১লা সেপ্টেম্বর ২০২১
আফগানিস্তান ছেড়ে আসার পর বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আসলে কি হবে? এ নিয়ে অনেকেই কথা বলছেন।
মার্কিন চিন্তাবিদ জর্জ ফ্রীডম্যান থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘জিওপলিটিক্যাল ফিউচার্স’এর এক লেখায় বলছেন যে, ২০ বছর যুদ্ধ করে হেরে যাবার পরেও যুক্তরাষ্ট্রে কেউ কেউ চাইছেন যুদ্ধ চালিয়ে নিতে। কিন্তু তিনি মনে করছেন না যে, আরও ২০ বছর যুদ্ধ করলেও জয়ের দেখা মিলবে; কেননা, সফলতার সংজ্ঞাই এখানে অস্পস্ট এবং অতিরিক্ত রকমের উচ্চাভিলাসী। এর লক্ষ্য ছিল একটা সমাজকে তাদের জীবনযাত্রা থেকে পরিবর্তিত করে মার্কিনীরা যেমন চায় সেরকম করে গড়ে তোলা। কিন্তু এই অঞ্চলের বহু যুদ্ধরত গ্রুপগুলিকে যুদ্ধক্ষেত্রে হারিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা এবং নতুন একটা সংস্কৃতির জন্ম দেয়া ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সাধ্যের বাইরে। ফ্রীডম্যান বলছেন যে, সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে ঠান্ডা যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র যেমন চেয়েছিল পশ্চিমা লিবারাল আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করতে, ঠিক একইভাবে আফগানিস্তানের যুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছে আফগানদের সংস্কৃতিকে পরিবর্তন করতে। শক্তি প্রয়োগে দেশটার মাত্র কিছু অংশকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আবার আফগানদের নিজস্ব রাজনৈতিক ব্যবস্থা ছিল পশ্চিমা লিবারাল আদর্শ থেকে অনেক আলাদা। আফগানরা তাদের নৈতিকতাকেই সঠিক মনে করেছে; তাই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আফগানদের নৈতিকতা পরিবর্তন করে তাদেরকে পশ্চিমা ধাঁচের নৈতিকতাতে নিয়ে আসা ছিল দুষ্কর।
মার্কিন সামরিক কন্ট্রাক্টর ‘ব্ল্যাকওয়াটার’এর প্রতিষ্ঠাতা এরিক প্রিন্স মার্কিন টিভি চ্যানেল ‘ফক্স নিউজ’এর সাথে এক সাক্ষাতে বলছেন যে, ডেমোক্র্যাটরা বলছিলেন যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটোর ক্ষতি করেছেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের একা একা আফগানিস্তান ছেড়ে আসার ঘোষণা ন্যাটোর যতটুকু বাকি রয়েছে, তাও ধ্বংস করবে। যুক্তরাষ্ট্রের উপর তার ইউরোপিয় মিত্রদের আস্থা চলে গেছে। মার্কিন ইন্টেলিজেন্স যদি কোন দেশে তাদের লোক নিয়োগ করতে চায়, অথবা কোন দেশকে চীনের বিপক্ষে দাঁড়াতে বলে, তাহলে তারা চিন্তা করবে যে, যুক্তরাষ্ট্র তার বন্ধুদেরকে কিভাবে ফেলে চলে যায়। মার্কিন ডলার দুনিয়ার রিজার্ভ মুদ্রা, কারণ এর পিছনে রয়েছে মার্কিন সামরিক সক্ষমতা। যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি পূরণ করা হচ্ছে ডলার ছাপিয়ে। এখন সারা দুনিয়াতে যদি মার্কিন শ্রেষ্ঠত্ব নিঃশেষ হয়ে আসে, তাহলে তা মার্কিন ডলারের উপর দুনিয়ার জনগণের আস্থাকেও প্রভাবিত করবে। এর ফলশ্রুতিতে মার্কিন অর্থনীতি এবং জীবনব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এমন একটা জাতির কাছে পরাজিত হয়, যারা কিনা ৭০ বছরের পুরোনো অস্ত্র ব্যবহার করছে এবং চিন্তাধারার দিক থেকে ষষ্ঠ শতাব্দীতে রয়েছে, তাহলে বুঝতে হবে যে, মার্কিন সামরিক সক্ষমতা যতটা মনে করা হয়, ততটা নয়। সেখানে যতটা সার্ভেইল্যান্সই থাকুক না কেন, তা সেখানকার সমাজের বাস্তবতাতে কতটা পরিবর্তন করতে পারলো, সেটাই আসল কথা। করোনাভাইরাসকে যখন অনেক বড় হুমকি বলে বলা হচ্ছে, তখন এটা মনে রাখা উচিৎ যে, তালিবানরা কোন মাস্ক না পড়েই পুরো দেশ জয় করে নিয়েছে। এই মহামারি তাদেরকে জয়কে খুব একটা আটকাতে পারেনি।
মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইউরেশিয়া গ্রুপ’এর প্রতিষ্ঠাতা ইয়ান ব্রেমার বলছেন যে, আফগানিস্তান থেকে সড়ে আসার সাথে সাথে বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কি হওয়া উচিৎ, তা নিয়ে কথা হচ্ছে। বহুকাল যাবত মার্কিনীরা মেনেই নিয়েছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র দুনিয়ার ‘পুলিশম্যান’। কিন্তু এখন সেই চিন্তায় পরিবর্তন হয়েছে। সারা দুনিয়াব্যাপী যুক্তরাষ্ট্র উন্মুক্ত সমাজ, আইনের শাসন, মানবাধিকারের মতো পশ্চিমা আদর্শগুলিকে প্রতিষ্ঠা করেছে। মার্কিন জনগণ প্রশ্ন করা শুরু করেছে যে, তারা মার্কিন সরকারকে যেসকল প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করার জন্যে নির্বাচিত করছে, তা তারা বাস্তবায়ন করতে পারছেন না। উল্টো বহু অভিবাসী সেদেশে ঢুকে পড়ছে এবং সমাজকে পরিবর্তন করে ফেলছে। স্ট্যাচু অব লিবার্টির চিন্তাগুলি হঠাত করেই বহু আমেরিকানের কাছে আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে না। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের রাস্তাতেই সহিংসতা থামছে না, সেখানে অন্য দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে যাওয়া কেন? বাকি দুনিয়ার কাছে উদাহরণ হতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রকে নিজের জনগণের দেখাশুনা করতে হবে। ব্রেমার বলছেন যে, যদিও বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান বলবত থাকবে, তথাপি যুক্তরাষ্ট্র যে দুনিয়ার ‘পুলিশম্যান’, সেই চিন্তাটা একটা বড় ধাক্কা খেলো। এখন জাতীয়তাবাদী চিন্তাটাই বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র দুনিয়ার নিরাপত্তার জন্যে কাজ করবে মার্কিন জনগণের স্বার্থে। অর্থাৎ যেখানে মার্কিন জনগণ নিজেদের সুবিধা দেখবে না, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র নাক গলাবে না। ২০২১ সাল পর্যন্ত মার্কিনীরা মনে করেছে যে, তাদের আদর্শ দুনিয়ার বাকি আদর্শের চাইতে উন্নততর। কিন্তু বর্তমানে মার্কিন আদর্শ আসলে কোনটা, সেটাই কেউ নিশ্চিতভাবে বলছে পারছে না। তবে মার্কিন মিত্ররাও সমস্যায় রয়েছে; যেকারণে তারাও যুক্তরাষ্ট্রের ছেড়ে আসা জায়গাগুলি অত সহজে পূরণ করতে পারবে না। অপরদিকে চীনারা তাদের প্রভাব বৃদ্ধি করলেও চীনারা যুক্তরাষ্ট্রের ছেড়ে আসা স্থান নিয়ে নেবে, এটা ভাবার পক্ষে কোন যুক্তিই নেই। রুশরাও সেটা করবে না। নেতৃত্ব হয়ে উঠছে আঞ্চলিক; বৈশ্বিক নয়। এতে আঞ্চলিক সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়বে। ওবামা, ট্রাম্প বা বাইডেন সকলেই চাপের মাঝে পড়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এতকাল যে বৈশ্বিক নেতৃত্ব দিয়েছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি সমর্থন করছে না। অনেকেই মনে করেছিলেন যে, ট্রাম্পের উত্থান একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা; কাঠামোগত পরিবর্তন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা বলে দিচ্ছে যে, আসল ব্যাপার তার ঠিক উল্টোটা।
