Tuesday, 22 December 2020

‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’... নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার শুরু?

২২শে ডিসেম্বর ২০২০

‘ফেইস রেকগনিশন’ প্রোগ্রামের মাধ্যমে চীনে ‘সোশাল রেটিং’ বা ‘সোশাল ক্রেডিট’এর যে ব্যবহার শুরু হয়েছে, তা চীনাদেরকে ‘এআই’ ডেভেলপমেন্টে অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে গেছে। কিন্তু বৃহত্তর জনগোষ্ঠির দৈনন্দিন জীবনের উপর নিয়ন্ত্রণমূলক কর্মকান্ডে প্রযুক্তির ব্যবহার একটা নৈতিক প্রশ্নের অবতারণা করেছে, যা বিশ্বকে বিভাজিত করছে।


মার্কিন বিমান বাহিনী বলছে যে, গত ১৫ই ডিসেম্বর তারা প্রথমবারের মতো একটা সামরিক বিমানের কোপাইলট হিসেবে ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ বা ‘এআই’, অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ব্যবহার করেছে। বিমান বাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ডিজিটাল যুগে তাদের জাতীয় প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে একটা বড় ধাপ এগিয়েছে। মার্কিনীরা মনে করছে যে, ‘এআই’এর ব্যাপারে দক্ষতা অর্জন ভবিষ্যতে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলির সাথে এগিয়ে থাকার ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিমান বাহিনীর ‘এয়ার কমব্যাট কমান্ড ইউ ২ ফেডেরাল ল্যাবরেটরি’র গবেষকেরা ‘আরটাম’ নামের এই এলগোরিদম ডেভেলপ করে। মার্কিন বিমান বাহিনীর বরাত দিয়ে ‘সিএনএন’ বলছে যে, একটা মহড়ার মাঝে বিমান বাহিনীর ‘ইউ ২’ কৌশলগত গোয়েন্দা বিমানে এই পরীক্ষা সফলভাবে চালনা করা হয়, যেখানে ‘এআই’ একজন মানুষের জন্যে বরাদ্দকৃত কাজগুলি সম্পাদন করে। বিমান চালনার কর্মকান্ডের মাঝে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের সেন্সরগুলি পরিচালনা এবং ট্যাকটিক্যাল ন্যাভিগেশন বা দিকনির্দেশনার কাজগুলি ‘আরটাম’ সম্পাদন করে। অপরপক্ষে বিমানের মূল পাইলট খেয়াল রাখছিলেন যে কোন শত্রু বিমান এসে পড়ে কিনা। বিমান বাহিনীর ক্রয় পরিদপ্তরের সহকারি সচিব উইল রোপার এক বার্তায় বলেন যে, ‘এআই’এর সক্ষমতাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে ব্যর্থতা মানেই হলো প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে হার স্বীকার করে নেয়া।

‘এআই’এর সাথে পশ্চিমা স্বাধীনচেতাদের দ্বন্দ্ব

‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’এর বহু খাত প্রতিদিনই খুলছে, যা মাত্র কিছুদিন আগেই ছিলই না। বিশেষ করে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের পর থেকে ‘এআই’এর ব্যবহার ব্যাপক বেড়ে গেছে। সিয়াটলের সফটওয়্যার কোম্পানি ‘রিয়েল নেটওয়ার্কস’ একটা ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যা বিভিন্ন বাণিজ্যিক এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানে মাস্ক পড়ার বাধ্যবাধকতা মনে করিয়ে দেবে। ‘মাস্ক চেক’ নামের ‘এআই’ ভিত্তিক এই ব্যবস্থা প্রথমে একটা ট্যাবলেটের ক্যামেরা ব্যবহার করে নিশ্চিত করে যে, এর পাশ দিয়ে চলে যাওয়া মানুষটা মাস্ক পড়েছে কিনা অথবা সঠিকভাবে সেটা মুখের উপর লাগিয়েছে কিনা; যেমন, মাস্ক দিয়ে মুখ ঢাকলেও নাক বের হয়ে আছে কিনা। এরপর দরকার অনুযায়ী এই ব্যবস্থাটা সতর্কবার্তা দেবে এবং সঠিকভাবে মাস্ক পড়ার নিয়ম দেখিয়ে দেবে। ‘লস এঞ্জেলেস টাইমস’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে ‘রিয়েল নেটওয়ার্কস’এর চিফ টেকনলজি অফিসার রেজা রাসুল বলছেন যে, এই ‘এআই’ প্রকৃতপক্ষে মানুষের চেহারা বিশ্লেষণ করে পরিচয় খুঁজে না বা কোনকিছু রেকর্ড করে না। তবে এর ব্যবহারকারী চাইলে ব্যক্তির ছবি তুলে তা আরও কিছু সেবা দিতে সক্ষম। যেমন মানুষের বয়স এবং লিঙ্গ বোঝার মাধ্যমে তা তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম, যার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা সম্ভব যে, কো ধরণের মানুষের মাঝে মাস্ক পড়ার প্রচলন কেমন। তবে ‘লস এঞ্জেলেস টাইমস’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, এখানেই আসল আলোচনার বিষয়টা চলে আসছে। এই ব্যবস্থায় যত বেশি তথ্য রেকর্ড করার ব্যবস্থা করা হবে, ততটাই তা একটা পুলিশ রাষ্ট্রের কথা মনে করিয়ে দেবে। এছাড়াও ‘মাস্ক চেক’ ব্যবস্থার মাঝে না থাকলেও কেউ কেউ ইতোমধ্যেই চিন্তা করছেন যে, এর মাঝে একটা অপশন থাকতে পারে, যার মাধ্যমে মুখে মাস্ক না থাকলে ‘এআই’ ইলেকট্রনিক ব্যবস্থায় দরজা আটকে দিয়ে প্রতিষ্ঠানে ঢোকার পথে বাধা প্রদান করবে। সেকুলার আদর্শের পশ্চিমা স্বাধীনচেতা সমাজে অনেকেই চান না যে, সরকার বা কোন প্রতিষ্ঠান তাদেরকে বাধ্য করুক মাস্ক পড়তে। চীনে 'ফেইস রেকগনিশন' প্রোগ্রামের মাধ্যমে ইতোমধ্যেই মানুষের ব্যক্তিগত কর্মকান্ডের উপর নজরদারি করার কথা আলোচনায় এসেছে। আপাততঃ পশ্চিমা সেকুলার আদর্শের সাথে খুব সামান্য ব্যবধান রেখে চলছে ‘এআই’। তবে পশ্চিমা সমাজের অধঃগামিতা অনেক ক্ষেত্রেই বিভিন্ন দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করছে, যা ‘এআই’এর ক্ষেত্রকে আরও বাড়াচ্ছে। নিরাপত্তার কথা বলে পশ্চিমা বিশ্বেও অনেকেই চীনাদের মতো না হলেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে ‘ফেইস রেকগনিশন’ প্রোগ্রামের ব্যবহার করতে ইচ্ছাপোষণ করছেন।
ডিসেম্বর ২০২০। মনুষ্যবিহীন ‘এআই’ চালিত ড্রোন ‘ভ্যালকাইরি’র সাথে ফর্ম্যাশন ফ্লাইটে মার্কিন বিমান বাহিনীর মনুষ্য চালিত ‘এফ৩৫’ এবং ‘এফ২২’ যুদ্ধবিমান। ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’এর সবচাইতে জটিল কাজগুলি হচ্ছে প্রতিরক্ষা শিল্পে। ‘এআই’ বর্তমানে ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতার মাঝে একটা নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার জন্ম দিয়েছে।



‘এআই’এর আসল ক্ষেত্র হলো প্রতিরক্ষা

‘জাপান টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক সেক্টর প্রতি বছর ‘এআই’এর পিছনে প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। তবে ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’এর সবচাইতে জটিল কাজগুলি হচ্ছে প্রতিরক্ষা শিল্পে। ‘বিজনেস ওয়্যার’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ডিফেন্স প্ল্যাটফর্ম’ বা ‘এআইডিপি’ নামের একটা কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা এন্ডি খাজা ‘বিজনেস ভিউ’ ম্যাগাজিনের ২০২০ সালের সেরা উদ্যোক্তা হয়েছেন। ‘এআইডিপি’র কর্মকান্ডের পরিধি হলো প্রতিরক্ষা, স্বাস্থ্য এবং পরিবেশ। কোম্পানিটা তাদের কাজকে কেন্দ্রীভূত করেছে ‘ইসাবেলা’ নামের একটা ‘এআই’ ডেভেলপ করার পিছনে। কোম্পানির ওয়েবসাইটে বলা হচ্ছে যে, ‘ইসাবেলা’ ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত থেকে ওপেন সোর্স তথ্য পড়ছে এবং জমিয়ে রাখছে। এর মাধ্যমে প্রোগ্রামটা বিভিন্ন ভাষার তথ্য থেকে শিখবে। এই প্রোগ্রামটার তথ্য সংরক্ষণের কোন সীমা নেই। অন্যান্য প্রযুক্তি এবং যন্ত্র ‘ইসাবেলা’র সাথে যুক্ত হয়ে এর প্রসেসিং ক্ষমতাকে ব্যবহার করতে পারবে। ২০২৫ সালে ‘ইসাবেলা’কে তারা সবার সন্মুখে উন্মোচন করবে বলে বলছেন এন্ডি খাজা।

