Tuesday, 13 July 2021

হাইতির প্রেসিডেন্টের হত্যাকান্ড … যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার দ্বন্দ্বের ফলাফল?

১৩ই জুলাই ২০২১

২০১৮ সাল। প্রেসিডেন্ট জোভেনেল মোইজের ছবি নষ্ট করছেন একদল প্রতিবাদকারী। ট্রাম্প প্রশাসনের সময় ডেমোক্র্যাট রাজনীতিবিদেরা সরাসরিই নির্বাচন পাশ কাটিয়ে হাইতির প্রেসিডেন্ট মোইজকে ক্ষমতাচ্যুত করার কথা বলছিলেন। আবার অনেকেই হাইতির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নাক গলানোর বিপক্ষে কথা বলছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে সকলের সামনে ক্যারিবিয়ানে মার্কিন স্বেচ্ছাচারিতার ব্যাপারটাই সামনে আসছে; যুক্তরাষ্ট্র এতে জড়িত থাকুক আর না থাকুক।

 

হাইতির প্রেসিডেন্ট জোভেনেল মোইজকে তার বাড়িতে ঢুকে হত্যার ঘটনার পিছনে কারা জড়িত ছিল, তা নিয়ে চলছে ব্যাপক জল্পনা কল্পনা। ৭ই জুলাই দিবাগত রাতে মোইজের প্রাইভেট বাড়িতে ঢুকে তাকে নৃশংশভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। তার স্ত্রীও ভীষণভাবে আহত হন। এই হত্যাকান্ড এমন সময়ে এলো, যখন হাইতির নেতৃত্ব নিয়ে ব্যাপক দ্বন্দ্ব চলছে। দেশটাতে এখন কোন কার্যকর পার্লামেন্ট নেই। মোইজের পদত্যাগের দাবিতে রাস্তায় বিক্ষোভ চলছে প্রায় তিন বছর ধরে। ২০১৭ সাল থেকে প্রেসিডেন্ট মোইজ ছয়জনকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিয়েছেন। ক্লদ জোসেফ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী হলেও তাকে মোইজ নিয়োগ দিয়েছিলেন ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। হত্যাকান্ডের শিকার হবার মাত্র কয়েকদিন আগে মোইজ আরিয়েল হেনরিকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিয়েছিলেন। তবে পার্লামেন্ট এবং প্রেসিডেন্ট ছাড়া হেনরির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর কঠিন হবে। অপরদিকে হাইতির সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের মৃত্যু হলে ক্ষমতা পাবার কথা প্রধান বিচারপতির। কিন্তু কিছুদিন আগে প্রধান বিচারপতি করনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। বোঝাই যাচ্ছে যে, প্রেসিডেন্ট মোইজের হত্যাকান্ডের ঘটনার সময়টা ছিল খুবই সংবেদনশীল। ১ কোটি ১২ লক্ষ মানুষের হাইতি আমেরিকা মহাদেশের দরিদ্রতম দেশ। ১৯৯০এর দশক থেকে দেশটা অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে খুঁড়িয়ে চলছে। তবে এই দরিদ্র দেশটাকে কেন্দ্র করেই চলছে ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা।

যুক্তরাষ্ট্র এবং কলম্বিয়ার নাগরিকেরা জড়িত

‘সিএনএন’এর এক প্রতিবেদনে প্রশ্ন করা হচ্ছে যে, হাইতির পুলিশ কর্মকর্তারা যেখানে বলছেন যে, হত্যাকারীরা ছিল বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সামরিক সদস্য এবং তারা কয়েক মাস ধরে পরিকল্পনা করেছে, সেখানে তারা যে হাইতির পুলিশের আক্রমণের শিকার হবে, তা তারা একেবারেই চিন্তায় রাখেনি! শুধু তাই নয়, আশ্চর্য হলেও সত্যি যে, মোইজের শরীরে অনেকগুলি বুলেটের আঘাতের কথা বলা হলেও প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তারক্ষীদের মাঝে কারুরই হতাহত হবার খবর আসেনি! বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয় যে, সেই রাতে প্রেসিডেন্টের বাড়িতে হামলার খবর পেয়ে ছুটে আসা নিরাপত্তা সদস্যরা কোন কারণে পাঁচটা গাড়িতে করে আসা হত্যাকারীদেরকে বিনা বাধায় চলে যেতে দেয়। এরপর গাড়িগুলি কিছুদূর যাবার পর কয়েক’শ নিরাপত্তারক্ষীর বাধার সন্মুখীন হয় এবং গাড়ি থেকে বের হয়ে পালিয়ে যায়। একটা বাড়িতে লুকিয়ে থাকা গ্রুপকে হাইতির নিরাপত্তা বাহিনী ঘিরে ফেলে। সকালের দিকে কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়ার পর তারা নিরাপত্তারক্ষীদের সাথে ফোনে আলাপ করতে থাকে এবং একে একে বের হয়ে আসতে থাকে। এদের মাঝে দু’জন ছিল হাইতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈত নাগরিক। তারা নিজেদেরকে অনুবাদক বলে পরিচয় দেয়। কমপক্ষে তিনজন ভাড়াটে সেনা গোলাগুলিতে নিহত হয় বলে নিরাপত্তা বাহিনী জানায়। প্রতিবেদনে প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে বলা হয় যে, কয়েকজন সদস্য কাছেই তাইওয়ান দূতাবাস থাকার ব্যাপারে জানতো বা অন্য কারো কাছ থেকে জানতে পারে। যদিও স্প্যানিশ ভাষাভাষী কলম্বিয়ার নাগরিকেরা ফরাসি ভাষাভাষী হাইতিতে কি করে তাইওয়ানের দূতাবাস খুঁজে পেলো, তা বোধগম্য নয়। হয়তো তারা মনে করেছিল যে, রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করলে তাইওয়ানের দূতাবাসের কর্মকর্তারা হাইতির পুলিশের কাছে তাদের ধরিয়ে দেবে না বা পুলিশকে ভেতরে ঢুকতে দেবে না। এই ব্যক্তিরা পাহাড় এবং দূতাবাসের উঁচু দেয়াল বেয়ে দূতাবাসে ঢুকে পড়ে। তাইওয়ান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন যে, প্রেসিডেন্টের হত্যার খবর জানার পর নিরাপত্তার কারণে তাইওয়ানের দূতাবাসে কেউ অবস্থান করছিল না। তবে হাইতির নিরাপত্তা বাহিনীর অনুরোধে তাইওয়ান দূতাবাসের কর্মকর্তারা পুলিশকে সেখানে ঢোকার অনুমতি দেয়। সেখান থেকে ১১ জন ভাড়াটে সেনাকে গ্রেপ্তার করা হয়। নিজস্ব সূত্রের বরাত দিয়ে ‘সিএনএন’ বলছে যে, গ্রেপ্তারকৃত কিছু ব্যক্তি মার্কিন ‘ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট এডমিনিস্ট্রেশন’ বা ‘ডিইএ’ এবং ‘ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন’ বা ‘এফবিআই’এর ‘সোর্স’ হিসেবে কাজ করতো।

 
প্রেসিডেন্টকে হত্যার অভিযোগে হাইতির পুলিশ দু’জন মার্কিন নাগরিক এবং ১৫ জন কলম্বিয়ার নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে। হত্যাকারীদের হাইতি ছেড়ে পালাবার তেমন কোন পরিকল্পনা চোখে পড়েনি। হয়তো তাদেরকে বলা হয়েছিল যে, প্রেসিডেন্টকে হত্যার পর একটা অভ্যুত্থান সংগঠিত হবে এবং নতুন ক্ষমতা নেয়া ব্যক্তিরা তাদেরকে নিরাপদে দেশ ছাড়তে সহায়তা করবে।


১২ই জুলাই ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’এর এক খবরে বলা হয় যে, হাইতির প্রেসিডেন্টকে হত্যায় জড়িত থাকার সন্দেহে যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামিতে বসবসকারী হাইতির নাগরিক ক্রিশ্চিয়ান ইমানুয়েল সানোনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যদিও হাইতির কর্মকর্তারা বলছেন যে, ইউটিউবে প্রকাশ করা ভিডিওতে জাজক এবং ডাক্তার সানোন হাইতির নেতৃত্ব পাবার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন, অনেকেই বলছেন যে, সানোন প্রকৃতপক্ষে এব্যাপারে কিছুই জানেনা; বরং যারা সত্যিকারের অপরাধী, তারাই সানোনের নাম সামনে এনেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সানোনের বন্ধুর বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, কিছু ব্যক্তি নিজেদেরকে মার্কিন সরকারের প্রতিনিধি আখ্যা দিয়ে সানোনের সাথে দেখা করে এবং তাকে হাইতির প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় বসাতে চায়। এতে পরিকল্পনা করা হয় যে, প্রেসিডেন্ট মোইজকে আটক করা হবে; খুন করা হবে না। ফ্লোরিডাতে সানোনের বন্ধুরা বিশ্বাস করতে পারছেন না যে সে হত্যার মতো প্রকল্পের অংশ হতে পারে।

হাইতির পুলিশ প্রধান লিয়ন চার্লস বলছেন যে, হাইতিতে সানোনের বাড়িতে মার্কিন ‘ডিইএ’এর লোগো খচিত একটা টুপি তারা পেয়েছেন; সাথে ২০ বাক্স বুলেট, অস্ত্র, ডোমিনিকান রিপাবলিকের চারটা লাইসেন্স প্লেট, দু’টা গাড়ি, এবং কিছু চিঠি। তিনি বলেন যে, এখন পর্যন্ত ২৩ জন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে; যাদের বেশিরভাগই কলম্বিয়ার নাগরিক। তিনজন হাইতির নাগরিককেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়াও আরও তিনজন ইতোমধ্যেই গোলাগুলিতে মৃত্যুবরণ করেছে। অপরদিকে কলম্বিয়ার পুলিশ প্রধান জেনারেল লুইস ভারগাস বলেন যে, ফ্লোরিডাতে রেজিস্টার করা ‘সিটিইউ সিকিউরিটি’ নামের এক কোম্পানি কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোটা থেকে ডোমিনিকান রিপাবলিকের সান্টো ডোমিঙ্গো পর্যন্ত ১৯টা বিমানের টিকেট ক্রয় করেছিল। এই ব্যক্তিরা জুনে ডোমিনিকান রিপাবলিকে আসে, এবং কয়েক সপ্তাহের মাঝেই স্থলপথে সীমান্ত অতিক্রম করে হাইতিতে প্রবেশ করে। দ্বীপ দেশ হাইতির একমাত্র স্থলসীমানা রয়েছে ডোমিনিকান রিপাবলিকের সাথে। শুধু তাই নয়, হাইতির পুলিশ কর্মকর্তা দিমিত্রি হেরাল্ড হত্যাকান্ডের আগের মাসগুলিতে কলম্বিয়া, ইকুয়েডর এবং পানামাতে যাতায়াত করেছিল। তাই কলম্বিয়ার পুলিশ তার ব্যাপারেও তদন্ত করে দেখছে যে ভাড়াটে সেনাদের রিক্রুট করার ক্ষেত্রে তার কোন ভূমিকা ছিল কিনা। হাইতির পুলিশ বলছে যে, সানোনের সাথে ‘সিটিইউ সিকিউরিটি’র যোগাযোগ ছিল; এবং একটা প্রাইভেট বিমানে করে সানোন হাইতিতে আসেন; তার সাথে কিছু অস্ত্রধারী ব্যক্তিও ছিল। সানোনের এক বন্ধু বলছে যে, কিছুদিন আগে ‘সিটিইউ সিকিউরিটি’র মালিক ভেনিজুয়েলার নাগরিক ইমানুয়েল ইন্ত্রিয়াগো ভালেরার সাথে সানোনের বৈঠক হয়; যেখানে ভালেরা হাইতির উন্নয়নের জন্যে কিছু প্রকল্প তুলে ধরেন। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সানোন হাইতিতে একজন অপরিচিত ব্যক্তি। তাকে এই ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কেউই মানতে পারছেন না।

