Sunday, 10 January 2021

ওয়াশিংটন ডিসির সহিংসতার ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব কতটুকু?

১১ই জানুয়ারি ২০২১
সুপারপাওয়ার যুক্তরাষ্ট্র এখন অভ্যন্তরীণভাবে ভীষণভাবে বিভক্ত। এমতাবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতা সকলের কাছে দৃশ্যমান; অনেকেই এই বিভাজনে ইন্ধন যোগাতেও পিছপা হবে না। কেউ কেউ সেই বিভক্তিতে কোন একটা পক্ষকে সরাসরি সমর্থন করছে; আবার কেউ কেউ বিশ্বব্যাপী পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েই চিন্তিত। সারা বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পিছনে যতটা জোরেসোরে চেষ্টা চালিয়েছে এতকাল, তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ। পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় পশ্চিমাদের ভূরাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আরও কমলো। চীন এবং রাশিয়া ছাড়াও ছোট দেশগুলি নিজেদের মতো করেই গণতন্ত্রের সংজ্ঞা দাঁড় করাবে এবং পশ্চিমা আদর্শকে ভূলুন্ঠিত করতে থাকবে।


গত ৬ই জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থকরা হামলা করে কিছু সময়ের জন্যে ক্যাপিটল হিলের পার্লামেন্ট ভবন দখলে নেয়। নজিরবিহীন এই সহিংসতায় কমপক্ষে ৪ জন নিহত হয় এবং অর্ধশতাধিক ব্যক্তি গ্রেপ্তার হয়। ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় সারা দুনিয়ার নেতৃবৃন্দ, চিন্তাবিদেরা এবং মিডিয়া তাদের অবস্থান ব্যক্ত করছেন। এহেন ঘটনার ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব আসলে কতটুকু, তা বুঝতে হলে এই বিবৃতিগুলির বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

‘গ্লোবাল ব্রিটেন’

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ৬ই জানুয়ারি এক টুইটার বার্তায় মার্কিন কংগ্রেসের ঘটনাকে ‘লজ্জাজনক দৃশ্য’ বলে আখ্যা দেন। তিনি একইসাথে শান্তিপূর্ণ এবং নিয়মতান্ত্রিক ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান জানান। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডমিনিক রাব এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, আইনগত ক্ষমতা হস্তান্তরকে বাধাগ্রস্ত করার পিছনে কোন যুক্তিই থাকতে পারে না। ব্রিটিশ বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা কেয়ার স্টার্মার এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, এটা ছিল গণতন্ত্র এবং জনগণের প্রতিনিধিদের উপর সরাসরি আঘাত, যারা জনগণের ইচ্ছা বাস্তবায়ন করছেন।

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন ওয়াশিংটনের ঘটনাকে ‘ভীষণ দুঃখজনক’ ও ‘উদ্বেগজনক’ বলে আখ্যা দেন। তিনি আরও বলেন যে, এটা পরিষ্কার যে, সময়টা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে বেশ কঠিন যাচ্ছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে শান্তিপূর্ণ সরকার পরিবর্তন আশা করেন।

নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন যে, উশৃংখল জনগণের কারণে গণতন্ত্র অকার্যকর হয়ে যাবে, এটা হতে পারে না। পরদিন এক টুইটার বার্তায় আরডার্ন বলেন যে, এই ঘটনায় যারা দুঃখ পেয়েছেন, নিউজিল্যান্ডের এতাত্মতা থাকবে তাদের জন্যে। নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নানাইয়া মাহুতা এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, এত কঠিন সময়ের মাঝে জো বাইডেনের প্রেসিডেন্ট হবার ব্যাপারে কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত নেয়াটা ছিল গণতান্ত্রিক পদ্ধতি চালিয়ে নেবার পথে বড় একটা পদক্ষেপ।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো ৬ই জানুয়ারি এক রেডিও ইন্টারভিউতে বলেন যে, তিনি ওয়াশিংটনের সহিংস ঘটনা দেখে ‘উদ্বিগ্ন’ হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রে ‘গণতন্ত্রের উপর এই হামলায় কানাডিয়রা ভীষণভাবে মর্মাহত’। দু’দিন পর সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে ট্রুডো ঘটনার জন্যে ট্রাম্পকে সরাসরি দায়ী করেন। তিনি বলেন, এটা ছিল বর্তমান প্রেসিডেন্ট এবং কিছু রাজনীতিবিদের উস্কে দেয়া সহিংস দাঙ্গা। তবে তিনি মনে করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্র যথেষ্ট শক্তিশালী এবং উগ্রবাদীরা মানুষের ইচ্ছাকে ছাপিয়ে যেতে পারে না।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন

‘ডয়েচে ভেলে’র টুইটারে এক ভিডিও বার্তায় জার্মান চ্যান্সেলর এঙ্গেলা মার্কেল বলেন যে, মার্কিন ক্যাপিটলএর ছবিগুলি তাকে একইসাথে ‘রাগান্বিত’ এবং ‘দুঃখিত’ করেছে। নির্বাচনের ব্যাপারে জনমনে যে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছিল, সেটাই শেষ পর্যন্ত এই ঘটনাকে বাস্তবতা দিয়েছে। জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাইকো মাস এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, ওয়াশিটনের এই বীভৎস ছবিগুলি দেখে গণতন্ত্রের শত্রুরা ভীষণ খুশি হবে। ট্রাম্প এবং তার সমর্থকদেরকে শেষ পর্যন্ত মার্কিন জনগণের রায়কে মেনে নিতে হবে এবং গণতন্ত্রের উপর আঘাত করা বন্ধ করতে হবে। জার্মান পত্রিকা ‘ডাই ওয়েল্ট’এর শিরোনামে বলা হয় যে, এটা ছিল মার্কিন গণতন্ত্রের জন্যে লজ্জার দিন। মিথ্যাবাদী প্রেসিডেন্ট এবং মেরুদন্ডহীন রিপাবলিকান পার্টিই এর জন্যে দায়ী।

৭ই জানুয়ারি টুইটারে এক ভিডিও বার্তায় ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ বলেন যে, অল্প কয়েকজন ব্যক্তির সহিংসতার কাছে তারা নতি স্বীকার করবেন না। তিনি ইংরেজিতে বলেন যে, ওয়াশিংটন ডিসিতে যা ঘটেছে তা নিশ্চিতভাবেই যুক্তরাষ্ট্র নয়। তিনি ফ্রান্স এবং যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের শক্তির উপর আস্থা রয়েছে বলে বলেন।

তুরস্ক

তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, ক্যাপিটল হিলের ঘটনা তুরস্ক উদ্বিগ্নতার সাথে অবলোকন করছে। একইসাথে তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের সকল পক্ষকে সাবধানী হবার এবং প্রজ্ঞার মাধ্যমে কাজ করার উপদেশ দেয়। বিবৃতিতে আরও বলা হয় যে, তুরস্ক আশা করছে যে, যুক্তরাষ্ট্র পরিপক্কতা দেখিয়ে এই অভ্যন্তরীণ সমস্যা মোকাবিলা করবে।

চীন

চীনের কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা ‘গ্লোবাল টাইমস’এর এক লেখায় বলা হয় যে, চীনারা এখনও ভুলতে পারেনি সেই দিনটার কথা, যেদিন হংকংএর দাঙ্গাকারীরা ব্যাপক সহিংসতা চালাচ্ছিল। সেই সময়ে দাঙ্গার বিরুদ্ধে কথা না বলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিবিদেরা দাঙ্গাবাজদের সাহসিকতার প্রশংসা করেছিলেন। চীনের সোশাল মিডিয়া ‘উইবো’র একজন ব্যাবহারকারীর বক্তব্য তুলে ধরে ‘দ্যা টাইম’ ম্যাগাজিন। সেখানে বলা হয় যে, এটা যুক্তরাষ্ট্রের কর্মফল। যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরে সারা বিশ্বে আগুন লাগিয়েছে; এখন সেই ‘স্বাধীনতা’র আগুন তাদেরকেই পোড়াচ্ছে। আরেকজন বলেন যে, এখানে কোন আইন নেই; আইনের শাসন নেই। এটাই হলো সেই ‘গণতন্ত্র’, যা নিয়ে তারা গর্ব করে। চীনা সাংবাদিক সিমা নান ২০১৯ সালে মার্কিন পার্লামেন্টের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির এক কথাকে তুলে আনেন; যখন হংকংএর সরকার বিরোধী আন্দোলন দেখে তিনি বলেছিলেন ‘চমৎকার একটা দৃশ্য’। সিমা নান বলেন যে, ওয়াশিংটনের দৃশ্যটা ছিল আরও চমৎকার।

রাশিয়া

‘রাশান ফেডারেশন কাউন্সিল’এর পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির প্রধান কন্সটান্টিন কসাচেভ এক ফেইসবুক পোস্টে বলেন যে, গণতন্ত্রের জয়জয়কার এখন শেষ। এটা প্রথমবারের মতোও হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক বিশ্বের জন্যে আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করার পক্ষে এখন কোন যুক্তি নেই। আমেরিকা যেখানে নিজেই সেই পথে হাঁটছে না, সেখানে সেই পথের সংজ্ঞা দেয়ার অধিকারও সে হারিয়েছে; আর অন্যের উপর তার চাপিয়ে দেয়ার অধিকার থাকার তো প্রশ্নই ওঠে না। তিনি আরও বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সমাজের বিভাজন এতটাই গভীর যে, রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাট উভয় শিবিরই এই নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে খুশি হতে পারবে না। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা সাংবাদিকদের বলেন যে, এটা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। তবে রাশিয়া আবারও বলছে যে, মার্কিন নির্বাচনী পদ্ধতি একটা অতি পুরাতন পদ্ধতি এবং তা আধুনিক গণতান্ত্রিক মানদন্ডে পাস করে না। এতে নিয়ম বহির্ভূত কর্মকান্ডের সম্ভাবনা থাকে। একইসাথে তিনি বলেন যে, মার্কিন মিডিয়া রাজনৈতিক কোন্দলের হাতিয়ার হয়ে গিয়েছে।

