Showing posts with label Cultural Genocide. Show all posts
Showing posts with label Cultural Genocide. Show all posts

Sunday, 4 July 2021

আদিবাসী শিশুদের গণকবর … কানাডার বর্ণবাদী ইতিহাস প্রশ্নবিদ্ধ করছে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’কে

৪ঠা জুলাই ২০২১

 
কানাডার একটা আবাসিক স্কুলের ১৮৯০ সালের ছবি। ব্রিটিশ কমনওয়েলথের কানাডার ‘সাংস্কৃতিক গণহত্যা’র ইতিহাস আবারও উঠে এলো এমন এক সময়ে, যখন পরিবর্তিত বিশ্বে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ পুনরায় নেতৃত্ব পাবার চেষ্টায় রয়েছে। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডকে সাথে নিয়ে ব্রিটেনের এই চেষ্টা কানাডায় প্রশ্নবিদ্ধ হলেও তা অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের গণহত্যার ইতিহাসকেও সামনে টেনে নিয়ে আসছে। বিশ্ববাসীর কাছে প্রতিনিয়ত ব্রিটিশ নেতৃত্বের বর্ণবাদী ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়াটা ব্রিটিশ সরকার আটকাতে পারছে না কিছুতেই।

কানাডায় গত মে মাস থেকে কমপক্ষে তিনটা গণকবরের সন্ধান মিলেছে, যেগুলি সেখানকার আদিবাসী মানুষদের সন্তানদের কবর বলে সনাক্ত হয়েছে। এই ঘটনায় পুরো কানাডা জুড়ে আবেগের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। এই কবরগুলি ছিল আবাসিক স্কুলে পড়া আদিবাসী ছাত্রদের। এখন পর্যন্ত কানাডার সরকারি অর্থায়নের বোর্ডিং স্কুলগুলির আশেপাশে কমপক্ষে ১১’শ কবরের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। ‘বিবিসি’ জানাচ্ছে যে, এই বোর্ডিং স্কুলগুলির উদ্দেশ্য ছিল আদিবাসীদেরকে কানাডার ইউরোপিয় সংস্কৃতিকে মেনে নিতে বাধ্য করা এবং আদিবাসীদের নিজস্ব সংস্কৃতি এবং ভাষাকে ধ্বংস করা। তবে এই গণকবর আবিষ্কার কানাডায় নতুন কিছু নয়। দেশটার পুরো ইতিহাস জুড়েই রয়েছে এই কলঙ্কময় কর্মকান্ড; যা এখন বিশ্ব মিডিয়াতে নতুন করে আসছে।

মে মাসে কানাডার পশ্চিমের ব্রিটিশ কলম্বিয়া রাজ্যের কামলুপস শহরের কাছে প্রথম গণকবরটা পাওয়া যায়। রাডার ব্যবহার করে ২’শ ১৫টা কবর আবিষ্কার করা হয়। কামলুপসএর স্কুলটাতে একসাথে প্রায় ৫’শ আদিবাসী ছাত্র পড়াশুনা করতো। ১৮৯০ সাল থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত চালু ছিল এই স্কুল। এরপর জুন মাসে সাসকাচুয়ান প্রদেশে আরও একটা গণকবরে এখন পর্যন্ত ৭’শ ৫১ মরদেহ পাওয়া গিয়েছে। ব্রিটিশ কলম্বিয়ায় আরেকটা স্কুলে গণকবরে পাওয়া গিয়েছে ১’শ ৮২টা মরদেহ। এই স্কুলটা ১৯১২ সাল থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত চালু ছিল। দেশটার আদিবাসীদের নেতা চিফ রোজ্যান কাসিমির বলেন যে, আবিষ্কার করা কবরগুলির মাঝে কারো কারো বয়স হয়তো তিন বছরেরও কম ছিল। এই বোর্ডিং স্কুলগুলিতে মৃতুবরণ করা হাজারো শিশুর মৃতদেহ তাদের স্বজনদের কাছে পাঠানো হয়নি। কমপক্ষে ১’শ ৩০টা আবাসিক স্কুলে ১৮৭৪ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত সরকারি অর্থায়নে চালিত কর্মকান্ডে প্রায় দেড় লক্ষ আদিবাসী ‘মেটিস’ এবং ‘ইনুইট’ শিশুদেরকে তাদের পরিবার থেকে জোরপূর্বক নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ১৯২০এর দশকে আদিবাসী শিশুদের জন্যে বোর্ডিং স্কুলে পড়া বাধ্যতামূলক করে দেয়া হয়। এই আদেশ অমান্য করলে কারাদন্ডাদেশের ব্যবস্থা ছিল। শিশুদেরকে নিজস্ব ভাষা ত্যাগ করে ইংরেজি অথবা ফরাসি ভাষা শিখতে হয়েছিল এবং খিস্টধর্মে দীক্ষিত হতে হয়েছিল।