প্রেসিডেন্ট মোইজ বনাম হাইতির জনগণ

এবছরের এপ্রিলে ‘হারভার্ড ল’ স্কুল’এর ‘ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস ক্লিনিক’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ২০১৮ থেকে ২০২০এর মাঝে হাইতির রাজধানী পোর্ট আউ প্রিন্সএর গরীব এলাকাগুলিতে সরকারি সহায়তায় তিনটা গণহত্যা চালানো হয়। এতে কমপক্ষে ২’শ ৪০ জন মানুষকে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকান্ডে হাইতির সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এবং পুলিশ সদস্যরা জড়িত ছিল। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, যে এলাকাগুলিতে এই হত্যাকান্ড চালানো হয়, সেই এলাকাগুলি থেকেই সরকার বিরোধী বিক্ষোভ শুরু এবং পরিচালনা করা হয়েছিল। নিহত প্রেসিডেন্ট মোইজ ক্ষমতা নেবার পর থেকেই তার বিরুদ্ধে রাস্তায় বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভের মূল বিষয় ছিল দেশটার রাজনীতিবিদ এবং সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যাপক দুর্নীতি। মোইজএর সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয় যে, এই হত্যাকান্ডগুলি সশস্ত্র গ্যাংএর সহিংসতা ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে যে, এই হত্যাকান্ডগুলি পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং তথ্যপ্রমাণ গোপন করার পিছনে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্তাব্যক্তিরা জড়িত ছিলেন। মোইজের সরকার গ্যাংগুলিকে অর্থ, অস্ত্র এবং গাড়ি দিয়ে সহায়তা দেয়। দায়িত্বরত না থাকা পুলিশ কর্মকর্তারাও এসব কর্মকান্ডে অংশ নেন। পুলিশ স্টেশনগুলির কাছেই এই ঘটনাগুলি ঘটে; কিন্তু পুলিশ মানুষকে রক্ষা করার জন্যে এগিয়ে আসেনি। অপরাধীদের বেশিরভাগই ছিল ‘জি৯’ গ্যাংএর সদস্য। এই গ্যাংএর নেতা জিমি শেরিজিয়ের সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে থাকেন।

২০১৮ সালের জুলাই মাসে মোইজের সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করলে মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। প্রতিবাদস্বরূপ সেপ্টেম্বর থেকে পুরো দেশজুড়ে ‘লকডাউন’ ঘোষণা করা হয় এবং স্কুল, ব্যাংক এবং আদালতসহ সকল অর্থনৈতিক কর্মকান্ড প্রায় শূণ্যের কোঠায় পৌঁছে। অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে যায় এবং ব্যাপক দারিদ্র্য পেয়ে বসে জনগণকে। এখন পর্যন্ত সহিংসতায় দু’শর বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে বলে বিভিন্ন খবরে প্রকাশ। এই আন্দোলনের সময় হাইতিতে অতি প্রভাবশালী বিদেশী গ্রুপগুলির ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

 
২০১০ সাল। হাইতিতে ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদস্যরা ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করছে। হাইতির রাজনীতি এবং নীতিনির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্র সর্বদাই কেন্দ্রীয় ভূমিকা রেখেছে। একদিকে যেমন মার্কিন সরকার মোইজকে সমর্থন দিয়ে গিয়েছে, অন্যদিকে মার্কিন রাজনীতিবিদেরা হাইতি প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্যে সরাসরি বক্তব্য দিয়েছেন।


হাইতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব

মার্কিন সরকারের একটা প্রতিনিধিদল হাইতি ঘুরে এসেছেন। সফরকালে তারা হাইতির বর্তমান নেতৃত্বের এবং নেতৃত্ব দাবি করা ব্যক্তিদের সাথে কথা বলেছেন। হোয়াইট হাউজের প্রেস সচিব জেন পিসাকি সাংবাদিকদের বলেন যে, হাইতি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ সামরিক হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে। তবে সেব্যাপারে মার্কিন সরকার এখনও কোন সিদ্ধান্ত নেয়নি। তিনি আরও বলেন যে, প্রতিনিধিদল সফরে বুঝেছেন যে, নেতৃত্বের ভবিষ্যতের ব্যাপারে কোন পরিষ্কার সিদ্ধান্ত নেয়া যাচ্ছে না।

হাইতির নীতিনির্ধারণে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ‘কোর গ্রুপ’; যা হলো শক্তিশালী কয়েকটা রাষ্ট্র এবং সংস্থার প্রতিনিধিদের গ্রুপ। এর সদস্যদের মাঝে সবচাইতে শক্তিশালী হলো যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা; যারা ক্যারিবিয়ানে সবচাইতে প্রভাবশালী। হাইতির প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্সও এতে রয়েছে; ক্যারিবিয়ানে ফ্রান্সের এখনও উপনিবেশ রয়েছে। এছাড়াও এই গ্রুপে রয়েছে জাতিসংঘ, ইইউ, জার্মানি, স্পেন এবং ল্যাটিন আমেরিকার একমাত্র প্রতিনিধি দেশ ব্রাজিল। ‘অর্গানাইজেশন অব আমেরিকান স্টেটস’ বা ‘ওএএস’এর একজন প্রতিনিধিও রয়েছে এই গ্রুপে। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হাইতির রাস্তায় ব্যাপক সহিংসতার পর ‘কোর গ্রুপ’ একটা বিবৃতি দেয়। হাইতিতে মার্কিন দূতাবাসের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ‘কোর গ্রুপ’এর এই বিবৃতিতে বলা হয় যে, তারা হাইতিতে ভোট ব্যতীত আর কোন পদ্ধতিতে সরকার পরিবর্তন সমর্থন করে না। বিক্ষোভকারীদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষের সময় পুলিশের ভূমিকারও ব্যাপক প্রশংসা করা হয় সেই বিবৃতিতে। আর সহিংসতা থামাতে হাইতির নেতৃত্বকে আলোচনায় মনোনিবেশ করার উপদেশ দেয়া হয়। একইসাথে মোইজের সরকারকে সংস্কার কাজ চালিয়ে যেতে আহ্বান জানানো হয়।

কয়েক দশক ধরে হাইতির রাজনীতি এবং নীতিনির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্র সর্বদাই কেন্দ্রীয় ভূমিকা রেখেছে। একদিকে যেমন মার্কিন সরকার মোইজকে সমর্থন দিয়ে গিয়েছে, অন্যদিকে মার্কিন রাজনীতিবিদেরা হাইতির প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্যে সরাসরি বক্তব্য দিয়েছেন। হাইতির সহিংসতার মাঝে ২০১৯এর অক্টোবরে ফ্লোরিডার ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য ফ্রেডারিকা উইলসন হাইতির উপর একটা গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করেন; যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত হাইতির নাগরিকরা হাইতির রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ বন্ধের আহ্বান জানান এবং প্রেসিডেন্ট মোইজের ক্ষমতা ছাড়ার পক্ষে মত দেন। ডিসেম্বরে হাইতির পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কমিটির শুনানি হয়। ‘মায়ামি হেরাল্ড’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, এই শুনানি ছিল ছয় বছরের মাঝে হাইতি নিয়ে প্রথম শুনানি। সেসময়ে ডেমোক্র্যাট সদস্যরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ক্ষমতা থেকে সরাবার চেষ্টা করছিলেন। ফ্লোরিডার ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য ফ্রেডারিকা উইলসন হাইতির প্রতিনিধিদের জিজ্ঞেস করেন যে, হাইতির প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করার কাজ কতটা এগুলো। হাইতির রাজনৈতিক কর্মী ইমানুয়েলা দুইয়োন বলেন যে, হাইতির পার্লামেন্টের সদস্যারা সকলেই প্রেসিডেন্ট মোইজের সমর্থনপুষ্ট এবং অত্যন্ত দুর্নীতিগ্রস্ত। প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে তারা বিভিন্ন আইন পাস করার জন্যে অর্থ পেয়ে থাকে। সেবছরের মার্চে প্রেসিডেন্টের সমর্থনপুষ্ট হয়েই পার্লামেন্টের সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীকে সরিয়ে দেয়। এর পর থেকে হাইতিতে জনগণের প্রতিনিধিত্বমূলক কোন সরকার নেই। শুনানিতে ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য ম্যাক্সিন ওয়াটার্স অভিযোগ করেন যে, মোইজের সরকার ভেনিজুয়েলার পেট্রোক্যারিব তেল আমদানি প্রকল্প থেকে বেঁচে যাওয়া ২ বিলিয়ন ডলার আত্মসাৎ করেছে। অথচ ২০১০ সালের মারাত্মক ভূমিকম্পের পর ধ্বংসপ্রাপ্ত হাইতির পুনর্বাসনের জন্যে এই অর্থ ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ। তদুপরি মার্কিন সরকার মোইজের সরকারকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। হাইতির ‘ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস নেটওয়ার্ক’এর ডিরেক্টর পিয়েরে এসপেরেন্স বলেন যে, হাইতিতে আন্তর্জাতিক সহায়তা মূলতঃ দেয়া হচ্ছে দেশটার নির্বাচন পদ্ধতিকে সঠিক করতে; হাইতির পুলিশ এবং আদালতকে শক্তিশালী করতে সহায়তা আসছে না। হাইতির আরেক নাগরিক লিওনি হেরমানটিন বলেন যে, আন্তর্জাতিক শক্তিরা নির্বাচন কেন্দ্রিক সহায়তার মাঝেই নিজেদেরকে সীমাবদ্ধ করার কারণে হাতে গোণা কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত লোকের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়ে গিয়েছে। হাইতিতে নির্বাচন হলেই গণতন্ত্র সঠিকভাবে বজায় থাকবে, এব্যাপারে তিনি দ্বিমত পোষণ করেন। ওবামা প্রশাসনের সময় ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের বিশেষ উপদেষ্টা ড্যানিয়েল এরিকসন বলেন যে, হাইতির সমস্যার সমাধান করতে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত কানাডা, ইইউ এবং ‘অর্গানাইজেন অব আমেরিকান স্টেটস’ বা ‘ওএএস’এর সাথে যৌথভাবে কাজ করা। তিনিও হাইতির পুলিশ এবং আদালতের জন্যে মার্কিন সাহায্য দেয়ার আহ্বান জানান। ফ্রেডারিকা উইলসন বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে মাত্র দু’শ মাইল দূরের একটা দেশে কি হচ্ছে, সেব্যাপারে চোখ বন্ধ করে থাকার সময় নয় এটা।