এক টুইটার বার্তায় জর্জ ফ্রীডম্যান বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র হলো একটা আদর্শিক প্রকল্প। যেকোন আদর্শিক প্রকল্পের মতোই সে নিজের আদর্শকে অন্যের আদর্শ থেকে উন্নততর মনে করে। তবে আদর্শিক কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে সামরিক হস্তক্ষেপ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়; এবং এর শেষ প্রায় কখনোই ভালো হয় না। ফ্রীডম্যান, প্রিন্স এবং ব্রেমারের কথা থেকে পরিষ্কার যে, যুক্তরাষ্ট্র এখন নিজেকে দুনিয়ার আদর্শিক নেতৃত্বের অবস্থানে দেখতে চাইছে না। আফগানিস্তান ছেড়ে আসার ঘটনা এই ব্যাপারটাকে আরও পরিষ্কার করলো। মার্কিনীরা এখন অনেক ‘জাতীয়তাবাদী; তারা নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যায় জর্জরিত থেকে বাকি দুনিয়ার ‘পুলিশম্যান’ হতে চাইছে না। তবে যেহেতু কোন একক শক্তি এখনও যুক্তরাষ্ট্রের স্থলাভিষিক্ত হবার মতো অবস্থানে নেই, তাই বিশ্বকে হয়তো নতুন নেতৃত্বের জন্যে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
Showing posts with label Kabul Embassy Evacuation. Show all posts
Showing posts with label Kabul Embassy Evacuation. Show all posts
Wednesday, 1 September 2021
Tuesday, 17 August 2021
আফগান বিপর্যয়ে বৈশ্বিক নেতৃত্ব ফিরে পাবার শেষ আশাটুকু হারালো যুক্তরাষ্ট্র
১৮ই অগাস্ট ২০২১
১৬ই অগাস্ট মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আফগানিস্তানের পরিস্থিতির ব্যাপারে মুখ খুলেছেন। এক বক্তব্যে তিনি বলেন যে, তিনি ২০০৯ সালে বারাক ওবামা প্রশাসনে ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকার সময়ে আফগানিস্তানে অতিরিক্ত সেনা প্রেরণের বিরোধিতা করেছিলেন তিনি আরও বলেন যে, যদিও সেনা সরাতে গিয়ে অনেক সমস্যার পড়তে হয়েছে, তথাপি সেনা সরিয়ে নেবার জন্যে কোন ভালো সময় কখনোই ছিল না। তিনি বলেন যে, গত এক সপ্তাহের ঘটনা দেখিয়ে দেয় যে, আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসাটা সঠিক সিদ্ধান্তই ছিল। যে যুদ্ধে আফগানরা নিজেরাই নিজেদের জন্যে যুদ্ধ করতে রাজি নয়, সেখানে মার্কিন সেনাদের যুদ্ধ করে মৃত্যুবরণ করাটা উচিৎ নয়। তিনি আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতির জন্যে দায় পুরোপুরিভাবে নিজের কাঁধে নিতে চাননি। তিনি বলেন যে, আফগানিস্তানে মার্কিন মিশন কখনোই দেশ গড়ার জন্যে ছিল না। তিনি ক্ষমতায় এসে তালিবানদের সাথে চুক্তির ফলাফলটুকু পেয়েছেন; কারণ সেই চুক্তি ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সময় করা হয়েছিল। তিনি হলেন চতুর্থ মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের সবচাইতে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন; এবং তিনি পঞ্চম কোন প্রেসিডেন্টের কাছে এই দায়িত্ব হস্তান্তর করতে চান না। তবে সকলে বাইডেনের সাথে একমত হতে পারেননি। রিপাবলিকান নেতা মিচ ম্যাকনেল এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, আফগানিস্তান হলো একটা চরম বিপর্যয়। বাইডেন প্রশাসনের আফগানিস্তান থেকে সরে আসার জন্যে তা যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদার উপরেই দাগ ফেলে দিয়েছে। ‘বিবিসি’ বলছে যে, অনেক মার্কিনীদের কাছেই কাবুলে মার্কিন দূতাবাসের উপর মার্কিন হেলিকপ্টার ওড়ার ঘটনাটা ১৯৭৫ সালে দক্ষিণ ভিয়েতনামের রাজধানী সায়গন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের লজ্জাজনক পলায়নের স্মৃতিকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে; বাইডেন সেসময় একজন নব নির্বাচিত সিনেটর ছিলেন।
‘ভয়েস অব আমেরিকা’ বাইডেনের বক্তব্যের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং সংস্থার প্রতিক্রিয়া যোগাড় করেছে। কংগ্রেসের রিপাবলিকান দলের প্রধান কেভিন ম্যাকার্থি বলছেন যে, কয়েক দশকের মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের সবচাইতে মারাত্মক পররাষ্ট্রনীতি বিপর্যয়ে ছয় দিন চুপ থাকার পর বাইডেন মুখ খুলেছেন। তার বক্তব্য সৈন্য সরাবার বিপর্যয়ের কারণে মার্কিন জনগণকে রক্ষা করতে না পারা, হাজারো সেনাকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়া এবং সন্ত্রাসবাদের হুমকি বেড়ে যাবার বিষয়ে অনেক প্রশ্নের উত্তর দেয়না। আরেক রিপাবলিকান লিন্ডসে গ্রাহাম বলছেন যে, বাইডেন আফগানিস্তানে বিপজ্জনক এবং অপমানজনক পথে হেঁটেছেন; এর জন্যে তিনি নিজেকে ছাড়া কাউকেই দোষ দিতে পারেন না। ডেমোক্র্যাট দলের প্রধান স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি বাইডেনকে সমর্থন করে বলেন যে, শক্তিশালী নেতৃত্ব এবং মার্কিন সেনাদের আফগানিস্তান থেকে সরিয়ে আনার জন্যে একাগ্র ভূমিকার জন্যে প্রেসিডেন্ট প্রশংসার দাবিদার। মার্কিন থিংকট্যাঙ্ক ‘আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইন্সটিটিউট’এর ফেলো ক্যাথারিন জিমারম্যান বলছেন যে, তালিবান আফগানিস্তানে ইসলামিক আমিরাত প্রতিষ্ঠার ফলে বাইডেনের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে রয়েছে মানবাধিকার, এই কথাগুলি অন্তসারশূণ্য হয়ে গেলো। ‘ফ্রিডমওয়ার্কস’এর প্রেসিডেন্ট এডাম ব্র্যান্ডন বলছেন যে, আফগানিস্তানের এই পরিস্থিতির জন্যে শুধুমাত্র বাইডেনকে দায়ী করা যাবে না। কংগ্রেসের সামনে যেসকল সামরিক এবং ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তারা ভুল তথ্য উপস্থাপন করেছেন, তাদেরকেও দায়ী করতে হবে।