রুশ বিশ্লেষকেরা কেউ কেউ মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, বেলারুশ এবং ইউক্রেনে মস্কোপন্থী সরকার উৎখাত করার জন্যে যুক্তরাষ্ট্র একসময় উস্কানি দিয়েছিল। রুশ রাজনীতিবিদ সের্গেই মারকভ ফেইসবুকে এক লেখায় বলেন যে, এটা আশ্চর্য ব্যাপার যে, যেসব মার্কিন রাজনীতিবিদ একসময় ইউক্রেন এবং বেলারুশের পার্লামেন্ট ভবন দখলের পক্ষে কথা বলেছিলেন, এবং ট্রাম্প সমর্থকদের বিরুদ্ধে ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ বিষয়ে রাস্তায় সহিংসতায় জড়াবার পক্ষে ছিলেন, তারাই এখন মার্কিন কংগ্রেসে হামলার নিন্দা জানাচ্ছেন।

কারা কোন পক্ষে

বিবৃতিগুলি থেকে এটা পরিষ্কার যে, ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর অন্তর্গত ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং কানাডা মোটামুটিভাবে সরাসরিই ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে কথা বলেছে এবং জো বাইডেনের পক্ষ নিয়েছে। এতে বোঝা যায় যে, ব্রিটেনের বৈশ্বিক আকাংক্ষা বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন কতটা জরুরি। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের জার্মানি গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করছে। ২০২১ সালেই এঙ্গেলা মার্কেল জার্মান চ্যান্সেলর পদ ছেড়ে দিচ্ছেন, যা ইউরোপে একটা নেতৃত্বের শূণ্যতা তৈরি করতে পারে। ফ্রান্সও যত জোর গলায় গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেছে, ততই তার দুর্বলতাটা প্রকাশ পেয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ফ্রান্সের রাস্তা সহিংসতায় পরিপূর্ণ ছিল। ফ্রান্স এবং জার্মানি উভয় দেশেই ডানপন্থীদের উত্থান পশ্চিমা সেকুলার আদর্শকে দুর্বল করেছে। ক্যাপিটল হিলের ঘটনার মাঝে ইউরোপ নিজেকেই দেখতে পাচ্ছে।

চীনা এবং রুশরা যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সমালোচনাতেই বেশি ব্যস্ত রয়েছে। হংকং, ইউক্রেন এবং বেলারুশের রাস্তায় সহিংসতার কথা মনে করে তারা ওয়াশিংটনের ঘটনা দেখে খুশিই হয়েছে। তারা হয়তো এই ভেবে খুশি হবে যে, তাদের দেশে গণতন্ত্রের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে তারা একটা শক্ত যুক্তি পেয়েছে। রুশরা অনেক ক্ষেত্রেই ট্রাম্পকেই সমর্থন দিয়েছে।

সুপারপাওয়ার যুক্তরাষ্ট্র এখন অভ্যন্তরীণভাবে ভীষণভাবে বিভক্ত। এমতাবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতা সকলের কাছে দৃশ্যমান; অনেকেই এই বিভাজনে ইন্ধন যোগাতেও পিছপা হবে না। কেউ কেউ সেই বিভক্তিতে কোন একটা পক্ষকে সরাসরি সমর্থন করছে; আবার কেউ কেউ বিশ্বব্যাপী পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েই চিন্তিত। সারা বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পিছনে যতটা জোরেসোরে চেষ্টা চালিয়েছে এতকাল, তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ। পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় পশ্চিমাদের ভূরাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আরও কমলো। চীন এবং রাশিয়া ছাড়াও ছোট দেশগুলি নিজেদের মতো করেই গণতন্ত্রের সংজ্ঞা দাঁড় করাবে এবং পশ্চিমা আদর্শকে ভূলুন্ঠিত করতে থাকবে।

Saturday, 9 January 2021

সৌদি আরব এবং কাতারের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব

০৯ই জানুয়ারি ২০২১

আল উলা, সৌদি আরব, জানুয়ারি ২০২১। বিমানবন্দরে কাতারের আমির আল থানিকে স্বাগত জানাচ্ছে সৌদি যুবরাজ বিন সালমান। বিশ্বব্যাপী প্রভাব হারালেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির উপর মার্কিন প্রভাব যে এখনও যথেষ্ট, তা কাতারের ইস্যু থেকে পরিষ্কার হয়। ট্রাম্প প্রশাসনের সমর্থনপুষ্ট হয়েই সৌদিরা কাতারের উপর অবরোধ দিয়েছিল; আবার সেই একই প্রশাসন হোয়াইট হাউজ ছাড়ার আগে আলোচনার পিছনে চাপ দিয়েছে।

গত ৭ই জানুয়ারি রাতে কাতারের রাজধানী দোহা থেকে ‘কাতার এয়ারওয়েজ’এর একটা ফ্লাইট সৌদি ভূখন্ডের উপর দিয়ে উড়ে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহান্সবার্গের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। ‘আল আরাবিয়া টিভি’ বলছে যে, সৌদি আরবের সাথে কাতারের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের সাথে সাথে ২০১৭এর পর প্রথমবারের মতো কাতারের বিমান সৌদি আকাশসীমা ব্যবহার করে। এর আগে ৫ই জানুয়ারি সৌদি আরবের আল উলা শহরে ‘গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল’ বা ‘জিসিসি’র ৪১তম শীর্ষ বৈঠকে আরব দেশগুলি সর্বসম্মতিক্রমে কাতারের উপর থেকে সকল নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান সাংবাদিকদের বলেন যে, সকলে মিলে নিজেদের মাঝে দ্বন্দ্ব ভুলে যাবার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়েছে। ২০১৭ সালে সন্ত্রাসবাদে ইন্ধন দেবার অভিযোগে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন এবং মিশর কাতারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং দেশটার উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবার জন্যে কাতারের কাছে সৌদি গ্রুপের মোট ১৩টা দাবি ছিল; যার মাঝে ছিল ‘আল জাজিরা’ টেলিভিশন বন্ধ করে দেয়া, কাতারে তুরস্কের সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করা, ইরানের সাথে কাতারের সম্পর্ককে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করা, এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে কাতারের সকল সম্পর্ক কর্তন। তবে সাড়ে তিন বছর পর দুই পক্ষের মাঝে মিলমিশ হয়ে যাবার কারণ কি? ব্রিটেনের ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা বলছে যে, উভয় পক্ষই এই দ্বন্দ্বকে চালিয়ে নেবার শক্তি হারিয়ে ফেলায় শান্তির পথ বেছে নিয়েছে। ‘বিবিসি’ বলছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে কুয়েত এবং যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এই সমস্যা সমাধানে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছে।

‘জিসিসি’ বৈঠকে সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান বা ‘এমবিএস’এর কথাগুলি কাতারের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের কারণ সম্পর্কে কিছুটা ইঙ্গিত দেয়। বিন সালমান তার বক্তব্যে বলেন যে, এই অঞ্চলের দেশগুলির একত্রিত হবার জন্যে একটা বিরাট চাহিদা তৈরি হয়েছে; যার উদ্দেশ্য হবে বর্তমানের চ্যালেঞ্জগুলি মোকাবিলা করা, বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের প্রকল্পের হুমকি এবং স্যাবোটাজ ও ধ্বংসের পরিকল্পনা। ‘বিবিসি’ তাদের বিশ্লেষণে বলছে যে, ২০১৭ সালে মার্কিন সরকার সৌদিদের পক্ষাবলম্বন করে এবং কাতারকে ‘সন্ত্রাসের অর্থায়নকারী’ হিসেবে আখ্যা দেয়; যদিও মধ্যপ্রাচ্যের মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের সবচাইতে বড় সামরিক ঘাঁটি হলো কাতারের আল উদাইদ। ২০১৮ সাল থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উপদেষ্টাদের প্রচেষ্টায় সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় কাতারের ভালো ভূমিকার কথা বলা হতে থাকে। ইরানকে নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের শক্ত নীতির অংশ হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসন যখন উভয় পক্ষের উপর চাপ দিতে থাকে, তখনই আলোচনায় গতি আসে। ট্রাম্পের জেষ্ঠ্য উপদেষ্টা ও জামাতা জ্যারেড কুশনার ডিসেম্বরে সৌদি আরব এবং কাতার সফর করেন। আল উলার বৈঠকেও তিনি ছিলেন বলে খবর পাওয়া যায়।

‘রয়টার্স’ বলছে যে, ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি তেলের খনিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর থেকে সৌদিরা কাতারের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের দিকে মনোযোগী হয়। সৌদি এবং মার্কিনীরা হামলার জন্যে ইরানকে দায়ি করেছিল। সেবছরের অক্টোবরে সৌদি আরব সফরের পর ডিসেম্বরে কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুররহিম আল থানি ‘সিএনএন’কে বলেন যে, সৌদিদের সাথে আলোচনার পর অন্ততঃ বন্ধ হয়ে যাওয়া কথাবার্তার ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। তবে কাতার মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে সরাসরি সম্পর্ক রাখার কথা অস্বীকার করে এবং কাতারে তুর্কি ঘাঁটি বন্ধ করার ব্যাপারে অপারগতা জানায়। কাতারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন যে, কাতারের খারাপ সময়ে যেসব দেশ সহায়তা দিয়েছে, তাদেরকে কাতার পিঠ দেখাবে না। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, সেই আলোচনাতেই সৌদিরা ‘আল জাজিরা’ বন্ধ করা এবং তুরস্কের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার ব্যাপারে নমনীয়তা দেখিয়েছিল। আর এই আলোচনার পিছনে যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচ্ছন্ন প্রভাব ছিল, তা জানা যায় হোয়াইট হাউজের বিবৃতি থেকে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানিকে ফোনে বলেন যে, দুই দেশের মাঝে আলোচনা চলমান থাকলে তা উপসাগরীয় অঞ্চলের সমস্যা নিরসণে ভূমিকা রাখবে।