 
২০১৮ সাল। হাইতির প্রেসিডেন্ট জোভেনেল মোইজের সাথে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। হাইতিতে কানাডার প্রভাব খুব একটা দৃশ্যমান নয়। কয়েক দশক ধরেই ক্যারিবিয়ানে ব্রিটেনের প্রাক্তন উপনিবেশগুলিকে উপজীব্য করে নিজের প্রভাব ধরে রেখেছে কানাডা। ১৯৯০এর দশক থেকে হাইতির রাজনৈতিক সমস্যা শুরু হলে কানাডা এই সুযোগে সেখানে নিজেদের রাজনৈতিক এবং সামরিক প্রভাব বৃদ্ধি করার সুযোগ পায়। কিন্তু বরাবরের মতোই সারা বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের নামটাই প্রচারিত হয়; কানাডার নয়। তাই যেকোন রাজনৈতিক সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে সকলেই যুক্তরাষ্ট্রের নামটাই উচ্চারণ করতে থাকে।

যুক্তরাষ্ট্র বনাম কানাডা

‘দ্যা ডেইলি বিস্ট’এর নিকো হাইনসএর মতে, হত্যাকারীদের হাইতি ছেড়ে পালাবার তেমন কোন পরিকল্পনা চোখে পড়েনি। হয়তো তাদেরকে বলা হয়েছিল যে, প্রেসিডেন্টকে হত্যার পর একটা অভ্যুত্থান সংগঠিত হবে এবং নতুন ক্ষমতা নেয়া ব্যক্তিরা তাদেরকে নিরাপদে দেশ ছাড়তে সহায়তা করবে। ‘ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর’এর ওয়াশিংটন প্রতিবেদক কেথেভানি গোরজেস্তানি বলছেন যে, হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তারা যেভাবে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে একই কথা বারবার বলছিলেন, তাতে বোঝা যাচ্ছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র কাউকেই তড়িঘড়ি করে দোষী বলে বিপদে পড়তে চাইছে না। অর্থাৎ মার্কিন প্রশাসন আসলে নিশ্চিত নয় যে, এই হত্যাকান্ড কারা চালিয়েছে। হাইতির রাস্তার মানুষ বলছে যে, মোইজ একজন দুর্নীতিগ্রস্ত লোক ছিলেন; যাকে আরও কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিই খুন করেছে। কেউ কেউ বলছেন যে, এই হত্যাকান্ডের পিছনে কাজ করছে প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শক্তিরা; যাদের মাঝে রয়েছে কানাডা এবং ফ্রান্স। ফ্রান্স ছিল হাইতির প্রাক্তন ঔপনিবেশি শক্তি; যুক্তরাষ্ট্র দু’শ মাইল দূরে বর্তমান বিশ্বের সুপারপাওয়ার। সেই হিসেবে হাইতির রাজনীতিতে ফ্রান্স এবং যুক্তরাষ্ট্রের নামটা আসতেই পারে। কিন্তু কানাডার নামটাও হাইতির রাস্তার মানুষের কাছে এতটা পরিচিত কেন?

হাইতিতে কানাডার প্রভাব খুব একটা দৃশ্যমান নয়। তবে একটা উদাহরণই বলে দিতে পারে যে, পুরো ক্যারিবিয়ানে কানাডা আসলে কতটা প্রভাব রাখে। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ২০১৪ সালে কিউবার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনপ্রতিষ্ঠার পিছনে এক বছরের বেশি সময়ে ধরে কাজ করেছিলেন ওবামা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বেন রোডস। রোডস গোপনে কিউবার ব্যাপারে আলোচনা চালাচ্ছিলেন কানাডাতে। কয়েক দশক ধরেই ক্যারিবিয়ানে ব্রিটেনের প্রাক্তন উপনিবেশগুলিকে উপজীব্য করে নিজের প্রভাব ধরে রেখেছে কানাডা। ১৯৯০এর দশক থেকে হাইতির রাজনৈতিক সমস্যা শুরু হলে কানাডা এই সুযোগে সেখানে নিজেদের রাজনৈতিক এবং সামরিক প্রভাব বৃদ্ধি করার সুযোগ পায়। কিন্তু বরাবরের মতোই সারা বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের নামটাই প্রচারিত হয়; কানাডার নয়। তাই যেকোন রাজনৈতিক সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে সকলেই যুক্তরাষ্ট্রের নামটাই উচ্চারণ করতে থাকে।

২০২০ সালের মে মাসে ট্রাম্প প্রশাসনের সময় ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বিদেশী ভাড়াটে সেনাদের ব্যবহার করে অপহরণ করার অবাস্তব পরিকল্পনা মিডিয়াতে আসার পর ক্যারিবিয়ানে মার্কিন নিয়ন্ত্রণ যেমন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল, তেমনি জো বাইডেন প্রশাসনের সময় হাইতির প্রেসিডেন্ট মোইজের হত্যাকান্ড একইভাবে মার্কিন অবস্থানকে দুর্বল করবে। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের সময় ডেমোক্র্যাট রাজনীতিবিদেরা যখন সরাসরিই নির্বাচনকে পাশ কাটিয়ে হাইতির প্রেসিডেন্ট মোইজকে ক্ষমতাচ্যুত করার কথা বলছিলেন। অপরপক্ষে অনেকেই হাইতির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নাক গলানোর বিপক্ষে কথা বলছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে সকলের সামনে ক্যারিবিয়ানে মার্কিন স্বেচ্ছাচারিতার ব্যাপারটাই সামনে আসছে; যুক্তরাষ্ট্র এতে জড়িত থাকুক আর না থাকুক। গত কয়েক দশক ধরে ক্যারিবিয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তারের বিরুদ্ধে মূল বাধা হলো কানাডা। সুপারপাওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অর্থনৈতিক এবং সামরিক শক্তিতে বহুদূরে থাকা কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের স্থলসীমানায় অবস্থান করে কিভাবে সুপারপাওয়ারকে চ্যালেঞ্জ করতে পারছে, তা বুঝতে হলে কানাডাকে আলাদা একটা জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র হিসেবে দেখলে হবে না। ব্রিটিশ কমনওয়েলথের কানাডা চিন্তাগত দিক থেকে প্রাক্তন সুপারপাওয়ার ব্রিটেনের মতোই। তাই নিজের ভৌগোলিক আকার হিসেব করে তারা তাদের নীতিনির্ধারণ করেনি। হাইতি যুক্তরাষ্ট্র থেকে দু’শ মাইল দূরে হলেও কানাডা থেকে কিন্তু অনেক দূরে। তথাপি সেখানে কানাডার সম্মতি ছাড়া যে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে কোন কিছুই করা সম্ভব হচ্ছে না, তা নিশ্চিত। কয়েক দশক চেষ্টার পরেও হাইতির রাজনীতিকে নিজ পক্ষে নিয়ে আসতে না পারাটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে একটা বড় ব্যর্থতা। সেখানে অন্য কারুর বাধা থাকুক আর না থাকুক; সকলেই যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতাটাই মনে রাখবে। পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় দুর্বল হতে থাকা সুপারপাওয়ার যুক্তরাষ্ট্রকে নিজ উঠানে হেনস্তা করাটা আসলে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ কৌশলের মাঝে পড়ে; কানাডা যেটার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ক্যারিবিয়ানে প্রতি পদে যুক্তরাষ্ট্রের হারানো প্রভাবকে প্রতিস্থাপিত করতে চাইছে কানাডা।

Saturday, 10 July 2021

কৃষ্ণ সাগরে ব্রিটেনের স্বার্থ কি?

১০ই জুলাই ২০২১

ক্রিমিয়ার উপকূলে রুশ যুদ্ধজাহাজ থেকে দেখা যাচ্ছে ব্রিটিশ রয়াল নেভির ডেস্ট্রয়ার 'ডিফেন্ডার'কে। ‘ডিফেন্ডার’ এবং ডাচ ফ্রিগেট ‘এভারস্টেন’ ব্রিটিশ বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘কুইন এলিজাবেথ’এর সাথে দূরপ্রাচ্যের মিশনে বের হয়েছে। জাহাজগুলির দক্ষিণ চীন সাগরে পৌঁছানো এখনও অনেক দেরি; কিন্তু ইতোমধ্যেই তারা আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে আসার মতো একটা খবর তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। কৃষ্ণ সাগরে ন্যাটোর মিশনের সাথে ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ নিয়মিতই মোতায়েন হচ্ছে; তবে মিডিয়ায় এসেছে মার্কিন কর্মকান্ড। এই ঘটনার মাধ্যমে ব্রিটেনের কৃষ্ণ সাগরের ব্রিটিশ মিশনকে হাইলাইট করা হলো।


গত ২৩শে জুন ব্রিটিশ রয়াল নেভির একটা যুদ্ধজাহাজ কৃষ্ণ সাগরে রুশ সামরিক বাহিনীর সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হবার পর থেকে ব্রিটেন এবং রাশিয়ার মাঝে কাদাছোঁড়াছুড়ি চলছে। রুশ বার্তাসংস্থা ‘ইন্টারফ্যাক্স’ বলছে যে, ব্রিটিশ ডেস্ট্রয়ার ‘ডিফেন্ডার’ রাশিয়ার সমুদ্রসীমায় ঢুকে পড়লে রাশিয়ার সীমান্তরক্ষী যুদ্ধজাহাজ থেকে গোলাবর্ষণ করে সতর্ক করা হয় এবং একটা ‘সুখোই ২৪’ যুদ্ধবিমান থেকে কয়েকটা বোমা জাহাজটার কাছাকাছি ফেলা হয়। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলে যে, ব্রিটিশ জাহাজটা আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অমান্য করেছে। রুশ বার্তাসংস্থা ‘তাস’ জানাচ্ছে যে, ঘটনার পর ব্রিটিশ সামরিক এটাশেকে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে ডেকে পাঠানো হয়। অপরদিকে টুইটারে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, ‘ডিফেন্ডার’কে লক্ষ্য করে কোন সতর্কতামূলক গোলাবর্ষণ করা হয়নি। বরং জাহাজটা আন্তর্জাতিক আইন মেনে ইউক্রেনের সমুদ্রসীমানা ‘নিরপরাধভাবে অতিক্রম’ করছিল। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেস পার্লামেন্টের আইনপ্রণেতাদেরকে বলেন যে, রাশিয়ার এই দাবির ব্যাপারে তিনি অবাক হননি; কারণ রাশিয়ার সাথে এরকম ঘটনা নিয়মিত।

২৪শে জুন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেন যে, ক্রিমিয়ার উপকূলে ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজের চলাচল পুরোপুরি সঠিক ছিল। সমুদ্রে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতাকে সমুন্নত রাখতে ব্রিটেন মস্কোকে চ্যালেঞ্জ করে যেতে থাকবে। তিনি বলেন যে, আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমা ব্যবহার করাটা পুরোপুরি সঠিক ছিল; এবং এখানে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, ব্রিটেন রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখল করে নেয়ার স্বীকৃতি দেয়নি। মূলতঃ বরিস জনসনের কথাগুলি এই দ্বন্দ্বকে সংজ্ঞায়িত করে। ব্রিটেন ক্রিমিয়াকে এখনও ইউক্রেনের অংশ হিসেবে দেখছে এবং ক্রিমিয়ার সমুদ্রসীমানাকেও ব্রিটেন দেখছে ইউক্রেনের এলাকা হিসেবে; রাশিয়ার এলাকা হিসেবে নয়। অপরদিকে ব্রিটেন এবং রাশিয়া উভয়েই ক্রিমিয়ার মালিকানার সংজ্ঞার উপর নির্ভর করে আন্তর্জাতিক আইনকে সমুন্নত রাখার কথা বলছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নিজের সমুদ্রসীমা থেকে হাজার মাইল দূরে ব্রিটেন কৃষ্ণ সাগরে কি করছে?