যুক্তরাষ্ট্র সরকার ‘এআই’এর পিছনে ব্যাপক বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছে। ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর ২০১১ সালে যেখানে ‘এআই’, ‘বিগ ডাটা’ এবং ‘ক্লাউড কম্পিউটিং’এর পিছনে ৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছিল, তা ২০১৬ সালে গিয়ে দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে। ২০১৭ সালের এপ্রিলে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিবের একটা মেমোর মাধ্যমে ‘প্রজেক্ট ম্যাভেন’ নামের একটা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্ট ‘গুগল’এর ডেভেলপ করা ‘এলগোরিদমিক ওয়ারফেয়ার’ নামে পরিচিত এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক ড্রোনগুলির পাঠানো ভিডিও চিত্র থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি এবং বস্তুর পরিচয় বের করার ব্যবস্থা করা হয়। এতে কোন মানুষের সরাসরি সংযুক্তি ছাড়াই মাঠ পর্যায়ের ইন্টেলিজেন্স পাচ্ছে সামরিক বাহিনী। মার্কিন বিমান বাহিনী গত ৯ই ডিসেম্বর সফলভাবে মনুষ্যবিহীন স্টেলথ ড্রোন ‘এক্সকিউ ৫৮এ ভ্যালকাইরি’র ‘এআই’ চালিত ফ্লাইটের পরীক্ষা চালিয়েছে। পরীক্ষায় মানুষ চালিত ‘এফ২২’ এবং ‘এফ৩৫’ যুদ্ধবিমানের সাথে সমন্বয় করে ‘ভ্যালকাইরি’ ড্রোনটা ফর্ম্যাশন ফ্লাইট চালনা করে। মার্কিন নৌবাহিনীও ‘এআই’এর ব্যবহারে বেশ এগিয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বী সাবমেরিনের পিছু নেবার জন্যে ‘সী হান্টার’ নামের একটা মনুষ্যবিহীন যুদ্ধজাহাজ তারা তৈরি করে ২০১৬ সালে। ৪০ মিটার লম্বা এবং মাত্র ১’শ ৪৫ টন ওজনের এই জাহাজ টানা ৭০ দিন সমুদ্রে টহল দিতে পারে এবং একবার জ্বালানি নিয়ে প্রায় ১০ হাজার নটিক্যাল মাইল চলতে সক্ষম। মানুষ না থাকার ফলে জাহাজটা সমুদ্রে দিনের পর দিন টহল দেবার ধকল খুব সহজেই সামলে নেবে। জাহাজ পরিচালনার কাজগুলি ‘এআই’ করবে। তবে একজন মানুষ খেয়াল রাখবে এবং শুধু সিদ্ধান্ত দেবার ব্যাপারটা দেখবে। নেভাল ইন্টেলিজেন্স বিশ্লেষক এইচ আই সাটন গত সেপ্টেম্বরে ‘ইউএস নেভাল ইন্সটিটিউট’এর এক লেখায় চীনা সোশাল মিডিয়া ‘উইয়েবো’তে পোস্ট করা একটা ছবির বরাত দিয়ে বলেন যে, মার্কিন ‘সী হান্টার’ প্রকল্পের কপি হিসেবে চীনারাও একটা মনুষ্যবিহীন যুদ্ধজাহাজ তৈরি করেছে।

ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘হাডসন ইন্সটিটিউট’এর আয়োজিত এক অনলাইন আলোচনায় বলা হয় যে, ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ বর্তমানে ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতার মাঝে একটা নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার জন্ম দিয়েছে। আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাবার জন্যে মার্কিন স্পেশাল অপারেশনস কমান্ডএর কমান্ডার জেনারেল রিচার্ড ক্লার্ক সেনাদের মাঝে ডাটা সাইন্টিস্ট, কোডার এবং মিড লেভেল ম্যানেজার ডেভেলপ করার কথা বলেন। তিনি বলেন যে, ‘এআই’তে বিনিয়োগ করা ছাড়া তাদের সামনে আর কোন পথই খোলা নেই। তবে কেউ কেউ বলছেন যে, ‘এআই’ ডেভেলপ করতে যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে পড়ছে। গত বছর ‘ইউএস নেভাল ইন্সটিটিউট’এর এক আলোচনায় মার্কিন নৌবাহিনীর প্রাক্তন স্পেশাল ফোর্সের কমান্ডার রিয়ার এডমিরাল ব্রায়ান লুজি বলেন যে, নিজেদের ক্রয় পরিদপ্তরের জটিলতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার তুলনায় ‘এআই’ ডেভেলপ করার ব্যাপারে পিছিয়ে আছে।

‘বস্টন কলেজ’এর প্রফেসর থমাস ড্যাভেনপোর্ট ‘মার্কেট ওয়াচ’এর এক লেখায় বলছেন যে, চীন যখন নিজেদের ‘এআই’ কৌশলকে বাস্তবায়নে নেমেছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশলের ব্যাপারেই এখনও নিশ্চিত নয়। চীনারা সাম্প্রতিক সময়ে ‘এআই’এর পিছনে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আশা করছে। প্রতিরক্ষা এবং ইন্টেলিজেন্সসহ জনগণের উপর সামাজিক এবং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও চীনারা ‘এআই’ ব্যবহারে পিছপা হচ্ছে না। ‘ফেইস রেকগনিশন’ ব্যবহার করে রাস্তায় নিয়ম ভঙ্গকারীকে পাকরাও করা এবং মানুষের দৈনন্দিন কর্মকান্ডের তথ্য বিশ্লেষণ করে সেই তথ্যের উপর ভিত্তি করে তাকে ‘সোশাল ক্রেডিট’ বা ‘সোশাল রেটিং’ করার ব্যাপারে চীনারা বহুদূর এগিয়ে গিয়েছে। অপরদিকে ‘এআই’এর পিছনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর ছাড়া বাকি গবেষণাগুলি হচ্ছে মূলতঃ বেসরকারি কর্পোরেট সেক্টরে। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কর্পোরেট সেক্টর গবেষনার পিছনে ৫৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে, যার অনেকটাই গিয়েছে ‘এআই’ খাতে। তবে এই গবেষণার একটা বড় অংশ গিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে; বিশেষতঃ চীনে। ব্যক্তির কর্মকান্ডের সাথে মিল রেখে বিজ্ঞাপন দেয়া, সার্চ ইঞ্জিনের ফলাফল উন্নত করা, মানুষের চেহারা খুঁজে বের করা এবং তাদের লেবেলিং করা ইত্যাদি ক্ষেত্রে স্মার্ট পণ্য উৎপাদনের পিছনে এই গবেষণা গিয়েছে। তদুপরি ড্যাভেনপোর্ট মনে করছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এখনও ‘এআই’ প্রযুক্তিতে চীনের থেকে এগিয়ে আছে; তবে চীনারা সরকারিভাবে যেভাবে উঠেপরে লেগেছে, তাতে ভবিষ্যতে এই পরিস্থিতি উল্টে যেতে পারে। 


মার্কিন নৌবাহিনীর ডেভেলপ করা ‘এআই’ চালিত মনুষ্যবিহীন জাহাজ ‘সী হান্টার’কে কপি করেছে চীনারা। ‘এআই’ এখন এমন এক প্রতিযোগিতার জন্ম দিতে চলেছে, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বীরা এগিয়ে থাকার মাঝেই নিজেদের অস্তিত্বকে দেখতে পাচ্ছে। জাতীয় নিরাপত্তার প্রতিযোগিতায় নৈতিকতা হতে চলেছে দ্বিতীয় সাড়ির চিন্তা।



‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় ‘এআই’এর ভবিষ্যৎ কি?

মার্কিন সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ অফিসার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফএর চেয়ারম্যান জেনারেল মার্ক মাইলি কিছুদিন আগেই ‘ব্রুকিংস ইন্সটিটিউট’এ কথা বলতে গিয়ে বলেন যে, বেসামরিক সমাজিক ব্যবহার এবং বাণিজ্যিক কর্মকান্ড ছাড়াও সামরিক ক্ষেত্রে ‘এআই’এর ব্যবহার অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বাড়ছে। আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মাঝে যেসকল সামরিক দ্বন্দ্ব হবার সম্ভাবনা থাকবে, তাতে ‘এআই’ এবং রোবোটিক্সএর অনেক বড় ভূমিকা থাকবে; এমনকি বেশিরভাগ সামরিক বাহিনীতেই হয়তো রোবোটের ব্যাপক ব্যবহার থাকবে। ২০২০এর শুরুতে পেন্টাগনের এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, চীনারা ‘এআই’কে ভবিষ্যতের সামরিক এবং শিল্প শক্তির অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছে। জাতীয় নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে বেইজিং ‘এআই’এর উপর বিশ্বব্যাপী কৌশলগত বিনিয়োগ করছে। প্রতিবেদনে বলা হয় যে, গত পাঁচ বছরে চীন ‘এআই’ ব্যবহার করে মনুষ্যবিহীন জাহাজ তৈরি করেছে, যা ব্যবহার করে দক্ষিণ চীন সাগর তাদের নিয়ন্ত্রণে রেখে চীনারা নিজেদের ভৌগোলিক দাবিগুলিকে সমুন্নত রাখতে চাইছে। এছাড়াও সেনাবাহিনীর জন্যে মনুষ্যবিহীন ট্যাঙ্কও তারা ডেভেলপ করেছে।

সকলেই বুঝতে পারছেন যে, ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ নিয়ে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে বিশ্ব আরও অনিরাপদ হয়ে যাচ্ছে। গত ১৮ই ডিসেম্বর চীনের শিংহুয়া ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত এক ফোরামে চীনের প্রাক্তন উপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফু ইয়িং বলেন যে, ‘এআই’এর ব্যবহারের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের একত্রে বসে কিছু আন্তর্জাতিক নিয়ম তৈরি করতে হবে, যা কিনা ‘এআই’ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক হবে। ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ২০১৯ সালের অক্টোবর থেকে শুরু করে চীনা প্রতিনিধি হিসেবে ফু ইয়িং এবং মার্কিং প্রতিনিধি হিসেবে থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ব্রুকিংস ইন্সটিটিউট’এর প্রেসিডেন্ট জন এলেন ‘এআই’এর সামরিক ব্যবহারের ব্যাপারে তিন দফা আলোচনা করেছেন। তাদের আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল কোন টার্গেটগুলি ‘এআই’ অস্ত্রের বাইরে থাকা উচিৎ, আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে এগুলির ব্যবহারের পরিসীমা, মানুষের দেখাশুনা, ইত্যাদি। উভয় পক্ষ একমত হয়েছে যে, ‘এআই’এর ডেভেলপমেন্টের গতি আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্বগুলিকে আরও অবনতির দিকে ঠেলে দেবে; আর এর মাধ্যমে সাধারণ বেসামরিক জনগণই ক্ষতিগ্রস্ত হবে বেশি। অথচ যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন উভয়েই ‘এআই’কে আরও নতুন ধরনের অস্ত্র হিসেবে ডেভেলপ করছে এবং একে অপরের এই প্রচেষ্টার উপর কড়া নজর রাখছে। ঠান্ডা যুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতার মতো যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মাঝে প্রযুক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিস্থিতি তৈরি হওয়াটা অসম্ভব নয়। বেশিরভাগ ‘এআই’ অস্ত্র এখনও ডেভেলপমেন্টের শুরুর দিকে রয়েছে। সামরিক বাহিনীর মাঝে ছড়িয়ে দেবার আগেই দুই দেশের মাঝে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা হওয়া উচিৎ বলে তারা মন্তব্য করেন। জন এলেন বলছেন যে, নিরাপত্তার ব্যাপারটা যদি চিন্তার শীর্ষে চলে যায়, তাহলে প্রযুক্তিগত দিক থেকে এগিয়ে থাকার লক্ষ্য ভবিষ্যতে বিপদ এড়ানোর পথকে বাধাগ্রস্ত করবে।
 