‘বিবিসি’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, একমাস আগেই বাইডেন সাংবাদিকদের বলেছিলেন যে, তালিবানরা পুরো আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেবে, এটা প্রায় অসম্ভব। তবে এবারের ভাষণে তিনি স্বীকার করেন যে, আফগানিস্তানের ঘটনাগুলি তারা যতটা দ্রুত আশা করেছিলেন, তার চাইতে বেশি দ্রুত ঘটেছে। বাইডেনের সাথে সুর মিলিয়েই ন্যাটোর সেক্রেটারি জেনারেল জ্যান্স স্টলটেনবার্গ বলেন যে, আফগানিস্তানে ন্যাটোর সেনারা চিরকালের জন্যে যায়নি। তবে তালিবানরা যত দ্রুত আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, তা তাদেরকে অবাক করেছে। তিনি তালিবানদের এই সাফল্যের পিছনে আফগান রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই দায়ি করেন। ‘বিবিসি’ আরও বলছে যে, মার্কিন জনমত বলছে যে, বেশিরভাগ জনগণই আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের পক্ষে। ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক এন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’ বা ‘সিএসআইএস’এর এনথনি করডেসম্যান বাইডেনের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে ‘ভয়েস অব আমেরিকা’কে বলেন যে, আফগানিস্তানে যত সময়ই যুক্তরাষ্ট্র থাকুক না কেন, সেখানে কার্যকর একটা গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব ছিল না; এই ব্যাপারটাকে তিনি বেশ শক্তিশালীভাবেই তুলে ধরেছেন। একই ধরনের কথা বলেছেন ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’এর সিনিয়র ফেলো চার্লস কুপচান। তিনি বলেন যে, ছয় মাস, এক বছর বা দুই বছর সময় দিলেই ফলাফল পরিবর্তিত হয়ে যেতো, এমন কোন প্রমাণ নেই। ‘কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’এর সিনিয়ন ফেলো আরন ডেভিড মিলার বলছেন যে, বাইডেন যে একটা বিষয় সম্পর্কে তার দায় স্বীকার করেছেন তা হলো, তারা বুঝতে পারেননি যে তালিবানরা এতটা সহজে পুরো আফগানিস্তান নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেবে।
‘ইউরেশিয়া গ্রুপ’এর প্রধান মার্কিন চিন্তাবিদ ইয়ান ব্রেমার বাইডেনের সমালোচনা করে বলছেন যে, বাইডেন তার বক্তব্যে কেন আফগানিস্তান ছেড়ে যাওয়া উচিৎ সেটার শক্ত ব্যাখ্যা দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু আফগানিস্তানে মারাত্মক কতগুলি ব্যর্থতার ব্যাপারে তিনি কিছুই বলেননি। ব্রেমার বলছেন যে, ১৯৭৯ সালে ইরানে মার্কিন দূতাবাসের জিম্মি হবার পর থেকে চার দশকে এটা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে সবচাইতে ভয়াবহতম পররাষ্ট্রনীতির বিপর্যয়। এখানে ব্যর্থতাগুলির প্রথমে থাকবে সামরিক এবং ইন্টেলিজেন্সের ব্যর্থতা। যখন বাইডেন আফগানিস্তান ত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিলেন, তখন মার্কিন ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তারা বলেছিলেন যে, আফগান সেনাবাহিনী তালিবানদের বিরুদ্ধে দুই থেকে তিন বছর যুদ্ধ করতে পারবে। অথচ যখন তালিবানরা আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে, তখন ইন্টেলিজেন্সের কর্মকর্তারা বলেন যে, আফগান সেনাবাহিনী মাত্র দুই থেকে তিন দিন টিকবে! ব্রেমার বলছেন যে, তিনি তার ক্যারিয়ারে এতবড় ইন্টেলিজেন্স ব্যর্থতার কথা কখনোই শোনেননি। যুক্তরাষ্ট্র বিশ বছর ধরে প্রায় ৯০ বিলিয়ন ডলার খরচ করে যে আফগান সেনাবাহিনী তৈরি করেছে, তা যুদ্ধ করতে রাজি হয়নি! আর দুই দশক ধরে প্রশিক্ষণ দেবার পরেও এই সেনাদের সক্ষমতা এবং মনোবল সম্পর্কে তারা নিশ্চিত ছিলেন না! দ্বিতীয়তঃ সমন্বয়ের ব্যর্থতা। পশ্চিমা দেশগুলি যুক্তরাষ্ট্রের সাথেসাথে আফগানিস্তানে গিয়েছে এবং যুদ্ধ করে জীবনও দিয়েছে। কিন্তু আফগানিস্তান ত্যাগের সময় যুক্তরাষ্ট্র একাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যখন ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত কাবুলে রয়ে গিয়েছেন, তখন মার্কিন রাষ্ট্রদূত কাবুল ছেড়ে গিয়েছেন। তৃতীয়তঃ পরিকল্পনার ব্যর্থতা। ছয় হাজার সেনাকে একবার আফগানিস্তান থেকে সরিয়ে নিয়ে আবারও যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখন্ড থেকে কয়েক হাজার সেনাকে উড়িয়ে নিয়ে আসা এবং আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের সহায়তা করা হাজারো আফগানের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে না পারা খুবই বাজে ধরনের পরিকল্পনার ব্যর্থতাকে তুলে ধরে। পুরো ব্যাপারটাই শেষ মার্কিন সেনা দেশ ছাড়ার আগেই করা যেতো। আর চতুর্থতঃ গণযোগাযোগের ব্যর্থতা। ৮ই জুলাই বাইডেন বলেছিলেন যে, তালিবানের পক্ষে পুরো আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেয়া প্রায় অসম্ভব। বাইডেন আরও বলেছিলেন যে, ১৯৭৫ সালে সায়গনে মার্কিন দূতাবাসের ছাদের উপর থেকে মার্কিন নাগরিকদের সরিয়ে নেবার মতো কোন পরিস্থিতিই কাবুলে নেই। ব্রেমার বলছেন যে, বাইডেনের এই কথাগুলি স্বল্প সময়ের মাঝেই ভুল প্রমাণিত হবার পরেও মার্কিম কর্মকর্তারা বলছিলেন যে, তারা সাফল্যের সাথে কর্মসম্পাদন করেছেন। শুধু তাই নয়, এরকম একটা দুর্যোগ পরিস্থিতিতে বাইডেন ক্যাম্প ডেভিডের অবকাশকেন্দ্রে অবস্থান করছিলেন এবং সেসময় বাইডেনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা কেউই তার সাথে ছিলেন না। তিনি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার সাথে কথা বলছিলেন অনলাইনে। আর এতবড় একটা দুর্যোগের পর মুখ খুলতে বাইডেন নিঃসন্দেহে অনেক বেশি সময় নিয়েছেন।
ইয়ান ব্রেমার বলছেন যে, বাইডেনের সিদ্ধান্তের পিছনে যথেষ্ট জনসমর্থন রয়েছে। কারণ রাজনৈতিক মতামত দিতে অপারগ সাধারণ আমেরিকানরা আফগানিস্তানের ব্যাপারে মাথা ঘামাতে চান না। তবে কাবুল ছেড়ে আসার সময় যদি কোন দুর্ঘটনা ঘটে যায়, তাহলে তা ১৯৭৯ সালের তেহরান দূতাবাসের বিপর্যয়কেও ছাড়িয়ে যাবে। এবং তা বাইডেনের প্রেসিডেন্সিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলতে পারে। এই মুহুর্তে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে কাবুলের ঘটনাগুলি হয়তো বড় কোন প্রভাব ফেলবে না; তবে আন্তর্জাতিকভাবে এর ফলাফল হবে মারাত্মক। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুরা হয়তো মনে করতে শুরু করেছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র তার আগের নেতৃত্বশীল অবস্থানে ফিরে এসেছে; তারা এখন ধরেই নেবে যে, যুক্তরাষ্ট্র আসলে একা একাই সিদ্ধান্ত নেবে এবং কাজ করবে; অন্য কারুর সিদ্ধান্ত তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। যুক্তরাষ্ট্র একটা অনির্ভরযোগ্য বন্ধু। পশ্চিমা বিশ্বের আদর্শিক নেতৃত্ব দেবার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র অনেক বেশি হারালো। রাশিয়া এবং চীন এখন অন্যান্য দেশের কাছে আরও নির্ভরযোগ্যভাবে বলতে পারবে যে, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের নেতৃত্ব দেবার যোগ্যতা রাখে না। এমতাবস্থায় বিশ্বের অনেক দেশই যুক্তরাষ্ট্রের উপর পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল থাকতে চাইবে না।