‘ডিফেন্ডার’ ব্রিটিশ রয়াল নেভির দৈত্যাকৃতির বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘কুইন এলিজাবেথ’এর সাথে ভূমধ্যসাগরে এসেছিল। সেই গ্রুপ থেকে আলাদা হয়ে ‘ডিফেন্ডার’ এবং ডাচ নৌবাহিনীর ফ্রিগেট ‘এভারস্টেন’ কৃষ্ণ সাগরে ঢোকে। ঘটনার দুই দিন আগে ২১শে জুন ইউক্রেনের ওডেসা বন্দরে ‘ডিফেন্ডার’এর ডেকের উপর ইউক্রেনের সাথে একটা সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে যে, গত অক্টোবরে দুই দেশের মাঝে স্বাক্ষরিত সমঝোতা অনুযায়ি এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি মোতাবেক ব্রিটেন ইউক্রেনের জন্যে ৮টা ছোট দ্রুতগামী ক্ষেপণাস্ত্রবাহী যুদ্ধজাহাজ তৈরি করবে এবং ব্রিটিশ রয়াল নেভির পুরোনো দু’টা মাইন সুইপার জাহাজ ইউক্রেনকে দেবে। ইউক্রেনের নৌবাহিনীর জন্যে দু’টা নৌঘাঁটি তৈরিতেও সহায়তা দেবে ব্রিটেন। একইসাথে এই প্রকল্পের জন্যে ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়নও ব্রিটিশ সরকারই করছে। এছাড়াও ইউক্রেনের বর্তমান কিছু যুদ্ধবিমানকেও পশ্চিমা ক্ষেপণাস্ত্র বহণ করার জন্যে উপযোগী করার কথা উল্লেখ করা হয়। তদুপরি ইউক্রেনের নৌবাহিনীর জন্যে ফ্রিগেট তৈরির প্রকল্পেও সহায়তা দেবে ব্রিটেন।

 
কৃষ্ণ সাগরে রাশিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন ছাড়াও পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক আইনকে সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব নিতে চাইছে ব্রিটেন; প্রতিটা সুযোগই কাজে লাগাতে চাইছে তারা।

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘আটলান্টিক কাউন্সিল’এর সিনিয়ন ফেলো ব্রায়ান হুইটমোর বলছেন যে, ২০১৪ সালে রাশিয়া ক্রিমিয়া দখল করে নেবার পর থেকে এই এলাকায় উত্তেজনা চলছে; ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজের সাথে রুশদের এই দ্বন্দ্ব সেই উত্তেজনারই অংশ। ক্রিমিয়ার আশেপাশে কৃষ্ণ সাগরে আন্তর্জাতিক আকাশসীমানায় মার্কিন এবং ব্রিটিশ সামরিক বিমান নিয়মিত টহল দিচ্ছে এবং রুশ যুদ্ধবিমান সেগুলিকে আকাশে বাধা দিচ্ছে। ‘ব্রুকিংস ইন্সটিটিউশন’এর সিনিয়র ফেলো স্টিভেন পাইফার এই ঘটনাকে ‘চায়ের কাপে ঝড়’এর সাথে তুলনা দেন। তিনি বলছেন যে, রাশিয়া বলতে চাইছে যে, পশ্চিমারা রাশিয়ার সীমানায় আগ্রাসী ভূমিকা নিয়েছে; আর রাশিয়া নিজ সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করছে। এতে আন্তর্জাতিকভাবে রাশিয়া যেমন বলতে চাইছে যে, পশ্চিমা চাপের মুখে রাশিয়া নিজেকে রক্ষা করতে চাইছে; অপরপক্ষে রুশ সরকার নিজ জনগণের কাছ থেকেও সমর্থন চাইছে। তবে তিনি বলছেন যে, রাশিয়া কৃষ্ণ সাগরের শক্তি হিসেবে নিজেকে জাহির করে যেতে থাকবে এবং পশ্চিমারাও রাশিয়াকে চ্যালেঞ্জ করে যেতে থাকবে।

কৃষ্ণ সাগরে ব্রিটেনের স্বার্থ নতুন নয়। ১৮৭৮ সালে ইস্তাম্বুলের উপকন্ঠে রুশ সেনাবাহিনী হাজির হলে ব্রিটেনের বাধায় রাশিয়া পিছু হঠতে বাধ্য হয়। কৌশলগতভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ বসফরাস প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ব্রিটেন রাশিয়ার হাতে ছাড়তে রাজি নয়; তাই বসফরাসের নিরাপত্তা কথা বলে ব্রিটেন সাইপ্রাসে সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করে; যা আজও রয়েছে। ১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে উসমানি খিলাফতের অধীনে থাকা অঞ্চলগুলি ভাগবাটোয়ারা করার সময়েও বসফরাস প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ যেন রাশিয়ার কাছে চলে না যায়, সেব্যাপারটা নিশ্চিত করে ব্রিটেন। ১৯২৩ সালে স্বাক্ষরিত লাউস্যান চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটেন বসফরাসের নিয়ন্ত্রণ দেয় লীগ অব নেশনসএর হাতে। তবে ১৯৩০এর দশকে ফ্যাসিস্ট ইতালি এবং নাজি জার্মানির আবির্ভাবের পর ১৯৩৬ সালে ‘মনট্রিউ কনভেনশন’এর মাধ্যমে নতুন করে বসফরাসের নিয়মগুলি ঠিক করা হয়; যেগুলি আজও বলবত রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের চাপে তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাহায্য চাইলে কৃষ্ণ সাগরে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের আগমণ ঘটে এবং চার দশক তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের উপরেই নির্ভরশীল থাকে। ঠান্ডা যুদ্ধ শেষে ২০০৪ সালে কৃষ্ণ সাগরের দেশ রোমানিয়া এবং বুলগেরিয়া ন্যাটোর অন্তর্ভুক্ত হলে কৃষ্ণ সাগরে পশ্চিমাদের সাথে রাশিয়ার উত্তেজনা শুরু হয়। ২০০৮ সালে রাশিয়া জর্জিয়া আক্রমণ করে। এরপর ২০১৪ সালে ইউক্রেনে বিপ্লবের মাধ্যমে রুশ সমর্থিত সরকারের পতনের পর পূর্ব ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু হয় এবং রাশিয়া ক্রিমিয়া দখল করে নেয়।

ব্রিটিশ রয়াল নেভির ডেস্ট্রয়ার ‘ডিফেন্ডার’ এবং ডাচ ফ্রিগেট ‘এভারস্টেন’ ব্রিটিশ বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘কুইন এলিজাবেথ’এর সাথে দূরপ্রাচ্যের মিশনে বের হয়েছে। জাহাজগুলির দক্ষিণ চীন সাগরে পৌঁছানো এখনও অনেক দেরি; কিন্তু ইতোমধ্যেই তারা আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে আসার মতো একটা খবর তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। কৃষ্ণ সাগরে ন্যাটোর মিশনের সাথে ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ নিয়মিতই মোতায়েন হচ্ছে; তবে মিডিয়ায় এসেছে মার্কিন কর্মকান্ড। এই ঘটনার মাধ্যমে ব্রিটেনের কৃষ্ণ সাগরের ব্রিটিশ মিশনকে হাইলাইট করা হলো। কৃষ্ণ সাগরে রাশিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন ছাড়াও পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক আইনকে সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব নিতে চাইছে ব্রিটেন; প্রতিটা সুযোগই কাজে লাগাতে চাইছে তারা।

Sunday, 4 July 2021

আদিবাসী শিশুদের গণকবর … কানাডার বর্ণবাদী ইতিহাস প্রশ্নবিদ্ধ করছে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’কে

৪ঠা জুলাই ২০২১

 
কানাডার একটা আবাসিক স্কুলের ১৮৯০ সালের ছবি। ব্রিটিশ কমনওয়েলথের কানাডার ‘সাংস্কৃতিক গণহত্যা’র ইতিহাস আবারও উঠে এলো এমন এক সময়ে, যখন পরিবর্তিত বিশ্বে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ পুনরায় নেতৃত্ব পাবার চেষ্টায় রয়েছে। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডকে সাথে নিয়ে ব্রিটেনের এই চেষ্টা কানাডায় প্রশ্নবিদ্ধ হলেও তা অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের গণহত্যার ইতিহাসকেও সামনে টেনে নিয়ে আসছে। বিশ্ববাসীর কাছে প্রতিনিয়ত ব্রিটিশ নেতৃত্বের বর্ণবাদী ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়াটা ব্রিটিশ সরকার আটকাতে পারছে না কিছুতেই।

কানাডায় গত মে মাস থেকে কমপক্ষে তিনটা গণকবরের সন্ধান মিলেছে, যেগুলি সেখানকার আদিবাসী মানুষদের সন্তানদের কবর বলে সনাক্ত হয়েছে। এই ঘটনায় পুরো কানাডা জুড়ে আবেগের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। এই কবরগুলি ছিল আবাসিক স্কুলে পড়া আদিবাসী ছাত্রদের। এখন পর্যন্ত কানাডার সরকারি অর্থায়নের বোর্ডিং স্কুলগুলির আশেপাশে কমপক্ষে ১১’শ কবরের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। ‘বিবিসি’ জানাচ্ছে যে, এই বোর্ডিং স্কুলগুলির উদ্দেশ্য ছিল আদিবাসীদেরকে কানাডার ইউরোপিয় সংস্কৃতিকে মেনে নিতে বাধ্য করা এবং আদিবাসীদের নিজস্ব সংস্কৃতি এবং ভাষাকে ধ্বংস করা। তবে এই গণকবর আবিষ্কার কানাডায় নতুন কিছু নয়। দেশটার পুরো ইতিহাস জুড়েই রয়েছে এই কলঙ্কময় কর্মকান্ড; যা এখন বিশ্ব মিডিয়াতে নতুন করে আসছে।

