয়েছে। যেমন, তারা এখনও তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকায় মানুষের উপর প্রচুর করের বোঝা চাপাচ্ছে; স্কুল বন্ধ করে দিচ্ছে; সরকার পরিচালনায় নারী সদস্য রাখছে না; ইত্যাদি। তালিবানরা দোহা আলোচনায় কোন নারী সদস্য বা সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধি রাখেনি বলেও পশ্চিমারা অভিযোগ করেছে। দোহাতে তারা সেকুলার আইনের স্থানে কিছু শরীয়াহ আইন বাস্তবায়নের কথা বলার কারণেও পশ্চিমারা নাখোশ হয়েছে। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘আটলান্টিক কাউন্সিল’এর এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, তালিবানরা যে ব্যাপারটাতে সবচাইতে বেশি অদূরদর্শিতা দেখিয়েছে তা হলো, আফগানিস্তানের জন্যে নির্দিষ্ট কোন লক্ষ্য দেখাতে না পারা। সরকার পরিচালনা, সেবা দেয়া, অথবা আইনের শাসন বাস্তবায়নের কোন পরিকল্পনাই তারা দেখাতে সক্ষম হয়নি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দেশ পুনর্গঠন, ইত্যাদি কোন বিষয়েই তারা নির্দিষ্ট কোন দিকনির্দেশনা দিতে পারেনি।

তালিবান মনে করছে যে, তারা সারা দুনিয়ার মুসলিমদের মাঝে সবচাইতে আলাদা; কারণ তারা যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে হারিয়েছে এবং তাদেরকে দেশ ছাড়ার জন্যে আলোচনায় বসতে বাধ্য করেছে। তবে তালিবানরা রাজনৈতিক লক্ষ্যের ব্যাপারে অপরিপক্বতা দেখিয়েছে। জালমেই খলিলজাদ তালিবানদের পরিবর্তিত হবার কথা বলেছেন, কারণ তালিবান আলোচনার মাধ্যমে ছাড় দেবার প্রবণতা দেখিয়েছে। হেরে যাবার পর যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা ডাকার কোন অধিকারই ছিল না; অথচ তারপরেও তালিবানরা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় বসেছে। তালিবানরা তাদের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে রাশিয়া এবং চীনের সাথে আলোচনা করে তাদেরকে আস্বস্ত করেছে। এই ব্যাপারগুলি ১৯৯০এর দশকের তালিবান থেকে পুরোপুরিভাবে আলাদা। ‘আল জাজিরা’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, বর্তমানের তালিবান মিডিয়া এবং প্রযুক্তির ব্যাপারে যথেষ্ট পরিবর্তিত। তারা নিয়মিতভাবে তাদের বিভিন্ন কর্মকান্ডের ছবি এবং ভিডিও মিডিয়াতে দিচ্ছে; বিভিন্ন ইস্যুতে মিডিয়াতে বিবৃতি দিচ্ছে; ফেইসবুক পেইজ আপডেট দিচ্ছে ঘনঘন। তালিবানরা পুরো আফগানিস্তান জুড়ে সাম্প্রতিক সময়ে যতগুলি শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, সবগুলি শহরই তাদের হাতে এসেছে শান্তিপূর্ণভাবে। তারা কাবুলে ঢোকার আগেও বারংবার ঘোষণা দিয়েছে যে, তারা কোন রক্তপাত ছাড়াই ক্ষমতা হস্তান্তর চায়। আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনির দেশ ছেড়ে পালাবার পর তালিবান যোদ্ধারা আফগান প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেসে প্রবেশ করে। সেখানে তারা লাইভ টেলিভিশনের সামনেই প্যালেসের হস্তান্তর সম্পন্ন করে এবং সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেয়।

তালিবানরা বলছে যে, তারা ইসলামিক আমিরাত তৈরি করতে যাচ্ছে। তারা শরীয়াহর কিছু আইন বাস্তবায়নও করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। তবে আফগানিস্তানের আন্তর্জাতিক বাউন্ডারিগুলি মেনে নিয়ে তারা মূলতঃ জাতিরাষ্ট্রের চিন্তাকেই ভিত হিসেবে তুলে ধরেছে। জুলাই মাসে মস্কোতে তালিবান প্রতিনিধিরা গিয়েছিলেন রাশিয়াকে চিন্তামুক্ত করতে যে, তালিবানরা আফগানিস্তানের সাথে উজবেকিস্তান এবং তাজিকিস্তানের সীমানা মেনে চলবে। একই মাসে মোল্লা আব্দুল গনি বারাদারের নেতৃত্বে আফগান দল বেইজিং ঘুরে এসেছে চীনাদেরকে দুশ্চিন্তামুক্ত করতে। চীনারা যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান প্রস্থানে নিজেদের বিরক্তি প্রকাশ করেছে। তাদের প্রধান দুশ্চিন্তা ছিল আঞ্চলিক নিরাপত্তা। এমতাবস্থায় তালিবান প্রতিনিধিদের বেইজিং গমন চীনের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই মোল্লা বারাদারকেই পাকিস্তান সরকার ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আটক করেছিল যুক্তরাষ্ট্রকে খুশি করতে। আবার ২০১৮ সালে এই বারাদারকেই পাকিস্তান ছেড়ে দিয়েছে কাতাদের রাজধানী দোহায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় নেতৃত্ব দেবার জন্যে। পাকিস্তানই তালিবানকে রাজি করিয়েছে হেরে যাওয়া শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় বসতে। আর এর মাধ্যমে তালিবান তাদের ছাড় দেয়ার মানসিকতা দেখাতে থাকে। ব্রিটেনের ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা বারাদারকে ২০ বছরের যুদ্ধের অবিসংবাদিত বিজয়ী বলে আখ্যা দিয়েছে। কিন্তু এখানে পাকিস্তানের ভূমিকাটা নিঃসন্দেহে সামনে চলে আসে এবং পাকিস্তানের উপর স্থলবেষ্টিত আফগানিস্তানের নির্ভরশীলতাকে তুলে ধরে। আলোচনার টেবিলে বারাদারের ভূমিকা পশ্চিমাদের কাছে ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আলোচনার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র যে ব্যাপারগুলি নিশ্চিত করেছে তার মাঝে রয়েছে আইনের ব্যাপারে তালিবানকে কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দিতে রাজি করানো এবং আন্তর্জাতিক সীমানা অমান্য করে খিলাফত ঘোষণা করা থেকে বিরত থাকা। হেরে গিয়েও যুক্তরাষ্ট্র তালিবানদেরকে দিয়ে তাদের উদ্দেশ্য কিছুটা হলেও বাস্তবায়িত করিয়ে নিয়েছে। তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধরে রাক্ষার জন্যে যথেষ্ট নাও হতে পারে।

Thursday, 12 August 2021

মাদাগাস্কার ... দুই শতকের ব্রিটিশ ফরাসি দ্বন্দ্ব

১২ই অগাস্ট ২০২১
ছবিঃ ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর সাথে মাদাগাস্কারের প্রেসিডেন্ট আন্দ্রি রাজোএলিনা। রাজোএলিনা মাদাগাস্কারে ফ্রান্সের স্বার্থকে দেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে তার বিরোধীরাও যে ব্রিটিশ মার্কিন স্বার্থ দেখেছে, তার প্রমাণও যথেষ্ট। দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন দূরে থাকুক দেশটার ভৌগোলিক অবস্থানের গুরুত্বের কারণে বড় শক্তিদের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় নিমজ্জিত রয়েছে দেশটা। বহুকাল ধরে এখানে মূল খেলোয়াড় ফ্রান্স এবং ব্রিটেন থাকলেও বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন, এবং আরও বিভিন্ন দেশ যুক্ত হয়েছে।


আফ্রিকার দক্ষিণ পূর্ব উপকূলের পাশে পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম দ্বীপ মাদাগাস্কার; যা মালাগাসি বলেও পরিচিত। ২ কোটি ৭০ লক্ষ মানুষের দেশটা রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত রয়েছে। কারণ গত ২০শে জুলাই দেশটার প্রেসিডেন্ট আন্দ্রি রাজোএলিনাকে হত্যা করার একটা ষড়যন্ত্র বানচাল হয়ে গেছে বলে দেশটার সরকারি কর্মকর্তারা বলেন। ছয় ব্যক্তিকে এই ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়; যার মাঝে দু’জন ফরাসি নাগরিক। গ্রেপ্তারকৃতদের মাঝে দু’জন ফরাসি সামরিক বাহিনীতে কাজ করেছেন বলেও উল্লেখ করা হয়। অনেকেই বলছেন যে, এই ঘটনার পিছনে বিদেশী হাত রয়েছে। মাদাগাস্কারে রাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন নয়; এবং সেখানে বিদেশী হস্তক্ষেপও নতুন নয়। দেশটার ইতিহাস জুড়েই রয়েছে বিদেশী ইন্ধনে রাজনৈতিক পালাবদল। তবে আফ্রিকার উপকূলের দরিদ্র এই দেশটার ব্যাপারে অন্যান্য দেশের এত আগ্রহই বা কেন?