আফগানিস্তানের ব্যাপারে মার্কিন ইন্টেলিজেন্সের ব্যর্থতা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব হারাবার ক্ষেত্রে মার্কিন ইন্টেলিজেন্সের দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যৎবাণী পুরোপুরিই সত্যি হতে চলেছে। কাবুলের মার্কিন দূতাবাসের উপর মার্কিন হেলিকপ্টারের ছবিগুলি যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের কাছে তেমন কিছু না হলেও তা যে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্বের গোড়ায় আঘাত করেছে, তা সেদেশের নেতৃত্ব বুঝতে পেরেছে। বুঝতে পেরেছে বলেই তারা কেউই চার দশকের মাঝে সবচাইতে মারাত্মক এই বিপর্যয়ের দায় নিতে চাইছেন না। যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুরা আরও আগ থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীলতা কমাচ্ছে। কাবুলের বিপর্যয় সেই সিদ্ধান্তকে আরও দৃঢ়তা দিলো কেবল। প্রকৃতপক্ষে আফগান বিপর্যয় যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্বশীল অবস্থানে ফিরে আসার শেষ আশাটুকুও কেড়ে নিল।
১৬ই অগাস্ট মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আফগানিস্তানের পরিস্থিতির ব্যাপারে মুখ খুলেছেন। এক বক্তব্যে তিনি বলেন যে, তিনি ২০০৯ সালে বারাক ওবামা প্রশাসনে ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকার সময়ে আফগানিস্তানে অতিরিক্ত সেনা প্রেরণের বিরোধিতা করেছিলেন তিনি আরও বলেন যে, যদিও সেনা সরাতে গিয়ে অনেক সমস্যার পড়তে হয়েছে, তথাপি সেনা সরিয়ে নেবার জন্যে কোন ভালো সময় কখনোই ছিল না। তিনি বলেন যে, গত এক সপ্তাহের ঘটনা দেখিয়ে দেয় যে, আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসাটা সঠিক সিদ্ধান্তই ছিল। যে যুদ্ধে আফগানরা নিজেরাই নিজেদের জন্যে যুদ্ধ করতে রাজি নয়, সেখানে মার্কিন সেনাদের যুদ্ধ করে মৃত্যুবরণ করাটা উচিৎ নয়। তিনি আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতির জন্যে দায় পুরোপুরিভাবে নিজের কাঁধে নিতে চাননি। তিনি বলেন যে, আফগানিস্তানে মার্কিন মিশন কখনোই দেশ গড়ার জন্যে ছিল না। তিনি ক্ষমতায় এসে তালিবানদের সাথে চুক্তির ফলাফলটুকু পেয়েছেন; কারণ সেই চুক্তি ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সময় করা হয়েছিল। তিনি হলেন চতুর্থ মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের সবচাইতে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন; এবং তিনি পঞ্চম কোন প্রেসিডেন্টের কাছে এই দায়িত্ব হস্তান্তর করতে চান না। তবে সকলে বাইডেনের সাথে একমত হতে পারেননি। রিপাবলিকান নেতা মিচ ম্যাকনেল এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, আফগানিস্তান হলো একটা চরম বিপর্যয়। বাইডেন প্রশাসনের আফগানিস্তান থেকে সরে আসার জন্যে তা যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদার উপরেই দাগ ফেলে দিয়েছে। ‘বিবিসি’ বলছে যে, অনেক মার্কিনীদের কাছেই কাবুলে মার্কিন দূতাবাসের উপর মার্কিন হেলিকপ্টার ওড়ার ঘটনাটা ১৯৭৫ সালে দক্ষিণ ভিয়েতনামের রাজধানী সায়গন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের লজ্জাজনক পলায়নের স্মৃতিকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে; বাইডেন সেসময় একজন নব নির্বাচিত সিনেটর ছিলেন।
‘ভয়েস অব আমেরিকা’ বাইডেনের বক্তব্যের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং সংস্থার প্রতিক্রিয়া যোগাড় করেছে। কংগ্রেসের রিপাবলিকান দলের প্রধান কেভিন ম্যাকার্থি বলছেন যে, কয়েক দশকের মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের সবচাইতে মারাত্মক পররাষ্ট্রনীতি বিপর্যয়ে ছয় দিন চুপ থাকার পর বাইডেন মুখ খুলেছেন। তার বক্তব্য সৈন্য সরাবার বিপর্যয়ের কারণে মার্কিন জনগণকে রক্ষা করতে না পারা, হাজারো সেনাকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়া এবং সন্ত্রাসবাদের হুমকি বেড়ে যাবার বিষয়ে অনেক প্রশ্নের উত্তর দেয়না। আরেক রিপাবলিকান লিন্ডসে গ্রাহাম বলছেন যে, বাইডেন আফগানিস্তানে বিপজ্জনক এবং অপমানজনক পথে হেঁটেছেন; এর জন্যে তিনি নিজেকে ছাড়া কাউকেই দোষ দিতে পারেন না। ডেমোক্র্যাট দলের প্রধান স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি বাইডেনকে সমর্থন করে বলেন যে, শক্তিশালী নেতৃত্ব এবং মার্কিন সেনাদের আফগানিস্তান থেকে সরিয়ে আনার জন্যে একাগ্র ভূমিকার জন্যে প্রেসিডেন্ট প্রশংসার দাবিদার। মার্কিন থিংকট্যাঙ্ক ‘আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইন্সটিটিউট’এর ফেলো ক্যাথারিন জিমারম্যান বলছেন যে, তালিবান আফগানিস্তানে ইসলামিক আমিরাত প্রতিষ্ঠার ফলে বাইডেনের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে রয়েছে মানবাধিকার, এই কথাগুলি অন্তসারশূণ্য হয়ে গেলো। ‘ফ্রিডমওয়ার্কস’এর প্রেসিডেন্ট এডাম ব্র্যান্ডন বলছেন যে, আফগানিস্তানের এই পরিস্থিতির জন্যে শুধুমাত্র বাইডেনকে দায়ী করা যাবে না। কংগ্রেসের সামনে যেসকল সামরিক এবং ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তারা ভুল তথ্য উপস্থাপন করেছেন, তাদেরকেও দায়ী করতে হবে।
‘বিবিসি’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, একমাস আগেই বাইডেন সাংবাদিকদের বলেছিলেন যে, তালিবানরা পুরো আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেবে, এটা প্রায় অসম্ভব। তবে এবারের ভাষণে তিনি স্বীকার করেন যে, আফগানিস্তানের ঘটনাগুলি তারা যতটা দ্রুত আশা করেছিলেন, তার চাইতে বেশি দ্রুত ঘটেছে। বাইডেনের সাথে সুর মিলিয়েই ন্যাটোর সেক্রেটারি জেনারেল জ্যান্স স্টলটেনবার্গ বলেন যে, আফগানিস্তানে ন্যাটোর সেনারা চিরকালের জন্যে যায়নি। তবে তালিবানরা যত দ্রুত আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, তা তাদেরকে অবাক করেছে। তিনি তালিবানদের এই সাফল্যের পিছনে আফগান রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই দায়ি করেন। ‘বিবিসি’ আরও বলছে যে, মার্কিন জনমত বলছে যে, বেশিরভাগ জনগণই আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের পক্ষে। ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক এন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’ বা ‘সিএসআইএস’এর এনথনি করডেসম্যান বাইডেনের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে ‘ভয়েস অব আমেরিকা’কে বলেন যে, আফগানিস্তানে যত সময়ই যুক্তরাষ্ট্র থাকুক না কেন, সেখানে কার্যকর একটা গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব ছিল না; এই ব্যাপারটাকে তিনি বেশ শক্তিশালীভাবেই তুলে ধরেছেন। একই ধরনের কথা বলেছেন ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’এর সিনিয়র ফেলো চার্লস কুপচান। তিনি বলেন যে, ছয় মাস, এক বছর বা দুই বছর সময় দিলেই ফলাফল পরিবর্তিত হয়ে যেতো, এমন কোন প্রমাণ নেই। ‘কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’এর সিনিয়ন ফেলো আরন ডেভিড মিলার বলছেন যে, বাইডেন যে একটা বিষয় সম্পর্কে তার দায় স্বীকার করেছেন তা হলো, তারা বুঝতে পারেননি যে তালিবানরা এতটা সহজে পুরো আফগানিস্তান নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেবে।