মে মাসে কানাডার পশ্চিমের ব্রিটিশ কলম্বিয়া রাজ্যের কামলুপস শহরের কাছে প্রথম গণকবরটা পাওয়া যায়। রাডার ব্যবহার করে ২’শ ১৫টা কবর আবিষ্কার করা হয়। কামলুপসএর স্কুলটাতে একসাথে প্রায় ৫’শ আদিবাসী ছাত্র পড়াশুনা করতো। ১৮৯০ সাল থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত চালু ছিল এই স্কুল। এরপর জুন মাসে সাসকাচুয়ান প্রদেশে আরও একটা গণকবরে এখন পর্যন্ত ৭’শ ৫১ মরদেহ পাওয়া গিয়েছে। ব্রিটিশ কলম্বিয়ায় আরেকটা স্কুলে গণকবরে পাওয়া গিয়েছে ১’শ ৮২টা মরদেহ। এই স্কুলটা ১৯১২ সাল থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত চালু ছিল। দেশটার আদিবাসীদের নেতা চিফ রোজ্যান কাসিমির বলেন যে, আবিষ্কার করা কবরগুলির মাঝে কারো কারো বয়স হয়তো তিন বছরেরও কম ছিল। এই বোর্ডিং স্কুলগুলিতে মৃতুবরণ করা হাজারো শিশুর মৃতদেহ তাদের স্বজনদের কাছে পাঠানো হয়নি। কমপক্ষে ১’শ ৩০টা আবাসিক স্কুলে ১৮৭৪ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত সরকারি অর্থায়নে চালিত কর্মকান্ডে প্রায় দেড় লক্ষ আদিবাসী ‘মেটিস’ এবং ‘ইনুইট’ শিশুদেরকে তাদের পরিবার থেকে জোরপূর্বক নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ১৯২০এর দশকে আদিবাসী শিশুদের জন্যে বোর্ডিং স্কুলে পড়া বাধ্যতামূলক করে দেয়া হয়। এই আদেশ অমান্য করলে কারাদন্ডাদেশের ব্যবস্থা ছিল। শিশুদেরকে নিজস্ব ভাষা ত্যাগ করে ইংরেজি অথবা ফরাসি ভাষা শিখতে হয়েছিল এবং খিস্টধর্মে দীক্ষিত হতে হয়েছিল।

২০০৯ সালে তৈরি হওয়া কানাডার ‘ট্রুথ এন্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’এর ২০১৫ সালের এক প্রতিবেদনে সরকারের এই কর্মকান্ডকে ‘সাংস্কৃতিক গণহত্যা’ বলে আখ্যা দেয়া হয়। সরকার, চার্চ এবং স্কুলের ইচ্ছাকৃত অবজ্ঞার কারণেই কমপক্ষে ৬ হাজার শিশুর মৃত্যু হয় বলে সেই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। শিশুদেরকে অত্যন্ত খারাপ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রাখা হতো, অত্যন্ত কঠিন শাস্তি দেয়া হতো, এবং তাদের কোন মেডিক্যাল সুবিধাও দেয়া হতো না। শিশুদের উপর এই পরিবেশের অতি খারাপ প্রভাব সরকারের সকল নেতৃত্বের কাছে জানা ছিল। প্রতিবেদনে এও উল্লেখ করা হয় যে, শারীরিক এবং যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে কিছু শিশু বোর্ডিং স্কুল থেকে পালিয়েছিল। বাকিরা বিভিন্ন রোগ বা দুর্ঘটনা বা অবহেলায় মৃত্যুবরণ করে। ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত আদিবাসী বোর্ডিং স্কুলে শিশুমৃত্যুর হার অন্যান্য বোর্ডিং স্কুলের চাইতে পাঁচগুণ বেশি ছিল। বোর্ডিং স্কুল থেকে বেঁচে যাওয়ারা বলে যে, তারা বিভিন্ন সময়ে হঠাত করেই লক্ষ্য করতো যে, তাদের একজন বন্ধুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কোন কোন ক্ষেত্রে চার্চের পাদ্রীদের অবৈধ সম্পর্কের জেরে জন্ম নেয়া সন্তানদেরকে তাদের মায়ের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে চুল্লির মাঝে ফেলে দেয়া হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

জাস্টিন ট্রুডোর সরকার নতুন করে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেয়ার কথা ঘোষণা করলেও আদিবাসী নেতারা তাতে খুশি হতে পারেননি। তারা চাইছেন প্রথমে সত্যটা পুরোপুরিভাবে জানানো দরকার। সেকারণে আদিবাসী নেতা মারে সিনক্লেয়ার এবং চিফ বেলেগার্ড বলছেন যে, পুরো ১’শ ৩০টা স্কুলেই গণকবর খোঁজা দরকার। ‘বিবিসি’ বলছে যে, ১৯৮০এর এবং ১৯৯০এর দশকে ‘ইউনাইটেড’, ‘এংলিকান’ এবং ‘প্রেবিসটেরিয়ান’ চার্চের প্রতিনিধিরা এসব কর্মকান্ডের ব্যাপারে ক্ষমা চেয়ে হাত ঝেড়ে ফেললেও ক্যাথোলিক চার্চের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব পোপএর কাছ থেকে কোন বিবৃতি আসেনি। ট্রুডো ২০১৭ সালে পোপ ফ্রান্সিসকে ক্ষমা চাইবার আহ্বান করলেও ভ্যাটিকান তা করতে অস্বীকৃতি জানায়।

তবে কানাডার এই গণকবরের ঘটনা কি শুধুই চার্চের ব্যাপার? ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা জানাচ্ছে যে, গণকবরের ঘটনার জের ধরে কানাডায় ব্রিটিশ রানী এলিজাবেথ এবং রানী ভিক্টোরিয়ার মুর্তি ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। পহেলা জুলাই ‘কানাডা দিবস’এ ম্যানিটোবা রাজ্যে রানী ভিক্টোরিয়ার মুর্তির উপর কাপড় দিয়ে ঢেকে লাল রঙ মেখে সেটাকে টেনে মাটিতে ফেলে দেয়া হয়। এই মুর্তিগুলি আদিবাসীদের কাছে কানাডার ঔপনিবেশিক ইতিহাসের উদাহরণ। অটোয়া শহরে ‘পার্লামেন্ট হিল’ এলাকায় ‘কানাডা দিবস বাতিল কর’ শীর্ষক জনসমাবেশে হাজারো মানুষ ‘কানাডার জন্যে লজ্জা’ এবং ‘তাদেরকে ফিরিয়া আনো’ বলে স্লোগান দেয়। কিছুদিন আগে কানাডার বোর্ডিং স্কুল ব্যবস্থার স্থপতি বলে পরিচিত এগারটন রায়ারসনএর মুর্তিও ভেঙ্গে ফেলা হয়। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে এক বার্তায় বলা হয় যে, ব্রিটিশ সরকার ব্রিটিশ রানীর মুর্তি ধ্বংস করার প্রতিবাদ জানাচ্ছে। তবে বিবৃতিতে এও বলা হয় যে, ব্রিটিশ সরকার কানাডার আদিবাসীদের আবেগের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে।

কানাডার জাস্টিন ট্রুডোর সরকার এবং ব্রিটেনের ডাউনিং স্ট্রিট আদিবাসী শিশুদের গণকবরের ঘটনাগুলিকে কোনমতে পাশ কাটিয়ে যাবার চেষ্টা করলেও তা ব্রিটিশদের লিবারাল সেকুলার আদর্শের প্রতি একটা আঘাত হিসেবেই এসেছে। ট্রুডো ব্যাপারটাকে ক্যাথোলিক চার্চের দায় বলে চালিয়ে দিতে চাইলেও কানাডার লিবারাল সংস্কৃতির মাঝে ক্যাথোলিক চার্চের ক্ষমতা কতটুকু, তা সামনে চলে আসে। অন্ততঃ আদিবাসীদের কিছু অংশ বুঝতে পেরেছে যে, দোষটা শুধু ক্যাথোলিক চার্চের ঘাড়ে দিলেই হবে না; যেকারণে তারা ব্রিটিশ রানীর মুর্তিও ভাংচুর করেছে। ব্রিটিশ কমনওয়েলথের কানাডার এই ‘সাংস্কৃতিক গণহত্যা’র ইতিহাস আবারও উঠে এলো এমন এক সময়ে, যখন পরিবর্তিত বিশ্বে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ পুনরায় নেতৃত্ব পাবার চেষ্টায় রয়েছে। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডকে সাথে নিয়ে ব্রিটেনের এই চেষ্টা কানাডায় প্রশ্নবিদ্ধ হলেও তা অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের গণহত্যার ইতিহাসকেও সামনে টেনে নিয়ে আসছে। বিশ্ববাসীর কাছে প্রতিনিয়ত ব্রিটিশ নেতৃত্বের বর্ণবাদী ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়াটা ব্রিটিশ সরকার আটকাতে পারছে না কিছুতেই।

Saturday, 26 June 2021

ইথিওপিয়া... ধ্বসে পড়া বিশ্বব্যবস্থার প্রকৃষ্ট উদাহরণ

২৭শে জুন ২০২১
২২শে জুন ২০২১। ইথিওপিয়ার তিগ্রে অঞ্চলে বিমান হামলায় ৬৪ জন নিহত হয়। তবে ইথিওপিয়ার সরকার ঘটনার দায় পুরোপুরি অস্বীকার করে। আফ্রিকার গুরুত্বপূর্ণ হর্ন অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ হারাবার ভয়ে পশ্চিমা দেশগুলি ইথিওপিয়ার সংঘাতকে থামাতে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। আসলে ইথিওপিয়া ধ্বসে পড়া বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার একটা প্রকৃষ্ট উদাহরণ।


২৫শে জুন মানবাধিকার সংস্থা ‘ডকটর্স উইথআউট বর্ডার্স’ বা ‘এমএসএফ’এর এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, তাদের তিনজন কর্মীকে দেশটার গৃহযুদ্ধ আক্রান্ত তিগ্রে অঞ্চলে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। ইথিওপিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, তিগ্রে অঞ্চলের আবি আদ্দি শহরে ‘তিগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট’ বা ‘টিপিএলএফ’ বিচ্ছিন্নতাবাদী গেরিলারা তাদেরকে অপহরণ করে হত্যা করেছে। ‘ডয়েচে ভেলে’র এক খবরে মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, গত মার্চ মাসে ‘এমএসএফ’এর ত্রাণ কর্মীরা আক্রমণের শিকার হয়, যখন তারা অভিযোগ করে যে, তারা ইথিওপিয়ার সেনাদেরকে বিচার বহির্ভুত হত্যাকান্ডে জড়িত হতে দেখেছে। ‘এমএসএফ’এর কর্মী হত্যার কয়েকদিন আগেই ২২শে জুন তিগ্রে অঞ্চলের তোগোগার বাজার এলাকায় বিমান হামলায় ৬৪ জনের প্রাণহানি হয় এবং ১’শ ৮০ জন আহত হয়। ঘটনাস্থলে এম্বুলেন্স যেতেও বাধা দেয় ইথিওপিয়ার সেনারা। তবে ইথিওপিয়ার সরকার ঘটনার দায় পুরোপুরিভাবে অস্বীকার করে। গত নভেম্বরে শুরু হওয়া ইথিওপিয়ার গৃহযুদ্ধে প্রতিবেশী দেশ এরিত্রিয়ার সেনারা ইতোমধ্যেই ইথিওপিয়ার পক্ষে তিগ্রেদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে। শুধু তাই নয়, এই যুদ্ধ এমন এক সময়ে চলছে, যখন নীল নদের উপর বাঁধ দেয়াকে কেন্দ্র করে ভাটির দেশ মিশর ও সুদানের সাথে ইথিওপিয়ার সম্পর্কের ব্যাপক অবণতি হয়েছে। এমতাবস্থায় অতি দরিদ্র এই দেশটায় সংঘাত নিরসণ এবং অসহায় মানুষের জীবন রক্ষার্থে জাতিসংঘ ও পশ্চিমা দেশগুলির ভূমিকা নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠছে, তেমনি জাতিগতভাবে বিভক্ত ইথিওপিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়েও কথা হচ্ছে।