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এক ভাষণে বলেন যে, ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধ হবে ড্রোনের মাঝে। এক রাষ্ট্রের ড্রোন যখন অপর রাষ্ট্রের ড্রোনগুলিকে ধ্বংস করে ফেলবে, তখন যুদ্ধ বন্ধ করে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া কোন গতি থাকবে না। মানুষের দুর্বলতাগুলিকে অতিক্রম করে ‘এআই’ চালিত রোবোটের মাধ্যমে যুদ্ধ চালিয়ে নেবার যে ভবিষ্যৎবাণী প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলি উচ্চারণ করছে, তাতে হত্যা করার সিদ্ধান্ত কি কোন যন্ত্রের হাতে ছেড়ে দেয়া হবে কিনা, তা নিয়ে চলবে নৈতিক এবং আদর্শিক দ্বন্দ্ব।
 

হত্যা করার সিদ্ধান্ত কি যন্ত্রের হাতে ছেড়ে দেয়া উচিৎ?

২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ছাত্রদের উদ্দেশ্যে এক ভাষণে বলেন যে, যে রাষ্ট্র ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’এর ক্ষেত্রে এগিয়ে যাবে, সে রাষ্ট্র দুনিয়া শাসন করবে। ‘এআই’এর ডেভেলপমেন্টের কারণে বিপুল সুযোগ এবং হুমকির ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে, যা কিনা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তিনি আরও বলেন যে, ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধ হবে ড্রোনের মাঝে। এক রাষ্ট্রের ড্রোন যখন অপর রাষ্ট্রের ড্রোনগুলিকে ধ্বংস করে ফেলবে, তখন যুদ্ধ বন্ধ করে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া কোন গতি থাকবে না। পুতিন তার কথাগুলির পুনরাবৃত্তি করেন ডিসেম্বরের শুরুতে ‘এআই জার্নি’ নামের এক অনলাইন কনফারেন্সে। তিনি বলেন যে, ‘এআই’ কোন ফ্যাশন নয় অথবা শুধুমাত্র গর্ব করার জন্যে তৈরির বিষয় নয়, যে তা সময়ের সাথে হারিয়ে যাবে। পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক উদাহরণ রয়েছে, যখন বড় রাষ্ট্র বা কর্পোরেট শক্তি প্রযুক্তির উন্নয়নের সময় ঘুমিয়ে ছিল; পরবর্তীতে রাতারাতি ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে গেছে। তিনি সকলকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, ‘এআই’এর কারণে যেসব জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে, তা মানুষ আগে কখনোই দেখেনি। পুতিনের কথাগুলি ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতার কথা যেমন মনে করিয়ে দেয়, তেমনি নতুন কিছু জটিলতার কথা সামনে আনে, যা এই প্রতিযোগিতা দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। যেমন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে এমন কোন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে কিনা, যা মানুষের মৌলিক কোন চিন্তার সাথে সাংঘর্ষিক?

‘এআই’কে বলা হচ্ছে যুদ্ধের ইতিহাসে তৃতীয় বিপ্লব; এর আগের দু’টা ছিল গানপাউডার বা বারুদ এবং পারমাণবিক প্রযুক্তি। অনেকেই বলছেন যে, ‘এআই’এর ব্যবহারে খুব শিগগিরই যুদ্ধক্ষেত্রে রোবোট সেনা দেখা যাবে। কিন্তু একটা যন্ত্রকে কতটুকু পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে দেয়া যাবে? এই প্রশ্নের উত্তর একেক জন একেকভাবে দিচ্ছেন। মার্কিন প্রযুক্তি ব্যবসায় অভিজ্ঞ উদ্যোক্তা পামার লাকি ’ওয়েব সামিট’এর এক আলোচনায় প্রশ্ন করছেন যে, মানুষের জীবন মৃত্যুর সিদ্ধান্ত কি একটা যন্ত্রের কাছে ছেড়ে দেয়া উচিৎ? একটা যন্ত্রকে তো কোর্ট মার্শাল করা সম্ভব নয়। যন্ত্রকে যুদ্ধাপরাধের কারণে কারাগারে প্রেরণও সম্ভব নয়। লাকি মনে করছেন যে, ‘এআই’ ব্যবহারের মাধ্যমে ডাটা এনালিসিসের যে কাজগুলি একজন মানুষের পক্ষে করা কঠিন, তা করে নেয়া যেতে পারে। কিন্তু কোন মানুষকে হতাহত করার সিদ্ধান্ত মানুষের হাতেই থাকা উচিৎ। তিনি এও মনে করছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষও যাতে সেপথেই হাঁটে, তা নিশ্চিত করার জন্যে তাদের উপরে চাপ সৃষ্টি করা দরকার। তবে পামার লাকির এই চিন্তাগুলি বাস্তবায়ন যে অতটা সহজ নয়, তা এখন নিশ্চিত।

যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করা থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘পলসন ইন্সটিটিউট’এর প্রযুক্তি বিষয়ক উইং ‘মার্কোপোলো’র ফেলো ম্যাট শীহান ‘বিবিসি’র সাথে এক সাক্ষাতে বলছেন যে, সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি কোম্পানিগুলি একসময় বড় কাজগুলি ধরার জন্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্যে কাজ করেছে; এবং একইসাথে বড় বাজার হিসেবে চীনে কাজ করতে গিয়ে চীনা নেতৃত্বের সাথে ভালো সম্পর্ক রেখে চলেছে। এভাবে কোম্পানিগুলি যখন বিপুল সম্পদের মালিক এবং বহু মানুষের কর্মসংস্থানের কেন্দ্র হয়ে যায়, তখন তারা নিজস্ব একটা সিভিল সোসাইটি তৈরি করে ফেলে। এই সোসাইটির চাপের মুখে অনেক সময়েই এই কোম্পানিগুলি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে। মার্কিনীদের সাথে চীনাদের ‘গ্রেট পাওয়ার’ দ্বন্দ্বে নিজেদের ব্যবসা ধরে রাখতে এরা হিমসিম খাচ্ছে। ‘গুগল’ যদিও আফগানিস্তানে ব্যবহৃত ‘প্রজেক্ট ম্যাভেন’ ডেভেলপ করেছিল, তথাপি ২০১৮ সালে ‘গুগল’এর ৩ হাজার কর্মী এর বিরুদ্ধে পিটিশন স্বাক্ষর করার পর কোম্পানি নৈতিকতার কথা বলে প্রকল্প থেকে বের হয়ে যায়। একই বছর ‘গুগল’ মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ ক্লাউড কম্পিউটিং প্রকল্প ‘ জয়েন্ট এন্টারপ্রাইজ ডিফেন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ বা ‘জেডাই’ থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নেয়। ‘গুগল’এর কর্মীরা প্রতিবাদ করার পর তারা ঘোষণা দেয় যে, এই প্রকল্প তাদের কর্পোরেট আদর্শের সাথে যায় না।

প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ভয়ই একসময় পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতার জন্ম দিয়েছিল। এখন ‘এআই’এর ক্ষেত্রেও এই প্রতিযোগিতাই সকল পক্ষকে গতিশীল করছে। বৈশ্বিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব যখন কিছু কোডিং প্রোগ্রামের মাঝে চলে যাচ্ছে, তখন মাল্টিবিলিয়ন ডলারের সামরিক শক্তি দ্বিতীয় সাড়ির শক্তিতে পরিণত হতে চলেছে। মানুষের দুর্বলতাগুলিকে অতিক্রম করে ‘এআই’ চালিত রোবোটের মাধ্যমে যুদ্ধ চালিয়ে নেবার যে ভবিষ্যৎবাণী প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলি উচ্চারণ করছে, তাতে হত্যা করার সিদ্ধান্ত কি কোন যন্ত্রের হাতে ছেড়ে দেয়া হবে কিনা, তা নিয়ে চলবে নৈতিক এবং আদর্শিক দ্বন্দ্ব। কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তার প্রতিযোগিতায় আদর্শিক অবস্থান কতটা শক্তভাবে ধরে রাখা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন করছেন অনেকেই। একারণেই কেউ কেউ চাইছেন, প্রতিযোগিতা ঠান্ডা যুদ্ধে রূপ নেবার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের আলোচনার মাধ্যমে ‘এআই’এর ব্যাপারে আন্তর্জাতিক আইন তৈরি করা। তবে সেখানেও কথা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের তথা পশ্চিমা বিশ্বের আদর্শিক দুর্বলতার সুযোগ না নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলি, বিশেষতঃ চীন এবং রাশিয়া, আলোচনার প্রতি কতটা আগ্রহী হবে? নতুন বিশ্ব ব্যবস্থায় নৈতিকতা যখন দ্বিতীয় সাড়ির চিন্তায় রূপ নিতে যাচ্ছে, তখন মানবজাতি এমন এক মহাবিপদের মাঝে পড়তে যাচ্ছে, যা থেকে বের হবার কোন গ্রহণযোগ্য সমাধান বর্তমান বিশ্বের সেকুলার রাজনৈতিক চিন্তার মাঝে নেই।