‘ইউরেশিয়া গ্রুপ’এর প্রধান মার্কিন চিন্তাবিদ ইয়ান ব্রেমার বাইডেনের সমালোচনা করে বলছেন যে, বাইডেন তার বক্তব্যে কেন আফগানিস্তান ছেড়ে যাওয়া উচিৎ সেটার শক্ত ব্যাখ্যা দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু আফগানিস্তানে মারাত্মক কতগুলি ব্যর্থতার ব্যাপারে তিনি কিছুই বলেননি। ব্রেমার বলছেন যে, ১৯৭৯ সালে ইরানে মার্কিন দূতাবাসের জিম্মি হবার পর থেকে চার দশকে এটা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে সবচাইতে ভয়াবহতম পররাষ্ট্রনীতির বিপর্যয়। এখানে ব্যর্থতাগুলির প্রথমে থাকবে সামরিক এবং ইন্টেলিজেন্সের ব্যর্থতা। যখন বাইডেন আফগানিস্তান ত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিলেন, তখন মার্কিন ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তারা বলেছিলেন যে, আফগান সেনাবাহিনী তালিবানদের বিরুদ্ধে দুই থেকে তিন বছর যুদ্ধ করতে পারবে। অথচ যখন তালিবানরা আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে, তখন ইন্টেলিজেন্সের কর্মকর্তারা বলেন যে, আফগান সেনাবাহিনী মাত্র দুই থেকে তিন দিন টিকবে! ব্রেমার বলছেন যে, তিনি তার ক্যারিয়ারে এতবড় ইন্টেলিজেন্স ব্যর্থতার কথা কখনোই শোনেননি। যুক্তরাষ্ট্র বিশ বছর ধরে প্রায় ৯০ বিলিয়ন ডলার খরচ করে যে আফগান সেনাবাহিনী তৈরি করেছে, তা যুদ্ধ করতে রাজি হয়নি! আর দুই দশক ধরে প্রশিক্ষণ দেবার পরেও এই সেনাদের সক্ষমতা এবং মনোবল সম্পর্কে তারা নিশ্চিত ছিলেন না! দ্বিতীয়তঃ সমন্বয়ের ব্যর্থতা। পশ্চিমা দেশগুলি যুক্তরাষ্ট্রের সাথেসাথে আফগানিস্তানে গিয়েছে এবং যুদ্ধ করে জীবনও দিয়েছে। কিন্তু আফগানিস্তান ত্যাগের সময় যুক্তরাষ্ট্র একাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যখন ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত কাবুলে রয়ে গিয়েছেন, তখন মার্কিন রাষ্ট্রদূত কাবুল ছেড়ে গিয়েছেন। তৃতীয়তঃ পরিকল্পনার ব্যর্থতা। ছয় হাজার সেনাকে একবার আফগানিস্তান থেকে সরিয়ে নিয়ে আবারও যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখন্ড থেকে কয়েক হাজার সেনাকে উড়িয়ে নিয়ে আসা এবং আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের সহায়তা করা হাজারো আফগানের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে না পারা খুবই বাজে ধরনের পরিকল্পনার ব্যর্থতাকে তুলে ধরে। পুরো ব্যাপারটাই শেষ মার্কিন সেনা দেশ ছাড়ার আগেই করা যেতো। আর চতুর্থতঃ গণযোগাযোগের ব্যর্থতা। ৮ই জুলাই বাইডেন বলেছিলেন যে, তালিবানের পক্ষে পুরো আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেয়া প্রায় অসম্ভব। বাইডেন আরও বলেছিলেন যে, ১৯৭৫ সালে সায়গনে মার্কিন দূতাবাসের ছাদের উপর থেকে মার্কিন নাগরিকদের সরিয়ে নেবার মতো কোন পরিস্থিতিই কাবুলে নেই। ব্রেমার বলছেন যে, বাইডেনের এই কথাগুলি স্বল্প সময়ের মাঝেই ভুল প্রমাণিত হবার পরেও মার্কিম কর্মকর্তারা বলছিলেন যে, তারা সাফল্যের সাথে কর্মসম্পাদন করেছেন। শুধু তাই নয়, এরকম একটা দুর্যোগ পরিস্থিতিতে বাইডেন ক্যাম্প ডেভিডের অবকাশকেন্দ্রে অবস্থান করছিলেন এবং সেসময় বাইডেনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা কেউই তার সাথে ছিলেন না। তিনি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার সাথে কথা বলছিলেন অনলাইনে। আর এতবড় একটা দুর্যোগের পর মুখ খুলতে বাইডেন নিঃসন্দেহে অনেক বেশি সময় নিয়েছেন।
ইয়ান ব্রেমার বলছেন যে, বাইডেনের সিদ্ধান্তের পিছনে যথেষ্ট জনসমর্থন রয়েছে। কারণ রাজনৈতিক মতামত দিতে অপারগ সাধারণ আমেরিকানরা আফগানিস্তানের ব্যাপারে মাথা ঘামাতে চান না। তবে কাবুল ছেড়ে আসার সময় যদি কোন দুর্ঘটনা ঘটে যায়, তাহলে তা ১৯৭৯ সালের তেহরান দূতাবাসের বিপর্যয়কেও ছাড়িয়ে যাবে। এবং তা বাইডেনের প্রেসিডেন্সিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলতে পারে। এই মুহুর্তে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে কাবুলের ঘটনাগুলি হয়তো বড় কোন প্রভাব ফেলবে না; তবে আন্তর্জাতিকভাবে এর ফলাফল হবে মারাত্মক। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুরা হয়তো মনে করতে শুরু করেছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র তার আগের নেতৃত্বশীল অবস্থানে ফিরে এসেছে; তারা এখন ধরেই নেবে যে, যুক্তরাষ্ট্র আসলে একা একাই সিদ্ধান্ত নেবে এবং কাজ করবে; অন্য কারুর সিদ্ধান্ত তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। যুক্তরাষ্ট্র একটা অনির্ভরযোগ্য বন্ধু। পশ্চিমা বিশ্বের আদর্শিক নেতৃত্ব দেবার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র অনেক বেশি হারালো। রাশিয়া এবং চীন এখন অন্যান্য দেশের কাছে আরও নির্ভরযোগ্যভাবে বলতে পারবে যে, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের নেতৃত্ব দেবার যোগ্যতা রাখে না। এমতাবস্থায় বিশ্বের অনেক দেশই যুক্তরাষ্ট্রের উপর পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল থাকতে চাইবে না।
আফগানিস্তানের ব্যাপারে মার্কিন ইন্টেলিজেন্সের ব্যর্থতা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব হারাবার ক্ষেত্রে মার্কিন ইন্টেলিজেন্সের দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যৎবাণী পুরোপুরিই সত্যি হতে চলেছে। কাবুলের মার্কিন দূতাবাসের উপর মার্কিন হেলিকপ্টারের ছবিগুলি যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের কাছে তেমন কিছু না হলেও তা যে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্বের গোড়ায় আঘাত করেছে, তা সেদেশের নেতৃত্ব বুঝতে পেরেছে। বুঝতে পেরেছে বলেই তারা কেউই চার দশকের মাঝে সবচাইতে মারাত্মক এই বিপর্যয়ের দায় নিতে চাইছেন না। যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুরা আরও আগ থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীলতা কমাচ্ছে। কাবুলের বিপর্যয় সেই সিদ্ধান্তকে আরও দৃঢ়তা দিলো কেবল। প্রকৃতপক্ষে আফগান বিপর্যয় যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্বশীল অবস্থানে ফিরে আসার শেষ আশাটুকুও কেড়ে নিল।
Sunday, 15 August 2021
তালিবান... আবার?