মাদাগাস্কারকে নিয়ে ঔপনিবেশিক দ্বন্দ্ব

‘ফিনানশিয়াল টাইমস’এর এক লেখায় কেনিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষক নানজালা নিয়াবোলা প্রশ্ন করছেন যে, মাদাগাস্কার আসলে উপনিবেশিক সময় পার করতে পেরেছে কিনা। তার বিশ্লেষণে দুই দশক ধরে ফ্রাঙ্কোফাইল বা ফরাসি প্রভাবে থাকা গ্রুপের সাথে এংলোফাইল বা ব্রিটিশ-মার্কিন গ্রুপের মাঝে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব চলছে। তবে তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে, এই দ্বন্দ্ব মূলতঃ দুই শতক ধরে ফ্রান্স এবং ব্রিটেনের মাঝে চলা ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা। ২০০২ সালের নির্বাচনে জেতা প্রেসিডেন্ট রাভালোমানানা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে মাদাগাস্কারের জন্যে প্রচুর সহায়তা পান। অপরদিকে রাভালোমানানাকে উৎখাত করতে যেয়ে ২০০৯ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় পুলিশের গ্রেপ্তার এড়াতে বর্তমান প্রেসিডেন্ট রাজোএলিনা ফরাসি দূতাবাসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ফরাসি বার্তাসংস্থা ‘এএফপি’ বলছে যে, ফরাসিরা জাতিসংঘের নির্দেশনাতেই রাজোএলিনাকে রক্ষা করেছিল। দূতাবাসের বাইরে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রাভালোমানানার শতশত সমর্থক বিক্ষোভ করে। নিয়াবোলা বলছেন যে, দু’শ বছর ধরে মাদাগাস্কারের ভাগ্য ঠিক হয়েছে পশ্চিমা রাজধানীগুলিতে।

ঊনিশ শতক থেকে মাদাগাস্কারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফরাসি আর ব্রিটিশদের প্রতিযোগিতা ভীষণ আকার ধারণ করে। ফরাসি ইঞ্জিনিয়ার জঁ লাবোরদা মাদাগাস্কারের রাজ্যের প্রধান ইঞ্জিনিয়াররূপে নিয়োগ পেয়ে যান এবং রাজ পরিবারের জন্যে রাজধানী এনটানানারিভোতে কাঠ দিয়ে ‘রোভা প্যালেস’ তৈরি করে দেন। এর প্রতিযোগিতায় স্কটিশ মিশনারি জেমস ক্যামেরন পাথর দিয়ে প্যালেস নির্মাণ করে দেন। আরেকজন ফরাসি ব্যবসায়ী জঁ ফ্রাঁসোয়াঁ ল্যামবার্ট মাদাগাস্কারের রাজার সাথে একটা বাণিজ্য চুক্তি করেন, যা পরবর্তীতে মাদাগাস্কারকে ফরাসিদের পদানত করতে ব্যবহৃত হয়েছিল। ইউরোপিয় মিশনারিদের প্রভাবে ১৮৬৯ সালে মাদাগাস্কারের রাজা খ্রিস্টধর্মকে রাজ্যের অফিশিয়াল বিশ্বাস বলে ঘোষণা করেন। ইউরোপিয়রা দেশটার শিক্ষা ব্যবস্থা ডিজাইন করে। দেশটার সেনাবাহিনীকে ট্রেনিং দেয়ার দায়িত্ব নেয় ব্রিটিশরা; উদ্দেশ্য ছিল ফরাসিরা যাতে মাদাগাস্কারের নিয়ন্ত্রণ নিতেনা পারে। ব্রিটিশ আইনের আদলে মাদাগাস্কারের আইন তৈরি করা হয়। আদালতগুলিও তৈরি করা হয় ইউরোপিয় আদলে। ১৮৮৩ সালে ল্যাম্বার্ট চার্টার ভঙ্গ করার ছুতো দেখিয়ে ফরাসিরা মাদাগাস্কারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এই যুদ্ধ প্রায় ১৩ বছর ধরে চলে। দ্বীপের উত্তরে কিছু এলাকা দখল করে সেখানে ফরাসিরা দিয়েগো সুয়ারেজ নৌঘাঁটি তৈরি করে। আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে রাজধানী এনটানানারিভো থেকে সমুদ্রে যাবার প্রধান দুই সমুদ্রবন্দর তোয়ামাসিনা এবং মহাজঙ্গ গোলাবর্ষণ করে ফরাসি নৌবাহিনী। তাতেও কাজ না হওয়ায় সেনাবাহিনী প্রেরণ করে রাজধানী এনটানানারিভোর উপর ভারি আর্টিলারি দিয়ে গোলাবর্ষণ করে রানী তৃতীয় রানাভালোনাকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করে ফরাসিরা। ১৮৯৬ সালে ফরাসিরা মাদাগাস্কারকে উপনিবেশ ঘোষণা করে এবং রাজ পরিবারকে দেশত্যাগে বাধ্য করে। এভাবে মাদাগাস্কার পুরোপুরিভাবে ফরাসিদের নিয়ন্ত্রণে আসে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির হাতে ফ্রান্সের পতন হবার পর ব্রিটিশরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ফরাসিদের অধীনে থাকা এলাকাগুলির নিয়ন্ত্রণ নিতে সচেষ্ট হয়। যুক্তি ছিল যে, জার্মানরা এগুলির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে। ১৯৪২ সালে জাপানিরা মাদাগাস্কারে অবতরণ করতে পারে এই ছুতোয় ব্রিটিশরা মাদাগাস্কার দখল করে নেয়। ব্রিটিশরা ফরাসিদের হাতে দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিলেও যুদ্ধ শেষেই ১৯৪৭ সালে মাদাগাস্কারে স্বাধীনতার জন্যে আন্দোলন শুরু হয়। ফরাসিরা শক্ত হাতে এই বিদ্রোহ দমন করে এবং এর প্রায় এক দশক পর মালাগাসিরা শান্তিপূর্ণভাবে ফরাসিদের কাছ থেকে স্বাধীনতা মেনে নিতে বাধ্য হয়। ১৯৬০ সালে মাদাগাস্কারকে স্বাধীন দেশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ফরাসিরাই দেশটার প্রথম প্রেসিডেন্ট ফিলিবার্ট সিরানানাকে নিয়োগ দেয়। ১২ বছর তিনিই দেশ শাসন করেন। তার সময়ে ফ্রান্সের নাগরিকেরাই মাদাগাস্কারের গুরুত্বপূর্ণ অফিসসমূহ নিয়ন্ত্রণ করতো। এর ফলশ্রুতিতে দেশটাতে ব্যাপক আন্দোলন দানা বাঁধে। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত অনেকগুলি অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা যায় নৌবাহিনীর অফিসার দিদিয়ের রাতসিরাকার কাছে। রাতসিরাকা পড়াশোনা করেন প্যারিসে এবং ফরাসি নৌবাহিনীতেই তার ক্যারিয়ার শুরু হয়। তিনি দেশটাকে আপাতদৃষ্টে সমাজতন্ত্রের দিকে ধাবিত করলেও কিছুদিনের মাঝেই তিনি প্রমাণ করেন যে, তিনি ইউরোপকে কখনোই ছেড়ে যাননি। অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়ার পর বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফএর কাছ থেকে ঋণও পায় মাদাগাস্কার। ১৯৯২ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি ক্ষমতা হারালেও ১৯৯৬ সালে তিনি আবারও ক্ষমতায় ফিরে আসেন।
ছবিঃ মাদাগাস্কারের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট রাভালোমানানা। মাদাগাস্কারকে ফরাসি প্রভাবের নেতৃত্ব থেকে বের করে আনার লক্ষ্যে রাভালোমানানার পিছনে বিশ্ব ব্যাংক এবং যুক্তরাষ্ট্রের যথেষ্ট বিনিয়োগ রয়েছে। ২০০২ সালে রাভালোমানানা প্রেসিডেন্ট হন। তবে ২০০৭ সাল থেকেই তিনি ফরাসি সমর্থিত প্রার্থী রাজোএলিনার ব্যাপক প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হন।