Saturday, 19 December 2020

আফ্রিকায় প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় সোশাল মিডিয়াকে যুদ্ধক্ষেত্র বানিয়েছে ফ্রান্স ও রাশিয়া

২০শে ডিসেম্বর ২০২০ 

 ফেইসবুকের এই ব্যবস্থা গ্রহণে রুশ অপারেশন বেশ বাধাগ্রস্ত হয়েছে ঠিকই, তবে একইসাথে সামরিক হস্তক্ষেপের কারণে দুর্বল হওয়া ফ্রান্সের অনৈতিক অবস্থানও জনসন্মুখে এসে গেল। এতে শুধু ফ্রান্সই ইমেজ সংকটে পড়েনি, গণতন্ত্রের ঝান্ডাবাহী পশ্চিমা লিবারাল চিন্তার দেশগুলি আফ্রিকার প্রাক্তন উপনিবেশগুলিকে স্বাধীনভাবে চলতে দেবার বেলায় কতটা লিবারাল, তা আরও একবার প্রকাশ পেল।

গত ১৫ই ডিসেম্বর সোশাল মিডিয়া কোম্পানি ফেইসবুক ঘোষণা দেয় যে, তারা বেশকিছু একাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছে, যেগুলির রুশ এবং ফরাসি সরকারি গোয়েন্দা বিভাগ ও সামরিক বাহিনীর সাথে যোগাযোগ রয়েছে। অভিযোগে বলা হয় যে, এসব একাউন্ট থেকে ভুয়া আইডির মাধ্যমে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কর্মকান্ড পরিচালিত হতো। ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ বলছে যে, প্রথমবারের মতো ফেইসবুক কোন পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশের সামরিক বাহিনীর সাথে যোগাযোগ থাকা কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলো। ফেইসবুক রুশ যে গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে, তারা ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচনে জড়িত ছিল বলে সন্দেহ করা হয়েছিল। ফেইসবুক বলছে যে, মোট ২’শ ৭৪টা একাউন্ট বন্ধ করা হয়েছে; সাথে এদের দ্বারা চালিত বিভিন্ন গ্রুপ এবং পেইজ ছাড়াও ‘ইন্সটাগ্রাম’ একাউন্টও রয়েছে। ‘ইন্সটাগ্রাম’ হলো একটা ছবি শেয়ারিং ওয়েবসাইট, যা ফেইসবুক ২০১২ সালে ১ বিলিয়ন ডলারে কিনে নেয়। এক সংবাদ সন্মেলনে ফেইসবুকের কর্মকর্তারা বলেন যে, এই অপারেশনগুলি সবচাইতে বেশি টার্গেট করেছে পশ্চিম আফ্রিকার মালি এবং সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিককে। এছাড়াও বুরকিনা ফাসো, নিজের, আলজেরিয়া, আইভোরি কোস্ট এবং শাদ কমবেশি আক্রান্ত হয়েছে। নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ গ্রুপ ‘গ্রাফিকা’ বলছে যে, ফেইসবুকের এহেন ব্যবস্থায় প্রথমবারের মতো তৃতীয় কোন রাষ্ট্রে দু’টা প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার চিত্র ফুটে উঠলো। আফ্রিকার দেশগুলিতে প্রভাব বিস্তারের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা শুধু ফেইসবুকই নয়, টুইটার, ইউটিউব এবং বিভিন্ন আর্টিকেলের মাঝেও দেখা যাচ্ছে। ‘গ্রাফিকা’র চিফ ইনোভেশন অফিসার ক্যামিল ফ্রাঁসোয়া বলছেন যে, যখন গণতান্ত্রিক সরকারগুলি মিথ্যা বানোয়াট খবর প্রচারে মনোনিবেশ করে, তখন তাদের জন্যে নিজেদের দেশে অন্য কারুর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টাকে নিন্দা করাটা কঠিন হয়ে যায়।

বন্ধ করা ফরাসি একাউন্টগুলির মাঝে রয়েছে ৮৪টা ফেইসবুক একাউন্ট, ১৪টা ‘ইন্সটাগ্রাম’ একাউন্ট এবং কতগুলি ফেইসবুক গ্রুপ ও পেইজ। এদের প্রায় হাজার পাঁচেক ফলোয়ার ছিল। ফরাসিরা আফ্রিকান মানুষের ভুয়া বেশ ধরে ফরাসি এবং আরবি ভাষায় আফ্রিকায় ফ্রান্সের নীতি, সেখানে নিরাপত্তা পরিস্থিতি, আফ্রিকার নির্বাচনে রুশ হস্তক্ষেপের প্রচেষ্টা, ইত্যাদি বিষয় ছাড়াও আফ্রিকায় প্রাক্তন ফরাসি উপনিবেশগুলিতে ফরাসি সামরিক বাহিনীর কর্মকান্ডের পক্ষে পোস্ট দিচ্ছিল। পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালির জনগণকে টার্গেট করা একটা ফেইসবুক পোস্টে বলা হয় যে, ‘মালির জন্যে রুশ সাম্রাজ্যবাদীরা হলো গ্যাংগ্রিনের মতো! জারিস্ট ব্রেইনওয়াশ থেকে সাবধান থাকুন!’ ফেইসবুক বলছে যে, যদিও এই একাউন্টগুলি নিজেদের পরিচয় এবং সমন্বয় গোপন করতে চাইছিল, তথাপি তাদের তদন্তে পাওয়া গেছে যে, এই ব্যক্তিদের সাথে ফরাসি সামরিক বাহিনীর যোগসাজস রয়েছে। ফেইসবুকের ব্যবস্থা নেবার পরদিন ফরাসি সরকার এই ঘটনায় তাদের নিজেদের জড়িত থাকার ব্যাপারে কোনকিছু না বলে শুধু বলে যে, আফ্রিকায় মিথ্যা বানোয়াট খবর মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বিবৃতিতে বলা হয় যে, ফরাসি সরকার এই প্রতিবেদন খতিয়ে দেখছে। এই মুহুর্তে তারা কাউকে দায়ি করতে পারছেন না; বরং তারা বলছেন যে, যেহেতু অনেকগুলি পক্ষ এখানে জড়িত, তাই কাউকে নির্দিষ্ট করা কঠিন। তাদের পার্টনারদের সাথে ফ্রান্স আফ্রিকায় শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজ করে যাচ্ছে বলে বিবৃতিতে বলা হয়।

অপরপক্ষে রুশদের মূল লক্ষ্য ছিল সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকে ২৭শে ডিসেম্বরের আসন্ন নির্বাচন। একটা রুশ পোস্টে সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ফস্টিন আরশাঞ্জ তুয়াদেরার পক্ষ নিয়ে বলা হয় যে, শান্তির পক্ষে প্রেসিডেন্ট তুয়াদেরা যে প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন, তার কারণে পরবর্তী প্রজন্ম ভালো জীবন পাবে। রুশ নেটওয়ার্কগুলি রাশিয়ার ডেভেলপ করা করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনের পক্ষেও পোস্ট দেয়। বন্ধ করা রুশ একাউন্টগুলির প্রায় ৬০ লক্ষ ফলোয়ার ছিল। রুশরা লিবিয়ার রাজনৈতিক আলোচনাকে টার্গেট করে অপারেশন চালাচ্ছিল। লিবিয়ার এই ফেইসবুক পেইজগুলিতে ১৩ লক্ষ ফলোয়ার ছিল। এছাড়াও পশ্চিম আফ্রিকার গিনি উপকূলের দেশ ইকুয়েটোরিয়াল গিনিতে অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা চলছে বলেও তথ্য ছড়ায় রুশরা। রুশরা অবশ্য সোশাল মিডিয়া ব্যবহার করে অন্য কোন দেশে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করার ব্যাপারটা সরাসরিই অস্বীকার করেছে। রুশ এবং ফরাসি নেটওয়ার্কগুলি একে অপরের পোস্টে কমেন্ট করছিল এবং একে অপরের ফ্রেন্ড লিস্টে ঢোকার চেষ্টা করছিল। তারা একে অপরকে ভুয়া একাউন্ট বলে অভিযোগ করছিল। ফেইসবুক বলছে যে, ২০১৭ সাল থেকে ফেইসবুক ১’শ নিষেধাজ্ঞার ব্যবস্থা নিয়েছে, যার মাঝে মাত্র একটাতে প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ একে অপরের সাথে যোগাযোগ করছিল। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, যখন রাষ্ট্রীয় শক্তিগুলি নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করতে একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে মিথায় বানোয়াট তথ্য দিয়ে সোশাল মিডিয়া ভরিয়ে দেয়, তখন সাধারণ জনগণ এর শিকারে পরিণত হয়।

ফরাসি পত্রিকা ‘লে ওপিনিওন’এর এক লেখায় ফরাসি সাংবাদিক জঁ ডমিনিক মারশে ফরাসি সামরিক বাহিনীর এই ‘সমন্বিত ভুয়া কর্মকান্ড’র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন যে, এধরণের কর্মকান্ড এতদিন রাশিয়ার কাছ থেকে আসতো; এখন ফরাসি সেনাবাহিনী এহেন কর্মকান্ডে জড়িয়েছে। ফরাসি পত্রিকায় সেদেশের সরকারের আফ্রিকা নীতি নিয়ে সমালোচনা করা হলেও এগুলি মূলতঃ ফ্রান্সের দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় নীতিরই ফলাফল। পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলিতে নিয়মিত সামরিক হস্তক্ষেপ করায় এমনিতেই ফরাসিরা ইমেজ সংকটে রয়েছে। তদুপরি ফ্রান্সের সামরিক হস্তক্ষেপের পর থেকে পশ্চিম আফ্রিকার মালি এবং আশেপাশের নিজের, বুরকিনা ফাসো, আইভোরি কোস্টে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার কারণে আফ্রিকায় ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক নীতি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। আফ্রিকায় ফ্রান্সের এই দুর্বল অবস্থানের সুযোগ নিয়ে অন্যান্য প্রভাবশালী রাষ্ট্র নিজেদের অবস্থানকে সুসংহত করতে চাইছে; ফেইসবুকে এই দ্বন্দ্ব সেই ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বেরই বহিঃপ্রকাশ। পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় সোশাল মিডিয়ার গুরুত্ব যে বাড়ছে, তা শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলির সুনির্দিষ্ট অপারেশনই বলে দিচ্ছে। ফেইসবুকের এই ব্যবস্থা গ্রহণে রুশ অপারেশন বেশ বাধাগ্রস্ত হয়েছে ঠিকই, তবে একইসাথে সামরিক হস্তক্ষেপের কারণে দুর্বল হওয়া ফ্রান্সের অনৈতিক অবস্থানও জনসন্মুখে এসে গেল। এতে শুধু ফ্রান্সই ইমেজ সংকটে পড়েনি, গণতন্ত্রের ঝান্ডাবাহী পশ্চিমা লিবারাল চিন্তার দেশগুলি আফ্রিকার প্রাক্তন উপনিবেশগুলিকে স্বাধীনভাবে চলতে দেবার বেলায় কতটা লিবারাল, তা আরও একবার প্রকাশ পেল।