১৬ই অগাস্ট ২০২১
১৫ই অগাস্ট মার্কিনীদের জন্যে যেমন ভুলে যাবার মতো দিন হিসেবে থাকবে, আফগানিস্তানের তালিবানদের জন্যেও ঠিক একইভাবে মনে রাখার মতো দিন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। হেলিকপ্টার দিয়ে মার্কিন দূতাবাস খালি করার ভিডিও চিত্র দেখা যাচ্ছিল সকল টেলিভিশন চ্যানেলে। অনেকেই এর সমান্তরাল টানছিলেন ১৯৭৫ সালের ২৯শে এপ্রিল দক্ষিণ ভিয়েতনামের রাজধানী সায়গন থেকে মার্কিন দূতাবাস খালি করার ঘটনার সাথে। ছবিগুলি বিশ্বব্যাপী মার্কিন প্রভাব কমার উদাহরণ হিসেবেই প্রতিফলিত হবে। অনেকেই অবাক হচ্ছেন এই ভেবে যে, আফগান সেনাবাহিনী প্রায় কোন যুদ্ধ ছাড়াই কিভাবে তালিবানদের হাতে পুরো দেশ ছেড়ে দিল। আর একইসাথে অনেকেই আলোচনা করছেন তালিবানদের চিন্তাধারা, নীতি এবং কর্মকান্ড নিয়ে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, তালিবানদের হাতে আফগান সেনাবাহিনীর পরাজয় প্রায় জানাই ছিল; তবে এটা কতটা দ্রুত হতে পারে, সেব্যাপারে কেউই নিশ্চিত ছিলেন না। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, আফগান সেনাবাহিনীর সদস্যসংখ্যা কাগজেকলমে ৩ লক্ষের মতো হলেও প্রকৃতপক্ষে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা তাদের আয় বৃদ্ধি করার জন্যে সেনাসদস্যের সংখ্যা বেশি দেখাতো। আফগান সেনারা এতটাই কম বেতন পেত যে, তারা তাদের অস্ত্র এবং যন্ত্রপাতি বিক্রি করে দিয়ে সংসার চালাতো। কোন দরকার ছাড়াই বেশি বুলেট ব্যবহার করতো এবং বুলেটের খোসাগুলি ব্জারে বিক্রি করে দিতো। আফগান সেনাবাহিনীর অস্ত্র এবং যন্ত্রপাতি তালিবানরা আফগান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধেই ব্যবহার করেছে। এমতাবস্থায় আফগান সেনাবাহিনীর অস্ত্রসস্ত্র নয়, বরং তাদের যুদ্ধ করার ইচ্ছাশক্তিটাই ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অন্ততঃ গত কয়েকদিনের খবরে এটা পরিষ্কার যে, এই ইচ্ছাশক্তি পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল আফগানিস্তানের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতির উপর।
মার্কিন কূটনীতিবিদ জালমেই খলিলজাদ আফগানিস্তানের একাধিক টেলিভিশনের সাথে সাক্ষাতে বলেছেন যে, এই তালিবান আগের তালিবান নয়; তারা অনেক পরিবর্তিত হয়েছে; বিশেষ করে নারী শিক্ষা, বাকি বিশ্বের সাথে সম্পর্ক এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলিকে থাকতে দেবার ক্ষেত্রে তারা তাদের আগের ভুলগুলি বুঝতে পেরেছে। তবে পশ্চিমা দুনিয়ার অনেকেই খলিলজাদের সাথে একমত নন। তারা মনে করছেন যে, তালিবানরা পশ্চিমা আদর্শ বাস্তবায়ন থেকে বহুদূরে রয়েছে। যেমন, তারা এখনও তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকায় মানুষের উপর প্রচুর করের বোঝা চাপাচ্ছে; স্কুল বন্ধ করে দিচ্ছে; সরকার পরিচালনায় নারী সদস্য রাখছে না; ইত্যাদি। তালিবানরা দোহা আলোচনায় কোন নারী সদস্য বা সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধি রাখেনি বলেও পশ্চিমারা অভিযোগ করেছে। দোহাতে তারা সেকুলার আইনের স্থানে কিছু শরীয়াহ আইন বাস্তবায়নের কথা বলার কারণেও পশ্চিমারা নাখোশ হয়েছে। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘আটলান্টিক কাউন্সিল’এর এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, তালিবানরা যে ব্যাপারটাতে সবচাইতে বেশি অদূরদর্শিতা দেখিয়েছে তা হলো, আফগানিস্তানের জন্যে নির্দিষ্ট কোন লক্ষ্য দেখাতে না পারা। সরকার পরিচালনা, সেবা দেয়া, অথবা আইনের শাসন বাস্তবায়নের কোন পরিকল্পনাই তারা দেখাতে সক্ষম হয়নি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দেশ পুনর্গঠন, ইত্যাদি কোন বিষয়েই তারা নির্দিষ্ট কোন দিকনির্দেশনা দিতে পারেনি।
তালিবান মনে করছে যে, তারা সারা দুনিয়ার মুসলিমদের মাঝে সবচাইতে আলাদা; কারণ তারা যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে হারিয়েছে এবং তাদেরকে দেশ ছাড়ার জন্যে আলোচনায় বসতে বাধ্য করেছে। তবে তালিবানরা রাজনৈতিক লক্ষ্যের ব্যাপারে অপরিপক্বতা দেখিয়েছে। জালমেই খলিলজাদ তালিবানদের পরিবর্তিত হবার কথা বলেছেন, কারণ তালিবান আলোচনার মাধ্যমে ছাড় দেবার প্রবণতা দেখিয়েছে। হেরে যাবার পর যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা ডাকার কোন অধিকারই ছিল না; অথচ তারপরেও তালিবানরা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় বসেছে। তালিবানরা তাদের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে রাশিয়া এবং চীনের সাথে আলোচনা করে তাদেরকে আস্বস্ত করেছে। এই ব্যাপারগুলি ১৯৯০এর দশকের তালিবান থেকে পুরোপুরিভাবে আলাদা। ‘আল জাজিরা’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, বর্তমানের তালিবান মিডিয়া এবং প্রযুক্তির ব্যাপারে যথেষ্ট পরিবর্তিত। তারা নিয়মিতভাবে তাদের বিভিন্ন কর্মকান্ডের ছবি এবং ভিডিও মিডিয়াতে দিচ্ছে; বিভিন্ন ইস্যুতে মিডিয়াতে বিবৃতি দিচ্ছে; ফেইসবুক পেইজ আপডেট দিচ্ছে ঘনঘন। তালিবানরা পুরো আফগানিস্তান জুড়ে সাম্প্রতিক সময়ে যতগুলি শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, সবগুলি শহরই তাদের হাতে এসেছে শান্তিপূর্ণভাবে। তারা কাবুলে ঢোকার আগেও বারংবার ঘোষণা দিয়েছে যে, তারা কোন রক্তপাত ছাড়াই ক্ষমতা হস্তান্তর চায়। আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনির দেশ ছেড়ে পালাবার পর তালিবান যোদ্ধারা আফগান প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেসে প্রবেশ করে। সেখানে তারা লাইভ টেলিভিশনের সামনেই প্যালেসের হস্তান্তর সম্পন্ন করে এবং সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেয়।