একুশ শতকে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা

২০০১ সালের নির্বাচনে রাজধানী এনটানানারিভোর মেয়র মার্ক রাভালোমানানা ক্ষমতায় আসেন। রাভালোমানানা গরীব ঘর থেকে উঠে আসা একজন প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টান; যেখানে মাদাগাস্কারের প্রয়ায় সকল রাজনীতিবিদেরাই মূলতঃ ক্যাথোলিক। মাদাগাস্কারের প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চ মূলত ব্রিটিশদেরই প্রতিষ্ঠা করা। তিনি তার পড়াশোনা করেন প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চের চালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়ার এনজিওগুলির সুবাদে তিনি ইউরোপে পড়াশোনা করেন। দেশে ফিরে তিনি ডেইরির ব্যবসা করেন এবং বিশ্বব্যাঙ্কের ঋণের সুবাদে মাদাগাস্কারের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়ীদের একজন বনে যান। ইউরোপিয় এবং আমেরিকানরা তার ব্যবসায় ব্যাপক বিনিয়োগ করে। তার রাজনৈতিক আকাংক্ষা প্রকাশ পেতে থাকার পরেই রাতসিরাকার সরকারের সাথে তার দ্বন্দ্ব শুরু হয়। রাভালোমানানা ১৯৯৯ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে রাজধানী এনটানানারিভোর মেয়র হন। এরপর ২০০১ সালে ৫১ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট হন। হেরে যাওয়া রাতসিরাকা পেয়েছিলেন ৩৬ শতাংশ ভোট। ২০০৬ সালে দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবার সময় তিনি ৫৫ শতাংশ ভোট পান। তার ব্যবসায়িক শক্তিকে তিনি নির্বাচনে পুরোপুরিভাবে ব্যবহার করেন। অনেকেই মনে করেন যে, রাভালোমানানা মাদাগাস্কারকে ফরাসি প্রভাব থেকে বের করে ব্রিটিশ মার্কিন বলয়ে নেবার চেষ্টা করেছিলেন।

তবে এখানে বাধা হয়ে দাঁড়ান আন্দ্রি রাজোএলিনা। বিলবোর্ড ব্যবসায়ী রাজোএলিনা তার ব্যবসায়িক শক্তিকে ব্যবহার করে রাজনীতিতে ঢোকেন। ২০০৭ সালে ‘ভিভা’ টেলিভিশন কিনে তিনি সরকারের বিরুদ্ধে কাজ করতে শুরু করেন। মাত্র ৩৩ বছর বয়সে তিনি রাজধানী এনটানানারিভোর মেয়র বনে যান। ২০০৮ সালে প্রেসিডেন্ট রাভালোমানানা ‘ভিভা’ টেলিভিশন বন্ধ করে দেন। কিছুদিনের মাঝেই রাজোএলিনা মাদাগাস্কারের বিরোধী রাজনীতিবিদদের একত্রিত করে হাজারো মানুষকে রাস্তায় আন্দোলনে নামান। ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে এক জনসভায় রাজোএলিনা ঘোষণা দেন যে, তিনি এখন থেকে মাদাগাস্কারের নেতৃত্ব দেবেন। মার্চ মাসে সেনাবাহিনী রাজোএলিনার পক্ষ নিলে প্রেসিডেন্ট রাভালোমানানা ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়ে আশ্রয় নেন। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, দক্ষিণ আফ্রিকার এক রেডিওর সাক্ষাৎকারে রাভালোমানানা অভিযোগ করেন যে, রাজোএলিনার মাধ্যমে ফ্রান্স মাদাগাস্কারের নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছে। ২০০৮ সালের জুলাই মাসে রাভালোমানানা প্রেসিডেন্ট থাকার সময় ফরাসি রাষ্ট্রদূত গিলদাস লে লিডেককে দেশ থেকে বের করে দিয়েছিলেন।

রাজোএলিনা ক্ষমতা নিলেও ‘আফ্রিকান ইউনিয়ন’ বা ‘এইউ’ এবং ‘সাউদার্ন আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট কমিউনিটি’ বা ‘এসএডিসি’ এটাকে অভ্যুত্থান বলে আখ্যা দেয়। যুক্তরাষ্ট্র তার মাদাগাস্কার দূতাবাস খালি করতে শুরু করে। আইএমএফ মাদাগাস্কারের ঋণ মুলতুবি করে। ‘রয়টার্স’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, মোজাম্বিকের রাজধানী মাপুতোতে ‘এসএডিসি’র মধ্যস্ততা মেনে নিতে বাধ্য হন রাজোএলিনা; তিনি হন অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট। গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান পরিবর্তন করে প্রেসিডেন্ট হবার বয়স ৪০ বছর থেকে নামিয়ে ৩৫ করা হয়, যাতে রাজোএলিনা পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। তবে রাভালোমানানার পক্ষের গ্রুপের বাধার কারণে রাজোএলিনা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। ২০১৪ সালে রাজোএলিনার সমর্থনে হেরি রাজাওনারিমামপিয়ানিয়া ৫৪ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট হন। তবে ২০১৮ সালে রাজোএলিনা নির্বাচনে অংশ নেন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ব্রিটিশ এবং মার্কিনীদের পছন্দের প্রার্থী রাভালোমানানা। প্রথম ধাপে ৩৯ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ধাপে ৫৬ শতাংশ ভোট পেয়ে রাজোএলিনা প্রেসিডেন্ট হন। রাভালোমানানা পেয়েছিলেন ৪৪ শতাংশ ভোট।

মাদাগাস্কারে ফরাসি প্রভাব এখনও প্রবল

‘ওয়ার্ল্ড কালচার এনসাইক্লোপেডিয়া’র এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, ঊনিশ শতক থেকেই মাদাগাস্কারের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ফরাসি সংস্কৃতিতে আসক্ত হয়ে পড়ে। দেশটার মানুষ মালাগাসি ভাষায় কথা বললেও ১৮৯৬ থেকে ১৯৬০ পর্যন্ত ঔপনিবেশিক সময়ের প্রভাবের কারণে দেশটার অফিশিয়াল ভাষা হলো ফরাসি। বিভিন্ন সময়ে ফরাসি ভাষাকে সরিয়ে দেবার অনেক চেষ্টাই বিফলে গেছে।

‘ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ১৯৪৭ সালে মাদাগাস্কারের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় ফরাসিরা বিদ্রোহীদের উপরে প্রচন্ড নির্যাতন চালায়; যার ক্ষত এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে অনেকে। প্রায় ৯০ হাজার মানুষ সেই আন্দোলনে ফরাসি এবং তাদের ঔপনিবেশিক সেনাদের হাতে মৃত্যুবরণ করে। অত্যাচারের শারীরিক ক্ষত নিয়ে বেঁচে ছিল বাকিরা। অনেকেই মনে করছেন যে, ৬০ বছর পরেও ফ্রান্সের হাত থেকে মুক্ত হতে পারেনি মাদাগাস্কার। ‘লন্ডন স্কুল অব ইকনমিকস’এর ২০১৮ সালের গবেষণায় ‘ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, ডেভিস’এর ওমার গার্সিয়া পনসা এবং ‘প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি’র লেনার্ড ওয়ান্টচেকন ১৯৪৭ সালের ফরাসি অত্যাচারের প্রভাব খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন। তারা বলেন যে, ১৯৪৭ সালের ফরাসি অত্যাচারের কারণে মাদাগাস্কারের জনগণের মাঝ থেকে কথা বলার সাহস হারিয়ে গেছে। অর্থাৎ মাদাগাস্কারের জনগণের সংস্কৃতিটাই পরিবর্তিত হয়ে গেছে। মানুষের মনে যুদ্ধে অংশ নেয়া বীরদের স্মৃতি নয়, বরং ফরাসি বর্বরতাটাই গেঁথে গেছে।