‘ইউরেশিয়া গ্রুপ’এর আফ্রিকা বিশ্লেষক কনর ভ্যাসি বলছেন যে, হর্ন অঞ্চলের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ দেশ হলো ইথিওপিয়া। এই অঞ্চলের সংঘাতপূর্ণ সোমালিয়া, সুদান এবং দক্ষিণ সুদানে ইথিওপিয়ার সেনা মোতায়েন রয়েছে। পশ্চিমারা এই অঞ্চলকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইথিওপিয়াকে মূল স্তম্ভ হিসেবে দেখে। তবে দেশটার বর্তমান অবস্থা পশ্চিমা দেশগুলিকে ইথিওপিয়ার উপর নির্ভর করাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। দেশটা অস্থির থাকলে সুদানের সাথে সীমান্ত সমস্যা এবং নীল নদের উপর বাঁধের ব্যাপারে বিরোধের নিষ্পত্তি কঠিন হয়ে যাবে। আর সাড়ে ১১ কোটি জনসংখ্যার একটা দেশ অস্থির হওয়াটা পুরো অঞ্চলের জন্যেই চ্যালেঞ্জ। পশ্চিমারা মনে করছে যে, তারা যদি প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের সরকারের উপর বেশি চাপ সৃষ্টি করে, তবে তারা হর্ন অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব হারাবে। সেকারণেই ইথিওপিয়ার সরকারি বাহিনীর মানবাধিকার লংঘনের ব্যাপারটাকে পশ্চিমারা তেমন কঠোরভাবে দেখছে না। দেশটায় চীন, রাশিয়া এবং তুরস্ক তাদের প্রভাব বৃদ্ধি করতে চাইছে। তাই পশ্চিমারাও চাইছে না নিজেদের প্রভাব ছেড়ে দিতে।

সুদানের মন্ত্রী ইয়াসির আব্বাস বলছেন যে, ইথিওপিয়ার চলমান গৃহযুদ্ধ আদ্দিস আবাবার সরকারকে ভাটির দেশগুলির সাথে সমঝোতা ছাড়াই নীল নদের উপর বাঁধের প্রকল্পের কাজকে এগিয়ে নিতে আরও বেশি একরোখা করেছে। এমতাবস্থায় সুদান চাইছে যে, জাতিসংঘ এব্যাপারে অগ্রগামী ভূমিকা নিক। ১৫ই জুন আরব লীগের দোহা বৈঠকে আরব দেশগুলিও মিশর ও সুদানের পক্ষে একই দাবি জানায়। মন্ত্রী আব্বাস সাংবাদিকদের সামনে ইথিওপিয়ার বর্তমান সরকারের তিগ্রে অঞ্চলে সামরিক অভিযানের ব্যাপক সমালোচনা করেন। দুই দেশের মাঝে অবিশ্বাস এখন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে বলে উল্লেখ করেন। সুদান সরকারের জবাবে ইথিওপিয়ার সরকার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলে যে, আফ্রিকান ইউনিয়নের নেতৃত্বে যে আলোচনা চলছে, সেই আলোচনাকে নষ্ট করতেই মিশর এবং সুদান জাতিসংঘকে এই সমস্যায় জড়িত হতে বলছে এবং এখানে আরব দেশগুলিকে ডেকে নিয়ে আসছে।

‘টাইম’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় মার্কিন ভূরাজনৈতিক চিন্তাবিদ ইয়ান ব্রেমার প্রশ্ন করছেন যে, ইথিওপিয়া তার বর্তমান কাঠামোতে আদৌ একটা রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকবে পারবে কিনা। ১৯৯১ সাল থেকে ইথিওপিয়ার ক্ষমতা ছিল তিগ্রেদের হাতে, যারা জনসংখ্যার মাত্র ৬ শতাংশ। ২০১৮ সালের পর থেকে অরোমো এবং আমহারা জাতিগোষ্ঠির মানুষেরা ক্ষমতায় আসে, যারা কিনা জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ। তবে প্রাক্তন যুগোশ্লাভিয়ার মতোই ইথিওপিয়াতেও বহুকালের একনায়কতন্ত্র শেষ হবার পর সকল জাতিগোষ্ঠিই নিজেদের নিরাপত্তার ব্যাপারে সন্দিহান হতে থাকে। প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ ক্ষমতা নেবার প্রায় সাথে সাথেই দেশটাতে জাতিগত সংঘাত শুরু হয়ে যায়। ঠিক এসময়েই তিগ্রেরা নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতা হারিয়ে ইথিওপিয়া থেকে আলাদা হয়ে যাবার কথা বলতে শুরু করে। ইথিওপিয়ার সরকারি সেনারা তিগ্রে অঞ্চলে সামরিক অপারেশন শুরু করে; এবং সেখান থেকে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের খবরাখবর আসতে থাকে। যে পশ্চিমারা একসময় আবি আহমদেকে গণতন্ত্রের ঝান্ডাবাহক হিসেবে দেখেছে এবং তাকে নোবেল পুরষ্কার দিয়েছে, তারাই এখন তার কর্মকান্ডের সমালোচনা করছে। জাতিসংঘের হিসেবে প্রায় সাড়ে ৩ লক্ষ তিগ্রে জনগণ দুর্ভিক্ষের মুখে পড়েছে। শুধু ইথিওপিয়া নয়, পার্শ্ববর্তী এরিত্রিয়ার সেনারাও তিগ্রেদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে; এবং ‘রয়টার্স’ বলছে যে, তাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছে যে তারাও তিগ্রেদেরকে না খাইয়ে মারার চেষ্টা করছে। এমতাবস্থায় ইথিওপিয়া জাতিগত বিভেদের উপর ভিত্তি করে লেখা সংবিধানের উপর নিজেদের ভৌগোলিক অখন্ডতাকে টিকিয়ে রাখতে পারবে কি? দেশটা কিন্তু তার ইতিহাসে রাজতন্ত্র, সামরিক একনায়ক, সাংবিধানিক গণতন্ত্র সকল কিছুই দেখেছে।

ইথিওপিয়ার জটিল সমস্যা দেখিয়ে দিচ্ছে যে, বর্তমান বিশ্ব নিয়মহীনভাবে চলছে। ‘আল মনিটর’ বলছে যে, মে মাসের শেষ সপ্তাহে মিশর এবং সুদান ‘গার্ডিয়ান অব দ্যা নাইল’ নামে একটা বড়সড় যৌথ সামরিক মহড়ার আয়োজন করে। যদিও উভয় দেশের সরকার বলছে যে, এই মহড়ার সাথে নীল নদের উপর ইথিওপিয়ার বাঁধের কোন সম্পর্ক নেই; তথাপি কথা থেকেই যাচ্ছে। মিশরের ‘নাসের হাই মিলিটারি একাডেমি’র অধ্যাপক মেজর জেনারেল নাসর সালেম বলছেন যে, এই মহড়া ইথিওপিয়া সহ মিশরের স্বার্থের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো যেকোন দেশের জন্যে একটা বার্তা। ইথিওপিয়াকে ভীতি প্রদর্শনের ব্যাপারে নাসর সালেমের কথাগুলিকে ইথিওপিয়ার অভ্যন্তরীণ বিভেদের সাথে যুক্ত করতেই হবে। আফ্রিকান ইউনিয়ন ও জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার নীল নদের বাঁধের আলোচনায় জড়িত হবার ব্যাপারে ইথিওপিয়া এবং আরব দেশগুলির বিরোধ লক্ষ্যণীয়। আবার আফ্রিকার গুরুত্বপূর্ণ হর্ন অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ হারাবার ভয়ে পশ্চিমা দেশগুলি ইথিওপিয়ার সংঘাতকে থামাতে কঠোর পদক্ষেপও নিচ্ছে না। আসলে ইথিওপিয়া ধ্বসে পড়া বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার একটা প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

Wednesday, 23 June 2021

বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়ছে কেন?

২৪শে জুন ২০২১
ছবিঃ মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে সামরিক বাহিনীর গণহত্যা চালাবার ফলে ১১ লক্ষ মুসলিম রোহিঙ্গা শরণার্থী এখন বাংলাদেশে অবস্থান করছে। কাজেই স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের কাছে এই শরণার্থীদের ফেরত যাওয়া সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ; দেশটাতে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা নয়। রোহিঙ্গা ইস্যুতে পশ্চিমাদের নিষ্ক্রিয় অবস্থান মিয়ানমারকে শক্তিশালী করছে। তবে শুধু মিয়ানমার বিষয়ে জাতিসংঘের ভোটাভুটিই নয়, সাম্প্রতিক সময়ে পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক বেশকিছু ইস্যুতে বাংলাদেশের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে আলোচনায় এসেছে।


গত ১৮ই জুন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে মিয়ানমার নিয়ে ভোটাভুটি হয়ে গেল। পরিষদ ভোটাভুটির মাধ্যমে মিয়ানমারের সামরিক সরকারকে গণতান্ত্রিক নির্বাচন মেনে নিতে বলে এবং রাজবন্দীদের মুক্তি দিতে আহ্বান জানায়। ১’শ ১৯টা ভোট পড়ে পরিষদের রেজোলিউশনের পক্ষে; বিপক্ষে ভোট দেয় শুধুমাত্র বেলারুশ। তবে আরও ৩৬টা দেশ ভোটদান থেকে বিরত থাকে। বিরত থাকা দেশগুলির মাঝে গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে রয়েছে চীন, রাশিয়া, ভারত, পাকিস্তান, ইরান, মিশর, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, আলজেরিয়া। ভারতীয় পররাষ্ট্র দপ্তরের বরাত দিয়ে ‘ইকনমিক টাইমস’ জানাচ্ছে যে, ভারত সরকার মনে করছে যে, মিয়ানমারের প্রতিবেশীদের নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা উচিৎ। রেজোলিউশনে সেটা উঠে না আসার কারণেই ভারত ভোটদানে বিরত থাকে। ভারত এবং চীন ছাড়াও মিয়ানমারের প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড, নেপাল এবং ভুটানও ভোটদানে বিরত থাকে। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা হিসেবে বলা হয় যে, রেজোলিউশনে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণহত্যার বিষয়টা সঠিকভাবে প্রতিফলিত না হওয়ায় তারা ভোট দেয়নি। ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, যদিও সাধারণ পরিষদের রেজোলিউশন মানার কোন বাধ্যবাধকতা নেই, এবং সাধারণ পরিষদের ভোটাভুটির তুলনায় ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদের ক্ষমতা বেশি, তথাপি নিরাপত্তা পরিষদে রাশিয়া এবং চীনের ভেটো দেয়ার এখতিয়ার রয়েছে বিধায় সেখান থেকে মিয়ানমার ইস্যুতে কোন রেজোলিউশন পাস করানো কঠিন। ভোটাভুটিতে গণতন্ত্র রক্ষার মতো আদর্শিক ইস্যু মিয়ানমারের প্রতিবেশী দেশগুলির বাস্তবতার সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে সামরিক বাহিনীর গণহত্যা চালাবার ফলে ১১ লক্ষ মুসলিম রোহিঙ্গা শরণার্থী এখন বাংলাদেশে অবস্থান করছে। কাজেই স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের কাছে এই শরণার্থীদের ফেরত যাওয়া সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ; দেশটাতে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা নয়।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, রেজোলিউশনে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে কোন সুপারিশ বা কর্মকান্ডই ছিল না। এমনকি শরণার্থীদের নিরাপদে প্রত্যাবাসনের জন্যে উপযোগী পরিবেশ তৈরি করার বিষয়েও কোন কথাই সেখানে বলা হয়নি। জাতিসংঘে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমা বলেন যে, রেজোলিউশনে বাংলাদেশ অসন্তুষ্ট এবং এর মাধ্যমে একটা ভুল বার্তা দেয়া হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা ইস্যুতে কোনকিছু না বলায় তা মিয়ানমারকে শক্তিশালী করছে। শুধু মিয়ানমার বিষয়ে ভোটাভুটিই নয়, সাম্প্রতিক সময়ে পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক বেশকিছু ইস্যুতে বাংলাদেশের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে আলোচনায় এসেছে।