তালিবানরা বলছে যে, তারা ইসলামিক আমিরাত তৈরি করতে যাচ্ছে। তারা শরীয়াহর কিছু আইন বাস্তবায়নও করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। তবে আফগানিস্তানের আন্তর্জাতিক বাউন্ডারিগুলি মেনে নিয়ে তারা মূলতঃ জাতিরাষ্ট্রের চিন্তাকেই ভিত হিসেবে তুলে ধরেছে। জুলাই মাসে মস্কোতে তালিবান প্রতিনিধিরা গিয়েছিলেন রাশিয়াকে চিন্তামুক্ত করতে যে, তালিবানরা আফগানিস্তানের সাথে উজবেকিস্তান এবং তাজিকিস্তানের সীমানা মেনে চলবে। একই মাসে মোল্লা আব্দুল গনি বারাদারের নেতৃত্বে আফগান দল বেইজিং ঘুরে এসেছে চীনাদেরকে দুশ্চিন্তামুক্ত করতে। চীনারা যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান প্রস্থানে নিজেদের বিরক্তি প্রকাশ করেছে। তাদের প্রধান দুশ্চিন্তা ছিল আঞ্চলিক নিরাপত্তা। এমতাবস্থায় তালিবান প্রতিনিধিদের বেইজিং গমন চীনের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই মোল্লা বারাদারকেই পাকিস্তান সরকার ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আটক করেছিল যুক্তরাষ্ট্রকে খুশি করতে। আবার ২০১৮ সালে এই বারাদারকেই পাকিস্তান ছেড়ে দিয়েছে কাতাদের রাজধানী দোহায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় নেতৃত্ব দেবার জন্যে। পাকিস্তানই তালিবানকে রাজি করিয়েছে হেরে যাওয়া শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় বসতে। আর এর মাধ্যমে তালিবান তাদের ছাড় দেয়ার মানসিকতা দেখাতে থাকে। ব্রিটেনের ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা বারাদারকে ২০ বছরের যুদ্ধের অবিসংবাদিত বিজয়ী বলে আখ্যা দিয়েছে। কিন্তু এখানে পাকিস্তানের ভূমিকাটা নিঃসন্দেহে সামনে চলে আসে এবং পাকিস্তানের উপর স্থলবেষ্টিত আফগানিস্তানের নির্ভরশীলতাকে তুলে ধরে। আলোচনার টেবিলে বারাদারের ভূমিকা পশ্চিমাদের কাছে ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আলোচনার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র যে ব্যাপারগুলি নিশ্চিত করেছে তার মাঝে রয়েছে আইনের ব্যাপারে তালিবানকে কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দিতে রাজি করানো এবং আন্তর্জাতিক সীমানা অমান্য করে খিলাফত ঘোষণা করা থেকে বিরত থাকা। হেরে গিয়েও যুক্তরাষ্ট্র তালিবানদেরকে দিয়ে তাদের উদ্দেশ্য কিছুটা হলেও বাস্তবায়িত করিয়ে নিয়েছে। তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধরে রাক্ষার জন্যে যথেষ্ট নাও হতে পারে।
১৫ই অগাস্ট মার্কিনীদের জন্যে যেমন ভুলে যাবার মতো দিন হিসেবে থাকবে, আফগানিস্তানের তালিবানদের জন্যেও ঠিক একইভাবে মনে রাখার মতো দিন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। হেলিকপ্টার দিয়ে মার্কিন দূতাবাস খালি করার ভিডিও চিত্র দেখা যাচ্ছিল সকল টেলিভিশন চ্যানেলে। অনেকেই এর সমান্তরাল টানছিলেন ১৯৭৫ সালের ২৯শে এপ্রিল দক্ষিণ ভিয়েতনামের রাজধানী সায়গন থেকে মার্কিন দূতাবাস খালি করার ঘটনার সাথে। ছবিগুলি বিশ্বব্যাপী মার্কিন প্রভাব কমার উদাহরণ হিসেবেই প্রতিফলিত হবে। অনেকেই অবাক হচ্ছেন এই ভেবে যে, আফগান সেনাবাহিনী প্রায় কোন যুদ্ধ ছাড়াই কিভাবে তালিবানদের হাতে পুরো দেশ ছেড়ে দিল। আর একইসাথে অনেকেই আলোচনা করছেন তালিবানদের চিন্তাধারা, নীতি এবং কর্মকান্ড নিয়ে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, তালিবানদের হাতে আফগান সেনাবাহিনীর পরাজয় প্রায় জানাই ছিল; তবে এটা কতটা দ্রুত হতে পারে, সেব্যাপারে কেউই নিশ্চিত ছিলেন না। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, আফগান সেনাবাহিনীর সদস্যসংখ্যা কাগজেকলমে ৩ লক্ষের মতো হলেও প্রকৃতপক্ষে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা তাদের আয় বৃদ্ধি করার জন্যে সেনাসদস্যের সংখ্যা বেশি দেখাতো। আফগান সেনারা এতটাই কম বেতন পেত যে, তারা তাদের অস্ত্র এবং যন্ত্রপাতি বিক্রি করে দিয়ে সংসার চালাতো। কোন দরকার ছাড়াই বেশি বুলেট ব্যবহার করতো এবং বুলেটের খোসাগুলি ব্জারে বিক্রি করে দিতো। আফগান সেনাবাহিনীর অস্ত্র এবং যন্ত্রপাতি তালিবানরা আফগান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধেই ব্যবহার করেছে। এমতাবস্থায় আফগান সেনাবাহিনীর অস্ত্রসস্ত্র নয়, বরং তাদের যুদ্ধ করার ইচ্ছাশক্তিটাই ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অন্ততঃ গত কয়েকদিনের খবরে এটা পরিষ্কার যে, এই ইচ্ছাশক্তি পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল আফগানিস্তানের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতির উপর।