মাদাগাস্কারের ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের প্রায় সকলেই ফ্রান্সে পড়াশোনা করেছেন; নতুবা ফ্রান্সের সাথে তাদের ব্যবসা রয়েছে; নতুবা ফ্রান্সের কোন সংস্থার অধীনে তারা কাজ করেছে। দেশটার স্বাধীনতার ৬১ বছরের মাঝে ৪৮ বছর ক্ষমতা ছিল মাত্র চারজন প্রেসিডেন্টের হাতে। ১২ বছর ক্ষমতায় থাকা দেশটার প্রথম প্রেসিডেন্ট ফিলিবার্ট সিরানানা ফ্রান্সে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৫০এর দশকে ফরাসি পার্লামেন্টে মাদাগাস্কারের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালে ক্ষমতা নেয়া প্রেসিডেন্ট দিদিয়ের রাতসিরাকা ছিলেন ফরাসি নৌবাহিনীর অফিসার। তার বাবাও ফরাসি উপনিবেশের কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি ২১ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। এরপর বাকি ১৫ বছর ভাগাভাগি করেছেন ব্রিটিশ মার্কিনপন্থী রাভালোমানানা এবং ফরাসি প্রভাবে থাকা রাজোএলিনা।
ছবিঃ ভাস্কো দা গামার ভারত মহাসাগরে আসার পথ। ১৯৭০এর দশকের পর থেকে সুয়েজ খালের অপারেশন স্বাভাবিক থাকার কারণে যারা ভাস্কো দা গামার অতিক্রম করা আফ্রিকার দক্ষিণের এই সমুদ্রপথের কথা ভুলেই গিয়েছিলেন, তারা সুয়েজ খালে কনটেইনার জাহাজ ‘এভার গিভেন’এর আটকে যাবার পর বাস্তবতায় ফিরেছেন। তবে গত কয়েক দশকে দক্ষিণ আমেরিকা এবং পশ্চিম আফ্রিকার সাথে চীনের বাণিজ্য বৃদ্ধিও এই সমুদ্রপথকে ব্যস্ত করেছে।



মাদাগাস্কারের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব

মাদাগাস্কার একটা দরিদ্র দেশ; যার মাথাপিছু গড় আয় ১৮’শ ডলারেরও কম। তৈরি পোষাক, মাছ, মসলা, ইত্যাদি দেশটার রপ্তানি পণ্য। বেশিরভাগ শিল্পপণ্য, ভোগ্যপণ্য এবং খাদ্যদ্রব্য আমদানি করেই চলে তাদের। একসময় সবচাইতে বেশি বাণিজ্য ফ্রান্সের সাথে হলেও এখন চীনাদের কাছ থেকেই তারা সবচাইতে বেশি আমদানি করে থাকে। তবে ফ্রান্স এখনও মাদাগাস্কারের পণ্যের সবচাইতে বড় ক্রেতা। দেশের মাত্র ১৫ শতাংশ মানুষ বিদ্যুতের আওতায় রয়েছে বলে বলছে বিশ্বব্যাংক। দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন দূরে থাকুক দেশটার ভৌগোলিক অবস্থানের গুরুত্বের কারণে বড় শক্তিদের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় নিমজ্জিত রয়েছে দেশটা। বহুকাল ধরে এখানে মূল খেলোয়াড় ফ্রান্স এবং ব্রিটেন থাকলেও বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন, এবং আরও বিভিন্ন দেশ যুক্ত হয়েছে।

১৪৯৮ সালে আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে ভাস্কো দা গামার ভারত মহাসাগরে আসার সাথেসাথেই দক্ষিণ আফ্রিকার আশেপাশের অঞ্চলগুলি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়। কারণ এটাই ছিল ইউরোপ থেকে ভারত মহাসাগরে আসার পথ। এই পথের উপরে যেকোন বাণিজ্য, লজিস্টিক্যাল বা সামরিক ঘাঁটি ইউরোপ এবং এশিয়ার মাঝে বাণিজ্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। যোড়শ এবং সপ্তদশ শতকে পর্তুগীজরা পূর্ব আফ্রিকার মাদাগাস্কার, তাঞ্জানিয়া ও কেনিয়ার উপকূলে উপনিবেশ স্থাপন করে। ডাচরা দক্ষিণ আফ্রিকায় বসতি স্থাপন করে ১৬৫২ সালে। ১৭১৫ সালে ফ্রান্স মাদাগাস্কারের পূর্বে মরিশাস দ্বীপ দখল করে। ১৮০৬ সালে ফ্রান্সের সাথে যুদ্ধের ছুতোয় ব্রিটিশরা দক্ষিণ আফ্রিকায় উপনিবেশ স্থাপন করে। এরপর ১৮১০ সালে ব্রিটিশরা ফরাসিদের কাছ থেকে মরিশাস পুনর্দখল করে। লা রিউনিয়ন দ্বীপ দখল করলেও পরে তা ছেড়ে দেয়; যা আজও ফ্রান্সের হাতে রয়েছে। ১৮৮৬ সালে ফরাসিরা মোজাম্বিক চ্যানেলে কমোরুস দ্বীপ দখল করে। আর শেষ পর্যন্ত ১৮৯০এর দশকে ফরাসিরা মাদাগাস্কার দখল করে। ততদিনে অবশ্য সুয়েজ খাল তৈরি হয়ে যাওয়ায় আফ্রিকা ঘুরে বাণিজ্যপথের গুরুত্ব কমে আসে।

১৯৬৭ সালে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ হলে সুয়েজ খাল বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত আট বছর বন্ধ থাকে এই খাল। এসময়ে ইউরোপ এবং এশিয়ার মাঝে যাতায়াত করা সকল বাণিজ্য এবং যুদ্ধজাহাজ দক্ষিণ আফ্রিকা ঘুরে যাতায়াত করে। ২০২১ সালের ২৩শে মার্চ ‘এভার গিভেন’ নামের বিশাল কনটেইনার জাহাজ সুয়েজ খালে আটকে গেলে প্রায় এক সপ্তাহের জন্যে খাল বন্ধ হয়ে যায়। এসময়ে অনেক জাহাজ খালের দু’পাশে আটকে থাকে; কিছু জাহাজ দক্ষিণ আফ্রিকা ঘুরে যাত্রা করে। এই ঘটনা দেখিয়ে দেয় যে, সুয়েজ খালের আশেপাশে যেকোন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কারণে দক্ষিণ আফ্রিকা ঘুরে সমুদ্রপথের গুরুত্ব বেড়ে যেতে পারে। এই মুহুর্তে দক্ষিণ আমেরিকা এবং পশ্চিম আফ্রিকার সাথে চীনের সমুদ্র বাণিজ্যপথ হলো এটা।

মাদাগাস্কারের প্রেসিডেন্ট আন্দ্রি রাজোএলিনাকে হত্যাচেষ্টা আফ্রিকার দক্ষিণের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ নিয়ন্ত্রণের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকেই তুলে ধরে। এই ঘটনা এমন সময়ে ঘটলো, যখন দ্বীপ দেশটার অদূরে মোজাম্বিকের কাবো দেলগাদো অঞ্চলে মুসলিম বিদ্রোহ দমনে বিভিন্ন দেশের সেনারা অবতরণ করছে। মোজম্বিকের উপকূলের গ্যাস খনিগুলি নতুন করে অত্র অঞ্চলের গুরুত্ব বাড়ালেও সমুদ্রপথ হিসেবে এর গুরুত্ব সবসময়েই প্রধান ছিল। ১৯৭০এর দশকের পর থেকে সুয়েজ খালের অপারেশন স্বাভাবিক থাকার কারণে যারা ভাস্কো দা গামার অতিক্রম করা আফ্রিকার দক্ষিণের এই সমুদ্রপথের কথা ভুলেই গিয়েছিলেন, তারা সুয়েজ খালে কনটেইনার জাহাজ ‘এভার গিভেন’এর আটকে যাবার পর বাস্তবতায় ফিরেছেন। তবে গত কয়েক দশকে দক্ষিণ আমেরিকা এবং পশ্চিম আফ্রিকার সাথে চীনের বাণিজ্য বৃদ্ধিও এই সমুদ্রপথকে ব্যস্ত করেছে। দু’শ বছরের ব্রিটিশ ফরাসি দ্বন্দ্বে এখন আরও অনেকেই জড়িত।

Tuesday, 10 August 2021

মোজাম্বিকের সহিংসতা ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে দেখিয়ে দিচ্ছে

