১২ই জুন ২০২২
ভারতের বিজেপি সরকারের দুই মুখপাত্র ও রাজনীতিবিদ নুপুর শর্মা এবং নাভীন জিনদালের নবী মুহাম্মদ (সাঃ)কে নিয়ে করা অবমাননাকর মন্তব্যের উপর ভর করে পুরো মুসলিম বিশ্বে যখন ঝড় বয়ে যাচ্ছে, তখন এই ঘটনার সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে মাত্র। গত ২৬শে মে নুপুর শর্মা এক ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেলে রাসূল (সাঃ) এবং তার স্ত্রী আয়েশা (রাঃ)কে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন। এই মন্তব্যের মারাত্মক সমালোচনা শুরুর পর বিজেপির আরেক মুখপাত্র নাভীন জিনদাল টুইটারে তার সহকর্মীকে সমর্থন দেন। ‘সিএনএন’এর খবরে বলা হচ্ছে যে, ঘটনার স্পর্শকাতরতা অনুধাবন করে বেশিরভাগ ভারতীয় মিডিয়া শর্মার কথাগুলি কি ছিল, তা পরিষ্কার করে বলা থেকেও বিরত থেকেছে। শর্মা পরবর্তীতে এক টুইটার বার্তায় তার এই মন্তব্য তুলে নেন। পুরো মুসলিম বিশ্ব থেকে চাপ আসার পর ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি ৫ই জুন নুপুর শর্মার সদস্যপদ স্থগিত করে এবং নাভীন জিনদালকে দল থেকে বহিষ্কার করে। প্রশ্ন উঠেছে যে, বিজেপির অধীনে ভারতীয় মুসলিম নাগরিকদের উপর চরম অত্যাচারের খবরের ব্যাপারে মুসলিম বিশ্ব থেকে এতকাল কোন চাপ না আসলেও এখন কেন চাপ আসা শুরু হয়েছে?
সারা মুসলিম বিশ্বে প্রতিক্রিয়া
বার্তা সংস্থা ‘এএফপি’ জানাচ্ছে যে, ৫ই জুন ভারতের ভাইস প্রেসিডেন্ট ভেঙ্কাইয়াহ নাইডু কাতার সফর করার সময় ভারতের কাছ থেকে ক্ষমা প্রার্থনার দাবি জানানো হয়। একই দিনে ইরানের বার্তা সংস্থা ‘ইরনা’ জানায় যে, সেদেশে ভারতের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে ইরানের ‘সরকার এবং জনগণের পক্ষ থেকে’ প্রতিবাদ জানানো হয়। মধ্যপ্রাচ্যের ছয়টা দেশ নিয়ে গঠিত ‘গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল’ বা ‘জিসিসি’র সেক্রেটারি জেনারেল নায়েফ ফালাহ আল হাজরাফএর পক্ষ থেকেও বিবৃতি দেয়া হয়। ৫৭টা মুসলিম দেশ নিয়ে গঠিত ‘ওআইসি’র পক্ষ থেকে বিবৃতি দিয়ে জাতিসংঘকে অনুরোধ জানানো হয় যাতে করে ভারতের মুসলিমদের রক্ষা করার জন্যে ব্যবস্থা নেয়া হয়। ৬ই জুন ভারতের বার্তা সংস্থা ‘পিটিআই’ জানায় যে, সোদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্দান, বাহরাইন, আফগানিস্তান, পাকিস্তানের সাথে ইন্দোনেশিয়াও যোগ দিয়েছে নিন্দা জানাতে। তবে একইসাথে সৌদি আরব এবং কুয়েত বিজেপির মুখপাত্রকে দল থেকে সাময়িক বরখাস্ত করার মোদি সরকারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায়।
৬ই জুন ‘ইজিপ্ট টুডে’র এক খবরে বলা হচ্ছে যে, মিশরের সর্বোচ্চ ধর্মীয় সংস্থা ‘আল আজহার’ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে, বিজেপির নেতৃত্বের বক্তব্য সন্ত্রাসের শামিল। এধরনের মন্তব্য পুরো বিশ্বকে মারাত্মক বিপর্যয়ের মাঝে ফেলা দেয়া ছাড়াও যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। বিবৃতিতে বলা হয় যে, ভারতের কিছু রাজনীতিবিদেরা নিজেদের ভোট বাড়াতে এধরনের কথা বলছে। সেখানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানানো হয়। সৌদি আরবের ‘জেনারেল প্রেসিডেন্সি অব দ্যা এফেয়ার্স অব দ্যা গ্র্যান্ড মস্ক’এর পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে ভারতীয় রাজনীতিবিদদের বক্তব্যকে নিকৃষ্টতম কর্মকান্ড বলে আখ্যা দেয়া হয়। ‘সৌদি আরবের ‘মুসলিম ওয়ার্ল্ড লীগ’এর পক্ষ থেকে বলা হয় যে, এর মাধ্যমে বিদ্বেষ বৃদ্ধি পাবে। এর দু’দিন আগে ওমানের গ্র্যান্ড মুফতি শেখ আহমাদ বিন হামাদ আল খলিল এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, এধরনের মন্তব্য সকল মুসলিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধের শামিল। তিনি ভারতীয় পণ্য বয়কট করারও আহ্বান জানান। বার্তা সংস্থা ‘এএফপি’র এক খবরে বলা হয় যে, কুয়েতের ‘আল আরাবিয়া কোঅপারেটিভ সোসাইটি’র এক সুপারস্টোরের কর্মচারীরা সেখানকার ভারতীয় পণ্য শেলফ থেকে সড়িয়ে ট্রলিতে করে জমিয়ে আলাদা করেছে। প্লাস্টিকে মুড়িয়ে রাখা চাল এবং মসলার প্যাকেটের উপর লিখে দেয়া হয় যে, ‘আমরা ভারতীয় পণ্য সড়িয়ে ফেলেছি’। কোম্পানির একজন কর্মকর্তা বলেন যে, তারা পুরো কোম্পানিজুড়ে ভারতীয় পণ্য বয়কট করার চিন্তা করছে। ‘দ্যা মালদিভস জার্নাল’ বলছে যে, মালদ্বীপে হুলহুমালে দ্বীপের সৈকতে এবং হাউজিং প্রকল্প এলাকায় ময়লার ঝুড়ির উপর নরেন্দ্র মোদির ছবি লাগানো হয়েছে। ছবিতে মোদির চেহারার উপর জুতার ছাপ দেয়া ছিল। কুয়েতেও ডাস্টবিনের উপর একই ছবি দেখা গেছে। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলছে যে, ভারতের বন্ধু রাষ্ট্র বলে খ্যাত প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় ১০ই জুন শুক্রবার জুমআর নামাজের পর হাজারো মানুষ রাস্তায় বিক্ষোভ করেছে।
সকলেই ঘটনার সুযোগ নিচ্ছে
সাংবাদিক এবং লেখক দেবাশিষ রায় চৌধুরী ‘টাইম’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় বলছেন যে, হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের প্রতিনিধিরা যখন নবী মুহাম্মদ (সাঃ)কে অবমাননা করেছে, তখন ভারতের সেকুলার রাজনীতিবিদেরাও চুপ থেকেছে। শুধুমাত্র এক সপ্তাহ পর মুসলিম বিশ্ব থেকে প্রতিবাদ আসার পরেই তারা মুখ খুলেছেন। মুসলিম বিশ্ব থেকে ভারত সরকারের উপর চাপ আসায় ভারতের মুসলিমরা কিছুটা স্বস্তি পেলেও সেটা খুব বেশি হলে স্বল্প সময়ের জন্যে। এই উত্তেজনা যখন ঠান্ডা হয়ে আসবে, তখনই বোঝা যাবে যে, ভারতের মুসলিম জনগণের নিরাপত্তার চাইতে বাণিজ্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মোদি সরকার তখন হয়তো রাষ্ট্রদ্রোহিতার কথা বলে কিছু ব্যক্তিকে কারাবন্দী করবে। আর উগ্রবাদী হিন্দু এবং সরকারি শক্তিকে আবারও মুসলিমদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়া হবে। শুধু তাই নয়, মোদি আবারও মুসলিম দেশগুলি সফর করে তাদের নেতৃত্বকে আলিঙ্গন করবেন। যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ নবী মুহাম্মদ (সাঃ)কে নিয়ে কথা না বলবে, ততক্ষণ সকলকিছু স্বাভাবিক থাকবে। বিজেপির ৮ বছরের শাসনের মাঝে ভারতের মুসলিমদের উপর চরম অত্যাচার হলেও মুসলিম বিশ্ব থেকে কোন প্রতিবাদই আসেনি। উল্টো সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরব দিল্লীর সাথে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করেছে।
ভারতের উগ্রবাদী হিন্দুরা বিজেপির মুখপাত্রকে বরখাস্ত করার মোদির সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে পারেনি। এদের কেউ কেউ মোদিকে কাপুরুষ হিসেবে আখ্যা দিয়ে ‘শেইম অন মোদি’ হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করছে। তারা অনেকেই টুইটারে মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালনা শুরু করেছে। কেউ কেউ মুসলিম দেশগুলির বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধের ডাক দিচ্ছে। কাতারের সমালোচনা করে কেউ কেউ ‘কাতার এয়ারলাইন্স’কে বয়কটের ডাকও দিয়েছে।