২০০৯ সালে তৈরি হওয়া কানাডার ‘ট্রুথ এন্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’এর ২০১৫ সালের এক প্রতিবেদনে সরকারের এই কর্মকান্ডকে ‘সাংস্কৃতিক গণহত্যা’ বলে আখ্যা দেয়া হয়। সরকার, চার্চ এবং স্কুলের ইচ্ছাকৃত অবজ্ঞার কারণেই কমপক্ষে ৬ হাজার শিশুর মৃত্যু হয় বলে সেই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। শিশুদেরকে অত্যন্ত খারাপ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রাখা হতো, অত্যন্ত কঠিন শাস্তি দেয়া হতো, এবং তাদের কোন মেডিক্যাল সুবিধাও দেয়া হতো না। শিশুদের উপর এই পরিবেশের অতি খারাপ প্রভাব সরকারের সকল নেতৃত্বের কাছে জানা ছিল। প্রতিবেদনে এও উল্লেখ করা হয় যে, শারীরিক এবং যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে কিছু শিশু বোর্ডিং স্কুল থেকে পালিয়েছিল। বাকিরা বিভিন্ন রোগ বা দুর্ঘটনা বা অবহেলায় মৃত্যুবরণ করে। ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত আদিবাসী বোর্ডিং স্কুলে শিশুমৃত্যুর হার অন্যান্য বোর্ডিং স্কুলের চাইতে পাঁচগুণ বেশি ছিল। বোর্ডিং স্কুল থেকে বেঁচে যাওয়ারা বলে যে, তারা বিভিন্ন সময়ে হঠাত করেই লক্ষ্য করতো যে, তাদের একজন বন্ধুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কোন কোন ক্ষেত্রে চার্চের পাদ্রীদের অবৈধ সম্পর্কের জেরে জন্ম নেয়া সন্তানদেরকে তাদের মায়ের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে চুল্লির মাঝে ফেলে দেয়া হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

জাস্টিন ট্রুডোর সরকার নতুন করে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেয়ার কথা ঘোষণা করলেও আদিবাসী নেতারা তাতে খুশি হতে পারেননি। তারা চাইছেন প্রথমে সত্যটা পুরোপুরিভাবে জানানো দরকার। সেকারণে আদিবাসী নেতা মারে সিনক্লেয়ার এবং চিফ বেলেগার্ড বলছেন যে, পুরো ১’শ ৩০টা স্কুলেই গণকবর খোঁজা দরকার। ‘বিবিসি’ বলছে যে, ১৯৮০এর এবং ১৯৯০এর দশকে ‘ইউনাইটেড’, ‘এংলিকান’ এবং ‘প্রেবিসটেরিয়ান’ চার্চের প্রতিনিধিরা এসব কর্মকান্ডের ব্যাপারে ক্ষমা চেয়ে হাত ঝেড়ে ফেললেও ক্যাথোলিক চার্চের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব পোপএর কাছ থেকে কোন বিবৃতি আসেনি। ট্রুডো ২০১৭ সালে পোপ ফ্রান্সিসকে ক্ষমা চাইবার আহ্বান করলেও ভ্যাটিকান তা করতে অস্বীকৃতি জানায়।