১১ই অগাস্ট ২০২১
জুলাই ২০২১। মোজাম্বিকের পথে রুয়ান্ডার সেনারা। গ্যাস নিয়ে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ছাড়াও মোজাম্বিক চ্যানেলের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও দ্বন্দ্ব রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা, পর্তুগাল, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও আরও অনেক দেশ এখন এই সংঘাতের অংশ; প্রত্যেকেরই রয়েছে ভিন্ন রাজনৈতিক লক্ষ্য। আফ্রিকার দেশগুলি এখানে সেনা মোতায়েন করলেও এই মিশনের অর্থনৈতিক ভার বহণের শক্তি বেশিরভাগেরই নেই; যা বলে দেয় যে, এই দেশগুলি মূলতঃ বড় শক্তিগুলির উপরেই নির্ভরশীল থাকবে।


পূর্ব আফ্রিকার দেশ মোজাম্বিকের চলমান গৃহযুদ্ধে রুয়ান্ডার সেনারা বড় বিজয় পেয়েছে। মোজাম্বিক সরকারের পক্ষে যুদ্ধ করতে আসা মধ্য আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডার সেনারা গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বন্দর শহর মোচিমবোয়া দা প্রাইয়া পুনর্দখল করেছে বলে এক টুইটার বার্তায় জানায় রুয়ান্ডার সামরিক বাহিনী। মোজাম্বিকের উত্তরে মুসলিম অধ্যুষিত কাবো দেলগাদো প্রদেশে ২০১৭ সাল থেকে চলছে সহিংসতা। বার্তা সংস্থাগুলি বলছে যে, এখন পর্যন্ত এই যুদ্ধে কমপক্ষে ৩ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং ৮ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, মোজাম্বিকের সেনাবাহিনী এই যুদ্ধের জন্যে একেবারেই প্রস্তুত নয়; তথাপি নিজ দেশে বিদেশী সেনা মোতায়েনের ব্যাপারে মোটেই রাজি ছিল না মোজাম্বিক সরকার। তবে যুদ্ধের বাস্তবতার কাছে হার মেনে গত ১০ই জুলাই ১ হাজার রুয়ান্ডার সেনার প্রথম দলকে মোতায়েনের অনুমতি দেয় মোজাম্বিক সরকার। অবতরণের পর থেকেই রুয়ান্ডার সেনারা সরাসরি যুদ্ধে নামে এবং তারা সাফল্য পাচ্ছিলো বলে খবর আসছিল। বিদ্রোহী গ্রুপগুলি ২০২০এর অগাস্টে মোচিমবোয়া দা প্রাইয়া শহর দখল করে নিয়েছিল। এখন শহরটার পুনর্দখলের পর প্রশ্ন উঠছে যে, এই সাফল্য কতটা স্থায়ী।

‘বিবিসি’র এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, বিদ্রোহীরা খুব সম্ভবতঃ শহর ছেড়ে পালিয়েছে; যার অর্থ হলো, তারা গ্রামাঞ্চলে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখবে এবং আবারও কখনও সুযোগ পেলে যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে। এটা ভাবলে ভুল হবে যে, বিদ্রোহীদের যুদ্ধ করার সক্ষমতা ধ্বংস হয়ে গেছে। ‘ডয়েচে ভেলে’ আবার মনে করিয়ে দিয়েছে অত্র অঞ্চলে রুয়ান্ডার সেনা মোতায়েনের ভূরাজনৈতিক জটিলতা। মোজাম্বিক হলো ‘সাউদার্ন আফ্রিকা ডেভেলপমেন্ট কমিউনিটি’ বা ‘এসএডিসি’ নামের আঞ্চলিক সংগঠনের সদস্য। ‘এসএডিসি’ যখন মোজাম্বিকে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছিল, ঠিক সেসময়েই রুয়ন্ডার সেনারা মোজাম্বিকে নামতে শুরু করে; যা কিনা ‘এসএডিসি’ পছন্দ করেনি। রুয়ান্ডা ১৬ সদস্যের ‘এসএডিসি’র সদস্য নয়। দক্ষিণ আফ্রিকার ‘সিগনাল রিস্ক’এর নিরাপত্তা বিশ্লেষক রায়ান কামিংস বলছেন যে, রুয়ান্ডার সাথে মোজাম্বিকের সামরিক চুক্তি হয়েছিল ২০১৮ সালে। কাজেই মোজাম্বিকে রুয়ান্ডার সেনা মোতায়েনে অবাক হবার কিছু নেই। মোজাম্বিকের প্রেসিডেন্ট ফিলিপ নাইয়ুসি বলেন যে, রুয়ান্ডার সেনারা আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় রুয়ান্ডার প্রেসিডেন্ট পল কাগামি প্রশংসিত হয়েছেন। তবে কামিংস বলছেন যে, রুয়ান্ডার সেনারা ‘এসএডিসি’র নেতৃত্ব মানবে না; তবে ‘এসএডিসি’ এবং ইইউএর সাথে সমন্বয় করে চলবে। মোজাম্বিক চাইছে ‘এসএসডিসি’র সেনারা যেন মোজাম্বিক সরকারের নিয়ন্ত্রের বাইরে চলে না যায়।

‘এসএডিসি’ ১৫ই জুলাই মোজাম্বিকে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়। ২১শে জুলাই থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার স্পেশাল ফোর্সের সেনারা মোজাম্বিকে নামতে শুরু করে। ‘রয়টার্স’ জানাচ্ছে যে, ২৮শে জুলাই দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সাইরিল রামাফোসা মোট ১ হাজার ৪’শ ৯৫ জন সেনা মোজাম্বিকে মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ১৫ই অক্টোবর পর্যন্ত তিন মাসের এই মিশনে প্রায় ৬৬ মিলিয়ন ডলার খরচ হবে বলে জানান রামাফোসা। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার সকলে এত খরচ করে মোজাম্বিকে সেনা মোতায়েনের পক্ষপাতি নন; বিশেষ করে দেশটার অর্থনীতি যখন ধুঁকে ধুঁকে চলছে এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলে যখন রাস্তায় ২৫ হাজার সেনা মোতায়েন করতে হয়েছে। বিরোধী দল ‘ডেমোক্র্যাটিক এলায়েন্স’এর কোবুস মারাইস বলছেন যে, এই মিশন তিন মাসের বেশি স্থায়ী হলে তো খরচ তো আরও বেড়ে যাবে। তিনি সেনা হতাহত হবার আশংকা প্রকাশ করে মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রে মোতায়েন করা সেনাদের কথা মনে করিয়ে দেন। সেখানে বাঙ্গুইএর যুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার ১৫ জন সেনা নিহত হয়েছিল।

‘ভয়েস অব আমেরিকা’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ২৬শে জুলাই বতসোয়ানার ২’শ ৯৬ জন সেনা বিমানে করে মোজাম্বিকের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। ২৭শে জুলাই এঙ্গোলার পার্লামেন্টে ২০ জন সেনা এবং একটা সামরিক পরিবহণ বিমান মোজাম্বিকে প্রেরণের জন্যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তিন মাসের এই মিশনে এঙ্গোলার প্রায় ৫ লক্ষ ৭৫ হাজার ডলার খরচ হবে বলে বলেন এঙ্গোলার মন্ত্রী ফ্রানচিস্কো পেরেইরা ফুরতাদো। ২৯শে জুলাই জিম্বাবুয়ের প্রতিরক্ষামন্ত্রী অপা মুচিংগুরি কাশিরি জানান যে, জিম্বাবুয়ে মোজাম্বিকে ৩’শ ৪ জন সেনা পাঠাচ্ছে। নেদারল্যান্ডসের পৃষ্ঠপোষকতায় চলা মোজাম্বিকের এনজিও ‘আইএমডি’র রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডারসিও আলফাজিমা বলছেন যে, ‘এসএডিসি’র কাছে এখন গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই সংঘাত যেন মোজাম্বিকের সীমানা পেরিয়ে আশেপাশের দেশগুলিতে চলে না যায়।
মোজাম্বিকের কাবো দেলগাদোর অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সমস্যা অনেক পুরাতন; যার সমাধান কেউ দেয়নি। বিশাল গ্যাসের খনির কাজ শুরু হবার পরপরই এখানে সহিংসতা শুরু হয়। এই অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের অর্থনৈতিক বঞ্চনার কারণে সহিংসতার পরিবেশ আরও আগ থেকেই প্রস্তুত হয়েই ছিল। তবে পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থা এখানে স্ফুলিঙ্গ তৈরি করেছে। 