Friday, 18 December 2020

হ্যাকিং যুদ্ধ... প্রকাশ পাচ্ছে নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার চেহারা

১৮ই ডিসেম্বর ২০২০
পাল্টাপাল্টি সাইবার হামলার এই নয়া বিশ্ব ব্যবস্থায় আইনের শাসন একটা কল্পনার বিষয়বস্তু। বিশাল সামরিক বাহিনী এবং সর্বোচ্চ সামরিক বাজেটও ডিজিটাল সম্পদের নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা দিতে সক্ষম নয়। অর্থাৎ শুধুমাত্র অর্থনৈতিক এবং সামরিক শক্তি নয়া বিশ্ব ব্যবস্থায় নেতৃত্ব দেবার জন্যে যথেষ্ট নয়।

গত ১৩ই ডিসেম্বর ‘রয়টার্স’ খবর দেয় যে, মার্কিন সরকারের বেশ কয়েকটা দপ্তর একটা বড় ধরনের সাইবার হ্যাকিংএর শিকার হয়েছে, যার মাঝে রয়েছে মার্কিন রাজস্ব দপ্তর, বাণিজ্য দপ্তরের অধীন ‘ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন এন্ড ইনফরমেশন এডমিনিস্ট্রেশন’ এবং ‘ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি’। এছাড়াও সাইবার নিরাপত্তা কোম্পানি ‘ফায়ার আই’ও আক্রান্ত হয়েছে বলে বলা হয়। ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ বলছে যে, এই হ্যাকিংএর পিছনে রুশ বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘এসভিআর’এর হাত রয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে। ‘এপিটি২৯’ বা ‘কোজি বেয়ার’ নামের একটা হ্যাকার গ্রুপ কাজটা করেছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। বার্তা সংস্থা ‘ব্লুমবার্গ’ বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও ন্যাটো, ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট, ব্রিটিশ ‘ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস’, হোম অফিস, আঞ্চলিক পুলিশ ডিপার্টমেন্ট, করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন ডেভেলপার কোম্পানি ‘এসট্রাজেনেকা’, এমনকি ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা ‘জিসিএইচকিউ’ এই সফটওয়্যারের ব্যবহারকারী। প্রাথমিক হিসেবে বলা হচ্ছে যে, ‘সোলার উইন্ডস’এর ব্যবস্থাপনায় চালিত ‘ওরাইয়ন’ নেটওয়ার্ক ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রায় ১৮ হাজার কম্পিউটার এই হ্যাকিংএর শিকার হয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিষয়ক এই দপ্তরগুলিতে কতটুকু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা নিয়ে কেউ সুনির্দিষ্ট কোন মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। ‘সোলার উইন্ডস’ হলো একটা সফটওয়্যার ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান, যারা মূলতঃ নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনা, আইটি সিস্টেম এবং অবকাঠামো নিয়ে কাজ করে থাকে। ১৯৯৯ সালে শুরু হওয়া এই ব্যবসার হেডকোয়ার্টার্স টেক্সাসের অস্টিনে এবং এর জনবল তিন হাজারের বেশি। ২০১৯ সালে কোম্পানিটা ৯’শ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি আয় করে। ‘মাইক্রোসফট সিকিউরিটি রেসপন্স সেন্টার’ বলছে যে, সফটওয়্যারের আপডেট করার সময়ই সন্তর্পণে হ্যাকাররা ব্যবহারকারীদের কম্পিউটারে ‘ম্যালওয়্যার’ ঢুকিয়ে দেয়। এরপর এই সুযোগে তারা খুব সম্ভবতঃ ব্যবহারকারীদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতিয়ে নেয়। আপাতঃ ধারণায় বলা হচ্ছে যে, এই সাইবার হামলা খুব সম্ভবতঃ গত মার্চ মাস থেকে শুরু হয়ে মাসের পর মাস ধরে চলেছে। বলা হচ্ছে যে, এটা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচাইতে মারাত্মক সাইবার হামলার মাঝে একটা।

মার্কিন তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক সামরিক ম্যাগাজিন ‘সিফোরআইএসআরনেট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, মার্কিন সরকারি দপ্তরগুলিতে হ্যাকিংএর এই ঘটনার ফলে এটা পরিষ্কার হচ্ছে যে, বেসামরিক সরবরাহকারীদের কাছ থেকে বিভিন্ন সেবার উপর নির্ভরশীল থাকার ফলে প্রতিরক্ষা দপ্তর মারাত্মক ঝুঁকির মাঝে রয়েছে। সরকারি নির্দেশে বিভিন্ন দপ্তরগুলি যখন ‘সোলার উইন্ডস’এর ‘ওরাইয়ন’ সফটওয়্যার ব্যবহার থেকে সড়ে আসছে, তখন সামরিক বাহিনীতে এই সফটওয়্যার ব্যবহারের ফলে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কিনা, তা নিয়ে কেউ মুখ খুলছেন না। মার্কিন সেনা, নৌ, বিমান, ম্যারিন এবং স্পেস, সবগুলি বাহিনীই এই সফটওয়্যার ব্যবহার করে। এছাড়াও পেন্টাগন এবং গোয়েন্দা সংস্থা ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি’ বা ‘এনএসএ’ও এই সফটওয়্যারের ব্যবহারকারী। কি পরিমাণ তথ্য চুরি হয়েছে, অথবা তথ্যের গোপনীয়তা কি পর্যায়ে ছিল, তা এখনই নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছেন না।

হ্যাকাররা কি পেলো?

বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, সবচাইতে চিন্তার বিষয় হলো, সরকারি ইমেইল এবং তথ্য হ্যাকাররা অনেক লম্বা সময়ের জন্যে নাগালের মাঝে পেয়েছিল। ‘কার্নেগি ইন্সটিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’এর সাইবার পলিসি ইনিশিয়েটিভএর ফেলো জন বেইটম্যান মনে করছেন যে, বিশ্বের সবচাইতে শক্তিশালী সংস্থাগুলিকে যখন সবচাইতে শক্তিশালী হ্যাকাররা আক্রমণ করছে, তখন যা বোঝা যাচ্ছে তা হলো, এসব ক্ষেত্রে যথেষ্ট সময় পেলে আক্রমণকারীরাই জয়ী হচ্ছে। এর মাধ্যমে সাইবার নিরাপত্তার সক্ষমতার পরিসীমাটা প্রকাশ পাচ্ছে। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘দ্যা আটলান্টিক কাউন্সিল’এর ‘সাইবার স্টেটক্রাফট ইনিশিয়েটিভ’এর ডিরেক্টর ট্রে হার বলছেন যে, চুরি করা তথ্য হ্যাকারদের কাছে স্বর্ণখনির মতো হবে। মার্কিন সরকারের সিদ্ধান্ত নেবার পদ্ধতিগত দিকগুলি উন্মুক্ত হয়ে যাবে।

‘বিজনেস ইনসাইডার’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ‘এনএসএ’এর প্রাক্তন হ্যাকার ডেভিড কেনেডি বলছেন যে, হ্যাকাররা এতটা কষ্ট করে মার্কিন নেটওয়ার্কের ভেতর এতটা সময় কাটিয়েছে; যার অর্থ হলো, তারা নিশ্চয়ই দামি কিছু পেয়েছে। তিনি বলেন যে, অন্য রাষ্ট্রের ইন্টেলিজেন্স সাধারণতঃ এরকম হ্যাকিংই চায়, কারণ এর মাধ্যমে তারা এমন শক্ত ইন্টেলিজেন্স পায়, যা সাধারণতঃ সহজে পাওয়া যায় না এবং সেই রাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি সম্পর্কেও তারা জানতে পারে।

মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা সম্পর্কিত সাইবার নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক ‘ইন্সটিটিউট ফর টেকনলজি এন্ড সিকিউরিটি’র প্রধান ফিলিপ রেইনার মনে করছেন যে, তৃতীয় পক্ষের লেখা কোডের উপর মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর, ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি এবং সরকারি দপ্তরগুলির ব্যাপক এবং ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীলতা তাদেরকে সর্বদাই বিপদের মাঝে রাখবে। তিনি বলছেন যে, মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের আসলে তৃতীয় পক্ষের তৈরি পণ্য এবং সেবার উপর নির্ভর করা ছাড়া কোন উপায়ই নেই। যারা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কাজ করছে, তারা এটা জানে এবং এটাকে তারা ব্যবহার করছে। এই অবস্থা দিনে দিনে আরও খারাপ হতে থাকবে বলে তিনি মনে করছেন। সাইবার নিরাপত্তা রেটিং এজেন্সি ‘বিটসাইট টেকনলজিস’এর ভাইস প্রেসিডেন্ট জ্যাকব ওলকট বলছেন যে, পুরো সামরিক বাহিনীতে বহু কর্মকান্ডকে এখন ‘সেবা’ হিসেবে দেখা হচ্ছে; মনে করা হচ্ছে যে, এই ‘সেবা’গুলি তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে ক্রয় করা সম্ভব। মার্কিন সিনেটর এঙ্গাস কিং বলছেন যে, তিনি চিন্তা করতেই ভয় পাচ্ছেন যে, কতগুলি কোম্পানি মার্কিন সরকারকে বিভিন্ন পণ্য এবং সার্ভিস বিক্রি করছে। বর্তমানে শুধুমাত্র পেন্টাগনের সাথেই ব্যবসা করছে ৩ লক্ষ কোম্পানি!