তবে নুপুর শর্মা এবং নাভীন জিনদালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে ভারতের ক্ষমতাসীনরা দেখাতে চেয়েছে যে, তারা পুরো মুসলিম বিশ্বের সাথে সংঘাতে যাবার জন্যে প্রস্তুত নয়। এতে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের দুর্বলতাটাও প্রকাশ পায়। সকলেই এই দুর্বলতাকে ব্যবহার করতে চাইছে। জঙ্গী সংগঠন আল কায়েদার পক্ষ থেকেও ভারতকে হুমকি দেয়া হয়েছে। ‘সিএনএন’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে ভারতের প্রভাবশালী থিংকট্যাংক ‘অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’এর ফেলো মোহাম্মদ সিনান সিয়েচ বলছেন যে, এটা আল কায়েদার রিক্রুটিং প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। ‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’এর ফেলো হাসান আল হাসান বলছেন যে, মোদি সর্বদাই চেষ্টা করেছেন যাতে করে তার অভ্যন্তরীণ হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডার ফলাফল দেশের বাইরে চলে না যায়; এবং সেটা যেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির সাথে ভারতের সম্পর্ককে সমস্যায় না ফেলে।
ভারতের মুসলিমদের কি হবে?
‘সিএনএন’এর এক প্রতিদেবনে বলা হচ্ছে যে, নবী (সাঃ)কে অবমাননার ঘটনা ভারতের প্রায় ২০ কোটি মুসলিমদের কাছে নতুন কোন ব্যাপার হয়ে আসেনি। কারণ গত ৮ বছর ধরে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের অধীনে তারা মারাত্মক অত্যাচারের শিকার হয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে ভারতে উগ্রবাদী হিন্দুদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক কর্মকান্ড বেড়েছে। গত জানুয়ারি মাসেই ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের জ্যেষ্ঠ বিজেপি নেতা পূজা শাকুন পান্ডে ভারতকে রক্ষা করতে মুসলিমদের নিধন করে ফেলার কথা বলেন। তিনি বলেন যে, তারা যদি ২০ লক্ষের মতো মুসলিম হত্যা করে ফেলতে পারে, তাহলে একটা হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। এরপর ফেব্রুয়ারি মাসেই দক্ষিণের কর্ণাটক রাজ্যে মুসলিম ছাত্রীদের হিজাব পড়া নিষিদ্ধ করা হয়। ২০১৮ সালে বিজেপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেন যে, বাংলাদেশ থেকে আসা মুসলিমরা হলো ‘পিঁপড়া’র মতো এবং এদেরকে উৎপাটন করার জন্যে তারা ব্যবস্থা নেবেন। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মাঝে বহু মুসলিমকে হিন্দুত্ববাদীরা গরুর গোশত খাওয়ার ‘অপরাধে’ হত্যা করেছে বলে বলছে মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’। ২০১৯ সালে ভারতীয় পার্লামেন্টে নাগরিকত্ব বিল পাস হয়; যার মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশ থেকে সংখ্যালঘুদেরকে ভারতে আশ্রয় দেয়ার কথা বলা হয়। অপরদিকে লক্ষ লক্ষ মুসলিমের ভারতীয় নাগরিকত্ব বাতিল ঘোষণা করা হয়। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে উত্তর প্রদেশে নতুন আইন করা হয়, যার মাধ্যমে হিন্দুদের পক্ষে ইসলাম গ্রহণ করার কঠিন করে ফেলা হয়।
মুসলিম দেশগুলি যদি ভারতকে এতটাই গুরুত্ব দেয় এবং মুসলিমদের উপর অত্যাচারের ব্যাপারে এতদিন চুপ থাকে, তাহলে এখন কেন তারা মুখ খুলছে? দেবাশিষ রায় চৌধুরী বলছেন যে, হয়তো মুসলিম নেতৃত্ব নিজেদের দেশের জনগণকে ঠান্ডা রাখার জন্যেই ভারতের উপর চাপ সৃষ্টি করেছে। কুয়েতের মিডিয়া বলছে যে, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক খাদ্যসংকটে নিজেদের সুরক্ষা দিতে ভারত গম রপ্তানি বন্ধ করে দেয়ার পর কুয়েতের সরকার দিল্লীকে তাদের এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার অনুরোধ জানিয়েছে। ভারতের মোট বহির্বাণিজ্যের ১৫ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্যের ছয়টা দেশের সাথে হয়ে থাকে। ভারতের মোট জ্বালানি