মোজাম্বিকে প্রায় চার বছর ধরে যুদ্ধ চললেও সেনা মোতায়েনের ব্যাপারটা হঠাতই সামনে আসে গত মার্চে, যখন কাবো দেলগাদোর সর্বউত্তরে তাঞ্জানিয়ার সীমানার কাছে পালমা শহর বিদ্রোহীদের দখলে চলে যায়। মাত্র ২’শ বিদ্রোহী সেনা শহরটা দখল করলেও শহরটা ফরাসি তেল কোম্পানি ‘টোটাল’এর প্রকল্পের কাছাকাছি হওয়ায় কোম্পানি তাদের কর্মকান্ড থামিয়ে দেয়। কাবো দেলগাদো মোজাম্বিকের সবচাইতে দরিদ্র এলাকা, যেখানে ৫৩ লক্ষ মুসলিমের বাস। মার্কিন সরকারের হিসেবে এই অঞ্চলেরই উপকূলে পাওয়া গিয়েছে প্রায় ১’শ ৮০ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিটের বিশাল গ্যাস খনি। ফরাসি কোম্পানি ‘টোটাল’এর নেতৃত্বে এখানে ২০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল এলএনজি প্ল্যান্টের কর্মকান্ড চলমান। ইতালিয়ান কোম্পানি ‘এনি’ এবং মার্কিন কোম্পানি ‘এক্সন মোবিল’ও এখানে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। তবে সকলেই তাকিয়ে আছে ‘টোটাল’এর প্রকল্পের সাফল্যের দিকে। মোজাম্বিকের প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শক্তি পর্তুগাল ইতোমধ্যেই মোজাম্বিকের সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রও প্রশিক্ষণে যুক্ত হয়েছে; ইইউও জড়িত হতে যাচ্ছে।

মোজাম্বিকের কাবো দেলগাদোর অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সমস্যা অনেক পুরাতন; যার সমাধান কেউ দেয়নি। বিশাল গ্যাসের খনির কাজ শুরু হবার পরপরই এখানে সহিংসতা শুরু হয়। এই অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের অর্থনৈতিক বঞ্চনার কারণে সহিংসতার পরিবেশ আরও আগ থেকেই প্রস্তুত হয়েই ছিল। তবে পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থা এখানে স্ফুলিঙ্গ তৈরি করেছে। গ্যাস নিয়ে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ছাড়াও মোজাম্বিক চ্যানেলের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও দ্বন্দ্ব রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা, পর্তুগাল, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও আরও অনেক দেশ এখন এই সংঘাতের অংশ; প্রত্যেকেরই রয়েছে ভিন্ন রাজনৈতিক লক্ষ্য। আফ্রিকার দেশগুলি এখানে সেনা মোতায়েন করলেও এই মিশনের অর্থনৈতিক ভার বহণের শক্তি বেশিরভাগেরই নেই; যা বলে দেয় যে, এই দেশগুলি মূলতঃ বড় শক্তিগুলির উপরেই নির্ভরশীল থাকবে।

Sunday, 8 August 2021

ব্যাক্তিস্বাধীনতার ফরাসি সংজ্ঞা আসলে কি?

০৮ই অগাস্ট ২০২১

ব্যক্তিস্বাধীনতার সংজ্ঞা একেকজনের কাছে একেকরকম। নবীকে অপমান করাটা ব্যক্তিস্বাধীনতার মাঝে পড়লেও প্রেসিডেন্টকে অপমান করাটা রাষ্ট্রের কাছে অপরাধ হিসেবে ঠেকেছে। রাষ্ট্রের অঙ্গগুলি, তথা সরকার, আদালত এবং জনগণের মাঝে চিন্তার দৃশ্যমান ফারাক ফ্রান্সের রাষ্ট্রীয় ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ এবং দুর্বল করে ফেলছে।


চার সপ্তাহ ধরে ফ্রান্সের রাস্তায় হাজারো মানুষের বিক্ষোভ। ৭ই অগাস্ট ফ্রান্স জুড়ে প্রায় দুই লক্ষ মানুষ প্রতিবাদ করেছে। তাদের দাবি হলো ফরাসি সরকারের করোনাভাইরাস ‘হেলথ পাস’এর ঘোষণা বাতিল করা। ফরাসি সরকারের প্রজ্ঞাপণ অনুযায়ী জনগণকে বেশিরভাগ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যেতে হলে বা গণপরিবহণে উঠতে হলে করোনাভাইরাস থেকে মুক্ত, এই মর্মে একটা ‘হেলথ পাস’ দেখাতে হবে। এরপর গত ২৯শে জুলাই ফরাসি সরকারের আরেক নির্দেশনায় বলা হয় যে, জনগণকে যেকোন পর্যটন স্থানে বা ৫০ জনের বেশি জমায়েত হয় এমন কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যেতে হলে ‘হেলথ পাস’ দেখাতে হবে। এর আগে থেকেই সিনেমা হল, কনসার্ট হল, থিম পার্কের মতো স্থানে পাস লাগছে। ৯ই অগাস্ট থেকে যেকোন বার, রেস্তোরাঁ বা শপিং মলে যেতে হলে অথবা দূরপাল্লার বিমান, রেলগাড়ি বা বাসে ভ্রমণ করতে হলে এই পাস লাগবে। এই পাসে এমন তথ্য থাকতে হবে, যাতে বহণকারী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত নয়, সেব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়। এতে ভ্যাকসিন নেবার সার্টিফিকেট ছাড়াও মুচলেকা থাকবে যে, গত ৪৮ ঘন্টার মাঝে করোনা পরীক্ষায় তিনি নেগেটিভ ফলাফল পেয়েছেন। শুধু তাই নয়, তিনি গত ৬ মাসের মাঝে করোনায় আক্রান্ত হননি; অথবা আক্রান্ত হয়ে থাকলেও গত ১৫ দিনের আগেই তিনি সুস্থ্য হয়ে উঠেছেন। ফরাসি সরকারের এই সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিযুক্ত, সেব্যাপারে যেমন আলোচনা চলছে, তেমনি এর মাধ্যমে ফ্রান্সের ব্যক্তিস্বাধীনতার সংস্কৃতি কতটা আক্রান্ত হয়েছে, সেটাও আলোচনায় আসছে।

গত ৫ই অগান্সট ফ্রান্সের সর্বোচ্চ আদালতে রায় দেয়া হয় যে, ফরাসি সরকারের ‘হেলথ পাস’এর সিদ্ধান্ত সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। একইসাথে আদালত এই সিদ্ধান্তও দেয় যে, ফ্রান্সের পার্লামেন্টে পাস করা আইনের মাধ্যমে জনগণের উপর যে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে, তা মানুষের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে “ব্যালন্সে রেখেছে”; অর্থাৎ এখানে ব্যক্তিস্বাধীনতা খর্ব হবার বিষয়ে খুব বেশি চিন্তিত হবার কিছু নেই। ‘ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর’ বলছে যে, প্যারিসে আদালতের বাইরে কয়েক’শ মানুষ এই রুলিংএর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। প্রতিবাদকারীরা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ‘হেলথ ডিক্টেটরশিপ’ বা ‘স্বাস্থ্যবিষয়ক একনায়কতন্ত্র’ বলছে। একজন প্রতিবাদকারী জুলিয়েন বেইলি বলছেন যে, তিনি ভ্যাকসিন নিয়েছেন। তবে ভ্যাকসিন নেবার ব্যাপারটা হওয়া উচিৎ ছিল স্বেচ্ছায়; সরকারের চাপে পড়ে নয়। তিনি আশংকা করে বলেন যে, কিছুদিন পর হয়তো সকল কর্মকান্ডের জন্যে ‘কিউআর কোড’ দেখাতে হবে। এটা ব্যক্তিস্বাধীনতার উপর নজিরবিহীন আঘাত।