যুক্তরাষ্ট্র এখন কি করবে?

নিরাপত্তা ম্যাগাজিন ‘ডিফেন্স ওয়ান’এর এক লেখায় মার্কিন থিংকট্যাঙ্ক ‘ডিফেন্স প্রায়রিটিজ’এর ফেলো বনি ক্রিস্টিয়ান মত দিচ্ছেন যে, নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রধানতম কাজগুলির একটা হওয়া উচিৎ সাইবার নিরাপত্তা। তিনি মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, ২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মার্কিন সরকারের অডিট রিপোর্টগুলি বলছে যে, নিরীক্ষণকারীরা খুব সাধারণ সরঞ্জামাদি ও কৌশল ব্যবহার করেই মার্কিন সামরিক বাহিনীর পরীক্ষাধীন থাকা অস্ত্রগুলির নিয়ন্ত্রণ নিতে পেরেছিল। তিনি বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদকে অন্য দেশের উপর আক্রমণাত্মকভাবে ব্যবহার করে প্রতিশোধমূলক হামলা ডেকে না এনে বাইডেনের উচিৎ হবে নিজেদের সাইবার নিরাপত্তা শক্তিশালী করা।

তবে ১৭ই ডিসেম্বর মার্কিন হবু প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এক বক্তব্যের মাধ্যমে কড়া ভাষায় জানিয়ে দেন যে, তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেবার মুহুর্ত থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের উপর কোন ধরনের হামলা হলে চুপচাপ বসে থাকবেন না। তিনি আরও ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে, সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তিনি সরকারের সকল ক্ষেত্রে সাইবার নিরাপত্তা জোরদার বাধ্যতামূলক করবেন এবং বেসরকারি সরবরাহকারীদের সাথে সম্পর্ক আরও গভীর করা ছাড়াও সাইবার নিরাপত্তায় অবকাঠামো এবং জনবলের পিছনে বিনিয়োগ করবেন। তিনি আরও বলেন যে, তার সরকার এমন ব্যবস্থা নেবে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বীদের পক্ষে এহেন কর্মকান্ড অনেক কঠিন হয়ে যায়। এই কাজগুলি বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র তার বন্ধু দেশগুলির সহায়তা নেবে। মার্কিন ডেমোক্র্যাট সিনেটর মিট রমনি ‘সিএনএন’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে বলে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের উচিৎ শক্ত কিছু বলা। তিনি বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমালোচনা করে বলেন যে, ব্যাপারটা অনেকটা এমন যে, একটা রুশ বোমারু বিমান যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ এবং দেশের রাজধানীর উপর দিয়ে উড়ে গেল; অথচ ট্রাম্প এসময় কিছুই করলেন না। রমনির কথাগুলি বুঝিয়ে দেয় যে, সাইবার নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা ছাড়াও বাইডেনের সরকারের উপর এই সাইবার যুদ্ধে আক্রমণাত্মক ভূমিকা নেবার জন্যে চাপ থাকবে।

পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় নিরাপত্তা এখন নতুন সংজ্ঞা নিচ্ছে। কম্পিউটার এবং সাইবার স্পেস এখন নতুন যুদ্ধক্ষেত্র, যার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলছে ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতা। প্রতিদ্বন্দ্বীর ক্ষয়ক্ষতি করতে এখন অপরের রাজধানী শহরের উপর বোমা ফেলতে হচ্ছে না। শুধু তাই নয়, হামলা যে হয়েছে, সেটা বুঝে উঠতেই লেগে যাচ্ছে মাসের পর মাস। তদুপরি কে এটা করেছে, সেটা নিশ্চিত করে বলা যেমন কঠিন, তেমনি হামলাকারীরা চুরি করা তথ্য কোথায় কিভাবে ব্যবহার করবে, সেটাও অনিশ্চিত থেকে যাচ্ছে। নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন শক্তভাবে ব্যবস্থা নেবার কথা বললেও মার্কিন সরকার যখন বেসরকারি সেবা প্রদানকারীদের উপর নির্ভরশীলতা বাড়াচ্ছে, তখন সরকারের সাথে কাজ করা লাখ লাখ মার্কিন কোম্পানির সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজটা ততটাই কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় এহেন সাইবার সংঘাতের সম্ভাবনা দিনে দিনে বাড়তে থাকবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। হামলার পিছনে সন্দেহভাজন রুশ ইন্টেলিজেন্স এজেন্সিকে নিয়ে কথা হলেও মার্কিন ইন্টেলিজেন্সের হ্যাকিং অপারেশন আলোচনায় আসছে কমই। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় সেন্ট্রিফিউজ ধ্বংস করার পিছনে মার্কিন সাইবার ইন্টেলিজেন্সের হাত ছিল বলে খবরে এসেছে। পাল্টাপাল্টি সাইবার হামলার এই নয়া বিশ্ব ব্যবস্থায় আইনের শাসন একটা কল্পনার বিষয়বস্তু। বিশাল সামরিক বাহিনী এবং সর্বোচ্চ সামরিক বাজেটও ডিজিটাল সম্পদের নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা দিতে সক্ষম নয়। অর্থাৎ শুধুমাত্র অর্থনৈতিক এবং সামরিক শক্তি নয়া বিশ্ব ব্যবস্থায় নেতৃত্ব দেবার জন্যে যথেষ্ট নয়।

Tuesday, 15 December 2020

তুরস্কের উপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা পশ্চিমাদের সাথে তুরস্কের গভীর বিশ্বাসগত পার্থক্যকেই তুলে ধরে

১৫ই ডিসেম্বর ২০২০


২০১৯এর জুলাই। ২০১৬ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের তিন বছরপূর্তিতে রুশ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘এস ৪০০’এর তুরস্কে অবতরণ। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, তুরস্ক এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনেছে ভবিষ্যতের অভ্যুত্থান ঠেকাতে। কিন্তু এই ব্যবস্থা ন্যাটোর অন্যান্য সদস্যরাষ্ট্রের বিমানও টার্গেট করতে সক্ষম; যা তুরস্কের অন্য কোন ক্ষেপণাস্ত্র পারে না।


মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজ ছাড়ার প্রায় শেষ মুহুর্তে এসে গত ১৪ই ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র তুরস্কের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। নিষেধাজ্ঞার মাঝে পড়েছে তুরস্কের প্রতিরক্ষা ক্রয় দপ্তর ‘প্রেসিডেন্সি অব ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিজ’ এবং এর প্রধান ইসমাঈল দেমির সহ মোট চারজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। এর ফলে তুরস্কের এই দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রযুক্তি ক্রয়ের লাইসেন্স পাবে না। একইসাথে উল্লিখিত চারজন কর্মকর্তার যেসকল সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তা আটকে দেয়া ছাড়াও তাদেরকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মাঝে সম্পর্কে যে টানাপোড়েন চলছিল, তার সর্বাগ্রে রয়েছে তুরস্কের রুশ ‘এস ৪০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয়। মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব মাইক পম্পেও এক বিবৃতিতে বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র বহুবার সর্বোচ্চ পর্যায়ে তুরস্ককে জানিয়েছে যে, ‘এস ৪০০’ ক্রয়ের ফলে মার্কিন সামরিক প্রযুক্তি এবং জনবল হুমকির মাঝে পড়বে। একইসাথে তা রুশ প্রতিরক্ষা সেক্টরকে অর্থায়ন করবে এবং তুরস্কের সামরিক বাহিনী এবং সামরিক শিল্পে রাশিয়ার ঢোকার ব্যবস্থা করবে। তিনি বলেন যে, এরপরও তুরস্ক এই বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয় এবং পরীক্ষা করা থেকে বিরত থাকেনি। অথচ ‘এস ৪০০’এর বিকল্প হিসেবে ন্যাটোর নিজস্ব বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল, যা তুরস্কের প্রতিরক্ষার প্রয়োজনীয়তা মেটাতে পারতো। তিনি তুরস্ককে যত দ্রুত সম্ভব এই সমস্যা সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যৌথভাবে কাজ করায় ব্রতী হবার আহ্বান জানান। অপরপক্ষে তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই বিভিন্ন সময়ে স্বীকার করেছেন যে, তুরস্কের ‘এস ৪০০’ কেনার ব্যাপারটার যৌক্তিকতা রয়েছে। একইসাথে বিবৃতিতে বলা হয় যে, তুরস্ক তার সুবিধামত যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের জবাব দেবে। বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের আহ্বানও জানানো হয়। ‘আল জাজিরা’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ট্রাম্প প্রশাসনের শেষ সময়ে পররাষ্ট্রনীতির যে সিদ্ধান্তগুলি আসছে, সেগুলিকে কাঁধে নিয়েই পরবর্তী জো বাইডেন প্রশাসনকে কাজ শুরু করতে হবে।

‘এস ৪০০’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ক্রয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ককে ‘এফ ৩৫’ স্টেলথ যুদ্ধবিমান প্রকল্প থেকে বের করে দেয়। তবে এর পরবর্তীতে আর কোন বড় পদক্ষেপ নেয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্র বিরত থাকে। গত অক্টোবর মাস থেকে তুরস্ক ‘এস ৪০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরীক্ষা শুরু করে। মার্কিন কংগ্রেস থেকে এব্যাপারে আহ্বান করা হয় যে, ‘কাউন্টারিং আমেরিকাস এডভারসারিজ থ্রু স্যাংসন্স এক্ট’ বা সিএএটিএসএ’ বা ‘কাটসা’ আইনের অধীনে তুরস্কের উপরে অবরোধ আরোপ করা হোক। এই আইনের অধীনে মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় এমন কাজের জন্যে যেকোন রাষ্ট্রকে শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা রাখা হয়। যদিও বাইডেনের নির্বাচন জয়ী দল বলে এসেছে যে, তারাও তুরস্কের ‘এস ৪০০’ ক্রয়ের বিরোধী, তথাপি এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র এবং তুরস্কের সম্পর্কের মাঝে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা দেয়ালকে আরও উঁচু করলো।