তেলের এক তৃতীয়াংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসেবে বিশ্বব্যাপী ভারতের মোট ১ কোটি ৩৫ লক্ষ প্রবাসীর মাঝে প্রায় ৮৭ লক্ষই বাস করে ‘জিসিসি’ অন্তর্ভুক্ত দেশগুলিতে। এই প্রবাসীদের কাছ থেকে বছর প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে; যা কিনা ভারতের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৬৫ শতাংশ। বুঝতে বাকি থাকে না যে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির সাথে ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্ক কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ভারত মধ্যপ্রাচ্যের উপর যেমন অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল, তেমনি মধ্যপ্রাচ্যও ভারতের সাথে বাণিজ্যের উপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি জনবলের সংকটের কারণে বিদেশী শ্রম, বিশেষ করে ভারতীয় নাগরিকদের উপর বিশেষভাবে নির্ভরশীল।
নবী (সাঃ)কে অবমাননার ফলে মোদির বিজেপি সরকারের অবস্থান অভ্যন্তরীণভাবে পরিবর্তন হচ্ছে না ঠিকই; তবে ঘটনার বাস্তবতার চাপ মোকাবিলা করতে বিজেপি সরকার যে তাদের হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডায় কিছুটা ছাড় দিয়ে বাস্তববাদীও হতে পারে সেটার প্রমাণ মিলেছে আবারও। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির নেতৃত্বও যথারীতি বাস্তববাদীই থেকেছে। তারা নুপুর শর্মার বিরুদ্ধে নেয়া বিজেপির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। কিন্তু এই মুসলিম দেশগুলির কোনটাই ভারতের মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিজেপি সরকারের অত্যাচার নিয়ে কোন কথাই বলেনি। ভারতের মুসলিমদের উপর অত্যাচারের খবরাখবর যাতে দিল্লীর সাথে অর্থনৈতিকভাবে যুক্ত থাকার লক্ষ্যের উপর কোন বিরুপ প্রভাব না ফেলে, সেব্যাপারে মধ্যপ্রাচ্যের নেতৃত্ব সর্বদাই খেয়াল রেখেছে। ঠিক একারণেই এই দেশগুলির পক্ষ থেকে নবী (সাঃ)কে অবমাননার বিষয়ে ভারত সরকারের সমালোচনা অনেকের কাছেই অদ্ভূত ঠেকেছে। এই প্রতিবাদ শুধু সরকার নয়, বরং সকল প্রকারের ধর্মীয় সংস্থার পক্ষ থেকে এমনকি বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকেও এসেছে। এটা বলে দিচ্ছে যে, পুরো মুসলিম বিশ্বের জনগণের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে বলেই এখানে কূটনীতিকদের জড়িত হতে হয়েছে; যা এর আগে দেখা যায়নি। অর্থাৎ মুসলিম বিশ্বের জনগণের এই প্রতিক্রিয়া মুসলিম দেশগুলির সেকুলার নেতৃত্বের বাস্তবাদী থাকার নীতিকে চ্যালেঞ্জ করেছে বলেই বিজেপিকে ছাড় দিতে হয়েছে। যদিও বিজেপি সরকার তার মুসলিম বিদ্বেষী নীতি বাস্তবায়নে মুসলিম দেশগুলির নেতৃত্বের ‘রেড লাইন’ কোথায়, তা বুঝতে পেরেছে; তথাপি মুসলিম বিশ্বের জনগণের ‘রেড লাইন’ তাদের কাছে পরিষ্কার না হওয়াটাই স্বাভাবিক। এটা এড়িয়ে যাবার উপায় নেই যে, উগ্র হিন্দুবাদী ভারত তৈরির আকাংক্ষা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সুস্থ্য মস্তিষ্কের চিন্তা বেশিরভাগক্ষেত্রেই অবহেলিত হবে; যার ফলশ্রুতিতে আবারও হয়তো মুসলিম বিশ্বের সেকুলার নেতৃত্ব তাদের জনগণের কাছ থেকে চাপ অনুভব করবে। প্রতি ক্ষেত্রেই মুসলিম বিশ্বের জনগণের মাঝে নেতৃত্বের হাহাকার জেঁকে বসবে; যা কিনা ভূরাজনৈতিকভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ।
Showing posts with label GCC. Show all posts
Showing posts with label GCC. Show all posts
Sunday, 12 June 2022
ভারতে নবী (সাঃ)কে অবমাননার ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব কতটুকু?