‘বিবিসি’ বলছে যে, কাতার হয়তো অত সহজে সৌদি গ্রুপের অবরোধের কথা ভুলে যাবে না। অপরদিকে আরব আমিরাত এখনও কাতারকে পুরোপুরি বিশ্বাস করে না; বিশেষ করে ফিলিস্তিন এবং লিবিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে কাতারের সম্পর্ককে আমিরাত তার রাজতান্ত্রিক নেতৃত্বের প্রতি হুমকি হিসেবে দেখে। নিষেধাজ্ঞার সময়টাতে ২৭ লক্ষ জনগণের জরুরি প্রয়োজন মেটাতে তুরস্ক ও ইরানের সাথে কাতার অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করে। ‘জিসিসি’র দু’টা সদস্য দেশ কাতারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেনি, যারা হলো কুয়েত এবং ওমান। এর মাঝে কুয়েতই আলোচনার মধ্যস্ততাকারী ছিল।

বিশ্বব্যাপী প্রভাব হারালেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির উপর মার্কিন প্রভাব যে এখনও যথেষ্ট, তা কাতারের ইস্যু থেকে পরিষ্কার হয়। ট্রাম্প প্রশাসনের সমর্থনপুষ্ট হয়েই সৌদিরা কাতারের উপর অবরোধ দিয়েছিল; আবার সেই একই প্রশাসন হোয়াইট হাউজ ছাড়ার আগে আলোচনার পিছনে চাপ দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে সৌদিদের ভালো সম্পর্ক থাকলেও আসন্ন ডেমোক্র্যাট প্রশাসনের আদর্শিক নীতির সাথে সৌদি সরকারের সম্ভাব্য বিরোধ আলোচনায় আসছে নিয়মিত। বিশেষ করে ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের নীতি কি হবে, তা নিয়ে সৌদিরা চিন্তিত। মার্কিন ভূরাজনৈতিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘স্ট্রাটফর’ বলছে যে, কাতারের সাথে সৌদি গ্রুপের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পিছনে মূল উদ্দেশ্য হলো বাইডেন প্রশাসনের ভালো নজরে আসা। তবে সৌদিদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বহু বিষয়ে যথেষ্ট মতবিরোধ রয়েছে, যেগুলি থেকে সৌদিদের পক্ষে বেরিয়া আসা কঠিন। কাতারের উপর সৌদি অবরোধ পারস্য উপসাগরে তুরস্কের সামরিক উপস্থিতির সুযোগ করে দেয়া ছাড়াও কাতারকে নতুন একটা সামরিক বাহিনী তৈরির অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে; যা গড়ে তুলতে তুরস্কের ভূমিকাই সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদিরা তুরস্কের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করছে; তুরস্কও সৌদি গ্রুপের পথ অনুসরণ করে ইস্রাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করছে। পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় নিজস্ব জাতীয় অবস্থানকে টিকিয়ে রাখতে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন জোটের সৃষ্টি হচ্ছে, যেগুলির স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও স্বল্প মেয়াদে এগুলি আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিকে প্রভাবিত করবে।

Tuesday, 5 January 2021

বালুচিস্তানে ভারতের প্রক্সি যুদ্ধ পাকিস্তানের জাতীয়তাবাদী নীতিরই ফলাফল

৫ই জানুয়ারি ২০২১
বালুচিস্তানের বিচ্ছন্নতাবাদী নেত্রী করিমা বালোচের মৃত্যুর পর করাচির রাস্তায় প্রতিবাদ। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের এনজিও ‘ইইউ ডিজইনফোল্যাব’ তাদের এক বিশ্লেষণে বলে যে, ভারতীয় ইন্ধনে চলা ‘আফ্রিকান রুরাল এন্ড এগ্রিকালচারাল ক্রেডিট অর্গানাইজেশন’এর পক্ষে বালুচিস্তানের নেত্রী কারিমা বালোচ বক্তৃতা দিয়েছেন। 



গত ২২শে ডিসেম্বর কানাডার টরোন্টো শহরে করিমা মেহরাব নামে এক মহিলার মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। করিমা বালোচ নামে পরিচিত এই মহিলা পাকিস্তানের দক্ষিণের বালুচিস্তান প্রদেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন। ২০ তারিখ থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন বলে বলছে তার আত্মীয়রা। টরোন্টো পুলিশ এক বিবৃতিতে বলে যে, মৃতের সকলকিছু বিশ্লেষণের পর পুলিশ অফিসাররা নিশ্চিত হয়েছেন যে, এই মৃত্যু কোন হত্যাকান্ড নয়। মৃতের পরিবারকে এব্যাপারে জানানো হয়েছে। এক টুইটার বার্তায় টরোন্টো পুলিশ জানায় যে, পুলিশ এই মৃত্যুর ব্যাপারে মিডিয়ার যথেষ্ট আগ্রহের কথা জানে। ‘ভয়েস অব আমেরিকা’ বলছে যে, করিমা বালোচ ২০১৫ সালে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে টরোন্টোতে বসবাস করছিলেন। পাকিস্তান সরকার তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ এনেছিল। তার মৃত্যুর সাথেসাথেই মিডিয়াতে অনেকেই সন্দেহ করা শুরু করে যে, বালোচের মৃত্যু হয়তো পাকিস্তানি ইন্টেলিজেন্স অপারেটিভদের হাতেই হয়েছে। পাকিস্তান সরকার ইতোমধ্যেই পাকিস্তানি ইন্টেলিজেন্সকে জড়িত করার চেষ্টাকে ‘অবাস্তব’ বলে আখ্যা দিয়েছে। এবং বলেছে যে, এই কথাগুলি বলা হচ্ছে পাকিস্তানের ইমেজ নষ্ট করার লক্ষ্যে।

করিমা বালোচের স্বামী হাম্মাল হায়দার ব্যাপারটাকে একদমই মেনে নিতে পারছেন না। ব্রিটেনের ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকার সাথে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন যে, বালোচ ‘টরোন্টো সেন্টার আইল্যান্ড’এ গিয়েছিলেন; যেখান থেকে তিনি আর ফেরেননি। যাবার সময় তিনি যথেষ্ট শক্তসমর্থ মানুষ হিসেবেই গিয়েছিলেন। এখানে কোন সন্দেহভাজন কর্মকান্ডকে উড়িয়ে দেয়া যায় না; কারণ তিনি হুমকির মাঝেই ছিলেন। তার বাড়িতে দু’বার অভিযানের পর তিনি পাকিস্তান ছেড়েছিলেন। ‘বিবিসি’র সাথে কথা বলতে গিয়ে করিমা বালোচের সহকর্মী লতিফ জোহার বালোচ বলেন যে, কিছুদিন আগেই করিমা হুমকি পান যে, তাকে নাকি ‘ক্রিসমাস গিফট’ দেয়া হবে এবং ‘শিক্ষা দেয়া হবে’।

২০০৫ সাল থেকে করিমা বালোচ বালুচিস্তানে নিখোঁজ ব্যক্তিদের ব্যাপারে প্রতিবাদ শুরু করেন। প্রতিবাদকারীরা বলছেন যে, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে হাজারো মানুষের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। করিমা বালোচের পরিবারের দুইজন সদস্য নিখোঁজ হন এবং এর কিছুদিন পর তাদের মৃতদেহ পাওয়া যায়। ২০০৬ সাল থেকে ‘বালোচ স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশন’এ নাম লেখান করিমা। ২০১৩ সালে সংস্থাটাকে পাকিস্তান সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তবে এর কার্যক্রম চলমান থাকে; এবং ২০১৫ সালে করিমা বালোচ সংস্থার চেয়ারপার্সন হন। তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ এলে তিনি পাকিস্তান ছাড়েন। টরোন্টোতে তিনি তার সহকর্মী হাম্মাল হায়দারকে বিয়ে করেন। গত পাঁচ বছর ধরে সোশাল মিডিয়া ছাড়াও কানাডা এবং ইউরোপে তিনি বালুচিস্তানের ব্যাপারে যথেষ্ট সরব ছিলেন। ২০১৬ সালে ‘বিবিসি’ করিমা বালোচকে ১০০ জন প্রভাবশালী মহিলার তালিকায় রাখে। বালুচিস্তানের আন্দোলনকারীর এরকম রহস্যজনক মৃত্যু এবারই প্রথম নয়। ২০২০ সালের মে মাসে সুইডেনে বসবাসকারী বালুচিস্তানের স্বাধীনতার জন্যে কাজ করা সাংবাদিক সাজিদ হুসাইনের মরদেহ পাওয়া যায়। পুলিশ বলে যে, তিনি পানিতে ডুবে মারা গিয়েছেন এবং তা হত্যাকান্ড ছিল বলে কোন প্রমাণ নেই। ২০১২ সালে সাজিদ পাকিস্তান ছেড়ে পালিয়ে সুইডেনে আশ্রয় পান।
বালুচিস্তানে ‘সিপেক’ প্রকল্পের অধীন গোয়াদর বন্দর। ‘সিপেক’ প্রকল্পকে টার্গেট করে ভারত শুধু পাকিস্তানকেই দুর্বল করতে চাইছে না, চীনের জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পকে হুমকির মাঝে রাখছে। এতে রক্তপাত হচ্ছে পাকিস্তানিদের; ভারতের কেউ মরছে না। এহেন প্রক্সিযুদ্ধে ভারতের লজ্জিত হবার কোন কারণও থাকার কথা নয়। বরং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হবার পরেও পাকিস্তানকে কেন কষ্ট করে একত্রে রাখতে হচ্ছে, সেই প্রশ্নটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।