 
২০১৩ সাল। ভূমধ্যসাগরের ক্রিট দ্বীপে গ্রিস রুশ নির্মিত ‘এস ৩০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরীক্ষা করছে। গ্রিস এবং বলকানের অন্যান্য দেশগুলি রুশ সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করলেও ন্যাটো তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি। মূলতঃ তুরস্কের বিরুদ্ধে ব্যালান্স করে রাখার জন্যেই গ্রিস ‘এস ৩০০’ ক্রয় করেছে, এবং ন্যাটো তা সহ্য করেছে।


তুরস্ক বরাবরই বলে আসছে যে, যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ককে ‘প্যাট্রিয়ট’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিক্রি করতে অস্বীকৃতি জানাবার ফলেই তুরস্ক রুশ ‘এস ৪০০’ ক্রয়ে বাধ্য হয়েছে। তুরস্ক আরও বলে আসছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্রগুলির মাঝেই দ্বিমুখী নীতি নিয়েছে; গ্রিস রুশ নির্মিত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ব্যবহার করলেও তাকে কোন অবরোধের মাঝে পড়তে হয়নি। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, গ্রিক সাইপ্রাস ১৯৯৭ সালে রাশিয়া থেকে দূরপাল্লার ‘এস ৩০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয় করে। পরে তুরস্কের প্রতিবাদের জেরে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাটাকে গ্রিসের ক্রিট দ্বীপে মোতায়েন করা হয়। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে এই ব্যবস্থাকে গ্রিকরা প্রথমবারের মতো পরীক্ষা করে বলে বলছে ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’। ২০১৫ সালে গ্রিস রুশ সহায়তায় এই ব্যবস্থাটার প্রযুক্তিগত উন্নয়ন সাধন করে এবং নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ক্রয় করে। এছাড়াও গ্রিকরা রাশিয়া থেকে ‘টর এম১’ এবং ‘অসা একেএম’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয় করেছে। গত নভেম্বর মাসে তুরস্ক বলে যে, গ্রিস তার রুশ নির্মিত ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ক্রিট দ্বীপে ন্যাটোর মহড়ার মাঝে পরীক্ষা করেছে।

এর আগে গত ১৬ই অক্টোবর তুরস্ক ‘এস ৪০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রথমবারের মতো পরীক্ষা করে। তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগান ব্যাপারটা নিশ্চিত করে বলেন যে, তুরস্ক এই পরীক্ষা চালিয়ে যাবে এবং এই পরীক্ষার জন্যে তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি চাইবে না। অক্টোবরের ‘এস ৪০০’ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার পিছনে ক্রিট দ্বীপে ফ্রান্স এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের যুদ্ধবিমান মোতায়েনকে কারণ হিসেবে দেখায় তুরস্ক। তুরস্কের সেই পরীক্ষার প্রায় দু’মাস পর যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থা গ্রহণ করলো। অক্টোবরে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের মুখপাত্র জনাথন হফম্যান বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তুরস্কের সম্ভাব্য এই পরীক্ষার খবর এসেছে। যদি এটা সত্যি হয়, তাহলে প্রতিরক্ষা দপ্তর এর কড়া প্রতিবাদ জানাবে।

 

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ বা ‘সিএসআইএস’এর এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, ২০১৬ সালের জুলাই মাসে তুরস্কে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার সময় ‘এফ ১৬’ যুদ্ধবিমান দ্বারা পার্লামেন্ট ভবন এবং প্রেসিডেন্টের বিমান আক্রান্ত হলেও তুর্কি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সেই বিমানগুলিকে টার্গেট করতে পারেনি। এই ব্যবস্থাটা ন্যাটোর তৈরি করা; যার মাধ্যমে এটা নিশ্চিত হয় যে ন্যাটোর একটা সামরিক সরঞ্জাম অপরটার উপর হামলা করবে না। এরদোগান হয়তো ‘এস ৪০০’ ক্রয়ের মাধ্যমে আরেকটা অভ্যুত্থানই প্রতিরোধ করতে চাইছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, গ্রিস কেন ‘এস ৩০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনেছে রাশিয়ার কাছ থেকে? ‘সিএসআইএস’ অবশ্য এব্যাপারে কোন বিশ্লেষণ দেয়নি।

গ্রিস ছাড়াও পূর্ব ইউরোপের বেশ কিছু দেশ ব্যাপকভাবে রুশ অস্ত্র ব্যবহার করে থাকে। চেক রিপাবলিক, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া এবং স্লোভাকিয়া এখনও রুশ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। গ্রিস এবং তুরস্কের রুশ সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহারের ক্ষেত্রে পশ্চিমাদের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির উত্তর পাওয়া যাবে অত্র অঞ্চলের ইতিহাসের দিকে। পূর্ব ইউরোপের বলকান অঞ্চলের বেশিরভাগ দেশই একসময় ইস্তাম্বুলের উসমানি খিলাফতের অধীনে ছিল। রাশিয়া, অস্ট্রিয়া হাঙ্গেরি, ব্রিটেন, ফ্রান্স, এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশ চার শতক ধরে যুদ্ধ করে উসমানিদের কাছ থেকে বলকান অঞ্চল ছিনিয়ে নেয় এবং সেখানে অনেকগুলি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। ইউরোপ এবং রাশিয়ার মাঝে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা থাকলেও সকলেই ইসলামের ঝান্ডাবাহী উসমানি খিলাফতের বিরুদ্ধে কাজ করেছে। বলকানে তৈরি করা রাষ্ট্রগুলির মাঝে রয়েছে গ্রিস, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া, হাঙ্গেরি, সার্বিয়া, বসনিয়া, আলবেনিয়া, স্লোভেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, মেসিডোনিয়া, মন্টিনেগ্রো, কসোভো। এই দেশগুলির বেশিরভাগ জনগণ বিশ্বাসগত দিক থেকে ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চের অনুসারী হবার কারণে রাশিয়ার চার্চের সাথে তাদের গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। একারণেই পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলি বলকানে তাদের প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে সাবধানে এগিয়েছে; অনেক ক্ষেত্রে ছাড়ও দিয়েছে। রুশ অস্ত্র ব্যবহারে ছাড় দেয়াটাও এই দেশগুলিকে ন্যাটোর অংশ করে নেবার নীতির অংশ ছিল।

সাইপ্রাস নিয়ে ১৯৭০এর দশক থেকেই গ্রিস এবং তুরস্কের দ্বন্দ্ব চলছে। গ্রিস এবং তুরস্ক উভয়েই ন্যাটোর তৈরি সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে; যার একটা অপরটাকে টার্গেট করতে পারবে না। মূলতঃ ন্যাটোর তৈরি তুর্কি বিমানগুলিকে টার্গেট করার জন্যেই গ্রিস ‘এস ৩০০’ কিনেছে রাশিয়ার কাছ থেকে। অর্থাৎ রুশ ক্ষেপণাস্ত্রগুলি গ্রিসের জন্যে তুরস্কের বিরুদ্ধে রক্ষাকবচ। আর একারণেই ন্যাটো গ্রিসের সাথে রাশিয়ার বহু বছরের সামরিক সম্পর্ককে সহ্য করে চলছে। গ্রিসের সামরিক বাহিনীতে রুশ নির্মিত ক্ষেপণাস্ত্রগুলিকে ন্যাটো হুমকি মনে না করলেও তুর্কি বাহিনীতে রুশ ক্ষেপণাস্ত্রকে ন্যাটো হুমকি হিসেবে দেখছে। এই দ্বিমুখী নীতি মূলতঃ কয়েক শতক ধরে চলে আসা চিন্তারই ফলাফল; যার মাঝ দিয়ে ইস্তাম্বুলকে রুশ এবং পশ্চিমারা কেউই বন্ধু হিসেবে নেয়নি। রুশ ‘এস ৪০০’ ক্রয়ের জন্যে তুরস্কের উপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা দেখিয়ে দেয় যে, আঙ্কারার সেকুলার নেতৃত্বের মাঝেও পশ্চিমারা উসমানি খিলাফতের ছায়াই দেখতে পাচ্ছে। তুরস্ক হয়তো নিজস্ব সামরিক শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তির উপর তার নির্ভরশীলতা বহুলাংশেই কমিয়ে ফেলতে পারবে; কিন্তু তুর্কিদের মুসলিম পরিচয়ের ব্যাপারে পশ্চিমাদের কয়েক’শ বছরের অস্বস্তি যে মুছে ফেলতে পারবে না, তা নিশ্চিত।

Saturday, 12 December 2020

ইউক্রেনের সাথে তুরস্কের কৌশলগত সহযোগিতার ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব

১৩ই ডিসেম্বর ২০২০
ককেশাস এবং লিবিয়াতে তুর্কি সহায়তায় আজেরি এবং লিবিয়দের সাফল্য ইউক্রেনিয়ানদের ডনবাসে সফলতা পাবার আকাংক্ষা যুগিয়েছে। তবে ককেশাসের বাস্তবতা যেমন রাশিয়াকে নিরপেক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল, তা ডনবাসের ক্ষেত্রেও একই ফলাফল দেবে, তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছে না। তবে এটা নিশ্চিত যে, ককেশাস এবং লিবিয়ার যুদ্ধ ইউক্রেনকে সহায়তা দেবার ক্ষেত্রে তুরস্ককে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।