Labels:
BJP,
Egypt,
GCC,
Hindu Extremism,
Ideological Crisis,
India,
Islam,
Kuwait,
Middle East,
Muslim,
New World Order,
OIC,
Oman,
Qatar,
Saudi Arabia,
UAE
Saturday, 9 January 2021
সৌদি আরব এবং কাতারের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব
০৯ই জানুয়ারি ২০২১
গত ৭ই জানুয়ারি রাতে কাতারের রাজধানী দোহা থেকে ‘কাতার এয়ারওয়েজ’এর একটা ফ্লাইট সৌদি ভূখন্ডের উপর দিয়ে উড়ে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহান্সবার্গের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। ‘আল আরাবিয়া টিভি’ বলছে যে, সৌদি আরবের সাথে কাতারের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের সাথে সাথে ২০১৭এর পর প্রথমবারের মতো কাতারের বিমান সৌদি আকাশসীমা ব্যবহার করে। এর আগে ৫ই জানুয়ারি সৌদি আরবের আল উলা শহরে ‘গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল’ বা ‘জিসিসি’র ৪১তম শীর্ষ বৈঠকে আরব দেশগুলি সর্বসম্মতিক্রমে কাতারের উপর থেকে সকল নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান সাংবাদিকদের বলেন যে, সকলে মিলে নিজেদের মাঝে দ্বন্দ্ব ভুলে যাবার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়েছে। ২০১৭ সালে সন্ত্রাসবাদে ইন্ধন দেবার অভিযোগে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন এবং মিশর কাতারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং দেশটার উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবার জন্যে কাতারের কাছে সৌদি গ্রুপের মোট ১৩টা দাবি ছিল; যার মাঝে ছিল ‘আল জাজিরা’ টেলিভিশন বন্ধ করে দেয়া, কাতারে তুরস্কের সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করা, ইরানের সাথে কাতারের সম্পর্ককে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করা, এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে কাতারের সকল সম্পর্ক কর্তন। তবে সাড়ে তিন বছর পর দুই পক্ষের মাঝে মিলমিশ হয়ে যাবার কারণ কি? ব্রিটেনের ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা বলছে যে, উভয় পক্ষই এই দ্বন্দ্বকে চালিয়ে নেবার শক্তি হারিয়ে ফেলায় শান্তির পথ বেছে নিয়েছে। ‘বিবিসি’ বলছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে কুয়েত এবং যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এই সমস্যা সমাধানে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছে।
‘জিসিসি’ বৈঠকে সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান বা ‘এমবিএস’এর কথাগুলি কাতারের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের কারণ সম্পর্কে কিছুটা ইঙ্গিত দেয়। বিন সালমান তার বক্তব্যে বলেন যে, এই অঞ্চলের দেশগুলির একত্রিত হবার জন্যে একটা বিরাট চাহিদা তৈরি হয়েছে; যার উদ্দেশ্য হবে বর্তমানের চ্যালেঞ্জগুলি মোকাবিলা করা, বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের প্রকল্পের হুমকি এবং স্যাবোটাজ ও ধ্বংসের পরিকল্পনা। ‘বিবিসি’ তাদের বিশ্লেষণে বলছে যে, ২০১৭ সালে মার্কিন সরকার সৌদিদের পক্ষাবলম্বন করে এবং কাতারকে ‘সন্ত্রাসের অর্থায়নকারী’ হিসেবে আখ্যা দেয়; যদিও মধ্যপ্রাচ্যের মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের সবচাইতে বড় সামরিক ঘাঁটি হলো কাতারের আল উদাইদ। ২০১৮ সাল থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উপদেষ্টাদের প্রচেষ্টায় সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় কাতারের ভালো ভূমিকার কথা বলা হতে থাকে। ইরানকে নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের শক্ত নীতির অংশ হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসন যখন উভয় পক্ষের উপর চাপ দিতে থাকে, তখনই আলোচনায় গতি আসে। ট্রাম্পের জেষ্ঠ্য উপদেষ্টা ও জামাতা জ্যারেড কুশনার ডিসেম্বরে সৌদি আরব এবং কাতার সফর করেন। আল উলার বৈঠকেও তিনি ছিলেন বলে খবর পাওয়া যায়।