ভারতের ভূমিকা

পাকিস্তান সরকারের অভিযোগ হলো, বালুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের পিছনে রয়েছে ভারতের মদদ। ২০১৬ সালে ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রাক্তন অফিসার কুলভুষন যাদব পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে গোয়েন্দাবৃত্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। পাকিস্তান সরকার একটা ভিডিও ছাড়ে, যেখানে দেখা যায় যে, কুলভুষন যাদব বালুচিস্তানে বিভিন্ন হামলার পিছনে সহায়তা দিয়েছেন বলে স্বীকার করছেন। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, ২০১৭ সালের এপ্রিলে একটা সামরিক আদালতে বিচারের পর কুলভুষনের মৃত্যুদন্ডাদেশ দেয়া হয়। ভারত এব্যাপারে আন্তর্জাতিক আদালতে গেলেও আদালত পাকিস্তানের সামরিক আদালতের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। তবে দোষী ভারতীয় নাগরিককে ভারতীয় কূটনীতিবিদদের সাথে দেখা করার আদেশ দেয়। ২০১৯এর সেপ্টেম্বরে ভারতীয় কর্মকর্তারা কুলভুষনের সাথে দেখা করেন।

গত ৯ই ডিসেম্বর ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের এনজিও ‘ইইউ ডিজইনফোল্যাব’ তাদের এক বিশ্লেষণে বলে যে, ২০০৫ সাল থেকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে কেন্দ্র করে ভারত সরকার গোপনে মিথ্যা তথ্য ছড়াবার অপারেশন চালিয়ে আসছে। সাড়ে ৭’শর বেশি মিডিয়া আউটলেট এবং ১০টার বেশি এনজিওর নাম ব্যবহার করে প্রায় ১’শ ১৯টা দেশে এই অপারেশন চালাচ্ছে ভারত। এর অধীনে সাড়ে ৫’শ ইন্টারনেট ডোমেইন রয়েছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া মিডিয়া, এনজিও এবং থিঙ্কট্যাঙ্ক আবারও জীবন্ত করে চালিয়ে নেয়া হয় এই অপারেশন। এমনকি মৃত ব্যক্তিদেরও এক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। আফ্রিকা বিষয়ক এনজিওর নাম ব্যবহার করে পাকিস্তানের মানবাধিকার বিষয়ক খবরাখবর প্রচার করা হয়। উদাহরণস্বরূপ ‘আফ্রিকান রুরাল এন্ড এগ্রিকালচারাল ক্রেডিট অর্গানাইজেশন’এর পক্ষে বালুচিস্তানের নেত্রী করিমা বালোচ বক্তৃতা দিয়েছেন। ব্রাসেলস এবং জেনেভাতে অপারেট করা এই নেটওয়ার্কের মূল টার্গেট হলো পাকিস্তান; যদিও চীনও এই টার্গেটিংএর অংশ। ‘শ্রীভাস্তাভা গ্রুপ’এর নেতৃত্বে পরিচালিত এই অপারেশনের মূল লক্ষ্য হলো ভারতীয়দের মাঝে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ জাগিয়ে তোলা ও পাকিস্তান বিরোধী আবেগ উস্কে দেয়া; এবং একইসাথে ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলির বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের অবস্থানকে সুসংহত করা। ‘ইইউ ডিজইনফোল্যাব’ ভারতের এই অপারেশনের নাম দেয় ‘ইন্ডিয়ান ক্রনিকলস’। এই প্রতিবেদন পাকিস্তানের জন্যে বড় সুখবর হিসেবে আসে। এর মাধ্যমে পাকিস্তান সরকার মিডিয়াতে ভারতের বিরুদ্ধে আক্রমণে যেতে পারে। পাকিস্তান সরকার ভারতের বিরুদ্ধে ‘পঞ্চম জেনারেশনের যুদ্ধ’ বা তথ্য যুদ্ধ চালনা করার অভিযোগ করে।

ভারত অবশ্য পাকিস্তানের সকল অভিযোগ অস্বীকার করে এবং ‘ইইউ ডিজইনফোল্যাব’কেই মিথ্যা খবরের উৎস বলে আখ্যা দেয়। ১১ই ডিসেম্বর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অনুরাগ শ্রীভাস্তাভা সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে বলেন যে, ভারত নয়, বরং পাকিস্তানই মিথ্যা এবং বানোয়াট খবর প্রচার করে। ‘ইইউ ডিজইনফোল্যাব’ এর প্রতিবাদ করে ভারত সরকারের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থার হুমকি দেয়।
করাচি স্টক এক্সচেঞ্জে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হামলার পর কড়া নিরাপত্তা। ১৯৭১ সালে ভারতের সহায়তায় পাকিস্তানকে ভেঙ্গে বাংলাদেশ তৈরি হয় এবং পাকিস্তান তার অর্ধেক জনসংখ্যা হারায়। পাকিস্তান সরকারের উগ্র জাতীয়তাবাদী নীতিকে ভারত ব্যবহার করেছিল মাত্র। পাকিস্তানের সেই জাতীয়তাবাদ মূলতঃ পাঞ্জাবিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় পাকিস্তানকে জন্মের পর থেকেই বিচ্ছিন্নতাবাদের মোকাবিলা করতে হয়েছে; যদিও ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের জন্মই হয়েছিল মুসলিম সংখ্যাধিক্য এলাকাগুলি নিয়ে। জাতিগত চিন্তাকে প্রাধান্য দেয়ায় পাকিস্তান তার বাঙ্গালী, পুশতুন, বালুচ এবং সিন্ধি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। ভারত পাকিস্তানের সেই ঐতিহাসিক ভীতিকেই কাজে লাগিয়েছে। 



পাকিস্তান যেকারণে শান্তিতে নেই

করিমা বালোচ, সাজিদ হুসাইন, ‘ইন্ডিয়ান ক্রনিকলস’, কুলভুষনের ঘটনা পাকিস্তানকে স্বস্তি দেয়না। কারণ এতে পাকিস্তানের বালুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বন্ধ হয়ে যায়নি। বালুচিস্তানের গুরুত্ব আরও বেড়ে গিয়েছে গোয়াদরে চীনা বিনিয়োগে গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প শুরুর পর থেকে। গোয়াদর হলো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘চায়না পাকিস্তান ইকনমিক করিডোর’ বা ‘সিপেক’এর দক্ষিণ প্রান্ত। ‘সিপেক’এর মাধ্যমে বালুচিস্তানের গোয়াদর চীনের মূল ভূখন্ডের সাথে যুক্ত হয়েছে। বালুচিস্তানে চীনা কর্মীদের উপর বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হামলা বেশ নিয়মিত। গত জুলাই মাসে বালুচ এবং সিন্ধি বিচ্ছন্নতাবাদীরা একত্রিত হয়ে একটা জোট করে। এক যৌথ বিবৃতিতে তারা বলে যে, চীনের আগ্রাসী কর্মকান্ডে সিন্ধি এবং বালুচ উভয়েই সমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ২০২০এর জুনে করাচি স্টক এক্সচেঞ্জে হামলার জন্যে বালুচরা দায় স্বীকার করলেও তারা সিন্ধিদের কাছ থেকে সহায়তা পেয়েছে বলে বলা হয়। ওয়াশিংটন ভিত্তিক বিশ্লেষক মালিক সিরাজ আকবর ‘নিকেই এশিয়া’র সাথে কথা বলতে গিয়ে বলেন যে, দুই বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ একত্রিত হয়ে ‘সিপেক’এর জন্যে বড় সমস্যা তৈরি করতে পারলেও চীন এবং পাকিস্তানকে এই প্রকল্প বন্ধ করাতে সক্ষম হবে না। তবে তারা পাকিস্তান সরকারকে নিরাপত্তা বৃদ্ধি করতে বাধ্য করবে; যার ফলে বিচ্ছন্নতাবাদীরা সাধারণ মানুষকে চীনাদের বিরুদ্ধে আরও খেপিয়ে তুলতে পারবে। অন্যদিকে পাকিস্তান সরকার হয়তো বালুচিস্তানের জনগণকে এই প্রকল্পের সাথে আরও বেশি যুক্ত করতে চাইবে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ’এর প্রফেসর মোহন মালিকের মতে, বিচ্ছিন্নতাবাদীরা চীনের জন্যে ‘সিপেক’ প্রকল্পের খরচ বাড়িয়ে দিতে চাইবে। তিনি আরও মনে করছেন যে, এর ফলশ্রুতিতে দক্ষিণ এশিয়াতে প্রক্সি যুদ্ধ আরও বাড়বে। অত্র এলাকার রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রবিরোধী গ্রুপগুলিকে ভারত বা চীনের পক্ষে টানার একটা প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যাবে। লন্ডনের ‘ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টমিন্সটার’এর ‘স্কুল অব সোশাল সাইয়েন্সেস’এর প্রধান দিবিয়েশ আনন্দ বলছেন যে, পাকিস্তান সরকারের জন্যে বালুচিস্তানের জনগণকে ‘সিপেক’ প্রকল্পে জড়িত করার মাধ্যমে এর উন্নয়নকে পুরো অঞ্চলের জন্যে উন্নয়নের ইঞ্জিন বানানো যায়; আর উল্টোটা হলে তা হতে পারে চীনাদের গর্ব করার মতো একটা নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রকল্প, যেটাকে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ঔপনিবেশিক কর্মকান্ড বলে আখ্যা দিতে পারবে।