গত ২৭শে নভেম্বর ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিমিত্র কুলেবা তুরস্কের সরকারি বার্তা সংস্থা ‘আনাদোলু এজেন্সি’কে দেয়া এক সাক্ষাতে বলেন যে, তুরস্কের সাথে তার দেশের সম্পর্ক এখন সবচাইতে ভালো। দুই দেশের মাঝে বোঝাপড়া, নেতৃত্বের সমঝোতা এবং যৌথ প্রকল্পের ঝুড়ি নিয়ে খুশি হবার কারণ রয়েছে। তিনি আরও বলেন যে, দুই দেশের মাঝে ভালো সম্পর্ক শুধু তাদের দ্বিপাক্ষিক দিক থেকেই ভালো তা নয়; পুরো অঞ্চলের জন্যেও তা ভালো। ইউক্রেন এই সম্পর্কে তার বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে থাকবে বলে বলেন তিনি। ইউক্রেনের সাথে তুরস্কের সুসম্পর্কের এই কথাগুলি এমন সময়ে আসছে, যখন বিভিন্ন আঞ্চলিক ইস্যুতে তুরস্কের সাথে রাশিয়া, গ্রিস, ফ্রান্স, মিশর, ইরান এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। মাত্র কিছুদিন আগেই ককেশাসে তুর্কি সমর্থনে নাগোর্নো কারাবাখে আর্মেনিয়ার বিরুদ্ধে আজেরবাইজান একটা সামরিক জয় ঘরে তুলে নিয়েছে। এর আগে তুর্কি সমর্থনে লিবিয়ার ত্রিপোলি সরকারও জেনারেল হাফতারের বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এছাড়াও পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের হাইড্রোকার্বন অনুসন্ধান নিয়ে গ্রিসের সাথে বিরোধ এবং সিরিয়াতে তুর্কি সামরিক হস্তক্ষেপের ফলে রাশিয়া এবং ইরানের সাথে বিরোধ আঞ্চলিক ভূরাজনীতিকে উত্তপ্ত রেখেছে। তদুপরি এই প্রতিটা ইস্যুতেই ভূমধ্যসাগরে প্রভাব বিস্তারের খেলায় ফ্রান্সের সাথে তুরস্কের বিরোধ চরমে উঠেছে। লিবিয়ার ত্রিপোলি সরকারের জন্যে তুর্কি সামরিক সহায়তা বন্ধ করতে ইউরোপিয় ইউনিয়নের নৌ অবরোধ নিয়েও তুরস্কের সাথে ইউরোপের বিরোধ চলছে; তুরস্কের উপরও অবরোধ আরোপের ব্যাপারে কথা চলছে। এরূপ পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের সাথে তুরস্কের কৌশলগত সম্পর্কোন্নয়নের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব কতটুকু?

২০১৫ সালে ইউক্রেনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পেত্রো পরোশেঙ্কোর সময়ে ইউক্রেন তুরস্কের সাথে বেশ কয়েকটা সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর করে। ২০১৮ সালে ৬৯ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ইউক্রেন তুরস্কের কাছ থেকে ৬টা ‘বায়রাকতার টিবি২’ ড্রোন এবং ২’শ ক্ষেপণাস্ত্র ক্রয় করে। ২০১৯ সাল থেকেই ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী এই ড্রোনগুলিকে নিয়ে ব্যাপক পরীক্ষা চালাচ্ছে। নতুন প্রেসিডেন্ট ভলদিমির জেলেন্সস্কিও তুরস্কের সাথে গত ফেব্রুয়ারিতে এবং অক্টোবর মাসে তার তুরস্ক সফরের সময় সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর করেন। নভেম্বরে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর প্রধান রুসলান খোমচাক ঘোষণা দেন যে, ২০২১ সালে ইউক্রেন আরও ৫টা ‘বায়রাকতার’ ড্রোন কেনার পরিকল্পনা করছে। এছাড়াও তুর্কি কোম্পানি ‘বায়কার মাকিনা’র সাথে যৌথ উদ্যোগে ইউক্রেন নিজেদের কারখানায় ৪৮টা ‘বায়রাকতার টিবি২’ ড্রোন তৈরি করতে চাইছে। রুশ মিডিয়া ‘আরআইএ নভোস্তি’ বলছে যে, ককেশাসে ড্রোন ব্যবহারে আজেরিদের ব্যাপক সাফল্য ইউক্রেনের সামরিক নেতৃবৃন্দের কাছে উদাহরণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। ডনবাসের রুশ সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীরা নতুন করে ইউক্রেনের সামরিক হামলার আশঙ্কা করছে। ২রা ডিসেম্বর থেকে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী মার্কিন ‘এমকিউ ৯’ ড্রোনের সাথে যৌথ সামরিক মহড়া শুরু করেছে। কিছু রুশ মিডিয়া এও দাবি করছে যে, ইউক্রেন এবং তুরস্ক যৌথভাবে ক্রিমিয়া এবং ডনবাস পুনর্দখল করতে চাইছে। 

রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সমর্থন অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা বেশি থাকায় ইউক্রেন এবং তুরস্কের নিরাপত্তা সহযোগিতা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তুরস্কের সম্পর্ককে স্থিতাবস্থায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একইসাথে ইউক্রেনের ইঞ্জিন নির্মাণ প্রযুক্তি তুরস্ককে তার কৌশলগত দুর্বলতাগুলিকে কাটিয়ে উঠতে সহায়তা দিতে পারে। এই ব্যাপারগুলি ২০২১ সালে তুরস্কের ভূরাজনৈতিক আকাংক্ষা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হতে পারে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক পত্রিকা ‘আল মনিটর’এর এক লেখায় ফেহিম তেস্তেকিন প্রশ্ন করছেন যে, তুর্কি সহায়তা নিয়ে ইউক্রেন রাশিয়ার কাছ থেকে ডনবাস পুনর্দখল করতে পারবে কিনা। তুরস্ক সফরের সময় ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিমিত্র কুলেবা বলেন যে, তার দেশ চাইছে রুশ অধিকৃত ক্রিমিয়া উপদ্বীপ ইস্যুতে তুরস্ক নেতৃস্থানীয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হোক। তেস্তেকিন মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, কৃষ্ণ সাগরীয় অঞ্চলে রাশিয়াকে ব্যালান্স করতে ইউক্রেনের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন মূলতঃ ন্যাটোর কৌশল। প্রাকৃতিক গ্যাস এবং ‘এস ৪০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আমদানির ব্যাপারে তুরস্ক রাশিয়ার সাথে ভালো সম্পর্ক রেখে চললেও রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখল করে নেয়াটা তুরস্ক মেনে নিতে পারেনি কখনোই। ইউক্রেনের সাথে রাশিয়ার দ্বন্দ্বই প্রকৃতপক্ষে তুরস্কের সাথে ইউক্রেনের নিরাপত্তা সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন যে, সিরিয়া এবং লিবিয়াতে রাশিয়া যেহেতু তুরস্কের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল, হয়তো সেকারণেই তুরস্ক রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনকে শক্তিশালী দেখতে চাইছে। তবে ককেশাসের যুদ্ধে রাশিয়া সরাসরি হস্তক্ষেপ না করলেও ডনবাসের ব্যাপারটা আলাদা; কারণ ডনবাস রাশিয়ার সীমানার উপর অবস্থিত।

ইউক্রেনের সাথে তুর্কি সামরিক সহযোগিতা শুধু একমুখী নয়। সোভিয়েত সময় থেকে ইউক্রেন বেশকিছু প্রযুক্তির মালিক হয়েছে, যা তুর্কিরা বেশ গুরুত্ব সহকারে নিচ্ছে। ইঞ্জিন প্রযুক্তিতে তুরস্ক এখনও পশ্চিমা দেশগুলির উপর নির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি; যার ফলশ্রুতিতে তুরস্ক তার ভূরাজনৈতিক আকাংক্ষা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে পশ্চিমা অবরোধের হুমকিতে পড়ছে। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘জেমসটাউন ফাউন্ডেশন’এর এক লেখায় তুর্কি বিশ্লেষক ক্যান কাসাপোগলু মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, তুরস্কের ‘বায়কার মাকিনা’র তৈরি নতুন বৃহদাকৃতির ড্রোন ‘আকিনচি’তে খুব সম্ভবতঃ ইউক্রেনে তৈরি ‘ইভচেঙ্কো প্রগ্রেস এএল ৪৫০টি’ ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে। অপরদিকে ‘ডিফেন্স নিউজ’ বলছে যে, বিমানের ইঞ্জিন ডেভেলপ এবং তৈরি করার ক্ষেত্রে দুই দেশের মাঝে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সহযোগিতা দেখা যাচ্ছে। তুর্কি থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘সিফোর ডিফেন্স’এর বিশ্লেষক ওজগুর একসি বলছেন যে, ইউক্রেনের কাছে এমন কিছু প্রযুক্তি রয়েছে, যা তুরস্কের জন্যে জরুরি দরকার। তুরস্কের ‘গেজগিন’ ক্রুজ মিসাইলে ব্যবহৃত হচ্ছে ইউক্রেনের ‘ইভচেঙ্কো প্রগ্রেস এএল ৩৫’ ইঞ্জিন। ‘গেজগিন’ হলো মার্কিন ‘টোমাহক’ ক্রুজ মিসাইলের আদলে তৈরি তুর্কি মিসাইল, যা পাল্লা হবে প্রায় ১ হাজার কিঃমিঃ।

ককেশাস এবং লিবিয়াতে তুর্কি সহায়তায় আজেরি এবং লিবিয়দের সাফল্য ইউক্রেনিয়ানদের ডনবাসে সফলতা পাবার আকাংক্ষা যুগিয়েছে। তবে ককেশাসের বাস্তবতা যেমন রাশিয়াকে নিরপেক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল, তা ডনবাসের ক্ষেত্রেও একই ফলাফল দেবে, তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছে না। তবে এটা নিশ্চিত যে, ককেশাস এবং লিবিয়ার যুদ্ধ ইউক্রেনকে সহায়তা দেবার ক্ষেত্রে তুরস্ককে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। অপরদিকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সমর্থন অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা বেশি থাকায় ইউক্রেন এবং তুরস্কের নিরাপত্তা সহযোগিতা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তুরস্কের সম্পর্ককে স্থিতাবস্থায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একইসাথে ইউক্রেনের ইঞ্জিন নির্মাণ প্রযুক্তি তুরস্ককে তার কৌশলগত দুর্বলতাগুলিকে কাটিয়ে উঠতে সহায়তা দিতে পারে। এই ব্যাপারগুলি ২০২১ সালে তুরস্কের ভূরাজনৈতিক আকাংক্ষা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হতে পারে।