‘রয়টার্স’ বলছে যে, ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি তেলের খনিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর থেকে সৌদিরা কাতারের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের দিকে মনোযোগী হয়। সৌদি এবং মার্কিনীরা হামলার জন্যে ইরানকে দায়ি করেছিল। সেবছরের অক্টোবরে সৌদি আরব সফরের পর ডিসেম্বরে কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুররহিম আল থানি ‘সিএনএন’কে বলেন যে, সৌদিদের সাথে আলোচনার পর অন্ততঃ বন্ধ হয়ে যাওয়া কথাবার্তার ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। তবে কাতার মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে সরাসরি সম্পর্ক রাখার কথা অস্বীকার করে এবং কাতারে তুর্কি ঘাঁটি বন্ধ করার ব্যাপারে অপারগতা জানায়। কাতারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন যে, কাতারের খারাপ সময়ে যেসব দেশ সহায়তা দিয়েছে, তাদেরকে কাতার পিঠ দেখাবে না। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, সেই আলোচনাতেই সৌদিরা ‘আল জাজিরা’ বন্ধ করা এবং তুরস্কের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার ব্যাপারে নমনীয়তা দেখিয়েছিল। আর এই আলোচনার পিছনে যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচ্ছন্ন প্রভাব ছিল, তা জানা যায় হোয়াইট হাউজের বিবৃতি থেকে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানিকে ফোনে বলেন যে, দুই দেশের মাঝে আলোচনা চলমান থাকলে তা উপসাগরীয় অঞ্চলের সমস্যা নিরসণে ভূমিকা রাখবে।
‘বিবিসি’ বলছে যে, কাতার হয়তো অত সহজে সৌদি গ্রুপের অবরোধের কথা ভুলে যাবে না। অপরদিকে আরব আমিরাত এখনও কাতারকে পুরোপুরি বিশ্বাস করে না; বিশেষ করে ফিলিস্তিন এবং লিবিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে কাতারের সম্পর্ককে আমিরাত তার রাজতান্ত্রিক নেতৃত্বের প্রতি হুমকি হিসেবে দেখে। নিষেধাজ্ঞার সময়টাতে ২৭ লক্ষ জনগণের জরুরি প্রয়োজন মেটাতে তুরস্ক ও ইরানের সাথে কাতার অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করে। ‘জিসিসি’র দু’টা সদস্য দেশ কাতারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেনি, যারা হলো কুয়েত এবং ওমান। এর মাঝে কুয়েতই আলোচনার মধ্যস্ততাকারী ছিল।
বিশ্বব্যাপী প্রভাব হারালেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির উপর মার্কিন প্রভাব যে এখনও যথেষ্ট, তা কাতারের ইস্যু থেকে পরিষ্কার হয়। ট্রাম্প প্রশাসনের সমর্থনপুষ্ট হয়েই সৌদিরা কাতারের উপর অবরোধ দিয়েছিল; আবার সেই একই প্রশাসন হোয়াইট হাউজ ছাড়ার আগে আলোচনার পিছনে চাপ দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে সৌদিদের ভালো সম্পর্ক থাকলেও আসন্ন ডেমোক্র্যাট প্রশাসনের আদর্শিক নীতির সাথে সৌদি সরকারের সম্ভাব্য বিরোধ আলোচনায় আসছে নিয়মিত। বিশেষ করে ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের নীতি কি হবে, তা নিয়ে সৌদিরা চিন্তিত। মার্কিন ভূরাজনৈতিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘স্ট্রাটফর’ বলছে যে, কাতারের সাথে সৌদি গ্রুপের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পিছনে মূল উদ্দেশ্য হলো বাইডেন প্রশাসনের ভালো নজরে আসা। তবে সৌদিদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বহু বিষয়ে যথেষ্ট মতবিরোধ রয়েছে, যেগুলি থেকে সৌদিদের পক্ষে বেরিয়া আসা কঠিন। কাতারের উপর সৌদি অবরোধ পারস্য উপসাগরে তুরস্কের সামরিক উপস্থিতির সুযোগ করে দেয়া ছাড়াও কাতারকে নতুন একটা সামরিক বাহিনী তৈরির অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে; যা গড়ে তুলতে তুরস্কের ভূমিকাই সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদিরা তুরস্কের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করছে; তুরস্কও সৌদি গ্রুপের পথ অনুসরণ করে ইস্রাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করছে। পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় নিজস্ব জাতীয় অবস্থানকে টিকিয়ে রাখতে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন জোটের সৃষ্টি হচ্ছে, যেগুলির স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও স্বল্প মেয়াদে এগুলি আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিকে প্রভাবিত করবে।