১৯৭১ সালে ভারতের সহায়তায় পাকিস্তানকে ভেঙ্গে বাংলাদেশ তৈরি হয় এবং পাকিস্তান তার অর্ধেক জনসংখ্যা হারায়। পাকিস্তান সরকারের উগ্র জাতীয়তাবাদী নীতিকে ভারত ব্যবহার করেছিল মাত্র। পাকিস্তানের সেই জাতীয়তাবাদ মূলতঃ পাঞ্জাবিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় পাকিস্তানকে জন্মের পর থেকেই বিচ্ছিন্নতাবাদের মোকাবিলা করতে হয়েছে; যদিও ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের জন্মই হয়েছিল মুসলিম সংখ্যাধিক্য এলাকাগুলি নিয়ে। মুসলিম পরিচয়ের চাইতে জাতিগত পরিচয়কে প্রাধান্য দেয়ায় পাকিস্তান তার বাঙ্গালী, পুশতুন, বালুচ এবং সিন্ধি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। ভারত পাকিস্তানের সেই ঐতিহাসিক ভীতিকেই কাজে লাগিয়েছে। বালুচিস্তানে ‘সিপেক’ প্রকল্পকে টার্গেট করে ভারত শুধু পাকিস্তানকেই দুর্বল করতে চাইছে না, চীনের জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পকে হুমকির মাঝে রাখছে। এতে রক্তপাত হচ্ছে পাকিস্তানিদের; ভারতের কেউ মরছে না। এহেন প্রক্সিযুদ্ধে ভারতের লজ্জিত হবার কোন কারণও থাকার কথা নয়। বরং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হবার পরেও পাকিস্তানকে কেন কষ্ট করে একত্রে রাখতে হচ্ছে, সেই প্রশ্নটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অপরদিকে পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে চীনের প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণ করাটাই যখন সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে, তখন ভারতও বালুচিস্তানে প্রক্সিযুদ্ধ চালিয়ে নিয়ে চীনা কৌশলগত প্রকল্পে বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করলে তা যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সমান্তরালেই থাকবে। পারমাণবিক যুদ্ধ নয়, বরং প্রক্সিযুদ্ধই হতে চলেছে দক্ষিণ এশিয়ায় ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের নতুন চেহারা। 

Monday, 4 January 2021

জাতিসংঘে রোহিঙ্গা ও মিয়ানমার নিয়ে ভোটাভুটির ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব

৪ঠা জানুয়ারি ২০২১

ডিসেম্বর ২০১৯। আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন মিয়ানমারের মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক নেত্রী নোবেল বিজয়ী অং সান সু চি। তিনি সরাসরিই রাখাইনে মিয়ানমার সরকারের সকল মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ অস্বীকার করেন। উগ্র জাতীয়তাবাদের বর্ণনা থেকে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ‘অবৈধ বাংলাদেশী অভিবাসী’ বলে আখ্যা দেয়। শরণার্থী প্রত্যাবাসন যে একটা সময়ক্ষেপণ চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়, তা বুঝতে বাকি থাকে না।


৩রা জানুয়ারি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডঃ একে আব্দুল মোমেন নিজ অফিসে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে জাতিসংঘে পাস হওয়া রেজোলিউশনের ব্যাপারে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন যে, বাংলাদেশ এই ব্যাপারটাকে একটা কূটনৈতিক সফলতা হিসেবে দেখছে। তিনি বলেন যে, যেসব দেশ রেজোলিউশনের পক্ষে ভোট দেয়নি, তাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের কোন অসন্তোষ নেই। তিনি তাদের ভোট না দেবার সিদ্ধান্তগুলিকে ‘কৌশলগত সিদ্ধান্ত’ হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি বলেন যে, দেশগুলি তাদের এই সিদ্ধান্ত নেবার আগে বাংলাদেশকে জানিয়েছিল। এই দেশগুলি অন্য পদ্ধতিতে মিয়ানমারের উপর প্রভাবকে ব্যবহার করতে চাইছে বলে বলেন তিনি। তবে তিনি এও বলেন যে, এই দেশগুলি জাতিসংঘে আরও ভালো ভূমিকা রাখতে পারতো। জাতিসংঘের ৭৫তম সাধারণ অধিবেশনে গত ৩১শে ডিসেম্বর ‘দ্যা সিচুয়েশন অব হিউম্যান রাইটস অব দ্যা রোহিঙ্গা মুসলিমস এন্ড আদার মাইনরিটিজ ইন মিয়ানমার’ নামে এই প্রস্তাব পেশ করা হয়। মোট ১’শ ৩০টা দেশ এই রেজোলিউশনের পক্ষে ভোট দেয়; ৯টা দেশ বিপক্ষে ভোট দেয়; ২৬টা দেশ ভোট দানে বিরত থাকে। আরও ২৮টা দেশ ভোটাভুটির সময় উপস্থিত ছিল না।

কারা কোন পক্ষে ভোট দিয়েছে

ভোটাভুটির বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, দক্ষিণ এবং পূর্ব এশিয়ার বেশিরভাগ অমুসলিম দেশই রেজোলিউশনের পক্ষে ভোট দেয়নি; এরা হয় বিপক্ষে ভোট দিয়েছে, অথবা ভোটদানে বিরত থেকেছে। একমাত্র আলাদা দেশ ছিল দক্ষিণ কোরিয়া, যারা প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে। রাশিয়া এবং তার প্রভাবের মাঝে থাকা ইউরেশিয়ার দেশগুলিও ভোট দেয়নি; যেমন বেলারুশ, কাজাখস্থান, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান। সাহারান আফ্রিকার বেশ কিছু দেশ ভোট দেয়নি; যাদের মাঝে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ দেশ ছিল নাইজেরিয়া এবং ইথিওপিয়া। ইউরোপে শুধুমাত্র হাঙ্গেরি এবং সার্বিয়া পক্ষে ভোট দেয়নি। এমনকি গ্রিস এবং আর্মেনিয়াও পক্ষে ভোট দিয়েছে!

 
৩১শে ডিসেম্বর ২০২০। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে রোহিঙ্গা এবং মিয়ানমার বিষয়ে ভোটাভুটির ফলাফল। বিশ্বের সবচাইতে বড় দেশগুলির চারটা মিয়ানমারের পক্ষে থাকার চেষ্টা করেছে।




পক্ষে ভোট না দেয়া পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির বেশিরভাগই ‘আসিয়ান’ অর্থনৈতিক জোটের অংশীদার। আসিয়ানের তিন মুসলিম দেশ মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং ব্রুনাই পক্ষে ভোট দিয়েছে। এই দেশগুলিতে মুসলিম জনগণের পক্ষ থেকে ব্যাপক চাপ রয়েছে সরকারের উপর, যা বিগত বছরগুলিতে রাস্তায় মিয়ানমার বিরোধী বিক্ষোভ মিছিল দেখলেই বোঝা যায়। মধ্য এশিয়াতে হয়েছে পুরো উল্টাটা। এই দেশগুলির কট্টর রুশপন্থী সরকারগুলি তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এমনকি দক্ষিণ এশিয়াতে বাংলাদেশের বন্ধু দেশগুলিও রেজোলিউশনের পক্ষে ভোট দেয়নি, যেমন শ্রীলংকা, নেপাল, ভুটান। পশ্চিমা দেশগুলি পক্ষে ভোট দেবে এটা প্রায় জানাই ছিল; কারণ তাদের আদর্শিক কারণে তারা এটা করবে।

এই ভোটাভুটিতে সবচাইতে বড় ভূমিকা ছিল রাশিয়া, চীন, ভারত এবং জাপানের। এরকম চারটা দেশ এবং আসিয়ান ও দক্ষিণ এশিয়ার সকল অমুসলিম দেশ যদি মিয়ানমারের পক্ষে থাকে, তাহলে এই রেজোলিউশন যে মিয়ানমারকে ভয় দেখাতে পারবে না, তা নিশ্চিত। কয়েক দশক বিশ্ব থেকে আলাদা থাকা মিয়ানমারের জন্যে এরকম ভোটাভুটি এমনিতেই মূল্যহীন। তার উপর সেখানে যদি পৃথিবীর বৃহত্তম রাষ্ট্রগুলির চারটা মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নেয়, তাহলে মিয়ানমার এতে আশহত হওয়া তো দূরে থাকুক, যথেষ্ট উল্লসিতই হবে।