মে মাসের শেষের দিকে বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কার সাথে ২’শ মিলিয়ন ডলারের মুদ্রা বিনিময়ের চুক্তি করে। এই চুক্তি মোতাবেক বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সমপরিমাণ শ্রীলঙ্কার মুদ্রা নিজেদের কাছে রাখবে; বিনিময়ে শ্রীলঙ্কাকে ডলার দেবে। শ্রীলঙ্কা সরকারের ব্যাপক ডলার ঘাটতির এই সময়ে এটা প্রকৃতপক্ষে একটা বৈদেশিক মুদ্রার ঋণ। ভারতীয় পত্রিকা ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ বাংলাদেশের এই কর্মকান্ডকে দেশটার উঠতি অর্থনীতির ফলাফল হিসেবে উল্লেখ করে একটা প্রতিবেদন তৈরি করে। প্রতিবেদনে বলা হয় যে, বাংলাদেশের অর্থনীতি দুই দশক ধরে ৬ শতাংশের বেশি হারে বেড়েছে এবং এখন দেশটার মাথাপিছু আয় ভারতের চাইতে বেশি। মাথাপিছু আয় ভারতের যখন ১৯’শ ৪৭ ডলার, তখন বাংলাদেশের তা ২২’শ ২৭ ডলার। পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় আরও কম; ১৫’শ ৪৩ ডলার। ‘দ্যা হিন্দু’ পত্রিকা বলছে যে, করোনা মহামারির কারণে শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক মুদ্রার আয় এবং রিজার্ভ একেবারেই কমে গেছে। ফলশ্রুতিতে দেশটা তার বৈদেশিক ঋণ ফেরত দিতে হিমসিম খাচ্ছে। এবছরের এপ্রিল মাসে শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়ায় সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলারে; যা এবছরের বৈদেশিক ঋণ শোধ করতেই চলে যাবার কথা। ২০২০ সালের মে মাসে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষে ভারতের কাছে ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের মুদ্রা বিনিময়ের অনুরোধ করেছিলেন; ভারত এক বছরেও সেটা নিশ্চিত করেনি। অপরপক্ষে বাংলাদেশ মাত্র দুই মাসের মাঝে এই অর্থের সংকুলানের ব্যবস্থা করেছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০১০ সালে ৯ বিলিয়ন থেকে ২০২১ সাল নাগাদ ৪৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

সকলেই বাংলাদেশকে পাশে চাইছে

অস্ট্রেলিয়ার প্রভাবশালী থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘লোয়ি ইন্সটিটিউট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, বাংলাদেশ একটা অতি দরিদ্র দেশ থেকে আঞ্চলিক প্রভাবশালী দেশে পরিণত হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, নিজেদের অর্থনৈতিক অগ্রগতি আঞ্চলিকভাবে বাংলাদেশকে কি ধরনের ভূমিকায় অবতীর্ণ করাবে, তা এখন আলোচ্য বিষয়। শক্তিশালী দেশগুলি বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কোন্নয়নে ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ‘কোয়াড’এ যোগ দেয়ার সম্ভাবনার বিষয়ে বাংলাদেশে চীনের রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যের জের ধরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতিবাদকে তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয় যে, বাংলাদেশ আদৌ কখনোই ‘কোয়াড’এ যোগ দেবে বলে যেমন মনে হচ্ছে না, তেমনি চীনের হুমকির সামনেও বাংলাদেশ নত হবার সম্ভাবনা নেই; যদিও চীন বাংলাদেশের অতি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সহযোগী। শ্রীলঙ্কাকে ঋণ দেয়ার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এখনও পরিষ্কার নয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। তবে সেখানে ধারণা করা হয় যে, এর সাথে শ্রীলঙ্কার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী সরকারের সাথে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শরণার্থী ইস্যুতে ঐকমত্যে পৌঁছাবার একটা প্রচেষ্টা থাকতে পারে।

‘লোয়ি ইন্সটিটিউট’ একইসাথে বলছে যে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির আরেকটা ফলফল হলো দেশটার সামরিক শক্তির বৃদ্ধি। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ চীনের বাইরেও পশ্চিমা দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কিনেছে। তুরস্কের কাছ থেকে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারে আর্মার্ড ভেহিকল এবং রকেট লঞ্চার কিনেছে। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের দেশগুলি বাংলাদেশের কাছে উন্নত প্রযুক্তির ফাইটার বিমান বিক্রির জন্যে লবিং করছে। তবে চীন থেকে কেনা সাবমেরিনের পর ম্যারিটাইম অঙ্গনে আর কি ধরনের সক্ষমতা যুক্ত হতে পারে, সেব্যাপারটা এখনও বোঝা যাচ্ছে না। প্রতিবেদনে অস্ট্রেলিয়ার সরকারকে ভারত মহাসাগরে শুধুমাত্র পুরাতন সহযোগীদের উপর নির্ভর না করে বাংলাদেশের সাথে নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধি করা ব্যাপারে সচেষ্ট হতে বলা হয়।
ছবিঃ ঢাকায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের বিশেষ দূত জন কেরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে। বাংলাদেশ এখন এমন একটা অবস্থানে পৌঁছেছে যে, চীন ছাড়াও পশ্চিমা দেশগুলি দেশটার সাথে সম্পর্কোন্নয়নে তৎপর হচ্ছে। শুধু অর্থনৈতিক সম্পর্ক নয়, বাংলাদেশের সাথে কৌশলগত এবং সামরিক সম্পর্ক স্থাপনে ব্রতী হয়েছে পশ্চিমা দেশগুলি।


অর্থনৈতিক সম্পর্ক থেকে কৌশলগত সম্পর্কের দিকে

শুধু অস্ট্রেলিয়া নয়। অনেক দেশের চিন্তাবিদেরাই বাংলাদেশকে কৌশলগতভাবে তাদের সাথে রাখার জন্যে আলোচনা শুরু করেছেন। কানাডার থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘জিওপলিটিক্যাল মনিটর’এর এক লেখায় বলা হয় যে, বাংলাদেশ এখন এমন একটা অবস্থানে পৌঁছেছে যে, চীন ছাড়াও পশ্চিমা দেশগুলি দেশটার সাথে সামরিক সম্পর্ক বৃদ্ধিতে তৎপর হচ্ছে। ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’এর এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, বাংলাদেশের জন্যে মার্কিন নেতৃত্বে ‘ইন্দো প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’ বা ‘আইপিএস’এ যোগ দেয়া কঠিন হবে; কারণ তাতে চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক সমস্যায় পড়তে পারে। সেখানে আরও বলা হয় যে, বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তা নির্ভরশীলতা থাকার কারণে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের দূরে থাকাটা সম্ভব নয়। তবে সামনের দিনগুলিতে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মাঝে দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশ কোন পথে যেতে পারে, সেব্যাপারে ‘ওআরএফ’ প্রতিবেদনে পুরোপুরি অজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। ‘ইউনিভার্সিট অব টেক্সাস, অস্টিন’এর নিরাপত্তা ম্যাগাজিন ‘ওয়ার অন দ্যা রক্স’এর এক লেখায় অনুমান করা হচ্ছে যে, বাংলাদেশের পরবর্তী ৫০ বছরের ইতিহাস নির্ধারিত হবে বাংলাদেশ কিভাবে ভারত এবং চীনের সাথে সম্পর্ককে ব্যালান্স করে, সেটার উপর।

২০২০এর মার্চে ফরাসি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফ্লোরেন্স পার্লি বাংলাদেশ সফর করেন। একই বছরের সেপ্টেম্বরে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব মার্ক এসপার ফোন করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে কথা বলে সামরিক সহযোগিতার বিষয়ে কথা বলেন। পরের মাসে, অক্টোবরে মার্কিন উপপররাষ্ট্র সচিব স্টিফেন বাইগান ঢাকা সফর করে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ‘আইপিএস’এর অংশ হবার আমন্ত্রণ দিয়ে যান। এরপর এবছরের এপ্রিলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের বিশেষ দূত হিসেবে প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব জন কেরি ঢাকা সফর করেন। একই মাসে চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েই ফেংহি ঢাকা সফর করেন। প্রায় একইসাথে বাংলাদেশ চীনের নেতৃত্বে দক্ষিণ এশিয়ার জন্যে ‘ইমারজেন্সি ভ্যাকসিন স্টোরেজ ফ্যাসিলিটি’তে যোগ দেয়। গত বছর অক্টোবরে বাংলাদেশ তুরস্কের ‘ষষ্ঠ ডিফেন্স পোর্ট টারকি’ নামের দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিরক্ষা মেলায় যোগ দেয়। এর মাধ্যমে তুরস্ক বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা চাহিদা বোঝার চেষ্টা করে। শুধু অর্থনৈতিক সম্পর্ক নয়, বাংলাদেশের সাথে কৌশলগত এবং সামরিক সম্পর্ক স্থাপনে ব্রতী হয়েছে পশ্চিমা দেশগুলি। বাংলাদেশ তার বেশিরভাগ অস্ত্র চীন এবং রাশিয়া থেকেই কিনে থাকে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমা অস্ত্রের দিকে ঝোঁকার একটা প্রবণতা লক্ষ্যণীয়। এক্ষেত্রে উন্নততর প্রযুক্তি যোগাড় এবং নতুন ধরনের সক্ষমতা যোগ করার দিকে আগ্রহী বাংলাদেশ। বেশিরভাগ অস্ত্রের সাথেই প্রযুক্তি কেনার চেষ্টা করা হচ্ছে। রাশিয়া থেকে কেনা বহুসংখ্যক ‘এমআই ১৭১’ হেলিকপ্টারের মেইনটেন্যান্সের জন্যে ওভারহলিং কারখানা তৈরি করা হয় ইউক্রেনের সহযোগিতায়। চীনের কাছ থেকে কেনা ‘এফ ৭’ ফাইটার বিমান এবং ‘পিটি ৬’ প্রশিক্ষণ বিমানের ওভারহলিং কারখানাও স্থাপন করা হয়েছে।
ছবিঃ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্যে কেনা তুরস্কের তৈরি ‘টি ৩০০ টাইগার’ মাল্টিপল রকেট লঞ্চার। রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশকে অন্ততঃ এটা বুঝিয়েছে যে, তার অর্থনৈতিক উন্নয়ন বহিঃশক্তির হাত থেকে নিরাপদ নয়। এই সমস্যাই বাংলাদেশকে গত এক দশকের বেশি সময় ধরে সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে অনুপ্রাণিত করেছে।