তবে কানাডার এই গণকবরের ঘটনা কি শুধুই চার্চের ব্যাপার? ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা জানাচ্ছে যে, গণকবরের ঘটনার জের ধরে কানাডায় ব্রিটিশ রানী এলিজাবেথ এবং রানী ভিক্টোরিয়ার মুর্তি ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। পহেলা জুলাই ‘কানাডা দিবস’এ ম্যানিটোবা রাজ্যে রানী ভিক্টোরিয়ার মুর্তির উপর কাপড় দিয়ে ঢেকে লাল রঙ মেখে সেটাকে টেনে মাটিতে ফেলে দেয়া হয়। এই মুর্তিগুলি আদিবাসীদের কাছে কানাডার ঔপনিবেশিক ইতিহাসের উদাহরণ। অটোয়া শহরে ‘পার্লামেন্ট হিল’ এলাকায় ‘কানাডা দিবস বাতিল কর’ শীর্ষক জনসমাবেশে হাজারো মানুষ ‘কানাডার জন্যে লজ্জা’ এবং ‘তাদেরকে ফিরিয়া আনো’ বলে স্লোগান দেয়। কিছুদিন আগে কানাডার বোর্ডিং স্কুল ব্যবস্থার স্থপতি বলে পরিচিত এগারটন রায়ারসনএর মুর্তিও ভেঙ্গে ফেলা হয়। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে এক বার্তায় বলা হয় যে, ব্রিটিশ সরকার ব্রিটিশ রানীর মুর্তি ধ্বংস করার প্রতিবাদ জানাচ্ছে। তবে বিবৃতিতে এও বলা হয় যে, ব্রিটিশ সরকার কানাডার আদিবাসীদের আবেগের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে।

কানাডার জাস্টিন ট্রুডোর সরকার এবং ব্রিটেনের ডাউনিং স্ট্রিট আদিবাসী শিশুদের গণকবরের ঘটনাগুলিকে কোনমতে পাশ কাটিয়ে যাবার চেষ্টা করলেও তা ব্রিটিশদের লিবারাল সেকুলার আদর্শের প্রতি একটা আঘাত হিসেবেই এসেছে। ট্রুডো ব্যাপারটাকে ক্যাথোলিক চার্চের দায় বলে চালিয়ে দিতে চাইলেও কানাডার লিবারাল সংস্কৃতির মাঝে ক্যাথোলিক চার্চের ক্ষমতা কতটুকু, তা সামনে চলে আসে। অন্ততঃ আদিবাসীদের কিছু অংশ বুঝতে পেরেছে যে, দোষটা শুধু ক্যাথোলিক চার্চের ঘাড়ে দিলেই হবে না; যেকারণে তারা ব্রিটিশ রানীর মুর্তিও ভাংচুর করেছে। ব্রিটিশ কমনওয়েলথের কানাডার এই ‘সাংস্কৃতিক গণহত্যা’র ইতিহাস আবারও উঠে এলো এমন এক সময়ে, যখন পরিবর্তিত বিশ্বে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ পুনরায় নেতৃত্ব পাবার চেষ্টায় রয়েছে। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডকে সাথে নিয়ে ব্রিটেনের এই চেষ্টা কানাডায় প্রশ্নবিদ্ধ হলেও তা অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের গণহত্যার ইতিহাসকেও সামনে টেনে নিয়ে আসছে। বিশ্ববাসীর কাছে প্রতিনিয়ত ব্রিটিশ নেতৃত্বের বর্ণবাদী ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়াটা ব্রিটিশ সরকার আটকাতে পারছে না কিছুতেই।