গত ৭ই জানুয়ারি রাতে কাতারের রাজধানী দোহা থেকে ‘কাতার এয়ারওয়েজ’এর একটা ফ্লাইট সৌদি ভূখন্ডের উপর দিয়ে উড়ে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহান্সবার্গের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। ‘আল আরাবিয়া টিভি’ বলছে যে, সৌদি আরবের সাথে কাতারের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের সাথে সাথে ২০১৭এর পর প্রথমবারের মতো কাতারের বিমান সৌদি আকাশসীমা ব্যবহার করে। এর আগে ৫ই জানুয়ারি সৌদি আরবের আল উলা শহরে ‘গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল’ বা ‘জিসিসি’র ৪১তম শীর্ষ বৈঠকে আরব দেশগুলি সর্বসম্মতিক্রমে কাতারের উপর থেকে সকল নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান সাংবাদিকদের বলেন যে, সকলে মিলে নিজেদের মাঝে দ্বন্দ্ব ভুলে যাবার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়েছে। ২০১৭ সালে সন্ত্রাসবাদে ইন্ধন দেবার অভিযোগে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন এবং মিশর কাতারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং দেশটার উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবার জন্যে কাতারের কাছে সৌদি গ্রুপের মোট ১৩টা দাবি ছিল; যার মাঝে ছিল ‘আল জাজিরা’ টেলিভিশন বন্ধ করে দেয়া, কাতারে তুরস্কের সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করা, ইরানের সাথে কাতারের সম্পর্ককে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করা, এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে কাতারের সকল সম্পর্ক কর্তন। তবে সাড়ে তিন বছর পর দুই পক্ষের মাঝে মিলমিশ হয়ে যাবার কারণ কি? ব্রিটেনের ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা বলছে যে, উভয় পক্ষই এই দ্বন্দ্বকে চালিয়ে নেবার শক্তি হারিয়ে ফেলায় শান্তির পথ বেছে নিয়েছে। ‘বিবিসি’ বলছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে কুয়েত এবং যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এই সমস্যা সমাধানে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছে।
‘জিসিসি’ বৈঠকে সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান বা ‘এমবিএস’এর কথাগুলি কাতারের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের কারণ সম্পর্কে কিছুটা ইঙ্গিত দেয়। বিন সালমান তার বক্তব্যে বলেন যে, এই অঞ্চলের দেশগুলির একত্রিত হবার জন্যে একটা বিরাট চাহিদা তৈরি হয়েছে; যার উদ্দেশ্য হবে বর্তমানের চ্যালেঞ্জগুলি মোকাবিলা করা, বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের প্রকল্পের হুমকি এবং স্যাবোটাজ ও ধ্বংসের পরিকল্পনা। ‘বিবিসি’ তাদের বিশ্লেষণে বলছে যে, ২০১৭ সালে মার্কিন সরকার সৌদিদের পক্ষাবলম্বন করে এবং কাতারকে ‘সন্ত্রাসের অর্থায়নকারী’ হিসেবে আখ্যা দেয়; যদিও মধ্যপ্রাচ্যের মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের সবচাইতে বড় সামরিক ঘাঁটি হলো কাতারের আল উদাইদ। ২০১৮ সাল থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উপদেষ্টাদের প্রচেষ্টায় সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় কাতারের ভালো ভূমিকার কথা বলা হতে থাকে। ইরানকে নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের শক্ত নীতির অংশ হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসন যখন উভয় পক্ষের উপর চাপ দিতে থাকে, তখনই আলোচনায় গতি আসে। ট্রাম্পের জেষ্ঠ্য উপদেষ্টা ও জামাতা জ্যারেড কুশনার ডিসেম্বরে সৌদি আরব এবং কাতার সফর করেন। আল উলার বৈঠকেও তিনি ছিলেন বলে খবর পাওয়া যায়।