মার্কিন কূটনীতিবিদ জালমেই খলিলজাদ আফগানিস্তানের একাধিক টেলিভিশনের সাথে সাক্ষাতে বলেছেন যে, এই তালিবান আগের তালিবান নয়; তারা অনেক পরিবর্তিত হয়েছে; বিশেষ করে নারী শিক্ষা, বাকি বিশ্বের সাথে সম্পর্ক এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলিকে থাকতে দেবার ক্ষেত্রে তারা তাদের আগের ভুলগুলি বুঝতে পেরেছে। তবে পশ্চিমা দুনিয়ার অনেকেই খলিলজাদের সাথে একমত নন। তারা মনে করছেন যে, তালিবানরা পশ্চিমা আদর্শ বাস্তবায়ন থেকে বহুদূরে রয়েছে। যেমন, তারা এখনও তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকায় মানুষের উপর প্রচুর করের বোঝা চাপাচ্ছে; স্কুল বন্ধ করে দিচ্ছে; সরকার পরিচালনায় নারী সদস্য রাখছে না; ইত্যাদি। তালিবানরা দোহা আলোচনায় কোন নারী সদস্য বা সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধি রাখেনি বলেও পশ্চিমারা অভিযোগ করেছে। দোহাতে তারা সেকুলার আইনের স্থানে কিছু শরীয়াহ আইন বাস্তবায়নের কথা বলার কারণেও পশ্চিমারা নাখোশ হয়েছে। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘আটলান্টিক কাউন্সিল’এর এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, তালিবানরা যে ব্যাপারটাতে সবচাইতে বেশি অদূরদর্শিতা দেখিয়েছে তা হলো, আফগানিস্তানের জন্যে নির্দিষ্ট কোন লক্ষ্য দেখাতে না পারা। সরকার পরিচালনা, সেবা দেয়া, অথবা আইনের শাসন বাস্তবায়নের কোন পরিকল্পনাই তারা দেখাতে সক্ষম হয়নি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দেশ পুনর্গঠন, ইত্যাদি কোন বিষয়েই তারা নির্দিষ্ট কোন দিকনির্দেশনা দিতে পারেনি।
তালিবান মনে করছে যে, তারা সারা দুনিয়ার মুসলিমদের মাঝে সবচাইতে আলাদা; কারণ তারা যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে হারিয়েছে এবং তাদেরকে দেশ ছাড়ার জন্যে আলোচনায় বসতে বাধ্য করেছে। তবে তালিবানরা রাজনৈতিক লক্ষ্যের ব্যাপারে অপরিপক্বতা দেখিয়েছে। জালমেই খলিলজাদ তালিবানদের পরিবর্তিত হবার কথা বলেছেন, কারণ তালিবান আলোচনার মাধ্যমে ছাড় দেবার প্রবণতা দেখিয়েছে। হেরে যাবার পর যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা ডাকার কোন অধিকারই ছিল না; অথচ তারপরেও তালিবানরা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় বসেছে। তালিবানরা তাদের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে রাশিয়া এবং চীনের সাথে আলোচনা করে তাদেরকে আস্বস্ত করেছে। এই ব্যাপারগুলি ১৯৯০এর দশকের তালিবান থেকে পুরোপুরিভাবে আলাদা। ‘আল জাজিরা’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, বর্তমানের তালিবান মিডিয়া এবং প্রযুক্তির ব্যাপারে যথেষ্ট পরিবর্তিত। তারা নিয়মিতভাবে তাদের বিভিন্ন কর্মকান্ডের ছবি এবং ভিডিও মিডিয়াতে দিচ্ছে; বিভিন্ন ইস্যুতে মিডিয়াতে বিবৃতি দিচ্ছে; ফেইসবুক পেইজ আপডেট দিচ্ছে ঘনঘন। তালিবানরা পুরো আফগানিস্তান জুড়ে সাম্প্রতিক সময়ে যতগুলি শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, সবগুলি শহরই তাদের হাতে এসেছে শান্তিপূর্ণভাবে। তারা কাবুলে ঢোকার আগেও বারংবার ঘোষণা দিয়েছে যে, তারা কোন রক্তপাত ছাড়াই ক্ষমতা হস্তান্তর চায়। আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনির দেশ ছেড়ে পালাবার পর তালিবান যোদ্ধারা আফগান প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেসে প্রবেশ করে। সেখানে তারা লাইভ টেলিভিশনের সামনেই প্যালেসের হস্তান্তর সম্পন্ন করে এবং সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেয়।
তালিবানরা বলছে যে, তারা ইসলামিক আমিরাত তৈরি করতে যাচ্ছে। তারা শরীয়াহর কিছু আইন বাস্তবায়নও করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। তবে আফগানিস্তানের আন্তর্জাতিক বাউন্ডারিগুলি মেনে নিয়ে তারা মূলতঃ জাতিরাষ্ট্রের চিন্তাকেই ভিত হিসেবে তুলে ধরেছে। জুলাই মাসে মস্কোতে তালিবান প্রতিনিধিরা গিয়েছিলেন রাশিয়াকে চিন্তামুক্ত করতে যে, তালিবানরা আফগানিস্তানের সাথে উজবেকিস্তান এবং তাজিকিস্তানের সীমানা মেনে চলবে। একই মাসে মোল্লা আব্দুল গনি বারাদারের নেতৃত্বে আফগান দল বেইজিং ঘুরে এসেছে চীনাদেরকে দুশ্চিন্তামুক্ত করতে। চীনারা যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান প্রস্থানে নিজেদের বিরক্তি প্রকাশ করেছে। তাদের প্রধান দুশ্চিন্তা ছিল আঞ্চলিক নিরাপত্তা। এমতাবস্থায় তালিবান প্রতিনিধিদের বেইজিং গমন চীনের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই মোল্লা বারাদারকেই পাকিস্তান সরকার ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আটক করেছিল যুক্তরাষ্ট্রকে খুশি করতে। আবার ২০১৮ সালে এই বারাদারকেই পাকিস্তান ছেড়ে দিয়েছে কাতাদের রাজধানী দোহায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় নেতৃত্ব দেবার জন্যে। পাকিস্তানই তালিবানকে রাজি করিয়েছে হেরে যাওয়া শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় বসতে। আর এর মাধ্যমে তালিবান তাদের ছাড় দেয়ার মানসিকতা দেখাতে থাকে। ব্রিটেনের ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা বারাদারকে ২০ বছরের যুদ্ধের অবিসংবাদিত বিজয়ী বলে আখ্যা দিয়েছে। কিন্তু এখানে পাকিস্তানের ভূমিকাটা নিঃসন্দেহে সামনে চলে আসে এবং পাকিস্তানের উপর স্থলবেষ্টিত আফগানিস্তানের নির্ভরশীলতাকে তুলে ধরে। আলোচনার টেবিলে বারাদারের ভূমিকা পশ্চিমাদের কাছে ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আলোচনার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র যে ব্যাপারগুলি নিশ্চিত করেছে তার মাঝে রয়েছে আইনের ব্যাপারে তালিবানকে কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দিতে রাজি করানো এবং আন্তর্জাতিক সীমানা অমান্য করে খিলাফত ঘোষণা করা থেকে বিরত থাকা। হেরে গিয়েও যুক্তরাষ্ট্র তালিবানদেরকে দিয়ে তাদের উদ্দেশ্য কিছুটা হলেও বাস্তবায়িত করিয়ে নিয়েছে। তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধরে রাক্ষার জন্যে যথেষ্ট নাও হতে পারে।
Labels:
Afghan Emirate,
Afghanistan,
China,
Geopolitics,
Kabul Embassy Evacuation,
Khilafah,
Pakistan,
Russia,
Taliban,
USA
Subscribe to:
Posts (Atom)