নতুন আইনে রেস্তোরাঁয় খেতে গেলে ‘হেলথ পাস’ লাগবে। রেস্তোরাঁ মালিকরা বলছেন যে, ক্রেতাদের পাস আছে কিনা, সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তো রেস্তোরাঁর হতে পারে না। হাসপাতালে রুগীকে দেখতে গেলেও পাস লাগবে; অথবা অতি জরুরি নয় এমন কোন মেডিক্যাল সেবা নিতে গেলেও। স্বাস্থ্যকর্মীরা এখন ভ্যাকসিন নিতে বাধ্য। তবে আদালত এই আইনের মাঝে কিছু অংশ বাতিল করেছে; যেমন সরকার চেয়েছিল যে, ‘হেলথ পাস’ না থাকলে চাকুরিদাতা কর্মচারীকে হঠাত করেই বরখাস্ত করতে পারবে; যা আদালত অনুমোদন দেয়নি। তবে অনেক মানুষের সাথে কাজ করতে হয় এমন কোন চাকুরিতে থাকলে চাকুরিদাতা তার কর্মচারিকে বরখাস্ত করতে পারবে। ফরাসি থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইন্সটিটিউট মনটেইন’এর করা এক জনমত জরিপে বলা হচ্ছে যে, ফ্রান্সের ৩৭ শতাংশ জনগণ ‘হেলথ পাস’এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীদের পক্ষে রয়েছে; অন্যদিকে ৪৮ শতাংশ রয়েছে বিপক্ষে। অর্থাৎ একটা বড় সংখ্যক মানুষ এই আইনের বিপক্ষে। আর ৫২ শতাংশ জনগণ প্রতিবাদকারীদের বিপক্ষে নয়। ফরাসি সরকারের হিসেবে দেশের ৫৪ শতাংশ জনগণের এখন পর্যন্ত করোনার টিকা দেয়া সম্পন্ন হয়েছে।

ফ্রান্সে ব্যক্তিস্বাধীনতার সংজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এমন একটা সময়ে, যখন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর ব্যাঙ্গাত্মক ছবি বিলবোর্ডে ছাপাবার কারণে মামলা হয়েছে। গত ২৮শে জুলাই বিলবোর্ডের ব্যবসায় থাকা মিশেল অঙ্গে ফ্লোরি এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, ফরাসি প্রেসিডেন্টের অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে টুলঁ শহরের পুলিশ ডেকে পাঠিয়েছে। তিনি ফ্রান্সকে ‘ম্যাক্রনিয়া’ আখ্যা দিয়ে বলেন যে, এই দেশে নবীকে অপমান করে ছবি আঁকলে সেটাকে ‘স্যাটায়ার’ হিসেবে মেনে নেয়া হয়, কিন্তু প্রেসিডেন্টকে একনায়ক বললে ‘ব্লাসফেমি’ হয়ে যায়। ম্যাক্রঁ যে বিলবোর্ডের ব্যাপারে চিন্তিত, ‘ইউরোনিউজ’ তার বর্ণনা দিয়ে বলছে যে, সেখানে ম্যাক্রঁর একটা ছবিকে পরিবর্তিত করে হিটলারের মতো করে দেখানো হয়েছে এবং ম্যাক্রঁর দলের লোগো পরিবর্তিত করে হিটলারের নাজি পার্টির স্বস্তিকা লোগোর মতো করে আঁকা হয়েছে। এর সাথে লেখা হয়েছে যে, “সকলে আদেশ মান্য কর; ভ্যাকসিন নাও”। টুলঁ শহরে ঢোকার পথে রাস্তার পাশেই দু’টা বিলবোর্ডে ম্যাক্রঁর এই ব্যাঙ্গচিত্র প্রদর্শিত হয়।

ফ্লোরি এমন একটা ইস্যুকে সামনে নিয়ে এসেছেন, যা শুধু ব্যক্তিস্বাধীনতা নয়, ফ্রান্সের রাষ্ট্রীয় চিন্তাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ফ্রান্সের সেকুলার চিন্তাকে রক্ষা করার কথা বলে সেদেশের মুসলিম জনগণকে আইন করে ইসলাম পালনে বাধা দেয়া হচ্ছে। গত জুলাই মাসে ফরাসি সরকারি সংস্থা ‘এসজি সিআইপিডিআর’এর এক টুইটার বার্তায় নতুন করে সেকুলারিজমের উপর একটা মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করার কথা ঘোষণা দেয়া হয়। অনেকেই মনে করছেন যে, এর মাধ্যমে ফ্রান্সের মুসলিম জনগণকে রিপাবলিককে কিভাবে ভালোবাসতে হবে, সেটা শিক্ষা দেয়া হবে। গত ডিসেম্বরে ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেরাল্ড ডারমারিন এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেন যে, ফরাসি রিপাবলিকে মানুষ আল্লাহর ইবাদত করতে পারবে এবং রিপাবলিককে ভালোবাসতে পারবে। কিন্তু এক মুহুর্তের জন্যেও আল্লাহ রিপাবলিকের উপরে নয়।

ফ্রান্সের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা তাদের রাষ্ট্রীয় চিন্তাকে রক্ষা করতে ক্রমাগতভাবেই জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। একারণেই ফ্রান্সের বড় একটা অংশ এখন রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তগুলিকে একনায়কোচিত বলে আখ্যা দিচ্ছে। মুসলিমদের ইসলাম পালনের বিরুদ্ধে সরকারের সিদ্ধান্তগুলির পরপরই এখন ‘হেলথ পাস’এর ইস্যু নিয়ে জনগণের মাঝে ক্ষোভ দানা বাঁধছে। ব্যক্তিস্বাধীনতার সংজ্ঞা একেকজনের কাছে একেকরকম। ফ্লোরি যেভাবে বলেছেন যে, নবীকে অপমান করাটা ব্যক্তিস্বাধীনতার মাঝে পড়লেও প্রেসিডেন্টকে অপমান করাটা রাষ্ট্রের কাছে অপরাধ হিসেবে ঠেকেছে। রাষ্ট্রের অঙ্গগুলি, তথা সরকার, আদালত এবং জনগণের মাঝে চিন্তার দৃশ্যমান ফারাক ফ্রান্সের রাষ্ট্রীয় ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ এবং দুর্বল করে ফেলছে।

Sunday, 1 August 2021

তিউনিসিয়া… গণতন্ত্রের সাফল্যের গল্প?

০৮ই অগাস্ট ২০২১

যুক্তরাষ্ট্র এবং ইইউ একইসাথে সাইয়েদের সমালোচনা করা থেকে বিরত থেকেছে, যা ‘এননাহদা’ এবং তুরস্কের মাঝে সম্পর্কোন্নয়নকে নিরুৎসাহিত করছে। লিবিয়াতে তুরস্কের হস্তক্ষেপ পশ্চিমারা মেনে নিলেও তিউনিসিয়ার ক্ষেত্রে সেটা হয়নি। আরব বসন্তের পর তিউনিসিয়ার তথাকথিত ‘গণতান্ত্রিক সফলতা’ নয়, বরং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতাই দেশটার ভাগ্যের নিয়ন্ত্রক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ পশ্চিমা গণতন্ত্রের আদর্শিক চিন্তার বাস্তবয়নের চাইতে ভূকৌশলগত নিরাপত্তাই এখন পশ্চিমা দেশগুলির কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


গত ২৫শে জুলাই তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট কাইস সাইয়েদ প্রধানমন্ত্রী হিচেম মেচিচিকে বরখাস্ত করে পার্লামেন্ট স্থগিত করেন। পার্লামেন্টে সবচাইতে বড় দল মুসলিম ব্রাদারহুডপন্থী ‘এননাহদা পার্ট’র নেতা স্পিকার রাচেদ ঘানুচি এই ঘটনাকে অভ্যুত্থান বলছেন। এছাড়াও ‘হার্ট অব তিউনিসিয়া’, ‘আত্তায়ার’ এবং ‘আল কারামা’ দলগুলিও এটাকে অভ্যুত্থান বলছে। প্রাক্তন একনায়ক বেন আলির সমর্থক সেকুলার ‘ফ্রি দেস্তুরিয়ান পার্টি’ কোন মন্তব্য করেনি। অপরদিকে পার্লামেন্টে ২’শ ১৭ আসনের মাঝে ১৫ আসন নিয়ে থাকা ‘চাব’ দল প্রেসিডেন্টকে সরাসরি সমর্থন করেছে। প্রেসিডেন্টের পক্ষে এবং বিপক্ষে মানুষ রাস্তায় নেমেছে। এমতাবস্থায় আরব বসন্তের সফল গণতন্ত্র বলে আখ্যা দেয়া তিউনিসিয়া কতটা সফল, সেটা নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা।