‘রয়টার্স’ বলছে যে, ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি তেলের খনিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর থেকে সৌদিরা কাতারের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের দিকে মনোযোগী হয়। সৌদি এবং মার্কিনীরা হামলার জন্যে ইরানকে দায়ি করেছিল। সেবছরের অক্টোবরে সৌদি আরব সফরের পর ডিসেম্বরে কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুররহিম আল থানি ‘সিএনএন’কে বলেন যে, সৌদিদের সাথে আলোচনার পর অন্ততঃ বন্ধ হয়ে যাওয়া কথাবার্তার ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। তবে কাতার মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে সরাসরি সম্পর্ক রাখার কথা অস্বীকার করে এবং কাতারে তুর্কি ঘাঁটি বন্ধ করার ব্যাপারে অপারগতা জানায়। কাতারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন যে, কাতারের খারাপ সময়ে যেসব দেশ সহায়তা দিয়েছে, তাদেরকে কাতার পিঠ দেখাবে না। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, সেই আলোচনাতেই সৌদিরা ‘আল জাজিরা’ বন্ধ করা এবং তুরস্কের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার ব্যাপারে নমনীয়তা দেখিয়েছিল। আর এই আলোচনার পিছনে যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচ্ছন্ন প্রভাব ছিল, তা জানা যায় হোয়াইট হাউজের বিবৃতি থেকে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানিকে ফোনে বলেন যে, দুই দেশের মাঝে আলোচনা চলমান থাকলে তা উপসাগরীয় অঞ্চলের সমস্যা নিরসণে ভূমিকা রাখবে।
‘বিবিসি’ বলছে যে, কাতার হয়তো অত সহজে সৌদি গ্রুপের অবরোধের কথা ভুলে যাবে না। অপরদিকে আরব আমিরাত এখনও কাতারকে পুরোপুরি বিশ্বাস করে না; বিশেষ করে ফিলিস্তিন এবং লিবিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে কাতারের সম্পর্ককে আমিরাত তার রাজতান্ত্রিক নেতৃত্বের প্রতি হুমকি হিসেবে দেখে। নিষেধাজ্ঞার সময়টাতে ২৭ লক্ষ জনগণের জরুরি প্রয়োজন মেটাতে তুরস্ক ও ইরানের সাথে কাতার অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করে। ‘জিসিসি’র দু’টা সদস্য দেশ কাতারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেনি, যারা হলো কুয়েত এবং ওমান। এর মাঝে কুয়েতই আলোচনার মধ্যস্ততাকারী ছিল।
বিশ্বব্যাপী প্রভাব হারালেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির উপর মার্কিন প্রভাব যে এখনও যথেষ্ট, তা কাতারের ইস্যু থেকে পরিষ্কার হয়। ট্রাম্প প্রশাসনের সমর্থনপুষ্ট হয়েই সৌদিরা কাতারের উপর অবরোধ দিয়েছিল; আবার সেই একই প্রশাসন হোয়াইট হাউজ ছাড়ার আগে আলোচনার পিছনে চাপ দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে সৌদিদের ভালো সম্পর্ক থাকলেও আসন্ন ডেমোক্র্যাট প্রশাসনের আদর্শিক নীতির সাথে সৌদি সরকারের সম্ভাব্য বিরোধ আলোচনায় আসছে নিয়মিত। বিশেষ করে ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের নীতি কি হবে, তা নিয়ে সৌদিরা চিন্তিত। মার্কিন ভূরাজনৈতিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘স্ট্রাটফর’ বলছে যে, কাতারের সাথে সৌদি গ্রুপের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পিছনে মূল উদ্দেশ্য হলো বাইডেন প্রশাসনের ভালো নজরে আসা। তবে সৌদিদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বহু বিষয়ে যথেষ্ট মতবিরোধ রয়েছে, যেগুলি থেকে সৌদিদের পক্ষে বেরিয়া আসা কঠিন। কাতারের উপর সৌদি অবরোধ পারস্য উপসাগরে তুরস্কের সামরিক উপস্থিতির সুযোগ করে দেয়া ছাড়াও কাতারকে নতুন একটা সামরিক বাহিনী তৈরির অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে; যা গড়ে তুলতে তুরস্কের ভূমিকাই সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদিরা তুরস্কের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করছে; তুরস্কও সৌদি গ্রুপের পথ অনুসরণ করে ইস্রাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করছে। পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় নিজস্ব জাতীয় অবস্থানকে টিকিয়ে রাখতে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন জোটের সৃষ্টি হচ্ছে, যেগুলির স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও স্বল্প মেয়াদে এগুলি আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিকে প্রভাবিত করবে।
Labels:
GCC,
Geopolitics,
Iran,
New World Order,
Persian Gulf,
Qatar,
Saudi Arabia,
Turkey,
UAE,
USA
Subscribe to:
Posts (Atom)