বাংলাদেশে পশ্চিমাদের অস্ত্র বাণিজ্য

এমনই এক পরিস্থিতিতে তুরস্ক যখন দক্ষিণ এশিয়াতে তার প্রভাব বৃদ্ধিতে ব্যস্ত, তখন বাংলাদেশের সাথে তুরস্কের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক দ্রুতই এগুচ্ছে। ২০শে জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তুরস্ক থেকে কেনা ‘টি৩০০ টাইগার’ মাল্টিপল রকেট লঞ্চারের ’৫১তম এমএলআরএস রেজিমেন্ট’এ অন্তর্ভুক্তির উদ্ভোধন করেন। তুরস্কের কাছ থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শতাধিক ‘অতোকার কোবরা’ আর্মার্ড ভেহিকল ক্রয় করেছে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জার্মান কোম্পানি ‘রেইনমেটাল’ থেকে অত্যাধুনিক ‘উরলিকন জিডিএফ০০৯ স্কাইগার্ড’ অটোম্যাটিক এয়ার ডিফেন্স কামান কিনে ’৪৮ এয়ার ডিফেন্স আর্টিলারি রেজিমেন্ট’এ অন্তর্ভুক্ত করে। একই বছর সেনাবাহিনী অস্ট্রিয়া থেকে ৪টা ‘ডায়ামন্ড ডিএ ৪০এনজি’ প্রশিক্ষণ বিমানের ডেলিভারি পায়। এর আগে ইউরোপের এয়ারবাস থেকে সেনাবাহিনী ‘সি ২৯৫ডব্লিউ’ পরিবহণ বিমান কেনে। সার্বিয়া থেকে সেনাবাহিনী ৩৬টা ‘নোরা বি৫২’ ১৫৫মিঃমিঃ সেলফ প্রপেল্ড আর্টিলারি এবং ৮টা ‘বিওভি এম১১’ আর্মার্ড ভেহিকল কেনে।

এছাড়াও ১০ই জুন বিদায়ী বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চীফ মার্শাল মশিহুজ্জামান সারনিয়াবাত এক বিদায়ী ভাষণে ঘোষণা দেন যে, বাংলাদেশ জার্মানির ‘গ্রোব এয়ারক্রাফট’ কোম্পানির কাছ থেকে প্রযুক্তি সহ ২৪টা ‘জি ১২০টিপি’ কম্পোজিট ম্যাটেরিয়ালে তৈরি প্রশিক্ষণ বিমান ক্রয় করার চুক্তি করেছে। তিনি একইসাথে সামনের দিনগুলিতে বিমান বাহিনীতে পশ্চিমা প্রযুক্তির অন্তর্ভুক্তির আভাস দেন। জার্মান বিমানগুলি চীনে তৈরি ‘পিটি ৬’ বিমানকে প্রতিস্থাপন করবে। বাংলাদেশ ব্রিটেনের রয়াল এয়ার ফোর্সের কাছ থেকে ৫টা ‘সি ১৩০জে সুপার হারকিউলিস’ পরিবহণ বিমান ক্রয় করেছে; যেগুলির ডেলিভারি এখনও চলছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রেসিডেন্ট আব্দুল হামিদ বরিশালে বিমান বাহিনীর জন্যে ইতালির ‘লিওনার্ডো’ কোম্পানির তৈরি অত্যাধুনিক ‘ক্রনোজ’ ‘মাল্টি ফাংশন ৩ডি’ রাডার ইউনিট উদ্ভোধন করেন। এর আগে একই কোম্পানি থেকে একটা ‘আরএটি ৩১ডিএল’ দূরপাল্লার রাডারও কেনা হয়। অথচ ২০১৫ সালেই কক্সবাজারে বিমান ঘাঁটি প্রতিষ্ঠার সময় সেখানে চীনে তৈরি ‘ওয়াইএলসি ৬’ রাডার স্থাপন করা হয়েছিল। ‘লিওনার্ডো’ কোম্পানি ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ বিমান বাহিনী এবং নৌবাহিনীকে ‘এডব্লিউ ১৩৯’, ‘এডব্লিউ ১১৯’ এবং ‘এডব্লিউ ১০৯’ হেলিকপ্টার সরবরাহ করেছে। বহুকাল ধরে রাশিয়া ছিল বাংলাদেশের মূল হেলিকপ্টার সরবরাহকারী। কয়েক বছর আগে চেক রিপাবলিক থেকে বিমান বাহিনী ৩টা ‘এল ৪১০ টারবোলেট’ স্বল্পপাল্লার পরিবহণ বিমান কেনে।

২০১৯ সালে ইন্দোনেশিয়ার সহযোগিতায় নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা নারায়নগঞ্জ ডকইয়ার্ডে কম্পোজিট স্পিডবোট তৈরির কারখানা স্থাপন করা হয়। এই প্রযুক্তির মূল সরবরাহকারী হলো সুইডিশ কোম্পানি ‘নর্থ সী বোটস’এর ইন্দোনেশিয়ান সাবসিডিয়ারি ‘পিটি লুনডিন’। নৌবাহিনীর জন্যে ‘ডর্নিয়ার ২২৮এনজি’ ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান কেনা হয় জার্মানির ‘রুওয়াগ এভিয়েশন’এর কাছ থেকে। প্রথম দু’টা কেনার পর আরও দু’টা আর্ডার করা হয়। এছাড়াও বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্যে ৬টা ফ্রিগেট তৈরির প্রকল্প নেয়া হয়েছে; যার জন্যে প্রযুক্তি সহযোগী এখনও নির্ধারিত হয়নি। হল্যান্ড, তুরস্ক, চীনসহ অনেক দেশই এই প্রকল্পে প্রযুক্তি সহযোগী হতে চাইছে। নৌবাহিনীর বর্তমান ফ্রিগেটগুলির বেশিরভাগই চীনে নির্মিত। বিমান বাহিনীর জন্যে অত্যাধুনিক মাল্টিরোল ফাইটার বিমান সরবরাহ করতে ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বেশ প্রতিযোগিতা চলেছে। এর বাইরেও সেনাবাহিনীর জন্যে ১৫৫মিঃমিঃ হাউইটজার, এটাক হেলিকপ্টার, বিমান বাহিনীর জন্যে মধ্যম পাল্লার এয়ার ডিফেন্স ক্ষেপণাস্ত্র, মনুষ্যবিহীন ড্রোন, নৌবাহিনীর এন্টি সাবমেরিন হেলিকপ্টার, লজিস্টিক জাহাজ, হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার, ইত্যাদি অনেক কিছুরই সরবরাহকারী হতে চাইছে পশ্চিমারা। তারা মূলতঃ চীন এবং রাশিয়ার অস্ত্রকেই প্রতিস্থাপিত করতে চাইছে। এখানে কৌশলগত উদ্দেশ্য ছাড়াও বিপুল অংকের অস্ত্র বাণিজ্যও জড়িত।

কি চাইছে বাংলাদেশ?

অর্থনৈতিক লক্ষ্যই যে একটা রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হতে পারে না, তা আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনাতে পরিষ্কার। কোন রাজনৈতিক লক্ষ্য ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন শক্তিশালী দেশগুলিকে প্রভাব বিস্তারে আগ্রহী করবে মাত্র। বাংলাদেশ তার রাজনৈতিক লক্ষ্যকে পরিষ্কারভাবে না বলার কারণে প্রতিটা শক্তিশালী দেশই চাইছে ঢাকায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে। আর যেহেতু প্রতিটা দেশের কৌশলগত চিন্তায় ইন্দোপ্যাসিফিক এখন শীর্ষে রয়েছে, তাই বাংলাদেশ কোন পক্ষে থাকবে, তা অতি গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার হয়ে দেখা দিচ্ছে। বাংলাদেশ আপাত দৃষ্টিতে কোন পক্ষকেই সরাসরি সমর্থন দিতে চাইছে না। কিন্তু সমস্যা হলো, ভূরাজনীতিতে নিরপেক্ষ বলে কিছু নেই। নিরপেক্ষ অর্থ হলো কোন একটা পক্ষে না যাওয়া; এর ফলে যে পক্ষের সহায়তা দরকার বেশি সে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর অপর পক্ষ হয় লাভবান। কাজেই এক পক্ষ বাংলাদেশকে পাশে চাইবে; অপর পক্ষ চাইবে বাংলাদেশ নিরপেক্ষ থাকুক। এই মুহুর্তে ভারত মহাসাগরে চীনের প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাংলাদেশকে নিজের পাশে না পাওয়াটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে একটা বড় ক্ষতি এবং সুপারপাওয়ারের বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধরে রাখার প্রতি চ্যালেঞ্জ।

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘ, বিশেষ করে পশ্চিমাদের নিষ্ক্রিয় ভূমিকা বাংলাদেশকে হতাশ করেছে। সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে গিয়ে বাংলাদেশ বড় পশ্চিমা শক্তির, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির অধীনে যেতে চাইছে না। রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশকে অন্ততঃ এটা বুঝিয়েছে যে, তার অর্থনৈতিক উন্নয়ন বহিঃশক্তির হাত থেকে নিরাপদ নয়। এই সমস্যাই বাংলাদেশকে গত এক দশকের বেশি সময় ধরে সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে অনুপ্রাণিত করেছে। কিন্তু পশ্চিমাদের শর্তযুক্ত সামরিক সরঞ্জামের ফাঁদেও পড়তে চাইছে না বাংলাদেশ। ইন্দোপ্যাসিফিকের অতি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকার সুবিধা বাংলাদেশ কতটুকু নিতে পারবে, তা নির্ভর করবে না যে বাংলাদেশ কতটা সফলতার সাথে চীন এবং ভারতের মাঝে বা চীন এবং পশ্চিমাদের মাঝে ব্যালান্স করতে পারে; বরং পশ্চিমা আদর্শিক শক্তিগুলিকে একে অপরের সাথে ব্যালান্সে রাখতে পারবে। কাজটা অসম্ভব না হলেও আদর্শিক কোন অবস্থানে আসীন হওয়া ছাড়া তা অর্জন সম্ভব নয়।