মিয়ানমারের অস্ত্র ক্রয়ের জোয়ার

সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমার রাশিয়া, ভারত এবং চীন থেকে বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম ক্রম করেছে। এই সরঞ্জামের অনেকটাই মিয়ানমারের বিদ্রোহী গ্রুপগুলিকে নিয়ন্ত্রণের জন্যে নয়; যেমন বিমান বাহিনীর ৪র্থ জেনারেশনের যুদ্ধবিমান এবং নৌবাহিনীর জন্যে সাবমেরিন ও ফ্রিগেট। জাতিসংঘের ভোটাভুটির এক সপ্তাহ আগে ২৪শে ডিসেম্বর মিয়ানমার নৌবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত থেকে পাওয়া সাবমেরিন কমিশনিং করে। মিয়ানমারে ভারতের রাষ্ট্রদূত সৌরভ কুমার বলেন যে, সাবমেরিনের কমিশনিং দুই দেশের সম্পর্কে একটা মাইলফলক। এর মাধ্যমে দুই দেশের ম্যারিটাইম বন্ধুত্ব বহু এগিয়ে গেলো। একই অনুষ্ঠানে মিয়ানমার নৌবাহিনীর জন্যে নিজস্ব ডকইয়ার্ডে নির্মিত একটা স্টেলথ ডিজাইনের মিসাইল ফাস্ট এটাক ক্রাফট, দু’টা ৬৩ মিটার এন্টি সাবমেরিন ভেসেল, একটা ৫৬ মিটার লম্বা ল্যান্ডিং ক্রাফট এবং দু’টা সমুদ্রগামী টাগবোট কমিশনিং করা হয়। চীনা সহায়তায় মিয়ানমারের ইয়াঙ্গনে তৈরি করা হয় ‘থিলাওয়া ডকইয়ার্ড’; যেখানে গত তিন দশক ধরে চলছে এক বিশাল নির্মাণযজ্ঞ। এখানে ২০টা ৪৭ মিটার প্যাট্রোল ক্রাফট ও মিসাইল বোট, ২টা ৪৯ মিটার স্টেলথ ফাস্ট এটাক ক্রাফট, ৬টা ৫৬ মিটার লম্বা ল্যান্ডিং ক্রাফট ইউটিলিটি, ২০টা ২৯ মিটার ল্যান্ডিং ক্রাফট ট্যাঙ্ক, ৮টা ২৬ মিটার লম্বা সমুদ্রগামী টাগবোট তৈরি করা হয়েছে। ২০০১ সালে এর উন্নয়ন কাজ শেষ হবার পর থেকে মিয়ানমারের নৌবাহিনীর জন্যে ১’শ ৮মিটার লম্বা তিনটা ফ্রিগেট, ৭৭ মিটার লম্বা তিনটা কর্ভেট যুদ্ধজাহাজ এবং একটা ৮১ মিটার অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল তৈরি করা হয়েছে। এই যুদ্ধজাহাজগুলির ইলেকট্রনিক্স সরবরাহ করে ভারত; যার মাঝে রয়েছে জাহাজের মূল এয়ার ডিফেন্স রাডার এবং সাবমেরিন খোঁজার সোনার, যেগুলির প্রযুক্তি মূলতঃ পশ্চিমা। জাহাজগুলিতে সাবমেরিন ধ্বংসের জন্যে টর্পেডোও সরবরাহ করে ভারত। জাহাজের উপর থেকে অপারেট করার জন্যে ড্রোন কেনা হয়েছে অস্ট্রিয়া থেকে। অস্ট্রিয়া জাতিংসঘের রেজোলিউশনের পক্ষে ভোট দিয়েছিল। ২০১৮ সালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর এক ভিডিও ফুটেজ থেকে জানা যায় যে, মিয়ানমার গোপনে অস্ট্রিয়া থেকে অত্যাধুনিক ‘শাইবেল ক্যামকপ্টার এস১০০’ ড্রোন কিনেছে। এক হিসেবে বলা হয় যে, এই ক্রয়ের মূল্য ছিল প্রায় ৬০ মিলিয়ন ডলার। এরকম একটা ড্রোনের মূল্য প্রায় ৪ লাখ ডলার; আর এর কন্ট্রোল স্টেশন ও ট্রেনিংসহ পুরো সিস্টেমের খরচ প্রায় ২ মিলিয়ন ডলার। কাজেই মিয়ানমার আসলে কতগুলি ড্রোন কিনেছে, তা বলা কঠিন।

 

মিয়ানমার নৌবাহিনীর জন্যে অস্ট্রিয়া থেকে কেনা অত্যাধুনিক ‘শাইবেল ক্যামকপ্টার এস১০০’ ড্রোন। দন্তহীন সংস্থা জাতিসংঘের ভোটাভুটি পশ্চিমাদের লোক দেখানো কর্মকান্ড ছাড়া আর কিছুই নয়। গোপনে মিয়ানমারকে অস্ত্র সরবরাহ করে বিশ্বব্যাপী রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পক্ষে জনমত সৃষ্টির কথা বলাটা কপটতার শামিলই বটে। মুসলিম দেশগুলির নেতৃবৃন্দও আদর্শিক দিক থেকে মিয়ানমারকে জবাবদিহি করাকে নিজেদের দায়িত্ব বলে মনে করছে না। বরং বাস্তবতাকে চিন্তার ভিত ধরে মিয়ানমারকে আরও কাছে টানার নীতিতে এগুচ্ছে।


এই অস্ত্রগুলি অন্ততঃ সংখ্যার দিক থেকে হলেও মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে দিয়েছে। মিয়ানমার নৌবাহিনীর সবচাইতে বড় যুদ্ধজাহাজ উভচর ডক ল্যান্ডিং শিপ তৈরি করে দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া, যারা কিনা পূর্ব এশিয়ার একমাত্র দেশ হিসেবে রেজোলিউশনের পক্ষে ভোট দিয়েছে। গত ডিসেম্বরেই খবর বেরোয় যে, মিয়ানমার মুসলিম দেশ জর্দানের বিমান বাহিনীর কাছ থেকে প্রায় ৩৯ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে দু’টা ‘এয়ারবাস সি২৯৫’ সামরিক পরিবহণ বিমান ক্রয় করছে। বিমানগুলি ইউরোপে তৈরি এবং এর ইঞ্জিনগুলিও কানাডার কোম্পানি ‘প্র্যাট এন্ড হুইটনি’র তৈরি। মিয়ানমারের মিডিয়া ‘ইরাবতী’ বলছে যে, ২০১১ সালে ইউ থেইন সেইন প্রেসিডেন্ট হবার পর থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মিয়ানমার বিমান বাহিনীতে ৯৬টা নতুন বিমান যোগ করা হয়েছে; যার মাঝে দশ প্রকারের ৭৯টা বিমান এবং পাঁচ প্রকারের ১৭টা হেলিকপ্টার রয়েছে। ২০০১ সাল থেকে ২০১৬ সালের মাঝে ১ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করে রাশিয়া মিয়ানমারের সবচাইতে বড় সরবরাহকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। একই সময়ে চীনের কাছ থেকে মিয়ানমার পেয়েছে ১ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র। মিয়ানমারের কয়েক’শ সেনা যেকোন মুহুর্তে রাশিয়াতে সামরিক শিক্ষা নিচ্ছে।

অবাক ব্যাপার হলো, ১৯৮৮ সাল থেকে মিয়ানমারের উপর পশ্চিমা অস্ত্র অবরোধ রয়েছে। ‘ইরাবতী’ বলছে যে, ২০১৯এর ডিসেম্বরে এক অনুষ্ঠানে মিয়ানমারের সিনিয়র জেনারেল মিং অং হাইং বিমান বাহিনীর ৭২তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে ১০টা বিমান কমিশনিং করেন; যার মাঝে ছিল পাকিস্তানে তৈরি ২টা ‘জেএফ১৭বি’ মাল্টিরোল ফাইটার, রাশিয়ায় তৈরি ৬টা ‘ইয়াক১৩০’ এডভান্সড ট্রেইনার বিমান এবং ২টা ‘এমআই৩৫’ এটাক হেলিকপ্টার। ৭০তন প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতেও মিয়ানমার বিমান বাহিনীর জন্যে ১০টা বিমান কমিশনিং করা হয়; যার মাঝে ছিল ৬টা ‘ইয়াক১৩০’, হল্যান্ডে তৈরি দু’টা ‘ফকার ৭০’ বিমান এবং ফ্রান্সে তৈরি দু’টা ‘এটিআর ৪২’ বিমান। এভাবে প্রতি বছরই মিয়ানমারের বিমান বাহিনীর জন্যে যুদ্ধবিমান কমিশনিং করা হয়েছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র মেজর জেনারেল জাও মিন টুন বলছেন যে, মিয়ানমার ভারত বা চীনের সাথে হয়তো প্রতিযোগিতা করতে পারবে না, কিন্তু অন্য তিন প্রতিবেশী থাইল্যান্ড, লাওস এবং বাংলাদেশের সাথে তারা প্রতিযোগিতা করতে পারে। অস্ত্র ক্রয়ের উদ্দেশ্য হিসেবে তারা বলছে যে, এগুলি মূলতঃ বিদেশী হুমকিকে বাধা দেয়ার জন্যে, বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অভিবাসীরা এসে যাতে মিয়ানমারে বসতি স্থাপন না করতে পারে সেজন্য, আর দেশের সম্পদ রক্ষা করার লক্ষ্যে আকাশ পাহাড়া দেবার জন্যে। ২০০১ সালে থাইল্যান্ডের সাথে মিয়ানমারের সীমান্ত যুদ্ধে মিয়ানমারের ব্যাপক পরাজয়ের পর মিয়ানমার রাশিয়া থেকে যুদ্ধবিমান ক্রয়ে মনোযোগী হয় বলে বলা হয়। বহুবছর সামরিক শাসনের সময় পশ্চিমা অবরোধের মাঝে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার একটা চিন্তা ছিল যে, পশ্চিমারা হয়তো যেকোন সময় মিয়ানমারের উপর সামরিক হামলা করতে পারে। এছাড়াও বহু দশক ধরে নিজ জনগণের বিদ্রোহ দমন করতে ব্যস্ত মিয়ানমার। একারণেই মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর যুদ্ধ প্রস্তুতি যথেষ্ট এডভান্সড। উদাহরণস্বরূপ, স্যাটেলাইট ছবিতে মিয়ানমারের কোন বিমান ঘাঁটির রানওয়েতেই সামরিক বিমান পার্কিং করা দেখা যায় না।

মিয়ানমারের সামরক বাহিনীর বরাত দিয়ে ‘ইরাবতী’ বলছে যে, চীনাদের উপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা কমাবার লক্ষ্যেই মিয়ানমার রাশিয়া, ইউক্রেন, পোল্যান্ড, ভারত, ইস্রাইল এবং পাকিস্তানের কাছ থেকে অস্ত্র কিনতে থাকে। মিয়ানমারের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মূলতঃ রাশিয়া থেকে আসে। একটা বড় সংখ্যক যুদ্ধবিমান ছিল চীনা নির্মিত ‘এফ৭’ যুদ্ধবিমান। মিয়ানমারের সামরিক মুখপাত্র বলছেন যে, বাংলাদেশ এবং থাইল্যান্ডের হুমকি মোকাবিলা করতে মিয়ানমার একটা সাবমেরিন ফ্লিট গড়ে তুলতে চাইছে। সেই লক্ষ্যে ভারতের কাছ থেকে কেনা রুশ নির্মিত ‘কিলো ক্লাস’এর সাবমেরিনটা মূলতঃ ব্যবহৃত হবে ট্রেনিংএর উদ্দেশ্যে। ২০১৮ সালে রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু ঘোষণা দেন যে, রাশিয়া ২’শ ৪ মিলিয়ন ডলারে মিয়ানমারের কাছে ৬টা ‘সুখোই ৩০’ ফাইটার বিমান বিক্রি করছে। একই বছর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপদেষ্টা কেনতারো সোনোউরা বলেন যে, জাপান মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর উন্নয়নে সহায়তা দেবে। সেই হিসেবেই জাপানের ‘ন্যাশনাল ডিফেন্স একাডেমি’তে এখন মিয়ানমারের ক্যাডেট নেয়া হচ্ছে। মিয়ানমারের অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তা খাতে জাপানের অংশীদারিত্ব আরও বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। মিয়ানমারের সামরিক মুখপাত্র মেজর জেনারেল জাও মিন টুন বলছেন যে, ভারত এবং চীনের মাঝে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় বঙ্গোপসাগর অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় মিয়ানমারের বিমান এবং নৌবাহিনীকে আরও শক্তিশালী করা ছাড়া সামনের দিনে কোন পথই খোলা নেই।