‘রয়টার্স’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, তিউনিসিয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক বিবৃতি নির্ভর করেছে কে ইসলামিক দলগুলির কতটা পক্ষে বা বিপক্ষে, সেটার উপর। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলি তিউনিসিয়ার ঘটনায় কি বলবে, তা তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না। ২৬শে জুলাই যুক্তরাষ্ট্র তিউনিসিয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং স্থিতিশীলতার আহ্বান জানায়। তবে এই ঘটনা একটা অভ্যুত্থান ছিল না, সেব্যাপারে কোন কথা বলেনি। তিউনিসিয়ার প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্স তিউনিসিয়ায় আইনের শাসন কায়েমের স্বপক্ষে জোর দেয় এবং সকল রাজনৈতিক দলকে সহিংসতা বর্জন করতে বলে। ইইউ একইসাথে সকল দলকে সংবিধান মেনে চলতে বলে এবং সহিংসতা এড়াতে অনুরোধ করে। জার্মান সরকারের মুখপাত্র সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন যে, এটাকে অভুত্থান বলার ইচ্ছে তাদের নেই। তারা বার্লিনে তিউনিসিয়ার রাষ্ট্রদূতের সাথে কথা বলবেন বলে বলেন। মিশরের সরকার তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তকে ‘ব্রাদারহুড সন্ত্রাসী’দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বলে আখ্যা দেয়। সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান তিউনিসিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ফোন করে দেশটার নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়ন আশা করেন। শুধুমাত্র তুরস্কই তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্টের সরাসরি সমালোচনা করেছে। ক্ষমতাসীন ‘একে পার্টি’র মুখপাত্র ওমের চেলিক এক টুইটার বার্তায় তিউনিসিয়ার ঘটনাকে অভ্যুত্থান বলে আখ্যা দেন। ‘একে পার্টি’র সাথে তিউনিসিয়ার ‘এননাহদা পার্টি’র সম্পর্ক বরাবরই ভালো; যা কিনা ‘ফ্রি দেস্তুরিয়ান পার্টি’সহ অনেকে তিউনিসিয়াতে তুরস্কের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা বলে দেখে। লিবিয়ার যুদ্ধে তুরস্কের হস্তক্ষেপের পর থেকে এই আলোচনা তিউনিসিয়াকে বিভক্ত করেছে।

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইউরেশিয়া গ্রুপ’এর ‘জি জিরো মিডিয়া’র এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, তিউনিসিয়ার মানুষ মনে করছে যে, বর্তমানের রাজনীতিবিদেরা আগের একনায়ক বেন আলি সরকারের রাজনীতিবিদদের মতোই দুর্নীতিবাজ। তারা সকলেই গণতন্ত্রের দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সাধারণ নাগরিকদের জন্যে উন্নততর জীবন দিতে ব্যর্থ হয়েছে। পার্লামেন্টে অনেকগুলি দল থাকার কারণে ভঙ্গুর কোয়ালিশনের মাধ্যমে রাজনীতিবিদেরা দেশ চালিয়েছেন; যার ফলশ্রুতিতে পার্লামেন্টে সিদ্ধান্তহীনতা এবং জনজীবনে অর্থনৈতিক স্থবিরতা দেয়া দিয়েছে; এবং পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার উপরেই জনগণের আস্থা ধ্বসে পড়েছে। গত এক বছর ধরেই তিউনিসিয়ার জনগণ থেকে থেকে রাস্তায় নেমেছে। রাস্তায় মানুষের সংখ্যা গত এক দশকের মাঝে ছিল সর্বোচ্চ। স্থবির অর্থনীতি, বাড়তে থাকা অসমতা, অপ্রতুল জনসেবা এবং চাকুরির সুযোগ কমে যাওয়া মানুষের অসন্তোষের মূল কারণ ছিল। মহামারি শুরু হবার আগেই তিউনিসিয়াতে যুবকদের মাঝে বেকারত্বের হার ছিল ৩৬ শতাংশ! খুব স্বাভাবিকভাবেই তরুণরাই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে। করোনা মহামারি শুরুর পর থেকে অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। তিউনিসিয়ার অর্থনীতিতে পর্যটন একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেখানে বহু মানুষের কর্মসংস্থান ছিল। মহামারির কারণে তা পুরোপুরি ধ্বসে পড়েছে। তিউনিসিয়া থেকে হাজারো মানুষ সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ওপাড়ে ইতালিতে যাচ্ছে; উদ্দেশ্য ইউরোপে কাজ খোঁজা। ২০২০ সালে এরকম অভিবাসী প্রত্যাশীর সংখ্যা পাঁচ গুণ বেড়ে গেছে।

‘ভোক্স’ ম্যাগাজিনের সাথে এক সাক্ষাতে মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’এর সিনিয়র ফেলো সারাহ ইয়ার্কিস তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক কলহের একটা ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করেন। ২০১১ সালে আরব বসন্তের সময় তিউনিসিয়ার একনায়ন জেইন এল আবেদিন বেন আলি সরকারের পতন হলে সেদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের আবির্ভাব হয়। পার্লামেন্টে মাত্র এক চতুর্থাংশ আসন নিয়ে সবচাইতে বড় দল ‘এননাহদা’ পার্টি; যারা মূলতঃ মুসলিম ব্রাদারহুডের চিন্তা বহণ করে। গত এক দশকে তারা সর্বোচ্চ ভোট পেলেও সরকার গঠন করার জন্যে তাদেরকে কোয়ালিশনে যেতে হয়েছে। তাদের বিরোধী হিসেবে রয়েছে প্রাক্তন একনায়ক বেন আলির সমর্থকদের দল ‘ফ্রি দেস্তুরিয়ান পার্টি’, যারা ফ্রান্সের সাথে তিউনিসিয়ার সুসম্পর্কের পক্ষে। আবির মুসির নেতৃত্বে থাকা এই দল পুরোপুরি সেকুলার এবং ‘এননাহদা’র মতো ইসলামিক দলের পুরোপুরি বিপক্ষে। এছাড়াও সেখানে রয়েছে ‘আল কারামা কোয়ালিশন’; যারা ইসলামিক দল এবং তারা মনে করে যে ‘এননাহদা’ যথেষ্ট ইসলামিক নয় এবং রাষ্ট্রে ইসলামের অস্তিত্ব নিয়ে ‘এননাহদা’ যথেষ্ট চিন্তিত নয়। প্রেসিডেন্ট কাইস সাইয়েদ আবার কোন দলের অংশ নন। তিনি প্রথম থেকেই ‘এননাহদা’র বিপক্ষে থাকলেও তিনি পুরোপুরি সেকুলার দলগুলির অংশও নন। তিউনিসিয়ার রাজনীতিতে ইসলামিক দল বনাম পুরোপুরি সেকুলার দলগুলির প্রতিযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমদিকে পার্লামেন্টের দলগুলির মাঝে সমঝোতা করে কোয়ালিশন করার প্রবণতা থাকলেও পরবর্তীতে পার্লামেন্টারিয়ানরা হাতাহাতি মারামারি শুরু করে। একারণেই আবির মুসির নেতৃত্বে চরম সেকুলার ‘ফ্রি দেস্তুরিয়ান’ এবং ‘আল কারামা’র মতো ইসলামিক দল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গিয়েছে।

ভূমধ্যসাগর উপকূলে আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্যপথের উপর অবস্থিত তিউনিসিয়ার ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব যথেষ্ট। লিবিয়ার যুদ্ধে তুরস্কের জড়াবার পর থেকে তিউনিসিয়ার গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ফ্রান্সের সাথে তুরস্কের দ্বন্দ্ব চরমে উঠেছে। তিউনিসিয়ার প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্স এখানে তুরস্কের প্রভাব দেখতে চায় না। সেকারণে প্রেসিডেন্ট কাইস সাইয়েদের ক্ষমতা নেয়াটা ফ্রান্সের কাছে চিন্তার বিষয় নয়, বরং ‘এননাহদা’র সমর্থকদের রাস্তায় দেখতে চাইছে না ফ্রান্স। তবে এখানে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইইউ একইসাথে সাইয়েদের সমালোচনা করা থেকে বিরত থেকেছে, যা ‘এননাহদা’ এবং তুরস্কের মাঝে সম্পর্কোন্নয়নকে নিরুৎসাহিত করছে। লিবিয়াতে তুরস্কের হস্তক্ষেপ পশ্চিমারা মেনে নিলেও তিউনিসিয়ার ক্ষেত্রে সেটা হয়নি। আরব বসন্তের পর তিউনিসিয়ার তথাকথিত ‘গণতান্ত্রিক সফলতা’ নয়, বরং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতাই দেশটার ভাগ্যের নিয়ন্ত্রক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ পশ্চিমা গণতন্ত্রের আদর্শিক চিন্তার বাস্তবয়নের চাইতে ভূকৌশলগত নিরাপত্তাই এখন পশ্চিমা দেশগুলির কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।