 
সেপ্টেম্বর ২০১৭। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মিয়ানমার সফরের সময় ঘোষণা দেন যে ভারত মিয়ানমারের সাথেই রয়েছে। পরিবর্তিত বিশ্বে গ্রেট পাওয়ার প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে চীনকে নিয়ন্ত্রণ করাই যখন মূল লক্ষ্য, তখন রোহিঙ্গাদের মতো মুসলিম শরণার্থীরা ভূরাজনৈতিক খেলার গুটি হিসেবেই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ভূরাজনৈতিকভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ বঙ্গোপসাগরে সকলেই শক্তিশালী অবস্থান চাইছে; আর তাদের ঢোকার রাস্তা হলো রোহিঙ্গা সমস্যা।

নতুন বিশ্ব ব্যবস্থায় ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব

মিয়ানমারে সামরিক যজ্ঞের ফিরিস্তি দেখলে বোঝা দুষ্কর যে দেশটা আসলে মানবাধিকারের ব্যাপারে চাপের মাঝে রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সকল দেশ যেভাবে মিয়ানমারের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন করছে, তাতে মিয়ানমারই শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে; তারা যা চাইছে, তাই পাচ্ছে। দন্তহীন সংস্থা জাতিসংঘের ভোটাভুটি এক্ষেত্রে পশ্চিমাদের লোক দেখানো কর্মকান্ড ছাড়া আর কিছুই নয়। গোপনে মিয়ানমারকে অস্ত্র সরবরাহ করে বিশ্বব্যাপী রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পক্ষে জনমত সৃষ্টির কথা বলাটা কপটতার শামিলই বটে। মুসলিম দেশগুলির নেতৃবৃন্দও আদর্শিক দিক থেকে মিয়ানমারকে জবাবদিহি করাকে নিজেদের দায়িত্ব বলে মনে করছে না। বরং বাস্তবতাকে চিন্তার ভিত ধরে মিয়ানমারকে আরও কাছে টানার নীতিতে এগুচ্ছে। কেউ হয়তো সরাসরি মিয়ানমারকে সমর্থন দিচ্ছে; যার মাঝে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলি রয়েছে। অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলি অস্ত্র রপ্তানির ক্ষেত্রে কিছু ক্ষেত্রে ভীষণ কঠোর হলেও মিয়ানমারের ক্ষেত্রে ততটা নয়। জাতিসংঘের অধিবেশনে তারা কিন্তু ন্যায়ের পক্ষেই নিজেদের নাম লেখাচ্ছে।

পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করার পর ২০১৯এর ডিসেম্বরে মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক নেত্রী নোবেল বিজয়ী অং সান সু চি সরাসরিই রাখাইনে মিয়ানমার সরকারের সকল মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ অস্বীকার করেন। মিয়ানমার খুব ভালো করেই জানে যে, তারা বাংলাদেশের জন্যে কতটা সমস্যার সৃষ্টি করেছে। উগ্র জাতীয়তাবাদের বর্ণনা থেকে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ‘অবৈধ বাংলাদেশী অভিবাসী’ বলে আখ্যা দেয়। একইসাথে যেহেতু রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফেরত নেবার তাদের কোনরকম সদিচ্ছাই দৃশ্যমান নয়, কাজেই শরণার্থী প্রত্যাবাসন যে একটা সময়ক্ষেপণ চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়, তা বুঝতে বাকি থাকে না। মিয়ানমার বাংলাদেশকে মূলতঃ বুঝিয়ে দিয়েছে যে, মিয়ানমার বাংলাদেশের কথা শুনতে বাধ্য নয়। উল্টো বিশাল অস্ত্রের ভান্ডার গড়ে তুলে তারা বাংলাদেশকে একপ্রকার হুমকিই দিচ্ছে এবং শান্তির পথকে করছে সংকীর্ণ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে লেখা নতুন বছরের বার্তায় বলেন যে, রোহিঙ্গাদের ফেরত না নিলে অশান্তি হবার সম্ভাবনা রয়েছে। আর অশান্তি হলে সবার জন্যে অসুবিধা। ডঃ মোমেনের এই বার্তায় যে অশান্তির আভাস দেয়া হয়েছে, তা কিন্তু মিয়ানমার এখনও টের পাচ্ছে না ভূরাজনৈতিক কারণেই। পরিবর্তিত বিশ্বে গ্রেট পাওয়ার প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে চীনকে নিয়ন্ত্রণ করাই যখন মূল লক্ষ্য, তখন রোহিঙ্গাদের মতো মুসলিম শরণার্থীরা ভূরাজনৈতিক খেলার গুটি হিসেবেই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ভূরাজনৈতিকভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ বঙ্গোপসাগরে সকলেই শক্তিশালী অবস্থান চাইছে; আর তাদের ঢোকার রাস্তা হলো রোহিঙ্গা সমস্যা। পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় এই সমস্যার সমাধান হবার সম্ভাবনা ক্ষীণ থাকলেও বঙ্গোপসাগরে ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব যে আরও তীব্র হবে, তা সন্দেহাতীত। সকলেই প্রস্তুতি নিচ্ছে আসন্ন দ্বন্দ্বের জন্যে।

Sunday, 3 January 2021

ইস্রাইলের সাথে তুরস্কের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব

৩রা জানুয়ারি ২০২০

জুলাই ২০০৮। প্যারিসে ইস্রাইলি প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্টের সাথে তুর্কি প্রধানমন্ত্রী রিচেপ তাইয়িপ এরদোগান। ১৯৪৯ সাল থেকেই তুরস্ক ইস্রাইলের সাথে ভালো সম্পর্ক রেখে চলেছে। ২০১০ সালের পর থেকে দুই দেশের মাঝে থেকে থেকে উত্তেজনা বিরাজ করলেও বাস্তবতা তুরস্কের নেতৃত্বকে আবারও ইস্রাইলের কাছে টেনে এনেছে, যদিও তা তুরস্ক ছাড়াও গোটা মুসলিম বিশ্বের কাছে অপছন্দনীয় ঠেকবে।


গত ৯ই ডিসেম্বর ‘আল মনিটর’ খবর দেয় যে, তুরস্ক প্রায় তিন বছর পর ইস্রাইলে একজন রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দিতে চলেছে। উফুক উলুতাস নামের এই কূটনীতিবিদ বর্তমানে তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চ’এর চেয়ারম্যান। জেরুজালেমের হিব্রু ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করা এই কূটনীতিবিদ মধ্যপ্রাচ্য এবং ইহুদি ইতিহাস নিয়ে লেখালেখি করেছেন। এর আগে নভেম্বরে নিজস্ব সূত্রের বরাত দিয়ে ‘আল মনিটর’ বলে যে, তুরস্ক এবং ইস্রাইলের ইন্টেলিজেন্স প্রধানরা গোপনে আলোচনা চালাচ্ছেন। ২০১৮ সালের মে মাসে অধিকৃত গাজা উপত্যকায় প্রতিবাদকারী ফিলিস্তিনিদের উপর ব্যাপক ইস্রাইলি হামলার প্রতিবাদে তুরস্ক তার রাষ্ট্রদূতকে তেল আভিভ থেকে প্রত্যাহার করে নেয়। সেসময় ফিলিস্তিনিরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জেরুজালেমকে ইস্রাইলের রাজধানী ঘোষণা এবং তেল আভিভ থেকে জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস সরিয়ে নেবার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিল। তবে এই ঘটনার বহু আগে ২০১০ সালের মে মাসে গাজা উপত্যকার উপর ইস্রাইলের অর্থনৈতিক অবরোধ ভাঙতে গিয়ে তুর্কি জাহাজ ‘মাভি মর্মরা’তে ইস্রাইলের স্পেশাল ফোর্সের সেনারা হামলা করে ৯ জন তুর্কি নাগরিককে হত্যা করে। এই ঘটনার প্রতিবাদে তুরস্ক ইস্রাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। ‘বিবিসি’ বলছে যে, ২০১৩ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মধ্যস্ততায় ইস্রাইল এবং তুরস্কের মাঝে সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়। ইস্রাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু তুর্কি প্রধানমন্ত্রী রিচেপ তাইয়িপ এরদোগানের সাথে ফোনে কথা বলে ‘মাভি মর্মরা’র ঘটনার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। ২০১৬ সালে দুই দেশের মাঝে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিকতা পায়। ‘আল জাজিরা’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, উফুক উলুতাসকে তেল আভিভ পাঠাবার সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এলো, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্ততায় সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, সুদান এবং মরক্কো ইস্রাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে। তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান ট্রাম্পের এই প্রচেষ্টা এবং আরব দেশগুলির ইস্রাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের সমালোচনা করেছেন এবং নিজেকে মুসলিম বিশ্বের মাঝে ফিলিস্তিনি অধিকার আদায়ের শক্ত সমর্থক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। নেতানিয়াহু এবং এরদোগান বিভিন্ন সময়ে একে অপরের বিষোদগার করেছেন। তাহলে এখন আরব দেশগুলির মতো একই পথে হাঁটছে কেন তুরস্ক?

তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগানের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা মেসুত কাসিন ‘ভয়েস অব আমেরিকা’র সাথে কথা বলতে গিয়ে বলছেন যে, সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে ইস্রাইল যদি এক পা এগোয়, তাহলে তুরস্ক দুই পা এগিয়ে আসতে পারে। তিনি বলেন যে, শান্তি এবং নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা উভয় দেশের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ। তারা কেউই ২০১০ সালের ‘মাভি মর্মরা’র মতো ঘটনা চান না। কারণ সেই ঘটনার পর থেকে সম্পর্ক শতভাগ স্বাভাবিকতা পায়নি। কাসিন বলছেন যে, উভয় দেশের মাঝে প্রতিরক্ষা এবং জ্বালানি ক্ষেত্রে অনেক সহযোগিতার ক্ষেত্র রয়েছে। দুই দেশের সামরিক সহায়তা আজেরবাইজানকে আর্মেনিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ জিততে সহায়তা করেছে। আর পূর্ব ভূমধ্যসাগরে আহরিত গ্যাসের জন্যে তুরস্ক হতে পারে গুরুত্বপুর্ণ বাজার এবং তুর্কি অঞ্চলের উপর দিয়ে পাইপলাইন বসিয়ে এই গ্যাস ইউরোপের বাজারে যেতে পারে। কাসিন ইঙ্গিত দিয়ে বলেন যে, নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ক্ষমতা নেবার পর অনেক কিছুই পরিবর্তন হবে। ‘ভোয়া’ বলছে যে, ট্রাম্প এবং এরদোগানের মাঝে বেশ ভালো বোঝাপড়া ছিল; কিন্তু বাইডেন হোয়াইট হাউজে আসার সাথেসাথেই আঙ্কারার জন্যে অনেককিছুই চ্যালেঞ্জিং হয়ে যাবে। ইস্তাম্বুলের বোগাজিচি ইউনিভার্সিটির গবেষক সেলিন নাসি মত দিচ্ছেন যে, মার্কিন কংগ্রেসে তুর্কিদের বিরোধী মতামতই বেশি। এমতাবস্থায় তুরস্ক হয়তো মনে করছে যে, ইস্রাইল এব্যাপারে তুরস্ককে কংগ্রেসের চোখে ভালো দৃষ্টিতে নিতে সহায়তা করবে। তবে তুরস্কের সাথে সম্পর্কোন্নয়নে ইস্রাইলের মূল উদ্দেশ্য বুঝতে পারা বেশ কঠিন বলে বলছেন নাসি। একটা উদ্দেশ্য হতে পারে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে দুই দেশের মাঝে ঐকমত্য রয়েছে। আর যখন ইস্রাইল মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করছে, তখন সেই তালিকায় তুরস্ক যোগ হলে আঞ্চলিক নেতৃত্বের চোখে ইস্রাইলের ইমেজ আরও শক্তিশালী হবে।

তবে ইস্রাইল আসলে এই সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে কতটা ইচ্ছুক, তা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করছেন কেউ কেউ। ‘আল জাজিরা’র সাথে কথা বলতে গিয়ে ‘তেল আভিভ ইউনিভার্সিটি’র ‘ইন্সটিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ’এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো গালিয়া লিন্ডেনস্ট্রস বলছেন যে, দুই দেশের মাঝে রাষ্ট্রদূত আদানপ্রদান হলেও সন্দেহ দূরীভূত হবে না। ইস্রাইল এই সম্পর্কোন্নয়নের ব্যাপারে অপেক্ষাকৃত কম আগ্রহী। ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাসের জন্যে তুরস্কের সমর্থন ইস্রাইলের সাথে সম্পর্কোন্নয়নে বাধা। হামাসের কিছু নেতৃবৃন্দ তুরস্কে অবস্থান করে তাদের কর্মকান্ড চালান। তুরস্ক যদি হামাসকে সমর্থন দেয়ার ব্যাপারে ছাড় দেয়, তাহলে ইস্রাইলের চোখে তা হবে বড় পরিবর্তন। আঙ্কারার ‘মিডল ইস্ট টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর হুসেইন বাগচির মতে তুরস্ক ইস্রাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ করতে গিয়ে ছাড় দিতে প্রস্তুত। মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে ফিলিস্তিনে, মুসলিম ব্রাদারহুডের জন্যে তুরস্ক সরাসরি সমর্থনের ক্ষেত্রে ছাড় দেবে।

তবে লিন্ডেনস্ট্রস বলছেন যে, যেহেতু উভয় দেশের নেতৃবৃন্দ একে অপরের প্রতি কটুবাক্য ছুঁড়ে রাজনৈতিক সুবিধা পান, তাই অত সহজেই তারা আবারও তেমন সুযোগ পেলে হাতছাড়া করতে চাইবেন না। ‘জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর লিসেল হিন্টজ ‘আল জাজিরা’কে বলছেন যে, এরদোগান যখন ফিলিস্তিনিদের পক্ষ নেন, তখন মুসলিম বিশ্বে তিনি জনসমর্থন পান। আর যখন তিনি ইস্রাইল বিরোধী অবস্থান নেন, তখন তুরস্কে তার জাতীয়তাবাদী সমর্থন বাড়া ছাড়াও মুসলিম বিশ্বে তার জনপ্রতিয়তা বৃদ্ধি পায়। তবে লিন্টজ বলছেন যে, এরদোগান সবসময় বাস্তবতাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। ২০১৬ সালে অর্থনৈতিক কারণে তুরস্কের ইস্রাইলের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন করাটা ইস্রাইলের জন্যে বড় জয় ছিল। এবারেও বিশ্লেষকেরা মনে করছেন যে, ইস্রাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ তুরস্কের বর্তমান কঠিন বাস্তবতারই ফলাফল। বাইডেন প্রশাসন খুব সম্ভবতঃ সিরিয়া, লিবিয়া এবং ককেশাস ইস্যুতে তুরস্কের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ তুরস্কের কর্মকান্ডকে নিয়ন্ত্রণ করতে অবরোধ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের কোণঠাসা অবস্থানও হয়তো তুরস্ককে ইস্রাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে অনুপ্রেরণা যোগাতে পারে। পূর্ব ভূমধ্যসাগরে সামরিক এবং জ্বালানি ক্ষেত্রে গ্রিস এবং মিশরের সাথে ইস্রাইল সহযোগিতা বাড়িয়েছে। অনেকেই বলছেন যে, এর পিছনে অত্র অঞ্চলে তুরস্কের প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য রয়েছে।

ইস্রাইলের জন্মের পরপরই ১৯৪৯ সালে তুরস্ক ইস্রাইলের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে। পুরো ঠান্ডা যুদ্ধের সময়েই দুই দেশ ছিল পশ্চিমা ধাঁচে চলা বন্ধু রাষ্ট্র। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, ২০০২ সালে তুরস্কে ‘একে পার্টি’ ক্ষমতায় আসার পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কে পরিবর্তন আসে। ২০০৮ সালের পর থেকে গাজায় ইস্রাইলের অভিযান শুরু হলে ‘একে পার্টি’ ফিলিস্তিনিদের পক্ষ নিলে দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি হয়। তদুপরি গত ৮ বছরের মাঝে দুই দেশের মাঝে বাণিজ্য সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার থেকে ৬ বিলিয়নের মাঝে ওঠানামা করেছে। ২০২০ সালের প্রথম ১০ মাসে দুই দেশের বাণিজ্য ৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ হলে এই বাণিজ্য আরও বাড়বে।

সুপারপাওয়ার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বল হওয়াটা সকলের কাছে অজানা না থাকলেও ওয়াশিংটনে ক্ষমতার পট পরিবর্তন এখনও বাকি বিশ্বের জন্যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা ইস্রাইলের সাথে মুসলিম দেশগুলির সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের সাড়িবদ্ধতা দেখেই বোধগম্য। হোয়াইট হাউজে বাইডেন প্রশাসনের আগমণের আগেই তুরস্ক প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে; যার অংশ হিসেবে ইস্রাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের পথকেই বাস্তববাদিতা বলে দেখেছে তুরস্ক। গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং বাকস্বাধীনতার ব্যাপারে আসন্ন বাইডেন প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি বিদায়ী ট্রাম্প প্রশাসনের থেকে আলাদা হওয়ায় মুসলিম দেশগুলির নেতৃবৃন্দ সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে। তবে বিভক্ত যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের সাথে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যখন জো বাইডেন প্রশাসনের জন্যে বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিতে যাচ্ছে, তখন মধ্যপ্রাচ্যের ব্যাপারে ইস্রাইলের দৃষ্টিভঙ্গিই ওয়াশিংটনের কাছে অধিক গ্রহণযোগ্য হিসেবে ঠেকবে। এমতাবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যে ইস্রাইলের টিকে থাকার ব্যাপারে তেল আভিভ সরকারের ওয়াশিংটন নির্ভরশীলতা যেমন কমছে, তেমনি তার মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাও গুরুত্ব পাচ্ছে বেশি। যুক্তরাষ্ট্র নয়, বরং মুসলিম দেশগুলিই এখন ইস্রাইলের নিরাপত্তার পিছনে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চাইছে, যদিও তা মুসলিম বিশ্বের সাধারণ জনগণের কাছে অগ্রহণীয় হবে এবং তা তৈরি করবে অস্থিরতার। মুসলিম বিশ্বের নেতৃবৃন্দ বর্তমান বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে ইস্রাইলের সাথে বন্ধুত্ব করাকে যখন মুসলিম আবেগের উপর স্থান দিচ্ছে, তখন একদিকে তা মুসলিম জনগণের মাঝে তাদের নেতৃত্বের প্রতি যেমন ঘৃণার জন্ম দিচ্ছে, তেমনি শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্যে জনগণকে আরও মরিয়া করে তুলছে। এহেন অস্থিরতা সামনের দিনগুলিতে নতুন এক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম দিতে যাচ্ছে, তা থেকে পরিত্রাণ পাবার ক্ষমতা মুসলিম দেশগুলির নেতৃবৃন্দের নেই।